Category: Stephen Biegun

  • আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3dR

    Biegun-Momen joint Press meeting

    আমেরিকান ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের দু’দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম যে মন্তব্য করার আছে সেটা হল, এতে তাৎক্ষণিক কোনো ফল আসেনি বা আসছে না তা বুঝা গেছে। কিন্তু এর মানে কী আগামীতে আসবে? না। সেটাও একেবারেই অনিশ্চিত এবং সম্ভবত, না। বরং এশিয়ায় আমেরিকা এক চির-অথর্ব শক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

    যদিও আপাতত, আমেরিকার দিক থেকে বললে তারা যে ফলাফলের আশায় আর যে বুঝাবুঝিতে বাংলাদেশকে রাজি করানোর পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল তা তাৎক্ষণিক ফল দেয়নি, মানে কাজ করছে না, এটা তারা বুঝেছে। এ যাত্রায় তাতে দেরি হবে, সময় লাগবে এমনকি কখনো না-ও হতে পারে। এখন আমেরিকা যদি একটা ইতিবাচক ফল চায় তবে এই রাস্তায় হবে না। ভিন্ন রাস্তা ও কৌশল ধরতেই হবে। তাহলে কী হবে এখন?

    ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়েছে নাকি-আলাপ হয়নিঃ
    ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ জিনিসটা কী? স্ট্রাটেজি নাকি নেশনস বা ভিশন অথবা জোট বা সমিতি? আজও তা আমেরিকাও জানে না। তবু ভারতের মিডিয়াকে অনুসরণ করে এবার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (বা সংক্ষেপে আইপিএস [Indo-Pacefic Strategy, IPS]) বলতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু প্রো-ইন্ডিয়ান মিডিয়াকে। যেখানে খোদ আমেরিকাই এখনো একেক সময় একেকটা শব্দ ব্যবহার করে অস্থিরতা প্রকাশ করে যাচ্ছে। আমেরিকান কূটনীতিকরা আর গ্লোবাল নেতা থাকছেনা বলে আমেরিকার ওজনের ভারে কিছু কাটতে পারছেন না। তারা বললেই হয়ে যাচ্ছে না। বহু কাঠখড় পুড়িয়েও সময়ে তা থেকে কিছুই মিলছে না। সবকিছু দ্রুতই যেন দিন ফুরিয়ে আসছে, এমন দশা। এ দিকে বিগানের বাংলাদেশে আসার পর দেখা যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক “বিজনেস ফোরাম” বলে আরেক নতুন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। শব্দটা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মানে রাষ্ট্র যারা ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্ত হবেন তাদের একটা ইকোনমিক বা বিজনেস জোটও থাকবে, তাই মনে হচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দিক থেকে দেখলে এটা যেন বিগানকে দেয়া তার এক সান্ত্বনা পুরস্কার যে, ‘বিজনেস ফোরাম নিয়ে খুশি থাকো’! এদিকে আবার ‘কোয়াড’ বলে চার-রাষ্ট্রীয় (QUAD) এক জোট  তো আছেই। সেই সাথে আবার এদের সবাইকেই কি ‘এশিয়ান ন্যাটো’ বলে আরেক নামে নামাবে এরও কানাঘুষা উঠছে। তার মানে ইন্দো-প্যাসিফিক বলতে সামরিক-নিরাপত্তা জোট নাকি বিজনেস জোট মুখ্য হবে এ নিয়ে টানাটানির এখনো শেষ হয়নি।

    অভ্যন্তরীণভাবে ইন্দো-প্যাসিফিকে এসব অমীমাংসিত বিষয় থাকা অবস্থায়, বাংলাদেশে আমরা দেখছি এবার প্রথম বাধা উদয় হল যে, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলাপ হয়েছে, না হয়নি – এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান হল, ধারাবাহিকভাবে তারা বলছেন- ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন ও ডেপুটি-মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দু’জনই আলাদা করে ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন “আইপিএসের প্রসঙ্গটা আলোচনায় আসেনি”। অথচ ‘প্রথম আলো’ নিশ্চিত করে লিখেছে তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিগান বলেছেন, “আজ (বৃহস্পতিবার) আমি বাংলাদেশ সরকারের সাথে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করেছি। ব্যাপকতর অর্থে আইপিএসে যেসব সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছি। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে আমরা একে অন্যকে কিভাবে যাতে সহায়তা করতে পারি তা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই, এর প্রতিবেশী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে”।

    এখন ভাষ্যগুলোকে আমরা কী এভাবে নিতে পারি? বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে কথা বলতে চায় না এই অবস্থানটা বুঝিয়ে দিতে গিয়ে যতটুকু যা কথা বলতে হয়েছে, এটা তাই। এ ছাড়া সরকারের অবস্থানটাও  বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগে থেকেই অনেক শক্ত ছিল। অন্তত যতটুকু আর যে শক্ত ভাষায় তারা মিডিয়ায় কথা বলছেন। যেমন, দেশের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় উঠেছে, বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগের দিন মন্ত্রী মোমেনকে এক সাংবাদিক যতবার আমেরিকান প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন করেছেন তাতে অন্তত বেশ কয়েকবার তিনি বলেছেন ‘উই আর নট ইন্টারেস্টেড’। এর মধ্যে সবচেয়ে কোটেড দু’বাক্য হল এ রকম। মোমেন বলছেন,

    “We have no objection to the Indo Pacific Strategy. But they should come forward to the infrastructure development if they want to make the Indo Pacific Strategy more effective”.

    “ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আমাদের আপত্তির তো কিছু নেই। যদি তারা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে কার্যকর দেখতে চান, তবে তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপায়গুলো নিয়ে সামনে আসতে হবে। তাদের অর্থব্যয় করতে পারতে হবে; শুধু কথায় কাজ হবে না”। এরপরে ঐ সাংবাদিক নিজে যোগ করেছেন, ‘মন্ত্রী আসলে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে আমেরিকার কোনো বিনিয়োগ বা অবদান নেই এ কথার দিকে ইঙ্গিত করছেন”।
    এর আগেরদিনও আমেরিকার কেবল অস্ত্র-বিক্রির দিকে আগ্রহকে খোঁচা দিয়ে মোমেন বলেছিলেন, “তারা আমাদের অস্ত্র-বিক্রি (অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইত্যাদি) করতে চায়। কিন্তু আমরা কোনো সঙ্ঘাতের ব্যাপারে জড়িত হতে আগ্রহী নই। তারা চাইলে অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে”।

    “They want to sell arms, but we are not interested in issues related to conflict,”

    আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক নৌকায় ওঠার প্রস্তাব উপড়ে ফেলে দেয়ার দিক থেকে দেখলে এটা হাসিনা সরকারের ভাল কৌশল যে, এমনভাবে শান্তিবাদী এবং উন্নয়নবাদী সেজে জবাবটা দিয়েছে। আর উল্টা আমেরিকাকে খোঁটা দেয়া যে, – “এখন অবকাঠামো খাতে আর তোমার বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তুমি অযোগ্য আর এটা তোমার দুর্বল জায়গা”। সাথে যেন বুঝিয়ে দেয়া বাংলাদেশের চীনের প্রতি আগ্রহ বা চীনকে আমার দরকার তোমার চেয়ে বেশি। অতএব “উই আর নট ইন্টারেস্টেড”। কিন্তু বাংলাদেশের এই অবস্থান কত দূর টিকবে? সেটা বলা মুশকিল হলেও এটা আপাতত আমেরিকান স্ট্রাটেজিস্টদের বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছে, সন্দেহ নেই।

    বাংলাদেশের অনেকে এখানে একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তর্ক করেন যে, “আমেরিকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ নাকি এখন সর্বোচ্চ”। অনেকে আরো অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটের রেফারেন্স দেন। তাদের বিনয়ের সাথে বলব, বিনিয়োগ বলতে অবকাঠামো বিনিয়োগ বলে যা বুঝায় সেটা সাধারণত কেবল সরকারি ভাবেই হয়। আরেক ধরণের বিনিয়োগ হয় সেটা বেসরকারি। অর্থাৎ ডাইরেক্ট মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) [FDI, Foreign Direct Investment]। যেটা সরকারের নয়; আমেরিকান প্রাইভেট কোম্পানির। আমেরিকান সরকার সেটার মালিকও নয়; ফলে এসব কোম্পানি উঠে চলে যেতে বা জেঁকে বসতে চাইলেও তা তাদের মালিক-শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই মুখ্য করেই সব সিদ্ধান্ত নিবে যেটা ওর শেষ কথা। সেক্ষেত্রে আমেরিকান সরকারের বলার সুযোগ এখানে তাই প্রায় নাই। অতএব, ‘আমেরিকান সরকারি বিনিয়োগ’ বলতে কেবল অবকাঠামোকেই বুঝতে হবে। কিন্তু দূতাবাসের সাইটে ব্যাপারটাকে Bilateral Economic Relations ‘বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ’  বলে শিরোনামে রাখা হয়েছে। অথচ ভিতরে কেবল এফডিআই এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সব বিভ্রান্তি সম্ভবত এখান থেকে। যেখানে আবার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে ঐ বিনিয়োগে সাঙ্গু গ্যাসের জন্য বিনিয়োগটাই ওর বড় অংশ। এটা আসলে শেভরন কোম্পানির বিনিয়োগ। তাই মোট পরিমাণ হিসাবে সেটা ৩.৪ বিলিয়নের। তবু সেখানেও একটা অঙ্কের ফাঁকি আছে। ঐ ফিগারটা বলা হয়েছে ২০১৮ সালের। এ কথার মানে হল তারা ২০২০ সালের পর্যন্ত আপডেটেড তথ্য দিচ্ছে না।, সম্ভবত এর পরের দু’বছরে ফিগারটা কমে গেছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ কথাটা মিথ্যাও নয় আবার এটাই সব সত্যি তাও নয়। তবে মন্ত্রী মোমেনের পরিস্কার দাবি – অবকাঠামোতে আমেরিকান বিনিয়োগ নেই। আর একথাটাও ভুল বলে কেউ দাবি করেছেন, দেখা যায়নি।

    তাহলে কি এখন আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশকে তুলতে না পেরে হতাশ মুখে বসে থাকবে?
    না, ঠিক তা নয়। তবে ইতোমধ্যে বিগান ও তার দল তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটা দেখিয়ে ফেলেছেন মনে করা যেতে পারে। যেমন প্রথম আলোর বিস্তারিত কথোপকথনের রিপোর্টে (১৬ অক্টোবর) দেখা যাবে, যতগুলো ইস্যু বিগান তুলেছেন তাতে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন আমেরিকা তা সমাধানে আগ্রহ দেখাবে যদি তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশ আগে উঠে, তাহলে। তবেই আমেরিকা প্রধান উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে।
    যেমন, স্টিফেন বিগানের এই সফরের পাশাপাশি আরেক প্রচেষ্টা চলছে ইউরোপে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। তাতে বাংলাদেশ অনাগ্রহ দেখিয়েছে ইতোমধ্যেই। ক্রিটিক্যাল বিচারে ব্যাপারটায় বাংলাদেশের অনাগ্রহ দেখানো খুবই সঠিক। কারণ, ব্যাপারটা হল  এরা ইউরোপিয়ানদের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এভাবে জোট বেধে আগামি ২২ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য একটা ফান্ড তৈরির চেষ্টায় বসতে যাচ্ছে। এমন বিষয়ে এক রিপোর্টের শিরোনাম – “রোহিঙ্গাদের ১০ বছর মেয়াদি মানবিক সহায়তা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের, আগ্রহী নয় বাংলাদেশ”।  এখান থেকেই আসলে পুরা ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে যাতে সুবিধা হয় এমন আমেরিকান পরিকল্পনা থাকা অসম্ভব নয় মনে হচ্ছে। যেমন এনিয়ে বণিকবার্তায় মোমেনের বক্তব্য বা মিডিয়ায় প্রশ্ন রেখেছেন,  এতে মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর”।

    চারটি গ্রুপ এ বৈঠকটি মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর। – পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন

    অর্থাৎ সোজা মানে হল, রোহিঙ্গা[Rohingya] ইস্যুতে আমরা আশ্রয়দাতা অথচ কোথাকার চার গ্রুপের মিটিং আর আমরা তা জানি না কেন? দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের পালার জন্য অর্থ সাহায্যের চেয়েও বড় প্রয়োজন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি যাতে তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেদিকে কোনো উদ্যোগ নেই কেন? আর তৃতীয়ত, তিন বছর হয়ে গেল; এখন কেবল ফান্ডের উদ্যোগ। তাহলে প্রত্যাবাসন নিয়ে আগ্রহ হবে কবে, সে খবর নেই কেন? এই কঠোর সমালোচনা বিগান প্রকারান্তরে মেনে নিয়ে বলছেন- কেবল “এ দেশের জনগণকে যাতে তার বোঝা টানতে না হয়” তাই ফান্ডের অর্থ তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দরকার আছে। এছাড়া বিগানের দাবি, “এ সমস্যার শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। তবে এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। সব দেশকেই এ সমস্যা সমাধানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে”।
    দেখা যাচ্ছে “আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন”  বা ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’- সবই তিনি বলছেন কিন্তু উদ্যোগ কে নিবে – ঘন্টাটা বাধবে কে – সেটাই বলছেন না। বরং এক “অনন্তকালের দিকে” তা ঠেলে দিয়েছেন, এটাই সম্ভবত ষড়যন্ত্রপুর্ণ দিক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এছাড়াও, বিগান যে ভাষায় বলছেন, “শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে” যুক্তরাষ্ট্র করেছে বলে যা বলছেন এটা পুরাপুরি ভুয়া। বরং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সীমান্তে ধেয়ে আসার এর প্রথম বছরটা ছিল – আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন শক্তিরই বার্মিজ জেনারেলদের কে কত তোয়াজ করতে পারে এরই যেন প্রতিযোগিতার বছর। কারণ মূল প্রতিযোগিতাটা আসলে ছিল মায়ানমার থেকে কে কত ব্যবসা বাগাতে পারে সেদেশে, এরই প্রতিযোগিতা।  বার্মীজ জেনারেলরাও এই ব্যবসা বিতরণের টোপ দিয়ে ঐতিনটা দেশকেও নাচিয়ে চলেছিল। ব্যবসা পাবার লোভে আমেরিকা, ভারত ও চীন কারোরই আন্তর্জাতিক দায়দায়ীত্ব বা মানবাধিকার প্রসঙ্গে কোন খেয়াল ছিল না। আর এটার সুযোগ নিয়েই  বার্মীজ জেনারেলেরা রোহিঙ্গাদের ইচ্ছামত হত্যা ও রেপ ও নির্মমতার আয়োজন  করে বাংলাদেশে তাদের ঠেলে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এভাবে ঠেলে দেওয়ার সাফাই হিসেবে বার্মিজ পুলিশ-আর্মির ওপর কথিত “আরসা (ARSA) বাহিনীর” মিথ্যা আক্রমণের গল্প হাজির করেছিল। অথচ আরসা হল বার্মীজ সেনাবাহিনীরই তৈরি এই বাহিনী – যা একই পুতুল শিয়ালের ছানার মত বার্মীজ সেনাবাহিনী সব জায়গায় হাজির করে বিপদে পড়লেই; বিচ্ছিন্নতাবাদী ফোর্স হিসাবে দেখায়। যেমন সেসময় দাবি করেছিল কথিত আরসা আক্রমনের প্রতিক্রিয়ায় নাকি বার্মীজ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মেরে রেপ করে সীমান্তে পাঠিয়েছিল। আর এসবের সবচেয়ে ত্যাদরামো ব্যাপার হল, এ নিয়ে এই তিন শক্তি কে কত ভালোভাবে বার্মীজ সেনাবাহিনীর ঐ সাফাই এর পক্ষে দাড়াতে ও সমর্থন যোগাতে পারে, গল্প  গাইতে পারে এরই প্রতিযোগিতা চলেছিল। সে কারণেই রোহিঙ্গাদের আগমনের ঢল সে সময়ে সহসা বন্ধ করা যায়নি। অতএব প্রথম বছরজুড়ে সেসব দিন ছিল ভয়াবহ, এখন সেসব সত্যতা পাল্টাতে চাইলেই কেউ পারবে না। বরং বিপদ ও শঙ্কার কথা হল, ঐ তিন শক্তির বার্মীজ সেনাবাহিনী তোয়াজের প্রতিযোগিতা আবার না শুরু হইয়ে যায়। যদিও এখন একমাত্র চীনই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া  নিয়ে সোচ্চার। আর ভারত, আমেরিকার কোনই খবর নাই। এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এদুইয়ের কাছে কোন ইস্যুই নয়।
    আসলে বার্মীজ সেনাবাহিনীর সাথে এই তিন শক্তির খাতিরদারি সবকালে একই রকম থাকে নাই। যেমন এখন মুখ্যত ভারত সবচেয়ে কাছে বার্মীজ সেনাবাহিনীর নৌকায়। আর এই ভারতই হল সেই ২০০৭ সাল থেকেই আমেরিকাসহ সারা ইউরোপ এমন সকলকে  বার্মীজ জেনারেলদের সা্থে যোগাযোগের অগ্রদুত বা এডভান্স পার্টি – এই ভুমিকা পালন করে এসেছে। আর চীন এখন একেবারেই বাইরে ছিটকে পড়েছে, মনে হচ্ছে। আর আমেরিকার অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগে, যার প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা মেইনটেন করে দিচ্ছে ভারত এবং অবশ্যই তা ভারতের বিরাট এক স্বার্থে। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসব।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুরই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে। এর মানে কি তারা এখন একেবারেই চলে যাচ্ছে?
    অবশ্যই না। তারা অবশ্যই আবার আসার কথা ভাববে। তবে সেটা খুব সম্ভবত আমেরিকার নির্বাচন সমাপ্তির আগে না; পরেই নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাত ধরে, হয়ত। যদি তা ঘটে তবে সেটা হবে বাংলাদেশের উপর আরো চাপ নিয়ে, আরো প্রলোভন নিয়ে এবং আমাদের সরকারকে যতভাবে বাধ্য করার সুযোগ তাদের হাতে আছে সব নিয়ে। এছাড়া আরো অনেক ‘কিন্তু’ আছে।

    স্টিফান বিগানের এই সফরের মুল সাফাইঃ
    মনে রাখতে হবে, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গড়তে চাওয়া এটা আসলে ইতোমধ্যেই একটা ফেইল্ড প্রজেক্ট ছিল; ২০১৬ সালেই ওবামার হাতে ‘এশিয়া পিভোট’ নামের এই প্রকল্পটা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইন্দো-প্যাসেফিক সমুদ্র-অঞ্চলের পাশের একটা দেশও সেকালে ওবামা নিজ নৌকায় তুলতে পারে নাই। তারপরেও স্টিফেন বিগান কিন্তু এখন প্রথম আলোকে যে নতুন গল্পটা দিয়েছে তা এরকমঃ স্টিফেন বিগান বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্যি, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে আমাদের নিরাপত্তার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আর এটা আমি অস্বীকারও করতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দেশেরও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করব না। যেমন হিমালয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গালওয়ান উপত্যকায় চ্যালেঞ্জ আছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপান সাগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাইওয়ানে উত্তেজনা রয়েছে। হংকংয়ে ক্রমবর্ধমান দমন পীড়ন চলছে। তিব্বতের শিনজয়ানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। এসব উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে”।
    এখানে প্রথম বাক্যে ‘আমাদের’ লেখা, এই আমাদের বলতে কারা? কারণ, ওবামার সেই কালেও এশিয়া-প্যাসিফিকের (এশিয়া-পিভোট নাম ছিল তখন ) কোনো দেশই আমেরিকার নৌকায় উঠেনি। এমনকি এই ভারতও না। যদিও তাতে অনেক দেশই আছে যারা সেসময় হয়ত জেনুইনভাবেই চীনের ওপর অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধও এবং অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার যুদ্ধ-নিরাপত্তা ফেরি করার জোটে তারা কেউ উঠেইনি। তাহলে এটা এখনও আমেরিকার “আমাদের” নিরাপত্তা’ চ্যালেঞ্জ হল কেমনে? আমাদের মানে, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ তো আসলে আমেরিকাকে একাই! অর্থাৎ আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে আর তা হয়েছে চীনের হাতে। এবং বড় কথা তা ন্যাচারাল!  আর মানতে হবে কেউই দুনিয়ায় স্থায়ী নেতা নয়। তাই, এমন ধরে নেয়ার কোনই ভিত্তি নাই। কাজেই “আমাদের” বলে এই মিথ্যাটা বলার দরকার কী? আর এতে কী আমেরিকার দুঃখ ঘুচবে? এছাড়া একালেও তো কোয়াডের তিন দেশ ছাড়া আর কেউ এখনও আমেরিকার সাথে জোট করেনি? আবার এই তিন রাষ্ট্রও আবার আধামন দিয়ে ও দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায়। অতএব আগের এশিয়া পিভোটের মত এবারো ইন্দো-প্যাসেফিক উদ্যোগও যে ফেল করবে না, তেমন নতুন কিছু তো ঘটেনি। আমেরিকা তা দাবিও করতে পারছে না।  আর ভারত? সেও আধামনে ও দ্বিধায় যতটুকু ভিড়েছে আর যা করছে এর কারণ ভিন্ন। ভারত তা কেবল নিজদেশের লোক আর মিডিয়ার মনোবল যেন চাঙ্গা থাকে সে জন্য করেছে – যেন বলতে চাইছে “ভয় নাই, বড় মুরুব্বি দেশ ভারতের পাশে আছে”। কিন্তু আসলে আছে কী?

    ভারতের আধা-মনে, দ্বিধায় দিন গুজরানঃ
    ভারতের আধা-মনে মানে হাফ-হার্টেড হয়ে দ্বিধায় দিন কাটছে। চলতি অক্টোবর মাসের ছয় তারিখে জাপানে যে কোয়াড (QUAD) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেল এটা তো আসলে ভারতেই হওয়ার কথা ছিল। [“But he (Biegun) added that the Quad grouping is expected to meet in New Delhi this autumn..…. ] কিন্তু ভারত আগেভাগেই গত মাসে মাফ চেয়ে হোস্ট হতে অপারগতা জানায়। কারণ ভারতের আসল অবস্থান হল – একপা আগে দুইপা পিছে, এমন টলমলে। কেন?

    মোদী গত ২০১৮ সালে ১ জুন সিঙ্গাপুরে আটল্যান্টিক জোট ‘সাংগ্রিলা” এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানবক্তার বক্তব্যে হিন্দু বেদের বরাত দিয়ে; ভারত ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কারো বিরোধী হয়ে কোন জোট গড়ার বিরুদ্ধে- বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে ভারতের নিজের সংশ্লিষ্টতা এমন হতে হবে যে ভারত কারো বিরুদ্ধে না [মানে এখন যেভাবে আমেরিকা বলছে চীনের বিরুদ্ধে জোট তা নয়] বরং ইনক্লুসিভ বা সবাইকে নিয়ে হতে হবে। এবার ধর্মগ্রন্থ বেদের বরাত দিয়েছিলেন – एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति বাংলায়, সত্য একটাই, জ্ঞানীরা তা বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করে থাকে। তাই ভারত বহুত্ববাদে, একসাথে পাশাপাশি বসবাসে, খোলামনে আর ডায়লগে বিশ্বাস করে। যারা এর রেফারেন্স চান তারা ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটের এই রেফারেন্স লিঙ্কে পুরা বক্তৃতাটা দেখতে পারেন।

    In conclusion, let me say this again: India’s own engagement in the Indo-Pacific Region – from the shores of Africa to that of the Americas – will be inclusive. We are in-heritors of Vedanta philosophy that believes in essential oneness of all, and celebrates unity in diversity एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति (Truth is one, the learned speak of it in many ways). That is the foundation of our civilizational ethos – of pluralism, co-existence, open-ness and dialogue. The ideals of democracy that define us as a nation also shape the way we engage the world.

    এছারা এই আলোকেই একবার এই গত জুলাই ২০২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন যে, ভারত কোন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যাবে না [India will never be a part of an alliance system, says External Affairs Minister Jaishankar]। কারণ ভারত জোট-নিরপক্ষে সেই সোভিয়েত কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে। এই নীতিতেই ভারত এখনো থাকবে। তার মানে হল, যতটুকু অন্য দেশে গিয়ে কোয়াডের মিটিং-এ ভারত যোগ দিয়েছে সেটা লোক দেখানোর জন্য। আর খুব সম্ভবত তা প্রধানত বর্তমান চীনের চাপে মারখাওয়ার মুখে নিজ পাবলিক ও মিডিয়ার মনোবল ঠিক রাখতে। তাই এবার একবার যদি ভারত কোয়াডের হোস্ট হয়ে যেত তবে সেখান থেকে যে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোকাস ভারতের জন্য তৈরি হয়ে যেত তাতে ভারত আর কোয়াডের সিরিয়াস ও সক্রিয় কেউ নয় বা সে তখনও জোট-নিরপেক্ষ  – এসবকথা এরপর দাবি করা খুবই কঠিন হয়ে যেত। সেটা হলে হয়ত পাবলিকলি অনেক কিছুই ভারতকে মুখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলতে হত যা করতে ভারত একেবারেই প্রস্তুত নয়। এই বিড়ম্বনা ও সম্ভাব্য ‘বেইজ্জতি’ থেকে বাঁচতে বা এড়াতে সে কোয়াড মিটিংয়ের আয়োজক না হয়ে এড়িয়ে যায়।

    নতুন আরো বিশাল বড় কারণঃ
    যদিও এর পেছনে আরো বড় কারণ আছে। আসলে এখন ক্রমশ পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে শুধু কোয়াডের চার দেশ – ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া – আর এদেরকে নিয়ে আমেরিকা, এদের নিয়েও কোনো ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়া একেবারেই সম্ভবই নয়। কেন? এত বড় কথা কেন?
    মূল কারণ মিয়ানমার ইস্যু। অথবা বলা যায় ভারতের আসল ইচ্ছা বা ঘটনায় মোঁচড়।
    মূল প্রশ্নটা হলঃ মিয়ানমার ইস্যুতে আমেরিকা্র রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করাসহ মিয়ানমার জেনারেলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যেকোনো ভূমিকা – এটা নেয়া কি আদৌ সম্ভব? উত্তরটা কন্ডিশনাল বা শর্ত সাপেক্ষ। মানে আমেরিকাকে যদি তা সম্ভব করতে তুলতে চায় তাহলে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক কোনো জোট খাড়া করার চিন্তা আমেরিকাকে এখন থেকে একেবারেই বাদ দিতেই হবে। কারণ কী?

    কারণ, নিশ্চয় আমেরিকা জানে যে মিয়ানমারকে সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। আর এতে ভারত মুখে সাফাই দিয়েছে, চীনের ভয়ে তাকে নাকি এটা করতে হয়েছে। অর্থাৎ ভারত-মিয়ানমার এখন এক ঘোষিত সামরিক-অ্যালাই বা পক্ষজোট হয়ে গেছে। তাহলে আমেরিকার এই ভারতকে নিয়েই কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কী করে সম্ভব?
    এর সোজা মানে হল, যত দিন মিয়ানমার-ভারতের সম্পর্ক ভারতের কাছে সবার উপরে বা আগে অগ্রাধিকার-সম্পর্ক হয়ে আছে বা থাকবে তত দিন আমেরিকা ভারতকে নিয়ে  ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কোন ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। এশিয়ায় কাউকেই কোনো সাহায্যে হাজির হতে বা কিছু করতে পারবে না যা ভারতের স্বার্থবিরোধী। এর মানে আমেরিকার আসলে হাত-পা বাঁধা পড়তে যাচ্ছে। এক অথর্ব শক্তি হচ্ছে। এসব আমাদের আগেই বুঝতে পারা কি খুব কঠিন? বার্মীজ জেনারেলেরা বহু চিন্তা করে  ঠিক এটাই করতে চেয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের মধ্যে ভারতকেই বেছে আলাদা করে কাছে টেনে আপন করে নিয়েছে। আর তা থেকেই এতকিছু ঘটা শুরু হয়েছে।
    এখন এসবের সোজা মানে স্টিফেন বিগানের এই সফর এখন তাহলে দাড়াচ্ছে যে এটা পুরাটাই লোক দেখানো বলে হাজির হতে পারে। যদিও এমনিতেই আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরে পরিষ্কার হয়ে যাবে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট এরা আসলে সিরিয়াস না নির্বাচনী দেখন-শোভা ছিল; নির্বাচনের পরেও কি এরা বেঁচে থাকবে, তৎপর থাকতে পারবে, কিভাবে?
    এরপরে নতুন প্রেসিডেন্ট তিনি যদি চান – এইবার আমেরিকা যে অথর্ব নয় তা প্রমাণ করতে গেলে আমেরিকার জন্য সেক্ষেত্রে একমাত্র অপশন হল, ভারতের বিরুদ্ধে সামরিকসহ সবভাবে খাড়া হতে আমেরিকাকে রাজি থাকতে হবে – এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারা। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছে দেখাতে হবে যে আমেরিকা ভারতবিরোধী সামরিক কোন জোটনেতা বা শক্তি – এভাবেই একমাত্র হাজির হতে হবে। সেক্ষেত্রে তাহলে এর মানে হবে এশিয়ায় আমেরিকার ভারত বলে কেউ নাই, দাঁড়াবার জায়গাই নাই। এমন হয়ে যাবে যা চিন্তা করা আমেরিকার জন্যই খুব কঠিন। আর আমাদের জন্য আমেরিকা তেমন দুর্দশায় পড়েছে সেটি চোখে না দেখলে আমরা কেউ বিশ্বাস করব না।

    আমেরিকার কুমিরের কান্না নাকি অথর্ব হয়ে যাওয়াঃ
    অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আমেরিকান চোখের পানি কুমিরের কান্না হয়েই থাকার সম্ভাবনা প্রবল।  তাহলে  গত দুবছর ধরে স্টিফেন বিগানের ততপরতা ফল কী এবার উল্টা ফলতে যাচ্ছে? এশিয়াতে আমেরিকাই ভারতের স্বার্থের অধীনে কেবল ততপর থাকবে? আর এটাই কী এবার স্টিফেন বিগানের ভারত সফরের ফলাফল হবে!
    তাই এখন এই অথর্ব আমেরিকা যে ভারতের কারণে উত্থান-রহিত হতে যাচ্ছে (আগামি ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে), এই আমেরিকাকে লইয়া কেবল হাসিনা নয়, পুরা বাংলাদেশই বা ‘কী করিবে’?  এই অথর্ব আমেরিকা আমাদের কোন কাজে আসবে? ভারত তার নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ফাঁদে, অগ্রাধিকারের ফাঁদে খোদ আমেরিকাকেই আটকে ফেলতে যাচ্ছে, সম্ভবত!
    তার মানে আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকা পড়তে চাইছে! নাকি এটাই যৌথ উদ্যোগ?

    সবশেষে একটা বাড়তি প্রসঙ্গ কথিত ভুরাজনীতিঃ
    বিগানের সফর উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের মিডিয়ার দুর্দশা দুর্গতি কী মাত্রায় তা সব উদাম হয়ে গেছে। এক কারো দালালি বা এজেন্ট হওয়া ছাড়া কোনকিছুই এদের করার দূরে থাক ইস্যুটা বুঝবারও সামর্থের সংকট প্রবল হয়ে ধরা দিয়েছে।  আর যখন কোন কিছু বুঝার ব্যর্থতা হাজির হয় তখন তা ঢাকতে এদের অনেকে একটা শব্দ ব্যবহার করে – ‘ভুরাজনীতি’। এ’এক কঠিন সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে। অথচ শব্দ না বুঝলে তা ব্যবহারের দরকার কী? এছাড়া ভুরাজনীতি শব্দটাই ভাল শব্দ নয়, আসলে তা  এমন আবছা। যেমন গ্লোবাল অর্থনীতি বা কোন গ্লোবাল অর্ডার নিয়ম বলে যে দুনিয়ায় কিছু আছে তা ভুরাজনীতি শব্দটা কাভারই করে না, তাই এই প্রসঙ্গটা কিছুই বুঝবার উপায় নাই। এই কথিত ভুরাজনীতি মানে কী, তা তাদের লেখা পড়েও কিছু বুঝার সুযোগ নাই। আরেক দল আছে যারা নিজের অসহায়ত্ব টের পেয়ে বুদ্ধিমান হতে চেয়ে ভারতের মিডিয়াকে কপি করে রিপোর্ট লিখেছে। অথচ এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থানই ভারতের বিরুদ্ধে সে খবর তাদের নাই। তারা খেয়ালই করে নাই। ওদিকে স্টার গ্রুপ বা প্রো-আমেরিকান মিডিয়া যারা, তারা ভাব ধরতে গেছে তারা সরাসরি আমেরিকান অবস্থান হাইলাইট করছে। কিন্তু হায়! তারাও বুঝে নাই যে এই ইস্যুতে স্টিফেন বিগানও মায়ানমারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইছেন না। যদিও তিনি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ‘আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক’ উদ্যোগ নিলে আমেরিকা আছে। মানে তিনি আসলে ইস্যুটাকে অনন্তকালের দিকে অমীমাংসিত ঠেলে দিয়েছেন। মানে কোন উদ্যোগ না নেওয়া, মানেই ত ভারতের অবস্থান। আবার বিগানের  “আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক” উদ্যোগ মানে কী? চীন উদ্যোগ নিলে তারা যাবে না সে তো বলাই বাহুল্য। ফলে এটাও এক কথার কথা।  সারকথায় রোহিঙ্গা বা মায়ানমার ইস্যুটাকে স্বাধীনভাবে বুঝবার তাগিদ বা সম্ভবত মুরোদ আছে মিডিয়ার তা বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে টের পাওয়া যায় না। আবার প্রথম আলোর বাংলা অনুবাদের এক উদাহরণ হল, চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগের বাংলা করেছে  – “অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই)”। ফলে এক কঠিন দশা। আর এসবের সার ফলাফল হল বাংলাদেশের পাবলিককে মুল ইস্যুটা কী তা বুঝাতেও মিডিয়ার ব্যর্থতা। এতে সবমিলিয়ে ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থের। আর এটা বলার সময় হয়েছে যে সরকার সরকারের অনুগামি মিডিয়া (ফার্মের মুরগীর মত) তৈরি করে রাখলে এর কী পরিণতি হয় তাও আমরা দেখলাম!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৭ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের স্বার্থে আটকা পড়ছে আমেরিকা!” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোন জোটে উঠা এড়াতে হবে

    উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোন জোটে উঠা এড়াতে হবে

    গৌতম দাস

    ১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3dt

    যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট (উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী) স্টিফেন ই. বিগান

    বাংলাদেশের একটা ক্রিটিক্যাল সময় পার করছে, সামনে আরও খারাপ সময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। সাথে আবার এটা এমন একটা সময় যখন বাংলাদেশের সরকারের রেটিং ভালো নয়, হওয়ার কোন কারণও নাই। অথবা সরকারও এ সময়ে অন্তত ২৫% মানুষ তার পক্ষে আছে মনে করে বোকার সাহস দেখাতে একটা খোলা সার্ভে হতে দিতে চাইবে না বা মনেও করবে না। সাধারণভাবে এশিয়ার জন্য বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যই খুব খারাপ সময় এটা। মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতির পুরান নেতা আমেরিকার বদলে পালাবদলে চীনের ক্রমশ নেতা হয়ে হাজির হওয়ার সময় হয়েছে। মূলত গ্লোবাল নেতা হওয়ার পালাবদলের এই সময়, বিশেষ করে এশিয়ান স্টেজ বা রঙ্গমঞ্চে ছোট দেশগুলোকে নিজের নিজের নৌকায় বা জোটে তুলতে টানাহেঁচড়ার খুব ভয়ঙ্কর সময় সামনে। তার প্রকৃত মাত্রা ও চিত্রটা পাবো আমরা আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরের সপ্তাহ থেকে। কারণ এই টানাহেঁচড়ার পেছনের আবার একটা বড় কারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ‘দেখন শোভা’ বা রোডশো। এই নির্বাচনে ট্রাম্পকে দেখাতে হবে, তিনি চীন বিরোধিতায় প্রবল লড়ছেন ও এমন সক্রিয়ভাবে তৎপর যে, নিজের অসুস্থতা ভুলে করোনার বেড থেকে উঠে এসেছেন।

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড’ [QUAD – India, Australia, japan, USA] জোট গড়তে ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (বা আমাদের সমতুল্য অর্থে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) পম্পেও গত এই ৬ অক্টোবরও জাপানে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিটিং করেছেন, ট্রাম্প লড়ে চলেছেন এটা দেখাতে। অথচ ভিতরের কাহিনী হল, এবারেও তারা একসাথে চার রাষ্ট্র মিলে একটা যৌথ-বিবৃতি দিতে পারেনি। আলাদা আলাদা করে দিয়েছেন আর তাতে নিজ নিজ ইস্যু ঢুকিয়েছেন। এ’থেকেই সন্দেহ ৩ নভেম্বরের পরে কোয়াডের কোন অর্থপুর্ণ মিটিং আদৌ আর হয় কিনা অথবা কী হয়? আর হলে সেটা কেমন হয়, ভাষ্য কী থাকে তা দেখতে হবে আগে। নইলে আমেরিকান ইলেকশনের আগের মাসেও আমেরিকান কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এর আগে কখনও এমন তৎপর ছিলেন জানা যায় না।

    পালাবদলঃ
    আমেরিকার বদলে চীন নতুন নেতা হতে যাচ্ছে, এটা কোন মানুষ বা সাবজেক্ট দ্বারা নির্ধারিত ঘটনা নয়; অবজেকটিভ ঘটনা। বস্তুগতভাবে নির্ধারিত এই ঘটনা। আর এটা আমেরিকার পরপর তিনটা সরকারি সার্ভেরই একই মূল ফাইন্ডিং বা প্রাপ্ত ফলাফল। অবজেকটিভ বা বস্তুগত শর্ত বলতে এখানে প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে হাজির হয়েছে চীনের হাতে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা বা চীনের হাতের বিপুল সারপ্লাস বা পুনঃবিনিয়োগযোগ্য সঞ্চিত সম্পদ। যা সম্ভবত সবাই মানবেন তা হল এই চীনা সক্ষমতা, এটা আনপ্যারালাল; মানে একালে এই বস্তগত সক্ষমতার তুলনা একমাত্র চীন নিজেই। কিন্তু সমস্যা হল, কোন দেশ নিজে পরাজিত হয়েছে জানলেও একেবারেই চলতে না পারা দশা না আসা অবধি কে যেচে পরাজয় স্বীকার করতে চায়! জটিলতা সেখানেই। তবে বোকার স্বর্গে বাস করা কেউ কেউ তো থাকেনই। অথবা আমেরিকান ছোট ছোট এন্টারপ্রাইজের পরিচালকেরা কেউ, যাদের পক্ষে আমেরিকার হারু-বাস্তবতা মেনে নেয়া তো আসলেই কঠিন। তাই এদের কেউ কেউ এর পরেও সামরিক দিক থেকে আমেরিকা এখনো অনেক গুণ শক্তিশালী – এ দিয়ে আমেরিকার শক্তি মেপে চলতে চাইবে হয়ত। তাদেরকে বুঝানোও সম্ভব নয় যে, সামরিক শক্তি দিয়ে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব কায়েম করা যায় না, সক্ষমতাও মাপা যায় না।

    এখনও এক অমীমাংসিত অংশঃ
    কিন্তু তবু আমেরিককন ঐ সার্ভেতে নির্ধারিত ফাইন্ডিংসে যে মুখ্য অংশটা এখনও অমীমাংসিত তা হল, এই পালাবদল কী একটা যুদ্ধের পরিণতি হয়ে আসবে, না আপসে টেবিলে বসে কথা বলে আসবে? আমরা এখনও কেঊ তা জানি না। তবে বড়জোড় গত পালাবদলের কথা মনে করে দেখতে পারি আমরা। গত পালাবদল মানে? এর আগেও গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল হয়েছে নাকি? অবশ্যই; এর আগেও যে পালাবদল হয়েছে তা অনেকে আমলই করেন নাই হয়ত। তাদের মন করিয়ে দেই, ৭৫ বছর আগে আমেরিকা গ্লোবাল পলিটিক্যাল (অর্থনৈতিকসহ) নেতা হয়েছিল বিপরীতে সব কলোনি-দখলদারদের (ইউরোপের বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ ইত্যাদি সকলকে) পরাজিত করে অথবা তাদের উপরের নেতা হয়ে বসে আর সেটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৫ সাল। অর্থাৎ যুদ্ধের ফলাফল হিসাবেই আমেরিকা নেতা হয়েছিল বৃটিশসহ সবার উপরে। যে ইউরোপের ওরা গর্ব করত যে, কলোনি সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কখনোই অস্ত যাবে না। সেই গর্ব ভেঙে চুরমার করে দেয় আমেরিকা। তা সত্বেও এটা আজ কোন নিশ্চয়তা নয় যে এবারও তাহলে একটা যুদ্ধের পরেই কেবল চীন নেতা হবে।

    সীমিত যুদ্ধ না বড় পারমাণবিকঃ
    এছাড়াও যুদ্ধ হলে সেটা ছোটখাটো যুদ্ধের সীমায় থাকবে তো? না বড় আত্মহত্যার কোনো কাণ্ড ঘটবে? ‘আত্মহত্যা’ বলছি এজন্য যে, বেশির ভাগ মন্তব্যকারী “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” বলে একটা কথা প্রায়ই বলে ফেলে। কিন্তু তাতে এটা বুঝাই যায়, তারা কী নিয়ে কথা বলছে, এর কোনো ইমাজিনেশন বা কল্পিত ছবিও তাদের মাথায় কিছু নেই। তারা প্রায় সবাই গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনাটাই মাথায় রেখে এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা অবলীলায় বলে যায়। অথচ তারা আমলই করেনি যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেটা কোন পারমাণবিক বোমার যুদ্ধ ছিল না। কারণ সেকালে রাষ্ট্রনেতারা পকেটে পারমাণবিক বোমার কোড নিয়ে ঘুরতেন না। কিন্তু একালে ঘুরেন! তবু সেবার কেবল আমেরিকা ঐ যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এরপরেও ঐ যুদ্ধের পটভূমিকে উসিলা করে পারমাণবিক বোমা কেমন নৃশংসভাবে মানুষ মারতে পারে এরই পরীক্ষা করে নিয়েছিল। যুদ্ধে এক “হারু পার্টি” ছিল হিটলারের বন্ধু জাপানের সামরিক সরকার, কলোনি এম্পায়ার; অথচ বেচারা জাপানের জনগণের উপর পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে সেই পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। এর ফলাফল ছিল চরম ভয়াবহ, তা বললেও কম বলা হবে! কিন্তু তবু একালে যারা অবলীলায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলছেন মনে হয় না তারা আমল করেছেন যে, এবার হবু যুদ্ধে প্রধান তিন থেকে ছয়টা দেশ – পারমাণবিক বোমাসমৃদ্ধ দেশই হবে। সুতরাং এবার যদি (সীমিত নয় এমন) বড় যুদ্ধ হয় তাহলে আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাকেই আর খুজে পাওয়া না যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই নিজে বাঁচার তাগিদে হুঁশজ্ঞানটুকু অন্তত যদি থাকে তবে বড় যুদ্ধের কথা কেউ বলবে না বা সেদিকে যাবে না। কিন্তু যুদ্ধ লেগে গেলে কে নিশ্চয়তা দিতে পারে এটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে! নাকি দুনিয়াই শেষ হবে?
    তাই এসব সম্ভাবনার দিক মাথায় রেখে এশিয়ান স্টেজে চীন ও আমেরিকার মহড়া আর লেজে ফাঁকফোকরে আমেরিকান প্রক্সি হিসাবে ভাবধরা ভারত  – এভাবে সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা আমাদের মত দেশের জন্য এক অস্বস্তিকর ও খারাপ সময়।
    তাই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল ঘটবে অনিবার্য এটা জেনেও আমেরিকা যেন নিজ মনকে শান্ত্বনা দিতে চীনবিরোধী একটা যুদ্ধজোট গড়তে চাইছে, কখনও যেটাকে ‘কোয়াড’ অথবা “ইন্দো-প্যাসেফিক জোট” বলছে কখনও “এশিয়ান ন্যাটো”। আর ভাবছে  একবার এই জোট গড়তে পারলে আমেরিকা আরও কিছুদিন গ্লোবাল নেতা থাকতে পারবে। অথচ খাঁড়া মিথ্যাটা হল, সামরিক শক্তি দেখিয়ে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়া যায় না। কারণ মুরোদের প্রশ্নটা এখানে বিপুল সারপ্লাস বা বিনিয়োগ সক্ষমতার, বিপুল সমরাস্ত্রের যোগ্যতার নয়; বিনিয়োগ সক্ষমতার তারুণ্য একালের চীনের মত আমেরিকারও এককালে ছিল, যা সবশেষে এখন আর নাই।

    স্টিফেন ই বিগান এর বাংলাদেশ সফরঃ
    এমন অবস্থায় আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি (উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী) স্টিফেন ই বিগান বাংলাদেশ সফরে আসছেন আগামী ১৪-১৬ অক্টোবর। মি. বিগান আমাদেরকে বলে কয়েই তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে তুলে নিতে চেয়েই আসছেন। ঢাকার আমেরিকান এমবেসি ও বণিকবার্তা  আমাদের তাই জানাচ্ছে। আমেরিকা তার স্বার্থের কথা ও পথে তাদের মতে আমাদের ‘হেদায়েত’ করতে চাইবে। তাতে বলার কিছু নেই। কিন্তু আমরা আমাদের কোনো কোটারি গোষ্ঠীর স্বার্থে তাতে সাড়া দিতে পারি না। আমাদেরকে পাবলিক ইন্টারেস্ট বা জনস্বার্থ তো দেখতে হবে! আর ঠিক এই বিষয়ে আমাদের জন্য আইডিয়েল ও সঠিক অবস্থান হবে নিউট্রালিটি; মানে কারও নৌকায় বা জোটে না উঠে, এড়িয়ে যাওয়া। কোন যুদ্ধে বা কারো যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া মানে হবে আমাদের যাকিছু অর্জন এর শেষ সম্বলটাও হারানো। অথচ আমাদের জন্য সময়টা কঠিন এজন্য যে, আমাদের এখনকার সরকার দুর্বল, পিছনে জনসমর্থন নাই; তাই স্বর নরম করে ফেলতে পারে। আর সে কারণে সেসব ঘাটতি পূরণ করতে ওদিকে আবার ক্ষমতায়ও থাকতে চাইবে বলে কোন না কোন আপস যাতে না গিলে ফেলে, এই ভয় আমাদের থাকবে। সরকারের পাবলিক রেটিং থাকা না থাকাটা এখানে এভাবে সম্পর্কিত। অথচ এসময় দরকার ছিল অভ্যন্তরীণভাবে অন্তত এই ইস্যুতে পাবলিকের সবপক্ষের একটা ঐকমত্য, একক অবস্থান নিয়ে এক ভয়েজে কথা বলা। তাহলেই আমাদের এসব কোটারি স্বার্থগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারা সহজ হয়ে যেত।

    ভুল ম্যাসেজ(!) দিয়ে শুরুঃ
    ওদিকে ইতোমধ্যেই  মি বিগান আমাদের সাইলেন্ট মেজরিটিকে একটা প্রাথমিক ভুল মেসেজ দিলেন মনে হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশে কাজ শেষে ভারতে যাচ্ছেন। এর মানে কী? চৌদ্দ বছর পরে আবার একালেও ভারতকে বগলে করে আমেরিকা কী বাংলাদেশে এসেছে? এর অর্থ-ইঙ্গিত খুবই সুদূর প্রসারীভাবে হবে নেতিবাচক। যদি মানে তাই হয় তবে আমাদের দেশের মানুষের জন্য খুবই খারাপ মেসেজ তিনি এনেছেন। এর মানে বাংলাদেশের সাইলেন্ট মেজরিটির মনোভাব আমল করতে ও ক্ষোভ বুঝতে আমেরিকা আবার ব্যর্থতার পথই বেছে নিতে যাচ্ছে। যেখানে হাত পরিষ্কার রাখতে ও দেখাতে আমেরিকার উচিত আলাদা ডেস্ক মানে আলাদা স্টাফ-ডেস্ক থেকে ভারতকে ডিল করা। তাই বলা বাহুল্য যে এরকম চললে আমেরিকার এখনও বাংলাদেশে কাজ করা বা ভূমিকা রাখার যতটুকু শেষ সুযোগ আছে তা অকার্যকর করা হবে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এতে বাংলাদেশে আমেরিকার কোনো পরিকল্পনাই পাবলিকের দিক থেকে কোনদিনই আর সমর্থন বা আমল পাবেই না।

     

    এশিয়ার ছোট দেশের সমস্যা, উদাহরণ হিসাবে মালদ্বীপঃ
    তাই একটা উদাহরণ হিসাবে এবার মালদ্বীপকে সামনে রেখে কিছু কথা বলব। তবে মালদ্বীপ এশিয়ার ছোট দেশ হিসাবে পালাবদলের কালের সমস্যা ভাল মোকাবেলা করেছে কীনা সেজন্য নয়; বরং কিভাবে আরো জটিল জালে মালদ্বীপ আটকে গেছে এর উদাহরণ হিসেবে মালদ্বীপকে নিয়ে কথা বলব। মালদ্বীপের মূলসমস্যা আসলে – তাদের দুই প্রধান দল  গ্লোবাল পালাবদলের দুই ক্যাম্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে একটু ফারাক হল এটা চীন-আমেরিকা দুই ক্যাম্প না হয়ে চীন-ভারত হয়ে আছে; মানে আমেরিকার প্রক্সি এক্ষেত্রে ভারত। যেকোন দেশের জন্য এটা চরম দুর্ভাগ্যজনক যে, দেশের প্রধান দুই রাজনীতির দল যদি চীন ও ভারতের এজেন্ট হয়ে কায়েমি দোকান খুলে বসে যায়। এরই আরেক উদাহরণ যেমন শ্রীলঙ্কা। অভ্যন্তরীণভাবে বলা হয় মালদ্বীপ মূলত নাকি দুই সৎভাই মামুন আবদুল গাইয়ুম আর ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম মূলত তাদের আর তাদের অনুসারী বা অনুগামী রাজনীতিকদের নিজেদের দুই দল হিসেবে ভেতরের লড়াই হয়ে বিভিন্ন সময়ে হাজির হয়ে চলেছে।

    Mohamme্‌d, Nasheed, Ibrahim Mohamed, Solih & Abdulla Yameen

    দুই ভারতীয় রিপোর্টারঃ
    মালদ্বীপ নিয়ে এ’বছরের আগস্ট থেকে এপর্যন্ত দুই ভারতীয় রিপোর্টারের দুইটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। সুধা রামচন্দ্রন ব্যাঙ্গালোর থেকে লিখেছেন আগস্টে জাপানি ‘ডিপ্লোমেট’ পত্রিকায় – [Has India Won the Match Over the Maldives?]- এই শিরোনামে। আর সীমা দাসগুপ্তা কলকাতা থেকে লিখেছেন গত সপ্তাহে হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমসে -India risks losing its military hold on Maldives – এই শিরোনামে। সুধার লেখাটা একেবারেই প্রো-ইন্ডিয়ান ভাষ্য বা ভারতের তথাকথিত ‘জাতীয়’ স্বার্থ মেনে লেখা বলা যেতে পারে। সীমার লেখাটা সে তুলনায় অনেক বেশি নিউট্রাল।
    গত ২০১৮ সালের শেষে সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  (প্রো-চাইনিজ) ইয়ামিন হেরে যান প্রো-ইন্ডিয়ান নাশিদ গ্রুপ ও দলের কাছে। মালদ্বীপ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ও প্রায় ১২শ’ দ্বীপমালার দেশ, যার মাত্র  প্রায় ১৮৫টা ছোটবড় দ্বীপ বসবাসযোগ্য। বাকিগুলোতে চাষাবাদ হয় মূলত। ইয়ামিনের গত আমলে রাজধানী মালে ও এর সংলগ্ন এমন বড় চারটা দ্বীপকে একটা ব্রিজ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে, যার একটাতে এয়ারপোর্ট আর শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য জোন আছে। আর বাকি দুটোতে বসবাসের জন্য ১৬-২৫ তলা করে আবাসিক ফ্লাট তৈরি করেছে,  ইয়ামিনের সরকার চীনা ঋণে। মোট প্রায় ২২৪০০০ ফ্লাট। এরকম প্রতি ফ্লাটে যদি দু’জন করে বাসিন্দার এক পরিবার ধরি তবে মালদ্বীপের ৮৬% জনসংখ্যাকেই সরকার আবাসন দিতে পারবে, এতই বিপুল সংখ্যায় ফ্লাট নির্মাণযজ্ঞের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে এখনও।
    এখন সুধার লেখায় তাঁর অভিযোগ হল, ইয়ামিন মোট ১.৪ বিলিয়ন ডলার চীন ঋণ নিয়ে এসব নির্মাণকাজ করেছে। আরো বড় অভিযোগের স্বরে লিখছেন, এখন এই ঋণ কি মালদ্বীপ পরিশোধ করতে পারবে? নাকি শ্রীলঙ্কার মত হবে? মানে, বলতে চাইছেন, ভারত শ্রীলঙ্কায় যেমন প্রপাগান্ডা করতে পেরেছিল তেমন প্রপাগান্ডা করার সুযোগ কি মালদ্বীপেও পাবে?
    সুধা লিখছেন, “This was of concern to India. Would the Maldives, like Sri Lanka, end up handing over strategic assets in lieu of unpaid debt to China? Would the Chinese set up a naval base in the archipelago?”। কিন্তু তামাশাটা হল, ঋণ নিয়েছে মালদ্বীপ, কিন্তু তাতে উদ্বিগ্ন হয়েছে ভারত, যে কী করে মালদ্বীপ সেই ঋণ শোধ দিবে! আবার সেই ভারতই ইয়ামিনের পরের বর্তমান প্রো-ইন্ডিয়ান সলিহ-নাশিদ সরকারকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ দিয়েছে। অথচ এখন এই নতুন ঋণের বোঝা এটা শোধ দিবে কী করে সেটা ভারতের উদ্বিগ্নতার বিষয়ই নয়? দুনিয়াতে এরচেয়ে বড় জোকারি আর কী হতে পারে!

    প্রপাগান্ডা ও গুজবের শুরু এখান থেকেইঃ
    ধরা যাক, সুধার আশঙ্কামত মালদ্বীপ চীনা ঋণ পরিশোধে বিরাট সমস্যায় পড়বে। কিস্তির অর্থ দিতে গিয়ে বাজেটে টান পড়বে!  ইব্রাহিম সলিহ এখন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। তাহলে সলিহ-নাশিদ গ্রুপ যারা এখন ক্ষমতায়, এরা তো ক্ষমতায় এসেই নতুন করে ইন্ডিয়ান ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ মালদ্বীপ সরকার নতুন আরও প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ভারতীয় ঋণ নিয়ে এবার একইভাবে অন্য আর তিনটা দ্বীপ যুক্ত করতে রাস্তা বানাচ্ছে। এখন চীন ঋণ শোধে যদি মালদ্বীপের মুরোদই না থাকে তবে এর উপর আবার ভারতীয় ঋণ নিচ্ছে কেন? কোন সুখে আর বিবেচনায়? আর এই ভারতীয় ঋণের বেলায়ও এর কিস্তি পরিশোধের অর্থ কোথা থেকে আসবে, শোধ দিবে কী করে? এনিয়ে ভারত নিরুদ্বেগ কেন?  অর্থাৎ সুধার অনুমিত, কথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আসলে ছিল প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন মাত্র। আর মালদ্বীপের অর্থনীতির কোন ঋণের দায় বইবার আসল সহ্যক্ষমতা কী এবং কতটুকুর উপর দাঁড়িয়ে এনিয়ে কোন পেশাদারের বিশ্লেষণ-প্রাপ্ত ফলাফল জেনে নিয়ে তিনি কথা বলেননি। বরং ভারতীয় সাংবাদিক বলে চোখ বুঝে মিথ্যাবলার  ভারত সরকারের স্বার্থের পক্ষে দাড়ায় অপেশাদার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করে বসেছেন! অথচ প্রপাগান্ডা করা তার কাজ বা পেশা নয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সুধা আসলে প্রবল জাতিবাদী হয়ে কথিত ভারতীয় “জাতীয় স্বার্থে” এই মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। আর আমাদের জন্য এখান থেকে শিক্ষণীয় হচ্ছে, এমনিভাবে দুই প্রধান দলের, এমন চীন বা ভারতের পক্ষ নিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করবেই – একটা দেশের জন্য এই ইতরোচিত প্রপাগান্ডাই সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ও আপত্তিকর ও বিপদজনক। আর মালদ্বীপের প্রধান দুর্ভাগ্য আর পতনের কারণ হতে পারে এটা! এ জন্যই বলছি একেকটা দল চীন বা ভারতের দালালি নিবে, আর দেশটা ভাগ হয়ে যাবে পাবলিক এটা চলতেই দিতে পারি না। এমন হলে সে দেশ শেষ হয়ে যাবেই।
    আবার এই নাশিদ (২০১৩ সালের তিনিই শুরুতে প্রো-ইন্ডিয়ান প্রেসিডেন্ট ছিলেন যদিও, কিন্তু শেষে প্রো-চাইনিজ হয়ে ভারতীয়দেরকে দেয়া এক এয়ারপোর্ট প্রকল্প তিনিই বাতিল করে দিয়েছিলেন ) পরে তিনি ইয়ামিনের আমলে দুর্নীতির দায়ে জেলে ছিলেন। কিন্তু কোনো এক (সম্ভবত অসুস্থতার) অজুহাতে জামিন পেয়ে সেসময় পালিয়ে শ্রীলঙ্কা চলে যান আর সেখান থেকে ২০১৮ সালে মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান আর্মিকে মালদ্বীপ দখলের প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এদের দল আবারও ২০১৮ নির্বাচনে জয়ী হয়ে এলে সেবার ঘোষণা দিয়ে প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার কায়েম করেছিলেন যেখানে সোলিহ হন প্রেসিডেন্ট আর নাশিদ স্পিকার। আর পুরাতন চেয়ারছোঁয়া-খেলায় রোটেশনের মত ইয়ামিন এখন জেলে। এই হল ভারত বা চীনা দালালির রাজনীতির পরিণতি!

    এখন সলিহদের অভিযোগ হল চীন ঋণ থেকে ইয়ামিন সরকারের আমলে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ, চীনা প্রাইভেট কোম্পানির কাছে ঋণ নিয়ে ইয়ামিনের সরকার মালদ্বীপের কিছু প্রাইভেট ব্যবসায়ীকে কয়েকটা রিসোর্টগুচ্ছও বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইয়ামিনের সরকার ঋণের খাতক না হয়েও নিজে ঐ বেসরকারি বাণিজ্যে লোনের গ্যারান্টার হয়ে আছে। অতএব সলিহ-নাশিদের গ্রুপ এর দাবি এখানে এই গ্যারান্টার হওয়া মানে, তারা এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে এি সমুদয় অর্থও সরকারই ঋণ নিয়েছে ধরতে হবে। অর্থাৎ গ্যারান্টার হওয়া মানেই সরকার নিজেই ঋণ বুঝতে হবে। এবং এই অর্থও আত্মসাৎ হয়ে গেছে। সলিহ-নাশিদের অর্থমন্ত্রী অভিযোগ তুলে বলছেন, গ্যারান্টার হওয়া মোট ৯৫৩ মিলিয়ন ডলার হল এটাও ইয়ামিন সরকার চীনা ঋণ নিয়েছে ধরতে হবে। আর এছাড়া সরকার নিজের জন্য ঋণ নিয়েছে বাদ বাকিটা। এভাবে মোট ১.৪ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নিয়েছে। সে ঋণ পরিশোধে নাকি শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হবে মালদ্বীপের। আসলে এই প্রো-ইন্ডিয়ান গোষ্ঠী বুক ফুলিয়ে সবাইকে ‘হাইকোর্ট’ দেখাচ্ছে। ভেবেছে, সারা দুনিয়া তাদের এই বাক-চাতুরী বুঝবে না। অথচ এতে যে প্রশ্ন উঠে গেছে, তাহলে বাড়তি ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ঋণ নিল কেন আর এই ঋণের কিস্তি দেবে কিভাবে?

    সরকার গ্যারান্টার হওয়ার কালচার কোথা থেকেঃ
    প্রপাগান্ডা ফেলে এখন প্রকৃত ঘটনাটা ব্যাখা করা যাক। রাষ্ট্র কেন এখানে গ্যারান্টার হতে গেল এর পক্ষে ইয়ামিন সরকারের উপযুক্ত সাফাই থাকা দরকার ছিল, অবশ্যই। কিন্তু অন্যদিকের আরেক কথাও জেনে রাখা ভাল। তাহলে, ফেয়ার বিচার করা হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের গ্যারান্টার হয়ে থাকা স্বাভাবিক হতে পারে। যেমন  তা হল, বিশ্বব্যাংকের নিয়ম ও কালচার অনুযায়ী যারা নিজেদের “মধ্য আয়ের দেশ” হয়ে যায় বা দাবি করে আর বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদের (যেখানে ঋণের সুদহার নামমাত্র ০.৭৫% যা ১% এরও কম) ঋণ আর পাবে না। তখন থেকে তাদের ২% সুদহারের ঋণ শ্লটে যেতে হবে। বাংলাদেশ এখন এই শ্লটে। এছাড়া আরও একটা শ্লট আছে যেটাকে আইএফসি (ইন্টারনাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, IFC) লোন বলে, যার সুদহার ৪%। আইএফসি বিশ্বব্যাংক গ্রুপেরই আরেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে ওর লোনও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ওর শর্ত হল এই লোন সরকারি খাতের জন্য নয়, কেবলমাত্র বেসরকারি কোম্পানিকে দেয়া হয়। এছাড়াও আরেক শর্ত হল তবু সরকারকেই আবার ঐ লোনের গ্যারান্টার থাকতেই হবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে দুইটা বেসরকারি কোম্পানি যারা ১২০০ মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকারি তারা আইএফসির লোন পেয়েছে বা পাইয়ে দিয়েছে। কারণ এই লোন সরকারকেই পাইয়েই দিতে হয়, সুপারিশ করে। স্বাধীনভাবে পাওয়া যায় না। এই ঋণের অন্তত একটা মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন প্রকল্প অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই এমন গ্যারান্টার হয়ে আছে। সম্ভবত বিশ্বব্যাংককে অনুকরণ করে চীনা বেসরকারি লোন নেয়া হয়েছে ওখানে, মালদ্বীপে সরকার গ্যারান্টার হয়ে। আরো কথা আছে, এই লোন চুক্তি কিন্তু হয় ঐ বেসরকারি লোন গ্রহীতা কোম্পানির সাথেই দাতা IFC এর। কারণ, যদি পরিশোধে কোনো সমস্যা দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে সরকার যাতে লোন আদায়ে দাতার পক্ষ নেয়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা। আর এমন প্রকল্প যেহেতু তা সাধারণত সরকারের কোন ঠিকাদার কোম্পানির জন্যই করা হয়; যেমন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সরকারি ঠিকাদার অথবা উতপাদিত বিদ্যুৎ  সরকারকে বিক্রি করে এমন হয়ে থাকে ফলে ঐ বেসরকারি কোম্পানিকে আল্টিমেট পেমেন্ট দেয় সরকার। তাই সরকারের হস্তক্ষেপের কোন না কোন সুযোগ থেকেই যায় তাই এমন গ্যারান্টার ব্যবস্থা কোন সরকারের জন্য  বড় কোন রিস্কের সম্ভাবনা কম থাকে।
    এই যদি হয় আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের কালচার বা নিয়ম তাহলে আমেরিকার বন্ধু ভারত মানে প্রো-ইন্ডিয়ান মালদ্বীপ সরকার কেন এই প্রপাগান্ডা শুরু করেছে? ৯৫৩ মিলিয়ন ডলার ঋণে সরকার গ্যারান্টার বলে এই অর্থও ‘সরকার চীনা ঋণ নিয়েছে’ বলে পাড়া মাতাচ্ছে কেন? এগুলাই চরম অসততা ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফলে বিপদজনক। চীন বা ভারতের স্বার্থে তাদের এজেন্টরা এসব মিথ্যা প্রপাগান্ডার লড়াই দেশের উপর চড়িয়ে দেয়। এই হল মালদ্বীপে দেশ ভাগ হয়ে থাকা দুই দালালদের কায়কারবার থেকে পাওয়া শিক্ষা; যদি তা আমরা শিখতে চাই!
    এখন তামাসা হল, মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের দুই লেখকের আশঙ্কা কিন্তু একই। তাই শিরোনামও প্রায় এক। দু’জনই আশঙ্কা করছেন, ভারত মালদ্বীপে টিকবে কিনা; মালদ্বীপে ভারতের প্রভাব টিকাতে আর কতদিন পারবে? প্রথম লেখক সুধা রামচন্দ্রনের আশঙ্কা, চীনের মত ভারতের বেশি ঋণ দেবার মুরোদ নাই, তাই সমস্যা। তাই সুধার শিরোনামে শঙ্কা – “মালদ্বীপে ভারত কী চীনের উপরে জিততে পেরেছে?”। আর দ্বিতীয় লেখক সীমা দাসগুপ্তের আশঙ্কা ভারত হেরে যাচ্ছে সেজন্য শিরোনাম দিয়েছেন, “মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত”। কারণ সলিহ-নাশিদ গ্রুপ প্রো-ইন্ডিয়ান হলেও সম্ভবত ইতোমধ্যে তারাই আবার চীনের সাথে যোগাযোগ শুরু করে বসেছে। কোভিডের পরে তাদের সম্ভবত অর্থ বা ঋণ দরকার। আর অনুমান করি এক্ষেত্রে তারা সঠিকভাবেই ভারতের চেয়ে চীনকে উপযুক্ত মনে করেছে।

    এছাড়াও মালদ্বীপে নন-পার্টিজান এক সংগঠন ‘প্যাট্রিওটিক ইয়ুথ মুভমেন্ট অফ মালদ্বীপ’  মালদ্বীপে ভারতের উপস্থিতি, হেলিকপ্টার ও আকাশ থেকে সমুদ্রসীমা মনিটরিংয়ের কিছু বায়ুযান দেশের সঠিক প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করেছে। এ ছাড়া এসব যানগুলো পরিচালনার জন্য পাইলটদের ট্রেনিং শেষ করতে অসীমভাবে দেরি করে মালদ্বীপ ছাড়তে ভারতীয় সেনাদের গড়িমসি নিয়ে  – সবমিলিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে তারা নানা ধরণের পাবলিক সমাবেশে প্রতিবাদ করা শুরু করে দিয়েছে। তাই সীমা দাসগুপ্তার আশঙ্কা, ভারতকে মালদ্বীপ ছাড়তে হতে পারে। তাই তার লেখার শিরোনামই হলো সরাসরি, “মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত”। অর্থাৎ ভারতের ফকিরি বা ছ্যাঁচরামি করতে এখানেও দেখা যাচ্ছে।  ছেচরামো করে হলেও ভারতের সামরিক সদস্যদের মালদ্বীপে রাখতে হবে। এতে ভারতের কোন ইজ্জত বাড়ে তা কে জানে!  এটা যেন ভারতের ফরাক্কা বাঁধ তৈরির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বাঁধটা  পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর অনুমতি নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশের থেকে, শেখের আমলে। অথচ সে পরীক্ষামূলকটাই এখন  বিনা অনুমতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে, ভারতের খবর নাই!

    এদিকে সীমা দাসগুপ্তা দুটা আরো ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন। সীমা লিখেছেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেন্ট সলিহ ভারতের সাথে করা একটা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন, যেটা অনুসারে মালদ্বীপে “ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত বিষয়ে ভারতীয় আদালতের রায় প্রযোজ্য হবে”। এটা এক ভয়ঙ্কর নতজানু চুক্তি। আমাদেরও এটা নিয়ে সতর্ক হওয়ার ব্যাপার আছে। সারা দুনিয়ার রেওয়াজ হল – আইনি বিষয়ের জন্য এক্তিয়ার হবে প্রকল্প ভোক্তার স্থানীয় দেশের আদালতের। তবে আরও কিছু স্বার্থবিরোধ-বিতর্ক দেখা দিলে আন্তর্জাতিক কোনো সালিশি আদালত যেমন বিশ্বব্যাংকের সালিশ-বিরোধ নিরসনের আদালত, না হয় ইউরোপীয় সমতুল্য সালিশি আদালতের কথা সাধারণত বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লেখ করা থাকে।
    এছাড়া অপর তথ্য হল, সীমা লিখছেন, “ভারতের নজরদারি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন এবং এগুলো পরিচালনার জন্য (মালদ্বীপে) মোতায়েন করা ভারতীয় সেনা ও সরঞ্জামাদির বিষয়কে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু“ করেছে মালদ্বীপের পাবলিক। এমন ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ও ছড়িয়েছে যা দাবি করছে যে, “মালদ্বীপের কিছু অংশকে ভারত নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে”। সীমা লিখেছে, “মালদ্বীপের সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তা বলছেন, ভারতের সামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে মালদ্বীপের পাবলিকের মধ্যে গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে যার গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে”। দেখা যাচ্ছে, অপরের জন্য গর্ত-খানাখন্দ খুঁড়লে তার শিকার হয়ে ঐ গর্তে নিজেকেই পরতে হতে পারে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১০ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোনো জোটে ওঠা নয়” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]