Category: Politics

  • চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর

    চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর
    গৌতম দাস

    ১৪ মার্চ ২০১৬, সোমবার
    http://wp.me/p1sCvy-RW

    শিরোনাম দেখে ভুল পড়ছি মনে হতে পারে কিন্তু আসলে ঠিকই পড়েছেন। ভারত ও চীনের সম্পর্ক কেমন, এ প্রসঙ্গে কোনো এভারেজ বা আম ভারতীয়কে বলতে বললে তার মুখ থেকে খুবই তিক্ত বক্তব্য শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বক্তব্য এমন তিক্ত-বিষাক্ত হওয়ার পেছনে দায়ী ভারতের উপস্থিত মিডিয়ার ব্রিফিং। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ আর তা এমন শক্তই। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপারে ভারতের মিডিয়া খুবই অনুগত, যেটাকে একেবারেই বাছবিচারহীন আনক্রিটিক্যাল বলে অনেকের ধারণা। এটা ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন নয়, ফ্যাক্টস। এই সূত্রে অনুমান করা যায়, ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের কৌশলগত অবস্থান সম্মত মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ। ফলে আমরা সর্বক্ষণ শুনতে পাই ভারতের প্রায় সব মিডিয়াই প্রপাগান্ডা করে বলছে- “চীন তাদের চার দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে”। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কি একেবারে ঠিক এ রকমই? সেটা এবার পরীক্ষা করে দেখব।
    কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর অবস্থা ভয় পাওয়া পথিকের মত; যে চলতি পথে  নিজেকেই সাহস যোগানোর জন্য উঁচুস্বরে গান ধরে থাকে। কারণ এভাবে গান ধরলে নিজেকেই দুজন মনে হয়।  “চীন আমাদের ভারতকে এভাবে অথবা সেভাবে ঘিরে ফেলছে” এই নিয়মিত প্রচারের সাথে এই পত্রিকা সম্প্রতি এবার আরো খবর ছড়াচ্ছে- ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন বা মিয়ানমার- এই রাষ্ট্রগুলো ভারতের সাথে নৌ-সামরিক নানান তৎপরতা বা চুক্তিতে যুক্ত হচ্ছে ইত্যাদি। খবরগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে আস্থার প্রপাগান্ডায় নেয়ার মতো করে সাজানো, সন্দেহ নেই। তবে উপরে যে দেশগুলোর নাম নিলাম, এদের মধ্যে কমন দিকটি হল, এরা বেশির ভাগই চীনের পড়শি রাষ্ট্র। সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশের এবং চীন থেকে সমুদ্রপথে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চীনের একমাত্র প্রবেশদ্বার দক্ষিণ চীন সাগর। প্রবেশমুখের চারপাশের প্রায় সব পড়শি-রাষ্ট্রের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্ক বিরোধ শুরু হয়ে আছে, চলছে দু-তিন বছর ধরে। এর ফলে চীনের পড়শি-রাষ্ট্রগুলোর ক্ষোভ-অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নেতা হয়ে সার্ভিস দিতে চায়, এমন ধারণা হাজির করলে অর্থনীতিতে উঠতি চীনের বিপরীতে পড়তি আমেরিকার এ অঞ্চলে কৌশলগত দাম-গুরুত্ব বাড়বে বলে মনে করে সে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরে এটা একটা টেনশন জাগানোর কারণ। এছাড়াও এমন টেনশন জেগে ওঠার পেছনের আরও কারণ এই সাগরে এমন সাতটি দ্বীপ আছে, যেগুলো জেগে ওঠার পথে বা উঠেই গেছে; চীন যার সবগুলোই নিজের বলে দাবি করে আসছে এবং ইতোমধ্যেই সব দ্বীপে কম-বেশি স্থাপনা গেড়েছে। এ ছাড়াও এই সাগরের নিচে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর। অপর দিকে আবার জ্বালানি তেলের উৎস মধ্যপ্রাচ্য এলাকা আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত চীনে প্রবেশের এই অঞ্চল প্রসঙ্গে পরিসংখ্যান বলছে, এখানে বছরে সব মিলিয়ে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য বা পণ্য জাহাজের চলাচল হয়ে থাকে। তাই চীন চায় এই এলাকাকে নিজের মুক্তাঞ্চল হিসেবে দেখতে। চীনের চোখে ভারত বা আমেরিকা- এদের নিজ রাষ্ট্রীয় সীমানার আশপাশের অঞ্চল এটা নয়। ফলে এই অঞ্চল এ দুই রাষ্ট্রের সরাসরি নিজেদের প্রত্যক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট, এমন নয়। তবুও আমেরিকা ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ নামের এক তত্ত্ব আউড়িয়ে এ এলাকার সবখানেই নিজের অবাধ চলাচলের অধিকার ফলাতে চায়। এর বিপরীতে চীনের স্পষ্ট আপত্তি ও অবস্থান হল, নিজ সমুদ্রসীমানার ১২ মাইলের মধ্যে কেউ প্রবেশ করলে বা উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করলে তাকে চীন সামরিকভাবে প্রতিরোধ করবেই। কারণ চীনের যুক্তি, এই ১২ মাইল নিজের ‘একান্ত অঞ্চল’ বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এ ছাড়া চীনের ব্যাখ্যায় এটা খুবই সেনসেটিভ এলাকা এ জন্য যে, নিজ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এখানে ফ্রিডম অব নেভিগেশন যুক্তিতে প্রবেশ করে আমেরিকার ফ্রিডম টেস্ট করতে চাওয়া খুবই বিপজ্জনক। কারণ, আমেরিকা ভুলচুকে ও অনিচ্ছায় ১২ মাইলের ভেতরে প্রবেশ করে ফেললে প্রতিক্রিয়ায় চীনের আমেরিকাকে আক্রমণ করে বসতে হতে পারে। কারণ, এখানে স্থাপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন আর তুলনায় দূরত্ব মাত্র ১২ মাইল।
    ওইদিকে আমেরিকা শুধু চীনের পড়শিদের নেতা হতে চায় তাই নয়, সে চায় ভারতও এ কাজে একইভাবে আমেরিকার পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিক।
    কথা শুরু করেছিলাম দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে ভারত-চীন সম্পর্কের চেয়েও পেছনের আরো বড় ক্যানভাস ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যকার সামরিক টেনশন কেমন, তা নিয়ে। এ কথা দুনিয়ার কেউ অস্বীকার করবেন না যে, এমন সামরিক টেনশনের কোনোই বাস্তবতা নেই, তা নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কখনো কোনো অছিলায় সামরিক সঙ্ঘাত লেগেই যায়, তবে সম্ভাব্য সেই বাস্তবতা হবে ভারত-চীনের সীমান্তে অচিহ্নিত থেকে যাওয়া বেশ কিছু অংশের কারণে। যদিও ভারত-চীন দু’পক্ষই বিষয়টি নিয়ে কোনো টেনশন যেন না বাড়ে, সে লক্ষ্যে যৌথ মাপামাপি আর ডায়লগের ভেতর দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলতে চায়। এমন যৌথ ইচ্ছা প্রকাশ করে বিগত কংগ্রেস সরকারের আমলে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইতোমধ্যেই একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দু’পক্ষের নির্বাহী প্রধানের ঘোষিত স্থায়ী প্রতিনিধি পর্যায়ে সরাসরি এ নিয়ে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের কাজ চলছে। এ ছাড়াও কখনো আকস্মিক কোনো ঘটনায় এবং অনিচ্ছায়ও কোনো সামরিক টেনশন যেন ছড়িয়ে না পড়ে সে লক্ষে মাঠপর্যায়ে হটলাইন টেলিফোন যোগাযোগ সুবিধা চালু করা হয়েছে ওই চুক্তির ফলে। স্বভাবতই এসবের অর্থ উভয় পক্ষ এ ধরনের এক সীমান্ত সমঝোতা চুক্তি করতে আগ্রহবোধ করেছিল আগে থেকেই। এই আগ্রহবোধের তাগিদ অনুভবকে কেবল একটা দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব; সেটা হল উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিরাট সম্ভাবনা আছে, যেটা দু’পক্ষই স্বীকার করে ও কাজে লাগাতে চায়। বিগত ১২ বছরে বিশাল পণ্য লেনদেন বিনিময়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে, যার মোট পরিমাণ এখন ৭০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

    আগ্রহবোধ বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তার করে বলা যায়। যেমন প্রথমত, দু’টি রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে সামরিক-অসামরিক কোনো টেনশন থাকলেই তা আমাদের মনে পুরনো ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় ছেয়ে থাকা আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ঠাণ্ডাযুদ্ধ’ বা ‘কোল্ডওয়ার’ দিয়ে তা বুঝতে হবে এই অভ্যাস একেবারে বাদ দিতে হবে। বরং পরামর্শ থাকবে, ঠাণ্ডাযুদ্ধ দিয়ে কোন কিছুকে বুঝার মানসিকতা আমরা জীবনেও চিরতরে যেন ত্যাগ করি, এদিয়ে আর যেন কোনো কিছুকে বুঝার চেষ্টা না করি। কারণ, ইতোমধ্যেই এমন এক বড় ফারাক এখানে ঘটে গেছে, যাতে কোল্ডওয়ার ধরনের শর্ত-পরিস্থিতি দুনিয়ায় আর কখনো কোথাও ফিরে আসবে না। বরং আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করতে পারি যে, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো একই কমন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের মধ্যকার সম্পর্কিত দুই অর্থনীতি ছিল না। আরো সোজা ভাষায় বললে সে সময়ে এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পারস্পরিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কই ছিল না, বরং প্যারালাল এমন দুটো জোটের অর্থনীতি হয়ে তারা তখন চালু ছিল, যাদের মধ্যে আবার কোনো বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন নাই। ফলে পরস্পরের মধ্যে সহজেই এমন শত্রুতা কল্পনা করা খুবই সম্ভব ছিল যে, পরস্পর পরস্পরকে অবলীলায় দুনিয়া থেকে নির্মূল করার কথা ভাবতে পারে এবং তাতে একজন অপরজনকে নাই করে দিলেও পারস্পরিক কোনো পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্ক নেই বলে এতে বেঁচে থাকা অপর রাষ্ট্রপক্ষের অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধে বিরোধীকে নির্মূল করার মতো যেকোনো চরম পর্যায়ে নেয়ার বাস্তবতা ও সুযোগ তখনো ছিল। কিছু আজ সারা দুনিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের সাথে যতই স্বার্থবিরোধ থাক, তারা আবার সবাই একই গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হয়ে পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত সম্পর্কিত হয়ে আছে। এটাই সবচেয়ে প্রভাবশালী বাস্তবতা। ফলে এখানে রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধ প্রবল আছে এবং তা থাকলেও কিন্তু সে বিরোধকে কোনো চরম দিকে নেয়ার সুযোগ নেই। ফলে বিরোধকে বরং নির্মূল বা চরমে না নিয়ে, এই পথ ছাড়া অন্য আর যেকোনো পথ অবলম্বন করে বিরোধ লড়াইয়ের মীমাংসা খুঁজে নেয়াই মঙ্গল। কারণ, এখন অন্যের নির্মূল মানে নিজেরও বিরাট ক্ষতি। অতএব, একদম সারকথায় ভারতের মিডিয়া যতই তারস্বরে চিৎকার করুক যে ‘চীন ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলল’ তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের মধ্যে এমন সীমান্ত সমঝোতা চুক্তির পক্ষে উভয় রাষ্ট্র আগ্রহ দেখাতে পারা সম্ভব। এবং সেটাই হয়েছে।
    কিন্তু ২০১৩ সালের শেষে ওই চুক্তির পরও এখন “চীন ভারতকে মুক্তামালার মত চার দিক থেকে ঘিরে ফেলছে” ভারতের এই প্রপাগান্ডায় কোনো ভাটা পড়েনি। এটাকে ভারতের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মিডিয়া প্রসঙ্গে কৌশলগত অবস্থান বলে মনে করা যেতে পারে। এছাড়াও এর পেছনে আর দু’টি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে: এক. সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে তুলনায় চীনের থেকে ভারত পিছিয়ে আছে। অস্ত্রের ও বাহিনীর সক্ষমতা বিষয়টি যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির সক্ষমতার বা মুরোদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, সামরিক ব্যয় জোগানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলে তবেই তা ওই রাষ্ট্রের অস্ত্র ও বাহিনী মজুদের সক্ষমতা হিসেবে হাজির হতে পারে। এই বিচারে ভারত চীনের চেয়ে পিছিয়ে আছে; ভারত তুলনায় ছোট অর্থনীতির বলে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও যেটুকু ব্যয় জোগানোর সামর্থ্য ভারতের হাতে আছে, তার সমতুল্য অস্ত্রশস্ত্র কেনা বা উৎপাদন করতে পারার সক্ষমতার দেখানোর ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক’ বেশ কিছু ঘাটতি ভারতের আছে। এসব সমস্যা ঢেলে সাজানোর জন্য সময়ে ভারতের মিডিয়ায় তা খোলাখুলি আলোচনাও হতে দেখা গেছে। এসব সমস্যা ভারত দ্রুত আপ্রাণ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে এই অবস্থায় প্রপাগান্ডা দিয়ে অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখার উদ্যোগ এটা হতে পারে। আর পয়েন্ট দুই. ১৯৬২ সালে নেহরু আমলে চীন-ভারত এক প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হয়েছিল, যে যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় হার ভারতের কাছে ট্রমার মতো এখনো মানসিক বিষয় হয়ে আছে বলে মনে করা হয়। যেটা একালে সামরিক সক্ষমতা এখন অর্জনে থাকলে বা তৈরি হলেও নিজের ওপর আস্থা বিষয়ক এক খচখচি থেকেই যায় ধরনের। এ ছাড়া সবার উপরে, মিডিয়ার সব কিছুকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে দেখার এক প্রপাগান্ডা তো আছেই। যার পরিণতিতে সব আলোচনায় হয়ে যায় যেন দুই ছাপোষা কেরানির রাস্তার ধারে বসে টংয়ের চা দোকানের আলাপ; যারা জাহাজের খবরাখবর নিয়েও আলাপ করছে, রাজা-উজির মারছে এসব। আনন্দবাজার পত্রিকার খবর উপস্থাপনে এই ভাষা ও ইঙ্গিত দিয়ে লেখা হয়। সম্ভবত তারা মনে করে, এটাই সাধারণ মানুষকে বোঝানোর ভাষা, তরল করে লেখার ভাষা। নিজের পক্ষে ন্যায্যতা টানার উপায় হিসেবে তারা হয়তো এমন বলবে, কিন্তু তবু এটা অন্যায্য যুক্তি তাই তা অপ্রতিষ্ঠিতই থেকে যাবে।
    আমেরিকা চায় ভারতও আমেরিকার মতো ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ এর অধিকার টেস্ট করতে আমেরিকার সাথে যৌথভাবে এ অঞ্চলে টহল দিতে এগিয়ে আসুক। এ কাজে আমেরিকা ভারতকে উসকানিমূলক প্রস্তাব দিয়েছিল। সম্প্রতি গত ১০ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে এ কথাই ছেপেছে। রয়টার্স বলছে, ‘আমেরিকা চায় তার আঞ্চলিক বন্ধুরা সবাই চীনের বিরুদ্ধে এমন জোট অবস্থান নিক। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।’ ভারতীয় নেভাল মুখপাত্র রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে জানিয়েছে, ‘ভারতের নীতি হলো অন্য রাষ্ট্রের সাথে একই ফ্ল্যাগ-কমান্ডের অধীনে কোনো যৌথ টহলে ভারতের অংশ না নেয়া। ভারত এখন পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘ ছাড়া অন্য কোথাও কোনো ভিনরাষ্ট্রের সাথে যৌথ টহলে অংশ নেয়নি; না নেয়ার ভারতের এই নীতিতেই সে এখনো অটল আছে।’ এখানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার মনের গোপন খায়েশ প্রকাশিত হয়েছে- এটাই চীনের বক্তব্য। এ নিয়ে চীনের সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয়ক পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ বেশ কয়েকটা লেখা ছেপেছে। ভারত-আমেরিকা-চীন এই ট্রয়কার পারস্পরিক সম্পর্কের দিক নিয়ে আরো কিছু বক্তব্যও সেখানে হাজির করেছে। চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নামাতে রাজি করানোর আমেরিকান খায়েশ মার খাওয়াতেই চীনের মুখে এই বোল ফুটেছে এমন মনে করা অসঙ্গত হবে না। গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘নিজের অর্থনীতিক বিকাশ-উন্নতির স্বার্থ এবং চীনের সাথে মিলে ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগে ভারতের স্বার্থের দিক থেকে ভাবলে ভারতের কাছে চীন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলের আমেরিকান প্রস্তাবের পাল্লায় পড়ার বিলাসিতা করতে গিয়ে ভারত চীনা সহযোগিতা হারাতে পারে না।’ কথা সত্যি। ভারতের দিক থেকে কথাটির মূল বিষয়- ভারতের কাছে প্রায়রিটি কোনটি। ভারত সঠিকভাবেই ধরেছে, সময়টা এখন পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ভেঙে আমেরিকার বদলে চীনা নেতৃত্বের সাথে মিলে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার সাজিয়ে তোলা। দুনিয়াকে নতুন করে নেতৃত্ব দেয়া। সাজিয়ে ওঠার এই কাজে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ স্পষ্টতই নতুন অর্ডার, নতুন নেতৃত্বের সাথেই। ফলে পুরনো অর্ডারে নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ চীনের সাথে নতুন অর্থনৈতিক অর্ডার গড়ার কাজেই। এ প্রসঙ্গে আমার আগের লেখায় অনেক সময় এই অবস্থানই ব্যক্ত করেছি বটে বিষয়টি নিয়ে এর আগে কখনোই ভারত, আমেরিকা বা চীন কেউ কখনো স্পষ্ট করে মুখফুটে কিছু বলেনি। ভারতও স্পষ্ট না করে বরং আমেরিকাকে এক মিথ্যা ভানের মধ্যে রেখে ফায়দা নেবার চেষ্টা করে গেছে। যেমন আমেরিকান নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্টের ব্যাংক গড়তে গিয়ে এর গঠনকাঠামো রচনা করার সময় চীনের পরে দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার ভারতের হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সম্মতি পেতে ভারতের কোনো অসুবিধাই হয়নি। এবং সম্ভবত সেজন্য এই প্রথম চীনের দিক থেকে গ্লোবাল টাইমস ব্যাপারটিকে পরিষ্কার বাক্য লিখে বলেছে, ‘… ভারত চীনের সহযোগিতা-সম্পর্ক, সমর্থন হারানোর কথা ভাবতেই পারে না।’ বিষয়টির গুরুত্ব লক্ষ করে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাও ১ মার্চ সংখ্যায় চীনের গ্লোবাল টাইমসকে উদ্ধৃত করে এক রিপোর্ট ছেপেছে। এর প্রথম বাক্য হলো, ‘বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলে অংশ নিয়ে চীনের সমর্থন হারানো ভারতের পোষাবে না।’

    [লেখাটা এর আগে ৭ মার্চ ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে এখন আপডেট করে ছাপান হল। ]
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বিচারকের ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা

    রাষ্ট্রের কারও বিচার করা মানে কীঃ
    ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা করা
    গৌতম দাস
    ০৭ মার্চ ২০১৬, সোমবার
    http://wp.me/p1sCvy-LB

    অবশেষে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ)  ছাত্রসংসদের নেতা কানহাইয়া কুমারকে ভারতের আদালত জামিন দিয়েছে। তিনি এখন মুক্ত। দেশদ্রোহ মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসের নয় তারিখ থেকে তিনি গ্রেফতার ছিলেন। ভারতের মিডিয়া এতদিন জেএনইউ আর কানহাইয়া শব্দে  তাদের পাতা ভরিয়ে রেখেছিল। সে উত্তেজনা সীমান্ত ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও এসে পড়েছিল।  আবেগ শুণ্য হয়ে বিষয়টা একটু রিভিউ করার এবার সম্ভবত সময় হয়েছে।

    মুল ঘটনার সংক্ষেপ হল, ২০০১ সালে ডিসেম্বরে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে এক সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছিল। অনুমান করা হয় কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাজ এটা। পাঁচজন হামলাকারীসহ মোট ১৪ জন ওই হামলায় নিহত হন। পরে ওই হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অন্য অনেকের সাথে এক আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। আদালতের রায়ে তার ফাঁসির আদেশ হয়। কিন্তু ওই আদেশ সঙ্গোপনে বাস্তবায়ন করা হয় এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলখানার ভেতরেই তাকে কবর দেয়া হয়েছিল। ফাঁসি্র দড়িটানার দিনক্ষণ কবে কখন তা স্ত্রী, পরিবার, আত্মীয়স্বজন কাউকেই আগে জানানো হয়নি। তবে ফাঁসি কার্যকর করার পরের দিন সকালে তা সকলকে জানানো হয়। আর জনরোষের ভয়ে আফজাল গুরুর লাশ স্ত্রী,পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে কখনই দেয়া হয়নি। এমনকি জেলে আফজালের ব্যবহার্য জিনিসপত্রও কখনই ফেরত দেয়া হয়নি। তার বিচার সঠিক হয়নি, ত্রুটিপূর্ণ ইত্যাদি অভিযোগ সে সময়ই উঠেছিল; কিন্তু সেগুলো সুরাহা না করেই ফাঁসি দেয়া হয়েছিল- ভারতের জনসমাজের কোথাও কোথাও এমন অনুমান এখনও বজায় আছে।

    রাজনৈতিক কমিউনিটি তৈরি করে না নিলে বিচ্ছিন্নতাবাদ আসে
    ভারত এক এককাট্টা ভুখন্ড এক রাষ্ট্র, আজ বেশির ভাগের মানুষের মনে ধারণাটা এমন। যদিও খোদ বৃটিশ আমলেও তা এককাট্টা বৃটিশ-ইন্ডিয়া রাষ্ট্র ছিল না। ছিল তিন প্রেসিডেন্সী (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বে) আর প্রায় ৫৫০ টার মত ছোট-বড় নানান করদ রাজ্য বা প্রিন্সলি স্টেট – এই সবকিছু মিলিয়ে কালেকটিভ ভুখন্ডটাকে বৃটিশ-ইন্ডিয়া বলা হত। অবশ্য সময়ে নানান এলাকাকে প্রশাসনিকভাবে প্রদেশও ঘোষণা করা হয়েছিল। এককথায় বললে, অন্ততপক্ষে আজ ভারত যেমন নানান রাজ্যে সীমানায় (সর্বশেষ সম্ভবত ২৯টা) বিভক্ত, সেরকম কোন রাজ্য বা সীমানা ধারণা তখন ছিল না। এই সীমানা টানা হয়েছে ১৯৪৭ সালের পরের সময়ে বিভিন্ন রাজার রাজ্য একেক রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অথবা বিচ্ছিন্ন করে। তাহলে দাড়াল, বৃটিশ-ইন্ডিয়ার পুরা প্রায় ২০০ বছর ভারত বলতে কোন ইন্টিগ্রেটেড বা সম্মনিতভাবে অন্তর্ভুক্ত কোন ভুখন্ডকে বুঝান হত না। বৃটিশ-ইন্ডিয়ার পরিসমাপ্তিতে ১৯৪৭ সালে ইউনিয়ন রাষ্ট্র বা ইউনাইটেড ভারত বলে একটা কিছু খাড়া করা হয়েছিল বটে কিন্তু তা করা হয়েছিল উপাদান হিসাবে একমাত্র বলপ্রয়োগকে ব্যবহার করে, সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে। আর কোন উপাদানের কথা ভাবাও হয় নাই, উপস্থিত ছিলও না। তবে এক উপাদানের কথা বলা যেতে পারে, হিন্দুত্ত্ব বলে এক ধারণা। এসব কারণে ভারত ভুখন্ডের “রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি” হিসাবে আবির্ভাব অথবা রাজনৈতিক কমিউনিটি বা এক রাজনৈতিক পরিসর হিসাবে আবির্ভাব সব সময়ই খুবই দুর্বল  থেকে গেছে। এটাকে আর এক দিক থেকে কেউ বিশাল ভারতের ইন্টিগ্রেশনের দুর্বলতাও বলতে পারেন, যেটা ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এবং একমাত্র বলপ্রয়োগ করে তা মোকাবিলার চেষ্টাও সেই থেকে। বৃটিশ আমলে ভারতে বৃটিশরা ছিল খোলাখুলি বলে কয়ে কলোনি শাসক এবং এক ধরণের দুর্বল ইন্টিগ্রেটেড ভুখন্ড বৃটিশ-ভারত। আর ১৯৪৭ সালের পর জবরদস্তিতে জড়ো করা সেটাকেই দাবি করা হল এককাট্টা এক ভুখন্ড। আর কলোনির বদলে এবার দাবি করা হল সেটা একটা  মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র। এসব কিছুরই বিপরীত দিকটা বা প্রতিক্রিয়াগত দিকটা হল বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির আবির্ভাব। কাশ্মীর ভারতের তেমন এক বিচ্ছিন্নতাবাদিতার সমস্যার নাম।

    রাষ্ট্রদ্রোহ নাকি খোদ রাষ্ট্রেরই নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা
    বিতর্কিত বিচারে কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীর ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো ভারতে কি বৈধ হবে, না রাষ্ট্রদ্রোহ মনে করা হবে – এমন আদলের এক তর্ক ও মামলা এখানে জড়িয়ে আছে। আফজাল গুরুর ফাঁসি দেয়া হয়েছিল ২০১৩ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে এবার তৃতীয় বার্ষিকীতে তা স্মরণ করতে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল জওয়াহেরলাল নেহরু  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কিছু ছাত্র সংগঠন। পালটা জমায়েত নিয়ে এর বিরোধীতায় নামে বিজেপির ছাত্র সংগঠন। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়াতে মাঝখানে পুলিশ এসে দাড়ায়। কানহাইয়া বামপন্থী সিপিয়াই এর রাজনীতিতে জড়িত। তাঁর দাবি ছাত্র সংসদের সভাপতি হিসাবে উত্তেজনা থামাতে তিনিও সেখানে গিয়েছিলেন। আর মোদীর দল ও পুলিশের দাবি তিনিই সেখানে রাষ্ট্রবিরোধী শ্লোগান দিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। এতে কানহাইয়াসহ মোট সাতজন অন্যান্য ছাত্রও গ্রেফতার হয়ে ছিলেন। সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মনে করছে এটা অন্যায় এবং মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ বাড়াবাড়ি। যদিও তাদের বিরুদ্ধে বিজেপি-মিডিয়ার ভাষ্য হলো, তারা ভারত ‘কাশ্মির দখল করে রেখেছে’, ‘ভারত ধ্বংস (ভারত কা বরবাদি তক) হয়ে যাওয়া পর্যন্ত কাশ্মিরের স্বাধীনতা (আজাদী) আন্দোলন চলবে’ ইত্যাদি বক্তব্য ও স্লোগান দিয়েছে যেগুলো দেশদ্রোহী স্লোগান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইটারে লিখেছেন, তিনি ‘এন্টি ন্যাশনাল এলিমেন্টদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে’ যেতে দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেইড দেয়া ছাড়াও ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল স্লোগান’ দেয়ার জন্য দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা দিয়েছেন। আলজাজিরার দিল্লি ব্যুরো চিফ অমল সাক্সেনা লিখেছেন, রাজনাথ বলেছেন, ‘কেউ যদি ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে থাকে জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতিকে চ্যালেঞ্জ করে এটা সহ্য ও বরদাশত করা হবে না’। ও দিকে এর পাল্টা উদার রাজনীতির (লিবারেল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য হলো, ‘সরকার ভিন্নমত অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে’, ‘তারা মুক্ত চিন্তার ওপর আক্রমণ করছে’, ‘নিরীহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা টার্গেট হয়েছে’ ইত্যাদি। তাই এর বিরুদ্ধে সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট-আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, বামজোট সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়াচুরি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রেফতারের দুদিনের মাথায় ক্যাম্পাসে এসে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানোর পড় থেকে তা ভারতের জাতীয় রাজনীতির এক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। এর এক দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগের ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডা আর এক ধাপ চড়িয়ে ছিলেন। তিনি টুইটে দাবি করলেন ওই স্লোগান তোলার ঘটনায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সংগঠন লস্করই তৈয়বার প্রধান নেতা হাফিজ সাঈদয়ের মদদ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা এ প্রসঙ্গে শিরোনাম করে লিখেছিল এটা ‘তিলকে তাল করা’। রাজনাথ দাবি করেছিলেন ‘জনগণকে বুঝতে হবে’ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে ওই দিনের কর্মসূচিকে সমর্থন করার জন্য আহ্বান রেখেছেন। কিন্তু পরদিন জানা গেল ওই কথিত বিবৃতি পাকিস্তানের হাফিজ সাঈদের নয়, আসলে ওই নামে একটা নকল বেনামি অ্যাকাউন্টের। দিল্লি পুলিশই সেটা নিশ্চিত করেছিল। আবার খোদ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে নিজে বিবৃতি দিয়ে এটা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু ততক্ষণে রাজনাথ সিং প্রপাগান্ডা করার যা কিছু সুখ পাওয়া যায় তা কামাই করে নিয়ে ফেলেছেন। গ্রেফতার করা ছাত্ররা বেশির ভাগই পিএইচডি এর ছাত্র। ইতোমধ্যে তাদের দফায় দফায় বর্ধিত রিমান্ড শেষ হয়েছে। কিন্তু পরপর দুদিন দিল্লির পাতিয়ালা এলাকা আদালতপাড়ায় জামিনের জন্য যাতায়াত করার সময় এক অবাক করা এবং মারাত্মক কাণ্ড ঘটেছিল। আদালতপাড়ায় পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামি কানহাইয়া ও তাঁর উকিল বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থক ওপ উকিলদের হাতে মার খেয়েছেন। আর শুধু তিনি নন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠি বন্ধু, শিক্ষক এমনকি সাংবাদিকেরাও সেখানে মার খেয়েছেন পরপর দু’দিনই। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, “চলতি সপ্তাহে পাটিয়ালা হাউজ কোর্টে পরপর দু’দিন বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছিলেন জেএনইউয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এমনকি সাংবাদিকেরাও। বুধবার পুলিশি ঘেরাটোপে থাকা সত্ত্বেও আক্রান্ত হন কানহাইয়া, যা দেখে শিউরে ওঠে পুলিশ কমিশনারের কাছে রিপোর্ট তলব করে শীর্ষ আদালত। এরপরই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন কানহাইয়ার হয়ে মামলা লড়তে আসা সোলি সোরাবজি, রাজু রামচন্দ্রন, রাজীব ধবনের মতো প্রবীণ আইনজীবীরা”। আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে হামলায় নেতৃত্ব দেন দিল্লির বিজেপি বিধায়ক ও পি শর্মা।
    কিন্তু সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিন চাওয়াতে কিছুটা হিতে বিপরীত ঘটে গেছিল। কানহাইয়ার উকিলেরা আদালতে কানহাইয়ার নিরাপত্তা ও পাটিয়ালা হাউজ কোর্টের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়ে  হাহকোর্টও ফেলে সরাসরি তাদের সুপ্রিম কোর্ট আসার কারণ ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতিরা বলেন, ওই জেলা আদালতের ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারাও অবহিত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে হাইকোর্টে যাওয়া উচিত ছিল। কানহাইয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, পাটিয়ালা হাউজ কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্ট একই চত্বরে। তাই তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করাতে সেখানেও যান নাই। সরকারি আইনজীবীরা পাল্টা বলেন, হাইকোর্টে নিরাপত্তার সমস্যা নেই। বিচারপতিরা তখন বলেন, “সুপ্রিম কোর্টই একমাত্র নিরাপত্তা দিতে পারে, বাকি আদালত পারে না তারা এমন কোনো বার্তা দিতে চান না। আর এতে সবাই কিছু হলেই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টেই জামিন চাইতে আসার জন্য উৎসাহিত হয়ে যাবে”। আনন্দবাজার মন্তব্য করে লিখছে, “বিচারপতিদের কথায় যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু এ থেকে ভারতের খোদ রাজধানীর এক জেলা আদালতের পরিস্থিতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেল তা ভয়ঙ্কর”। বাংলাদেশের আদালতপাড়ায়ও বিচারকের উপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে প্রভাবিত করাসহ নানা সমস্যা আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু জামিন চাইতে এসে হেফাজতে থাকা আসামি এবং আসামির উকিলকে সরকারি দলের হাতে মার খেতে হয়েছে, এটা আমরা এখানে এখনো কল্পনা করতে পারিনি।
    আনন্দবাজার আরও জানিয়েছিল, “তবে সুপ্রিম কোর্ট মামলা না শুনলেও দিল্লির পুলিশের ওপর নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ জারি করার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে গেছে। এমনকি শুধু নির্দেশ নয়, এ বিষয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর (অ্যাটর্নি) জেনারেল রঞ্জিত কুমারের কাছ থেকে রীতিমতো আশ্বাস আদায় করে নিয়েছেন বিচারপতিরা”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে সঠিক জায়গা আর ঠিক সময়মতো ধরতে পারলে ভারতের বিচার ব্যবস্থায়ও ‘মার খাওয়ার’ বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে।

    হিন্দুত্বগিরি ভুলে লিবারেল গণতন্ত্রী হওয়ার হাওয়া কেন
    কিন্তু হঠাৎ করে ভারতে বিজেপি বিরোধীদের এমন এক হাওয়া বইছে, যেন ভারত হিন্দুত্বগিরি ভুলে গেছে। লিবারেল গণতন্ত্রী হয়ে গেছে সবাই এবং যেন এমন চিন্তাকারিরাই সারা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান ধারা হয়ে গেছে। ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়া অথবা এদের সম্পাদকীয় নীতিতে কে কার চেয়ে কত উদার এবং হিন্দুত্ব বা বিজেপিবিরোধী তা প্রমাণের যেন প্রতিযোগিতা লেগেছে। অথচ ভারতে প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নিজ রাষ্ট্র প্রসঙ্গে মতাদর্শিক অবস্থানের ফলাফল হল, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে তৈরি এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। বিশেষ করে পাকিস্তানের সাথে পাল্লা দিতে পাল্টাপাল্টি উগ্র জাতীয়তাবাদের এই প্রতিযোগিতা চলে আসছে ১৯৪৭ সালে উভয় রাষ্ট্রের জন্মের সময় থেকেই। কংগ্রেস এবং বিজেপির লালন করা এই উগ্র জাতীয়তাবাদকে এমন ক্যাটাগরিতে স্পষ্টতই হুবহু ফেলা যায়। তবে এই বিচারে ভারতের ‘বাম প্রগতিশীলরা’ নিজেদের আলাদা মনে করতে পারেন; বিশেষত তারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করেন না দাবি করতে পারেন। কিন্তু কোনো হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া এক ভারত রাষ্ট্রে ভারতের সব অংশকে ধরে রাখা যাবে কি না- এ প্রশ্নে তারাও সৎভাবে অন্তত একান্তে এটা স্বীকার করবেন মনে করা যায়। আর কংগ্রেস একটু ব্যতিক্রম – এক সেকুলার জামার আড়ালে থেকে সে একই কথাগুলো হাজির করতে চাইবে হয়ত। এ ছাড়া ভারতের রাজনীতিবিদেরা আচার-আচরণে হিন্দুত্বের ভিত্তিকে অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয় গণ্য করে থাকেন। নকশালি র‌্যাডিকেল কিছু রাজনৈতিক ধারা ছাড়া ভারতের বাকি প্রায় সব রাজনৈতিক দল দৃঢ়বিশ্বাস করে যে, ‘হিন্দুত্বের ভিত্তি’ ছাড়া ভারতকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখাই সম্ভব নয়। তবে অবশ্যই এটা ভারতের রাজনৈতিক দল-জগতের খবর। একাদেমিসিয়ান এর ব্যতিক্রম হতে পারেন; তাদের কথা এখানে ধরা হয়নি।
    আসলে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটা চলছে, এটা আসলে ছাত্র-শিক্ষকের বুদ্ধিবৃত্তিক দুনিয়ার লিবারেল আকাক্সক্ষা বিজেপিবিরোধী কংগ্রেস-সিপিএম রাজনৈতিক দলগুলোর সস্তা ভোটের রাজনীতির পড়ে বলি হয়ে যাওয়া।

    ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও যে এমন ন্যাক্কারজনক হামলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে রাজধানীর পুলিশ কমিশনারকে ব্যবহার করে তা দেখে আমরা বেশ পুলকিত হতে পারি এই ভেবে যে, আমরাও ভারতের চেয়ে বেশি খারাপ নই। রাজধানী হলেও দিল্লি এক জেলা শহর বটে, তবে দিল্লি অন্তত কাশ্মিরের মতই বেইনসাফি ও দমবন্ধের স্থান নয় বলে যে ধারণা আমাদের ছিল কানহাইয়ার জামিনবিষয়ক রিপোর্ট পড়ে সে ধারণা বেশ চোট পায় বৈ কি! যেমন একই ২০ ফেব্রুয়ারির আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা আরো কিছু অংশ “জেএনইউয়ের ঘটনায় মোদি সরকার, বিজেপি-সঙ্ঘ পরিবারের পাশাপাশি আঙুল উঠেছে দিল্লির পুলিশ কমিশনার বি এস বসসীর দিকেও। বুধবার আদালত চত্বরে কানহাইয়াকে মারার ঘটনা বেমালুম অস্বীকার করে গিয়েছিলেন বসসী। কিন্তু রাতে তিহার জেলে বুকে ব্যথা অনুভব করেন কানহাইয়া। তাকে রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানহাইয়ার নাক, উরুসহ বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও জানিয়েছে, আদালত চত্বরে পুলিশের সামনেই কানহাইয়ার ওপর হামলা সংঘটিত এবং তা পূর্বপরিকল্পিত। তার ওপর মানসিক চাপ দেয়া হয়েছিল বলেও ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে”। যাক এ রিপোর্ট স্বব্যাখ্যাত তাই কিছু বলার নেই। কেবল একটা বিষয় ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের মতোই দাঁত-নখহীন এমন ধারণা করা একেবারেই ভুল হবে। এমনকি ভারতের আদালতের রিপোর্ট ও অবজারভেশনও বিশাল গুরুত্ব রাখে।

    পেনাল কোড ১২৪এ – রাষ্ট্রদ্রোহ
    ভারতীয় পেনাল কোড বা আইপিসির ‘সেকশন ১২৪এ’ হলো সেডিশন-বিষয়ক (বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) অপরাধের ধারা। এই পেনাল কোড ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একই। কারণ ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলে ১৮৬০ সালে এই পেনাল কোড চালু হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে এই তিন দেশই এখনো সেই একই পেনাল কোড অনুসরণ করে থাকে। সেডিশন ধারার মূল অভিযোগ হলো ঠিক রাষ্ট্র নয়, সরকারের বিরুদ্ধে গণদাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি করা বা উসকানি দেয়া। এই অর্থে এটা আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ। তবে লিগ্যাল শব্দ হিসেবে এটা সঠিকভাবে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ না হলেও ; পপুলারলি আমরা এমনটা বলে থাকি।
    অতীতে ভারতের বিচার বিভাগ বহু সেডিশনের অভিযোগের (আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ) মামলা নাকচ করে দিয়েছেন। সেডিশনের মামলায় কোনো অভিযোগ প্রকৃত বলে টিকে গেছে এমন মামলার সংখ্যা খুবই কম। এসব মামলার রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দিলেই সেখানে সেডিশন হয়েছে বলে তা বিবেচিত হবে না যদি না ওই বক্তৃতার ফলে দাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, অথবা কাজে ততপরতায় জনশৃঙ্খলায় এটি ব্যাঘাত করে থাকে। ফলে ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা সেসব মামলার রেফারেন্স দিয়ে রিপোর্ট করেছে যে কানহাইয়ার মামলারও একই পরিণতি হবে। শুধু “ভারত নিপাত যাক”, এমন স্লোগান দিলেই সেটাকে সেডিশনের অভিযোগ হিসেবে মানতে ভারতের আদালত রাজি নয়। বহু আগে থেকেই এমন মামলাগুলো আদালত নাকচ করে দিয়ে আসছে। কিন্তু তবু নিজ বিরোধীদের হেনস্তা করতে সরকারগুলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয়া বন্ধ করেনি। এ ব্যাপারে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের কোনো সরকারই কারো চেয়ে কম যায়নি।
    গত ২০১৪ সালের মে মাসে বিজেপির মোদি সরকার বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিল। ওই নির্বাচনে বিজেপি নিজস্ব জোটবদ্ধতার সমর্থন ছাড়াও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। বিপরীতে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে হয়ে যায় ৫০-এরও নিচে, মানে ১০ শতাংশ আসনেরও কম। সিপিএমের অবস্থা আরো খারাপ। কিন্তু সেই থেকে মোদি সরকারের বয়স প্রায় দু’বছর পার হলেও কোনো ইস্যুতে স্পষ্টতই জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে এমনটি ঘটেনি। তবে কোন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির দলের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে এমন রেকর্ড আছে। কিন্তু ওই সব আঞ্চলিক বা রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভূমিকা কোনো বড় নির্ধারকের নয়। বাম জোটের গোনায় ধরে না গুরুত্ব পায় না অবস্থা। ফলে কংগ্রেস ও সিপিএম অনেক মরিয়া হয়ে অনেক দিন থেকে খুঁজছিল যেকোনো ইস্যুতে খাড়া হয়ে যাওয়া যায় কি না। কংগ্রেস বা বামজোটের সিপিএমের দিক থেকে তাকিয়ে বললে তারা সম্ভবত এই প্রথম কিছু আশার আলো দেখতে যাচ্ছে। ফলে সস্তা ভোট রাজনীতির বেশি কিছু আমল করার মত সিরিয়াস এগুলো নয়। যদিও এটা কেবল জেএনইউ নয়, ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রছাত্রীরা এই আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে। আর ঠিক ততটাই মোদি সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে গেছিল যে, এটা যে আসলেই একটা আইনানুগ সরকারদ্রোহিতার বা সেডিশন অপরাধ হয়েছে তা জনগণকে বিশ্বাস করানো। জনগণের কাঠগড়া ছাড়াও ও দিকে আদালতের কাঠগড়ায়ও মোদি সরকার সেডিশন প্রমাণ করতে পারবে না সে আলামতও পরিষ্কার হয়েছে।
    আবার বাংলাদেশের সরকারের সাথে এ জায়গায় মোদি সরকারের মিল খুব বেশি। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক-বিরোধী ভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে সেডিশনের অভিযোগ দিয়ে ঘায়েল করা, সস্তা প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানোর ব্যাপারে ওখানে মোদি সরকার আর এখানে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে খুবই মিল। যেমন মুক্তিযুদ্ধে ‘৩০ লাখ’ ইস্যু অথবা ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার ইস্যু এগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সেডিশনের অভিযোগে ঝুলিয়ে দেয়া, “পাকিস্তানি মনোভাব” বলে ভুতুড়ে অভিযোগ করা, পাকিস্তানি চিন্তা ইত্যাদি শব্দটা জড়িয়ে প্রপাগান্ডা করা ইত্যাদির ব্যাপারে দুই সরকারের মিল ব্যাপক। এ ধরণের অভিযোগ তোলার পেছনের অনুমান হলো জনগণ আসলে খুবই বোকা, তাদের বিবেচনাবোধ নেই, তারা আবেগি এই মনে করা হয়ে থাকে।

    উগ্র জাতীয়তাবাদের রাজনীতির কারণে মানবাধিকার রাজনীতিতে  নির্বাসিত ইস্যু
    ভারতের কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে বিচ্ছিন্নতাবাদী কোন ইস্যু সামলাতে তার কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের কারণে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটেছে, সরকারের বিরোধীরা এমন কোনো অভিযোগ কখনো করেছেন, এমন দেখা যায় না। ভারতের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ‘হিন্দুত্বভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদে’ ভরপুর বলে এমনটি হয় তা মনে করার কারণ আছে। এমনকি, কমিউনিস্ট কোনো দলকেও সরকারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলতে দেখা যায় না। প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলো কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা বা ইস্যুতে- সরকারের দিক থেকে এই ইস্যু মোকাবেলা করতে গিয়ে মানবাধিকারের দিকটি রক্ষা করছে কি না, তা দেখে না। এমন অভিযোগ করে না এই ভয়ে যে, সেটা করলে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটাই চোট খায় কি না। যেন মানবাধিকারের রেকর্ড শক্ত করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়। এই কারণে ভারতের রাজনীতিতে একমাত্র বিবেচ্য হয়ে গেছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের দাপট। এ পর্যন্ত কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপি খুবই কম সময়ে সরকারে এসেছে বা সরকার গঠন করেছে। ফলে কংগ্রেসের ধারণা, সরকারে থাকলে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন গোয়েন্দা বা ইন্টেলিজেন্স স্বার্থের পক্ষে থাকতে গিয়ে দলকে পাবলিকলি অপ্রিয় হতে হয়। বিপরীতে, বিরোধী দলে যে থাকে, সে এসব ব্যাপারে উদাসীন থাকার কিছু সুবিধা পায়; গা-ছাড়া ভাব দেখাতে পারে। এবারই প্রথম কংগ্রেস খুবই শোচনীয় অবস্থায় মাত্র ১০ শতাংশেও নিচে সদস্যসংখ্যা নিয়ে পার্লামেন্টে আছে। বিপরীতে জোট ছাড়াই এতে বিজেপি সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই কংগ্রেস এবার পালটা ‘গা-ছাড়া ভাব দেখানোর’ সুবিধা নিতে চাইছে। অতএব সারকথা, কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদী আফজাল গুরুর ফাঁসিবার্ষিকীতে প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকা রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ কি না- এই প্রশ্নে বিজেপি মনে করে এটা রাষ্ট্রদ্রোহী। বিপরীতে, কংগ্রেস ও সিপিএমের অবস্থান- এটা রাষ্ট্রদ্রোহী নয়। ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’কে শায়েস্তা করার দায় এবার বিজেপি নিক আর নিজেরা এর সুবিধা নিয়ে পপুলার হোক। তবে কংগ্রেসের এই অবস্থান ভুঁইফোড়ের মতো। ভারতের রাজনীতিতে এমন অবস্থান নেয়াকে বলা হয়, ভোটের রাজনীতি অথবা ভোটব্যাংকের রাজনীতি করা। অর্থাৎ কোনো নীতিগত কারণ মেনে আচরণ না করা, না চলা, অবস্থান না নেয়া; কেবল ভোট পাওয়ার লোভে যেদিকে সুবিধা, সেদিকে অবস্থান নেয়া। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুগুলোতে, যেগুলোকে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী ঘটনা বলে চালানো হয়, এসব ঘটনাকে ভারতের রাজনীতিতে মানবাধিকারের দিক থেকে দেখার চল নেই। বরং মিথ্যা প্রপাগান্ডা, উগ্র জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে নগদ সুবিধা লাভ করাই মুখ্য এবং এ কাজে কংগ্রেস বা বিজেপি তো বটেই, সিপিএমও কোনো অংশে ভোটের রাজনীতি করতে পিছপা নয়। এর সবচেয়ে হাতের কাছের নগদ উদাহরণ হলো- বছর দেড়েক আগে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে বোমা হামলার ঘটনা। সিপিএম বিজেপির মতো একই ভাষায় সেসময় মমতার বিরুদ্ধে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে গিয়েছিল। কারণ, মমতা সিপিএমের মুসলমান ভোট নিয়ে গেছে। কিন্তু পরে মাঝপথে মোদি সরকার কোনো কারণে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের পশ্চিমবঙ্গ-নীতির সাথে আর না থাকার সিদ্ধান্ত নেয়াতে ওই ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। আজকে কোথায় ‘বর্ধমান বোমা’ ইস্যু? অথচ আনন্দবাজার পত্রিকাকে সাথে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা তখন তুঙ্গে উঠেছিল। আজ সেই আনন্দবাজার আবার বিজেপির বিরুদ্ধে।
    জেএনইউ রাষ্ট্রদ্রোহিতা ইস্যু তাই কংগ্রেস ও সিপিএমের কাছে আসলে বড়জোর ভোটব্যাংকের একটি ইস্যু। বিজেপিবিরোধী জোট প্রথমবারের মতো শক্ত ভিত গড়াই এর সঙ্কীর্ণ লক্ষ্য। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এটা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিগত কংগ্রেস সরকারের চার বছরের (২০০৮-২০১২) কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মাদ্রাজি কংগ্রেস নেতা পি. চিদাম্বরম। তিনি দলীয় পরিচয় ফেলে হঠাৎ করে ‘ব্যক্তি’ হয়ে গেছেন। আফজাল গুরুর ফাঁসির সময়ও তিনি মন্ত্রী ছিলেন, তবে আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন। মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ফাঁসি ঠেকাতে তখন কিছু না করে এখন বলছেন, ‘আফজাল গুরুর বিচার সঠিক ছিল কি না, সন্দেহ হয়।’ বলছেন, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত আর তিনি ফাঁসি হওয়ার বছরখানেক আগে থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন না। তাই তার কিছু করার ছিল না। এই অর্থে ওই “ভুল ফাঁসির দায়” তিনি নিজ দলের সরকার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়েছেন। এ দিকে কায়দা করে আজ পর্যন্ত চিদাম্বরমের বক্তব্যের দায় কংগ্রেস স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। কিন্তু এতে সুবিধা হলো, কংগ্রেস ও সিপিএম এখন ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতিবাদকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়, বরং একটা ন্যায্যতা দিতে পারল। তিনি এখন বলছেন, “আফজাল গুরুকে যাবজ্জীবন দেয়া যেত এবং এই প্রতিবাদ করা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়”।
    ওদিকে এসব ঘটনা ফুটা করে দিয়ে আফজাল গুরুর বউ তাবাসসুম গুরু খাড়া কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “চিদাম্বরম ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতির’ জন্য ‘এত দেরিতে’ এমন কথা বলছেন। ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতি’ অর্থাৎ এই প্রথম বিজেপির বিরুদ্ধে একটা জোট খাড়া করে তা থেকে আগামী ভোটে সুবিধা পাওয়ার জন্য এটা করছেন। আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে বেইনসাফি ও অপরাধ হয়েছে কি না, এটা আসলে চিদাম্বরমের কাছে ইস্যু নয়। যদি হতো, তবে তো তিনি সে সময়ই পদক্ষেপ নিতে পারতেন। অথচ চিদাম্বরম ‘ঠুঁটো’ দর্শক হয়ে সে সময় দাঁড়িয়েছিলেন কেন? ‘তিনি বরং এখন এসব কথা বলে আমাদের কাটা ঘায়ে লবণ ছিটাচ্ছেন”। তাবাসসুম গুরু বরং আরেক মারাত্মক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “দিল্লিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আফজালের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আসলে ভারতের গালেই থাপ্পড় মেরেছে”।
    অতএব সারকথা, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলন- বুদ্ধিবৃত্তিজীবী এরা সৎ ও আন্তরিক হলেও এদের প্রভাব একাডেমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। কিন্তু এই লিবারেল রাজনৈতিক প্রভাবও কংগ্রেস ও সিপিএমের সস্তা ‘ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে’ পরে বিক্রি হয়ে যাবে। বিজেপির বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হবে। কিন্তু মূল বিষয়, ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনে কাজে আসবে না।

    বিচারক ‘জাতির সম্মিলিত বিবেকের’ নামে প্রতিহিংসা চর্চা করছেন
    আগে বলেছি, ভারতের জনসমাজের কোথাও কোথাও এমন অনুমান এখনও বজায় আছে যে আফজাল গুরুর বিচার ত্রুটিপুর্ণ। যেমন,পুলিশের কাছে আফজালের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী ভারতের আদালত মানে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট তা “স্বেচ্ছায় প্রদত্ত” হিসাবে “গ্রহণযোগ্য” মনে করেনি। কিন্তু আবার পরিস্থিতি ও পরিবেশগত প্রমাণের দিক থেকে ঐ একই আদালত মনে করে “আফজাল প্রত্যক্ষ হামলাকারি না হলেও হামলাকারিদের সহযোগী ছিল এবং এই সহযোগিতা প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ”। ওদিকে আফজালের বিশ্বাস ছিল, যেহেতু সে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কেউ নয়, এ ছাড়া স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সে ধরা দিয়েছে,ফলে বিচারের রায়ে তাঁর অন্তত ফাঁসি হওয়ার কথা নয়। ফলে এটাও একটা ক্ষোভের কারণ। কিন্তু এর চেয়েও আর বড় একটা কারণ হল, যে ভাষায় এর রায় লেখা হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার সময় সুপ্রিম কোর্ট সে সময় কী বলেছিল” শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে – সেখান থেকে নেয়া উদ্ধৃতিতে আমার অনুবাদে, “অপরাধ এতই ওজনদার ছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রচুর হতাহত ঘটানো ঐ ঘটনা সারা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল ফলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেই একমাত্র সমাজের সম্মিলিত বিবেক বা চেতনা (কালেকটিভ কনসাসনেস অব দা সোসাইটি) শান্তি পেতে পারে”। ………”ভারতের সার্বভৌমত্ব, সংহতি ও ঐক্যের চ্যালেঞ্জটা হলো …একমাত্র সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েই পূরণ করা সম্ভব। আপিল-দরখাস্তকারী একজন (ফিরে আসা) আত্মসমর্পণকারী জঙ্গি, কিন্তু আবার জাতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার কাজে যোগ দিয়েছিল; ফলে সে সমাজের জন্য হুমকিধারী আপদ এবং তার জীবন অবশ্যই নিভে যেতে হবে। তাই, আমরা তার মৃত্যু পরোয়ানার রায় বজায় রাখলাম”।
    রায়ের ইউনিক এই দিকটার কথা অনেকেই গুরুত্ব দেন নাই। এটা এক তামাসা যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত একটা ফাঁসির আদেশের ন্যায্যতা টানছেন মামলার মেরিট থেকে নয়। টানছেন গণমন একটা কল্পনা করে নিয়েছেন আগে; এরপর ঐ কল্পিত গণমনের কলিজা কিসে ঠান্ডা হবে বলে বিচারকরা মনে করছেন তা দিয়ে শাস্তির মাত্রা ঠিক করছেন। এটা সত্যিই ইউনিক। অথচ বিচারকেরা বলতে পারতেন ওমুক মাত্রার অপরাধের জন্য শাস্তি এই। কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটানোর অবিচার করেছে আদালত। আদালত সে জায়গায় বিমুর্তভাবে “গণমনের কলিজার” “মানসিক শান্তি” হবে কিসে – ধরণের আজীব ধারণার কথা টেনেছে। আর সেটা বিচারকেরা মাপলেন কী দিয়ে সেও এক বিরাট প্রশ্ন! যেন বিচারকেরা অন্তর্যামি হয়ে গিয়ে তা মেপে ফেললেন। আমাদের শাহবাগে “ফাঁসি চাই” বলে একটা বিক্ষোভ হয়েছিল ফলে আমাদের বিচারকেরাও মন-গণক অন্তর্যামি হয়ে গেছিলেন। সহজেই বুঝে গিয়েছিলেন গণমনের কলিজা কিসে ঠান্ডা হবে।
    সবশেষ আর এক গুরুত্বপুর্ণ মাত্রার দিক তুলব। “সমাজের সম্মিলিত বিবেক বা চেতনার শান্তির” কথা তুলে বিচারকেরা প্রমাণ করেছেন বিচারের নামে ওটা ছিল এক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার । কালেকটিভ কনসাসনেস অব দা সোসাইটির মানসিক শান্তি মানে কী ?কোন  বিচারালয়ে বিচারকের কাছে কালেকটিভ কনসাসনেস কী বস্তু? যে কালেকটিভ কনসাসনেস আবার অসুস্থ অশান্ত যার মানসিক শান্তি দরকার ? এটা একটা অসুস্থতা – তাই কী বিচারকেরা স্বীকার করে নিয়েছেন না? আর সেজন্যই কী অপরাধীর বিচার করার নামে সে নিজের  প্রতিহিংসা মিটাতে চাচ্ছে না? এমন অর্থই সেখানে দাড়িয়েছে।
    কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে মানসিক শান্তির জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া এটা নির্জলা “প্রতিহিংসা” ছাড়া আর কিছুই নয়। বিচারকেরা নিজে মানসিক শান্তি পাবার জন্য অথবা কাউকে পাইয়ে দিবার জন্য শাস্তির রায় ঘোষণা করেন না। করতে পারেন না। আসলে এভাবে মানসিক শান্তি পাওয়াকে প্রতিহিংসা বলে। আর প্রতিহিংসা এটা এক মানসিক ডিসঅর্ডারের নাম। রাষ্ট্রের পুলিশ বা বিচারকদের ভুমিকা কোনভাবেই নিজের ব্যক্তি “প্রতিহিংসা” অথবা “জাতির” প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা নয়। প্রতিহিংসা এক মানসিক অসুস্থতার নাম। ফলে স্বভাবতই এর নিদান চিকিতসা করানো।
    তাহলে সারকথা হল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আফজাল গুরুকে ফাঁসি দিয়ে আর রাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট সকলে তা বাস্তবায়ন করে জনগোষ্ঠিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। এরা সকলে মানসিকভাবে অসুস্থ।
    ফাঁসি শাস্তি দিলেই একমাত্র যে “জাতির” কলিজা ঠাণ্ডা হয় সেই কলিজা যে সমস্যাযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ,এই সন্দেহ পাঠকমাত্র আসা উচিত। আর এমন কলিজা যে ‘জাতির’,সে কলিজা অবশ্যই অসুস্থ। এর চিকিৎসা দরকার। এ ছাড়া এমনকি বিষাক্ত পোকামাকড় বা গাছ লতাপাতাকেও মানুষ নিজের সমাজ থেকে বিলুপ্ত করার দরকার মনে করে না, কেবল নিজের গার্হস্থ্য সমাজ থেকে বাইরে রাখে। এর থেকে মানুষের মৌলিক স্বভাব টের পাওয়া যায়। অথচ বিচারকেরা প্রমাণ করতে গেছেন, আফজাল গুরু নামের মানুষের জীবনটাকেই নিভিয়ে দেয়া ছাড়া ভারতের জনমানুষদের নাকি আর কোনো উপায়ই ছিল না। বিচারকেরা আফজাল গুরুর জীবনকে যতই খামাখা এবং জীবিত নাগরিকদের জীবনের তুলনায় তুচ্ছ প্রমাণ করতে গেছেন, ততই ওটা আর বিচারের রায় না থেকে যেন প্রতিহিংসার দলিল হিসেবে হাজির হয়েছে। অথচ কোনো রায় তো কখনো প্রতিহিংসাপত্র নয়।

    আশা করি কানহাইয়াকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচবার আগে না হলেও সাথে সাথে আমরা এসব প্রসঙ্গের দিকেও নজর দিব। তবে অবশ্যই কানহাইয়ার দেশদ্রোহ মামলার সাথে বাংলাদেশেরও দেশদ্রোহ মামলার বিশাল মিলের দিক আছে, সে প্রসঙ্গ আলাদা।

    [উপরের লেখাটা আফজাল গুরু ও জেএনইউ-কানহাইয়া ইস্যুতে সগের লেখা প্রায় চারটা লেখার সার করে লেখা, চুড়ান্ত ভার্সান। আগের লেখাগুলো দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হয়েছিল।]
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • চীনের হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ ধারণার নতুন মাত্রা

    চীনের হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ ধারণায় নতুন মাত্রা
    গৌতম দাস

    ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, মঙ্গলবার
    http://wp.me/p1sCvy-GP

     

    [আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ওয়াল স্ট্রিট পুঁজিবাজারের ক্রেতা বাড়ানোর কর্মসুচির আর এক নাম ‘উন্নয়ন’। কাঁধ বদল করে এই ব্যবস্থা চীনের নেতৃত্বে খাড়া হতে যাচ্ছে। পরিবর্তি এই পরিস্থিতিতে উন্নয়ন শব্দ ও ধারণা কোথায় কোথায় বদল ও প্রসারিত হতে যাচ্ছে, কোথায় ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে এসব নিয়েই এই রচনা। গত বছর ২০১৫ এপ্রিলে এই প্রসঙ্গে প্রথম একটা লেখা লিখেছিলাম। ওর শিরোনাম ছিল “চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে“। এরপর এবিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে কোন লেখা ছাপা হয়েছে এমন চোখে পড়ে নাই। সম্প্রতি আমার অনুমানকে শক্তিশালী করে এমন এক ইন্টারেস্টিং লেখা ছাপা হয়েছিল “প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের” সহযোগিতায়। এটা ছাপা হয়েছিল ১৩ জানুয়ারি ২০১৬  WORLD ECONOMIC FORUM এর ওয়েব জার্নালে, কিন্তু আমার নজরে এসেছে সম্প্রতি। আমার লেখার উপস্থাপন ছিল সাদামাটা। কিন্তু ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে’ ঐ লেখার শিরোনাম ছিল অনেক এগ্রেসিভ; “কার গ্লোবাল উন্নয়ন মডেল ধারণা টিকবে – পশ্চিমেরটা না চীনের” (Whose global development model will prevail – the West’s or China’s)। ফলে এই প্রসঙ্গে আরও কিছু অনুসন্ধান ও পাঠের পর চলতি এই রচনা; উন্নয়ন শব্দ ও ধারণার ব্যবচ্ছেদ করে দেখা।]

     

    উন্নয়ন শব্দটার সাথে আজ আমরা সবাই নানাভাবে নানা অর্থে ও সুত্রে পরিচিত। এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক – যেটাকে চীনের বিশ্বব্যাংক বলা হয় এটা  গড়ার তোড়জোরের প্রেক্ষিতে গেল বছর ২০১৫ এপ্রিলে আমার একটা লেখা চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে শিরোনামেরচনাটা লেখা হয়েছিল। “উন্নয়ন” শব্দটা আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের এক বিশেষ ফেনোমেনা – এরই নতুন অর্থ তাতপর্যের  নাম। যেখানে উন্নয়ন শব্দের অন্তত একটা অর্থ অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়ানোর উন্নয়ন। তাহলে নতুন কোনো গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার যদি চলতি আমেরিকার নেতৃত্বের বদলে আসন্ন আগামিতে চীনা নেতৃত্বে শুরু হয় তাহলে নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে কী কী নতুন বদল ঘটবে এবার; ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ কথাটার অর্থ কি ভিন্ন হবে? চীনারা কি সেটাকেও ‘উন্নয়ন’ নামে ডাকবে? বৈশিষ্ট্যগুলোতে  কী কী বদল আসবে? নাকি সেটা শুধু ডাকনাম বদলই নয়, অর্থ তাৎপর্যেও বদল, নতুন বৈশিষ্ট্য আনবে? যদিও ঐ লেখার শিরোনাম ছিল ‘চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে’ – আর  এবারের প্রসঙ্গটা মূলত সেরকমই কিছুটা, তবে ভিন্নভাবে।

    গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমিক লিটারেচারে ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘উন্নয়ন’ শব্দটা পরিচিত ও চালু হতে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর সাথে আর একটা শব্দও ছিল- ‘রি-কনস্ট্রাকশন’, যেটার বাংলা হতে পারে পুনর্গঠন । ঠিক যেমন বিশ্বব্যাংকের পুরা নাম  ‘রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক জন্মের সময় কী ধরনের সংগঠন এটা হতে যাচ্ছে তা বুঝানো ও প্রকাশ করাটা মুখ্য ছিল। ফলে ওর নাম ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, সংক্ষেপে আইবিআরডি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও একই বৈশিষ্ট্যের নিজের ব্যাংকের নাম ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ রাখা হয়েছিল। তবে পপুলার পর্যায়ে সংক্ষেপিত হয়ে সাধারণ্যে শব্দটা আর ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন’ না থেকে শুধু ‘উন্নয়ন’ হয়ে যায়। কিন্তু কী সে বৈশিষ্ট্য যার ভেতর উন্নয়ন শব্দের অর্থ লুকানো আছে?
    পুনর্গঠন ধারণা বা শব্দটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের ক্ষতিগ্রস্ত  হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনের বিষয়টাকে বুঝাতে। কিন্তু উন্নয়ন জিনিসটা কী? ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ কথাকে সংক্ষেপ করে উন্নয়ন বলা হয়। আগে ছিল এখন ক্ষতিগ্রস্ত এমন অবকাঠামো অথবা নতুন অবকাঠামোর বিস্তৃতি ঘটানোর অর্থে অবকাঠামো উন্নয়ন। কিন্তু অবকাঠামোই বা কী? যেসব সুবিধাদি আগে থেকে থাকলে কেউ নতুন কারখানা উৎপাদন ও পণ্য চলাচলের ব্যবসা-বাণিজ্য ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতায় প্রচুর দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নিয়ে আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসে – ফিজিক্যাল ঐসব সুবিধাদি হল “অবকাঠামো” । যেমন একটা স্কুল থাকা, রাস্তাঘাট ব্রিজ করা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা খাড়া করা, ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দক্ষ ও সংগঠিত প্রশাসন গড়ে রাখা ইত্যাদি; এগুলো সবই অবকাঠামোগত সুবিধা। এগুলো থাকা বা করে রাখা মানে ঐ সমাজে অবকাঠামো সুবিধাদি ভাল। স্বভাবতই ওখানে এগুলো বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পুর্বশর্ত পূরণ করে রাখা আছে বলে সব বিনিয়োগকারি বিবেচনা করবে। অবকাঠামোগত সুবিধাদি থাকলে কারখানা পণ্য উৎপাদন ও পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়। অবকাঠামো থাকলে বিনিয়োগ আসে বলে অবকাঠামো গড়াকে কোনো দেশের অর্থনীতিতে গতি আনার ক্ষেত্রে পয়লা বা মুখ্য ধাপ মনে করা হয়। কিন্তু অবকাঠামো আর বিনিয়োগ এ ধারণা দুটোর মধ্যে আরেক সম্পর্ক আছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো আগাম থাকা লাগে কথাটি সত্য। কিন্তু অবকাঠামো গড়তেও আবার বিনিয়োগ লাগে। কিন্তু প্রথম বাক্যের বিনিয়োগ যাকে আকৃষ্ট করার জন্য এত আয়োজন সে বিনিয়োগ বলতে ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ বুঝতে হবে। আর অবকাঠামো গড়তে যে বিনিয়োগের দরকারের কথা বলছি সেটাও বিনিয়োগ বটে তবে নামমাত্র বা না-সুদে কেবল সার্ভিস চার্জের ঋণে আনা বিনিয়োগ। বড় এবং মুল ফারাক “বাণিজ্যিক সুদ” এবং “না-সুদ” – এদুয়ের ফারাক। তাই দুই বিনিয়োগ ধারণায় যেন বিভ্রান্তি না লাগে তাই প্রথমটা ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ আর পরেরটাকে ‘অবকাঠামোগত বিনিয়োগ’ বলা হয়। ‘অবকাঠামোগত বিনিয়োগ’ জোগাড় করতে পারলে অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে রাখা যায়। অবকাঠামোগত সুবিধা গড়া থাকলে ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ আকৃষ্ট করা যায়।
    দুই বিনিয়োগ ধারণার মধ্যে অনেক বিষয়ে ফারাক থাকলেও আগে বলেছি, মূল ফারাক সুদের হারে। অবকাঠামোগত বিনিয়োগেও মুনাফার বিষয় থাকে। কিন্তু তা নামমাত্র বা খুবই কম মুনাফা (অবশ্যই তা এক ডিজিটের সুদে এবং তা সাধারণত ৫%-এর ওপরে তো নয়ই, বরং ১%-এর নিচে হতে পারে) হতে পারে। আর অবকাঠামো বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা করা নয়। মুনাফা কেমন করে আরো বেশি করা যায় এমন উদ্দেশ্যে এটা পরিচালিতও হয় না। সে জন্য এটা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়। তাহলে এর উদ্দেশ্য কী? এর উদ্দেশ্য বরং গ্লোবাল পুঁজি বাজারে যাকে প্রতীকীভাবে ওয়াল স্ট্রিট বলা হয় সেই বাজারে বাংলাদেশ যেন আরও বড় পূঁজির খাতক হয়। বাংলাদেশ সরকার যেসব কোম্পানীকে কারখানা-পণ্য-উৎপাদন ও পণ্য বিনিময়ের ট্রেডিং বাণিজ্যে বিনিয়োগের অনুমতি দিবে এরাই ওয়াল স্ট্রিট থেকে ধার করে বাণিজ্যিক ঋণ-বিনিয়োগ আনবে। এভাবে পুঁজি এনে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের করবে যারা এদের বিনিয়োগ আনার অর্থ হবে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে বাংলাদেশকে বড় বিনিয়োগ পূঁজির খাতক বলে হাজির করা।  বিপরীতে একটা স্কুল খোলা, রাস্তাঘাট-ব্রিজ করা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা করা, ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা ইত্যাদি। এসব অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং বলা বাহুল্য, এগুলো অবাণিজ্যিক – এগুলো যদি অবাণিজ্যিকভাবে করা না থাকে এর অর্থ হবে  তাহলে দুই ডিজিটের মুনাফার বাণিজ্যিক বিনিয়োগে স্কুল খুলতে হবে। ফলে এসব স্কুল থেকে বের হওয়া দক্ষ-শ্রমিককে চাকরিতে নিয়োগ দিতে গেলে বেতন দিতে হবে হয়তো ১০ গুণ। নতুন কারখানা খোলার ক্ষেত্রে যার এক মারাত্মক নেগেটিভ নিরুতসাহ প্রভাব পড়বে। আর খুব কমসংখ্যক লোকই এখানে সন্তানকে ভর্তির সামর্থ্য রাখবে। কিন্তু স্কুল বা শিক্ষায় অবকাঠামো বিনিয়োগে পরিচালিত করা মানে সমাজের অর্থনৈতিক উৎপাদনের দিক থেকে দেখলে দক্ষ শ্রম সহজে সস্তায় পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
    আবার, বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আসে গ্লোবাল পুঁজিবাজার ও দেশীয় বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে, তবে বাণিজ্য ও মুনাফার উদ্দেশ্যে। বিপরীতে অবকাঠামো বিনিয়োগ আসে বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, এডিবি অথবা এ কালের এআইআইবি ধরনের অবকাঠামো ব্যাংকের কাছ থেকে। স্বভাবতই এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয় বলে ব্যক্তি বা কোম্পানি এর মালিক নয়। কেবল অনেকগুলো রাষ্ট্রের জোট এর মালিক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নামের সাথেও ব্যাংক শব্দটা থাকলেও এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, তা বুঝাতে নামের মধ্যে ‘উন্নয়ন’ বা ‘অবকাঠামো’ বা ‘পুনর্গঠন’ এমন একটা না একটা শব্দ থাকবেই। তাই বিশ্বব্যাংকের নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, এডিবির নাম এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি এর নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইত্যাদি। ওপরের ধারণাগুলোকে জড়ো করে পপুলারলি তা এক শব্দে প্রকাশিত হওয়া শব্দ হলো উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মুনাফা- এসব পরিচিত ধারণার বাইরে সংযুক্ত হওয়া নতুন শব্দ অবকাঠামো ব্যাংকের বিনিয়োগে অবকাঠামো উন্নয়ন। ইউরোপে এটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। আর আমাদের মতো দেশে আরো অনেক পরে, বাংলাদেশে সত্তরের দশকে।
    অবকাঠামো বা উন্নয়নের সাথে নিজের সম্পর্কের ব্যাপারটা আজ গ্রামের মানুষও সহজেই একভাবে নিজের মতো করে বুঝেছে। তার গ্রামে অবকাঠামো বিনিয়োগ এলে তার কাজ বা চাকরি পাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়, এসব নানান বাধার অপসারণ ঘটে- এইসব বিষয়গুলো সে বোঝে নিজের মত করে। তাই মফস্বলের ভাষায় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ধারণার পপুলার নাম হলো উন্নয়ন। তাঁর বাড়ি থেকে উপজেলা বাজার, নিজের জেলা শহর বা রাজধানীতে পৌঁছানোর যোগাযোগব্যবস্থা যত সহজ হবে এর সাথে তার ভাগ্য খোলা, জীবনযাপনের মান বেড়ে যাওয়া, কাজ পাওয়া ইত্যাদি যে সরাসরি সম্পর্কিত এটা বুঝতে তার আর বাকি নেই। উন্নয়ন কথাটা সে এভাবে তার মতো করে বুঝে।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগে যেটাকে উপনিবেশ যুগ বা কলোনি শাসনের যুগ বলা হয় সেকালে সারা দুনিয়া ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো দেশ বাকি ছিল না যে, কলোনি হয়নি; কোনো না কোনো কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে চলে যায়নি। এ সময়টাতেই আমরা যেমন ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে ছিলাম- আমাদের মতো দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনে যা মূলত কৃষি – এর সব উদ্বৃত্ত ইউরোপের ব্রিটেনে পাচার হয়ে গিয়ে জড়ো হয়েছিল। এগুলো সঞ্চিত হতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ। আরেক দিক থেকে দেখলে এগুলোই আবার বিনিয়োগ পুনঃবিনিয়োগ নামে আমাদের মত দেশে ফিরে হাজির হতে সক্ষম। এক কথায় এটাই ইউরোপের বিনিয়োগ সক্ষমতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল ইউরোপে নিজ নিজ মাস্টারের দেশেই এই বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রয়োগ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের মতো দেশে ফিরে বিনিয়োগ হতে যোগ্য হলেও তা হয়নি, ব্রিটেনের সাথে আমাদের ‘কলোনি সম্পর্কের’ কারণে। তবে ঐ বিনিয়োগ আমাদের মত দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়া বা পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনাটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখনও ওর মালিকানা বিদেশের এবং মালিকের ইচ্ছার প্রাধান্যেই সে থাকে তবে আমাদের মতো দেশ বিনিয়োজিত হতে এবার আগ্রহী হয়। বাধ্য হওয়ার মত কারণটা হল,  ওই যুদ্ধের ফলাফলে সব ওলটপালট হয়ে তত দিনে হিটলারের পতনসহ পুরনো সকল কলোনি মাস্টারদের রুস্তমির দিন শেষ হয়েছে আর সারা ইউরোপে সবার নতুন নেতা, অর্থ ধারদাতা, ত্রাতা হয়ে উঠে এসেছিল আমেরিকা। এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, আমেরিকা নিজের নতুন ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার নিশ্চিত ছিল। সেটা হলো, আমাদের মতো দেশের সাথে বৃটেনের পুরনো কলোনির ধরণের সম্পর্ক আর নয়, সমাপ্ত। এবার বরং পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে আমেরিকা আমাদের মতো দেশের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্ব-পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাতক হিসেবে আমরা তার জন্য লোভনীয় বিনিয়োগ পুঁজিবাজারের ক্রেতা হতে পারি। আমরা তার ক্রেতা হই এটা আমেরিকার দরকার। এরই প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা হলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গড়ে ওঠা। আর এর ভেতর দিয়ে পুরানা দীর্ঘ অতীতে  লুণ্ঠিত ও পাচার হয়ে যাওয়া উদ্বৃত্ত নানা হাত ঘুরে যা এবার ‘বিনিয়োগ’ নাম নিয়ে কেবল নতুন শর্তে আমাদের মতো দেশে ফিরতে প্রস্তুত। শর্ত হলো ওই উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের মালিক আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের গ্লোবাল পুঁজি বাজার।  ওর নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে আমাদেরকে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের খাতক হতে দিতে চায়। সে বাংলাদেশে বিনিয়োজিত হতে চায় বিনিময়ে সে একটা সুদ চায়। এর আইনগত দিকগুলো সম্পন্ন হয়েছিল আগেই কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ বিনিয়োগ অবস্থায় ফিরে আসতে সত্তর দশক লেগে যায়। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে মূলত ঐ বিনিয়োগ, মাগনা অনুদান, নামমাত্র সুদের অবকাঠামোগত ঋণ হিসাবে আস্তে আস্তে আমাদের দেশে এসেছে। এবং এসবের পরিপ্রেক্ষিতে যতটা আকর্ষণীয় বাজার আমরা হতে পেরেছি সে মাত্রায় বাণিজ্যিক বিদেশী বিনিয়োগ এখানে এসেছে। একমাত্র এভাবে এ চেহারা ও শর্তেই কলোনি আমলে লুণ্ঠিত উদ্বৃত্ত নানা হাত ঘুরে ততটুকুই বাংলাদেশে ফেরত আসতে পেরেছে।
    আমেরিকার হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা এভাবে গ্লোবালি ও আমাদের দেশে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছিল। আবার গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে, অবকাঠামোগত বিনিয়োগে ‘উন্নয়ন’ কতটা হয়েছে কথাটার অর্থ আমরা গ্লোবাল বাণিজ্যিক বিনিয়োগের নামে কতটা উদ্বৃত্ত ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, আমরা কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছি এরই গ্লোবাল সক্ষমতার প্রকাশ। কারণ এ দিয়েই বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট কোনো এক রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে এর নির্ণায়কও। সম্ভবত এককথায় এভাবে বলা যায়, কলোনি সম্পর্কে ব্রিটিশের হাতে লুণ্ঠিত আমাদের উদ্বৃত্ত এবার আমেরিকার মাধ্যমে এরই যত কিঞ্চিৎ অনুদান, নামমাত্র সুদের অবকাঠামোগত ঋণ এবং মূল বাণিজ্যিক বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে ফেরত এসেছে- এভাবে ফেরত আসাটাকেই আমরা আসলে ‘উন্নয়ন’ বলে বুঝছি। এটাও উন্নয়ন ধারণার আর এক মাত্রা।

    ওদিকে, মোটাদাগে চলতি একুশ শতকের শুরু থেকেই নতুন পরিস্থিতি নতুন আলামত দেখা দিতে শুরু করেছিল। ইতোমধ্যে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটে গিয়েছিল। এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ফলাফলে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেতৃত্বে বদল। আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বের এক নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম হওয়া ও তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আমেরিকা আমাদের জন্য যা করতে পেরেছে তা হলো, আমরা কেবল পশ্চিমের পণ্যের খাতক না। আমাদের জন্য অন্তত গার্মেন্ট আর একেবারে কাঁচা-মাইগ্রেটেড অদক্ষ শ্রমের রফতানিকারক- এই পরিচয়ে একটা জায়গা করে দিতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা। উন্নতি বলতে এতটুকুই। আমেরিকার দেয়া উন্নয়নের অর্থ এর মধ্যেই সীমিত ছিল। ওর বৈশিষ্ট্যগত দিক হলো পশ্চিম বা আমেরিকা আবার নিজ বাজারে আমাদের পণ্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করেছে আর সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল বাজারকে নিজের পক্ষে রেখে দিয়েছে।

    কিন্তু এবার চীনের নতুন ভূমিকার কারণে চীন ধারণা দিচ্ছে – সে আরো কিছু সম্ভবত পারবে, যেটা আমেরিকার হাতে যা ঘটেছে এত প্রিমিটিভ নয়। যেমন এতদিন অবকাঠামো ধারণাটা কোনো একটা দেশের অভ্যন্তরীণ সীমায় সীমাবদ্ধ থাকত। অবকাঠামো গড়ে উঠত গরিব রাষ্ট্রের ভেতরেই। চীন পুরনো অবকাঠামো ধারণার ভেতরেই বাড়তি যে নতুন ধারণা হাজির করেছে সেটা ইন্টারন্যাশনাল অথবা বলা যায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের। যেমন এক-বেল্ট-এক-সিল্ক-রোড বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা ইউরোপ থেকে সড়কপথে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে, মধ্যএশিয়া হয়ে, চীন হয়ে এরপর সারা এশিয়ায় সবাইকে একই সড়ক অবকাঠামোতে যুক্ত করার প্রকল্প। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওয়েবসাইটে এসব নিয়ে একাডেমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। পুরনো বিশ্ব-অর্থনীতি যে ফর্মুলায় আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম পরিচালিত করত তা হল – গরিব দেশ থেকে কাঁচামাল তুলে নিয়ে আসা, গরীব দেশকে নিজ পশ্চিমের দেশে তৈরি পণ্যের ক্রেতা বানানো ইত্যাদি। এই ব্যবস্থার বদলে চীন মনে করে অন্তত এশিয়ার স্ব স্ব দেশেই ওই কাঁচামাল দিয়ে তাদের শিল্প সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলা সম্ভব, এমনকি চীনের নিজের ভারী শিল্পগুলোকে স্থানান্তর করে দেয়াও সম্ভব। এবং স্থানান্তরিত কারখানার পণ্য চীন নিজে আমদানি করতে রাজী। বিনিময়ে আরো জটিল চীনা পণ্য এশিয়ার অন্যেরা কিনে নিবে – এভাবে এগিয়ে যেতে চীন ভীত নয়। আমেরিকান ইকোনমিষ্টের ভাষায় এটা চীনের “build-it-and-they-will-come path”। এ জন্যই সে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের অবকাঠামো প্রকল্প যেমন এক-বেল্ট-এক-সিল্ক-রোড অথবা কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প যা গুচ্ছ কয়েক রাষ্ট্র ব্যবহার করবে, এসব বিশাল অবকাঠামো গড়তে আগ্রহী।
    চীন বাংলাদেশে অবকাঠামোগত খাতে বিপুল বিনিয়োগ করতে সক্ষম ও আগ্রহী এ কথা গত ২০১০ সাল থেকেই জানিয়ে আসছে। বলা বাহুল্য, চীনের দিক থেকে ‘উন্নয়ন’ শব্দের পুরনো অর্থ চীন এখানে নিঃসন্দেহে বদলে ফেলবেই। এসব বিষয়ে আমাদের দিক থেকে এর ভালো-মন্দ অলিগলি বুঝে নেয়ার কাজ আমাদের জন্য পড়ে থাকছে। প্রয়োজন সে দিকে উপযুক্ত আগ্রহে সময় দেয়া।

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সংখ্যায় এবং দৈনিক নয়াদিগন্ত ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সংখ্যায় আলাদা আলাদা লেখা আগের ভার্সান হিসাব ছাপা হয়েছিল। ঐ দুই লেখা একসাথে এখানে পরিবর্ধন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    goutamdas1958@hotmail.com

  • রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

    রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

    ভারতকে জামিনদার রেখে নেপালি রাষ্ট্র গড়ার খায়েস
    ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,বুধবার

    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-Fa

    গত প্রায় চার মাস ধরে ল্যান্ড লকড নেপালে পণ্য প্রবেশ ও যাতায়াত রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা মূলত ভারতের আরোপ করে অবরোধ। জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাসসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল সব কিছুর সরবরাহ এতে ব্যাহত হচ্ছে। এক কথায় বললে ভারত থেকে নেপালে যাওয়া সব পণ্যের চালানের উপর অবরোধ চলছে। নেপাল ল্যান্ড লকড ভূখণ্ড বলে সে ভারতের মধ্য দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় নির্ভরশীল।
    গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ নেপাল তার নতুন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রচনার সমাপ্তিতে তা কার্যকর-চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য এটা এক গুরুত্বপুর্ণ প্রক্লেমেশন। এই প্রক্লেমশনে ভিন-রাষ্ট্রের খুশি বা দুঃখ পাবার কো বিষয় নয়। কিন্তু সেই থেকে অখুশি অসন্তুষ্ট ভারত পণ্য অবরোধের রাস্তা ধরেছিল। ভারতের ব্যাখ্যা অনুসারে, দেশটি স্বীকার করে না যে- ভূমি আবদ্ধ নেপালে পণ্য সরবরাহের একমাত্র পথ ভারত অবরুদ্ধ করেছে। যদিও এটা প্রমাণিত যে ভারতীয় কাস্টম এবং বর্ডার গার্ড বিএসএফ স্পষ্ট বলছে যে ‘ওপরের নির্দেশে’ তারা এটা বন্ধ রেখেছে। তবু ভারতের ব্যাখ্যা হলো, নেপাল-ভারত সীমান্তের অধিবাসী যারা সমতলীয় ‘ত্বরাই’ অঞ্চলের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এদেরই বড় অংশ হলো মাধেসি জনগোষ্ঠী। যারা মনে করে নতুন কনস্টিটিউশনে তাদের প্রতিনিধিত্ব সঠিক ভাবে হয় নাই, কম করে রাখা হয়েছে। এজন্য তারা অসন্তুষ্ট হয়ে নেপাল-ভারত সীমান্ত অবরোধ করে রেখেছে। ভারত থেকে পণ্য আসা বন্ধ করেছে। ব্যাখ্যা যার যাই হোক, বাস্তবতা হল এটা কার্যত নেপালের জন্য সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ। আর সেই সূত্রে তা নেপালের রাজনীতিতে রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল। সম্প্রতি এই স্থবিরতা কাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
    নেপালের জনগোষ্ঠী গঠনের মধ্যে এমনিতেই সমতল-পাহাড়ি এমন ভূবৈশিষ্ট্যগত বিভেদ আগে থেকে ছিল। কিন্তু একালে নেপাল-ভারত সীমান্তের জনগোষ্ঠী সমতলী অঞ্চলের মাধেসি নেতারা তাদের স্বার্থ নেপালে ভারতের স্বার্থের সাথে মাখিয়ে গাঁটছড়া বেঁধে তুলে ধরাতে নিজ নেপালিদের জনগোষ্ঠীগত স্বাভাবিক বিভেদকে অস্বাভাবিক ও বড় করে ফেলা হয়েছে।

    নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৮ সালে ঐতিহাসিক পাশ ফেরার মতো প্রধান ঘটনা হল গত ২৪০ বছরের নেপালের শাসক ‘শাহ’ রাজবংশের শাসনের পরিসমাপ্তি। যেটাকে আমরা রাজনৈতিকভাবে নতুন এক বিপ্লবী গণরাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থানের ফলে রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ও রাজতন্ত্র ব্যবস্থার সমূলে উচ্ছেদের ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি। ব্যাপারটাকে প্রতীকী দিক থেকে বললে এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে একটা রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, এর বদলে এক প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে প্রকাশিত আরেক ঐতিহাসিক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সত্য হল, নেপালের রাজতন্ত্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের লড়াইয়ে ভারতের ভূমিকা ছিল আমেরিকার সহায়তায় কেবল ইতিবাচক সহযোগী বা সমর্থকের নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকের। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লড়াই – শুরু করার দিক থেকে এতে একক নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল নেপালের নতুন মাওবাদী রাজনৈতিক ধারার দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) বা ইউসিপিএন (মাওবাদী)। যারা এ লড়াইকে কেবল নিজ মাওবাদীদের নয়, সারা নেপালি জনগোষ্ঠীর লড়াই এবং এটা নেপালিদের সাধারণ ও প্রধান স্বার্থ হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর নেপালের সব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে এর পক্ষে সমর্থক হিসেবে সংগঠিত করা- কাজের এই শেষের অংশে আরো দুই প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল। এরা হলো আমাদের সিপিবির মতো কনস্টিটিউশনাল কমিউনিস্ট দল- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড এমএল ) এবং নেপালি কংগ্রেস। নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরাসহ এ তিনটি দলই সেই থেকে ৮০-৮৫ শতাংশ নেপালি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। বলা যায়, রাজতন্ত্র-উত্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শক্তির নিয়ন্ত্রক হল এই তিনটি দল, যাদের মধ্যে তা ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এ তিনটি দলের জোটের পেছনেই ভারত পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে নেপালের রাজতন্ত্রে সমাপ্তিতে ইতিবাচক ও নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল।
    কিন্তু রাজতন্ত্র উৎখাত হলেও নেপালে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা যায়নি। নেপালের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা এখানেই। প্রধান কারণ, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে উত্থিত ক্ষমতায় ভারতের কোনো ভাগ বা স্টেক নেই। নেপালি রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারতের স্বার্থের প্রতিনিধি কেউ নয়, নেই। কারণ রাজতন্ত্র উৎখাতে নির্ধারক পর্যায়ের ভূমিকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ভারত এটা নিজগুণে বিষাক্ত করে ফেলেছে। ভারতের ট্র্যাজেডি হল সে ঠিক কী চায়, কিভাবে চায় এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করা সুনির্দিষ্ট ও উপযুক্ত – নেপালের স্বার্থের ভেতর দিয়ে তা ভারতেরও স্বার্থ এভাবে এমন কোনো নীতি-পলিসি পেশ করা ও এর পক্ষে সমর্থন আদায় করতে না পারার কারণে সে নেপালের ক্ষমতার স্টেক থেকে বিচ্ছিন্ন। মনে রাখা যেতে পারে, মাওবাদীদের ১৯৯৬ সালে ৪০ দফার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের শুরুর সময় তারা নেপাল-ভারত কলোনিয়াল চুক্তির (১৯৫০ সালের চুক্তি) বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এবং ভারতকে নেপালের প্রধান শত্রু বলে চিহ্নিত করে ওই আন্দোলন শুরু করেছিল। ফলে খুব সম্ভবত ঐ চুক্তি ও ভারত সম্পর্কে এই মূল্যায়ন প্রসঙ্গে এ তিন দলের কিছু অভিন্ন মূল্যায়ন, অলিখিত সমঝোতা আছে। তৈরি হয়েছে। ফলে এই তিন দল যাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও নেপালের বর্তমান নতুন শক্তি ক্ষমতা তাদের হাতে ও নিয়ন্ত্রণে। সব ক্ষমতা এ তিন দলের হাতে ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এরই প্রতীকী প্রকাশ তারা ঘটিয়েছে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দিয়ে ও পরবর্তীকালে সরকার গঠন করে। নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে মাওবাদী দলের সমর্থনে অপর কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) এখন সরকার গঠন করে ক্ষমতায়, যার প্রধানমন্ত্রী খার্গা প্রসাদ শর্মা অলি। আর এই সরকার গঠনের আগে সংসদের ভোটাভুটিতে নেপালি কংগ্রেস এ’দুই কমিউনিস্ট দলের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে হেরে গিয়ে বিরোধী দলে আসন নিয়ে আছে।
    আর এটাই ভারতের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যর্থতা-অযোগ্যতাকে রেজিস্টার্ডভাবে প্রমাণিত করেছে যে, এ তিন দলের হাতে ভারতের স্বার্থ উপেক্ষিত। এ তিন দল ভারতকে দায় মনে করে, ব্যাগেজ হিসাবে দেখে। ভারতের ব্যাগেজ বইতে এরা কেউ এখনো রাজি নয়। ফলে নেপালের তৈরি হওয়া নতুন ক্ষমতায় ভারতের কোনো স্টেক নেই। উপায়ান্তর না দেখে ভারতকে এখন ভরসা করতে হচ্ছে নেপালের অ-প্রধান ধারার জনগোষ্ঠী, সমতলীয় ত্বরাই অঞ্চলসহ অন্যান্য অধিবাসী মূলত মাধেসিদের রাজনীতির ওপর।
    এককথায় বললে এই রাজনৈতিক উপস্থাপন সেকটারিয়ান, বাংলায় আমরা যেটা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির রাজনীতি বলে চিনি। যদিও ভারতে – এরা ভারতের সব মিডিয়া এই রাজনীতিকে হাজির করছে, যেন নেপালি সংখ্যালঘুদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর জন্য ভারত এটা করছে। অথচ সত্যিকার ঘটনা হলো ২০০৬-২০০৯ সাল, যেটা নেপালের রাজনীতির মৌলিক বদলের দিক থেকে টার্নিং পয়েন্ট- এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ার তাৎক্ষণিক আগের ও পরের সময় – সে সময়ে নেপালের রাজনীতিতে মাধেসি বলে কোনো ইস্যু কোনো কিছু ছিল না।
    নেপালের জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে এটা বলা হয়, পাহাড়ি-সমতলি হিসেবে জনসংখ্যা প্রায় সমান দু’ভাগে বিভক্ত। আবার কেবল মাধেসিদের নিয়ে রাজনীতি করে নেপালে এমন আঞ্চলিক দলের প্রায় শেষ নেই। আর এমন আঞ্চলিক দল খোলার হিড়িক লেগেছিল ২০০৯ সালে, যখন ‘মাধেসি’ ইস্যু হতে শুরু করে। এর আগে মাধেসিরা সবাই প্রধান ধারার ওই তিন দলের কোনো একটা করত, বেছে নিত। আর এর মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব পেত। অর্থাৎ ওই তিন প্রধান রাজনৈতিক দল দুই কমিউনিস্ট ও নেপালি কংগ্রেস এর আগে মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর পুরোটাকেই প্রতিনিধিত্ব করত। তবে মাধেসিদের নানান আঞ্চলিক দল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যারা প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থান নিয়েছে এরা ছাড়াও  মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর একটা বড় অংশকে এখনো ঐ তিন দলই প্রতিনিধিত্ব করে।
    যেমন যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম অবরোধে আটকে থাকা নেপাল বা নেপাল-ভারত সম্পর্ক, এর জট খোলার আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি তা পাস হয়েও গেছে। মোট ৬০১ মোট সদস্যের এই সংসদে প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থানের মাধেসি সদস্য যারা ভোটাভুটির সময়ের আগেই ওয়াকআউট করে গেছে, এরা হলো মাত্র ৩৫ জন। সংশোধনীটা পাস হয়েছে মোট ৬০১ সদস্যের মধ্যে ৪৬১ সদস্যের পক্ষ ভোটে। সাত সদস্যের বিপক্ষ ভোটে। আর ঐদিনের সভায় অনুপস্থিত সদস্য মোট ১২৮ জন, যার মধ্য মাধেসি  ঐ ৩৫ জনও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যারা অবরোধের পক্ষে এমন মাধেসি সংসদ সদস্য মাত্র ৩৫ জন। ফলে ভারত প্রচার চালাবার সময় মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি গুলো জনসংখ্যার অর্ধেক বলে প্রপাগান্ডা করলেও ফ্যাক্টস হল, মাধেসি জনগোষ্ঠি আঞ্চলিক প্রো-ইন্ডিয়ান দলগুলোকে ভোট দেয় নাই। এজন্য তারা মোট ৬০০ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন।
    প্রো-ভারত মাধেসি দলগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সবচেয়ে বড় জোট হলো ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট। গত চার মাসের অবরোধে রাজনীতিতে তারা শুধু শাসক ক্ষমতাসীনদের থেকেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনি ও বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, বরং একই সাথে নেপালের সাধারণ মানুষ, প্রধান ধারার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকেও নিজেদের দূরে দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত্রুর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। একই ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানান ধরনের স্বার্থবিরোধ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বার্থবিরোধ থাকা এক জিনিস, আর সেই বিরোধকে শত্রুতায় রূপ দেয়া আরেক জিনিস। গত পাঁচ মাসে এই বিপজ্জনক শত্রুতার আগুন নিয়ে খেলার কাজটা ভারতের প্ররোচনায় মাধেসিরা করেছে।
    নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনার পরের পরিস্থিতিকে ভারতের হিন্দুস্থান টাইমস বর্ণনা করছে এভাবে, বলছে “এর পরও ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট এই সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে এটা তাদের কিছু দাবি মেনেছে, সব নয়। কিন্তু নেপালের এই নতুন অবস্থান নেপাল ও ভারতকে কাছাকাছি এনেছে”। হিন্দুস্থান টাইমসের এই মন্তব্যে অনেক কিছুর ইঙ্গিত আছে। যেমন- এখনকার এক নম্বর বাস্তবতা হলো পাঁচ মাস ধরে অবরোধ চালানোর পরে মাধেসিদের পক্ষে এই আন্দোলন আর চালানোর অবস্থায় নেই। এমন ধারণা ভারত দিতে চাইছে। গত ২৬ জানুয়ারি রয়টার্সের এক রিপোর্টে এ বিষয়ে এক ডিটেইল নিউজ এসেছে। ওদিকে নেপালি সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পর ভারত একে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও আসলে ভারত ও প্রো-ভারত মাধেসিদের অবস্থান হল, তারা সম্ভবত অবরোধ একেবারে না তুলে ধীরেসুস্থে তুলতে চাচ্ছে। কারণ, এত দিন তারা আন্দোলন এমনভাবে পরিচালিত করেছে, যেন তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করছে, নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ফলে সে চিন্তায় বিচ্ছিন্নতার জায়গা থেকে ফেরত আসতে সময় লাগবে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা চলছে। ওই সফর শেষে অবস্থা বুঝে এরপর পরিস্থিতি আস্তে ধীরে সহজ হতে পারে। যদিও লিখিতভাবে ভারতের স্বাগত জানানো বিবৃতিতে অবরোধ পরিস্থিতি এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সংবিধানে সংশোধনী আনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রো-ভারত ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্টের নেতা রাজেন্দ্র মাহাতোর দাবি। তিনি দুটো অদ্ভুত দাবি করেছেন। যার ভেতর দিয়ে নেপালের নতুন ক্ষমতায় স্টেক হারানো ভারতের করুণ দুর্গতিই প্রকাশ করে। আবার এই দাবির ভেতর দিয়ে একই সাথে মাধেসি সেক্টরিয়ান বা বিভক্তির রাজনীতির আগুন নিয়ে খেলার বিপজ্জনক দিকটি উদোম হয়েছে। যে আগুন ভারতের জন্যও সমান বিপদের হতে পারে। মাহাতোর দাবি, ভারতকে তিনি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িত হোক বা হস্তক্ষেপ করুক দেখতে চান। আর দ্বিতীয়ত, নেপাল সরকার যেসব আইনি সংশোধনী যা আনছেন তা বাস্তবায়নে তিনি ভারতকে জামিনদার বা গ্যারান্টার হিসেবে দেখতে চান।

    সত্যিই এমন তামাশা সহজে খুব একটা দেখা মেলে না। ভারতের সেক্টরিয়ান রাজনীতির মহিমা এমনই যে, মাধেসি নেতারা এখন বলছেন নেপাল সরকারকে বিশ্বাস নেই, ভারতকে জামিনদার হিসেবে চাই! খবরটা ১৮ জানুয়ারির ভারতের দি হিন্দু পত্রিকার বরাতে একই দিন ১৮ জানুয়ারি আমাদের দৈনিক বণিক বার্তা ছেপেছে। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, মাধেসি নেতাদের কী বলা উচিত আর কী নয়, এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে আনার ব্যাপারেও ভারত একেবারেই নাদান। মাহাতোর এই কথা প্রমাণ করেছে তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে মৌলিক ধারণাও রাখেন না। তিনি রাষ্ট্র কী তা-ই বোঝেননি। ফলে তার এমন দাবি। অথচ রাষ্ট্র গঠন করা ভিনরাষ্ট্রকে জামিনদার রেখে করার জিনিস নয়। আবার রাষ্ট্র গঠনের কাজ নিজে করার কাজ; বাইরের কাউকে হস্তক্ষেপ করতে ডেকে করার কাজও নয়। নিজ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভিন্ন নাগরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়। আর ঐ ভিত্তির গাঠনিক দলিল হল কনস্টিটিউশন। বাইরের জামিনদার নয়। তাই রাজেন্দ্র মাহাতো তিনি আসলেই বড়জোর নেপাল রাষ্ট্রে ভারতের স্বার্থের এজেন্ট হয়েই থাকতে চান। এতটুকুর জন্যই তিনি যোগ্য। এটা যেন বাবাকে জামিনদার রেখে কেউ বিয়ে করতে চাওয়ার শখ প্রকাশ করছে। অথচ যেখানে জামিনদার রাখার কথা ভাবতে হয় সেটা কি বিয়ে!
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে ৩১ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর প্রিন্ট পত্রিকায় এবং পরের দিন ০১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খানে তা আবার পরিমার্জন সংযোজন এবং এডিট করে ছাপা হল।]

  • আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন

    আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
    গৌতম দাস

    ২৬ জানুয়ারি ২০১৬,মঙ্গলবার
    http://wp.me/p1sCvy-D3

    আধুনিক রাষ্ট্রের জমানায় বাণিজ্য চুক্তি করার রেওয়াজ উঠেছিল আশির দশকের শুরু থেকে। অর্থাৎ যারা গরিব দেশ বা ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্র বলা হয়, এদের সাথেও বাণিজ্য চুক্তি করার দরকার-বোধের শুরু তখন থেকে। বাণিজ্য চুক্তি বলে এটিকে বাড়িয়ে বলার অর্থ হয় না। সারকথায় বললে আমেরিকা তার নিজ বাজারে নিজ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় গরিব দেশগুলোকে পণ্য রফতানি করতে দেয়া শুরু করেছিল। কথাটিকে আরেকভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক পর মূলত ইউরোপের বাজার বিনিয়োগ-পুঁজিতে পরিপূর্ণ সয়লাব হয়ে গেলে উন্নত অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো মনে করা শুরু করেছিল, তাদের কেবল গরিব দেশে নিজ পণ্য রফতানিকারকের এত দিনের একক ভূমিকায় থাকা বোকামি হচ্ছে। ইউরোপের বাজার স্যাচুরেটেড হওয়ার এর পরে কে? তাই এশিয়ায় আসতে সময় লেগেছিল। অন্তত গ্লোবাল বিনিয়োগ-পুঁজির খাতক হতে পুঁজিবাজারের ক্রেতা বা ঋণগ্রহীতা আরো বাড়াতে চাওয়া- এ দরকারি দিক থেকে দেখে মূলত আমেরিকা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য স্লোগান হয়েছিল- গরিব দেশকে “রফতানিমুখী অর্থনীতি” করে ঢেলে সাজাতে হবে। বাংলাদেশে সে সময়ের এ’বিষয়টার  দুটো ঘটনায় চিহ্নিত করা আছে।

    বাংলাদেশে ‘রফতানিমুখী অর্থনীতি’ করতে বিশ্বব্যাংক ১৯৮২ সালে এরশাদ দিয়ে ক্ষমতা দখল করিয়ে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচি চালু করে দিয়েছিল। এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বা সংক্ষেপে ইপিজেড ধারণা সাথে আসে সেই থেকে। অন্যদিকে সে ঘটনা-সময়ের দ্বিতীয় চিহ্নটি সামাজিক সাংস্কৃতিক ধরনের। কবি ফরহাদ মজহারের এক কবিতার বই আছে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় বেরিয়েছিল, বইটার নামই “অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারী মেশিন”। বইয়ের তাতপর্যপুর্ণ এ’নামটাই অনেক কিছুর নির্দেশক। কলোনি আমল থেকেই আমাদের প্রচলিত রফতানি পণ্য ছিল পাট, কাঁচা পাট অথবা পাটজাত পণ্য। সে আমলে যাকে বলা হত অর্থকরি ফসল। বিশ্বব্যাংকের ওই সংস্কার কর্মসূচিতে এই প্রথম আমাদের সেখান থেকে সরিয়ে এনে মুখ্য রফতানি পণ্য করা হয় রেডিমেড গার্মেন্টস, আর আমাদের পরিচিতি দাঁড়ায় এরই রফতানিকারক দেশ। গার্মেন্ট রফতানির অর্থনীতিতে রূপান্তর করে দেয়া হয়।

    এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার। বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতিকে রফতানিমুখী করে সাজানো শুরুর আগে আমরা আমেরিকায় কোনো পণ্য রফতানি করতে চাইলে তাতে আইনগত কোনো বাধা ছিল তা নয়। তাহলে রফতানিমুখী করে সাজানো – এই পরিস্থিতিতে নতুন যে বিষয়টি তা হলো, আমেরিকাতে কোন কোন পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ কর মওকুফ বা ছাড় পাবে, এমন কিছু পণ্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য সেই পণ্যই রেডিমেড গার্মেন্ট। আর এর সাথে কর মওকুফের এক কোটা ব্যবস্থা। এই হল আমাদের মতো দেশের সাথে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় রফতানিকারকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বাণিজ্য চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া। আমাদের মতো দেশের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি করার ইতিহাসের শুরু। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল, আমাদের মতো দেশকে আমেরিকা কতটা এবং কী কী পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে দেবে, এমন একপক্ষীয় করে নেয়া ব্যাপারের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ।

    তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইস্যুতে ১৯৪৭ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের ব্যানারে নানান বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ শুরুল হয়েছিল। জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস এন্ড ট্রেড, গ্যাট (GATT) থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালে ডব্লিউটিও-তে এসে যা শেষ হয়। এতে আমাদের দিক থেকে পড়ে পাওয়া কিছু সুবিধার রাস্তা তো অবশ্যই খুলেছিল। যেমন আমরা উন্নত দেশের তৈরি সব ধরনের পণ্যের ক্রেতা হওয়া সত্ত্বেও উল্টো খোদ আমেরিকায় কিছু পণ্যের রফতানিকারক হয়ে গিয়েছিলাম। স্বভাবতই তা শুধু সেসব রফতানি পণ্য, তুলনামূলকভাবে যা টেকনোলজির দিক থেকে কম জটিল আর একেবারেই কম দক্ষ শ্রম লাগে আর তা প্রচুর গা-গতরের শ্রম, এমন। কিন্তু সেটাও এমনি আসেনি। অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যেন তারা আমাদের তাদের বাজারে মহান প্রবেশদাতা হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ বাজারে আমাদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ যেন আমেরিকার হাতে থাকে। কথাটা বলার কারণ বিষয়টি রেসিপ্রোকাল নয় বা পাল্টাপাল্টি ধরনের নয়। যেমন আমাদের বাজারে আমেরিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে তো এটা খাটে না। আমরা সেখানে কোনো দাতা হিসেবে হাজির নই। আমাদের বাজারে প্রবেশে আমেরিকার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই। যা হোক, এসবের ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সেই থেকে প্রবল কথাবার্তার জোয়ার উঠেছিল। ‘গ্রুপ-৭৭’ বা ‘উরুগুয়ে রাউন্ড’, ‘দোহা রাউন্ড’ ইত্যাদিতে সাতটি রাউন্ড বিস্তর আলোচনা দরকষাকষির পরে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও হিসেবে হাজির হয়েছিল। কিন্তু এভাবে হাজির হতে হতে আমেরিকা আবার এ ধরনের গ্লোবাল বাণিজ্য সংস্থায় আস্থা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এর মূল কারণ মনে করা হয়, ডব্লিউটিও’র কার্যকারিতা যত বাড়ছিল ততই অর্থনৈতিকভাবে গরিব এলডিসি বা লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজসহ নানা ক্যাটাগরির জোটবদ্ধতা শুরু হতে দেখা যায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে সবার জোটবদ্ধ হয়ে যাওয়া- এটাই আমেরিকার নিরুৎসাহিত হয়ে যাওয়ার কারণ। আর এর বদলে সেই সাথে আমেরিকার নতুন উৎসাহের বিষয় হয়ে ওঠে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি- বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। এর ভেতরে মুক্ত শব্দটি যত জ্বলজ্বল করে, ততটাই এটা বন্দিত্বের ফাঁদ।
    আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে নতুন উৎসাহের ফলে ডব্লিউটিও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেনি ঠিকই; তবে আমেরিকার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমেরিকার সাথে বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। দ্বিপক্ষীয় ধরনের চুক্তি আমেরিকার দিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে ধারণা প্রবল হতে থাকে। এর কারণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি। যেকোনো বাণিজ্য চুক্তি আসলে আইডিয়ালি ‘উচিত অর্থে’- রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই হওয়ার কথা। কিন্তু একটা চুক্তির মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রস্বার্থে বাণিজ্য’ ঘটানো ব্যাপারটা বাস্তবে অলীক না বললেও খুবই কঠিন। ফলে গণস্বার্থের বদলে নামেই এখানে একটা কোটারি স্বার্থ তৈরির সম্ভাবনা থাকে সব সময়। মূলত পুঁজিমালিক বা ব্যবসায়ীর স্বার্থটাই জনস্বার্থের নামে হাজির হয়ে যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেক বিপদ দেখা যায়।

    যেমন- বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধরা যাক। এখানে সরকারের স্বার্থ মানে আসলে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ অথবা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। জনস্বার্থের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বেলায় ক্ষমতাসীন সরকারের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগায়। বিশেষ করে জনগণের রাজনৈতিক মানবিক মৌলিক অধিকার রক্ষা না করা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার রক্ষা না করার মতো ব্যাপার থাকলে তা আড়াল, উপেক্ষা অথবা ন্যায্যতা আমেরিকার দেয়া অথবা না দেয়াকে ব্যবহার করে যেকোনো বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করে নেয়া সম্ভব। কারণ, এখানে ক্ষমতাসীন সরকার নিজের সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে অথবা নিজের ক্ষমতাসীন থাকার স্বার্থে খোদ রাষ্ট্রস্বার্থ বা গণস্বার্থকে বিক্রি করে দেয়া সম্ভব। কারণ আমাদের মত দেশের রাজনৈতিক সাংবিধানিক ব্যবস্থা, পাবলিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আর এটাই আমেরিকার জন্য সুযোগ। অথচ আমেরিকাকে একই বিষয়ে চুক্তি ডব্লিউটিও’র ভেতর জোটবদ্ধ এলডিসি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে করতে হলে, সেখানে কোনো একটা রাষ্ট্রের ‘সরকারের দুর্বলতা’কে ব্যবহার করা যেত না। কারণ সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ স্বার্থের সাথে সমঝোতা চুক্তি, ফলে শুধু একটা রাষ্ট্রের ও শাসকের দুর্বলতাকে পুঁজি করার সুযোগ সেখানে নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকার পছন্দ দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি। এটা হলো এমনই ফ্রি বা স্বাধীন যে, নিজে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে, দলবাজির স্বার্থে স্বাধীনভাবে দেশ বা গণস্বার্থ বেচে দেয়া যায়।
    এখানে দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি বলতে তা শুধু দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যেই এটা হতে হবে এমন বোঝা ভুল হবে। এর আরেক রূপও আছে, যেটা প্রায় যেন একটা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি- ওই ফরম্যাটই কয়েক রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার – এভাবে একসাথে করা হয়ে থাকে। সাধারণত একই স্তর বা মানের অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমেরিকা এমন দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি জোট করে থাকে। অথবা অনেক সময় ভৌগোলিক এলাকা বা অঞ্চলের কয়েকটা রাষ্ট্রের সাথে এমন বাণিজ্য চুক্তি করেছে আমেরিকা। যেমন ল্যাটিন আমেরিকার এমন দু’টি বাণিজ্য চুক্তি হল- উত্তর আমেরিকা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ১৯৯১ (নাফটা) এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ২০০৬ (সাফটা)। আমেরিকার করা এ ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোকেও তারা বাই-লেটারেল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা দ্বিপক্ষীয় এফটিএ বলে ক্যাটাগরি,  নামকরণ করে ফেলেছে।

    এ ছাড়া একই ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ধরনেরই ইদানীং আরেক সর্বশেষ ধাপ হলো, যেমন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা সংক্ষেপে টিপিপি এবং ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি। তবে এখানে এবার ‘পার্টনারশিপ’ শব্দটি নামের শেষে রাখার একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে।

    পার্টনারশিপ
    শব্দটির প্রতীকী কিন্তু এর গুপ্ত বা অনুচ্চারিত দিক হল, রাইজিং ইকোনমির চীন বা আগামী দিনের নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের নেতা চীনের বিরুদ্ধের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একসাথে আমেরিকার করা দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি- এরই জোট এটা। এর আগে সাধারণভাবে আমেরিকা দ্বিপক্ষীয় ধরনের যেসব বাণিজ্য চুক্তি করে চলছিল, এমনকি চলতি শতকে এসেও সে একই কাজ করছিল; তবে একই ধরনের এবারের চুক্তিগুলোতে চীনবিরোধী এক বাড়তি বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। যেমন- টিপিপি, এটা করা হয়েছে মূলত চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের চার পাশের পড়শি কাছে-দূরের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে। মূলত এমন রাষ্ট্রগুলো হল- অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম আর স্বাগতিক আমেরিকা। তবে ব্যতিক্রমভাবে এখানে কানাডা আর কিছু ল্যাটিন আমেরিকান দেশ, যেমন- চিলি, মেক্সিকো ও পেরুও আছে। এ ছাড়া অন্য যে দ্বিতীয় বাণিজ্য চুক্তি ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি – এটা হলো আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার হবু বাণিজ্য চুক্তি।

    টিপিপি আর টিটিআইপি এ দুই চুক্তির মধ্যে নামের শেষ পার্টনার শব্দ যোগ হয়ে আছে সে কথা ছাড়াও এ দুই চুক্তির বড় মিলের দিক হল, এটা চীনবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জোট। এ ছাড়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিলের দিক হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেমন- এ দুই চুক্তিরই প্রস্তুত প্রক্রিয়া চলছে অত্যন্ত সঙ্গোপনে। নিজ জনগণকে দূরে রেখে। লন্ডনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার ভাষায়, ‘এ গোপনীয় ধরনের অগণতান্ত্রিক চুক্তি প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং এ রিপোর্টে তুলে ধরা চুক্তিবিষয়ক প্রায় সব তথ্যই লিকেজ হয়ে আসা তথ্য অথবা তথ্য পাওয়ার অধিকার- ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ আইনে অনুরোধ পাঠিয়ে সংগ্রহ করা তথ্য’। অন্য দিকে এ চুক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটেনে জনমত সংগঠিত করার সংগঠন ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর নির্বাহী পরিচালকের ভাষায়, তিনি মনে করেন এ হবু চুক্তি ইউরোপ ও আমেরিকান সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির আক্রমণ।

    এই হলো সংক্ষেপে আমেরিকার করা ধারাবাহিক বাণিজ্য চুক্তির ইতিহাস। সাধারণভাবে বললে, আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করার উদ্দেশ্য হল, বড় বড় বিজনেস হাউজ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে যেসব রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন-রীতি মেনে চলতে বাধ্য হয় এমন নিয়ন্ত্রণ আইনগুলোর যে আইনি বাধা আছে, সেগুলো আলগা করে দেয়া। চুক্তি করার আগে প্রায়ই আমেরিকার ‘পার্টনার’ রাষ্ট্র ওই চুক্তি করার খাতিরে নিজ আইনের নিয়ন্ত্রণ আলগা করে ফেলে থাকে। যেমন নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, পরিবেশবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, ব্যাংকবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন অথবা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা বিষয়ক আইন- এগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছামতো ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুবিধা নেয়া এসব চুক্তির সাধারণ উদ্দেশ্য। আর এই মূল উদ্দেশ্যের অধীনে অন্যান্য উপ-উদ্দেশ্যে যেমন চীনবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি জোট অথবা আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি (জিএসপি’র মতো) করা হয়ে থাকে।

    নতুন ফেনোমেনা : মানবাধিকার
    প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকা এমন বাণিজ্য চুক্তি করে যাচ্ছিল, কোনো সমস্যা বা আপত্তি দেখা যায়নি। কিন্তু এবারই প্রথম এসবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার এক পাল্টা প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রথম টিপিপি এবং টিটিআইপি- এ দুই চুক্তির বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সাবধান করেছেন জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের (ইউএন-এইচআরসি) হেডকোয়ার্টার জেনেভা থেকে এর র‌্যাপোটিয়ারেরা বা র‌্যাপোরচারেরা। ফরাসি শব্দ ‘র‌্যাপোটিয়ার’-এর তুল্য ইংরেজি শব্দ ইনভেস্টিগেটর। অর্থাৎ নিরপেক্ষ তদন্ত অনুসন্ধান করে রিপোর্টদাতা। বিভিন্ন দেশের হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ঘটনায় অথবা কোনো সদস্য রাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটসের দশা পরিস্থিতি বিষয়ক ঘটনাকে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার জন্য জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের নিয়োগ দেয়া বিভিন্ন বিষয়ের র‌্যাপোটিয়ার আছেন। কাউন্সিল থেকে এরা এক ধরনের নিয়োগ নেন বটে, কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নেন না বা পান না। তবে কোনো ব্যক্তি সহকারী বা বস্তুগত লজিস্টিক সাপোর্ট লাগলে তা কাউন্সিল থেকে নিতে পারেন। সে জন্য এদের নিরপেক্ষ র‌্যাপোটিয়ার বলা হয়। যেকোনো ইস্যুতে এই র‌্যাপোটিয়ারদের সরজমিনে সংগ্রহ ও পেশ করা রিপোর্টকে মাঠের ফ্যাক্টস বা ভিত্তি মেনে এর ওপর এরপর সদস্যদের আলোচনা শুরু হয় ও সিদ্ধান্ত রেজুলেশনে পৌছানো হয়। এমন কাজ করে সুনাম কামিয়েছেন, এমন নামকরা ১০ জন র‌্যাপোটিয়ার উদ্বেগ জানিয়ে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন গত ২০১৫ সালের জুন মাসে। ওই বিবৃতিতে সবার আগে তারা স্পষ্ট করে নিয়েছেন যে, তারা যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজন বোঝেন। ফলে তাদের ইস্যু কোন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধীতা করা নয় বরং ওই চুক্তি করতে গিয়ে করা মানবাধিকার লঙ্ঘন।

    এ ছাড়া শুধু উদ্বেগ জানানো নয়, ওই বিবৃতিতে সবশেষে কী করা উচিত সে বিষয়েও কিছু পরামর্শ তাঁরা দিয়েছেন। যেমন- কাজ গোপনে না করে কাজে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা আনা, জনপ্রতিনিধিদের সামনে সব কিছু উন্মুক্ত রাখা, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে-পরে মানবাধিকারের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে তা বিবেচনায় নেয়া, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা কী থাকছে সেদিকে নজর দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদি।

    ওই বিবৃতির প্রায় ছয় মাস পরে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৬ আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় হিউম্যান রাইটসবিষয়ক দাতব্য সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ বা সংক্ষেপে এইচআরডব্লিউ একই ইস্যুতে নিজেরই তৈরি আটটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ছলে টিপিপি’র কার্যক্রমকে প্রশ্ন করেছে। টিপিপি চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানিয়ে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছে সেখানে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং আমেরিকান কোনো সরকারি দান তারা গ্রহণ করে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া এরা নিজ সরকারি নীতি অনুসরণ করে কাজ করে সিদ্ধান্ত নেয় এমন নয়। যেমন- মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ইস্যুতে এইচআরডব্লিউ শক্ত সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষত যেখানে ওবামা প্রশাসনসহ সারা পশ্চিম জগৎ ব্যবসার লকলকে লোভে এই ইস্যুতে চুপচাপ ছিল। পরবর্তীকালে ওবামা দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জেতার পরের সপ্তাহে প্রথম মিয়ানমার সফরে এসে মানবাধিকার বিষয়ে নিজ সরকারের অবস্থানের বদল ঘটিয়েছিলেন। তবে স্বভাবতই এই সংগঠন প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাতের ভাষায় না বললেও স্পষ্ট আপত্তির ভাষায় টিপিপি ইস্যুতে নিজের আলাদা অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ফলে সুযোগ রেখেছে যেন চাইলে ওবামা সরকার নীতি বদলিয়ে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে। যেমন- দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের শুরুতে এইচআরডব্লিউ বলছে, আমেরিকার ফ্রি টেড অ্যাগ্রিমেন্ট ভালো না মন্দ- এ বিষয়ে তাদের কোনো অবস্থান নেই। কিন্তু টিপিপি চুক্তিতে কিছু মারাত্মক হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ইস্যু উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে তারা মনে করে। বিশেষত “শ্রমিকের অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, সুস্বাস্থ্য থাকার অধিকার, মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশ এবং ইন্টারনেটে প্রাইভেসির অধিকার” বিষয়ে। তবে তাদের অবস্থান হল, টিপিপিতে হিউম্যান রাইটস বিষয়ক যে সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা সংশোধনযোগ্য। এছাড়া একটা হিউম্যান রাইটস ফ্রেন্ডলি টিপিপি কেমন হতে পারে এর একটা ধারণাও তারা রেখেছে। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার স্বভাবতই। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট রাজনীতির শক্তিতে সংগঠিত না করে কেবল মানবাধিকার সংগঠনের মুখ চেয়ে থাকা পরিস্থিতি তৈরি করে রাখলে তা আমেরিকার জন্য এমন আরো টিপিপি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেতে পারে।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদশ পত্রিকা ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় এবং দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান আকারে আবার ছাপা হল। ]

  • তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো

    তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো
    গৌতম দাস
    ২২ জানুয়ারি ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-zG

    ব্যাপারটা শেষ বিচারে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে বিক্রির প্রতিযোগিতা। চলতি মাসের ১৪ তারিখে রয়টার্সের বরাতে দৈনিক ‘বণিকবার্তা’ বলছে, ১৫০ ডলার ব্যারেলের তেল এখন দাম কমতে কমতে প্রায় ৩০ ডলারেরও নিচে নেমে গেছে। বিগত শেষ ২ বছর থেকে এ কমতি দশা। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্রমে একটানা বাড়তিতে ২০০৮ সাল থেকে যে তেলের দাম ১৫০ ডলার উঠেছিল প্রথমে পরে সেই দাম নামতে নামতে ৭০ ডলারে থিতু হয়েছিল। কিন্তু গত ৬ মাস থেকে এটাই আবার নামতে নামতে এখন এ ২৭ ডলারে নেমে যাওয়ার দশা। প্রায় ১ বছরের কিছু আগে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্সের এক নিউজ রিপোর্ট শঙ্কা ব্যক্ত করেছিল যে, তেলের দাম ২০ ডলারে পৌছাতে পারে। মনে হচ্ছে, ঘটনা সেই দিকে যাচ্ছে। আল-জাজিরার টক শো “ইনসাইড স্টোরি”তে তেলের দাম ১০ ডলারে নেমে যেতে পারে কিনা তা নিয়ে আলোচনা তুলেছিল গত সপ্তাহে।

    তেলের দাম এত উঠাপড়ার সাধারণ কারণ কি আছে
    মোটা দাগে বললে, একেক পর্যায়ে তেলের দাম ওঠা বা পড়ার কারণ একেক ধরনের। তাই সাধারণীকরণ না করে প্রতি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণের দিক থেকে তা বুঝতে হবে। যেমন, যে ১৩ বছর ধরে বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে দাম উঠতির কথা বলছিলাম এর প্রধান কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি। ব্যাপারটা মূলত চীনকে ঘিরে। চীনের মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। তাঁর মৃত্যুর আগের শেষ ৬ বছরের সময়কালে পশ্চিমের সঙ্গে (মূলত আমেরিকার সঙ্গে) চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় ধরনের রদবদল ঘটায় নতুন করে তা সাজানো হয়েছিল। যার সারকথা হলো, চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি নেবে, চীনে ব্যাপকভাবে বিদেশি পুঁজি আসতে দেবে। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ খাতেও। এককথায় গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের দুনিয়ার ভেতর কমিউনিস্ট চীন পুরোপুরি প্রবেশ করবে। অন্যভাষায় বললে, কমিউনিস্ট চীন নিজে এক ব্যাপক পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরে যাবে এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় পুঁজি চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে আসতে দেবে। এরই মৌলিক নীতিগত রফাদফা সম্পন্ন হওয়ার কাল ছিল ঐ শেষ ছয় বছর। বিস্তারিত রফাদফার খুঁটিনাটি শেষ করে চীনের নিজের অভ্যন্তরীণ আইনকানুন নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন নিয়্মে সাজাতে সাজাতে সময় লেগে যায় প্রায় ১৫ বছর, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এটাকে প্রস্তুতিমূলক বা পিকআপ নেয়ার আগের সময় বলা যেতে পারে। পরের ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছরকে বলা হয় রাইজিং ইকোনমির বা উদীয়মান অর্থনীতির চীন। এই এক নতুন টার্ম, যেটা উন্নত পশ্চিম আর আন্ডার ডেভেলপড (অনুন্নত) তৃতীয় বিশ্ব এই দুই শব্দের বাইরে; নতুন এক শব্দ। মূলত চীনের একেবারে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর প্রভাবে আর যে চার অর্থনীতি – ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা উঠে দাঁড়িয়েছিল মোট এ পাঁচ অর্থনীতিকে বোঝাতেই এই নতুন টার্ম রাইজিং ইকোনমি।

    তাহলে কথা দাঁড়াল, তেলের দাম দিয়ে গ্লোবাল অর্থনীতির মতিগতি বুঝতে সেকালে তেলের দাম বৃদ্ধির এক অন্যতম কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি – এটা বুঝতে হবে। এমনটা ঘটার বড় কারণ ছিল ১৯৯০-২০১০ এ ২০ বছরে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ডাবল ডিজিটের জিডিপিতে, যেটা খুবই মূল্যবান লক্ষণ মানা হয় এবং কোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সচরাচর তা দেখা যায় না এমন। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনা অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধির সে সময়ের আর এক লক্ষণ ছিল, ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা। এ বেড়ে চলা চীনের চলতি যে জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছিল শুধু সেজন্য নয়, বরং পরের কমপক্ষে ২০ বছরের পরিকল্পনায় চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরবরাহের প্রবাহ যেন একই ধরনের থাকে, এজন্য বিভিন্ন দেশের প্রমাণিত রিজার্ভের তেল খনিতে আগাম বুকিং বা ক্রয়চুক্তি করেছিল চীন। অর্থাৎ সার কথা হলো, চীনের অর্থনীতিতে তেলের চাহিদা – এ ক্ষুধার খবর বাজারে রটে থাকাতে তেলের বাজারে বিপুল বিনিয়োগকারীর আনাগোনায় দাম ১৫০ ডলারে উঠেছিল। অতএব ওই সময়ের তেলের উচ্চমূল্য রাইজিং ইকোনমিগুলোর উচ্চ চাহিদার নির্দেশক ছিল।

    এখানে মনে রাখা ভাল চীনের অর্থনীতির ওই ক্রমবর্ধমান উচ্চ চাহিদার প্রভাবে গ্লোবাল অর্থনীতিও বৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল ও নাড়াচাড়া পড়েছিল। বিশেষ করে তেল বিক্রির দেশ এবং বাকি রাইজিং ইকোনমির দেশের অর্থনীতিও চাঙা হয়েছিল। তেল বিক্রির দেশ, যেমন রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, দুবাই এদের সবারই বাজেটের বড় বা মূল আয়ের উৎস হল তেল বিক্রি থেকে আয়। কোনো কোনো এমন দেশের ৯০ থেকে ১০০ ভাগ বিদেশি মুদ্রা আয় বা রাজস্ব আয় হল তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থ। ফলে চীনের তেলের চাহিদা বৃদ্ধি মানে এসব তেল বিক্রি করা দেশের অর্থনীতি চাঙা করে রাখা। অর্থাৎ একটা চেইন ইফেক্ট বা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতার এক লম্বা শিকলের মতো অর্থনীতি ওখানে ওই পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল। তবে একেক দেশের তেল উতপাদন বা তোলার বিনিয়োগ ইত্যাদির খরচে ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় হলো এ হিসাবে দেখা গেছে, তেল রাজস্বের ওপর নিজের বাজেট নির্ভরশীল বলে মোটামুটি ৯০ থেকে ১০৫ ডলার – তেলের দাম ঐ জোনের মধ্যে বা উপরে থাকলে তা প্রায় সব তেল বিক্রি করে চলা দেশের অর্থনীতি চাঙাভাবে থাকে। রাষ্ট্র হাত খুলে বাজেট তৈরি ও খরচ করতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রগুলোর সবার বেলায় তেল-রাজস্ব ঠিক মত না এলে ঠিক বাজেট ছাঁটতে হবে এমনটা নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব। যদিও এবারই প্রথম এবারের ঘোষিত সৌদি বাজেট ঘাটতি বাজেট বলে দেখানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, সৌদি অর্থনীতি প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা হাফ বিলিয়ন ডলার আয় কম হচ্ছে এই অর্থে সে ঘাটতিতে আছে। আইএমএফের এক অনুমিত হিসাব মতে, গালফ রাষ্ট্রগুলো এ বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় হারাবে। একা সৌদি আরব ইতোমধ্যে গত একবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৬৪৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে বলে সৌদি মনিটারি এজেন্সীর বরাতে আলজাজিরা জানাচ্ছে। 

    অন্যদিকে আর একটা খবর আমাদের এ দিকের মিডিয়ায় নজরেই আসে নি। সেই খবরটা হলো, আমেরিকা এখন তেল রফতানিকারক দেশ। অনেকে অবশ্য হতে পারে আগে খেয়াল করেননি অথবা নিশ্চিত ছিলেন না যে আমেরিকা কি তেল রফতানিকারক দেশ ছিল নাকি! জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, আগে ছিল না। তবে কথাটা ভেঙে বলতে হবে- ছিল না মানে কী? রফতানি করার মতো তেল ছিল না নাকি, তেল ছিল কিন্তু আইন করে রোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? হ্যাঁ, দ্বিতীয়টা। অর্থাৎ আমেরিকার রফতানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল, যাতে রফতানি করা না যায়। এমনকি আমেরিকার যেসব স্টেট বা রাজ্য তেল তুলে বেচার ব্যবসায় জড়িত ও তেল বেচা আয়ের উপর রাজ্য বাজেট বড়ভাবে নির্ভরশীল এমন রাজ্যগুলোর রাজস্ব আয় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে, যেমন আলাস্কা, নর্থ ডাকোটা, টেক্সাস, ওকলাহামা, লুসিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যগুলো।

    কবে থেকে এবং কেন?
    কারণের বিস্তারে যাওয়া যাবে না এখন, সে অন্য প্রসঙ্গ হয়ে যাবে তাই। তবে সংক্ষেপে বললে, তৃতীয় আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ, আরব জাতীয়তাবাদী হয়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় ও শেষবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছিল।ঐ যুদ্ধে আরবেরা খুব খারাপভাবে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু এতে এর চেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে এরপর সবাই আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা ফেলে নিজ নিজ রাষ্ট্রবাদী-জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে ধরেছিল; সেই থেকে আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা আর কেউ বইতে রাজি হয় নাই। যেমন আরব জাতীয়তাবাদী জামাল নাসেরের মিসর এর পর থেকে হয়ে যায় মিসরীয় জাতীয়তাবাদে। এখানে বলে রাখা ভালো, বাক্যগুলোকে এভাবে লেখা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু  এটা “আরব জাতীয়তাবাদ” হারানোর কোন শোক থেকে একেবারেই নয়। বরং কথাগুলোকে আরব জোটবদ্ধতা হারানোর শোক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেভাবেই লেখা। আরব জোটবদ্ধ যেটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এখনও খুবই জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু সেসময়ে যুদ্ধে হেরে আরবদের দিক থেকে রাগের মাথায় একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত “তেল অবরোধ” নামে পরিচিত। শুনতেও খুব ভাল, জাতীয়তাবাদী জোশে উঠে দাড়ানোর মত। ব্যাপারটা হল জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ আরবেরা সে সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল পশ্চিমকে আর তেল বেচবে না। এই ছিল সিদ্ধান্তের সারকথা। মনে করা হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চিমকে খুব বড় বিপদে ফেলা যাবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতা ও এর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ফসিল ফুয়েল বা মাটির নিচের জ্বালানির ওপরে। দুনিয়াতে যে জ্বালানির বিরাট এক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের দেশে ও দখলে । ফলে পশ্চিমারা বিরাট অসুবিধায় পড়বে। কথা সত্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য এক সত্যও আছে। রিলেশনাল, মানে পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকার দিকটা কেউ ভালো করে দেখেনি। তেল না বেচলে ক্রেতার কী দশা হবে, কী অসুবিধায় পড়বে এটা যত বেশি নজর করা হয়েছিল, এর কণামাত্র নজর দেয়া হয়নি এতে বিক্রেতার কী দশা হবে। এতে ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যেন তেল বিক্রি করা বিক্রেতার একটা ঐচ্ছিক ব্যাপার খেয়াল বা শখ। তেল বিক্রি যেন বিক্রেতার দিক থেকেও গভীর প্রয়োজনের বিষয় নয়। অথচ ব্যাপারটা ছিল ঠিক এর উল্টো।  প্রতিটি আরব রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে বাজেটের রাজস্ব আয়ের (৯০-১০০%) একমাত্র উৎস ছিল ফসিল ফুয়েল বিক্রি। ফলে তেল বিক্রি না করলে পশ্চিমা শক্তি বিশাল বিপদে পড়বে সন্দেহ নেই; কিন্তু তেল বিক্রেতা আরব দেশগুলোর অর্থনীতি চলবে কীভাবে? এ দিকটাতে কোন গুরুত্বই দেয়া হয়নি। অতএব বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল শেষ বিচারে আত্মঘাতী হিসেবে হাজির হয়েছিল। আরব জাতীয়তাবাদ থেকে মিসরীয় জাতীয়তাবাদ অথবা সিরীয় জাতীয়তাবাদ হয়ে যাওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলোও কাজ করেছিল। শেষ বিচারে তেল অবরোধ হয়ে ওঠে আরবদের জন্যই বুমেরাং, কাউন্টার প্রোডাকটিভ। এ ছাড়া যুদ্ধ কোন ব্যয়-বিনিয়োগ প্রকল্প নয়, বরং আয়বিহীন বা রিটার্ণ না আসা এক বিনিয়োগ। ফলে  একদিক থেকে দেখলে যুদ্ধ মানে একটি রাষ্ট্রের আয়বিহীন এক ব্যয়ে জড়িয়ে পড়া। আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে সব আরব রাষ্ট্রের দশা ছিল তাই। ফলে যখন তেল বিক্রির আরব রাষ্ট্রগুলোর দরকার আরও আয় যাতে যুদ্ধ মানে ওই আয়বিহীন একটি ব্যয়ে ভারসাম্য ফেরে। অথচ তাঁরা পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রয়োজনের উলটা – তেল অবরোধ। ফলে তেল অবরোধ সিদ্ধান্ত না টেকার পেছনে এটাও বড় একটা কারণ।
    তবু “তেল অবরোধ” নামে তৎপরতাটাই, তা সে যত কম দিন কার্যকর থাকুক তা পশ্চিমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিল। এরই প্রমাণ হলো আমেরিকার থেকে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে আমেরিকা তেলে উদ্বৃত্ত হোক আর না হোক, আমেরিকান তেল কোনো ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারবে না বলে আইন পাস হয়েছিল। আইনটা পাসের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, “আমেরিকার নিজের মজুদ তেল সংরক্ষণের (মানে আমেরিকান নিজের তেল একমাত্র শেষ হতে হবে কেবল নিজেরা ভোগ করে, বিক্রি করে নয়) জন্য রফতানিকে নিরুৎসাহিত করতে এই বিল আনা দরকার”, তাই। ‘সংরক্ষণের’ এ কথা থেকে বোঝা যায় তাদের ভয়ের মাত্রা সম্পর্কে।

    চল্লিশ বছর এতদিনে পরে এখন সেই আইন সংশোধন করে নেয়া হলো। অর্থাৎ এখন থেকে আমেরিকান তেল রফতানি করা যাবে। লন্ডন ইকোনমিস্ট ১৮ ডিসেম্বর বলছে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ ও তাদেরই আনা বিল এবং তেল ব্যবসায়ী লবি যারা গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছিল এদেরই মিলিত আগ্রহে বিলটা আসে। আর ডেমোক্র্যাটরা যারা সংখ্যালঘু, এখন তারা অন্য একটি কিছু পাওয়ার আসায় সেই বিনিময়ে আনা এই আইনকে পাস হতে সম্মতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে আইনটি পাস হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫। প্রায় এক মাস আগে। এই অর্থে এটা কোনো একটা দলের একক প্রচেষ্টা আর অন্যটার বাধা দেয়া নয়, বরং বাই-পার্টিজান বা আমেরিকান দুই পার্টি মিলে নেয়া যৌথ সিদ্ধান্ত। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লিখেছে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটবদল’ প্রতিফলিত। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা গেল চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার ঘটনাটা। কিন্তু ‘তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ে’ ঘটা ঘটনাটা কী? মানে ঠিক এখনই কেন তেল রফতানির অবরোধ তুলে নেয়া?

    নতুন ধরনের এক তেলের উৎস একালে চালু হয়েছে- শেল অয়েল। চালু হয়েছে কথাটা টেকনোলজির দিক থেকে বলা- নতুন এক টেকনোলজি চালু হওয়াতে শক্ত শ্লেট থেকে তেল উৎপাদন করা যাচ্ছে। শ্লেট-পেন্সিলে লেখার শ্লেটের মতো দেখতে, স্তরের ওপর স্তর পড়া শক্ত মাটির শ্লেট  – মাটির নিচে এর ওপর উচ্চ চাপ ও তাপের পানি পাঠিয়ে তা থেকে উত্থিত তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করার টেকনোলজি ব্যবহার করে এই তেল উৎপাদন করা হয়। সম্ভবত এটাও আরেক ধরনের জীবাশ্ম, তবে এটা থেকে তেল বের করার কার্যকর টেকনোলজি ছিল না বলে এর ব্যবহার আগে ছিল না। এখন এই টেকনোলজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি ও খরচ পোষায় মনে করাতে শেল অয়েলের ব্যবসায় একটা উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা চলছে। এভাবে তেল বের করার এই টেকনোলজিটাকে বলা হয় ফ্রেকিং। তাই অনেকে এটাকে ফ্রেকিং অয়েলও বলে। অথবা শ্লেট জাতীয় উপাদান বা কাঁচামাল থেকে এই তেল বের করা হয় বলে একে শেল অয়েলও বলা হয়। এ ছাড়া এই টেকনোলজিতে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয় বলে এবং এর প্রক্রিয়ায় প্রচুর অব্যবহৃত তাপ উদ্ভব হয়, যেখানে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমানোটাই এখন ইস্যু সেখানে পরিবেশগত দিক থেকে এটা পরিবেশ বিনষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে এমন এই টেকনোলজি। ফলে অনেকে একে নোংরা তেল বা ডার্টি অয়েল নামেও ডাকে। মাটির নিচে  মজুদ শ্লেটের এর দিক থেকে বড় বা শীর্ষে থাকা দেশ হল আমেরিকা, জর্ডান, কানাডা ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, আমেরিকান মজুদের পরিমাণ এত বেশি যে, তা দিয়ে আমেরিকান জ্বালানি চাহিদা মেটানো তো বটেই এমনকি তা মিটিয়েও আমেরিকা শেল অয়েল রফতানি করতে পারে। তাই, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় এই শেল অয়েল উৎপাদনের জোয়ার উঠেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে এই জোয়ার ওঠাতে আমেরিকান মিডিয়ায় শেল অয়েলের বিরুদ্ধে নেগেটিভ দিক যেগুলো আছে তা খুব কমই ছাপা হচ্ছে। এই টেকনোলজির আরেক বড় নেগেটিভ দিক হল এই টেকনোলজি ব্যবহারের তুলনামূলক খরচ মানে তেল বের করা বা তেল তুলার খরচ অনেক বেশি। বলা হয়েছিল বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি হলে বেশ আয়েশে এই ব্যবসা করা যায়। সারকথায় তরল জীবাশ্ম তেল উৎপাদনের চেয়ে এর খরচ বেশি। সেটা যাই হোক, আমেরিকার এই শেল অয়েল বা ফ্রেকিং অয়েল উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে বলেই এই তেল উৎপাদনকারীদের লবি চাপ ইত্যাদিতে পরে এখন চল্লিশ বছর পরে আমেরিকা থেকে তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হল।

    আর ঠিক এখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জীবাশ্ম তরল তেল উৎপাদকদের (মূলত মধ্যপ্রাচ্যের) এক কার্টেল-জোট হল ওপেক (OPEC)। ওপেকের সাথে পশ্চিমের স্বার্থবিরোধ অনেক পুরনো। আমেরিকান রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উপলক্ষে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট গত মাসে ১৮ ডিসেম্বর এক রিপোর্ট বের করেছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা অনুবাদ করলে হয় এরকম : “যুগ যুগ ধরে ‘বাজার’ শব্দটা বিশ্বব্যাপী তেলবাণিজ্যে এক আনফিট শব্দ হয়ে আছে। তেল উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক কার্টেল ওপেক শুধু তেলের বাজারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করেছেই শুধু নয়, নিজের জন্য নানা মাত্রার সফলতাও বের করে নিয়ে গেছে।” এই বাক্য থেকে ওপেকের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধের তীব্রতা টের পাওয়া যায়। সারা দুনিয়ায় যে তেল উৎপাদন হয় এর এক-তৃতীয়াংশ করে ওপেক সদস্যরা সবাই মিলে। আর ওপেকে উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি একাই উৎপাদন করে সৌদি আরব- এটা প্রতিদিন মোটামুটি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যেখানে এখন দুনিয়ায় দৈনিক মোট উৎপাদন ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। ফলে ওপেকের কোনো সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। ফলে তেলের বাজারে আমেরিকার শেল অয়েল নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সৌদি আরব লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কাজে সে সহজেই ওপেককে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে নিতে পেরেছে। এখানে শেল অয়েলকে ঠেকানোর সৌদি কৌশল হল- শেল অয়েলের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি, সেটাকে কাজে লাগানো। এ কারণে এক দিকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে তেলের দাম ফেলে দিচ্ছে। আবার একই সাথে ওপেকে জোটবদ্ধ হয়ে উৎপাদন না কমিয়ে (তেলের দাম বেড়ে যাবে বলে) বরং বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে তেলের দাম ফেলে দিয়ে ২০০৩ সালের সমান ২৭ ডলারে নামিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে হটানোর মতো ফল এতে পেয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিপিসহ বহু তেল কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই করেছে, নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে, নতুন করে রিগ বসানোর যত পরিকল্পনা তেল তোলা কোম্পানিগুলোর ছিল, সব স্থগিত হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি সৌদি আরবের কম হয়নি। বলা হয়, প্রতিদিন নাকি সৌদি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে হাফ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। আইএমএফ হিসাব করে বলছে, এ বছরে মধ্যপ্রাচ্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারাবে। আইএমএফ সৌদি আরবকে সাবধান করেছে এভাবে সীমাহীন তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিপদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।

    সৌদিদের এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল সহজ। তারা মনে করে, দীর্ঘ দিন ২০ ডলার বা কম দামে তেল বিক্রি করে লোকসান সহ্য করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে দেউলিয়া বানানোর পরেই সে বাজারের লাগাম টেনে ধরবে, উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াবে। এ ব্যাপারে সৌদিদের অনুমিত সময়কাল এক বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বা সৌদিরা দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে। এ বছরের জুন মাসের পর থেকে এসব ব্যাপারে আলামত ফুটতে শুরু করবে সৌদি আরবের বিশ্বাস। এ কাজে তার প্রধান টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথমত আমেরিকান শেল অয়েল। আর এর পরের টার্গেট আবার বাজারে ফিরে আসা ইরান। দেখা যাক কার নার্ভ কত শক্ত, কে কতক্ষণ টেকে!

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ১৭ জানুয়ারি.২০১৬ সংখ্যায়  এবং ১৬ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল।]

  • চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী প্রভাবিত হবে

    দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক
    চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী এতে প্রভাবিত হবে

    গৌতম দাস
    ১৭ জানুয়ারী, ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-zk

     

    এআইআইবি [AIIB], চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বে  ১৯৬৬ ডিসেম্বরে গড়ে উঠা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও [ADB] প্রতিদ্বন্দ্বী। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রয়টার্স চীনা অর্থমন্ত্রীর বরাতে চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। এছাড়া ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্স এক রিপোর্টে আরও কিছু অগ্রগতির খবর জানিয়েছে। যেমন- আগেই সাব্যস্ত ছিল এই ব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত ক্যাপিটাল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। আর এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ওই ১০০ বিলিয়ন ডলারের ২০ শতাংশ পরিশোধ করবেন, যা পরিশোধিত হওয়ার পথে। এছাড়া ১৭ উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র মোট শেয়ারের মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করে ফেলায় এই ব্যাংক (এখানে এখন থেকে ব্যাংক বলতে এআইআইবি বুঝতে হবে) আর নেহাত এক আইডিয়া বা কল্পনা নয়, এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই আমেরিকা এই ব্যাংকের জন্ম নেয়ার বিরুদ্ধে যা যা বাধা দেয়া সম্ভব এর সবই করেছে। শুরুর দিকে তা কিছুটা কাজও করেছিল। এশিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথবা আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সম্পর্ক রেখে চলে এমন রাষ্ট্রগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদির ওপর আমেরিকার এ কূটনৈতিক চাপ ভালোই কাজ করেছিল। যদিও এসব রাষ্ট্র নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে বুঝেছিল আমেরিকার মুখ চেয়ে এই ব্যাংক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নিরাসক্ত ভাব নেয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানোটা নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে। তাই প্রথম বাঁধভাঙার ঘটনাটা ঘটে ইউরোপের নেতা রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি- এ তিনের তরফ থেকে; এরপর এশিয়া আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখেনি।নে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার কোন রাষ্ট্র। স্বভাবতই এর ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। এই উপলক্ষে আমাদের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ইতোমধ্যেই চীন রওয়ানা দিয়েছেন।


    দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্কঃ

    ওদিকে নতুন এক ইস্যু “দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক” – কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর হল সমুদ্রপথে চীনে পৌছানোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর কেবল চীনের দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বলা হয় যদিও কিন্তু সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর চীনের প্রবেশদ্বারের একেবারে মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।
    কিন্তু নতুন এক ইস্যু আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করতে শুরু করে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর- সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশ দ্বার। চীন বাকি তিনদিকেই স্থলাবদ্ধ, ল্যান্ড লকড।

    আজ চীন যেমন অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার বিভিন্ন বিবেচনার দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ১৮৮০ সালেই আমেরিকান অর্থনীতি সাইজের দিক থেকে তৎকালীন টপ কলোনি মাস্টার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকা উঠে যায়। সেকালে উত্থানের যুগে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রের সমুদ্রপথের প্রবেশে আশপাশের সব সমুদ্র অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে এ ঘটনার সঙ্গে এর নিরাপত্তার প্রশ্নটাই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে বাধাহীন, ভয়হীন “নীল পানি বা Blue Water” এলাকায় বয়ে যাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিশ্চিত করাকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে। আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে সেনসিটিভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে সামরিক-কূটনৈতিক টেনশন মারাত্মক। জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সঙ্গে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আমেরিকা বিরোধে বিরোধী রাষ্ট্রকে তাল দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ শব্দটা হয়ে উঠেছে দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দিতে অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

    আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাবার চাহিদা  ও নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে  দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া যেকোন রাষ্ট্র এ বিষয়টাকে যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।
    আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ফিলিপাইন- দ্বীপ মালিকানা বিরোধে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ এ রাষ্ট্রের কাছে একটা ইস্যু। উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার স্বাক্ষর সে করেছে; কিন্তু বাকি আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করতে এ ব্যাংক উদ্যোগে সদস্য হিসেবে ভাগে পাওয়া শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতে এত দিন সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। যে চীনের সঙ্গে দ্বীপ মালিকানা নিয়ে তার বিরোধ তুঙ্গে যাচ্ছে, সেই চীনের উদ্যোগেই এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান শেয়ার মালিকানা ও সদস্য হওয়া কি ঠিক হচ্ছে- এ ছিল ফিলিপাইনের দ্বিধার সুনির্দিষ্ট বিষয়।
    ফিলিপাইনের জন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আমেরিকান অর্থনৈতিক বা গ্লোবাল পুঁজিবাজারবিষয়ক ম্যাগাজিন বস্নুমবার্গ ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছে, ফিলিপাইন সরকার পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিজের ভাগের ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনার অর্থ ৫ বছরে যা পরিশোধযোগ্য তার অর্থ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ফিলিপাইনের জন্য সিদ্ধান্তটি কেন এবং কত কঠিন তা বোঝা যায় পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এর সপক্ষে যেসব বিবেচনা অর্থসচিব তুলে ধরেছেন তা থেকে। ফিলিপিনো অর্থসচিব বলছেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপস্থিত বহু রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ভূমিকার দিক থেকে এআইআইবি এক সহায়ক ও পরিপূরক এবং এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান আস্থা রাখার মতো এবং আমাদের সে আস্থা আছে।’ বোঝা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের ঋণ চাহিদা প্রবল আর তা পূরণে এক ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে এআইআইবিকে দেখে থাকে।
    একজন চীনা মুখপাত্রকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সদস্যদের সবার অংশগ্রহণে লেখা ওর গঠনপ্রণালিতে যেভাবে লেখা আছে এআইআইবি নিজের অপারেশনের সময় সেটা অনুসরণ করেই ফিলিপাইন লোন পাবে কিনা তা নির্ধারিত হবে, অন্য কিছু নয়।
    মনে হচ্ছে, চীনের দিক থেকে এআইআইবির বিষয়াদিতে বাইরের কোনো বিবেচনা নয়, ব্যাংকের নিজস্ব গঠনপ্রণালি ও রুল অনুসরণ করে চলতে চায় চীন। এখন দেখা যাক, বাস্তবে চীন সেটা কতটা কীভাবে করে।

     

    দুইঃ কাপলান ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক
    দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে আগেই বলেছি, কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকলে ওর সমুদ্রপথে প্রবেশদ্বার সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ইস্যু হয়ে যায় সেটা। এর মূল কারণ, সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি নিরাপদ ও অবাধ রাখতে হয়। বাণিজ্য-নিরাপত্তার স্বার্থ বলে এটা সামরিক স্বার্থও। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, এই সামরিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ অন্যের দান, দয়াদাক্ষিণ্য, আইনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে রাখতে কোনো রাষ্ট্রই পারে না।
    মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন লজিক র‌্যাশনালিটি বা আইনের দ্বারা ন্যায্য বলে সাব্যস্ত  হওয়ার অপেক্ষায় ছেড়ে দিয়ে রাখা যায় না, কেউ রাখতে পারে না চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর একক রুস্তমি করতে চাওয়া ঠিক তেমনি। এই ব্যাপারটাকে প্রতীকীভাবে ধরে এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’।
    সাধারণত সাগর-উপসাগর বলতে আমাদের কল্পনা হলো, যার অন্তত একটা দিক, সাধারণত তীর বা উপকূলের উল্টো দিক অসীম আর অবারিত। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকেই চীনের নানা পড়শি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড।
    আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের অধীনে জন্ম নেওয়া সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের রেওয়াজ অনুসারে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা টানা ও মানা হয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকের প্রায় সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সমুদ্রসীমা বা জেগে ওঠা দ্বীপের মালিকানাগত বিরোধ হাজির হয়েছে ও চলছে কয়েক বছর ধরে। পূর্ব চীন সাগরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মালিকানা নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিরোধ-বিতর্ক আছে; গত বছর যা তুঙ্গে উঠেছিল।
    এখন সার করে বললে চীনের জন্য ইস্যুটা হলো, লজিক আইনের ঊর্ধ্বে, নৌ-বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচলের স্বার্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, রেওয়াজ, সালিস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ মীমাংসার পথও একটা বাস্তবতা। চীনের জন্য এই দুই সত্য সংঘাতময়, বিরোধাত্মক। ফলে চীনকে দেখাতে হচ্ছে কতটা সৃজনশীল হয়ে সে এই দুই সত্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত বিরোধ মীমাংসার ফর্মুলা হাজির করতে সক্ষম হয়। চীনের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জটি এখানেই।
    আমেরিকায় থিংক-ট্যাংক বা চিন্তার দোকানের শেষ নেই। আমেরিকা দুনিয়ায় রুস্তমি করে চলেছে মূলত এদেরই বদৌলতে। এই দুনিয়ার তেমনই এক শেঠ রবার্ট ডি কাপলান। নামের শেষ অংশ দিয়েই বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে। ২০১৪ সালের মার্চে তার লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে : এশিয়ার ফুটন্ত কড়াই : দক্ষিণ চীন সাগর ও শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরের দিন শেষ।
    ওই বইয়ে তিনি চীনের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীনের সপক্ষে এক শক্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার শিরোনাম, “বেইজিংয়ের ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলান প্রথমত আমেরিকার উত্থান ইতিহাসে গিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। এই উত্থান পর্যায়ে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে লাগোয়া প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
    সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুরাষ্ট্র ছিল ইউরোপ; যাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমেরিকাকে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসতে হয়েছে।
    সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে যেন ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রের অবাধ আনাগোনা না থাকে, ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল যেন আমেরিকার জন্য অবারিত থাকে- ১৮৮০ থেকে প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
    কাপলান আমেরিকান সেই নীতির রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উত্থিত হওয়ার দিন ছিল সেগুলো- ফলে আমেরিকা বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান নৌ-অঞ্চলে নিজের জন্য ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’ নীতি অনুসরণ করেছিল। সেকালে তা ন্যায্যতা পেলে আজ দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যা করছে, তা কেন পাবে না?
    কাপলানের এই লজিকের পক্ষে এক বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল গত বছর। দক্ষিণের মতোই পূর্ব-চীন সাগরের দ্বীপ মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ আছে। আমেরিকা গত বছর এই বিরোধকে ধারালো করতে জাপানকে তাতিয়ে তুলছিল। একপর্যায়ে এটা চরমে যায়।
    এই দেখে ওয়াল স্ট্রিট কারবারিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত ও বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরের সপ্তাহের লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার কাভার স্টোরিতে তা উঠে আসে। ওখানে দুটো পয়েন্ট ছিল : চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে, কেউ এমন পরাশক্তি হলে ব্লু-ওয়াটার ধরনের ইস্যুতে তার পেশি দেখানো স্বাভাবিক এবং এটা আমাদের নিচু গুরুত্বে দেখা উচিত। কারণ, আমরাও এমন করেছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুনিয়াব্যাপী মহামন্দার ভেতর আমরা এখনো আছি। এ সময়ে চীনের মতো রাইজিং ইকোনমি না থাকলে আমাদের অবস্থা আরও করুণ হতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিবাদের খাতা খোলার চেষ্টা অর্থহীন ও আত্মঘাতী। এরপর থেকে এই ইস্যুতে জাপান লো-প্রফাইলে চলে যায়। যদিও পুব চীন সাগরের অপর অংশ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটা এখনো জীবন্ত, বিশেষ করে ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের দিক থেকে।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর ০৩ জানুয়ারী সংখ্যায়, দৈনিক নয়াদিগন্তের ০৪ জানুয়ারী সংখ্যায় এবং সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৯ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সেগুলোকে আবার একসাথে এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

  • ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কোন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব নয়

    ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব কোন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব নয়

    গৌতম দাস
    ১২ জানুয়ারি ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-yg

    সৌদি আরব ও ইরানের দ্বন্দ্ব ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে। ৩৫ বছর ধরে ছোট-বড় একটা না একটা ইস্যুকে মুখ্য করে সৌদি আরব ও ইরানের লেগে থাকা দ্বন্দ্বের এবারের ইস্যুও বেশ বড়, ফলে এবারের দ্বন্দ্বও তেমনি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। সৌদি আরবের জনগোষ্ঠী মূলত সুন্নি ধারার; তবে মাঝে মাঝে কোথাও ক্ষুদ্র খোপ বা পকেট আকারে শিয়া জনগোষ্ঠীও আছে। বিশেষত যা কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঘটনায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের তেলসমৃদ্ধ জনপদ ইস্টার্ন প্রভিন্স বা পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফ জেলা তেমনই এক শিয়া অধ্যুষিত জনপদ। কাতিফের শিয়া ধর্মীয় নেতা ছিলেন শেখ নিমর আল নিমর। “বিদেশি হস্তক্ষেপ ডেকে এনে রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টির” অভিযোগে রাজকীয় আদালত তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে ২০১৪ সালের অক্টোবরে। আর পরবর্তিতে ২ জানুয়ারি এ দণ্ড কার্যকর করা হয়। স্বভাবতই ভারতের কাশ্মীর, বাহরাইন, লেবানন, ইরাক, ইরান ইত্যাদি শিয়া রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী দুনিয়ায় যেসব দেশে বা শহরে নজরে পড়ার মতো আছে সেখানে এ মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকারে এবং পরে আরও ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসে ইরানে, তেহরানের সরকারি প্রতিক্রিয়া থেকে। ইরান সরকার সৌদি দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এনে প্রতিবাদ জানায়। আর ওদিকে ইরানি বিক্ষোভকারীরা তেহরানের সৌদি দূতাবাস আক্রমণ করে বসে, পেট্রলবোমা ও ইট-পাথরও ছোড়ে। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে একেবারে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুধু তাই নয়, গালফ কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জোট জিসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোও সৌদি সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে।

    মৃত্যুদণ্ড এখন কার্যকর হলেও এই  ঘটনার শুরু ২০১১ সালে। যখন দুনিয়াজুড়ে ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের ছোঁয়া চারদিকে লেগেছিল। আমেরিকার খায়েশ মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারীর বদলে লিবারেল রাজনীতি এবং এ রাজনীতিতে সাজানো সরকার দেখতে চাওয়া। এই খায়েশের নাম ‘আরব বসন্ত’। আরব বসন্ত আলাদা কিছু নয়, এটা ওতপ্রোতভাবে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর বিদেশনীতিতে পরিপূরক আরেক দিক বা বৈশিষ্ট। বুশের ওয়ার অন টেররকেই আবার নরম চেহারা করে সাজানো ফুলের নাম আরব বসন্ত। ফলে এটা একই আমেরিকার অপর এক পরিপূরক নীতি। সারকথায় ওয়ার অন টেররের নীতিতে পরিচালনের কারণে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে আমেরিকা-বিরোধী যে সেন্টিমেন্ট তৈরি হচ্ছিল মূলত তা হালকা করে দেয়ার উদ্যোগ। ওইসব রাষ্ট্রগুলোতে যতটা সম্ভব এক লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করে দিলে ঐ দেশের নাগরিকেরা  আমেরিকাবিরোধী এবং আল কায়দার সমর্থক হয়ে ওঠার বদলে নিজ নিজ রাষ্ট্রে লিবারেল শাসন নিয়ে খুশি ও ব্যস্ত হয়ে উঠবে। সব মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠবে নিজ নিজ রাষ্ট্র। এ বিবেচনায় আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে লাগানো আর এক বৈশিষ্ট্যের পালকের নাম আরব বসন্ত। আমেরিকার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো হল আরব বসন্তের জন্য সবচেয়ে ভাল টার্গেট বা খাতক রাষ্ট্র। এ টার্গেট লক্ষ্য করে আমেরিকার দিক থেকে দেশে দেশে আরব বসন্তের উসকানি দেয়া শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। এ উসকানিতে পরে প্রায় একচেটিয়া সুন্নি জনসংখ্যার মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে ক্ষুদ্র শিয়া জনগোষ্ঠীও আছে, তারা প্রান্তিক কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে সংগঠিত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার সুযোগ নিয়েছিল। তেমনই নিজেদের অন্যদের মাঝে শুনানো অবস্থায় হাজির করার এক আওয়াজ ছিল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের কাতিফ জেলায় শিয়া ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর আল নিমরের নেতৃত্বে রাস্তায় সংগঠিত প্রতিবাদ। সৌদি রাজসরকার নিজ দেশে নিজ সুন্নি জনগোষ্ঠীকেও রাস্তায় সংগঠিত হয়ে কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটাক, তা সহ্য করে না। ফলে ধর্মীয় নেতা নিমরের পদক্ষেপকে সৌদি সরকার ইরানের ষড়যন্ত্র, বিদেশি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র, শিয়া ষড়যন্ত্র ইত্যাদি অভিযোগ তুলে কঠোর হাতে দমন-নির্যাতনের পথে যায়। এভাবে ২০১৪ সালেই সৌদি আদালত তাকে মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করেন। বিবিসি জানাচ্ছে, ২০১১ সালে তিনি বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, “তিনি সৌদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রের বদলে শব্দের গর্জনকেই পছন্দ করেন। বুলেটের চেয়েও শব্দের অস্ত্র অনেক বেশি শক্তিশালী। কেননা, যদি অস্ত্রের যুদ্ধ হয়, তবে কর্তৃপক্ষই লাভ ঘরে তুলবে”। অর্থাৎ এককথায় বললে, তিনি একেবারেই নিরস্ত্র গণআন্দোলনের পথেই অাঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন এক সিভিল লিবার্টি মুভমেন্ট আকারে। সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য সহ্য করার দিক থেকে বরং সেটাও বড় ভয়ঙ্কর ছিল।

    সুতরাং এদিক থেকে দেখলে শেখ নিমর আল নিমর প্রাণ দিয়ে আমেরিকার “মধ্যপ্রাচ্য নীতির” স্ববিরোধিতাকেই উৎকটভাবে তুলে ধরেছেন। এ নীতি একদিকে সেই ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা সৌদি বাদশাতন্ত্রকে পেলেপুষে বড় করেছে, আমেরিকার ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির লাইফ লাইনকে, তথাকথিত সিভিলাইজেশনকে জীবিত রাখার প্রয়োজনে এক বাদশাহতন্ত্রকেই পালছে। আবার আমেরিকা নিজেই নিজের ভিলেন চেহারা ঢাকতে সেই বাদশাহতন্ত্রের ভেতরেই এক আরব বসন্তের উসকানি তৈরি করে চলেছে। এরই নিট ফল হল- শেখ নিমর আল নিমরের মৃত্যু।

    অনেকেরই ধারণা, একেবারে প্রায় দৃঢ় ধারণা যে, সৌদি-ইরানের বিরোধের উৎস নাকি ইসলামের শিয়া-সুন্নি বিভাজন। এ দাবি ভিত্তিহীন। বরং এ বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হল বাদশাহতন্ত্র বা ইসলামে আমিরগিরি। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো এমিরেট বা আমিরগিরি টিকিয়ে রাখা।

    এককথায় বললে, এই আমিরগিরির পক্ষে কোনো লিবারেল শাসন সহ্য করাও অসম্ভব। আমিরগিরির সঙ্গে সবকিছুই অচল। ফলে ইসলাম থেকে যে কোনো রেডিকেল তত্ত্ব, জিহাদ বা বিপ্লব করার তত্ত্ব বেরিয়ে আসা আমিরগিরির দিক থেকে জোঁকের মুখে নুন। তাতে সেই তত্ত্ব সুন্নি জিহাদ বা গ্লোবাল বিপ্লব করার তত্ত্ব হোক অথবা শিয়া আয়াতুল্লাহর ইরান বিপ্লবের তত্ত্বই হোক। কোনো ফারাক তাতে নেই। কারণ মূল বিষয়, আমিরগিরির সহ্য করার মুরোদের দিক থেকে – তা কোনো রেডিকেল চিন্তা থেকে দূরে থাকা কোন লিবারল চিন্তাকেও সহ্য করার মুরোদ রাখে না। ফলে উৎখাতের বিপদের মুখে প্রার দিক থেকে লিবারেল চিন্তাই আমিরগিরির জন্য ভয়ানক।

    বাদশাহতন্ত্র নিজের এ ভয়ানক বিপদকে আড়াল করতে দাবি করে, বারবার চিৎকার করে বলে, ইরানের সঙ্গে তার বিরোধ নাকি শিয়া-সুন্নি বিভাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিজের আমিরগিরি বা বাদশাহতন্ত্রকে আড়াল করতেই এটাকে সে ‘শিয়া-সুন্নি বিরোধ’, ‘বিদেশি রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র’ বলে হাজির করে। অথচ ১৯৭৯ সালের আগে ইরান যখন শাহের ইরান ছিল, আর এক বাদশাহতন্ত্র ছিল, শাহের বাদশাহতন্ত্র যখন ইরানের তেল ব্রিটিশ-আমেরিকান-ডাচ ও ফরাসি কোম্পানির এক জোটের হাতে তুলে দিয়েছিল ১৯৫৩-১৯৭৮ এই সময়কালে তখনও তো সেই ইরান শিয়া ইরানেই ছিল। অথচ সৌদি বাদশাহতন্ত্র তখন এর ভেতর কোনো শিয়া-সুন্নি বিরোধ দেখেনি, কেন? শাহের শিয়া ইরান আমির-বাদশাহদের বন্ধুই ছিল কেন? কোন সূত্রে? ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরেই কেন সৌদি বাদশাহ ইরানের সঙ্গে সব বিরোধ আবিষ্কার করলেন? ইরানের বাসিন্দারা কী ১৯৭৯ সালেই প্রথম শিয়া হয়েছে!

    অতএব মূল কথা হলো, ইসলাম থেকে বের করে আনা যে কোনো রেডিকেল তত্ত্ব মধ্যপ্রাচ্যের আমিরগিরির জন্য ভয়ঙ্কর শুধু নয়, আরব বসন্তের মতো লিবারেল ইসলামও আমিরগিরিতে অচল। ফলে সৌদি-ইরানের দ্বন্দ্বের শুরু আসলে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব থেকে, কারণ সেটা ছিল এক রেডিকেল বিপ্লব।

    তবে সম্প্রতি বাড়তি যে বিষয়টা যোগ হয়েছে তা হলো, এক. আমেরিকার অর্থনীতির মাজাভাঙা দুর্দশা বিশেষ করে আরেকবার ফুট সোলজার পাঠিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কোথাও যুদ্ধ করার খরচ জোগানোর অক্ষমতা। দুই. আইএসের ভয়ানক উত্থান- এ দুই বাস্তবতাতে আমেরিকা ইরানকে পাশে পেতে চায় নিজের মধ্যপ্রাচ্য এভাবে সাজিয়েছে, ইরানকে পাশ পাওয়ার নীতি  সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাইরের দিক থেকে যেটাকে ইরান-আমেরিকার ৫+১ মিলে পারমাণবিক চুক্তি হিসেবে আমরা দেখছি। এতে আমেরিকার লাভ হল, অন্তত আইএস হামলায় আইএসের হাতে ইরাকের পতনের ঘটে যাওয়ার বিরুদ্ধে ইরান প্রতিরোধে এগিয়ে আসবে, এভাবে ইরানের সাহায্য আমেরিকা পাবে। তবে অবশ্যই ইরান নিজের স্বার্থেই ইরাক সরকারকে রক্ষা বা উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিনিময়ে আমেরিকাকে যে মূল্য চুকাতে হয়েছে তা কম নয়। ইরান বিপ্লবের পর থেকে যে আমেরিকা বিপ্লবী ইরানকে স্বীকার করেনি অথচ আজ তা স্বীকার করে নিতে হয়েছে। আর এখান থেকে সৌদি আরব ও আমেরিকার এতদিনের কমন স্বার্থের বিচ্ছেদ ঘটে গেছে।  ফলে এ বিশেষ ফ্যাক্টরটা সৌদি-ইরান বিরোধকে মুখোমুখি উদোম করেছে। তবু সৌদি-ইরান বিরোধ শিয়া-সুন্নি বিরোধ একেবারেই নয়। শিয়া-সুন্নি বিরোধ হিসেবে দেখালে সুন্নি কনস্টিটুয়েন্সিকে নিজের পক্ষে ও ইরানের বিরুদ্ধে ক্যাশ করার উদ্দেশ্যেই সৌদিদের একথা বলা।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জানুয়ারি ২০১৬ সংখ্যা দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ফাইনাল এডিট করে আবার প্রকাশিত হল।]

  • মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

    মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
    মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
    গৌতম দাস 

    http://wp.me/p1sCvy-tV
    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

     

    ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

    মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
    ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
    কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
    ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

    সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
    এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

    আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
    ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
    এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
    এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
    বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
    ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
    মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

    “সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
    বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
    কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

    মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
    মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

    এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

    সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

    [এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

    goutamdas1958@hotmail.com

  • ইউরোপের মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

    ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় দেখা
    মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-qH

    ২০১৫ ডিসেম্বর ২৯

    আইএস কারা, কোথা থেকে কোন দেশ থেকে এসেছে; কী ধরণের মানুষ এরা যারা আইএস সংগঠনে এসে যোগ দিচ্ছে ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা জানি মূলত এদের এক বিশাল অংশ পশ্চিমা সমাজগুলো থেকে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজের কারা কারা কোন ধরণের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক ব্যকগ্রাউন্ডের সন্তানেরা আইএসে যোগ দিচ্ছে এনিয়ে পশ্চিমা সমাজগুলোর অভ্যন্তরে বিশেষত ইউরোপের দেশগুলোতে পরিচালিত সামাজিক গবেষণার শেষ নাই। কী ধরণের মানুষেরা বিশেষ করে আইএস সংগঠনে যোগ দিচ্ছে এবিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো মিথ্যা দাবি করে – আমেরিকান উচু কদরের দ্বিমাসিক জর্নাল “ফরেন এফেয়ার্স” এর চলতি ডিসেম্বরে প্রকাশিত জানু-ফেব্রু ২০১৬ সংখ্যায় – এক রিপোর্ট করেছে। যারা পশ্চিমা নেতা দেশ- দুনিয়া চালায় ও নীতি নির্ধারক, এমন গুরুত্বপুর্ণ লোকেদের চিন্তা ও পাঠের জন্য জরুরি বলে মনে করা হয় এই জর্নালকে – এই অর্থে এটা প্রেস্টিজিয়াস জর্নাল বলেন কেউ কেউ। যেমন হিলারি ক্লিনটন, ওবামা সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট থাকা অবস্থাতে এখানে লেখা ছেপেছেন। সেই জর্নালে আলোচ্য আর্টিকেলটা লিখেছেন ভারতে জন্ম বৃটিশ নাগরিক কেনান মালিক ()।
    মানুষ কেন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শ (র‍্যাডিক্যালিজম) আপন করে নেয় এবিষয়ে মোটা দাগে প্রচলিত চারটা তত্ত্বের কথা তুলেছেন লেখক কেনান মালিক।  সেগুলোর “প্রথম তত্ত্ব বলে – লোকে জঙ্গী হয় কারণ তারা ধর্মীয় অনুমোদন পিছনে আছে  এমন কিছু জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সহজে তাদের  নাগালে আসে, তাই। কেনান বলছেন, কিন্তু বৃটিশ আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগ ২০০৮ সালে MI5 পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে (লিক হয়ে বেরিয়ে পড়া রিপোর্ট) “ধর্মীয় জোশ উন্মাদনায় উজ্জীবিত হওয়া দূরে থাক বরং যোগদানকারীদের বিরাট এক অংশ নিয়মই ধর্মকর্ম পালন করে না”। (• Far from being religious zealots, a large number of those involved in terrorism do not practice their faith regularly. Many lack religious literacy and could actually be regarded as religious novices. ) ওদিকে দ্বিতীয় তত্ত্ব বলে, অন্যান্য জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সাধারণত যেভাবে মানুষে অর্জন করে তা থেকে ভিন্ন ভাবে এরা ভাবাদর্শ লাভ করে। প্রচলিত ধরে নেয়া ধারণা হল এদের ভাবাদর্শ ঘৃণা-ছড়ানী-প্রচারকদের থেকে এসেছে “ideology comes from hate preachers”, তাই। গবেষণায় এর পক্ষেও সমর্থন মিলেনি। তৃতীয় তত্ত্ব বলে, এটা যেন ভারী কিছুকে যান্ত্রিকভাবে বইবার এক কনভেয়ার বেল্ট এর মত; যার শুরু হয়  ক্ষোভ অসন্তোষে মানুষের ঐ বেল্টের উপর উঠে বসা থেকে। এরপর তা এক ধর্মভাবের ভিতর দিয়ে পার হয়ে এমন এক রেডিকেল বিশ্বাসের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় যা পরিণতিতে সন্ত্রাসবাদে পৌছায়। কেনান বলছেন কিন্তু ২০১০ সালের আর এক বৃটিশ গবেষণা রিপোর্টও কনভেয়ার বেল্ট তত্ত্বকে নাকচ করে বলেছে এটা ভাবাদর্শ বিষয়টাকে অযথা ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখিয়েছে। ……conveyor belt thesis “seems to both misread the radicalization process and to give undue weight to ideological factors.”। আর চতুর্থ তত্ত্ব , এরা বারেবারে বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সন্ত্রাসবাদে যোগদানকারীরা হল সমাজের সেই গ্রুপ যারা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার শিকার। ফলে মানুষ অমন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শকে আপন করে নেয়। কিন্তু কেনান বলছেন, লন্ডনের কুইন মেরী কলেজের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, “সন্ত্রাসবাদীওরা আর যাই হোক এরা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার ভুগা ব্যাকগ্রাউন্ডের জনগোষ্ঠী থেকে আসা কেউ নয়। বরং যারা জিহাদী্ গ্রুপে যোগ দিয়েছে এরা  বয়সে আঠারো থেকে বিশ বছরের মধ্যে, এরা অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান, বাসায় ইংরাজিতে কথা বলে, হাইস্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত; কখন কখনো তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরও। আসলে  তারুণ্য, অর্থসম্পদ ও শিক্ষিত – এ’তিনটাই গুরুত্ত্বপুর্ণ নির্ণায়ক; এমন ক্যটাগরিই সন্তানদের বেশি বিপদজনক”।

    কেনান মালিক এভাবে সামাজিক গবেষণার ক্রিটিকগুলো জড়ো করে দাবি করে বলছেন, “পশ্চিমের সমস্যা হল, তারা এইসব পুর্ব-অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাদের আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী নীতি সাজিয়েছে; যেগুলোর সবই ভুল”। ইউরোপে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক গবেষণার বরাতে কেনান মালিক এবার নিজ বরাতে এর কারণ বলছেন এভাবেঃ “দেখা গেছে যোগ দেয়া বেশির ভাগ তরুণ টিনএজ বয়সের – এই to little interaction with others in the society. Theirs is a much more existential form of alienation. তরুণেরা জিহাদী সন্ত্রাসে যোগ দিবার কারণ হল কিছু একটা তারা খুঁজে ফেরে যেগুলো খুব বেশি বর্ণনা করা যায় না তবু সেগুলো যেমনঃ পরিচয় খুঁজে ফেরা, অর্থ খোঁজ করা, সামিল বোধ করা, সম্মানবোধ করা। আর এটা মোটেও সত্যি না যে হবু জিহাদীরা মুল সমাজের সাথে দুর্বলভাবে যুক্ত থাকে এই অর্থে যে তারা স্থানীয়ভাষা বলতে পারে না অথবা স্থানীয় আদব-কায়দা রপ্ত নাই অথবা সমাজের অন্যান্যদের সাথে আলাপ আলোচনায় অংশ নিতে পারে না বা নেয় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ত্বমানতাবোধ বিষয়ক এক বিচ্ছিন্নতাবোধ আছে”।

    শেষের এই বাক্যটা বলার জন্য লেখক কেনান মালিকের এতক্ষণকার কসরত। “বিচ্ছিন্নতাবোধ”। এই শব্দ ও ধারণা মার্কসবাদীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। বিশেষত সাহিত্যের এস্থেটিকস বা সৌন্দর্যতত্ত্ব চর্চায়। “বিচ্ছিন্নতাবোধ” ধারণাটা সার কথায় বললে, ক্যাপিটালিজম উতপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার এক নতুন ফেনোমেনা হল, এখানে শ্রমিক নিজের উতপাদ্য বা প্রডাক্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। নিজ উতপাদ্য, নিজের সৃষ্টির ভিতর  নিজে কোথায় সে অস্তিত্ত্বমান আছে তা খুজে পায় না। অন্তত কোনটা তাঁর শ্রমের অংশ বা ক্রেডিট তা চিনতে পারে না। এথেকে  অর্থাৎ উতপাদন থেকে উতপাদকের বিচ্ছিন্নতাবোধ, এক বিরহ সৃষ্টি হয়। এই অর্থে যে, উতপাদনের আগে বাজার দরে শ্রমিককে শ্রমমুল্য দিলেও তা উতপাদিত পণ্যে হাজির হবার পর ওর বাজার মুল্য আগের মোট সব খরচের চেয়ে বেশি হবে – যেটাকে আমরা মুনাফা বলে ধরে নেই। অর্থাৎ পণ্যের আসল এডেড ভ্যালু  ওর কাঁচামাল, মেশিনারিস ই্ত্যাদির উপর পরিশোধিত শ্রমমুল্য এসবের যোগফলের সমানের চেয়ে বেশি হবে। প্রতিটা উতপাদিত পণ্যের সাথে তৈরি হয় এই বাড়তি মুল্য। এটাই মার্কসের সারপ্লাস ভ্যালু বা “বাড়তি মুল্য তত্ত্ব”। বাড়তি মুল্য থেকে প্রমিক বঞ্চিত হয়ে চলেছে সব সময়। এটাই মুল্য হিসাবে  তা না পাবার কারণে তাঁর বিচ্ছিন্নতাবোধ  অথবা বলা যায় উতপাদিত পণ্যকে নিজের মনে না করতে পারার বিচ্ছিন্নতাবোধ। এছাড়া, কাঁচামাল থেকে  ফিনিশ প্রডাক্ট যত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে  ততই প্রডাক্টের কোন অংশটা কোন শ্রমিকের শ্রমে তৈরি তা আলাদা করা মশকিল হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে এক বিচ্ছিন্নতা বা বিরহ বোধের সৃষ্টি হবে। অনেকা যেন বাচ্চা জন্ম দিবার পর কোন কারণে মা বাচ্চার সাথে সম্পর্কিত বা টান বোধ না জাগা ধরণের সমস্যা। মানুষের মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ঠগুলোকে মুখ্য করে সিনেমা বানানো বা সিনেমায় সেগুলোকে আনার ক্ষেত্রে  Rainer Werner Fassbinder নামের এক জর্মন ফিল্মমেকারের কথা অনেকেই জানেন; যিনি এনিলিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধের উপর সিনেমা বানিয়ে খ্যাত।

    বুঝা যাচ্ছে, আমাদের আলোচনার কেনান মালিক  আসলে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের একজন খাতক। সার করে বললে, কেনান মনে করেন পশ্চিমকে রেডিক্যাল ইসলামি বিপ্লবীর সমস্যার মুখোমুখি  হতে হয়েছে তাদের জিহাদী ভাবাদর্শের জন্য – একথা তিনি মানতে নারাজ। ইসলামি রেডিক্যালিজম এর কোন কারণ নয়। এজন্য নানান গবেষণা ফলাফল হাজির করে তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তবে তিনি মানেন এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরের প্রতি টান বা আগ্রহ কমে যাবার সমস্যা পশ্চিমা সমাজে আছে, তৈরি হয়ে আছে  এটা তিনি মানেন।আসলে তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমকে এসবের খাস জবাব বিচ্চিন্নতাবোধ দিয়ে দিতে চান, দেয়া সম্ভব দাবি জানাতেই এই রচনা।

    তিনি বলছেন,  ইতোমধ্যেই হবু জিহাদীরা প্রধান ধারার সংস্কৃতি, ভাব এবং আচারনিয়ম ইত্যাদিতে ভালভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করেছে আর এর বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গীর খোঁজে নেমেছে। এটা মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, জিহাদী হতে ইচ্ছুক অনেকে হয় নতুন করে ইসলামে ধর্মান্তরিত নয়ত, মুসলিম যারা দেরিতে নিজেদের ধর্মের দিকে নজর ফিরিয়েছে এমনও আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রে তাদের সমাজ নিরাসক্ততা, বিচ্ছিন্নতা তাদেরকে সাদা-কালো ভাবে মরাল কোডের চরম ইসলামিজমের দিকে ঝুকিয়ে ফেলেছে। ফলে “এটা ঠিক কোন রেডিক্যাল ভাবাদর্শের বিষাক্ত করে ফেলা নয় বরং এটা অবশ্যই সমাজের প্রচলিত প্রধান ধারার মরাল কাঠামোর প্রতি অনাস্থা এবং একই সাথে এক বিকল্পের খোঁজে লেগে পরা”। কেনন বলছেন, “অতীতে সমাজের প্রধান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন সহানুভুতিহীন মানুষ রাজনৈতিক রূপান্তরের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, চরম বাম ধারা থেকে শ্রমিক আন্দোলন অথবা কোন রেসিজম- বিরোধী আন্দোলন এমন অনেক কিছুতেই যোগ দিয়েছেন”। ফলে কেনন বলছেন, স্বভাবতই সামিল থাকাহীনতা, সংশ্লিষ্টহীনতা বোধ, “এটা কোন মুসলিম সমস্যা নয়”। মুসলিম সমস্যা বলে ালিয়ে দেয়া যাবে না।

    কেননের মুখে মুসলমানেদের দায়ী না করে দেখে – এটা দেখে আমাদের ঠিক খুশি হবার কিছু নাই। আর কেনন কারণ মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন পশ্চিমের বিশেষত ইউরোপের শত শত মুলত টিনএজ তরুণ আইএস এর মত সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এটা আশির দশকে পপুলার বিচ্ছিন্নতাবোধ বা এলিনিয়েশন বা (মানুষ বা শ্রম তার উৎপাদিত উৎপন্নের ভিতর নিজেকে খুজে পায় না) তত্ব দিয়ে একালে আর ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সস্তা একপেশে এবং বস্তুবাদী। এটা অর্থনীতিবাদী বা স্টালিনিস্ট ধারণাও বটে। কারণ ‘আধুনিক রাষ্ট্রে’ মানুষ (বা তাঁর শ্রম) যেমন নিজের বস্তুগত সৃষ্টির থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় ঠিক একইভাবে মানুষের প্রতি মানুষের স্পিরিচুয়াল টান অনুভব, সকলের সাথে একই তৌহিদে মিলিত হবার আকুতি ও আকাঙ্খাও তাঁর ভিতর কাজ করে। এরও এক অভাব বোধ হয়। কারণ মানুষ শুধু শ্রমের এক আধার, বৈষয়িক অর্থনীতির এলিমেন্ট মাত্র নয়; বরং একই সাথে সে স্পিরিচুয়াল বিয়িং। সকল অপরের সাথে সম্পর্কহীনতা – এই অভাব মানুষের মধ্যে এক হাহাকারের জন্ম দেয়, সে অস্থির হয়ে উঠে, দমবন্ধ লাগে। এটাও আর এক চরম বিচ্ছিন্নতাবোধ। অতএব বিচ্ছিন্নতাবোধ মানেই কেবল বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ নয়; স্পিরিচুয়াল বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্ভবত প্রভাবে এর দিক থেকে বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ এর চেয়েও বড়। এদিকটাই কেনান মিস করেছেন। তিনি আশির দশকে পড়ে থাকতে চাইছেন। কেননের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে আমাদের এই সমালোচনা আরো জায়েজ মনে হয় এজন্য যে তিনি এরপরে লিখছেন, “একালের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে মানুষের নিরাশক্তবোধ, রাজনৈতিকভাবে স্বরবিহীন থাকা অবস্থা ছেয়ে গেছে। এধরনের উদ্বেগ ও অভাবগুলোকে কোন চার্চ বা ট্রেড ইউনিয়ন বুঝবে না”। অর্থাৎ কেনান একালে ২০১৫ সালে এসে এখনও বস্তবাদ-সর্বস্ব “এলিনিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ” তত্ত্ব আউড়িয়ে সব রোগ সারানোর ধনন্তরি ওষুধ মনে করতে চাইছেন। বিচ্ছিন্নতা্বোধ চার্চ, মসজিদ মন্দির – বলে নজর আন্দাজ করতে চাইছেন। আমাদের দেশে “বিরহ” বলে গানের ধারা আছে; ময়মনসিংহ থেকে মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া ইত্যাদি। যারা আমাদের এলিনিয়েশন ত্ত্ত্ব বুঝবার নাগাল পাবার অনেক আগে থেকে স্পিরিচুয়াল আবহে “বিরহ” গান করে আসছে।

    কেননের এই রচনার ছোট শিরোনাম “ইউরোপের বিপদজনক মাল্টিকালচারালিজম”। অর্থাৎ ভারতীয় অরিজিনের বৃটিশ  নাগরিক হলেও তিনি বৃটিশ মাল্টিকালচারালিজম নীতির সমালোচক। আবার এটাই তাঁর একই নিশ্বাসে ইউরোপের ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ফরাসি এসিমিলিয়েশন বা ‘সবাইকে একরকম করণ’ নীতির পক্ষে দাঁড়ানো। আসলে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন – কথা দুটোরই কোন সারবত্তা নাই। তবুও বুঝবার জন্য শব্দদুটোর অর্থ খোলসা করা দরকার। মাল্টিকালচারালিজম বলতে বৃটিশ বুঝটা হল – বৃটিশ সমাজটাকে সে নানান কমিউনিটির মিলিত এক বড় কমিউনিটি হিসাবে রাখতে, দেখতে চায়। বৃটিশ কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে কলোনি প্রজা দেশ থেকে আসা সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই “উপরি এক বৃহত্তর বৃটিশ সমাজের”নিচে এক বৃটিশ পরিচয়ে বড় হোক; এটাই চায়। বিপরীতে ফরাসী পছন্দের এসিমিলিয়েশন (এক ছাঁচে ঢালাই করার নীতি) শুনতে ভাল লাগলেও কিন্তু আসলে অনেক বেশী বলপ্রয়োগে জবরদস্তি করে নাগরিক সবাইকে একরকম করণের প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ এখানে আর ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নাই। বরং সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা ফরাসীরা আড়ালে রাখতে চায় বা থেকে যায়। সবাইকে “সুন্দর” ইউনিফর্ম একরকম করার নামে (ইংরাজি সিমিলার বা একরকমকরণ থেকে এসিমিলিয়েশন ) জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা। যতটুকু ও যেভাবে বর্ণনা করলাম তা থেকে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন এর ভিন্নতা্র সবটা বুঝা বা বুঝানো যাবে না। কারণ এসব ভারি কথার আড়ালে মুল আরও এক বিষয়কে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

    প্রথম কথা হল, পশ্চিম মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের আমদানি ঘটায় একেবারে একমাত্র নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে, সস্তা শ্রম পাবার স্বার্থে, সবসময় এটাই সে করে এসেছে। নইলে লো-স্কিল না নো-স্কিল লেবার নিতে হত কেবল নিজ দেশীয় চামড়া থেকে ফলে এর মুল্য কমপক্ষে দ্বিগুণ তাদের যোগাতে হত। ফলে একমাত্র সস্তা মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পাবার স্বার্থেই তাকে নিজের সমাজে এসব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” বলে বকোওয়াজের জন্ম দিতে হয়েছে। এটা প্রথম সত্য। তবে নিজ অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে ভাল চলা অথবা মন্দা হয়ে চলার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্য চামড়ার শ্রমিক কতজনকে আসতে সে অনুমতি দিবে এটা সময়ে সময়ে তাকে কড়া নিয়ন্ত্রণে করতে যেতে হয়। অর্থনীতি ভাল মানে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন নইলে উলটা হলে সব খেদাও – এটাই হল আসল নীতি। সবারই নীতি তবে দোষ দেয়া হয় তথাকথিত ডানপন্থি্র।

    এরপর দ্বিতীয় আর এক আজব সত্য হল, কলোনি দখলের ফেলে আসা বছরগুলোতে  কপাল গুণে বৃটিশের কলোনির তুলনায় ফরাসি কলোনির বাসিন্দারা বেশির ভাগই মুসলমান বা ইসলাম ধর্মপালনকারী। এরফলে কলোনি প্রজা দেশ থেকে সস্তা শ্রমের মধ্যে মুসলমান প্রজার হার ফ্রান্সের বেলায় বেশি। তাই সস্তা শ্রম ঢুকার অনুমতি দিতে গিয়ে একই ইউরোপে বৃটিশ ও ফরাসী হয়েও তাদের নীতি ও অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। এভাবে ফ্রান্সে মুসলমানের সংখ্যা বলা হয় ৫০ লাখ। এসব তথ্যের দিকে নজর করে আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ফরাসী সরকার পছন্দ করেছে – এসিমিলিয়েশন নীতি। কারণ এসিমিলিয়েশনের কথা বলে স্কার্ফ হিজাব বা কোন মুসলমান চিহ্ন প্রকাশিত হওয়া ঠেকিয়ে দেয়া যায়। ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি যেকোন পরিচয় বা চিহ্ন ভুলে গিয়ে সব কিছু ফরাসি হতেই হবে বলে বাধ্য করা যায়। অতএব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” – ফরাসি না বৃটিশ কোনটা ভাল – এসব কথা তাই আসল কথা লুকিয়ে বকোওয়াজ।

    তাহলে কথা দাড়ালো, সস্তা শ্রম থেকে বেশি মুনাফার লোভে ক্যাপিটালজম কলোনি প্রজা দেশ থেকে শ্রম আনতে বাধ্য। আবার সেই শ্রম কে কীভাবে ম্যানেজ করার সুবিধা দেখে সে ভিত্তিতে “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর কূটতর্কও সে হাজির করবে। কারণ নইলে আসল কথাগুলো সরাসরি বলতে হবে। কেনান মালিক তবু “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর ভুয়া তর্কের মধ্যে “মাল্টিকালচারালিজমকে বেশি বিপদজনক বলছেন। কারণ বৃটিশরা নাকি “মাল্টিকালচারালিজমের কথা বলে মুসলমান ধর্মীয় নেতাদেরকে কমিউনিটির প্রতিনিধি মনে করেন ভুল করে, বেশি গুরুত্ব দেন; ইত্যাদি। কেনানের কথা শুনে বৃটিশদেরকে বোকা ভাবার কোন অর্থ নাই। আবার বৃটিশদের নীতিটা বেশি ভাল তাও নয়। ব্যাপারটা হল ম্যানেজমেন্ট। নাগরিকদের বা অপজিশনকে লিবারেল স্পেসের মধ্যে রাখলে তাদের কথা বলতে দেয়া, বিরোধীতা করতে দেয়ার আইনি সুযোগ যতটা সম্ভব বেশি রাখলে তাদের সকলের বিরোধীতা সামলে রাখা তুলনামুলক সহজ হবে বলে মনে করা হয়। বৃটিশ প্রশাসন মনে করে এই লিবারেল নীতি তাদের জন্য বেশি ফলদায়ক হচ্ছে। আর ধর্মীয় নেতার প্রসঙ্গটা হল, ধর্মীয় নেতারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোন নেতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালি হন তাহলে বৃটিশ প্রশাসন কী তা অস্বীকার করার মত বোকামি করতে পারে? বরং একথা বলাতে কেনানের কথায় ইসলাম বিদ্বেষের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেনান মালিক নিজেই বলেছেন “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” দুটোর মধ্যেই ভাল মন্দ দুটাই আছে। তবু কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি শিরোনামে “মাল্টিকালচারালিজমকে” বেশি বিপদজনক বললেন। এথেকেও মনে করার কারণ রয়েছে যে তিনি ফরাসিদের মত ইসলাম-বিদ্বেষ জারি রাখার সুযোগটা হারাতে চান না।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২১ ডিসেম্বর তারিখে। অনেক জায়গায় অপুষ্ট বা সংক্ষিপ্ত রেখেই তা ছাপতে হয়েছিল। এখানে সেসবের অনেক কিছু পরিপূরণ করে, সংযোগ ও সম্পাদনা করে আবার এখানে ছাপা হল। ]