Tag: ওয়াশিংটন

  • আফগানিস্তানের সম্ভাব্য আগামী

    আফগানিস্তানের সম্ভাব্য  আগামী

    গৌতম দাস

    ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬

     

    চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান [Wendy Ruth Sherman ] ভারত সফরে এসেছিলেন। দুই দিনের সফরে তিনি প্রকাশ করেননি, তিনি ফেরার সময় আর কোথায় যাবেন; যদিও ধরে নেয়া হয়েছিল তিনি কেবল ভারতে এসেছেন, আর আফগান-তালেবান ইস্যুতে বেদিশা হয়ে থাকা ভারতকে দিশা ও রাস্তা দেখাতে আসছেন। দিশা কতটা দেখাতে পারছেন, সেটা নিয়ে আমরা আজ কিছু কথা বলব। কিন্তু এর চেয়েও, দিশা দিতে এসে শেরমানও বুঝে গেছেন যে, ভারত একটা দেখানো ঘামবড়া আর ফুটানিতে চলতে চায় এমন দেশ। ফলে শেরমান তার ভারত ছাড়ার আগে যখন প্রকাশ পেল তিনি পাকিস্তান হয়ে ফিরবেন (শুধু তা-ই নয়, তিনি আসলে পাকিস্তান সফর শেষে  এরপরে আবার তালেবানদের আফগানিস্তান হয়েও ফিরেছিলেন) তখন সেটা শুনে ভারত তার ভান-ভণিতা আর ভারত যেন খুবই উচ্চবংশীয় – এই মিথ্যা ফুটানি প্রদর্শন তুঙ্গে উঠেছিল। তারা তখন শেরমানকে অভিযুক্ত করেছিল এই বলে যে  তিনি ভারত-পাকিস্তানকে সমান পাল্লায় মাপছেন। মানে বলতে চেয়েছেন, পাকিস্তান ভারতের সমতুল্য নয়, বরং ভারত অনেক শুদ্ধ বা পবিত্র। কাজেই এতে ‘ভারত-পাকিস্তান’ এভাবে মাঝখানে হাইফেন দিয়ে লেখা (হাইফেনেটেড, hyphenated) শুরু হয়ে যাবে। সেটা নাকি ভারতের জন্য ‘অপমানজনক’! এতে শেরমান বুঝে যান তিনি কোনো ভয়ঙ্কর পেটি কালচারাল খপ্পরে পড়েছেন। উপায়ন্ত না পেয়ে তাই তখন তিনিও তেল ঢালা শুধু করেছিলেন। আর যে কথার আড়ালে যেটা বলে পার পেতে চেয়েছিলেন তা হলো – পাকিস্তানের সাথে আমি কোনো গভীর ভালোবাসায় জড়াতে যাচ্ছি না। আমার ‘খুবই সুনির্দিষ্ট আর ছোট্ট একটি কাজ’ [very specific and narrow purpose]আছে; তাই যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো পুরুষ যখন তার এক প্রেমিকার কাছে ধরা পড়ে যায় তার অপর প্রেমিকার খবরসহ – সেই দশায় তিনি। শেরমান নাকি তখন বলেছিলেন, “ভারতের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক সেই লেভেলের কোনো দিন পাকিস্তানের সাথে হবে না। কিন্তু সেটা কেউ ভালো করে না ছাপানোয় ভারত আবার সেটা নিজেই লন্ডন গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছাপানোর ‘বন্দোবস্ত’ করেছিল। এ ঘটনা জেনে আমাদের মনে হতে পারে ভারত আসলেই খুবই উচ্চবংশীয় কালচারের দেশ!

    কিন্তু শেরমান পাকিস্তান থেকেও আমেরিকা ফেরেননি। এরপরে গিয়েছিলেন আফগানিস্তানে এবং সরাসরি তালেবানের সাথে একই টেবিলে মুখোমুখি বসে মিটিং করে গেছেন। কিন্তু কেন আফগানিস্তানে আর তালেবানদের সাথে মিটিং? যখন শুধু আমেরিকা কেন, বলতে গেলে কোনো রাষ্ট্রই এখনো যে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠনিক স্বীকৃতি দেয়নি। তবে এ কারণে  ভারতের অসুবিধা হয়নি; কারণ ভারতের হিন্দুত্বপ্রেমী ভোটারদের দৃষ্টি-আগ্রহের ততদিনে এসবের বাইরে চলে গিয়েছিলেন শেরমান। আসলে মোদির নিজের তৈরি যে খাঁচা সেখানে তিনি নিজেকে বন্দী দেখাতে বাধ্য হন যে, তিনি বিদেশী কূটনৈতিক দেখা সাক্ষাৎ সম্পর্কগুলোর মধ্যেও ক্রমেই মুসলমান বা পাকিস্তান কোপানোর একমাত্র নেতা এবং সফল হিন্দুবাদী নেতা তিনি। আর এটা দেখিয়েই তিনি ভোটের বাক্স ভরিয়ে ক্ষমতাসীন আছেন। যদিও কাহিনী হল, নয়নীমা বসু প্রমুখের মত কূটনৈতিক সংবাদদাতাদেরও তবু মোদির হিন্দুত্বপ্রেমি ভোটারকে দেখানোর এসব মিথ্যা ভাব-ভনিতার সেনসিটিভিটির দিকে খেয়াল রেখে তেমন শব্দ বেছে রিপোর্ট লিখতে হয়।

    শেরমানের দেশ আমেরিকা আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি না দেয়া সত্ত্বেও তার আফগান সফর এবং ফ্লাইট-এয়ারপোর্ট ঠিকমতো ন্যূনতম থিতু হয়ে চালু শুরু না হওয়া সত্বেও এক আমেরিকান মন্ত্রী হিসেবে তার আফগানিস্তান গিয়ে সরাসরি তালেবানের সাথে মিটিং – সেটা এক বেশ উল্লেখযোগ্য ঘটনা বৈকি। যখন  এ’ঘটনাটাকে তালেবানদের অনেকে আমেরিকার ওপর তাদের ‘বিজয়’ বলে দেখার আগ্রহ আছে। যা এমনকি আমাদের দেশেও অনেকের।

    এমন আরো কথা হল – তালেবান, ২০ বছর ধরে আমেরিকার হাতে মার্জিনালাইজড বা চাপা পড়ে থাকা জনগোষ্ঠী বলে তাদের মনেও ক্ষোভ কম নয়; বরং এমন হওয়ারই কথা। আর হতেই পারে তারা সেটা প্রকাশ করেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সংস্পর্শে কখনো আসার কালে, যা মোটেও অসম্ভব নয়; কারণ আমরা দেখেছি ইমরান খান তাদের মুখপাত্র হয়ে যেন আমেরিকাকে একটু বকা দিতে গেয়েছিলেন। সিএনএনের সাথে ইন্টারভিউয়ে বলেছেন, এবারের তালেবান উত্থানের কারণে গত ২০ বছরের আমেরিকান চাপ-নির্যাতন থেকে আফগানরা মুক্তি পেয়েছে। আবার ইমরান একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে, গত ২০ বছর আমেরিকা পাকিস্তানকে ‘ভাড়া করা অস্ত্রের মতো ব্যবহার’ করেছে [US treated Pakistan like a ‘hired gun’ in its fight against Taliban, says Imran Khan]। গত ১৫ আগস্টের পর ইমরানের এধরনের কড়া কথাগুলো আমেরিকার ভালো হজম হয়নি। আবার কথাগুলোতে অনেক খানিকটা সত্যতা তো আছেই। ইমরান নিজের দেশের অভিজ্ঞতা হিসেবে দ্বিতীয় কথাটা বলতে পারতেন হয়ত, কিন্তু তালেবানদের জন্যও তাদের মুখপাত্র ও নেতা হতে চেয়ে আমেরিকাকে দায়ী করে কিছু বলা্র কারণে হয়ত আমেরিকানরা এটাকে “একটু বেশি কথা” হিসেবে দেখেছে। ফলে শেরমান ঐ সফরে ইমরানের সাথে সাক্ষাৎ করেননি; যদিও করবেনই এমন  নির্ধারিত কোন শিডিউল ছিল না।

    এদিকে আরো অন্য কিছু মূল কথা, আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের পর আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের আর পাকিস্তানকে প্রয়োজন নেই বা ফুরিয়েছে –  এখনকার বাস্তবতা কিন্তু এর একেবারেই ধারেকাছেও নয়। বরং উল্টো; আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের পাকিস্তানকে এখন আরো বেশি দরকার তবে ভিন্ন কারণে। লন্ডন ইকোনমিস্ট সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সম্প্রতি এক আর্টিকেল ছেপেছে।  আবার আরও ধারালো আরেক মন্তব্য করেছে [It is too important—and dangerous—to ignore] আবার পাকিস্তানেরও আমেরিকাকে আর তেমন দরকার নেই, পরিস্থিতি সেটাও নয়। আজকের পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকা ছেড়ে অনেক বেশি চীন নির্ভরশীল হলেও এটা কোনো ‘আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়’ ধরনের অবস্থা নয়। তাই মাঠের সাধারণ নাগরিকের ভাষায়, কোনো প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকার সাথে বা নিয়ে কথা বলতে যাওয়ার কিছু দিকটা ধরলে এই আমলনামাতে একটা ভুল তো এখানে আছেই। ব্যাপারটাকে সেভাবে দেখতে পারি আমরা।

    এটাকে ভুল বলার অন্য আরো যে বিশেষ কারণ, তা এখন বলব। প্রথমত, এবারের সেনা প্রত্যাহার করার পর বাইডেন প্রশাসনের কারো, মানে শেরমানের এই পাকিস্তান সফর একেবারের ভিন্ন ও নয়া তাৎপর্যের। এটা অবশ্যই আমল করতে হবে। এটা এক নয়া যুগের। কারণ আগের ২০ বছর আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল এমন যে, আমেরিকার বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে হামলা চালাতে চায় তাই হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসেবে আমেরিকার পাকিস্তানকে দরকার ও তাকে আমেরিকা বাধ্য করবে – এই যে “সম্পর্ক” – সেটা এতদিন বজায় থাকলেও সময় এসেছে এবারই প্রথম সেই শর্ত আর নেই। পাকিস্তানও এসব বাধ্যবাধকতা থেকে এখন একেবারে বাইরে ও মুক্ত। আর এই নয়া মুক্ত পরিস্থিতিতে শেরমান পাকিস্তান সফরে এসেছেন। অতএব এই নয়া পরিস্থিতির উপলব্দি – তা থেকেই সব পক্ষের দেখা উচিত। ফলে কথাবার্তা বা নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় এ নিয়ে সব পুরনো রেফারেন্স বাদ দিয়ে বরং নয়া এই পরিস্থিতির মধ্যে নয়া সম্পর্কের কাল হিসেবে কথা বলতে পারতে হয়েছে বা হবে এখন থেকে উভয়পক্ষকে।

    কিন্তু সাবধান, উপরের এসব ঘটনার সাথে আরো কমন কিছু ইস্যু সামনে। সেগুলো  হলঃ
    ১. তালেবান এখনো কোনো সরকার গঠন করতে পারেনি।
    ২. তারা এখনো এক আমিরের আফগানিস্তান নিয়ে আঁকড়ে পড়ে আছে। রাজা আর জনপ্রতিনিধির ফারাক বুঝতে চাইছে না।  ফলে অবলীলায় রাজা বা আমিরের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতে পারছে। এযুগেও জনপ্রতিনিধি হবার যুগ ফেলে রাজা হতে চাইছে তা স্পষ্ট না। আমিরের দেশে আমিরই দেশের মালিক এখানে কোনো নাগরিক থাকে না, সব হুকুমের বান্দা থাকে। এখানে দেশ গড়ার কিছু থাকে না। আমিরের খেয়াল থাকে। অথচ এক আমিরাতই তাদের লক্ষ্য।

    ৩. সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপদের কথা হল, আমেরিকান ভোয়া [VOA] লিখছে,  জাতিসঙ্ঘসহ সারা পশ্চিম যেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তা হলো- প্রায় ১০ লাখ শিশু না খেয়ে মরার মুখোমুখি, প্রায় ১৮ লাখ দুস্থ মানুষ যারা জাতিসঙ্ঘের মানবিক নানান ধরনের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল প্রভৃতি। এসব মানবিক সাহায্য তালেবান সরকার স্বীকৃত নয় বলে আগের মতো সরবরাহ বজায় রাখতে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের ক্ষুধা এসব কী সমস্যা তা জানার যোগ্য থাকে না।

    Sherman recounted a recent U.N. warning that about 1 million Afghan children were at risk of starvation, that more than 18 million Afghans needed urgent humanitarian assistance, and that deepening drought and the approaching harsh winter were only going to make matters worse.

    পশ্চিম তাই আগেই স্বীকৃতির ইস্যু বাইরে রেখে এড়িয়ে সরাসরি কথা বলতে এসেছে। আমেরিকা, ইইউ এরই মধ্যে স্বীকৃতির প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে  কাবুল সফরে এসে কথা বলেছে। এমনকি সেখানে আবার একটা স্বীকৃত সরকার হতে করণীয় কী সে সম্পর্কে আলোচনা, পরামর্শ তুলেছেন। কিন্তু এটাকে তাদের ঠেকা, তারাই বিপদে পড়েছে – এমন অনুমান নিয়ে ব্যাপারটাকে তালেবানদের দেখা এক বিরাট ভুল ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে যাওয়া হবে।  তার ইঙ্গিত উঠে আসছে।  ফলে আমেরিকা, ইইউ যেটা আগবাড়িয়ে করছে, সেটা হলো নিজেদের দিক থেকে যা করণীয় কর্তব্য ছিল, তা যতদুর পারে আগেই পূরণ করে রাখছে; যাতে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় যদি কিছু শিশু অভুক্ত মারা যায়; যাতে সে আগেই পরিষ্কার রাখতে পারে তাদের দায়ের অংশ ও উদ্যোগ তারা যথেষ্টই নিয়েছিল। তাতে তখন কিন্তু পরিস্কার দেখা যাবে তালেবানদের কারণে পুরোটাই ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাই এমনটা কখনই যেন না হয় যে, দানগ্রহীতার আগ্রহ নেই ফলে দাতা চেষ্টা করেও কিছু করতে পারে নাই। ফলে তখন মানুষ দাতাকে নয় গ্রহিতাকেই প্রধান দায়ী করবে।

    ৪. অতএব দাতারাই ঠেকায় পড়েছে আর তাদের সেই ঠেকে যাওয়া দশাকেই ব্যবহার করে চাপ দিয়ে তালেবানদেরকে তাদের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে হবে এমন অনুমান- এটি খুবই আত্মঘাতী ও বিপজ্জনক এবং দায়দায়িত্বহীন  সিদ্ধান্ত হবে।

    ৫. এরপর যা লিখব সেগুলোই তালেবান ইস্যুর মূল প্রসঙ্গ। নয়া তালেবান এরা কোন স্বীকৃত সরকার নয়। একারণেই এটা কোন থিতু সরকার নয়, এ অনুমান ভুল, ভিত্তিহীন। কারণ আসলে এটা এখনো অস্থিতিশীল মূলত এর অভ্যন্তরীণ (গ্রুপিং-গুলোর) সংহতি খুবই দুর্বল, তাই। কথাটাকে যদি রেডিক্যাল [হাক্কানি] আর তুলনায় লিবারেল [তালেবান]  ধারা হিসেবে বলি, তবে এ দুই ধারার বিরোধ – এটাই প্রধান অ-সংহতি [un-consolidated] চিহ্ন। এখানেই শেষ নয়। তালেবানের ভেতরের এই বিরোধের বাইরেও আবার আরো চরম রেডিক্যাল (আইসিস-কে) ধারা আছে, যার ছাতার নিচে আবার এর সমমনা আরো ছোট ছোট গ্রুপ আছে। এই চরম রেডিক্যাল (আইসিস-কে) [ISIS-K] –  এরা তালেবানদের ‘চরম অসহ্য শত্রু’ জ্ঞান করে।

    ৬. এরই মধ্যে আইসিস-কে গত আগস্টের দুইবার এয়ারপোর্ট হামলার পরে আর শান্ত বসে নাই। তাদের এখনকার টার্গেট মূলত হাজারা ট্রাইব বা এথনিক গোষ্ঠী, যারা শিয়া জনগোষ্ঠী। [The Hazaras are a Persian-speaking ethnic group; bigger other parts are in Iran. They primarily residing in the Hazarajat region in central Afghanistan.] আর মোট আফগান জনসংখ্যার ৯ শতাংশ। আফগানিস্তানের বড় প্রথম তিন জনগোষ্ঠী হল – পশতুন (৪০-৫০ শতাংশ ), তাজিক (২৫ শতাংশ) আর হাজারা (৯ শতাংশ)। ISIS-K এর এই হামলা মূলত নির্মূল করা [Ethnic Cleansing] ধরনের। আপাতত এনিয়ে তাদের ততপরতা “মসজিদে হামলা” টাইপের। অনেকে হাজারা-রা মুসলমান কি না তর্ক সে দিকে নিতে পারেন। এটি ভুল পথ। কারণ, এমন তর্ক ইসলামের ভেতরের। এটা বাইরের গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের জায়গায় বসে দেখলে  বাইরের এই পুরো দুনিয়ার চোখে তারা ব্যাপারটাকে দেখবে কোনো এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা হিসেবে, বসনিয়ায় যা হয়েছে। দুনিয়াতে ১৯৪৫ সালের আগে এমন বহু এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে দেয়া গেছে। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরে দুনিয়া বদলে গেছে; কারণ এক ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ তৈরি হয়ে আছে। বিশেষত ২০০০ সালের পরে যে গ্লোবাল আইনি-কাঠামো, আদালত ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেছে; তাতে যারাই কোনো এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে যাবে, তো সে যে অজুহাতেই হোক তারা সহি মুসলমান ছিল না বলে অথবা অন্য কিছু, এরা প্রত্যেকেই এখন বিচারের সম্মুখীন হবেই, সর্বোচ্চ সাজা পাবে। যেমন ইতোমধ্যেই বার্মার শাসকেরা রোহিঙ্গা নির্মূল প্রচেষ্টার অভিযোগে।

    এসব হলো আফগানিস্তানের আরেক জগৎ। সেই জটিলতার একটু ইঙ্গিত দিলাম। আর এখানে এবার ভারতের অবস্থা নিয়ে একটি কথা বলে শেষ করব।

    অবশেষে ভারতের মিডিয়া জানাচ্ছে, আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তানে যেসব দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা আছে এমন দেশগুলোর ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার’ [NSA, National Security Advisor] দায়িত্বে আছেন এমন মর্যাদার মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সম্মেলন আহ্বান করতে যাচ্ছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হল, তাতে ভারতের প্রধান দুই মেহমান হল পাকিস্তান ও চীন [Pakistan & China among invitees as India looks……… ]।

    তাহলে এত দিন মোদির হিন্দুত্ববাদ আর ভোটের স্বার্থে যে এ দুই দেশকে ভারতের চরম শত্রু বলে প্রপাগান্ডা চালানো হয়েছিল, এর কী হবে? যে চরমশত্রু দেশ সেই আবার দাওয়াতি-অতিথি হয় কী করে? এই ভারত সরকারের এই স্ববিরোধিতার কোন উত্তর নাই।আলাদা রাষ্ট্র বলে  ভারতের স্বার্থ অবশ্যই চীন বা পাকিস্তানের স্বার্থের বিরোধী এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে ‘চরমশত্রু দেশ’ বলে চীন বা পাকিস্তানকে চিনানো আর প্রতি মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালানো – এই হিন্দুত্ববাদ অগ্রহণযোগ্য ও আত্মঘাতি, তা ভারতের পক্ষেও যায় না – এটাই ভারত প্রমাণ করল!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৩ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তানের আগামী“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতের নিজেকে বিশেষ প্রিয়া দাবি, আমেরিকার অসহায়ত্ব

    ভারতের নিজেকে বিশেষ প্রিয়া দাবি, আমেরিকার অসহায়ত্ব

    গৌতম দাস

    ১১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3L8 

     

    State-Dept-No-2-to-visit-Pakistan-India-after-Taliban-takeover

    –
    সার-সংক্ষেপঃ ছবিতে মাঝখানে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা আমেরিকান ডেপুটে সেক্রেটারি অব স্টেট ওয়েন্ডি শেরমান যার দুপাশে দুজন, বায়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আর ডানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। ওয়েন্ডি ভারত-পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন, বিশেষত আফগানিস্তান ইস্যু নিয়ে কথা বলতে। তাতে প্রথমে ভারত, পরে পাকিস্তানে গিয়ে এই ইস্যুতে কথা বলার পরে শেষে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের পরে এই প্রথম ওয়েন্ডি সরাসরি আফগানিস্তান সফরে চলে গেছেন যখন আমেরিকা একা নয় দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রই তা-লে-বা-ন সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন নাই। আবার তাদের নয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণও যখন ঘটে নাই, এমন সময় এটা।  তাই তা-লে-বা-ন-দের জন্য এটা মর্যাদার ও  আনন্দের যে খোদ আমেরিকা  আনুষ্ঠানিক  স্বীকৃতিদান সম্পন্ন না হলেও ওয়েন্ডি আফগানিস্তানে আসার তাগিদ বোধ করেছেন ও কথা বলেছেন। কিন্তু ভারত থেকে পাকিস্তান রওনা দিবার আগে, ভারত নিজেকে আমেরিকার “বিশেষ প্রিয়া” যেন এই গুরুত্ব দাবি করে বসেছিল। কী করে? যখন সে জানতে পারে ওয়েন্ডি ফেরার সময় পাকিস্তান যাচ্ছেন, তখন এটাকে দেখেছিল ভারত-পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপা মানে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে অনুযোগ করেছিল। শব্দটা হল, হাইফেনেশন মানে ভারত-পাকিস্তান মাঝখানে একটা ড্যাশ দিয়ে লেখা। স্বভাবতই এটার কো গুরুত্ব দেন নাই ওয়েন্ডি। আসলে এসম্পর্কেও একুটাই শব্দ প্রয়োগ করার আছে  “ফাজলামো” করে ভারত নিজেকে নিচে নামাচ্ছে! অপ্রয়োজনীয়!]

     

    কোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসাবে একজন প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রিন্টেড পত্রিকায় নিজের রাষ্ট্র-সরকারের মনোভাব-অনুভব নিয়ে কলাম লিখবেন তা সাধারণত আমরা দেখতে অভ্যস্ত নই। তবে তাই বলে তিনি লিখতে পারবেন না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং এমন সরাসরি লেখার ভেতর দিয়ে একধরনের স্বচ্ছতা আর অনেককে বা অনেক ইস্যুকে কিভাবে তিনি দেখেন, দেখতে চান তা নিয়ে আর কোনো লুকোছাপা গোপন ডিলিং নয়, এর বদলে ইস্যুটাকে ওপেনহ্যান্ড ডিলিং করার সাহস দেখানো যায়, অবশ্যই।

    তেমনি একটা কাজ করেছেন পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি আমেরিকার “ওয়াশিংটন পোস্ট” পত্রিকায় একটা মতামত কলাম লিখেছেন গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। বলাবাহুল্য, তাতে প্রসঙ্গ হলো, এ সময়ের মুখ্য ইস্যু আফগানিস্তান এবং ২০ বছরের দখলমুক্তিতে একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পাকিস্তানির ফিলিং ও মূল্যায়ন। আর তার শিরোনাম হলঃ [Imran Khan: Don’t blame Pakistan for the outcome of the war in Afghanistan]।

    সেকালের পাকিস্তান আমলের এক পশতুন এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ার একরামুল্লাহ খান; এমন বাবার অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট ছেলেই হল ইমরান খান। প্রচলিত অর্থে ইমরান রাজনীতিবিদ নন, মূলত আন্তর্জাতিক লেভেলের ক্রিকেট প্লেয়ার বা দলের ক্যাপ্টেন। সেখান থেকে রিটায়ারমেন্টের পরে যেমনটা হয় আমরা দেখি, তিনি জীবন উপভোগকারী; কেউ কেউ যার ভেতর প্লেবয় ইমেজও খুঁজে পান। এরপরও তিনি সরাসরি রাজনীতিক হতে যাননি, বরং তার আগে সামাজিক চ্যারিটি বা দাতব্যমূলক কাজে নেমে গিয়েছিলেন; একেবারে এক ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ার কাজে। এরই মধ্যে একবার হঠাৎ তিনি ১৯৯৬ সালে এক নয়া রাজনীতিক দল খুলে বসেন, নাম তেহরিক-ই-ইনসাফ। বাংলা করলে অর্থ হয় ‘ইনসাফের জন্য আন্দোলন’। দলের সংক্ষিপ্ত নাম পিটিআই [PTI] (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ)।

    আমেরিকা গত ৪০ বছর ধরে পাকিস্তানকে প্রথম নিজের পছন্দের ইসলামে সাজিয়েছে আর  যেভাবে খুশি পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছেঃ
    আফগানিস্তান থেকে ২০ বছরের দখলদারিত্ব সম্প্রতি শেষ টেনেছে আমেরিকা। তবে এই ২০ বছরেরও আগের (গত শতকে) ২০ বছরের ইতিহাসও কম লম্বা ছিল না। বলা যায় ১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিলের ইরান বিপ্লব ছিল এর সুইচ-অন বা স্টার্টিং ঘটনা। ইরান এক নয়া ‘ইসলামী রিপাবলিক’ বলে নিজেকে ঘোষণা করেছিল সেদিন। ইরানের ঐ “খোমেনি বিপ্লবের” সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল, এই প্রথম ১৯০১ সাল থেকে ইরানের তেল চুষে খাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানি আর পরে (১৯৫৩ সাল থেকে) আমেরিকান নেতৃত্বে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা পাঁচ তেল কোম্পানির যৌথ লুটপাট বন্ধ ও উতখাত করতে সক্ষম হয় তারা। ইরান এখান থেকেই তাদের গুটিয়ে চলে যাওয়ার শেষ দিন ঘোষণা করতে পেরেছিল।
    কিন্তু তাতে আরেক নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয় ভীত সোভিয়েত ইউনিয়নের মনে। তার দুশ্চিন্তা হল সেন্ট্রাল এশিয়া নিয়ে। সেন্টাল এশিয়া বলতে যা এখন আলাদা পাঁচ দেশ, আর যাদের নামের শেষে ‘স্তান’ আছে যেমন কাজাখস্তান, কিরঘিজিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান; এরা। গত (১৭২১-১৯১৭) রাশিয়ান জার-সম্রাটের আমল জুড়ে সেন্ট্রাল এশিয়া রাশিয়ার দখলে ছিল; আবার পরেও লেনিন-স্টালিনের  বিপ্লব বা আমল থেকে তাঁরাও এদের নিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে নিয়েছিল। পিছনের মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ার জনগোষ্ঠী এরা একেবারে গোড়ায় এথনিক জনগোষ্ঠি হিসাবে হল চীনা-মঙ্গোলয়েড। তারা চীনের তাং রাজার [Tang dynasty (618–907 CE)] অধীনে ছিল। কিন্তু  আব্বাসীয় ডাইনেস্টির আমল (৭৫০-১২৫৮) এই তাং রাজা পরাজিত হয়ে যায়। আর তাতে বাসিন্দারা তখন থেকে মুসলমান বা ইসলাম অনুসারী হয়েছিল। ফলে ইরানের খোমেনি বিপ্লবের পরে ইরানের পড়শি এরা না “বিপ্লবী” প্রভাবে পড়ে যায় আর তাতে না তারা তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বের হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়। এই ভয়ে কমিউনিস্ট সোভিয়েতরা ইরান আর সেন্ট্রাল এশিয়ার মাঝখানে এক প্রাচীরতুল্য বাফার স্টেট হিসেবে অবস্থানে থাকা আফগানিস্তানকে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ সামরিকভাবে দখলে নিয়ে নিয়েছিলেন ওই বছরই, ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯।  যার কাভার দেয়া হয়েছিল যে  আফগান কমিউনিস্ট পার্টি নাকি আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে ব্রেজনেভ-এর দেশকে ডেকে নিয়ে এসেছে।  কিন্তু এতে হিতে বিপরীত ঘটে যায়।

    সেটা স্নায়ুযুদ্ধের আমল; ফলে সোভিয়েত “আগ্রাসনের” বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে আমেরিকা ফরজ জ্ঞান করে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করেছিল। বলা যায় পাকিস্তানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে চরম অপব্যবহারটা করতে শুরু করেছিল।  এতে পাকিস্তানকে “আমেরিকান স্বার্থে ইসলামী” করে সাজিয়ে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে ‘মুজাহিদিন’ আন্দোলন শুরু করেছিল আমেরিকা। এতে পাকিস্তান নিজের স্বার্থের নিজের জন্য আর দেশ-রাষ্ট্র থাকেনি। পাকিস্তান হয়ে যায় একদিকে সিআইএর ঘাঁটি ও তৎপরতার কেন্দ্র; অন্যদিকে আফগান রিফুইজিদের আশ্রয় আর আফগান মুজাহিদিন যোদ্ধাদের সুরক্ষার দেশ যাতে, তারা সোভিয়েত উৎখাতে তারা লড়তে পারে – এমনই এক লঞ্চিং প্যাড বা ভুমি হয় পাকিস্তান। শেষে ১৯৮৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত বাহিনী হেরে যায়।  হার স্বীকার করে সোভিয়েত বাহিনী চোখের জলে কাবুল ত্যাগ করেছিল, ঠিক যেমন গত ১৫ আগস্ট ২০২১ আমেরিকা কাবুল ত্যাগ করেছে।

    ফিরে আসি একালে। “ওয়াশিংটন পোস্টে” ইমরানের ওই মতামত-কলামের মুখ্য তাৎপর্য হল তিনি আমেরিকাসহ পশ্চিমা মন ঠিকমত পড়তে পেরেছেন বলে তাদের ওপর ঠিকমত সওয়ার হয়ে এলেখাটা লিখতে পেরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকা কিভাবে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে একেবারে একান্ত নিজস্ব স্বার্থে বারবার পাকিস্তানকে ব্যবহার করে গেছে। যদিও সেটা বলার চেয়ে ‘ব্যবহৃত হতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে’ বলা সঠিক হবে। পশ্চিমা মন পড়ে তাদের মনের ভাষায় কথা বলাতেই ইমরানের এ’লেখা আকর্ষণীয় হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডাসহ পশ্চিমা মন যারা ওয়ার অন টেররের প্রপাগান্ডায় “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী”- এব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠায় ২০ বছর ধরে কসরত করে গেছেন; এদের মুখের উপরই ইমরান এক কড়া জবাব দিয়েছেন। কারণ পাকিস্তান শুধু এই শতকের ২০ বছর নয়, গত শতকেরও ২০ বছর ধরে আমেরিকার স্বার্থে বলি হয়ে গেছে বারবার। যেন আমেরিকা নয় (তার স্বার্থ বা নীতি নয়), পাকিস্তানই ‘সন্ত্রাসবাদ’ আবিষ্কার করেছে আর চর্চা করে গেছে।

    জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৭৭ সাল থেকে। এই জিয়াউল হক, আমেরিকা তাঁর ঘাড়ে সওয়ার হয়েই সোভিয়েত তাড়ানোর কৌশল হিসেবে এক ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন। আর তাতেই পাকিস্তানকে আরো কথিত ইসলামী করে গড়ে তুলতে পুরনো বৃটিশ আমলের পেনাল কোডের ২৯৫ ধারাকে নতুন করে ব্লাসফেমি আইন বলে একে ঢেলে সাজিয়ে প্রচারে আনা হয়েছিল। আর ওদিকে নতুন নতুন মাদরাসা খোলার জন্য অঢেল অর্থ দেয়ার এক কর্মসূচির পুরোটাই আমেরিকান কর্মসুচী ছিল যা সোভিয়েত তাড়ানোর  আমেরিকান ততপরতার অংশ। সৌদি আরব ও কিছু বিশেষ পাকিস্তানি মাওলানার তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়িত হয়েছিল। অথচ এখন মুসলমান মানেই জঙ্গি আর পাকিস্তান তাদের আঁতুরঘর যেন- এটাই আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রধান বয়ান ও অভিযোগ। আর এখান থেকেই ভারতের কথিত জঙ্গিবাদের বয়ানও শুরু হয় [সাথে অবশ্য ভারতীয় কাশ্মীরের ভোটচুরি করে এই ব্যবস্থা অকেজো করে দেওয়ায় দায়ী]। বাংলাদেশেও এরা বলে, কথিত পশ্চাৎপদ বলে মুসলমানরা নাকি ব্লাসফেমি আইন চায়, মাদরাসাগুলো হলো জঙ্গি গড়ার আস্তানা প্রভৃতি প্রপাগান্ডা। ভারতকে সাথে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ-ব্লেয়ার  আর আমেরিকান থিংকট্যাংকের এই যে বয়ান, একেই ইমরান খান চ্যালেঞ্জ করেছেন, ঐ লেখায়।

    কেন এসময়ে তিনি করতে গেলেন?
    সাম্প্রতিককালে আফগান সেনা প্রত্যাহার-উত্তরকালে আমেরিকান কংগ্রেসে (সংসদে) এনিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে শুনানি চলেছিল। আমেরিকা লবিংয়ের দেশ, লবিং করার কাজ বৈধ।  কংগ্রেস সদস্যের কাছে  খাতির জমিয়ে লবিং করে দিবে বলে কারো কাছে থেকে অর্থ নিতেও সমস্যা নেই। কেবল বিচার মন্ত্রণালয়ে রাখা একটি ফরম পূরণ করে রাখতে হবে। তা করার সময় স্ব-উদ্যোগে অর্থ নেওয়ার কথা আগাম তা উল্লেখ করে আসতে হবে। তবে এই লিখে স্বীকার করে নেয়া কোনোই অপরাধ নয়। তাই কোনো সমস্যা নেই। তবে ভবিষ্যতে এ কাজের ভেতরে অন্য কোনো আইনভঙ্গ করার বিষয় যুক্ত বলে প্রমাণিত হলে তখন সেই আইন ভঙ্গের কারণে এটা অপরাধ হতে পারে। নইলে না। এই কংগ্রেস বা সিনেটরদের লবিংয়ে ভারত লবিং খুবই শক্ত। কারণ তারা মেরিকান ব্যবসায়ীদেরকে নানান ব্যবসা দিয়ে কংগ্রেস্ম্যানদের সাথে সম্পর্ক গড়ে নিয়েছে। ফলে ভারতও এদের দিয়ে এই শুনানিতে পাকিস্তানের ওপর সব দায় চাপিয়ে বাইডেনকে মুক্ত করতে লেগে পড়েছে। আর এ কারণেই ইমরান নিজের হাতে ও নামে মতামত কলাম লিখেছেন।

    ইমরানের ওই লেখায় প্রথম প্যারাটা এরকমঃ “সাম্প্রতিককালের কংগ্রেসনাল শুনানি দেখে আমি আসলেই বিস্মিত হয়েছি। গত দিনগুলোতে (প্রায় ৪০ বছর, ইমরান কম করে কেবল চলতি শতকেরটা ধরে দুই দশক বলেছেন) আমেরিকার সহযোগী দেশ হিসেবে পাকিস্তানিরা আমেরিকার ওয়ার অন টেরর কর্মসূচিতে যে আত্মত্যাগ করেছে, এর কোনো উল্লেখ নেই দেখে বিস্মিত হয়েছি। অথচ এর বদলে আমরা দেখছি  আমেরিকার যেসব ক্ষতি হয়েছে, এই শুনানিতে এর কারণে আমাদেরকে দায়ী করা হয়েছে”।

    “Watching the recent Congressional hearings on Afghanistan, I was surprised to see that no mention was made of Pakistan’s sacrifices as a U.S. ally in the war on terror for more than two decades. Instead, we were blamed for America’s loss.” – Imran Khan

    অথচ “আমি বারবার বলে এসেছি আফগানিস্তানে বিজয়-সম্ভব-নয় [unwinnable], এটা এমন একটি যুদ্ধ। আফগানরা এমন এক লড়াকু জাতি, যারা কখনো নিজ ভূমিতে বিদেশী উপস্থিতি সহ্য করেনি। এমনকি সেই বিদেশী পাকিস্তান হলেও এই বাস্তবতা বদল হবে না”। এরপর ইমরান ওই সব বিগত বছর পাকিস্তানের কী কী ক্ষতি হয়েছে, আত্মত্যাগ করেছে, এসবের পরিসংখ্যানগত লম্বা বর্ণনা সাথে জুড়ে দেন।

    এসবের বর্ণনাযুক্ত বয়ান পাঠকরা ঐ  মতামতকলাম থেকে নিয়ে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিতে পারে। ঘটনাচক্রে প্রথম এ’ব্যাপারটা  আমার নিজের নজরে এসেছিল পাকিস্তানের ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে। আমার হাতে আসে ইমরানের দলের ঘোষিত মেনিফেস্টো, যা সম্ভবত ২০১৬ সালে তৈরি করা; কারণ তাতে ওবামা আমলে ব্যাপক ড্রোন বোমা হামলা ঘটনার পরিসংখ্যান দিয়ে নিন্দা জানানো হয়েছিল। আমি ওবাক হয়েছিলাম এ জন্য যে, এই প্রথম আমেরিকান ওয়ার অন টেররকে একেবারে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে মানে পাকিস্তানকে কিভাবে বাধ্য করা হয়েছে আর এতে পাকিস্তানের স্বার্থে কিভাবে বিঘ্ন হয়েছে – এই বয়ান দাঁড় করানো হয়েছে।

    কিছু ব্যক্তি অভিজ্ঞতাঃ
    গত ২০১৩ সালের দিকে বিদেশে মানবাধিকার ইস্যুতে এক প্রোগ্রামে অংশ নেয়ায় অনেক দিন পর কিছু পাকিস্তানি নারী-পুরুষের সান্নিধ্যে সাথে দু-তিন দিনের সেশনে কাটাতে হয়েছিল। ফলে সেসময় একালের পাকিস্তানের তরুণ-যুবাদের সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল। এমনিতে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিদেশী চাকরি সূত্রে অনেক পাকিস্তানি আমার কলিগ ছিলেন, কখনো বাসা পাওয়ার সমস্যায় তাদের সাথে একই বাসায় বসবাস বা শেয়ার করেছি; স্বভাবতই অফিসরুমও শেয়ার করেছি।  বিশেষত সেটা আফ্রিকা বলে আমরা এশিয়ান পাকিস্তানি, আফগানি, ভারতীয় বা ভুটানিরা যেন আপন আত্মীয় হয়ে গেছিলাম।  দে্শিভাইয়েরা তো আছেই, সাথে ভারতীয় ব্যাটেলিয়ন আর বিশেষত পাকিস্তানি ব্যাটেলিয়ান অফিসারেরা; কারণ তারা  মাসে অন্তত দুদিন আসত আর খুব খাওয়াদাওয়া হত।  তবু পাকিস্তানের তারুণ্যে এসব লেটেস্ট পরিবর্তন তখনো তেমন জানা হয়নি। তবে ২০১৩ সাল থেকে আলজাজিরার কিছু রিপোর্ট থেকে প্রথম টের পাই আমাদের চেনা সেই পুরনো রক্ষণশীল পাকিস্তান বদলে যাচ্ছে। তরুণ বা নয়া প্রজন্ম আগের আমেরিকান বয়ানে আর আগ্রহী নয়। খুঁড়িয়ে হলেও পাকিস্তানে এক নয়া প্রজন্ম, এক নয়া এডুকেটেড মধ্যবিত্ত একালে হাজির হয়ে গেছে। আমার রিডিং ও অনুমান এই নয়া প্রজন্ম পাকিস্তানকে বদলে দিচ্ছে।  পাকিস্তানের জন্য তারাই সম্ভবত আগামী দিনের বিরাট ভরসা! যেমন আসলে আর কত? – দোষ মূলত আমেরিকার অথচ দেশ-বিদেশে প্রপাগান্ডা চলছে যে সব দোষ পাকিস্তানের, আর পাকিস্তানই জঙ্গি ইত্যাদি বয়ান শুনতে শুনতে তারা হতাশ ও বিরক্ত। ফলে আমার মনে হত ইমরান আগামিতে তাদের সম্ভাব্য নেতা হবেন হয়ত। আর এরই কিছু ২০১৩ সালের শেষের নির্বাচনে এর কিছু আলামত দেখেছিলাম। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে এসে এর সরাসরি ফল দেখলাম।

    পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বদলঃ
    ইমরানের সাথে তুলনা করলে অপর দুই দল ও নেতা ভুট্টো বা নওয়াজ শরিফের দল, এদের ব্যর্থতা হল – তারাও নিঃসন্দেহে প্রচণ্ডভাবে যা-ইচ্ছা তাই ভাবের আমেরিকান চাপ সয়েছেন আর পাকিস্তানের উপরেই ড্রোন-বোমাবাজিসহ যা ইচ্ছা আমেরিকা করতে চায়, তা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তারা এখান থেকে বের হওয়ার পথ না খুঁজে বরং সে সময়-সুযোগটাতে আমেরিকার নামে দোষ চাপিয়ে রাষ্ট্রীয়-সম্পদ নিজের নামে দখল বাড়ানো  ও লুটের দিকে কাজে লাগাতে গেছেন। এটা অকল্পনীয় যে, আমাদের মত দেশের কোন নেতা দুই বিলিয়ন ডলার সম্পদ গড়েছেন। দুই বিলিয়ন কী ব্যক্তির একাউন্ট বা পকেটে থাকার মত অর্থ? অথচ এটাই পাকিস্তানে হয়েছে।
    আর ওদিকে সেনাবাহিনীও প্রচণ্ডভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল বিশেষ করে ট্রাম্প আমলের শুরু থেকেই।  ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে প্রতিদিন গড়ে আমেরিকাকে নিয়মিত ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় থেকে আমেরিকায় নিজ প্রশাসনকে বাঁচানো; কিন্তু তিনিও  পাকিস্তানকে এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী বলে মনে করে তাতে ভারতকে সাথে নিয়ে প্ররোচনায় তার প্রপাগান্ডা শুরু করতে থাকেন।
    গত ২১ নভেম্বর ২০১৮ ট্রাম্প বলেন,  “ওরা (মানে পাকিস্তান) আমাদেরকে সাহ্যায্য করতে কিছু করে নাই” – আর এই অজুহাতে তিনি মোট প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রত্যাহার করেছিলেন [“Done Nothing To Help Us”: Trump On Stopping $1.3 Billion Aid To Pakistan]। এই প্রপাগান্ডা নিউজটা ভারতের। তবে সবচেয়ে বড় হৈচৈ পড়েছিল যে খবরে সেটা হল, ৩০০ মিলিয়ন ডলার যা Coalition Support Funds  হিসাবে যা পাক-আর্মিকে দেয়ার কথা তা প্রত্যাহার করে নেওয়ায়।  কিন্তু আমেরিকান [VOX News] ভক্স নিউজ জানায় ঘটনা কিছু অন্য। তারা লেখেছিল,  It’s all part of a broader strategy to have Pakistan help defeat regional militants — but it’s unclear if the strategy is working. কিন্তু এই কৌশল কেন নেয়া হয়েছে তা অস্পষ্ট।

    ফলে সারকথায় ট্রাম্প পাকিস্তানকে আরো ঠেকিয়ে ধরেছিলেন। কারণ ডলার আয়ের অভাব তখন এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ছেয়ে বসেছিল। যদিও তাতে  ততদিনে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত সেনাবাহিনী আমেরিকান “অস্পষ্ট” অভিযোগ নিয়ে ট্রাম্পকে আর তোয়াজ করতে যায় নাই, সম্পর্ক এতই নিচে নেমে গেছিল। ফলে আর আমেরিকাকে আবার আপার হ্যান্ডে যাবার সুযোগ দেয় নাই বা আসে নাই। ফলে তখন থেকেই রাজনীতিবিদদেরও আগে পাকিস্তান সেনারা নতুন বন্ধু খুজতে গিয়ে চীনের কোলে গিয়ে উঠেছিল। চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক বহু আগের কমপক্ষে ১৯৬৮ সাল থেকে, তা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু তা সত্বেও পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গুরুত্ব বা ঘণিষ্ঠতা চীনেওরও উপরে।  ফলে ভারত যতই প্রপাগান্ডা করুক প্রথমত চীন নয়, পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গুরুত্ব বা ঘনিষ্ঠতা ছিল চীনের চেয়েও উপরের।  আর দুইঃ আমেরিকাই পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক একেবারেই দুর্বল করে ফেলেছিল।  বাধ্য হয়েও সে চীনকেই নিজ সম্পর্কের শীর্ষে নিয়েছিল। আসলে আফগানিস্তানে খরচ ও ব্যর্থতায় ডুবে আমেরিকার বেপরোয়া আচরণই সব সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। একেবারে ভাঙ্গে নাই, কিন্তু মর্ম দুর্বল হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে।
    শেষে, ২০১৮ সালের শেষ থেকে ট্রাম্প বুঝতে পারেন, তাঁর এই মিথ্যা কৌশল অকাজের; এটা তাঁর নিজের স্বার্থের পক্ষেই কাজ করবে না।  মুল কারণ, আমেরিকাকে  আফগানিস্তান ফেলে বের হতে যেতে গেলে – কোন পুতুল গণি সরকার তাকে সাহায্য করতে পারবে না। আমেরিকার একমাত্র পথ ও ভরসা যদি তারা তালেবানদের সাথে একটি চুক্তি করতে পারে। কারণ যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাক্ত ফেলে কারো ভেগে যাওয়ার পরিকল্পনার মানে হল পালানোর সময় কেউ আক্রমণ করলে সে্টা থেকে কাভার মানে ঐ হবু আক্রমণ থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করবে কে? এর ব্যবস্থা করতেই – টানা বিশ বছর যে তালেবান যোদ্ধাদের সাথে আমেরিকা যুদ্ধ করল  ট্রাম্প  বুঝে যান যে এই তালেবান যোদ্ধাদের সাথেই তাকে চুক্তিতে আসতে হবে। কিন্তু এই সমস্যা আরো জটিল কারণ ট্রাম্প টের পেলেন যে, পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যে  আমেরিকানদের সাথে একটা চুক্তি করতে তালেবানদেরকে রাজি করাতে আমেরিকাকে সাহায্য করতে পারে।

    তাই ট্রাম্প তালেবানদের সাথে আপসনামা রচনায় তাঁর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোমাট [Zalmay M. Khalilzad] জালমে খলিলজাদকে নিযুক্ত করার পরই ট্রাম্প পাকিস্তানের সাথে দ্রুত সব  বিবাদ মিটিয়ে ফেলেন। তবে ২০১৮ সালে ইমরান প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলে তালেবান আলোচনা গতি পায় যদিও;  কিন্তু ততদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমেরিকা থেকে বহু দূরে সরে গেছে। বলা যায়  মূলত গত প্রায় বিশ বছরের গভীর সামরিক সম্পর্ক, নির্ভরশীলতার  সম্পর্ক পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছিল।  আর ততই চীনের সাথে সম্পর্ক গভীর করে নিতে এগিয়ে যায়।  খুব সম্ভবত এটাই পাকিস্তান সেনা প্রশাসনের ইমরানের দলের সাথে  নয়া এক ওয়ার্কিং রিলেশন গড়ে তুলার ভিত্তি হয়ে যায়। যেটা একেবারেই মাঠে কার্যকর হয়ে যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে।

    আমেরিকা যে সারাজীবন একান্ত নিজের স্বার্থে পাকিস্তান ব্যবহার করে গেছে অথচ এর সব আবর্জনার ও দায় উলটা পাকিস্তানের উপর ঢেলেছে – আর এর বিপরীতে ইমরানের দলের নয়া বয়ান পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে শুধু ছুঁয়ে যায় তাই না,  হুঁশের এই বয়ান পাকিস্তানে সবচেয়ে কার্যকর এক নয়াপথ হিসাবে হাজির হয়েছিল।  আসলে  অতি-নির্ভরশীলতা ত্যাগ না করলে, কষ্ট না করলে স্বাধীনতা ভোগের যোগ্য হওয়া যায় না – সেটাই ঘটেছিল।  আর তা পেরেছিল বলেই তারা ইমরানের সাথে সম্পর্ক গড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। বরং এখন উলটা পাকিস্তানের ওপর আমেরিকান নির্ভরশীলতা এখনো বর্তমান। আফগানবিষয়ক বা ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার ওই অঞ্চলে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থের জন্যই আমেরিকার পাকিস্তানকে দরকার। এ কারণে ভারত যতই চেষ্টা করুক, মার্কিন কংগ্রেসকে দিয়ে পাকিস্তানবিরোধী চাপ সৃষ্টি করবে ইত্যাদি যাই করুক; কিন্তু বাইডেন প্রশাসন জানে পাকিস্তানকে তার কেন দরকার।

    ওদিকে ভারতের হাহাকারঃ
    এরই মধ্যে দোহায় (২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০) দেড় বছর আগের আমেরিকান-তালেবান চুক্তিতে ভারত কী কী হারিয়েছে বা কী কী নেই, তাদেরকে জানানো হয়নি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভারত এখন আপত্তি তোলা শুরু করেছে। কোথায় আর এখন কেন?

    জয়শংকর বলেছেন, দোহা চুক্তির বহু বিষয় নিয়ে ভারতকে অন্ধকারে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রঃ
    গত ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল ওয়াশিংটনে ভারত-আমেরিকা ‘কৌশলগত পার্টনার’ ফোরামের চতুর্থ বৈঠক [US-India Strategic Partnership Forum (USISPF)] । যদিও হিন্দুস্তান টাইমসের নিউজটা জয়শঙ্করের  ভনেকটা ঘুরিয়ে বলা ভাষ্যটা। বলা সেই ভাষ্যটা এরকম, ট্রাম্প-তালেবান কথা চালাচালির অনেকগুলো থেকেই ভারত বাইরে পড়ে গেছিল ‘India wasn’t fully in the loop on US-Taliban deal’: Jaishankar explains concerns]।
    সেখানে ভারতে আমেরিকার এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ফ্রাংক জি উইজনারের প্রশ্নে এসব মতভিন্নতা বাইরে চলে আসে [During the question and answer session, former US ambassador to India Frank G. Wisner quizzed him on the “dramatic” developments in India.]। ফলে যদিইও সেটা ভারত-আমেরিকার দুই সরকারি বৈঠক নয়। তবু উইজনারের প্রশ্নের জবাবে নিজের অনুযোগ জয়শঙ্করকে সেখানে হাজির করতেই হয়েছিল।  সেখানে ভারতের ক্ষোভ হল – “ভারতকে জানানো হয়েছিল যে, এক ইনক্লুসিভ সরকার হবে (ভারতের কাছে এর ব্যাখ্যা সম্ভবত, গণি সরকারেরও প্রতিনিধি তালেবান সরকারে থাকবেন)। এ ছাড়া নারীদের কী হবে? আর সর্বোপরি ভারতের প্রশ্ন, তালেবানের আমলে কি ভারতীয় কাশ্মিরের মুসলমানরা তালেবান সহায়তা পাবে?” তবে কথাটা অন্য ভাষ্যটা হল, যেমন বলা হচ্ছে যে, তালেবানের মাটি কি অন্য দেশে সন্ত্রাস চালানোর কাজে ব্যবহৃত হবে? কিন্তু এই একই প্রশ্নের অন্য দিক আছে, আগে যেভাবে গনি সরকারের আমলে আফগান মাটি ব্যবহার করে ভারত-আমেরিকার সমর্থনে  চীন ও পাকিস্তানে  অন্তর্ঘাতমূলক
    আক্রমণ চলত, প্রজেক্টে হামলা চলত, চীনা প্রকৌশলী নিহত হতেন, সেসবের কী হবে? অর্থাৎ সেই একই গান?  ভারত-আমেরিকার সমর্থনে যে চীন ও পাকিস্তানেও সন্ত্রাসী আক্রমণ চলছে তা নিয়ে তিনি চুপচাপ।  তবে ওই স্ট্র্যাটেজিক সভা শেষ হয়েছে ভারতের এ মর্মে অসন্তোষে যে, আংশিকভাবেই গনি সরকারের আমলের কোনো সুযোগ-সুবিধা ফেরত আসছে না কেন!

    এব্যাপারে আমেরিকান ব্যাখ্যা হল, আমরা ৩০ আগস্টের আগেই সব অস্ত্র ও রসদ নিয়ে ফিরে চলে আসব, কোনো কিছু আর আফগানিস্তানে ব্যবহার করব না – চুক্তিতে এমন কথা ঢুকিয়েই আমরা বিপদে পড়ে গেছিলাম।। চুক্তির এই ফেরে পড়েও তালেবানরা চুক্তির কোনো অংশ বাস্তবায়ন না করলেও আমরা চিপায় পড়ে গেছি। মানে এখন কিছুই করার নেই, ‘মাফ চাই’ ধরনের।

    আর ভারতের ততই গোসসা। এতদিন কংগ্রেসের শুনানি চলাবস্থায় বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানের সাথে তাদের অনেক কথা বলা দরকার হলেও তা করতে যাননি। অবশেষে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমানের ভারত সফরে গত ৬ অক্টোবর ফরমালি ভারতের গোসসা শোনা হয়। ভারত এবার সুযোগ পেয়ে আফগান হাক্কানি নেটওয়ার্কের আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি জানিয়েছে। দ্যাপ্রিন্টের নয়নিমা বসু তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেন “India raises concerns over Haqqanis, ISI in Afghanistan with visiting US Deputy Secy of State”]। এই আর্টিকেল পাকিস্তানের মুন্ডপাত করা ভারতের আভ্যন্তরীণ দেশপ্রেমিক জনগণ তা পছন্দ করতে পারে। কিন্তু একাজ নিঃস্ফলা।

    ট্রাম্প কি জানতেন না যে তালেবান বলতে তাদের সাথে হাক্কানি গ্রুপও থাকবে?
    এ বিষয়ে আসলে কিছু কড়া কথা বলতেই হয়। বিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার পর বাজনা বাজাতে দেখলে মানুষের বিরক্তই লাগবে। ট্রাম্প কি জানতেন না যে তালেবান বলতে তাদের সাথে হাক্কানি গ্রুপও থাকবে?  এমনকি ট্রাম্পের জানা না  থাকলেও নিজে থেকেই হাক্কানি গ্রুপ প্রসঙ্গে আগাম তাদের আপত্তির কথা বরে রাখা যেত। যা তিনি বলেন নাই। তা তিনি বলে নেননি কেন? এফবিআই কিংবা ইউএনের খাতায় হাক্কানি নেতা সিরাজুদ্দিনের মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে নাম আছে তো! তাতে কী?  কারণ, ট্রাম্প যখন দোহা চুক্তি করেই ফেলেছেন যেখানে সিরাজুদ্দিন বা ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ নেতাদের সম্পর্কে কী হবে এ নিয়ে আমেরিকার কোনো আপত্তি করে রাখা হয় নাই। তাহলে সিরাজুদ্দিন বা হাক্কানি প্রসঙ্গে এখন আমেরিকানদের কিছুই বলার নাই। আবার থাকলেও আমেরিকার কিছু করর থাকত না। কেন?  আমেরিকানদের পক্ষে কিছু লেখা থাকলেই তা বাস্তবায়নে তালেবানদের বাধ্য করার জন্য আমেরিকার হাতে কোনো উপায় রাখা হয়নি। তার সব উপায় ও অস্ত্র ৩০ আগষ্টের পরে প্রতাহার করে নিয়ে যেতে বাধ্য ছিল আর আমেরিকানেরা তাই করেছে। কাজেই হাত ধুয়ে ফেলা ছাড়া আমেরিকার কী করার আছে এখন! – এর সোজা অর্থ, এখন এসব ফালতু আলাপ। এখন আমেরিকা চুক্তি করেছে মানেই তারা তালেবানদের সরকারে থাকতে পরোক্ষে হলেও অ্যাপ্রুভাল দিয়ে দিয়েছে। কাজেই ভারতের এখন এখানে সেখানে হাক্কানিদের “তালিকায় নাম আছে’, তালেবান সরকারে হাক্কানিরা আছে – বলে এসব নিয়ে কিছু দিনের প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কোনো মূল্যই নেই।

    আর পাকিস্তান নিয়ে নালিশের ব্যাপারে মার্কিন উপপররাষ্ট্র-মন্ত্রী শেরমান ওয়েন্ডি ভারতকে বহু কিছু বলে দিয়েছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, তিনি বলছেন তা হল, সেই রাধাও নেই আর তার নাচের মন-মর্জিও নেই। মানে ওই সব বাদ দিতে হবে। তিনি সোজা করে বলেছেন, দেখুন  সেই আফগানিস্তান আর নাই এটাতো একুশ শতক আর গত ২০ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে [we live in the 21st century and that things have changed over the last 20 years. ]। এখন যতটুকু যা হতে পারে তা হলো, আমরা সবাই (ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি) যদি এক থাকতে পারি, একসাথে চেপে ধরতে পারি তা হলে কিছু হতে পারে। এরপর তিনি সরাসরি স্বীকার করে নেন যে, ‘সেই আফগানিস্তান আর নেই যেমনটি কেউ কেউ চাচ্ছে।’ মানে কথা সোজা, ও দিন গত, আমাদের সেই মুরোদও আর নেই। কাজেই বিরক্ত কইরেন না…।’

    “And I think what I hope is that everyone engaged with the Taliban, I have no problem, and the United States has no problem with people engaging with the Taliban, and telling them what needs to happen, that we live in the 21st century and that things have changed over the last 20 years. It is not the Afghanistan that they want to, and that it will be very hard to try to go all the way backwards and the international community has to stand as one,”

    শেষে ভারত বোবা হয়ে গিয়ে আর কিছু না পেয়ে এবার শেরমানকে চেপে ধরেছে। কেন? কী নিয়ে? কারণ ততক্ষণে আপনাতেই প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি ভারত থেকে পাকিস্তান যাচ্ছেন। এখন ভারতীয় ছেচড়ামো শুরু হয়েছে, আপনারা তা হলে ভারত-পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপছেন? এটি বলে ‘সে কী কান্না’! মানে ভারত বলতে চাচ্ছে আমরা তো পাকিস্তানের চেয়ে উঁচু জাতের ছিলাম তোমার কাছে। আর তার কী হলো?  কথাটা ইংরাজিতে তারা বলে বলে হাইফেনেটেড করা। মানে ভারত-পাকিস্তান শব্দ দুটো মাঝখানে একটা ড্যাশ দিয়ে লেখা!

    এখন সমস্যা হলো, এই কান্না দেখেও আমেরিকার হাতে কিছুই করার নেই! তবে একটি সান্তনা বাক্য দিয়েছেন ওয়েন্ডি, বলেছেনঃ বিশ্বাস করো বেশি মিশব না, খালি অল্প একটু করে মিশব [It’s for a very specific and narrow purpose]!

    তবে ভারতকে এখন ভান করেই যেতেই হবে যে, আমেরিকার কাছে অনেকের চেয়ে দামি সে!
    তবু খুশি থাকুক, এ আমাদের কামনা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৯ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারতের গোসসা, আমেরিকার অসহায়ত্ব“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা কী নিজ-ভুল রিভিউয়ের সাহসী হবে!

    আমেরিকা কী নিজ-ভুল রিভিউয়ের সাহসী হবে!

    গৌতম দাস

    ৩০ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    Biden sticks to Aug 31st deadline for Afghanistan exit; 

     

    এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে, বাইডেনের আমেরিকা এবার আফগানিস্তান ছাড়তে মন বেঁধে ফেলেছে যদিও যাদের জানার তাদের জানা ছিল যে, বাইডেনের হাতে এদেশ ছেড়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প শুধু না, ফেলে পালিয়ে যাবার এক বিরাট সুযোগ। আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাট যাই হন, ২০০৫ সালের পর থেকে সবাই জেনে গিয়েছিলেন যে, ভুল হয়ে গেছে, পা দেবে গেছে, বিকল্প নেই। সবটাই লস। কিন্তু কিভাবে ফিরে আসবেন, কী করে ফিরে আসবেন এটাই জানা ছিল না। শেষে পাগলা আর গোঁয়াড় যে ট্রাম্প তিনি নির্ধারক সিদ্ধান্তে তালেবানদের সাথে চুক্তি করে ফেলেছিলেন আর বাইডেন খরচ কমানোর এই শেষ সুযোগটা ছাড়তে চাননি।

    সারা দুনিয়াতেই দেখা গেছে রাজার চেয়ে রাজার বন্ধু-পারিষদেরাই সমস্যা। তারা রাজার স্টোর-টাঁকশালে কী আছে এর খবর না রেখে বোলচালের দুর্বুদ্ধি-হামবড়া করে গেছেন। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কথিত উন্নত সাত-রাষ্ট্রের গ্রুপ ‘জি-৭’  [What Is the Group of Seven (G-7)?], এরা সেই বন্ধু-পারিষদ। নিজ মুরোদ নাই, এরা বাইডেনের ঘাড়ে চড়তে গেছিলেন। তারা বাইডেনকে ৩১ আগস্টের পরেও আফগানিস্তানে থাকার ‘বুদ্ধি’ বের করতে বলেছিলেন। কিন্তু বাইডেন এসব ‘বাজে পরামর্শ’ ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। কারও কারও মতে বাইডেন জি৭-এর সাথে ভাল করে আলাপ না করেই এককভাবে তালেবানদের সাথে সমঝোতা চুক্তি ফাইনাল করেছেন [US abruptly withdrew from Afghanistan and left a mess behind]।   লক্ষণীয়, পশ্চিমের একমাত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সূত্রে বাইডেন ছাড়া এর বাইরে পশ্চিম বা ইউরোপের আর কারো সাথে তালেবানদের কোনো আলাপ-সম্পর্ক, কথা বা চুক্তি হয়নি। ইউরোপ বরং এটাকে সুবিধা হিসেবে নিয়েছে যে তালেবান-ইউরোপ কোনো চুক্তি নেই ফলে তাদের কোনো প্রত্যক্ষ দায়দায়িত্বও নাই। আর এই সুযোগে ইউরোপ বাইডেনের ঘাড়ে চড়তে চাওয়া!

    দুনিয়ার কোনো রাজাই চিরকাল রাজা থাকেননি। গ্লোবাল নেতা আমেরিকাও অনন্তকাল নেতা থাকবেন না। এটা বুঝতে না পারা তো কোন ব্যাপার নয় যদি গভীর ‘আমেরিকা প্রেম-আবেগ’ কোন বাধা না হয়।
    আঙ্কেল আমেরিকার সঙ্কট অর্থের টানাটানি। সেটা অস্বাভাবিক অবশ্য নয়। আফগানিস্তান ছেড়ে গিয়ে অর্থ সাশ্রয় করা ছোটখাটো অর্থ না। মূলত এ জন্যই তিনি এই এক সিদ্ধান্তে ফোকাসড। বক্তৃতা দিয়ে সোজা বলছেন- ‘কোনো অনুশোচনা নাই [: ‘I Do Not Regret My Decision’ To Withdraw ]”। কারণ খরচ কমিয়ে সরকার-দেশ কিছু বাঁচাতে পারলে বাপের নাম! পেন্টাগনের জেনারেলেরাও ৩১ আগস্টের পরে আফগানিস্তানে আরো কিছু দিন থেকে যাবার আবদার না করে বরং বাইডেনকে বিরাট সাপোর্ট দিয়েছেন [Biden sticking to Aug. 31 Afghan pullout ]। খরচের পরিমাণও বিশাল! আফগানিস্তানে আমেরিকার প্রতিদিনের গড়ে খরচ বলা হচ্ছে, প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার এবং তা টানা ২০ বছর ধরে। ৩০০ মিলিয়ন ডলার মানে কত? এর একটা ধারণা দেয়া যাক। এরশাদ পরবর্তি  নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশে যে নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা শুরু হয়েছিল তখন প্রতিটা সরকার কামনা করত, প্রতি বছর (এখানে দিন নয়, বছরের কথা বলা হচ্ছে) প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে (তিন বছরে এক বিলিয়ন) আইএমএফ লোন পেলে সরকার চালানোটা আরামের হয়; আমদানি ব্যয় মিটাতে টানাটানিতে চলতে হয় না।

    House Democrats and Republicans held news conferences and pushed for the Biden administration to extend the withdrawal of troops in Afghanistan past the Aug. 31 extension deadline, citing the need for a slow exit in order to not escalate the current situation with the Taliban.CreditCredit…Sarabeth Maney/The New York Times   কংগ্রেসের দুই দলই বাইডেন কে সেনা প্রত্যাহারের তারিখ পিছাতে চাপ দিয়েছিল।

    কেউ প্রভাবশালী গ্লোবাল নেতা অথবা দেশ  –  এই কথাটার পেছনের আসল অর্থ হল যে, ঐ দেশের অর্থনীতিতে ঐকালে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় সর্বাধিক। আমেরিকা এমন নেতা হিসেবে টানা পঁচাত্তর বছর ধরে দুনিয়ায় মাতব্বরি চা্লালিয়ে যেতে পেরেছে। অর্থাৎ সামরিক সক্ষমতা নয়, অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই কোনো রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি হওয়া ও থাকার মূল চাবিকাঠি। কারণ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই একবার হাতে এলে তখন সামরিক সক্ষমতা অর্জন হাতের মুঠোর জিনিস, মাত্র কয়েক বছরের ব্যাপার হয়ে যায়।

    এই কথাটাই অনেকে সহজে মানতে বা বুঝতে চায় না। আপনি আমি আমেরিকা বা ব্রিটেনের ভক্ত হতেই পারি, কেউ কেউ শেষ জীবনে সেখানে সেটেলড হবার কথাও সামর্থ্য থাকলে ভাবতে পারি। মানে নিজ ব্যক্তিস্বার্থ ওর মধ্যে দেখতেই পারি। কিন্তু তাই বলে কেউ যখন কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার উত্থানের সাথে ওর গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা পতন সম্পর্কিত এটা সে দেখতে পাচ্ছে, অথবা নির্দেশ করে দেখায়- কিন্তু তা বলে এর মানে, সে আমেরিকাবিরোধী বা সে চীনভক্ত তা বুঝায় না। তাই এমন ট্যাগ লাগিয়ে বুঝাবুঝির চেষ্টা অর্থহীন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসদাতা তো ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস আনার কর্তা নন!

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্সে’ আত্মোপলব্দিঃ
    তবে আফগানিস্তানে সর্বশেষ ক্ষমতায় পরিবর্তন এবার অনেককেই ‘ন্যাংটা’ করে দিয়েছে; অনেক মিথ্যা স্বীকার করিয়ে ছাড়ছে। আত্মসমালোচনা বা রিভিউ যা আমেরিকা বহু দিন দেখেনি তা এবার কেঁপে কেঁপে বাইরে বের হয়ে আসছে। এমনই এক রচনা প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে। মূলত এটা এক দ্বিমাসিক ম্যাগাজিন। যদিও এশিয়াকে প্রভাবিত করার প্রবল প্রতিযোগিতার একালে পশ্চিম আর মাতবর-ভাব নিয়ে বসে না থেকে মাঠে নামতে হচ্ছে। তাই একালে দ্বিমাসিক হয়ে তাতে আটকে থাকতে পারছে না। অতএব দ্বিমাসিকের বাইরে, এখন প্রতিদিন অনলাইনে বাড়তি এটা ডেইলি ব্রিফিং পাঠাচ্ছে তারা। মানে পুরানা কাস্টমার হিসেবে প্রতিদিন একটা আর্টিকেল ফ্রি পড়তে পাচ্ছি। বলাই বাহুল্য, এটা এক এলিট পত্রিকা। প্রায় ১০০ বছরের পুরানা, ১৯২২ সালে এটা প্রথম প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভাল একটা গুণ হল – প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গুরুত্ব তারা সবচেয়ে ভাল বুঝে। থিংকট্যাংক নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তারা  দাতব্য  (নন-প্রফিট বা এনজিও) প্রতিষ্ঠান হিসেবে খুলে চালিয়ে থাকে।  আর এর মাধ্যমে একটা নীতি-পলিসির পক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক জনমত তৈরির প্রক্রিয়া সমাজে জারি রাখে। জনমত তৈরির এই স্টাইলটা এতই কার্যকর যে একালে বুড়া বয়সে পুতিনের রাশিয়াতেও এমন নীতি-গবেষণার থিঙ্কট্যাংক   প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। তেমনই আমেরিকান এক প্রতিষ্ঠান হল “কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর  CFR)। এরাই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনের প্রকাশক। দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে যারা বিভিন্ন প্রেসিডেন্টের আমলে মন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট অথবা ডিফেন্স) বা এর ডেপুটি ছিলেন তারাই আমেরিকার ফরেন পলিসি বিষয়ে এখানে লিখে থাকেন। এখানে এখন যার লেখার কথা তুলব তিনি – বেন রোডস [Ben Rhodes]। ওবামা আমলে ওই প্রশাসনে তিনি ডেপুটি-প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন।

    তার লেখার ছোট শিরোনাম তিনি দিয়েছেন- ‘ওরা আর আমরা’ [Them and Us]।’ আর “কী করে আমেরিকা নিজ-শত্রুর হাতে তারই ফরেন পলিসি হাইজ্যাক হতে দিয়েছে” [How America Lets Its Enemies Hijack Its Foreign Policy] – এই ছিল ওর বড় শিরোনাম। এরপর তিনি লিখতে শুরু করেছেন এভাবে, “নাইন-ইলেভেন বা টুইন-টাওয়ার হামলার ঘটনার চেয়ে বেশি একুশ শতকের আর কোনো ঘটনা আমেরিকাকে এত আকার দেয়নি ও এর ভুমিকা ঠিক করে দেয়নি। কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগে (মানে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত- ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় আমেরিকাই একক পরাশক্তি ভেবে) আমাদের মধ্যে যে সন্তুষ্টি ভাব তৈরি হয়েছিল এই আক্রমণ তাকে একেবারেই ফুটা করে দিয়ে যায়। সাথে আমাদের মধ্যে ‘আমেরিকার নেতৃত্বের এক গ্লোবালাইজেশনের বিজয়ের ভেতর দিয়েই ইতিহাস শেষ হবে’ বলে যে মিথ্যা ধারণা তৈরি হয়েছিল এটা তাও ভেঙে তছনছ করে দিয়ে গেছে”।

    তিনি বলে চলেছেন, ” ‘ওয়ার অন টেরর’ বলতে আমেরিকার সরকারের কাজের ধরণ, মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি এমনকি মানুষের প্রতিদিনের জীবনে যেমন – ভ্রমণ, ব্যাংকের কাজ বা আইডেনটিটি-সংশ্লিষ্ট যেকোনো ইস্যুতে সবার জীবন একেবারেই বদলে গিয়েছিল। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ফিলিপাইন, সোমালিয়া, ইয়েমেনসহ অনেক রাষ্ট্রের উপর আমেরিকা সামরিক শক্তি ব্যবহার করেছিল। বিভিন্ন দেশের সাথে ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের উপরে টেররিজম সবক্ষেত্রে এক মুখ্য ইস্যু হয়ে থেকেছিল। আসলে ‘৯/১১’-এর পরে প্রেসিডেন্ট বুশ আমেরিকান পরিচয়কে সংহত করে নয়া প্রজন্মের লড়াইকে সামরিক নেতৃত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এই যুগের লড়াই ফ্যাসিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াই হিসাবে চলবে”।

    অর্থাৎ বেন রোডস এখানে স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকার একক পরাশক্তি ভাব ও অহংকার এসেছিল যা ভেঙে চূরমার করে দেয় ৯/১১-এর হামলা। পরিণতিতে বুশ ক্ষোভে ফ্যাসিজম ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা তুলে বিভিন্ন দেশে সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার দখল (বাংলাদেশের ‘১/১১’-এর ক্ষমতা দখল যেমন) এর চল শুরু করেছিল। আর তাতে যাকে খুশি ক্ষমতায় আনা এবং ইচ্ছামত সরকার বদলে দেয়ার মত উন্মত্ততায় কাজে তারা নেমে পড়েছিলেন।

    তাই এবার স্বীকার করে বলছেন, “গ্লোবাল ওই যুদ্ধকে ঠেকানো দুঃসাধ্য ছিল হয়ত; তবে তা আমেরিকার জন্য অনাকাঙ্খিত সব পরিণতি ডেকে এনেছিল। আমেরিকা সরকার শিগগিরই তার ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে সার্ভিলেন্স, ডিটেনশন ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছিল। আলকায়েদা উৎখাতে লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ”।

    ‘‘সামরিক হস্তক্ষেপে সরকার বদলানোর ‘রেজিম চেঞ্জ’- এটা দেশে ও বিদেশে আমেরিকান গণতন্ত্রের কী হাল করছে সেটা খেয়াল করেনি। যেসব বিজয় অর্জনের কথা প্রেসিডেন্ট বুশ অর্জিত হবে বলে দাবি করে গেছেন যা রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মিডিয়া নিরন্তর প্রচার করেছে, তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তাতে নিজ সরকারের ওপর আমেরিকার আস্থা নষ্ট করে আর তাতে নতুন করে অভ্যন্তরীণ অজুহাত খুঁজতে থেকেছে।’’

    বেন রোডসের এরপরের লেখা অংশটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। বেন রোডস এবার ট্রাম্পের মতো চরিত্রের উত্থান কেন আমেরিকায় ঘটেছে এর একটা ব্যাখ্যায় গিয়ে বলছেন, “৯/১১ পরবর্তী-যুগের আমেরিকা যে  যুদ্ধবাজ ন্যাশনালিজম [Jingoistic nationalism ] দেখেছিল তা আসলে মূলত মানুষের মনের এক অজানা শঙ্কা আর বিদেশভীতির ককটেল থেকে তৈরি – যা ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে এই প্রেসিডেন্টের জন্ম দিয়েছিল। ট্রাম্প আসলে বাকচাতুরিতে দেশের ভিতর শত্রুর ইঙ্গিত করে তাদের উপর দায় চাপিয়ে গেছেন”।

    বেন রোডস-এর এই শেষাংশটা তাদের দেশের দুই দলের কামড়াকামড়ি দোষ চাপিয়ে কেটে পড়া – তাই এতে জড়ানো আমাদের কোনো কাজ নাই। তবে এরপর রোডস বাইডেনের পক্ষে ঢোল পিটিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, এইবার নাকি বাইডেন “আফগানিস্তান থেকে গুটিয়ে সমস্ত শক্তি চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করবেন, দুনিয়ায় আমেরিকার হাজির থাকার লক্ষ্য দুনিয়াকে দেখাবেন”।

    সরি বেন রোডস! আমরা একটুও নড়লাম না, আপনি আমাদের ন্যূনতম আকৃষ্ট করতে পারেননি এসব বলে। এখানে বেন রোডসের দেয়া ২০ বছরের যুদ্ধের খতিয়ানে তিনি বলেছেন, মোট খরচ (দুই ট্রিলিয়ন নয়) নাকি সাত ট্রিলিয়ন ডলার। আর আফগানিস্তান ও ইরাকে মৃত মোট  সেনা সার্ভিস মেম্বার বলছেন (দুই হাজার নয়) সাত হাজার। তবে তারা এই খরচ বেশি আর কম যাই দেখাক তাতে এতে বাইডেন সরকারের আয় বাড়বে না, কিছু খরচ কমবে। এটাই মূল কথা।

    তা ছাড়া, বিয়ে শেষ হয়ে যাবার পরে ব্যান্ড পার্টির মধুর সুরও কারোই ভালো লাগবে না। যেমন ধরেন আফগানিস্তান এবং এরপরে পরেই ইরাক থেকে আমেরিকা ও ন্যাটোর সেনা প্রত্যাহারের পর সেন্ট্রাল এশিয়া, ইরান, মধ্যপ্রাচ্যসহ (সাউথ চায়না সি এলাকা আর ভারত বাদে) বাইডেনের আমেরিকা ক্রমশ বাকি এশিয়ায় আর কোথাও নাই হয়ে যাবে। আর সাউথ চায়না সি-তে ওর চারপাশ তো ওবামার আমলেই তার ‘পিভোট এশিয়া’ পলিসি ফেল করার পর থেকে ওখানে কিছুই আর জাগেনি। আগ্রহিরা তাদের ব্লকের ম্যাগাজিন ডিপ্লোম্যাটের কিছু রিপোর্ট যেমন [The Pivot to Asia Was Obama’s Biggest Mistake] দেখে নিতে পারেন।]   সবমিলিয়ে গত পঁচাত্তর বছর  এশিয়াতেও আমেরিকার রুস্তমি চলেছিল কিন্তু এখনকার মত কখনো এভাবে এশিয়া থেকে উৎখাত হয়নি।

    কেন আফগানিস্তান থেকে ফিরলেও আমেরিকান শক্তির রকমফের হবে নাঃ

    মূল যে কথাটা, তা হল, আফগানিস্তান থেকে বাইডেন ফিরে গেলে আমেরিকান অর্থনীতিতে সারপ্লাস অ্যাকুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বেড়ে যাবার কোনো ঘটনা তো সেটা নয়, তাই সেটা ঘটার কারণ নাই। ফলে এতে আমেরিকার চীনের সাথে অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রশ্নে আমেরিকার প্রতিযোগী হয়ে ওঠার বাড়তি কোনো কারণ নেই,  কারণ ঘটনাই তা নয় তাই। আসলে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কখনো ডুববে না বলে গর্ব করা হত, যে ব্রিটিশরা গর্ব করত, তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কোথায় মুখ লুকালো? কোথায় সেই উইন্সটন চার্চিল? এরপরের একচ্ছত্র বিজয়ী আমেরিকার সামনে কেন আর তারা কখনো আসেনি? কারণ সবকিছু ফিরে আসে না!  একালে  ব্লোয়ারকে কেন বুশের ছোট-তরফের মিথ্যাবাদী গুণ্ডা-রংবাজই হতে হয়? কারণ একালে এই দালাল-ভাড়ামো ভুমিকাই তার জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই ১৯৪১ সালের আগষ্টের আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তিতে!

    সব যুদ্ধবাজি জিঙ্গোইজমের দায় বুশের নয়, পরের ওবামা-হিলারিও দায়ীঃ
    আবার আমরা লক্ষ করেছি, লেখার শেষে বেন রোডস নিজ-পরিচয় দিয়েই বলেছেন তিনি ওবামার দুই টার্মেই ডেপুটি মন্ত্রী ছিলেন। অথচ তার মন্ত্রীত্বের সরকারের আমলে, মানে  ওবামা-হিলারির আমেরিকা যেসব দেশে গিয়ে আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপে সে দেশের সরকার ফেলানোর হিসাব দিয়েছেন – সেগুলোও আগের বুশের আমলে দায় বলে চাপিয়েছেন। যেমন ইরাকের সাদ্দামের সরকার ফেল্মলানোর দায় বুশের অবশ্যই কিন্তু এরপরের – লিবিয়ার গাদ্দাফি, সিরিয়ার আসাদ (ব্যর্থ) ইত্যাদি এসব অন্যায় তো বুশের দায় নয়। এটা তো ‘ভিজা বেড়াল’ ওবামা-হিলারির ‘মহান’ কাজ। তাদের অতি আত্মবিশ্বাসের কারণে বেনগাজির আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব স্টাফ নিহত হয়েছেন। যাদেরকে দিয়ে গাদ্দাফিকে মারা হয়েছে তারাই একাজ করেছে।  আর এ নিয়ে সিনেটে-কংগ্রেসে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন হিলারি। আর এই হত্যাকান্ড ঘটাবার পর থেকেই এরা নতুন নামে ‘আইএসের’ উত্থান ঘটেছিল। এই উত্থানে ওবামা-হিলারির দায় আছে। সবকিছু বুশের উপর চাপিয়ে ডেমোক্র্যাটরা হাত ধুয়ে ফেলতে চাইলে কী হবে? ওয়ার অন টেররে ২০ বছরে আমেরিকার দুই পার্টির কারো অবদান কি কম?

    তবে এ’দুই পার্টির সবচেয়ে বড় অপরাধ হল – আমেরিকার চোখে দুনিয়ার মুসলমান মানেই তারা আমেরিকার সম্ভাব্য এনিমি – এই মনোভাবে সেই থেকে তারা পরিচালিত হতে শুরু করেছে।  অথচ এই অ্যাটিচুড নেয়া, আমেরিকান কনস্টিটিউশন ও আইনেরই বরখেলাপ। টুইন টাওয়ারে হামলা চালায় যারা এমন মোট ১৯ জনের ১৫ জন সৌদি, দু’জন দুবাই, একজন লেবানন ও একজন মিসরের ছিল। অর্থাৎ কেউ আফগানি নয়। তাহলে টুইন টাওয়ারে হামলার অজুহাতে সারা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করা কেন?   অথচ আইনি অপরাধের চোখে দেখলে যারা হামলাকারি ও সংশ্লিষ্ট তারাই তো কেবল অপরাধী।  এমনকি, আমেরিকা চাইলে এদের যারা বা যেসব গ্রুপ জড়িত কেবল তাদের পুরোটাকেই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আমেরিকার ছিল; কিন্তু তা না করে একটা সর্বাত্মক ও লাগাতার যুদ্ধ যাওয়া কেন? মুসলমানেই সবাই হামলাকারি এই মনোভাবের ভিত্তি কী? এই প্রশ্ন উঠেছিল সেকালেই এবং আমেরিকার ভিতর থেকেই। এর জবাব দেয়া হয়নি, কারণ তাদের কাছে জবাব ছিল না। আর উদ্দেশ্য খারাপ ছিল।

    আবার টুইন টাওয়ারে হামলাকারীরা মুসলমান তাই মুসলমানমাত্রই ‘আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকুরিটি’ তাদের ধরে এনে শাস্তি দেয়া বা সন্দেহ করা, রিমান্ডে এনে টর্চার করা ও রেনডিশন [rendition] কেন? এটা তো আমেরিকান কনস্টিটিউশন ও আইনেরই বরখেলাপ। এছাড়া এই চিন্তা গোত্রবাদী, সঙ্কীর্ণ ট্রাইবাল চিন্তা। আমেরিকান রাষ্ট্রেরই এই কাজের এখতিয়ার নেই। হামলাকারিরা মুসলমান বলে সারা দুনিয়ার মুসলমানেরা এতে অপরাধী – এটা হতে পারে না।  এটা কোনো চুরির জন্য চোরের বাপ-মাকে ধরে এনে শাস্তি দেয়ার মত।

    RENDITION: (especially in the US) the practice of sending a foreign criminal or terrorist suspect covertly to be interrogated in a country with less rigorous regulations for the humane treatment of prisoners.

    এখানেই শেষ নয়। এর পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। দুনিয়া দুই ভাগ হয়ে গেছে। আপনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, আপনার মুসলমান-মুক্ত আমেরিকা কায়েম করতে চাওয়ার পথে নেমে যাওয়া মানে, আপনি উসকালেন যেন এখন মুসলমানরা পাল্টা পশ্চিমা বা আমেরিকান-ছাড়া নিজেদের দুনিয়া কায়েমের রাস্তায় যায়। এখন এতে আপনি অবশ্যই দেখাতে পারবেন যে, মুসলমানেরা কত খারাপ, তাদের চিন্তা সঙ্কীর্ণ, তারাই কারো সাথে থাকতে পারে না, চায় না, ইনক্লুসিভ না ইত্যাদি বহু কিছু! কিন্তু দুনিয়া তো আগেই ভাগ করে ফেলেছেন! এর কী হবে? মুসলমানেরা নতুন আফগানিস্তানে আমেরিকানদের নেবে না, দেখতে চায় না –  এমন একটা দুনিয়া এখন তাদের কল্পনায় হাজির হয়েছে। অনেকে হয়ত স্বপ্ন দেখছে আমেরিকান ছাড়া এক বাংলাদেশ গড়বে! এখন এর কী সমাধা করবেন?

    জানি, আমেরিকান-মুক্ত নতুন আফগানিস্তান কিংবা বাংলাদেশ-এসব একেবারেই অবাস্তব এবং এটা তাদের চরম রাগ-ক্ষোভের প্রকাশ! অত্যাচার, নির্যাতন অপমান ‘রেনডিশন’ … ইত্যাদি ! কিন্তু  এসব কি সহজে মুছে যাবে…। কী দিয়ে মুঝবেন? পরাশক্তির বড়াই? বেন রোডস, আপনি নিজেই বলছেন, লাদেন নয়, তাকে গ্রেফতার  ছাড়িয়ে বুশ ও তার বন্ধুদের ভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে ইত্যাদি…।

    তাহলে আবার মিথ্যা আশ্বাসের কথা কেন বলছেন? কেন বলছেন, বাইডেন আমেরিকাকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বি করে আবার যোগ্য করে হাজির করতে পারবেন? সমস্যা তো চীনের সাথে প্রতিযোগিতা নয়। এটা কোন বড় সমস্যা নয়।  আসল সমস্যা দুনিয়ার দ্বিবিভাগ – আমেরিকান ছাড়া মুসলমানের দুনিয়ার কল্পনা হাজির হয়ে গেছে, এর সমাধান কী? মুরোদ দেখান। সবার আগে নিজেদের এসব অপ-ততপরতা এবং এক্ট আবার ফিরে চেক করেন, পুনঃমূল্যায়ন করেন। কোথায় ভুল হয়েছে, উপলব্ধি ও স্বীকার করেন সবার আগে। এসব ছোট ছোট কিন্তু পাওয়ারফুল পদক্ষেপ ছাড়া মুসলমান বা ইসলাম ইস্যু আমেরিকার পিছু ছাড়বে না। আপনি ভান করতে পারেন যে, আফগানিস্তান বা ইরাক ছেড়ে এসেছেন মানে সব পাপ ধুয়ে গেছে। না, তা একবিন্ধু ধুয়ে যায় নাই, যাবে না। অন্তত অপরাধী মন নিজেই নিজেকে তাড়া করে ফিরবে!   ইতোমধ্যে পশ্চিম বা আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতক’ শব্দটা অনেক কর্নার থেকে ব্যবহৃত হওয়া শুরু হয়েছে। তা নিশ্চয় আমেরিকার জন্য ভালো কিছু নয়!

    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা আর না থাকলে কী? সেই আমেরিকার এর পরেও দুনিয়াকে বহুকিছু দেবার যোগ্যতা থাকবে। এখনো লন্ডন বা প্যারিস বহু মানুষকে সেটেলমেন্টের শহর হিসেবে আকৃষ্ট করে। ফলে এসব কোনো বড় ফ্যাক্টর নয়। কিন্তু মানুষের দ্বিবিভাগ! আমেরিকা-মুক্ত মুসলমান অথবা মুসলমান-মুক্ত আমেরিকা? এটা মানুষের জন্য কোনো ভালো বার্তা নয়! আপনি শাহরুখ খান হলেও বা এক সাধারণ এশিয়ান মুসলমান হলেও আপনাকে পশ্চিমা বা আমেরিকান ইমিগ্রেশনে অপমানজনকভাবে আটকে থাকতে হতে পারে। আফগানিস্তান বা ইরাক বাইডেন ছেড়ে গেলেও এসব বিভক্তির শেষ হবে না!

    অথচ এই বিভক্তি দূর করা, চীনের ওপর প্রতিযোগিতায় বাইডেনের বিজয়ী হওয়ার চেয়েও অনেক বড় ও গুরুত্বপুর্ণ কাজ!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৮ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কানে কি পানি ঢুকেছে? মনে হচ্ছে!“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ফাঁপা পরাশক্তির ভানভনিতায় সুখ

    ফাঁপা পরাশক্তির ভানভনিতায় সুখ

    গৌতম দাস

     ১৪ জুন ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3AC

     

    ক পাঁড় হিন্দুত্ববাদী সুব্রামনিয়াম স্বামী ২০২০ সালের মধ্যে ভারত পরাশক্তি হবে, বলেছিলেন ২০১২ সালে।

    ভারতের সবার আগে দরকার সম্ভবত চিকিতসা। সেটা না হলেও সবার আগে তার জানা  দরকার পরাশক্তি মানে আসলে কী! নুন্যতম কী হলে তা পরাশক্তি হবার লক্ষণ। পরাশক্তি মানে কী এনিয়ে একটা সার্ভের প্রশ্ন হলে দেখা যাবে তাতে ভারতের সন্দেহবাদিরা ছাড়া হয়ত সবাই বলবে “সামরিক শক্তি”।  পরাশক্তি হবার পুর্বশর্ত হচ্ছে অর্থনীতিতে লিডার হওয়া।  অর্থনীতি, অর্থনীতি এবং অর্থনীতিতে গ্লোবাল লিডার। আর আরেকটা কথা – এটাও ভাল করে মনে রাখা যে কোন পড়ন্ত পরাশক্তি ভারতের পিঠে হাত রাখলে তা থেকে ভারতের পরাশক্তি হয়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নাই!  কারণ এটা পরাশক্তি হবার কোন পথই নয়।

    হেরে গেলেও হার স্বীকার করা যাবে না। পারলে মানুষের ক্ষতি করে বেড়াতে হবে। সেটাও না পারলে ঈর্ষা করতে হবে। গত কয়েক বছর ধরে, মানে মোটামুটি ২০০৫ সালের পর থেকে ভারতকে চীনের সাথে তুলনা করতেই হবে, তুলনীয় বলে দাবি করতে হবেই। আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখাতে সেই থেকে ভারত ফাঁপা হলেও পরাশক্তি হয়ে যাওয়ার ভান করা শুরু করেছিল।  সুব্রামনিয়াম স্বামী বিখ্যাত হার্ভার্ড এর পিএইচডি। তিনিওও ২০১২ সালে বলেছিলেন মানে দেখেছিলেন এয় ২০২০ সালের মধ্যে ভারত পরাশক্তি হয়ে যাচ্ছে। আর সেটাই এখন ঠেকেছে হাসপাতাল নাই, বেড নাই, অক্সিজেন নাই আর কোভিড লাশের সতকার নাই, নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজার মাইল……। বীভৎস এক চিত্র!

    তবু একটা জিনিষের বিরতি নাই। তা হল, ভারতকে পরাশক্তির ভানভনিতা করে যেতেই হবে। সর্বশেষ নরেন্দ্র মোদির আমলে এসে কোভিডের সেকেন্ড ওয়েভে এসে এবার এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। কারণ বীভৎস বাস্তবতা লুকানোর যোগ্য না।  কিন্তু তবু কেউ কেউ চাপাবাজি চালানোর সুখানুভবে তা বন্ধ করতে রাজি হতে চাচ্ছে না; এমনকি উদাম হয়ে গেলেও না। এর মূল কারণ আমেরিকা। তারও খায়েশ, সে ভারতকে ব্যবহার করেই, একে আরো অথর্ব করে দিয়ে হলেও এশিয়ায় চীনকে ঠেকিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেই, জিদ ধরেছে।

    আমেরিকারও নিজের স্টাডি রিপোর্ট যাই বলুক, তারও প্রায় একই সমস্যা। ভারত সম্পর্কে আমেরিকার আচরণ ফাঁপা ভানভনিতার হোক তবু সেটাই পছন্দ। আমেরিকার স্টাডি রিপোর্ট বলছে, সে চীনের কাছে গ্লোবাল অর্থনীতিতে ক্রমে হেরে যাচ্ছে। চীন তাকে ছাড়িয়ে যাবেই। মানে মামলাটা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা থাকা আর হেরে সরে যাওয়া- এ দুইয়ের। অন্য ভাষায় বললে, এখন গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতৃত্বে পালাবদলের কাল যেখানে পালাবদলের স্টেজে দেখা যাবে আমেরিকা সিন-আউট হয়ে যাচ্ছে আর চীন ক্রমে আসরে জেঁকে বসছে। এসব কথা আমেরিকার গ্লোবাল ট্রেন্ড রিপোর্টের। বাইরের কারো লেখার উদ্ধৃতি এটা নয়; যেখানে বলা হয়েছে এত দিন গ্লোবাল বিনিয়োগ পুঁজি পশ্চিমেই বসে থেকেছে আর সেই পশ্চিমে বিনিয়োগে বসে থেকেই বাকি সারা দুনিয়ার ওপর আমেরিকা নেতৃত্ব ও মাতব্বরি করে এসেছে। কিন্তু এখন সেই চিরপরিচিত ট্রেন্ডে বদল ঘটছে। আর তাতে  সারভাইভাল বা টিকে থাকার প্রশ্নে  আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট মানে দুনিয়াতে বিপুল সক্ষমতার বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর আড়ত যেখানে তারাই এখন চীনভক্ত। চীনের উত্থানে তাদের উত্থান ও সারভাইবাল মনে করে যারা, তারাও আপনি বাচলে বাপের নাম। তাই তার চোখে এখন চীনকে শক্ত হাত ও সক্ষম বলে উঠে আসছে – ব্যাপারটাতেই তাদের মূল আকর্ষণ। তাই পুঁজি এখন আমেরিকার হাত ছেড়ে চীনের হাত ধরতে ছুটছে। আর এতেই সারা পশ্চিমের পুঁজি একেবারে ঢলে পড়ে এশিয়া-মুখে ছুটে চলেছে [An historic transfer of relative wealth and economic power from West to East]। তাতে যে পশ্চিমে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বড় হয়েছে, কোল পেয়েছে তার প্রতি ওয়াল স্ট্রিটের কোনো মহব্বত নেই। কারণ সারভাইভাল! সে এতে মরবে না বাঁচবে- কারণ ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’- এই সম্পর্কে আছে সে।

    আরো মারাত্মক কথা হল, গ্লোবাল পুঁজির এভাবে পশ্চিম ছেড়ে পুবে-এশিয়ায় ছুটে চলা এটা সাময়িক নয়, একেবারে স্থায়ী। মানে, এটা আর নিকট ভবিষ্যতে কখনো উল্টামুখী বা ফিরে পশ্চিমমুখী হবে না। কিন্তু তবু আমেরিকার তা শোনার বা কান দেয়ার অবস্থাতেও নাই। সম্প্রতি বাইডেন সে দেশে ক্ষমতায় এসে ইউরোপকেও মিথ্যা আশায় রাজি করিয়েছেন তিনি। যদিও ইইউ-ও এতদিন চীনের সাথে আগেভাগে সম্পর্ক করতে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। তবু এখন সেসব ফেলে বাইডেনের আশ্বাসে ফিরে তারা এখন বাইডেনের পেছনে।

    এর কারণ সম্ভবত আমেরিকার সাথে ইউরোপের সিভিলাইজেশন ও কালচারাল অর্থে নিকট আত্মীয়ের সহমর্মিতাবোধ। মাত্র পাঁচশ বছরের মধ্যে যে পশ্চিম এতদিন এশিয়াকে তার গোলাম বানিয়ে রেখেছিল আজ পশ্চিমকে সেই এশিয়ার অধীনে চীনের নেতৃত্বে চলে যেতে হবে, এটা কোনও পশ্চিমা-মনের পক্ষে গ্রহণ করা সহজ নয়। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ এভাবে হেরে যাবে, গুটিয়ে যাবে, এশিয়ার পেছনে তাদের হাঁটতে হবে এটা তাদের কাছে সম্ভবত অকল্পনীয়।

    অথচ সোজা ভাষায় বললে, ব্যাপারটা পুঁজির সারপ্লাস একুমুলেশন [surplus accumulation] বা উদ্বৃত্ত পুঁজির পুঞ্জীভবনের অবজেকটিভ ঘটনা। এটা একেক কালপর্বে যেখানে যে ভুগোলে যত দ্রুত ঘনীভূত হবে, সে-ই ভুগোলের রাষ্ট্রই সে কালপর্বে  গ্লোবাল নেতা হবে। কারণ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা ঘটার সবচেয়ে ফেভারেবল পরিস্থিতি পেলে সে সেখানেই পেকে বেড়ে উঠবে যাকে এরপর কেউ ঠেকাতে পারবে না, রোধ করতে পারবে না। সেই ভুগোলটাই এখন বর্তমান কালপর্বে হল ‘চীনের নেতৃত্বে এশিয়া’।

    এভাবেই কি একইভাবে এককালে ইউরোপের বিপরীতে আমেরিকার হাতে প্রবলভাবে সারপ্লাস একুমুলেশন ঘটায়নি! আর তার ফলেই কি আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপেরও নেতা এবং গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে ছিল না! এত কিছু পরিষ্কার জানা সত্ত্বেও আমেরিকার এক মরিয়া জিদ যে, সে ভারতের পিঠে হাত রেখে ছলনায় বলবে, এবার এশিয়ায় ভারত চীনের সমতুল্য? এটা অবাস্তব এবং কোনো ডাটা যা বলে না এমনই অসত্য। কিন্তু এই মিছাকথা সে ভারতকেও বিশ্বাস করিয়েছে।

    এতে আমেরিকা  যে গোড়ার মিথ্যা কথাটা তোতাপাখির মনে ঢুকিয়েছে আর তারাও  গ্রাজুয়েশন বা পিএইচডির স্কলারশীপের লোভে তোতাপাখি হয়েছে এদেরকে দিয়েই  আমেরিকা ভারতকে মিছাকথাগুলো বিশ্বাস করিয়েছে।  এরই একটা হল,  যেমন- ভারতের (১৩৭ কোটি ২০১৯ সালের) জনসংখ্যা চীনের (১৪৩ কোটি) প্রায় কাছাকাছি হতেই পারে। এর মানে তো আপনাতেই ভারতে চীনের মত ও লেবেলে অর্থনীতিতে সারপ্লাস একুমুলেশন ঘটে যাবার  দেশ হয়ে যাবে না অথবা গেছে এমন দাবি করা যাবে না। তা সত্যও নয়। কিন্তু ভারত তা বিশ্বাস করে এতদিন গিলে বসেছিল। বস্তুত বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই হবে না।
    যেমন এর পালটা সত্যও আছে তা হল –  আমেরিকার দেশ বড় কিন্তু জনসংখ্যা এখনই মাত্র ৩৩ কোটি, আর সেকালে (১৮৮০ এর দশকে) আমেরিকা প্রথম যখন শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হয়েছিল তখন ওর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫ কোটি ( 50,189,209, in 1880)। এর সোজা অর্থ হল, বড় পপুলেশন হলে শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হতে কিছু সুবিধা পাওয়া যায় সত্য। কিন্তু বড় পপুলেশন না হলে তা হবেই না ব্যাপারটা তাও সত্যি না।
    মুল কথা হল এর আবার ভোক্তাবাজারটা কত বড়। আর তাতে উপযুক্ত নীতি-পলিসির কারণে এক ভাইব্রেন্ট অর্থনীতি হিসাবে তা হাজির হচ্ছে  করা যাচ্ছে কী না – এটাই মূল চাবিকাঠি ও মূল চালিকাশক্তি। চীন এটা অর্জন করতে টানা চল্লিশ বছর ব্যায় করেছিল। যেটা বেশিরভাগ মানুষই খেয়াল করে নাই।  কমিউনিস্ট চিন্তার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির অত্যাচারে হাতেগোনা বাদে সবাই ব্যস্ত ছিল ১৯৭০ এর দশকের “চীন তখনও সমাজতন্ত্রী” কিনা এই ভুয়া ও বেকুবি তর্কে।  মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। এর আগে পর্যন্ত  মাও নিজে ওসব তর্কে ইন্টারেস্টেড কেউ নন। দেং জিয়াও পিং সহ তার লক্ষ্য তখন – কমিউনিসট পার্টির নেতৃত্বে চিনে একটা ক্যাপিটালিজম সম্পন্ন হতে পারছে কীনা।  এটা তার একমাত্র ফোকাস যা থেকে আজকের চীনের উত্থান।

    মাওয়ের চীন  সেসময় চীনকে শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হিসাবে গড়ে তুলেছিল দুই পর্বে (১৯৭০-৯০ প্রস্তুতিপর্ব আর পরে ১৯৯০-২০১০ একশনপর্ব ) এভাবে তা অতিক্রম করেছিল।

    দুর্ভাগ্য হল ভারতের কেউ, কোন একাদেমিশিয়ান অন্তত এদিকটা ও এদিক থেকে ব্যাপারটা কখনও স্টাডি করেছেন জানা যায় না।  চীনের এদিকটা স্টাডি করতে পারলে তবেই না এটা এরপরে  ভারতের উপর প্রয়োগের প্রশ্ন আসে!  এব্যাপারে সবচেয়ে নেতিবাচক ফ্যাক্টস হল, ১৯৯০ সালের ভারতে ইকোনমিক ক্রাইসিস দেখা না দিলে ভারত হয়ত নেহেরুয়ান সমাজতন্ত্রী হয়েই থাকার চেষ্টা করত। ১৯৯০ সালের ক্রাইসিস মানে ভারত যখন প্রথম বড় “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের” ঘাটতিতে পড়েছিল। “ব্যালেন্স অব পেমেন্টে” মানে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার একাউন্টে  আয়-ব্যায়ে বৈষম্য মান্‌ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার যোগ্যতা হারিয়েছে বলে ব্যায় বেশি হয়েছে দেখাচ্ছে। আর এমন অবস্থা মানেই এই ঘাটতি পূরণ করে দিতে পারে একমাত্র আইএমএফ কিন্তু শর্ত থাকে যে বহু নীতি-পলিসিগত সংস্কার মানতে বাধ্য থাকতে হবে।  যেসব পর্ব বাংলাদেশ পেরিয়ে এসেছে সেই ১৯৭০ এর শেষ দশকে আর ১৯৮২ সালের সংস্কারে।

    আমাদের জন্য এখন মূলকথাটা হল, শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হিসাবে ভারতকে সাজানো যে বকেয়া কাজ, যে  মূল চাবিকাঠি সেটা আজও ভারতে কারও কানে ঢুকেছে এমন হগ্ন দেখা যায় নাই। এটা সবার আগে ঘটাতে পারলে তবেই চীনের লেভেলে সারপ্লাস একুমুলেশনের কথা ভাবা বা দাবি করার বাস্তবতা ভারতের জন্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু এর আগেই সারা ভারত জুড়ে কেবল আমেরিকার প্ররোচনায়  চীনের সাথে ভারতের সমতুল্য ভেবে তুলনীয় ধরে নিয়ে কথা বলার ছড়াছডি।  যেন অর্থনীতিতে এটা করে দেখানোর মামলা নয়, বিরাট করে দেশপ্রেমের ভাব তুলতে পারলেই একাজ হয়ে যাবে।  অথচ শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ না হলেও কাছাকাছি  কিছু যেটা ঠিকমত একবার চালু হলে- পরে একমাত্র তারপরেই সব কিছুই ঠিক চলতে পারে।

    একমাত্র এরপরেই, একপর্যায়ে এই উদ্বৃত্তের কিছু অংশ নিজ সেনাবাহিনীতে ব্যবহার বা অন্য দেশে বিপুল বিনিয়োগে খরচ (ফলে অন্য দেশের ওপর প্রভাব প্রতিপত্তি হাতে আসা) করার সামর্থ্য আসবে। এভাবে কমপক্ষে ২০ বছর চলতে পারলে সেই দেশ পরাশক্তির মর্যাদা পাওয়ার পূর্বাবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অথচ ভারতের ভাইব্রেন্ট অর্থনীতি, ডাবল প্রবৃদ্ধি, চীনের ন্যায় সারপ্লাস একুমুলেশন- ইত্যাদি কোনো কিছুরই খবর নেই। বুঝাবুঝিটাই নাই।  অথচ ভারতকে অনবরত চীনের সাথে তুলনা করতে উসকানি দিয়ে চলেছে আমেরিকা। যেন সোনালি চাবুক হলেই জীর্ণ-শীর্ণ ঘোড়াও সবল হয়ে উঠবে।

    মোদীর গত সাত বছরে এই মিথ্যা ভ্যানিটিটাই ভারতের সাংবাদিকসহ ইন্টেলেকচুয়ালদের এমন বিশ্বাস করিয়েছেন যে, সেটা একটা মানসিক অসুখে পরিণত করেছে। এতে কেবল মোদীর যা অর্জন তা হল সবচেয়ে মডার্ন-নারী-সাংবাদিক ও ফরেনডেস্ক এডিটরও এখন মোদীর হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে নিজের চরম অগ্রহণযোগ্যতাটা প্রকাশ করতে ভুলে গিয়েছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেছেন ভারত নাকি একেবারে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কাজেই এই ভারত হিন্দুত্ববাদের হলেও অসুবিধা কী! কারণ সকাল-বিকেল তাকে দেখানো হত আর সে দেখত ভারত এখন আমেরিকার সাথে ছাড়া ওঠাবসা করে না। এটা দেখে সে বিগলিত হত। কিন্তু ফাঁপা ভেতরটা কোভিডের সেকেন্ড ওয়েভের ঝড়ে তছনছ ও উদোম হয়ে যায়। বাস্তবের ভারতে বেড বা অক্সিজেন নেই, হাসপাতাল বা চিকিৎসা নেই। প্রতিদিন চার হাজার করে রোগী মরছে। মৃতের সৎকারের খবর নেই, নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। এই হল বাস্তবের ভারত!

    অসহায় মোদী এতে উপায়ন্ত না দেখে শেষে ক্ষুদ্র ভুটান বা  চিরশত্রু মনে করা সেই চীনসহ ২০টা দেশের কাছে ত্রাণসাহায্য চেয়ে হাত বাড়িয়েছেন। আর এতেই কথিত ইন্টেলেকচুয়ালদের কিছু চোখ খুলেছে যে তাঁর ভারত যদি পরাশক্তি হয় তো সে কেন ত্রাণ চাইবে? এতে সব ভেঙে উদোম হয়ে গেছে যে ভারত কোন পরাশক্তির ধারেকাছেরও কেউ নয়। যদিও এত কিছু বুঝার পরও কারো কারো আমেরিকার মিথ্যা প্রলোভনে থাকতে চাওয়া বন্ধ হয়নি। এরা কিছু তোতাপাখি যারা আমেরিকান অনুদান-স্কলারশিপ দিয়ে ডিগ্রি দিয়ে এভাবে শেষে তোতাপাখি বানানো হয়েছে।

    Hudson Institute   হাডসন ইনস্টিটিউটঃ
    ওয়াশিংটনের এক থিংকট্যাংক ও রিসার্চ সেন্টার হল ‘হাডসন ইনস্টিটিউট’। তার এক পাকিস্তানি ও এক ভারতীয় ফেলো যৌথভাবে ভারতের বা গ্লোবাল মিডিয়ায় লেখা নিয়ে হাজির হচ্ছেন ইদানিং। তেমনই এক লেখার প্রসঙ্গ ছিল সাউথ-ইস্ট এশিয়ান জোট, সার্ক [SAARC]। বলা ভাল সম্ভবত সার্ককে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করতে গেছিলেন। কিন্তু নের জানাশুনার অভাবে কিছু ধরা খেয়ে গেছেন। লেখাটা ভারতের চোখে দেখে লেখা মনে হয়েছে। ওর লিড  লেখক ভারতীয় অপর্ণা পান্ডে [APARNA PANDE] আর তাতে শিরোনাম হল, ‘কোভিড বলছে ভারত যদি সার্কের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয় তবে চীন নিয়ে নিবে” [Covid shows if India can’t take care of SAARC, China will]।’

    এরপর ওই লেখা শুরুর বাক্যটাও বলছে, ‘কোভিড মহামারী কেবল মানব দুর্দশা বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই আনে না এর খারাপ স্ট্র্যাটেজিক পরিণতিও আছে। এটা দেখিয়ে দিয়েছে সাউথ এশিয়াকে নেতৃত্ব দিতে ভারত কোন সীমায় আটকে আছে! আর সেই সাথে ভারতের প্রতিবেশীদের কাছে ভারতকে নিচু দেখিয়ে চীনের ভূমিকা কত উঁচুতে”।

    In addition to causing a humanitarian and economic disaster, the Covid-19 pandemic has also had strategic consequences. It has demonstrated the limits of India’s ability to lead South Asia and raised China’s standing at India’s expense among some of its neighbors.

    এভাবে চীনের সাথে খামোখা ভারতের তুলনা করা হয়েছে এ লেখায়। এক কথায় বললে এটা সেই পুরান কথা, খামোখা চীনের পর্যায়ে তুলে ভারতের বন্দনা আর কোভিডে ভারতের ইজ্জত লুটানোতে সহানুভূতি জোগাড় করার চেষ্টা। যেমন- যে কুকুরের গায়ের চামড়া উঠে গেছে তার নাম বাঘা রাখলেও কোন ইমেজ ফিরে না। তবু অনেক মানুষ সেটাই করে যাবেন। যেন ভারতের হাতে চীনের কাছাকাছি সারপ্লাস একুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সম্পদ আছে, যা ভারত চাইলেই প্রতিবেশী দেশে বিনিয়োগ করতে সক্ষম। ফলে ‘কোভিডের কারণে প্রতিবেশীদের ওপর ভারতের স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব খাটো হয়ে যাচ্ছে। না হলে চীনকে একেবারে দেখিয়ে দিত” এমন ভাব।

    তাই ওই লেখার শিরোনামে কনক্লুশনে  বলছে, “অতএব কোভিডই দেখাচ্ছে যে, এ অবস্থায় ভারত সার্ককে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগটা এবার চীন নিয়ে নেবে”। এগুলো আসলেই নায়িকাদের ফুটানি বা ভ্যানিটির মত কথা যেন! স্টার-ইমেজ ছাড়া নায়িকাদের সিনেমা চলে না, আমরা বুঝি। কিন্তু আমেরিকা আর কত দিন ভারতের পিঠে হাত রেখে এমন মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে যাবে?

    হোমওয়ার্ক না থাকলে যা হয়ঃ
    আসলে অসংখ্য ত্রুটিতে ভরা এই লেখা কারণ,  আগে ‘হোমওয়ার্ক’ করে নেয়া হয়নি ঠিকমত।
    প্রথমত, এই লেখকদ্বয়ের সার্ক সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো ধারণা আছে মনে হয় না। যেমন- সাম্প্রতিকালে ভারতই ‘সার্কে পাকিস্তান আছে’ বলে সার্ককেই বাদ দিয়ে ভাগাড়ের মতো ফেলে রাখার চেষ্টা করেছে, সে খবর এদের কাছে নেই। এমনই ২০১৬ সালের শেষের এক খবর হল – বিডিনিউজ২৪ লিখেছিল, “সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট ‘বিমসটেকের’ ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন” সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক ও ভারতের ওআরএফের [ORF] ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। অর্থাৎ বলতে চাইছেন, তাই ভারতের কাছে সার্ক আপন কোনো কিছু নয়।
    অথচ আমরা লক্ষ্য করছি সেই সার্ককেই লেখাটা ভারতের জন্য উদাহরণ হিসেবে এনেছেন।
    দ্বিতীয়ত, ফ্যাক্টস হল  চীন সার্কের মেম্বার নয়। তাহলে “ভারত না পারলে চীন পারবে” এ কথা তোলা হচ্ছে কিভাবে? এই অহেতুক কথার মানে কী?
    তৃতীয়ত, এই অঞ্চলে সার্ক  সত্যিকারের ফাংশনাল কিছু হয়ে উঠেছে, এমন ভূমিকা কখনই নিতে পারেনি। মূলত ভারত-পাকিস্তান এর মধ্যে  সবসময় দ্বিপক্ষীয় অসংখ্য ক্যাচালের ইস্যু থাকেই – যা এখানে সার্কের মধ্যে হাজির করাতে নিষেধ থাকলেও এরা পেছনের ক্যাচালের কারণে সার্কে এসেও সবকিছুতেই  নিষ্ক্রিয় থাকতে চেয়েছে  – আর এভাবে এটা সার্ককে কার্যকর হতে বাধা হয়ে কাজ করেছে। আবার এই বাধার কাজে ভারত-পাকিস্তান কারো ভূমিকাই কম ছিল তাও নয়। এসব সমস্যা সত্বেও পরেও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে শুল্ক কমিয়ে পণ্য বিনিময় বাড়ানোর একটা চেষ্টা করা হয়েছিল যা কাজ করেনি। মূলত ভারতের পুরানা অভ্যাসের কারণে যে, একদিকে ভারত বলবে তারা শুল্ক তুলে নিয়েছে অথচ রফতানি করতে গিয়ে দেখা যাবে হয়ত এবার প্রায় সমান সমতুল্য কিছু নন-ট্যারিফ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে ভারতই। এককথায় ভারতের সাথে কোন ধরণের বাণিজ্য সমঝোতা – গিভ এন্ড টেক – এটা অসম্ভব। কখনও এটা কাজ করে নাই। মূলত ভারতের উগ্র জাতিবাদী মোটাবুদ্ধির কারণে।

    অনেকের মনে হতে পারে আমি ভারতের বিরুদ্ধে একটু বেশি কঠোর হচ্ছি।  না তা হচ্ছি না, আমি নিশ্চিত। নিচের উদ্ধৃতিটা এখানে আলোচিত লেখার ভারতীয় লেখক অপর্ণা পান্ডে-এর এক সাক্ষাতকার থেকে উঠিয়ে আনা। যেটা তিনি ২০২০ আগষ্টে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দিয়েছিলেন। এখানে আমরা দেখব তিনি ভারতের “বিগ পাওয়ার” বা পরাশক্তি হওয়া বলতে কী বুঝেন। যেখানে সবচেয়ে আপত্তিকর হল “এই ভারত প্রতিবেশির” উপর কী   ‘hegemon’ আচরণ করবে সে বর্ণনা দেখে। তিনি আসলে পরাশক্তি বলতে  কলোনিদখলদার শক্তি বুঝেছেন!
    “To be considered a big power, you need to be the acknowledged hegemon in your own neighborhood [South Asia] and to be recognize as a global power by your peers. Finally, you need to be willing to exercise power to protect your interests.”

     

    কঠোর ‘দেশপ্রেমী’ ‘উগ্র-জাতিবাদী’ ভারত কী করে বিদেশী পণ্য আমদানি করতে দিতে পারে? বরং এর বিনিময়ে বাংলাদেশের পুরা বাজারটা কব্জা করাই তাদের জন্য ‘দেশপ্রেম’; যার সোজা মানে হলো, ভারত কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক রাষ্ট্রজোটের সদস্য হওয়ারই তো যোগ্য নয়। আসলে বোকা উগ্র জাতিবাদ আর গ্লোবাল বাণিজ্য পরস্পর বিরোধী!

    তবু আমরা দেখেছি ওই লেখায় লিড ভারতীয় লেখক অপর্ণা পান্ডে ভারতকে “লারজেস্ট কান্ট্রি ইন দ্য রিজিয়ন” খেতাব দিয়েছেন। আর পাকিস্তান তা মেনে নেয় নাই বলে দোষারোপ করেছেন। আবার সেকেন্ড ওয়েভে অক্সিজেনের অভাবে পড়লে ছোট দেশ ও সার্কের সদস্য ভুটান নিজের অক্সিজেন প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৫০ টন করে অক্সিজেন ভারতকে দিচ্ছে, এ কথাটা তিনি জ্বলুনির সাথে উল্লেখ করছেন; সেটাও এক ভারি তামাশা বটে! তাহলে তার চোখে ভারত ‘লারজেস্ট কান্ট্রি’- এটা কী অর্থে? লারজেস্ট কী জনসংখ্যায় নাকি উদ্বৃত্ত সম্পদে্র বিনিয়োগ সক্ষমতায়? নিশ্চয় জনসংখ্যাই বুঝেছেন ও বুঝিয়েছেন। কোনো দেশকে প্রভাবশালী হিসাবে ‘বড়’ বুঝায় তার কী থাকলে পরে? – এরা যেন তাই বোঝেন না। নইলে ভারত বড় কি না এখানে এই তর্ক তোলার অর্থ কী? ছোট্ট ভুটানের অক্সিজেন নিতে কষ্ট হচ্ছে- এটা তো দেখছি সংকীর্ণ পেটি মধ্যবিত্ত সুলভ ঈর্ষা!

    তার আরো মারাত্মক এক বক্তব্য হলো, তিনি এবার স্বীকার করে বলছেন, সার্কের ভেতর ভারতকে ন্যাচারাল নেতা (রিজিয়নস ন্যাচারাল লিডার) বলে পাকিস্তান স্বীকৃতি না দিতে পারার কারণেই নাকি এই জোটের সমন্বয় হয়নি কখনো।

    ভারতীয় এই নারী লেখিকার এই বক্তব্য খুবই ক্ষুদ্র মনের। তিনি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা কোন বলার যোগ্য তা মনে হচ্ছে না। এখানে ভারত ‘ন্যাচারাল লিডার’ মানে কী? আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন? এ রকম?

    আসলে বন্ধুদের ছোট গ্রুপের বেলাতেও যেটা দেখা যায়, অনেক গ্রুপে এমন বন্ধু একজন থাকে যে বন্ধুদের বিপদে এগিয়ে যায়, উদ্ধার করতে খরচ করে এবং খরচ করা অর্থ কী করে পরে ফেরত পাবে বা আদৌ ফেরত পাবে কি না তা না জেনেই সে এটা করে। এমন দায়িত্ব নেয়ার এই স্বভাব- এটাই গ্লোবাল নেতার স্বাভাবিক স্বভাব-বৈশিষ্ট হতে হয়  এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বেলায় একেই ‘এম্পায়ার’ বা “সাম্রাজ্যের শাসকের ইতি গুণধারী” ব্যক্তিত্ব বলা হয়। কেউ গ্লোবাল নেতা হতে চাইলে তার এই গুণ থাকা জরুরি বা অনিবার্য। এর বাইরে ন্যাচারাল লিডার বা খামোখা লিডার বলে কিছু নেই।  এছাড়া, আর কী হতে পারে?  ভারত ‘ন্যাচারাল লিডার’ কথার মানে কি কলোনি-ব্রিটিশ কী ভারতের বাপ? নেহেরু যেমন নিজেকে কলোনি “ভাইসরয়” ভাবতেন!

    তবে বড় জোর অপর্ণা পান্ডের এমন কথা এক ‘উগ্র দেশপ্রেম’ হতে পারে। যেটার আবেগী মূল্য কিছু থাকলেও সেটার অবস্থান কিন্তু কেবল তাঁর দেশের ভেতরেই থাকতে পারে। আর বাইরের লোকেরা শুনলে এটাকে গাধামি মনে করে বিরক্ত হবে।

    আসল কথাটা হল, নেপাল বা ভুটান ল্যান্ডলকড দেশ বলে এ থেকে দুধ দোয়ানোর মতো করে এখনো নিয়মিত সুবিধা বের করে আসছে ভারত। যেমন- নেপাল বা ভুটান বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে চাইলে আগে কোনো ভারতীয় কোম্পানিকে কমিশন বুঝিয়ে দিয়ে এরপর কেবল ওই ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে তা বিক্রি করতে হবে। এর অর্থ হল, ‘সাম্রাজ্যের শাসকের ইতিগুণ’ জিনিসটা প্রসঙ্গে ভারতের বোঝাবুঝি একেবারেই শুণ্য। এটাকেই ‘স্মল’ চিন্তা বলে। এটা কোন উদারতাবাদ প্রাকটিস করা নয়।  বরং বড় করে অন্যকে সুবিধা দেয়া যাতে বড় করে প্রতিদান সুবিধা ফেরত পাওয়া যায়। ভারত এটা বুঝবে না! উগ্র দেশপ্রেমিকতা  আর স্বল্পবুদ্ধির জাতিবাদ এসব বুঝের বাইরে……।

    না এটাকে ‘দাতা মহসীন’ হতেও বলা হচ্ছে না। একটা ‘ফেয়ার ডিল’, একটা ন্যায্য সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে; যেখানে এতে এম্পায়ারের কোনো ফাইন্যান্সিয়াল লস হলে সেটার দায় ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। আর এতে এম্পায়ারের কোনো লস হলেও যেহেতু এতে তার স্বাভাবিক প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়বে, এটাই তার পক্ষে নন-ফাইন্যান্সিয়াল রিটার্ন ফেরত পাওয়া হবে। আসলে কারো গ্লোবাল নেতার ভূমিকায় হাজির হওয়া এতই সহজ নয় বা একপক্ষীয় কোন সুখের নয়। এভাবে দেখতে চাইলে দেখার সুযোগ অবশ্যই আছে।

    ঐ লেখায় শেষে খুবই দৃষ্টিকটু ও ঈর্ষাকাতর এক মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “কোভিডের এই এমারজেন্সির কালে নগদ অর্থ ঢালার ক্ষতিকর ক্ষমতার চীন (cash-flush malign power) তার প্রভাব বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে”-[ during an emergency, a cash-flush malign power like China gets an opportunity to expand its influence]।

    ভারতের জন্য দিল্লি আসলেই দু-র-অ-স্ত। অন্তত ঈর্ষা দিয়ে এসবের কিছুই অর্জন করা যায় না! আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছে বলেই ভারত তার সব অক্ষমতার বন্ধ্যাত্ব ছাড়িয়ে সক্ষম হয়ে যাবে না। আমেরিকা তা করতেও পারে না, করবে না। কারণ ওদিকে আবার রাষ্ট্র মানেই নিজ একান্ত স্বার্থ এবং সেটাই সবার আগে মানে প্রায়োরিটি। আর সক্ষমতা? সেটা তো সবার নিজেরটা নিজেই অর্জন করে নেয়ার জিনিস! কাজেই……।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যখন ফাঁপা পরাশক্তির ভান করাতেই সুখ“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ বাইডেনের গাজা কারেকশন

    বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ
    বাইডেনের গাজা কারেকশন ও প্রায়োরিটির প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস

    ২৬ মে ২০২১, ২১:৪৮  বুধবার

    https://wp.me/p1sCvy-3yF

    US President Joe Biden speaks with Representative Rashida Taib (D-Mich), and Representative Debbie Dingell (D-Mich)(R), as he arrives at Detroit, Metropolitan Wayne County Airport in Detroit, Michigan on May 18, 2021. (AFP)

    বাংলাদেশ কী ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে? এটা এখন বাংলাদেশে সর্বত্র আলোচনার বিষয়। আলোচনা যেভাবে হচ্ছে, তাকে খারাপ সংবাদই বলতে হয়। আর  বিষয়ের ঠিক এদিকটাই  আমল করতে সরকার মারাত্মক ভুল করছে।

    বাংলাদেশে এই ইস্যুতে প্রথম নিউজ করে ‘শেয়ার বিজ’ এই ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ পত্রিকা। এটি তাদের ক্রেডিট অবশ্যই। কিন্তু একইসাথে ডিসক্রেডিটও। কেন? কারণ এ ইস্যুটায় প্রধান খবর জড়িয়ে আছে মুখ্যত দুটি আলাদা বাক্য। এক, নতুন পাসপোর্টে “এক্সসেপ্ট ইসরাইল” শব্দ দুটা লেখা নাই। আর দ্বিতীয় বাক্যটা হল, নতুন ই-পাসপোর্টে লেখা রয়েছে “দিস ই-পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড”।  মানে যার বাংলা করলে হয় – এই ই-পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ”।
    এখন এনিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা যেটা তারা সাথে ছেপেছে সেখানে আছে, “… তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আমরা পাসপোর্টে এক্সসেপ্ট ইসরাইল শব্দ দুটি তুলে দিচ্ছি”। এভাবে ব্যাখ্যা ছাপাটা বিভ্রান্তিকর কাজ হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য তো হয়ইনি। কারণ এখন ‘এক্সসেপ্ট ইসরাইল’ শব্দ দুটি বাদ দেয়াতে অবশিষ্ট বাক্যটা হয়ে গেছে ‘এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ – অথচ এটা নিয়ে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করে মন্ত্রীকে সচেতন করে দেয়া যে সেক্ষেত্রে – এখন কথা রয়ে গেছে তাহলে এভাবে যে, “এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ” –  মন্ত্রী কী তাই বুঝাতে চেয়েছেন? এই কথাটাতে মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানা দরকার ছিল। কিন্তু শেয়ার বিজ বা অন্য কোনো মিডিয়ার দিক থেকে এই প্রশ্নটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে করা হয়নি। আসলে সাংবাদিকেরাই যেন চেয়েছে যে মন্ত্রীরা যেমন দাবি করছেন যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দ তুলে নিয়েছেন। ব্যাপারটা তা নয়। কথা ঠিক যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দই তুলে নিয়েছে। কিন্তু তাতে বাকি বাক্যের অর্থ একই থাকে নাই।    একথা বলতেই হচ্ছে যে এতে থেকে যাওয়া বাকি শব্দ যে  – “এই ই-পাসপোর্ট সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ কথাটার সোজা মানে হয়ে গিয়েছে যে বাংলাদেশীদের জন্য ইসরাইল ভ্রমণও বৈধ। অথচ এটাই হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক বক্তব্য।

    আরো টু দা পয়েন্টে বললে এখন মানে হয়েছে, বাংলাদেশের ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত আছে, না নেই – সেটা যাই থাক – আমাদের পাশপোর্টে ইসরাইল ভ্রমণও আমাদের জন্য বৈধ হতে পারে।  এ কথাটাই আমাদের পাসপোর্ট এখন বলছে।

    অতএব,  ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দ দুটা এখন নেই – তাতে আসলে কী হয়েছে, তা বুঝতে হবে। এখন স্পষ্ট করে বলা হয়ে গেছে যে আমাদের পাসপোর্ট ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’- এটাই মুখ্য স্টেটমেন্ট। সব দেশ ভ্রমণ বৈধ হওয়ার অর্থ হল ইসরাইল সফরও বৈধ। তাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন মুখে যতই ব্যাখ্যা দেন না কেন যে – ‘এই পরিবর্তনে ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পরিবর্তনের কিছু নেই’ অথবা ‘আমরা তো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই না’ – তাতে কিছুই হেরফের হবে না। এর মূল কারণ, মোমেনের এই বাড়তি ব্যাখ্যার ‘আইনি ভিত্তি নেই’ বা এটা সরকারের ‘আইনি অবস্থান’ নয়।  কারণ, ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’– এটাই পাসপোর্টে লেখাগুলো অনুসারে পাশপোর্ট অফিসের আইনগত অবস্থান।

    কেন এমন হলোঃ
    এখন আসি, কেন এমন হল বা সরকার এমন সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেল? সেটা নিয়ে কথা বলার আগে আরেকটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। পাসপোর্টে পরিবর্তনের এই প্রস্তাব সরকারের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তির কাছে যে-ই নিয়ে এসেছেন আর তা যতই লোভনীয় করে লাভালাভ দেখিয়ে তিনি পেশ করে থাকেন না কেন এটা সরকারের জন্য নীতিনির্ধারকদের নেয়া এক আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হয়েছে। বরং সরকারের উচিত ছিল দুনিয়ার কোন কর্নার থেকে এই প্রস্তাব-উদ্যোগটা উঠেছে বা এসেছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে খোঁজ নেয়া, আর সে সম্পর্কে আগে এর পুরা পটভুমিটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়া। সরকার খুব সম্ভবত যথেষ্টভাবে ওই কাজটা না করে ‘এমন দুই শব্দ’ তুলে দিলে সরকারের কী কী লাভালাভ হবে – এর মধ্যেই বুঁদ হয়ে থেকে সিদ্ধান্তটা নিতে গেছে। সব বিপর্যয় ঘটেছে সেখান থেকে।

    বলা হচ্ছে আমাদের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছয় মাস আগে। হা মোটা মুটি ব্যাপারটা তাই। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা সেই আগের পরিস্থিতিটাও এখন আর বজায় নাই। অনেক কিছুই এখন বদলে গেছে। বিশেষ করে সদ্য ১১ দিনের গাজায় ইসরাইলি হামলাকে কেন্দ্র করে।

    ঘটনাটা তাই শেষের দিক থেকে যদি বলি, এটা এক গভীর গোপন পরিকল্পনা যা রচিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আর তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে বুদ্ধি করে। আসলে এই পুরো বিষয়টাই নেতানিয়াহুর উদ্যোগে করা এক জায়নিস্ট পরিকল্পনা।

    এখানে ইহুদিবাদী বা জায়নিস্ট [Zionist] শব্দের অর্থ যা বুঝতে হবে তা হল ১. জায়নিস্ট রাষ্ট্র মানে এটা কেবল ইহুদিদের জন্য একক ও  বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র, ২. সেখানে অন্য কেউ যদি নাগরিক থাকেও সে ইহুদিদের সাথে সমান অধিকারের নাগরিক নয়। ৩. এই জায়নিস্ট রাষ্ট্রের কোন ইহুদি সদস্য যদি অন্য নাগরিকের জায়গা-জমি সম্পত্তি দখল করে সেক্ষেত্রে জায়নিস্ট রাষ্ট্র সেটাকে শুধু বৈধ মনেই করবে তাই নয়; উলটা ঐ দখলদারদেরকে সব ধরণের সহায়তা দিবে। ৪. এমনকি জায়নিস্ট রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে ঐ দখলদারদের রক্ষা করবে। আর একাজকে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার বলে চালিয়ে দিতে চাইবে। ৫. যেহেতু তারা হিটলারের নৃশংসতার ভিক্টিম অতএব কেবল তাদের বেলায় এসব কিছু করা জায়েজ আছে।  ভিক্টিমহুড – এই বোধের জন্য এই মনকষ্টের জন্য এখন উলটা তাদের এই হিটলারবাদি আচরণ দুনিয়াকেই সহ্য করে নিতে হবে।  ৬. আর সর্বশেষটা হল, যদি আপনি জায়নিস্ট রাষ্ট্রের এসব কাজ ও ততপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তাহলে এই রাষ্ট্র উলটা আপনার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলবে যে  আপনি এন্টি-সেমেটিক। আপনি ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন! এর আবার মানে কী আর সেটা কী করে? মানে হল, সেমেটিক=ইহুদি, এই সমীকরণ অনুসারে আপনি ইহুদিদেরকে ইহুদি বলে নিচা দেখিয়েছেন, ঘৃণা করেছেন ছড়িয়েছেন, তুচ্ছ করে দেখিয়েছেন ঠিক যেমন এসব করে জর্মানির হিটলার সেদেশের ইহুদি নাগরিকদেরকে বিভিন্ন নির্যাতন ও পুড়িয়ে মেরে ফেলার আগে করেছিল। তাই তাঁরা এখন জায়নিস্ট (হিটলারের কপি) হবেন বলে আবদার।  সবমিলিয়ে এই হল জায়নিস্ট আচরণ ও তাদের সচেতন মনোবৈকল্য চর্চা।

    আগে যেকথা বলছিলাম নেতানিয়াহু  তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করানোর কাজটা করে নিয়েছিলেন ট্রাম্পের জামাই কুজনারের [ Jared Corey Kushner]  তিনিও সেমেটিক=ইহুদি তবে আমেরিকান] মাধ্যমে ট্রাম্পকে কব্জা করে। এদিকে আরবদের দিক থেকে একাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন দুই প্রধান হলেন দুবাই ও সৌদির দুই প্রভাবশালী যুবরাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে এই অসৎ পরিকল্পনাটার নাম হল ‘আব্রাহাম চুক্তি’ [আব্রাহাম একর্ড বা The Abraham Accords । এটি অবয়ব পায় হোয়াইট হাউজে বসে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু আর সাথে দুবাইয়ের ও বাহারাইনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী- এই চারজনের এক চুক্তি স্বাক্ষরে। এটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।
    অনেকের মনে হতে পারে এসব কী সত্যি নাকি আমার “মনে হয়” টাইপের কিছু? যেহেতু আমি হয়ত ইহুদি দেখতে পারি না সেজন্য? তাই কী? কারণ কঠিন সত্যি অনেক সময় বিশ্বাস হতে চায় না।

    আজকাল আবার অনেকে আছেন যারা নিজেরাই মনে মনে মানেন সে তার তত জানাশুনা নাই কিন্তু আবার সেজন্য কেমনে ফস করে   জিজ্ঞাসা করে যে একথা যে সত্যি এর প্রমাণ কী? এমন সবার জন্য কাজটা সহজ আর স্বাধীন করে দেই। The Abraham Accords 2020 – এই কথা কয়টা এখান থেকে কপি করে গুগলে গিয়ে পেস্ট করে সার্চ দেন। এতটুকুই যথেষ্ট হবে। এবার যা ফল পাবেন তা হল – না হলেও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ দিনের  শ’খানেকবিভিন্ন দেশের ইংরাজি দৈনিকের এই চুক্তি করা বিষয়ক খবরের লিঙ্ক। আর এরই ভিতর একটা লিঙ্ক পাবেন আমেরিকান সরকারি দলিল।  এর শিরোনাম হবে The Abraham Accords Declaration আর চিনবেন কী করে যে এটা আমেরিকার? দেখবেন লিঙ্কে লেখা আছে  state.gov – এই কথা কয়টা। আর এটাই অরিজিনাল চুক্তির কপিটা। ওখানেই সাথে পিডিএফ কপিও নামিতে নিতে পারবেন।
    আবুধাবি থেকে প্রকাশিত একটা দৈনিক দ্যা ন্যাশনাল, এদের করা ঐদিনের একটা রিপোর্ট হল যে কে কে উপস্থিত ছিল [ Who attended the Abraham Accord signing] । আবার আমেরিকার বোস্টনভিত্তিক দ্যা আটল্যান্টিক[The Atlantic] এর সম্পাদক  পরের দিন ১৬ সেপ্টেম্বর নিজেই এক আর্টিকেল লিখেছিলেন এই চুক্তিতে কার লাভ কার ক্ষতি বিষয়ে শিরোনাম দিয়েছিলেন – Iran and the Palestinians Lose Out in the Abraham Accords.। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এটা কোন শান্তি চুক্তিওও হয় নাই। কারণ দুবাই বা বাহারাইন কখনই ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ করে নাই। আবার তিনি বলছেন, এর পিছনে সৌদি আরব আছে এর বড় প্রমাণ হল বাহারাইনের উপস্থিতি। বলেছেন সৌদি যুবরাজ, Bin Salman, without whom these Gulf states, Bahrain in particular, would not dare make such a bold and public move,…।

    আসলে এই চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তি বলার উদেশ্য হল মনোথিওজমের জনক আব্রাহামের নামে নিয়ে একটা জাঁকজমক আবহ তৈরি করা।  অথচ এর আসল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদেরকেই কোণঠাসা ও উপেক্ষা করে জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা এক হয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধেই একসাথে কাজ করা। ফলে এটাকেই তারা “আব্রাহাম চুক্তি” বলে চালাতে চেয়েছেন। এছাড়া যদিও এখানে স্বাক্ষরকারিদের মধ্যে আমেরিকা মানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আছেন কিন্তু তিনি আসলে ঠিক কোন পক্ষ নন;  বড় জোড় মধ্যস্থতাকারি। অথচ সেখানেও জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। কারণ আসল সংঘাত জায়নিস্টেরা তৈরি করে রেখেছে তো প্যালেস্টাইনিদের সাথে। অথচ প্যালেস্টাইনিরা এই চুক্তির কোন পক্ষই নয়।

    তবে ছয় মাস আগের পরিস্থিতি এখন নেইঃ
    ২০২০ সালের আমেরিকান নির্বাচনের দুমাস আগে করা ঐ চুক্তি এখন ট্রাম্প পেরিয়ে বাইডেনের আমলে পৌঁছেছে। কিন্তু বাইডেন এত দিন এই চুক্তিতে যে যালেস্টাইনিদের উপর চাপ সৃষ্টি ও বঞ্চিত করা হয়ে আছে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফেলে রেখেছিলেন। এর বাস্তব অর্থ হয়েছিল যে বাইডেনও যেন ট্রাম্পের অনুসারি।

    কিন্তু এবারের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বাইডেনের চোখ খুলেছে; তিনি  ইতোমধ্যেই তাঁর কাজের প্রায়োরিটি বদল নিয়েছেন। এখন তিনি ওই চুক্তির কারণে যেসব ক্ষতি হয়ে গেছে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে ওইসবের ক্ষত সারাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। সে কাজেরই এক প্রধান অংশ ছিল এবারের গাজায় ইসরাইলি হামলায় ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করা। তাছাড়া আমেরিকার আগের প্রতিশ্রুত যেসব ত্রাণ ও পুনর্বাসনের তহবিল আমেরিকা গাজায় দিত, যার পুরোটাই ট্রাম্প বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেসব আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন বাইডেন। আর মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কগুলো যা ট্রাম্পের কথিত আব্রাহাম চুক্তির কারণে এলোমেলো হয়ে গেছিল – সেগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট বিল্কেনের এক লম্বা সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

    আর বাইডেনের এই নতুন অবস্থানে আসা বা আমেরিকাকে হুঁশে ফিরিয়ে আনার কাজটি মূলত কারা করলেন? এনিয়ে বিবিসি বাংলাতে এক বিশেষ করা হয়েছে যার শিরোনাম, “ইসরায়েল ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমেরিকায় ডেমোক্র্যাট শিবিরে গভীর পরিবর্তন“। তাতে বলা হচ্ছে, এরা হলেন ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে নতুন যারা তুলনামূলক তাদের ভাষায় ‘প্রগ্রেসিভ’ (আমেরিকান অর্থে প্রগ্রেসিভ যারা রক্ষণশীলের উল্টা, আমাদের মতো দেশের অর্থে প্রগেসিভ মানে কমিউনিস্ট তারা নন)। বিবিসির উপরে উল্লেখিত এই রিপোর্টের ভাষায়,……

    “কিন্তু কংগ্রেসের ভেতর দিনকে দিন বৈচিত্র্য আসছে, আর সেই সাথে ইসরায়েলের প্রশ্নে আমেরিকার প্রচলিত নীতি চাপের মধ্যে পড়েছে।
    জরিপ সংস্থা পিউ ফাউন্ডেশন স্টাডি বলছে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেটে নির্বাচিত সদস্যদের ২৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক, এশীয় এবং আদি আমেরিকান বংশোদ্ভূত । এটি একটি রেকর্ড। বিশ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৪৫ সালে ছিল মাত্র ১ শতাংশ”।

    এরা আসলে বাকি ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বেশি প্রো-অ্যাকটিভ। আর এদের প্রতিনিধি বলতে তিন নারীর কথা বেশি সামনে এসেছে।  বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর ভাষায়, “এরাই সেই প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রাটস যারা বাইডেনকে গত প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জিততে শুধু সাহায্য করেছিল তাই না, বাইডেন নমিনেশনও পেয়েছিলেন এদের শক্ত  সমর্থনের জন্য …progressive Democrats, a group that helped Biden win the Democratic nomination and the presidency……]।

    বিবিসি লিখেছে, কংগ্রেসে তরুণ, প্রগতিশীল কয়েকজন সদস্যের একটি জোট – যেটি স্কোয়াড নামে পরিচিতি পেয়েছে -, তার মধ্যে রয়েছেন মিশিগান থেকে নির্বাচিত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব এবং মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর।]

    এদের একজনের সাথে বাইডেন-কমলা বিমানে উঠার আগে টারম্যাকে আন্তরিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলাপ করছেন, এমন একটা ছবি অনেক জায়গায় ঘুরছে।

    মূল কথাটা হল, এনিয়ে রয়টার্সের একমাত্র এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ মে। সেখানে বহু প্রসঙ্গে ডিটেইলড বর্ণনা আছে। যার শিরোনাম হলো, গাজা কনফ্লিক্ট ফোর্সেস রিঅর্ডারিং অব বাইডেন’স পলিসি প্রায়োরিটিস প্রশ্নে ব্যাখ্যা [Analysis: Gaza conflict forces reordering of Biden’s policy priorities]। এককথায় বললে, বাইডেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর শয়তানি পরিকল্পনার ‘আব্রাহাম একর্ড’ ভেঙে আমেরিকাকে বের করে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন।

    কিন্তু এর সাথে আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুর কী সম্পর্ক?
    হ্যাঁ, সেটাই সবচেয়ে মজার। আব্রাহাম একর্ড ২০২০ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরের পরে ঐ সময় এর বাস্তবায়নের দায় পড়ে মূলত দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) উপর। এই চুক্তিতে দৃশ্যত সৌদি আরব নেই। কিন্তু পশ্চাদ-পটভূমিতে সর্বত্র আছে। এনিয়ে আটল্যান্টিকের আরেক রিপোর্ট Why the UAE Made Peace With Israel দেখা যেতে পারে। এছাড়া ঐ চুক্তিস্বক্ষরের সময় আরও পাইপলাইনে ছিল (আছে বলতে পারছি না) আরো দুই দেশ ওমান, সুদান ইত্যাদি।

    আব্রাহাম একর্ড করার মূল লক্ষ্য কী ছিলঃ
    কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রশ্ন হলো, এই আব্রাহাম একর্ড কেন তারা করেছিলেন? কেন পক্ষগুলো এর দরকার অনুভব করেছিল? সেটাই মূল ঘটনার আরেকটা দিক। ওই মূল ঘটনা হলো, ইরান; মানে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি বাস্তবে হাজির হওয়া। আর এর বিরুদ্ধেই জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা মিলে এক হয়ে কাজ করা জোট পাকানো আর একারণেই রিপাবলিকান ট্রাম্প তাতে মদদ নিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য,  ইরানের এই নব উত্থানে ইসরাইল ভীত। আবার জিসিসির বাদশাহ-দেশগুলো মধ্যে সম্ভবত কাতার ছাড়া সব বাদশাহ-রাষ্ট্র ও বিশেষ করে দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) – তারাও ভীত। এখানে ইসরাইলের ভয় হল যে এই (চীনের বলে বলিয়ান) ইরান এখন আরো বড় ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়াবে। হামাস-হিজবুল্লাহ এর সাহায্যে। এছাড়া আমেরিকার সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান আর ফিরে কোন চুক্তিতে বাধা পড়তেও সম্ভবত চাইবে না। এগুলোই ইসরাইলের মাথা খারাপ করে দেয়া তাদের মূল শঙ্কা।

    ওদিকে ইরানের প্রভাব যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে আর তাতে সে মধ্যপ্রাচ্যে কোন বাদশাগিরিই আর রাখবে না – এই অবস্থান নিতে পারে এই হল  জিসিসির [GCC] বাদশা-আমীরদের মূল শঙ্কা। আর চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে, তাতে আমেরিকান প্রভাবের পতন ঘটবে, আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সৌদিদের মুখ্য ভূমিকাটা নিয়ে বসবে ইরান। এটাও তাদের শঙ্কা। একারণে, নেতানিয়াহু জামাই কুজনারের মাধ্যমে শ্বশুর ট্রাম্প (ও তার দল রিপাবলিকানদের) কব্জা করে আমেরিকান মধ্যস্থতায় এই আব্রাহাম একর্ড করে নিয়েছিলেন তারা সকলে মিলে যেন এই চুক্তি একটা তাদের জন্য প্রতিরক্ষা। তা আসলে ইরান-চীনবিরোধী এবং ইরানি উত্থানে ভীত আরব বাদশাহ আর ইসরাইলিদের কমন এনিমি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের জোট। অতএব এই যুবরাজদের চোখে ভরসা হয়ে দেখা দিয়েছিল  ইসরাইল। তাদের ভীত মনের অনুমানে, ইসরাইলই একমাত্র তাদেরকে ইরানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। এই মনোভাবটা টের পেয়েই নেতানেয়াহু “আব্রাহাম একর্ড” পরিকল্পনা নিয়ে আগানো শুরু করেছিল।

    একারণে আবার আব্রাহাম অ্যাকর্ডের বাস্তবায়ন মানে ইসরাইল দাবি করেছিল  যে তাহলে  যুবরাজ-দ্বয়ের কাজ হল, তারা মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রগুলো থেকে ইসরাইলকে স্বীকৃতি এনে দিক। আর ওই কাজে যুবরাজের অন্য অনেকের মত পাকিস্তানের (এবং বাংলাদেশও) ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইমরান যেকোনো মূল্যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে বসে। আর তাতে দুবাই পাল্টা ব্যবস্থায় সমস্ত পাকিস্তানি (মূলত মাইগ্রেন্ট লেবারদেরকে) দুবাই থেকে বের করে দেয় বা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু করোনা আমল বলেও অনেকে ধরে নেয়, এটা বোধহয় করোনা-পদক্ষেপের কারণে হচ্ছে। যেমন এই রিপোর্টে কারণ কী তা ব্যাখ্যা দেয়া বা উল্লেখ করা হয় নাই। এই প্রসঙ্গে সৌদি আচরণের রিপোর্ট এখানে ।  আর এনিয়ে ভারতের খুশি লক্ষ্য করেন এখানে।মজার কথা হল, বাংলাদেশের নাম ওই সময় দুবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় উঠেনি। এখান থেকেই অনুমান যে আমরা স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধকে পালটে নিয়ে আপাতত – এভাবে পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ পর্যন্ত শব্দগুলো উঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, এটা ভাল সিদ্ধান্ত হয়নি যা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

    তবে এই প্রসঙ্গে এখন সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে পাসপোর্ট ইস্যুতে সব সিদ্ধান্ত স্থগিত করে পুর্বাবস্থায় ফিরে রেখে দেয়া আর পুরো ইস্যুটা যেসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা এক কমিটি করে রিভিউ করতে বসানো। মনে রাখতে হবে এখনকার বাইডেন, তিনিই যেখানে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর অবস্থানে থাকতে চাইছেন না। নিজের প্রায়োরিটি বদলে ফেলার পথে রওনা দিয়েছেন তাহলে অন্ততপক্ষে এই সুযোগে আমরাও আমাদের ভুল সংশোধন করে নিতে পারি।

    এছাড়া আরো দিক আছে। ইতোমধ্যে দুবাইয়ের সাথে চীনের সম্পর্ক কিছু উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। আর এর প্রকাশ হল দুবাই করোনা টিকা ইস্যুতে পুরোপুরি চীনা টিকা-নির্ভর। সম্ভবত এটাতে তাদের কথা বলার পথ খুলেছে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নীতির পক্ষে আমাদের দাড়াতে হবে তা হল, ইরানের পিছনে চীনের সমর্থন আছে বলে এই নতুন ইরান সে আর যাই করুক মধ্যপ্রাচ্যে বাদশাদের রাষ্ট্র-এর ওপর হস্তক্ষেপ করবে, বা-হাত ঢুকাবে, সরকার বদলাবে কী রাষ্ট্রপদ্ধতি বদলে দিবে – এটা একেবারেই কাম্য নয় ও অগ্রহণযোগ্য। এটা হতে পারে না। দুবাই বা সৌদি আরবে আভ্যন্তরীণভাবে সরকারে কে বসবে রা সরকার পদ্ধতি কী হবে তা একমাত্র তার অভ্যন্তরীণ জনগণই নির্ধারণ করবে – এই নীতির বাইরে আমরা কেউ যেতে পারি না। আমরা ওয়ার অন টেররের জুনিয়র বুশ হয়ে যেতে পারি না।

    কাজেই দুবাইয়ের সাথে চীনের কত দূর কী আলাপ হয়েছে আমরা জানি না। তবে দুবাই অন্তত এখন অনেক আশ্বস্ত তাই আমরা লক্ষ্য করছি। কারণ অন্তত  ইসরাইলকে ত্রাতা জ্ঞান করার আগের  দুবাই অনেকটাই এখন শীতল বলে মনে হয়।

    তবে চীনকেও অবশ্যই নীতিগত অবস্থানে শক্ত হতে হবে, আর চীন-ইরান চুক্তি হয়েছে বলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আরেক বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়। তা চীনেরও পক্ষে যাবে না। একমাত্র নীতিগত অবস্থান ধরে দাঁড়ানোই চীন দায়িত্ববান গ্লোবাল নেতার ভূমিকায় স্বাগত লাভ করতে পারে।

    সারকথায় আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে আরো বড় ক্ষতি হয়ে যাবার আগেই অবিলম্বে সিদ্ধান্ত স্থগিত ও রিভিউয়ের অবস্থানে চলে যাওয়াই কাম্য। এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সারা জীবন আমরা ফিলিস্তিনের পক্ষে থেকে এখন তাদের হাত ন্যূনতম শিথিল করার কোনো অর্থ নেই, এটা হতেই পারে না! আশা করি, আমাদের সরকার  বদলাবার সুযোগটা নিবেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে    “বাংলাদেশের পাসপোর্ট : প্রেক্ষাপট বাইডেনের প্রায়োরিটি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকার স্থায়ী ক্ষত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ

    আমেরিকার স্থায়ী ক্ষত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ

    গৌতম দাস

    ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3m1

          ‘We must end this uncivil war’ President Joe Biden, VP Kamala

    আমেরিকার রাজনীতিতে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের” উত্থান এক স্থায়ী ক্ষত, যদিও তা আপাতত ট্রাম্পের বাধাকে পরাজিত করে বাইডেনের শপথের মধ্য দিয়ে ঢেকে লুকিয়ে ফেলা গেল।  তবে এটাই এখন আমেরিকার রাজনীতিতে মুখ্য ইস্যু হতে থাকবে।  আমেরিকান সমাজের অভ্যন্তরের এই দগদগে ক্ষত যেটা ট্রাম্পের হাত ধরে চারবছর আগে একটু একটু করে বাইরে আসছিল সেটাই এখন উদাম হয়ে পড়েছে। এই ক্ষতের নাম “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা”। সাদা চামড়ার লোকেরাই দুনিয়াতে শ্রেষ্ঠ রেসিয়াল মানুষ। তাই বাকি সব রেসের [race] মানুষকে তাঁদের অধীনে আসতে ও চলতে হবে, শাসিত হতে হবে। আমেরিকা চলবে সাদা আধিপত্যে, অন্যদের বের করে দেওয়াও হতে পারে। ইত্যাদি এসবই হল, রেসিয়াল (বা জাত) শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের কমন বয়ান। হিটলার মনে করতে নীল চোখের জর্মান আরিয়ান জাতি ইউরোপে শ্রেষ্ঠ। তাই ইহুদি-সহ সব রেসের মানুষকে তাঁদের পদানত করতে হবে। মোদী ও তাঁর সঙ্গী ও দল মনে করে দক্ষিণ এশিয়ায় হিন্দুরাই শ্রেষ্ঠ। তাই বাকিরা সবাই ‘নিচা জাত” বা রেসের মানুষ। তাই বাকি সকলকে তাঁদের অধীনে যেতে হবে। এগুলো জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদের কমন বয়ান। সবখানেই দেখা যাবে “শ্রেষ্ঠত্ববাদের” ধারণা। এই শ্রেষ্ঠত্ববাদের সাদা চামড়ার ভার্সান হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট – এই নামে সেটা যে গত চারবছর ধরে রিপাবলিকান পার্টিটাকেই অনেকটা খেয়ে ফেলেছে সেটাই আমেরিকা তো বটেই সারা দুনিয়াও এখন জানল। মূলত জাতিবাদী এই  “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা” চিন্তা হিসাবে খুবই ডেসপারেট,  বিধ্বংসী।  আমেরিকার এই  জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা -সহ সব জাতবাদীরা সেটা মোদী-ভগত এদের আরএসএস হিন্দুত্ববাদ কিংবা স্বয়ং  নাৎসি-স্বস্তিকার হিটলার ইত্যাদি সকলেই কোন হেদায়েতি (পারসুয়েসিভ) ধারা নয় একেবারে কেবল কঠোর বলপ্রয়োগেই বিশ্বাসী হয়ে থাকে। তারা অন্যকে নিজেদের মতাদর্শ বুঝায়ে বলতেও আগ্রহি নয়। বরং মনে করে কেবল বলপ্রয়োগে তা আপনাকে মানতে বাধ্য করানো সহজ, এমন ভাবনার পক্ষের লোক। অবশ্য জাতিবাদী মাত্রই কম-বেশি তাদেরকে মেনে নিতে বলপ্রয়োগে  বাধ্য করার পক্ষের লোকই হয়ে থাকে।

    এখন সামগ্রিক বিবেচনার জায়গা থেকে দেখলে, গ্লোবাল নেতৃত্বের স্থানে আমেরিকার জায়গায় চীনের উত্থানের ধাক্কায় দেখা যাচ্ছে তা সামলাতে না পেরে প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জগত এমন তছনছ হয়ে যাবে তা আগে ভাবা যায় নাই।  যদিও  ইউরোপের নয়া নাৎসি ধরণের ছোট ছোট পকেট-অস্তিত্ব গোপন/বেনামে অনেকদিন থেকেই আছে। আর এরই মতন আমেরিকান সমাজেও হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট নামে ছোট ছোট পকেটও  অনেক দিন থেকেই আছে। তবে যেটা আগে হয়ত তত গোণায় ধরার মত ছিল না। আবার অর্থনীতি ভাল চলার সাথে “মাইগ্রেশন” বা সস্তা বিদেশি-লেবার আমদানি হতে দেয়া আমেরিকান সমাজে বেড়ে যাওয়ারই কথা। আবার খারাপের সময় মাইগ্রেশনকে বিরাট বোঝা মনে করা – এভাবে মাইগ্রেশন ইস্যুটাই অর্থনীতির ভাল-মন্দের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।  আর এই মাইগ্রেশন বাড়া-কমার সাথে আমেরিকায় সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার প্রভাব বাড়া-কমা সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ অর্থনীতি খারাপ চলা মানেই মাইগ্রেটেড শ্রমিককে বোঝা মনে করা লোকের সংখ্যা বেড়ে  যাওয়া; আর এটাই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার আইডিয়াকে পপুলার করার ভাল সময় হয়ে উঠে। সেই হিসাবে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব বা প্রথম স্থান হারিয়ে দ্বিতীয় হয়ে যাওয়ার আলামত দেখা দেওয়াতে এতে আমেরিকান সমাজে এমন একটা ধাক্কা বা বড় নড়াচাড়া আসা অস্বাভাবিক নয় অবশ্যই।
    কিন্তু তাতে এবার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীতা কী এতদিনের আমেরিকান রাজনীতির রিপাবলিকান ও-ডেমোক্রাট এদুই ধারাকে তিন ধারায় রূপান্তরিত করে দিবে? অথবা  আগের দুই ধারাই থাকবে কিন্তু রিপাবলিকান ধারাটা মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা হয়ে যাবে (!) – এটা এতদিন কেউ কল্পনাও করে নাই। আমেরিকান-রাষ্ট্র এতদিন নিজেকে খুবই [stable] স্থায়ী রাষ্ট্র বলে গর্ব করত; সম্ভবত সেদিন ফুরাচ্ছে। এখন সেটা তিন ধারায় পরিণত হোক অথবা দুই ধারাই কিন্তু  ‘রিপাবলিকান ধারাটা বলতে মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা হয়ে যায় যদি তবে বুঝতে হবে এটা হলে আমেরিকার চীনের কাছে হেরে আর দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিও থাকতে পারাটাও ক্রমশ অনিশ্চিত হওয়ার পথে যাচ্ছে।  অন্যভাবে  সার করে বললে, আমেরিকা-রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গঠন এতে ভিতর থেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।  আর এই ফাঁকে আমেরিকাকে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে হিমশিম অবস্থায় পড়ে বা অন্যেরা না তাকে তৃতীয় অবস্থানে ঠেলে ফেলে দেয়, এই অবস্থা তৈরি হবে। যাতে এই লড়াইয়ে ভারতের বদলে ইউরোপ (ইইউ) হয়ে উঠতে পারে চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ট হিসাবে দ্বিতীয় শক্তি, আর তারও নিচে চলে যেতে পারে আমেরিকা। এককথায় আমেরিকায় সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা উত্থান ও জেঁকে বসার  সোজা মানে হবে আমেরিকার গ্লোবাল অবস্থানকে আরও দুস্থ অসহায় করে পিছিয়ে দেয়া।
    তবে আমেরিকার এমন দুর্দশা ও পতন কত নিচে যাবে তা এই মুহুর্তেই প্রায় পুরাটাই উন্মোচিত হতে হতে গিয়েও শেষে ঠেকে গেল। মূল কারণ, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট আর হল না।  যদিও এখনও তা হতে পারে,  শপথের পরে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আবার এর সম্ভাবনা বাড়বে। সেক্ষেত্রে সেটা হবে কোন “সাবেক” প্রেসিডেন্টের ইমপিচমেন্টের প্রথম উদাহরণ। সেই হবু সিনেট ইমপিচমেন্ট শেষে পর্যন্ত আর হোক আর নাই হোক, আমেরিকান-রাষ্ট্র স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়া এবং আমেরিকান রাষ্ট্র-রাজনীতিতে কালোদাগ ছাপ লেগে যাওয়াটা ঘটেই গেছে।  এটাই আর আমেরিকান রাষ্ট্র আগের মত কমপিটিটিভ থাকবে না। মানে, অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সবল থাকার ক্ষমতাটা এখন হারাবেই। কেবল এর মাত্রা কেমন হবে সেটা নির্ণিত হতেই কেবল বাকি আছে।
    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতি আমেরিকান রাজনৈতিক পাড়ায় কত বড় জায়গা নিবে, দখল ও প্রভাব নিয়ে হাজির হবে এর প্রথম রাউন্ড আমরা দেখে ফেলেছি গত ৬ জানুয়ারি – সাদাবাদিদের আমেরিকার সংসদের রানিং যৌথ অধিবেশনের উপর শরীরি দখল নেয়া – তান্ডব ও নিজেদের আধিপত্য সেদিন কতটা প্রতিষ্ঠা করেছিল তা দেখে। যেমন সেদিনের মোট গ্রেফতারের সংখ্যাটা ছিল মাত্র ৮৩ জন। যার মধ্যে আবার প্রায় অর্ধেক ছিল তাঁদের বাড়ি ফেরার সময় ততক্ষণে (সন্ধ্যার পর থেকে কার্ফু জারি হয়েছিল) সে কার্ফুভঙ্গের অভিযোগে পড়ে গেছে তাই। দিনের বেলায় সংসদে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটানোর জন্য গ্রেফতার হয়নি তারা। অর্থাৎ পুলিশ উদার থেকেছিল এর প্রমাণ এটা। আর  কার্ফুভঙ্গ যা তুলনায় খুবই লঘু অপরাধ। এর সোজা মানে হল, সংসদের ভিতরের হাজার হাজার তান্ডবরত  সাদাবাদি-দেরকে পিঠে হাতবুলিয়েই বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।  আর, ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় যদি ইমপিচ করে শেষে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হত সেক্ষেত্রে সাদাবাদিরা দ্বিতীয়বার তাঁদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে রাস্তায় নামতে প্রস্তুত ছিল।  আর তাহলেই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কতটা রাজনৈতিক প্রভাব সঞ্চয় করেছে আর রিপাবলিকান দলের মধ্যেইবা কতটা প্রধান ধারা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে এরই প্রদর্শনী আর লুকানো থাকত না।
    এর তাহলে সোজা অর্থ হল, আমেরিকান সমাজে রিপাবলিকান ধারাটা মূলত কতটা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারা হয়ে গেছেই কেবল সেটা দেখানোটাই আড়ালে রয়ে গেছে। বাইডেন এই ক্ষতটাই লুকিয়ে চলার সুযোগ নিচ্ছে। তাসত্বেও মনে হচ্ছে আগামি ছয়মাসের মধ্যেই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারাটাই মুখ্য বিরোধী-ধারা হয়ে জানান দিতে চেষ্টা করবে। এতে এরা যতটা সফল হবে বাইডেনের আমেরিকা ততই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক নিগোশিয়েশন দ্রুত গুটাতে তাড়াহুড়া শুরু করা সম্ভাবনা বাড়বে। যা হবে অনেকটা সত্যিকার হারার আগেই বাইডেনের হেরে যাওয়া। তা আগামিতে আরও কী পরিণতি হয় দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তবে সব কিছুরই ভিত নড়ে গেছে, আগের মত আর কিছুই নাই।

    আপাতত শেষটা ভাল দিয়ে শেষঃ
    তবু আমাদের বলতেই হবে আমাদের সামাজিক প্রবাদ যেমন বলে, ‘শেষটা ভালোভাবে হলেই সবটা ভালোই হয়েছে’। হোয়াইট সুপ্রিমিসিস্ট রিপাবলিকান; আর এদের হুমকিতে আমেরিকার দীর্ঘ প্রায় আড়াই শ’ বছরের রাজনৈতিক সিস্টেমে ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থাটা প্রথমবারের মত হুমকিতে পড়ে ভণ্ডুল হয়ে যেতে লেগেছিল। শেষে অন্তত, যা কিছু হয়েছিল, খচখচে কাঁটাসহ সব কিছু পেছনে ফেলে বাইডেনের আমেরিকা তা আপাতত মাটিচাপা দিতে পেরেছে। বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠান ন্যূনতম কোনো অঘটন ছাড়াই শেষ হতে পেরেছে। যদিও শপথ শেষের  বক্তৃতায় বাইডেন, তিনি আমেরিকায় প্রধান শত্রু হিসাবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের” নাম উল্লেখ করতেই হয়েছে। স্বীকৃতি বাইডেনকে দিতেই হয়েছে।
    কাজেই অন্তত মিডিয়া জগতে এখন আমরা, গ্লোবাল পারস্পেকটিভে বিজনেস আগের মতই আর তা ব্যবহারিক যার যার স্বার্থের দিক থেকে সামনের দুনিয়া কেমন হতে যাচ্ছে, সম্ভাবনা কী কী তৈরি হচ্ছে সেসব দিকে মনোযোগ ফিরাতে পারি। বাংলাদেশের দিক থেকে, আমাদের তিনটি স্তরে তিন দিক থেকে আগামী চার বছরের দুনিয়ায় যখন বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকবেন তখন তা দেখতে কেমন হবে এর ছবিটা জানার ব্যাপারে আমাদের জনগোষ্ঠিগত নিজস্ব স্বার্থ ও আগ্রহ মেলে ধরতে পারি। এর প্রথম স্তরটা হল, গ্লোবাল যা মুখ্যত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় কোন পয়েন্টে গিয়ে শেষে থিতু হচ্ছে এবং কেন এমন হবে সেটা জানাবুঝার চেষ্টা করা। এটা আমাদের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, এই প্রভাব বাইরের হলেও তা আমাদের উপরও পড়বে ও বড় প্রভাব রাখবে। আর দ্বিতীয় স্তরটা হলো জোনাল। অর্থাৎ এশিয়ার নাট্যশালায় যা আমাদের ডানে-বামে চীন ও ভারতের স্ব স্ব স্বার্থাবস্থানের দিকে আমাদেরকে নিয়ে যেতে টানাটানির হবে, সাথে বাইডেন প্রশাসনের যোগ হওয়া প্রভাব তো থাকবেই। আর তা আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, চীন হতে যাচ্ছে ‘নতুন নেতা’। এ ছাড়া তৃতীয় স্তরেরটা হল, সরাসরি বাংলাদেশ-আমেরিকা সম্পর্ক।

    যদিও এই তৃতীয় স্তরেরটা এবার আমাদের কল্পনারও বাইরে চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। এর মূল কারণ চলতি শতকের শুরু থেকেই ২০ বছর ধরে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষত বাংলাদেশে এসেছিল ভারতকে ভর করে সাথে নিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজে ভারতকে ‘ঠিকা দিতে’। আগামি এবার বিরাট ফারাকটা হবে এখানেই। কী সেটা?

    আগের আমেরিকার আচরণ ও তৎপরতা দেখে যদিও আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ঠেকানোটাই আমেরিকার একমাত্র স্বার্থ নয়। কিন্তু বেকায়দায় অবস্থাতে পড়ে আমেরিকা এসেছিল যেন চীন ঠেকানো ছাড়া তার আর কোনো স্বার্থ নেই, এমন ভাব ধরে। আমেরিকার অন্য মুখ্য স্বার্থ যা তখনো ছিল এবং এখনো আছে – তা হল বঙ্গোপসাগরে সেভেনথ ফ্লিটকে যদি নোঙর করাতে পারে।  কিন্তু তার মনের কথাটা এতদিন মনেই রয়ে যায়, কারণ এ বিষয়ে ভারত একদম ঘোরতর বিরোধী, নুন্যতম ছাড় দেওয়ার পক্ষপাতি নয়। যদিও চীনের অসহনীয় চাপের মুখে পড়লে আন্দামানে আমেরিকাকে ঘাঁটি গাড়তে দিতে পারে, এমন চিন্তা বাড়ছে, যা একালের নতুন ঘটনা। তবে এতদিন আমেরিকা এই স্বার্থ লুকিয়ে রেখেছিল, যাতে চীন ঠেকানোর ঠিকাগ্রহিতা ভারতের সার্ভিসটা সে পেতে পারে। কিন্তু আজ এটা সবপক্ষের কাছেই পরিষ্কার, আমেরিকার এই চীন ঠেকানো পলিসি অকেজো, কোন কাজে আসেনি, ডিভিডেন্ট, লাভ-মুনাফা দেয়নি। আমেরিকার সব স্বার্থ পানিতে গেছে। চীনের অবজেকটিভ বা বৈষয়িক-অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উত্থান সামরিক উত্থান নয় যে, তাই এটা ঠেকানো অসম্ভব রয়েই গেছে। ফলে ভারতের ‘মুই কী হনু রে’- এই মিথ্যা ঘাড় ফোলানো দেখা ছাড়া  আমেরিকার এতদিনের পলিসি আমেরিকাকে কিছুই দেয় নাই, কোন কাজে লাগেনি। অতএব এবার বাইডেনের আমেরিকার পুনঃরূত্থানের চেষ্টা এই নবউদ্যোগে এশিয়ায় আমেরিকার আগমন যদি ঘটে তা হওয়ার অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকবে একান্ত আমেরিকান নিজ স্বার্থ ডমিনেটিং রেখে নিজেকে হাজির করাতে। মানে, এবার আমেরিকা ততটাই ভারতবিরোধী না হলেও কোন রকম গাটছাড়া না বেঁধে আসারই সম্ভাবনা।
    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাইডেনের আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক বিশেষত, বাণিজ্য সম্পর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকে, কিভাবে তা সেখানে পৌঁছাবে; জট খুলবে নাকি, সঙ্ঘাত চরমপথ নিবে ইত্যাদি শুধু তাদের দুই রাষ্ট্রেরই নয়, এটা আমাদের চলতি গ্লোবাল রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই অর্ডারে অদল-বদল ঘটিয়ে দেয়ার মত পটেনশিয়াল ক্ষমতা রাখে। বাইডেন প্রশাসনের আমলে কী হতে যাচ্ছে, সেটা আপাতত ততটুকু প্রকাশিত যতটুকু বাইডেন তার স্টাফ-উপদেষ্টা হিসেবে কাদের নিয়োগ দিচ্ছেন, তাদের চিন্তাভাবনা অভিমুখ-দিশা কেমন বা ব্যাকগ্রাউন্ড ও কাজকর্মের অভিজ্ঞতা কেমন, তা দেখে যা অনুমান করা যায়।

    এনিয়ে হংকংভিত্তিক এশিয়া টাইমস পত্রিকা খবর দিচ্ছে, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রেগুলার ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র বলেছেন, চীন আশা করে চার বছর আগে তাঁদের সম্পর্ক যেমন ছিল তেমনটাই ফিরে আসবে এটা তারা আশা করে – ইংরেজি শব্দটা ছিল সম্পর্ক যেন “ব্যাক অন ট্র্যাক” – এমন হয়ে [The Chinese government hopes Sino-United States relations will get back on track after the Biden administration took office ]।
    এদিকে বাইডেনের নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্থনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, তিনি মনে করেন বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্পের চীনকে ডিল করার যে ধরন (ওয়ে অব হ্যান্ডলিং)তা তার পছন্দ নয় যদিও তাঁর অনেক শক্ত অ্যাপ্রোচ সঠিক ছিল। এটাকে অনেক কূটনীতিক ব্যাখ্যা করেছেন, শুরুতেই নতুন প্রশাসন চীনের প্রতি ভীষণ উদার অথবা “ট্রাম্পের সবই ভুল ছিল” এমন বলার ইমেজ নিয়ে শুরু করতে চাইছেন না; যদিও এতে এটাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চীন ইস্যুতে তারা ট্রাম্পের পথে আগাবেন না। [Antony Blinken, the incoming US Secretary of State, said Tuesday that he disagreed with Trump’s way of handling China in several areas, but believed that Trump was right in taking a tough approach to Beijing]।

    ট্রাম্প-পম্পেও এর শেষ প্রতিহিংসার কাঁটা বিছিয়ে যাওয়াঃ
    ওদিকে ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে এক প্রতিহিংসাপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কিছু কাজ করে গেছেন একনিষ্ঠ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও। ওয়াশিংটন পোস্ট এনিয়ে শিরোনাম ব্যবহার করেছে ‘কূটনৈতিক তাণ্ডবলীলা’ বলে [Trump and Pompeo’s campaign of ‘diplomatic vandalism’]। যেমন গত চল্লিশ বছরের আমেরিকার আভ্যন্তরীণ তাইওয়ান নীতি-গাইড লাইন বলে শক্ত পালনীয় এক নীতি ছিল। ট্রাম্প-পম্পেও ক্ষমতা ছাড়ার আগে  প্রতিহিংসায় তা নির্দ্বিধায় ছিড়ে ফেলে দিয়ে গেলেন। এছাড়া এমন আরও আছে।

    গত ১৯৪৯ সালের মাওয়ের চীনা বিপ্লবের পর থেকে চীনের নিরবচ্ছিন্ন অবস্থান হল, ‘এক চায়না পলিসি’ [One China Policy] শক্তভাবে অনুসরণ করে চলা। কথাটার ব্যবহারিক মানে যেখান থেকে উদয় হয়েছিল,  চীনের নেতা মাও  তাঁর ১৯৪৯ সালের বিপ্লবে সারা মূলভুখন্ড দখল করে ফেলেছিলেন। এতে মাওয়ের বাহিনীর এনিমি চীনা ন্যাশন্যালিস্ট চিয়াং কাইশেক তাইওয়ানে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু সময়কাল হিসাবে সেটা ছিল হিটলারকে পরাজিত করা আর জাতিসংঘের জন্ম দেয়া এক যুদ্ধবিরোধী থিতু গ্লোবাল অর্থনীতি গড়বার সময়। তাই এই আবহ-তে আমেরিকান রুজভেল্ট পরবর্তি ট্রুম্যান, সোভিয়েত স্টালিন আর বৃটেনের প্রবল আপত্তি গড়ে উঠেছিল মাওকে আর তাইওয়ান দখলে না যেতে। সেসময় এমন কিছু ঘটলেই দেশটাই ভাগ করে বিবদ্মানদের দুই অংশে আলাদা রাষ্ট্র করার দিকে ঠেলে দিয়ে আপাত সমাধান পাবার ঝোঁক অনেক বেশি ছিল। যেমন কোরিয়া অথবা ভিয়েতনাম এভাবেই শর্টকাটে হাটতে রাষ্ট্র ভাগ করা হয়েছিল। চীন-তাইওয়ানও এমনই এক চিহ্ন।

    তাই সেই থেকে শুরু হয় মাওয়ের চীনের এক চায়না নীতি যে, তাইওয়ান কোনো আলাদা রাষ্ট্র নয়, চীনেরই অংশ। তাই অন্য যেকোনো দেশ নয়াচীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে চাইলে তাকে ‘একচীন পলিসি’ মানতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয় আগে। যে রাষ্ট্র লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয় না চীন তার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কই করে না। এককথায়,  এ প্রসঙ্গে একমত না হলে চীন সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করে না। তাই আমেরিকার ক্ষেত্রেও ১৯৭৯ সালে ১ জানুয়ারি চীন-আমেরিকা প্রথম পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করার সময় আমেরিকাকে তাইওয়ানের হাত ছেড়ে মূল ভূখণ্ড চীনকে জানাতে হয়েছিল যে আমেরিকা একচীন পলিসির প্রতি সম্মতি আছে। ফলে আমেরিকাকে তাইওয়ানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতেও হয়েছিল আগে। মানে আমেরিকার সরকারি অবস্থান হল, তাইওয়ান আলাদা কোন রাষ্ট্রই নয়। তবে চীন তাইওয়ানের সাথে যেকোনো রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে, “ট্রেড রিলেশন অফিস” খুলতে আপত্তি করে না। এমনকি চীনের নিজেরই তাইওয়ানের সাথে সেসব সম্পর্কই আছে। আর এই সূত্রে সেই থেকে আমেরিকান ফরেন অফিসে অভ্যন্তরীণভাবে কিছু আইনি সার্কুলার জারি করা আছে যে, আমেরিকান কূটনীতিকরা ‘একচীন পলিসি’ মেনে চলতে কী কী করবেন আর কী কী কখনো করবেন না। কিন্তু পম্পেও গত ১০ জানুয়ারি ২০২১ এক ঘোষণা করেন, তিনি চীনের একচীন নীতি মানার জন্য আমেরিকা স্বেচ্ছায় যেসব শর্ত মানতে অভ্যন্তরীণ সার্কুলার দিয়েছিল, সেসব সার্কুলার তিনি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এটাকে কূটনীতিক বিষয় নিয়ে একধরনের ফাজলামো করাই বলা চলে।

    যেখানে চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করার ক্ষেত্রে এটা ছিল উভয়ের মেনে নেয়া একটা শর্ত। সেখানে এই শর্তপালনের জন্য আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সার্কুলার যেটা ঠিক কোনো চুক্তির অংশ নয় বটে, কিন্তু তা প্রত্যাহারের কথা কেন আসছেন পম্পেও? তবুও সম্পর্ক-চুক্তি মেনে চলার জন্য এতদিন জারি থাকা অভ্যন্তরীণ সার্কুলার বাতিল করে দেয়াটা একটা অকূটনীতিক আচরণ। কারণ পম্পেও সাহস করে অর্থপূর্ণ কিছু করতে চান তাইলে তার এমন ঘোষণা করে দেয়া দরকার ছিল যে, ‘চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক আমরা ছিন্ন করছি”। কিন্তু না। ট্রাম্প-পম্পেও গোষ্ঠির সেই মুরোদ নাই।  তাই ঘুমিয়ে থাকা মানুষকে কষে গালি দেয়া মত এটা – যার শুনতে পাবার সম্ভাবনাই নাই।  এটা অনেকটা ‘গরুর মাংস খাবো না কিন্তু ঝোল খাবো’ বলা ধরণের। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের মধ্যে সার্কুলার প্রত্যাহার করার মানে, চীনকে উসকানি দেয়া যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, সে কথা মানলাম না। কিন্তু আবার ট্রাম্প-পম্পেওর সেই মুরোদ নেই যে, সে কথা মুখের ওপর চীনকে বলে জানায়। তা হলে এর উদ্দেশ্য কী? এতে পম্পেও কী অর্জন করলেন? অন্যের বাসায় ঢিল মেরে পালিয়ে গেলেন, যাতে বাড়ির মালিক বাইরে এসে বাইডেনকে দেখে মনে করেন তিনিই ঢিলটা মেরেছেন। অথবা অন্য ভাষায় বললে এটা হল, অন্যকে কষ্ট দিয়ে নিজে সুখ পাওয়া। অন্যের আসা যাওয়ার পথে কাঁটা বিছিয়ে রেখে তার ক্ষতি করার ‘সুখ’ নেয়া।
    এছাড়াও আরও আছে। যেমন এরই আরেক অংশ হল, পম্পেও ওদিনই ঘোষণা দিলেন “বাংলাদেশে আলকায়েদা আছে”। অথচ ট্রাম্প-পম্পেও আর ক্ষমতাতেই থাকবেন না। তা হলে এমন কথা বলে তার কী লাভ হল? কারণ যদি আলকায়েদা থাকেও তাতে বাইডেন কী করবেন তা তো বাইডেনই জানেন। তাহলে পম্পেও এর লাভ হল এই যে, বাইডেন প্রশাসনের সাথে আগেই হাসিনা সরকারের সম্পর্কটা তিতা করে দিয়ে চরমে উঠার দিকে উস্কে দেয়া। আমরা দেখলাম হাসিনা ঠিক ট্রাম্প-পম্পেওকে নয়, আমেরিকার প্রশাসনকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। এর রেশ ও প্রভাব এখন শপথ নিয়ে ক্ষমতায় এসে যাওয়া বাইডেন প্রশাসনের উপরও পড়বে। একই ধরণের অভিযোগ তিনি করেছেন ইরানের বেলায়ও, যে “আলকায়েদা আছে”। যাতে বাইডেন ইরান-আমেরিকা নিউক্লিয়ার ছাড় দিবার সমঝোতা চুক্তি সহজেই আবার শুরু করতে না পারেন।  এর আরেক মানে তা হলে পম্পেও চেয়েছেন – তিনি এমন কিছু ঘটিয়ে দিলে এতে তার অনুমান হল, বাইডেনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো যাবে না। তাই এটাই তার ভালো পছন্দ যে, এটাকে এদের মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ফেলে দিলে ঝগড়াটা বেশি তিতা হবে। তাই তিনি এটি করেছেন।
    এ তো গেল যেটা চলে গেছে সেই ট্রাম্প প্রশাসনের আলাপ। কিন্তু যেভাবেই হোক ঐ পর্ব এখন মৃত।  আর শকুনের বদ দোয়ায় গরু মরা বেড়ে যায় না।  বরং চার দিকে জল্পনা কল্পনা  এবং বাস্তবতা হল, বাইডেন নিজে সরাসরি কী করতে যাচ্ছেন? ভারতের মত বাংলাদেশেও সরকারের হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ইস্যুগুলো খুবই শক্তভাবে জোরালো হয়ে উঠতে যাচ্ছে, চারদিকে সেই ইঙ্গিত বেড়েই চলছে।
    এছাড়া অন্য প্রসঙ্গে যেমন চীন প্রসঙ্গে বাইডেনের বিদেশনীতি মূল ধারা যেটা সামনে আসছে তা খবরের শিরোনামের ভাষায় হল, “প্রতিযোগিতা ভালোভাবেই চালাতে হবে কিন্তু (কোনো যুদ্ধের) বিপর্যয় ঘটানো যাবে না” [Competition Without Catastrophe]। এটা নিরস্ত্র লড়াই করে রাখতে হবে। নিজ নিজ স্বার্থের স্ট্রাটেজিক আর কূটনীতিতে লড়াই চালাতে হবে।

    যেমন- শপথের দিন বাইডেন বলছেন, তিনি তার শাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে এমন কিছু করতে চান, যা দেশ-বিদেশে মানুষের কাছে বার্তা দেবে যে আমেরিকা ফিরে এসেছে- ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’! [Joseph Biden has promised a fast and furious agenda in his first 100 days in office in a bid to show the world “America is back” after four erratic and divisive years under the outgoing Donald Trump.]
    বলা হয়ে থাকে, আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে কী কী করে দেখাতে পারেন, তা দেখেই বোঝা যায় তার আমলটা কেমন যাবে। আর এটা প্রথমবারের মতো চালু হয়েছিল আমেরিকার টানা চারবারের  (১৯৩৩-৪৫) প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আমল থেকে। এ বিচারে বলা যায়, বাইডেনের প্রথম ১০০ দিনের আলাপ তোলার শুরু। তবে এটি মূলত অভ্যন্তরীণ ইস্যু আর তাতে অর্জন কী কী করা হয় বা যায় সেই বিষয়। কিন্তু লক্ষ করার বিষয় হল – বাইডেন কথাটা বলেছেন, ‘এটি করা হবে দুনিয়াকে দেখানোর জন্য’। আবার বলা হচ্ছে দুনিয়া দেখবে যে ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে’। কিন্তু কোথায় চলে গিয়েছিল আমেরিকা, ট্রাম্পের হাত ধরে? আর কোথায়ইবা সে ফিরতে চায়?
    এর জবাব হল, আমেরিকা মূলত যে গত ৭৫ বছর ধরে এক গ্লোবাল সিস্টেমের নেতা ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেসব কিছু ভুলে ট্রাম্পের হাত ধরে জাতিবাদী হয়ে যায়। সেখান থেকে সে গ্লোবাল নেতৃত্বে ফিরতে পারুক আর না পারুক; কিন্তু সে গ্লোবাল সিস্টেমে ফিরতে চায়, প্লেয়ার হতে চায়, গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিতে নিজের করণীয় ও ভূমিকা নিতে চায়। এই মেসেজই বাইডেন বারবার দিতে চাইছেন। এর বিপরীতে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ২০ জানুয়ারি জো বাইডেনের কাছে আবেদন করে বলেছেন, চীনের সাথে আমেরিকা যেন যুক্তিবুদ্ধি খাটিয়ে আচরণ (মানে রাগ বা বিদ্বেষে নয়) করে, বিশেষত দ্বিতীয়-বৃহত্তম অর্থনীতির একটা দেশ যেমন আশা করে। আরো আছে। চীন বলছে চার বছর আগে যেমন চীন-আমেরিকা আমরা ছিলাম তেমন জায়গায় (ব্যাক অন ট্র্যাক) ফিরে যেতে।

    মজার কথা হলো, এই শেষ বাক্যে এসে দেখা যাচ্ছে- চীন ও আমেরিকার মন্তব্যের মধ্যে এক বিশাল মিল দেখা যাচ্ছে। এ যেন প্রেমের প্রস্তাবের আগেই দু পক্ষই চাচ্ছে  যে সে প্রত্যাখ্যাত হবেন না, তা আগাম নিশ্চিত হতে।

    অর্থাৎ শপথের দিনের মহড়া দেখে মনে হয়েছে তারা এক রাস্তা ধরেই এগোচ্ছেন হয়ত! যদিও পথে অনেক বাধাও আছে। আর তা কী হয়, দেখার জন্য অন্তত প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত আমাদেরকে অপেক্ষা মনে হচ্ছে লাগবেই। কারণ কাজটা একেবারেই সহজ নয়। দেখা যাক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৩ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “শেষে বাইডেনের শপথ হয়েই গেল” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    গৌতম দাস

     ১১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬,  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kW

     

    TRUMP’s MENTAL STAGE

    আপনি যখন অন্যকে শারীরিকভাবে কষ্ট দিয়ে সুখ অনুভব করবেন তখন বুঝতে হবে আপনি মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে প্রবেশ করে ফেলেছেন। উপরের চারটা ছবির মধ্যে কম-বেশি সেসবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে প্রথমটায়। কারণ এই অসুস্থতার সাথে মুখভঙ্গি বদলের সম্পর্ক আছে। ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে আমেরিকায় বিশেষত সাইকিয়াট্রিস্ট মহলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকেই বিস্তর আলোচনা হয়ে এসেছে। এমন সাইক্যাট্রিক রিপোর্ট ও এমন আলোচনার অজস্র রিপোর্ট ওয়েব সাইট পাওয়া যাবে।
    এদিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবলভাবে ঢলে পড়ছে, প্রভাব হারাচ্ছে আর তা নিয়ে অজস্র রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে।  বিশেষ করে ট্রাম্পের আমলে সাথে চলতি করোনাকালে এই ভাইরাসের প্রভাব প্রতিক্রিয়া ম্যানেজমেন্ট ও মোকারিলা প্রশ্নে ট্রাম্পের আমেরিকা পরাজিত হয়েছে বলা যায়। জনসংখ্যার  ৬.৬% আক্রান্ত হয়েছে যা হয়ত তুলনায় খুব বেশি নয় কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ (৩.৭২ লাখ) ছুঁয়ে ফেলার দিকে যেটা ট্রাম্পের পারফরমেন্সের দশা মাপার ক্ষেত্রে এক বড় ইন্ডিকেটর।  আর ঠিক এক দিকটাকে স্টাডির মধ্যে নিয়ে একটা স্টাডি রিপোর্ট বলছে অর্থনীতিতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের এক নম্বরে যাওয়ার কথা যেটা আগে বলা হয়েছিল যে এটা ২০৩৫ সালের দিকে ঘটবে সেটা এখন বলা হচ্ছে কোভিড মোকাবিলায় লড়াইয়ে ট্রাম্প আমেরিকাকে হারিয়ে পিছনে ফেলে দিবার কারণে সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যে ঘটে যাবে।
    এসবেরই প্রভাবে এখন ১২.৮ মিলিয়ন (১.২৮ কোটি) বেকারের ট্রাম্পের আমেরিকায় অর্থনৈতিক সংকটের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট্রদের প্রভাব। অর্থাৎ সাদা মানুষেরাই শ্রেষ্ট, আমেরিকা হল মূলত সাদাদের, এখানে অন্যান্য কালারের মানুষেরা এসে সাদা মানুষদের দুঃখ দুর্দশা সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সাদাদের  শ্রেষ্ঠত্ব ‘রি-ক্লেম’ করে ফেরত নিতে হবে। যার আসল মানে হল সাদা সুপ্রিমিস্টদের চরম উগ্র বর্ণবাদী হতে হবে। চারবছর আগে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান আসলে ছিল এই সাদাবাদীদেরই রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম বড় প্রকাশ। আর এই সাদা রাজনীতির পাবলিক ফিগার স্টিভ ব্যানন  (Stephen K. Bannon), তাঁকে ট্রাম্পের ‘হোয়াইট হাউজের চীফ স্ট্রাটেজিস্ট’ হিসাবে  নিয়োগ দেয়া ছিল ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। কিন্তু এই রাজনীতির একটা লিগাল সমস্যা আছে। আমেরিকার কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের পক্ষে প্রচারক [preach] হলে তাঁর এর বিরুদ্ধে মামলা খাবার বা ইমপিচ হবার সম্ভাবনা আছে। তাই ট্রাম্প একটা দুরত্ব রেখে এদের সমর্থন করে থাকে। ব্যাননকেও এক পর্যায়ে উপদেষ্টা পদ থেকে খারিজ করে দেন তিনি।  কিন্তু এবার ০৬ জানুয়ারি ২০২১-তে?

    এদিকে অবশেষে জানা গেল প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ও তার ক্যাম্পের সমর্থকেরা আমাদের জানাচ্ছেন, আমেরিকায় টেরোরিস্ট কারা! কথিত ট্রাম্প সমর্থক যারা ক্যাপিটোল হিলের আমেরিকান কংগ্রেসের ভিতরে প্রবেশ করে ৬ জানুয়ারি তান্ডব ভাঙচুর চালাতে ঢুকেছিল বাইডেন নিজমুখে বলছেন, তারা ‘টেরোরিস্ট’। কিন্তু এতেও পরিস্কার হয়নাই বা লুকিয়ে ফেলা হয়েছে  এঁদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়ের দিক।  তবে আটই জানুয়ারির পর থেকে মিডিয়ায়  প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়ে গেছে এদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়। অর্থাৎ বাইডেনের বা অনেক আমেরিকান “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” যারা সংসদে হামলাকারিদেরকে “টেররিস্ট” বলে নামকরণ করছেন এরা আসলে হামলাকারিদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই মূল পরিচয়, এই মারাত্মক রেসিজম ও ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় – এসবই আড়াল করে রেখেছিলেন, গুরুত্ব দেন নাই। সেসবগুলো এখন প্রকাশ্যে সামনে এসে গেছে।  এদিকে  ফেসবুক ও টুইটার কর্তৃপক্ষ এখন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে এদের সচিত্র ততপরতা, কী কী গ্রুপের সদস্য হয়ে তারা ঐদিন দলবদ্ধ হয়ে ততপর ছিল এর বিবরণ দিয়েছে। আর সেই সাথে ওসব সোশাল মিডিয়া বলছে তারা ট্রাম্পের একাউন্ট চিরদিনের মত মুছে দিয়েছে। যেখানে মূল অভিযোগ তারা জানিয়েছে ট্রাম্প ও তার এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী সমর্থকেরা ফেসবুক ও টুইটার প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে মানুষ হত্যা ও ঘৃণা-হিংসা ছড়ানোর কাজে নেমে গেছিল।

    সবশেষে পরিস্থিতি এখন পুরাটাই  বাইডেনের পক্ষে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরাটাই আমেরিকার সংসদের (কংগ্রেসের উভয়কক্ষের) হাতে চলে গিয়েছে। এটা ট্রাম্পের জন্য আরও বিপদজনক হয়ে উঠেছে কারণ ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানদের বড় অংশটাই এখন কোন্টাকির সিনেটর ম্যাক-কনেলের [Mitchell McConnell ] নেতৃত্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এবং  তিনি তার গ্রুপ নিয়ে সম্ভবত  আগামি সোমবারে ডেমোক্রাটদের আনা ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের (অনাস্থা ও অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা) প্রস্তাব যেটা তুলতে যাচ্ছে তা সমর্থন করে বসতে পারেন।

    বিপদজনক দেউলিয়া ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    যেকোনো ব্যবসামাত্রই তাতে উত্থান-পতন আছে, থাকবে। এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি এই সূত্রে কারও ব্যবসা ফেল করাতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তাই বলে দেউলিয়া হলেই ঐ ব্যবসায়ীর মানসিক রোগ বা অস্থিরতাও দেখা দিবেই তা কিন্তু নয় যদিও কারো বেলায় এটা হতেও পারে। আবার তেমন কিছু নাও হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা কিছু হয়েছে কিনা চেক করার দরকার আছে। দেউলিয়া [Bankrupt]  হলে ঐ ব্যবসায়ী সাথে আবার কোন মানসিক রোগগ্রস্ত হয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। নইলে কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট নিজেই সংসদে হামলার জন্য দাঙ্গাবাজ রেসিস্টদের এনে উক্সানি দিতে পারে?  আমেরিকান কংগ্রেসে তা হামলাভাঙচুর পর্যন্ত ঘটাতে পারে, কিছু লোক বেঘোরে মারা পড়তে পারে!  তাই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করার সময় বয়ে যাচ্ছে, যদিও এই আওয়াজ আগেও উঠেছিল।
    সেই ২০১৬ সালে প্রার্থী হওয়ার আগেই, ট্রাম্পের মানসিক স্থিতি চেক করে নেয়া দরকার ছিল, সেটা আজ স্পিকারসহ আমেরিকা রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন।  ট্রাম্পের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন কোন অনুসন্ধানী ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট মতে, ওয়াশিংটন পোস্ট জানাচ্ছে,  ট্রাম্প ১১ বার নিজেকে দেউলিয়া ব্যবসা কোম্পানি হিসেবে রেজিস্টার্ড হয়েছিলেন।

    কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘দেউলিয়া’ হওয়া মানে কীঃ
    কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজেকে ‘দেউলিয়া’ ঘোষণা করিয়ে নেয়া মানে কী? আমেরিকান বিজনেস ল’ অনুসারে কোম্পানির মালিকেরা নিজেরাই নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করাতে পারেন, তবে আদালতের মাধ্যমে। সাধারণত এটা কোম্পানি মালিক ও ম্যানেজমেন্টের ঘোষিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘটে থাকে। অনেকের মনে হতে পারে, মালিক নিজেই কেন ঘোষণা করবেন, নিজেকে কি কেউ পাগল বলেন বা বলবেন?
    হ্যাঁ বলবেন, ও বলে থাকতে পারেন। কারণ, নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়ার জন্য আদালতে ঐ কোম্পানিকেই আবেদন করতে হয় আর তাতে আদালতের অনুমোদন পেতে হয়। কিন্তু কখন ও কেন? যখন সাধারণত দেখা যায় কোনো কোম্পানির আয় ও অর্জিত সম্পদের মোট মূল্যের চেয়ে ওই কোম্পানিকেই পরিশোধ করতে হবে, সম্ভাব্য এমন দায়-দেনার পরিমাণ ছাড়িয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
    কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হয় বা হতে পারে? সাধারণত দেখা যায় কোম্পানিটা ধরা যাক সেটা ওষুধের মত পণ্য উৎপাদনকারী এবং বাজারে খুবই সুনাম-ওয়ালা কোম্পানি। কিন্তু ওর যেকোন একটা পপুলার ওষুধ-পণ্যের গুণে ত্রুটি ধরা পড়েছে যা উৎপাদনকালীন বা মুল ফর্মুলাতেই মারাত্মক ত্রুটিজনিত এক ভুল। আর তাতে হয়ত ঐ ওষুধ ব্যবহার করে কয়েক লাখ লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা অঙ্গ হারিয়েছে অথবা এদের মধ্যে প্রায় শ’খানেক লোক মারাও গেছেন। এমন হলে ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করা শুরু করেছে হয়ত। হয়ত দু-একটা মামলার অবস্থা থেকে বোঝাও যাচ্ছে, এসব মামলায় কোম্পানির বিরুদ্ধে আদালতে শাস্তির রায় হয়েই যাবে আর শাস্তির পরিমাণও অনেক বড়, হয়ত মাথাপিছু কয়েক কোটি টাকার উপরে দিতে হবে একেকজন ভুক্তভোগীকে।
    এই পরিস্থিতিতে তখন ঐ কোম্পানি নিজ ক্ষতি ও দায় কমাতে বা বেঁচে যেতে আদালতে নিজ উদ্যোগেই আবেদন করে যে, তার কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়া হোক। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সব ভুক্তভোগীর সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ দিতে গেলে এর দায় কোম্পানি অ্যাসেট বা মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। এখন এতে আদালত ঠিক কী করবেন? আদালত এই আবেদনে সন্তুষ্টি থাকলে এবার আদালত কোনো এসেট নির্ণয় ও মূল্যায়ন কোম্পানিকে ঐ ওষুধ কোম্পানির খরচে নিয়োগ দিয়ে ঐ দাবির যথার্থতা যাচাই করবেন। যদি ওই নির্ণয় কোম্পানির রিপোর্টও মালিকদের আবেদনের সাথে মিলে যায় তখন সাধারণত আদালত রায় দেন যে, পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানির যতটুকু সম্পদ বর্তমানে আছে সেই অনুপাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের অর্থ কম করে দিয়ে যেন সব দায় মিটিয়ে দেইয়া হয়। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ দানের ব্যাপারটা অসীম না থাকতে দিয়ে সম্পদ যা আছে সে অনুসারি সীমিত বা আনুপাতিক করে দেয়া হয় এতে। এরপর আদালত ঐ ক্ষতিপূরণ ভাগ করে দেয়া সাপেক্ষে ঐ ওষুধ কোম্পানিকে দেউলিয়া  ও দায় পরিশোধের পরে বিলুপ্ত ঘোষণা করে দিতে পারে। তাই সারকথায় কোন কোম্পানি তার বিভিন্ন ধরনের পাওনাদারদের দাবি যদি মেটাতে ব্যর্থ হয়, সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে সে নিজেকে আদালতের কাছে দেউলিয়া প্রমাণ করিয়ে আদালতের মুখ দিয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়, যাতে পাওনাদার থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।
    ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত হাউজিং ডেভেলপমেন্টের ব্যবসায়ী। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ২০১৬ সালের এক ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট বলছে, তিনি কমপক্ষে ১১ বার এমন দেউলিয়া ঘোষণা করিয়েছেন নিজেকে।
    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো কোম্পানির মূল মালিকের বহু স্বপ্নের বাস্তবতা হয়ে থাকে তাঁর নিজের ঐ কোম্পানি। ফলে কোম্পানিকে বাজারে দেউলিয়া হয়ে যেতে দেখলে সেটা কারো কারো বেলায় এক মানসিক আঘাত হয়ে হাজির হতেও পারে। একারণে দেখা যায়, মালিক আর নুন্যতম স্বাভাবিক মানুষ নাই, মানসিক বিকারগ্রস্থ ব্যক্তি হয়ে গেছেন। এতে হয়ত দেখা যায় সামাজিক সাধারণ মূল্যবোধ দ্বারা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বা সামাজিক দায়বোধ বা জবাবদিহিতা ইতাদির প্রতি আর তাঁর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। আসলে সম্ভাব্য এমনই মানসিক অসুস্থতায় পৌঁছেছেন ট্রাম্প। এদের মনোবিকার হয় এমন যে এখন তো তার কোম্পানিটাই আর নাই। কাজেই তিনি আর এখন সমাজের মুল্যবোধ মেনে কী করবেন?  ফলে সবকিছুই মিথ্যা এমন হতাশা ও নৈরাশ্যের জগতে চলে যান তিনি। এর ফলে ঐ অবস্থায় নিজেকে সুস্থভাবে পরিচালিত করার মত অবস্থায় ঐ মালিক আর থাকেন না। এই  অস্বাভাবিকতা যেকোনো মাত্রার মানসিক স্থিতিশীলতা, অস্থিরতা হয়ে হাজির হতে পারে।
    এখন এমন অবস্থায় আরও বাড়তি দিকটা হল,  মানসিক-অসুস্থ মানুষ নিজের সমাজ, পরিবারে থাকলে সেটা এক জিনিস; কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয়-সরকারি পদ, তিনি প্রধান নির্বাহী, প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন? সেটা অবশ্যই মারাত্মক। কারণ সেটা তো সারা দেশের মানুষের প্রতিদিনের স্বার্থের ব্যাপার। তাই নির্বাহী পদে নমিনেশন পেপার পেশ করার আগেই শর্ত হিসেবে তার মানসিক স্থিরতা (মেডিক্যাল স্টান্ডার্ড মতে) পরীক্ষা করে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনা মানে, সম্ভবত শত কোটি নাগরিক ভাগ্য নিয়ে যাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন দেউলিয়া ব্যবসায়ীর মানসিক অস্থিরতার রিস্ক ঐ দেশের জনগণ নিতে পারে না।
    ঠিক এই অবস্থাটা আজ আমেরিকান পাবলিক অনুধাবন করছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল গত ৬ জানুয়ারি?

    WASHINGTON, DC – JANUARY 06: Thousands of Donald Trump supporters storm the United States Capitol building following a “Stop the Steal” rally on January 06, 2021 in Washington, DC. The protesters stormed the historic building, breaking windows and clashing with police. Trump supporters had gathered in the nation’s capital today to protest the ratification of President-elect Joe Biden’s Electoral College victory over President Trump in the 2020 election. (Photo by Spencer Platt/Getty Images)

    কী ছিল গত ৬ জানুয়ারি?
    আমেরিকার কনস্টিটিউশনের বহু কিছু দু’রকম মানে হয়ে যেতে পারে এমন বাক্য যতটা সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে রচনা করার উপর জোর দিয়ে রচিত হয়েছে। যেমন নির্বাচন কবে হবে, সেটাও বলা থাকে ওমুক বছরের ওমুক মাসের প্রথম মঙ্গলবারে – এভাবে। অর্থাৎ সব কিছুই আগাম ও ফিক্সড। রাষ্ট্রের কোন নির্বাহির বিবেচনা মতে নির্বাচনের দিন ঠিক করার সুযোগ রাখাই হয় নাই।  সবার বিবেচনাবোধ এক বা সমান হয়না; মানুষে মানুষের মধ্যে এনিয়ে ফারাক হতে পারে; তাই কথা এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে তা  হওয়ার সুযোগই রাখা হয়নি। এভাবেই গত বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ৩ নভেম্বর আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে  আবার নির্বাচনের পরে কত দিনের মধ্যে রাজ্যগুলোর ফলাফল তারা কে কোথায় পৌঁছে দেবেন তাও বলে রাখা আছে। এই পদ্ধতিতে এবং আনুষ্ঠনিকতার দিক থেকে এক গুরুত্বের দিন হল ৬ জানুয়ারি। কারণ, ঐদিন আমেরিকার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেস বা সংসদের উভয়কক্ষ এক যৌথ অধিবেশনে মিলিত হবে। আমেরিকায় আমাদের সংসদের মত আছে ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং আরেক দ্বিতীয় কক্ষ আছে ‘সিনেট’। ঐদিন এরা উভয়েই ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিল জেলায় অবস্থিত প্রতিনিধি পরিষদের নির্ধারিত হলঘরে একসাথে অধিবেশনে বসবেন। আর ঐ যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করবেন রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার পাশে বসবেন হাউজ স্পিকার। এই হিসাব মতে,  ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ৬ জানুয়ারি সভাপতির আসন নিয়েছিলেন। আর সাথে পাশে বসেছিলেন পরপর চারবারের ও এবারেরও স্পিকার (ডেমোক্র্যাট) ন্যান্সি পেলোসি [Nancy Pelosi ]।
    ওদিকে নির্বাচনের ফলাফল কিভাবে চূড়ান্ত হবে কে করবেন, আর তাতে বিতর্ক বা আপত্তি থাকলে তা কী করে নিষ্পত্তি হবে এরও সবই আগাম বলে দেয়া আছে। প্রত্যেক রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের কাজ ও পরিচালনা সেখানেই শেষ করা হয়। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বা অফিস আমেরিকায় রাখা হয়নি। তাই ৫০ রাজ্যের আমেরিকার প্রত্যেক রাজ্যে একজন সেক্রেটারি থাকেন যিনি ঐ স্টেটের (সরকারের নয়) ‘সেক্রেটারি অব স্টেট’; আর যার প্রধান কাজ হল তিনি প্রধান নির্বাচন অফিশিয়াল এবং এটা নির্বাচিত একটা পদ; তিনিই ভোটের ফলাফল চূড়ান্ত করেন, কারও আপত্তি থাকলে তাও নিষ্পত্তি করেন। আপত্তিকারী এতে সন্তুষ্ট না হলে তিনি স্থানীয় জেলা জজ থেকে শুরু করে ফেডারেল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারেন। আর এরপরে সেই চুড়ান্ত ফলাফল তিনি ঐ যৌথ অধিবেশন কক্ষের সভাপতির (রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট) অফিসে পৌছানোর ব্যবস্থা করেন।

    ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনের আগে থেকে ‘বড় পাগলামোতেই’ আছেন। একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এটা কোন ভাল পরিচায়ক নয় অবশ্যই। তিনি নির্বাচনের ফলাফল নিজের বিপক্ষে হলে মেনে নেবেন না, ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না, ইত্যাদি নানাকথা আউড়ে চলেছিলেন নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই। এদিকে বাস্তবে ৩ নভেম্বরের দু’দিন পর থেকেই পরিষ্কার হতে থাকে নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন। আর ততই ট্রাম্পের পালটা পরিকল্পনার কথাগুলো কানাঘুষা প্রচার হতে থাকে। সবখানেই ট্রাম্প বা তার পক্ষের এজেন্টদের কমন অভিযোগ ছিল – তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। এরই একপর্যায়ে দেখা যায় এসব ফলাফল বিতর্কগুলো সাথে কোন প্রমাণ না দিয়েই তাঁরা কেবল অভিযোগ মাত্র করে গিয়েছেন। তাই সে মামলাগুলো জেলা জজের আদালতেই শেষ হয়ে যায়, মামলা ডিসমিস। ফলে প্রমাণ অভাবে কোন অভিযোগ কখনোই কোন জেলা জজের আদালতে উপরে যেতে পারেনি। কারণ সবখানেই ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল – তাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। অথচ মূলকথা, সব আদালতেই যা হাজির ছিল না তা হল, সাথে পেশ করা তথ্য প্রমাণ। অন্তত মামলা শুরু করার মত কিছু ন্যূনতম প্রমাণও ছিল না। ফলে  প্রায় সব আদালতই ন্যূনতম প্রমাণ দেখাতে না পারার কারণে মামলা ডিসমিস করে দিয়েছে। শেষে এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই মিডিয়াতে নিজেই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন যে, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তার মামলাগুলো দায়ের করা বা পৌঁছানোর মত অবস্থায় তিনি নাই বা মেরিট এগুলোর নেই। কিন্তু এরপরেও সবসময় তিনি শেষ কথা হিসেবে মুখস্তের মত বলে চলেন যে, তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।

    তাই এসবের বিপরীতে, ট্রাম্পের এক বড় পরিকল্পনার দিন ছিল গত ৬ জানুয়ারি। কিন্তু ৬ জানুয়ারি আমেরিকার নির্বাচনি ফলাফলের দিক থেকে অবশ্যই একটি আনুষ্ঠানিকতার পর্ব কেবল। বিশেষ করে, আমেরিকায় কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন রাখা হয়নি বলে এর বিকল্প কিছু বলে যেন রাজ্য পর্যায়ে চূড়ান্ত ফলাফলগুলোর যোগফল চূড়ান্তভাবে কে ঘোষণা করবেন এরই এক আনুষ্ঠানিকতার দিন কংগ্রেসে ঐ যৌথ অধিবেশন এটা। তাই পরিষ্কার করেই কনষ্টিটিউশনে  বলা আছে যে, যৌথসভার সভাপতি ভাইস প্রেসিডেন্টের ঐদিনের কাজ কী কী। মূলত তা দুটো। রাজ্যের পাঠানো ফলাফলের বাক্স যা তার অফিসে পাঠানো হয়েছিল তা উন্মোচন করা এবং তা গণনার জন্য নির্ধারিত স্টাফদের নির্দেশ দেয়া; আর তা হবে যৌথসভার (সংসদ ও সিনেটের) সদস্যদের সম্মুখে। সেখানে ভোট গণনার কাজ শেষ হলে উপস্থিত যৌথ সদস্যদের প্রস্তাব-ভোটে চূড়ান্ত ফলাফল যা সেখানে পাওয়া যাবে তা ঘোষণা করা হবে।

    ট্রাম্পের কনষ্টিটিউশন পাঠঃ
    এখন ট্রাম্পের বা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উপদেষ্টাদের দেখা যায়, উটকো কিছু ব্যাখ্যা তারা হাজির করে গেছে। আর দেউলিয়া ব্যবসায়ী মনের ট্রাম্প নিজে বুদ্ধি বলে তাঁর উপদেষ্টাদের এসব আজগুবি পাঠ বিশ্বাস করেছিলেন।  যেমন ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে সুনির্দিষ্ট কিছু করণীয় ও নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা তিনি প্রকাশ্যেও বলেছেন।
    এখন কথা হল, ট্রাম্প কি যা তার খুশি তা করতে পেন্সকে নির্দেশ দিতে পারেন? নাকি যা যা করার এখতিয়ার পেন্সকে কনস্টিটিউশন দিয়েছে কেবল সেগুলোর মধ্যে থাকা সাপেক্ষে নির্দেশই দিতে পারেন? এখানে ট্রাম্পের ধারণা তিনি যেকোন কিছু নির্দেশ দিতে পারেন। অথচ তা তিনি পারেনই না। তবু তিনি পেন্সকে (নির্দেশ) বলেছিলেন, তিনি যেন যোগফল পাওয়ার পর ঘোষণা করেন, এই ফলাফল তিনি মানছেন না বা অনুমোদন করছেন না। কিন্তু কার্যত সময়ে দেখা গেল মাইক পেন্স ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে বসেছেন। অধিবেশন শুরুর আগে তিনি এক বিবৃতি পাঠ করেন।

    “It is my considered judgment that my oath to support and defend the Constitution constrains me from claiming unilateral authority to determine which electoral votes should be counted and which should not,” Pence said in a letter to Congress.  বাংলা করে বললে, “আমার বিচার বিবেচনায়, আমার শপথের সময় দেয়া কনষ্টিটিউশন রক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোন ইলেকটোরাল কাউন্ট হবে কোনটা হবে না এই সিদ্ধান্ত নিবার একক কোন কর্তৃত্ব আমাকে দেয় নাই”।

    অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে কাজ করতে পারছেন না, এটাই তিনি জানিয়ে দেন।  আর এখান থেকে শুরু হয় ট্রাম্প-পেন্স এর ডিপারেচার।  অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, মানসিক অসুস্থতা কেবল ট্রাম্পের, এখনো তার ভাইস প্রেসিডেন্টকে এটা তেমন স্পর্শ করেনি। তাই যৌথ অধিবেশন শুরুর মুহূর্তে পেন্স এক লিখিত ঘোষণায় জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের অনুরোধ রাখতে পারছেন না। কেবল কনস্টিটিউশন যা তাকে করার এখতিয়ার দিয়েছে এর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এবার হতাশ হয়ে এক টুইট করেছিলেন, “পেন্স সাহসী নন। তার সাহসের অভাব আছে, তাই তিনি পারলেন না” [“didn’t have the courage to do what should have been done.”]। অথচ ফলাফল নিয়ে আপত্তি তুলবার জায়গা তো ঐ অধিবেশনই নয়। সেটার জায়গা যার যার রাজ্য নির্বাচন অফিসে বা আদালতে।
    ইতোমধ্যে ঐ অধিবেশকে নিয়ে অনেক নাটকীয়তা করা হয়। সবশেষে ওই যৌথসভা থেকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে বলা হয়, বাইডেন বিজয়ী বলে তারা ‘সার্টিফাই’ করছেন [Biden’s election victory certified after chaos at US Capitol leaves four people dead]। তবে এর আগে অনেক নাটকীয়তা হয়েছে। ট্রাম্প তার সমর্থকদের দিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামার ব্যবস্থা করেছিলেন সংসদের ভেতরে মূল হলসহ বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙচুর করা হয়েছিল। (যদিও পরে পুলিশ জানাচ্ছে যে তারা হামলাকারিদের দখলে থাকা অস্ত্র ও বোমার এক বিরাট মজুদ আটক করেছে। ) অবশ্য এর আগেই পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডরা সব নির্বাচিত সদস্যকে প্রত্যেকের মুখে একেবারে গ্যাস মাস্ক পরিয়ে সংসদ বিল্ডিংয়ের ভেতরেই গোপন কুঠিতে তাদের নিরাপদ গোপন স্থানে রেখে এসেছিলেন। এদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ট্রাম্প অসুস্থ বা তেমন কিছু হলেই তঁকেই  প্রেসিডেন্ট পদে বসতে হতে পারে, তাই প্রেসিডেন্টের মাপের এই নিরাপত্তা অবস্থা। এছাড়া ঐ সংসদকেই কার্যত আমেরিকান রাষ্ট্রের অন্যতম বাস্তব রাষ্ট্ররূপ মনে করা হয়। তাই মূলত পুলিশের আধিপত্যেই ওই দিনটা দাঙ্গাহাঙ্গামাকারিদেরসহ সংসদে সবার কেটেছে। পুলিশ আধিপত্য করে গেছে দাঙ্গাবাজদের পরাস্ত ও নিয়ন্ত্রণ করেছে।

    তবে মিডিয়াসহ ট্রাম্পের মধ্যে যে ধারণাটা কাজ করতে দেখা গেছে তা হল,  যেন ঐ যৌথ অধিবেশন চাইলেই তাঁদের ভোটাভুটিতেই বা অধিবেশনের সভাপতি পেন্স চাইলেই যাখুশি ফলাফল যেমন ইচ্ছা ঘোষণা করতে পারেন। এরা একটা এমন আশা নিয়ে বসে থেকেছেন, রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু বটমঅব দা  ফ্যাক্টস হল, একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাবলিক সেখানে সরাসরি ভোট দেয়ার পর সেই ফলাফলের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু ঘোষণা করার ক্ষমতা কি পরে ঐ যৌথ অধিবেশনের কারো থাকতে পারে? কনস্টিটিউশন কি এমন এখতিয়ার পেন্স বা ওই হাউজকে চাইলেও দিতে পারে? এর সোজা জবাব হল, দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশনই এটা পারেই না। এমনকি আমেরিকান কনস্টিটিউশন না পড়েই বলা যায়, এটা তাঁদের কনস্টিটিউশনেও থাকতে পারে না। কারণ সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে জনগণের ম্যান্ডেটের বিরোধিতা; ওই ম্যান্ডেটকে উল্টে দিতে পারে কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টিকে এমন এখতিয়ার কনস্টিটিউশন দিতেই পারে না।  পাবলিকের দেয়া ভোট-ম্যান্ডেট এটা সুপ্রীম নাকি ঐ যৌথ অধিবেশন বা ওর সদস্যরা? অবশ্যই পাবলিকের ম্যান্ডেটই চুড়ান্ত। কারণ পাবলিকের ভোটের এই ম্যান্ডেট সুপ্রিম, এর ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দেয়া যায়, কারেক্ট করা যায় এমন বিন্ধুমাত্র ক্ষমতা ঐ যৌথ অধিবেশনকে বা কাউকেই দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশন দিতেই পারে না। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দিবার ক্ষমতা হিসাবে মাইক পেন্স কেউ না? উনি নাথিং! তিনি কেউ নন, তিনি এমন এক্তিয়ার বিহীনও।

    এখন আবার ফিরেএকটা সামআপ হিসাবে বলা যায়, আসলে আমেরিকার এই সমস্যাটা কি ব্যক্তি- ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা-জাত? না তা অবশ্যই নয়। সমস্যাটা মূলত রাজনৈতিক। অর্থাৎ পলিটিকো-অর্থনৈতিক। আর সেটা জাগিয়ে তুলেছে চীনের অর্থনৈতিক  উত্থান, এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা। চীন নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক  হবু নেতা হতে চলেছে, আমেরিকাকে সরিয়ে। ফলে এর আঘাতে আমেরিকান সমাজ-রাজনীতি টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডামাথায় এর প্রতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেরাই এলোমেলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে মূলত ভুল অনুমান, ভুল পাঠ এর কারণে। তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট সবসময়ই এরকম হাজারো রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরিও করে থাকে। একমাত্র পোক্ত নেতৃত্ব এটা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ, যা হবেই তাকে যতটা কমক্ষতিতে পারে এভাবে স্বাগত জানিয়ে এই রূপান্তরকে কম অস্থিরতায় পার করে দিতে পারে – এটাই হতে হবে তাঁদের মূলসুত্র।

    ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টঃ
    এখন আগামি সোমবার থেকে নতুন ইস্যু ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট। ডেমোক্রাটেরা এই প্রস্তাব তুলতে যাচ্ছে।  অনেকে আশা করছেন এখানে বিভক্ত রিপাবলিকানদের অনেকে তাকে সাপোর্ট করবে। এটা কিছু একটা ফলাফল আসবে হয়ত তা খুব তাতপর্যপুর্ণ কিছু নয় কারণ আর মাত্র নয় দিন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট আছেন।  তাহলে এই ইমপিচমেনট কেন? সেটার আসল কারণ ট্রাম্পকে চাপে রাখা যাতে তিনি “ইরানের উপর হামলার নির্দেশ” জাতীয় কিছু মানসিক ভারসাম্যহীন কাজ না করে বসেন তা থেকে বিরত বা চাপে রাখতে। যেমন স্পিকার ন্যান্সি ইতোমধ্যে আমেরিকান আর্মির টপ কয়েকজন জেনারেলের সাথে কথা বলে তার উদ্বেগ জানিয়েছেন, মতবিনিময় করেছেন এসব নিয়ে।

    তাহলে দিনশেষে মানে আগামিতে কী হতে যাচ্ছে?  এককথায় বললে, চীনের উত্থানের চাপের মুখে আমেরিকার নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা গত ৬ জানুয়ারির ঘটনায় বেশ কয়েকধাপ নিচে নামিয়ে দিবে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেল  যে আসন্ন ‘আমেরিকান সঙ্কট” মোকাবলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব সকলের মধ্যে সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত নাই। তাঁদের মারাত্মকভাবে বিভক্তিরই প্রকাশ গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী। এম্নকি রিপাবলিকান দলই পুরা বিভক্ত।  সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত থাকত তাহলে ট্রাম্পের জাতিবাদ যার আরেক নাম সাদা সুপ্রিমিস্ট – এই চিন্তা মাইনর কিছু হয়ে থাকত।  এটা হল সেই লক্ষণ যে আমেরিকার বিভক্তি সহসাই মিটছে না।  অর্থাৎ আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরো দুর্বলই হচ্ছে। তবে তা হয়ত তাতক্ষণিক নয়।, কিন্তু ধীরে ধীরে। যদিও বাইডেনের প্রথম বছরের মধ্যেই আমেরিকানেরা ট্রাম্পের বিরোধী হয়ে যাবে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করবে ট্রাম্প তাঁদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। যদিও সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারা ভাল রকমই থেকে যাবে! ঠিক যেমন ট্রাম্প তো আগেই জানতেন তিনি ছয় তারিখেই হেরে যাবেন সব শেষ হয়ে যাবে। তবু তিনি এই নষ্টামিটা করলেন কেন?  কারণ সাদা সুপ্রিমিস্টরা মনে করে রিপাবলিকান পার্টির উপর তারা পুরা কব্জা কাজ (এখন সব রিপাবলিকান সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারার নয়) করতে হলে, তাদেরটাই প্রধান ধারা হিসাবে ছেয়ে বসতে চাইলে সেকাজের পক্ষে বিনিয়োগ এটা।  যদিও যৌথ কংগ্রেস অধিবেশনে দাঙ্গা হাঙ্গামাটা একটা নৈরাজ্যমূলক কাজ হিসাবেই দেশে-বিদেশে দেখা শুরু হয়ে গেছে। ফলে তাঁদের উদ্দেশ্য একেবারেই কাজ করবে না। উলটা তারাই সমাজে কোনঠাসা হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি! বিশেষত ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র ট্রাম্প ও সাদা সুপ্রিমিস্টদের নিন্দা করেছে, এমনকী ভারতের মোদীও দিনশেষ দেখে এই নিন্দাকারিদের দলে!

    নির্বোধের খুশি!

    ভারতীয় পতাকা দোলানোর গর্বঃ
    সাদা সুপ্রিমিস্ট যারা হয় তারা তো নয়ই কিন্তু তাঁদের নেতা-পরিচালকেরা সুস্থ মাথায় চিন্তা করতে পারে এর অভাব সবসময় লক্ষ্য করা যায়। অন্য ভাষায় বললে নুন্যতম যুক্তিবুদ্ধির সামঞ্জস্যপুর্ণ “বয়ান-ভাষ্য” কখনই তাঁদের থাকে না, দাঁড় করাতে পারে না। অথচ বয়ান ছাড়া কেউ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হতে পারবে না। যেমন নিউজিল্যান্ডের ৫০ জনের মত মুসলমান হত্যার এক সাদা সুপ্রিমিস্ট ব্রেনটন (Brenton Harrison Tarrant) এর কান্ডটা আমাদের নিশ্চয় মনে আছে। ওর বয়ান হল, নিউজিল্যান্ডে মুসলমানেরা বাইরের লোক, তারা সাদা নয় ইত্যাদি, অতএব হত্যা……। আচ্ছা সে নিজেও কী নিউজিল্যান্ডে “বাইরের লোক” নয়।  কোন সাদা চামড়ার কেউ নিউজ্যল্যান্ডের আদি লোক নয়।  তাঁদের পুর্বপুরুষেরা সকলেই ইউরোপের আর মূলত বৃটেনের।  তাও একেবারেই গরীব, সহায় সম্পদহীন খেটে খাওয়া, জেল খাটা অংশ। কারণ মূল মিডল ও লোয়ার মিডল ক্লাস অংশটা আগেই আমেরিকা চলে গেছিল।  তাহলে এই বিদেশি, বাইরের লোক, দখলদার এসব শব্দের ভিত্তি কৈ?

    ক্যাপিটোল হিলে ৬ জানুয়ারির আয়োজকই ছিল সাদা সুপ্রিমিস্টরা। অথচ সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছে এক ভারতীয় অরিজিন বাসিন্দা।কলকাতার আনন্দবাজারের অনুসন্ধানি দাবি  যে তিনি ভিনসেন্ট জেভিয়ার। লিখেছে, “কট্টর ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা বছর চুয়ান্নর ভিনসেন্ট যে তাঁর কৃতকর্মে অনুতপ্ত নন, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি”।  এছাড়াও লিখেছে, “কাল সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত  ভিনসেন্ট জেভিয়ার নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বললেন, ‘‘ভারতকে অসম্মান করাটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি আসলে আমেরিকাতেও যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আছে, সেটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। দেখাতে চেয়েছিলাম, রিপাবলিকান পার্টি একেবারেই বর্ণবিদ্বেষী নয়।’’
    এসব কথা বলে না ঐ কথিত ভিনসেন্ট না আনন্দবাজার নিজেদের মনভাব অভিপ্রায় ঢাকতে পেরেছে। ৬ জানুয়ারি নিয়ে  আনন্দবাজার দুটা রিপোর্ট করেছে। কিন্তু দুটাতেই সহানুভুতির জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখা।  কেন, কীসে এই সহানুভুতি?  ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিবিদের এটিচুড হল, ট্রাম্পই তাঁদের ফেবারেট লোক ছিল, বাইডেন নয়। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন ভারতকে ছেড়াবেড়া করে দিবেন। তাঁদের মোদীসহ হিন্দুত্ববাদ দুনিয়াজুড়েই নিন্দার বিষয় হয়ে উঠবে তাতে। কাজেই ট্রাম্পই তাঁদের পছন্দের নেতা যে ভারতের মুসলমানকে পিটিয়ে মারলে বা কাশ্মীরে আগুন ছড়িয়ে দিলেও মোদীকে কিছুই বলবেন না। অতএব ৬ জানুয়ারি যদি লাইগা যায়, চাইকি ট্রাম্প যদি আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে আবার ফিরে আসতে পারেন তাহলে তো লাভই লাভ! এই জায়গায় এসে কথিত ভিনসেন্ট আর আনন্দবাজার দুজনের অবস্থান এক জায়গায়। কিন্তু সেজন্য ভারতীয় পতাকা বইবার দরকার কী?
    এইখানে এসে ভিনসেন্ট ধরা খেয়ে গিয়েছেন। তিনি মূলত হিন্দুত্ববাদের লোক এবং জাতিবাদী তাই আমেরিকান ভোটার হয়েও ভারতীয় পতাকা ছাড়া হাটেন না।  তিনি বাদামি, হোয়াইট নন।  তাই তিনিই কিন্তু সাদা সুপ্রিমিস্টদের একদম আসল টার্গেট। কিন্তু মোদী-ট্রাম্প প্রেম তাঁকে  ঐ জমায়েতে নিয়ে গিয়েছে। আবার সাদা সুপ্রিমিস্টদের জমায়েতে গিয়ে তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, সাদা সুপ্রিমিস্টদের ভিতরে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য খুজেছেন! কি তামসা!তারা বর্ণবাদী নয় বলে সাফাই দিয়েছেন।  মানুষের আসলেই বড় অদ্ভুত প্রাণী!  আর ওদিকে আনন্দবাজার আরো তামাশার। তাঁদের হেডলাইন হল, “তাণ্ডবে তেরঙ্গা উড়িয়েও অবিচল“। মানে হোক না “তান্ডবে” কিন্তু তেরঙ্গা ভারতীয় পতাকা তো তুলেছে! তাই এটা নাকি গৌরবের!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৯ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “আগে প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করুন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

    আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

    গৌতম দাস

    ২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

    http://wp.me/p1sCvy-2hc

     

    সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

    ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

    এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

    গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

    [জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

    কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
    সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

    যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

    তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

    অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

    পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

    কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

    এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

    ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

    ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

    আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

    একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

    ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

    ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

    চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

    গৌতম দাস

    ০১ আগষ্ট ২০১৭

    http://wp.me/p1sCvy-2gF

     

    ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

    ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

    তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

    যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

    অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

    তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

    চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

    এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

    আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

    ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

    কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

    নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

    ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

    এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

    মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

    ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

    ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

    চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

    এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

    আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

    চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

    এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

    ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

    পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

    গৌতম দাস

    ১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

    http://wp.me/p1sCvy-2g5

     

    ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

    সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

    কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

    কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

    এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

    সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

    তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

    একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

    দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

    তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
    আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

    চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

    সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

    যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

    কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

    পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
    তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
    ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

    এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

    এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

    এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

    খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

    এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

     

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]