Category: হর্ষবর্ধন শ্রিংলা

  • সচেতন হল, না ‘রক্তের সম্পর্কেই’ রইল

    সচেতন হল, না ‘রক্তের সম্পর্কেই’ রইল

    গৌতম দাস

    ২৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-39x

     

    ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা হঠাত করে বাংলাদেশ সফরে আসছেন বলে ঢাকঢোল পিটানো হচ্ছিল গত ১৮ আগষ্ট সকাল থেকে। এটা নাকি তাঁর দুদিনের ঝটিকা সফর। বরাবর প্রো-ইন্ডিয়ান জায়গা থেকে নিউজ করা প্রথম আলো এখানেও তা করতে ব্যতিক্রম করে নাই। তাই ভারতীয় উতস ব্যবহার করে বানানো খবর দিয়ে রিপোর্ট করে গেছে।  অথচ অন্তত একবার পালটা উতস থেকে খবরটা পরীক্ষা করে নেয়া জরুরী ছিল। এমন বেপরোয়া ভুয়া খবর প্রথম আলো যেমন লিখেছে,

    আজ ঢাকায় অবস্থানের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গণভবণে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

    কিন্তু না। মঙ্গলবার রাত না যেতেই সবাই বুঝে যায় “ডাল মে কালা” আছে। প্রথম আলো ঢাকার উতস দিয়ে পালটা যাচাই করে নাই।  যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন শ্রীংলা ঢাকায় নামা সত্বেও মঙ্গলবার সকালে তিনদিনের সফরে সিলেট চলে গেছেন। মতিউর রহমান চৌধুরী লিখেছে, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন কেন তিনদিনের সফরে সিলেট চলে গেলেন তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে” ।

    আবার প্রথম আলোর ঐ প্রো-ইন্ডিয়ান ভাষ্য যে এটা নাকি শ্রীংলার দুদিনের ঝটিকা সফর, না সে কথা মানতে চান নি আমাদের পররাষ্ট্র সচিব।  এনিয়ে  মানব্জমিন লিখছে, সফরটি ঝটিকা নয় বরং রেগুলার বা নিয়মিত বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

    এছাড়া,  বিবিসি বলছে, ‘…বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকারই করেনি”। আরো লিখেছে, “ সেই রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোন বৈঠক বা সাক্ষাৎ সেদিন হয়নি”।

    এতে সব মিলিয়ে দেখা গেল শ্রীংলার  বাংলাদেশ সফর  একটা অপমানজনক অভিজ্ঞতা হিসাবে শেষ হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান এজেন্টদের দিয়ে বহু প্রপাগান্ডা প্রটেকশনের চেষ্টার কমতি করেন নাই শ্রীংলা। তবু এটা একটা শিক্ষা যে শ্রিংলার মানসম্মানবোধ থাকলে সহসাই আর দাওয়াত না নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অফিসমুখী হবেন না কখনো?

    তিস্তা ইস্যুর শুরু কীভাবেঃ
    গত ২০০৯ সালের ভারত-বাংলাদেশের যে বুঝাবুঝি যেখানে মূল বিষয় ভারত আসাম-ত্রিপুরার জন্য বিনা পয়সায় করিডোর নিয়ে যাচ্ছে।  এটাই ছিল ভারতের মূল টার্গেট।  কিন্তু ব্যাপারটা দেখে খারাপ লাগবে তাই একটা কাভার দরকার ছিল যাতে মনে হয় একটা বিনিময় হইতেছে। আর সেই বিনিময় হিসাবে ভারতের প্রস্তাবে তিস্তা ইস্যুওটা লটকে যায়।

    কিন্তু তিস্তার পানি কী ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ইস্যু?  এটা কী ভারতের দিক থেকে বিনিময়ে বাংলাদেশকে কিছু দেয়া বলে আমলযোগ্য? প্রশ্নই আসে না। কারণ আন্তর্জাতিক নদী আইনে তিস্তার পানি পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার। তাই এটা ভারত দিতে বাধ্য।  অথচ বাংলাদেশের এই অধিকারের দিকটা উপেক্ষা করে তিস্তার পানি একটা বিনিময়ের আইটেম  – মানে আমরা করিডোর দিলে এর বিনিময় হিসাবে ভারত তিস্তার পানির সাথে এর বিনিময় করছে – এমন আবহ তৈরি করেছিল।

    অথচ এটাও ছিল ভারতের দিক থেকে চরম ফ্রড একটা কাজ।   কারণ, তিস্তা একটা ‘ডেড ইস্যু’ ভারতের কাছে, ২০০৯ সালের বহু আগে থেকেই।  কেন ডেড কেন?  কারণ, তিস্তা থেকে আসলে ভারতের কাউকে কিছু দেয়ার নেই। উৎস থেকে যা নেয়া সম্ভব এমন সব পানি আন্তর্জাতিক নদী আইন ভঙ্গ করে বহু আগেই টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়। ২০০৯ সালের আগেই ভারতের এসব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার কাছে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, তিস্তা চুক্তি হবে।  এমনকি আজও সেই মিথ্যা  বলে যাওয়া হচ্ছে। অন্তত গজলডোবায় অন্যায়ভাবে  যে পানি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এটাও ভারতের পক্ষে কোথাও আলোচনার ইস্যুওও নয়।

    আজ আবার ভারত যখন শুনেছে, চীন-বাংলাদেশ তিস্তা নিয়ে নতুন করে এক প্রকল্পের কথা ভাবছে তাতে অস্থির হয়ে ছুটে এসেছেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। যাদের না শক্তি না আত্মসম্মানবোধ কোনোটাই থাকে না, তারাই এভাবে আসে আর ‘ফুটা’ হয়ে যান।

    দাওয়াত খেতে এসে দেখছেন, হোস্ট নিজের শ্বশুরবাড়ি রওনা দিচ্ছে- এর মানে হলো, আপনি নিজেই নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলেছেন, কারণ আপনার দাওয়াতই ঠিকমতো নেয়া হয়নি, কেউ দেয়নি বা দাওয়াত ছিল না। আপনি সৌজন্যও বোঝেন না, বা সৌজন্য সাক্ষাতের সময় কোলাকুলির নামে অস্বস্তিকরভাবে জড়িয়ে ধরতে চান। এতে একসময় সবাই আপনাকে কিন্তু এড়িয়েই চলবে। কিন্তু আপনার মনে ধারণা, আপনি নিজে বিরাট একটা কিছু। ভারত বিরাট কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে গেছে যেন। তাই কি? কোনো দেশের জন্য বিরাট কিছু হওয়ার মানে একটাই- প্রথমত অর্থনীতিতে বিরাট কিছু হওয়া। কিন্তু ভারত কি অর্থনীতিতে বিরাট কিছু হতে পেরেছে? না তা ভারতও কখনো দাবি করেছে বলে শুনিনি। তাহলে এই আত্মপ্রবঞ্চনা কেন?

    এটা ত একদিন হওয়ারই ছিল! কিছু কথা সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে হয়। যেমন,  ভারতের সাথে বাংলাদেশের “অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ” বা “ঘনিষ্ট বন্ধুর” বা “রক্তের” সম্পর্ক কবে ছিল? মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে যা কিছু ছিল তবু সেটি কি গভীর কোনো ‘রক্তের সম্পর্ক’ না, তা কখনো বলা বা দাবি করা হতে দেখিনি আমরা। কেউ দাবি করেননি। তবে প্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠ তা অবশ্যই ছিল। আর পরে শেখ মুজিব দেশে ফিরলে সবকিছু তো আরো ফরমাল হয়ে যায়, অর্থনৈতিক দিক থেকে সময়টাও খুবই কঠিন ছিল। তেল অবরোধে পরে জ্বালানি তেলের দাম দশ গুণ হয়ে যাওয়াতে সবার অর্থনীতিরই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায়। সবাই নিজেকে কোনো মতে টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে কোনো ‘বাড়তি উচ্ছ্বাস প্রকাশ’ কি আদিখ্যেতা- কোনো পক্ষেরই ছিল না। আর মুজিবের মৃত্যুর পর সেই বাস্তবতাও অন্য দিকে চলে যায়।

    তাই, এটা কেবলমাত্র এই ২০০৯ সাল যখন থেকে ভিত্তিহীন সব কথার ফুলঝুরি শুরু হয়েছে, যার শুরু হয়েছিল দীপুমনির পররাষ্ট্র মন্ত্রী থাকার আমলে। তবে অবশ্যই এটা দীপুমনির কোন ক্রেডিট না। এটাই ছিল চীনা ঠেকানো [China Containment] ঠিকা ভারতকে দেওয়াতে প্রাপ্য তার উপহার।  উপহার পাওয়ার কথা ত ভারত পাবলিকলি দাবি করতে পারে না তাই এসব বন্ধুত্বের ভংচং, রক্তের সম্পর্ক এসব অর্থহীন বাতচিতের আমদানি করা।  এরই এক সারকথা হল –  ভারতকে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বলে দাবি করা। ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ শব্দটার ব্যবহার শেখের আমলেও কখনো ছিল না। এটা একটা ভংচং  কারণ এর মানে, এক ধরনের সোনার-পাথরের বাটি। বাটি হয় সোনার হবে না হয় পাথরের! সোনার-পাথরের বাটি কথাটা একটা ফ্রডারি। আর এই ফ্রড আর মিথ্যা কথা দিয়েই ২০০৯ সালে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল।   আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের পরে আরো অপমানজনক শব্দ ‘স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক’, এটা নিয়ে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। আর গ মাস থেকে আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন শুরু করেছে ” আমাদের বিজয়,ভারতের বিজয়। আমাদের উন্নয়ন, ভারতের উন্নয়ন – এসব অর্থহীন প্রলাপ। কেন করেছেন?  কারণ, চীনের সাথে সরকারের নতুন ঘনিষ্ট সম্পর্ক করার দরকারে। কিন্তু তাতে ভারতের বারবার বাগড়া তোলাতে ব্যাপার রি-ডিফাইন  করে দিতে বলেছে –  “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক”।  কিন্তু লাভ হচ্ছে না। এথেকেই শেষে শ্রিংলার কথিত ঢাকা সফর।

    কিন্তু ২০০৯ সালের বাংলাদেশকে ভারতের ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বলে ‘সম্পর্ক’কে কেন দেখানো হয়েছিল? এটা কি ভারতের কোনো অর্থনৈতিক অর্জন? অথবা ভারত কোনো ইনফ্লুয়েনশিয়াল দেশ হয়ে উঠেছে সেই জন্য কি? না, এর কোনোটাই নয়। কারণ বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছিল। গ্লোবালি নতুন নেতা হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকাতে, ভারত ‘চায়না ঠেকানোর’ (চায়না কন্টেইনমেন্ট) কাজ করবে আর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তার হাতে ‘তুলে দেয়া হবে’। আর এই থেকেই ভারতের ‘মুই কী হনু’-এর শুরু। আজ কংগ্রেসের এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর লিখে বলছেন, চীন ঠেকানোতে ক্ষেপ মারতে যাওয়া ঠিক হয়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার থিংকট্যাংকের মতামতেও টান পড়েছে; বলা হচ্ছে, চীন ঠেকানো প্রোগ্রাম নেয়া ঠিক হয়নি। কেন? কারণ এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আমেরিকার কোনই লাভ হয় নাই।  কারো অর্থনৈতিক উত্থান ‘ঠেকানোর’ জিনিস এটা নয়। তবে বলাই বাহুল্য যারা ২০০৭ সাল থেকে চীন ঠেকানো প্রোগ্রামের ঠিকা ভারতকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কনসালটেন্সি, বা “বাংলাদেশ এক্সপার্ট”,  কিংবা আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের “বাংলাদেশে শাখা দোকান” খুলেছিলেন – এদের কাউকে এখন পাওয়া যাবে না। কেউ দায় স্বীকার করবে না।

    অথচ এটাই তো আমেরিকাও মানতে চায়নি তখন।  আর হাভাতে বাংলাদেশের কনসালটেন্সদের কথা আর কী বলব!  নিজের বউ অথবা মাকে বিক্রি করে ঐ দালালি কথিত কনসালটেন্সিটুকু যোগাড় করাই তাদের যোগ্যতা ও মুরোদ। অবজেকটিভ বাস্তবতা বুঝা ও বিশ্লেষন করার যোগ্যতা তাদের কখনই ছিল না। অথচ ঘটনা হল,    চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও প্রভাব বেড়ে যাওয়া এসব তো অবজেকটিভ বা বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা। যার মধ্যে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্ভরতা নেই। ওবামা আমলের শেষেই এই অনুভব উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল – যে চায়না কনটেনমেন্ট  প্রোগ্রাম ফেল করবেই। তাই ওবামার শেষ আমলে পুরা ২০১৬ সাল্টা সব শুনশান হয়ে গেছিল। তবে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ভাঙ্গার কাজটা করে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের জাতিবাদ। তাই ট্রাম্প এসে অকার্যকর, চায়না ঠেকানো প্রোগ্রামে ভারতের সাথে সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে দূরে চলে যান। অর্থাৎ চীনা উত্থান অবজেকটিভ। কাজেই এটা ঠেকানোর বিষয় নয় – এটা পরোক্ষে তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

    এখন ভারতের মিডিয়া জগত ও এর সাংবাদিকেরা ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত চীন ঠেকানোর কাজে ভারতের ফলস উত্থান এবং এর নায়ক নায়ক ভাব আর এসব ঘটনার উত্থান ও পতন যদি না বুঝেন আর যদি বিশ্বাস করতে থাকেন, ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে তাতে তাদের স্টুপিডিটি কে ঠেকাবে? বিদেশ মন্ত্রণালয়ে কিছু বাড়িয়ে বলা চাপাবাজি থাকে, মোদীর ভারত হঠাত করে বিরাট পরাশক্তি হয়ে গেছে – এটা ভারতের যে মিডিয়া আর সাংবাদিকেরা বিশ্বাস করে তাদের চিন্তা করার সক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়ে আর কী বলব? ভারত বাংলাদেশের জন্য একটা ডোনার কান্ট্রি- এসব কথা তাঁরা  বিশ্বাস করে। এখন ভারতের সাংবাদিকদের বিশ্বাস করা-না-করা ফেলে যাচাই ও ফ্যাক্ট জেনে রাখা কী তাদের দায়িত্ব ছিল না?  কিন্তু দ্য হিন্দু’র সুহাসিনী হায়দার বা কল্লোল ভট্টাচার্য বা একালে দ্য প্রিন্টের নয়নিমা বসু ইত্যাদি এরা যেন নিজেই নিজেদের মিথ্যা কথার ফাঁদ থেকে বের হতে পারতে চান না। তাদের কে বের করবে? এরা ভারতকে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো ঋণদাতা ডোনার কান্ট্রি বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ভারত কিসের ডোনার?

    ভারত মফস্বলের কোনো পৌরসভায়  পাচ লাখ টাকার চাপকল সরবরাহ করেছে, রাজশাহীতে ভারত তিন লাখ টাকা বৃত্তি দিয়েছে বা ছাগলনাইয়ার এক প্রাইভেট কলেজের চার লাখ টাকায় দোতলায় চার-পাঁচটা ঘর তুলে দিয়েছে ইত্যাদি। এসব হলো নাকি বাংলাদেশে  পরিচালিত ভারতের ‘উন্নয়ন কর্মসূচি’। অথচ আসাম-ত্রিপুরা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে করিডোর সুবিধা নিচ্ছে এর জন্য অবকাঠামোর ঋণ ব্যায় হচ্ছে তা বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে নিজের জনগণকে বন্ধক রেখে নিয়েছে। যাদের নিজ করিডোরের অর্থনৈতিক দায় ও খরচ বইবার মুরোদ নেই তারা নাকি ঋণদাতা! পদ্মা সেতু এবং সেতুর রেল ব্যবহার করে ভারত কলকাতা-আগরতলা যোগাযোগ শক্ত করবে।

    ভারতের এসব মিডিয়া সাংবাদিকেরা, এরা ঠিকাদার আরা ঋণদাতাকে এক মনে করে থাকেন। সেকারণে, বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে ভারতকে চীনের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে চায়, কাজ পেতে চায়। এরা ঠিকাদার আর ঋণদাতা চীনের এই দুই ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখেন আর ভাবেন, এটা আসলে কেবল চীনের ঠিকাদারি ভূমিকা। তাই ভারতকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো কোম্পানি মনে করেন। কিন্তু বুঝতেই পারেন না, চীন যদি ঋণদাতার ভূমিকাতে নাই থাকে তাহলে আর বাংলাদেশে ঠিকাদারের দরকার কী?

    তবে চীন ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে কেবল ঠিকাদারই ছিল। আর ২০১৬ সাল থেকে কম সময়ে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা হয়ে গেছে অবশ্যই। মাত্র তিন বছরে চীন ঋণ বিতরণ করেছে ২৬ বিলিয়ন ডলারের যেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল ২০ বিলিয়ন ডলারের। এটা কত পরিমাণ অর্থ এর একটা ধারণা দেয়া যাক। এর আগে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া অবকাঠামো ঋণ; ধরা যাক ১৯৯১ সালের কথা। আমরা তিন বছরে এক বিলিয়ন মানে, বছরে ৩৩৩ মিলিয়নের মত অবকাঠামো ঋণ পেলেই মনে করতাম যথেষ্ট ঋণ পেয়েছি। কারণ তাতে আর ঐসব বছরগুলোতে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতির মোকাবিলায় পড়তে হত না। সুতরাং আমাদের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানেরা সন্তুষ্ট থাকতেন। আর এখন চীনা ঋণ তিন বছরে ২৬ বিলিয়ন, মানে গড়ে বছরে আট বিলিয়নের বেশি। অথচ ভারতীয় সাংবাদিকরা ভাবছেন,  কী সহজ বাংলাদেশে ভারত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী দাতা দেশ হয়ে গেছে!

    আমাদের সরকারের সবচেয়ে বড় এক আত্মঘাতি ভুল হল ২০১৪ সালে, তারা ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব ভেবেছিল। ফলে ভারতের সমর্থনটাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক বলে ভেবে নিয়েছিল।  এমনকি পরখও করে নাই।  এমনকি সেই অভ্যাসে পরের ২০১৮ সালেও ভারত এই সরকারকেই সমর্থন দিক, এটা চাইতে গিয়েছিল।  কিন্তু ‘জ্ঞানী’ দিগগজ ভারতীয়রা চিন্তায় পড়ে যায় যে, বাংলাদেশে যে সরকারের পাবলিক রেটিং-ই নেই সেই ব্যক্তি আবার পরের নির্বাচনে জিতে আসবেন কী করে? এই চিন্তা করে তারা বাংলাদেশের অনুরোধ রাখেনি। ঘটনা হল, ভারতের  গোয়েন্দা বিভাগ খুবই দক্ষ তো তাই  তারা বুঝতেই পারেনি যে, নিশীথ ভোটের সাথে রেটিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

    সরকার তাই ২০১৯ সালে নিশীথ ভোটে বিজয়ী হয়ে শুরু থেকেই ভারতনির্ভরতা উপেক্ষা করে চীনের দিকে আরো ঘনিষ্ঠতার নীতি নিয়েছিল। যেগুলো এতদিন সেই ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ধমকানি আর  বড়ভাই-ইচ্ছায় কেবল মাত্র যেসব চীনা প্রকল্প ভারত এলাও করেছে কেবল তার মধ্যে সরকারকে সীমাবধ থাকতে হত। সোনাদিয়া ফেলে পায়রা নিতে বললে তা যতই গলার কাটা কীংবা অকেজো হোক তাই নিতে হয়েছে।  গত নির্বাচনের পর থেকে এটাই বিরাট পরিবর্তন গয়ে সামনে আসতেছে, ক্রমশ ।   তাই হবার কথা কোন না কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে সম্পর্ক সবার উপরে প্রভাবশালী হয়ে হাজির হবেই।  বিনা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারত আর কত ফলস মাতব্বরি চালাবে! ‘সামআপ’ করে বললে, বাংলাদেশে কেউ ক্ষমতায় থাকতে হলে তাকে ভারতের সমর্থন পেতেই হবে – এটা এখন একেবারেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তাতেই মূলত ভারতের কপাল পুড়েছে!  তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত চার বছরের নীতির পরোক্ষ কারণে মূলত এই অবস্থাটা তৈরি হয়েছে। আর তাই এবার নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনার সাহস করে চীনের পক্ষে ও সাথে দাঁড়ানো – এবং এটা কার্যকর আছে।।

    আবার হাসিনা নিজে নিজেই একটু কনজারভেটিভ থেকেই ইন্ডিয়া নিরভরতাওহীন থাকতে চেয়েছেন।  এর মানে হল, ভারতকে এতিম করে দেয়া নয় বা যা আগে দিয়েছেন, তা কেড়ে নেয়া নয়। কিন্তু ভারতকে  আর নতুন কমিটমেন্ট দেয়া হবে না, কোনো নতুন নির্ভরতার সম্পর্ক হওয়ার কথা না। কিন্তু এটা ভারতকে মানানো – এটাই হাসিনার সবচেয়ে বড় অস্বস্তি।  মোমেনকে টুঙ্গিপাড়া পাঠিয়ে খুবই গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট করে  – ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক” – একথা বলার পরেও  কিন্তু লাভ হচ্ছে না। বান্দরকে একবার মাথায় তুললে এমন বিপদই হয়!
    আর এর ফাঁকে, চীন নিজেকে বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক এবং বিশেষত এপর্যন্ত নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প ইতোমধ্যে রিভিউ করে নিয়েছে। তাই আবার নতুন অবকাঠামো ঋণ দিতে চীন রেডি। সাথে এবার চীন কিছু হোমওয়ার্কও করে এসেছে।

    নতুন করে তিস্তা প্রসঙ্গঃ
    আগেই বলেছি ভারত যে বাংলাদেশকে তিস্তার কোনো কিছুই দেবে না- সেটি ২০০৯ সালের আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। পানি টেনে নিয়ে গিয়ে যেখানে ভারতের আর নতুন করে কিছুই করার নাই; যা নেয়ার তা সব করা হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আর কোনো দিন ভারতকে হাত লাগাতে হবে না। তবু প্রণব মুখার্জি তিস্তা চুক্তি করবেন বলে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এটাই হল সেই ঠান্ডা মাথার ফ্রডারি। তিনি চেয়েছিলেন হাসিনা সরকারের সাথে একটা চুক্তি সই করতে যার কোনো বাস্তবায়ন মূলত ভারত কোনো দিন করবে না। মমতা দোষ দেবেন কেন্দ্রকে আর কেন্দ্র দোষ দেবে মমতাকে- এভাবেই পার করে দেয়া হবে সময়।

    এ কারণে ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নির্ধারিত ঢাকা সফরের তিন দিন আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব কলকাতায় সফরে গিয়েছিলেন। গিয়ে মমতাকে জানান, তিনি যেন কোনো আপত্তি না তোলেন তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে। কারণ তাকে বাংলাদেশকে ‘ত কোন পানি দিতে হবে না’। কিন্তু মমতা বলেন, এই অসততার চুক্তি করতে তিনি মনমোহনের সাথে বাংলাদেশে যাবেন না। বেকে বসেন, এমন কাজে তিনি সম্পৃক্ত হতে অপারগতা জানান। আর সেখান থেকেই সব দায় মমতার উপরে চাপিয়ে কংগ্রেস সরকার দায় সারে চলছে কংগ্রেস, বিজেপি সকলেই। আর এদিকে আমাদের গওহর সাহেব পন্ডিত মানুষ গভীর আস্থার সাথে চুক্তিটা ধরে বসে আছেন – আয়েগা কোন এক ছোটা প্রণব মুখার্জি আয়েগা, পানি লায়েগা!  উনি আজও বুঝতেই পারলেন না পানি দেওয়া আর একটা পানিচুক্তির কাগজ পুরাই সম্পর্ক হীন বিষয়। তিনি কোন ফ্রডের পাল্লায় পরেছেন সেটা আজও বুঝতে পেরেছেন মনে হয় না। যদিও পারা না পারায় আর কিইবা এসে যায়!  রের চেয়ে নেত্রীই ভাল – একশনে বিশ্বাসী। তাই নতুন তিস্তা প্রকল্পের দিকে রওনা দিয়েছেন।  অতএব হাসিনা নতুন তিস্তা প্রকল্পে আবার ভারতকেও ওয়াকেবহাল রাখবেন   শ্রিংলার এই মহান খায়েস?  – না না – এটা নেত্রিকে খুবই আন্ডার এস্টিমেট করা হবে। তাঁর দোষ আছে, ক্ষমতার জন্য যেকোন কিছু করতে চাওয়া আছে, বন্ধুত্ব কী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের লমছোম কথা আছে – কথা সত্য। কিন্তু কে নিজেকে দেখতে চায় যে অন্যেরা তার মাথায় কাঠাল রেখে খাচ্ছে!

    চীন এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশে কী ফ্রড করেছে তার পুরোটাই ওয়াকিবহাল। তাই সে বাংলাদেশকে এই প্রকল্প সাহায্য দিয়ে হাত বাড়িয়েছে। আর স্বভাবতই এই প্রকল্প বাই ডিফল্ট ভারতবিরোধী এবং বাংলাদেশে জনপ্রিয় হবে আর ভারতীয় চাতুর্যকে আরো ভালো করে সামনে তুলে ধরবে। এগুলোই চীনের হোমওয়ার্ক বা পুরনো প্রকল্প রিভিউ। অর্থাৎ এভাবে প্রায় আরো নয়টা নতুন প্রকল্প নিয়ে চীন আগাচ্ছে যাদের মোট মূল্য ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও একটা বড় খচখচে কাঁটা আছে।  নতুন তিস্তা প্রকল্প পরিবেশগত দিক থেকে জবরদস্তি নয় সত্যিকারের  গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও স্বচ্ছ নয়। যদিও প্রকল্পের ডিটেইল করতেই এখনও অনেক কিছুই বাকি।
    অতএব, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা ‘উন্নয়ন-ই’ দিতে গেলে, নিজের কর্মীদের খাওয়াতে গেলে, চীনই তাদের একমাত্র ভরসা। সেটা কিন্তু ফিকসড হয়ে আছে।

    চীনকে নতুন করে স্থানীয় মিডিয়ায় মুল্যায়নঃ
    ঢাকার কোনো কোনো রিপোর্টে চীনের এই ‘নতুনভাবে’ হাজির হওয়াটাকে চীনের বাংলাদেশে শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও জড়িয়ে পড়া বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এটা একেবারেই ওভার-রিডিং বলে মনে করার শক্ত কারণ আছে। এ ছাড়া অনেকে আবার এখানে অনেকদিন আগে থেকেই ভারতের প্রভাব এবং তা ও আবার একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অনুমান করে কথা বলছেন দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের অনুমানও ভিত্তিহীন। এরা চায়না কনটেনমেন্ট প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানেনই না সম্ভবত। আর কনসালটেন্ট যারা জানেন তারা কোন সুখে নিজের দালালি জীবনের কথা শেয়ার করবেন?  ভারতের প্রভাব কোথা থেকে আসবে? ভারতের প্রভাব মানে সেটা তো অবশ্যই অর্থনৈতিক সক্ষমতা। তো ভারত কবে অর্থনৈতিক শক্তি ছিল, যার অর্থনীতি নুন আনতে পান্তা দুরায়? যারা এসব কথা বলেতারা কী বলছে নিজেরা দুদন্ড চিন্তা করে বলে না।
    এক কথায় বললে, প্রথমত চীনের বাংলাদেশে ‘রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়া’ কথাটার কোনো ভিত্তিই নেই। এ জন্য যে, চীনের রাজনৈতিক ভূমিকা মানে কী- কোন টাইপের রাজনীতির প্রতি ফেভার দেখানো? যেমন আমেরিকান টাইপ হলে এর মানে হলো হিউম্যান রাইটস সুরক্ষা করতে হবে এবং প্লুরালিজম চর্চা করতে হবে- এরকম? কথা এরকম চিন্তা করে বলতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে চীনের এখনো এমন কোনো “বিশেষ পছন্দের’ টাইপের রাজনীতি নেই। মূল কারণ, হিউম্যান রাইটস এখনো কমিউনিস্টদের চিন্তার সাথে কম্পিটিবল বলে মনে করা হয় না।
    তবে কি চীনের রাজনীতি মানে আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি আগ্রহ?  না অবশ্যই না।  সে সুযোগও নেই। কারণ যে চীন গ্লোবাল নেতা হতে চায়, সে কেবল একটা নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নিয়ে দাঁড়াতে পারে না। এটা আত্মঘাতী কারণ, চীনকে সবার নেতা হতে হবে।

    আর ওদিকে আগের আমেরিকার নেতৃত্বের জমানাতেও এশিয়ায় ভারতের কখনো একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অনুমান- এসব কথা অমূলক। খুব সম্ভবত তারা ভারতের একালে চীন ঠেকানোর ‘ক্ষেপ’ নেয়ার কথা মনে রেখে এগুলো বলছেন।  কিন্তু সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক ও অকার্যকর হয়ে গেছে। নিজেরাই প্রমাণিত হয়ে গেছে বলে, সেই ২০১৭ সালে। কাজেই আমেরিকার কাছে ভারতের আর কোন গুরুত্ব নাই।  ভারতও সেই আগের মতোই গুরুত্বহীন আম-ভারত হয়ে গেছে। কারণ, এতে আমেরিকার কড়া এক আক্কেল হয়ে গেছে। কারণ এর সুযোগে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকাকেই বাইরে রেখে সব স্বার্থলাভের বাইরে রেখে ঢাকা-দিল্লি রুল করে গেছে। এছাড়াও এদিকে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হয়েছে প্রচুর। টিআইবি, আর সুলতানা কামালরা মিলে এখন এন্টি-ইন্ডিয়ান হয়েও সুবিধা করতে পারছে না। তারা এখন অভিযোগ করেছেন সবাই নাকি কয়লা বিদ্যুৎ করে পরিবেশ নষ্ট করছেন। তা ভালো। কিন্তু ভাসুরের নাম নেন না কেন? দোষ ধরেন চীন আর ভারতের। মাতারবাড়িতে জাপান আর তার সাথে আড়ালে আমেরিকা কী নাই? তারাও কী কয়লা বিদ্যুৎ করছে না? কাকে এগুলো মিথ্যা বলেন? কাজেই, এতে হবে না। ফ্রেশ সৎ ইমেজ লাগবে।

    তবে আগামীতে মানে নভেম্বরের পরে এবং জানুয়ারি থেকে আমেরিকা আবার নিজের গ্লোবাল ভূমিকা ফিরে পেতে চেষ্টা করবে। তা কতটা ফিরে পাবে তা দেখতে হবে। তবে আগামী দিনে ভারতকে আর আমেরিকার বগলে দেখা যাবে না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।  আর যদি আবার এই ভুল করে তবে এবার প্রকাশ্যে মার খেতে হবে আমেরিকাকে!

    আর ভারত? বাংলাদেশে ভারতের দিন শুকিয়ে গেল। মনে হচ্ছে সরকারের মোহ কেটে গেছে। তাহলে কি একটা যুগ, একটা পর্বের সমাপ্তি ঘটল? আমাদের আক্কেল কী হয়েছে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২২ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বাংলাদেশ কি এবার সচেতন হতে পারবে?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

    নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

    গৌতম দাস

    ০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Us

     

    Shringla’s visit, Independent Online /UNB

    ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

    কেন শ্রিংলাঃ
    ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
    এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

    পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
    এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

    এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

    দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

    মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

    অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

    এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে “বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

    বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

    শ্রিংলার সেমিনারঃ
    শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

    তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

    তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

    অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
    বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

    আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
    আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
    আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
    সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

    দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
    আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

    দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

    গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

    তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

    “Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

    এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

    “Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.”

    এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

    দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে “নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]