Category: China Containment

  • বাংলাদেশে ‘ভারতের সমর্থনের সরকারও’ কাজ করছে না

    বাংলাদেশে ‘ভারতের সমর্থনের সরকারও’ কাজ করছে না

    গৌতম দাস

    ১৮ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার

    http://wp.me/p1sCvy-2eC

     

    প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষ হবার পর সপ্তাহ পার হতে চলছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা এখন শেষ হয়েছে ধরে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকেই সবচেয়ে বড় সমালোচনার আসর ছিল বলা যায়। যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সফরকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সম্মেলনের আবহাওয়ায় নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে সাধারণত প্রচুর জল্পনাকল্পনা হয়ে থাকে। আর তাতে উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যুর সম্ভাব্য অর্থ তাৎপর্য কী তা নিয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন বয়ান ব্যাখ্যা শুরু হওয়া সাধারণ ঘটনা। কিন্তু শেখ হাসিনার সফরকে ঘিরে সেসব বিবেচনায় যত আলাপ-আলোচনা উঠে থাকুক না কেন তা যথেষ্ট ছিল না। যেমন তিস্তার পানি ইস্যুতে আমরা মিডিয়াতে বিস্তর আলোচনা হতে দেখছি যে – কেন পানি দিচ্ছে না, কী সমস্যা, কী হলে দিতে পারে, কবে দিতে পারে, আদৌ দিবে কি না, অথবা কী হলে সমস্যার হাল হতে পারে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই আলোচনায় উঠে এসেছে। এরপরও নির্দ্বিধায় বলা যায় তবু মূল একটা বিষয় কোথাও আসেনি। কী সেটা? না, শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সবচেয়ে বড় সমর্থন জুগিয়ে চলেছে ভারত, বলা যায় এই সমর্থন সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। বাস্তবতা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে কম বেশি সব পক্ষই তা স্বীকার করেন। “ভারতের সমর্থনের সরকার” – ভারতের দিক থেকে দেখলে এটাই কী সবচেয়ে বড় কিছু দিয়ে দেয়া নয়? তাহলে এরপরে আরও কিছু কেন দিবার কথা ভাববে?
    ব্ব্র

    ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে দেখলে, এই সমর্থনকে তারা এক বিরাট দান বলে গণ্য করে। ভারতের এই দানের অনুভব এটা কেউ আমল করেনি। আর এই দান তারা বাংলাদেশকে দিলো, নাকি তাদের পছন্দের ব্যক্তি বা দলকে দিলো সবই তাদের কাছে সমান। কিছু আসে যায় না। যদিও এর ফারাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশাল হয়ত। কিন্তু ভারত গণ্য করবে দুই ক্ষেত্রেই তারা বাংলাদেশকে বিশাল কিছু দিয়েছে। আর ঠিক সে কারণেই আমরা আর যা কিছু ভারত থেকে আশা করছি তা তাদের চোখে বিবেচনায় আরো অতিরিক্ত, বাড়তি। এ কারণেই সব সময়ই ভারতের মনে প্রশ্ন উঠে কোনো বাড়তি বা অতিরিক্তগুলো সে আর কেন দেবে? বিনা নির্বাচনে একটা সরকার বসিয়ে দেয়া বা তাতে ভারতের সমর্থন দেয়া – এর একটা বড় রকমের মূল্য যে আছে সেটা ভারতকে বুঝিয়ে বলার কিছু নাই। ভারত এটা না বুঝার কথা নয়।

    হাসিনার ভারত সফরকে নিয়ে বিস্তর দিকে আলোচনা উঠেছে কিন্তু ভারতের এই দৃষ্টিকোণটা সব আলোচনাতেই অনুপস্থিত। অথচ এটাই ভারতের মুখ্য দৃষ্টিভঙ্গি।
    তিস্তায় বা অন্য কোনো যৌথ নদীর বেলায় পানি, এটা তো বাড়তি; এই পানি ভারত কেন দিবে? অথবা ট্রানজিটের মূল্য কেন দেবে, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার করতে পারবে না কেন, সীমান্তে লোক মারা বন্ধ করা ইত্যাদি। আগেই তো সরকারে সমর্থন দিয়ে রেখেছে! এক কথায় বললে সমর্থন দিয়ে সরকার ক্ষমতায় রাখার মূল্য এতই অমূল্য বা তা সীমাহীন হওয়ারই কথা। ফলে সেই অমূল্যদানের পরে এরপর আবার বাংলাদেশের আর কোনো মূল্য চাওয়ার আছে এটা তারা গণ্য করতে রাজি না হওয়ারই কথা। সরকার বসিয়ে দেওয়ার পর সেই সরকারের আর কতটা বারগেন-দড়কষাকষির অবস্থা অবশিষ্ট থাকে! বাকী সব ডিমান্ড সেকেন্ডারী গুরুত্বের হয়ে যায়।
    তিস্তার কথাই ধরা যাক, সবশেষ ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা ইস্যু প্রসঙ্গ সবচেয়ে জীবন্ত ছিল। ভারত তখ্নও পানি দিতে পারেনি বা চায়নি। কেবল নাম-কা ওয়াস্তে একটা চুক্তি করে রাখতে চেয়েছিল। বড় জোর যেমন গঙ্গাপানি চুক্তি। চুক্তির সাথে বাস্তবে পানি প্রাপ্যতার সম্পর্কিত নয়। সেবার তিস্তার বেলায় সেটাও হয় নাই।  এরপর থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে হাসিনার দিক থেকে ভারতের সমর্থন পাওয়া স্বভাবতই এতই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক ছিল যে ওই নির্বাচনের দুই বছর আগে এবং পরে নির্বাচনের একই  সাথে তিস্তা প্রসঙ্গ তোলা হত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তোলার বিষয়টা গুরুত্ওব যোগাড় করতে পারে নাই। নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া ব্যাপারটা যতই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে অন্য যেকোনো ইস্যু তুলনায় ততই গুরুত্বহীন হবে, তোলা হবে না এটাই তো স্বাভাবিক; বাংলাদেশ ততই ‘লেস ডিমান্ডিং’ হবে। বাংলাদেশের এই দুর্বলতার দিকটা ভারতীয় কূটনীতিকদের টের না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই ঠিক এর পাল্লা দিয়ে যেন ভারতের অবস্থা হয়েছে তাদের স্তবার্তথের ইস্যুতে  ‘এন্ডলেস ডিমান্ডিং’।
    সরকারে রাখার সমর্থনের ‘বিনিময় মূল্যও’ দাবি হয়ে পড়েছে অফুরন্ত। আবার ২০১৭ সালের হাসিনার ভারত সফর, এখানেও তিস্তা গত ছয় বছরের মতোই কোনো ইস্যু ছিল না, হতে পারেনি। কারণ এবার হাসিনার কাছে এর চেয়ে অনেক অনেক উঁচু প্রায়োরিটির একনম্বর ইস্যু ছিল ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’। অর্থাৎ ডিফেন্স প্যাক্ট না করে আপাতত শুধু একটা এমওইউর মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রেখে যদি ফিরতে পারেন, এটাই হবে তাঁর বিরাট অর্জন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী একবার স্পষ্ট এই ভাষাতেই কথাটা বলে ফেলেছিলেন।

    ভারতের সাথে চীনের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধ আছে, থাকাই স্বাভাবিক। সব রাষ্ট্রের সাথেই যেমন সবার থাকে। আর মূলত যে কারণে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র বলে নিজেকে গণ্য রাখে, টিকিয়ে রাখে মিলে যায় না। যেকোনো বড় দুই ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রেরও স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্ট আলাদাই হয়, সঙ্ঘাতমুখর হতে পারে। আবার সব রাষ্ট্র একই কূটনৈতিক পথে নিজের স্বার্থবিরোধ নিয়ে লড়ে আর, আদায় ও মোকাবেলা করে না। নানান কায়দা সেখানে থাকে, নরম-গরম, গিভ অ্যান্ড টেক, কোনো ইস্যুতে নরম হলেও আবার একই সময়ে আর এক ইস্যুতে গরম ইত্যাদি সব কিছুর মিশাল, এটাই এই শতকের কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শুধু এই স্বাভাবিক বিষয়টাই ভারত-বাংলাদেশ এখানে কার্যকর নয়। কিছু সীমিত কার্যকর দিক থাকলেও তা মুখ্য নয়।  এখানে ব্যতিক্রম বা বাড়তি বিষয়টা হল, ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, ‘বাংলাদেশ’ সেটা তো আমাদেরই সরকার। তাই ভারতের দাবি ও আকাঙ্খা হল, তাহলে চীন-ভারত স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ যেসব জায়গায় সঙ্ঘাতপূর্ণ সেখানে বাংলাদেশ মানে হাসিনা সরকার নিজের সব কিছু ভুলে ভারতের স্বার্থে অবস্থান নেবে না কেন?  বাংলাদেশে যেকোন অবকাঠামো প্রজেক্ট থেকে চীনকে বাংলাদেশ দূরে রাখুক – এটা ভারতের কাম্য।  ভারতের সব ডিম্যান্ডের-আর্গুমেন্ট, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাঙ্খা এখান থেকেই। এটাকে বলা যায় হাসিনা ভারতের ‘দাবির জবরদস্তির’ ভেতর পড়ে গেছে। কারণ ভারত এমন পেতে পেতে এভাবে নিতে ও পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেন এমন হলো?
    একটা উদাহরণ নেয়া যাক। ডিপ সি পোর্ট বা গভীর সমুদ্রবন্দর। কক্সবাজারের  সোনাদিয়ায় টেকনিক্যাল স্টাডি করে লোকেশন পছন্দ করা, ফিজিবিলিটি ভায়াবিলিটি নিরীক্ষা সব শেষ হওয়ার পরও ২০০৯ সালে এই সরকার আসার পর ঐ প্রজেক্ট ঠেলতে ঠেলতে এখন সোনাদিয়া একেবারেই বাদ করে দেয়া হয়েছে। আবার ভারত এর বদলে পোর্ট অন্য কোথাও  কিছুই না করার পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষে ‘পায়রায়’ বিকল্প বন্দর পছন্দ করেছে। যেন এটা খামখিয়ালের বিষয়। আর তবুও এই প্রজেক্টে ভারতকে অযাচিত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অযাচিত এই অর্থে যে অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকা সত্ত্বেও ভারতকে ছোট অনুসঙ্গী করে প্রজেক্টে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবু প্রজেক্টে মূল পোর্ট গড়ার কাজ চীনকে দিতেই হয়েছে। কারণ অন্য কারও কোন অর্থ বিনিয়োগের সংস্থান মুরোদ নেই, কেবল ভারতের ইচ্ছাকে জায়গা দেয়া এটা বাংলাদেশ দিতে চাইলেও তো দিতে পারা সম্ভব নয়, সম্ভব নয়। মূল প্রশ্ন বিনিয়োগ কে দেবে? আর এই মারাত্মক কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পিপিপি বা ব্যক্তি উদ্যোগ ঢুকানো হয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্প আর বাণিজ্যিক প্রকল্পের ফারাক আর বজায় রাখা হয়নি। যেন যমুনা সেতু নামমাত্র সুদের অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে করে বাংলাদেশ ভুল করেছে। এতে ট্রাকপিছু এর টোল এখনো এক হাজার টাকা। এর বদলে ওই সেতু যদি (২-৬% সুদের) বাণিজ্যিক প্রকল্প অথবা পিপিপি করতাম তাহলে টোল পড়ত ট্রাকপিছু তিন হাজার টাকা, এটাই ভালো হত। তাই কী? এমন এক বেলজিয়াম কোম্পানিকে ঢুকানো হয়েছে মূল চ্যানেল খননের কাজে। আর পুরো প্রজেক্টটাই জি-টু-জি তে চীনকে। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশ থেকে টেন্ডার আহ্বান উঠে গেছে। যদিও এখনো বিনা সিক্রি টকশোতে বলে বেড়াচ্ছেন মূল প্রজেক্ট নাকি চীনকে না, ডাচদেরকে দেয়া হয়েছে।
    আচ্ছা সোনাদিয়ায় ভারতের আপত্তির মূল বক্তব্য কী? ভারতের বক্তব্যকে কোনো যুক্তি হিসেবে মেনে নেয়া মুশকিল। ভারতের একটা সুপ্ত স্বপ্ন-আকাঙ্খা আছে, তা হলো চীন বাংলাদেশে কিছুই করতে পারবে না। মুরোদের খবরহীন ফালতু এসব স্বপ্ন নিয়ে কথা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। ওবামার আমেরিকার একটা লক্ষ্য ছিল চীন ঠেকানো; চায়না কনটেইনমেন্ট। বুশ ও ওবামার আমেরিকা এটা ভারতকে সামনে রেখে ভারতকে দিয়ে যতদূর সম্ভব করাতে চাইত। ট্রাম্পের আমলেও ‘চীন ঠেকানো’ এখনও ট্রাম্পের আমেরিকার এজেন্ডা কিনা এখনও আমরা এর রিনিউয়াল কিছুই শুনিনি। কিন্তু ভারত তার পুরনো অবস্থানেই আছে, ‘চীন নাকি ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলল’, আমেরিকার এই শিখানো বুলি সে কপচে চলছে।
    সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর একটা বাণিজ্যিক প্রজেক্ট। কোনো ডিপ সি পোর্ট প্রজেক্ট যেটা নাকি আসলে ছুপা  স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হয়েছে বা হতে পারে এটা শোনা যায়নি। এর কারণ মূল প্রজেক্টটাই কমপক্ষে চার বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি একমাত্র এটা বাণিজ্যিক হলেই এই বিনিয়োগ ঋণের বোঝার দায় নিতে সে সক্ষম। কারণ স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হলে ওর বাণিজ্যিক রিটার্ন নেই। সারকথায় বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো প্রজেক্ট মানেই তা অবশ্যই বাণিজ্যিক  প্রজেক্ট হতে হবে। নইলে ঋণ শোধ করতে পারবে না। তাই  নিঃসন্দেহে সোনাদিয়া আসলেই ছিল এক বাণিজ্যিক প্রজেক্ট এবং বাংলাদেশকেও নিজে থেকেই যেটা নিশ্চিত করতে হবে –  চীনের সাথে কথা বলতে হতে পারে যে এটা মাত্র বাণিজ্যিক প্রজেক্টই হবে। এ জন্য যে এই বন্দর ব্যবহার করে চীনের সাউথ-ইস্ট, ভারতের নর্থ-ইস্ট এবং বার্মা সবাই মূলত নিজের নিজের ল্যান্ডলকড অঞ্চল বা এলাকাগুলোকে সমুদ্র যোগাযোগের আওতায় নাগালে আনবে। এটাই সবার মুখ্য আর বার্ণিং স্বার্থ। ফলে এর যেন শুধু বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এটা বাংলাদেশ নিজেই দায়িত্ব ও লিড নিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে ও চায়। ভারত এটাই বাংলাদেশের কাছে আশা করতে পারত। আর চীনের এতে আপত্তিরও কোনো কারণ থাকত না। নিজের ল্যান্ডলকড দশা ছুটানোটাই চীনের বিরাট ও মূল স্বার্থ। বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ হল, এটা যদি ব্যবহারকারীদের সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ শক্তভাবে রক্ষা করা যায় তবে সবার ব্যবহারে ব্যবহারকারী বেশি হওয়ায় পোর্টের বিনিয়োগ খরচ তুলে আনা সহজ ও দ্রুত সম্ভব। কিন্তু ভারত সে পথে না গিয়ে আমাদের সরকারের ওপর আবদারের চাপ তৈরি করে সোনাদিয়া বন্ধ করে দিল। যদিও অন্য কোন ডিপ সি পোর্ট না করার পক্ষে থেকে চুপ থাকতে পারেনি। সরকারের ওপর চাপ দিয়ে পায়রাতে রাজি করিয়েছে। কিন্তু কেন? এতে ভারতের কী লাভ হয়েছে? একমাত্র ঈর্ষা হাসিল করা ছাড়া? আচ্ছা চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক সামরিক প্রভাবও বাড়বেই। সেটাকে   ঠেকানো – ভারতের এই চিন্তা বড় জোর এক খড়কুটো নয় কী? আর এটা কি সেই পথ?  আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারতের সেই মুরোদ কৈ? আর বাংলাদেশ সেটা ভারতের ইচ্ছায় কেন ঠেকাবে? বাংলাদেশের কী লাভ হয়েছে এতে? ভারতেরই যেখানে মুরোদ নাই সেখানে বাংলাদেশের মুরোদ কোথায়? উলটা বাংলাদেশের বৈষয়িক সুবিধা আছে এখানে।  হাসিনা সরকারকে কেন, ভারতের যেকোনো বসানো সরকারকে তারা নিজের ব্যক্তিগত গোলাম বানিয়ে রেখেও তো বাংলাদেশের কোনো ডিপ সি পোর্টের চাহিদা ঠেকানো সম্ভব নয়। এটা অবজেকটিভিটি, এক বাস্তবতা।
    কিন্তু পায়রাতে সরিয়ে নেওয়াতে এখন ফলাফল কী হয়েছে? ভারতকে বাংলাদেশে চীনের সংশ্লিষ্টতাতেই একটা ডিপ সি পোর্ট তৈরি মানতেই হয়েছে। কিন্তু লোকেশন বদলে ভারতের কী লাভ হয়েছে? আমাদের অর্জন কী? সর্বশেষটা শোনা যাক। পায়রায় লোকেশন পছন্দ-পরিকল্পনার ভিতরে শুরু থেকেই ড্রাফটের সমস্যা ছিলই। ড্রাফট মানে গভীরতা বা নাব্যতার সমস্যা ছিল। তাই শুরু থেকেই নাব্প্রযতা ধরে রাখতে প্রবেশমুখ ও আশপাশের ১০-১৫ কিমি নিয়মিত ড্রেজিং করে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল।  এটাই সে পরিকল্পনাতে ত্রুটির  প্রমাণ। এরপরেও এর ড্রাফট সোনাদিয়ার সমপর্যায়ের লেভেলে পৌঁছাবে না, সমান হবে না এটা সবাই জানত। এখন সেই দায়ভার আগেই ঝেড়ে ফেলতে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলে বসেছেন, ‘পায়রা বন্দরের স্থান নির্বাচন সঠিক হয় নাই’, গত ১০ এপ্রিলের দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বরাতে আমরা এ কথা জানছি। এখন একনম্বর প্রশ্ন হল, তাহলে সোনাদিয়া বাদ দেয়া আর পায়রায় নতুন স্থান নির্বাচন  কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছিল? বাণিজ্যিক ঋণ নিয়ে বড় অবকাঠামো প্রজেক্টে এসব খামখেয়ালিপনা করা হচ্ছে কেন? আমরা চাইলেই কি ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব? করা উচিত হচ্ছে? এর অর্থনৈতিক দায় কে নিবে?

    ভারত সফরের একমাস আগে থেকে আমরা দেখলাম ভারত চলতি সরকারের বদলে অন্য কাউকে সরকারে রাখার কথা ভাবতে পারে এই সন্দেহ হাসিনার সরকারে হাজির হয়েছে। আবার ভারতেরও সন্দেহ হয়েছে চীনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের পক্ষে ‘তাদের সমর্থিত সরকার” সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সম্ভবত তাদের পক্ষে থাকছে না!
    এসব মিলিয়ে এটা আজ পরিষ্কার ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ বাংলাদেশে এটা কোনো কাজের না, ফাংশনাল না, কাজ করছে না। এটা কার্যকর থাকছে না, থাকবে না। আমরা চাইলেই ভারতের খুশিতে খামখেয়ালিভাবে পায়রায় বন্দর করতে পারছি না। সম্ভব নয়।

    ওদিকে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কথাটারই আর এক অর্থ হল, এর প্রভাবে বাংলাদেশে এখন নির্বাচন আয়োজন ঠিকঠাক মত করা না করার সাথে ক্ষমতার কোনোই সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের বাইরে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এটাই আজকের হাসিনার সরকারের রীতি। কিন্তু তা ওয়ার্কেবল কী? হাসিনার সব মিলিয়ে আট বছর অভিজ্ঞতা বলছে না যে তা খুব সুখকর কিছু। এর চেয়ে বড় বিষয় ইতোমধ্যেই হাসিনা নিজেকে ভালনারেবল বা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছেন। জনগণের সাথে থেকে মোকাবেলা, সাথে নিয়ে থাকা, নির্বাচন ইত্যাদি সবকিছু থেকে দূরে চলে গিয়েছে দল এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতার বিকল্প যে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কোনো মতেই নয় এটা বোঝার মতো কানে পানি যাওয়ার কথা। ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ হাসিনার জন্য আরো রিস্কি ও অনিশ্চিত এক পথ, এই বাস্তবতা ক্রমে বাইরে আসা স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে। হাসিনা কি সাহসের সাথে নিজের সে অনুভব পক্ষে কাজ করতে পারবেন? কারণ সেটা হাসিনা পারেন আর নাই পারেন এটা প্রমাণিত যে ‘আমরা চাইলেই ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব না।
    হাসিনার ভারত সফর-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে, “ভারতে গিয়ে আরো পাঁচ বছরের দাসখত দিয়ে আসলেন কিনা, অথবা আরো পাঁচ বছরের ক্ষমতা নিশ্চিত করে আসলেন কিনা” , এমন প্রশ্ন উঠেছিল। সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন হাসিঠাট্টা করে প্রধানমন্ত্রী জবাব দিয়েছেন। এটা কিন্তু তেমন ঠাট্টার বিষয় নয়। গত ২০০১ সালে বিএনপি ভারতের কাছে দেশ বেচছিল সেকারণে ২০০৯ অথবা ২০১৪ তে আওয়ামী লীগের বেচাটা জায়েজ বা ভালো। এটা গ্রহণ করার মতো বয়ান বক্তব্য নয়। বাংলাদেশ অথবা এর কোনো রাজনীতিকের ভবিষ্যৎও ঐ বয়ানে নেই। এই কথা তাই কাউকে ভালো লাগার মতো কথা নয়। ফলে আমরা যত ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’  এরপরেও চেষ্টাই করতে দেখি না কেন, জনভিত্তি গড়া ও জনসমর্থন ধরে রাখা-মুখী রাজনীতি ও সরকার আবার ফিরে আসবেই। অচিরেই ফিরবে, অভিমুখ সেটাই। আমাদের কী সাহস হবে অভিমুখ চিনে সাড়া দিবার!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে ১৬ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। ১৮ এপ্রিল অনলাইন দুরবীন ম্যাগাজিনেও ছাওয়া হয়েছে।  সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

  • ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

    ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

    গৌতম দাস

    ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

    http://wp.me/p1sCvy-2cF

     

     

     

    বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

    ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
    আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

    কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়।

    চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

    তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
    ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

    অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
    মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

    Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

    বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

    না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

    এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

    বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

    তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

    ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]