Tag: আইএমএফ

  • গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গৌতম দাস

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3id

     

     

    Washington is pressing for a post-pandemic decoupling from China

    আমেরিকার এবার নভেম্বর ২০২০ নির্বাচন সমাপ্ত এবং ফলাফল অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন বিজয়ী হতে যাচ্ছেন জানা গেছে। তবে ফলাফল নিয়ে নানা রাজ্যের যেসব আপত্তি এর নিষ্পত্তি এখনো শেষ হয়নি। তবে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছেন, বাইডেনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষিত হবেন। গ্লোবাল মিডিয়াতে বাইডেনকে নামের আগে রীতি অনুযায়ী “প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট” [President-Elect] শব্দ যোগ করেই পরিচিত করানো হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন তাঁর হবু নতুন সরকারে মানে আমেরিকান ভাষায়, বাইডেন প্রশাসনে কাদেরকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা প্রধান কর্মকর্তা করবেন এই বাছাইও শুরু হয়ে গিয়েছে। বেছে নেয়া ব্যক্তিদের নাম ক্রমেই সামনে আসছে।

    হবু বাইডেন প্রশাসনে তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পদ “সেক্রেটারি অব স্টেট” বা আমাদের ভাষায় “পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। এক হিসাবে এটা প্রশাসনের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে বাইডেন যে নাম বেছে নিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন তিনি  এন্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony John Blinken]। হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েট ব্লিঙ্কেন এর আগে ওবামা আমলে একসময় উপ-নিরাপত্তা মন্ত্রী (২০১৩-৫) আর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৫-৭) হিসেবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ বাইডেন তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে তার সাথে কাজ করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, সেসব সূত্রে ব্লিঙ্কেন এবার হবু বাইডেন প্রশাসনে বাছাইয়ে টিকেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের আমলেই একটা নতুন শব্দ চালু হয়েছিল ‘ডি-কাপলিং’ [decoupling]। ইংরেজি ‘ডি-কাপলিং’ শব্দের অর্থ কঠিন কিছু নয়, আমাদের প্রায় পরিচিত। এটা আসলে কাপলের [couple] উল্টা শব্দ। কাপল শব্দের একটা অর্থ, দম্পতি (স্বামী-স্ত্রী)। মানে, কারো সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া। আর এরই উল্টা শব্দ হল, ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা বুঝাতে ডি-কাপলিং। ট্রাম্পের আমলে শেষের দিকে এই শব্দটা ব্যবহার করে বলা হত যেমন,  ট্রাম্প চীনকে ডি-কাপলিং করার নীতি নিয়েছে। মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্ক থেকে চীনকে আলাদা করে দূরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাচ্ছেন ট্রাম্প, চীনের সাথে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে। যেমন, যেসব আমেরিকান কোম্পানি চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে তা স্থানান্তর করে আমেরিকায় ফিরিয়ে না আনলেও চীনের বাইরে অন্য দেশে নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আর তাতে ওই স্থানান্তরের খরচও ট্রাম্পের সরকার বহন করবে। এই ছিল,  ট্রাম্পের ডি-কাপলিং। এমনকি এই প্ররোচনায় জাপান এগিয়ে এসেছিল। অবশ্য যুক্তি দিয়েছিল যে, চীনের ‘ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে এটা সে করছে। যদিও কোনো এন্টারপ্রাইজ বা বড়  কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন স্থানান্তর খুবই রুটিন। আর তা মূলত যে কারণে সাধারণত হয়ে থাকে তা হল, ফেলে আসা দেশে ন্যূনতম মজুরি তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়া। অথবা উল্টা করে বললে, নতুন কোন দেশ পাওয়া গেছে যেখানে ন্যূনতম মজুরি অনেক কম এবং অবকাঠামোগত সুবিধা অনেক ভাল, প্রশাসন দক্ষ চটপটে ইত্যাদি। আর এমন পাওয়া যায় বলেই ফ্যাক্টরি স্থানান্তর করা হরহামেশাই হয়ে থাকে। যেমন জাপান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের এক সিগারেট কোম্পানি কিনে বাংলাদেশের সিগারেট ব্যবসায় ঢুকে গেছে অনেকটা এমনভাবেই। যদিও এখানে ব্যাপারটা ঠিক মেশিনপত্র নয়, পুঁজি স্থানান্তর করে। আর বিপরীতে, ট্রাম্পের ‘ডি-কাপলিং  ব্যবস্থাটার কথা বলা হয়েছিল এর উদেশ্য ছিল, চীনকে একঘরে করা, চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে।
    কিন্তু হবু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ইতোমধ্যেই ডি-কাপলিং প্রসঙ্গে তার শক্ত বিরোধী অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “ডি-কাপলিং করা এক অবাস্তবচিত ও উল্টা ফল দেবে এমনটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ ধারণা” […।decoupling is ‘unrealistic’ and ‘counterproductive’; it also wouldn’t work]।’ এ নিয়ে তিনি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ  বক্তৃতাও করেছেন।

    গ্লোবাল বাণিজ্যঃ
    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ [Global Trade] শব্দটা শুনলে বিরাট দুনিয়াব্যাপী কোনো ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই দূরের কিছু না। এখানে বাণিজ্য মানে লেনদেন; অর্থাৎ আপনি আপনার পণ্য দিবেন আর অন্যের পণ্য নিবেন। কিন্তু না, অনেকের মনে হতে পারে এর আরেকটা মানে আছে। সেটা হল, বাণিজ্য মানে পণ্য দিয়ে মুদ্রা নেবেন। হ্যাঁ, এই কথাও ঠিক; তবে এটা পুরো ঘটনার অর্ধেকটা। আপনি পণ্য দিয়ে যে মুদ্রা নিয়ে ফিরলেন এরপরে সেই মুদ্রা দিয়ে আবার অন্য পণ্য বা কাঁচামাল কিনবেন। মানে, কিনতে হবে আপনাকে; খুব স্বাভাবিক। যেটা শেষ বিচারে পণ্য বেচে আরেক পণ্য কেনার ঘটনায় গিয়ে দাঁড়াবে। একারণে বাণিজ্য মানে, পণ্য লেনদেন। এটাই পণ্য কেনাবেচা মানে বিনিময়, ইংরেজিতে এক্সচেঞ্জ [exchange]। তাই গ্লোবাল বাণিজ্য মানে একটা গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ, দুনিয়াব্যাপী পণ্য বিনিময়।
    কথাগুলো ধারণা হিসেবে অবশ্যই ঠিক আছে, তবুও একটা বিষয় এতে আড়ালে থেকে গেছে, সেটাকে সামনে আনতে হবে। সে বিষয়টা হল মুদ্রা। পণ্য কেনাবেচা করতে গেলে মুদ্রা লাগবে। এর সাথে কথা আরো আছে। পকেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে আপনি বাংলাদেশের যেখানেই যান যেকোনো পণ্য কিনতে পারবেন। টাকার বিনিময়ে বিক্রেতা আপনাকে পণ্য দিবে। তবে আবার সেই কিছু ‘কিন্তু’ও এখানে আছে সাথে! বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলে কী হবে? না, এইবার আর কেউ আপনাকে কোন পণ্য বেচবে না। কারণ আপনার হাতে বাংলাদেশের মুদ্রা, তাই বাংলাদেশের ভেতরে থাকলে যেকোনো বিনিময় সম্ভব হলেও সীমান্ত পার হলে কিন্তু আর ওই মুদ্রা চলবে না। প্রত্যেকটা স্থানীয় মুদ্রার সীমাবদ্ধতা হল এটাই; দেশের সীমানা পার হলে ওই মুদ্রায় কোন বাণিজ্য, পণ্য কেনাবেচা বা বিনিময় আর চলে না। তাহলে?
    দেশের বাইরেও বাণিজ্য বা বিনিময় করতে চাইলে এবার প্রয়োজন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা”। এমন এক মুদ্রা, যা দেশের সীমানা পার হয়ে গেলেও যেকোনো দেশেই ওই মুদ্রায় পণ্য বাণিজ্য বা বিনিময় বিক্রেতারা তখনও করবেন। তাই এবার সোজা বলা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় যে বাণিজ্য সম্পন্ন করা যায় তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এটাকেই গ্লোবাল বাণিজ্যও বলে। বাংলাদেশের বাইরের সাথে কোনো কিছু বেচাকেনা, বাণিজ্য করে আসা – এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য। আমাদের সীমান্তের বাইরের ভারত থেকে কোনো কিছু বাণিজ্য করে আসাও তাই গ্লোবাল বাণিজ্যের অংশ। কাজেই “গ্লোবাল বাণিজ্য” বলতে সুদূরের কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলেই এর শুরু।
    এখন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা” আবার কী? গ্লোবাল বাণিজ্য মানে বুঝেছিলাম তা আদতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বেচাকেনার বাণিজ্য। আর এটাই সম্পন্ন করার একটা সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটাই আইএমএফ। ফলে যেসব দেশের মুদ্রাকে আইএমএফ আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে (আইএমএফ এর টেকনিক্যাল শর্ত পূরণের কারণে), যে মুদ্রার বিনিময় হার (conversion rate) আইএমএফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, এমন মুদ্রাগুলোই কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যেমন এখন পর্যন্ত – ডলার, পাউন্ড, ইউরো, ইয়েন ও ইউয়ান আন্তর্জাতিক মুদ্রা। তবে মনে রাখতে হবে এগুলো কিন্তু একই সাথে প্রধানত দেশীয় মুদ্রা বা নিজ নিজ দেশের স্থানীয় মুদ্রা যাকে আবার ‘ডাবল রোল’ হিসেবে কাজ করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রারও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
    এখন এতে দুনিয়াতে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে তা হল – একটা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বা নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে গেছে যার কারণে আমরা নিজ দেশের ভেতরের মতই দেশের বাইরেও বাণিজ্য-বিনিময় বা গ্লোবাল বাণিজ্য সহজেই করতে পারি। এবং তা কবে থেকে? গত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে।

    কিন্তু এ তো গেল ইতিবাচক দিক। এবার নেতিবাচক দিক থেকে দেখা যাক। যেমন ইরান কোন কোন দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে বা আদৌ কারো সাথে পারবে কি না এটা ডিকটেট করার ক্ষমতা এসে গেছে আমেরিকার হাতে। এই ক্ষমতাটা যদিও পড়ে পাওয়া। মানে আইএমএফ এটা জেনেশুনে দিতে চেয়েই দিয়েছিল ব্যাপারটা এমন নয়। এটাকেই আমরা ইরানের ওপর আমেরিকার “অবরোধ” [Sanction] বলে জানি। অবরোধ – মানে ইরান নিজদেশের বাইরের কারো সাথে বাণিজ্য করতে পারবে না। কিন্তু এটা আমেরিকা কার্যকর করে কী করে? ের জবাবের আগে একটা কনসেপ্ট পরিস্কার করে নেই। আমেরিকার যে অবরোধ দেয় তা আইএমএফ-এর অনুমোদনে প্রাপ্ত কোন ক্ষমতা নয়, বরং আমেরিকা নিজ ক্ষমতাতেই এটা আরোপ করে থাকে। কিন্তু ইরান সেটা মানতে বাধ্য হয় কেন? সোজা। আমেরিকার ‘অবরোধ’ কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, যেন আমেরিকা বলছে, ইরান তুমি কোন কেনাবেচা ডলারে করতে পারবে না; মানে, ইনভয়েসে মূল্যটা “আমেরিকান ডলারে” তা লিখতে পারবা না। করলে কী হবে, আমেরিকা বাধা দেবে কিভাবে? ইনভয়েসে বা বিলে ডলারে দাম লেখার মানে হল, ঐ কেনাবেচা সম্পন্ন করতে গেলে ক্রেতার ব্যাংক আর বিক্রেতরা ব্যাংকের লেনদেনের মাঝখানে একটা আমেরিকান ব্যাংকের সাহায্য-সহায়তা লাগবেই। না হলে কেনাবেচায় মূল্যের অর্থ-স্থানান্তর ঘটানো যাবে না। আর ট্রাম্প তাঁর দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে, “যেসব দেশ বা ব্যক্তিকে অবরোধ তালিকায় ফেলেছি এদের দেশের কোনো কোম্পানির  অর্থ ছাড়ে তোমরা জড়িত হবে না, হলে ঐ আমেরিকান ব্যাংককেই আমেরিকা-রাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করবে”। এভাবেই অবরোধ কার্যকর করেছে আমেরিকা। এই এক পড়ে পাওয়া বিশাল ক্ষমতা আমেরিকান হাতে আছে বা এসে গিয়েছে, সেই থেকে।

    ডি-কাপলিংঃ
    তাহলে ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধে “চায়না ডি-কাপলিং” এই প্রোগ্রামের আসল মানে কী? মানে হল, চীনকে একঘরে করা। যেটা আরও পরিস্কার করে বললে, চীনকে বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়ার যত বেশি দেশ পাওয়া যায় এমন সকলকে নিয়ে আগে যেমন আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে ছিল  যেন সে অবস্থাটাই ফিরে এসেছে বলে ট্রাম্পের সুখবোধ ফিরে পাবার এ’এক বাসনা!  তবে এটা বাসনাই! মূল কারণ এই শতকের শুরু থেকেই চীন হল সেই রাষ্ট্র যার হাতে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস সঞ্চিত হওয়া শুরু হয়েছে। যার অর্থ চীনই এখন আমাদের মত বা এর চেয়েও ভাল অর্থনীতির রাষ্ট্র এমন যাদেরই আবার বিদেশি বিনিয়োগ-পুঁজি খুবই দরকার তাঁদের চীনকে খুবই দরকার। এছাড়া চীনের উঠতি বিশাল বাজার সেটাও আকর্ষণীয়। অতএব ট্রাম্প তো ফেল করবেন; করছেনও। কারণ এই জায়গায় এসে আমেরিকা আর চীনের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কোনটাই একেবারেই নয়। একারণে অষ্ট্রেলিয়া বা এমনকি জাপান যারা ট্রাম্পের হামবড়া বাতের কোয়াড [QUAD] জোটের দুই মাতবর; এই তারাই আবার চীনের নেতৃত্বের RCEP বাণিজ্য জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সেখানে সবার আগে নাম লিখায়। সাথে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ভিয়েতনাম কেউ বাইরে বাকি থাকে নাই।

    যদিও বাস্তবত ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন তবু এমন ঘোষিত নীতিটা এখনও বর্তমান। তাই এই ‘একঘরে’ করতে চাইলে মানে আসলে ঠিক কী হত? আমাদের গ্রাম-সমাজের প্রেক্ষিতে একঘরে মানে ওর নুন, পানি বন্ধ করে দেয়া; আর ওর সাথে কেউ কোনো পণ্য বিনিময় করবে না যার ব্যবহারিক মানে ‘নো এক্সচেঞ্জ’! ওকে সমাজ থেকে বের করে দেয়া; সেক্ষেত্রে যদিও সে আগের বাড়িতেই বসবাস করবে, তারপরেও। কেমন করে এটা ঘটানো সম্ভব হবে? কারণ, ওর সাথে পণ্য বিনিময় না করা মানে, ও যে লবণটা খাবে সেটাও তাকে নিজেই সমুদ্রের পানি জোগাড় করে শুকাতে হবে, না হয় লবণের খনি জোগাড় করতে হবে এবং তা নিজেই। তাতে সমুদ্র হাজার মাইল দূরে বা লবণের খনি খুঁজতে পাকিস্তানের সিন্ধুতে যেতে হতে পারে। মূল কথায়, যা কিছু সে ভোগ করবে তার সবটার ‘উৎপাদক’ তাকে নিজেই হতে হবে। নইলে তা ভোগ করা যাবে না, ভোগ নাই! ‘নো এক্সচেঞ্জ’ কথার মানে তাই। এখান থেকেই ‘সমাজ’ কথাটার মানে কত বিশাল সে হুঁশ আসতে পারে আমাদের। আমরা যারা যারা পণ্য বিনিময় করি-জড়াই তারা এই কাজের মাধ্যমে আসলে একটা সমাজ গড়ে তুলি, অজান্তেই। সমাজ মানে তাই এক অর্থে পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ, পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়ার সমাজ। এমনকি এভাবে ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’ও। অর্থাৎ চীন যেখানে আমেরিকার বদলে নয়া গ্লোবাল নেতা হবার সবগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠছে সেখানে ঐ চীনকেই একঘরে করার চিন্তা? এটা ট্রাম্পের একটা ফাজলামো ছাড়া আর কিইবা বলা যায়!

    জাতিবাদী সমাজঃ
    আর গ্লোবাল পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ ঠিক এর উল্টা অর্থ সেটাই হল “জাতিবাদী সমাজ”। সে জন্য জাতি-রাষ্ট্র বা বিদেশবিরোধীতা কথাটার অর্থ এখানেই। তত্ত্ব অনুযায়ী (তত্ব বলেছি কারণ বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না; অলীক) এসব জাতিবাদী দেশে সবকিছুই নিজেরাই দেশের ভিতরে উৎপন্ন করার কথা। জানি একথা শুনে অনেকেই খুশিতে পুলকিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু না ঘটনাটা হবে উলটা! তত্ত্বীয়ভাবে বললে এরা আমদানি-রফতানি কোনটাকেই না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা তা অপছন্দ করে। কিন্তু বাস্তবতা এর উলটা।
    নরেন্দ্র মোদী সাহেব কট্টর হিন্দুত্ব জাতিবাদী। তিনি জাতিবাদী সমাজের প্রবক্তা। বক্তৃতায় সবসময় আত্মনির্ভর, স্বদেশী দেশপ্রেমিক টাইপের কথা তুলে বক্তৃতা করবেন এরা। কিন্ত সেই মোদী সীমান্তে চীনের হাতে মার খেয়ে চীনা-পণ্য বয়কটের হুঙ্কার দিয়েছিল। অর্থাৎ আগেই যেমন চীনা-পণ্য আমদানি করতেন, কোন কোন পণ্য ৯০% পর্যন্ত চীনা আমদানির, তেমনই তিনি আর করবেন না বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টাটা, ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বেড়েছে। দেখুন, As Chinese imports boom, what happened to Modi’s ‘self-reliant’ India?
    এটাই মোদীর ‘আত্মনির্ভরশীল’ তবে ‘অলীক অর্থনীতি’। গত সপ্তাহে ভারতের নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই আত্মনির্ভরশীল (তবে অলীক) অর্থনীতির গড়বেন [New Parliament building testament to Aatmanirbhar Bharat: PM Modi] বলে ‘চাপা মেরেছেন’।
    এখানে আরেকটা কথা পরিস্কার করে রাখা ভাল। এই জাতিবাদিরাই আবার নিজ দেশের বিদেশি পণ্য আমদানিকে খুবই অপরাধ বা নিচা চোখে দেখে থাকেন। এটাও অর্থহীন এবং এক মিথ্যা ধারনা-বুঝ। প্রথমত আমি আমদানি করতে পারি মানে আমার বৈদেশি্ক মুদ্রা যথেষ্ট আছে। অর্থাৎ অন্যকিছু পণ্য আমি উতপাদন ও রপ্তানি আমিই করি তবেই না ঐ মুদ্রা পাই। তাহলে এটা খারাপ কেন? যেমন আমরা গার্মেন্ট রপ্তানি করতে পারি মানে হল অন্তত একটা ধরণের পণ্য আছে যা উতপাদনে আমরা দক্ষ বলে সবার চেয়ে কম শ্রমে মানে দামি তা রপ্তানি করতে পারি। আর এরপরে ঐ প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আমরা অবশ্যই আমদানি করব,।কাজেই আমদানি মানেই নিচা বা খারাপ এমন ধারনা ভিত্তিহীন!

    ট্রাম্পের অবুঝ খায়েস ডি-কাপলিংঃ
    তামাশার কথা হল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এমনই এক কল্পিত আমেরিকান জাতিবাদী অর্থনীতি গড়বেন বলে- ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে।
    ট্রাম্প সেই গত চার বছরে আবদার ধরে বসেছিলেন যে, চীন চাক বা না চাক তিনি চীনকে একঘরে রাষ্ট্র বানাবেনই। তবে এটা তো আসলে অলীক, এক খায়েশের কথা। আর বাস্তবে সেটা আসলে উল্টা। তিনি চীনবিরোধী হতে চান এমন বুঝা না বুঝা উসকানি-চুলকানি যাদের আছে এ ধরনের দেশগুলোর একটা আমেরিকান প্রভাবাধীন জোট বানিয়ে চীনকে তা থেকে আলাদা করে দিতে চান। এমনই কল্পরূপের কিছু নমুনা হল, ‘কোয়াড’ রাষ্ট্র গ্রুপ (ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া) বা হবু ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ ইত্যাদি।
    আপাতত ট্রাম্পের হাত থেকে দুনিয়া বেঁচে নাজাত পাইছে, চায়না অথবা কোন দেশকে ডি-কাপলিং করা দুনিয়াকে আর দেখতে হচ্ছে না। কারণ ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গেছেন। আর ব্লিঙ্কেনও দাবি করছেন, তিনি বুঝেছেন ডি-কাপলিং অবাস্তব। কিন্তু ধরা যাক, ট্রাম্প নির্বাচনে জিতলে কী হত?

    সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ কী?
    এক কথায় বললে, ট্রাম্পের হবু পদক্ষেপে সেটাই হওয়ানোর চেষ্টা হত। ফলে যেন তা সম্ভাব্য সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’। যদিও এটা নিয়ে অনেকে এর আগে আন্দাজে ঢিল মেরেছেন। চীন ও আমেরিকার ঝগড়া-সঙ্ঘাত কখনও মারাত্মক হলেই লিখে দিয়েছেন ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ আসছে। কিন্তু না। ঠিক কোন শর্ত পূরণ হলেি কেবল ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ হতে পারে, সেটাই আমরা জানব এখন। তার আগে,  কোল্ড ওয়ার বলতে ঠিক কী বুঝব? গত ১৯৫৩-৯১ সাল, এই সময়কালে দুনিয়াটাকে সোভিয়েত-আমেরিকা এদের উভয়ের নেতৃত্বে দুইটা ব্লকে ভাগ করে নেয়া হয়েছি্‌ বা গিয়েছিল। কিন্তু শুধু দুই ব্লক-জোটরাষ্ট্রে দুনিয়া ভাগ করলেই সেটা কোল্ড-ওয়্যার বলে চালানোটা আনাড়িপনা হবে। তাহলে আর কী শর্ত লাগবে? সেটি হল, প্রথমত যদি একটা ব্লক-জোট ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ না নেয়। নেয়ার যোগ্য না হয়। কিন্তু অংশ নেয় নাই তা বুঝব কেমন করে? এটা বোঝা খুবই সহজ। একেবারেই সহজ বুদ্ধিটা হল কোন রাষ্ট্র যদি আইওএমএফের সদস্যপদ না নিয়ে থাকে এর মানে তখন সে চাইলেও আর গ্লোবাল বাণিজ্যে যোগ দিতে পারবে না। তাই আমরা জেনেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের কখনই সদস্যপদ আবেদনই করে নাই। আর সাথে তার ব্লকের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই এমন সদস্যপদ নেয় নাই। অথবা বাংলাদেশ  মত; যে নিয়েছে ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ১৯৭৬ সালের শুরুরদিকের আগে তেমন কোন সক্রিয়তায় কোন কাজে লাগায় নাই। এভাবেই আমরা শেখ মুজিব জীবিত থাকতে ১৯৭৪ জুলাইয়ে দুর্ভিক্ষটা পর্যন্ত আমরা যেন সোভিয়েত ব্লকেই ছিলাম। আবার শেখ মুজিব নিজেই ১৯৭৪ সেপ্টেম্বর থেকে আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয়তা চাইতে গেছিলেন। তো, এদেরকেই  যারা কোল্ড-ওয়ারে জড়িয়ে গেছিল এমন দেশের ব্লক বুঝাতে চাচ্ছি।  এদের যারা যারাই আইএমএফের সদস্যই না হয় অথবা আগে হয়ে থাকলে এখন সদস্যপদ ত্যাগ করে – এটাই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ যে এরা ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নেয় না। আইএমএফের সদস্যপদ ত্যাগ করা মানে, ওসব রাষ্ট্র আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নিতে পারবে না। ঠিক এমনটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের অনেক রাষ্ট্রের।
    কিছু বেজ ফ্যাক্টস বলে রাখি। আইএমএফের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলের ২২ দিনের সম্মেলনে, ৪৪ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে। তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মানে, জোসেফ স্টালিনের প্রতিনিধিও তাতে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু এর জন্ম দলিল তৈরি করা সম্পন্ন হওয়ার পরে ফাইনাল সদস্যপদ নিয়ে যখন চাঁদা দিয়ে স্বাক্ষর করতে একটা দিন ধার্য হয়েছিল তখন থেকে কোনো সোভিয়েত প্রতিনিধি আর উপস্থিত হননি। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই আইএমএফের সদস্য ছিল না। তবে  আইএমএফ ফাংশনাল হলে পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত ব্লকের অনেক সদস্যই যেমন- পোল্যান্ড এর সদস্যপদ পেতে আবেদন করেছিল। তাতে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়েই অনুমোদন করলেও আমেরিকান প্রশাসনের আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়। অতএব মূল কথাটা হল সোভিয়েত ব্লক-জোটের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিদের ব্লক-রাষ্ট্রের কোনো গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। তাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সম্ভব ছিল না। এটাই যেকোন ‘কোল্ড-ওয়ার’ পরিস্থিতি আবার দেখা দিতে গেলে প্রধান শর্ত, যা আগে পুরণ হতেই হবে।

    কাজেই ট্রাম্পের স্বপ্ন একালে অধরা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই ছিল প্রচুর। মূল কারণ এখন দুনিয়ার খুব কম রাষ্ট্রই আছে যে আর আইএমএফের সদস্য নয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ভেঙ্গে আরো ১৫ রাষ্ট্রে পরিণত হবার পর থেকে এরা সকলেই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল সেজন্য। আর ১৯৮০ সালে কমিউনিস্ট চীন আইএমএফের সাথে সম্পর্ক সক্রিয় করে ফেলার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০ টা দেশই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় চীনকে আর একঘরে করা আরো অসম্ভব হয়ে গেছে। যে চীন দুনিয়ার হবু নেতা এবং পালটা নতুন করে পুরান আইএমএফের সংস্কার করে নিবার ক্ষমতা সম্পন্ন।  কাজেই ট্রাম্প আবার জয় লাভ করলেও আইএমএফ একটা বড় ঝাকুনি খেত হয়ত। কিন্তু তবু আইএমএফের সদস্যপদ সবারই থেকে যেত। ওদিকে সারা ইউরোপ ট্রাম্পের আমেরিকার উপর ১৯৪৫ সালের পরে এই প্রথম আস্থা হারিয়েছিল যেটা আর ফিরে আসত না। যেমন এর উল্টাটা, সেই আস্থা আবার কতটা ফিরে পাওয়া যাবে সেলক্ষ্যে বাইডেন ঝাপিয়ে পড়ে কাজ করার পরিকল্পনা নিচ্ছে্ন এখনই।

    তাই  একালে বাইডেনের হবু প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ডি-কাপলিং ‘অবাস্তব’ ও ‘কাউন্টার-প্রডাকটিভ’। কথাটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ; যদিও এর মানে বাইডেনের আমলে চীন ও আমেরিকার মধ্যে আর কোনো সঙ্ঘাত থাকবে না  – না সেটারও কোন সত্যতা নাই, এর একেবারেই সত্যি নয়। মূল বিষয়, একই গ্লোবাল বাণিজ্য সমাজে সবাই থাকছে কি না। আর একই বাণিজ্য সমাজে আর যদি কখনও না থাকে একমাত্র সেক্ষেত্রেই যেটা হতে পারে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ পরিস্থিতি। কাজেই না-বুঝ ‘কোল্ড-ওয়ার ২ বলে এ নিয়ে আলাপ তোলা বন্ধ করাই ভাল। আর উল্টাটা যদি চীন-আমেরিকা একই বাণিজ্য সমাজে যদি থাকে, তবেই দুনিয়া ফান্ডামেন্টালি ঠাণ্ডা থাকবে!‘ বলাই বাহুল্য!

    সবশেষেঃ
    ১। কয়েক মণ চাল-ডাল যদি একবার মিশিয়ে ফেলা হয়, এরপর তা আবার আলাদা করে আগের জায়গায় আলাদা চাল ও আলাদা ডাল করা প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা। এই যুগে ডি-কাপলিং প্রয় সেরকমই এক অলীক ধারণা!
    ২। একটা মজার কথা হল, কমিউনিস্টদের কাছে তবু সেই থেকে জোসেফ স্টালিনের মতই “গ্লোবাল বাণিজ্য” এক অ-বুঝ ধারণা শুধু না, একটা নো-গো [no-go] ধারণা; যা তারা বুঝার চেষ্টাও করে না, আলোচনায় অংশগ্রহণও করে না! বরং অনেকটা যেন হারাম খাদ্যের প্রতি যেমন মানুষের আগ্রহ থাকে না সেরকম! এমনকি কেন এমন ‘হারাম মনোভাব সেটা উলটে দেখা বা রিভিউও করে না এরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গ্লোবাল বাণিজ্য ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের মুদ্রার স্বীকৃতি

    চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি
    গৌতম দাস
    ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-mF

     

    আইএমএফের মালিক শেয়ারহোল্ডার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি ২৪ সদস্যের নির্বাহী বোর্ড ৩০ অক্টোবরের সভায় চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে আইএমএফে রিজার্ভ জমা রাখার মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত চারটি (ডলার,ইউরো,পাউন্ড ও ইয়েন) মুদ্রার পাশাপাশি পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংক্ষেপে বললে, দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন আগের টপ চারটি মুদ্রার মতোই চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেও এবার আইএমএফ তার পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকার করেছে। এ স্বীকৃতির অর্থ কী? তাৎপর্যই বা কী, সেসব নিয়ে এখানে কথা বলব।

    দেশের অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ্যে যেসব ধারণা আলোচনা হয় সেখানে পুঁজিতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বলে ভাসাভাসি কিছু ধারণা থাকলেও সে আলোচনা কখনও মুদ্রা পর্যন্ত যেতে দেখা যায় না। অর্থাৎ মুদ্রার কাজ বা ভূমিকা কী সে সম্পর্কে এর ভালো-মন্দ অলিগলি দিক সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা আরও কম। বলা হয়ে থাকে, কোনো জিনিসকে মুদ্রার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে গেলে ওর তিনটা গুণ থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ মুদ্রা মানে যার ঐ তিন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এক. গ্রহণযোগ্যতা : অর্থাৎ যে কেউই ওই মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বেচতে রাজি। শুধু তাই না, পণ্য বেচে ওই মুদ্রা পেতে অথবা পাওয়া মুদ্রা দিয়ে অন্য পণ্য কিনতেও সবাই রাজি। সার কথায়, বিনা দ্বিধায় বাজারের যে কেউ ওই মুদ্রায় কিনতে ও বেচতে রাজি। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, লিকুইডিটি : এটাকে বলা যায় গ্রহণযোগ্যতার মাত্রার কমবেশি। যেমন ব্যাংকের চেকের চেয়ে নগদ মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অর্থাৎ নগদ মুদ্রার লিকুইডিটি সব সময় অন্য যে কোনো ধরনের মুদ্রার চেয়ে বেশি। আবার একেবারে মফস্বলের হাটে ১ হাজার টাকার নগদ নোট দিয়ে সওদা নিতে চাইলে এত বড় নোটের খুচরা পাওয়া সহজ নয় বলে সেখানে ১০ থেকে ২০ টাকার নোটের গ্রহণযোগ্যতা ১ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। এভাবে মুদ্রার এই দুই বৈশিষ্ট্যই আসল বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। কেন?
    তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, মুদ্রার বদলে সোনা: ব্যাংকে গিয়ে মুদ্রার বদলে সোনা চাইলে তৎক্ষণাৎ তা পাওয়া যায় এমন হতে হবে। এ গুণটা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ আগেকার দিনে যে কোনো ব্যাংক কাগুজে মুদ্রা ছাপার আগে সমমূল্যের সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে নিত। এখন তা আর করে না। বিশেষত আইএমএফের ১৯৪৪ সালে জন্মের সময়ের ম্যান্ডেট বা ঘোষণাপত্রে বদল এনে ১৯৭৩ সালে নতুন করে আইএমএফ গঠন করে নেয়ার পর থেকে কাগুজে মুদ্রার বদলে সোনা ফেরত দেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও উঠে গেছে। সারকথায় তাই, এখন মুদ্রা হতে গেলে প্রথম দুই বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট।
    উপরের আলোচনায় সাধারণভাবে মুদ্রা নিয়ে কথা তুলা হয়েছে। কিন্তু ওই মুদ্রা কি কোনো একটা রাষ্ট্রের মুদ্রা নাকি একই সঙ্গে তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা, সেটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। তাই এবার দেশি ও বিদেশি (আন্তর্জাতিক মুদ্রা) এভাবে মুদ্রাকে ভাগ করে, ভাগ মনে রেখে কিছু কথা। একালে দেশি মুদ্রা মানে কাগুজে মুদ্রা যা মূলত রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মুদ্রা। অর্থাৎ নিজ ভূখন্ডের বাইরে যে মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলায় বললে, চলে না। নিজ ভূখন্ডের মধ্যে দেশি মুদ্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেনে একচেটিয়াভাবে চলতে পারে। অন্যভাবে বললে, শুধু নিজ মুদ্রার ওপর নিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের) একক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের সীমানা পর্যন্ত কার্যকর ও বিস্তৃত থাকে। রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে হলে আর থাকে না। তাহলে সারকথা দাঁড়াল, প্রথমত মুদ্রা ছাড়া কোনো বাণিজ্য লেনদেন নেই, হবে না। আবার দেশি মুদ্রামাত্রই ওর ভূখন্ডগত সীমাবদ্ধতা থাকবে, নিজ রাষ্ট্র সীমানা পার হলেই ওই মুদ্রা অচল হয়ে যাবেই। তাহলে যেকোনো দুই রাষ্ট্র বাণিজ্য বিনিময় করবে কীভাবে, কোন মুদ্রায়? স্বভাবতই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য লেনদেন ঘটাতে চায় বলে সব রাষ্ট্রেরই বাকি সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে বেশি দিন আগের কথা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃত মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আইএমএফ গঠন করার পেছনে ১৯৪৪ সালে প্রধান যেসব তাগিদ কাজ করেছিল তা হল, এর আগে অচল হয়ে ভেঙে পড়ে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়কে নতুন করে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে এক সিস্টেম ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করা। এ আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এককথায় বললে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় চালু থাকার পূর্বশর্ত হল এক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা চালু থাকা। এটাই আইএমএফের মুখ্য কাজ। অবশ্য বলা বাহুল্য, আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব বড়লোক রাষ্ট্রের পক্ষে কান্নি মারা। কারণ আইএমএফের মালিকানা শেয়ার যে রাষ্ট্রের ভাগে সবচেয়ে বেশি আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বের ওপর প্রভাব তার সবচেয়ে বেশি। এই নিয়মে সাজানো আছে ও পরিচালিত হয় আইএমএফ। যেমন সর্বশেষ মালিকানা শেয়ার অনুসারে আমেরিকা (একাই ১৬ শতাংশ) ও ইউরোপে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আর ছয়টা রাষ্ট্র মিলে ৪৩ শতাংশ মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে আছে। আমেরিকা আর ঘনিষ্ঠ ছয় রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষ করে গরিব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের ঐকমত্য রক্ষা করার এক ক্লাব সংগঠন আছে, যার নাম গ্রুপ অব সেভেন কান্ট্রিস, সংক্ষেপে ‘গ্রুপ সেভেন’ নামে; প্রতি বছর কমপক্ষে একবার ‘গ্রুপ সেভেন’ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা বসে থাকে, এমন সম্মেলন তারা নিয়মিত করে থাকে। এ গ্রুপ সেভেন আইএমএফের মালিকানার ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এ সাত রাষ্ট্রের মালিকানার বিপরীতে বাংলাদেশের মতো গরিব রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণত এক পার্সেন্টেরও অর্ধেক হয় বলে গ্রুপ সেভেনের পক্ষে ৪৩% মালিকানা দিয়ে পুরা আইএমএফকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য ‘আইএমএফ নিপাত যাক’ বলা সঠিক শ্লোগান হবে না। অথবা আইএমএফ আমাদের দরকার নেই সেটাও সঠিক কথা বা দাবি হবে না। কারণ আইএমএফ নিপাত যাওয়া বা নেই এর মানে আমাদের রাষ্ট্রের জন্যও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য ও পুঁজির বিনিময় লেনদেন এবং মুদ্রাও নাই হয়ে যাবে। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ইত্যাদি আমাদের অবশ্যই দরকার। অর্থাৎ মূল পয়েন্ট হল, ব্যবস্থাটার নিপাত যাওয়া নয় বরং এটা আন ফেয়ার, অসাম্য এক ব্যবস্থা হয়ে আছে একদিকে কান্নি মারা হয়ে আছে। এর অবসান দরকার।
    একালের একটা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার মালিকরা যেমন ওই ব্যাংকের পরিচালনার নিয়মকানুন সবটা নিজের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে এবং দেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হয়ে থাকে, হতে বাধ্য। তবে এ কর্তৃত্বের অধীনে থাকা মেনেও এরপর যতটুকু মালিকানার ইচ্ছা প্রয়োগের সুযোগ থাকে তা অবশ্য করা হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিক মানেই সে-ই মূল নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অথরিটি নয়। কারণ ব্যাংকের মালিক আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অথরিটি আলাদা আলাদা। অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা ঠিক উল্টো। আইএমএফের মালিক রাষ্ট্রগুলোর এক বড় শেয়ার মালিকানা একটা মালিক-জোটের হাতে এবং ঐ জোটই আবার এর নিয়ন্ত্রণ অথরিটি এবং তা অনেক সরাসরি। এই সমস্যার রেডিকেল সমাধান দরকার। একথাটাকেই আরেক ভাষায় প্রায়ই হালকা সরল করে বলা হয় যে, আইএমএফের পরিচালনা সিদ্ধান্তে গরিব রাষ্ট্রের গলার স্বর আরও বেশি বা উঁচু করা দরকার। সারকথায় বললে, আইএমএফের ওপর কর্তৃত্বের চলতি কাঠামো এটা ভাঙা দরকার কিন্তু তা অবশ্যই এটা আবার ঢেলে সাজিয়ে গড়ার লক্ষ্যে। শুধু নিপাত যাক বলাটা সম্ভবত আগের বাক্যের ভেঙে আবার গড়া ধারণার সমার্থক নয়, তাই।
    তাহলে দাঁড়াল, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের জন্য এক দরকারি প্রতিষ্ঠান। যদিও এর সংস্কারও দরকার। বিশেষত আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন, শ্রমের দক্ষতা বাড়ানোর দিক থেকে এর আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকেও এটা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব এসব অর্জনের পূর্বশর্ত এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা থাকা এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা নেই তো বাণিজ্য বিনিময় নেই। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রার মান, যেটাকে আমরা অনেক সময় মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট বলি।
    নিজের ঘোষণাপত্র অনুসারে আইএমএফের ম্যান্ডেটরি কাজ হচ্ছে মূলত দুইটি। বিভিন্ন সদস্য দেশের মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্য রাষ্ট্রের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ এর দিকে নজর রাখা। কোনো রাষ্ট্রের বার্ষিক আমদানি-রফতানিতে আয়-ব্যয়ের চলতি হিসাবের খাতায় আয়ের তুলনায় ব্যয় সেটা ঘাটতি বা বাড়তির দিকে, এটাকেই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বলা হয়। সেদিকে নজর রাখা এবং সেক্ষেত্রে ঘাটতি হলে তা মোকাবিলার জন্য ওই রাষ্ট্রকে ধার ও পরামর্শ দেয়া ইত্যাদি। এখানে লক্ষণীয় যে, নিজ রাষ্ট্র অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি ফেলালে তবেই ধার নিতে হবে। আর ধার নেয়া মানেই সঙ্গের শর্ত-পরামর্শও শুনতে হবে। নইলে নয়। মানে ঘাটতি নেই তো উটকো পরামর্শও নেই।
    আইএমএফ প্রসঙ্গে আর একটা মৌলিক দিক হল, আইএমএফের সদস্যপদ লাভ করতে চাইলে শুরুতেই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এটা ঠিক, চাঁদা বলতে যা বুঝি যে, প্রদেয় চাঁদার অর্থ জমা করার পরে তা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পত্তি হয়ে যায়। আইএমএফের বেলায় এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং আইএমএফ প্রতিষ্ঠানে সব সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামে একটা অ্যাকাউন্ট থাকে, প্রদেয় চাঁদা ওই নিজ অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এটা অনেকটা কোনো আমদানিকারকের মাল জেলায় জেলায় বেচার জন্য জেলা পরিবেশক হওয়ার মতই, যেন আমদানিকারকের কাছে আগে প্রদেয় ডিপোজিটেড বা জমা রাখা অর্থ। এর পরিমাণ কত তা ঠিক হবে বছরে কী পরিমাণ মালামাল নিয়ে বিক্রি করতে পারব এ আকারের অনুপাতে। এবং আগাম জমা রাখতে হবে এমন এক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এরপর যা মালামাল তুলেছি প্রতি তিন মাস পরপর এর বকেয়া মূল্য পরিশোধ করে দিতে হয়। আইএমএফের সদস্য ফি আগাম জমা দেয়া অনেকটা এরকমই এক ব্যবস্থা। কিন্তু এর সুবিধা কী?
    সুবিধা হলো, ওপরে যে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা চলতি হিসাবে ঘাটতি আয়-ব্যয়ের কথা বলছিলাম তেমন কোনো পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ ওই সদস্য রাষ্ট্রকে কতদূর ধার দেবে, তা হিসাব করা হয় এভাবে যে, আইএমএফে আমার রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

    এই ফাঁকে একটা কথা বলার সুযোগ নেই।
    আইএমএফের তহবিলে সব সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ হিসাব করা হয় অদ্ভুত নামের এক ভার্চুয়াল (নামে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই) মুদ্রায়। নামটা হল স্পেশাল ড্রয়িং রাইট বা এসডিআর। এজন্য আইএমএফের মুদ্রার নাম বলা হয় এসডিআর। এ মুদ্রার মান মানে, যেমন কয়টা বাংলাদেশী টাকা দিলে তা এক এসডিআরের সমান হবে, তা কীভাবে ঠিক হয়?
    প্রতিদিন আইএমএফের ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় দেখা যাবে ওই দিনের এসডিআর রেট দেয়া আছে। যেমন আজ ৬ ডিসেম্বর এক এসডিআর = ০.৭২৯৯৮৮ ডলার। এ হিসাবে এক এসডিআর = ১০৮.৪০ টাকা। এখন প্রতিদিনের এসডিআর রেট এটা কীভাবে হিসাব করা হয় বা সাব্যস্ত করা হয়?
    প্রতিদিনে টপ চারটা মুদ্রা আমেরিকান ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড আর জাপানি ইয়েন – এদের বিনিময় হার বাজারে কত ছিল তা থেকে এক গড় বিনিময় হার বের করা হয়। আর সেটাকে ডলারে প্রকাশ করলেই সেটাই ওই দিনের এসডিআর রেট। অর্থাৎ এখন ওই চারটা মুদ্রার গড় বিনিময় হারই ওই দিনের এসডিআর এর মান। আর এসডিআর মান বের করতে শুধু ওই চারটা মুদ্রাকেই বেছে নেয়ার কী কারণ? কারণ, দুনিয়াতে এখন যত ব্যবসা-বাণিজ্যিক লেনদেন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন শীর্ষ চার মুদ্রা ওগুলো তাই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের মুদ্রা তালিকায় সবার উপরের চার মুদ্রাগুলো তাই। আর প্রতি পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করে দেখা হয় শীর্ষ চার মুদ্রা কারা ছিল? যেমন ২০০০, ২০০৫ ও ২০১০ এভাবে। এবারের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এবং গত ১০ বছরের মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছিল চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই বাড়ছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে এবারের আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় আইএমএফের টেকনিক্যাল কর্মীদের গণনা ফলের সুপারিশ এর পক্ষে শেয়ার মালিকানার নির্বাহী বোর্ড সায় দিয়েছে। তাই পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে এখন থেকে মিডিয়া রিপোর্টে আর এক টেকনিক্যাল শব্দের দেখা মিলবে ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা ‘বাস্কেট কারেন্সি’। উপরে বলেছিলাম, চারটি টপ আন্তর্জাতিক মুদ্রার গড় বিনিময় হারই হল ওই দিনের এসডিআর মান। তো এজন্য ওই চার আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে আইএমএফের ‘বাস্কেট কারেন্সি’ বলে। যার ভাবটা এরকম যে, এসডিআর মুদ্রার মান নির্ধারণের জন্য একটা ঝুড়িতে থাকা টপ চারটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে ওখান থেকে তুলে আনা হয়েছে। এবার ওই বাস্কেট কারেন্সিতে চীনা ইউয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে মর্যাদা দেয়া হলো। তবে টেকনিক্যাল রুল হল, আগামী বছর ২০১৬ সাল থেকে এটা কার্যকর হবে। অর্থাৎ আগামী বছর ১ অক্টোবর থেকে ইউয়ানসহ পাঁচ টপ মুদ্রার গড় থেকে আইএমএফের এসডিআর মান নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ তখন থেকে প্রতিদিনের এসডিআর মান কত হবে তা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চীনা ইউয়ান একটা ফ্যাক্টর হবে।
    শুধু কী তাই? না আরও আছে। উপরে আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামের এক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলাম। কত অর্থ সেখানে আগাম জমা রাখতে হবে তা নির্ভর করে আমার অর্থনীতিতে লেনদেনের সাইজ কেমন এরই এক অনুপাতিক পরিমাণ। কিন্তু এতে সাব্যস্ত হওয়া মোট পরিমাণের ৭৫ ভাগ অর্থ জমা রাখতে হয় সোনা অথবা ডলারে। আর বাকি ২৫% নিজ দেশি মুদ্রায়। এটা আইএমএফের জন্মের সময়কার ১৯৪৪ সালের নিয়ম ছিল। কিন্তু দিনকে দিন প্রতিটা সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ বেড়েই চলেছে ফলে সে অনুপাতে আইএমএফের জমা রাখা সোনা ও ডলারের পরিমাণও। কিন্তু দুনিয়াতে সোনা ও ডলার তো অফুরন্ত নয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে ১৯৬৯ সালে বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হয়েছিল। এর ফলে নতুন সংযুক্তি আইন হল, ডলার ও সোনা ছাড়াও বাস্কেট কারেন্সিতে থাকা অন্যান্য মুদ্রাতেও আইএমএফের সদস্য চাঁদা সম্পদ রিজার্ভ রাখা যাবে। অতএব কোনো রাষ্ট্র এখন ইউয়ানেও তার জন্য ধার্য আইএমএফের সদস্য চাঁদার সম্পদ রিজার্ভ রাখতে পারবে। এর অর্থ শুধু আইএমএফে নয়, দুনিয়ার নানা রাষ্ট্র ব্যক্তি বা কোম্পানি সবাই নিশ্চিন্তে এখন থেকে স্ব-স্ব সম্পদ চীনা ইউয়ানে রূপান্তরিত করে ধরে রাখতে শুরু করবে। আইএমএফের হিসাবে ইউয়ানকে বাস্কেটে স্বীকৃতি দেয়ার আগে বাস্কেট মুদ্রাগুলো কতটা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রার দখলে আছে এর হিসাবে ডলারের ভাগে ৪১.৯ শতাংশ, ইউরো ৩৭.৪ শতাংশ, পাউন্ড ১১.৩ শতাংশ আর ইয়েন ৯.৪ শতাংশ। আর আগামী বছর থেকে তা সম্ভবত হবে ডলার ৪১.৭৩ শতাংশ, ইউরো ৩০.৯৩ শতাংশ, ইউয়ান ১০.৯২ শতাংশ, পাউন্ড পাউন্ড ৮.০৯ শতাংশ আর ইয়েন ৮.৩৩ শতাংশ।
    এটা গেল কেবল শুরুতে কার কত বাজার শেয়ার দাঁড়াবে এর হিসাব। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রায় সবাই একযোগে যে কথাগুলো বলছে যেমন, আইএমএফের স্বীকৃতি চীনের দিক থেকে ‘বিরাট রাজনৈতিক অর্জন’ এবং চীনের ওপর আস্থার প্রকাশ ও চীনের জন্য এটা ‘প্রেস্টিজিয়াস বিষয়’। এ ছাড়া মুদ্রা যেহেতু শুধু পণ্য বিনিময়েই কাজে লাগে তাই নয়। সম্পদ ধরে রাখার মুদ্রা হিসেবেও এর কদর আছে। বিশেষত যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার মান বা হার স্থিতিশীল, বাজারের উঠতি মুদ্রা এবং আস্থার মুদ্রা সেই মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সম্পদ রাখতে মানুষ আগ্রহী হবেই। এই বিচারে ব্লুমবার্গ ম্যাগাজিন আগাম অনুমান করে বলছে, প্রথম বছরেই ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখার জন্য বাজারে এক প্রবল জোয়ার উঠবে। এর ধাক্কায় আবার পণ্য বিনিময় বাজারে ইউয়ানের বাজার-শেয়ার বেড়ে যাবে। আর ততটাই ডলার বাজার হারাবে। এ রকম কিছু চেন রিয়াকশন বা চক্রাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার কিছু মিডিয়ার ঈর্ষা ছড়ানোর প্রপাগান্ডাও আছে। যেমন কেউ কেউ সন্দেহ বাতিকের রিপোর্ট করেছে, আইএমএফ কি আসলেই ঠিক মতো যাচাই করে দেখে বোর্ডের কাছে সুপারিশ করেছে? এ রকম। তবে খোদ আইএমএফ এ দিকটা আগেই আঁচ করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার দিনেই আইএমএফ নিজ ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় ‘সহসাই যেসব প্রশ্ন উঠে’ শিরোনামে নিজেই প্রশ্নোত্তরে এসব সন্দেহ-কৌতূহলেরও বহু আগাম প্রশ্নের বাড়তি জবাব দিয়ে রেখেছে। অনেক বেশি আন্তরিক আর খোলামেলাভাবে সেসব জবাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের মতো বহুরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানের চীন ও আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান বিরোধের বেলায় সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের ভূমিকা কী হলে সঠিক হবে, সে প্রশ্নে এপর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা একেবারেই প্রফেশনাল অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষ নিতে চাননি। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তিনিরপেক্ষভাবে যা সত্য, যা সঠিকÑ এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। যেমন, আইএমএফের সংস্কারের দাবি বিষয়ে তাদের অবস্থান সংস্কারের পক্ষে। আর তাদের সুপারিশের ফাইল আমেরিকান সিনেটে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। চীনা ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নেও আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের একই ধারাবাহিকতার অবস্থান দেখা গিয়েছে। ইউয়ানকে আমলে নিয়ে আইএমএফের সম্পদের ইউনিট গণনা আগামী বছর থেকে শুরু হবে বলা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি কোম্পানির ধরে রাখা সম্পদ ইউয়ানে রূপান্তর করে রাখার ঝোঁক এ বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবে কি দাঁড়ায় সেটি দেখা যাক।

    গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এবং একই প্রসঙ্গে ০৭ ডিসেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছিল। সে লেখা দুটো একসাথে মিলিয়ে আরও সংযোজন ও আবার এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]