Category: AFGAN TALIBAN

  • আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

     

    গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

    “রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

    গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

    ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

    অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

    যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

    ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
    বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
    কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

    ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
    তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

    But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

    আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
    কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

    অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

    এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

    সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
    “অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

    উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

    সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

    এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

    কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

    তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

    আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

    যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
    আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

    তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
    ‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

    এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

    আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

    তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

    নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

    আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

    আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

    তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    গৌতম দাস

    ০৯ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

     

    India Not Invited to Extended Troika Meeting on Afghanistan

     

    তালেবানবিরোধী  প্রচারণা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।  ফলে তাদের সতর্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে পা-ফেলা দরকার। এদিকে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি কখনো কখনো বেশি শক্তি দেখাতে চায়। আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council], এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো-রা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়েও বুদ্ধিমান দেখাতে চাচ্ছেন নিজেদের। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে হিমশিম খেয়ে, কী বলবেন এখন, কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা হাতড়ে অসহায় অবস্থায় মুখ বন্ধ হয়ে আসার দশায় তারা। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা এখন আমেরিকাকে সাধুপুরুষ আর মহাভদ্রলোক সাজিয়ে এরপর চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এমনকি ভারতকেও অভিযুক্ত করে নিজ মান বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। বলার চেষ্টা করছেন এসব দেশের স্বার্থের কারণেই নাকি তালেবানেরা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরে আসার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক হয় নাই। এমনকি এর স্বপক্ষে কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেও সে নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই  এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  অতএব,  আটলান্টিক কাউন্সিল – এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব পুরান প্রপাগান্ডায় খ্যান্ত দেয়া, ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  দেখাই যাচ্ছে, রাশিয়ার উদ্যোগে চীনও পাশে দাড়িয়েছে। বাইডেনও যোগ দিয়েছেন। কাজেই নতুন ও ইতিবাচক চোখে  এসব কনসালটেন্টদের সামনে তাকানো উচিত।  বাইডেনের চেয়ে বুদ্ধিমানের ভান করা অপ্রয়োজনীয়।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক করেছে এমন কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেই নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই সেটা এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  কাজেই আটলান্টিক কাউন্সিল, এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  আবার ওদিকে ফ্যাক্টস হল, তালেবানদের আইডিয়া মর্ডান না হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো তাদের প্রতি বিদ্বেষ জাগিয়ে তা কোন সমাধান নয়, এটা তো প্রমাণিত। একমাত্র ডায়লগ চালিয়ে গেলে, এনগেজমেন্ট এটাই পথ।  আর মূলত দরকার আফগানি স্টাবিলাইজিং ফোর্স। যেটা অবশ্যই পুতুল সরকারের কেউ নয়। এটা আপন ভাগ্যন্বেষণের লোক।  তুলনায় তালেবানদের নিয়ে যত আপত্তি আমরা মিডিয়ায় দেখি তবু তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

    ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে আমেরিকা তালেবানবিরোধী পুতুল সরকার বসিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ নিয়ে চলেছিল। অথচ এই কনসালট্যান্ট ফেলো এরাই এখন প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কেন আফগানিস্তানে এমন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি, যেখানে তালেবানের বিকল্প শক্তি তৈরি হয়, কেন তালেবানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকল?” এখন এই প্রশ্ন তাদেরকেই আমরা জিজ্ঞাসা করব। তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তাই তারা বুদ্ধিমানের মত আগে নিজেই প্রশ্ন তুলে জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন, কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। এরাই আবার পাকিস্তানকে দায়ী করছেন যে পাকিস্তান হল তালেবানের “আশ্রয়দাতা”। যেন সে জন্য আজকের আফগানিস্তানে তালেবানরা ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ ঘটনা হল আফগানিস্তান বা তালেবানরা কেউই পাকিস্তানের শত্রু বা বিরোধী ছিল না, স্বাভাবিক পড়শি ছিল। আমেরিকানরাই জবরদস্তিতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে, আমেরিকার আফগান-শত্রুতাকে যেন পাকিস্তানও নিজের শত্রু জ্ঞান করে। আর যাতে আমেরিকা পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে আফগানিস্তানে বোমা ফেলে আসতে পারে। অথচ সেই আমেরিকাই (ইন্ডিয়াকে বগলে নিয়ে ) উল্টো পাকিস্তানকে “জঙ্গি আশ্রয়দাতা” দেশ বলে প্রপাগান্ডা করে গেছে।  অথচ কার্যত এভাবে পাকিস্তান তো আমেরিকান হুকুমে চলে যাওয়া এক দেশ হয়েই ছিল। তাহলে এই পাকিস্তান আবার আমেরিকানদের শত্রু তালেবানদের নিজ দেশেই আমেরিকানদের পাশাপাশি আশ্রয় দেয় কেমন করে!

    আবার একালে আফগানিস্তান সব খোয়ানো আমেরিকার সেই আফগানিস্তানকে ফেলে পালানোর ইচ্ছা বহুদিনের, সেই ওবামা আমল থেকে। এ কারণে তারাই সে সময় চীনকেও আফগানিস্তানে সংশ্লিষ্ট হতে বলেছিল। গ্লোবাল নেতা হতে চাওয়া চীনেরও কিছু কিছু দায়-দায়িত্ব  নেয়া শুরু করুক এই উদ্দেশ্যে আমেরিকা তার কিছু ভার হাল্কা করতে চেয়েছিল, ফলে চীন তালেবানদের সাথে কথা বলুক মূলত এ লক্ষ্যে।  ফলাফলে  এক থার্ড পার্টি দেশ কাতারে  – তালেবানরা যেন অবাধে যেতে-আসতে ও যে কারো সাথে মিটিং করতে পারে; এ ব্যবস্থা ওবামা আমলেই ২০১৫ সাল থেকে চালু করা হয়েছিল। অরিজিনালি ‘সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন’ বা এসসিও জোট গঠন করার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এটিই। যে কারণে সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশ আর চীন ও রাশিয়াকে নিয়েই গঠন করা হয়েছিল এসসিও। অথচ আজ আমেরিকান ফেলোরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন যেন চীন-রাশিয়া নিজ স্বার্থেই তালেবানদের ফেরত আনছে। আর ওদিকে বিবিসি খবর দিচ্ছে কাতারের আলোচনা আরো পুরানা ২০১৩ সালের উদ্যোগ।

    আবার ওবামার পরে ট্রাম্প আরো জব্বর উদ্যোগী যেন পারলে এখনই আফগানিস্তানকে ফেলে নিজ সেনাদের নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু তিনিই তো সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা আফগান পুতুল সরকারের সাথে করেননি; বরং সরাসরি কেবল তালেবানদের সাথেই কথা বলেছিলেন, ‘ডিল’ করেছিলেন। সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিন কী হবে, তাও পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন; যা বাইডেন ক্ষমতায় এসে পুনঃঅনুমোদন দিয়ে সেটি ‘তারও চুক্তি’ বলে স্বীকৃতি দেন। অথচ ট্রাম্প তালেবানদের সাথে কিসের বিনিময়ে কী ডিল করে গেছেন, সেটা প্রকাশ্য নয়। তালেবানরা নিজ উদ্যোগে ক্ষমতা দখল করুক আর এতে ট্রাম্পই অনুমোদন দেয়ার বিনিময়ে- এ শর্তেই আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার বাধাহীন করে দিয়ে যাননি, তা আমরা কি নিশ্চিত? সে জন্যই কি থিংকট্যাংক ফেলোরা আমেরিকা বাদে বাকি সবাইকে আগাম দায়ী করা শুরু করেছেন যেন তাদের জন্যই তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে এসে যেতে পারে বলে – প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। মানে তারা কলসালট্যান্ট এই পরিচয় ধুলায় লুটিয়ে একেকজন ‘প্রপাগান্ডিস্ট’ পরিচয় নিতে চাইছেন! অথচ কী চুক্তি হয়েছে অন্তত ইনফরমালি কিছু তাদের অজানা থাকার কথা নয়!

    রাশিয়ার পুতিনের ট্রয়কাঃ
    অরিজিনালি ট্রয়কা (troika) শব্দের আক্ষরিক অর্থ সেকালের রাশিয়ান তিন ঘোড়ায় টানা গাড়ি; অর্থাৎ তিন শক্তির সমন্বয়ে কোনো একশন। আর এখন এখানে  শক্তি বলতে এরা হল রাশিয়ার পুতিনের উদ্যোগের তিন শক্তি   – রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন। হ্যাঁ, অবশ্যই তারা পরস্পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও এরা আফগান-তালেবান ইস্যুতে একসাথে কাজ করতে নেমেছে। আর একাজে মানে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যেন আফগানিস্তানে কোনো বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা বা সশস্ত্র তৎপরতার ঢল নেমে না আসে, অতীতে যেমন আফগানিস্তানে অনেকবারই ঘটেছে। সেটা ঠেকানোর কাজ।  কিন্তু সেটাই বা ট্রয়কা চাচ্ছে কেন?

    খুবই সংক্ষেপে বললে, সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিবদমান পক্ষ ও স্বার্থগুলো একত্রিত হয়ে একটি রাজনৈতিক নেগোশিয়েশনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি থিতু সমাজ, একটি ফাংশনাল সরকার আর ন্যূনতম আইনশৃঙ্খলা স্থাপন করতে যেন সক্ষম হয়, সে কাজে সহায়তা করা এই ট্রয়কার উদ্দেশ্য।

    গত ২০১৮ সালের শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তালেবানদের সাথে কথা বলার, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেনা প্রত্যাহার। কারণ তার সরকারের অর্থ আফগানিস্তানে ঢালার অপচয় চলছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল ছাড়াই। তাই তিনি এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট  – জালমে খলিলজাদেকে [Zalmay Mamozy Khalilzad, an Afghan-American diplomat]  সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে তাঁর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি তালেবানদের প্রধান আলোচক বা নেগোশিয়েটর মোল্লা আবদুল গনি বারাদরের সাথে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার নিয়ে কথা শুরু করতে পারেন। আর মূলত প্রথম থেকেই তালেবানদের শর্তানুসারে আফগান পুতুল সরকারের কোনো প্রতিনিধিই তাদের দুপক্ষের কোনো সভাতেই না রাখার নিয়ম চলে আসছে। কারণ এতাই তালেবানদের শর্ত ছিল। শেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একটি চুক্তিতে তারা পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিল আমেরিকার নির্বাচনের বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখে; যদিও এর বাস্তবায়নের মূল উদ্যোগের মাঠের কাজ গড়িয়ে যায় পরের বছরে। অর্থাৎ তত দিনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে নিয়েছেন।

    কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরে অনেক স্থানে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় তালেবানদের সশস্ত্র তৎপরতা। এ ঘটনায় তাই উদ্বিগ্ন হয়ে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল পুতিনের রাশিয়া। কেন? সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়ান স্বার্থ কী?

    ২০০৮ সালে সেকালের জি-৮ গ্রুপ থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার পর (আবার তা জি-৭ হয়ে যায়) রাশিয়া-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল। তা কখনোই ভালো হয়নি। কিন্তু আফগানিস্তানের যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা আজো রুশ স্বার্থের জন্য অনেক কিছু যায়-আসে, তাই গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই রাশিয়ার স্বার্থ। এসব দেশ অতীতে জার সাম্রাজ্যের অধীনে দখলে গিয়ে প্রথম রাশিয়ান শাসিত  অঞ্চল হতে শুরু করেছিল।  ফলে সেই থেকে পরে (১৯১৭-১৯৯১) কমিউনিস্ট আমলেও শুরু থেকেই এই সেনট্রাল এশিয়া কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যায়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে সেন্ওটাল এশিয়ান দেশগুলো আলাদা আলাদা দেশ হয়ে যায় তবুও তা বড় পাহারাদার বা রাশিয়ান বলয়ের দেশ হয়েই থেকে যায়। আসলে এখনও পর্যন্ত আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর ভিতর কোন র‍্যাডিক্যাল ইসলামী সমাজ-রাজনীতির চিন্তার প্রভাবে যেন সেন্ট্রাল এশিয়ায় সাজানো রুশ ভারসাম্য নষ্ট না হয়ে যায়, এ দিকে পরের রাশিয়ার সব শাসকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, এখনো আছে। এটাই কোর রুশ স্বার্থ।

    এমনকি যেমন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে খোমানির ইরান বিপ্লবের পরে এর প্রভাবে না সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন-বিপ্লবের ছাপ পড়ে যায় বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে; এই ভয়ে ভীত হয়েই ছয় মাসের মধ্যে ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরেই আগাম আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ কার্যত আফগানিস্তান হল ইরান থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে [The region consists of the former Soviet republics of Kazakhstan, Uzbekistan, Tajikistan, Kyrgyzstan, and Turkmenistan.] বেশির ভাগ জায়গায় আলাদা করার এক ভুখন্ড ও দেয়াল। তাই সেই ইরান বিপ্লবের পর শুরু হয়ে আফগানিস্তান আজো এক হট স্পট ও আন্তর্জাতিক ইস্যু।

    এ কারণে রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক যতই নিচে থাকুক না কেন, পুতিনের রাশিয়া আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ও স্বার্থে রাশিয়াকে অনেক কিছু করতেই হয়। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমেরিকা ও চীনকে সাথে নিয়ে ট্রয়কা গড়ে নিয়েছেন পুতিন। সেই পুরনো উদ্দেশ্য, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোন রেডিক্যাল ইসলামি চিন্তার ছাপ বা আঁচ যেন মধ্য এশিয়ার দেশে না পড়ে যায়। এদিকে চীন এখন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল নেতা হওয়ার দাবিদার। ফলে তারও দায়-স্বার্থ আছে। ফলে রাশিয়া ঢাকলে তাকেও অংশ নিতেই হয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে চীনের খোদ সীমান্তই আছে।

    তাহলে মুলকথা, এই ট্রয়কায় চীন ও রাশিয়া এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা শত্রুতা থাকলেও মিলের ভিত্তিটা ঠিক কী? কেন?
    এই ভিত্তিটাই হল, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার, যার কেন্দ্রে আছে জাতিসঙ্ঘ। ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্র রেখে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাই এর ভিত্তি। কেন?
    এই জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা  – যেটা গত ৭৫ বছর ধরে ফাংশনাল হয়ে আছে, এটি নিয়ে অজস্র অভিযোগ এবং এর নানান খুঁত ও ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তা সত্ত্বেও এটাই দুনিয়াতে একমাত্র গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার কায়েম করা এক সিস্টেম। আর এটা না থাকার মানে ১৯৪৫ সালের আগের সময়ে ফিরে যাওয়া, যখন যুদ্ধ করারও কোনো নিয়মনীতি মানার বালাই নেই; আইনকানুন  বা প্রটেকশন নাই।  চাইলে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে ‘নির্মূল’ করে দেয়াও ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। জর্মানিতে হিটলারের হাতে ইহুদি নিধন ও নির্মুলের চেষ্টা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। রেসিজমও কার্যত বৈধ ছিল মানে কোনো বাধা ছিল না – যা খুশি, জোর যার রাজ্য তার এবং সর্বোপরি কাউকে কোন ভুখন্ড দখল নেয়া বা কলোনি করে রাখাও ন্যায্য ছিল।  শুধু তাই না  কলোনিদখল করে রাখা এটাই সেকালের  প্রধান ফেনোমেনা ও প্রচলিত ঘটনা ছিল। সারা অখন্ড ভারত বৃটিশ কলোনি হয়ে ছিল।   কাজেই সেই পরিস্থিতির বিপরীতে  জাতিসংঘ – এটাই সবেধন নীলমনি, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের ভারকেন্দ্র। আর এটি দাঁড়িয়ে আছে যে ভিত্তি-অবস্থানের  উপর তা হল, কোনো ভূখণ্ডের নাগরিক বাসিন্দারা হল আসল ক্ষমতার উৎস;  তারাই একমাত্র নির্ধারক যে কোনো ভূখণ্ড কার দ্বারা শাসিত হবে। ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ এই নির্ধারণের একমাত্র হকদার – এ ভিত্তিতে। তাই এটা মূলত অন্য কারো দেশ দখল বা কলোনি করে নেয়ার বিরুদ্ধে এক রক্ষাকবজ। যেকারণে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর  নেহেরুর ভারতের সাথে যুক্ত করে দিয়ে গেছে, এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ একথা বলবার হকদার একমাত্র কাশ্মীরের জনগণ, কোন রাজা নয়।  আর সেখান থেকেই, এই আইনিভিত্তি – পরোক্ষেও রাজা-বাদশাহদের কোন ভুখন্ডের শাসন ক্ষমতাকেও বৈধতা দেয় না। তবে একটা ছাড় আছে যে, আগে থেকে চলে আসা কোনো রাজতন্ত্র বা বাদশাহতন্ত্রকে জাতিসঙ্ঘ অবৈধ বলতে চায় না, যতক্ষণ না ওর অভ্যন্তরীণ জনগণ সংগঠিত হয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ চায় বা দাবি করে। অর্থাৎ জাতিসংঘের ফর্মুলা হল গণভোটে চলে যাওয়া ও সে রায়ের ভিত্তিতে দাবির ফয়সালা করা।

    ঠিক এ কারণে ট্রয়কার কাজের ভিত্তি জাতিসঙ্ঘ ও একে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার-টা। আর ২০১৯ সালের মার্চ থেকে এই ট্রয়কা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন মিটিং করে আসছে, আর সেখানে জাতিসঙ্ঘের পাশ হওয়া বিভিন্ন প্রস্তাবকে ভিত্তি করেছে এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিকেই সংশ্লিষ্ট করেছে। আর তাই সেখানে ৩০ নভেম্বর ২০২০ এক রেজ্যুলেশনের তিন নম্বর সিদ্ধান্ত হল এরকমঃ [কথাগুলো ট্রয়কার এক বিবৃতি থেকে নেয়া]

    3. As stated in the UNSC resolution 2513 (2020), we do not support the restoration of the Islamic Emirate and we call on the Government of the Islamic Republic and the High Council for National Reconciliation to engage openly with their Taliban counterparts regarding a negotiated settlement.

    অর্থাৎ, ট্রয়কা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) ২০২০ সালের এক সিদ্ধান্ত অনু- সমর্থন করছে। আর যেখানে বলা হয়েছে, তারা ‘তালেবানদের ইসলামিক আমিরাতকে পুনঃস্থাপন সমর্থন করছে না”। বরং আহ্বান রাখছে যেন আফগানিস্তানের বিবদমান সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সবাই সংশ্লিষ্ট হয়ে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছায় এবং বিবাদের একটি শান্তিপূর্ণ সুরাহা যেন হয় এবং তা করতে উতসাহ ও সহায়তা দিতে চায়।

    এসব প্রস্তাবকে কিভাবে দেখব ও বুঝব?
    প্রথমত শুরুতে যেমন বলেছি আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো যারা সব দোষ তালেবানের বলে তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন, অথচ এরা জানেন একটি  ট্রয়কা-উদ্যোগ কাজ করছে ফাংশনাল; যেখানে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন এই তিন শক্তি সক্রিয়। অথচ এরা তালেবানদের এক  শত্রুজ্ঞান করে আগাম কোন ক্যাম্পেইন করতে বসেনি। কেবল ডায়লগে সবাইকে নিয়ে বসে একটি পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট করে নিতে বলছে, সাহায্য করতে চাইছে। অথচ এই থিংকট্যাংক ফেলোরা তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় আগাম নেমে গেছেন, যা আসলে ভারতের অবস্থান! এমনকি এ্টা আমেরিকার অবস্থানও নয়। উপরের ট্রয়কার বিবৃতিটা আমেরিকান সরকারি ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া যার শিরোনাম – Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan.।

    এখন অনেকে মনে করতে পারেন যে এই সেট হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটা আপনি পছন্দ করেন না, তা হতেই পারে। জাতিসঙ্ঘ এর একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। বরং কেবল শুরু যাকে অনেক পথ হাঁটতে হবে, বদলাতে হবে, অন্য অনেক ‘অপরকে’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ডায়লগ করতে হবে। যেমন ধরা যাক, আপনি এক ইসলামিস্ট অথবা কোনো কমিউনিস্ট, যিনি গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটাকে পছন্দ করেন না বা এটা আপনার ফেভারে বলে দেখেন না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

    আসলে এ ব্যাপারটা অনেকটা আগে থেকে গড়ে থাকা একটি শহরের মত, যেখানে ওই শহরের ভেতরে বাসিন্দাদের বসবাস ও থাকা বা চলাচল ইত্যাদির জন্য সেখানে প্রচলিত নিয়মকানুন আইন কনভেনশন সবই আছে। ধরা যাক, আপনি এখন বাইরে থেকে এসে ওই শহরেই বাস করতে চাইছেন। কিন্তু আপনার দাবি ওদের সব নিয়ম আইনের কিছুই আপনি মানেন না; কারণ এগুলো তৈরির সময় আপনার মতামত নেয়াই হয়নি। এখন – এমন কথা বলে যদি ওই শহরে ঢুকতে যান এতে ফলাফল হতে পারে এই যে, ওরা উল্টো আপনাকেই আউটকাস্ট, কী বাইরের লোক বা গোঁয়ার, গাঁইয়া অভব্য আনকুথ কিংবা ধরেন জঙ্গি বলেই বের করে দিতে পারে। আইনের শাসন না মানা লোক বলে ‘অমার্জিত’ ট্যাগ দিয়ে আপনাকে একা করে দিতে পারে; আর এমন ইমেজের কারণে হয়তো আপনি আর কারও কোনো সহানুভুতি বা আপনার কী হয়েছে, তা শুনানোর মত কাউকেই পেলেন না- এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখার দশায় পড়ে যেতে পারেন।

    তা হলে এদেরকে মোকাবেলার উপায় কী?  আছে। একারণে ঐ শহরে ঢুকতে গেলে আপনাকে পরিকল্পনা-কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। তাই সম্ভবত এর চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রথমত আপনি তাদের নিয়ম মানেন বলে প্রবেশাধিকার তো নিয়ে নিবেন আগে। এরপর ওদের নিয়ম মেনেও চলেন। আর এবার কেউ আপনার পাল্টা নিয়মটা যা আপনি চালু করতে চান, সেটা কেন বেশি ভালো সেটা দেখান ও এই প্রচার চালান আশপাশে। ওই শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটে নিজের ভালো চিন্তাগুলো তুলে ধরার চেষ্টাও করতে পারেন। এরপর সময়ে আপনার দলে ভারী বুঝলে এবার তখন ঐ শহরের পুরানা সব নিয়ম বদলানোর চেষ্টা বা উদ্যোগ নেন।

    অর্থাৎ এর মূল কথাটা হল – খেলার পুরনো নিয়ম বদলাতে চাইলে দূরে গ্যালারিতে বসে থেকে তা বদলাতে পারা যাবে না। উল্টো আপনাকেই এরা উপড়ে তুলে ফেলে দিতে পারে। এর চেয়ে বরং খেলায় অংশ নিয়ে খেলতে খেলতেই এমন পুরনো নিয়ম বদলাতে চেষ্টা করতে পারেন। এর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই পথ না ধরলে কী হবে?

    সেটা একটি উদাহরণে বলা যাক। গত ৩০ জুলাই আমাদের স্থানীয় প্রথম আলো দৈনিকের খবরের শিরোনাম – “ফজলের ‘কৌতুক’ চিরতরে স্তব্ধ করল তালেবান”। ফজল, তিনি আফগান পুতুল সরকারের এক পুলিশ অফিসার ফজল মোহাম্মদ। তিনি অনলাইনে হাস্যরসাত্মক নানান ভিডিও পোস্ট করার জন্য আফগানদের কাছে তার পুলিশ পরিচয়ের চেয়ে ‘কৌতুক অভিনেতা’ বলে বেশি পরিচিত। কিন্তু তালেবানরা নাকি প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি বাড়ি ফেরার পর তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করে। এ ক্ষেত্রে হত্যার কথা শুরুতে অস্বীকার করলেও পরের সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরই তাকে হত্যার কথা স্বীকার করে তালেবান। এ হলো খবরটার সারকথা। তবে অবশ্য আফগানিস্তানে অনেক সময় এসব হত্যা প্রকাশ্যেও ঘটে থাকে।

    এখানে তালেবানদের জন্য খবরটার  সবচেয়ে খারাপ দিকটা  হল, এটা তার ইমেজ ধ্বংস করেছে। সেটা তালেবানেরা আইনের শাসন মানে না আর জঙ্গি ট্যাগ লাগানো ধরণের ইমেজ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অবশ্যই। তাই খবরটা যতটা সত্যি তাতে তালেবানদের এমন স্টাইলের তৎপরতা আত্মঘাতী!

    কোনো যুদ্ধের মাঠে আপনি বা আপনার শত্রু খুন হয়ে যাওয়ার একটা আলাদা অর্থ হয়। সামরিক ইস্যুতে এর ক্রিমিনাল আইনে মামলা হয় না। তবে এর বিপরীতে তুলনামূলক শান্ত এক জনসমাজে আপনি ঘর থেকে কোনো জেনুইন অপরাধীকেও যদি উঠিয়ে এনে জনসমক্ষে মেরে ফেলেন এর ফল হবে উল্টো। আপনি অপরাধী হবেন। এছাড়া নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ, ওই সময়ে অসহায় যে মানুষটা খুন হচ্ছে, তা যারা দেশে-বিদেশের লোক দেখবে  এরা প্রায় সকলে নিজেকে আবিষ্কার করবে ঐ খুন হওয়া নিরস্ত্র লোকটার ভিতরে। ফলে খুন হয়ে লোকটার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর এটাই আপনার জন্য বিরাট নেতি-ইমেজ তৈরির উপাদান হয়ে উঠবে। বলাই বাহুল্য এই ইমেজের জন্য এবার আপনিই হেরে যাবেন।  আপনি নৃশংস খুনি, কিংবা আপনার ধর্মটাই খারাপ এমন বয়ান উঠে আসতে পারে। তা হলে করণীয়?

    এমন ঘটনা যুদ্ধের মাঠের খুনোখুনি কিনা সেটা এক বড় প্রশ্ন। যদি তা হয় বুঝাতে চান, তবে আগে যুদ্ধ ঘোষণা করে নেয়া হয়েছে সে প্রমাণ হাজির দেখান।  নইলে অপর বিপরীত পথ হল,  কাউকে (সে অপরাধী হলেও) হত্যা করার আগে তার বিচার হতে হবে। এখন বিচার মানে কিন্তু অনেক কিছু। যার শুরু সেই কনস্টিটিউশন থেকে। এরপর রাষ্ট্র সরকার আইন, বিচারব্যবস্থা সেটআপ ইত্যাদি অনেক কিছু। মানে আসলে সবার আগে ক্ষমতা দখল করে নিতে হবে। এরপর আবার অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে এবং স্থায়ী ও আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আদালত থাকতে হবে। আর গ্রেফতারকারীই পরে বিচারক এবং তিনিই আবার শাস্তি বাস্তবায়নকারী, তিনি এমন হতে পারবে না। মানে পুলিশিং আর বিচারক একই লোক হতে পারবে না। নইলে তো যে কেউ যে কাউকে অপরাধী বলে মেরে ফেলার অরাজকতা শুরু হয়ে যাবে। আর এখানেই দেশে-বিদেশে আপনার ইমেজ আপনার রাজনৈতিক চিন্তা কেমন, আপনি দায়িত্বশীল ক্ষমতাবান মানুষ কি না – এসব বহু প্রশ্ন ভর করবে। বলাবাহুল্য, আপনি জঙ্গি, আপনি অমানবিক গুণের বা আপনি নৃশংস, কাজেই আপনার ধর্মটাই খারাপ- এই ইমেজ দাঁড় করানোর জন্য একদল লোক অবশ্যই হাজির থাকবে। অর্থাৎ আপনি নিজেই ২০০১ সালের মতো নিজেকে উপড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পক্ষে কাজ করতে পারেন না।  এমন বোকামির অর্থ হয় না।  কাজেই আপনার  দায়ীত্বশীল ও গঠনমূলক ইমেজ অবশ্যই খুবই জরুরি।

    সারকথায় একালের দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে একটা কিছু আছে, একে অবজ্ঞা করবেন না। একে মানুন আর না-ই মানুন, একে আগে বুঝুন। এরপর এগোনোর পদক্ষেপ কৌশল ঠিক করেন। নইলে বেঘোরে মার খেয়ে উলটা আপনিই হারিয়ে যাবেন।  এরা আপনাকেই উপড়ে ফেলে দিবে!

    আফগানিস্তান নিয়ে এত হইচইয়ের কারণ কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ট্রয়কার গঠন দিয়ে। পরে এই ট্রয়কা নিজেকে প্রথমে নিজেকে বর্ধিত করে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আর তাতেই ঘটে প্রথম বিস্ফোরণ। কেন?

    প্রথমত, পাকিস্তান হল ল্যান্ডলকড আফগানিস্তান ভূখণ্ডের এক প্রবেশদ্বার, যা সমুদ্রের পর  পাকিস্তানের পেরিয়ে এরপর সহজেই প্রবেশ করা যায়। আমেরিকা এজন্য আফগানিস্তানে হামলা চালানোর আগে পাকিস্তানকে হাত করে, বাধ্য করে, ঘাঁটি বানিয়েই নিয়েছিল। অতএব, আফগানিস্তানে ব্যবহারিক যেকোনো পদক্ষেপের আগে ট্রয়কাকে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে নেয়া জরুরি ছিল। কাজেই রাশিয়া নিজে উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কথা বলে সসম্মানে তাকে ট্রয়কার বাড়তি সদস্যের ভূমিকায় জুড়ে  নিয়েছিল।

    কিন্তু রাশিয়া আমেরিকা বা চীনের ত্রয়কার এসব ব্যবহারিক সমস্যার দিকটি ভারতের বুঝার বা আমল করার মত অবস্থান নিলে ভারতের চলে না। এমনকি মনে মনে মানলেও তা স্বীকার করা অসম্ভব। কারণ? ও পাকিস্তান- এটা তো একটা জঙ্গি রাষ্ট্র, ‘তালেবানদের মদদ দেয়া রাষ্ট্র’ ইত্যাদি গত ২০ বছর ধরে ভারত তার দেশের ভিওতরে বাইরে  প্রপাগান্ডা করে এসেছে।  নিজের সেই কথা তো এখন ভারত টিকাতে পারছে না। মানে এখন প্রশ্ন হল, পাকিস্তান যদি জঙ্গি রাষ্ট্রই হয়, তা হলে তো সে রাশিয়া, আমেরিকা বা চীনের পাশাপাশি একই মর্যাদার আসনে বসতে পারে না। আর বাস্তবে যদি বসতে দেখা যায় তার মানে পাকিস্তান জঙ্গি রাষ্ট্রই নয়, দায়িত্ববান রাষ্ট্র। তাই যদি রাশিয়া পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতকেও ট্রয়কায়  সাথে নিত, তাতে  হয়ত ভারতের কিছুটা মুখরক্ষা হত।   মানে ভারত নিজেই এখন আগের ইসলামবিদ্বেষী নিজের ছড়ানো ঘৃণার মধ্যেই নিজেই আটকে গেছে!

    ওদিকে রাশিয়া আবার পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভিতরে নিয়ে ট্রয়কাকেই পরে ট্রয়কা-প্লাস [troika+] নাম দিয়ে নিয়েছে, ফলে তাতে ভারতের জ্বলুনি আরো বেড়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির আর বাইরে খুবই কম প্রচারিত ঘটনা বলে এত দিন ভারত এই লজ্জা লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। যদিও তাদের মিডিয়া গত মার্চ ২০২১ থেকেই জানত যে ভারতকে বাদ দিয়ে ট্রয়কার মিটিং চলছে [ India not part of Russian meet on Afghanistan]।  কিন্তু এখন, গ্লোবাল মিডিয়ায় আফগানিস্তানে কী হচ্ছে এটা এক শীর্ষ ইস্যু। তাই মিডিয়া জুড়ে  আগাম ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে,  আগামি ১১ আগস্ট হবে ট্রয়কা+ এর পরের মিটিং। আর সাধারণত এসব মিটিং  এতদিন হয়েছে রাশিয়ায় না হলে কাতারে। কারণ কাতার ২০১৫ সাল থেকে আফগান-তালেবান ইস্যুতে নিরপেক্ষ হোস্ট। তাই সেও ট্রয়কার মিটিংয়েও প্রতিনিধি পাঠায়; সাথে ওই মিটিংয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ইরান ও তুরস্ককেও নেয়া হয়েছে। এতে এখন ভারতের মিডিয়াও আর দেশপ্রেমের জোশে মোদি-জয়শঙ্করকে জবাব দাবি করে  পার পাচ্ছে না।  একেবারে সবারই ইজ্জতের সওয়াল হয়ে গেছে।  কারণ এখন ভারতের চেয়ে  (কথিত জঙ্গী) পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন গ্রহণযোগ্য আর দায়ীত্বশীল রাষ্ট্র হিসাবে  আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের সাথে সমান মর্যাদার টেবিলে বসেছে কথা বলছে। এটা ভারতে বসে দেখা যায় না! এমনই কঠিন জলুনি!   আর এসব কথা বাংলাদেশেও  ভারত প্রভাবিত মিডিয়ায় বড় করে আসায় বাংলাদেশেও ভারতের এই বেইজ্জতির খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

    রাশিয়া ভারতকে এমন বিমুখ ও বেইজ্জতিতে ফেলল কেন?
    রাশিয়ার সমস্যা ভিন্ন! রাশিয়া মনে করে এই আগস্টের শেষে সেনা প্রত্যাহারের পরে বর্তমান আফগান পুতুল সরকারের আর ক্ষমতায় থাকা ঠিক নয়। ,[However, the Russian side appears opposed to the continuation of the Ghani government and favours an interim set-up ……]   বরং অন্তর্বর্তীকালীন ও সবার প্রতিনিধিত্বমূলক এক সরকারের থাকা উচিত, যার কাজ হবে সবাইকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। আর এর বিপরীতে ভারতের অবস্থান হলো, বর্তমান পুতুল সরকারে হাত দেয়া যাবে না” [While India has backed the government of President Ashraf Ghani…।]।’ আরো আগিয়ে ভারত বলছে, গায়ের জোরে পুতুল সরকারকে বদলালে ভারত মানবে না। যেন ভারত না মানলে বিরাট কিছু যায়-আসবে!

    কথা হল, প্রথমত ক্ষমতা তো মুরোদেই মানে গায়ের জোরেই বদলাতে হয়, বদলায়। যদিও এ্টাই শেষ নয়। এরপর ক্ষমতা নিজের কাছে রেখে কিন্তু  সব পক্ষকে নিয়ে প্রপার সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন গড়তে তো অসুবিধা নেই।
    আর তালেবানদের ক্ষমতা দখল না করতে কেউ স্পষ্ট করে তো কিছু বলেনি। ত্রয়কাও কোন আগাম আপত্তি প্রকাশ করে নাই। এমনকি ব্রিটেন আগাম জানিয়েই দিয়েছে, সে স্বীকৃতি মানে কাজ করতে রেডি। কাজেই তালেবানরা ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়ার পর তখন ত্রয়কার কথা শুনে তাদের কনসার্ণ গুলো আমল করে চলতে অসুবিধা হবার কথা না! যেমন তারা সব পক্ষীয় সরকার ইত্যাদির করতে গেলে অসুবিধা কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়ার ত্রয়কা ভারতের বুকে শেল মেরেছে“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

    ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

    গৌতম দাস

    ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2tY

     

    ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

    পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

    রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

    তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

    বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

    ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

    উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
    উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

    গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে।

    প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

    কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

    কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

    কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

    কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

    তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party’”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

    কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

    কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

    তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

    কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

    এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

    কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

    ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

    তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
    যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

    সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

    ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
    নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

    কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
    পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

    সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

    আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
    ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

    কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
    তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের সাথে প্রথম অস্ত্রবিরতি

    সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের প্রথম অস্ত্রবিরতি

    গৌতম দাস

    ২৩ জুন ২০১৮, ০০:০২

    https://wp.me/p1sCvy-2sl

     

     

    SCO, সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন – এই সংগঠন শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। এর আজকের জায়গায় আসার পেছনে কয়েকটা ঘটনা পটভূমি হয়ে আছে। সেখান থেকে জানা যায়, এসসিও বা সাংহাই গ্রুপের আজকের ভূমিকা এবং এর সম্ভাবনা ও অভিমুখ। এসসিও (SCO) বা সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন কী ও কেন?

    এমনিতেই পুরনো ইতিহাস অর্থে সাধারণভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়ার (মধ্য এশিয়া বলতে পাঁচ রাষ্ট্র বুঝায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। যদিও এর বাইরে মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের অংশকেও মধ্য এশিয়া বলতে বুঝানো হয়ে থাকে।) সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ঘটনা ঘটেছিল ইসলাম যখন বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় (abbasid dynasty) খলিফা শাসন (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। আগের শাসক চীনা ‘তাং রাজবংশ’ (Tang dynasty) আব্বাসীয়দের হাতে পরাজিত হলে সেন্ট্রাল এশিয়া সদলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় বড় প্রভাবের ঘটনা হল, কলোনি দখলদারি যখন দুনিয়ার মুল অভিমুখ ও সাম্রাজ্য শাসনের স্টাইল সেই আমলে রাশিয়ান জার এম্পায়ারের। সে আমলে ১৮৩৯-৮৫ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে নানান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রাচীন জার সাম্রাজ্যের সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। যতক্ষণ না এর পালটা বৃটিশ এম্পায়ার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার দিক থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্থানে না পৌছেছিল।

    আর একালের প্রথম ঘটনা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া (১৯৯১) যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল রাশিয়াসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার ঐ পাঁচ রাষ্ট্রই। তবে রাশিয়াসহ কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এরা সবাই এখন সাংহাই গ্রুপের সদস্য। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে এক জোট গঠন তাদের হাতে শুরু হয়েছিল ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ- এই নাম দিয়ে ১৯৯৬ সালে; তবে তখনো উজবেকিস্তান এতে যোগ দেয়নি বলে তখন ছিল পাঁচ রাষ্ট্র, তাই ‘সাংহাই ফাইভ’।

    দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় যে ভয়ে সবসময় দিন কাটাতে হত তা হল, আমেরিকা বা ইউরোপ অর্থে, পশ্চিমা শক্তি যেন ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে আলাদা হয়ে পড়া ১৫ রাষ্ট্র বিশেষ করে, সেন্ট্রাল এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ও খাতির জমিয়ে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ধরণের সম্পর্ক জমিয়ে এগিয়ে যেতে না শুরু করে। যদি তা পারে তাহলে প্রায় ১৮৮৫ সালের পর থেকে নিশ্চিত থাকা রাশিয়ার এশিয়ার দিক থেকে নিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়বে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া সবসময় চেষ্টা করে গেছে নানা উছিলা, নানান জোট, সামাজিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে এর মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকতে। [তবে সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে একটা রাষ্ট্রের কথা এতক্ষণ বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা হলো তুর্কমেনিস্তান। কারণ, দেশটি সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সদস্য নয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না।]

    এখন গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেন্ট্রাল এশিয়ার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হল এটা ল্যান্ডলকড এবং চার দিকে পাহাড় পর্বতের ভেতর ডুবে থাকা, এক কথায় বদ্ধ। এশিয়ার সর্বোচ্চ উত্তরে, গহীন পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে যত বিদেশী শাসক এর জীবনে এসেছে শেষ বিচারে সে কলোনিপ্রভু এ যেমন সত্য, ততোধিক সত্য হয়ে যে, সেইই তার বদ্ধ-দশা বিশেষত বদ্ধ অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকা ও গতি আনার ক্ষেত্রে, ত্রাতা হয়ে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া গহীন পাহাড় ঘেরা অঞ্চল বলে সেকালের পশ্চিমা শক্তি ইউরোপও এদের দখলে নিতে আসতে পারেনি অথবা এটা তাদের পোষায়নি। তবু শেষ দিকে ব্রিটিশেরা একবার উঁকি মেরেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার তার উপনিবেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে আজকের পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা চালাতেই সেন্ট্রাল এশিয়া আরো নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে পোক্ত হয়ে যায়।

    বলা যায়, সেই থেকে জার সম্রাটের উপনিবেশ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল এশিয়া। এই সত্য পূর্ণ স্বীকার করেও বলা যায়, এই সম্রাট ও সাম্রাজ্যই ছিল তার একমাত্র আশার বাতি। কেন? কারণ ল্যান্ডলকড সেন্ট্রাল এশিয়ার আবদ্ধতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে তিনিই একটু সম্ভাবনা। এখান থেকে বের করে সমুদ্রে পৌঁছানোর রাস্তা অথবা অন্য রাষ্ট্রের ভূমি পেরোনোর পর সমুদ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কেউ যদি দেখাতে পারেন, তিনি হলেন ঐ উপনিবেশবাদী শাসক জার সম্রাট। ইতোমধ্যে জার সম্রাটের উচ্ছেদ ঘটিয়ে লেনিনের বিপ্লব (১৯১৭) হয়ে গেলেও ‘সেন্ট্রাল এশিয়া হল পুরনো জারের কলোনি’- এই সম্পর্কটাই থেকে যায় কিছুটা নতুন সোভিয়েত কাঠামোতেও। যা হোক, আজো সেন্ট্রাল এশিয়ায় যা কিছু কলকারখানা তা সোভিয়েত সূত্রের এবং তার সমুদ্র দর্শনও। আর অনেক কথার এক কথা হিসেবে বলা যায়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে, এখনো সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচ রাষ্ট্রের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনবরত রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটা তাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। হয়তো নিজ নিজ স্কুলগুলোতে রুশ ভাষা শেখার সুযোগ আগের মতোই তারা এখনও চালু রেখেছেন।

    আর একাল? পুতিনের রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কথা উপরে বলেছি। কিন্তু সামর্থ্য বা মুরোদ পুতিনের নেই। সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমের কোনো প্রভাব ঠেকাতে হলে আগেই ব্যাপক অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যয় ও বিপুল বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। তা হলেই হয়ত সেন্ট্রাল এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকানো সম্ভব। এই বিবেচনা থেকেই পুতিনের সব সামর্থের মূল উৎস হল চীন। পুতিনকে সাথে নিয়ে চীন ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ তৈরি করেছিল। এটা একই সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক জোট হিসেবে হাজির হয়েছিল। তুলনায় আর অন্য সব জোটের কথা আমরা শুনি এরা মূলত সবগুলোই অর্থনৈতিক জোট। এছাড়া এই জোটের ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে আরো সহজেই আগানোর সুযোগ এর হাতে আসে।

    নাইন-ইলেভেনের (২০০১) হামলার পর আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক হামলা সাংহাই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে প্রথম ধাক্কায় মনে হলেও পরে (২০১১) বুঝা যায়, এটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইন-ইলেভেনের আগেই ২০০১ সালের জুন মাসে আগের ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ নিজেকে SCO, (সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন)- এই নতুন নামে ও ম্যান্ডেটে নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিয়েছিল। এই লেখায় সংক্ষেপে এরপর থেকে একে ‘সাংহাই গ্রুপ’ লিখব।

    ওবামার আমেরিকার ২০১১ সালে এসে আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে এ দেশকে বিধস্ত করে ফেলে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূল কারণ ওই যুদ্ধ অনন্তকাল অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ব্যয় বেড়েই চলেছিল। এ এক বিরাট জগাখিচুড়ি। জট পাকানো এই দশা থেকে বের হওয়ার সব উপায় আমেরিকা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদিকে যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমেরিকা অপারগ হয়ে শুধু নিজ অর্থনীতি ভেঙে ফেলা নয়, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাও ডেকে এনেছিল। এই পরিস্থিতিই SCO -এর জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।

    লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে সাংহাই গ্রুপের সদস্য সবাই আফগানিস্তানের পড়শি এবং আফগানিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত আছে। ফলে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরের পরিস্থিতিতে কারা তালেবান ও প্রো-আমেরিকান আফগান সরকারকে সহায়তা করবে, কে শান্তি স্থিতিশীলতার দিকে নেবে, এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা কারা তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার কোন রফায় পৌঁছাতে পারবে – এমন শক্তির অনুপস্থিতি ও অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, ওই অঞ্চলের সবকিছুকে গভীর সঙ্কটে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা আমেরিকা নিজেরও স্বার্থ ছিল এখানে। কিন্তু সে কাজে তার নিজের কোনো ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতা কোথাও ছিল না।

    স্বভাবত এই পরিস্থিতিতে চীনের নেতৃত্বে সাংহাই গ্রুপ দুনিয়াজুড়ে সবার কাছেই ‘একমাত্র ত্রাতা’ হয়ে হাজির হয়। কারণ আফগানিস্তানে পশ্চিমা শক্তির তুলনায় যে কারো চেয়ে চীন হল সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য শক্তি। এর মূল কারণ, আফগানিস্তানে একমাত্র চীনের হাতেই কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অসহায় আমেরিকা প্রকাশ্যে চেয়েছে এবং স্বীকার করেছে চীন আফগানিস্তানে ভূমিকা নিক। সাংহাই গ্রুপ ভূমিকা রাখুক। অন্তত যুদ্ধে ভেঙে পড়া আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে, অবকাঠামো গড়তে।

    মোটামুটি ২০১৫ সাল থেকেই চীন আফগান তালেবানদের সাথে ডায়লগে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে এর আগেও এবং পাশাপাশি, আফগানিস্তানে সামাজিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠনসহ বহু অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে তৎপর হয়ে গেছিল। এ ছাড়াও আফগানিস্তানকে এখন সাংহাই গ্রুপের ‘অবজারভার সদস্য’ করে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই এ বছর থেকে এর পূর্ণ সদস্য। ফলে সব মিলিয়ে আফগানিস্তান বুঝে গিয়েছিল আমেরিকার মতো চীনের হাতে অস্ত্র নেই, অথচ চীনের হাতে আছে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা। আর শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা প্রধান উপাদান, মানুষকে পুনরায় অর্থনৈতিক জীবন ও তৎপরতায় ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত- বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা একমাত্র চীনের এবং সে তা দিতে অপেক্ষা করছে।  ফলে চীনা উদ্যোগ এবং তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা – সহজেই কাজ করতে শুরু করেছিল। এখন শুধু কাজ করতে নয়, ফল দিতেও শুরু করেছে।

    এটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা রিপোর্ট। এখানে মূল ঘটনাটা হল চীনের তালেবান ইস্যুতে অর্জন। ঘটনাটা হচ্ছে, সদ্য শেষ হওয়া এই ঈদে তালেবান বনাম সরকার যুদ্ধে এই প্রথম উভয় পক্ষ তিন দিনের অস্ত্রবিরতি পালন করেছে। তাই খবরের শিরোনাম, “Taliban agrees to unprecedented Eid ceasefire with Afghan forces”।  ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এই প্রথম এক সত্যিকারের ঈদ অনুভব। তাঁরা এই প্রথম আত্মীয়স্বজনে মিলে ঈদ পালন করেছে। ওই রিপোর্ট লিখছে, ‘তালেবানেরা ২০০১ সালের পর এই প্রথম আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে। চিন্তাও করা যায় না এমন ঘোষণাটা আসে আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা সপ্তাহব্যাপী স্থগিত ঘোষণা করার দু’দিন পরে। [“The Taliban announced its first ceasefire in Afghanistan since the 2001 US invasion today against the country’s security forces.  The unexpected move came two days after the Afghan government’s own surprise announcement of a week-long halt to operations against the Taliban.] তবে তালেবানদের শর্ত ছিল, এই বিরতি ‘বিদেশী দখলদার’ [আমেরিকা বা তার বন্ধুদের বুঝানো হয়েছে] জন্য প্রযোজ্য হবে না।
    ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মিডিয়া রিপোর্ট হল, পাকিস্তান ও চীনের প্রবল তৎপরতার কারণেই কেবল তালেবানেরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। [Afghan Eid truce ‘backed by Pakistan, China’] কারণ এব্যাপারে তালেবান নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, “কেবল চীন ও পাকিস্তান গ্যারান্টার হলে তবেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাবো। কারণ আমরা বাকিদের (আমেরিকা) বিশ্বাস করি না”।

    ডিপ্লোম্যাট মহলে এখন এমন আলোচনা উঠেছে, চীন এমন এক ক্ষমতাবান মধ্যস্থতাকারীর আস্থা অর্জন করেছে যে, চাইলে এক দিকে আফগান সরকারের ওপর চাপ খাটাতে পারে, অন্য দিকে সে কারণে চাপ খাটাতে পারে তালেবানদের ওপরেও। কেন এবং কী করে এটা সম্ভব হয়েছে? কারণ, গত ডিসেম্বর থেকে আফগান-পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চীন নিয়মিত ডায়লগ অনুষ্ঠান করে আসছে। ফলে স্বভাবতই এখন যেকোনো সময় আফগানিস্তানে অস্ত্রবিরতি ডাকা, নেগোসিয়েশনে বসানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চীন ঘন ঘন দেখতে পা্রবে বলে সবাই আশা করছে। নিঃসন্দেহে, এটা এক বিরাট আশার আলো।

    এখন এর পাল্টা ঘটনাটা স্মরণ করা যেতে পারে। ঘটনাটা হল, গত বছরের আগস্টে ট্রাম্পও তাঁর আফগান পলিসি দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতকে আফগানিস্তানে ব্যবসার সুবিধা নিতে ডাকা হয়েছিল আর পাকিস্তানকে তালেবানদের (হাক্কানি গ্রুপ) সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত করে সাবধান করা হয়েছিল। সাথে আমেরিকান ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আসল ঘটনা ছিল অন্য।

    পাক-আফগান সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে বিতর্ক সেই ১৮৯৩ সালের আফগান যুদ্ধ-পরবর্তী “ডুরান্ড লাইন” টানা থেকে। এটা অবাস্তাবায়িত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মূল পশতুন বা পাঠান জনগোষ্ঠিকে ভাগ করে ফেলে এই লাইন। ফলে লাইন ফেলে রেখে সীমান্ত পোস্ট বৃটিশ আমল থেকেও বৃটিশ-ভারতের [বর্তমান পাকিস্তান] ভিতরে গাড়া হয়, তাতেও সুরাহা আসে নাই।  এ ছাড়া একালের কয়েক লাখ আফগান উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে এসেছে, এখন তারা প্রায় স্থায়ী। ফেরার নাম নাই।  স্থানীয় পাকিস্তানিদের মতোই সব ব্যবসায় ওরা জড়িত। এসব খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। এর বিতর্ক খুবই গভীর কিন্তু তালেবান ইস্যু সামনে থাকাতে এর আড়ালে তা কাজ করে থাকে।  খুব সম্ভবত আগাম পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজ প্রভাব তৈরির কথা ভেবে কিছু তৎপরতা পরিচালনা করে থাকে। তাই আফগান তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপের সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক রাখে। এটাকেই ট্রাম্প প্রচার করেছেন যেন ‘পাকিস্তানের প্ররোচনাতেই তালেবানেরা তালেবান হয়েছে’- এমন প্রপাগান্ডায় শামিল হয়ে। অপর দিকে, এটাই ট্রাম্পের সাথে ভারতের নীতির মিল। ‘পাকিস্তান মানে তালেবান’- এই প্রপাগান্ডা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মাইলেজ দেয়। ট্রাম্পের এই প্রপাগান্ডা যেন বলতে চায়, পাকিস্তানই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল। পাকিস্তানই তালেবানের জনক। অথচ কঠিন বাস্তব তা হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের প্রতিক্রিয়া থেকে পাকিস্তান আমেরিকার ইচ্ছায় বাধ্য হয়ে তালেবান দায় নিয়ে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ করে গেছে, যাচ্ছে।

    যা হোক, ট্রাম্পের আমেরিকার পাশাপাশি চীনা কূটনীতির অ্যাপ্রোচ লক্ষণীয়। চীন শুরু করেছে পাক-আফগান অমীমাংসিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা থেকে এবং তাদের ডায়লগ এখান থেকেই। ট্রাম্পের মত পাকিস্তানকে তালেবান বলে গালি দিয়ে, সব দায় চাপিয়ে ওরা শেষ করেনি।
    এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট, গ্লোবাল এম্পায়ার বা লিডারের কিছু ভূমিকায় ইতোমধ্যেই চীন আমেরিকাকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, ক্রমশ আগিয়ে আসছে চীন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সাংহাই গ্রুপ ও তালেবানের প্রথম অস্ত্রবিরতি”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]