Category: Belt-Road Initiative (BRI)

  • ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

    ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

    গৌতম দাস

    ১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

    https://wp.me/p1sCvy-2rG

     

     

     

    ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

    বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

    তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

    বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

    আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

    রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

    ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

    এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

    এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

    আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms।

    সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

    আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

    “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

    গৌতম দাস

    ০৩ এপ্রিল ২০১৮,  মঙ্গলবার, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2r9

    কথা সত্য। চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যা অবস্থায় ছিল এর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে, ভারতের ভাষায় এটা রি-সেট (“reset”) হয়ে গেছে। মানে ‘ফির সে শুরু’ হয়ে গেছে। এটা হতে ১৬ বছর লাগল। তাই আজ কথা শেষের দিক থেকে শুরু করে বলব। প্রায় ষোলো বছর পর ভারত মেনে নিল যে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা ও প্রভাব ঠেকানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। সে হার স্বীকার করে নিচ্ছে। তাই সে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছে না, বরং মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। ভারত মালদ্বীপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে চীন যেন ভারতের দিকটাও একটু খেয়াল রাখে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ভারত স্বীকার করে নিল যে, আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’ অথবা চীন ঠেকানো বৈদেশিক নীতির যে ঠিকা আমেরিকার কাছ থেকে ভারত এত দিন নিয়ে খেদমত দিয়ে গেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন তা পরিত্যাগ করছে, ক্ষেমা দিচ্ছে। ফলে চীন যেন ভারতকে এর প্রতিদান দেয় (“it is clear that Delhi expects Beijing to reciprocate”)।

    ‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

    সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।

    “India cannot claim sole proprietorship of the region. We can’t stop what the Chinese are doing, whether in the Maldives or in Nepal, but we can tell them about our sensitivities, our lines of legitimacy. If they cross it, the violation of this strategic trust will be upon Beijing,” the official said.

    এখানে শেষের রঙিন বাক্যে রঙ দিয়েছি আমি। এই বক্তব্যের অর্থ ও ইঙ্গিতে খুবই করুণ ও অসহায়। ভারত যেন বলতে চাইছে, “এই দুনিয়ার লড়াইয়ে শক্তি আর মুরোদে আমরা হেরে গেছি, তবে পরকালে যেন বিচার হয় তেমন একটা বিচার দিছি”।’ এ ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ ভারতের কোটেড প্যারাগ্রাফের বক্তব্য হল এ রকমঃ – “যেদিন ভারত দেখেছে সে আর দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করে রাখতে ও চীনের মতো শক্তিকে  এখানে ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে আসা বন্ধ করতে পারছে না সেদিন সে বুঝে গেছে এসব কিছু নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গেছে”।

    “The days when India believed that South Asia was its primary sphere of influence and that it could prevent other powers, such as China, from expanding its own clout are long gone,” a senior government official told The Indian Express. 

    খুবই পরিস্কার ভাষায় বলা অক্ষম অসহায়ত্বের বক্তব্য। যদিও এতদিন এসব প্রসঙ্গে ভারত চাপাবাজি করে বলে রেড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাবাধীন এলাকা, এখানে চীন আসতে পারে না।

    এ ছাড়া মালদ্বীপ নিয়ে খুবই পরিস্কার ভাষায় ভারতের আর এক তৃতীয় বক্তব্য আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টার দাবি করছেন, ওই সিনিয়র অফিসার তাকে বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের গত ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরের সময় তিনি চীনকে জানিয়ে দিয়েছেন, “ভারত মালদ্বীপ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে মালদ্বীপে ভারতের  হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা নেই”। আর এই বাক্যটাকেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে। On the Maldives, for example, the unusual overture to China was made by none other than Foreign Secretary Vijay Gokhale during his trip to Beijing in February,

    অনুমান করা যায়, এখানে ভারতীয় এই স্বীকারোক্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে এভাবে যে, সবার আগে এটা ‘সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল’-এভাবে পরিচয় লুকানো এক বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটা ছাপবে। এরপর বাকি প্রায় সব লিডিং দৈনিকগুলো সবাই এবার তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ছাপবে। তাই-ই হয়েছে। তবে এভাবে এখানে ছাপা হওয়ার মধ্যে লক্ষণীয় দুটো দিক হল, কোনো মিডিয়াই কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বা এর রেফারেন্সকে অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করেনি। এমনকি তারা এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা কোন মুখপা্ত্রকে জিজ্ঞাসা করতে যায়নি। এটাই খুবই  ইন্টারেস্টিং। এর অর্থ  হল বাকি সব পত্রিকা বরং নিজেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে এই খবর ছেপে বলতে চাইছে যে, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে এই খবর সত্য, তারাও ব্যাপারটা জানে। এ ছাড়া অন্যদিকে ভারত সরকারও মিডিয়াগুলোতে এই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেছে অথচ এই খবরকে অস্বীকার করে কোনো বিবৃতিও দেয়নি। এর অর্থ তারাও পরোক্ষে স্বীকার করছে যে হা এটাই তাদের বক্তব্য।

    এদিকে আরেক ইংরেজি দৈনিক – ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, সবার মতো সেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতের রিপোর্ট  ছেপেছিল । তবে সেটা ছাড়াও রয়টার্সের বরাতে সে পরের দিন আরেকটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম ‘Dalai Lama faces cold shoulder as India looks to improve China ties”। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে দালাইলামাকে ‘শীতল কাঁধ দেখানোর’ কারণ ভারত বুঝিয়ে বলাতে তিনি ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, মনে কোনো ক্ষোভ বা আকাঙ্খা নিয়ে দেখেননি। আসলে ঘটনা হল, বেচারা দালাইলামা তার সব কর্মসূচিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বাতিল করে দিয়েছে। আসলে এটা ছিল দালাইলামাদের চীনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ৬০তম বার্ষিকী পালনের দিন। কিন্তু দিল্লীতে যত অনুষ্ঠান নেয়া হয়েছিল মোদী সব কিছুর পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এমনকি ভারত তাদের থাকতে দিয়েছে এজন্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য  সরকারকে “ধন্যবাদ জানাবার কর্মসূচিও” বাতিল করে তা তিব্বতের ধর্মশালায় সরিয়ে নিতে দালাইলামাকে বাধ্য করা হয়েছে। আর সাথে মোদীর সরকারের সার্কুলার জারি করা হয়েছে যে কোনো মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী যেন এদের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কারণ চীন মনে করে, দালাইলামা চীনের জন্য খুবই বিপজ্জনক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। এককথায় বললে চীনকে খুশি করতে, রাখতে ভারত চরমতম মরিয়া অবস্থান নিয়েছে। গত ছাপান্ন বছরে এমন “চীন তোষামোদী” ভারত কেউ আগে দেখেনি। দালাইলামা সম্পর্কে  চীনের মূল্যায়ন ও মনোভাবকে পবিত্র আমানত জ্ঞান ও আমল করে আগলে রাখতে ভারত এখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই রিপোর্টের সাথেও নাম প্রকাশ না করে আরও এক সোর্সের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপিয়েছে। প্রথমত সেখানে বলা হয়েছে, নাম গোপন রাখা এই সোর্স তিনি নাকি ভারতের চীননীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন উচু ব্যক্তি। তিনি জানাচ্ছেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে নিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের আইডিয়া হল, ২০১৭ সাল পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তা ভুলে গিয়ে পেছনে ফেলে রাখতে চাই আমরা”। “We are moving forward with this relationship, the idea is to put the events of 2017 behind us,” a government source involved in China policy said. অর্থাৎ আর পরিস্কার নিশ্চিত করা বক্তব্য আমরা এখানে পাচ্ছি।

    তবে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সরকারি স্বীকৃতি এখনো না দিলেও ভারতের অপর পক্ষ চীন, মানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের রেগুলার ব্রিফিং থেকেও এ বিষয়ে অনেক কিছুর স্বীকৃতি মিলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্রকে (Foreign Ministry Spokesman Lu Kang) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁঁর সেই বয়ানে। “চীন কি সাম্প্রতিক ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের (দালাই লামার সাথে দূরত্ব তৈরিসহ) প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়?” – এই ছিল সেই প্রশ্ন, মুখপাত্র এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেলেন। মুখপাত্র  দালাই লামা শব্দটা এড়িয়ে উচ্চারণ না করে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে জবাবে দেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, তিনি বলেছেন, “সাম্প্রতিক কালে তাদের উভয় পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক বাধাহীন গতিতে (‘সাউন্ড মোমেন্টাম’ বা ‘sound momentum’) বিকশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি”।

    আসলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত চীন-ভারত তাদের বিভিন্ন মন্ত্রিপর্যায়ে (গড়ে সম্ভবত প্রতি মাসে প্রায় দু’টি করে) মিটিং আছে। আর সর্বশেষ জুন মাসে সাংহাই করপোরেশন সংস্থার (SCO, http://eng.sectsco.org/about_sco/) চীনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সভার সাইড লাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাক্ষাৎ হবে।  আর আগামী মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চীন সফর দিয়ে বৈঠকগুলো শুরু হবে। এরপর আছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, বাণিজ্য ইত্যাদি।

    আগামী জুন মাস পর্যন্ত তৎপরতায় ভারতের লক্ষ্য কী এ দিকে তাকিয়ে বললে এর এক কথায় জবাব হল, মুখ্যত চীনে ভারতের রফতানির বাজার লাভ করতে চায়। ভারত এত দিন চীনের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছিল, আমেরিকার চীন ঠেকানোর নীতি নিজের কাঁধে নিয়েছিল বলে। আর তা নিজের কাঁধে নিয়েছিল বিনিময়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাজার পেয়েছিল বলে। কথাটা ভেঙ্গে সার কথাটা বললে, ভারতীয় পণ্য মূলত রফতানিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একে আমেরিকার পণ্যের চেয়ে সস্তা ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে নেয়া ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আগের দুই প্রেসিডেন্টের দুই দুই করে টার্মে (মোট ষোলো বছরে) সবসময় আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে (চায়না কনটেইনমেন্ট) প্রাধান্য দিয়ে বিদেশনীতি সাজানো ছিল। তাই তখন ভারতকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা করে ভারতের ভর্তুকির রফতানিকেও অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে ভারতের গড় মাথাপিছু আয় কেবল এক হাজার ডলার না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে। কিন্তু গত ২০১৫ সালে এই শর্ত পূরণ হয়ে গেলেও রফতানি সুবিধা ভারত পেয়ে চলছিল। মোটা দাগে বললে, ট্রাম্পের সাথে আগের দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ভারত-বিষয়ক নীতির ভিন্নতা কী – এভাবে কথাটা তুললে তার জবাব হবে – ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে আর কোনো প্রাধান্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি উল্টো ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার ওপরে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে’ এই নীতিতে চলতে চাইছেন (যদিও কতটা পারবেন পারছেন সেটা অন্য কথা)। ঠিক এ কারণেই ভারতের “ট্রাম্প রিডিং” হল, ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের আর বাণিজ্য সুবিধা কিছুই পাওয়ার নেই। তাই ভারতের উল্টো দ্রুত চীনের দিকে ও কাছে যেতে পথ বদল ঘটেছে। আর বাণিজ্য সুবিধা এবার চীনের কাছ থেকে পাওয়ার আশায়, ভারত চীনের মন জোগাতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেয়ার নীতি নিয়ে আগাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি  ৫০ বিলিয়ন ডলারের, (এখন চীনের ভারতে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার, ভারতের চীনে ১০ বিলিয়ন)। ভারতের লক্ষ্য চীন থেকে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়নের রফতানি বাজার লাভ করা। মূলত কৃষিজাত পণ্য রফতানি ভারতের লক্ষ্য।

    আমার লেখায় সবসময় বলে আসছি, চলতি আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়া ক্রমেই চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে বদলে যাওয়ার অভিমুখী হয়ে আগাচ্ছে। এই বিচারে চীন হল ‘রাইজিং অর্থনীতি’ এই নতুন অভিমুখের নেতা, বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতি পড়তি দশার। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের ন্যাচারাল অবস্থান ও অভিমুখ হল – চীনের সাথে ও পক্ষে, আমেরিকার বিপক্ষে। আমেরিকা হল অতীত যেখানে চীন হল আগামি – এই সুত্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যত হল চীনের সাথে মিলে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক অর্ডার শৃঙ্খলা তৈরি।  কিন্তু এতদিন সে কাজ না করে ভারত রিভার্স খেলে বাড়তি নগদ সুবিধা যা পায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। যেন কোন বালক তার নির্ধারিত খেলাধুলার বাল্য বয়েস এক্সটেন্ডেড করে নিয়ে হাসিখেলা আর মজা করে কাটাচ্ছিল। সেটারই এবার পরিসমাপ্তি ঘটল, এভাবে বলা যায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন সিস্টেম নতুন ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে ও উদ্যোগে ভারত-আমেরিকার আর একসাথে কাজ করার দিন সম্ভবত এখান থেকে পরিসমাপ্তি লাভ করবে। বাস্তব শর্তগুলো (যেমন ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা) ট্রাম্পের হাতে চির নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পথ নেবে। ওদিকে ভারতের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা যে ভারতের আমেরিকায় হারানো রফতানি টার্গেট বা বাজার ঘাটতি যা হয়েছে তা চীন পূরণ করে দিক, চীনে রফতানির বাজার দিক। মূলত এজন্যই ভারতের চীনের সামনে মরিয়া ও হাটুগাড়া অবস্থায় নিজেকে উপস্থাপন।   চীনও খুব সম্ভবত কিছু বাজার দেবে, বিশেষত ভারতকে আমেরিকা থেকে আলাদা করার তাগিদ চীনেরও আছে। আর ভারত এতই মরিয়া যে, চীনের সামনে ‘নীলডাউন’ অবস্থা। তবে আপাতত সফররত চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী কোনো চুক্তি ছাড়া গতকাল ভারত সফর শেষ করে চীনে ফিরে গেছেন। তবে ভারতকে রফতানি বাজার দেয়ার ‘প্রমিজ’ করেছেন, ভারতের মিডিয়া বলছে। চীনের প্রমিজ বা ওয়াদা সত্যিকারের ওয়াদা, ভারত আস্থা রাখতে পারে, রাখবে। কিন্তু ভারতের কাল থেকেই যেন এটা পেতে চায়।

    স্বাভাবিকভাবেই এখন ভারতকে মুখোমুখি হতে হবে চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ” (http://english.gov.cn/beltAndRoad/) – এই ইস্যুতে। সত্যি কথাটা হল, এবার সত্যিকার অবস্থানটা ভারতকে বলতে হবে। সম্ভবত আর ভ্যানিটি  বা মিছা লোক দেখানো অবস্থান আর নয় যে ভারত একনম্বর অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এরকম নয়, বাস্তব সত্য অবস্থান অর্থাৎ তা প্রকাশ করার বিনিময়েই খুব সম্ভবত চীনের কাছ থেকে ভারতকে রফতানি বাজার সুবিধা পেতে হবে। কারণ ভারত নিজেই নিজের মিথ্যা ভ্যানিটি- ‘আমেরিকা আমার পিঠে হাত রেখেছে’, ‘মুই কী হনুরে’- এগুলো তার ভুয়া পরিচয়, ভারত নিজেই তা ভেঙে ফেলে এখন চীনের সামনে নীলডাউন। কাজেই ভুয়া মিথ্যা চাপাবাজির দিন শেষ। সত্যি কথাটা হল আজ শেখ হাসিনা ভোটের কথা চিন্যেতা করে যে উন্নয়ন বা “মধ্য আয়ের দেশের”  তর্ক  তুলেছেন ভারত সেই “লোয়ার মধ্য আয়ের দেশের” (“lower-middle-income” economy ) হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালের জুনে। ভারতেরই এক মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, The World Bank has dropped the use of developing nation tag for India in its specialized reports and instead classifies it as a “lower-middle-income” economy in South Asia, a top official has said. ফলে সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি এই হল বলে, অথবা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগে যোগ দিলে সে “চীনের সাবরডিনেট বা অধস্থন অবস্থায় চলে যাবে” এসব কল্পিত গল্পের জগত ফেলে ভারতকে বাস্তবে নেমে আসতে হবে। কারণ বেসিক কথাটা হল, কোন  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জিনিষটা অবজেকটিভ। একে কেউ চাইলেই সাবজেকটিভলি দাবায় বা অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই স্বপ্নে পোলাও খাওয়া অথবা গল্প প্রচার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

    তবে মিথ্যা ভ্যানিটি বা গর্বের কী দশা হয় এর এক আদর্শ ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আমেরিকা বা চীনের মত থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুলে ভারতের স্বার্থ কী হতে পারে তার ষ্ট্রাট্রজিক বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ তৈরি করার শখ ভারতেরও। কিন্তু এর খরচ?  ২০০৫ সালে বুশের প্রস্তাবে এর খরচের দায় আমেরিকা নিয়েছে। ভারতের ধারণা সে আমেরিকাকে মহাঠকিয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ আমেরিকার উপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। আপনার স্ত্রী-সন্তান মানে সংসার প্রতিপালনের খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতে পারেন আপনি। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন ঐ সংসার আর অচিরেই আপনার থাকবে না। ফলে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো গজিয়েছে হয় ভারতে এনজিও রূপে যার ফান্ড করছে আমেরিকান কোন ফাউন্ডেশন অথবা আমেরিকান কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক এক্সটেন্ডেড হয়ে ভারতে শাখা খুলেছে। আর এতে সবচেয়ে খুশি হয়েছে তরুণ একাদেমিক কেরিয়ারিস্ট্রা যারা ভারতের স্বার্থের চেয়ে নিজের কেরিয়ারে আগ্রহ রাখে বেশি। আর এতে ভারেতের প্রায় সব থিঙ্কট্যাঙ্কঅগুলো আসলে আমেরিকান বিদেশনীতিই ভারতে প্রচার করার কাজএ লিপ্ত হয়েছে। আমেরিকান অর্থ উসুল হয়েছে এভাবে।  মুক্তমালার মত চীনের ভারতকে ঘিরে ফেলার তত্ব তারাই খাইয়েছে ভারতকে, সয়লাব করে ফেলেছে। এমনকি যে দুএকটা ভারতের ডিফেন্সের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও আমেরিকান বিদেশনীতির প্রভাব ঢুকাতে পেরেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে IDSA নামে এমন এক প্রতিষ্ঠানের “চীন-ভারতঃ নতুন ভারসাম্য” শিরোনামের থিম নিয়ে বার্ষিক কনফারেন্স করতে অনাপত্তি-পত্র দেয় নাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়।  অনুমান করা যায় আমেরিকার চোখে দেখা চীনা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিত সেখানে ছিল বা থাকতে পারে – তা চীনের মন জয়ে ভারতের  জন্য বাধা হিতে পারে আশঙ্কায়, চীন অখুশি হতে পারে  – তাই এই অনুমতি প্রদান না দেওয়া্র ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে,  Meanwhile, the MEA has refused clearance to an annual conference by the ministry of defence-sponsored think tank, Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) whose theme was “India-China: a new equilibrium”. The conference slated for this week has been “deferred” said people familiar with developments. এথেকে বুঝা যায় ভারতকে এখন কত গভীর পর্যায়ে চীন-বিরোধীতার খোলনলচে বদলাতে হবে।

    ওদিকে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার উপরে প্রায়োরিটি’ এই নীতি তিনি যদি ধরে রেখে এগিয়ে যান (যেটা এখনও পর্যন্ত এর ভিন্ন কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ) কারণ ট্রাম্প মনে করেন তার ‘বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি’ এই নীতির প্রশ্নে তিনি – এতটাই সিরিয়াস যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  এই প্রথম ইউরোপের সাথেও আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান হতে বা তা নিয়ে লড়তে তিনি পিছপা নন। এমনকি আমেরিকা দুনিয়ার এক ‘এম্পায়ার’ অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার প্রভাবে চলে  – এসব কথাগুলোও বাদ দিতে বা বদলাতে হলেও ট্রাম্পের আমেরিকা এসব ভ্যানিটি ছাড়তে রাজি। তবু ‘বাণিজ্য প্রায়োরিটি’ নীতির জায়গা থেকে তিনি সরবেন না বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক কোথায় দাঁড়ায়।

    এবার এই সূত্রে বলা যায়, আমেরিকার ভারতের কাছে ‘বাংলাদেশকে বন্ধক দেয়া’- সে বাস্তবতারও একই সাথে অবসান হতে চলেছে বা ঘটবেই। যদিও সেটা বাস্তবায়িত হতে, কার্যকর হতে – বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তনের আগমনী ‘ঘণ্টা বাজিয়ে’ দেয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও এখন থেকে ভারতের নতুন নীতি, নতুন বন্ধু, মিত্র এগুলো থিতু হয়ে বসতে, সমন্বিত হয়ে বসতে কিছু সময় লাগবে। আবার ওদিকে আমেরিকা দিক থেকে বললে, তার “ভারত-বিবেচনার দায়” ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ ভারত আর আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর খেদমত করবে কিনা তা নিয়ে আর কোন ভরসা ট্রাম্পের আছে বলে মনে হয় না। এই কারণে অবশ্যই আমেরিকা নিজেই “ইন্ডিপেন্ডেন্টলি” বাংলাদেশ নিয়ে কিছু সরাসরি ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এর শর্ত তৈরি হয়ে গেছে, সে কথাও সত্যি। ফলে ভারতের পরামর্শ, মতামত সমন্বয় এগুলো আমেরিকার কাছে আর আগের মতো নেই, থাকবে না। বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিবর্তন যদিও শুরু হয়েছে মাত্র। ফলে ফল দেখতে পেতে ধীর লয়ের কারণে দেরি হতে পারে বা দ্রুতও হতে পারে।  কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সারকথা “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” সেই বিউগল বেজে গেছে। এতে কে কার কাছে আসবে, কোলে উঠবে নাকি চিরতরে সুদূরে চলে যাবে এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০১ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনকে কোথায় বসতে দেয় সেই অস্থিরতায় ভারত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • ব্যাক ক্যালকুলেশন

    ব্যাক ক্যালকুলেশন

    গৌতম দাস

    ০৮ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার ০০ঃ০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2qv

     

     

    ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’। কথাটার মানে হল, দু’টি সংখ্যার যোগফল আর ওই সংখ্যা দু’টির একটা জানা থাকলে; বিয়োগ করে অপর সংখ্যাটি বের করা যায়। অর্থাৎ ফলাফল থেকে শুরুর উপাদান কী ছিল, তা জানার চেষ্টা। অথবা রান্না খেয়ে রেসিপি কী ছিল তা বোঝার চেষ্টা বলা যায়।

    গত ১৯-২১ ফেব্রুয়ারি হোটেল র‌্যাডিসনে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ’ নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ভারতের প্রধান ধারার প্রিন্ট মিডিয়ার বেশির ভাগই অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর পর্যায়ের ব্যক্তিরা (যুগান্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী, তারা কমপক্ষে আটজন) এতে যোগ দিয়েছিলেন। যুগান্তরের রিপোর্ট থেকে আরো জানা যাচ্ছে, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ -এর আহ্বায়ক শ্যামল দত্ত। তিনি বাংলাদেশের দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক। কিন্তু কেন এই অপ্রচলিত আয়োজন? এর একটি জবাব খুঁজে পাওয়া যায় “মৌলবাদ রুখতে দিল্লিকে চায় ঢাকা” শিরোনামে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আনন্দবাজার পত্রিকার অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা রিপোর্ট থেকে। অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তিনিও একজন অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তিনি লিখছেন, “দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে সরকারি স্তরে তৎপরতা তো রয়েছেই। তার পাশাপাশি মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশের সাংবাদিকদের মতবিনিময়ের মতো ‘ট্র্যাক টু’ কূটনীতির একটি উদ্যোগ নজর কেড়েছে ঢাকার একটি পরিচিত ‘থিংক ট্যাংক’ ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইসিএলডিএস) উদ্যোগে”।

    তার মানে, বোঝা যাচ্ছে, এটা একটা বেশ চিন্তাভাবনা করে করা আয়োজন। কিন্তু আনন্দবাজারের ‘ট্র্যাক টু’ কথাটা যেন অনেক কিছু বলে দিচ্ছে, যা কোথায় নাই, বলা হয়নি। “ব্যাক ক্যালকুলেশন” করা যাক। মাস কয়েক আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময়ও আনন্দবাজার এই শব্দটা ব্যবহার করেছিল। “ট্র্যাক টু” – মানে মূল কূটনৈতিক চ্যানেল ও অবস্থানের বাইরে দ্বিতীয় আর এক মাধ্যমে যোগাযোগ বা বার্তা পৌছানো। অর্থাৎ ‘কাকাবাবু’ যেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হয়ে কিছু একটা মোদি সরকারের কাছে পৌঁছে দেন, সুপারিশ করেন বা দুই সরকারের মতভিন্নতায় মধ্যস্থতা করেন ইত্যাদি। কিন্তু কী সে বিষয়, তা কোথাও লিখিত প্রকাশ ছিল না, যদিও অনুমানে ছিল।

    আসলে ঘটনার শুরু বা গুঞ্জন অনেক পুরনো; শেখ হাসিনার সর্বশেষ ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফরের সময় থেকে। কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত দুই সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা বাড়ছিল,  গত প্রায় একবছর ধরে। তা কমিয়ে একটা আপোষ-রফার একমত অবস্থানে  দাঁড় করানো যায় কীনা সে প্রচেষ্টাও চলছে। সেই আপোষ-রফায় পৌছানোর ইচ্ছায় আমাদের সরকারের দিক থেকে নেয়া পদক্ষেপ হিসাবে  ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’ ্কে বলা যায় এক সর্বশেষ উদ্যোগ।

    বিরোধের ইস্যুগুলো কী
    চীনের One Belt One Road বা সংক্ষেপে OBOR প্রকল্প। এটা মূলত ৬৫ রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে বা ঐসব রাষ্ট্রের ভিতর দিয়ে যাবে এমন এক মেগা অবকাঠামো প্রকল্প। এটা সড়ক ও রেল পথে ও সাথে সমুদ্র পথেও যোগাযোগের সম্পর্কের দিক থেকে পণ্য চলাচলের এক নেটওয়ার্ক হয়ে উঠবে।  মূলত এশিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র, ওদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এবং রাশিয়াসহ ইউরোপের অনেক রাষ্ট্রকে এই প্রকল্পের যোগাযোগের আওতায় আনা এর লক্ষ্য।  তবে এর সাথে কিছু আফ্রিকান ও ল্যাটিন আমেরিকান রাষ্ট্রকেও সাথে যুক্ত করে নেওয়া হয়েছে। আর মূল অবকাঠামোটা রেল ও সড়ক-ভিত্তিক হলেও এই পুরা সড়ক পথের অন্তত পাঁচ জায়গায় পাঁচ গভীর সমুদ্র বন্দরের কানেকশন থাকবে। অর্থাৎ সমুদ্রপথে পণ্য- মালামাল এনে সুবিধামত কোন একটা গভীর সমুদ্র বন্দরে তা নামিয়ে এবার সড়ক পথে যে কোন দেশে ঐ পণ্য নেওয়ার সুবিধা থাকবে এই প্রকল্পে। এইভাবে এটা ট্রিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের  এক প্রকল্প। বাংলাদেশ সোনাদিয়াতে গভীর সমুদ্র বন্দর করতে রাজি হলে সে বন্দরও বেল্ট-রোড প্রকল্পের সাথে যুক্ত হবে। তবে তা  হোক আর নাই হোক, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ বা যুক্ত হয়ে থাকতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে জানিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারের সাথে ভারতের বিরোধ, আপত্তি বা মতভিন্নতা এখান থেকে। সাথে অবশ্য আরও কিছু প্রসঙ্গও আছে।

    এই OBOR প্রকল্প কাজের নানা অগ্রগতি আছে। তার একটা হল এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারি রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সর্বপ্রথম এক সামিট ডাকা। ঐ সামিট ডাকা হয়েছিল চীনের বেইজিংয়ে গত বছর মানে, ২০১৭ সালের মে মাসে। তখন থেকে OBOR  প্রকল্পের আর এক নতুন নামকরণ হয়, Belt-Road Initiative (BRI) অথবা বাংলায় ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’।

    বাইরে থেকে চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে  যুদ্ধ লেগে না গেলেও অনবরত আমরা বিবাদ, রেষারেষি দেখি সেটা মুদ্রার এক পিঠ। সহযোগিতার অন্য পিঠ আছে। না, এখান থেকে দুই পিঠের মধ্যে কোন স্ববিরোধিতা বা শঠতা খুঁজা যাবে না, ভুল হবে। এটা শুধু চীন-ভারত বলে নয় সব আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কই একালে এরকমই হবে, এটাই স্বাভাবিক।  তবে ‘একালে’ কথার মানে কী? একালে মানে হল, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পরের সময়ে। তখন থেকে সারা দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত। ফলে,  পণ্য, পূজি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য আর একই বাজারে্র এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ  লেনদেনে একেবারে মাখামাখি। এখানে কেউ আর বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি বা বিনিময় সম্পর্কহীন কেউ নয়। তাই একালে মানে ১৯৯১ সালের পরের দুনিয়াতে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কুটনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি সব সম্পর্ক এরকম দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার – মাখামাখি।

    ফলে অন্য পিঠ, চীন-ভারতের মধ্যে প্রবল সহযোগিতাও আছে। যদিও ভারতের মিডিয়া ব্যাপারটাকে আরাল করে এক উগ্র এবং ভুয়া জাতিবাদী অবস্থান প্রচার করে থাকে। যেমন তাদের দ্বিপাক্ষিক পণ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশই হলো চীনের রফতানি আর ১০ শতাংশ ভারতের রফতানি,  চীনের বিনিয়োগ ভারতে ডেকে আনা আছে, আবার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আপারহ্যান্ড বা বড় ভাগটা চীন নিয়ে নিল কি না সে টেনশন আছে, সেই সাথে অচিহ্নিত সীমান্ত বিতর্কের টেনশন – তা তো আছেই। কিন্তু ২০১৭ সালের মে মাসের আগ পর্যন্ত  কখনোই তাদের মধ্যে বড় বা দৃশ্যমান কোন অসহযোগিতা দেখা যায়নি। এমনকি, গত ২০০৫ সাল থেকে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিতে সে ভারতের পিঠে হাত রাখা সত্ত্বেও চীন-ভারত সম্পর্ক এমনই ছিল। ভারত ঐ সামিটে দাওয়াত পাওয়া সত্ত্বেও,  সেবারই প্রথম চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সামিট ভারত বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল।

    ভারত যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এর কারণ বলেছিল যে,   বিতর্কিত পাকিস্তান অংশের কাশ্মিরের উপর দিয়ে এই প্রকল্প গেছে, তাই ভারত  নিজের সার্ভভৌমত্ব লঙ্ঘণের সমস্যা হিসাবে দেখে সেই  আপত্তিতে তারা এতে অংশ নিচ্ছে না। “Regarding the so-called ‘China-Pakistan Economic Corridor’, which is being projected as the flagship project of the BRI/OBOR, the international community is well aware of India’s position. No country can accept a project that ignores its core concerns on sovereignty and territorial integrity, ” Baglay added.  [Gopal Baglay is the Spokesperson of MEA, India.]

    তবে ভিতরের কারণও চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অশোক কান্তা বলে দিয়েছিলেন ভারতের এক মিডিয়াতে। আমরা যদি এর আগে ২০১৫ সালের চীনের বিশ্বব্যাংক (AIIB ব্যাংক) গড়ার সময়ের ভারত-চীন সহযোগিতার সাথে তুলনা করি, তাহলে আমরা দেখি –  যে কোন ভাগাভাগিতে মুড়োটা নিজের পাতে পাওয়ার জন্য ভারত দরাদরি করেছে আর চীন সহানুভূতির সাথে তা দেয়ার চেষ্টা করছে। সব পশ্চিমা রাষ্ট্রের চেয়েও ভারতকে ভাগের দিক থেকে ওপরে রাখছে চীন। কিন্তু বেল্ট রোড উদ্যোগের বেলায় ভারতের মনের কথাটা সার করে অশোক কান্তা যা বলছেন তা হল, “বেল্ট-রোড উদ্যোগ খুবই কাজের; তা সবার দরকার। বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্রের জন্য।  কিন্তু ভারত এতে যোগ দিলে সে চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবার সম্বেভাবনা খুব বেশি, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত প্রথম তিনটি অর্থনীতির মধ্যে একটি হতে যাচ্ছে”।  [আসলে বেল্ট-রোড উদ্যোগ যে খুবই কাজের তা ভারত কেন আর এক প্রতিদ্বন্দ্বি আমেরিকাও তা অস্বীকার করে নাই কোথাও।] নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা ১৩ মে ২০১৭ থেকে ইংরাজি উদ্ধৃতিগুলো নেয়া। 
    [Former Indian Ambassador to China Ashok K Kantha said,
    “It needs pragmatic approach on China’s part as well. We will be two largest economies of the world by 2030. So joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,” Kantha added.]

    তাহলে অর্থ দাঁড়াল, এটা কেবল তথাকথিত সার্বভৌম ইস্যুতে ভারত ‘বেল্ট-রোড সামিট’ বয়কট করছে; তা নয়। এ প্রসঙ্গে ভারতের সিরিয়াসনেস কত গভীরে সেটা বুঝানোর জন্য একটু বিস্তারিত বলতেই হবে। কিন্তু তার আগে একটি ডিসক্লেমার দিয়ে রাখতে হবে। সেটা হল, মনে রাখতে হবে, এখানে আমি বলিনি যে, ভারতের বা অশোক কান্তার এই অনুমান-বিশ্বাস [ইংরাজিতে কোট করে আনা উপরের বক্তব্য] সঠিক। আসলে এটা তাদের একটা পারসেপশন মাত্র। অর্থাৎ আমি এখানে কেবল বলছি যে, ভারত নিজেকে কী মনে করে, সেটা। কিন্তু তাদের এই অনুমান সঠিক আমি তা মনে করি না। ফলে আমি তাতে কিন্তু সায় দেইনি। আর খুব সম্ভবত এই বয়কটের কারণেই ভারতের ট্রেন মিস হবে। তবে সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

    স্বভাবতই এই বয়কটের সিদ্ধান্তের পরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং এ’ঘটনার লেজ আছে। এর অন্যতম হল, এরপর থেকেই ভারতের বিদেশনীতিতে নতুন কিছু হিসাব, কিছু ‘মুই কী হনু রে’ যোগ হয়েছে।  যেমন  এশিয়ার যেসব রাস্ট্রের সরকার চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিয়েছে ভারতের বিদেশনীতি তাদের উপর খড়্গহস্ত হয়ে গেছে। নেপাল বা শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। এশিয়ায় ভারতের পড়শি মানে চীনেরও, এমন রাষ্ট্রের কোনো সরকার যদি চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে নিজের সম্মতি চীনকে দিয়ে থাকে, তবে সেই পড়শির সরকারের এখন কপাল খারাপ। কারণ ওই সরকারের সাথে ভারত চরম অসহযোগিতার অবস্থান নেয়। শুধু তাই না, ঐ সরকার ফেলে দেয়া, অথবা ওর বিরোধীদের জিতিয়ে আনার চেষ্টা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, এমনকি সম্ভাব্য সাবভার্সিভ এক্টিভিটিসহ দরকার মতো সবকিছু করা পর্যন্ত ভারত যেতে পারে। এই হয়েছে ভারতের বিদেশ নীতির নতুন বৈশিষ্ট, নতুন পালক। কিন্তু কেন, এর কারণ নিয়ে পরে আসছি। তবে ভারতের এই বিদেশ নীতি, স্বভাবতই এটা কোনো দলিল দিয়ে প্রমাণ করা যাবে না। তবে খোলা চোখে বাস্তব তৎপরতা দেখে বোঝা যেতে পারে। বাংলাদেশও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে বলেছে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা।

    আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ২০১৭ সালের এপ্রিল ভারত সফরে তিনি বার্তা পেয়েছিলেন – No OBOR, নো চাইনিজ প্রজেক্ট। আমাদের ব্যাক ক্যালকুলেশন এটাই বলে। কারণ যেকথা দিয়ে লেখা শুরু হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া মিডিয়া ডায়ালগ ২০১৮’  এতে আগত ভারতীয় সম্পাদকেরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তিনি পরোক্ষে এটাই বলেছেন যে ভারতীয় সম্পাদকেরা যেন ভারতের চীন নিয়ে উদ্বেগ কমাতে ভুমিকা রাখে।

    কিন্তু এই রচনার মূল প্রসঙ্গে এখন আসব। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা কীভাবে নিয়েছিলেন, ভারতের বার্তা ও পরামর্শকে?

    আগে বলেছি ভারতের নির্ণায়ক হল ‘চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের যোগদানে’ যে সরকার সম্মতি জানিয়েছে, ভারত সে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু খুব সম্ভবত বাংলাদেশ ভারতের ‘অনেক কাছের ও বন্ধু সরকার’ বলে একে কাছে ডেকে ভারতের চাহিদার কথা বলে দেয়া হয়েছিল। সরকার ফেলানো বা সরাসরি বিরোধীতার দিকে যায় নাই।

    আসলে ভারত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে, সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে উথাল-পাথাল চলছে, চীন নতুন নেতা হয়ে আসছে কিন্তু ভারতের কী হবে – ইত্যাদি পুরা ব্যাপারটা নিয়ে এপর্যন্ত অন্তত চারটি (তিনটা আমেরিকার সরকারি ও একটা প্রাইভেট) বড় বড় সার্ভে ও গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে এপর্যন্ত , কিন্তু তাদের কোনটাতেই এমন কথা বলা হয়নি। তবু যেন ভারত এক নম্বর অর্থনীতি হয়েই গেছে, এই বিশ্বাসে আমাদের দৈনিক কালেরকন্ঠ পত্রিকা কোনো রেফারেন্স ছাড়াই এমন দাবি করে একটি লেখা ছাপিয়ে ফেলেছে গত মাসে। যার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “কয়েক বছরেই চীনকে টপকে যাবে ভারত, উবে যাবে পাকিস্তানও!”। অথচ কোথা থেকে এই খবর পেল এর কোন রেফারেন্স সেখানে দেয়া হয় নাই। খুব সম্ভবত ভারতের ইকোনমিক টাইমসের কোন ‘প্রপাগান্ডা’ খবর এখানে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছে।

    উপরে যেসব স্টাডি রিপোর্টের কথা বললাম, ওর মধ্যে প্রাইভেট কোম্পানী “প্রাইজ-ওয়াটার-হাউজ-কুপারস” এর যে রিপোর্ট তা ২০৫০ সালের দুনিয়ায় সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে সার্ভে স্টাডি। একমাত্র সেখানেই ভারতকে আমেরিকার উপরে নিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আর বাকি তিনটা আমেরিকান রিপোর্ট হল ২০৩০ সাল, ২০৩৫ সাল ও ২০৩৫ সালের দুনিয়ায় টপ অর্থনৈতিক অবস্থানে কোন রাষ্ট্র কে কোথায় থাকবে তা নিয়ে। কিন্তু  (২০৩০-২০৫০ সালের মধ্যে) কোথাও কোন রিপোর্টে ভারতের প্রথম স্থান দখলের কথা কোথাও নাই। চারটা রিপোর্টেই চীন প্রথম এবং দ্বিতীয় যে কারও চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা প্রথম।

    ওদিকে আবার শেষ বিচারে এই রিপোর্টগুলো এখনও একেকটা সার্ভে ও স্টাডির এক অনুমিত ফলাফল,  যা বাস্তব নয়। তবে সম্ভাবনা মাত্র। ফলে বহু ‘যদি, কিন্তু’সহ নানা শর্তসাপেক্ষ; যার মূলকথা হল, এগুলা অনুমিত ফলাফল বা প্রেডিকশন। কিন্তু ভারত ব্যাপারটাকে পুরাপুরি ভিত্তিহীন অনুমানে অর্থনীতিতে নিজের প্রথম হওয়ার বিষয় হিসাবে নিয়ে সেটা ফসকে যাওয়া-না যাওয়া হিসেব এমন সিরিয়াস হয়ে দেখছে।

    তাহলে সারকথা হল, ভারতের একটা পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে ভারত নিজের কথিত এক নম্বর অর্থনীতি সে হতে যাচ্ছে। কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে যে ব্যাপারটা পারসেপশনের,মানে অনুমানের। যেটা সত্য নয়। আর ঐ পারসেপশনের উপর দাড়ানো ভারতের বৈদেশিক নীতি অবস্থান হল এই যে, বেল্ট-রোড প্রকল্পে এশিয়ার যে সরকার যাবে সে ভারতের শত্রু। ভারতকে ওর বিরোধিতা করতে হবে, ঐ সরকারের পতন ঘটানো ভারতের স্বার্থ। ফলে তা থেকেই ভারত সরকারের এক প্রেসিং ডিমান্ড তৈরি হয়েছে কেবল যাকে ব্যাখ্যা করতে পারলে জানা যাবে যে ভারত এত মরিয়া অবস্থায় কেন, অথবা কেন ভারত এক চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে।

    ব্যাপারটা দাঁডিয়েছে এমন যে, এশিয়ার কোন সরকার চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে ভারতের কাছে একথার মানে ঐ সরকার ভারতের দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট করতে কাজ করছে।

    আমাদের সরকার কী ভারতের বার্তা বুঝেছে?
    তাহলে হাসিনা তার গত ভারত সফরে তিনি যে বার্তা পেয়েছিলেন তা কী ঠিকঠাক বুঝেছিলেন? খুব সম্ভবত না। কী দেখে তা মনে হল? মনে হল কারণ, হাসিনার ঐ এপ্রিল ২০১৭ সফরের পরে,  ঐ বছরই ২০১৭ অক্টোবরে আমাদের পররাষ্ট্র সচিব ভারত সফরে গিয়ে সরবে চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের অংশ হয়ে থাকার কথা জানিয়ে এসেছিলেন। অর্থাৎ আমাদের সরকার বুঝাতে চাচ্ছিল যে ভারতের আপত্তি মতভিন্নতা আছে কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ। অথচ ভারতের মূল আপত্তি হল কোন সরকারের  চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়া, চীনা বিনিয়োগ নেয়া।  এথেকে বুঝা যায় যে বাংলাদেশ ভারতের অবস্থানের সম্মক উপলব্দি ছিল না। অথবা ভারতও তার আপত্তির কারণ খুলে বলে নাই। ভারতের (পারসেপশন অনুসারে)অবস্থান হল যদি সে বাংলাদেশকে বেল্ট-রোডে যোগ দিতে দেয়, চীনা বিনিয়োগ এনে নিজের উন্নয়ন চালায়ে যায় তবে এর মানে হবে সেই বাংলাদেশ ভারতের “দুনিয়ার অর্থনীতিতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট” করতে কাজ করছে। অর্থাৎ এটা ভারতের মরিয়া স্বার্থ। কিন্তু এটা যে ভারতের প্রথম হওয়া ফসকে যাবার মামলা তা সে কখনও বাংলাদেশের মত কাউকে খুলে বলছে না। বলছে পাকিস্তান-কাশ্মীর হয়ে প্রকল্প আঁকাতে তা ভারতের সার্বভৌমত্ব – এটাই তার আপত্তি। ফলে হাসিনা সরকারও মনে করছে এই ইস্যুটা হল, ঠিকমত ভারতকে বুঝালে, তোয়াজ করলে ভারত মানবে। আর সে কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের চীনা বেল্ট-রোডের পক্ষে থাকা শক্ত করে তুলে ধরে ভারতকে বুঝানো। অথচ হাসিনা সরকারের ঠেকা যদি হয় আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন তার জন্য খুবই জরুরি তবে সরকার আসলে পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়ে উলটা কাজই করিয়েছে। মুল কথা এটা তো পরিস্কার যে হাসিনাকে বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দিতে দিয়ে ভারত নিজের এক নম্বর হওয়ার ‘মরিয়া স্বার্থ’ [perceived desparate interest] নষ্ট করতে পারে না। ভারতের কাছে হাসিনার আবার ক্ষমতায় আসা না আসা ভারতের মরিয়া স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারে না।

    অতএব এই ব্যাপারে সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে যে হাসিনা ভারতের পারসেপশন, ভারতের অবস্থান কেন এমন ইত্যাদি বুঝেছে কি না। বরং হাসিনা ব্যাপারটাকে চীন-ভারতের সাধারণ বিরোধ যেমনটা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে স্বাভাবিক রুটিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা,  প্রতিযোগিতায় হতে দেখা যায় এর বেশি কিছু বলে দেখেছে মনে হয় না। সে কারণেই, বাংলাদেশ সরকার এখনো মনে করছে একটা ভালো পারসুয়েশন হলে, একটু তোয়াজ কিংবা বুঝিয়ে বললে ভারত বুঝে যাবে। অর্থাৎ আমাদেরকে চীনা প্রজেক্ট নিতে দেবে। গত এক বছর ধরে আমরা দেখেছি সেই পারসুয়েশনের তোয়াজ, বাংলায় যাকে বলে, মন জয়ের চেষ্টা। আর এর সর্বশেষ নজির হল  ‘বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া ডায়ালগ-২০১৮’।

    যদিও আসলে এটা তোষামোদ কি না সেটা আমার বলার মুল বিষয় নয়। মূল ব্যাপার হল, ভারত ব্যাপারটাকে দেখছে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিজের কথিত প্রথম হওয়া-না-হওয়া হিসেবে। বাংলাদেশ সরকার এখনও বিষয়টা ভারতের চোখে দেখেনি বা এই পারস্পেকটিভের নাগালই পায়নি,  কারণ ভারতও খুলে সেকথা বলছে না বা বলতে পারছে না বা চাচ্ছে না – এটা মনে করার কারণ আছে। কারণ, আমাদের সরকার নাগাল পেলে বা জানা থাকলে তো বুঝত যে সেক্ষেত্রে এরপরে আর এখানে তোয়াজ বা ভারতকে বুঝানোর আর কিছু নেই। সেকারণে এই উলটা তোয়াজ আমরা হতে দেখছি, ভারতীয় সম্পাদকদের মাধ্যমে হাসিনা ম্যাসেজ পৌছাতে চাইছেন যে ‘‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। বাংলাদেশের কাছ ভারত ভারতের জায়গাতেই থাকবে, চিন চিনের জায়গায়। ভারতের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। চিন তো নতুন বন্ধু।’’ অথচ এই ম্যাসেজের অর্থ ভারতের কাছে তো উলটা।

    ভারত হাসিনাকে বলছে, বাংলাদেশে নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ। আর হাসিনা পালটা ম্যাসেজ দিচ্ছে, বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আমি আর কিছু করব না, চীনের বলয়ে যাব না। এটাই হল এখানে, ব্যাট আর বলের পরস্পরের সংযোগ সম্পর্ক না হবার ঘটনা।  ভারত চাচ্ছে চীনের সাথে সম্পর্কহীন, বিনিয়োগ সম্পর্কহীন এক বাংলাদেশ। অথচ সরকার এটাকে বুঝছে এভাবে যে, চীনের থেকে বিনিয়োগ নেয়া ছাড়া আর কোনো সম্পর্ক না রাখলেই বুঝি ভারত সন্তুষ্ট হবে!

    তাহলে ভারতের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে? এককথায় এর জবাব ভারতের কাছে নাই। তবে ভারতের স্বপ্ন হল কল্পিত চীনের বেল্ট-রোড এর এক বিকল্প ‘মাজা ভাঙা’ একটা চার দেশীয় জোট হতে পারে কি না তেমন প্রাথমিক আলাপ চলছে এবং যেটা পাল্টা বেল্ট-রোড উদ্যোগ হতেও পারে। যেটা অবশ্যই অনেকটা ‘গোফে তেল’ ধরণের। তবুও গরিবেরও যেমন অর্থ না থাকলেও স্বপ্ন থাকে, তেমনি। ওই বিকল্প চালু হলে এরপরে ভারত সেই হবু প্রজেক্টের নৌকায় বাংলাদেশকে তুলে নেবে। আর ততদিন বাংলাদেশকে বিনিয়োগহীন বসে থাকতে হবে। বাস্তবে এখন, বাংলাদেশে অবকাঠামোতে যে বিনিয়োগ চাহিদা সেখানে ভারতের কোনো বিনিয়োগই নেই, অবদান নেই। থাকার কথাও না। মূল কারণ হল – ভারত এখনো অন্য রাষ্ট্রের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে পারে, এমন অর্থনীতিই নয়। তবে দু-চার বিলিয়নের যে কথা শোনা যায় সেটা বাংলাদেশে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ নয়। আসলে সেটা ভারতের দুর্বল মান এবং প্রতিযোগিতায় অচল স্টিল ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ভর্তুকির অর্থ। এজন্য ওই দু-চার বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়ে মূলত ভারতের স্টিল সংশ্লিষ্ট প্রডাক্ট (টাটা বা অন্য ভারতীয় গাড়ি, রেলের যন্ত্রপাতি) কিনতে পারা যায়; যাতে ভারতের অদক্ষ স্টিল ইন্ডাস্ট্রি ভারত সরকারের সাহায্যে টিকে থাকে। তাহলে বাংলাদেশ সরকারের মূল সমস্যাটা হল, চীনকে বাদ দিলে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় সে বিনিয়োগ ভারত থেকেও পাচ্ছে না। তাহলে কোথা থেকে পাবে? আর বিনিয়োগ না পেলে –“গণতন্ত্র না উন্নয়ন” – এ বিতর্কে নিজেকে উন্নয়নের কর্তা হিসেবে কেমনে প্রচার করবে? কারণ, অবকাঠামো বিনিয়োগ নেই মানে প্রজেক্ট নেই। প্রজেক্ট নাই তো হাসিনার দল বা কর্মি কিছুই নাই। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের চাহিদা পূরণের দিক থেকেও ভারত এখনও অযোগ্য, অপুষ্ট। আসলে ভারত এখনও অবকাঠামোতে বিনিয়োগ গ্রহীতা অর্থনীতির রাষ্ট্র। অথচ স্বপ্নে পোলাও খায়। চীনের রিজার্ভ যেখানে ৩১৮১ বিলিয়নের উপরে ভারতের সেখানে মাত্র ৪১৭ বিলিয়ন। কিন্তু ভারত এখনই ‘গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক নম্বর অর্থনীতি হয়ে গেছে’- এই ভাব ধরতে চায়।

    এই বিচারের দিক থেকে দেখলে প্রথম আলোও একই ভুল করছে, ব্যাপারটা তারাও বুঝেছে মনে হয় না। তারা একটা আর্টিকেল ছেপেছে, “চীন-ভারতের ‘লড়াই’য়ে বাংলাদেশ জড়িত না” এই শিরোনামে, এটাও অর্থহীন। কারণ বাংলাদেশ বা শেখ হাসিনা তো জড়াচ্ছেন না। ভারতই তার অনুমিত ধারণা বা পারসেপশনে জড়িয়ে বাংলাদেশকে দেখছে। আর প্রশ্নটা আসলে চীনা বিনিয়োগে ভারতের কঠোর আপত্তি। বলছে, শুধু বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না তাই নয়; কোনো চীনা বিনিয়োগই নিতে পারবে না হাসিনা সরকার। অপর দিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।’ দুটো এক কথা নয়। বরং বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগই তো ভারতের ‘পারসিভড’ উদ্বেগের কারণ। আসলে ভারত যেন বাংলাদেশকে বলছে- ‘কোনো কিছু না ছুঁয়ে বসে থাক।’ এ কথার মানে কী পাঠকেরা কল্পনা করে দেখতে পারেন। কারণ বিনিয়োগের বাজারে, মুরোদে ভারত এখনো বামন, অপুষ্ট। তাই ভারত, চীনের কোন বিকল্প নয়। প্রথম আলোও বুঝেছে যেন চীনা প্রভাব বলয়ে হাসিনা যাবে না – এর নিশ্চয়তা চাচ্ছে ভারত। অথচ বিষয়টা চীনা প্রভাব বলয় নয়, চীনা বিনিয়োগ নেয়া না নেয়ার।

    ভারত যদি মনে করে বাংলাদেশে  – নো বেল্ট-রোড, নো চীনা বিনিয়োগ – অবস্থান মানলে একমাত্র তবেই হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিবে – তাহলে অবস্থা দাড়াবে এবার তাহলে আর ভারত হাসিনা সরকারকে আগামি নির্বাচনে সমর্থন দিতে পারছে না।

    এ অবস্থায় আস্তে ধীরে হলেও হাসিনা সরকার তাই সপক্ষে কোনো বিদেশের সমর্থন পাওয়া ছাড়াই সংসদ নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছে, বুঝতে হবে।

     

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ব্যাক ক্যালকুলেশন”  -এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]