Category: Eileen Laubacher

  • আলী রীয়াজদের সংকট এবং আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    গৌতম দাস
    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

     

       র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ৫ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

     

     

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও! 

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।
    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি! 

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।
    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর! 
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?


    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত”
    এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!
    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!
    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

     

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!
    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।
    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।
    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!
    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!
    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!
    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

     

     

     

     

     

     

     

     

    নিচে উপরের লেখাটারই একটা সাদামাটা রচনা বা Plain Text ভার্সান দেয়া হল পরীক্ষামূলকভাবে,  অনেকে বলছেন এতে লেখা মোবাইলে পড়তে সুবিধা হবে। পাঠকেরা মন্তব্য জানাবেন আশা করিঃ

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে!
    গৌতম দাস

    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও!

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।

    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি!

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।

    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর!
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?

    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!

    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!

    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

     

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!

    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।

    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ  https://thefederal.com/…/will-us-do-a-bosnia-on…/

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।

    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!

    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!

    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!

    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০