Category: Politics

  • সালাহ উদ্দিন, গুম ও দিল্লির দায়

    সালাহ উদ্দিন, গুম ও দিল্লির দায়
    লেখার ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-am

    গত পাঁচদিন ধরে বিএনপির মুখপাত্র সালাহ উদ্দিন আহমেদকে কেন্দ্র করে তিনটা শব্দ মিডিয়া ছেয়ে রেখেছে – মেঘালয়, সালাহউদ্দিন আর খোঁজ। যারা সালাহ উদ্দিনকে গুম বা ‘নিখোঁজ’ করে রেখেছিলেন বলা বাহুল্য তাঁরাই এ’বিষয়টায় সবচেয়ে ভাল জানেন ও বলতে পারবেন। ফলে তাঁরাই তো সবার উপরে সালাহ উদ্দিনের খোঁজ প্রসঙ্গে নির্ভরযোগ্য সোর্স। কিন্তু বুঝা যাচ্ছে তাঁরা খবরের সে সোর্স হতে চাচ্ছেন না। বলাই বাহুল্য তাদের পক্ষে সোর্স হবার মত পরিস্থিতি নাই, হওয়াটাও অনুমান করি নতুন বিপদের বটে। অথচ সালাহ উদ্দিনের যে “খোঁজ পাওয়া গেছে” এটা আবার তাঁরাই রাষ্ট্র করতে চান, করা দরকার বোধ করছেন। তাই আমরা লক্ষ্য করলাম “খোঁজ পাবার পরে” প্রথম দুদিন সালাহ উদ্দিন সম্পর্কে যতটুকু তথ্য পাওয়া গিয়েছে এর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের একমাত্র সোর্স হয়ে হাজির হয়েছিলেন মেঘালয়ের শিলং টাইমসের সম্পাদক মানস চৌধুরী। সম্ভবত তিনি সফল এবং অযাচিতভাবে কোন পক্ষের দায় নিতে তিনি যান নাই।
    “খোঁজ পাবার” খবরটা মিডিয়ার ভাষায় বললে বলতে হয়, ‘চাঞ্চল্যকর’। তবে এটা পপুলার পাঠের দিকে তাকিয়ে বলা। মূলত “সরকারি দায়দায়িত্বের” দিক থেকে এটা খুবই বিপজ্জনক একটা খবর ও ফেনোমেনা – বিপদ নানান দিক থেকেই — ঘটনা হিসাবে, লক্ষণ হিসাবেও। যারা এর সাথে জড়িত তাদের জন্য তো বটেই। সরকারি পদাধিকারী, যারা হুকুম বা নির্দেশদাতা এবং যারা বাস্তবায়ন কর্তা উভয়েই এবং এছাড়া যারা তথ্য জানতেন তাদের সবার জন্য এ ঘটনা খুবই বিপদের। যে যত উপরের কর্তা ও পদবির তাঁর উপর এর দায় ততোটাই মারাত্মক। আসলে কী ঘটেছিল তা প্রকাশিত হয়ে পড়া পরিস্থিতিতে ক্ষমতাচ্যুতি, ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত হয়ে যাওয়া, সাজা হয়ে যাওয়া, ইমেজ কি হবে ইত্যাদির দিকগুলো চিন্তা করলেই আমরা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারব। আমাদের মত দেশে ও দুনিয়ায় এমন অনেক উদাহরণ আছে, নারায়ণগঞ্জের ঘটনা যেমন। সাম্প্রতিককালের ইন্দোনেশিয়ার কথা অনেকের মনে থাকার কথা। বাংলাদেশও এক অদ্ভুত জায়গা যেখানে জাতীয় জীবনের অভিজ্ঞতা এমন যে এপর্যন্ত এখানকার প্রতিটা জাতীয় গুরুত্বপুর্ণ ঘটনায় আসলে কি ঘটেছিল তা শেষেমেষে কখনই অপ্রকাশিত থাকে নি। ফাঁস হয়ে গিয়েছে।
    এই ঘটনায় মজার দিকটা হল সংশ্লিষ্ট পক্ষ অনেকানেক, শুধু তাই না প্রত্যেকটা স্বার্থই অন্যটার চেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা। এখানে এমন স্বার্থগুলোর কয়েকটার চাওয়া-পাওয়ার দিকটা নিয়ে আলাপ করব।
    সরকার ও বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত ১০ মার্চ সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ হবার দিন থেকে থানায় মামলা নেয়াকে কেন্দ্র করে থানা এবং পরে আদালতে বিচারক মোকাবিলা এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নিজে যেচে এসে ব্যাখ্যা বয়ান দিতে যাওয়া ইত্যাদি দিকগুলো দেখলে মনে হয় ক্ষমতাসীনরা কেবল আমাদের জানাতে চান যে এই ইস্যুটাকে তারা কঠোর হাতে মোকাবিলা করতে চান। এতটুকুই হাবভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকারি দায়দায়িত্ব নিয়ে আন্তরিকতায় জনগণকে আশ্বস্ত করা, আসলে ঘটনাটা কি ঘটেছে তা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে জনগণের কাছে হাজির করে বলা – এসব দিক থেকে সরকারের অর্জন একেবারেই শূন্য। এই অবস্থায় ঠিক দুমাস পর খোঁজ পাবার দিনে দুএকটা মিডিয়ায় “অনামক গোয়েন্দা সুত্রে প্রাপ্ত খবর” বলে বরাত দিয়ে–“সালাহ উদ্দিন নিজেই নিখোঁজ হয়ে ছিলেন, নিজেই মেঘালয়ে এসেছেন” –  এমন নিউজ করিয়ে রাখা হয়েছে। বুঝা যাচ্ছে সরকারের পালটা বয়ান এভাবে হাজির করে রাখা হল। কিন্তু এই গল্প এতই দুর্বল এবং “বাংলাদেশের কথিত গোয়েন্দাদের” বিশ্বাসযোগ্যত্র মাত্রাও এতো নীচু যে যে কোন আদালতেই এমন ষ্টেটমেন্ট কোন কাজে আসবে না, উড়ে যাবে তা বলা বাহুল্য। কারণ সরকার “সালাহ উদ্দিনকে গুম বা অপহরণ করে রাখে নাই” এর পক্ষে সরকারের সাফাই শুনার চেয়ে জনগণ শুনতে চায় নিশ্চিত হতে চায় যে সালাহউদ্দিন কে কেউ অপহরণ করতে পারবে না। সালাহ উদ্দিন সেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও প্রতিশ্রুতির বেষ্টনিতে নিরাপদ আছে। তাতে সালাহউদ্দিনের নামে আবার আদালতে অমীমাংসিত কোন মামলা থাকুক অথবা কোন মামলাই না থাকুক।
    ওদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃষ্টিকটুভাবে দুটা তথ্যের উপর জোর দিচ্ছেন দেখা গেছে। প্রথম তথ্য – “এতে প্রমাণিত হল যে আমরা সালাহউদ্দিনকে গ্রেফতার করি নাই” – আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমন ষ্টেটমেন্টের উপর জোর দিচ্ছেন। যদিও সালাহ উদ্দিনকে মেঘালয়ে খুঁজে পাওয়ার গেছে এই প্রাথমিক তথ্য নিজে – আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সালাহউদ্দিনকে গ্রেফতার করে নাই অথবা করে ছিল – এমন কোন তথ্যকেই এই পর্যায়ে নাকচ করে না। দ্বিতীয় তথ্য – এখন সরকার সালাহ উদ্দিনকে কিভাবে ফেরত আসতে সাহায্য করবেন বা তিনি আসতে পারেন সেটা নয় বরং খুবই জোর দিয়ে জনগণকে সাজেশন ম্যাসেজ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে যে ভারতের আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সালাহ উদ্দিন এখন দীর্ঘ এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারতের জেলে পচবেন – এব্যাপারে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুবই নিশ্চিত এবং আশ্বস্ত। অথচ এটা বলা তাদের কাজ বা এক্তিয়ার নয়। নিজেদেরকে এভাবে উপস্থাপনের ভিতর দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদেরকে দায়শূন্য জ্ঞান করছে। বরং সালাহ উদ্দিনকে আগে ভারত থেকে ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে সাহায্য করা এবং তারপর আদালতে মামলা চালানোর কঠোরতা দেখালে জনগণ হয়ত সেটা পছন্দ করত মেনে নিত, বিশ্বাস করত।
    সালাহ উদ্দিনের খোঁজ পাওয়াতে এবং বিশেষত ভারতের “মেঘালয়ে তাঁর খোঁজ পাওয়াতে” এই ঘটনাটা আর এক মারাত্মক দিকে মোড় নিয়েছে। সাদামাটা ভাবে বললে নিখোঁজ ঘটনাটা আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। মানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনকানুন তো বটেই এখন এর বাইরে ভারত রাষ্ট্রও জড়িত হয়ে পড়ল। সালাহ উদ্দিন ভারতের মেঘালয়ে হাজির হলেন কি করে, কেন কি ভাবে – এজাতীয় সকল সম্ভাব্য প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাবে মূলত ভারত সরকারের সংশ্লিষ্টতা এবং সংশ্লিষ্টতার স্তর এবং মাত্রাকে কেন্দ্র করে।
    আগেই বলেছি সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজের ব্যাপারটা “রাষ্ট্র ও সরকারি দায়দায়িত্বের” দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক একটা খবর ও ফেনোমেনা। এছাড়া সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ নিঃসন্দেহে একটা হাই প্রফাইল রাজনৈতিক ঘটনা। এটা নারায়ণগঞ্জ সাতখুন ঘটনার নূর হোসেনের কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার মত সরল কোন ঘটনা নয়। কারণ নূর হোসেন ভিসা পাসপোর্টে নিজেই কলকাতায় হাজির হয়েছিলেন। তুলনায় সালাহ উদ্দিন দাবি করছেন, তাকে “অপহরণ” করে কেউ শুধু দুমাস বাংলাদেশেই নয়, ভারতেও তৎপরতা চালিয়ে অপহৃত অবস্থায় নিয়ে হাজির করেছে। অর্থাৎ ভারতীয় ভুখণ্ডেও সালাহ উদ্দিনের উপর একটা বড় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এই অপহরণ রাজনৈতিক অপহরণের অভিযোগ এবং ঘটনা। এখানে রাজনৈতিক শব্দের অর্থ ক্ষমতা, নারায়ণগঞ্জের সাত খুন এর তুলনায় রাজনৈতিক ঘটনাই নয়। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই আন্দোলন সংগ্রামের সাথে জড়িত এই ঘটনা। এই অর্থে রাজনৈতিক। আন্তর্জাতিক আইন কানুনে গুম, অপহরণ খুবই নিন্দিত অপরাধ বলে চিহ্নিত, বিশেষত রাজনৈতিক ঘটনাবলির ক্ষেত্রে। ফলে সেনসেটিভও।
    বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামে ভারত কোন পক্ষ নয়। এটা পরিষ্কার রাখা ভারতের দিক থেকে জরুরী। এছাড়া ভারত কোন পক্ষ হয়ে গেছে এ ধরনের কোন ইঙ্গিত যেন কোনভাবেই না ওঠে সেই দিকে মোদি সরকারের দৃষ্টি দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইনত বা কূটনৈতিকভাবেও তা হবার কোন সুযোগ রেখে দেওয়া বিশ্বে অবশ্যই ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করবে। বিশেষত বাংলাদেশের ক্ষমতা পেতে বা রাখতে গিয়ে কোন খুনাখুনি গুম বা অপহরণের সাথে ভারতের নুন্যতম সংশ্লিষ্টতা ছিল, সে বাংলাদেশের কোন ক্ষমতাসীনকে এমন চরম অবৈধভাবে এবং ক্রিমিনাল আচরণ করে ভারত সাহায্য করেছে এমন ধারণা থাকাও ভারত-বাংলাদেশের আজ এবং আগামি দিনের সম্পর্কের জন্য খুবই বাজে একটি চিহ্ন হয়ে থাকবে। এই কলংক মোচন দিল্লীর জন্য কঠিন হবে। এক রাষ্ট্রের ভিতর অপর রাষ্ট্রের স্বার্থ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে কোন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের নির্বাহী নিজ রাষ্ট্রকে কোন খুনাখুনি গুম বা অপহরণের মত ক্রিমিনাল কাজে জড়িয়ে ফেলতে পারে না। বাংলাদেশে ভারতের বহুবিধ স্বার্থ আছে। কিন্তু সেজন্য ভারত বাংলাদেশের খুনাখুনি গুম বা অপহরণের রাজনীতির সাথে নিজেকে জড়িত করতে পারে বা করেছে এই ভাবমূর্তি একবার দানা বাঁধলে কূটনৈতিক ভাবে ভারত কলংকের গর্তে পতিত হবে। মোদি এই ঝুঁকি নেবেন বলে বিশ্বাস করা কঠিন।
    এসব দিক বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির উচিত হবে যেচে তাঁর নিজের হাত পরিষ্কার করে রাখা। এটা বাংলাদেশ ও ভারতের আজ এবং আগামিদিনের সম্পর্ককে ফাংশনাল ও কার্যকর রাখার দিক থেকে দরকারি। কোন ধরণের কাল ছায়া থেকে মুক্ত রাখার দিক বিবেচনা করে ন্যূনতম দায় ও কূটনৈতিক দিক থেকে দুরদর্শী চিন্তা ও কাজ করতে হবে মোদীকে।
    সালাহউদ্দিনের মেঘালয়ে হাজির হওয়া নেহায়তই এক কাকতলীয় ঘটনা। এটা বাংলাদেশ সরকার কিম্বা সরকারের অজান্তে আইন শৃঙ্ঘখলা বাহিনীকে ক্রিমিনাল কাজ করতে সহায়তা করার ঘটনা নয় মোটেও – এই সত্য নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ করে রাখা প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাজ। কিভাবে সালাহ উদ্দিনের ভারত ভুখন্ডে প্রবেশ করলেন অথবা কে তাকে আনল, তিনি কিভাবে আসলেন তা বিশ্বাসযোগ্য কোন তদন্ত কমিশনকে দিয়ে উদ্ঘাটন করে রাখা প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তাঁর সরকার এবং আগামি বহু অজানা সরকারের দিক থেকে হাত পরিস্কার করে রাখার মত একটা কাজ হবে।

    সালাহ উদ্দিন কিভাবে মেঘালয়ে হাজির হলেন তা নিয়ে তিনি নিজে যা বলছেন তা আপাতত হয়ত এক বর্ণনা মাত্র মনে হচ্ছে। কিন্তু তিনি আসলে যা বলছেন তা কিন্তু ভারত সরকার ও প্রশাসনের কাছে এক নালিশ বা অভিযোগ। অভিযোগটা এই যে ভারত ভুখণ্ডে কোন আইনভঙ্গকারী ভারত সরকারের ক্ষমতা ও এখতিয়ার অবজ্ঞা করে সালাহ উদ্দিনকে নির্যাতন ও অপহরণের মত জঘন্য অপরাধ করেছে। এই অভিযোগ যেহেতু ভারত ভুখন্ডে ঘটেছে বলে সালাহউদ্দিন অভিযোগ করছেন ফলে এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে সকলে স্বাভাবিকভাবে দাবি করবে যে  তিনি এই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য এক তদন্ত করবেন এবং সকল তথ্য নিরপেক্ষা ভাবে যাচাইয়ে ব্যবস্থা করবেন।  প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতে তাঁকে ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • প্রধানমন্ত্রী মোদি আর বিজেপির মোদিঃ ফারাক কি বজায় রাখতে পারবেন

    লেখার ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-a7

     

    বাস্তবে যা পাওয়া যায় তাই বাস্তব, যা বাস্তব করা যায় না তাই আদর্শ

    ভারতের এখন বিজেপির সরকার ক্ষমতাসীন আর এর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদি। বাংলাদেশে মোদী সম্পর্কে পাবলিক পারসেপসন হল, “ও মোদী উনি তো বিজেপি, আর সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি সম্পর্কে কি আর নতুন বলব”। মোটা দাগে বললে এই বয়ান এটাও এক সত্য। এথেকে এই বয়ান কনষ্ট্রাকশনের পিছনের অনুমানগুলো কি তাও বুঝা যায়, আমরা কমবেশি জানি। তবে অবশ্যই এমন বয়ান যথেষ্ট নয়। আবার এই বয়ানের কারিগর এক সেকুলার মন, মানে “কমিউনিষ্ট”, “প্রগতিশীল”, লিবারেল উদারবাদী ইত্যাদির হলেও ইসলামী মনের দিক থেকে যারা দেখেন তারাও এই বয়ানের বিরুদ্ধে বিশেষ আপত্তি করবেন না। কারণ তাদের আপত্তি-জাত সিদ্ধান্তও কমবেশি একই। এজন্য এই বয়ান ডমিনেটিং বা প্রায় সব পক্ষের উপরে দাঁড়ানো ও ছেয়ে থাকা বয়ান। এখন একথা মেনে নিয়েও বিজেপির মোদী যখন প্রধানমন্ত্রী মোদী হিসাবে একশনে ততপর – এই ডায়ানামিক পরিস্থিতির দিকে নজর ফেলতে এই লেখা। ডায়ানামিক কেন? বলা হয়, কোন রাজনীতি বা রাজনৈতিক দল নিজেকে যাদের দল বলেই মনে করুক না কেন, দলের পতাকা বা সাইনবোর্ডে যে রংকেই প্রতীকী চিহ্নে হাজির করুক না কেন ঐ ব্যক্তি বা দল আসলে কেমন বৈশিষ্টের রাজনীতির – তা নির্ধারকভাবে বুঝার উপযুক্ত একমাত্র উপায় হল ওর ততপরতা, মানে ষ্টেপ বা পদক্ষেপগুলো কি, কেমন এর ভিতর দিয়ে তাকে বুঝতে চেষ্টা করা। কারণ শেষ বিচারে এসব পদক্ষেপগুলোই ঐ দল বা ব্যক্তির প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতীকী রং-চিহ্ন আঁকে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দল বা কোন রাজনৈতিক ট্রেন্ডকে ওর ঘোষণাপত্র গঠনতন্ত্র এগুলো দিয়ে চিনা যায় না, চিনতে হয় ওর বাস্তব পদক্ষেপ, বাস্তব ঘটনায় ওর বাস্তব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রকা্‌শ, অবস্থান নেয়া, করণীয় মনে করে বাস্তবে যা করে ইত্যাদি এসব দিয়ে। সোজা কথায়, রাজনীতির ঘোষিত প্রতীকী রঙ কমিউনিষ্ট গাড় লাল বা ইসলামি গাড় সবুজ যাই দেয়া থাক না কেন ওর রাজনীতির আসল রঙ কতটা ফিকে বা ট্রু কালার কী তা বুঝতে হয় ওর পদক্ষেপ দেখে। কোন কমিউনিষ্ট পার্টির দলের রঙ আর পদক্ষেপে ফারাক – এঘটনাকে অনেকে ঘোষিত রংয়ের বিচ্যুতি বা “আদর্শ বিচ্যুতি” বলে চিনাতে পারে। কিন্তু এটা বিচ্যুতি কিনা সেই তর্কে আমাদের জড়ানোর চেয়ে বাস্তব প্রেক্ষিতে রংটা কি, ঐ রঙয়ের অর্থ কি সেটা বুঝার দিকে মনোযোগ দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ “আদর্শ লইয়া আমরা কি করিব”। আদর্শ তো আদর্শই, তা কখনই বাস্তব নয়। আদর্শ সব সময়ই আগাপাশতলা অবাস্তব তবে, এক প্রাক-আইডিয়া মাত্র। যা হুবহু বাস্তবে হাজির করা যায় না, হয় না। অথবা বাস্তবে হাজির হতে গেলে তা আসলে কি হয়ে যায় সেটাই মুখ্য ফোকাস। বুঝার বিষয়। আদর্শ কি রূপ কল্পনায় এঁকে সে মাঠে নেমে ছিল তা শত মোহনীয় হলেই বা আমাদের কি লাভ, কি যায় আসে তাতে। বাস্তব মানে চলমান ডায়ানামিক পরিস্থিতিতে যা আকার নেয়। ফলে এখানে একজামিনের বিষয় বাস্তব মোদী। এই অর্থে প্রধানমন্ত্রী মোদীর বাস্তব পদক্ষেপ সমূহ। সেই ট্রু কালারের খোঁজে এই রচনা।

    গত বছর ২০১৪ সালের ২৬ মে নরেন্দ্র দামোদর মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তার রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি, এই দলের পরিচয়েই তিনি প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেসের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো তিনিও একজন গুজরাটি হলেও গান্ধীর সাথে তুলনায় অন্য অনেক কিছুর চেয়ে তার সবচেয়ে বড় ফারাক হলো প্রজন্মে। ১৯৪৭ সালের পর ভারতে যাদের জন্ম এমন প্রজন্মের মধ্যে তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় শিখরে। গুজরাট রাজ্যের পরপর তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। সেই সাথে প্রথমবারের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ের গুজরাটের দাঙ্গা, মুসলমান হত্যার দাগ ও এর দায়দায়িত্বের মূল অংশীদার তিনি। এতে মামলা বা আইনি দিক থেকে রেহাই পেয়ে গেলেও এর রাজনৈতিক দায়দায়িত্বের দিক থেকে তিনি কখনই মুক্ত হবেন না। তার দল সম্পর্কে আপামর সাধারণ ধারণা হলো, আমাদের দেশের ও ভারতের সেকুলারদের ভাষায় বলা হয় এটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক দল।
    যদিও বিজেপি সম্পর্কে মূল্যায়নের মূল দিকটা হলো জন্ম থেকেই বিজেপি ইসলামফোবিক দল, মুসলমানবিদ্বেষী দল। আরো পরিষ্কার করে বললে, বিজেপির বয়ানের সারকথা হলো ভারতে ধর্ম ও সংস্কৃতিতে হিন্দুত্ব বলে একটা কিছু আছে। বিশেষ সেই হিন্দুত্ব ধারণাজাত ও একে ভিত্তি মেনে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দল বিজেপি; এই হিন্দুত্ব ধারণা শ্রেষ্ঠ, এমন বয়ানের ওপর দাঁড়ানো সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আধিপত্যের স্বপ্ন ও অনুমান এ দলের আছে।
    কথা আরও আছে, কথিত হিন্দুত্বের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আধিপত্যের প্রাবল্য মেনেই ভারতে অন্য যেকোনো ধর্ম, রাজনৈতিক শক্তি বা বয়ান হাজির থাকতে পারবে। এই হলো বিজেপির আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন বা ভিশনে দেখা কাঙ্খিত ভারত। যেমন, ভারতের প্রাচীন সামাজিক ও ক্ষমতা কাঠামোয় হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রমের বিষয়টি আমরা কমবেশি বুঝি। মানে এক কালে সমাজে কার কী পেশা হবে, সামাজিক মর্যাদা কী হবে এসবের ভাগ-বণ্টন ও বিভক্তির ভেতর দিয়ে শাসক ব্রাহ্মণদের সামাজিক ক্ষমতা চর্চা হত। এই অর্থে এটা ভারতের সামাজিক শ্রমের এক বর্ণ বিভাজন। একালে ক্যাপিটালিজমের পাল্লায় পড়ে এবং ক্রমশ বিস্তারে সে কাঠামো কেবল ভাঙছে আর ভাঙছে, দুর্বল হচ্ছে। তবুও ঐ মৌল কাঠামোটা সমাজে এখনো নির্ধারক ভূমিকা রেখে চলে, টিকে আছে। আমাদের চলতি ভাষায়, এটা এক জাতপাত ব্যবস্থা। বিজেপির ইমাজিনেশন বা কল্পচিত্রটা হলো তাদের হিন্দুত্ব ধারণার বাইরে আর কোনো ধর্ম, বা মতাদর্শ যা আছে সেগুলোকে বড়জোর তারা পুরনো বর্ণাশ্রমের ধারণার ভেতরেই যেনবা আর একটা জাত-বর্ণ কেবল এতটুকু মর্যাদা তারা সব ‘অপর’দের দিতে পারে, চায়। অর্থাৎ নানান জাত-বর্ণের মতোই নিজ হিন্দুত্বের অধীনস্থ যেন আর এক জাত হয়ে কেউ চাইলে থাকতে পারে। এতটুকু ‘অপর’ সে সহ্য করতে রাজি আছে। যেখানে বিজেপির হিন্দুত্ব ধারণাজাত সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধীনস্থ থাকবে সব জাত, ধর্ম, বয়ান সবকিছুই।
    বিজেপি কংগ্রেসের সেকুলার ধারণা গ্রহণ করে না। তবে পপুলার পারসেপশন হলো, কংগ্রেস অন্তত মুখে বলা বা আড়াল হিসেবে নিজেকে সেকুলার বলে দাবি জানায়, তাই সে বিজেপির চেয়ে একটু বেশি ভালো। বিজেপি এই ভান করা ঠিক মনে করে না। তবে আমরা সেকুলার ধারণার প্রতি আগাম বিশেষ পক্ষপাতিত্বের ঝোঁক থেকে না দেখলে সম্ভবত এর সঠিক ব্যাখ্যা হবে বিজেপি ও কংগ্রেস দুটোই মূলত ‘হিন্দুত্ব’ ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী দল। অর্থাৎ ঐতিহ্য কথার আড়ালে ‘হিন্দুত্ব’ বয়ানে গঠিত এক সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের ভারত হতেই হবে। উভয় দল এই চিন্তায় অভিন্ন এবং তাদের মৌলিক চাওয়া। কিন্তু নিজেকে বাইরে উপস্থাপনের প্রশ্নে কংগ্রেস সেকুলার জামা পরে নেয়া ঠিক মনে করে, আর বিজেপি এর বালাই রাখতে রাজি নয়। মানে দাঁড়াল, এ বিষয়ে এই দু’টি দলই ‘হিন্দুত্ব’ ধারণার হিন্দু ছাড়া ভিন্ন কোনো ধর্ম বা বয়ানের কাউকে একই সাম্য-মর্যাদা দেওয়া বা কোনো সামঞ্জস্য বিধান দূরে থাক, কোনো আংশিক শেয়ার দিতেও রাজি নয়। আবার এভাবে উদ্ভূত ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা যে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ছাড়া অন্য কোনো ভিত্তিতে পুনর্গঠন করে নিতে পারে, আগামিতে হতে পারে এমন সম্ভাবনা এই দুই দলই মনে করে না। এ বিষয়ে ভাবতে পারে না বা চায় না। এমন না চাওয়ার পেছনে বড় এক অনুমান আছে যেটা আবার দুটো দলেরই চিন্তার মৌলিক ভিত্তি। এটাই আবার কংগ্রেস ও বিজেপি এই দুই দলের মধ্যে বিরাট এক মিলের দিক। সেটা হলো, দুই দলের প্রধান ধারণা হিন্দুত্ব, তবে দুইভাবে ইমাজিন বা কল্পচিত্রে এঁকে নেয়া, পরিগঠিত এক হিন্দুত্ব। দুই দলেরই দৃঢ়বিশ্বাস হলো, এই ‘হিন্দুত্ব’ ধারণাটা হলো নানা জাতপাতের ভারত, নানা প্রদেশের ভারত, সমতলী-পাহাড়ি ভারত ইত্যাদি নানা স্বার্থ বিরোধের ভারতকে এক রাখার চাবিকাঠি। এক ভুতুড়ে হিন্দুত্ব পরিচয় (দুইভাবে তৈরি) এটাই ভারতকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখার ভিত্তি। এমন ভাবনার পেছনের অনুমান হলো, এই হিন্দুত্ব ধারণার ভেতর গোঁজামিল, অসামঞ্জস্যতা যাই থাক হিন্দুত্ব ধারণা প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণ না করলে গতি নেই। ভারতে কোন ‘রাজনৈতিকতা’, রাজনৈতিক ভিত্তি আরম্ভ করা সম্ভব নয়।
    এমন ভাবনা কেন?
    ক্ষমতা, আইন, জাতিগঠন, রাষ্ট্র, জাতি রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো সম্পর্কে মৌলিক ধারণাগুলো গত অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের হাত ধরে দুনিয়ায় হাজির হয়েছে। তবু এভাবে উদ্ভবের ভিতরে এর অস্পষ্টতা অস্বচ্ছতাও কম নয় বরং সময়ে মারাত্মক। উপরে অনেকগুলো শব্দ উল্লেখ করে মৌলিক বিষয় ও ধারণাগুলোকে চিনিয়েছি। তবে গুরুত্বের কমবেশির দিক এসব শব্দ বা ধারণার মধ্যে মূলত ‘পলিটিকস’, ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ ধারণা দুটো প্রধান। বাকি ধারণাগুলো এই দুই ধারণা সাপেক্ষে নির্মিত ও অর্থপুর্ণ হতে পারে, নইলে নয়। চিন্তার দিক থেকে মূলত ‘পলিটিকস’, ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ ধারণাদুটোর অর্থ গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে চলতি শতকে এসে একাডেমিক ও বাস্তব মাঠের চর্চা এবং উদাহরণ অভিজ্ঞতায়ও এখন তা অনেক স্বচ্ছ হয়েছে। কিন্তু তবু তা ডোমিনেটিং হয়েছে একথা বলা যায় না। এগুলো চিন্তার দিক থেকে মূলত ‘পলিটিকস’, ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ ইত্যাদি ধারণাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী তা বোঝা অনুসন্ধানের পথে না চেয়ে বরং ইউরোপ বা তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের নকল করতে গিয়ে সেসব অস্বচ্ছতার আবর্জনা তৈরি হয়েছে তা থেকে জাত সমস্যা। তবে সবকিছুই আবার চিন্তার সীমাবদ্ধতার সমস্যা নয়। বৈষয়িক স্বার্থও সমস্যার উৎস হয়। আর একটু স্পষ্ট করে বললে এগুলো পশ্চিমের এনলাইটমেন্ট ধারণায় রামমোহন বা বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা, তাদের চিন্তার আমলের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা।
    ওদিকে ভুতুড়ে এক ‘হিন্দুত্ব’ ধারণার ভিত্তিতে ভারতকে এক রাখার সমস্যাগুলো ভারতের সব রাজনৈতিক, ইনটেলেকচুয়াল সদস্য সবার জানা। কিন্তু নতুন করে নতুন চিন্তায়, নতুন ভারত পুনর্গঠনের কাজটা এতই পর্বত প্রমাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যে এই ভারত নিজ গুণে ভেঙে পড়ে অচল না হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউই এ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা না তুলে বরং ‘হিন্দুত্বের’ ভেতরেই মাথা গুঁজে যত দিন টিকে থাকা যায়, সমস্যা নেই মনে করা যায় সেটাকেই শ্রেয় মনে করে।

    গান্ধীর সাথে মোদির কথা তুলেছিলাম মূলত প্রজন্মের দিকটা ভেবে। অর্থাৎ মোদি কি সেই প্রজন্ম হতে পেরেছেন যিনি অন্তত গান্ধী-নেহরুর জমানার বাইরে নতুন চিন্তা করার মতো চিন্তার মুরোদ-সামর্থ্য ও সাহস রাখেন? এই প্রশ্নটার জবাব খোঁজার বা পাঠককে সাথে নিয়ে ভাবার চেষ্টা করব।

    ওপরে চিন্তার ভিত্তি প্রসঙ্গে স্বল্প কিছু যে পরিচিতি বিজেপির দিয়েছি সে দিক থেকে মোদিকে বিজেপি থেকে আলাদা করা যায় না। অর্থাৎ চিন্তার ভিত্তির দিক থেকে মোদি বিজেপি থেকে কিছুই আলাদা নন অবশ্যই। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় প্রধানমন্ত্রী মোদির স্বপ্ন চিত্রকল্পের আগামী ভারতের ছবির মধ্যে এমন কিছু আছে যা তাকে আলাদা করে আগামীতে তিনি আলাদা হয়ে উঠতেও পারেন। তবে অবশ্যই এটা সম্ভাবনা, এটা হতে যাচ্ছে বা হবেই এমন দাবি করছি না। কি সেটা? প্রধানমন্ত্রী মোদি আর বিজেপির মোদি এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফারাক আছে। এভাবে এই বাক্য লিখে তার প্রাথমিক ধারণা হাজির করা যায়।

    প্রথমত, মোদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতে যে ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি বদলানো ও পুনর্গঠন কাজ করতে চান তা মনে করে তিনি হাঁটছেন না। কিন্তু তিনি যে ‘বিকাশের স্বপ্ন’ দিকে তাকিয়ে একাগ্র হয়ে হাঁটছেন তাতে ভারত রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি বদল ও পুনর্গঠনের দিকে রওনা হয়ে যেতে পারে।

    অন্য যেকোনো হিন্দুত্বভিত্তিক আর পাঁচটা নেতার মতোই হলেও অন্যদের চেয়ে মোদির ফারাক এখানেই, তিনি নতুন মাত্রার এক ‘বিকশিত’ ভারত কল্পনা করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির মুখ্য স্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’। হিন্দিতে বিকাশ শব্দের অর্থ আমাদের কাছে প্রচলিত ‘উন্নয়ন’ বা ‘ডেভেলপমেন্ট’ ধারণাটাই। কিন্তু বিকাশ, ‘উন্নয়ন’ বা ডেভেলপমেন্ট শব্দগুলোর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এককথায় বললে নানা বাধা পেয়ে বামন হয়ে থাকা ক্যাপিটালিজমের বাধাগুলো দূর করে ভালো ধরনের বিকাশ। অর্থাৎ কার বিকাশ, উন্নয়ন বা ডেভেলপমেন্ট এই প্রশ্ন করলে জবাব আসবে, ক্যাপিটালিজমের বিকাশ। ক্যাপিটালিজমের বিকাশ সম্ভব এই অভিজ্ঞতা বা অভিজ্ঞতার মজা মোদি হাতে-কলমে পেয়েছেন গুজরাটের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে। এটাই হিন্দুত্বের বিজেপির মোদির কাছেই নতুন বিস্ময়। নতুন আলো। মোদির নতুন প্রেম তাই ‘বিকাশ’-এর সাথে, তার চিন্তার মৌলিক পরিচয় ভিত্তি বিজেপিরই হওয়া সত্ত্বেও।

    এর কারণ কী বা এটাকে অনেক রকম সমাজতাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন অনেকে। যেমন অনেকে বলতে পারেন মোদি রেল স্টেশনে চা বিক্রি করে পেট চালানো মা-বাবার সন্তান। আবার তিনি ছোট থেকেই আরএসএস ও বিজেপির সাথে যুক্ত। ফলে জীবনের স্পিরিচুয়াল দিকটা মানসিক ভিত্তি হিসেবে তিনি হয়তো তাদের কাছ থেকে পেয়েছেন। কিন্তু বৈষয়িকভাবে জীবন নির্বাহ, বাঁচিয়ে রাখার কষ্ট এই বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকটা তিনি কখনই উপেক্ষা করেননি। ভুলে যাননি, বাদ দেননি। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রচার চলার সময়ই অবলীলায় তিনি সেসব দিনের কাহিনী অকপটে পাবলিক মিডিয়ায় বলেছেন। তার মায়ের প্রতি সবিশেষ অনুরাগ তিনি এখনো লুকাননি। কারণ মা তাকে খেয়ে না খেয়ে কষ্ট করে বড় করেছেন। একমাত্র বসবাসের ঘরে একই সাথে শুকনা গোবরের জ্বালানি রাখতে হতো বলে এর গন্ধে তিনি কেমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সেই খুঁটিনাটি বর্ণনাও তিনি বাদ দেননি। আবার মানুষের জীবনে কাজের সংস্থান না থাকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার অর্থ কী তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানেন।
    সম্ভবত সে জন্যই তিনি নিজের ‘বিকাশ’ স্লোগানের অর্থ করছেন নিজে এভাবে ‘সবার টেবিলে খাবার, সব বাচ্চা স্কুলে, সকলের জন্য কাজের সংস্থান, পায়খানাসহ একটা বাসস্থান, প্রত্যেক পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ’ ইত্যাদি। এগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় বলা। যেটা মোদির সরকারের দিক থেকে ‘বিকাশ’ এই অর্থনীতিক নীতি পলিসি। বিজেপির মোদি ছাপিয়ে রক্ত-মাংসের মানুষের জীবন ব্যবহারিক দিক থেকে দেখা অভিজ্ঞতায় এসব মিলিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদি।

    আর এক সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হতে পারে এরকম। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ বা রাজ্যের জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম বা অন্য সবার আগে নিজ ভাষাভাষীর পরিচিত এলাকা ছেড়ে বাইরে বের হয়েছেন কাজের অনুসন্ধানে বা বেটার লাইফের জন্য তারা হলো গুজরাটের বাসিন্দা বা গুজরাটি। তারাই জমিজিরাতি ছেড়ে ভিন্ন পেশার সন্ধানে অভিযাত্রী। ক্রমে তারাই ট্রেডার। বাণিজ্যিক বেণে বা ব্যবসায়ী। ফলে ব্রিটিশ আমলেই তারা ব্রিটিশের হাত ধরে সাউথ আফ্রিকাসহ সারা আফ্রিকাতেই প্রবেশ করেছিল এবং এখনো ছড়িয়ে আছে। ব্যবসায়ী কথার আর এক ইতিবাচক অর্থ উদ্যোক্তা। নতুন কর্মের সংস্থান, নতুন আইডিয়ায় নতুন উৎপাদনের সংগঠন হাজির করতে লেগে থাকার নিরন্তর প্রয়াস। এটাও হয়তো মোদির রাজনৈতিকভাবে ‘বিকাশ’ ধারণা ও মনে এক স্বপ্ন পুশে একটা ভিশনে পৌঁছানোর পেছনের কথা। হয়তো মোদির বেলায় তা ভালোরকম এক অবসেশনও মাখা।  প্রতিদ্বন্দ্বীরা গুজরাটিদের নেতিবাচকভাবে দেখাতে, নিজের অক্ষমতা ঢাকতে গুজরাটিদের ‘গুজ্জু’ বলে থাকে।

    যাক সেসব কথা। মূলকথা প্রধানমন্ত্রী মোদি নামটা নতুন মাত্রায় হাজির হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। সমাজে ও রাজনীতিতে যেভাবে তিনি ক্ষমতা তৈরি করেছেন ধাপে ধাপে মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ততই তার ‘বিকাশের’ স্বপ্ন প্রধান হয়ে উঠতে শুরু করেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর তিনি সব কিছুর আগে ‘বিকাশের’ স্বপ্নধারণকারী মোদি এরপর অধস্তন তিনি বিজেপির মোদি এমন হয়ে উঠছেন। এটা লুকিয়ে বা অজান্তে বেখেয়ালে করে ফেলা কাজ না। তিনি সরব। বলছেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিজেপির প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকতে চান না। নিজ দল আর সরকারের মধ্যে তিনি এক পরিষ্কার ভাগ বজায় রাখতে চান। এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বলে কেউ যেন তাকে কেবল গুজরাটের লোক না ভাবেন তা নিয়ে তিনি আগেই সজাগ। তাকে অনেক দূর যেতে হবে, অনেককে নিয়ে পথ চলতে হবে, তাই তিনি আগেভাগেই সতর্ক। আবার এই অবস্থানটাই কেবল তার ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারো রাজা নয়, এম্পায়ার বা এক সাম্রাজ্যের শাসক হয়ে ওঠার পূর্বশর্ত হলো তাকে সঙ্কীর্ণ কোনো স্বার্থ নয় বরং সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থের দিকে নজর করে সমন্বয়ে এক কমন স্বার্থ হাজির করে, বাদ বাকিগুলো সামলিয়ে চলতে পারার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। বড় পরিকল্পনা সফল হওয়ার পূর্বশর্তও এটাই। এটা ঠিক কারো শৌখিনতা বা উদারতার ব্যাপার নয়।

    এবার বিপরীত দিকটি আমরা দেখি। এভাবে প্রধানমন্ত্রী মোদি যতই তার ‘বিকাশের’ স্বপ্নকে সবার ওপরে রেখে চলতে শুরু করবেন, বা বলা যায় বিজেপিকে সেকেন্ডারি করে রাখবেন ততই আস্তে আস্তে একসময় তিনি বিজেপির মোদির বদলে প্রধানমন্ত্রী মোদি হয়ে উঠবেন। এটা কোনো সন্দেহ না রেখে বলা যায়। ব্যাপারটাকে বোঝানোর জন্য নিচে একটা উদাহরণ এনেছি। মোদির এক লিখিত ভাষণ ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছি নিজ দায়িত্বে।
    সে প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে এর পটভূমি প্রেক্ষিত জানিয়ে রাখা দরকার যাতে পাঠকের পড়ে বুঝতে সুবিধা হয়।

    ১. বিজেপি দলের কাঠামো মোটা দাগে বললে এককেন্দ্রিক নয়, যে অর্থে আমাদের হাসিনা, খালেদা বা ভারতের সোনিয়া। এক ‘নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র’ এমন একটা জায়গা বিজেপি তার চর্চায় জারি ও চালু রাখতে সক্ষম হয়েছে। দলের মূল নীতি বা কাজের কৌশল সেখানে ঠিক করার পর তা বাস্তবায়নের প্রধান হবেন খোদ দলের সভাপতি। এই অর্থে বিজেপির সভাপতি কংগ্রেসের সভাপতির সোনিয়ার মতো নন। সোনিয়া একাধারে নীতিনির্ধারক শেষ কথা বলার অধিকারী। তিনি দলের সভাপতি ঠিকই তবে বিজেপির মতো আবার ওই গৃহীত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ক প্রধান হিসেবে সভাপতি তিনি নন।
    ওদিকে বিজেপির নীতিনির্ধারণী কেন্দ্র আর সভাপতি দুটোই আলাদা। বরং নীতিনির্ধারণী কেন্দ্রের অধীনস্থ হলেন সভাপতি। কিন্তু এর মানে এমন নয় যে, বিজেপির অভ্যন্তরীণ লড়াই নেই। মোদি ২০১৪ নির্বাচনের মাস আটেক আগে যেদিন নিজেকে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে দল থেকে সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে আনলেন সেদিন থেকে দলের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে বয়স্ক নেতাদের (আদভানি বা যোশী) পরাস্ত করেই অর্থাৎ নিজে জিতেই নিজেকে হাজির করেছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেকে কেন্দ্রে রেখেই বর্তমান দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা সাজানো হয়ে যায়। কিন্তু তিনি আবার নিজেকে দলের সভাপতিও করেননি। এ ছাড়া ওদিকে আরএসএসের সাথে সমন্বয় এবং বৃদ্ধ পুরনো প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ সমন্বয়ও ঠিকমতো রাখেন। অনুমান করা যায় নিজের ‘বিকাশের’ স্বপ্নকে শেয়ার করেন। তিনি নিজের কাজ সফলতা যোগ্যতা দেখিয়ে সম্মতি আদায় করে নেন।

    ২. মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপির দলীয় কর্মসূচি আগের নীতিতেই চলছে বরং আরো ব্যাপক এবং সরব হয়েছে। যেমন সবচেয়ে সরব কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’। বাংলায় বললে যেসব হিন্দু চার্চের তৎপরতায় খ্রিশ্চান হয়ে যাচ্ছেন, অথবা কথিত ‘লাভ জিহাদে’ গল্পে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে, মুসলমানের সাথে প্রেম বা বিয়ে হয়ে যাচ্ছে এমন ক্ষেত্রে তাদের প্রতি সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে আবার হিন্দুতে ফিরিয়ে আনা। তাদের ‘ঘরে ফেরানো’ বা এন্টি কনভারশন কর্মসূচি। সোজা কথায় হিন্দুত্বের উন্মাদনা সৃষ্টি করা, আর বিজেপির ভাষায় এগুলো তাদের সামাজিক কর্মসূচি। এবারের কর্মসূচির বিশেষ দিকটা হলো, এবারের আক্রমণের ঘটনা চার্চ, বা খ্রিশ্চান স্কুলের ওপর বেশি। চার্চে হামলার ঘটনা সামাজিক বা মিডিয়ায় হইচই ফেলেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদি এই কর্মসূচির ব্যাপারে শুরু থেকেই নির্বাক। তার ইনার মেসেজটা এমন যে এটা দলীয় কর্মসূচি, দলীয় ব্যাপার। এটা তো তার সরকারের কর্মসূচি নয়। আর তিনি তো দেশের সবার প্রধানমন্ত্রী তাই প্রতিক্রিয়াবিহীন।
    এভাবেই এই পরিস্থিতি পাঁচ মাস ধরে চলছিল, গত জানুয়ারিতে ওবামার সফরের আগ পর্যন্ত। ওবামা বিদায় নেয়ার দিন ২৭ জানুয়ারি মিডিয়ায় ওবামা এক সাক্ষাৎকারে মোদি সরকারের প্রতি এক হেদায়েত বাণী রেখে যান। যার সারকথা হলো, মোদির ‘রিলিজিয়াস টলারেন্সের’ (ভিন্ন ধর্মকেও সহাবস্থান করতে দেয়া) ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া উচিত। নইলে এগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। (‘splintered along the lines of religious faith’) । এ ঘটনার পরের দিন এর প্রতিবাদ করে কিন্তু বিজেপি থেকে এক বিবৃতি দেয়া হয়। মোদি তবু নিশ্চুপ। আর প্রায় সব প্রধান মিডিয়ার মূল সুর আগে থেকেই ছিল বিজেপির তৎপরতার বিরুদ্ধে, তখনো তেমনই থাকল। তবে টিভির টক শোগুলোতে মোদি সরকারকে অভিযুক্ত করা শুরু হলো। পরের মাস ফেব্রুয়ারি ১৭ তারিখে মোদি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কেরালাভিত্তিক এক চার্চের বার্ষিক ওরস ধরনের উৎসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি হন। এখানেই তিনি এ বিষয়ে প্রথম মুখ খোলেন। নিজ সরকারের নীতিগত এক বিস্তারিত লিখিত অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও এর আগে সিরিজ ঘটনায় ঘর ওয়াপসি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লির বুকে চার্চ ও খ্রিশ্চান স্কুলে একের পর এক হামলা-ভাঙচুরের পরিপ্রেক্ষিতে খ্রিশ্চান ধর্মীয় নেতাদের একটা দল মোদীর সাথে দেখা করে অভিযোগ জানিয়েছিল। কিন্তু তারপরও মোদি ১৭ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত একেবারে নিশ্চুপ ছিলেন।

    ৩. হায়দ্রাবাদের নিজাম অর্থাৎ এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী, এই অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের পর আরো নিচে বা দক্ষিণ থেকে ভারতের একেবারে শেষ দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত যেসব রাজ্য আছে এককথায় এই অঞ্চলকে দক্ষিণার্ত বলা হয়। বলা হয় উত্তরের আর্য প্রভাব, দখল শাসন যে অঞ্চলের আগেই আটকে গিয়েছিল, প্রবেশ করতে পারেনি এটা সেই অঞ্চল। এটা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চল বলেও ইতিহাসে কথিত আছে। কিন্তু ব্রিটিশ-ভারত আমলে সবচেয়ে বেশি খ্রিশ্চান মিশন ও কনভারসন তৎপরতা ওই অঞ্চলেই ঘটেছে। এখন এ অঞ্চলের কোনো কোনো জনবসতিতে খ্রিশ্চান জনসংখ্যা ওই শহরের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের মতো। এর মধ্যে আবার সর্বদক্ষিণের কেরালা রাজ্য অর্থডক্স খ্রিশ্চান বা পর্তুগীজ চার্চসহ সবধরণের ফ্যাকড়ার খ্রীশ্চান চার্চ অধ্যুষিত। সেকালে দুর্গম যোগাযোগের এই রাজ্যে পড়াশোনার বিস্তার খ্রিশ্চান স্কুল মিশনারির মাধ্যমেই ঘটেছিল। কেরালা-ভিত্তিক দিল্লীর ঐ চার্চের ওরস ধরণের অনুষ্ঠানের উপলক্ষ ছিল, সে আমলের দুই বিখ্যাত পাদ্রির মোদির ইংরেজি ভাষ্যে এটা elevation to sainthood বলে বর্ণনা করা হয়েছে, যার বাংলা করা হয়েছে ‘সাধুসন্তে উত্তরণ’ হওয়ার দিন উদযাপন। অর্থাৎ পাদ্রির অবদান মূল্যায়ন করে চার্চের দেয়া তিনি কত বড় কামেল পীরের ভূমিকা রেখেছেন তার স্বীকৃতি দেয়ার দিন। এরই বার্ষিকী স্মরণ উৎসবের অনুষ্ঠান ছিল সেটা।

    ৪. কী করে এটা পাঠক পড়বে এর একটা পরামর্শ রাখতে চাই। সেটা হলো, মোদি ‘ধর্মীয় সহনশীলতা’ বিষয়ে তার সরকারের নতুন নীতি ব্যাখ্যা করছেন কিভাবে সেদিকটা বুঝতে মনোযোগী হওয়াটাই সঠিক কাজ হবে। কারণ এখানে কোন মোদিকে বুঝতে হবে? যে মোদির দল বিজেপি জন্ম থেকেই বিশেষত বিগত পাঁচ মাস ‘ঘর ওয়াপসি’ (ঘরে ফেরা) কর্মসূচি চালিয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদি হিসেবে তিনি উল্টো অবস্থান নিচ্ছেন। অনুমান হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের এই নীতিমালা বা এর দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে মোদি নির্ধারকভাবে বিজেপির ঘোষিত ও চর্চাকৃত দলের নীতির পুরোপুরি উল্টো দিকে অবস্থান নিলেন। অর্থাৎ সরকারের নীতি আর বিজেপি দলের নীতি পরস্পরের উল্টো অবস্থানে।
    ব্যবহারিক দিক থেকে বললে সরকারের এমন মৌলনীতির অধীনতা মেনেই একমাত্র কোনো রাজনৈতিক দল তৎপর থাকতে পারে। মৌলনীতি বলছি কারণ এর সাথে রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও কনস্টিটিউশন যুক্ত হয়ে গেছে, এটা সাদামাটা মোদি সরকারের কোনো নীতি পলিসির ঘোষণা ধরনের নয়। যেমন মোদি আসলে ধর্মীয় সহাবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছেন। বলছেন, ধর্মীয় কারণে (কনভারসনসহ) কেউ কারো ওপর বলপ্রয়োগ করলে মোদি সেটা গ্রহণ করবেন না, ব্যবস্থা নেবেন। বলছেন, ‘আমার সরকার এমন কাজের বিরুদ্ধে শক্তভাবে তৎপর হবে’। অর্থাৎ তার সরকার এমন কৃতকাজের বিরুদ্ধে দমনমূলক অবস্থান নেবেন, আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তি দেয়ার পথে যাবেন।

    ওদিকে মোদির এই ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মোদি ইস্যুটাকে সেকুলারিজম বলে কোনো ধারণার দিক থেকে বা সাহায্যে বা কোনো সেকুলার অবস্থান নিয়ে এর ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করেননি। বরং বলছেন যে, যেটা খুশি ধর্ম পছন্দ করতে পারবেন এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারবেন এর সপক্ষে মোদির সরকার ওই নাগরিককে সুরক্ষা দেয়ার নীতির কথা বলছেন।

    দিল্লীতে চার্চে দেয়া মোদির ভাষণের পূর্ণ বিবরণ। মূল ইংরেজি উৎস ভারতের ‘ফার্স্টপোস্ট’ ওয়েব পত্রিকা। ভুল অনুবাদের দায় অনুবাদকের। পাঠকের কোনো সন্দেহের ক্ষেত্রে মূল উৎস থেকে দেখে নিতে পারেন।

    [নীচে মোদীর বক্তৃতার পুর্ণ টেক্সট বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।]
    আমি কেরালা দুই সাধু সেন্ট কুরুয়াকোস ওরফে চাভারা এবং সেন্ট ইউফ্রাসিয়া তাদের সাধুসন্তে উত্তীর্ণের দিন উদযাপনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে উচ্ছ্বসিত বোধ করছি। তাদের এই স্বীকৃতিতে দেশবাসী গর্বিত। তাদের উত্তরণ কেরালারই আর এক সাধু সেন্ট আলফানসো শুরু করে গিয়েছিলেন। সেন্ট চাভারা এবং সেন্ট ইউফ্রেসিয়া তাদের জীবন ও কর্ম শুধু খ্রিশ্চান কমিউনিটির জন্যই অনুপ্রাণিত হওয়ার উৎসস্থল নয় বরং সামগ্রিক মানবজগতের জন্যও বটে।
    সেন্ট চাভারা মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র এবং তিনি একজন সমাজ সংস্কারকও। সে যুগে যখন শিক্ষাদীক্ষার জগতে প্রবেশ খুবই সীমিত ছিল তখন তিনি সব চার্চেরই একটা করে স্কুল থাকার ওপর জোর দিয়েছিলেন। এভাবে তিনি সমাজের সব অংশের জন্য শিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন।
    কেরালার বাইরে খুব কম লোকই জানে যে, তিনি একটা সংস্কৃত স্কুলও খুলেছিলেন এবং একটা ছাপাখানা প্রেস। নারীর ক্ষমতাপ্রণর পক্ষে তার অবদানও উল্লেখযোগ্য।
    সেন্ট ইউফ্রাসিয়া ছিলেন একজন ইন্দ্রীয়-অতীত মিষ্টিক, তার সারা জীবন তিনি অর্চনা ও গডের আনুগত্যে উৎসর্গ করেছিলেন।
    অনুসারী সাথীদের খেদমত করে এই উভয় সাধু গডের জন্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। প্রাচীন ভারতীয় প্রবাদ নিজেদের জীবন ব্যাখ্যা করেছে এভাবে : ‘আত্মানো মোক্ষর্থম জগত হিতাযাচা’ মোক্ষ (মুক্তি) লাভের পথ হলো দুনিয়ার কল্যাণের জন্য কাজ করা।
    বন্ধুরা,
    ভারতের ঐতিহ্যের শেকড় হলো স্পিরিচুয়ালিজম। হাজার হাজার বছর আগে, ভারতের সাধুরা এবং গ্রিক জ্ঞানীরা নিজেদের মধ্যে চিন্তা ও স্পিরিচুয়াল বিনিময় করে গেছেন। নতুন আইডিয়ার প্রতি দরজা খুলে রাখার কথা ঋকবেদে হাজির আছে : ‘আনো ভদ্রা: কৃতও যন্তু বিখত’ নোবেল চিন্তা সব দিক থেকে আমাদের কাছে আসতে দাও। বিস্মরণের কাল থেকে এই দর্শন আমাদের চিন্তা-বুদ্ধির চর্চাকে গাইড করে গেছে। ভারতমাতা এই ভূমিতে অনেক ধর্মীয় ও স্পিরিচুয়াল স্রোতধারার জন্ম দিয়েছে। এগুলোর কিছু আবার এমনকি ভারতের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়েছে।
    সব ধর্মবিশ্বাসকে স্বাগত জানানো, সম্মান জানানো এবং শ্রদ্ধা করা ভারতেরই সমবয়সী পুরনো ঐতিহ্য। স্বামী বিবেকানন্দ যেমন বলেছেন : ‘আমরা সার্বজনীনতাকেই শুধু জায়গা ছেড়ে দেই না, আমরা সব ধর্মকেই সত্য বলে গ্রহণ করি’। শতবর্ষ আগে বিবেকানন্দ সৎ ও শুভইচ্ছা আঁকড়ে ধরেছিলেন চিরদিনের জন্য কেবল আমাদের জনগোষ্ঠীর জন্য নয় বরং আমাদের সরকার এবং এই অর্থে ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দলের সরকারের জন্য। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম-আচরণের এই মৌলিক নীতি হাজার বছরের ভারতের মৌলিক বৈশিষ্ট্যচিহ্নের অংশ হয়ে আছে। আর সে কারণেই তা ভারতের কনস্টিটিউশনের অঙ্গে পরিণত হয়েছে। আমাদের কনস্টিটিউশন শূন্য থেকে উদ্ভূত হয়নি। এর মূল ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে প্রোথিত।
    গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক স্বপ্নভূমির কথা বলেছেন, চিত্ত যেথা ভয় শূন্য এবং উচ্চ যেথা শির। এটা সেই মুক্তির স্বর্গ যা আমরা সৃষ্টি ও সংরক্ষণ করে রাখতে প্রতিশ্রুতবদ্ধ। আমরা বিশ্বাস করি সব ধর্মেই সত্য আছে। ‘একম সৎ বিপ্র বহুধা বদন্তি’।
    বন্ধুরা,
    সমকালীন দুনিয়াতে শান্তি ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সহবস্থানের জন্য যা মুখ্য ও ক্রিটিক্যাল ইস্যু সে দিকে আলোকপাত করি। দুনিয়া দিনকে দিন ধর্মীয় ভাগের লাইনে বিভক্ত ও মারমুখী হতে দেখছে। এটা গ্লোবাল উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই পটভূমিতে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবিষয়ক প্রাচীন ভারতের যে নিবেদন প্রস্তাব তা এখন গ্লোবাল চিন্তা বিনিময়ের স্তরে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
    পারস্পরিক সম্মানজনক সম্পর্কের এই দীর্ঘ অনুভূত প্রয়োজন ও আকাক্সক্ষা ২০০৮ সালের দশ ডিসেম্বর হেগে অনুষ্ঠিত ‘মানবাধিকারের বিশ্বাস’ এই ‘ইন্টারফেথের’ কনফারেন্সে নিয়ে আমাদের হাজির করেছিল। ঘটনাচক্রে সেটা ছিল জাতিসঙ্ঘের সার্বজনীন মানবাধিকার চার্টার ঘোষণার ৬০তম বর্ষপূর্তিরও বছর।
    খ্রিশ্চানিটি, হিন্দুজম, যুদাইজম, বাহাই, বুদ্ধইজম, ইসলাম, তাওইজম এবং লোকায়ত ধর্ম বিশ্বাসের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ যারা দুনিয়ার প্রধান ধর্মগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেন তারা মিলিত হয়েছিলেন, আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন এবং সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা এবং ধর্ম অথবা বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন।
    ঐতিহাসিক ঘোষণায় বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত ও এর অর্থ হাজির করেছিলেন এবং কিভাবে তা সুরক্ষা করতে হবে তা বলেছিলেন।
    আমরা মনে করি, কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস কারো থাকা, ধরে রাখা, গ্রহণ করা এগুলো নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়।
    দুনিয়া এক পথ পরিক্রমার জংশনে আছে। যদি সঠিকভাবে তা পার হতে না পারি তবে তা আমাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ফ্যাকড়া, ফ্যানাটিসিজম ও রক্তগঙ্গার অন্ধকারের দিকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে। ধর্মগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যের ঐকতান দুনিয়া এমনকি তিন হাজার বছরে প্রবেশের আগেও অর্জন করতে পারবে না। এখনই সময়। দেখা যাচ্ছে বাকি দুনিয়াও প্রাচীন ভারতের পথেই আবর্তনের পথ গ্রহণ করছে।
    ভারতের পক্ষ থেকে, আমার সরকারের পক্ষ থেকে বললে আমি ঘোষণা করছি আমার সরকার ওপরের ঘোষণার প্রতিটা শব্দ ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে। আমার সরকার ধর্মবিশ্বাসের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে যে প্রত্যেক নাগরিক সে কোনো ধর্ম ধরে রাখা অথবা গ্রহণ করা তার পছন্দের বিষয় এবং এটা কোনো ধরনের কারো বলপ্রয়োগ অথবা অন্যায্য প্রভাব ছাড়াই সে করবে এটা নাগরিকের অ-অমান্যযোগ্য অধিকার। আমার সরকার কোনো ধর্মীয় গ্রুপ, তা সে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যে ধরনেরই হোক, সঙ্গোপনে অথবা খোলাখুলি অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সহ্য করবে না। সব ধর্মকে সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান দেবে আমার এই সরকার।
    ভারত বুদ্ধ ও গান্ধীর মাটি। সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রতিটি ভারতীয়ের ডিএনএ-তে থাকতে হবে। যেকোনো ওছিলায় কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য এবং আমি এমন সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই। আমার সরকার এমন কাজের বিরুদ্ধে শক্তভাবে তৎপর হবে। এই প্রতিশ্রুতিতে আমি সব ধর্মীয় গ্রুপের প্রতি সংযত হওয়া, পারস্পরিক সম্মান দেখানো ও জায়গা করে দেয়া প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এসব সৎ স্পিরিটে দাঁড়াতে বলি যেটা আমাদের কনস্টিটিউশনেও প্রতিভাত এবং যেটা হেগ ঘোষণাতেই অনুলিখিত আছে।
    বন্ধুরা,
    আধুনিক ভারত গড়ার এক স্বপ্ন আমার আছে। আমার এই স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে এই বিরাট মিশনে আমি রওনা হয়েছি। আমার মন্ত্র হলো উন্নয়ন, বিকাশ ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’।
    সহজ ভাষায় বললে এর মানে সবার টেবিলে খাবার, সব শিশু স্কুলে, সবার জন্য কাজের সংস্থান, পায়খানাসহ একটা বাসস্থান, প্রত্যেক পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ। সেটা এক গর্বের ভারত হবে। একতাবদ্ধ হয়েই আমরা তা অর্জন করতে পারি। একতা আমাদেরকে শক্তিশালী করবে। বিভক্তি আমাদের দুর্বল করবে। আমি আন্তরিকভাবে সব ভারতীয়ের কাছে এবং সবাই যারা এখানে উপস্থিত আছেন তাদের কাছে নিবেদন করি এই বিশাল কর্মযজ্ঞে আমাকে সহায়তা করুন।
    সেন্ট চাভারা এবং সেন্ট ইউফ্রাশিয়ার সাধুসন্তে উত্তরণ এবং তাদের নোবেল কাজ আমাদের অনুপ্রাণিত করুক :
    -আমাদের অন্তরশক্তি বৃদ্ধি করতে।
    -অপরের সেবা করার ভেতর দিয়ে আমাদের সমাজের রূপান্তর কাজে সেই শক্তি ব্যবহার করতে।
    -আধুনিক ভারত ও উন্নীত ভারত আমাদের এই যৌথ স্বপ্ন পূরণ করতে।
    ধন্যবাদ সবাইকে।

    ______________অনুবাদ এখানে শেষ___________

    সবশেষে, এবার মোদী কেন নিজ দলীয় অবস্থানের বিরোধী নিজের এই সরকারি অবস্থান নিলেন। এর তাৎপর্য কী সে প্রসঙ্গে কিছু কথা।

    ১. প্রধানমন্ত্রী মোদি তার ‘বিকাশের স্বপ্নকে’ নিজ দলের পুরনো নীতির ওপরে প্রাধান্য দিয়ে বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ এখন দলের নীতি সরকারের নীতির লাইনে খাপ খাইয়ে চলতে, সাজিয়ে নিতে বাধ্য হবে। কার্যত সরকারি অবস্থানটাই ইতোমধ্যে আধিপত্যের জায়গা নিয়ে ফেলেছে।
    ২. মোদির স্বপ্ন এর আসল অর্থ তিনি একটা ভারতীয় ক্যাপিটালিজম গড়ার পথে সিরিয়াস। ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের স্বার্থের সাথে নিজের স্বপ্নকে এলাইন করার দিকটা তিনি বেছে নিতে ভুল করলেন না।
    ৩. চলতি গত দশ বছরের আলকায়েদা বা ইসলামি খলিফা স্টেট ধরনের দুনিয়াব্যাপী ফেনোমেনা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের জন্য হুমকি মনে করে। তাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম সিস্টেম বা ব্যবস্থার দিক থেকে প্রতিক্রিয়াটা হলো ‘ইন্টারফেথ’ নামের পালটা কর্মসূচির পথে যাওয়া। মোদি নিজেকে ইন্টারফেথ কর্মসূচির সাথে নিজেকে এলাইন করলেন। আবার অন্য দিকে এর ওপর বাড়তি নিজ দলের ‘হিন্দুত্ব’ কর্মসূচি বা নিজ স্থানীয় এজেন্ডা থেকে সরে আসা সঠিক মনে করলেন।

    ৪. যদি ধরা যাক আগামী বছরর জুন মাসের দিকে মোদি সরকারের অর্থনীতিক কর্মসূচি (‘বিকাশের স্বপ্ন’ দুই বছর পার করবে তখন) ফল দেখাতে শুরু করে। অর্থাৎ অর্থনীতিক পরিসংখ্যানগুলোতে কাঙ্খিতভাবে হাজির হতে শুরু করে, জিডিপি বাড়ে, নতুন কাজ সৃষ্টির হার ভালো হয়। এককথায় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে এক ভাইব্রেন্ট অর্থনীতি হিসেবে হাজির হতে শুরু করে তবে বিজেপি দলের রাজনীতির মুখ্য ফোকাস তখন সব ছেড়ে হয়ে যাবে এই ‘বিকাশ’ আর এর সাফল্য প্রচার এমন হতে বাধ্য হয়ে যাবে। এমনটা যতই হবে ততই ‘হিন্দুত্ব’ ভিত্তিতে বিজেপির রাজনীতি ভিত্তি বদল করে ফেলবে। ‘বিকাশ’ ধরনের বক্তব্য আর এর সাফল্য প্রচার এটা বিজেপির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে থাকবে। ফলাফলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রচলিত ইস্যুর মধ্যে এক বড় ধরনের রূপান্তর দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা হাজির হবে। নিঃসন্দেহে এর একটা ইতিবাচক বেনিফিট বাংলাদেশ রাষ্ট্র পাওয়ার কথা। কারণ বর্তমানে ভারত নিজের ‘নিরাপত্তা’ যার ভেতর যেভাবে দেখে এই ভিত্তিমূলক দিক বদলে যাবে। যদিও মোদি সরকারের ‘বিকাশের’ পথে আরো অনেক বাধা আছে যেগুলোর অনেক যদি কিন্তু আছে। তবুও এই আলোচনার সীমার বাইরে বলে তা এখানে আনা হয়নি। তা পরে কোথাও আনা যাবে। আপাতত এতটুকুই।

    ________সমাপ্ত______

    [এই লেখাটা আজকে পোস্ট করেছি কিন্তু এটা লেখা হয়েছিল প্রায় মাস খানেক আগে অর্থাৎ এপ্রিলের শুরুতে এখানে তবে ভিন্ন শিরোনামে। ইতোমধ্যে বিজেপি দলের রাজনীতি থেকে আলাদা করে কিছুকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর অবস্থান বলে  চিহ্নিত করা আরও বেশি অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গরু জবেহ করা যাবে না বলে সারা ভারতে নয় কেবল মহারাষ্ট্র রাজ্যে আইন পাস করা হয়েছে – এই ফালতু অজুহাতে বিপদজনক বিভক্তির রাজনীতির ইস্যুতে মোদীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  রাজনাথ সিং বাংলাদেশ সীমান্তে এসে বিএসএফের সাথে মিলে এই দলীয় কর্মসুচীর পক্ষে প্রচার চালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বেশি হবে আর প্রাপ্যতা কমতিতে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিবে এমন বক্তব্যও রেখেছেন। ফলে পরবর্তি এই পরিস্থিতি নিয়ে আরও আপডেটেড লেখা আলাদা করে লিখতে হবে। তার আগে এই লেখা পড়ার সময় পাঠক যেন মাস খানেক আগে লেখা পড়ছি একথা মনে রেখে পড়েন – এই অনুরোধ করছি।]

  • নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন

    নতুন অর্থ ব্যবস্থা গড়তে চীনা উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটেন
    গৌতম দাস

    ০৯ এপ্রিল ২০১৫

    https://wp.me/p1sCvy-9Y

    আগামী দিনের ইতিহাসে ১২ মার্চ ২০১৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে সম্ভবত বিবেচিত হবে। ঘটনাটার শুরু, গত বছরের অক্টোবরে চীনের সাংহাইয়ে চীন কর্তৃক প্রস্তাবিত Asian Infrastructure Investment Bank (সংক্ষেপে AIIB), এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে আগ্রহী দেশগুলোর আহূত এক সম্মেলন থেকে এই ব্যাংকের কার্যক্রমের হাজিরা ঘোষণা করেছিল। AIIB কার্যকর হলে তা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা রাখতে শুরু করবে। ওই সম্মেলন থেকে উদ্যোক্তা পত্র বা Memorandum of Understanding (MOU)-এ স্বাক্ষর করা শুরু হয়েছিল। উদ্যোক্তা সদস্য কারা কারা হতে চায় সেই সম্মতি জানানোর খাতা তখন থেকে খোলা হয়েছিল। উদ্যোক্তা স্বাক্ষরদান বন্ধ হওয়ার শেষ দিন ৩১ মার্চ ২০১৫। উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় ১৩ মার্চ ২০১৫ হঠাৎ করে ব্রিটেন ওই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা-উদ্যোক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়ার ওপর মাতবরি, আধিপত্য প্রভাব জারি রাখার উদ্দেশ্যে মাতবর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় আলোচনার জন্য ‘জি৭’ বা গ্রুপ সেভেন নামে একটি সংগঠন আছে। গ্রুপ সেভেন অন্তর্ভুক্ত সাত রাষ্ট্রের সবাই তবে আলাদা আলাদা করে AIIB-এর ঘোষণার সময় ঘটনাটিকে বাঁকা চোখে দেখেছিল। এখন ‘জি৭’-এর ব্রিটেন একমাত্র রাষ্ট্র যে দলছুট হয়ে বিপরীত ক্যাম্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত জানাল। ওদিকে ব্রিটেনের এ সিদ্ধান্তে আমেরিকা সবচেয়ে অখুশি ও অসন্তুষ্টি জানিয়েছে। জবাবে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের অবস্থান নিয়ে কথা হয়েছে।’ আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ‘এটা সারপ্রাইজ সিদ্ধান্ত’। বোঝাই যাচ্ছে, AIIB-এর উত্থান বা আবির্ভাব কোনো সাধারণ ব্যাংক আবির্ভাবের মতো ফেনোমেনা নয়। এটি ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েই ফাংশনাল হতে যাচ্ছে, ফলে স্বভাবতই তা হবে এ দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের ভেতর দিয়ে ওই যুদ্ধের পর থেকে (১৯৪৪) ইউরোপকেন্দ্রিক কলোনি শাসনের যুগের সমাপ্তি টেনে অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন করে পশ্চিমা শাসন দুনিয়াতে কায়েম হয়েছিল। এর সবচেয়ে তাৎপর্যময় দিকটি ছিল, আমেরিকা নিজের আধিপত্যের নতুন কাল শুরু করেছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘ আর ডবিস্নউটিও এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে। এ চার প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুইটি গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য, তৃতীয়টি গ্লোবাল রাজনৈতিক (পরাশক্তিগত) ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আর চতুর্থটি গ্লোবাল পণ্য রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য। এভাবেই দুনিয়াতে নিজের অধীনস্থ নিজেদের দিকে কান্নি মারা এক গ্লোবাল আধিপত্য ব্যবস্থা কায়েম ও যাত্রা শুরু করা হয়েছিল। গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দুনিয়ায় আধিপত্য করার এ ফেনোমেনা এর আগের ৩০০ বছরের কলোনি যুগেও দেখা যায়নি। কলোনি যুগ সেটা পারেনি। যেমন আইএমএফের প্রধান ভূমিকা বা ম্যান্ডেট হলো, আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা চালু রাখা। সে কাজে মুখ্য প্রয়োজনীয় হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিনিময় মুদ্রা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে আয়ব্যয়ের ঘাটতিতে পড়া সদস্য কোনো রাষ্ট্রকে ধার দিয়ে ঘাটতি পূরণ – এ দুই মূল কাজের মাধ্যমে গ্লোবাল মুদ্রা ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ করে আইএমএফ সে ভূমিকা বাস্তবায়ন করে থাকে। মানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের সঙ্গে আর তিনটি প্রধান মুদ্রার তুল্য বিনিময় হার নির্ধারণ করে, এরপর বাকি সব সদস্য রাষ্ট্রের মুদ্রার বিনিময় হার সেই নিরিখে নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে থাকে। এটা বলা বাহুল্য যে, এ প্রাতিষ্ঠানিকতা একচেটিয়া আমেরিকা বা এর মুদ্রা ডলারের অধীনে নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো গরিব বা ছোট অর্থনীতির দেশের ওপর আধিপত্য কায়েম করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে এ অস্বস্তি সত্ত্বেও এর ভেতর দিয়ে পড়ে পাওয়া সুবিধার দিকটি হলো, আমেরিকার দিকে কান্নি মারা হলেও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা, যেটাকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বলছি তা দুনিয়ায় সেই থেকে চালু হয়ে আছে। চলতি এ গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি যুগের মুদ্রা ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও মান নির্ধারণের লক্ষ্যে কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম ঘটেনি। এমনকি কোনো কলোনি মাস্টার যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রাষ্ট্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কিছু ছিল না। আর মুদ্রার মান বা হার নির্ধারণ নিয়ন্ত্রণও কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করত না। ব্যাংক অব ইংল্যাল্ডকে মাত্র ১৯৪৬ সালে সরকার অধিগ্রহণ করে ব্রিটেনের সেন্ট্রাল ব্যাংকের দায়িত্বে হাজির করে। দেশের ব্যাংক ব্যবসা ও স্থানীয় মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ সেন্ট্রাল ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিতে হবে – এ ধারণাটি ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সমসাময়িক ঘটনা। কারণ আইএমএফ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমেই নিজের উপস্থিতি, কর্তৃত্ব তৎপরতা ও কার্যকারিতা কায়েম করে থাকে। সে সময় এসবের কোন বালাই ছিল না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ছিল খুবই সীমিত পর্যায়ে। ফলে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হতো কোনো প্রাইভেট ব্যাংকে নয়, যেমন হত রথশিল্ড-পরিবার ধরনের পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে; বাবা রথশিল্ড আর তার তিন ছেলে ইউরোপের চার শহরে বসে পরস্পরের যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে বিনিময় হার নির্ধারণ করে দিতেন। এভাবেই এক মুদ্রা বিনিময় হার ও মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ফলে সীমিত পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ব্যবস্থা সে সময় চালু ছিল। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় কথা হলো, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মুদ্রা বিনিময় হারের এই ব্যবস্থার প্রতি বাজারের আস্থাহীনতার কারণে ভেঙে পড়েছিল চিরদিনের জন্য। পরে শেষমেশে এ প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে ১৯১৪ থেকে ১৯৪৪ এই ৩০ বছর কোনো আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা বলে কিছু ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। এরপর এমন দুর্দশায় পৌঁছানো ইউরোপ বারবার অনুরোধ করে একেবারে হাতে-পায়ে ধরার অবস্থায় পৌঁছে, আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় (আইএমএফ) আমেরিকান ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সূচনা হয়। আমেরিকার হাতে-পায়ে ধরা আর ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক মুদ্রা মেনে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো – এসবের মূল কারণ একটাই। তা হলো ১৯১৪ সাল থেকেই যুদ্ধে জড়িয়ে ইউরোপের প্রতিটি রাষ্ট্র যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় আয়ব্যয়ের মারাত্মক অসামঞ্জস্য ঘাটতির মুখোমুখি হয়। পরিণতিতে প্রত্যেকেই জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েও অন্য দেশের মুদ্রার তুলনায় নিজ মুদ্রার একটি স্থিতিশীল মান বা হার ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে সে সময়ের একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। তাই ডলারকে একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা মেনে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাজানো, ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা সাজানো ছাড়া কারও উপায় ছিল না। আইএমএফের জন্ম হয় এভাবেই। সে থেকে ডলারকেন্দ্রিক অন্য মুদ্রার হার নির্ণয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্যের খাতায় ডলার হিসাবের মুদ্রা হয়ে পড়া ও অন্যান্য মুদ্রার হার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি করে আসছিল আইএমএফ। সংক্ষেপে এ হলো ডলারের উত্থান ও শাসন কাহিনী। কিন্তু ১০ বছরে ক্রমেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সে কাহিনীতে নয়া ওলটপালট আসন্ন হওয়ার আলামত দেখা দিতে শুরু করেছে।

    শুরু করেছিলাম ইতিহাসের কথা তুলে। সে আগামী দিনের ইতিহাস মানে কোন ইতিহাসে- ‘গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক’ অর্থনৈতিক ইতিহাসে। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বা অর্ডার শৃঙ্খলের ওপর এবার চীনের নতুন করে নতুন প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়ার প্রভাব  – এটা  শুধু গ্লোবাল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এ প্রভাব পড়বে ও ধীরে ধীরে বাড়বে- দুনিয়ার পরাশক্তিগত ভারসাম্যে, গ্লোবাল রাজনীতিতে, স্ট্র্যাটেজিক ও সামরিক ইত্যাদি সব গ্লোবাল ফেনোমেনাকে তা প্রভাবিত করবে। চলতি একুশ শতকের প্রথম দশক (২০০১-২০১০) গ্লোবাল পরাশক্তিগত পরিস্থিতিতে দুইটি নতুন ইঙ্গিত হাজির হতে দেখা দিয়েছিল। প্রথমটি গ্লোবাল রাজনৈতিক ফেনোমেনা আকারে। দুনিয়ায় পশ্চিমের ক্ষমতা আধিপত্যের শাসনকে চ্যালেঞ্জকারী ‘ইসলাম প্রশ্ন’কে সামনে আনা বা তুলে ধরার নতুন রাজনৈতিক ফেনোমেনা। গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের এ নয়া প্রভাব আর এর পাল্টা পশ্চিমের ‘ওয়ার অন টেরর’ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, পরিণতিতে আগামীতে দুনিয়া দেখতে কেমন হবে তা এখনও ফয়সালা হয়নি। তা আদৌ হবে কিনা, নাকি কে হেরে যাবে তা এখনও অমীমাংসিত অসমাপ্ত। তবে ছড়িয়ে পড়া বা বিস্তৃতির দিক থেকে বললে গ্লোবাল রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব ভালোই ছড়িয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকা বাদে সব মহাদেশকেই তা স্পর্শ করে ফেলেছে বলা যায়। এছাড়া ওদিকে ঐ দশকের দ্বিতীয় ফেনোমেনাটা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের উত্থান। আর এর প্রভাবে আমেরিকার একক পরাশক্তিগত ভূমিকা নড়বড়ে হয়ে নতুন এক পরাশক্তিগত ভারসাম্য আসন্ন হওয়ার ইঙ্গিত। এর রাজনৈতিক ইঙ্গিতগুলো অনুভূত হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই; কিন্তু আমেরিকার সরকারি গবেষণা, স্টাডি এবং প্রাপ্ত নিউমেরিক্যাল ডাটা প্রজেকশন থেকে প্রথম নতুন চিত্র স্পষ্ট হয় ২০০৭-৮ সাল থেকে। অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজির প্রবাহ পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী হতে শুরু করেছে- এ তথ্যগত স্বীকৃতি তখনকার প্রকাশিত রিপোর্ট থেকেই প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, পুঁজির এ প্রবাহের ধরন কেবল একমুখী অর্থাৎ ভবিষ্যতে আবার কোনোদিন এর বিপরীতমুখী হওয়ার সম্ভাবনা নেই- এটাও সেই গবেষণালব্ধ ফলে প্রকাশিত হয়। এ গবেষণা হয়েছিল আমেরিকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের’ অধীনে এবং ২০০৮ সালে জনসমক্ষে প্রকাশিত রিপোর্টে। এমনিতেই এমন পরিসংখ্যানগত গবেষণা রিপোর্ট প্রতি চার বছর অন্তর প্রকাশিত হওয়া এক চলমান ঘটনা। তবে ২০০৮ সালের রিপোর্ট ছিল স্বভাবতই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই রিপোর্টকে বলা যেতে পারে, গ্লোবাল অর্থনীতি ও পরাশক্তিগত পরিস্থতিতে আসন্ন নতুন করে সাজানো ভারসাম্যের ইঙ্গিত। এসব ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান কী হতে যাচ্ছে সেসব জানা ও জানানো। কিন্তু বাস্তবে সে জায়গায় চীন পৌঁছাবে কী করে আর তাতে উপস্থিত মাতবররা কে কি ভূমিকা নেবেন এসবের বাস্তব রূপ আকার দিতে যাচ্ছে AIIB-এর আবির্ভাব। কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের চীন যে এমন কিছু করতে যাচ্ছে তা অনেক আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। যেমন- নিজ বাণিজ্যের উদ্বৃত্তের অর্থ নিয়ে চীন চুপচাপ পুরনো কান্নি মারা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক যেমন আছে, তেমনি রেখে এতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুনিয়াতে নিজের নতুন প্রভাব যোগ করার চেষ্টা করা – এটাকে চীন সঠিক মনে করেনি। তাই এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, ভোটিং রাইট ইত্যাদিতে সংস্কারের দাবি করেছিল। প্রতিষ্ঠান দুইটি ২০০৯ সালের বার্ষিক সম্মেলন থেকেই এ ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানান দিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকান রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতে সাড়া দেয়নি। প্রতিষ্ঠান দুটোর সংস্কার প্রস্তাবের ফাইল সেই থেকে আমেরিকান কংগ্রেসে পড়ে আছে। ফলে ২০০৯ সাল থেকেই চীন বিকল্প উদ্যোগ নেয়ার পথে চলতে শুরু করে। আর এতে বিশেষত রাশিয়ার প্রবল আগ্রহে BRICS ব্যাংক নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ শুরু হয়। রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকাকে নিয়ে রাশিয়াতে প্রথম ব্রিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সে থেকে প্রতিবছর ব্রিক সম্মেলন হওয়া সত্ত্বেও ইন্ডিয়ার নড়বড়ে হাফ-হার্টেড ভূমিকার জন্য ব্রিক কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে এখনও অনেক দূরে থেকে যায়। এ অবস্থা দেখে চীন আর এক বিকল্প উদ্যোগে আগানো শুরু করে। মাত্র ২০১৩ সালে AIIB-এর ঘোষণা দিয়েই পরের বছর ২০১৪ সালে AIIB এর উদ্যোক্তা সম্মেলন ডেকে বসে চীন। ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের চেয়েও AIIB-এর উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনেক গতিশীল। মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ব্রিটেনের এতে যোগদানের সিদ্ধান্ত বিরাট সাড়া ফেলতে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া অক্টোবরের AIIB-এর উদ্যোক্তা সম্মেলনে প্রায় যোগ দিয়েই ফেলেছিল; কিন্তু ওবামার কড়া হুমকি ও লবিংয়ের কারণে এরা শেষে থমকে যায়। এবার ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের প্রভাবে ওবামার বাধা পেরিয়ে দেশ দুইটি এবার সম্ভবত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। এ বছরের শেষ থেকে উদ্যোক্তারা AIIB-কে কার্যকর করে ফেলতে চান। AIIB-এর উত্থান ৭০ বছরের গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর ওলটপালট ঘটনা হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে।

    দুইঃ

    চীনের বিশ্বব্যাংক, এবার “উন্নয়ন” এর অর্থ কি বদলে যাবে
    আগের পর্বে বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং একে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের নেতৃত্বে AIIB ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে বলেছিলাম। AIIB ব্যাংক গড়ার লক্ষ্যে চীনের সাংহাইয়ে প্রথম উদ্যোক্তা সম্মেলন হয়েছিল গত বছর ২৬ অক্টোবর। ওই সম্মেলনে এশিয়ার বাইরের কোনো রাষ্ট্র যোগ দিতে আসেনি। AIIB প্রসঙ্গে আগের লেখাতে ফোকাস করেছিলাম ১২ মার্চ, আচমকা ব্রিটেনের যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তকে। এবারের ফোকাস অন্যদিকে। AIIB-তে বিশ্বব্যাংকের মতোই শুধু কোনো রাষ্ট্রই এর সদস্য হতে পারে, কোনো প্রাইভেট কোম্পানি বা ব্যক্তি নয়। আর সম্মেলনের দিনেই কে কে উদ্যোক্তা হতে চায় এমন রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি স্বাক্ষর বইয়ে সই করেছিল এশিয়ার ২০টি রাষ্ট্র। এরপর সে স্বাক্ষর খাতা খুলে রাখা হয় পরবর্তী পাঁচ মাস, ৩১ মার্চ পর্যন্ত। মঙ্গলবার শেষ দিন গত হয়েছে। এর মানে কি এখন আর কেউ সদস্য হতে আবেদন জানাতে পারবে না? না ঠিক তা নয়। ৩১ মার্চের পরের আবেদনে কেউ সাধারণ সদস্য হতে পারবে, কিন্তু আর উদ্যোক্তা সদস্য হতে পারবে না। যেমন- বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল, স্বাক্ষর করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ উদ্যোক্তা সদস্যদের একজন। তাতে বাংলাদেশের বাড়তি কী লাভ হতে পারে? লাভ হল। এখন শুধু উদ্যোক্তা সদস্যরাই বসে আগামী বছর থেকে কাজে নেমে যেতে চাওয়া AIIB ব্যাংকের ম্যান্ডেট অর্থাৎ এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেল লিখবে। আর একটু সোজা কথায়, কে কত শেয়ার মালিকানা নেবে, পরিচালনায় কে কোন পদপদবি নেবে-পাবে, দায় নেবে, পরিচালনার নীতি, সদস্যপদের চাঁদা ধার্যের নীতি, ঋণ দেয়ার নীতি ইত্যাদিসহ পরিচালনার সব বিষয়ে নির্ধারণ করতে পরস্পরের সঙ্গে নিগোসিয়েশনের টেবিলে বসবে, নিজ নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে, নীতি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। যারা ৩১ মার্চের পর সদস্যপদের আবেদন করবে তারা আর এই টেবিলে বসার সুযোগ পাবে না। এ হলো ফারাক। তবে একথা থেকে বোঝাই যাচ্ছে, ওই টেবিলে বসাটাই আবার শেষ কথা নয়, নিজ অর্থনীতির সক্ষমতা, আরও স্পষ্ট করে বললে মূলত কী পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের অর্থনীতি আমার রাষ্ট্রের আছে এবং তা কতটা দীর্ঘ লাগাতার- এসবই ঠিক করে দেবে নেগোসিয়েশন টেবিলে আমার গলার স্বরের ওজন কেমন হবে। তবে আবার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মতো ইস্যুগুলো নেগোসিয়েশনের মতো বিষয় নয়। বরং প্রতিষ্ঠানের নিজের দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়ে টিকে থাকা না থাকার বিষয়। তাই এসব বাস্তবে বেস্ট যা করা সম্ভব তাতে সবার ঐকমত্যই ঘটবে তা আশা করা যেতে পারে। আর কিছু প্রসঙ্গে সিরিয়াস বিতর্ক দেখা দেবেই, তা বলা বাহুল্য।

    যেমন ‘উন্নয়ন’ বা ইংরেজিতে ‘ডেভেলপমেন্ট’ শব্দের কথাই ধরা যাক। অনেকে আমরা হয়তো খেয়াল করেছি অথবা না, তবে এটা বুঝি এ শব্দটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে চলে এমন এক শব্দ। এ শব্দের বিশেষ অর্থ ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে নতুন বিশেষ অর্থে কয়েন করে নেয়া হয়। বিশেষ কিছু বোঝানোর শব্দ হয়ে যায় এটা। এ শব্দ আর এর ভাবের প্রভাবে আমাদের রাজনীতির ভোকাবুলারিও বদলে গেছে। যেমন বলা হয়, আমরা ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ করি বা করব। এমন ভাবের বাক্য ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্ব্বার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত চালু এবং সরকার বা বিরোধী সবাই ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, অহরহ ব্যবহার করি। ভোটার, জনগণের কাছেও এর অর্থ আছে, নিজের মতো করে বুঝে, কমিউনিকেটেডও হয়, পৌঁছায়। ভোটার-জনগণও কিছু একটা বোঝে। তাহলে এমন প্রশ্ন তুললাম কেন যে, AIIB ব্যাংক গঠনের নেগোসিয়েশনের কালে উন্নয়ন শব্দটা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিতে পারে? সে প্রসঙ্গ হলো এ পর্বের রচনার ফোকাস। কিন্তু সরাসরি সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বরং কিছু বিষয় ধারণা পরিষ্কার করার ভেতর দিয়ে যাব। যেমন- AIIB ব্যাংক কী? এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলতে হচ্ছে এটা বিশ্বব্যাংকের আদলে এবং বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জকারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হতে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও সেই সূত্রে আইএমএফ এরা কেমন প্রতিষ্ঠান, কী করে, কেমনে করে ইত্যাদি সম্পর্কে সোজা ভাষায় কিছু ধারণা দেয়া ছাড়া AIIB ব্যাংক নিয়ে কোনো ধারণা স্পষ্ট করা যাচ্ছে না। তাই এবারের সেকেন্ডারি প্রসঙ্গ হলো এ দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সংক্ষেপে একটা ধারণা দেয়া।

    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বাস্তবিক কার্যকারিতার দিক থেকে এর তাৎপর্য বলা হয়, এটা যেন আমেরিকা রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির বর্ধিত হাত ধরনের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো প্র্যাকটিক্যাল অর্থে বলা কথা, আইনি নয় বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যান্ডেট বা এর গঠনপ্রণালি ও কার্যপ্রণালির আর্টিকেলে সরাসরি এমন কথা লেখা নেই। কিন্তু আমরা সবাই জানি, টের পাই যে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর যে কোনো সিদ্ধান্তের ওপর আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল শুধু নয়, একচেটিয়া।

    আইএমএফের বেলায়, এরকমটা সম্ভব করে তোলা হয়েছিল সদস্যপদ লাভের নিয়ম বা শর্ত যেভাবে আরোপ করা হয়েছে সেখান থেকে। প্রত্যেক রাষ্ট্রকে তার অর্থনীতির সাইজের অনুপাতে নির্ধারিত-ধার্য সদস্য চাঁদা দিয়ে তবেই সদস্যপদ পেতে হয়। যেহেতু এটি ঠিক ব্যাংক নয়, সদস্য রাষ্ট্রের ওপর ধার্য বিভিন্ন পরিমাণ চাঁদা একাট্টা করে তৈরি একটি ফান্ডমাত্র, ফলে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা শেয়ার যার বেশি পরিচালনা সিদ্ধান্তে তার বক্তব্যের মূল্য তত বেশি। এ কায়দায় আইএমএফের ওপর আমেরিকান প্রভাব বেশি নিঃসন্দেহে; কিন্তু সেটা কায়েম করা হয়েছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি আমেরিকার, ফলে সদস্য পদে প্রবেশের চাঁদা তার সবচেয়ে বড়, এই কায়দা করে। তবে এভাবে সংগৃহীত আইএমএফের ফান্ড ঠিক বাণিজ্য বিনিয়োগের পুঁজি হিসেবে বা মুনাফা লাভের উদ্দেশে খাটানো হবে এমন ফান্ড নয়। এ ফান্ড ব্যবহার করা হয় শুধু কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ব্যয়ে ঘাটতি থেকে গেলে। সেক্ষেত্রে ওই বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য এ ফান্ড থেকে শর্তসাপেক্ষে তাকে ঋণ দেয়া হয়। তবে মাত্র ০.৭৫% সুদে, অর্থাৎ ওই ঋণ সুদে খাটানোর জন্য বা মুনাফা কামানোর জন্য নয় বরং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যয় তুলতে সার্ভিস চার্জ হিসেবে নেয়া হয়। তাই এত স্বল্প পরিমাণ। এটাই আমাদের মতো এলডিসি বা স্বল্পোন্নত (অর্থনীতির) দেশের বেলায় দেয়া কনসেশনাল আইএমএফ ঋণ সুবিধা। আর মধ্যম আয়ের দেশ হলে সার্ভিস চার্জের ওপর কিছু মুনাফাও ধার্য হবে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে ধার দেয়ার পূর্বশর্ত হলো, সদস্য দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে আইএমএফের ফর্দ অনুসারে সংস্কার আনতে হবে। এমন এক চুক্তিতে রাজি হতে হবে, আর তা মনিটরিং ও সঠিক পালন সাপেক্ষে কিস্তিতে ধাপে ধাপে ঋণের অর্থ ছাড় করা হবে। এ হলো আইএমএফের একটি প্রধান দায়িত্ব- ম্যান্ডেট বা ঘোষিত উদ্দেশ্য। আইএমএফের দ্বিতীয় করণীয় বা ম্যান্ডেট হলো, প্রত্যেক রাষ্ট্রের মুদ্রার মান-হার অন্য মুদ্রার তুলনায় কত তা প্রতিদিন সকালে প্রকাশ করা। এখানে অন্য মুদ্রা মানে, সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক লেনদেন হয় এমন চারটি মুদ্রা- ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েন। এ চারের গড় করে প্রতিদিন তা ডলারে প্রকাশ করা হয়। আইএমএফের ভাষায় আর তার খাতাপত্রে প্রতিদিনের এ গড় মূল্যের নাম SDR, এমনকি প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রের আইএমএফ অ্যাকাউন্টের অবস্থা কি, এর হিসাবকিতাব করা ও রাখা হয় SDR মূল্যে। এ অর্থে বলা হয়, আইএমএফের নিজস্ব মুদ্রার নাম SDR. আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের SDR-এর দাম লটকানো থাকে। যেমন ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে এক USD = 0.724763 SDR। আগেই বলেছি, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দাতা বা খাতক সদস্য শুধু কোনো রাষ্ট্রই হতে পারে। কারণ এর লক্ষ্য রাষ্ট্র মানে রাষ্ট্রের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এভাবেই আমেরিকার দুনিয়ার অর্থব্যবস্থার ওপর প্রভাব, কর্তৃত্ব আইএমএফের মাধ্যমে রাখার অবস্থা তৈরি হয়। তবে একটি সুবিধার দিকও আছে, কোনো রাষ্ট্র বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি বাধিয়ে না ফেললে আইএমএফের কাছে বন্ধক বা শর্তের বন্ধনে পড়ার দরকার হয় না।

    এবার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তির আয়োজন প্রসঙ্গে। কোনো কোনো ব্যাংকের নামের মধ্যে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’, ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘রিকনস্ট্রাকশন’ ইত্যাদি থাকতে দেখা যায়। নামের মধ্যে কামের অর্থাৎ ওই ব্যাংক কী ধরনের ব্যাংক, এর চিহ্ন ধারণ থাকে, ইতিহাসও লুকিয়ে থাকে। যেমন ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’, ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আবার বিশ্বব্যাংকের পুরো নাম IBRD, ভেঙে বললে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। আমাদের রাজনীতি ও সমাজে ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটা আমাদের এদিকে সত্তর দশক থেকে আমদানি ঘটেছিল, পরিচিত হতে শুরু করেছিল। পশ্চিমা দেশেও এ শব্দটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যত জায়গাতেই ডেভেলপমেন্ট শব্দের ব্যবহার দেখা যাক না কেন ওই শব্দ আসলে অর্থ করে, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। অর্থাৎ ডেভেলপমেন্ট মানেই ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বুঝলে তবে ডেভেলপমেন্ট শব্দের অর্থের তালাশ মিলবে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কথাটা সংক্ষিপ্তি পেয়েছে শুধু “ডেভেলপমেন্ট” বা ‘উন্নয়ন’ উচ্চারণ করে। কিন্তু ইনফ্রাস্ট্রাকচার মানে আবার কী? বাংলায় এর প্রতিশব্দ আমরা করে নিয়েছি ‘অবকাঠামো’। প্রতিশব্দ জানলেও তবু প্রশ্ন থেকে গেল, অবকাঠামো মানে আবার কী, কার অবকাঠামো, কী সূত্রে – এসব বুঝতে আমাদের যেতে হবে ক্যাপিটাল বা ‘পুঁজি’ ধারণায়। কারণ এসব শব্দ পুঁজি ধারণার চোখে দেখা এবং দেখে তৈরি হওয়া সংশ্লিষ্ট আরও ধারণা এবং ডেরিভেটিভ বা অনুসৃত শব্দ। অর্থাৎ পুঁজি এ ফেনোমেনার চোখ দিয়ে না দেখলে তা থেকে অনুসৃত শব্দগুলোর অর্থ খুলবে না। অবকাঠামো ঋণ বলতে ফিজিক্যাল (রাস্তাঘাট, ব্রিজ ইত্যাদি খাতে) ও হিউম্যান (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে) এ দুই ধরনের অবকাঠামো খাতেই ঋণ বুঝায়। অবকাঠামো বলার বা এ শব্দে চেনানোর কারণ এগুলো ঠিক বাণিজ্যিক তৎপরতা হিসেবে দেখে দেয়া ঋণ নয়। ঋণ ব্যবসার বাজারের তৎপরতায় টার্মোনোলজি হিসেবে যা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তা বোঝাতে অবকাঠামো ঋণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কোনো ঋণ বাণিজ্যিক কিনা, তা বোঝার মূল নির্ণায়ক সুদের হার। বিশ্বব্যাংকের অবকাঠামো ঋণের সুদ ০.৭৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ শতাংশের নিচে। এটা ঠিক ঋণের অর্থের ওপর সুদ নয় বরং ঋণ দিবার বিষয়টা পরিকল্পনা, প্রজেক্ট নেয়া, তা বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যে অফিস পালতে হয় সেই অফিস পালা-পরিচালনার খরচ। ব্যাংকের ভাষায় এটাকে সুদ না বলে সার্ভিস চার্জ বলে। এতক্ষণ সব শুনে তো বিশ্বব্যাংকের সবই ভালো মনে হচ্ছে। তাহলে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো ঋণ দেয় কেন? কী ঠেকা তার? এককথায় বললে, গ্লোবাল পুঁজিবাজারে (আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট, সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে মূলত পরিচালিত) আমরা যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরও বড় বাণিজ্যিক বিনিয়োগের খাতক হই। যেমন বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে, বৈদেশিক ঋণ চাহিদা যত বাড়বে, আমরা ততই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের চোখে আকর্ষণীয় বাজার হয়ে ধরা দেব। অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে বিশ্বব্যাংক মূলত আমাদের অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের থেকে বাণিজ্যিক পুঁজি পাওয়ার চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। এটাই তার মূল কাজ, ম্যান্ডেট। কিন্তু অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয় বলে সে ব্যাপারটিকে এদিক থেকে হাজির করে বলবে সে ‘দারিদ্র্যদূরীকরণ’ করছে। তবে কথা ঠিক বাণিজ্যিক বিনিয়োগের উপযুক্ত খাতক হয়ে যাওয়ার পড়ে পাওয়া (এটা টার্গেট নয় এই অর্থে) এবার পাওয়া বৈদেশিক ঋণের অবকাঠামোর খাতে ব্যয়, ফলে নতুন কাজ সৃষ্টির শর্ত তৈরি। এভাবে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো এক সিস্টেম যার কারণে এর বিভিন্ন শর্তের ফেরে পড়ে আমাদের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর পরাশক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।

    এ ব্যাপারে এত দিন একচেটিয়া কর্তৃত্ব পেয়েছে আমেরিকা। এখন চীনের নেতৃত্বে AIIB বা গ্লোবাল অর্থ ব্যবস্থার পাল্টা প্রতিষ্ঠান হাজির হয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার কর্তৃত্বের ভাগে টান পড়া। শুধু তাই নয়, ‘উন্নয়ন’ শব্দের অর্থ আমেরিকা যেভাবে নির্ধারণ করে রেখেছে তা বদল হওয়ার সম্ভাবনা। যেমন- উন্নয়ন লোনের পাবার সঙ্গে হিউম্যান রাইট পরিস্থিতি ভাল কি না তা শর্তযুক্ত করে হিউম্যান রাইট নাই এর উসিলায় হস্তক্ষেপ করার সুবিধা এখন আমেরিকার আছে। এখন লোন পাওয়ার বিকল্প উৎস চীন হাজির হয়ে গেলে সেখানে উন্নয়ন শব্দের অর্থ কী দাঁড়াবে? অন্ততপক্ষে চীনের নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে কান্নি মেরে উন্নয়ন শব্দের নতুন অর্থ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সে হিউম্যান রাইট বা পরিবেশকে কি ঋণ বিতরণের সাথে শর্তযুক্ত করবে অথবা করবে না? এটা কী হয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

    [এখানে প্রকাশ করা লেখাটা এর আগে বাংলা দৈনিক “আলোকিত বাংলাদেশ” এর উপ-সম্পাদকীয় হিসাবে আমার নামেই ছাপা হয়েছিল। এখানে এক ও দুই পর্ব আকারে তেমন কোন নতুন এডিট না করেই এই ওয়েবে সংরক্ষণের জন্য সংকলিত করে প্রকাশ করা হল।]

  • নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাঃ চীনের বিশ্বব্যাংক আসন্ন

    নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাঃ চীনের বিশ্বব্যাংক আসন্ন
    http://wp.me/p1sCvy-9O

    আজ ৩১ মার্চ ২০১৫। দুনিয়ার শাসন ও নিয়ন্ত্রণে হাতবদল হয়ে আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বে চলে যাবার দিক থেকে দিক থেকে খুবই তাতপর্যপুর্ণ দিন। এই মুহুর্তের গ্লোবাল মিডিয়া তোলপাড়ে মূল খবর AIIB বিষয়ক। সব খবরেই একটা শব্দ দেখা যাবে –AIIB যার সংক্ষেপ ভাঙলে দাড়ায়, Asian Infrastructure Investment Bank। পুরা মার্চ মাস ধরেই প্রতিদিনের খবর আজ কোন রাষ্ট্র AIIB ব্যাংক গড়ার উদ্যোগে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল। আজ এবিষয়ে সম্মতি জানানো ও উদ্যোক্তা স্বাক্ষর করার শেষ দিন।

    সারসংক্ষেপ
    এককথায় বললে AIIB ১৯৪৪ সালে গঠিত হওয়া বিশ্বব্যাংকের তুল্য ও প্রতিদ্বন্দ্বি প্রতিষ্ঠান, এই অর্থে চ্যালেঞ্জকারি প্রতিষ্ঠান। তাই বিশ্বব্যাংকের ধারণা থেকে AIIB কে বুঝা সহজ হবে। সেসময় আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়েছিল আমেরিকার সবচেয়ে বেশি মালিকানা শেয়ার রেখে আর সারা ইউরোপকে নিজের জুনিয়র সাগরেদ জুটিয়ে। জাতিসংঘের ১৯১ সদস্যের মধ্যে প্রায় সব রাষ্ট্রই মুল প্রতিষ্ঠান আইএমএফের সদস্য। আর আইএমএফের সদস্য হওয়া বিশ্বব্যাংকের সদস্য রাষ্ট্র হবার পুর্বশর্ত। এভাবে প্রায় সকল রাষ্ট্রই বিশ্বব্যাংকের সদস্য। কেউ ঋণগ্রহিতা খাতক কেউ বিনিয়োগকারি হিসাবে। সেই থেকে দুনিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এক গ্লোবাল অর্থব্যবস্থা কায়েম এবং এই মাধ্যমে দুনিয়ার অর্থব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে নেয় আমেরিকা। গত ৭০ বছর ধরে আজও সেই রুস্তমি চলছে। তবে অবশ্যই সেই নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব আগামি বছর থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাঙ্গা হাটের মত হতে থাকবে।
    AIIB আগামি বছর থেকে কার্যকর হয়ে গেলে কি বিশ্বব্যাংক ভেঙ্গে পড়বে – এর জবাব হল না কোনভাবেই তা হবে না। তাহলে কি হবে? আমাদের মত দেশের দিক থেকে বললে, বিশ্বব্যাংক যে ঋণ আমাদের সরবরাহ করে আমরা যার খাতক তা হল, বিশ্বব্যাংক আমাদেরকে ইনফ্রাষ্টাকচার বা অবকাঠামো খাতে প্রায় না সুদে কনসেশনাল ঋণ দেয়। এই অবকাঠামো বলতে ফিজিক্যাল (রাস্তাঘাট ব্রিজ ইত্যাদি খাতে) ও হিউম্যান (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে) এই দুই ধরণের অবকাঠামো খাতেই ঋণ। অবকাঠামো বলার বা এই শব্দে চিনানোর কারণ এগুলো ঠিক বাণিজ্যিক ততপরতা হিসাবে দেখে দেয়া ঋণ নয়। ঋণ ব্যবসার বাজারের ততপরতায় টার্মোনোলজি হিসাবে যা বাণিজ্যিক ঋণ নয় তা বুঝাতে অবকাঠামো ঋণ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। বাণিজ্যিক কি না তা বুঝবার মূল নির্ণায়ক সুদের হার। বিশ্বব্যাংকের অবকাঠামো ঋণের সুদ ০.৭৫% অর্থাৎ ১% এর নীচে। এটা ঠিক অর্থের উপর সুদ নয় বরং, ঋণের বিষয়টা পরিকল্পনা, প্রজেক্ট নেয়া, তা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের যে অফিস পালতে হয় সেই অফিস পালা-পরিচালনার খরচ। যেকোন ব্যাংকের ভাষায় এটাকে সুদ না বলে সার্ভিস চার্জ বলে। এতক্ষণ সব শুনে তো বিশ্বব্যাংকের সবই ভাল মনে হচ্ছে। তাহলে বিশ্বব্যাংক অবকাঠামো ঋণ দেয় কেন? কি ঠেকা তার? এককথায় বললে, গ্লোবাল পুঁজি বাজারে (ওয়াল ষ্ট্রিট, সিঙ্গাপুর বা দুবাই থেকে মুলত পরিচালিত) আমরা যেন আরও বড় খাতক হই। বাংলাদেশের অর্থনীতি যত বড় হবে আমরা ততই পুঁজিবাজারের চোখে আকর্যণীয় বাজার হয়ে ধরা দিব। অবকাঠামো খাতে ঋণ দিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের অর্থনীতিতে গ্লোবাল পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক পুঁজি পাবার চাহিদা, আকাঙ্খা সৃষ্টি করে। আর এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা এমন ভাবে সাজানো এক সিস্টেম যার কারণে এর বিভিন্ন শর্তের ফ্যারে পড়ে আমাদের অর্থনীতি রাজনীতির উপর পরাশক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়।
    এশিয়ার অর্থনীতিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অবকাঠামো খাতে আগামি দশ বছর পর্যন্ত যে ঋণের চাহিদা আছে এর অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না। এশিয়ায় বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বা এডিবি অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণ করে থাকে। অর্থাৎ এদের মিলিত সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম। ফলে বাস্তবতা হল যে, এই প্রতিষ্ঠান দুটো চাইলেও AIIB এর উত্থান রোধ করতে পারবে না। অর্থাৎ AIIB প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির হবে। এছাড়া গত অন্তত বিশ বছর ধরে চীনের লাগাতর বড় রকমের উদ্বৃত্বের অর্থনীতি হিসাবে হাজিরের কারণে চীনের বিনিয়োগ বিশেষ করে অবকাঠামো বিনিয়োগ সক্ষমতা ট্রিলিয়ন ডলারে হিসাব করতে হবে। প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে চীনের নেতৃত্বের AIIB এর শর্ত ভিন্ন ও সুবিধাজনক হবার সম্ভাবনা। যেমন আমাদের আলোচিত পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে চীনের বিকল্প প্রস্তাব ছিল বিনা সুদ বা সার্ভিস চার্জ। অবশ্য সেই সাথে দুই বিলিয়নের ঋণে কনসালটেন্সী ফি এর অপশন (তুলনায় খুবই কম মাত্র ৫৫ মিলিয়ন) ছিল না। তবে বাংলাদেশ চাইলে নিজ খরচে কনসালটেন্ট নিয়োগ দিতে পারত। এই প্রস্তাব আলোচনা, নিগোশিয়েশনের দিকে আর যায় নাই ফলে চুড়ান্তভাবে তা কোথায় দাড়াত তা আমাদের সামনে নাই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, এই প্রকল্পে ঋণ পাবার সম্ভাব্য উৎস এখন আর একা বিশ্বব্যাংক-এডিবির জোটই নয়, এদের একচেটিয়া কারবারের অবস্থায়, শর্ত ডিকটেট করার সুবিধাজনক অবস্থায় আর নাই এটা প্রতিষ্ঠিত। AIIB হাজির হয়ে গেলে এই প্রতিষ্ঠান আরো সংগঠিতভাবে নতুন সুবিধাজনক শর্ত নিয়ে হাজির হবে। সারকথা হল, এশিয়ায় ঋণ চাহিদা পুরণের ক্ষেত্রে চাহিদা-যোগানের গ্যাপের কারণে AIIB এর পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক-এডিবি থেকে যাবে। কিন্তু কে কত ভাল সুবিধাজনক শর্ত দিতে পারে এনিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা দিবে। ফলাফলে আমেরিকান নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হাজির হতে থাকবে। শুরুতে যেটা দেখা দিবে তা হল, চীনের কাছে দুনিয়ার প্রভাব কর্তৃত্বে হারাতে থাকবে, শেয়ার দিতে হবে। এক পর্যায়ে সমস্ত কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে এখনকার অর্থব্যবস্থায় যেমন আমেরিকান কর্তৃত্বের অধীনস্ত হয়ে ইউরোপ ছোট সাগরেদ বা জুনিয়র পার্টনার হয়ে থাকতে হচ্ছে আমেরিকা চীনের অধীনে সে ভুমিকাটাও পাবে কি না সন্দেহ আছে। কেন? সে প্রসঙ্গে নিচে এখন প্রবেশ করবে চলতি ঘটনাবলি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে।
    তার আগে সার সংক্ষেপ টানব ওয়াশিংটনের এক থিঙ্কট্যাঙ্ক Peterson Institute for International Economics এর প্রতিষ্ঠাতা Fred Bergsten এর কথা দিয়ে। চলতি মার্চ মাস জুড়ে সারা পশ্চিমে যত থিঙ্ক ট্যাংক, একাদেমিক মতাদর্শিক প্রতিষ্ঠান আছে সব জায়গায় আলোচনার বিষয়বস্তু একটাই AIIB বা চীনের উত্থান আর এর প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমের ক্ষমতা কর্তৃত্বের সৌধ ভেঙ্গে কী রূপ আকার নিবে সেসব। বাইরের দিক থেকে দেখলে এটা নেহায়েতই আর এক ঋণদানের প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। কিন্তু এর আসল অর্থ তাতপর্য Fred Bergsten এর বরাতে শুনব। তিনি আমেরিকারই আর এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান NPR আর সাথে আলাপকালে AIIB প্রসঙ্গে বলছেন, “I think the fact that it is China and this is part of the broader competition for global leadership, economic leadership, broader political leadership – that is, I think, a central part of this equation.”। বাংলা করে বললে, “ব্যাপারটা হল আসলে চীন। এটা চীনের সাথে দুনিয়ার নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক নেতৃত্ব, বৃহত্তর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইত্যাদি পাবার বৃহত্তর প্রতিযোগিতা – এটাই এই সমীকরণের কেন্দ্রীয় বিষয়।

    চলতি মার্চেই আচমকা ট্রিগার দাবানোর কাজটা করল বৃটেন
    গত সাত বছর ধরে চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়” একটা মোচড়ানির কথা বলে আসছি। প্রায় সব রচনাতেই মুখ্য ইস্যু ছিল এটাই। এই মোচড়ানি ঠিক ব্যবস্থাটা ভেঙ্গে পড়ার অভিমুখি নয় বরং কাঁধ বদল অথবা আরেক কাতে পাশ ফরে শোয়া ধরণের অবস্থায় যেতে চাওয়া বলতে পারি। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের প্রবল অর্থনৈতিক উত্থান থেকে সেই মোচড়ানি, চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়” আসন্ন বদলের আলামত ক্রমশ স্পষ্ট দৃশ্যমান করে তুলছিল। লক্ষণগুলো ক্রমান্বয়ে ফুটে উঠছিল, পড়া যাচ্ছিল। সে ইঙ্গিত দেখে আরও সুনির্দিষ্ট করে জানতে আমেরিকান সরকারি সার্ভে, গবেষণা ষ্টাডি রিপোর্ট হয়েছে গত ২০০৮ সালে। এই রিপোর্টটাকে বলা যেতে পারে ঘুর্ণিঝড়ের রিপোর্টের মতন। আর এখানকার “ঘুর্ণিঝড় আসন্ন” বলে পুর্বাভাস মানে আমরা বুঝেছিলাম এটা আর পিছনে ফিরবে না, আঘাত হানবেই। এসব ক্ষেত্রে আমরা তখন খালি ক্ষয়ক্ষতি কত কি কম করা যায় করণীয় হিসাবে কেবল সেখানেই সব মনোযোগ নিবদ্ধ করি – এই রিপোর্টটাও ছিল তেমনি। আসন্ন ওলটপালট বদলের ঝাপ্টার অভিমুখ বিশ্লেষণ করে ঠিক করা হয়েছিল কি করলে এর প্রভাব আঁচ আমেরিকার উপর কমানোর চেষ্টা করা যায়, একে যতটা দেরি করিয়ে দেয়া যায় – এমন। সে মোতাবেক আমেরিকান বিদেশনীতিতে বদল করা হয়েছিল। আমেরিকার কাছে ভারতের দাম গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছিল। তার ঠেলা বাংলাদেশের ঘাড়ে কিভাবে এসে পড়েছিল সেসব আমরা জানি। কিন্তু “আসন্ন” বুঝা যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আঘাত হানাটা কোনখান থেকে কেমন করে শুরু হবে তা স্পষ্ট হচ্ছিল না। কারণ চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা”টা দাঁড়িয়ে আছে মানে চারটা গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে – আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থা, জাতিসংঘ গ্লোবাল রাজনৈতিক (পরাশক্তিগত) ক্ষমতা, আর ডব্লিউটিও গ্লোবাল পণ্য রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কায়েম করে। ফলে আসন্ন নতুন “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটার” আঘাত হানা বলতে বুঝতে হবে যখন এই চারটা প্রতিষ্ঠানের কোন এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জকারি কোন ঘটনা ফেনোমেনা দেখা যাবে। অর্থাৎ এতদিন আসন্ন বলতে আমরা বুঝেছি তত্ত্ব, ফ্যাক্টস ফিগারের প্রজেকশন দিয়ে বাস্তব আঘাত বা চ্যালেঞ্জকারি পালটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেখা দিয়েছে এমন ভাবে নয়।
    আমাদের অপেক্ষার পালা সম্ভবত শেষ। আগামি দিনের ইতিহাসে মার্চ ২০১৫ সম্ভবত চিহ্নিত হতে যাচ্ছে নতুন “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার” শুরুর কাল হিসাবে।
    “আসন্ন” শুনতে শুনতে আর সহ্য করতে না পেরে প্রথম গুলি ছুড়া মানে ট্রিগার দাবানোর কাজটা করে বসলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যমেরনের বৃটেন। আকস্মিকভাবে গুলিটা একেবারে তাক করলেন আমেরিকার দিকে। এটা সেই আমেরিকা বৃটেনসহ ইউরোপও যার নেতৃত্ব ও খবরদারি মেনে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে এক নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক (পুঁজিতান্ত্রিক) ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। আর এরপর বিগত ৭০ বছর ধরে এই ব্যবস্থার দুনিয়াজুড়ে রুস্তমিতে বৃটেন আমেরিকার ছোট পার্টনার হয়ে সাথ দিয়ে চলেছে। কিন্তু সম্ভবত আর নয়, এবার ছন্দে পতনের সুর। গত সত্তর বছরের ওস্তাদ-সাগরেদের আস্থার সম্পর্ক এই মুহুর্তে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। গত ১২ মার্চ ২০১৫ বৃটিশ সরকার আমাদের জানিয়ে দিলেন যে, বৃটেন চীন প্রস্তাবিত ও নিয়ন্ত্রিত নতুন Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ব্যাংক গড়ার উদ্যোগে সামিল হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ এবার কাঁধ বদলের মত করে আমেরিকার বদলে চীনের সাথে সাথ মিলিয়ে নতুন এক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পথে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে AIIB ব্যাংক গড়তে সম্মতি জানিয়ে দিল। মাত্র পাঁচ মাস আগে গত বছর অক্টোবর ২০১৪ চীন সাংহাই শহরে এক সম্মেলন ডেকেছিল যারা AIIB এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে ইচ্ছুক এমন সব রাষ্ট্রকে। ঐ সম্মেলন থেকেই মূলত প্রাথমিকভাবে একাই ৫০ বিলিয়ন ডলার পুঁজি ঢালার ঘোষণা দিয়েছিল চীন, যেটা পরে ১০০ বিলিয়ন ডলার হবে। সেই থেকে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের স্বাক্ষর চলছে। উদ্যোক্তা-স্বাক্ষরের সুযোগ শেষ হবে এই মাসের শেষ দিন, ৩১ মার্চ ২০১৫ । তাই ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের এই হুড়োহুড়ি আকস্মিকতা। বৃটেনের ১২ মার্চের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আমেরিকার দিক থেকে বিরাট আচমকা ঘুষি খেয়ে পড়ে যাবার মত। গত সত্তর বছর ধরে সারা ইউরোপকে আমেরিকা ভাগ দেবার সময় সবার চেয়ে বৃটেনকে আলাদা চোখে দেখেছে, ভাগবিতরণে মাছের মাথাটাই বৃটেনের পাতে দিয়ে গেছে। ওদিকে চীন যে এমন পালটা প্রাতিষ্ঠানিক আঘাত করবে সেটা আমেরিকার জানা থাকলেও, কিছু প্রস্তুতি ততপরতা থাকলেও সে আঘাতের ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ করে বৃটেন যে লীড নিয়ে পক্ষ বদল করতে পারে – এটা আমেরিকারও বিবেচনায় আছে এমন কোন আলামত গ্লোবাল মিডিয়াতে কখনও চোখে পড়ে নাই। গত বছর প্রকাশ্যে চীনের AIIB উদ্যোগের আগেও অন্য দিক থেকে আগানোর আর এক উদ্যোগ ছিল চীনের। গত ২০০৯ সাল থেকেই ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, নিজে আর সাউথ আফ্রিকা এই পাঁচ রাইজিং ইকোনমিকে নিয়ে BRICS ব্যাংক গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিল চীন। এটা সবার জানা। কিন্তু চীনের ব্রিক উদ্যোগের প্রতি আমেরিকার মতই সারা ইউরোপের আগ্রহ বা প্রতিক্রিয়া শুরু থেকেই শীতল ছিল, যেন এটা তাদের চায়ের কাপ না, কিছু এসে যায় না ধরণের। ফলে সম্ভবত সেই উদাহরণ সামনে থাকাতে চীনের যে কোন উদ্যোগ প্রচেষ্টার প্রতি ইউরোপ টলে, ঢলে যেতে পারে এই দিকটা আমেরিকা খাটো করে দেখেছে। কিন্তু বৃটেনের এই আঘাতই শেষ নয়। বৃটেনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার চারদিন পড়ে জানা যাচ্ছে যে এটা একা বৃটেনের সিদ্ধান্ত নয়। গত ১৭ মার্চ -জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালীও বৃটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করার ঘোষণা প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। বার্তা সংস্থা এপির বরাতে আমরা জানছি জর্মান অর্থমন্ত্রী এই বিবৃতি দিয়েছেন। অথচ গত বছর অক্টোবরে যখন সাংহাইয়ে AIIB সম্মেলন ডাকা হয় তাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা প্রকাশ্যে ততপরতা চালিয়েছিল যাতে এশিয়ার অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া মত দেশ যারা এশিয়া নীতিতে আমেরিকাকে অনুসরণকারি ও আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক শেয়ার পার্টনার, এরা AIIB উদ্যোগে যেন যোগ না দেয়। তবু সেসময় বৃটেন প্রকাশ্যে AIIB উদ্যোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন বক্তব্য দেয় নাই। এখন বৃটেনের যোগ দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর আমেরিকা প্রকাশ্যেই নিজের অখুশি, অস্বস্তি জানিয়েছে। বৃটিশ অর্থমন্ত্রী জবাবে মিডিয়াকে বলেছে, এটা বৃটেনের “জাতীয় স্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত” এবং এমন সিদ্ধান্ত নেবার আগে এব্যাপারে তারা আমেরিকাকে জানিয়ে ও কথা বলে নিয়েছে।
    দুনিয়াজুড়ে রুস্তমিতে আমেরিকার নিজের একক নীতি সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে প্রধানত অর্থনৈতিক বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের সাথে সমন্বয় করতে সাত শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানদের একটা ক্লাব আছে যার নাম জি৭ বা গ্রুপ সেভেন। জি৭ এ ইউরোপের ভিতরকার চার রুস্তমি রাষ্ট্রের মধ্যে বৃটেন ওর একজন। জি৭ থেকেও AIIB উদ্যোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন প্রকাশ্য বক্তব্য আসে নাই। ওদিকে AIIB সাংহাই উদ্যোক্তা প্রস্তুতি সম্মেলনেই ২০ রাষ্ট্র প্রতিনিধি সদস্য স্বাক্ষর করে ফেলেছিল। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতও তাদের একজন -গিয়েছিলেন, স্বাক্ষর করেছেন। এখন বৃটেনের ঘোষণার আগেই ইতোমধ্যে মোট উদ্যোক্তা সদস্য সংখ্যা ত্রিশে পৌচেছে। তবে এতদিন এরা সবাই ছিল কেবল এশিয়ার সদস্য। বৃটেনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এশিয়ার অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া যাদেরকে আমেরিকা ধমকায়ে বিরত রেখেছিল অথচ এসব প্রত্যেক দেশের ব্যবসায়ী, একাডেমিসিয়ান, পরামর্শক এবং এমনকি কোন কোন মন্ত্রীও AIIB তে যোগ দেবার প্রকাশ্যে পক্ষে ছিল ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিল। এখন এমন সব রাষ্ট্রেই সে তর্ক আবার জোরাল হয়েছে, যোগ দিবার পক্ষের লোক ও যুক্তি বেড়েছে। গত ২০ মার্চ রয়টারের খবর অষ্ট্রেলিয়া যোগদানের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। জাপান দ্বিধাবিভক্ত কাপাকাপিতে। থিঙ্কটাংক এক্সপার্টরা বলছেন জাপান যদি যোগ দেয় তাহবে এশিয়ার সর্বশেষ দেশ, এবং বিশেষ শর্তে। দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে মিডিয়ায় ইঙ্গিতপুর্ণ খবর বেরিয়েছে যে তারা নাকি ৫% শেয়ার আর একটা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দরাদরি করছে। যদিও এক ক্যাবিনেট মিটিংয়ের শেষে কোরিয়ান অর্থমন্ত্রী এই জল্পনাকল্পনা স্বীকার করতে চান নাই। ওদিকে ইউরোপের মধ্যে বৃটেনের সাথে জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালীর যোগ দেবার কথা আগে বলেছি। ইতোমধ্যে তা অনুসরণ করে আরও এগিয়ে যোগদানের ঘোষণা করেছে লুক্সেমবার্গ এবং সুইজারল্যান্ড। তবে বৃটেনের সাথে জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালী – এরা ইউরোপের কারা? এটা জেনে রাখা দরকার। আমেরিকার নেতৃত্বে এতদিনের গ্লোবাল মাতবর প্রতিষ্ঠানে আমেরিকার ক্ষমতায় সুখের ভাগ নিবার ভুমিকায় ইউরোপের মধ্যে চার রাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় সাগরেদ – চার ইউরোপিয়ান বৃটেন, জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালী। আমেরিকান নীতির সাথে চোখবন্ধ ধরণের সমর্থনের সবচেয়ে বেশি থেকে কম কার এই ধারাবাহিকতা মেনে নামের ধারাবাহিকতাগুলো লিখা হয়েছে। এই চারের বাইরে ইউরোপের বাকি রাষ্ট্র, এমনকি সে বাকি ইউরোপের রাষ্ট্র বলতে (ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫) ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই চার বাদে বাকি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আর কেউই প্রভাবশালী নয়। এখানে প্রভাবশালী কথার অর্থ বর্তমান বিশ্বব্যাংকে ইউরোপের টপ বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার হল এরা সেই এই চার রাষ্ট্র। আবার যেমন, জি৭ – এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপের মধ্যে চার ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্র হল – এই চার রাষ্ট্র। এই গ্রুপের সদস্য কে হতে পারে তা মানার ভিত্তি হল দুনিয়ায় সঞ্চিত সম্পদ কোন রাষ্ট্রের হাতে বেশি এমন তালিকার উপরের সারির প্রথম সাত রাষ্ট্র। এই সাত রাষ্ট্রের মোট সম্পদ দুনিয়ার মোট সম্পদের ৬৪ শতাংশ। একটা ফুটনোট, যদিও এখানে জি৭ এর ক্রাইটিরিয়া বলার সময় শব্দটা ‘সম্পদ’ ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এই শব্দের প্রকৃত অর্থ বিনিয়োগ ক্ষমতা অথবা বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোন্ডিং বা দাতা মালিক। এছাড়াও মনে রাখতে হবে চীন জি৭ এর সদস্য নয়, হতেও চায়নি, অফারও করা হয় নাই। ফলে এই তিন রথি বৃটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করার সারার্থ হল, ইউরোপের প্রধান চার মোড়ল আমেরিকাকে এতিম করে দিয়ে চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগের পক্ষে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সারা এশিয়া ও ইউরোপের মূল অর্থনীতিগুলো AIIB উদ্যোগের পক্ষে চলে যাচ্ছে বলা যায়। গত বছরের সাংহাই সম্মেলনের আগে আমেরিকান আমলা কুটনীতিকরা নিজেদের পিঠ চাপড়িয়েছিল এই বলে যে এই উদ্যোক্তা সম্মেলন মোট সদস্য সংগ্রহের সংখ্যা ২০ হয়েছে বটে কিন্তু চীন ও ভারত বাদে এশিয়ার বড় অর্থনীতির কেউ আর এর সদস্য হতে আসেনি। আর সেই সাথে ইউরোপ থেকেও কেউই আসেনি। এটা তাদের কূনৈতিক লবির সাফল্য। অর্থাৎ চীন উদ্যোগের বিরুদ্ধে কানপড়া দেয়া, ভাঙরি দেয়ার, ভয় দেখানোর তাদের প্রচেষ্টাটা সফল। স্বভাবতই এই হিসাবের মধ্যে এশিয়ার জাপানকে বাইরে রেখে বলা। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাস পড়ে সে দৃশ্যপট এখন একেবারে বদলে গিয়েছে, আগামিতে আরও বদলে যাবে সে আলামত দেখা যাচ্ছে। আর দৃশ্যপট বদলে দিবার পিছনের ট্রিগার টানার মত কাজটা করেছে বৃটেন। নিজে একা শুধু নয় ইউরোপের বাকি তিন মুল মুরুব্বিদেরও সাথে আনার কাজ হয়ে গেছে সেটা। এটা এমন এক ঘটনা যা ১৯৪৪ সালের পর থেকে দুনিয়াতে ঘটতে দেখা এমনকি কল্পনা করাও খুব সহজ ছিল না।
    ওদিকে অষ্ট্রেলিয়ার ঘনিষ্ট পড়শি, রাজনীতি-অর্থনীতিতে প্রায় সমনীতি অনুসরণকারি নিউজিল্যান্ডও আনুষ্ঠানিকভাবে AIIB তে যোগদান করেছে। তবে বৃটেনের পরের তিন ইউরোপীয় রাষ্ট্র ঠিক কি বলে এই আগ্রহের কথা জানিয়েছে সেটাও বেশ গুরুত্বপুর্ণ। বার্তা সংস্থা এসোশিয়েটেড প্রেস জর্মন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রচারিত তাদের তিন রাষ্ট্রের আগ্রহ-পত্রকে উধৃত করে জানাচ্ছে, “তিন ইউরোপীয় দেশ চলতি ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকগুলোর অংশীদারির পাশাপাশি AIIB তে যোগদানের পরিকল্পনা করছে যাতে এশিয়ায় প্রচুর অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটাতে AIIB তে ফান্ড সরবরাহ করে তাতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে”। ফ্রান্স, ইটালি ও জর্মনি আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় পার্টনারদের সাথে ঘনিষ্ট সমন্বয় রেখে AIIB এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়ে কাজ করতে আগ্রহী যাতে এমন এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায় যেটা এর পরিচালনা, সুরক্ষা, ঋণ বিতরণ ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘বেষ্ট ষ্টান্ডার্ড ও প্রাকটিস’ অনুসরণ করতে পারে”।

    এখানে শুরুতে চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার” কথা বলছি মানে একটা সিস্টেমের কথা বলছি। যেমন সাধারণ মানুষ বলে “একটা সিস্টেম করে নিয়েছি” – আসলে ঠিক তাই-ই বুঝাচ্ছি। অর্থাৎ এটা একটা সিস্টেম, এর অর্ডার, এর আইন-কানুন, নিয়ম প্রটোকল, প্রভিশন, ম্যান্ডেট, ট্রিটি-সম্মতিচুক্তি ইত্যাদি সব মিলিয়েই – এটা এক ব্যবস্থা। গত ১৯৪৪ সালে এই ব্যবস্থার জন্মটাকে বলা হয় দুই বিশ্বযুদ্ধের সার ফলাফল। যার মাখন হল আমেরিকার নেতৃত্বে কর্তৃত্বে জন্ম নেয়া এক “গ্লোবাল সামগ্রিক ব্যবস্থা”। প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বললে, এই ব্যবস্থা মুখ্যত চারটা গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসংঘ এবং ডব্লিউটিও এর মাধ্যমে দুনিয়ায় ততপর ও হাজির। এছাড়া আরও প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো মূলত আমাদের মত দেশগুলোর উপর গ্লোবাল ঐ চার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সমন্বয় করে। অর্থাৎ সেগুলো সরাসরি আমাদের মত দেশের স্বার্থের বিপরীত প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে আমাদের মত দেশের সদস্যপদ নাই। যেমন G7, OECD। চার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্মের কথা বলছিলাম। না, ১৯৪৪ সালে এটা ঠিক বন্দুকের মুখে ফেলে সই করিয়ে নেয়া ঘটনা নয়। আর আমরা তখন কলোনি মাস্টারের বৃটিশ-ইন্ডিয়ার অধীনস্ত। ফলে আমাদের কথা বলার কিছু নাই। সব কলোনি মাস্টারের সারা ইউরোপের কাছে রুজভেল্টের আমেরিকা তখন হয়ে উঠেছিল একমাত্র ত্রাতা। সে এক অবজেকটিভ বাস্তবতা, পরিস্থিতি যেটা একদিক থেকে সবাই উপায়হীন এক অন্ধকার ভবিষ্যতে, অন্যদিকে একমাত্র আশা ভরসা রুজভেল্ট ও তার আমেরিকা। এবং আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধোত্তর ইউরোপকে বিশেষত ইটালিকে ত্রাণ দিবার ক্ষমতা বাস্তবতা একমাত্র আমেরিকার ছিল এবং দিয়েছিল। আর বিগত ১৯৪১ সালে বৃটেনকে আটলান্টা চার্টারে স্বাক্ষর করিয়ে নেবার পর থেকে ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত আমেরিকা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের সবার যুদ্ধের সিংহভাগ রসদ ও খরচ যুগিয়েছে। আবার, যুদ্ধশেষে এরপরেও আবার পুনর্বাসন, পুনর্গঠন এর জন্য ধার, বিনিয়োগ সবই এসেছে ঐ আমেরিকা, একই উৎস থেকে। ১৯৩৩ সাল থেকে সারা ইউরোপের তাগিদ আমেরিকা যেন একটা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” গড়ার উদ্যোগ নেয়। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু ১৯১৪ সালের পর থেকে ১৯৪৪ সালে পর্যন্ত এই ত্রিশ বছর ধরে কলোনি শাসনের হাত ধরে দুনিয়ায় যে খুবই সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পণ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু ছিল তা একেবারেই প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছিল। এই বাস্তবতার মধ্যেই ঐ চার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” গড়ে উঠেছিল। উপরে খুবই সংক্ষিপ্তভাবে যে বাস্তবতার বন্দীত্বে সারা দুনিয়াকে আমেরিকার হাতে এনে দিয়েছিল এর মুল চাবিকাঠি হল, আমেরিকার অর্থনীতির প্রবল উত্থান, একমাত্র অর্থনীতি যার মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেও উদ্বৃত্ব সম্পদ সঞ্চিত হয়েছিল। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আয়-ব্যয়ে টানাভাবে উদ্বৃত্ব থাকছিল। যুদ্ধের আগের (১৯১৪) দুনিয়া ছিল যার যত কলোনি দেশ দখলে আছে সে তত বড় সাম্রাজ্যের রাজা। আর যুদ্ধের পরে হল উলটা ইউরোপের সব কলোনি দখলকারি মাস্টারেরা দেউলিয়া, সবাই আমেরিকার প্রজা, আমেরিকা একমাত্র দাতা। যেকথা বলছিলাম, আমেরিকার অর্থনীতির প্রবল উত্থান, একমাত্র উদ্বৃত্ব অর্থনীতি – এটাই তার নেতৃত্বে যেকোন নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম হবার পিছনের শর্ত, অবজেকটিভ বাস্তবতা তৈরি করে। এই অর্থে চলতি একুশ শতকের শুরুতে দ্বিতীয় দশক ১৯৪৪ সালের আশেপাশের সময়ের বাস্তবতা পরিস্থিতির সাথে তুলনীয়। নিশ্চয় সবটা হুবহু নয়, যেমন আমরা এখন কোন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে নাই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ যে দুনিয়ায় একমাত্র অর্থনীতি চীনের, যেখানে সবচেয়ে দ্রুত এবং বেশি উদ্বৃত্ব সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে। এর তুলনায় কাছাকাছিও কেউ নাই। উদ্বৃত সম্পদ মানেই পুনবিনিয়োগের ক্ষমতা। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অবকাঠামোখাতে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিনিয়োগ ক্ষমতা। তাই AIIB শুধু বিশ্বব্যাংক বা এশিয়ার এডিবিকে চ্যালেঞ্জ করেই থেকে থাকবে না। অপ্রত্যক্ষে আইএমএফকেও চ্যালেঞ্জ করবে। চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাবস্থা কায়েমের পথে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু হবে। এই প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত যাব পরে।

    কেন আমরা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওলটপাল্টকে জানব, কোন জায়গায় বসে দেখব
    আবার চলতি শতকের প্রথম দশক মানে (২০০১-১০) সালের সময় থেকেই দুনিয়া জুড়ে নানান ঘটনায় বারবার আলামত ফুটে উঠছিল যে ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়’ এক মহা-ওলটপালট আসন্ন বলেছি। গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কথার সোজা মানে দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্লোবাল ক্যাপিটালের ততপরতা, ফেনোমেনা -গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। তবে একে ক্যাপিটালিজম বলে চিনিয়ে দিলে আমরা ‘ক্যাপিটালিজম কত খারাপ দেখেছ’ ধরণের এক নৈতিক সমালোচনার দিকে যেন ধাবমান না হয়ে যাই। সেটা আমরা বহু যুগ থেকে করে আসছি। এখন পরিপক্ক হবার সময়। ফলে এটা কত খারাপ বা ভাল এই প্রশ্নের চেয়েও অর্থনৈতিক এই সিষ্টেম বা ব্যবস্থাটাকে বুঝা, কিভাবে ততপর আছে করছে টিকে আছে তা বুঝা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আমাদের এই বুঝাবুঝির উদ্দেশ্যের দিকটা কি তা না ভুলে বা হারিয়ে সব সময় সামনে সমুন্নত রাখা। উলটাপালটা জঙ্গল পিটিয়ে পরিস্কার থাকতে হবে যে সে উদ্দেশ্য এটা নয় যে এই ব্যবস্থাটা ভাল না খারাপ, চাই কি চাই না। কারণ এই ব্যবস্থা ভাল না খারাপ, চাই অথবা না চাই এর চেয়েও বড় দিকটা হল এই ব্যবস্থার মধ্যেই আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে ও হবে আরও অনেকদিন। ফলে উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশে আমাদের সুনির্দিষ্ট করণীয় কি হবে সেই লক্ষ্যে ব্যবস্থাটাকে বুঝাবুঝি। এই গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ভিতরেই বদল ওলটপালট কি হচ্ছে আর এতে আমাদের উপর এর ততপরতা, নড়াচড়ার প্রভাব কোথায় কিভাবে পড়বে আসছে আসবে তা অনুমান করে আর তা থেকে নিজেদের কম্পিটিটিভ এডভ্যানটেজ বা তুলনামূলক সুবিধার দিক কি, কি আমাদের জন্য উন্মোচিত হচ্ছে এসব মিলিয়ে একটা সম্ভাব্য কৌশল নির্ণয়ে পৌছানো। অর্থাৎ এটা দূরে দাঁড়িয়ে বা গ্যালারিতে বসে মজা দেখা না, ভাল খারাপ বলে রায় দেয়া না। আমরা সংশ্লিষ্ট হয়েই আছি, থাকতে হবে এই উপলব্দি জাগিয়ে রেখে সম্ভাব্য নিজ করণীয় কৌশল কি হতে পারে তা বুঝাবুঝির দিকে নিজেদের নিবদ্ধ করা।

    চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটা আজীবন দুনিয়াতে এমনই ছিল ব্যাপারটা তেমন নয়। দুনিয়াতে এটা সাজিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছিল ১৯৪৪ সালের সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পটভুমিতে। এই হিসাবে গত ৭০ বছর ধরে এই ব্যবস্থার রুস্তমি কায়েম আছে। আর আগেই বলেছি, প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে বললে, অর্থনৈতিক দিকটা সাজানো ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়ে আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত দিকটা জাতিসংঘ আর ব্যবসা বাণিজ্য মানে আন্তর্জাতিক ট্রেডের দিকটা ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ‘সাজানো ও নিয়ন্ত্রণ’ এভাবে বলাতে এসবের নেতিদিকটা তুলে বলা হল। কিন্তু আমাদের উপর এসব প্রতিষ্ঠানের ভুমিকা কেবলই নেতিবাচক এমন ধারণা ও এপ্রোচে নেয়া ভুল হবে। কারণ নেতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও শেষ বিচারে এর ইতিবাচক দিকটা হল একটা গ্লোবাল সিষ্টেম এতে চালু হয়েছে। দুনিয়াতে কোন সিষ্টেমই চালু ফাংশনাল বা কার্যকর নাই এই সিনারিওটা বাংলাদেশে আমাদের জন্য কোন সুখকর দৃশ্যপট নয়। গ্লোবাল সিষ্টেম নাই কথার সিধা অর্থ, নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমার বাইরে কোন কমিউনিকেশন লেনদেন, পণ্য বিনিময় বাণিজ্য, বিনিময় মুদ্রা, ভাব বিনিময় দেয়ানেয়া কিচ্ছু নাই। এমন দৃশ্যপটটা বাংলাদেশের শ্রম, জীবন ব্যবস্থার জন্য বর্তমানের চেয়ে আরও দুঃসহ। অর্থাৎ সারকথাটা হচ্ছে, কোন গ্লোবাল ব্যবস্থা আমাদের অবশ্যই চাই। কিন্তু তাতে আমাদের উপযুক্ত শেয়ার, আমাদের স্বার্থ আমাদের কথা ভয়েস শোনানোর উপযুক্ত ব্যবস্থাও চাই। মানে এটা স্রেফ কোন প্রতিষ্ঠানের নিপাত যাকের মামলা নয়।

    আইএমএফ জন্মের আগে মুদ্রার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল না
    যেমন ১৯৪৪ সালের আগের দুনিয়াটা দেখতে কেমন ছিল তা যদি আমরা খুজি তাহলে দেখব চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” ধরণের কাছাকাছি তুল্য কিছু নাই। আছে কলোনি সম্পর্কের অধীন এক খুবই সীমিত অপুষ্ট এক বিনিময় ব্যবস্থা। কলোনি মানে কলোনি-দাস জনগোষ্ঠীর আত্মস্বীকৃতি এই মৌলিক দিকটাই সেখানে অনুপস্থিত। লেনদেনের গ্রহণযোগ্য কোন আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে কিছু দাড়ায় নাই, ছিল না। যদিও ভাল দিকটা ছিল কোন মুদ্রা মানে কোন না কোন প্রাইভেট ব্যাংকের নোট। ঐ নোট দেখালে সেই ব্যাংক নোটের বদলে গচ্ছিত রাখা সমতুল্য সোনা ফিরিয়ে দিত। এটাকে গোল্ড ব্যাকড নোট – বলা হয়। এই সময়ে চালু কলোনি অর্থনৈতিক সিষ্টেমের এক গুরুত্বপুর্ণ উল্লেখযোগ্য লক্ষণ চিহ্ন হল, কোন দেশের মুদ্রা কি হবে ওর মান হার কি হবে তা নির্ধারণে ঐ কালের কলোনি সাম্রাজ্য রাষ্ট্র ধরণের বৃটিশ বা ফরাসী এমপায়ার রাষ্ট্রের কোন হস্তক্ষেপ (অবমুল্যায়ন বা অতিমুল্যায়ন) ছিল না। মুদ্রার মান হার নির্ধারিত হত বাজার দিয়ে – শেষ বিচারে প্রাইভেট বা পারিবারিক ব্যাংকের হাতে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের হাতের বাইরে। এককথায়, কলোনি আমলে মুদ্রা ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু অসুবিধার দিকটা ছিল, আন্তঃ কলোনি মাষ্টারের মধ্যে বিনিময় যেমন বৃটিশের সাথে ফরাসী বিনিময় খুবই সীমিত অপুষ্ট পর্যায়ের। আর আমরা নিজেরা তখনকার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার আমরা গোনায় ধরিনা, বাইরে। তবে মূল একমুখি উদ্বৃত পাচার একটা ছিল বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে বৃটেনমুখি। এটাকে পণ্য বিনিময় বলা কষ্টকর। একথা নিসন্দেহে সত্যি যে আমরা কলোনি ধরণের বিনিময় ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে ১৯৪৪ সাল থেকে আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের অধীনস্ত গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যে পড়েছি। তবু তুল্য বিচারে এটা ভাল। এই ব্যবস্থা অসাম্যের হলেও অন্তত পণ্য, মুদ্রা, টেকনোলজি, ভাব ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে এটা অনেকানেক ব্যাপক বিস্তৃত ফলে কলোনি যুগের ব্যবস্থার তুলনায় ভাল। আবার ওয়াল ষ্ট্রিটের অধীনস্ত গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে খারাপ দিক হল, এর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ও একে কার্যকর করতে গিয়ে সাধারণভাবে “রাষ্ট্র ও মুদ্রাকে” গভীরভাবে সম্পর্কিত তো বটেই নিজ মুদ্রার মান হার বাজারের বদলে রাষ্ট্রের হাতে চলে গিয়েছে। “সমাজতন্ত্রী মনের” বিচারে অনেকের মনে হতে পারে এটা ভালই তো, বাজারের প্রাইভেট ব্যাংকের বদলে মুদ্রার উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম হয়েছে। কিন্তু এই বুঝ মিথ্যা আর ফাঁকির বুঝ, প্যারাডক্স।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে গ্লোবাল বিশ্বব্যবস্থাটাকে আগের কলোনি যুগের সঙ্গে তুলনা করছিলাম। প্রথমটাকে ১৯৪৪ সালের সুচনা ঘটনা মানলেও পরেরটা ১৯৪৪ সালের আগে বলতে আসলে ১৯১৪ সালের আগে বুঝতে হবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু ১৯১৪ সাল তাই এর আগে। কারণ ১৯১৪-১৯৪৪ এই ত্রিশ বছর সময়কালকে তুলনায় বলা যায় “নো সিষ্টেমের” যুগ। এমনকি অন্তর্বর্তিকালীন সময়ও সেটা নয় যে নতুন ব্যবস্থা সেখানে তৈরি হতে শুরু করেছে এমন। বলা যায় ঐ সময়টা পুরান কলোনি ব্যবস্থাকে কেবল ভাঙ্গছে আর ভাঙ্গছেই নতুন ব্যবস্থা জন্মানোর আলামত নাই, ফলে যে যেমনে পারে কোন মতে দিন গুজরান, সংকটের দিন পাড় করা ধরণের কাল। এসবের মূল কারণ যুদ্ধ আর চেপে বসা ক্রমবর্ধ্মান যুদ্ধের খরচ – এটাই সবার আগে চলতি মুদ্রার বাজার ব্যবস্থাকে নন-ফাংশনাল করে দিয়েছিল। আগেই বলেছি ঐ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট ছিল, প্রাইভেট ব্যাংক হলেও সোনা মজুদ রাখার বিনিময়ে সম-পরিমাণ মুদ্রা ছাপানো আর প্রতিদিন যে পরিমাণ সোনা বা ভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংক মুদ্রা ফেরত আসলে আর যে পরিমাণ বের হলে গেল এর সাম্য প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিতে পরের দিন সকালের মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করে দেয়া। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এই দুই গুরুত্বপুর্ণ ভিত্তির উপর আস্থা নষ্ট হয়ে পড়ায় ব্যবস্থাটাই নন-ফাংশনাল হয়ে যায়। এর উপর আবার – যেমন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড তখনও প্রাইভেট ব্যাংক তবে মুদ্রা ছাপানোর একমাত্র লাইসেন্সধারি। এবং সেই সাথে ব্যক্তি একাউন্টধারি খাতকের মতই বৃটিশ রাষ্ট্রও তার একাউন্টধারি গ্রাহক মাত্র। এই বিশেষ গ্রাহককে যুদ্ধের খরচে মিটাতে ব্যাংককে প্রচুর বেধরক ধার দিতে হয়েছে, আবার কবে ধার শোধ করতে পারবে সে আলামত নাই। এই পরিস্থিতিটা হল, ব্যাংক থেকে সোনা বেরিয়ে গেছে যার ফেরার আলামত নাই। এই ক্ষতির ফলাফল সব খাতকের উপর পড়েছিল। দেশে বিদেশে পাউন্ড মুদ্রার উপর কারও আস্থা নাই। এটা ১৯৩০ সালের পর থেকে, একমাত্র নগদ সোনার বিনিময়েই আমেরিকার সাথে এক ধরণের সীমিত বিনিময় ঘটেছিল তাও আবার ওকে ঠিক বাণিজ্য নয় একমুখি বিনিময় বলা যেতে পারে। আমেরিকান ব্যবসায়ীর অস্ত্র বা যুদ্ধের রসদ নামিয়ে বিনিময়ে নগদ সোনা নিয়ে ভেগে পড়া ধরণের। আমেরিকার “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন” ১৯৩৫, ১৯৩৭ এসবের সাক্ষ্য।
    আবার এখনকার দুনিয়ায় সব রাষ্ট্রেই একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রিজার্ভ ব্যাংক নামে প্রতিষ্ঠান থাকা স্বাভাবিক ফেনোমেনা হয়ে গেছে। সেন্ট্রাল ব্যাংক – মানে মুদ্রা, মুদ্রার মান, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ এসবের উপর নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠা করার এক প্রতিষ্ঠান থাকাটা অবশ্যম্ভাবি মনে করা হয়। কিন্তু এর ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ফেনোমেনাটা ১৯৪৪ সালের আশেপাশের সময়ের। তবে ১৯৪৪ সালের আগের ত্রিশ বছরে সময়ের ভিতর। তবে কিছুটা একমাত্র ব্যতিক্রম যেমন আমেরিকার ফেডারল রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয় ১৯১৩ সালে। এবং কারণও ভিন্ন। এর পিছনের কারণ ঠিক ডলারের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নয়। বরং তার আগে আলাদা আলাদা প্রাইভেট ব্যাংকের আলাদা সিলের নোট তো বটেই – এক আমেরিকান রাজ্যের নোট আর এক রাজ্যে গৃহীত হত না, চালু ছিল না। অর্থাৎ প্রত্যেক রাজ্য তার অর্থনীতির উদ্বৃত্ব নিজ রাজ্যেই পুনবিনিয়োগ হতে ধরে রাখতে চাইত। ১৭৭৬ সালে জন্মের পর থেকেই এই রক্ষণশীল অবস্থান ব্যবস্থা ছিল। মুল বিষয়ছিল ফেডারেল ব্যবস্থার নামে এক রাজ্য যেন অন্য রাজ্যের উপর বাড়তি সুবিধা না নিতে পারে। যেটা খুব সম্ভবত পরবর্তিতে পুঁজির সঞ্চয় বেড়ে যাওয়া বা উলটা করে বললে নিজ রাজ্যে পুনবিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে আসায় অপর রাজ্যে বিনিয়োগ সন্ধানে বের হওয়া বাস্তবতা হয়ে পড়েছিল। এছাড়া রাজ্যগুলোর মধ্যে সমন্বয়, একসাথে পরিকল্পনা ইন্টগ্রেশনে ও ফেডারেল ব্যবস্থা কার্যকর থাকার সুবিধার দিক চিন্তা করে ফেডারেল রিজার্ভ নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করা হয়। আর ওদিকে ইউরোপে প্রায় সব দেশে এমন কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৩০-১৯৪৬ সালের মধ্যে। এর মূল কারণ এককথায় বললে, ১৯৩০ এর মহামন্দা ফলে প্রত্যেক রাষ্ট্রের মুদ্রার অবমুল্যায়ন ঘটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য রাষ্ট্রের উপর রপ্তানি বাণিজ্যের সুবিধা পেতে চেয়ে করা হয়েছিল। যদিও এসবের মিলিত ফলাফল শেষ পর্যন্ত শুণ্য। কারণ সবাই কমালে কেউ কারো উপর সুবিধা হাসিল করতে পারেনি। সেটা আলাদা কথা। কিন্তু মুদ্রার অবমুল্যায়ন তখনই করা সম্ভব যখন মুদ্রার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধরণের কিছু আছে। মুদ্রা যদি বাজার আর প্রাইভেট ব্যাংকের হাতে পরিচালিত হয় তবে রাষ্টের অবমুল্যায়নের খায়েসে তারা সাড়া দিবে না। ওদিকে ১৯১৪ সালের পর থেকেই রাষ্ট্র নিজেই প্রাইভেট ব্যাংকের খাতক হিসাবে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশির ঘাটতিতে, সেই ঘাটিতি পুরণে ঋণ নেয়া আর ঋণশোধের ব্যর্থতায় দেউলিয়া – এই দশা থেকে একটা আপাত সুরাহা চাচ্ছিল রাষ্ট্র। যেমন, মুদ্রার অবমুল্যায়ন বা মুদ্রাস্ফীতি আগে নেয়া ঋণের প্রকৃত মুল্য ক্ষয়ে যায় বা কমিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের নিজের পুরানা দেউলিয়াত্ব কাটানো এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কেউ ১৯৪৪ সালের আগেই মুদ্রা নিয়ন্ত্রণকারি প্রাইভেট ব্যাংককে অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে ঘোষণা করে। এছাড়া সব স্থানীয় মুদ্রার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর আইডিয়ার বাস্তবায়ন ও এর কার্যকরি প্রতিষ্ঠান হওয়া একমাত্র সম্ভব এর প্রত্যেকে সদ্স্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে। অর্থাৎ প্রত্যেক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক অস্তিত্ত্ব থাকার পুর্বশর্ত। তাই বাস্তবে দেখা যায়, কোন রাষ্ট্রের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যলাভ করতে চাইলে ঐ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কিছু আছে কি না, ঐ রাষ্ট্রের স্থানীয় মুদ্রা তা ঐ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে কি না এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর যে কমন ফরম্যাটে অনুসারে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ততপরতার বিষয়ক বেস ডাটা সংগ্রহ ও সরবরাহের উপযোগী কি না ইত্যাদি সদস্যপদ লাভের টেকনিক্যাল পুর্বশর্ত।
    এসব ঘটনাবলির ভিতর দিয়ে মুদ্রা সরবরাহের উপর অবমুল্যায়ন্সহ সব ধরণের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের মাধ্যমে আইএমএফ হাতে নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থা ভেঙ্গে নিজ নিজ স্থানীয় মুদ্রার উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রথম ঘটনাটা ঘটা শুরু এখান থেকে।

    AIIB এর উদ্যোক্তা-সদস্য হবার সুযোগ এই মাসেই শেষ, এরপর এই বছর শেষের মধ্যে মালিকানা শেয়ারসহ ম্যান্ডেট চার্টার আইন কানুন শেষ করে আগামি বছরের শুরু থেকে এই ব্যাংক কার্যকর হতে চায়। এই উদ্যোগের সাথে একটা জিনিষ নিশ্চিত থাকা যায় যে ডলারের বদলে চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময়ের মুল্য শোধের ব্যবস্থা খাড়া করা একটা মূল উদ্দেশ্য হবে। সব দ্বিধা ছেড়ে আগেভাগে বৃটেনের আগিয়ে আসার পিছনের বড় কারণ এটা। সে ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, হংকংয়ের বাইরে ইউয়ানে পণ্য বিনিময়ে দ্বিতীয় ক্লিয়ারিং হাউস হতে চায় লন্ডন। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে কার্যকর বড় বড় প্রভাব আমরা দেখতে শুরু করব আগামি বছর থেকে। AIIB চালু হলে এর প্রভাব প্রতিক্রিয়া কোথায় কোথায় কিভাবে কতটুকু পড়বে, আমাদের অর্থনীতির জন্য কি সুবিধা অসুবিধা আনবে সেসব দিক নিয়ে আলো ফেলার চেষ্টা করব পরের পর্বে।

  • ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করের সফরের তাতপর্য

    ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিব সুব্রাহ্মনিয়াম জয়শঙ্কর গত ২ মার্চ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট কোনদিকে মোড় নিবে সে অভিমুখের পরের স্তর শুরু হয়েছে এই সফর থেকে। জয়শঙ্কর যা বয়ে এনেছিলেন তা কেবল “অবস্থান পরিবর্তিত” ভারতের একার কথা নয় বরং একই সাথে তা আমেরিকা ও ইউরোপের সাথে ভারতের অবস্থান মিলিয়ে এক সমন্বিত অবস্থান। সে সমন্বিত অবস্থানেরই বাহক তিনি। এর মানে হল, জয়শঙ্করের সফরটা ভারত-বাংলাদেশের রুটিন সফর বা অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে কোন আলোচনা নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে আসার ছলে ‘সাইড টক’ হিসাবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে পশ্চিমের সাথে মিলিয়ে ভারতের “সমন্বিত বার্তা” পৌছে দেওয়া। এই বার্তা তিনি পৌচেছেন।
    ভারত-বাংলাদেশের উভয় সরকার ঘোষিত ও রুটিন বানিয়ে ফেলা অমীমাংসিত দুই ইস্যুর একটা হল তিস্তার পানি। এই ইস্যুতে সর্বশেষ অবস্থা বুঝবার জন্য প্রথম আলোতে ১ মার্চ প্রকাশিত নয়াদিল্লীর সৌম্য বন্দোপাধ্যায়ের রিপোর্ট পড়লেই জানা যায় বিষয়টির সমাধান এখনও কতো অপরিপক্ক অবস্থায় সাত হাত পানির নিচে পড়ে আছে। এছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ল্যান্ড বাউন্ডারি – এটা নিয়েও বাংলাদেশের সাথে কথা বলার কিছু নাই,সব আলোচনা-কথাই বহু আগেই শেষ। এখন কেবল বাকি আছে ভারতের করে দেখানোর,সংসদে ভারতের কনস্টিটিউশনে আইনী সংশোধনী আনা। ভারতের চলতি বাজেট অধিবেশনে এই সীমান্ত বিল বা ল্যান্ড বাউন্ডারি বিল সংসদের চলতি অধিবেশনেই পাস হবে বলে শোনা যাচ্ছিল। যদিও এখন জানা যাচ্ছে অধিবেশনের প্রথমার্ধে তা সম্ভবত হচ্ছে না। সর্বশেষ গত ৫ মার্চের প্রথম আলোর রিপোর্ট বলছে, আগামি ২০ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে বিলটি পাস করা হবে। অর্থাৎ এই হল ইস্যু দুটো নিয়ে ভারতের উদ্যোগ ও করে দেখানো সর্বশেষ অবস্থা। সারকথায় তাই এসব নিয়ে বাংলাদেশে এসে কথা বলার মত কিছুই পেন্ডিং ছিল না। এর মানে এই দুই ইস্যু ছিল আসলে জয়শঙ্করের সফরের প্রকাশ্য উছিলা। আর প্রকৃত ইস্যু ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে ভারতের নতুন বদলে যাওয়া অবস্থান এবং আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে তৈরি সমন্বিত অবস্থান -এটাই জয়শঙ্করের মুখ দিয়ে হাসিনার কাছে উপস্থাপনের।
    ভারতের অবস্থান যে বদলেছে সে বিষয়ে মানবজমিন এক রিপোর্ট করেছে, “পরিবর্তনের বার্তাই দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”। ঐ রিপোর্ট বলছে, জয়শঙ্করের সাথে সাক্ষাত শেষে হতাশ পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক উপস্থিত প্রেসকে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,”একেক সরকারের একেক পলিসি থাকে। ভারতের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশটির ফরেন পলিসিতে ‘বড় রকমের পরিবর্তন’ এসেছে”। এছাড়া এই “পরিবর্তন” যে একা ভারতের নয় বরং একটা সমন্বিত বার্তা ছিল এর অন্য প্রকাশটা আমরা ঘটতে দেখলাম, পরের দিন আমেরিকান রাষ্ট্রদুত বার্ণিকোটের নেতৃত্বে ঢাকার ১৬ কুটনৈতিক মিশন প্রধান ও প্রতিনিধিরা খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করলেন। অনেকটা যেন – হাসিনা ও খালেদা –এই দুজনের কাছে বিদেশী কুটনীতিকদের মধ্যে কার বা কোন দেশের প্রবেশ-গম্যতা মানে একসেসিবিলিটি ও গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি এই হিসাব মাথায় রেখে একই সবার সমন্বিত বার্তা আলাদা আলাদা করে হাসিনাকে পৌছে দেয়া হল ভারতের মাধ্যমে। আর একই বার্তা খালেদার কাছে পৌছে দেয়া হল আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি সবাই মিলে।
    ‘বাকি সবাই’ বলেছি বটে যদিও বাংলাদেশের চীনা রাষ্ট্রদুত ঐ ১৬ জনের মধ্যে ছিলেন না। এর মানে কি চীনের ভিন্ন অবস্থান আছে এরই প্রকাশ সেটা? না। এমন চিন্তা করা, ধরে নেয়া অথবা এমন পাঠ-রিডিং একেবারে ভুল হবে। তাহলে ব্যাপারটা কি? কি বুঝব আমরা? লক্ষ্য করলে দেখব আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে জাতিসংঘ খুবই ততপর এবং সক্রিয়ভাবে জড়িত। আসলে জাতিসংঘ যতটা জড়িত চীনও ততখানি জড়িত – এভাবে পাঠ করতে হবে। কেন? কারণ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গত ২৫ বছর ধরে চীন যত প্রভাবশালী ক্রমশ বড় করে জায়গা নিচ্ছে ততই পরাশক্তিগত চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা তার ক্রমশ বাড়ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরাশক্তিগত চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা – এটাকে আমরা অনেক সময় বলি “পলিটিক্যাল ষ্টেক” মানে, (রাজনৈতিক) বাজিগুলোতে ভাগ। ষ্টেক শব্দটা জুয়ার আসর থেকে উতপত্তি হওয়া শব্দ। অর্থাৎ কোন জুয়াতে যে পরিমাণ অর্থ লাগিয়ে আপনি বাজি ধরেন তাই আপনার ষ্টেক। তো কোন রাউন্ডের বাজিতে হার অথবা জিতে আপনার সংশ্লিষ্টতা, আপনার স্বার্থ, আপনার যায়-আসে ততটা। এখান থেকে একাডেমিক ভাষায় “ষ্টেকহোল্ডার” বলে শব্দের উতপত্তি। অর্থাৎ বাজিতে হারজিতের ভার যতটা আপনি নিজে ধারণ, বহন বা শেয়ার করে আছেন। ব্যাপারটা অনেকটা -একটা টেবিল কল্পনা করা যেতে পারে যার উপর অনেক ভারি কিছু চাপিয়ে দেয়া আছে। এতে ঐ টেবিলের মোট যা ওজন দাড়িয়েছে সেই ওজন এখন টেবিলের যতগুলো পায়া আছে তারা সবাই মিলে শেয়ার করে ধারণ বহন করে আছে। এখন পায়াগুলোর প্রত্যেকে অবস্থান অনুসারে এক একজন সমান অথবা অসমান ষ্টেকহোল্ডার। প্রত্যেকে ভারবাহি এবং একই সাথে ও থেকে যা সুবিধা পাওয়া যাবে এর ফসল লাভালাভের ক্ষতির ভাগীদার। এই হল ষ্টেক বা ষ্টেকহোল্ডার ধারণা। এখন ১৯৯০ সাল থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও সক্ষমতার শুরু থেকেই চীনের অনুসরণ করা একটা শক্ত এবং গুরুত্বপুর্ণ নীতি হল, অর্থনীতিতে উত্থানের কারণে সমতালে বিশ্ববাজারে চীনের রাজনৈতিক ষ্টেক যতই বেড়ে যাক না কেন চীন বেড়ে যাওয়া রাজনৈতিক প্রভাব দিয়ে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার সুযোগ নিবার পথে চীন যাবে না। কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থের ষ্টেক নিবার দিকে নিবদ্ধ থাকবে। বলা ভাল উত্থানের এই পর্যায়ে এটাই হবে কঠোরভাবে অনুসৃত চীবের নীতি। কেন নিজেকে এভাবে সীমিত করে রাখার ব্রত? কারণ এটা ঠিক কোন ভালভালাইয়া প্রতিষ্ঠা করার নীতি নয়। এর মূল কারণ এটা করতে গেলে উপস্থিত গ্লোবাল পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পলিটিকাল ষ্টেক নিয়ে শিখড়ে আছে আমেরিকা। চীনকে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হবে। এমন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেটা আবার সামরিক টেনশন সংঘাতের পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। নিজ অর্থনৈতিক উত্থানের যুগে চীন সামরিক সংঘাত চরমভাবে এড়িয়ে চলতে চায়। এপর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে কোন রাষ্ট্রের উদ্বৃত্ব অর্থনীতির সাফল্য উত্থান নষ্ট জবার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হয়েছে যুদ্ধ, সামরিক সংঘাত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫) পর্যন্ত মাঝের এই ত্রিশ বছরে আমেরিকা নিজের সামরিক সংশ্লিষ্টতা শুরু থেকে খুবই হিসাব করে ও সীমিত করে চলতে পেরেছিল। শেষে একবারই চরম ফয়সালার যুদ্ধে নির্ধারক হয়ে অংশ নিয়েছিল বলেই পরিণতিতে এর সুবিধায় যুদ্ধের আগের দুনিয়ার চিত্র যেখানে ছিল কোলোনী শাসকদের মাতবরির দুনিয়া যুদ্ধ শেষ দেখা গেল তার সবাই দেউলিয়া পর্যদুস্ত। আর ওদিকে আমেরিকা হয়ে গেল দুনিয়ার নতুন প্রভু, একমাত্র সফল উদ্বৃত্ব অর্থনীতির রাষ্ট্র ফলে ইউরোপের অর্থ সংকটে ধার অনুদান দেবার ও নতুন বিনিয়োগ সক্ষম একমাত্র অর্থনীতি। চীন এই অভিজ্ঞতাটাই অনুসরণ করছে। তাই রাজনৈতিক ষ্টেক জমা হলেও এর সুবিধা নয় আপাতত কেবল অর্থনৈতিক ষ্টেকের মধ্যে নিজেকে সীমিত রাখা। রাজনৈতিক ষ্টেক মানে কোন দেশের সরকার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হবে থাকবে এর উপর প্রভাব বিস্তার করা। এর বদলে চীনের আপাতত অনুসৃত নীতি কে ক্ষমতায় কিভাবে থাকল সেদিকে নয়, নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থের ষ্টেকটা বুঝে পেলেই কে সরকারে, কেমন রাজনীতিতে এদিকে সে অনাগ্রহী। রাজনৈতিক ষ্টেক না নেবার নীতির কথা বলেছি কিন্তু কূটনীতি বা কূটনৈতিক ষ্টেক? দুনিয়াকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার আর এক প্রতিষ্ঠান হল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যা মূলত ভেটো ক্ষমতাধারী পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ক্লাব। চীন ওর সদস্য। চলমান দুনিয়ার ঘটনাবলিতে ওর রাজনৈতিক ষ্টেক আছে। কিন্তু তাই বলে এটা পেতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তেই হবে এমন নয়। এই কূটনৈতিক ষ্টেকটা পেতে, ব্যবহার করতে চীন বরাবরেই মতই সক্রিয়। এসব হিসাবের দিক আমেরিকার নখদর্পনে না থাকার কোন কারণ নাই। তাই নিজেই যেচে কূটনৈতিক ষ্টেক দিবার ব্যাপারে আমেরিকা সচেতন। স্বেচ্ছায় না দিলে ভেটো খাবার বাধায় পড়তে হবে। জাতিসংঘ -এটাই আবার দুনিয়ার উপর মাতবরিতে আমেরিকান ততপরতার প্রতি চীনের সম্মতি যোগাড়ের উপায়ও বটে। চীনের সাথে সমন্বয়ের উপায়ও বটে। তাই জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতা মানে চীনের কুটনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, কূটনৈতিক ভাবে ষ্টেক প্রাপ্তি। একারণেই ১৬ কূটনীতিকের খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাতের ততপরতায় চীনা রাষ্ট্রদুতের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও কুটনৈতিকভাবে জাতিসংঘের ভিতর দিয়ে চীন হাজির। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটে জাতিসংঘের যা কিছু ততপরতা এর প্রতিটার ভিতর চীনের সম্মতি আছে, এভাবেই চীনও হাজির আছে। আর অনুমান করা যায় চীনকে অর্থনৈতিক ষ্টেক দিবার দিকটা স্বেচ্ছায় মাথায় রেখে আমেরিকা এটা সমন্বয় করছে। আমেরিকা নিজের পলিটিকাল ষ্টেক ও মাতবরিটা মসৃণভাবে কার্যকর করে তুলতে পারছে। আমাদের অনেকের ধারণা চীন ও ভারতের রেষারেষি স্বার্থ বিরোধ বেশ তুঙ্গে। বিশেষত বাংলাদেশ প্রশ্নে। এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পে চীনের বদলে দুবাই বা অন্য কাউকে দিলে ভারত খুশি হবে। এই বেচা বিক্রি থেকে হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার ব্যাপারে ভারৎ অধিক আগ্রহী হবে। হাসিনাকেই ক্ষমতা রাখার বিষয়ে ভারত অতিরিক্ত দুকদম হাটতে সিরিয়াস হবে। কিন্তু না এই অনুমানের পিছনে বাস্তবতা নাই। আগেই বলেছি চীন বাংলাদেশে তার অর্থনৈতিক ষ্টেক বুঝে পাবার ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস। বাংলাদেশ চীন ও ভারতের দুই রাষ্ট্রদুত কখনও এর আগে দেখা করেছেন এমন খবর চিন্তা করা যায় নাই। এব্যাপারে আমাদের পাবলিক পারশেপশন হল, এরা বাংলাদেশ ইস্যুতে পরস্পর বৈরি। কিন্তু আমরা দেখলাম ভারত-আমেরিকা-ইউরোপের যৌথ অবস্থান চীনকেও ব্রিফ করতে বাংলাদেশে চীন-ভারতের রাষ্ট্রদুতদ্বয় সাক্ষাত করেছেন।

    জটের গোড়া খুলেছিলঃ মোদি-ওবামা বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
    এসব কিছুর গোড়ার জটটা ছিল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত-আমেরিকার অবস্থান বিরোধ। এই বিরোধ কেটে গেছে এবছরের শুরুতে গত জানুয়ারির শেষে। এবিষয়ে খবরটা প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা ছিল,গত জানুয়ারি মাসের শেষে ওবামা ভারত সফরে এসেছিলেন,সেখানে ওবামা-মোদি দু’জনের আলোচনায় ‘বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’ এসেছিল। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের উদযাপন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হতে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। সেখানে ওবামা-মোদির নানা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু এই তথ্যের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তিতে আসা ছিল অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি তা রেওয়াজসম্মতও নয় বলে কেউ তেমন আশা করেনি। রেওয়াজমাফিক হলে সে ক্ষেত্রে হয়তো আমরা তা শুনতাম বড়জোর কোনো অনুসন্ধানী দেশী বা বিদেশী মিডিয়াকর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই প্রকাশিত হতে দেখতেই আমরা সাধারণত অভ্যস্ত। কিন্তু আমাদের অবাক করে এমন এক ব্যতিক্রম ঘটনায় আমরা দেখছি, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রাইনার আমাদেরকে এই তথ্য না চাইতে বৃষ্টির মতো আমাদেরকে ঢেলে দিয়ে জানিয়েছেন। ফিল রাইনার জানুয়ারিতে ওবামার ভারত সফরে সফরসঙ্গী ছিলেন। তবু লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউজ অথবা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়তই কোনো মুখপাত্র নন। অর্থাৎ স্টেট ডিপার্টমেন্ট এটা রুটিন কোনো মুখপাত্রের মাধ্যমে প্রকাশ বা প্রচার করতে চায়নি। সাদামাটা রুটিনের বদলে তারা চেয়েছে এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তার অর্জন বিষয়ে প্রেসকে অবহিত করতে ডাকা কনফারেন্সে রাইনার সেখানে এসেছিলেন। এখানে ‘অর্জন’ শব্দটা সতর্কভাবেই জেনে ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রাইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখের উলটানোর মতো ঘটনা, তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাবো না। কিন্তু তাহলে দাঁড়াচ্ছে, ওই প্রেস কনফারেন্স ডাকার প্রকাশ্য মূল উছিলা এটা নয় যে, ওই সফরে ওবামা-মোদি বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো আলাপ করেছেন কি না। বরং বলা যায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনা ছিল আসলে সাইড টক। কিন্তু তবু সেই ‘সাইড টকের’ প্রসঙ্গেই ফিল রায়নার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। সে কথা বলতে গিয়ে ফিল রাইনার অনেক বেশি যেচে ও বিস্তার করে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন। যেমন তিনি বলছিলেন, ‘আমি একটি বিষয় লক্ষ করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনো আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন’। অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ বলে এক শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে একটা সবার ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ হয়নি কথা সেদিক নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। সাধারণভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের’ উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। তার এটাকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বিরাট বড় ধরনের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ প্রশ্নে আমেরিকার পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে। শুধু তাই নয়, ভারতের এই অবস্থানের প্র্যাকটিক্যাল সারার্থ তাৎপর্য হলো, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ যাকেই ভোট দিক, যেকোনো উছিলায় তারা আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রায়নার সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব প্রশ্নে ভারতের সাথে বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদি-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরনো অনেক বিরোধে এলোমেলো সঙ্ঘাতময় অবস্থানকে এবার যেমন ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে, সবার ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। এখানে তারা উভয়ে পৌঁছেছেন। এটাই ফিল রাইনার আমাদের জানাচ্ছেন। তা ভালো, আমরা জানলাম। এতটুকু নিশ্চয়ই অনেক ছিল। কিন্তু রাইনার এখানেও থামেননি। আরো বাড়তি বলছেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে’ নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ওই ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান ‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতির’ দিকেও তাদের নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হলো শেষ বাক্য ‘বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনো আলোচনা অব্যাহত আছে’। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্যমতের মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনা বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
    ফিল রাইনারের যেচে এসে এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সঙ্ঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোন দিকে যাবে আদৌ যাবে নাকি এমনই দিশাহীন কত দিন পড়ে থাকবে কেউ জানত না। এরপর ২০১৪ সালের মে মাসে মোদির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসা, এরপর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরনো স্থবির বিরোধের ঝাঁপি মোদির খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদি-ওবামার খুবই স্বল্প সময় সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাৎ। আগের লেখায় বলেছি, ভারত-আমেরিকার বিরোধ এটা যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরো বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এ প্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনীতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি। ভারতের নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণকে বলতে শুনেছি যে, ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না। এ কথার অর্থ আরো পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদির জয়লাভে প্রধানমন্ত্রিত্ব নেয়ার পরও বলেছিলেন, বাংলাদেশে ’০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ওই ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে’। ( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।) অর্থাৎ এক দিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে চরমে উঠে আছে, পরে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয় পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি সেটা আদৌ হবে বা এর কী হবে তার কোনো দিশা নেই। অন্য দিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে এবং সেটা নরেন্দ্র মোদির, যার প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেসের থেকে একেবারেই আলাদা এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদি আমেরিকার সাথে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধও) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য। ফলে তা কোন দিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, ঐকমত্যে আসে কি না সেসব যাই হোক না কেন পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা করে রাখতে চান। সে জন্য আগেই নিজ দায়িত্বে ঘোষণা দিয়ে রাখছিলেন যে, মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোনো বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনার টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে ইত্যাদি। পঙ্কজের এই “বাড়াবাড়ি সার্ভিস” এবারের জয়শঙ্করের সফরে উদোম হয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি,আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কী কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান, রাখতে চান যে নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদি আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন রূপ আকার সমাধান দেন না কেন তা পঙ্কজকে তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব,পথ ও কথা না শুনে তা যেন করতে পারবেন না। এক কথায় বললে,এটা রাজনীতিবিদদের ওপর আমলাদেরকে ক্ষমতা কর্তৃত্বে বসিয়ে নিয়ে দেখা এক বোকার চিন্তা ও কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উল্টো তাদের নিয়ন্ত্রণ করার অক্ষম প্রচেষ্টা। এর ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ এমন মনে করার কারণ আছে। আর পঙ্কজ যে হাসিনার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গার করার পক্ষে কাজ করতে মিথ্যা ধারণা ছড়াচ্ছিলেন এর প্রমাণ হল গত সপ্তাহে সচিব জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফর ও “সমন্বিত বার্তা বহন। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হলো, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরনের ব্যক্তিত্বের এসব মনোভাবের একটা ফলাফল হলো, দৃশ্যত যতই মোদি কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হন না কেন, সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু-দুবার ওবামার সাথে সাক্ষাৎ করে নতুন নীতিগত ঐকমত্যের দৃশ্য আবহ তৈরি করেন না কেন অন্তত বাংলাদেশ নীতিতে ভারত-আমেরিকার কোনো ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না, বিশেষত সবার ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ প্রসঙ্গে একমতে এসেছেন কি না এর পক্ষে সব আলামত দেখতে পেলেও আমরা কেউ এত দিন নিশ্চিত হয়ে কিছু বলতে পারছিলাম না। এক স্টেলমেট নিস্তরঙ্গ পরিস্থিতি যেন কোনো দিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদি এসব ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোনো ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রাইনার যেন ওবামা-মোদির নীতিগত ঐকমত্যের দিকটি দৃশ্যমান করতেই ওই প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।

    ফিল রায়নারের বক্তব্যের সারকথার আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদির স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা ‘যৌথ ঘোষণার’ ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত ‘এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ স্ট্র্যাটেজিক ভিশন’ ডকুমেন্টের শুরুতেও তা উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো গেল ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কী উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এ প্রসঙ্গে ফিল রায়নার দাবি করছেন ওবামা ভারতের সক্রিয় ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’ ও ‘এর নির্বাচন’ এবং ‘এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে’ এবং এর মাধ্যমে ‘গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা’ এবং ‘জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা’ এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এ ব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই উপায়কে তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রায়নারের অনুভব ও মন্তব্য।

    এখনকার প্রসঙ্গে সার করে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে, এ যাত্রায় মোদি ওবামার সাথে মিলে ‘গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের’ নীতির মাহাত্মে যদি মেতে ওঠেন, ফিল রায়নারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরো পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় এটা চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোনো একটার দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোনো একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারো স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারো স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দেয়ার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের জন্য খোলা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতা দাঁড় করানো যাবে না যে, তা নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আড়–ণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধা দেবো বিনিময়ে সে যেন আমাকে ক্ষমতায় রাখে এই দুর্গতির পথে হাঁটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিনভাবে সত্যি। এ দিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা গুরুত্বপুর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ কোনো বিভাজনের ইস্যু পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।

    নরেন্দ্র মোদি আর প্রণব মুখার্জির এপ্রোচে ফারাক
    তবে আরও কিছু কথা আছে। আমেরিকাকে হাসিনার এই উন্নাসিক নীতি তৈরির পটভুমিটা তৈরি হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের বুঝাপড়া ও সম্পর্কের ভিত্তিতে,তারই ফলাফলে। কিন্তু প্রণবের সেই কংগ্রেস সরকার আর এখন ক্ষমতায় নাই,গত হয়েছে। আর মোদি কোন বিবেচনাতেই প্রণব নন। ব্যক্তিগতভাবে প্রণবের সাথে হাসিনার সম্পর্ক যে পর্যায়ে ছিল মোদি ঠিক তেমন ভাবের কোন সম্পর্ক চান বলে মনে হয় না,প্রমাণ নাই। যেমন বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে অর্থনৈতিক করিডর বা কুটনৈতিক ভাষায় ভারত যেটাকে “কানেক্টিভিটি” বলে তা মোদিও অবশ্যই চান। কিন্তু এর অর্থ প্রণব করেন এভাবে যে এটা হাসিনার সরকারের কাছ থেকে আদায় করা বিনাপয়সায় ট্রানজিটের মালামাল নিবার একটা কাগুজে অনুমতিপত্র হিসাবে। কিন্তু মোদি এই পেটি মনোভাব থেকে ব্যাপারটাকে দেখেন না। তিনি ট্রানজিট করিডোর বা কানেক্টিভিটি বলতে বুঝেন কোন অনুমতির কাগজ নন বরং বাংলাদেশে করিডোরের জন্য রাস্তা ঘাট ব্যবস্থার ফিজিক্যাল ইনফ্রাষ্ট্রাকচার। ফলে স্বভাবতই সেটার বিস্তারিত অর্থ হল, একাজে বিনিয়োগের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশী অর্থ যোগাড়, যৌথ প্রকল্প হাতে নেয়া আর পরে বাস্তব ইনফ্রাষ্ট্রাকচার রাস্তা ঘাট ইত্যাদি। অর্থাৎ এক বিশাল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক কারবার হবে, যার মধ্যে দুপক্ষের লাভালাভ দেখতে পাওয়া, বাংলাদেশের হাত মুচড়ে তা আদায়ের পথেরও বাইরে এই প্রজেক্টের নিজস্ব বাণিজ্যিক ভায়াবিলিটি থাকবে। ফলে চাপে পড়ে নয় এরপর বাংলাদেশের সক্রিয় উদ্যাগ, অংশগ্রহণ এবং ভারতের টোল দিয়ে ব্যবহার করার ব্যাপার হবে। কারণ প্রশ্নটা হাত মুচড়ে নেবার নয়, প্রজেক্টের নিজস্ব বাণিজ্যিক ভায়াবিলিটি তৈরি করা । সহজ করে বললে ব্যাপারটা হল ঢাকা-চাঁটগা যাবার পথে আপনি রাস্তায় খাবেন কোথায় সেবিষয়ে নিজেকে বুদ্ধিমান ভেবে এর দায় চলার পথে বাসা পড়ে এমন বন্ধু বা আত্মীয়ের মাথায় চাপিয়ে দেবার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু এটা প্রাকটিক্যাল,পেশাদারি,সিরিয়াস ব্যবসায়ীর এপ্রোচ হল না। কারণ প্রতিবার সফরে আপনাকে খেতে গিয়ে খাওয়ার মান, সার্ভিস, সঠিক সময়ে না পাওয়া ইত্যাদির মুখোমুখি হতে হবে। অসন্তুষ্ট হতে হবে। আপনার ব্যবসার ক্ষতি হবে কিন্তু তাতে বন্ধু বা আত্মীয়ের কোন মাথাব্যাথা নাই, তাকে উদাসীন দেখবেন। ফলে এটা হল একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়কে পেটি-মন থেকে দেখা সমাধানের এপ্রোচ। এমন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীর সমাধানটা হবে ঐ বন্ধু বা আত্মীয়ের জমি ভাড়া নিয়ে আবার তার সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে পথের ধারে একটা হোটেল খুলে বসা। যাতে আপনার নিজে পয়সা দিয়ে প্রফেশনাল খাওয়া পাওয়া যাবেন,সার্ভিসের মানের জন্য হোটেল ম্যানেজারকে ধমক দেয়া যাবে আবার ঐ হোটেল ব্যবসার লাভের অংশীদারি দু্টোই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ট্রানজিট ইস্যুতে এখানে প্রণবের এপ্রোচটা হল হাসিনার কাছ থেকে একটা পার্মানেন্ট দাওয়াতপত্র যোগাড় করা ধরণের। অথচ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখা বা নিঃশর্ত সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে একটা কাগজ যোগাড়ের বিষয়ই মূলত এটা নয়। ভারতীয় ট্রাক যাবার ব্যাপারটি শুধু অনুমতির বিষয় নয়;সেই লং-হুইল ট্রাক যাবার “রাস্তা” কি হবে সে প্রশ্নে চুপ থেকে প্রকারন্তরে সেটা বাংলাদেশ নিজ রাজস্ব আয় দিয়ে “যেভাবে পারে” যুগিয়ে যাবে ধরে নিতে পারে একমাত্র পেটি-চিন্তার মন। কোন সিরিয়াস ব্যবসায়ির চোখে এটা কোন অর্জন নয়। “যেভাবে পারে” অবস্থার রাস্তার দশা কেমন হবে সেটা যে কোন সিরিয়াস প্রফেশনাল ব্যবসায়ি বুঝে, ফলে এটা ব্যবহার করে কোন ব্যবসার সম্ভাবনা তিনি দেখবেন না। ফলে প্রণবের চোখে ট্রানজিট ইস্যুটা হল তথাকথিত রাজনৈতিক,একটা তাঁবেদার সরকার বসিয়ে অনুমতির কাগজ যোগাড়ের। আর মোদির চোখে সেটা সিরিয়াস অর্থনৈতিক,বাস্তব ইনফ্রাষ্ট্রাকচারের। বাংলাদেশে নিজের পছন্দের হাসিনা ধরণের সরকার সেখানে কোন ইস্যুই নয়। আবার ওদিকে ভারতের পুর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুটাও বাংলাদেশের তাবেদার সরকার বসালেই সমাধান হবে বলে প্রণব দেখেন। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। আসল সমাধান ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব থেকে রিসোর্স বন্টনে পিছিয়ে পড়া পুর্বাঞ্চলকে মনোযোগ দেয়া। মোদি এভাবে ব্যাপারটাকে দেখেন বলে নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই জানিয়েছেন। সারকথায় প্রণবকে হাসিনা যা বিক্রি করেছিলেন মোদির বেলায় মোদি তা কিনে ভারতের কোন লাভ আছে বলে মনে করেন না। ফলে তিনি হাসিনার গ্রাহকই না। হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে এমন বাসনা বা গরজ তাই মোদির নাই। অন্তত প্রণবের মত তো নয়ই।
    গত ২০১১ সাল থেকে ওবামা বাংলাদেশের উপর দিল্লির মধ্যস্থতায় ব্যবহারের যাঁতাকাঠিটা ভারতের থেকে ফিরিয়ে নিজের কব্জায় নিয়েছেন। এতে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নাখোশ হয়েছেন বেশি। অন্য দেশের উপর প্রভাব খাটানোর অনিবার্য ক্ষমতা একটি দেশ অর্জন করে মূলত নিজ অর্থনীতির সক্ষমতাকে দুনিয়ার প্রধান দু-তিনটা অর্থনীতির একটা হিসাবে হাজির করতে পাবার উপর। ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সেটা করে দেখানোর মুরোদ অর্জন করবার কষ্টকর কাজটা করে দেখানো ছাড়াই আমেরিকার যাঁতাকাঠি চায়। প্রণবের কংগ্রেসের বিদেশনীতির ভারকেন্দ্র ছিল এখানে। গত ২০০৭ থেকে ২০১১ এই কয়েক বছর সেটা ব্যবহারের জমিদারি সুখ ভোগের পর সেটা ফিরে পাওয়া তাদের এখনকার একমাত্র আরাধ্য,সেটা পেলেই কেবল তারা সন্তুষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবতা পালটে গেছে অথচ তাঁরা সে বাস্তবতা মেনে ভিন্ন চিন্তা করতে চায় না। গত বছর মোদি জিতে আসার আগে পর্যন্ত ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। আগেই বলেছি ভারতের সমস্যাকে দেখার এপ্রোচ মোদির ভিন্ন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্ব নিজের মতো মোদি ঢেলে সাজিয়ে নিতে পারলেও এর পক্ষে একই সমতালে আমলা-গোয়েন্দাদের উদ্যোগ সামিল করতে পারছিলেন না। একাজে ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে সবার আগে মোদির এপ্রোচের পক্ষে সক্রিয় সাড়া ও সহায়তা তিনি পান জয়শঙ্করের কাছ থেকে,তিনি তখন ছিলেন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদুত। সেই থেকে মোদির চোখে জয়শঙ্করের গুরুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা। আর ঠিক সমান বিপরীত মাত্রায় তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের প্রতি মোদির দুরত্ব সৃষ্টি ও অসন্তুষ্টি। পদের স্তর হিসাবে সার্ভিস আয়ুকালের দিক থেকে জয়শঙ্কর সুজাতার চেয়ে সিনিয়ার হলেও সুজাতার অধীনের পদে ছিলেন জয়শঙ্কর। গত জানুয়ারিতে ওবামার ভারত সফরের সময় এই পরিস্থিতি এতই মিসম্যাচ হয়ে উঠেছিল যে ঐ সফরের আয়োজনে উপলক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের আমলাদের কাজের দায়িত্ব বন্টনে সুজাতাকে কোন বিশেষ দায়িত্বের বাইরে রাখা হয়েছিল বলে ভারতীয় মিডিয়ায় খবর এসেছিল। জমতে থাকা এসব টেনশনের ফলাফলে ওবামার ভারত ত্যাগের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সুজাতার বরখাস্ত আদেশ আসে। আর জয়শঙ্করের সরকারি চাকরি জীবন শেষ হবার মাত্র দুদিন আগে তাঁকে পররাষ্ট্র সচিব বলে ঘোষণা করেন মোদি। জয়শঙ্করের বিশেষত্ব হল, তিনি বুশের থেকে তুলনায় বদলে যাওয়া ওবামার নীতি সহজে মেনে নিয়ে এরপর আমেরিকান স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থের কমন জায়গা কি হতে পারে তা এক্সপ্লোর করে ভায়াবল ও কার্যকর পথ বের করতে সমর্থ একজন কারিগর হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। এমন কাজ সফল করতে গিয়ে আবার জয়শঙ্কর এক বিশাল সুবিধা অর্জন করেছেন। ভারতের সাথে আমেরিকার অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে ঐক্যমতের জায়গা বের করার জন্য আমেরিকাও মুখিয়ে ছিল। কারণ আমেরিকার এশিয়া নীতিতে সাফল্য আসার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে সম্পর্ককে আমেরিকা খুবই নির্ধারক বিষয় মনে করে। ফলাফলে আমেরিকার কাছেও জয়শঙ্কর একজন গভীর আস্থার ব্যক্তিত্ব হয়ে হাজির হলেন, যিনি আমেরিকার চাওয়া-পাওয়াগুলোর দিকগুলোর পজিশনের সম্যক খবর রাখেন। এসব কিছু মিলিয়ে আমেরিকার আস্থার জয়শঙ্কর – যিনি গত ২ মার্চ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।

    জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফরের গ্রাউন্ড প্রস্তুতি
    কিন্তু জয়শঙ্করের এই সফরের গ্রাউন্ড প্রস্তুত করতে মোদির স্টাইল খুবই চমকপ্রদ। মোদি চমক দিয়ে কাজ করতে দেখাতে ভালবাসেন। তিনি কোনভাবেই জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফরকে হাই প্রোফাইলে দেখাতে রাজি না। অর্থাৎ জয়শঙ্কর মূলত কেবল ভারতের নয় একটা সমন্বিত বার্তা নিয়ে আসছেন। ফলে এমন হাই প্রোফাইল সফর হওয়া সত্বেও মোদি সেটা লো প্রোফাইলে হাজির করতে চান। কারণ তাতে সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং তা সফরের লক্ষ্যের সাথে ফিট করে। মোদি একে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের রুটিন সার্ক-দেশগুলো সফর বলে হাজির করতে চাইলেন। জয়শঙ্করের এই সফরের অফিশিয়াল নাম তাই ছিল “সার্ক-যাত্রা”, অর্থাৎ কেবল বাংলাদেশ নয়।
    কিন্তু দাওয়াতের একটা ব্যাপার আছে। এখানে দাওয়াত মানে ইজি মুলাকাত, আপোষে, নো টেনশন। জয়শঙ্কর একটা দাওয়াতে,যা মুলত সম্মতি্তে,বাংলাদেশে আসছেন সেটা দেখানোর দিকটাও জরুরি। তাই মোদি এবার ক্রিকেট-কূটনীতি ব্যবহার করলেন। তখন ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হচ্ছিল, ফলে মোদি ঐ খেলার আয়োজনে সার্কের সদস্য যারা বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন এমন সরকার প্রধানদেরকে স্ব স্ব দেশকে তাঁর সাফল্য কামনা জানাতে মোদি ফোন করেছিলেন। ক্রিকেট ছিল সেই উছিলা। মোদি হাসিনাকে ফোন করেন গত মাসের ১৩ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ এর আগে থেকেই জয়শঙ্কর যে সমন্বিত বার্তাবাহক হিসাবে আসবেন তা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ঐ ফোন কল থেকে মোদির যা পাওয়ার ছিল তা হল,জয়শঙ্করকে তিনি পাঠাচ্ছেন এই সফরের পক্ষে হাসিনার সম্মতি আদায় বা জানিয়ে রাখা। তবে এজেন্ডা কি হবে তা নিয়ে খুব বিস্তারিত কিছু আলাপ তিনি তুলেন নাই;সেটা অনুমান করতে পারি আমরা। মোদির ফোনের পরে হাসিনার সাথে কি বিষয়ে কথা হয়েছে তা নিয়ে ভারতের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিনকে প্রেস প্রশ্ন করেছিল। প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন – ক্রিকেট শুভেচ্ছার বাইরে অনেক কিছু নিয়েই আলাপ হয়েছে।
    এরপর ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে সার্ক-যাত্রার ঘোষণা আসে। কিন্তু কবে আসবেন,কি এজেন্ডায় জয়শঙ্কর বাংলাদেশ আসছেন এর সিডিউল গত ২৫ ফেব্রুয়ারির আগে জানানোই হয় নাই। মিডিয়ায় যেখানে যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে তা অনুমান নির্ভর, ইনফরমাল উৎসের,আনুষ্ঠানিক নয়। এর কারণ কি? ভারতের “দি হিন্দু” পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার জানাচ্ছেন,এর কারণ । তিনি লিখছেন,“জয়শঙ্কর আমেরিকা সফরে আছেন। তিনি ফেরত আসার পরই ২৬ ফেব্রুয়ারি শিডিউল জানানো হতে পারে”। অনুমান করা যায় “সমন্বিত বার্তা” তৈরি ফাইনাল করতে জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরের সম্ভবত একটা উদ্দেশ্য। এটা ভারতের একার ইস্যু নয়। তাই সম্ভবত সেই সমন্বিত বার্তা ঠিকঠাক করে জয়শঙ্কর যাবার জন্য রেডি হবেন,বার্তার ড্রাফট রেডি হবে এসব বিষয় ছিল – তাই আগে তাঁর সফরসুচি আমাদের জানাতে পারছিলেন না। বাংলাদেশের পত্রিকা ও ভারতের পত্রিকার অনুমিত খবরে তাই বাংলাদেশ সফরের তারিখ কেউ জানাচ্ছিলেন ১ মার্চ, কেউ বা ২ মার্চ।
    সমন্বিত বার্তা বাহকের ভুমিকার কথা ভারত তার মিডিয়ার বাইরে রাখতে পেরেছেন বলেই মনে হচ্ছে। যেমন ভারতের “দি হিন্দু পত্রিকার” সুহাসিনী ২৮ ফেব্রুয়ারি জয়শঙ্কর বাংলাদেশে কি নিয়ে মেতে থাকবেন সে প্রসঙ্গে লিখছেন, In Dhaka, he is expected to discuss the issues of the Land Boundary Agreement, which is expected to be tabled in Parliament for clearance, as well as the Teesta water settlement, given the nod by West Bengal Chief Minister Mamata Banerjee during her visit to Dhaka last week. Prime Minister Modi is understood to have told Sheikh Hasina about his intention to visit Dhaka “very soon” when he spoke to her ahead of the Foreign Secretary’s visit. অর্থাৎ একেবারেই রুটিন অমীমাংসিত ইস্যু কেন্দ্র করে লেখা রিপোর্ট। অথচ আগেই বলেছি এসব ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সাথে পেন্ডিং কোন বিষয়ই নাই। বিষয়টা ভারতের দিক থেকে একশনের, করে দেখানোর। এসব তো হাসিনা ভালই জানতেন। তাহলে মোদির ক্রিকেট কূটনীতির ফোনালাপে জয়শঙ্করকে মোদির সফরে পাঠানোর ইচ্ছাকে হাসিনা সাড়া দিলেন কেন? কি বুঝে?
    এটা বোঝা কঠিন নয় যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের বিষয়ে বিদেশী কারও সাথে ডায়লগে আগ্রহী না, ফলে কোন কূটনৈতিক সফরে এবিষয়কে এজেন্ডা রাখতেই রাজি না। এই “বিদেশ” বলতে ভারতও অন্তর্ভুক্ত। এই বিচারে হাসিনার আগানোর কৌশলের দিক থেকে তিনি মোদীর কাছে ধরা খেয়েছেন, বলতে হবে। তবে হতে পারে তখনও তিনি জানতেন না জয়শঙ্করের এই সফর আসলে “সমন্বিত বার্তা” বাহকের সফর। অনুমান করা যায় অন্তত সফরের দিনে ততক্ষণে তিনি যথেষ্ট জেনে গিয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ হাসিনার জানা অজানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবে দেখলে ভুল হবে। জয়শঙ্করের সফরকে সাড়া দেবার পিছনে হাসিনার মূল ভাবনা হল, ভারতের সমর্থন লাভের প্রয়োজন ও কড়কড়ে লোভ। এই লোভের জায়গাতেই তিনি ফেঁসেছেন। ফলে তাকে জয়শঙ্করের সমন্বিত বার্তা ধৈর্য রেখে শুনতে হয়েছে। ধরে নেয়া যায় স্বভাবতই তিনি বিরক্ত হয়েছেন। “ভারতকেও দেখা হয়ে গেল” ধরণের একটা শ্বাস ফেলেছেন হয়ত। কিন্তু মনে করা ভুল হবে যে তিনি এতটুকু টলবেন। ভারতসহ বিদেশী কারো সমর্থন ছাড়াই তিনি কোন আলোচনা ডায়লগ সংলাপ ছাড়াই আগের মত ক্ষমতায় থেকে যাবার পথেই দৃঢতা দেখাতে থাকবেন। অর্থাৎ সারকথা হল,ঘটে যাওয়া জয়শঙ্করের সফরটা আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সর্বশেষ আলাপ আলোচনা,মধ্যস্থতা ইত্যাদির সিভিল ও কূটনৈতিক পথে কোন সুরাহা পাবার শেষ সুযোগ। তবে এটা সুযোগ হলেও কোন পক্ষের ভোগে লাগছেনা,আপাত দৃষ্টিতে নিস্ফলা সুযোগ হয়ে থাকছে। আর কুটনীতিকদের দিক থেকে তারা যে উদ্যোগ রেখেছিলেন এর রেকর্ড হয়ে থাকল, যা আগামিতে দরকার হবে।
    তাহলে এখন কি হবে? যা হবে ত হল, কোন বলা কওয়ার সুযোগ না নিয়ে দেশি এবং বিদেশীরা সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকে একপক্ষীয় এক্ট, যে যা তারা দেখাতে পারবে তাই দেখাতে থাকবে,এই পথে হাটবে। সেই পথেই বাংলাদেশ যাচ্ছে। অর্থাৎ হাসিনা ইনক্লুডেড আলাপের পথ শেষ, যার যার আলাদা পথে পোলারাইজেশনের শুরু হবে এখান থেকে।

    জয়শঙ্করের এই সফর পুরাটাই মূলত একটা অঘোষিত এজেন্ডার সফর। সাইড টকের ভিতর ছিল আসল এজেন্ডা। আর সাইড টকে কি ছিল তা ঘোষিত এজেন্ডায় আনার দরকার থাকে না। এছাড়া খালেদার সাথে জয়শঙ্করের সাক্ষাত কি এজেন্ডায় থাকবে কি না এ জল্পনা-কল্পনা ছিল। সেটা শুধু খালেদাকে গ্রেফতারের পরোয়ানা তখনও তামিল হয় নাই সেজন্য নয়। এছাড়া আরও দুটো উদ্যোগ আমরা জয়শঙ্করের সফরের আগের দিন দেখেছিলাম। খালেদা এখন যে অফিসে থাকছেন তা তল্লাসির পক্ষে আদালতের অনুমতি যোগাড় করা হয়েছিল। আর বাড়ীর সামনের সব পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ জয়শঙ্কর যদি যেতেন যেন দেখে মনে না হয় যে একজন “গ্রেফতারের পরোয়ানা পাওয়া আসামি” খালেদার সাথে তিনি দেখা করতে এসেছেন। একজন কূটনীতিক জন্য এটা খুবই বিব্রতকর। শেষে জয়শঙ্কর খালেদার সাথে সাক্ষাত করতে যান নাই।

    হাসিনার অপছন্দের কাজ
    কিন্তু একটা অনুমান এখানে করা যায়। জয়শঙ্করের এই সফরে হাসিনার অপছন্দ হবে এমন দুইটা কাজ তাকে করতেই হয়েছে। এক,“সমন্বিত বার্তা” শুনানো আর দুই খালেদার সাথে (সম্ভাব্য) দেখা করা। এই দুটোর মধ্যে প্রথমটা করতেই তাঁর এখানে আসা। আর দ্বিতীয় অপছন্দের কাজটা খালেদার সাথে দেখা করা। আমরা দেখলাম সেটা তিনি এড়ালেন বটে। কিন্তু সে ম্যাসেজটা অন্যভাবে হাজির করলেন। পরের দিন আমেরিকান রাষ্ট্রদুত বার্ণিকোটের নেতৃত্বে ঢাকার ১৬ কুটনৈতিক মিশন প্রধান খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করলেন। অর্থাৎ অপছন্দের কাজটা অন্যভাবে ঘটানো হল।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০২ মার্চ ২০১৫ চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার সেটা আরও অনেক কিছু এডিট করে নতুনভাবে লিখে ছাপানো হল। ]
    লেখার ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-9J

  • মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

    মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

    গৌতম দাস
    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

    ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-9n

    mamota

    পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ঢাকা সফরে এসেছেন। এমন সময়ে তার আসা যখন আমরা বিরাট রাজনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এই সংকটে ভারতের অবস্থান কোন দিকে এ’সম্পর্কে জানতে আমরা আগ্রহী, বিশেষত দিল্লি আর কলকাতার অবস্থানের ঐক্য ও পার্থক্য আমরা বুঝতে চাই। বলা বাহুল্য, এখানে ভুল করার বিশেষ কোন অবকাশ নাই যে মমতা একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রতিনিধি তিনি নন, প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেনও না, করার সুযোগও নাই। তাহলে মমতার এই সফরের প্রয়োজন দেখা দিল কেন?
    এর দুটো দিক আছে। এক, হাসিনা সরকার কেন মমতার সফরে আগ্রহ দেখালেন? আর দুই, মমতা এই সফর কেন প্রয়োজন মনে করলেন? এই দুটো বিষয় নিয়ে আমরা এখানে কথা তুলব।
    বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে বিচারে ভারতের কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকতে পারে তবে দিল্লির নীতি নির্ধারক শক্তি হিসাবে মনেকরে তাকে গণনায় নেবার কোন কারণ নাই। না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল হিসাবে না ব্যবহারিক সুবিধার কারণে। ভারতের যে কোন রাজ্য সরকারের সাথে আমাদের সৌজন্যমূলক সম্পর্ক থাকাটাই যথেষ্ট, কারণ খামাখা সম্পর্ক খারাপ করার কোন মানে হয় না। ভারতের কনষ্টিটিউশনে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক অনুসারে যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ রাজ্যের ভাগে পড়েছে সে বিষয়ে কোন বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হলে রাজ্য সরকারের মতামতের সঙ্গে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আছে। তবে আবার কোন বিদেশি কোম্পানীকে কারখানার জমি বরাদ্দ দেবার ক্ষেত্রে রাজ্যের ভুমিকাই প্রধান, কেন্দ্র সেই ক্ষেত্রে পিছনে। ইত্যাদি। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোকে নিয়েই যে ভারত ইউনিয়ন সেই সমগ্র ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করার এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকার কি করে রাজ্য সরকারকে নিজের প্রতিনিধিত্বের অধীনে আনবে সেটা নিশ্চিত করবার দায়ও কেন্দ্রীয় সরকারের। যেমন কেন্দ্রীয় সরকার নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কোন চুক্তি করার সময় রাজ্য সরকারকে কেমন করে দিল্লির সিদ্ধান্ত-বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে সেটা তাদের ব্যাপার। আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসবে কেন্দ্রীয় সরকার, তার দায়দায়িত্বও কেন্দ্রীয় সরকারের । তবে বুদ্ধিমানের মত “ইনফরমালি” আমাদের জেনে রাখা জরুরি ও ভাল যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি রাজ্যের সম্মতি রয়েছে কিনা। ঐ সম্মতি সাথে নিয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধি এসেছেন কি না। অর্থাৎ ঐ ইস্যুতে ভারতের যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-আমলা কথা বলতে এসেছেন ‘বাস্তবে’ তিনি রাজ্যেরও প্রতিনিধিত্ব সত্যিই করছেন কিনা সেটা আমাদের জানা থাকা দরকার। কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোন মতদ্বৈততা থাকতে পারে যা না জানলে দিল্লির সঙ্গে কোন বিষয়ে চুক্তি এক হাওয়াই চুক্তি হয়ে থেকে যেতে পারে। এমন রেকর্ডও আছে যেমন, কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-আমলা জানতেন যে তারা রাজ্যকে সহমতে না নিয়েই বাংলাদেশে চুক্তি করতে আসছেন। তবু তারা এসেছেন আর আসার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলে এসেছেন যে চুক্তিটা হয়ে যাবার পরে আপনার আপত্তি আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে চিঠি দিলে আমরা এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন না করে ফেলে রাখব। ফলে আপনার অসুবিধা হবে না। এতে সত্যমিথায় যাই থাকুক দিল্লি এটা করে এবং দুর্বল প্রতিবেশির সঙ্গে তাদের এ ধরনের অসৎ সম্পর্ক চর্চা অস্বাভাবিক কিছু নয় বাংলাদেশে এই বিশ্বাস বেশ প্রবল। গত তিস্তাচুক্তির সময় এমন কথা শোনা গেছিল। এরপর আমাদেরকে জানানো হল যে মমতার জন্যই নাকি ঐ চুক্তিটা হয় নাই। অথচ এটা তো আমাদের জানার বা শোনার কথা নয়। কারণ আমাদেরকে যদি এমন কথা শুনতেই হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলে যারা আমাদের কাছে এসেছিলেন সেই মনমোহন সিং বা প্রণব মুখার্জি আসলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ ছিলেন না, তারা প্রতিনিধি ছিলেন না। ভারতের প্রতিনিধিত্বের ম্যান্ডেট বাস্তবে তাদের ছিল না। সরকারে থেকেও তারা সরকারি নন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যেন যার গোডাউনে মাল নাই অথবা যে মাল আছে সেটা তাঁর নিজের নয় সেই পার্টির সাথে পণ্য বিনিময় চুক্তি করতে গিয়েছিলাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম যে চুক্তি হতে গিয়েছে দিল্লির সঙ্গে, কিন্তু তার কোন খবর নাই, আর অন্যদিকে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, খাতির জমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। অর্থাৎ যেটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায় এবং কাজ উভয়ই আমরা নিজের কাঁধে নিলাম। সেই থেকে বাংলাদেশে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর গুরুত্ব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি কিম্বা ভারতের রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতারিত করবার জন্য কি ধরনের ছুতা ব্যবহার করে তার বৈশিষ্ট্য ও মাত্রা সম্পর্কে আমাদের ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
    ভারতের এই কপট কূটনীতি প্রসঙ্গে আরও দুটো কথা বলা জরুরি। এমনিতেই হাসিনার এই ভারত-খাতিরের জমানায় আমরা ভারতের সাথে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো যেন কেবল তিস্তা আর ল্যান্ড বাউন্ডারির দুই ইস্যু সেই স্তরে নামিয়ে এনে দিয়েছিলাম। সীমান্ত হত্যা, বাকি নদীর পানি বন্টন ইত্যাদি আর কোন ইস্যু যেন আমাদের আর নাই। ওদিকে ল্যান্ড বাউন্ডারি – আমাদের সাধারণ্যের প্রচলিত ভাষায় ছিটমহল বিনিময় চুক্তি – তা মুলত ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সেকালে স্বাক্ষরিত হওয়া এক চুক্তি। ফলে সেকালের ঐ চুক্তিতেই তা শেষ হবার কথা। কিন্তু সেকালে চুক্তি একটা হয়েছিল বটে কিন্তু বাস্তবায়নের খবর আজও হয় নাই। অর্থাৎ আজও কাগজে কলমে মীমাংসিত বিষয়টা আসলে একটা অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির শর্ত অনুসারে দুই রাষ্ট্রের সংসদে ঐ স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসম্মতি জানিয়ে অনুমোদন দেবার কথা ছিল। বাংলাদেশে আমরা তা সততার সঙ্গে করেছিলাম সেকালেই, কিন্তু ভারতের পার্লামেন্ট এখনও তা করেনি। আদালতে মামলা আছে এই অজুহাতে এখনও সেটা পেন্ডিং। যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ঐ চুক্তি হতে পারে বলে রায় দিয়ে মামলা চূড়ান্ত নিস্পত্তি করে দিয়েছে গত ১৯৯৪ সালেই। সেই থেকে ইস্যুটা ঝুলে ছিল। এদিকে এখনকার পার্লামেন্টে চুক্তির বিপক্ষে দেওয়া আপত্তির যুক্তি বেশ অদ্ভুত। ভারতের বিগত পার্লামেন্টে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বা মমতার দলের আপত্তি ছিল এরকম যে, যেহেতু এখানে সমান পরিমাণ ছিটমহলের জমি বিনিময় হবে না, ভারত কম পাবে তাই এই চুক্তি তারা পার্লামেন্টে পাশ করবে না। প্রথম ধাক্কায় শুনতে অনেকের মনে হতে পারে যে এই কথায় বোধহয় যুক্তি আছে। কিন্তু সে ধারণা ভিত্তিহীন। অল্পকথায় ভারতের সুপ্রীম কোর্ট চুক্তিটা হতে পারে বলে রায় দিয়েছিল ওর যুক্তিটা শুনলে আমরা বুঝব যে এসব কথা ঈর্ষাকাতর এক পেটি-মনের চিন্তা ও  ছলনা মাত্র।
    যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনের ভিত্তিগত ধারণা বা পিছনের চিন্তা হল, নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা মানেই ওর ভুখণ্ডগত সীমারেখাসহ তা উল্লেখ করে তার ওপর ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার ঘোষণা। পরবর্তিতে রাষ্ট্রের কোন নির্বাহী (প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা পার্লামেন্ট) ঐ ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভুখন্ডের কোন অংশ অন্য কোন রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে বা বিনিময় করার ক্ষমতা রাখে না। এই যুক্তিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার ঐ চুক্তি অবৈধ এবং পার্লামেন্ট ঐ চুক্তির পক্ষে অনুসিদ্ধান্ত জানাতে পারে না বলে আদালতে মামলা করা হয়েছিল। এর বিপরীতে এই মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নিস্পত্তি করার যুক্তি হল – ঠিকভাবে দেখলে এটা ভারতের ভূখন্ড বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া বা বিনিময় করার মত কোন চুক্তি নয়। মূলত এটা, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান দুটো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সময় উল্লেখিত ভুখণ্ডের কোন অদল-বদলও নয়। বরং চুক্তিটা হল, ঐ গঠন-ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের পর্যায়ে দীর্ঘকালীন বিষয়টি অমীমাংসিত ফেলে রাখা বিষয়ের মীমাংসা। অতএব এই চুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ এটা মাঠ পর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের মামলা মাত্র। কোন জমি অদলবদলের চুক্তি নয়।
    একই যুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন একমাত্র সমান পরিমাণ জমির বিনিময়ই কেবল এই চুক্তি হতে পারে বা হতে হবে এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। তাহলে বিনিময় বলা হচ্ছে কেন? কারণ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ ঘেরা ভুখন্ডে অথবা বাংলাদেশের নাগরিকের বেলায় উলটা ভারতের ভুখন্ডে এই অবস্থায় আছে। ফলে উভয় পক্ষেই নাগরিকেরা নিজ নিজ মুল রাষ্ট্র ও ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হবে তাই বিনিময় ধরণের একটা ধারণা এখানে প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু আইনী ভাষায় এটা মূলত উভয় রাষ্ট্রের অমীমাংসিত সীমানা চিহ্নিত করণের মামলা। এখানে চিহ্নিতকরণের পরের হিসাবে কারও ভাগে জমি কম বেশি হতেই পারে। কিন্তু সেই হিসাবটা চুক্তির ভিত্তি নয়, সেটা চুক্তির জন্য কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। অতএব ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধীদের যুক্তি ভিত্তিহীন। এছাড়া বাংলাদেশের চোখে দেখলে, এটা মমতার বা তার রাজ্য সরকারের বিষয় নয়। এটা সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ত্ব করে বলে দাবিদার কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। তাদেরই আইনী বাধ্যবাধকতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার আপত্তি কি এটা শোনা বা দেখার দায়দায়িত্ত্ব আমাদের নয়। ফলে মমতার কাছে আমাদের দেনদরবার করার কোন যুক্তিই নাই। রাষ্ট্র হিসাবে আমরা চিনি কোন রাজ্য সরকার নয় কেবল কেন্দ্রীয় সরকারকে, যে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে দাবি করে আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসে বা এসেছিল।
    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল পানি চুক্তি, বিশেষ করে তিস্তা পানি চুক্তি। মমতাসহ যারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিল তাদের যুক্তির প্রসঙ্গে যাব। এ প্রসঙ্গে প্রায়ই একটা কথা শুনতে পাই যে, নদীতে পানিই নাই ভারত দিবে কোথা থেকে। অথবা প্রাকৃতিক পানি এখন কমে আসছে তাই আমরা কতদুর কি করতে পারি। অথবা মমতার ক্লাসিক যুক্তি – তিস্তার পশ্চিমবঙ্গ অংশের অববাহিকা অঞ্চলের লোকেরাই চাষাবাদের পানি পাচ্ছে না, আমরা আর কি দিব। ইত্যাদি। অর্থাৎ পানি চুক্তির প্রসঙ্গটা যেন ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পর আমাদের দিবার মত পানি থাকে কি না এর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এই “প্রয়োজন” কথাটাকে কি দিয়ে ব্যাখ্যা করব? বুঝব? পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পানির ‘প্রয়োজন’-এর সীমা কিভাবে কোথায় টানব? মানুষের প্রয়োজনও অসীম। এখানে পুরা তর্কটাকে পর্যবসিত করা হয়েছে আগে পশ্চিমবঙ্গের “প্রয়োজন” মিটাতে হবে এরপর বাংলাদেশ। না থাকলে নাই। ভারতের দিক থেকে এটা একটা ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। কিভাবে তারা তাদের “প্রয়োজনের” সমস্যাটাকে আগে মিটিয়ে নেবে তারপর বাংলাদেশের জন্য কি করতে পারে সেটা বিবেচনা করবে। অর্থাৎ ভারত সদয় পানিদাতা আর আমরা ঐ দাতার ভিক্ষাপ্রার্থী। আন্তরাষ্ট্রীয় কমন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশ আমরা, উজানের দেশ ভারত পানি আটকে রেখে দিয়েছে আর আমরা তার ভিক্ষা প্রার্থী? তাই কি? আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দেনাপাওনা ভিক্ষা বা দয়ার উপর দাঁড়ায় না। বিশেষত স্বার্থের প্রশ্নে দয়া বা ভিক্ষা চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শনে পর্যবসিত হয়।
    না আমরা মোটেই পানিভিক্ষাপ্রার্থী না। আন্তর্জাতিক নদী আইন বলছে, উজান দেশের মত ভাটির দেশও সমান কমন নদীর পানির ভাগীদার। এটা তার হক। এছাড়াও উজানের দেশ নদীর মুল ধারা থেকে খাল কেটে বা বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিতে সে পারে না। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে নদীর সিকিম অংশে তাই করা হয়েছে। তাহলে দাঁড়ালো, পানি ভাগাভাগির আসল ভিত্তি হল, ভাটির দেশের হক ও অধিকার। উজানের দেশের কাছে সে পানির জন্য ভিক্ষাপ্রার্থী নয়। আগে উজানের দেশের পানির প্রয়োজন মিটানো এরপর যদি থাকে তবে বাংলাদেশ পাবে এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে দিল্লিকে দেয়া হয় নি, দেয় না। অতএব ভারতের পানির প্রয়োজন কত তা জানারও কোন প্রয়োজন আমাদের নাই। অথচ পানি ভাগাভাগির আলাপ উঠলেই ভাগের ভিত্তি কি এটা অস্পষ্ট থেকে যায়। ভাগের ভিত্তি কি তা অস্পষ্ট রেখে মিডিয়াসহ সব জায়গার আলাপ শুরু হয়ে যায় ভারতের প্রয়োজনের গল্প। আজ পর্যন্ত কোন পানির আলোচনায় পানি ভাগের ভিত্তি কি এনিয়ে কোন কথা আমরা শুনি নাই। সব খানে বয়ানটা হল ভারত পানির সদয় দাতা। আশা করি মমতার এই সফরেও আমরা এই একই গান শুনতে পাব। মমতা দির দয়ার ওপর তিস্তার পানি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করছে গণমাধ্যমগুলো এই বাজে তর্ক করে যাবে।

    দুই
    মমতার দিক থেকে তাঁর বাংলাদেশ সফরের তাগিদটা কি? আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন আগামি বছর ২০১৬ সালের মে মাসে। ইতোমধ্যে মমতা এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ৩৪ বছরের বামফ্রন্টকে পরাজিত করে গত ২০১১ সালে নির্বাচনে রাজ্য সরকার দখলের চেয়েও প্রভাবের দিক থেকে এটা আরো বড় বিপ্লব। বড় তার তাৎপর্য। কে কি ধরণের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে ভোটে জিতেন সেই ভোটারদেরকে বলা হয় কনস্টিটুয়েন্সী। আমরা এই ধারণাকে নামিয়ে ক্ষুদ্র করে অর্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এমপি কোন এলাকা থেকে জিতে এসেছেন ঐ “এলাকার” অর্থে আমরা কনস্টিটুয়েন্সী শব্দটাকে নামিয়ে এনেছি। যদিও এর মূল অর্থ এমপি কাদের প্রতিনিধি, কোন ভোটাররা তাকে ভোট দিয়েছেন তারাই ঐ এমপির কনস্টিটুয়েন্সী – এটাই এর অর্থ।
    তো এই অর্থে মমতার দল তৃণমুলের মূল কনস্টিটুয়েন্সী এখন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটাররা। যেখানে মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের ২৮%। যারা এরআগে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে বামফ্রন্টের ভোটার ছিল। এখন মমতার অবদান তিনি মুসলমান ভোটারদের মুসলমান হিসাবেই মুক্তি দিয়েছেন, তাদের এখন আর “সেকুলার” ভোটার বলে অকেজো ধারণার আড়ালে লুকানোর দরকার নাই। তারা যা তাই। পিছিয়ে পড়া দশা থেকে বের হতে তাঁরা এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের রিসোর্স বরাদ্দে নিজের অংশ দাবি করতে পারে। আগামি দিনে কতদুর এর বাস্তবে পারবে কি দাঁড়াবে সেসব আলাদা প্রশ্ন। অর্থাৎ এসবের প্রতি রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এখন সামনে এসে গেছে। একধরণের রাজনৈতিক স্বীকৃতি এসেছে, এখন দেখার বিষয় অর্থনৈতিক অর্থে এটা কতটা কতদিনে বাস্তবায়িত হয়। মুসলমান ভোটারদের ইস্যু বাকি সব কলকাতা কেন্দ্রিক দল যেমন বিজেপি, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জন্য বিরাট মাথাব্যাথার ইস্যু হয়ে গেছে।
    এর অর্থ বাকি ৭২% ভোট এখন তৃণমূল সহ চারটা দলের মধ্যে ভাগ হবে, ভোটের সংখ্যার এই সংখ্যাতত্ত্ব পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে মূল নির্ধারক, মূল নির্বাচনি ইস্যু। এখান থেকেই দলগুলোর রাজনৈতিক বয়ানের ভিন্নতা এবং মিল। যেমন ইদানিং বিজেপি ও বামফ্রন্টের বয়ানের ফারাক খুজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। কারণ এখন মূল বয়ান হতে হবে এন্টি-মুসলমান যেটা এন্টি-তৃণমূল হয়ে কাজ করবে, তৃণমূলকে কাটবে। কিন্তু সরাসরি এন্টি-মুসলমান বয়ান তো দেয়া যায় না, এতে সেকুলারদের সেকুলার জামা আর গায়ে থাকে না, আপনাতেই খুলে পড়ে। আবার ভারতের নির্বাচনী আইনে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই বয়ানটা কিছুটা বদলে হয়েছে – আড়াল করতে করা হয়েছে ‘জঙ্গী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বয়ান’। জঙ্গী-সন্ত্রাসী মানেই তো মুসলমান এই সূত্রে। শুধু তাই নয় পড়শি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানে একটা হিন্দু-মনের চোখে মুসলমান, হিন্দুর ‘অপর’ — এ ছাড়া কলকাতা ভিন্ন কিছু ভাবতে পারে তার প্রমাণ খুবই কম। আর কি! বাংলাদেশকে এটাতে জড়াতে পারলে বয়ান আরও পোক্ত হবে। ফলে এই হল, বাংলাদেশ-জঙ্গী-সন্ত্রাস বয়ানের সুত্র। মমতা বাদে বাকি তিন দলের আসন্ন নির্বাচনে প্রপাগান্ডার কৌশলও তাই মুসলমানদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
    মমতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সময় শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন মমতা। কলকাতায় হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের বিপরীতে একদিকে মুসলমানদের ভোটের ক্ষেত্রে একচেটিয়া সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের সঙ্গে অতিরিক্ত মৈত্রী প্রদর্শন করে কলকাতার হিন্দুদের অভিমান হ্রাস করা — এই দোদুল্যমান রাজনীতি মমতা ব্যানার্জির। বাংলাদেশ সফরে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। আমাদের ইমপ্রেস হবার কিছু নাই। এখনকার সফরে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করলেও পশ্চিম বঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সহমর্মিতার প্রয়াস বাংলাদেশের জনগণ সমর্থন করবে। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির বিপরীতে সীমান্তের দুই পাশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি কী ভূমিকা রাখেন তা দেখার জন্য নজরে এই দেশের জনগণের আগ্রহ আছে।
    বর্ধমান জেলায় একটা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল গত বছর অক্টোবরে। সেটা কাজে লাগিয়ে এই প্রপাগান্ডায় আলো-বাতাস লাগানো হয়েছে। ওদিকে সারদা কেলেঙ্কারি নামে এক অর্থ কেলেঙ্কারিতেও মমতার দল অভিযুক্ত হয়ে আছে। (সারদা কেলেঙ্কারি হল আমাদের ‘ডেসটিনি” কেলেঙ্কারির মত সমতুল্য ঘটনা।) এই দুইয়ে মিলে প্রপাগান্ডার গল্প জমিয়ে তোলা হয়েছে। এই গল্পকে আরও সুনিপুণ করতে বাংলাদেশের জামাতকেও টেনে আনা হয়েছে। যাতে মূলত এন্টি-মুসলমান ক্যাম্পেনটাকে জামাত-জঙ্গী-সন্ত্রাসী এসব শব্দের মোড়কে হাজির করা যায়। সেটা জায়েজ এমন একটা ন্যায্যতাও টানা যায়। জামাত পর্যন্ত প্রসঙ্গ টানা শুরুর কারিগর মূলত পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর। গত ২০১৪ মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কলকাতা বামফ্রন্টের প্রধান সমাবেশ থেকে তিনি এই বয়ান দিয়েছিলেন। মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সী মমতার কাছে হারানোর দুঃখের তীব্রতা আমাদের এভাবেই তিনি জানিয়েছিলেন। তখনও বর্ধমান ইস্যু হাজির হয় নাই। পরে এই ইস্যু হাজির হলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ — যিনি পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে দলকে জিতানোর মূল দায়িত্বে এখন আসীন — তিনি বিমান বসুর বয়ানটাকেই এবার বাড়তি আকার দেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে আগামি নির্বাচনে তখন থেকে অনেকবার উচ্চারিত শব্দ হয়েছে বাংলাদেশ, আগামিতেও থাকবে, নির্বাচন পর্যন্ত। কিন্তু অমিত শাহের এসব কারবারে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী সরকার নিজেকে দূরে রাখতে চান। যদিও তার বিশ্বস্ত প্রধান অমিত শাহকে তিনিই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দলকে ক্ষমতাসীন করার এসাইমেন্ট সঁপেছেন। তবু নিজের হাত ধুয়ে রাখতে, আর তা রেকর্ডে রাখতে মোদী ইতোমধ্যেই ভারতীয় পার্লামেন্টে নিজের এক মন্ত্রীর লিখিত বিবৃতি পাঠ করিয়ে পরিস্কার করেছেন যে, বাংলাদেশ-বর্ধমান-সারদা ইস্যু এসব মিলিয়ে যে বয়ান তার পক্ষে  তদন্তকারি গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ এর রিপোর্টে প্রমাণ করার মত তথ্য মিলেনি। অমিত শাহ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন, র কে আর সেই সাথে এনআইএ-এর বাংলাদেশ সফর, পালটা বাংলাদেশ থেকেও আমাদের গোয়েন্দাদের সফর ইত্যাদিতে প্রশাসন পর্যায়ে অনেকদুর ব্যবহার করেছেন। মোদী সরকারের বিবৃতির পরে তবুও পশ্চিমবঙ্গ পর্যায়ে প্রপাগান্ডা এখনও একই রকম রয়ে গেছে। কারণ জঙ্গী-সন্ত্রাসের ভীতিটা রয়েই গেছে।

    মমতার প্রত্যাশা
    এই পটভুমিতেই মমতা বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি কি চাইবেন হাসিনার কাছে?
    মমতা চাইবেন, হাসিনা যেন পশ্চিমবঙ্গের চলতি নির্বাচনী প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে যে জঙ্গী-সন্ত্রাসের বয়ান চলছে একে পরিপুষ্ট না করেন। হাসিনা নিজে এমন কোন বয়ান যোগ না করেন যেটা এই বয়ানকে পরিপুষ্ট করে। বরং বাংলাদেশের নাম যতই উঠুক তিনি যেন এটা ভারতের এক আঞ্চলিক এবং একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক সেদিক থেকে দেখেন। যার বিপরীতে কলকাতার বয়ানের বিরুদ্ধে যায় হাসিনার নিজস্ব পালটা বয়ানে যদি তেমন কিছু হাসিনা যোগ করতে রাজি হন তাহলে সেটা মমতার চরম পাওয়া হবে। আর যদি তা না-ই পারেন, তবে যেন চুপ থাকেন, তাহলেও মমতার জন্য এটা ভাল কাজে লাগবে। এই হবে মমতার চাওয়া। এটাই তার বাংলাদেশ সফরের মুল উদ্দেশ্য। অবশ্য সেটা যাই হোক এই সফর থেকে একটা বাড়তি সুবিধা তিনি পাবেন। মমতা যে বাংলাদেশ থেকে “যাওয়া” জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয় দেবার নেত্রী নন — যে প্রপাগান্ডা কলকাতায় তাঁর বিরোধীরা জারি রেখেছে – তার প্রমাণ তিনি এবার করতে পারবেন। সেটা হবে এরকম যে, তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন এবং হাসিনার দ্বারা ভাল আপ্যায়িত হয়েছেন। তিনি জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয়দাত্রী হলে কি এই মর্যাদা পেতেন!
    কিন্তু মমতা যেভাবে যা চাইবেন তাই হাসিনা দিবেন এমন কোন কারণ নাই। তাহলে হাসিনা কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবেন? তাঁর সিদ্ধান্ত নিবার ভিত্তি হবে মমতা কি দিতে পারেন যা তার ক্ষমতাকে পোক্ত করতে কাজে লাগতে পারে। হাসিনার সরকারের পক্ষে মোদীর সমর্থন আনার ক্ষেত্রে মমতা সঠিক লোক নন, বরং উলটা। তবে তিস্তার পানি বা ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যুতে তিনি আপত্তি করবেন না এমন ধারণা মমতা ঘোষণা করতে পারেন। যদিও এমন ঘোষণা মানেই এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের পেয়ে যাওয়া নয়। যদিও ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যু আগামি ২৩ মার্চের মধ্যে ভারতের পার্লামেন্টে চুড়ান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে এবং তা মোদীর ক্রেডিটে আসবে। তার চেয়েও বড় কথা হাসিনার কাছে এর মূল্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি তাকে সাহায্য করে এমন কোন ইস্যু নয়। বাংলাদেশের চলতি সংকটের যাত্রায় যদি হাসিনা ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তবে এরপরে হয়ত প্রপাগান্ডায় এটা তাঁর কাজে লাগতে পারে। সারকথায় মমতা যা দিতে পারেন তা হাসিনার চলতি ক্ষমতা-সংকটকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে এমন কিছু নয়। ফলে মমতার অফার হাসিনার জন্য বড়জোর অপ্রত্যক্ষ এক সুবিধা মাত্র। আগামিতে কাজে দিবে এমন। এধরণের বিচারের প্রেক্ষিত থেকে হাসিনার সিদ্ধান্ত পরিচালিত হবে বলে অনুমান করা যায়। এই সফরের বাকিটা হবে হাসিনা ও মমতার উভয়ের জন্যই শো-আপ এর লাভালাভ।
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।
    [এই লেখাটা গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার সামান্য এডিট করে ছাপা হল।]

  • বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

    বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

    গৌতম দাস

    ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-99

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ phil reiner

    যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার (Phil Reiner) গত ০৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফর সম্পর্কে প্রেসকে অবহিত করা। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। ফিল রেইনার ওবামার ভারত সফরে সঙ্গী ছিলেন। ঐ প্রেস কনফারেন্স ছিল মূলত ভারত সফরে ওবামার দিক থেকে নিজের তাৎপর্য বিশেষত অর্জনগুলো তুলে ধরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ওয়েবসাইটে রেইনারের প্রেস কনফারেন্সটিকে সেই ভাবেই পেশ করা হয়েছে। (আগের লিঙ্কে দেখুন, From President Obama’s Trip to India: Perspectives on U.S.-India Relations।
    গত কংগ্রেস সরকারের শেষ তিন বছর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ অমীমাংসিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব বিরোধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশেষত বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে উভয়ের বিরোধ আরও প্রকাশ্য ও চরমে উঠেছিল। জানুয়ারি ২০১৪ সফরটা ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে ওবামা-মোদীর দ্বিতীয় মুলাকাত। গতবছর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠনকে ভারত এবং আমেরিকা উভয়েই তাদের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বিরোধ মিটানোর উপায় হিসাবে দেখেছিল। কারণ উভয়ে অনুভব করছিল যে সম্পর্ক স্থবির রাখাতে উভয়েই ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে মোদীর দিক থেকে আটমাসের সরকারের সাফল্য হল, দ্রুততর সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। সেখানে ওবামা-মোদীর নানান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল।

    ফিল রেইনার এর প্রেস কনফারেন্সের খবরটা আমাদের মিডিয়ায় প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে, ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা হল, গত মাসের শেষে ওবামার ভারত সফরে ওবামা-মোদী দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ব্যাপারটা তথ্য হিসাবে কোন সংবাদপত্রে আসা এক কথা আর যেচে তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ভিন্ন। শেষেরটা অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি ভারত-আমেরিকার শীর্ষ আলাপে ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মন্তব্য রেওয়াজ সম্মতও নয় বলে কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু প্রকাশ্যে আশা করে নাই। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে কোন কথা হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে হয়ত আমরা ভারত বা আমেরিকার সরকারি ভাবে না, বরং শুনতাম বড়জোর কোন অনুসন্ধানী দেশি বা বিদেশি মিডিয়া কর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই কূটনৈতিক বিষয়গুলো প্রকাশিত হওয়া রেওয়াজ।

    কিন্তু আমরা ব্যতিক্রম দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার না চাইতে বৃষ্টির মত অনেক তথ্য আমাদের ঢেলে দিয়ে জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও আছে। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউস অথবা স্টেট বা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়েতই কোন মুখপাত্র নন। অর্থাৎ আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কোন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ বা প্রচার করতে চাইছেন না। সাদামাটা রুটিনের বদলে চাইছেন এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। তাই বক্তব্য এসেছে একজন একজিকিউটিভ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে। ফিল রেইনার মিডিয়াতে এসে অনেক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন। এটাও একটা ব্যতিক্রম। যেমন “বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না” । এই তথ্য বড়জোর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে এলেই যেখানে যথেষ্ট হত। তা ছাড়িয়ে — অফিসের মুখপাত্রও না — একেবারে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের এক পরিচালকের মুখ দিয়ে প্রকাশ করা হল। এখানে কেবল একটাই স্বাভাবিক অথবা বলা যেতে পারে দৃশ্যমান ছুতা: সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তাঁর অর্জন প্রেসকে অবহিত করা। এখানে ইংরেজি ‘রিড আঊট’ কথাটা ‘তাৎপর্য “অর্জন” ইত্যাদি অনুবাদে সতর্কভাবেই ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রেইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন।
    অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখ উলটানোর মত ঘটনা। তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাব না। তবে ঐ প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসেছিল অবশ্য সাইড টক হিসাবে। তবু সেই “সাইড টকের” প্রসঙ্গেই ফিল রেইনার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। আর সেসব কথা বলতে গিয়ে ফিল রেইনার অনেকটা যেচে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন।
    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতি বুঝতে হলে সরকারী ভাষ্যগুলো সরাসরি ইংরেজিতে মূল দলিলে পড়াই ভাল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নয়। মুল মানে অরিজিনাল ইংরাজি হুবহু বক্তব্য পাঠ করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে একটা কথার অনুবাদ যেভাবে ব্যবহার করেছে তাতে বিভ্রান্তির সুযোগ আছে। ফিল রাইনার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” মানে ইংরাজিতে “পারটিসিপেটরি ইলেকশন” বা “অল পার্টি ইলেকশন” ধরণের কোন কথা বলেন নাই। বরং তাঁর বক্তব্যে তিনি কখনও “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” আবার কখনও “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” শব্দ ব্যবহার করেছেন । অর্থাৎ তিনি গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে ওর শক্তি দেখিয়ে -এই পথে দেশি-বিদেশি সবার অন্তর্ভুক্তির তাগিদ নিয়ে আগাতে চান। যাতে আওয়ামি লীগ, বিএনপিসহ কোন ‘গণতান্ত্রিক’ পক্ষ বাদ না পড়ে। আবার ওদিকে ভারত ও আমেরিকাও ঐক্যমত্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানবজমিন এটাকেই তার পাঠকের জন্য “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে অনুবাদ করেছে। গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আর ওর শক্তি দেখানোর কথা বলে আসলে ফিল রাইনার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন করার সমালোচনা করেছেন। নিজ দেশে কোন দলকে কায়দা করে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভারত যেমন ভাবতেই পারবে না সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি দলকে ভারতের জিতিয়ে আনার কথাও ভাবা যায় না। কিন্তু এ ধরনের নীতি দিল্লি নিল কি করে? এই দিকটা নিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসা করে আর এর সাথে তুলনা করে ফিল রেইনার প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থন করারই সমালোচনা করেছেন। আবার “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” বা “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবার আহ্বান জানিয়ে ভারত-আমেরিকার ঐকমত্যের ভিত্তি দাঁড় করাতে চাইছেন। ফিল রেইনার বলছেন,
    “আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন”। (দেখুন, মানব জমিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
    অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়নি – কথা সেদিক নিবার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সাধারণভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের” উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।

    ফিল রেইনারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বড় ধরণের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রশ্নে আমেরিকা পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে। শুধু তাই না ভারতের এই অবস্থানের প্রাকটিক্যাল মানে হল, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ কাকে ভোট দিতে চায় তাতেও ভারতের কিছুই আসে যায় না, যে কোনো উছিলায় দিল্লি আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রেইনার সম্ভবত সেকথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব নিয়ে ভারত-আমেরিকার বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদী-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরানা অনেক বিরোধে এলোমেলো সংঘাতময় অবস্থান এবার ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। কিন্তু রেইনার এখানেও থামেন নাই। আরও বাড়তি বলছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে (দুটি দেশ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ঐ ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান “অস্থিতিশীল পরিস্থিতির” দিকেও তারা নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ বাক্য –“বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে”। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্য ঘটে যাওয়া বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, বরং এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

    যেচে এসে ফিল রেইনারের এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সংঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোনদিকে যাবে আদৌ কোনো দিকে যাবে কিনা, নাকি কতদিন এমনই দিশাহীন পড়ে থাকবে এসব কেউ জানত না। পরবর্তিতে ২০১৪ সালের মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসা, আর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরান স্থবির বিরোধের ঝাঁপি খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদী-ওবামার খুবই স্বল্প সময় মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মোদীর দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাত। এর আগের লেখায় বলেছিলাম, ভারত-আমেরিকার বিরোধ যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরও বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এপ্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনৈতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেওয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি।
    ভারতের ২০১৪ নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ কে বলতে শুনেছি যে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন অন্য দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না, হবে না। একথার অর্থ আরও পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদীর জয়লাভে প্রধানমন্ত্রীত্ব নিবার পরেও বলেছিলেন, বাংলাদেশে “০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ঐ ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে”।( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।)
    পঙ্কজ শরণের এমন কথার অর্থ কি? এর মুল উদ্দেশ্য হাসিনাকে সাহায্য করা এভাবে যে, কংগ্রেস সরকার আবার জিতে না আসতে পারছেনা টের পেয়ে যাতে হাসিনার কর্মি-সমর্থক নিজের নিজের ভাগ্য গুছাতে হাসিনাকে ফেলে কেটে না পড়ে। বলাবাহুল্য এটা একজন হাইকমিশনারের সীমাছাড়ানি কাজ । পঙ্কজের বাড়াবাড়ি। অথচ পঙ্কজ জানেন, একদিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে আছে, পরবর্তীতে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয়পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি এই তাগিদ আছে। সেটা আদৌ হবে অথবা হবে না তার কোন দিশা নাই। অন্যদিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগেথেকেই জানা যাচ্ছিল নতুন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেস থেকে একেবারেই আলাদা হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধ) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য । ফলে তা কোনদিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাড়ায়, ঐক্যমত্যে আসে কি না সেসব আগাম অনুমান করা কঠিন। কিন্তু সে যাই হোক পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখতে চান। সেজন্য আগেই নিজ দায়িত্বে জবরদস্তিতে ঘোষণা দিয়ে রাখলেন যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোন বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে, ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি, আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কি বিশেষ কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান এবং প্রমাণ করতে চান নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন আকার দেন না কেন তা পঙ্কজ তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব, পথ ও কথা না শুনে মোদী করতে পারবেন না। যেন করতে দেয়া হবে না। এককথায় বললে, এটা রাজনীতিবিদদের উপর আমলাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বালখিল্য ধারণা প্রসূত এক কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উলটা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা।
    বালখিল্য ওমন কাজের ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই মোদীর হাতে সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ? এমন মনে করার কারণ আছে। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হল, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরণের ব্যক্তিত্বের মনোভাব এবং ভারতের বিদেশনীতিতে সাধারণ ভাবে গোয়েন্দা-আমলাদের প্রভাবের একটা ফলাফল হল মোদী ক্ষমতায় আসার পর দিল্লী তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করতে চায় সেই বিষয়ে অ্নিশ্চয়তা। দৃশ্যত মোদী কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা এবং নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হাজির। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু’বার ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত করে এক নতুন নীতিগত ঐক্যমত্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি নীতিতে ভারত-আমেরিকা কোন ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না সেটা এরপরও বোঝা যাচ্ছিল না। বিশেষত সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে। যদিও বোঝা যাচ্ছিল তাঁরা একটা একমতে এসেছেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এতদিন নিশ্চিত হয়ে কেউই কিছু বলতে পারছিলেন না। পুরানা এক ষ্টেলমেট পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল। কোনদিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদীর মধ্যে এইসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোন ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রেইনার যেন ওবামা-মোদীর নীতিগত ঐকমত্যের দিকটা দৃশ্যমান করতেই ঐ প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।
    এতে একটা জিনিষ পরিষ্কার হয়েছে। মোদীর জয়লাভের পরও পঙ্কজ শরণের “সাংবিধানিক প্রয়োজনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন” হয়েছিল, অথবা “এটা অতীতের মৃত ঘটনা এটা নিয়ে আবার ভেবে দেখার কিছু নাই” – এধরণের বক্তব্য যেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এখন চাকরি হারানো পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর বক্তব্যেরই কপি – এই সব কিছুকে ফিল রেইনারের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে। বিশেষ করে রেইনারের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে বক্তব্য পঙ্কজ শরণের ভারতের অবস্থান বলে যা প্রচার করছেন তাকে সরাসরি নাকচ করে। গত ৩ জানুয়ারি রেইনারের বক্তব্য প্রচারের পর দশ দিনের বেশি দিন গত হতে চলল, কিন্তু এখনও খোদ পঙ্কজ শরণ নিজে অথবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেইনারের বক্তব্য নিয়ে কোন আপত্তি অথবা ভিন্ন বক্তব্য জানাতে আমরা দেখি নাই।

    ফিল রেইনারের বক্তব্যের সারকথার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় “শান্তি ও স্থিতিশীলতার” ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদীর স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা “যৌথ ঘোষণার” ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত “এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ ষ্ট্রাটেজিক ভিশন”র শুরুতেও উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কি উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এপ্রসঙ্গে ফিল রেইনার দাবি করছেন, -ওবামা ভারতের সক্রিয় “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” ও “এর নির্বাচন” এবং “এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে” এবং এর মাধ্যমে “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা”, এবং “জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে উঠা” এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই ‘উপায়কে’ তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রেইনারের অনুভব ও মন্তব্য।
    মোদী-ওবামার মিটিংয়ে সম্পর্কের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বসিত ফিল রেইনার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপনের আর একটা কারণ আছে। ওবামার ভারত সফরের পরে সিএনএনের ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে, ওবামা চীন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। কারণ ইতোমধ্যে এই সফর চীনের বিরুদ্ধে ভারত-আমেরিকার জোট পাকানো কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় কথা উঠে গিয়েছিল। ওবামা জানিয়েছেন, এসব “বুলি” বা উস্কানিমূলক ধরণের আলোচনা থেকে দূরে থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের বন্ধনের পক্ষে কাজ করে যেতে চান তিনি।
    এশিয়ায় চীন-আমেরিকা-ভারতের অবস্থা এখন এমনই যে কোন দৈব ঘটনাবলে এরা তিন পক্ষ মিলে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারলে এরপরেও পারস্পরিক কিছু সন্দেহ অবিশ্বাসের বাস্তবতা থেকেই যাবে। এর মূল কারণ বাকি দুপক্ষের তুলনায় চীনের উত্থিত অদম্য “অর্থনৈতিক সক্ষমতা” এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। এর ফলাফলে এই তিন পক্ষের যে কেউ অন্য দুইয়ের চেয়ে, তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার চেষ্টা করবেই। এক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত ও আমেরিকার অন্তত একটা বাড়তি সুবিধা হল, ভারত ও আমেরিকা নিজেদেরকে “আভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুসরণের শক্তি” মনে করে। তাদের বিচারে যা চীনের নাই। ফলে যদি তারা উভয়ে মিলে একাগ্রভাবে এশিয়ার জন্য প্রত্যেক দেশে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে’ থাকে তবে এশিয়ায় জোট পাকানোর ক্ষেত্রে তারা চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে তাদের উভয়ের দৃঢ় অনুমান। চীনের উত্থান দেখে পালটা যতদূর সম্ভব গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকা, ড্রাম বাজানো – এই অনুমানের অরিজিনাল উদ্গাতা হলেন এখনও সক্রিয় তবে বুড়ো তাত্ত্বিক হেনরি কিসিঞ্জার। যদিও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের এইকালে পাশাপাশি একই সাথে ইসলাম কিছু প্রশ্ন তুলে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমকে কুপোকাত করে ফেলেছে। আর একে ওয়ার অন টেররের নীতিতে মোকাবিলা করতে গিয়ে কিসিঞ্জারের তত্ত্বও অকেজো এবং কথার কথা হয়ে আছে। এসব আমেরিকাসহ পশ্চিমের অজানা নয়। তবু যেসব অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয় আছে সেসব জায়গায় কিসিঞ্জারের তত্ত্ব কিছু কাজে লাগতে পারে এই আশা আমেরিকা ছেড়ে দেয় নাই। যেমন, ভারত-আমেরিকার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কূটনীতিতে সেখানে দেখব বলা হচ্ছে দুনিয়ার দুই “বৃহৎ কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার দেশ”, “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা” – ইত্যাদি। অর্থাৎ ওবামা তাঁর চীনকে ঘায়েল করার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির ফাঁদের মাহাত্ম ও সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভারতকে কাছে টানতে চাচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ভারত-আমেরিকার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির কমননেস বা সাধারণ দিক এরই ভিত্তি বলে ড্রাম পিটতে চাইছে।
    তবে ভারত-আমেরিকা ড্রাম বাজাতে চাইছে কথা সত্য হলেও এতে ভারতের কিছু পুরান জামা খুলে পড়ারও লক্ষণ এটা। যেমন, নেহেরু আমলের ভারত তখনও বৃহৎ “গণতান্ত্রিক” নাকি তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র ছিল এর ফয়সালায় কোন স্পষ্ট উচ্চারণ আজ এখনও নাই। কেউ সাহস করে নাই এখনও । তবু মাঝামাঝি ষাটের দশকের সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার বাইরে “জোটনিরপেক্ষ দেশের” একটা তকমা নেহেরুর ভারতের ছিল অনেকদিন। তাসত্ত্বেও ঐ অবস্থাতেই কালক্রমে নেহেরুর আমল থেকেই অস্ত্রের চালানের প্রয়োজনে ভারত যতই রাশিয়া মুখি হয়েছিল ততই ভারতের মুখে আর “আমাদের বৃহৎ গণতন্ত্রের” ঢাক শোনানোর দরকার দেখা যায় নাই। বরং সত্তর দশক থেকে ইন্দিরা আমলে “সমাজতন্ত্র” আর “সেকুলারিজম” ভারতের প্রধান পরিচয় বলে তিনি স্পষ্ট দাবি করতে শুরু করেন। তামাশার দিকটা হল, সেটাই আবার ইন্দিরার “জরুরী আইন” জারি করে ভারত চালানোর কাল। এরপর ১৯৮৫ সালের পর থেকে নেহেরুর নাতি রাজীবের আমলে ক্রমশ “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র কথাটা কার্পেটের তলে চলে যেতে থাকে আর “বৃহৎ গণতন্ত্র” কথাটা প্রথম সামনে আসতে থাকে। তবুও তখনও একটা জিনিষ – আমেরিকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিনা এই সার্টিফিকেট ভারত আমেরিকাকে দেয় নাই, মূলত রাশিয়ান ব্লক রাজনীতির পুরান দায় বা লিগ্যাসির কারণে। না দিয়ে চলতে হয়েছিল। শেষে গত ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের ইউপিএ এর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আমেরিকার সাথে ষ্ট্রাটেজিক এলায়েন্সের দিকটা স্পষ্ট আকার নিতে থাকে। কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির মুখে আমরা ভারত দুনিয়ার “বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ” এই বয়ান শুনেছি। অর্থাৎ তিনি আর ভুয়া “সমাজতন্ত্রের” জামা পড়তে চাচ্ছেন না। ভারত এবার পরিষ্কার করে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” ভারত হল। আর এর সম্ভবত আরও চূড়ান্ত দিকটা ঘটল এবারের মোদী সরকারের হাতে। ভারতের কনষ্টিটিউশন গ্রহণ ও কার্যকর হবার দিন ২৬ জানুয়ারি, যেটা তাদের ভাষায় প্রজাতন্ত্র দিবস। সম্ভবত ২০০৪ সাল থেকে ভারতে গত কয়েক বছরের এক নতুন রেওয়াজ চালু করা হল যে, ঐদিন কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রধান অতিথি করে আনা হবে। আর গত বছর থেকে। আমেরিকার সাথে ভারতের জটিল ও জট পাকিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিট-ছুটাতে একটা শো-আপ করা মোদীর খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। মোদী তাই ওবামার প্রতি আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে থাকার ইমেজ দেখাতে ওবামাকে হঠাৎ করে প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অতিথি হিসাবে এবার দাওয়াত দেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য এই ঘোষণা প্রথম তিনি নিজেই প্রকাশ করেন নিজের টুইটার একাউন্ট বার্তা থেকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস তো নিজেই রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী। “প্রগতিশীলতার” শ্লোগান ধরে রাখার লোভে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে নিজের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত দিবার কথা এর আগে সম্ভবত ভারতের কোন নেতা কেউ ভাবতেও চায়নি। মোদী সেটাই করে দেখায়ে দিলেন। কিন্তু এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ তকমার বদলে গণতন্ত্রী বলে সার্টিফিকেট দিতে চান বলে এটা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এবারের মোদী-ওবামা সাক্ষাতে যৌথ ঘোষণায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এর প্রায় সব ইস্যুগুলোই গত কংগ্রেসের আমলে ২০০৫ থেকে চালু ছিল তবে অকেজো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার সেগুলোই অর্থাৎ আমেরিকার সাথে সব পুরান চুক্তিই এবারের চুক্তিগুলোর বিষয়। কারণ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানান বিরোধ সংঘাত একটা করে বের হতে হতে গত দশ বছরে ভারত-আমেরিকা সামগ্রিক সম্পর্কই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। ভারতের দিক থেকে মোদীর সাফল্য এই যে তিনি মাত্র আট মাসে ওবামার সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই প্রত্যেক ইস্যুতে জটগুলো মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, চুক্তিগুলো নবায়ন করেছেন। ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যেমন, চীন বা জাপানের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক মুখ্য ইস্যু, আমেরিকার সাথে ঠিক তেমনটা নয়। আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্থনৈতিকও বটে তবে মুখ্য ইস্যুগুলো হল সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ-ঝগড়া বিষয়ক নীতি নিয়ে। ফলে তা যথেষ্ট জটিলও। মোদীর দিক থেকে, আমেরিকার সাথে এসব মুখ্য ইস্যুগুলোকে সুরাহা করে, পার হয়ে তবেই নিজের মুখ্য ফোকাস – অর্থনীতি বা ইনফ্রাষ্টাকচার উন্নয়নের দিকে তাঁকে যেতে হবে। তাই কাজের মানুষ মোদীর এই তাড়া। কিন্তু এই বিষয়গুলো ভারতের জন্য কি লাভালাভ আনবে, কতটুকু কাজে লাগবে সেই বিস্তারিত আলোচনা এখন না অন্য কোথাও তুলতে হবে।
    এখনকার প্রসঙ্গে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে এযাত্রায় মোদী ওবামার সাথে মিলে “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির মাহাত্মে যদি মেতে উঠেন, ফিল রেইনারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত – বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই ভারতের এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরও পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় যে আমাদেরকে চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা যেয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া। এমন মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে, এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোন একটার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোন একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দিবার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের টিকে থাকার জন্য খোলা আছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের দশা এক্ষেত্রে সেরকমের উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতার দল করা যাবে না যে, নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আকণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিজে ক্ষমতায় থাকতে চায় – এই দুর্গতির পথে হাটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিন ভাবে সত্যি। এদিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এছাড়া আভ্যন্তরীণ কোন বিভাজনের ইস্যু যেমন সেকুলারিজম বনাম ইসলাম ধরণের বিভাজন পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
    এসব ঘটনাবলী ঘটছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই ফিল রেইনারের এই প্রেস বক্তব্য হাসিনা সরকার ও সমর্থকদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। ফলে এর পালটা কিছু প্রোপাগান্ডাও আমরা লক্ষ্য করছি। দৃশ্যত এর কেন্দ্রবিন্দু বিবিসি, তবে বিবিসি কলকাতার বাংলা বিভাগ। প্রথম রিপোটটা এসেছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নয়, কলকাতা বিজেপি সুত্রে। দুদিন পরে, এরপর ছাপা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার পঙ্কজ সরণকে আশ্বস্ত করেছেন”। পঙ্কজের নামে চালানো তবে পঙ্কজ নয় “বিশেষ সুত্রে পাওয়া” এমন বরাতে, যে পঙ্কজ সরণকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার কি বলেছেন। অর্থাৎ যেন পঙ্কজ সেটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে কিভাবে রিপোর্ট করেছেন সেই ভঙ্গিতে। আদৌও পঙ্কজ সেটাই রিপোর্ট করেছেন কি না তা আমরা কেউ জানি না। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের কোন সরকারই ফরমালি পঙ্কজ সরণকে এটা বলবে না যে নিজ সরকারের হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে বাংলাদেশের সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, ড্রাইভিং সিটে আছেন এমনটাই স্বাভাবিকভাবে হাসিনা পঙ্কজকে বলবেন। আস্থা রাখতে বলবেন। কিন্তু তাতে ভারতের হাইকমিশনার আশ্বস্ত হয়ে গেছেন কিনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রিডিং কি সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়। এরপর আবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পঙ্কজের রিডিং কতটুকু কিভাবে গ্রহণ করবেন, একমত হবেন বা হয়েছেন সেটা আরও আলাদা। কিন্তু বাংলা বিবিসির রিপোর্টে এই পুরা বিষয়টাকে প্রোপাগান্ডা করতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, “আশ্বস্ত করেছেন” বলে দাবি করে। একথা সত্যি যে হাসিনা সরকার পঙ্কজকে “আশ্বস্ত করাতেই চাইবেন”। কিন্তু সেটাকে পঙ্কজের আশ্বস্ত হওয়া এবং তাতে ভারতের সচিব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও “আশ্বস্ত হয়েছেন” বলে ইঙ্গিত করে চালিয়ে দেয়া মিডিয়া টুইষ্টিং। এটা আর নিউজ নয়, বড় জোর এক লেখকের কলাম বা ভিউজ। কারও রাজনীতির প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হওয়া এমনটা হয়ত মিডিয়ায় হয়, করে থাকে কিন্তু সেটাকে অন্তত নিউজ দাবি করে করা যায় না। তবু আপাতত এসব প্রোপাগান্ডার চল আমরা দেখছি।

    [লেখা এই রচনা এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫  চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সামান্য এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

    মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

    গৌতম দাস


    http://wp.me/p1sCvy-91

    ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

     

    পরাশক্তি হওয়ার নির্ণায়ক
    কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার অথবা গ্লোবাল পাওয়ার বলে যেটা আমরা বুঝাই) খেতাব পাবার নির্ণায়ক কি? অনেকের মনে হতে পারে পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা আর সে বোমা কোন রাষ্ট্রের সংগ্রহে থাকলেই তাকে বোধহয় পরাশক্তি বলা যায়। আসলে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। তবু কারও কারও এমন ধারণা থাকে। সেটা তৈরি হবার পিছনের কারণটা হল – কোন রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এটা নিঃসন্দেহে তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটা মাত্রা ও সেই মাত্রাকে প্রকাশ করা মাত্র। কিন্তু শুধু ঐ একটা মাত্র দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পায় একথা সত্যি না – ভুল অনুমান এখানে। অর্থাৎ সার কথাটা হল, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলে বুঝা – এটা ভুল। আবার পরাশক্তি ধারণা মানে  কেবল কোন সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নও নয়, বরং সামরিকের সাথে ষ্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সব ধরণের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হল ঐ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কারও পরাশক্তি হয়ে উঠার প্রথম শর্ত নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলে, উদ্বৃতের অর্থনীতিতে পৌছালে তা বাকি সামরিক, স্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার পুর্বশর্ত বলে এরপর পরাশক্তি হয়ে উঠা কিছু সময়ের ব্যাপার কেবল। যদিও, এটা ঠিক যে নিজের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকলে শত্রুর কাছ থেকে বড় বা সর্বাত্মক ধরণের হামলা বা আক্রমণ আসার সম্ভাবনা এটা কমায় মাত্র। আবার শত্রুর উপর এই বোমা ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগও একই কারণে খুবই সীমিত হয়ে যায়। যেমন ভারত-পাকিস্তান কখনও কোন বড় বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায় না একারণেই। দুদেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে কেউই যুদ্ধকে বড় করতে বা ছড়াতে চায় না – সীমিত স্তরে রাখতে চায়। কারণ কোন পক্ষ অপর পক্ষের হাতে চরম নাস্তানাবুদ হয়ে গেলে সে অপমাণিত বোধ থেকে এটা তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে উস্কানি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রকৃতি ও মানুষের উপর বিকিরণ বিষয়ে পার্মানেন্ট ক্ষতির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। না নিয়ে গত্যন্তর থাকে না। কারণ বিকিরণের প্রভাব তার নিজ ভুখন্ডেও আসতে পারে। ফলে সামগ্রিক বিবেচনায় পারমাণবিক বোমা মূলত আত্মরক্ষামূলক; এবং তাও সীমিত অর্থে।
    আত্মরক্ষামূলক কথার আরও মানে হল সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা যাই থাক না কেন, কোন রাষ্ট্রের সে সক্ষমতা তার প্রতিপক্ষের তুলনায় ছাড়িয়ে গেলেও হামলা করার সময় আক্রমণকারী যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করবে। করবে এই ভয়ে যে সেক্ষেত্রে উপায়হীন দেখে আক্রান্ত প্রতিপক্ষ, দুর্বল হলেও, নিজের কাছে মজুদ থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভেবে বসতে পারে, সেদিকে যেন উস্কানি দেয়া না হয়। আবার আক্রমণকারী শত্রুরও যদি পারমাণবিক সক্ষমতা থাকে সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করে থাকে, উভয়কেই কড়া সর্তক থাকতে হয় যেন কেউ কাউকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। সর্বশেষ ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ফলে নিট ফলাফল হচ্ছে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহে থাকার কারণে উভয় পক্ষকেই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, উভয়কেই একটা স্ব-আরোপিত সীমা তৈরি করে ও তা মানতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে শত্রুকে ঘায়েল বা ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং ভয় দেখানো এবং ভয় পাবার দিক থেকে এটা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।
    আবার ২০০১ সালের পরে আমেরিকার আফগানিস্তান বা ইরাক হামলার বেলায় ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন; ঐক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকার পারমাণবিক সক্ষমতা আছে বলেই সে সহজে ঐ দুই দেশকে আক্রমণ করে পদানত ও দখল জারি করতে পেরেছিল। যদিও আফগানিস্তান বা ইরাকের হাতে পারমানবিক বোমা থাকলে ফারাক কিছু হতেও পারত। পারমাণবিক বোমা মূলত ভয় দেখানোর অস্ত্র, যতটা ঠেকিয়ে রাখার অস্ত্র ততটাই তা ব্যবহারের নয়। এসব কারণে, জাপানে ১৯৪৫ সালে এই বোমা ব্যবহারের পর বিশ্বে কোন যুদ্ধ সংঘাতে আর কোথাও এর ব্যবহার হয় নাই। এছাড়া ইদানীং বোমা কেন, পরমাণু এনার্জির ব্যাপারেও প্রত্যেক দেশেই জনগণ যেভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে, ব্যবহার-বিরোধী জনমত প্রবল হচ্ছে তাতে বোমা সংগ্রহে থাকলেও তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে খোদ নিজ জনগণেরই মনোভাব প্রবল বাধা হয়ে উঠতে পারে, এটা নাকচ করা যায় না। অতএব বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
    আবার আর একদিক থেকে দেখলে, পারমাণবিক সক্ষমতা মানে নুইসেন্স করার ক্ষমতাও বটে; যেমন উত্তর কোরিয়া। সে তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে দেশের ভিতরে ও বাইরে একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরির কাজে। একদিক থেকে মনে হতে পারে উত্তর কোরিয়ার শাসক এই বোমার জোরে নিজ সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আবার অন্যদিক থেকে যদি প্রশ্ন করি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে কি? এর অর্থ খুঁজতে ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ায় এর আসল অর্থ হয়ে আছে নিজ অর্থনীতিকে ক্ষুদ্র বামন করে রাখা, এমনকি বর্তমান ক্ষমতার অধীনেই ন্যূনতম সংস্কার করার আগ্রহ না দেখানো, জনগণের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা, জীবনের মান অচলায়তনে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরা ইত্যাদি। ফলে এগুলো করে কার সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা। সবমিলিয়ে দেশের ভিতরে বাইরে সবার কাছেই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অন্যদের চোখে ‘নুইসেন্স’ হিসাবেই হাজির হয়ে আছে। অতএব এখানেও আমরা দেখছি, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী বলেই পরাশক্তি হিসাবে গণ্য নয়।
    যদিও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে উঠাকেই পরাশক্তির হয়ে উঠা বলে ভুল অনুমানের ধারণা এক সময় বেশ প্রকট হয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বাদে অন্যান্য দিক বিকশিত করবার দিকে ঝোঁক ক্রমশ বেড়েছে। আগের কিস্তিতে বলেছিলাম সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কোন রাষ্ট্রের কেমন থাকবে কি থাকবে না অথবা তা কতটা হবে এটা মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের উপর। পারমাণবিক সক্ষমতা তো নয়ই এমনকি সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটাও ঠিক কারও পরাশক্তি হবার পরিমাপক অথবা নির্দেশক নয়। কারণ সামরিক খরচ বইবার মত একটা সামঞ্জস্যপুর্ণ উপযুক্ত ও যোগ্য অর্থনীতি সবার আগে থাকতে হবেই। এর উপরই দাঁড়াতে পারে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটার অর্থ। এক্ষেত্রে এখনকার রাশিয়া এক আদর্শ উদাহরণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে থাকার সময় এর যে সামরিক সক্ষমতা ছিল এখন রাশিয়ান ফেডারেশন হয়ে যাবার পর সে নিজ অর্থনীতির মাপে নিজের আগের সামরিক সক্ষমতাকে ছেঁটে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। সেটাও বহাল রাখতে পারছে অর্থনীতির ইন্ডাষ্টিয়াল সক্ষমতা্র ভিত্তি দিয়ে নয়, মাটির নিচের তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থনীতি দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে।
    অতএব, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে দরকার একটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি অর্জনের সক্ষমতা নীতি গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সম্পদ বিতরণ ও বণ্টনের নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা যেন আভ্যন্তরীণ সংকট রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে না পারে। এই দুটো দিক অর্জিত হলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা আসা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু তারপরও কোন দেশ নিজেকে পরাশক্তি বলে গণ্য নাও করতে চাইতে পারে। অর্থাৎ গণ্য হওয়াটা ঠিক অনিবার্য বা জরুরিও নয়।
    মনে রাখতে হবে পরাশক্তি ধারণাটা মূলত ঐতিহাসিক। অর্থাৎ দুনিয়ায় একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ শর্তে এই ফেনোমেনা হাজির হয়েছে যেটা ভিন্ন সময় শর্ত পরিস্থিতি এটা উধাও হতে পারে। ফলে অনিবার্য বা চিরন্তন কিছু নয়। দুনিয়ায় কলোনি শাসনের আবির্ভাবের কাল থেকে ধারণাটার উদ্ভব। ধারণাটা মূলত কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল প্রভাব আধিপত্য কেমন এরই এক নির্দেশক। আবার অন্যদিক থেকে নেতিবাচক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন বিনিময় সম্পর্ককে কেবল জবরদস্তি খাটানো বিনিময় সম্পর্ক হিসাবে জারি রাখা, জবরদস্তিতে নিজের মতাদর্শগত দিকটা দুনিয়ার অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজেকেই একমাত্র সভ্যতার ধারক-বাহক, আদর্শ বিবেচনা করা -এগুলো হল পরাশক্তি ধারণাটার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। পরাশক্তির এটা খারাপ অর্থ। তবে আগামী দিনের নতুন কোন গ্লোবাল অর্ডারে যদি পরাশক্তি ধারণার প্রত্যক্ষ ও খারাপ অর্থগুলো কমতে কমতে নাই হয়ে যায় তবু এরপর কোন রাষ্ট্রের নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক সক্ষমতার সূত্রে গ্লোবাল প্রভাব রাখার বিষয়টা থেকে যাবে, সম্ভবত সহসাই উবে যাবে না।

    সম্ভাবনা সম্পন্ন হয়তো, কিন্তু ভারত পরাশক্তি নয়
    পরাশক্তি শব্দটার এই স্বল্প ব্যবচ্ছেদ থেকে আমরা এতটুকু স্পষ্ট হতে পারি যে, পরাশক্তি ধারণার বিচারে ভারত কোন পরাশক্তি এখনও নয়। কিন্তু তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে পরাশক্তি বিবেচনা করার কথা উঠেছে। এর কিছু কারণ নিশ্চয় আছে, সেদিক যাব। যেমন, ২০০৪ সালের মে মাসে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকারের প্রথম টার্মে ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২৭ জুন ২০০৫, ভারত-আমেরিকা একটা “ডিফেন্স প্যাক্ট” সই করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সহায়তায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ উপলক্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৯ জুন ২০০৫ এর রিপোর্টিং এর প্রথম বাক্যটা এরকম, “India and the United States have signed a 10-year defence relationship agreement that gives credence to the Bush administration’s pledge to help India become a major world power in the 21st century.” এই বাক্যের ভিতরের পরের অংশটা ইন্টারেস্টিং। বলছে, “ভারতকে ২১ শতকে ‘মেজর ওয়ার্ল্ড পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল এই চুক্তি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে”। এখন পরাশক্তি কথার আমরা আসল যে অর্থ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে ন্যূনতম শীর্ষ তিন-চার জনের একজন হওয়া -এমন অর্থবোধে গত দশ বছরেও ভারত পরাশক্তি হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট অথবা দাবি আমরা কোথাও দেখি নাই। তাহলে এই মিডিয়া রিপোর্টটা এমন কেন? এটা পড়ে অনুমান করা যায় যে অর্থে ভারতের পরাশক্তি হওয়া মানে করা হয়েছে, তাও আবার আমেরিকার সহায়তায়, এটা কারো পরাশক্তি হওয়া বুঝায় কি না? অন্য রাষ্ট্রের সহায়তায় কেউ পরাশক্তি হতে পারে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ এই রিপোর্টে নাই। এছাড়া এই রিপোর্টটা মূলত ভারতকে আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার ও টেকনোলজি সরবরাহ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এতে ভারতের বড়জোর সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তাতে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার বা পরাশক্তি হবার সম্পর্ক কি – সে প্রশ্ন করতে মিডিয়া ভুলে গেছে। রিপোর্টের এসব ভুয়া অনুমান উদোম করতে এই রিপোর্ট থেকে আরও কিছু প্রসঙ্গ তুলে আনব।
    প্রথমত রিপোর্ট জানাচ্ছে, “Hugely ambitious in its size and scope, the agreement envisages a broad range of joint activities, including collaborating in multinational operations ‘when it is in their common interest,’ ”। অর্থাৎ ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে আছে, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ বলে উভয়ে মনে করলেই ‘টেররিজম ধ্বংস’ জাতীয় কোন কিছুর উছিলা তুলে ভারত আমেরিকার সাথে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঐ “টেররিষ্ট” দেশের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মতি জানাচ্ছে। এই পত্রিকার রিপোর্ট নিজে অবশ্য চুক্তিতে কেবল এমন অনুচ্ছেদ থাকাকে ভারতের “উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসাবে দেখছে। আর এই চুক্তি অনুমান করছে এভাবেই নাকি “two militaries to promote security” তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে আগিয়ে যাবে। রিপোর্টের আর এক অংশ বলছে, “The framework agreement also envisages what is tantamount to the U.S and India jointly policing the world.”। এখানে পত্রিকা প্রতিরক্ষা চুক্তিটা সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য লিখে বলছে, যেন ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকায় নামতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ব-পুলিশী করার খায়েস রাখার বিপদের দিকটা নিয়ে পত্রিকা আপত্তি তুলছে। তৃতীয়ত, ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে সই করেছিলেন, যুদ্ধবাজ বুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফিল্ড আর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রণবকে এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন, এটা “playing a subservient role to a uni-polar US agenda” অর্থাৎ ভারতের দিক থেকে দুনিয়াতে এক মেরুর মাতবর আমেরিকার এজেন্ডার অধীনস্থ হওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না। এর জবাবে প্রণব আমেরিকাকে বিশাল ঠকান ঠকিয়ে এই চুক্তি জিতে এনেছে এমন এক মিচকি হাসি দিয়ে বলেছেন, “This is the real deal…we have both put down what we want for the next decade… “he didn’t expect convergence or agreement on all issues at all times.”। তর্জমা করলে, “এটাই তো আসল খেলা, … পরের দশক পর্যন্ত আমরা কি চাই তা উভয়েই ওখানে লিখে রেখেছি।… সব ইস্যুতে সবসময় আমাদের উভয়ের একমত হতে বা মিলতে হবে এটা আমি আশা করি না”। প্রণবের এমন আস্থাবাচক মুচকি হাসির কারণ, ঐ প্যাক্টের আর এক অনুচ্ছেদ হল এরকম, “এই চুক্তি ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়ার অধিকার খর্ব করে না”। “ The agreement does not preclude India’s right to its independent views.”। এই হোল প্রণবের “ভারত পরাশক্তি” নামক প্রপাগান্ডার ফানুস। তবে ফানুস উড়িয়ে একটা ভাব তো ছড়ানোই যায় যে আমরা এই তো চাঁদে চলে যাচ্ছি। সে যাক, কিন্তু ‘আমেরিকাকে মহা ঠকিয়েছে’ ভাবটা প্রণব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ভারত প্রথম ধাক্কা খায়, ২০১১ সালের প্রথম অর্ধে যখন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। স্বভাবতই ওবামার এই ইচ্ছার ভিতরে ভারত এবার খোদ নিজেরই নিরাপত্তার জন্য হুমকি আর বিপদের দিকটা দেখেছিল। ভারত আমেরিকান পরাশক্তির যাঁতাকাঠি ধার পেয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ থেকে; বাংলাদেশে কে সরকারে আসবে থাকবে, কি শর্তে থাকবে তা ঠিক করার কর্তা হওয়ার ভিতর দিয়ে। এটাও প্রণবের চোখে পরাশক্তি ভাবার সুখবোধ হতে পারে।

    দুই হাজার চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথাবার্তার পর নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ছিল ২৬%, সেটা এখন বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ হবার কথা ছিল। মোদীর মার্কিন সফরের পর সেটা আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে।

    কিন্তু ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভারতের সেই সুখবোধে টান পড়তে শুরু করে প্রায় একই সময় ২০১১ সাল থেকে। এরই এক প্রকাশ্য রূপ হল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারত-আমেরিকার দুই মেরুতে অবস্থান। অর্থাৎ আমেরিকার বিদেশনীতি আর ভারতের বিদেশনীতি হরিহরাত্মার মত একই আত্মা না হলেও “নিরাপত্তা”, “টেররিজম” এসব শব্দের আড়ালে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এই হরিহর মিলনের মধ্যে কোন খটমটর নাই, আসবে না এই ভাব ছড়ানো হয়েছিল। এমন মিথ্যা ধারণাটা উন্মোচিত হয়ে যেতে শুরু করেছিল ২০১১ সাল থেকে। অথচ ভারত ও আমেরিকা দুজনেই জানত যে মূলত আমেরিকার চীন ঠেকানোর ইচ্ছা থেকে এসব ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। যদিও আসলে চীন ঠেকানো অসম্ভব এটাই অবজেক্টিভ বাস্তবতা। একেই আগের কিস্তিতে “উদ্বৃত্ত বাস্তবতা” বলেছিলাম। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে যতটুকু ও যতদিন আমেরিকা পরাশক্তি হিসাবে নিজের উঁচু জায়গা জাগিয়ে রাখতে পারে সেই উদ্দেশ্য সাধনে সাময়িক সে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। কিন্তু উভয়েই এই জানা জিনিষটা লুকানোর ভাব ধরেছিল। বিশেষত ভারত ভাব ধরে ছিল যে সাদা চোখে ধরা পড়া জিনিষটাও সে দেখেও দেখে নাই। যেন এটাই তার পরাশক্তি হবার পথ, যেন আমেরিকা তাকে পরাশক্তি হতে সহায়তা করছে, এই ধারণা প্রণবের সরকারই মিডিয়াতে ছড়িয়েছিল।

    আজকের দুনিয়ার মুল দ্বন্দ্ব
    আজকে চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বের মুল বিষয় হল, আগামি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে? একালেও ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার ছোটখাটো স্বার্থবিরোধ দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব তুলনায় তেমন একেবারেই কিছু নয়। তবে এককালে, ব্রিটেন ও আমেরিকার সত্যিকারের একটা বড় দ্বন্দ্ব ছিল, যা ক্রমশ চরমে উঠা আর ফয়সালার সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টা (১৯১৪-১৯৪৪), এই ত্রিশ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কর্তা হিসাবে ব্রিটেনের পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে আমেরিকার মাতব্বরিতে নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে হাজারো বই-পুস্তক সিনেমায় হাজির বয়ান আছে। যেখানে যুদ্ধের মুল প্রতিপাদ্য হল হিটলারের জার্মানি, ইটালি বনাম বাকি পশ্চিমা শক্তি – যেন এমন এক “ন্যায়ের যুদ্ধ” সেটা। জেনারেলদের বীরত্বের এক এক গাথা সেগুলো। কিন্তু কোন বর্ণনায় যেটা বলে না তা হল, ঐ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক তাতপর্য। তা হল, সারা দুনিয়াকে উপনিবেশ বা কলোনিতে ভাগ করে নেয়া, এক একটা সাম্রাজ্যের অধীন করে রেখে দেয়া আর শিরোমনি হিসাবে থাকা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সীমিত বিকশিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষে হস্তান্তর হয়ে আমেরিকার হাতে চলে যাওয়া। সেটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে -এই প্রথম জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া আর নিজের পরাশক্তিগত উত্থান। অর্থাৎ আগে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে নড়বড়ে অবিকশিত এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ছিল কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো ছিলই না। এমনকি কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ছিল Rothschild family এর পারিবারিক ব্যাংকের মত কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসবের বিপরীতে কায়েম হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে এক প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার। তবে তা ছিল তখনকার “উদ্বৃত্ত বাস্তবতায়” আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে, সামরিক বা গায়ের জোর দেখিয়ে নয়। আর, ব্রিটেন সেকালের উদীয়মান শক্তি আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পুরানা কলোনি ব্যবস্থা অর্থাৎ তখনকার গ্লোবাল অর্ডারকে টিকানো বাস্তবত অসম্ভব ছিল বলে কিছুই করতে পারে নাই। তবে পরাজিত হবার পর ব্রিটেন আবার আমেরিকার নেতৃত্বে যে নতুন গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হল সেখানে আমেরিকার খুবই ছোট পার্টনার হয়ে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির উপর রুস্তমির ভাগ যতদূর পায় তা টুকিয়ে সেই থেকে দিন চালাচ্ছে।

    আজ চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বড় দ্বন্দ্বের মতই। দ্বন্দ্বটা একই ধরণের, পুরান ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডার বনাম আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার; এর নিয়ন্ত্রণ করবে কে –সেটাকেই আমরা আর এক অর্থে মাতবর বা পরাশক্তি হবার লড়াই বলছি। আজ চীন আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারটা চ্যালেঞ্জ করে ফেলেছে। এটা ভেঙ্গে দিয়ে নিজের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম করতে চাইছে। দ্বন্দ্বের সারকথা এটাই। ফলে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের মুখে আমেরিকা ভারতকে পাশে রাখতে চায় যাতে ভারত চীনের সাথে নতুন গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করবার সহযোগী সাথী না হয়ে ওঠে। সে লক্ষ্য হাসিল করতে আমেরিকা ভারতকে পরাশক্তি হবার মিথ্যা লোভ দেখিয়েছে। মিথ্যা এজন্য যে, পরাশক্তি হওয়াটা কারও সহযোগিতায় পাওয়া না পাওয়ার উপর নয় বরং আপন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার উপর নির্ভর করে। ফলে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে আমেরিকা প্রলুব্ধ করেছে আর প্রণবের কংগ্রেস সে লোভে মশগুল থেকেছে। এভাবেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের দশ বছর পার হয়েছে। আর সেই থেকে ভারত একটা পরাশক্তি এমন ভুয়া ধারণা মিডিয়ায় খামাখা চালু হয়ে রয়েছে।

    আগে বলেছি ভারতের সামরিক শক্তিতে শ্রীবৃদ্ধি হলেও এর মানে তার পরাশক্তি হওয়া নয়। তাছাড়া মুল কথা, কোন রাষ্ট্র কাউকে সহযোগিতা দিয়ে পরাশক্তি বানিয়ে দিতে পারে না। তবু সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজির আকাঙ্ক্ষা ও লোভে ভারত আমেরিকার এই প্ররোচনায় পা দিয়েছে। তাও হয়ত হতে পারে। কিন্তু, আমেরিকা কি চীন ঠেকাতে গিয়ে ভারতকে পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা বাস্তব করে তুলতে পারে? অর্থাৎ আমেরিকা যদি চীনের পরাশক্তি হওয়া খর্ব করতে চায় সেই আমেরিকা আবার আর এক পরাশক্তি হতে ভারতেকে কি সহযোগিতা আদৌ করতে পারে? কেন করবে? জবাব হল করতে পারে না, কোন কারণ নাই। তবু ভারত সেটা বিশ্বাস করে যে সে পরাশক্তির হতে চলেছে বা হয়ে গয়েছে। এমন স্বপ্নে দিল্লী বিভোর থেকেছে।

    তাহলে সারকথা, ভারতের পরাশক্তি হবার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঠিক মৌলিক করণীয় কাজ হল সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, সবার আগে অর্থনীতি ফোকাস করে এগিয়ে যাবার নীতি গ্রহণ করা। “নিরাপত্তার” নামে বাকচাতুরি, আমেরিকাকে ফাঁকি দিতে পারছে মনে করা -এগুলো আসলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া, সদর রাস্তা থুয়ে ব্যাকডোরে কাজ হাসিল করার মত শর্টকাট কাজ – পণ্ডশ্রম। আবার অন্যদিকে প্রণবের কংগ্রেসের দশ বছরে সর্বোচ্চ জিডিপি ছিল একমাত্র ২০১০ সালের প্রথম দুই মাস, ডাবল ডিজিটে। এরপর এটা পড়তে পড়তে কংগ্রেসের বাকি আমল ছিল পাঁচের নিচে। গত বছর কংগ্রেসের পতনের পরে, এসবের বিপরীতে যা কিছু বুঝে বা মনে করেই হোক মোদীর ভারতের উত্থান অর্থাৎ অর্থনীতি ফোকাস করে নিজের আগানোর নীতি নির্ধারণ স্বভাবতই সঠিক পদক্ষেপ। যদিও মোদী আমেরিকার সাথে ডিল করবে কি করে সে প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিতই রয়েই গেছে।

    জুন-সেপ্টেম্বর মোদীর ক্ষমতার প্রথম চার মাসের পরে
    আগের কিস্তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মানসিক আমোদ, আদর্শ এবং সুখবোধের উৎস হয়ে থেকে গেছে। আমলাদের এমন মনোগাঠনিক প্রভাব সত্ত্বেও মোদি নিজেকে পরিচালিত করতে সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম চার মাস। এর মধ্যেই ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামার সাথে শীর্ষ বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে আমেরিকার সাথে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসে, গোয়েন্দা-আমলাদের মনোগাঠনিক প্রভাবের বাইরে মোদি আর থাকতে পারেন নাই। এর সম্ভাব্য কারণ, মোদী এবং তাঁর টিম ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য যে পথে পরিচালিত করতে চান এনিয়ে স্বপ্ন পরিকল্পনায় যতটা হোমওয়ার্ক করেছেন ততটা সময় আমেরিকার সাথে ডিলিং এর বিষয়ে দিতে পারেন নাই। এর কারণ ভারত-আমেরিকার দেনাপাওনার ফোকাস সিম্পল অর্থনৈতিক নয়। এছাড়া ভারতের চাওয়াগুলো কি করে আদায় করবেন, এমনকি তা কোন জায়গায় রেখে কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়েছে সেখান থেকে এর বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের পথ কি হতে পারে এনিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তার টিমকে স্টাডির কাজ দিয়ে হয়ত শুরু করতে হত। আর মুখ্য বিষয় কংগ্রেসের অকেজো “নিরাপত্তা” লাইনের বদলে নিজের “অর্থনীতি” লাইনে চলতে চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সেই একই রয়ে গেছে।
    ওদিকে নতুন গ্লোবাল অর্ডার যা ভারতেরও অর্থনৈতিক স্বার্থ, তা নির্মাণে BRICS ও AIIB মত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তে মোদী কি চীনের মতই পাশে থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নিবেন? নাকি আমেরিকার প্ররোচনায় সেই উদ্যোগে গড়িমসি করে বিনিময়ে আমেরিকার থেকে নিজের অমীমাংসিত স্বার্থগুলো আদায়ে একে ব্যবহার করবেন? বিগত কংগ্রেস এই বিনিময়ের লাইন বজায় রেখে এগিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তাতে ভারতের কোন স্বার্থই হাসিল হয়নি, কোনদিকে তেমন ফল দেয় নাই।

    সমান মালিকানা শেয়ার, সমান ভোট ফলে মতামতের সমান ওজন
    দ্বিতীয় আর এক দোনোমনা অবস্থা ভারতের রয়ে গেছিল। BCIM অথবা BRICS গড়ার প্রশ্নে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বা নতুন সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগের প্রশ্ন ছিল সেখানেই চীনের শেয়ার যাতে কোনভাবেই বেশি না হয় তা ঠেকানোর বিষয়টাকে মুখ্য বিবেচনা করে এগিয়েছে। অন্যভাবে বললে ভারত এমন নিয়ম আরোপের পক্ষে কাজ করেছে যাতে উদ্যোক্তাদের সবার বিনিয়োগ সমান হতে হবে, এই নিয়ম আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলেছিল। বাস্তবে যে কথার মানে হল, BCIM অথবা BRICS প্রতিষ্ঠানগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্যারালাল প্রতিদ্বন্দ্বী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে নিজস্ব প্রাইমারি মূলধন চাহিদা যাই থাক এবং তা পূরণের চাহিদা সম্মিলিতভাবে থাক আর না থাক, তাকে ছেঁটে ভারতের নিজের নিচু বিনিয়োগ ক্ষমতার মাপের সীমায় আটকে বামন ও অকার্যকর করে রাখা। ফলাফলে এগুলো প্রভাবশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হোক না হোক তা ভারতের বিবেচনার বিষয় নয়। অথবা সেকেন্ডারি বিবেচনা। একথা ঠিক আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসারে, ওসব প্রতিষ্ঠানে আমেরিকান শেয়ার সবার চেয়ে বেশি বলে, যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ মালিকানা নীতি অনুসারে মালিকানা শেয়ার যার বেশি মানে ভোটের ক্ষমতা তার বেশি, মানে তার নিজের অবস্থান মতামতের ওজন অন্য সবার চেয়ে বেশি। এর ফলাফলে এগুলো হয়েছে আমেরিকান স্বার্থে কান্নি মারা প্রতিষ্ঠান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসরণে নতুন করে BCIM অথবা BRICS গড়তে গেলে তা একই সমস্যার জন্ম দিবে। ফলে ভারতের উদ্বেগ জেনুইন। কিন্তু এই উদ্বেগের সমাধান করবার ফর্মুলা কোনভাবেই উদ্যোক্তা মালিকানা সবার শেয়ার সমান করে দেয়া হতে পারে না। কারণ এর অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বামন ও অকার্যকর করে রাখা হবে। ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপ মানে ততোধিক নিচু মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগ বলতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের কথা বলছি না। এটা অবকাঠামোগত অথবা নতুন অর্থনৈতিক সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি বীজ-পুঁজির কথা বলছি। যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা নয়, এই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসবে আধা পার্সেন্টের নিচে অথবা হয়ত কোন মুনাফাই নয় এমন। ফলে ভারতের এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সক্ষমতার চেয়েও কম হবে। তাহলে আমাদের এই পথে নয়, অন্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ অস্বস্তি জেনুইন, কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবনা নয়। কি হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান?
    মালিকানা শেয়ার ভিত্তিতে ভোট বা বক্তব্যের ওজন – সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নীতি এমন না করে সদস্যদের মালিকানা শেয়ার অবশ্যই অসমান হবে আর তা যার যাই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি হয় কনসেনসাস বা ঐক্যমত্য এবং অবজেক্টিভ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত বিবেচনা তাহলে সহজেই এই সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কারও মালিকানা ভোটকে তার অবস্থান বক্তব্যের ওজন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অবস্থান মতামতকে নিজ মেরিটে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী হতে হবে, ভোটের ক্ষমতার জোরে নয়। এটা করতে পারলে প্রধান সুবিধা যা পাওয়া যাবে তা হল, চীনের হাজির প্রবল বিনিয়োগ সক্ষমতাকে BCIM অথবা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা। যেটা BCIM অথবা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত প্যারালাল সমতুল্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির করতে পারে। ঠিক এরকম অন্য কারও কোন প্রস্তাবও হতে পারে। কিন্তু মূলকথা, মালিকানা ভোটের ভয়ে নব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বামন করে রাখা যাবে না। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে নতুন কিন্তু বামন প্রতিষ্ঠান করা আর না করা সমান। কোন অর্থ হয় না তাতে।
    প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? আমরা একেবারেই নিশ্চিত নই। আমরা অপেক্ষা করছি। মোদী সম্পর্কে মূল্যায়নে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। আর তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাসের নীতির কারণে এই নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মোদীর পক্ষে এমন চিন্তা করা অবশ্যই সম্ভব হলেও তিনি তা করবেন, তাঁর গোয়েন্দা-আমলাদেরকে পিছনে ফেলে আগাতে পারবেন এতদূর এখনই বলা ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু ফেভারেবল দিক আছে; যেমন, চীনের প্রতি তাঁর সাধারণ মনোভাব অন্তত প্রণবের মত নয়। আমেরিকার প্রতি সাধারণ মনোভাবও অন্তত প্রণবের কংগ্রেস বা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মত নয়। আমেরিকা ভারতকে একটা “পরাশক্তি ভাব” দিবার সক্ষমতা বাস্তবতায় থাক আর না থাক তাকে ঢলে পড়তে হবে, না দিলে আবদার অথবা আকাঙ্ক্ষার সুখবোধে বিভোর থাকতে হবে – এমন একেবারেই নয়। তবুও মোদীর অবস্থান দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সাথে মুলাকাতের প্রথম পর্ব মোদীর শেষ হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতে মোদীর ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের অমীমাংসিত এবং জট পাকিয়ে যাওয়া ইস্যুগুলোর সাথে সাক্ষাত বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছেন। আমরা অনুমান করতে পারি, আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজি পাবার বিষয়ে তিনি যতদূর নমনীয় হওয়া সম্ভব হবেন। কিন্তু সেটা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে রাখার বিনিময়ে নয়। এই ভরসা রাখছি এজন্য যে শেষ বিচারে মোদী তাঁর অর্থনীতি” ফোকাস থেকে সম্ভবত কোনভাবেই সরবেন না। কারণ তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাস আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব তাঁর চেয়ে ভাল আর কে বুঝে। এই পটভূমিতে ওবামা এমাসেই ভারত সফরে আসছেন বিশেষ দাওয়াতি হিসাবে। ভারতের “প্রজাতন্ত্র দিবস” মানে কনষ্টিটিউশন গৃহীত হবার দিন, ২৬ জানুয়ারি উৎযাপনে, প্রধান অতিথি হিসাবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার হিসাবে খ্যাত সি রাজামোহন এটাকে বলছেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের দিক থেকে মোড় ঘুরার সফর। অর্থাৎ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে যে দোলাচল আছে তা অনেকটা থিতু হবার সফর। তিনি একটা বিশেষ দিকে নজর এনেছেন যার সারকথা হল, গত সেপ্টেম্বরের মোদীর সফরের সময় ওবামা-মোদী উভয়ে তাদের আমলা প্রশাসনের অবস্থান মতামতকে পিছনে ফেলে বাণিজ্য বিষয়ে ঝগড়ার মীমাংসা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পত্রিকায় তিনি লিখছেন, … suggests that the two leaders had personally driven their bureaucracies to bring the dispute on trade facilitation to an end.। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে সামরিক ইস্যু ছাড়াও অন্য মুল ইস্যু হল WTO সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধাদি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ আমলা প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতে পুরাপুরি পরিচালিত না হয়ে বরং এর উপরে নিজেদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে স্থান দেবার একটা চল মোদী-ওবামা উভয়ের মধ্যে আছে। এই বিচারে ওবামার এই সফর থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে এর আরও কিছু অগ্রগতি এখানে আমাদের দেখতে পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রাজামোহনের দৃষ্টিতে এই সফরকে দেখার করার দরকার নাই। মনে রাখতে হবে, তিনি ভারতকে আমেরিকার “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” হিসাবে দেখতে চাইবার লোক। এখানে “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” কথাটা ভাঙলে এর সারার্থ, চীন বিরোধী হয়ে ভারত-আমেরিকার আগানোর ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ জোট।

    নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি প্রণব মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গী
    প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? সে প্রসঙ্গে যাবার আগে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারের প্রতি প্রণবের মনোভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। এটা শুধু প্রণবের মনোভাব নয় বরং বিগত কংগ্রেসের সরকার যে রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেছে তা হল – ভারত চীনের সাথে এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে চলে যেতে পারে আমেরিকাকে এই ভয় দেখিয়ে এটাকে জিম্মির বুটি বানিয়ে এ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। সারকথায় পুরানা গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটার আয়ু আরও লম্বা করে দেওয়া। যেমন, ভারতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি হয় নি সেটা বিবেচ্য না, কিন্তু ভারতের লোভ বর্তমান জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে চীন বা আমেরিকার মতই ভেটো মেম্বার কিভাবে হওয়া যায়। আর এই লোভের কথা টের পেয়ে আমেরিকারও তাকে মুলা ঝুলিয়ে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মিথ্যা লোভের তীব্রতা বুঝার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হাসিনার প্রথম ভারত সফরে মনমোহন-হাসিনার যে ৫১ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়েছিল এর ৪৮ নম্বর দফা দেখা যেতে পারে। ঐ দফা বলছে, “ভারতের ভেটো মেম্বার হবার খায়েসে বাংলাদেশ ভারতকে সমর্থন করে”। অর্থাৎ এর অর্থ হল, প্রণবের ভারত কল্পনায় নিজেকে এমন এক আগামী দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে যেখানে আদতে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাই থাকবে আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে চীন ঠেকানোর পুরস্কার হিসাবে তাদের স্বার্থে সাজানো গ্লোবাল অর্ডারকে টিকিয়ে রাখে এমন জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের মতই সমান গ্লোবাল ক্ষমতায় ভারতকে পাশে বসাবে। এভাবে পুরান ময়লার ভিতরে প্রণবের ভারত নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এর বেশি ভাবতে পারে না। এটা ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বের চিন্তা-প্রতিবন্ধতার সমস্যা, তারা স্বপ্ন দেখতেও শিখেনি। তারা জানতে শিখতে খবর করতে এখনও অক্ষম যে ১৯৪৪ সালে কোন শর্ত বা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা গঠন করে নিতে পেরেছিল। কাদের মধ্যে ভেটো ক্ষমতা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, কেন তা সম্ভব হয়েছিল। এ সম্পর্কে স্টাডি করে সেটা না বুঝলে এটা বুঝা যাবে না এই অর্ডার ভেঙ্গে পড়বে কেন এবং কখন। কোন্‌ আলামত দেখলে তা বুঝা যাবে। অথবা কেন তারা আজ গ্লোবাল অর্ডারের পড়তি দশায় ভারতকে তাদের সমান আসনে বসাবে অথবা আদৌ বসিয়ে দিতে পারে কি না। একদম মৌলিক প্রশ্ন – জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা কি কেউ কাউকে অনুগ্রহ করে অথবা চীনকে জিম্মি করার বুটি হিসাবে দিবার বিষয়? নাকি নিজেই নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে নিজেই তা নিবার বিষয়? প্রণবের কংগ্রেস চিন্তা কতবড় নাবালক এরই প্রমাণ এগুলো। ভারতের ভেটো সদস্য হবার স্বপ্ন দেখাটা শুধু স্বপ্ন অর্থ কোন সমস্যার নয়। কিন্তু চিন্তার দেউলিয়াত্ব বা সমস্যা হল, নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে উঠার উদ্যোগে সামিল না হয়ে বরং আমেরিকার অনুগ্রহে পাবার চেষ্টা আর পুরান অর্ডারের ময়লা ঘেঁটে এর মধ্যেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় মনে করা। তারা ভুলে থাকতে চায় অথবা খেয়াল করেই হয়ত দেখেনি যে, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে তাদের সমমর্যাদা দিবার লোভ দেখানোর অর্থ কি? এটা কি পশ্চিমের নিজেদেরই ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডারে নিজেদের গুরুত্ব বা মর্যাদাকে চ্যুত করা নয়? সারকথায় পশ্চিমের উপস্থিত সমস্যা হল, পুরান গ্লোবাল অর্ডারের পড়ে যাওয়াটাকে কি করে ঠেকানো যায় অথবা অন্ততপক্ষে দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সেই দশায় সে কাকে কি দিতে পারে? কেন দিবে? আমাদের সৌভাগ্য যে প্রণবের এসব এবসার্ড স্বপ্ন তাদের সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থাতেই অকেজো, ফলহীন বৃক্ষ হয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। তাসের ঘরের মত প্রণবের স্বপ্নের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক নন-ফাংশনাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা আজ প্রমাণিত যে এই লাইন অনুসরণ করে ভারতের পাতে কিছুই আসেনি। আমেরিকার সাথে তার জমে উঠা দূরে থাক, এশিয়ায় আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে গেলে এখন খোদ ভারতের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি যায় এটা আজকের বাস্তবতা। ফলাফলে আমেরিকার সাথে মনোমালিন্য আর ঝগড়া তুঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতাকাল শেষ করেছিল।
    তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রণবের এই অবাস্তব ও অকেজো আমেরিকান অনুগ্রহ পাবার স্বপ্নের বলয়ের মধ্যেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে। হাসিনা-প্রণব সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশকে দিল্লি হয়ে মার্কিন অনুগ্রহের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল, ঢাকা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। প্রণবের দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায় দিল্লির, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন মনোমালিন্য সেই ক্ষেত্রে বড় কোন সংকট হয়ে ওঠে নি। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর মার্কিন অনুগ্রহ পাবার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ কি? সেটা বোঝা যাবে ভারতের মনমোহনের সাথে শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণার মধ্যে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যা স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার ক্ষমতায় আসার প্রায় ঠিক একবছর পর। এটা ভারতের সমর্থনে হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন, হাসিনা মানে দিয়েছিলেন যে তার স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ। এমনকি দল হিসাবে এটা আওয়ামী লীগের স্বার্থ এটাও অনিবার্য ধরে নেয়ার কারণ নাই। প্রণবের সরকারের আয়ু-দশাতেই এটা প্রমাণিত যে প্রণব ও কংগ্রেসের স্বপ্নটাই অবাস্তব। ইতোমধ্যে ভারতে সরকারই বদলে গিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও সে পথেই আছেন। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সকল বিষয় ভারতের স্বার্থে যায় তাকেই হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছেন।। এই ভরসায় যে দিল্লী তাতে অনুরাগ বোধ করবে এবং মূল্য হিসাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ভারতের স্বার্থ হয়ে উঠবে। প্রণব যেমন ছিলেন, এখন মোদীও যেন হাসিনার পক্ষে ভারতের সমর্থন নিয়ে হাজির হন বা হবেন। কিন্তু এর মিসিং লিঙ্ক হল, প্রণব বা কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত। যদিও একই চিন্তার লাইনের গোয়েন্দা-আমলারা রয়ে গেছেন। কিন্তু মোদী কি গোয়েন্দা-আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত প্রভাবিত হবেন? এখনও কিছুই স্পষ্ট নয়। আপাতত এতটুকু বলা যায় যে মোদীর সরকার পরিচালনা নীতি স্পষ্টতই সেদিকে নয়। মোদী প্রণবও নন।

    [এই রচনা প্রথমে চিন্তা ওয়েবে ছাপা হয়েছিল এখানে গত ১৮ জানুয়ারী ২০১৫। এখন এখানে আরো আপডেটসহ আবার এডিট করে ছাপা হল।]

     

  • মোদির ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল

    মোদির ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল

    গৌতম দাস

    ১২ জানুয়ারি ২০১৫

    http://wp.me/p1sCvy-8C


    MODI & Globe
    পুঁজির গোলকায়ন দুনিয়ার অর্থব্যবস্থায় মৌলিক কিছু রূপান্তর ঘটিয়েছে ও ঘটাচ্ছে এ কথা সবসময়ই বলে আসছি। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের দিক থেকে এর তাৎপর্য উপলব্ধির জায়গাগুলো বুঝব কী করে? এই প্রশ্ন মনে রেখে নরেন্দ্র মোদির ভারত নিয়ে এই লেখা। দুনিয়াব্যাপী বিস্তৃত পুঁজিতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ভারকেন্দ্র এশিয়া – বারাক ওবামার ভাষায় এশিয়ার থিয়েটার বা নবোদ্ভূত এশিয়ার রঙ্গমঞ্চ। এই থিয়েটারে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যারা জয়ী হবে তারাই আগামি বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে ভারতের পরিবর্তনের অভিমুখগুলো ঠিক ঠিক বুঝতে হবে বাংলাদেশের কথা ভেবে। একই সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের চীন, ভারত ও আমেরিকা নীতি কি হতে পারে তা মাথায় রেখেই লেখাটি তৈরি; অনুমান হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামি দিনে চিন্তাশীল ও সবলেরাই নেতৃত্ব দেবেন, বর্তমান পরিস্থিতি টিকবে না। বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের নেতৃত্ব অক্ষূণ্ণ রাখতে যে সূক্ষ্ম দড়ির ওপর তাঁদের হাঁটতে হবে তারই কিছু ধারণা দেবার চেষ্টা হয়েছে এখানে। ভারত প্রসঙ্গ এখানে ভারি হওয়া সেই উদ্দেশ্য মনে রেখেই।

    নিরাপত্তা বনাম অর্থনীতিঃ ভারতের বিদেশ নীতির দুই মুখ
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতায় আসীন হওয়ার প্রায় সাত মাস পার হতে চলল। মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় পরিসরে নানান পরিবর্তন ও ছাপ ফেলেছে। আর এতে বাংলাদেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, কী নতুন সম্ভাবনা হাজির হচ্ছে সেসব নিয়ে আগের কিছু লেখায় আমরা আলোচনা করেছিলাম। সেখানে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় ছিল আগের কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতিতে মোদীর নতুন সরকার মৌলিক কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসার সম্ভাবনা এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব।

    বিগত কংগ্রেসের নীতির মূল ফোকাস ছিল “নিরাপত্তা”। একে কংগ্রেস নীতির ভারকেন্দ্র গণ্য করলে ভুল হবে না। এর পরিবর্তে মোদির নীতির মুল ফোকাস “অর্থনীতি”। ভারতের বিদেশ নীতির অভিমুখ কোথায় বদলাতে পারে সেটা বোঝার জন্য এভাবে ভাবা যেতে পারে। মোদি এই নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই এবং এখনও তার নীতির ভারকেন্দ্র ‘অর্থনীতি’ এই ধারনা দিচ্ছেন।

    কংগ্রেস নীতির “নিরাপত্তা” ধারণাটিকে ভেঙ্গে অর্থ করলে সেটা দাঁড়ায় পড়শীদের উপর আগ্রাসী বা হকিস নীতি যা চীন অবধি বিস্তৃত; আর ভারতের ভিতরেও যেকোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে সেকুলারিজমের আড়ালে সামরিক জবরদস্তির পথে চাপিয়ে দেয়া সমাধানের উপর অতি নির্ভরতা।

    একে অন্যভাবেও আমরা বলতে পারি। কোন রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক আমলা — বিশেষত গোয়েন্দা বাহিনী যদি সরকার চালায়, কিম্বা সরকারের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রাখে, তাহলে দেশের ভেতর বাইরের যে কোন সমস্যা ও অসন্তোষকে রাজনৈতিক দিক থেকে দেখা ও সমাধানের ক্ষমতা হ্রাস পায়, উপেক্ষিত থেকে যায়। এর কারনে মারমুখি (hawkish) বা হকিস সমাধানই সাধারণত মুখ্য হয়ে ওঠে। ‘নিরাপত্তা’ কংগ্রেসের নীতির ফোকাস বা ভারকেন্দ্র বলার মানে এটাই । অর্থাৎ ধর-মারো দিকটা প্রাধান্যে নিলে স্বভাবতই অন্য অপশনগুলো — যেমন, রাজনৈতিক সমাধান অথবা অর্থনৈতিক-উন্নয়ন ঘটিয়ে সমাধান – ইত্যাদি পদ্ধতিগত দিক গৌণ কিম্বা অকেজো হয়ে যায়। কিম্বা তাদের অকেজো করেই রাখা হয়। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এখানে কাজ করে না, আমলাতান্ত্রিক সমাধান সে কারনে ধরো আর মারো জাতীয় সমাধানে পর্যবসিত হয়। এ ছাড়াও যে যে ভিন্ন পথ হতে পারে সেটা উপেক্ষিত থাকে। অথবা একেবারে উপেক্ষিত যদি নাও হয় তবে বড়জোর সেকেন্ডারি অপশান হয়।

    আগের কংগ্রেসের ইউপিএ জোট সরকার একনাগাড়ে দুই টার্ম অর্থাৎ ১০ বছর (২০০৪-২০১৪) ক্ষমতায় ছিল। একে আমরা বলতে পারি বড় দাদাদের যুগ। সেটা কেমন? এর শুরুটা ছিল আমেরিকার যুদ্ধবাজ জর্জ বুশের ‘ওয়ার অন টেররের’ অনুরূপ নীতি, নাইন-ইলেভেন পরবর্তি যুগ। বলা বাহুল্য এটা কংগ্রেসের “নিরাপত্তামুখি” নীতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রধান প্রভাবক এবং সহায়কও ছিল। বুশেরও আট বছরের দুই টার্মের সেই যুগে (২০০১-২০০৯) ভারতের ওপর আমেরিকার প্রভাব-সম্পর্ক তৈরি হবার যুগ। দাদা বুশ ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতে ভারত কোন পরাশক্তি না হয়েও পরাশক্তির ভাব ধরেছিল। ভারতের পরাশক্তি হয়ে ওঠার বাসনা এই সময়টাতেই দানা বেঁধেছিল। দাদা বুশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তিগত যাঁতাকাঠি ভারতকে সাময়িক ব্যবহার করতে দিয়েছিল। যদিও ইউপিএ সরকারের শেষ দুই বছর আমেরিকার সাথে “নিরাপত্তা” বিষয়ক সহযোগিতার মধুচিন্দ্রমা আর টিকে থাকে নি। শুধু তাই নয়, উল্টা ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক প্রকাশ্যে চরম তিক্ততায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। কংগ্রেসের “নিরাপত্তামুখি” নীতিকে এভাবেই দাদার জোরে বুক ফুলিয়ে চলার নীতি বলেও বোঝা যেতে পারে।

    বিপরীতে মোদীর নীতিতে “অর্থনীতি” মুল ফোকাস। সরকারের মুখ্য কর্তব্য কাজ সৃষ্টি আর সেটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সেটা অবকাঠামোগত বিনিয়োগ আর প্রাইভেট বিদেশী বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই হতে হবে – মোদির অর্থনীতিবাদকে ভেঙে বুঝতে চাইলে এভাবেই আমাদের বুঝতে হবে। কাজ সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু মানার অর্থ অবকাঠামো ও আনুষঙ্গিক বিষয়সহ উন্নয়নের দিকে মুল মনোযোগ ধাবিত করা, তাকেই চালিকাশক্তি মেনে পরিচালনা করা ।

    এই ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, এতে নিরাপত্তা বিষয়টাকে অবশ্যই ভুলে যাওয়া হয়েছে সেটা বলা হচ্ছে না। কিম্বা কংগ্রেসের কোন উন্নয়ন নীতি ছিল না, সেটাও নয়। মূল বিষয় হচ্ছে ভারতের ‘নিরাপত্তা’ কথার আড়ালে দেশের ভিতরে বাইরে সবাইকে দাবড়ে বেড়ানোর আগ্রাসী নীতি এটা নয়। দিল্লী নিজের খাসিলত ছেড়ে দিয়েছে সেটা বলা হচ্ছে না। এখন কিন্তু সেটা মারমুখী নয়। নিরাপত্তার সামরিক দিক তো থাকবেই, কিন্তু আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসঙ্ঘাতের সমাধান কিম্বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক অবসানের জন্য মারমুখী নীতি ছাড়াও অন্যান্ন রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক দিক এক্সপ্লোর করে দেখার প্রবণতা নরেন্দ্র মোদির রাজনীতি থেকে পাঠ করা যায়। এই অর্থেই কংগ্রেসে ‘নিরাপত্তা’ নীতির বিপরীতে মোদির নীতি “অর্থনীতি” নির্ভর। আর মোদির পপুলার ভাষায় এটা হল উন্নয়ন বা হিন্দীতে “বিকাশ”।

    ভারতের বিদেশ নীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
    আবার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, মোদির নীতি এখনকার বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপুর্ণ, আর এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। দুনিয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক অর্ডারের মধ্যে ১৯৪৪ সালের পর থেকে আমরা যে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছিলাম তা চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে — বিশেষ করে গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে তার বিন্যাসের মধ্যে ক্রমশ স্পষ্ট দৃশ্যমান রূপান্তর দেখা দিতে শুরু করেছে । এটা শুধু বিশ্ব অর্থনীতির অভিমুখ পশ্চিমমুখিতার বদলে পুর্ব দিকে ঢলে পড়া নয়; কিম্বা শুধু চীনের উত্থান কিম্বা চীনসহ অন্তত পাঁচটা ‘রাইজিং ইকোনমির’ উত্থানও নয়, এটা একই সাথে এক কেন্দ্রিক দুনিয়ার ক্রম অবসানের ইঙ্গিত। আমেরিকান পরাশক্তিগত ক্ষমতার শাসনের বদলে চীনকে মুখ্য করে অন্তত আরও চার-পাঁচটা রাষ্ট্রের পরাশক্তিগত উত্থানে তা ভাগ হওয়া আসন্ন। এর ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মৌলিক চরিত্র বদল হয়ে যাবে সেটা ভাবার কোন কারন নাই। এর যে আগ্রাসি, দখলদারি বা রুস্তমিও দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। তবে এটা ভুমিকম্পের পর ভুগর্ভের ওজন কে অথবা কে কে বহন করবে তেমনি ভূগোলে প্লেট চেঞ্জ ঘটনার মত। এতে বিশ্ব ব্যবস্থা রক্ষার ভার অন্যের কাঁধে চলে যাতে পারে। রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক চুক্তি এসবের ভিতরে কিছু বদল আসবে অবশ্যই। কাঁধ-বদলের মত ঘটনাগুলো শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে।
    এতদিন অবধি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আমরা বহাল দেখে এসেছি। ১৯৪৪ সাল থেকে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংক এর মত প্রতিষ্ঠান খাড়া করে এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিধি বিধানের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ষ্ট্রাটেজিক অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষূণ্ণ রাখতে পেরেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব অর্থনীতি পশ্চিমের দিকে কান্নি মেরে সাজানো হয়েছিল; তা এবার ভেঙ্গে পড়ার আলামত শুরু হয়েছে, নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম হচ্ছে, তাতে নতুন ভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিন্যাস ঘটছে। ধারনা করা যায় পরিশেষে নতুন ধরণের এক বিশ্ব অর্থনৈতিক শৃংখলার জন্ম হবে। সেই শৃংখলার নতুন বিধি বিধান আইন কানুনও থাকবে। এটা আসন্ন, চারদিকে আলামত ফুটে উঠছে।

    নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক শৃংখলায় আমাদের মত দেশগুলো জন্য শ্বাস নেবার তুলনামূলক বড় জায়গা মিলবে, এটাই কমবেশী অধিকাংশ অর্থশাস্ত্রবিদদের ধারণা। যেকোন আন্তর্জাতিক চুক্তি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তুলনামূলক ভাবে বেশি ফেভারবল হবে। প্রতীকিভাবে বললে, অবকাঠামোগত ঋণ পাবার ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ডব্যাংক আর একছত্র কর্তৃত্ব খাটানোর প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে না, থাকছে না। শুরু হয়েছে সমান্তরাল অবকাঠামো ঋণ পাবার প্রতিষ্ঠান। সেটা বোঝা যায় Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB), এবং BRICS ব্যাংকের আবির্ভাব দেখে।

    বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এই দুই প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা ভুমিকা রয়েছে। BRICS অবশ্য শুরুতে আপাতত একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংকের মত দুই ভুমিকা পালন করে দুটোরই বিকল্প হতে চাইছে। আইএমএফ মূলত মুদ্রামান নির্ধারণ ও যাচাই এবং তাদের নির্দেশিত মূদ্রানীতি আমাদের মতো দেশকে মানতে বাধ্য করা আর অন্যদিকে কোন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ দেওয়াকে নিজের ম্যান্ডেট মনে করে। সারকথায়, মূদ্রামান ব্যবস্থাপনা ও ব্যলান্স অফ পেমেন্টে ঘাটতি হলে পূরণ এই দুই কাজ পালনকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটিও আর মূদ্রামান ব্যবস্থাপনা ও ব্যলান্স অফ পেমেন্টে ঘাটতি পুরণ করবার একচ্ছত্র ও একমাত্র কর্তৃত্ববান প্রতিষ্ঠান হিসাবে টিকে থাকতে পারছে না। চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ পাওয়ার বিকল্প উৎস হিসাবে BRICS আইএমএফের মতই ভুমিকা নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ বিতরণ করবে, সেটা ইতোমধ্যেই জানিয়েছে। সবমিলিয়ে ক্রমশ বিদ্যমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প দুনিয়ায় হাজির হবার ঘোষণা এসেছে। এতে বর্তমান আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেলের নিগড় থেকে আমাদের মত দেশের অন্তত তুলনামূলক অর্থে কিছুটা মুক্তি মিলবে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্লোবাল অর্থনীতির এই পাশ ফেরা মোচড় দেয়া যেটা শুরু হয়েছে সেই অভিমুখের আর উল্টাপথে চলার সম্ভাবনা নাই। এটা এখন এমনই একমুখী ফেনোমেনা। চীনের অর্থনীতি ক্রমশ বড় থেকে আরও বড় উদ্বৃত্ব অর্থনীতির দেশ হচ্ছে, ফলে চীনের এই বিশাল বিনিয়োগ সক্ষমতার কারণে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংক টাইপের বিকল্প নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার শর্ত হাজির হয়েছে। দুয়ার সহজেই খুলে গেছে। ওদিকে এমন বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমের সক্ষমতা ততই কমছে। অর্থাৎ আমেরিকা চাইলেও রূপান্তরের এই অভিমুখ নিকট আগামিতে উল্টাতে পারবে না, উদ্বৃত্ব অর্থ তেমন জমা হচ্ছে না বলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার কথাও তাদের চিন্তার অতীত, অবাস্তব। দুনিয়া জুড়ে এই এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

    তাহলে এখন প্রশ্ন, আমেরিকা কি নিজের কবর খননের এই ফেনোমেনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? স্বভাবতই এই জবাব হল না। প্রচলিত আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেল সংস্কার করে ভিতরে চীনকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে নতুন চিনকেও একই পাত্রে ধারণ করতে পারত হয়ত কিন্তু তাতেও চীনের বিশাল সক্ষমতার ভলিউমের কারণে গ্লোবাল কর্তৃত্ব চীনের হাতেই চলে যাওয়া ঠেকানো যেত না। ফলে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেলের সংস্কার পথ পরিহার করে মরণ কামড়ে যতটা এই রূপান্তরের গতিকে শ্লথ রাখা যায় সে চেষ্টায় রত হয়েছে আমেরিকা। এতে প্রথম দিকে রূপান্তরের গতির হয়ত সাময়িক কিছু হেরফের ঘটাতে পারে।

    আমেরিকা এর জন্য অনেকখানি নির্ভর করছে ভারতের উপর। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের উপর। কিভাবে? তা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকা চায় ভারত ঢলতি বা পুরান গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংকের আয়ু লম্বা করুক, সেজন্য AIIB, এবং BRICS ধরণের বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিনেের সাথে সক্রিয় উদ্যোক্তার ভুমিকা না নেক। এভাবে ঢলে পড়া পুরান প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার হাত থেকে বাঁচাক। বিনিময়ে আমেরিকা কি অফার করতে পারে? বা কি দেখিয়ে ভারতকে প্রলুব্ধ করছে?

    ভারতের লোভ কিম্বা বাসনাঃ সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের লজিস্টিক
    আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের পাবার সবচেয়ে লোভনীয় দিকটি হচ্ছে ভারতের সামরিক বাহিনীকে সক্ষম করবার জন্য আমেরিকান সহযোগিতা পাওয়া। রাজনৈতিক দিক থেকে এই আকাংখা দিল্লী-ওয়াশিংটন সম্পর্কের অনেক খানি নির্ধারণ করে। বুশের আমলের ভারত-আমেরিকার সখ্যতার শুরুতে সেই সম্পর্ক রচনার একটি প্রধান উপাদান ছিল ভারতে অস্ত্রের সরবরাহকারি ও উৎস দেশ হিসাবে আমেরিকার প্রবেশ। পারমাণবিকসহ সবকিছুতেই সামরিক সহযোগিতা্র অনেকগুলো চুক্তি হয় ২০০৫ সালে। যদিও গত কয়েক যুগ ধরে অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারত মুলত রাশিয়া নির্ভর হয়ে ছিল। এই চুক্তিগুলো ২০০৫ সালে যখন হয় তখন আমেরিকার উস্কানিতে এবং ভারতেরও মনে মনে যে চীন নিয়ে ভীতি ছিল এই পটভুমিতে ঘটেছিল। সামরিক সক্ষমতা ভারতের ইতোমধ্যে কিছু বেড়ে থাকুক আর না থাক ভারতীয় মিডিয়া বলে থাকে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতাটা ভারতের কাছে এখনও একটি ট্রমা হয়ে থেকে গেছে। কিন্তু মনের পুরানা টেনশনে নয় চীন-ভারতের স্বার্থ সংঘাতের এখন প্রধান ইস্যু চীন-ভারতের দীর্ঘ সীমান্তের অনেক জায়গা অচিহ্নিত বা বিতর্কিত থেকে যাওয়া। সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ স্বার্থ-বিরোধের জায়গাটা এটাই। কিন্তু ইতোমধ্যে এই ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে।

    গত ২০১৩ সালটা ছিল চিন-ভারত দুপক্ষের সরকার প্রধানের পালটা পালটি সফর বিনিময় এবং সফর শেষে একটি সীমান্ত বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরে উপনীত হবার বছর। ঐ চুক্তির সারকথা হল, সীমান্ত অচিহ্নিত থাকার সুত্র ধরে কোন ছোটখাট টেনশন থেকে বড় কিছু যেন না হয়ে যায়। যেন কোন পক্ষই ইচ্ছা অনিচ্ছায় যুদ্ধের উস্কানি তৈরি না করে বসে বরং সংযত থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে; ফ্লাগ মিটিং, হট লাইনে কথা বলা ইত্যাদির মাধ্যমে টেনশন কমানো, এসব উপায় আরো বিস্তৃত করা ইত্যাদি বিষয়ে একমত হয় ঐ চুক্তি। আর যত দ্রুত সম্ভব বিতর্কিত সীমান্ত চিহ্নিত করার ব্যাপারে দুপক্ষই সক্রিয় উদ্যোগ নেবার অঙ্গীকার করেছে। সীমান্ত সমঝোতার উপর দাঁড়িয়ে এরপর পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও বিরাট উল্লম্ফনে নেবার এক ঘটনা ঘটানো হয়। তা হল, BCIM-EC বা BCIM ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে জোট গঠনে উভয়ে উদ্যোগী হতে একমত হওয়া।
    এই ইকোনমিক করিডর মানে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ ও মায়ানমার হয়ে চিনেের কুনমিং পর্যন্ত যোগাযোগ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, পণ্য চলাচলের ব্যবস্থা করা, আর বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি ইত্যাদি। গত বছর ২৩ অক্টোবর ২০১৩ মনমোহনের ফিরতি চীন সফরে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয় আর তখনই তাদের যৌথ ঘোষণায় বিষয়টা প্রথম সামনে আসে। এক বছর পর ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে এমাসের শুরুতে আমাদের কক্সবাজারে BCIM জয়েন্ট ইকোনমিক ষ্টাডি গ্রুপের দ্বিতীয় মিটিং হয়েছে।

    কিন্তু এতকিছুর পরও চিন-ভারতের সীমান্ত বা যুদ্ধ বিষয়ক টেনশন বা ট্রমা যাই বলি সেটা যায় নি। চুক্তি ও করিডরের আলাপে অগ্রগতির পরেও তা ভারতের পাবলিক মাইন্ডে একই রকম জায়গায় রয়ে গেছে। আসলে বলা উচিত ভারতের মিডিয়া জগতে একই রকম রয়ে গিয়েছে। সম্পর্কের নতুন অগ্রগতি সত্ত্বেও চিন প্রসঙ্গে ভারতীয় গণ মনোভাবে কোন পরিবর্তনের ছাপ পড়েনি। ফলে জন মনে এর কোন প্রভাব নাই। ওদিকে সীমান্ত চুক্তি বিষয়ক অগ্রগতির পরে কংগ্রেস সরকারের স্বাভাবিক আয়ু আরও ছয়মাস ছিল। ফলে বিগত দশবছর ধরে কংগ্রেস সরকারের “নিরাপত্তা” কেন্দ্রিক চিন্তা বা মারমুখী যে নীতি ছিল সেখানেও বিশেষ বদল ঘটে নি। চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত টানাপড়েন হ্রাস করার প্রয়াসের কোন ছাপ দেখা যায় না। সবসময় ভারতের চিন বিরোধি রেঠরিক বা কথার যে যুদ্ধ চলছিল কোন বদল বা ছাপ পাবলিকলি প্রদর্শন না করে তার আগেই কংগ্রেস সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাবার সুযোগ নেয়। এদিকে চুক্তি সইয়ের দিক থেকে দেখলে এরপর একবছর হয়ে গেছে, ইতোমধ্যে মোদীর জয়লাভ ও তাঁর অর্থনীতি কেন্দ্রিক নীতিও এসে গেছে তবু ভারতের কোন পক্ষের মিডিয়ার অবস্থানে কোন বদল হয়নি, বরং মিডিয়ায় চীন প্রসঙ্গে সন্দেহ ছড়ানো যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। যেন সীমান্ত চুক্তি বা করিডর এসব ইস্যুতে অগ্রগতি চীন-ভারত সম্পর্কের জন্য কোন নতুন উপাদান নয়, যেন এসব কিছুই ঘটেনি বা ঘটলেও তার প্রভাব শূন্য।

    এর সম্ভাব্য একটা কারণ, আমেরিকা। গত দশ বছরে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সিয়া – জনমত বা পলিসি অবস্থান যারা তৈরি ও প্রভাবিত করে– তাদের করা গবেষণা, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি যা কিছু হয়েছে তা গড়ে উঠেছে আমেরিকার হাত ধরে অথবা কোন না কোন ধরণের মার্কিন সহযোগিতায়। ধরণ হিসাবে সেগুলো যেমন, মার্কিন কোন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ভারতীয় একাডেমিকের পিএইচডি বা গবেষণা অথবা কোন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক জয়েন্ট কোলাবরেশনে যেমন, Carnegie Endowment for International Peace এর মত প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়া বিভাগকে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে ইন্ডিয়ান স্কলার দিয়ে চালানো। অথবা বড়ভাই পিঠে হাত রাখায় যে পরাশক্তির সুখবোধ হচ্ছিল সেটাই ভারতের জন্য আদর্শ – এই বোধের প্রাক্তন সামরিক-বেসামরিক আমলাদের দিয়ে চালানো কোন ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক। এসবের সাধারণ তাৎপর্য হল, আমেরিকান চোখ দিয়ে চীন-ভারতের সম্পর্ককে দেখা। এককথায় বললে, এর ফলে চীন বিষয়ে যে সকল ভারতীয় একাডেমিক এক্সপার্ট তৈরি হলেন বা যাদের মিডিয়ায় হাজির হতে দেখা যাচ্ছে তারা প্রায় সবাই আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, কিম্বা তাদের তত্ত্বাবধানে অথবা মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষার চিন্তার কাঠামো বা ওরিয়েন্টেশনে গড়ে উঠেছেন। তারা ভারতের বিদেশ নীতি নিয়ে যা ভাবেন বা ভাবছেন সেখানে আমেরিকা যেভাবে ভারতকে দেখতে চায় তারই ছাপ প্রবল ভাবে হাজির দেখা যায়। চীন-ভারত সম্পর্কের কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়ায় এর কোন ছাপ না পড়ার কারণ সম্ভবত এটাই। এর ফলে চিনের প্রতি ভারতের জনমতে বিশেষ বদল ঘটে নি। যার প্রভাব মোদির বিদেশ নীতিতে পড়তে বাধ্য।
    তো এটা গেল একটা কারণ। কিন্তু মূল কারণ নয়। তাহলে আসল কারণ কি?

    “ভারত একটি পরাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে কি?’- ইকনমিস্ট পত্রিকার প্রশ্ন। ভারতের দরকার একটি পেশাদার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা কর্মী যাতে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারে। দরকার তাদের ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্র পরিচালিত ডিফেন্স ইন্ড্রাস্ট্রিতে বেসরকারি ও দেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিরক্ষা খাত সব সময়ই এই ধরণের সমালোচনার মুখে রয়েছে।

    সামরিক বিষয় কিম্বা প্রতিরক্ষা ব্যয় উভয় ব্যাপারে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বা প্রগতিশীলদের মনে বিরাট অনীহা কাজ করে। বঞ্চিত মধ্যবিত্তের ক্রোধ ছাড়া এই নব্য গড়ে ওঠা শ্রেণির মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশেষ কোন ধারণা এখনও গড়ে ওঠে নি। প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের কাছে খুব দূরের একটি বিষয়। এর সঙ্গে যেহেতু সেনাবাহিনীর সম্পর্ক সরাসরি তাই এর বিরোধিতাই তারা সঠিক বলে মনে করে। সামরিক মানে সব অপচয় অথবা একটা ট্যাঙ্কের টাকায় কয়টা স্কুল করা যেত ধরণের তর্কে এরা নিজেরা বুঁদ হয়ে থাকে আর সমাজেও শ্রেণিগত কারণে তার প্রভাব আছে। ফলে সামরিক শাসন বা সামরিক শাসনের বিরোধিতা করা, কিম্বা সামরিক অফিসারদের দুর্নীতি ও গরিব দেশের তুলনায় অন্যায় ও অতিরিক্ত সুবিধাভোগের তর্ককে তারা সেনাপ্রতিষ্ঠান বিরুদ্ধে তর্কে পর্যবসিত করে ফেলে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে উপযুক্ত সামরিক প্রতিষ্ঠান বা সুস্পষ্ট প্রতিরক্ষার নীতি কী করে প্রণয়ন করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা এদের শূন্যই বলা যায়।
    মূলত এমন ধারণার সুত্রপাত করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকাকে ঘায়েল করতে প্রপাগান্ডা হিসাবে। আমরা সবাই জানি, সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ সামরিক খাতে ব্যয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিল না। ফলে স্পষ্টত কথাটা রাশিয়ানরা নিজে বিশ্বাস করার জন্য নয় অথবা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় রাষ্ট্র গঠন ও তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয় নি। তৃতীয় বিশ্বের সেনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্নায়ুযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডার প্রয়োজন মনে রেখে সাজানো হয়েছিল। বাস্তবে তৃতীয় বিশ্বের সেনাবাহিনী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধারক ও কমিউনিজম মোকাবিলার প্রথম সারির মিত্র ছিল অবশ্যই। বিপ্লবোত্তর যে কোন রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক আলোচনা রয়েছে। যার মূল্য অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সেনাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক অবস্থান নেওয়ার অর্থ কোনভাবেই পুরানা স্নায়ুযুদ্ধের আমলের চিন্তাভাবনা বয়ে বেড়ানো হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেই ওজনের ভার বয়ে বেড়াচ্ছি।

    ফলে একালে গণপ্রতিরক্ষার আলোকে সৈনিকতা, সেনাবাহিনী, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন ভাবে ভাববার দরকার আছে, একাট্টা সৈনিকতা, সামরিকতা বা প্রতিরক্ষার চিন্তাকে গৌণ করে ভাবার কোন উপায় নাই। একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি শুধু অর্থনৈতিক শক্তির জোরে টিকে থাকে না, একালে কেউই বিশ্বাস ভরে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বিরোধী কোন ধারণা গ্রহণ করতে পারে না। সেটা হবে কঠিন বাস্তবতায় পা না নামিয়ে হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানো।

    কারণ, কঠিন দিকটা হল, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষার শক্তির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। তাকে আলাদা করারা কোন উপায় নাই। প্রদত্ত বাস্তবতায় ভারতের মতো একটা রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যতই সক্ষম ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে, তার প্রভাবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্তরে ষ্ট্রাটেজিক চিন্তা ভাবনায় বদল ঘটাতেই হবে বা ঘটবে। আর এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণভাবে সামরিক সক্ষমতায় সমৃদ্ধ হতেই হবে। সামরিক খরচ বাড়াতে হবে, নইলে ছাগলে সব মুড়ে খাবে। সামরিক ব্যয়টা আবার এমন জিনিষ যা নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকেই হতে হবে, বাণিজ্যিক বিষয়ের মত এজন্য বিদেশি লোন পাওয়া যাবে না। এছাড়া অস্ত্রের সোর্স কে হবে মনমত তা খুঁজে পাবার সমস্যা তো আছে। তবে বড় জোর কিস্তিতে অস্ত্রের মুল্য পরিশোধ করার সুবিধার চেষ্টা করা যেতে পারে। ফলে পুরা বিষয়টা হল, একদিকে সামরিক সক্ষমতা যেমন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সমৃদ্ধির উপর নির্ভর করে আবার ঐ অর্থনীতিকে প্রটেক্ট করার জন্যই সামরিক সক্ষমতা জরুরি।
    ব্লু ওয়াটার বলে একটা ধারণা আছে। এর অর্থ হল, নিজ রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে সমুদ্রে আমার পণ্যবাহী জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারার সুযোগ থাকবে কি না। থাকলে তা আমার জন্য ব্লু ওয়াটার। যদি না থাকে, কেউ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় যদি বাধা সৃষ্টি করে তা মোকাবিলার উপায় বের করার সামরিক সক্ষমতা অর্জন একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। ফলে নিজ সামরিক সক্ষমতা বা ব্যয় বাড়াব কি বাড়াব না সেটা কোন রাষ্ট্রের সুবোধ ইচ্ছাধীন ব্যাপার নয়। আবার সামরিক সক্ষমতা থাকা মানেই অস্ত্র হাতে সবাইকে দাবড়ে বেড়ানোও না। সেটা বিশুদ্ধ মাস্তানি হতে পারে, যার কোন রাষ্ট্রিক বা অর্থনৈতিক তাৎপর্য নাই। কারও সাথে নিজের বা পারস্পরিক স্বার্থ প্রসঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে চলে যাওয়া সবসময়ই যে কোন রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক। কিন্তু টেবিলে বসে আলোচনা করার সময় আমার পকেটে যে পিস্তল আছে সেটা জানিয়ে পকেট উচা করে রাখলে আমার গলার স্বর একরকম গুরুত্ব পাবে আর না থাকলে স্বর অন্য রকম হবে। হয়ত কথা গুরুত্বই পাবে না, পাত্তা পাবে না। এই খুটিনাটি দিক থেকে চিন্তা করলে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেই আমরা সামরিক ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারব।
    ভারতের এসব সাধারণ হুঁশজ্ঞান সবসময়ই ছিল, না থাকার কোন কারণ নাই। কিন্তু সেই সাথে নেহেরুর আমল থেকে ভারতের একটা নীতি হল, ইন্ড্রাস্টিয়াল পণ্য বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানি না করে বরং সরবরাহ কোম্পানীর সাথে ভারতীয় কোম্পানীর যৌথ উদ্যোগে লোকালি ঐ পণ্য বানানোর কারখানা করা। ভারতের জনসংখ্যা বড় ফলে বাজারও বড় বলে এই ধরণের নীতি সফল হয়েছে কমবেশি। কিন্তু অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম উড়োজাহাজ নৌজাহাজ সংগ্রহ করার বেলায় একই নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ভারতের অসফলতা সীমাহীন। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনান্ট জেনারের বিনয় শংকর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখেছেন, “দেশের ভেতরে অস্ত্রশস্ত্র তৈয়ারিতে ক্ষেত্রে ভারতকে আরও দক্ষ হতে হবে। বিনয় শংকরের নিবন্ধ থেকে বোঝা যায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা– বিশেষত অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম তৈয়ারির ক্ষেত্রে ভারত নিজে সফল হয় নি। এখনও দেশটি পরনির্ভর। এই বাস্তবতা ভারতের বিদেশ নীতির ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য”। এগুলো হাইটেক বলে শুরুতে ভারতের পরিকল্পনা ছিল স্পেয়ার পার্টস তৈরি আর এসেম্বল দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে পুরা জিনিষটা তৈরির দিকে যাওয়া হবে। আর সে অনুপাতে তৈরি পণ্য আমদানি কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু তা ঘটে নাই। অসফলতার কারণ বিবিধ। ভারতীয় স্টিলের কোয়ালিটি, অথবা ম্যানেজমেন্টের অক্ষমতা, সামরিক বিষয়ক সবকিছুই সরকারি মালিকানাধীন কারখানা প্রতিষ্ঠান বলে ইত্যাদির অদক্ষতাসহ জানা অজানা সম্ভাব্য কারণ যাই হোক – শেষ কথায় ভারতের সামরিক সরঞ্জাম স্থানীয় ভাবে উৎপাদনের প্রজেক্ট ফেল করেছে।
    একথার আরও প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার ঐ একই রিপোর্টে থেকে। রিপোর্ট বলছে, “The problem is with technology, quality as well as cost and delivery schedules”। গত ৩০ মার্চ ২০১৩ প্রভাবশালী ইকোনমিষ্ট একই বিষয়ে আলোকপাত করে বলছে, “The defence ministry is chronically short of military expertise”। ভারতে সামরিক হার্ডওয়ার সংগ্রহ ও অর্জনের দুর্বলতার বিষয়টা নীতি বিষয়ক কাগজপত্রে সামরিক খাতে “আত্মনির্ভরতা” বা “সেলফ রিলায়েন্স” শব্দে আলোচনা করা হয়। গত বছর ১৪ মে ২০১৩ দি হিন্দু পত্রিকা লিখছে, “The government has finally started taking small steps to change procurement policy but what is required is to free it from the inefficient public sector”। অর্থাৎ অদক্ষ সরকারি মালিকানাধীন সামরিক উৎপাদক কারখানাগুলোকে সব সমস্যার গোড়া মনে করছে। এছাড়া কোন সামরিক কারখানায় আগে ২৬% পর্যন্ত বিদেশি মালিকানা থাকতে পারত যা বাড়িয়ে ২০১৩ সালে ৪৯% করাতে এটাকে সামরিক হার্ডওয়ার সংগ্রহ বা প্রকিউরমেন্ট নীতিতে খুবই “সামান্য পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করছে। সামরিক উতপাদন খাতে “আত্মনির্ভরতার” বুলির ভারে ভারতের সামরিক সক্ষমতা কিভাবে ধুঁকছে তা ধারণা করা যায় এসব রিপোর্ট থেকে।
    সামরিক উড়োজাহাজ আকাশেই দুর্ঘটনায় পড়া অথবা সাবমেরিন নিজেই মৃত্যুকুপ হয়ে উঠায় এগুলো ইতোমধ্যেই ভারতের বাহিনীর কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে ভারতের এনডিটিভির আলোচনা থেকে জানা যাচ্ছে সেখানে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার ইস্যু হল বাহিনীর পায়ের বুটের অভাব, রাইফেল ও অস্ত্রের বুলেটের অভাব আর বাহিনীর ক্ষোভ।
    না ভারতীয় বাহিনীকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নাই। সেই ভাবনা উস্কে দেওয়াও বাতুলতা। বরং সমস্যার মাত্রার গভীরতা এখান থেকে বুঝতে হবে। অর্থাৎ হাইটেক বিষয়াদি থেকে বুট বুলেট সরবরাহ পর্যন্ত এই অব্যবস্থাপনা বিস্তৃত। ভারতের সামরিক সক্ষমতার দুর্দশার গভীরতার চিত্র এগুলো। অর্থাৎ ভারতের জন্য এটা স্রেফ বিদেশ থেকে সামরিক সহযোগিতা পেলেই হচ্ছে না বরং কেমনভাবে সে সহযোগিতা নিব সে প্রশ্নও বটে।
    আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আইডিওলজি বা অন্যকিছুর যতোই ভিন্নতা বা বিরোধ থাকুক, সারা দুনিয়া একই গ্লোবাল পুজিতন্ত্রের অন্তর্গত হয়ে, পরস্পরের সাথে পরস্পর গভীর থেকে গভীরতর নির্ভরশীলতায় পুঁজির চলন ও বিচলনের সুত্রে বিনিময় লেনদেনে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। নতুন এই বাস্তবতায় তাই সহসাই রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধ বড় আকারে যুদ্ধের দিকে মোড় নেবে এমন সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। এমনকি চীন-আমেরিকা অথবা চীন-ভারতের ক্ষেত্রেও এটা সত্য। যদিও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম রাখবার চেষ্টা অবশ্য অব্যাহত রাখবে।
    তবু এক সিনারিও ধরে নেয়া যাক। যদি দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধের পরিস্থিতি হাজির হয়ে যায় এই কল্পনায়, ভারতের সাথে স্বার্থবিরোধে সম্ভাব্য যেসব রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ হতে পারে সে তালিকায় এক নম্বরে যে থাকবে, যার সাথে যুদ্ধে ইজ্জত রক্ষা করা বা অন্তত ইজ্জতের সাথে যার মুখোমুখি দাড়ানোটা সম্ভবত সম্ভব এবং খুবই জরুরি সেই রাষ্ট্র হল চীন। তাতে সে বাস্তবতায় চিন-ভারত সম্পর্ক গভীর সহযোগিতামূলক কোন গ্লোবাল এলায়েন্সে যুক্ত থাকুক আর না থাকুক অথবা আজকের মত সম্পর্কে থাকুক – এখন এটাই বাস্তবতা। আগামি দু-তিন যুগেও এই অবস্থার সহসা বদল হবে না।
    এই পরিস্থিতিতে ভারতের অস্ত্র সরঞ্জাম পাবার নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্য প্রধান উৎস আমেরিকা এমন ইমাজিনেশনের বাইরে অন্য কিছু কল্পনা করাও ভারতের সংশ্লিষ্ট লোকেদের জন্য খুব সহজ নয়। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে মোদী জাপানের সাথে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে চীনের বিনিয়োগ হাসিল করেছেন। ফলে বাণিজ্যিক বা অর্থনীতিমূলক গভীর সম্পর্ক চিনের সাথে ভারতের অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সামরিক সহযোগিতার দিকটা নয়। অস্ত্র, অস্ত্রের টেকনোলজি, হাইটেক ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভারত চীনের ওপর নির্ভর থাকবে না, কিম্বা হতে পারবে না বা থাকতে চাইবেও না। আগামিতে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সামরিক সক্ষমতার যে প্রয়োজন দেখা দিবে তাতে কোন সামরিক সহযোগিতার বিষয় চীনের সাথে ঘটা অসম্ভব। কারণ সামরিক সংঘাত চীনের সাথে ঘটবার সম্ভাবনা থাকায় সেই চীনের সাথেই আবার ভারতের সামরিক সহযোগিতা হবার সম্ভাবনা সেটা নাকচ করে। সামরিক ইস্যুর এই বাস্তবতার দিকটার জন্য ভারতের রাজনৈতিক দল, নেতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যুক্ত যে কেউই আমেরিকান সহযোগিতা পাবার আশা ত্যাগ করে অন্য কিছু ভাবতে পারে না। তাদের লোভের জায়গাটা এখানে। ফলে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা – এটাই আমেরিকার কাছে ভারতীয়দের মনোবাসনা। মোদিরও বটে।
    কিন্তু এই কামনা পূরণে ভারত কতদুর আমেরিকার কাছে ধরা দিতে পারে? কামনা পূরণের বিনিময়ে ভারত আমেরিকার কাছে নিজের কোন স্বার্থ এবং কতটা ছাড় দেয়া সঠিক গণ্য করবে। এই মাত্রা নির্ণয়ও ভারতের জন্য খুবই জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। আজ অথবা সামনে আমেরিকান নেতৃত্বের পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডারটা আর চলতে পারবে না, তা ভেঙ্গে না পড়লেও ঢলে পড়া শুরু হয়েছে। আলামত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর বিকল্প চ্যালেঞ্জকারি সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব হতে শুরু করে দিয়েছে। আগামি গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠানগুলো আকার নেয়া শুরু করে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যত দেরিতে ভারত যোগ দিবে, যতই (covenant) উদ্যোক্তা হতে দ্বিধা করবে, নানান কৌশলে এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করবে, এসব প্রতিষ্ঠানগুলো জন্ম নেবার গতি কমিয়ে রুদ্ধ করতে অংশ নিয়েও ক্রমাগত ওজর আপত্তি তুলে দেরি করাবে অথবা অংশগ্রহণই করবে না ততই ওসব প্রতিষ্ঠানে শুরুর দিকে আকার নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা কমে যাবে বা থাকবেই না। সেটা হবে ভারতের জন্য বিশাল এক পার্মানেন্ট ক্ষতি।
    যেমন BRICS ব্যাংকের জন্মের লক্ষ্যে প্রথম সামিট হয় ২০০৯ সালে। কিন্তু সদস্যদের বিশেষত ভারতের নানান ওজর আপত্তিতে এখনও এটা কাতরাচ্ছে। স্পষ্ট বাস্তব আকার নিতে পারে নাই। আপাতভাবে ভারত আছে ভিতরে কিন্তু গতি কমানোর ভুমিকায়। বিপরীতে AIIB এর ক্ষেত্রে, আইডিয়াটা চীন প্রকাশ বা হাজির করেছে মাত্র গত বছর অক্টোবরে ২০১৩ তে, আর এবছরই তা আকার নিয়ে ফেলেছে। BRICS গড়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি দেখে এটা চীনের বিকল্প পথ বা পালটা চাপ ও ক্ষমতা দেখানোর ব্যবস্থা। ভারতও AIIB তে অন্তর্ভুক্ত না থেকে পারে নাই। আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস ০৯ অক্টোবর ২০১৪ এব্যাপারে একটা বিশ্বস্ত সুত্রের খবর ছেপেছে। অনুবাদ করে বললে তা হল, AIIB এর বিষয়ে, “চিনা উদ্যোগের সাথে সম্ভাবনায় ইচ্ছুক পার্টনার যারা তাদের সাথে নিরবে ঢিলেঢালা আলাপের পরিবর্তে এই ব্যাংকের বিরুদ্ধে আমেরিকান কর্মকর্তারা সচরাচর আশা করা হয় না এমন প্রত্যয়ের সাথে ব্যাংক প্রজেক্ট যাতে ঝুলে যায় সেজন্য প্রচার ও বুঝানোর কাজে নেমে পড়েছে – সিনিয়র আমেরিকান কর্মকর্তা ও অন্যান্য সরকারের প্রতিনিধিদের তরফে এটা জানা গেছে”।

    এই রিপোর্টের এক সপ্তাহ আগে মোদী পাঁচ দিনের আমেরিকা সফরে ছিলেন। এর প্রথম তিনদিন কাটিয়েছেন নিইয়র্কে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলির মিটিংসহ কাজে, শেষের দুদিন মূলত ছিল ওয়াশিংটনে সফর, ওবামার সাথে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে। দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর মধ্যে ক্রুসিয়াল ছিল বিগত দশ বছরের সামরিক চুক্তির নবায়ন। যেটা স্বাক্ষর হয়েছিল ২০০৫ সালে, শেষ হচ্ছে আগামি বছর। মোদী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় আসীন হবার পর ইতোমধ্যে গত বছর আগষ্টে আমেরিকার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা চাক হেগেলের ভারত সফর করেছিলেন। সে সময়ে ঐ চুক্তি আরও দশ বছর নবায়ন করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে উভয়ে একমত প্রকাশ করেছিলেন। মোদী-ওবামা বৈঠকে এতে কি কি বিষয় নতুন যুক্ত হবে বা বাদ পড়বে, বদলাবে এসব খুটিনাটির ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের খসড়া তৈরির কাজ চলছে তা নিয়ে কথা আগিয়ে নেয়া হয়। ভারতের সামরিক সংগ্রহ ও ক্রয়ের ৩০ ভাগ নিজেরা করতে পারে, বাকিটা আমদানি। আবার সামরিক হার্ডওয়ারের নির্ভরতার ৭০ ভাগই উৎস রাশিয়া। বাকি ৩০ ভাগে মূলত আমেরিকা, তবে ফ্রান্সও আছে। এছাড়া গত দশ বছরে আমেরিকার সাথে ডিফেন্স প্যাক্টের আওতায় মোট ১০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ঘটেছে। আর ভারী কিছু তুলে বহন করার হেলিকপ্টার ও এট্যাক হেলিকপ্টার এবং এন্টি-ট্যাংক মিশাইলের সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ক্রয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
    কিন্তু এপর্যন্ত এগুলোতে ভারতে স্থানীয়ভাবে যৌথ উৎপাদন, যৌথ উন্নয়ন ও ডিজাইন কাজ অথবা টেকনোলজি হস্তান্তর বিষয়ক কোন কিছুই ঘটেন, যেটা গত চুক্তি অনুসারে হবার কথাছিল। এছাড়া গত চুক্তির আগে যদিও কোন যৌথ মালিকানা সামরিক প্রজেক্টে ২৬ ভাগ বিদেশি মালিকানায় করার আইনি সম্মতি আগে দেয়া ছিল সেটা সম্প্রতি ৪৯ ভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।এসব এসত্ত্বেও তা ঘটেনি। এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগই নেয়া হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ভারতের আইবিএনলাইভ ওয়েবসাইট থেকে। অর্থাৎ ভারতের আমেরিকার কাছ থেকে কাম্য বহু কিছুই পাওয়া হয়নি, ফলে ভারত আকাঙ্খী। আবার উপরে চিনের AIIB ব্যাংক এর বিষয়ে, সম্ভাব্য রাষ্ট্রগুলোকে এর উদ্যোক্তা সদস্য হওয়া ঠেকাতে আমেরিকার মরিয়া প্রচেষ্টা সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে তাতে মিডিয়া জগতে এই অনুমান শুরু হয়েছে যে ওবামা-মোদীর আলোচনায় ওবামা মোদীকে AIIB এবং BRICS ধরণের উদ্যোগে সামিল হতে নিরুৎসাহ হবার শর্ত না হলেও পরামর্শ রেখেছিলেন। শর্ত এই অর্থে যে আমেরিকার সাথে হবু সামরিক চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফাইনালি কি দাঁড়াবে, কি কি অন্তর্ভুক্ত হবে তা সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে কতটা কি থাকবে এরই বিনিময় শর্ত। যদিও টাইমসের রিপোর্টে কোন কোন রাষ্ট্রকে কান ফুসলানি দিয়ে AIIB থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে কিন্তু ওসব রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট নাম দেয়া হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ব্যাংক বিষয়ে “China’s potential partners” এবং আমেরিকার “important allies” এদেরকে – এভাবে। যদিও অন্যান্য কিছু মিডিয়া রিপোর্টে দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অষ্ট্রেলিয়ার নাম সুনিদিষ্ট করে এসেছে। এদের মধ্যে প্রথম দুদেশ AIIB এর উদ্যোক্তা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণই করেনি। আর অষ্ট্রেলিয়াও অনুপস্থিত ছিল তবে পরের মাসে আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছে। ওবামা মোদীকে যাই বলে থাকুক তবু ভারত পরের মাসে ২৪ অক্টোবর ২০১৪ AIIB এর উদ্বোধনে গিয়েছে এবং উদ্যোক্তা সদস্য হয়ে স্বাক্ষর করেছে। তবে ওবামা-মোদীর আলোচনায় AIIB এবং BRICS প্রসঙ্গটা কিভাবে এসেছে তা জানতে একাডেমিক ও মিডিয়া লেভেলে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। ওবামা মোদীকে শর্ত অথবা পরামর্শ যাই দিয়ে থাকুক অথবা না AIIB বিষয়টা এমনই যে BRICS ব্যাংকের মত গতি কমানোর ভুমিকা নেবার সুযোগ ভারতের এখানে নাই। শুধু তাই না আমেরিকার কাছ থেকে সামরিক সহযোগিতা পাবার লোভে ভারত AIIB তে যোগ না দিলে ভারতেরই আবার অন্য নগদ কিছু স্বার্থ হারাবার সম্ভাবনা আছে। কারণ AIIB তে অংশগ্রহণকারির সংখ্যা এবং তাদের আগ্রহ আর সর্বোপরি এশিয়াতে অবকাঠামো খাতে ঋণ প্রাপ্তির চাহিদার ৯০ ভাগই ঘাটতি আছে, অর্থাত পুরণ হয় নাই। এশিয়ায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবির হাত দিয়ে প্রাপ্য যোগ্য ঋণ বা প্রতিষ্ঠান দুটোর ঋণ বিতরণ সক্ষমতা এদের সদস্য দেশগুলোর চাহিদার দশভাগের একভাগ মাত্র। অর্থাৎ কাড়াকাড়ি ধরণের ঘাটতি আছে এখানে।
    এশিয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবকাঠামোগত ঋণের চাহিদা কত এ বিষয়ে এডিবির এক ষ্টাডি বলছে আগামি আট বছরের প্রজেকশন অনুযায়ী এর মোট চাহিদা বছরে এক ট্রিলিয়ন করে। তাই ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চলতি প্রেসিডেন্ট কিম এই পরিস্থিতিকে “massive need” বলে উল্লেখ করে AIIB এর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার থাকতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক বা কোন রাষ্ট্রস্বার্থের প্রত্যক্ষ পক্ষে দাড়াতে চান নাই। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ম্যান্ডেট অনুসারে এর কর্মিদের কোন মন্তব্যে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে্র ক্ষেত্রে সরাসরি কোন রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে অথবা এর রাজনৈতিক বিষয়াদিতে জড়িত হতে নিষেধ করা আছে। এই অর্থে পেশাদার কথাটা পড়তে হবে। অতএব সারকথা দাড়াল আমেরিকার ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, এশিয়া চীনের উদ্যোগের AIIB এর আগমনকে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থে স্বাগত জানায়। যদিও ওবামার আমলা প্রশাসন ২৪ অক্টোবর AIIB এর উদ্যোক্তা সদস্য সামিট শেষ হবার পর নিজেদের জন্য এক সান্ত্বনা বাক্য প্রকাশ করেছে। বলছে, এশিয়ায় ভারত ছাড়া বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো AIIB তে যোগ দেয় নাই। যেসব রাষ্ট্র যোগ দিয়েছে তাদের সংখ্যা ২২ আর সর্বসাকুল্ল্যে এদের ঋণ চাহিদা পুরণ করতেই ৫০ বিলিয়ন ডলার যথেষ্ট বলেই চীন AIIB তে ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করেছে। অর্থাৎ এটা যেন তাদের ভাঙড়ি দেবার কুটনৈতিক তৎপরতা সফল। কিন্তু এশিয়ায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবির মিলিত ঋণ বিতরণের ফান্ডের থলেটা বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের। এর তুলনায় চীনের একা ৫০ বিলিয়ন কম নয়। এছাড়া এরচেয়ে বড় কথা এই সংখ্যাটা চীনের সামর্থের প্রকাশ নয়। বরং বলা যায় এটা ঋণ নিতে আগ্রহিরা তাদের চাহিদা মিটাতে কেমন এগিয়ে আসে তা দেখার। ফলে এটা প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি। কারণ চীনের সক্ষমতা এখনকার দুনিয়ার যে কোন রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। এছাড়া AIIB ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে এর বীজ-পুঁজি সরবরাহের উৎস হবার ক্ষমতা অর্থাৎ উদ্বৃত্ব অর্থনীতির কোন রাষ্ট্র আছে এই প্রশ্নে চীন অপ্রতিদ্বন্দ্বি, একচেটিয়া। এক হিসাবে দেখা যায় AIIB বা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান (অর্থাৎ বাণিজ্যিক বাজার মুনাফার প্রজেক্ট নয়) গড়তে এই মুহুর্তে চীনের বিনিয়োগের ক্ষমতা তিন ট্রিলিয়ন ডলারের মত। অতএব এখানে আলোচ্য প্রসঙ্গের জন্য মুলকথা হল AIIB তে যোগ না দিলে বা গরিমসি করলে অবকাঠামো ঋণ গ্রহিতা হিসাবে ভারতেরই ক্ষতি। ফলে এখানে ভারতের (covenant) উদ্যোক্তা হতে দ্বিধা দেখানোরও সুযোগ নাই। বরং এখানে নিজ অর্থনীতির সাইজ হিসাবে চীনের পরেই দ্বিতীয় ষ্টেকহোল্ডারের গুরুত্ত্ব থাকায় সে অনুযায়ী AIIB তে প্রভাব সে রাখতে পারবে, যা না নিলে সে সুযোগ হারাবে। অনুমান করা যায় এসব বিবেচনা থেকে ওবামা যাই বলে থাকুক ভারত বিনাবাক্যে কোন মিডিয়া নিউজ তৈরি না করেই AIIB তে যোগদান করেছে।

    এবিষয়ে আর একটা উদাহরণ হলঃ অষ্ট্রেলিয়া। আমেরিকার কাছে ভারতের তুলনায় অনেক কাছের রাষ্ট্র অষ্ট্রেলিয়া, সাউথ-ইষ্ট এশিয়ার জগতে অস্ট্রেলিয়া সবার আগেই আমেরিকার এশিয়া নীতির পক্ষে পতাকা তুলে আছে, দেশটি আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার। চীনকে প্রাথমিক কথা দিয়েও সে আমেরিকার প্ররোচনায় AIIB তে উদ্যোক্তা সদস্য না হতে সে খোঁড়া অজুহাত তুলেছিল যে সে অপেক্ষা করে দেখতে চায় এই প্রতিষ্ঠানটা স্বচ্ছ হয় কি না। আর তা নিয়ে অষ্ট্রেলিয়ার আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড বিতর্কের মুখে এবং AIIB সামিট শেষে পরের সপ্তাহে চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক ফ্রি ট্রেড চুক্তি স্বাক্ষরের পর আর দ্বিধা টিকাতে পারে নাই। এখন সদস্য হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আসলে এমন কিছু অবজেক্টিভ বাস্তবতা তৈরি হয় যেটা কোন একটা রাষ্ট্র অন্য সব রাষ্ট্রের উপরে অধিক সুবিধা পেয়ে যায়। এমন ক্ষমতা পড়ে পাওয়া বাস্তবতা হিসাবে আসে যেটা অন্য কেউ চাইলেই অস্বীকার করতে পারে না। যেমন ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় ডলারকে আইএমএফের এর একমাত্র আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা ছাড়া অন্য সদস্য রাষ্ট্র কারও উপায় ছিল না। ফ্রান্স তবু আপত্তি তোলার বা এড়ানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু টিকাতে পারে নাই। কারণ বিশ্বযুদ্ধের সেকালে নিজ অর্থনীতির ব্যালেন্সশীটে উদ্বৃত্ব অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল একমাত্র আমেরিকা। আর বিপরীতে উদ্বৃত্ব দূরে থাক আমেরিকার কাছে ক্যাশ ও কাইন্ডের ঋণে ও অনুদানে আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিল এককালের কলোনি সাম্রাজ্য রুস্তম-রাষ্ট্রগুলো বৃটেন, ফ্রান্সসহ সবাই। কমবেশি তেমনই “উদ্বৃত্বের” বাস্তবতায় এখন আমেরিকায় জায়গায় চীন হাজির হয়েছে। চীনের এমন উদ্বৃত্ব এখন তিন ট্রিলিয়ন ডলার।

    ভারতের দিক থেকে দেখলে, চীনের এই “উদ্বৃত্ত্ব বাস্তবতার” পরিস্থিতির প্রভাব আরও প্রায় সব জায়গায় পড়ছে। যেমন BRICS অথবা করিডর কেন্দ্রিক BCIM এর গঠনে। এখানে চীনের সাথে সে নিজেকে সমমর্যাদা ও সমগুরুত্ত্বের স্বার্থের সদস্য হিসাবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রশ্নে যে বিনিয়োগ আবার বাণিজ্যিক বাজার মুনাফা ধরণের বিনিয়োগ নয় অর্থাৎ এই বিনিয়োগে সুদ ফিরে আসবে খুবই কম ১% এর নীচে, এমন বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে সে কোনভাবেই তুলনীয় নয়। বরং সে ঐ বিনিয়োগের গ্রহিতা দেশ, দাতা নয়। এই বাস্তবতায় চীন কেন বেশি বিনিয়োগের সক্ষমতার জোরে কোনও কোনও বিষয়ে সবার চেয়ে উপরে থাকবে এগিয়ে থাকবে এসব প্রশ্ন তুলে লাভ নাই, এমনকি ঈর্ষা করেও লাভ নাই। তবে চীনের সাথে কোন উদ্যোগে জড়িয়ে গিয়ে তাতে নিজের মারাত্মক বা পার্মানেন্ট ক্ষতি যেন না হয় অথবা ভবিষ্যতে বড় কোন সমস্যায় না পড়ে এগুলো দেখে বুঝে নেবার, নিশ্চিত করার দরকার আছে। কিন্তু সেগুলোও বুঝে নেবার অন্য মেকানিজম বের করতে হবে। কিন্তু নিজের বিনিয়োগ সক্ষমতার মাপে BRICS প্রতিষ্ঠানে সবার সমান বিনিয়োগের মাপ-মাত্রা হতে হবে এমন আবদার ধরে বসে থাকলে BRICS প্রতিষ্ঠান এমন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে থেকে যাবে, গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন ক্ষুদ্র প্রভাবের প্রতিষ্ঠান হবে যে তা জন্ম হওয়া আর না হওয়ার কোন ফারাক থাকবে না। BRICS প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্দেশ্যই এখানে মাটি হয়ে যাবে। একই ধরণের সমস্যা হচ্ছে আর থমকে দাঁড়িয়ে আছে করিডর কেন্দ্রিক BCIM এর গঠন। এসব নিয়ে আরও বিস্তারে এদিক আবার ফিরে আসব পরের কিস্তির লেখায়। এছাড়াও মোদীর “অর্থনীতি” মুল ফোকাস নীতি এটা কিভাবে প্রথম চার মাস জুন-সেপ্টেম্বর মোদী পার করল সেদিকে কথা আগাতে হবে। পরের কিস্তিতে যাব সেদিক নিয়ে।
    এখন চলতি কিস্তির সারাংশ হল, একদিকে চীনের শক্তি “উদ্বৃত্ত্ব বিনিয়োগ ক্ষমতা” এই বাস্তবতার ক্ষমতা অন্যদিকে আমেরিকার কাছে থেকে ভারতের কাম্য সামরিক সহযোগিতা ইস্যুগুলো আদায়; এই দুইয়ের টানাপোরেনেতে সামরিক চাহিদার কামনা পূরণ করতে বিনিময়ে ভারত আমেরিকার কাছে নিজের কোন স্বার্থ এবং কতটা ছাড় দেয়া সঠিক হবে – এই মাত্রা নির্ণয়ও ভারতের জন্য একটা খুবই জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। এটা ভারতের দিক থেকে চীনের প্রতি রাগ বা ঈর্ষা করে আমেরিকার দিকে হাটা দিবার মত সিম্পল নয়। আর আজ অথবা কাল গ্লোবাল অর্থনীতিতে আসন্ন নতুন অর্ডার কেবল সাধারণভাবে সারা দুনিয়ার আগামি ভবিষ্যত বলে শুধু সেটাই নয়, রাইজিং ইকোনমির ভারতের কাছেও এটা আরও গুরুত্বপুর্ণ, কারণ ভারতের নিজ অর্থনীতিরও ভবিষ্যতও এটা। আমেরিকার প্ররোচনায় চীন ঠেকানোতে ভারতের মেতে উঠার খেলার সোজা মানে হবে – ঢলে পড়া পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাকে জোর করে আয়ু দেয়া। আর নতুনের আগমনকে দেরি করিয়ে দেয়া মানে নিজের রাইজিং ইকোনমির ভবিষ্যতের পায়ে কুড়াল মারা। রাইজিং ইকোনমি কথাটার অর্থ তখনই মেলে ধরে ফুটে উঠতে পারে যখন এর অর্থ পুরান অর্ডারের স্বাভাবিক বিনাশ আর নতুন অর্ডারের মধ্যে নিজের প্রভাবের জায়গাগুলো যতটা সম্ভব তা নিশ্চিত করা। গ্লোবাল অর্থনীতির অবজেকটিভ ট্রেন্ড এটাই। আবার তা এমন নয় যে ভারত চাইলেই রুপান্তরের এই ট্রেন্ডকে থামিয়ে দিতে পারে বা গতি কমাতে পারে। বরং ঢলে পড়ছে বলেই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং, নইলে নয়। এটা আমরা যেন ভুলে না যাই। আবার এর অর্থ দিকবিদিক হারিয়ে চীনের কোলে ঝাপিয়ে পড়াও নয়। ভারতের এখন এই সুক্ষ্ম দড়ির উপর দিয়ে সামলিয়ে এক ব্যালেন্সিং এক্টে করে আমেরিকা-চীনের সাথে সম্পর্কে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করে এগিয়ে যাওয়ার সময়। কিন্তু সেক্ষেত্রে একটাই বিবেচ্য গ্লোবাল অর্থনীতির অবজেকটিভ ট্রেন্ড, পুরান অর্ডারটার ঢলে পড়া এটাকে স্বাভাবিক রাখা, নতুন আয়ু না দেওয়া। এই বিষয়টা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। বিশেষ করে ভারতের পো ধরা বাংলাদেশ, আর পো ধরার সুবিধা দিলে সে বাংলাদেশর কোন বিশেষ দলকে ক্ষমতায় রাখবে এভাবে বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টাও অসফল হবে। সেক্ষেত্রে ভারতের অর্থনীতি ডুববে, আর সেই সাথে বাংলাদেশও। পরের কিস্তিতে দেখা হবে।

    [একই শিরোনামে লেখাটা ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েবে। সে লেখা এখানে আবার অনেক জায়গায় আপডেট ও এডিট করে ছাপা হল।]

  • বিজেপির নাকি মোদীর সমর্থন, কোন দিকে

    বিজেপির নাকি মোদীর সমর্থন, কোন দিকে

    গৌতম দাস

    ১০ জানুয়ারি ২০১৫।
    গত ০২ জানুয়ারি ২০১৫ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির এক নেতা তথাগত রায় বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের এক ধর্মীয়-সামাজিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে এসে বক্তৃতায় বলেছেন, “বিজেপি সরকার উপলব্ধি করেছে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেওয়া উচিত এবং সেই কাজটি তারা করেছে। এটা আমি আপনাদের নিশ্চিত করেই বলতে পারি” – -প্রথম আলো ২ জানুয়ারি ২০১৫। এখানে সমর্থন মানে কি? বিগত কংগ্রেস সরকারের মত ও মাত্রায়? বিগত কংগ্রেস সরকার যেভাবে বাংলাদেশে পছন্দের সরকারের থাকার ব্যাপারে মরিয়া হয়েছিলেন অথবা ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগের মাসে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যেমন ঐ নির্বাচনের ব্যাপারে মরিয়া অবস্থান নিয়েছিলেন তেমন? এই প্রশ্নটা নিয়ে নাড়াচাড়া করব।

    প্রথমত, আমার মনে হয়, বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বক্তব্য সংক্রান্ত এই খবরটা নিশ্চিত খবর বা মোদী সরকারের অবস্থান হিসাবে নিতে আমাদের আরও দুচারদিন অপেক্ষা করা সঠিক হবে। কারণ হাসিনা ও মোদী সরকারের সম্পর্কের মধ্যে এমন কোন ফরমাল বা দৃশ্যমান প্রকাশ কিছু দেখা যায় নাই যা থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে মোদী কংগ্রেসের মতন ও মাত্রায় হাসিনার সমর্থক হয়ে উঠছেন। বিজেপির নেতা তথাগত রায়ের পরিচয় তিনি বিজেপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি। অর্থাৎ তিনি মোদীর বিজেপি সরকারের ঠিক কেউ নন অথবা এই বিষয়ে কথা বলার সরকারি মুখপাত্র ধরণেরও কেউ নন। তিনি নিজে এটা দাবিও করেন নাই। এমনকি এব্যাপারে তিনি যে সতর্ক তা জানাতে তিনি ওখানে বলছেন, “যদিও ভারত একটি দেশ। তারা আরেকটি দেশের সঙ্গে কাজ করবে এটি স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে বিজেপি নেতা হিসেবে আমার বলা উচিত না, তার পরও আমি আপনাদের জানাতে চাই…………” । একই বিষয়ে দৈনিক মানবজমিন বলছে, “আমি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে এটা বলতে পারি না। আমরা একটি দেশের সঙ্গে দেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি। তবে বাংলাদেশের বিষয়টা ভিন্ন। আপনাদের (উপস্থিতদের উদ্দেশে) বোঝার জন্য বলছি”। অর্থাৎ তিনি মূলত বলছেন, সরকারি প্রতিনিধি তিনি নন ফলে আইনী দিক আর তাছাড়া কুটনৈতিক দিক থেকে কথাটা তার বলা উচিত না। এদিকটায় তিনি সচেতন তবু তাঁর অনুমিত একটা “সত্য” কথা তিনি আমাদের জানাচ্ছেন। অর্থাৎ এতটুকু নিশ্চিত বলা যায় খবরটা কেন্দ্রীয় বিজেপি দলের হয়ত কিন্তু মোদীর সরকারের নিশ্চিত অবস্থান হিসাবে না নিয়ে বরং তা নিশ্চিত হতে আমাদের অপেক্ষা করাই উচিত হবে। অপেক্ষা বললাম এজন্য যে অনুমান করি, এখন বাংলাদেশের অনেক পত্রিকারই “কলকাতা প্রতিনিধি” বা “দিল্লি প্রতিনিধি” আছে। ফলে দুচারদিনের মধ্যে উতসাহী তাদের কেউ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদী বা নুন্যতম তাঁর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আকবরউদ্দিনের কাছে সরাসরি জিজ্ঞাসা করে আমাদের জন্য খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে আনবেন।

    দ্বিতীয় কারণ
    অপেক্ষা করতে চাওয়া বা নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার আরও কারণ আছে। এমন দ্বিতীয় ও তৃতীয় এভাবে আরও দুটো কারণ এখানে বলব। দ্বিতীয় কারণটা এককথায় বললে, ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিন্যাস পরিস্থিতিতে এক গুরুত্বপুর্ণ বদল ঘটেছে। সেই পটভুমির মধ্যে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় কারণটা বলব। বিগত পাঁচ বছরে একনাগাড়ে কিন্তু ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন এক রাজনৈতিক বিন্যাস বা পোলারাইজেশন বিরাট তাতপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। গত বছর ২০১৪ সালের ভারতের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের (যেটার ফলাফলে মোদী প্রধানমন্ত্রী) সময়ে থেকে এর এক চুড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে। আর আগামি ২০১৬ সালের মে মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচন। কিন্তু এর সাথে বাংলাদেশের কি সম্পর্ক তা বুঝতে একটু বিস্তারে যেতে হবে। সেই পোলারাইজেশনের তাতপর্য না বুঝলে বাংলাদেশের সাথে এই প্রাদেশিক নির্বাচনের সম্পর্ক সবটা বুঝা যাবে না। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভিতরের রাজনৈতিক গঠন বিন্যাস প্রসঙ্গে আগে একটু বিস্তারে যাব।
    আগামি ২০১৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তখন বাংলাদেশের সরকারে যেই থাক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ নামটা নানা উছিলায় বারবার উচ্চারিত হতে থাকবে। আমি পশ্চিমবঙ্গ বলেছি ভারত বলি নাই। এই নির্বাচনে নির্ধারক ঘটনা হল, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের ২৮% ভোটার মুসলমান। এই তথ্য এখন খুবই নির্ধারক এক তথ্য। ইতোমধ্যেই এই মুসলমান ভোটারদের ব্যাপক অংশ ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমুল কংগ্রেসের ভোটার সমর্থক হয়ে নতুন এক সমীকরণে একাত্ম হয়েছেন। আগে ১৯৪৭ সালের পর থেকে এরা প্রথমে কংগ্রেসের ভোটার, আরও পরে আশির দশক থেকে সিপিএমের ভোটার পরিচয়ে এতদিন ছিল। ইতোমধ্যেই তারা মমতার তৃণমুল কংগ্রেসের পক্ষে একচেটিয়া পোলারাইজ হয়েছে্ন। আগের কংগ্রেস অথবা সিপিএমের ভোটার থাকায় সময় এরা উভয় ক্ষেত্রে “সেকুলার” ভোটার হয়ে ছিল। অর্থাৎ সেকুলার পরিচয় তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সঠিক অবস্থান ভাবতেন। কিন্তু এখন মমতা তাদেরকে “তারা যা তাই”, অর্থাৎ “সাচার কমিটি রিপোর্টের” ভাষায় অবহেলিত এবং মুসলমান পরিচয়েই গ্রহণ করেছেন। ভারতের বিশ্লেষকেরা বলে থাকেন, ২০০৬ সালের শেষে প্রকাশিত ভারতের মুসলমানদের দুরাবস্থা বিষয়ক যে ডিটেল সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, “সাচার কমিটি রিপোর্ট” নামে যা পরিচিত, এটা প্রকাশিত হবার পর থেকে ধীরে ধীরে এর প্রভাব পড়তে থাকে পশ্চিমবঙ্গের ভোট ও ক্ষমতার প্যাটার্ণে। ঘটনার প্রভাবের প্রথম দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে ২০১১ সালে; যখন বিগত ৩৪ বছর ধরে একনাগাড়ে আসীন সিপিএমের বামফ্রন্ট সরকার প্রাদেশিক বিধানসভার নির্বাচনে মমতার তৃণমুলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। বিধানসভা ২০১১ এর ফলাফলে মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৮৪ আসন একাই মমতার পক্ষে যায়। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হন। মুসলমান ভোটারদের সাথে মমতার এলায়েন্স তখনও তেমন পোক্ত হয় নাই। কিন্তু মমতা মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে ভোটার ভাগিয়ে আনার শুধু তাঁর মুখের প্রতিশ্রুতি নয়, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের যেসব সামাজিক আইনী বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোর সাথে ক্ষমতায় আসা মমতার সরকারের দেয়ানেয়া রফাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এর প্রকাশ হিসাবে মমতা রাজ্যসভায় মুসলমান ভোটারদের নেতা প্রতিনিধি হিসাবে মোহম্মদ হোসেন ইমরানকে মনোনীত করে পাঠান। ভারতের পার্লামেন্ট লোকসভা আর প্রাদেশিক বিধানসভার সমন্বয়ে আরও একটা আইন প্রনয়নী প্রতিষ্ঠান হল রাজ্যসভা। রাজ্যসভার সদস্য প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। প্রত্যেক প্রাদেশিক সরকারের রাজ্যসভায় সদস্য মনোনয়ন দেয়ার কোটা থাকে। মুসলমান ভোটারদের সাথে মমতার এই এলায়েন্সের গড়ে নেবার পরে এই এলায়েন্সের তাতপর্যের চরম প্রকাশ ঘটে গত বছর ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনে। নির্বাচনের ফলাফলে লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়া মোট ৪২টা আসনের ৩৪টাই একা মমতা দখল করে। যেটা আগের ২০০৯ সালের নির্বাচনে ছিল মাত্র ২০ আসন। যদি মনে রাখি ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের মোদী-ঝড় বা জ্বরের কথা যেখানে প্রায় সব আঞ্চলিক দল উড়ে ধরাশায়ী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই ঝড়েও উলটা মাত্র দুটো আঞ্চলিক দল, তামিলনাডুতে (মাদ্রাজ) এক আঞ্চলিক দল এবং কলকাতায় তৃণমুল, আগের চেয়ে আরও বড় সংখ্যাগরিষ্টতার আসন সমর্থন নিয়ে টিকে গিয়েছিল। মমতা টিকে যাওয়ার প্রধান কারণ বলা হয় তিনি মুসলমান ভোটারদের সাথে আগেই এলায়েন্স পোক্ত করে ফেলেছিলেন তাই।
    ওদিকে মোদী ঝড়ের গত নির্বাচনের পরে আরও কিছু প্রতিক্রিয়া আছে। ঐ নির্বাচনের সময় থেকে উঠা মোদী-ঝড়ের সুবিধায় বিজেপিও পশ্চিমবঙ্গে তাদের মোট ভোটের শেয়ার বাড়িয়ে আগের ৪% থেকে ১৭% এ নিতে সমর্থ হয়। ভোটার পোলারাইজেশন ট্রেন্ড বিচারে দেখা গেছে, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস এদের সেকুলার ব্লক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তাদের ভোটাররা ছুটছে তৃণমুলের দিকে। আর এই ছুটাছুটিতে আবার বিজেপি ভোট বেড়েছে সম্ভবত মোদীর দেখানো অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্নের কারণে। ফলে এখন আগামি পশ্চিমবঙ্গ ২০১৬ প্রাদেশিক নির্বাচনে ক্ষমতা পেতে বিজেপি প্রচন্ডভাবে আকাঙ্খী ও আগ্রাসী দল হয়ে উঠেছে। তাই আগামি ২০১৬ নির্বাচনে “২৮% মুসলমান” এই তথ্যটা প্রধান ফ্যাক্টর ও একে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে, দলগুলো নিজের নির্বাচন কৌশল সাজানো শুরু হয়ে গেছে। কারণ সবাই বুঝে গেছে “২৮% মুসলমান” ভোটারের বাক্স এখন মমতা যেটা সহজে বদল হচ্ছে না। ফলে বাকি হিন্দু ও অন্যান্য ৭২% ভোটার ভাগ হবে তৃণমুল, বিজেপি, বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের মধ্যে। ফলে “মুসলমান” শব্দটা ইতোমধ্যেই মমতার সাথে গাটছাড়া বেধে ফেলেছে, আর বাকি বিরোধী বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেসের কাছে আক্রমনের শব্দ মুসলমান, আর শব্দটা টেনেটুনে এর আরও নতুন অনেক অর্থ হচ্ছে যেমন – “জঙ্গী”, “অনুপ্রবেশকারি”, “জামাত”, “বাংলাদেশী” ইত্যাদি। এককথায় এই শব্দগুলোর সুত্রে বাংলাদেশ নামটা বহু বিচিত্রভাবে আ্সা শুরু হয়েছে। এসবের সারকথা, এগুলো পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটারদের মমতার দিকে পোল বদলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রতিক্রিয়া। আর এসব নির্বাচনী প্রপাগান্ডার ট্যাগ আমাদের উপরেও নানান উতপাত নিয়ে আসছে।
    বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে, আমরা এখন মোদী-হাসিনার সম্পর্ক কেমন সে বিষয়ে এই চারটা দল যে যখন যেভাবে বললে নিজের নির্বাচনী কৌশলের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজে লাগে সেভাবেই নানান ব্যাখ্যা দিতে দেখতে পাচ্ছি, আগামিতে আরও পাব। বিজেপি নেতা তথাগত রায় বাংলাদেশে এসে যে বয়ান দিয়েছেন তা এই আলোকে দেখাই বুদ্ধিমানের হবে। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে এই বক্তব্যগুলো সত্য-আধাসত্য-মিথ্যা যাই হোক এগুলো মুলত একেবারেই পশ্চিমবঙ্গের দলগুলোর আঞ্চলিক নির্বাচনী স্বার্থমূলক বক্তব্য, তাও আবার একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক বয়ান। কোনমতেই এই রেঠরিকগুলোকে মোদীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ভারত সরকারের বৃহত্তর স্বার্থ বয়ান নয়, ফলে আমাদের জন্য সেভাবে দেখাও হবে মারাত্মক ভুল।

    তৃতীয় কারণ
    তৃতীয়ত, নরেন্দ্র মোদী তাঁর সরকার ও বিজেপি দলের মধ্যে ব্যবহারিক একটা সুক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ফারাক বজায় রাখতে চান। এনিয়ে গত ২০১৪ নির্বাচনের প্রচারণা চলার সময় থেকেই তিনি মিডিয়াতে ধারণা দিয়ে আসছেন। এখন বাস্তবেও এর প্রমাণ রেখেছেন। যেমন, কেন্দ্রীয় বিজেপির সভাপতি অমিত শাহকে কলকাতার আগামি ২০১৬ নির্বাচনে দলকে জিতিয়ে আনার প্রকাশ্য এসাইমেন্ট সঁপেছেন মোদী। কলকাতায় দলকে জিতানোর জন্য মমতার চরম বিরোধী হয়ে সর্ববিধ কৌশল ঠিক করবেন তিনি একক দায়িত্বে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী আবার সেই মমতার সাথেই সখ্যতার এক ওয়ার্কেবল সম্পর্ক রেখে চলবেন, চলতে চান। অর্থাৎ বিজেপি দলের প্রাদেশিক স্বার্থ আর কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থ, কর্মকাঠামোর মধ্যে এমন একটা ব্যবহারিক ফারাক তিনি বজায় রাখতে চান। এই হল সরকার ও দলের ফারাক বিষয়ে মোদীর ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গের এসাইমেন্ট কাজে নেমে অমিত শাহ সারদা অর্থ কেলেঙ্কারি ও বর্ধমানের খাগড়াগোড়ে বোমা হামলা নিয়ে, গোয়েন্দা র ও তদন্তকারী সংস্থা NIA কে যতটা সম্ভব ম্যানিপুলেট করে নিজের ষড়যন্ত্র প্রপাগান্ডায় সামিল করেছেন। যতদুর এই কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুল কাজ কেন্দ্রীয় সরকারের বৃহত্তর স্বার্থে পরিচালিত হওয়া তা ক্ষুন্ন না হয়। এমনকি খাগড়াগোড়ে বোমা হামলা নিয়ে বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের সফর করিয়েছেন। অমিত শাহ নিজে নয়, কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আর মোদীর পররাষ্ট্র প্রশাসনের মাধ্যমে হাসিনা সরকার ও তার গোয়েন্দা বাহিনীর সাথে সম্পর্ক করিয়েছেন, সফর বিনিময় করিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে না জড়িয়েই তিনি এটা করাতে পেরেছেন। কারণ ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগ যেকোন প্রাদেশিক ইস্যুতে পররাষ্ট্র বিষয়ে সার্ভিস সহায়তা দিতে পারে। অমিত শাহ বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি হলেও তিনি মোদীর সরকারের কেউ নন, সরাসরি কোন পদে বা মন্ত্রীসভায় তিনি নাই। কিন্তু মোদী এসব বিষয়ে নিজেকে জড়াবেন না, ঐ প্রতিষ্ঠানগুলোও মোদীর বৃহত্তর স্বার্থ নীতির উপর আঁচ-প্রভাব না ফেলে, না ফেলার সীমার মধ্যে থেকে যতদুর সম্ভব অমিত শাহকে সমর্থন দিতে পারে এভাবে কাজ করেছে। যেমন, অমিত শাহ কলকাতার জনসভায় মমতাকে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গী আমদানি করেছেন, সারদা কেলেঙ্কারির অর্থ খাগড়াগোড়ে বোমা হামলায় মমতা ব্যবহার করেছেন – এসব অভিযোগ এনে আক্রমণ করেছেন। সারদা অর্থ কেলেঙ্কারি কথার অর্থ, সারদা হল বাংলাদেশের ডেসটিনির মত এক কোম্পানীর নাম; ফলে ডেসটিনির মতই কলকাতায় প্রকাশ হয়ে সারদার অর্থ কেলেঙ্কারি। মমতাকে সারদা অর্থ কেলেঙ্কারির, “জঙ্গী”, “অনুপ্রবেশকারি”, “জামাত”, “বাংলাদেশী” এসব শব্দে অভিযোগ তুলে পর্যদুস্ত করা অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গে জেতার নির্বাচনী কৌশল, তাই। কিন্তু অমিত শাহ বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি হলেও এগুলো ঠিক আবার মোদী সরকারের বাংলাদেশ নীতিকে প্রতিফলিত করে না। মোদীর কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের বৃহত্তর কেন্দ্রীয় স্বার্থের পক্ষে কাজেই মূলত নিমগ্ন থাকতে চাই। তাই মোদীর সরকারের এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, সারদার অর্থ পাচার আর বোমা হামলা, বাংলাদেশ এগুলোর মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই। কেন্দ্রীয় তদন্ত প্রতিষ্ঠান NIA তারও ফরমাল ফাইন্ডিং রিপোর্টে একই কথা বলেছে। এমনকি তারা রিপোর্টে বাংলাদেশ বা জেএমবির নাম আনে নাই, তবে সন্দেহের পর্যায়ে -খুজে নিশ্চিত হতে হবে ধরণের কিছু কথা সেখানে রেখেছে। অর্থাৎ অমিত শাহের কলকাতার পাবলিক বক্তৃতা যা উভিযোগ তুলেছেন সেকথার সাথে মোদীর মন্ত্রী সামঞ্জস্য রাখে নাই। এই অসামঞ্জস্য নিয়ে মিডিয়ায় কথাও উঠেছে। এখানে নেপথ্যে বলে রাখা যায়, আমাদের অর্থমন্ত্রী সপ্তাহ দুয়েক আগে কলকাতায় বিজনেস চেম্বারের এক সভায় গিয়ে এক কলকাতার সাংবাদিককে বলেছেন, “সারদার টাকা ঘুরপথে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকে সেই অর্থ বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবিকেও দেওয়া হয়েছে – এমন কোন তথ্য মেলেনি”। আর এসব তর্ক থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছেন মোদী তবু কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ম্যানিপুলেট না করে স্বাভাবিক কাজের পক্ষে অবস্থান উপরে রেখেছেন। দলের অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে সে ভিত্তিতে সরকারের বক্তব্য সাজাতে যান নাই। তবে এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল, দল আর সরকারের মধ্যে ফারাক রাখার নীতি মোদীর অনুসরণ করার কারণ ঠিক কোন নৈতিক বা কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যকথার দিক ভেবে নয়। মূল কারণ হল, মোদী সারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকতে চান যেন অভিযোগ না আসে যে তিনি কোন একটা বা দুইটা প্রদেশ বা রাজ্যের দিকে কান্নি মারা প্রধানমন্ত্রী। তিনি গুজরাট বা পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের দিকে কান্নি মারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী – এই পরিচয় তিনি একেবারেই চান না। সেজন্য এই নীতিগত অবস্থান।
    আবার পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সরকারের সাথে চার প্রাদেশিক দল বা শাখা দল -তৃণমুল, বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস এরা সবাই দেখাতে চায় তাদের সম্পর্ক খুবই ভাল এবং স্ব স্ব নির্বাচন কৌশলের পক্ষে বাংলাদেশ আছে। এমনটা দেখানোর একটা সুক্ষ্ম প্রতিযোগিতা সবার আছে। যদিও এই দল চারটার চোখে সবার ইস্যু একটাই, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার। তবে সেখানে তফাত হল, মমতার অবস্থান মুসলমান ভোটারদের পক্ষে আর বাকি তিন দলের বিপক্ষে। যেমন আগামি ফ্রেব্রুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী মমতার আসন্ন বাংলাদেশ সফরে নুমান করি, নিজের নির্বাচন কৌশল কেন্দ্রিক যে ধারণা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দিবেন তা হল, মমতা “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ” বা জঙ্গী অনুপ্রবেশ ঘটছে এই বয়ান মানেন না, বিরোধী তিনি এটা আমাদেরকে বুঝানো। কারণ মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কৌশল হিসাবে বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস কমবেশি এদের সবার অবস্থান মমতার অবস্থানের বিরোধী। আর মমতা বাদে বাকি তিনদল প্রত্যেকের বয়ান কমবেশি – সারদা অর্থ কেলেঙ্কারির, “জঙ্গী”, “অনুপ্রবেশকারি”, “জামাত”, “বাংলাদেশী” এইসব অভিযোগ দিয়ে সাজানো। অনেকে অবাক হতে পারে কিন্তু “সেকুলারিজমের” বড়াই করা দশার কমিউনিষ্ট সিপিএমের বয়ানও কমবেশি এটাই। সিপিএমের বাংলাদেশি কাউন্টার পার্ট হল মেনন-ইনু, মূলত মেননের দল। সেজন্য তারাও হাসিনা সরকারকে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্র বা কাছের সমভাবাপন্ন মনে করে।
    অতএব তৃতীয় এই কারণে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বক্তব্যকে নিশ্চিত মোদী সরকারের অবস্থান বলে সিদ্ধান্তে না গিয়ে আমি তাই অপেক্ষার কথা বলছি।
    সারকথা, আগামি ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক দল বা শাখার বক্তব্যগুলো তাদের নির্বাচনী কৌশলের আলোকে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ঝাপিয়ে পরা যাবে না। তা বোমা হামলা, জঙ্গী “অনুপ্রবেশকারী” অথবা হাসিনাকে সমর্থন এমন যাই ইস্যু হোক। মোদী সরকারের অবস্থান সরাসরি মোদীর মুখ থেকে বা কোন মুখপাত্রের মুখ থেকে শুনলে তবেই তা নিশ্চিত বলে বুঝতে হবে।

    সর্বশেষ অমিত শাহের খালেদাকে ফোন বিষয়ে
    লেখার উপরের এই পর্যন্ত অংশটা লিখে শেষ করেছিলাম ঠিক ৬ জানুয়ারি ভোরবেলায়। প্রকাশ করা হয় নাই। পরে আরও বড় বিস্তারিত করতে চেয়েছিলাম। তাও হয় নাই। আপাতত তাই, কোন আপডেট না করে নোট আকারেই প্রকাশ করলাম। ইতোমধ্যে গতকাল থেকে ঢাকায় অমিত শাহের ফোন বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে।
    উপরের কথাগুলো সাজানোর কাঠামো অনুসারে অমিত শাহের ফোন করা বা না করা যাই হোক তা থেকে একই কারণে এটা মোদী সরকারের অবস্থান হিসাবে নিশ্চিত ধরে নেয়াটা এখনই ঠিক হবে না। কারণ আগেই বলেছি অমিত শাহ মোদী সরকারের কেউ নন, কোন মুখপাত্রও নন। কিন্তু অমিত শাহ ফোন করেছেন অথবা করেন নাই মোদী সরকারের হাসিনার প্রতি মনোভাবে বাংলাদেশের চলমান খালেদা “অবরোধ” প্রেক্ষিতে কি নেতিবাচক হয়ে গেছে? অবশ্য অবশ্য অবশ্যই হয়েছে। কংগ্রেসের মতন করে হাসিনার পক্ষে তো নয়ই বরং ডায়লগ ও নতুন নির্বাচনের পক্ষে মোদীর ভারত সরকার ঘুরতে যাচ্ছে। এই প্রাথমিক ইঙ্গিতকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে, ফলে তা তাতপর্যপুর্ণ মনে করছি – অমিত শাহ এর কথিত ফোনের প্রেক্ষিত থেকে তা নয় বরং বিশেষ কিছু মিডিয়া রিপোর্ট থেকে। যেমন টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে বিএনপির নজরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকার বিষয়ে একই দিনে দুদুটা রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ছাপিয়েছে। এছাড়া টাইমস অব ইন্ডিয়ায় সম্পাদকীয় বিভাগের রুদ্রনীলের ব্লগে লেখা মুল্যায়ন, রুদ্রনীল ঘোষের নিজের নামে বাংলায় প্রায় একই সারকথা মানবজমিন ০৯ জানুয়ারি ২০১৫ পত্রিকার লেখা “রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতা ঘুচাতে এখনই সংলাপ দরকার”। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একই মুল্যায়নের একেবারে সম্পাদকীয় লিখে নিজেরই আগের অবস্থান উলটে দেয়া।
    ভারতে যেসব মিডিয়া বিজেপিকে বেশি কাভারেজ দেয় এদের মধ্যে জি-নিউজ টিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং আনন্দবাজার অন্যতম। বিশেষত গত নির্বাচনের পরে অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে এসাইনমেন্টে আসার পর থেকে আনন্দবাজারের অমিত শাহকে সার্ভিস সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। অমিত শাহ যখন সারদা আর বোমা হামলা নিয়ে নির্বাচনী প্রপাগান্ডায় ঝাপিয়ে পড়লেন তখন থেকে তাঁর প্রধান মিডিয়া হাতিয়ার আনন্দবাজার। সময়ে তা এমন জায়গায় গেছে যে সোর্সছাড়া খবর, গোয়েন্দা সুত্রের নামে চালানো বাপ-মাহীন রিপোর্ট, একেবারে অমিত শাহের মমতা ও বাংলাদেশের অনুপ্রবেশী মুসলমান বা জামাতের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার কার্বন কপিও ছাপা হয়েছে। এই চক্রের ফ্যারে পড়ে সেসব প্রপাগান্ডা আবার বাংলাদেশের প্রথম আলো আনন্দবাজারের সুত্রে ছাপিয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। রিপোর্টের টার্গেট ছিল, মমতার রাজ্যসভার সদস্য ইমরান-সারদা-বর্ধ্মানের বোমা হামলা-জামাত এসব কিছুকে এইসুত্রে গেথে গল্প লেখা। সেই সন্ধ্যায় আওয়ামি ঘরানার তিন টিভি আবার প্রথম আলোর ঐ মিথ্যা রিপোর্টের বরাত দিয়ে খবর প্রচার করেছে। মাত্রাছাড়ানি টের পেয়ে অথবা কোন কারণে প্রথম আলো সে অবস্থান থেকে সরে আসে দুদিন পরে। আর ড্যামেজ কন্টোল ও ব্যালেন্স করতে এবার শুধু ইমরানের পালটা ডিফেন্স বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট ছাপে। উপরে বলেছি এসব প্রপাগান্ডা মোদী সরকারের মন্ত্রী, অনুসন্ধান রিপোর্ট সবাই নাকচ করে দিয়েছে। সেই আনন্দবাজার এবার খোদ সম্পাদকীয় মানে নিজ সম্পাদকীয় অবস্থান ব্যক্ত করেছে। খালেদাকে আটকে রাখার উদ্বেগ, গনতন্ত্রের জন্য উদ্বেগ ইত্যাদি জানিয়ে উলটা হাসিনাকে অভিযুক্ত করে বলছে – এগুলো হাসিনার “কেমন ধরনের গণতন্ত্র?”, এগুলো হাসিনার “প্রতিহিংসার ক্রিয়া”, “অর্থনৈতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িবার আশঙ্কা প্রবল”, “মৌলবাদীরা তাহার সুযোগ লইতে পারে” ইত্যাদি। আনন্দবাজার বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছে, “বিএনপি ও তাহার জোটসঙ্গী জামাতে ইসলামির যৌথ আন্দোলন সহজেই হিংসাত্মক হয়, তাহা সত্য। কিন্তু অতিরিক্ত দমন নীতি জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাহিরে আসার পথটিই রুদ্ধ করিতে পারে, স্বাভাবিক নিষ্ক্রমণের পথ না পাইয়া এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অন্তর্ঘাতেই বিস্ফোরণের পথ খুঁজিবে”। হাসিনাকে দোষী করে তাঁকে নমনীয় হতে বলেছে আর খালেদার আন্দোলন ন্যায্য বলে সাফাই দিয়েছে। আনন্দবাজারের এই অবস্থান পরিবর্তন বিজেপির অমিত শাহের অবস্থান পরিবর্তন বলে মনে করার ইঙ্গিত বলে মনে করার কারণ আছে। তবুও এখনই এটাকে মোদী সরকারের অবস্থান বলে নিশ্চিত বুঝতে দেরি করতে বলব। তবে অবশ্যই এটা প্রাথমিক ইঙ্গিত।

    মোদীর সাথে অমিত শাহ এর সম্পর্ক
    মোদীর সাথে অমিত শাহ এর সম্পর্ক কি কেমন তা জানা থাকলে নজরুল ইসলাম খানের সাক্ষাতকার থেকে আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় পর্যন্ত ঘটনাবলীর আঁকা গ্রাফ থেকে বের হওয়া ইঙ্গিতগুলোর সম্ভবত কিছু তাতপর্য উদ্ধার পাওয়া যেতেও পারে। বলা হয়ে থাকে, রাজনীতিতে রাজনীতিক নেতাকে অনেক ডার্টি-কাজ করার বা ময়লাঘাটার প্রয়োজন অনুভব করতে হয়, যেগুলো খাস প্রমাণ না থাকলেও কানাঘুষায় বা আধাপ্রমাণে তা অপ্রকাশিত থাকে না। ফলে সেসব কাজ এটা মূল নেতা করলে আবার তাঁর ইমেজের বিরাট কাল দাগ লেগে ক্ষতি হয়। সেটা এড়াতে মূল নেতা তা খুব কাছের বিশ্বস্ত একজনকে দিয়ে করিয়ে থাকেন। মোদীর তেমন বিশ্বস্ত লোক হলেন অমিত শাহ। মোদীর প্রথমবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় গুজরাটের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অমিত শাহের উত্থান। আর সর্বশেষ ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের নির্বাচনে একা সবচেয়ে বড়ভাগের আসন সংখ্যা হল ৮০ আসনের রাজ্য, উত্তর প্রদেশ। মোদী সেই উত্তর প্রদেশ জয় করে আনার জন্য গুজরাট থেকে অমিত শাহকে এসাইমেন্ট নায়কের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়ে দেন। অমিত শাহকে তখন কেন্দ্রীয় বিজেপির সেক্রেটারিও করে দেয়া হয় আগে। নির্বাচনের ফলাফলে চমক দেখিয়ে তিনি ৮০ আসনের ৭২ টাই একা বিজেপির পক্ষে আনেন। তবে সেজন্য তার দুর্ধর্ষ নামের সাথে আরও কালি লেগেছিল। এই নির্বাচনের কয়েক মাস আগে উত্তরপ্রদেশের মুজাফফরনগরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগে আদালতের মামলাগুলোতে তিনি আসামি। তাঁর এসাইমেন্টের সফলতার কৌশল বড় অদ্ভুত, সময়ে অবিশ্বাস্য। দাঙ্গার অভিযোগ তার নামে থাকে কিন্তু তিনিই আবার কোন সংখ্যালঘু অথবা জাত-ধারণায় সময়ে কোন উচুজাত অথবা নিচুজাতের কাউকে ঐ স্থান থেকে বিজেপির হয়ে নির্বাচন করিয়ে এবং জিতিয়েও আনতে পারেন। এসব ডার্টি কাজে গুজরাট থেকে উত্তর প্রদেশ পরিক্রমায় তার নামে যতগুলো মামলা আছে এর সব পেন্ডিং আর তিনি জামিনপ্রাপ্ত। গুজরাটের পর থেকে এপর্যন্ত তিনি আর কখনও কোন বিজেপি সরকারে সরকারি পদ নেন নাই, আড়ালে ক্ষমতাধর থেকেছেন। চলতি মোদী সরকারেরও তিনি কেউ নন। তিনিই হলেন এখন কেন্দ্রীয় বিজেপির সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গের ২০১৬ নির্বাচনে দলকে জিতানোর এসাইনমেন্টে মুল দায়িত্বপ্রাপ্ত।
    বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে অমিত শাহ মোদীর হয়ে আগমনী বার্তা দেবার ভুমিকা নিয়ে থাকতে পারেন। অর্থাৎ মোদী এখনই সরকারকে জড়াতে চান না, হয়ত কিছু প্রস্তুতি বাকির কারণে। এমনটা হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে একাজ তাঁর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী এসাইমেন্টের সাথে সম্পর্কিত কিছু নয়। অসম্ভব নয় যে এটা আলাদা এসাইনমেন্ট। অর্থাৎ অমিত শাহ আর মোদীর অবস্থানের এখানে এক হতে পারে। এখানে তিনি মোদীর আগমনী বার্তার বাহক। ফলে এটা দল-সরকারের ফারাকের দিক থেকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। বরং মোদীর আগমনী বার্তা মানে মোদী যে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে যাচ্ছেন তা আগাম জানাচ্ছেন অমিত শাহ এভাবে অনুমান করতে সমস্যা নাই। আপাতত এই পর্যায়ে এটা অনুমান হিসাবেই থাক। তবে বেশিদিন নয়, এমাসের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে সম্ভবত এটা আরও স্পষ্ট পরিস্কার হয়ে সকলের কাছে ধরা দিবে। দেখা যাক।

    লেটেষ্ট আপডেটঃ সকাল, ১৪ জানু ২০১৫

    [ইতোমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন মিডিয়ায় মুখ খুলেছেন, গত পরশু ১২ জানুয়ারি ২০১৫। তাঁর বক্তব্যের অর্থ কি, নতুন কি বললেন আর কি বললেন না তা নিয়ে আমার কিছু মন্তব্য নিচে সংযোজিত করে দেয়া হল।]
    অমিত শাহের টেলিফোন করা না করা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিতর্কিত হয়ে আছে। এর ভিতরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিনের এক বক্তব্য আজ প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়া ছাপিয়েছে। প্রথম আলো বলছে তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের কোনো ভূমিকা নেই, আগামী দিনেও থাকবে না। বাংলাদেশ কিভাবে চলবে তা সে দেশের সরকার ও জনগণই ঠিক করবে”।
    এখন এই বক্তব্য কি অমিত শাহের টেলিফোন করা না করা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্কের কোন অবসান ঘটাল? প্রত্যক্ষভাবে অবশ্যই নয়। দৈনিক যুগান্তর থেকে জানা যাচ্ছে, অমিত শাহ বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেও তিনি এর জবাবে বলেন, “বাংলাদেশে কী ধরনের সমাজ থাকবে, কোন বিষয় প্রাধান্য পাবে, তা ঠিক করে দেওয়ার কেউ ভারত নয়। বাংলাদেশের সরকার ও সে দেশের জনগণই ঠিক করবে কোন সমাজে কীভাবে তারা থাকবে”।
    তাহলে কি দাড়াল?
    তবু অনেকে এই বক্তব্য -অমিত শাহ ফোন করেন নাই – এমন অর্থ বের করার জন্য চেষ্টা করবেন হয়ত। সে চেষ্টা বিফলে যাবে সন্দেহ নাই, আর বিতর্কের অবসানও হবে না। তবে এই বক্তব্য থেকে সবাই মানবেন এমন কিছু সিদ্ধান্তে আসা যায়।
    যেমন, হাসিনার প্রথম পাঁচ বছর আর পরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে যেভাবে দাবি করছিলেন ওর সারকথা ছিল –যা কিছুই হোক তাদের হাসিনাকেই চাই। এমন প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের জায়গায় মোদীর সরকার এখন নাই এটা আকবরউদ্দিন পরিস্কার করেছিলেন। সুজাতা সিং চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে আমাদের মিডিয়াকে সেসময় নিজে দুটো বাক্য বলেছিলেন। এক, নির্বাচন হবার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় হাসিনার এগিয়ে যাওয়া উচিত। দুই, সকলকে নিয়ে নির্বাচনের চেষ্টার বদলে যত বেশি দলকে পারা যায় তাদের নিয়ে নির্বাচনে যাওয়া উচিত। আর ওদিকে এরশাদের সাথে দেখা করে তাঁকে বলেছিলেন, জামাত ক্ষমতায় এসে যাবে সেটা ঠেকাতে এরশাদের নির্বাচনে যাওয়া উচিত। এখন সৈয়দ আকবরউদ্দিন আমাদের বুঝিয়ে দিলেন তিনি কোনভাবেই সুজাতা সিং নন। সুজাতা সিং এখনও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব থাকলেও তিনি আর এখন কংগ্রেসের না মোদীর সরকারের সচিব হয়ে আছেন। একথাটাও সৈয়দ আকবরউদ্দিন প্রচ্ছন্নে আমাদের জানালেন। তবে সুজাতার চক্ষুলজ্জা ফিরে এসেছে কিনা আমরা এখনও জানি না। গত বছর তিনি মোদীর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশ সফরের সময় সঙ্গী হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু মোদী সরকার চান নাই সেই তিনি আবার বাংলাদেশের মিডিয়ার মুখোমুখি হন অথবা সুজাতার পুরান বক্তব্য ঘেঁটে মোদী সরকারকে কোন বিব্রত পরিস্থিতির মুখে ফেলেন। ফলে আমরাও জানতে পারিনি সুজাতা সিংয়ের চক্ষুলজ্জা ফিরেছে কি না। সেই থেকে সৈয়দ আকবরউদ্দিনই মিডিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যু সামলাচ্ছেন। অবশ্য উপরের কথাগুলোর অর্থ এমনও না যে বিড়াল মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ সব রাষ্ট্রই নিজের স্বার্থ, সক্ষমতা আর সুযোগ অনুযায়ী অন্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে। এটা বন্ধ হবার হয়ে গেছে বা যাবে সেকথা এখানে বলা হচ্ছে না। তবে সেটা কূটনৈতিক সীমা, কনভেনশন আর শোভন বা চক্ষুলজ্জা ইত্যাদি সীমায় থেকে অপ্রকাশ্যে চলতেই থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
    সৈয়দ আকবরউদ্দিনের এই বক্তব্য একইসাথে এবছরের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা তথাগত রায়ের বাংলাদেশে এসে দাবি করা বক্তব্যকেও নাকচ করে।
    ওদিকে কলকাতার আনন্দবাজার ১০ জানুয়ারি জানিয়েছে, “বিজেপির মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ এ দিন দিল্লিতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করলেও খালেদাকে তাঁর দলের সভাপতির ফোন করা বা না-করা নিয়ে একটি কথাও বলেননি। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক থেকেও সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দিয়ে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়নি”। এই পরিস্থিতি দেখে আনন্দবাজার নিজে ঐ রিপোর্টের শেষে মন্তব্য করেছে, “তবে কি বিজেপি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না, নাকি বিএনপি-র সঙ্গে ভবিষ্যৎ বোঝাপড়ার পথ খোলা রাখতেই মুখ বন্ধ রাখার কৌশল?”।