Category: Politics

  • ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ


    ভারতীয় সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ

    গৌতম দাস

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2qj

     

     

    সম্ভবত এক ‘বিরাট জ্ঞানী’ জেনারেলের সাক্ষাৎ পেয়েছে ভারত। কোন কথা কোথায় বলতে হয় আর কোথায় তা বলা উচিত নয় – এই বিবেচনা তার লোপ পেয়েছে বলেই মনে হয়। ইতিহাস-ভূগোল বোধ থাকলে এমন করার কথা নয়। কোনটা সামরিক অপারেশনাল বোর্ডরুমে বসে বলার কথা আর কোনটা পাবলিক মিটিংয়ে বা স্টেডিয়ামে, এমন হুঁশজ্ঞান যার নেই – এমন ব্যক্তি হলেন ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। কিন্তু অনেকে আবার বলছেন, এটা আসলে বোকা ও গাড়োল মানুষের চালাকি।

    যাই হোক ঘটনা হল, রাওয়াত এবার নয়াদিল্লিতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়া- ব্রিজিং গ্যাপ অ্যান্ড সিকিউরিং বর্ডার্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে কিছু মন্তব্য করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিরাও ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

    ‘প্রথম আলো’র ভাষ্য দিয়েই বলা যাক। কারণ, অনেকের অনুমান হল, এদের অনুবাদভাষ্য তুলনামূলকভাবে নমনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য, এমন অনুমানের একদল পাঠক আছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি “চীনের মদদে পাকিস্তান বাংলাদেশিদের ভারতে ঢোকাচ্ছে: ভারতীয় সেনাপ্রধান” – এই শিরোনামে প্রথম আলো লিখেছে, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার অভিযোগ, এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে”। এটা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, শুনতে কেউ কোথাও ভুল করেছে কি না। তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু উদ্ধৃতি আনা যাক। এ ব্যাপারে আনন্দবাজারের বক্তব্য এ রকম – “ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই সুপরিকল্পিতভাবে এমন করছে ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ এবং তাতে সমর্থন জোগাচ্ছে উত্তর সীমান্তের দেশটি, যাতে ওই অঞ্চলে গোলযোগ বজায় রাখা যায়”। রাওয়াত আসলেই সরাসরি  ‘পাকিস্তান’ বলেননি। তিনি কূটনৈতিক দায় এড়াতে সরাসরি নাম না নিয়ে ইঙ্গিত করে ‘ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ’ বলেছেন। আর ‘চীন’ও বলেননি, এর বদলে বলেছেন ‘উত্তর সীমান্তের দেশটা’।

    রাওয়াত আরো বলেছেন, আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত পাকিস্তান দখলে (‘taken over’) নিতে চায়। সেজন্য নাকি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের নিয়ে গিয়ে এরা আসামের জেলাগুলো ভরে ফেলছে। এখানে রাওয়াতের ‘দখল’ কথাটির অর্থ বুঝে নিতে হবে। ভূগোল হিসেবে আসামের জেলাগুলো কোনোভাবেই পাকিস্তানের পড়শি নয়। ফলে পাকিস্তানের পড়শি হিসেবে ভুখন্ড দখল ধরনের কিছু করে ফেলার প্রশ্ন নেই। কারণ, পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে সারা ভারতের সুদীর্ঘ বুক পেরিয়ে এরপর বাংলাদেশে ঢুকে তারও উত্তরে গেলে আসামের দেখা মিলতে পারে। বিপিন রাওয়াতের এটা অজানা নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, একটা অঞ্চলে বা কয়েক জেলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে, এর মানে হল – ওই অঞ্চল পাকিস্তানের দখলে চলে যাওয়া, ‘পাকিস্তান’ হয়ে যাওয়া। এটা খুবই অবাস্তব বক্তব্য, রাস্তার ধারের টঙের চা-দোকানের যে লেবেলের আলাপ হয় এটা সেই তুল্য। কোনো রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান এভাবে লুজ টক করতে পারেন না। মুসলমান মানেই পাকিস্তান, মুসলমান মানেই ভারতের শত্রু –  এতগুলো লুজ টক করে কীভাবে বলেন তিনি। এই অনুমানের কারণে তিনি পাকিস্তান-চীনের কথিত পরিকল্পনার ভেতরে ভারতের জন্য হুমকি দেখেছেন। বলছি না চীন বা পাকিস্তান ভারতের প্রতিপক্ষ নয় বা হতে পারে না। নানা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ-সঙ্ঘাতে তা হতেই পারে; কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এরা ভারতের শত্রু, এগুলো মূর্খতা বললেও কম বলা হয়। তবে হ্যাঁ, বিজেপির ভোটের রাজনীতি এমন হয় আমরা প্রায়ই হতে দেখি। রাস্তায় মুসলমান লোক ধরে চর থাপ্পর মেরে “হরে রাম” বলায় নিচ্ছে। অথবা দ্রিজে গরুর মাংস রেখে ছে অজুহাতে খুনই করে ফেলেছে। সেক্ষেত্রে, এর মানে হল,  বিজেপির তৃতীয় শ্রেণীর এসব মাঠকর্মির চিন্তা ও ভাষায় বিপিন কথা বলছেন তা মনে রাখতে হবে। যেমন এখানে রাওয়াতের ঘিন ঘিন করে বের হওয়া মুসলমান ঘৃণা গুলো দেখেন। তাঁর চিন্তার ফর্মুলার মধ্যে ধরে নেওয়া আগাম অনুমানটা হল – বাংলাদেশের মুসলমান = মানেই তারা পাকিস্তানের দালাল কারণ তারা মুসলমান = মানে তারা ভারত শত্রু। এগুলোকে একেবারে গো-মুত্র এর রাজনীতিক চেতনা – বলাই শ্রেয়।

    আবার রাওয়াত নিজের কথাগুলো বলতে দুটো বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, এটা “পরিকল্পিত মাইগ্রেশন” (planned immigration)। আর এভাবে তারা চীন-পাকিস্তান এক “প্রক্সিযুদ্ধ” (proxy war) চালাচ্ছে। রাওয়াত একজন সেনাপ্রধান। ফলে ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ বা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’ শব্দের সামরিক অর্থ তিনি না বুঝে লেখেননি। এগুলো তার সচেতনভাবে বেছে নেয়া শব্দ বলে আমাদের মানতেই হয়। তবে হাসিনা সরকার বা আওয়ামী লীগের খুশি হওয়ার কারণ নেই। কারণ, মুসলমানদের ‘পরিকল্পিত মাইগ্রেশনে’ চীন-পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের এখনকার সরকারও জড়িত, এটাই রাওয়াতের দাবি।

    ভারতের মিডিয়াতেও অনেকে বলছেন, রাওয়াত আসাম নিয়ে মন্তব্য করতে গেলেন কেন? বিশেষ করে আসামে বিদেশী অনুপ্রবেশকারী কারা এবং কতজন, তা যখন সরেজমিন সার্ভে করে দেখার কাজ চলছে এবং এর নিবন্ধন তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। গত সপ্তাহে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও আগামী জুন মাসের মধ্যে সে তালিকা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন আরো গোড়ায়। রাওয়াত ভারতের মতো দেশের সেনাপ্রধান। এই ইনস্টিটিউশন বাই ডিফল্ট নিজগুণে ও নিজ স্বার্থে অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকার কথা। ফলে প্রমাণিত ডাটা বা ফ্যাক্টস ছাড়া কোন অনুমিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়া, সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের হওয়া শুধু খুবই বিপজ্জনক তা নয়, এটা অপরাধ। তাই প্রশ্ন করতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘স্রোতের মতো (ইনফ্লাক্স)’ এবং ‘মুসলমানেরা’ আসামে গিয়েছে বা যাচ্ছে- এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? আসামের জনগণনা, নাগরিকত্ব যাচাই ও নিবন্ধন  তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আদালতও আগামী জুনে সে তালিকা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এর সোজা অর্থ- কারো কাছে এ বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই, তৈরি হচ্ছে। মানে এযাবৎ যা উল্লেখ হচ্ছে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণিত তথ্য বা সত্য কোথাও নেই, সব অনুমাননির্ভর। তবুও একজন সেনাপ্রধান নেহায়েত অনুমাননির্ভর কথা বলেন কী করে? দ্বিতীয়ত, ওই নিবন্ধন তালিকা তৈরি করতে যাচাই হচ্ছে কেবল কোনো ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক কি না, এতটুকুই।  আর কেউ ভারতীয় নাগরিক না হলেই সে বাংলাদেশি এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ কেউ বাংলাদেশী কি না এমন কোন কিছু সেখানে যাচাই করা হচ্ছে না। তাদের কাজও নয় সেটা। তাহলে প্রমাণ ছাড়া, অনুমাননির্ভর বলা যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসীর স্রোত আসছে, এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের উৎস কোথায়? এসব মনগড়া তথ্যের প্রপাগান্ডায় রাওয়াত নেমেছেন কেন? তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা তাকে বাংলাদেশকে অবশ্যই দিতে হবে। আসলে এ ধরনের প্রপাগান্ডা আসামে চলছে আর তাতে প্রধান মদদদাতা হল মোদির বিজেপি এবং তাদের সাথে কিছু স্থানীয় দল, আমরা জানি। এগুলা তারা করে চলেছে তাদের সস্তা ভোটের রাজনীতির স্বার্থে। রাওয়াত নিশ্চয়ই জানেন, রাজনৈতিক দলের বিভেদমূলক প্রপাগান্ডায় একজন সেনাসদস্যের যোগদানের অর্থ কী।

    রাওয়াত আসামের অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নিজের আপত্তির কারণ নিজেই প্রকাশ করেছেন এভাবে – ‘যেহেতু মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে’। লক্ষ করেন, রাওয়াতের বক্তব্য ওরা ভারতীয় অথবা অনুপ্রবেশকারী কি না, সেটা নয়। তার আপত্তি বা ভারতের কথিত নিরাপত্তার হুমকি দেখতে পাওয়ার একমাত্র কারণ, ওরা মুসলমান। সেই মুসলমানেরা বেড়ে যাচ্ছে সংখ্যায়। এর সোজা অর্থ – আসলে তিনি এক চরম মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ব। তার বিচার্য পয়েন্ট হওয়ার কথা ছিল, ওরা ভারতীয় নাগরিক নাকি অনুপ্রবেশকারী! এটাই। আসামের নাগরিক নিবন্ধনের কাজেও এটাই যাচাই চলছে। ওরা মুসলমান কীনা এটা সেখানে অবান্তর প্রশ্ন।

    থ্যাঙ্কস জেনারেল বিপিন রাওয়াত। এ রকম স্পষ্ট ‘বিদ্বেষ’ অনেকেই দেখাতে পারেন না, মনের মাঝে লুকিয়ে রাখেন; কিন্তু আপনি পেরেছেন। এর অর্থ – ভারতের মুসলমান নাগরিকেরাও আপনার চোখে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। যা হোক, সে বিচার ভারতের রাষ্ট্র ও নাগরিকেরা করবেন। আমতা আর কী বলতে পারি! ‘সেকুলার’ ভারতের সেনাপ্রধান একজন মুসলিমবিদ্বেষী ব্যক্তি – এই তথ্য আমাদের জন্য আসলে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক না আসলে একটা সার্কাস। তবে উদ্বেগেরও এ জন্য যে, বাংলাদেশ থেকে মুসলমানেরা নাকি স্রোতের মতো আসামে চলে যাচ্ছে; কোনো প্রমাণ ছাড়া এ কথা তিনি বলছেন। বাংলাদেশ যদি অর্থনীতির দিক থেকে আসামের চেয়ে পিছিয়ে পড়া হয়, তবেই বাংলাদেশ থেকে বেটার লাইফের আকর্ষণে আসামে ‘মুসলমান’ মাইগ্রেশন হতে পারে। এটা যেকোন মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে এই মৌলিক শর্ত পূরণ হতে দেখা যায়। কাজেই রাওয়াতকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে বাংলাদেশের চেয়ে আসামের অর্থনীতি আগিয়ে আছে, অথবা কাজ পাবার সুবিধা আর ভোগ্যপণ্য উপভোগের সুযোগের দিক থেকে জীবনযাত্রার মান বা  লাইফ স্টান্ডার্ড বাংলাদেশের চেয়ে আসাম লোভনীয়। এটা না পারলে আমাদেরকে রাওয়াতের বক্তব্য ফালতু কথা মনে করতেই হবে।

    ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ ও ‘প্রক্সিযুদ্ধ’
    মি. বিপিন রাওয়াত, আপনি বলছেন, চীন ও পাকিস্তান নাকি ‘প্লানড ইমিগ্রেশন’ চালাচ্ছে আর এর মধ্য দিয়ে এটা একটা ‘প্রক্সিযুদ্ধ’। একজন ভারতীয় সেনাপ্রধানের জানা থাকার কথা, বাংলাদেশে একটা সরকার আছে। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি দাবি করছেন, আমাদের সরকারসহ আমরা জনগণ সবাই চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা পুতুল, পাপেট। নইলে আমরা চীন-পাকিস্তানের কথায় আসামে ‘মুসলমান’ পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করলাম কেমনে! অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়ার ভাষ্য হল – গত ১০ বছরে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভারতবান্ধব সরকার। তাহলে বোঝা গেল ভারতের মিডিয়া ও সরকার রাওয়াতের ভাষ্যের সাথে একমত নয়, বরং উলটা। আচ্ছা মিস্টার  রাওয়াত আপনার কথা অনুসারে আমরা আসলে ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- তাই তো? ঠিক আছে, আমরা জনগণের বেশির ভাগ আপনার দাবিমতো না হয় কাঠপুতলি হলাম। আমরা সারাক্ষণই শুনছি বাংলাদেশের সরকারের বিরোধীদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে, ‘পাকিস্তানি মন’ আমাদের ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে এ আর নতুন কী? কিন্তু রাওয়াতের ভাষায় আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকারও ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুল’- এ কথা বেশ কৌতুককর। কথা আরো আছে। রাওয়াত বলছেন, “বাংলাদেশী মুসলমানদের অনুপ্রবেশে আসামের চারটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা থেকে বেড়ে এখন ৯টি জেলা হয়ে গেছে, আর এই পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন” – (inversion has taken place whichever be the government)। এ অংশটি বেশ উপভোগ্য। এর সোজা অর্থ – রাওয়াত আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে কোনো ফারাক করেননি। দু’টি দলই সমানে নাকি আসামে মুসলমানের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে মুসলিমবিদ্বেষী বিপিন রাওয়াতের চোখে হাসিনা সরকার কী তা জানা গেল। অর্থাৎ এ সরকার যতই ভারতকে সার্ভিস দিক, ভারতবান্ধব সরকারের খেতাব পাক না কেন, কাকাবাবুকে চেয়ারে বসিয়ে দাস হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে বসে ছবি তুলুক না কেন,  জেনারেল রাওয়াতের চোখে হাসিনাও খালেদার মতো একজন মুসলমানই। তদুপরি, তিনি এমন মুসলমান যে, আসামের জেলাগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সব জেলাকে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা করে তুলছেন; ‘চীন-পাকিস্তানের চাবি দেয়া একেকটা কাঠপুতুলের’ মত আচরণ করছে, ‘প্লান্ড ইমিগ্রেশন আর প্রক্সিযুদ্ধ’ করছেন।

    আসলে রাওয়াত এক ঘোরতর মুসলমানবিদ্বেষী অসুখে ভুগছেন, এমন আরও একটা বড় প্রমাণের দিক নজর করা যাক।  আসামের স্থানীয় রাজনীতিতে বারবার মুসলমান নিধনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ করে বোড়ো পাহাড়িদের হাতে স্থানীয় মুসলমানদের হত্যা ও বিচারহীনতার পটভূমিতে ২০০৫ সালে All India United Democratic Front, AIUDF নামে একটা দলের জন্ম হয়েছিল। দলটির প্রধান নেতা সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল এবং দলটির প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের সমর্থন বেশি।  এটাই হল অপরাধ। ঐতিহ্যগত ও পারিবারিকভাবে সৈয়দ বদরুদ্দিন আজমল আতরের ব্যবসা করেন। তার আতর বিখ্যাত কারণ এটা আসামের জঙ্গলের বিশেষ আগর গাছ থেকে  সংগৃহিত। সবচেয়ে বড় কথা AIUDF কেবল মুসলমানদের দল নয় অথবা ‘ইসলাম কায়েম’ তার লক্ষ্য এমন দল নয়। অর্থাৎ এটা কেবল একটি সম্প্রদায়ের দল নয়। তাদের ঘোষিত আদর্শ : ‘National Inclusiveness with a regionalist political position’ । এ ছাড়া দলটা নামের মধ্যেও নিজেদেরকে মুসলমানের দল বলে কোনো দাবি করা হয়নি। ফলে এটা একেবারে ভারতের কনষ্টিটিশন মানা রেজিষ্টার্ড আইনসম্মত লিবারেল রাজনৈতিক দল।  গত ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় আসামের জন্য বরাদ্দ ১৪টি আসনের মধ্যে তিনটাতে দলটি জয়ী হয়েছে। তারা হলেন- বদরুদ্দিন (ধুবড়ি) এবং তার ভাই সিরাজউদ্দিন (বড়পেটা)। আর তৃতীয় আসনটিতে জয়ী হয়েছেন রাধেশ্যাম বিশ্বাস। ইনি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। এতসব তথ্য সত্বেও, রাওয়াত AIUDF দলের দ্রুত বিকাশকে মুসলমানদের আসামে সংখ্যা বৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ বলে হাজির করেছেন, প্রকাশ করেছেন উষ্মা। বলেছেন, ১৯৮৪ সালে বিজেপির (তখনকার নাম ছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ) আসন ছিল দু’টি, সেই দলও এত দ্রুত বাড়েনি। (‘AIUDF have grown in a faster time-frame than the BJP grew over the years. When we talk of Jan Sangh with two MPs & where they have reached, AIUDF is moving at a faster pace in the state of Assam,’ said Rawat.)। আসলেই এক বিরাট জ্ঞানীর জ্ঞানের কথা এটা।  রাওয়াত মুসলমানদেরকে কী ও কেমন ঘৃণার চোখে দেখেন, মুল্যায়ন করেন এর এক আদর্শ প্রমাণ এটা।

    প্রথমত, তার এই তুলনাই মুসলিমবিদ্বেষের প্রকাশ। AIUDF আইনসম্মত দল কি না, কোনো আইন ভঙ্গ করেছে কি না – সেটা দেখার সরকারি দফতর আছে। যেমন আমাদের বেলায় রয়েছে নির্বাচন কমিশন । কিন্তু ভারতের সেই দফতরের পক্ষ থেকে এই দলের বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি করা হয়নি। এই দল দ্রুত না ধীরে বাড়ল, দলটা ইসলামি কি না এমন কোন অভিযোগ ঐ দফতরের আছে এমন নয়। আর তা থাকলেও তাতে কোন অপরাধ হয়েছে কি না সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখার দায়িত্ব ভারতের সেনাপ্রধানের নয়। তবে সেনাপ্রধানের কোনো আপত্তি থাকলে ওই দফতরে গিয়ে তিনিও অভিযোগ জানাতে পারেন। তা তিনি করেন নাই। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোনো দলের দ্রুত বাড়া কি অপরাধ? অথবা, ব্যাপারটা কী এরকম যে, এই দলটা কথিত অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে গড়া দল? রাওয়াত কিন্তু এ অভিযোগ পরিষ্কার করে আনছেন না। কেবল অমূলক ইঙ্গিতে বলা সন্দেহ ছড়িয়ে কথা বলছেন। দলের সভাপতি আজমল একজন মুসলমান, এটাই যেন তার বিরাট অপরাধ। আর দ্রুত বাড়াই যদি সমস্যা হয় তাহলে সেনাবাহিনী কি গত ১৯৮৪ সালে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধির সময় এমন একই প্রশ্ন তুলেছিল? নাকি সেটা বিজেপি বলে খুশি হয়ে চুপ ছিল? এই প্রশ্নে রাওয়াতের জবাব কী? ইন্ডিয়া যদি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তাহলে কয়েকটা জেলায় মুসলমানের সংখ্যা বেড়ে গেলে সমস্যা কী? এতে কী এসে যায়? এ ক্ষেত্রে আইনি সমস্যাই বা কী?

    আসলে বিজেপি বা বিপিন রাওয়াত যদি অহিন্দু কোনো ধর্মের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করেন, তবে বুঝতে হবে তারা ভারতকে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রের ভারত বলে অনুমানে ধরে নিয়েছেন, এমনটাই কামনা করেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আরএসএস বা শিবসেনার রাজনৈতিক লোক কীংবা কোন রেসিস্ট কীট হন তাতে কিছু এসে যায় না। কিন্তু নিজ পদ পদবির সাথে এসব নোংরা অবস্থান তিনি অবলীলায় জড়াচ্ছেন। বরং সাংবিধানিক পদে থেকে কোনো ধর্মের (যেমন মুসলমানের) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করে ইঙ্গিত করে কথা বলা – এটা ঐ জনগোষ্ঠি-বিদ্বেষী আচরণ ফলে তা অসাংবিধানিক এবং তা ফৌজদারি অপরাধ। ভারত যদি রাজনৈতিক সাম্যের দেশ হয়ে থাকে, ভারতে ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকারের সাম্য যদি বিজেপি বা রাওয়াত মানেন, তাহলে তারা শুধু হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চাইতে পারেন না। রাওয়াতের উচিত, আগে ভারতের কনস্টিটিউশনে এ কথা লিখিয়ে নেয়া যে, ‘এখানে নাগরিক নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান নয়।’ আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, মোদির বিজেপি সরকারের প্রতিক্রিয়া এতে কী হয়, কী তামাশা সেখানে করে!
    একটা কথা পরিষ্কার করে বলা যায়, বিজেপি বা বিপিন রাওয়াতরা মুসলমান অথবা যেকোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যখনই কোনো এক ‘ভারত’ (যেমন হিন্দুত্বের ভারত) গড়তে চাইবেন, আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, ওই বৈষম্য ও বিভাজনই মহাবিপদ ডেকে আনবে। ১৯৪৭ সালে এটাই হয়েছিল। যে মুসলমান ইনক্লুসিভ ভাবে, ভারতে সমান মর্যাদায় নাগরিক থাকবে, সে কখনো ভারতের জন্য হুমকি হবে না। একথার বিপরীতে যখন ভাবা হবে মুসলমান তাই ওরা ভারতের শত্রু বা হুমকি – এটাই রেসিজম। মনের গভীর গহীনে এক দগদগে ঘৃণার অসুখ! মনে এত ঘৃণা নিয়ে উনি ঘুমান কী করে!

    তবে একথা মনে করার কোন কারণ নাই যে ভারতে জ্ঞানবুদ্ধি-ওয়ালা লোকের কোন অভাব আছে। বরং এটা বুঝা যায় যে তাদের চাপিয়ে পিছনে ফেলে রাখা হয়েছে। যেমন এক ‘শ্রীনাথ রাঘবন’ এক্ষেত্রে আদর্শ উদাহরণ। তিনি দিল্লীরই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’ এর সিনিয়র গবেষক সদস্য। রাওয়াতের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,… “চীন-পাকিস্তানের তত্বাবধানে এক পরিকল্পিত মাইগ্রেশন আমরা নাকি দেখতে পাচ্ছি – এটা এক অবান্তর বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলা কথা”। [To suggest that we are witnessing “planned immigration” overseen by Pakistan and China appears to be an absurd overstatement.] হিন্দুস্তান টাইমসে লেখা এক মন্তব্য কলামে তিনি এটা লিখেছেন। তাঁর লেখার শিরোনামে তিনি দুটো শক্ত শব্দ ব্যবহার করেছেন – বলেছেন রাওয়াতের বক্তব্য ‘অ-ইতিহাস’ [ইতিহাসের সত্যতা নাই] এবং ‘অপুষ্টির বিচার’ [ahistorical, poorly judged]। পুরা লেখায় একজনের গবেষকের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে তিনি সেখানে রাওয়াতকে ন্যাংটা করে তাঁর সমস্ত দাবি প্রচুর যুক্তি তুলে একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন। আগ্রহিরা পড়ে দেখতে পারেন।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সেনাপ্রধানের মুসলিমবিদ্বেষ“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

    গৌতম দাস
    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার

    https://wp.me/p1sCvy-2qc

    ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন ও উল্লেখযোগ্য বাঁক নেয়া শুরু হয়েছে। একালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ বা স্বার্থসংঘাতের ধরন ও প্রকাশ কিছুটা নতুন। কারণ, এখন বিরোধ বা সংঘাত হয় ইস্যুভিত্তিক; মানে একেক ইস্যুতে একেক রকম। অর্থাৎ এক ইস্যুতে চরম বিরোধে সামরিক সংঘাত পর্যন্ত লাগার অবস্থা, অথচ একই সময়ে আরেক ইস্যুতে গলাগলি সহযোগিতা অথবা আধা সহযোগিতা, কিংবা নিউট্রাল অথবা সুপ্ত বিরোধে আগানো ইত্যাদি নানা রূপ এখন দেখা যায়। অবশ্য এর কোনো কোনোটা দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে মুখ্য বিরোধের বিষয় হয়ে থাকে।

    ভারতের পিঠে হাত রেখে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment) পলিসি, একটা ভিত্তি প্রস্তুত করা অর্থে শুরু হয়েছিল মোটা দাগে ২০০৫ সাল থেকে বুশের আমলে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার দুই টার্মের সময়ে সেটা আরো পোক্ত হয়েছিল, অ্যাকশনে গিয়েছিল। আর সেটাই ট্রাম্পের আমলে এঁটে বসা পলিসি হিসেবে এখনো আছে, তবে প্রশাসনের রুটিন গাইডলাইনের মত। মানে অতিরিক্ত বা নতুন কোনো মাত্রা তাতে যোগ হয়নি। তবে ট্রাম্পের অর্থনীতি্তের বৈশিষ্টে – বাজারে কাজ সৃষ্টি, হাতছাড়া হওয়া কাজ ফেরানো অথবা  ‘আমেরিকা ফাস্ট’ ধরনের যেসব কথিত ‘দেশী জোশের’ (অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন) কর্মসূচি আছে তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক। বিশেষ করে আইটি খাতে ভারত বাজার ও চাকরি হারিয়েছে; কিন্তু তা নিয়ে ট্রাম্প কোনো দয়ামায়া দেখাননি, বিকল্প কিছু দিয়ে ক্ষতিপুরণ করেননি । এমনিতেই আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিকে ভারতের দিক থেকে দেখা হয়েছিল এভাবে যে, এর আসল ঠেকা আমেরিকানদের। ফলে আমেরিকা ‘ভালো দাম ধরে দিলে’ তবেই ভারত এতে খেদমত করতে রাজি। ফলে ব্যাপারটা যেন এমন যে – আমেরিকা হল তোয়াজকারি কাজদাতা আর ভারত এক্সিকিউটর বা বাস্তবায়ক। ‘উপযুক্ত মূল্য দাও তো কাজ করে দেবো’ ধরণের এক সম্পর্ক। তবে আবার ভারতের অনুভূতি হল, আমেরিকাকে তার দরকার, গভীরভাবে দরকার। এটা তার অন্তরের অনুভব; অন্তত দু’টি প্রসঙ্গে। এক. আমেরিকা হলো ভারতের জন্য পারফেক্ট অস্ত্রের সরবরাহকারী বা উৎস। কারণ, ভারতের দৃষ্টিতে তার নিজের সমস্যা হচ্ছে, কখনো যদি কোনো সামরিক বিরোধে তাকে জড়াতে হয় তবে সম্ভাব্য সেই যুদ্ধের বিপক্ষ হিসেবে চীনকে দেখতে পায় সে। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়ে ভারত দেখে চীনকে; কারণ, পাকিস্তান বিষয়টা ভারত নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে করে। ওদিকে আবার চীন-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে আমদানি-রপ্তানি হয় মোট প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে ৯০ শতাংশই চীনা রফতানি। এছাড়াও ভারতে চীনা বিনিয়োগ আছে। কিন্তু তাই বলে, ভারতে চীনা অস্ত্র আমদানি এক অসম্ভব কল্পনা। আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হল, যে পাড়ায় আপনি থাকেন সেখানে সম্ভাব্য বিরোধের বিষয় থাকলে আপনি আগেই পাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সালিস বৈঠকের সাধারণত মধ্যস্থতাকারী যে হয় তাঁর সাথে আগাম যোগাযোগ রাখা দরকার মনে করেন। ভারতের কাছে আমেরিকার গভীর প্রয়োজন মূলত এখানেই।

    সম্প্রতি সম্ভবত ভারত মত ও নীতি বদলিয়েছে বা বদলাচ্ছে। মানে, আমেরিকা যেসব সুযোগ সুবিধা ভারতকে দেয়ার জন্য কমিটেড, যেসব বাড়তি বা ফাও সুবিধা ভারত পায়, সে বিষয়টি ভারত নতুন করে সম্ভবত মূল্যায়ন করেছে। অনুমান হলো, ভারত চেষ্টা করলে আরো বেশি মূল্য আদায় করতে পারে। ফলে সে আমেরিকার উদ্দেশ্যে নাক উঁচা করেছে।

    ঘটনা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের’ বার্ষিক সভায়। এ সভা মূলত অর্থনীতিতে গ্লোবালাইজেশনের ইস্যুতে সুবিধা-অসুবিধা বা বাধা নিয়ে এক ধরনের সমন্বয় সভা। ফলে এর মূল ফোকাস হল, গ্লোবালাইজেশন। ওদিকে, গত বছর ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে শপথ নেয়ার সময় থেকেই অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের ধারণায় তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী নীতির কথা বলতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের শুরুর দিকের এর সপক্ষে যে মূল নেতা ছিল সেই আমেরিকা এখন ট্রাম্পের আমলে এসে পারুক আর না-ই পারুক ‘উগ্র’ জাতিবাদী এবং নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী নীতির স্লোগান তুলেছিল। প্রতিবার এই ফোরামের সভা হয় জানুয়ারির শেষে, মানে গত বছরও তা হয়েছিল ট্রাম্পের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারির পরে; তবে তা হলেও ট্রাম্প গতবার এই সভায় নিজে যোগ দেননি। ফলে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সারা ইউরোপ শান দিয়ে বসে ছিল ট্রাম্পকে ‘ধোলাই দিতে’, কিন্তু পারেনি। একটা জাতিবাদী ভিত্তিক গ্লোবাল অর্থনীতিকে গ্লোবালাইজেশনে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু একই গ্লোবে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিগুলোকে একবার একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীলভাবে গড়ে তুলে এবং বাজার শেয়ারের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে সাজিয়ে দিয়ে ফেললে (যাকে আমরা গ্লোবালাইজেশন বলি) তাতে এভাবে ঢুকে যাওয়ার পরে তাকে ফিরিয়ে আবার আগের জায়গায় আনা কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। আমেরিকার উদ্যোগে সাড়া দিয়েই ইউরোপ একসাথে গ্লোবালাইজেশনের পথে এসেছিল। কারণ, গ্লোবালাইজেশনে একসাথেই যেতে হয়, একসাথে করার বিষয় এটা। এখন একা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী ও সংরক্ষণবাদী নীতি আওড়ানোর ফলে চীন ও ইউরোপের ক্ষোভ বেশি; এমনকি ভারতেরও। তাই এবারই প্রথম ট্রাম্পকে পাওয়ার পর তাকে কঠোর সমালোচনার সামনে পড়তে হয়। আর এবার মোদি সেখানে ছিলেন প্রথম বক্তা। তিনি নাম না ধরে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির কঠিন সমালোচনা করেছেন। [“Instead of globalization, the power of protectionism is putting its head up,” ] জলবায়ু-পরিবেশ ইস্যু থেকে দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যও আমেরিকার সমালোচনা করেন তিনি। এমনকি প্রটেকশনিজম (সংরক্ষণবাদ) ‘সন্ত্রাসবাদের মতোই ভয়ঙ্কর’ (as dangerous as terrorism) বলে এক বাণী দেন তিনি। আনন্দবাজার লিখেছে,  “ট্রাম্পের আমলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে ধাক্কা খাচ্ছে ভারত-সহ একাধিক দেশ”। এরপরে এমনকি টিট ফর টেট হিসাবে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার কথা, এভাবে ট্রাম্পও পালটা পাটকেল মারার কথা ভাবছে বলে ভারতের আর এক টিভি, এনডিটিভি জানাচ্ছে।  

    ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, এটা মূলত দুনিয়ার প্রভাবশালী সরকার এবং ব্যবসায় প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের মিলে এক ‘প্রাইভেট-পাবলিক জমায়েত’। ফলে সব দেশের সরকারপ্রধান প্রতিবার নিজে এ ফোরামে যান না। তবে কেউ নিজেকে ব্যবসাবান্ধব বা ব্যবসা-উপযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা একটা ভাল ফোরাম মনে করা হয়। এ বিচারে গতবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম গিয়েছিলেন। অনেকটা আমেরিকার কাছাকাছি গ্লোবাল লিডার হয়েছে চীন, যেন সেটা জানান দিতে। আর এবার মোদি গেলেন ভারত নেতা হয়েছে; না হলেও অনেক দূর এগিয়েছে, এটা জানাতে। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠা এক ঘটনা হল, ভারতের ‘গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে দাঁড়ানো ও আমেরিকার সমালোচনাকে’ চীনের পররাষ্ট্র বিভাগের রেগুলার ব্রিফিংয়ে প্রকাশ্যে ও  সরাসরি প্রশংসা করা হয়। এমনকি চীনা পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রথম পেজে মোদির ছবিসহ এ প্রসঙ্গে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ এ ইস্যুতে আমেরিকা হলো পুরনো নেতা; কিন্তু সূর্যের মতো ক্রমেই ডুবে যাওয়া বিরাট শক্তি। এর বিপরীতে চীন নতুন নেতা, ভারতও উদীয়মান। এ বিচারে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের অভিন্ন অবস্থান আকাঙ্খিত, এমনই হওয়ার কথা অন্তত ইকোনমিক ইস্যুতে। কিন্তু তা না হয়ে ভারত দুই নৌকায় পা দিয়ে গাছের আর তলার দুই দিকে খামচা দিয়ে খাচ্ছে; যেন দুনিয়ার কোনো কিছুতে তার দায় নেই। আবার ন্যূনতম ন্যায়নীতি বইবার মতো কাঁধই তার তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ তার কাছে এতই তুচ্ছ যে, তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে সে বেপরোয়া, কোনো কিছুতে যার কমিটমেন্ট নেই। আর ওদিকে চীন খামাখা ধর্মবিরোধিতা করে বেড়াচ্ছে আর মানুষের ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকেই চীন আমল করার যোগ্য হয়নি বলে, আমাদের ধারণা দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মুল্যবোধের বিষয়ে  গ্লোবাল অর্জনগুলো রক্ষার ও তা বয়ে নিবার জন্য অন্তত মুখে সমর্থন করার যোগ্য, দুনিয়ার আগামী সম্ভাব্য নেতৃত্ব এরা কেউ নয়। এমনই এক অবস্থায় সমগ্র দুনিয়া যেন ঝুলে আছে বা জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে।

    এ দিকে আরেক ঘটনা হল – অস্থির সময়ে ‘পাগলা’ ট্রাম্পের আড়ালে আমেরিকার ড্রাইভিং সিটে ক্রমেই সাবেক আর সিটিং জেনারেলরা সংগঠিত হয়ে উঠছেন। ‘পাগলা’ ট্রাম্পকে সামনে রেখে কোর আমেরিকান স্বার্থ ধরে রাখা আর নানাভাবে দুনিয়ার নেতৃত্বে আমেরিকার টিকে থাকা এবং একে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। বুড়া ঘোড়াকে চাবকে আবার খাড়া করার চেষ্টা বলা যায় এটাকে। তেমনি এক ঘটনার ক্ষেত্র হল, থাইল্যান্ড। অর্থনৈতিক দিক থেকে থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে অগ্রসর এবং এর সেনাবাহিনী আমেরিকার হাতে তৈরি। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আমেরিকার সাথে উঠাবসা করে জন্ম নেয়া। স্থানীয় থাই এলিটদের পছন্দের গন্তব্য ইউরোপের কোনো শহর নয়, আমেরিকা। রাজধানী ব্যাঙ্কক, এর কালচারাল মডেল হচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু ওয়াশিংটনের আজকের দুরবস্থা দেখে সেই ব্যাঙ্কক আজ মুখ ফিরিয়েছে, তাদের সম্পর্ক ঢলে পড়া ও স্থবির হয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি ব্যাঙ্ককের সামরিক শাসনের ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছিল আমেরিকা, এটাও কারণ। সেই স্থবিরতা ঘুচাতে বহুদিন পরে আমেরিকান মেরিনের জয়েন্ট চিফ জেনারেল ডানফোর্ড ব্যাংকক হাজির হয়েছেন। উদ্দেশ্য, পুরনো সামরিক সম্পর্কসহ রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও চাঙ্গা করা। কিন্তু তিনি প্বরথমেই কথা শুরু করেছেন এভাবে বলে, ‘আমেরিকা কোনো পড়তি শক্তি নয়’ (not a declining power)। অর্থাৎ জেনারেলের মনে আসলে ভয় ঢুকেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে বাস্তবতায় কে না ভয় পায়? ওবামাও ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ড সফরের সময় পাবলিক মিটিংয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াকে আমেরিকাই আরো বহুদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে, চিন্তার কিছু নেই।’

    আর এক ঘটনা হল, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভারত সফর করে গেলেন। যখন ট্র্রাম্পের আমেরিকা ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি (এটা আমেরিকা-ইরান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং পি৫+১; অর্থাৎ এর সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্য ও জার্মানি মিলে একত্রে করা চুক্তি, Nuclear Deal) বাতিল করে আবার কঠোর অবরোধ আরোপ করতে চাইছে। সেটা মূলত ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপ ও লবিতে। এর সারকথায় বলে দেখা যাচ্ছে, চীন ঠেকানো ইস্যুতে আমেরিকার দেয়া সুবিধা সব আদায় করে নিলেও ভারত ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনুসরণ করতে পারছে না। অবশ্য ইরান আবার চীনের সাথেও বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তবে তাতে ভারত অথবা ইরান এদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়তে কারো কোন সমস্যা নেই। এর প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের বিকল্প হিসেবে, ইরান হয়ে আফগানিস্তান ঢোকার নতুন এক সড়ক-ট্রানজিট রুট তৈরি করেছে ওই জোট। আনুষ্ঠানিকভাবে এটা ভারত, পাকিস্তানসহ সাত রাষ্ট্রীয় ‘আশগাবাত চুক্তি’ নামে পরিচিত; আর আশগাবাত বা আশাকাবাদ (Ashgabat)  তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী এবং তা ইরানি সমুদ্রসীমায় চাবাহার নতুন পোর্টকে কেন্দ্র করে গড় উঠেছে। ফলে স্বভাবতই ইরান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট হাব’ হবে। বলা বাহুল্য এটা আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর।

    এম ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার ভাষায়, এটা ভারতের আমেরিকান নীতিকে অমান্য ও উপেক্ষা করা। শুধু এটুকুই নয়, ভারতের তৃতীয় তেল সরবরাহকারী দেশ এখন ইরান। এ ছাড়া পুতিনের রাশিয়ার এক কোম্পানি ইরান থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত  এক গ্যাস পাইপলাইনের প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারত নতুন ‘অরবিট’ তৈরি করছে ও যোগ দিচ্ছে। তবে আমেরিকার জন্য ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ বিষয় এখানে আর একটা আছে; তা হলো- রাশিয়া, ইরান ও ইন্ডিয়া এরা মিলে তৈরি সব প্রকল্পে পরস্পরের দেনা-পাওনার মুদ্রা হিসাবে তা আমেরিকান ডলারে না করে নিজস্ব মুদ্রায় করবে। বলা বাহুল্য, এটা হবে আমেরিকার জন্য বিরাট ‘বড় ঘুষি’ খাওয়া।

    আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ নীতিতে ভারতের আবদার মেটাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়েছে – এটাই হল মূল কথা। কিন্তু এ দিকে যত দিন যাচ্ছে, নানান ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থজোট যত তৈরি হচ্ছে তাতে আমেরিকার বা ভারতের স্বার্থ বেশির ভাগ সময় একই লাইনে মিলছে না বা থাকছে না। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ, আমেরিকান স্বার্থের মুখোমুখি বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। আমেরিকা মিয়ানমার সরকারকে জেনোসাইডের জন্য ধমকাচ্ছে আর ভারত মিয়ানমারের জেনোসাইডের পক্ষে সাফাই বয়ান দিচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের ও আমেরিকান স্বার্থ এক জায়গায় থাকছে না।

    তবে এ কথা ঠিক, ভারতের ও আমেরিকার স্বার্থবিরোধ প্রকট হয়ে হাজির করার পেছনে কিছু অংশের অবদান ভারত;  আমেরিকার কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করার জন্য। এর অর্থ, এখানে আমেরিকানদের ঠেকা বেশি, তাই সেই সুযোগে ভারত বেশি মূল্য আদায় করতে চাইছে। আর বাকি অংশ আমেরিকা বা ভারত না চাইলেও সেসব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ বিরোধী হয়ে উঠে আসছে, সেটা মৌলিকভাবেই পরস্পরবিরোধী। এই স্বার্থবিরোধ কি তাহলে কোন চূড়ায় বা চরমে পৌঁছেছে? বিশেষ করে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলছেন, ‘টেররিজম নয়; আমাদের প্রধান হুমকি চীন ও রাশিয়া’। ফলে ভারত-আমেরিকান ‘সহযোগিতা’র বেলায় যে অভিন্ন জায়গা বের করা হয়েছিল তা কি এখন বন্ধ বা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে? তাহলে আমাদের কি মুক্তি মিলবে? এ দিকে সতর্ক চোখ রাখতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • কোল্ড ওয়ার ও রুজভেল্ট

    কোল্ড ওয়ার ও রুজভেল্ট

    গৌতম দাস

    ১৭ জানুয়ারি ২০১৮,  রবিবার, ১৮:৫১

     

     

    কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগ বলে একটা কথা আমরা প্রায়ই শুনি। এটা বলতে মোটা দাগে ১৯৫০-৯০ সাল, এই সময়কালকে বলা হয়, বিশেষত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া নয়, তবে দুনিয়াটাকে দুই ব্লকে ভাগ করে নিয়ে এদের দু’জনের মধ্যে সব সময় প্রায় সব বিষয়ে রেষারেষি, উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ইত্যাদিকে বলা হতো ঠাণ্ডা যুদ্ধ। তবে সরাসরি যুদ্ধ লাগানোর পরিস্থিতি দু’পক্ষই এড়িয়ে চলেছিল আর পরস্পরকে হুমকি-ধমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পেরেছিল। কারণ উভয়েই জানত সঙ্ঘাত মুখোমুখি জায়গায় নিয়ে গেলে সেটা অন্তত ‘হাতছুট’ ঘটনা হিসেবেও পারমাণবিক যুদ্ধের স্তরে চলে যেতে পারে। ঠিক এ কারণেই সম্ভবত দু’পক্ষের মধ্যে রেষারেষি, উত্তেজনা,পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ যতই থাকুক না কেন তা যেন শেষ বিচারে ‘ঠাণ্ডা’ই থাকে, গরম হয়ে মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে যায়, সেদিকে উভয় পক্ষেরই প্রচেষ্টা থাকত। এ কারণে সময়টাকে ঠাণ্ডা যুদ্ধ বা ইংরাজিতে কোল্ড ওয়ার বলার চল দেখা যায়। তবে এটা শুধু দুনিয়াটাকে দুই জোটে ভাগ করে নেয়া নয়, অর্থাৎ সব রাষ্ট্রকেই এই দুই ব্লকের কোনো একটাকে বেছে নিয়ে যোগ দিতে হতো তাই নয়; বরং এটা ছিল আসলে সেকালের প্রচলিত দুনিয়াতে প্যারালাল দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা; যাদের দুইয়ের মাঝে পণ্য, পুঁজি অথবা ভাব বা চিন্তা কোনো কিছুরই লেনদেন অথবা বাণিজ্য বিনিময় ধরনের মতো কোনো সম্পর্কও ছিল না। সব রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো একটা ব্লকে যোগ দিতে হতো এ জন্য যে, নইলে অস্ত্রশস্ত্রের উৎস বা সরবরাহ কোনো ব্লক থেকেই পাওয়া যেত না। ব্লকে যোগ দেয়া ছিল আনুগত্য বা বিশ্বস্ততা প্রদর্শনের উপায়, প্রাথমিক শর্ত পূরণ। আরো কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা যেতে পারে। এমন কোনো রাষ্ট্র ছিল না, যে একই সাথে সোভিয়েত অস্ত্র এবং আমেরিকার অস্ত্র পেত বা জোগাড় করতে পারত। একটা পেলে অপরটা পাওয়ার আর সম্ভাবনা থাকত না। অর্থাৎ ক্রস সোর্স বা অস্ত্রের দুই উৎস মাখিয়ে ফেলার পরিস্থিতির সম্ভাবনা ছিল না। আজ ব্লকে ভাগের যুগ বা কোল্ড ওয়ারের কাল শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এটা এতই সিরিয়াস ছিল যে, একই রাষ্ট্রের দুই সোর্সের অস্ত্রের সরবরাহ পাওয়ার বা জোগাড়ের সম্ভাবনা কম ছিল। এটা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এখনো প্রচ্ছন্নভাবে কাজ করে থাকে। আবার অনেকের মনে হতে পারে, সেকালে ‘জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্র’ বলেও তো দুই ব্লকের বাইরে কেউ কেউ ছিল। তা অবশ্য ছিল। কিন্তু মজার কথা, এদের অস্ত্রের উৎসের দিকে তাকালেই তাদের নিরপেক্ষতার ভুয়া দিকটি নজর করা সম্ভব। যেমন- নেহরুর ভারত, এটা ‘জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্র’-এর প্রবল প্রবক্তাদের একটি। কিন্তু এর অস্ত্রের উৎস ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এমনকি ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও না, একেবারে ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা দুনিয়াতে আবির্ভাবের পর ২০০৫ সালে বুশের ভারত সফরের পর থেকে ভারত এই প্রথম একই সাথে আমেরিকান অস্ত্রেরও সরবরাহ পাওয়ার ‘যোগ্য’ হয়। ওদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়াও এর আগে কখনো পাকিস্তানকে অস্ত্র দেয়নি। জন্মের শুরুতে পাকিস্তানের এককভাবে সরবরাহদাতা ছিল আমেরিকা, পরবর্তীকালে তাতে চীন যুক্ত হয়েছিল। এবার একালে এই প্রথম সোভিয়েত বা রুশ অস্ত্রও পাকিস্তান জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছে। এই হলো, ঠাণ্ডা যুদ্ধ সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা। এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এখন ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, কেন এমন কোল্ড ওয়ারের পরিস্থিতি সে সময় তৈরি হয়েছিল, পেছনে কী কারণ কাজ করেছিল।

    আমাদের কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের ইতিহাস পাঠ সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত ব্রিটিশদের চোখে দেখা ও লেখা ইতিহাস পাঠ হয়ে আছে। এর কারণ সম্ভবত একটাই, আমরা ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিলাম। সে কারণে আমাদের সাথে আমেরিকান পণ্য ও পুঁজি বিনিময় তেমন ছিলই না। এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় ভাববিনিময় অথবা আমেরিকার চোখে দেখা ও লেখা ইতিহাসের বয়ানের সাথে পরিচয় থাকা সীমিত থাকায় এর সুযোগও হয়নি। যেমন- সে সময়ে আমাদের কলোনির মালিক প্রভু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল, তিনি আমাদের চোখে বিশাল ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা। এমনকি তুলনায় আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের নাম আমরা অনেকেই জানার বা মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করিনি। কথাটা বলছি এ কারণে যে, রুজভেল্টের সাথে যদি চার্চিলের তুলনা করি, তবে রুজভেল্ট ছিলেন সাহায্যদাতা আর চার্চিল গ্রহীতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু ধরা হয় ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর। হিটলারের জার্মানি প্যারিস দখল করে ১৯৪০ সালের জুন মাসে ফরাসি সরকারকে বশ্যতা স্বীকার এবং ক্ষতিপূরণ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল। অর্থাৎ চার্চিলের ইংল্যান্ড থেকে হিটলার ছিলেন মাত্র ইংলিশ চ্যানেলের অপর প্রান্ত দূরে। ফলে চার্চিল শেষ আশ্রয় হিসেবে রুজভেল্টের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছিলেন। আমেরিকা তখন পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধে নিজেকে কোনো পক্ষের সাথে জড়ায়নি। তবে চার্চিলের ইচ্ছা ছিল, আমেরিকা ইংল্যান্ডের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে জড়াক। অর্থ ও অস্ত্র সব ধরনের সাহায্য সহায়তা প্রার্থী তিনি। কারণ, ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর থেকে ব্রিটিশ অর্থনীতি আর কখনো সচ্ছলতার মুখ দেখেনি। ধারদেনা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ইত্যাদি করে কোনো মতে চলছিল। এর বিপরীতে আমেরিকান অর্থনীতির অবস্থা ছিল সটান। অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হিসেবে আমেরিকার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয় ১৯২০ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই। আজ যেমন চীনের অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেছে, অনেকটা সে রকম। ফলে চার্চিলকে সহায়তা করার সামর্থ্য বা ক্ষমতা আমেরিকার ছিল। কিন্তু রুজভেল্ট চার্চিলকে বলছিলেন, তিনি সাহায্যই করতে চান, তবে যুদ্ধ তিনি একবারই করতে চান। তাই যুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে সে চিত্র আমেরিকা যেভাবে দেখতে চায়, সে বিষয়ে চার্চিল রাজি না হলে রুজভেল্ট সে যুদ্ধে জড়াতে চান না। কী সে চিত্র? সরাসরি বললে তা হলো- এক. দুনিয়াতে কোনো রাষ্ট্রকে কলোনি করে রাখার অবসান ঘটাতে হবে। দুই. যুদ্ধে বিশেষত বড় যুদ্ধে বা বিশ্বযুদ্ধে বিপুল পরিমাণে পুঁজি বা সঞ্চিত সম্পদের ক্ষতি হয়। ফলে রুজভেল্ট এমন এক শেষ যুদ্ধে জড়াতে চান, যার পরে সহসাই আর যুদ্ধের দরকার না হয়। তা তিনি নিশ্চিত করতে জাতিসঙ্ঘের মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়তে চান, যার অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের ঐকমত্যে কিছু কনভেনশন, সবাই একমত হয়েও পালনযোগ্য আইন আরবিট্রেশন চালু করতে চান, যাতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার যেকোনো স্বার্থবিরোধ মীমাংসার ভিত্তি হিসেবে ওইসবের আলোকে আপসে বিচার-আচার, কূটনৈতিক সংলাপ ইত্যাদির মাধ্যমে সমাধান করা যায়; সব না হলেও অনেক বিরোধ এভাবে এড়ানো সম্ভব। আমেরিকার এই অবস্থান আকস্মিক ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময় থেকেই আমেরিকান রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী বিশেষত পুঁজিবাজারে পুঁজির ব্যবসায়ীদের প্রভাবশালী অবস্থান ছিল এটা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এই অবস্থান নিয়েই ইউরোপে গিয়েছিলেন। অবশ্য ইউরোপ তখনকার বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানিকে শাস্তি দিতে, আর যুদ্ধে ক্ষতিপূরণ জার্মানির কাছ থেকে আদায় করতে উন্মত্ত ছিল। ফলে উইলসন ইউরোপের নেতাদেরকে নিজের অবস্থান বুঝিয়ে স্বপক্ষে নেয়ার সুযোগ বের করতে পারেননি। তবে একটা আপস হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়া তখনো উইলসন বোঝানো এবং এর পক্ষে আনার চেষ্টা করেছিলেন। ফলে যুদ্ধ শেষের ক্ষতিপূরণ আদায় বা বিপারেশন বিষয়ক ভার্সাই চুক্তির দুই অংশ করা হয়। প্রথম অংশ জার্মানি কাকে কী ক্ষতিপূরণ দেবে বিষয়ক। আর শেষ অংশ হলো লিগ অব নেশনস নামে এক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া, যার কাজ হবে ক্ষতিপূরণ আদায় ও তা বিতরণে কাজ করা। পরবর্তী সময়ে ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করা যায়নি।
    অপর দিকে (১৯৪০-৪১ সালে চার্চিলের সাথে আলাপের সময়) দুনিয়া থেকে কলোনি তৈরির ব্যবস্থা উঠানোর পক্ষে আমেরিকার শক্ত অবস্থান নেয়ার কারণ নিশ্চয়ই আমেরিকান রাষ্ট্র বা রুজভেল্টের কোনো বিপ্লবীপনা নয়। আসলে পুঁজিবাজারে পুঁজি ধার দেয়া কোম্পানিগুলোর ধার দেয়ার সক্ষমতা যতটা বেড়েছিল, সে তুলনায় বাজারে পুঁজি ধার নেয়ার ক্রেতা বাড়ছিল না। এর মূল কারণ কলোনিকৃত দেশ আর কলোনি মাস্টারের মধ্যকার সীমিত লেনদেনই ছিল অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রধান ধরন। যেমন, ব্রিটিশ-ভারতের সাথে ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল একমুখী উদ্বৃত্ত পাচারের। ফলে পুঁজির পূর্ণ বিনিয়োগ, পণ্য, পুঁজি বিনিময় ইত্যাদি সব কিছুই একটা সীমিত বাজারের মধ্যে আটকে ছিল। এর বিপরীতে আমেরিকান পুঁজি বাজার যা প্রতীকীভাবে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ নামে পরিচিত, সেই ওয়াল স্ট্রিট চাইছিল, দুনিয়া থেকে কলোনি সম্পর্ক উঠে যাক। ফলে উপনিবেশমুক্ত রাষ্ট্রগুলো সরাসরি রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পণ্য, পুঁজির লেনদেন, বিনিময় বাণিজ্য ঘটাতে থাকবে। এরই সার ফলাফল, বিনিয়োগ পুঁজির চাহিদা বৃদ্ধি। পুরনো কলোনি ধরনের সম্পর্কটাই ওয়াল স্ট্রিটে পুঁজির বাজারে পুঁজির চাহিদা ব্যাপক না হওয়ার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক। তাই অনেক আলোচনা ও দরকষাকষির পর ১৯৪১ সালের আগস্টে চার্চিল-রুজভেল্ট যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল সেটাকে আটলান্টা চার্টার বলে। ওই চার্টারের প্রথম দফাই হলো দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠী নিজেই ঠিক করবে, সে কিভাবে কার দ্বারা শাসিত হতে চায়, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বিষয়ক এই কালজয়ী ধারণার পক্ষে দাঁড়ানো। এর অর্থ, সব জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে শাসন করার অধিকার পাবে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার মানেই হলো কলোনি সম্পর্কের অবসান। তবে তামাশার ব্যাপার হলো, কলোনি মাস্টার চার্চিল যখন এই চার্টারে দাসখতের স্বাক্ষর দিচ্ছেন, তখনো ব্রিটিশ ইন্ডিয়া তাদের কলোনি। অর্থাৎ চার্চিলকে পরোক্ষে স্বীকার করতে হচ্ছে যে, কলোনি রাখা ভুল, তা করা ঠিক নয়। কেন এই বেকায়দায় পড়া? কারণ হলো, নইলে হিটলার ফ্রান্স দখলের মতো এরপর ইংল্যান্ডও দখল করে নেবে।
    পরপর চারবার প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ানো এবং জিতে আসা সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্র্যাট রুজভেল্ট। ১৯৩২, ১৯৩৬, ১৯৪০ ও ১৯৪৪- এভাবে চারবার তিনি জিতেছিলেন। আর ১৯৪৫ সালে চতুর্থবার শপথ নেয়ার মাত্র চার মাস পরে এপ্রিল ১৯৪৫ সালে তিনি মারা যান। তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুুম্যান প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুরো সময় পার করেছিলেন। পরের বার ট্রুম্যান সরাসরি প্রার্থী হন এবং জিতে আসেন। অর্থাৎ প্রায় আট বছর ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আর এই পুরো সময়টা তিনি রুজভেল্টের নীতিই অনুসরণ করেছিলেন। বিশেষত জাতিসঙ্ঘকে গড়ে তোলা এবং তা রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরিক স্বার্থবিরোধ অবসানের ডায়ালগ আর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঐকমত্যে তৈরি কনভেনশন, চুক্তি, আইন, আরবিট্রেশন ইত্যাদির মাধ্যমে। তবে এগুলো ছিল এক ধরনের প্রস্তুতিমূলক এবং তত্ত্বীয় কাজ। এটা প্রথম পরীক্ষার সম্মুখীন হয় ব্রিটিশ-ইরান তেলবিষয়ক স্বার্থ সঙ্ঘাতে।
    ইরানের তেল প্রাপ্তির নিশ্চয়তা এবং সেই তেল তোলার চুক্তি প্রথম সম্পন্ন হয়েছিল ১৯০১ সালে। স্বভাবতই সেটা টেকনোলজির গরমে প্রায় একমুখী বা একপেশে চুক্তি। এরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে ইরানি প্রধানমন্ত্রী রাজমারা খুন হয়ে যান ১৯৫১ সালের ৭ মার্চ, আর সর্বসম্মতিক্রমে ড. মোসাদ্দেক মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হন। ২৯ এপ্রিল আর পয়লা মে সে দেশের সব তেলের খনি জাতীয়করণ করা হয়। ব্রিটেনের সাথে সঙ্ঘাতের শুরু এখান থেকেই। প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এই বিরোধে ভূমিকা নেন মধ্যস্থতাকারীর, যেটা রুজভেল্টের স্বপ্নের জাতিসঙ্ঘের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্রিটেনের সাথে বিরোধ মীমাংসায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা দেয়া হয়। ট্রুম্যান বহু চেষ্টা করেছিলেন আপসে বিবাদ মেটাতে। তার প্রচেষ্টায় ব্রিটেন ইরানের সার্বভৌমত্বের খাতিরে জাতীয়করণের অধিকার মেনে নেয়। কিন্তু নিজের বিনিয়োগের ক্ষতিপূরণ দাবি করে। এসব বিতর্ক শেষ করার আগেই আমেরিকায় নতুন নির্বাচনে এবার রিপাবলিকান আইসেনহাওয়ার (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান মিত্রবাহিনীর কমান্ডার) জিতে আসেন। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে শপথ নেয়ার পর থেকে পুরনো রুজভেল্ট-ট্রুম্যানের নীতি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন। ইরান-ব্রিটেন ঝগড়ায় ব্রিটিশদের পক্ষ নিলেন। এটা ঠিক যে, ওই তেল তোলার অনুমতি সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়ার জন্য স্টালিন আগ্রহ প্রকাশ করলেও মোসাদ্দেক তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তবু রাশিয়ানরা সুবিধা নিতে পারে এই অজুহাতে নতুন প্রেসিডেন্ট সিআইএ পাঠিয়ে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেককে সরিয়ে শাহকে ক্ষমতায় আনা এবং এবার তেলের খনি ব্রিটিশ, ডাচ, ফ্রান্স ও আমেরিকান কোম্পানির এক কনসোর্টিয়ামের হাতে তুলে নেয়া হয়েছিল। এক কথায়, রুজভেল্ট-ট্রুম্যানের মধ্যস্থতাকারী আমেরিকার সেই থেকে হয়ে পড়ল ইম্পেরিয়াল এক ক্ষমতা; তেল কোম্পানির দখলের জন্য যে খুনোখুনি করতে প্রস্তুত।
    বলা হয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের যুগের শুরু সেখান থেকেই।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কোল্ড ওয়ার ও রুজভেল্ট”, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

    ‘মুসলমান’ ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে আসাম

    গৌতম দাস
    ১১ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার, ০০:০২

    https://wp.me/p1sCvy-2pL

    আসামে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘মুসলমান’ নামে আর এক ক্লিনজিং ও নিধন, নারী, শিশু ও বয়স্কদের সবচেয়ে সীমাহীন দুর্দশা আর শরণার্থীর ঢল – এসব দৃশ্য কী আমাদের দেখতে হবে? হলে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের কাঁধে বন্ধুক রেখে এই হত্যাকান্ড ঘটবে? এর দায়ভার কী আদালত বইতে পারবে? ভারত হিন্দুত্বের রাজনীতিতে ডুবে শেষ হয়ে যাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে আর মাত্র ১৬ মাস বাকী। মোদীর অর্থনীতির ডুবে যাওয়া আর কাজ সৃষ্টিতে ব্যর্থতা আর লুকানো নয়, গত সপ্তাহে এবার এটা একেবারে ষ্টাটিস্টিক্যালি প্রকাশিত। সেখানে দেখা যায় মোদীর গত চার বছরের শাসনের মধ্যে সর্বনিম্ন জিডিপি এবার, সাড়ে ছয় পারসেন্টে নেমেছে। ফলে ধরে নেয়া যায় আগামী নির্বাচনের মোদীর অস্ত্র হবে একটাই – উগ্র হিন্দুত্ব ও মুসলমানবিদ্বেষ। আর তাতে এখান থেকেই অনুমান করা যাচ্ছে পরিণতি কী হবে!

    রোহিঙ্গা সমস্যার দৃশ্যমান কোনো সুরাহার দেখা পাওয়া যায় নাই এখনও, অথচ এর আগেই প্রায় একই ধরনের নতুন আরেক ফেনোমেনা ‘আসাম মুসলমান নিধন নিপীড়ন’ – ব্যাপকভাবে উঠে আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আসামের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে তারা কথিত ‘বাংলাদেশী’, ‘মুসলমান’, ‘ফরেনার’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি বলে অত্যাচার-নির্যাতন নিয়মিত শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। আসলে এক কথায় বললে আসাম বা অসমিয়রা এক চরম জেনোফোবিয়াতে ভুগছে। ইংরেজি জেনোফোবিয়া (Xenophobia) শব্দের ‘জেনো-‘ এর তুল্য প্রচলিত বাংলা হবে – ফরেনার বা বিদেশী। এভাবে পুরো শব্দের অর্থ হল – ফরেনার বা বিদেশী ভীতি। যদিও এই শব্দের আসল গভীর অর্থ হল – ‘অ-পর’; যে আমার মতো নয়, এমন অপর-ভীতি। ফলে তাকে দেখতে পারি না, ঘৃণা করি। যেমন – কেউ আমার মতো নয়, সে আমার ধর্মের নয়, অথবা আমার মত অহমিয়া নয়, অথবা আমার মতো এশিয়ান নয় ইত্যাদি। ফলে সে আমার ‘অ-পর’। “অসমে বসবাসকারী বাঙালিরা অসমিয়াদের ভাষা-সংস্কৃতিসহ সব গ্রাস করে ফেলছে” – এই হল অসমিয়াদের সবচেয়ে কমন আক্ষেপ ও বিদেশ- বিরোধী প্রপাগান্ডা। এই ‘অপর-ভীতি’ বা জেনোফোবিয়াতে ভুগছে আসাম। অথবা সম্ভবত বলা ভালো, জেনোফোবিয়াতে ভোগানো হচ্ছে। কারা ভোগাচ্ছে, কারা এরা?
    বলাবাহুল্য, ‘অপরে আমাদের সব গ্রাস করে ফেলল’ – এই আক্ষেপের বয়ান তৈরির পেছনে আধা সত্য-মিথ্যা অনেক গল্প তারা জড়ো করেছে, অনুমান করা যায়। এখানেই সবচেয়ে বড় মিল দেখা যাবে বর্মিজদের সাথে। বর্মিজদের অপর-ভীতি রোহিঙ্গা নিধনের পিছনের মূল কারণ। এদিকে এখানে বর্মিজদের আসাম দখল থেকে অসমিয়াদের অপর-ভীতির সুত্রপাত। দ্বিতীয় এঙ্গলো-বার্মিজ যুদ্ধ হয়েছিল ১৮৫১ সালে। এর আগেই, (১৮২৪-১৮৩৮) সালের মধ্যে অহম রাজা ও আশপাশের অন্যান্য রাজা যেমন কাছাড় রাজ্য মিলিয়ে পুরো আসামই ব্রিটিশ কলোনির দখলে ও শাসনাধীন চলে যায়। বার্মিজ রাজার আসাম অঞ্চল দখল নিতে যাওয়া থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল।  তাই অসমিয়াদের একালের আক্ষেপের বয়ানে গল্পের একটি উপাদান হল – ব্রিটিশ কলোনি তাদের দখল করে নিয়েছিল। আগে তারা কত সুন্দর দিন কাটাইত। যদিও এর জন্য এখনকার বাংলাদেশ বা এর কোনো বাসিন্দা আমরা কেউ দায়ী নই। তবু এক জেনোফোবিয়ায় ভিকটিম-বোধের গল্প এখান থেকে শুরু হয়েছে। এর ওপর আদি পাপ আমরা তো মুসলমান, সেটা তো আছেই, যা জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো সমস্যার জন্য মুসলমানদের দায়ী করা সহজ। তবে আমাদের আরেক অপরাধ ছিল যে, যেহেতু ব্রিটিশ দখলে যাওয়ার পর আসামকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রশাসনিক অধীনে একটি ব্রিটিশ কমিশনারেটের কর্তৃত্বে রেখে শাসন করা হয়েছিল, আর তা হয়েছিল ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। ফলে বৃটিশেরা নয়, বাঙালিরাই যেন এতে দায়ী। আর এর জন্য যেন বাংলাদেশ, মুসলমান বা বাঙালিরা দায়ী, এমন বলে নানান অনুমান ও গল্পও তাদের ঝুলিতে আছে। ভিকটিম-হুড যারা বিক্রি করে, তারা এমনই করে।
    আর ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগ হলে আসামকে পুরা বেঙ্গলের সাথে আর না, বরং সরাসরি পূর্ববঙ্গের সাথে যুক্ত করে নতুন প্রদেশ করা হয়। তাতেও তারা আরো বেশি অখুশি  হয়েছিল। যদিও (১৯০৫-১৯১১) মাত্র এই ছয় বছর আসাম পূর্ববঙ্গের সাথে ছিল। তবে ততদিনে আসাম ব্রিটিশদের চোখে নগদ অর্থকরী ফসল, চা উৎপাদনের এক খনি যেন, এভাবে হাজির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেকালের চা উৎপাদনের শ্রমিক কারা হবে, সে বিষয়ে ব্রিটিশেরা স্থানীয় অসমিয়াদের পছন্দ না করে বিপুল শ্রমিক মাইগ্রেট করে এনেছিল। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার এক রিপোর্টের মতে, এই শ্রমিকেরা মূলত ট্রাইবাল, তবে ছোটনাগপুর উপত্যকা মানে সেকালের বিহারের ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড (যে দুটোই এখন আলাদা রাজ্য) থেকে এবং বিহারের বাকি অংশ থেকে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা (তেলেঙ্গনা, কয়েক বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আলাদা হওয়া রাজ্য) এসব অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে আনা হয়েছিল। এ ছাড়া লর্ড কার্জনের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেন পূর্ববঙ্গ থেকেও আনা হয়। সম্ভবত পড়শি ও দক্ষ কৃষিকাজ জানা লোক বলে। [People – mostly tribals – were brought in from the Chota Nagpur plateau and its adjoining areas covering present-day Jharkhand, Chhattisgarh, and parts of Bihar, West Bengal, Odisha, Telengana and Andhra Pradesh to work in the newly-opened tea plantations from the mid 19th century; the British encouraged the migration of Muslim farmers from East Bengal after Lord Curzon became Viceroy of India (1899-1905). ]
    তবে এর আরেকটা বড় কারণ আছে। ব্রিটিশ-ভারতের ‘ভারত শাসন আইন-১৯৩৫’ অনুসারে, ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা প্রথম স্থানীয় নেটিভদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তবে এর আগেও মন্ত্রিসভা বা স্থানীয় শাসনে সিলেক্টেড স্থানীয় নেতা নেয়া হত। তার পুরো আনুষ্ঠানিক নাম মৌলবি সাইদ স্যার মোহম্মদ সাদদুল্লাহ। গৌহাটির সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান সাদদুল্লাহ পরে কলকাতা হাইকোর্টের উকিল ও সরকারি প্লিডারও ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের আসাম প্রদেশের প্রথম নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী হন (তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত)। এর আগে তিনি ১৯১৯ সালের সরকারেও সিলেক্টেড প্রতিনিধি ছিলেন। মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন। রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি গোপীনাথ বরদোলাই। এমনকি স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার কাজে যে ৯ সদস্যের খসড়া কমিটি হয়েছিল, তিনি সেখানে একজন ছিলেন। তিনিও পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষক নিয়ে গেয়েছিলেন, ধান চাষে বাংলার অভিজ্ঞতায় বেশি ফসল এরা ফলাতে পারে এই বিশ্বাসে। এসব মিলিয়ে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা জাম্প করেছিল। তবে তা সবই ১৯৪১ সালের মধ্যে, এরপরে নয়। যেমন ১৯০১ সালে আদমশুমারিতে মুসলমান ছিল আসামের মোট জনসংখ্যার ১২.৪ শতাংশ। এরপর বিপুল মাইগ্রেটেড হয়ে আসা জনসংখ্যার কারণে পরের ৪০ বছরের মধ্যে ১৯৪১ সালে তা দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছিল, ২৫.৭২ শতাংশে। তবে এটাই ছিল প্রথম ও শেষ সবচেয়ে বড় মুসলিম মাইগ্রেশন। মনে রাখতে হবে এটা হয়েছিল, ব্রিটিশ-ভারতে যখন দাওয়াত দিয়ে জমি ও সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে পুর্ববঙ্গ থেকে মাইগ্রেট করে বাঙালি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের ৩০ বছরে দেখা যায় ১৯৭১ সালের শুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যা ১ শতাংশ কমে ২৪.৫৬ হয়েছিল। এরও পরের ১০ বছরে এই প্রথম মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৮১ সালে ৪ শতাংশ বেশি হয়ে ২৮.৪৩ শতাংশ হয়। এর পরের ১০ বছরে জনসংখ্যা ১৯৯১ সালে আরো ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছিল ৩০.৯৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১১ সালের শুমারি অনুসারে এখন মুসলিম জনসংখ্যা ৩৪ শতাংশ।
    নিচের গ্রাফ নেওয়া হয়েছে, সাথে দেয়া লিঙ্ক ফলো করেন। 
    ASSAM muslim population
    তাই সবচেয়ে হইচই শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এক উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেখানে আওয়াজ উঠেছিল, ‘বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক মুসলমান অনুপ্রবেশ’ হচ্ছে। কিন্তু প্রমাণ করে এমন কোন তথ্য না থাকলেও একথা বলা হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই বিচারে এটা একটি মিথ, একটি পারসেপশন মানে ভোটে জেতার পারসেপশন। এ ছাড়া অনেক গবেষক দেখিয়েছেন এর কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই। বিশেষত, যেখানে ১৯৭১ সালের শুমারিতে দেখা গেছে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়েনি। এ ছাড়া অন্য যেসব ‘রাজনৈতিক পারসেপশনের অভিযোগ’, যেমন – বাংলাদেশের সাথে আসামের সীমান্ত এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা নাকি বেশি। অথচ কোন শুমারির গণনাতে দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করা হয়নি। আবার এমনই আরেক অভিযোগ হল, অন্যান্য রাজ্যের মুসলমানদের তুলনায় আসামের মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নাকি বেশি, মানে “মুসলিম অনুপ্রবেশকারী” এসেছে। সেটাও তুলনীয় ফিগার দিয়ে গ্রাফ একে তুলনা করে দেখা গেছে, এই অভিযোগও ভিত্তিহীন। অর্থাৎ আদমশুমারির তথ্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ ধারণাকে সমর্থন করে না। তবে এটা হতে পারে যে, আসামের ভেতরেই ১৯৮১ সাল থেকে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানদের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া শুরু করেছে। কিন্তু এর অর্থ মুসলমান মোট জনসংখ্যা বেড়েছে তা নাও হয়ে পারে। কারণ মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলমানদের শতকরা হার যেহেতু এটা একটা শতকরা হিসাব অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শতকরা যোগফল ফিক্সড বা ১০০ থাকতে হবে, তাই। এতে কোন কারণে হিন্দুদের জন্মহার কমাটাও তুল্যপরিমাণ মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে বলে দেখাবে। অথচ মুসলমান মোট জনসংখ্যা আসলে হয়ত বাড়েই নাই – এমন হতে পারে।
    এমনিতেই সাধারণভাবে কোন জনগোষ্ঠির শতকরা হার এর বাড়া-কমা ঘটার পিছনের কারণ হিসাবে দেখা যায় – আরবানাইজেশন বা শহরায়নের হার বেশি হলে জন্মহার কমে। হিন্দুদের শহরায়ন বা শহুরে চাকরিজীবী পেশা গ্রহণ মুসলিমদের তুলনায় বেশি হলে হিন্দু জন্মহার কমেছে – এর একটা কারণ হতে পারে। মূল কারণ হল, কৃষিকাজ বা প্রত্যক্ষ শ্রম বেচে খাওয়া বাবা-মায়েদের সন্তান বেশি নেয়ার ঝোঁক থাকে। কারণ সেক্ষেত্রে সন্তান কম বয়স থেকেই নিজেই আয় করতে পারে বা উল্টা বাবাকে শ্রম-আয় দিয়ে সাহায্য করতে পারে। যেটা শহুরে বা শিক্ষিত চাকুরে পেশার বাবা-মায়ের বেলায় উল্টা হয়। কারণ তাদের সন্তান শিক্ষিত করতে গিয়ে সন্তানের পিছনে খরচ করতে হয়। তাদের মানুষ করার এই খরচ কমাতে বাবা-মায়েরা জন্মহার কম রাখার পথে যায়। মুসলিম জন্মহারের তুলনায় বেশি দেখানোর সম্ভাব্য কারণ এটিই। আরও একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আসাম ভেঙ্গে আরও নতুন চারটা প্রদেশ করা হয়েছে। আর ঐ প্রদেশগুলো হওয়ার কারণে পুরান আসাম প্রদেশ থেকে (মুসলমান জনসংখ্যার তুলনায়) বেশি হিন্দু জনসংখ্যাই বের হয়ে গেছে। তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা কম বের হওয়াতে মোট সংখ্যাটা একই থাকলেও শতকরা হারের দিক থেকে মুসলমানের শতকরা হার বেশি দেখতে পাওয়া সম্ভব। তবে মূল কথা, কেন শতকরা হিসাবে মুসলমানের পার্সেন্টেজ বেশি দেখাচ্ছে এর আসল কারণ পরিসংখ্যান ফিগার ঘেঁটে বের করা যেত। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাই মুসলমান ‘অনুপ্রবেশকারীর’ উপস্থিতির প্রমাণ – এদিকে অনুপ্রবেশের রাজনীতি, মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় নাই। অথচ এটা একটা অপ্রমাণিত বা ভিত্তিহীন কথা।
    আসলে ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এক মুসলিম বিদ্বেষের ঝড় উঠেছিল। এরই সাক্ষ্য হয়ে আছে ১৯৫১ সালের ‘NRC 1951’ (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেন)। এটা এই প্রথম ভারতের একটাই প্রদেশে যাচাই করে নাগরিক তালিকা তৈরি করা। ভারতে নিয়মিত প্রতি দশ বছর পরপর আদমসুমারি হয়ে থাকে। সে হিসাবে ১৯৫১ সালের আদমশুমারির পরই সেই ডাটা থেকে সারা ভারতের মধ্যে একমাত্র আসাম প্রদেশেই “রেজিস্টার্ড নাগরিকদের তালিকা” তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ অন্য কোনো রাজ্যে তাদের কোন NRC করা হয় নাই। আসামে ‘মুসলমানেরা বেড়ে গেল কি না’ এই উছিলা তুলে মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা তখন থেকেই। এমনকি এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধ’ আসামের হিন্দু বাঙালিদেরও বিপক্ষে। বিশেষ করে সিলেটের লাগোয়া আসামের তিন জেলার (কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি) হিন্দু বাঙালি যাদেরকে বরাক উপত্যকা বিধৌত অঞ্চলের লোক বলা হয়। আর শুরুতে এই ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস। তাই বরাক অঞ্চলের লোকেরা এখন ‘উগ্র অহমিয়াবোধের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘নাগরিকত্ব নিয়ে সোচ্চার বরাকের বাঙালিরা” –এই রিপোর্ট এখনও আসামের বরাকের তিন জেলার হিন্দু বাঙালির প্রতিবাদ। যদিও এরাই ১৯৪৭ সালে সিলেট নিয়ে ভোটাভুটিতে আসামের পক্ষে পতাকা উড়িয়েছিল। এদের মোহভঙ্গ হয় ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। বিশেষত ১৯৫১ সালে কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদোলাই যখন মুখ্যমন্ত্রী এবং  ১৯৬১ সালে, যখন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা ‘অসমিয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ ‘উগ্র অহমিয়াবাদের’ শুরুর দিকে এর নেতৃত্বে ছিল প্রদেশ কংগ্রেস।
    যদিও খোদ নেহরু বা পরে ইন্দিরা গান্ধী এই উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ পছন্দ করেননি। আবার এদের দুজনের কেউই প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে থামাতেও পারেননি। এর নিট ফলাফল হল – এর পর থেকে আসামের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব কংগ্রেসের দেখানো পথেই থাকে কিন্তু নেতৃত্ব অন্যান্য দল বা গোষ্ঠির হাতে চলে যায়। আর সেটাই এখন বর্তমানে বিজেপির হাতে। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই ‘অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ সংক্ষেপে আসু [AASU] এটাই আসামের বড় ছাত্র সংগঠন। অন্য রাজ্যের সাথে তুলনা করে বললে, ভারত স্বাধীনের পরে কংগ্রেস আর কমিউনিস্টদের ছাত্র সংগঠন সব রাজ্যে আলাদা হয়ে যায়। ব্যতিক্রম আসাম। এখানে ভাগ না হওয়া সংগঠনটাই হল আসু। সম্ভবত ‘উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদ’ সেকালে উত্তাল হয়ে উঠা – এমন অবিভক্ত থেকে যাওয়ার কারণ।  AASU এই সংগঠন ১৯৭৯ সালে (NRC) এনআরসির নাগরিকের তালিকা তৈরি শেষ করে এর ভিত্তিতে ‘কথিত অনুপ্রবেশকারীদের’ বের করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। অর্থাৎ কোনো রাজনৈতিক দলের বদলে ছাত্র সংগঠনের তরফে এমন দাবির তোলা হয়েছিল। এর অর্থ তাতপর্য হল, কংগ্রেস দলের কেন্দ্র বা হাই কমান্ড, প্রদেশ কংগ্রেসের উগ্র অহমিয়া জাতীয়তাবাদে মোড় নেয়ার বিপক্ষে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছিল, এরই প্রতিক্রিয়া। এজন্য পরিণতিতে আমরা দেখি পরবর্তিতে এই ছাত্র সংগঠনই নতুন রাজনৈতিক দল (অসম গণ পরিষদ) খুলেছিল, যেটা তখন জন্ম হয় নাই। ১৯৭৯ সালের আসুর আন্দোলন শুরুর পরে ১৯৮৩ সালে রাজ্য সরকার বা বিধানসভার নির্বাচনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আসু এই নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়। ফলে কংগ্রেস ছাড়া এতে আর কোনো দল অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু মুসলমান ভোটারেরা কংগ্রেসের প্ররোচণায় ভোট দিতে গিয়েছিল। এখান থেকে এক মহা-বিপর্যয়ের শুরু।
    আসামের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রধান চারটির একটি – বোড়ো (Bodo) ট্রাইব, অনেকে এদেরই আদি অহমিয়া মনে করে। ট্রাইবের নামে এক আঞ্চলিক দল (National Democratic Front of Bodoland) আছে তাদের (পরে অবশ্য দুটা ভাগ হয়ে গেছে)। বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের আমলে ২০০৩ সালে বোড়ো সংখ্যাগুরু চারটি জেলা (Kokrajhar, Baksa, Chirang and Udalguri ) নিয়ে এক  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ও আলাদা নির্বাচিত প্রশাসন, Bodoland Territorial Council (BTC) গঠন করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে BTC তে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৭৫ ভাগ সংসদীয় আসন বোড়োদের জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই সমস্যা উল্টা হয়। কারণ সর্বসাকুল্যে বোড়ো জনসংখ্যা ৪৮% এর কম। আর পরের বড় অংশ হল ২৭% মুসলমান, এছাড়া অন্যান্য ধর্ম বা ট্রাইব ইত্যাদির লোক আছে। অর্থাৎ ঐ চার জেলাতেই মুসলমানসহ অন্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আছে। বোড়োরা এখন এসব কোন সংখ্যালঘুদেরকে ক্ষমতায় কোন প্রতিনিধিত্ব দিতে চায় না।  উল্টা রুখে দিতে চায়, রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত করতে চায়। এমনকি নির্বাচনে ক্যান্ডিডেট দিতে বাধা দেয়, হত্যা ম্যাসাকার করে ইত্যাদি। আগ্রহিরা এই রিপোর্টের পুরাটা পড়ে দেখতে পারেন। এটা ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের অধীনে করা হয়েছেন। সেখান থেকে, [ This year 2014, between May 1 and May 3, nearly 50 unarmed Muslims were shot dead in three separate incidents in the Bodo Territorial Administered Districts. These killings, according to the report, were a retaliation by Bodo militants because a host of non-Bodo communities, including Muslims, had collectively put up an election candidate from the United Liberation Front of Assam to contest for the Kokrajhar Lok Sabha election seat against Bodo candidates.] এরাই ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিও নিলা ম্যাসাকার (Nellie massacre) ঘটিয়েছিল। প্রায় হাজার খানেক বোড়ো অধিবাসী দল বেধে প্রায় মোট প্রায় তিন হাজার (অফিসিয়ালি দুহাজারের কম) মুসলমান জনগোষ্ঠির লোককে হত্যা করেছিল।  ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে আসামের নওগাঁ জেলার নিলা ও এর আশেপাশের গ্রাম এলাকায় মুসলমানকে হত্যা করার সাথে শিশু ও নারীদের আহত এবং নির্যাতিত হয়, এটাই নিলা ম্যাসাকার নামে এটি পরিচিত। পরবতিতে একটা ডকুমেন্টারি সিনেমা হয়েছে এই হত্যাকান্ডের সার্ভাইভারদের নিয়ে। পরে ২০১২ ও ২০১৪ সালের জুনেও (মোদি এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর) একইভাবে আক্রমণ নিপীড়ন করা হয়েছিল।

    ১৯৮৩ সালের মুসলমান নিধন হলেও এ নিয়ে আজো কোনো বিচার আদালত কিছু হয়নি। তবে ইন্দিরা গান্ধীর (তিনি তখনো বেঁচে, নিহত হয়েছেন অক্টোবর ১৯৮৪) প্রতিক্রিয়া কিছু টের পাওয়া যায় তার এক কাজে। তিনি এই হত্যার ব্যাপারটা যতদুর সম্ভব চেপে গিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু একটা কাজ করেছিলেন। ভারতের ভুখন্ডে কোন ‘বিদেশির অনুপ্রবেশ’ ইস্যু ডিল করতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় “১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্ট” [The Foreigners Act, 1946.] এই আইন। তা সত্ত্বেও ঐ হত্যাকান্ডের পরে কেবল আসামে প্রয়োগের জন্য ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’ [Illegal Migrants (Determination by Tribunal) Act, 1983] বলে নতুন আইন করেন তিনি। এই আইনের সারকথা হল – কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী কি না সেটা প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এ ছাড়াও অভিযোগকারীকে কথিত অনুপ্রবেশকারির বাসার ১০০ গজের মধ্যে বসবাস করতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে ভারত থেকে বের করে দেয়া খুবই কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

    ইন্দিরা গান্ধী  (৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) মারা গেলে  পরে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। তিনি এবার ‘আসু’র সব দাবি মেনে নিয়ে ১৯৮৫ সালের আগষ্টে  ‘আসাম চুক্তি বা আসাম অ্যাকর্ড’ সই করেন। অর্থাৎ NRC ১৯৫১ তালিকা আপডেট করে এর ভিত্তিতে অবৈধ বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার আন্দোলনকারিদের দাবি মেনে এর বাস্তবায়নে চুক্তি করেন তিনি। এছাড়াও তিনি ১৯৮৩ সালের রাজ্য নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য নতুন নির্বাচন দেন। অর্থাৎ রাজীব গান্ধী যা করলেন এর অর্থ তাতপর্য হল, তিনি স্বেচ্ছায় চাইলেন আসু এরপরে নিজেদের নতুন দল খুলুক, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জিতে আসু সরকার গড়ুক। এবং ১৯৮৫ সালে তাই হয়েছিল। আর  আসুর নতুন গড়া স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নাম হল ‘অসম গণ পরিষদ’ (Asom Gana Parishad, AGP) আর আসুর নেতা প্রফুল্ল কুমার মোহান্ত এই দলের সভাপতি ও ১৯৮৫ সালের নির্বাচনে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কারণ রাজীব গান্ধীর অনুমান ও ভীতি ছিল একটাই, এমন না হতে দিলে আসাম ভারত থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে যেত। অতএব রাজীব গান্ধী টাইম বায়িং বা সময় কেনার পথ ধরেছিলেন। আর মোহান্তর কি হয়েছিল পরে? পরের বারের (১৯৯০) নির্বাচনে মোহান্ত গোহারা হেরে যান। তবে কোনোমতে তার পরের বার (১৯৯৫) জিতেছিলেন । আর সেটাই শেষ। এখন ঐ দল ভেঙ্গে দুইটা, আর প্রতিবারের রাজ্য নির্বাচনে আসামের মোট ১২৬ আসনের রাজ্য সরকারে দলের অর্জনে থাকে ১০-১৪ আসন।

    এদিকে এখনকার আসাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হলেন সর্বানন্দ সনোয়াল, তিনি আসলে ছিলেন AGP নেতা এবং আসুরও নেতা সভাপতি (১৯৯২-৯৭)। তিনি ২০০৫ সালে, নিজ নামে ‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্ট (ট্রাইব্যুনালে সাব্যস্ত) আইন-১৯৮৩’-কে [IMDT এক্ট] কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে  একটি রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট এই আইনকে  ‘নাল অ্যান্ড ভয়েড’ ঘোষণায় বাতিল করে দেন। ফলে এখন অনুপ্রবেশকারি বলে কাউকে বের করে দেয়া সহজ। আসলে এই পরিকল্পনাগুলো ছিল বিজেপির। এবার সে পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে তিনি AGP ছেড়ে প্রকাশ্যে ২০১১ সালে এবার বিজেপিতে যোগ দেন। রাজ্য নির্বাচনে সেই প্রথম তিনি বিজেপির পক্ষ থেকে এর আগে যেটা ছিল অনুপ্রবেশ বা বাঙালি বা বাংলাদেশি খেদাও এর ইস্যু সেটাকে তিনি সরাসরিভাবে এবার “মুসলমান খেদাও” বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। সর্বানন্দ পরে ২০১৪ সালের বিজেপি থেকে লোকসভা নির্বাচনে জিতে কেন্দ্রে প্রতিমন্ত্রী হন। আর ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসাবে ২০১৪ সালের ঐ নতুন ভাষ্যে ‘মুসলমান খেদাও’ এতে প্রায় ৫০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছিল বলা হয়।  এদিকে আসামে কংগ্রেস এর মাঝের (২০০৬, ২০১১)  আবার দুইবার মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার গড়েছিল।  তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল এই যে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে রাজীব গান্ধীর দলসহ সকলে অনুপ্রবেশ বা মুসলমান ইস্যুকে ব্যবহার করেছে ক্ষমতায় যাবার জন্য। যারাই রাজ্য সরকারে এসেছে সবাই এটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু সবাই জানে এর বাস্তবায়ন কী কঠিন ও ভীষণ বিপদের। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাঙালি খেদাও অথবা অনুপ্রবেশকারী অথবা বিদেশী মাইগ্রেন্টের কোনো না কোনো একটি আসাম রাজনীতির ইস্যু ছিল। আর সবসময়ই ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে এই ‘বাংলাদেশী’ ইস্যুটি ব্যবহার করতে কেউ দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক স্থানীয় এনজিও ইস্যুটাকে সেবার সুপ্রীম কোর্টে নিয়ে যায়,  আর এর বাস্তবায়ন দাবি করেছিল। সেই থেকে এটা কোর্টের মনিটরিংয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ আদালতও ঐ মিথ বিশ্বাস করেছে যে একটা বড় বাংলাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠি ১৯৮১ সালের পরে আসামে এসেছে।

    কিন্তু এরপর কী?
    সবচেয়ে ভয়াবহ এক অবস্থার জন্য যেন আসামের সব দল বা পক্ষ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও।  কেন? কারণ আসামের নাগরিকের তালিকা কী হচ্ছে, কতদূর হচ্ছে এর বাস্তবায়ন ‘নির্বাহী সরকার’ নিজে করছে না। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধানে, নির্দেশ ও মনিটরিংয়ে এটা সরকার বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু ঘটনা হল যদি ‘কেউ ভারতের নাগরিক’ এটা প্রমাণ করতে পারল না – এর মানেই সে অ-ভারতীয় হয়ত, কিন্তু সে বাংলাদেশের নাগরিক প্রমানিত হল না, হবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রে কারও কাছেই যার জবাব নেই তা হল, তাহল, এই কথিত ‘অ-ভারতীয় বা অবৈধদের’ কোথায় ঠেলে ফেলা হবে? এর জবাব সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নেই। কেউ অ-ভারতীয় এটুকু বলেই আদালত পার পেতে চায়। কিন্তু আদালত এ নিয়ে কিছু না বললে অন্যেরা, কোন না কোন রাজনৈতিক শক্তি এরা কী বসে থাকবে? সুযোগসন্ধানীরা কেউ বসে থাকবে না। বরং ‘বাংলাদেশীদের বের করে দেয়ার ক্রেডিট’ নিজে নিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেকোনো সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারে। এর দায় কে নেবে? সবচেয়ে আজব ব্যাপার, সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো আসামের সবাই মনে করছে, নাগরিক তালিকা পূর্ণ হলেই ওটাই সব সমাধান। অথচ এটাই হবে দাঙ্গার উৎস। নতুন ও গভীর ক্ষত তৈরি ও সঙ্কটের শুরু। ভারতের এক গবেষণা থিংক ট্যাংকও (দিল্লির থিঙ্ক ট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য।) এতে সায় দিয়ে বলছে, আসামের এই তালিকা একটি ‘টাইম বোমা’। তবে ভিন্ন কারণে।

    ঘটনার আসল দিকটা হল, আসামের প্রধান সমস্যা পিছিয়ে পড়া অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের অভাব। আসাম ঠিক ল্যান্ডলকড ভুখন্ড নয়। প্রবেশ বা একসেস আছে কিন্তু সেগুলো কেবল এক কোনা, আসামের কেবল পশ্চিম দিক শিলিগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হবে, ফলে সহজ না। কখনও পাচগুণ পথ ঘুরতে হয়, পুর্ব দিক থেকে আসলে। অথচ সব রিসোর্সে আসামের সহজে প্রবেশের উপায় হতে পারে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশের সাহায্য ও সুসম্পর্ক হতে পারত এর জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বস্তু। কিন্তু মিথ্যা মিথ ও ভ্যানিটি আর ‘অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে পাহাড় ও মনের ঘেরার ভেতর আটকে গেছে অসমিয়রা। অসমিয়াদের যদি মিথের তালাশে দিন কাটে, বিদেশি বা অ-পর’ ঘৃণা, মুসলমানবিদ্বেষ এর মুডে থাকে তবে এই অসমিয়াদেরকে কোন বাংলাদেশ সহায়তা করবে? কেন করবে? কেউ বিদেশি মানে সে আমার জনগোষ্ঠির স্বার্থ-বিরোধী – এসব ধারণা ও কথা বার্তা বড় জোর সত্তর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এরপর আর নাই। বুঝমান মানুষ বুঝেছে এটা ডাহা মিথ্যা আর ভিত্তিহীন কথা। যে মানুষ ‘বিনিময়’ শব্দটার অর্থ তাতপর্য শুনে নাই, খেয়াল করে বুঝে নাই সে তো অচল। দুনিয়ার বাকী সবার জন্য সে এক অচল সিকির মত দায়!

    যে ‘বিদেশী’ ঘৃণা করে বাইরের সব রিসোর্সে তাকে অ্যাকসেস দেবে কে? আসামের আসলে ত্রাতা হতে পারে কথিত এই ‘মুসলমানের বাংলাদেশই’, অথচ আসাম মুসলমান ঘৃণা আর বিদ্বেষে ডুবে যাচ্ছে। তাকে কে বাঁচাবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৯ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসাম পাহাড়ে আর মনের ঘৃণায় আটকে গেছে সঙ্কট“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

    চীনের ‘ভাত-কাপড়ের’ হিউম্যান রাইট বুঝ

    গৌতম দাস
    ০৪ জানুয়ারি ২০১৮, বৃহষ্পতিবার, ০০:১৮

    চীন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু দিনকে দিন মুখোমুখি হয়ে ওঠা বাড়ছে। তবে চীনের ভেতরে মানবাধিকার আছে কি না তা নিয়ে চীনকে পশ্চিমের খোঁচা দেয়া কিংবা বিব্রত করার যে নিয়মিত প্রচেষ্টা আছে, আমরা সেটার কথা বলছি না। যদিও দুটার মধ্যে কোথাও একটা সম্পর্ক আছে, তবুও এখানে প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ খোদ চীনের অভ্যন্তরীণ নয়, বাইরের। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে যেগুলো বাইরের দেশ যেমন, আমাদের মতো রাষ্ট্র বা মিয়ানমার –  সেখানে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের পরিস্থিতি। চীনের আভ্যন্তরীণ নয় বাইরের ভিন্ন রাষ্ট্রে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ঘটনায় চীনের দায় কী?কী অর্থে? যেমন আমাদের মতো দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা, নির্বাচিত সরকার থাকা কী রাষ্ট্রের জন্য জরুরি? আবার কিংবা ধরুন বিরোধী দল মানে সরকারে থাকা দলটা ছাড়াও এর বাইরের কোনো দল দেশে থাকা জরুরি কি না? অথবা সরকারের কোনো সমালোচক থাকা কতটা দরকার? অথবা ধরেন, কোন বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা ও সাফাই মানে না, ভিন্ন চোখে দেখতে চায় – এমন লোক কি দেশে থাকতে পারবে না গুম হয়ে যাবে, ইত্যাদি। অথবা কথাটা আরেকভাবে তোলা যায়। গণতন্ত্র না উন্নয়ন, কোনটা চান? মানে, যেন মানবাধিকার ও উন্নয়ন- এ দুটোর কোনো একটা বেছে নিতে হবে। এর একটা যেন অপরটার বিকল্প! যেন পথ দু’টি কিন্তু একই ফল পাওয়া যায় এমন। এমন কথা বলা কী ঠিক? এগুলো তো দানব সরকারের কাজ!  এছাড়া এখানে আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল যে দানব সরকার এমন দানবীয় সাফাই দিচ্ছে তাই না। বরং খোদ চীন সরকার এব্যাপারে এখন সাফাই দিয়ে এগিয়ে এসে যাচ্ছে।

    এটাই হল এসবের সাথে চীনের সম্পর্ক। বিতর্ক অন্য রাষ্ট্রের ভেতরের হলেও গুরুত্বপূর্ণ হল, চীন বিষয়গুলোতে জড়িয়ে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নিজেই একটা সাফাইদাতা হয়ে উঠছে। লজ্জ্বার মাথা খেয়ে এভাবে চীন সেই সব স্বৈরশাসক রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকাশ্য মঞ্চে সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দিতে শুরু করেছে। বলছে, এটা হচ্ছে নাকি যার যার রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ বা ‘নিজস্ব গণতন্ত্রবোধ’। এখানে অন্যের কিছু বলার নাই। সবাইকে একই বুঝ ও বোধের হিউম্যান রাইটে চলতে হবে এমন কোনো মানে নাকি নেই! চীনের ধারণা, হিউম্যান রাইটের বোধ যেহেতু একেকটা রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, ফলে ‘গণতন্ত্র’বোধ একেকজনের একেক রকম হতে পারে। আর সেই সূত্রে কোনো রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট রক্ষা মুখ্য কাজ হিসাবে নিতে পারে। আবার কেউ নাকি উন্নয়নের পথ বেছে নিতে পারে। এমনকি “উন্নয়নের স্বার্থে” কোনো রাষ্ট্রের কাউকে গুম, খুন করতে হতে পারে! দুর্নীতিও পুষতে হতে পারে! এটাও কোনো এক ‘বুঝের বা বোধের গণতন্ত্র’। এটাই যেন বা ‘কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব উন্নয়নের পথ’। এটা নিয়ে অন্যের কথা বলার কিছু নেই। যেমন চীনের অন্য রাষ্ট্রে মাথা গলানোর কিছু নেই বলে চীন বড় গলায় দাবি করে।

    চীন বলছে এই যে, প্রত্যেক রাষ্ট্রের ‘নিজস্ব উন্নয়নের পথ’ এটাতে চীন কোনো মাথা গলাতে চায় না। এর কারণ চীনের সাধারণ নীতি হচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যাপারে, মানে তার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ব্যাপারে চীন মাথা ঘামায় না। সাধারণভাবে বললে, ‘রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের’ ধারণার দিক থেকে দেখলে এটা অনেক পুরনো কথা, ফলে চীন নতুন কিছু বলেনি। কিন্তু চীন এ কথা বলে আসলে যেসব রাষ্ট্রের স্বৈরাচার শাসক নিজের আকামগুলাকে ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নিয়েছে বলে চালিয়ে দিবার চেষ্টা করছে – চীন এসব রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজকে সাফাই সরবরাহকারি ও স্বৈরশাসকের ‘রক্ষক’ হয়ে উঠতে চাইছে। এক কথায়, অন্যের রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করি না – এ কথা বলে চীন আসলে স্বৈরশাসকদের বন্ধু আর এমন শাসকদের ক্লাবের নেতা ও সংরক্ষক হতে চাইছে।

    কিন্তু চীনের এটা হওয়ার দরকার কী? দরকার হচ্ছে কেন? দরকার হচ্ছে এ জন্য যে, ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন, আর সেকথার পক্ষে এক গ্লোবাল স্বীকৃতিও আছে। চীন দুনিয়ার নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া এমন হবু গ্লোবাল নেতা। কিন্তু তাঁর এমন আকাঙ্ক্ষার আগে থেকেই ‘অধিকার’ কথাটা সার্বজনীন হয়ে আছে। আর এই গ্লোবাল স্বীকৃতি পেয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে নতুন দুনিয়া গড়ার কাল থেকে। জাতিসঙ্ঘ বলে প্রতিষ্ঠান ১৯৪৫ সালে গড়ে ওঠে আর ১৯৪৮ সালে ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস চার্টার’ ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার ভিতর দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার বিষয়টা সার্বজনীন স্বীকৃত। এটা ছিল প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নাগরিকদের জন্য অধিকারের সনদ। আর চীনকে আজ একথা মানতে হবে যে, ১৯৪৮ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন রাষ্ট্রে মনে করা হয়নি বা কেউ এমন কথা তোলেনি যে, ওই চার্টারের কারণে ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে বা এতে কোনো রাষ্ট্রের মধ্যে জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ ঘটছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ‘রাইট’ বা ‘অধিকার’ কথাটা কেবল বিশেষ একটি রাষ্ট্রের জন্য পালনীয় ধারণা নয়, বরং এটা বিশ্বজনীন ধারণা।

    আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, এটা রাষ্ট্রসংঘের সদস্য ও অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সব রাষ্ট্রেরই পালনের এক ধরনের বাধ্যবাধকতাও আছে। যেমন রাষ্ট্রসংঘের আর এক কনভেনশন হল, International Covenant On Civil And Political Rights 1966 । সদস্য ইচ্ছুক রাষ্ট্রগুলোর স্বাক্ষর শেষে এটা কার্যকর হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। স্বাক্ষরের পরে নিজ নিজ সংসদে এতে অনুস্বাক্ষরের প্রস্তাব পাশ করে ফেলার পরে ঐ রাষ্ট্র ঐ কনভেনশনে বর্ণিত ভাবে নিজ নাগরিকের সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইট রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যান। মজার কথা হচ্ছে, চীন এতে অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। আর আগামী বছর এতে চীনের স্বাক্ষরের ২০ বছর পূর্তি পালন করতে হবে।  তাই চীনেরও বাধ্যবাধকতা আছে। অতএব আমরা ধরে নিতে পারি, চীনের এই স্বাক্ষরের কারণে রাষ্ট্র হিসেবে চীনের ওপর বাইরের বা রাষ্ট্রসংঘের কারও কোন হস্তক্ষেপ ঘটে নাই বলেই চীন বিশ্বাস করে।

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? হিউম্যান রাইট বা মানবাধিকার বিষয়টা এমন না যে যার যার মত করে এর একটা সংজ্ঞা দেয়া যায়। নিয়মিত হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন করে এরপরে আবার সেটাকে যার যার ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়ার ঘটনা বলে চালানোর সুযোগ নাই। আমার হিউম্যান রাইট বুঝের সংজ্ঞা আলাদা তাই আমার ইচ্ছামতো স্বৈরশাসক হওয়ার সুযোগ আছে। এই ব্যাপারে, চীন যা বলছে তা সত্য নয়। স্বৈরশাসকদের ক্লাব বানানো ও চীনের এদেরকে আগলে রেখে পেলে পুষে এদের নেতা হওয়ার সুযোগ আসলেই নেই। যেমন মিয়ানমারের সু চি এবং ওর জেনারেলদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘন ততপরতা অথবা কম্বোডিয়ার স্বৈরশাসক হুন সেন – এদের হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের কাজকে চীন ওদের  ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেওয়া বলে সাফাই দিয়েছে। অথচ এই সাফাইয়ের কোন সুযোগ নাই। আর এই উসিলায় এদেরকে নিয়ে চীনের আলাদা স্বৈরশাসক ক্লাব বানানো অথবা তাতে বাংলাদেশকে যোগ করানোর চেষ্টা করা – এগুলোর কোনো সুযোগ আসলে নেই। তবু এই প্রবণতা দিন দিন বাড়তে দেখছি আমরা।

    কিন্তু কেন বাড়ছে, গোড়াটা কোথায়? ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের এই চার্টার গঠন ও অনুমোদনের সময়কালে বা পরে কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র এই চার্টার মানি না অথবা এর অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হবো না – এমন কথা বলেনি। যদিও কোনো কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিউম্যান রাইট কথাটার একটা ভিন্ন সংজ্ঞা, একটা ‘কমিউনিস্ট ব্যাখ্যা’ আগলে নিয়ে সময় সময়ে তা আউরেছে। সেই কমিউনিস্ট ব্যাখ্যাটাই সব ত্রুটি আর বিভ্রান্তির উৎস। স্বৈরশাসকের পক্ষে সাফাই ওখান থেকে আসছে।

    কমিউনিস্টদের এক বিশাল আত্মতুষ্টি যে, তারা মনে করেন- রিপাবলিক রাষ্ট্র বিষয়ে ‘পশ্চিমের রাজনৈতিক সাম্য ও নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার ধারণা’- এগুলো খামাখা এবং ভিত্তিহীন। তারা মনে করেন, ‘অধিকার’ ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখা ও বোঝাটাই এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’। কেন? কারণ, কমিউনিস্টদের চোখে বরং অধিকারের আসল অর্থ হল ‘বৈষয়িক অধিকার’। এই বিচারে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান – এই বৈষয়িক অধিকারগুলোই আসলে কমিউনিস্ট বুঝ, বিকল্প বুঝের ‘অধিকার’-এর অর্থ। পশ্চিমের ধারণার বিরুদ্ধে ‘অধিকার’ শব্দের কমিউনিস্ট অর্থ ও সংজ্ঞা এটাই। বলা বাহুল্য এটা খুবই অধপতিত ধারণা।

    তাই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া – এই কথার আড়ালে স্বৈরশাসকদের কথার সারার্থ হল, তারা রাজনৈতিক অধিকার বা মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার কথা মানেন না। কারণ তারা কমিউনিস্ট হন বা না হন, তারা কমিউনিস্টদের ইচ্ছামত বানানো হিউম্যান রাইটের নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করতে চান। আড়ালে থাকতে চান। কারণ চীনের মত কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক অধিকার মানেন না।  এটাকেই ‘উন্নয়নের নিজস্ব পথ’ বেছে নেয়া বলে চালাতে চান। আর এই নতুন বক্তব্যের ভিত্তিতে চীন স্বৈরশাসকদের ‘নতুন ক্লাব’ গড়ার উদ্যোগ নিতে চাচ্ছে দেখছি আমরা। এক কথায় বললে, এটা  কমিউনিস্টদের ‘অধিকার’-সম্পর্কিত ভিত্তিহীন ধারণা। কমিউনিস্টদের চোখে অধিকার মানে বৈষয়িক সুবিধাদি পাওয়ার অধিকার। ফলে যে স্বৈরশাসক দাবি করবেন- আমি ‘গণতন্ত্র না উন্নয়নের’ বিতর্কে ‘উন্নয়ন’ এর পক্ষে আছি- এর মানেই হলো সেই স্বৈরশাসক বলতে চাইছেন, অধিকার সম্পর্কিত পশ্চিমা ধারণার বিরুদ্ধে আমি। তাই আমাকে পশ্চিমের ধারণা দিয়ে মাপলে হবে না। আমি আমার ব্যাখ্যা সহি আছি।

    তবে বাংলাদেশ কি চীনের এই ক্লাবে জয়েন করবে? কিছু তোড়জোড় দেখা গিয়েছিল। সিপিবিসহ চার দল নিয়ে চীনা মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছিল, আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সম্ভবত বেশি সুবিধা হয়নি।

    অনেকে ভাবতে পারেন, এগুলো তো ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগের কমিউনিস্টদের ধারণা। ফলে সেই পুরান দায় দিয়ে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করা কি ঠিক হবে? হ্যাঁ অবশ্যই সঠিক হবে। কেন? ওয়েন জিয়াবাও ২০০৩ সাল থেকে ১০ বছর ধরে চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার বাণী শুনুন। তিনি বলেছেন, “সবচেয়ে বড় হিউম্যান রাইট হল ১.৩ বিলিয়ন লোককে খাওয়ানো। ফলে সিভিল নাগরিকের ধারণা- পশ্চিমের এই ধারণা আসলে বাতিল বলে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে”। [……Jiabao, when premier, said the biggest human rights issue was feeding 1.3 billion people. Civil liberties were rejected as Western ideals…….]

    চীনের আরেক আলোচিত প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন। ২০০৬ সালে তার এক বিখ্যাত মন্তব্য, ‘পেট ভর্তি থাকছে কি না আর গরম কাপড় পরা আছে কি না – এসবের ভিত্তিতে চীনের হিউম্যান রাইটকে সংজ্ঞায়িত করে দেখতে হবে।’  [Former president Jiang Zemin famously said in 2006 that having a full stomach and warm clothes was how human rights should be defined in China.] এর সোজা অর্থ পুরান কমিউনিস্টদের হিউম্যান রাইটের ‘বিকল্প সংজ্ঞা’ চীন এখনো ত্যাগ করেনি, বরং আঁকড়ে ধরে আছে। আর একালে এসে স্বৈরশাসকদের ক্লাব গড়ে সেখান থেকে চীন নিজেই সাফাই সরবরাহকারী হতে চাচ্ছে। চীন যদি ভেবে থাকে এই নতুন সাফাইয়ের ভিত্তিতে  দুনিয়ার সব স্বৈরশাসকদের নিয়ে চীন নিজের ‘স্বৈরশাসক ক্লাবের মেম্বার’ বানাবে, বুঝতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের কোন ধারণাই হয় নাই।

    মানুষ কি কেবল  খাওয়া আর বাথরুম করার একটা মেশিন? কেবল এক বৈষয়িক ভোগের মেশিন মাত্র? নাকি তার এসবের বাইরেও বহু উন্মেষ আছে এবং তা দরকারও! মানুষ আসলে রক্তমাংসের জীবন্ত সত্তা, আবার এক স্পিরিচুয়াল সত্বা সে। দুনিয়ায় সে কেন এসেছে, কিভাবে দুনিয়ার আর সব কিছুর সাথে সে সম্পর্কিত, কী তার দায়-কর্তব্য- এসব বোঝাবুঝি এবং তদনুযায়ী অ্যাক্ট-রিঅ্যাক্ট করার নামই মানুষ। একথাগুলোকেই আরেক ভাষায় আমরা বলি মানুষের রাজনৈতিক সত্ত্বা আছে। এমনকি সে অবজেকটিভ সত্ত্বা না, কর্তা সত্ত্বা আছে। এজন্যই তাঁর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে এমন বৈশিষ্টের রাষ্ট্রও লাগে। কেবল খাওয়া-পরায় বাঁচায় রাখার রাষ্ট্র হলে চলে না, সন্তুষ্ট হয় না সে।

    অপর দিকে, রাষ্ট্রসংঘের হিউম্যান রাইট চার্টারই শেষ কথা নয়। চার্টারেরও নানান ঘাটতি আছে ও ত্রুটি আছে। সবচেয়ে বড় ফাউন্ডেশনাল ত্রুটি হল, এটা ইনডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর দাঁড়িয়ে সাজানো। অথচ মানুষ মানেই সামাজিক মানুষ। কিন্তু সেদিকটা ফেলে, ভুলে মানুষের ব্যক্তিবোধের দিকটাই কেবল সত্য ধরে নিয়ে ‘চার্টার’ সাজানো হয়েছে।  ফলে এটাও ভেঙ্গে চুড়ে নতুন কিছু লাগবে, এরও আরও অনেক উন্মেষ লাগবে। কিন্তু সেই ‘আরো ভালো কিছু’ পাওয়ার আগে কিছু শুরু করার বিন্দু হিসেবে এখনো চার্টারের ভূমিকা আছে। ফলে একালে এসে, মানুষ রাজনৈতিক না বৈষয়িক- এই বিতর্কটা এমন নয় যে, মানুষ হয় কেবল রাজনৈতিক না হয় কেবল বৈষয়িক সত্ত্বা। কমিউনিস্টরা ‘অধিকার’ বলতে রাজনৈতিক অধিকারের বদলে বৈষয়িক অধিকার বলে বুঝাকেই সহি মানতে চেয়েছে। কিন্তু এটা ডাহা ভুল ও এবসার্ড।

    একারণে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের আর এক দগদগে স্ববিরোধীতা আছে।   ইউরোপের মর্ডানিটির ফসল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রকে কমিউনিস্ট চিন্তার বিচারে এটা এক ‘বুর্জোয়া প্রতারণা’ বা ‘বুর্জোয়া কান্ডকারখানা’ বলে তুচ্ছ করা হয়।  রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা – এগুলোকে কোন অর্জন বলে মানা হয় না, গুরুত্ব দেয়া হয় না। খেয়াল করলে দেখা যাবে সোভিয়েত ইউনিয়নে বা চীনে বিপ্লবের পরের নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা রেখে দেয়া হয়েছে। USSR অথবা PRC নাম দুটার মধ্যেই ‘R’ এর অর্থ রিপাবলিক। রাজনৈতিক অধিকার বা রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা যদি তুচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় হয়ে থাকে তবে রাষ্ট্রের নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ বয়ে বেড়ানোর ন্যায্যতা কী?

    এখন রাষ্ট্রসংঘের ‘চার্টারে’  ‘অধিকার’ বলতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ হয়ে গেছে – এই ভয়ে ও অভিযোগে অধিকারের রাজনৈতিক অর্থের দিক – মৌলিক মানবিক অধিকারের দিকটা তুচ্ছজ্ঞান করা্র কোন সুযোগ নাই। এটা ভিত্তিহীন ও মারাত্মক অন্যায়। ফলে ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়’ সর্বস্ব অধিকারের বৈষয়িক ধারণাই মুখ্য – এমন মনে করাও বোকামি। মনে রাখতে হবে মানুষ ও দুনিয়া সম্পর্কে চীনের এই বৈষয়িকতাসর্বস্ব চিন্তার কারণেই – চীন বার্মায় ব্যবসা করতে গিয়েছে, অথচ পাশে একটা বিরাট (রোহিঙ্গা) জনগোষ্ঠী নিধন হয়ে যাচ্ছে। তবু চীন বে-খবর। কারণ চীনের শাসকেরা মানুষ নয়, একটা বৈষয়িক বিষয়-আশয় বোধের ডিব্বা। তাই চীন নিজের ‘পেট ভর্তি খাবার আর গরম কাপড়ের’অধিকার’ রাজনীতিতে বুঁদ হয়ে আছে। হয়ত বিশাল উন্নতি করছে চীন! কিন্তু এই বিশাল উন্নীত চীন ‘লইয়া দুনিয়া কী করিবে!’

    গৌতম দাস
    লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০২ জানুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের ‘পেট ভর্তি’ আর গরম কাপড়ের মানবাধিকার“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

    জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

    গৌতম দাস
    ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:২৩

    https://wp.me/p1sCvy-2pc

    গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ অর্থাৎ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ থেকে এক ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে স্বীকৃতি দেয়ার সময় হয়েছে।’ কিন্তু কেন তিনি এমন বললেন? এখনইবা বললেন কেন? এছাড়া, ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে দুনিয়ার কোথায় কোথায় কী কী ইস্যুতে এর ইতি অথবা নেতি প্রভাব পড়বে? আর তাতে আমরা বাংলাদেশীরা কোথায় কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবো? সবচেয়ে বড় কথা ন্যায়-অন্যায়ের আলোকে এতে অন্যায়টা কী করছেন ট্রাম্প? এবিষয়গুলো নিয়ে বুঝাবুঝি করতে হবে আমাদের।

    ওদিকে আর এক প্রশ্ন আমাদের মনে জাগা স্বাভাবিক যে ইসরাইলের জন্মের (১৪ মে ১৯৪৮) প্রায় ৭০ বছর পরে এসে এখন ট্রাম্পকে কেন স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে হচ্ছে কোনটা ইসরাইলের রাজধানী? কারণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুসারে, জেরুসালেম একটা অকুপায়েড বা অবৈধ দখলি এলাকা। অথবা আরও বলা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকেই জেরুজালেম কোন রাষ্ট্রের অংশ হবে সেই বিচারে এটা অমীমাংসিত এলাকা, ফলে কারও না।  জাতিসংঘের আইনি ভাষায় “corpus separatum”। যার অর্থ, জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন। তাই আইনত এটা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকা এলাকা । ১৯৪৭ সালের জাতিসঙ্ঘের ১৮১ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন (corpus separatum — a separate entity under international jurisdiction)। এই রেজুলেশন বা গৃহিত প্রস্তাব অনুসারে – ওর PART III অংশে,  ‘City of Jerusalem’ শিরোনামের অধীনে উপশিরোনাম হল – A. SPECIAL REGIME।
    সেখানে লেখা আছে,
    “The City of Jerusalem shall be established as a corpus separatum under a special international regime and shall be administered by the United Nations. The Trusteeship Council shall be designated to discharge the responsibilities of the Administering Authority on behalf of the United Nations.” ….  দেখুন A. SPECIAL REGIME, City of Jerusalem, PART III.

    এ ছাড়া পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে, বিশেষ করে যেটাকে পূর্ব জেরুসালেম বলা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেঃ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেম পুরো অংশ (ঐ যুদ্ধের আগে পর্যন্ত সেটা জর্ডানের অংশ ছিল) দখল করে নেয়। তাই এ নিয়ে পরে জাতিসঙ্ঘের পাস করা প্রস্তাব হল, এটা দখল করা এলাকা। ইসরাইল তার সংসদে পুরো জেরুসালেমকে নিজের রাষ্ট্রের অংশ-ভূমি বলে দেখিয়েছে। এর বিরুদ্ধেই জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশনটা হয়েছিল। কারণ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইসরাইল তাঁর সংসদ, প্রেসিডেন্ট হাউজ, প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ বহু কিছু জেরুসালেমে বানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে  জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ছিল – জাতিসংঘের ঐ রেজুলেশন, নম্বর ৪৭৮, ২০ আগষ্ট ১৯৮০।   ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ঐ সিদ্ধান্তে, বিদেশী সব মিশন বা অ্যাম্বাসির অফিস  জেরুসালেমের বাইরে নিতে সব সদস্য রাষ্ট্রকে বলা হয়।

    1. Decides not to recognize the “basic law” and
      such other actions by Israel that, as a result of this law,
      seek to alter the character and status of Jerusalem and
      calls upon:
      (a) All Member States to accept this decision;
      (b) Those States that have established diplomatic
      missions at Jerusalem to withdraw such missions from
      the Holy City;

    এখানে “বেসিক ল” মানে হল ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে, ঐ “বেসিক ল” বলে পুরা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখল করা এলাকা বলে জায়েজ করা হয়েছে। তাই জাতিসংঘ গৃহিত ঐ প্রস্তাবে “বেসিক ল” এর ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই বলা হচ্ছে। তাই 5(b) অনুচ্ছেদে, সকল সদস্য রাষ্ট্রকে জেরুজালেমে কেউ ইতোমধ্যে অফিস খুলে থেকে থাকলে তা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

    বাস্তবে তাই এই কারণেই ইসরাইলে অন্য সব রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসি জেরুসালেম থেকে ৬৫ কিমি দূরে তেল আবিবে স্থাপিত। অর্থাৎ আমেরিকাসহ কোনো রাষ্ট্রই ইসরাইলের দখলি এলাকায় নিজের অফিস খুলে নিজেকে বিতর্কিত করতে চায়নি।

    এবার সর্বশেষে,  ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। স্বভাবতই ভেটোদানের ক্ষমতাবান সদস্য হিসেবে আমেরিকার সেই প্রস্তাবকে ভেটো দিয়ে স্থগিত করে দেয়। ওই ভেটো দেয়ার আগে জাতিসঙ্ঘে আমেরিকান স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি নিম্রতা হ্যালির (হা, তিনি মাইগ্রেটেড ভারতীয় শিখ পরিবারের সন্তান, শিখ অরিজিন আমেরিকান ও রিপাবলিকান) দেয়া বক্তৃতায় বলেন, “সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা নিজের অ্যাম্বাসি কোথায় বানাবে, আদৌ বানাবে কিনা তা নিজে ঠিক করবে। ফলে যারা প্রস্তাব এনেছিল তারা আমেরিকাকে অপমান করতেই এই প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করেছিল”। নিকির এই মন্তব্য শুনে পাঠকেরা অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন যে, হ্যাঁ, তাই তো আমেরিকান সাবভৌমত্বের কথা তো ঠিক মনে হচ্ছে। না বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। কারণ জেরুসালেম হলো অন্যের ভূমি, যা ইসরাইলের দখল করা। কারো কোনো দখলি ভূমিতে অ্যাম্বাসি খোলার অধিকার আমেরিকা বা ইসরাইলেরও নেই। আরো বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হলো ওটা দখলি ভূমি, corpus separatum। অর্থাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইসরাইল ও আমেরিকার এমন বহু সিদ্ধান্ত আছে। সিএনএনকে দেয়া ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিকির সাক্ষাতকার দেখুন, কিছু নমুনা পাবেন এই ক্লিপে। সে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন যে আছে তা লুকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে।  তাহলে মূলকথা হলো জর্ডান-ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে নিয়ে তা নিজের (‘বেসিক ল’) বলে দাবি করে সেখানে ইসরাইল তার রাজধানী গড়েছে। আর ওদিকে এবার কথা ঘুরিয়ে বলছে, ইসরাইলের রাজধানী কোথায় হবে এটা ঠিক করার অধিকার ইসরাইলের সার্বভৌম অধিকার। হ্যাঁ, অবশ্যই তার অধিকার যদি সেটা কোনো দখলি জমিতে না হয়।

    ঠিক একই মিথ্যা যুক্তিতে জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশন অমান্য করে, ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় একটি আইন পাস হয়েছিল। তার নাম ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’, এই পিডিএফ লিঙ্ক থেকে আগ্রহিরা তা নামিয়ে নিতে পারেন। এই আইন আমেরিকান সিনেট ও সংসদে ১৯৯৫ সালে পাস হয়ে ও পরে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হয়েছিল। ওই আইনের সেকশন দুইয়ের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে জেরুসালেমের দুই অংশ এক হয়ে যায়।’ [(6) In 1967, the city of Jerusalem was reunited during the conflict known as the Six Day War.]

    কিন্তু কীভাবে এটা ঘটেছিল? দুই অংশ নিজেরাই হেঁটে হেঁটে দুই বোনের মিলনের মত? নাকি যুদ্ধে মানুষ মেরে, খেদিয়ে দখল করে নেয়াতে? এ কথা সেখানে বলা নেই। এই আইনটি হল (মূল কথায় বললে), আমেরিকা যেন ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে ইসরাইলে তাদের অ্যাম্বাসি তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নেয় সেজন্য আমেরিকার নির্বাহী রাষ্ট্রপতিকে আইনগত বাধ্যবাধকতায় আনার জন্য প্রণীত আইন এটা। তবে একটি ছাড় আছে সেখানে যে, প্রেসিডেন্ট এটা করতে ব্যর্থ হতে পারবেন কেবল এক শর্তে; যদি তিনি আগাম কংগ্রেসকে জানান যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণে তিনি এটা নির্ধারিত সময়ে করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর এভাবে তিনি ছয় মাস ছয় করে বার বার সময় বাড়িয়ে চলতেই থাকতে পারবেন। গত ১৯৯৫ সালে বিল ক্লিনটনের আমলে এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ক্লিনটনের পরের ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান উভয় প্রেসিডেন্টই ওই আইনের সেকশন সাত-এর ‘প্রেসিডেন্টের ওয়েভার’ বা ছাড় [SEC. 7. PRESIDENTIAL WAIVER.] এর সুবিধা নিয়ে ওই আইন বাস্তবায়ন না করে ছাড় ছয় মাস করে করে বাড়িয়েই চলে আসছেন। এবার ট্রাম্প বলছেন তিনি ছাড় না নিয়ে আইনটা সরাসরি বাস্তবায়ন করবেন, এই হল ঘটনা।

    ১৯৪৮ সালে ইসরাইল জন্মের সময় থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল তার স্বপক্ষে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। সেটা ইসরায়েলের কাছে একেবারে “না হলে নয় এর মতো প্রয়োজনীয়” ছিল, ফলে কঠিন বিষয়। কিন্তু তা সফল হয়েছিল আমেরিকার সমর্থনে। সেই থেকে আমেরিকান জনমত নিজের পক্ষে রাখা হয়ে আছে ইসরাইলের ধ্যানজ্ঞান। ট্রাম্পের তাই নিজে কেন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন এর স্বপক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছেন এভাবে যে, আগের প্রেসিডেন্টরা সবাই নির্বাচনের সময় ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন, তাই তিনি হচ্ছেন সেই সাচ্চা বীর যে এটা বাস্তবায়ন করছেন।

    স্বভাবতই ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া হয়েছে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে। জাতিসঙ্ঘের ভেতরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নিরাপত্তা কাউন্সিলের আমেরিকাবিরোধী প্রস্তাবে আমেরিকা ভেটো দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারলেও এরপর প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শোচনীয়ভাবে আমেরিকা হেরে যায়। আমেরিকার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে মানা- এটা ‘null and void’ বলে বাতিল করে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে ভোটাভুটি নেয়া হয়। তোলা এই প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮ রাষ্ট্র ভোট দিয়ে প্রস্তাবকে জিতিয়ে দেয়। ওদিকে মাত্র ০৯ রাষ্ট্র বিপক্ষে আর ৩৫ রাষ্ট্র বিরত থেকে ভোটদান সম্পন্ন করেছিল। [The United Nations has voted by a huge majority to declare a unilateral US recognition of Jerusalem as Israel’s capital “null and void”.]

    এখানে নিউ ইয়র্ক টাইমস ব্যতিক্রমি আমেরিকান মিডিয়া হিসাবে একটা সততার কাজ করেছে। তাঁর এক বিশেষ রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত জেরুজালেম নিয়ে জাতিসংঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করেছে” [Trump’s Move Departs From U.N. Resolutions on Jerusalem]। এই রিপোর্টের তাতপর্য হল, সমস্ত আমেরিকান মিডিয়া এবং প্রশাসন যখন জেরুজালেম যে দখলি এলাকা সেকথা লুকিয়ে যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের রেজুলেশনের অস্তিত্ব লুকিয়ে কথা বলে যাছে; সেখানে ট্রাম্পের ঘোষণার পরের দিন নিউ ইয়র্ক টাইমস  ০৭ ডিসেম্বরে এসে সরাসরি এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখানে আমেরিকা জাতিসংঘের মোট নয়টা রেজুলেশন (UN Resolution UN Resolution 1073 Sep 1996, UN Resolution 1322 Oct 2000, UN Resolution 1397 Mar 2002, UN Resolution 181, UN Resolution 2334 Dec 2016, UN Resolution 242 Nov. 1967, UN Resolution 252 May 1968, UN Resolution 465 Mar 1980, UN Resolution 478 Aug 1980, UN Resolution 672 Oct 1990,) ভঙ্গ করেছে এর একটা তালিকা করে দেয়া হয়েছে।

    ওদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, তাঁর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পক্ষে ইউরোপের বন্ধুদের মন পাওয়ার চেষ্টায় সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন সফরে বের হয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরে আসেন। কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্র ট্রাম্পকে সমর্থন করতে রাজি হয়নি। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোনো সমর্থক রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি। সারাক্ষণ ইরান-ভীতিতে থাকা সৌদি আরব ও তার বন্ধুরা ইসরাইলকে বাস্তবে কাছের ও নিজের মনে করলেও, সৌদি আরব বা তার বন্ধুরা কেউই এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বরং সৌদি আরবও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘নিন্দা করে গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের এই দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছিল সাধারণ পরিষদের ভোটেও। বলা যায় সারা দুনিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেয়ে প্রস্তাব নিয়েছে।  নিকি হ্যালির মতো রিপাবলিকান জন বোল্টনও বুশের আমলে (২০০৫-৬) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। যে কোন ভোটাভুটিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে আমেরিকার পক্ষে রাখার ও পক্ষে ভোট নেয়ার আবিষ্কারক তিনি। এবার নিকি হ্যালিও সেই জন বোল্টনের পুরনো পথে নেমেছেন। তবে এবার এর বিশেষত্ব হল, এটা খুবই ন্যাংটা। কারণ তিনি প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন যেটা বোল্টন কখনো করেননি। অথচ নিকি বলেছেন, ভোট না দিলে এইড বন্ধ হয়ে যাবে, দেখে নেবো ইত্যাদি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি, উল্টো আমেরিকার ইজ্জত গেছে। নিকি আসলে ভুলে গেছেন এটা আর সেই আমেরিকার রুস্তমির দিন নয়, তা শেষ। তাই এক ইসরাইল ছাড়া আমেরিকার পক্ষে বাস্তবে ন্যূনতম গুরুত্ব দেবার মতো কোনো রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি।

    ট্রাম্পের ইউরোপের সমর্থন না পাওয়ার মূল কারণ কী? আমেরিকা জাতিসংঘ রেজুলেশন অমান্য করে  ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’ আইন করেছে।  বলা যায় সেটা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পুর্ব জেরুজালেমকে অবৈধ ও গায়ের জোরে জমিদখলকে স্বীকৃতি দিয়ে এর উপর দাঁড়িয়ে বানানো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান জাতিসঙ্ঘের রেকর্ড অনুসরণ করে নেয়া  অবস্থান। শুধু তাই না এটা যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তাও ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়ে জানিয়েছে বহু আগেই ।  সে মোতাবেক, ১৯৯৯ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক রেজুলেশন হলো যে জেরুসালেম corpus separatum।

    এছাড়া এদিকে ইউরোপের বিবেচনায় এখন ট্রাম্পের এই প্রস্তাব কোনো জরুরি অথবা রাজনৈতিক লাভালাভের ইস্যু ছিল না। এ ছাড়া, বেশির ভাগ ইউরোপীয় বন্ধুরা বলছেন, তারা মনে করছে এতে আমেরিকার ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে, যেটা হবে এক কাউন্টার প্রডাকটিভ কাজ। আসলে বেশির ভাগ রাষ্ট্রই “দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়ে ফেলা” ভুল হবে এই যুক্তিকেই বেশি সামনে আনছেন। কারণ এই অবস্থানটা আসলে ‘জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী কিনা’ এই বিতর্কে কোনো অবস্থান না নিয়ে থাকার অবস্থান। এ ছাড়াও এতে জেরুসালেম ইস্যুটা আলোচনা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরসিত হোক, এই আকাঙ্খার অবস্থানে থাকা যায়। তবে সার কথা, আমেরিকা এখন পুরাপুরি একঘরে হয়ে গেছে, সেটা আনন্দবাজারেরও নজরে এসেছে।

    তাহলে ট্রাম্প এমন অবস্থান তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন কেন? যেখানে এমনকি এটাও এখন জানা যাচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পের মতামতদানের বৈঠকে প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রসহ সব উপদেষ্টারা সবাই তাকে না করেছিলেন। তিনি কারও কথা শোনেননি। এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা বা উত্তর দিয়েছে, আমেরিকার শতবর্ষী পুরনো এক গবেষণা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান – ব্রুকিংস (Brookings)। তাদের এক রিপোর্ট এর শিরোনাম হল, মূলত খ্রিষ্টান ইভানজেলিকদের খুশি করতে বা তাদের বিজয়ী করতে ট্রাম্প এটা করেছেন। [Trump’s Jerusalem decision is a victory for Evangelical politics] কথাটা ব্যাখ্যা করতে ‘খ্রিষ্টান-জায়নিস্ট’ বলে একটা টার্ম এনেছে ব্রুকিংস। [লিখেছে, in particular the views of Christian Zionists, who believe that the return of the Jews to the Holy Land is in accordance with God’s will, and biblical prophecy.] এছাড়া, এ প্রসঙ্গে তারা বেশ কিছু জনমত সার্ভেও করেছে, যার হদিস আছে ওদের রিপোর্টে সেখানে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

    ট্রাম্পের আমেরিকা কী আসলে সন্ত্রাস-দমন চায়?
    সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ট্রাম্পের এই ‘ইসরাইলি’ সিদ্ধান্ত – বলতে গেলে আসলে সারা পশ্চিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে পশ্চিমের নাম্বার ওয়ান গ্লোবাল কর্মসূচি হল, ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাস-দমন। কাউকে সন্ত্রাসী মনে হলে পশ্চিম তাকে অস্তিত্বহীন করে দিতেও দ্বিধাহীন থাকে। এদিকে এটা বুঝতে কাউকে গবেষকও হতে হয় না যে, পশ্চিম যাকে ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বলছে এই ফেনোমেনা আসলে এই বেইনসাফির প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যেখানে হয়ত কাম্য ধরণের প্রতিক্রিয়া এটা নয়। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া  হাজির হবার পিছনে সবচেয়ে বড় এক কারণ হল, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, ভূমি দখল, অবাধ্য ইসরাইল- ফলে ফিলিস্তিদের প্রতি বে-ইনসাফ, উদাসীন্য, তাদের দীর্ঘ মানবেতর জীবনে ফেলে রাখা ইতাদি। তাই এই ‘গ্লোবাল টেররিজম’ ফেনোমেনার একমাত্র ও আল্টিমেট জবাব ও করণীয় হল, মজলুমের পক্ষে সবলে দাঁড়ানো ও ইনসাফ দেয়া। অথচ ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উল্টো। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সারা দুনিয়াতে মানুষ বে-ইনসাফিতে তাদের অসহায়বোধ আরও চরমে উঠছে। উল্টা বললে, তাহলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, এটা কি গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্মসূচি নয়? ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্তা কি তাহলে ট্রাম্প হতে চাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাব ট্রাম্পকে দিতে হবে, আজ অথবা কাল।

    অন্যের জমি দখলের ও একাজের পক্ষে সাফাইদানে ওস্তাদ ইসরায়েল
    ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের ফলে আমরা বেশ কিছু প্রো-ইসরাইলি ভাষ্য ও ভাষ্যদাতাদের চিনতে পেরেছি। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো বোস্টনের ‘দা আটল্যান্টিক’, মাসিক এই ম্যাগাজিন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কেন তা নিয়ে এক আর্টিকেল ছেপেছে তারা, শিরোনাম- ‘অবশেষে এই প্রেসিডেন্টকে পাওয়া গেল যে ইসরাইলকে লজিক্যালি দেখেছে’। [Finally, a President Who Looks at Jerusalem Logically]। তারা ট্রাম্পের কাজের মধ্যে এই প্রথম যুক্তি খুঁজে পেয়েছে, কী আর করা!

    এছাড়া, আর সবচেয়ে ভয় পাওয়া এক আর্টিকেল দেখা গেছে হংকং থেকে প্রকাশিত অনলাইন ‘এশিয়া টাইমসে’। পশ্চিমের বাইরে এশিয়ায় দু’টি ব্যাপক কাভারেজের উঠতি পত্রিকার একটা হলো এটা। এর কলামিস্ট হলেন ডেভিড পি গোল্ডম্যান যিনি  SPENGLER ছদ্মনামে লেখেন। অথচ তার লেখা কলামের শিরোনাম হলো, ‘অমর্যাদা করে মুখ ঠেসে ধরা : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ’ (Humiliation – the only path to peace for the Middle East)।

    ডেভিডের যুক্তি খুব সহজ। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধের ফয়সালাকেই দুনিয়ার সব বিতর্ক বিবাদের সঠিক ও ন্যায্য ফয়সালা মনে করেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা হল, ‘হারু পার্টি আরবরা হেরেও ইসরাইলের কাছে হার স্বীকার করে না এমন নাছোড়বান্দা’। তাই তিনি এবার নতুন ওষুধের প্রেসক্রপশন হিসেবে বলছেন, “যুদ্ধে পরাস্তের পরে আরেক ধাপ হল ওদেরকে মানে হারু পার্টিকে মুখ মাটিতে ঠেসে ধরার মতো চরম অমর্যাদার অবস্থায় ফেলে দিতে হবে, তাহলে এবার তাঁরা হার মানবে। আর ঝামেলা করবে না। দেখেন না জাপানে কী হয়েছিল! দুটি আণবিক বোমা মেরে দেয়াতে মাটিতে ওদের মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। তাই চুপ মেরে গেছে…।” এই হল ডেভিড পি গোল্ডম্যান। ‘এখন আমরা সুজনেরা বুঝে ফেলেন কী বলতে চাইলেন ডেভিড। ডেভিড আমাদেরকে যেটা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হল – দুনিয়ায় ন্যায়-অন্যায়, ন্যায্য-অন্যায্য, মানে ইনসাফের ধারণা এগুলো খামোখা, কিছু না। ফলে কেউ যুদ্ধে হারলে বুঝতে হবে সে অন্যায়কারী, অন্যায্য। অর্থাৎ যার গায়ের জোর বেশি সেই সঠিক ও ন্যায্য।

    এটাই জায়নিস্ট বুঝ। তা আমরা আগেও দেখেছি। যে অন্যের জমিতে তারা ইসরাইল রাষ্ট্র গড়েছে তা তাদের হল কী করে, কিসের ভিত্তিতে? এটা বুঝাতে এরা সবসময় ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার কথা আনে’ আমরা দেখেছি। যেহেতু গায়ের জোরে তারা অন্যের ভূমি দখল করেছে, ফলে তা ন্যায্য। এই তত্ত্বই তারা কপচাতে থাকে। ফলে সেটাই সঠিক ও ন্যায্য। হিটলারের হাতে নির্মম মার খেয়ে এরা ইনসাফের ওপর আস্থাহীন বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তবু ইনসাফ ফিরে আসবেই। আমাদের তা লাগবে। ইনসাফ কায়েম করতেই হবে। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে ইনসাফের ওপর। ইনসাফের ওপর সমাজের আয়ু, শ্রীবৃদ্ধি ও টিকে থাকা নির্ভর করে। যদিও আবার সাময়িক বে-ইনসাফিও দেখা দিতে পারে। তবে তারও একমাত্র সমাধান ও স্থিতিশীলতা আনার জাদুকাঠি হল ইনসাফ কায়েম। আমেরিকার পরাশক্তি অবস্থান একটু ঢিলা হতে শুরু করলে ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার’ তত্ত্ব আর ইসরাইলকে বাঁচাতে পারবে না; তারা তা আর কপচাবেও না। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জেরুসালেম : একমাত্র সমাধান ইনসাফ’, শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

    নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

    গৌতম দাস
    ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

    https://wp.me/p1sCvy-2oW

     

    অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

    গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

    এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

    প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

    নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

    আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

    মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

    গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

    এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না ।

    শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

    নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

    তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

    তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

    কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

    দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

    পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

    আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

    রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

    গৌতম দাস
    ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2oJ

    ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

    সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

    তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

    তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
    গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

    যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

    এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
    আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

    ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
    কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

    ০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [“সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি।]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

    ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

    যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

    শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

    সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

    খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

    বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

    তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

    মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

    নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

    গৌতম দাস
    ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহষ্পতিবার ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2lW

     

    নতুন করে রাষ্ট্রগড়া বা একটা মর্ডান রিপাবলিক গঠন কালে এর গঠনসভা, একে ইংরাজিতে কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (Constituent Assembly) বলা হয়; বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭২ সালে ধারণাটাকে বাংলায়  “গণপরিষদ” – এই বাংলাটা নেয়া হয়েছিল। আম-ধারণা হিসাবে নির্বাচন বলতে বা ‘ভোট আসছে’ বলে আমরা যা বুঝি ও বুঝাই সেটাই “সাধারণ নির্বাচন”। আবার কোন নতুন রাষ্ট্র গঠনসভারও সদস্য কারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন এর জন্যও একটা নির্বাচন হয়। তবে সেটাকে “সাধারণ নির্বাচন” নয় বরং একে “গঠনসভার সদস্য নির্বাচন” বলে। যদিও বাইরে থেকে দেখতে সেটা সাধারণ নির্বাচনের মতই মনে হতে পারে।

    ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ এর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল –  উদ্দেশ্য। ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য হল ওখানে ঐ নির্বাচিত কমিটি একটা কনষ্টিটিউশন রচনা করতে বসে, সেকাজ শেষ হলে নিজেরা  অনুমোদন দেয়। পরে এক গণভোটে তা পাশ করিয়ে আনে। আর ফাইনালি  ‘নতুন কনষ্টিটিউশন চালু হল’ বলে এক প্রোক্লেমশন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মূলত এই কাজটাকেই আরেক ভাষায় বলে ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হল। আর গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হল ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরে নির্বাচিত ঐ গঠনসভার অস্তিত্ব ঐ পর্যন্তই, এরপরে সে নিজে নিজেই আপনাতেই ভেঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরা হয়। এইবার রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে গঠিত নতুন কনষ্টিটিউশন মোতাবেক। যার প্রথম পদক্ষেপ হল, কনষ্টিটিউশনে যেভাবে লেখা আছে সে মোতাবেক  কারা জাতীয় সংসদের সদস্য হবেন নির্বাচন কমিশন এর নির্বাচন আয়োজন করতে থাকে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এই নির্বাচনকে ‘সাধারণ নির্বাচন’ বলা হয়। মনে রাখতে হবে “সাধারণ নির্বাচন” ঘটার ক্ষেত্রে সবসময় আগে থেকে একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন  থাকে আর সে মোতাবেক ঐ সাধারণ নির্বাচন আয়োজিত হয়ে থাকে।  ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য একটা কনষ্টিটিউশন লেখা আর এই নির্বাচন একবারই হয়; বিপরীতে সাধারণ নির্বাচনের বেলায় আগে থেকে থাকা একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়।

    তবে কনষ্টিটুয়েন্সির দিক বিচারে এই দুই ধরণের নির্বাচনের কনষ্টিটুয়েন্সি অনেক রাষ্ট্রের বেলায় ভিন্ন দুরকম হয়, অনেক ক্ষেত্রে আবার একই থাকে। কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা মানে হল কোন কোন প্রশাসনিক এলাকা অর্থাৎ কোন কোন ইউনিয়ন বা উপজেলার ভোটারদের নিয়ে একেকটা কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হবে। অনেক সময় এটাকে নির্বাচনী আসন এলাকাও বলতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে এমন কনষ্টিটুয়েন্সি মোট ৩০০ টা। তবে  অনেক দেশে ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ – দুই ক্ষেত্রে কনষ্টিটুয়েন্সি বা আসন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায়, ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ আসন সংখ্যা বা নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনায় বেশি থাকে। যেমন নেপালে ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ মোট আসন ছিল ৬০১, আর সাধারণ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা হল ২৭৫। এছাড়া ‘গঠনসভার নির্বাচনের’ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষে প্রক্লেমেশন আর এরও পরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকে ও পরিচালিত হয় এক অন্তর্বর্তিকালীন বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।  গঠনসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ঐ অস্থায়ী সরকার গঠন করে থাকে। এই হল ভেঙ্গে বিস্তার করে বলা একটা নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া অথবা পুরা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস।

    আমাদের পড়শি নেপাল তাদের প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসন উতখাত শেষে (২০০৬ সালে),  দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস সম্পন্ন করার পরে, এখন নেপালে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন চলছে। কিন্তু প্রায় দশ বছর লাগল কেন? এটা তো বরং চার-পাঁচ বছর বা তারও আগে (বাংলাদেশ একবছরেরও কম সময়ে হয়েছিল) শেষ করে ফেলার কথা। আর কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে কোন জনগোষ্ঠি যত লম্বা সময় নিবে পুরা জনগোষ্ঠিকে ততদিন ভয়ঙ্কর সব বিপদের মধ্যে থাকতে হবে। এ যেন অন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদে থাকা। আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করব, নতুন রাষ্ট্রগঠন করব ইত্যাদি অনেকের স্বপ্ন আমাদের থাকে। কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক অধ্যায় হল  একটা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শুরু করেও শেষ না করতে পারা বা প্রক্লেমশন না দিতে পারা। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে, পেট কাটা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই এবার নানান জটিলতায় পরে সেলাই দিয়ে পেট আর বন্ধ করা যায় নাই। এমন বাজে অবস্থা আর কারও হয় না। স্বভাবতই সেক্ষেত্রে তখন রোগীর জীবন চলে যাওয়ার বিপদ মাথার উপর টিকটিক করবে। নেপাল হল সেই দুর্ভাগ্যের জনগোষ্ঠি যারা প্রথমবার  কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচিত করেও (২৮ মে ২০০৮ থেকে, ২৮ মে ২০১২ সাল সময়কালের মধ্যে) ঐ নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে পারে নাই। এদিকে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নিজেই আয়ু শেষ করে ভেঙ্গে যায়। ফলে পুরা জনগোষ্ঠি দেশবাসী এক লিম্ব বা ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর উপায়ন্ত না দেখে সব রাজনৈতিক দল মিলে সুপ্রীম কোর্টের কাছে আদালতকে সাক্ষী রেখে বিশেষ পরিস্থিতি ও বিবেচনার দোহাই দিয়ে আবেদন করেছিল আর একটা সুযোগ দিতে; আর নিজ জনগোষ্ঠির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এবার আর ব্যর্থ হবে না। এথেকেই আর একবার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচনের বৈধতার ভিত্তি তৈরি করেছিল নেপাল। এটা সৌভাগ্য যে নেপাল যে সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয়বার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নির্বাচন হয়েছিল নভেম্বর ২০১৩ সালে। পড়শি কারও হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদ পেরিয়ে বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই ঐ নির্বাচন শেষে নেপাল আবার নতুন করে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার ফেরা ও কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি্তে কনষ্টিটিউশান রচনার কাজ  শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল। তবে  নেপালি জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়েও বড় সৌভাগ্য হল এবার দ্বিতীয় সুযোগে শত বাধা সত্ত্বেও (বিশেষ করে ভারতের বাধা) ‘কনষ্টিটিশন গঠন কাজ শেষ’ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তারা প্রক্লেমশন জারিতে সফল  হয়েছিল। আর তা সম্ভব হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল  (দাহালের মাওবাদী দল, আর বাকি দু দল হল,  আমাদের সিপিবির মত নির্বাচনমুখি কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস) একজোটে পরস্পরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা যে তারা ভারতের কোন প্ররোচনায়  না পড়ে প্রথম সুযোগেই কনষ্টিটিউশনাল রচনার কাজ শেষ করবে। দুবছরের মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সক্ষম হয়েছিল, যদিও ভারত শেষ চেষ্টা করেছিল মাধোসি জনগোষ্ঠিকে উস্কে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে, কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারিতে বাধা দিতে। কিন্তু সেসব কার্যকর করতে ভারত শেষে ব্যার্থ হয়। তবে নেপালে প্রদেশ কয়টা হবে, কিভাবে ৭৭টা জেলা কোন প্রদেশে কিভাবে  অন্তর্ভুক্ত হবে এটা অমীমাসিত রেখেই ঐ তিন দল কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারি করে দিয়েছিল। আর পরবর্তিতে ঐ অমীমাংসিত কাজ শেষ করা হয়েছিল।

    এখন নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর অর্থ গত দুবছরে সেসব জনগোষ্ঠিগত স্বার্থবিরোধ মিটিয়ে তারা অসমাপ্ত অংশগুলোও পুর্ণ করে ফেলেছে। এটাই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সফলতার আসল  তাতপর্য।

    এটা সাধারণ নির্বাচন, এখানে ‘সাধারণ’ শব্দটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কারণ এটা জানাচ্ছে  নেপালে কনষ্টিটিউশন রচনার কাজ পুরাটাই সমাপ্ত হয়েছে। তবে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পর্বে। কারণ এই শীতের সিজনে দুর্গম পাহাড়ে চলাচলের অসুবিধার কারণে মাঝে দুসপ্তাহের ফারাকে দুই আলাদা দিনে ভোট নেওয়া হচ্ছে।  দুই পর্বের ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ ডিসেম্বর।

    সাধারণভাবে বললে, নেপাল সম্পর্কে ভারতের কল্পনা হল – এটা ‘নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি’ বা তালুক যেন। ফলে সেখানে যা হবে তা ভারতকে তার ইচ্ছাকে অমান্য করে হতে পারবে না। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এখন বাস্তব পুরোটাই উল্টেপাল্টে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভারতের বিদেশনীতির বিরাট পরাজয়ের আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে নেপাল। আর এতে  ভারতের রাজনীতিক ও বিশেষ করে তার আমলা-গোয়েন্দাগোষ্ঠি যেন খোদ ভারতের স্বার্থের শত্রু।

    নেপালকে ভারত নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি মনে করার পটভূমি হাজির হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৪৭-পূর্ব যুগে একদিকে খোদ বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক নেপাল – দুটোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তবে দুই অর্থে। আর এতে বিরাট তফাতটা হল, ১৯৩৭ সালের পর থেকে ভারতে ধীরে ধীরে নেটিভরা অন্তত স্থানীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকার নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। এর বিপরীতে নেপাল তখন নিজস্ব এক রাজতান্ত্রিক সরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এক করদরাজ্য। নেপালের সাথে বৃটিশদের “নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩”, এটাই ছিল দ্বিতীয় ও শেষ চুক্তি, যার মেয়াদ উল্লেখ ছিল ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। যদিও সেটা নেপালের রাজাদের স্বার্থের দিক থেকে খারাপ চলছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা ১৯৪৭ সালে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় নেহরুর-ভারত যেন ‘নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩’-এর ব্রিটিশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওই চুক্তিই এবার ১৯৫০ সালে নতুন করে, ব্রিটিশ সরকারের জায়গায় ভারতের নাম বসিয়ে ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’ নামে পুনর্লিখিত  করা হয়েছিল। সেই থেকে নেহরুর-ভারতের দৃষ্টিতে ও মনোভাবে রিপাবলিক ভারত যেন আসলে নতুন এক ‘কলোনি মাস্টার’।

    সুনির্দিষ্ট করে নেপালের বেলায় বললে, নেহরুর-ভারত এমন ভাববার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কারণ নেপাল ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া তার বাইরে বের হওয়ার বা পণ্য আমদানি-রফতানির উপায় নেই। তিন দিকে ভারত আর উত্তরে চীন। কিন্তু চীনের দিকের অংশে তা আরো দুর্গম উঁচু পর্বতে ঢাকা ফলে পুরাটাই অগম্য এলাকা। কেবল একালে এসে রাইজিং চীন বিপুল বিনিয়োগ করে পাহাড় ডিঙিয়ে নেপালের সাথে স্থল যোগাযোগ (বিশেষ করে হাজারের দুয়েকের কিমি বেশি দীর্ঘ রেল লাইন পেতে) স্থাপনে রত হয়েছে। যদিও তা ঠিক নেপালের জন্য না, চীনের নিজের ঐ অঞ্চলও ল্যান্ডলকড, ওর বিকাশের জন্য।

    রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্র তার কোনো পড়শি বা বিদেশ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করা মানেই সেটা ভারতের কলোনি বানানোর বা কলোনি-সম্পর্কের চেষ্টা করে যেতে হবে – নয়াদিল্লির এই মনোভাব, এই অনুমান ও বোধ স্বাধীন ভারত জন্ম হওয়ার সময় থেকেই। ভারতের এই অনুমান যে মারাত্মক ভুল, আত্মঘাতি, আর এর জন্য ভারতকে উলটা কাফফারা দিতে হবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে শিক্ষা পেয়ে চললেও তা থেকে কোনো শিক্ষা ভারত নিচ্ছে – এমন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের পড়শি প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে একটা কলোনি সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার যুগ যে এটা আর নয়, তা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে- এই শিক্ষা পেলেও তা গ্রহণ করার অবস্থায় ভারত গিয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

    তাই ২০০৬ সালের পর থেকে ক্রমেই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং যদিও তাতে ভারত নির্ধারক ভূমিকায় নেপালকে ইতি-সহায়তা দিয়েছিল তা সত্ত্বেও নেপালের এই বিরাট পরিবর্তনের তাৎপর্য কী তা ভারত কখনো ধরতে পারেনি। কারণ ভারতের রাজনীতিক ও আমলা-গোয়েন্দা এই স্টাবলিশমেন্ট-চক্র আসলে, পড়শি রাষ্ট্র-সম্পর্ক বলতে কলোনি-সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে তা এখনো কল্পনা করে না। তাই এক দিকে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া  – এটা নেপালের জন্য একটা বিরাট বিজয়। আর ভারত ততই অযথা নেপালের জন্য এক নম্বর ভিলেনের ভূমিকায় ক্রমান্বয়ে হাজির হওয়া – এটা ভারতের বিরাট পরাজয়। একালে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার একমাত্র উপায়, ওর ওপর কলোনি সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়া নয়, বরং এটা কাউন্টার প্রডাক্টিভ; মানে উল্টো ফল দেয়া কাজ। এটা ভারতের স্টাবলিশমেন্ট-চক্রের এন্টেনায় ধরা পড়া, হুশ  ও নতুন মুল্যায়নে আসার আগে পর্যন্ত, সে নিজেও শান্তি পাবে না, পড়শিদেরও শান্তি দিবে না।

    ভিন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কলোনি নয় বরং মর্যাদার সম্পর্ক হিসাবে দেখা আর একে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে আগানো – এমন অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ, এটাই অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই বোধের  -পানি ভারতের কানে ঢোকা – দুরঅস্ত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘কলোনি অ্যাপ্রোচ’ যে তার আদি সমস্যা এটা ভারত এখনো উপলব্ধি করে না। আর এখন তো ভারতের এমন বেকুবিপনার নীতির পক্ষে আরো বড় সাফাই এসে গেছে। তা হচ্ছে রাইজিং অর্থনৈতিক প্রভাবের চীন। যেমন নেপালের ক্ষেত্রেও ভারত হয়তো সাফাই দিতে চাইবে, নেপালে ভারতের এমন দুর্দশা হয়েছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার করতে গিয়ে – এসব বাজে কথার সাফাই গাইবে। যদিও ভারতও জানে, এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা। নেপালের বেলায় চীনের প্রভাব বা চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে নেপালের নেয়া এটা একেবারেই নতুন ‘ফেনোমেনা’, মাত্র ২০১৫ সাল বা এর পর থেকে। অথচ নেপাল যেন একটা নতুন কনস্টিটিউশনের ভেতর দিয়ে নতুন করে রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করে থিতু হতে না পারে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এর সপক্ষে নেতিবাচক তৎপরতায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচন করতে হয়েছে নেপালকে, তবু ভারতের নেতিবাচক ভূমিকা শেষ হয়নি। অবশেষে দ্বিতীয়বারের (২০১৩) কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচনের পর নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল এক হয়ে ভারতের বাধা মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপাবলিক নেপাল হিসেবে নতুন কনস্টিটিউশনের ঘোষণা দিতে নেপাল সক্ষম হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে কূটনীতিতে পরাজিত ভারত ঐ ঘোষণারও বিরোধিতা করেছিল। এরপর ভারতের শেষ অবলম্বন হয়েছিল, নেপাল-ভারত সীমান্তের নেপাল অংশের সমতলভূমির বাসিন্দা মাধেসি জনগোষ্ঠীর ত্রাতা সাজার।

    ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপালের সমতলি-পাহাড়ি স্বার্থবিরোধ যেন কোনো মীমাংসায় না পৌঁছায় – এভাবে কাজ করে গেছিল ভারত। নেপালকে কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ২০১৫ সালে ঘোষণা দেয়া হলেও এর অভ্যন্তরে প্রদেশগুলো কিভাবে বিভক্ত করার কাজ অসমাপ্ত ছিল মানে, অভ্যন্তরীণ সীমানা টানার কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এতদিন আয়োজন করাও যায়নি। বিগত দুই বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাধা দিয়ে একাজগুলো যেন শেষ না নয়, পাহাড়ি-সমতলি জনগোষ্ঠীগুলো যেন তাদের স্বার্থের ঝগড়ার ব্যাপারে আলোচনা করে কোন একটা মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারে, এ ক্ষেত্রে নেপালকে ঠেকিয়ে রাখার সব চেষ্টা করা ছিল ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য।

    এই পটভূমিতে চলতি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তাৎপর্য হল, ভারতের সব প্রচেষ্টাকে নেপালের জনগণ পরাজিত করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের সব বিতর্ক-বিবাদ নিরসন করে নেপাল নিজেকে সাত প্রদেশে ভাগ করে  ও প্রদেশ গঠন সম্পন্ন করেছে। এটা একটা বিরাট অর্জন। বিগত ২০ বছর নেপালে কোথাও (আমাদের ইউপি ও উপজেলার মত) স্থানীয় নির্বাচন হয়নি। অনেকটা, সীমানা টানা বা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আমাদের উপজেলার নির্বাচন না করতে পারলে যেমন হত তাই। এই বছরে এসে কনস্টিটিউশনের অসমাপ্ত এসব কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আর সব কিছুই হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তাই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সাল ছিল নেপালের জন্য ‘নির্বাচনের বছর’; ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এই তিন নির্বাচনই এবছর সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এক বছর আগেও এটা আদৌ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রায় সবার মনে সংশয় ছিল। কোনো আশার আলো কোথাও ছিল না। আমাদের অনুমান, নেপালের জনগণ এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট দেবে সম্ভবত নেপালি মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডকে। না, এটা তার রাজনৈতিক আদর্শ ভাল কি মন্দ তা বিচার করে বলা কোন কথা নয়। নেপালের সর্বশেষ সংসদে ৬০০ আসনের মধ্যে মাওবাদীদের ছিল মাত্র ৮০ আসন। আর ওদিকে নেপালি কংগ্রেসের ছিল ১৯৬ আসন আর কমিউনিস্ট নেতা অলির ইউএমএলের ১৭৫ আসন। ফলে নেপালের প্রধান তিন দলের কারোই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তবে সব মিলিয়ে একসাথে মোট আসনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ আসন তাদের দখলে ছিল। ফলে গত পাঁচ বছরে তিনবার এই তিন দলের তিন ধরনের কম্বিনেশনে সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সেটা সব সময় আগাম আপস আলোচনাতেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে কোনো অচলাবস্থার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে দাহালের কৃতিত্ব হল, তিনি ছিলেন সেই আশার আলো; প্রতিটি বিবাদের ইস্যুতে সমঝোতা টানার উদ্যোক্তা।  আর বাকি দুই দল – আমাদের সিপিবি দলের মতো নির্বাচনী কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস এদের ভূমিকা ছিল যে এরা নিজেদের রাজনৈতিক বিবাদের সমাধানে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে না পারলেও দাহালের প্রদত্ত সমাধান প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন এবং ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তা সফল করা। বিশেষ করে ভারতের কোনো প্ররোচনার ফাঁদে বা লোভে না পড়া। অবশ্য পুরো নেপালের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গরিব মানুষের কাছে ভারতের কোনো ইতিবাচক ইমেজ আর নেই। কারণ, ২০১৫ সালে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে ভারত একনাগাড়ে পাঁচ মাস ল্যান্ডলকড নেপালে ভারত থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি ভারত বন্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি, যার ফলে কষ্ট সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছিল  নেপালের গরিব জনগণকে।

    সমঝোতার সরকার হিসেবে বর্তমানে নেপালে শেষ বা তৃতীয় কোয়ালিশন চলছে  এটা নেপালি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার, যার পার্টনার দাহালের মাওবাদী দল। এটাই শেষ ১১ মাসের সরকার, যার আগের ১১ মাসে দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার ছিল। নেপালে সাত না আটটি প্রদেশ থাকবে, কোন কোন জেলা কোন প্রদেশে থাকবে- এ বিষয়টিকে মোটা দাগে বললে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ ছিল স্বার্থবিরোধ বিবাদের সবচেয়ে জটিল ইস্যু। আর ভারত এই বিবাদে মাধেসিদের কান ভারী করে বিবাদ আরো বড় করে তা লাগিয়ে রেখেছিল যেন সমাধান না মেলে – এটাকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ বলে নির্ধারণ করে পথ রেখেছিল। গত ২২ মাসে নেপালের বিরাট অর্জন হল – প্রদেশ ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ মিটিয়ে এগুলোর সীমানা নির্ধারণ শেষ করা। এর পরপরই শুধু প্রাদেশিক নয়, স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজনের সব বাধা খুলে যায়। ফলে ২০ বছর পরে এই প্রথম ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এরপর দুই পর্বে প্রাদেশিক (সরকার) ও ফেডারেল (কেন্দ্রীয় সরকার)- এ দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে যা হবে তা হল, নেপাল মোট ৭৭টি জেলা আর সাতটি প্রদেশে আপোষে বিভক্ত হয়ে থাকবে।

    চলতি সাধারণ নির্বাচনে নেপালে সারা দেশ থেকে মোট ২৭৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (আমাদের ভাষায় কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হয়ে আসবেন। তারা একটি ফেডারেল সংসদ গঠন করবেন। এই সংসদের সংখ্যাগরিস্ট দলের সদস্যরা একটি কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠন করে নেবেন। এ ছাড়াও সাতটি প্রদেশে আলাদা আলাদা প্রাদেশিক সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেকাজে সাত প্রদেশে মোট প্রাদেশিক সদস্য নির্বাচিত হবেন ৫৫০ জন। নেপালের সাফল্য হল নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষমতার তিন স্তর ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এর অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। আর সেই সাথে এ বছরই তিন স্তরের নির্বাচন সফলভাবে শেষ করা। ফলে এখন নেপাল দাবি করতে পারবে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রগঠন পর্ব সফলভাবে শেষ করে সে এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। স্বভাবতই এটা নেপালের জনগণের জন্য যতটা সফলতা ও অর্জনের বিষয়, ঠিক ততটাই ভারতের সরকারের জন্য একধরনের পরাজয়ের বিষয়।

    এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় ভারতের নেপালনীতি আজ পরাজিত। নেপালের নির্বাচন কাভার করা ভারতের মিডিয়াগুলোর সম্পাদকীয় দেখলে বোঝা যায় যে, অন্তত তারা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর নেপালের জনগণের কাছেও ভারত যে একটা প্রবল নেতি-শক্তি এবং নেপালের গরিব মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ, আরো কঠিন ও কষ্টকর করে দিতে পিছপা হয় না, তা প্রমাণিত করে গেছে। ১০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে নেপালের কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেসে ভারত এক বিরাট নেতিবাচক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে, যা থেকে ভারতের জন্য পরাজয় আর নেপালি জনগণের ধিককার কুড়ানো ছাড়া কোনো অর্জন নেই। এর ফাঁকে ভারতের নেতি-রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়ায় নেপালি জনগণের কাছে অনেকটা অপরিচিত চীন, আজ নেপালি জনজীবনের কষ্ট লাঘবে বহুল আকাঙ্খিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগকারী ‘ত্রাতা’ হয়ে উঠছে।

    বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফলাফলে কমিউনিস্টদেরকে আগিয়ে রাখছেন। এই নির্বাচন হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। এক পক্ষে মাওবাদী, অন্য পক্ষে কমিউনিস্ট ইউএমএল আর বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি। ভট্টরায়, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাতের সময় মাওবাদী দলের সাথে দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে ছিলেন। এ তিন কমিউনিস্ট দলের জোট বনাম নেপালি কংগ্রেস এবং এর সাথে ছোটখাটো দলের গণতন্ত্রী জোট। এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে যদি জনগণের মন-মেজাজের ইঙ্গিত বলে আমরা মানতে চাই তবে কমিউনিস্ট জোট বিপুল ভোটে জিতবে, বলা হচ্ছে। [Based on the results of Nepal’s recently concluded local level polls, there is a better chance that the left alliance of CPN-UML and CPN (Maoist Center) will gain a majority and form the government] এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে অবশ্য প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে পর্যন্ত।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে নির্বাচন আয়োজনে সফলতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    গৌতম দাস
    ২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2lK

     

     

    চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

    ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

    তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

    সাইড লাইন
    যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

    আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

    গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

    আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

    জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
    কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

    এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

    এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

    ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]