Tag: আমেরিকা

  • জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    গৌতম দাস
    ২১ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5DG

     

    ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া 

     

     

    গতকাল দুপুর থেকেই খবরটা  ঢাকায় ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাবেক এক ‘বাংলাদেশ আর্মি চীফ’ জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অসন্তোষ বা এনিয়ে তাদের “নয়া পদক্ষেপ” এর খবর। আজ ডেইলিস্টার লিখেছে, “আমেরিকা আজিজ আহমেদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের উপর [“United States has imposed sanctions on former chief of Bangladesh Army Aziz Ahmed and his immediate family…”] স্যাংশন  দিয়েছে। এলেখায় বেশির ভাগ সময় জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান বিবৃতিকে  আমি “আমেরিকান পদক্ষেপ” বা শুধু “পদক্ষেপ” বলে চিহ্নিত করব। যদিও ডেইলি স্টার সহ অনেক মিডিয়াই এটাকে স্যাংশন আরোপ করা বলেছে। আর এর বিপরীতে আমেরিকান বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটা দেখিনি। তাই, এই বতর্ক থেকে দূরে থাকতে  একে “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলব এখানে।

    “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলতে শব্দে যাই থাক, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এক বড় খুশির প্রতিক্রিয়া হয়েছে দেখার মত। এতে লক্ষ্যণীয় যে,  বিগত দুবছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে যারা আমেরিকান সাপোর্ট ও সহায়তার ব্যাপারে গভীরভাবে বাইডেন-লু এর আমেরিকার উপর “রাজনৈতিক আস্থা” রেখেছিল; গভীর নির্ভরশীলতায় আপন বোধ করত প্রবল খুশির প্রতিক্রিয়া এসেছে মূলত তাদের থেকে।  কিন্তু এসব সত্বেও , সেসময়ে এরাই আবার বাধ্য হয়েছিল নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকা  নিজেই নিজ কমিটমেন্টের উলটা ঘুরে গিয়ে বাংলাদেশকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল শুধু না, একেবারে “বিজয়ী” হাসিনার কোলে গিয়ে উঠেছিল; আর তা দেখে লজ্জায় মারা গিয়েছিল যারা মূলত তারাই এবার জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকান পদক্ষেপ দেখে আর নিজেদের চাপা কষ্ট বা প্রতারিতবোধের কষ্ট আর লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশের এই “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি” লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিল, নির্বাচন ঘটে যাবার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত। বিশেষ করে এখন বাইডেন-হাসিনা নাকি “কেমন জানি বন্ধু” যা নিয়ে আবার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিএনপিকে টিটকিরি দিয়ে কথা বলে চলেছে। এদিকে আমেরিকার ধারণা তারা একসাথে বাইডেন-হাসিনা ‘কী জানি’ [ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি] উতযাপনও শুরু করে দিয়েছিল ইত্যাদি!  তাই গত চার-পাঁচ মাস “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি”দের কেটেছে এসব নখড়া দেখতে দেখতে!  অতএব পালটা এবার এদের উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াই ছিল আজ দেখার মত। যেন তারা বলতে চাচ্ছে – তাদের প্রিয় আমেরিকা অনেক সুইট – এরা বিট্রে করে না, ফেলে পালায় না ইত্যাদি। মানে যেন সিনেমার ডায়লগের ভাষায়,   উদ্ধার করতে ‘মেরা অর্জুন [এখানে আমেরিকা] জরুর আয়েগা”। কিন্তু আসলেই কী তাই? এটার মানে কী আমেরিকার ফিরে এসেছে?   আমেরিকা কী ফিরে এসে গেছে? বা আসবে?

    বলা বাহুল্য উচ্ছ্বসিত এই আমেরিকা সমর্থকেরা কঠোর সরকারবিরোধী; তারা সরকারের পতন দেখার জন্য উন্মুখ বহুদিন থেকেই জেনুইনলি। কিন্তু তারা সকলে কী তা এবার দেখতে পাবে?
    এনিয়ে আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – এখনও উচ্ছ্বসিত না হয়ে “ধীরে চলেন”। প্রচুর [if, not, but’] এসবের যদি, কিন্তু আছে সামনে; সেসব ব্যাপারে – আমেরিকা কী অবস্থান নেয় সুযোগ থাকে; পরিস্থিতি কতটা আমেরিকার ফেবারে থাকে বা আমেরিকা চায় তা এখনও অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যাদের ভরসায় বা যাদের সমর্থন পেতে বা খুশি করতে চেয়ে বা লক্ষ্য করে এই “পদক্ষেপ ঘোষণা” নিয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক অংশ কী আমেরিকাকে আগের মতই গ্রহণ করবে? এটাই এখন একেবারেই অনিশ্চিত। যেমন, মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাক!

    আজ বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়াঃ
    আজকে বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞা আরেকটা বিভ্রান্ত করাঃ মির্জা ফখরুল”। এর সোজা মানে হল, আমেরিকা আগেও বিভ্রান্ত করেছে তাই আবার আরেকটা বিভ্রান্তি আনা বলেই দেখতে চাচ্ছে বিএনপি – আমেরিকান এই পদক্ষেপকে!  কেন তিনি এমনটা বললেন সেটা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন আমেরিকা সমর্থকেরা। উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থকদের মত করে, আলমগীর সাহেবেরও তো অন্তত ইতিবাচক মন্তব্য করার কথা! কিন্তু এই মন্তব্য অন্তত নেতিবাচক! কিন্তু সেটাই বা কেন?  এছাড়া আরেকটা কথাও তিনি ওখানে বলেছেন।  আলমগীর সাহেব বলছেন – “নিজের ঘরকে যদি নিজে সামলাতে না পারি, অন্য কেউ সামাল দেবে না। নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের শক্তি দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে হবে”। এই বাক্যের মূল শব্দ নিজের শক্তিতে দাঁড়ানো, আমেরিকার না। এদিকটা মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।
    কাজেই আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – বাংলাদেশের “উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থক”, আপনারা একেবারেই ধীরে চলেন; স্থির হয়ে নেন আগে! আর সমস্ত স্ব-সক্ষমতা  দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে ও ব্যাখ্যা পেতে চেষ্টা করেন সবার আগে। এর আগে কোন মুভ করলে ভুল হবে।

    এখন কেন এই আমেরিকান পদক্ষেপঃ  
    জবাবটা এবার এখানে খাড়া বলে ফেলি। ভারতের নির্বাচনে মোদি নাকি এবার হেরে যাবেন। আমেরিকান এই পদক্ষেপ এমন এই অনুমানের উপর নির্ভর করে নেয়া হয়েছে; যেটা এখনও ঘটে নাই। আগামি ৪ জুনে প্রকাশিতব্য ভারতের নির্বাচনী ফলাফলে মোদি হেরে গেছে – এটা আমেরিকাসহ আমরা সকলেই শুনতে পাব হয়ত। এই হল সেই অনুমান। সোজা কথা এটা এখনও ঘটে নাই; ঘটতেও পারে!

    তাই বলাই বাহুল্য যদি উলটা হয়। মানে মোদি যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেখাতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য – “আমেরিকার পদক্ষেপের” এখানেই আপাতত ইতি হয়ে যাবে।
    তবে মির্জা ফকরুলের নেতি-প্রতিক্রিয়ার কারণ ভিন্ন। এর সাথে আমরা যেন আবার আমেরিকার ভাবনা বা অনুমানের সাথে সম্পর্কিত করে না দেখি; এটা সম্পর্কিত নয় তাই। সেটা বিএনপির নিজস্ব আলাদা কারণ।

    এখন আমার অনুমান হাসিনা বা মোদি সরকারও খুব নিশ্চিত নন যে আমেরিকা বা বাইডেন-লু ঠিক কী বুঝে এমন বেমাক্কা এক পদক্ষেপ হাঁকালেন?  বিবৃতির কাগজে আমেরিকা  “ডেজিগনেশন” [designation] এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। মানে নামকরণে সাবেক জেনারেল আজিজকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে ফেললো।
    তবে আমি মন্ত্রী হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে আমাদের সরকার জানত দুদিন আগে বাংলাদেশের আমেরিকার এমবেসিকে বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছিল, এনিয়ে কিছু বলছি না।

    আরেকটা কথা, হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে – এটা “ভিসা স্যাংশন নয়” – একথা কিন্তু সত্য [US sanction on Aziz not under visa policy: foreign minister]। বরং অরিজিনাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতেও স্যাংশন বলে কোন শব্দই নাই। এছাড়া আমেরিকার ঐ বিবৃতিতে আজিজ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের  – আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ বা সম্পত্তি বায়োজাপ্ত ইত্যাদি কোন শব্দাবলীও নাই।

    কেবল একটাই শব্দ আছে “ডেজিগনেশন”। মানে, বাংলায় বললে “চিহ্নিত করা” ধরণের বা নামকরণ করা যেন। তাই বলছে, আমেরিকান প্রশাসন সাবেক জেনারেল আজিজকে দুর্নীতিবাজ যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধবংস বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। এই হলো অভিযোগ ও নামকরণ। একথা অবশ্যই বেশ ওজনদার!  কিন্তু সেজন্য আমেরিকার দিক থেকে শাস্তি কী বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কী আরোপ করা হবে – এধরণের কোন বাক্য আর সেখানে নাই। তবে কোন আইনে এই ডেজিগনেশন এর একটা ধারা নম্বরউল্লেখ করা আছে; তা হল  [7031(c)] ।  হতে পারে ঐ ধারার বিস্তারে কোন শাস্তির কথা লেখা আছে। তবে আপাতত আমরা তা জানি না।

    তাই,  উপরে আমি লিখেছে, জেনারেল আজিজের উপর স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে। হা বলেছি তবে নিজ বরাতে না। বলেছি ডেইলিস্টারের বরাতে। বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটাই নাই আগেই বলেছি; আমি গত রাতে পড়েছি। তাই ঢাকার মিডিয়ায় কীভাবে আসছে এমনকি হাসান মাহমুদ তিনিওও স্যাংশন আরোপ হয়েছে বলেছেন।

    তাহলে মূলকথাটা হল, আগামী ৪ জুন ভারতের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন। এদিন যদি মোদিই হেরে গেছেন বলে প্রকাশিত হয় তবেই আমেরিকান বিবৃতি আরো পাতা খুলে ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠতে চাইবে। এবং সেক্ষেত্রে খুব দ্রুতই বহু বহু সব ঘটনা ঘটবে।   ইতোমধ্যেই অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে প্রবল আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে যে মোদি এবার হারছেন। ভারতের যত জুয়ার আড্ডা আছে বড় বড় সব বিখ্যাত ডেরা সেখানে মোদি হেরে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরা জুয়ারি লোকের সংখ্যাই বেশী, রেটও হাই। এটা একটা খুবই তাতপর্যময় তথ্য! ইতোমধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজারও সব বিক্রি করে দাম ফেলে মানে আগে নিজ বিনিয়োগ বাচাও – এমন জোয়ার তুলেছিল আমরা দেখেছি।  আার অন্যদিকে, ভারতে ভোটপ্রদানের % যদি ৬০ এর নিচে যায় তবে মনে করা হয় এটা মোদির হারার লক্ষণ! সেটাও চারপর্বের পর থেকে দেখা যাচ্ছে!
    তবুও আমার শেষ কথা, এমন যত আলামতই দেখা যাক না কেন –  মোদির হাতে থাকা “ভোট বাক্সকে সফটওয়ার ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা” যদি অকার্যকর হয়ে থাকে তবেই একমাত্র তবেই, উপরে যা বলেছি তা সত্য হতেও পারে, নইলে মোদি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেনই আগেরবারের মতই!!
    এবার এক বাক্যে বলি,  যদি মোদি হেরে যায় তবে সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে পড়বে হাসিনা সরকার! আর হবু সেটাই আমেরিকার পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য!
    নিচে আমেরিকান বিবৃতিটা সেঁটে দেয়া হলঃ

    Designation of Former Bangladesh Official for SIGNIFICANT Corruption:

    The U.S. Department of State announced today the public designation of former General Aziz Ahmed, previously Chief of the Bangladesh Army Staff, due to his involvement in significant corruption.  His actions have contributed to the undermining of Bangladesh’s democratic institutions and the public’s faith in public institutions and processes.

    Aziz Ahmed engaged in significant corruption by interfering in public processes while helping his brother evade accountability for criminal activity in Bangladesh.  Aziz also worked closely with his brother to ensure the improper awarding of military contracts and accepted bribes in exchange for government appointments for his personal benefit.

    This designation reaffirms the U.S. commitment to strengthening democratic institutions and rule of law in Bangladesh.  The United States supports anticorruption efforts in Bangladesh through assistance to make government services more transparent and affordable, improve the business and regulatory environment, and build capacity in investigating and prosecuting money laundering and other financial crimes.

    These public designations are made under Section 7031(c) of the annual Department of State, Foreign Operations, and Related Programs Appropriations Act.  This action renders Aziz and his immediate family members generally ineligible for entry into the United States.

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ২১ মে ২০২৪  রাত ১১ঃ ২৬
    শেষ আপডেটঃ   ২৩ মে ২০২৪, ভোর  ০৫ঃ ৪৬

  • ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-5Cc

     

       “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’?”  – এটা গত ২০১৯ সালের ভারতের নির্বাচনের সময়ের বিবিসির রিপোর্ট। যা ভারতের নির্বাচনি তামাসা বুঝবার জন্য এখনও গুরুত্বপুর্ণ।

     

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা!
    ভারতে এখন নির্বাচন চলছে। মানে সাতপর্বে ১৯ এপ্রিল থেকে ০১ জুন পর্যন্ত সাতটা আলাদা আলাদা দিনে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মূলত মোট একই সিকিউরিটি ফোর্স বারবার কিন্তু নানান আসনে ব্যবহারের সুবিধা পাবার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। নইলে, যেটা একই দিনে সব আসনে নির্বাচন হলে আসন প্রতি ফোর্সের সংখ্যা কমাতে হত, তা এখানে এড়ানো সম্ভব। আজ ১৭ মে ২০২৪;  মানে ইতোমধ্যে ভারতের চার পর্বেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন বাকি আছে ২০ মে, ২৫ মে আর ০১ জুনের নির্বাচন। মানে ০১ জুনেই সাত পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর দুদিন গ্যাপ দিয়ে ফলাফলের জন্য ৪ জুন সকাল থেকে সব ভোটের বাক্স নানা রাজ্যে একই দিনে একসাথে গণনা শুরু হবে। আর ঐদিনই দুপুর ১২ টার মধ্যে মিডিয়ায় বিশেষত টিভিগুলোতে কে কোথায় আগিয়ে আছে এই ট্রেন্ড [trend] বা অভিমুখ অনুমানের সুযোগ দর্শক-পাবলিকের কাছে এসে যাবে। যদিও সব ভোট গণনায় আরো সময় লাগবে। এরপর ঐদিনেই সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ক্রমশ আরো স্পষ্ট হতে থাকবে; ভোটের ফলাফলের আরো স্পষ্ট  অভিমুখ কোনদিকে। আর ঐদিনই রাত বারোটার মধ্যে অভিমুখ তো বটেই ফলাফলেও একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কোন দলের জোট বিজয়ী হতে যাচ্ছে।  এই হলো এবারের ভারতের নির্বাচনি দিন-তারিখ!

    এবারের ভারতের নির্বাচন নিয়ে আমি  এপর্যন্ত এবারের হবু বা ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা আসছে ও ঘটবে এসবের অর্থ তাতপর্য অথবা বিশ্লেষণ নিয়েও কিছুই লিখি নাই। তুলনায় গতবার মানে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের বেলায় সম্ভবত মোট আট / দশটা লেখা দিয়েছিলাম। তাহলে এবার দূরে আছি কেন?
    মূল কারণ, ২০১৯ সালে পুরা নির্বাচনের সময়ের ঘটনাবলীর খুবই কমই মনিটর করতে বাদ রেখেছিলাম। যেমন ভোটের আগের অন্তত তিনটা সার্ভে গ্রুপের সার্ভে সম্পর্কে স্টাডি ও ফলো করেছিলাম। যারা আবার একই সাথে  “বুথ ফেরত ভোটারদের” সাক্ষাতকার নিয়ে সার্ভে রিপোর্ট নিয়েও আমার স্টাডিতে অনেক সময় দিয়েছিলাম। শেষের দিকে ভারতের অনেক মিডিয়ার সাথে আমিও ধারণা দিচ্ছিলাম যে মোদির দল বিজেপি ও তাদের জোট[এনডিএ] সম্ভবত নির্বাচনের হেরে যাবে। কিন্তু না। মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের [অবৈধ হাত ঢুকিয়ে ফলাফল উলটানো] ব্যবস্থা আছে। এবং তা খুবই সুনির্দিষ্ট করে ফল আনতে পারে এমন বা  যেখানে যতটুকু ফলাফল পালটানো দরকার তা করার ক্ষমতা সম্পন্ন। এদিকটা তখন আমল করা হয় নাই। তাই বিপত্তি। আর এবারও অনেক কিছুই পরিবর্তন হলেও মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের ব্যবস্থা বহাল ও অটুট আছে বলেই জানি। তাই এবার দূরে থেকেছি লিখা থেকে যদিও, এবারেরও খবরাখবর রাখছি কিন্তু কিছু লিখি নাই।

    গতবারও এমন সব পর্বের নির্বাচনের পরে গণনার দিন শুরুর আগে এমন চারদিনের গ্যাপ ছিল। মনে করা হয় ঐ গ্যাপের দিনগুলোই মোদি-অমিতের চোখে এসব ম্যানিপুলেশনের উপযুক্ত সময় আর তা তখনই করা হয়ে থাকে বলে এপর্যন্ত যতটুকু জানা যায়। যেমন দেখেন, উপরে যে ছবিটা ব্যবহার করেছি সেটা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিবিসির একটা রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। যেখানে তখনকার শিরোনাম ছিল কত এগ্রেসিভ বা উদগ্র আক্রমানাত্মক! শিরোনাম লিখেছিল – “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’!!!
    সেসময়ের অমিত শাহ যিনি এখন কেন্দ্র-সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তখন তিনি কোন মন্ত্রীই ছিলেন না, কেবল ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক) তিনি তখন এক টিভি লাইভ শোতে এসে বলেছিলেন বিজেপি ৩০০ পার করবে। ভারতে সরকার গড়তে ২৭২+ আসনে বিজয়ী হতে হয়। তো ৩০০ পার মানে হল ৩০০ এর বেশী আসন পাবে। সত্যিই তাই ঘটেছিল। ২০১৯ সালে, একা বিজেপির মোট আসন পেয়ে হয়েছিল ৩০৩।  মোদি সেসময় মানে ঐ টিভি শো এর দিন কাশী (উত্তরপ্রদেশের খুবই গুরুত্বপুর্ণ হিন্দুদের এক তীর্থস্থান মনে করা হয়) থেকে ফিরেছেন। সেখানে নাকি তিনি কয়েকদিনের ধ্যানে বসেছিলেন!!! সেবারের নির্বাচনের শেষদিনের আগেই  মোদি কাশীতে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন তাঁর হরেক রকমের রংঢঙ আর প্রপাগান্ডার অংশ হিসাবে। তাই সেই শো তে তিনি অমিত শাহের পাশে বসে থাকলেও বেশী কথা বলছিলেন না। তবে অমিত শাহের সেদিনের ঘোষণা ছিল যে তারা ৩০০ আসন পার করবেনই, এটা শোনার পর থেকে আমার মনে গভীরতম সন্দেহ শুরু হয়েছিল যে অমিত শাহের কথাই সম্ভবত সত্য হতে যাচ্ছে! আমি বোকা হয়ে যাচ্ছি!

    আগেই বলেছি অমিত শাহের কথা সত্য হয়েছিল; নিজ দলের আসন ছিল ৩০৩ আর সাথে বিজেপির নিজ জোট [NDA] এর আসন সহ মোট আসন হয়েছিল ৩৫৩। সেবারের মূলত এমন ম্যানুপুলেটেড বা হস্তক্ষেপ করা ফলাফলের কারণেই এবার ভারতের নির্বাচন নিয়ে কোন ধরণের লেখা লিখিই নাই। এড়িয়ে গিয়েছি। আর তাই এবার এটাই প্রথম লেখা। তাহলে আবার কেন ভোট পর্বের মাঝামাঝি সময়ে এখন লিখতে আসলাম?
    সেসব আরেক কাহিনী যা বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে কারণ এবার এক প্রবল অনুমান হল, মোদি এবার নির্বাচনে নাকি হেরে যাবেন। আর তাতে কংগ্রেসের রাহুল এন্ড গং মানে তাদের জোট ক্ষমতায় আসলে আমেরিকার সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্কের সরকার হবে সেটা।  তাই বলাই বাহুল্য এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আয়ুসহ আনাচে কানাচে। সেকারণে এখন বাংলাদেশে যাই ঘটছে বা ঘটবে সেসকল ঘটনার সাথেও এইসব (মোদি হারবেন ধরণের) কল্পিত-অনুমিত ঘটানাবলীর মিল আছে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনাও প্রবলে উঠেছে।

    যদিও এমন বহু ঘটনা – গুজব, আধা গুজব, আধা সত্যি  ইত্যাদি সবই কানে আসছে। তবুও ভারতের এবারের নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ অবস্থান হল, মোদি-অমিত শাহের হাতে বাক্স ম্যানিপুলেশনের মেকানিজম নাই তা খর্ব বা অকেজো হয়ে গেছে একথা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত  শেষ বিচারে মোদির হারের কোন সম্ভাবনা (অন্তত আমার কাছে) নাই আর তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদিও এবার ইতোমধ্যেই এমনকি এখন ভারতের ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান -র- বলতে সেটা,  ‘মোদির র’ আর ‘কংগ্রেসি র’ বলেও ভাগের কথা উঠে গেছে, এমনটা সত্বেও!

    এমনিতে রাহুলের কংগ্রেস বা তাদের জোটের [I N D I A] পক্ষে বাইডেন প্রশাসন এবার দাঁড়িয়েছিল বেশ আগেই।  আর তাতেই  মোদিকে বিপুল অর্থদাতা ও তাঁর অবাধে খরচে উৎস যে আদানি গ্রুপ; আর এর বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসনের লেগে পড়াতেই তাতে এই গ্রুপের শেয়ারে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল, বলে মনে করা হয়। ওপেন সোসাইটি খ্যাত বা হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস নিজেই [একালে বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের ধারা বজায় রাখতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা যোগাতে আমেরিকা প্রশাসন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই সেই অভাব পূরণে অর্থের চালান যোগাতে এখন সবচেয়ে বড় যোগান দাতা হয়েছে এই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নামের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। পুরানা সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে গেলে তা যে ১৫ রাষ্ট্র হয়েছিল এমন সব রাষ্ট্রেই আমেরিকান (এনজিও) হস্তক্ষেপ এর উসিলায় অর্থ ঢেলেছে এই প্রতিষ্ঠান। এটাকে তারা অরেঞ্জ রেভেলিউশন বলে ডেকে থাকে। ]
    বাইডেনের হয়ে ভারতে  আদানির বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন জর্জ সোরেস; এক পাবলিক বক্তৃতা দিয়ে তিনি নিজে আদানির বিরুদ্ধে মার্কেট তাতিয়ে  ছিলেন। কিন্তু এতকিছু করে বাইডেন প্রশাসন আগিয়েও মাঝে হঠাত কংগ্রেসী রাহুলদের সব ততপরতায় ভাটা দেখতে পাই আমরা। রাহুলের জোটও অসংলগ্ন বা আভ্যন্তরীণ দ্বিধায় শ্লথ হতেই দেখেছিলাম। কিন্তু এবার ডোনাল্ড লু এর সফর [তিনি এমাসে বাংলাদেশে আসার আগে ভারত পরে শ্রীলঙ্কা সফর করে এসেছিলেন।] যেটা  বাইডেন প্রশাসনেরও ভাটা বা শেষ সময়ে সফর এটা; এবার তাঁর রুট ছিল ইন্ডিয়া-শ্রীলংকা হয়ে বাংলাদেশ।  আর লু এর এবারের ভারত সফরের পরে আমরা দেখি যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সরব বা চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ওদিকে ভোট প্রদান চতুর্থ পর্বে এসে অবজারভেশন বলছে, ভোটপ্রদানের হার নিম্নমুখি। আর ভারতের ভোট বিশ্লেষকেরা একমত যে  মোট ভোটপ্রদানের নিম্নহার (%) মানে তা মোদির ভোট  কম  হবার লক্ষণ।  আবার ওদিকে ইরানের সাথে মিলে চাবাহার [Chābahār ] সমুদ্র বন্দর চালু ও ব্যবহারের ততপরতা শুরু করেছে ভারত বহুদিন এই প্রকল্প পরিত্যক্ত থাকার পরে। যদিও আবার ততপর হওয়াতে বাইডেন প্রশাসন ভারতকে থ্রেট করেছে, নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা নিবার হুমকি দিয়েছে।
    ইত্যাদি এসব কিছু নতুন সব ঘটনাবলীতে মুল ঘটনা হয়ে উঠে আসছে বাইডেন প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অনেকদূর আগিয়ে গিয়েছে। আর তা থেকেই নিট ফলাফল হল, মোদির এবার হেরে যাওয়ার আলাপ, সম্ভাবনা বা গুজব উঠে আসছে তা বলা যায়। এককথায় বললে, বাইডেন প্রশাসনের কাছে, চলতি নির্বাচনে এক প্রো -আমেরিকান নয়া সরকার দেখতে চাওয়া হল তাদের প্রায়োরিটি। এই আকাঙ্খাটা খুব একটা কোথাও লুকানো ঠিক তা নয়। বরং কোথাও কোথাও এনিয়ে গভীর সব পরবর্তি পরিকল্পনা করতে বসে গেছে সংশ্লিষ্ট অনেকেই।  এমনকি তাতে কথিতভাবে মোদি আর অমিত শাহের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্বের কথাও আবিস্কার করে রেখেছে অনেকে। অথচ এরা জানেনা মোদি-অমিত এরা দুজন ‘হরি আর হর এর মত’ হরিহরাত্মা!
    আর এই মিলিত-আত্মার জন্ম হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাত কিলিং  বা মুসলমান নিধনের কালে যখন গুজরাটি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি আর তাঁর ডানহাত ছিল এই অমিত শাহ, যিনি ছিলেন আবার ঐ মোদির রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! এই যুগল একসাথে আরএসএস-কে হাত করে, প্রভাবিত করে বিজেপি থেকে – লাল কৃষ্ণ আদভানি এবং অন্য দু’জন নেতা মুরলী মনোহর যোশি ও উমা ভারতী (এরা তিনজন হলেন আদালতের খাতায় বাবরি মসজিদ ভাঙার মূল আসামি) সহ অন্যান্য সব বুড়াদেরকে বয়সের অজুহাত তুলে দলের সব কমিটি থেকে বিদায় করে দিয়েছিল!  এরপর গত দশবছর ভারতের ক্ষমতায় থেকে তারা যা যা করেছে তা কেবলমাত্র এদুই জনের আজীবনের প্লান ও খায়েস বলে মনে করা হয়। এদের মাঝে আর কেউ নাই। তবে লিডার কেবল মোদিই। কাজেই যারা মোদি- অমিতের বিচ্ছেদ বা দ্বন্দ্বের কথার গল্প ছড়াচ্ছেন এই বিচারে তারা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনও শিশু!
    এছাড়াও, সবকথার শেখ কথা হল, মোদি-অমিতের হাতে যতক্ষণ ভোটবাক্স ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা আছে ততক্ষণ সব জল্পনা-কল্পনা অনুমান লু-তত্ব সবই ভুয়া আর অকেজো বলে হাজির হবেই বলে আমার ধারণা। মোদি আবার বিজয়ী হবেনই, সম্ভবত এভাবেই। এপ্রসঙ্গ আরেকটু কথায় শের দিকে আবার আসব। এর আগে উপরের কথা শেষ করে নেই।

     

    সফটওয়ার ভিত্তিক বাক্স ম্যানিপুলেশনঃ
    ততদিনে কানে আসছিল অন্য আরেক দিকের তথ্য, (দেশি-বিদেশি) ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশন যে মোদি ভোটের বাক্স বা ইভিএম বাক্স ম্যানিপুলেট (বাইরে থেকে প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে ফল গণনা শুরুর আগেই হবু ফলাফল উলটে রাখা) করার সফটওয়ার সংগ্রহ করেছেন। অনুমান করা হয়ে থাকে এটা জুয়ারি শহর ম্যাকাও [Macao] আর- উত্তরকোরিয়া ভিত্তিক সফটওয়ার গ্রুপ যারা সাহায্য করছে বা করে চলেছে। অনেকে এমনকি এটাও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকিংয়েও এই গ্রুপের কেউ কেউ টেকনিক্যাল কাজ ও দিকে এসব অর্থে ও সুত্রে জড়িত ছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হল, এদিকটা নিয়ে মানে ভারতের নির্বাচনে ভোটের বাক্সের স্বচ্ছতা রাখা নিয়ে যত আবেদন  বা দাবি এপর্যন্ত তোলা হয়েছে এর সবই হয় ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজে বা সুপ্রীম কোর্ট – এরা সেসব নাকচ করে ফেলে রেখেছে। কখনও সুপ্রীম কোর্ট বলেছে এটা কমিশনের কাজের উপর হস্তক্ষেপ হবে তাই তারা কিছু করবে না; আবার কখনও  (নির্বাচন) কমিশনের  কাছে মামলা ফেরত পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। আর নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ সময় যেকোন পাবলিকের আবেদনের ক্ষেত্রে জবাবই দেয় নাই বা নাকচ করে ফেলে রেখেছে। এনিয়ে আমার অন্তত তিনটা পুরানা লেখায় এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি। বেশিরভাগ সময় ফেরত পাঠানোর যুক্তিতে বলা হয়েছে যে এতে নির্বাচন ব্যবস্থা ফলাফল দিতে দেরি করবে বা ম্যানুয়াল ভোটের মত হয়ে যাবে তাই এতে হাত দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যেন স্বচ্ছ নির্বাচন করা এটা প্রধান বিবেচনা নয়; এর বদলে অস্বচ্ছ ও কারচুপির সুযোগ রেখে দেওয়া আর এভাবেই তাড়াতাড়ি ফল আসার নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই আদালত ও কমিশনের কাছে লক্ষ্য!
    মজার কথা হল, এই অবস্থা সত্বেও কয়েকমাস আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশে এসেছিলেন আমাদেরকে সবক শিখাতে যে ভারতের বা কোন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায়  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা কতই না মহান ও পবিত্র! আগ্রহিরা দেখতে পারেন এনিয়ে আমার পুরানা লেখা।

    যেটা অনুমান করা যায় সারকথায়,  মোদির তৈরি এটা একটা বিরাট র‍্যাকেট; অর্থ ও নানান ব্যক্তিগত সুবিধার আয়োজন ঘটিয়ে এই সিস্টেমটা দাঁড় করানো হয়েছে মোদি আর অমিত শাহের জুটিতে।  এবং ততই খোলাখুলি তাদের কাজের ধরণ। যেমন ২০১৯ সালের নির্বাচনে আইনভঙ্গের জন্য অনেক প্রার্থীকে সতর্ক করে ফাইন বা শাস্তি দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু মোদির নামে বহু অভিযোগ জমা পড়লেও বা স্থানীয় নির্বাচনী কমিশন কর্তারা একশনের অনুমতি চাইলেও কমিশনারেরা তাতে অনুমতি দেয় নাই। অর্থাৎ প্রার্থী মোদি বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন ভঙ্গের সব অভিযোগই ব্যবস্থাহীন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থেকেছিল সেবার।  ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রধান-সহ তিন সদস্য বিশিষ্ট। এটা সব সময় তাদের দুই-এক ভোটে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেসময়। আর তৃতীয় সদস্য অশোক লাভাসা, তাঁর আপত্তি ভোট সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। সেই নির্বাচন শেষে কয়েক বছরের মধ্যে শেষে অশোক লাভাসাকে কমিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আপোষ করে তিনি এখন ম্যানিলায় বিশ্বব্যাংক সমতুল্য এডিবি-তে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে লটকে আছেন। মানে নির্বাচন কমিশন থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হয়েছে কায়দা করে।
    এমনকি এখনকার যে নির্বাচন কমিশন তা এবারের নির্বাচনী তারিখ ঘোষণার আগের সপ্তাহেও হয়ে পড়েছিল, এক সদস্য বিশিষ্ট; মানে কেবল প্রধান কমিশনার বিশিষ্ট। কারণ, আভ্যন্তরীণ আয়োজনে মোদি বাকি দুজনের পদত্যাগ করায়ছেন যাতে মোদি নয়া দুজন নতুন পছন্দের কমিশনার নিতে পারেন। তাই-ই হয়েছিল। আর এরপর তিন-সদস্য বিশিষ্ট হয়েই দুদিন পরে ঐ কমিশন এবারের নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছিল। আমাদের দুদকের মত তথাকথিত এমন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মোদির হাতে অনেকগুলো। যেমন সিবিআই [Central Bureau of Investigation], ইডি[Enforcement Directorate] ,  এনআইএ [National Investigation Agency], আইবি [Intelligence Bureau (India]; এছাড়া আয়কর বিভাগ আছে। আর এর বাইরে যে আর কত এমন প্রতিষ্ঠান আছে অগুনতি। কিন্তু সারকথা হল, বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধীদলের বিরুদ্ধে মোদি্র এদের লাগিয়ে দেয়া, হয়রানি করা, বিজেপির সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করাই এদের মুল লক্ষ্য হয়ে আছে মোদির ইচ্ছায়। এসবই মূলত পলিটিক্যাল স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার।
    আর এর বাইরে গত পাঁচ বছরে ধরে চলেছে মোদির আরেক মারাত্মক ব্যবস্থা। এর আনুষ্ঠানিক নাম ইলেকটোরাল বন্ড [electoral bonds] স্কিম। সরকারী ব্যাংক স্টেট ব্যাংক [SBI] থেকে এটা কেবল যেন বিজেপি-কে চাঁদা আদায়ের এ’এক আজিব ব্যবস্থা। এই ব্যাংক আসলে বড় ব্যবসায়ীদেরকে এই বন্ড বিক্রি করে থাকে; কিন্তু কে কিনল সে পরিচয় পাবলিকলি দেখায় না। আর বিজেপি সরকার উপরে যে দুদক সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের কিছু নাম দেখালাম, এদেরকে দিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে ঐ ব্যাংকে চাঁদা জমা করে আসতে মানে বন্ড কিনতে বাধ্য করে থাকে। এখাতে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রায় একমাত্র সুবিধাভোগী হল বিজেপি। আর মোট এমন বন্ডের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি রুপীরও বেশী। গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে থেকে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এটা পাঁচ বছর লুটপাট করতে দিবার পরে এবার নির্বাচনের আগে সুপ্রীম কোর্ট বীর হয়ে উঠেছিল। তারা ওসব চাঁদাদাতা সবার নামের তালিকা চলতি নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই একদিনের মধ্যে  প্রকাশ করতে “স্টেট ব্যাংক-কে পালনীয় বাধ্যতামূলক” বলে নোটিফাই করেছিল। আর তাতেই সব নাম বের হয়ে আসে। অথচ পাঁচ বছর আগেই একাজ তারা করতে পারত।
    সবচেয়ে বড় কথা উপরে যেসব ইনভেস্টিগেশন প্রতিষ্ঠানের অল্পকিছু তালিকা দিয়েছি সেগুলো অপব্যবহার করেই বিজেপি সব বিরোধীদল আর ব্যবসায়ীদেরকে সাইজ করে গেছে যাচ্ছে। অথচ না সুপ্রীম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন এদিকে তাকায়-ই নাই। এটাই মূলত মোদির নামে এখন ফ্যাসিজমের অভিযোগ তুলেঅনেককে আগিয়ে আসতে দেখছি। কিন্তু এমন অভিযোগ তোলার ক্ষমতা এখনও যেন তাদের দেশের বাইরে – বাইডেন প্রশাসনের হাতে! এমনই দুর্দশা!

    আর এমন মোদি-ব্যবস্থার মধ্যেই আবার এবারের নির্বাচন হচ্ছে! আর কোর্ট বা কমিশন এব্যাপারে নির্বিকার! দেখেন এটা কমবেশি এখন সবাই জানে যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষ করে ঘৃণা জাগিয়ে মোদি ভোটের প্রপাগান্ডা পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছে! অথচ এটা ঠেকানোই ছিল কোর্ট এবং কমিশন   এর মুখ্য দায়ীত্ব! কিন্তু এরা নির্বিকার! এটাই প্রমান করে ভারত কোন চুলায় মাথা লুকায়েছে! অথচ সমাজ অসহায়! এমনকি মোদিকে ফ্যাসিবাদ বলতেও যেন সাহস করছে না!

    এখন দুইটা শেষ কথাঃ
    অনেকাংশেই কথাগুলো বলব ভারত-ইরানের চাবাহার পোর্ট কে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ইরান-ভারত চুক্তি হয়েছে। আর তাতে পোর্ট পরিচালনা ভারতকে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই আমেরিকা ভারতকে কড়া স্যাংশনের হুশিয়ারি দিয়েছে।

    ১। এই নির্বাচনে মোদি ফিরে জিতুক কিংবা বিরোধি কোয়ালিশন জিতুক – একটা মূল কথা হল, ভারত ক্রমশ আমেরিকা থেকে দূরে যেতে থাকবে।  মানে ততই ভারত একেবারে চীনের কোলে উঠে না গেলেও অন্তত নিউট্রাল বা একধরণের গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক করতে অনেক ধাপ আগিয়ে যাবে। এককথায় বললে, চীন-ভারত উভয়ের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক দুরত্বটা ফিকে হতে থাকবে। আর ব্যবসায়িক স্বার্থ ততই ওর জায়গা নিবে।
    বাংলাদেশের গত কথিত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আমি লিখেছিলাম আমেরিকা আমাদেরকে রাস্তায় ফেলে চলে গেলে তা এশিয়া থেকেই আমেরিকার বিদায়ের সুত্রপাত ঘটবে। এখানে সেই কথাটাই বলছি তবে আরেক ভাবে আরেক দিক থেকে। এবার মোদি ক্ষমতায় নিজেকে বিজয়ী দাবি করে টিকে গেলে ইন্ডিয়া-আমেরিকার সম্পর্কের পতন ও পারস্পরিক দুরত্ব ঘটবে খুবই দ্রুত। আর যদি কংগ্রেস এন্ড গং জিততে পারে তবে সাময়িক এই নয়া সরকার আমেরিকা-ঘনিষ্ট বলে নিজেদের দেখানো শুরু করবে। কিন্তু সেটা হবে সাময়িক ক্ষীণ আয়ুর এক ঘটনা। মানে জমবে না। অচিরেই একেবারে সাধারণ ব্যাবসায়িক স্বার্থের বিরোধ বাধা হবে।
    যেমন ধরা যাক, ভারত-ইরানের চাবাহার পোট [Chabahar Port ]। এটা এদুই দেশের জন্যই গুরুত্বপুর্ণ , তবু ভারতের জন্য বেশী।  পাকিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর ভারত পুরানা ক্যাচালের কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। এর মানে হল, সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্তানে (ল্যান্ডলক দেশ) পণ্য পাঠাতে অসুবিধায় পড়তে হবে। অথচ ঐ রুটে শুধু গোয়াদরের সুবিধা না। আর গোয়াদর ব্যবহার করতে পারলে এরপর ওদিকে চীনের বেল্ট-রোধ ধরে একদিকে একেবারে ইউরোপ পর্যন্ত ট্রেন বা সড়ক পথে পরিবহনের যে সুবিধা; অন্যদিকে ইরান থেকে পুবে সেন্ট্রাল এশিয়া আফগানিস্থান যে সড়ক ও রেল সুবিধা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভারত বঞ্চিত হয়ে আছে।  এসব কিছুরই অন্তত এক ছোট বিকল্প হলেও চাবাহার ভারতের জন্য এক ভাল বিকল্প ও বাস্তবতা।
    কিন্তু আমেরিকা ইরানের সাথে কোন সম্পর্কই রাখা যাবে না কেউ রাখলে তার উপর স্যাংশন দেয়া হবে – এই হুশিয়ারিই আমেরিকার এশিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাবার পথেই তাকে কয়েক ধাপ ঠেলে দিবে। কারণ, ভারতে মোদি অথবা রাহুল যাদের সরকারই আসুক কারোই চাবাহারের পক্ষে না থাকার বিকল্প নাই। কারণ, এটা ভারতের জন্য বিরাট এক বাণিজ্যিক সুযোগ। কাজেই আমেরিকা বিরোধিতার পথেই ভারতকে যেতে হবে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ  আরেকদিকের কথা বলিঃ
    ইরানের ভারতকে দেয়া এই অফার – এবিষয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি এতে চীনের সম্মতি আছে। আর আছে বলেই ইরান সহজেই এতদুর আগিয়ে পোর্ট পরিচালনার ভার ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। যেখানে আমেরিকান সুবিধা খেতে ট্রাম্পের আমলে ভারত ইরানের হাত ছেড়ে পালিয়েছিল। সেসময় ইরান তেল ভারতে পৌছে দিতে চেয়েছিল তাও ভারত ইরানের তেল কিনতে রাজি হয় নাই। বরং রাজি না হয়ে এই সিদ্ধান্তকে বিক্রি করে আমেরিকার থেকে সুবিধা নিয়েছিল। সেই থেকে চাবাহার প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু প্রতিশোধ ভুলে এখন ইরানের আবার আগানো এটা চীনের আগ্রহ ও প্ররোচনাতেই বলে অনুমেয়। চীনের ক্যালকুলেশন পাকা যে ইরান এই সুবিধা দিলেই ভারতের আমেরিকার বিরোধিতা বাস্তবতা হয়ে উঠবে।  আর সেটা দেখতেই ইরানকে দিয়ে এই অফার। বাণিজ্যিক দিক থেকে এতে ইরানেরও তো ক্ষতি নাই।
    আবার এ’ঘটানার মাধ্যমে চীন ভারতের কাছে ম্যাসেজ দিয়েছে যে ভারতেরও বাণিজ্য সুবিধা কার্টেল / ছেটে ছোট করা চীনের নীতি নয়, তাতে চীন-ভারত যতই বিরোধ থাকুক। আসলে চীন ভারতকে বলতে চায় ভারতও গোয়াদর ডিপ পোর্ট হয়ে বেল্ট-রোড ধরে সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্থানে বা অন্যদিকে, ইউরোপ পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোডের রেল ও সড়ক ফেসিলিটিজও ব্যবহার করতে পারে। চীন এনিয়ে বাধা তৈরির বদলে পজিটিভলি আহবান জানাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি বিকাশে চীনের ক্ষতি নাই, লাভ আছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় লাভ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকাকে আউট করা হবে তাতে। কারণ, আমেরিকা ভারতে পা রাখতে সুযোগ পায় বলেই বার্মা, বাংলাদেশের মত দেশে যা খুশি করার চেষ্টা করে থাকে।
    এখন মোদি ক্ষমতায় ফিরলে আমেরিকা-ভারতের সম্পর্কের ইতি দ্রুত ঘটবে। আর আমেরিকা ভারতের উপর স্যাংশন দিলে তাতে ভারতও দ্বন্দ্ব ভুলে বাধ্য হয়ে ডলার ফেলে ইউয়ানে বাণিজ্য শুরু করে দিবে।  আবার যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন ক্ষমতায় আসে তাহলেও এটাই ঘটবে। হয়ত শুরুর এক বড় জোর দুই বছর একটু আমেরিকান-ভারত (কংগ্রেস) ঘষাঘষি জারি থাকবে। আর ক্রমশ সেটা ভারতের বাণিজ্য স্বার্থেই হবু কংগ্রেস সরকারও একই পথ ধরবে। খুব সম্ভবত সেক্ষেত্রে মোদির চেয়ে দ্রুতই কংগ্রেস চীনের কোলে গিয়ে উঠার সুযোগ নিতে চাইবে।

    ২। মোদি যদি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনঃ
    সেক্ষেত্রে এটা চরম দানব এক মোদি হবে। বিরোধী বলে কারো অস্তিত্ব নিয়ে টিকাই মুশকিল হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই কানাঘুষা তিনি ভারতের কনষ্টিটিউশনেও হাত দিবেন।  এই ধারা যতই তীব্র হবে হিন্দুত্ববাদী – এই উগ্র জাতিবাদি মোদির ভারত ততই পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতা বাদের মুখোমুখি হবে। আর তা ঘটে গেলে ভারত মেজর তিন টুকরা হবে। মোদি এখন ক্ষমতায় টিকে আছে ভারতরাষ্ট্র গঠনগত দিক থেকে এক সেন্ট্রালাইজড কুক্ষিগত ক্ষমতার আর এর উপর আবার উগ্র হিন্দু-জাতিবাদি রাষ্ট্র বলে। আবার এটাই আবার মোদির আগামিতে ক্ষমতায় উত্থান ঘটলে এই গঠন বৈশিষ্টই মোদির ভারতকে ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যাবে দ্রুত!

    সব মিলিয়ে ভারতের প্রতিটা পরিবর্তনের ধাক্কা চাপ (এমনকি শরণার্থীর) বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়তে পারে সেক্ষেত্রে! বাকি যা কিছু পাঠক আন্দাজ করে নিয়েন। এই হল, আগামি দিনের দক্ষিণ এশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৭ঃ ১৮
    শেষ আপডেটঃ   ২৪ মে ২০২৪  বিকাল ০৩ঃ ৫৫

  • রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?

    রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    হাসিনা থেকে পদক, সম্মাননা পেতে তিনি এত মরিয়া কেন?
    গৌতম দাস
    ২৯ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-5xj

     

    দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান

     

    [রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া দেশে ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    এছাড়া তিনি হাসিনা থেকে পদক সম্মাননা পেতে এত মরিয়া কেন?]

    বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সিপিডি [CPD] এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ও চেয়ারম্যান হলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান,  যার বয়স এখন ৮৯ বছর। ভেবেছিলাম এই বয়সে আর তাঁকে নিয়ে কিছু বলব না; অন্তত তিনি মুরুব্বি বয়সের, এই খাতিরে! কিন্তু না। তিনি নিজেই যেন তা হতে দিতে চান না! মানুষের জীবনকালের কাজে-কর্মে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভুল শুদ্ধ বহু কিছুই হয়, হতেই পারে। কিন্তু জীবন সায়হ্নে এসেও স্বাভাবিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে কেউ যখন নিজেকে ভুলহীন বিশুদ্ধজ্ঞানে উপস্থাপন করতে চায় অথবা এদিকটা যেন বুঝেবই নাই, খেয়াল করেন নাই অথবা নিজ কৃতকর্মের কোন দায় নিতে চায় না ইত্যাদি আচরণ করে বসে,  এটা খুবই পীড়াদায়ক!  একারণেই মনে হচছে, এই শেষ জীবনে এসে এখন তিনি যেন “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হয়ে উঠতে চাইছেন। যিনি আবার যেন সব ভুল-শুদ্ধের উর্ধে! অন্যদিকে আবার হাসিনার এই পনেরো-ষোল বছরের শাসনের দিকে তাকালে দেখতে পাই – যারা হাসিনার বাবার আমলে মানে তাঁর বাবার সাথে কাজ করেছেন, স্মৃতি আছে তাদের অনেকের প্রতি হাসিনা বিশেষ “আনুকুল্য” দেখিয়েছেন। পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া ইত্যাদি্র ভাল-মন্দ তিনি করেছেন।  আর এটাই আবার অনেকের ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাড়িয়েছে যে জীবন সায়হ্নে এসে হলেও যেভাবেই হোক হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু একটা উসিলায় হাসিনার আনুকুল্য আদায় করে তবেই বাকি জীবন শেষ করতে চান!
    যদিও এই দৃষ্টি-আকর্ষণ করে সুবিধা নেয়ার ফেনোমেনা – এটা আবার দেখা যায় সুবিধা-বাদিদের কেবল শেষ জীবনের আকাঙ্খার বিষয় না। যেমন উপরের দিকের সরকারী আমলারা জেনে গেছেন যে নিজ পরিবারের কেউ আওয়ামি লীগ করতেন বা তিনি নিজে ছাত্রলীগ করেছেন এটা বেচে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে; এমন অনেকেই সচিব হওয়া বা ভাল পদোন্নতি নিয়েছেন এটা তো হাসিনার এই আমলে ডাল-ভাতের রেওয়াজ।  এমনকি সারা জীবন জাসদ বা বাসদ করেছেন অথচ এখন হাসিনার ছাত্রলীগ করেছেন বলে দেখিয়ে দাবি করে সচিব বা সমতুল্য পদোন্নতি নিয়েছেন এমন অনেক পরিচিত, সহপাঠি বা অপরিচিতকেও চিনি। এসব এখন খুবই কমন! এটাকেই অনেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী এখন ক্ষমতায় অথবা এটাই ‘চেতনার” রাজনীতিক ক্ষমতার মহিমা ও তাতপর্য বলেও  এক নামি কমিউনিস্ট একবার আমাকেই বুঝিয়েছিলেন!

    বাংলাদেশ যাত্রা শুরু কথিত এক  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” দিয়ে, কারা ছিলেন এর মূল কারিগরঃ
    বাংলাদেশে জন্মযাত্রার শুরুতে কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির” এক অন্যতম কারিগর ছিলেন রেহমান সোবহান। তবে কমিউনিস্ট-সমাজতন্ত্রীদের আবেগ-বিবেকের তর্কের চক্কড়ে না পড়ে, ব্যাপারগুলো আরেক দিক থেকে দেখব ও দেখাব।  বাংলাদেশের ইতিহাসে কমিউনিস্টদের কমিউনিস্ট ভাবনা থেকে আনা গজব, সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যবহারিক কাজ হল কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”; ১৯৭২ সাল থেকেই যার নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ – ততকালীন অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী ও পাট মন্ত্রী এসবগুলোই ছিলেন তাজউদ্দিন একাই। তাঁর নেতৃত্বেই কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েম করতে যাওয়া হয়েছিল। যার করুণ পরিণতিই হল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ! এমনকি এখান থেকেই যে শেখ মুজিবের হত্যা বা মৃত্যুর পরিস্থিতি যে আসন্ন হয়ে উঠবে এমনটা খুব কেউ বুঝেনই নাই। তবে তখন এমন অনুঘটক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ কিন্তু এই কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ডেকে আনা  দুর্ভিক্ষ – এই করুণ পরিণতি, সেটা বলাই বাহুল্য! তবে এই কথিত সমাজতন্ত্রের সারকথা বা মুখ্য বাণী-টা ছিল যে, দেশের কারখানাসহ “সকল উতপাদন ব্যবস্থাকে সরকারী মালিকানায়” নিয়ে যেতে পারলেই নাকি মোক্ষলাভ ঘটবে!

    এমনিতেই কোন প্রতিষ্ঠানের ‘ম্যানেজমেন্ট’ মানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যবস্থা যা ঐ প্রতিষ্ঠান/অফিসের, দক্ষতার সাথে উতপাদন ব্যবস্থার জন্য খুবই জরুরি; আর এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটা টিকতে পারবে কিনা এর জন্য ভাইটাল বিষয়। কিন্তু সোভিয়েত কমিউনিজম এর চোখে ম্যানেজমেন্ট ধারণাটাই নাকি এক “শোষণ ব্যবস্থার” ধারণা; তাই এটা তাদের চক্ষুশুল ছিল!  অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট মানে দক্ষ উতপাদক হওয়া এটা নাকি বুর্জোয়া ধারণা; আর এটা নাকি তাই শোষণের হাতিয়ার!

    কোন নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় তা কাজ করছে আগাচ্ছে যেটা বুঝার ঊপায় কিঃ
    তবু এসব কথা এখন থাক; এসব কথা এখন পাশে ফেলে রেখে যদি একটু আগাই তবে, একটা দেশের সমগ্র অর্থনীতিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানো (তা বিশেষ “পবিত্র জ্ঞান করা” সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন)  বা বাস্তবায়নে চলে গেলে এরপর এই অগ্রগতি কাঙ্খিতভাবে চলছে কীনা এটা দেখার কোন ব্যবস্থাও সাথে থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয় একটা দিক। এটাকেই বলে মনিটরিং বা অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা যার থাকাটা খুবই এসেনশিয়াল আর প্রফেশনাল কাজের পুর্বশর্ত। এখান থেকেই মনিটরিং এর ইন্ডেক্স [index] বাংলায় যেটাকে আমরা সূচক বা নির্দেশক নামে চিনি বা বলি – তা খুবই গুরুত্বপুর্ণ!  কারণ কী দেখে বুঝব অগ্রগতি  পরিকল্পনা মাফিক ও দিকে চলছে কিনা?   কারণ না হলে যদি পরিকল্পনাটা পাঁচবছরের হয় তাহলে কী কেবল পাঁচবছরে পরেই জানা যাবে যে পুরা পরিকল্পনাটাই আসলে ফেল করেছে? অথবা সফল হতে যাচ্ছে?  নাকি প্রকল্প শুরু হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় পরে পরে যেমন ধরা যাক,  প্রতি তিনমাস পরে কখন কী কী  অগ্রগতি ও লক্ষণ-সুচক দেখা যাবে; এভাবে বা ওভাবে কখন কী দেখা যেতে  হবে  – এটাই সুচক ইন্ডেক্স এর মাপামাপি।  অর্থনীতির অভিমুখের সিগনাল দেয় এটা!   কিন্তু যদি অন্তত শুরুর একবছর পরেও এমন কোন রেজাল্টই না দেখা যায় তবে আগেই বুঝে নিতে হবে যে এই প্রকল্প ফেল করতে যাচ্ছে, ইত্যাদি। এগুলোকেই মোটাদাগে – অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা- বলে বুঝা হয়।

    এখন তাজউদ্দিনের সেই “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”  কায়েমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধ ও অঘটনমূলক ঘটনাটা ছিল যে, তারা সমাজতন্ত্র  প্রতিষ্ঠার এই “পবিত্রকাজে” রওনা করার পরে মানে একেবারে আড়াই বছর পরেই দেখলেন ও জানলেন যে এটা নুন্যতম সফলতা দূরে থাক তাদের এই পবিত্র অর্থনীতি দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে সব শেষ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র-সরকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই ফলাফল দেখে আমাদের অনুমান কোন মনিটরিং ব্যবস্থার সুচক সেখানে রাখা হয় নাই; বরং বিপ্লবী রাজনৈতিক আবেগে সবাই ভরপুরভাবে ডুবে ছিল!!

    আর এই পরিণতি  দেখে সবার আগে এসব “অকর্মা সমাজতন্ত্রীদের” সকলকে পদত্যাগ করিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ শেখ মুজিব।  শুধু তাই না, ঐ ১৯৭৪ সালেরই সেপ্টেম্বরে (সেবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উসিলায়) আমেরিকা গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে প্রথম দেখা করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য সেই প্রথম বিশ্বব্যাংক-কে সংশ্লিষ্ট করা; মানে দ্রুত অনুদান, ঋণ জোগাড়। গত ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভ করলেও মুজিব সরকার বা অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সাথে কার্যকরি কোন সম্পর্ক করতে যান নাই; তাঁরা সম্পর্ক না রাখাটাই বিপ্লবীপনা বলে বুঝেছিলেন!  ফলে আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের অনুদান, সাহায্য যোগাড় ধরণের কোন খাতাই খোলা হয় নাই। কারণ এই মন্ত্রী তাজউদ্দিন ও তাঁর সহ বিপ্লবীরা কেনিয়াতে ১৯৭৩ সালেও সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের [রবার্ট ম্যাকনামারা] সাথে আলোচনার প্রস্তাব (পরিচিতি ও সৌজন্য সাক্ষাত) পেলেও এই সোভিয়েত বিপ্লবীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ফেলে রেখেছিলেন। প্রতি পরের-বছর বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন হয় দুনিয়ার নানান দেশে; সেটাই সেবার হয়েছিল KENYA 1973 হিসাবে; এখানে এক আর্কাইভ লিঙ্ক দেওয়া হল যারা এবিষয়ে আরও গভীরে যেতে চান এমন আগ্রহিদের জন্য। আবার একালেও অনেক বিপ্লবীকে (আনু মোহম্মদ ও তাঁর বন্ধুদের) দেখা যায় বিশ্বব্যাংককে এই প্রত্যাখানকে নিয়ে গর্ব করতে।  আসলে না জানার অনেক সুবিধা যা খুশি বলা যায়!!!  এছাড়া যদিও এর আগে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা বাংলাদেশে এসে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এছাড়া, VOA এর এক ভিডিও তে দেখা যায় তাজউদ্দিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

    এবার মূল প্রসঙ্গে আসি;  রেহমান সোবহান ক্রমশ চরম বিপদজনক হয়ে উঠছেন। যেন দেশ জাহান্নামে গেলেও মৃত্যুর আগে তাঁকে হাসিনার থেকে পদক-সম্মাননা পেতেই হবে! জীবন সায়হ্নে হাসিনার দৃষ্টি ও আনুকুল্য পেতে যাতে তিনি “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হিসাবে কোন পদক বা সম্মাননা পেতে পারেন যেন একারণেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ জন্মের পরে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই তিনি কথিত “পরিকল্পিত ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েমের কালে টপ তিন-চারজনের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তি সেকালের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য।  আবার মনে রাখতে হবে সেকালের পরিকল্পনা কমিশন মানে সাংঘাতিক ব্যাপার, আজকের মত গুরুত্বহীন না। এর মূল বৈশিষ্ট বুঝতে হবে এভাবে যে, সেকালে সমাজতন্ত্র মানেই হল পরিকল্পিত অর্থনীতি এমনটাই গর্বের সাথে বুঝা হত;  আবার এর অর্থনীতিক পরিকল্পনা হত পাঁচসালা, পাঁচ বছরের জন্য। তাই সব সময়ই দেশের অর্থনীতি এক চলমান পাঁচসালা পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকত। কিন্তু ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের এসব ভংচং সবকিছুই নিজ গৌরবে খতম হয়ে গেলেও এই পাঁচসালা পরিকল্পনার রেওয়াজটা পরেও কিছুদিন চালু ছিল।। স্মরণ হাতড়ে বলছি ১৯৮০ এর দশকে এটা লুপ্ত হয়ে যায়। কাজেই রেহমান সোবহানের সেকালে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য থাকা ছিল অনেক ভারী জিনিষ। একালে দেখছি সিপিডি থেকে প্রকাশিত তাঁর বায়োডাটায় ব্যপারটা লেখা আছে এভাবে ……He served as Member, Bangladesh Planning Commission, in charge of the Divisions of Industry, Power and Natural Resources, । সেই সাথে ওখানে আরো লেখা আছে যে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন যার এক্তিয়ার বা কর্মক্ষেত্র ছিল পরিকল্পনা বিভাগ ও অর্থনীতির ইআরডি [ERD] বিভাগ। এখানে  পাঠককে জানিয়ে রাখা ভাল যে বাংলাদেশে বাকশাল শাসন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) কায়েমের পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল।  যার সারকথা হল সেটা প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নয় বরং প্রেসিডেন্টই সব ক্ষমতার উতস ও সরকারের প্রধান নির্বাহি ক্ষমতাধারী; মানে কোন প্রধানমন্ত্রী নয় বরং প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। তাই রেহমান সোবহানের ১৯৯১ সাল পর্যন্ত – প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য- কথার মানে ও ওজনদার তাতপর্য, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। আর তা জিয়া ও এরশাদ এদুই প্রেসিডেন্টের আমল জুড়ে সেটাও বুঝতে হবে।

    আবার সম্প্রতি দেখলাম সম্ভবত রেহমান সোবহান তার জীবনী প্রকাশ উপলক্ষ্যে তিনি যা বলছেন এর সারকথা হল, বৃটেনে থাকার সময়ের লেবার পার্টি করেই তিনি ‘কমিউনিজম’ শেখেছেন। কি সাংঘাতিক কথা আর, কী সহজ তাই না!!  এর মানে কার্ল মার্কসের কোন মূল লেখা বই বা কোন গুরুত্বপুর্ণ আর্টিকেল পাঠ নিয়ে কিছু জেনেছেন – এভাবে এটা তাঁর জানবার পথ ছিল না। এখন তাই তাঁর নিজেই নিজেকে মুল্যায়ন করা উচিত যে, শুধু এটুকু দিয়ে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” করতে যাওয়া কী ঠিক হইছে? বাংলাদেশের প্রতিটা সাধারণ মানুষ যার দ্বারা এফেক্টেড ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল??? এটা কী কোন ছেলেখেলার বিষয়?  বিশেষ করে বৃটিশ লেবার পার্টি মানে তো ওয়ার অন টেররের কালে প্রেসিডেন্ট বুশের সহযোগী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর পার্টি! এছাড়া বড় জোর ওর জ্ঞানের দৌড় হল এক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট এর যেমন থাকে! লেনিন কেন নিজ পার্টিরই কোন ট্রেড ইউনিয়ন করার বিরুদ্ধে ছিলেন, আগ্রহিরা সেটা জেনে নিতে পারেন!

     রেহমান সোবহানের “ভ্যালু এডিশন” বুঝঃ
    আমি অনেকবার বলেছিল রেহমান সোবহান হলেন, বাংলাদেশে বসে ভারতের স্বার্থরক্ষা ও দেখার কনসাল্টেন্ট। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে ভারতকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ইন্ডিয়ান এজেন্ট হল রেহমান সোবহান ও তাঁর এইকাজের প্রতিষ্ঠানটাই হল সিপিডি। উলটা করে বললে, সিপিডির সর্ববৃহত ক্লায়েন্ট হল ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বাহিনী। যদিও তিনি নিজে এটাকে “প্রগতিশীল আর ইতিবাচক” কাজ হিসাবেই গণ্য করে থাকেন!!!
    Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP) is a free-trade agreement (FTA) – এদুই ধারণার মধ্যে FTA সারকথায় এর মানে হল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে একে অপরের বাজারে পণ্য নিয়ে ঢুকলে কত কী শুল্ক ছাড় দিবে বা শুল্কই আরোপ করবে না এরই ছুক্তি। এমন FTA বানিজ্য জোটের ভিতর আবার RCEP একেবারেই নতুন ধারণা। আর এই RCEP এটাই হল এক “ভ্যলু এডেড চেইন” এই ধারণার ভিত্তিতে পণ্য উতপাদন ও ভোগ – তা শেয়ার করার ব্যবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ধারণা হল ভ্যলু (value); এই ভ্যালু আসলে কী? মনে রাখতে হবে মার্কস সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের জন্য বিখাত আর এটাই তাঁর জীবিনের মুখ্য অবদান মানেন অনেক। তাই ভ্যলু (value) সম্পর্কে তার বিস্তারে লেখা রচনা আছে। একেবারেই সার কথায় ভ্যলু (value) মানে হল কোণ পণ্য উতপাদনে একদিকে থাকে কাঁচামাল আর এই কাঁচামালের উপর মানুষের শ্রম যোগ করেই পণ্য উতপাদন করা হয়। এই শ্রম যোগ করা এটাই ভ্যলু (value) এডিশন। একারণের উতপাদিত পণ্যের মূল্য কাঁচামানের মুল্যের চেয়ে ছাড়িয়ে। কাজের উতপাদনে শ্রম যোগ করাই ভ্যালু এডিশন। এখন কয়েকটা দেশ মিলে কোন অর্থনৈতিক জোট যদি কোন পণ্য উতপাদনের ক্ষেত্রে যে দেশ যে অংশটায় দক্ষতার সাথে ভ্যালু এড করতে পারে তা করে ফাইনালি কোন একটা দেশে যদি তা এসেম্বল করে ফিনিস প্রডাক্ট-টা তৈরি হয় আর এবার ঐ পণ্য যদি জোটের সব দেশ কিনে ও ভোগ করে তবে ঐ উতপাদিত ঐ পণ্য হল  “ভ্যলু এডেড চেইন” পদ্ধতিতে উতপাদিত ও ভোগ্য এক পণ্য। আর বলাই বাহুল্য এই পণ্য যেহেতু সবদেশেরই শ্রম আছে তাই কেউই আর এর প্রবেশের উপর শুল্ক-আরোপ করে না আর সুবিধাটা সদস্য সকল দেশ পাবে। এমনই চীনা উদ্যোগের প্রথম জোট হল RCEP  যা পুর্ব-এশিয় আশিয়ান দশ দেশ ও এর বাইরে ঐ অঞ্চলের আরো ছয় FTA সদস্য দেশ; যাদের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, অষ্টেলিয়াও আছে। আইডিয়াটা হাজির করা হয় ২০১১ সালে।
    এমন জোট বাস্তবায়িত হয় ২০২০ সালে। কিন্তু ভারতের স্বার্থ-ধর রেহমান সোবহান ব্যাপারটা জানার পর সম্ভবত ভেবেছিলেন তাঁর ক্লায়েন্ট ভারতকে সুবিধার হাড়ি খুলে চমকে দিতে হবে। তিনি ক্লায়েন্ট ভারতকে খুশি করতে বিবেচনাবোধ হারিয়ে দাবি তুললেন ভারত-বাংলাদেশকে মিলে  “ভ্যলু এডেড চেইন” পণ্য উতপাদনে যেতে হবে।

    আবার ভারতও সব শুনে মনে করেছিল রেহমান সোবহানের কাছে খুবই জ্ঞানের এক কথা তারা শুনলেন। কারণ ভারত ভেবেছিল এটাকরতে পারলে তাহলে ভারতও তো চীনের সমতুল্য এক বিরাট দেশ হয়ে যাবে!!  তারা রাজি হয়ে যায়।  রেহমান সোবহান ঠিক করে দেন এই জ্ঞানের আলোচনাটা ঢাকায় হবে আর এটা ডেইলি স্টারের নামে আয়োজন করা হবে। তাই হয় আর এতে ভারত সরকারের হুকুমে ভারতীয় আমলারা দল বেধে অংশ নিয়েছিল।  এটাসি ঘটেছিল ২০১৬ সালে তিনি ডেইলি স্টারকে দিয়ে আয়োজিত সেমিনারে ভারতীয় আমলাদেরও ঢাকায় জড়ো করেছেন – উদ্দেশ্য “ভ্যলু এডেড চেইন” শিখাবেন।

    ‘ভ্যালু এডিশন চেইনে’ উতপাদন, উগ্র অর্থনীতিক জাতিবাদ এর জন্য হারামঃ 
    চোথা মারা মানের অপরের ধারণা বুঝে বা বুঝে টুকলিফাই করা – ব্যাপারটা শেষে তাই হয়েছিল। গোড়ার ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহান ‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ জিনিষটাই ঠিকমত বুঝেন নাই; এছাড়া মার্কসের ভ্যলু সম্পর্কেও প্রাথমক কিছু ধারণা থাকতে হবে। তিনি ভেবেছিলেন চীন বা RCEP এর ধারণাটা তিনি সহজেই ক্লায়েন্ট ভারতের কাছে বেচে দিতে পারবেন। কিন্তু ফাঁকি বা চোথা মারা ধারণার কারণে ভ্যলু এডিশনের সাথে শুল্ক-আরোপের সম্পর্ক কী তিনি জানেন নাই। আবার মনে রাখতে হবে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করা আর এভাবেই বিদেশি পণ্যের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়া ১৯৪৫ সালের পরে জাতিবাদি ও কলোনিমুক্ত দেশগুলোতে খুবই পপুলার পদক্ষেপ ছিল। এটাকেই ইকোনমিক ন্যাশনালিজম বলে।  সব জাতিবাদিরাই ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট, মোদির মত উগ্র হলে তা আরও বেশী। এমনকি স্তালিন ও তার কমিউনিজম ও আসলে ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট।  মুল কারণ, এরা বা এই চিন্তার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাটাই নাই। আর একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হয়েও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫-১৯৯১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এমনকি সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাবস্থা ছিল না;  আসলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যই সম্ভব নয়।

    কিন্তু রেহমান সোবহান এসব জানতেন পড়াশুনা আছে তা তাঁর কাজদেখে এমন জানা যায় না। যেমন ধরেন, তিনি কী জানেন উগ্র জাতিবাদী রাষ্ট্র ভ্যালু এডিশন বুঝতেই পারবে না।  গ্রহণ করবে না বা সম্ভব না? কারণ এই রাষ্ট্র-সরকার উগ্র জাতিবাদী মানে সে ইকোনমিক ন্যাশনালিজম করে বেড়ায় – মানে অন্য দেশের পণ্যকে সে কড়া ট্যাক্স বসিয়ে নিজ সীমান্তের বাইরে রাখাটাই সঠিক মনে করে। নিজ অদক্ষপুর্ণ দামে প্রস্তুত পণ্যকে যে এভাবেই প্রটেক্ট করে; আর দেশের মানুষকে তাই কিনতে বাধ্য করে থাকে। এটাই তো ইকোনমিক ন্যাশনালিজম । তাহলে তিনি মোদীর ভারতকে ভ্যালু এডিশন বুঝাবেন কেমন করে? রেহমান সোবহান সেদিকটা না বুঝেই বাগড়ম্বরা করতে গেছেন ইন্ডিয়া বাংলাদেশের পাটের উপর, ব্যাটারির উপর, বাথ সোপের উপর এরকম ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছে। আর রেহমান সোবহান বলছেন ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ভ্যলু এডেড চেইন”  এর যৌথ পণ্য উতপাদন করতে যাওয়া উচিত!!! এই হল প্রগতিশীল বিরাট বুঝমান রেহমান সোবহান!    দেখেন এখানে এনিয়ে ২০১৬ সালের ডেইলিস্টারের রিপোর্ট। এছাড়া এসব ইস্যু নিয়ে আমার পুরানা লেখা আগ্রহিরা এখানে  আর এখানে দেখতে পারেন।

    কিন্তু তবু এত ক্ষমতাধর রেহমান সোবহান কখনও ১৯৭৪ এর কথিত সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির পরাজয় ও দেশকে একটা দুর্ভিক্ষে নিয়ে ফেলা এজন্য কোন দায় কখনও নেনই নাই। কোন একাদেমিক আলোচনাও টেনেছেন জানা যায় না।  এমনকি যদি কেন ঐ অর্থনীতি ফেল করেছিল এনিয়ে কোন সৎ মূল্যায়ন বা তাঁর কোন সৎ অনুভবও কোথায় আলোচনা করেছেন জানা যায় না।

    বিআইডিএস ও রেহমান সোবহানঃ
    বিআইডিএস [BIDS] কী তা এই প্রজন্ম কমই জানে, আমার অনুমান। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিক চিন্তা ও সক্রিয়তায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা যেভাবে এখন উপেক্ষিত কোনঠাসা, গুরুত্ব-প্রভাবহীন নিস্তেজ হয়ে গেছে বিআইডিএস এই প্রতিষ্ঠানের দশাও তাই। আমাদের প্রজন্মের একাদেমিক যৌবনে বিআইডিএস – একে দেখা হত এক বিরাট প্রগতিশীল জ্ঞান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান।  বিআইডিএস সরকারী ফান্ডে চলা এক আধা-সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অরিজিনালি বিআইডিএস এর জন্ম পাকিস্তান আমলে করাচিতে; আর নাম ছিল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস বা পাইড [PIDE]। ১৯৭১ সাল ঘুরে,  একে বাংলাদেশে এনে ১৯৭৪ সালে এসে এর নাম হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ  বিআইডিএস [BIDS]। বিস্তারে গিয়ে কথা না বললেও, অরিজিনালি করাচিতে এটা আমেরিকা প্রভাবিত এক প্রতিষ্ঠান ছিল; মানে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শী নয়।  কিন্তু বাংলাদেশে এসে এটা হয়ে যায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের প্রতিষ্ঠান; এমনকি এখনও প্রচ্ছন্নে এটা তাই মানা হয়। দুই বাক্য উপরে ডেভেলবমেন্ট শব্দটা আমি সবুজ রঙ দিয়েছি; আর BIDS শব্দের D যার প্রতীক! ক্রিটিক্যালি বললে এই ডেভেলবমেন্ট বা বাংলায় উন্নয়ন – এই শব্দ ও ধারণাটাই এন্টি কমিউনিস্ট।  কেন? ডেভেলবমেন্ট মানে হল – মানে এর পুরা কথাটা হল “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট” – কিন্তু একে সংক্ষেপে বলতে শুধু ডেভেলবমেন্ট শব্দটা নেয়া হয়েছে। আর বাংলাতে বললে এটা অবকাঠামো উন্নয়ন [Infrastructure Development] যাকে সংক্ষেপে আমরা শুধু উন্নয়ন বলি।  ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর জন্মের সাথে সম্পর্কিত এক মুখ্য কনসেপ্ট হল এই “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট”। মনে রাখা যেতে পারে বিশ্বব্যাংক এটাও এর সংক্ষিপ্ত নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানের পুর্ণনাম হল, International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)।

     কমিউনিস্টদের কাঙ্খিত ক্যাপিটালিজমের বিনাশ বা পতন এখনও হয় নাইঃ
    খুবই সংক্ষেপে বললে, খোদ কার্ল মার্কস সহ কমিউনিস্টদের আকাঙ্খা ও অনুমান ছিল যে দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম টিকবে না; টিকতে পারবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়বে। কার্কস তাঁর সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের প্রেক্ষিত এমনটা মনে করতেন। তাই এই আকাঙ্খা-বিশ্বাস খোদ মার্কসের (১৮১৮-১৮৮৩) ছিল; একইভাবে লেনিনেরও (১৮৭০-১৯২৪) ছিল। ফলে পরবর্তি প্রায় সকল কমিউনিস্টদেরও। কিন্তু কমিউনিস্ট অনুমান বা ভবিষ্যতবাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করা এক্ট বা এমন প্রধান ততপরতা মনে করা হয় – এই ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হওয়া।  যেটা লেনিন পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালের এসে সোভিয়েত  প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্তালিন চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন যে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসেছিলেন। কোন প্রতিক্রিয়া দেন নাই, দেখান নাই, কিছু লেখেনও নাই। সম্ভবত তিনি অস্পষ্ট ছিলেন, নিশ্চিত ছিলেন না যে কী বলা ঠিক হবে! অন্যদিকে এদুই প্রতিষ্ঠানের জনক  বা ফাউন্ডিং ফাদার মনে করে খোদ আইএমএফ-ই নিজের ওয়েব সাইটে লিখে রেখেছে যাদের নাম – এমন দুজন হলেন, বৃটিশ অর্থনীতিবিদ কেইনস [John Maynard Keynes ]  আর অপর জন হলেন সেকালে আমেরিকান ট্রেজারি মন্ত্রণালয়ের চীফ ইকোনমিস্ট ডেক্সটার [Harry Dexter White]। এরা মূলত দুনিয়ায় উন্নত দেশ মানে অর্থনীতিতে সারপ্লাসের দেশ থেকে গরীব দেশের জন্য অবকাঠামোগত ঋণ এর ব্যবস্থা করে দুনিয়াকে এক নয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পথে সাজিয়ে ফেলেছিলেন। এদিকের ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়া জুড়ে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশের এক দুনিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই, সারপ্লাস অর্থনীতির বড় দেশগুলো তাদের সম্পদের একটা ছোট অংশ আমাদের মত দেশে অবকাঠামোগত ঋণ (প্রায় নাই সুদে) দেওয়ার একটা গ্লোবাল কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) গড়াতে এদুই প্রতিষ্ঠান শুরুতে খুবই প্রাণবন্ত ও সচল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম চালু করতে পেরেছিলেন। এটাই অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি। সংক্ষেপে উন্নয়নের অর্থনীতি।  মজার কথা হল জনবহুল চীন এই অর্থনীতির সুবিধা নিবার পথ ধরেই আজ প্রায় খোদ আমেরিকাকেই ছাড়িয়ে যাওয়া দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যা আগামিতে পালাবদলে নেতা আমেরিকার স্থান নিবার পথে উঠে  আসছে!  অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ধারণাটাই কমিউনিস্ট আগের ভবিষ্যতবাণীকে আপাতত নাকচ করে রেখেছে, এটা এক কঠিন বাস্তব সত্য।  আর একারণে বলাই বাহুল্য যে “উন্নয়ন”, এটা এন্টি কমিউনিস্ট ধারণা; যা কমিউনিস্ট প্রেডিকশনকেও নাকচ করে রেখেছে।

    এজন্যই BIDS [প্রাক্তন নাম PIDE] কে বলেছি এটা আমেরিকা প্রভাবিত ধারণা। আবার তামাসাটা হল, এই BIDS ১৯৭৪ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়; যা এখনও কম-বেশি তাই।  আর রেহমান সোবহান প্রগতিশীল পরিচয়েই অবসরের (১৯৯২) আগে পর্যন্ত এই BIDS এর  ডিজি বা প্রধান ছিলেন।  সারকথায়,  ১৯৭৪ এর আগে পর্যন্ত রেহমান সোবহান বাংলাদেশে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” গড়ার বিরাট কুতুব কারিগর; আবার ১৯৭৪ সালের পরবর্তিতে BIDS জেগে উঠলে মানে পুঁজিতান্ত্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি শুরু হলে পরে (১৯৮০) তিনিই আবার BIDS এর প্রধান হয়ে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতিরই মুল্যায়নকারী, প্রকল্পের গবেষক! ব্যাপারটা হেভি মজার নিঃসন্দেহে। তবে একটা বাক্য পাওয়া যায় উইকিতে যেটা রেহমান সোবহানের  বায়ো বা পরিচিতি্র অংশ। সেই বাক্যটা এরকম, …… After the liberation of Bangladesh in 1971, Sobhan was appointed a member of the Planning Commission. He quit when he, along with others, fell from the grace of Sheikh Mujib in 1975. । বাংলায় বললে, ১৯৭৫ আসতে আসতে শেখ মুজিব কমিশনের সকলকে বের করে দেন; তারা সকলে নিজে পদত্যাগ করতে বলেন  আর এভাবেই তাঁরা শেখ মুজিবের অনুগ্রহ বা গুড-বুক থেকে  সকলে ঝড়ে পরেছিলেন।

    অথচ, ১৯৭২ সাল থেকেই এই প্রগতিশীল কথিত “কমিউনিস্ট অর্থনীতির গোষ্ঠির” এরা আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংক সাহায্য করতে বা অনুদান দিতে অথবা প্রায় না সুদে ঋণ দিতে চাইলেও এরা তা ঠেকিয়ে রেখেছিল। যেটার জন্যই  শেখ মুজিবকে পরে তবে ঐ ১৯৭৪ সেপ্টেম্বরেই নিউইয়র্ক গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের সাহায্য নিতে তাঁর আগ্রহ তিনি পুনরায় প্রকাশের সুযোগ নিয়ে তা নিশ্চিত করে এসেছিলেন।   কিসিঞ্জার তাতে একমত হলেও তা বাংলাদেশে আসার প্রস্তুস্তি শেষ করে আসতে আসতে ১৯৭৬ সালের বাজেট বছর শুরু হতে সময় লেগে যায়। আর ততদিনে শেখ মুজিব নিহত, এই কাফফারা দিতে হয়! বিশ্বব্যাংক সেই প্যাকেজে প্রথমে অনুদান (যার সুদ-আসল কিছুই ফেরত দিতে হয় না ) সাহায্য আর পরে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (প্রায় না সুদের ০.৭৫%) ঋণ দেয়া শুরু করলে এর স্থানীয় ইভ্যালুয়েটর ও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনার কনসালটেন্সি পায় কিন্তু আধা-সরকারি বিআইডিএস [BIDS] আর এই বি আইডিএসের প্রধান ছিলেন রেহমান সোবহান। মানে দাড়িয়েছিল এমন যে, দুভিক্ষ লাগানো কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির এক কর্তা তখন হয়ে গেছেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের ইভ্যালুয়েটর!!!

    এখন পুরাই বিষটাকে যদি ইতিবাচকভাবে দেখি তবে এটা ছিল রেহমান সোবহানের জন্য একটা খুবই ভাল সুযোগ। তিনি এই দুই প্রচেষ্টা [কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি আর পরে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতি ]  এই দুই অর্থনীতির ব্যবহারিক তুলনা (আতলামো না) এমন ভালো-মন্দের মুল্যায়ন মন্তব্য তিনি নিজ সৎ -অভিজ্ঞতা আকারে হলেও লিখে যেতে পারতেন! যা নিঃসন্দেহে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য এক মৌলিক সোর্স হতে পারত!  কিন্তু হায়! কিছুর বলার নাই। রেহমান সোবহান এখন একালে বাংলাদেশ যেন ভারতকে  করিডোর দেয় – এই জবরদস্তি ও বিনা পয়সায় তা দেওয়ার দালাল হয়েছেন!

    এমনিতেই ২০০৭ সাল থেকে (আসলে ২০০৪ সালে সিপিডির সৎপ্রার্থী আন্দোলনের সময় থেকেই) তিনি বাংলাদেশে ভারতের লুটে নেয়া স্বার্থ হাসিল বা পাইয়ে দিবার ক্ষেত্রে সরাসরি এজেন্টের ভুমিকায় নেমে গেছিলেন। যেটা এখনও নানা উছিলায় ও ডালপালায় সক্রিয় আছে। যেমন বাংলাদেশ থেকে ভারতকে বিনা পয়সায় আর বাংলাদেশের স্বার্থ ত্যাগ করে কেবল একচেটিয়া ভারতের স্বার্থে ভারতকে করিডোর পাইয়ে দিবার পক্ষে তিনি এক নম্বর ওকালতকারি।  এমনকি যারা ভারতকে করিডোর দিবার বিপক্ষে তাদেরকে তিনি প্রকাশ্য সভায় ‘অশিক্ষিত’ বলেছেন; এতই ঘামন্ডি আত্মদর্পী তিনি। দেখুন ১। ট্রানজিট বিরোধিতাকে ‘অশিক্ষিতদের বিতর্ক’ বললেন রেহমান সোবহান; ২।  “Bangladesh is the only country to see debate over transit, which is very usual through borders,” ……“I think it’s a debate of ignorant people,”। 

    এগুলো হল এখন তাঁর ক্রেডেনশিয়াল; বিরাট অর্জন!!! বাংলাদেশে এই লবি আর দালালি করে দিয়েই তিনি শেষ জীবনে সিপিডি [CPD] কে খাড়া করেছেন। এটা নাকি তাঁর যোগ্যতা!! আর প্রতীকিভাবে বললে যেমন ধরেন মুচকুন্দ দুবে যিনি ভারতের এক সাবেক আমলা কূটনীতিক; বাংলাদেশে এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুত ও বলা যায় যিনি প্রো-কংগ্রেসী। তিনি একালে ঢাকা আসলে পরে রেহমান সোবহান তাঁকে নিয়ে যেন পবিত্র তীর্থে যাচ্ছেন এভাবে তাঁরা দুজনে প্রথম আলোর অফিসে এসে মতিউর রহমানের সাথে মোলাকাত করবেন! আবার অনেকে বলেন, প্রথম আলো আর সরকারের মধ্যে যে টেনশন বা যেমন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনা-আমন্ত্রণ বা ঢুকতে না দেওয়া এসব পেরিয়ে তাদের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারি হলেন রেহমান সোবহান! ইত্যাদি।

    কিন্তু কেন এই লেখাঃ
    উপরে এতক্ষণ যা যা লিখেছি তা বলার জন্য  মূলত এলেখা লিখতে বসি নাই।  সেগুলো পটভুমি মাত্র! আর এখন সেই মূল প্রসঙ্গে যাব।  সম্প্রতিকালে রেহমান সোবহান এক মহৎ কর্ম করেছেন!!
    গত দুবছর একটু একটু করে এবছরে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর দুর্দশায় নিমজ্জিত; এটা সারা দেশের লোক টের পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যেকটা বাণিজ্যিক ব্যংক ব্যাপক অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর ভারে ডুবে আছে। যদিও কম বেশী আছে যা থেকে দুর্বল আর সবল ব্যাংক এর ধারণা টানা হয়েছে। যেখান থেকে মূল সমস্যাটা হল, প্রত্যেকটা ব্যাংক তার আমানত মানে আম পাবলিকের জমা টাকা খেয়ে ফেলেছে – অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর সংকট কথাটার প্রকৃত অর্থ এটাই। তাই মিডিয়া রিপোর্ট আসছে যে প্রায় প্রত্যেকটা ব্যংকই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে টিকে আছে, প্রতিদিনের দায় মিটাচ্ছে। এই সময় রেহমান সোবহান এক সভায় বক্তৃতায় বলেছেন, “দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান”। খোজ নিয়ে জানা গেল এমন কথা তিনি ২০১৮ সালেও একবার বলেছেন। দেখুন, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি জিয়ার আমলে শুরু: রেহমান সোবহান।

    কোন একাদেমিক বা গবেষকের জন্য এমন বক্তব্য অপরাধমূলক; এক ক্রিমিনাল বক্তব্য। জনমানুষকে বিভ্রান্তকারি বক্তব্য। কেন এমন বলছি??

    তাঁর এই বক্তব্যকে দুভাবে দেখব। এক,  বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি এদের বিতর্ক-ঝগড়া কোন সিরিয়াস আলোচনায় আনার যোগ্য নয়। যদিও তাদের এমন ঝগড়া কালচারে পরিণত হয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে বড়জোড় যা পারি তা হল, কোন সিরিয়াস আলোচনায় অথবা একাদেমিক টেবিলে বা জগতে এসব তর্ক-কে না আনতে পারি; এড়িয়ে যেতে পারি। অর্থাৎ ইতিবাচক  ও অর্থপুর্ণ আলোচনার তাগিদ থাকলে কোন একাদেমিশিয়ানের এই বিতর্ক-ঝগড়া সচেতনভাবেই টেবিলে আনার কথা না বরং এড়িয়ে চলার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি রেহমান সোবহান এটা এনেছেন। ১৯৮০-৮১ সালের ঘটনাকে লীগ বনাম বিএনপির ক্যাচালের মত করে এখানে তুলে এনেছেন। কেন এনেছেন?

    কারণ দুই, তিনি বর্তমানে দুর্দশায় নিমজ্জিত অর্থনীতির এই কালে হাসিনার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ জনমানুষের ক্ষোভ বা তা থেকে উঠা হাসিনার সংকটকে লঘু করে দিয়ে চেয়েছেন। যেন বলতে চেয়েছেন যে খোদ জিয়াউর রহমানই যেহেতু এটা শুরু করেছেন আজ থেকে ৪৫ বছর আগে তাইলে আর একালে হাসিনার আর দোষ কী? কিন্তু আসলেই কী তাই যে, জিয়াই খেলাপী ঋণের কালচার সৃষ্ট করেছিলেন কী?

    অন্যদিকে আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখছি কথাটা হাসিনা, ওবায়দুল কাদের বা লীগের কেউ রেহমান সোবহানের এই চাতুরিকে প্রশ্রয় দেয় নাই, পিক-আপ করেই নাই। যাকে বলে লীগের কেউ এতে মাতে নাই!!! কেন? খুব সম্ভবত হাসিনা খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনাতেই ঢুকতে চায় নাই। কারণ তিনি জানেন প্রায় প্রত্যেকটা ব্যাংকই অনাদায়ী খেলাপি ঋণের দুর্গতি আটকে আছে। শুধু তাই না এই খেলাপিরা সোজা বা ঘুর পথে সরকারী দলের বা আড়ালে থেকে সুবিধা খেয়ে নিয়েছে।  আসলে এগুলো আদায় করার মুরোদ সেটা সরকারেরও নাই!  আর সবচেয়ে বড়কথা ঋণগুলো যারা নিয়ে ভেগে গেছে এরা বেশির ভাগই তার দলীয় নেতা বলে সরকার এদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। খুব সম্ভবত এটাই সরকারের মূল্যায়ন!

    কিন্তু রেহমান সোবহানের এনিয়ে এত তাগিদ উতলা কেন?
    এলেখাতেই শুরুতে বলেছি, হাসিনা তাঁর বাবার আমলের লোক, শেখ মুজিবের সাথে কাজ করেছেন স্মৃতি আছে এমন ব্যক্তিত্বদের একালে  পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া তিনি করেছেন। আবার আরেকটা ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহানের পেশাগত এক বড়ভাই আছে। নাম প্রফেসর নুরুল ইসলাম (গতবছর ২০২৩ সালে মারা গেছেন)। যিনি ১৯৭২ সালে গঠিত সরকারী পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট। কথাটা একটু বুঝায়ে বলতে হবে। সোভিয়েত ভাষ্য বলে থাকে যে তারা পরিকল্পিত অর্থনীতি করে থাকে। তাই পরিকল্পনা কমিশন বা মন্ত্রণালয়, সেখানে এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ। সেই আদলে, আমাদের পরিকল্পনা কমিশনের তখন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট আর প্রেসিডেন্ট পদ ছিল। পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রীই কমিশনের প্রেসিডেন্ট হতেন। আর এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন (একালের হিসাবে যেটা পরিকল্পনামন্ত্রী পদ) তবে এটা টেকনিক্যাল পোস্ট – আর এই নুরুল ইসলাম ছিলেন সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট।

    এখন আওয়ামি আমলে কথিত আছে যে পাকিস্তান আমলে এই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম আর জুনিয়র রেহমান সোবহান এরাই নাকি শেখ মুজিবের ১৯৬৬ সালের ছয়দফার প্রনেতা বা ড্রাফটকারি। শুধু তাই নয় এরাই দুই পাকিস্তান অংশের অর্থনীতির দশা ইকোনমিক ডাটা ব্যবহার করে তুলে দেখিয়েছিলেন যে তুলনায় পুর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত ও অসাম্যের শিকার!  সেকালের এসব ততপরতা থেকেই এরা নিজেদের হিরো ভাবতে ভালবাসেন আর তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিব ঘনিষ্ট ছিলেন। তাই সেকাল থেকেই এই ক্রেডিট কিছু বিনিময় মূল্য কিছু বিশেষ করে রাখা ইত্যাদি তারা তাদের শেষ জীবন্বের মরিয়া হয়ে চেয়ে থাকেন।  কিন্তু সমস্যা হল, আগেই বলেছি বাংলাদেশের শুরুতে কথিত ঐ  সমাজতান্তিক অর্থনীতি দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে শেষ হলে শেখ মুজিব তাজউদ্দিন সহ সকলকে পদচ্যুত করেন, মানে পদত্যাগ করতে বলেন। এতে তাদের স্বাধীনতা-পুর্ব সব ক্রেডিট কালো হয়ে যায়।  অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম এর কেসটা আবার আরো খারাপ। কারণ, তিনি সেকালের অর্থনৈতিক দুর্দশা আর দুর্ভিক্ষের মধ্যেই বা কিছুটা আগেই (সম্ভবত সেপ্টেম্বর ১৯৭৪) বিদেশে জাতিসংঘের [FAO] er চাকরি নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। যেটা শেখ মুজিবকে আহত করেছিল। আবার বলা হয় একবছরের ছুটি নিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেন নাই।
    অথচ বিদেশি চাকরি শেষ করে গত কয়েক বছর ধরে তিনি দেশে এসে হাসিনার মন, দৃষ্টি ও স্বীকৃতি পেতে কোন কিছুই করতে বাদ রাখেন নাই। উদ্দেশ্য একটাই হাসিনা যেন স্বাধীনতা-পুর্ব অবদানের ঘটনায় তাদের স্বীকৃতি দেন। কিন্তু তাঁর দেশত্যাগ ও শেখ মুজিবের আহত হওয়া; আর ওদিকে এমনকি অনেকে দাবি করেন ১৯৭৪ সালে তাজউদ্দিননের পদত্যাগ উত্তরকালে শেখ মুজিব নুরুল ইসলামকেই নাকি অর্থমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুরুল ইসলাম তখন দেশত্যাগে ব্যস্ত। খুব সম্ভবত, সমাজতন্ত্রী করতে গিয়ে দেশকে দুর্ভিক্ষে ফেলা আর নুররুল ইসলাম-সহ এমন তাদের অন্যান্যা সহযোগী অনেকেই নিজ উন্নতির লক্ষ্যে হারিয়ে যান। (যেমন আনিসুর রহমান, মোসাররফ ইত্যাদি অনেকেই যেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম  সম্ভবত প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ যাকে জিয়া নিজ ক্যাবিনেটে শিল্পমন্ত্রী উপদেষ্টা করে রেখেছিলেন, যিনি বিশেব্যাংকের অনুদানে ঢাবিতে আইবিএ প্রতিষ্টান সাজিয়ে নেন। ) এসব বিবেচনা থেকেই শেখ হাসিনা সমাজতন্ত্রী অর্থনীতিবিদ এই গোষ্ঠির কাউকেই কোন আনুকুল্য বা কোন বিশেষ সম্মন্ননা জানাতে এখনও কারও প্রতি রাজি হন নাই। হাসিনার এই মুল্যায়ন খারাপ বা ভুল তা বলা কঠিন; বা অন্যভাবে বললে, এমন বলার মত যথেষ্ট পয়েন্ট আমাদের হাতে নাই। বিরাট জ্ঞানীরা দেশে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দিয়ে কেটে পড়বেন বা কোন দায় নিবেন না, রিকভারিতে হাত লাগাবেন না – তো এরা তাহলে দেশের জন্য কারা? রেহমান সোবহানও পরের পাঁচ বছর বিদেশে চাকরিতে ছিলেন।

    তামাসার কথাটা হল, গত বছর নুরুল ইসলাম মারা [৯মে ২০২৩] যান, য়ার এতে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে যে শোক সভা ডাকা হয়েছিল সেখানে উপস্থিত প্রগতিশীল গোষ্ঠির তরফ থেকে তাতে বক্তারা সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে হাসিনাকে দুষে কথা বলেছিলেন। এখানে   এখানে  এখানে দেখুন।    এছাড়া দেশে ফিরার পর থেকে নুরুল ইসলাম মৃত্যুর আগে পর্যন্ত  তার আক্ষেপ ছড়িয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিয়ে গেছিলেন। যার সর্বশেষটা সম্ভবত এইটা। আর এতে লক্ষ্য করা যায় কেউই সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির দুর্ভিক্ষ এই পরিণতি নিয়ে, এর দায় নিয়ে কোন প্রসঙ্গই তুলেন নাই। আমার ধারণা অন্তত একারণে, তারা কোন কিছুর বিশেষ প্রাপ্তির দাবিদার হওয়াটা নিজেরাই ম্লান করে দিয়েছেন! আবার নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে খোদ রেহমান সোবহানের লেখাটাও এখানে দেখতে পারেন।

    তবু এই লেখায়  মুলকথাটা হল, রেহমান সোবহান এর ভাষায় তার “কমরেড” নুরুল ইসলামকে হাসিনার পাত্তা না দেয়া বা নিরুত্তাপ থাকা – এটা দেখার পরও মনে হচ্ছে রেহমান সোবহান হাসিনার মত পেতে হাল ছাড়তে রাজি না। তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, তাঁর লাস্ট ট্রাম্প হল – দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান -একথাটা রটায় দিলে নিশ্চয় হাসিনা এবার তাঁকে কোলে তুলে নিবেনই!!! কিন্তু হায়!  রেহমান সোবহানের পোড়া কপাল, তেমন কিছুই ঘটে নাই! হাসিনাও একথা তুলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কোন ব্যাশিং করতে যান নাই!

    তবে মূল প্রশ্ন, আসলেই কী জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক? নাকি এই বক্তব্য রেহমান সোবহানের এক অসৎ কাজ – এক ইন্টেকচুয়াল অসততা?
    প্রথম কথা হল জিয়ার আমলে ঋণ খেলাপীর ঘটনা ঘটেছে।  কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এমন ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার ছিলই না।  এই সিদ্ধান্ত ছিল খোদ বিশ্বব্যাংকের।
    এর প্রমাণ, আমি নিচে বাংলা অর্থসুচক পত্রিকা থেকে রেহমান সোবহানের এই বক্তব্য নিয়ে ছাপানো রিপোর্ট উঠিয়ে এনেছি আর নিচে সেঁটে দিয়েছি।  ওখানে দেখা যাচ্ছে রেহমান সোবহান বলছেন, “বিশ্বব্যাংকই এই ঋণদানে চালিকাশক্তি। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে”
    ।

    “সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেশে খেলাপি ঋণের জনক হিসেবে আখ্যা দিয়ে রেহমান সোবহান বলেন,
    ওই সময় বিশ্বব্যাংকও খেলাপি ঋণ তৈরিতে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের দিকে তাকানো হয়নি।
    শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের খেলাপি
    ঋণ বেড়ে গেলে বিশ্বব্যাংক একটি কথাও বলেনি, যদিও পরবর্তীকালে তারাই খেলাপি ঋণের বিষয়ে সোচ্চার…”

     

    পয়েন্ট দুইঃ
    রেহমান সোবহান কী চেক করেছেন কোন কোন ব্যাঙ্ক এমন ঋণ বিতরণ করেছে যা খেলাপি ঋণ হয়ে গেছিল?

    এর জবাবটা রেহমান সোবহান  নিজেই সম্ভবত অজান্তেই আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন।

    ১। সেকালের খেলাপি ঋণ যে ব্যাংকের সে ব্যাংকের কার আমানতের অর্থ এটা?
    রেহমান সোবহান নিজেই বলেছেন এগুলো – “শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে” -সেই ঋণ।  এখন শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার যে ঋণ দিয়েছে খেলাপি হয়ে যাবার জন্য সেই অর্থ মানে ব্যাংকের আমানত কাদের অর্থ? কারা এদুই ব্যাংকে অর্থ রেখেছিল, অর্থ আমানত রেখেছিল যাতে তা ঋণ হিসাবে বিতরণ করা যায়? [যে ঋণ পরে অনাদায়ী খেলাপি ঋণ হয়ে যায়?]। এর জবাব হচ্ছে,  এই অর্থ আম পাবলিকের কারও না। সরকারেরও না।
    কারণ শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা – এদুই নামে এরা ব্যাংক হলেও এদের গ্রাহক বা সেবা-ক্রেতারা সাধারণ মানুষ নয়। এদুই ব্যাংকে কোন সাধারণ মানুষ বা স্বল্প আয়ের মানুষের একাউন্ট নাই। তাই এমন আম নাগরিকের কোন অর্থ এখানে রাখা নাই, একাউন্ট খুলে দেয় না। এদুই ব্যাংক কেবল মাত্র যারা সম্ভাব্য উদ্যোক্তা যারা শিল্প- কারখানা গড়বেন তাদেরকে ঋণ দেওয়া ও ফেরত নেওয়ার ব্যাংক। কেবল এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আমানত ও একাউন্ট আছে। এককথায় এগুলো বিশেষায়িত ব্যংক। যাদের সার্ভিস-ক্রেতা জনসাধারণ নয়। কেবল সম্ভাব্য শিল্প উদ্যোক্তারাই এর খাতক। তাও আবার এই খাতকেরা কিন্তু এই ব্যাংকে তাদের নিজের অর্থ আমানত হিসাবে রাখতে আসেন নাই।

    এখন আসেন আরো সরাসরি প্রশ্ন তাহলে,  এই দুই ব্যাংক তাহলে ঋণ দিবার মত অর্থ কোথা থেকে পায়? কারা এই অর্থদাতা?

    এর জবাব হল, এই অর্থই বিশ্বব্যাঙ্ক আমাদের সরকারের মাধ্যমে দুই বিশেষায়িত সরকারী ব্যাংক শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা কে দিয়েছে; যাতে এদুই ব্যাংক সিলেক্টেড উদ্যোক্তা যাদের ঋণের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে তাদেরকেই কেবল বিতরণ করবে এমন ব্যাংক। এর মানে সোজা ভাষায় হবু শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে বিতরণের জন্য দেয়া এই অর্থ যা, না আমাদের সরকারী অর্থ, না তা কোন সাধারণ মানুষের অর্থ। অর্থাৎ এই ঋণদান শেষে খেলাপি হয়ে গেলেও এর দায়ভার সরকারের নয়।  এসবের প্রকৃত কারণ এটা ছিল বিশ্বব্যাংকের এক এক্সপেরিমেন্ট প্রকল্প এর ঋণ যে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ঘটাতে গেলে তাদেরকে কিভাবে আগাতে হবে এজন্য তাদের বুঝাবুঝি শক্ত করার প্রকল্প এটা।

    বিশ্বব্যাংক-কে বুঝাবুঝিঃ
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে বুঝাবুঝির সমস্যা, এটা আসলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান, এর কাজ ও ম্যান্ডেট কী এটা নিয়ে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের বুঝা-পড়া সবচেয়ে করুণ!  ব্যাপারটা তাদের কাছে নিপাত যাক বলতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ!
    তবুও সেকালের বিশ্বব্যাংক কেন এমন করেছিল তা নিয়ে আরো বিস্তারিত বুঝাবুঝি যারা প্রবেশ করতে চান তাদেরকে সত্তর ও আশির দশকের বিশ্বব্যাংককে স্টাডির বিষয় হিসাবে নিতেই হবে। এছাড়া তাদের জন্য আরেক বড়কাজ হবে – ROBERT McNAMARA  (5th President of the World Bank Group, April 1, 1968 – June 30, 1981) – এই ব্যক্তিত্বকে জানতেই হবে; তার  কাজ ও জীবনী প্রক্রিয়াকে।  তবে সাবধান; তাঁর কাজ ন্যয়সম্মত নাকি অন্যায় এসব মুল্যায়ন পাঠকের হাতেই থাক! কিন্তু ফ্যাক্টসগুলো জানা থাকতেই হবে – তাতে বা পাঠকের কাছে নেতি বা ইতিবাচক যাই হোক! এটাই আমার আবেদন থাকবে।
    কেন তাকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল? তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকান ফোর্ড মটোর কোম্পানির প্রেসিডেন্ট। পরে তাঁকে (১৯৬১-৬৮) আমেরিকান সরকারের নিরাপত্তা মন্ত্রী  [Defence Secretary] করা হয়। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিলেন। কিন্তু কেন? কী তার এক্সপার্টিজ যা তাঁকে নিয়ে এত চাহিদা তৈরি করেছিল? খুবই সংক্ষিপ্তভাবে একটু উত্তর দেই। তিনি তাঁর বিশেষ ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটি এই সক্ষমতার জন্য বিখ্যাত বলে নিয়োগদাতারা বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আমলটাই ছিল আসলে আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের কাল। আর সবশেষে বিশ্বব্যাংকে তাঁকে আনা হয়েছিল এটা মনে করে যে তাঁর আগমনের আগে বিশ্বব্যাংক এশিয়াতে এসে ভাল কাজ করতে পারছিল না। এর সুরাহা করতে। এশিয়ায় সরকারগুলোর সাথে মিলে কোন দেশের মূল অর্থনীতি খাঁড়া করলেও এর সুবিধা নিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের বহু গরীব লোককে তা স্পর্শ করতে পারছিল না। ঐ দেশের অর্থনীতিক কার্যক্রমে একেবারে প্রান্তিক গরীবদেরকে তাতে সামিল করতে পারছিল না। এটাই এককথায় বিশ্বব্যাংকের কর্মসুচি গ্রামের প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে সমস্যার  মুখোমুখি হচ্ছিল। এটা ভাঙতেই ম্যাকনামারার ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধি কাজে আসবে মনে করা হয়েছিল।
    তাই ম্যাকনামারার টেকনিক অনুসরণ করতে গেলে এজন্য অর্থ অপচয় কিছু হলে হোক, এই নীতি নেয়া হয়েছিল। তিনি এক নয়া টার্গেট নেন প্রান্তিক অঞ্চলে যেভাবেই হোক কম সুদের ঋণ সহজলভ্য করতেই হবে – তাতে কিছু চোর বাটপার বিশ্বব্যাংকের অর্থ মেরে দিলেও ক্ষতি নাই। একবার প্রান্তিক অঞ্চলে অর্থ (ঋণ বা মূলধন) এভেলএবল করতে পারলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি তাদেরকে ক্যাপিটালিজম এর অংশ করে ফেলতে পারলে পরে এরা নিজেরাই এগিয়ে আসবে। তাতে শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত আসবে না, মেরে দিবে, অপচয় হবে তা হলেও কেবল শুরুতে এই পথেই আগাতে হবে। বিশ্বব্যাংক তাই অনুসরণ করেছিল। আর এসময়কালের অপচয় নিয়েই আনু মোহম্মদের মত অনেকেই সেকালের বাস্তবতায় লিখেছেন, এর অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আশির দশকের শেষে বিশেষ করে ৯১ সালের পরে এসব এলোমেলো হয়ে থাকা অব্যবস্থা, ক্ষতি, অপচয় ইত্যাদি সবকিছুকেই কঠোর এক জবাবদীহিতার অধীনে আনা হয়। ইন্টিগ্রইটি [INTEGRITY] বা জবাবদীহিতা শাখাকে মূল আলাদা এক প্যারালাল শাখা তৈরি করা হয় যারা কেবল বিশ্বব্যাংকের বোর্ডের কাছে জবাবদীহিতা করবে। এভাবেই ম্যাকনামারার আমলের ইচ্ছা করে তৈরি কিছু আবর্জনা তখন সব সাফা করা হয়। এই পরীক্ষারই আরেক অংশ ছিল আমাদের শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা মত  প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পঋণ বিতরণ করার উদ্যোগ। যেখানে বিশ্বব্যাংকের অনেক অর্থেরই অপচয় হয়েছিল। এতে বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের নয়, তাই এতে অনাদায়ী খেলাপী ঋণের দায়ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উপর চাপায় নাই। কিন্তু সেকথা উল্লেখ না করে জিয়াকে দায়ী করে এমন বক্তব্য দেয়া ইন্টেলেকুচুয়ালি গ্রহণযোগ্য নয়! সৎ ততপরতা নয়!

    আরেকটা কথা বলে শেষ করব, এটা মার্কসের এক তত্ব যে যেকোন দেশের শিল্পায়নের শুরুতে যে পুঁজির যোগাড় তা এসেছে অন্যের অর্থ আত্মসাত করেই বা সরকারী ট্যাক্সের অর্থ না দিয়ে সেই অর্থ মেরে দিয়ে ইত্যাদি ধরণের সব অসদুপায় ব্যবহার করেই। এটাই মার্কসের আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের তত্ব।  ম্যাকনামারার বিশ্বব্যাংক এটাকেই ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। তাই খেলাপি ঋণের নামে অর্থ লোপাট করতে দিয়েছিল।  যেমন একটা একসময়ের বিড়ি ফ্যাক্টরির কথা জানি যে ১৯৯৯ সালের ১০০ কোটি টাকা আবগারি টাক্স মেরে দিয়েছিল যা সরকারের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সে ছিল আসলেই ভাল উদ্যোক্তা। তাই সে মেরে দেওয়া সেই ১০০ কোটি সেকালের বিচারে অনেক টাকা। সেই অর্থ দিয়ে সে ছয়টা নতুন কোম্পানি খুলেছিল যার চাওরটাই ছিল কারখানা আর দুইটা মার্কেটিংয়ের। এবং সবগুলোই এখন খুবই ভাল চলে এখন সে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী। ম্যাকনামারা এই পথ ধরার পক্ষপাতি ছিলেন।
    কিন্তু ম্যাকনামারার শেষ জীবন কাটে হতাশায়। শেষ পনেরো বছর তিনি কারো সাথে দেখা করতেন না। কোন সাক্ষাতকারো না। এভাবেই তিনি ২০০৯ সালে মারা যান। কিন্তু কেন তিনি একান্তে চলে গেছিলেন সেটাই জানা জরুরি। তাঁর কোনকিছুই   গ্রহণ করে নিবার কথা আমি বলছি না। তবে তাকে বিস্তারিত জানা আমাদের অনেক কাজে লাগবে বলে আমি মনে করি।

    শেষ কথাটা হল, নিশ্চয় আমি রেহমান সোবহানকে এসব দিক জানাবার বা শিখাবার কেউ নই; আমি তুলনার অনেক ছোট্ট তুচ্ছ। তবে দাবি ও আশা করব অন্তত তিনি এসব জেনে নিয়ে তবেই না মূল্যায়ন করে মন্তব্য করবেন যে দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান – কথাটা সত্যি কিনা!! অবশ্যই আমি এবিষয়ে তাঁকে শিখাবার কেউ না, এটা আমার কাজও না। তাঁর প্রতি কোন উদ্ধত্ত দেখানো এটাও আমার জন্য হারাম। তিনি আমাদের কাছে সম্মানিত অবশ্যই! কিন্তু কম বা যথেষ্ট চিন্তা না করে কেউ একটা মন্তব্য বা কথা বলে ফেলবে এটাও আশা করি না!  অগ্রহণযোগ্য!

    ২।  এবার তুলনা করব। বাংলাদেশের এখন যে ঋণ খেলাপির ঘোরতর সমস্যা তা কী শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার এর খেলাপি ঋণের মতন?
    প্রশ্নই আসেনা। পদ্মা ব্যাংকের কথাই যদি ধরি, পদ্ম্যা ব্যাংকের খাতক আর শিল্প ব্যাংকের সেবা খাতক এক নয়। সবচেয়ে বড়কথা আমানতের প্রশ্ন। পদ্মা বা ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানত সরাসরি দেশের আম জনতার। আপনার-আমার বাসায় গৃহিকর্মী হেল্পারের কাজ যারা করে এখন গরীব মহিলাদের অর্থ। যারা মাসে দুশ-পাচশ করে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে, তাদের কষ্টার্জিত আমানত করা টাকা। আর সে টাকাই ঋণ দিয়ে খেলাপী করা হয়েছে। তাই কোনভাবেই ন্যাশনাল ব্যাংক আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক বা তুলনীয় উদাহরণ নয়। কারণ, শিল্পব্যাংকের আমানত বিশ্বব্যাংকের দেয়া আর তারা জানে এটা তাদের এক্সপেরিমেন্ট; তাই অর্থ ফেরত নাও আসতে পারে।

    তাহলে এখন প্রশ্ন রেহমান সোবহানের মত এক ব্যক্তিত্ব তিনি ন্যশনাল ব্যাংক ধরণের ক্রাইসিসে পরা ব্যাংকের খেলাপি হওয়া আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি – এদুটাকে এক করে দেখলেন কেন? কীভাবে?  এ যেন “সোবহান” যার যার নামের সাথে আছে তারা সবাই কী একই রকম ব্যবহারের হবেই? তেমনই অনাদায়ী খেলাপি ঋণ মানেই কী এমন সব কেসগুলো একই?  তাহলে  এসব ফারাক বুঝা কী রেহমান সোবহান সাহেব এর জন্য কঠিন কোন কাজ? আমরা বুঝতে অক্ষম!

    একমাত্র পথ হল, ইন্টেলেকচুয়াল সততা বজায় রেখে আমাদের সকলের কাজ-মন্তব্য করা উচিত!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     ০৩ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ৬ঃ ১৫
    এই আপডেটে মূলত -‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ নিয়ে অংশটাই একটু বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

     

     

     

  • ইরান-ইসরায়েল বিরোধের ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে অন্যান্য

    ইরান-ইsরায়েল বিরোধে,
    এই ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে আমার কিছু রিডিং
    গৌতম দাস
    ১৫ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা

    https://wp.me/p1sCvy-5wh

     

    US will not take part in any Israeli retaliatory action against Iran

     

    ইsরায়েলের উপর ইরানের হামলা আসন্ন বলে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল আর এর আগে গাজায় লাগাতর ইরায়েলি ম্যাসাকার ঘটে চলা ইত্যাদি এসব কিছুর একটা পর্যায় সম্ভবত আমরা পার হতে যাচ্ছি। বিশেষত ইরানের হামলার পরে কী যুদ্ধ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাবে – এই ছিল সারা দুনিয়া তো বটেই গ্লোবাল অর্থনীতি ও রাজনীতির মুখ্য টেনশন। এই টেনশন বা টান টান উত্তেজনার একটা আপাত পর্যায়কাল শেষ হল বলে সকলের ধরে নিচ্ছে।  বিশেষ করে খোদ ইsরায়েল বড় বাঁচা বেঁচে গেছি বলে দুর্ঘ্নিশ্বাস ফেলেছে। আর কথিত পশ্চিমা ওস্তাদদেরকে থ্যাঙ্ক জানিয়েছে। ……credited an international military coalition with helping thwart   .।
    কিন্তু আকাঙ্খা –  নানান মুসলিম-প্রধান দেশের মূলত তরুণদের পর্বত প্রমাণ ‘মুক্তির’ আকাঙ্খা মানে প্যালেসটাইনিদের জন্য সহমর্মীতা থেকে উতপন্ন যেসব আকাঙ্খা সেই আকাঙ্খা-চাহিদার তুলনায় বাস্তবে ইsরায়েলকে ইরানের শিক্ষা দেয়া মানে, মিসাইল ও ড্রোন নিয়ে হামলার কার্যকারিতা হয়ত তুলনায় কম মনে হচ্ছে! সেকারণে, অনেকেই অসন্তুষ্ট! অনেককে দেখেছি ফেসবুকে ইরানের উপরই ঝাল ঝেড়ে ক্ষোভ প্রশমণ করেছেন!
    এবারের গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হত্যার যে অসহনীয় পরিস্থিতি ও গাজাবাসীর আত্মত্যাগ তা কী এবারও ক্ষতি বেশী লাভ তুলনায় কম হয়েই থাকবে?

    আগেই মূলকথাটাই সরাসরি বলে নেয়া যাক; প্রসঙ্গের ভিতরে ঢুকে বিস্তারে যাবার আগেই। আরব-ইরায়েলের যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-রক্তাক্ত সংঘাত সেই ১৯৪৮ সালে ইsরায়েল – এই দানব রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। অথচ প্রকৃত ও শুরুর দ্বন্দ্বটা ছিল ইsরায়েলের সাথে পশ্চিমাস্বার্থের, পশ্চিমা দেশগুলোর। বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে ইউরোপ থেকে ইহুদিবিরোধী চরম মনোভাব বা জর্মান-কেন্দ্রিক নির্মুলের [cleansing] মনোভাব থেকে।  তাই ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি জনগোষ্ঠি শেষে সারা ইউরোপ ছেড়ে পুনর্বাসিত হতে  দখলীকৃত প্যালেস্টাইনী ভুমিতে ইsরায়েল রাষ্ট্র জন্মাক, গড়ে উঠুক – এটা চেয়ে আমেরিকার নেতৃত্বে সারা পশ্চিরা সরকারগুলো এই ভূমি দখলী কাজে ইsরায়েলকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা-সমর্থন করেছিল। এভাবেই নিজেদের পাপ ও অপরাধ তারা মুসলমান উপরে সঁপে দিয়েছিল!

    হিটলার ইউরোপ থেকে ইহুদি জনগোষ্ঠি নির্মুল-নিধনের এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর অপরাধ করেছিলেন। এই নৃশংস ঘটনায় কোন মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্র বা কোন মুসলমান জনগোষ্ঠি একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয় বা কখনও  কোন দৃশ্যপটেই ছিল না। মূলত জর্মান থেকে তাদের নির্মুল ও বের করে দেওয়া হলেও যেহেতু আরব বা প্যালেস্টাইন ভুমিদখল করে তাদের ঘাড়ে চড়ে সেখানেই ইহুদিদের বসতি গড়তে ঠেলে দেয়া হয় তাতে ইহুদিরাও আর সারা ইউরোপ বা আমেরিকাকে আর শত্রু ঠাউড়ালো না। নয়া শত্রু ঠাউড়ালো আরব বা মুসলমানদের।  যে নয়া শত্রুর ভুমি ইহুদিরাই দখল করেছিল। আর দখলিকাজে পশ্চিমারা ইহুদিদের সাহায্য-সহায়তা তাদের করেছিল বলে ইহুদিরা নিজেদের আসল শত্রুদের ভুলে যায় ও মাফ করে দেয়। অথচ জন্ম থেকেই খৃশ্চান ধর্ম বা এর অনুসারীরা ইহুদিদের শত্রু হয়েই জন্মেছিল – ইহুদি-খৃশ্চান বিরোধ তাই তখন থেকেই।  তা সত্বেও  ওদিকে যারা কিছুই করে নাই সেই মুসলমান বা আরবেরা হয়ে যায় ইহুদিদের নয়া টার্গেট, নয়া মূল শত্রু!

    এ যেন বাইরে ব্যাপক মার খেয়ে এসে হতাশ পুরুষের বাসায় ফিরে মনের সুখে  বউ পিটানোর বিপ্লবীপনা!! ইহুদিরা যদি প্যালেস্টাইনিদের উপর তাদের ভুমিতে জবরদখলি করে পুনর্বাসিত না হয়ে যদি, ইউরোপের কোন ভুমিতেই নয়া আবাস গড়ত হত তাহলে যারা ইহুদি এথনিক ক্লিনজিং এর হোতা তাদের সঠিক ভাবে অপরাধের প্রতিকার হত!!
    অথচ নয়া ঠাউড়ানো শত্রু মুসলমানদের উপর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের অত্যাচার এখনও চলছে; আর এটাই এখন আর কোন আরব রাষ্ট্রই দায় নিতে চায় না; একে কেকে সবাই কেটে পড়েছে আর যেন সব দায় সওয়ার হয়েছে ইরানের ঘাড়ে। আর সেটাই একালে ইরান-ইsরায়েল বিরোধ-সংঘাত হিসাবেই হাজির! গত ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকে কোন মুসলমান রাষ্ট্র আর প্যালেস্টাইনের পক্ষে লড়াইয়ে লক্ষ্যহীন হয়ে সক্রিয় থাকতে চায় নাই ; আরব জাতিবাদের পক্ষের রাষ্ট্র বলেও কেউ আর থাকতে চায় নাই। আরব জাতিবাদের পরিচয় ফেলে সবাই সেই থেকে নিজ নিজ আরব পরিচয় পিছনে ফেলে নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রের জাতিবাদ [আরব জাতিবাদের বদলে সিরীয় বা মিসরীয় জাতিবাদ হয়ে গেছে] বলে পরিচয় বদলে নিয়েছিল। আর এঘটনারই আরেক ভাষ্য হল, আরাফাতের পিএলও [PLO] বা পিএফএলপি [PFLP] নামে যত বিপ্লবী যোদ্ধা ছিল সেসব হারিয়ে এখন মূখ্য নাম ইরান-সমর্থিত হামাস [HAMAS]! প্রথম দিকে হামাস এরা ইসলামি দল বলে প্রগতিশীলেরা নাক শিটকালেও এখন বাস্তবতা হল, হামাস ইসলামিস্ট কিনা সেই আপত্তি তলিয়ে গেছে – বাস্তবতায় মুরোদ দেখানোর সক্ষমতার বিচারে হামাস হল  এক সাহসী লড়াকুর নাম!  এরাই একমাত্র – ভুলে যাওয়া প্যালেস্টাইনদের লড়াইকে আবার চাঙ্গা করেছে! সামনে এনেছে! যদিও পথটা খুবই কঠিন ও চড়া মূল্যের। ইতোমধ্যেই তেত্রিশ হাজারের উপর জীবন, গাজাবাসীকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু তবু মুখ্য সাফল্য হল, ভুলিয়ে দেয়া লড়াইকে আবার সামনের কাতারে হাজির করা গেছে।  এবারের লড়াই-সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই। একে তুচ্ছ করা খাটো করে দেখা অপরাধ হবে! সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করব, আকাঙ্খার তুলনায় এই অর্জন হয়ত কম মনে হতেই পারে! কিন্তু দেখা-বিচারের ক্ষেত্রে একে যেন খাটো করে দেখা না হয়। ছোট করে না দেখা হয়। কারণ, এই অর্জনের তাতপর্য ব্যাপক!

    ইতোমধ্যে এতদিনে অন্যদিকের আরেক ডেভেলবমেন্ট হল, আমরা জানি চলতি নয়া শতকে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার বলে একটা অনুভব ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে; এই বলে তাদের মুক্তি – গ্লোব-জুড়ে তাদের মুক্তির আকাঙ্খা এখন অনেক দূর ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বুশের ওয়ার অন টেররের আমলে তাদের উপর আক্রমণ, সীমাহীন বৈষম্য অন্তহীন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমাদের মত দেশে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত বলে তাদের মুক্তি চাই বলে যতই চিতকার উঠুক – তা বাস্তবায়িত হবে ততটুকুই যতটুকু  এখনকার দুনিয়ার মূল দ্বন্দ্ব-বিবাদে ও মেরুকরণে  ইসলামি আকাঙ্খা কতটা বাস্তববাদী হয়ে প্রধান দ্বন্দ্বে ভিতরে নিজেকে সফলভাবে গেঁথে দিতে / নিতে পেরেছে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপুর্ণঃ
    ইরান কেন আরো বেশী করে ইসরায়েলের উপর আমাদের তরুণের আকাঙ্খা পূরণের মত আক্রমানাত্মক হতে পারলো না? – এটাই এখনকার  এক প্রধান জিজ্ঞাসা! অনেকে মনে করছেন ইরান ভিতু, কম মুরোদের কিংবা ওরা শিয়া বলে নেতৃত্ব দিতে পারল না!
    কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এগুলো একটাও সঠিক না। বিষয়টা সঠিক বুঝবার এপ্রোচ নয়!  তাহলে কীভাবে বুঝব কোনটা সঠিক? তরুণের আকাঙ্খা কী এভাবে মার খেতেই থাকবে?

    না, অবশ্যই না। তবে এসব ঘটনা বুঝবার পদ্ধতি না জানা থাকলে এমন অপ্রয়োজনীয় দোষারোপ চলতেই থাকবে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা এসব এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি। প্রধান দ্বন্দ্ব মানে?
    একটা সমাজ, রাষ্ট্রে বা এমনকি একটা পরিবারে অনেক ধরণের স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা সমস্যা থাকে। একটা পরিবার দিয়েই যদি বলি ধরা যাক – অনুমিত এমন পরিবারে ধরা যাক দু-তিন ভাইবোন আর বাবা-মা নিয়ে সংসার; যেখানে বাবা চাকুরিজীবী মানে যার আয়ে ঐ সংসার। এখন ঐ বাবার চাকরি টিকিয়ে রাখা, তিনার নিজে সক্ষম থাকা ফিট থাকা এটাই সেখানে প্রধান স্বার্থ। এর বাইরে ধরা যাক বড় ছেলে রাজধানীতে গিয়ে ইঞ্জিয়ারিং পড়তে চায় আর এই লক্ষ্যে কলেজ স্তরেই তাকে ভালো টিউশন শিক্ষক মানে পড়ালেখায় বিনিয়োগ দেয়া জরুরি।  কিন্তু এই চাহিদা-আকাঙ্খা কোনভাবেই বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থ যেটা ঐ পরিবারের এর চেয়ে বড় হতে পারবেই না। ছেলের স্বার্থই প্রধান এমন গুরুত্বপুর্ণ জিনিষ হতে পারবে না। একইভাবে অন্য ভাইবোনদেরও পড়ালেখা বেড়ে উঠার যেসব চাহিদা-আকাঙ্খা আছে সেগুলো পুরণ হওয়া এটাও বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারবে না।  এমনকি মায়ের কোন অসুস্থতাও না। বাবার ফিট থাকা প্রধান স্বার্থ কারণ, বাবাটাই প্রধান বা পরিবারে একমাত্র আয় আনবার ব্যক্তি। বাবা না থাকলে পরিবার পথে বসবে।

    আমাদের বর্তমান দুনিয়া ইতিমধ্যে (মূলত অর্থনৈতিক কারণে) এতই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে একালে যে কোন কিছুই আর লোকাল-আঞ্চলিক বিরোধ দ্বন্দ্ব নয়। সব দ্বন্দ্বই মিটাতে গেলে সমাধান পেতে চাইলে তা গ্লোবাল ইস্যু হয়ে যায়। কিন্তু গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব আরেক জিনিষ, আরেকটা ইস্যু। তাই সব লোকাল ইস্যুকেই সবার আগে গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্বে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতেই হয় – এক মেরুকরণে অবস্থান নিতে হয়। প্যালেস্টাইন ইস্যু বা আরব স্বার্থ বা মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা যেটাই হোক তা মিটতে পারে তাই গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব মিটা বা সমাধান কিভাবে হবে সেই সাপেক্ষে।  প্রধান দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে  মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা পূরন হতে পারবে না।

    গ্লোবাল পালাবদল এর সময়কালেঃ
    আসলে, গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব-বিরোধ হল যে এটা পালাবদলের কাল, মানে গ্লোবাল নেতৃত্বেই এখানে পালা বদল আসন্ন। গত প্রায় আশি বছরে ধরে আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে তা পরিবর্তিত হতে চাইছে – উদিয়মান চীনের হাতে। তাই চীনকে এখন এক নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ ঘটাতে নামতেই হচ্ছে।
    মধ্যপ্রাচ্য নীতি বা মিডল-ইস্ট পলিসি অর্থে কথাটা তুলছি। ১৯৭৩ সালের শেষে কিসিঞ্জার আমেরিকান মিডল ইস্ট পলিসি দিয়েছিলেন যা এতদিন ধরে আমেরিকা নিজ স্বার্থ, রাজত্ব সামলিয়েছে। এটা মুখ্যত গালফ রাজতন্ত্রগুলোকে নিজের পক্ষে দাঁড় করিয়ে আমেরিকা এদের ব্যবহার করে গেছে।
    কিন্তু একালে কখন চীন মধ্যপ্রাচ্য এর ভিতরে ঢুকে গেছে আর সব মেরুকরণ উলটে দিয়েছে বাইডেনের আমেরিকা তা টের পাবার আগেই কাজ শেষ করেছে। আমেরিকান ব্যর্থতার শুরু এখান থেকেই। সবচেয়ে দৃশ্যমান হল, ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে লাগাতর সৌদি-ইরান বিরোধ। আমেরিকা এই বিরোধকে আরো উস্কে তুলে সৌদিদের সুরক্ষা দিচ্ছে এই ভান করে আমেরিকা নিজের পক্ষে মানে ইরানকে দাবড়ে বা বঞ্চিত রাখতে এর সুবিধা ব্যবহার করে গেছে। কিন্তু কখন চীনা মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান নুন্যতম একসাথে কাজ করতে সম্মত এমন কূটনীতি-ব্যবসা বিনিময়ে নয়া পথ খুলে ফেলেছে তা আমেরিকা যখন টের পেয়েছে তা অনেক দেরি হয়ে গেছে। চীনা নয়া মেরুকরণে, তুরস্ক, ইরান আর এদিকে মালয়েশিয়া ইত্যাদি মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্রগুলো একটা কমন রাজনীতি নীতিমালা যেন অনুসরণ করতে পারে এমন কাছাকাছি চলে এসেছে।
    আবার ওদিকে নয়া আফগানিস্থানে দেখেন;  আমেরিকা বিতাড়িত করে সদ্য মুক্ত আফগানিস্তানে তা-লে-বা-নদের সাথে চীন নয়া ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আফগান মাটির নিচের কেবল দামি পাথর উত্তোলন ও তা বাজারজাতকরণ ঘটিয়েই চীন আফগান অর্থনীতি উজ্জ্বল করে দিয়েছে। যদিও বিনিময়ে চীনা রাজনৈতিক  চাহিদা ছিল একটাই যে,  আফগান শাসকদেরকে তাদের দেশের ভিতরে আশ্রয় নেয়া আইএস-কে [খোরাসান] দূরে ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যারা মূলত সশস্ত্র চিনা উইঘুর গোষ্ঠির আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক!  আর ওদিকে  আইএস-কে এখন প্রায়ই গোপনে আমেরিকা পক্ষ হয়ে (এমনকি সময়ে ভারতেরও হয়েও) খেপ মারা এসাইমেন্ট (বোমাবাজি বা হত্যার) করে দেয়। [সম্প্রতি রাশিয়ায় গানের কনসার্টে হামলার ক্ষেত্রে এরা সি আইএ এর হয়ে কাজ করেছে বলে পুতিনের অভিযোগ অনুমান।]।  হিলারি ক্লিনটনের আমলে এরাই একইভাবে ঠিকা নিয়ে লিবিয়াকে তছনছ করে রাস্তায় গাদ্দাফিকে লিঞ্চিং করেছিল। কিন্তু সবটা লাভ হয় নাই। এরাই শেষে বেনগাজি আমেরিকান এমবেসিতে রাষ্ট্রদুত-সহ সকল স্টাফকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিল!

    আবার দেখেন, বাইডেনের প্রথম তিন বছরে,  ইরানের উপর আমেরিকা নিরন্তর ডলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এর বিপরীতে চীন ইরানি তেল কেনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছে, বিভিন্ন পণ্য বিনিময়, চীনা বিনিয়োগ আর চীনা ইউয়ান ব্যবহার করতে দিতে দিয়ে চীন ইরানকে এক বিকল্প দুনিয়ার সন্ধান করে দিয়েছে। সারকথায় সব মিলিয়ে এক নয়া ভারসাম্যে নয়া মেরুকরণের মধ্যপ্রাচ্য – এই অর্থে এক নয়া গ্লোবাল অর্ডারের ইঙ্গিতও এখানে আছে। আর এর ভিতর দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রস্বার্থগুলো যখন নিজেদের মধ্যেকার স্বার্থ-বিরোধকে যদি সামলে রাখতে পারে তরে সকল রাষ্ট্রই এক এক নয়া মুক্তির দিশা – টানেলের প্রান্তে আলো দেখতে পেতে পারে। এই হল এর সারকথা।   সৌদি আরবও তার ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমানের কেবল তেলবিক্রির উপর নির্ভরশীল এমন  একচেটিয়া নির্ভর করা দেশ নিজ অথনীতিকে তেলের বাইরে এক নয়া অর্থনৈতিক ভিত্তির সৌদি হয়ে উঠতে -যুদ্ধ সংঘাত টেনশেন ও অস্থিতিশীলতা পাশে ফেলে নিজ আকাঙ্খা পূরণ করতে পারে – চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে সৌদি এখান থেকে দেখছে।
    একটা সাবধানবাণী দিয়ে রাখি।
    এটা চীনপন্থি হওয়া নয়; তা হয়েছে বা হতে ইঙ্গিতও দিচ্ছি না।  সারকথাটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল হঠাত সহসা ঘটে না। তবে এখন এটা আসন্ন, তাই সবাই এর সুযোগ নিতে চাইছে – এতে আমেরিকার বিকল্প যে কোন নেতৃত্বের বেলাতেই এমনই ঘটবে। এতে সব রাষ্ট্রই পুরানা বৃত্ত পুরানা রেস্টিকশন বা টেনে দেওয়া সীমা ভেঙ্গে – নয়া কোন ভারসাম্য নিজের পক্ষে গড়ে নিবার সুযোগ হিসাবে দেখবেই। তাতে এই বিকল্প এটা চীন কী না – আমি বা আপনি চীনকে ভালবাসি পছন্দ না ঘৃণা করি বা ভক্ত? সেসব বিচার এখানে একেবারেই গৌণ! এককথায় একমাত্র নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই এখানে প্রধান এক্টর!!
    শেষের ঘটনা দিয়েই যদি বলি, সংকীর্ণ আত্মস্বার্থে পলায়নপর গালফ স্টেট এর লজ্জাজনক ২০২০ সালের কাজ ছিল তথাকথিত আব্রাহাম একর্ড [Abraham accords ] নামে ইরায়েলের সাথে নিজ  নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের প্রটেকশন চুক্তিতে যাওয়া। দুবাই ও বাহারাইন [UAE and Bahrain ] প্যালেস্টাইনিদের ভুলে গিয়ে ই-রায়েলের সাথে এই আপোষ চুক্তি করেছিল।  যেখানে দুবাই ছিল আসলে সৌদি আরবের এডভান্স পার্টি। মানে সোদিদের এই আপোষপথ অনুসরণ করার কথা ছিল। এনিয়ে দ্বিপাক্ষিক সৌদি-ইওরায়েল বৈঠকও চলমান ছিল। কিন্তু গত বছর এপ্রিল ২০২৩ সালে সব উলটে যায়।

    The United Arab Emirates and Bahrain made peace with Israel in 2020 through
    the so-called ‘Abraham accords’ and Saudi Arabia was considering following
    suit in return for U.S. security commitments.

     

    সারকথায়, এই গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে উপেক্ষা করে কোন মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাত প্রধান দ্বন্দ্ব মীমাংসার অংশ নিতে হবে। আর এরই নয়া মেরুকরণের ভিওত্রে ঢুকে এর মধ্যে নিজ নয়া স্বার্থ বের করে আনতে হবে।
    আর একই কথা প্যালেসটাইনের মুক্তির প্রশ্নের নয়া ও বাস্তব দিশা!

    দানব ইসরায়েলি রাষ্ট্র গড় উঠেছে নেতা আমেরিকার প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে এবং এখনও টিকে আছে আমেরিকান ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদল নির্রবিশেষে এদের প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে। চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি প্রতিক্রিয়ায় কার্যত ইসরায়েলকে আরো বেশী করে আমেরিকার কোলে উঠিয়ে দিয়েছে যেটা এখন ইউরোপের কোলেও তুলে দিবার সামিল। আর এতেই ওদের আসল নৈতিক সংকটকে উদাম করে দিয়েছে।
    ইসরায়েলকে এবারের ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করতে এগিয়েছে কারা? বৃটিশ, ফরাসি আমেরিকা এরা? আর বলছে নাম প্রকাশ করতে চায় না এমন আরো কিছু দেশ! যে অন্যের ভুমি দখলকারি তার আবার নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে এসেছে পশ্চিম, এই নৈতিক সংকট এতই দেউলিয়া এখানে!

    পুরানা প্রগতিশীল (ইসলাম কোপানো) ধারণার উপর দাঁড়িয়ে অনেকে বলে থাকেন, যে দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা আমেরিকা এনেছে এথেকে দুনিয়াকে মুক্ত হতে নাকি আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ লাগবে। মানে এদের সারকথাটা দাঁড়ায় সে এটা নাকি প্রায় অসম্ভব!!  কিন্তু না, সরি; এই চিন্তা অপরিপক্ক!
    ব্যাপারটা বিশ্বযুদ্ধ হতেই হবে তা না। বিষয়টা হল দানব ইসরায়েল টিকে আছে আর নিরন্তর নুইসেন্স করে যেতে পারছে কারণ একে প্রটেক্ট করছে আমেরিকা। কাজেই গ্লোবাল নেতা থেকে আমেরিকার সরে যাওয়া, চ্যুত হয়া দুর্বল হয়ে যাওয়া এটা ঘটে গেলেই – এটাই একমাত্র প্রয়োজনীয় শর্ত। এখন আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে চলে যাওয়া কী করে ঘটবে তা আমরা নিশ্চিত জাতি না। কিন্তু সেকারণে, এটা ঘটতে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধই লাগবে এমন করে কথা বলাটা একেবারেই বোকামি; আর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি এর বাস্তবায়নের পথ কেবল এটাই বলতে পারা উচিত; দানব ইsরায়েলের বিলুপ্তি অসম্ভব – এমন মানে করা ইঙ্গিতপুর্ণ কথা বলার তো প্রয়োজন নাই। এর চেয়ে গ্লোবাল পালাবদলকে ফলো করা য়ার বুঝতে পারাই যথেষ্ট।

    আমাদের মত দেশের মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খার কথা বলছিলাম।  তাদের আকাঙ্খায় থাকা কোন ইসলামি বিপ্লব বা রাজনীতি কতটা সঠিক বা ভাল সে বিচার-পর্যালোচনা এখানে এখন পাশ কাটাবো, প্রসঙ্গটা আলাদা বলে। তবে এর মধ্যে কেবল পরিবর্তনের  আকাঙ্খাটাকে নিয়ে কথা বলব। আর তা করতে চাইলে তাঁদেরকে অন্তত গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব বা পালাবদলের ভিতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নয়া নীতি নয়া মেরুকরণকে দেখতে পারতেই হবে। এটা কেবল ইরানের বা সৌদি রাষ্ট্রের বিচার-পর্যালোচনা নয়। মনে রাখতে হবে প্যালেসটাইন ইস্যু নিজে নিজেই দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব নয়। আসন্ন  গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে ঘিরে যে নয়া মেরুকরণ ঘটছে ঘটবে এই ভিতরেও প্যালেসটাইন ইস্যু বা দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ-কে দেখতে পারতে হবে। আর তবেই সফলভাবে এর সমাধান বের করে আনা যাবে। অরুণদের আকাঙ্খাকে অস্থিরতা দিকে নয় বরং স্থিরতা ও গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে বুঝাবুঝির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; কারণ এটাই এখানে মুখ্য হবে। সবচেয়ে বড় কথা চীনা নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি আর একে ঘিরে মেরুকরণের সময় প্যালেসটাইন ইস্যুর সমাধান ও দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ উপযুক্তভাবে প্রোথিত করে নিতে হবে।

    ইরানের এবারের ইসরায়েলে হামলা কেন সীমিত ছিল এর প্রধান কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতি এমনিতেই নুব্জ হয়ে আছে বিশেষত করোনা ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাইডেনের ভুল সিদ্ধান্ত ভুল যুদ্ধ ইউক্রেন থেকে এখন ক্রমশ আরো সব সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ছে। গত সাড় তিন বছরে দিশাহীন ডলার অবরোধের নেতি প্রভাব এখন ক্রমশ আরো সবল হচ্ছে – ডলারের বদলে ইউয়ানে গ্লোবাল বাণিজ্যে অগ্রগতি ঘটে গিয়েছে যা খোদ বাইডেনের নীতির প্রতিক্রিয়া – নিজের পায়ে কুড়াল মারা হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমেরিকান মুদ্রাস্ফীতি গত তিনমাসে আরো বেড়েছে আর তাতে ইতোমধ্যেই বাণিজ্য ব্যবস্থায় শঙ্কা ছড়িয়েছে। এর মাঝে যদি ইরানের ইসরায়েল হামলা তীব্র হয় তবে এর ধকল কাটানো মুশকিল হবে। যেমন সবার আগে তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে যা এত সংকটের মধ্যেই গড়ে আশি ডলারের মধ্যে ছিল যা এখনও আশি-নব্বই ডলারের মাঝে থাকছে – এটা উথাল-পাথাল হলে সবার আগে উতপাদন ও মুল্যবৃদ্ধিতে সব এলোমেলো অনিশ্চিয়তার পথে হাটবে – যেটা আরেক অর্থে পধান ইস্যু।
    এই স্বার্থেই ইনফরমালি হলেও চীন=-আমেরিকার ম্যাসেজ বিনিময় ঘটেছে।  মধ্যপ্রাচ্য লেবেল এনিয়ে ব্যাপক কটনীতি  কাজ করেছে। রয়টার্স এনিয়ে চারটা রিপোর্টে এসব দেখিয়েছে। এমনকি ইরানের ইওরায়েলে হামলার পরে ইওরায়েল কোন পালটা হামলার চিন্তা করলে তা এই দেশকে নিলে দায়ীত্ব ও পরিণতির দায় নিয়ে করতে হবে বলে বাইডেন হুশিয়ারি দিয়েছেন। ইসরায়েলের যুদ্ধ-ক্যাবিনেটও এখন নিজে একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বা চাচ্ছে না। সে বন্ধু-শ্যন্য হয়ে পড়েছে। তাই পশ্চিমা-বন্ধুদেরকেও আর হারাতে চাচ্ছে না বলে এই সিদ্ধান্ত। আর মুখে বলছে ইরানের হামলার পরে তা যতই ক্ষতি ইসরায়েলের হোক না কেন এর কোন প্রতিক্রিয়া তারা এখন না ভবিষ্যতে কখনও দেখাবে।

    আপাতত এতটুকুই!

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৫ এপ্রিল ২০২৪  রাত ৯ঃ ০০

  • জেনেট ইয়েলেনঃ চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?

    বাইডেনের আরেক হারঃ
    চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?
    গৌতম দাস
    ০৮ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা ০৭ঃ ৫২
    https://wp.me/p1sCvy-5vk

     

           U.S. Treasury Secretary Janet Yellen meets with Wang Weizhong, deputy party secretary and governor of Guangdong, … in southern China’s Guangdong province, April 5, 2024. (Pool/AP)

     

    আমেরিকায় বলে ট্রেজারী সেক্রেটারি, ইংল্যান্ডেও বলে ‘চ্যান্সেলার অফ এক্সচেকার’ আর সমতুল্য ভাবনায় আমরা যাকে বলি অর্থমন্ত্রী। তবে অবশ্যই কড়া সমতুল্য বলে কিছু নাই। কারণ, কঠোর বিবেচনায় সবগুলো ধারণাই আবার আলাদা বলেও মানে ট্রেজারী সেক্রেটারি আর অর্থমন্ত্রী এক নয় বলেও প্রমাণ করা যাবে। আমরা এখানে  তুলনীয় অর্থে ট্রেজারী সেক্রেটারি বলতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অর্থমন্ত্রী ধরে নিয়ে এখানে কথা বলব। বাইডেনের বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নাম জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]।  নিয়মিত হুঙ্কার দেয়া বাইডেন এর এই অর্থমন্ত্রী জেনেট চীনের কাছে এক আর্জি নিয়ে চীন সফরে গেছেন ও আছেন। একলম্বা সফর এপ্রিল ৩-৯ জুড়ে [From April 3-9,…… ] চলবে এই সফর বলে জানিয়েছে চীনের অবস্থিত আমেরিকান এমবেসী। কেন এই সফর তা এককথায় বললে, আমেরিকান এক রাজ্য জর্জিয়ার সোলার বিদ্যুৎ কোম্পানীগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সোলার কোম্পানি বলতে যারা electric vehicles, solar cells and lithium batteries ইত্যাদি এসব সম্পর্কিত পণ্য উতপাদক! কেন, আর তাতে চীনের সাথে এর সম্পর্কটা কী?

    জেনেটের নিজ সরকারী বিবৃতির ভাষায় বললে, ……because it could not compete against large quantities of goods that China was exporting at artificially depressed prices. সারকথাটা বাংলা করে বললে – “  চীনে উতপাদিত এই পণ্য উতপাদনের বিপুল সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম-মুল্যের সাথে সমতুল্য আমেরিকান কোম্পানিগুলো পেরে না উঠাতে[could not compete] “ –  আমেরিকান কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
    পাঠককে পরিস্কার করে দেই এটা কোন নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট থেকে কোট করি নাই। এটা জেনেটের নিজ মন্ত্রণালয় এর ওয়েব সাইটে প্রকাশিত জেনেটেরই বিবৃতি। তাই কোন ভিন্ন ব্যাখ্যা বা অর্থের ভিন্নতার সুযোগ নাই। আর, এখন আসি যে জেনেট ঠিক কী চাইতে চীনে এসেছেন? রয়টার্স লিখেছে, ...concerns are growing over the global economic fallout from China’s excess manufacturing capacity, বাংলায় সারকথা – এই পণ্যের গ্লোবাল মার্কেটে [এখানে গ্লোবাল মার্কেট বলতে মুলত আমেরিকান মার্কেটের উদ্বেগ বুঝতে হবে ] উতকন্ঠা বাড়ছে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতার সাথে পারছে না বলে!!

    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরেঃ
    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরে তা বুঝবার সহজ পথ হল,  সফরে আলোচনা শেষে তিনি কী পেলেন এনিয়ে তার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত বিবৃতি পাঠ – এটাই সবচেয়ে ভাল সোর্স। সেই বিবৃতিটা এখানে পাওয়া যাবে।  এই বিবৃতির শিরোনাম – Statement from Secretary of the Treasury Janet L. Yellen on Announcement of New U.S.-China Initiatives Following Meeting -। আর ওর ভিতরের অংশ ছোট ছোট করে তুলে এনে বাংলায় পাঠককে দেখাবো এখন।

    ভিতরের বক্তব্য ১ঃ
    উচ্ছসিত খুশি প্রকাশ করে জেনেট ইয়েলেন বলছেন,
    আমি খুবই খুশি যে আমরা (তিনি ও চীনা প্রতিনিধি) একমত হয়েছেন যে তারা দুইটা তাতপর্যময় নয়া উদ্যোগ চালু করতে পেরেছেন। এতে কী হবে? এতে “আমেরিকান শ্রমিক ও কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা পাবে আর এতে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষিত হবে” – জেনেট বলছেন। সারকথায় এতে চীন আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য গ্লোবাল বাজারের কিছু অংশের ভাগ আপোষে আমেরিকাকে ছেড়ে দিবে।  আর সেটাই জেনেট কথিত  “two significant new initiatives”, আর এটাই এই সফরে তাঁর চীনের কাছ থেকে অর্জন! 

    “I am pleased that we have agreed to launch
    two significant new initiatives that will advance
    the interests of American workers and firms
    and help protect U.S. national security.”

    ভিতরের বক্তব্য ২ঃ
    এক নম্বর অর্জন হল, জেনেট বলছেন যে, “এখন চীন-আমেরিকা তাদের আভ্যন্তরীণ ও গ্লোবাল অর্থনীতির ইস্যুতে এক ভারসাম্যপুর্ণ অর্থনৈতিক উন্নতি [মানে আমেরিকাকে ছুড়ে ফেলে একক চীনা উন্নতি নয়] পথে গভীর নিচ পর্যন্ত স্বার্থ-মতামত বিনিময় করতে পারব। আর এতে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতায় ভারসাম্য টানাসহ সাথে আমি এখানে সুযোগ নিব যাতে আমেরিকান কারখানা আর শ্রমিকেরা চীনের কাছে থেকে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিজেদের জন্যও পায় – এদিকে চীন যেন খেয়াল রাখে। আমি বিশেষ করে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ প্রসঙ্গে খেয়াল রাখব যেমন কিছু উতপাদন সেক্টরে সরকারী সহায়তায় চীনের অতিউতপাদন সক্ষমতার ধাক্কা যা আমাদের উপর পড়ছে আর এই ধাক্কা আমেরিকান অর্থনীতির উপর পড়ছে”।

    First, we agreed that the U.S. and China will hold intensive exchanges on balanced growth
    in the domestic and global economies. These exchanges will facilitate a discussion around
    macroeconomic imbalances, including their connection to overcapacity, and I intend to
    use this opportunity to advocate for a level playing field for American workers and firms.

    I am particularly concerned about the impact of Chinese industrial overcapacity in
    certain sectors as a result of government support, and the impact it could have on
    the American economy. 

    ভিতরের বক্তব্য ৩ঃ
    এটা হল জেনেটের বলা এই সফরে তাঁর দ্বিতীয় তাতপর্যপুর্ণ অর্জন প্রসঙ্গে। কী সেই অর্জন?
    চীন-আমেরিকা দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে গ্লোবাল অর্থনীতিক নিয়ন্ত্রণ আনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা।  এখানে দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুঝাতেই শব্দদুটো হল, Treasury-PBOC Cooperation।  যেখানে টেজারি হল জেনেটের মন্ত্রণালয় আর PBOC  মানে হল পিপলস ব্যাংক অফ চায়না – চীনে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক সমতুল্য তাদের প্রতিষ্ঠানকে বুঝাতে তা PBOC নামে ডাকা হয়। এবং এই সহযোগিতা বিনিময় হবে বিদেশে অর্থপাচার বিরোধী কাজগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা।

    Second, we agreed that the U.S. and China will start Joint
    Treasury-PBOC Cooperation and Exchange on Anti-Money
    Laundering to expand cooperation against illicit finance
    and financial crime.
     

    অর্থাৎ এই পুরা সফরটার একটাই উদ্দেশ্য ছিল – সেটা হল, চীন-আমেরিকান সহযোগিতা, বিরোধ না।  কিন্তু সেটা এত দেরিতে এই বোধোদয় এত দেরিতে কেন? 

    চীন-আমেরিকান বিবাদ কী ও কেনঃ
    শুরুতে এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি গত ৩ এপ্রিল ২০২৪ মানে জেনেটের সফর শুরুর একই দিনে তবে কিছু আগেই,  বাইডেন-শি এক গুরুত্বপুর্ণ টেলিফোন কথোপকথন করেছেন। শি  মানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং  [Xi Jinping]। এই কথোপকথন নিয়ে আগ্রহিরা এই দুটা রিপোর্ট দেখতে পারেন। APnews আর  REUTERS  এদুইটা হল বিখ্যাত তিন গ্লোবাল নিউজ এজেন্সীর অন্যতম দুই কর্ণাধার। এটা পাঠক যারা এই প্রসঙ্গের গভীরে ঢুকতে চান তাদের জন্য।  তবে সারকথাটা বলে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার চারবছরের ক্ষমতা-আয়ুর তিনবছর তিন মাস পার করে ফেলেছেন; এছাড়া আর ছয়মাস (নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহে)  এর মধ্যে তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে পাস দেখাতে হবে।  আর মিডিয়ায় জোর অনুমান পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে যাবে। সে যাই হোক এই সময়কালে বাইডেন গড়ে বছরে একবারের কিছু বেশী হয়ত চীনা প্রেসিডেন্টের শি সাথে এমন  ফোনালাপ করেছেন! অর্থাৎ বাইডেনের নীতি ছিল চীন-মার্কিন অসহযোগিতা। এর পিছনের মূল কারণ কী?

    এটা পালাবদলের যুগ চলছেঃ
    এর পিছনের মূল কারণ বলতে প্রথমে যা আমাদেরকে বুঝতে হবে এটা পালাবদলের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা।  এটা পালাবদলের যুগ মানে হল, গত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা সেই যে গ্লোবাল নেতা হয়ে বসেছিল সেটা এখন ফুরিয়ে আসছে আর বিপরীতে চীন সেই আসনে গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠে আসতে চাইছে। এখানে গ্লোবাল নেতা বলতে – কোন দেশের অর্থনীতি এখন সবাইকে ছাপিয়ে সারপ্লাস বা নয়া বাড়তিমূল্য নিজ অর্থনীতি জমা করতে পারছে – যার সোজা অর্থ হল অন্য দেশের অর্থনীতিকে ঋণ-বিনিয়োগ দিবার নেতা হয়ে উঠছে এরই হিসাবের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলা। আর বলাই বাহুল্য অন্যদেশকে বিশেষ করে আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ দেয়া আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হিসাবে বাণিজ্যিক পুঁজি ধার দেয়া  – একাজে এখন সবার উপরে সক্ষম রাষ্ট্র হল চীন। আমাদের মত কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ থেকে দখলদারেরা ২০০ বছরের সারপ্লাস সব লুটে নেয়া হয়েছিল। ফলে এই ঘাটতি যে রাষ্ট্র মিটিয়ে নয়া আশার আলও যে এগিয়ে আসে সেই চীনের প্রভাব আমাদের উপর থাকবেই!  এটাকে ইতিবাচক দেখা হবে, স্বাভাবিক! এটা পন্থি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না – যে আপনি কাউকে বলবেন যে উনি আমেরিকা ছেড়ে চীন-পন্থি বলেই নাকি তিনি দেশে চীনা বিনিয়োগ-সহযোগিতাকে ইতিবাচক দেখছেন। সবচেয়ে বড় কথা গত প্রায় ৮০ বছর এই ভুমিকাতেই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা ছিল!
    এককথায় বললে, আমাদের মত সব গরীব খাতক-দেশকে  অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ [development loan] আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ [FDI] যে দাতা দেশ দিতে পারে সেই-ই গ্লোবাল নেতা ধারণাটার সারকথা!
    উলটা দিকে চীনের এই উত্থান এটা ততই আমেরিকার গ্লোবাল নেতা স্টাটাস ও সক্ষমতা শুকিয়ে যেতে থাকছে ও থাকবে এটা স্বাভাবিক। এককালের এমন গ্লোবাল নেতা বৃটিশ সরকারেরও মুরোদ এভাবে শুকিয়েছিল বলে আমেরিকার উত্থান হয়েছিল।

    কিন্তু এটা আমেরিকার কোন প্রেসিদেন্ট (বিশেষ করে ২০০০ সালের পরের কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) শেষে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। ভেবেছেন তাদের সামরিক সক্ষমতা ও গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান সমুহকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো অটুট আছে – এই ভাবনা থেকে। তবে একটা লাইন টেনে বলা যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকান প্রতিটা প্রেসিডেন্ট যে নীতি অনুসরণ করেছেন তা হল, চীনের কাছে যাওয়া আর একটা না একটা সেক্টরে নিজের অর্থনীতির জন্য বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে এসেছেন।  সবচেয়ে বড় কথা চীনও এই সহযোগিতা করে গেছে। সবচেয়ে বেশী এখন সহযোগিতা নিয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা (দুই টার্মের ওবামা ২০০৯-২০১৬ সময়কালে)। আর এটাই এই একই চীনা সহযোগিতা টোকাতে এখন বের হয়েছে এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইদেন।

    এমনকি ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরও একই নীতিতে চীনা বাজার সহযোগিতা টোকানো – তা এনেছেন। কিন্তু পরের বছর থেকে ট্রাম্পের নয়া রাস্তা হয়ে যায় অসহযোগিতা – মানে সংঘাতে মোকাবিলার পথে যাওয়া। শুরু হয় আমেরিকায় চীনা আমদানি নানা পণ্যের উপর ইচ্ছামত কর আরোপ – এটা ছিল ২৫% থেকে ৬৬% পর্যন্ত করারোপ। যদিও ট্রাম্পের শপথের পর থেকে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন তিনি তা হল অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন আর নয়। মানে ১৯৮০ সাল থেকে  অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন এর নেতা ছিল খোদ আমেরিকা। এটা ছিল তথাকথিত অর্থনীতিক জাতিবাদ – এই মৃতপ্রায় নীতির বিপরীতে অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন  এর পথে দুনিয়াকে সঠিকভাবেই ঠেলে দেওয়া। অথচ ট্রাম্পই প্রথম ২০১৭ সালে ক্ষমতার শপথের পর থেকেই পুরানা  অর্থনীতিক জাতিবাদ   কে কতটা ফিরিয়ে আনা যায় এই ব্যর্থ পথে তিনি ফিরে রওনা দিয়েছিলেন। যদিও এর মূলধারা হোয়াইট সুপ্রিমিজম [সাদা ককেশীয়রাই শ্রেষ্ঠ জাতি] ধারণা। একি কারণে, তিনি আমেরিকার একাই ন্যাটো [NATO] এর ৯৫% খ্রচ যোগানো ত্যাগ করার পক্ষে। তিনি কোন গ্লোবাল নেতা থাকার ব্যয়ভার বইতে রাজি ছিলেন না।
    বিপরীতে বাইডেনও তাই তবে একটু ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে।
    যেমন চীনা পন্যে বাড়তু করারোপ যা ট্রাম্প করে গেছিলেন তিনি তা বন্ধ না করে সেটাই চালিয়ে গেছেন, এখনও চালু আছে। আর বাইডেনও  হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি নিয়েছেন। তবে তফাত হল, ট্রাম্প আমেরিকার ভিতরের সাদা বাদ বাদামি বা কালো লেবার তাড়িয়ে দিবার পক্ষপাতি – মেক্সিকো বর্ডার পারলে পুরা ল্যাটিন আমেরিকান বর্ডার বন্ধ করতে চান। বিপরীতে বাইডেন দেশের বাইরে হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি অনুসরণ করে গেছেন। সারকথায়, দুনিয়ায় সাদা ককেশীয় শাসন কলোনি দখলদারের হাতে যার বয়েস হয় প্রায় পাচশ বছর।  তিনি তাই  ইইউ-কে সাথে এই সাদা শাসন আরো চালিয়ে যেতে চান। কেন? চীন গ্লোবাল নেতার আসনে বসে যাওয়া মানে পশ্চিমা সাদা শ্রেষ্ঠত্ব এর শাসনের দিনের শেষ হবে। আর এখান থেকে ইউক্রেনকে সামনে রেখে রাশিয়ার সাথে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের লড়াই এর শুরু। তবে তাদের ময়ল আগ্রহ ছিল রাশিয়ার অবস্থা খারাপ হলে চীন তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসে সামরিকভাবে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের কাছে হেরে যাবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠলেও এই কৌশলে চীন হেরে লোপাট হয়ে যাবে আর দুনিয়া সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের শাসন টিকে যাবে – চলতে থাকবে। যদিও চীন দূরে থেকেই রাশিয়াকে সহযগিতা দিয়্বে গেছে।  আর বাইডেনের ডলার অবরোধ কাজ করে নাই। উলটা ইন্ডিয়া রাশিয়াত সস্তা তেল নিয়ে রপ্তানিকারক হয়ে অর্থ লুটেছে আর ও দিকে রাশিয়াও বিদেশি মুদ্রার সমস্যায় না পরে উলটা রিজার্ভ বাড়িয়েছে সোনা কিনেছে।
    বাইডেনের টানা তিন বছর ছিল তথাকথিত গণতন্ত্র-মানবাধিকার এর পররাষ্ট্রনীতি আর সাথে ডলার অবরোধ সহ নানান ধরণেরস্যাংশন আরোপ করার নীতি। তিনি দাবি করে এসেছিলেন আমেরিকার এসব অস্ত্র লুকানো অবস্থায় পড়ে আছে আর তিনি এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দুনিয়া থেকে চীনা প্রভাব কাটাবেন।
    এরই সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ও প্রদর্শন স্থল ছিল সাউথ চায়না সি – অন্যভাষায় বললে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি দিয়ে চীনকে একঘরে করবার খায়েস। যেমন বাংলাদেশকেই চীনা বিনিয়গসহ সব ধরণের প্রভাব মুক্ত করা এর লক্ষ্য ছিল।

    কিন্তু গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে আমেরিকা আমাদেরকে পথে ফেলে চলে যায় শুধু তাই না। এবার আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে যায়।

    বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনেঃ
    আর সব হারিয়ে অর্জন-শুণ্য বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনে!!!! নিজ কারখানা-কোম্পানি বাঁচাতে এখন চীনের কাছেই হাত পাতা।
    সগযোগিতা অবশ্যই সঠিক ও বিনা-যুদ্ধের পথে স্বার্থ-দ্বন্দ্ব এর মোমাংসার পথ!! তার মানে বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি করে কোন লাভ হয় নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি একটা পুরাটাই ভুল পথ ভুল সিদ্ধান্ত ছিল!!!  সবটাই গচ্চা গেছে পানিতে। ডোনাল্ড ল্যু এই কথিত মহান ব্যক্তিত্বকে তাহলে আসলে বাইডেনের দরকার ছিল না, দুনিয়ারও না।  উনি তাহলে একতা খামোখা ছিলেন!!!! নাকি তাই তো? 

    তাহলে আমাদের আম-স্বার্থ, রাষ্টড় রাজনীতি ও অধিকার এসবের যে ক্ষতি বাইডেন করে গেলেন এর দায় কে নিবে এখন???
    এসবের সোজা মানে এক ভারত ছাড়া দুনিয়াতে কেউ আর আমেরিকাকে বিশ্বাস করবে না! 

    এরপরেও আবার বাইডেনের আয়ূ আর মাত্র ছয় মাস। যদি ট্রাম্প বাবাজি জিতে আসেন তো সেক্ষেত্রে কী হবে?
    কথা একটাই, আমাদের রাস্তা আমাদের স্বার্থ নিয়ে আমাদেরকেই ভেবে-চিন্তে  আর সর্বোপরি শত্রু-বন্ধু বুঝে ফারাক করে উঠে দাঁড়াতে হবে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪    সন্ধ্যা
    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪   রাত

     

     

     

     

  • আলী রীয়াজদের সংকট এবং আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    গৌতম দাস
    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

     

       র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ৫ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

     

     

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও! 

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।
    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি! 

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।
    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর! 
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?


    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত”
    এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!
    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!
    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

     

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!
    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।
    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।
    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!
    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!
    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!
    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

     

     

     

     

     

     

     

     

    নিচে উপরের লেখাটারই একটা সাদামাটা রচনা বা Plain Text ভার্সান দেয়া হল পরীক্ষামূলকভাবে,  অনেকে বলছেন এতে লেখা মোবাইলে পড়তে সুবিধা হবে। পাঠকেরা মন্তব্য জানাবেন আশা করিঃ

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে!
    গৌতম দাস

    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও!

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।

    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি!

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।

    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর!
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?

    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!

    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!

    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

     

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!

    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।

    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ  https://thefederal.com/…/will-us-do-a-bosnia-on…/

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।

    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!

    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!

    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!

    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

  • নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা

     নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা
    গৌতম দাস

    ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫
    https://wp.me/p1sCvy-5j8

     

                  বিএনপি ক্ষমতায় আসতে অন্ধকার গলি খুঁজছে: প্রধানমন্ত্রী

     

    আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতার আয়ু রাখা হয়েছে (আমাদের মত পাঁচ বছর না) চার বছরের। তাই বাইডেনের আয়ুকাল (২০২১-২৪), মানে ২০ জানুয়ারি ২০২১ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৫। যে কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব এর বিচারে বাইডেন প্রশাসন এক ব্যতিক্রম হবেন। ইতিহাসে বাইডেনই সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আর দীর্ঘ প্রভাব ফেলা প্রেসিডেন্ট হবেন।  ফেলে ছড়িয়ে একটা ঢিলেঢালা হিসাব করলেও বাংলাদেশের উপর বাইডেনের প্রভাবের ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই প্রায় দুবছরের।  আর সেই সময়কাল বলা যায় গত ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের বছর শেষ – এভাবে মোটামুটি এই দুবছরের কথা বলছি।  আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইডেনের সম্ভবত চরমতম প্রভাবিত করার আয়ুকাল ছিল এই দুই বছর। যদিও এদুই বছর চরমতম প্রভাব বিস্তারের ফলাফল কী হয়েছিল বলে আগামিদিনের ইতিহাসে কী লেখা হবে?

    বাংলাদেশের আগামিদিনের ইতিহাসে বাইডেনের আমেরিকাকে নিয়ে কী লেখা হবেঃ
    প্রথমত লেখা হবে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক ওলটপালট ঘটিয়ে দিবার কান্ডটা করেছেন এই বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের কপালে যাই হোক প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজের দেশের জন্য বাংলাদেশ থেকে কিছু গালাগালি আর হতাশা ছড়ানোর দায় ভিন্ন খুব কিছুই ফেরত নিতে পারেন নাই। তিনি এদুই বছর বিরাট খাটাখাটনি করেছেন, কিন্তু সবই ব্যর্থ আর পন্ডশ্রম! মানে প্রচুর দামি এই শ্রম তা হলেও এটা কারোরই ভোগে লাগে নাই! বেকার গেছে। এজন্য দায়ী বাইডেন প্রশাসনের কিছু হামবড়া কর্তা যেমন আজরা জেয়া বা ডোনাল্ড ল্যু ইত্যাদি।
    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হিসাবে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদের মত দেশে অপছন্দের সরকার হলে তাকে ফেলে দেয়া এই ছিল আমেরিকার স্টাইল।  এরপর নয়া সরকারকে দিয়ে আমেরিকা যা চায় তাই আদায় করে নিত। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে এই হামবড়া কর্তারা তাতেও এবার পরিবর্তন আনতে গেছেন। এরা যে স্টাইল ফলো করতে গেছেন তা হল ঠিক সরকার ফেলানো না বরং সরকার রেখেই অর উপর চাপ দিয়ে আমেরিকার পছন্দমত কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা। অনেকটা এই কর্তারা যেন বলতে চান যে সরকার বদলে আমরা কি করব ওর চেয়ে বরং একে আমার স্বার্থের পক্ষে চুক্তি করা বা অবস্থান নিতে বাধ্য করলেই তো বেশী লাভ! আর এতে ফলাফল হয়েছে এমন যে না আমেরিকানেরা কিছু পেয়েছে না বাংলাদেশের বিরোধীদলের ভাগ্যে কিছু জুটেছে! অথচ বাইডেন প্রশাসন এই নয়া এক্সপেরিমেন্ট করতেই সবটা সময় ব্যয় করে ফেলেছে – যার আলটিমেট ফলাফল শুন্য থেকেছে!

    ওদিকে বরং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশের। এখনকার অবস্থা হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের (মানে সরকার ও বিরোধী সব দলের) কথা বলছি – সকলেই প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; একেবারেই দিশাহীন ওল্টপাল্ট অবস্থা হয়েছে সবার।
    শব্দটা সবার বলেছি, মানে হাসিনা সরকারেরও। যদিও কেউ কেউ বা হাসিনা নিজেও এটাকে মনে করতে পারেন কথিত নির্বাচন তিনি সম্পন্ন করেছেন ও নিজেকে আবার বিজয়ী ঘোষণা করতে পেরেছেন; সুতরাং এটাই বাইডেনের উপর দিয়ে তার ক্রেডিট!  বিশাল বিজয় হয়েছে। কিন্তু – তাই কী?
    না,  তা একেবারেই নয়। কেন? ৭ জানুয়ারি নির্বাচন শেষ হয়েছে এখন থেকে কম করে হলেও সাতদিন আগে। কিন্তু খেয়াল করেন পুরা আওয়ামী লীগের কথাও না ধরে যদি ৩০০ এমপির (২২৩ জন খোদ লীগের নিজের আর বাকিরা ব-কলমে তো লীগেরই নয়ত লীগের অনুগ্রহপ্রাপ্ত) কথাই ধরে কথা বলি এই এমপিরা কেউ জানে না যে এখন কী? কী বলতে হবে? মানে তারা কী অর্জন করেছে বলে এখন বলতে হবে তারা কেউ জানে না! মুল কারণ, এনিয়ে হাসিনার কোন নির্দেশ আসে নাই।
    যদিও এটা ঠিক এবারের কথিত নির্বাচিতেরা সকলেই এই নির্বাচনের পরে কঠোরভাবে হাসিনার হাতের মুঠোতে সংহত বা কেন্দ্রীভুত! কিন্তু সবাই কাঠের পুতুল হয়ে আছে! কে কে জিতবে সেটা নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরে কাকে কাকে ও কেমন মন্ত্রী করে নেয়া হবে বা কে কে বাদ পড়বে বা কেন ইত্যাদি সবই এককভাবে হাসিনার মুঠোয়! তাঁর বাইরের কেউই জানেন না ঠিক কোন লজিক বা বিবেচনায় কে বাদ পড়ছেন বা উপরে উঠছেন! অথচ সকলেই তটস্ত যে না জানি কি করার কারণে এমপি হতে বা পরে মন্ত্রী হতে বাদ পড়ে যাবেন বা গৃহিত হবেন! এমনকি নৌকা মার্কা পেলেও বাদ পড়তে পারেন!  পরে এখন তিনি যাবেন কোনদিকে কোথায় সেটাও কেবল হাসিনাই জানেন! আমাদের এই বক্তব্যগুলোর ভিত্তি গত সপ্তাহ-দশদিন ধরে বাংলাদেশের টিভিতে প্রকাশিত রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ছবি ও বর্ণনা নিয়ে রিপোর্ট সেগুলো!  নির্বাচনের পরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা যেকোন মন্ত্রী – ধরেন জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক; টিভিতে তার চোখের ভাষা দেখে মনে হয় সেখানে যেন লেখা আছে যে তিনি কিভাবে জিতলেন, কেন জিতলেন এমনকি প্রতিমন্ত্রী পদটাও টিকে গেল কেমনে – তিনি জানেন না। সেজন্য কেবল শুকরিয়া আদায় – এটাই কেবল তার নিজের করা বাকি সবই তাঁর!! অথচ এলাকা হিসাবে পলকের পড়শি সদ্য প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার তার কেন এমন হল তা কেউ জানে না!  কেবল এটা সেটা কিছু অনিশ্চিত অনুমান করতে পারেন মাত্র!

    তাতপর্যপুর্ণ ১১ জানুয়ারিঃ
    কেন তাতপর্যপুর্ণ বলছি? নির্বাচনের তারিখ ছিল ৭ জানুয়ারি। এর ফলাফল কি ঘোষণা দিবে তা আন্দাজ থাকলেও এই তিনশ আসনের ফল সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকাশ করতে ৮ জানুয়ারি দুপুর গড়িয়ে যায়।  আর এরপরের ৯-১১ জানুয়ারি এই তিনদিনে সরকার যেসব মেজর কাজ দ্রুততার সাথে হাসিনার লোকেরা শেষ করেছেন তা হল বিজয়ী তালিকা গেজেট করা মানে, নয়া সংসদ সদস্যদের তালিকা আনুষ্ঠানিক করে বানানো এরপর তাদের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করা আর এরচেয়েও আরেক কঠিন কাজ মন্ত্রী বাছাই করা। মানে নেয়া বা বাদ দেয়া। বলা হয়েছে “সর্বশেষ গত (১১তম সংসদে) মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৮ জন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন ২৫ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রী।  এদের মধ্যে ৩০ জনকেই বাদ দেয়া হয়েছে ” । মানে এক বিশাল ঢেলে সাজানো আর তাতে পুরান মন্ত্রীদের দুই-তৃতীয়াংশ  বাদের খাতায় চলে গেছেন। আর এমন বাদ দিবার পরে শেষে নতুন মন্ত্রীসভা হয়েছে ৩৭ জনের। আর তাদের মন্ত্রণালয় নয়া বন্টনো সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে বোধহয় সবচেয়ে কম সময়ে ঘটা এমন ঘটনা। মাত্র তিনদিনে এটা সম্পন্ন।
    তাই বলা যায় ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যারাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ; এটা তাতপর্যপুর্ণ। কিন্তু তর্ক এখান থেকেই! যে এত তাড়াতাড়ির পিছনের কারণ কি?

    একদিকে সরকারবিরোধীরা এর সমালোচনা করে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে চেয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে বা নিজ মনোমত ব্যাখ্যা খাড়া করেছে যে সরকার ভীত সেকারণেই এই তাড়াহুড়ো করে নয়া মন্ত্রীসভা গঠন শেষ করেছে। রাজনীতিতে ঠেস মেরে বা খোটা দিয়ে সরকার আর বিরোধীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলা খুবই কমন জিনিষ, যা আমাদের মত প্রায় সবদেশেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধীদলের অযোগ্যতাটা অন্য খানে!

    হাসিনা এর পালটা জবাব দিয়েছেন যার সারকথা হল, আমাদের মুরোদ আছে তাই করেছি। বলেছেন, “আরে তাড়াতাড়ি, আমাদের তো সব তৈরি আছে। করব না কেন? আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হই না। জানি নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জিতলে কী করব, হারলে কী করব—এগুলো সব আগে থেকেই তৈরি করা থাকবেই। তাই আমাদের সময় লাগবে কেন? সময় নষ্ট করব কেন? আমাদের একটা দিনেরও মূল্য আছে। উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে।’” – এইসব কথা।
    আসলে বিরোধীদের লক্ষ্য ছিল কথিত নির্বাচনে হাসিনা দলকে বিজয়ী বলে পেশ করাতে নিজ কর্মি-সমর্থকদের ভাঙ্গা মনোবল চাঙ্গা করা। ভাঙ্গা কারণ তারা  নির্বাচন ঠেকায় দিতে বা হাসিনারে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অর্থে বিরোধীদের পরাজয় হয়েছে এটা তো দিনের আলোর মত পরিস্কার, তা অস্বীকারের জো নাই। তবু তারা চেষ্টা করেছে এটা বুঝাতে যে এখনও যেন হাসিনা সরকারকে চাপ দিয়ে আমেরিকা অনেক কিছুই বাধ্য করতে পারে! আর এর প্রমাণ হল, হাসিনা সরকার গঠনে তাড়াহুড়ো করছে। কিন্তু আসলে কি এটা সত্যি? কতটা সত্যি?

    নয়া সরকার গঠনে হাসিনা তাড়াহুড়ো করেছে সত্য। কিন্তু কেন, এটাই প্রশ্নঃ
    কথা সত্য দেখলাম আমরা হাসিনা তিনদিনের মধ্যে সরকার গঠনের সব করেছে এমনকি দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি শেষে ১৫ তারিখ সকালেই প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠক করে ফেলেছেন। কিন্তু এত তাড়া কেন?
    কানখাড়া করে আমাদের শুনা ও বুঝা উচিত এটা কোনই আমেরিকান চাপ নয়।  বরং বাস্তবত আমেরিকা এধরণের সব চাপ দেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে বা নিজেই নাই করে ফেলেছে। এটা হল কঠিন সত্যিটা। কিন্তু বিরোধীরা এটা নিজেরা বিশ্বাস করতে বা মানতে পারছে না। বা চাচ্ছে না – ব্যাপক হতাশা আসবে বলে। কেন? মানে কেন এমন হল?

    আসলে এটা মুখে মাটি ঢুকে যাওয়ার মত অবস্থা! মাটি আমাদের খাদ্য না। তাই মুখে কোন কারণে মাটি পড়লে থু থু করে ফেলা আর বারবার মুখ ধুয়ে পরিশুদ্ধ, মন কে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। বিরোধীদের সেই মাটি খাওয়া দশাটাই হল, তাদের আত্মত্যাগ, শতকষ্টের শেষ দুবছরের আন্দোলনে প্রায় শতভাগ তারা আমেরিকা-নির্ভর করে সাজানো কৌশলের মধ্যে থেকে আগাতে চেয়েছে।  এই একপেশে পশ্চিমা অতিনির্ভরতাই তাদের খেয়ে ফেলেছে, সব শ্রম-ঘাম পানি করে দিয়েছে। তাই তারা এখন বিশ্বাস করতে চায় নাই আমেরিকা ফেল করতে পারে অথবা বাইডেনের আমেরিকারই চরম অযোগ্যতাও আছে।

    আর সবার আগে, বাংলাদেশের বিরোধীরা এদিকটা যেন বুঝতেই চায় নাই যে বাইডেনের আমেরিকারই কিছু গভীর নিজস্ব স্বার্থ আছে সেটাই বাইডেনের প্রায়োরিটি বা প্রথম বিবেচনাই শুধু নয়; সরাসরি বললে সেই স্বার্থই বাইডেনের কাছে তার সব ততপরতার একমাত্র নির্ধারক উপাদান। মানে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা ও নির্ভরতার কথা আছে মানেই এটা নয় যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বাইডেনের কাজকর্মের চালিকাশক্তি বা ড্রাইভিং ফোর্স। অথচ আমাদের বিরোধীরা সেটাই বিশ্বাস করেছে!
    অথচ আমরা কি ভুলতে পারি হাসিনার এই দানব ক্ষমতাটা আমেরিকারই তৈরি। জঙ্গীবাদ দমনের নামে হাসিনা যে তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদেরকেও নির্মুল করে ফেলতেছে, বাংলাদেশ একটা গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতেছে ইত্যাদি – সেটা কি আমেরিকাসহ পশ্চিমারা দেখে নাই? জানে না?  বরং তারা সেসব দেখেও এরাই হাসিনাকেই পিঠচাপড়ে বাহবা দিয়ে যেতে আমরা দেখেছি। এর পিছনের কারণ একটাই পশ্চিমাদের চীন ঠেকানোর স্বার্থ – এটাই সুপ্রীম। আর একাজের ভেট-উপহার হিসাবে তারা বাংলাদেশকে অবলীলায় ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। আমেরিকার স্বার্থ এতই নির্মম ও নিষ্ঠুর একচোখা আত্মস্বার্থকামী! যার কাছে তার আপন-স্বার্থই সব! এটা তো আমেরিকা সব সময়ই!

    কিন্তু অবজেকটিভিটি বা প্রকৃতির মার-প্রতিশোধ বলে কথা আছে যা কেউ এড়াতে পারে না। আর সেটাই ঘটে চলেছে বারবার। যেমন ২০০৭ সাল থেকে যখন এটা আমেরিকার কাছেই সত্য প্রমাণিত যে আফগানিস্তানে তার পা আটকে গেছে। আর এতে আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিতে যে পিছিয়ে পড়া শুরু এটাই চীনের কাছে ‘পড়ে পাওয়া সুবিধা’ হয়ে হাজির হবে ও হয়েছেও। সেই থেকে আমেরিকা যেটাতে হাত দিয়েছে সব ক্ষেত্রেই হারতেই আছে! এখন এতে বিদেশিদের কি বিপদ হল তা ছেড়ে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে আসি!

    হাসিনাবিরোধী সকলের শর্টকামিং বা প্রধান খামতিঃ 
    মূল বিষয়টা ক্ষমতা ধারণা। রাষ্ট্র-ক্ষমতা কি একে বুঝতে পারা। এবারের আন্দোলনে বিরোধীদলের শ্রম-ঘাম পরিশ্রম ব্যয় সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ!  তবু তাদের পদক্ষেপ দেখে কখনই মনে হয় নাই যে তারা ক্ষমতা ধারণাটা বুঝে। এই সোজাকথাটা হল, বলপ্রয়োগ। হাসিনা বলপ্রয়োগে সক্ষম ও সফল। যেই সক্ষমতাটা ব্যবহার করেই সে ক্ষমতায় আছে আর বারবার নিজেকে নির্বাচিত বলে দাবি করছে। তাহলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত কেউ করতে চাইলে তাকেও পালটা সেও বলপ্রয়োগের যোগ্য আর সেটা আরো শক্তিশালী ক্ষমতা এটাই প্রমাণ করতে হত। মানে সেভাবে হাজির হতে হত। এটাি বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর লড়াইয়ের মূল কথা। এর বাইরে বাকি সবই এর ঝালর-সাজসজ্জা (ডেকোরেটিভ ও প্রেজেন্টেশন এর অংশ)।  অন্যভাষায় এটাকেই আমি প্রায়শই বলি মুরোদ। মানে পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ। আপনার এই মুরোদ আছে তো আপনি রাজনীতিতে আছেন। মুরোদ নাই তো রাজনীতিতে আপনি কেউ না হয়ে থাকবেন।

    তাহলে নির্বাচন কি? এর কি কোন ভুমিকাই নাই?
    অবশ্যই আছে। আর সেটা হল, যাদের যাদের পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আছে এমন দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতার নিয়ম সেটা। কিন্তু সাবধান; এখানে লক্ষ্য করবেন প্রমাণিত পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আপনার আছে আপনিও সক্ষম – এভাবে সাথে আপনারও থাকলেই এরপর আপনি ঐ সমঝোতা নিয়মের সদস্য বিবেচিত হবেন, নইলে নয়। আর কি সেই সমঝোতা? সেটা হল, যাদের যাদের মুরোদ আছে কেবল তাদের মধ্যেই যে সবচেয়ে বেশী জনসমর্থন বা ভোট-কনষ্টিটুয়েন্সি আছে সেই সেবার ক্ষমতায় যাবে।
    তবে সাবধান, আপনি ক্ষমতায় গেলেও অন্য আর যারা  পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ ওয়ালা সদস্য তাদেরও কিছু কমন স্বার্থ ও সুবিধা আপনি তাদেরকেও দিতে বাধ্য থাকবেন। যেমন আপনি ক্ষমতায় আছেন বলে আমার গণ-সমাবেশ আপনি গ্রেনেড (এটা মিলিটারি গ্রেড আর্মস যা পুলিশের হাতে রাখা হয় না) হামলা করতে বা ভেঙ্গে দিতে পারবেন না। আমি রাস্তায় সমাবেশ করে আমার কথা বলতে পারব কিন্তু সেজন্য ক্ষমতাসীন আপনি মিছিলে আমাকে পায়ে-থাইয়ে গুলি করে আমাকে পঙ্গু করে দিতে বা সরাসরি বুকে গুলি করে আমাকে খামোশ বা বাধা দিতে পারবেন না। অথবা এরই আরেক বর্ধিত রূপ ক্ষমতাসীন আপনি আমাকে গুম-খুন-অপহরণ করে বাধা তৈরি করতে পারবেন না। এটাই সেই সমঝোতার নিয়ম। আরেক ভাষায় এটাই নাগরিক সকলের কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এমনকি এই যেটাকে মুরোদওয়ালাদের সমঝোতা  বলছি এটাই আমেরিকান কনষ্টিটিউশনের প্রথম সংশোধনী (১৭৯১)।   আর এটাকেই আমরা এর এই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ দিকটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়ে বলি “সিভিল রাজনীতি”, বা আবেগে বলি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। মানে যেটাকে কমিউনিস্টেরা বলে গণ-আন্দোলন (যেটা সশস্ত্র নয়) বা মাস-লাইন এর রাজনীতি।  আর আমরাও এথেকেই ভাব মারি যেন রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়; মানেই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ নয়।  কাম্য রাজনীতি মানে হল যেন সিভিল রাজনীতি!!! আর সেকারণেই বলেছি এই মুরোদওয়ালাদের মধ্যে সমঝোতা – এই সমঝোতা কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এই রাইট বা খেলার নিয়ম যখন ক্ষমতাসীনেরা মানবে না , অস্বীকার করবে বুঝতে হবে এই অমান্য মানেই তখন পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ এর দিকে রাজনীতিকে নিতেই হবে। আর এখানটাতেই আমাদের বিরোধী দলেরা নিজেদেরকে ব্যর্থ বলে তুলে ধরেছে। ভেবেছিল আমেরিকা একাজটা করে দিবে!

    কিন্তু এবারের দুবছরের আন্দোলনে কি হয়েছেঃ
    প্রথম অপরাধ হল, রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসতে চাইলে তা যে বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ – এই মূলসুত্র বিরোধীদলেরা মান্য করি নাই। যেন ভুলে গেছি বা থাকতে চেয়েছি।
    এর চেয়েও বড় অপরাধ হল, ধরেই নিয়েছি সব আমেরিকা করে দিবে। যেন আমাদের কাজ হল কেবল বড় সমাবেশ করে দেখিয়ে দেয়া। কিন্তু সরকার পড়বে কি করে? অনেক বড় নেতাকে বলতে শুনেছি বা জেনেছি তারা বলেছেন – সরকার কি করে পড়বে এ’দায় নাকি তাদের নয় আমেরিকার!!! সাথে এটাও বলেছেন, এভাবে আমেরিকা  তার দায় সম্পন্ন করে দিলে মানে সরকার পড়ে গেলে তারা তখন আবার নির্বাচন দিতে হবে বলে দাবি করতে থাকবে!!!!  আর এটাই শুধু অতি আমেরিকা-নির্ভরতাই নয় যেন নিজ বিবেচনা জ্ঞান-বুদ্ধি খুলে পাশে ফেলে রেখে নিজেই গাধা সেজে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া! আত্মপ্রবঞ্চনাও বোধহয় এমন ভোলেভালা হয় না! 

    এই আলোচনা থেকে এটা পরিস্কার যে এবারের দুবছরের আন্দোলনের প্রধান খামতি হল এরা জানে না বা ভুলে ছিল যে রাজনীতিতে ক্ষমতা মানে তা বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ। আর এর বাইরে কোন সত্য নাই।  সেকারণে, যেখানে দরকার ছিল আভ্যন্তরীণ যত শক্তি বা যত পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ সমাজের যাদের যাদের আছে যারা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ তাদের সকলকে সবার আগে জড়ো ও যোগাড় করা; আর পরে এর উপর দিয়ে আমেরিকান সহায়তা যত যা পাওয়া যায় তা সামিল করে পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ দেখানো এভাবে; সেখানে বাস্তব ঘটনাটা হয়ে দাড়িয়েছিল যে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ – এই অংশটাই একেবারে অনুপস্থিত। আর সাথে সব আমেরিকা করে দিবে এই মনোভাব সপ্তমে উঠানো হয়েছিল! এমনকি ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ সেটা আহবানের পিছনেও – সব আমেরিকাই করে দিবে আর আমাদেরকে অহিংস হয়ে বসে থাকলেই হবে -এ’ছিল তাদের স্পষ্ট ভাবনা! তাই এক সাউন্ড গ্রেনেডে্র শব্দে সব অক্কা পেয়েছিল!  মঞ্চে বক্তৃতারত অবস্থাতেই সব ফেলে পালানো ঘটেছে। আর এটা হঠাত নয়, এটাই আগাম সিদ্ধান্ত ছিল! যেন আমেরিকাকে বলা যে ভাইসাব আমরা কিন্তু আমাদের করণীয় পার্ট শেষ করলাম; বাকিটা দেইখেন!

    অথচ উলটা করে চিন্তা করেন। ২৮ অক্টোবরের কর্মসুচি সেদিন না থাকলেই মানে কোন কর্মসুচি না থাকলেই সেটাতে  বিরোধীদের পক্ষে পরিস্থতি থাকত! কারণ, হাসিনা অপেক্ষা করছিল কিভাবে সহিংসতা, জঙ্গিত্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী আন্দোলনকে মাঠ থেকে বিদায় করবে, সাজা দিয়ে জেলে রাখবে আর তার কারচুপির নির্বাচন আয়োজনের পথে ফাইনালি রওনা দিবে।
    আবার দেখেন ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ জানিয়ারি বা এর পরেও আমেরিকা নিশ্চুপ যাকে বলে নট নড়ন-চরণ!! তার মানে বিরোধীরা – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন – বলে যে মঞ্চ ছেড়ে ভেগেছিল  সেটা তারা করেছিল এবিষয়ে আমেরিকান মনোভাব কি – তারা এরপরে আসলেই কি কিছু করবে বা করতে পারে – এনিয়ে কিছু না জেনেই। তাহলে কিসের ভিত্তিতে কি লক্ষ্য করে ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ডাকা হয়েছিল? এটাই কি আবেগে ধরে নেয়া নয় বা ছিল না যে – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন????

    মানে, মনে করা হয়েছিল গণ-মহাসমাবেশ সফল করা মানেই বিরোধীদলের দায়দায়িত্ব করণীয় সব শেষ ওখানে। এটাই কি হাসিনার বলপ্রয়োগের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ দেখানো??? অবশ্যই না। এটাসি তো সবচেয়ে বড় ভুল! কারণ, তাদের ভাষাতেও যদি বলি তবে গণ-মহাসমাবেশ আর গণ-অভ্যুত্থান তো এক কথা নয়। বরং দুইয়ের দুরত্ব বহুদুর! এছাড়াও একালে গণ-অভ্যুত্থান এটাও সহজ যা যথেষ্ট নয়!  এটাও বহু কঠিন হয়ে গেছে, যেটা ১৯১৭ সালে পারা যেত সেটা এখন খুবই কঠিন। এখানে তা নিয়ে বিস্তারে বলার সুযোগ নাই তাই সংক্ষেপে বলব, একালে ১৯১৭ সালের রাশিয়ার মত হবু বা গণ-অভ্যুত্থানকামী দেশটা বাকি দুনিয়া থেকে আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেকটা রাষ্ট্র এখন বিপুল্ভাবে বিকশিত হয়ে পরা গ্লোবাল বাণিজ্যের কারণে এই গ্লোবাল বাণিজ্যে নানান স্বার্থের অংশ হয়ে গেছে। তাই এখন বাংলাদেশে কি হয় তাতে ওসব দেশের বিশেষ করে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি স্বার্থের দিক এখন জ্বলজ্বলে!  এমনকি ১৯৬৯ সালের আমাদের সাতদিন আয়ুর যে গণ–অভ্যুত্থান যেটা বলা হয় সেটাও ছিল অর্কেস্টেডেড বা সাজানো! তাই টিভি-তে এসে সেকালে আয়ুব খানের সারেন্ডার-বক্তৃতা ছিল যে,  আসেন গোলটেবিল করি, ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থার করি।

    তাহলে মূল পয়েন্টটা হল, সবার আগে সরকারবিরোধী এভেলেবল দেশীয় সকল শক্তি (সরকারি ইন্সটিটিউশন প্রশাসন যারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ) এমন সকল সরকারবিরোধী স্বার্থ – এমন সকলকে নিয়ে একটা বুঝাবুঝি তৈরি করা এরপরে আমেরিকার কথা আসতে পারে – এমন হতে হত। এর বদলে সবই পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ এর খবর নাই তা ভুলে কেবল এক আমেরিকা ভরসা! এমনই বোকা আর এবসার্ড কাজটাই আমরা করতে গেছিলাম!

    এখানে সাথে আর একটা সাবধান বাণীঃ বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ বিষয়টা বুঝবার সময় ভুলেও এটা ন্যায় নাকি অন্যায় – এমন বিবেচনা এর ভিতর আনবেন না। মুরোদ-ই সত্য! যো জিতা ও-হি সিকান্দার! যে নিজেকে ডিফেন্ড করতে সক্ষম তার জন্যই এই দুনিয়া! বাকি সবকিছু আসবে এরপরে। সবার আগে ক্ষমতা এরপরে আইন বা ন্যয়-অন্যায় বা অধিকার বোধ ইত্যাদি! যার সোজা মানে হল, আগে মুরোদ এর বিজয় এরপরে সেই মুরোদকে গণ-মানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট), ন্যয়-অন্যয় বোধ, অধিকার বোধের পায়ে সমর্পণ বা উতসর্গ করে দেয়া! দিতে হবে! এই হল পথ! এর কোন উল্টা-পাল্টা বা আগে-পিছে করা যাবে না!  আর মুরোদ না থাকলে না বুঝলে রাজনীতি তার জন্য নয়!

    এমবেসি পাড়ার ক্ষমতার করিডোরে কান পেতে ইনফরমাল যা জানা যায়ঃ
    কেন আমেরিকা বা ওর প্রতিনিধি পিটার হাস ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই ক্রমশ  নিশ্চুপ? প্রায় নো এক্টিভিটি? নো স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চলে গেছিলেন?
    এর অনেকগুলো ভাষ্য-ই পাওয়া যায় যার মধ্যে বেশী মুখে মুখে ফেরা ভাষ্যটা হল যে, গত দুবছরের এই শেষের দিকে এসে আমেরিকার কাছে পরিস্কার হওয়া শুরু করেছিল যে আমেরিকা যদি এরচেয়েও বেশী  স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চাপ হাসিনা সরকারের উপর প্রয়োগ করে তবে সেটা আনবেয়ারেবল বা অসহ্য হয়ে যাওয়াতে এই সরকার এখনও যেভাবে একটু ব্যলেন্স রেখেছে যে কেবল চীন নয় (যদিও একটু বেশী নির্ভরতার) তবুও পশ্চিমের সাথেও পাশাপাশি যোগাযোগ ও লেনদেন সম্পর্ক একটা রেখে চলে। কিন্তু এটাই আর তখন একেবারেই থাকবেই না। একপেশে হয়ে সরকার একেবারেই সবকিছুর জন্য চীন-মুখি হয়ে বা চীনের কোলে উঠে যাবে। পশ্চিম থেকে পুরাটাই বিচ্ছিন্ন হয়েই বিকশিত হতে থাকবে! যেটা আমেরিকার একেবারেই কাম্য নয়!
    অনেকে আবার  একটু পাকামো করে এখানে ভারতকে টেনে তাকে ক্রেডিটটা দিতে চায় যে ভারত দীর্ঘদিন থেকে এমন ঘ্যানর ঘ্যানর করলেও বাইডেন প্রশাসন এটাকে গুরুত্ব দেয় নাই। সেটাই নাকি এখন এই ডিসেম্বরে এসে পিটার হাসের আমল পেয়েছে।
    এক্ষেত্রে আমাদের পালটা বক্তব্য হবে তাহলে – এর মানে হল “কি করিলে কি হইবে” সেসব পুর্ণ হোমওয়ার্ক সবার আগে  সম্পন্ন না করেই বাইডেন প্রশাসনের এসব আজরা জেয়া বা -ডোনাল্ড ল্যু রা মাঠে নেমেছিল??? আচ্ছা এসব লোকগুলো কি ফাজলামো না সিরিয়াস কাজ করতে এসেছিল?? যারা হোমওয়ার্ক শেষ না করেই সিদ্ধান্ত নেয় কাজে নেমে আসে তাদেরকে আমরা কি বলবো???

    কাজেই দেখা যাচ্ছে এই বয়ানও সুবিধাজনক হল না। তাই আরেক বয়ানের হদিস পাওয়া যায়। সেটা হল প্রধানমন্ত্রীর সন্তানকে মানি লন্ডারিং মামলায় আটকে চাপ দিলে সেটা বাইডেনের আমেরিকার জন্য অব্যর্থ অস্ত্রের মত কাজে দিবে, এটাই নাকি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু  প্রধানমন্ত্রীর এজেন্ডা-ক্রম এর ভিতরে সন্তানকে বাঁচানো  – এটাকে তিনি কোন এজেন্ডাই করেন নাই বা  রাখেন নাই। তাই আজরা জেয়াদেরও কপাল ফুটা হয়ে হাজির হয়!  মানে হাসিনার পরিকল্পনার কাছে তারা সবাই হেরে যায়!
    এটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক বরং আমরা দেখেছি হাসিনা সরকারের সবার আগেই প্রায়োরিটি ছিল যে – নির্বাচন-সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে দেখানো। একাজকেই প্রথম ধ্যান-জ্ঞান করে নেমে পড়া। কারণ, এটাই হল তাঁর সব ক্ষমতার ভিত্তি না শুরু! কথা সত্য। কিন্তু তাহলে কি এরপরে সন্তান বাচানোর ইস্যু আসবে?  না তাও নয় তিনি তা করেন নাই; আগেই বলেছি এটা এখন তাঁর এজেন্ডাতেই নাই। আর এতেই বাইডেন প্রশাসনের কুতুবেরা নাকি বোবা হয়ে যায়! মানে এই প্রশাসন হাতে -বার্গেনিংয়ের বুটি – শুন্য হয়ে সব অকেজো হয়ে যায়! আর এটাই নাকি পিটার হাসের ক্রমশ নিশ্চুপতা!!!!! এর সত্য-মিথ্যা আমরা নিশ্চিত নই। তবে সন্তান বাঁচানোকে কোন প্রায়োরিটিতে না রাখার সিদ্ধান্তই সফল ও কার্যকর!
    তাহলে হাসিনার এরপরের বা সেকেন্ড প্রায়োরিটি কি?

    হাসিনার দুঃচিন্তা কি নিয়েঃ
    বলার পেক্ষা রাখে না হাসিনা নিজের এই সেকেন্ড প্রায়োরিটি সফল হবে কিনা এনিয়ে চিন্তিত। যদিও কোনভাবেই সেটা বাইডেন আবার নয়া সরকারের ক্ষমতার উপর চাপ দিতে পারে – এটা তা নয়! এটা আন্দাজে ঢিল ছোড়া আর যার মূল লক্ষ্য হতাশ কর্মীদের মনোবল খাড়া করা। এই অ্আন্দাজি কাজ এটা আত্মঘাতিমূলক! যেখানে বিরোধীদের সকলের কাজ এখন নিজেদেরকেই সঠিকভাবে মুল্যায়ন, কি কি ভুল হয়েছে এটা খুজে দেখে স্বীকার ও কারেকশন করে নেয়া সেখানে চাতুরি উলটা নেগেটিভ ভুমিকায় হাজির হবেই!
    তাহলে হাসিনার সেকেন্ড প্রায়োরিটি বা দুঃশ্চন্তা কি নিয়ে?

    এই পিটার হাস বা বাইডেন প্রশাসন স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা এটা এখন ক্রমশই অকেজো দুর্বল হয়ে যাবে। সেকথায় আরেকটু বিস্তারে আসব।
    এর আগে, নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে সক্ষম হলেও এই ২০২৪ সালেই হাসিনার জন্য অন্তত দুইটা বিপদ বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিপদের ইস্যু হল দেশের অর্থনীতির বেহাল – এই হাল! এটাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তার সামনে। পড়িমরি অবস্থা! এটা তিনি জানতেন তাই অনেক আগেই বলেছিলেন আমেরিকা নাকি দেশে দুর্ভিক্ষ আনবে।

    গত ৯ ডিসেম্বর কালের কন্ঠের এই শিরোনাম ছিল মার্চের দিকে দুর্ভিক্ষ ঘটাতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে – গোপাল্গঞ্জে শেখ হাসিনা। কিন্তু কেন বলেছিলেন অথবা এর ঘটনা পরম্পরা কি?
    এর একেবারে প্রথমে বা শীর্ষে আছে আপাদমস্তকে চোর একটা শ্রেণী। এটা ঠিক ধনী-গরীবের ধনি শ্রেণী বলতে যা বুঝাই ঠিক তা নয় যে যেকোন সরকারের বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ থাকে যে সরকার ধনীদের পক্ষে কাজ করে গরীরসহ বাকি দেশের সকলকে ডুবিয়েছেন। বরং এরা হোল চোর-লুটেরা আর হাসিনাকে এমন চোরদের উপর ভরসা করেই নিজ ক্ষমতা-শ্রেণী সাজাতে হয়েছিল। হাসিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা খামতির দিক হল তাঁর অবস্থান ঠিক রাজনীতি না, প্রতিহিংসা! বাবার হত্যার প্রতিশোধ! তাই আকন্ঠ নিমজ্জিত চুরির সুবিধা খাওয়া একটা শ্রেণী যারা জিন্দাবাদ দিয়ে হাসিনার চোখবুজা সমর্থক সেজেছে। হাসিনা তাদের আনুগিত্য কিনেছে। অথচ প্রশাসনের ভুল পরামর্শে হাসিনা যখন তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়েছিল এই আকন্ঠ লুটেরারা সবার আগে সকলে মিলে মানে তারা প্রায় সকলেই ব্যাংক ঋণএর ডিফল্টার তারা কব্জায় থাকা সকল টাকা একসাথে ডলারে কনভার্ট করে দেশ ছাড়তে ততপর হয়েছিল। এতে সৃষ্ট যে ডলারের চাহিদা এটা একেবারেই কৃতিম, স্বাভাবিক অর্থনীতিতে যে ডলার লাগে সেই চাহিদা নয়। আর আমাদের অর্থনীতি এই সীমাহীন যোগান দিতেও সক্ষম ঠ্যাকার কোন কারণ নাই। এই ভারসাম্যহীনতাকেই এই এলোমেলো দশা আমরা বলছি দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। অর্থাৎ হাসিনা নিজেই যে অর্থনৈতিক শ্রেণীর উপর ভর করে তার প্রতিহিংসা বা বাবার নাম প্রতিষ্ঠার কাজ হাতে নিতে চেয়েছিলেন সেটাই তার আসল শত্রু!
    তাহলে এখন হাসিনার চ্যালেঞ্জটা কি? তিনি চিন্তিত কেন?
    সোজা কথায় দুইটা কাজ তাকে করতেই হবে বা অর্জন করতেই হবে। এক নগদ (ক্যাশ) ডলার ঋণ যা কমপক্ষে দশ বিলিয়নের আশেপাশে। যদিও তাঁর আসল প্রায়োরিটি অর্থে প্রধান বিষয় হল, আইএমএফ এর কাছ থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে একটা পজিটিভ বা ভাল রিপোর্ট। মনে রাখতে হবে বিদেশী পুঁজি বাজারের কাছে কোন দেশের অর্থনৈতিক হাল মানে এর সম্ভাবনা-সংশয় নিয়ে (সেই ১৯৪৫ সালে প্রথম আইএমএফ এর জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত) আইএমএফ এর দেয়া রিপোর্ট বাজারের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, আন-বায়াসড রিপোর্ট বলেই মনে করা হয়। যদিও অনেকে ভুল্ভাবে মনে করে থাকেন এমন রিপোর্ট না, যেন আইএমএফ এর কাছ থেকে পাওয়া ঋণই আসল বিষয়। অবুঝ কমিউনিস্টেরা এই বোকা বুঝ তৈরি করেছে। দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে আইএমএফ এর রিমেডি বা প্রতিকার বাতলে দেয়। আর এটাকেই কমিউনিস্টেরা হুদাই শর্ত দিল কেন বলে অবুঝ হৈচৈ শুরু করে থাকে। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কোন দেশের এমন অরররথনৈতিক দুর্দশায় যদি আইএমএফ এর হিসাবে প্রতিকার-বুদ্ধিতে ২০ বিলিয়ন ডলার দরকার হয় তবে আইএমএফ নিজে ছয় বিলিয়নের বেশী দেয় না। অর্থাৎ আইএমএফ এর লোন দেয়াটা মুখ্য না ওর রেকমেন্দেড করণীয় পরামর্শটাই মুখ্য। এটা ২০১৮ সালে পাকিস্তানের ইমরানের ক্ষেত্রে কি হয়েছিল সেই উদাহড়ণ মাথায় রেখে বলছি। চীন পুরা ২০ বিলিয়ন একাই দিতে চেয়েছিল, ইমরান নেন নাই। আইএমএফ ৬, চীন ৬ আর বাকিটা সৌদি (তেল শোধনাগার প্লান্ট) থেকে এভাবে নিয়েছিলেন। কারণ বাজার এসব পরিস্থিতিতে একমাত্র প্রফেশনাল বিশ্বাসযোগ্য আইএমএফ পাকিস্তানের অর্থনীতির অলিগলিতে ঢুকে সব দুর্বলার কথা জেনেছে কিনা।
    অদিকে এখন বলাই বাহুল্য আইএমএফ এর এক নম্বর শর্ত হবে চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণ উদ্ধার করে নিয়ে আসো।  ডলারের দুধরণের বা নানান রেট বন্ধ কর। সরকারী-ব্বসরকারির মধ্যে একদুই টাকার ফারাক এমন স্থিতিশীল ডলারের মূল্য-হার ফিরিয়ে আনতেই হবে। এটাই মূল জিনিষ। অতেব নগদ ডলারের ঋণ যোগাড় আর তা নিয়ে এরপর আইএমএফ এর প্রতিকার-পরামর্শ পালন শেষ করে আইএমএফ এর কাছ থেকে ভাল অর্থনৈতিক অবস্থার একটা সার্টিফিকেট যোগাড় – এই হল হাসিনার দুই মাথা ব্যাথার নাম!
    দুটাই কঠিন কাজ!

    চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণের অর্ধেক্টাও কি উদ্ধার করতে পারবেন?  মনে রাখতে হবে এরাই কিন্তু হাসিনার সমর্থক ও পোষ্য শ্রেণী; মানে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে নামার মত কাজ এটা! কাজেই ………!!!

    দুই বা দ্বিতীয়টা হল চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার ঋণ আনা! কিন্তু চীন কি হাসিনার উপর আস্থা রাখবে? হাসিনা বিনিময়ে চীনকে সবকিছু দিতে রাজী থাকলেও চীন আপত্তি করতে পারে এই বলে যে তুমি তো বারবার কথা দিয়েও ভারত-প্রেমি! তাই আস্থা নাই!

    এখানে আমরা একটা কথা মনে রাখতে পারি যে এবারই প্রথম হাসিনা আমেরিকার চাপ সামলানোর জন্য ভারত-নির্ভর নয়। যেটা অন্তত ২০১২ সাল থেকেই হাসিনার ভারত-নির্ভরতার মূল কারণ! যেটা এবারই ভারতের আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ করেছে আর হাসিনা এর বিনিময়েই ক্ষমতায় তা নয়। কাজেই এবার ভারতের স্বার্থ নিয়ে পরে দেখব মনে করার সুযোগ হাসিনার আছে।  আর সেই লিভারেজ ব্যবহার করে সে চীনকে সন্তুষ্ট করতে লেগে পড়তে পারে! চাইকি এজন্য এবার যদি হাসিনাকেই এক নম্বর ভারত-বিরোধী ভুমিকায় দেখা যায় তাতে অবাক হবার কিছু নাই! যদিও কি হয় কি দাড়ায় সেটা আমাদের বাস্তবে দেখে বুঝতে হবে।

    আর এসব কিছুর শেষ কথাটা কীঃ
    শেষ কথাটা হলো – দেশের অর্থনীতির বেহাল দশা, নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফিতিতে গরীব মানুষ ক্রয়ক্ষমতা না হারিয়ে ফেলে; খাদ্য ক্রয় করা টিকে থাকার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলার আসল নাম হল দুর্ভিক্ষ – এটা যে আমরা না ভুলি! বিরোধীদলেগুলো যত দ্রুত ঐ আমেরিকা আসতেছে – এই মিথ্যা ত্যাগ করে বাস্তবে ফিরে আসে এটা প্রথম কাজ্জ। এরপর হাসিনার চ্যাক্ষমতার চ্যালেঞ্জ বা দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থাটার গুরুত্ব বুঝতে পারে আর তা থেকে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে এবং তা ইতিবাচকভাবে এটাই হতে পারে তাদের বেরিয়ে আসার পথ! 

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    গৌতম দাস
    https://wp.me/p1sCvy-5i1

    খুবই তাতপর্যপুর্ণ হিন্দুস্তান টাইমসের এই কার্টুন যা ছাপা হয়েছে এক রিপোর্টের সাথে। সারকথায় যা I WON! আর  BANGLADESH LOST! মানে হল  ইন্ডিয়ান অন্তত এই মিডিয়া আর হাসিনার সাথে নাই! 

     

     

    আমি বিরক্ত! যারপরনাই বিরক্ত! আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে? তাহলে?
    [যারা মনে করেন – “আমেরিকা পালাবে? আমার বিশ্বাস হয় না!” – আমি তাদের ধারণাকে সম্মান জানাচ্ছি। আর আপাতত আমরা দেখি ঘটনা কোন দিকে যায়। এর আগে পাশাপাশি থাকতে আমি অসুবিধার কিছু দেখছি না।]

    হাসিনা তো এই প্রথম নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করল না, এসব তো সে আগেও করেছে ফলে সেদিক থেকে নতুন কিছু না, সেসব। ফলে আমাদের অজানা নয়!

    কিন্তু বিরোধীরা মানে, যেমন ধরেন সুনির্দিষ্ট করে ফেসবুক-ভিত্তিক কিছু সরকারবিরোধীদের কথাই যদি ধরি – এদের মধ্যে কিছু লোক যারা বাস্তবতা ফেস করতে পারছেন না।  আচ্ছা বলেন ত – আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে এটা কী আমরা জানি না!  দেখি নাই কখনো? তাই কী এখন  অনেকে বুঝতে পারছে না যে কী হইতেছে! আমাদের উচিত হবে আমেরিকা পলাইতে নিলে এর আগে (২০১৮ নির্বাচনের পরে) আমরা কী দেখেছিলাম সেই স্মৃতি হাতড়ানো! সব খুঁজে বের করা।

    এমনিতে যারা সহজে ভাবতে পারছেন না, সমস্যা তাদের একটা না অনেক। এই সমস্যা মনোগঠনগত! যেমন বাস্তব কী, রিয়েল [real]  কি – এটা তাদের কাছে অস্পষ্ট। মনে করেন বুঝেছেন কিন্তু আসলে না। আইডিয়েল কেই তারা রিয়েল মনে করেন তাই এরা কনফিউজড বা বিভ্রান্ত, আইডিয়াল [ideal] এর সাথে রিয়েলের ফারাক করে বুঝতে হবে।  আইডিয়েল মানে যা হওয়া উচিত জ্ঞান করে ব্যাপারটা জেনেছিলেন বা শিখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নাই। কারণ বাস্তবে যা হয় ওটাই তো সত্যি, বাস্তব অর্থে সত্য [reality]!
    অথচ আমাদের সরকারবিরোধী সমর্থকেরা এদের অনেকে হল এমন, যা তারা দেখতে চায় না যেন সেটা বাস্তবে ঘটতে পারবে না বা ঘটেই নাই; ঘটবে না – এমন মনে করা ব্যক্তি বা চিন্তা করে এমন ব্যক্তিত্ব!
    এটাকেই অনেকে পুষ্ট না-হওয়া মানসিক বিকাশ বলবেন হয়ত তা বলুক!  তবে  এদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা দেখা যায় যখন সাময়িক পরাজয় আসে! আর তাতে এরা আরো বাস্তবতা বিমুখ হতে শুরু করে। আর এতে সাধারণত সবচেয়ে ক্ষতিটা হয়, এরা আবার দ্রুত উঠে দাড়াতে পারে না!

    ভগ্নদুত কীঃ
    পুরানা বা সংস্কৃত ঘেষা বাংলায় একতা শব্দ আছে ‘ভগ্নদুত’ বলে। আগেরকার রাজাদের দিনে, যেখানে কোন যুদ্ধ চলতে তা থেকে রাজধানী বা রাজার আবাসস্থল অনেক দুরেই হত। এখন সেসব যুদ্ধের খবরাখবর দেয়া-নেয়ার জন্য বিশেষ দক্ষ বিশ্বস্ত রাজদুত ছিল। তাদের মাধ্যম্বের রাজা যুদ্ধের খবরাখবর নিতেন। এখন কোন যুদ্ধে রাজার পক্ষ যদি পরাজিত হত তো সেই খবরও তো রাজার কাছে পৌছাতে হত, কেবল সাফল্যের খবরগুলোই রাজার কাছে পাঠাত তা তো না! কিন্তু সমস্যা বাধত তখনই!
    দুনিয়াতে মাথাগরম গাধার মত বোকা রাজার সংখ্যাও তো কম ছিল না। তো তেমনই রাজারা অনেকে যে কান্ডটা করে বসত তা হল, রাজার পক্ষের পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনতে যে রাজদুত, রাজা পরাজয়ের বার্তা শুনে তাকেই খুন করে ফেলত। যেন বিরাট বিরত্ব দেখিয়েছেন ভাবত। আর এতে মানে দাড়াতো যেন দুত নেহায়ত খবরটাই ক্যারিয়ার বা বাহক নন। ঐ বাহক-ই যেন রাজাকে যুদ্ধে হারিয়েছেন! মানে হল, পরাজয়ের বার্তা যে বয়ে আনছেন আর রাজা যুদ্ধে হেরেছেন যে কারণে এদুটা যে একই জিনিষ না তা এসব গাধার বুদ্ধির রাজারা বুঝতে চাইত না। আর কিছু চামচা পারিষদ এতে তাল দিত যে দেখেছো তাদের রাজা কত সেনসেটিভ এই বলে তেল মারত।
    তো বাংলাদেশে এখন হয়েছে তাই। যারা বিরোধীদের খবর স্বীকার করে কথা বলছে তাদেরকেই দায়ী করা লোকের সংখ্যা বাড়ছেই। ভগ্ন দুত-কে হত্যা করাটাই এখন বীরত্ব! আশা করি এখন এমন বীরত্ব তারা ত্যাগ করবেন!

     

    আচ্ছা, আমেরিকা হেরে গেলে পরে, কী করে থাকেঃ
    প্রথম কথা হল, আমেরিকা হেরে গেলে কী করে? মানে পলায় কেমনে?
    তা আমরা কী আগে দেখি  নাই? মানে বলতে চাচ্ছি, এই ২০২৪ সালের আগে দেখি নাই?

    যেমন ধরেম ২০১৮ সালের নির্বাচনে, যখন বিএনপিকে সাত আসন পাইতে দেওয়া হয়; বিশেষ করে সে নির্বাচনের পরে কী হয়েছিল?
    সাহস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন তো দেখি, কার আশ্বাসে বিরোধীরা সেবার নির্বাচনে গেছিল? সেবার হঠাত বিরোধীরা “নির্বাচনে যাবার কৌশল” – এপথ নেয় নাই নিশ্চয়!
    আমেরিকার কোন আশ্বাস ছাড়া তো সেটা হয় নাই! যেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যাই হোক! এখন হতেই পারে সে আশ্বাসের বাহক ছিল কামাল হোসেন! অথবা বিরোধীদলগুলো নিজেই যে যার মত বাড়তিভাবে আমেরিকান কর্তা বা দুতাবাসের সাথে কথা বলে নিয়েছিল! মিনিমাম এতটুকু না হলে তো সেবার নির্বাচন কৌশল ওমন হয় নাই! তা বলাই বাহুল্য!

    তাহলে এখন আসেন। ঐ নির্বাচনের দিন সকালে উঠে যখন সকলে জানতে পারল যে ভোট আগের রাতে হয়ে গেছে – এমনকি জেনেছি তখনকার আমেরিকান রাষ্ট্রদুত রবার্ট মিলার [Earl R. Miller]তিনিও এর বাইরের নন! এখন বলেন তিনি কেন আম জনতার মত সকালে উঠে জানলেন? আগে কেন জানতে পারলেন না?
    আসলে কথার পিঠে কথা আসে। এই রবার্ট মিলার কোথা থেকে দৃশ্যপটে আসলেন? রাষ্ট্রদুত তো ছিল মার্শা বার্ণিকাট। হা, আমাদের ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক ৪২ দিন আগে আমেরিকা, বাংলাদেশে তার রাষ্ট্রদুত বদল করেছিল। বার্ণিকাটের বদলে মিলারকে এনেছিল।
    আর পাঠক এটা নিশ্চয় জানেন আমেরিকা কখন মাঝপথে তার রাষ্ট্রদুত বদল করে দেয়? সরকারের রানিং পলিসি আচমকা বদলে গেলে মানে আমেরিকা বদলালে  তারা পরিস্থিতি সামলাতে সাথে রাষ্ট্রদুতও বদলে দেয়। এমনকি এর আগেও ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ঘটক রাষ্ট্রদুত বিউটিনিস-কে ১/১১ ঘটনার ছয়মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করে বদলে দিয়েছিল আমেরিকা!  তাহলে আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে – এটা তো আমরা কিছু এক্সপেরিয়েন্স রাখি! অভ্যস্ত আমরা। তাহলে এখন বাস্তবতাকে মানতে না চাওয়া কেন?
    বরং, এখনকার প্রধান করণীয় তো বাস্তবতা বা রিয়েলিটিকে আপন করে নিয়ে আবার উঠে দাড়াতে চান যারা তারা মুল্যায়নে বসেন নয়া রাস্তা খুজেন।

    কাউকে দেবতা বানানোটা নিজেরই ভুলঃ
    এধরণের বহু বাণী আমরা জানি যে – কারো উপর এত আস্থা রেখেন না যেন সে নিজেই নিজেকে দেবতা গণ্য করতে থাকে। আমাদের এমন অসচেতনাতেই আমাদের কেউ কেউ আমেরিকাকে দেবতা গণ্য করে নিয়েছিল। আর বলাই বাহুল্য সেটা বিরাট ভুল। আর তা বুঝতে আর এই ভুল কাটাতেও তাদের বেশী সময় লাগছে বা লাগবে। এর একনম্বর ভুলটা হল, আমেরিকা হল মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক – পাহারাদার গণ্য করার পর্যায়ে নিয়ে গেছিলাম বুঝে না বুঝে কেউ কেউ।  এর বাস্তব দিকটা বুঝতেই চাই নাই। এভাবে বুঝতেই চাই নাই যে মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক আমেরিকা যে নয় তা সে নিজেও জানে। সে এসেছিল এটাকে ব্যবহার করতে, এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতিতে এটাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন; এতটুকুই। আমরা কী জানতাম না যে গত পনেরো বছর ধরে আমেরিকান সমর্থনেই জঙ্গী তাড়ানোর অজুহাতে হাসিনা সরকার দানব হয়েছে? এমনকি দুমাস আগেও ইইউ এর নেতারা (অন্তত তিনটা দেশ) তর্ক করেছে যে হাসিনা তো ভালই নাকি জঙ্গী তাড়িয়েছে! সুতরাই তাকে সরাতে চাই কেন আমরা? হাসিনা যে কিছু হলেই জঙ্গী তাড়ানোর নামে তার সব রাজনৈতিক-বিরোধীদের নির্মুল করে দিয়েছে এটা কী আমেরিকা-ইইউ জানত না, দেখে নাই?
    কাজেই আমাদের পুরা ভার ছেড়ে দিয়ে এত আস্থা রাখা কেন? এজন্যই গত দুবছরের আমাদের মাঠের ততপরতার উপর  আমেরিকা-ইইউ এর যদি নয়া কোন সমর্থন দিয়ে থাকে সেটাকে তাদের কাফফারা হিসাবে দেখা আমাদের জন্য সবচেয়ে সঠিক হত।  যদিও বড় বিরোধী দলগুলো এপথের চেয়ে বরং পুর্ণ ভক্তি দেখিয়ে “আমরা এবিষয়ে আমেরিকান অবস্থান সমর্থন করি” ধরণের বয়ান দিয়ে গেছে আমরা দেখেছি।

    তবে এমন চিন্তার ভুল বাংলাদেশে বহুদিনের। যেমন ধরেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম কিনা! এনিয়ে সবচেয়ে বেশী করে নিজের অজ্ঞতা দেখিয়ে থাকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা। আর এদেরই প্রভাবে বেশ খানিকটা গত দুবছরের মাঠের বিএনপি।
    যেমন ধরেন, জাতিসংঘকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আচ্ছা বাংলাদেশ কী সার্বভৌম? তাতে ঐ কর্তা বলবে অবশ্য অবশ্যই। চাই কী তিনি জাতিসংঘের ম্যান্ডেট খুলেও দেখায় দিতে পারেন যে জাতিসংঘের চোখে বাংলাদেশ সার্বভৌম। কিন্তু এবার যদি সেই কর্তার কাছে আবার দাবি করেন যে আমি যে আমাদের দেশের জন্য যেকোন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত  নিতে যে ক্ষমতা লাগবে সে ক্ষমতা আমারটা আমাকে বুঝায়ে দেন! তাহলে কী হবে?
    এবার সেই কর্তা বলবে আমি বিনয়ের সাথে বলছি, আসলে সার্বভৌম নিজেই হয়ে উঠতে হয়, আপনার সার্বভৌমত্ব অন্য কেউ গুনে গুনে আপনাকে আপনার সার্বভৌমত্ব বুঝিয়ে বা ফিরে দিতে পারে না! মানে নিজেই উঠে দাড়াতে হয়।

    এবারও তাই হয়েছে, আমরা বুঝেছি উল্টা। আর ওদিকে আমেরিকা চেয়েছিল আপনাদের মানবাধিকার-গণতন্ত্র ফেরত দিবার অজুহাতে এই অঞ্চলে তার কিছু এজেন্ডা ছিল ভেবেছিল তা কতটা পরিপুরণ করে নিতে পারে।  কিন্তু আপনারা সেদিকটা না খেয়াল করে যারা যারা তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে ছিলেন তাদের এখন সেখান থেকে বের হতে একটু সময় লাগবে, লাগছে হয়ত। কিন্তু বের হতেই হবে কারণ এটাই বাস্তবতা!
    আবার এখন এসব কথা তুলছি বলে ফিরে এক প্রান্ত থেকে উলটা আরেক প্রান্ত মানে চীনকে দেবতা মানতে শুরু করে দিয়েন না!

    তাহলে এখন কী হবেঃ
    এখন যা হবে তা সবই মূলত রুটিন। সারকথায় সবাই জানাবে হাসিনা খুবই খারাপ! অন্যজনও বলবে হা সে তো অবশ্যই খারাপ!
    হাসিনা আমাদের উত্তর কোরিয়া বানায়ে ছাড়বে অথবা বাংলাদেশ একদলীয় দেশ হয়ে যাবে ইত্যাদি কথা উঠবে।
    হ্যা অবশ্যই সন্দেহ নাই। কার্যত তাই হওয়া শুরুওও হয়েছে। যদিও এর কোন প্রভাব হাসিনাকে থামাবে না বা তারা থামাতে আসবেও না।

    তবে এবার কথিত যে সংসদ কায়েম হল, তাতে ৬১ জনের বেশী স্বতন্ত্র হিসাবে বিজয়ের দাবিদার। এদের মধ্যে আবার ৯৫% এর মত হবেন যারা এখনও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটির সক্রিয় সদস্য। মানি সক্রিয় আওয়ামী লীগার! তাই আগামিতে আর জাতীয় পার্টি নয়। বিরোধীদল বানাবার এবারের নয়া ফর্মুলা হবে এসব স্বতন্ত্র (আধা- মূলত আওয়ামী লীগারেরা) এরাই এবার এক সংসদে বসেই সংসদীয় বিরোধী-জোট বানায় নিবে। আর এবাই বিরোধী দলের আইনি মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা দাবি করবে। এরকমই একটা ‘বিরোধীদল’ হতে যাচ্ছে খুব সম্ভবত।  এতে হাসিনাও বাঁচবে; আর কত! বার বার এই নির্বাচন আসলেই দরাদরি  আর জাপা তারা আজকাল অনেক ডাট মারে এমনকি মাঙনা বিদ্যুতকেন্দ্র রেন্টাল বিদ্যুৎ এর মালিকানা চেয়ে বসে; সেগুলো আর কত হাসিনা সহ্য করবেন?  এছাড়া এদের জন্য হাসিনাকেও ভারতের হাত-পা ধরতে হয় যেন (জাপা) কাদেরদেরকে একটু বলে বা বকে দেয়! তাই এবারই সেসবের বালাই শেষ। এখন থেকে সবাই স্বাধীন!
    আর বাকিরা  মানে বিদেশিরা কি করবে? তারা সকলেই একটা করে বিবৃতি দিয়ে তাদের দায় শেষ করবে।

    আমেরিকান বিবৃতিঃ
    রুটিন যেভাবে বলে থাকে – মার্কিন  পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে একমত যে, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ না করায় আমরা হতাশ”। ফলে বুঝতেই পারছেন আমেরিকা এখন কী সুবিধায় আছে। মানে হল এখন উলটা দাঁড়ালো যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আমেরিকা হতাশ! কী তামসা! সাথে বিরোধীদলের প্রতি পরামর্শও রেখেছে আমেরিকা – “সব দলের প্রতি সহিংসতাকে পরিহার করারও আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন” – কিন্তু কেন এমন পরামর্শ?
    কারণ এখন আবার বিরোধীরা কোন আন্দোলন করতে গিয়ে যদি হতাহত খুনোখুনি মৃত্যু হয় তাই, আগেভাগেই আমেরিকা হাত ধুয়ে নিল যে আমেরিকা কিন্তু এতে নাই!

    আরও আছে কিছু কথার কথা, নিচে দেখেনঃ

    “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন
    লক্ষ্যে কাজ করা, বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নাগরিক সমাজের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের
    জনগণের মধ্যে ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

     এর প্রথমে আছে বাইডেনের হারু প্রোগ্রাম IPS বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যেটার বা এই ব্যর্থতার নেতা স্পেশালিস্ট  ডোনাল্ড ল্যু এর গলার এই হারু-মালা চড়ায়ে দেয়া ছাড়া এর আর কোন মূল্য নাই। বাইডেনের IPS এর ঘন্টা বেজে গেছে। এই কঠিন কথাগুলো বলছি এজন্য যে একবার তাকায় দেখেন যে এগারোটা দেশ হাসিনাকে তাঁর বিজয়ে গতকালই অভিনন্দন জানিয়েছে এই প্রথম সাত রাষ্ট্র কারা?

    শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানালেন যে ৭ দেশের রাষ্ট্রদূতেরাঃ
    লিঙ্ক এখানে
    । এই সাত দেশের মধ্যে চীন, রাশিয়া, ভুটান ও ভারত – এই চারজন হল হাসিনা বা চীনের ঘরের লোক! মানে এরা এ তো হোনাই থা ধরনের! কিন্তু বাকি তিন রাষ্ট্র ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা – এরা তো এখনকার খোদ আমেরিকার প্রত্যক্ষ স্ট্রাটেজিক প্রভাবের দেশ! যার মধ্যে আবার ফিলিপাইনো???? কি সাংঘাতিক?? কোল্ডওয়ার যুগের ফ্যাসিস্ট জেনারেল মার্কোস এর ছেলের ফিলিপাইন? মানে মার্কসের ছেলে যার বর্তমান প্রেসিডেন্ট! শুধু তাই না! এই যে একটু আগে আমরা আমেরিকান বিবৃতিতে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার খায়েস পুনঃব্যক্ত হতে দেখলাম সে খায়েসের এখনকার প্রধান রাষ্ট্রই হল এই ফিলিপাইন। ফিলিপাইনকে দিয়ে আমেরিকা নিয়মিত চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিবাদ জীবন্ত রেখে চলেছে। তাহলে সেই ফিলিপাইন হাসিনার সমর্থনের প্রায় এক নম্বরে সমর্থন জানাতে এসে পড়েছে, সেটা কি কারণে? তাহলে বাইডেনের আমেরিকা কোথায়? তারা ফিলিপাইনকে এলাও করল কেন???

    সব আউলাইনা লাগতেছে! জেনারেল মার্কোসের ছেলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বংবং মার্কোস [Bongbong Marcos] আমেরিকার বাইরে এসে এ’কোন খেলা!!!

    আবার দেখেন বৃটেন। নির্বাচনের আগের তিনমাস আমার কান ঝালাপালা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদেরকে বারবার তিনদেশের নাম শুনতে হচ্ছিল – বৃটেন (যুক্তরাষ্ট্র) ফ্রান্স ও জর্মানির। এদের কথা হল, হাসিনা নাকি ভালই জঙ্গি তাড়িয়েছে তাহলে আমরা হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি চাই কেন? ইত্যাদি। আর আজ দেখেন কী তামসা! রাত না পোহাতেই আমেরিকান বিবৃতি অনুসরণে সাথে সাথে বিবৃতি বাংলাদেশের নির্বাচন গণতান্ত্রিক হয়নি: যুক্তরাজ্য! মানে এরা সবদিকেই আছে লিপ সার্ভিস নিয়ে।
    আবার নিরুত্তর প্রশ্নো আছে। যেমন ধরেন এখন মানে আট জানুয়ারি তারা জানাচ্ছে  –নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। অথচ এই খবরটা আগে মানে নির্বাচনের জানায় নাই কেন? বাংলাদেশে স্ব স্ব দেশের এমবেশী কী করছিল? অথচ নির্বাচনের পরে বলাতে এসব ভুয়া পর্যবেক্ষক তারা যা করতে এসেছিল এর সবটাই পুরণ করে ফেলেছে। এমনকি গতকাল বিকেলের সাংবাদিক সম্মেলন করে আরো বিভ্রান্তি ছড়ানো পর্যন্ত! আমরা এজন্য কাকে দায়ী করব?

    কিছুক্ষণ আগের, নয়া ১৯ দেশের অভিনন্দনঃ
    এই সমর্থন-অভিনন্দন গুলোর অর্থ হচ্ছে যে আপনাদের দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে কিনা আমি আগ্রহী নই। কিন্তু আমি আপনারদেশের সাথে ব্যবস্থা চাই। আর এই উনিশ দেশের মধ্যে আছে, সৌদি আরব আর জাপান। জাপান মানে? হা এটা চীনবিরোধী আমেরিকান সবচেয়ে বড় স্ট্রাটেজিক মিত্র! আমরা তাই জানতাম। অন্তত ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যু বা অন্তত এশিয়ায় আমেরিকার চীন বিরোধীতার প্রশ্নে। অথচ হায় হায় তাহলে এ আমরা কী দেখছি? কেন?  আরো মেট্রো রেল বা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প!!! সব চীন পেয়ে যাবে এই ভয়ে? ভাগ পেতে?
     সৌদি নয়া তেলশোধনাগার প্রকল্প! বাকিটা পাঠক বুঝে নেন।

    আসেন এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধানঃ
    এটা নতুন না যে জাতিসংঘের বইয়ে বা দলিলে যাই থাক, জাতিসংঘ গলা চড়ায় ততটা যতটা আমেরিকা তাদের চাবকায়! গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে আছে “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান এর তো তাতে কোন খবর ছিল না। তবে গত একদেড় বছর আমেরিকা চাবকিয়েছে তাই তাদের কিছু চিৎকার শুনেছি। এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান – হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক; এটাই তার সম্ভবত শেষ চিৎকার!  যদিও জোশের ঠেলায় একটু বেশী বলে ফেলেছেন। বলেছেন, “পথ পাল্টান, সত্যিকার অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পরিবেশ তৈরি করুন”! 

    কথাগুলো শুনতে খুবই ভাল লেগেছে সন্দেহ নাই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল হাসিনাকে কী পাগলা কুত্তায় কাটছে? তিনি এসব করবেন কেন? তার ঠেকা লাগছে? তার তো কোন ঠেকা নাই!

    তাহলে কী হবে, ঠিক কী বলতে চাইঃ
    কথা খুব সহজ! যার মাথা ব্যাথ্যা তাকেই ওষুধ খুঁজে আনতে হবে। সেই মুরোদও লাগবে! মুরোদ যার ক্ষমতা তারই হবে, তার কাছে ফিরে আসতে পারে তা!!!
    এভিন্ন সবকিছুতেই রুটিন বিবৃতিই চলতে থাকবে!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৯ জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • আরব স্প্রিং – বাঘ আসছে বলে এক ভুয়া প্রপাগান্ডা

    আরব স্প্রিং – বাঘ আসছে বলে এক ভুয়া প্রপাগান্ডা
    গৌতম দাস
    ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৭

    https://wp.me/p1sCvy-5bf

     

                      Timeline: How the Arab Spring unfolded

    শেষের কথা এখন শুরুতেঃ
    আজ এখন ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ রাত পোনে বারোটা। আজ এনটিভি নিউজে দেখলাম ঢায় রাশিয়ান রাষ্ট্রদুতের একটা বক্তব্য প্রচার ও দেখানো হয়েছে। যার সারকথা হল, তিনি বলছেন রাশিয়া বাংলাদেশে বয়াসে আমেরিকার সাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা করবেন না – মোটাদাগে এই হল বয়ান। যেটা ঢাকায় ম্যানুফাকচার্ড আরব স্প্রিং সংক্রান্ত অসৎ প্রপাগান্ডা থেকে তারা সরতে চায় এমন বলে মনে হয়েছে।

    প্রিন্ট মিডিয়া থেকে এখন ভোরবেলা পাওয়া বয়ানটা হলঃ
    “বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা করছে না রাশিয়া। তবে পশ্চিমা দেশগুলো কী করেছে, আর কী করতে পারে, তা মস্কো তুলে ধরেছে”।

    কিন্তু কী করতে পারে বলে আগাম যা ঘটে নাই তা নিয়ে এই প্রপাগান্ডার দরকার কী?  সেটা আমরা বুঝতে পারি নাই। একাজটা নিজেই কী এক হস্তক্ষেপ নয়? ঢাকার রাশিয়া দুতাবাসের কী কাজের অভাব পড়েছে? বাংলাদেশের পাবলিক কী নিজস্বার্থ নিজে বুঝতে অক্ষম? disgusting! এটা রাষ্ট্রদুত-সুলভ এক্সপেক্টেড আচরণ হয় নাই!

    এমনিতেই সবচেয়ে বড় কথা মুখপাত্রের  জাখারভা কথিত বিবৃতি যেই দিয়ে থাকুক এটা সীমা ছাড়ানি। ঐ বিবৃতি লিখেছে – “গত ১২-১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সরকারবিরোধীরা রাস্তাঘাট অবরোধ করে, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়”। এই বক্তব্য একেবারে খুবই এক্তিয়ার বহির্ভুত। ফলে এটা রাশিয়ার প্রমাণিত হস্তক্ষেপ। কারণ,  রাশিয়া কিভাবে নিশ্চিত হল যে  গত ১২-১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সরকারবিরোধীরা রাস্তাঘাট অবরোধ করে, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে??? এটা রাশিয়ার কেউ কিভাবে জানল, নিশ্চিত হল? কোন জুডিশিয়াল তদন্ত কী হয়েছে? কে করেছে? তদন্তকারীদের সাথে রাশিয়ার যেকেউ এর কী সম্পর্ক? কী এক্তিয়ার???   ঢাকার রাশিয়ার দুতাবাসের আমেরিকা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেই চলেছে।

    তাহলে সেই রাশিয়ান দুতাবাসের এই লিখিত বয়ান এটা কী আমেরিকানদের হস্তক্ষেপ এর চেয়ে বড় হস্তক্ষেপ নয়? তারা তো আমাদের ঠুঠো বিচার বিভাগেরও বাপ হয়ে বসেছে যে রায় দিয়ে বলে দিচ্ছে কে আগুন দিয়েছে!!! এটা কিভাবে তারা করতে পারে??????

    মূল লেখার শুরু এখান থেকেঃ
    আরব স্প্রিং – এই বাঘ আসছে বলে প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে! বলা হচ্ছে এনিয়ে নাকি এক বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া! এনিয়ে বাংলায় রিপোর্ট করেছে সমকাল; যদিও তাদের প্রিন্ট ভার্সানে এর হদিস পাওয়া যায় নাই। তবে বাংলা বিবিসি আবার অফ চান্সে কিছু কামিয়ে নিতে নিজ মুরোদে বা বরাতে না বরং, সমকালের প্রিন্ট বা ই-পেপার ভার্সানের ঘাড়ে চড়ে একখানা রিপোর্ট ছেড়ে দিয়েছে। আবার যুগান্তর এর রিপোর্টটা এককাঠি সরেস আর সেটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। মিথ্যা বলছি কারণ যুগান্তর লিখেছে, ১৫ ডিসেম্বর এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। খবর তাসের। অথচ এই প্রপাগান্ডা খবরটা তাস (রাশিয়ান নিউজ এজেন্সী তাস বা TASS) এর সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

    আরেকটু ভেঙ্গে বলা যাক!
    এই প্রপাগান্ডা খবরের সোর্স বা উতস বানানো হয়েছে ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাসের ফেসবুক ভেরিফায়েড পেজ থেকে করা এক স্টাটাস কে। যদিও সেখানেও একটা টুইস্ট আছে। বলা হয়েছে এটা রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারভা তাঁর এক মন্তব্য থেকে নেয়া [Comment by Russian Foreign Ministry Spokesperson Maria Zakharova on the danger of destabilization of the situation in Bangladesh], কিন্তু সেই মন্তব্য কোথায় পাবলিকলি দেখা যায়, ছাপা হয়েছে এমন এর হদিস দেয়া হয় নাই। মানে পাবলিকলি কোথায় ছাপা হয় নাই, হয়ত আভ্যন্তরীণভাবে রাশিয়ান সরকারি ইন্টার-অফিস মেমো কোন হতে পারে। অথবা আসলে জাকারভা এমন কোন মন্তব্য করেনই নাই। তবে ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাসের এই ফেসবুক পেজ – এটা ভেরিফায়েড পেজ সেখানে এটা ছাপা হয়েছে– তাই এটাই কেবল ভরসা! আর আমাদের সাদা চোখে  অন্তত এটুকু বলা যায় যে – ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাস-ই সবকিছুর জনক!!

     

    এটা তাসের খবর নয়ঃ
    কিন্তু যুগান্তরের ভাষ্য অনুসারে “এটা তাসের খবর” এর প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। যদিও এটা সত্য যে মুখপাত্র মারিয়া জাকারভার তাস-কেই তার বিবৃতিগুলো সাধারণত দিয়ে থাকেন। কিন্তু কথিত এই আরব স্প্রিং- নিয়ে খররেরটা – এটা তাসের লিস্টে নাই। জাকারভা তাসকে যে বিবৃতির কপি দিয়ে থাকেন তার চলতি এমাসের লিস্ট এখানে দেয়া হল, তাস এর ওয়েব সাইট ঘেটে। তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কোন বিবৃতি নাই। কাজেই যুগান্তর এর দাবি ভিত্তিহীন!

     

    প্রসঙ্গ দুইঃ আরব স্প্রিং নিয়ে মূল ফেসবুক স্টাটাসে কী লেখা আছে
    আগেই বলেছি এই প্রপাগান্ডা খবরের একমাত্র উতস হল ঢাকার রাশিয়ান এমবেসি এর ফেসবুক পেজ।  আর সেখানে আরব স্প্রিং প্রসঙ্গে এক প্যারায় শেষ বাক্যে কয়েকটা শব্দ আছে মাত্র। তা হল,……the lines of the Arab Spring are likely.। বাংলায় বললে আমেরিকা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে, আরব স্প্রিংয়ের লাইন নিতেও পারে – এরকম।
    এর বাইরে আরব স্প্রিং সংক্রান্ত কোন ভাষ্য-বক্তব্য ঐ বিবৃতিতে নাই। এর সোজা মানে হল আরব স্প্রিং বলতে  রাশিয়ান এমবেসি আসলে অস্থিতিশীলতা মানে আমেরিকার তৈরি অস্থিতিশীলতা বুঝিয়েছে। কিন্তু আরব স্প্রিং জিনিষটা কী?  মনে করার কারণ আছে যে ঢাকার রাশিয়ান এমবেসি বা মুখপাত্র জাকারভা -প্রমুখের আরব স্প্রিং বুঝাবুঝিতে ঘাটতি আছে!

    আরব স্প্রিং জিনিষটা কীঃ
    প্রথম কথা বাংলাদেশ সরকার বহুদিন থেকেই আমেরিকান সরকারকে বাংলাদেশ আরব স্প্রিং কর্মসুচী চালাতে সহযোগিতা করে আসছে। কিভাবে সেটা?
    আর বহুদিন থেকেই মানে কবে থেকে?  আরব স্প্রিং এর জন্ম মোটামুটি ২০১১ সাল থেকে, সেসময় থেকেই। উপরে সেই টাইম্লাইন নিয়ে আল-জাজিরার একটা রিপোর্টে প্রকাশিত ছবিতে সেই লিঙ্ক দিয়েছি। বাংলাদেশের প্রধান সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা অনেক কলেজে ইয়ুথ প্রোগ্রাম বলে একটা কিছু চালু আছে । এই ইয়ুথ প্রোগ্রাম টাই আরব স্প্রিং এর থিতু ভার্সান।  এটাই আমেরিকান সরকারি দাতা প্রতিষ্ঠান USAID এর প্রধান প্রোগ্রাম বা কর্মসুচী। আর আরব স্প্রিং অবশ্যই আমেরিকার সরকারি কর্মসুচি কিন্তু এর উদ্দেশ্য কোন দেশকে ঠিক “অস্থিতিশীল করা” – এটা বেশি কথা বলা, too much। তবে অবশ্যই এটা ওয়ার অন টেরর [war on terror] এর সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ।

    কিন্তু পাঠকেরা এখন খুঁজে দেখতে পারেন দুনিয়া ১৯৩ টা দেশ (যারা সবাই জাতিসংঘের সদস্য) এদের মধ্যে কেন দেশের সরকার এতে সামিল ছিল না? বরং সবাই বুশের জমানায় (২০০১-২০০৯) বিশেষত প্রথমদিকে ওয়ার অন টেরর এরঅংশ বা সমর্থক ছিল !!! যেমন সেসময়ের পুতিনের রাশিয়া চেচেন সমস্যার কারণে, চীন উইঘুর সমস্যার কারণে (ওদিকে ভারতের কথা আর কী বলব) এতে এমন সবাই সক্রিয়ভাবে ওয়ার অন টেররে যুক্ত ছিল; মানে এভাবে কোন দেশের সরকারই বাদ ছিল না। আর সেসময়ে বাদ থাকার চেষ্টা করলে কী হত এর উদাহরণ বাংলাদেশের বিএনপি!  কারণ, সেটা ছিল বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের আমল (২০০১-৬)। এই দল ‘বুদ্ধিমান’ সাজতে গিয়ে বেশি করে ধরা খেয়েছিল, যার প্রভাবে এখনও বিএনপি ভুগে থাকে!! বিএনপি’র সরকার বুদ্ধিমান সাজতে আমেরিকার সাথে ‘এলাইনে না থেকে’ গড়িমসি করতে গেছিল, দুনিয়া বা জাতিসংঘ বুঝে নাই বলে! তাই আমেরিকান থাবড়া খেয়েছিল। আর ঠিক এটারই সুযোগ নিয়ে হাসিনা কথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তো  পরে ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় এসেছিল।

    ঘটনা হল ২০০৫ সালের মাঝামাঝিতেই এটা আমেরিকার পলিসি লেভেলে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে এই ওয়ার অন টেরর-এ বিশেষত, আফগানিস্তানে আমেরিকার পা আটকে গেছে। কোনদিন শেষ হবে না এমন এক যুদ্ধে আমেরিকা আটকে গেছে। এমনকি আবার এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করে গুটিয়ে বাড়ী ফিরে যাওয়াও সহজ না। সেটা ছিল আমেরিকার এমনই এক দশা পরিস্থিতি। অথচ এই যুদ্ধের সব শরীকদের খরচও আমেরিকাকে একা বইতে হচ্ছিল। তাই প্রথম কাজ হয়ে পড়েছিল বিকল্প কী করা যায় এনিয়ে পলিসি বদলাবার জন্য গবেষণায় নামা। একাজে যে গবেষণা ও সুপারিশটা বেশি গৃহিত হয়েছিল সেকাজটা ছিল RAND Corporation  (এক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান, ‘স্বাধীন’ থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ধরণের) এর করা গবেষণা-সুপারিশ।  [ এনিয়ে আমার পুরানা লেখায় বিস্তারিত আছে। এমনকি এনিয়ে RAND এর রিপোর্টটা তারা পাবলিকলি কপি পাবার ব্যবস্থা করেছিল সেসময়, আমার সে লেখায় এর হদিস ও রেফারেন্স আছে। আমাকে খুজে বের করতে পাঠক একটু সময় দিবেন।] লিঙ্কটা এখন পেলাম এখানে  । আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ RAND এর সেই রিপোর্ট এখানে দিলাম।

    এখন বুশের দুই টার্মের পরের ওবামা-হিলারি প্রশাসন (২০০৯-২০১৭ জানুয়ারি) ক্ষমতায় এলে তাঁরা এই  RAND এর রিপোর্টটা বাস্তবায়নের জন্য কাজে নেমে পরেছিল। ওবামার সেই নয়া পলিসিরই টোকেন নাম ছিল আরব স্প্রিং [Arab Spring]। যদিও আমেরিকান রেওয়াজ অনুসারে ওবামা প্রশাসন এনিয়ে তারর মূল পলিসিটা (RAND এর রিপোর্টটার কোনটা আর কতখানি এর বিস্তারিত দিকটা) প্রকাশ্য পাবলিক ডকুমেন্ট করা হয় না। তবে তাদের প্রশাসনের প্রকাশ্য কাজগুলো অনুসরণ করলে বা এনিয়ে কংগ্রেস-সিনেটের তৎপরতা একেবারেই প্রকাশ্যে লাইভ-টিভিতে দেখানোর যোগ্য বলে  তাদের থেকে এর অনেকটাই জানা যায়। এছাড়া, আমেরিকান এলিটদের ফরেন এফেয়ার্স ম্যাগাজিনে হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কি কী লেখা ছেপেছিলেন [তা নিয়ে দুইটা লেখা এখানে আর এখানে পাবেন]। তাথেকেও অনেকটাই জানা যায়।

    আরব স্প্রিংয়ের দুই(!) ভার্সানঃ
    কমকথায় সংক্ষেপে বললে, ওবামার এই আরব স্প্রিং [Arab Spring]  এর আবার দুটা ব্যবহারিক রূপ বা ভার্সান দেখতে পাওয়া যায়। একটা বলা যায় কাতার-কেন্দ্রিক; যার মধ্যে জড়িত ছিল ইসলামি স্কলার কারযাভী [Yusuf al-Qaradawi]। এরই আবার সবচেয়ে বড় প্রোগ্রামটাই ছিল মিসরেরটা; যেটা পরিণতিতে মিসরে মোরসি’কে ক্ষমতায় এনেছিল। যদিও রাখতে পারে নাই। আর বাংলাদেশ থেকে অনেককেই এই ভার্সানটা দেখতে-জানতে কাতারে দাওয়াত করা হয়েছিল। তার গিয়েছিলেনও। যতদুর মনে পরে হাসিনা নিজেও আমেরিকান আমন্ত্রণে তা দেখতে গেছিলেন। আবার জামায়াতের নিজামী-মুজাহিদ তখনও বেঁচে। তাদের থেকেও একটা টিম গেছিল। মূল কারণ, সেখানে মানে কাতারে কারযাভীর নেতৃত্বে আরব স্প্রিং [Arab Spring] অফিস-ট্রেনিং কর্মসুচী যেমন ছিল তেমনি খোদ আমেরিকান প্রশাসনের আরব স্প্রিং এর নিজ অফিসও কাতারে ছিল।

    আবার ওবামা-হিলারির আরব স্প্রিংয়ের নামে আরেক ভয়ঙ্কর ভার্সানও ছিল। যেমন লিবিয়ার গাদ্দাফিকে হত্যা ও উতখাত; যেটাতে পরে  বেনাগাজীতে আমেরিকান নিজ রাষ্ট্রদুতসহ স্টাফেরা খুন হয়ে যান। কারণ, সেটা ছিল বেনামে আই-এসের সাথে এলায়েন্স তবে তখনও এই গ্রুপ আই-এস নামধারণ করে নাই। আবার এই গ্রুপকেই কথিত আছে যে আমেরিকা সিরিয়ায় আসাদকে নামানোর প্রোগ্রাম দেয়া হয়েছিল।  কিন্তু ততদিনে এরা আই-এস নামধারণ করে নিয়েছে। আর তাদের স্বার্থ ও লক্ষ্য ছিল বা হয়ে যায় ইরাক ফিরে দখল। কিন্তু এবার ওবামা এই আই-এস গ্রুপকেই দমন ও খতম করতেই ইরানের সাথে এলায়েন্স করে [ যেটা P5+1 চুক্তি] ও ইরানকে দিয়েই আই-এস কে উতখাত করে এই ধারার আরব স্প্রিং-র পরিসমাপ্তি ঘটায়।
    তবে মনে রাখতে হবে এই  দ্বিতীয় ধারার আরব স্প্রিং যেটা বলা হচ্ছে এর ততপরতাগুলো RAND এর সুপারিশের মধ্যে ছিল না। তাই একাদেমিশিয়ানেরা  আই-এস এর সাথে জড়িয়ে পরা বা সশস্ত্রভাবে ইসলামের নামেই এসব বিরুদ্ধ কাজ-ততপরতাগুলোকেও আরব স্প্রিংয়ের আরেক ধারা বলতে নারাজ। কারণ তাদের যুক্তি হল, আরব স্প্রিংয়ের মৌলিক সারকথা এটা থেকে আলাদা। আর ইরাক-লিবিয়া-সিরিয়া নিয়ে যাকিছু ওবামা-হিলারি করেছেন বা কংগ্রেসে সমালোচিত হয়েছেন সেসব ছিল RAND এর সুপারিশের অবশ্যই বাইরের; তবে সেগুলো ওবামা প্রশাসন-সরকারেরই  আলাদা কাজ-প্রোগ্রাম বা স্বার্থ বটে!

    আরব স্প্রিংয়ের সারকথা কীঃ
    সারকথা হল, মুসলমান দেশ-রাষ্ট্রের বাসিন্দাদেরকে নাগরিক অধিকার এর ধারণা বা বোধ শিখানো – এভাবে সাজিয়ে নেয়া। এজন্য এখন ঢাকায় যে ইয়ুথ প্রোগ্রাম চলছে এর প্রধান দিক হল, বাংলাদেশ রিপাবলিক রাষ্ট্রের তরুণ নাগরিকদেরকে অধিকার শিখানে বা একটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টগুলো সম্পর্কে ওয়াকেবহাল করা।  বাংলাদেশের কলজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ুথ প্রোগ্রাম বলতে এটাই এখনও কার্যকর। অনেক স্টুডেন্ট কে দেখবেন ফেসবুকে পরিচয় হিসাবে নিজেই ইয়ুথ কর্মসুচীতে নিজের যোগ দেওয়ার কথা বলছেন। এর আরেক সবচেয়ে ভাল বা উপযুক্ত উদাহরণ হল মিসরের “অক্টোবর সিক্স গ্রুপ”। যেটা মিসরের মোরসির নির্বাচিত হওয়া পর্যন্তও ছিল সামাজিক সংগঠন। আর এখন যা এক রাজনৈতিক দল যারা নাগরিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চায়, এমন রাজনীতি সচেতন একটা দল।

    কেন RAND এমন সুপারিশে গেছিলঃ
    বুশের ওয়ার অন টেরর সম্পর্কে একটা মৌলিক মুল্যায়ন হল, যে তিনি সেখানে আগ্রাসী ও মুসলমান-বিদ্বেষী হয়েছিলেন; এই অর্থে যে এথনিক-ধর্মীয় মুসলমানকে তিনি  নিচা ও বৈষম্যমূলক চোখে দেখে চলেছিলেন। তাই কেউ সশস্ত্র ইসলামি রাজনৈতিক ধারার না হলেও মুসলমান মাত্রই যে কেউই বুশের বৈষম্য ও নৃশসতার শিকার হয়েছিলেন। এছাড়া সাথে ছিল আরেক কারণ যে, সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকা তখন  দুনিয়ায় একক মেরুর ঝান্ডাধারী। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতন হয়ে গেছে বলে।  ফলে বুশের আমেরিকা চাইলে যাখুশি করতে পারে – এই মিথ্যা ও বোকার উদ্ধত্য ছিল বুশের!! ঘটনাচক্রে, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকান রিপাবলিকান পার্টি নয় ক্ষমতায় নয় বরং দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্রাট ক্লিনটন। যারা রিপাবলিক বুশের চোখে বোকা অকর্ম! যারা (তখন আমেরিকা একক পরাশক্তি ফলে ) পড়ে পাওয়া সুবিধা নাকি নিতে জানে না!!!  ইত্যাদি এসবই বুশ-কে কার্যত এমন  মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ব ও বোকার উদ্ধত্য – এরই প্রেসিডেন্ট বুশ বানিয়েছিল। যেকোন বিশেষত, মুসলমান অধ্যুসিত রাষ্ট্র হলে তো কথাই নাই – প্রেসিডেন্ট বুশ – তিনি হতে চেয়েছিলেন এমন যেকোন দেশের রেজিম চেঞ্জের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট!

    RAND রিপোর্ট তাই উদাহরণ হিসাবে বলেছিলঃ মানে তারা সেসময়ের ওয়ার অন টেররের আমলের (আমাদের মত) গরীব মূসলমানের দেশের এক সন্ধ্যাবেলার চিত্র এঁকেছিল এভাবে; যে সন্ধ্যার পর ডিনার টেবিলে পরিবার যখন টেবলে একত্রিত হত তখন কোনায় রাখা টিভিটা চালু করে তাদের কমন প্রথম ডায়লগের বাক্যটা হত – “আজ কয়জন”? মানে হল আজ কয়জন আমেরিকান সেনা মরল!   আর সেটাই এরা উতযাপন করত! কারণ এমন প্রত্যেকটা দেশেই থাকত এক স্বৈরাচারি জনবিচ্ছিন্ন সরকার যে আমেরিকা সমর্থিত বলে জন-ঘৃণিত। অতএব ওমন দেশে মধ্য বা উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজ পরিবারগুলো নিজ সরকার-রাজনীতিকে না বলত, দূরে থাকত। অথচ একেবারে গ্লোবাল পরিসরে্র মূল হোতা আমেরিকাকেই গালাগালি মুন্ডপাত করত।  তাই এককথায় যেকোন তৃতীয় বিশ্বের দেশে আমেরিকা-বিরূপতা কমানো RAND এর লক্ষ্য ছিল। আর তা অর্জনের জন্য মুসলমান অধ্যুসিত দেশগুলোতে সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার, নুন্যতম জবাবদিহিতা ও পাবলিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল লক্ষ্য। আর এতে নুন্যতম অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তায় এক রিপাবলিক হয়ে উঠুক তাদের নিজ নিজ দেশ এই ছিল লক্ষ্য; যাতে  মুসলমান অধ্যুসিত দেশগুলোতে স্থানীয় জনগণ আমেরিকাবিরোধী কম হয় ও নিজদেশের সরকারের সাথে সংস্লিষ্টতাবোধ বাড়ে!

    তবে সাবধান এর সাথে একালে বাইডেনের  মানবাধিকারের পররাষ্ট্রনীতি বা স্যাংশন আরোপ করে চাপ সৃষ্টি ইত্যাদি এসবের সাথে  সেকালের আরব স্প্রিং এর কোন সম্পর্ক নাই, ছিল না। আমরা যেন মাখায় না ফেলি।

    তাহলে কথাগুলো এখন গুছিয়ে সারাংশে বললে,
    ১। গত ২০০৩ সালে বুশের ইরাক দখলের আগে পর্যন্ত দুনিয়ার প্রায় সব সরকারই নিজ নিজ স্বার্থে ওয়ার অন টেররের এককাট্টা পক্ষে ছিল বা থাকতে বাধ্য হয়েছিল; এমনকি জাতিসংঘের যেকোন সিদ্ধান্তেও এরা সকলে একপক্ষে ছিল। যেমন আফগানিস্তান ইস্যুতে (তাই পরে আমেরিকার আফগানিস্তান দখলেও) নিরাপত্তা পরিষদে সকলেই একই পক্ষে মানে আল-কায়েদাবিরোধী দিকে ভোট দিয়েছিল। কেবল ইরাক দখলের আগে ফ্রান্স-জর্মানি এর বিরোধিতা করেছিল কিন্তু বছর খানেক পরে এরাও ইরাক-আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়ে অংশ নিয়েছিল।
    ২। পরে ওয়ার অন টেরর এর এক সংস্কার রূপই হল আরব স্প্রিং। লিবিয়া-সিরিয়ার ঘটনাগুলো বাইরে রাখলে রাশিয়া কখনও আরব স্প্রিং-কে সমালোচনা করেছে জানা যায় না। তাহলে এখন আরব স্প্রিং এর কথা তুলে খোঁচা মারা নেতি দেখানো রাশিয়া – এটা তো নতুন ঘটনা। তাই রাশিয়া আসলেই কী বুঝাতে চাইছে? তারা কী আরব স্প্রিং এর বিরুদ্ধে ছিল? নাকি এখন হাসিনা সরকারের পক্ষে লিপ সার্ভিস এসেছে – তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
    ৩। আবার এখন রাশিয়ার আরব স্প্রিং এর ভয় দেখানো এতে কার্যত সরকার কী খুশি হয়েছে? না তাও নয়! পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এতে খুশি হয়েছেন তা বলতে-দেখাতে পারেন নাই। কারণ, মোমেন-কে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়েছে সেটা এই বলে যে এখন আর বাংলাদেশে আরব স্প্রিং এর সম্ভাবনা নাই। তার মানে আসলে সরকারকে দেখাতেই হয়েছে যে সে রাশিয়ার আরব স্প্রিং ভয় ছড়ানোর বিরুদ্ধে!!! তাহলে রাশিয়ার কথিত এই অবস্থান নেয়া – এটা কার পক্ষে গেছে??? মানে কেন মোমেনকে বলতে হয়েছে আরব স্প্রিং এর ভয় নাই???? এটাই হল হাসিনা সরকারের স্ববিরোধ! 
    ৪। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট যে মোমেনের “আরব স্প্রিং বাংলাদেশে আসবে না” এই কথাটা বলার কোনই মানে হয় নাই! কারণ, ইতোমধ্যে USAID ফান্ডেড আরব স্প্রিং এর ইয়ুথ প্রোগ্রামগুলোকে সরকারি (এনজিও ফান্ড হিসাবে) অনুমোদন দিয়েছে বলেই তো এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে। তাহলে  মোমেনের “আরব স্প্রিং বাংলাদেশে আসবে না” কথাটার কোনই মানে কী থাকল; পুরাটাই অপ্রাসঙ্গিক!!!

    এর মানে রাশিয়ার “আরব স্প্রিং’ নাম বলে রাশিয়ার যা কিছু খোচাখুচি তা অপ্রাসঙ্গিক, অর্থহীন। মানে এটা কীন সিরিয়াস বক্তব্য-প্রতিক্রিয়া নয়! বাংলায় বললে, এগুলোকেই আমরা খামোখা বলি!!!    জমে নাই এমন অকেজো প্রপাগান্ডা মাত্র! এজন্য কী মুখপাত্র মারিয়া জাকারভা নিজে এই কথিত বিবৃতি দেন নাই!!!

    আবার আরব স্প্রিংয়ের অনেক ফজিলত আছে! যেমন ২০১৩ সালে পাকিস্তানের ইমরানের উত্থান এমনই এক পাকিস্তানি আরব স্প্রিং থেকে।


    শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে এক “আরব স্প্রিং” বানানোর আগ্রহ ছিল আমেরিকার, কিন্তু হয় নাইঃ

    আর একটা তথ্য দেই। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে এক “আরব স্প্রিং” বানানোর আগ্রহ ছিল আমেরিকার, কিন্তু হয় নাই। দেখেন এখানে। অন্য স্বার্থের কাছে হেরে যায়, সফল হতে পারে নাই! সেই ২০১৩ সালের প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক রিপোর্টের শিরোনাম ছিলঃ

    শাহবাগে বাংলা বসন্ত

    এমন অনেক লেখা এখনও পাবেন। আর ভাষ্যগুলো খেয়াল করেন।   কথিত শাহবাগী আন্দোলনের ইমরান এইচ সরকার, তিনিও আসলে ছিলেন President at Youth for Peace & Democracy, Bangladesh (YPD)এই [YOUTH PROGRAM] মানে আরব স্প্রিংয়ের সাথে জড়িত নেতা। তাকে আমেরিকানেরা পুশ করে শাহবাগে পাঠিয়েছিল। প্রথম আলো এনিয়ে দুটা ফিচারও ছেপেছিল।

    ইমরান এইচ সরকার

     

     

     

    কিন্তু পরে রাজীব বা থাবা বাবা খুন হয়ে গেলে ইমরান সহ সকলেই নিরাপত্তা পেতে উন্মুখ হয়ে উঠে আর সরকারের কোলে গিয়ে উঠেছিল। মানে  আমেরিকান এই ইয়ুথ প্রোগ্রামের দিকটা আর সামনে আসতে পারে নাই। সোজা কথার শুরুর দিকে আমেরিকা চেয়েছিল শাহবাগ আন্দোলনকে মিসরের আরব স্প্রিংয়ের মত করে গড়ে দেয়া যায় কিনা……। যেটা শুরুতেই হেরে গেছিল, ফলে পারে নাই।

     

    … আপডেটঃ   ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩,  রাত ৯ঃ ৩০
    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২০ ডিসেম্বর ২০২৩,  সকাল ০৭ঃ ১০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

    কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর ২০২৩  ২১ঃ ৫৮ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-57i

               দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায় – স্টিফেন ইবেলি বলেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভারতে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

    আবার শুরু হয়েছে। সেই পুরানা বানানো গল্প –  ভারত নাকি আমেরিকার সাথে দেন-দরবার করে হাসিনাকে বাঁচাবে। ফিরে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখবে ইত্যাদি! মানে সেই পুরানা “আনন্দবাজারি” ও  “অগ্নি রায়” আর তাঁদের ঢাকার সহযোগী – মার্কা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আর তা শুনে কিছু না বুঝে হাহাকার করে উঠা লোকের সংখ্যাও কম নয় যারাই মূলত – ভারত আবার হাসিনাকে বোধহয় ক্ষমতায় রেখে দিল – এই প্রপাগান্ডাকে পরোক্ষে আয়ু দিচ্ছেন। আর তাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার অপ-সাংবাদিকতা করে হিট বাড়ানোর অসৎ ততপরতার জয়জয়কার শুরু হয়েছে। এবার একাজের লিড হল, বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। তিনি নেমেছেন যে নিজে ভারতীয় আর ভারতীয় বলেই যেন এক আরএসএসের কর্মির মত আচরণ করে আসছেন তিনি। আর তাত এই আচরণের পিছনে আছে আরেক পরিচয়।

    কলকাতার আরএসএস এর এককালের (২০১৬) দায়ীত্বে থাকা নেতা তথাগত রায় এখানে দেখেন তার পরিচয়,
    এরই চ্যালা-শিষ্য ছিলেন এই শুভজ্যোতি ঘোষ! 
    তথাগতের আমলে (সে সময়
    জঙ্গীবাদের নামে যা খুশি লিখতে-করতে-চালাতে পারত এরা), তাতেই এই শুভজ্যোতির উত্থান!

    শুভজ্যোতি ঘোষ, তিনিই এবার প্রপাগান্ডা লিড-নেতা! বাংলা বিবিসি-তে তিনি সত্য-মিথ্যায় মিশানো এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করেছেন। আর তা থেকেই প্রধান প্রপাগান্ডাটা শুরু হয়েছে। আর এটাই বাংলাদেশে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ ইত্যাদি এরা বিবিসির নাম না নিয়েই ঐ মেটারিয়াল দিয়ে সুত্রবিহীন স্ব স্ব রিপোর্ট করেছে।  যদিও গতদিনটা শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এরও এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট দিয়ে। সেটা এখানে দেখতে পাবেন।

    মিথা প্রপাগান্ডার শিরোনাম কীঃ
    গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল আভ্যন্তরীণ রুটিন ঘটনা হিশাবে ভারত-মার্কিন সংলাপের দিন। আর সে উপলক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তাঁদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে সাথে নিয়ে আগের দিনই ভারত সফরে পৌছে গেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে বাংলাদেশের কোনই সংশ্লিষ্টতা নাই; থাকার কোন কারণও নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই ইন্ডিয়ার হাসিনাকে দেয়া মিথ্যা মিডিয়া প্রপাগান্ডা সার্ভিস যে এই সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে! কেউ কেউ সাবধানী খাড়া মিথ্যা বলতে ভয় পেয়েছে।  যেমন কালের কন্ঠ লিখেছে  “ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ : উঠতে পারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও” ।  আবার প্রথম আলো তো খুবই সাহসী মিথ্যাবাজ। তাই সে বুক ফুলিয়ে শিরোনাম করেছে,দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।  কিন্তু প্রকাশ করার পর বুঝেছে এত হারাম কাজ দুনিয়া সহ্য করবে না। রাত দশটার মধ্যেই ঢাকার মানুষ চোরামি জেনে গেছে। মানে প্রথম আলো – এরা এত নিচে নেমেছে যে প্রথম প্রপাগান্ডা নিউজটা গায়েব করে দিয়েছে। লক্ষ্য করবেন এর রেফারেন্স লিঙ্কটা প্রিয়.কম এর। এই ওয়েবে কারো অনেকের প্রকাশিত লেখাই অটো কপি করে রাখা থাকে। তাই আমি সেখান থেকে লিঙ্ক দিয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে যারা স্ন্যাপ কপি করে স্টাটাস দিয়েছিল ততক্ষণাত তাঁদের স্টাটাসে প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা এখনও লটকানো আছে।
    তাই এবার শিরোনাম সহ সবই বদল। বলা যায় এবার দিল্লির সৌমের বরাতে প্রথম আলোর একেবারে ভাল মানুষী এবং পুরা উলটা শিরোনাম – যুক্তরাষ্ট্রকে বলল ভারত নির্বাচন কীভাবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ।

    তাহলে শুভজ্যোতি কী করেছিলঃ
    শুভজ্যোতি একদিকে প্রায় তেরশ অক্ষরের প্রপাগান্ডা রিপোর্ট-টা করছেন, শিরোনামে কায়দা করে উস্কানি দিয়ে লিখছেন দিল্লিতে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে!!!  অপরদিকে লেখা সেই রিপোর্টের একেবারে শেষে ভারতীয় মুখখপাত্র অরিন্দম বাগচির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “বাগচি বলেছেন, আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”। 

    “বাংলাদেশের নির্বাচন একান্তভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব
    নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”, -জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। সেই সঙ্গেই তিনি যোগ
    করেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পার্টনার
    হিসেবে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মর্যাদা দিই।”

    যার সোজা মানে হল, শুভজ্যোতির পুরা রিপোর্বটের বক্তব্যটাই ভুয়া প্রপাগান্ডা! কারণ, অরিন্দম বাগচির কথা সত্য হলে শুভজ্যোতির কথা যে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় – এটা মিথ্যা।  অদ্ভুত, এরপরেও এমন রিপোর্ট আবার বিবিসি বাংলায় ছাপা হয়েছে সাংবাদিকতা বলে!!!!

    ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেনঃ
    সকাল থেকেই বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা শুরু যেখান থেকে যে ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেন! প্রপাগান্ডিস্ট কালবেলার কথাই ধরেন, তার এই রিপোর্ট দেখেন।  এরা পিটার হাসকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকেই এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার খারাপ  প্রভাব পড়েছে! কারণ পিটার হাস দিল্লি চলে গেছেন!

    তো – তাতে কী হবে? না, তাঁদের থামার সময় নাই। পিটার হাস ইন্ডিয়া গেছে মানেই যেন ফিরে এসে তিনি হাসিনা কে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিবেন! তাই কান্নাকাটি???
    তাঁদের কে বলি – এখন থামেন, একটু শ্বাস নেন ভাল করে; এবার শুনেন!

    প্রথম কথা হল, আজ সন্ধ্যা সাতটায় সমকালে ছাপানো ছবি-সহ নিউজ বলছে, দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়। এখন বুঝেন প্রপাগান্ডার হাত-পা, ডালপালা কতদুর বিস্তৃত!

    দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

                                                                                     এটাই বিবিসির প্রপাগান্ডা রিপোর্ট 

     

     


    এমনকি হাস যদি ইন্ডিয়া যেতেন তবুও কিছুই মানে হত না কেনঃ

    কারণ, আজ দশ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত-মার্কিন ২+২ সভা শুরু হবে আর তাই সেখানে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন আগের দিনই এসেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও হাস যদি যেতেন তিনি মূলত বড় জোর ব্লিঙ্কেনের সাথেই দেখা করতে যেতেন। তবু কোনভাবেই পিটার হাস ভারত-মার্কিন ২+২ সভার কেউ হতেন না। কারণ তিনি এর কেউ নন।

    আর তাতেও কী কী ‘সত্য না’ থেকেই যেতঃ
    ১। পিটার হাস ২+২ সংলাপ-সভার কেউ নন, হবেনও না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মাত্র!
    ২। এখানে ২+২ সংলাপ মানে আসলে কী? তা হল, ভারত-মার্কিন দুপক্ষেরই দুই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে ভারতেরও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ( তাই, ২+২) – একসাথে ডাকা নিয়মিত সভা – এমন সভার কাঠামোর নাম হল  ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে; যা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এর উদ্দেশ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করা কার্যত যা, ভারতকে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি এবং কী কী শর্তে বিক্রি সেসব নিয়ে আলোচনা। কারণ রাশিয়ার কী কী অস্ত্র ভারত কিনলে আমেরিকা অস্ত্র ভারত পাবে না সে তর্ক আছে। আর দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সামরিক রিসোর্স ও স্টোর-গুদাম শেয়ার করতে পারে কিনা যা পরে পূরণ করে দেয়া হবে এধরণের এক আলাপের সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়েছিল।  সুতরাং বলাই বাহুল্য, এই সংলাপে বাংলাদেশে কোন ইস্যুই না। এটাই আমাদের জন্য মূল কথা।  একারণেই বলছি পিটার হাস  ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের কেউই নন।
    ৩। মনে রাখতে হবে ২০১৮ সাল মানে সেটা ট্রাম্পের আমল। আর এবার বাইডেনের আমলেই এই সভাতেও এবার যুক্ত করা হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক ইস্যু। যা আসলে এশিয়ায় চীন ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করতে পারে কিনা, কতটুকু? এনিয়ে তাঁদের আলোচনা। অর্থাৎ, এখানে এটাতেও বাংলাদেশ কোন ইস্যু-ই না!

    মূল কিছু কথা হাতে গুনে মনে রাখতে হবেঃ
    এক. এশিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে নিয়ে আমেরিকা আর যৌথ কিছুই করবে না। যেটা ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটেছিল। সে সময় এক্ষেত্রে আমেরিকান লক্ষ্য ছিল ভারতকে চীন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করার ঠিকা দেয়া। সেই ঠিকা দেয়া-নেয়া এখন ওভার! মানে শেষ বা ইতিটানা হয়েছে। যার প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালেই। তিনি এই ঠিকার বিনিময়ের বস্তুগত সুবিধায় ভারতকে আমেরিকায় (কম বা না-শুল্কে) ১৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুবিধা বাতিল করেছিলেন।  আর পুরা এসাইনমেন্ট-ঠিকা অবলুপ্তি ঘটিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তবে এসাইনমেন্ট বা ঠিকা দেওয়াটাও যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া যায় না (এসব কাজ পাবলিকলি করা হয় না) সম্ভব ছিল না; সেকারণে এই ঠিকা বাতিল টাও আনুষ্ঠানিকভাবে করার কিছু নাই। যদিও এতে ঠিক কি ঘটেছে সেটা আমরা জেনেওবুঝে নিতে পারি বাস্তবতা দেখে। এর আগে আমার পুরানা লেখায় বিরোধী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লেখা থেকে – এই ঠিকা দেওয়ার –  রেফারেন্স আছে আমি দেখিয়েছিলাম! আলী রিয়াজেরাও এটা স্বীকার করতে চায় নাই!

    তবুও এর স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বাইডেনের নয়া নীতি-পলিসিগুলো যদি খেয়াল রাখি। যেমন বার্মা এক্ট, বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখার আগ্রহ কিংবা আন্দামান নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনা (ও আমেরিকান খায়েসও বলতে পারি) ইত্যাদি এসবের দিকে যদি নজর রাখি। এসব কোন ইস্যুতেই ভারত আমেরিকার খায়েসের সাথে চলতে পারবে না – ভারতেরও ঘোষিত নীতি-পলিসি এর বিরোধী। তাই এখানে এসে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক – এই কবি এখানে নীরব থাকবে। ভারত আমেরিকান খায়েস-কে আপন করে নিতে পারবে না শুধু না বরং ভারতের অবস্থান এর চরমতম-বিরোধী! এমনকি ২০২৪ সালে যদি মোদির পরাজয়ে রাহুল বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রেও আমেরিকান খায়েস সম্ভবত পূরণ হবে না! এককথায়, আমেরিকান খায়েস – এই ইস্যুটার ভাগ্য অনিশ্চিত!
    সুতরাই এককথায়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে এই প্রশ্নে আমেরিকান অবস্থান আর কখনও ভারতের সাথে শেয়ার করে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকা আর গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ সেটা হবে আমেরিকার একক সিদ্ধান্ত।

    দুই.
    কিন্তু তাই বলে কী এশিয়ায় চীনবিরোধী অবস্থান, স্বার্থ ততপরতা প্রশ্নে ভারত-আমেরিকা  কমন স্বার্থেও কোন সম্পর্ক বা এক সাথে কমন স্ট্রাটেজিতে কাজ সব নাই হয়ে যাবে? অবশ্যই না। এটা থেকেই যাবে কারণ এটা আলাদা ইস্যু। এমনকি বাংলাদেশে হাসিনার সাথে চীন কী সম্পর্ক রচনা করছে তা নিয়েও ভারত-মার্কিন আলাপ হতে পারে কিন্তু সেটা হবে – বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোন সরকার থাকবে সেই প্রশ্ন বাদ দিয়ে –  যেটা একান্তই আমেরিকার একক বিষয় হয়েই থেকে যাবে!
    আমাদের সমস্যা হল, কেন ভারত হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকছে সেটা আমরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের সংঘাত ও প্রেক্ষিত থেকে দেখা বুঝা করি। যেন এর বাইরে অন্য কোন কারণ থাকতেই পারে না। ব্যাপারটা যেন হিন্দু-মুসলমানের পুরানা বিরোধই! আমি সবাইকে অনুরোধ করব একটু অন্যদিক থেকেও দেখেন! প্লিজ!! 

     তিন.  তবে এক্ষেত্রে মানে ভারত-মার্কিন সংলাপে কিছুটা  গোলমাল পাকিয়ে ফেলতে পারেন ডোনাল্ড ল্যু (সবাই নয়)। তিনিই এবার   ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস (IPS) ঢুকিয়ে ফেলার মূল কারিগর। বাইডেনের ইলেকশনী প্রচার স্ট্রাটেজি সাজানোর সময় থেকেই নির্ধারিত ল্যু-এর এই অবস্থান ও পদ। কিন্তু সরি ল্যু! সো ফার তার সাকসেস প্রায় জিরো!  পাকিস্তানে আর সর্বশেষ হাসিনার বাংলাদেশে ল্যু-এর আইপিএস স্ট্রাটেজির এর অর্জন শুন্যই বলা যায়। তবে এবার তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আর খুব বেশি এটা আগাবে এমন সম্ভাবনা কম!

    চার. ভারত চাইবে এই আলাপের ছায়ায় এক ফাঁকে চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি-টা আবার পাওয়া যায় কিনা! সেদিকটা উস্কে তুলতে; আবার যদি লাইগ্যা যায় – আর কী!  একদম আগের মতই না হলেও ভিন্ন মোড়কে অথবা কিছু অংশের কাজ!
    কিন্তু না। আমেরিকা এদিকে ভারতকে আবার এই ইস্যুতে ছাড় বা ঠিকা দিবার জায়গা এবং পরিকল্পনা কোনটাই নাই। আর তা থেকেই আলোচনায় ভারত বিরোধাত্মক ইস্যুগুলোকে সামনে তুলতে শুরু করে ফেলতে পারে। তাহলে, ভারত-আমেরিকার এবারের সংলাপ মোদির শেষ জমানা খারাপ পরিণতি ফলাফলের দিকে রওনা দিবে!

    পাঁচ. অথচ বিবিসি লিখেছে, “বৈঠকে দুই দেশের চারজন মন্ত্রী মিলে সার্বিকভাবে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ডোনাল্ড লু নাকি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। আসলে দোনাল্ড ল্যু এর বরাতে যা যা বিবিসিতে শুভজ্যোতি লিখেছেন এর সবটাই মিথ্যা প্রপাগান্ডা! তাই কোন রেফারেন্স এখানে নাই যে ল্যু এসব কথা কোথায় বলেছেন???

    এসব কথা থেকে পরিস্কার যে বিবিসির এই কথিত রিপোর্ট একেবারেই ভুঁয়া। ঘরে বসে ইচ্ছামত বানানো! ভারত-মার্কিন সংলাপে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে কোন আলোচনা এমনিতেই হওয়ার সুযোগ নাই। কারণ, ১। তা সংলাপ কাঠামোর মধ্যে পরে না। ২। এসময়ে ভারত বা  বাংলাদেশের কারো ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েই আলোচনা তোলাটাই ভারতের জন্য রিস্কি। কারণ, তাতে ভারতের নিজের ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা উঠে যেতে পারে।‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ ইস্যুটাই মোদির জন্য সেনসেটিভ। সেই খবর যার নাই তিনি বিবিসির এই মনগড়া রিপোর্ট লিখতে গেছেন বলেই এই সমস্যা।

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নিয়ে আজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গের নামে যা কিছু হয়েছে এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতাই নাই। বিশেষ করে বিবিসি এনিয়ে অপরাধী-সাংবাদিকতা করেছে।
    কিছুক্ষণ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার বয়ানে মানবজমিনে যা ছাপা হয়েছে সেটার উপর বিশ্বাস মানবজমিনও রাখে নাই; এমন না রেখেই মানবজমিন এই রিপোর্ট ছেপেছে।
    আবার ভারত-মার্কিন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার আবার বক্তব্য কেন? তিনি কিভাবে এটা দিতে পারেন? উনি কে এখানে? দুই পররাষ্ট্র-মন্ত্রীর যৌথ বক্তব্যের পরে তিনি কে?? কী তার প্রটোকল????
    ভারতের চেষ্যেটা হল, গায়ের কাপড় খুলে গেলেও ন্নযাংটা হয়েও যদি  হাসিনার ক্ষমতাকে যেকোন উপায়ে কিছু প্রাণ পাইয়ে দেয়া যায় কীনা – এরই এক মিথ্যা প্রাণান্তকর প্রয়াস!
    ভারতের এই খামোখা প্রচেষ্টা উলটা হাসিনা ও লীগের বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি! মানুষ বিরক্তবোধ করবে, যে এত মিথ্যা বলার কী দরকার!  মিথ্যা কারো সঙ্গি হয় না!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ১১ নভেম্বর  ২০২৩,   দুপুর ০১ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com