Category: লকডাউন LOCKDOWN

  • নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    গৌতম দাস

    ১৫ জুন ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-33n

    _Nepal’s new territorial map, released earlier this week, has shown the area in the light red shade to be part of its territory, evoking strong reactions from India. This came after India, in its new maps released in November last year, showed the Kalapani area (marked in deep red) to be part of its territory. SCMP

    এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতের পড়শি অঞ্চলের সকলেই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য রাখছে নেপাল কী করছে, কী করে ভারত মোকাবিলা করছে। প্রশ্নটা মোকাবিলার। নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবল টেনশন উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বেড়েই চলছিল। এরই মধ্যে নতুন ঘটনা হল, গত ১২ জুন সকাল নয়টায় ভারতের বিহার রাজ্যের সীতামারহি [Sitamarhi] জেলার সীমান্তের ওপারে নেপালের অংশে তাদের সরলাহি [Sarlahi] জেলার সীমান্ত এলাকায় নেপালি সীমান্তরক্ষীর গুলিতে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। সেই সাথে ঐ গোলাগুলিতে দুজন ভারতীয় গুরুতর জখম হয়ে ভারতের হাসপাতালে জীবন নিয়ে লড়ছে আর একজন ভারতীয় নেপালি হেফাজতে আটকা আছে, যাকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
    নেপাল-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এবারের উত্তেজনা ও অসন্তোষের  মূল ঘটনাটা মূলত ৮ মে থেকে; যখন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (অনলাইনে ভার্চুয়ালি) একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। বিবিসির ভাষায়, “ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ঐ গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটা ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে”। নেপালের দাবির পক্ষে যুক্তি এটাIndia and Nepal Treaty of 1950তে [Sugauli Treaty 1816]  এর রেফারেন্স আছে। সুগৌলি চুক্তি হল ১৮১৪-১৬ সালের এংলো-নেপাল যুদ্ধের শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটা থেকে নেপালের সীমানার রেফারেন্স টানা হয়ে থাকে। এই চুক্তির পরবর্তিতে ব্রিটিশরা আরও তাদের দখল নেয়া এলাকা ছেড়ে দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে ১৯২৩ সালে আরেক আপডেটেড নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি [Nepal–Britain Treaty 1923] করেছিল। আর এই চুক্তিতে উল্লেখিত মেয়াদ শেষেই ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি [India and Nepal Treaty of 1950] স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নিয়ে এখনকার নেপালের প্রবল আপত্তি উঠে আছে। চুক্তি নিয়ে একটা রিভিউ প্রক্রিয়া চালু আছে। যদিও চুক্তি এখনো বহাল আছে।

    সাবধান, প্রতিহিংসা এক নেতি এনার্জি, এটা উলটা আপনারই ক্ষতি ডেকে আনতে পারেঃ
    গত ১৯৯৬ সালে নেপাল মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর প্রাক্কালে এই ১৯৫০ সালের চুক্তি রিভিউ বা বাতিল অন্যতম দাবি হিসাবে তাতে যুক্ত করা ছিল। বিগত প্রায় দুশ বছর ধরে নেপাল-ভারত সব সময়ই কোন না কোন এক চুক্তি  গুরুত্বপুর্ণ হয়ে থেকেছে। অন্তত তা এজন্য যে নেপাল ভুমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। নেপালের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চীন এভাবে এইদুদেশ দিয়েই নেপাল ঘেরা। যদিও আবার দক্ষিণের ভারতের দিক দিয়ে নেপালে প্রবেশপথগুলো তুলনামূলক সহজ, অন্তত দক্ষিণদিকের পাহাড়ি এলাকা বা পথ কম উচ্চতার বলে আর এদিক দিয়ে কোন সমুদ্রবন্দরে পৌছানোর দুরত্ব তুলনায় কম বলে। আর প্রাচীনকাল থেকে এপথটাই আগে থেকে চালু হয়েছিল বলে। ফলে ১৯৫০ সালের চুক্তির মুখ্য প্রসঙ্গ সমুদ্রে যেতে ভারতের অনুমতি ও শর্ত এসব (অসম) চুক্তির মাধ্যমেই বলবত থেকেছে। তবে ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের নতুন কনষ্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা হয় নাই বলে, এরপর ভারত হয়ে পণ্য আমদানীর ঐ একমাত্র পথও ভারত অবরোধে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই সিদ্ধান্তই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষত জ্বালানির অভাবে ভীষণ রকম কষ্টে ফেলে দেওয়ার কথা, আর তা ফেলেছিলও তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সবশেষে এর ফলাফল হয়েছিল একেবারে উলটা।  সেটাই নেপালের জন্য নতুন দুয়ার, নতুন পথ খোলার শর্ত হয়ে বাস্তবতা হাজির হয়েছিল। ঐ অবরোধে নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় মাস ছয়েক পরে  নেপাল চীনকে অনুরোধ করলে চীন সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। চীন মানে চীনা-তিব্বতের সীমানা নেপালের আরও উত্তর দিকে যেটা আরও খাড়া পাহাড়ের দিক।  চীনা-তিব্বতের এদিকে  দুটো সীমান্ত চৌকি দিয়ে বের হওয়া যেত আগে। কিন্তু এপ্রিল ২০১৫ এর নেপালের ভুমিকম্পে সেগুলো ভারী পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে যায় বা ভেঙ্গে যায় বলে ব্যবহার অযোগ্য হয়েছিল। তবুও বিকল্প সুবিধা একটাই ছিল যে ২০১৫ সালের আগে থেকেই চীন-তিব্বত অংশ থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি (২০০০ কিমির বেশি) চীনের কোন সমুদ্রে পৌছানোর হেভিডিউটি রেললাইনের এক প্রকল্পে নতুন করে রেললাইন পাতা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছিল। কিন্তু নেপাল এর ব্যবহারকারি হওয়ার কোনই আলাপ ছিল না বলে ঐ রেলপথ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে কমপক্ষে ১০০কিমি দূর দিয়ে চলে গেছিল। চীন তাই ঐ রেললাইন যেন নেপাল ব্যবহার করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে ঐ প্রায় ১০০কিমির এক নতুন কানেকটিং রেল প্রকল্প নিয়ে নেপালকে সহায়তা করতে আসে। সেই কানেকটিং রেলপথ এখন চালু হয়ে গেছে। চীনের সাতটা বন্দর এখন নেপালও ব্যবহার করতে অনুমতিপ্রাপ্ত উন্মুক্ত। তাই নেপালের ভারত-নির্ভরতার দিন এভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায় আর, এমন শাপে বর নিয়ে নেপাল তাদের ভাগ্য গড়ার দিকে রওনা দিয়েছে। কারও অসুবিধা বা খারাপ করতে চাইলে আপনার অজান্তেই এর পরিণতি তার জন্যই ভাল হয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা হয়, খারাপ উদ্দেশ্য বা নেতি মন বা প্রতিহিংসা – এগুলো এর কর্তার বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য হবাব সম্ভাবনা নিয়ে আসে! কাজেই সাবধান!

    ওদিকে লিপুলেখ নিয়ে নেপালের বিপরীতে ভারতের যুক্তি হল – এলাকাটা প্রায় ‘ষাট বছর’ আগে [মানে এরও আগে বা এর চেয়ে পুরানা কালে নয়] থেকেই তাদের দখলে আছে। তাই এটা তাদের। সাথে আরেকটা যুক্তি দেয় ভারত যে, ২০১৫ সালে এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ই দুই দেশ মিলে লিপুলেখে একটি বাণিজ্যিক পোস্ট খুলতে সম্মত হয়েছিল, যা তাদের যৌথ ঘোষণায় আছে। এ কথার বিপরীতে নেপালের বক্তব্য তাতেও নেপাল  ঐ ঘোষণা কখনোই মেনে নেয়নি বলে তখন থেকেই রেজিষ্টার্ড আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাই এখন গত মাসে ৮ মে লিপুলেখে ভারতের রাজনাথ সিং সড়ক তৈরির কাজ উদ্বোধন করা থেকেই নেপালের পুনঃআপত্তিতে প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। নেপালে প্রতিবাদের বিষয়টাকে পার্লামেন্টে আইন পাস বা কনস্টিটিউশন সংশোধনের পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জিও মোদীর বিরুদ্ধে নেপালের পক্ষে এক স্বাক্ষীঃ
    নেপালে একের পর এক ভারতের পরাজয়ের শুরু বলা যায় নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনার প্রথম উদ্যোগের (First failed Constituent Asembly was dissolved on May 28, 2012 ) ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকে। নেপালের কোন রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভারত কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে না পেরে ঐ রচনা প্রক্রিয়া যেন ফেল করে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এতে হতাশায় ডুবে যাওয়া সারা নেপাল এরপর আবার বহু কষ্ট সহ্য করে (কারণ সবদলের একমত হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ) সর্বদলীয় আবেদন নিয়ে তাদের সুপ্রীম কোর্টে গেলে  কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে  নতুন করে রিপাবলিকের কনষ্টিটিউশন রচনার “কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের নির্বাচন” অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুব কমই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগে নেপালের প্রধান তিনটা দলই  আয়োজনের পুর্ণ সদব্যবহার করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ভারত থেকে (দুই কমিউনিস্ট আর নেপালি কংগ্রেসও) প্রধান তিনদল নিজেদের দূরে নিয়ে যায়। এই তিনশক্তি মিলে নেপালের নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও তাতে ভারতের প্রবল আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করেই ঐ নতুন কনষ্টিটিউশনের ঘোষণা দিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫। তাদের তিন দলীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূরণ করেছিল। কিন্তু এতে ভারত প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ জলুনির। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালে সব ধরণের পণ্য আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকেই চীন-নেপাল সম্পর্কের নতুন দিনের শুরু।  অথচ অন্তত দুশত বছরের ভারত-নেপাল সম্পর্কের মধ্যে চীন কখনও কোথাও হাজির ছিল না। ২০১৬ সাল থেকেই মাত্র নেপালের মঞ্চে চীনের প্রবেশ ঘটেছে।

    এককথায় বললে, তাই কাউকে দোষারোপের আগে ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্তা, রাজনীতিক বা একাদেমিকের নিজেদের লজ্জা ঢাকতে হলে  নিজেকেই দোষারোপ করা উচিত ছিল। হয়ত আত্মসমালোচনা করে এজন্য তারা কিছু অনুশোচনামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এমন আমাদের দেখতে পাওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, তবু কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মোদী ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায়। তাই এদের মধ্যে একটা ঝোঁক উঠে এসেছে যে ভারতের আগের সব ব্যর্থতা মোদীর মাথায় ঢেলে দেওয়া। যদিও মোদীও, তার আমলে পুরান ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছেন নীতি বদলিয়েছেন তা জানা যায় না।
    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা অবসরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোন চলতি সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। কিন্তু সাবেক ভারতীয় এক রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম। তিনি রাজনাথের সড়ক নির্মাণ উদ্বোধন ঠিক পছন্দ করেননি। আর বিবিসিকে বলছেন, ‘রাস্তা উদ্বোধনের বিষয়টা অন্যভাবে করা যেতে পারত বলেও তার অভিমত”। দেবের অভিমত নেপালের আপত্তির মুখে মোদী সরকার নাকি বলেছিল, এ নিয়ে আলোচনা হবে। তাই বিবিসি লিখেছে দেব মুখার্জি বলেছেন, “… ভারত যখন নেপালকে কথা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বলা যায় না এটা আমাদেরই এলাকা – তোমাদের এ নিয়ে কিছু বলার হক নেই”। অর্থাৎ মোদী সরকারকে তিনি খুবই শক্ত হাতে আঘাত ও সমালোচনা করেছেন বলতেই হয়। এই ঘটনাকে আমরা বোধহয় দলবদ্ধভাবে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে করা দেব মুখার্জির প্রায়শ্চিত্ত বলতে পারি।
    আরেক দেশের নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি তোলার আমি কে? এনিয়ে আপত্তি তুলে নিজেকে হাস্যকর করার কোনো মানে হয় বলে এমন কাজ  আমরা কোন রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। কিন্তু নেপালে সব হারিয়ে ভারত তাই করেছিল। যদিও সবকিছু উপেক্ষা করে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত ও ডিক্লারেশন বা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে এক ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ক্ষমতায় আসে সেটা ছিল নেপালের বড় দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে এক দলের সরকার। আর একমাত্র নেপালি কংগ্রেস কোন মতে বিরোধী দলে জায়গা হয় আর সেই সাথে তার ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার কিছু সুযোগও সামনে আসে। কিন্তু এবার, নেপালের পার্লামেন্টে লিপুলেখ নিয়ে প্রতিবাদ ইস্যুতে আলোচনায় সেই নেপালি কংগ্রেসের এক এমপি পুষ্পা ভূষল গৌতম বলেন, “১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই এলাকা সম্পূর্ণভাবে নেপালের”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে নেপাল কংগ্রেস দলও এখন কম ভারতবিমুখ নয়। এ থেকে নেপালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বেশ খানিকটা আন্দাজ পেতে পারি।
    নেপালের মাওবাদীরা তাদের সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৬ সালে। সেখানে নেপালে তাদের রাজার মূল সহযোগী বলে ভারতকে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ওই বিপ্লবের মূল শত্রু বলে তারা চিহ্নিত করেছিল ভারতের শাসকদের। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি বাতিলের প্রধান দাবি তারা সেই থেকে শুরু করেছিল। মাঝে ২০০৭ সালের দিকে নিজেরা কৌশল বদলে সশস্ত্র থেকে গণআন্দোলনে নেমে আসারকালে চুক্তি বাতিলের কথা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে চুক্তি রিভিউয়ের পক্ষে আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার একপর্যায়ে ২০১৬ সালে এটা কাজ শুরু করলেও নেপালের মূল ফোকাস সরে যায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ও কোনো নতুন চুক্তির পথ খুঁজে বের করা। তা এখন চীনের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে গেছে। এরও প্রভাব এখন নগদ দেখা যাচ্ছে। সারা নেপালের চরম ভারতবিমুখ হয়ে পড়া চলছে ধরা যায় গত সাত বছর ধরে। কিন্তু এই লিপুলেখ সীমান্তের রাস্তা নির্মাণ কেন্দ্রে করে এবারের ভারতবিমুখতা বা বিরোধিতা অনেক বাস্তব হয়ে উঠেছে। চীন-নেপালের সাতটা সীমান্ত দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক করার কথা নেপাল প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে পারে এখন। এক কথায় মূল কারণ এটাই যে, ভারত ছাড়াও নেপালের অর্থনৈতিক জীবন এখন সার্ভাইভ করা বাস্তবে সম্ভব। এটাই হলো এবারের ভারতবিমুখতার বিশেষ দিক।

    ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে?
    এছাড়া এরই আরেক ছাপ দেখা যাচ্ছে আবার এখন। যেমন গত ১১ জুন কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় একটা কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম- ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে”? [Is this the end of the ‘special relationship’?] এখানে বিশেষ সম্পর্ক বলতে ভারত-নেপাল বিশেষ সম্পর্কের কথা বুঝানো হয়েছে। আর ঐ লেখায় কলকাতার হিন্দুস্থান টাইমসের এক সম্পাদকীয় আর এক প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমসের ঐ সম্পাদকীয় [The costs of anti-Indian nationalism in Nepal | HT Editorial] একেবারেই সাব স্ট্যান্ডার্ড; ওর নিম্নমান তাদের নিজের জন্যই লজ্জার। এত খারাপ তারা সাধারণত লিখে না। কিন্তু এখানে তারা নিজের দগদগে কিন্তু খামোখা “নেশনস্টেট বোধের” আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর কাউকে “কাজের ছেলে” গণ্য করে কোনো লেখা দাঁড় করালে যেমন হয় তারই ছাপ রেখে একটা লেখা হয়েছে এটা। ঐ সম্পাদকীয়-এরই আবার সাব-হেডলাইন হল, “কাঠমান্ডু (ভারতের সাথে) সম্পর্ক রিসেট করে ঢেলে সাজাতে চায়, এতে তারই স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে“। পত্রিকাটা অভিযোগ করেছে, নেপালে নাকি “গভীর এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” ছড়িয়ে পড়েছে।
    আরো লিখছে, “নেপাল-ভারতের মধ্যে এক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আছে, অসন্তোষের গোড়াটা সেখানে”। লিখেছে, “বাস্তবে এর মানে ভারত-নেপালের সাথে খোলা সীমান্ত শেয়ার করে। ভারত নেপালিদের বিনা বাধায় ভারতে কাজ করতে এলাউ করে আর নেপালিরা (গুর্খা) ভারতের সেনাবাহিনীকে সেবা (কাজ) করে। এর বিপরীতে, নেপালিরা এ দুটোতেই রাজি আছে, পরোক্ষে ওরা নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটা ভূমিকা দিয়েছে (এটা আর কোন সম্পাদকের আলাপ নয় রাস্তার চা দোকানের রকবাজের আলাপ হয়ে গেছে) আর নেপালিরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের ব্যাপারে সেন্সেটিভ হয়ে থাকছে। … ভারতও বিশেষ সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশেষ সম্পর্ক রিসেট(reset) করলে নেপালকে এর মূল্য দিতে হবে”।
    “নেপালকে এর মুল্য চুকাতে হবে। এর মানে হবে কড়া সীমান্ত, এর মানে হবে নেপালিদের ভারতে অবাধে কাজ করা বন্ধ, এর মানে হবে নেপালের উন্নয়নের জন্য (ভারত থেকে) দ্বিপক্ষীয় জরুরি সহযোগিতার দ্রব্যাদি কমে যাওয়া, এর মানে হতে পারে, ত্বরাই মানে নেপালের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ঝড় উঠবে (মানে ভারত উসকিয়ে তুলবে) তা সামলানো। কাঠমান্ডু কি এসবের জন্য তার একক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মূল্য চুকানোর জন্য তৈরি? এটা তো একটা পরিষ্কার প্রো-চায়না ঝোঁক ও এক আগ্রাসী ন্যাশনালিজম? এভাবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সব নিঃশেষ করে দেয়া দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তবে নেপালের বেশি ক্ষতি হবে”।

    এখন এক কথায় বললে, হিন্দুস্থান টাইমসের এই ভাষ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে অন্তত গত দশবছরে নেপাল-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে এদের কোন খবর নাই, মুল্যায়ন বা কমপক্ষে কোন রিডিং  নাই। তবে সেটা যাই হোক, হিন্দুস্থান টাইমস মুলত একটা মিডিয়া একটা দৈনিক, কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়। কাজেই মিডিয়া হিসাবে এই বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। আর তাদের এই লেখার প্রেক্ষিতে মন্ব্যে বলতে হয়, কাউকে কাজের ছেলের মত ট্রিটমেন্ট আচরণ করে যদি বলা হয় “আমার পা-দাবানো ছেড়ে চলে গেলে তুই তো না খেয়ে মরবি”- এটা সেরকমের বক্তব্য।  এটা নেপালের জন্য অপমানজনক হবারই কথা। আসলে ভয় দেখিয়ে কাউকে জোয়ালে নিয়োজিত রাখার অনেক উপায় আমরা জানি, দেখেছিও। তবে এখানে দেখছি; এখানে বলা যে ‘আমারও একটু কষ্ট হবে তোর হাতে আমার পা-দাবানো পাব না, তবে তোরই না খেয়ে থাকতে বেশি কষ্ট হবে”। এটা এ ধরনের। এমনই নিম্নমানের।

    বলাই বাহুল্য, এটা কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় হতে পারে না। বাহ্যত উভয়ের সম্পর্ক যাই থাক, নেপাল-ভারত সম্পর্ক দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের, যেখানে কেউ কারো অধস্তন এমন মনে করাটাই অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, বরং এভাবে বলা বা মনে এমন ধারণা পুষে  নিয়ে কথা বলাটাও অপরাধ। দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের এই সম্পর্ক-নীতির কথা মনে রেখে এই সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। এজন্য এটা গর্হিত কাজ।

    জাতিসঙ্ঘ যেখানে ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রের পড়শি দেশের উপর দিয়ে গিয়ে সমুদ্র ব্যবহারের একসেস পাওয়াকে অধিকার গণ্য করে রেজুলেশন তৈরির প্রক্রিয়ায় আছে, এরা তখন বেখবর হয়ে নেপালকে “এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” করার মূল্য চুকাতে হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে।

    এছাড়া, এটা আসলেই একটা হাসির কাণ্ড যে হিন্দুত্বের ভারত ও হিন্দুত্বের ন্যাশনালিজমের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমরা আরেকটা মানে নেপালের  ন্যাশনালিজম দেখে টিটকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে দেখছি। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল নেপালের ত্বরাইবাসীরা ভারতের উসকানিতে নেপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে – ভারত-রাষ্ট্র তা করাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু হুমকি দিচ্ছেন এক পত্রিকার সম্পাদক! কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক নয়। এখানে আবার পত্রিকার সম্পাদক এমনই জাতিবাদী হয়েছে যে, রাষ্ট্র বা সরকারের কেউ না হয়েই তিনি হুমকি দিচ্ছেন! এটা এমনই জাতিবাদিতা!   জমিদারের ছেলে যদি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে পাশের টেবিলে বাসার এককালের কাজের ছেলেকে খেতে দেখে তাহলে যেমন জমিদার রোয়াব-ভ্যানিটি রক্ষার্তে তেলেবেগুনে ঝাপিয়ে পড়ে, হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদকের অবস্থ হয়েছে তেমনই।  এই অবস্থায় সম্পাদককে একটাই কথা বলা যায় – মহাশয়, কুল ডাউন! আপনি শান্ত হোন! সাম্য, সম-মর্যাদা ব্যাপারটা বুঝেন?  আপনি বুঝে নেন জলদি, অবস্থা আরো খারাপ হবার আগেই! দেখছেন না ৪০০ বছরের আগের কালো-দাস-ব্যবসায়ী সেলিব্রেটি হয়ে এতদিন নিজের মুর্তি টাঙিয়ে খারায় ছিলেন! কিন্তু এখন? না আর না! এবার সময় হয়েছে আপনি মাটিতে, নদীতে লুটায় পড়তেছেন না? আর লুকায়ে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না! আপনিও, কেউ বাদ যাবেন না!

    ওই সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল গত ৮ জুন। আর নেপালে এর পালটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ১১ জুন। এ থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক কোন উত্তেজনায় আর কেমন পর্যায়ে আছে এরই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

    নেপাল সীমান্তে ভারতীয়দের উপর গুলিঃ
    তাহলে গত ১২ জুন নেপালি পুলিশের হাতে ভারতের এক নাগরিককে হত্যা, দুইজন ভারতীয় নাগরিকের মারাত্মক আহত ও একজনকে নেপালি পুলিশের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনার কি নেপাল-ভারত সীমান্ত লিপুলেখ নিয়ে উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে? এর জবাব হল, পরোক্ষে সম্পর্ক অবশ্যই ভাল মতনই আছে, প্রত্যক্ষে সম্ভবত নেই। সাধারণ অবস্থায় নেপাল-ভারত  তো খোলা সীমান্ত, অবাধে দুদেশের নাগরিক যেতে পারে। বিশেষ করে বিহার জেলা সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈবাহিক আত্মীয় সম্পর্কই প্রচুর। কিন্তু এখন নেপালে ১৪ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলছে। নেপ[আলী সীমান্ত্রক্ষীর যুক্তি,  এসময় নেপালের মেয়ে বলে এক ভারতের বউমা অবাধে এখনই শ্বশুরবাড়ি অবাধে আসাযাওয়া করতে পারে না। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেটা করতে যাওয়া থেকেই তর্কবিতর্কের শুরু। এরপর এই বাধা ভাঙতে ভারত থেকে লোকজন এনে (কমপক্ষে ৩০ জন) চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সীমান্তরক্ষীরা (মাত্র ৭ জন) ভয় পেয়ে ভারতীয়দের সামলাতে না পেরে গুলি ছুড়েছে। প্রথমে দশ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার। কিন্তু এতে কোন কাজ না হওয়ায় এবার নিচে ফায়ার করেছে। ভারতের প্রায় সব পত্রিকার বর্ণনার সারকথা এটাই। তবে নেপালের সীমান্ত সৈন্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আছে তা ভারতের ইকোনমিক টাইমস লিখেছে বলে কেউ কেউ লিখেছে। কাজেই পরোক্ষ লিপুলেখের টেনশন এখানেও আছে, বলা যায়। এখানে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি ভারত-নেপাল সম্পর্কের আগামি অভিমুখ সেদিকেই যাচ্ছে – মুক্ত অবাধ সীমান্ত আর থাকছেই না। চুক্তি বদল হচ্ছেই। তবে কতটা আপোষে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন!

    তবে আমরা উপরে দেখলাম ভারতীয় সম্পাদকের মনোভাব। তিনি নেপালের এমন বেড়া দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া কী সহজে সহ্য করে নিবেন? সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে অবশ্যই!   জমিদার-মন এসব সহজে নিতে পারে না। ‘বান্দি’ করে যাকে এতদিন দাবায় পায়ের নিচে রাখছিলেন তিনি, সে এখন আমারই পাশের চেয়ারে বসে কেমনে!   আর বিপরীতে ওদিকে নেপালির পত্রিকার কলামিস্ট চাইছেন নেপাল-ভারত সম্পর্ক রিসেট করা ঢেলে সাজিয়ে নিতে, যাতে অসাম্য, অমর্যাদার সম্পর্ক দূর হয়ে যায়। মানুষ না খেয়ে হলেও সম-মর্যাদার জন্য জীবন দিতেও উঠে দাড়াতে চায়। এটা কোন জমিদার মন বুঝে না। যার একটাই ওষুধ – রিপাবলিক মন – রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতা, মর্যাদা ইত্যাদি ঝাপ্টা দেওয়া।  অর্থাৎ কলামিস্ট তিনি বুঝাতে চাইছেন ১৯৫০ সালের চুক্তির বাতিল অথবা ন্যূনতম একটা রিভিউ করতে। আর বর্তমান সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন। রিভিউ রিপোর্ট এসে গেছে। কিন্তু মোদী সময় পাচ্ছেন না বলে এড়িয়ে রেখেছেন।

    বোঝা যাচ্ছে, নেপালের সাথে ভারত তাদের সম্পর্কটা খামোখাই তিতা করে ফেলেছে, খুব সম্ভবত তাদের পুরাণা কলোনি আচরণ পছন্দ করে তা আকড়ে থাকার কারণে। আর এর তাবত দায় এখন চীনের ওপর চাপাতে চাইছে। যদিও রেকর্ড ও ফ্যাক্টস একেবারেই পরিষ্কার যে ২০১৫ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে চীনের নামই কেউ জানত না। কোথাও উচ্চারিত হত না এমনই অপ্রয়োজনীয় মনে হত। তবে নিশ্চয় চীনও নিস্পাপ নয়। তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গও নয়। বাস্তবতা হল, নেপালের প্রতিটা মানুষকে ভারতের চরম কষ্টকর জীবনের মুখে ফেলে দেয়া থেকেই এর ভিতরেই ত্রাতা হিসেবে হাজির হতে সুযোগ পেয়ে গেছিল চিং । যে সুযোগ সে না চাইতে পেয়েছিল এবং নিয়েছিল।  এরপর থেকে নেপালে চীনের আবির্ভাব ঘটা আর কেউ ঠেকাতে পারে নাই।  প্রতিহিংসা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। নেপালের কিছুই করতে পারবে না, উলটা নিজের আরো ক্ষতি ছাড়া।

    ভারত কেবল নিজের আচরণ আর স্বভাবকেই দায়ী করতে পারে; আর যারা আগে সেসময় ২০১৫ সালে এটা দেখতে মিস করেছেন তাদের জন্যই সম্ভবত সেই প্রমাণ এখনো হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক আবার হাজির করেছেন!

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টেও  “নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

    করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

    গৌতম দাস

    ১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2WY

     

      Image MSN.COM,করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন

    করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত শুক্রবার সারা দুনিয়ায় মোট মৃত্যু এক লাখ ছাড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশেও করোনাবিষয়ক খবরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হয়ে উঠেছে “লকডাউন”। শব্দটা একটা গোটা জেলাশহর তো বটেই, আবার একটা পাড়া বুঝাতেও সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    কিন্তু লকডাউন শব্দটার অর্থ একটা নয়, দুটা। বলা সম্ভবত ভাল যে এটা যুগ্ম অর্থের শব্দ। এমনকি এমন এক দ্বৈত বা যুগ্ম অর্থের শব্দ যেটা সাধারণত দেখা যায় যে, এসব শব্দ একটা অর্থে ব্যবহৃত হলে শব্দের অন্য অর্থটা সেখানে আর হাজির থাকে না। কিন্তু লকডাউন শব্দটার দুই-অর্থই সবখানে বজায় থেকে চলে। লকডাউন কথার মূল অর্থ কোন এলাকা যেটা একটা দেশ বা জেলা বা পাড়াও হতে পারে, সেই এলাকাকে ওর সব পড়শি সব এলাকা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা শব্দটা তাই ব্যবহার করছি স্বাস্থ্য সুরক্ষার্থে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে যেমন, ল্যাবে কোন পরীক্ষিত ফলাফলে মানে, প্রমাণিত কোনো ভাইরাস সংক্রমণের কেস হলে, এটা এরপর যাতে সেই পরিবার-সমাজে আর না ছড়িয়ে পড়ে তাতে বাধা দেয়ার জন্য,রোগীকে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে আমরা বলি, লকডাউন করা হয়েছে।

    লকডাউনের দ্বিতীয় অর্থ হল, অর্থনৈতিক অর্থে যেখানে এতে অর্থনীতিটাও পরিণতিতে লকডাউন হয়ে গেছে। কাজেই একটা পাড়াকে লকডাউন করা  মানে ঐ পাড়ার সাথে (ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে) অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময়ও বন্ধ করা হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন  করা হয়ে যায়। যদিও সেক্ষেত্রে কেবল খুবই সীমিত পর্যায়ের একটা ‘একমুখী কিছু ভোগ্যপণ্য সরবরাহ’ সেখানে চালু রাখা হয়। তাই, এভাবে লকডাউন শব্দটা না চাইলেও সবসময় একই সাথে এ দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে যায়।

    অতএব দুনিয়াজুড়ে ভাইরাসের আতঙ্কে বিচ্ছিন্নকরণ করা মানে একই সাথে অর্থনীতিও বিচ্ছিন্নকরণ। তাই অর্থনৈতিক  বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন দুনিয়াজুড়ে। আর অর্থনীতিকেও ‘বিচ্ছিন্ন’ করার অর্থ হল অর্থনীতির ঢলেপড়া, স্তব্ধ বা স্থবির মৃত হয়ে যাওয়া। তাই ভাইরাসের শঙ্কার পাশাপাশি লকডাউনের ফলে দুনিয়াজুড়ে এখনকার আরেক সবচেয়ে বড় শঙ্কা হল করোনার দশায় পড়া বন্ধ অর্থনীতি কি দুনিয়াজুড়ে আবার কখনও জীবিত হবে, চালু হবে? হলে কবে, কিভাবে হবে? নাকি অর্ধেক বা ত্রিশ ভাগের বেশি ওচল থেকে যাবে যা আর কখনোই চালু হবে না? নাকি একে কোনো চাবুক দিয়ে চাবকাতে হবে মানে প্রণোদনা দিয়ে চালু করতে হবে ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন এখন চার দিকে। এই আশঙ্কা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বা কম প্রভাবের নয়।

    একটা উদাহরণ নেয়া যাক। বাংলাদেশে এখন চৈত্র-বৈশাখের গরম চলছে। এরই মধ্যে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্তও পৌঁছেছিল কয়েক দিন। আমরা তা খেয়ালও করেছি হয়তো কেউ। প্রতি বছরের মত এবারও আমাদের টিভিগুলোতে চৈত্র- বৈশাখ মাসের মত করে বিজ্ঞাপনের ধরণও বদলে ছিল। যেমন এবারের গরমের জন্য নতুন এয়ার কন্ডিশনার  ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্সের এড; অথবা ট্যালকম পাউডার কিংবা বৈশাখী উৎসব আসন্ন বলে ক্রেতার মনে সুড়সুড়ি তোলার এড বা পণ্যের লোভ দেখানোও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তাতে ছন্দপতন ঘটে যায়। লকডাউনের দিন বাড়ানোর নির্দেশ আসাতেই  এখন প্রায় সব বন্ধ। উতপাদক-বিক্রেতারা এথেকে বুঝে যায় যে এই লকডাউন অবস্থায় এখন আর এড দেখানোটা মাঠে মারা যাবে। কারণ দোকানপাট মানে বেচাবিক্রিই বন্ধ। ওদিকে টিভিতে গান-নাটক ইত্যাদির বিনোদন ধরনের প্রোগ্রামে নতুন রেকর্ডেড আগে তৈরি অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কারণ নতুন রেকর্ডিং বন্ধ। আর এসব মিলিয়ে টিভির আয় হিসাবে পাওয়া বিজ্ঞাপনে টান পড়তে শুরু করেছে। এই টানাটানি এখন ক্রমশ কর্মী মানে তাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে। এর ফলাফল এই পরিবারগুলো এখন সাবসিস্টেন্স (নুন্যতম “টিকে থাকার” ) মানে, ন্যূনতম খাওয়ার পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কিনবে না। এটা আসলে হাজার হাজার এমন উদাহরণের একটা মাত্র। এভাবে সবাই যদি “টিকে থাকার” [[subsistence] ক্রেতা হয়ে যাই, এর মিলিত ফলাফল হল অর্থনীতি শুকিয়ে ক্ষীণ হয়ে আসা; সবাই মিলে ডুবে মরার মত হবে। এটাই সামগ্রিক অর্থনীতির ঢলে পড়া।
    আসলে এর উল্টোটা ছিল স্বাভাবিক সময়ে; যখন তা চালু থাকে, তখন পণ্যের ভোক্তা যখন বাড়ে তাতে উৎপাদনও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, তাতে নতুন কাজ সৃষ্টিতেও বৃদ্ধি ঘটে আর তাতে আবার নতুন ভোক্তাও বাড়ে। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়, সব মিলিত যার ফলাফল হল, সবার প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলা। আর এখন ঠিক এটারই উলটা – সাবসিষ্টেন্স লেবেলে পৌছানোর দিকে সকলের ধেয়ে চলা।

    এই হল অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর অদ্ভুত ও কঠিন খেলা।  সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে আসতে চাইছে। যদিও অর্থনীতিতে এমন চাকা ঘুরার বা ঘুরানোর নিয়ম হল একটা চাকা ঘুরলেই তা ধীরে ধীরে অসংখ্য চাকাকে ঘুরিয়ে তুলতে পারে। তাহলে এখনকার জন্য আমাদের নির্ধারক প্রশ্ন হল – কোন চাকা সবার আগে ঘুরানোর চেষ্টা করব? অনেকে চাকা ঘুরানোর প্রসঙ্গটা চাহিদার চাকার দিক থেকে শুরু করতে চাইতে পারেন। চাহিদা নতুন চাহিদা সৃষ্টি করে; ফলে তা নতুন উৎপাদন আর নতুন কাজও। যেসব চাহিদা সহজেই প্রথমে পূরণ করে দেয়া সম্ভব ও উপযুক্ত যাতে তা চালু করে দিলে বা বাড়িয়ে তুললে তা অন্যসব চাহিদার চাকাকে ঘুরাতে, চালু করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটা প্রাইম মুভার (প্রথমে যে চাকা ঘুরে অন্যদের ঘুরায়) [Prime mover] বা এমন মূল চাকার সন্ধান পেতে হবে আমাদের সবাইকে।

    একইভাবে গ্লোবাল অর্থনীতির চাকাকেও আবার সচল রাখা বা দেখতে চাওয়া যাদের প্রথম মাথাব্যাথা বা যারা মূল দায়িত্বে বা সংশ্লিষ্ট সেই পরিসরে যেমন আই এমএফ বা জি২০-এর সভায়, সেখানে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য হল বাজারে প্রচুর অর্থঢালা ব্যয় বাড়ানোতে যেতে হবে। মানে কৃচ্ছতার উল্টোটা। যেমন এব্যাপারের সবচেয়ে প্রচলিত চিত্র হল, গ্লোবাল পরিসরে সরকারি বন্ড আগে থেকেই বাজারে থাকলে তাতে লভ্যাংশ বাড়িয়ে বেশি দিয়ে এগুলোকে ফিরে সরকার কিনে নিয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ সাধারণত বাড়ানো হয়ে থাকে।  এভাবে মোট অর্থঢালা ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এক ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে গত জি২০ রাষ্ট্রগুলোর [What is the G20] বিশেষ সভা থেকে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ-ভারতের মত দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার ক্ষেত্রে কোথায় আঘাত করা উচিত, মানে কোথায় প্রাথমিক চাহিদা বাড়াবার উদ্যোগ নিলে অন্য সব চাকাকে সে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে সচল করে ফেলতে পারে – সেই জায়গাটা কী হতে পারে?

    কোথায় প্রণোদনার অর্থ ঢালবেনঃ
    এর আগে গত বছর (২০১৯) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কলকাতায় জন্ম নেয়া অভিজিত-এস্থার নোবেল দম্পতির কথা বলেছিলাম। গত সপ্তাহে ভারতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সমিতি মানে চেম্বার অব কমার্সের কলকাতা রাজ্য শাখা, অনলাইনে কথা বলার এক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। যেখানে অভিজিত-এস্থার ছিলেন মূল বক্তা-অতিথি তাদের (আমেরিকায়) বোস্টনের বাসাতে বসেই।

    ভারত বা বাংলাদেশে আমদের সরকারগুলো ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে শুরু করে দিয়েছে , নানান প্যাকেজ ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।  কেবল ব্যবসায়ীদেরকে দেয়াকে কেন্দ্র করে এসব প্রণোদনার অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করা মানে বুঝা যাচ্ছে এখানে সরকারের  পিছনের-অনুমান হল হল এসব প্যাকেজই চাহিদা বা উদপাদন বাড়ানোর প্রাইম মুভার বলে সে নিশ্চিত হয়েছে।  অর্থাৎ এসবের কোন প্রমাণ সাথে হাজির না করলেও এই সরকারি উদ্যোগগুলো বুঝাতে চাইছে, এই প্রণোদনাই একমাত্র প্রাইম মুভার ফলাফল আনবে।

    কিন্তু এই প্রসঙ্গে অভিজিতের প্রস্তাব এখানে একেবারে রেডিক্যাল এবং আলাদা। তার সাহসী পরামর্শ হল, গরিবের হাতে টাকা পৌঁছানো, যাদের এটা এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার।

    নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ-এর রেডিক্যাল প্রস্তাব হল, ঘরে খাবার নাই এমন গরীবের হাতে টাকা পৌছানো। যাদের  এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার। 

    ফলে তাঁদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোটা আমাদের প্রায়োরিটি হতে হবে। মোদীর গত টার্মে ২০১৫ সালের একটা সফল প্রকল্প ছিল “জনধন প্রকল্প”।  যার সারকথাটা হল, যেখানে গরিব কৃষককে ১০ টাকা দিয়ে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সরকার যাতে সরাসরি এমন গরীব উৎপাদকের হাতে প্রয়োজনে যেকোন অর্থ সরাসরি পৌঁছাতে পারে। অভিজিত এই প্রকল্পের অবকাঠামো সুবিধা নিয়ে সরাসরি গরিব কৃষকের চাহিদা পূরণ করে দিয়ে অর্থনীতির প্রাইম চাকাকে ঘুরাতে চাওয়ার পক্ষপাতী। এটাই তাঁর আসল কথা।

    যদিও তাঁর বক্তব্যের এই মূল অংশ চাপা পড়ে যায় তাঁর বক্তব্যের অন্যকিছু সহ-মন্তব্যের কারণে।  ভারতের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা হল, করোনা আক্রমণে ছেয়ে ওঠার আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি স্থবির হয়েই ছিল। তাই এখন অভিজিতের গরীব-প্রণোদনার প্রস্তাবে এমন  প্রশ্ন উঠা ছিল স্বাভাবিক যে, সরকারের হাতে তো এখন এমন যথেষ্ট বাড়তি অর্থ নেই। সে কথা চিন্তা করে  তাই অভিজিত আগাম বলেছিলেন, “নতুন টাকা ছাপিয়ে হলেও” সরকারের এটা করা উচিত।

    এদিকে এটা এখন গ্লোবালি প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে যে, আমরা ইতোমধ্যেই এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দায় প্রবেশ করে গেছি। বিশেষত আইএমএফের প্রধানের এ নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যের পরে আর কোনো তর্ক থাকে না। সে কথা মনে রেখে অভিজিতের প্রস্তাব, এই অবস্থায় ভারতের ম্যাক্রো বা সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় ডুবে গিয়ে চিন্তা করার চেয়ে কিছু সদর্প সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেছেন, “প্রথাগত, সাবধানি পথে হেঁটে এই পাহাড়প্রমাণ সমস্যার মোকাবেলা করা শক্ত। চাহিদার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়েও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো জরুরি। তাতে মূল্যবৃদ্ধির হার মাথাচাড়া দেবে কি না, সেসব ভাবার সময় এখন নয়। কারণ, এই অবস্থায় তা না করলে, অর্থনীতিকে চড়া মাশুল দিতে হতে পারে বলে সম্ভাবনা থাকছে”। কলকাতার আনন্দবাজারে এভাবেই লেখা হয়েছে। এনিয়ে ইংরাজি টেলিগ্রাফের রিপোর্টিংও এখানে।

    এমনকি তিনি ‘আর্গু’ করছিলেন – তিনি মানছেন স্বভাবতই একটা মুদ্রাস্ফীতি হবে এতে। কিন্তু তিনি বলছেন, এটা পরে আলাদা করে মোকাবেলা করা যাবে এবং তা সম্ভব। তাঁর একথা অবশ্যই তা সত্যি কারণ, একালে প্রত্যেক রাষ্ট্রে একটা কেন্দ্রীয় (রিজার্ভ) নিয়ন্ত্রক ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংকের মত) থাকায় এবং এর হাতে ম্যাক্রো অর্থনীতির পরিচালনার যেমন এর ঘোষিত ফিসক্যাল বা মনিটরি পলিসি ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকার কারণে বাজারে মুদ্রার (টাকার) প্রবাহ বাড়ানো বা কমানোর মেকানিজমে যদি সদিচ্ছা থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ কাজ। যদিও সাবধান, আজকাল টাকা ছাপানো বলতে এর অর্থ বাজারে মদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া বুঝায়। অ্যামেরিকান ফেড (ফেডারল রিজার্ভ) এটাই করে। এভাবে বুঝতে হবে।

    কিন্তু অভিজিতের পরামর্শের উজ্জ্বল দিকটা হল তিনি চাহিদা বাড়ানো বা চাহিদা ধরে রাখার প্রাথমিক চাকা হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিবার কথা তিনি বলেননি। সেদিকে তিনি যানই নাই। বরং তিনি উলটা বলেছেন, গরিব মানুষের পকেটে টাকা দিতে। তিনি আসলে জোর দিয়েছেন এই জনগোষ্ঠির বিপল সংখ্যাটার দিকে। এক বিরাট ভোক্তা বাজার এটা। এটাকে তিনি আসলে পালটা শক্তি হিসাবে দেখে সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে রেডিক্যাল হতে চেয়েছেন। সারা পশ্চিমের কোনো রাষ্ট্রের যে সুবিধাটাই নেই। এ কারণে এটা অপ্রচলিত, কিন্তু বাস্তব।

    বাংলাদেশে চিত্রটা এর কাছাকাছিই। আমরাও আমাদের লকডাউন করেছিলাম; কিন্তু দিন এনে খাওয়া লোকগুলোর ঘরে চাল নেই।  এই পরিকল্পনা এখনও করি নাই।  তাদের ঘরে খাবার কোন ব্যবস্থা না করেই।  তাঁরা চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে আকুতি জানিয়ে রাস্তায় ভিড় করছে, সৈনিকের পায়ে ধরে আকুতি জানাচ্ছে তাকে রাস্তা-ছাড়া না করতে। নারায়নগঞ্জের এমন এক ছবি আমরা দেখেছি; চিত্রটা খুবই মর্মান্তিক। নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এখানে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে? আমরা অন্তত এক মাসের বিনা পয়সায় রেশন বরাদ্দের কথা তুলছি না। কিন্তু সরকার এটা না যেন বাকি সব কিছুই করতে আগ্রহী।

    নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এর ভিতরে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে আমরা গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। গরীবের না খেয়ে হলেও তাদের ঘরে থাকার বিনিময়ে আমরা বাকিরা নিজেরা ভাইরাসমুক্ত থাকতে চাইছি। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে?

    আবার যেটুকু  দশ টাকা কেজি চাল কিনার ব্যবস্থা আছে [মানে যার হাতে অন্তত দশটা টাকা আছে কেবল তাদের জন্য] তাতে প্রতিদিন ‘দশ টাকার চাল’ চুরি করার ঘটনার লুটপাট রিপোর্টেড হচ্ছে। আমরাও কি আমাদের “না-আয়ের” সব গরিবের  হাতে চাল তুলে দিয়ে একটা প্রোগ্রাম চালু করতে পারি না? এমন চার কোটি লোকের চাহিদা মেটানো আমাদের অর্থনীতিতে এক প্রণোদনা হতে পারে। এ জন্য এক-দুই মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির আছে। আবার চাইলে বিশ্বব্যাংকের করোনা ‘রিকভারি ফান্ড’ আছে। সেখান থেকে চাওয়া যেতে পারে। এছাড়া তাদের কোনো অনুদান ফান্ড আছে কি না, তাও চেক করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি সরকার আইএমএফের কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা  দেয়েছে .[..to mitigate the economic impact of the coronavirus crisis] – করোনায় অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে। ওদিকে ভয়ে অব আমেরিকা জানিয়েছে এমন মোট পাঁচ দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ চাওয়ার মোট পরিমাণ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার।

    তবে আমাদের ক্ষেত্রে ঘরে একমাসের বিনা পয়সার রেশন পৌছানো – এটাই অভিজিতের মত করে বলা প্রস্তাব। অভিজিতের মত করে এই প্রস্তাবের সারকথাটা হল, আমাদের সমাজের যেসব চাহিদা প্রবল তাকে কাজে লাগানো, হারিয়ে যেতে না দেয়া। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে বা উদ্ধার পেতে চাইলে কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে আমরা মেরে ফেলতে বা মরে যেতে দিতে পারি না। কারণ বিপুল জনসংখ্যার দেশে এটাই আমাদের অ্যাসেট।

    তবে অভিজিতের প্রস্তাবে আইএমএফ খুশি হয়নি, যদিও সেটা তাদের আলাদা বিবেচ্য বিষয়ের কারণে। আর কলকাতায় ওদিকে সেটা ছিল ব্যবসায়ী উৎপাদকদের চেম্বার সমিতির আয়োজিত কর্মসূচি, ফলে তারাও তেমন খুশি হয়েছে অথবা গা-করেছে মনে হয়নি। তবে আইএমএফের পক্ষে অভিজিতকে সমর্থন না দেয়ার কারণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তাদের অন্য সমস্যা আছে সেকারণে।

    চলতি পরিস্থিতিতে আমাদের গ্লোবাল মহামন্দায় প্রবেশ যেটা এখন ঘটে গিয়েছে, অভিজিত-এস্থারসহ অনেকেই মনে করেন সেটা ব্যাপকতার দিক থেকে ১৯৩০ সালের মহামন্দার সাথে  তুলনীয়। সেই সময় ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র আয়ের চেয়ে যুদ্ধে ব্যয় বেশি করাতে তা মিটানোর অক্ষমতায় যার যার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। মানে, তারা বিস্তর টাকা ছাপিয়েছিল তখন। আর সবাই মিলে একসাথে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটানোয় – এই মূল কারণেই গ্লোবাল মহামন্দা হাজির হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আর এই মূল্যায়নের ওপরে দাঁড়িয়েই বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল। তাই ‘সম্মিলিত মুদ্রা অবমূল্যায়ন’ ঘটানো আইএমএফের চোখে লিখিত জন্মনীতি হিসাবে হারাম ধরনের কাজ মনে করা হয় সেই থেকে।

    ফলে আইএমএফ  অভিজিতকে বলতে চাইবে- অবমূল্যায়ন নয়, সে বরং ঋণ দিতে চায়। তবে সেটা যা হোক, অভিজিতের কথা আমরা আক্ষরিকভাবে না নিয়ে তার মূলকথা গরিব মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছানো; এর বাস্তবায়ন করতে পারি। এটাকে একটা সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ মনে করতে পারি আমরা। বাংলাদেশের লকডাউনে অভুক্ত গরিবদের জন্য এটা কি আমরা করতে পারি না? দায়িত্ববানদের ভেবে দেখা উচিত।

    ওদিকে চরম ক্রাইসিসে টাকা ছাপানো জায়েজ আছে – উদাহরণও আছে – একথা বলে লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইম রীতিমত এক নিজ সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে গত ০৬ এপ্রিল ২০২০। যা বলা যায় পরোক্ষে নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। লিখেছে “Printing money is valid response to coronavirus crisis”।

    “Printing money is valid response to coronavirus crisis” – London Financial Times

    তাদের দাবি ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডও জন্ম থেকেই এমন অর্থ ছাপিয়ে নিয়ে সরকারকে সাহায্য করে আসছেই। কানাডার এক স্থানীয় পত্রিকা দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোও নাকি তাই করেছে।

    তবে আমাদের জন্য সারকথা, বাংলাদেশেও টাকা ছাপানো নয়, চাল কিনতে  হাতে টাকা নাইদের ঘরে একমাসের চাল পৌছে দেওয়া প্রকল্প আমরা নিতেই পারি।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে  “করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]