Category: BJP

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

    মোদি মুসলমান ‘নির্মূলের’ উস্কানি তুলছেন

    গৌতম দাস

    ০৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3S5

     

    সাধুবেশে মুসলমান গণহত্যা-নির্মুলের প্রধান উস্কানিদাতা

    Is India Headed for an Anti-Muslim Genocide?

    প্রশাসনিকভাবে ‘হরিদ্বার’ যদিও একটি জেলা শহর মাত্র, কিন্তু এটা ভারতে হিন্দুদের এক গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান [pilgrimage]। বয়স্ক হিন্দু নারী-পুরুষের কাছে সাধারণত এক আগ্রহ ও আকাঙ্খার নাম হরিদ্বার যে, যদি তিনি একবার তীর্থের উদ্দেশ্যে হরিদ্বার ঘুরে আসতে পারতেন!  তীর্থ মানে হল পূণ্যসঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে কোন “পবিত্র স্থান”  ভ্রমণ। পবিত্র স্থান মানে সেসব জায়গাকে হিন্দু ধর্মীয় মিথিক্যাল ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান মানা হয়েছে। সাধারণত দেখা যায় বেশিরভাগ এমন তীর্থস্থানগুলো ভারতের উত্তরপ্রদেশেরও সর্ব-উত্তরে (ভারতের দিক থেকে উত্তর-পুর্ব কোণে) প্রায় নেপাল সীমান্তের কাছে।
    গত ২০০০ সালের আগে এই হরিদ্বার ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের অংশ। কিন্তু গত নভেম্বর ২০০০ সালে উত্তরপ্রদেশের সর্ব-উত্তর অংশকে প্রশাসনিকভাবে উত্তরাখন্ড [Uttarakhand] নামে আলাদা আরেক রাজ্য বলে এর জন্মের ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তাই হরিদ্বার এখন নবগঠিত উত্তরাখন্ড রাজ্যের ১৩ জেলার একটা। তবুও উত্তরাখন্ড ভারতের ছোট ছোট রাজ্যের কাতারেই রয়ে যায়। কারণ একটা তুলনা করলে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার (রাজ্য সরকার যে নির্বাচিত সংসদের হাতে গঠিত ও জবাবদিহিতা করে থেকে) ২৯৪ আসনের চেয়ে উত্তরাখন্ডে বিধানসভা মাত্র ৭০ আসনের , আবার কেন্দ্রীয় সংসদের আসন নিয়ে যদি তুলনা করি তবে পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনের তুলনায় উত্তরাখন্ডের আসন মাত্র পাঁচটা। তবে এটা একটা জনসংখ্যাগত ধারণা পাওয়ার জন্য তুলনা মাত্র।

    ওদিকে উত্তরপ্রদেশ মানে কুখ্যাত যোগী আদিত্যনাথ যার (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী; যিনি জনপ্রতিনিধির পরিচয়ের চেয়ে কট্টর ধর্মীয় জবরদস্তির এক শাসক হিসেবে বেশি নাম কামিয়েছেন। পুরানা সেই উত্তরপ্রদেশের এক জেলা হরিদ্বার তীর্থক্ষেত্র হিসেবে নামডাকের আরেক কারণ, এটা হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত। ফলে দু’টি নদী যমুনা ও গঙ্গা নদীর প্রবাহের শুরু, হিমালয়ের গা-চুইয়ে আসা বরফগলা পানির উৎস, এখান থেকেই। এই নদীর পানিতে স্নান, এর স্বর্গীয় প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আছে – এই মিথ [Myth, মুখে মুখে প্রচলিত বহুপুরানো কোন ধারণা] সেখানে প্রচলিত। এ’কারণে এখানে গঙ্গাকে শুধু গঙ্গা না বলে আগে পবিত্র শব্দ বসিয়ে মানে ‘পবিত্র গঙ্গা’ লেখা বা উচ্চারণ এর রেওয়াজ। যদিও বর্তমানে সারা হরিদ্বারের মানুষের বসবাসের প্রধান সঙ্কটের নাম পানি। খাবার পানি বা চাষাবাদের পানি দু’টিরই সঙ্কট এখানে। নদী দূষিত আর পানি প্রাপ্যতা কমে গিয়ে শহর এলাকাগুলোয় হাহাকার উঠেছে।

    উত্তরাখন্ডের ভেতরেই হরিদ্বার আর  এই হরিদ্বার থেকে মাত্র কুড়ি কিমির বাস-দূরত্বের মধ্যেই আবার আরেক তীর্থের শহর ঋষিকেশ। ঋষিকেশ যোগ [Yoga] (পপুলারলি যা এটা ‘যোগব্যায়াম’ বলে পরিচিত) ও ধ্যান বা মেডিটেশন – একে বুঝবার জানবার শহর।  এ’ছাড়া আরেক মিথিক্যাল গঙ্গাস্নানের ভুমিঘাট হল “কুম্ভমেলা” সেটাও এখানেই এই হরিদ্বারে। যা ১২ বছর পরপর আয়োজন করা রীতি আর এসময়ে গঙ্গাস্নানে খাস পুণ্য মিলবে- এ্মন বিশ্বাসে বা লোভে এবার (২০২১) সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীর নিজের উদ্যোগে করোনার প্রকোপের মধ্যেও এ’মেলার আয়োজন চালু রেখেছিলেন। আর তাতে করোনাভাইরাসের সেকেন্ড ওয়েভে ভারতের প্রশাসন ও অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। না ভাইরাসে আক্রান্তদের ভাগ্যে  হাসপাতালের বেড অথবা শ্বাস সহজের অক্সিজেন মিলেছে কিংবা মারা যাবার পর সৎকার – কোনোটাই ঠিকমত কপালে জুটেনি কুম্ভমেলায় অংশগ্রহণকারীদের-সহ উত্তরপ্রদেশ ও ভারতের প্রায় সব শহরের বাসিন্দাদের। মোদি সরকারের সেকেন্ডম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যন্ত দল বেঁধে গায়ে গা লাগিয়ে কথিত পুণ্যস্নানের লোভ সামলাতে পারেননি। এমন পুণ্যস্নানের পরে সৎকারবিহীন মৃত্যু যাদের হয়েছে তা নিয়ে খুব কিছু বলাও আসলে অস্বস্তিকর!

    অর্থাৎ সাধারণভাবে মূলত ধর্মীয় ভিজিটর বা ট্যুরিস্টের শহর হরিদ্বার আর এটাই এর অর্থনৈতিক ভিত্তি। আর কমবেশি সারা উত্তরাখন্ডই এমন। যার পিছনের অর্থ হল – বড়লোক ট্যুরিস্ট নয়, পুণ্য আদায়ের লোভে বা বলা যায় স্পিরিচুয়াল চাহিদা মিটাতে নিম্ন আয়ের যারা এরাই এই শহরের প্রধান ভিজিটর। আর এ’ফ্যাক্টরের কারণে উত্তরপ্রদেশের যেকোনো নতুন স্থাপনা বা অবকাঠামো বা কারখানা উতপাদন তা আর এই ঘিঞ্জি তীর্থস্থানগুলোতে নির্মাণ করা নয়; বরং এদেরকে পাশ কাটিয়ে অন্য শহরে স্থাপিত হতে শুরু করেছিল। আর ততই এসব তীর্থস্থানের শহুরগুলো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নাম নিয়েছে। আর একপর্যায়ে নবগঠিত উত্তরাখন্ড হল আসলে তেমনই ওসব পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর সমাহার। মানে পিছিয়ে পড়া শহরহুলোকে নিয়ে গঠিত নতুন রাজ্য। এবার কড়া সত্যটা বলি, এরই পরিণতি হল, উত্তরাখন্ড তাই সাধু-সাধ্বীদের [সাধু শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ সাধ্বী] দ্বারা নিয়ন্ত্রিত শহর। স্বভাবতই তাই বিজেপি-আরএসএসের বহু নামি-বেনামি অঙ্গসংগঠনের সক্রিয় তৎপরতার প্রধান শহর এটা। আর এসব ধর্মীয় নেতার প্রধান কাজ রাজনীতিবিদ ও রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে দায়-দায়িত্বহীন উস্কানি ও হুঙ্কার তুলে কথা বলা। আমাদের আজকের প্রসঙ্গ এটাই!

    দুই মাস আগে আমার এক লেখায় ত্রিপুরার মুসলমানদের উপর নিপীড়নে করুণ মার্জিনাল অবস্থা লক্ষ্য করে  বলেছিলাম, মোদি এখন সব হারানো মুসাফির, পাবলিক রেটিং যার তলানিতে। তাই সে এসব অপরাধমূলক নিপীড়নের রাস্তা ধরেছে। আর   এসব কিছু নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনাতেও খুব দূরে যাওয়া জরুরি নয়। কারণ যেসব রাজ্যে মোদির ভরাডুবির সম্ভাবনা বলে বিজেপি নিজেই  মনে করে তা বুঝার সবচেয়ে সহজ ফর্মুলা হল যে, যেসব রাজ্যে মুসলমান কোপানোর বিজেপি ততপরতা ও হুমকি যত বেশি বুঝতে হবে, বিজেপি মনে করে তাদের অবস্থা বা পাবলিক রেটিং ওখানে খুবই খারাপ। মোদির কাছে তাই, সমাজে মুসলমান হত্যার উন্মাদনা তোলাটাই ওসব কনষ্টিটুয়েন্সিতে হিন্দু-ভোটারদেরকে দলবেধে বিজেপি বাক্সে নিয়ে আসার শেষ ভরসা বা অবলম্বন। তাতে সরাসরি মুসলমান হত্যার উন্মাদনা আওড়ানো তা যতই মারাত্মকভাবে কনস্টিটিউশন বা নির্বাচন কমিশনের আইন লঙ্ঘন হোক না কেন, মোদি-অমিত তাতে পিছপা নন! বরং বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন!

    এসব বিচারে হরিদ্বার – এ তীর্থের শহর মানে পুণ্যলোভীদের খেদমত ও বিশ্বাস আরো শক্ত করা ও আশ্বাস দেয়ার উসিলায় সর্বজ্ঞানী, ধর্মজ্ঞানী ভাবধরে মিথিক্যাল গল্প ছড়িয়ে যারা পেটের ভাত জোগাড় করে এমন ‘পাণ্ডাদের’ শহর এটা। অরিজিনাল ‘পান্ডা’ শব্দের অর্থ,  ধর্মীয় টুরিস্টদের ধর্মীয় ক্রিয়া-কর্মাদি পালন ও সম্পন্ন করার কাজে যারা ভিজিটরদের থেকে নেয়া ফি-এর বিনিময়ে সহায়তা দেয়। এই বিশেষ মানসিক স্থিতি ও পরিবেশটা কেমন তা বুঝানোর জন্য এই লেখার শুরু থেকেই প্রায় ৩০০ অক্ষর ব্যয় করলাম। এ’ছাড়া নতুন বছর, এই ২০২২ সালে মোদির জন্য নির্ধারক উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজের নির্বাচন, তা অনুষ্ঠিত হবে এই ফেব্রুয়ারি-মার্চে।

    অতএব বলাবাহুল্য মোদির বিজেপির কাছে  তাই হরিদ্বারের কথিত সাধু-সাধ্বীর  কদর এখন তুঙ্গে। এদের ভাড়া করে নিয়ে হুঙ্কারের বক্তৃতা দেয়ানোর স্টাইলটা হল, তারা সরাসরি মুসলমানদেরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অপমান করে তাদের – মেরে ফেলবে, কেটে ফেলবে, পিষে ফেলবে – এথনিক ক্লিনজিং করে মুসলমান মুছে দেবে- এসব কথা বলবে তারা দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে। আর এদের দিয়ে বলানোতে মোদি আশা করেন, বিরোধীরা যেন আপত্তি না তুলে এই ভেবে যে, ওরা ‘ধর্মীয় লোক’ কত কিছুই না বলে। অথবা এরা, আধুনিক রাষ্ট্র কনস্টিটিউশন না বুঝে বলেছে এই ভেবে বিরোধীরা এটা উপেক্ষা করুক। আবার বিরোধীরা এ নিয়ে আপত্তি তুললে সেটা থেকে পরে পাওয়া সামাজিক হৈচৈ বিজেপির নির্বাচনী ইচ্ছা- হিন্দুভোটের পোলারাইজেশন সেটা করে দিক, এটাই মোদি-বিজেপির প্রধান খায়েস। আর সর্বোপরি পুলিশ যেন কোনো অভিযোগ না নেয় বা মামলাকে নিরুৎসাহিত করে এটাই অমিত শাহের এবারের ‘পবিত্র’ নির্বাচনী দায়িত্ব। এরই মধ্যে এক পুলিশ অফিসার সেসব জ্ঞান পাবলিককে বিতরণ করে দিয়েছে মিডিয়ায়। অথচ কাহিনী হল, এবার ক্রিকেটে পাকিস্তানকে সমর্থন-উচ্ছ্বাস দেখানোতে এক ভারতীয় কাশ্মিরি তরুণের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসদমন আইনে চার্জ এনেছে পুলিশ।

    হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর আয়োজনঃ
    এবারের ঘটনার শুরু যেভাবে, গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে “ধর্মসংসদ” নামে সংগঠন এক আয়োজন করেছিল যার মূল আয়োজক ছিলেন এক বিতর্কিত কথিত ধর্মগুরু যতি নরসিংহানন্দ সরস্বতী। এদের নাম এমন বাহারিই হয়ে থাকে। “সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন হিন্দু রক্ষা সেনার প্রবোধানন্দ গিরি, বিজেপির মহিলা মোর্চার নেত্রী উদিতা ত্যাগী এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়। ভাইরাল একটি ক্লিপে দেখা যায়, প্রবোধানন্দ গিরি বলছেন, ‘মিয়ানমারের মতো আমাদের পুলিশ, সেনা, রাজনীতিবিদ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সব মানুষকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এবার ‘সাফাই [ক্লিনজিং] অভিযান’ চালাতে হবে।” এই ভাষ্যটা আনন্দবাজারের। এখানে সাফাই মানে ‘ক্লিনজিং বা ‘নির্মূল’ করা বুঝতে হবে। ভারতের দেয়া বাংলাভাষী বয়ান থেকে সরাসরি তা বুঝবার জন্য আনন্দবাজারের ভাষ্যটা এখানে এনেছি।
    তবে আম-পাঠকদের জন্য একটা সাবধান-বার্তা জানিয়ে রাখি। হরিদ্বারের ওসব ধর্মীয় নেতার সরাসরি সেসব বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। বলাহুল্য, তা লোমহর্ষক, একটা মানুষ কী করে গোষ্ঠী-ধরে অপর মানুষদের খুন করার আহ্বান জানাতে পারে? কিন্তু  তবু সাবধান আমরাও ওই ভিডিওর ব্যাপক প্রচার করে হিন্দুদের ‘অপর’ বলে তাদেরকেও খুন হতে  খুনাখুনির উসকানি দিতে পারি না। সেটা আইনি চোখেও পালটা আমাদের ‘অপরাধ’ হবে। তাদের মতোই দায়দায়িত্বহীন কাজ হবে। এমন প্রত্যেক ইউটিউব ভিডিওর শুরুতে সেকথা স্পষ্ট বলা আছে; পাবেন। পড়ে নিতে পারেন। তারা অপরাধী মানুষ ও দায়দায়িত্বহীন হলে আমরা যারা ধর্ম-নির্বিশেষে এমন মুসলমান হত্যার ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই, তারাও তাদের মতোই অপরাধী ও দায়দায়িত্বহীন হয়ে যেতে পারি না।

    এই অপরাধের শাস্তি কী?
    গত ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার এক মৌলিক ফারাক এখানেই। দুনিয়াতে কোনো দু’টা জনগোষ্ঠী স্বার্থ-সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়লে অন্যকে ‘অপরজ্ঞান’ করে তাদের ‘গুষ্ঠি-সহ নির্মূলের’ কথা, উগ্র ঘৃণা ছড়ানোর কথা আমরা শুনে থাকি। অপরকে কোনো একটা শব্দ দিয়ে ব্যঙ্গ বা তুচ্ছ করে কথা বলা যেমন, পাকিস্তানিদের”পাকি” বলা বা হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলা ইত্যাদি; ভদ্র বা আইনি ভাষায় এটাকে বলে ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর শুরুর প্রথমদিকের  উস্কানি তুলে কথা বলা। যেটা এরপর গণহত্যার পথে যাবার আগাম-ধ্বনি!

    এটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার গংয়ের প্রধান অপরাধ যিনি ঠিক এই কথিত সাধু-সাধ্বীদের মতই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর উসকানি, কিল দেম [kill them]– এই আহ্বানে প্রধানত ইহুদিদের আর সাথে অন্য যেকোনো বিরোধীদের হত্যা করেছিলেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াতে সেই প্রথম – আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসঙ্ঘ, মানবাধিকার সনদ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে নানান সংগঠন গড়ে উঠে এবং এখান থেকেই ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর অপরাধে ‘সর্বোচ্চ শাস্তির’ সুপারিশ করা হয়। সেকালের জার্মানির ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে হিটলারের বন্ধুদের বিচার হয়েছিল। পরে এই আইনের আরো ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট অ্যাক্ট ২০০১’ [ICC act 2001] গৃহীত হয়েছে। যেখানেও এই অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাগার। প্রতিটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশনে একইভাবে একাজকে এমন অপরাধ বলে গণ্য করে রাখার কথা।

    এথনিক ক্লিনজিং কথাটাঃ
    দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। তবে নামটা আইনি ও ভদ্রভাষায় হাজির করা হয়েছে বলে অনেকের কাছে অস্পষ্ট লাগতে পারে। এথনিক [ethnic] এই শব্দকে খাস বাংলায় এটাকে বলি আমরা ‘জাতি’।  তবে এটা ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে যাকে জাতি বা জনগোষ্ঠি  বলে বুঝানো হয় সেই অর্থে। আর ক্লিনজিং [cleansing], এটা বলে বুঝানো হয় কোন জনগোষ্ঠির প্রতিটা সদস্যকে খুন করার কল্পনা বা হুমকি-মূলক ততপরতা। গত ১৯৭১ সালের সময় এটাই আরেক শব্দে বর্ননা করা খুব চালু ছিল যেমন বলা হত “পোড়া মাটির” নীতি। সম্ভবত সেখানে ব্যাখ্যার কল্পনাটা হল, একটা জনগোষ্ঠির যেখানে বসবাস সেই ভুখন্ডের সবকিছুকে আগুন লাগিয়ে পুরিয়ে দেয়া, এভাবে নির্মুল করা। অর্থাৎ যেখানে অবশেষ কেবল যা বাচে [residue] তা হল পোড়ামাটি-টা এই কল্পনা। আর বাংলা ভাষায় ক্লিনজিং শব্দ বাংলায় সবচেয়ে পরিচিত শব্দ হল ‘নির্মুল’। যেমন খেয়াল করেন,  শাহরিয়ার কবিরে সংগঠন “ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিটি” – এই নামের মধ্যে নির্মুল শব্দটা্কে। এখানে মজার তামাসা হল, শাহবাগে বসে একদিকে তারা “ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের” মত জামায়াতের (কার্যত বুঝাতে চায় ইসলাম ধর্মের নিকুচি) বিচার চেয়েছে। অথচ এই বিচার যারা চাচ্ছে তেমন এক সংগঠনের নামই আবার নির্মুল কমিটি! মানে  ক্লিনজিং করতে চাওয়াদের কমিটি।
    সারা দুনিয়ায় এখন “গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমে” সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধের নাম “এথনিক ক্লিনজিং”। মানে কোন জাতি বা জনগোষ্ঠিকে নির্মুল বা মুছে ফেলার চেষ্টা ও কাজ। এটাই বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ মানা হয়! তাই কাউকে “নির্মুল” করে দিবার অথবা মুছে ফেলে দিবার জন্য পাবলিকের মাঝে উস্কানি তোলা বা ক্লিনজিং – এক কঠিনতম অপরাধ। মোদী সেই অপরাধী এবং সেটা করতেও বেপরোয়া!

    কিন্তু ভারতে এনিয়ে এখনো আমরা সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে, সুয়োমোটো[Suo Moto] মানে  কোন অভিযোগকারীর অপেক্ষায় না থেকে বিচারক নিজেই ঘটনা আমলে নিয়ে মামলার প্রক্রিয়া শুরু করা্; এর  কোনো খবর নেই। এটা “জনস্বার্থ সমুন্নত রাখতে মামলাও” [Public Interest Litigation (PIL)] এর মতনও। তাও করা হয় নাই। আর ভারতীয় নির্বাচন  কমিশন? তাদের নাম নিলে আমাদেরকেই যেন উলটা তওবা পড়তে হবে !  চলতি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে উত্তরাখন্ড ও উত্তরপ্রদেশ এ’দুই রাজ্যেই বিধানসভা নির্বাচন পরিচালনা করতে আসা এই কমিশনেরই দায়িত্ব। কাজেই সবচেয়ে সম্মুখসারির উপযুক্ত  অথরিটি হল এই কমিশন!  কিন্তু তারাও মনে হচ্ছে, তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। আর মোদি সরকারের কথা আর কী বলব? প্রধান বেনিফিশিয়ারি হিসাবে বরং এঘটনায় ন্যায্যত মোদির সরকারের বিরুদ্ধেই মামলা হওয়ার কথা। কিন্তু না, অমিত শাহ উল্টা নিশ্চিত করছেন কথিত ‘সাধুদের’ যেন কেউ স্পর্শ না করে।

    ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন?
    সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল, হরিদ্বারে এই ‘ঘৃণার সম্মেলন’ এখন কেন? কেন গত ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর হরিদ্বারে ‘ধর্মসংসদ’ এর এই আয়োজন! আমরা জানি না ঠিক কিসের প্রতিবাদে তাদের এই হুঙ্কার? কোথাও কি মুসলমানরা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনায় আপত্তি বা বাধা দিয়েছিল? না, এমন কোনো রেফারেন্স কথিত সাধুরাও দেয়নি। অর্থাৎ এ থেকে পরিষ্কার, এর উদ্দেশ্য একটাই – দুই মাস পরে নির্বাচন। আর তাতে সব হিন্দুভোট যেন বিজেপি বাক্সে যায় এই অনুমানে যতটা ব্যাপকভাবে পারা যায় এক মুসলমান ঘৃণা তীব্রতর করে হিন্দু-জোশ তোলা। আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে যথেচ্ছ হুমকি গালাগালি দিয়ে হিন্দু-জোশ তোলার সমতুল্য এফেক্ট আর কী কিছু হতে পারে?

    আবার এদের এই কথিত ‘ধর্ম-সংসদ’ শব্দটাই দেখুন। সংসদ শব্দটা দোজাহান-বাচক কোনো শব্দ নয়। শব্দটা কেবল বৈষয়িক দুনিয়া-কেন্দ্রিক। কারণ সংসদ মানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একত্রে শলাপরামর্শের জন্য বসার নির্দিষ্ট স্থান। আর জনপ্রতিনিধি শব্দটা আমাদের এই বস্তুগত দুনিয়ার, কেবল এই জাহানের শব্দ। আমরা আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তাকে আমাদের প্রতিনিধিরূপে নির্বাচন করি না। আমাদের সম্পর্ক তা নয় বলেই সব ধর্মতত্ত্ব সেই সাক্ষ্য দেয়। কাজেই এই ধর্ম-সংসদ কী জিনিস? সোনার পাথরের বাটি- এরকম? যদি আবার ভুল শব্দে তারা ‘ধর্মের ক্ষমতা’ বুঝাতে চেয়ে থাকেন তো তবে এভাবে বর্ণনা করার অথরিটি তাদের কে দিয়েছে? দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই তাদের এই অথরিটি দিতে পারে না।

    তা হলে এরা কারা? এরা হলো ধর্মীয় গুণ্ডা যাদের মোদির দল ভাড়া করেছেন এই আসন্ন নির্বাচনী মৌসুমে।

    তবে এতই ঘৃণ্য অপরাধীদের সম্পর্কে খুবই সীমিত দুই একটা ভারতীয় মিডিয়া রিপোর্ট করেছে। টিভি-মাধ্যমের মধ্যে করেছে এনডিটিভি, টেক্সট রিপোর্ট ও সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিস্তারিত ও ডিটেইল রিপোর্ট করেছে বরাবরের মতো ‘ওয়াইর’ (WIRE) এই ওয়েব পত্রিকাটা। এ ছাড়া সবার আগে রিপোর্ট করেছে কুয়িন্ট (QUINT), দা প্রিন্ট করেছে এদের সবার থেকে নিয়ে, তা হলেও করেছে। এছাড়া বিজেপি সমর্থক এসব আখড়াগুলো কেমন এর বর্ণনা দিয়েছে এরা।  অবশ্য যেসব মিডিয়া কিছুই বলে নাই, তাদের মুখ বন্ধ করতেও তো অর্থ লেগেছে!
    বাংলাদেশে আমরা কত গভীর বিপদে আছে এর ভাল প্রমাণ হল কোন প্রগতিবাদী টু শব্দ করছে না। কোন একটা ছোট বিবৃতিও নাই; যেন মোদি যেহেতু ভারতের নেতা অতএব তিনিই হলেন “প্রগতিবাদের নেতা”। যেখানে এমনকি পাকিস্তানের ইমরান সরকার এই ঘটনার সিরিয়াসনেস বুঝাতে পাকিস্তানের ভারতীয় হাইকমিশনকে ডেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা এটাকে “ফ্যাসিজমের জন্মদাতা বাবা হওয়া” [beget fascism] বলে চিহ্নিত করেছে।  কারণ আগেই প্রতিবাদী সচেতনতার লিড না নিলে আমরা তিনদেশের সাধারণ মানুষ এই ফ্যাসিজমের উন্মাদনায় এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যেতে পারি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ০১ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “মোদি নির্মূলের হুমকি দিয়ে হলেও জিততে চান”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    বাইডেনের অবরোধঃ
    অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২১   ১৭ঃ১৮ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3R1

       US President Joe Biden’s Summit for Democracy

     

    ঘোর ঘনঘটা। অন্ধকার ছেয়ে আসছে!
    যদিও এই অন্ধকার মানে এটা নয় যে এখন বাইডেন হাতে আলোর প্রদীপ আছে অথবা হাতে প্রদীপ নিয়ে তিনি মঞ্চে আসছেনই! না ব্যাপারটা একেবারেই এবার ২০০৭ সালের মত এত সরল নয়। বরং উল্টা-পালটা বহু কিছুরই সম্ভাবনা। সবচেয়ে বড় কথা এক প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা আর গভীর অনিশ্চয়তা ছেয়ে আসতে যাচ্ছে! সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সে “আমেরিকান অথরিটি” আর নাই। অথচ ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে একমত নাই। যেটুকু গত ৭৫ বছরে তোইরি হয়েছিল তা সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকা অপব্যবহার করাতে সবকিছু এখন অন্ধকারে। সারকথায় পুরান ওস্তাদের অথরিটি দুর্বল এমনকি চ্যালেঞ্জড হয়ে যাচ্ছে অথচ  ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে যেটুকু ঐক্যমত্য ছিল তাই ভেঙ্গে পড়তেছে। ইউক্রেন নিয়ে হুঙ্কার পালটা হুঙ্কার এর প্রমাণ। তবে আমাদের প্রসঙ্গ বাইডেনের অবরোধ আরোপ।

    বাইডেন বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপ করেছেন। আর এটা ২০০৭ নয়, ২০২১ সাল। যখন আমেরিকার গ্লোবাল কর্তৃত্ব ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে; অর্থাৎ সিংহ এবার আরও বুড়া ও বেশি উত্থান-রহিত হয়ে গেছে। অথচ বাইডেন সেদিকটা আমল না করে উলটা বুড়া সিংহ আমেরিকাকে ওভার স্ট্রেস মানে আরও ভারের বোঝা চাপিয়ে দিলেন এই অবরোধ আরোপ করে। আর তাতে এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে এতে বুড়া সিংহের ঘারে সবকিছু হুরমুর করে ভেঙ্গেচুড়ে পড়ল। ফলাফল  আরো এক গভীর নিম্নচাপ!
    উপরে এসব কথার অর্থ আবার কোনমতেই এটা নয় যে এখানে আমাদের সরকার সেফ থাকবে এমন কোন ইঙ্গিত দিচ্ছি। সেটা নয় তবে বহুকিছুই অনিশ্চিত বলছি ফলে স্বভাবতই এর মধ্যে সরকারের টিকে যাওয়াটাও অনিশ্চয়তা থেকে বাইরে থাকবে কী করে! মোট কথা যাদের হাতে যা কিছু নিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম সেসব সম্ভবত আর তেমন থাকছে না।  ফলে সবার আগে ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে পুরাতন ভারসাম্যটা।

    তবে একটা সারকথা একেবারে আঙুলে গুনে আমরা মনে রাখতে পারি যে, এবারের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” বা সেখান থেকে ঘোষিত অবরোধের নিষেধাজ্ঞার তালিকা প্রকাশের পর থেকে দুনিয়াটা আর আগের মত নাই, আগের জায়গায় তা আর স্থির নাই হয়ে গেছে। যদিও ক্রমশ ঘটনা গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ঘটনায় সেদিকেই যাচ্ছিল। তাতে বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা হল এসবের ‘ফাইনাল এলার্ম’ বাজানো।
    কিন্তু মজার কথাটা হল যদি প্রশ্ন জাগে বাইডেন কী জানতেন যে তিনি একটা “ফাইনাল এলার্ম” বাজিয়ে দিচ্ছেন! এর জবাবটা হবে খুব সম্ভবত না। তিনি বরং আমেরিকান সক্ষমতা আগের মত আছে মনে করে স্বাভাবিক মনে করেই একাজ করেছেন। হয়ত এখন ক্রমশ বুঝতেছেন বা বুঝবেন। এর একটা লক্ষণ হল থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান এর মন্তব্য যেটা প্রথম আলোতে অনুবাদে ছাপা হয়েছে। আর যার শিরোনাম “এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য খারাপও হতে পারে”। অর্থাৎ তিনি আমেরিকার জন্য খারাপ কথাগুলো সবটা উচ্চারণ করলেন না। কেবল কিছু ইঙ্গিত দিলেন।

    দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছেঃ
    আসলে আমাদের বেশির ভাগের অলক্ষ্যেই দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছে।  পোলারাইজেশন বা বাংলায় মেরুকরণ মানে কে কার দলে বা পক্ষে; সেই পক্ষা-পক্ষির ব্যাপারটা বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে যেভাবে সাজানো থেকে কাজ করত তা ভেঙ্গে গেছে। যেমন ভারতের কথাই যদি ধরি, বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগের দিনে,  ভারত আমেরিকার খুবই ঘনিষ্ট একথা মানতে কারও অসুবিধা হত না। এমনকি অকাসের না হোক অন্তত কোয়াডের প্রসঙ্গ উঠলে ভারত অবশ্যই চীনবিরোধী প্রথম সারির আমেরিকা ঘনিষ্ট, তা বলা যেত।  কিন্তু এখন এটা পুরাটাই আবছা অস্পষ্ট!  কিন্তু  এটাকে “বদলে গেছে” না বলে ভেঙ্গে গেছে বললাম কেন? বললাম এজন্য যে ভাঙ্গার পরে এটা এখন কোনদিকে যাবে থিতু হবে সেই নিশ্চয়তা এখানে এখনও নাই। এজন্যই বলছি পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত।

    যেমন এখন দশাটা এমন যে না চাইতেও একটা আপনাআপনি বা অবজেকটিভ পোলারাইজেশন এখানে তৈরি হয়ে আছে। তা হল, কে কে এখন বাইডেনের ‘ডেমোক্রেসি সামিট’ বা কথিত গণতন্ত্রের ছড়ি ঘুরানোর পক্ষে আর কে নয়।  তাতে একেবারেই একা বাইডেন একদিকে এমনকি ইউরোপও সেখানে বাইডেনের সাথে নয়, সম্ভবত এর মধ্যে বিপদ আঁচ করে দূরে থাকতে চাইছে। আর অন্যদিকে, শুধু চীন না, এখনকার গুরুত্বপুর্ণরা হল  রাশিয়া, চীন এবং ভারত ইত্যাদি। হা ভারত!  এবং এই নব সংযোজন ভারত এটা ১৩৫ কোটির দেশ তবে মোদির ভারত।  অথচ গত টানা বিশ বছর ধরে আগে কখনও দেখা যায় নাই এমনভাবে আমেরিকা-ভারত গাঁটছাড়া বেধে চলে আসছিল। সবাই এটাই জানত তারা ঘনিষ্ট বন্ধু – যেহেতু ভারত আমেরিকার চীন ঠেকানো [containment] এর বন্ধু অতএব এই সম্পর্ক এক লম্বা পথ হাটবে; অবশ্যই সহসা ভাঙবে না। এটাই ছিল সবার অনুমান!
    কিন্তু না। সবাইকে হতাশ করে দিয়ে এবার এক পুরান সত্যঃ রাষ্ট্র মানেই তা কেবল একান্তই নিজ নিজ স্বার্থ – সে কথাটাই ভেসে সামনে এলো। সেকথার ভাষ্যটা অনেকে এভাবে ঠাট্টা করে বলছেন, ভারত ‘বাবা’ বদলিয়েছে। আমেরিকার বদলে ভারতের বাবা এখন রাশিয়া। গত সপ্তাহে ৬ ডিসেম্বর রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন। আর সেটাকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রচন্ড হাইপ তুলে প্রপাগান্ডা করেছে [এটা নাকি ডিফাইনিং মোমেন্ট] যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের নজরে পরে এই এলান। স্বভাবতই এর প্রধান টার্গেট শ্রোতা হোক বাইডেনের আমেরিকা এই ছিল ভারতের আকাঙ্খা! আর এসব প্রচন্ড হাইপ তোলা এটাকেই অনেকে ভারতের বাবা বদল বলছেন!

    এমনিতেই বাইডেনের প্রেসিডেন্ট জিতে যাওয়া মোদির জন্য কাম্য ছিল না। তা অপ্রকাশ্য ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন নিজ নির্বাচনের এক ক্যাম্পেইন-করণীয় বানিয়েছিলেন কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুকে। বলেছিলেন তিনি এই ইস্যুতে প্রশ্ন  তুলবেন। তাই মোদির দিক থেকে তার অপছন্দের কিছুই লুকানো ছিল না বা ক্ষমতায় এলে পরে দেখা যাবে – এমন ইস্যু ছিল না। তাই মোদি নিজ অবস্থান ভেবে রেখেছিলেন যে বাইডেনের কাছাকাছি মুখোমুখি না হবার বা এড়িয়ে চলার। আর কামনা করতেন, চীন-আমেরিকার ট্রেড সংঘাত তীব্র হোক যাতে কাস্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি এর আড়ালে প্রথম দুয়েক বছর কাটাতে পারেন। কিন্তু এমন কামনা পূরণ করনে-ওয়ালার কাছে ভিত্তি পায় নাই।

    অন্যদিকে আরও জটিল সমস্যা। বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে তা বিস্তারে নোট  করা আর তা নিয়ে মামলা সাজানোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক স্বাধীন কমিশন আছে। যারা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট পাঠায়। এর নাম USCIRF (United States Commission on International Religious Freedom)।

    ভারত সম্পর্কে এই প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট খুবই খারাপ। এমন খারাপদেরকে তারা সিপিসি ক্যাটাগরিতে ফেলে চিহ্নিত করে থাকে। “কান্টি অফ পার্টিকুলার কনগার্ণ (CPC) বা “বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ এই ক্যাটাগরিতে। ভারতে মুসলমানদের উপরে নিপীড়ন প্রশ্নে ভারত এখন সিপিসি তালিকার দেশ। গত কয়েকমাসে মোদির সরকারের উপর এবার যুক্ত হয়েছে চার্চেও হামলার অভিযোগ।

    অতএব এ’দুই উদ্বেগের বিচারে বাইডেনের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” এর দিন যত ঘনায়ে আসছিল তাতে বাইডেন এবার ভারতের উপর কোন অবরোধ আরোপ দিতে পারে এই ছিল মোদি সরকারের অনুমান। কারণ ২০২১ সালের সিপিসি রিপোর্টে এটাই সুপারিশ করা ছিল। যেটা ট্রাম্পের আমল থেকেই এমন রিপোর্টগুলো উপেক্ষা করে চলছিল।  আবার মোদির দিক থেকে দেখলে এই ধর্মীয় নিপীড়নই তার শেষ ভরসা। মোদির ধারণা আগামি বছর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে পাবলিক রেটিং খারাপ অবস্থাতেও তার জিতে আসবার একমাত্র উপায়। ফর্মুলা সেই পুরানা; গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমল থেকে গত আট বছরের মোদির প্রধানমন্ত্রীত্ব পর্যন্ত যে – যত মুসলমান নিপীড়ন ততই ভোটার পোলারাইজেশন এবং ততই বেশির ভাগ হিন্দুভোটার মোদির দলের বাক্সে। এই অনুমানে যে মোদি হল বাঘের বাচ্চা যে অন্য ধর্মের লোকেদের দাবড়িয়ে বেড়াতে সক্ষম; “হিন্দুধর্মই শ্রেষ্ঠ যা ধরে রাখার নায়ক মোদি”! কাজেই মোদির পক্ষে মুসলমান কোপানো একটু আপাতত কমানোও অসম্ভব! কাজেই মোদির পক্ষে বাইডেনের অবরোধ নিয়ে ভাববার সুযোগ নাই।

    আবার অবরোধের ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। অন্যের (আমেরিকান) বোমারু বিমান ঠেকানোর মিসাইল রাশিয়ার তৈরি S-400 । কিন্তু এই মিসাইল ক্রয়কারি রাষ্ট্রকে ঠেকাতে বা এক ধরণের অপরাধী বলে চিহ্নিত করার আইন আমেরিকা সাজিয়েছে যার নাম (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act,  CAATSA) ।  অর্থাৎ যে রাশিয়ান এই মিশাইল কিনবে সে আমেরিকার ঘোষিত শত্রু হবে তাই তার উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ করা হবে। ভারতের এমন ক্রয়াদেশের পাবার পরে রাশিয়ান মিসাইল পাঠানো রাশিয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও বাইডেন অবরোধ দিবেন নাকি ভারতকে এই আইন থেকে ছাড় দিবেন এসবের কোনটাই এখনও ঘোষণা করেন নাই। অর্থাৎ সব এখনও বকেয়া বা পেন্ডিং হয়ে পড়ে আছে।

    এবার বাস্তবে কী ঘটেছে? এরই মধ্যে এবার বাইডেনের ডেমোক্রেসি সামিটে ভারত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় দাওয়াত প্রাপ্ত দল ছিল। কিন্তু ঐ সামিট থেকে যেসব দেশের উপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে সে তালিকায় ভারত নাই। এককথায় ভারতের উপরে আমেরিকার কোন অবরোধই আরোপ করা হয় নাই।

    আসলে এর মানে, উলটা বাইডেনই মোদির ভারতের হাতে বাঘবন্দি হয়ে গেছেন যেন। কেন এমন হল?

    কারণ মোদির উলটা চাল, তিনি পুতিনকে ভারতে ডেকে এনেছেন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক নানা কথা আর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জয়েন্ট ভেনচার নিয়ে আলাপ করেছেন। আর তাতেই বাইডেনের যেন বলতি বন্ধ!  ভারত এরপরে আর বাইডেনের চীন ঠেকানোর কাজে নাই লাগুক তবু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতীয় বাজার যার লোভ দেখিয়ে ভারত সবসময় তার অপনেন্টকে এভাবেই শায়েস্তা করেছে। এটাই আরেকবার প্রমাণ করেছে যে পচাত্তর বছর আগের যে আমেরিকা ছিল, বাইডেনের আমেরিকা সেটা আর নয়। বাইডেনের আমেরিকাই উলটা ভারতের কাছে কেঁচো হয়েছে – নত হয়েছে, অকেজো হয়ে গেছে। অন্তত এখন আমরা এটাই দেখছি!

    তাই বাইডেন ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দাওয়াত করেছেন আর যত পেন্ডিং অবরোধ-করার কথা ছিল এর একটাও প্রকাশ করতে পারেন নাই উলটা সবগুলোকে নিজের মুখের মধ্যে আটকে রেখে তা নিজেকেই  গিলে খেতে হয়েছে – এটা কোন আমেরিকা???

    ফলাফল কী? এর নেতি ফলাফলও আছে। আগে হলে আমেরিকান চাপে মোদির ভারত ইসলামবিদ্বেষ কিছুটা আড়াল করে হয়ত সরাসরি ইসলাম কোপানো অন্তত কিছুদিন বন্ধ রাখত।  যেমন বেশিদিন আগের কথা নয়। মোদির ক্ষমতায় আসার পরের বছর (২০১৫) ওবামা ভারত সফরে এসে (সেসময় মুসলমান ও খ্রীশ্চান নিপীড়ন, চার্চে হামলা শুরু হয়েছিল) মোদিকে চাপ দেওয়াতে শেষে মোদি বিজেপির নীতি-রাজনীতি আর তার সরকারের নীতি আলাদা বলে ঘোষণা করেছিলেন। সরকারের নীতি হিসাবে সব ধর্মাবলম্বির ধর্মপালনের স্বাধীনতাকে মোদি স্বীকার করে প্রটেক করার দায় কবুল নিয়েছিলেন। দিল্লির এক চার্চের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। [আগ্রহিরা এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত জানতে আমার পুরামা ২০১৫ সালের মে মাসের এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন। ওখানে সেকালে চার্চের অনুষ্ঠানে দেয়া মোদির ভাষণটাও সংযোজিত আছে।]  অথচ এবার উলটা, ভারতই বাইডেনকে চ্যালেঞ্জ করে গেল! আমেরিকা কিভাবে ক্রমশ কর্তৃত্ব হারাচ্ছে এর এক জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা।

    রাজনাথের কারিগরিঃ
    এদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ৫০ বছর স্মরণে এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে ছিলেন। এতদিন এধরণের অনুষ্ঠানে ভারত বড়জোর দাবি করত যে তারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। কিন্তু এবার তিনি দাবি করেন ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে।  আবার দেখা যাচ্ছে, ভারতের এক নামী সম্পাদক- কলামিস্ট লিখেছেন বাংলাদেশে আমেরিকান অবরোধে ভারতের নিশ্চুপ থাকার বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে অনেকেরই অনুমান-কল্পনা হল আবার কী তাহলে  আমেরিকার হাত থেকে প্রটেকশন পেতে বা হুজুর ধরতে মোদী-হাসিনা গভীর সম্পর্ক হতে যাচ্ছে, তাই কী ?
    দিন সবসময় একরকম থাকে না। না, এটা এখন বাস্তবতাতেই অসম্ভব। ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের কথা অবশ্যই আমরা কেউ বলছি না। ফলে কথাটা হচ্ছে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যের। এমন রুটিন সম্পর্কের (আমরা ১৯৭১ সালে এটা সেটা ছিলাম টাইপের) বাইরে অন্য কোনদিকে এখন আর আগাবার সম্ভাবনা নাই। আর এদিকে হাসিনা সরকার কখনও যদি ফেল না করে তাহলে চীনের সাথে তার সম্পর্ক একটুও ঢিলা হবার কোন সম্ভাবনা নাই।
    তবে সরকারের জন্য এখনকার চ্যালেঞ্জ হল – অবরোধ আরোপের ফলে আমলা আর দলীয় কর্মি-নেতাদের যাদের সক্রিয়তা সরকার টিকাতে ম্যাটার করে এদের মনোবল নিঃসন্দেহে চাপ খাবে – সেটা কতদুর সামলাতে পারে তা দেখতে হবে।  অবরোধের পাল্লায় পড়া যাবে না যা “অর্জন” তা সামলাতে হবে – তাদের এই পালাই পালাই মনোভাব ডমিনেট করবে।  সরকারের পাবলিক রেটিং থাকলেই একমাত্র যা দিয়ে এমন চাপ মোকাবিলা সহজেই সম্ভব হত হয়ত।
    আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে!

  • মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা, সাথে পিকের কৌশল

    মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা, সাথে পিকের কৌশল

    গৌতম দাস

    ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    –

    For India’s opposition to recover, the Gandhis should quit

    [সার-সংক্ষেপঃ উপরের বা সাথে দেয়া ছবিটা লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকার চলতি সংখ্যায় এক আর্টিকেলের প্রচ্ছদ। যদিও আমার এলেখার প্রসঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ও তার দল। ইকোনমিস্টের  ঐ আর্টিকেলের সারকথা হল, ভারতের বিরোধী দলকে জোটবদ্ধ হতে পিছিয়ে দিয়েছে  ও দিচ্ছে এই গান্ধী পরিবার।  আর ঠিক এজায়গায় প্রত্যক্ষ না হওয়া সত্বেও বিপরীতে মমতা নিজেকে উত্থিত করার যে চেষ্টা করছেন তা সম্পর্কিত।  ইকোনমিস্ট সরাসরি বলেছে গান্ধী পরিবারের ভারতের রাজনীতিকে এভাবে স্থবির করে রাখা “ত্যাগ করা উচিত” । শিরোনামেই সেকথা বলেছে যে “গান্ধীদের ত্যাগ করা উচিত” [Gandhis should quit]।
    কিন্তু ততদিন কী তাহলে মমতা অপেক্ষা করবেন? গান্ধী পরিবার কী করে তা দেখার জন্য? একেবারেই না। ভারতের মিডিয়া এনিয়ে অনেক কথা লিখেছে। যেমন যা লেখা শুরু করেছে তা হল,  “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমশই নিজেকে মোদী-বিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন”।  এমন নেতা  হিসাবে নিজেকে হাজির করার কাজে মমতা অনেক দূর আগিয়ে গেছেন।  আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ দল হচ্ছে গান্ধীদের কংগ্রেস।
    আরেক পত্রিকা লিখছে, “আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ”।
    কেন?  কারণ, মমতার নিজেকে এই প্রধান মুখ হিসাবে উপস্থাপনে বিভিন্ন দল ভেঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গ্রুপ দল বেধে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য যোগাযোগ শুরু করেছে। অনেকে সরাসরি যোগদান করছে।  চলতি নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মমতার দিল্লি সফরে একটা অন্যতম কর্মসুচি ছিল এমন যোগদানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটিয়ে তা দেখানো।  আর এবার মিডিয়া লিখছে এভাবেঃ “একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে”। অর্থাৎ অনেক দল থেকে লোক আসছে তৃণমূলে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে দল ভেঙ্গে লোক মমতার দলে যোগ দিচ্ছে সেদলটা হল গান্ধী পরিবারের কংগ্রেস।
    কোন কোন পত্রিকা তাদের রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা শুরু করেছে কেন আভ্যন্তরীণভাবে কংগ্রেস স্থবির ও অগোছালো। যার মূলকথাটা হল, গান্ধী পারিবারিক নেতৃত্বটাই এর মুল কারণ। এই পরিবার এটা কংগ্রেসের তরুণ নেতাদের আকাঙ্খা দাবায় রাখার প্রতীক হয়ে গেছে। আবার কংগ্রেসের বয়স্ক বা পরীক্ষিত নেতারাও মনে করছে তাদের পোটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাবনা সব এই পরিবারের জন্যই স্বীকৃতি পাচ্ছে না। মিডিয়ায় লেখা হয়েছে, রাহুল গান্ধীকে দলে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না।  আর এতেই ফলাফলে সবকিছুই স্থবির হয়ে বসে থাকা। আর ঠিক এ’জিনিষটার দিকে নজর ঢেলেছেন পিকে মানে প্রশান্ত কিশোর । যিনি আসলে মমতার পক্ষে ও মমতার নিয়োগকৃত  রাজনৈতিক দলের জন্য  পেশাদার এক  “ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট”; ভারতের আনন্দবাজারি ভাষায় “ভোটকুশলী”।  যদিও শব্দটা হবে সম্ভবত ভোটকৌশলী এক্সপার্ট। বাংলায় প্রকৌশলী শব্দের “কৌশলী” শব্দটা যেখান থেকে।

    এছাড়া ওদিকে ঠিক বিজেপি না, আরএসএসে আভ্যন্তরীণ বিরোধের টেনশনে্র কথা শুনা যাচ্ছে মোদিকে তৃতীয়বার প্রার্থী না করার ব্যাপারে ফলে আরএসএসের মমতার প্রতি তাদের কিছু আগ্রহের খবরও বাজারে এসেছে দেখা যাচ্ছে। ]

     

    মমতার তৃণমূল কংগ্রেস রাইজিংঃ
    অসময়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও এর নেতা মমতা ব্যানার্জি নিয়ে আজকের প্রসঙ্গ। অসময়ে এজন্য যে, এটা পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনের আগের অথবা অব্যবহিত পরের সময় অবশ্যই একেবারেই নয়। আবার যদিও একটা পৌরসভা  (ওদের ভাষায় পুরভোট)  বা মেয়র নির্বাচন আসন্ন। তবে  এর রাজনৈতিক গুরুত্ব তেমন নেই। সাধারণত যতটুকু একটি পৌর নির্বাচনের থাকে, এবার তাও নেই। এর মূল কারণ গত   ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলে মমতা শুধু নিজে ও দলকে টানা তৃতীয়বার রাজ্যের ক্ষমতায় বিজয়ী হয়ে নিয়ে এসেছেন সে জন্য নয়। আসলে এই নির্বাচন ছিল হেভিওয়েট বিজেপি পুরা দলকেই কলকাতা থেকে পুরো উৎখাত করে ফেলা। অথবা বলা যায়, সারা ভারতের বিরোধীরা যখন মোদির সামনে শিশু বা বামন হয়ে যায়, কেবল সেখানে একা মমতা নিজ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দিয়ে লড়ে প্রমাণ করে দিলেন, এক প্রধানমন্ত্রী মোদির ইমেজের ওপর দাঁড়ানো চালু এদলটিও তার সামনে কিছুই না। ফলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে যে ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার ঝড় বিজেপি তুলেছিল, সেটাসহ মোদি বা বিজেপি কোনো কিছুকেই মমতা আস্ত রাখেননি। উপড়ে ফেলেছেন। এরপর যারা নির্বাচনের আগ দিয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের এবার বিজেপি ছেড়ে আবার একমাত্র দল মমতার তৃণমূলেই ফেরতের হিড়িক পড়ে যায়; যেন সবাইকেই ফিরে যেতে হবে, বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।  এছাড়া “দ্রুত অনুগ্রহ যোগাড় করে” কার আগে কে ফিরে জায়গা নেবে যেন এর প্রতিযোগিতাও শুরু করাতে পেরেছিলেন মমতা।

    তবে বছরের শুরুতে মার্চ-এপ্রিল ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পরেও আবার ওরই  উপনির্বাচনও ইতোমধ্যে হয়ে গেছে অনেক আসনে; কারণ করোনার জন্য আটকে থাকা, শিডিউলে থাকা অনেক উপনির্বাচন দীর্ঘ দিন হতে পারেনি।  আর সেই উপ-নির্বাচনেও বিজেপি আরেক দফা আরো তুচ্ছ হয়ে যায়।
    এসব কারণে এখন পৌর নির্বাচনের গুরুত্ব এবার আরো কম বা নাই; কারণ গত ৩০ সেপ্টেম্বরে, ছয় মাসের মধ্যে ঐ উপ-নির্বাচন হয়েছিল। আর এবার সুযোগ পেয়ে একসাথে সারা ভারতেও অনেক উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তা ছিল ভারতের ১৩টি রাজ্যের লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভা মিলিয়ে মোট ২৮টি আসনে উপনির্বাচন। এতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন ছিল চারটি। আর ওদিন আরো তিন রাজ্যের তিন লোকসভা আসনে উপনির্বাচন হয়। রাজ্য তিনটি হলো – হিমাচল, মধ্যপ্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত রাজ্য দাদরা ও নগর হাভেলি; যার  মধ্যে বিজেপি জিতেছিল কেবল মধ্যপ্রদেশে; আর বাকি দুই রাজ্যে বিজেপি হেরে যায়। এ বছরের কলকাতায় মমতার রাজ্য নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর থেকে সেই জোয়ার এতই তীব্র  উঠেছিল যে, এই উপনির্বাচনে ছয় মাসের ব্যবধানে এক লাখেরও বেশি ভোটে উল্টো বিজেপি প্রার্থীরা এবার হেরে যান। আর বিজেপি প্রার্থী প্রায় সবার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

    পশ্চিমবঙ্গে মোদির এই ব্যাপক হার গত প্রায় আট বছরের মোদির শাসনামলে এই প্রথম, যা তার বিজেপি দলসহ তাকে এই প্রথম সমূলে এত বড় আঘাত হেনেছে মনে করা হচ্ছে। একটা পত্রিকা লিখেছিল,

    উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজেপি শিবিরে প্রচণ্ড উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বিজেপিবিরোধী তৃণমূলের পালে হাওয়া লেগেছে, তাতে মনে করা হচ্ছে, সেই হাওয়ায় সত্যিই এবার বিজেপির বাগান তছনছ হয়ে যেতে পারে?

    এ ছাড়াও প্রথমে মনে করা হয়েছিল, মোদির ওপর এ আঘাত বোধহয় কেবল পশ্চিমবঙ্গেই। কিন্তু এখন একেবারেই পরিষ্কার, এটা ভারতজুড়েই বিরাট ছাপ ফেলেছে।
    আসলে এটা এক ‘আন্ডার কারেন্ট’ যেখানে সেটা নদীর যত তলদেশে ততই সেখানে স্রোতের বেগ তত বেশি। অথচ পুরো ব্যাপারটা বাইরে থেকে তেমন বোঝাই যায়নি। কিন্তু কী সেটা?
    বিজেপি বা মোদিবিরোধী সব বিরোধী দলের অভ্যন্তরেই প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত ও ক্ষোভ বর্তমান। এসব ক্ষুব্ধ ভগ্নাংশ বা গ্রুপগুলোতে অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত এতই তীব্র কিন্তু তারা দল ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সেদিকে ফায়সালার পথ বেছে নেবে, তা ঘটছিল না। সম্ভবত তাদের দ্বিধার মূল কারণ, এসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ ভেঙে বেরিয়ে যেতে চাইলেও তারা কোথায় যাবে কোন দিকে বা গন্তব্যে? এটা স্পষ্ট খুঁজে না পাওয়ায়ই তারা উদ্দেশ্যহীন হয়ে পুরনো নিজ দলের সাথে লেপ্টে থেকে গিয়েছিল।

    কিন্তু দেখা যাচ্ছে আজ এটা প্রমাণিত যে, তৃণমূলের মমতা হলেন সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক যার বাঁশির পেছনে ওসব ক্ষুব্ধ গ্রুপ একেবারে সদলে এসে একের পর এক যোগদান শুরু করেছে এখন। আর তাতে রাতারাতি মমতার তৃণমূল দল এক আঞ্চলিক দলের পরিচয় থেকে বেরিয়ে সর্বভারতীয় দলের পরিচয় ধারণ করতে যাচ্ছে।

    ‘সর্বভারতীয় দল’ মানে কীঃ
    ভারতে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে মোট রাজ্যের সংখ্যা ২৮টা। কোনো একটা রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকটা রাজ্যেই বা বেশির ভাগ রাজ্যেই উপস্থিতি মানে কমিটি থাকলে সাধারণত চলতি অভ্যাসে তাকে “সর্বভারতীয়” দল বলে বুঝানো হয়ে থাকে। তবে স্বভাবতই এটা আইনি বা নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত সংজ্ঞা নয়। কমিশনের মতে, তাদের কতগুলোর শর্তের একটা পূরণ করলেই সেটা ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদা লাভ করে থাকে। এছাড়াও সময়ে সময়ে নির্বাচন কমিশন এই মর্যাদা কোন দলের জন্য সে দল “প্রাপ্ত বা কেড়ে নেয়া” হল বলে ঘোষণা দিয়ে থাকে।

    যেমন এমন কিছু শর্তগুলো হল, দলটাকে ভারতের যেকোনো তিন রাজ্য থেকে লোকসভার (কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে যেটা) নির্বাচনে মোট ভোটারের কমপক্ষে ২ শতাংশ পেতে হবে। অথবা দলটিকে লোকসভা বা বিধানসভা (রাজ্য সরকার গঠনের লক্ষ্যে) নির্বাচনে যেকোনো চার বা ততোধিক রাজ্য থেকে মোট ভোটের ৬ শতাংশ পেতে হবে। আর সাথে আরো চারটি লোকসভা আসন জিততে হবে। অথবা দলটাকে চার রাজ্যের যেকোনো একটাতে ‘রাজ্য দল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হবে।

    যেমন, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে কমিশন ঘোষিতভাবে ভারতে আটটা ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল আছে যদিও সম্প্রতি এদের চারটির অবস্থা খারাপ যে, সম্ভবত তারা নয়া রিভিউয়ে বাদ পড়বে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস কখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত দল নয়; যদিও গত ২০০১ সালের রাজ্য নির্বাচনের সময় থেকে তৃণমূল খুবই কঠোর চেষ্টা শুরু করেছে। আর আগামী বছর মানে সারা ২০২২ সালে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এগুলো হল – গোয়া, মনিপুর, উত্তরখণ্ড, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশ। এতে একমাত্র উত্তর প্রদেশের নির্বাচন হবে মে মাসে আর বাকি চারটি নির্বাচনই হবে মার্চ মাসের বিভিন্ন সময়ে। বাংলা ভাষায় এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিধানসভার নির্বাচন’ বলে পরিচিত। ইংরেজিতে যা ‘লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’ বা সংক্ষেপে শুধু “অ্যাসেম্বলি” নির্বাচন বলার চল আছে।
    আর সার কথাটা হল, তৃণমূল কংগ্রেস এখনো ‘জাতীয় রাজনৈতিক দলের’ মর্যাদাপ্রাপ্ত নয়। তৃণমূল মূলত আঞ্চলিক দল মানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যভিত্তিক দল।

    তাহলে ২০২১ সালের মার্চ-এপ্রিলের নির্বাচনের পর এবার তৃণমূলকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও হইচই ওঠার কারণ কী?
    এক কথায় বললে, পশ্চিমবঙ্গের গত এপ্রিল নির্বাচন হয়েছিল মোদির নামে, মোদির সুনাম বা ক্রেডিটকে দেখিয়ে, তাঁকে সামনে রেখে। এমনকি বিজেপি দলের চেয়েও মোদির নাম এগিয়ে রাখা হয়ে থাকে সবসময় ঠিক যেমন গত সাত বছর ধরে বিজেপি একা মোদির নাম ও ক্রেডিটের উপরে নির্বাচন করে যাচ্ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এতে কলকাতায় এমন প্রপাগান্ডা ঝড় তারা তুলেছিল যেন নির্বাচনের পরে সারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ছাড়া “আর কোনো দল থাকছে না”। ফলে অন্যান্য দল থেকে সুযোগসন্ধানীদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায় যে, নিজ নিজ দল ছেড়ে কার আগে কে বিজেপিতে যোগ দেবে। অথচ ফলাফল প্রকাশের পরে পেলে দেখা গেল, কিছুই বাস্তব-সত্য নয়, সব প্রপাগান্ডা। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টিতে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। অথচ মোদি-অমিত আওয়াজ দিয়েছিলেন বিজেপি নাকি ২০০ এর বেশি আসন পাবে। বাস্তবে  তাও আবার সেই ৭৭ এখন ৭২ হয়ে গেছে। অর্থাৎ  ঐ পাঁচজন তৃণমূলে আবার ফেরত গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোটের সাথে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ‘সেক্যুলার ফ্রন্ট’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল  জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পীরজাদার দলের একটা আসন পাওয়া ছাড়া এই পুরো দল বা জোট এবার আর কোনো আসন পায়নি। অনেকে এটাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, এটা গত ২০১৯ সালের কেন্দ্র নির্বাচনে সিপিএমের নিজ কর্মের শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। কেন?
    সিপিএমের বামফ্রন্ট ২০১১ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেসের সাথে জোট করে নির্বাচন লড়ে আসছে। কিন্তু যেহেতু মমতাই তাদের ৩০ বছরের সাজানো দুর্গ ২০১১ ভেঙে দিয়ে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন, তাই মমতার দলই তাদের প্রধান শত্রু ও বিরোধী তা আজও এরা মনে করে থাকে। তাতে ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতায় যে দলই থাক। কিন্তু এখানে ফাঁকিটা হল, এতে ক্ষমতাসীন মোদি কমিউনিস্টদের ভাবধারার অলক্ষ্যে এবং একথা তারা মুখে না বললেও পরোক্ষে  সিপিএমের দোস্ত হয়ে উঠেছে। এরই চরম অবস্থাটা আমরা দেখে ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনে। তারা বিজেপির সাহায্য নিয়ে মমতা উৎখাতের পরিকল্পনা করে ভোটকেন্দ্রে বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়েছিল। এই কৌশল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মত বয়স্ক নেতারা পছন্দ না করলেও সেবার তারা পাত্তা পাননি। তাদের আপত্তি দলের কেউ শুনে নাই।  আর তাতে হঠাৎ বিজেপি তিন আসন থেকে এক লাফে ১৮ আসন লাভ করেছিল যেখানে মোট পশ্চিমবঙ্গের ভাগে মোট আসন ৪২টা আর তৃণমূল একাই প্রায় সবটা পেয়ে থাকে। এ কারণেই ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে একটা সিটও না পাওয়াকে সিপিএমের কর্মের শাস্তি বলা হচ্ছে। এ ছাড়া তারা পীরজাদাকে জোটের সাথে নিয়ে মূসলমান ভোট ভাগ করতে চেয়েছেন, যাতে বিজেপির সুবিধা হয়। কিন্তু মুসলমান ভোটাররাই সব রুখে দেন, তারা ভোট ভাগ হতে দেননি। মমতার এত আসন পাওয়া বা বাম-কংগ্রেস সাথে পীরজাদার জোট মাত্র একটিই আসন পাওয়ার ঘটনাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে।

    এ তো গেল শুধু পশ্চিমবঙ্গের হিসাব, সাথে এখন তৃণমূলের বিস্তৃতি বাইরের রাজ্যেও। সর্বভারতীয় দল হিসেবে তৃণমূল নিজের নতুন কেন্দ্রিয় কমিটি সাজিয়ে নিয়েছে। আর এতে একেক করে অন্যান্য রাজ্যের দলের নেতাকর্মীরা যোগ দেয়া শুরু করেছেন; যার মধ্যে গোয়া আর ত্রিপুরা সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে।

    এবার গত সপ্তাহে (২৫ নভেম্বর) মমতা দিল্লি সরকারি সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু আসলে এর ফাঁকে নিজ দলের শুভযাত্রার অনেক কাজ করে এসেছেন তিনি, যাতে অন্তত তৃণমূলকে এখন এক সর্বভারতীয় দল মনে হয়। আসলে বিভিন্ন দল থেকে মমতার দলে যোগদান করতে আসছেন; এরই এক অনুষ্ঠান ছিল এবারের মুখ্য আকর্ষণ। যেসব রাজ্য থেকে পুরনো দল ছেড়ে নেতারা (সাবেক বা বর্তমান) এমপিরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন এদের মধ্যে আছেন উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে; বলা হচ্ছে হিন্দি বলয়ের তিন সাবেক সাংসদ কীর্তি আজাদ, অশোক তনওয়ার ও পবন বর্মা যোগ দিয়েছেন। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখছে, “দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমেই নিজেকে মোদিবিরোধী শিবিরের ‘মুখ’ করে তুলছেন।”

    আসলে বলা যায়, এটাই হল মমতার মুখ্য মেসেজ। অর্থাৎ মোদিবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গড়তে গেলে এর সম্ভাব্য নেতা কে কে হতে পারেন – এই বিচারে মমতা নিজেকে সর্বভারতীয় নেতার ইমেজ দিয়ে রাখলেন। কিন্তু কেন এটা?

    প্রশান্ত কিশোর বা পিকেঃ
    রাজনীতিতে কনসালটেন্সি বা ভারতে একালের ভোটযুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে প্রফেশনাল এক্সপার্ট নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনে পরিকল্পনা করে ভোটে নামা শুরু হয়েছে। ভারতের রাজনীতি ষোলোআনাই নির্বাচননির্ভর। তাই “ভারতে রাজ্যের বা কেন্দ্রের নির্বাচনের আগেই কেবল রাজনীতি করো। বাকি সময় দলের বাতি ধরে রাখলেই হবে”। এই হলো ভারতের রাজনীতি। ফলে দলের হয়ে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা, লড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে যেহেতু এটা ‘পরিচালনা’ মানে ডিরেকশন বা নির্দেশনা দেয়া; কাজেই ব্যাপারটা আসলে একটা ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক কাজ যার এক বাংলা করতে পারি পরিচালনা বা ম্যানেজ করা বা সামলানো। কাজেই এজন্যই তো “ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট” নিয়োগ। তাই না?

    বিহারের প্রশান্ত কিশোর (পিকে) হচ্ছেন আপাতত ভারতের একমাত্র এমন পলিটিক্যাল কনসাল্ট্যান্ট। এটা আসলে জনমত যাচাই, পাবলিক মনোভাব আগাম বুঝা, নির্বাচনে ভোটারদের মুখ্য আশা-আকাঙ্খা কী, কী হলে তারা খুবই খুশি হবে, দলের সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটা, দলের পজিটিভ-নেগেটিভ সব জেনে নেয়া ইত্যাদি সবকিছুই এর কাজের মধ্যে পড়ে। এসব কাজের জন্য একেবারে স্যাম্পল ডাটা সংগ্রহ করে গবেষণা স্টাডিতে নেমে পড়া; আর সে স্টাডির ফলাফল অনুসারে দলকে পরিচালিত হতে, নড়াচড়া করতে নির্দেশ দেয়া, এটাই কনসালটেন্টের কাজ। পিকে এর আগে পুরান পেশা হিসাবে পেশাদার কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে জাতিসঙ্ঘে এমন স্টাডি গবেষণার কাজ করতেন। এরপর কী খেয়ালে সেসব ছেড়ে এখনকার কাজে নেমে এসেছেন। এ’পর্যন্ত কোনো দলের সাথে (ও পক্ষে) পরামর্শদানের চুক্তি করে সে দল কখন ঐ নির্বাচনে হারেনি। ফলে এটা তার এক ভালো রেকর্ড। এককালে বিজেপিকেও এমন পরামর্শ দিয়েছেন। কংগ্রেসকেও। বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষমতাসীন রাজ্য সরকারকেও। আবার পাঞ্জাবসহ এমন অনেক রাজ্যকেই। মমতার সাথে  তাঁর  সম্পর্কের শুরু ঐ ২০১৯ সালে; সেবারের কেন্দ্র নির্বাচনে খারাপ ফলাফলের প্রেক্ষিতে এরপর থেকেই মমতা পিকে-কে নিয়োগদান করেছিলেন; যার ফলাফল পরেরবার মমতার ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে মোদি হারানোর জয়জয়কার লাভ করেন। কিন্তু এরপর থেকেই কেন্দ্রের নির্বাচনে মমতার দলের পক্ষে নেমে পড়া, নতুন চুক্তি হাতে নেন পিকে। আনন্দবাজারের ভাষায় এটাই ‘ভোট-কুশলীর কাজ’। শব্দটা ইংরেজি স্ট্রাটেজিস্ট শব্দটার বাংলা কৌশলী আর সেখান থেকে ব্যক্তি কুশলী। এটা কুশল বিনিময়ের কুশল নয়। আসলে, এটা প্রকৌশলী লিখতে যে কৌশল শব্দ ব্যবহার করি সেই কৌশল শব্দ থেকে কৌশলী হবে।

    পিকে তার কাজের শুরুতেঃ
    গত মে মাস থেকে কাজে নেমেই পিকে ‘বিরোধী জোটের ঐক্য’ গড়া দিয়ে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। ঘোষণাও করেছিলেন, কংগ্রেসকে সাথে নেয়া ছাড়া এ কাজ শুরু করার মানে নেই; এ ধরনের বক্তব্যও দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মাথাতেই অগ্রগতি না দেখে এবার আবিষ্কার করেন যে, খোদ কংগ্রেস দল ও এর অভ্যন্তরীণ বর্তমান দশাই সব সমস্যার উৎস। আর এরপর থেকেই তিনি প্রকাশ্যেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো কী তা বিভিন্ন ঘটনার সময় প্রকাশ্যেই তুলে ধরতে শুরু করেন। ইঙ্গিত দিতে থাকেন কংগ্রেস যোগ্য দল নয়; তাই সে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। এর পরই তিনি মমতাকে নেতা হিসেবে ‘প্রজেক্ট’ করা শুরু করে দেন। খুব সম্ভবত তারই পরিকল্পনায় মমতার এবারের দিল্লি সফর।

    ঘটনা যতটুকুই যা, তা সঠিক হোক বা না; বাস্তবতা হলো পিকের কৌশলে মোদিবিরোধী জোট গড়তে এখনো অগ্রসর হতে পারেন আর না পারেন, মমতাই যে কিছু করার ক্ষমতা রাখেন, এই ইমেজ তিনি (পিকের মাধ্যমে) চার দিকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন, সন্দেহ নেই। এরই সোজা মানে হল, পিকে সঠিকই ধরেছেন, মোদিবিরোধী দল বা কর্মীরা কোন নেতা, কোন পরিকল্পনা, কোন দল ও জোট ইত্যাদি, এমন সব কিছু আছে এমন একটা জায়গা যে খুঁজে ফিরছে – তা পিকে ধরে ফেলেছেন। আর সেজায়গাটাই হতে যাচ্ছে মমতার তৃণমূল।  বিভিন্ন দল ও গ্রুপে তারা যে এখন পুরান দল ছেড়ে বের হয়ে আসবে, সাহস করবে, মমতাকে দেখে তারা পথ খুঁজে পেয়েছে মনে করবে –  তা ফল দেয়া শুরু করেছে। আর এ কাজটা করতেই রাহুল বা সোনিয়ার নেতৃত্বের কংগ্রেস আনফিট, সেটিই সম্ভবত প্রমাণ হতে যাচ্ছে। ইকোনমিস্ট সেকথাটাই বলেছে।

    বাংলাদেশের বাংলা ট্রিবিউনে তাদের কলকাতা প্রতিনিধি লিখেছেন শিরোনাম দিল্লি দখলের পথে মমতা!। বলছেন, ‘একের পর এক উইকেট পড়ছে কংগ্রেসে। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্রমেই জাতীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। অন্য দিকে বাংলার বুকে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হওয়া তৃণমূল আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে দেশে বিজেপিবিরোধী রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে। আঞ্চলিক দলের তকমা ঝেড়ে তৃণমূল এখন সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার পথে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে মোদিবিরোধী জোটে সোনিয়া, রাহুল কিংবা প্রিয়াঙ্কা নন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন মুখ্য। এমনটিই বলছে রাজনৈতিক মহল। তবে কী ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর ‘মহামিশন ২০২৪’-এর গেমপ্ল্যানকে লক্ষ্য করে এখন দিল্লি দখলের পথে মমতা!”।
    কথা সঠিক; এখন পর্যন্ত যে দলটা সবচেয়ে বেশি ভেঙে দলে দলে নেতাকর্মী বের হয়ে তৃণমূলে যোগ দিচ্ছে এদের বেশির ভাগই পুরনো কংগ্রেস দলের।

    তবে আমাদের অতি উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। আপাতত মনোযোগে পর্যবেক্ষণই আমাদের কাজ বোধ করি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২৭ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “মোদির পরাজয় ঘটাতে মমতা ও পিকে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    শ্যাম সরণের বোকা নেহরুপ্রীতি

    গৌতম দাস

    ২২ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    –

    Nehru was way ahead of his time. Seeing him through a 20/20 lens is wrong

    ভারতের শ্যাম সরণ [Shyam Saran], একজন কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট। গত ১৯৭০ সাল থেকে ভারতের ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি ২০০৪-০৬ সালে এই সময়কালে মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। পরে সে পদ থেকে ফরমাল অবসর নিলেও এরপর সাধারণ নাগরিক হিসেবে ভারত সরকারের বা সময়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও নানান দায়িত্বে কাজ করে গেছেন। বহু ধরনের কাজে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বা বেসরকারি ও বিদেশে অনেক কিছুর সাথে এখনো সক্রিয় তিনি। দেশী-বিদেশী থিংকট্যাংকের কাজের সাথেও তিনি জড়িত। একেবারে সক্রিয় এখন সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ [CPR] এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে। এছাড়া প্রায়ই তাঁর লেখা কলাম বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত।

    সম্প্রতি তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু সম্পর্কে উঁচু মূল্যায়নমূলক এক কলাম লিখেছেন। ভারত সরকারের ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে যারা যোগ দেন তাদের সবারই এক স্বপ্ন-খায়েশ থাকতে দেখা যায় যে, তিনি ফরেন সচিব হওয়ার পরেই অবসর নেবেন। যদিও টেকনিক্যাল ঝামেলায় সচিব পদটা খালি নেই এমন হয়ে দাড়াতে পারে কারো বেলায়; অবসরে যাওয়ার সময় এসে গেলে অনেকের ভাগ্যে তা হয় না। এমনকি আরেকটু এগিয়ে অনেকের জ্বলজ্বলে খায়েশ মনে পুষে রাখে যে, সার্ভিস লাইফে যদি ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে লাইন-ঘাট, সম্পর্ক, পারফরম্যান্স দেখিয়ে মন পাওয়া ইত্যাদি ঘটে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ তাহলে তিনি চাকরি থেকে অবসরের পরে কপালও খুলে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন।

    যেমন কংগ্রেসের সালমান খুরশিদ এমন এক কূটনীতিক ছিলেন যিনি এখন কংগ্রেস দলের সাবেক মন্ত্রী এবং এখন কংগ্রেস দলের এক রাজনৈতিক নেতা হিসাবেও পরিচিত। আর বিজেপির মোদির ক্ষেত্রেও তাঁর বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করও তেমনদের একজন। তখন মোদি কেবল প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ২০১৪ সালে। কোন আমেরিকান সরকার-প্রশাসনকে ছুঁতে বা পৌঁছাতে গেলে সবচেয়ে ভাল উপায়টা কী? তারাই বা ভারতের বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে থাকেন? বিষয়গুলো ব্যক্তিগত মত করে জানা জরুরি। মোদির সেসব প্রয়োজন মিটাবার মত করে ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসার পর থেকে এরই প্রধান হাতিয়ার হয়ে আছেন জয়শঙ্কর, ঘটনা চক্রে যিনি তখন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।  ঘটনাচক্রে  মোদির তাঁকেই পছন্দ হয়েছিল।  আবার মোদিও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু নিশ্চিত নন যে, আমেরিকার কাছে কী চাইতে হয়, কী পাওয়া যায়; কিভাবে তা চাইতে হয় আবার কী চাওয়া ঠিক নয়, ইত্যাদি। আবার যেখানে মোদি আমেরিকার খাতায় ওসময়ের  কিছু দিন আগে পর্যন্ত গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে মুসলমান হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকলেও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন। আবার আমেরিকারও মোদির সাথে বিশেষ সম্পর্ক করা দরকার। কাজেই জয়শঙ্কর হয়ে যান মোদি আর আমেরিকা এ’দু’পক্ষের মনোভাব আগাম বুঝাবার ব্যক্তি ও দু’জনা দু’জনের বিশেষ দুত।  তাই সেসময় জয়শঙ্কর অবসরে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে হঠাৎ মোদি সেসময়ের উপস্থিত ফরেন সচিব সুজাতা সিংকে  সরিয়ে দিয়ে জয়শঙ্করকেই সচিব পদে নিয়ে নেন। আর এরপরে ২০১৯ সালে মোদি দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জিতে এলে ততদিনে জয়শঙ্করেরও  সচিব থেকেও অবসরে যাবার সময় তখন। কিন্তু আবার ভাগ্যের শিকা ছিড়েছিল।  তখন হঠাৎ মোদির আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মারা যাওয়াতে মোদি এবার জয়শঙ্করকে  মন্ত্রীও করে নিয়েছিলেন।

    কিন্তু সচিব হওয়ার এসব লালিত স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে একটা মূল ফ্যাক্টর থেকে যায় তা হল ‘বহনকারী’; মানে একটা রাজনৈতিক দল লাগে। কারণ তিনি তো আমলা ফলে একটা  রাজনৈতিক দলই কেবল তাকে রাজনৈতিক পদ দিতে পারে ও বসাতে পারে। শ্যাম সরণের ক্ষেত্রে এই দলটার নাম হল কংগ্রেস। অর্থাৎ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শেষের দিকে যত সামান্যই হোক পক্ষে একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থন পেতেই হয়। সচিব বা বিশেষ করে মন্ত্রী পর্যায়ে পৌঁছাতে গেলে রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট পাওয়া নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে যায়।

    এই বিচারে শ্যাম সরণকে দিনশেষে কেউ কংগ্রেসের লোক বলে ফেলবে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও ভারতে আরেকটা রেওয়াজ আছে যা এখন হয়ে উঠেছে আরেকটা বিষয়ের প্রশ্ন। তা হল  – জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ। এটাও প্রায় ফরেন মিনিস্টারের মতোই আরেক পদ। কারণ উপদেষ্টা ঠিক মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীর সম-মর্যাদার পদ। কোনো সাবেক ফরেন সচিব অবসর নেয়ার পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নিযুক্তি পেয়েছেন এমন হতে পারে ও হয়েছে। তাই এটাকেও এসব সাবেক আমলারা জীবনের বিরাজ ক্রেডিট ও অর্জন গণ্য করে। তা করুক কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এই উপদেষ্টা পদে সাবেক গোয়েন্দা বিভাগের আমলারাও নিয়োগ পেতে পারেন এবং পেয়ে থাকেন। যেমন বর্তমান মোদির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সাবেক “ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর” (আইবি) সর্বোচ্চপদ ডিরেক্টর ছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল – ফরেন সার্ভিস আর ইন্টেলিজেন্স বুরো এরা উভয় উভয়কে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে বসার জন্য অনুপযুক্ত বা কম যোগ্য মনে করে রেষারেষির কারণে। তাই কনুই-গুঁতা মারামারি চলে নিরন্তর। যেমনটা এখন জয়শঙ্কর আর দোভালের মধ্যে চলে আর মোদিকে সবসময় তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা সামাল দিতে হয়।

    এখানে একটা বাড়তি তথ্য দিয়ে রাখি, আশাকরি অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিনিষটা কী? আবার এটার সর্বোচ্চ উপরে কোন মন্ত্রী নয়, তবে এক উপদেষ্টা কেন? প্রশ্নদুটার জবাব একই। এটাই আসলে ‘র’ [RAW] এর আসল মন্ত্রণালয়-ঘটিত ডিপার্টমেন্ট এর নাম।  অন্যভাবে বললে ‘র’ – এটা ভারতের বাইরে ভিন্নদেশে গিয়ে নাশকতার কাজ করে বেড়ানোর প্রতিষ্ঠান; এটাকে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হবে – এই প্রশ্নের সমাধান হিসাবে এটা  জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার অধীনে; যেখানে আবার তিনি উপদেষ্টা, ঠিক মন্ত্রী নন। কেন?
    কারণ ‘র’ এর পরিচালনার জন্য দরকার ছিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডাইরেক্ট একসেস, রাত-বিরাতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি পৌছে যাওয়ার সুবিধা। বিদেশে কাউকে খুন করার সিদ্ধান্ত দেয়া ও এর দায় নেয়া কোন ছোট সিদ্ধান্ত নয়।  অথচ অন্য সবের মত এই প্রতিষ্ঠানকেও আর পাঁচটা কোন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর অধীনে রাখলে ডাইরেক্ট একসেস বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঐ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরই আগে সবকিছু বিবেচনা করে দেখা একটা এক্তিয়ার ও তাতে সময়ব্যয় করতে দিতেই হবে। এরপরে দরকার হলে প্রধানমন্ত্রী।  এই কালক্ষেপণ বন্ধ করতেই ‘র’ মূলত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের অধীনেই একটা বিভাগ করে রাখা হয়েছে। আর ওর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়মিত পরামর্শদান ও তথ্যে আপডেট রাখার কাজটা করেন ঐ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। বাইরে থেকে বুঝবার সুযোগ নাই যে  এই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা – উনার কাজকর্ম  ‘র’ কে নিয়ে যারা, কাকে মারবে ধরবে, খুনোখুনি ধবংস বিনাশ কাকে করবে ইত্যাদি এসব নিয়ে। এবং ভারতের নিয়ম অনুযায়ী, এই পদে সাবেক ফরেন সচিব অথবা সাবেক ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো চীফ এমন দুদিক থেকেই আসতে পারে। [এই ব্যাপারগুলো পাবলিকলি আরো  জানার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে ২০০৭ সালে ভারতে প্রকাশিত “কাও বয়েস” বা [The Kaoboys of R&AW] এই বই থেকে।]  যেমন  শিবশঙ্কর মেনন তিনি সাবেক ফরেন সচিব থেকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। আর এপর্যন্ত  কেবল পাঁচজন মানে পাঁচবার নয়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগে বদল এসেছে।  এ’হল, ভারতের আমলা থেকে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হবার গল্প।

    যেটা বলতে চাচ্ছি তা হল – ফরেন সার্ভিসের ব্যক্তিত্বরা সার্ভিসের শেষের দিকে পছন্দের দলের দিকে লীন হয়ে যেতে থাকেন আর অবসরের পরে তো ওই দলের লোকই হয়ে যান। সেই বিচারে শ্যাম সরণের ভাগ্যে জুটেছিল কংগ্রেস দল। সে কারণেই বা সেই থেকে কি নেহরু সম্পর্কে তার এত উচ্ছ্বাসের মূল্যায়ন? আমরা তা খেয়াল করে দেখব, বিচার করব।

    নেহেরুকে নিয়ে শ্যাম সরণের লেখাঃ
    গত ১৭ নভেম্বরে ভারতের দ্যা প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় শ্যাম সরণের প্রায় ১২০০ অক্ষরের কলামের দ্বিতীয় প্যারাতেই তিনি এক সমালোচনামূলক মন্তব্য লিখে বলছেন, “নেহরুর নেতৃত্বে ভুলত্রুটি ছিল, যার কিছু আবার দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক পরিণতি রেখে গেছে। তার কাশ্মির ইস্যু নাড়াচাড়ার মধ্যে ত্রুটি দেখি, ঠিক যেমন আমি তার ১৯৬২ সাল চীনের ভারতে অনুপ্রবেশকে ভুলপাঠ করার দোষ দেখি” [“There were flaws in his leadership, some of which left enduring and negative consequences. I would fault his handling of the Kashmir issue, just as I would his misreading of Chinese intentions in 1962.” ]।

    সারা জীবন আমলা হিসাবে কাটানো কাউকে শেষে কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক ব্যক্তিত্ব বলে অনুমান করে নেয়াটা ভুল হবে। তা সত্ত্বেও নেহরুর মত ‘পরম’ নেতার ভুলত্রুটি  আছে সেটা বলা – সেটা সম্ভবত এই প্রথম আমরা উচ্চারিত হতে দেখলাম। তা সু-রেওয়াজের ধারা হতে উঠতেও পারে হয়ত আগামিতে; যেটা ভারতে এখন নেই বা আমরা দেখি না। তবে শ্যাম সরণ সম্ভবত আদর্শ বা খাঁটি কোন চোখে নয়, প্র্যাকটিক্যাল চোখে দেখে বিচার করতে অনুরোধ রেখেছেন।

    কিন্তু এরপরেও আবার শ্যাম সরণ ডিপ্লোম্যাটের মত এখানে এসে পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন। এছাড়া আবার এই সুযোগে না বলার সুযোগ নিয়েছেন যে, কাশ্মির ইস্যু অথবা ১৯৬২ সালের চীনের আসাম দখল ইস্যুতে নেহরুর ত্রুটিটা ঠিক কী ও কোথায়? বরং এবার তিনি নেহরুকে প্রশংসায় ছেয়ে ফেলেছেন, আগের যে কারো চেয়ে এগিয়ে। আর তা করতে গিয়ে তিনি আর পাঁচটা ‘হিন্দু জাতিবাদীই’ হয়ে থাকার মধ্যে আটকে গেছেন। কোন ধরনের ব্যতিক্রম হতেও চেষ্টা করেননি। সবচেয়ে মজার কথা, তিনি নিজে “হিন্দু জাতিবাদী” অবস্থান নিচ্ছেন আর ‘জাতিবাদের’ পক্ষে কথা বলছেন সেদিকে খেয়াল নাই অথচ একই সাথে অভিযোগ করছেন সাতচল্লিশ সালে “ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ” হয়েছে [The country had been partitioned on the basis of religion…… ]। নেহেরু-গান্ধি যদি এক ‘হিন্দু জাতিবাদের ভারত’ বানাতে লেগে পড়েন এই এক্টটাই তো দেশভাগের পক্ষে তাদের শুরু করা প্রথম কাজ!  তাই নয় কী? এর মানে হল – নিজের অবস্থান যে, একটা ‘হিন্দু জাতিবাদের’ সেটা খেয়াল করার পরিপক্কতা তার এখনও হয়নি অথচ ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ’ কেন হল তা নিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটা হল – নেহরু-গান্ধী যদি ভারতকে একটা হিন্দু জাতিবাদী ভারত হিসাবেই গড়তে শুরু করে দেন (যা তারা বাস্তবে করেও ছিলেন) তাহলে এর সোজা মানে হল – তারাই তো তাহলে মুসলমানদেরও একটা মুসলমান জাতিবাদী পাকিস্তান গড়ে নিতে ঠেলে দিয়েছেন – তাই নয় কি? এটা বুঝতে কারো কষ্ট হলে বুঝতে হবে, সেটা হচ্ছে তাঁর হিন্দুত্বের  প্রতি গভীর ভালোবাসার আর মুসলমান বা ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ফোবিয়ার কারণে। এসবই পুরা এর পেছনের কারণ।

    এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার সময় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৫০ করদ রাজ্যের কথা তুলেছেন। মানে  যাদেরকে হবু ভারতে কেমনে জোর করে ঢুকিয়ে নিতে সেকাজে নেহরুর প্রশংসা করে নিতে চান এই সুযোগে। সরি এটা কোন প্রশংসনীয় কাজ ছিল না যে তাদেরকে নেহরু সামরিক শক্তি দেখিয়ে নেহরুর ভারতে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিলেন। অথচ তিনি এটাকে নেহরুর সাফল্য হিসেবে দেখছেন। অথচ এটাই ছিল ব্যর্থতা; কারণ, তিনি গায়ের জোরে কাজটা করেছেন; যা না করেও হয়ত এটা করা যেত।

    যেমন কোন স্বাধীন মানুষকে যদি চয়েজ দেয়া হয় যে, তিনি এক রাজার শাসনাধীনে থাকতে চাইবেন নাকি পাবলিকের প্রতিনিধিত্বের শাসনের অধীনে যেটা রিপাবলিক না জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র, এমন চান? করদ রাজ্যের সমাধান আসলে ছিল এ দুই চয়েজের প্রশ্ন। কাজেই নেহরুকে ওই সব করদ রাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হত যে, তারা কী চায়। কিন্তু নেহরু তা করেননি। তিনি গিয়েছেন করদ রাজ্যের রাজার কাছে। আসলে নেহরু বাসিন্দা নাগরিকদের কাছে নয়, তিনি গেছেন রাজার হুকুমের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে। আর এটাকেই তিনি সহজে কাম সারা ভেবেছিলেন।  এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এর মানে, তিনি তো রিপাবলিক ধারণাই বুঝেননি। তাই এর শক্তিও বুঝেননি। স্বাধীন মানুষ নিজের স্বাধীন চয়েজ প্রকাশের সুযোগ পেলে জনগণের শাসনাধীন রাষ্ট্র-এর পক্ষে থাকবে। কিন্তু নেহেরুর ভিতরে এসব বোধ কাজ করে নাই। কেবল এক হিন্দু জাতিবাদ বুঝের অন্ধকারে তিনি সব হারিয়ে ফেলিয়েছেন।

    আর সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মির সমস্যার মূল কথা বা মূল সমস্যাটাই তো এটাই। কারণ, প্রথমত কাশ্মিরও একটা বড় করদ রাজ্য অথচ এর সমাধানে তিনি কিছুই করতে পারেননি। করতে গেছেন হিন্দু রাজাকে পক্ষে টেনে সহজ সমাধান, যেহেতু বাসিন্দারা বড় সংখ্যায় মুসলমান তাই। একারণে, বাসিন্দাদের মতামতের কাছে যাননি। তাই এতে উল্টা তা এমন জটিল করেছেন যে, আজো ভারত-পাকিস্তান সব সঙ্ঘাতের প্রধান ইস্যু এটাই। অর্থাৎ শ্যাম  সরণের করদ রাজ্য ইস্যুর সমাধান নিয়ে নেহরু প্রশংসা করতে গেছেন যা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ‘খামোখা’ আর স্রেফ চাটুকারিতা! এই বয়সে (৭৫) এটা তাকে মানায় নাই বলাই বাহুল্য।

    শ্যাম সরণের জন্ম ১৯৪৬ সালে। পরের ২৪ বছরের মধ্যে  তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ১৯৭০ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে ফেলেছেন। মানে, মোটামুটি ১৯৬৬ সাল থেকেই ধরা যায় তিনি যথেষ্ট ‘ডাগর’ হয়ে গিয়েছিলেন। লক্ষণীয় ওটাই ছিল সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের দুনিয়া। অথচ আর পাঁচজন সেকালের গ্র্যাজুয়েট বা রাজনীতিকের মত তিনিও খবর রাখেননি যে, দুনিয়ার জন্য “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের” মুখ্য অর্থ ও তাৎপর্যটা কী? আর ১৯৪৫ সাল মানে, বিশ্বযুদ্ধ শেষের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে প্রধান ফারাকটা কী ও কেন?

    কিন্তু সে কথা আমরা কী দেখে বুঝলাম? কারণ, তিনি লিখছেন, “যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শান্তি স্থাপনের কিন্তু তা না হয়ে দুনিয়া দুই ইডিওলজির দুই সামরিক ব্লকে ভাগ হয়ে গিয়েছিল [The post-war world was already moving from the promise of enduring peace to a prolonged confrontation between two powerful ideological and military blocs, with the constant threat of a nuclear holocaust.]। তিনি আসলে সোভিয়েত ও আমেরিকা এভাবে দুই ব্লকে ভাগের কথা বলছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন বা কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ব্লকে ভাগাভাগি এসেছিল একমাত্র ১৯৫৩ সালের পরের ঘটনা হিসেবে। এমনকি তাও ইমিডিয়েট পরে নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার শপথ নিয়েছিলেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩। আর এরপর প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতি বিশেষ করে সামরিকনীতি যেখানে আসলে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়াদি এসেছিল; আর তা বাইরে প্রকাশ্যে আসতে আসতে দুই বছর লেগেছিল। য়ার সবচেয়ে বড় কথা এগুলো তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাৎপর্য নয় বরং যুদ্ধ শেষের দশবছর পরের ঘটনা। যা প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার (১৯৫৩-৬১)-এর দুনিয়াকে একেবারেই উলটা এক নতুন গতিপথ যার সাথে বিশ্বযুদ্ধের নেতা রুজভেল্টের (১৯৩৩-৪৫) কাজ ও তৎপরতার কোনোই সম্পর্ক নেই বরং উলটা ততপরতা এগুলা। যার মানে শ্যাম সরণও নেহরুর মতই রুজভেল্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই স্টাডি অথবা ন্যূনপক্ষে আমেরিকান ইতিহাস পাঠ ইত্যাদি ঘটনার দিকে যানই-নি। কাজেই তিনি নেহরুর মূল্যায়নকারী হবেন কিভাবে? আর ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে ফারাকটা কী ও কেন তা কিভাবে বুঝবেন?

    অতএব তিনিও যে মুখস্থ কথার এক গতানুগতিক চাপাবাজ তাও প্রমাণ করছেন এখানে। আবার যেমন লেখার শেষের দিকে তিনি  “সেকুলারিজমে” নিষ্ঠাবান এক  মহাভক্ত হিসেবে নিজেকে হাজির করেছেন।

    ভারত সম্পর্কে লিখছেন, “একটা বহু ধর্মীয়, বহু কালচারের রাষ্ট্র ভারত সেকুলার রাষ্ট্র না হলে আর কী হতে পারে [A multi-cultural and multi-religious country could not be anything but a secular State ……]?  অথচ  ঘটনা হল, শ্যাম সরণ সেকুলার শব্দটা জানছেন, শিখেছেন কবে থেকে? তিনি কি জানেন ১৯৭৬ সালের আগে সেকুলার শব্দটা ভারতের কনস্টিটিউশনে কখনো ছিল না! আসলে ১৯৭৬ সালেই প্রথম সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনের আরেকটা নীতি হিসেবে নয়া সংশোধনী জারি করে তা ঢুকানো হয়েছে এবং তা খামোখাই এবং নিজেদের হিন্দুজাতি চিন্তা লুকাবার জন্য। আর তাতে তাই কেবল একটাই লাভ হয়েছিল যে, এটা দিয়ে নিজেদের হিন্দুত্ব প্রীতি ও হিন্দু-জাতিবাদ প্রীতিকে লুকিয়ে এর উপরে সেকুলার জামা টাঙানো গিয়েছিল তখন থেকেই। এই আর কী! আর সেকুলারিজমকে যারা নীতি হিসেবে দেখতে ও বুঝতে চায় তারা অবশ্যই ভণ্ড ও মুসলমানবিদ্বেষী। আমার রাষ্ট্রনীতি সেকুলারিজম এমন কথা লিখে কনুষ্ষ্টিউশনে সেটে দিয়ে বাস্তবায়ন করার বিষয়ই নয়। এমনকি কোথাও না লিখে রেখেও সৎভাবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব।  তাই  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এরা এসবের কোনো পাঠ-পড়াশোনা ও ফ্যাক্টস যাচাইসহ কোনো হোমওয়ার্কই করেননি।

    করণীয় সেকুলারিজম নয়; মূল করণীয় মানুষ জাতি নয় নাগরিক এই বোধে এবার  নাগরিক অধিকারে সাম্য মানে বৈষম্যহীন করা – এর বাস্তবায়ন – এটাই সব কাজের কাজ।  অথচ তারা কোন একটা জাতির কথা মানে “ধর্মীয় জাতির” কথা আনবেই আর এরপর জাতি-রাষ্ট্রের গড়ার দিকে হাটা দিবে।  অথচ সকলেই জানে এই জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট মাত্রই তা নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করবেই।  ফলে সে আবার কিসের সেকুলার নীতি করবে?  আর নেশন স্টেট মাত্রয়ই সেখানে আর না নাগরিক ধারণা  না নাগরিক অধিকার ধারণা কোনটাই থাকে না। সব আবছা করে ফেলা যায় সহজেই জাতি আর দেশপ্রেমের জোশে।
    কথা আরও আছে। নেশন-স্টেট যারা আদি চর্চাকারী (১৬৫০-১৯৫০) তারা সবাই ইউরোপের কলোনি দখলদার রাষ্ট্র ছিল। সারা দুনিয়ায় কলোনি দখল করে বেড়ানো তাদের প্রধান ব্যবসা, প্রধান পেশা এবং প্রধান রাষ্ট্রনীতি ছিল, এই টানা ৫০০ বছর ধরে।  ফলে তারা নাগরিক অধিকার বা মূল নাগরিক ধারণা কী বুঝবেবা বুঝেছিল? ফলে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতার কী আর বাস্তবায়ন করবে? অথচ আমরা তা পড়িনি, খোঁজ খেয়াল  রাখিনি।

    এজন্যই এসবের বিপরীতে মূল প্রশ্নটা আসলে ‘নাগরিক সাম্য’ কায়েম। মানে, সবার সমান নাগরিক অধিকার থাকতেই হবে। সেকুলার বলে দুনিয়াতে কিছু থাকলে এর একটাই ইতিবাচক অর্থ, সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ এটা কোনো জাতিরাষ্ট্র মানে নেশন-স্টেটে অর্জন একেবারেই সম্ভব নয়। যেমন বাঙালি জাতিবাদ পাহাড়িদের সমান নাগরিক গণ্য করবে না। করেনি। এমনকি পাহাড়িদের জুম্ম-জাতিবাদ সেটাও তাদের বাইরের কাউকে তার সমান গণ্য করবে না। হিন্দু নেশন-স্টেট মুসলমানকে সমান নাগরিক অধিকারের গণ্য করবে না, প্র্যাকটিস করবে না। একই অবস্থা হবে মুসলমান নেশন-স্টেটে হিন্দু নাগরিকের।
    এসবই একেবারে গোড়ার মূল সমস্যা; এগুলোই চিন্তার গভীর ত্রুটি । হিন্দুত্ববাদ আড়াল করা যার লক্ষ্য সেই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধি দিয়ে এসব কোনো সমাধান নয় বা কিছুই আড়াল কেমন করে করবে!  বরং মুসলমানবিদ্বেষের উৎস লুকানো হয়ে আছে এটাই!

    শ্যাম সরণ বলছেন, একালের ভারত নাকি “ভারত রাষ্ট্রের সেকুলার থেকে দূরে চলে যাওয়ার কুৎসিত পরিণতি” [We see the ugly consequences of the State departing from the secular norm.]।  মানে হল, তবু এসব লোকগুলো পড়াশুনা না করে, বাস্তবে কি হচ্ছে তা না দেখে কথা বলবে।   খুব ভালো কথা। তাহলে গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেস ও তার একালের প্রতিনিধি ও নেতা রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ‘সফট হিন্দুত্ব’ চাচ্ছে কেন আর মোদির সাথে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে কেন? তাহলে আসলে সারা ভারতজুড়ে  প্রধান রাজনৈতিক ধারা এখন খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ। হিন্দুত্ব মানে এই হিন্দু-জাতিবাদ এটাই কি নেহরু-গান্ধীর ভারত নয়? এর আরও  সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – মোদি বা বিজেপি কি ঘোষণা দিয়ে খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ চর্চা করতে গিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছে?  কোনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা কোনো নির্বাচন কমিশনের আইনে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, হচ্ছে? কোথাও হয়নি। কারণ এটাই তো নেহরু-গান্ধীর ভারত ও ভারতের কনস্টিটিউশন, তাই নয় কি? মোদি তো তাদের কনস্টিটিউশন বা ভারতকে কোনো বদল করে নেননি! কাজেই আর কী প্রমাণ লাগবে? ফলে,  এনিয়ে একে তাকে দায়ী বা অভিযোগ করার সুযোগ কই?

    তাহলে এভাবে নিজের সাথে প্রতারণার দরকার কী? শ্যামসরণ এভাবেই মোদির আগের কংগ্রেসের প্রতারণাপূর্ণ হিন্দু-জাতিবাদ করে যেতে চান, এটাই ফারাক দেখাতে চান, তাই কী?  এতে কী ফারাক হবে? অথচ পরে অপর অংশ মানে মোদিকে তিনি বলছেন, ওরা ধর্মান্ধ বা বাইগট-ধারা [small-minded, vulgar and bigoted version]।  অর্থাৎ নিজেকে আড়াল করার নখরা এরা তবু করবেই! অথচ মোদি-আরএসএস এরা বরং তুলনায় ‘ভালো’; কারণ তারা খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদী। তারা কংগ্রেস, নেহরু বা শ্যাম সরণের মত নিজের হিন্দুত্ববাদ লুকায় না, অর্থহীন সেকুলার জামা গায়ে দেয় না! শ্যাম সরণের চোখ এই নেহরুই তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব!! এটাকে এক বোকা চাটুকারিতা ছাড়া আর কী বলা যায়?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২০ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “শ্যাম সরণের নেহরুপ্রীতি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • এক মফস্বলী জেনারেল

    এক মফস্বলী জেনারেল

    গৌতম দাস

    ০৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Nt

     

    –China Attempting To Reduce India’s Influence In Myanmar, Sea: Bipin Rawat

     

    ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াত [General Bipin Rawat], তার পদবি হল চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ, সিডিএস বা CDS; যা ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদেরও উপরের এক পদ ও পদবি। এই পদটি সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে। জেনারেল রাওয়াত ভারতের যখন (২০১৭-১৯) আর্মি চীফ ছিলেন তখন এটা মোদির হাতে তৈরি হচ্ছিল।  বলা যায় আর্মিকে হিন্দুত্ববাদ ও আরএসএসের আলোতে ছাপ দিয়ে সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ এটা।  তাই এই পদ সৃষ্টি হলে এর প্রথম পদাধিকারী হয়েছেন ততদিনে অবসর নেয়া ভারতের আর্মি চিফ এই জেনারেল বিপিন রাওয়াত। আর ওর শুরু, গত ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

    তিনি সম্প্রতি আসাম সফরে গিয়েছিলেন; গত ২০ অক্টোবর এক অভ্যন্তরীণ সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিতে। ঘটনা হল – আসাম পুলিশের এক অনুষ্ঠান ছিল সেটা। সভাটা হল – “প্রথম রবিকান্ত সিং মেমোরিয়াল লেকচার সিরিজ” যা আয়োজিত হয়েছিল ভারতের আইপিএস অফিসার ও পুলিশের এসপি রবিকান্ত সিং স্মরণে। তিনি আসামে তাঁর কাজের জেলা তিনসুকিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবিরোধী তৎপরতা দমনের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দল ‘উলফা’র হাতে তিনি খুন হয়ে যান। এসবই তাই আসামের আভ্যন্তরীণ ঘটনা।

    জেনারেল রাওয়াত ছিলেন সেই স্মরণসভার প্রধান বক্তা। পুরো অনুষ্ঠানে এক তিনি ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন সিভিলিয়ান। আর সাথে বক্তৃতার স্টেজে দেখা যাচ্ছে পেছনের টাঙানো ব্যানারে বাংলাদেশে বর্তমান ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দোরাইস্বামীর নাম, মানে তিনিও সেখানে বক্তা ছিলেন।

    যে উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠান, তার সাথে ওর দুই প্রধান বক্তা এবং প্রধান বক্তার বক্তব্যের বিষয় ইত্যাদি এসবগুলোর সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। বরং দেখা গেছে, খামোখা কোথা থেকে বাংলাদেশ সেখানে আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ না হয়েও। কেন?

    কেন বাংলাদেশঃ
    “Assam at crossroads: Geopolitical events its Geographical events in its neighbourhood impacting North East India” – এই ছিল সভায় আলোচ্য বিষয়। বাংলা করলে হয়, নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়ার পড়শি দেশের জিও-পলিটিক্যাল ঘটনায় আসাম বড় বিপদে আছে, এরকম।

    সেখান থেকে  বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মূল কথাগুলো তুলে আনলে, জেনারেল রাওয়াত বলছেন, ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে (আর নট ইন ইন্ডিয়াস ইন্টারেস্ট’)। আরো বলছেন, “আমাদের সাউথইস্ট এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে চীন ঢুকে পড়ছে তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে। সম্প্রতি আমরা দেখছি একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।

    এখানে বক্তব্যগুলো নেয়া হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস, আসামের নিউজ-লাইফটিভি ও স্ক্রল (Scroll)ওয়েব ভারতীয় পত্রিকা থেকে। এছাড়া এখানে আলাদা করে বাংলাদেশের বণিকবার্তা পত্রিকার নাম ও রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিশেষত ভারতীয়  নিউজ বাংলাদেশে স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় কী করে রিপোর্টিং করতে হয় এর অনুকরণীয় উদাহরণ হিসাবে। বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া যেখানে বিপরীতে এটাকে ভারতীয় প্রপাগান্ডা করে অর্থ আয়ের উপায় হিসাবে নিয়েছে। তারা  “পছন্দের” ভারতীয় পত্রিকা বা ‘র’ এসাইন্ড নিউজের বাংলায় অনুবাদ করে বা অনুবাদের নামে যা খুশি লিখে ছাপিয়ে থাকে।  ঢাকার এমন অন্য বাংলা সব মিডিয়ার জন্য বণিকবার্তা এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত; যদি কেউ ভাল হতে চায় অনুসরণ করতে পারে।

    উপরে তুলে আনা জেনারেল রাওয়াতের কথায় ফিরে যাই, তার প্রথম বাক্য  ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে” – এই  বাক্যতেই তার কথা মিললো না।  যেমন চীন বাংলাদেশে ‘হানা’ দিচ্ছে, এই হানা দেওয়ার মানে কী?  চীন বাংলাদেশের কীভাবে হামলা দিয়েছে? কোন সামরিক হামলা করেছে নাকি? তা অবশ্যই না।  এছাড়া চীন বাংলাদেশে হানা দিলে বাংলাদেশ কি তাতে আপত্তি জানিয়েছে কারও কাছে নাকি? তা তো না।  এমনকি সে কথা কিন্তু রাওয়াতও আমাদের জানাচ্ছেন না। তাহলে?

    অথচ – এক. রাওয়াত নিজেই বলছেন, চীন অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তার মানে ব্যাপারটা বাণিজ্যিক। তাহলে এটাকে রাওয়াত হানা দেওয়া [foray] বলছেন কেন?  মানে সাথে একটা সামরিক  ভাব-ইঙ্গিত তুলছেন কেন? এটা একে বাণিজ্যিক জিনিস তার ওপর ‘অবকাঠামো বিনিয়োগ’ কোনো বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয় – ফলে গ্রহিতা দেশের জন্য খুবই কাম্য; যা  বাংলাদেশকে  দেওয়ার ভারতের  মুরোদ নেই, এখনো হয়নি। বরং পারলে এই বিনিয়োগ ভারত-ই চীনের কাছ থেকে নেয়। তাহলে রাওয়াত এটাকে চীনের বাংলাদেশে ‘হানা দেয়া’ বলছেন কেন? অবকাঠামো বিনিয়োগ দেয়া কী করে ‘হানা’ দেয়া হয়? সেটাও কি ঈর্ষায় বলা কথা? সে জন্য?  নাকি সম্ভবত  রাওয়াত কি সামরিক তৎপরতা আর অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে আসা – এ দুয়ের ফারাকই বুঝেন না? একটা বাণিজ্যিক তৎপরতাকে যদি তিনি সামরিক হানা দেয়া বলেন, বুঝেন, তাহলে বলতেই হয় চার স্টার জেনারেল হলে হবে কী তিনি এখনো এক “মফস্বলের লোকই’ রয়ে গেছেন।  মানসিক বৃদ্ধি-বিকাশ কিছুই ঘটেনাই।  মফস্বলিয়া মানে শহরায়ন হয় নাই। জ্ঞানবুদ্ধি, মুল্যাবোধে অপুষ্ট থেকে গেছে যার।  ভারতের মডার্নাইজেশন, এডুকেশন ধারা যথেষ্ট বিকশিত ফলে ওর সামরিক মান তো খারাপ মনে করার কিছু নাই। তাহলে জেনারেল রাওয়াতের বেলায় এমন কেন সে এক প্রশ্ন বটে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায় – এটা কোন সামরিক জেনারেলের নুন্যতম স্ট্যান্ডার্ড নয়।

    আর এর মানে দাঁড়ালো জেনারেল বিপিন তো চীনের বিরুদ্ধে তার অভিযোগটা কী তাই তো প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না। চীনের বাংলাদেশে বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ানোর মুরোদ যদি থাকে ও প্রয়োগ হয় তা নিয়ে ভারতের কিছুর বলার নাই। আর যেকোন দেশ তা করবেই এবং তা বৈধ। তবে বড় জোর রাওয়াতের এনিয়ে ঈর্ষা হওয়া জায়েজ। কিন্তু তবু এই ঈর্ষা হতে হবে গোপনে বা মনে মনে অথবা আভ্যন্তরীণ গোপন নন-পাবলিক দলিলে।  কারণ, প্রকাশ্যে ঈর্ষা দেখানো  ভাল আদব ও রুচির পরিচয় নয়। তবে সবচেয়ে ভাল হবে চীনের যোগ্য প্রতিযোগী হয়ে আরো বড় বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের দরজা খটখটানো।আর এই মুরোদ না থাকলে ভারতের চেপে যাওয়াই ভাল! নয় কী? দেখা যাচ্ছে জেনারেল বিপিন যেন জিদ করেছেন  যে তাঁর এই বোকা ব্যবহার আমাদের সামনে বের করবেনই!

    এমন মন্তব্য করেও কেন জেনারেল বিপিন রাওয়াত এমন বোকা বোকা ব্যবহার করতে পারেন আর সেটা কেন কেমন হল এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে মনে হল, এটা এমনি এমনি সম্ভবত বুঝা যাবে না। তার ‘ভারতীয় মনগঠনে’ প্রবেশ করতে হবে।  একাজে আগে কিছু কথা আগাম ধরে নিতে হবে যেটা সম্ভবত তাঁর মনে ধরে নেয়া আছে। বছর কয়েক আগে ভারতের এক মিডিয়ায় দেখেছিলাম এক অনুমান যে, সারা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই ফলে বাংলাদেশের উপরেও, মানে যেন বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারির অধীনে আছে। নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া এই অনুমানের উপর তারা লিখছিলেন। অনেক ভারতীয় মিডিয়ায় সেকালে দেখেছিলাম লেখা হয়েছে একইভাবে ও অভিযোগে যে, চীন সাউথ এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়া নাকি ভারতের বাগানবাড়ি – এটা আগাম ধরে নিতেই হবে। আর বাগানবাড়ি মানে মূল বাড়ির পেছনের যেমন বাড়ির মালিকের বাগানবাড়ি থাকে, বাংলাদেশ হলো ভারতের সেই বাগানবাড়ির অংশ। বাংলাদেশে মানে ভারতের সেই কথিত বাগানবাড়িতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে এসে ঢুকে গিয়েছে।

    কেন ধারণাটা আমদানি করতে হল?
    কারণ এই উটকো ধারণাটা ছাড়া চীনের সাউথইস্ট এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এটাকে নেগেটিভ বা খারাপ কাজ বলা যাচ্ছে না।  এটা ভারতের স্বার্থের বিরোধী কাজ তাও বলা যাচ্ছে না। অথচ এতে বেকুবিটা হল –  বাংলাদেশ কী করে ভারতকে বাগানবাড়ি হল? কে দিয়েছে, ও কীভাবে? এর সাফাই কে দিবে সে খবর নেই। কিন্তু এটা আগাম ধরে নেওয়া আছে।
    এখন বাংলাদেশ যদি ভারতের বাগানবাড়ির অংশ হয় তাহলে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ( রাওয়াত নিজেই বলছেন, ……a tremendous influx of Chinese investments to build community projects and infrastructure.) নিয়ে বাংলাদেশে আসা মানে চীনের ভারতের বাগানবাড়িতে আসাই হয় – আর সেই সুত্রে, তা তো চীনের বাংলাদেশে হানা দিয়ে আসাই হয় – তাতে বিপিন রাওয়াত বলতেই পারেন! নাকি?
    এ ছাড়া দুই নম্বর পয়েন্ট হল – রাওয়াত বলেছেন, “বাংলাদেশ অনেক চীনা অস্ত্র কেনে”। (…… countries have been the largest recipients of military-grade weapons from the Chinese)।
    হ্যা, তো কিনে! কিন্তু তাতে কী হয়েছে? বাংলাদেশের অস্ত্র কেনা কী বেআইনি? না কি?  ভারতও কী আমেরিকা, রাশিয়া বা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড থেকে ‘মিলিটারি গ্রেড’ অস্ত্র কিনে না? আর এমন ক্রয়ের আগে কি ভারত প্রতিবেশী বাংলাদেশের অনুমতি নেয়? না। তাহলে  রাওয়াতের মনে এতে কী সন্দেহ জাগে তাতে আমাদের কী? আর অনেককে নিয়ে অনেকেরই নানা সন্দেহ থাকতেই পারে যা নিজ নিজ বাহিনীর অভ্যন্তরে কৌশলপত্রে থাকে ও এর অংশ হয়। তো  থাক  সেসব কথা। কিন্তু আসামের ঐ প্রকাশ্য সভায় তা উগরানোকেন? এটা কী কোন বুদ্ধিমানের কাজ? মানে এসব কী তাহলে বাংলাদেশকে শুনানো, ভয় দেখানোর জন্য?

    দিন সব একই রকম থাকেনা, বদলায়। তাই একালে বিপিন রাওয়াতের এসব ছেড়ে দেয়া উচিত। আগের এক লেখায় বলেছিলাম বোকা মানুষ জেনে না জেনে নিজেই নিজের শত্রু জন্ম দেয়, শত্রু খাড়া করে এবং শত্রুর মধ্যে বিশেষ সব আকার-বৈশিষ্ট্য তাতে এঁকে দেয়। আবার পরে এই মানুষই কান্নাকাটি করে যে, আমার শত্রু এমন কেন হলো! কাজেই রাওয়াতের বুদ্ধিমান হওয়া উচিত, এসব ‘কইরেন না।’ বাংলাদেশকে ভারতের শত্রুর আকার-বৈশিষ্ট দিয়েন না, নিজের খাতিরে।  ভারত চাইলে অবশ্যই এসব কাল্পনিক শত্রু কল্পনায় এঁকে চলতে পারে। এতে এক পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশকে চীনের কোলে আশ্রয় নিতে ঠেলে দিতেও পারে। কেননা, অকারণে ও অত্যধিক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হলে যে কেউই নিরাপত্তার জন্য ছোটাছুটি করবেই। তাতে উপায়ন্তর না পেলে সে চীনকে বা যে কাউকে শক্তিশালী ও ভারতবিরোধী পাবে তাকেই ডেকে আনবে। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই বলছিলাম ঠেলেন না!  কাজেই বাংলাদেশ ভারতের  কেমন শত্রু হবে সেটা নির্ধারণ বা নির্বাচনও ভারতের হাতেই আছে, রয়েই গেছে – এটা খেয়াল রেখেন।

    ভারতের আরো করণীয় কী?
    করণীয় হল – ১. আমরাও ব্রিটিশদের কলোনি ছিলাম যা থেকে ১৯৪৭ সালে মুক্তি পেয়েছি। কাজেই এরপর আমরা কোনোভাবেই ভারতের বাগানবাড়ি নই। সারা সাউথ এশিয়াও নয়। কথাগুলো ভারতের লিখে মনে রাখা উচিত। এছাড়াও লাস্ট ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কখনোই নেহরুকে পরবর্তী ভাইসরয় করে দিয়ে যাননি। কারণ মাউন্টব্যাটেনই সর্বশেষ। কাজেই নেহেরুর মত  মিথ্যা কল্পনায় স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেন। রাওয়াতের মত সবাই বন্ধ করেন যে, বাংলাদেশ ভারতের বাগানবাড়ি আর চীন সেখানে ‘হানা দিতে’ এসেছে।

    বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারি নয়। ইঙ্গিতেও এটা সত্যি না, ভুল। তাই, প্রথমে মিথ্যা স্বপ্নের গল্প বা মিথ থেকে বের হয়ে আসেন। আর জেনে রাখেন, আপনারা আমাদের চাপাচাপিতে ভয় না দেখালে, পুশ না করলে, বাধ্য না করলে (আমরা জানি চীন-ভারত সামরিক সমস্যা বিতর্ক-বিরোধ আছে; তবে) আমরা সেই সামরিক বিরোধে কখনো কোনো পক্ষ নিব না। কারণ ওতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো স্বার্থ নেই। এটা চীন বা কারো কোনো হবু প্ররোচনা বাংলাদেশের ওপর আসার আগে থেকেই আমরা নিশ্চিত, আমাদের স্বার্থ নেই। আর সস্তা বলে চীনের থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি আমরা, সেটা এক জিনিস। কিন্তু এর মানে কোনো বিরোধে চীনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে এমন মুচলেকা কোথাও দেইনি আমরা। এখন বাকিটা হলো বুদ্ধিমান ভারতের হাতে ও উপরে।

    কাজেই “আসাম নাকি ক্রসরোডে পড়েছে” – এটা আমাদের জানার কথা নয়। আমাদের কনসার্ণ না।  তাই যদি পড়েও থাকে এর মধ্যে বাংলাদেশ কেউ না এবং নেই। সবটাই আপনারা ভাইসরয় বা বাংলাদেশ আপনাদের তালুক এই- জাতের অসার কল্পনাপ্রসূত চিন্তার সমস্যা। আর নয়তো তা ভারত-চীনের কোনো সামরিক, ভৌগোলিক বা স্ট্র্যাটেজিক বিরোধ যার কোনোটার অংশ আমরা নই। তবে এই অজুহাতে আবার ২০০৮ সালের মত বাংলাদেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চান? কে বসবে ঠিক করে দিতে চান? পরের ১২ বছরের জন্য কাউকে বসাতে চান? আসেন চেষ্টা করে দেখেন! তবে মনে রেখেন, কোনো ঘটনা দুনিয়ায় একই রকমভাবে দু’বার ঘটে না! কেবল আবার বলব, নিজের শত্রু কেমন হবে মানুষ নিজেই এর আকার-বৈশিষ্ট্যদাতা!

    সত্যি কথা সরাসরি বললে, বিপিন রাওয়াতের কথার আসলে মানে হয় না। প্রথমত বাণিজ্যিক আর সামরিক তৎপরতা বা স্বার্থের ফারাক তিনি পরিষ্কার বুঝেন ও মনে রাখেন বলে আর মনে হয় না।। যেমন ধরেন – আমরা কি বলতে পারি যে, আমার ছেলে কেবল ম্যাট্রিক দিলো তাই পড়শির ছেলে  বুয়েটের পরীক্ষায় টিকে চান্স পাওয়াতে এটা আমার পরিবারের স্বার্থবিরোধী কাজ ও ঘটনা হয়েছে? পড়শির কোন সমৃদ্ধি মানে কী তা আমার স্বার্থবিরোধী? এভাবে বলা যায়? সেক্ষেত্রে, এটা বড়জোর হিংসার কথা, তাও আবার বেকুবি হিংসা কথা হবে!

    অথচ রাওয়াতই বলছেন, “চীন তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে সাউথ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে ঢুকে পড়ছে” সম্প্রতি আমরা দেখছি “একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।  মানে  রাওয়াতের কথাতেই এটা পরিষ্কার যে, এর পুরোটাই বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো বিনিয়োগ, সামরিক নয়। কাজেই এটা ভারতের স্বার্থ কি না, এতে ভারতের স্বার্থ আছে কি না ইত্যাদি প্রশ্ন তোলারই তো মানে হয় না, বোকামি। পড়শির ঘরে মেলা বাজার-সওদা আসলে এটা আমার স্বার্থে না, একথা বললে কী মানে হয়? তখন রাওয়াতকে বলতেই হয় যে, হ্যাঁ, অবশ্যই এসব বাজার-সওদা আপনাদের জন্য নয়, কাজেই এটি ভারতের স্বার্থ নয়। কিন্তু সে জন্য কান্নাকাটি করা যায় না, অভিযোগ করা যায় না, কেবল এ ঘটনা আপনাদের স্বার্থবিরোধী বলে চিৎকার করলে আপনাদের পাগলাগারদে পাঠানোই বাকি থাকে!

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত, আপনাকে আবার মনে করিয়ে দেই। ভারতের নীতি আসলে – ‘আমরা ভালো প্রতিশ্রুতিশীল পার্টনার হতে পারব না’- এটাই যেন হয়ে আছে। বরং কে কত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারে, ঠকাতে পারে এরই দক্ষতা দেখানোকেই আপনারা যোগ্যতা মনে করে আসছেন। ভারত বড় দেশ, ১৩৫ কোটির দেশ, তাই ভারতের এসব ‘জুয়াচুরি’ পড়শিরা যেন মানতে বাধ্যই থেকে যাবে। আর এই পরিস্থিতিতে এখন আপনাদের পড়শি দেশে আপনাদের কথিত বাগানবাড়িতে চীন কেন আসবে – আপনারা সেই দুশ্চিন্তায় থাকলে আমাদের কী করার আছে? এটি আপনাদেরই সম্ভবত মানসিক সমস্যা।

    বৃহত্তর দিকটা দেখিঃ
    ব্যাপার হল, ভারত বাংলাদেশের আইনিভাবে প্রাপ্য ৫৪ নদীর পানিতে আমাদের ভাগ লুটে খাচ্ছে – এটা কি এভাবেই চলতে পারে মনে করেন? কখনোই নয়। ভারত নাকি দক্ষিণ চীন সাগরে সবার অবাধ চলাচলের নেভিগেশনের রাইট চায়? সে জন্য চীনবিরোধী কোয়াড জোট বেঁধেছে। তাহলে আমাদের পানির রাইট দিতে চায় না, জন্ম থেকে পানি আটকে রেখেছেন কেন? যদি বলেন আপনাদের গায়ে বল আছে তাই দিবেন না। এর মানে বুঝেন?  আসলে বলছেন, আমাদেরকে ঠেলছেন যে, ভারতের চেয়ে বড় বা বেশি গায়ের বল নিয়ে আসো। তাহলে এসে নিয়ে যেও। অর্থাৎ বলশালী ভারতবিরোধী দেশের কাছে যেতে বলছেন? বুঝে বলেন কিন্তু!

    বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার সময় আগে থেকেই ভারতের দুই শর্ত হল যে, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় আসামের জন্য সব ধরনের করিডোর নিবেন। দিতে হবে। এমনকি রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর সেটা আড়াল করতে শর্ত হল, বিনিময়ে ভারত ছিটমহল লেনদেন সম্পন্ন করবে, যেটা শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিক কথা দিয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে বেরুবাড়ি হস্তান্তরের পরও ভারত আমাদেরটা তখনো দেয়নি। সেটাই এবার দেয়ার কথা। এটা কিন্তু দয়া নয়, আমাদের পাওনা। পাওনাটা আটকে রেখেছিলেন। কাজেই এটা তো করিডোর দেয়ার বিনিময়যোগ্য কিছু নয়। তাই আসলে এটাও ছেলেভুলানি!

    আর দ্বিতীয় শর্তটা ছিল তিস্তা নদীর পানি। যা ভারত আজও দেয়নি, কখনো দিবে না বলে বুঝা  হয়ে গেছে। ভারতেরই কেউ নাকি বাংলাদেশকে পানি দিতে দেয়নি – এ কথা যদি ভারত বলে তার মানে হবে ভারতেরই কথিত ‘কেন্দ্র’- এর সার্বভৌম মুরোদ নেই। এমন যদি ‘মাজাভাঙা’ হয় তাহলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ভারত করে কেন, কী করেই বা করে যা পালন করার মুরোদ নেই? নাকি অজুহাত খাড়া করতে এমন চুক্তি করে?

    তাহলে এখন কেন বাংলাদেশ আপনাকে যোগ্য পার্টনার মনে করবে? আবার দেখুন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে এমন বড়ভাইয়ের ভয় দেখিয়ে ভারত চলে আসছে। তাহলে এখন, চীন কেন পড়শিদের দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসে, এ নিয়ে আপনাদের জ্বলুনি দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, ভারতের হাত ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে সব নিয়ন্ত্রণ? তাহলে আপনাদের কথিত প্রভাব এখন কোথায়? কাজেই সাবধান হওয়া উচিত! কী চাচ্ছেন, মানে কিভাবে আপনার হবু শত্রুর আকার আমাদেরকে দিচ্ছেন – এ দুটি বুঝেই  কথা আগাবেন আশা করি। এটা মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

    বিপিন রাওয়াত কে?
    ২০১৭ সালের শুরু থেকে জেনারেল বিপিন রাওয়াত ভারতের আর্মি চিফের দায়িত্বে এসেছিলেন। সেই থেকে জেনারেল রাওয়াত সম্পর্কে বাংলাদেশের মনোভাব কেমন তার এক সারসংক্ষেপে জানা যেতে পারে।

    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত তিন বছর রাওয়াত ছিলেন ভারতের সেনাপ্রধান। তিনি তিন বছরের আর্মি চিফের পোস্টে আসীন ছিলেন রুটিনভাবেই। তবে সে সময়ই নতুন পদ সিডিএস সৃষ্টি করা হয় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। এই পদ ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের পদ হলেও এটা শুরু থেকেই পোশাকী মানে উর্দি বা সামরিক পদ ছিল। কিন্তু এটা ঠিক, তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের আগের যে যারা যেখানে সরকারি পদ যা একেবারে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত যার যা দায়িত্ব কর্তব্য ও কমান্ড যা ছিল সিডিএস [CDS] পদ সৃষ্টির পরেও, আগের সে কাঠামোতে কোনো বদল আনা হয়নি।
    আনুষ্ঠানিকভাবে তাই যা আগে বলা হয়েছিল, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বা সিডিএস পদ তৈরির পরও তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর সোজা মানে, সিডিএস তিন বাহিনী প্রধান আবার বাইরের কাউকেও কমান্ড করতে পারবেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে সিডিএসের কাজ হল তিন বাহিনী প্রধানের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা। আর সাথে কোথাও কোথাও আকার-ইঙ্গিতে বলা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথেও সমন্বয় করা।

    একারণে, এটাই অনুমান আকারে ভারতে প্রচলিত আছে যে, আরএসএস-মোদি ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও হিন্দুত্বের ছাপ দিতে চায়। একারণেই এই নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে। বাইরের চোখে যা একটা কথিত কো-অর্ডিনেশন।

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত আর্মি চিফ থাকার সময় থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে যেন তিনি বিজেপি কর্মী এমন আচরণ ও তাল দেয়া শুরু করেছিলেন; যার প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট বলে মনে করা হয় ২০১৯ মার্চ-মে মাসের নির্বাচনের ঠিক আগেই পাকিস্তান হামলার ভনিতা সাজানো। বিজেপি ও মোদি চেয়েছিলেন পাকিস্তানে সাজানো হামলা ও এভাবে প্রতিশোধ নেয়ার জোশ তোলা। তাতে যেন মোদির নেতৃত্বে বীরত্বের সাথে প্রতিশোধ নিয়ে আসা হয়েছে- এই জোশ তুলে হিন্দু ভোটার পোলারাইজেশন ঘটানো ও তা বিজেপির বাক্সে জড়ো করা। অর্থাৎ মেসেজটা হলো, অ্যান্টি পাকিস্তান মানে অ্যান্টি মুসলমান মানে এবার হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে একমাত্র মোদির দলকে ভোট দাও এই ছিল ২০১৯ নির্বাচনের স্লোগান সূত্র। এখন বিজেপির ওই ভোট রাজনৈতিক প্রোগ্রামে আর্মি কেন আসতে বা সায় দিতে রাজি হবে, এটাই নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল এই রাওয়াতের।

    এ কারণে, পাকিস্তানি বিরাট ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে বলে ভারতীয়রা সাফল্য দাবি করলে পরে ইমরান খান কূটনীতিকদের স্বচক্ষে সেই হামলাস্থলে নিয়ে গিয়ে দেখান, একটা মরা পাখি ছাড়া সেখানে কোনো প্রাণী আহত-নিহত কিছু নেই। তবে মাটিতে বোমা ফেলায় গর্ত হয়েছে অনেক, এর সচিত্র বর্ণনা তারা দেখিয়েছিল। কিন্তু তত দিনে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে এর কোনো প্রভাব সেখানে ছিল না।

    এর অনেক আগে অবশ্য বিপিন রাওয়াত যে আনুগত্য প্রদর্শনে সম্মতি জানিয়েছেন তাও পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। অনেকের মনে থাকতে পারে ঘটনাটা। কাশ্মিরের এক তরুণ কথিত সন্দেহভাজন জঙ্গি। তাকে ভারতীয় আর্মি তাদের এক জিপ গাড়ির বনেটের উপরে সামনে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। এরপর সেই গাড়ি নিয়ে সারা শহর ঘুরানো হয়েছে। এই নৃশংস অমানবিক কায়দায় এবং আইনবহির্ভূত অবস্থায় তাকে বসিয়ে সারা শহরে ফুল স্পিডে গাড়ি চালানো হয়েছিল। এটা মিডিয়ায় রিপোর্ট হওয়ার পর হইচই উঠেছিল। আর সামরিক কর্তারা সাফাই দিয়েছিলেন, বন্দীর বন্ধুদের ভয় দেখাতেই নাকি এমন করা হয়েছিল। অথচ বন্দীর সাথে এই আচরণ বেআইনি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর্মি চিফ বিপিন রাওয়াত সে সময় এর স্বপক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন। এর আগে ভারতের কোন আর্মি চীফ এমন দলবাজ হতে দেখা যায় নাই। নিজের পেশার প্রতিওই অনুরক্ত থেকে কাজ করেছেন। অনুমান করা হয়, মোদি এভাবেই তাকে পরীক্ষা করে নিয়েছিলেন। মনে করা হয়, এটাই তার হিন্দুত্ববাদী-রাজনীতির পক্ষে প্রথম অ্যাক্ট ও অফার, ফলে তা এক অন্তর্ভুক্তি ও সম্মতি। কারণ, একই সময় মুম্বাইয়ের কিছু অভিনেতাও বিজেপিতে রিক্রুট করা হয়েছিল। সাধারণভাবে অভিনেতাদের কাছে ব্যাপারটা টাকা নিয়ে অভিনয়ের মতোই রাজনৈতিক অভিনয় করে দেয়া। এমন অভিনেতাদের অনেকের মধ্যে ছিলেন সস্ত্রীক অনুপম খের, পরেশ রাওয়াল, কঙ্গনা রানাউত ইত্যাদি। পরেশ রাওয়ালসহ অনেকেই জিপে বেঁধে ঘুরানোর ওই ঘটনায় বিপিন রাওয়াতদের পক্ষে প্রপাগান্ডামূলক পাবলিক আর্গুমেন্ট দিয়েছিলেন।

    তাই জেনারেল বিপিন রাওয়াত এখনো যা করছেন তা এক আরএসএস ক্যাডারেরই তৎপরতা যেন। আর এতে আমরা দেখলাম, আরেক ক্যাডার বিপিন রাওয়াত  আসামে কী করলেন!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “এক জেনারেল “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

      ইসকনের মন পেতে দুদলের প্রতিযোগিতা আত্মবিলীনতা

    গৌতম দাস

    ০১ নভেম্ববর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3MV

     

    আ.লীগ কি আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাচ্ছে— প্রশ্ন রানা দাশগুপ্তের

    গত বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর   চট্টগ্রামে ইসকনের এক জনসমাবেশ হয়েছে। পরদিনের প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে এ সমাবেশের আয়োজকদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে- “বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রামের নন্দনকানন চত্বরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি আয়োজিত এক সমাবেশ হয়েছে”।

    ‘ইসকন’ [ISCKON] ১৯৬৬ সালে আমেরিকায় রেজিস্টার্ড এক হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যা ‘কৃষ্ণনাম চর্চার এক বিশেষ ব্যাখ্যা’ প্রচারের সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তা সত্বেও চলতি শতকে এসে আমেরিকান সংসদে ও সিনেটে ভারত সরকারের পক্ষে আমেরিকান নীতি পলিসিকে প্রভাবিত বা লবি[lobby] করতে ভারত আমেরিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মিলিত এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, ক্রমেই ইসকনও তার অংশ হয়ে যায়। এর নিট ফলাফল হল ইসকন আর নেহায়েতই ধর্মপ্রচারের সংগঠন থাকেনি। এর ফোকাস বদলে রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে যায়।

           চট্টগ্রামে সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার সমাবেশ

    আমেরিকা হল এমন সমাজ যেখানে বহু বছর আগে থেকেই মানুষের জীবনে থিওলজি [theology] মানে ধর্ম বা ধর্মতত্বের আর প্রয়োজন নেই; মানুষের থিওলজিক্যাল নিড বা ধর্ম-বিষয়ক কোন চাহিদা আর নেই – এমন মনে করা, রটিয়ে বা  ঘোষণা করে দেয়া এক সমাজ। এই অনুমান-ধারণাটা যে ভিত্তিহীন এবং যথেষ্ট ভেবেচিন্তা বলা ভাষ্য নয় এরই প্রমাণ হল সেকালের জন্মের শুরুতে ইসকনের টিকে যাওয়া। যেকোন থিওলজির সারকথাটা  হল এটা এক আন্তঃসম্পর্ক বোধ, যা আমাদের ভেতরে এক ‘সম্পর্কিত’ বা  কানেকটেড বোধ জাগিয়ে দেয় বা রাখে। আমার যায় আসে আমাকে টানে, এমন একটা টান-বোধ করা কাজ করে টের পাই। সে আন্তঃসম্পর্ক বলতে তা হতে পারে মানুষে-মানুষে অথবা প্রকৃতির (মানুষ বাদে) সব কিছুর সাথে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক বোধ। আর এসব যেকোনো দুইয়ের সম্পর্কের মাঝে থাকে ‘আল্লাহ’ ধরনের এক ধারণা যার মাধ্যমে মধ্যস্থতায় আসলে আমরা সবাই সব কিছুর সাথে কানেকটেড বা সম্পর্কিত বোধ করতে থাকি। এতে মানুষের বেঁচে থাকাটা মিনিংফুল এবং উদ্দেশ্যসম্মত মনে হতে থাকে। কিন্তু মডার্নিটির সস্তা বা দায়দায়িত্বহীন ব্যাখ্যার কারণে নিজেরা থিওলজিক্যাল নিড শূন্য ঘোষণা করে দেয়াতে পশ্চিম নিজের ক্ষতি করে ফেলেছে; অথচ বাস্তবে মানুষমাত্রই কম-বেশি একটি থিওলজিক্যাল চাহিদা থেকেই যায়। আমেরিকান সমাজের থিওলজিক্যাল নিড নাই, দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা এই ধারণা  এতে তৈরি হওয়া যে শুণ্যতা বা গ্যাপটা পূরণ করতেই এশিয়ান থিওলজিগুলোর অনেকেই পশ্চিমে এসে পপুলারিটি পেয়ে যায়। কারণ মানুষ মাত্রই তার থিওলজিক্যাল নিড থাকে থাকবেই। কম অথবা বেশি; জীবনের শুরু থেকেই নয়ত শেষের দিকে, তরুণ জোঁসে নয়ত অবসর জীবনে – এসব খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এছাড়া বুঝা যায় আরো বহু যূগ থিওলজিক্যাল নিড থাকবে। ফর্ম বা আকারে হয়ত বদল আসবে।  বহুবার দেখা গিয়েছে মানুষ মারাত্মক আত্মঘাতি ভুল করেছে, তাঁর জানা জ্ঞান কোনটাই তাকে সতর্ক বা সাহায্য করে নাই।  পরে আবার থিওলজি থেকে, পড়তে গিয়ে বুঝছে তাকে সাবধান করা হয়েছিল কিন্তু সে বুঝে নাই, মোল্লাদের কারবার বলে তুচ্ছ করে গেছিল। আবার সাথে বলে রাখা ভাল যে তাই বলে জীবনের বস্তুগত দিকটাও উদাসিন, নজর আন্দাজ বা বেখেয়ালি হওয়া বা থাকাটাও সমান বিপদের হবে।
    যা হোক আমেরিকার সমাজের থিওলজিক্যাল গ্যাপ আছে-ছিল বলেই  ইসকন আমেরিকায় হবার  প্রথম দিকে এ সূত্রেই ‘জায়গা’ করে নিতে না পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে ভারতের লবি প্রতিষ্ঠানগুলোর জোটের অংশ হয়ে যাওয়াতে ইসকনের ফোকাস সরে গেছে। এমনকি নেতৃত্বও বদলে যায়, পরিচালন ক্ষমতায় এমন এক ক্যু হয়ে গিয়েছিল। যারা ভারত সরকারের পক্ষে সরাসরি কাজ করতে চায় ইসকন সংগঠনের এই ধারা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়। এতে আগের ধর্মপ্রচারের উছিলায় আমেরিকায় জন্মানো এশিয়ান থিওলজির প্রতিষ্ঠানটা এবার হয় ঘোরতর এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষত ভারত সরকারের বর্ধিত হাতের ভুমিকায় তার গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করার প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ইসকন হল বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে ও কাছে ভারত সরকার ও তার গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ঘটিয়ে দেয়ার বা পৌঁছানোর হাতিয়ার। ইসকন এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিরোধী এক সংগঠন; যদিও পরিকল্পিতভাবেই ইসকনের আগের ধর্মীয় ভাব ও এর বাইরের আদল সবই বজায় রেখে দেয়া হয়েছে। আর ওদিকে এই নয়া ইসকন এখন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও বিদেশে নাশকতা ও অপতৎপরতার সংগঠন ‘র’-এর বর্ধিত হাত হয়ে নিজেকে সাজিয়ে হাজির করতে থাকে।

    শুধু তা-ই নয়, এতে অবস্থা এখন এমনই যে, একালের আরএসএস-মোদির যুগে বাংলাদেশের ইসকনের তৎপরতায় বাংলাদেশের হিন্দুরা যেন কালচারালি আর বাঙালি হিন্দু নয়; তারা যেন আরএসএসের যে উত্তর প্রদেশের হিন্দু ব্যাখ্যা আছে – তার অনুসারী করে নেয়ার এক প্রোগ্রাম। এটাই ইসকনের প্রধান কর্মসূচি এবং তা নিশ্চিত করাই এর কাজ। যেমন বাঙালি হিন্দুকে উত্তর প্রদেশের হিন্দুর স্টাইলে নিরামিশাষী হতে শেখাচ্ছে তারা, ইসকন মার্কা কৃষ্ণভক্ত হওয়ার নামে। অথচ এথনোলজিক্যাল [ethnological] জাতির বিচারে এটা  প্রতিষ্ঠিত যে  বাঙালির খাদ্যাভ্যাস হল সে আমিষ-ভোজী। আর সেখান থেকেই প্রবাদ তারা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সেও হিন্দু অবশ্যই কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মত এথনিক প্রজাতি্তে এক নয়। মানে এরা নিরামিষের লোক নয়। সোজা কথায় এথনোলজির বিচারে আমরা বাঙালি হিন্দু, উত্তর প্রদেশের আর্য অনুসারী হিন্দু নই। এই পুরান কাহিনী হিসাবে আর্যদের ভারত দখল অভিযানে দুটো অংশে গিয়ে তাদের অভিযান আর আগে বাড়তে পারে নাও, মূলত প্রাকৃতিক গাহাড় বা নদীর কারণে। এক হল ভারতের দক্ষিণে যেখান থেকে ভারতের দাক্ষিণার্ত-এর শুরু ধরা হয় – অন্ধ্র-হায়দ্রাবাদের কিছু অংশ থেকে দক্ষিণের পুরাটাই। আর এদিকে ভারতের পুবদিকে মারাঠা-বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্তবেশের পরে পরেই। ভাষার স্টাইল, খাদ্যাভাস, দেবদেবীর ভিন্নতা এমন কী আর্টকালচার গানের সুর-রাগ, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি অনেক কিছুতেই এথনিক ভিন্নতাগুলো বেঁচে যায় টিকে যায়।
    অথচ বাংলাদেশে ইসকন এসেছে পুরো উল্টা-পাল্টা হয়ে, আরএসএস-হিন্দুর প্রতিনিধি হয়ে।  তারা বাংলাদেশে এসেছে হিন্দু বাঙালি  সবাইকে আরএসএস বর্ণিত হিন্দু সাজাতে। পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে মমতা (হিন্দু-মুসলমান) বাঙালি বনাম আরএসএসের হিন্দু এই প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের জয় নিজের পক্ষে এনে মোদিকে ঠেকিয়েছিল।
    আর এসব কারণের বাংলাদেশে ইসকন আবার এদিকে, হিন্দু বাঙালিকে বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় চিহ্ন হিসেবে গলায় ‘কাঠের মালা’ পরাচ্ছে। অথচ ফ্যাক্টস হল, গলায় কাঠের মালা মূলত যারা নদীয়ার গৌড় বা বৈষ্ণব অনুসারী তাদের রেওয়াজ; এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাঙালি হিন্দু মাত্রই সবাই নদীয়ার শ্রীচৈতন্যের অনুসারী বা বৈষ্ণব নয়। অর্থাৎ বাঙালি হিন্দু মাত্রই গলায় কাঠের মালা পরা তাদের রেওয়াজ নয়। অথচ ইসকনের আরএসএসের হিন্দু হল, তারা এটিকে এক ইউনিফর্ম ধারণায় (গলায় কাঠের মালা) সাজিয়ে নিতে চায়। তাই হিন্দু বাঙালি মাত্রই ইউনিফর্মের মতো সবাইকে কাঠের মালা পরার রেওয়াজে নিতে চায়; অর্থাৎ পুরোটাই রাজনৈতিক ও ভিন দেশের অসৎ রাজনৈতিক স্বার্থ তারা চাপিয়ে রাজত্ব করতে চায়। মূলত এর মূল উদ্দেশ্য হল আরএসএসের উত্তর প্রদেশকেন্দ্রিক যে হিন্দুত্ববাদী ব্যাখ্যা আছে, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও বলপ্রয়োগ করে হলেও এর অংশ করে নেয়া – তাও খাঁটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

    কাজেই আরেক অর্থে বাংলাদেশে ইসকন হয়ে উঠেছে ‘র’-এর “ফুট সোলজার”; মোদি সরকারের ‘বাংলাদেশ দখল নীতি’ বাস্তবায়নের ভয়ঙ্কর হাতিয়ার। স্বাধীন দেশে এটা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের কাছ থেকে ‘আশা’ করা যায় না। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক মোদির নীতির বাস্তবায়ক হতে পারেন না। কারো প্রভাবহীন নয় ও স্বাধীন থাকতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারও এসব দিকে কোন নাগরিককে কোন ছাড় দিতে পারে না; উলটা সরকারকে এসব দমন করতেই হবে। এটা তার কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়ীত্ব ও মুখ্য কাজ।  এটা রাষ্ট্রস্বার্থের গুরুতর প্রশ্ন।

    এসবের পটভুমিতে এটা হতবাক করার বিষয় যে, গত ২৮ অক্টোবর সেই ইসকন চট্টগ্রামে জনসমাবেশ ডেকেছে আর তাতে যোগ দিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে লেগেছে প্রতিযোগিতা যে, কে বেশি ইসকনের সুনজর ও অনুগ্রহ লাভ করবে! এর প্রতীকী অর্থও খুবই বিপদের ও লজ্জাজনক! অর্থাৎ কে বেশি ভারতের অনুগ্রহ লাভ করবে? আর তাতে আওয়ামী লীগ যদি ১৩ বছরের শাসন চালাতে পারে তবে বিএনপির ভাগ্যেও নিশ্চয় এর কাছাকাছিই কিছু একটা হবে! এমন অনুমান, তাই কি? ওদিকে মিডিয়া রিপোর্টের এনিয়ে ইঙ্গিতে উপস্থাপনটাই মারাত্মক। লিখেছে, ‘সমাবেশে চট্টগ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, নগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি নগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন”। কিন্তু মজার কথা হল, ওখানে বিএনপির কেবল একটি নেতার নাম আছে। অথচ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে ছোট নেতাটার নামও সেখানে দেয়া আছে। আর ভোরের কাগজ লিখেছে, “নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা: শাহাদাত হোসেন” সেখানে বক্তৃতা করেন।

    ‘সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, এটা ষড়যন্ত্র’
    গুগল সার্চে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে দেখা যায় “সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: “ এমন বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি রেফারড হয়েছেন আইনমন্ত্রী। আর ভারতের কিছু মিডিয়ায় দেখা গেছে একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে কোট করা হয়েছে খোদ আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। এমনকি গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৃত্যু ও ধর্ষণের নানা গল্প ছড়ানো হচ্ছে।’ অর্থাৎ সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রপাগান্ডা মানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে দাবি। অথচ এরপরও চট্টগ্রামের সমাবেশের নাম হল – ‘সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে’ এই সমাবেশ। কেউ সরছেনা; প্রচলিত শব্দ ‘সাম্প্রদায়িক হামলা’ কথাটা দিয়েই সব জায়গায় কুমিল্লার ঘটনাকে বর্ণনা করা হচ্ছে। অথচ ইকবাল হোসেন গং তারা এখনো রিমান্ডে আর তাদের পেছনে কে আছে? নিয়োগ বা অ্যাসাইনমেন্ট দাতা কারা? ‘র’ না ‘ইসকন’ না থার্ড কেউ? এখনো তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এই অংশটা ঢেকে দেয়ার প্রপাগান্ডা চলছেই! ইকবাল হোসেনেই যেন সবশেষ খোঁজাখুজি শেষ ধরা হয়, এর পিছনে আর কেউ নাই; ভারতীয় মিডিয়ায় এমন  আকাঙ্খাই প্রবল!

    এদিকে চট্টগ্রামে ইসকনের সমাবেশে প্রধান গুরুত্ব পায় দু’জন হিন্দু-ব্যক্তিত্বের বক্তব্য। এর প্রথমজন রানা দাসগুপ্ত, তিনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তাদের দেয়া ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দের বর্ণনা অনুযায়ী কি খোদ রানা দাসগুপ্তের সংগঠনের নামটাই তাদের কথিত ‘সাম্প্রদায়িক’ নয় কি? আর দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের নাম ডঃ অনুপম সেন।

    আবার লক্ষণীয়, ওই সমাবেশে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়েছে আওয়ামী লীগ। সময়ে মনে হয়েছে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিকল্প এবার পেয়ে গেছে। যেন এবার তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনবে। রানা দাসগুপ্ত বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। কেউ কেউ এই দ্বিতীয় বাক্যটাকেই মিডিয়ায় শিরোনাম করেছে। কিন্তু রানা দাসগুপ্তের বক্তব্য স্ববিরোধী।
    রানা দাসগুপ্তই কড়া অভিযোগগুলো তুলেছেন। এমনকি এটাও বলেছেন, ভোরের কাগজ লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্রমেই ১৯৪৮ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে চলে যাচ্ছে”।  এর জবাব আওয়ামি লীগ কী দেয় আমরা দেখব।  তবে এটা বহু পুরনো দিন থেকেই মুসলিম লীগ নিয়ে হিন্দু নেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। এসব অভিযোগ, রাগ বা ক্ষোভের আদি উৎস হল – ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কেন করা হল।  কারণ এতে পুর্ববঙ্গেও   হিন্দু জমিদারদের যে পলিটিক্যাল, কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য ছিল তা এক নিমিষেই নাই হয়ে  গিয়েছিল। তাই একালে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় তারা এখন কী চায় আর যদি তারা মনে্র কথা খুলে বলতে রাজি হয় তাহলে সম্ভবত এর জবাব আসবে তারা সেই পুরানা আধিপত্যটাই ফেরত চায়। এমনকি একালের প্রজন্ম যারা তারাও ঘুরেফিরে একালের ভারত না হলেও কলকাতাকে যেভাবে দেখে জানে তেমন একটা পলিটিক্যাল যদি নাও হয় তবে অন্তত একই কালচারাল ও সামাজিক ধরণের আধিপত্য দেখতে চাইবে। কিন্তু খুবই দুঃখিত এটা এবসার্ড, এক অবাস্তব কল্পনা!   আবার আমরা খেয়াল করলে জানব  যদিও খোদ শেখ মুজিবও এর নিন্দা করেননি বা নিজে মুসলিম লীগার ছিলেন বলে কখনো অস্বীকার করেননি। এমনকি হাসিনা শেখ মুজিবের আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন তাকে মুসলিম লীগার হিসেবেই বর্ণনা বজায় রেখে এবং কোনো রাখঢাক না করেই। কিন্তু “মুসলীম লীগ” শব্দটা হিন্দু নেতাদের কাছে একটা গভীর পাপের নাম।

    অথচ ভারতের কংগ্রেস যেমন এক হিন্দু-জাতিবাদী দল; সমতুল্যভাবে (পূর্ব) পাকিস্তানে মুসলিম লীগ মুসলমান-জাতিবাদী দল।  বাংলাদেশের হিন্দু নেতারা কংগ্রেসের চোখ দিয়ে কংগ্রেস যেমন মুসলিম লীগকে তার মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বি-শত্রু  দল হিসেবে দেখে, সেভাবে ঐ চোখেই তারা দেখে গেছে। অথচ কংগ্রেসের দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতি কোনো সর্বজনীন স্ট্যান্ডার্ড নয়, কারণ এটা তো হিন্দু-জাতিবাদী চোখ। বরং কোন সর্বজনীন, কোন সুনিদ্দিষ্ট পরিচয়হীন দৃষ্টিভঙ্গীর এক অবিভক্ত ভারতের কল্পনা করতে না পারার অযোগ্যতা আর ব্যর্থতা থেকেই তো তিনদেশে বিভক্ত হয়েও তো আমরা আজও মূল প্রশ্ন সমাধান করতে পারি নাই, হাতড়ে মরতেছি। য়ার এমনিতেই  পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ ভারতের ওই দৃষ্টিভঙ্গি কখনো গ্রহণ করেনি, করার কথাও না। কারণ মূল ত্রুটি ওটা হিন্দু-জাতিবাদী বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী।  অথচ রানা দাসগুপ্তরা অযথা এই পণ্ডশ্রম করে গেছেন। এখানেও করেছেন। কংগ্রেস বা একালের বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদীর চোখ দিয়ে তারা আগের পূর্ব পাকিস্তান বা এখনকার বাংলাদেশকে দেখতে হবে এবং সাজানোর দাবি করতে হবে এই অদ্ভুত কল্পনা তারা করে গেছেন।  হিন্দু-জাতিবাদী ভারত বা যা এই শতক থেকে আরো হিন্দুত্ববাদী  ভারত এটাই এখনও তাদের চোখে সেকুলার রাষ্ট্রের মডেল। তাদের কল্পনা শুধু না দাবিও যে বাংলাদেশকে তাদের কল্পনা মত হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী “কথিত সেকুলার রাষ্ট্র” করে গড়ে দিতে হবে।  নইলে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ লাগিয়ে দেবে।
    অবশ্য এখানে আরেক  সূক্ষ্ম দিক আছে। লক্ষণীয়, আসলে রানা দাসগুপ্ত কিন্তু “মুসলিম লীগ” বলেনইনি। বলেছেন ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। দুটার অর্থ একেবারেই উলটা। অর্থাৎ যেটা আওয়ামী লীগেরই আগের নাম বা প্রথম জন্মকালীন নাম সেটাসি ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। মানে আজকের হাসিনা আওয়ামি লীগের  আগে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” নামেই জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন। সবচেয়ে বড় কথা তারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ ত্যাগ করে বেড়িয়ে এসেই নতুন এইদল খুলেছিলেন।  তা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের দিকে যাওয়া বলতে তিনি আজকের হাসিনা আওয়ামী লীগের জন্ম হওয়াটাই দোষ বলছেন যেন। এককথায় মুসলিম লীগের উলটা এবং শত্রুদল হল আওয়ামী মুসলিম লীগ। তাহলে রানা দাসগুপ্ত এতে আপত্তির দেখছেন কী বা তার বিশেষ অভিযোগটা কী? আসলে  পুরোটাই ভুয়া।  রানা দাসগুপ্ত কি তাহলে ভাসানী-শামসুল হকের ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগের গায়ে হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের চোখে তাকিয়ে দাগ লাগিয়ে দিতে চাইছেন? নাকি কিছু ভেবেচিন্তে বলেননি?

    আসলে ব্যাপারটা হলো, কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের প্রবক্তা ও কায়েমকারী হয় তা হলে এই দলের বা সমর্থকের কি আর মুসলিম লীগকে বিরোধিতা বা নিন্দা করার সুযোগ থাকে?  কেন? কারণ কংগ্রেসই কি মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের জনক নয়? সেটা আবার কীভাবে? তাদের হিন্দু জাতিরাষ্ট্র গড়তে বেপরোয়া হওয়াটাই কি অবিভক্ত ভারতের মুসলমানদের মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়তে ঠেলে দেওয়া, বাধ্য করা ও উৎসাহ দেয়া নয়? অর্থাৎ হিন্দু-জাতিবাদী দল খাড়া করে একটা  কংগ্রেস দলের জন্মই কী সমস্ত বিপর্যয় ডেকে আনার মূল প্রতিষ্ঠান ছিল না বা ঘটনা নয়? ভারতকে কংগ্রেস যদি হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র করে আকার দিতে চায়, তবে এটাই কি প্রকারান্তরে মুসলমানদের ঠেলে দেয়া নয় যে, মুসলমানেরা তোমরা শুনে রাখ – ভারত বা কংগ্রেসে তোমাদের জায়গা নেই তাই তোমরা একটি পাল্টা মুসলিম-জাতিরাষ্ট্র গড়ে নাও? নইলে আমাদের তৈরি ভারত বা কংগ্রেসে আমাদের আধিপত্য ও অধীনতা মেনে চেপে গিয়ে কোনার চিপায় পড়ে থাকতে পারো। কাজেই এই অবস্থায় অতএব – হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রধারী কংগ্রেসের মুসলিম লীগকে কোনো সমালোচনা বা আপত্তির জায়গা কই? করলে সেটা তো তাদের নিজেরই সমালোচনা হবে!

    আবার দেখেন,  মনে হচ্ছে সূর্য সেনদের রাজনীতি রানা দাসগুপ্ত এখনো করে যাচ্ছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা ১৯০০ সালের পরেও আগের শতবছরের (১৮০০-১৯০০) রামরাজত্ব  তাদের পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রভাব কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধরে রাখতে চান। আবার এ-ও আবদার যে, ততদিনে ব্রিটিশদের প্রায় দেড়শ বছরের সব অবকাঠামোগত ব্যয় সব কলকাতাতেই হোক, থেকে যাক। কিন্তু ব্রিটিশরা তা মানেনি, সম্ভব ছিল না। তারা বাংলাকে ভাগ করে ঢাকাকে রাজধানী করে আলাদা নতুন অবকাঠামো গড়তে ব্যয় করতে চেয়েছিল। কেন? মূল কারণ ততদিনে আসাম চা উৎপাদন যোগ্যতার জন্য তৈরি ও সম্পন্ন হয়ে গেছিল। অথচ চা বিক্রি, বিতরণের জন্য সেই চা চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে যেতে ঢাকা পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জে ছোট জাহাজে তুলে তা চট্টগ্রাম বন্দ্রের উদ্দেশ্যে নিবার কোনো অবকাঠামোই ছিল না। না আসাম থেকে ঢাকা হয়ে নারায়নগঞ্জ পর্যন্ত। এ’কারণে ঢাকাকে রাজধানী করে আসাম ও পূর্ববঙ্গকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ করা হয়েছিল ১৯০৫ সালে। এটাই ‘বঙ্গভঙ্গ’।  মানে  ঢাকাকে কেন্দ্র করে আরেক বাংলা প্রদেশ বানানো।  আর এটাই সহ্য হয়নি কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের, চ্যালেঞ্জ বোধ করেছিলেন যে, ঢাকা তো তাহলে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে যাবে তাতে। সক্ষমতাতেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কারণ এখানে বাণিজ্যিক দিক এখানে ভারী – চায়ের সাথে পাটও আছে; আর বিস্তীর্ণ ধানের জমিতো আছেই। যার উপর আসামের লোভ ছিল। কারণ পুর্ববঙ্গ এব্যাপারে আসামের চেয়ে এগিয়ে ও দক্ষ। এসব ছাড়াও আরো দিক আছে। পূর্ববঙ্গে জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলমানরা বেশি, সংখ্যাগরিষ্ট; ফলে কলকাতার ম একচেটিয়া কুক্ষিগত প্রভাব  হিন্দু জমিদারেরা ঢাকায় সামাজিক সাপোর্ট সমর্থনে  জমাতে নাও পারতে পারেন। এসবই ছিল হিন্দু জমিদারদের মূল ভীতি। আর এসব স্বার্থে তারা নতুন প্রদেশ করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। এবং এনিয়ে তারা এত মরণপণ সিরিয়াস হন যে যে জমিদারেরা একশ বছরে বৃটিশদের সমর্থন ও ঔরসে  জমিদারি কামাইলেন অবিভক্ত বাংলার একছত্র নেতা হলেন যেই বৃটিশদের বদৌলতে সেই বৃটিশদের তারা অস্ত্র হাতে বিরোধীতার করতে লোক নিয়োগ ও সন্ত্রাসী দল গড়ে  শাসকদের বিরোধিতা করেছিলেন। তা হলে সূর্য সেনরা ছিল মূলত হিন্দু জমিদারদের স্বার্থে কাজ করেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, চট্টগ্রামের লোক হয়েও সূর্য সেনরা নিজ পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধী। কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদারদের লেঠেল। আর তারা জমিদার স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো লোক হলেন। পূর্ববঙ্গের বা, বাংলাদেশের কেউ হতে পারেন না। বরং সরাসরি কলকাতার হিন্দু জমিদারের পক্ষের লোক। কাজেই পূর্ববঙ্গের চোখে তারা কোনো বীর নন,  না হতেই পারেন না।  বরং পূর্ববঙ্গের বা ঢাকার স্বার্থের বিরোধী।  মানে চট্টগ্রামের লোক হয়ে ঢাকার কথা ভুলে মাড়িয়ে কলকাতার পক্ষে অস্ত্র হাতে মাকালীর নাম নিয়ে দাড়িয়ে গেলেন। কাজেই আপনারা নাকি কথিত স্বদেশী এটা কাদের আন্দোলন? কোন স্বদেশ? কলকাতার এবং হিন্দু জমিদারদের জন্য স্বদেশী!  কিন্তু দেখা যাচ্ছে এটা তো পূর্ববঙ্গের কোন স্বার্থই নয়। অথচ জবরদস্তিতে কলকাতা বা কংগ্রেসের স্বার্থটা বারবার আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এখনও।

    দেখা যাচ্ছে, এখনো কংগ্রেসের স্বার্থ ও অবস্থানের চিন্তাটাই রানাদের মাথায় সবসময় ভর ও ডমিনেট করে এবং গাইড করে থাকে। ফলাফলে হিন্দু জমিদার স্বার্থ তাদের চোখে হয়ে যায় কথিত অসাম্প্রদায়িক আর কেউ এর বিরোধিতা করলেই হয় ‘সাম্প্রদায়িকতা’। এই মুখস্থ কথা আর কত দিন?

    একালে কিছু হলেই আরেক বক্তব্য হল রাষ্ট্রধর্ম বলে ইসলামের বিরোধিতা। আচ্ছা,  আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতে কোনো হিন্দু নাগরিক কী মামলায় হেরে গেছে এজন্য যে, আদালত তাকে এক মুসলমান নাগরিকের মতই সমতুল্য ও  সমান অধিকারের সাথে সমান অধিকারের ট্রিটেড হননি বলে এবং শুধু তাই না  সেটা ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার কারণে এবং এমনটা চালু হবার পর থেকে? এমন রেকর্ড কোথাও আছে কি?

    অর্থাৎ আদালত  অধিকার ও ট্রিটমেন্টে এর দিক থেকে কখনও নাগরিক বৈষম্য করে নাই, কোনো অসাম্য হয়নি। তবে ডেকোরেটেড পিস হিসেবে  রাষ্ট্রধর্ম শব্দগুলো অবশ্যই আছে। যা না থাকলে ভাল হত। অর্থাৎ এটা একটি জেদ-ক্ষোভের  সিম্বল। ফলে একটু ভেদের সিম্বলও অবশ্যই। কিন্তু তা-ই-বা কেন থাকবে? কারণ ইন্দিরা গান্ধী প্রগতিশীলতার নামে, অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত এক অর্থহীন ‘সেকুলার’ শব্দ ও ধারণা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বুঝা যাচ্ছিল কারণ তখন তিনি  একাত্তরের শেষের দিকে সম্ভবত অক্টোবরে পাঁচবার আমাদেরকে স্বীকৃতির অনুরোধের ফাইল ঘুরাচ্ছিলেন।  পরে আমাদেরকে পরোক্ষে জানানো হয় এটা না মানলে আমাদের অনেক ভোগান্তি হবে।  ফলে এতে আবার সেই ইসলামবিদ্বেষ ফোবিয়া হিন্দু-জাতিবোধের চিন্তা ও  ডোমিনেন্স যা ভারতে গড়ে উঠেছে তাই আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এটাই তো ইসলামবিদ্বেষ। যেন তাজউদ্দিন সাহেব যত নিজেকে ইন্দিরা গান্ধীর সামনে নিজেকে বাঙালি বলে পরিচয় করান না কেন, ইন্দিরা ভুলতেই পারছিলেন না যে তাজুদ্দিন তো আসলে মুসলমান!  তাই তিনি যেন “সেকুলার” সাবধানতার জোরাজুরি্তে তাজুদ্দিনকে বলতে চাচ্ছিলেন তাজউদ্দিন তুমি মুসলমান নও, তুমি সেকুলার……।
    আবার সেকুলার মানে কী তা তো তিনি ইন্দিরা বা আজকের রাজনৈতিক ভারত জানে  এর প্রমাণ তাদের রচিত কনষ্টিটিউশনে আজও নাই। তাদের ধারণা একটা হিন্দু-জাতিবাদী বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তা ভিত্তিক রাষ্ট্রে কোন সমস্যাই নাই। কেবল “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” একথা ঢুকিয়ে দিলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়!
    অথচ বাংলাদেশে আমরা তো সবাই হিন্দুও নই। আমরা সেসময় ছিলাম রাজনৈতিকভাবে “বাঙালি জাতিবাদী”। ফলে ফেলে আসা জমিদার আধিপত্যের ইমেজ আমাদের ক্ষুব্ধ আশংকিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের নতুন বাংলাদেশ বলে কী হচ্ছে এনিয়ে সন্দেহ করবে। জনমনের মনে আবার  সাতচল্ভেলিশের আগের জমিদারি অত্যাচারের ছবি ভেসে  উঠবে  চালু হবে।  এসব ভেবেও   আমাদেরকে সব মেনে নিতে হয়েছিল। (এনিয়ে বিস্তারিত আরো অন্য অনেক বইয়ে আছে। এখানে সেদিক আর টানছিনা।
    আবার মজার গোলমেলে ফ্যাক্টস হল, ১৯৪৭ সালে ভারতকে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র (নেশন-স্টেট) বানালেও নেহরু-গান্ধী কখনোই ভারতের কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলার’ শব্দটা রাখেননি; বরং আমাদের ওপর ১৯৭১ সালে জবরদস্তি করার বহু পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৬ সালে এবার ভারতের কনস্টিটিউশনের ৪২তম সংশোধনী হিসেবে ‘সেকুলার’ শব্দটা অন্তর্ভুক্ত করেন। [ সংশোধনীর প্রথম পাতাতেই  STATEMENT OF OBJECTS AND REASONS এই শিরোনামের অধীনে তৃতীয় পয়েন্টে]। এই লিঙ্কে গিয়ে দেখুন। আর সেই থেকে অনেকের ভুল অনুমান হল, যেকোন রাষ্ট্রে এমনকি তা  হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত রাষ্ট্র হলেও এতে  আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল  ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দ থাকলেই রাষ্ট্র সেকুলার হয়ে যায়। ফলে এভাবেই ইন্দিরা গান্ধী আগে আমাদের দেশে এমন নীতি ঘোষণা করতে বাধ্য করেওছেন ১৯৭১ সালে পরে ১৯৭৬ সালের ভারতেও তাই করেছেন। এসব এমনই রাষ্ট্রচিন্তায় নাজুক  অবস্থা, দুরবস্তা। আসলে  নিশ্চয় আমাদের কনস্টিটিউশনেও  এই সকুলারিজম এই শব্দ থাকতে পারলেই এদিয়ে তারা মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন আর তারা তাদের হিন্দুত্ববোধ বুদ্ধিকে সেকুলার বলে চালাতে পারবেন, রাষ্ট্রে ছেয়ে রাখতে পারবেন এতটুকুই তাদের লক্ষ্য।  অথচ যারা সেকুলার শব্দ কোথাও না লিখে কায়েম করা যায়। মূলকথা সবাই নাগরিক আর নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র হতে হয়ে যেখানে সবাই একমাত্র পরিচয় নাগরিক হতে হয় ও সমান অধিকারের নাগরিক  – এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে হয়।  এতে কে কী হিন্দু না মুসলমান না পাহাড়ি এটা এখন যা আছে তাই থাকি কিন্তু কনষ্টিটিউশন এই পরিচয় সামনে অধিকারে কোন কমবেশি বা ভাগাভাগি করে না। সবাই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে মুসলমানের দেশে সেকুলার লিখে রেখে ইসলামবিদ্বেষ জারি রাখার যে সন্দেহ আমাদের দেশের মুসলমান নাগরিকদের মনে ভাসে, সন্দেহ জাগে তা তো অমূলক নয়।
    এভাবেই আরেক সন্দেহযুক্ত শব্দ হল “অসাম্প্রদায়িক”। এটা ডিকশোনারিতেই নাই। হিন্দু জাতিবাদের সৃষ্টি এই অদ্ভুত শব্দ।  এটাও হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের বোধবুদ্ধিতে খাড়া করা শব্দ যা দিয়ে যেকোন অ-হিন্দুর উপর চাপ সৃষ্টি বা তাকে, কোনঠাসা করার হাতিয়ার হয়। য়ার তারা আরামে অসাম্প্রদায়িক এই শব্দের আড়ালে হিন্দু-জাতিবাদিতা বা হিন্দুত্ববাদ এর আধিপত্য কায়েম করে নিতে পারে। আবার এই আকামকে তারা সেকুলার বলেও সার্টিফাই বা সাফাই দিতে পারে। অথচ  নতুন বাংলাদেশ তো অন্তত ইন্দিরাদের হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই নয়। এ্টা ছিল মুজিবের “বাঙালি নেশন স্টেট”; ভারতের মতো ‘হিন্দু নেশন স্টেট’ও কোনোভাবেই নয়। ফলে ভারতকে কপি করতে হবে কেন আর তা ফিট করবে কেন? ফলে সেই থেকে রানা দাসগুপ্তরা তাদের ‘কল্পিত দুঃখে’ আমাদেরও মাথা খাচ্ছেন।
    ওদিকে ১৯৭১-৭২ সালের এই সেকুলারিজম চাপিয়ে দেয়ার বিরোধিতা সহজ বা সময়ের সাথে মানানসই ছিল না বা হতো না। এজন্য এমনকি শেখ মুজিবও দেশে ফেরত আসার পর পরিস্থিতি বুঝে তখনই তা বিরোধিতা করতে যাননি। তাই পঞ্চম সংশোধনী লেখার সময় সেই প্রথম আর পরে অষ্টম সংশোধনী লেখার সময় আমাদের হাতে সুযোগ এসেছিল। ফলে সেকুলারিজম উঠিয়ে ফেলে দিলেও ঐ জায়গা ফাকা ফেলে রাখতে চায় নাই। এছাড়া রাগ-জিদও ছিল। তাই সেই জিদ উসুল করা হয়েছিল।  যদিও ‘সেকুলারিজম’ বা ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ ইত্যাদি যে অসৎ শব্দ, খারাপ উদ্দেশ্যের শব্দ সেটা চিনতে আমাদের আমজনতার কোন অসুবিধা হয় নাই।
    যেমন এই রাগ-জেদের দিকটা ভালো বোঝা যায় যখন পঞ্চম সংশোধনীতে সেকুলারিজম ফেলে দিয়ে লেখা হয়েছিল “আল্লার উপর অগাধ বিশ্বাস”। এটা তো লিখে কায়েমের কিছু না। কিন্তু দেয়া হয়েছিল অনেকটা হুশিয়ারি বা পাল্টাপাল্টি হিসাবে। অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে, ভারতের এক হিন্দু নেশন স্টেট রাষ্ট্রচিন্তায় কল্পিত ‘সেকুলার’ শব্দটা বাংলাদেশে তোমরা চালু করতে চেয়েছো অযথাই, খারাপ উদ্দেশ্যে। কারণ বাংলাদেশ তো হিন্দু নেশন স্টেট কখনোই নয়। কাজেই ইসলাম বা মুসলমানদের কন্ট্রোল করা আবদ্ধ রাখা জাতীয় কোনো শব্দ ইসলামবিদ্বেষ ও ফোবিয়া থেকে জন্ম নেয়া বুদ্ধি। আর এর প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দিতেই ১৯৮৮ সালে আরো পোক্ত হবে ভেবে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করে দেয়া – এমন মনে করা যায়। অথচ এর কোনো ব্যবহারিক বা লিগ্যাল ইমপ্লিকেশন নেই, কারো কারো জন্য হয়ত কিছুটা অস্বস্তি ছাড়া। আর এটাই মুসলমান হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী অ্যান্ড গংদের ওপর শাস্তির মত বা প্রতিবাদ চিহ্ন লটকে দেয়া।

    তবে আমার ধারণা একদিন পুর্ণ ও স্বাধীন জনগোষ্ঠির ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে নতুন কনষ্ঠিটিউশনে আমরা কোন বিভেদ চিহ্ন রাখব না।  জেদাজেদি করারও কিছু থাকবে না। সব মাফ করে দিয়ে পুরানা ভুলে জনগোষ্ঠি হিসাবে আমরা হয়ে দাড়াতে পারব। বৈষম্যহীন এক  সম-নাগরিক অধিকারের সমাজে আমরা জীবন গড়ব।

    উপরেও রানা দাসগুপ্ত বা অনুপম সেনদের চিন্তায় যে ফোবিয়ার কথা বলেছি এসব কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো সম্ভবত তারা এখন কী বলছেন তা যদি দেখি। ইসকনের ওই সভায় সারকথায় তারা বলছেন, তাঁরা বাহাত্তরে ফিরে যেতে চান। অথচ খোদ শেখ হাসিনাই তো ১৫তম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম আর সেকুলারিজম দুটোই রেখে  দিয়েছেন। যা এখনও লেটেস্ট ভাষ্য।  অথচ কায়দা করে রানা দাসগুপ্ত বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনো রাজনীতিবিদের ওপর আমাদের আস্থা নেই। আমরা সরকারি দলের মধ্যে আত্মশুদ্ধি চাই”। অর্থাৎ কথার কোন তাল-ঠিকানা নাই।

    আসলে এসব কায়দা করে লাভ নেই। কিন্তু তারা এখন এসব কথা তুলছেন কেন? আমাদের দুই রাজনৈতিক দলই এখন ভারতের আনুগত্য লাভের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং দেখা যাচ্ছে তা আবার সরাসরি ভারতের কাছেও না, তার ‘র’-এর কাছেও না। একেবারে ‘র’-এর হ্যান্ডলার ইসকনের কাছে হাত পেতেছে আর তা দেখে রানা দাসগুপ্তদের নিজেকে অনেক পাওয়ারফুল মনে হচ্ছে? তাই তো?  কিন্তু আর কত? ২০০ বছর হয়ে গেল এই মুসলমানদের দাবড়ে রাখতে হবে নাইলে নাকি মাথা চাড়া দিবে – এমন এই দাবড়ানোর চিন্তা এটাই তো ফ্যাসিজম, হিটলারি চিন্তা।  আপনার এই দাবড়ানির চিন্তার জন্যই তো আপনাকে বিশ্বাস করবে না কেউ, কোন আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে না। এটা এমনই ক্ষতিকর চিন্তা তা একবারও ভেবে দেখেন নাই। এজন্য হিন্দুত্ববাদি বা হিন্দুজাতিবাদ চিন্তাকে আমাদের এদিকের হিটলারিজম বলা হয়! এমন চিন্তার জন্যই আজ আমরা তিন দেশই বিচ্ছিন্ন, ধুঁকছি। হাতড়াচ্ছি।  খারাপ চিন্তাই প্রতিহিংসায় অন্য খারাপ চিন্তাকে ডেকে আনে। মানুষ নিজেই নিজের শত্রুর স্বভাব বৈশিষ্ট তৈরি করে।

    আসুন হিংসা পাশে ফেলে রাখি। আর আপনাদের চোখে ধর্মই যদি সব সমস্যার উৎস হয়ে থাকে তবে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজের কথা তো শুনেছেন। অবিভক্ত ভারতে রাষ্ট্র ধারণার গোড়া যেখান থেকে, সেই ১৮১৫ সালের রামমোহন রায় তাঁর আত্মীয় সভা আর যিনি আবার বেঙ্গল রেনেসাঁর নাকি আদিগুরু কমিউনিস্টরা দাবি করে, তা হলে তিনি রেঁনেসার আদিগুরু হয়ে নতুন করে ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ চালু করেছিলেন কেন? করেন কী করে? রেনেসাঁর আদিগুরুর সাথে ধর্ম? কেমন মিলাবেন? এতো দুধ আর লেবুর চেয়েও খারাপ মিশ্রণ! হবে? তাই নয় কী এবং কেন?  আপনাদের উচিত হবে এর কারণ খুঁজে দেখা। ব্রাহ্মসমাজ জন্মের কারণ ধরতে পারলে বুঝে যাবেন, ধর্ম (আসলে ইসলাম ধর্ম) নিয়ে আপনাদের অনুমান কতটা ভিত্তিহীন, অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা!

    অথচ খুবই সহজ এসবের সমাধান। আমাদের ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ধারণা ত্যাগ করতে হবে। বদলে তা অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র হতে হবে যেখানে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক। ফলে হিন্দু বা মুসলমান (বা জুম্ম জাতি) জাতি পরিচয় নিয়ে লড়ার কিছু থাকবে না। তখন দেখবেন, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক ধরনের শব্দের আড়াল আর দরকার নেই, লাগছে না।

    শেষ কথা
    এত সেকুলারপ্রিয় আপনারা যারা সেকুলার ভারতের কনস্টিটিউশনকে আদর্শ মনে করেন,  তাহলে ভারতের এই কনস্টিটিউশনই আরএসএসের মোদিকে রাজত্ব করতে জায়গা করে দেয় কেমন করে? সেই প্রশ্ন করুন না। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশনও বিজেপি দলকে অনুমোদন রেজিষ্ট্রেশন দিয়েছে কী করে? সহ্য করে কী করে? এতে কোনো সেকুলারিজমের সমস্যা দেখে না! কী অদ্ভুত? সহ-বাস! হিন্দুত্ববাদ আর সেকুলারিজম সহ-বাস করে কেমন করে? তাহলে কেবল মুসলমান-বাদ দেখলেই এবার ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হাতে দৌড়ে আসেন কেন?

    এছাড়া  বাংলাদেশের হিন্দুনেতাকেই দেখি এই মোদির সাথে দেখা করে এসে বলশালী অনুভব করেন। আবার দেশে ফিরেই সেকুলার বাংলাদেশ নাই, কিংবা রাষ্ট্রধর্ম আছে বলে কান্নাকাটি করেন। কিভাবে করেন এগুলো? তা হলে আপনারা ঠিক কী চান? বাহাত্তরের কনস্টিটিউশন নামের আড়ালে মোদির ভারতের আধিপত্য ও অধীনস্থতা কায়েম? এসবের জন্য আপনারা বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার হতে পারেন না। পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা না বাড়ালে স্বল্প কিছু পরিবর্তনও কাজ করার কোন কারণ নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩০ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ইসকনের মন পেতে প্রতিযোগিতা “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ

     

    মোদী কী হারবেন? তাই ‘বেশি’ পয়দা, বাংলাদেশ নিয়ে হৈচৈ 

    গৌতম দাস

    ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    [সার-সংক্ষেপঃ  আরএসএস প্রধান এই মোহন ভাগবত, ইনার দাবি মুসলমানেরা নাকি বেশি পয়দা করে। এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে ধর্মীয় জনসংখ্যায়  ভারসাম্যহীনতা মানে কী? একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? দেশে হিন্দু-মুসলমান কী সমান থাকতেই হবে? কেন? ইহা কি বস্তু? যে না থাকলে কী ক্ষতি? যদি নাগরিক মাত্রই সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয় তো উনার সমস্যা কী?
    আর এই মোহন ভাগবত তিনি কে?  কোন নবাব বা দেশের কোন মালকিন উনি? তার অনুমতি নিয়ে কী মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে নাকি? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন?
    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে – এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? উনি কী দিয়ে বুঝেছেন, মেপেছেন যে কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন জনসংখ্যা বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার ভারসাম্য বলে কোন বস্তু পরিমাপ করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন? ইউজলেস লুজার সব!]

     

    There has been attempt to increase Muslim population and turn India into Pakistan: Mohan Bhagwat

     

     

    প্রধানমন্ত্রী মোদী কি আগামী নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন বলে এখনই টের পেয়েছেন? ভারতের আগামী নির্বাচন মানে প্রধানমন্ত্রিত্ব নির্ধারণের নির্বাচন বা চলতি ভাষায় অনেকে একে ‘কেন্দ্রের’ নির্বাচন বলে। আর আনুষ্ঠানিক ভাষায় তা ১৮তম “লোকসভার” নির্বাচন। আর সেই নির্বাচনের শেষে ফলাফল হয়ে যাওয়ার কথা ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে, এই হলো শিডিউল।

    অনেকের মনে হতে পারে এখনো সে তো প্রায় আড়াই বছর মানে অনেক দূরে। না, ঠিক দূরে না। ভারতের ভোটের হিসাবে আগামী মার্চ মাস – সেটা হল অনেকটা আমেরিকার মিড-টার্মের মত। আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের চার বছর টার্মের মধ্যে মাঝামাঝি, ঠিক দুই বছরের সময় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদের সব আসনেরই নতুন নির্বাচন হয়। আর সাথে সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনেও নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ্টাই মিড-টার্ম নির্বাচন। এর ফলাফল যাই আসুক প্রেসিডেন্ট স্বপদেই থেকে যাবেন, কিছুই হবে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে মানুষের মনোভাব বোঝা যাবে, যেটা পরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বা তার দলের ভবিষ্যত কেমন এর ইঙ্গিত দিবে।

    ভারতের (এখনকার) ছোটবড় মিলিয়ে মোট ২৮ রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় হল উত্তরপ্রদেশ। এরাজ্য একাই কেন্দ্রের মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৮০ আসনের; যেখানে এর পরের বড় বড় পাঁচ রাজ্যের আসন হল – ৪৮, ৪২, ৪০, ৩৯, ২৮ এরকম। মানে উত্তরপ্রদেশের পরে অন্য রাজ্যগুলো সবাই অনেক ছোট, প্রায় সবাই এর অর্ধেক আসনের নিচে। তাই উত্তরপ্রদেশের নিজ রাজ্য-নির্বাচন (যা প্রাদেশিক বা লেজিসলেটিভ) ভারতের মিড-টার্ম নির্বাচনের মত বলে মনে করা হয়।

    উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন আগামী বছর ২০২২ সালের মার্চে, ৪০৩ আসনের রাজ্য নির্বাচন হবে এটা। মনে করা হয় এ রাজ্যে মোদীর দল আগামী মার্চে এবারো জিতলে তা মোদীকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে সহায়তা করবে। এ ছাড়াও মনে করা হয়, ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের শাসন মানে হিন্দিভাষীর শাসন, উত্তরপ্রদেশের শাসন বা কালচারালি আর্য আধিপত্যের শাসন ইত্যাদি সব উত্তরপ্রদেশের সাথে যুক্ত।
    এখন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ও শাসন বা আসলে নির্বাচন মানে হল যোগী আদিত্যনাথের দানবীয় নিপীড়নের মুখে দাঁড়ানো। তবুও উত্তরপ্রদেশে আগামী মার্চে কে জিতবে সেটা আজকের এলেখার কোনো ইস্যু নয়। এখানে আজ ইস্যু বা লেখার প্রসঙ্গ হল এখন থেকে সারা ভারতে আরএসএস-বিজেপির নির্বাচনী ইস্যু কী হতে যাচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ সম্প্রতি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত “ভাস্ট ডিফারেন্স” বলে ফেটে পড়েছেন। তিনি গত শুক্রবার নাগপুরে (মহারাষ্ট্রে) বার্ষিক বিজয়াদশমী পালন উপলক্ষে বক্তৃতা রাখছিলেন।

    কিন্তু ‘ভাস্ট ডিফারেন্স’ মানে কী?
    ভাস্ট ডিফারেন্স বা ব্যাপক ফারাক বলতে কী কিসের ফারাক বুঝানো হয়েছে?  মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। এটা অনেক দিনের পুরানা এক  ইতরোচিত রেসিস্ট [racist] বা হিটলারি অভিযোগ; বিশেষত যখন আরএসএস-বিজেপির মনে হয় যুতসই অভিযোগের অভাব ঘটেছে, তখন এটা তারা আবার উঠায় আনে। স্বাধীন হওয়ার পর ভারতে এ’অভিযোগ প্রথম তুলেছিল ১৯৫১ সালে আসাম রাজ্য। সেটা কংগ্রেসের নেতৃত্বে। তবে সারা অসমীয়া বা আসামিজ [Assamese] জনগোষ্ঠী করেছিল। সেই সময় থেকে (পূর্ব পাকিস্তান) বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষ বাঙালিরা মূলত তারা বুঝাত মুসলমানরা, আসামে অনুপ্রবেশ করেছে বলে অভিযোগ প্রথম জোরেশোরে ফোকাস উঠতে থাকে। পরে ট্রাইবাল বা পাহাড়িসহ সব অসমীয়া-জনগোষ্ঠী এক দিকে আর বাকিরা সবাই ‘বিদেশী’, এভাবে এক যুক্তিতে ভাগ করে সর্বাত্মক বিভেদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা আর এদের কারো হাতে থাকেনি; অসমীয়া-জাতিবাদীদের চরম-উগ্র আন্দোলন হয়ে উঠেছিল। শেষে ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এক আপস-চুক্তি করেছিলেন এই শর্তে যে, তিনি “আসামে বিশেষ জনগণনা” ও প্রত্যেকের “নাগরিকত্ব চেক বা যাচাই” করে কথিত বিদেশী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে বের করার বন্দোবস্ত নেবেন। রাজীব গান্ধীর ভাষায় তিনি এই আপস না করলে আসাম ভারত থেকে আলাদা হয়ে যেত। তাই তিনি এমন আপস করেছিলেন। কিন্তু তিনি পরে এ নিয়ে কোনো বাস্তবায়নে যাননি। ফলে অসমীয়-জাতিবাদ আরো চরম উগ্র হয়ে উঠতে থাকে। আর তাদের এই উগ্রতার জোরে তারা একেবারেই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আসামের “সব দুঃখের কারণ” হল বাংলাদেশের বাঙালি। (অথচ নেহেরুর  আসল ভয় হল আসাম ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চীনের অংশ হয়ে যেতে পারে অথবা অন্তত চীন আসামের উপর দিয়ে করিডোর নিতে পারলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এরপর বঙ্গোপসাগরকে বন্দর হিসাবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে যেতে পারে – এই ভয়ে তারা আসামকে সবসময়  যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল করে ফেলে রাখতে চেয়ে এসেছে। আর এটাই আসামের পিছিয়ে পড়া রাজ্য হয়ে থাকার মূল কারণ। ) তাই তাদের অসমীয়-জাতির জন্য জীবন দিয়ে ফেলতে পারে এমন চাওয়া অসমিজ ইন্টেলেকচুয়ালরা আদালতের মাধ্যমে ওই দাবি বাস্তবায়নে আগানোর বা বলা যায় এক সেমি-ষড়যন্ত্রের পথ ধরেন। এর এক কুতুব নেতা বলতে পারি আমরা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারক রঞ্জন গোগই [Ranjan Gogoi], এই অসমিজের নাম করতে পারি। এক বেআইনি কাজকে তারা আইনি রূপ দিয়ে হালাল করেছেন বলা যায়।  বিচার বিভাগ গায়ের জোরে নির্বাহি বিভাগের কাজ হাতে তুলে নিয়েছিল। আসামের মাঠের নাগরিকত্ব যাচাই আদালতের কাজ ছিল না।  তবু তারা তাদের মুসলমান-ঘৃণা ও অনুপ্রবেশকারি তত্ব সত্য প্রমাণ করতে একাজ করেছিল। এবং তাতেও ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশীদের কথিত অনুপ্রবেশ তাদের সব দুঃখ ও সম্পদ হারানোর কারণ’ একথা তারা মাঠের গণনা ও শতভাগ নাগরিকত্ব পরীক্ষা করেও দেখেছেন – কথা সত্য নয়, প্রমাণ করতে পারেন নাই।
    বাস্তবে এই গণনা পরিচালিত হয়েছিল পুরোটাই আসামের কোনো প্রশাসন নয়, খোদ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে। আর অন্য প্রদেশ (মধ্যপ্রদেশ) থেকে ক্যাডার অফিসার এনে আর মূলত বিচারক রঞ্জন গোগইয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং যখন এর শেষ ১৩ মাস তিনি  ভারতের চিফ জাস্টিস সেসময়ে। কিন্তু সব চেষ্টার পরও শোচনীয়ভাবে অসমীয়া-জাতিবাদীরা তাদের দাবির বাস্তবতা প্রমাণ করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতি ও ফলাফলে তারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বিজেপি (তখন রাজ্য সরকারে) প্রস্তাব করে মুখরক্ষার্থে আবার ১০-২০ শতাংশ বাংলাদেশসংলগ্ন আসাম সীমান্ত অংশে আবার গণনা করতে বিচারক রঞ্জন গোগই যেন এক আদালতের নির্দেশ জারি করে দেন। উদ্দেশ্য ছিল এবারের পুণঃগণনায় কারচুপি করে মুসলমানদের ‘অনাগরিক’ বলে বেছে বের করে দেয়া হবে। কিন্তু রঞ্জন গোগই  আর নোংরা  একাজে নিজেকে জড়াতে রাজি হননি। তিনি ওই প্রাপ্ত গণনাকেই ফাইনাল বলে রায় দেন। তাতে কিন্তু অসমীয় নেতা-পাবলিকেরাও এবার বিজেপি থেকে আলাদা হয়ে আন্দোলন শুরু করার চেষ্টা করে; কারণ তাদের বিভেদের পয়েন্ট হল, বিজেপি চাইছিল বাংলাদেশী সাধারণভাবে নয়, কেবল বাংলাদেশের কথিত মুসলমানদের বের করে দিতে নতুন কিছু করে। আর অসমিজরা বলছিল, তারা হিন্দু-মুসলমান সব বাংলাদেশীকে বের করতে চান, যা তাদের অরিজিনাল দাবি ছিল।

    এদিকে গত ২০১৯ সালে আসামে আবার রাজ্য নির্বাচন হয় এবং বিজেপি আবার ‘কোন জাদুমন্ত্রে’ ক্ষমতায় আসে। কারণ এই নির্বাচনের আগে অসমীয় ন্যাশলালিজম এত উগ্র হয়ে উঠেছিল খোদ বিজেপির বিরুদ্ধে যে মোদী পাঁচবার এসেও মিটিং করতে পারেন নাই, ফিরে গেছিলেন।  আর এবার নতুন চালে নতুন করে এবারের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। আর এসেই  এরই মধ্যে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “মুসলমানরা নাকি খালি বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তাই ওই কথায় গত জুলাই মাসে আনন্দবাজার লিখেছিল, “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ বিধান সভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এমনকি আনন্দবাজারও ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যে লিখেছে, ‘তবে মুসলিম জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটছে বলে দাবি করলেও, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে দেখা যায়নি হিমন্তকে।’

    “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী অসম সরকারও। তার জন্য ১ হাজার ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সেনা’ নামাতে চলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা খোদ সোমবার বিধানসভায় এমন ঘোষণা করেছেন। তবে নমনী অসম, যেখানে মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস, সেখানেই এই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।”  – আনন্দবাজার ২০ জুলাই ২০২১।

    আর ওদিকে অসমীয়া দেশপ্রেমী ভাইয়েরা, তাদের কী খবর? তারা ক্রমেই এখনো ‘অসমীয়া জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Assamese culture superior to RSS ideology] – এই জাতিবাদের ঝাণ্ডা সবখানে উঁচিয়ে চলেছেন। কিন্তু বিজেপির বয়ান ও বাক্সে ঢুকে গেছেন সেটা এখন ভুলে আছেন। গত মাসে আসামের বৈধ-মুসলমান নাগরিককে প্রায় ছয় হাজার একরেরও বেশি বৈধ নিজ জমি থেকে মুখ্যমন্ত্রী তাদের উৎখাত করে দিয়েছেন। প্রথমে বলা হল শিবমন্দির বানাতে মুসলমানদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে দেখেন বিবিসির রিপোর্ট  আসাম: শিবমন্দির বানাতে মুসলিম উচ্ছেদ, বিক্ষোভে পুলিশের গুলি। পরে বলা হল যে না একটা কৃষি খামার করবে হাজার একরের।

    “বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনা হচ্ছিল এই উচ্ছেদ আর তার পরের পুনর্বাসন নিয়ে। সরকারের দাবি এই জমি তাদের। গ্রামবাসীরা দখলকারী। তাই তাদের সরে যেতে হবে। “কেন এটা সরকারি জমি হবে? আমাদের পূর্বপুরুষরা উচিত দাম দিয়ে এই জমি কিনেছিল। সেই দলিলও আমাদের কাছে আছে,” বলছিলেন আজিরুন্নেসা নামের এক নারী।

    সরাসরি সেই হত্যার ক্লিপ আর বিবিসির সরেজমিন রিপোর্ট আপনারা দেখেছেন, যেখানে নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর বক্তব্য যেটা শিরোনাম করা হয়েছে যে, আসামে মুসলিম উচ্ছেদ: ‘আমাদের দোষ একটাই – আমরা মুসলমান’ বলছিলেন ধলপুরের এক গ্রামবাসী।

    এই হলো হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যার ‘ভাস্ট ডিফারেন্সের’ মানে, ব্যাপক ফারাকের গল্প। এত দিন ভাবা হয়েছিল, বিজেপি এমন করে আসামে বা বিক্ষিপ্তভাবে উত্তরপ্রদেশে যোগীর রাজ্যে জোর করে ভ্যাসেকটমি করা বা ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সেনা’ নামানো হতে পারে।

    কিন্তু না। এটা আর শুধু বিজেপির না, এটা এখন একেবারে আরএসএসের কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম, মানে এটাই আরএসএস-বিজেপির প্রার্থী নরেন্দ্র মোদির মূল কর্মসূচি। সে কথাই ঘোষণা করেছেন মোহন ভাগবত গত শুক্রবার।

    ‘Vast differences’ in growth rate of religions
    ভাস্ট ডিফারেন্স থিওরি।  ভাগবত গত ২০১৫ সালের তাদেরই এক পুরনো প্রস্তাব বের করে এনেছেন, বলেছেন এটি নাকি তাদের ‘পপুলেশন পলিসি’। তবে তিনি মোদি সরকারকে যত দ্রুত সম্ভব ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি’ বানাতে বলছেন। আর দাবি করছেন, বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রুপ জনগোষ্ঠীর জন্মহার বৃদ্ধির ব্যাপক ফারাক, অনুপ্রবেশ ও ধর্মান্তকরণের ফলে আমাদের ধর্মীয় জনসংখ্যার অনুপাত ভারসাম্যহীন হয়ে গেছে। বিশেষত সীমান্ত এলাকাগুলোতে, যা আমাদের দেশের ঐক্য, সংহতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে ‘অনুপ্রবেশ ও উচ্চ জন্মহার এমন দুভাবেই মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ভারতের ঐক্যের জন্য বিরাট হুমকি’। 

    Friday called for a National Register of Citizens (NRC) and a review of the population policy, pointing out “demographic imbalance” due to “vast differences” in the growth rate of different religions and infiltration in border areas.

    “আমাদের জনসংখ্যার মধ্যে ভারতীয় ধর্মীয় অরিজিন যারা এরা ছিল ৮৮ শতাংশ, যা ১৯৫১-২০১১ এ সময়ের মধ্যে নেমে এসেছে ৮৩.৮ শতাংশে। অথচ এর বিপরীতে মুসলিম জনসংখ্যা যা আগে ছিল ৯.৮ শতাংশ বেড়ে হয়ে গেছে ১৪.২৩ শতাংশ” । এ ছাড়াও শেষে মোহন ভাগবত যা বলেছেন, তাতে তারই মানসিক স্থিরতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। তিনি বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনের পরে সে সহিংসতা শুরু হয়েছে এবং আর তাতে রাজ্য সরকার যে বর্বরতা ও জনসংখ্যার (হিন্দু-মুসলমান) ভারসাম্যহীনতাকে তোয়াজ করেছে, তাতে হিন্দুদের দুস্থ অবস্থা উঠেছে চরমে।’ এখানে উদ্ধৃতিগুলো নিতে হয়েছে শনিবারের ভারতের ওয়েব ম্যাগাজিন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে।

    This resolution says the share of religions of “Bharatiya origin” — including Hinduism, Buddhism, Jainism and Sikhism and excluding Islam and Christianity — came down to 83.8 per cent in 2011 census from 88 per cent in 1951 while the Muslim population increased to 14.23 per cent from 9.8 per cent during that period.

    বাংলাদেশে পুজাঃ
    এদিকে বাংলাদেশের  দুর্গাপূজার শেষ দুই দিন স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে পারেনি। আবার আমাদের মুসলমান জনগোষ্ঠীও প্রচণ্ড অস্বস্তিতে, তারাও ক্ষুব্ধ; তাদের জন্যও ধর্মীয় অবমাননাকর ঘটনার জন্য। আবার সরকারও খাচ্ছে হিমশিম; আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে তাদের নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কোনোপক্ষই সন্তুষ্ট নয় একেবারেই। এক কথায় বললে, কোথাও একটা স্যাবোটাজ হয়েছে,আমাদের আন্তঃজনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘৃণা ছিটানো হয়েছে, যা সরকারের অনুমানের নিয়ন্ত্রণসীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সবাই একটি লজ্জায় পড়ে গেছি। আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক সমসাময়িককালে এমন খারাপ হয়নি এবং দুর্দশায় কখনো পড়েনি। এরই মধ্যে আমরা দেখলাম বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারী একটা স্পষ্ট ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তিনি লিখিতভাবে (যে চিঠি বিবিসিতে প্রকাশিত) প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে বাংলাদেশে ‘হস্তক্ষেপ করতে’ আহ্বান রেখেছেন!  অর্থাৎ সকালে মন্দিরে কোরান শরীফ রেখে আসার ঘটনা আর সন্ধ্যায় মোদীকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের জন্য ডাক দেয়া?
    তার নিশ্চয় অজানা নয় যে, আরেকটা দেশে হস্তক্ষেপ করতে প্রকাশ্যে আহ্বান জানানোর অর্থ-তাৎপর্য ও এর দায়-দায়িত্ব কী? দেখা যাচ্ছে তিনি আগে থেকেই যেন সব জানতেন। তবে বিবিসি তার প্রপাগান্ডা করতে রাজি হয়নি না হলেও তাকে দুরেও ফেলে নাই। তার আহবানের চিঠি ঠিকই প্রচার করে দিয়েছে! তা হলে বাংলাদেশের সহিংসতায় তার সংশ্লিষ্টতা কী সেটি পুরাটা এখন খুলে বলার দায় বিজেপির কলকাতার সংসদীয় দলের নেতা শুভেন্ধু অধিকারীর। আর বাংলাদেশের উচিত হবে এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করা।

    যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, মোদির আগামী নির্বাচনে জয় না পাওয়া নিয়ে তিনি কি নিশ্চিত? না হলে মুসলমানরা নাকি ‘বেশি বাচ্চা পয়দা’ করে অথবা জনসংখ্যা ‘ভারসাম্যহীন’- এসব কথা যে রেসিজম বর্ণবাদিতা, তা জেনেও এমন কথাগুলো তাদের র‌্যাংক অ্যান্ড ফাইল- আরএসএস থেকে বিজেপি সব নেতাকর্মী মুখ্যমন্ত্রী মরিয়া হয়ে উচ্চারণ করতে শুরু করেছে কেন? সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ এমন কথা বলতে পারে না।

    এই মোহন ভাগবত, এই জ্ঞানী লোকের কাছে জানতে চাই, দেশে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা মানে কী? মানে একটা দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অনুপাতের মধ্যে ভারসাম্য থাকতেই হবে, কেন? এটা কি বস্তু?

    মোহন ভাগবত তিনি কে? তার অনুমতি নিয়ে মুসলমানদেরকে কী বাচ্চা পয়দা করতে হবে? তাহলে তো প্রশ্ন করতে হয় হিন্দুরা জনসংখ্যায় বেশি কেন? মুসলমানের সমান না কেন? ইউজলেস লুজার সব!

    একালের ভারতে বা বাংলাদেশে অথবা অবিভক্ত ভারতে কোথাও কখনো কি দেশে হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যা অনুপাত কী হবে- এ নিয়ে কোনো আইন, কোনো চুক্তি হয়েছিল? ভারতের কনস্টিটিউশনে এ নিয়ে কি কোথাও কিছু লেখা আছে? নাকি থাকতে পারে? ইনি কী দিয়ে বুঝেছেন, কোনটাকে ভারসাম্যপূর্ণ আর ভারসাম্যহীন বলে? এমনকি টেকনিক্যালি জনসংখ্যা বিশারদদের কাছে কী এমন কোনো মাপক আছে, থাকা সম্ভব, যা দিয়ে জনসংখ্যার পরিমাপক করা যায়? ভাগবত সাহেব কী দিয়ে মেপেছেন?

    ভারতের কনস্টিটিউশনে বা কোন আইন অনুযায়ী, মুসলমানরা কথিত কোন ভারসাম্য ভেঙেছে? আর সেটি তিনি ডিকটেট করার কে? তিনি কোন মহারাজা?
    মোহন ভাগবত কি জানেন ভারতের সরকারি ভাষ্য হলো, মুসলমানদের জনসংখ্যা বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক?

    আবার এসমস্ত বক্তব্যই তো এক রেসিস্ট বক্তব্য। তিনি নিজেই মনেও হচ্ছে, জলাতঙ্ক রোগীর মতো মুসলমান-আতঙ্কে ভুগছেন! এত ভয়াবহ অসুস্থতা! এটি তো হিটলারের অন্য জাতি-ঘৃণা বা অন্য জাতি-আতঙ্ক এসবেরই কপি। ভারতের কনস্টিটিউশনাল কোর্টের উচিত হবে এই দাঙ্গাবাজ অসুস্থ উসকানিদাতাকে থামানো, স্বপ্রণোদিত হয়ে অন্তত কিছু পদক্ষেপ নেয়া। নইলে এসব অসুস্থ লোক এ অঞ্চলে আগুন লাগিয়ে ছারখার করে দেবে, নিজেরাও পুড়ে মরবে। াশা করি ভারতে কিছু সুস্থ লোক এখনো বেঁচে আছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৬ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বেশি পয়দার বিরুদ্ধে মোদির সংগ্রাম“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলো কী নিজেই নিজেকে মৃত ঘোষণা করতে চাইছে?

    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১০.৫৬ সকাল
    প্রথম আলো চরমতম বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমাদের জানামতে এর অফিস কাওরানবাজারেই ছিল। কিন্তু গত দুমাসের রিপোর্টিং মান, ধরণ ও ততপরতায় তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছে এটা বোধহয় কোন ভারতীয় পত্রিকা। যার অফিস ভারতের কোন শহরে!
    এমনিতেই ভারতীয় পত্রিকায় জার্নালিজম থাকে না। থাকে জাতিবাদ-দেশপ্রেমিকতা। মানে খবর যেভাবে পেশ করলে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেম প্রকাশ পাবে সেটাই করতে হবে। তাতে নিউজ মিথ্যা হলেও অসুবিধা নাই। অর্থাৎ জার্নালিজমের নীতি ও সততা এর গাইডলাইন নয়, বড়জোর সেকেন্ডারি। অর্থাৎ দেশপ্রেমের নামে খাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডাও জায়েজ। আর কথিত এই দেশপ্রেমের নিচে যদি কিছু জায়গা ত্থাকে তো সেখানে জার্নালিজমকে ফেলে রাখা যেতে পারে। এককথায় কথিত তাদের ‘ন্যাশনাল ইন্টারে্স্টটের’ সাংবাদিকতা। ফলে এরপর আর খবরের সত্য-মিথ্যা জাহান্নামে!
    কথা এখানেই শেষ না। দল বিজেপি যেহেতু এখন ক্ষমতায়। তাই মোদীর
    আরএসএস –বিজেপির রাজনীতি এবং স্বার্থটাই ভারত দেশপ্রেমের মাপকাঠি এবং তাদের কথা-ই ভারতের ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’। তাই শেষে এটাই প্রথম আলোরও খবর প্রকাশের গাইড লাইন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ প্রথম আলোর খবরের সোর্স বলা হচ্ছে ভারতে প্রকাশিত কোন পত্রিকার খবর।
    আগেও বলেছিলাম “ডেস্ক নিউজের” নামে প্রথম আলোতে আরেক চাতুরি চলে। তা হল, খবরের উতস-এর পরোয়া না করে অনুবাদের নামে যা ইচ্ছা তাই রিপোর্ট করা। যেন ‘অনুবাদক’ বলে আরেক ক্যাটাগরির কর্মী প্রথম আলো নিয়োগ দিয়েছে বা দেখতে পাওয়া যাবে। যারা সাংবাদিকতার সব দায় কর্তব্যের উর্ধে। খবরের উৎসে কোন কথা বা শব্দ থাক আর নাই থাক তিনি যেকোন শব্দ খবরের মধ্যে ঢুকাতে পারেন, বেপরোয়া। কারণ ওটা নাকি ‘ডেস্ক নিউজ’। ফলে যেন খবরের সত্যতার দায় প্রথম আলোর নাই।
    এর উপর আবার গতমাস থেকে এখন শুরু হয়েছে ‘বান-তালে’ (শব্দ উলটে নিয়ে পড়তে হবে) জার্নালিজম’। মানে যারা কা=বু=লে ক্ষমতা দখল করেছে। তাদের নিয়ে ভারতের জার্নালিজম। খবরের সোর্স না থাকলেও বানিয়ে এই নতুন শাসকদের বিরুদ্ধে লিখতে হবে ও সেটাই জার্নালিজম বলে মানতে হবে। নয়া শাসক আসাতে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয়েছে। তাই এই ইস্যুতে ভারতের জার্নানিজম বাপ-মা হারা বেপরোয়া হয়ে গেছে। বেঁচে আছে কেবল কথিত ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের সাংবাদিকতা, তাই দেশপ্রেমের ভারে, উৎস না থাকলেও যা খুশি লিখে দিবার স্বাধীনতা।
    আর এতে প্রথম আলো হয়েছে আরো স্বাধীন বেপরোয়া। ভারতের যেকোন মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব প্রপাগান্ডা গারবেজকে প্রথম আলো তার প্রকাশিত নিজ খবরের সোর্স বলে দাবি করছে। পেগাসাস এই ইসরায়েলি আড়িপাতা সফটওয়ার মোদী কিনেছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে, আর বিরোধী রাজনীতিক এমনকি নিজ সরকারের সচিব ইত্যাদির উপর তিনি তা ব্যবহার করে আসছেন। এটা নিয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে মামলা চলছে। সংসদে হৈ চৈ চলছে। অথচ এখনও না সরকার বা সফটওয়ার কোম্পানী (এনএসও) স্বীকার করেছে যে মোদী এই সফটওয়ার কিনেছে। আদালতে দেওয়া সরকারের এফিডেফিট ইতোমধ্যে দুবার বদলিয়েছে। এমনকি কিনে নাই সেটাও বলছে না। পিছলে বেড়াচ্ছে। অথচ এনিয়ে যে রিপোর্ট প্রথম আলো ২৪ জুলাই ছেপেছে তা আসলে কোম্পানী এনএসও এর পক্ষের এক সাফাই। সেজন্য শিরোনাম হল এই আড়িপাতা সফটওয়ারের কারণে নাকি “লাখ লাখ মানুষ রাতে ভালো ঘুমাতে পারে”।
    এএনআই – এটা নিজেকে ভারতের এক প্রাইভেট নিউজ এজেন্সী বলে দাবি করে। বস্তুত এটা ফেক নিউজের একটা আড়ত। ইইউ এর এক গবেষণাালব্দ ফল থেকে পাওয়া অভিযোগ এটা। (EU DisinfoLab report) গুগল সার্চ দিয়ে আগ্রহিরা খুজে নিতে পারেন। আর এই কথিত এজেন্সীর উপরে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে যেসব ফেক নিউজ করার দরকার হয় তা করে দেওয়ার বা হালাল করে দেওয়াই এই এজেন্সীর কাজ। অথচ এই এএনআই এর নিউজকেই উৎস মেনে পিআলো তা ছেপে চলেছে।
    যেটা গত পরশু একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে সেটা হল, একটা কথিত নিউজ;
    এতে উল্লেখিত খবরের সোর্সগুলো এরকমঃ
    ১। ……বলে সরকারি সংস্থাগুলো মনে করছে
    ২।…… বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে।
    ৩……… বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
    ৪।……… বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
    ৫। ……… পাকিস্তানের নাম জড়িয়ে পড়ার কথা শোনা যায়।
    ৬।………… পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রচার রয়েছে।

    ৭।………… ঢাকার বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী

    ৭৫০ অক্ষরের এই কথিত নিউজে খবরের সোর্স এই সাতভাবে বলা আছে। এটা কী জার্নালিজম? তাও প্রথম আলোর?
    প্রথম আলো এভাবে নিজেকে নিচা করে নামিয়ে কথিত খবর ছাপছে কেন?
    অর্থ সংকট? পাকিস্তান আমাদের কারও অপছন্দের দেশ হতেও পারে। কিন্তু সেজন্য এর বিরুদ্ধে এমন প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে নিজের অর্থ সংকট মিটাতে হবে? ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ বা নয়াদিল্লির অর্থ নিয়ে? তাই কী?
    এমন গারবেজ অসততার জিনিষগুলো প্রথম আলোতে ছাপার আগে এই পত্রিকার সম্পাদকের আত্মহত্যা করাই অনেক সম্মানের হত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

     

    গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

    “রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

    গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

    ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

    অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

    যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

    ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
    বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
    কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

    ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
    তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

    But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

    আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
    কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

    অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

    এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

    সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
    “অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

    উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

    সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

    এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

    কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

    তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

    আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

    যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
    আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

    তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
    ‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

    এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

    আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

    তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

    নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

    আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

    আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

    তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]