Category: Nepal-India relation

  • নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    গৌতম দাস

    ১৫ জুন ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-33n

    _Nepal’s new territorial map, released earlier this week, has shown the area in the light red shade to be part of its territory, evoking strong reactions from India. This came after India, in its new maps released in November last year, showed the Kalapani area (marked in deep red) to be part of its territory. SCMP

    এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতের পড়শি অঞ্চলের সকলেই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য রাখছে নেপাল কী করছে, কী করে ভারত মোকাবিলা করছে। প্রশ্নটা মোকাবিলার। নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবল টেনশন উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বেড়েই চলছিল। এরই মধ্যে নতুন ঘটনা হল, গত ১২ জুন সকাল নয়টায় ভারতের বিহার রাজ্যের সীতামারহি [Sitamarhi] জেলার সীমান্তের ওপারে নেপালের অংশে তাদের সরলাহি [Sarlahi] জেলার সীমান্ত এলাকায় নেপালি সীমান্তরক্ষীর গুলিতে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। সেই সাথে ঐ গোলাগুলিতে দুজন ভারতীয় গুরুতর জখম হয়ে ভারতের হাসপাতালে জীবন নিয়ে লড়ছে আর একজন ভারতীয় নেপালি হেফাজতে আটকা আছে, যাকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
    নেপাল-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এবারের উত্তেজনা ও অসন্তোষের  মূল ঘটনাটা মূলত ৮ মে থেকে; যখন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (অনলাইনে ভার্চুয়ালি) একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। বিবিসির ভাষায়, “ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ঐ গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটা ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে”। নেপালের দাবির পক্ষে যুক্তি এটাIndia and Nepal Treaty of 1950তে [Sugauli Treaty 1816]  এর রেফারেন্স আছে। সুগৌলি চুক্তি হল ১৮১৪-১৬ সালের এংলো-নেপাল যুদ্ধের শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটা থেকে নেপালের সীমানার রেফারেন্স টানা হয়ে থাকে। এই চুক্তির পরবর্তিতে ব্রিটিশরা আরও তাদের দখল নেয়া এলাকা ছেড়ে দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে ১৯২৩ সালে আরেক আপডেটেড নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি [Nepal–Britain Treaty 1923] করেছিল। আর এই চুক্তিতে উল্লেখিত মেয়াদ শেষেই ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি [India and Nepal Treaty of 1950] স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নিয়ে এখনকার নেপালের প্রবল আপত্তি উঠে আছে। চুক্তি নিয়ে একটা রিভিউ প্রক্রিয়া চালু আছে। যদিও চুক্তি এখনো বহাল আছে।

    সাবধান, প্রতিহিংসা এক নেতি এনার্জি, এটা উলটা আপনারই ক্ষতি ডেকে আনতে পারেঃ
    গত ১৯৯৬ সালে নেপাল মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর প্রাক্কালে এই ১৯৫০ সালের চুক্তি রিভিউ বা বাতিল অন্যতম দাবি হিসাবে তাতে যুক্ত করা ছিল। বিগত প্রায় দুশ বছর ধরে নেপাল-ভারত সব সময়ই কোন না কোন এক চুক্তি  গুরুত্বপুর্ণ হয়ে থেকেছে। অন্তত তা এজন্য যে নেপাল ভুমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। নেপালের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চীন এভাবে এইদুদেশ দিয়েই নেপাল ঘেরা। যদিও আবার দক্ষিণের ভারতের দিক দিয়ে নেপালে প্রবেশপথগুলো তুলনামূলক সহজ, অন্তত দক্ষিণদিকের পাহাড়ি এলাকা বা পথ কম উচ্চতার বলে আর এদিক দিয়ে কোন সমুদ্রবন্দরে পৌছানোর দুরত্ব তুলনায় কম বলে। আর প্রাচীনকাল থেকে এপথটাই আগে থেকে চালু হয়েছিল বলে। ফলে ১৯৫০ সালের চুক্তির মুখ্য প্রসঙ্গ সমুদ্রে যেতে ভারতের অনুমতি ও শর্ত এসব (অসম) চুক্তির মাধ্যমেই বলবত থেকেছে। তবে ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের নতুন কনষ্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা হয় নাই বলে, এরপর ভারত হয়ে পণ্য আমদানীর ঐ একমাত্র পথও ভারত অবরোধে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই সিদ্ধান্তই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষত জ্বালানির অভাবে ভীষণ রকম কষ্টে ফেলে দেওয়ার কথা, আর তা ফেলেছিলও তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সবশেষে এর ফলাফল হয়েছিল একেবারে উলটা।  সেটাই নেপালের জন্য নতুন দুয়ার, নতুন পথ খোলার শর্ত হয়ে বাস্তবতা হাজির হয়েছিল। ঐ অবরোধে নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় মাস ছয়েক পরে  নেপাল চীনকে অনুরোধ করলে চীন সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। চীন মানে চীনা-তিব্বতের সীমানা নেপালের আরও উত্তর দিকে যেটা আরও খাড়া পাহাড়ের দিক।  চীনা-তিব্বতের এদিকে  দুটো সীমান্ত চৌকি দিয়ে বের হওয়া যেত আগে। কিন্তু এপ্রিল ২০১৫ এর নেপালের ভুমিকম্পে সেগুলো ভারী পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে যায় বা ভেঙ্গে যায় বলে ব্যবহার অযোগ্য হয়েছিল। তবুও বিকল্প সুবিধা একটাই ছিল যে ২০১৫ সালের আগে থেকেই চীন-তিব্বত অংশ থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি (২০০০ কিমির বেশি) চীনের কোন সমুদ্রে পৌছানোর হেভিডিউটি রেললাইনের এক প্রকল্পে নতুন করে রেললাইন পাতা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছিল। কিন্তু নেপাল এর ব্যবহারকারি হওয়ার কোনই আলাপ ছিল না বলে ঐ রেলপথ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে কমপক্ষে ১০০কিমি দূর দিয়ে চলে গেছিল। চীন তাই ঐ রেললাইন যেন নেপাল ব্যবহার করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে ঐ প্রায় ১০০কিমির এক নতুন কানেকটিং রেল প্রকল্প নিয়ে নেপালকে সহায়তা করতে আসে। সেই কানেকটিং রেলপথ এখন চালু হয়ে গেছে। চীনের সাতটা বন্দর এখন নেপালও ব্যবহার করতে অনুমতিপ্রাপ্ত উন্মুক্ত। তাই নেপালের ভারত-নির্ভরতার দিন এভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায় আর, এমন শাপে বর নিয়ে নেপাল তাদের ভাগ্য গড়ার দিকে রওনা দিয়েছে। কারও অসুবিধা বা খারাপ করতে চাইলে আপনার অজান্তেই এর পরিণতি তার জন্যই ভাল হয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা হয়, খারাপ উদ্দেশ্য বা নেতি মন বা প্রতিহিংসা – এগুলো এর কর্তার বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য হবাব সম্ভাবনা নিয়ে আসে! কাজেই সাবধান!

    ওদিকে লিপুলেখ নিয়ে নেপালের বিপরীতে ভারতের যুক্তি হল – এলাকাটা প্রায় ‘ষাট বছর’ আগে [মানে এরও আগে বা এর চেয়ে পুরানা কালে নয়] থেকেই তাদের দখলে আছে। তাই এটা তাদের। সাথে আরেকটা যুক্তি দেয় ভারত যে, ২০১৫ সালে এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ই দুই দেশ মিলে লিপুলেখে একটি বাণিজ্যিক পোস্ট খুলতে সম্মত হয়েছিল, যা তাদের যৌথ ঘোষণায় আছে। এ কথার বিপরীতে নেপালের বক্তব্য তাতেও নেপাল  ঐ ঘোষণা কখনোই মেনে নেয়নি বলে তখন থেকেই রেজিষ্টার্ড আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাই এখন গত মাসে ৮ মে লিপুলেখে ভারতের রাজনাথ সিং সড়ক তৈরির কাজ উদ্বোধন করা থেকেই নেপালের পুনঃআপত্তিতে প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। নেপালে প্রতিবাদের বিষয়টাকে পার্লামেন্টে আইন পাস বা কনস্টিটিউশন সংশোধনের পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জিও মোদীর বিরুদ্ধে নেপালের পক্ষে এক স্বাক্ষীঃ
    নেপালে একের পর এক ভারতের পরাজয়ের শুরু বলা যায় নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনার প্রথম উদ্যোগের (First failed Constituent Asembly was dissolved on May 28, 2012 ) ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকে। নেপালের কোন রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভারত কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে না পেরে ঐ রচনা প্রক্রিয়া যেন ফেল করে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এতে হতাশায় ডুবে যাওয়া সারা নেপাল এরপর আবার বহু কষ্ট সহ্য করে (কারণ সবদলের একমত হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ) সর্বদলীয় আবেদন নিয়ে তাদের সুপ্রীম কোর্টে গেলে  কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে  নতুন করে রিপাবলিকের কনষ্টিটিউশন রচনার “কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের নির্বাচন” অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুব কমই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগে নেপালের প্রধান তিনটা দলই  আয়োজনের পুর্ণ সদব্যবহার করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ভারত থেকে (দুই কমিউনিস্ট আর নেপালি কংগ্রেসও) প্রধান তিনদল নিজেদের দূরে নিয়ে যায়। এই তিনশক্তি মিলে নেপালের নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও তাতে ভারতের প্রবল আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করেই ঐ নতুন কনষ্টিটিউশনের ঘোষণা দিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫। তাদের তিন দলীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূরণ করেছিল। কিন্তু এতে ভারত প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ জলুনির। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালে সব ধরণের পণ্য আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকেই চীন-নেপাল সম্পর্কের নতুন দিনের শুরু।  অথচ অন্তত দুশত বছরের ভারত-নেপাল সম্পর্কের মধ্যে চীন কখনও কোথাও হাজির ছিল না। ২০১৬ সাল থেকেই মাত্র নেপালের মঞ্চে চীনের প্রবেশ ঘটেছে।

    এককথায় বললে, তাই কাউকে দোষারোপের আগে ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্তা, রাজনীতিক বা একাদেমিকের নিজেদের লজ্জা ঢাকতে হলে  নিজেকেই দোষারোপ করা উচিত ছিল। হয়ত আত্মসমালোচনা করে এজন্য তারা কিছু অনুশোচনামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এমন আমাদের দেখতে পাওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, তবু কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মোদী ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায়। তাই এদের মধ্যে একটা ঝোঁক উঠে এসেছে যে ভারতের আগের সব ব্যর্থতা মোদীর মাথায় ঢেলে দেওয়া। যদিও মোদীও, তার আমলে পুরান ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছেন নীতি বদলিয়েছেন তা জানা যায় না।
    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা অবসরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোন চলতি সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। কিন্তু সাবেক ভারতীয় এক রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম। তিনি রাজনাথের সড়ক নির্মাণ উদ্বোধন ঠিক পছন্দ করেননি। আর বিবিসিকে বলছেন, ‘রাস্তা উদ্বোধনের বিষয়টা অন্যভাবে করা যেতে পারত বলেও তার অভিমত”। দেবের অভিমত নেপালের আপত্তির মুখে মোদী সরকার নাকি বলেছিল, এ নিয়ে আলোচনা হবে। তাই বিবিসি লিখেছে দেব মুখার্জি বলেছেন, “… ভারত যখন নেপালকে কথা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বলা যায় না এটা আমাদেরই এলাকা – তোমাদের এ নিয়ে কিছু বলার হক নেই”। অর্থাৎ মোদী সরকারকে তিনি খুবই শক্ত হাতে আঘাত ও সমালোচনা করেছেন বলতেই হয়। এই ঘটনাকে আমরা বোধহয় দলবদ্ধভাবে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে করা দেব মুখার্জির প্রায়শ্চিত্ত বলতে পারি।
    আরেক দেশের নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি তোলার আমি কে? এনিয়ে আপত্তি তুলে নিজেকে হাস্যকর করার কোনো মানে হয় বলে এমন কাজ  আমরা কোন রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। কিন্তু নেপালে সব হারিয়ে ভারত তাই করেছিল। যদিও সবকিছু উপেক্ষা করে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত ও ডিক্লারেশন বা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে এক ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ক্ষমতায় আসে সেটা ছিল নেপালের বড় দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে এক দলের সরকার। আর একমাত্র নেপালি কংগ্রেস কোন মতে বিরোধী দলে জায়গা হয় আর সেই সাথে তার ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার কিছু সুযোগও সামনে আসে। কিন্তু এবার, নেপালের পার্লামেন্টে লিপুলেখ নিয়ে প্রতিবাদ ইস্যুতে আলোচনায় সেই নেপালি কংগ্রেসের এক এমপি পুষ্পা ভূষল গৌতম বলেন, “১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই এলাকা সম্পূর্ণভাবে নেপালের”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে নেপাল কংগ্রেস দলও এখন কম ভারতবিমুখ নয়। এ থেকে নেপালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বেশ খানিকটা আন্দাজ পেতে পারি।
    নেপালের মাওবাদীরা তাদের সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৬ সালে। সেখানে নেপালে তাদের রাজার মূল সহযোগী বলে ভারতকে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ওই বিপ্লবের মূল শত্রু বলে তারা চিহ্নিত করেছিল ভারতের শাসকদের। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি বাতিলের প্রধান দাবি তারা সেই থেকে শুরু করেছিল। মাঝে ২০০৭ সালের দিকে নিজেরা কৌশল বদলে সশস্ত্র থেকে গণআন্দোলনে নেমে আসারকালে চুক্তি বাতিলের কথা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে চুক্তি রিভিউয়ের পক্ষে আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার একপর্যায়ে ২০১৬ সালে এটা কাজ শুরু করলেও নেপালের মূল ফোকাস সরে যায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ও কোনো নতুন চুক্তির পথ খুঁজে বের করা। তা এখন চীনের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে গেছে। এরও প্রভাব এখন নগদ দেখা যাচ্ছে। সারা নেপালের চরম ভারতবিমুখ হয়ে পড়া চলছে ধরা যায় গত সাত বছর ধরে। কিন্তু এই লিপুলেখ সীমান্তের রাস্তা নির্মাণ কেন্দ্রে করে এবারের ভারতবিমুখতা বা বিরোধিতা অনেক বাস্তব হয়ে উঠেছে। চীন-নেপালের সাতটা সীমান্ত দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক করার কথা নেপাল প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে পারে এখন। এক কথায় মূল কারণ এটাই যে, ভারত ছাড়াও নেপালের অর্থনৈতিক জীবন এখন সার্ভাইভ করা বাস্তবে সম্ভব। এটাই হলো এবারের ভারতবিমুখতার বিশেষ দিক।

    ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে?
    এছাড়া এরই আরেক ছাপ দেখা যাচ্ছে আবার এখন। যেমন গত ১১ জুন কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় একটা কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম- ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে”? [Is this the end of the ‘special relationship’?] এখানে বিশেষ সম্পর্ক বলতে ভারত-নেপাল বিশেষ সম্পর্কের কথা বুঝানো হয়েছে। আর ঐ লেখায় কলকাতার হিন্দুস্থান টাইমসের এক সম্পাদকীয় আর এক প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমসের ঐ সম্পাদকীয় [The costs of anti-Indian nationalism in Nepal | HT Editorial] একেবারেই সাব স্ট্যান্ডার্ড; ওর নিম্নমান তাদের নিজের জন্যই লজ্জার। এত খারাপ তারা সাধারণত লিখে না। কিন্তু এখানে তারা নিজের দগদগে কিন্তু খামোখা “নেশনস্টেট বোধের” আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর কাউকে “কাজের ছেলে” গণ্য করে কোনো লেখা দাঁড় করালে যেমন হয় তারই ছাপ রেখে একটা লেখা হয়েছে এটা। ঐ সম্পাদকীয়-এরই আবার সাব-হেডলাইন হল, “কাঠমান্ডু (ভারতের সাথে) সম্পর্ক রিসেট করে ঢেলে সাজাতে চায়, এতে তারই স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে“। পত্রিকাটা অভিযোগ করেছে, নেপালে নাকি “গভীর এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” ছড়িয়ে পড়েছে।
    আরো লিখছে, “নেপাল-ভারতের মধ্যে এক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আছে, অসন্তোষের গোড়াটা সেখানে”। লিখেছে, “বাস্তবে এর মানে ভারত-নেপালের সাথে খোলা সীমান্ত শেয়ার করে। ভারত নেপালিদের বিনা বাধায় ভারতে কাজ করতে এলাউ করে আর নেপালিরা (গুর্খা) ভারতের সেনাবাহিনীকে সেবা (কাজ) করে। এর বিপরীতে, নেপালিরা এ দুটোতেই রাজি আছে, পরোক্ষে ওরা নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটা ভূমিকা দিয়েছে (এটা আর কোন সম্পাদকের আলাপ নয় রাস্তার চা দোকানের রকবাজের আলাপ হয়ে গেছে) আর নেপালিরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের ব্যাপারে সেন্সেটিভ হয়ে থাকছে। … ভারতও বিশেষ সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশেষ সম্পর্ক রিসেট(reset) করলে নেপালকে এর মূল্য দিতে হবে”।
    “নেপালকে এর মুল্য চুকাতে হবে। এর মানে হবে কড়া সীমান্ত, এর মানে হবে নেপালিদের ভারতে অবাধে কাজ করা বন্ধ, এর মানে হবে নেপালের উন্নয়নের জন্য (ভারত থেকে) দ্বিপক্ষীয় জরুরি সহযোগিতার দ্রব্যাদি কমে যাওয়া, এর মানে হতে পারে, ত্বরাই মানে নেপালের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ঝড় উঠবে (মানে ভারত উসকিয়ে তুলবে) তা সামলানো। কাঠমান্ডু কি এসবের জন্য তার একক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মূল্য চুকানোর জন্য তৈরি? এটা তো একটা পরিষ্কার প্রো-চায়না ঝোঁক ও এক আগ্রাসী ন্যাশনালিজম? এভাবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সব নিঃশেষ করে দেয়া দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তবে নেপালের বেশি ক্ষতি হবে”।

    এখন এক কথায় বললে, হিন্দুস্থান টাইমসের এই ভাষ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে অন্তত গত দশবছরে নেপাল-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে এদের কোন খবর নাই, মুল্যায়ন বা কমপক্ষে কোন রিডিং  নাই। তবে সেটা যাই হোক, হিন্দুস্থান টাইমস মুলত একটা মিডিয়া একটা দৈনিক, কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়। কাজেই মিডিয়া হিসাবে এই বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। আর তাদের এই লেখার প্রেক্ষিতে মন্ব্যে বলতে হয়, কাউকে কাজের ছেলের মত ট্রিটমেন্ট আচরণ করে যদি বলা হয় “আমার পা-দাবানো ছেড়ে চলে গেলে তুই তো না খেয়ে মরবি”- এটা সেরকমের বক্তব্য।  এটা নেপালের জন্য অপমানজনক হবারই কথা। আসলে ভয় দেখিয়ে কাউকে জোয়ালে নিয়োজিত রাখার অনেক উপায় আমরা জানি, দেখেছিও। তবে এখানে দেখছি; এখানে বলা যে ‘আমারও একটু কষ্ট হবে তোর হাতে আমার পা-দাবানো পাব না, তবে তোরই না খেয়ে থাকতে বেশি কষ্ট হবে”। এটা এ ধরনের। এমনই নিম্নমানের।

    বলাই বাহুল্য, এটা কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় হতে পারে না। বাহ্যত উভয়ের সম্পর্ক যাই থাক, নেপাল-ভারত সম্পর্ক দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের, যেখানে কেউ কারো অধস্তন এমন মনে করাটাই অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, বরং এভাবে বলা বা মনে এমন ধারণা পুষে  নিয়ে কথা বলাটাও অপরাধ। দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের এই সম্পর্ক-নীতির কথা মনে রেখে এই সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। এজন্য এটা গর্হিত কাজ।

    জাতিসঙ্ঘ যেখানে ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রের পড়শি দেশের উপর দিয়ে গিয়ে সমুদ্র ব্যবহারের একসেস পাওয়াকে অধিকার গণ্য করে রেজুলেশন তৈরির প্রক্রিয়ায় আছে, এরা তখন বেখবর হয়ে নেপালকে “এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” করার মূল্য চুকাতে হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে।

    এছাড়া, এটা আসলেই একটা হাসির কাণ্ড যে হিন্দুত্বের ভারত ও হিন্দুত্বের ন্যাশনালিজমের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমরা আরেকটা মানে নেপালের  ন্যাশনালিজম দেখে টিটকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে দেখছি। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল নেপালের ত্বরাইবাসীরা ভারতের উসকানিতে নেপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে – ভারত-রাষ্ট্র তা করাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু হুমকি দিচ্ছেন এক পত্রিকার সম্পাদক! কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক নয়। এখানে আবার পত্রিকার সম্পাদক এমনই জাতিবাদী হয়েছে যে, রাষ্ট্র বা সরকারের কেউ না হয়েই তিনি হুমকি দিচ্ছেন! এটা এমনই জাতিবাদিতা!   জমিদারের ছেলে যদি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে পাশের টেবিলে বাসার এককালের কাজের ছেলেকে খেতে দেখে তাহলে যেমন জমিদার রোয়াব-ভ্যানিটি রক্ষার্তে তেলেবেগুনে ঝাপিয়ে পড়ে, হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদকের অবস্থ হয়েছে তেমনই।  এই অবস্থায় সম্পাদককে একটাই কথা বলা যায় – মহাশয়, কুল ডাউন! আপনি শান্ত হোন! সাম্য, সম-মর্যাদা ব্যাপারটা বুঝেন?  আপনি বুঝে নেন জলদি, অবস্থা আরো খারাপ হবার আগেই! দেখছেন না ৪০০ বছরের আগের কালো-দাস-ব্যবসায়ী সেলিব্রেটি হয়ে এতদিন নিজের মুর্তি টাঙিয়ে খারায় ছিলেন! কিন্তু এখন? না আর না! এবার সময় হয়েছে আপনি মাটিতে, নদীতে লুটায় পড়তেছেন না? আর লুকায়ে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না! আপনিও, কেউ বাদ যাবেন না!

    ওই সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল গত ৮ জুন। আর নেপালে এর পালটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ১১ জুন। এ থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক কোন উত্তেজনায় আর কেমন পর্যায়ে আছে এরই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

    নেপাল সীমান্তে ভারতীয়দের উপর গুলিঃ
    তাহলে গত ১২ জুন নেপালি পুলিশের হাতে ভারতের এক নাগরিককে হত্যা, দুইজন ভারতীয় নাগরিকের মারাত্মক আহত ও একজনকে নেপালি পুলিশের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনার কি নেপাল-ভারত সীমান্ত লিপুলেখ নিয়ে উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে? এর জবাব হল, পরোক্ষে সম্পর্ক অবশ্যই ভাল মতনই আছে, প্রত্যক্ষে সম্ভবত নেই। সাধারণ অবস্থায় নেপাল-ভারত  তো খোলা সীমান্ত, অবাধে দুদেশের নাগরিক যেতে পারে। বিশেষ করে বিহার জেলা সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈবাহিক আত্মীয় সম্পর্কই প্রচুর। কিন্তু এখন নেপালে ১৪ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলছে। নেপ[আলী সীমান্ত্রক্ষীর যুক্তি,  এসময় নেপালের মেয়ে বলে এক ভারতের বউমা অবাধে এখনই শ্বশুরবাড়ি অবাধে আসাযাওয়া করতে পারে না। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেটা করতে যাওয়া থেকেই তর্কবিতর্কের শুরু। এরপর এই বাধা ভাঙতে ভারত থেকে লোকজন এনে (কমপক্ষে ৩০ জন) চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সীমান্তরক্ষীরা (মাত্র ৭ জন) ভয় পেয়ে ভারতীয়দের সামলাতে না পেরে গুলি ছুড়েছে। প্রথমে দশ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার। কিন্তু এতে কোন কাজ না হওয়ায় এবার নিচে ফায়ার করেছে। ভারতের প্রায় সব পত্রিকার বর্ণনার সারকথা এটাই। তবে নেপালের সীমান্ত সৈন্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আছে তা ভারতের ইকোনমিক টাইমস লিখেছে বলে কেউ কেউ লিখেছে। কাজেই পরোক্ষ লিপুলেখের টেনশন এখানেও আছে, বলা যায়। এখানে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি ভারত-নেপাল সম্পর্কের আগামি অভিমুখ সেদিকেই যাচ্ছে – মুক্ত অবাধ সীমান্ত আর থাকছেই না। চুক্তি বদল হচ্ছেই। তবে কতটা আপোষে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন!

    তবে আমরা উপরে দেখলাম ভারতীয় সম্পাদকের মনোভাব। তিনি নেপালের এমন বেড়া দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া কী সহজে সহ্য করে নিবেন? সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে অবশ্যই!   জমিদার-মন এসব সহজে নিতে পারে না। ‘বান্দি’ করে যাকে এতদিন দাবায় পায়ের নিচে রাখছিলেন তিনি, সে এখন আমারই পাশের চেয়ারে বসে কেমনে!   আর বিপরীতে ওদিকে নেপালির পত্রিকার কলামিস্ট চাইছেন নেপাল-ভারত সম্পর্ক রিসেট করা ঢেলে সাজিয়ে নিতে, যাতে অসাম্য, অমর্যাদার সম্পর্ক দূর হয়ে যায়। মানুষ না খেয়ে হলেও সম-মর্যাদার জন্য জীবন দিতেও উঠে দাড়াতে চায়। এটা কোন জমিদার মন বুঝে না। যার একটাই ওষুধ – রিপাবলিক মন – রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতা, মর্যাদা ইত্যাদি ঝাপ্টা দেওয়া।  অর্থাৎ কলামিস্ট তিনি বুঝাতে চাইছেন ১৯৫০ সালের চুক্তির বাতিল অথবা ন্যূনতম একটা রিভিউ করতে। আর বর্তমান সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন। রিভিউ রিপোর্ট এসে গেছে। কিন্তু মোদী সময় পাচ্ছেন না বলে এড়িয়ে রেখেছেন।

    বোঝা যাচ্ছে, নেপালের সাথে ভারত তাদের সম্পর্কটা খামোখাই তিতা করে ফেলেছে, খুব সম্ভবত তাদের পুরাণা কলোনি আচরণ পছন্দ করে তা আকড়ে থাকার কারণে। আর এর তাবত দায় এখন চীনের ওপর চাপাতে চাইছে। যদিও রেকর্ড ও ফ্যাক্টস একেবারেই পরিষ্কার যে ২০১৫ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে চীনের নামই কেউ জানত না। কোথাও উচ্চারিত হত না এমনই অপ্রয়োজনীয় মনে হত। তবে নিশ্চয় চীনও নিস্পাপ নয়। তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গও নয়। বাস্তবতা হল, নেপালের প্রতিটা মানুষকে ভারতের চরম কষ্টকর জীবনের মুখে ফেলে দেয়া থেকেই এর ভিতরেই ত্রাতা হিসেবে হাজির হতে সুযোগ পেয়ে গেছিল চিং । যে সুযোগ সে না চাইতে পেয়েছিল এবং নিয়েছিল।  এরপর থেকে নেপালে চীনের আবির্ভাব ঘটা আর কেউ ঠেকাতে পারে নাই।  প্রতিহিংসা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। নেপালের কিছুই করতে পারবে না, উলটা নিজের আরো ক্ষতি ছাড়া।

    ভারত কেবল নিজের আচরণ আর স্বভাবকেই দায়ী করতে পারে; আর যারা আগে সেসময় ২০১৫ সালে এটা দেখতে মিস করেছেন তাদের জন্যই সম্ভবত সেই প্রমাণ এখনো হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক আবার হাজির করেছেন!

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টেও  “নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

    নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

    গৌতম দাস

    ১৪ এপ্রিল ২০১৭,  শুক্রবার

    http://wp.me/p1sCvy-2ev

     

    প্রবাদ আছে- কারো উপর বেইনসাফি আর জুলুম করলে সে কাজের কাফফারাও চুকাতে হয়। কিন্তু অনেকের বেলায় এমন হয় যে, কাফফারা পরিশোধ আর যেন শেষ হতে চায় না। সেই দশাকে খুবই খারাপ সময় বলতে হয়। নেপাল-ভারত সম্পর্কের বেলায় ভারতের জন্য এখন সেই ‘খারাপ সময়’ চলছে, যখন তার কাফফারা চুকানো যেন আর শেষ হতে চাচ্ছে না। নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রজাতান্ত্রিক(রিপাবলিক) নেপাল হওয়ার লড়াই বিজয়ী হয়েছে সম্প্রতিকালে। তাতে আমেরিকার অনেক নেতি ভুমিকা থাকলেও শেষে  ইতিবাচক ভুমিকায় সে নেপালের লড়াইয়ে সাথে থাকতে পেরেছিল। আমেরিকার ইতিবাচক অবস্থানের সাথে  মিলে ভারতেরও অনেক ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। সময়ে নির্ধারক ভুমিকাও ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এককথায়, ভারত সে লড়াইয়ের সাথে পরিশেষে ইতিবাচক পথ ধরেই হাঁটতে পেরেছিল। যদিও এরও পরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গঠনের কালে  ভারতের ভুমিকা তা আর থাকে নাই। ভারত কল্পনাও করতে পারে নাই যে  আগের রাজতন্ত্রী নেপাল-ভারতের কলোনিয়াল দাসত্ব চুক্তির বাইরে নতুন নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভিন্ন কিছু হবে;  স্বভাবতই দিন বদলেছে- সেটা বুঝতে ভুল করেছিল এখানেই। অথচ ভারত প্রাকটিক্যাল হতে পারলে অন্য কিছু হতে পারত হয়ত। বলা বাহুল্য, সেটা কখনোই হয়নি। হওয়ার আর সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন উঠছে।আর উল্টো নেপালের মূল তিনটি রাজনৈতিক দল (নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল বা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিস্ট আর সশস্ত্র ধারার নতুন মাওবাদী কমিউনিস্ট) যারা একসাথে সংসদের মোট ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করে- এদের সবার সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যায়। নতুন রিপাবলিক নেপালের তাৎপর্য ভারত বুঝতে ভুল করেছিল। বলা যায়, ভারত নেপালের পরিবর্তনের গুরুত্ব ধরতে পারে নাই। ভারতের সম্ভবত এমন ভাববার কারণ হল সে ভেবেছিল, নতুন নেপাল রিপাবলিক হলেও তাতে কী? সে তো আগের মতই ল্যান্ডলকড যা ছিল তাই, ভারত দিয়ে ভৌগোলিকভাবে ঘেরা। ফলে সে ধরে নিয়েছিল, নতুন নেপালও আগের মতোই ভারতের অনুগ্রহে এবং ভারতের আরো নিয়ন্ত্রণের নেপালই হবে। ভারতের এমন আচরণ দেখলে মনে হয়, ভারতে প্রশাসনের চোখে, আমলা-গোয়েন্দার ইমাজিনেশনে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ‘সম্পর্ক’ বলতে কলোনিয়াল সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা কখনোই তাদের জানা হয়নি। ফলে ভারত সীমান্তসংলগ্ন মাধেসি ও তরাই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সাথে নেপালের প্রধান ধারার জনগোষ্ঠীর, পাহাড়ি-সমতলী স্বার্থবিরোধকে উসকে দিয়ে তা থেকে নেপালের রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর শেষ চেষ্টাই ছিল ভারতের শেষ ভরসা। কিন্তু এটা করতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলেছে ভারত।
    নেপাল ল্যান্ডলকড এই অবস্থাটির অর্থ কেমন, তা সহজেই  বোঝা যায় নেপালের শুধু ছোট-বড় শহুরের জ্বালানি ব্যবহার করা দেখলে। নেপালের গ্রাম হয়তো লাকড়ি দিয়ে চলে, কিন্তু একটি সেমি-আরবান শহরও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং নির্ভরশীল; তবে অবশ্যই ভারত যদি সেই গ্যাস নেপালে আসতে দেয়। শুধু গ্যাস নয়, নেপালের জনগোষ্ঠী বরাবরই একমাত্র ভারতের ভেতর দিয়ে রান্নার গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ভারত নেপালের সব শ্রেণীর জনগণের এই মৌলিক চাহিদা জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্যের চাহিদাকে পণবন্দী করে চাপ প্রয়োগের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিশেষত নেপালের ওই তিন প্রধান দল পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নেপালে ভারতের সব প্রভাব ও স্বার্থ অস্বীকার করেছিল। এরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই তিন দল সমন্বিতভাবে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা। এই ঘোষণা দেয়া মাত্র যেন নেপালের রাজনীতিতে ভারত আসলেই সব নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব হারিয়ে ফেলেছে, সেটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। তাই দিগবিদিক হারিয়ে ভারত পাঁচ মাস ধরে সব ধরনের পণ্য নেপালে যেতে বাধা দিয়ে অবরোধ করে রাখে। এই চরম পদক্ষেপের পথ ধরাতে নেপালের গরিব সাধারণ মানুষের স্তরেও জন-মন থেকে ভারতের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এত দিন সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল রাজনীতিকদের স্তরে, তা এবার সেখানে সীমিত না থেকে সর্বস্তরের আমজনতা লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছিল। হতে পারে ভারত এ দিকটি নিয়ে যথেষ্ট ভাবেনি অথবা তার সব কার্ড ফুরিয়েছিল। তবে সব হারানো ভারত চিন্তাও করেনি এর কাফফারা কী হতে পারে। কারণ পণ্য অবরোধের মূল ধাক্কা বিশেষ করে জ্বালানি অবরোধের ধাক্কা খেয়েছিল স্বল্প আয়ের মানুষ। এদের জীবনও ভারত পণবন্দী করে ফেলেছিল। এরই ফলাফল হিসেবে নেপাল-ভারত সম্পর্কের মধ্যে এখন জনগণের পর্যায়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভারতবিরোধী মনোভাব।
    নেপাল-ভারত সীমান্ত প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আগে যেখানে ছিল আরেক পাড়ায় গিয়ে সওদা কেনার মত, আজ সেই সম্পর্কের মধ্যেও যেন আগুন লেগেছে। সীমান্তে এক কালভার্ট নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। আর তাতে আলাপ-আলোচনার পথে গিয়ে নয়, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে নেপালিদের সাথে এই বিরোধ মোকাবেলা করতে গিয়ে গুলি করায় এক নেপালি তরুণের (গোবিন্দ গৌতম) মৃত্যু হয়। ভারতের দুর্দশা এখন এমন যে, ক্ষুব্ধ মারমুখী নেপালি সাধারণ জনগণকে মোকাবেলা করতে ভারতকে নিজের রক্ষীবাহিনীর ওপর ভর করতে হচ্ছে। অথচ ভারত গত বছর প্রায় পাঁচ মাস ধরে নেপালে পণ্য চলাচল আটকে রেখেছিল, কনস্টিটিউশনের বিরোধিতা করেছিল। এসব নাকি নেপালের সীমান্তবর্তী জনগণের স্বার্থেই! আজ নেপালি পুলিশের ভূমিকা হলো লড়াকু নেপালিদের ফেরানো, যেন তারা ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মারমুখী না হয়।
    ঘটনার সূত্রপাত ও সারসংক্ষেপ হল, সীমান্তে নেপালের কালভার্ট নির্মাণকে কেন্দ্র করে কিছু ভারতীয় দাবি করে, কালভার্টের অপর পার নোম্যান্সল্যান্ডে পড়েছে, তাই তাদের আপত্তি আছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নেপালি পক্ষের বক্তব্যও জোরালো। কারণ তাদের কথা হল, সীমান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক টেবিলে বসে ঠিক করা হোক। আর আসলেই তা টেবিলেই ছিল। কিন্তু সেটাকে বল প্রয়োগের স্তরে নিয়ে গিয়েছে ভারতীয় পক্ষই। আর কেন এতে এক নেপালিকে হত্যা করা হলো? ফলে তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।
    নেপালের ‘মাই রিপাবলিকা’ ইংরেজি দৈনিক গত ১১ মার্চ নেপালি সরকারি কর্মকর্তার বরাতে লিখছে, ভারতীয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ঐকমত্য ভঙ্গ করে নেপাল-ভারত সীমান্তে কাঞ্চনপুর জেলায় আনন্দবাজারে নির্মীয়মাণ কালভার্ট ভেঙে দিয়েছে। আর তা থেকে ডেকে আনা মুখোমুখি সঙ্ঘাতে একজন নেপালি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে গত ৯ মার্চ। নেপালের স্থানীয় সমাজকর্মী হরি লামসাল বলছেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে উভয় দেশের স্থানীয়রা ও নিরাপত্তা সদস্যরা মিলে একমত হয় যে, কালভার্ট নির্মাণ হবে। কিন্তু পরে এই একমত হওয়া বিষয়টি না মেনে তারা কালভার্ট ভেঙে দেয়।’ কাঞ্চনপুর জেলার এসপি প্রকাশ বাহাদুর চাঁদও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, ‘দুই দেশের কর্তৃপক্ষ একমত হয়েছিল এই নির্মাণে। অথচ পরে ভারতীয় পক্ষ এককভাবে এটা ভেঙে দিচ্ছে। এটাই সীমান্ত উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।’

    ঘটনাস্থল ভারত-নেপাল সীমান্তে নেপালের কাঞ্চনপুর জেলার ‘পুনর্বাসন মিউনিসিপালিটির’ অন্তর্গত। ওই মিউনিসিপালিটির প্রধান নির্বাহী শের বাহাদুর বুধা বলেন, তারা নেপালের মাটিতে ওই কালভার্ট নির্মাণের জন্য পাঁচ লাখ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। নেপাল ও ভারতীয় পক্ষ কালভার্ট নির্মাণে একমত হওয়ার পরই ওই ফান্ড মিউনিসিপালিটি অনুমোদন করেছিল। ওই জেলা পুলিশ অফিসার এবং তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ গত ২০ ফেব্রুয়ারি দু’জনে বসে ওই নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। সেই সূত্রে নেপালের সংশ্লিষ্ট উপপ্রধান জেলা অফিসার (ডেপুটি ডিসি) ও তার ভারতীয় প্রতিপক্ষও পরের দিন একসাথে বসে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্থানীয় ভারতীয়রা বুধবার সন্ধ্যা (৮ মার্চ) ৬টার দিকে কালভার্টটি ভাঙা শুরু করেছিল আর স্বভাবতই তা নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়।
    বাংলাদেশের সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের ভারতীয় রক্ষীবাহিনী নাম যেমন বিএসএফ, নেপাল-ভারত সীমান্তে এখানে সে বাহিনীর নাম এসএসবি (সশস্ত্র সীমা বল)। রিপাবলিকা লিখছে, ‘ভারতীয় এসএসবির একজন এএসপি আর কে মোড়ল স্বীকার করেছেন, কালভার্টটি দুই দেশের সম্মতি অনুসারে নির্মিত হচ্ছিল।’ এ ছাড়া কাঞ্চনপুরের পাশের জেলা কাইলালির (এটাও নেপালের আরেক ভারতীয় সীমান্ত জেলা শহর) চিফ জেলা অফিসার (ডিসি) গোবিন্দ রিজালের বরাতে আরো জানিয়েছে, রিজাল পরের দিন (১০ মার্চ) ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করেছেন। তিনি জানান, ‘আমরা তাদের বলেছি, দ্বিপক্ষীয়ভাবে একমত হওয়ার ভিত্তিতে এরপর তৈরি করা কালভার্ট তারা একতরফা ভেঙে দিতে পারে না।
    ৯ মার্চ সকাল থেকেই ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেপালিরা সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকে। কোনো কোনো মিডিয়ার (যেমন নিউইয়র্ক টাইমস), অনুমানে তারা প্রায় ১০ হাজারের বেশি। তারা ভাঙা কালভার্টের স্থানে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। আর তা রুখতে সীমান্ত সীমার অপর পারে ভারতীয় এসএসবিও সমবেত হয়। ৯ তারিখের রিপাবলিকা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে লিখেছে, এসএসবির লোকাল ইউনিট চিফ যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘থানেদার’ ডাকা হয়, পিস্তল বের করে পরপর চারটি ফায়ার করেন এবং চতুর্থ শটটি গোবিন্দকে কোমরে আঘাত করে। কথাগুলো বলছিলেন, দেবেন্দ্র খাড়কা, তিনি মৃতব্যক্তির এলাকার। খাড়কা বলেন, ‘বুলেটটি গোবিন্দের কোমর বরাবর আঘাত করলে সাথে সাথে ও পড়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘থানেদার অরবিন্দ কুমার শুক্লা গুলি ছোড়ার আগে নেপালি প্রতিবাদকারীদের ছোড়া পাথরে আঘাত পেয়েছিলেন। গুলিতে আহত গোবিন্দকে ধানগাড়ী সিপি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি।’
    ঐকমত্যে নির্মিত কালভার্ট ভেঙে দেয়া আর এসএসবির গুলি ছোড়ার ঘটনায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। কিন্তু তাতে আরো ঘি ঢেলে দেয় নেপালের ভারতীয় হাইকমিশন। এ ঘটনায় হাইকমিশন এক টুইট বিবৃতি প্রচার করে। কিন্তু সেটা সব দায় অস্বীকার করা এক বক্তব্য। ‘কাঞ্চনপুরের আনন্দবাজার সীমান্তে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যেখানে এসএসবি গুলি ছুড়েছে’ বলে ওই বিবৃতি সব কিছুই অস্বীকার করেছিল। বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা ছিল খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপেশাদার কাজ।
    এতে স্বভাবতই ফুঁসে ওঠা নেপালি সাধারণ মানুষ, ভারতবিরোধী স্লোগান তুলে সারা নেপাল তোলপাড় করে ফেলেছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠায় ভারত এক দিন পরই অবস্থান বদলায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, তাদের অবস্থানের রেকর্ড ঠিক রাখার চেষ্টা হিসেবে এসএসবি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে । আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির হয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহমর্মিতা জানান এবং তদন্ত করে দেখছেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। ইতোমধ্যে নেপাল সরকার গুলিতে নিহত গোবিন্দ গৌতমকে শহীদ ঘোষণা করে এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাঞ্চনপুর জেলার ডোডা নদীর তীরে তার সৎকারের আয়োজন শুরু করে।
    এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান যে ভুল ছিল এর প্রতিফলন ঘটে ভারতের এনিডিটিভির এক রিপোর্টের শিরোনামে। তা হলো ‘সীমান্ত হত্যায় প্রতিবাদ প্রতিরোধ বেড়েই চলছে। ফলে ভারত নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তদন্ত করার প্রতিজ্ঞা করেছেন।’ ইতোমধ্যে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালাস্টিক পরীক্ষার রিপোর্টেও নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন, এই বুলেট এসএসবির। ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওই রিপোর্ট তিনি হস্তান্তর করেছেন। সুষমা শাস্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।
    অপর দিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখার নির্বাহী পরিচালক আকার পাতিল নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দাবি করেন, বিশেষ করে ভারতীয় এসএসবির সদস্যরা ‘প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ করেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে দাবি জানান। নেপালে এবারের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয়, মিডিয়ায় রিপোর্টিংয়ে সঠিক আইনি ভাষা প্রয়োগ। বেশির ভাগ মিডিয়া শুরু থেকেই খুব বেছে একটা শব্দ প্রয়োগ করেছে- ‘হাইহ্যান্ডেডনেস’। কথাটির আইনি অর্থ হলো- কোনো নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, যেমন কাউকে গ্রেফতার করে গাড়িতে উঠানোর সময় কোনো বাধা না দিলেও তাকে টেনেহিঁচড়ে অথবা অযথা কোমরে একটা রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে মেরে তোলা অথবা প্রতিহিংসামূলকভাবে বল প্রয়োগ ইত্যাদি। মাই রিপাবলিক পত্রিকা আইনি শব্দে নেপালিদের ভাষ্য খুবই সফলভাবে তুলে ধরেছে। যেমন পর্যবেক্ষণ ধরনের ১১ মার্চের এই রিপোর্ট লিখছে, ‘একটা দেশের একজন নাগরিক অন্য দেশের (বাহিনীর) ছোড়া গুলিতে মারা যাওয়া; এটা খুবই সিরিয়াস ইস্যু। এটা এমন এক ইস্যু যা সর্বোচ্চ সতর্কতা, যতœ ও সূক্ষ্ম সেনসিটিভ বিষয়াদির দিকে খেয়াল রেখে নাড়াচাড়া করা উচিত।’ পত্রিকাটি কথাগুলো বলছিল ভারতীয় হাইকমিশনের দায় অস্বীকার করা বিবৃতি দেখে। তাই আরো বলছিল, ‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেই টেনশন কমানোর বদলে হাইকমিশনের ঘটনার দায় অস্বীকার করা; এমনকি এসএসবির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ন্যূনতমভাবেও এটাই বলতে পারেনি যে, আমরা ব্যাপারটা আরো খুঁজে বা যাচাই করে দেখব। অ্যাম্বাসি অফিসিয়ালদের এমন আচরণ যদি চলতে থাকে তবে নেপালে ভারতের দীর্ঘ পণ্য অবরোধে ইতোমধ্যেই (২০১৫ সালে) দাগ লেগে থাকা নেপাল-ভারত সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে। এ সবের ফলাফলে ভারতবিরোধী যে জ্বর এখন নেপালে বয়ে যাচ্ছে, তা দিয়ে নেপালে ভারতের কোন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল। এভাবে ভারত প্রসঙ্গে আমাদের মুখ যদি এত তেতো হয়ে যায়, তাতে স্বভাবতই এর প্রতিফল হিসেবে জনগণের ভেতর থেকে একটা চাপ প্রবল হতে থাকবে যে, চীনের সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করো। স্বভাবতই এটা ভারতের জন্য সবচেয়ে বাজে এক ব্যাপারে হবে। সেজন্য নেপালের পাবলিক সেন্টিমেন্টের বিষয়ে আরো সেনসিটিভ হতে নেপালে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আহ্বান জানাই। নেপাল-ভারত সম্পর্ক ইতোমধ্যে অনেক জটিল হয়ে গেছে, একে আর জটিল করবেন না।’
    ভারতের সাথে নেপালের সীমান্তবিরোধ কী করে মোকাবেলা করতে হয়- তা সবার জানা-বোঝার জন্য নেপালের জনগণ এখানে কিছু শিক্ষা রেখে গেল।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে ০৯ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]