Tag: অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন

  • ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চায়, জানে?

    ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চা্‌য়, জানে?

    গৌতম দাস

     ২২ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-34w

     

    ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এরা নাকি পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন একটা অনুমান-পারসেপশন অনেকের মধ্যে আছে। একথার হয়ত কিছুটা সত্যতাও কেউ কেউ দেখাতে পারবেন। এরপরেও  সেটা যত ঘনিষ্ঠই কল্পনা করা যাক না কেন, শেষ বিচারে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে এরা দুটো একেবারেই আলাদা রাষ্ট্র।  আমের মওসুম এটা, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে যেন এখন – সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার একটা গল্প আছে, তাই যেন কেউ আনতে চাইছে।

    সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার গল্পঃ
    ছোটবেলায় বৈশাখ মাসের ঝড়ে আম কুড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একালের ঢাকা শহরে যারা বড় হচ্ছেন তাদের জীবন-অভিজ্ঞতার সাথে মিলবে না হয়ত। তবে যারা পুরনো দিনের বা জেলা শহরে বা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের এমন অভিজ্ঞতা আছে। তেমনি এক কালবোশেখি ঝড়ে আম কুড়ানোর বিকেলের ঘটনা। আট-দশ বছর বয়সের বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে বিকেলে ঝড় উঠতেই আম কুড়াতে ছুটছে। বাগানে গিয়ে আম কুড়ানোর ধুম লেগেছে। কিন্তু বন্ধুদের একজনের যেন কোনো ঘুম নেই। দেখতে-শুনতেও সে অন্যদের চেয়ে একটু যেন আলাদা, সবার চেয়ে লম্বাতেও হয়ত একটু বেশিই হবে। সে আম কুড়াচ্ছে না।
    কিন্তু আবার প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারণ সে বরং সবাইকে আম কুড়াতে বাধা দিয়ে বেড়াচ্ছে – “এই আম নিবি না, রাখ” – বলে হাত থেকে আম কেড়ে ফেলে দিয়ে পরের জনেরটা কাড়তে যাচ্ছে। এভাবে সবার হাত থেকে আম ফেলে দিচ্ছে। আর মুখে বলে চলছে, “আমার খালাত দুলাভাইয়ের চাচার বাগানের আম, তোরা কেউ আম নিবি না”। কিন্তু এখানে সমস্যাটা হল, বাধাদানকারী একজন আর কুড়ানেওয়ালা বাকি সবাই। ফলে সবাই বিকল্প উপায় খুঁজতে গিয়ে কিছু সুযোগ পাচ্ছে। অন্যকে বাধা দেয়ার সময় কিছু না কিছু ফাঁকফোকর পেয়েই যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দু’চারটা করে আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। এদিকে একসময় ঝড় থেমে গেছে। সবাই যার যার বাড়ির পথে। কিন্তু অবাক ব্যাপার। দেখা গেল সবারই হাতে-কোচড়ে দু-চারটা করে আম আছে। বাধাদানকারী মেয়েটার ভাগে একটাও আম নেই! কারণ সে যখন পুরো সময়টা সবাইকে বাধা দিতে গিয়ে নষ্ট করেছে, অন্যরা প্রত্যেকে সেই ফাঁকে দু-চারটা করে আম সংগ্রহ করে নিতে পারলেও সে নিজে কিছুই পায়নি।
    গল্পটার মরাল হলঃ হিংসা বা ঈর্ষা না, এর ইতিবাচক ফল নাই; তাই বরং কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে নিজ শ্রম-উদ্যোগ কাজে লাগালে ভাগ্য কিছুটা ফিরতেও পারে।

    থিংকট্যাংকের মাহাত্ম্যঃ
    কথাগুলো মনে হল ভারতের এক জয়িতা ভট্টাচার্যের একটা রচনা দেখে। যেন তিনি সেই ঝড়ের সময় সবার কুড়ানো আম ফেলে দিয়ে বেড়ানো ছোট মেয়েটা। জয়িতা ভারতের ‘ওআরএফ [ORF]’ মানে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে এক থিংকট্যাংকের ফেলো। সম্ভবত আসামের শিলচরের মেয়ে তিনি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেছেন।

    আমেরিকান সমাজের পলিটিক্যাল কালচারে রাষ্ট্র-সরকারের নীতিনির্ধারণে বা পলিসি সাব্যস্ত করতে পক্ষ-বিপক্ষের পয়েন্টগুলোকে নিয়ে গুছিয়ে জোরালো করে তুলে ধরতে অনেক স্টাডি ও গবেষণা করতে হয় অথবা কখনও কনসেন্সাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কাজটা – আমেরিকান সমাজ সেগুলো থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করে থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা নন-প্রফিট ফাউন্ডেশন টাইপের কাঠামোর হয়ে থাকে। যদিও একটা দুর্ভাগ্য যে, একালে এসে লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক সময় থিংকট্যাংক গড়ার নামে এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান গড়া ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকা চলতি শতকে এসে যখন এখাতে ভারতের দিকে তাকিয়ে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করেছে। এমনিতেই আরেক দেশের অর্থে থিংকট্যাংক গড়া- এটা থিংকট্যাংক ধারণার মৌলিক ভিত্তিরই বিরুদ্ধে। কারণ থিংকট্যাংক তো গড়া হবে নিজ দেশেরই নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি গবেষণার জন্য। কাজেই এ’খাতে অন্য-রাষ্ট্রের যেচে অর্থ দিতে আসা মানে এতে দাতাদেশের সরাসরি স্বার্থ ও চিন্তায় প্রভাব ছড়ানো শুধু নয়, এটা প্রায় ঐ দাতা দেশের ফরেন পলিসির বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তামশার দিকটা হল প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সবখানে এক “আত্মম্ভরিতা” মানে স্বনির্ভরতার গল্প বলে বেড়ানো ভারত সে-ই, প্রথম রাষ্ট্র যে আমেরিকার টাকায় ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে ভরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কেন?

    সোজা কথাটা হল, চীন-ভারত দুরাষ্ট্র যেন পরস্পর থেকে দূরে থাকে, পরস্পরকে চরম ও একমাত্র ‘শত্রুজ্ঞান’ করে দূরে থাকে এটাই আমেরিকা নিশ্চিত করতে চায়। এদের পারস্পরিক প্রবল রেষারেষি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেন এরা লিপ্ত ও ডুবে থাকে, ঈর্ষায় থাকে এটাই আমেরিকান স্ট্র্যাটেজি। আমেরিকা এখনও বর্তমান গ্লোবাল লিডার যদিও দ্রুত এটা শুকিয়ে আসছে, ক্ষীয়মান। আর বিপরীতে চীন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, নেতৃত্বের জায়গাটা সে দখল করবে এটাই এর অভিমুখ। এখন ভারত যদি চীনের পাশে দাড়ায় তবে এই  অনিবার্য রদবদলটা ঘটবেই তবে এবার দ্রুত হতে থাকবে।  আমেরিকা যদি ডুবতে বসা এক বর্তমান হয় তবে চীন পাশে ইন্ডিয়া এক সম্ভাব্য আগামি। এখন  আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতায় পতন আর চীনের উত্থানের একালে তাই আমেরিকার চাওয়া ও তার ভয় হল যে চীন-ভারত যেন আমেরিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আগামীর নেতৃত্ব হয়ে একজোটে দাঁড়িয়ে না যায়। ফলে এর সোজা হিসাব হল, চীন-ভারত যেন রেষারেষির সম্পর্কে খাড়া হয়ে থাকে সবসময়। আর এখানে সবচেয়ে বড় ইনপুট যেটা দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি নাকি সবার চেয়ে (চীনের চেয়েও) উপরে যাবে এমন কথা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর তাই ভারত, বাস্তবতার সাথে মিল না পেলেও ‘যদি লাইগা যায়’ এই লোভে, ভারত চীনের সাথে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে বরং অস্থিরতায় একধাপ আগালে তিনধাপ পিছিয়ে যায়। এ কাজগুলোই নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে করিরে নিচ্ছে আমেরিকার কিছু থিংকট্যাংক যারা ভারতে এর শাখা খুলেছে।

    আবার এটাও খুবই সম্ভব যে ভারত বিরাট কিছু হওয়ার লোভ করতে গিয়ে আমেরিকান পরামর্শের ফাঁদে পড়ে , ভারত আর হয়ত চীনের সহযোগী আগামির স্থানটাও নিতে পারল না। বরং আমেরিকান লোভ-উস্কানি বা পরামর্শে ডানে-বায়ে চীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেটুকু সফল হওয়ার ভারতের সম্ভাবনা ছিল সেটুকুও ভেসে গেল। এমনও ঘটে যেতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। কারণ, ভারত যদি দুনিয়ার আগামি বা আগামির মূল সহযোগী বলে নিজেকে মনে করে তবে ভারতকে অবশ্যই মানতেই হবে আমেরিকা তার পথে বাধা অর্থে এনিমি। কারণ আমেরিকার বর্তমান অবস্থান থেকে সে যদি চ্যুত না হয় তবে ভারতের ভাগ্য খুলতে পারে না। অথচ তামশাটা হল, ভারত আমেরিকার হাত জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে চাচ্ছে, আর মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে কিছু একটা হওয়ার। যেটা আমেরিকার হাত ধরে অর্জন তো হবারই নয়।

    আমেরিকা যেমন চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তেমন ভারতের কাছেও আমেরিকা নিশ্চয় হারতে চাইবে না। অথচ এ কথাটা ভারতের কানে নিচ্ছে না, কোনো আমলই করে না। বরং ধরে নিয়েছে আমেরিকা তার বন্ধু থাকবে। এসব কারণেই ভারতের কোন ধরণের কোন অর্থনৈতিক শক্তির কিছুই না হয়ে ফলাফলে, কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে না ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। এছাড়াও ভারতের আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র-কাঠামোগত  দুর্বলতার দিক  আছে যেমন অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বলতা হল কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব। মানে এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ঘাড়ে উঠে থাকতে চায় – ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নামে।

    তবে ভারতের বিপুল এক ভোক্তা জনগোষ্ঠী আছে, যা তার নিজের জন্যই এটা চীনের মতোই বিশাল তবে তুলনায় একটু ছোট) এক বিরাট সম্ভাব্য রেডি বাজার। এই ফ্যাক্টরটা ছাড়া ভারতের সব কিছুই প্রায় নেগেটিভ জোনে। কাজেই কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) আর পজিটিভ এটিটিউড লাগবে, খুবই জরুরি এটা। অন্যের ক্ষতি করে বেড়ানো কারও অন্তত ভারতের বেলায়, তার জনজীবনের লক্ষ্য হতেই পারে না। এটি কী সবার আগে ভারত বুঝবে? দেখা যাক!

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখাগুলো যা ভারতে খোলা হয়েছে এরা আবার কাঠামোর দিক থেকে বিদেশী এনজিও গোত্রের। আর ভারতে ওদের বড় অফার হল, ভারতীয় স্টুডেন্ট-একাডেমিকদের পিএইচডি বা মাস্টার্স বিদেশে পড়তে স্কলারশিপ দেয়া। এটা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির উপর একে প্রলুব্ধ করে বিপথগামি বা বিভ্রান্ত করে ফেলার বিরাট পদক্ষেপ। আমেরিকা বিগতা অর্থনৈতিক শক্তি। অথচ এর স্বপক্ষে ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মনকে কব্জা করে সাজিয়ে নেয়া, মূল লক্ষ্য ভারতীয় মনকে কনফিউজ করে রাখা। । এর কাজ হল  ক্যারিয়ারের লোভে এরা ভারতে বা জাপানে বসে চীনা তৎপরতার এটা বা সেটা খারাপ, চীনা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খারাপ এসব কথা প্রচার প্রপাগান্ডামূলক কাজ অথবা  ক্যাম্পেইন-মূলক গবেষণা স্টাডিতে এসব ভারতীয়দেরকে এনগেজ করে রাখা। গত ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর থেকে এসব কাজের ধারা শুরু হয়েছিল। পরে ওবামার আমলে তুঙ্গে উঠেছিল ডালপালা বিছিয়ে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে এসে ২০১৭ সাল থেকে ট্রাম্পের আধাখেচড়া জাতিবাদী  ধারণার ধাক্কায়  আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলোর  আগের প্রায় সব অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই সাথে, ভারতকে দেয়া আমেরিকায় বিশেষ রফতানি সুবিধা (যেন চীনবিরোধী হওয়ার বুকিং মানি) যা কিছু আগে ওবামা আমলে দেয়া হয়েছিল সব গুটিয়ে ফেরত নেয়া হয়। সারকথা ট্রাম্পের আমেরিকা এ ব্যাপারে আমেরিকানদের কোন লাভ হচ্ছে কিনা এনিয়ে হতাশ ও হয়রান, সন্ধিহান হয়ে উঠেছিল। থিংকট্যাংক এনজিওগুলো তাই ট্রাম্প আমলে এসে ফান্ড অনেক গুটিয়ে ফেলেছে। তবে “চীনা ঋণের ফাঁদ”, “চীনা ঋণের শোষণ” ইত্যাদি এসব ক্যাম্পেইনগুলো এখনও এরা চালিয়ে যায়।

    তবে ওআরএফ এর গঠন ঠিক একইরকম নয়, ব্যতিক্রম। ওআরএফ এটাও দাতব্য অবশ্যই, তবে মুখ্যত স্থানীয় ব্যবসায়ী – রিলায়েন্স গ্রুপেরই প্রায় একক দানের অর্থে পরিচালিত। কিন্তু আমেরিকান  থিংকট্যাংকগুলোর সাথে ওআরএফ এর সবচেয়ে কমন মিল ও সম্পর্কের দিকটা হল, ওআরএফসহ সব থিংকট্যাংক পরিচালিত হয় ওই একই আমেরিকান চীনবিরোধী বয়ানভাষ্য ও নীতির অধীনে। আমেরিকার তৈরি যে অভিমুখ। আমেরিকান মাদার থিংকট্যাংকগুলোতে বসে যেসব চীনবিরোধী যুক্তি বয়ান তৈরি হয় সেগুলো সারা ভারতের সব থিংকট্যাংকই আউড়িয়ে যেতে থাকে। তবে লক্ষণীয় যে ভারত সরকার বেশির ভাগ সময়ই নিজের সরকারি ভাষ্য বা অবস্থানে ওইসব বয়ানকে য়ানে না, মূলত এড়িয়ে চলে। এর সম্ভাব্য কারণ, এই চীনের সাথেই তো ভারত সরকারের যৌথভাবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক, এআইআইবি ব্যাংক [AIIB]  অথবা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] ধরনের জোট তৎপরতায় অংশ নিয়ে থাকতে হয়।

     ওআরএফ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এখন কেনঃ
    সারা দুনিয়ার মত করোনাভাইরাসে বাংলাদেশেও খারাপভাবেই আক্রান্ত। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট করার সুযোগহীনতা বা চিকিৎসাহীনতার চরম দিনগুলো পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রায় ৬০টির মতো টেস্ট-সেন্টার খুলতে সক্ষম হয়েছে তত দিনে আবার এখন দিনকে দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডেড সংখ্যাটাই বিপজ্জনকভাবে বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। হাসপাতালে একটা সিটের খোঁজে পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে করতেই রোগী মরে শেষ এমনই অবস্থা। এমনিতেই আমাদের সরকারের ম্যানেজমেন্ট সামর্থ্য সামলিয়ে যতটুকু যা রিসোর্স বা স্বাস্থ্য বাজেট আমরা জড়ো করতে সক্ষম সেটাও দুর্নীতির কারণে লোপাট হচ্ছে। যার সারকথাটা হল, এক চরম ম্যানেজমেন্ট ফেল করা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। বের হওয়ার উপায় নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সমস্যার কারণে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রেনিং বা দক্ষতা বাড়ানো পর্যন্ত আমাদের রিসোর্স পৌঁছাতে পারে না। করোনার আবির্ভাব আমাদের সবাইকে উদাম করে ছেড়েছে, নিজেদের অযোগ্যতায় নিজেরাই এখন চরম বিপদে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই হুমকি দিচ্ছেন ‘এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দিতে পারব না।’ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থা যদি চূড়ান্ত ফেল করে তবে এরপর পুরা আইনশৃঙ্খলাই ফেল করতে আর সময় লাগবে না।

    দেরিতে হলেও করোনা মোকাবেলায় একশন গত মার্চের শেষে আমরা যখন শুরু করি তখনই অনেকে জানতেন যে আমাদের জন্য সামনে অনেক রিস্ক অপেক্ষা করছে, আমরা ঢুকছি। যারা দূরেরটা আগে দেখতে পেয়ে যান; তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমরা কঠিন বিপদে পড়ে গেলে শেষ পর্যায়ে আমাদের এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার একটাই সম্ভাবনা আছে যে চীনের সাহায্য সহায়তা যদি পেয়ে যাই, দুয়ার খোলে যদি । কারণ করোনা যা দাবি করে আর আমাদের যা সামর্থ্য এ দুইয়ের গ্যাপ মিটাতে সক্ষমতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র চীনা সহায়তা।
    ঘটনাচক্রে সেটাই এখন বাস্তব, আমরা তারই মুখোমুখি। আমাদের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, ইতোমধ্যেই চীনা সাহায্যকারী টিমও এখন ঢাকায়।

    আমরা উদ্যোগ নিতে পেরেছি এটা ভালো খবর অবশ্যই। সব সরকারই কোনো খারাপ অবস্থায় হাতের কাছে যা আছে ও সম্ভব তার সবই কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয় আমরা এমন কোনো সরকার দেখার আশা করি না যারা বুঝছেন তাদের কোনো ভুল বা ব্যর্থতায় বা কোনো গ্যাপে শেষে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে, অথচ তারা সেটা দাঁড়িয়ে কেবল দেখছেন! এটা তো হতে পারে না!

    তবে এরপর আরেকটু আছে, চীনেরই আরেকটা প্রোগ্রাম আছে ‘সিস্টার সিটি অ্যালায়েন্স’ [China wants ‘sister cities’ in Bangladesh]। পত্রিকার ঐ রিপোর্ট বলছে, চীনা টিম আমাদের ঐ এলায়েন্স প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হতে পারি বা চাই কিনা এর দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। তা নিয়ে সরকারি নানা পর্যায়ে কথাবার্তা এখনো চলছে।

    কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্যের লেখা দেখে বুঝা যাচ্ছে, এনিয়ে তাঁরা খুবই ক্ষেপে উঠেছেন।, ওই চীন-বাংলাদেশ সরকারপ্রধান পর্যায়ে টেলিফোন আলাপ ঘটার পর থেকেই। যেন তিনি বলতে চাইছেন আমার “দখলি প্রিয়া” কেন অন্যের সাথে কথা বলল। কিন্তু
    সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশটা ইন্ডিয়া নয়। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে চীনের টিম বা উহান সিটির কর্তাদের আমরা কেন দেখব?  আমরা দেখতে পারব না। আমাদের প্রয়োজনের চোখ দিয়েই আমরা দেখব?

    বলা বাহুল্য, করোনা প্রসঙ্গে আমাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে সীমা কী তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই। তাই চীনা বন্ধুদের আমরা দেখব আমাদের খারাপ সময়ের  সহায়তা-দাতা হিসেবেই। এই দাতা যাদের নিজ শহর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, দক্ষতা আছে, দক্ষ জনবল আছে, সব রিসোর্স আছে যারা আমাদের শিখিয়ে নিতে দিতে সহায়তা করতে পারবে। আর সর্বোপরি যাদের আগ্রহ আছে। এখন খাদের কিনারায় ঠেকে যাওয়া আমরা কোন ‘সিটি অ্যালায়েন্স চুক্তি’ তে যুক্ত হই আর নাই হই – করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চীনা সহযোগিতা খুবই দরকার। এ হলো বাস্তবতা। তাহলে আমরা কেন তা নেবো না?

    ভারত পছন্দ করছে না তাই?
    কোনদিক দিয়েই  ভারতের অবস্থান ও সক্ষমতা কোনোভাবেই চীনের কাছাকাছি নয়। না রিসোর্সের সক্ষমতায়, না অভিজ্ঞতায়। এর উপর ভারতেরই এখন অথবা আগামী মাসে করোনা সংক্রমণের পিক সময়কাল আসে কিনা এ নিয়ে তারা চরম এক হিমশিম অবস্থায়। এছাড়া আরো বিরাট এক সমস্যা আছে। ভারত থেকে সহায়তাকারী কোনো টিম এসেছে এমন যদি হয় তবে ওই টিমকে সাধারণ মানুষই গ্রহণ করবে না, এটা আমাদের আগে খোদ জয়িতাই জানেন! তিনিই লিখেছেন আমরা ভারতীয়দের পছন্দ করি না। তাহলে?

    পাবলিকের উপর গোসসা করা  – যারা পাবলিক নিয়ে ডিল করেন যেমন কোন গবেষক তিনি কখনই তা করতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন পাবলিকের উপর রাগ করা গোসসা দেখানো তার কাজ এক্তিয়ার একেবারেই নয়। কাজেই সাবধান! জীবনে ভাল সফল গবেষক হতে চাইলে তার উচিত হবে বরং পাবলিক কেন ওরকম বা সেরকম হয়েছে বা আচরণ করছে সেটা খুজে বের করা, এটা বের করতে জীবন লাগিয়ে দেয়া। সস্তা দেশপ্রেমিক হবেন না।

    ইন্ডিয়ার সমস্যা এটা যে, নিজের আকার আকৃতি বা অবস্থানের ব্যাপারেও তার সঠিক ধারণা নেই। তাই ভান করে যেন সে এক পরাশক্তি। যেমন দেখেন, বাংলাদেশের এক পত্রিকা মালিক সম্পাদকের উপজেলার পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য প্রজেক্টে ভারত তাতে মাত্র কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। অথবা ধরেন মফস্বলের একটা কলেজের কয়েকটা ঘর দোতলা করতে হবে তাকে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়ে দিল। আর ভারতের হাইকমিশনার সেটা আবার ঘটা করে উদ্বোধনও করতে গেছেন। ভারতের ধারণা এতে এবার ভারতকে দাতা দেশের আসনে বসতে জায়গা দেয়া হবে। অথচ বুঝতে চেষ্টা করল না যে, সব রাষ্ট্রেরই অনুদান দেবার সক্ষমতা থাকতেই হবে এর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কোন ঘটনাটা নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলবে এটা তো সকলেরই অবশ্যই বুঝার ক্ষমতা থাকা উচিত! তাই না!
    আবার দেখেন, এবার করোনা শুরু হলে সার্কের নামে একটা ফান্ড তৈরি করতে হবে বলে হইচই করা হল। কেন? সত্যিই অর্থপূর্ণ সাঙ্ঘাতিক কিছু কী তারা করতে চেয়েছিল?
    ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (যেটা ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট) এটা করোনার ওষুধ বলে যা এখনও প্রমাণিত নয় – অথচ এটাকেই মোদীর পক্ষ থেকে করোনা নিরাময়ের ওষুধ বলে দান করে গেলেন। শুধু তাই নয়, জানিয়ে গেলেন ওই ওষুধের দাম মোদীর দেয়া চাঁদার ভাগ থেকে কাটা যাবে। বুঝেন মোদী-ফান্ডের কী মহিমা! এতে দুটো ঘটনা ঘটল। এর একটা অপরাধ। কারণ আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনহীন একটা ওষুধ আমাদের দেশে আমদানি করা হল। আবার এটা তো ডাক্তারেরা ব্যবহার করতে বলতে পারবেন না। অন্তত আইনি ঝামেলায় পড়বেন। আর এটা করোনার বিরুদ্ধে কাজ করবে এর কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই এখনো শেষ হয়নি,  ফলে প্রমাণিত কোনো ওষুধ নয় এটা। ফলে আমাদের ওষুধ প্রশাসনেরও কোন অনুমোদন দেয়ার সুযোগই নেই। মানে যেন দাওয়াত দিয়ে কাউকে গরম ভাতের বদলে পান্তা খেতে দেয়া যায়? আপনি তাই করলেন।

    এদিকে, জয়িতা বলতে চাইছেন এই ‘সিটি অ্যালায়েন্সের’ অফারের মধ্যে চীনা “বেল্ট-রোড প্রকল্পের” সম্পর্ক আছে। আর এটাতে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে”।  আসলে দুনিয়ার অনেক সমস্যারই জন্ম হত না। হয়েছে এস্টিমেশন থেকে মানে নিজেকে মাপতেই শিখে নাই। শিক্ষা নেয় নাই কখন। বিশেষ করে দুচারজন  বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার এরকম। এরা পোস্টিং পেয়েই মনে করা শুরু করে তারা বাংলাদেশের রাজা না হলেও কিছু অংশের মালিক হয়ে গেছেন!  আচ্ছা ধরা যাক, বাংলাদেশে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে””  [The Chinese motivation exceeds the promotion of cultural ties and it has a larger Geo-strategic objective…]।  আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে বেল্ট-রোড প্রকল্প – এই ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের চীনা “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য নাই।  কিন্তু সাবধান প্রশ্নটা “আছে কিনা” এর নয়, এটা একেবারে মুরোদের প্রশ্ন। এজন্য বাইরের কারও দিকে তাকানোর আগে নিজের মুরোদ চেক করা উচিত! তাই না! তাই প্রথম প্রশ্ন হল,  তাতে ভারতের কী সমস্যা? যার মুরোদ নাই আসলে তার কোন সমস্যা কী আমলযোগ্য? ভারতই বলুক! আচ্ছা এছাড়া আরও কাহিনী আছে! দেখেন  অফার তো বাংলাদেশকেই করেছে তাই না? ভারতকে তো করে নাই? নাকি? কাজেই প্রতিক্রিয়া যা দেখানোর তা বাংলাদেশই দেখাক। অন্তত বাংলাদেশকে দেখাতে দেয়া উচিত। এজন্যই বলে ওভার-এস্টিমেশন একটা গভীর অসুখ!

    আসলে, বুঝা গেছে সমস্যার গোড়াটা মেন্টরের। জয়িতার মেন্টর-মুরুব্বি সম্ভবত বলে দিতে ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশ কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এমন ধারণা জয়িতার মুখ দিয়ে প্রকাশ পেলে  লোকে জয়িতাকেই বেকুব বলবে!

    আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। ভারতে কী চীনা ঋণে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প চালু নেই? খোদ মোদীই মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই একাজে দক্ষ্মহস্ত নয়?  ভারতে কোনো নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণ অথবা রেলের অবকাঠামো বা রেলকর্মী ট্রেনিং ইত্যাদি? এগুলো কাদের বিদেশি অবকাঠামো প্রকল্প? এখানে ভারতে চীনা রাষ্ট্রদুতের একটা সাক্ষাতকার আছে ২০১৫ সালের এপ্রিলের সেকালের চীনা প্রজেক্টের হদিশ মিলবে এখানে।  এটাই  মোদীর ক্ষমতায় আসার পরে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝাপিয়ে পড়া ছিল।  আমরা এই একটা নমুনা থেকে অ-নে-ক নিশ্চয় জানবে পেরে স্বর নিচা করব! এখন কথা হল,  তাহলে সেগুলোতে কী “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে” তা ভারতের মনে হয়নি? নাকি সব জিও-স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার কেবল বাংলাদেশের চীনা প্রকল্পের বেলায়? যত্তসব বিরক্তিকর কাণ্ড!

    আর জয়িতা “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” খুজতে বাংলাদেশে এসেছেন? ভারতের মিডিয়া খবর লিখছে ভারতের ওষুধের বাজারের ৪০% কাচামাল বা তৈরি ওষুধ আমদানির দিক থেকে নির্ভরশীল।  সেই চীনের কাছে গালয়ানে মার খেয়ে এসে এখন চীনাপণ্য বয়কট আউড়াইতেছেন, “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য বুঝতে আইছেন?  তো চীনা ওষুধ বা কাঁচামাল কী এখন আমদানি বন্ধ করতে পারবেন? এই আপনাদের স্ট্রাটেজিক বুঝ?  যে চীন ভারতের প্রথম সম্ভাব্য এনিমি তার কছেই আপনি ওষুধের মত জীবনরক্ষাকারি পণ্যে নির্ভরশীল। আর মুখে সেই গান্ধীর আমল থেকে আউড়াইতেছেন আত্মনির্ভরতা? অথচ এই আত্মনির্ভরতা শ্লোগানটাই বহু আগে থেকেই ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত। অথচ ভারতের রাজনীতিকদের সে হুশই নাই।  আপনারা আসলে কাকে ফাঁকি দেন? চীনা ওষুধ বা কাচামাল সবচেয়ে সস্তা আর এই সস্তা থুয়ে অন্য জায়গায় যাবার মুরোদ কী ভারতের আছে, কেমনে সে মুরোদ অর্জন ক্রতে হয় তাও তো জানেন না। সস্তা দেখলে যেখানে কাপড় ঠিক রাখা মুশকিল – এমনই অর্থনীতি আপনারা বানাইছেন? আবার এই অবস্থায় আইছেন আমাদেরকে “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” বুঝাইতে? হা হা হা কী তামশা……

    আবার কিছু কথা তো একেবারেই পরিষ্কার। যেমন বেল্ট-রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে যুক্ত আছে সেই ২০১৬ সাল থেকে। এটা তো লুকানো নয়। এ নিয়ে একবার আমাদের অবস্থান ইন্ডিয়াকে জানান দিতে গিয়ে য়ামাদের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে ছোটখাটো একটা বিতর্কও হয়ে গিয়েছিল সে সময়। অর্থাৎ এই ফ্যাক্টসটা প্রতিষ্ঠিত। তবে ভারতের নিজের জন্য এই বেল্ট-রোড প্রকল্প হারাম বলে মনে করতেই পারে ভারত। এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো, তা করুক। কিন্তু তাহলে ভারতের জন্য যা হারাম তা আমাদের ওপরও হারাম বলে চাপানোর চেষ্টা কেন?

    এখন চীনের ‘সিটি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের’ সাথে যদি বেল্ট-রোড প্রকল্প যুক্তও থাকে আর তাহলে তা ভারতের জন্য “সন্দেহের উদ্রেক” [raised suspicions ] করলেও বাংলাদেশের তাতে কী? কারণ আমরা তো বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ হয়েই ঢুকে আছি। কাজেই ভারতের ‘সন্দেহের উদ্রেক’ আমাদের ঘাড়ে চড়াবার তো সুযোগ নেই। ভারতের নিজের ঘাড়েই এটা রাখতে হবে জয়িতাকে। তিনি নিশ্চয় আশা করবেন না যে আমাদেরও চীনকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করতে হবে! আশা করি জয়িতা পরিষ্কার থাকবেন, নাকী!

    জয়িতার চীনা শোষণ তত্বঃ
    আবার আরেক বিপদ। জয়িতার দাবি বেল্ট-রোড প্রকল্প বিভিন্ন রাষ্ট্রকে এতে ঢুকিয়ে নেয়ার এটা নাকি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে চীনা ঋণগ্রস্ত করে ‘ঋণের বোঝা’ চাপানোর আর ‘শোষণের’ প্রকল্প [debt burden and the exploitation by China]। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য তাহলে বলেন, ভারতও কেন নানা ধরনের চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলে সেটা আবার কোন চীনা শোষণের পাল্লায় পড়ার জন্য? আমি অবশ্য ভুটানে ইন্ডিয়ান লোন কত তানিয়ে কিছু বলছি না। জয়িতা নিজের ক্রাইটেরিয়াতে নিজেই চেক করে দেখতে পারেন।

    আবার এখানেই শেষ নয়। চীনা-বিশ্বব্যাংক এআইআইবি-তে সেখানে চীনা (শোষকের) সাথে ভারতই তো প্রধান পার্টনার-মালিক হয়ে আছে। আবার ভারত একই শোষক চীনের সাথে ব্রিকস ব্যাংক খুলেছে? এর মানে কী, তাহলে কি ভারতও শোষক? বলেন কী? না না – জয়িতা আপনাকে অনেক পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে!

    এ জন্যই বলছিলাম, কেউ আজকাল ন্যূনতম হোমওয়ার্ক না করে লিখতে বসে না। থিংকট্যাংক বলতে আমেরিকানরা গবেষণা কাজ বোঝাত। অথচ আজকাল থিংকট্যাংক আর প্রপাগান্ডা কাজ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। যারা প্রপাগান্ডিস্ট তারাই গবেষক বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এমন দুর্দশার কথা কারে বলি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২১ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  সেদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

    ‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

    গৌতম দাস

    ৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

    https://wp.me/p1sCvy-2sr

     

    থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

    কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

    যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

    এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

    আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
    ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

    এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
    ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

    সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

    সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
    ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

    চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

    মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

    মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
    এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

    তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
    তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

    তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

    এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

    আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

    ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

    সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

    Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]