Tag: ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে

  • সম্প্রতি বদরুদ্দিন উমর সাহেব ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে

    সম্প্রতি বদরুদ্দিন উমর সাহেব ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৫ এপ্রিল ২০২৫
    https://wp.me/p1sCvy-6qi

     

     

     

     

    [বদরুদ্দিন উমর আমাদের প্রবীন রাজনীতিবিদের মধ্যে অন্যতম যাকে আলাদা করে চেনা যায়।  এখন ৯৪ বছরের উর্ধে তাঁর বয়স। ৫ আগষ্ট-উত্তর মানে, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি উত্তরকালের এসময়ে, গত দুদিন আগে ২২ এপ্রিল ২০২৫ তার এক সাক্ষাৎকার ছেপেছে প্রথম আলো। সেখানে পরিচিতি অংশে লিখেছে, …”বদরুদ্দীন উমর লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক। ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পিপিই ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন”……”তিনি (উমর সাহেব প্রথম আলোতে) কথা বলেন চলতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়া নতুন দল, অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে“। আমি প্রথম আলোর সেই পরিচিতিটাই এখানে তুলে দিলাম। এই পরিচয়টা সম্ভবত উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া। সেখানেই উমর সাহেবের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে লেখা রয়েছে যে তিনি “একজন বাংলাদেশি মার্কসবাদী–লেনিনবাদী তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক সক্রিয়তাবাদী, ইতিহাসবিদ, লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (উমর)-এর নেতা”। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে উমর সাহেব হলেন ষাটের দশকে প্রথম্ভাগে (১৯৬৪) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন মস্কো-পিকিংয়ে ভাগ হয়ে গেলে তিনি পিকিং ধারার অংশে পড়েন। যেটা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে মো. তোয়াহা গ্রুপের অংশের আর সেটাও তিনি সম্ভবত ত্যাগ করে নিজের ধারা গড়েন ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময়কালের ভিতরেই। পেশা এবং কর্মততপরতা দিক থেকে দেখলে তিনি মূলত একাদেমিক রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশে প্রকাশিত ইতিহাস-বিষয়ক বই-পুস্তকের একটা বড় অংশ জুড়ে তাই তাঁরই রচনা।  এখন যাদের বয়েস ২০ বছরের উপরে সেই প্রজন্মের কাছে তাঁর নুন্যতম কিছু পরিচয় করিয়ে দিতে আমার লেখার প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে খুবই অল্প কিছু কথা লিখলাম।]

    আমার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে পড়াশুনা শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে তখনকার প্রকাশনা জগতে পাওয়া তার লেখা বই পাঠের মধ্য দিয়ে।  আগেই বলেছি প্রথম আলোতে এই সাক্ষাতকারে তিনি চলতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়া নতুন দল, অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন।  তার সেসব কথা বলায় আরেক রেলেভেন্সি বা গভীর সংশ্লিষ্টতা দিকটা হল, হাসিনার উন্মাদপ্রায় হয়ে নিজ কথিত বাবার ইতিহাস জোর করে লিখবার একটা গভীর ঝোঁক ছিল যা থেকে তৈরি বিশৃঙ্খলায় আমরা সকলেই অস্বস্তি অনুভব করেছি। যেমন  তা্র একটা হল যেমন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভাষা আন্দোলনও শেখ মুজিবই করেছেন বলে হাসিনার দাবি ও সেভাবে নয়া ইতিহাস রচনার চেষ্টা। যেটা সেসময়ের ঘটনাবলী নিয়ে প্রত্যক্ষ গবেষক হিসাবে সেই অথরিটিতে উমর সাহেব নিয়মিতভাবে হাসিনার দাবির বিরোধিতা ও নাকচ করে গেছেন সাহসের সঙ্গে!  তাই অনুমান করি হাসিনা উতখাতের পরে এটা তারও একটা অর্জন তো বটেই। অন্তত সেই উতপাত তাঁকে বা আমাদেরকে আর মুখোমুখি হতে হবে না এটাই শান্তি!

    রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ানে পরিভাষাঃ
    প্রত্যেক দেশেই রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের লিখিত ইতিহাসের বয়ান ভাষ্যে শব্দ বা পরিভাষা [Terminology] তৈরি হয়ে যায় যেটার সহসা বদল হয় না। যদিও লম্বা সময় পরে  নয়া পরিভাষা তৈরি হয়েও যেতে পারে’ বাংলাদেশে হয়েছেও বলে আমার ধারণা। যেমন আমার কথাই যদি বলি উমর সাহেবদের প্রজন্ম আমার চেয়েও কমপক্ষে ৩০ বছরের সিনিয়র; কিন্তু আমি তাদের প্রজন্মের পরিভাষা সম্পর্কে পরিচিত যদিও এই আমি আবার পরবর্তি প্রজন্মের পরিভাষা সম্পর্কেও পরিচিত।  যেমন একটা উদাহরণ যদি দেই উমর সাহেবের প্রজন্ম – ব্যবহার করতে ভালবাসেন – “সামাজিক বিপ্লব” শব্দটা। মানে বিপ্লব মানেই একে সামাজিক [social] বিপ্লব বলে তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে লিখে থাকেন। আর একালে আমাদের ধারণা, বিপ্লব বলতে তা তো আসলে এসেনসিয়ালি পলিটিক্যাল রেভেলিউশনই (রাজনৈতিক বিপ্লবই)। যদিও যেকোন রাজনৈতিক বিপ্লবই এরপরে এর প্রভাবে পরে আনুসাঙ্গিক আরো অন্যান্য সামাজিক নানা বিপ্লবও ঘটাবে অবশ্যই!

    এখানে আম পাঠকের জন্যও একটু জানায় রাখি যে বিপ্লব বলতে ঠিক কী বুঝব? আমার বুঝাবুঝিতে বললে প্রথম মনোযোগ জড়ো করতে হবে যেখানে তা হল, ইভোলিউশন [evolution] আর রিভোলিউশন[revolution] সম্পর্কে। প্রথমটা মানে হল, কর্তা মানুষ [subjective] যা করে নাই; মানে, প্রাকৃতিকভাবে বা নেচারালি যা ঘটেছে। এই অর্থে এটা অবজেক্টিভলি [objectively] ঘটা ঘটনাও বলা যেতে পারে। দুনিয়ার সব প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ঘটনাবলী ঘুর্ণঝড়, জলোচ্ছাস, ভুমিকম্প এর মত ঘটনাবলী যেগুলা ওসবই  ইভোলিউশন এর ঘটনা বলা যায়। আর এর বিপরীতে কর্তা মানুষ যেসব পরিবর্তনকে আর প্রাকৃতিক থাকতে দেয় নাই, ঘটনায় মানুষ-কর্তা সক্রিয় হাত ঢুকিয়ে পরিবর্তনে প্রভাব ঘটিয়েছে, নতুন মাত্রা দিয়েছে, জোর খাটিয়ে সুনির্দিষ্ট ডিরেকশনে পাঠিয়েছে, পুরানা অভিজ্ঞতায় জেনে-বুঝে যা বুঝেছে ঘটিয়েছে – এটাই হল রিভোলিউশন। তাই রিভোলিউশন মানেই যেখানে সচেতন কর্তা মানুষ হাজির আছে। আর তিনিই বিপ্লবী তা, বলাই বাহুল্য!

    এরপর আরেকটা পরিভাষাঃ পলিটিক্যাল বা পলিটিক্স মানে কী? ঠিক কী বুঝব?
    মানুষ হিসাবে আমরা অনেক কিছু করি, বিশেষত পরিচয় দেই বা পুর্বনির্ধারিত কারণ বা পরিচয়-বৈশিষ্টগত কারণে তা করে থাকি। যেমন, আমাদের প্রজাতিগত বা রেস [race] পরিচয় য়াছে অথবা পরবর্তি ইতিহাসে মানে মানুষের প্রথম কৃষিকাজ শিখে ফেলার পরের কোন ভুপ্রাকৃতিক-অঞ্চলে স্থির হয়ে বসবাস শুরুর পরের হাজার বছরের মধ্যে আমাদের একটা নয়া এথনিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্থায়ী পরিচয়-বৈশিষ্ট লাভ করা হয়ে যায়। মজার কথা হল এই পরিচয় বা বৈশিষ্টগুলো মানুষের জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। মানে যেমন আমি মুসলমান বা বাঙালি হব কিনা এটা আমি ঠিক করি নাই, চয়েজ করি নাই, এতে আমার কোনই ভুমিকা নাই, ছিল না। বরং আমি যে ঘরে জন্ম নিয়েছি, যে পিতামাতার ঘরে ও তাদের রক্ত বা ডিএনএ-তে আর তাদের যে এথনিক পরিচয়ের মধ্যের আমার জন্ম – এতে আমার জন্মের পরে আমার রেসিয়াল-এথনিক-ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সব পরিচয় কী দাঁড়াবে তা এসবের মধ্য দিয়ে আমার জন্মের আগেই ঠিক হয়ে গেছে।  সবচেয়ে বড়কথা এতে আমার নিজের কোন সক্রিয় ভুমিকা নাই, ছিল না।
    আর ঠিকএর বিপরীতে পলিটিক্স, পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক পরিচয় হল সেটা যেটা আমি নিজেই এবং সচেতনে জেনে-বুঝে কোথায় যাব বা পৌছাবো তা জেনেই তৈরি করেছি। মানুষের  জন্মের থেকে নির্ধারিত রেসিয়াল বা এথনিক বৈশিষ্টকে যদি বলি গিভেন [ GIVEN বা আগে থেকেই দেয়া আছে] বৈশিষ্ট-পরিচয় তাহলে এর বিপরীতে, পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট মানে হল যা মানুষ নিজেই এবং সচেতন [conciousness] ও সক্রিয় [active] ভাবে নিজেই নিজেকে নির্মাণ করে নেয়  – গিভেন যা আছে তা আছে এর বাইরে; কিন্তু এসবের উপর ভরসা না করে।  বা তার প্রভাবের কারণে নয় নিজ সক্রিয়তায় মানুষ যা নির্মাণ করে সেটাই মানুষের পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট। আর মানুষের পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট মানেই তাই  মানুষের নিজ পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট। নিজে নির্মিত।  এবং মানুষের পলিটিক্যাল এক্টিভিটি এটাই পলিটিক্স বা রাজনীতি।  রাজনৈতিক ততপরতা।

    এই ফাঁকে সুযোগ নেই একটু। তাহলে পলিটি [polity] কী?
    এর সোজা অর্থ পলিটিক্যাল কমিউনিটি।মানে? মানে হল, একটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি গড়ে নিজেদের পলিটিপ্রকাশ করা করে নিতে পারি আমরা।  অনেকে অবশ্য এই পলিটি শব্দের [polity] বাংলা করে রাজনৈতিকতা।
    সেটা আবার কেমন?
    যেমন,  পলিটিক্স মানে আবার কিন্তু আইডিয়া [idea]। অনেকে এটাকে সিরিয়াস অর্থে “ভাব বা গভীর ভাব” বলে। মানে এটা আবার “ভাব দেখানো” নয় কিন্তু।  আমি এরচেয়ে বরং আরেকটা ভাল বাংলা শব্দ আছে; যা ব্যবহারে অনেকেই সাহস করে না, নিশ্চিত না বলে সে শব্দটা হল “চিন্তা”। ইংরাজিতে আইডিয়া মানে হল চিন্তা। অর্থাৎ ফিলসফি-ক্যালী বা দার্শনিক অর্থের দিক থেকে,  পলিটিক্স মানে হল “চিন্তা“।

    তা হলে এবার পলিটি বা রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়া বা হয়ে উঠা বলতে ঠিক কী বুঝব?
    বুঝব যেঃ রাজনীতি বা পলিটিক্স – এই কাজ একা করা যায় না। রাজনৈতিক বৈশিষ্টের অধিকারীরা ( আমাদের সব গিভেন বৈশিষ্ট পাশে ফেলে রেখে) আমরা একা একাজ করতে পারি না। সমাজ বা কমিউনিটিতে চর্চা করে হতে হয়।  এখন সারা সমাজে যখন সচেতন ও সক্রিয় মানুষেরা  ততপরতায়  চর্চায় (সব ‘গিভেন’ বৈশিষ্ট পিছনে ফেলে রেখে) এক পলিটিক্যাল কমিউনিটিতে নিজেদের হাজির করে ফেলতে সক্ষম হয় – এটাই পলিটি কায়েম করা বা হয়ে উঠা।

    কিন্তু এখন এই পলিটি কোন কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? এর দরকারটা কি?
    উলটা করে জবাব দিবার সুযোগ নিব। রাষ্ট্র মানে আসলে জনগণের রাষ্ট্র মানেই, রিপাবলিক রাষ্ট্র [কিন্তু এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-পরিক্রমার বাইরের ঘটনা]। এই রাষ্ট্রচিন্তার স্ফুরণ – গ্লোবাল ইতিহাসে দেখলে, এটা মানুষের মধ্যে এসেছিল ১৬৫০ সালের দিকে বা এরপরে এবং ইউরোপে (আমেরিকাতেও নয়)। আর এটা নিজেকে নুন্যতম পরিশুদ্ধ, অসংলগ্নতা কাটিয়ে আর সৎ বা ন্যয়সম্মত -উপস্থাপনে হাজির হতে হতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪৫) পার হয়ে যায়। সে যাই হোক, এমন রিপাবলিক রাষ্ট্র মানেই সেখানে আবার কনষ্টিটিউশন বলে কিছু একটা থাকতেই হবে। এখন  কনষ্টিটিউশন [constitution]  শব্দের রুট শব্দটা হল কনষ্টিটিউট [constitute]। এর বাংলা করতে পারি গঠন– নিজেদেরকে গঠন করা – গঠিত করে নেয়া – এটাই সংগঠিত [organise] করে নেয়া অর্থে।  আর এটাই পলিটি বা পলিটিক্যাল কমিউনিটিতে নিজেদের গঠন বা কনস্টিটিউট করে নেয়া। যার আউটকাম বা ফলাফল হল একটা কনষ্টিটিউশন এর জন্ম দেয়া। এটা এক অর্থে পলিটি বা পলিটিক্যাল কমিউনিটির পরস্পরের সাথে চুক্তি বা বোঝাপড়া (আন্ডারস্টান্ডিং) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া যেমন এই যে আমরা এই এই জিনিষ মানুষের অধিকার মনে করি এবং আমরা সেটা রক্ষার্থে পরস্পর পরস্পরের পাশে এসে দাড়াবোই; এরকম। তাহলে সারকথায় একটা জনগণের রাষ্ট্র তখন কায়েম হবে ও কাজ করতে পারবে যখন ওর পিছনে একটা পলিটিবা পলিটিক্যাল কমিউনিটি আগেই গড়ে নিয়ে খাড়া হয়ে আছে।  তাই ঐ রাষ্ট্রে আমাদেরকে কনষ্টিটিউট বা গঠন করামানে সেটাই একটা কনষ্টিটিউশন জন্ম দিয়ে ফেলা  –  এভাবে এগুলা সব আসলে একই কথা।

    এখন আসবো প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নঃ
    উপরে লেখার শিরোনাম বলছে এটা বদরুদ্দিন উমরের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে কোন রচনা; তাহলে সেসব কোথায়? আর এতক্ষণ যা লিখলাম সেসবের সাথে এর সম্পর্ক কী?

    সেদিকে এখন যাব। তবে সবার আগে বদরুদ্দিন উমর সাহেব কে গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে শুরু করতে চাই। তিনি আমাদের মুরুব্বি, আমাদের অগ্রজ – আমার থেকেও যদি বিচার করি তাহলেও তিনি আমার চেয়ে ৩০ বছরের পুর্ব-প্রজন্ম! ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে গিয়ে একালে বসে ভিন্নভাবে দেখে কিছু কথা এখানে তুলবো এই ভরসা যে তিনি আমাকে পাশে এক ভিন্ন একালের দৃষ্টিভঙ্গি বলে জায়গা দিবেন, বেয়াদবি নিবেন না।

    যেমন ধরেন,  উমর সাহেব এই সাক্ষাতকারে প্রথমেই বলছেন, “…… এই যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, এটা তো কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়, যদিও এর মধ্য দিয়ে একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে”।
    পাঠক লক্ষ্য করবেন এই সামাজিক বিপ্লব বলা – [মানে রাজনৈতিক বিপ্লব না বলে, এটা তাদের প্রজন্মের কথা বলার রেওয়াজ। তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে বিপ্লব মানেই সেটাকে সামাজিক বিপ্লব বলে লিখে থাকেন।] আর একালে আমাদের ধারণা, বিপ্লব বলতে তা তো আসলে এসেনসিয়ালি পলিটিক্যাল রেভেলিউশনই (রাজনৈতিক বিপ্লবই)। যদিও যেকোন রাজনৈতিক বিপ্লবই এরপরে এর প্রভাবে প্রায় সবখানেই এর আনুসাঙ্গিক সামাজিক নানান দিকে বিপ্লবও ঘটাবে, অবশ্যই। আর সেসব থেকে এটা সামাজিক বিপ্লবও ঘটেছে পরে তা বলা যাবে। তবে প্রথমে যেটা ঘটবে বা ঘটে থাকে সেটা রাজনৈতিক বিপ্লব। তবু উনারা ব্যাপারটাকে  সামাজিক বিপ্লব এভারেই বলে থাকেন। আসলে এটা হল তাদের আকাঙ্খায় যেটা কমিউনিস্ট বিপ্লব সেটাই বুঝাতে চান। বা তা না হলেও একটা প্রগতিশীল বিপ্লব এমন কিছু একটা। আর সেই তুলনায় আগষ্ট ২০২৪ সালে হাসিনার উতখাত এটা তার বিপ্লব বলে যে আকাঙ্খার নামকরণ এর  ধারেকাছের কিছু নয় বলেই তারা মনে করে থাকেন। তবে তিনি খুবই পরিস্কার নিজের আকাঙ্খা মত তা না হলেও এটাকে তিনি অর্জন মানেন।  তাই কোন কার্পন্য না করে তিনি বলছেন, .“…..একটা নিষ্ঠুর ফ্যাসিস্ট সরকার অক্টোপাসের মতো দেশকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেটা উৎখাত হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের এটা একটা খুব বড় অর্জন”।

    আবার এরপরের প্যারায় নিজের আকাঙ্খার দিকে নজর ফিরাচ্ছেন। বলছেন, “…কিন্তু এই সংগ্রামের তো কোনো শ্রেণি–পরিচয় নেই, এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না। একটা রিগ্রেসিভ (নিপীড়নমূলক) সরকারকে ফেলে দিয়েছে এই অভ্যুত্থান। যারা ফেলে দিয়েছে, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না। যারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই ছাত্রদের মধ্যে তত্ত্বগত বোঝাপড়া খুব একটা আছে, সেটাও দেখা যাচ্ছে না”।

    আসলে তিনি বলতে চাইছেন, ছাত্রদের মাথায় কমিউনিস্ট চিন্তা নাই। এখানে বলে রাখি, উমর সাহেবদের প্রজন্ম  বিপ্লব মানে তাদের সামাজিক বিপ্লব মানেই কিন্তু তা কমিউনিস্ট বিপ্লব! এভাবে একমাত্র বলে বুঝে থাকেন।  তাও আবার সেটা শ্রেণী সংগ্রামের হতে হবে, রাজনৈতিক (কমিউনিস্ট) তাত্বিক ভিত্তির হতেই হবে। এছাড়াও – এতে  শ্রেণীর পরিচয় থাকতে হবে ইত্যাদি।
    আসলে এগুলো হচ্ছে তাদের মাথায় গেথে বসে থাকা একটা বিপ্লবী ছক বা ইমেজ, যেটা একটা ইমাজিনেশন বা স্বপ্ন-কল্পনার মত। যেটা প্রায় তাঁর বয়সের সমান বয়সী এক কল্পনা মাত্র! এজন্য এটা এক কল্পিত আকাঙ্খা! তবে একটা কথা এখানে নিশ্চিত করেই বলা যায় এটা বিপ্লবের এক আইডিয়েল [ideal] চিন্তা। আইডিয়েল মানে যেটা রিয়েল [real] নয়, রক্তমাংসের বাস্তব মানুষের মত বাস্তব নয়; এই অর্থে। যেটা অবশ্য আইডিয়েল বনাম রিয়েল এর ফারাক জানা  থেকে বুঝতে হবে।

    কিন্তু সেই প্রজন্মের কমিউনিস্ট চিন্তা কেন এমন আইডিয়েল হলঃ
    এর প্রথম কারণ হল যা কিছুই ১৯৪৫ সালের আগের উতপত্তি হওয়া চিন্তা, তা এমনই হবে। হতে বাধ্য।  কারণ, জাতিসংঘের মত গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা গ্লোবাল অর্ডার শৃঙ্খলা বলে কিছু  এর আগের কালে জন্মায় নাই। যে কোন যুদ্ধ, আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার যুদ্ধ বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় তা যেটাই হোক সে যুদ্ধ কোন আন্তর্জাতিক নিয়ম-আইন মেনে হতে হবে এমন কোন গ্লোবাল অথরিটি (জাতিসংঘের মত) এর আগে ছিল না; জন্মই হয় নাই। এমনকি রেডক্রস ধরনের প্রতিষ্ঠানও ছিল না। যুদ্ধবন্দী বলে কোন ধারণা নাই, যুদ্ধেও পালনীয় আইন বলে কিছু ছিল না। আর সবচেয়ে বড় কথা হিউম্যান রাইট বলেও কোন ধারণা বা প্রতিষ্ঠানই তখন ছিল না। জন্ম হয় নাই।
    এখন মজাটা হচ্ছে, একালে এসেও কমিউনিস্ট চিন্তায় মানবাধিকার বলে কিছু নাই; যেটা [জাতিসংঘের (১৯৪৫) জন্ম,] আর (১৯৪৮ সালে) হিউম্যান রাইট চার্টার এর জন্ম হয়ে গেলেও কমিউনিস্টেরা নির্বিকার; তারা  এটা গ্রহণ-বর্জন কিছুই করবে না। অংশও নিবে না। বেশি জোড়াজুড়ি করাতে ১৯৬৬ সালে এসে জাতিসংঘের ফ্রেমে তারা হিউম্যান রাইটের এক নতুন কমিউনিস্ট সংজ্ঞা দিয়ে বসে যে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থান হল নাকি মানবাধিকার????  অধিকার শব্দটাই যে একটা রাজনৈতিক ধারণা;  আর সেই সাথে রাজনৈতিক ধারণা আর অর্থনৈতিক ধারণা বলে যে দুটা মোটা  ক্যাটাগরি খেয়াল রেখা কথা বলতে বা চিন্তা করতে হবে সেটা কমিউনিস্টেরা এখনও আমল করতে রাজি হয় নাই, নিজেরাও আমল করতে শিখে নাই। মূলকথা বৈষয়িক মানুষ আর রাজনৈতিক মানুষ এদু্টা যে শার্প আলাদা বুঝ তা এরা আমল করতে পারে না এখনও!

    খেয়াল করলে দেখব, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থান এগুলা মানুষের বৈষয়িক চাহিদা। এগুলা বৈষয়িক চাহিদা মাত্র। তাহলে পলিটিক্যাল মানে কী? আর অধিকার মানেই তো সেটা পলিটিক্যাল ধারণা পলিটিক্যাল চাহিদা সেদিকে বুঝতে যেতে হবে। না, এগুলো মার্কস তো নয়ই লেলিনের আমলেও এগুলো আমলযোগ্য ধারনা হতে পারে নাই। এর উপরে দুইটা আরো বড় বড় প্রবলেম বা বাধা আছে। এক. শ্রেণীবোধের ধারণায় বিশেষ করে শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণায়। শ্রেণী বুঝ দিয়ে সমাজ ব্যাখ্যা করেন তত্ব সাজান বড় সমস্যা হবে না হয়ত চলবে কোনভাবে। কিন্তু যখনও কমিউনিস্ট বুঝ থেকে শ্রেণীর একনায়কত্বের রাষ্ট্র বানাতে যাবেন মানে শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতায় গেলে অন্য সকল শ্রেণীকে (আবার যাকে ইচ্ছা তাকে অপর সব শ্রেণী আপনার শত্রু শ্রেণী ঘোষণা করে দিতে পারবেন) গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন তখন সব শেষ।  [এখনও কমিউনিস্ট চীন যেমন সিটিং প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে গুম করে রেখে দিয়েছে।] ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীরা  নেতা মানে ক্ষমতায় থাকা হাসিনা যেমন কাজেই তিনি যাকে রাজাকার (বা জঙ্গী) ট্যাগ দিবেন তাকেই তিনি  গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন। এটাই তো ছিল ১৫ বছরের হাসিনার [চেতনা] শ্রেণীর রাষ্ট্র!!!!
    সোজা কথায় বললে, কমিউনিস্টেরা এখনও অধিকার শব্দটা নিয়ে কী করবে না করবে জানে না। ফলে তাদের রাষ্ট্র ধারণায়, সকল শ্রেণীর (নাগরিক) অধিকার বলে কিছু থাকে না। বরং সুনির্দিষ্ট কেবল ক্ষমতাসীন শ্রেণীরই যাখুশি অধিকার থাকে ?
    এর উপর আবার শ্রমিক শ্রেণী বা এর নামে যারা ক্ষমতায় থাকবে তারা কী কী করতে পারবে, কাকে কাকে বুর্জয়া বলতে পারবে তার কোন নির্ণায়ক কী কোথাও লেখা থাকবে? বিচার বিভাগ বলে কিছু থাকবে? কনষ্টিটিউশন বলে কী কিছু থাকবে? কোন কমিউনিস্টই তা জানে না। কেউ বুর্জোয়া কিনা তা কে কীভাবে সাব্যস্ত করবে???
    আসলে সমস্যা হল, খোদ মার্কসের মাথাতেই রিপাবলিক বলে কোন ধারণা ছিল না। তার শ্রেণীবোধের তলে সব ঢাকা পরে গেছিল। এছাড়াও বাস্তবত ১৯১৬ সালের পরে আর কোন তাত্বিক লেখা বা বইই নাই। লেনিন মারা গেছে ১৯২৪ জানুয়ারিতে। ফলে যা কিছু ইস্যু এরপরে এনিয়ে কমিউনিস্টেরা বিভ্রান্ত। সাথে এর আগের যা কিছু (চিন্তাগত) খামতি ছিল তা সহ!

    কমিউনিস্ট চিন্তা আরেক বিশাল গ্যাপ হল, ক্ষমতা ধারণা। মানে রাষ্ট্রক্ষমতা ধারণা।

    কথাগুলো বললাম এজন্য যে  হাসিনা উতখাতে যে পালটা ক্ষমতাকে জন্মাতে ও কাজে সফল হতে হয়েছে- সেটা তো সবাই বুঝতে পারে যেটা সেনাবাহিনীর ভিতর থেকে এসেছে। তবু মানুষ ভাবতে ভালবাসে সে ছাত্র-জনতাই সব করেছে! যেটা উমর সাহেব তার দৃষ্টিকোন থেকে  প্রশ্ন তুলছেন, সেই ছাত্রদের শ্রেণী পরিচয় কী?  বলেছেন, তাদের তো শ্রেণি–পরিচয় নেই,  (অতএব) এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না।
    উমর সাহেব এর শ্রেণীবোধের চিন্তার বিচারে – “তাদের তো শ্রেণি–পরিচয় নেই” বললে আমরা বুঝতে পারি ১৯৪৫ সালের আগের চিন্তায় বা পরে আর কখনও শান না দেয়া চিন্তায় তিনি ঠিক কী বলছেন তা বুঝা যায়।
    কিন্তু  যখন বলছেন, জুলাই-আগষ্ট ২০২৪ এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না – এখানে এসে বিনীতভাবে বলতে চাই এটা বোধহয় তার অসতর্ক মন্তব্য!
    কারণ তাহলে “আজ পর্যন্ত দুনিয়ার সব ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস” – কার্লমার্কসের একথার অর্থ থাকে না। মানে কার্ল মার্কসের জন্ম হওয়ার আগের ইতিহাসও তো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস – এটা তাহলে কেমনে হবে?? সেই প্রশ্ন উঠবে।

    যা হোক এসব খুচরা তর্ক থাক। সমস্যার কথা বলি। একালে আমাদের আর্মি সহ রাস্তায় আন্দোলনকারীদেরসহ সবাইকে হাসিনা উতখাতের লড়াইয়েও হিউম্যান রাইট ইস্যুটা কীভাবে সক্রিয় ছিল তা খেয়াল রাখতে হয়। নইলে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় আমরা করতে ব্যর্থ হতাম। যা একালের যেকোন পরিবর্তনে একটা বড় বিবেচনা। আমাদের আর্মির বেলায় এটা তো আরো মারাত্মক! জাতিসংঘের মানবাধিকার না মানলে তারা আমাদের আর্মিকে মিশনে অংশগ্রহণ থেকে বের করে দিবে – যেটা আসলে এক বিরাট ফাইন্যান্সিয়াল বোঝা হয়ে আমাদের সামনে হাজির হত তাহলে। ফলে ক্ষতিও। কারণ, আমাদের গরীবী পেমেন্ট পাওয়া সাধারণ সৈনিকদের কাছে তাদের মিশন বন্ধ হলে তাদের জীবনের সব আশার প্রদীপ নিভে যাবে। ফলে ইউএন এর কথা খেয়ার রেখে হাসিনা উতখাতে তাদের অংশ নিতে হয়েছে। আবার বিজয়ের পরে তাদেরকে কোন ক্রেডিটই দেয়া যাচ্ছে না। সবই ছাত্র-জনতা বলে এর আড়ালে রেখে দিতেই হচ্ছে।

    এসব দিকগুলো উমর সাহেবদের ইমাজিনেশনের যে বিপ্লব ধারণা যেটাকে আমি আইডিয়াল ধারণা বলছি যেটা একালে ২০২৪ সালে এসেও এটাকে রিয়েল ধারণা নয় বলছি। একালে আন্তর্জাতিক নানান প্রতিষ্ঠান সুবিধা-অসুবিধা দুটাই মারাত্মক! কাজেই বিপ্লব নিয়ে আবার সেটা আইডিয়েল না, রিয়েল ধারণায় ইমাজিনেশন করতে হবে। এককথায় চিন্তার বিভিউ। পুনঃর্গঠন লাগবে। নয় কী!

    আর এই সাক্ষাৎকারটা ছিল অনেক ছোটই। তবু এই ছোট পরিসরে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ হল, রাজনৈতিক বা পলিটিক্যাল শব্দটা! কিন্তু কেন? কেন সামাজিক বিপ্লব বলছেন রাজনৈতিক বিপ্লব বলছেন না কেন? এটা আমাদেরকে ভাবতে হবে, আগামী প্রজন্মের জন্য চিন্তার এসব দিকের এক ব্যাপক রিভিউ লাগবে।

    সবকিছুতেই শ্রমিক-কৃষক দিয়েই বুঝতে হবে কেনঃ
    উমর সাহেব বলছেন, “কোটার বিরুদ্ধে বৈষম্য না হয় বুঝলাম, সামাজিক বৈষম্য বলতে তারা কী বোঝে? তাদের এখন পর্যন্ত দেশের কৃষক, শ্রমিকের পক্ষে কোনো কথা বলতে শুনিনি”। আসলে সত্যিটা হল, এই ছাত্রদের তো কোন পার্টি পরিচয়ই তো ছিল না। তারা প্রথম পার্টি খুলেছে এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে হাসিনা উতখাতের পরে। আর তাদেরকে কৃষক, শ্রমিকের পক্ষে কথা বলতে দেখতে চাচ্ছেন উমর সাহেব! এর মানে এরা কমিউনিস্ট নাহলে তিন তাদের গোনায় ধরতে পারছেন না!
    আচ্ছা যারা কৃষক, শ্রমিকের পক্ষের বলে – কথা বলতে জানে তারাও কেউ কী বলেছে আমার জানা নাই। যদিও অনেক কমিউনিস্টই দাবি করছে তারা জুলাই বিপ্লবে ভুমিকা রেখেছিল।
    আবার ধরেন বাংলাদেশে যথেষ্ট বিকশিত শ্রমিক মানে বিস্তৃত কারখানা এখনও নাই। তখন কী করব আমরা?

    কথা আরো আছে মারাত্মক!
    আমরা কী খেয়াল করেছি যে আমাদের গার্মেন্ট শিল্প আছে সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কেমন? কেমনে চলছে সেগুলো?
    বইয়ের ভাষায় আমাদের ধারণা হল, গার্মেন্টসে মালিকও আছে শ্রমিকও আছে। তাহলে এটা মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব আর আমাদেরকে শ্রমিকের পক্ষে থাকতে হবে। কিন্তু তাই কী বাস্তবতা???

    তাহল একর্ড [accord] গ্রুপ এরা করাঃ
    আমরা কী জানি সেখানে একর্ড বলে একটা বিদেশি বায়ার্স [buyers’] গ্রুপ আছে। আর ট্রেড ইউনিয়ন গুলার সাথে তাদের ব্যাপক খাতির! কেন এমন?
    বায়ার্স গ্রুপ মানে হল যাদেরকে  (স্থানীয়) মালিক মনে করেছি তারাই মালিক নয়। বায়ার্সরাই হল মালিকের উপরে আসল মালিক? তাহলে শ্রমিকদের সাথে তাদের খাতির হবে কেন?

    কাজেই এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার – শ্রমিক-কৃষকের কথা বলে যেতে হবে – এটা কতটুকু সঠিক হবে? আবার সেই শ্রমিকের পক্ষে থাকার মানে? এই  বাস্তবতায় এটা কী????
    এথেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে  ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার শ্রমিক-কৃষকের কথা বলা সম্ভবই নয়। বাস্তবের শ্রমিক-কৃষক অন্য জিনিষ!  ফলে এখানেই ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার -শ্রমিক-কৃষক- বলার যে চল সেই কমিউনিস্ট চিন্তারও রিভিউ লাগবে। এর আগে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির পক্ষে কথা বলতে হতেই হবে বলে বা এদিয়ে কিছুই বুঝা যাবে না।

    উপরে যে বক্তব্যের কার্ডটা দেখছেন সেটা প্রথম আলোর উমর সাহেবের সাক্ষাতকারে দেয়া আছে, সেখান থেকে নিয়েছে। এই কার্ডে উমর সাহেবের তিন নম্বর পয়েন্ট টা অস্বস্তিকর! দেখেন, খোদ কমিউনিস্টেরা কী কনষ্টিটিউশন / সংবিধানকে জরুরি কিছু মনে করে? কাজের জিনিষ মনে করে? করে না।
    এমনিতেই কমিউনিস্টদের চিন্তায় পার্টি আর রাষ্ট্র বলে দুটা আলাদা কিছু নয়। এছাড়াও মূলত রিপাবলিক ধারণাটাই মার্কসের ধারনায় নাই। শ্রেণী ধারণা দিয়ে বদলে ফেলেছেন, অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছেন তিনি। কাজেই উমর সাহেবের মুখে  কনষ্টিটিউশন / সংবিধান নিয়ে কথা তোলা এটা কীভাবে দেখব জানি না; অর্থই বা কী হবে?

    আবার কার্ডের প্রথম পয়েন্ট তিনি বলছেন, “কোটার বৈষম্য আর সামাজিক বৈষম্য তো এক জিনিষ নয়”।
    এখানে ভুল বুঝা হচ্ছে মানে মারাত্মক ভুল বুঝা আছে। উমর সাহেব আসলে সামাজিক বৈষম্য বলতে একটা কথাই বুঝেন আর সেটা তিনি মিন করছেন অর্থনৈতিক বৈষম্য। এর বাইরে বৈষম্য  বলে আর কিছু নাই। এধারণাটাও ভুল বলে আমার ধারণা। আসলে বৈষম্য শব্দতার তাতপর্য এখানে (তাতে সেটা কোটা বা সামাজিক বৈষম্য যেটাই বলেন) এটা একটা পলিটিক্যাল শব্দ। অধিকার ভিত্তিক শব্দ বলেও বুঝতে পারেন। কিন্তু ওদিকে রাজনৈতিক বা অধিকার শব্দ কমিউনিস্ট ডিকশনারিতে আবার নাই। এটাই মূল সমস্যা। আর পলিটিক্যাল বৈষম্য বা অধিকারে বৈষম্য করা অপরাধ তা হলেও এটা কমিউনিস্ট এন্টেনায় ধরা পড়বে না।
    সারকথাটা হচ্ছে, ক্লাসিক বা মুখস্ত কমিউনিস্ট ভোকাবুলারি দিয়ে এযুগে কাউকে মুল্যায়ন করা অর্থহীন; যদি না আগেই আমরা ১৯৪৫ সালের আগের ধারণাওগুলোকে নিয়ে ব্যাপক রিভিউ করতে আগেই না বসি। আর পলিটিক্স শব্দের অর্থ তাতপর্য বুঝলে অর্থনৈতিক ক্যাটাগরি দিয়ে কমিউনিস্ট ভাব প্রকাশের ভুল আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব।

    সবশেহ উমর সাহেব নিজ ক্লাসিক ধারণা বিবেচনার দ্রুত নির্বাচন দিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর সেটাকে কাজে লাগাতে উঠে ততপর হয়ে গেছে প্রথম আলো। তারা উমর সাহেবের কথাকে বিএনপি র এখনই নির্বাচিন দাবি – এর সাথে যেন উমর সাহেবও একই কথা বলছেন এই ভাব তৈরি করে নির্বাচন কথাটাকে হাইলাইট করে দিয়েছে!

    আপাতত এতটুকু!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com


    সবশেষ আপডেটঃ  ,   এপ্রিল ২০২৫