Category: Allied powers

  • মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

    মোদীকে ইউরোপে মানবাধিকার কমপ্লায়েন্স হতে হবে

    গৌতম দাস

    ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2S0

     

    মুসলমানবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল ভারতের সংসদের দুই কক্ষেই পাস হয়েছে গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এর মধ্যে। আর পরদিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা আইনে পরিণত হয়েছে। সংক্ষেপে বিভিন্ন মিডিয়ায় একে ‘সিএএ’ (CAA) (সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট) এভাবে ডাকা ও লেখা হচ্ছে। আগামি মার্চ মাসে ব্রাসেলসে ইন্ডিয়া-ইইউ শীর্ষ সামিটে যোগ দিতে যাবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। প্রকৃতপক্ষ এটা হয়ে উঠবে ভারত নাগরিক অধিকার কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র বা সরকার হয়ে থাকবে কীনা এর প্রতিশ্রুতিদানের সভা। সম্প্রতি সিএএ- আইন পাশের পর এর নিন্দা বা আপত্তি প্রকাশ নিয়ে প্রস্তাব স্থগিত করে রাখা হয়েছে, মার্চ মাসের এই সামিট পর্যন্ত।

    এই বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো তাদের চরম উদ্বেগ, প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়েছে। এবার সুনির্দিষ্ট করে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের (এমইপি বা MEP) সদস্যরা পার্লামেন্টে তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা অনুসারে সংগঠিত ছয়টি গ্রুপের পক্ষ হয়ে প্রথমে ছয়টা আলাদা প্রস্তাব এনেছিল; যাতে এবার তা পার্লামেন্টে সবার আলোচনার পর এক নিন্দা প্রস্তাব হিসেবে পাস হয়। অথবা আরো কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আলাদা আলাদা প্রস্তাবের সবগুলোকে একত্রে একটা প্রস্তাব হিসেবে আলোচনার পর তা পাস করা হয়। এভাবে কোন একটা প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে, বলাই বাহুল্য ভারতের জন্য সেটা হবে চরম বিব্রতকর ও লজ্জার। এনিয়ে ভারতের এনডিটিভি লিখেছে, ‘ভারত এখন এক বিরাট কূটনৈতিক বিপর্যয় বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখার মুখোমুখি। কারণ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সিএএ নিয়ে আর কাশ্মিরে ধরপাকড় নিয়ে হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে”। [India is facing a major diplomatic backlash from the European Union (EU) parliament on the Citizenship Amendment Act and the clampdown on Jammu and Kashmir…। এছাড়া ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে যদি আরো কঠোর অবরোধ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাস হয়, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য ক্ষতিকর হবে ।
    আবার প্রায়ই কথায় কথায় আমরা যেমন দাবি শুনি ভারত নাকি “বৃহৎ গণতন্ত্রের” দেশ  – এমন সেই ভ্যানিটি থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ পালক এখন এথেকে খসে পড়বে তা বলার অপেক্ষা করে না। এই পরিস্থিতিতে ভারতের দিক থেকে এসবের পাল্টা পদক্ষেপে কোথাও হাত জোড় করে নরম অথবা কোথাও ব্যবসা-সুবিধা না দেয়ার গরম হুমকি ইত্যাদি সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভারতের কূটনীতিকরা মাঠে নেমে পড়েছে, লবি চলছে, সব দিকে সব কিছুর এক বড় তোড়জোড় চলছে।
    ভারতকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের (EP) এই নড়াচড়াকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কারণ এর ৭৫১ জন (বেক্সিট কার্যকর হবার পর হয়ে যাবে ৭০৫)  সদস্যের  EP মধ্যে সিএএ’র বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলেছে অন্তত ৬২৬ জনই। যদিও অনেকে বলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের MEP এরা কাগুজে বাঘ মাত্র, যারা হুঙ্কার দেয় যতটা কামড় বসানোর ক্ষমতা বা প্রভাব ততই কম এদের –  পুর্ব অভিজ্ঞতায় এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা অনেকে বলবেন অবশ্যই। কিন্তু ব্যাপারটা এবারও কী তাই হবে? দেখা যাক!

    ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা এসব প্রস্তাবে আপত্তিগুলোর একেবারে শীর্ষের কথা হল, ভারতের নতুন নাগরিক আইন, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে বৈষম্যমূলক। মানে ‘নাগরিক অধিকার’ হল আনা ঐ প্রস্তাবগুলোর ফোকাস। ‘নাগরিক অধিকার’ ব্যাপারটা আসলে কী ও কোথা থেকে এনিয়ে খুব সংক্ষেপে বললে, আমাদের চলতি বিশ্বের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্টান্ডার্ড এবং এর সবচেয়ে বড় কমন কাম্য দিকটা হল ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ হতে হবে। অর্থাৎ রাজতন্ত্র নয়, কলোনি-মালিকের দখলাধীন কলোনি-রাষ্ট্র নয় বরং স্বাধীন রিপাবলিক ও গণক্ষমতার রাষ্ট্র যার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হতে হবে যেন এগুলো নাগরিকের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হয়।

    ফলে এর কমন বৈশিষ্ট্যই শুধু নয়, এক কমন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হল নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া। অন্তত নীতিগত ভিত্তি হিসাবে ১৯৪২ সালে  ১ জানুয়ারি সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন (যদিও তখনও তা মাওয়ের চীন নয়) – এই দুই রাষ্ট্র আমেরিকা ও বৃটেনের সাথে একমত হয়ে গ্লোবাল রাজনীতিক ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি মানতে লিখিত ঐক্যমত প্রকাশ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি এমন সময় থেকেই এই মূল মেরুকরণ শুরু হয়েছিল। আমেরিকার নেতৃত্বের কাম্য সেই নতুন দুনিয়াতে কলোনি আর নয়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র – হিটলার ও তার সঙ্গীদের রাষ্ট্রজোটের বিপরীতে এই পক্ষই জয়লাভ করে ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল। আর সেই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ সব রাষ্ট্রের এক অ্যাসোসিয়েশনের জন্ম হয় জাতিসঙ্ঘ নামে। এরপর জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই বসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ‘আইন ও কনভেনশন’ থেকে অধিকারের চার্টার লেখা হয়েছিল। আর স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশের ওপর আইন ও কনভেনশনগুলো বাধ্যতামূলক পালনীয় হয়ে যায়।

    অবশ্য এর সাথে তৈরি হয়ে যায় নানা ফাঁকফোকরও। বিশেষ করে আইন ও কনভেনশনের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন কে কার উপর করবে, কিভাবে করবে, কতটা করবে নাকি ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে নিজেকে আড়াল করবে – এসব প্রশ্নে। এছাড়া সবার উপরে তো আছেই রাষ্ট্রের বৈষয়িক লাভালাভের স্বার্থ আর এই ভিত্তিতে পক্ষে-বিপক্ষে থাকা অথবা না থাকার জোট বাঁধা। দেখা গেছে, বৈষয়িক স্বার্থের লোভে কোনো রাষ্ট্র অন্যকে অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আপস বা ছাড় দিয়ে বসতে দেখা যায়। যেমন, রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেও মায়ানমার যেভাবে বেচে যাচ্ছে। অথবা ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ভারতের বাজার সুবিধা পেতে পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্রই ভারতের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে মোদী সরকারকে ছাড় দিয়ে বা উপেক্ষা করে বসে আছে। এসব সমস্যা থেকে দুনিয়া একেবারে মুক্ত হতে পারেনি এখনো, সে কথা সত্য। কিন্তু তাই বলে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড গড়ে বা অধিকার বিষয়ক নানান আইন ও কনভেনশনের প্রটেকশন গড়ে তুলে কোনোই লাভ হয় না অথবা এ নিয়ে ব্যত্যয় ঘটলে কারো বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা হয় তাকে বিব্রত করার জন্য এমন কথাও ভিত্তিহীন অবশ্যই। এছাড়াও যদিও জাতিসঙ্ঘের অধীনের বিচার বা তদারকি কাঠামো- এই ব্যবস্থার মধ্যে কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও তা প্রমাণ করা বা প্রস্তাব পাস করে আনা খুব সহজ কাজ নয়। অভিযোগ সবটা বা সবার বিরুদ্ধে প্রমাণ করতে কখনো সমর্থ না হলেও কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে এমন উদাহরণের বাস্তবতা নেই।

    তবে সবচেয়ে কমন ঝোঁক হল, কোনো রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন বা অধিকার বৈষম্যের অভিযোগে নিন্দা প্রস্তাব উঠলে নিরুপায় সে রাষ্ট্র তখন অন্যের অভিযোগ তোলাটাকে নিজের ‘সার্বভৌমত্বের’ লঙ্ঘন বা ভিন রাষ্ট্রের বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ বলে দাবি করতে থাকে। এভাবে নিজ মুখ রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আদালতে অন্তর্বর্তী রায়ে অভিযুক্ত হয়ে ধরা খেয়ে মিয়ানমারও  এই কাজটা করেছে। আর সিএএ ইস্যুতে এবার ভারতের প্রতিক্রিয়াও তাই। এটা ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ “entirely internal to India” বলে দাবি করা হয়েছে। মানে বলতে যাচ্ছে যেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আনা প্রস্তাবের কথা তুলে ইউরোপ যেন ভারতের পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন করেছে। এ ব্যাপারে পুরানা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো আরো সরেস। তাদের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন আসা মাত্রই তারা একে ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বা ‘হস্তক্ষেপ’ বলে প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকে। আবার খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেও কখনও অভিযোগ উঠলে সেও কম যায় না। সে নিজে জাতিসঙ্ঘের ওই অঙ্গসংগঠন থেকে নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়ে অথবা আর কখনো চাঁদা দিব না বলে অথবা  খোদ জাতিসংঘ বা ঐ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানকে অকেজো করার হুমকি দিয়ে থাকে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে কলোনি ব্যবস্থার সমাপ্তি ও অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক ধারণার রাষ্ট্রের প্রস্তাবক হলেন সেকালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নিজে। শুধু প্রস্তাবকই নয়, যুদ্ধে নিজের অংশ গ্রহণ ও মিত্রদের সামরিক-অর্থনৈতিক সহায়তার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি বলেছিলেন একথাটা।

    সেকালে হিটলারের কাছে হেরে যাবার ভয়ে নিরুপায় হয়ে হিটলার-বিরোধী ইউরোপীয় “মিত্র-রাষ্ট্রগুলো” [Allied powers] আমেরিকান প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল। তবে এর আগে থেকেই যদিও ইউরোপ দাবি করত যে, তারা সবাই নাকি আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুদ্ধ শেষে সবার আগে তারা নিজেই নিজেদের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা কাঠামো ব্যবস্থা সংস্কার করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়েছিল। অর্থাৎ মানে দাঁড়িয়েছিল যে, আগে নিজেদের আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও সেবার মেনেই নিয়েছিল যে তারা “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র আসলে ছিল না।  যারা অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাস অরিস্কার করে বুঝতে চান তাদের জন্য যুদ্ধোত্তর এই নতুন ইউরোপকে চেনা ও বুঝতে চেষ্টা করা খুব গুরুত্বপুর্ণ। ইউরোপের বেশির ভাগ যেসব রাষ্ট্র বিনাবাক্য ব্যয়ে বা কোন ওজর আপত্তি না তুলে এভাবে নবজন্ম লাভ করে নিতে আগিয়ে এসেছিল এমন ৪৭ টা রাষ্ট্রের একটা জোট তখনই গড়ে তোলা হয়েছিল। এর নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe). এবিষয়ে আরও জানতে আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন – Who we are – the Council of Europe ।  আর একই সাথে লক্ষ্যণীয় একই প্রসঙ্গে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষে নাগরিক-অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রের নব-দুনিয়া গড়ার আমেরিকান প্রস্তাবে বৃটেনের চার্চিলসহ স্টালিনের সোভিয্যেন ইউনিয়ন ও চিয়াং কাইসেকের  সমগ্র চীন স্বেচ্ছায় এবিষয়ে একমতের দলিলে স্বাক্ষরকারী। এবং  ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি আমেরিকা, বৃটেন, সোভিয়েন ইউনিয়ন ও চীন এই চার রাষ্ট্র স্বাক্ষরিত এই দলিলকেই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা (Declaration of The United Nations 1942) বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম ইউরোপ নিজেকে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE (Council of Europe) গঠনের মাধ্যমে সংশোধন বা পুনঃজন্মলাভ করে নিলেও এবং চিয়াং কাইসেকের বা পরবর্তিতে মাওয়ের চীনসহ স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে  “নাগরিক অধিকারভিত্তিক” রাষ্ট্র গড়ার ইস্যুতে কোন প্রভাব পড়ে নাই। যদিও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা  এই দলিলে স্বাক্ষর করে স্টালিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

    ইউরোপের নিজেকে  নাগরিক অধিকারভিত্তিক করে পুনর্গঠনে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামি সংগঠিত হয়েছিল। আসলে এটা ছিল জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর ভুলকে সংশোধন করে   নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিজেদেরকে পুণর্গঠন। এভাবে কাউন্সিল অফ ইউরোপ নামে ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্রের জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। আর এর মধ্যেকার কেবল ২৮ রাষ্ট্রের আরও ফরমাল ও আরও ঘনিষ্ঠতার রাষ্ট্রজোটে হচ্ছে ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বা ইইউ (European Union)।  এই হল, ইইউ এর সাথে  কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE এর সম্পর্ক ও  ফারাক।

    ১৯৫৩ সালে কাউন্সিল অফ ইউরোপ COE শুধু গঠন করা নয়, বরং নিজেদের সব নাগরিকের জন্য এক কমন অধিকারের চার্টার রচনা কাজ করে নিয়েছিল সদস্য রাষ্টড়্গুলোর এক কনভেনশন ডেকে, যার নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অ্ন হিউম্যান রাইট (European Convention on Human Right, ECHR) । আর এটা বাধ্যতামূলক প্রযোজ্য করা হয়েছিল কাউন্সিল অব ইউরোপ নামে নিজেদের নবগঠিত ৪৭ ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোটের সব রাষ্ট্রের ওপর। আর অধিকার সম্পর্কিত ইস্যুতে সদস্য রাষ্ট্রের কোন নাগরিকের অভিযোগ তদারকির জন্য আলাদা সুপ্রিম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল যার নাম ইউরোপীয় কোর্ট অব হিউম্যান রাইট বা (ECtHR) নামে। আসলে এটাই ছিল আগামির কোন হিটলারের ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদ বা জাতনিধনের বিরুদ্ধে ইউরোপের নিজেকে রক্ষাকবচ।

    মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ অতীতের কারণে আজকের ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ-বিরোধিতা করে অধিকারবিষয়ক যেকোনো প্রস্তাব আলাদা গুরুত্বের হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    এ ছাড়া আরো একটি কারণে এখনকার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে প্রস্তাব আনা আলাদা বিশেষ গুরুত্বের। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন সে জায়গা নিতে চাচ্ছে বা যাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতায় চীনকে ঘায়েল করতে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে হিউম্যান রাইট ইস্যু ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে চীনের প্রতি ইইউর অবস্থান ভিন্ন। কমিউনিস্ট কাঠামোর রাষ্ট্র হিসেবে চীনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ড সবসময় খারাপ থাকে। আর আমেরিকার পলিসি হল চীনকে দাবড়ে রাখা। তাই আমেরিকা তে চিনের হিউম্যান রাইটের রেকর্ডের কথা তুলে চিনকে ঘায়েল করতে চায়। কিন্তু ইইউর অবস্থান আমেরিকার মতো ঘায়েল করা নয়। বরং ইইউ এর পলিসি নিয়েছে, চীনকে হিউম্যান রাইট মেনে চলা কমপ্লায়েন্স রাষ্ট্র করে গড়ে উঠতে সাহায্য-সহযোগিতা করা। আর এভাবে চীন-ইইউর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। গত ২০১৯ সালের এপ্রিলে ব্রাসেলসে চীন-ইইউ এক শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখান থেকে ২৪ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল, সেটাই হিউম্যান রাইট প্রসঙ্গে চীন-ইইউ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়তে চাওয়ার এক প্রামাণ্য দলিল।

    কিন্তু মোদির কপাল সত্যিই খারাপ। আগামী মার্চ ২০২০ সালে ভারতের সাথেও একই রকমভাবে ভারত-ইইউ সামিট হতে যাচ্ছে ব্রাসেলসে। তাই ওই সময়ে মোদির ব্রাসেলস সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই যারা ভাবছেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ভারতের সিএএ ইস্যুতে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা আগের মতোই কোনো মামুলি ব্যাপার অথবা ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে কোনো শক্তিশালী প্রভাব ফেলার মতো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাপার নয় তারা সম্ভবত ভুল প্রমাণিত হবেন। আগের ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট শক্ত অথবা নরম যাই ভূমিকা নিয়ে থাকুক না কেন এবারের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আগের চেয়ে ভিন্ন এটা প্রমাণিত হবেই। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইটের নীতির ভিত্তিতে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন থেকে তারা সাজাবেনই, এ নিয়ে তারা নিজেদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ।

    সেটা এ জন্য যে, এমন নীতি ভিত্তিতে আরো আগে না দাঁড়াতে পারার জন্য চীনকে বিশেষ করে বেল্ট-রোড ইস্যুতে চিনের সাথে যুক্ত হওয়া বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ইইউ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য প্রায় সবাই আলাদা এককভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক করতে প্রায় চলেই গিয়েছিল। শেষ পর্যায়ে সেখান থেকে সরে আসতে সক্ষম হয়েছিল অবশ্য।  এরপর তারা ইইউ হিসেবে একসাথে চীনকে মোকাবেলা করতে সমর্থ হওয়া থেকেই চীনকেও হিউম্যান রাইট মেনে চলতে বাধ্য ও রাজি করানোর পর্যায়ে আসতে পেরেছে তারা। এর ফলেই সব বিপর্যয় এড়িয়ে নিজেদের ভাঙন এড়িয়ে ও শক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে বলে মনে করে। এতে এমনকি এরপর গত বছরের মে মাসে চীনে বেল্ট-রোড টু এর সম্মেলনও এই নীতির ভিত্তিতেই ২৯ রাষ্ট্রপ্রধানের এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল।

    সর্বশেষ অবস্থা হল, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে এবারের ঐ ছয় প্রস্তাব একসাথে একটা প্রস্তাব হিসেবে পেশ করা হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে নিজেদের আরো আলোচনা ও তা পাস হওয়ার ব্যাপারটা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। এর মূল কারণ সম্ভবত ভারতের সুপ্রিম কোর্ট  নতুন নাগরিকত্ব আইন  ভারতের কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করেছে বা বিরোধী হয়েছে কিনা সে মামলার বিচার করতে গিয়ে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে ৪০ দিন সময় দিয়েছে। অর্থাৎ আদালত এই বিতর্কিত আইন বাতিল করে দেয় কিনা বা কী রায় দেয়  সে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চেয়েছে। কিন্তু ভারতের কিছু পত্রিকা লিখছে এই স্থগিত করাকে মোদি সরকার নিজের কূটনৈতিক বিজয় মনে করছে।

    এটাও ভুল প্রমাণিত হবে। কারণ মার্চ মাসেই ভারত-ইইউর সামিট (India-EU Summit 2020) অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে মোদি সিএএ’র ব্যাপারে পিছিয়ে সরে এসে যদি হিউম্যান রাইট মেনে চলার জোরালো অঙ্গীকার না করেন তবে এর পরিণতি খুবই খারাপ দিকে যেতে পারে। তবে বড়জোর ভারত হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য আরো সময় চাইতে পারে। কিন্তু সেটা কেবল এই শর্তে যে, তত দিন নতুন নাগরিক আইন ও এনআরসির বাস্তবায়ন স্থগিত করতে হবে। অন্যথায় চরম খারাপ দিকটা হল, ইইউ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা পর্যন্ত গিয়ে বসতে পারে। এক কথায় সিএএ-এনআরসি বাস্তবায়ন আর ইইউর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক- এই দুটো আর আগের মতো একসাথে চলতে পারবে না।

    এমনকি বাংলাদেশের চলতি নির্বাচন নিয়ে যে ‘পর্যবেক্ষণ’ ইস্যুতে তর্কাতর্কি চলছে। এটাকেও হাল্কা বিষয় হিসেবে দেখা হয় যদি, এটাও ভুল হবে। ইইউ হিউম্যান রাইট মেনে চলা বা এর কমপ্লায়েন্স ইস্যু এখন থেকে খুবই কঠোরভাবে অনুসরণ করবে। এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। কেবল বাস্তবায়নের জন্য সময় বেশি চাইলে অর্থাৎ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে তা করতে চাইতে পারি। তবুও সেটা সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতির অধীনেই কেবল হতে পারে।

    হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স এটা হতে যাচ্ছে ধীরে ধীরে – অর্ডার অব দ্যা কামিং ডেজ! ফলে এটা এখন দেখার বিষয় মোদী কিভাবে নিজেকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে হাজির করেন!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মানবাধিকার ইস্যুতে সিরিয়াস” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

    মোদীর ভোটবাক্স ভরার পরিকল্পনা আরও উদাম

    গৌতম দাস
    ০৪ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2xY

     

    যুদ্ধ একই সাথে বয়ানের যুদ্ধ হয়ে উঠে, বিশেষ করে যেখানে এর একপক্ষে থাকে মোদীর মত যুদ্ধবাজ শিকারি নেতা। মোদীর কাছে  ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাটা হল আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আসন্ন নির্বাচনে জিতবার হাতিয়ার হিসাবে একে ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা ও ইস্যু। সেই উত্তেজনা প্রসঙ্গে সর্বশেষ বড় খবরটা ছিল – পাকিস্তানে বিধ্বস্ত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের আটক পাইলট যার নাম – “অভিনন্দন বর্তমান” – তিনি গত ১ মার্চ রাত ১০টার দিকে ভারতের মাটিতে ফিরে গিয়েছেন; তাকে মুক্ত ও হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর আগের দিন পাকিস্তানের সংসদে মানে ওদিনের উচ্চ ও নিম্ন সংসদের যৌথ অধিবেশনে তাঁর বক্তৃতায় নিজের এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেন, “শুভেচ্ছা আর সৌজন্য দেখাতে আর উত্তেজনা নামিয়ে”[…as a gesture of goodwill to de-escalate tensions in the region.”], ডায়ালগের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের প্রতি আস্থা তৈরি করতে তিনি আটক পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

    কিন্তু এতে ব্যাপারটা মোদীর পক্ষে যায় নাই। বরং তাঁকে এবার এখানেও আরও উদাম করে ফেলেছে। মূল কারণ মোদী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এতদিন যে ঘৃণা তাতিয়ে ছিলেন, ভারতীয় মনকে যেভাবে উত্ত্যক্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন এই বলে যে, নিশ্চিতভাবে পাকিস্তান খুবই খারাপ স্বভাবের আর মানবিক চরিত্রহীন এক শত্রু এমন ছবি এঁকেছিলেন, তাতে খাড়া করা এমন বয়ানের ওপরে ইমরান খানের এই ঘোষণা শুধু পানি ঢেলে দেয়া নয়, একেবারে ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দিয়েছিল। এর ভালো চিহ্ন হল গত দুই সপ্তাহে মোদী পাকিস্তান বা ইমরানের যে কল্পিত দানব ছবি এঁকে ফেলেছিলেন – সেই ভারত থেকেই ইমরানের প্রতি অভিনন্দন জানানোর একটি লহর বয়ে গেছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে।

    যারা অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের এমন জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এতে প্রকাশ্যে সবচেয়ে আগে আছেন সম্ভবত ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। তিনি ইমরানের এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম আলো এ বিষয়ে “যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ‘হিরো’ ইমরান!” শিরোনামে সবার প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। আরো লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী ইমরানের পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তের জন্য “সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। এমনকি তাকে সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কও বলা হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদীর পরিকল্পনার একেবারে বিপরীত। ভারতে পাকিস্তানবিরোধী প্রবল উত্তেজনার মধ্যে পাইলটের জীবনে এরপর কী হবে এ নিয়ে জনমত যখন চরম উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়ে উদ্বিগ্ন মানুষের কল্পনাকে ছাড়িয়ে ইমরান এক ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জনমতের বড় অংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিয়ে গেছেন। আর এটাই ছিল মোদির সবচেয়ে বড় হার, এক দুর্বল পয়েন্ট হয়ে হাজির হয়েছে।

    কাশ্মীর প্রসঙ্গে একটা ফ্যাক্ট যা একটা কঠিন বাস্তবতা আর যা একালের খুব কম মানুষ ব্যাপারটা জানেন বা আমল করতে দেয়া হয় না এমন সে কথা তুলে ধরা যাক, যা কাশ্মির ইস্যুকে বুঝার জন্য ফাউন্ডেশনাল। গত ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও কলোনি মুক্তির কালে – বেঙ্গল বা পাঞ্জাব এ দুই প্রদেশ যেমন ভাগ হয়ে একেকটা করে টুকরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে অংশ হয়ে যায়, আর সেই থেকে টুকরাগুলো এ দুই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে-  কাশ্মীর, কিন্তু সেই একই অর্থে বাংলা বা পাঞ্জাব মত নয়। এমনকি তুলনীয়ই নয়। যদিও ভারতীয় কাশ্মীর আর পাকিস্তানি কাশ্মীর বলে বিভক্ত অংশ আছে তবুও কাশ্মির কোনোভাবেই বাংলা বা পাঞ্জাব নয়। কেন?

    এর একেবারে গোড়ার কারণ হল, বেঙ্গল ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রেসিডেন্সি’ প্রশাসনে আর পাঞ্জাব ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার এক ‘প্রদেশ’ প্রশাসন। আর তুলনায় কাশ্মীর বরাবরই ছিল প্রিন্সলি স্টেট বা এক  রাজার করদ রাজ্য। আসলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বলে এক ব্রিটিশ কলোনি-রাষ্ট্রের কথা আমরা জানি আর শুনি বটে, কিন্তু এককাট্টা একই প্রশাসনের অধীনস্ত ভুখন্ড মানে কোন একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে আমরা সবাই এক ইন্ডিয়ান রাষ্ট্র ভূখণ্ড  – এমন কিছু কোনো দিনই ছিল না। তাহলে ছিল কী? ছিল আসলে একই শাসক “ফোর্ট উইলিয়াম” নামে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক দুর্গ বা হেডকোয়ার্টার। এতটুকুই এক। আর বাকি সবাই আলাদা আলাদা প্রশাসনিক ভুখন্ড।
    এই কোম্পানি শাসন শেষ হয় প্রথম শত বছর পরে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এরপর থেকে কোম্পানির জায়গায় সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়, কিন্তু তাতে আগের মতোই ব্রিটিশ-ভারত বলতে ওই একই ফোর্ট উইলিয়ামের অধীনের তিন ধরনের প্রশাসনিক পদ্ধতিতে তিন ধরনের ভূখণ্ডই বজায় রাখা হয়েছিল। বেঙ্গল, বোম্বাই আর মাদ্রাজ- এ তিনটাকে প্রেসিডেন্সি প্রশাসন বলা হত। আর এর পাশাপাশি ছিল প্রায় আট-নয়টা প্রদেশের (১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ছেড়ে যাবার সময় হয়েছিল ১৭ টা প্রদেশ) প্রশাসন। আর ওদিকে ভুখন্ডের তৃতীয় ধরণটা ছিল ছোট-বড় প্রায়.৫৬৫ প্রিন্সলি স্টেট [Princely State]। প্রিন্সলি স্টেটগুলোকে করদ রাজার রাজ্যও বলা হত – এজন্য যে এসব করদ রাজ্যের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা ইস্যুতে এরা সরাসরি ব্রিটিশদের ইচ্ছা ও স্বার্থই শেষ কথা – এমন অধীন। এছাড়া এটা মেনে নিয়েই আগের মত এর রাজারা খাজনা তুলে রাজত্ব করে যেতেন আর তোলা খাজনার একটা ভাগ ব্রিটিশদের শেয়ার করতেন। তবে এভাবে করদরাজ্য চালাতে রাজত্বের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে  রাজ্যগুলো পরিচালিত হত ঐ করদ রাজাদের আলাদা নিজস্ব প্রশাসনে। এগুলো ‘স্বাধীন’ বলে মনে করা হলেও আসলে তা ছিল বৃটিশদের পক্ষ হয়ে রাজার শাসন।

    বৃটিশ ইন্ডিয়ান মোট ভুখন্ডের ৪০% ভুমিই ছিল এমন প্রিন্সলি স্টেট। আর এসব স্টেট বা করদ রাজ্যে বসবাসকারী জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩%। এমনই এক প্রিন্সলি স্টেট ছিল কাশ্মীর। কাশ্মীর তাই কোন প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশ প্রশাসনের সাথে তুলনীয় ভুখন্ড নয়, কারণ এসব প্রশাসন পরিচালিত হত সরাসরি ফোর্ট উইলিয়াম থেকে। বিপরীতে কাশ্মীর সরাসরি করদ রাজার অধীনস্ত প্রশাসন; যা প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশের প্রশাসনের মত সরাসরি ব্রিটিশদের পরিচালিত প্রশাসন নয়।
    একারণে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও কলোনিমুক্তির সময়, সাধারণভাবে প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশগুলো ভাগাভাগি হয়ে  যেমন তুলনামূলক সহজেই নতুন স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান বলে দুই রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পেরেছিল, প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে নাই। এর মূল কারণ করদ রাজ্যগুলো পরিচালিত হতো ফোর্ট উইলিয়ামের কোনো ধরনের প্রশাসনে নয়, বরং করদরাজার নিজের প্রশাসনে। আবার ব্রিটিশ শাসকেরা এসব রাজার সাথে ‘করদরাজ্য’ সম্পর্ক ও চুক্তিতে থাকার ফলেই  করদরাজ্যের কাউকেই আইনত ভারত অথবা পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দিতে পারার আইনি সুযোগ ছিল না, সে জটিলতা ছিল। আর এই আইনি সুযোগ নিয়েই বৃটিশ শাসকেরা, প্রিন্সলি স্টেট গুলোর কী হবে এই ইস্যু প্রসঙ্গ না তুলে বরং তা এড়িয়ে থেকেই নিজেরা ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

    ওদিকে বিশেষ করে কাশ্মীর আবার সম্ভবত একমাত্র স্টেট, যা হবু ভারত-পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে মানে উভয়েরই সীমান্তে অবস্থিত। অর্থাৎ দুটোর সাথে সীমান্ত আছে। এবার অন্য আর একটা প্রিন্সলি স্টেটের সাথে তুলনা করা যাক। আরেক করদরাজ্য হল “নিজামের হায়দরাবাদ” [এখনকার অন্ধ্রপ্রদেশ], এর বেলায়, এর চার দিকে ভারত ভূখণ্ড বলে যেমন নেহরু সৈন্য পাঠিয়ে বলপ্রয়োগে সহজেই একে ভারতে ঢুকিয়ে নিতে পেরেছিলেন। কাশ্মিরের বেলায় তেমনটি ঘটেনি, বা বলা যায় এমন ঘটাতে গিয়েই বিপত্তি দেখা দেয়। করদরাজ্যের করদ রাজা ও শাসক হরি সিংয়ের অধীনে কাশ্মীরে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যালঘু আর তুলনায় মুসলমানেরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু নয়, বড় অংশ ছিল ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী। এরাই নতুন পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে বসে বলে তা মোকাবেলায় হরি সিং চলে যান নেহরুর ভারতের কাছে। তবে কে প্রথম সঙ্ঘাত শুরু করেছিল, এ নিয়ে যার যার আলাদা ভাষ্য আছে। আবার কাশ্মীর কোন দিকে যাবে অংশ হবে – ভারত না পাকিস্তানে, ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তা ফেলে রেখে কাশ্মীরের রাজা স্বাধীন থাকার বোকা স্বপ্ন দেখত। অর্থাৎ দুনিয়া অভিমুখ কোনদিকে চলে গেছে এর কোন ধারণাই তাঁর ছিল না। দুনিয়া থেকেই কলোনি শাসন উতখাত হয়ে যাওয়া যেখানে বিশ্বযুদ্ধের দুনিয়ার অভিমুখ সেখানে তিনি মহারাজা থাকার স্বপ্ন দেখতেন। ফলে এমন স্বপ্ন রাখাই থেকেছিল যেন একটা বিস্ফোরককে পকেটে রাখা। তাই সারকথায় বললে, ১৯৪৮ সালে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় কাশ্মীরকে নিয়ে। যুদ্ধ শুরু হলে পরে নেহরুর অনুমান ছিল, বিরোধের ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘ তুলতে পারলে তিনি নিজের পক্ষে আনুকূল্য পাবেন। তাই তিনিই ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে তোলেন।
    এখানে জাতিসংঘের জন্ম বৈশিষ্ট কিছুটা বলে রাখলে কাশ্মীর ইস্যু বুঝতে সুবিধা হবে। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া আর ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এর গুছিয়ে বসা – বলা যায় এসময়টা জাতিসঙ্ঘ ছিল এক বহুল আদর্শময় ও আকাঙ্খিত মডেলের এক শান্তি স্থাপনের প্রতিষ্ঠান, হাই মরালের প্রতিষ্ঠান। দুনিয়াতে কেউ কাউকে কলোনি দখল করে রাখা এই দখলদারি ও কলোনি শাসন চালানো গ্রহণযোগ্য নয় – বলা যায় এই নীতিতে পরিচালিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এলায়েড পাওয়ার [Allied powers ] বা আমেরিকার নেতৃত্বের পক্ষ। ঐ যুদ্ধে হিটলার বিরোধী এলায়েড পাওয়ার বা মিত্র বাহিনী জয়লাভ করেছিল। জাতিসংঘের জন্মেরও ভিত্তি একই; ঐ একই “কলোনি শাসন অগ্রহণযোগ্য” – এই নীতিতে। এর মূল কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করার প্রধান শক্তি ছিল আমেরিকা আর এর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হল জাতিসঙ্ঘ। তিনি বাকি বিজয়ী শক্তিদের রাজি করিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়েন। তাই এটা আবার যুদ্ধবিরোধী নৈতিকতায় পরিচালিত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে, তা কোনো যুদ্ধে নয় বরং জাতিসংঘের করা ডায়ালগ ও মধ্যস্থতা মধ্যদিয়ে, আন্তর্জাতিক নানান আইন ও কনভেনশনের ভিত্তিতে – যেকোন বিরোধ মিটানো – এই ছিল জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য। তাই যুদ্ধ এড়ানোর আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেকালের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন রুজভেল্ট ও তারপরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান।
    আমেরিকার ১৯৩৩-১৯৫৩ সাল, এই ২০ বছরের পাঁচ প্রেসিডেন্টের প্রশাসন থাকার কথা। এই ২০ বছরের প্রথম টানা চারবার প্রেসিডেন্ট জিতেছিলেন রুজভেল্ট, আর শেষবার হ্যারি ট্রুম্যান। প্রথম পর্বের টানা সাড়ে ১২ বছর প্রেসিডেন্ট ছিল রুজভেল্টের। আর শেষ সাড়ে সাত বছর (সাড়ে তিন ও চার মিলে) প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রুম্যান। কারণ, ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থবারও শপথ নেয়ার পর, মাত্র পরের তিন মাসের মধ্যে রুজভেল্ট মারা গেলে তার নীতি-পলিসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান দায়িত্ব নেন। এছাড়া, এভাবে ভাঙ্গা প্রায় সাড়ে তিন বছর প্রেসিডেন্টের দ্বায়িতে পালন শেষ করার পরের বার ১৯৪৮ সালে নির্বাচনেও ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি প্রার্থী ছিলেন ও বিজয়ী হন। তাই ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একই রুজভেল্টের নীতিটাই বজায় ছিল। আর এদিকে রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে দেখেছিলেন দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন একেবারে উতখাত করে বদলে দিয়ে স্বাধীন রিপাবলিক (রাজতন্ত্র নয়) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও যুদ্ধ এবং এরই সুযোগ ও নীতি হিসেবে। জাতিসংঘ তাই তাঁর উদ্যোক্তা-স্বপ্ন প্রতিষ্ঠান।

    আর এ’কারণেই সেকালের কাশ্মীর বিরোধে জাতিসংঘের চোখে – রাজা হরি সিং নেহরুর কাছে ভারতে এক্সেশন [accession] বা অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এক “রাজার ইচ্ছা” জানিয়েছিলেন কি না, সেটি কোনো ভিত্তি নয় বরং কাশ্মীরের জনগণ কোন দিকে যেতে চায়, এই ভিত্তিতেই কাশ্মীরের ভাগ্যের আপস সমাধানের পক্ষে রায় দেয় জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘের রেজুলেশন হয়, কাশ্মিরে গণভোট হতে হবে আর এর রায়ই হবে সমাধান যে, কাশ্মির ভারত-না-পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রসঙ্গক্রমে এখানে কিছু বাড়তি বাক্য বলে রাখি। কমিউনিস্ট ভাষ্যে সাম্রাজ্যবাদ-আমেরিকা, অন্য দেশের তেল বা সম্পদ লুটেরা আমেরিকা, সিআইএ পাঠিয়ে গুপ্তহত্যা ঘটানোর আমেরিকা ইত্যাদি – যে পরিচয়ের আমেরিকা আমরা শুনি এর শুরু হয়েছিল রুজভেল্টের নীতির সমাপ্তিতে; মানে ১৯৫৩ সালে জানুয়ারিতে বিজয়ী রিপাবলিকান নতুন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার শপথ নেয়ার পর থেকে।
    যা হোক, জাতিসঙ্ঘের এই গণভোটের সিদ্ধান্ত আজও নেহেরু বা ভারতে বাস্তবায়ন করা হয়নি। উপেক্ষা করেই চলছে। আর সে কারণেই কাশ্মীর প্রসঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারী কারো সাহায্য নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কারো সাথে কাশ্মিরবিরোধ ইস্যু শেয়ার বা সংযুক্ত করা যাবে না – এই হলো ভারতের স্থায়ী নীতি। যে কারণ ভারত সবসময় আউরাতে থেকে বলে, “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – যা বলার মানে হল কেউ ভারতকে “গণভোট না করার কথা” মনে করায় দিতে পারবে না। এটাকেই বলে ভারতের “বিগ-এম” (ইংরেজিতে ‘এম’ মানে এখানে Mediation বা মধ্যস্থতা) ভীতি। এর অর্থ হল যদি কোন মধ্যস্থতাকারী আবার জাতিসঙ্ঘের সেই প্রস্তাব বাস্তবায়ন চেয়ে বসে কিংবা মনে করিয়ে দেয়, তা আলোচনার ইস্যু হয়ে যায়। এ সপ্তাহে ভারতের এক মুরব্বি সাংবাদিক শেখর গুপ্তা লিখেছেন, কোনো শক্তিধর দেশের মধ্যস্থতা ছাড়া কাশ্মির সমস্যার সমাধান নেই। [Bilateralism has failed. India can make peace with Pakistan only with big-power guarantees]। বলা বাহুল্য এটা ভারতের – “কাশ্মীর ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু” – গত ৭০ বছর আটকে থাকা কিন্তু অকার্যকর নীতির সরাসরি সমালোচনা।

    কেন?
    কারণ, যুদ্ধবাজ মোদী বাস্তবে এবারের কাশ্মীর সমস্যার ইতি টেনেছেন বিশেষত, আটকে পড়া পাইলটকে ফেরত এনেছেন, আপাতত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দিয়েছেন “বাইরের” মধ্যস্থতাকারীদেরই সাহায্যে।

    প্রথমত, মোদীর তথাকথিত ‘প্রতিশোধের’ উন্মাদনা তৈরি করে ভারতীয় মনকে ক্ষেপানোর উদ্দেশ্য ছিল এটা দাবি করা যে, তিনিই একমাত্র নেতা ও দল যে “মুসলমান” পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সক্ষম। মোদীই ৩৬ ইঞ্চি বুঝের ছাতি-ওয়ালা [বুকের ছাতির রেফারেন্স মোদীর নিজের দেয়া] সেই নেতা।  বিজেপির রাজনীতির বহু পুরনো অনুসরণ করা মূল লাইন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে  হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে এভাবে হিন্দুমনের মেরুকরণ ঘটিয়ে, সেই জনমতকে নিজের পক্ষে ভোটের বাক্সে আনা। এ কারণে মেরে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব, ছাল ছাড়িয়ে নেব, বুকের ছাতি দেখানো ইত্যাদি ভাষা এসব হল মোদীর দলের ও ব্যক্তিত্বদের “প্রতিশোধ” নিতে সক্ষমতার প্রমাণ। আর হিন্দু হলে ভাল আর মুসলমান হলেই খারাপ – এভাবে অতি সরলীকরণ করে নিজেদের ভয়ঙ্কর দাঙ্গার উন্মাদনা তৈরির চিন্তাকে আড়াল করা। অথচ রাজনীতি, রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন, নাগরিক অধিকার, নাগরিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এসব নিয়ে কাজ করা ইত্যাদি মোদীর দলের কাছে এজন্য কখনো কোনদিন কোন ইস্যু নয়, ইস্যু হয় নাই; বরং “প্রতিশোধের” রাজনীতি, দাঙ্গার উন্মাদনা তাদের প্রিয় জিনিস।

    এবার তাই পুলওয়ামায় আত্মঘাতি হামলার বিরুদ্ধে  “প্রতিশোধের” মাতম তুলেছিলেন মোদী, পরে তিনি বোমারুবিমান পাঠিয়ে বালাকোটে [বালাকোট পাকিস্তান কাশ্মীরের ভিতরে নয়, বাইরে পাখতুন প্রদেশে]  কথিত “টেরর ক্যাম্পের” ওপর বোমা ফেলে সব ধ্বংস করে এসেছেন, এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করা ছিল তাঁর পরিকল্পনা। প্রায় সবই ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধে পাকিস্তানের হাতে হামলাকারি ভারতের পাইলট আটকা পড়ায়। অপর দিকে আরেক বড় বিপদ দেখা দেয়। মোদী দাবি করেছিলেন, বালাকোটের ক্যাম্পে ভারতের পাইলটের বোমা হামলায় নাকি “৩০০ টেররিস্ট” মেরে এসেছেন। যদিও ঠিক তিনশ’ই কেন, ২৯৯ বা ৩০১ নয় কেন তা জানা যায়নি। এদিকে সেসব নিয়ে পরের দিন থেকে শুরু হয়ে যায় বোমা ফেলার স্থানের সরেজমিন রিপোর্টিং। পাকিস্তানের জিও টিভির এই প্রজন্মের সাংবাদিক হামিদ মীর ঘটনাস্থল সফর করে ফেসবুকে ক্লিপ পাঠিয়ে বলছেন, এক মরা কাক ছাড়া [There was one casualty, a crow ] সেখানে কেউ মরেনি। আর ওই বনের ভেতর কুঁড়েঘরের এক গরিব মানুষ কিছুটা আহত হয়েছেন। তবে বাড়ি অক্ষত আছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর বিশাল এক গর্ত হয়ে গেছে। সেটি আবার রয়টার্সের এক সাংবাদিকের নিজস্ব সফরের ছবি ও রিপোর্ট। সেটা আবার ইতোমধ্যে  ছাপা হয়ে গিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

    তবে এসব মিডিয়া রিপোর্ট আসার আগেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মোদিবিরোধী মমতা-রাহুলসহ ২১ দলের এক সভা হয়েছে। সেখানে বিরোধীরা দাবি তুলে ও নিন্দা জানায় যে, মোদি সেনাবাহিনীর রক্ত ও জওয়ানদের ত্যাগকে নিজের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন [Opposition leaders condemn Modi govt for politicising current situation with Pakistan]। কলকাতা ছেড়ে দিল্লির এই মিটিংয়ে রওনা হওয়ার আগে মমতার নিজ ভাষায় আঙুল তুলে বলেছেন, “জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করাই কি আসল লক্ষ্য? আর ওই দিকে পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১ দলের মিলিত অভিযোগ মোদী “জওয়ানদের আত্মত্যাগকে নিয়ে রাজনীতিকরণ করছেন”India’s Modi criticised for politicising Pakistan standoff]। আর কলকাতায় ফিরে ১ মার্চ, এবার মমতার সরাসরি চ্যালেঞ্জ বালাকোটে ” ‘‘প্রথমদিন থেকেই শুনছি, শত্রুপক্ষের ৩০০-৩৫০ লোক মারা গিয়েছেন। কত কী, আদৌ কেউ মারা গিয়েছেন কি না, আমরা জানতে চাই। আরও জানতে চাই, বোমা কোথায় ফেলা হয়েছিল, আদৌ বোমা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছিল কি না”। এরপর বিভিন্ন বিদেশি সংবাদপত্রের নাম উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আরও বলেন, ‘‘তারা বলছে, এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি। বোমাটা অন্য জায়গায় পড়েছে, মিস হয়েছে। মানুষ মারা যায়নি। কেউ বলছে, একজন মারা গেছেন। তো সত্যটি কী, এটা তো মানুষ জানতে চাইতেই পারে। আমরা বাহিনীর সাথে রয়েছি। কিন্তু বাহিনীকে সত্যি কথাটি বলার সুযোগ দেয়া উচিত। দেশের লোকেরও সত্যিটা জানা উচিত”।
    কিন্তু এখন মোদীর বিপদ এর চেয়েও বড়। তার ধারণা ছিল প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে, ফলে তিনিই একমাত্র ছাতিওয়ালা নেতা, সেসব দাবির পক্ষে রসদ এখন তাঁর হাতে এসে গেছে। সুতরাং এখন সীমান্ত উত্তেজনা শীতল [de-escalation] করাই মূল কাজ। কিন্তু পাইলট আটকে যাওয়ায় ব্যাপারটি পুরা ঘোলাটে জটিল হয়ে থাকে।

    তাই তিনি আসলে তিনটি বা অন্ততপক্ষে দু’টি ক্যাম্পকে মধ্যস্থতা করতে কুটনৈতিক ততপরতা করতে ডাকেন। প্রথম ক্যাম্পের মূল নেতা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহম্মদ বিন সালমান বা এমবিএস (MBS)। এটি কারো অজানা নয় যে, অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ সঙ্কটে থাকা পাকিস্তানে তিনি গত সপ্তাহে সফরে এসে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ছাড়া আরো ৯ বিলিয়নের মধ্যে নগদ তিন বিলিয়ন ডলার ইমরান ক্ষমতায় আসার পরই দিয়েছেন। এক কথায় এই প্রিন্স হলেন এখন ইমরানের পাকিস্তানের কাছে প্রমাণিত ত্রাতা। আবার খাসোগি হত্যা মামলায় ইমেজ হারানো এই প্রিন্সের কাছে পাকিস্তান সফর হল ইমেজ আবার চাঙ্গা করার উপায়। কাজেই মোদীর দিক থেকে সেই ইমরানকে রাজি করাতে হলে এখন ইমরানের দুর্বলতা ও ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তোলা ব্যক্তিত্ব প্রিন্সই হলেন সঠিক লোক, এটি বুঝতে মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কষ্ট হয়নি। এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রিন্স- MBS আর দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স, এরা হলেন মূল ক্ষমতাধর। দুবাইয়ের প্রিন্সও এমবিএসের আগেই পাকিস্তান সফরে এসে প্রায় ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। কাজেই মোদীর বিদেশ মন্ত্রণালয়ের আগ্রহে – ভারত ওআইসি’র কেউ নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও দুবাইয়ের প্রিন্স ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওআইসি’র সভায় অতিথি হতে দাওয়াত করেন। এখানেই মোদীর কাম্য মধ্যস্থতাটা ঘটে। কারণ, এর শুরু শুধু প্রিন্স MBS এর নিজের প্রভাব নয় আর এক হাতে তিনি ট্রাম্পের জামাই ক্রুসনারের মাধ্যমে ট্রাম্পের আমেরিকা দিয়েও ইমরানকে প্রভাবিত করেন। ভিয়েতনাম সফরে থাকা ট্রাম্প তাই শুধু ইঙ্গিতে বলে্ন “সারপ্রাইজ আছে”। [Earlier, U.S. President Trump said he expected “reasonably decent news” regarding the conflict between India and Pakistan, adding that the United States was trying to mediate.] অতএব, এটাকে বলতে পারি আমেরিকা সমর্থিত মিডল ইস্ট ক্যাম্পের মধ্যস্থতা।
    দ্বিতীয় ক্যাম্পটি হল, এটা মূলত চীনের উদ্যোগ। অনেকটা অপসৃয়মাণ আমেরিকান প্রভাবের ভেতর উত্থিত দুনিয়ার নতুন নেতা চীনের। ভারত ও পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ ও বাজার স্বার্থ খুবই ভাইটাল। এনিয়ে দুবাইয়ের এক সেমিনারের জাতিসংঘ আর বিশ্বব্যাংকের মন্তব্যটা দেখা যেতে পারে [Don’t let border tensions hamper trade: UN & World Bank economists to India, Pakistan]।  যদিও চীনের গ্লোবাল স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এর ভেতর ভারত আবার একটু বেয়াড়া, সবসময় কথা শুনতে চায় না। দাম বাড়িয়ে চায়, নেয়। তাই চীন নিজের প্রভাব বাড়াতে রাশিয়াকে সাথে রাখে। তাই এখানে মিটিংটা হয়েছে চীনে। ভারত, রাশিয়া ও চীন এ তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে। এ ছাড়া সাংহাই করপোরেশন সংগঠনের সূত্রে গত ২০১৭ সালে ভারত-পাকিস্তানকে একত্রে সাংহাই জোটের সদস্য করে নেয়া হয়।
    কিন্তু সব পক্ষের “উত্তেজনা নামানোর” প্রস্তাব শুনে ইমরান উল্টো নিজের ইমেজ বাড়ানোর বুদ্ধিতে নিজেই এগিয়ে আসেন। তাই পরের দিনই বিনা শর্তে পাইলটকে ছেড়ে দেয়ার আগাম ঘোষণা তিনি দিয়ে বসেন।

    কিন্তু বালাকোটে নাকি বোমা ফেলে ৩০০ জন জঙ্গী মেরে ফেলা হয়েছে – সেসব কথিত মৃত জঙ্গীর লাশ মোদী এখন কোথা থেকে দেখাবেন? সমস্যা এখন এখানে ঠেকেছে। এ দিকে খবর বেরিয়েছে, হাজার কেজি বোমা ফেলে বনজঙ্গলের পরিবেশ নষ্টের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে মামলা করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। এতে ৩০০ মৃত জঙ্গির লাশ সংগ্রহ মোদীর জন্য আরো কঠিন করে দিয়ে তাকে বিব্রত করাই পাকিস্তানের উদ্দেশ্য, তাই মনে হচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস আরও খারাপ মন্তব্য করে বলেছে, – “Pakistan released the Indian pilot it had captured, capping a humiliating episode for India and a surreal week for him”.

    তাহলে এখন ভারতের বিগ-এম ভীতি, মানে মধ্যস্থতাকারীর ভীতির কী হল, কোথায় গেল? আমরা দেখলাম, ঘটনা শক্তপোক্ত করতে মোদী দু’টি বৃহৎ ক্যাম্পকে নিয়োগ করে নিজে উদ্ধার পেলেন। সম্ভবত এই বাস্তবতায় শেখর গুপ্ত লিখছেন, কাশ্মির ইস্যুতে “দ্বিপাক্ষিকতার দিন শেষ, বিগ পাওয়ারের মধ্যস্থতা নেয়ার” দিন এসে গেছে।
    পাইলটকে ফেরত পেতে গিয়ে আর ওই দিকে মমতার চোখা প্রশ্নের কারণে মোদির সব প্রপাগান্ডা আর তৎপরতাই এখন উদোম। সবাই সব জেনে গেছে।

    সর্বশেষ আবার ওআইসিঃ
    আজ আবার ওআইসি ইস্যু হাজির, কিন্তু এবার তা ভারতের জন্য চরম নেতিবাচক। ভারত দুবাইয়ে সমাদরে ওআইসির দাওয়াত খেয়ে এসে এরপরের দিনটাই তাঁর জন্য ছিল উলটা, অন্যরকম। কেন? ওআইসির ঐ দুবাই-সম্মেলন থেকে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে তাতে ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  কাশ্মীরে ভারত সরকারের নাগরিক ট্রিটমেন্ট অর্থাৎ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। মানে দুবাই মিটিংয়ে কাশ্মীরের নির্যাতিত জনগণ প্রসঙ্গের গৃহিত প্রস্তাবগুলোতে স্বভাবতই ভারতের কঠোর সমালোচনা করতে হয়েছে। সেখানে যে দুটা শব্দ ভারতের জন্য খুবই বিব্রতকর সেটা হল – “Indian terrorism” “MASS BLINDING” এর নিন্দা। প্রথমটা সরকারি গুম, খুন নিপীড়ন এসবের সীমাছাড়ানি বলপ্রয়োগের তাই এটাকে সরকারি “সন্ত্রাস” বলা হয়েছে। আর পরেরটা  বিশেষ করে নাগরিক গ্রহণযোগ্যতা সীমার বাইরে গিয়ে ছররা গুলির প্রয়োগ[use of pellet guns by security forces ] যা মাথার খুলিতেও পর্যন্ত গিয়ে ঢুকে থাকে, তাই এর কড়া সমালোচনা।

    অতএব ভারত ঐ দাওয়াতে গিয়ে খাদ্য আর প্রশংসাসহ যা যা কিছু গ্রহণ করেছিল তা এবার বমি করে উগরে বের করতে হয়েছে।  ভারতকে এবার “প্রত্যাখ্যানের” বিবৃতি দিয়ে তা বলতে হয়েছে। দা হিন্দু পত্রিকার শিরোনাম, India rejects OIC resolution on “Indian terrorism” in Kashmir। আর ওদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও এর রিপোর্ট করেছে। মূলত এদুই পত্রিকাতেই এটা ভাল রিপোর্টেড হয়েছে। এক্সপ্রেসের শিরোনাম হল, “OIC condemns ‘atrocities’, India says J&K internal matter”। অর্থাৎ ওআইসি কাশ্মীরে ভারত সরকারের নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের নিন্দা করেছে।  আর এর জবাবে ভারত বলেছে, জম্মু-কাশ্মীরে যা কিছু ঘটে তা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। মানে হল বাইরের কেউ এতে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু তাহলে ভারত মধ্যস্থতা নিতে গিয়েছিল কেন, সে জবাব ভারত আমাদের দিচ্ছে না!

    ওদিকে ওআইসির প্রস্তাবে, ভাঙ্গা বাবরি মসজিদের জায়গায় আবার তা নির্মাণ করে দেওয়ার আহবানও রাখা হয়েছে [… Indian government to rebuild the Babri Masjid in Ayodhya]। ফলে মোদী সরকারের জন্য এটা এক চরম বিপর্যয় অবস্থা।

    বাকী বেশির ভাগ মিডিয়া এটাকে মোদী সরকারের “কূটনৈতিক বিপর্যয়” এর ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছে। কিন্তু মিডিয়ায় কেন তা এত জোড়ালো হল? কারণ সুষমা স্বরাজ ওআইসিতে দাওয়াত পাওয়াতে সেটাকে খুবই গর্বের সাথে ভারত তা প্রচারে নিয়েছিল যে এটা পাকিস্তানকে কোনঠাসা করতে পারার কুটনৈতিক সাফল্য। এছাড়া যখন সুষমা দাওয়াত করার কথা উঠেছিল ওআইসির মধ্যে আভ্যন্তরীণ ভাবে তখন থেকেই পাকিস্তানের পরিরাষ্ট্রমন্ত্রী এটা নিয়ে পাকিস্তান সরকারের আপত্তির কথা সরাসরি মিডিয়ায় তুলেছিল। এরই প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের অন্য ডেলিগেট সদস্যরা পরে যখন দুবাই সম্মেলন যোগ দিলেন তখন দেখা গেল তাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাদ রাখা হয়েছে। সম্ভবত কোন বিব্রতকর কিছু ঘটার সুযোগ রাখতে চায় নাই কোন পক্ষ। আর তাতেই ভারত এটাকে তাদের বিরাট সাফল্য বলার সুযোগ নিতে গিয়েছিল। এছাড়া ওআইসির প্রস্তাবে ইমরানের পাইলট ফেরত দেবার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করা হয়েছে। এটাও ভারতের দেখানো সাফল্য – এবার ফুটা হয়ে যাবার আর একটা কারণ। সারকথায় ভারতের মোদী সরকারের মিথ্যা বা যুদ্ধবাজ প্রপাগান্ডা – ধর্মের কল মানে ন্যায়ের কলের বাতাসে নড়ে – এর মত আপনাতেই যেন ভেঙ্গেচুড়ে পড়েছে।
    ফলে মোদীর উদাম ন্যাংটা হয়ে যেতে আর কিছুই যেন বাকি থাকে নাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০২ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদি আরো উদোম হয়ে গেছেন“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]