Tag: আমেরিকা

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোনদিকে?

    গৌতম দাস

    ১১ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-42k

     

        The Indian-American underachiever

    ইউক্রেন ইস্যুতে পরাজয়ের পরে বাইডেন প্রশাসনের শেষ কামড় যেন শুরু হয়েছে। সে্টা অনুমান করেই আগে লিখেছিলাম, বাইডেন এখন দক্ষিণ এশিয়ায় চাপ বাড়াবেন। তাকে ফল দেখাতে হবেই! বাংলাদেশ এই চাপের মধ্যে পড়বে। তা কেবল বাংলাদেশ নয়, আমাদের এই সারা অঞ্চলে প্রবলভাবে এই চাপের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আসন্ন আরেক প্রধান টার্গেট এখন ভারত। “ভারতকে পক্ষে আনতেই হবে”, এরই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে আমেরিকা। কিন্তু এই চাপ কি কাজ করবে, না ভারতই হাতছুট হয়ে যাবে?

    দুই সপ্তাহ আগে বাইডেনের ইউরোপ সফরের পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বাইডেন হেরে গেছেন। ইউরোপ বাইডেনের কথা মেনে রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারছে না। বাইডেন বিকল্প দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা নাকি ইউরোপকে তেল-গ্যাস জ্বালানিদাতা হতে চায়। এতে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া আগেই বিপুল উচ্ছ্বাসে মেতে এটাকে কাভারেজ দিলেও ইউরোপ মানে জার্মান-ফান্স-নেদারল্যান্ডসের ইউরোপ আনমুভড [unmoved] থেকে যায়। মানে, নিজেদের পুরনো অবস্থান যে, রাশিয়ান গ্যাসই তাদের লাগবে, সে অবস্থান বহাল থেকে যায়। অন্তত ২০২৪ সাল পর্যন্ত নাকি তাদের এমন থাকতেই হবে; না হলে তারা বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়বে, এই ছিল তাদের বক্তব্য ও অবস্থান।
    তাহলে, ইউরোপ বাইডেনের কথায় আনমুভড বা “মাতে নাই” পরিস্থিতিতে থেকে যায়। এটাতেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইউক্রেন ইস্যুতে বাইডেন হেরে গেলেন। আর এতে প্রথম ধাক্কাটা হল বাইডেন ইউরোপকে সাথে ধরে রাখতে ফেল করলেন।

    অবরোধের স্ববিরোধঃ
    কেন এমন হল, বাইডেন ইউরোপে কেন হারলেন? এর সোজা জবাব হল, বাইডেনের আমেরিকা তার চাপ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াবাড়িভাবে ব্যবহার করেছেন। কী সেটা? বাইডেন-ই এই ইউক্রেনের যুদ্ধকে তাঁর আবিস্কার “অবরোধ আর মানবাধিকার” এদুই অস্ত্র দিয়ে লড়বার একক পরিকল্পক। তিনি নিজে রাশিয়ার ওপর এক গাদা সিরিজ অবরোধ আরোপ তো করেছেনই। সাথে ইউরোপকেও চাপ দিয়ে বাধ্য করেছেন একইভাবে অবরোধ দিতে। এটাই বাড়াবাড়ি। তাতে এবারই প্রথম ইউরোপ কোনো দেশের ওপর এমন বেপরোয়া হয়ে রেকর্ড পরিমাণ অগুণতি অবরোধ আরোপ করেছে। এ ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও আত্মঘাতী কাজটাও তারা করে ফেলেছে, জাস্ট বাইডেনকে খুশি করতে হবে এই বিবেচনায়। যেন না জানি, তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে না আবার বাইডেন মহাশয় ইউরোপের ওপর অসন্তুষ্ট ও ‘সংহতিতে’ নেই মনে করে বসেন কি না যেন এই ছিল ইউরোপের ভয়। কিন্তু ইউরোপেরও কপাল খারাপ, যেখানে বাঘের ভয় ঠিক সেখানেই যেন গাড়ি খারাপ হওয়ার দশা!

    বাইডেনের চাপে তারা খেয়ালই করেননি যে, রাশিয়ার ওপর দিয়ে তাদের ইউরো মুদ্রার অবরোধে আরোপের অর্থ আসলে কার্যত ইউরোপের নিজের ওপরই অবরোধ দেয়া হয়েছে। কেন?
    এটা শুনতে অনেকের মজা লাগতে পারে যে, ইউরো মুদ্রা এখন মহা ক্ষমতাধর হয়ে গেছে যে, সে রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে তাকে কুপোকাত করে দিতে পারে। তাহলে নিশ্চয় ইউরোপের অর্থনীতি অনেক ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে! তাই কি? একটু দাঁড়ান, ধীরে চলেন প্লিজ! কেন?

    ইউরো অবরোধের সোজা মানে হল, আপনি পুতিনের রাশিয়াকে বলছেন যে, এখন থেকে আর আমার ইউরো মুদ্রায় কোনো পণ্য আর বেচা এবং কেনা কোনোটাই করতে পারবেন না। অর্থাৎ ইউরো যাদের মুদ্রা এই ইউরো জোনের বাইরের রাশিয়াসহ সব দেশ তো বটেই এমনকি জোনের ভিতরের সদস্য যেমন জার্মানি সেও রাশিয়ার কাছ থেকে ইউরোতে গ্যাস কিনতে পারবে না। এটাই হয়ে গেছিল এর অর্থ।  যেখানে জার্মান অর্থনীতি্র (চাহিদা ওঠানামা আছে বলে), ৪০-৫৫% রাশিয়ান গ্যাসের ওপর  নির্ভরশীল। অথচ জার্মানিও রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করতে পারবে না। অবরোধের মানে হয়ে গেছে তাই। কেন?

    অবরোধের শুরুতে একটা ফাঁকি দিয়েছিল জার্মানির মত ইইউ এর ইউরোপ। তারা বুদ্ধিমান হয়েছে মনে করে কার্যত রাশিয়ান গ্যাস কেনার ওপর অবরোধ অকার্যকর করে রেখেছিল। ভেবেছিল, এভাবে রাশিয়ার ওপর ইউরো অবরোধ দিয়েও রাশিয়ান গ্যাস তারা কিনে-চলতে পারবে। কিন্তু না!

    খোদ পুতিন এতে পানি ঢেলে দিয়েছেন। পুতিন ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যারা আর বন্ধুসুলভ দেশ নয় (মানে যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ দিয়েছে) তারা এখন থেকে রাশিয়ান কোনো কিছু কিনতে চাইলে রাশিয়ার নিজের মুদ্রা রুবলে [ruble] এর মূল্য পরিশোধ করবে। আর এতেই মহাবিপদে পড়ে গেছে ইউরোপ; বিশেষত যারা রাশিয়ান গ্যাসের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাৎক্ষণিক এদেরকে জ্বালানি রেশনিং শুরু করতে হয়েছে। কারণ ইউরোপে বসবাসে নিজ বাস করার ঘর গরম রাখার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে সেই ইউরোপ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়। তাতে আপনি গরিব-ধনী যাই হন। আর এই সমস্যা মোকাবেলার তাদের সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হল, বিপুল জ্বালানি ব্যবহার করে মিউনিসিপালিটির গরম পানির প্রবাহ বাসিন্দাদের বাসগৃহে পৌছানো। এতে প্রত্যেকটা বাসার প্রত্যেক বসবাসের রুমের ভিতরের দেয়াল বেষ্টন করে থাকে এই গরম পানির লাইন। আর তাতেই রুম বসবাসযোগ্য থাকে। তাই গ্যাস ইউরোপের জীবনযাপনে খুবই এসেনশিয়াল। তাহলে এর মানে দাঁড়িয়েছে, যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে নিজেরা পরাশক্তির ভান ও সুখবোধ করছিল আজ সেই ইউরোপ নিজেরাই নিজেদের অস্ত্রের মুখে কাঁপছে!! নাকি হয়তো ঠাণ্ডায় কাঁপছে, আসলে সব একই কথা হয়ে গেছে! মানে নিজ অবরোধ নিজেরই বিরুদ্ধে চলে গেছে।

    এখন অনেকের মনে হতে পারে, রুবলে মূল্য পরিশোধের কথা বলে এটা পুতিনের প্রতিহিংসা। আমেরিকান ইউরোপে প্রপাগান্ডায় পুতিনের যে দানব ছবি এঁকে দিয়েছেন তাতে বেশির ভাগ মানুষ এটাই বিশ্বাস করবে হয়ত! কিন্তু না এটা ফ্যাক্টস নয়। কেন?

    ইউরোপ ভাবতে পারে যে,  তারা ইচ্ছা করলেই কেবল তাদের রাশিয়ান গ্যাস কেনার উপর তাদের অবরোধ অ-প্রযোজ্য করে রাখতে পারে। আর এমন এই ব্যতিক্রম বা বিশেষ ছাড় দিয়ে তারা তো পুতিনকেই ফেবার করছিল। যে পুতিনের গ্যাসটা অন্তত ইউরোপ কিনতেই থাকবে। ফলে বেচাবিক্রিহীন পুতিন-কে নিশ্চয় এটা ফেবার করাই হল!!  সরি,  এই অনুমানটা ডাহা ভুল। কারণ রাশিয়ান গ্যাসের বিনিময়ে ইউরোপ পুতিনের হাতে ইউরো ধরিয়ে যদি দেয়ও তবু এসব ইউরো আসলে অচল মুদ্রা। না, এটা অচল পয়সা বা ফেক নোট গছিয়ে দেয়া নয়। আসল ইউরো তারা দিলেও তা রাশিয়ার কাছে অচল নোটের মতোনই ঠেকেছিল। কেন? কারণ রাশিয়া ঐ ইউরোতে নিজের কোনো কিছু কেনার বেলায় দাম পরিশোধের মুদ্রা হিসাবে তা ব্যবহার করতে পারে না। কারণ, মূলত ইউরোপ তো রাশিয়ার ওপর ইউরো ব্যবহার করে কিছু কেনার ক্ষেত্রেও অবরোধ দিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ যেন হাতে একশ টাকার নোট আছে ঠিকই কিন্তু দোকানদার ওই নোট নিতে চাচ্ছে না। সোজা কথায়, রাশিয়ার হাতে পড়লেই যেকোন ইউরো অচল নোট হয়ে যাবে। তাই ইউরো নিয়ে রাশিয়ার কাউকে গ্যাস বিক্রি করার মানে হল তাকে মাগনা গ্যাস দেয়া হয়েছে। কারণ রাশিয়ার হাতে থাকা ইউরো বাজারে কেউ নিবে না। এ কারণেই ইউরোপসহ সবাইকে রুবলে দাম শোধ করে রাশিয়ান পণ্য কিনতে বলা – এটা পুতিনের কোনো প্রতিহিংসাই নয়। এটা আসলে ইউরোপের ইউরো অবরোধ আরোপের-ই স্ববিরোধিতা। তারা খেয়ালই করেনি যে, রাশিয়ান গ্যাস বিক্রির উপর অবরোধ আরোপে তাদের বেলায় ছাড় থাকলেও তাতে রাশিয়ার কোনো লাভই নেই; কারণ তা রাশিয়ার নিজের কোন কেনাকাটাতে  হাতে পাওয়া অই ইউর মুদ্রা ব্যবহারের কোন সুযোগই নাই। তাই।রাশিয়ার দিক থেকে ইউরোতে যেকোনো কেনাবেচার উপরেও কোনো ছাড় বলে বিবেচিত হবে না। হওয়ার সুযোগই নেই।

    দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশঃ
    আর এখান থেকেই দৃশ্যপটে ভারতের প্রবেশের সুযোগ খুলে যায়। রাশিয়ার উপর অবরোধ এখন বহুবিধ। আরোপিত  অবরোধ এখন আমেরিকা, ইউরোপ ছাড়াও আমেরিকার ধন কোয়াড সদস্য (কেবল ভারত ছাড়া) সবারই অবরোধ আরোপিত আছে। এমনিতেই একালে রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এক বড় উপায় হল তার মাটির নিচের সম্পদ বিক্রি করা। কাজেই এই সম্মিলিত অবরোধ রাশিয়ার উপরে যথেষ্ট ভারী প্রভাব এনেছে। আবার লক্ষণীয় ভারতের জনসংখ্যা ১৩৫ কোটি যার কাছাকাছি হল একমাত্র চীন। ফলে এমন বিশাল জনসংখ্যার ভারতে বিশাল জ্বালানি চাহিদা অনুমেয়। তাই পুতিনও ব্যারেল-প্রতি ৩৫ ডলার সমতুল্য ছাড় দেয়াতে [India Will Continue to Buy Oil From Russia, Sitharaman Says] এই সুযোগে সম্প্রতি ভারত ১৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনে নিয়েছে, রাশিয়া থেকে রুবলে। আর এতে স্বভাবতই এটা আরোপিত সব অবরোধকেই ফাঁকি দেয়া। অতএব আমেরিকার চোখে ভারত “বেয়াড়া এক দুষ্ট ছেলে’ হয়ে উঠেছে। তাই আমেরিকা ভারতকে প্রথমে বুঝিয়ে বলা, পরে কড়া কথা আর হালকা হুমকি দিতে দিতে গত এক মাস পার করে ফেলেছে। এখন এরপর আগামী পরশু ওয়াশিংটনে বসছে দু’পক্ষের এক ক্রুশিয়াল বৈঠকে। এই বৈঠকের আনুষ্ঠানিক নাম “U.S.-India 2+2 Ministerial meeting: গত চার বছর ধরে এদুই দেশ এমন বৈঠক করে আসছে। তাই এটা চতুর্থ বৈঠক।

     

    কিন্তু কেন ভারতের রাশিয়ান তেল কিনাতে আমেরিকা এতে এত বিপদ গুনছেঃ
    ভারত সস্তা পেয়ে কিছু রাশিয়ান তেল কিনে নেওয়াতে য়ামেরিকার কাছে কেন ব্যাপারটা সিরিয়াস আর তা ঠিক কতটা সিরিয়াস? এর উত্তর পাওয়া খুবই সহজ। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার দেশ হল চীন ১৪০ কোটির বেশি। আর এর পরের বড় জনসংখ্যার দেশ হল ভারত ১৪০ কোটির কম, প্রায় ১৩৮ কোটি। আর এরা দুই রাষ্ট্র যদি একসাথে রাশিয়ান তেল কিনে এবং রুবলে তাহলে এর অর্থ হবে দুনিয়ার মোত জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ ভাগ জনসংখ্যায় রাশিয়ান তেন কিনতে ফিরে গেল। অর্থাৎ এদের মিলিত জনসংখ্যা বা রাশিয়ান তেলের ভোক্তা হয়ে যাওয়া খুবই তাতপর্যপুর্ণ। রাশিয়ান মোট কাস্টমারের কাছাকাছি। অর্থাৎ আমেরিকান অবরোধের প্রভাব অকার্যকর হয়ে যাবেই। সবচেয়ে বড় কথা এতা কিন্তু চীন-ভারতের কোন আঁতাত নয়। বরং ২০১৪ সালে যখ প্রথম আমেরিকা রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ করেছিল এরই প্রতিক্রিয়ার চীন-রাশিয়া তেল কিনার চুক্তি হয়েছিল। চীনা ইউয়ান মুদ্রায় রাশিয়ান তেলের বিনিময়ে চীনা পণ্যের রাশিয়ার কিনে নেওয়া চালু তখন থেকে।   আর ভারত এখন রাশিয়ান তেল সস্তায় পেয়ে ছারতে চাচ্ছে না এমন কাস্টমার। কাজেই  এদুই বড় রাশিয়ান তেলের ক্রেতা বাইডেনের জন্য বিরাট হুমকি অবশ্যই!! এথেকে অনুমান করা যায় ভারতকে আমেরিকার কোলে ফের পেতে বাইডেন অনেক দূর যেতে রাজি হবেন, সম্ভবত  চাপ প্রয়োগ সর্বোচ্চ করবেন!

    এমনিতে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকারের – কথা যদি বলি তবে শুরু থেকেই বাইডেনের “মানবাধিকার” –  এই অস্ত্র তাক করা ছিল মূলত ভারতের দিকে। না ভারতকে ঠিক কোন বিশেষভাবে ঘায়েল করার জন্য নয়। বরং বাইডেনের দেখানো দরকার এই অস্ত্র তিনি সবার উপরে সমান প্রয়োগ করছেন কোনো বৈষম্য বা কাউকে খাতির ছাড়া। এ ছাড়া এটা বাইডেনের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। বরং ভারতের পাওনা তিনটা অবরোধের সিদ্ধান্ত তৈরি আছে; কিন্তু তিনি কার্যকর না করে ফেলে রেখেছেন। অর্থাৎ বাইডেনের ক্ষমতা নেয়ার পর থেকেই মুলত বাইডেন-ভারত আর এক লাইনে অ্যালাইন করা অবস্থানে নাই, চলছে না এবং এটাই তাদের ফান্ডামেন্টাল বিরোধ। মানে কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে চলতে পারবেন না। কেন?

    যে শাসক নরেন্দ্র মোদি নিজেরই  জনগোষ্ঠীর এক অংশ, মুসলমানদের খুন করার প্রকাশ্যে হিন্দুদেরকে আহবান জানানোর ব্যবস্থা করে দিতে দ্বিধাগ্রস্ত নন – এই মোদিকে চিনতে হবে। কেন মোদি এমন ডেস্পারেট? তার খোঁজ নিলে দেখব, এটাই আসলে তাঁর নির্বাচনে জিতে আসার খুবই কাজের এক কৌশল। সব পথ হারিয়ে এটাই এখন মোদির একমাত্র অবলম্বন। কাজেই মুসলমান নিগৃহীত করা তার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তবেই এই জোশে হিন্দু ভোট তার বাক্সে আসবে। অতএব, এ জায়গায় মোদি বাইডেনের মানবাধিকারের কথায় কোনো ছাড় দিতে পারবেন না। আবার বাইডেনও ভারতকে মানবাধিকারে এমন জলজ্যান্ত লঙ্ঘন উপেক্ষা করতে পারবেন না। কারণ অবরোধ ও মানবাধিকার এদুই এখন তার প্রধান অস্ত্র। তিনি ভারতের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ বাতিল না করে বড়জোর পিছিয়ে যত দিন দেরি করা যায় তা করতে পারেন, এটাই কেবল বাইডেনের হাতে আছে। এভাবেই তিনি এখন পর্যন্ত ভারতকে ধরে রেখেছেন চুড়ান্ত ফাটাফাটিতে যান নাই। যদিও এটাই হয়ে আছে – বাইডেন-ভারত সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা না হওয়ার পথে প্রধান এক বাধা হয়ে থেকে আছে।

    বাধা দুইঃ
    রাশিয়ার ওপরে ভারতের সমরাস্ত্রে নির্ভরশীলতা, সেটা কমপক্ষে ৭০ শতাংশ। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক রিপোর্ট এটাকে ৮৫%  […as high as 85 per cent.] বলেছে। তাই আমেরিকার রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপের পরে সবচেয়ে বড় বিপদ গুনেছে ভারত। প্রধান কারণ সত্যিই ভারতের সাথে কোথাও কারও সাত দিন যুদ্ধ চললে সাপ্লাই ফুরিয়ে যাওয়াতে এরপর ভারত রাশিয়ান সাপ্লাই বিশেষত ছোট-বড় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও স্পেয়ার্স পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাবে।  ভারত কেন এমন রাশিয়া নির্ভরশীল হল এর অবস্থার পেছনের কারণ দু’টা। এক. রাশিয়ান অস্ত্র তুলনায় আমেরিকান যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে সত্যিই দশগুণ সস্তা। একটা হেলিকপ্টার, এমন ন্যূনতম ভারী অস্ত্রের বেলাতেই এটা সত্য। দুই. রাশিয়া তো আসলে ভারতের কোল্ডওয়ার-কালের মিত্র। ফলে সেকাল থেকে রাশিয়ান অস্ত্রনির্ভর হয়েই ভারত নিজের প্রতিরক্ষা সাজিয়েছিল। সুবিধা ছিল প্রধান ভারতের তখনকার প্রধানশত্রু পাকিস্তান যেমন আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়া বাঁধা। ফলে ভারতেরও রাশিয়ার সাথে বাধা পড়লে এটা দীর্ঘ দিন একই সাপ্লায়ার হয়ে টিকে থাকার বা কাজ করার সম্ভাবনা ভাল মনে করা হয়েছিল। তাই এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জেনেশুনেই তৈরি। তবে এটাতে প্রথম নড়াচড়া পড়েছিল ২০০১ সালে বুশের আমলে ওয়ার অন টেরর ইস্যুতে ভারত বুশের মিত্র হওয়ার পর থেকে। অর্থাৎ কোল্ডওয়ার উত্তরকালে সেই প্রথম বুশ ভারতকে নিষিদ্ধ পারমাণবিক কাঁচামাল ও টেকনোলজি সরবরাহের লোভ দেখানোতে। সেখান থেকেই ক্রমেই এটা ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর হয়ে পরে চীন ঠেকানোর নাম করে ভারত-আমেরিকা সখ্যের গভীরতা শুরু। আর এতেই আমেরিকা-ঘনিষ্ট ভারতই এখন সবচেয়ে করুণ দশায়। বলা হচ্ছে ‘বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর সবচেয়ে চিকন এক দড়ির উপর দিয়ে হাঁটছেন” [Why India is walking a diplomatic tightrope… ]।’ কেন এমন মনে করা?

    তাই ভারতের একেবারে প্রধান শঙ্কা হল, রাশিয়ান অস্ত্রের সাপ্লাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কারণ রাশিয়ার উপর বলতে গেলে আমেরিকার সব বন্ধু অবরোধ আরোপ করেছে। তাই এক কড়া অবরোধের চাপে তাহলে ভারত রাশিয়ান স্পেয়ার্সের সাপ্লাই পাবে কী করে? অর্থ পরিশোধ করবে কী উপায়ে? আর এখান থেকেই আমেরিকান অবরোধ বাইপাস করে রুবলে রাশিয়ার সাথে পণ্য লেনদেনের ব্যবস্থা প্রথম চালু করে ভারত। স্বভাবতই এটাই বাইডেনের সবচেয়ে বড় না-পছন্দ ও ক্ষুব্ধ তিনি। অতএব আমেরিকা হুঙ্কার দিচ্ছে, “রাশিয়ার তেল কেনা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন নয়, তবে ইতিহাস নয়া দিল্লিকে ভুল স্থানে নিয়ে যাবে: হোয়াইট হাউজ”।

    এই অবস্থায় আমেরিকার ডেপুটি নাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার দালিপ সিং, যিনি আসলে বাইডেনের রাশিয়া অবরোধের টেকনিক্যাল প্রণেতা, তিনি ভারত সফরে এসেছিলেন। তিনি উপস্থাপন নরম কিন্তু কড়া ভাষায় ভারতকে সাবধান করেন ভারতকে, রাশিয়ান তেল কিনার বিরুদ্ধে। সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়া সংগে সম্পর্ক গভীর না করতে [urged the country not to enhance ties with Moscow.] র তাতেই মিডিয়া মন্তব্যে এটাকে বিতর্কিত মন্তব্য [created controversy ] বলে ট্যাগ দেয়া হয়েছে। এমনকি শিরোনামে আর কড়া করে বলা হয়েছে NSA who warned India on Russia ties…।

    এমনিতেই আমেরিকার শখের ধন কোয়াডের [QUAD] এটা নিয়ে গর্ব বা হুমকির শেষ নাই এরই ভিতর ভারত বাকি কয়াড সদস্যদের মত রাশিয়ার উপর কোন অবরোধ আরোপ দূরে থাক উলটা পক্ষে যায় এমনভাবে ভোট দিয়েছে।তাই   বাইডেন একবার বলে বসেন কোয়াডের মধ্য একমাত্র ভারতই কাপাকাপি [shaky] বা অগোছাল [The Quad is — with the possible exception of India being somewhat shaky] . আর এতে আরএসএস এর এম নেতা উলটা বলেন আমেরিকাই কাপাকাপি [shaky]। আমেরিকা চীন থেকে শুরু করে আফগান্সতান পর্যন্ত শেকি [It’s Biden’s US that’s shaky, not India — from China to Afghanistan]। শুধু তাই না তিনি আরও আগিয়ে বলেন, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক একটা শেকি ফেজে প্রবেশ করেছে [India-US relations seem to be entering a ‘shaky’ phase]।

    অর্থাত এসব রিপোর্ট নিয়ে  ভারতের মিডিয়া তোলপাড়। যদিও ইউক্রেন ইস্যু হাজির হবার আগে থেকেই ভারত বাইডেনের বিকল্প বা বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করে আসছিল, যাতে মুসলমান দলনের কারণে মোদির ওপর আমেরিকান মানবাধিকার চাপ ভারত এড়াতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ‘কোলে চলে যাওয়া’র সময় তখন যে ভানটা ভারত তৈরি করেছিল সেটাই এখন একেবারেই সিরিয়াস হয়ে গেছে।

    অবস্থা দেখে মনে হয় ভারতের মনের গহিনের অনুভব সম্ভবত এটাই যে, ভারত আমেরিকার সাথে সখ্য চাইলেও শেষে ভারত তা রক্ষা করে চলতে পারবে না। রাশিয়ার কাছেই ভারতকে যেতেই হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার চীনের সাথে সম্পর্কটা কেমন হবে – এই হল আরেক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আর এটাই   ভারতের বড় দ্বিধা অস্পষ্টতার জায়গা। ফলে আমেরিকা চাপ দিলেই ভারত আরও দিশেহারা বোধ করে। আর নিজ বিপুল জনসংখ্যার বাজারের লোভ দেখিয়ে ক্ষুব্ধ আমেরিকাকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এবার স্টেক সম্ভবত অনেক উঁচু! তাই কী হবে এই আশঙ্কা জয়শঙ্করেরও! তিনি আবেদনের স্বরে বলছেন, রাশিয়ায় অবরোধের কারণে আমাদের নিরাপত্তার দিকটা (মানে তাদের অস্ত্র পাবার দিকটা)  অস্পষ্ট হয়ে গেল। এদিকটা তাদের বিবেচনা করা দরকার।

    এসবের মধ্যেই ব্যাপক কুটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে। অথচ ভারতের এই “রুবলে দেনদেন” চালুর ব্যাপারে এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর হতে চান বাইডেন। সর্বশেষ এটা নিয়েই মূলত ওয়াশিংটনে ১১ এপ্রিল থেকে ভারত-আমেরিকান বৈঠক, যার গালভরা নাম ‘২+২’। আর এখানেই রাশিয়ান এস-৪০০  ভারতের কিনবার শাস্তি হিসাবেও এক অবরোধ আরোপ পেন্ডিং পড়ে আছে। আর এখানে ২+২-এর মানে হলো, দু’দেশেরই দুই পররাষ্ট্র ও দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর একসাথে চারজনের বৈঠক। এর আগে চীনকে দেখাতে যে, ভারত যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে তা ভেবে এমন ২+২ বৈঠক নিয়ে মিডিয়ায় গর্ব ভরে উপচে উঠত আমরা দেখেছি। কিন্তু আজ সেসব ম্লান, সবাই রিয়েল প্রবলেমের সামনে পড়েছে। তাই যেন ভ্যানিটি উপাদানগুলো অনাদরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর এই মিটিংতা আসলে যদিও মূলত আমেরিকান সামরিক অস্ত্র ভারতের কিনা সংক্রান্ত কিন্তু নেপথ্যে ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের টানাটানি অসন্তোষটাই সারফেসে বারবার ছাপিয়ে উঠতে চাইবে।

    তবে এটাও ভুলে যাওয়া ভুল হবে যে, জয়শঙ্করের “খুব চিন্তায় আছি” টাইপের যে ইমেজটা তৈরি করেছেন এর আরেক অর্থ ও উদ্দেশ্য আছে। তা হল, ভারতের কেনাকাটার উপর এসব আমেরিকান অবরোধে যেন  আমেরিকা ছাড় পায় সে জন্য আমেরিকার সামনে এক করুণ ইমেজ তৈরি করে রাখা। যদিও ভারত জানে, বাইডেনের এখানে ছাড় দেয়ার সুযোগ বা ইচ্ছার মধ্যে নাই। তবে জয়শঙ্করের মুল বা খাস উদ্দেশ্য হল, ভারতে মোদির মুসলমান কোপানোতে এজন্য এর উপর কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবরোধ যেন আরোপিত না হয়। সে ব্যাপারে বাইডেনকে ঠান্ডা রাখা। কারণ, রাশিয়ান অস্ত্র কিনার শাস্তি হিশাবে অবরোধ খাওয়া যতটা জাতিবাদি গর্বের, মুসলমান কোপানোর জন্য অবরোধ খাওয়া ততটাই বেইজ্জতির হবে!

    তবে ভারতের দিক থেকে আরেক রিয়েল থ্রেটও আছে যেটা ভারতের ভাষায় চীনের সাথে তার সীমান্তবিরোধ। যেটা আর কিছুই না, কলোনি আমল থেকেই অচিহ্নিত হয়ে থাকা সীমানা। যদিও একথা মনে করার কারণ আছে, এটা মূলত উগ্র হিন্দুত্ব এমন জাতিবাদী কল্পনার শাসক মোদি হওয়ার কারণে। যে কারণে এই যে দেখার বা উপস্থাপনের চেষ্টা যে, মোদির হিন্দুত্ব জাতিবাদ সীমান্ত রক্ষায় সবচেয়ে দেশপ্রেমিক! কিন্তু আসলেই কি এই প্রদর্শন খুবই মূল্যবান? সীমান্ত দুই ইঞ্চি জায়গা ছাড় বা দখল পাওয়াটাকে হিন্দুত্বের জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে ভোটের বাক্সে এর ফল ক্যাশ করার চেষ্টা এটা ত ফালতু জাতিবাদেরই থাকে। যেটা প্রাকটিক্যাল নয়, কাজের লাভালাভ নাই।

    বরং ভারতের লম্বা ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে কথা বললে এই কথিত সীমান্তবিরোধ তুলনায় তুচ্ছ। আর আমেরিকা তো ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া গ্লোবাল নেতা যার বিপরিতে চীন  সে জায়গা নিতে ক্রমেই উত্থিত নেতা তাহলে বুড়া সিংহ আমেরিকার যে ন্যাচারালি মরণ হবে এটা না বুঝার কিছু নাই। কারণ এর আর ভারতকেও ন্যূনতম বিনিয়োগ বা ঋণ দেয়ার মুরোদও নেই। তাই প্রতীকী অর্থে ক’দিন পরে মরবে যে শক্তি এর সাথে ভারতের গাঁটছড়া বাঁধার অর্থ কী? ভারতের বন্ধু তো হওয়ার কথা ভারতের আগামীদের, তার অতীত নয়। এটা মানতে না পারার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আসলে মোদির উগ্র হিন্দুত্ব, এই চোখ দিয়ে দেখার সমস্যা।

    ভারত-আমেরিকান নড়বড়ে সম্পর্কঃ
    ইউক্রেনে হার হচ্ছে টের পাওয়ার পরে বাইডেন দক্ষিণ এশিয়ায় জোর দিয়েছেন, মনোযোগ ফোকাস করেছেন। এটা ভারতও সেন্স করেছে। যেমন এক মিডিয়া রিপোর্ট তাই লিখছে, ‘পাকিস্তানের অস্থিরতা, কলম্বোর অর্থনৈতিক ক্রাইসিস, মালদ্বীপে ভারতবিরোধী ক্যাম্পেইন, তালেবানদের ভারতবিরোধিতা ও চীনের প্রভাব বাড়ানোতে ভারতের প্রতিবেশী দেশের অস্থিরতা ভারতের জন্য লংটার্ম রিস্কের ইঙ্গিত।’ [Colombo to Male to Islamabad, India has new headaches as neighbourhood erupts in trouble] অথচ আগে হলে মানে, ভারত আমেরিকার শক্ত কোয়াড বন্ধু হয়ে থাকার কালে এসব অস্থিরতাকে ভারত ইতিবাচকভাবে দেখত, নিজের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নিত। অথচ এখন শঙ্কিত হচ্ছে। আসলে ভারত যদি নিজেকে চীনের সাথে তুলনীয়ই শুধু না, এক পরাশক্তি ভাবতে থাকে তাহলে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক আর ঘনিষ্ঠ না থাকলে চীনের সামনে সেই ভারতের কী হবে এ নিয়ে হাত পা কাঁপাকাঁপি করা থেকেই এমন রিপোর্টই তো লেখা হবে এবং হয়েছেও।

    যা হোক, ভারতের মন এখন আশঙ্কায় পূর্ণ যে আমেরিকা-ভারত সম্পর্কটা কি একেবারে ভেঙে না গেলেও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে? নাকি ভেঙ্গেই যাবে? যেমন, রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকান আপত্তি যদি ভারত না শুনে তবে চরম পরিস্থিতিতে খোদ ভারতের উপরই একটা অবরোধ আরোপ হতে পারে আর সেটা খুব দূরের কিছু নয়। আর এটা নিয়েই আসলে ভারতের মূল দুশ্চিন্তা। আর সে ক্ষেত্রে তাহলে এশিয়ায় সুনির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশে কী হবে?

    বাংলাদেশে কোনো হবু আমেরিকান তৎপরতা বা হস্তক্ষেপে ভারত কোথায় কোন দিকে অবস্থান নেবে, থাকবে, তাহলে সে ক্ষেত্রে? একটা সম্ভাবনা ধরা যাক যদি আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক খুবই নিচে চলে গেল; তবু সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেলায় ব্যতিক্রমভাবে তারা একসাথে লিপ্ত আছে, এমন দেখতে পাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও এমনটা দেখতে পাবার সম্ভাবনা কম। আবার অন্য একটা কথাও আছে।

    বাংলাদেশে কোনো তৎপরতায় আমরা যদি আমেরিকাকে দেখি, যার বগলে ভারত বাঁধা আছে তবে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বা যেমন ধরা যাক যাদেরকে অনেকে ‘ইসলামিস্ট’ বলে, এদের প্রতিক্রিয়া হবে খুবই মারাত্মক খারাপ। এদের কাছে আমেরিকার কোনো গ্রহণযোগ্যতা দূরে থাক সেক্ষেত্রে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হবে। তাতে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক যেমন অবস্থাতেই থাকুক না কেন। বলা যায়, এটাই গত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশে ভারতের অর্জন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এক জংশনে, যাবে কোথায়? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা – ইউক্রেনের পরে বাইডেন পাকিস্তানেও হেরে গেল

    বাংলাদেশে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা
    ইউক্রেনের পরে বাইডেন পাকিস্তানেও হেরে গেল

    গৌতম দাস
    ৪ এপ্রিল ২০২২  ১৫ঃ১৯ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-415

    _         Another failure for Biden, Messing up, Biden-style

    এলেখার প্রসঙ্গ পাকিস্তান লেটেস্ট পরিস্থিতি। কিন্তু শুরুতে এর বৃহত্তর বা গ্লোবাল দিক যার মধ্যে -পাকিস্তান একটা রঙ্গমঞ্চ- সেই বৃহত্তর দিকটা একটু আগে ঘুরে আসব।
    ইউক্রেনের পর এবার পাকিস্তানেও বাইডেন হারলেন। ইউক্রেনের কথা কেন?  ফরেন এফেয়ার্স  (ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের কথা বলছি না)  [Foreign Affairs Magazine] মূলত আমেরিকান পাওয়ার এলিট তাদের সার্কেলকে ইনফর্ম রাখার এক  ত্রৈমাসিক। যেমন ধরেন যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় হিলারি ক্লিনটনের আর্টিকেল ছাপা হয়। কিন্তু আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স [DNI, Office of the Director of  National Intelligence] ] এর সার্ভে রিপোর্ট যা চার বছর পর পর নিয়মিত বের হয় – তাতে বলা হয়েছে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল ট্রেন্ড হল ক্যাপিটাল মুভমেন্ট পশ্চিম থেকে নিরন্তর পুবে প্রবাহিত হওয়া শুরু করেছে। এবং এই প্রবাহ  ই-রিভার্সিবল [irreverseble]। মানে বাংলায়, তা আর কখন উলটা বাইবে না, আগামি কোন একদিন আবার পুব থেকে পশ্চিমা দেশে ফিরবে না।  অতএব উপায়ন্ত না দেখে এমন সব পশ্চিমা পত্রিকায় নয়া দুটা অভিমুখ তৈরি হয়েছে। এক হল তাঁরা সাপ্তাহিক-ত্রৈমাসিক রেখেও পাশাপাশি একটা ওয়েব ডেইলি ভার্সানও চালু করেছে।  আর দ্বিতীয়ত তাঁদের ফোকাস আর আগের মত পশ্চিমের পাঠকই নয়। বরং পুবের পাঠক-লেখক যারা পুবের (এশিয়ার) জনমত তৈরি ও প্রভাবিত করে থাকে তাদেরকে টার্গেট করে পরিচালিত করা শুরু করেছে।

    সম্ভবত সেকারণেই ফরেন এফেয়ার্স  এর ৩০ মার্চ এই রিপোর্টের মুল্যায়ন বাইডেনের আমেরিকা ইউক্রেনে মস্কোকে “ঠেকাতে গিয়ে পরিস্কারভাবে ফেল করেছে” [… deterrence clearly failed] । গ্লোবাল নেতৃত্ব পর্যায়ে কী ফাঁপা হামবড়ার কোন জায়গা আছে, না থাকতে পারে? বাইডেনের দুই অস্ত্র অবরোধ আরোপ আর মানবাধিকারের অভিযোগ এদুটা দ্যেই তিনি বিনা অস্ত্রে আর বিনা পোয়সায় সবখানে চীন (সাথে রাশিয়া)কে ঠেকায় দিয়ে আসতে পারবেন। এটাই নাকি ট্রাম্পের উপর বাইডেনের শ্রেষ্ঠত্ব।  এরই প্রথম পরীক্ষার মাঠ ছিল ইউক্রেন। এখন ফরেন এফেয়ার্স বলছে বাইডেন,  ক্লিয়ারলি ফেইলড।  তাই এই ম্যাগাজিনের সাজেশন আমেরিকার উচিত রাশিয়ার সাথে আপোষ করে নেওয়া [Compromising With Putin May Be America’s Best Option]।

    তা না হয় হল, কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হবে না।  কারণ আমেরিকান রাজনীতিতে এবারের মিড টার্ম বিশেষ তাতপর্যপুর্ণ।  মিড টার্ম মানে এখানে ঠিক গত ২০২০ সালের এই নভেম্বরেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত বাইডেন জিতেছিলেন। আর এবার প্রসিডেন্টের চার বছর ট্রার্মের মাঝে দুবছরের মাথায় আমেরিকান সসদ ও সেনেটের নির্বাচন হবে। তবে সব আসনে না, এক-তৃতীয়াংশ আসনে।  তাই এটা প্রেসিডেন্টের মিড টার্ম হলেও তার কোন নির্বাচন হবে না, হবে তার দলের প্রতিনিধিদের।  অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের দলকে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হবে। আর সেখানেই প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্স মানেই তা দলের পারফরমেন্স হিশাবে বিচার-পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট তার শাসনের দুরবছর সমাপ্তিতে এক পরোক্ষ মুল্যায়নের মুখোমুখি হবেন, সামনের নভেম্বরে।
    আর এখানেই টাম্প ও রিপাবলিকান দল বাইডেনকে তুলাধুনা করবেন – বিশেষত ইউক্রেন নিয়ে তার অবরোধ আর মানবাধিকার অস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে।
    অতএব এর আগেই বাইডেনকে তার এদুই অস্ত্র অন্য এক-দুইটা দেশেও প্রয়োগ করে তাতে ফল পেতে হবে। তাহলে হয়ত আগামি নভেম্বরে তার ইজ্জত কিছুটা ফিরতে পারে। এই বিচারে পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা মায়ানমার এরা হয়ে উঠতে পারে সেই “অন্য দেশ” যেখানে বাইডেন তাঁর দুই অস্ত্র প্রয়োগে মরিয়া হয়ে উঠার সম্ভাবনা এখন প্রবল হল।

    পাকিস্তানে দাড়ালোটা কী?
    ইউক্রেনের মত আপাতত পাকিস্তানেও বাইডেন হেরে গেলেন। কিভাবে?
    মোটা দাগে পাকিস্তানে স্বার্থ বা পক্ষ চারটা। বাইরে থেকে তা যদিও দুইটা – ইমরান ও তার বিপক্ষ মনে হবে। কিন্তু না; কার্যত এখানে সক্রিয় পক্ষ হল চারটা; – ইমরান, বিরোধীজোট, সেনাপ্রধান বাজওয়া আর বাইডেনের আমেরিকা। আর প্রকাশ্যে যে দ্বন্দ্ব বা ইস্যুকে  সামনে রেখে এই লড়াই তা হল সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষ-বিপক্ষে ভোটাভুটি।

    এবার বল গড়ানো শুরু হয়েছিল বিরোধী জোটের সেকেন্ড টাইম ইমরানের সরকার ফেলানোর উদ্যোগ থেকে। বিরোধী জোট মানে নওয়াজ পরিবার, ভুট্টো পরিবার আর মাওলানা ফজলুর। ইনিওই এখন পাখতন প্রদেশ ইমরানের কাছে হেরে এককথায় বললে মোস্ট এন্ড ডেসপারেট করাপ্ট কিছু লোক যারা হল গত বিশবছরে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের ফ্যান্টাসি আর তারাই একক পরাশক্তি এটা দেখাতে গিয়ে যেভাবে আজ দেউলিয়া অবস্থায় এই সময়কালে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তি বলে যেসব প্রডাক্ট মানে “আবর্জনা” তৈরি করেছিল তারাই। যাদের কাজই ছিল আমেরিকার জন্য সমর্থন তৈরি করে হাতিয়ার হওয়া আর বিনিময়ে দুইহাতে পয়সা লুটে নেওয়া। যাদের স্টেক হল বিলিয়ন ডলারের। যাদের মধ্যে নওয়াজ সবচেয়ে উচ্চমার্গের ফলে তিনি পানামা ফাইলসে নাম লেখানোর গৌরবান্বিত এবং পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে সাজাপ্রাপ্ত, জরিমানা আর রাজনীতি নিষিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।
    বাইডেন এদের ঘাড়ে চড়েই ইমরান স্বাঢীন পররাষ্ট্রনীতি বলে রশিয়ায় ডানা মেলে উড়ান দেওয়ার ডানা ছাটতে নেমে পরেছিল। যদিও এই জোট আর বাইডেনের এবারের লক্ষ্য চাওয়া-পাওয়ায় ভিন্নতা ছিল। জোট চেয়েছিল ক্ষমতা যাতে তাদের চোর ইমেজ কাটে, শাস্তি  ফাইন বা নিষেধাজ্ঞা মুছে যায়, ইমরানকে যেকোন ভাবে শাস্তি দিয়ে দেখাতে পারে তাঁরা ততটা চোর না, এটা ইমরানের কারসাজি ইত্যাদি।  ভুট্টো পরিবারের ১০% ইমেজ লঘু হয়, মাওলানার অনৈতিক ইমেজ মুছে যায় ইত্যাদি।  কিন্তু বাইডেনের লখ্য ছিল ওয়ার অন টেররের ক্ষত ও ক্ষতি কমানো। সুনির্দিষ্ট করে পাকিস্তানে সামরিক ঘাটী করে আফগানিস্তানে নতুন করে প্রভাব তৈরি করে যেটা ইমরান সরাসরি প্রত্যাখান করে দিয়েছে আগে। এককথায় চীনকে চ্ছাপিয়ে যতটা সম্ভব নিজের পুরানা প্রভাব ফিরিয়ে আনে। সেকারণে সেনাবাহিনী ও ইমরানসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকেই নিজ অধীনস্ততার বলয়ে আনা।   যাতে চীনের জন্য কোন পা রাখার জায়গা না থাকে।  এখানেই  বিরোধী জোটের সাথে বাইডেনের লক্ষ্যের ফারাক।

    একারণেই সংসদে আনাস্থা ভোটাভুটিতে ইমরান যেন পরাস্ত হয়ে যায় এর আয়োজন সমাপ্ত হয়েছে মনে করার পরে আমেরিকা বাজওয়াকে দিয়ে ইমরানের কাছে সংসদ ভেঙ্গে দেবার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল।  পায় প্রকাশ্যেই সবাই দেখেছিল ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় বাজওয়া ইমরানের সাথে দেখা করতে গেছেন।  মজার দিকটা হল, বিরোধী জোট অখুশি হয়েছে কিন্তু প্রকাশ করে নাই। ইমরানও বুদ্ধিমান হয়েছে – হা-না কিছু না বলে ধৈর্য ধরে শুনেছে। তবে সবচেয়ে খুশি হয়েছিল জেনারেল বাজওয়া।

    কারণ এই প্রথম তার আলাদা স্বার্থ আলাদা প্লেয়ার যে তিনি আরেক টার্ম প্রধান থাকার খায়েস – স্পষ্ট হয়েছিল।  একারণে তিনি ঐ সভায় নিজেকে ইমরান সরকারের সেনাপ্রধান নয় বরং বাইডেনের পক্ষের দুত যেন –  এভাবে হাজির করেছিলেন। যেন অনেকটা বাইডেন-ইমরান দ্বন্দ্বে মধ্যস্ততাকারিও – তবে এই শর্তে যে তার টার্ম বাড়ানোতে উভয়ে তাঁরা সম্মতি দিবে। এতে তিনি এতই বেপরোয়া ও আদব-লেহাজ বিহীন এক ব্যক্তি হিশাবে উপস্থাপন করেন যে এই লোক কোন সেনাপ্রধান দূরে থাক বাসার দাড়োয়ানও যতটা নিজ মর্যাদা রাখতে সচেতন চেষ্টা করে উনার সেটুকুও যে নাই, উনি সেই হুশ হারায় ফেলেছেন।
    তিনি পরের দুইদিন ধরে লাগাতর বলা শুরু করেন ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এছাড়া রাশিয়ান ‘আগ্রাসন ক্ষমার অযোগ্য’।  মানে যে কথা বাইডেন বলেও প্রতিষ্ঠা করতে হিমসিম উনি সেকথা বলছেন এক তাও আবার নেহায়তই এক সেনাপ্রধান।  সারা দুনিয়ার আর কোন সেনাপ্রধান এমন কথা বলে নাই। ইইউ এর ২৭ দেশে নিশ্চয় ২৭ সেনাপ্রধান জীবিত আছেন। ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের স্বার্থ তো প্রত্যক্ষ। অথচ মিডিয়ায় তাঁরা রাজনৈতিক বক্তব্যে হাজির নন। কারণ বাজওয়াকে আরেক টার্ম চাকরি পেতে হবে, এতই দুখি আর গরিব তিনি…যে চাইতেও জানেন না।

    তিনি এটুকুও বুঝেন নাই তার এই সমর্থন বাইডেনেরও কাজে আসবে না।  কারণ, ইমরানের বিজয় ডঙ্কা  ঘোষিত হয়ে গেছে যখন তিনি পাকিস্তানের জাতীট নিরাপত্তা কমিটি (এনএসসি) সভায় উপস্থিত থেকেছেন। এবং বাজওয়াসহ সিভিল-মিলিটারি প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানে আমেরিকার হস্তক্ষেপের জন্য কথিত সেই চিঠি বা পাকিস্তানী রাষ্টদুতকে দেয়া হুমকির নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তান সরকার সেই সভা থেকেই পালটা  আমেরিকাকে প্রতিবাদী নোট পাঠিয়ে দিয়েছে।   যে জেনারেল আমেরিকাকে  প্রতিবাদী নোট পাঠানোর পক্ষ হয়ে যায় সে এর পরে আর কীভাবে আমেরিকাকে খেদ্মত করবে!!!

    এককথায় এদিন ইমরানের কাছে বাকী তিন পক্ষই (বিরোধীজোট, সেনাপ্রধান বাজওয়া আর বাইডেনের আমেরিকা) পরাজিত হয়ে গেছে।
    এখন ইমরান তার শেষ ট্রার্ম কার্ড শো করে দিয়েছেন।  তিনি সংসদ ভেঙ্গে এখন নতুন নির্বাচনের দিকে পরিস্থিতি ঠেলে দিয়েছেন। এটাকে অনেকে মনে করতে পারে যে ইমরান আমেরিকান প্রস্তাব-ই গ্রহণ করেছে। না, এটা ভুল অনুমান হবে।  দুটাই সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলেও দুটার অর্থ ও তাতপর্য আলাদা। এক হলে আমরা দেখতাম আমেরিকা ও বাজওয়ার মুখ্য ভুমিকা। আর সবচেয়ে বড় কথা আমরা বিরোধী জোটের এখন আদালতে দৌড়াদৌড়ি  ্দেখতাম না।
    এতে পাকিস্তানে আমেরিকান অবস্থান আবার বিরোধী জোটের পিছনে বা নিচে। যার অর্থ আমেরিকা পাকিস্তানেও হেরে গেছে।

    এখান থেকে অন্য এক ইঙ্গিতঃ
    যার সোজা অর্থ বাংলাদেশে বাইডেন এখন আরো সক্রিয় হবেন। তাকে তাঁর দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার – যে খুবই কার্যকর অস্ত্র এটা তাকে দেখাতে, প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।  অতএব বাংলাদেশ হয়ে উঠল সম্ভাব্য বাইডেন সবচেয়ে সক্রিয়তা আর চাপের মুখে থাকা দেশ!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • “দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

    “দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

    গৌতম দাস

    ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৮ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-40v

     

    –        ‘The Kashmir Files’ Makers

    দ্য কাশ্মির ফাইলস – একটা ভারতীয় সিনেমার নাম। আসলে বলা উচিত, মুসলমানের প্রতি ঘৃণাবিদ্বেষের বিষ উগড়ে দিয়ে বিজেপির পক্ষে নিজ বাক্সে হিন্দুভোট জোগাড়ের নতুন এক উপায় হল, এই কথিত সিনেমা। ‘কথিত’ বললাম এ জন্য যে, কোন নির্বাচনী প্রপাগান্ডা বা প্রচারমূলক কাজে প্যারোডি গান লিখে গেয়ে তা ক্যাম্পেইনের যেমন রেওয়াজ দেখা যায় এটাও তেমনি যেন; তবে এটা অনেক বড় ধরনের বাজেটের প্রপাগান্ডা। তাই পয়সা খরচ করে গানের বদলে একেবারে সিনেমা বানিয়ে এক বড় প্রপাগান্ডার কাজ। প্রপাগান্ডা মানে যেখানে সত্য-মিথ্যা ভুলে, কেয়ার না করে তা কেবল প্রচার আর প্রচার! তাই এটা সিনেমা নয়; না সৌন্দর্যগুণ বিচারে না বিনোদনের বিচারে। এটা একটা প্রপাগান্ডার বস্তু মাত্র।

    আর খরচের বিচারে শোনা যায়, এটা প্রায় সাত কোটি রুপিতে বানানো, যেটা ইতোমধ্যে ৩০০ কোটির বেশি অর্থ আয় করেছে। সত্যি হিন্দুত্ববাদ কী না পারে যার মূল কারণ বলা যায়, বিজেপি শাসিত রাজ্যে এর টিকিট করমুক্ত করা হয়েছে, এভাবে হাইপ-জোশ তোলার কারণে আর দলীয় প্রপাগান্ডা যেমন সারা ভারতে নাকি মুসলমানরা হিন্দুদের ওপর হত্যা ও অত্যাচার করছে -ফলে হিন্দুরাই ভিকটিম, তাই ত্রাতা মোদিকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান, এটাই এই ছবির মাহাত্ম্য!

    কাশ্মির ফাইলস-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ধরতে ফ্যাক্ট চেকঃ 
    ‘কাশ্মির ফাইলস’-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ও অপততপরতাগুলোকে উন্মোচন করতে বিভিন্ন “ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট” প্রকাশ হতে শুরু করেছে।
    আবার ইতোমধ্যে ভারতেই এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে আরো যেসব প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে এর বিরুদ্ধে পাল্টা ‘ফ্যাক্ট চেক’ (অর্থাৎ বর্ণিত কোন ঘটনার পিছনের আসল ঘটনাটা কী তা পরীক্ষা ও প্রমাণসহ সেই ফ্যাক্টস তুলে ধরা) রিপোর্টও মিডিয়ায় প্রকাশ করা শুরু হয়েছে। এরই একটা রিপোর্ট দেখা গেল, গত পয়লা এপ্রিলের দক্ষিণী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’তে [Fact Check: ‘The Kashmir Files’ and the disinformation surrounding it]।

    A girl walks past a poster of the Bollywood movie “ The Kashmir Files” inside a cinema in Mumbai, on March 17, 2022. Credit: Reuters

    ওখানে পাঁচটা বিভিন্ন প্রপাগান্ডার ঘটনা তুলে আনা হয়েছে, যার পাঁচটাই ভুয়া বা মিথ্যা বলে প্রমাণ দেখানো হয়েছে। এখানে ওর একটা তুলে আনছি। যেমন, কাশ্মিরে কতজন হিন্দু কাশ্মিরি পণ্ডিত এ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে? এতে কোনো এক কথিত আরটিআই (RTI বা, রাইট টু ইনফরমেশন) তথ্যে বলা হয়েছে, তা ১৬৩৫ জন। কিন্তু এই ফ্যাক্ট চেক মোতাবেক, তা মাত্র ৮৯ জন আর বাকিরা ‘অন্য কেউ’। এই রিপোর্টের সিদ্ধান্ত হল, এই তথ্যা মিসলিডিং। মানে এটা শ্রোতা-দর্শককে ইচ্ছা করে ভুল ধারণা দিয়ে বিপথে নেয়া।

    ছবির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রা, তিনিই আসলে মোদির মুল পুতুল! যেমন তিনি ২০১৭ সালেও মোদির হয়ে ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের মেম্বার ছিলেন এবং  কাশ্মির নিয়ে অন্যান্যদের ফিল্ম রিলিজে বাধা দিয়েছেন। তিনিই এখন আবার কাশ্মিরি প্রপাগান্ডা সিনেমা বানানোর পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মোদির সাথে দেখা করতে গেছেন যেন তারা এক মহত-কাজ করেছেন। আর ঐ দেখা করার অনুষ্ঠানে মোদি বলেছেন মুক্ত ভারতে সবাই ছবি বানাতে পারে।

              সৎ যুধিষ্ঠির নরেন্দ্র মোদির “দেশের স্বার্থে” হিন্দুত্ববাদের সৎ ও সত্য কথা তুলে ধরার প্রজেক্ট এই সিনেমা; “….to portay the truth correctly”। বলেছেন                    সত্যের অনেক  রূপ আছে, যে চায় অন্য একটা ফিল্ম বানাক”। আগ্রহিরা দেখতে পারেন এখানে ।

    সার কথায় সব ফ্যাক্ট চেক রিপোর্টই পাল্টা কথায় বলছে যে, এটা একটা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা সিনেমা; ফলে নানান উসকানিমূলক তথ্য, ভুয়া তথ্য (অনেক মিডিয়ায় এই সিনেমাটাকে ধান্ধাবাজি বা ম্যানিপুলেটেড তথ্য বলতেও দ্বিধা করা হয়নি) সাথে দিয়ে দলীয় প্রপাগান্ডায় সবটা অসৎ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

     

    সিনেমা তৈরি পরে পরিচালক অগ্নিহোত্রী ও অভিনেত্রী পল্লবী জোশি  যেন এক মহৎ কিছু অর্জন করেছেন – যেখানে প্রপাগান্ডার গ্লানিটুকুও নাই –  এই মনে করে মোদি ও অমিতের সাথে দেখা করে এসে এরপর সেই মধুর সাক্ষাতের উচ্ছসিত বর্ণনা পাবেন – এই লিঙ্কে এখানে।  

    হিন্দুত্ববাদের প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও, দ্য ডেইলি স্টারঃ
    এই প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও লেগেছে মানে লাগিয়েছে ইংরাজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি বা তাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, যেমন কোনো ইংরাজি পত্রিকা এদের মধ্যে তারা সেকুলার হয়ে থাকবে ও দেখাবেই এমন ব্রত নিয়ে থাকতে দেখা যায়। কারো মধ্যে কোন কিছু ব্রত বা প্রতিজ্ঞা হিসেবে থাকা তা হয়ত খারাপ নয়; কিন্তু যখন ফলাফল দেখা যায় উল্টা!! কারণ এতে মূল সমস্যা আমরা যখন দেখি, ঠিক কী করলে তাদের আকাঙ্খার সেকুলার অবস্থান সেটা কী বা কী হতে পারে এটা নিয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নাই। যেমন অনেককেই ভেবে বসতে দেখা যায় যে, ধর্ম বিশেষত ইসলামকে যদি কষে গালাগাল  কেউ করে দিতে পারে বা ইসলামের নিকুচি করে দিতে পারে তাহলে সে বা ঐ আচরণ নিশ্চয় সেকুলার; অর্থাৎ এটা একটা তাদের কাছে এক অদ্ভুত মাপকাঠি!!!  এমন উদ্ভট সব ফ্যান্টাসী ধারণা বা গোপন খায়েশ আমাদের অনেকের মধ্যেই থাকতে দেখা যায়। এতে পরিণতি দেখা দেয় যে, কখন কথিত প্রগতিবাদ আর হিন্দুত্ববাদ এক হয়ে গেছে এরা কেউ তারা টের পায়নি বা খেয়ালই করেনি! তেমনই অবস্থা হয়েছে ডেইলি স্টারের!

    ফেসবুকে ডেইলি স্টারের এক সিনেমা রিভিউ পেজ আছে যার নাম “স্টার মুভি রিভিউ”। সেখানে দেখা গেল, দ্য কাশ্মির ফাইলস এই সিনেমা নিয়ে প্রায়  দশ মিনিটের এক সিনেমা রিভিউ বা পর্যালোচনার ভিডিও বক্তব্য [যে সিনেমা নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত ভারত] সাঁটা আছে। অনুষ্ঠান সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব। তিনি কথা শুরু করেছেন ওই সিনেমার পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীকে সাধুবাদ দিয়ে। কী কারণে? তিনি নাকি “এমন একটা ঘটনাকে এই প্রথমবারের মত বিগ স্ক্রিনে তুলে এনেছেন যা এপর্যন্ত কেউ তুলে আনেনি; গত ত্রিশ বছর ধরে ঘটনাটা নিয়ে কেউ কথাবার্তা বলেনি। অথচ এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”।

    আসলে এই কথা বলেই সঞ্চালক যে হিন্দুত্ববাদের কবলে পড়ে গেলেন তাই-ই তার হুঁশে নাই।
    ওদিকে ঐ হত্যা-অত্যাচারের ঘটার আগে-পরের সময়কালে  কংগ্রেস তো বটেই খোদ বিজেপি ও বাজপেয়িও এই ঘটনা ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে সহযোগী ভুমিকা ছিল অর্থাৎ ঢেকে রাখা কর্তাদের দলে তারাও ছিলেন তাহলে তারা কেন ও কিভাবে এ ঘটনা নিয়ে কথা তুলবেন?  ফলে এটা তো ঢাকাই থাকবে, নাকি? এটাই ঢাকা থাকার মূল কারণ। তো পরিচালক অথবা  এখনকার সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব ইত্যাদি এদের উচিত হবে কেন তারা ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন সে দিকে যাওয়া। কেবল কংগ্রেস খারাপ অথবা যেন কাশ্মীরের মুসলমানেরাই এটা প্রকাশ হতে না দিবার জন্য দায়ী এমন ইঙ্গিত তোলা অসততা  হবে।

    আসলে প্রথমত, এটা মুম্বাইয়ের কোনো বাণিজ্যিক সিনেমা বলতে যা বুঝায় তা নয়। এটা হিন্দুত্ববাদের পক্ষে দলীয় ভোট জোগাড়ের এক প্রপাগান্ডামূলক সিনেমা। অথচ এটাতে ভান করা হয়েছে যেন এটা একটা সাধারণ বাণিজ্যিক সিনেমাই। আবার এটা হিন্দুত্বের রাজনীতি এর স্বার্থে করা সিনেমা; অতএব এটা নিশ্চয় ভারতীয় উগ্র চরম জাতিবাদের স্বার্থের সিনেমা। কাজেই বিজেপি সরকার এ ছবির প্রদর্শন ট্যাক্স ফ্রি করে দিয়ে  কথিত দেশপ্রেমী জাতি-বোধের জজবা ও জোয়ার তুলুক,  তবু আমাদের একে প্রশংসা করতে হবে? এখন লক্ষণীয় কথিত হিন্দুস্বার্থ কিভাবে কোন ফাঁকে ভারতীয় জাতিবাদের স্বার্থ হয়ে গেছে কেউ তা খেয়াল করছে না। হিন্দুস্বার্থ মানেই তা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ না-ও হতে পারে, এটাই হলো বটম লাইন। মুসলমান কোপানোকে যদি কেউ হিন্দুস্বার্থ বলে মনে করে তাহলে এটাও কী ভারতের স্বার্থ হবেই?

    দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ঘটনা বা সঞ্চালকের চাতুরী এবং বোকামিটা হল, তিনি সাধুবাদ দিয়ে যাচ্ছেন পরিচালককে। কেন? তিনি মনে করছেন এর আগে কেউ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগ মানে, তাদের ভারতের অন্য শহরে চলে যাওয়া – এই চাপা পড়ে থাকা ঘটনার দিকটা সামনে নিয়ে আসেনি। অতএব পরিচালক অগ্নিহোত্রী নিশ্চয় অনেক মহান মানুষ। তাই কি?

    এথেকে দর্শক ভুল ধারণা পেতে পারে যে, তাহলে কাশ্মির সমস্যা মানে হল, মুসলমানদের হাতে হিন্দু দলন ও নিপীড়নের ঘটনা। বিজেপির ভাষায় ‘জাস্টিস’- দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের জাস্টিস দেয়ার কথা কেউ বলেনি। যেন সে জন্যই এটা এক সিনেমা! নাজমুস সাকিব জেনে না জেনে এই অসত্য ধারণা তৈরি করছেন।

    ধরা যাক যদি আপনি আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিকে প্রথমে আগ বাড়িয়ে খুবই নির্দয়ভাবে পিটিয়েছেন। পরে ওই প্রতিদ্বন্দ্বি আপনার চেয়ে দল ভারী করে আপনাকে আরো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আরো বেশি সংখ্যায় আহত-নিহত করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি খুবই বুদ্ধিমান বলে আগে আপনার ওদেরকে পেটানোর অংশ আড়ালে বা বাদ রেখে কেবল আপনাকে কিভাবে কত খারাপভাবে পিটিয়েছে এনিয়ে এক লোমহর্ষক সিনেমা বানিয়ে ছেড়ে দিলেন, যাতে কেউ এটা দেখলে আপনাকেই খুবই ও একমাত্র ভিকটিম মনে হতে থাকে। আর এর ফলে তা দেখে এক নাজমুস সাকিব বলা শুরু করেন, পরিচালককে ধন্যবাদ যে, তিনি ভিকটিমকে জাস্টিস দেয়ার পথ খুলেছেন, কেউ যা নিয়ে কখনো কথা বলেনি, সে চাপা পড়া বিষয়টাই তিনি সামনে এনেছেন। ব্যাপারটা অনেক সুইট আর প্রগতিবাদী হবে তাহলে তাই না? আর এতে আমরা নিশ্চয় আপনাকে ‘খুবই বুদ্ধিমান’ বলব, কী বলেন?

    কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতাঃ
    দ্য কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতা এটাই। কারণ এর উদ্দেশ্য হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে বিভক্ত ও মেরুকরণ করা। পরে হিন্দুরা ভালো, মুসলমানরা খারাপ এভাবে এক তৈরি বয়ানে ঘটনাকে তুলে ধরা, যাতে এবার বিজেপি বা মোদিকে ত্রাণকর্তা মনে হয়। আর তাতে সব হিন্দু ভোট বিজেপির বাক্সে ঢোকে। এ জন্য সে কাশ্মিরের ঘটনা ইতিহাসের আগে-পিছে দেখাবেই না। যেন কাশ্মীর মানেই মুসলমানের হাতে হিন্দু নিপীড়ন অত্যাচারিত হওয়া, এটাই তুলে ধরবে…।
    অথচ এই শঠতাকারিরা কাশ্মিরের ঘটনা মানেই তা ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্ম অথবা ১৯৫০ সালে রচিত ভারতের কনস্টিটিউশন থেকেও শুরু করবে না। তাঁরা এর শুরু ধরবে জানুয়ারি ১৯৯০ সালে  হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগের ঘটনা থেকে। আবার এর শেষও তাঁরা টেনে দিবে ১৯৯০ সালের দু-এক বছর পরেই। আর প্রচার চালাবেন, এখনো কাশ্মিরের একমাত্র সমস্যা হলো ইনজাস্টিস; দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের প্রতি ইনজাস্টিস। আর এতে নিশ্চয় আপনার প্রাপ্য হবে সাধুবাদ! তাই কি?

    কাশ্মির ফাইলস-এর শঠতাকে বিচার বা ওর শঠতাকে উদাম করতে চাইলে দুটা প্রশ্ন করেন আর তা বুঝার চেষ্টা করেন। এক, কাশীরে সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল কবে থেকে এবং কেন?  আর দুই, কাশ্মীর শুরু থেকে মানে ১৯৪৭ সাল থেকে কখনই এটা হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত দাঙ্গার ইস্যু ছিল না। ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে কাশ্মীরের সংঘাত; ভারতের সাথে থাকা  ও না-থাকার সংঘাত। তাহলে কাশ্মিরে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল কবে থাকে এবং কেন?

    সংক্ষেপে বললে, কাশ্মীরে সশস্ত্র রাজনীতি বা তরুণদের হাতে আস্ত্র তুলে নেওয়া এটা ১৯৪৭ সালের ঘটনা নয়। বরং ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কাশ্মীরের রাজনীতি মানেই সেটা নির্বাচনি রাজনীতি ছিল। ঐ ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরে ১৯৮৮ সাল থেকে কাশ্মীর সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করে।  আত তা থেকে প্রথমে বছরে দুএকজন পরে ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ঐ বড় করে  হিন্দু পণ্ডিতদের হত্যা নিপীড়ন ও দেশত্যাগের ঘটনাটা ঘটেছিল।  তাহলে এই পুরা ঘটনা থেকে কেবল ১৯৯০ সালের হিন্দু পন্ডিত নিপীড়নের ঘটনাকেই আলাদা করে এই সিনেমা উঠিয়ে আনছে কেন? কেবল ১৯৯০ সালের এই ঘটনাকেই ইনজাস্টিস বলে তুলে আনছে কেন? যে এই প্রশ্ন করতে পারবে না সেই-ই এই সিনেমার মাধ্যমে মোদির হিন্দুত্ববাদের শিকার হবে।

    কাশ্মীর বিরোধের ফান্ডামেন্টাল দিকঃ
    কাশ্মিরের সব অশান্তির শুরু ১৯৪৭ সাল থেকেই।  ভারতের প্রায় সব রাজনীতিবিদ এখনও কাশ্মিরের প্রাক্তন রাজা হরি সিং ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হয়ে যাওয়ার কাগজে সই করার উপযুক্ত অথরিটি বলে মনে করেন।  এমনকি রাজনীতিবিদদের এমন মনে করার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিকরা এনিয়ে ভিন্ন আর কিছু জানেন তা মনে হয় না।
    বরং সারা ভারতকে এক মিথ্যা জাতিবাদী জোশে ভুগতে দেখা যায় যে, ব্রিটিশ কলোনি দখলদাররা নাকি স্বদেশী আন্দোলনের নামে জমিদার হিন্দুর সন্ত্রাসবাদ বা কংগ্রেসের আন্দোলনে মুখে টিকতে না পেরেই যেন ভারত ত্যাগ করেছিল। অথচ একথা শতভাগ মিথ্যা। ফ্যাক্টস হল, কেবল ব্রিটিশরা নয়, সারা দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসকই ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ থামার পরে স্ব স্ব কলোনি ছেড়ে স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে গিয়েছিল। আর তারা ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল যে কারণে ঠিক সেই একই কারণে, রাজা হরি সিং-সহ তার মত কোন রাজারই ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হওয়ার কোনো কাগজ-দলিলে স্বাক্ষর করার অথরিটিই ছিল না, অথরিটি হারিয়েছিল। আর এসব কিছুর পেছনে মূল কারণ হল ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি [Atlantic Charter Aug14, 1941]। এটাকে বলা যায়, আমেরিকার সাথে কলোনি দখলদার ইউরোপের একেবারে মুখ্য এক চুক্তি। এই চুক্তিতে বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশেরা বিনা শর্তে দখলদারি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর এই শর্তেই আমেরিকা হিটলারের বদলে ব্রিটিশ-ফরাসি ইত্যাদি মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে বিশ্বযুদ্ধে সেই প্রথম অংশ নিতে সম্মত হয়েছিল। আর এর সাথে এতে ফেলে যাওয়া কলোনির কোন রাজার আর কোনো অথরিটিই নেই, থাকবে না যে, সে ওই দেশকে নিয়ে নিজ খেয়ালে অন্য কোনো দেশের ভেতর যোগ দেওয়াতে পারব। কারণ ঐ চুক্তিতে বলা আছে ওই দেশ কার দ্বারা শাসিত হবে, এর একমাত্র নির্ধারক হবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। ফলে ঐদেশের নিজ ভাগ্য তা নিজ পাবলিকের ভোটের সম্মতিতে ঠিক হবে। ফলে তা সহজেই এক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে পারবে। ব্রিটিশরা চলে গেলে কাশ্মিরেরও এমন হওয়ার কথা।

    নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, পড়েছেন জানা যায় নাঃ
    কিন্তু নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, এর চিহ্ন-প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি এই চুক্তি-ই যে, জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি -দলিল বলে জাতিসংঘ মনে করে এবং সেটাও নেহরু জানতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং উল্টা প্রমাণ আছে। এসবেরই ফলাফলে নেহরু কাশ্মিরকে জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে রাখার পক্ষে জোড়াতালি (৩৭০ বা ৩৫এ ধারা) কিছু কাজ করে যান। কাশ্মিরের সব সমস্যার শুরু এখান থেকে। এবং কোন মতেই এটা কাশ্মীরের হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ-সংঘাত একেবারেই নয়।
    আর কড়া কথাটা হল, দুনিয়ার সব ইতিহাস পাঠক বা স্টুডেন্টদের মুখস্ত থাকা উচিত আটলান্টিক চার্টার চুক্তির। কারণ এটা উপস্থিত মর্ডান ও গ্লোবাল  রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দলিল। যারা পড়বে না তাঁরা বকোয়াজ করবে।

    দ্বিতীয় বড় ফ্যাক্টস হল, জম্মু-কাশ্মির মিলে ২০১১ সালের হিসাবে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.৩ কোটি যার ৬৮.৩% হলো মুসলমান আর হিন্দুরা ২৮.৪; বাকিটা অন্যান্য। আর ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই যে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা যেটা সেটাই কাশ্মিরের ওপরেও ভর করেছিল কিন্তু অনেক ধীরে ধীরে  যদিও তা অনেক পরে ১৯৮৭ সালের আগে নয়। কেবল সেই সমসাময়িক সময়ে। তাতে কী হয়েছিল?

    ভারতের ‘আদি পাপ’ হল, সব নাগরিকদের সমান অধিকারের রাষ্ট্র হবে, সেটা তাঁরা করবে না। মানে অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র তা হবে না; তাঁরা গড়বে না। বরং তাঁরা সাম্য নয়, হিন্দু আধিপত্যের এক রাষ্ট্র গড়বে। যা এক হিন্দু ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে হবে। আর যে ধর্মের লোক সংখ্যায় বেশি মানে হিন্দুরা এ রাষ্ট্রে আধিপত্য নেবে। এভাবেই ১৮৮৫ সাল থেকে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এই লাইনে আগিয়েছে আর ১৯৪৭ সালের ভারত কায়েম করেছে।
    আমার এই অসাম্যের রাষ্ট্র হিন্দু আধিপত্যের রাষ্ট্র কথাটা বুঝে নিতে এদিকে আসেন। যেমন, সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে ভাঙেন, যে শব্দটা দুনিয়ার আর কোনো রাষ্ট্রে নাই। আর এ শব্দের আসল অর্থ হল, হিন্দু আধিপত্যের স্বার্থে ডিফাইন করা সীমার মধ্যে মুসলমানদের বসবাস, জীবন যাপন করতে হবে। তাই মুসলমানেরা ধর্মীয় চিহ্ন প্রদর্শন করে স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপনও করে চলতে পারবে না। যদি তা অনুসরণ না করে তবে ওসব মুসলমানকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ দিয়ে নিন্দা করা হবে। বিপরীতে যেসব মুসলমান তা মানবে, মানে হিন্দু আধিপত্য কর্তৃত্ব মেনে নেবে তাদের মানার শর্তেই তারা হিন্দুদের পাশে সমাজে মানে যেমন স্কুলে অফিসে পাশে বসতে দেয়া হবে। আর তাতে এসব মুসলমানরা ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে গণ্য হবে। তাই সাম্প্রদায়িক বা অসাম্প্রদায়িক শব্দের আসল কাজ ও রূপ হল “হিন্দু আধিপত্য” নিশ্চিত করা।
    যেমন দেখেন মোগল আমলে “সাম্প্রদায়িক” বলে কোন ধারণা বা শব্দটা নাই। তখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কথাও জানা যায় না। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বেশির ভাগ জমিদারি হিন্দুরা নেয়াতে (যে জমিদারি মানে, ব্রিটিশ শাসকের নিচে ওই সমাজের কর্তা এক নিয়ামক শক্তি ) এবার তারা তাদের আধিপত্য (ধর্মীয় পরিচয়ে আধিপত্য) চালু করেছিল। আসলে হিন্দু জাতিবাদের ভিত্তিতে হবু ভারত গড়তে হবে – কংগ্রেসের এই নীতির ভিত্তিতে ভারতের জন্ম – এটা ক্রমেই ওই জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের পক্ষে সাফাই হিসাবে হাজির হয়েছিল।

    এখন ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের কনষ্টুটিউশনে  কাশ্মিরকে ভিত্তিহীনভাবে ভারতের অঙ্গীভুত করে নিবার পরেও নেহরু শান্তিতে থাকতে পারেননি। সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ১৫% তবে কোথাও কোথাও মানে, কোন রাজ্যে বা শহরে তা বড়জোর ২৫-৩০%। ফলে সহজেই হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রাখা সহজ ছিল যদিও তা সমাজে সবধরনের নাগরিক অসাম্যের প্রধান উৎস হয়েই থেকে গেছিল।

    কিন্তু ভারতের এই হিন্দু-আধিপত্য পছন্দের শাসকরা তাদেরই আধিপত্যের তত্ত্ব মুসলমানরা কেমন অস্বস্তি অনুভব করে তা কাশ্মিরে টের পেয়েছিল। কারণ ওই একই আধিপত্য তত্ব কাশ্মিরে তাদের বিপক্ষে কাজ করেছিল। কারণ কাশ্মিরে মুসলমানরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ (৬৮%)।  আর এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে কোন হাতছুট ঘটনা ক্রমন হতে পারে এর প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৮৭ সালের কাশ্মীর (প্রাদেশিক বা অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে। কারণ তত দিনে কাশ্মিরের অতিষ্ঠ মুসলমানরা, তাদের ব্যক্তি বা সামাজিক-রাজনৈতিক দল বা গ্রুপগুলো একজোট হয়ে মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট (এমইউএফ MUF) গড়ে ওই নির্বাচনে লড়ে ক্ষমতা নিতে তৈরি হয়েছিল। এই এমইউএফ ছিল ১৯৮৪ সালে গড়ে তোলা প্রথম ভ্রুণ এক ছাত্রসংগঠন, যার নাম ছিল ইসলামী স্টুডেন্ট লীগ। এটাই প্রথম কাশ্মীরের রাজনীতিতে  “সবকিছু ইসলামি হতে হবে” এই আইডিয়ার রাজনীতির আবির্ভাব ঘটেছিল।   আসলে ভারতের আধিপত্য তত্ত্ব অনুসারে, কাশ্মিরে হবু মুসলমান আধিপত্য দেখে তারা প্রমাদ গুনে বিপদ বুঝতে পারে আর এটাই তারা মেনে নিতে পারেনি।
    কেন কাশ্মির এমন বদলে গেল, মূল কারণ নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হলে সেখানে ধর্মীয় বা সব ধরনের পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান নাগরিক হয়ে থাকতে পারে আর নাগরিকের যদি সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয়, তাহলে কারো কারো আধিপত্যের আলাপ সেখানে থাকে না। কিন্তু বাস্তবের ভারত ছিল এর বিপরীত। হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের হাতে পড়ে সেটা হিন্দু আধিপত্যের ভারত হয়ে উঠেছিল। আর তা একইভাবে কাশ্মিরের মুসলমানরা অনুসরণ করতে গেলে হিন্দুদের জন্য সব বিপদ ঘনিয়ে ওঠে।আর এতেই সবচেয়ে বড় স্টুপিডিটির বা দেশলাই মারার কাজটা করেছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ।

    দেশলাই জ্বালানোর ভুমিকায় ফারুক আবদুল্লাহঃ
    এই “মুসলিম উত্থান” বার্তাটা কাশ্মির জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ নজর করেন। কারণ তিনি এমইউএফ-এর ভেতরের কোন নেতা ও দল ছিলেন না। তিনি ততকালের বিষয়টাকে দিল্লি গিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কানে তোলেন; সাথে আলাপ করেন এই এমইউএফ-এর উত্থান ঠেকানো নিয়ে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ব্যাপক হলেও সরাসরি নির্বাচনী কারচুপি করেই তারা এই উত্থান ঠেকাবেন। তাই ঐ নির্বাচনের ভোটদানের পরেই এমইউএফের ছোট-বড় প্রায় সব নেতাকর্মীকে (যতদুর সম্ভব) তারা গ্রেফতার করেন আর পরে প্রতিটা কেন্দ্রের ফলাফল ওই দিন দূরে থাক সপ্তাহ-দশ দিন পরে ইচ্ছামত ঘোষণা করেছিলেন। আর এখান থেকে কাশ্মিরের রাজনীতি মানে মিছিল মিটিংয়ের প্রকাশ্য রাজনীতি ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরের বছর ১৯৮৮ সাল থেকে সারা কাশ্মির সশস্ত্র রাজনীতি পথে চলে যায়। অস্ত্র আর খুনাখুনি এটাই প্রধান ধারা হয়ে যায়। তারপর থেকে কাশ্মিরে নির্বাচনের আর কোনো গুরুত্ব থাকেনি, থাকার আর কোন সুযোগও থাকে নাই। কংগ্রেস-বিজেপির ভাষায় যা ‘জঙ্গিবাদ’ হয়ে যায়। আর বিজেপির বাজপেয়ি তার নতুন ডমিনেটং বয়ানে হাজির হলেন। তিনি কাশ্মিরে কংগ্রেসের হাতে ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপি করাতে রাজনীতিকে সশস্ত্রতার দিকে ঠেলে দেয়া্কে ভুলে গেলেন, অস্বীকার করলেন। আর এক নয়া বয়ান হাজির করলেন যে, কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস ‘সীমা পার কী আতঙ্কবাদ’ -মানে কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস নাকি পাকিস্তান থেকে আসা টেরোরিজম! কেন্দ্র ভারতের কোন ভুমিকা যেন নাই!
    যারা  ১৯৮৭ সালের এই টার্নিং পয়েন্ট বিস্তারিত আরো পড়তে চান তাঁরা দেখতে পারেন ১। এখানে,   ২।  এখানে The 23rd March 1987, the day that changed Kashmir as never before, ৩।  এখানে, ৪। এছাড়াও আমার এক পুরানা লেখা এখানে।

    আর ওদিকে কাশ্মিরের সশস্ত্র রাজনীতির শুরুতে এই প্রথম প্রথম প্রতিহিংসাবশত দু-একজন হিন্দু পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে যেটার সবচেয়ে বড় আর ব্যাপক হত্যার ঘটনাটা ছিল ১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি। আর এবারও কংগ্রেস, বিজেপি, ফারুক আবদুল্লাহ আর মুফতি সাঈদ সবাই কমবেশি যার যার অবদান-দায় রেখে পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন। ভেবেছিলেন পন্ডিতেরা দেশত্যাগ করলে সেটা সশস্ত্রতার বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান তৈরিতে একটা চাপ হবে। কাশ্মিরের গভর্নর জগমোহন বা কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি সাঈদ বা বিজেপি সমর্থিত কোয়ালিশনে ভিপি সিং-এর সরকারের আমলে এই জম্মুত্যাগের ঘটনাটা ঘটানো হয়েছিল। তাই সকলের দায় ছিল। যদিও কেউ এথেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। কিন্তু শিক্ষাটা হলো, কেউ কোনো একটা নিজধর্মীয় আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র গড়বেন নাকি অধিকারভিত্তিক সাম্যের নাগরিক রাষ্ট্র? যেমন গড়বেন তেমন ফল পাবেন। ফলে সেটা সারা ভারতে কায়েম করবেন অথবা কেবল কাশ্মিরে কোনো একটি ধর্মীয় আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়বেন – যেখানেই গড়েন, এই কাজ কোথাও কারো জন্য ফলদায়ক হয়নি। আর আপনি যদি হিন্দু আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র চান তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনি তার মানে সে দেশে মুসলমান আধিপত্যের আরেক জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জন্ম হতে দাওয়াত দিচ্ছেন!!!
    ঠিক যেমন এখন ভারতে শুরু হয়েছে হিন্দু-জাতিবাদের আরও ভয়াবহ সেকেন্ড ফেজ। এবার হিন্দুত্ববাদের আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়ার খায়েশ। এতে আরেকবার মুসলিম লীগের মতোই মুসলিম জাতিরাষ্ট্র চিন্তার জন্মকে (এবার তা সম্ভবত গ্লোবাল) দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। যেমন গুড় ঢালবেন তেমনই মিস্টি হবে!

    তাহলে কাশ্মির ফাইল কী দাঁড়াল? সেটা হচ্ছে কাশ্মিরের সব ইতিহাস ফেলে কেবল ১৯৯০ সালে কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যাওয়াটা – কেবল এই অংশটা ইতিহাস থেকে তুলে এনে একে সামনে এনে বিজেপির পক্ষে সহানুভ‚তি জোগাড়, এই হিন্দুত্ব উত্থানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ১৯৪৭ সাল থেকে কত কাশ্মিরি মরেছে – কত ইনজাস্টিস সেটা নয়; কেবল ১৯৯০ সালে্র মধ্যে সব বুঝাবুঝি সীমাবদ্ধ করতে রাখতে চাইছেন। সঞ্চালক নাজমুস সাকিবের মত বলতে থাকেন কাশ্মির ফাইল সিনেমা  “এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”। আর সাথে মুখরোচক দাবি – জাস্টিস।  তবে কেবল “১৯৯০ সালকে” জাস্টিস দিতে চাইছেন!

    কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে পরে প্রতিবাদঃ 
    ডেইলি স্টারের ওই সঞ্চালক তার অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বারবার অনুরোধ করছিলেন কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে যেন তাঁর কথার প্রতিবাদ বা ভিন্নমত নিয়ে কেউ আসেন। অথচ তিনি নিজেই আসলে কাশ্মিরের ইতিহাস কতটুকু জানেন? কাশ্মির মানে কী কেবল ১৯৯০ সাল??? না। অবু তার কাছে কাশ্মিরের ইতিহাস মানেই কেবল ওই ১৯৯০ সাল ও কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু-ত্যাগ এটুকুই মাত্র। তামাশার আসলে কোনো শেষ নেই।
    তিনি টেরই পেলেন না যে, তিনি পরিচালক অগ্নিহোত্রীর হিন্দুত্ববাদের পাল্লায় পড়ে অন্ধ হয়ে গেছেন বা হতে চেয়ে হয়েছেন। অথচ তিনি মনে করছেন, নির্যাতিত হিন্দুদের পক্ষ নিয়েছেন; তাহলে এটা নিশ্চয় প্রগতিবাদী অবস্থান।  কিন্তু কে তাকে বুঝাবে ঠিক এখানেই প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ এরা এমন এক হয়ে গেছে! তাই তিনি হিন্দুত্ববাদকেই প্রগতিবাদ ঠাওরাচ্ছেন!! বেচারা ডেইলি স্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’; যেখানে হিন্দুত্ববাদই প্রগতিবাদ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!

    পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!
    গৌতম দাস

    ১ এপ্রিল ২০২২   সময় ০০ঃ০৬ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ZZ

     

     

    দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্বে থাকা এক আমেরিকা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের এক রাষ্ট্রদুতকে হুমকি দেয়া এক চিঠিতে লিখেছে যে ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাশ না হলে পাকিস্তানকে নাকি চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে [ …wherein Pakistan was warned of “grave consequences” if the no-trust motion failed.]। এই চিঠিকে কেন্দ্র করে এটা পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্ষমতায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগে তোলপাড়। এবং এখন খুব সম্ভবত আগামি ৩ এপ্রিলে পাকিস্তানে সংসদে অনাস্থা ভোটে ইমরানকে পরাজিতই হতে দেখব আমরা।
    আসলে এটা কেবল পাকিস্তান নয়। আমাদের ধারণা সবাই পাকিস্তানের জায়গায় নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রকে বসিয়ে ব্যাপারটা ভাবতেছে। তাই এই পাকিস্তান ইস্যু গুরুত্বপুর্ণ।

    এনিয়ে আমার এক ফেসবুক স্টাটাসে আলোচনায় এক পাঠক একটা প্রশ্ন রাখেন। নিচে সেই প্রশ্নটা তুলে ধরা হল। আর এরপরে এনিয়ে আমার জবাবও সাথে দেয়া হল।

     

    প্রশ্নঃ  চীন কেনো হাত গুটিয়ে বসে থাকে বিভিন্ন দেশে এরকম অবস্থায়? চীনের তো বিশাল বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থ আছে। চীন তাহলে কিভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার সঙ্গে পেরে উঠবে? এছাড়া কোন দেশের সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে এরকম বিপদে পরলে, চীনের পক্ষ থেকে যদি যথাযথ সাহায্য না পায় তাহলে কে যাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে।

     

    আমার উদাহরণসহ একটু বড় জবাবঃ 
    সব স্বার্থ-সংঘাতকেই সামরিক সংঘাত মনে করা খুবই বড় ভুল বিচার। অথবা একে সামরিক দিক থেকে দেখা-নেওয়া বা ঠেলে দেওয়া ঠিক না; বুদ্ধিমানের কাজও না। কারণ এর চেয়েও সহজ পথ আছে।
    এছাড়া সবার আগে চীন-আমেরিকার স্বার্থ-সংঘাতটাকে বুঝতে হবে। মূলত এর ধরণটাকে বুঝতে হবে। এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে থাকে আমেরিকা, এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে।  চীনা উত্থান আমেরিকাকে তাড়া করে ফিরছে।  তাই এর নানা ধরণের ছাপ ও প্রকাশ ঘটছে চারদিকে বিশেষত এশিয়াতেই যা বেশি এবং সবদেশেই কমবেশি।  ফলে আমাদের মত দেশে একেকজন ইমরান – প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান এই টানাটানি চাপের মধ্যে পড়বেই। তাতে আপনি ইমরান অথবা হাসিনা  প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান যেই হন!
    এখন আপনি প্রশ্নকর্তা  আশা করছেন আমেরিকান ন্যায় অথবা অন্যায় চাপের মুখে চীন কেন পাকিস্তানের ইমরাঙ্কে  রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে না – এই হল আপনার প্রশ্ন!
    এনিয়ে আগে বাংলাদেশেরই একটা উদাহরণ দিব। পরে আবার কিছু তত্ব কথায় আসব।

    ঘটনাটা বাংলাদেশের টিকা প্রাপ্তি নিয়েঃ
    তখনও  দুনিয়াতে  চীনা উতপাদিত কোন টিকাই বাজারে আসে নাই।  এমনকি পশ্চিমা ফাইজার বা মর্ডানাও নয়। বরং চীনা টিকারই (Sinovac) তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হবে যা সফল হলে পরে টিকার বাণিজ্যিক উতপাদন শুরু হবে। চীন বাংলাদেশকে এই থার্ড ফেজে ঐ প্রক্রিয়াতে যুক্ত হতে অফার দিয়েছিল। থার্ড ফেজ মানে আগের মূল দুই গুরুত্বপুর্ণ ফেজ-এর পরীক্ষানিরীক্ষা সফল হয়ে গেছে। তাই এবার বাজারে ছাড়ার আগে একটু দেখে নেয়া যে (বাংলাদেশেও) এই টিকা পুশ করলে ব্যবহারিক পর্যায়ে ছোটখাট হলেও খারাপ প্রতিক্রিয়া হয় কিনা বা হলে আগেই তা এড়ানো যায় কীনা ইত্যাদি এসব ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এই থার্ড ফেজ। যার অর্থ চীন এই পরীক্ষামূলক টিকা বাংলাদেশ কেবল নির্বাচিত কিছু হেলথ-স্টাফদেরকে দেয়া হবে আর তাদেরকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যেহেতু এটা তখনও পরীক্ষামূলক তাই। আর বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল চীনা টিকার এক শেষ ফেজে টেকনিক্যাল সহায়তা করার।  বাংলাদেশকে দেয়া ঐ অফারে বলা হয়েছিল এই পরীক্ষা সফল হলে কয়েক লাখ ফাইনালি উতপাদিত টিকা  আমাদের দেয়া হবে বিনা খরচায় আর সাথে  লাইসেন্স ও সহায়তা দেয়া হবে যাতে নিজেরাই আমরা দেশে প্রডাকশনে যেতে পারি  একটা বড় খরচ ও সামর্থ ছাড়াই।
    কিন্তু ভারত পুরা ব্যাপারটা ভন্ডুল করতে নগদ “কমিশনের” লোভ দেখিয়ে সরকারকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশই ভারতে আগাম অর্থ দিয়ে ওদের ফ্যাক্টরির উতপাদন
    ক্ষমতা বাড়িয়ে দিবে আর তাতে উতপাদিত টিকা আর কমিশন দুটাই ভোগ করবে। আর তা করতে মাঝখানে সরকার-প্রিয় বাংলাদেশের প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে ভারতের সাথে চুক্তি করা হয়।  আর এতে মন্ত্রণালয় অতি খুশিতে থাকায় চীনের সাথে টিকার (থার্ড ফেজ) ফর্মাল চুক্তির সম্মতি স্বাক্ষরের সময়সীমা মিস করে যায়। পরে দেরিতে হলেও সেসব পত্র দিতে যোগাযোগ করলে চীনের দিক থেকে জানানো হয় যে যে তাদের টিকা উতপাদন কোম্পানি (ওটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানির টিকা পরীক্ষা ছিল) আমাদের সময়সীমা মিস করাতে ঐ অফার অন্য দেশকে দিয়ে দিয়েছে (সম্ভবত ইন্দোনেশিয়া)। ফলে এখন আর কী করা যায় এনিয়ে এক প্রাথমিক আলাপে বলা হয় ফান্ডই প্রধান সমস্যা।  এখন নতুন করে ফান্ড যোগাড় করতে সময় লাগবে। আপনারাও দেখেন আমরাও দেখি ফান্ড কোথা থেকে যোগাড় করা যায়। এককথায় ব্যাপারটা অনিশ্চিত হয়ে যায়।
    এখন এনিয়ে বাংলাদেশ খবর ছড়িয়ে পড়লে এটা বিব্রতকর হবে কারণ তখনও আমাদের টিকা কোথা থেকে আসবে তা একেবারেই অনিশ্চিত ছিল। তাই অনুমান করা হয় এথেকে রক্ষা পেতে ভারতের সাথে মিলে একটা গল্প সাজানো হয়। ভারতের রয়টার্সের রুমা পাল আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন চীনারা অর্থ চেয়েছে এজন্যই বাংলাদেশ-চীন টিকা ডিল ভেঙ্গে গেছে?
    আমাদের মন্ত্রী সায় দিয়ে বলে হা সেজন্যই। এরপর তারা আইসিডিডিআরবি-কেও জিজ্ঞাসা করে কেন টিকা-সম্পর্ক কাজ করছে না? কিন্তু এনিয়ে আইসিডিডিআরবি কোন মন্তব্য করতে রাজি হয় নাই। এরপর ঢাকার চীনা এমব্যাশি কেও একই প্রশ্ন করেছিল কিন্তু তাদেরও জবাব ‘নো কমান্টস’।
    আমাদের অঞ্চলে  আমেরিকান ফান্ডেড ও নিয়ন্ত্রিত আরেক মিডিয়া আছে “বেনার নিউজ” নামে। তারাও এনিয়ে রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও প্রায় একই রকম।

    অর্থাৎ এসব প্রশ্নের জবাবে চীন চাইলে প্রতিবাদ করে আসল ঘটনা ফাঁস করে দিলে আমাদের সরকার বিব্রত হয়ে যেত। কিন্তু চীনা অবস্থান ছিল মিডিয়া এড়িয়ে যাওয়া। কেবল সবুর করা ধৈর্য ধরা আর এতে মেওয়া মিলবে তা বিশ্বাস করা। ঘটেছিলও তাই।

    ভারতীয় টিকা আমরা নিতে শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে করোনা সেকেন্ডে ভ্যারিয়েন্ট বা ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে যায়। দাবি উঠে বাংলাদেশকে টিকা বন্ধ করার যদিও আমরা আগাম বিনিয়োগ করে কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়ে টিকা পাবার চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু ভারত সরকার আর টিকা দিতে পারে নাই, বন্ধ করে দিয়েছিল। ততদিনে দুনিয়ায় টিকা পুর্ণ আবিস্কৃত আর প্রত্যেক দেশই কোথা থেকে নিজের প্রয়োজনীয় টিকা পাবে তা চুক্তিবদ্ধ হয়ে রয়েছিল। কেবল আমরা বাদে। ফলে সরকারের এতা বলার সুযোগ ছিল না যে টিকা আবিস্কৃত-ই হয় নাই।  তাই উপায়ন্ত না পেয়ে সরকার চীনের হাত-পায়ে ধরা শুরু করেছিল।
    সংক্ষেপে বললে এতে ফলাফল হল, চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে অনেক ছাড় আমাদের দিতে হয়েছে যদিও বিনিময়ে আমরা এখন প্রয়োজনীয় টিকা যতটা পুশ করতে সক্ষম এর সবটা পাচ্ছি চীন থেকে আর তা সম্ভবত এখন ফ্রি। সাথে আমাদের একটা প্রাইভেট ওষুধ কোম্পানিকে টিকা উতপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে চীনা সহায়তায়।

    তাহলে কী দাড়ালো?
    কুটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোমালিন্য হলেই লাঠি-বন্ধুক বের করা চলে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ, সব সম্পর্কই সামরিকভাবে কে কত বড় বা সক্ষম তা দিয়ে সাব্যস্ত হয় না, তা নয়ও তাই।
    বিশেষ করে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব টা সামরিক নয়। আমেরিকার অর্থনৈতিক হাল চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, একেবারেই তুলনীয় নয়। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকা এখনও ছয়গুণ বেশি সক্ষম। আমেরিকার গ্লোবাল প্রভাব এখনও কম নয়। যদিও দ্রুতই তা কমছে।

    কাজেই আমেরিকার উদ্বৃত্ব সম্পদ না থাকার সমস্যাটা, অন্যদেশকে অর্থ-বিনিয়োগ-অনুদান দিবার অযোগ্যতাটা  এসবগুলো আমেরিকার বাড়তি সামরিক সক্ষমতা দিয়ে পূরণীয় নয়। কাজেই মূল সামর্থটা উদ্বৃত্ব সম্পদ কার কেমন আছে!

  • বাইডেনের আমেরিকা কী ইউরোপকে হারাবে!

    বাইডেনের আমেরিকা কী ইউরোপকে হারাবে!

    গৌতম দাস

    ২৮ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Zm

    US President Joe Biden Asks US Citizens To Leave Ukraine As Talks Between UK, Russia Fail

    জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে দুদিন আগে গত ২৪ মার্চ ইউক্রেন-বিষয়ক এক প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়েছে। আর বাংলাদেশ তাতে পক্ষে ভোট দিয়েছে; অর্থাৎ আগের ভোটাভুটিগুলোর চেয়ে এটা ব্যতিক্রম; যদিও এনিয়ে অনেক পত্রিকার রিপোর্টিংয়ে ভুল ইঙ্গিতে খবরটা উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন ‘প্রথম আলো’র শিরোনাম হল – “জাতিসঙ্ঘে ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দিলো বাংলাদেশ”। আর ফ্যাক্টস হল  – এটি ঠিক ইউক্রেনের পক্ষের বা বিপক্ষের কোনো ভোটাভুটিই ছিল না। তাহলে কী ছিল? সাধারণ পরিষদে একটা প্রস্তাব তোলা হয়েছিল এই বলে যে, ইউক্রেনের ‘সিভিলিয়ান সুরক্ষা আর মানবিক সাহায্যের প্রবেশের দাবি’ [demanded civilian protection and humanitarian access ] করা হচ্ছে। আর সেখানে এই প্রস্তাবের প্রস্তাবক ছিল ফ্রান্স, মেক্সিকো, ইউক্রেনের সাথে মিলে মোট ৯০টা দেশ। আর সুনির্দিষ্ট করে যেকোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বেলায় যেমনটা হয়ে থাকে যে, সিভিলিয়ান ক্ষতিগ্রস্ত যেন না হয় আর মানবিক সাহায্য চলাচলে যেন সুযোগ করে দেয়া হয় – এটা তেমনই অধিকার দাবি করে করা এক প্রস্তাব। কাজেই বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। আর এমন দাবি যেকোনো যুদ্ধে সব পক্ষই মেনে চলতে বাধ্য হতে হয়, কেননা এটা জাতিসঙ্ঘেরই এক সাধারণ অবস্থান। ফলে এটা ঠিক সরাসরি ‘ইউক্রেনের পক্ষে ভোটদান’ হয়েছে বলে দেখতে হবে – নট নেসেসারিলি [not necessarily]; অর্থাৎ এটা অনিবার্য নয়। তবে পরোক্ষে এই ভোটদানের সুফল ইউক্রেনের পক্ষে যেতে পারে, অবশ্যই।

    আসলে নিউজ রিপোর্টিংয়ের শিরোনাম বিতর্কিত না রাখতে চাইলে শুধু বললেই হত যে, বাংলাদেশ ‘ইউক্রেন-বিষয়ক একটি প্রস্তাবের পক্ষে’ ভোট দিয়েছে। আর বলাই বাহুল্য, ‘ইউক্রেন-বিষয়ক একটা প্রস্তাবের পক্ষে’ ভোট আর “ইউক্রেনের পক্ষে” ভোট – এদুটা কোনোভাবেই একই কথা নয়। ফলে অযথাই এখানে টুইস্ট করা হয়েছে – বাংলাদেশ ‘ইউক্রেনের পক্ষে’ ভোট দিয়েছে। তবে এখান থেকে আরেক অনুষঙ্গীয় প্রসঙ্গ – অনেকে বলছেন, বাংলাদেশ অবস্থান বদলিয়েছে। মানে আগে বিপক্ষে ভোট দিলেও এবার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাই কি? না, ঠিক তাও না।

    যেমন – ধরা যাক কোনো সাংবাদিক আগামী কোনো সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এনিয়ে প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশ অবস্থান বদল করল কি না বা কেন করল? সেক্ষেত্রে কি পক্ষে ভোটদানের কারণে মন্ত্রীকে স্বীকার করে নিতেই হবে যে, তার সরকার অবস্থান বদল করেছে?

    সরি, ব্যাপারটা এমন হবে না, কারণ ব্যাপারটা তাই নয়। কারণ মন্ত্রী (সম্ভবত) বলবেন, ‘আসলে হয় রাশিয়া না হলে ইউক্রেনের পক্ষ-বিপক্ষে ভোট দিতেই হবে – প্রস্তাবটাই এমন ছিল না। বাংলাদেশ পক্ষে ভোট দিয়েছে মানে বাংলাদেশ “সিভিলিয়ান সুরক্ষা’ আর ‘মানবিক সাহায্য অবাধ প্রবেশের’ পক্ষে ভোট দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের পক্ষে-বিপক্ষে নয়”। কিন্তু এরপরেও কেউ যদি জানতে চান, এই অবস্থানের জন্য বাইডেনের আমেরিকা কি একটু খুশি হবে? এর জবাব হবে – অবশ্যই খুশি হবে! তবে এটা পরোক্ষে খুশি করা, তা-ও খেয়াল রাখতে হবে।

    ইউক্রেনের সর্বশেষ অবস্থা কীঃ
    ইউক্রেনে যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা হল, এটা ইউক্রেনের দিক থেকে বললে – এটা তাদের আরো অধৈর্য হয়ে উঠা এবং বাইডেনের হাত প্রায় ছেড়ে কালকেই রাশিয়ার সাথে বসে সব মিটমাট করে নেয়ার আকুতি তুলে ধরা এক অবস্থায় পৌছে থাকা। যদিও বাইডেন বা পশ্চিমা শক্তির সেদিকে মনোযোগ নেই। আর রাশিয়ার দিক থেকে এটা এক হঠাৎ ঝিমিয়ে পড়া অবস্থায় পড়েছে। যেটা একধরণের ‘স্ট্যাটাস কো’[status quo] মানে, যে যে অবস্থায় আছে সেখানেই আটকে থাকার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ দু’সপ্তাহ আগের অবস্থার সাথে যদি তুলনা করি, বিশেষ করে আমেরিকার ‘এবিসি নিউজ’ টিভির সাথে ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যেখানে নিজ দেশের ভাষায় সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তার কথা বলছি। এনিয়ে আমার লেখা এখানে । ঐ সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের অভিমুখ যা ছিল তাতে এতদিন ইউক্রেন পরিস্থিতিতে একেবারে রাশিয়ান সেনা প্রত্যাহার না হলেও অন্তত লম্বা যুদ্ধবিরতি আর পুতিন-জেলেনস্কি দু’পক্ষকে সরাসরি ডায়ালগে বসতে দেখতে পেতাম। কারণ ওই সাক্ষাৎকার প্রচারের পরের দিন অন্তত দু’বার রাশিয়ান সরকারের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের অবস্থান ইতিবাচক বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। মানে জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার রাশিয়া ইতিবাচকভাবে নিয়েছে – এর স্বীকৃতি বলে ধরে নিতে পারি। তাহলে আবার এখন সব ঝিমিয়ে পড়া অবস্থায় বা স্ট্যাটাস কো – এমন বলছি কেন? কারণ এর পরে কোনো অগ্রগতি নেই – মানে এর কোনো ‘পরবর্তী’ নাই।

    এমনকি ওই একই সময় রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনে ইউরোপের কোনো বিকল্প নাই। ফলে তারা রাশিয়ান গ্যাস কিনবে বলে অন্তত তিনটি দেশ – ফ্রান্স, জর্মানি ও নেদারল্যান্ডসের প্রকাশ্য বক্তব্য দেখেছিলাম। অথচ সেসব বক্তব্যেরও আর কোনো ফলোআপ পরে আর দেখা যায়নি। বরং সর্বশেষ অবস্থান দেখা যাচ্ছে বাইডেনের এবং তা এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। এবিসি নিউজের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বলেছিলাম এর মধ্যে জেলেনস্কির কূটনৈতিক ডায়ালগের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহ আছে। কিন্তু তাতে সবার আগে বাইডেন ও জেলেনস্কির, এ দুই প্রেসিডেন্টের ইমেজ বাঁচানোটাই ছিল মুখ্য ইস্যু। সেটা নিশ্চিত হলে তবেই ওই যুদ্ধ সমাপ্তি ও ডিপ্লোম্যাটিক আলোচনা শুরু হতে পারে – এই ছিল আমেরিকান পরিকল্পনা।

    কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, হিসাবে এতে সব ঠিকঠাক থাকলেও বাইডেন সম্ভবত দেখছেন, এতে তার ইমেজ বাঁচানো যাচ্ছে না। কারণ এখন যদি বিনাযুদ্ধে ও কূটনৈতিক আলোচনাতেই যুদ্ধ শেষ করা যায় তাহলে যুদ্ধটা শুরু করার দরকার কী ছিল? সে প্রশ্ন কেউ না তুললেও বাতাসে তা হাজির হবেই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, জেলেনস্কি এবিসি নিউজকে ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছেন, তার আর ন্যাটোর কোনো সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই। ব্যাপারটি অনেকটা শখ মিটে যাওয়ার মতো হয়ে গেছে। আর তিনি বলছেন, ইতোমধ্যেই তিনি ‘এই আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে নিজেকে কুল ডাউন করতে পেরেছেন। আর বুঝেছেন যে, ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।’ আর এ পরিস্থিতিটাকেই বাইডেন নিজের জন্য পরাজয় হিসেবে দেখছেন!

    বাইডেন এখন ইউরোপেঃ
    অতএব, বাইডেন ইউরোপ সফরে এসেছেন। অর্থাৎ জেলেনস্কি কিভাবে কত দ্রুত  রাশিয়ার সাথে আপোষ ডিল শেষ করতে চাইছেন অথবা সাদা চামড়ার ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা কত দ্রুত ঘরে ফিরতে চাইছেন – সেগুলো নয়, বাইডেনের চাওয়া এখানে ডমিনেট করবেই, এমন দশায় এখন সংশ্লিষ্ট সকলে। তাই গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ইইউ হেড কোয়ার্টার-ব্রাসেলসে বসে বাইডেন বৈঠক করে গেছেন যার মূল বিষয় ইইউ সদস্যদের রাশিয়ান গ্যাসের বিকল্পের সন্ধান দেয়া শুধু নয়, একেবারে ব্যবস্থা করে দেয়া। বাইডেন বলতে চাইছেন রাশিয়ার তেল-গ্যাসে বিশেষত গ্যাসের উপর ইউরোপের নির্ভরতার সমাপ্তি তিনি নাকি ঘটাবেনই!

    আর এতে ‘ত্রাতা’ বাইডেন যা করতে চাইছেন তা যেন উচ্ছ্বাস দেখিয়েই হাজির করতে হবে। তাতে এটা যে, আসলে প্রপাগান্ডা তা লুকিয়ে কাজটা করতে চাইলেও লুকানো থাকেনি। বিবিসি বাংলা আর আমাদের ‘প্রথম আলো’ সেই উচ্ছ্বাস তৈরি করতে তেমন করেই শিরোনাম সাজিয়েছে। “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধঃ রাশিয়ার বদলে এখন থেকে ইউরোপের গ্যাস আসবে আমেরিকা থেকে” – এই হল বিবিসি বাংলার শিরোনাম। আর তা দেখে সব বিচার-বিবেচনা ভুলে প্রথম আলোর শিরোনাম – ‘রাশিয়াকে হটাতে ইউরোপে গ্যাস দেবে যুক্তরাষ্ট্র’। প্রপাগান্ডায় আরো সরস দেখাতেই যেন ‘হটাতে’ শব্দটার ব্যবহার। শুনলে মনে হবে – হ্যাঁ, এবার ‘ঘ্যাগের ওষুধ’ পাওয়া গেছে! বিবিসি লিখেছে,  “প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উপস্থিতিতে ব্রাসেলসে শুক্রবার হওয়া এক চুক্তির আওতায় এবছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অতিরিক্ত ১৫০০ কোটি ঘন মিটার এলএনজি বা তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহ করবে। এ বছরের মধ্যে রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরতা দুই -তৃতীয়াংশ কমানোর টার্গেট নিয়েছে ইইউ”।

    কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই কি তাই?
    জবাব হল – না, ঠিক তা নয়। বিবিসি বাংলার রিপোর্টের ভেতরেই তা নিয়ে খোলাসা করে কথা বলা হয়েছে। যেমন – ‘যুক্তরাষ্ট্র কি ইউরোপের চাহিদা মেটাতে পারবে? “রুশ জ্বালানির ও পর নির্ভরতা পুরোপুরি ঘোচানো কতটা সহজ হবে ইউরোপের জন্য? আমেরিকার ওপর কতটা ভরসা তারা করতে পারে?  নিজেই এই প্রশ্নটা তুলে বিবিসি বাংলা নিজেই উত্তরটা দিয়ে দিয়েছে। বলেছে, “বিবিসি নিউজের অনলাইন ইউরোপ এডিটর পল কিরবি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তিনি তুলে ধরেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি বড় চুক্তির ঘোষণা কিছু সময় আগে জানা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপক বাড়ালেও, ইইউভুক্ত ২৭টি রাষ্ট্রের জন্য এটি সামান্য মাত্র।’ অর্থাৎ বাইডেনের কথায় বাকচাতুরী আছে।

    “বিবিসির সংবাদদাতা পল কারবি বলছেন, ইইউ-এর ২৭টি দেশকে তাদের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে আমেরিকার বাইরে অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের দিকেও তাকাতে হবে।” – বিবিসি বাংলা

    এদিকে বাইডেনের ইউরোপ সফর নিয়ে ইংরেজি বিবিসি আরেকটা রিপোর্ট করেছে ‘পাঁচ চ্যালেঞ্জ’ [Ukraine war: Five challenges for Biden in Europe] শিরোনামে এবং বলতে গেলে তা খুবই খারাপ রিপোর্ট না হলেও বাইডেনের জন্য কঠিন বাধাগুলোই তুলে আনা হয়েছে সেখানে। যেমন, প্রথম চ্যালেঞ্জটা বলা হয়েছে “ঐক্য দেখানো”। মানে হল – ইউরোপের সাথে আমেরিকা যে ঐক্যবদ্ধ আছে তা দেখাতে হবে। অথচ ওখানেই বলা হয়েছে “যেখানে যত দিন যাচ্ছে ততই অনৈক্যের সম্ভাবনা বাড়ছে”।
    আসলে বড় অনৈক্যই প্রকাশিত হয়ে গেছে। অথচ তেল-গ্যাস নিয়ে যতই আমেরিকা বিকল্প আছে বলে এটা-সেটা দেখাক না কেন, কথার মধ্যে বড় ফাঁক আছে। আর তা সামলাতে না পেরেই তো অনেক আগেই ইইউ নেতারা বিশেষত জার্মানির সোজা কথা – “অন্তত ২০২৭ সালের আগে রাশিয়ার ওপর থেকে জ্বালানি-নির্ভরতা কমানোর সুযোগ নেই”। আর এ নিয়ে তবু বিবিসি বাংলা নিউজ প্রপাগান্ডার লাইন ধরেছে। এই প্রথমত বিবিসি বাংলার খবরে সুনির্দিষ্ট করে প্রকাশিত হয়েছে যে, ‘জার্মানি ও ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশের আপত্তির মুখে, রুশ তেল ও গ্যাস এখনো এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে। কারণ রুশ জ্বালানির ওপর, বিশেষ করে গ্যাসের ওপর, তাদের নির্ভরতা”। অর্থাৎ ইউরোপের রাশিয়ান তেল-গ্যাস ক্রয়কে এখনো নিষেধাজ্ঞার বাইরেই রাখা আছে এবং বিবিসি আরো জানিয়েছে, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎস বুধবারও বলেছেন, “রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে ইউরোপ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে”। এ ছাড়া রয়টার্স আরো সোজাসাপ্টা করে কথাটা এক এক্সপার্ট অ্যানালিস্টের বরাতে বলে দিয়েছে। লিখেছে, ‘সাধারণত একটি নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হতে দুই-তিন বছর লাগে। অতএব এই ডিলটা সম্ভবত উপস্থিত চালু সাপ্লাইকে নতুন দিকে নিয়ে যাওয়া যতটা না, এটা নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করার কথা বলেছে।’

    ইইউ এর স্ববিরোধী অবস্থানঃ
    ইইউ আমেরিকার সাথে তালে নাচতে চায় আবার রাশিয়ান গ্যাস জ্বালিয়ে ইউরোপের ঠান্ডায় নিজের ঘরগরম রাখতে চায়।  এই হল মূল স্ববিরোধ বা দু-মুখো অবস্থান। রাশিয়ার উপরে আমেরিকান ডলার অবরোধের সীমা-পরিসীমা নাই। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামিলার একদিন আগে থেকেই এর শুরু হয়েছিল। আর ইইউ-ও আমেরিকার এই অব্রোধ অনুসরণ করে তাদের ইউরো- অবরোধের ঘোষণা করেছিল। যার সোজা অর্থ রাশিয়া ইইউ-সহ কোন দেশের ক্রেতার সাথে  ইউরোতে কেনাবেচা করতে পারবে না।
    তাহলে এখন এই শর্ত অনুসারে ইউরোপ রাশিয়ান গ্যাসও কিনতে পারে না।  কিন্তু এই ক্ষেত্রে এসে ইইউ মোচড়ামুচড়ি শুরু করেছে। তাদের দাবি ও তারা বলতে চায় গ্যাসের উপর ইউরো অবরোধ কার্যকর নয়।  তারা কার্যকর করে নাই। আর এখানেই রাশিয়ার সাথে ইইউ-এর ব্যাখ্যা-বিতর্কের শুরু। রাশিয়া সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যারা অবন্ধুসুলভ-দেশ [unfriendly] তারা গ্যাস কিনতে চাইলে তাদেরকে তা রাশিয়ার মুদ্রায় রুবলে কিনতে হবে। যেমন জর্মানি যারা প্রায় ৫৫% রাশিয়ান গ্যাসের উপর নির্ভরশীল কিন্তু তারাই আবার ইইউ-এর সদস্য হিশাবে রাশিয়ার উপর ইউরো অবরোধ আরোপকারি অবশ্যই। তারা  কেবল নিজেদের সুবিধার্থে  গ্যাস কেনার বেলায় অবরোধ নাই (মানে বাকি সবকিছু ইউরোতে কেনাকাটাতে  অবরোধ আছে) বলছে।  যার মানে হল রাশিয়া গ্যাস বেচে যে ইউরো পাবে তা দিয়ে সে ইউরোপের অন্য কোন পণ্যও কিনতে পারবে না। বলাই বাহুল্য এটা তো এক অর্থহীন ও অসম খামখেয়ালি অবদার হয়ে গেল!
    তাই স্বভাবতই পুতিনকে বলতে হয়েছে সেক্ষেত্রে জর্মানির মত বন্ধু-নয় দেশকে রুবলে গ্যাস কিনতে হবে। ফলে এটা বলা যায় যে পুতিনকে একন কথা বলতে ইইউ-ই বাধ্য করছে বা ডেকে এনেছে। এনিয়ে রয়টার্স এক রিপোর্ট করেছে যাতে রাশিয়ান গ্যাস কিনে ও নির্ভরশীল এমন প্রায় সব দেশের প্রতিক্রিয়া তুলে আনা হয়েছে।  স্বভাবতই  এতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতারা বিপদে পড়েছে। তারা কেউ কেউ এটা গ্যাস কিনার চুক্তিতে নাই – এমন বক্তব্য দিয়েছে।  এর উপর আবার আরেক বিপদ হল যে গ্লোবাল মার্কেটে গ্যাসের দাম কমপক্ষে ৩০% বেড়ে গেছে। মানে হল ভোক্তা দেশকে এখন বেশিদামে কিনতে হবে। অবস্থাটা এককথায় বললে, ভোক্তা দেশে গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে উঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।  আবার মনে রাখতে হবে গ্যাসের সাপ্লাইয়ের বেলায় যেকোন বিকল্প উৎস যোগাড় হয়ে গেলেও অবকাঠামো নির্মাণ শেষে তা চালু করে থিতু হতে গেলে কমপক্ষে ২-৩ বছর সময় লেগে যায়। অর্থাৎ আরামে ইউরোপে বসবাস আর আরামে থাকছে না…!
    ওদিকে তেলের দামের যদি তাকাই। এর আগে ৮০ ডলারে ব্যারেল দামে রাখাই দুনিয়া হিমশিম খাচ্ছিল। সেটা এখন হয়েছে ১২০ ডলার প্রায়।  এর সোজা মানে হল সারা দুনিয়ায় সরকারগুলো বিপদে এক হৈচৈ অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের মত দেশ ও এর গরীব পাবলিক এরা খাদ্য কিনতেও সঙ্কটে পড়বে। এর জন্য কে দায়ী হবে? বলাই বাহুল্য ডলার অবরোধ।
    সারা দুনিয়াকে এভাবে অস্থির ও অনিশ্চিত রেখে বাইডেন কী কামাইতে চাইতেছেন?? কী ইমেজ রক্ষা করবেন তিনি??
    ইউরোপের সরকারগুলো কিভাবে  তাদের বাইডেনকে অনুসরণের পক্ষে কী সাফাই দিবেন? আর তা কেন ও কিভাবে তাদের আমজনতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে??

    ইউরোপে বাইডেনের আরেক গন্তব্যস্থল হল পোল্যান্ডঃ
    এছাড়া ইউরোপ সফরে বাইডেনের আরেক গন্তব্যস্থল হল পোল্যান্ড। হ্যাঁ, সেই পোল্যান্ড যে এখন ২০ লাখ ইউক্রেনীয় রিফিউজি নিয়ে পেরেশান। বলা হচ্ছে – ‘সেটা নাকি এখন তার ছোট অর্থনীতিকেই ভেঙে ফেলতে উদ্যত” […refugees has put a considerable financial and logistical burdens on Poland and, if not handled competently, could ultimately lead to social unrest and economic instability.]।    কিন্তু এই পোল্যান্ড ও পাশেই রোমানিয়া – এরা এখন ন্যাটোর সদস্য যারা আগে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বাফার রাষ্ট্র। মানে কলোনিদখলদার পশ্চিম-ইউরোপ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মাঝের বাফার রাষ্ট্র। যেটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে। বলেছেন, ২০১৪ সালের পরপরই এরা ন্যাটোর সদস্য হয়ে গেছে অথচ তখন রাশিয়া কিছু বলেনি, তাহলে এখন কেন পুতিন ইউক্রেনের বেলায় এত আপত্তি করছেন? অথচ জবাবটা খুবই সহজ। আপনি তখনই বাধা দেন যখন আপনার সামর্থ্য-মুরোদ সংগৃহীত হয়েছে বলে আপনার মনে হয়। এটা তো পানির মতই স্বচ্ছ কথা, নয় কী?  যেমন – ২০১৪ সালের রাশিয়া ছিল আমেরিকার দিক থেকে কঠোর অবরোধ আরোপের বছর আর সেটাই আবার চীনের সাথে রাশিয়ার নয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুরুর বছর। যেটা চীন-ইরানের বেলায় তাদের ২৫ বছর তেল-গ্যাস সরবরাহের বিনিময়ে চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার চুক্তি সেি চুক্টাতির মডেল রূপটা আসলে সর্বপ্রথম তৈরি হয়েছিল চীন ও রাশিয়ার মধ্যে। তাই পুতিনের রাশিয়া ডলারশূন্য হয়েও বা ডলার থেকে বের করে দিলেও রাশিয়া পরে অর্থনৈতিকভাবে টিকে গিয়েছিল চীনের সাথে ঐ অর্থনৈতিক চুক্তির কারণে।  সোজা কথায়, ২০১৪ আর ২০২২ সালের পুতিনের রাশিয়া একই অর্থনৈতিক অবস্থায় নেই। এ কারণেই ২০১৪ সালে পোল্যান্ড-রোমানিয়াকে কিছু বলতে না পারলেও এখন ইউক্রেনের বেলায় পুতিন সোচ্চার। এসময় রাশিয়া চীনের সাথে অনেক ঘনিষ্ট এবং সর্বোপরি আমেরিকা এখন অনেক বেশি গ্লোবাল কনট্রোল ও প্রভাব হারিয়েছে। তাই এটাই পুতিনের জন্য ফেবারেবল সময়!
    যে কথা বলছিলাম, বাইডেনের আরেক গন্তব্যস্থল পোল্যান্ড কেন? আসলে আগেই বলেছি, বাইডেন ইউক্রেন ইস্যুতে  নিজে বা ন্যাটোকে রাশিয়ার বিরিদ্ধে যুদ্ধে যাবে না ফলে এমন কিছু না করেই মিথ্যা আশ্বাসে জেলেনস্কিকে যুদ্ধে নামিয়েছেন। জেলেনেস্কি বারবার এই অভিযোগ তোলাতে তা সবাই জানে। তাই বাইডেন হয়ত এই অভিযোগে নিজ দেশেই  ধোলাই হয়ে যাওয়ার ভয় করছেন। আগামি নভেম্বরের মিড টার্ম এমনিতেই বাইডেন ও দলের অবস্থা খারাপ। এর উপর অনুমান করা যায় সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও ট্রাম্প বাইডেনের এই বোকা পারফর্মেন্স নিয়ে তাকে ধোলাই করতে ছাড়ার কোণ কারণই নাই।   মূলত এ জন্যই সম্ভবত রাশিয়া-ইউক্রেন আপস আলোচনা শুরু করতে মরিয়া জেলেনস্কি প্রতিদিন সকালে উদাত্ত আহ্বান জানালেও তা ঘটছে না। আর এসব অপবাদ ঘুচাতেই বাইডেন ইউক্রেনকে দূর থেকে কিছু অস্ত্র ছুড়ে দিতে চান। কিন্তু পুতিন হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন – পড়শি কোনো রাষ্ট্র এমন অস্ত্র ‘পৌঁছে দেয়ার কাজ করলে’ সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক কাজ করেছে বলে তিনি গণ্য করবেন। তাই বাইডেন নিজে সফর করে হয়ত পোল্যান্ডকে সাহসী করে তুলে পোল্যান্ডকে দিয়েই কাজটা করাতে চাইছেন; এটাই মুখ্য কারণ। পুতিনও এসব ডেভেলবমেন্ট আর বাইডেনের মতিগতি বুঝার জন্যই থমকে দাড়িয়েছেন। জেলেনেস্কির আপোহ আলোচনার দাওয়াত গা করছেন না।  এককথায় বাইডেনের ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে সবাই একটা স্টেলমেটে আটকে গেছে। কঠিন বাস্তবতাটা হল, কেউ-ই আমেরিকায় বাইডেনের ইমেজ রক্ষা করতে পারবে না। এই অবস্থা বড় সময় ধরে থাকলে বাইডেনের পক্ষের ইউরোপ-সহ দেশগুলোর তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না। কারণ নিজ নিজ দেশের স্বার্থ আর  নিজে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপরে আর কোন স্বার্থ বলে কিছু কখনও থাকতে পারে না – এই বট্ম লাইন সবাইকে মানতেই হয়!

    শেষ পেরেক, ডলারের বদলে চীনা ইউয়ানঃ
    আর সবশেষে, চীন গভীর মনোযোগে ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে দাঁড় করাতে চাইছে। এনিয়ে ব্যাপক ততপরতা শুরু করে দিয়েছে। সম্প্রতিকালের চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঈ-এর দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সফরের উদ্দেশ্য এটাই। এমনকি  দুবছর পরে তিনি এবার ভারতও সফর করেছেন।  আসলে এটা ২০১৫ সাল থেকেই রাশিয়াকে সাথে নিয়ে শুরু করা এক চীনা পরিকল্পনা। আর ২০১৫ সাল থেকে এ জন্য যে, ওই বছরই আইএমএফ ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মানে দুনিয়ার যে কোন মানুষ তখন থেকে ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখতে পারবে ও তার আন্তর্জাতিক অর্থদায় ইউয়ানে শোধ করতে পারবে। কারণ চীনা ইউয়ান আইএমএফের সব শর্তই তখন থেকে পূরণ করেছিল। ফলে অন্য চারটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা – ডলার, পাউন্ড, ইউরো ও ইয়েনের সাথে পঞ্চম সমতুল্য মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান [অনেকে একে রেনবি renminbi (RMB) বলে] স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু ইউয়ানের সেই ধীরগতি ও বিকাশকেই চীন এখন ত্বরান্বিত করতে চাইছে মাত্র। তখনই বলা হয়েছিল যে, চীন সৌদি আরব থেকে বছরে যা তেল কিনে তা ইউয়ানে পরিশোধ করতে পারলেই ইউয়ান অনেক আগেই বিশ্বাস ও আস্থাযোগ্য এক প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা হয়ে যেতে পারে। স্বভাবতই এতে এটা বাইডেনের পাগলা পুতিনকে সাঁকো না নাড়ানোর মত কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়ে যেতে পারে।  এতে এখন পর্যন্ত সবদেশের যে ঝোঁক অভিমুখ তা হল ডলারের পাশাপাশি সবাই ইউয়ানে গ্লোবাল বাণিজ্য করার সুযোগ খুলে রাখার পক্ষপাতি। তাই এটাই ইউয়ানকে স্বাগত জানিয়ে রাখার মত একটা ঘটনা হয়ে গেছে। এককথায়, কিছু হলেই “ডলার অবরোধ” আরোপ – এটা অতি বাড়াবাড়ি ও অপব্যবহার হিশাবে দেখতে শুরু করে দিয়েছে গ্লোবাল পুঁজি বাজার। কারণ সবারই দরকার সম্পদ ধরে রাখার মত এক স্থিতিশীল মুদ্রা।   আগামি ইতিহাস একে বাইডেনের এক বড় ভুল বলে চিহ্নিত করবে যে তিনি গ্লোবাল বাজারে “মুদ্রা অনিশ্চয়তা” এনেছিলেন।
    আর সামনের নভেম্বরের মিডটার্ম থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এসব কথা তুলেই প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প বাইডেনের পাবলিক রেটিং আরো নিচে নামানোর চেষ্টা করে যাবেন, বলাই বাহুল্য! এই ভয় বাইডেনকে তাড়া করছে – ইউরোপে দৌড়াদৌড়ি করছেন তিনি! কিন্তু এসব কিছু করে কী ইইউ-কে সাথে অবরোধের পলিসিতে ধরে রাখতে পারবেন??  নাকি ইউরোপও ডলারের সাথে ভেসে যাবে? প্রকাশিত ইঙ্গিতগুলো ভাল না!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৬ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ বাইডেন কি ইউরোপকে হারাবেন!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেন বা ইউক্রেনের হার লুকানোর প্রক্রিয়া শুরু?

    বাইডেন বা ইউক্রেনের হার লুকানোর প্রক্রিয়া শুরু?

    গৌতম দাস

    ১৪ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Yo

    –

    শিরোনাম দেখে এটাই মনে হবে যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কি তাহলে শেষ? না, ঠিক শেষ নয়। তবে?
    তবে প্রায় শেষ!! বাইডেন-জেলেনস্কির কাছে এই যুদ্ধে তাদের হার কিভাবে লুকানো যায় সেই প্রক্রিয়া তারা উভয়ে শুরু করে দিয়েছেন – তা বলা যায়। অর্থাৎ বাইডেন-জেলেনস্কির আগাম অনুমানটা তাহলে এমন দাড়িয়েছে যে এই যুদ্ধে তাদের হার হচ্ছে এবং সেটা তারা মেনেও নিচ্ছেন? তাই কী? হ্যা, ঠিক তাই।

    তবে তাদের কথাটা আরেকভাবে বললে, মূলত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন আর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি [Zelenskyy] নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছেন  ধরে নেয়া যায় যে, এই যুদ্ধ তাঁরা এখন শেষ করবেন। মানে কি তাঁরা হার স্বীকার নিবেন? এটাই সবচেয়ে মুশকিলের কাজ। তাই যদিও এ কথাটা স্পষ্ট ভাষায় তারা উভয়ে স্বীকার করবেন না;  কিন্তু তারা যুদ্ধে হেরে গেছেন এটা মুখে স্বীকার না করেও কিভাবে যুদ্ধটা বাস্তবে শেষ করা যায় এটাই এখন তাঁদের মুল লক্ষ্য। এমন  এজেন্ডা তারা ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করতে কিছু তৎপরতাতেও উভয়েই শুরু করে দিয়েছেন। আর সে তৎপরতার প্রথম এবং প্রধান প্রকাশ ঘটে গেছে এক সাক্ষাৎকারে।  অতএব যুদ্ধে তাঁদের হার হচ্ছে এবং তারা যুদ্ধে হেরে গেছেন এটা দেখানো এড়িয়ে যুদ্ধ শেষ করার পথে রওনা দিয়েছেন এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল এই এবিসি নিউজের এই সাক্ষাতকার।
    আমেরিকার স্থানীয় মানে অভ্যন্তরীণ দর্শকের (গ্লোবাল দর্শক নয়) কথা মাথায় রেখে প্রচারিত হয়, এমন এক টিভি চ্যানেল হল এবিসি নিউজ। নিউ ইয়র্কের এবিসি নিউজ আমেরিকান সময় গত ৭ মার্চ রাত আটটায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির এক সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে । এজেন্ডা-ঘটনার প্রকাশ্য পাবলিক একটিভিটি শুরু হয়েছে এখান থেকে।

    The Zelenskyy Interview: David Muir Reporting | ABC News Exclusive

     

    বাইডেন ঠিক কিসে হারলেন?
    বাইডেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন। কিন্তু কী ছিল এই যুদ্ধ, বাইডেনের কাছে? সেটাই আগে স্পষ্ট জেনে নেয়া যাক। সংক্ষেপে শিরোনামে বললে, ডেমোক্র্যাট নেতা বাইডেন যেন বলতে চেয়েছিলেন, রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্প মাথা মোটা প্রেসিডেন্ট।  তাই তিনি সহজেই নত মস্তকে মেনে নিয়েছিলেন যে আমেরিকার নেতাগিরির দিন শেষ। অতএব আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা বা রাজনীতি বলে দুনিয়ার কোন কিছুতে নাই ও থাকবে না। তারা এখন জাতিবাদি, সাদা-মানুষেরাই দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ – এই শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি করবেন।   আর এখানেই বাইডেন পালটা বলতে চাইছেন,  তুলনায় তাঁর মাথা ঠাণ্ডা এবং সূক্ষ্ম ও কূটবুদ্ধি তাঁর বেশি। তাই তিনি দেখতে পেয়েছেন, আমেরিকার নেতাগিরির দিন আসলে ফুরিয়ে যায়নি। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব এখনো অটুট আছে ও থাকবে আর তা রাখাও যাবে; যদি বাইডেনের মত প্রেসিডেন্ট আমেরিকার সক্ষমতা হিসেবে যেসব টুলস বা হাতিয়ার এখনো অ-ব্যবহারে পড়ে আছে সেগুলো ব্যবহার করতে শুরু করেন। এমন দু্টা  আমেরিকান অস্ত্র হল এক. অবরোধ [sanction] আরোপ (মানে অপছন্দ বা শত্রু বিবেচিত দেশকে আমেরিকান ডলারে বৈদেশিক বাণিজ্য করতে না দেওয়া) আর দুই. মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা।
    তাই এই দুই হাতিয়ার ব্যবহার করেই বিনা অস্ত্রে ও কোন সামরিক তৎপরতা ছাড়াই তিনি চীন ও রাশিয়া ধরণের দেশ যারা প্রতিদ্বন্দ্বি বা সম্ভাব্য শত্রুদেশ – এদেরকে সহজেই পরাজিত ও পর্যুদস্ত করতে পারবেন আর এভাবে আমেরিকার নেতৃত্ব অটুট রাখতে পারেন।

    বাইডেন এই উদ্দেশ্যেই ইইউকে পাশে নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে যুদ্ধে এনেছিলেন। কিন্তু এখন বাইডেন  রাশিয়া-ইউক্রেন এই যুদ্ধেই নিজের হার দেখতে পাচ্ছেন। অতএব তিনি এখন রাশিয়া-ইউক্রেনের আপস কিভাবে ঘটানো যায় এছাড়া, যেন এই যুদ্ধে তাদের হারের বিষয়টা কতটা আড়ালে ফেলা যায় এই লক্ষ্যে ততপরতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন!

    মজার কথা হল, আমরা এখন অনুমান করতে পারি যে, বাইডেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরেই যখন তিনি এ দুই (অবরোধ ও মানবাধিকার) মহা-অস্ত্রের কথা ইইউ নেতাদের জানিয়েছিলেন তারা এটাতে বিশ্বাস করেছিলেন। পেছনের গল্প-ভাবনাটা ছিল সম্ভবত এরকম যে, আমেরিকার হাবিলদার হয়ে ইউরোপ যদি আরো কিছু দিন আমেরিকার কাছ থেকে দুনিয়ায় ‘রুস্তমি’র ভাগ পাওয়া যায় তা হলে আর চীনের পিছনে পিছনে লাইন ধরে ব্যবসা বদল করে, চীনের থেকে কিছু ব্যবসা হাওলাত করে বাঁচতে চাওয়ার দরকার কী!! সম্ভবত একারণেই চীনের সাথে ইইউ-এর সামগ্রিক বিনিয়োগ চুক্তি [EU-China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষরিত হয়ে যাবার পরও  বাইডেনের অনুরোধে সেই চুক্তি গত ২৭ মে ২০২১ স্থগিত করে ফেলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইইউ নেতারা।

    অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বিনা যুদ্ধে ও বিনা অস্ত্র ব্যবহারে প্রতিদ্বন্দ্বি চীন ও রাশিয়ার উপরে অবরোধ আর মানবাধিকার এ দুই অস্ত্র ব্যবহার করে বিজয় লাভের ভাবনায় মশগুল হয়ে তারা পশ্চিম ( মানে আমেরিকা ও ইউরোপ) তখন কাজে নেমে পড়েছিলেন।
    আর এ কাজেই বলির বখরা বানিয়েছিল পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে ১৪ রাষ্ট্রের মধ্যে যারা এখনও ন্যাটোর সদস্য হয়নি, এদেরই এক রাষ্ট্র – ইউক্রেনকে।
    গত ২০১৪ সাল থেকে ইইউ, আমেরিকাসহ ন্যাটো ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করে নেয়া হবে বলে প্রলুব্ধ করে আসছিল  – তাই ন্যাটোর সদস্যপদ ইউক্রেনের কাছে এক সোনার হরিণ করে গড়ে তোলা হয়েছিল। যদিও এমন কথার আবার এর উল্টা দিকও আছে।
    বলা হয় ১৫৪৭ সাল ষষ্ঠ ইভান [Ivan IV, Ivan Vasilyevich] এর আমল থেকে রাশিয়ায় জার সাম্রাজ্যের শাসন শুরু হয়েছিল। আর পরে, ১৬৬৭ সাল থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হয়ে যায়; অর্থাৎ ৪০০ বছরের বেশি ধরে এই অধীনস্থতা যার শেষভাগটা মানে, ১৯১৭ সাল থেকে তা সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্থতায় কাটিয়েছিল। আর সেটাই একালে হাজির হয়েছিল বর্তমান পুতিনের রাশিয়ান আধিপত্য থেকে বাইরে থাকার খায়েশ হিসেবে। কারও শাসন-আধিপত্য থেকে বের হবার খায়েশ করা মোটেও খারাপ বা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু তা বলে বাস্তবতা ফেলে হারিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াও যাবে না এবং এর মানে হয় না। তাই এখানে প্রধান সমস্যাটা হল, এবারের চেষ্টাটা আসলেই “আগের সব অধীনতা থেকে বের হওয়াই তো হবে না উল্টা, পশ্চিমের হাতেই ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া হবে”! বাইডেনের হাতে বলি হয়ে আরেকবার “শহিদ” হয়ে যাবার দাঁড়প্রান্তে ইউক্রেন। এদিকটাই বাস্তব সম্মতভাবে ভেবে দেখেনি তারা! কাজেই এখন অন্তত অপমান ও বিড়ম্বনা মধ্যে দিয়েও যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে ব্যাপারটা শেষ হয় তবে সেটাই জেলেনস্কির ইউক্রেনের জন্য মন্দের ভাল, বলে তারা ভাবা শুরু করে দিয়েছে!! যদিও আরো কিছু খারাপ কিছু তাদের জন্য অপেক্ষা না করে থাকে!

    এটা বলার এখন সম্ভবত সময় হয়েছে যে, এই চলতি যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে এক কঠিন বাস্তবতার উপলব্ধিতে পৌঁছে দিয়েছে যে তিনি বোকা হয়ে গেছেন, প্রতারিত হয়েছেন – ন্যাটোর সদস্যপদ এক সোনার হরিণ ছিল – এই লোভ দেখিয়ে তাকে প্রতারণা করে বেপথে নেয়া হয়েছে।

    কিন্তু আবারো সেই মূল কথা। বাইডেন এই যুদ্ধে হেরে গেছেন, যাচ্ছেন। তারও যুদ্ধের শখ মিটে গেছে হয়ত! তবে তিনি হেরে গেছেন এ কথা আড়ালে ফেলে যুদ্ধের কী করে সমাপ্তি টানা যায় এটা এখনও বাইডেনকে অর্জন করতে হবে – এটাই তার প্রধান লক্ষ্য এবং সবচেয়ে কঠিন কাজের অংশ!

    বাইডেন কেন এবিসি নিউজ বেছে নিলেনঃ
    এখন আমরা আসি, এবিসি নিউজে। উপরে দেয়া ব্যাখ্যাগুলোর প্রমাণ মিলিয়ে নিব।  বাইডেন এবিসি নিউজকেই বেছে নিয়েছেন কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাঁকে এখন ফেলে পালাতে হবে। আর পরাজিত ও পালিয়ে যাওয়াটা কোনো এক ভিন্ন গল্পের আড়ালে ফেলা, এই প্রধান কাজে বাইডেনের কাছে এখন সবচেয়ে মুখ্য শ্রোতা-পাবলিক হল আমেরিকার সাধারণ মানুষ, ভোটার। যেন তিনি আমেরিকাকে ইউক্রেন যুদ্ধে নেন নাই ও  হারাননি – অন্তত এটুকু প্রতিষ্ঠিত করাই তার এখন একমাত্র লক্ষ্য। কারণ আগামী নভেম্বর ২০২২ হবে বাইডেনের ‘বিচারের দিন’ – সেটা হবে, বাইডেনের পারফরমেন্স নিয়ে বিচার – এটাই হবে আমেরিকার এবারের মিডটার্ম [mid-term] নির্বাচনের প্রধান ইস্যু। যেখানে গত বছর থেকে মূলত মুদ্রাস্ফীতির কারণে আমেরিকার বিভিন্ন সার্ভে রিপোর্টে এটা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত যে, বাইডেনের দল এখানে খারাপ ফল করবে। এনিয়ে আমার পুরানো লেখা এখানে পাবেন।  এর ওপর যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে গেছেন বাইডেন এই বয়ান স্থিতি পায় তবে বাইডেন সব কুল-ই হারাবেন। এজন্য সম্ভবত  হেরে যাওয়ার বয়ানকে বিজয়ী বা থিতু হতে না দেয়া বাইডেনের প্রধান লক্ষ্য। এতে তিনি কতটুকু সফল, আদৌ হতে পারেন কিনা তা সামনে দেখার বিষয়!

    বাইডেন হেরেছেন, জেলেনস্কি প্রধান সাক্ষীঃ
    কথাটা হল আসলে, জেলেনস্কির হাতে বাইডেনের ভাগ্য আটকে গেছে – এটাই মূল কথা। কিভাবে?
    গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পুতিন ইউক্রেন হামলা শুরু করে ইউক্রেনের সবাইকে পর্যুদস্ত করা শুরু করেছেন। আর এতে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জেলেনস্কি অবাক চোখে দেখেছিলেন তার পাশে কেউ নেই, কেউ আসেনি। না ন্যাটো, না ইইউর কোন দেশ, না আমেরিকা। তিনি এই ক্ষোভ ও অপমান না লুকিয়ে পরের দিন সকাল থেকে অভিযোগ করতে থাকেন যে, ‘কেউ পাশে আসেনি, তারা একাই লড়ছেন’ [‘We’re defending Ukraine alone’, ]। আমেরিকার জন্য এই অভিযোগ মারাত্মক!
    আসলে মারাত্মক না হয়ে উপায় কী? জেলেনস্কিকে দেয়া বাইডেনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির চাতুরি একদিন তো প্রকাশ্যে এসে যাবেই! সেটাই সেদিন ঘটেছিল!

    আর জেলেনস্কির এ অভিযোগই ছিল প্রথম সাক্ষ্য যে, বাইডেন হারতে যাচ্ছেন। আসছি সে কথায়। কিন্তু এতে বাইডেনের পক্ষে আর মূল সত্যটা লুকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে যায়। পরদিনই বাইডেনের মুখপাত্র জেন সাকিকে [Jen Psaki] দিয়ে বাইডেন পরিষ্কার করে বলে দেয়া ছাড়া উপায় ছিল না যে, আমেরিকা ইউক্রেনের পক্ষে কোনো যুদ্ধেই যাবে না; যাবার ইচ্ছাও কখনোই ছিল না। সেটা রাশিয়ার সাথে সরাসরি কোনো যুদ্ধে তো নয়ই [কোনো অবস্থাতেই রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ নয়: যুক্তরাষ্ট্র], এমনকি ইউক্রেনের মাটিতেও আমেরিকা কোনো যুদ্ধে যাবে না […the President has no intention of sending U.S. military or U.S. troops to fight in Ukraine.  ]। তাহলে, জেলেনস্কির ইউক্রেনকে যুদ্ধের মুখে ফেলা হল কেন? না, এর কোন জবাব পশ্চিম বা বাইডেনের কাছে নাই। তারা দিবে না!!! এই হল দায়ীত্বজ্ঞান-হীন ও দেউলিয়া গ্লোবাল নেতা!!!

    কারণ বাইডেনের কথিত মুল পরিকল্পনা অনুসারে রাশিয়ার সাথে তিনি তো লড়বেন বিনা-অস্ত্রে ও বিনাযুদ্ধে এবং তা কেবল অবরোধ ও মানবাধিকার এ দুই হাতিয়ার দিয়ে। কিন্তু এসবের চেয়েও সবচেয়ে অনৈতিক কথাটা হল, এ বিষয়টাই মানে আমেরিকা যে রাশিয়ার সাথে কোন যুদ্ধেই যাবে না একথা  জেলেনস্কিকে জানানো হয়নি। পশ্চিমের কেউ-ই তা জানাতেই চায়নি। শুধু তা-ই না, তাকে ন্যাটোর সদস্যপদের লোভ দেখিয়ে যুদ্ধে টেনে আনা হয়েছে। সরাসরি বললে, যেটা শ্রেফ একটা প্রতারণা; অর্থাৎ  এখন আগামীতে এ নিয়ে যদি জেলেনস্কি প্রতারণার অভিযোগ তোলেন তবে এটিই হবে বাইডেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য যে, তিনি এই যুদ্ধে হেরে গেছেন এবং কেন হেরেছেন!

    তাই বাইডেন এখন থেকেই জেলেনস্কির সাথে নিজের ভাগ্যকে বাঁধাবাঁধি শুরু করেছেন। কারণ জেলেনস্কিও তো তার ইউক্রেনীয় নাগরিকদের ভুল ও মিথ্যা বুঝিয়েছেন, যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবেও এটা তার অযোগ্যতা যে, তিনি বুঝতেও পারেননি যে, পশ্চিমের কেউই যুদ্ধে তাদের পাশে আসবেই না; আসলে সবই ছিল মিথ্যা প্রতিশ্রুতি; অর্থাৎ জনগণকে প্রতারণার মুখে ফেলে দেয়া এটাই এখন একা জেলেনস্কির সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং অযোগ্যতাও যে তিনি বুঝতেই পারেননি, এরা প্রতারক!

    কাজেই জেলেনস্কি আর বাইডেনের ইজ্জত বাঁচানো এখন এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে! দু’জনকেই নিজ নিজ পাবলিকের হাত থেকে বাঁচতে হবে!! এটা এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা!!

    [জেলেনস্কির এবিসিতে দেয়া সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশের ইংরাজিতে টেক্সট আকারে রিপোর্টে এনেছে মূলত বার্তা সংস্থা এএফপি। আর সেটা পাওয়া যাচ্ছে ইংরাজিতে  FRANCE24  আর  Singapore Strait Times, এখানে। আর ফরাসী নিউজটারই  বাংলা অনুবাদ লিঙ্ক এখানে দেয়া হয়েছে। অনুবাদ করেছে সাইফুল ইসলাম, সব ক্রেডিট তাঁর।]

    সম্ভবত এ কারণেই জেলেনস্কির এই সাক্ষাৎকারটা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ শ্রোতারাই মুখ্য টার্গেট শ্রোতা হোক এই বিবেচনায় এবিসি নিউজে আয়োজন করা হয়। আবার,এখানে  প্রশ্নও ইংরেজিতে করা হবে কিন্তু জেলেনস্কি এর জবাব দেবেন তার (ইউক্রেনীয়) স্থানীয় ভাষায়। যেটা আবার এবিসি অনুবাদ করে ইংরেজিতে প্রকাশ করবে। এই হলো অ্যারেঞ্জমেন্ট, অর্থাৎ জেলেনস্কির অনুমান যে, নিজ ভাষায় বললে নিজ ইয়ার জনগণ বুঝবে ভাল বুঝবে; এছাড়া তিনি কি বলেছেন, কেন বলেছেন তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ যেটা নিকট আগামিতে উঠতে বাধ্য তাতে জেলেনস্কি ভাল অবস্থায় থাকবেন – এই হল অনুমান। আমরা এখানে মনে রাখতে পারি যে, কোনো যুদ্ধে পরাজিত হওয়া বা পাবলিককে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে ফেলার দায়ে যুদ্ধ শেষে সব শাসককেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়।  মানুষ কোন পরাজিত শাসককে দেখতে পছন্দ করে না, করে নাই। সবাইকে দায় নিয়ে শেষে “আইয়ুব খান-ই” হয়ে যেতে হয়। ফলে এ যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ, কার দোষে এই দুর্ভোগ, মিস-হ্যান্ডলিং – এসব অভিযোগে্র জোয়ার উঠবেই আর তাতে ইউক্রেন শাসকের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবলই হবে। তাই এই সাক্ষাৎকারের জেলেনস্কির বয়ানের মধ্যে    যুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে বাইডেনকে দায়ী না করে জেলেনস্কির কোন উপায় থাকে নাই। আবার এই দায়-অভিযোগে বাইডেনও হেরে গেছেন এটাই সাক্ষ্য দেয়াও হয়ে যাচ্ছে আর এর প্রধান সাক্ষী হয়ে থাকছেন ওই জেলেনস্কিই!!

    অতএব জেলেনস্কি এই সাক্ষাৎকারে তিনি পশ্চিম বা বাইডেনকে অভিযুক্ত না করে পারেননি। “ন্যাটো সদস্য না করা” আর ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ওপর দিয়ে রাশিয়ার জন্য চলাচলে [unhappy Zelenskiy ] “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা না দেয়ার জন্য সরাসরি অভিযুক্তই করেছেন। এ সাক্ষাৎকারেই তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ন্যাটোর এই প্রশ্নে আমি নিজেকে ঠাণ্ডা করে নিয়েছি [I have cooled down ...] বেশ আগেই; যখন আমি বুঝে গেছি, ন্যাটো ইউক্রেনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়”। এটাই আসলে সববকথার এক কথা যে “ন্যাটো সদস্য হবার শখ মিটে গেছে“। আর পরিষ্কার করে বলা যে, মিথ্যা আশ্বাসে পশ্চিম (আমেরিকা ও ইইউ) ইউক্রেনের সাথে প্রতারণা করেছে। এ কারণে নিজেই নিজের আকাঙ্খাকে দমন করতে হয়েছে, মেরে ফেলতে হয়েছে যদিও এখন তাঁর এভাবে বলার কারণে ইউক্রেনবাসী কাকে মাফ করবেন, কাকে ছুড়ে ফেলবেন আমরা জানি না।

    “I have cooled down regarding this question a long time ago after we understood that … NATO is not prepared to accept Ukraine,” Zelensky said in an interview aired Monday night on ABC News.

    আর ন্যাটো নিয়ে তিনি পরোক্ষে বলে দিয়েছেন, ‘ন্যাটো জোট রাশিয়ার সাথে সঙ্ঘাতে যেতে বা বিতর্কে  [The alliance is afraid of controversial things, and confrontation with Russia,” ] জড়াতে ভয় পায়, ভীত” [সত্যি বলতে, সবাই ভয় পায়: জেলেনস্কি]।’ তিনি আরো বলছেন, ‘আর আমিও অন্যের কাছ থেকে ভিক্ষা করে পায়ের নিচে গড়াগড়ি খাওয়ার বিনিময়ে কিছু আনব, এমন প্রেসিডেন্ট হতে চাই না [not want to be president of a “country which is begging something on its knees.”]।’

    আর এটাই হল, যতটা সম্ভব বাইডেনের ইজ্জতের দিকে খেয়াল করে জেলেনস্কির নিজ ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টা। যদিও সেটা এই প্রচেষ্টা মনে হয় বৃথা যাবে কারণ তাহলে ইউক্রেনের জনগণকে ন্যাটোর কাছে নিয়ে গিয়েছিল কে? কিসের ভরসায়? কে দিয়েছিল সেই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি – এসব প্রশ্নে জেলেনস্কি লা-জবাব থাকতে পারেন না।

    রাশিয়ার সাথেও কথা হয়েছেঃ
    এটা এখন পরিষ্কার যে, বাইডেন-জেলেনস্কির হার লুকানোর প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার সাথেও তাদের কথা হয়ে গেছে। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ এপর্যন্ত দুটো পাওয়া যাচ্ছে। এক হল, রাশিয়া যুদ্ধ থামাবে কি শর্তে, সে কথাটা আবার এক রাশিয়ান সরকারি মুখপাত্রকে দিয়ে স্পষ্ট করে বলানো। মুখপাত্র স্পষ্ট করে তিন শর্তের কথা বলেছেন, যেটা আগেও রাশিয়া-ফ্রান্স আলোচনায় পুতিন স্পষ্ট করে বলেছিলেন। তবে এবার বাড়তি হল যে, শর্ত মানলে রাশিয়া যুদ্ধ থামাবে তো? এর নিশ্চয়তাই নিশ্চিত করেন ক্রেমলিন  মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। এনিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই স্পষ্ট। শিরোনাম হলো, “ইউক্রেনকে দেয়া শর্ত পূরণ হলেই ‘মুহূর্তের মধ্যে’ রাশিয়া থেমে যাবে – ক্রেমলিন” [Russia will stop ‘in a moment’ if Ukraine meets terms – Kremlin]।”

    এ নিয়ে বাইডেন-জেলেনস্কির যে কথা হয়েছে এর প্রমাণ হলসেটা বুঝা যায়, জেলেনস্কি যখন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেন, এক. তিনি আলোচনায় আপস করতে প্রস্তুত যে রাশিয়া প্রভাবিত ইউক্রেনের দুই প্রদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আপসে তিনি প্রস্তুত [Zelensky said he is open to “compromise” on the status of two breakaway pro-Russian territories…]। তিনি এদের “নিরাপত্তার গ্যারান্টি” দিতে চেয়ে কথা বলেছেন।
    কিন্তু এত সহজে কেন জেলেনস্কির এই উদারতা? উত্তর আসলে খুব সোজা। কারণ ওদিকে পুতিনও আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, ঠিক জেলেনস্কিকে ক্ষমতাচ্যুত করা বা কোনো রেজিম চেঞ্জ করা আর রাশিয়ার আক্রমণের লক্ষ্য নয়। কেবল ওই তিন দফাই তার যুদ্ধ বন্ধের মূল শর্ত। তাই ‘ক্ষমতায় থাকছেন’ এ কথা শোনার পরে জেলেনস্কি জান হাতে ফিরে পেয়ে রাশিয়ার সাথে আপসে রাজি হয়েছেন। একথাটা আর কাউকে বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না।

    আর পুতিনের শর্ত তিনটা হলঃ
    ১। ‘ইউক্রেন নিরেপেক্ষ হয়ে যাবে’ [ Kremlin says it insists on neutrality for Ukraine]। এ জন্য তার কনস্টিটিউশন সংশোধন করে এ কথাগুলো সেখানে ঢুকাবে। অন্য ভাষায় রাশিয়ার নিরাপত্তাবোধে অভাব সৃষ্টি করবে না, ন্যাটোর সদস্য হতেও আর চেষ্টা করবে না।
    ২। রাশিয়া ইউক্রেনকে অসামরিকীকরণের কাজ শেষ করবে [ Russia “will finish” demilitarisation of the country]।
    ৩। বিচ্ছিন্ন দুই প্রদেশ যার বাসিন্দারা এথনিক রাশিয়ান, সে দুই আবাসভূমিকে স্বাধীন দেশ বলে মানবে, ক্রাইমিয়ার বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়াকেও মেনে নেবে [Wants Kyiv to recognise breakaway regions, loss of Crimea]।

    এক কথায় তাহলে, এবিসির সাক্ষাৎকারটা হল, রাশিয়া-ইউক্রেন কী কী ব্যাপারে আপস করবে এরই আগাম প্রতিশ্রুতি বিনিময়ের সাক্ষাৎকার। এসব বক্তব্যের ভিত্তিতে এখন রাশিয়া-ইউক্রেন বসে ফাইনাল খুঁটিনাটি চুক্তিপত্র ঠিক করে নেবে। অতএব কেস ফরফিট এবং যুদ্ধ থামার পথে।

    তাহলে কী বাইডেনের অবরোধ এখন উঠে যাবে?
    সরাসরি বললে, বাইডেন আশা করে আছেন এটাই সেই জায়গা। কিন্তু তাতে এখন ইউক্রেন রাশিয়ার সাথে কি আরো খারাপ কোনো চুক্তি করে রাশিয়ার ভিতর ঢুকে গেল কিনা সেদিকে বাইডেনের কোনো আগ্রহ নেই। তিনি চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর অবরোধ জারি করতে – এখন তাই তিনি তো তিনি কামিয়ে ফেলেছেন ফলে সেখানেই মনোযোগ দিতে চান। কিন্তু অন্তত এখানে কি বাইডেনের আশা পূরণ হবে?

    কোন সকাল-কে দেখলেই বোঝা যায় যে, দিনের বেলায় বাকি সময়ে আর কী হবে। এই তত্ত্ব-অনুসারে এবার ইউরোপ একেবারে পিছটান দিয়ে ভেগে যেতে চাইছে। তারা বাইডেনের হাত ছেড়ে দিয়েছে এরই মধ্যে বলা যায়। কিভাবে?

    ইইউর প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক ধরা হয় ফ্রান্স ও জার্মানিকে। মানে এদের প্রভাবকে। এরই মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে, রাশিয়ান তেল ও গ্যাস ছাড়া তারা চলতে পারবে না। জার্মান ডয়েচে ভেলের বরাতে ঢাকার এক বাংলা পত্রিকা রিপোর্টের শিরোনাম, ‘রাশিয়ার তেল-গ্যাসে নিষেধাজ্ঞা চায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের অসম্মতি’। রাশিয়ান তেল-গ্যাসে এমনিতেই জার্মানির নির্ভরশীলতা প্রায় ৪৫ ভাগ। অন্য সবাইও কমবেশি নির্ভরশীল। এ দিকে ডাচ ও ফরাসি সরকারপ্রধানদ্বয় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে [Dutch PM: Not possible for Europe to cut off Russian oil and gas immediately ] পরিষ্কার করে বলে দিলেন, রাশিয়ার জ্বালানি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য তা ‘আনসাসটেইনেবল’, মানে টেকা অসম্ভব […would be unsustainable for European Union member countries.]।

    সোজা ভাষায়, রাশিয়ান জ্বালানি ইস্যুতে আমেরিকা-ইইউ আলাদা আলাদা রাস্তা ধরে ফেলেছে এরই মধ্যে; অর্থাৎ পুতিনের হুমকিটাই যেন কার্যকর যে, তিনি বলেছিলেন, আমাদের তেল না নিলে ‘ব্যারেল তিন শ ডলারে কিনতে প্রস্তুত হও’।

    বাইডেন কি নাদান?
    বাইডেন যেকথা আগাম ধরে নিয়েছিলেন তা হল, রাশিয়া মূলত ইউরোপকে অবরোধের কারণে জ্বালানি বেচতে না পারলে আর তার ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ আমেরিকার হাতে  আটকে থেকে গেলে রাশিয়ার আর কিছুই করার থাকবে না – সব স্তব্ধ হয়ে যাবে!! অথচ আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট এসব মনগড়া অনুমানে কি চলতে পারেন? বাইডেনের অনুমান আংশিক অবশ্য সত্য, সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা ঘটনার একটি পিঠ; যার অন্য পিঠের  খবর ওখানে নাই, নেয়া হয়নি।
    আসলে, দুনিয়ার সব বেচাবিক্রি মানেই তা কেবল একপক্ষীয়ভাবে দেখা। কারণ যেটা বেচাবিক্রি সে্টাই আবার আরেক দিক থেকে একই সাথে কেনাও বটে। কাজেই রাশিয়া বেচতে না পারলে যেমন বিপদ প্রায় তেমনিই বিপদ জ্বালানি ক্রেতারও। বাইডেন ইউরোপীয় ক্রেতার দিকটা দেখতেই চাননি। ফলে বাস্তবতা হল, ক্রেতা ইইউর সব সদস্যের জন্যই এটা রাশিয়ার মতোই সমান সঙ্কটের। এছাড়াও কথা আরো আছে।
    যদি ইউরোপ রাশিয়ান তেল-গ্যাস না কিনে বিকল্পভাবে কাতার বা অন্য কোথাও থেকে কিনতে চায় তা হলে সেই বিকল্প জ্বালানি যদি পাওয়াও যায় তবু সেটা বিপদেরই হবে। কারণ অবকাঠামো কোথায়? এটা তো পাড়ার বাজার ফেলে বিকল্প হিশাবে কাওরানবাজারে বাজার করতে যাওয়া নয়। গ্যাস-তেলের জন্য এখন নতুন করে বিকল্প পাইপলাইন বসাতেও তো কমপক্ষে তিন বছর লাগবে। এছাড়া বিনিয়োগের খরচ তোলার ব্যাপার আছে, কে দিবে? যে তেলের দাম এত দিন আশি ডলারে আটকে রাখার কসরত চলছিল এর মাঝেই এই যুদ্ধ এটাকে এরই মধ্যে প্রায় দেড়গুণ বাড়িয়ে ১১২ ডলারে নিয়ে গেছে। আর তেল বাজারের অনুমান হল এটা এমন চলতে থাকলে ১২০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
    তাই, বাইডেনের তেল অবরোধের খায়েশ পূরণ করতে চাইলে তেলের দাম পুরনো ৮০ ডলারে ফিরে যাওয়া দূরে থাক এটা কি সত্যিই ৩০০ ডলারের দিকে যাত্রা শুরু করবে? করোনার ধাক্কা সামলাতে যেখানে সারা দুনিয়া মন্দা আর মুদ্রাস্ফীতির কবলে, সেখানে এই নতুন তেলের দামের বোঝা কয়টা দেশ সামলাতে পারবে? বাছবিচারহীন বাইডেনের এমন পদক্ষেপকেই সম্ভবত আক্কেলের অভাব বলে!
    ওদিকে তেলের দাম না কমার মূল কারণ বলা হচ্ছে এখনও কোন দেশ বা সোর্স থেকে কেন দেশ তেল কিনে থাকে সেই সোর্স ইচ্ছামত বদলাবার মত প্রচুর বিকল্প সোর্স নাই। আর তেলের বাজারটাই এখন চলে গেছে একেবারেই স্পেকুলেটিভ মার্কেটে; মানে যেভাবে গ্লোবাল শেয়ার বাজার  স্পেকুলেটিভ মার্কেট সেরকম। তাই এখানে ব্রিয়েল ক্রেতা আর বিক্রেতার মাঝেই হাত বদল হয় এমন কমপক্ষে আরো তিনটা পক্ষ-পার্টি, এমন শেয়ার ক্রেতা বা শুধু ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ক্রেতা ঢুকে আছে। একারণে তেলের দাম যতই অস্থির ততই ডিও ক্রেতায় ভরপুর হয়ে উঠে এই বাজার। এরই নিট ফলাফল হল শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে বাইডেন ভেনিজুয়েলাকে বা মধ্যপ্রাচ্যে ফোন করতে হচ্ছে। অথচ ভেনিজুয়েলাকে আগের আরোপিত স্যাংশন এখনও বহাল। তাই লোভ দেখানো হচ্ছে ইউরোপের বিক্রেতা হতে। রাজি হলে স্যাংশন তুলে নেয়া হবে। তবুও কোন নড়নচরন দেখা যাচ্ছে না। এটাই এই বাজারে হওয়ার কথা। সবাই ওয়েট করছে দাম আরো বাড়ার জন্য…। আগ্রহিরা তাও পড়তে পারেন –Why US can and EU can’t ban Russian oil। আর একেই বলে বাইডেনকে – “কত ধানে কত চাল হয় শিখিয়ে দেয়া”।
    যে কারণে রাশিয়ান জ্বালানি ইস্যুতে আমেরিকা-ইইউ আলাদা আলাদা রাস্তা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এজন্যই জর্মান ডয়েচ ভেলের রিপোর্ট, 
    European leaders wary of cutting off Russian oil and gas । তাই আপনি যদি বাইডেনের শুধু কথা শুনেন তো “গায়ে বল বল ঠেকবে”। কিন্তু বাস্তবতা? ঠিক উল্টাটা যে আপনি আটকে গেছেন, নিজের অবিবেচক গর্বের ফাঁদে নিজেই বন্দি হয়ে পড়েছেন!!!

    তাহলে এখন একা কে? পুতিন না বাইডেন?
    পশ্চিম এখন স্বীকার করছে  – Outside the West, Putin is less isolated than you might think।
    এর কারণ, খুব সম্ভবত পশ্চিমের নখড়া দেখতে দেখতে – যারা মিথ্যা বলে,  আর চাতুরি করে বলে একটা করে আরেকটা – আমরা বাকি দেশেরা ক্লান্ত ও বিরক্ত!!

    তাই, এখন আনপপুলার সিটিং প্রেসিডেন্টের প্রধান উদাহরণ হতে যাচ্ছেন বাইডেন!
    আর এথেকে বাইনারিতে এমন মানে করা ভুল হবে যে তাহলে পুতিন খুবই ভাল লোক বলা হচ্ছে এখানে!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১২ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেনের হার লুকানোর প্রক্রিয়া শুরু?“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কী ডলারের বিকল্প এনেই ছাড়বে

    রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কী ডলারের বিকল্প এনেই ছাড়বে

    ০৭ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Xx

     WHY GOLD? –  Gold rises 2% on fear of Russia-Ukraine war

    সারা দুনিয়াই এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে, একভাবে না একভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে। এবং বলাবাহুল্য তা পক্ষে অথবা বিপক্ষে। আবার এই যে কথাটা বললাম সেটাও নতুন কথা নয়। কেবল ফারাক হয়ত এতটুকুই যে, অন্যরা আমার মত করে নয় তারা তাদের মত করে অন্যভাবে বুঝে বলেছে।

    তা হলে নতুন যে কথাটা এখন বলতে যাচ্ছি সেটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল এতে আরো আসন্ন হতে গতিপ্রাপ্ত  হয়ে যেতে পারে। এ কথা আমি ২০১৪ সাল থেকে নিশ্চিত করে বলে আসছি। আসন্ন সেই গ্লোবাল নেতৃত্বে বদলের দিকে একটা গ্রেট লিপ [great leap] বা বড় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার নতুন ঘটনাটাই হল ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ’  – তবে এটা ঘটনার একদিক। মানে বাইরের দিক থেকে দেখে এটাকে  কেবল ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ’ -ই মনে হচ্ছে।  অর্থাৎ  বড় পদক্ষেপে বদলের বাইরে দিকটাই মানুষ দেখছে ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ হিসেবে। আসলে গ্লোবাল নেতৃত্বের নেতাদেশ বদল মানে – আমেরিকা নেতৃত্ব হারানো আর চীনের উত্থান ঘটা, এটাই ধেয়ে আসছে। আর আমেরিকা নেতৃত্ব হারাচ্ছে – এ ঘটনাটাকে মুখে বলা তা মোটেই ব্যক্তির ইচ্ছা না। এমনকি সে চীনকে বেশি পছন্দ করে কি না তাতেও কিছু এসে যায় না। এটা এক ব্যক্তি-ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বাস্তবতা – এমন এক অবজেকটিভিটি। তাই তা সিরিয়াসভাবে আমল করার বিষয়।

    সাম্রাজ্যের ইতিবাচক ভূমিকাঃ
    এম্পায়ার [empire] বা বাংলায় ‘সাম্রাজ্য’ শব্দটা অনুসরণ করা যাক। বহু পুরনো এই শব্দ, দুনিয়া যখন শাসন বলতে কেবল রাজার শাসন বা রাজতন্ত্র বুঝত, সে আমলের। তখনকারই আরেক প্রায় সমান্তরাল শব্দ হল এই সম্রাট বা সম্রাটের সাম্রাজ্য। পরবর্তিতে সম্রাটের শাসন পর্ব বা যুগ শেষ হবার পরে ইউরোপে, অন্যের দেশ দখলদার – এটাই যেসব দেশের প্রধান পেশা ও ব্যবসা, পরিচয়, এমন সবচেয়ে বড় পাঁচ রাষ্ট্র হল – ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও স্পেন – যারা সবাই ‘সাম্রাজ্য’ (যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য) বলেই পরিচিত ছিল। এমনকি তারা ১৬০০ সালের পরে এরা ততদিনে রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠে গেলেও।
    আমাদের জন্য এখনকার প্রাসঙ্গিক কথাটা হল,  কোনকিছুকে রাজ্য আর সাম্রাজ্য বলে ডাকার ক্ষেত্রে একটা বড় ফারাক হল, ছোট হলে রাজ্য আর বড় হলে সাম্রাজ্য এমন একটা চিন্তা অবশ্যই কাজ করত; যদিও এদের মূল ফারাকটা আরো গভীরে। যেমন ধরেন, রাজা আর সম্রাট উভয়ে খাজনা তুলে খায় এটা কমন। কিন্তু দুটোর ফারাক বা বড় অমিলের দিকটা হল, রাজা খাজনা নেয়ার বিনিময়ে প্রজাকে কিছু দিতে সে বাধ্য নয় অথবা শাসন-সম্পর্ক চর্চায় সেটা ছিল না। যেমন দুনিয়ার যত রাজা ছিল তাদের এসব অর্থ আদায় হত যেসব নাম দিয়ে সেগুলো লক্ষ্য করা যাক। প্রথমত বলে রাখি এদের নানা নাম থাকলেও এখানে কমন নাম আকারে, সব কিছুকেই ‘খাজনা বলছি’। যেমন,  আমাদের পাহাড়ি এলাকায় রাজতন্ত্র অকেজো হয়ে গেলেও এখানে খাজনা আদায় হত ‘পুণ্যাহ’ এই নামে; এখনও এই নামে অনুষ্ঠানটা চালু আছে দেখা যায়। অর্থাৎ এখনো পাহাড়ি প্রজাদের [বাংলাদেশ রাষ্ট্র হয়ে গেছে বলে এই বিচারে পাহাড়িরা নাগরিক হয়ে গেলেও পুরানা রাজার বিচারে তারা প্রজা-ই ] থেকে তাদের রাজা অর্থ আদায় করতে পারুক আর না পারুক, সেই ‘পুণ্যাহ’ কালেকশন ও অনুষ্ঠানের স্মৃতি অন্তত রাজারা জারি রাখতে চান। রাজ-প্রশাসন বলে তেমন কিছু না থাকলেও তাদের সাংস্কৃতিক পরিসরে রাজার অনুভূতি থাকুক, এই চাওয়াকে কার্যকর রাখা হয় এ ঘটনায়। এখন এই শব্দটা পরীক্ষা করা যাক; এটা এক ধর্মতাত্বিক ইঙ্গিতমূলক শব্দ যা দিয়ে যেন বলতে চায় ‘খাজনা দেয়া পুণ্যের কাজ’। আর সারকথায় বলা যে, বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে কথাটার সোজা অর্থ হল, খাজনা দিলেও প্রজারা বিনিময়ে কিছু পাবে না।

    এসব ক্ষেত্রে এমনই আরেকটা শব্দে খাজনা তোলার রেওয়াজ ছিল  – ইংরেজিতে ‘ট্রিবিউট’ [tribute] শব্দে, যার একটা বাংলা করা যায় ‘শ্রদ্ধা’ জানানো। মানে হল যেমন, ভিজিটিং আওয়ারেই রাজাকে ভিজিট করতে গেছেন কিন্তু সেটাকে বলতে হবে – শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন। এখানেই শেষ না। আপনি যে শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন তা শুধু ‘ভাব-ভঙ্গিতে বুঝালে হবে না। পারিষদেরা বুঝবে কী করে যে রাজাকে আপনি শ্রদ্ধা-সালাম জানাতে গেছেন? সে জন্য আপনাকে নগদ অর্থ (অথবা জমির ফসল) দিতে হবে। দিলে পরে সেটাতে আপনার সালাম জানানোর ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, ধরা হবে। না, আমাদের বাংলা ভাষা বা সমাজেও দেখেন। সেখানে এটা এখনো তা আরেকভাবে চালু আছে। যেমন, কোন মার্কেটের দোকান ভাড়া নিতে গেছেন। মার্কেট মালিক বলছে ভাড়া মাসে তিন হাজার কিন্তু সাথে ‘সালামি’ দিতে হবে পাঁচ লাখ। এই সালামিটাই ইংরেজিতে ট্রিবিউট। সারকথায় রাজা মানে যারা সালামি, ট্রিবিউট, পুণ্যাহ ইত্যাদি নানান নামে খাজনা খায়। আর গুরুত্বপুর্ণ হল, বিনিময়ে রাজা প্রজাকে কিছু দেয় না। অথবা দিতে হবে এমন কোন অর্থ-ইঙ্গিত ওসব শব্দে থাকে না।

    রাজা-সম্রাটের ফারাকঃ
    আর ঠিক এ জায়গাটা হল রাজা-সম্রাটের ফারাক। যেমন সম্রাটের ক্ষেত্রেও,  সারকথায় সম্রাটও সালামি, ট্রিবিউট, পুণ্যাহ ইত্যাদি যা আছে সব নেয়। কিন্তু একই সাথে প্রজাদের জন্য অনেক সামাজিক দায়-কর্তব্য সে নেয়। কেমন সেটা? গঞ্জ-হাট-বাজার অনেক পুরনো জিনিস। সেকালে যে সম্রাট সে হয়ত এমন কমন জায়গার বাজারটা পাকা করার দায় নিবে, বর্ষাকালে খুব কষ্ট হয় তাই। এছাড়া বণিকদের হাটে আসা-যাওয়া চলাচলের নিরাপত্তা দিবে; সে জন্য পাইক-পেয়াদা নিয়োগ দিবে। এক কথায় কমন গুড [common good] মানে সবার কাজে লাগে, এমন কাজকর্মে সম্রাট মনোযোগ দিবে। সম্রাট জানে, এতে হাটবাজারে ব্যবসাটা ভালো জমলে খাজনা-আয় আপোষেই ভাল হবে। তার ভাবনা হল, এসব মিউনিসিপাল বা সিভিক [civic] সার্ভিস বাড়িয়ে দিয়ে যদি এবার খাজনা একটু বেশি চাই হাটের মানুষ তাও দেবে। এই হল সাম্রাজ্য ব্যবস্থা শুরুর গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটাই ‘সাম্রাজ্য’ ধারণা ও শব্দটার বড় কিছু ইতিবাচক দিক; আর যদিও সাম্রাজ্যের বড় বড় অনেক খারাপ দিক দিয়েই মানুষ ধারণাটাকে চিনে থাকে।

    উপরে সাধারণভাবে যেকোন সাম্রাজ্যের বেলায় কথাগুলো প্রযোজ্য এমন অনুমানে কথাগুলো বলা। তবে আমাদের সাবধান হতে হবে ১৯৪৫ সালের আগের (১৬০০-১৯৪৫) সাড়ে তিন শ’ বছরের ইউরোপ নিয়ে; এ সময়ের তাদের দেশের সাম্রাজ্য শব্দটার অর্থ আমাদের মত এশিয়ান দেশের অভিজ্ঞতায় পুরাটাই নেতিবাচক ছিল; কারণ সাম্রাজ্য তৎপরতা বলতে তখন এর একটাই অর্থ, যারা কলোনি দখল ও শাসন করে। সাম্রাজ্য মানেই অন্যের দেশকে কলোনি দখল – এই দিকটা অনেক ভারী ও প্রধান ছিল।

    তবে ১৯৪৫ সালের পরে আমরা প্রথম দেখলাম এক নতুন ধরনের আমেরিকা শুধু না, সেটা একটা কলোনিমুক্ত দুনিয়াও বটে। তবে না এটা আবার কোন সম্রাটের রাজতন্ত্র ছিল বরং ছিল নাগরিকের ক্ষমতায় নির্বাচিত এক আমেরিকান রিপাবলিক। ফলে সেই অর্থে এখানে কোনো আমেরিকান সম্রাট থাকে নাই। কিন্তু এই আমেরিকার হাতেই তবু ১৯৪৫ সালের পরে – সেই প্রথম দুনিয়াতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল বলে বুঝা যেতে পারে; এবং এর খারাপ-ভালো সব দিকসহ-ই। কমিউনিস্টরা এই আমেরিকান কর্তৃত্বকে বিশেষ করে ১৯৫৩ সালের পরের আমেরিকাকে ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’ বলে থাকে এবং তা বলার পক্ষে এমন আমেরিকান ভূমিকাও আছে; যেমন সিআইএ পাঠিয়ে কোনো দেশে ক্ষমতা দখল ও সরকার বদল এবং তা বিশেষত প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে। কিন্তু একই সাথে এই আমেরিকার এম্পায়ার রোলও আছে। যেটাকে আগে সাম্রাজ্যের ব্যতিক্রমী ইতি ভূমিকা বলেছি, তেমন এক ধারাবাহিকতা যেন, যেটা আমেরিকা একালেও পালন করেছে। কিভাবে?

    সেকালে সম্রাট যেমন রাজার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে বসে বসে চাঁদা-খাজনা খাওয়া নয় – প্রজাদের সার্ভিস দেয়ার কাঠামোতে হাজির ছিল এবং এই বিনিময়ের মাধ্যমে একটা রাজ্য-প্রশাসন বা সাম্রাজ্য খাড়া করে ফেলা যার মুখ্য অবদান; ঠিক তেমনি ১৯৪৫ সালের পরে, আমেরিকা এক ইতি-এম্পায়ার ভূমিকাও নিয়েছিল। কারণ এক নয়া গ্লোবাল সিস্টেম সে গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
    যার পিছনের কারণ গ্লোবাল সিস্টেমের নেতা হতে গেলে পজিটিভ এম্পায়ারের দায়-ভূমিকা যা থাকে সেটাও পালন করতে হয় এবং তা করে বলেই তো সে গ্লোবাল নেতা।  উদাহরণ, যেমন চলতি শতকের শুরু থেকেই, ব্যাপারটাকে ভাল / মন্দ যা বলেই দেখি,  আমেরিকা রাষ্ট্র  নিজে চলতে গিয়ে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি এই বেকায়দায় পড়ে সভরেন-লোন নিয়ে চলতে শুরু করেছিল আর তা, এখনও। সভরেন লোন [sovereign loan] মানে এখানে খোদ রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেয়া, আর এভাবেই ঋণ করে খরচ চালানো একটা দেশ আমেরিকা। আর সে-জন্য প্রায়ই আমেরিকাকে নিজ সংসদ থেকে নতুন লোন নেবার অনুমতি নিতে বা লিমিটটা বাড়িয়ে নিতে হয়। আর এনিয়ে প্রতিবারেই এক-দুই সপ্তাহের নাকানি-চুবানি খায় আমেরিকান প্রেসিডেন্টের। একবার ওবামা আমলে প্রেসিডেন্টের এমন নাকানি-চুবানি চলছিল কিন্তু এরই ভিতর ডব্লিউএফপি WFP (বিশ্ব খাদ্য সংস্থা – জাতিসঙ্ঘের খাদ্য সহায়তা-বিতরণ প্রতিষ্ঠান)-কে দেয়া তার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য ওবামা এক শ’ মিলিয়ন ডলার ফান্ড রিলিজ করছেন। কারণ, ডব্লিউএফপি এই ফান্ড ব্যবহার করেই সোমালিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য পাঠানোর অপেক্ষায় ছিল। অথচ তখন আমেরিকার নিজ-বাজেটে অর্থ বরাদ্দ নেই বলে যারা বিভিন্ন সেক্টরে দিন-ভিত্তিতে স্যালারি পান এমন আমেরিকার  সরকারি কর্মচারীদের ‘কাজ নাই’ বলে বাসায় রেখে দিতে হয়েছিল।

    অর্থাৎ, নিজের অবস্থা যাই হোক, ডব্লিউএফপি-কে প্রতিশ্রুত অনুদানের ফান্ড আগে রিলিজ করতে হবে – এই হলো গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এক ব্যবস্থায় গ্লোবাল নেতার ইতিবাচক দায়-ভূমিকা তাকে অগ্রাধিকারে পুরণ করতেই হয়েছে; যা পুরনো স্টাইলে বললে এটা ‘এম্পায়ারের ইতি-দায়’ বলা যায়। আমি অনেকবার লিখেছি, কোনো রাষ্ট্র গ্লোবাল নেতা হতে হলে এর একনম্বর শর্ত হল তার অর্থনীতিকে অবশ্যই উদ্বৃত্ত অর্থনীতি হতে হবে, মানে ভাল পরিমাণে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্তের সম্পদ থাকতে হবে। এমন হতে হবে, যাতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নয়া অবকাঠামোগত খাতে স্বল্পসুদে ঋণ পাবার যে চাহিদা আছে তা নেতা দেশকে পূরণের যোগ্যতা সামর্থ্য থাকতেই হবে। যে যোগ্যতার জন্যই সে পজিটিভ এম্পায়ার, ফলে সে গ্লোবাল নেতা।

    গ্লোবাল ইকোনমিতে আরও ভাল একটি উদাহরণে যাওয়া যাক; গ্লোবাল ইকোনমি ও চলতি করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে। গ্লোবাল ইকোনমি কখনও ফেল করলে, খারাপ অবস্থায় পতিত হলে এটা কোনো খুশির খবর নয়। আমরা দুর্ভিক্ষ দেখেছি। “সারপ্লাস ভ্যালু চোরেরা” এবার ‘ধরা খাইবে’ যুক্তিতেও তাই এটা খুশি হওয়ার বিষয় নয়। দুর্ভিক্ষ বা জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ না হওয়ায় তা-জনিত কোন মানুষের মৃত্যু কাম্য বিষয় নয়। তাই গ্লোবাল ইকোনমিকে পতিত বা ফেল করে যাওয়া থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে গ্লোবাল নেতার এক বিরাট দায়-ভূমিকা আছে থাকে, মানুষ ও বিশ্ব তা আশাও করে।

    গ্লোবাল নেতার কী করার আছে এখানে?
    করোনার টিকার পূর্ণ ডোজ নিলে আর করোনা হবে না অথবা শতভাগ করোনামুক্তি মিলবে, টিকা উৎপাদকেরাও কখনো এমন কথা দাবি করে না। তাহলে টিকা নিয়ে এত কী হৈচৈ, কাজ? কোনো “লকডাউন’ বা সব অর্থনৈতিক তৎপরতা বন্ধ যেটা প্রায়ই করতে দেখা যায় এর  বিরুদ্ধে আবার যদি মানুষ উঠে দাঁড়াতে চায়, আর এতে ন্যূনতম অর্থনৈতিক তৎপরতা যদি চালু করতে চায় তাহলে মানুষের হাতের নাগালে আছে আর যা কিছু পরিমাণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যা কিছুটা কাজ করে এমন একমাত্র উপায় হল টিকা – পাবলিককে টিকা দিয়ে নেয়া। যত দ্রুত দেশের বেশির ভাগ যোগ্য নাগরিককে তা দেয়া যায়। তাহলে এর অর্থ দাঁড়াল যে, গ্লোবাল অর্থনীতিকে যদি ফিরে দাঁড়াতে হয়- যতটা সম্ভব ফিরে উঠে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা সে ক্ষেত্রে নির্ভর করে মানুষের কাছে টিকার প্রাপ্যতা, টিকা কিনবার ফান্ড যোগান দেয়া আর ম্যানেজমেন্ট – যাতে সুষ্ঠুভাবে টিকা দেয়ার কাজটা সুচারুভাবে করা যাবে বা গেছে কি না এর ওপর। অর্থাৎ টিকা ধনন্তরী না হলেও বন্ধ অর্থনীতি থেকে বের হবার হাতের নাগালে থাকে আপাতত এমন একমাত্র উপায় হল টিকা। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় তাই দেখা যাচ্ছে।  আর এখানে গ্লোবাল নেতার বিরাট ভূমিকাটা হল, এখানেই এই তিন কাজে বিনিয়োগ জুটিয়ে আনা। কারণ টিকা উৎপাদন বা ক্রয়ে সামর্থ্যহীন অথবা লাইসেন্স দিলেও যে উৎপাদন করতে পারবে না; এমনকি টিকা শুধু পৌঁছে দিলেও হবে না; তা ঠিকমতো পুশ করার ম্যানেজমেন্টেও সহায়তা লাগবে এমন গরিব দেশ কম নয়, বরং এরাই সংখ্যায় বেশি। এ ছাড়া বড়লোক দেশগুলো নিজে সবাই টিকা নেয়ার পরও আরো দ্বিগুণ টিকা মজুদ করে রেখেছিল তাতেও “নয়া” করোনার বিস্তার ঠেকেনি। এমনকি এভাবে রেখে তারাও “নয়া” করোনার হাত থেকে বাঁচবে না। কারণ আফ্রিকায় টিকা না দিলে সেখান থেকেই এই ভাইরাস আরো ভয়ঙ্করভাবে নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা নতুন রূপ নিয়ে আবার সারা দুনিয়াতে ছেয়ে যাবে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাই বলছে, আমরা ওমিক্রনে এসে ঠেকেছি।

    তা হলে এখন বিচার করা যাক আমেরিকা বা চীন কে কতটা এ জায়গাটায় গ্লোবাল ভূমিকা দেখিয়েছে; বিনিয়োগ করেছে? আফ্রিকার সব বয়সের মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ১.২ বিলিয়নের মত। চীন একাই আফ্রিকাতে এক বিলিয়ন টিকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টায় রত হয়েছে। আর আমেরিকার একা নিজ প্রোগ্রামের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। বড়লোক দেশের জোট জি-৭ হিসেবে- ডব্লিউএইচও বা (হু WHO)-এর কাছে এদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ছিল এক বিলিয়ন ডোজের যা তারা এখনো টার্গেটের ধারে কাছে নাই বলে অভিযোগ। তবে WHO-কে দেয়া ওই মজুদ থেকেই (আমেরিকার অনুরোধে) হু আমাদের দেশে যত যা মডার্না ফাইজার টিকা সরবরাহকারী। আর ঢাকার একাংশসহ সারা দেশের জন্য এখনকার টিকার একমাত্র সরবরাহকারী চীন। আর আমার জানা মতে, চীনের এখনকার টিকাগুলো একেবারে বিনাপয়সায় আমাদের দেয়া। এ ছাড়াও অল্প কিছু টিকা জাপান থেকে এসেছে, আমেরিকা-ভারতের মুখরক্ষা করতে। কারণ টিকা-ইস্যুতে কোয়াডের ভিতরেই ক্যাচাল, মনোমালিন্য, অভিযোগের শেষ নাই। আর বড়কথাটা হল, বাইডেনের আমেরিকাই কোয়াডে টিকার জন্য অর্থ দেয় নাই, দিয়েছে জাপান। টিকার গ্লোবাল দায়-ভুমিকায় আমেরিকা নাই নয়ত পিছিয়ে। আবার সেকালেই ভারতের অভিযোগ তাকে কোন অনুদানের অর্থ  দেয় নাই। আর টিকার কাঁচামাল পেতে  আমেরিকা বাধা দিয়েছে।

    অর্থাৎ টিকা প্রশ্নে এরই মধ্যে গ্লোবাল ভূমিকা দেখাতে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে, আমেরিকার চেয়ে চীন অনেক বেশি গ্লোবাল নেতার ভূমিকা নিয়ে নিয়েছে। করোনা গত ২০১৯ সালের শেষের দিক থেকে বিশ্ব ছেয়ে ফেলা শুরু করেছিল। আর ২০২০ সালে ছিল ওর প্রথম ভয়ঙ্কর প্রকোপ। অথচ আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট এটা আদৌ কোনো সিরিয়াস ভাইরাস নাকি সাধারণ সর্দি-কাশি এসব নিয়ে মশকরায় দিন কাটিয়েছেন। মজার কথা হল, যড়যন্ত্র-তত্ত্ব বিশ্বাসী কিছু কমিউনিস্টরা বলে থাকেন, করোনার আবির্ভাব নাকি বিল গেটসের ‘জীবাণুযুদ্ধের ষড়যন্ত্র’। আর এনিয়ে খোদ ট্রাম্পের অবস্থানও এর কাছাকাছিই ছিল, যেটা আবার এখন পুরোই উদাম। সর্বশেষ কানাডায় ট্রাক ড্রাইভারদের দিয়ে ভ্যাকসিনবিরোধী আন্দোলনে এসে দেখা গেল ইউরোপের যড়যন্ত্র-তত্ত্ব বিশ্বাসী কমিউনিস্ট আর আমেরিকা-কানাডার কনজারভেটিভ বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট এরা দু’পক্ষই ভ্যাকসিনবিরোধিতার প্রশ্নে একাকার। দুনিয়াতে এমন ঐক্য সম্ভবত এই প্রথম; সত্যিই বিরল! সবশেষে কানাডার আদালত তাদের এই কথিত আন্দোলনকারীদের ইজ্জত-সম্মান বাঁছিয়েছেন, আদালত আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে।

    আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরির দিন যে ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে তা নিয়ে বাইডেনের পূর্বসূরি ট্রাম্প বা তার দল-গোষ্ঠীর অবস্থান। ট্রাম্প বলতে চাচ্ছিলেন যে, আমেরিকার জন্য তার আমলে গ্লোবাল দায়-দায়িত্ব নেয়া বিশাল ভারী হয়ে উঠেছে। অতএব ভানুর কৌতুকের মত, “তাহলে যুদ্ধেই যাবো না”; অর্থাৎ আমেরিকা আর ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশন এবং আমেরিকান গ্লোবাল রোল এর কোনোটাতেই আর থাকবে না। তাই সম্ভবত টিকা নিয়ে ফাজলামির রাস্তা নিছিলেন তিনি। এ ছাড়া আরো যেমন – ট্রাম্প ন্যাটো ভেঙে দিতে চান; এছাড়া এটা রাখার দরকার কী – ইউরোপ কোন খরচের দায় নেয় না ধরণের যুক্তি তুলেছিলেন। আর ১৯৪৫ সাল থেকে জার্মানি-জাপানে মার্কিন সেনা ও ব্যারাক আছে; আর একালের আফগানিস্তান থেকেও সব সেনা ফিরিয়ে আনতে চান, অবস্থান নিয়েছিলেন। এসবই ছিল গ্লোবাল নেতৃত্ব ছাড়তে চান এর ইঙ্গিত-ততপরতা। আর সবশেষে ৬ জানুয়ারি ২০২১ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের’ হাতে সংসদ ভবন আক্রমণকে সমর্থন করেন। বলা যায় করিয়েছিলেন ও এর বিল্ডিংয়ের মাথায় উঠে নৃত্য করান। তাহলে এই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট কারা, কী তাদের পরিচয় ও চাওয়া, আর কেন ট্রাম্প তাদের সমর্থন করেন বা নেন?

    সব প্রশ্নের জবাব একখানেঃ
    সব প্রশ্নের জবাবের মাথা একখানে – চীনের কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতি সবকিছু ক্রমশ হারানোতে আমেরিকান সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ থেকে উঠা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার একটা হল হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হয়ে যাওয়া বা এর সমর্থক হয়ে যাওয়া। এরা বলতে চায় আমেরিকা অর্থনীতির পিছিয়ে পড়া, ডুবে যাওয়া, কাজ-ব্যবসা হারানো, সচ্ছলতা কমে যাওয়া – এসব কিছুর কারণ একটাই। তা হচ্ছে, আমেরিকা হল সাদা ককেশীয় নীল-চোখের মানুষের দেশ। কিন্তু সেখানে আজ কালো আর বাদামি সারা দুনিয়ার মানুষে ভরে গেছে। আর এরা আমেরিকায় ছেয়ে বসে যাওয়াতেই এদের ভারে তাদেরই কাজ না পাওয়া বা সম্পদ ভাগাভাগিতে সঙ্কট এসেছে। অতএব তাদের বয়ানের সারকথাটা হল –  আমরা সাদারাই শ্রেষ্ঠ ছিলাম; এখন সেই পুরানা জমানাটাই ফেরত আনতে হবে। কাজেই দুনিয়াতে আমাদের গ্লোবাল দায়-দায়িত্ব নেওয়ার কাজ কী? আমাদের তা নিতে হবে কেন? এসবের অর্থে এরা বুঝুক না বুঝুক, যা তারা দাবি করছে এর বাস্তবায়ন-যোগ্যতা দুনিয়ায় থাকুক না থাকুক এরা এক এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থানে ঢুকে পড়েছে। আর এখানেই কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্রবাদীদের সাথে অজান্তেই তাদের অবস্থানগত মিল হয়ে গেছে। অথচ এরা খবর নেয় নাই যে, তাদের আমেরিকাই গত পঁচাত্তর বছর ধরে সারা দুনিয়াকে গ্লোবাল বাণিজ্যের গ্লোবালাইজেশনে টেনে নিয়ে গেছে। এখন খিচুড়ি একবার রান্না হয়ে গেলে কি আর চাল-ডাল আলাদা করা যায়? সেই অবস্থা! তেমনি এক বেচারা অবস্থায় এরা ও তাদের আমেরিকা! এছাড়া আবার গত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরাই। মাঠের বিচারে এরাই মূল ফাইটার।

    তা হলে গ্লোবাল কর্তৃত্ব হারাতে থাকা আমেরিকার অর্থনৈতিক এলোমেলো দুর্দশা দেখে থেকে এর একটা প্রতিক্রিয়া যদি হয় ট্রাম্প, তাহলে এরই আরেক প্রতিক্রিয়া (মুদ্রার অপরদিক) হল বাইডেন। বাইডেন বলতে চাইলেন তিনি অনেক বোঝেন – কাজেই তাদের প্রাণের আমেরিকা হারতে, হারাতে পারে না। কারণ তিনি জানেন আমেরিকার হাতে চীন-রাশিয়াসহ যে কেউ দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মত দুই মারাত্মক অস্ত্র আছে, যেটার কথা অন্যরা বুঝেইনি। এর একটা হল, বেয়ারা যারা এমন রাষ্ট্র ও ব্যক্তির উপর  অর্থনৈতিক অবরোধ (sanction) আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা। এ দুটো ব্যবহার করলেই আমেরিকাকে আর কারো কাছে গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাতে হবে না। আর এ’কাজটারই এক ব্যবহারিক রূপ-পদ্ধতি বিষয়ক ঘটনা হল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যেমন, রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কিন্তু একশনে যায়নি তখনই আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হল, রাশিয়ার উপর স্যাংশন আরোপ। অর্থাৎ বাইডেন যে অনুমানের উপরে চলতে চাইছেন তা হল, আমেরিকা রাশিয়ার সাথে কোনো  প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যাবে না; আর সে অনুযায়ী তিনি (যুদ্ধের খরচ দিবার ফলে এর সব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে বলে) বলিয়েছেন,  ন্যাটো কোনো “নো ফ্লাই জোন আরোপ করবে না”। মানে ন্যাটোও যুদ্ধে জড়াবে না। তবু কেবল অবরোধ আরোপ করেই নাকি বাইডেন সব দিকে জিতে আসবেন। কেন তা ঘটবে? কারণ, তিনি মহা-অস্ত্র “অবরোধ” তা ব্যবহার করে দিয়েছেন! আর এতে মনে হচ্ছে বাইডেন “অবরোধ” নামের সোনার ডিম দেয়া হাঁসের পেট কেটে সব ডিম বের করার পথে রওনা দিয়েছেন! তাই এনিয়ে নিচে এক প্রফেসরের বক্তব্য শুনে শেষ করব।

    সব কিছুতেই একই অবরোধ-নির্ভরতার অর্থ কী?
    হংকং থেকে পরিচালিত  গ্লোবাল পুঁজিবাজার অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের এক পত্রিকা “এশিয়া টাইমস”(Asia Times)। তারা অবরোধকে প্রসঙ্গ করে প্রধান এক রিপোর্ট করেছে। আর সেখানে এক্সপার্ট হিসেবে কথা বলেছেন আইএমএফের এক সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট কেনেথ রগঅফ (Kenneth Rogoff); যিনি বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরও। তার শেষ কথাটা দিয়েই শুরু করিঃ

    এমনিতেই আমেরিকা যেকোনো স্যাংশন আরোপ বলে যা করছে এর পেছনে আইএমএফের কোনোই অনুমোদন নেই। তবু এমন এই অতিমাত্রায় স্যাংশন বা অবরোধের ব্যবহার যা আমেরিকা করছে এর পরিণতিতে কী হবে তা নিয়েই এই প্রফেসর বলছেনঃ “স্যাংশন অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে ডলার-মুক্ত (ডি-ডলারাইজড) এক দুনিয়া হয়ে যাবার পথে হাটা এটা, সেই প্রক্রিয়ার দিকে যাওয়া এখন ব্যাপক গতি লাভ করবে। আর সেটাই ডলার আধিপত্যের কবর খোঁড়ার মতো সমতুল্য এক ঘটনা হবে” (the frequent use of the financial sanctions weapon will accelerate the process of de-dollarisation of the world, which is tantamount to digging a grave for dollar hegemony.)”।

    কেন এমন হবে এর আরও কিছু মুল্যবান বেজ ফ্যাক্টস তিনি তুলে এনেছেন। তিনি বলতে চাইছেন, স্যাংশনের ব্যাপারটা আর কেবল রাশিয়ার বেলায় সীমাবদ্ধ নাই। স্যাংশন   মানে এখন কেউ যেদেশ আমেরিকার কথা শুনে নাই বা নীতির বিরোধী, এমন সবার বেলায় ঘাড়ের উপর ঝুলানো এক তলোয়ার হয়ে ঝুলতে শুরু করেছে। কাজেই চীনও এখন এর আওতায়; তাতে সে আগামিতে তাইওয়ান আক্রমণ করতে যাক অথব না যাক কোন ফারাক নাই। আর এটাই চীনকে এখন বাইডেন আমেরিকান ডলারের বিকল্প – এখনই খুঁজে বের করতে বাধ্য করে দিয়েছে। কেন? এখনই কেন?

    For the United States, the frequent use of the financial sanctions weapon will accelerate the process of de-dollarisation of the world, which is tantamount to digging a grave for dollar hegemony.”

    প্রফেসর রগঅফ হিসাব দিচ্ছেনঃ এক) “আজ যে ডলার আধিপত্যের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়ায় আমরা আছি, আপনারা যদি এর একটু দুরের ভবিষ্যতের ছবিতে তাকান – বিশ্বাস করেন চীনও এমনই ভবিষ্যতের দিকে তাকাবেই। কারণ তার আছে তিন ট্রিলিয়ন (৩০০০ বিলিয়ন) ডলারের রিজার্ভ যা রাখা আছে আমেরিকার রিজার্ভ ব্যাংকে”। দুই) আমেরিকান ট্রেজারির দুই বিলিয়ন ডলারের সিকিউরিটি বন্ড কেনা আছে চীনের। এখন কোন কারণে আমেরিকা চীনের উপরও কোন অবরোধ দিলে রশিয়ার মত চীনেরও এসব অর্থ আটকে যাবে। তাই প্রফেসর বলছেন এজন্য রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ দেখে চীনেরও ক্ষুব্ধ-বিরক্ত হওয়াই নয়; এর চেয়েও বড় প্রতিক্রিয়া হবার কথা সেটা বা সেগুলো কী?

    যেকোন রাষ্ট্রের জন্য উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ধরে রাখার সমস্যাঃ
    বাইডেনের স্যংশন আরোপ এককথায় এতে স্যংশনকে  অতিব্যবহার ফলে তা অপব্যবহারের স্তরে চলে গেছে। শুধু তাই না, যেকোন রাষ্ট্রের জন্য তার উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ধরে রাখাকে উপায়হীন স্তরে নিয়ে ফেলেছে। বাইডেনের অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তের অর্থ  এখন হয়ে দাড়িয়েছে যে, প্রায় সব ব্যাপারে আমেরিকার ইচ্ছা ও স্বার্থের সাথে একমত থাকা বা তাল মিলিয়ে চলতে না চাইলে সব রাষ্ট্রেরই উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ডলারে তা সংরক্ষণ হারাম করে দিবেন তিনি।  তাহলে এখন চীন তাইওয়ানের উপর আক্রমণ করুক বা না-করুক চীনের সমস্ত উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণ এখন হুমকির মুখে। এই ব্যাপারটার দিকেই প্রফেসর মনোযোগ আনছেন।
    অনেকের মনে হতে পারে তাহলে তো বাইডেনের আমেরিকা এখন খুবই শক্তিশালী দেশ! তাই কী? এর জবাবটা হবে হ্যা এবং না। অর্থাৎ সাময়িক ভাবে হ্যা আর একটু আগামিতে  দৃষ্টি ফেললে দেখা যাবে তারা আমেরিকার ডলারের আধিপত্য ভেঙ্গে নয়া বিকল্প বের করে ফেলার পথেই। ফলে আমেরিকা তখন আর শক্তিশালী থাকবে না, বরং কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
    তাই প্রফেসর সমস্যাটা আমাদের বুঝাতে গিয়ে আবার বলছেন, “সোনা অবশ্যই সম্পদ ধরে রাখার এক ভাল বিকল্প  উপায়। কিন্তু এর সমস্যা হল, দুনিয়ার সবদেশের ব্যাঙ্ক রিজার্ভে যে পরিমণ সোনা রাখা আছে ডলারে এর মোট মুল্য হবে ২.৩ ট্রিলিয়ন। কিন্তু এক চীনের হাতে  যে বৈদেশিক মুদ্রা  মজুদ আছে এর পরিমাণ ৩.২ ট্রিলিয়ন।

    Gold is an alternative but China’s $3.2 trillion of foreign exchange reserves is greater than the $2.3 trillion value of all the world’s central bank gold reserves.

    মানে তিনি বলতে চাইছেন এতে সোনারই অভাব পড়বে। তত সোনা বিভিন্ন  দেশের মোট রিজার্ভেও নাই। ফলে  বাইডেন দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলো উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ রাখার যে ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছিল তাকেই ভালনারেবল বা নড়বড়ে করে দিয়েছেন। আর এটা বলাই বাহুল্য দুনিয়া যেহেতু উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ রাখার ব্যবস্থপনাকে নড়বড়ে করে রাখা সহ্য করবে না, মানে আমেরিকান খামখেয়ালিপনা বা সকলকে জিম্মি করে রাখা সহ্য করতে পারে না অতএব দুনিয়া একটা “ডলার বিকল্প” ব্যবস্থা গড়ে তুলবেই – এটাকেই প্রফেসর বলছে এক ডলার-মুক্ত বিশ্ব হবে সেটা!!!  আর এটাকেই সম্ভবত আমরা বলি আম-ছালা দুটাই হারানো দশা!!!
    আশা করি এখন পাঠক ধরতে পারবেন কেন সোনা? কেন সোনার দাম বাড়ছে? এখন অনেক মিডিয়ায় পাবেন আমেরিকান ডলার লেনদেন ব্যবস্থার SWIFT Code – এর বিকল্প  হিশাবে কেবল শুরু করা চীনের CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) এর কথা কেন উঠতে শুরু করেছে!

    [একটা সতর্কতাঃ অনেকে দেখা যাচ্ছে ভুল বুঝছেন তাই একটা আগাম সতর্কতা যে এটা আমেরিকার বিপক্ষে আর রাশিয়ার (মানের চীনেরও) পক্ষ নিয়ে – এভাবে তৈরি কোন লেখা নয়। এই চোখে দেখা ভুল হবে। এখানে আমার কাজ হল এভেলাবেল ফ্যাক্টস বিশ্লেষণ করে দেখানো। এমন চাপা পড়া দিকগুলোকে সামনে এনে দেয়া। আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব পরিণতি কী হতে পারে তা বলা বা সে ধারণা নিয়ে কথা বলা।  আশা করি পাঠক “পক্ষ-বিপক্ষের” মধ্যে আটকে থাকবেন না! ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৫ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যার বাইরের রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইউক্রেনঃ আমরা একা, কেউ জবাব দেয় না ভয় পায়

     

    ইউক্রেনঃ আমরা একা, কেউ জবাব দেয় না ভয় পায়

    গৌতম দাস

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3WL

    –

        guide to the Ukraine-Russia crisis

     

    শেষ পর্যন্ত রাশিয়ান সৈন্য ইউক্রেন অভিযান শুরু করে দিয়েছে। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে এক ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর জন্য নির্দেশ দেয়ার পরেই এই অভিযান শুরু হয়ে যায়। তিন দিক থেকে ইউক্রেনের উপর আক্রমণ শুরু হয়। গত কয়েক মাস ধরেই ইউক্রেন নিয়ে সামরিক উত্তেজনা চলছিল। একদিকে পশ্চিমা দেশ ও তাদের ন্যাটো জোট আর বিপক্ষে রাশিয়া – এভাবে হুমকি পাল্টা হুমকি চলার মধ্যেই এই সামরিক অভিযান এখন সত্যি হয়ে গেল। এই লেখায় পশ্চিমা দেশ বা শুধু পশ্চিমা বললে তা আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের মিলিত স্বার্থ বুঝাতে লেখা হয়েছে; যার আরেক প্রকাশ হল ন্যাটো জোট।

    বৃহত্তর দিকটা দেখে বললে, পুরান সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙে গিয়েছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে। ভেঙে গেলে পরে তা  রাশিয়াসহ মোট পনেরোটা রাষ্ট্রে আপসে বিভক্ত হয়েছিল। ইউক্রেন ওই পনেরো ভেঙে-গড়া রাষ্ট্রের একটা। আর সেই থেকেই মূলত রাশিয়া বাদে ১৪ রাষ্ট্রকে নিয়ে আরেক ধরনের ভাঙা-গড়া শুরু হয়েছিল। আর সম্ভবত তার শেষ-কাণ্ডই এখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আলাদা আলাদা ১৫ রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে বাধাহীন  জন্ম নেয়ার পরেও তারা থিতু না হয়ে উল্টো অস্থিরতার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল মূলত কিছু বাইরের উপাদান এতে হাজির হওয়ার কারণে। সেই বাইরের উপাদান ছিল ‘পশ্চিমা দেশ’। অথবা অন্যভাবেই বলা যায় ন্যাটোকেন্দ্রিক পশ্চিমা দেশ এরা, তাদের ব্যাপক খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেসব মারাত্মক ভুলগুলো করেছিল তার মাশুল দেওয়ার শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া ধরনের ঘটনাটাই বোধহয় এবার ঘটল।

    রাশিয়ার ইউক্রেনকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরে আক্রমণ শুরুর মূল লক্ষ্য রাজধানী কিয়েভের পতন ঘটানো তাই সেই অভিমুখে; আর তা সাময়িক হলেও লক্ষ্য কিয়েভ দখল। পুতিন ঘোষণা করেই বলছেন, ‘ইউক্রেনকে ডি-মিলিটারাইজ [to demilitarise] করা’ মানে তার সব সামরিক সক্ষমতা বিনাশ করে দেয়া আর ইউক্রেনের মনে হিটলার-গিরির ভাবনা [“denazify”], মানে ইউক্রেনের উগ্র চরম জাতিবাদী অবস্থান ছেয়ে গেছে সেটা ছেঁটে দেয়া এই অভিযানের লক্ষ্য [ Putin said he had orderd the operation to demilitarise and “denazify” the country.]। ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রুশ আর্মি রাজধানী কিয়েভের প্রবেশ মুখ পার হয়ে গেছে। এখন কার্যত সবাই কমবেশি নিশ্চিত যে, পুতিনের রাশিয়া কবে ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে যাবে সেটা একমাত্র তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে [Putin’s ‘prerogative to decide end of Ukraine operation’]। তবে ইউক্রেনকে রাশিয়া নিজ দখলে নিয়ে নেবে এমন কোনো পরিকল্পনা এখানে নেই বলে জানা যাচ্ছে।

    তাই এটা অনেকটা, ১৯৬২ সালে চীনের ভারতে আক্রমণ করে পুরো নর্থ-ইস্ট (আসাম) দখল করে নেয়া, এরপর কয়েক দিন এটা দখলে রেখে নিজের সক্ষমতা কতদূর এর একটা ইমেজ প্রতিষ্ঠার পরে নিজ ইচ্ছাতেই আবার সেনা প্রত্যাহার করে চলে যাওয়া – সেরকম। আর পরে এরই প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় সে যাত্রায় ভারত হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল, আর নতুন করে চীনকে ভাব-ভালোবাসার মেসেজ পাঠানো এমনকি তার এক গালভরা নামও ছিল ‘পঞ্চশীলা নীতি’ [শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি] বলে। তাতে চীন-ভারত ‘ভাই ভাই’ হয়ে গিয়েছিল। এটা তেমনি একটা কিছুর দিকে যাবে হয়ত। অথচ মূল ঘটনা হল – মাওয়ের চীন সরকার আর দালাইলামার মধ্যে তিব্বতের স্বায়ত্বশাসন নিয়ে  মতভেদ দেখা দিলে আমেরিকা তাতে দালাইলামার পক্ষে সিআইএ পাঠিয়েছিল; আর তারা ভারতের ভুমিতে নর্থইস্ট-আসামে স্টেশন করে ততপরতা শুরু করেছিল। তার তা থেকেই  নেহেরুর ভারতকে চীনের শিক্ষা দেওয়ার জিদ বা ঘটনা। কারণ, ১৯৫৩ সাল থেকে কোথাও কিছু হলেই আমেরিকা সেখানে সিআইএ পাঠানো – এভাবে হস্তক্ষেপের কূটনীতি চালু করেছিল। তাই কোনটাকে ন্যায় আর অন্যায় বলবেন?
    আবার মনে রাখতে হবে, আইনের মারপ্যাচে আপনি একটা দেশের বন্দর ব্লক করে ওদেশে প্রবেশ বা পণ্য আনা-নেয়ার পথ বন্ধ বা বাধাদেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এখন এসব ক্ষেত্রে ঐদেশের মুরোদ থাকলে সে অবশ্যই সামরিক-সহ সব পথেই বাধাদাতাদের উতখাত করবেই। রাষ্ট্রের কোর [core] ইন্টারেস্ট বা মৌলিক স্বার্থ ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া এমনই হবে; তাতে এই স্বার্থরক্ষার পক্ষে কোন দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন থাকুক আর নাই থাকুক অথবা এমনকি তা বেআইনি হোক! প্রতিক্রিয়া এমনই হবে। তাতে আপনি “আমেরিকা সেজে” সেটাকে “বেআইনি” আগ্রাসন বলার মজাও নিতে পারেন।

    বাংলাদেশের প্রধান মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়াতে স্বাভাবিকভাবে ইউক্রেন ইস্যু আছড়ে পড়েছে যদিও সেসব আলোচনার বেশির ভাগই “ন্যায়-অন্যায়” কার কতটা এদিকটাই ভারী করে। শুধু ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে অনেকেই যাবে অবশ্যই। কিন্তু কেন ঘটল এমন ঘটনা বা ঘটনাটা এ দিকে গেল কেন তা বুঝতে হলে আরো গভীর অন্য দিকে তাকাতে হবে। আবার এমন ঘটনা দুনিয়ায় নতুন নয়। সাথে আরেকটা সতর্কতা জানিয়ে রাখি; এটা কমিউনিস্ট-অকমিউনিস্ট ইস্যুও নয়। ফলে পুতিন বা কমিউনিস্টরা ভাল কিনা এই চোখে কোনো তর্ক তুলে আনাও অর্থহীন। এতে বুঝবুঝিতে অযোগ্যতাই প্রদর্শন করা হবে ও অকেজো তর্ক তুলে আনা হবে। আবার শুধু হামলার প্রসঙ্গের মধ্যে থেকে এজন্য যারা “ন্যায়-অন্যায়” খুজছেন তারা ধরে নিয়েছেন যেন এই হামলার আগে বা পরে কিছু নাই, কোন ঘটনা নাই  – জানবেন কেবল এর উপরে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছেন।

     অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের অভাব অনুভব কী খুবই তুচ্ছ বিষয়ঃ
    তাহলে অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের অভাব অনুভব কী খুবই তুচ্ছ বিষয় – “যা আমার কী আমি কেন”  আমল করব ধরণের???  একটু পরীক্ষা করা যাক!  আমেরিকান ফ্লোরিডা উপকূলের ৯০ মাইলের মধ্যে কিউবার নেতা ক্যাস্ত্রো এক কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটিয়ে বসলে, ১৯৬২ সালের এঘটনায় আমেরিকার তাতে অস্বস্তি শুরু হয়েছিল। এখান থেকে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস বলে ১৩ দিনের এক সেনা মোতায়েন ধরে টেনশনের কাহিনী শুরু হয়েছিল। কারণ, তাতে হুমকি পাল্টা হুমকিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় মিসাইল স্থাপন ও আমেরিকার দিকে তাক করে বসিয়ে দিলে তা এক চরম উত্তেজনাকর অবস্থা তৈরি করেছিল। মূল ইস্যু আমেরিকার ‘নিজ নিরাপত্তাবোধ’। আর অন্যদিকে, কিউবান বিপ্লবকে বাধা দান না করা।  আমেরিকা ‘নিজ নিরাপত্তাবোধ’ এর অভাব থেকে আপত্তি করাতে এর সব শুরু। আর তাতে এর শেষ হয়েছিল ‘কোনো যুদ্ধ নয়’ ভাবে। মানে আমেরিকা কিউবা থেকে আক্রান্ত হবে না আর বিপরীতে আমেরিকাও কিউবান বিপ্লব ভেঙে দিতে যাবে না আক্রমণ করবে না – উভয় পক্ষ এমন প্রতিশ্রুতি  বিনিময়ে তখন ঐ বিরোধের সমাপ্তি ঘটেছিল। এ বাইরে কোনো ন্যায়-অন্যায় অথবা এরা সঠিক-বেঠিকতা নিয়ে আলোচনা করতে বসে নেই। তাহলে এখানে রাশিয়ার “নিজ নিরাপত্তাবোধ” কোন বিবেচনার বিষয় হবে না, ১৯৯৭ সাল থেকে আমেরিকা রাশিয়াকে অপমান ও কোনঠাসা করে চলবে – আর এনিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া পরিণতি হবে না – এই আশা অবাস্তব ও আকাঙ্খা দিশাহীনই হবে।

    ইউক্রেনে কী নিয়ে বিরোধঃ
    অল্প কথায় বললে এর একদিকে ‘রাশিয়ার নিজ নিরাপত্তাবোধ’। কারণ প্রো-আমেরিকান ইউক্রেন সরকার ন্যাটোতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এথেকেই রাশিয়ার নিরাপত্তা চিন্তা শুরু। এটাকে যদি একালের ঘটনা হিসাবে দেখি, তবু এর শুরু খুবই কম করে ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু এ নিয়ে আপস আলোচনার ডায়লগের পথে কখনো দু’পক্ষ যায়নি, যেতে পারেনি; যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ান সেনারা পৌঁছানোর মুহূর্তে চীন-রাশিয়ার মধ্যে এক তথ্য বিনিময় ঘটেছিল, আর তাতে চীনের দিক থেকে রাশিয়াকে এক প্রকাশ্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক নিউজে বলা হয়েছে, চীন ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে এখন ‘নেগোসিয়েশন’ করে নিতে আহ্বান জানিয়েছে [China’s Xi speaks to Putin, calls for ‘negotiation’ with Ukraine]। যদিও আপাতত ঘটনা এদিকে যাবার পক্ষে কোনো আভাস নাই।
    নিজ নিরাপত্তাবোধের অভাব- সব সমস্যার শুরু এখান থেকেই। তবে এই বিবাদের রুট অনেক অনেক পুরোনা। আর সেখানেই এই “নিরাপত্তাবোধে অভাব” ব্যাপারটা ঢুকে আছে। অটোমান সাম্রাজ্যের সময়কাল (১২৯৯-১৯২২) যার তুলনায় রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের বয়স (১৮৯২-১৯১৭) অনেক কম। কিন্তু দুটা সাম্রাজ্যের আয়ু শেষ হয়েছিল কাছাকাছি সময়েই। সাম্রাজ্য মানেই তার কিছু কলোনি বা উপনিবেশ থাকতে দেখা যায়। আর জার সাম্রাজ্যের আমলেই নানা পথ ঘুরে ইউক্রেন জারের রাশিয়ার উপনিবেশ হয়েছিল আর তা থিতু হয়েই ছিল। তবে অস্থির হয়ে যায় ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনের কমিউনিস্ট বিপ্লব থেকে।

    অনেকেই হয়তো খেয়াল রেখেছেন জারের রাশিয়ায় লেনিনের বিপ্লব হয়েছিল কেবল রাশিয়ায়, মানে  জার সাম্রাজ্যের অংশ সংশ্লিষ্ট উপনিবেশগুলোতেও না। ব্যাপারটা অনেকটা, আমরা যখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া পরিচয়ে ছিলাম তখন যদি মূল ইংল্যান্ডে কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটত তবে তখন কলোনি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতে কি কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছে মনে করা যেত? অবশ্যই ঠিক তা না। তবে কী তা কল্পিত কমিউনিস্ট ইংল্যান্ড এই নয়া-রাষ্ট্রের অংশ হয়ে যেত? নাকি তাতে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াকে তারা কলোনিমুক্ত স্বাধীন বলে ছেড়ে দিত? আলোচ্য ক্ষেত্রে যেন কমিউনিস্ট ইংল্যান্ড কলোনি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াকে নিজের অঙ্গ করে নিয়ে নয়া এক কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছিল এটা হলে যেমন হত তেমনই রাশিয়ান বিপ্লবের নয়া নাম হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন – এক বিপ্লবী নয়া কমিউনিস্ট দেশ।

    ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরে, ইউক্রেনের ক্ষেত্রে  ঠিক এটাই ঘটেছিল। ইউক্রেন জারের উপনিবেশ ছিল বলে লেনিনের বিপ্লবের পরে কমিউনিস্ট রাশিয়ার সাথে একে যুক্ত করে নিলে তা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে হাজির হয়, ১৯২২ সাল থেকে। অর্থাৎ একা ইউক্রেন নয়, জারের সব উপনিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করে নয়া সোভিয়েত রিপাবলিক বলে রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। এতে ইউক্রেনও রাশিয়ান কর্তৃত্বের সোভিয়েত রিপাবলিক হয়ে যায়। বিপ্লব রাশিয়াতে হলেও রাষ্ট্র হিসেবে এর নাম হয়ে যায় ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ (১৯২২ সাল থেকে) আর বলাই বাহুল্য এতে রাশিয়ান ভূখণ্ডের তুলনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েক গুণ বড় হয়ে যায়।

    অনেকে এটাকে নয়া নামে লেনিনের উপনিবেশ এক্সটেনশন বলতে পারেন বা বলেন হয়ত। কিন্তু  এর পেছনের মূল কারণ ছিল রাশিয়ান কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুনিয়ায় প্রথম কমিউনিস্ট বিপ্লব বলে আর খোদ ইউরোপের ঘটনা আর ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যখন সবাই ব্যস্ত এই সুযোগে ফাঁক গলে লেনিনের ক্ষমতা দখল করে নেয়ার ঘটনা ছিল সেটা। ফলে পরে তারা প্রচণ্ড ভীত ছিল যে ইউরোপের কলোনিমালিকেরা (তখনকার ব্রিটেন ফ্রান্স এরা; যাদের প্রধান ব্যবসা তখনও ছিল কলোনি দখলদারি ) কখন জানি হামলা করে। ম্যাপের দিকে তাকালে দেখব, মূল রাশিয়ার মোটামুটি চার পাশে বেষ্টন করে আছে সাবেক সোভিয়েতের ইউক্রেনসহ বাকি উপনিবেশগুলো। অর্থাৎ তাদের পেরিয়ে গেলে তবেই বাইরে থেকে রাশিয়া আক্রমণ করা সম্ভব হতে পারে। আবার ইউক্রেন হলো সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড যার অপর পাড়ের দিকটাই হল পশ্চিম ইউরোপ। রাশিয়াকে যাদের ভয়ে সারাজীবন কাটাতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এরাই ইউরোপের মূল কলোনি দখলদার যারা এককালে আজকের আমেরিকাসহ সারা দুনিয়াকেই কলোনি করে রেখেছিল ১৯৪৫ সালের আগে পর্যন্ত।

    রাশিয়ার নিরাপত্তাবোধের প্রশ্ন কবে থেকেঃ
    তাহলে কমিউনিস্ট রাশিয়ার আমল থেকেই নিরাপত্তাবোধের অভাব প্রসঙ্গটা তুঙ্গে উঠেছিল যে, তারা নতুন ধরনের (কমিউনিস্ট) রাষ্ট্র বলেই পড়শিদের থেকে বা তাদের মাধ্যমে অন্যের হাতে হামলার শিকার হতে পারে এই সম্ভাবনা থেকে সব শুরু। এমনকি এই নিরাপত্তাবোধের অভাব প্রশ্নটা এতই সিরিয়াস ছিল যে, এ’থেকে ট্রটস্কি-র (Leon Trotsky)   নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব পর্যন্ত হাজির হয়ে ছিল যে, ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ করে তা টিকানো সম্ভব কিনা; সম্ভব করতে গেলে কী করতে হয় ইত্যাদি। এ নিয়ে তাদের নেতৃত্বে বিভক্তিও দেখা দিয়েছিল সেসময়। সারকথায় ওই ১৯২২ সালে রাশিয়া রাষ্ট্রের বদলে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র (সংক্ষেপে এরপরে শুধু সোভিয়েত লিখব) গড়ার মূল কারণ ছিল নিরাপত্তাবোধের অভাব মিটানো। আর ইউক্রেন-রাশিয়ার বিশেষ নিরাপত্তা সম্পর্ক সেই থেকে। কারণ ইউক্রেন পশ্চিম ইউরোপ থেকে রাশিয়াকে প্রটেক্ট করা সবচেয়ে বড় ও মূল ভূখণ্ড।

    পরবর্তীকালে ১৯৫৩ সাল থেকে আইসেনহাওয়ার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ‘হকিশ’ [hawkish] বা বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে সব কেড়ে নিয়ে যাওয়া আচরণের খারাপ দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল এমন আমেরিকার জন্ম হয়। এটাকেই কমিউনিস্টদের ভাষায় আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হয়ে ওঠা বলা্র শুরু। এমনকি তা কোল্ড-ওয়ার [Cold War] বা স্নায়ুযুদ্ধের কালের শুরু ধরা হয় যার অন্য একটা বড় কারণ হল ‘পারমাণবিক অস্ত্রের’ জমানার শুরুও সেটা। সোভিয়েত ও আমেরিকা দু’পক্ষই পারমানবিক অস্ত্রের  ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছিল ঐ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়েই। পারমাণবিক অস্ত্রের কথা ইউক্রেন নিয়ে আলাপে কেন তুললাম?

    পারমাণবিক অস্ত্রের কথায় ইউক্রেন নিয়ে আলাপে কেনঃ
    কারণ ওসব পারমাণবিক অস্ত্রের একটা বড় অংশই রাশিয়া মোতায়েন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মুখ ভূমি [frontal state-land], ফ্রন্টাল স্টেট হিসেবে ইউক্রেনে। কারণ পশ্চিম ইউরোপ থেকেই রাশিয়া আক্রান্ত হতে পারে বলেই রাশিয়াকে  রক্ষা করতে বাফার ইউক্রেনেই সেসব পারমানবিক অস্ত্রগুলোর বেশিরভাগ মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে সোভিয়েত ভেঙে  গেলেও সেই থেকে ১৯৯২ সালে ইউক্রেন আলাদা রাষ্ট্র হবার পরেও অনেকদিন তা আগের মতই মোতায়েন ছিল।   পরে আস্তে আস্তে সেসব পারমাণবিক অস্ত্র তুলে বা খুলে ফেলা হয়।

    এখন অনেকে যুক্তি তুলছেন, সেসময় ওসব অস্ত্র রেখে দিলে আজ ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে মার খেতে হতো না। এমন কথা কিছু ফ্যাক্টস নজরে না থাকার কারণে বলা হচ্ছে। প্রথমত পারমাণবিক অস্ত্র নিজেই এক বিরাট রাজনৈতিক তো বটেই এমনকি অর্থনৈতিক বোঝা। এর প্রধান কারণ অহেতুক (তুল্য রিটার্ণ নাই) বিরাট খরচ; যে খরচের পক্ষে সাফাই জোগাড় করা কঠিন। এছাড়া টেকনিক্যালি সাউন্ড স্টাফ লাগে প্রচুর আর এমন মোতায়েন থাকা অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা আরেক বাড়তি খরচ।  যেমন উত্তর কোরিয়া নিয়ে নিরন্তর আমেরিকার সাথে খোচাখুচি টেনশনের মুখে এখন চীনের পজিশন হল – ঐ পুরা অঞ্চলকেই পরমানু-মুক্ত রাখা। সবপক্ষই  অপরের সামরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকলে মিলে একটা কোন চুক্তি করুক, এটাই চীনের অবস্থান।  এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কথাগুলো এভাবে বলা হছে এজন্য যে, অস্ত্রগুলো ইউক্রেনের ভূখণ্ডে মোতায়েন হলেও এর মালিক-কর্তা ও খরচ বহনকারী ছিল খোদ রাশিয়া। ফলে সোভিয়েত ভেঙে গেলে এটা ইউক্রেনের জন্য দায় হয়ে উঠেছিল। মোতায়েন অস্ত্রে জং ধরিয়ে তো কারো কোনো স্বার্থ নেই। তবে উল্টা স্বার্থ ছিল ন্যাটোর। অস্ত্রগুলো পশ্চিম ইউরোপের দিকে, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি – এসব দেশের দিকে তাক করা। কাজেই তাদেরই বড় স্বার্থ ছিল কেবল ইউক্রেনকে যেন  পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করে দেয়া হয়। এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এখন পাঠকেরা বুঝবেন ইউক্রেনে হামলা স্রেফ ন্যায়-অন্যায়ের ইস্যু না। শুধু রাশিয়ান হামলার ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা দিয়ে এর সমস্যা বা সমাধান কিছু বুঝা যাবে না।

    সোভিয়েত ভেঙে যাবার পরেঃ
    বেশির ভাগ মানুষই কোল্ড-ওয়ার [cold war] বলতে সেকালে সোভিয়েত-আমেরিকার রেষারেষি-টেনশন যেটা যেকোনো দুটো দেশের মধ্যে হয়েই থাকে  তেমনই কিছু একটা বলে বুঝে থাকে। এটা ভাল অনুমান না। গভীর তলদেশ কত গভীরে তার আন্দাজ না নিবার মত ভুল। কোল্ড-ওয়ার বা এই এনিয়ে টেনশনের এক মূল বৈশিষ্ট্য হল দুই ধরনের অর্থনীতি। না, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বা যেটাকে ম্যাক্রো [macro] অর্থনীতি বলে সেটার কথা বলছি না। বলছি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা গ্লোবাল বাণিজ্যের দিক থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থে। তাই কোল্ড-ওয়ার বলতে তাদের মূল এক বিভক্তি হল – আমেরিকার নেতৃত্বে একদল দেশ, গ্লোবাল বাণিজ্যের প্রয়োজনে এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম চালু করে সবাই তাতে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আরেক দল (এরাই কমিউনিস্ট বা সোভিয়েত ব্লকের) বলছে, গ্লোবাল বাণিজ্য দূরে থাক, আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও দরকার নেই। তাই আমরা ওদের সাথে নাই।  প্রথম দল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে এই বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ’ব্যবস্থাটা একটা শৃঙ্খলার সিস্টেম  চালু করেছে। যদিও এটা বৈষম্যমূলক, এর মাখন যায় মাতবর রাষ্ট্রের ঘরে। অন্যদের জন্য তবু তা মন্দের ভাল; বিনিয়োগ বা কাজ-চাকরিহীন হয়ে না খেয়ে মরার চেয়ে। তাই সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো কেউ আইএমএফের সদস্য হয় নাই, (আমেরিকাও আগ্রহ দেখাতে চায় নাই এটাও একটা কারণ) একারণে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে যোগ দিতে চাইলেও তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
    আমাদের মনে রাখতে হবে পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের দুটা পরিণতির উদাহরণ হয়ে (তবে আদর্শ হিসাবে দেখতে বলছি না) তা আমাদের সামনে হাজির আছে। চীন আজ গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের পথে উঁচুতে অথচ উল্টাদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে, রাশিয়া হয়ে ধুঁকছে। আজ পাশে চীন না থাকলে আমেরিকার বিরুদ্ধে “কেঁদে উঠতেও” পারত না। কিন্তু সাবধান চীন-রাশিয়ার  তারা পুরান কমিউনিস্ট বলে হয়েছে তাদের সম্পর্কটা হয়েছে – এমন ধরে নেয়া একেবারেই না। মনে এই ভুল লালন করা যাবে না। বরং তাদের প্রধান এনিমি বা বাধা আমেরিকান আধিপত্য – এই কমন প্রধান এনিমির জন্যই তারা কাছাকাছি ও এটাই তাদের সখ্যতার ভিত্তি।

    তাহলে কোল্ড-ওয়ার থাকলেও সোভিয়েত ভেঙে গেলে  -সবার আগে দুটা অর্থনীতি বা অর্থনীতিগত ফারাক – এখানেই প্রধান পরিবর্তনটা ঘটেছিল। সোভিয়েত ব্লক – ১৯৯২ সালের মধ্যেই এরা সবাই আইএমএফের সদস্য হয়ে যায়, এমনকি রাশিয়াও। অর্থাৎ তখন থেকে দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ হয়ে যায়।সবার সাথে সবার  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও সম্ভব হয়ে  উঠে তাতে। কিন্তু তাহলে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশগুলোরও উচিত ছিল বিষয়টাকে গঠনমূলকভাবে দেখার, পরিকল্পিত ও সহযোগিতামূলক ভাবে দেখার।

    এই অংশটা আমার বক্তব্যের সার কথাঃ
    গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাতপর্য বুঝতে হবে।  গ্লোবাল নেতা হিসাবে ১৯৯১ সালের পরে আমেরিকার এখানে এক বিরাট করণীয় ভুমিকা ছিল। যেটা সে করে নাই বলে আজকের এই সংকট ও তার ব্যর্থতা। এবং এটা আজকে গ্লোবালি আমাদের সকলকেই এক সংকটেরর মুখোমুখি করেছে। কী সেটা?
    এককথায় ইন্ট্রিগেশন বা সমন্বয়। এবং ইতিবাচক দৃষ্টিতে সমন্বয়।  দুটা ধারার অর্থনীতিতে  থাকা ভিন্নতা ভেঙ্গে তাদের এক হবার এক ধারা হবার সুযোগ এসেছে এটাকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্নতা মিশে যাবার ব্যবস্থা নেয়া। কারণ দুটা পক্ষ অসংখ্য সামরিক টেনশন ও সংঘাতে থেকে বের হয়ে আসার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে সেটাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো। কাজটাও যথেষ্ট কঠিন ছিল। কী করে পুরোনা ১৫ রাষ্ট্রকে একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ করবে – যার প্রধান দিকটা ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে এক বাণিজ্যিক লেনদেন, বিনিময় ব্যবস্থা কার্যকর ভাবে খাড়া করা।  এসব দেশ থেকে যেসব পণ্য প্রতিযোগিতায় বাইরের সবার জন্য সবচেয়ে সস্তায় দেয়া সম্ভব সেগুলোকে উতসাহিত করা। আর এটা সম্ভব হলেই বিনিময়ে তাদের যেসব পণ্য পশ্চিমা জগত থেকে লাগবে চাহিদা আছে সেসব আমদানির অর্থনৈতিক সক্ষমতাও হাতে পাবে বলে আমদানি করবে; আর বলা বাহুল্য সেটা পণ্য, বিনিয়োগ সেবা সবকিছুতেই।  এই লক্ষ্যে একটা ব্যাপক স্টাডিভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করতে পারত। আর একাজ করতে গিয়ে ঐ ১৫ দেশের নিজ নিজ কোর স্বার্থগুলো কী, ওদের জনগণের মানে পাবলিক এক্সপেক্টেশন গুলো কী তা জেনে নিতে হত। আর সেবগুলো অর্থনৈতিক সমন্বয়ের পরিকল্পনায় প্রতিফলিত করতে হত। আর এতেই পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক্টা আগেই তৈরি হয়ে যেত।
    তবে একাজ আগে অর্থনীতি দিয়ে শুরু করতেই হত। কারণ বস্তুগত সম্পর্কটা আগে তৈরি হয়ে গেলে পরে রাজনৈতিক ভিন্নতাগুলো তৈরি হয়ে যাওয়া  অর্থনৈতিক স্বার্থে আপোষে মিটিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেত।

    কিন্তু না। গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা এখানে কোন স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করে নাই।  অথবা না করলেই বা চাপ ফেললেই তাদের বেশি লাভ এমন অনুমান কাজ করেছিল।

    কিন্তু আমেরিকা বুঝেছিল উলটা।  প্রথমত সোভিয়েত পতনটাকে সে নিয়েছিল উতযাপনের বিষয় হিসাবে। কী উতযাপন? না, দুনিয়াতে আমেরিকা তাহল তখন থেকে একক পরাশক্তি। এবং এর চেয়েও বড় কথা এই পরাশক্তি-বোধ এক চরম দায়-দায়ীত্বহীন কথিত পরাশক্তির। যেন যে পরাশক্তি হয়ে যায় তার আর দুনিয়া নিয়ে  কোন দায়দায়িত্ব থাকে না। যা ইচ্ছা তাই যেন সে করতে পারে এমন এক চরম বা এবসলিউট স্বাধীনতা-বোধের ফ্যান্টাসি ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। কথাটা একটুও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না। মিলিয়ে দেখা যাক।
    সেটা ছিল ক্লিনটনের যুগ (১৯৯৩-২০০১) মানে ২০০১ সালে জুনিয়র বুশের ক্ষমতায় আসার আগের আট বছর। এতে আমাদের মত দেশে বেধরক সামরিক ক্যু ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল – এই নীতি অন্তত তিনি বদলানোর পক্ষে চলে যান মূলত কিছু থিঙ্কট্যাংকের চাপাচাপিতে।  যার ফলস্রুতিতে একটা বড় উদাহরণ হল পাকিস্তান। তবে ভারতের বেকুবি প্ররোচনা আর নওয়াজ শরীফের তাতে পা-দেয়ার পরিণতিতে মোশাররফের ক্যু ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্যু হয় নাই। যদিও এই নীতি পরের আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চালু রাখতে পারে নাই। সিভিলিয়ান মুখোস পরে করেছেন। বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন এর প্রমাণ।   ্তাতে যতটুকু যা নয়া কাজ!

    আর ২০০১ সালে থেকে নির্মম ও বেপরোয়াভাবে বুশের ওয়ার অন টেররে যেকোন (বিশেষত মুসলমান) দেশে রেজিম বদল হয়ে উঠেছিল তার প্রধান নেশা। আর এর পিছনের চিন্তাটাই ছিল “আমেরিকা এখন একক পরাশক্তি” ফলে যা ইচ্ছা তাই।  অথচ বুঝতেও পারে নাই দায়দায়িত্ব কী জিনিষ গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষ! তাই পাঁচ বছরের মধ্যে (২০০৬) মূল স্ট্রাটেজিক প্লানারেরা বুঝে যায় তারা ডুবে যাচ্ছে, হাত-পা আটকে গেছে।

    ওদিকে পুরান সোভিয়েতেও তারা একাজটাই করেছে আরো ভয়ানকভাবে। রাশিয়াকে গুনেছে বুড়া বাঘ হিসাবে আর বাকি ১৪ রাষ্টকে ব্যবহার করেছে একেকটা পুতুল সরকার বসিয়ে, ওসব দেশে এনজিও খুলে আর এর মাধ্যমে কাকে পুতুল করা হবে সেই বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। অথচ আমেরিকা দেখতে পায় নাই এর অর্থ হল ওসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সোভিয়েতের কারণে এমনিতেই ছিল দুর্বল অবিকশিত আমেরিকা সেটাকে আরও দুর্নীতিবাজ ও প্রো-আমেরিকান করে গড়ে তুলতে।  অথচ বুঝতেই চায় নাই এমন প্রো-লাগালোর অর্থ হল ঐ ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এইবার প্রো-রাশিয়ান আরেক প্রতিরুপ গড়ার দিকে আমেরিকা নিজের ঠেলে দেওয়ার কর্মসুচি নেয়া হচ্ছে সেটা। প্রো-আমেরিকান বা প্রো-রাশিয়ান পুতুল – এটা কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতে পারে না। অথচ আমেরিকা এর ভিতরে ঐ ১৪ রাষ্টড়কে নিয়ে গেছে। আর তাতেও সামলাতে না পেরে এবার “ন্যাটোর মেম্বার বানিয়ে নেয়া” – এই নতুন কায়দা শুরু করেছিল। কেউ প্রশ্ন তুললেই বিরোধী মানে তারা গণতন্ত্রবিরোধী। যেন কাউকে কৌশলে ন্যাটোর মেম্বার করে সবার মুখ বন্ধ করা খুবই “গণতন্ত্রী কাজ” ও সমাধান। মাঝে ১৯৯৮  সালে খোদ রাশিয়াকে  লোভ দেখিয়ে জি৭ এর সদস্য বানিয়ে নিয়ে সেটা নিজে জি৮ করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার মুখবন্ধ করে রাখার এই পরিকল্পনা কাজ করে নাই। এককথায় কোন দায়ীত্ববান গ্লোবাল নেতার ভুমিকা নিয়ে নয় খাবলা দিয়ে খাবার মত ছল-বলে কৌশলে ঐ ১৪ দেশের উপর রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে গেছে আমেরিকা। আর একালে কিছু হলেই সবার উপরে অবরোধ আরোপ – হয়ে গেছে আমেরিকানদের ঢলে পড়া গ্লোবাল নেতৃত্ব টিকবে না জেনেও তা টিকানোর আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেছে। এরই এক পর্যায়ে অসহ্য হয়ে পড়া রাশিয়া এবার পালটা আঘাত করেছে। যদিও আঘাত বা পালটা আঘাত এদের কোনটাই সমাধান নয়। দরকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গটে তোলা, সেটা গ্লোবালি এবং ওসব ১১৪ বা ১৫ দেশেও।

    আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম এখানেই ব্যর্থ আর তা থেকেই এরই এক প্রকাশ হল,  বর্তমান সঙ্ঘাত।
    অনেক সময় আপনি যাকে শত্রু মনে করেন, তা সত্ত্বেও এটাও সত্যি যে তাকে কিছু ট্রেনিংয়ের ভেতর দিয়ে যদি নিতে পারেন তবে সেটা আপনাদের উভয়েরই ভাল হতে পারে। অহেতুক স্বার্থ সঙ্ঘাত তাতে লোপ পেতে পারে।

    সাধারণভাবে বললে, পশ্চিমের উচিত ছিল প্রথমে অর্থনৈতিকভাবে যতদূর সম্ভব ঘনিষ্ঠ ও পরস্পর নির্ভরশীল ও সহযোগিতায় এক বাণিজ্য সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া বা গড়ে তোলা। পরে রাজনৈতিক স্বার্থ অবস্থান ভিন্নতাগুলো কমানোর বিষয়ে কাজ করা। এতে পূর্ব-ইউরোপের সাথে ইন্ট্রিগেশন সহজ ও কম, বাধাহীন হত। মূলত এটাকেই বলছি পরিকল্পিতভাবে কাজ করা। কিন্তু আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম ইউরোপ এ কাজটা করেছে অপরিকল্পিত হেলাফেলায়। তার চেয়েও চাপে ফেলে বাধ্য করায়, আর অপর পক্ষের উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করে। সর্বোপরি এনজিও বা অন্য কোনো উপায়ে পাপেট সরকার বসিয়ে প্রভাবিত করা আর সাথে, যেকোনো উপায়ে ওসব দেশকে ন্যাটোতে ঢুকিয়ে নেয়া।
    এর মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও অন্যায় কাজটা  হল ন্যাটো টিকিয়ে রাখা। আর এটাকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐ ১৪ দেশকে ধরার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা।  ন্যাটোর জন্ম হয়েছিল  পশ্চিমাদের ঘোষিত রাশিয়াবিরোধী সামরিক জোট হিসাবে ১৯৪৯ সালেই। আর যার এক মারাত্মক নীতি হল, এর কোনো এক সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যের সবাইকে ওর পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে যুদ্ধে যেতে হবে। তা থেকেই এখনকার ইউক্রেন দ্বন্দ্বের জন্ম; যেটাতে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করে নিয়ে রাশিয়ার ওপর পাল্টা আধিপত্য কায়েম করে নিতে চাচ্ছে। আর রাশিয়ার আপত্তি হলো আমার নিরাপত্তা স্বার্থ উপেক্ষা করলে আর আমার ওপর রুস্তমি করতে চাইলে আমি সর্বাত্মক বাধা দেব। পশ্চিমের হুমকির মুখে তাই ইউক্রেনকে রাশিয়া কিছুতেই ন্যাটোর সদস্য করে নিতে দেবে না।

    এই হলো আমেরিকার অপরিকল্পিত ও হামবড়া দেখানোর সুবিধার ওপর চালিয়ে দেয়া কাজ। আমেরিকার ধারণা, সে ন্যাটোতে যোগদান করা ইউক্রেনের ‘অধিকার’ বলে চালিয়ে দিতে পারবে। এই সাফাই দিয়ে নিজের সব আকাম চাপা দিতে পারবে।  এটা ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপার বলে চালিয়ে দিতে পারবে।

    প্রথমত আমেরিকা নিজের বেলায় এভাবে বিষয়টাকে দেখে নাই। অর্থাৎ ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস যেটাকে বলে তখন, আমেরিকা কিউবার মিসাইল মোতায়েনকে কিউবার ‘অধিকার’ হিসেবে দেখতে পারেনি কেন? ন্যায় হিসেবে দেখতে পারেনি কেন? কেন নিজের নিরাপত্তাবোধকে আপত্তির ইস্যু করেছিল?

    এখানে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের প্রধান স্ববিরোধিতা হল, পুরনো সোভিয়েত ব্লককে ঘরে ডেকে নেয়া বা স্বাগত জানাতে না পারা। তারা সেটা তো করেইনি, উল্টা ন্যাটোকে শক্তিশালী করছে; তাও আবার সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোকেই ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে। সোভিয়েত ভেঙ্গে গেছে; এরপরে আর ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা থাকা যেখান প্রশ্নের মুখে সেখানে  আমেরিকা যদি রাশিয়ার সাথে যদি নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক চায় তবে ঐ ১৪ দেশকেই ন্যাটোতে ঢুকাতে হবে কেন? ফলে পশ্চিমের উদ্দেশ্যটাই অসৎ হয়ে গেছে, সে রাশিয়ার জন্য উপযুক্ত পার্টনার নয়। এটা তো কাজ করবে না সংঘাতই ফিরে আসবে।

    এ ছাড়া পুরোনা সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে এনজিওর তৎপরতাকে পাপেট সরকার বসানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা আর পরিস্থিতিকে এমন দিকে ঠেলে দেয়া যেন এখন ইউক্রেনের মতো দেশগুলো হয়েছে রাশিয়া আর পশ্চিম দু’পক্ষেরই নিজ নিজ পাপেট সরকার বসানোর প্রতিযোগিতা। এটা পশ্চিমের জন্য কোনো যুক্তিতেই তাদের পলিসি হতে পারে না- তাদের দাবি অনুসারে তারা তো ডেমোক্র্যাসির বরপুত্র! নাকি? কোনো দায়িত্ববান ব্যবসায়ীও এমন অবস্থান নিতে পারে না।

    রাশিয়ান হামলার মুখে আমাকে একা ফেলে পালিয়েছে পশ্চিমঃ
    এই কথাগুলো হলো হামলার দ্বিতীয় দিন, মানে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির বোধোদয়! “Who is ready to fight alongside us? I don’t see anyone,” এই হলো পাপেটের করুণ দশা। এ কথার সোজা মানে হল, সারা পশ্চিম তাকে ছেঁকা দিয়েছে; এতিম করে ফেলে পালিয়েছে এবং এজন্য পশ্চিম দায়ী অবশ্যই। কিন্তু প্রধান দায়ী প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নিজেই। কেন তিনি আগে চিনতে পারেননি? কাদের হাত ধরে ও উসকানিতে জেলেনস্কি পুতিনের সাথে শত্রুতা করতে গিয়েছিলেন? লাগতে গিয়েছিলেন কেন?
    এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় যে এই খবরটা কোন পশ্চিমা মিডিয়া কাভারই করে নাই। এসেছে evening standard স্থানীয় পত্রিকায় আর নয়ত আল জাজিরায়। কেন? দেশের দোষ ঢেকে রাখার দেশপ্রেমিকতা? নাকি এটাই এমবেডেড জার্ণালিজম???

    তাহলে এক মাস আগে পোল্যান্ডে ও রোমানিয়ায় পর্যন্ত বাইডেনের আমেরিকা নিজ সেনা মোতায়েন করেছিল কেন? আবার মোতায়েন করার পর যখনই নিশ্চিত হয়েছে যে  রাশিয়া আক্রমণ করবেই স্রেিরিয়াস আগেই সেনা প্রত্যাহার করে আমেরিকা ভেগে যায়। আর এখন বলছে আমেরিকা রাশিয়ার সাথে বা ইউক্রেনের ভূমিতে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করবে না। কী তামাসা! এ কথা আগে বলেনি কেন? এটা কি প্রতারণা না?

    কেন এমন পরিণতিঃ
    কারা কারা রাশিয়ার ওপর স্যাংশন দিয়েছে এই তালিকাটাও বেশ মজার। এক কথায় এটা হল বাইডেনের সাজানো অ্যান্টি-চায়না ব্লক; একেবারে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। মানে হল বাইডেনেকে যদি তারা শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে থাকে তবে এটা হবে সবাইকে না খাইয়ে মারার বুদ্ধিতে গড়া এক ব্লক যাদের মূল বৈশিষ্ট্য তাদের আর ‘গ্লোবাল’ হওয়ার ব্যাপারটাই কখনই বুঝে নাই। এছাড়া বুঝার মুরোদ নেই সেতা তো বহু পুরানা। মানে হল, তাদের যুদ্ধের খরচ বইবার অর্থেও কারো সাথে যথেষ্ট সারপ্লাস সম্পদ নেই অথচ গ্লোবাল নেতা হওয়া বা থাকার ক্ষেত্রে যা এক নম্বর শর্ত। আর মূলত একারণেই তাদের কেউ একটা দেশও ইউক্রেনের পক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়ায় নাই। যদি না দাড়াতে পারে, দাড়ালে বিশযুদ্ধ লেগে যাবার ভয় আছে মনে করে তাহলে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে সদস্য করে নিতে চাওয়াটাই তো অর্থহীন।

    কিন্তু বাইডেনের পরামর্শক বা থিংকট্যাংকের ফেলোরা তবু বুদ্ধি দিয়ে যাচ্ছেন, আমেরিকা এখনো সামরিক দিক থেকে চীনের ছয় গুণ শক্তিশালী। কাজেই তারাই গ্লোবাল নেতা।’ এদের কে বুঝাতে পারবে গ্লোবাল সক্ষমতা বলতে প্রধানত অর্থনৈতিক সক্ষমতা বুঝায়। এরপরে সামরিক আসতে পারে, আগে নয়।

    তাতে ফলাফল? এখন নিম্নচাপ! মানে?
    মানে হল, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটোর খরচ কে দেবে? এর উত্তর নেই বলে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির রাস্তায় পড়ে থেকে কাতরাচ্ছে! আর পশ্চিম ইউরোপের কথা, আমেরিকা ন্যাটোতে খরচ না দিলে তারা নড়াচড়া করবে না। তাই সাত মণ ঘি ঢালা হয়নি, আর তাতে রাধাও নাচেনি। আবার এটা এমনই লজ্জার কথা, তারা সেটা প্রধান কারণ মিডিয়ায় আনে নাই। প্রায় ৪৮ ঘন্টা পরে লজ্জার মাথা কাটা গেলে ৬০০ মিলিয়ন ডলারে হয়াত খউলেছে। যার অর্ধেকেরও বেশি ফ্রান্স অস্ত্রের ব্যবসা করে নিতে নিয়েছেন, ইউক্রেনকে দূর থেকে কিছু অস্ত্র পাঠাবেন বলে  অথচ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অভিযোগ তাকে ভালুকের মুখে ফেলে পালিয়েছে- এই বক্তব্যের ফলে পশ্চিমের কার মুখ-সম্মান এখনো বেঁচে আছে? আমেরিকান সংসদে অর্থের মঞ্জুরি হবে, এরপর বাইডেন অর্থ পাঠাবে আর এরপর ফ্রান্সের মত কেন অর্থের ভাগ পেলে অস্ত্র পাঠাবে ? এর ভাবেই যুদ্ধ করতে এমেছিলেন  প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি??? এটা কী যুদ্ধ!
    আবার রাশিয়ার দিক থেকে এটা প্রতিশোধের খায়েশ কিছু মিটানো ছাড়া কিছুই নয়। দিন শেষে সবাইকেই কথা বলতে বসতে হবে। দেশের ভিতরে বা বহুরাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবহা গড়ে তোলার মধ্যেই  সমাধান আছে। সবাইকে সেখানে যেতে হবে।

    আর এর মধ্য দিয়ে আমেরিকার অসহায়ত্ব আরো স্পষ্ট হয়েছে। আর নিশ্চিত হওয়া গেছে ট্রাম্প আর বাইডেন দুজনেই আসলে  পরাজিত আমেরিকার সৈনিক – তবে একই মুদ্রার দুই দিক। ফলে এই ট্রাম্প বলছেন, তিনি আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতাগিরিই ছাড়াতে চান! আর জাতিবাদী “সাদারাই শ্রেষ্ট” রাজনীতিতে আমেরিকাকে সাজাতে চান!  আর বিপরীতে বাইডেন মনে করেন – আরে আমেরিকা এখনও গ্লোবাল নেতা; তাদের কত কী ক্ষমতা আছে ট্রাম্প সেগুলার ব্যবহারই জানে না। তাই তিনি এবার সেগুলো ব্যবহার করে সবাইকে দেখিয়ে দিবেন। শেষে আমরা এখন দেখছি সে ফাটা ঢোল স্যাংশন! কিন্তু সেটাও হয়ত তাকে অন্তত বেইজ্জতিতে ফেলত না! কিন্তু  প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে গাছে তুলে নিয়ে দেখেন, তার পকেটে মানিব্যাগই নাই। এটা ওনেকটা বাসে উঠে টের পেলেন পকেটে কোন টাকা নাই। শেষে কন্টাকটরকে হাত ঘড়ি খলে দিয়ে কোন মতে বাসায় ফেরা, এই আর কী!

    আমেরিকার দিন ফুরানোর ইঙ্গিত এগুলো তাতে ট্রাম্প না বাইডেন এর প্রেসিডেন্ট, কিছু এসে যায় না। এরা একই মুদ্রার দুই দিক মাত্র!
    আর ওদিকে পুতিন যদি টার্গেট পুর্ণ করে ইউক্রেন থেকে ফিরে আসতে চান তবে ১৪ দিন অনেক বেশি, ৭-১০ এর মধ্যে শেষ করতে হবে। নইলে পা দেবে গেলে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আর ন্যাটোর কেউ যদি সেনা নিয়ে ইউক্রেনের পক্ষে দাড়ানোর চিন্তা করে তবে এক নয়া বিশ্বযুদ্ধ সকলকে তাতে টেনে নিয়ে যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভালুকের মুখে আমাকে একা ফেলে পালিয়েছে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    গৌতম দাস

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Vn

     

     

          MEA spokesperson Arindam Bagchi. | Photo Credit: twitter/@abagchimea

    ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

    অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে  সেই দরকারে অরিজিনাল  কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা  কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

    এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
    প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। আর জমিদার-হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য অবিভক্ত বাংলার সবাইকে মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি  – বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। মানে যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।
    সারা মোগল আমলের নিয়ম  খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদার শাসকেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে জমির আগের টাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদ-কারিদেরই ছিল।

    তাই এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে  মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও।  জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই,  জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য  এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

    কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত।  একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই  এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন! প্রয়োজন ব্যবহার বাদ দেয়া।
    মনে রাখতে হবে  মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর  বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

    ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। এদিকে হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)]  ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার-হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টা হচ্ছে যেন। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি  আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও পলিটি (রাজনৈতিকতা)” ।

    ……constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

    কিন্তু সরি,  অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই।  এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজ্যকে মুসলমান-শুণ্য করতে হবে, শেখানে তারা থাকতে পারবে না – এই ডাক ও পরিকল্পনাও শুনতে পাবেন।  আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে  ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো  আজ একেবারেই নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সে কারণে এসবের বিরুদ্ধে ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই।  বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই।   তাহলে?

    … ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না।

    অর্থাৎ  মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল।  অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই  “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে  কথা বলার!
    এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে,  খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে;  আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কারণ, কূটনৈতিক রেওয়াজে এ’বিষয়টা হল,  আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার  ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত।  এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দেয়া হয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে!  আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা এই অনুমান শেখানে খাটাতে যায় নাই!
    তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

    মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
    প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে  না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন!  আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।  কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

    সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

    নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
    শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে  মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে।  এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

    গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং,  গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই   ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও  হয়ে গেছে।

    এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

    এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
    নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা  রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ  সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

    এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

    কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
    এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও।  এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”;  যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

    কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

    কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing]  এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন???  কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়,  করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

    “Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

    এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে  দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

    ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
    এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে –  ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ  জীবনেও আর করেন নাই।

    আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই  উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি  দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”।  অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

    কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা!  আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে  ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!
    এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

    মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ
    অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও  উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

    ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
    এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?
    এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের  (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

    মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন।  এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

    এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

    ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ওআইসিকে বলে সাম্প্রদায়িক!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]