Category: ALI REAZ

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    গৌতম দাস

    ২৯ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3tW

    SOURCE

    আলী রীয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। ঢাকার আরেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যৌথভাবে তিনি এক রচনা লিখেছেন প্রথম আলো পত্রিকায়। তারই তৃতীয় পর্বে যে লেখাটা ছাপা হয়েছে, এর শিরোনাম “রাজনীতিতে ধর্মের ফিরে আসা”।

    রাজনীতিতে ধর্ম আসতে পারবে না বা ফিরে আসতে পারবে না ইত্যাদি এসব খুবই একঘেঁয়ে ধারণা, অতি ব্যবহারে জীর্ণ ফলে ক্লিশে [cliché] আর ভুল; এছাড়া সর্বোপরি বহু আগেই চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া এই ধারণা। এএসব কথা ন্যাগিং-এর পর্যায়ে পৌছানোয় তা আর নুন্যতম আগ্রহ তৈরি করে না। সিরিয়াস কোন আলোচনা এখান থেকে শুরু করা যায় না। এছাড়া কেন এই তর্ক কেউ তুলছে এর উদ্দেশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৎ বা পরিস্কার রাখা হয় না। এছাড়া পলিটিক্যাল বায়াসনেস তো আছেই। যেমন যেই ভারতকে “সেকুলারিজমের পিতৃভুমি” হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে এতদিন একে তুলনা করা হয়েছে এক বিশাল তুচ্ছতার চোখে যে কথিত ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান বা মুসলমানের বাংলাদেশ বলে – যেসব গর্বের ঠেলায় আমাদের প্রাণ যায় অবস্থা। অথচ “সেকুলারিজমের” নামে হাজির এই শক্তি মোদী বা আরএসএসের উত্থানে নির্বিকার। আবার মোদী তাদের ঘরের লোক এবং গ্লোবাল লিডারদের ক্ষমতার গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার হয়ে উঠেছে।  অথচ গুজরাট, দিল্লি কী উত্তরপ্রদেশের মুসলমানের রক্তে তার হাত রঞ্জিত হয়ে উঠেছে; এমন রাজ্যের সংখ্যা বাড়ছে তবু মোদীর রাজনীতি তাদের চোখে তেমন ‘ধর্মের রাজনীতি” নয়। এদের অনেকেই, “রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” নীতিগত অবস্থানের লোক – এই বলে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সারকথায়, রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” কথা যারাই তুলে তাদের উদ্দেশ্য এমনই গভীরভাবে অস্বচ্ছ থাকতে দেখা যায়। ফলে এদের কারণেই কোন সিরিয়াস আলোচনা সম্ভব হয় না। আর উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ থাকলে কোনদিকেই আগানো সম্ভব হবার কোন কারণ নাই। তবে সব জায়গায় দেখা যায় যে ইসলামি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে যারা আসছে বা ইসলামিস্টরা খারাপ  আর কথিত সেকুলারিস্টরা ভাল – এটাই একমাত্র এপ্রোচই।

    এদিকে রাজনীতি আর ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে যদি শুধু নাইন-ইলেভেনের পরই ধরি, তাতেও গত ২০ বছরে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। একেবারে উল্টে-পাল্টে অনেক দিক থেকে দেখে আলোচনা সমালোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব এমন লেখকদের উপর পড়েছে তেমন মনে হয়নি।  যেমন এখানে দেখে যাচ্ছে  তিনি সত্তর দশকের মধ্যে থেকেই কথা শুরু করতে চেয়েছেন।

    যেমন আলী রিয়াজ শুরুতেই লিখেছেন, “১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ “। এর মানে, কথিত সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে নেওয়ার বিষয়। কিন্তু এই অনুমানটাই ভিত্তিহীন।  এছাড়া কেন এটাকে নীতি হিসাবে নিতেই হবে?  আর কী উদ্দেশ্যে?  ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখতে হবে তাই?  আবার পরিস্কার হয়ে কী তারা কথা বলছেন?  যেমন, ব্যাপারটা কী সাধারণভাবে ধর্ম নাকি নির্দিষ্ট করে ইসলাম? মানে ধর্মটা ইসলাম হলে এটাকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখার প্রশ্ন তুলতে হবে? ব্যাপারটা কী এমন? এর জবাব সব সময় কথিত সেকুলারিস্টদেরকে অস্বচ্ছ রাখতে দেখেছি।  কখনও রিভিজিট করে নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন জানা যায় না!

    মূলত প্রশ্নটা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করারই নয়। একেবারেই না।  প্রশ্নটা নাগরিকদের মধ্যে কোন ধরণের বৈষম্য না করার। এটা নিশ্চিত করা, এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের প্রধান শর্ত ও উদ্দেশ্য। তথাকথিত সেকুলারিজম যেখানে কোন ইস্যুই নয়। কারণ বৈষম্যহীন না থাকলে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সকলে সমান এমন সাম্যে থাকবে না। ধর্মীয়সহ সব পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সকলে সমান অধিকারের এটা চর্চায় নিশ্চিত করতে গেলে ব্যবহারিক দিক থেকে সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র আর ঠিক আর কোন একটা ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হবে না আবার কোন এক ধর্মবিরোধী তাও হবে না। এই অর্থে এটা ব্যবহারিকভাবে যতটুকু যা আলাদা। এর বাইরে যারাই নাগরিক-বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয়, রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে হবে – এমন উদ্দেশ্যের কথা বলবে এরাই ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্যে কথা বলছে বুঝতে হবে। ইসলাম-কোপানি এদের উদ্দেশ্য।

    ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজম নীতি এসেছিল ইন্দিরার আত্ম-সংকটেঃ
    আসলে ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজমের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই, আত্মসঙ্কটে। এছাড়া সেটা ছিল  তাঁর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার শর্ত হিসেবে। অর্থাৎ অরিজিনালি সমস্যাটা তাঁর নিজের। কী সমস্যা? তা হল, সাতচল্লিশের দেশভাগ হয়েছিল নেহরুর স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে;  আর তা ভারতের মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর মধ্য দিয়ে। ফলে নেহেরুর চোখে পাকিস্তান ভারতের স্বার্থের শত্রু, তা মেনেই এর জন্ম। তা হলে এই ভাষ্য অনুযায়ী ইন্দিরার চোখে ১৯৭১ সালেও শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীন তো মূলত সেই মুসলমানই যারা স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙ্গেছিল। তা হলে একাত্তর সালে এসে ইন্দিরা গান্ধী ঐ মুসলমানদেরই সহায়তা করবেন কেন? তাই আমাদের নয়, ইন্দিরার মন ভাল করতে পারে এ প্রশ্নের এমন একটা যুৎসই  সাফাই জবাব দরকার ছিল ইন্দিরার। সেই প্রশ্নটা যেন ইন্দিরার মনে উঠেছিল ১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে; যখন ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে কি না সেটা আর বাস্তবে অমীমাংসিত ছিল না। তবে ‘কী পরিচয়ের’ বাংলাদেশক্ব স্বীকৃতি ঘোষণা দিবেন, ইন্দিরা নামবেন তাই তিনি খুঁজে ফিরছিলেন।

    যেমন, আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন,  কোল্ডওয়্যারের ঝগড়ায় দুই ব্লক-রাষ্ট্রজোটে বিভক্তির সেই যুগে যখন পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন এই  ব্লক-গ্রুপের বিপরীতে বাংলাদেশ-ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অ্যালাইনমেন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়ে গেছিল ও এভাবে যুদ্ধ হতে যাচ্ছে তা মুখ্যত নির্ধারিত হয়ে গেছিল, এটা ছিল সেই সময়। কিন্তু তখনই ইন্দিরার মাথায় যেন উদিত হয়েছিল, কেন এই মুসলমানের বাংলাদেশকেই তিনি সমর্থন করতে যাচ্ছেন এর এক সাফাই-জবাব তাঁর হাতে থাকতেই হবে।  তাকে সুরাহা দিতে মুজিব বা তাজউদ্দীন যদি বলতেন যে তারা আর মুসলমান নয় তাহলে হয়ত ইন্দিরার মনষ্কামনা পুর্ণ হত। কিন্তু হায়! এমনটা সম্ভব নয়!  অবাস্তব স্বপ্ন বলে, এর বিকল্প হিসেবে যেন ইন্দিরার মাথায় আসে ‘সেকুলারিজম’ শব্দটা। অর্থাৎ বাংলাদেশ যেন নিজেকে সেকুলার রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে নেয়, এমনটা করার পরই অষ্টম চিঠি চালাচালিতে ইন্দিরা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মানে ইন্দিরার ইচ্ছা পূরণ হয় এতেই যে, তিনি ‘মুসলমান বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দেননি, ‘সেকুলার’ বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন। এভাবেই  তাঁর অস্থির-মন কিছুটা শান্তি পায়!
    কিন্তু একাজ করেও ইন্দিরার সব দ্বিধা-সন্দেহ তবু চলে যায়নি। কারণ যেমনটা আলী রীয়াজের ভাষ্য, ‘সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ’ করা হয়েছিল – ব্যাপারটা ঠিক তা নয় আবার ওমনটা ফ্যাক্টসও নয়। অন্তত আমরা মানে বাংলাদেশ এটা নিজে যেচে কখনও গ্রহণ করেননি, বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া ছিল – তাই এখন প্রমাণিত।
    এছাড়া পাল্টা একটা বড় প্রশ্ন করা যায়, কথিত সেকুলার নীতি নেয়া ইন্দিরার চোখে যদি এতই কাম্য ও জরুরি হয়ে থাকে এমনকি ধরা যাক পবিত্র হয়ে থাকে তবে খোদ ভারতই ১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে (ওর কনষ্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে রচিত/গৃহিত) কথিত ‘সেকুলার’নীতির রাষ্ট্র ছিল না কেন? এই মহান সুযোগ ইন্দিরার বাবারা নেহরু বা গান্ধী খুঁইয়েছিলেন কেন? তাহলে তখনো ইন্দিরার ভারত নিজেই সেকুলার না হওয়া সত্বেও উলটা বাংলাদেশকে জবরদস্তিতে সেকুলার বানানো কেন? আলী রিয়াজের উচিত হবে এদিকটা খুঁজে দেখতে পারেন আগে। ইন্দিরার কাছেও এর জবাব ছিল না। বরং এনিয়ে আত্ম-অস্বস্তি ছিল, অনুমান করতে পারি। তাই এর ফায়সালা করতে ১৯৭৬ সালে (অর্থাৎ কথিত সেকুলার বাংলাদেশের জন্মেরই চার বছর পরে) ভারতের কনস্টিটিউশন বদলানোর সুযোগ পেয়ে খোদ ভারতকে কথিত সেকুলার ঘোষণা করিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসাবে দেখতে পারেন, The Constitution (Forty-Second Amendment) Act, 1976.

    কেন আওয়ামি লীগের পক্ষে নিজেকে কথিত সেকুলার বলা সম্ভবই ছিল নাঃ
    আবার বাংলাদেশের আওয়ামি লীগের  কাছে “তারা সেকুলার” এমন কথা মুখে আনাই সেকালে ক্ষতিকর ছিল – এটাই সেকালের ইতিহাস ও বাস্তবতা ছিল। এভাবেই আওয়ামী লীগ তৈরি হয়েছিল। সেটা কেমন?  কারণ, অন্তত ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দেওয়ার পরে আওয়ামী লীগের বিরোধীরা (মানে মূলত ইসলামী দলগুলো ও আর্মি সরকারের ভাষ্য যেটা)  ছয় দফার বিপরীতে তারা  অভিযোগ তুলে বলে চলত যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও ইসলামকে দুর্বল করতে চায় বলে ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের কথা তুলেছে। অর্থাৎ মূলকথা তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে “ইসলামকে দুর্বল ও ক্ষতি” করার অভিযোগ তুলত। এর অর্থ যেই আওয়ামী লীগের কাঁধে এমন অভিযোগ সেই দল তো যেচে বলতেই পারে না যে, সেকুলারিজম তার কোন হবু-রাষ্ট্রনীতি হবে! কারণ এতে ঐ অভিযোগকেই মেনে নেয়া বা প্রমাণ করে দেয়া হবে! এ কারণে কথিত “সেকুলারিজম” আওয়ামী লীগের দলে বা কোন নেতার মুখে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত থাকবার কোন সুযোগই ছিল না। এটাই আরেকটা খাস প্রমাণ যে “কথিত সেকুলারিজম” আওয়ামি লীগের নীতি ছিল না।
    অতএব, ১৯৭১ সালে আমাদের কথিত সেকুলার হওয়ার কথা যা আলী রীয়াজ দাবি করছেন তা  ভিত্তিহীন। তবে এটা পরিষ্কার যে, এটা ছিল ইন্দিরার ছুপা-মনোবাসনা! তাঁর মনের ‘খচখচি’ মিটানো! যা আমাদের উপর চাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ উল্টো করে বলা যায়, এক অন্যায় মনোবাসনা যে, যে যে মুসলমানদের কারণে অখণ্ড ভারত  হতে পারেনি, সেই মুসলমানদেরই ইন্দিরা সহায়তা করেন কিভাবে? এই খচখচানি দূর করতেই আমাদের সেকুলার হতে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে ইন্দিরার মনোস্তুষ্টি রিয়াজ নিজের কর্তব্য বলে হয়ত অজান্তে গ্রহণ করে নিয়েছেন; যদিও একাদেমিকদের কাজ হওয়া উচিত কোন বক্তব্যের পক্ষ-বিপক্ষ দুই দিকেরই সাফাই পয়েন্টগুলো নির্মোহ যাচাই করা এবং তা, খুলে ও মেলে ধরা।

    কোন রাষ্ট্রকে  কথিত এই সেকুলার হতেই হবে কেন; আর তা হওয়ার উপায়ইবা কী ও দরকার কেনঃ
    সেকুলারিজম নাকি এক ‘পবিত্র’ রাষ্ট্রীয় নীতি- এ কথাটা হল সবচেয়ে অর্থহীন এবং নিজেকেই ফাঁকি দেয়া এক বয়ান। অর্থাৎ এটা আসলে বুঝে বা না বুঝেই বলা কিন্তু মূলত অসৎ উদ্দেশ্যের এক বয়ান। আসলে এখানে মূল প্রশ্ন, কেন কোন রাষ্ট্রকে ‘সেকুলার’ হতেই হবে, দরকার কী? আবার তা হওয়ার উপায় কী? আর ‘সেকুলার’ হওয়া মানেই বা কী?
    আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সেকুলারিজম এক পবিত্র রাষ্ট্রীয় নীতি এ কথা বলে যারা রাষ্ট্রের গায়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে আমরা দেখেছি, এরা কার্যত মুসলমানবিদ্বেষী। এই বিদ্বেষ চর্চা করতেই তারা ঐ সাইনবোর্ড ব্যবহার করেছে। কেন বারবার এই বিদ্বেষের দিকে আঙুল উঠাচ্ছি বা উদ্দেশ্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি?
    কারণ, কোন কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    তা হলে প্রথমত এটা কোন রাষ্ট্রীয় নীতি বলে সাইনবোর্ড টাঙানোর কাজই না যে, এটা সেকুলার রাষ্ট্র। তা হলে ‘অসততা বা উদ্দেশ্যের কথা’ তোলা হচ্ছে কেন? কারণ অনেক পুরনো ও প্রথম কথা হল, আপনি একটা একচেটিয়া ক্ষমতার আধিপত্যে থেকে এরপর অন্য ধর্মের লোককে ডিকটেট করতে পারেন না যে, তাঁর সেকুলার হওয়া উচিত। সবসময় এই ব্যাপার ঘটেছে এইভাবে।  ঠিক যেমনটাকে আলী রিয়াজ এখন সমস্যা হিসেবে হাজির করছেন। যেমন, আমরা দেখেছি ১৯০ বছরের জমিদার আমলে, দুই বাংলার সেই জীবন জমিদার-হিন্দুর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যে কেটেছে। আর সেই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তারা মনে করত যেমন ইসলামী টুপি মাথায় দেয়া বা ইসলামী লেবাস পড়ে শহরে ঘোরা যাবে না। করলে নাকি তা সেকুলার নীতি ভঙ্গ হবে। তবে ব্রিটিশ আমলে  জমিদাররা এটাকে ঠিক সেকুলার না,  বলতেন “সাম্প্রদায়িকতা”। আর একালে সেটাকেই গুছিয়ে বলা হয়, কথিত “সেকুলার রাষ্ট্রীয়নীতি”। অথচ উদ্দেশ্যটাই অসৎ! একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখা!
    তাহলে সেকালের সাম্প্রদায়িকতার মানে হল, জমিদার-হিন্দুর যে আধিপত্য কায়েম ছিল সেটাকে কোনো চ্যালেঞ্জ করা যাতে না হয়ে যায়, এমন হতে না দেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের নিজ সম্প্রদায়েরও চিহ্ন প্রদর্শন করতে না দেয়াই সেকুলারিজম। এমন না করা যেন অ-সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলারিজম বলে সেকালে জমিদার-হিন্দু আর একালে ইন্দিরা বা মোদি সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন।
    আর তাই মুসলমান বা কোনো ধরনের ইসলামিজমের কাছে সেকুলারিজম শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে, এটাই ইসলামবিরোধীতার ও বিদ্বেষের এক হাতিয়ার এবং এটা তাদের সাথে বৈষম্য করার জন্য এসেছে।
    তা হলে মূল কথা, আগে থেকে থাকা কোনো মুসলমান বা হিন্দু আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আশ্রয় নেয়া বা এটাকে রাষ্ট্রীয়নীতি বলে চালিয়ে দেয়া- এগুলোই অসততা ও খারাপ উদ্দেশ্য বলছি। তাদের হাত পরিস্কার নয় তাই।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য বৈষম্যহীনতা, নাগরিক অধিকারে সাম্যঃ
    তা হলে, মূলকথাটা হলো বৈষম্যহীনতা। আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল- বৈশিষ্ট হিসেবে তার নাগরিকদের মধ্যে সাম্য, সব নাগরিকের অধিকার সমান- এই নাগরিক বৈষম্যহীন নীতির ভিত্তিতে দাঁড়ানো। যেখানে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকদের পরিচয় একটাই যে, সে নাগরিক এবং সবার সাথে বৈষম্যহীনভাবে সমান অধিকারের নাগরিক। তাতে নিজস্ব আইডেনটিটি (যেমন ধর্মীয় বা ভাষা বা পাহাড়ি-সমতলী, নারী-পুরুষ প্রভৃতি) আগের মতোই আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি একটাই যে, সে রাষ্ট্রের নাগরিক। অর্থাৎ নাগরিকের অন্যসব আইডেনটিটি আগের মতই নানান ভিন্নতা নিয়ে আছে; কিন্তু সেসবের ভিত্তিকে কাউকে কারো উপরে অধিপতি না বানানো, কাউকে নাগরিক বৈষম্যের শিকার না বানানো – এসব কঠোরভাবে চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকারে সাম্য নিশ্চিত করা, এটাই মূল দরকারি কাজ। খেয়াল করেন, এই পুরো প্যারাটায় কোথাও সেকুলার শব্দটাই লিখতে হয় নাই। অথচ অর্থ পরিষ্কার। নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের এটাই মূল-বৈশিষ্ট্য হতে হবে এবং তা কোনো ‘সেকুলারিজম আমার রাষ্ট্রীয় নীতি’ এমন কথার চাতুরি বা আড়াল না নিয়েও বলা যায়। এটা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই হয়ত আর কোনো মুসলমান বা যে কোন ধারার  ইসলামিজমের পুঞ্জীভূত অনাস্থা ও ক্ষোভ আমরা কাটাতে পারি। বাংলাদেশের হিন্দুরাও অনাস্থা কাটিয়ে তেমন বৈষম্যহীন বাংলাদেশকেই আপন মনে করে আস্থা খুজতে পারেন।
    অর্থাৎ মূল কথা, সেকুলারিজম শব্দের উচ্চারণই অপ্রয়োজনীয়। ফলে এ শব্দের আড়ালে কোনো চাতুরীও চলবে না। নাগরিক সাম্য-নীতি অনুসরণ করবেন এবং কোন সাইনবোর্ডে না – চর্চায় তা প্রতিষ্ঠা করবেন, এটাই এর মূল ফোকাস হতে হবে।

    রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন – বৃটিশ অসততাঃ
    আলী রিয়াজ লিখেছেন, ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকার কথা ছিল, রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ ছিল। এই শব্দ ও বাক্যগুলোই আড়ালেই প্রবল অপ-ব্যবহার ঘটানো হয়েছে। ইসলাম কোপানোর পারফেক্ট সুযোগ করে নেয়া হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এতে এক বিরাট অনাস্থা তৈরি হয়ে গেছে বিশেষ করে মুসলমান বা কোন ধরনের ইসলামিজমের জনগোষ্ঠীর মনে। মূলত ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ এর নামে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করা হয়েছিল। এই অসততার ‘গুরু’ ব্রিটিশ সরকার। বিশেষত ১৯২৩ সালের নেশন স্টেট ব্রিটিশ রিপাবলিক। এর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া তুরস্ক বা অটোমান এম্পায়ার দখল করে ব্রিটেনের নিজ ইচ্ছায় একে সাজানো। ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া’- এই কামালকে ক্ষমতায় বসিয়ে ব্রিটিশরা ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ কথাগুলো সাজিয়েছিল।
    আগেই বলেছি সাম্য-নীতিকে চর্চার বাস্তবায়ন, নাগরিক বৈষম্যহীনতা বাস্তব করে তোলা – এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারলে “জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক” কী হবে, কোথায় তা ভারসাম্য আনবে সেটা আপনাতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও বাস্তব সমাধান হবে। কিন্তু যার উদ্দেশ্য ইসলাম-কোপানি আর মনে বিদ্বেষ, ক্রুসেদে হারার পুরান রাগ তার মুখে এসব রুচবে না!
    যেমন, সুলতানি তুরস্ক ছিল ডমিনেটিংভাবে ইসলামী। তা এক সাম্রাজ্যরাষ্ট্র ছিল। আবার তুরস্ক মানেই, একই সাথে বারবার ক্রুসেড হেরে যাওয়ার ইউরোপীয় খ্রিশ্চীয়-মনের ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতাও। কিন্তু যেটাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের হেরে যাওয়ার পরের ১৯২৩ সালের সেকালের মডার্ন তবে জাতিরাষ্ট্রের ব্রিটেন চায়নি যে, ১৯২৩ সালের তুরস্কের কারণে ব্রিটেনে্র নিজ আভ্যন্তরীণ   খ্রিশ্চীয় থিওলজি আবার রাজনীতির চেয়ে  প্রবল হয়ে উঠুক বা রাজনীতিকদের পাশাপাশি ক্ষমতার ভাগীদার হয়ে উঠুক। তাই ব্রিটিশ শাসকেরা  ব্যাপারটাকে ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন” থাকা জরুরি এভাবে সাজিয়ে কথা তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ কথাগুলো এনেছিল।  যাতে বৃটেনেও  খ্রিশ্চীয় থিওলজির সত্ত্বা আগের মতই রাজনীতিক সত্ত্বার অধীনস্ত হয়ে নিচে চাপা থাকে। এছাড়া বাস্তবে পেয়ে যাওয়া তাদের বসিয়ে দেয়া শাসক কামাল আতাতুর্ক  জবরদস্তিতে খাড়া হতে পারেন বা কোন ধরণের ইসলামিজমের হাতে আক্রান্ত না হন। কামালকে রক্ষা করতেই এই নীতি। কথিত সেকুলারিজম মানেই রাষ্ট্র আর ধর্মের বিভাজন, এমন কথা সত্য নয়। এককথায় এটা ছিল তুরস্ক বা বৃটেন স্পেসিফিক তাদের আভ্যন্তরীণ হবু কোন সংকট যে উদয় না হয় এর জন্য সাবধাণতা। রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকতেই হবে এভাবে সেকুলারিজমকে উপস্থাপন করা একটা চিহ্ন হিসাবে একে দেখানো এমন কোন কথা কোনকালেই ছিল না।

    কাজেই মোদ্দা কথা ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’-এর তত্ত্ব কামালের তুরস্ককে বৃটেনের নিয়ন্ত্রণে সামলানোর এক আলাপ মাত্র।  এটা কোনোভাবে নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের আলাপই নয়। কাজেই রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের এই আলাপ এক কথায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ইউরোপে এটা যার যেভাবে কাজে লাগে সে সেভাবে এটা ব্যবহার করে, মানার ভান করে। এমনকি আমেরিকান রাষ্ট্রও এটা মানে না। আমেরিকা মনে করে, নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষাই রাষ্ট্রের কাজ। তবে মুখ্য বিষয়টি হল – তুরস্কে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের কথা নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের কথা নয় বা সেদিক থেকে তোলাই হয়নি। তাই এটি উপেক্ষাযোগ্য। এই সারকথাটা আমাদের মনে রাখতেই হবে।
    সোজা কথাটা বললে, লেখক যদি বেড়ে চলা ইসলামিজমের দিকে তাকিয়ে তা ঠেকানোর উপায় খুঁজতে থাকা কেউ হন, তা হলে তিনি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক – এ আলাপে আমাদের কেউ নন। তার এজেন্ডা ও প্রসঙ্গও তাই আলাদা। ১৯২৩ সালে তুরস্ক থেকে ব্রিটিশদের হাতে তৈরি করা ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দের আড়ালে আরো কত কিছু যে আমাদের দেখতে হবে সেটি তাদের ব্যাপার। এভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করতে থাকুন। কিন্তু আমরা তাদের সাথে একই নৌকায় নাই। উই আর নট ইন্টারেস্টেড! কারণ ওটা নষ্টা রাস্তা! এই সেকুলারিজম আমাদের রাস্তা নয়। এটি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক চিন্তারও কোন অংশ বা আত্মীয় কিছু নয়।
    আবার কলোনি জমিদার আমলে, যা আগেও বলেছি, যে এমনটাই জমিদার-হিন্দুর আকাঙ্খা ও বয়ান ছিল যাকে তার অলীক বাসনাও বলতে পারি। যে মুসলমানকে ‘বাঙালি’ বলে মনে করা হতো না, বাংলা ভাষাটা কেবল বাঙালি হিন্দুর ভাষা মনে করা হত। তাই এর শ্রীবৃদ্ধি ও বিকাশে যা বলার সেটাও বাঙালি হিন্দুরই একচেটিয়া মনে করা হত। এরাই এখন ‘হিন্দুত্ববাদের “হিন্দু সংহতি“র নামে আরএসএসের ছায়াতলে অঙ্গসংগঠন হয়ে আছে।

    আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’ হল মূল আসামীঃ
    বেড়ে চলা নানান ধরণের ইসলামিজম ও পশ্চিমের উপর তাদের জেনুইন অনাস্থার জন্য মূল দায়ী আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকার ‘হোম ল্যান্ড সিকিউরিটি’ নামে ডিপার্টমেন্ট খোলা (Nov 2002) এবং তার ইসলামবিদ্বেষী নীতির চর্চা করা। সচেতনে অথবা অচেতনে এই চর্চার ফলে যে মেসেজ তারা হাজির করেছিল তা হল, আমেরিকানরা কথিত সন্দেহভাজন “মুসলমান-মুক্ত” এক দুনিয়া গড়তে চায় আর সেখানেই বসবাস করতে চায়। অথচ এটি ছিল আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজ ভিত্তিমূলক বক্তব্য – নাগরিক বৈষম্যহীন রিপাবলিক ধারণার বিরোধী। আসলে এটাই ছিল ইভানজেলিক-খ্রীশ্চান বুশের শর্টকাট পথ।
    আর এর ফলাফলে ও পরিণতিতে ঠিক এরই উল্টো প্রতিক্রিয়াই হল – এরই নাম বেড়ে চলা নানা ধরনের ইসলামিজম। ইসলামিজম তাই স্বভাবতই আমেরিকাকে পাল্টা বলছে, তারাও এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করে যেখানে কেবল মুসলমানরা আছে। কাজেই বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার আগে উচিত আমেরিকা খোদ নিজ-নীতির দিকে তাকানো। বাইরে বাঘ খুজার আগে নিজ মনে যে বাঘের ভয় ও সীমাহীন ঘৃণা-বিদ্বেষ তাঁরা জন্ম দিয়েছিল এর পরিণতি তো এমনই হবার কথা!  সবার আগে নিজ ভুলগুলো তাদের বুঝতে হবে। বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে আমরা কামনা করব, আগে আমেরিকা নিজেই আত্মসমালোচনার যোগ্য হয়ে উঠুক। তবেই হয়ত তার চরম ইসলামবিদ্বেষ ভালো হয়ে যাক: তাহলেই তো হয়। কিন্তু সে কথা বলার মুরোদ কি অনেকেরই হবে? সন্দেহ আছে!

    ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপনের অভিযোগঃ
    ৯/১১ এ আলকায়েদা আমেরিকা-রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের উপরই কোন সশস্ত্র হামলার শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা সর্বোচ্চ শাস্তি।  লিগাল পয়েন্টে এই শাস্তি নিয়ে তর্কের কিছু নাই। কিন্তু সাবধান। আপনি যদি বলেন ঠিক আক্রমণকারী এখানে অপরাধী না।  ইসলাম এখানে অপরাধী? অর্থাৎ অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় তুলে আপনি প্রপাগান্ডা বিদ্বেষ তৈরির এক আসর চাইতেছেন। এবার আপনি তাহলে ইসলামবিদ্বেষ করলেন। অর্থাৎ আমেরিকান রাষ্ট্রের যা করা উচিত না, করণীয় ছিল না তাই করা হয়েছে এখানে।
    যেমন আলী রীয়াজ আরো লিখেছেন, “ইসলাম ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপন করে শাসনের হাতিয়ারে” পরিণত করেছে। সার কথায় তিনি বলতে চাচ্ছেন, “ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ” বলে ব্যবহার করা যাবে না। কেন যাবে না?  কোন কথিত সেকুলারিজম এটা না করতে চায়?  কিন্তু এ’ব্যাপারে আমাদের সবার পথ প্রদর্শক কি সাবেক মার্কিন  প্রেসিডেন্ট খোদ বুশ (জুনিয়র) নন? তিনি কি নাইন-ইলেভেনের দিনেই হামলার কয়েকঘন্টা পরে তাঁর প্রথম টেলিভিশনে হাজির হওয়ার বক্তব্যে আমাদের ইভানজেলিক খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডের হুমকি, আর আবার ক্রুসেড লড়ার হুমকি শোনাননি?  তাহলে ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ হিসাবে ব্যবহারের দায়ে  রিয়াজ ঠিক কাকে এ জন্য অভিযুক্ত করতে চান? আমরা জানি না। আগে রিয়াজের এটা আমাদেরকে জানানো উচিত!
    তবে এগুলো অবশ্যই এর বাইরের দিক। ভেতরের কথা হল, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না – এটা বাস্তবত এক অলীক কল্পনা। অবশ্যই ধর্মতত্ত্ব (Theology) আর রাজনীতি আলাদা বিষয়। বিশেষ করে দুটোর ভাষাই তো আলাদা। এমনকি প্রেজেন্টেশন ও বলার স্টাইল এবং পূর্ব-অনুমানগুলোতে তারা একেবারেই আলাদা। কিন্তু আবার এমন ঘোরতর মিলও আছে যে আলাদা করাই মুশকিল। যেমন আপনি আজ বলছেন, ধরা যাক, আপনার পার্টির কোন এক রাজনৈতিক ‘রেজুলেশনের’ [resolution বা সিদ্ধান্ত প্রস্তাব] কথা। তাতে মনে হতে পারে, আপনি বিরাট জ্ঞানী রাজনীতিক রাজনীতির আলাপ করছেন। কিন্তু তলায় হাত দেন। পারবেন? মুরোদ থাকলে প্রশ্ন করেন এই ‘রেজুলেশন’ শব্দটি কই পাইলেন? এই শব্দটা শতভাগই এক ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ ও ধারণা যার অর্থ খ্রিশ্চীয় বছর শুরুর প্রথম দিনে খ্রিশ্চীয় মানুষ নতুন বছরে কী কী করবে বলে তাঁর গডের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, এটাই তাঁর নতুন বছরের ‘রেজুলেশন’ বলে। ঐ দিন শেষে তাঁরা একে অপরের কাছে তার তার রেজুলেশন কী, জানতে চাইবে, ‘উইশ’ করবে ইত্যাদি। তাহলে এখন বলেন রেজুলেশন কী রাজনীতির না ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ?
    সারা দুনিয়াতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস বা এর চিহ্ন পাওয়া অনুসারে, এটা সর্বোচ্চ ছয় হাজার বছরের পুরানা মনে করা হয়। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি চিহ্ন পাওয়া যায় এই বিচারে তা তিন হাজার বছরের পুরানা। এই তিন হাজার বছরের প্রায় পুরাটা সময় কোন না কোন বা একটা না একটা “ধর্মতত্ব” তাঁর সাথে ছিল, মানুষকে সাথে নিয়ে যে পথ হেঁটে চলছে। আর এসবের বিপরীতে মাত্র দেড় হাজার বছর আগের এক নতুন ফেনোমেনা হল – দুনিয়াতে ধর্মতত্ব বা এর প্রভাব বলে কিছুই নাই, না চাইকি ধর্মতত্ব বলেই কিছু নাই এমন ধরে নেয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে দুনিয়ার সব ফেনোমেনাকে দেখার পদ্ধতির নাম হল বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির এনলাইটেনমেন্ট। অর্থাৎ সোজা বললে,  দুনিয়ার যেন সব ঘটনা-ফেনোমেনাই ফিজিক্যাল, এই অনুমান। মানে স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা বলে কিছুই নাই। আবার এর ফলাফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই খুবই ভাল। তা হওয়ারই কথা।  বিশেষত যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝবার ক্ষেত্রে এর উপর থিওলজির কোন প্রভাব নাই বলে এটা নাই তা ধরে নিতেই পারি। তাতে সুত্রে কোন হেরফের আসে না।  কিন্তু সাবধান যেখানে রক্তমাংসের মানুষের জীবন জড়িয়ে  আছে বা থাকে সেসব ক্ষেত্রে সেখানে বিজ্ঞান বা র‍্যাশনাল চিন্তার পদ্ধতি যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে না। এছাড়া থিওলজি এখনও তার মত করেই প্রভাব ফেলে থাকে।মানুষের চিন্তা বিষয়ক সব শব্দের আদিতে ধর্মতত্বের গর্ভ থেকে উতসারিত।

    তাই মূলকথাটা হল, মানুষের চিন্তায় বিশেষত যেসব শব্দ সে  ব্যবহার ও ধারণ করে এমন প্রতিটা শব্দের উতপত্তি ধর্মতত্বের হাতে ও ঘরে।  যদিও শব্দের উতস বা রূট ধর্মতত্বের তা হলেও সেসবের অর্থ অবশ্যই বদলে যেতে পারে, বদলে নিতেই পারি। secularize বা ধর্মতত্বীয় আগ্রহের বাইরের  সিভিল লাইভে ব্যবহার ধরণের এর অর্থ করে নিতেই পারি।
    দুনিয়াতে শব্দের অর্থের বিবর্তন হয়, নতুন অর্থে পুরনো শব্দের ব্যবহার দেখা যায় যদিও শব্দের রুট একই থাকে। যে ডিকশনারি শব্দের রূটের হদিস দিতে পারে না সেটা ভাল ডিকশনারি নয় বলে মানা হয়। অতএব, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির বন্ধন ও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তা হলে ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো পাকা দেয়াল তোলাও অসম্ভব। যদিও আবার বলছি ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির ভাষ্য ও প্রেজেন্টেশন আলাদা, বলার ঢঙ, গদ্যরূপ আলাদা; উদ্দেশ্যও আলাদা। সেটাও মেনে চলা উচিত।

    অতএব সাবধান। বুঝহ সুজন! আর মূলকথা, অমন সেকুলারিজমকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও আমাদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • হাত ধুয়ে ফেলাটা মাইলামের পক্ষেও যাবে না

     হাত ধুয়ে ফেলাটা মাইলামের পক্ষেও যাবে না

    গৌতম দাস

    ২২ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ss

    Ambassador William B Milam, wilson center

    উইলিয়াম ব্রায়ান্ট মাইলাম, একজন আমেরিকান ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট।  আনুষ্ঠানিক অবসর নিয়েছেন জুলাই ২০০১ সালে। তবে এরপরও মাঝে মধ্যে ছোট ছোট এসাইনমেন্টে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীনে স্বল্প সময়ের খুবই অস্থায়ী রাষ্ট্রদূত বা বিশেষ দূত ধরনের চুক্তিতে নিয়োগ নিয়েছেন। তবে এখন সেসবও ছেড়ে পুরোপুরিভাবে ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো বা সিনিয়র পলিসি স্কলার।  তিনি এককালে বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে আমেরিকান এম্বাসাডার ছিলেন। তবে বাংলাদেশে তাঁর আরো বিশেষ পরিচয় আছে। প্রশাসনে বৈধভাবেই লবি করার দেশ আমেরিকা; সেখানে আমেরিকান প্রশাসনে বাংলাদেশের রাজনীতিকদের নানান স্বার্থ নিয়ে যারা কোনো লবি করতে চান বা করেছেন, তাদের চোখে মাইলাম একজন ভাল প্রভাবশালী ওজনদার ব্যক্তিত্ব, যিনি পলিটিক্যাল ক্লায়েন্টকে ‘অনেক দূর’ পৌঁছে দিতে পারেন। অনুমান করা হয়, তার এমন পরিচয় তৈরি হয়ে যাওয়ার পেছনে দুটা মূল ঘটনা আছে।

    কথিত ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ যুগের শুরুর কালেঃ
    এরশাদ যুগের পরে গত ১৯৯১ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক “নবজন্মের কাল” বলে খামোখা উচ্ছ্বাস দেখানোর চেষ্টা করতে অনেককে দেখা যায়। সেটা এমন এক অর্থে যেন তা ছিল এরশাদের পতনের পরের কথিত ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ যুগের শুরু। বলা বাহুল্য, এটি অতি-আবেগি বাস্তবতাশূন্য ও নিজেকে খামোখা বড় দেখানো এক দাবি মাত্র। আসলে এটার সাথে বুদ্ধি-বিবেচনাহীন আরেক প্রবল আবেগ ঐ সময় কাজ করত যাতে বলা হয়ে থাকে যে, এতে “স্বৈরাচার পতন ঘটিয়ে” নির্বাচিত সরকারের যুগের পথের সূচনা হয়েছিল। এখানে ‘স্বৈরাচার পতন’ বলে গলা কাঁপানো হয়েছে, অথচ আমাদের কনস্টিটিউশন আগেরটাই আছে, বরং সেই থেকে একে ক্রমশঃ আরো এমন ‘দানব’ করে নেয়া হয়েছে যে, একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করার মুরোদও এর নেই। এ ছাড়া আবার চলতি সরকার মনে করছে, বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য কোনো নির্বাচন আয়োজন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ না; তা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। বরং মুজিব হত্যার বিচার ও বাংলাদেশের ৫০ বছরপূর্তিতে তার নাম উজ্জ্বল করে সর্বত্র তা লিখে দিলে এটাই হবে “দেশ ও জনগণের জন্য” বড় অর্জন। নিশ্চয় আজকের এই বাংলাদেশকে দেখার পর পুরনো সেসব উচ্ছ্বাস জ্ঞাপনকারী লোকজনের এখনো কিছু লজ্জা জীবিত থাকলে তাতে তারা নিজেকেই আসলে মূল্যায়ন কিভাবে করেন তা আমরা দেখতে চাইতে পারি।

    উইলিয়াম বি মাইলাম – তিনি বাংলাদেশের ঐ  ‘এরশাদ থেকে নির্বাচিত সরকার’ কথিত এই রাজনৈতিক ট্রানজিশনের কালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন আগস্ট ১৯৯০ থেকে অক্টোবর ১৯৯৩ পর্যন্ত, এই হলো প্রথম ঘটনাটা। এ ছাড়াও তার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ের পয়েন্ট আছে। সেটা হল, তাঁর রাষ্ট্রদূতের এসাইনমেন্টেরই আগে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট আরেক এসাইনমেন্টে ছিলেন তিনি।

    প্যারিস ক্লাবঃ
    যাদের জন্ম ১৯৮৫ সালের পরে তারা টার্মটা একাডেমিক পড়াশোনায় অতীতের ঘটনা-ফেনোমেনা হিসাবে শুনে থাকবেন হয়ত; তবে এই ‘সেকাল’ তাঁরা দেখেননি। এমন সেই শব্দটা হল, ‘প্যারিস ক্লাব’ [Paris Club]। জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশ প্রতি বছরের রাষ্ট্রীয় বাজেট নিজেই নিজ-রাজস্ব সংগ্রহ করে বাজেট-প্রণয়ন করতে পারতাম না। কারণ রাষ্ট্র-সরকারের রাজস্ব ও অন্যান্য আয় ছিল খুবই কম, ফলে এডিপি [এনুয়াল ডেভেলবমেন্ট প্রোগ্রাম]) বা উন্নয়ন বা বিনিয়োগ ব্যয়ও ছোট রাখতে হত। আবার যত কম উন্নয়ন ব্যয় ততই পরের বছর আরো কম রাজস্ব আয় – এমনই এক চক্রের মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়া ঘটছিল আমাদের। এমন চক্রে পড়ে যাবার পিছনে  একেবারে মূল কারণ হল, অবকাঠামো খাতে ব্যয়-বিনিয়ো্গের অক্ষমতা; সেটা বাইরে থেকে বা দেশের ভিতর থেকে সংগ্রহ করে আনা বা জোগাড়ের অক্ষমতা। তবে কলোনি আমল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্বৃত্ব পাচার বা লুট হয়ে যাবার ধারা ত সবসময় ছিলই; যেটা আসলে সব কারণের উতস। সবমিলিয়ে  আমাদের রাজস্ব সংগ্রহ আর জনগণের ট্যাক্স দেয়ার ক্ষমতাও এতই কম ছিল যে এর থেকে সরকার চালানোর খরচ ও ব্যয়নির্বাহের দায় মানে যা প্রয়োজন আর পকেটে যা আছে – এদুইয়ের মধ্যে ঘাটতি ও ভারসাম্যহীনতাতেই আমাদের দিন যেত। এ ছাড়া সরকারের প্রশাসনিক অদক্ষতায় অপচয়ও ছিল সীমাহীন; তাই সেটাও আরেক বাধা। আবার স্বাধীনতার পর কলকারখানার ব্যাপক সরকারিকরণ তাতে সে কারখানা উতপাদন চালু থাকুক আর নাই, লাভ হোক আর নাই হোক কিছু এসে যায় নাই ফারাক নাই – কিন্তু প্রতিবছর এর বেতন-ভাতা, দুর্নীতি ও অপচয় যোগানোর দায়, এই ব্যয়ের অর্থযোগাড় বাজেটকে অসম্ভব করে তুলছিল। ফলে বাস্তবত প্রথমে কিছু বিদেশী অনুদান আর পরে বিদেশি অবকাঠামো ঋণ-বিনিয়োগ প্রাপ্তি ছিল আমাদের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটানোর একমাত্র উপায়।

    “কমিউনিস্ট গোঁয়ার্তুমির”  খেসারত কী দিয়ে বাংলাদেশে তা শেষ হয়েছিলঃ
    কিন্তু এখানে খুব স্বল্প পরিসরে থেকে একটা কথা বলে নেই। বিদেশী ঋণ ও অনুদানে বাজেট তৈরির এই যে বিশেষ রকম ও বাস্তবতা, এটাই শেখ মুজিবের শাসনের সাড়ে তিন বছর আর তাঁর মৃত্যুর পরের বাংলাদেশের প্রধান ফারাক। সেটা কেমন?  আগেরটা মানে একাত্তরের স্বাধীনতার পর থেকেই বিদেশী অনুদান ও ঋণ নিব না বলে বুঝি-না-বুঝি এক “কমিউনিস্ট গোঁয়ার্তুমি” করে চলা এটাই ছিল তাজউদ্দীনের অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট। এতেই অর্থনীতি ‘ডুবছিল’ আর একসময়ে দেখা গিয়েছিল ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ের দুর্ভিক্ষ। কোন ফরেন রিজার্ভ নাই। আর এখান থেকেই ক্ষুব্ধ মুজিবের সব কিছু নিজ একক কর্তৃত্বে নেয়া, তাজউদ্দীনকে বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা ঢেলে সাজানো আর শেষে ঐ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠক এটেন্ড করার উসিলায় ওয়াশিংটনে সফর, কিসিঞ্জারের সাথে সাক্ষাৎ, ‘বটমলেস বাস্কেট কেস’ বলে মন্তব্য শোনা এবং বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাওয়ার জন্য বন্দোবস্তের আবেদন ইত্যাদি সেরি তিনি ফিরেছিলেন। কারও উপর ভরসা না করতে পেরে ঐ “সব কিছু নিজ একক কর্তৃত্বে নেয়া” এরই বাইরের দিকটা থেকে দেখানোর নাম ছিল তিনি “বাকশাল গঠন” করেছেন বা তিনি “সমাজতন্ত্রের পথে” রওনা।  আমাদের ক্ষতের দিক আমরা ঢেকে রাখি, এটা দেখানোর কিছু নাই। আর এসব ঢাকাঢাকি করতে গিয়ে কতকিছুই না অর্থহীন কান্ড আমরা করি!  তাই, বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাওয়ার জন্য বন্দোবস্তের আবেদনকেই পরিচিত করিয়ে দিতে হয় “বাকশাল গঠন” বলে।  কিন্তু শেখ মুজিবের দুর্ভাগ্য হল তিনি পপুলার নেতা, যিনি ভুলের জন্য মাফ চেয়ে আবার পাবলিকের সামনে খাঁড়া হতে পারলে আবার তাদের সংগঠিত করে ফেলবার সম্ভাবনা – এমন নেতাদের বেলায় এমন সম্ভাব্য ক্ষমতা সব সময় থেকে যায়। সম্ভবত সে কারণেই বা যেকোন কারণেই হোক বেঁচে থাকতে তিনি আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের নজর, পরামর্শ ও অনুদান-ঋণ পাওয়া প্রভৃতি দেখে যাবার সুযোগ পান নাই। মুজিবের ঐ আবেদন ও গ্রাউন্ড ওয়ার্কের নড়াচড়া আমরা পরে জিয়ার আমলের শুরু থেকেই পেতে শুরু করেছিলাম।

    তাহলে বাংলাদেশের জন্য ‘প্যারিস ক্লাব’ কী?
    তাহলে এর মধ্যে আবার ‘প্যারিস ক্লাব’ কী? এটা হল, বিদেশি অনুদান-ঋণ দাতাদের এক ইনফরমাল জমায়েত।  প্রতি বছর আমাদের বাজেটের আগে (এখনও রেওয়াজ অনুযায়ী আমাদের বাজেট পেশ করা হয় প্রতিবছর ১২ জুন।) এপ্রিল মাসে কেবল বাংলাদেশের জন্য আমেরিকাসহ পশ্চিমের দাতা দেশগুলোর এক সমন্বয় বৈঠক বসত, প্যারিসে। তাই ‘প্যারিস ক্লাব’ নামকরণ। এরই ব্যাকগ্রাউন্ড কর্তা থাকে স্থানীয়-বিশ্বব্যাংক। সরকারের অনুদান-ঋণ পাওয়ার অনুরোধে পেয়ে যারা অনেক আগে থেকেই সেগুলো বাছাইয়ের কাজ শুরু করে থাকে।  পরে সরকারের সাথেও বসে। আর ফাইনালি যেসব প্রকল্পগুলো নিবার পক্ষে সুপারিশ তৈরি করত যেমন, কী কী প্রজেক্ট সে অনুদানের জন্য বা ঋণের জন্য স্থানীয় বিশ্বব্যাংক অফিস প্রাক-অনুমোদন দিয়েছে সেসবের উপরে যাতে দাতারা ফান্ড দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (IDA) লোন ও অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থাটা কাজ করে এভাবে। আর ঐ প্যারিস বৈঠকে প্রাপ্ত ফান্ড অনুমোদন বা প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেই পরের জুন মাসে আমাদের বাজেট তৈরি হত। আমাদের আজ যা কিছু অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নতি এর সব সেখান থেকেই। তবে পরবর্তীকালে এরই এক পর্যায়ে এপ্রিলের বৈঠকটা ঢাকাতেই বসা শুরু হয়েছিল। এর মূল কারণ তত দিনে আমরা অনেক স্বাবলম্বী; ফলে লোন ও অনুদানের পরিমাণ কমে এসেছিল।  ফলে দাতাদের জন্যও ফান্ডের প্রতিশ্রুতি দিতে দাতাদেশের তেমন বড় কর্তা না হলেও চলে এমন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল আর এটাই মূল কারণ বলা যেতে পারে। আর সেটাই এখনও চলছে কিন্তু একেবারেই রুটিন, আমরা আরো অনেক স্বাবলম্বী বলে এখন দেখা যাচ্ছে। মধ্য আয়ের দেশের পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার অবস্থায় গেছি বলে গর্ব করতে দেখা যাচ্ছে।  আমরা গরীব ছিলাম বলে বিশ্বব্যাংকের খাতায় আইডিএ  ক্যাটাগরিতে ঋণের যোগ্য আমাদের এমন জায়গা হয়েছিল।  আইডিএ ক্যাটাগরি মানে একেবারেই স্বল্পসুদে মানে ০.৭৫% যা ঠিক সুদ নয় সার্ভিসচার্জ) ঋণ এবং এছাড়া  বিনাসুদে-বিনাফেরতে কিছু অনুদানও পাওয়া যেত। তবে এই জমানায় মধ্য আয়ের দেশ বলে দাবি – এমন করার জন্য বিশেষ কিছু  অনুদান ছাড়া, আগের আইডিএ ঋণ এখন প্রায় সব বন্ধ। আর লোনে সুদের হারও বেড়ে হয়েছে ২-৪ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু সেসবের সাথে আমাদের এখানের প্রসঙ্গ – মাইলামের কী সম্পর্ক?

    ডেপুটি এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইলামঃ
    গত ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগে, (১৯৮৫-৯০) উইলিয়াম মাইলাম তিনি টানা পাঁচ বছর ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের (১৯৮১-৮৯) ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, [Deputy Assistant Secretary of State for International Finance and Development.]। মানে যার দায়িত্ব ছিল বিদেশে আমেরিকার  দান-অনুদান দেয়া মানে “ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট” ডিপার্টমেন্ট দেখাশোনা করা। আর এই সূত্রে তিনি বাংলাদেশের জন্য ঐ ‘প্যারিস ক্লাবে’ দাতা আমেরিকার প্রতিনিধি হয়ে হাজির থাকতেন [He represented the United States at the Paris Club]।

    এদিকে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যা কিছু হয়েছে বা আরো হওয়ার সম্ভাবনা, ভাল-মন্দ মিশিয়ে এরই ভিত গড়া হিসেবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারটা (তাতে বহু বড় বড় ধরণের নেগেটিভ দিক আছে তা সত্ত্বেও) ঘটেছিল ঐ আশির দশকে ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল থেকে। সেকালে এর আনুষ্ঠানিক নাম ছিল, “স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম” বা [SAP] এবং যা প্রগতিশীলদের কাছে এক “স্যাটায়ারিক্যাল” শব্দও বটে।  বিগত ১৯৮৫ সালের পরের সেসব দিন থেকে মাইলাম বাংলাদেশের সাথে একারণে অনেকভাবে জড়িত হয়ে যান। বিশেষ করে পরে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার আমলে প্রথম তিন বছর মাইলাম এ’দেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বলে নিয়োগ পাওয়ায় সম্ভবত বিএনপির নেতাদের সাথে ব্যক্তি-সম্পর্ক অন্য সবার চেয়ে বেশি হওয়াতে, এমনটা মনে করা হয়। উইলিয়াম বি মাইলামের সাথে বাংলাদেশে পরিচয় ও সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানেই শেষ করব আমরা।

    সম্প্রতিকালের উইলিয়াম বি মাইলামঃ
    আগেই বলেছি সেই উইলিয়াম বি মাইলাম এখন ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো। গত মাসের ১৭ ফেব্রুয়ারি মাইলামের এক রচনা-মন্তব্য অনেক মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম ‘পলিটিক্যাল হিপোক্রাসি নোজ নো বাউন্ড অর বর্ডারস’ [Political hypocrisy knows no bounds or borders]। নিজ দায়িত্বে এর একটি ভাব-বাংলা করলে দাঁড়ায়, “রাজনৈতিক ভণ্ডামির কোনো সীমা বা সীমান্ত থাকে না”।
    অনেক কিছুই সীমাহীন হতে দেখা যায়। যেমন, অমুক ফ্যানক্লাব অমুকের সীমাহীন সমর্থক; এমন হতেই পারে। কিন্তু মাইলাম বলছেন, শুধু সীমা না। ‘সীমান্তও’ থাকে না। কেন? কারণ তিনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান আর আমেরিকান কিছু সিনেটরের সাম্প্রতিক আচরণ-বক্তব্যকে তুলনা করছিলেন। তুলনা করছিলেন দুটাই তাঁর চোখে “রাজনৈতিক ভন্ডামি” সমতুল্য উদাহরণ বলে। এবছরের শুরুতে ট্রাম্পের টার্ম শেষের পরে, তাঁকে নিয়ে “সিনেট ইমপিচমেন্ট” বা (দোষী ঠাউরানোর প্রক্রিয়া) শুরু হয়েছিল। আর সেখানে কিছু সিনেটর-পলিটিশিয়ানের তিনি তুলনা করছিলেন। মাইলাম ঐ রচনায় বলছিলেন, আমেরিকান কোন এক জার্নালে ঢাকার ডেইলি স্টারের একটা খবর কোট করা হয়েছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন বলে লেখা হয়েছিল যে, “আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার জন্য গণতন্ত্রে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অবশ্যই থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান সংসদের বিরোধী দলগুলো উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কাঙ্খিত স্তরে অর্জন করতে পারেনি।’ [……The Daily Star, that I saw the article in which Sheikh Hasina is quoted as saying, “[F]or a democracy, a strong opposition party is a must as we want our democratic trend to continue.” She went on to say, according to the article, “The present opposition parties in Parliament could not attain the confidence and trust of the people at the desired level due to lack of leadership.”]। আমেরিকান সিনেটের কিছু সদস্যের ট্রাম্পের ইম্পিচমেন্টকে বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়ার সময়ে দেয়া বক্তৃতার সাথে হাসিনার এই মন্তব্যকে তুলনা করেছিলেন মাইলাম। আর তাতে এসবকে “সীমা ও সীমানা” অতিক্রম করে যাওয়া দুই ‘ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখাচ্ছিলেন মাইলাম।

    আমরা মাইলামের ঐ লেখার আরও ডিটেলের দিকে আর আগাচ্ছি না। তবে মাইলাম তার এ রচনায় যা সিদ্ধান্ত টেনেছেন যেটা তার রচনার শুরুতে শিরোনামের নিচে সারসংক্ষেপ হিসেবে দেয়া আছে, সেটাতে চলে যাবো। কারণ সেটিই আমাদের প্রসঙ্গ। মাইলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র ব্যর্থতায় ডুবে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাই দায়ী যদিও, বিরোধী দলের ওপরও কিছুটা দায় বর্তায়।’  [Awami League and Sheikh Hasina are responsible for the failure of democracy in Bangladesh, but the opposing party also bears some responsibility, writes William Milam]   তাই কী? বাংলাদেশের দুর্দশায় বিদেশি বন্ধুদের কোনো দায় নেই?

    উড্রো-উইলসন সেন্টারের দুই ফেলোঃ
    মাইলামের মত আরেক বাংলাদেশী-অরিজিন স্কলার ড. আলী রিয়াজ; তিনিও ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ থিংকট্যাংকের ফেলো। তবে বর্তমানে রিয়াজ নিয়োগকর্তা বদলে নিয়ে ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’ [The Atlantic Council ] নামে আরেক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। আর গত ১৮ মার্চ থেকে আলী রিয়াজ চার পর্বের এক মতামত-কলাম যৌথ নামে ঢাকার প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে। সেই লেখার প্রথমপর্বটাই যার শিরোনাম “ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ” – এটাই যেন একটি সাক্ষ্য দলিল। সেখানে তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, বুশ প্রশাসন একান্তই নিজের সঙ্কীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে কিভাবে ও কেন বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করে ১/১১-এ ক্ষমতা নিয়ে ছিল আর ভারতের হাতে তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বেচে দিয়েছিল। এনিয়ে তাঁর লেখার কিছু অংশ এখানে নিচের প্যারায় তুলে এনেছি যেটা, প্রেসিডেন্ট বুশের বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ সম্পর্কে আলী রিয়াজের এক সাক্ষ্য-ভাষ্য হিসাবেও অবশ্যই তা পাঠ করা যায়।

    আলী রিয়াজ লিখছেন,
    “নাইন-ইলেভেনের হামলার পর মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। নিরাপত্তার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া এবং বুশ প্রশাসনের কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ বিবেচনা থেকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয় নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখে এসেছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে, এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়।’

    এ প্যারাটা আসলে শত কথার বদলে মাত্র কয়েকটা কথা। প্রথমত, রিয়াজ সাক্ষ্য দিচ্ছেন তার কথায়,  “আমেরিকা ভারতের স্বার্থের চোখে বাংলাদেশকে দেখেছিল”। কিন্তু কেন? এর জবাব পরের বাক্যে। বলেছেন, “আমেরিকা এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য নিশ্চিত করতে চায়”। মানে শুধু দেখা নয়, আমেরিকা ভারতের আধিপত্যই একেবারে নিশ্চিত করতে চায়। সেটাও বা আবার কেন? কারণ আমেরিকা “পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। মানে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে এটা ঠেকাতে আমেরিকা  “চায়না কনটেইনমেন্ট”[China Containment] বা চীন ঠেকানো করতে চায়। যদিও এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা আদৌ ঠেকানো যায় না, সেই চেষ্টা করা বৃথা ও অকার্যকর হবে এবং হচ্ছে তা জানা সত্ত্বেও।

    অর্থাৎ আমরা দেখছি আলী রিয়াজ ক্লিয়ার ও ক্যানডিড হয়েই কথা ‘তিনটি’ বলেছেন। যার কোনো দুই রকমের মানে নেই। এর ভেতরে এশিয়ায় চীনের বদলে ভারতীয় আধিপত্য ছেয়ে ফেলা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা – এ স্বীকারোক্তির মধ্যে রিয়াজ কোনো সমস্যা মনে করেছেন বা অন্যায় দেখেছেন, তা মনে হয়নি। স্বাভাবিক হিসাবেই দেখেছেন। অথচ এরপরেও আবার ভারতকেই দায়ী করে বলেছেন, “প্রায় এক দশক ধরে ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে”। যে আমেরিকা ভারতকে দানব বানালো এখন সেই ভারত কেন বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার  আনলো এর জন্য আমেরিকাকে না ভারতকেই দায়ী করছেন আলী রিয়াজ।

    আমরা তা হলে দুই থিংকট্যাংক ফেলোর বক্তব্য জানলাম। রিয়াজ আমাদের পরিষ্কার সাক্ষ্য দিয়ে জানাচ্ছেন বুশের আমল থেকেই আমেরিকান প্রশাসনগুলোর বাংলাদেশে ঢুকে পড়া ও হস্তক্ষেপগুলো কত গভীরে ছিল। এছাড়া দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়া বলে আসলে কিছু ছিল। ছিল এর আড়ালে বাংলাদেশ দখল করে নেয়া ও ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।

    তা হলে দেখা যাচ্ছে আলী রিয়াজ আমেরিকান সব হস্তক্ষেপ স্বীকার করে নিলেও আজকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশাগুলোর জন্য মানুষের যে সাফোকেশন, শ্বাস নিতে পারছে না দশা এ জন্য মাইলাম আমাদের সরকার আর বিরোধী দলকেই পুরো দায়ে দায়ী করছেন। এভাবে মাইলাম নিজের দেশ আমেরিকার প্রশাসনের হাত ধুয়ে ফেললেন; এটি কী ঠিক হল? না এটা বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবে? এ নিয়ে তার ব্যাখ্যা দেয়া উচিত। নিজ দল-গোষ্ঠীর কাজের দায় অস্বীকার করা কোনো কাজের কথা নয়। ভুল মনে করলে তা স্বীকারের সৎসাহস দেখানোই আমরা আশা করব। স্টার্টার হিসেবেও এসব খুবই অখাদ্য! একাজ তাঁকেও কোন সুবিধা দিবে না। বরং  মানুষ হিসাবেও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২০ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মাইলামের হাত ধুয়ে ফেলা অগ্রহণযোগ্য” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায় এবং তাই এখানে করেছি।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বুড়া সিংহ আমেরিকার বাংলাদেশের কাছে বাসনা

    বুড়া সিংহ আমেরিকার বাংলাদেশের কাছে বাসনা

    গৌতম দাস

    ১৯ মার্চ ২০২১ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-3rg

    ডঃ আলী রিয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রথম আলোতে কলাম লিখেন। তিনি সম্প্রতি যৌথ নামে  নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক সাইমুম পারভেজ এর সাথে মিলে এক মতামত ছেপেছেন।  সেই আর্টিকেলের নাম …”ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ”। বলা হয়েছে এটা নাকি চার পর্বের এক রচনা যার প্রথম পর্ব এটা। এর আগে কখনও প্রথম আলোতে তাঁর যৌথ নামের লেখা চোখে পড়ে নাই। কিন্তু কোন যৌথ নামের লেখা মানে ঐ লেখায় প্রকাশিত অবস্থান নিশ্চয় লেখকদ্বয়েরই, এই বলেই পাঠক বুঝবে ও ধরে নিবে। আমরাও তা ধরে নিয়েই  কিছু কথা বলব।

    প্রথমত, ঐ লেখায় এমন কিছু প্রসঙ্গ ও সে প্রসঙ্গে আলী রিয়াজদের বক্তব্য আছে তা দেখে মনে হয়েছে – গত ১৪ বছরের বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্তত আলী রিয়াজের যা মূল্যায়ন ও অবস্থান ছিল (যা আমাদের অনেকেরই পছন্দের অথবা অপছন্দের যাই হোক না কেন) এটা তা থেকে পরিবর্তিত কিন্তু নতুন উপলব্দ একটা পরিস্থিতিতে এসে এবার আলী রিয়াজ নতুন করে কিছু কথা বলছেন। এখন এটা কতটা নতুন আদৌ নতুন কিনা আবার সে সম্পর্কে কর্তা ও বক্তা কতটা অবগত তা নিয়ে মতান্তর থাকতে বা হতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে এটা নতুন অবস্থান। এবং কয়েকটা জায়গায় ১৪ বছর আগের কথার দায় পুরা অস্বীকার করে বিপরীত অবস্থানও আছে।  বিশেষ করে এই লেখার শেষ দুই বাক্য নিজেই নিজ আগের সব অবস্থানেরই বিরোধী। সেটা এরকমঃ

    “কিন্তু এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক নয়। তার বদলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া।”

    বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নষ্ট করেছে। এছাড়া এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আমাদের কেন আগ্রহ হবে, কী লাভ করার জন্য? আবার চীনের প্রভাব কমাতে হবে কেন? সেটাই বা কী পাবার জন্য? এসবের কোন হদিস তিনি দেন নাই।   অথচ  এটাই আমেরিকার স্বার্থ হয়তবা। আর আলী রিয়াজ ধরে নিয়েছেন যে বাংলাদেশ যেন  এটাকেই নিজের স্বার্থ মনে করবেই! নাকি করতেই হবে? ঠিক জানা যায় নাই। আমেরিকা পরাশক্তি হয়ত কিন্তু বুড়া বাঘ আসলে! কিন্তু চীনের প্রভাব কমাতে  হবে এটা না পাবলিক ডিম্যান্ড না সরকারের!

    মানুষ বা দেশ-রাষ্ট্র এসব কিছুরই স্বার্থ বদলে যেতে পারে, ফলে তা থেকে সব কিছুর অবস্থান, সবই বদলাতেই পারে। আবার বদল মানেই তা খারাপ তা নয়, আবার তা ভাল হবেই তাও নয়।  তবে বদলের ভাল-মন্দ নিয়ে পর্যালোচনা মূল্যায়ন তো অবশ্যই হবে।  তবু সবার চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, বক্তা এটাকে বদল বলে স্বীকার করছেন, নাকি অস্বীকার করে বদলে যেতে চাচ্ছেন – সেদিকটা।  তাঁর স্বীকার করা বা না-করাটা এথিক্যাল চোখে এখানে আমরা দেখব না।  তবে কেউ অস্বীকার করতে চাইলে কোন্ অসুবিধার কথা ভেবে কেউ তা স্বীকার করতে চাচ্ছেন না সেটা জেনে রাখা জরুরি। তবে কিছু তামাসার দিকও এসব ক্ষেত্রে থাকতে পারে। যেমন অনেক সময় বদলের মানে হয় আগের “গাধামি অবস্থানকে” পরোক্ষে স্বীকার করে নিয়ে হলেও নিজেকে বদলে নেয়া।  আমরা সেসব দেখব। কথাগুলো একটা তালিকা করে করে আগানো যাক যে কী কী বদল আমরা দেখছিঃ

    ১। ………”বুশ প্রশাসনের তথাকথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের” বিবেচনা থেকে”………

    এটা দেখতেও বেশ তামাসার যে আলী রিয়াজ লিখছেন তথাকথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”।  মানে এটা “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বলা হলেও তা ছিল না – তিনি তাই বলছেন। বুশের এই সিগনেচার শ্লোগান, এই ক্যাম্পেইনকে নিয়ে  আলী রিয়াজ এর আগে কখনও আপত্তি-মতান্তর অবস্থান দেখিয়েছেন জানা যায় না। বরং  কোন আমেরিকান “থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো” হিসাবে কারও এমন প্রকাশ্য ভিন্ন মূল্যায়ন নজরে আসে নাই।  আমেরিকান “থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো” হিসাবে আলী রিয়াজের নিয়োগ ২০০৭ সালের আগে-পিছের  আমাদের মিলিটারি টেকওভার মানে ১/১১ এর সময়ের, যতটুকু মনে পড়ে। অন্তত যখন থেকে আমরা আমেরিকার বাংলাদেশ সম্পর্কিত পলিসি মেকিং করিডোরে তাঁকে “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” হিসাবে দৃশ্যমান দেখছি। অর্থাৎ সেটা তখনও বুশ প্রশাসনের সেকেন্ড টার্ম চলছিল। কাজেই “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের” তখনও বর্তমান আর সেই পটভুমিতেই তিনি  “থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো” হিসাবে সম্পর্কিত হয়েছিলেন।  পরে অবশ্য ওবামা আমলে এই শ্লোগান শুধরে নেওয়ার সুযোগ নিয়ে তবে বিনা ঘোষণায় ওবামা ধীরে ধীরে এটা ফেস-আউট করে দেন। কিন্তু আভ্যন্তরীণ পলিসিতে “সন্ত্রাসের যুদ্ধ” সেটা একইভাবে চলমান ছিল। কেবল জাতিবাদী পাগলা ট্রাম্পের আমলে এসে, খরচ কমানোর জিদে তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে আমরা বলতে শুনেছিলেন টেররিজম তাঁর নীতিতে সেকেন্ডারি।  তাহলে আলী রিয়াজ এখন “তথাকথিত” বলা মানে, এই বিশেষণ ব্যবহার করা শুরু করেছেন। নট ব্যাড, তাঁকে স্বাগত। কিন্তু কবে থেকে এবং কী বিবেচনায় সেটা তা জানবার কৌতুহল নিবারণ হল না, থেকেই গেল। আর সেটা না জানা পর্যন্ত এটা কী জেনুইন বা কেমন স্থায়ী অবস্থান কীনা সন্দেহ থেকে গেল। কারণ, “তথাকথিত” বলা মানে আমেরিকার অন্তত চার টার্মের প্রশাসনের কোর নীতির বিরোধিতা ও সমালোচক অবস্থান। অথচ তিনি তো পরামর্শক! তাই কতটা মানানসই? কোণা থেকে সে প্রশ্ন উঠতে পারে!

    ২। ……”জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখে এসেছে।………

    অবিশ্বাস্য!  এটা সত্যই অবিশ্বাস্য যে এটা তাঁর কথা।  বরং একথাটাই আমরা বলে এসেছি যে থিঙ্কট্যাংক “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের” ডাকা সভা-সেমিনারে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্ডার সেক্রেটারির উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত উঠে এসেছিল। ২০০৭ সালের মে-জুন মাসের দিকের ঘটনা এটা। আর এর কোট-আনকোট ভাষাটা সেটা ঐ সভারই রেজুলেশন ছিল।  এছাড়া, ওদিকে  আমেরিকান কোন প্রশাসনিক কর্তা বা যারা দেশি-বিদেশি বাংলাদেশ-কনসাল্টেন্ট বা এক্সপার্ট তারাও এটা কখনও স্বীকার করেন নাই, কোন লিখিত রচনায় এসব কথা রেফার বা শেয়ার করেন নাই। পবিত্র রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা(?) হবে হয়ত!  তবে  বাংলাদেশি অনেক স্টুডেন্ট একাদেমিককে ক্ষুব্ধ হতে দেখেছি তারা জানিয়েছেন এক বাংলাদেশ এক্সপার্ট এটার অস্তিত্বই ঝেড়ে অস্বীকার করেছেন। এমন সিদ্ধান্তের কোন কথা তাঁর নলেজে নাই – এটা জানিয়েছেন।  সেই থেকে ব্যাপারটা বেমালুম হাওয়া, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলেই একেবারে লুকিয়ে মুখবন্ধ করে ফেলেছিলেন। অথচ সবাই জানতেন ঠিক কী হয়েছে। কারণ,  ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখা বলে যা বলা হয়েছে বা বাইরে এসেছে তা খুবই নগন্য অংশমাত্র। আর এর পিছনে বাস্তবে এর আরও ভয়াবহ দিক আছে।  সেটা হল এটাই ছিল পুরা বাংলাদেশকেই  ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার আমেরিকান সিদ্ধান্ত।  যে কারণে বেপরোয়া হয়ে  ভারতের এমন লাভালাভ হাসিলের মহানায়ক প্রণব মুখার্জি এই ক্রেডিট নিবার লোভ সামলাতে না পেরে অবলীলায় নিজেই বইয়ে লিখছেন তিনিই ছিলেন, হাসিনা আর মঈনের মধ্যস্থতাকারি গ্যারান্টার।
    এটা কেবলমাত্র একালে প্রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় পরে আমরা  গত বছর ২০২০ অক্টোবরে দেখছিলাম, যখন আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, বাংলাদেশ সরকার মানে মন্ত্রী মোমেন সাংবাদিকদের দিয়ে কথাটা তুলিয়ে  এরপর নিজেই সাফাই দিয়ে বলতে থাকেন, “দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে না যুক্তরাষ্ট্র”।  আসলে মোমেন বলতে চাইছিলেন ও বলেছেনও অন্যকিছু। তিনি স্টেফান বিগানকে একথাটাই বলেন যে, তোমাদের সাথে আগের যে সম্পর্ক ছিল, যেভাবে হাসিনা সরকার ছিল আমেরিকার তৈরি, ভারতের হাতে তুলে দেয়া সরকার – সেটা নাই। “ওদিন গয়া”। এখন হাসিনা সরকার আমেরিকার তো নয়ই; এছাড়া নতুন করে কতটুকু ভারতের আর কতটুকু  নিজেকে ক্ষমতায় রাখতে চাইলে চীনের হওয়া দরকার; সেই ভারসাম্যটাও হাসিনাই নির্ধারণ করেছেন। মূলকথা সেই ২০১১ সালের পর থেকেই হাসিনার উপর আমেরিকার প্রভাব-ক্ষমতা শুণ্য হয়েছিল।  নিজ পাপের শাস্তি আমেরিকা এভাবেই পাওয়া শুরু করেছিল। তাহলে এতদিনে হলেও আলী রিয়াজ নিজেই বুশ যে নিজেই বাংলাদেশকে বেচে দিয়েছিল সেই কাজের  স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন। কেন? এর একটা কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন। নিচে দেখেন।

    ৩। ……“এর পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে, এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়।”

    কী সাংঘাতিক, এক ভয়ংকর কথা! আলী রিয়াজ অবলীলায় বলছেন।  তিনি স্বাক্ষ্য দিয়ে বলছেন একথা যে ভারতীয় আধিপত্য আমেরিকার কাছে পছন্দের ও নিজস্বার্থের। তাই বুশ বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। ওদিকে চীন আমেরিকার শত্রু ও অপছন্দের এক বিরোধী শক্তি। কিন্তু শুধু একারণেই তাহলে বাংলাদেশকে বলি হয়ে যেতে হবে ও হয়েছে। এটাই আলী রিয়াজের স্বাক্ষ্য! অর্থাৎ এখানে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ অথবা নীতি বলে কিছু নাই। সবই নৃশংস রাষ্ট্রস্বার্থ। তাই যেন নৃশংসভাবেই আলী রিয়াজ এটা বলে যেতে পারছেন। কিন্তু দুটা প্রশ্নঃ
    ক) আপনি তো পরামর্শক, বাংলাদেশ এক্সপার্ট। তাহলে এই বাংলাদেশকে বেচে দেওয়ার ইস্যুতে আপনার পরামর্শ কী ছিল? সেই ডকুমেন্ট আমাদের না জানালে আমাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা জন্মানোর সম্ভাবনা দেখি না।
    খ) তাহলে, ২০০৭ সালের টেকওভার আর ২০০৯ সালের হাসিনা সরকার বসানো – সেসময় আমেরিকা এই ক্ষমতা বদলের উদ্দেশ্য জঙ্গিদমনের উপযোগী করে বাংলাদেশ সরকারকে সাজানো বলা হয়েছিল – সেগুলো সব তাহলে মিথ্যা কথা ছিল?

    আবার আলী রিয়াজকে একটা “থ্যাঙ্কস” দিতেই হয় আমেরিকার মারাত্মক সব খারাপ কাজগুলো স্বীকার করার জন্য। তিনি পরিস্কার করে শেষে লিখে দিয়েছেন “যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। তবে বাংলায় লেখেছেন বলে এর চেনা-প্রতীক হয়ে যাওয়া শব্দটা  “China Containment” বা এর বাংলা “চীন ঠেকানো” – এভাবে লিখেন নাই বলে অনেক চিনতে পারছেন না হয়ত। এই চীন ঠেকাতে চায় বলেই আমেরিকার উপহার হিসাবে বাংলাদেশকে ১/১১-এ দখল করে  ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল।

    ৪। ……”প্রায় এক দশক ধরে ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।”…

    কথা সত্য কিন্তু একথার দায় আমেরিকান  (বুশ থেকে এপর্যন্ত সকল) প্রশাসন ও তাঁর পরামর্শকদের সবার আগে নেয়া উচিত। এরপরেই কেবল আমরা কোন নাগরিক বা রাজনীতিবিদ এনিয়ে আমেরিকার সাথে কথা বলতে পারি। আগের বাক্যে আলী রিয়াজ আপনি নিজেই বলছেন ……”ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কী চীনের বদলে ভারতীয় আধিপত্য চেয়েছিল? না কোন আধিপত্যই চেয়েছিল? আমরা বিক্রি হলাম কেন?
    আবার অদ্ভুত স্ববিরোধিতাটা দেখেন; উপরের তিন ও চার নম্বর পয়েন্ট স্ববিরোধী। আলী রিয়াজ তিন নম্বরে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই ভারতীয় আধিপত্য এনেছে।  আমেরিকা ইচ্ছা-পরিকল্পনা করেই বাংলাদেশে আমাদেরকে  ভারতীয় আধিপত্যের কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তাতে ভারত যা খুশি তাই করছে। বাংলাদেশের বুক চিরে ভারত বিনা পয়সায় করিডোর নিয়ে যাচ্ছে।  আবার চার নম্বর পয়েন্টে রিয়াজ  লিখছেন,  …”ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে”। তাহলে কথা দুটা মিলিয়ে একসাথে পড়লে দাড়ায় মুল অপরাধী তো আমেরিকা। তাহলে  আলী রিয়াজ যে ভারতীয় আধিপত্যের মধ্যে তা চীনের আদফহিপত্যের চেয়ে বেটার অনুমানে আমাদের রাখতে চায়, এটাই আমেরিকার ইচ্ছা ও স্বার্থ মনে করে – সেই ভারতের বিরুদ্ধেই আবার  আলী রিয়াজ অভিযোগ তুলে কেন? এমনকি আমেরিকা নিজের স্বার্থ মনে করে বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনের নামে  এই হাসিনা সরকার যাকে এখন কর্তৃত্ববাদী সরকার মনে হচ্ছে তাকে তারা এনেছিল কেন?

    ৫। চীন ও ভারতের মধ্যে একটা ‘ব্যালান্সিং গেম’ বা ভারসাম্য নীতি বজায় রেখেছে। কিন্তু এটা…… কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ …ব্যর্থতা … শত্রুতা তৈরি করতে পারে।

    এশিয়ায় বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় আলী রিয়াজ স্বীকার করছেন আমেরিকাই ভারতের পিঠে হাত রাখার উসিলায় চীন-ভারতকে মুখোমুখি করে দিয়েছে। একথার মানে দাড়ায় তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আমাদের জন্য ‘ব্যালান্সিং গেম’ খেলা ছাড়া উপায় কী রেখেছে আমেরিকা? রিয়াজ বলছেন এটা নাকি ঝুঁকিপুর্ণ। কেন? কী হবে, যুদ্ধ লেগে যাবে? আমরা যুদ্ধ করলে তবেই না যুদ্ধ লাগবে! যুদ্ধ ছাড়াও দুনিয়া অনেক কিছু ঘটতে পারে। লাদাখে দেখেন নাই উগ্র জাতিবাদি মোদীও চীনের কাছে ভুখন্ড ছেড়ে দিয়ে চলে আসে নাই? ভারত কী যুদ্ধ করেছে? এর সোজা কথা যুদ্ধই একমাত্র অপশন নয়, অনেক অপশন আছে। ভারতের পাশে আমরা তো আছিই তাতে কী আমরা কেবল যুদ্ধ লাগাচ্ছি আর হেরে যাচ্ছে? বরং আমেরিকা যে বাংলাদেশকে বেঁচে দিয়েছিল তার জন্য তো আরো অনেক অপশন আছে।  সরাসরি বললে, হাসিনা নিজেকে ক্ষমতায় রাখতে ভারত-চীনের ভারসাম্য যেভাবে টানবেন তাতে তিনি টিকে যেতে পারলে সেটা হাসিনা বাংলাদেশ হবে। আর যদি নিজের স্থানীয় বিরোধীদের কাছে হেরে যা্ন তো গেল, সেটা আরেক কম্বিনেশন ও পরিণতিই হবে।  কিন্তু ভারত-চীনের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ লেগে যাবে এটা কারও জন্যই কোন অপশন বা বাস্তবতা তা সত্যি না। ফলে এখনও তা হতে পারে নাই।

    ৬। ……”যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতকেন্দ্রিক নীতির পরিবর্তন হবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক নয়। তার বদলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া।”……

    এটাই আলী রিয়াজ আপনি বেচাবিক্রি করতে এসেছেন। কিন্তু আপনি ভাল ফেরিওয়ালা নন বলেই দেখতে পাচ্ছি। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে আসেন নাই। আপনার বয়ান ঢিলা। গাথুনি ভাল না। উপরের পাঁচটা পয়েন্টেই দেখেন ঝুরঝুরা ঢলে পড়েছে। কথা শুরুর আগে একটা কথা।  আমরা দেখেছি, হাসিনা খারাপ হোক বা ভাল তিনি আমেরিকাকে একেবারেই বিশ্বাস করে না। তাই সবচেয়ে লোভনীয় ডিল তাঁকে অফার করলেও তিনি সেটা নিবেন বলা মুসকিল। এসব ক্ষেত্রে আস্থাহীনতা বিশাল নেতি-ফ্যাক্টর।  অতুএব এই ফ্যাক্টরের  কী করবেন? ভেবেছেন মনে হয় নাই।

    এবার আসি প্রসঙ্গে। আপনি এর আগে লিখেছেন মানে বলতে চেয়েছেন আমরা “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার” করছি না। এটার আবার মানে কী?
    মানে আসলে আমরা জানি। যদিও আপনি মোচরামুচরি করছেন খুলে বলতে চান নাই বা পারেন নাই। আপনি বলতে চাইছেন, ১। বাংলাদেশ যেন এইবার নিজ সমুদ্রসীমায় আমেরিকান সপ্তন নৌবহরকে স্থায়ীভাবে নোঙর ফেলে বসতে চুক্তি করেন। ২। এর সোজা মানে আমাদের সাথে ভারতের যুদ্ধ ঠিক না তবে আমেরিকাকেই এবার  ভারতের সাথে সামরিকস্বার্থের মোকাবিলায় যেতে হবে। কারণ, ভারত এটা জানামাত্র চরম অবস্থানে চলে যাবে। এটা তার জানকবজ মনে করে, তাই।
    এটাই আপনি বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার হাব ইত্যাদি বলে বুঝাতে চেয়েছেন! সমস্যা হল, এটাই যদি আমেরিকার কোর স্বার্থ তাহলে এশিয়ায় এতদিন ১৪ বছর ধরে এশিয়ায় “ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত” করলেন কেন? কোন সুখে? কী হাসিল করতে?  আর কীইবা পেলেন? এগুলো তো ছেলেখেলা না। অথচ এগুলো তো পরামর্শকদের ছেলেখেলা করে ফেলেছেন। কারণ, এসব ভুল পরামর্শের দায় কাউকে নিতে হবে না!
    এতে সবচেয়ে বড় কথা, বিশেষ করে একবার যখন ভারতের কাছে প্রকাশ পাবে আমেরিকার এই মনবাসনা । পুরা পরিস্থতি হয়ে যাবে আপসাইড ডাউন। ভারত চিরদিনের জন্য (ব্যাক-ফোর্থ না) চরম আমেরিকাবিরোধী হয়ে যাবেই।  আবার আমেরিকার এই স্টেশন করার খায়েস, এতে চীন তো এজন্য আরো বড় বিরোধ সংঘাতে যেতে দাঁড়িয়ে যাবে। অতএব পোলারাইজেশন বদলে যাবে। চীন-ভারতের আমেরিকাবিরোধী হাত মিলানোর সব সম্ভাবনা রেডি হতে থাকবে। মনে রাখতে হবে ভারত এখনও দুই নৌকায়, সে কোয়াডেও আছে আবার চীন-রাশিয়ার BRICS বা SCO জোট – সেখানেও আছে। আবার  ভারতের ভিতরেই এনিয়ে সুপ্ত বিতর্ক আছে, থিঙ্কট্যাঙ্কও মজুদ আছে। আরেক ধারাও প্রস্তুত রেডি আছে। এর মূল কারণ, ভারতের ন্যাচারাল ডেসটিনেশন চীনের সাথে সদ্ভাব!

    তবু এসব কল্পনায় আর গেলাম না। এরচেয়ে বিষয়াশয়, বস্তুগত খাওয়াপড়া ব্যবসাবাণিজ্য আর পুঁজির কারবারের দিকে আসি। প্রথম আর শেষ কথা আমেরিকার কাছে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ আর নাই। বিগত যৌবনা তাই জেনারেট হচ্ছে না।  অথচ এক বিপুল সারপ্লাস এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার প্রথম শর্ত, তাই প্রথম মুরোদ। যেটা থাকলে এরপরেই কেবল রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও জ্ঞানবুদ্ধি থাকলে এরপর গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতাও হওয়া সম্ভব। আর ঐ অর্থনৈতিক মুরোদ থেকেই আসে সামরিক মুরোদও। তাই আমেরিকা এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ সামরিক সক্ষমতার হলেও এই সক্ষমতার সবকিছুই তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যাবে। কারণ, এর খরচ যোগাতে অযোগ্য হবে আমেরিকান অর্থনীতি।  ঠিক যেমন পুরানা সোভিয়েন ইউনিয়নের হয়েছিল। একটাই কারণ, অর্থনৈতিক সামর্থ, উদ্বৃত্ত সম্পদ আর নাই। পুঁজির একুমুলেশন হচ্ছে না। আর এটা মানুষের ইচ্ছার বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উর্ধে  অবজেকটিভ ঘটনা।

    আমেরিকা নিজস্ব সরকারি স্টাডি যা চীনের উত্থান নিয়ে গবেষণা করে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ডিটেলে দুনিয়া অর্থনৈতিকভাবে তখন কী হতে যাচ্ছে তার স্টাডি রিপোর্ট বেরিয়েছিল সেই ২০১৮ সালেই; সেখানেও কোথাও এনিয়ে আমেরিকার সরকারের মানে সাবজেকটিভ-ভাবে কোন নীতি নিয়ে চীনের গ্লোবাল নেতা হওয়া ঠেকানো যাবে সে হদিস দেয় নাই। কারণ এটা অবাস্তব। মানে পরোক্ষে স্বীকার যে এটা অবজেকটিভ ঘটনা।  আবার হাতের কাছে দেখেন এমাসেরই কোয়াড মিটিং যা মূলত ছিল আমেরিকার জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহ। বাইডেন কেন জাপানের সুগাকে বগলদাবা করে মিটিংয়ে গেছিলেন? কারণ ভারতকে ভ্যাকসিনের জন্য বিনিয়োগ দিতে হবে যেটা জাপান ব্যবস্থা করবে, এক বিলিয়ন ডোজের মত ভ্যাকসিনের। অথচ সেই আমেরিকা আজ কোথায়? এসব অবকাঠামো বিনিয়োগের রাজা ছিল যে আমেরিকা, এক তুরিতে এসব বিনিয়োগ দিতে সক্ষম ছিল। সবার আগে এমন দানধ্যান নিজেকে অফার করত যে আমেরিকা!

    হাসিনাকে বুদ্ধিসুদ্ধি নাই এক মফস্বলের নেতা মনে হতে পারে।  কিন্তু হাসিনাও তো ব্যবহারিক বুদ্ধিতে এটাই বুঝেছেন যে আমেরিকার সেই অর্থনৈতিক মুরোদ নাই। হাসিনা আসলে বলতে চেয়েছিলেন তাঁর কাছে মানে তাঁর ক্ষমতায় থাকার নিজস্বার্থের চোখে চীনই ভাল। তাঁর এই মতের মোটাভাষায় ভাষ্যটা হল, “আমরা যুদ্ধ বা অস্ত্র চাই না। আমরা অবকাঠামো বিনিয়োগ চাই”। তাই স্টেফান বিগানকে মোমেন একথাই বলেছিলেন।  বুঝে বা নাই-বুঝে যাই হাসিনা বলে থাকেন না কেন, তিনি তো আমেরিকার ভ্যানিটির এক দুর্বল জায়গাতেই তো আঘাত করেছেন!

    তবে বিষয়টা অবশ্য আঘাত করা বা, না-করার না।  আমেরিকার সেভেন্থ ফ্লিট যদি বঙ্গোপসাগরে বসায়েও দেয় তবে তার একাজে যারা সমর্থক রাষ্ট্র হবে এদের বিনিয়োগ-বাণিজ্য চাহিদা আমেরিকা কীভাবে মিটাবে? অর্থনীতি কীভাবে চলবে?  যুদ্ধ তো খাওয়ার জিনিষ না!

    আগেই বলেছি এসবের মূল মুরোদ – বিপুল “একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল”, সঞ্চিত সারপ্লাস। এটা হাসিল হলে এরপরে বাকি সবকিছু।  কাজেই এই ফেজে যে শক্তিই আপাত সুবিধা পাচ্ছি মনে করে আমেরিকার সাথে গাটছাড়া বাধবে, নিজের ভাগ্য গড়বে বলে স্বপ্ন দেখবে সেই মারা যাবে।

    কাজেই আলী রিয়াজ আপনি কী বেচতে আসছেন? বিপুল সারপ্লাসহীন ফলে বিনিয়োগ সক্ষমতাহীন কিন্তু সামরিক দানব এক আমেরিকা? এটা কারও কাজে লাগবে না। উলটে না খেয়ে মরবে। ওর সামরিক খরচ যোগাতে গিয়ে আস্তে আস্তে ক্রমশ এখন সে নিজেই নিঃস্ব হতে থাকবে। যেভাবে আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। নিজ রাষ্ট্রের অর্থনীতিগত দিক মানে এটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এর অংশ ও বিষয়, সামরিক শক্তি অর্থনীতিক শক্তির কোন বিকল্প নয়। ফলে কিছুই না।

    আলী রিয়াজ তাদের আর্টিকেলের নামে একটা শব্দ রেখেছেন “ভূরাজনীতি”। এটাই সে চিহ্ন। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ও এর ভুমিকা বুঝাবুঝি বাদ দিয়ে বা এর গুরুত্ব আমল করা ছাড়া “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” যাদের স্টাডি ও চর্চার বিষয় হয়ে যায় “ভুরাজনীতি” তাদের শব্দ। কথিত  “ভুরাজনীতি” শব্দটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধারণাটা কাভার করে না। “ভুরাজনীতি” এটা পুরানা ধারণা অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজম নিজেই যখন গ্লোবাল হয়ে উঠে নাই। এর আবার মূল কারণ গ্লোবাল বাণিজ্য বলেও যখন কিছু ছিল না। কোন রাষ্ট্রের  বিপুল সারপ্লাস সঞ্চয়ের ফলে তৈরি অর্থনৈতিক মুরোদ থাকা এটাই গ্লোবাল নেতাগিরির ভুমিকায় হাজির হবার পুর্বশর্ত। মূলত অর্থনৈতিক মুরোদ নাই বলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ অস্তিত্বহীন, ১৬ টুকরা। ফলে কোনমতে এখন কেবল গোয়েন্দাগিরির স্ট্রাকচার দিয়ে পুতিন করে খাওয়ার চেষ্টা করছে।

    আসলে আমেরিকার পরিকল্পনাকারীরাই এখন আমেরিকার বড় বিপথগামি শক্তি। আমেরিকা আর নেতা নয় এটা যারা মানতে বা বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। এরই আরেক ফেনোমেনা বা বহিপ্রকাশ হল হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। সম্ভবত তারাই আমেরিকাকে বাকি যা আছে এর সবটা ভেঙ্গে ফেলবে, অন্য কারো কোন ক্ষতি করার আগেই।

    আলী রিয়াজ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতকেন্দ্রিক নীতির পরিবর্তন হবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়”। হা সেটা শুধু এখনই নয় আগামিতেই তা থেকে যাবার সম্ভাবনা বাড়ছে।  খাসোগী হত্যার অনুসন্ধানি রিপোর্ট তো বাইডেন প্রকাশ করতে পারেন নাই।  মিসরের সিসিকে ঠিকই অস্ত্র বিক্রিতে সায় দিয়েছেন। রাশিয়ান এস-৪০০ কিনার প্রসঙ্গ শেষ হলে তুরস্ক বা ভারতকে তিনি কী করবেন? অবরোধ দিতে পারবেন? কাজেই বাইডেনের উপর আস্থা রাখা কঠিন হতে যাচ্ছে!

    শেষকথাটা হল, কেন আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যের অধীনে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল? কেন সেই আমেরিকাকে আমরা আবার আস্থা রাখব? এর সদুত্তর ফয়সালা না পেলে বাংলাদেশের মানুষের নুন্যতম মন বা আস্থা ও বিশ্বাস পাওয়া কঠিন হবে। আবার আমাদেরকে এই বিপদে ফেলে এথেকে আমেরিকার কী অর্জন হয়েছে, তাও সে বলতে পারবে না।

    অথচ আলী রিয়াজ ধরে নিয়েছেন “এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে হবে, কেন? এতে বাংলাদেশের কী লাভ? আবার আমেরিকাও কী এথেকে কোন লাভ তুলবার মুরোদ রাখে? উপরে আমরা দেখলাম,  না সে মুরোদও নাই, সে বাস্তবতা নাই।

    তাই সেজন্যই বলেছি আলী রিয়াজ সরি, আপনি তো বেচবার মত কোন পণ্য নিয়ে আসেন নাই। আপনার কাছে তো কোন পণ্যই নাই। বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান অধিষ্ঠান – এটা কোন পণ্যই নয়। তাই, আপনি পরে আসেন। বয়ানের গাথুনি, নির্মাণ ঠিক করে পারলে পরে এসেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

    বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

    গৌতম দাস

    ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৭

    https://wp.me/p1sCvy-2wt

    সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে; যার শিরোনাম হল, “সংসদ নির্বাচন: গত দশ বছরের যে পাঁচটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে”। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হল – ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। তাদের অনুমান হল আমাদের আসন্ন নির্বাচনে এই পরিবর্তগুলো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

    চোখে পড়ার মত ঘটনা হল, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে যেন বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর এরপর রিপোর্টের বাকি অংশ হল, এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে “কর্তৃত্ববাদী শাসন” চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এতে নিজেদের দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনা ও চলার ক্ষেত্রে যেন বিবিসিরও কোনো দায় নেই!এমনকি বিবিসি যার রেফারেন্সে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে চলে গেলে সেটা হল এক জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংগঠন বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন [[Bertelsmann Stiftung]; কিন্তু তাদের রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল গত মার্চ ২০১৮ সালে। এরা গ্লোবে সব রাষ্ট্রের শাসন কেমন সে বিষয়ে স্টাডি করে সুচক তৈরি করে প্রকাশ করে থাকে। তাদের করা স্টাডিও ২০১৫-১৭ সালের। এই দুই বছর ধরে মাঠে সংগ্রহ করে এরপর তা থেকে স্টাডি করে তৈরি রিপোর্ট। দুনিয়ার ১২৯ রাষ্ট্রের উপর করা স্টাডিতে বাংলাদেশের শাসন অবস্থান ছিল ৮০ তম খারাপ অর্থাৎ ৮০ টা রাষ্ট্রের নিচে।

    এখানে যদিও বলা হচ্ছে এই পরিবর্তনের সময়কাল “দশ বছর”; অর্থাৎ হাসিনার শাসন কাল। কিন্তু যেকেউ নির্মোহ মুল্যায়ন করতে চাইলে মানবেন যে সত্যিকার ভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আর দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে এটা মোট ১২ বছরের। কারণ আসলে পরের ১০ বছর বা হাসিনার কালে যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কেউ অস্বীকার করবে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যেকোন গভীরে সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

    ঐ রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তারা (মানে বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুট দাতারা) কেবল তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় সংশ্লিষ্টতা আছে – সেটা ভাবভঙ্গিতে ও প্রচ্ছন্নে হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে সেটা বুঝা গেলেও বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন যে, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটা একেবারে যত্ন করে উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা – বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা নিশ্চিত যে, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না। তবে আসলে মুল কথা যে প্রশ্নের জবাব দূরে থাক প্রশ্নটাই তারা পুরাই লুকিয়ে ফেলেছে তা হল, এই কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম নিল – কারা কারা দায়ী? তত্ববধায়কের গাঁথা ভিত ও ঠিক করা অভিমুখ থেকে কেন “কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম” হল – এই প্রশ্নটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে।

    বিবিসির চোখে ঐ পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হল – বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত বা কো-রিলেশনাল। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে বা ইনপুট নিয়ে তারা রিপোর্টটা তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ – একটা নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে – এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি ধরে নেওয়া জরুরি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

    আর শব্দটাকে কখনও লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন – “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে” – সেটা এই অর্থে যে “রাজনীতিতে ইসলাম” দেখতে চাওয়া সব ধারার সকলে মিলে যারা এরা এখন সবচেয়ে এক বড় গোষ্ঠী; আর এরই বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। একথাতার সম-উদাহরণ হতে পারে যেমন, সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তারা সেযুগে সংখ্যায় ছিল সবচেয়ে বেশি – ঠিক তেমনি একালে ইসলামিস্ট। আবার কমিউনিস্টদের মতই ইসলামিস্টরাও তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও – বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার – এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন – এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অ-নেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েই আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ ধারণা নিয়ে কথা বলব।

    আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? কী সে কারণ ছিল? নীতি নির্ধারকদের পলিসি-চিন্তাকে নিয়ে এই প্রশ্ন করা বা বুঝবুঝির জগতে আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল – এর ফরমাল অথবা ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে অনুমিত ভাষ্যটা হবে এরকমঃ বাংলাদেশ তার নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে, বিএনপি তার শাসন আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস ছিল নয়। আমেরিকার মত করে সিরিয়াসলি দেখে নাই। এছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশকেও প্রতিরোধের রাষ্ট্র হিশাবে সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করে নেয়নি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে বাংলাদেশে ঐ সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত। আলোচনার করার সুবিধার্থে এই ভাষ্যটা ধরে নিয়েই কথা আগাবো।

    মানে, খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে বা আইনি বিপদ ও সমস্যা না থাকলে, ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হত। [এটা আমেরিকার সাফাই ফলে বিএনপিকে এর সাথে একমত হতেই হবে তা নয়।] তার মানে দাঁড়াল, বিবিসির এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করে পাঁচ ফ্যাক্টর বা বিপদ নিয়ে কথা বলতে বসেছে, সেই ১০ বছর হল আসলে এরও আগের দুবছরে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। আর সেই সাথে ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে হাসিনার [RATS নয়] আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার; সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

    এবার আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ”, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হল, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনা সরকারের ‘টেররিজম মোকাবেলা’ করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে ফলাফলে উল্টো ব্যাপক “ইসলামীকরণ” হয়েছে- এটাই বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুটদাতাদের পর্যবেক্ষণ – তাই নয় কি? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু অপছন্দ করলেও এটাই আমেরিকার বেধে নেওয়া নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক – এসব মিলিয়ে তাদের ঐ শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল। লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কিন্তু কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কী বিবিসি ও তার ইনপুটদাতা আলোচকদের? কিন্তু তারা এদিকে একেবারেই আগ্রহী নয়।

    DEEP STATE

    What does Deep State mean?

    The Deep State is believed to be a clandestine network entrenched inside the government, bureaucracy, intelligence agencies, and other governmental entities. The Deep State supposedly controls state policy behind the scenes, while the democratically-elected process and elected officials are merely figureheads.

    এছাড়া, বিবিসি জানিয়েছে আলী রিয়াজের ভাষ্যে বললে ‘ডীপ স্টেট’ হল, “যে কোন পরিস্থিতিতে যখনই রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়, তখন শক্তিপ্রয়োগের ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন যাদেরকে ‘ডীপ স্টেট’ বলে চিহ্ণিত করা হয়, তাদের ভূমিকা বাড়াটা স্বাভাবিক”। পাঠকের সুবিধার জন্য সেটাও এখানে দেয়া হল।

    অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ওয়েলকাম! কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। অথচ শুরু থেকেই হাসিনার ক্ষমতার ট্রেন্ড ছিল “ডিপ স্টেটে” বা দানব হওয়ার পথে রওনা দেওয়ার, এটা তো দেখাই যাচ্ছিল। তাই এই যাওয়া আমাদের অনুমান শুরু থেকেই, এটাই তো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার” নামে ফ্যাসিজম। “মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা-শ্রেণীর’ একনায়কতন্ত্র”। এই জয়ধ্বনিতে, ক্ষমতার বিরোধী বাকি “সকল শ্রেণীকে” গুম-খুন-পঙ্গুতে পিষে দাবড়ে রাখা।

    গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের একটা মূল বৈশিষ্ট্য – তা হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন তিনি এই আড়ালে থেকে এইবার – ইসলামের নামে প্রকাশিত বাংলাদেশের – সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং ততপরতাকে “নির্মুল” করতে গেছে এরা। এই ছিল মুল রাজনৈতিক লাইন। সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যেকোন ইসলামের নামে প্রকাশিত যেকোন ততপরতাকে “নির্মুল” করতে হবে – এই ছিল লাইন। এটাকেই “যুদ্ধাপরাধের বিচার” করা হচ্ছে এই আড়ালে সম্পন্ন করতে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এই আড়ালে বসে – ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এটাই তো বুশ প্রশাসনের (২০০১-৯) ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে প্রকাশিত ও তৎপর যেকোন ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। আর পরবর্তিতে ২০০৭ সালে এসে কী লাভালাভ হল এই মুল্যায়নে নীতি-নির্ধারকেরা দেখল সব-ভুল। তেমন কিছু অর্জিত হয় নাই। শত্রু কিছুই মরে নাই। উলটা রাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধে ঢুকে গেছে, মানে যুদ্ধের খরচ বইবার দাইয়ে আটকে গেছে। আর বাড়তি উপহার গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বুশ প্রশাসনের টেররিজম নীতি ছিল পরাজয়ের ও অকেজো – সকলে একমত হয়। এরপর থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের [RAND] গবেষণা প্রস্তাব [ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতেই হাতে আসা] অনুসরণ করে বুশ প্রশাসনের শেষ আমলে পুরানা নীতির পথ থেকে সরে ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন নতুন ‘টেররিজম’ মোকাবিলার নীতি চালু হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে আরও ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে বড় সংশোধন আনে। যদিও ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি মোটা দাগে আগেরটাই থাকে। তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা – এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করতে হবে। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির (র‍্যান্ড প্রস্তাবের) বৈশিষ্ট্য। টেররিজম নিয়ে আমেরিকার বদলে যাওয়া এই নীতি, এটাই ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পপুলারলি পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে থেকে ইসলামের নামে প্রকাশিত সকল সক্রিয় ফেনোমেনাকে নির্মুল ও দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

    আমেরিকার এই অভিজ্ঞতাগুলো তো সকলেরই জানা ছিল। তার মানে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকারে এই পথই যে নিবে তা আমেরিকার অজানা ছিল না। আর তা মনে করার কোনো কারণও নাই। অথচ তামাশার দিকটি হল – বুশ প্রশাসনের পুরান নীতিটা অনুসরণেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকার পথ নিয়েছিল ।

    সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে – উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘ডিপ স্টেটে’ নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করে লিখছেন, “ডিপ স্টেটে” চলে যাবার কথা। বলছেন, বাংলাদেশে “গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে”। অথচ সরকার কি এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেনি? শুরুতে এটা কেবল জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। কিন্তু এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, পরবর্তিতে তারাসহ যাকে হিটলারের শত্রু মনে হত সকলে একইভাবে সকলকে, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই হয়ে থাকে।

    তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে – অর্থাৎ বাংলাদেশের টেররিজম পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকা আর সিরিয়াস থাকে নাই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অ-গুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেছিল। কিন্তু কেন? কারণ, আমেরিকার তার স্বার্থের দিক থেকে আরও গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল।

    বাংলাদেশের টেররিজম ইস্যুর চেয়েও আমেরিকার গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ হাজির হয়েছিল। আমেরিকার যেটাকে দুনিয়াব্যাপী “ওয়ার অন টেরর” বা “টেররিজম ঠেকানো” বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর লক্ষ্যে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটা হল, ‘চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। বাংলাদেশের টেররিজম নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এর প্রতি ভারতের সমর্থন চাইতে গিয়ে আমেরিকার জন্য নতুন দুয়ার খুলে যায়। ‘চীন ঠেকানো’ হয়ে যায় মুল আলাপের ইস্যু। আর ভারতকে তাতে রাজি করাতে বিনিময় আমেরিকা সওদা করেছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে। এর সাথে অবশ্য ভারত আরও কিছু আদায় করে নিয়েছিল। আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে আমেরিকার ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। অবশ্য এই সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রত্যাহার করে নিয়েছে; চুক্তিতেও তাই ছিল।

    বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কী গত দশ বছর সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? না সরি; এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? তা বলতে বা দেখাতে পারতে হবে আগে। কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন? এটা বাংলাদেশের কোন টেররিজমের, কার টেররিজমের পক্ষে থাকা? কোন বলিদান?
    টেররিজমের ইস্যুর আড়ালে আমেরিকা নিজের চীন ঠেকানো ইস্যুতে ভারতকে পাওয়া হাসিল করেছিল। আর আমরা এই সওদার বুটি হয়েছি, আর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভারতকে সব ধরণের ট্রানজিট দেয়া আর ভারতের দিকে ঝুকে থাকা সরকার কায়েম ইত্যাদি……

    আমেরিকা গত ১০ বছর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে একরকম অন্ধ ও উদাসিন হয়ে থেকেছে। আর আমাদের সরকার ‘চেতনার’ শাসনের আড়ালে ইসলাম জঙ্গি দমনের নামে তার ক্ষমতার বিরোধীদের নির্মুল করে চলেছে। রাষ্ট্র তার ফাংশনাল সব প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ্ক প্রশাসন আদালত সব। তাই এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা গত ১০ বছরে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” বলে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলছেন তা যদি কিছু হয়ে থাকে বা যা যা কিছু হয়েছে – প্রথমত এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আমেরিকা ত টেররিজম মোকাবিলাযোগ্য করে রাষ্ট্র তৈরি করে দিয়েছিল সাথে শাসকও ঠিক করে দিয়েছিল। তাহলে দশ বছর পরে ইসলামিকরণ প্রডাক্ট আসবে না। আর যদি আসে এর জন্য দায়ী কে? এটা কী আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই ঘটেছে তা বলা যাবে না! অথচ এরা কেউ বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললেও যেন এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া্র চেষ্টা করছেন। কেন? এটা কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

    মূলকথাটা হল, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু। আর এসবের ফলাফলেই কালক্রমে আজ আমেরিকাকে পাত্তা না দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভারত-হাসিনার, দুজনে দুজনার, এমন শাসন হয়ে যাওয়ার গ্রাউন্ড হয়ে দাড়িয়েছিল।

    অথচ এক শুভ সকালে বসে আলী রিয়াজ ডিপ স্টেটে চলে যাওয়া বা ইসলামিকরণ – এসব লক্ষ করেছেন করছেন কিন্তু আমেরিকান নীতি ও পদক্ষেপের সাথের এর সম্পর্কের দিকে দেখতে পাচ্ছেন না। যতক্ষণ বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কী এবং কেন – তা না বলতে পারবেন ততদিন এসব আবিস্কার অর্থহীন। যদিও তাতে ইসলামিস্টরা কত খারাপ তা প্রমাণে একে ব্যবহার করা যাবে অবশ্যই।

    ওদিকে আর এক বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করবেন? শুরু থেকেই হাসিনা লাগাতর এক অপ্রয়োজনীয় ইসলামবিদ্বেষী নীতি চালিয়ে গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। অথচ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু তা বলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? জামাতের কোন অপরাধ দোষত্রুটি মানে সেটাকে ইসলামের ত্রুটি হিসাবে দেখানো্র ইঙ্গিত করা – এটা তো চরম অসততা। এভাবে কী ইসলামের গায়ে কালি লাগিয়ে দেওয়া যাবে? এটা কী কোন পথ হতে পারে? এর সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবিলার পথ ও উপায় হিসাবে একে ব্যবহার করা – এটাই তো চরম ইসলামবিদ্বেষী কাজ। এরচেয়ে আত্মঘাতি কাজ আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি তো আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ ও পরাজিত হবেই।

    আর এসব অবিবেচক তৎপরতারই সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। মানুষ এটাকে সরকারের জুলুম আর চরম বে-ইনসাফি হিশাবে দেখেছে। উলটা ইসলামের প্রতি আরও আগ্রহি ও সহানুভুতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা যেন রোমের মত। ঠিক এইভাবেই রোম সাম্রাজ্যে ক্রিশ্চানিটির প্রভাব উতখাতে লড়তে গিয়ে শেষে তা সামলাতে না পেরে সম্রাট কনস্টানটিনসহ নাগরিকেরা ক্রিশ্চান হয়ে গিয়ে রোমকে সেই প্রথম ৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে ‘ক্রিশ্চান রোমে’ পরিণত করেছিল। আর এখানে গত দশ বছরের হাসিনার শাসনে কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটাকেই বিবিসি ও তার বন্ধুরা বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে আক্ষেপ করছে।

    বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে তাদের উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির পুনঃমূল্যায়ন থেকে দেখা শুরু করতে হবে। আর সম্ভবত তাতে দেখা যাবে যে, কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসির অপর পীঠ। তাদের পলিসির কারণে ঢাকার সরকার কী করছে তা সকলেই উপেক্ষা করে গিয়েছে। আর ঢাকার সরকারের সবার ওপরে ডিপ স্টেট কায়েম আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা যা কিছু করেছে এসবের ফলাফলের অপর পিঠ হচ্ছে কথিত “ইসলামিকরণ”। আর আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখনকার বাংলাদেশের এই অবস্থাটা শেষ বিচারে আমেরিকার বা ভারতের কোন স্বার্থের পক্ষে যায় নাই। বরং তাদেরকে এর কাফফারা চুকাইতে এখন রেডি থাকতে হবে!

    এই পরিস্থিতিতে যারা বাংলাদেশ এক্সপার্ট হয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাজে নিজের নাম কামাতে চায় তাদের প্রথম কাজ হবে “ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা। বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং সেই পুনঃমূল্যায়িত নীতি, সংশোধিত নীতি নিয়ে এখনও ইতিবাচকভাবে আগালে, পুরান নীতিতে জমে যাওয়া আবর্জনা সাফসুতারা করতে বাংলাদেশের মানুষ এখনও তার পক্ষে সাড়া দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমাদের আস্থায় কমে গেছে।

    বিবিসির আলোচ্য রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথাটাই তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে কী বা সুস্থ নির্বাচন কে নিশ্চিত করবে? এটাই তো সবচেয়ে বড় আর নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসির রিপোর্ট বেখবর।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

    ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

    গৌতম দাস

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2tY

     

    ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

    পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

    রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

    তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

    বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

    ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

    উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
    উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

    গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে।

    প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

    কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

    কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

    কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

    কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

    তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party’”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

    কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

    কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

    তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

    কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

    এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

    কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

    ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

    তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
    যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

    সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

    ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
    নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

    কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
    পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

    সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

    আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
    ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

    কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
    তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • “কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

    “কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

    গৌতম দাস
    ০২ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৫

    http://wp.me/p1sCvy-2f6

    কাশেম বিন আবুবাকার নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে মিডিয়ায় মানে, টিভি টকশো, নিউজ, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া সবখানেই তোলপাড় চলছিল; এক বহুল উচ্চারিত নাম তিনি। তাও শুধু দেশে নয়, প্যারিসভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপির কল্যাণে কাশেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে তাদের করা নিউজটা যেসব দেশের স্থানীয় মিডিয়া প্রকাশ করেছে সেসব দেশেও কাশেম বিন আবুবাকারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কী সে খবর? আবুবাকারের কী খবর? এখানে একটু দম ধরে থামতে হবে।
    কয়েক বাক্যে মুল খবর হল, বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কাশেম বিন আবুবাকার ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখেন। শ’খানেক উপন্যাস লিখেছেন। আধুনিক জগতে অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে যে মডার্নিটি বা আধুনিকতাকে শুধু গ্রহণ না করে নয়, রীতিমতো আলিঙ্গন না করে কোন উপন্যাস লেখা সম্ভব কিনা। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচার করলে মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, মডার্নিটিকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরালে ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখা কি সম্ভব? বিশেষ করে যখন ইউরোপের আধুনিকতার যেসব ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধ বা সে মরালিটির ওপর ভর করে সাহিত্য উপন্যাস লেখা ও চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে বহু আগেই এবং এর প্রভাবে দুনিয়াতে প্রায় সব শহরে প্রবল প্রভাব ছেয়ে গেছে! দুনিয়াতে নানা জায়গায় এর প্রভাব পড়েছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শাসক সূত্রে; তাদের আধুনিকতা ও এনলাইটেনমেন্টের চিন্তা ও তৎপরতার প্রভাবে আমাদের মতো দেশে এরই প্রভাবিত ধারা ও এর চর্চা গড়ে উঠেছে। আর সেটাই প্রধান ধারা হওয়ার দাবিতে নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছে! এরপরে আর কি ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস বা ফিকশন সম্ভব নয়? [উপরের কথাগুলো লিখেছি এটা ধরে নিয়ে যে আধুনিকতার ভিত্তিগিত ধারণা ও এর উপর দাঁড়ানো মুল্যবোধ আর ইসলামি মুল্যবোধে বড় ফারাক আছে। যদিও সে ফারাক কী, কোথায় সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাই নাই।]

    আধুনিকতার এমন বাস্তবতাতেও কাশেম বিন আবুবাকার হলেন সেই লোক যিনি আধুনিকতার ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধের বাইরে সমান্তরালে (যদিও ক্রিটিক্যালি বললে আধুনিকতার  প্রভাবের বাইরে থাকা একালে কারো পক্ষেই আর সম্ভব নয়, ফলে তিনিও পুরোপুরি বা ঠিক বাইরে নন) ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। নয়া ধারা সৃষ্টি করেছেন। এর চেয়েও বড় কথা তার উপন্যাস আবার যে সে উপন্যাস নয়, তাঁর একেবারে ৮৫ শতাংশ লেখা মূলত রোমান্টিক উপন্যাস। আধুনিক চিন্তায় লেখা উপন্যাসের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা খেয়াল রেখে বললে, আবুবাকার অবশ্যই মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। মনে হতে পারে অনেকেই তো অনেক কিছু লেখেন, লিখেছেন, কিন্তু তা হয়তো শেষে ঠাঁই পায় বালিশের তলায়, আবুবাকারকে কী এই অর্থে রোমান্টিক উপন্যাস লেখক বলা হচ্ছে? না অবশ্যই না, একেবারেই না। তবে উপন্যাসের সাহিত্য-মূল্য বিচার, এটা সেকুলার মডার্ন জগতেও যথেষ্ট জটিল, থিতু বা সেটেলড্ নয়। ফলে সে দিকটা এখানে উহ্য রেখেও বলা যায় – তার লেখার পাঠক আছে কিনা, সে পাঠকেরা ব্যাপক কিনা, সে পাঠকেরা আবুবাকারের উপন্যাসের সাথে নিজেকে সম্পর্কিত, যেন নিজেরই জীবনের ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখছেন বলে মনে করেন কিনা, এই বিচারে বলা যায় আবুবাকার একজন সফল ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর পাঠকপ্রিয় এবং প্রধান ধারার নাম কামানো ঔপন্যাসিকদের চেয়েও তার পাঠক সংখ্যা বেশি। তবে স্বভাবতই তার পাঠকরা ভিন্ন ক্যাটাগরির যাদেরকে ভিন্ন অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক মর্যাদার স্তর ভিত্তি, মূল্যবোধের ভিত্তি ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়েই আলাদা করা সম্ভব। আবার যারা প্রধান ধারার পাঠক সেই ক্যাটাগরিরও কিছু অংশ তারও পাঠক। এই বিচারে এক কথায় বলা যায়, আবুবাকার প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর, ২০১১ সালের খবর হলো সেটা ছিল ত্রিশতম সংস্করণ প্রকাশিত। যদিও টিভি সাক্ষাতকারে  তিনি বলেছেন এটা আরও বেশি হতে পারে। কারণ রয়েলিটি না দেওয়ার জন্য প্রকাশকেরা অনেক সংস্করণের খবর প্রিন্টে উল্লেখ করে না।  আর তাঁর দেয়া ধারণা মতে, প্রতি সংস্করণ বই প্রকাশ সংখ্যা ৩০০০-এর কম নয়।

    একথা ঠিক যে মিডিয়া তাকে নিয়ে তোলপাড় করছে। কিন্তু যতগুলো মিডিয়া আলোচনা ও মন্তব্য শোনা, জানা বা কাউকে করতে দেখা গিয়েছে তাতে খুবই নগণ্য সংখ্যক (প্রায় কেউ নয়) দাবি করেছেন যে, তিনি আবুবাকারের কোনো উপন্যাস পড়েছেন। মূল কথা হল, মিডিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে যে আবুবাকার তাঁর উপন্যাস পাঠক জগতে এত বিখ্যাত অথচ মিডিয়া সেটা জানে না কেন? ফলে খোদ মিডিয়া এবং সেকুলার পাঠক পেরেসান হয়ে গেছে যে তাদের কালচারাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাদের প্রভাবকে তুচ্ছ করে ইতোমধ্যেই গজিয়ে যাওয়া হাজির কাশেম বিন আবুবাকার ফেনোমেনাকে তারা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন।  উপায়ন্ত না পেয়ে তারা  তাঁকে নিচা দেখানো বা খাটো তুচ্ছ করে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। যেমন তাদের ট্যাগ হল, তিনি “চটুল” লেখক, তিনি “ইসলামি যৌনতার” লেখক ইত্যাদি। আর সব তর্ক-বিতর্ক আলোচনা চলছে এসব মিথ্যা ভিত্তিহীন ট্যাগের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের কালি লাগানোর সব প্রচেষ্টা ঢলে পড়েছে। এর মূল কারণ এরা সবাই স্বীকার যে তারা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই। এছাড়া আরও বড় প্রশ্ন আছে, উপন্যাস পড়া এক জিনিষ আর উপন্যাসের মুল্যায়ন-সক্ষমতা কী সবার আছে? সাহিত্যের ভিতর থেকে প্রকাশিত সামাজিক মন, সমাজতত্ত্ব বের করে আনা, দেখতে পাওয়া, ট্রেন্ড ব্যাখ্যা  করা কিংবা লিখায় লেখকের লিখাকালীন সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব কী কতটুকু – এসব কিছু যথেষ্ট সিরিয়াস ও পেশাদারি কাজ – এসব কাজ আমপাঠকের কাজ নয়। অতএব, এক কথায় বললে প্রায় প্রত্যেকেই নিজের অযোগ্যতা বা মনের ক্ষোভ মিটাতে ইচ্ছামতন মন্তব্য করছেন ট্যাগ লাগাচ্ছেন। কিন্তু কঠিন সত্যি হল, প্রথমত এরা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই।  কোন উপন্যাসে এটা আছে এমন কোন রেফারেন্স উল্লেখ করে কেউ অভিযোগ করছেন না।  ৭১ টিভি টকশোতে এঙকর শুরুতেই খোদ আবুবাকারের সাথে কথা বলতে গিয়ে অবলীলায় এক বিশেষণ লাগিয়ে কথা বলছেন, “আপনার চটুল উপন্যাস”। আবুবাকার পাল্টা যখন জিজ্ঞাসা করলেন “চটুল উপন্যাস বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন” এঙকর তখন আর তার ব্যবহৃত বিশেষণ এর পক্ষে কোন সাফাই পেশ করতে পারলেন না, চুপচাপ এড়িয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য ঐ টকশোতে প্যানেলিস্ট কেউ ছিলেন না যে আবুবাকারের কোন উপন্যাস পাঠ করেছেন।

    দৈনিক বাংলা ট্রিবিউন ২৭ এপ্রিল এক সাক্ষাতকার নিয়েছে। সেখানে, “আপনি কেন পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন, এ প্রশ্নের জবাবে আবুবাকার বলছেন,   “আমি মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছি লেখার মধ্য দিয়ে। মুসলমান হয়ে চরিত্রহীন হলে চলবে না। আল্লাহর কথা মতো যারা চলে না, তারা তো মুসলমান না। আমি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছি বলে আমি জনপ্রিয়”। কিন্তু প্রশ্নকর্তা এবার জানতে চান “ইসলামি উপন্যাস” ইসলাম অনুমোদন করে কি না। অর্থাত প্রশ্নকর্তা নিজেই আবুবাকারের উপন্যাসেকে “ইসলামি উপন্যাস” লেবাস বা নামকরণ দিয়ে দিলেন।  এর বিপদ বুঝতে পেরে আবুবাকার পরিস্কার করে দিলেন, ‘আমি তো ইসলামি উপন্যাস লিখিনি। আমি ইসলামি ভাবকে কাজে লাগিয়ে উপন্যাস লিখেছি। কোরআন-হাদিসের আলোকে রোমান্টিসিজমের কথা লিখেছি”।  এছাড়া অনেকে দ্বিধা করেন জটিলতা পাকায়  ফেলেন যে প্রেম ও ইসলাম এর সম্পর্ক কী, এরা কী পরস্পর বিরোধী অথবা প্রেম মানেই তা যৌনতা কীনা।  তিনি এসব ধারণা পরিস্কার করার চেষ্টা করে বললেন এভাবে,  “প্রেম তো থাকবেই — ভাইয়ের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বিয়ের আগে প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু সেই প্রেম ভেঙে গেলে প্রেমিকাকে এসিড ছুড়তে হলে সেটা তো প্রেম না, সেটাকে বলে মোহ। আমার বইয়ের মধ্য দিয়ে আমি এগুলোই শেখাতে চেয়েছিলাম পাঠকদের। আর আমার লেখা এই শিক্ষামূলক বই সবাই পড়তে চেয়েছে বলেই আমি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছি”। এছাড়া এই পত্রিকাও শুরুতে পরিচিতিমূলক বক্তব্য আবুবাকারার উপন্যাসকে বলছেন “প্রেমের চটুল গল্পের”। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যারা চটুল শব্দ ব্যবহার করছেন তারা কেউ তার উপন্যস না পড়েই প্রিযুডিস (আগাম বিচারবিবেচনা করা ছাড়া ধারণা) থেকে সেকুলার নাক সিটকানো থেকে কথা বলছেন।  তিনি বলছেন শালীনতার কথা, শালীনতা রেখেও প্রেমের পথের কথা – ইসলামি মুল্যবোধের হেদায়েতের কথা আর এর বিপরীতে সেকুলার অভিযোগ হল তিনি নাকি চটুল গল্প লিখছেন, ইসলামি লেবাসে যৌনতা লিখছেন।

    ওদিকে প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও পরিস্কার করে কথা বলেছেন আর এক অনলাইন পত্রিকায়। তিনি বলছেন, (প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক কী) “এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমি বার বার হয়েছি। আমি ইসলামের কথা বলি প্রেমের উপন্যাসে। কেউ কেউ আমাকে বলেছেনও আমি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন করেছি। কিন্তু আমার মন জানে আমি কেনো করেছি। আমি চিন্তা করেছি অন্য জায়গা থেকে। আমি প্রেমকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছি। কারণ, আমরা যতো বাধাই দেই না কেনো যুবকদের প্রেমবিমুখ করতে পারবো না। তাই আমি প্রেমকেই বাহক হিসেবে বেছে নিলাম এবং তাদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিলাম। তাদের বোঝালাম, প্রেমের লাভ-ক্ষতি হিসেব কিন্তু আমি আমার উপন্যাসে দিয়েছি। বিশেষ করে সীমালঙ্ঘন যেনো না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছি”। অর্থাৎ আমরা দেখছি এমন লোককে চটুল গল্প লেখক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

    পরের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই খোদ এএফপির রিপোর্টে এক বিপজ্জনক মন্তব্য আছে তা নিয়ে কথা। আর তা থেকে এই রিপোর্ট এখন প্রকাশ করার উদ্দেশ্য কী তা কিছুটা আন্দাজ করা যায় সম্ভবত। বলা হয়েছে, “আবুবাকারের (কাজকে এখন নাকি) এক নবজাগরণের বা এক রেনেসাঁর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা হল, যাতে বাংলাদেশের যুগ যুগ ধরে জারি থাকা মডারেট মুসলমান পরিচয় এখন থেকে এটা  ধর্মীয় কালামের আরো রক্ষণশীল ব্যাখ্যার দিকে ঢলে পড়ছে”।
    ‘Now his work is undergoing something of a renaissance as Bangladesh slides from the moderate Islam worshipped for generations to a more conservative interpretation of the scriptures.’

    এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাসের সাথে সাম্প্রতিককালের হেফাজতের (আওয়ামি লীগের ঘনিষ্ঠতার) সম্পর্ক আছে এবং এটা নেতিবাচক।
    একাত্তর টিভির একটা টকশো হয়েছিল যার শিরোনাম ‘লেখক কাসেম বিন আবুবাকার লাইভে এসে লেখা ও নিজের সম্পর্কে যা বললেন’– এভাবে সেটা ইউটিউবে ২৮ এপ্রিল আপলোড হয়েছে। আলোচনায় প্যানেলে ছিলেন রবীন আহসান, প্রকাশক ও সম্পাদক বই নিউজ ২৪; তিনিই মুলত আবুবাকারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগকারী, একমাত্র তিনি অভিযোগ তুলছিলেন। এএফপি কী বুঝাতে ওই রিপোর্ট করেছিল তা রবীন এহসানের অভিযোগ থেকে আঁচ করা যায়। রবীন একই কথা অনেক ব্তযাখ্বেযা করে বলার পেয়েছেন বা নিয়েছেন। তবে রবীনের বক্তব্যের উপস্থাপন ছিল একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মত। বলতে চেয়েছেন, এএফপির রিপোর্ট ছিল যেন ‘বিদেশীদের ষড়যন্ত্র’। আর সে ষড়যন্ত্রের কথা বলতে চাওয়ার ছলে রবীন আঙুল তুলেছেন আবুবাকারের দিকে। বলছেন, আবুবাকার সেই ‘ষড়যন্ত্র প্রজেক্টে’ শামিল ।

    রবীনের কিছু বক্তব্যের অংশ বিশেষ তুলে ধরছি এখানে: “তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য উপন্যাস লিখেছেন। আমার যেটা মনে হয়েছে, এটা একটা প্রজেক্টের মতো। আবুবাকার একটা প্রজেক্টের মধ্যে ছিলেন। ত্রিশ বছরে তিনি যা লিখেছেন, এর প্রতিফলন সমাজের মধ্যে পড়েছে। তার উপন্যাসের নাম হচ্ছে ‘বোরখা পরা সেই মেয়েটি’ [ফ্যাক্টস হলো এই  উপন্যাস আবুবাকারের লেখা নয়]। তার উপন্যাসের ভেতর তার নায়ক-নায়িকারা যেভাবে কথা বলেন এবং বোরখা পরে, হিজাব পরে, এরকম সব চরিত্র হচ্ছে তার উপন্যাস এবং নিজেই যখন বলেছেন ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করার জন্যই তিনি লিখছেন। এজন্য কিন্তু তিনি সফল। মানে বাংলাদেশের যে সমাজ, যে সমাজের মধ্যে আমরা আছি, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই যে ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে লেখা এবং ইসলামি মূল্যবোধকে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে সমাজের মধ্যে প্রয়োগ করা, এতে কিন্তু কাসেম সফল হয়েছেন। তার আজকে যে ঢালাও করে প্রচার প্রপাগান্ডা পশ্চিমা দেশে হয়েছে, সেটার কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে যে, হঠাৎ করে নিউজটা হয়েছে যখন কোনো বইমেলা নেই; তখন দেখা যাচ্ছে ইসলামি বই লাখ লাখ বিক্রি হচ্ছে-এই রকম একটা সংবাদ হয়েছে। আমি বলব, সমাজে যখন হেফাজতে ইসলামের একটা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, ইসলামি সব দলের একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবং এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আবুবাকারের একটা অবদান আছে। এই যে ত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি লিখেছেন যে ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করবেন, ইসলামি নায়ক বানাবেন, নায়িকা বানাবেন, বোরখা পরে চলাচল করবে, আমরা কিন্তু সেটাই সমাজে দেখছি।’
    [এই অনুলিপি আমার করা, কাজ চালানোর জন্য। এতে দু-একটা শব্দ এদিক ওদিক হতে পারে। তাই একেবারে সঠিক স্ক্রিপ্টের জন্য মূল ইউটিউব নিজে দেখে নেবেন, অনলাইনে। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি।]

    এখন মূল কথা হল, রবীন এখানে আবুবাকারকে অভিযুক্ত করছেন উপন্যাসে ইসলামি মূল্যবোধ আনা, চর্চা বা জাগানোর চেষ্টা করার জন্য। যদি রবীনের একথাকে ফ্যাক্টস হিসাবে-একেবারে সত্যি বলে ধরেও নেই, তার পরেও বলতে হয়-ইসলামি মূল্যবোধ জাগানোর চেষ্টা করা কি অন্যায়? অপরাধ? ইসলামি বা আধুনিক যেকোন মুল্যবোধ প্রচার যে কেউ করতে পারে। আর তা বিচার বিবেচনা করে গ্রহণ -বর্জনের অধিকারও সকলের।  আবুবাকার এখানে ইসলামি এথিক্স / মরালিটির কথা বলছেন। একটা মরালিটির চর্চাকে অন্যায় বলবেন কি করে, একে অপরাধ বলবেন কী করে? আবুবাকার কারও কপালে বন্দুক ধরে মূল্যবোধের চর্চার কথা বলছেন না। তিনি এটা করতে আহ্বান রাখছেন কোন প্রবন্ধ লিখেও না- আরও নরম করে, একেবারে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লিখে। অথচ এটাকেও রবীন আহসান অপরাধ মনে করছেন। ফলে এটা এক জাতীয় ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখছি না। এটা হতেই পারে যে, রবীন ইসলামি মূল্যবোধ পছন্দ করেন না, তাই তিনি এই মূল্যবোধ বর্জন করতে পারেন, এমনকি এর ‘অসুবিধা’র দিক নিয়েও পাল্টা প্রচার করতে পারেন। এছাড়া তিনি অবশ্যই ইসলামি মূল্যবোধের চেয়েও ভিন্ন, ভালো এবং কার্যকর মূল্যবোধ নিয়ে এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি এটা ইসলামি হওয়াটাই যেন অপরাধ, সে হিসেবে ধরে নিয়ে কথা বলেছেন। এটা তাঁর লাইন ক্রশ।

    রবীন আহমদ হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ আনছেন। সত্যি এ’এক তামাসা বলতেই হয়। কোন চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেলে কি কাউকে অভিযুক্ত করা যায়? এটা তো ওই চিন্তা প্রচারকারীদের গৌরব যে, মানুষ তাদের কথা শুনেছে। রবীনের উলটো এটাকে অভিযোগ হিসেবে নেয়া বা অন্যায় মনে করেই বরং এক ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা নয় কী? এটা আইনি বিচারি চোখেও অন্যায় কাজ।
    এএফপি যেন আসলে ঠিক রবীনের মতোই সাজেশন রাখতে চেয়েছিল। অভিযুক্ত করতে চাইছিল যে কাসেম বিন আবুবাকার রোমান্টিক উপন্যাস লিখে দোষী। কারণ এতেই ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, আর যেন ঠিক এ কারণেই হাসিনা হেফাজতের সাথে আপস করেছেন। এটা কাকতালীয় শব্দটার চেয়েও বেশি কাকতালীয় বক্তব্য সন্দেহ নেই। এমনকি ৭১ টিভির ওই টকশোতে অংশগ্রহণকারী আর এক প্যানেলিস্ট ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকেও রবীন আহসান তার কাকতালীয় দাবি ‘খাওয়াতে’ পারেননি। শ্যামল দত্ত অন ক্যামেরা প্রকাশ্যে তার আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

    ওদিকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরেক তথ্য জানা যাচ্ছে। উপরে এএফপির রিপোর্ট থেকে যে ইংরেজি উদ্ধৃতি দিয়েছি, যেটা ওই নিউজ মিডিয়া (কনসার্ন-বোধ করে) উদ্বেগ বোধ করেছিল – এভাবে জানিয়েছিল। পরবর্তিতে এই রিপোর্ট ফলে ঐ একই উদ্বৃতিও চোখে  পড়েছিল স্টিভ ব্যাননের।  তিনি হচ্ছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  প্রধান পরিকল্পনা প্রণয়নকারী ( চিফ স্ট্রাটেজিস্ট)। হকিস আগ্রাসী ভুমিকার যে ট্রাম্পকে আমরা দেখেছিলাম বছরের শুরুতে এই নীতি প্রণয়নকারীদের বস তিনি। তবে ছিলেন বলতে হবে কারণ সম্প্রতি তাকে সাইজ করা হয়েছে, বহু পদ-পদবি ও দায়ীত্ব থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।  স্টিভ ব্যাননও  ঐ উদ্বৃতি তুলে নিয়ে তার নিজের ওয়েবসাইটে সেটে দিয়ে  উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা সত্যিই মজাদার ব্যাপার যে, রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসে লিখেও বাংলাদেশের আবুবাকারা “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে” লড়াকুদেরও উদ্বেগের মুখে ফেলা দিতে পারেন!

    বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান একাডেমিক, গবেষক ও বাংলাদেশ এক্সপার্ট ড. আলী রীয়াজ। তিনি আবুবাকার ইস্যুতে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাকে সম্ভাবত এই প্রথম একাডেমিকের ভঙ্গিতে দেখা গেল যে, কোনো ইস্যুতে তিনি সহজে কোনো পক্ষ না নিয়ে একাডেমিক অবজারভারের অবস্থান নিলেন। অবশ্য তার বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ ফ্যাক্টস হিসেবে সত্যি নয়।

    তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের সোস্যাল মিডিয়ায় যারা সক্রিয় তাদের এক বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন; সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন, অবশ্যই এএফপির কাছে। কিন্তু আবিষ্কারের পরে তাদের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই লেখকের বিষয়ে তারা কিছু না জানায় বিস্মিত এবং খানিকটা ক্ষুব্ধ”।
    এটা আলী রীয়াজের স্টাটাসের প্রথম দুই বাক্য। কিন্তু … আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে… ‘সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন’- এই বাক্যটা ফ্যাক্টস নয়। এটা বরং উলটো। কারণ এবারের আগে সোস্যাল মিডিয়ায় আবুবাকার ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছিলেন অন্তত গত বছর ডিসেম্বরে। পরে এএফপিতে তিনি রিপোর্টেড হয়েছেন মাত্র সেদিন।
    দ্বিতীয়ত, আলী রিয়াজ “ইসলামপন্থী জনপরিমণ্ডলব্যবস্থার” আলাপ তুলেছেন। অর্থাৎ এএফপির মতো আবুবাকারা আর হেফাজত-সরকারের সম্কাপর্কক নিয়ে কাকতালীয় উদ্বেগ জানাতে যাননি ঠিকই, তবে একাডেমিকভাবে আর খুবই নরমভাবে প্রায় একই কথা বলছেন। ‘জনপরিমণ্ডল’ খুবই খটমটে শব্দ মনে হতে পারে অনেকের কাছে তাই সারকথাটা বলে রাখি। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ আরও ইসলামি মূল্যবোধের (আবুবাকারার রোমান্টিক উপন্যাসের মাধ্যমে) গভীরে ঢুকে গেলে এর যে সামাজিক প্রভাব তৈরি হবে (যা ভালো মন্দ বহু কিছু) এরপর আবার সেগুলোর পরোক্ষ ফলাফলে তা কতটা আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবে, সেটা সমাজতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে বুঝতে হবে। ফলে সরাসরি আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাস লেখা দেখে আমেরিকার জন্য কেঁদে উদ্বেগে হাহুতাশ করে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

    তিনি বলছেন, “এ ধরনের উপন্যাস জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার কাউকে নিন্দা করার (ভিলিফাই অর্থে) জন্য নয়, বরঞ্চ জনপরিসরের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে তা বোঝার জন্য”।

    এখানে তিনি বলেছেন, ‘জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ’- এখানে ‘ইসলামীকরণ’ শব্দের ব্যবহার না করলেই তিনি ভালো করতেন। যে দেশের ডেমোগ্রাফিক্যালি মুসলমানের, তাকে আর ‘ইসলামীকরণ’-এর অভিযোগ করা কি চলে? ও ন্যাচারালভাবে যাই করবে তার মধ্যে ইসলামই তো দেখা যাবে, ছাপ থাকবে। তাই নয় কী? তাহলে তিনি বলছেন ‘ইসলামীকরণ’ কিন্তু বুঝাতে চাইছেন সম্ভবত অন্য কিছু। আবুবাকার মুসলমান হিসাবে যদি প্রেমের উপন্যাস লিখে ইসলামি মরালিটির প্রচার এবং প্রদর্শন করেন তাহলে এটাই কী খুবই স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক “ইসলামিকরণ” নয়? এর মধ্যে নেগেটিভ কী দেখলেন? এটা কী বেআইনী? মুসলমানের হাঁচি কাশিতেও নিজের বিপদ দেখলে, নিজের আধিপত্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুজে পেলে আমার মনে হয় না তাকে সাহায্য করতে পারবে? আর এখানে আধিপত্য হারানোর ট্রমা – এই মানসিক রোগে চিকিতসা ছাড়া সাহায্যেরই বা কী আছে?   বাংলাদেশের এক কমিউনিস্ট মুসলিম তরুণের বাবা মারা গিয়েছেন। তিনি দলের পত্রিকাও দেখাশুনা করেন। তো পত্রিকায় তিনি চার লাইনের এক কলামের সংবাদ লিখলেন, তার বাবা ওমুক মারা গিয়েছেন ইত্যাদি এবং ওমুক গোরস্থানে তার কবর হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক ঐ খবরটার “কবর” শব্দটা এডিট করে লিখলেন – তার “সমাধি” হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলে জানালেন “কবর সাম্প্রদায়িক শব্দ” তাই ছেটে দিয়েছেন। এই সম্পাদকও আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ট্রমাতে ভুগছেন। তবে আমাদের বাড়তি লাভ হল, আমরা সাম্প্রদায়িক শব্দের আসল সংজ্ঞা জেনে নিলাম।

    আর তবুও তিনি যদি অভিযোগ করতেই চান, এই যে ইসলামিকরণ হয়ে গেল কীনা বোধের ট্রমা,  এতে নন-ইসলামি পশ্চিমা সরকার ও জনগোষ্ঠীর কি দায় ভূমিকা নেই?

    সংক্ষেপে আরো কিছু সিরিয়াস স্পষ্ট আপত্তির কথা জানিয়ে রাখা যায়। ঘটনা হল, কাসেম বিন আবুবাকার মূলত মুসলিম লীগ – এই ধারার প্রডাক্ট বা ফসল। যে অর্থে আমেরিকায় ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয় সে অর্থে মুসলিম লীগ আর আলকায়েদা দুটোই ইসলামি হলেও  দুটোই একই ফেনোমেনা নয়। যেমন আবুবাকার তার গল্পে কোথাও সশস্ত্র পন্থার পক্ষে বলেনি। তা সত্ত্বেও তাকে কি আমরা ইসলামি মূল্যবোধের পক্ষেও কথা বলতে দেব না?  আবুবাকার এক রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাতে, এই “ইসলামিকরণে” যদি আমেরিকার গায়ে ফোস্কা পড়ে তাহলে, এই আমেরিকা লয়া আমরা কী করিব? ইহাকে কোথায় রাখিব?

    শেষ পয়েন্ট : বলতে গেলে এই চলতি শতকে (২০০১ সালের পরে) আরও উপন্যাস লেখেন নাই। অর্থাৎ ৯/১১ এর পরে বাকার আর উপন্যাস লেখেননি। গত শতক ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামের। আর ইরানি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বাদ রাখলে গত শতকে পোস্ট-কলোনি সময়কালের ইসলাম মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামই; এবং তা আবার ‘এ প্রডাক্ট অব মডার্নিটি’ অর্থে।

    আবুবাকারের সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস “ফূটন্ত গোলাপ”। আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিখাত সব আলোচকদের বেশীর ভাগই এই “ফূটন্ত গোলাপ” সহ কোন উপন্যাসই পড়ে দেখেন নাই। পড়লে দেখতেন এটা (মোটাদাগে ১৯০০ সালের পরে কলোনিয়াল কিন্তু হিন্দু ডমিনেটেড ) কলকাতা কেন্দ্রিক টিপিকাল মধ্যবিত্তের মডেল এর আলোকে লেখা কিন্তু ঢাকার মধ্যবিত্ত। বড়লোক নায়ক গুলসানের ও নায়িকা পুরান ঢাকার, দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। নায়িকার ফ্যামিলির মর্ডানসহ ইসলামি ভ্যালু দ্বারা পরিচালিত হতে অভ্যস্ত, আর নায়কের ফ্যামিলি মর্ডান কিন্তু নামাজ পড়তেও জানে না। এবং নায়িকার ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব যা লেখক ফুটিয়ের তুলেছেন সেজন্য কাশেম বিন আবুবাকার আপনি আমার সালাম নিবেন। বহু প্রগতিশীল এমন ব্যক্তিত্ব ধারে কাছে নয়।  লেখককে ইসলামি মরালিটির ক্ষমতা দেখাতে হবে সেজন্য তিনি লিখতে বসেছেন। ফলে এখানে আবুবাকারের মডেল হল নায়িকা লাঈলি। এই হল কলোনির হাত ধরে উঠে আসা চেনা আধুনিকতা যা কলোনি উত্তরকালের জাতীয়তাবাদ – যার প্রতীক হল মুসলীম লীগ। তা অবশ্যই আধুনিকতার ফসল। তবে উপরে পাঞ্চ করা ইসলামি মরালিটি। এই গল্প এই পরিবার আর ইসলামি ভ্যালু। মনে রাখতে হবে গত শতকে আমেরিকার সাথে ইসলামের (মানে জাতীয়তাবাদি কলোনি মর্ডানিজমের) কোনই সমস্যা নাই, ছিল না। তারা বন্ধু। এমনকি আফগান মুজাহিদ এরা একটু ভিন্ন তবুও  তারা আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু। এর বিপরীতে, একালে চলতি শতকের আলকায়েদার  নিজে কোনো আর অফ প্রডাক্ট অথবা বাই প্রডাক্ট হিসেবেও কোন জাতিবাদী ইসলাম ওটা নয়।
    তাহলে আবুবাকার ও তাঁর প্রেমের উপন্যাসকেও আমেরিকা সহ্য করতে পাচ্ছে না কেন? উদ্বিগ্ন হচ্ছে কেন? আসলে এই সমস্যাটা আমেরিকার, আমাদের না। ফলে বলতেই হয়, আবুবাকারাকে নিয়ে যারা এসব উদ্বেগ-ওয়ালারা এরা হয় হেজিমনি হারানোর ভয়ে  ট্রমাটিক না হয় ধান্দাবাজ। কিন্তু মুল কথা এই “উদ্বেগ”  ভুল জায়গায় ‘নক’ করে বেড়াচ্ছে। ভুয়া সেকুলারদের গলা জড়িয়ে অস্হিরতায় কান্নাকাটির রোল তুলতে চাইছে।

    তাহলে ব্যাপারটা  হল, একটা রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাও সহ্য করতে না পারছে না, আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, কেন? তাহলে আমাদেরই তো আমেরিকান জনপরিমণ্ডলের দিকে তাকাতে হবে, তাই তো না কী?

     সবশেষে পাঠকের কাছে একটা আবেদন রাখব, কাশেম বিন আবুবাকারের কোন একটা উপন্যাস অন্তত তার ফুটন্ত গোলাপ না পড়ে তাকে নিয়ে মন্তব্য করবেন না, অংশগ্রহণ করবেন না, কাউকে শুনবেনও না। এরপর নিজের মুল্যায়ন নিজে করেন। সেই মুল্যায়নের স্বপক্ষে তর্ক -বিতর্কের ঝড় তোলেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ৩০ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]