Category: মুদ্রার অবমূল্যায়ন

  • মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    গৌতম দাস

    ২৬  জুন ২০২১, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3BI

     

    –

    (গত সংখ্যার পরে শেষ পর্ব, বাইডেন জি৭ ইস্যুতে।)

    কলোনিদখলদারি (মোটামুটি ১৫০০-১৯৪৫) ব্যবসার যুগেই শেষের দিকে ১৮৮০ এর দশকে  আমেরিকা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে বড় অর্থনীতি হিসেবে কলোনি দখলদারদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল। তবে এক ঝাপটায় আমেরিকা সাথে  নেতা হয়নি। আর কারও নেতা হওয়া বা দুনিয়াতে অর্থনীতিতে কেউ নেতা হওয়া এসব বিষয়গুলো তখনও শুরুই হয় নাই। মূল কারণ গ্লোবাল পণ্যবিনিময় বাণিজ্য দূরে থাক দুটা কলোনি মালিক দেশের মধ্যে বিস্তর পণ্য বিনিময় বা অর্থনৈতিক নীর্ভরশীলতা বিষয়টাই তখনও সুনিয়াতে হাজির হয় নাই।  তাই সব মিলিয়ে  আমেরিকাকে  আরো প্রায় ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটাই  দুই দুটা বিশ্বযুদ্ধের কাল।  মূল কারণ দুনিয়া তখনও মূল একটিভিটি বলতে  কলোনি দখলের রামরাজত্বে মজেছিল, যার অবসান ঘটানো আগে  করে নেওয়ার দরকার ছিল আমেরিকার জন্য।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তিগুলা যারা দুনিয়ার ওপর একচ্ছত্র খবরদারি চালিয়ে বেড়াত তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই (২০১৪) সবাই এক এক করে দেউলিয়া হয়ে গেছিল, মূলত যুদ্ধের খরচসামলাতে ফেল করাতে। আর এরই সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল রথশিল্ড ব্যাংক [Rothschild Bank]  যেটা মূলত এবং একমাত্র সেকালের মুদ্রা কনভার্ট বা বিনিময় করে দিবার ব্যবসায়ে ছিল; এর বন্ধ হয়ে যাওয়া।  কারণ এই ব্যাংকটা কার্যকর ছিল সে সুত্রের ভিত্তিতে তা হল, ব্যাংকের ভল্টে সমতুল্য মানের সোনা রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা তখন ওসব দেশে চালু আছে।  এটা চালু থাকলে ঐ ব্যাংকের কাছে কোন দেশের পণ্য আমদানি / রফতানির হিসাব রাখা মানে ঐদেশে সোনা এসে ঢুকেছে বা বেরিয়ে গেছে কতটা তা জানায় বিশ্বাসযোগ্য উপায়।  কিন্তু যুদ্ধের সময়  সোনাজমা না রেখে মুদ্রা ছাপানোর সস্তা পথে যুদ্ধের খরচ সামলাতে যাওয়াতে এইবার মুদ্রার মানের (অবমূল্যায়ন) ঢলে পড়ে যাওয়ায় রথশিল্ডের ব্যাবসা বন্ধ রাখতে হয়।

    প্রথম আমেরিকান ঋণগ্রহিতা ইউরোপঃ
    ফলে এইবার কলোনিমালিক ইউরোপের দেশগুলোর  কাছে ঋণ পাবার একমাত্র বিকল্প মনে হয় আমেরিকাকে। তবে মূলত এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালের পর থেকে। আর আমেরিকান থেকে বলতে আমেরিকান প্রাইভেট ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রগুলো যেমন বৃটেন সরকার এবং ব্যবসায়ীরাও – এরা  ঋণ পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।  যদিও এনিয়ে আবার আমেরিকায় আভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভক্তি শুরু হয়েছিল যে আদৌও ইউরোপকে  ঋণ দিতে যাওয়া ঠিক কিনা। কারণ এতে ক্রমশ ইউরোপের যুদ্ধে খোদ আমেরিকাই সামিল হয়ে পড়ে যেতে পারে। এটাই সেকালের আমেরিকার  বিচ্ছিন্নপন্থি বনাম আন্তুর্জাতিক-পন্থি বিতর্ক  [America’s isolationist Vs internationalist debate] বলে পরিচিত। এই বিতর্ক ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যারা এনিয়ে বিস্তারে বুঝতে চান তারা রুজভেল্টের Cash & Carry Law 1939 এবং এবং সাথে এই আইনের আগের সব ভার্সান। আর সবমিলিয়ে – Neutrality Act of 1939, Lend-Lease সহ বহুকিছুর ভিতরে ঢুকতে পারেন বা ঢুকতে হবে।

    ওদিকে ১৯৩২ সালের পর থেকে হিটলারের উত্থান শুরু হয়েছিল। এতে ক্রমশ নেতা হিটলার সাথে মুসোলিনির ইতালি আর মার্শাল তেজো জাপানসহ অন্যদের মিলে গ্রুপ বড় হতে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপের ঋণ বা বাজেট সংকটের কথা জানা যায় না।  ফলে একদিকে হিটলার ও তার সঙ্গিদের গ্রুপ  আর অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিরা এভাবে এক পোলারাইজেশন ঘটতে পেরেছিল।  আর মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ বইবার ক্ষেত্রে আমেরিকান সক্ষম অর্থনীতি ও বিপুল উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে্র সক্ষমতার বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আমেরিকার নেতৃত্বে আসে আর এই অংশই যার সেকালের ডাকনাম এলায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তিই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।
    কিন্তু  এই যুদ্ধের আসল ফ্যাক্টর যে যুদ্ধে  আমেরিকান সক্ষমতার পোলারাইজেশন এবং তা এমন কেন হয়েছিল ও কিসের ভিত্তিতে; এসব কিছু আমাদেরকে  মানে বৃটিশ-ভারতের আমাদেরকে পরিষ্কার জানতে দেয়া হয়নি। তাই দুটো শক্তি বৃটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – এরা  ঘটনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিল আমরা খাপছাড়াভাবে তাই জানতাম।
    এরই একটা হল, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা  যেন এদের মত “ভাল মানুষদের” নেতৃত্বে মানে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নেতৃত্বে তাঁরা বিপরীতে খারাপ মানুষ হিটলার আর তার বন্ধুদেরকে  চার্চিল  পরাজিত করেছিল। এই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। এছাড়া ওদিকে আরেক ব্যাখ্যা চালু ছিল কলোনি-ভারতের কমিউনিস্টদেরও। এটিও আরেক ভালভালাইয়া; মানে চার দিকে সব খালি ভাল আর ভাল। ভাল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের হাতে জর্মানির হিটলারের পরাজয় ঘটেছিল। তিনি ভাল লড়েছিলেন বলেই হিটলার পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই সব ক্রেডিট কমিউনিস্টদের, এটাই নাকি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল গল্প।  যেমন এই গল্পের প্রভাব এতই মারাত্মক যে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কমিউনিস্ট – এখন এনজিও নেতা  মনে করে – পড়তি গ্লোবাল নেতা আমেরিকা নয়, এটা ইউকের বৃটিশেরা। এককথায় বৃটিশেরা আমেরিকার চেয়ে অর্থনীতির শক্তিতে সেরা। যাক, সেসব কথা। তবু  আমরা খুবই সরি, স্টালিন বা চার্চিল  বা তাদের সমর্থকদের একটারও বয়ানের ভিত্তি নাই। কারণ এদের বয়ানে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস – আমাদেরকে  যুদ্ধের পোলারাইজেশনে মুখ্য ফ্যাক্টর কী ছিল তা বলতে পারে না। কেন?

    প্রধান ধারা হিসাবে আমরা  চার্চিলকে দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বুঝতে গেছিলাম আর সেটা এজন্য যে তারাই তো আমাদের কলোনি মালিক।  আর তাই একমাত্র তাদের মাধ্যমেই তো সব তথ্য ও উতস। আমাদের ইউরোপকে চিনি-মানি আর বুঝাবুঝি ঘটেছিল। তারাই আমাদের প্রভু ছিল। ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংরেজিই আমাদের এলিটরা বুঝত আর তারা কেবল ব্রিটিশ মিডিয়া পড়ে সেখান থেকে এগুলো অনুবাদ করত। এভাবে গ্লোবাল কাহিনীর যতটুকু বাংলার নাগালে আসত তা দিয়েই কেবল আমরা বিশ্বযুদ্ধ যতটুকু যা বুঝতাম। তাই আমেরিকা বলে কোনো দেশ আছে কি না বা কেমন তারা সেটাই তো তখনও আমরা ঠিকমত বুঝতাম না; অর্থাৎ চার্চিলের চোখ দিয়েই নিরুপায় আমরা  দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ বুঝেছিলাম। তাই আমাদের চোখ এই বীর চার্চিল যে আমেরিকার কাছে দাসখত দিয়েছে সেটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। স্টালিনের সোভিয়েত দেশকেও যে অ্যামেরিকা যুদ্ধের খরচ ধার দিতে পারে এসব আমাদের কমিউনিস্ট মনে চিন্তার অতীত।  স্টালিনসহ বিপ্লবীদের চোখে কলোনি বা উপনিবেশ তো উঠেই নাই। তাই তো সেটা এখনও কমিউনিস্টদের চোখে “নয়া-উপনিবেশবাদ”।  যার মানে কী একমাত্র স্টালিনই জানে…।  যেখানে একালে আমাদের হাসিনাই বাইডেনকে চোখ উলটে তাকাতে পারে এটা সম্ভব (যদিও  হাসিনার ক্ষমতার স্বৈরাচারি বলতে পারেন তবু সে স্বাধীন আর এরপরেও এখনও তাঁর বড় বড় সীমাবদ্ধতা আছে )  – সেখানে দুনিয়াটা এখনও নয়া উপনিবেশের দুনিয়ায় আমরা আছে এই কথার অর্থ কী?

    অথচ হার্ডকোর সত্যটা এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের মত কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো আর ইউরোপের কারো না কারো কলোনি  হয়ে শাসনে থাকবে কি না- এটাই ফয়সালা করে দিয়েছিল। কঠিন সত্যটা ছিল, চার্চিল আমাদের ত্রাতা বা মুক্তিদাতা ছিলেন না। কলোনি থেকে মুক্তি –  আমাদের আসল মুক্তিদাতা ছিল আমেরিকা, তাতে আমরা যতই তখন বা আজও আমেরিকাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করি না কেন। এটাই ফ্যাক্টস।  যদিও তা আমেরিকার নিজ স্বার্থেই ঘটতে পেরেছিল। কীভাবে?

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দুনিয়ার সব কলোনি দখলদার চার্চিলসহ সব কুতুবকে দাসখত দিতে বাধ্য করেছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ে শেষ হলে পরে তাদের সবাইকে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা উঠিয়ে ফেলে দিতেই হবে। কেন? যাতে দুনিয়া কলোনিমুক্ত প্রায় শ দুয়েক স্বাধীন রাষ্ট্রের এক দুনিয়া হয়।  আসলে মূল কথাটা হল, আমাদের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চার্চিলও আসলে আমাদের জন্য ভিলেন ও এনিমি ছিল। কিন্তু হিটলারের মারের মুখে নিজের যুদ্ধের খরচ চালানোর মুরোদ ছিল না বলে সারা ইউরোপ আমেরিকান ঐ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অতএব যুদ্ধ শেষে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন-আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে অসংখ্য দেশের কলোনিমুক্তি ঘটে গিয়েছিল। সর্বশেষটা দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সালে। আর বলাই বাহুল্য ভারত বা পাকিস্তান কলোনিমুক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে।

    অখণ্ড ভারতের দিক থেকে দেখলে বিশ্বযুদ্ধের এটাই ছিল আসল বিশ্ব-ইতিহাস, আমাদের কলোনিমুক্তির ইতিহাস। গ্লোবাল ইতিহাসের দিক থেকে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ও একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধশেষে প্রথম “গ্লোবাল অর্থনীতি” বলে কোন কিছুর নেতা হয়েছিল আমেরিকা। আর এই ইতিহাস জানার একমাত্র পথ হল সরাসরি  আমেরিকান হিস্ট্রি পড়া। তবে এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা নিজেই সেসব ডকুমেন্ট অনলাইনে দিয়ে রেখেছে। তাই যে কেউ চাইলে আর পড়তে জানলে নিজেই জেনে নিতে পারে।

    এখন এই আমেরিকান নেতৃত্ব মানে কী? এর মানে আর আবছা রেখে লাভ নেই, যা স্টালিন বা চার্চিল আমাদেরকে সেকালে জানতে দেয়নি (কারণ তা নিজেদের অযোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে) তা হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে খরচের বড় অংশটি একাই [মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার আর একে ৫১গুণ করলে আজকের ডলার হবে] বহন করেছিল আমেরিকা। মানে ইউরোপ এমনি এমনি আমেরিকান নেতাগিরি মেনে নেয়নি।

    এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আরেক যে ব্যাখ্যা- আমাদের দেশের রাজনীতি ভাল  বুঝে এমন ভাব ধরে থাকা কমিউনিস্টদের মুখ থেকে যা জানি, সেটিও আসলে সোভিয়েত ভাষ্য। আর সেখানেও যুদ্ধের বড় খরচদাতা ঐ এক ও অদ্বিতীয় আমেরিকা হলেও কমিউনিস্টদের ইতিহাস ভাষ্যে সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়ে এসেছে।

    তবে অন্যদিকের ফ্যাক্টস হল, আমেরিকাও দাসখত বা ‘সহযোগিতা’ চুক্তিতে স্তালিন বা চার্চিলকে অপমানজনকভাবে শামিল হতে বাধ্য করেননি। এসব চুক্তিতে অপরপক্ষ হিসেবে প্রথম ও একক স্বাক্ষরদাতা ছিলেন চার্চিল আর সেটার নাম আটলান্টিক চুক্তি, ১৪ আগস্ট ১৯৪১। আর পরে সেই ড্রাফটটাই কিন্তু এবার চার রাষ্ট্র  – ব্রিটেন, আমেরিকা চীন ও সোভিয়েত মিলে আবার স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। তবে এবার ওই চুক্তির নাম দেয়া হয়েছিল “জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণায়” স্বাক্ষর এই নামের আড়ালে। সাথে একই দিনে আরো ২৬ দেশ ঐ একই ডকুমেন্টে প্রতি-স্বাক্ষর করেছিল। এটাই আমেরিকার নেতৃত্বে হিটলারবিরোধী জোটের মুলভিত্তি দলিল। কিন্তু তবু কোথাও “কলোনি শাসন ছেড়ে দিতে চলে যেতে হবে” – এই ভাষায় বা শব্দ কোথাও নেই। তবে  কথাটা ঘুরিয়ে বলা হয়েছে – “যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবে যে ওই ভূখণ্ডের শাসন কিভাবে চলবে; অর্থাৎ কলোনি করা নিষিদ্ধ হলেও তা এই ভাষায় বলা হয়ে আছে।

    এ’প্রসঙ্গকথা এবার গুছিয়ে সম্পর্ক-দেখিয়ে দিয়ে বলে শেষ করা যাক। তা হলে আমেরিকা কিভাবে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল সেটা আমাদের মতো দেশের কোন এলিট বা কুতুবরা কেউ সেকালে বা একালে জানতেন বা টের পেয়েছিল তা মনে হয় না। এর কাহিনী বা ঘটনার দিক এটাই। আর এটাই এখন আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক।

    কারণ গত ১১-১৬ জুন ২০২১ সাল জুড়ে বাইডেন জি-৭ আর ন্যাটোর মিটিংয়ে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি বা হুমকি তুলেছিলেন। অথচ আসল কথাটা এই যুদ্ধের খরচ কে দেবে সেটা নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কিছুই  বলেননি। আর আমরা উপরে দেখলাম যুদ্ধের খরচই যুদ্ধের হুমকি বা যুদ্ধ যেই করুক এর মুখ্য ও নির্ধারক  বিষয়।  আর এই খরচ  সেকালে ঐ পরিস্থিতিতে একমাত্র বহন করতে সক্ষম ছিল রুজভেল্টের আমেরিকা। তাই ইউরোপ হিটলারের হাতে দখল ও বিলীন হওয়ার বদলে আমেরিকান নেতৃত্বকেই মেনে ওর অধীনে পরিচালিত হওয়াটাকেই বেটার বিকল্প বোধ করেছিল সকলে। তাহলে একালে বাইডেনের স্বপ্ন্বের যুদ্ধ ও এই যুদ্ধের খরচ বইবার মত দাতাটা কে হবে?  এই ভাসুর বা স্বপ্নে দেখা দাতার নাম জানান না দিলে বাইডেনের হুঙ্কারের অর্থ কী?

    কেন আমেরিকার জন্য বিশ্বযুদ্ধ-২ এর নেতা হওয়া এত জরুরি ছিলঃ
    তবে কথা আরেকুটু আছে।  আমেরিকা এমনি ওমনি যুদ্ধে সবার নেতা হতে নিশ্চয় চায় নাই। কিন্তু সেটা কী?  তা হলে? আমেরিকার স্বার্থ শুধু গ্লোবাল নেতা হওয়া ছিল তা নয়, মূলত তার হাতে জমা থাকা বিপুল সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ তখন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল, অথচ ঋণ-খাতক বা গ্রহিতা দেশ আমেরিকা খুজে পাচ্ছিল না।  কারণ দুনিয়া তখন  কলোনিদখল হয়ে থাকা দুনিয়া। আর ১৯০৫ সালের এই হিসাবে দুনিয়ার কলোনি হতে  বাকি আছে এমন ভুমি বা কোন দেশ আর  খালি ছিল না। ফলে এটা ছিল আমেরিকান   স্বার্থ যে সে দুনিয়াকে এক কলোনি দখল বা শাসন মুক্ত এক স্বাধীন দেশের দুনিয়া হিসাবে যেন দেখতে পায়। যাতে স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশগুলো –  এরা সবাই তখন আমেরিকার ঋণের সরাসরি অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে খাতক হতে পারে। যাতে আমেরিকা এসব স্বাধীনমুক্ত দেশকে আমেরিকান ঋণের খাতক হিসেবে পেয়ে যায়।
    কাজেই একালে বাইডেনের ভাবি যুদ্ধের খরচের সংস্থান না করে চীনকে যুদ্ধের হুমকি দেখানো এগুলোকে কী বলা যায়? এর মানে কি আমেরিকা-চীনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ নামে যে বিরোধ প্রকাশ্যে বাজারে হাজির আছে, তা বাইডেন এখন যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছেন? হ্যাঁ তাই। সে জন্যই এটাকে ছেলেমানুষি চিন্তা বলছি। কারণ এক তো খরচের ব্যাপার আছে; সেটি ছাড়াও চীনের সাথে আমেরিকান বিরোধ মূলত হাতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকা থেকে উদ্ভূত বিরোধ  – এমন বিরোধকে বাইডেন যুদ্ধে গিয়ে সেটাকে নিজের পক্ষে জিতে আনবেন কী করে?

    যেমন ধরা যাক, যুদ্ধ একটা হল আর আমেরিকা তাতে জিতেও গেল। কিন্তু তার পরে এতে কি আমেরিকার হাতে যথেষ্ট ‘সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ’ না থাকার সঙ্কট, যেটা এখনই প্রকট হয়ে আছেও তা আমেরিকার কেটে যাবে?  আর এই বিপুল সম্পদটা আসবে কোথা থেকে? কিভাবে?

    আসলে তখনো দুনিয়ায় সম্ভাব্য একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদের উৎস দেশ হয়ে থাকবে এই চীনই। আর সেই চীনের কাছে হাত পেতে আমেরিকা তার জনগণকে খাওয়াবে, দুনিয়া রুল করবে – এমন কল্পনা এবসার্ড বলারও সুযোগ দেখি না। এ জন্য বলেছি, হাতে বিপুল সঞ্চিত সম্পদ থাকা না থাকার সঙ্কট এটাই মূল সংকট – অথচ এই সংকট  কী যুদ্ধে জিতেও কেটে যাওয়ার বিষয়???

    তা হলে অথর্ব ন্যাটোকে সামনে আনা কেন?
    বাইডেন ন্যাটোকে সামনে রেখে হুমকিটা দিয়েছেন। ন্যাটোকে দিয়ে তিনি আর্টিকেল পাঁচ চালু করার সামরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার হাসির এক কথা হল, চীন-রাশিয়া নাকি পারমাণবিক অস্ত্রে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমান হয়ে যাচ্ছে। আর  ন্যাটো সেক্রেটারি এটাকে আমেরিকার জন্য হুমকি দেখছেন। আচ্ছা খোদ পারমাণবিক অস্ত্রই যেখানে সবার জন্যই হুমকি, সে্টা  আপনার বন্ধু বা শত্রু   যার হাতেই থাকুক; সেখানে ওরা আমার সমান হয়ে যাচ্ছে কেন  – এটা কী নাকিকান্নাময় যুদ্ধের অজুহাত তোলা নয়!

    কিন্তু  ন্যাটো নিয়ে ঘরের কথাটা হল – সেই ওবামা আমল থেকে, চাক হেগেল [Chuck Hagel] যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (২০১৩-১৫), তখন থেকেই ন্যাটো যে একটি খরচের ডিব্বা, আর সেই খরচের বেশির ভাগ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) কেন আমেরিকা একা বইবে- এসব প্রশ্ন আর অজুহাত তুলে কি চাক হেগেল সেকালেই ইউরোপকে খরচের দায় নেয়না ওথচ বড় কথা বলে – এই বলে অপমান করেনি?   ট্রাম্পও তো একই প্রশ্ন তুলেছিলেন।  ইউরোপকে খরচের দায় নিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একালে ন্যাটো একটি অপ্রয়োজনীয় সংগঠন। আফগানিস্তানের পর ন্যাটোর আর দুনিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ কমে আসছে তাই – ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন সব ঘোষণা দেয়নি কি? এমনকি তিনি ইউরোপে (জার্মানিতে) ও জাপানে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এখনো আমেরিকান সৈন্যের সামরিক ব্যারাক মেনটেন করে যাওয়ার খরচ এবার থেকে ইউরোপকে দিতে হবে বলে ট্রাম্প দাবি করেননি?
    তাহলে সেসব প্রশ্নের সদুত্তর কী? উঠে থাকা এসব প্রশ্ন যা ন্যাটোর ভবিষ্যতই এলোমেলো করে রেখেছে সেসব পাশ কাটিয়ে বাইডেন কতদুর কোথায় যেতে পারবেন?  বাইডেনের কাছে এসব খরচের ব্যয়ভার প্রসঙ্গে সমাধান কী আছে? অর্থাৎ খরচ বইবার প্রশ্নে ন্যাটো এখন একটি পর্যদুস্ত সংগঠন হয়ে আছে! অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা না বলে, এক দিনের ন্যাটো বৈঠকে গিয়ে চীনকে হুমকি দিয়ে এলেন বাইডেন! এটি কি তামাশা না ছেলেখেলা?

    Bantonglaoatang

    অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের বিতর্কও আছে গভীরেঃ
    তবে মনে হচ্ছে, ইউরোপের সবাই এখনো বোকা ধামাধরা নেতাদের দেশ হয়ে যায়নি। তাই খোদ সিএনএন খবর দিচ্ছে কানাডা বাদে ইতোমধ্যেই জি-৭ এর বাকি নেতাদের মধ্যে বাইডেনের চীনের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। গরম তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি প্রকাশ করেছে ইতালি। এ নিয়ে চীনা ব্যাখ্যা হল, ইতালিই ইইউর প্রথম দেশ যে চীনের বেল্ট-রোডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে।  উপরের কার্টুনটা আমি নিয়েছি চীনা গ্লোবাল টাইমস ম্যাগাজিনের এক আর্টিকেল থেকে। ঐ আর্টিকেলে কার্টুনের চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইটালিকে কুমড়া নাম দেয়া হয়েছে যার আবার “শার্প টাং” মানে কাউকে কিছু বলতে যার মুখে কিছু আটকায় না এমন নির্দয়ভাবে ক্রিটিক্যাল। সেই ইটালি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে,   The grey wolf image shows Italy, the first European country that joined China’s Belt and Road Initiative (BRI), is reluctant to collaborate with the US in suppressing China, commented “sharp-tongued pumpkin.” 

    তবে সামগ্রিকভাবে বললে, চীনের বিরুদ্ধে কামান দাগানো যৌথ বিবৃতি ধরনের কাগজে চীনকে কী ভাষায় কতটা অভিযুক্ত করছে মূলত এই প্রশ্নেই ভিন্নতাগুলো দেখা দিয়েছে। স্বভাবতই সবচেয়ে শক্ত ভাষায় বাইডেন ওই সব ড্রাফট দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু কেউই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় ততটুকুতেই থাকতে চায়। যেমন জাপান টাইমস, যৌথ বিবৃতি ড্রাফট করতে গিয়ে বড় মতভেদের কথা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনকে কতটা সমালোচনা করা হবে সে বিষয়ে [G7 …….to counter Chinese influence in the world may prove a daunting challenge… ]।

    এ দিকে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, [G-7 Split on Biden’s Anti-China Push]। ইতালি জার্মানি আর ইইউ প্রতিনিধিকে দেখা গেছে, চীনের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে এরা অনিচ্ছুক; বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থাকতে আগ্রহী। আবার এসব প্রশ্নে কানাডা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর আমেরিকা নিজে এভাবে এরা চারজন আবার চার মাত্রায় চীনের বিরোধিতা করতে চায়। আর জাপান যে কোন দিকে অবস্থান নেবে, তা সে সবচেয়ে অনিশ্চিত।

    “There were some interesting discussions and a little bit of a differentiation of opinion,” said a senior Biden administration official……Italy, Germany, and the European Union appear reluctant to take as tough a stance on China, and instead would rather focus on the “cooperative nature of the relationship.” …… The U.S., Britain, Canada, and France, on the other hand, want to be more “action-oriented” to different degrees. Japan appears to be the most ambivalent of the group.

    সিএনএন লিখছে, এক আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট তাদেরকে জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানি খুবই অস্বস্তিতে ছিল বিবৃতির ভাষা নিয়ে [….US officials said Italy and Germany were uneasy with potential communique language that China might view as provocative. ]। যেন চীন এটিকে কোনোভাবেই উসকানিমূলক হিসেবে না দেখে। চ্যান্সেলর মার্কেল তো বলেই বসেছিলেন যে, চীন আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বটে কিন্তু আবার অনেক ইস্যুতে আমাদের পার্টনারও তো বটে [Angela Merkel said that “China is our rival in many questions but also our partner in many aspects.” ]। ফরাসি নেতা ম্যাক্রোঁও যোগ করেছেন, জি-৭ কে তো ওই চীনের সাথেই আবার জলবায়ু, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অন্য অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তিনি পরিষ্কার করে রাখার পক্ষে যে, তাদের জি-৭ কখনো চীনবিরোধী কোনো ক্লাব হতে পারে না. “I will be very clear: The G7 is not a club hostile to China,” the French President said।

    সারকথায়, ভেতরে বড় মাত্রায় বাইডেন বিরোধিতা বজায় আছে। তবে সবচেয়ে মজার অবস্থানে ভারত। ভারতের মিডিয়াই ভেতরের বিরোধের খবরগুলো বড় করে সামনে এনেছে। যেমন হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, জি৭ লিডারেরা কত শক্ত করে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এনিয়েই তাদের মধ্যে বড় তর্কবিতর্কটা শুরু হয়েছিল। [The leaders of Group of Seven (G7) debated how strongly they should respond to China’s growing clout around the world and alleged forced labour practices in the Xinjiang region.] আর উইঘুর ইস্যুতে আরো মারাত্মক কথা বলেছে ঐ একই রিপোর্টে, ……there was no immediate consensus on how forcefully they should call out Beijing over the alleged human rights abuses। অর্থাৎ কত জোর দিয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগ তুলবে তা নিয়ে এখনি নেতসাদের মধ্যে ঐক্যমত নাই। কিন্তু কেন এমন লিখল, কারণ, ভারতই চায় না এটা। কারণ সেক্ষেত্রে এখানে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ না চলে আসে। এছাড়া চীনের নেজেরই লিক হয়ে যাওয়া রিপোর্ট রেফার করে হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে ঐ চীনা রিপোর্টে “struggle against terrorism, infiltration and separatism.” চীন লিখেছে তারা (উইঘুরের) সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একথাগুলো ভারতের মনে দাগ ফেলেছে।

    এছাড়া আরেক নিরপেক্ষ মিডিয়া ওয়াইর [WIRE]  লিখেছে,  ন্যাটো মিটিংয়ে একসময় এমন উত্তপ্ত ভাষায় বাইডেনের সাথে ইউরোপীয়দের বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে কমিউনিকেশন সুইচ অব করে রাখতে হয়েছিল, যাতে বাইরে মিডিয়ার কাছে তা না পৌঁছায়। আবার আরেক ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছে, মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিবৃতিতে কিছু অবস্থান প্রসঙ্গে খোদ ভারতেরই অস্বস্তি দেখা দিতেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির প্রশ্ন ছিল, উইঘুর বা ফোর্সড লেবার ইস্যুতে কতটা চাপ দিয়ে তা বলা হবে, এ নিয়ে বিতর্ক।

     বাংলাদেশের প্রসঙ্গঃ
    এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশেরও বলার আছে। প্রথমত, বাইডেন আমাদেরকে যে পটেনশিয়াল বিপদের মধ্যে হাজির করে ফেলেছেন তা হল, সত্যিই যদি তিনি চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেন বা টেনে নিয়ে যান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি হয়ে উঠতে পারে তাদের দুই দেশের যুদ্ধের রণভুমি। এছাড়া অনেকের মনে আশা যে বাংলাদেশে কেমন ধরনের সরকার থাকবে বা কে থাকবে- এ প্রশ্নে বাইডেন তাদেরকে সাহায্য করবে বা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। যেমন করেছিল ১/১১ এর সময়ে। কিন্তু সে আশায় কী আমরা বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকার রণক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাইতে পারি? এমন আশার কোন মানে হয় না। এরা বাংলাদেশের হত্যাকারী।  ঠিক যেমন ১/১১ পরিণতি হয়েছিল আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  যার ফলে আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল আমরা ভোগ করছি কিন্তু বের হতে পারি নাই।  আমরা আমেরিকার স্বার্থের ওই যুদ্ধের বলি হতে পারি না। যেমন ভাবে বার্মা নিয়েও তাদের স্বার্থের লড়াইয়ের কোনো অংশ হয়ে যেতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও নানা পক্ষ আছে স্বাভাবিক। তাদের সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে আমরা যাই করি আমরা কারো হাতিয়ারে যেন পরিণত না হই। একবার হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।  বিশেষত বাংলাদেশকেই না তাদের বার্মা-বিবাদের রণক্ষেত্রে বানিয়ে ফেলি সেটা আমাদের খেয়াল রাখতেই হবে।

    আর উইঘুর বা মানবাধিকার প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে আমাদের অবস্থানটা হবে সবাইকেই হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স অবস্থানে যেতে হবে। আমরা কি উইঘুরে সত্যি মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই? নাকি এ নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ নিতে চাই, যাতে সেটি আমেরিকার বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়? এ দুয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা চায় তা আমেরিকাকে স্পষ্ট করতে হবে।

    কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটঃ
    এবার দাবি করা হচ্ছে, এবারের জি-৭ মিটিং নাকি কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটের লড়াই। আচ্ছা এই জি-৭ এটি কী এককালে জি-৮ করে নেয়া হয়নি? রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে। পরে যদিও ইউক্রেন-ক্রিমিয়া প্রশ্নে এক বিবাদে ২০০৭ সালে আবার রাশিয়াকে বের করে দেয়া হয়েছিল এবং সেই থেকে রাশিয়ার ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হয়ে আছে আজও। তা হলে সেসব সময় রাশিয়া যখন ভেতরে ছিল, তখন সবাই জি-৮ এর সবাই ডেমোক্র্যাসির লোক হয়ে গেছিল?  তার মানে রাশিয়া ভিতরে থাকলে জি হল ডেমোক্রেসির উদাহরণ আর তারা বের করে দিলে  রাশিয়াই হয় অটোক্রাসি! হায়রে ডেমোক্র্যাসি!

    আবার  প্রনবল আমানবিকভাবে ইয়েমেন তছনছ করতে সৌদিদেরকে   আমেরিকান সমর্থন এটিও কি ডেমোক্র্যাসির তাণ্ডব অথবা ওদিকে দেখেন, দুই দিন পরে পরে নিয়মিত গাজায় ইসরাইলি হামলা এটাই বা কোন ডেমোক্র্যাসি? আমেরিকার এসব “ডেমোক্র্যাসি-বিক্রির” বক্তব্য আসলে  আমাদে্র  জন্য এক চরম বিরক্তিকর জায়গায় পৌঁছেছে।

    তবে চীনের প্রসঙ্গেও অন্তত দুটো কথা বলার আছে। বিশেষ করে বাইডেনের সমালোচনা করছি বলে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইট ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ও পরে ১৯৪৮ সালের সম্মেলনে উঠলেও এর অগ্রগতি খুবই হতাশজনক। অথচ এরই মধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্বে বদলের সময়কাল আসন্ন। এত দিন কমিউনিস্টদের রাজনীতি ও তাদের দেশ যেভাবেই চলুক, এখনকার প্রশ্ন আলাদা।

    অন্তত গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বার্থে  মানবাধিকার  রক্ষা প্রসঙ্গে চীনের ন্যূনতম একটি অবস্থান গ্রহণ পূর্বশর্ত। নইলে প্রতি পদে এই ইস্যুতে সঙ্ঘাতে গ্লোবাল সব কাজ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। চীনকেই অযথা বিব্রত হতে হবে প্রায়ই।  চীন নিশ্চিত থাকতে পারে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে ন্যূনতম একটি অবস্থান ছাড়া চীনের নেতা থাকা খুবই কঠিন হবে। ফেলও করতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যুদ্ধের খরচ জরুরি, হিউম্যান রাইটও“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

    করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

    গৌতম দাস

    ১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2WY

     

      Image MSN.COM,করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন

    করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত শুক্রবার সারা দুনিয়ায় মোট মৃত্যু এক লাখ ছাড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশেও করোনাবিষয়ক খবরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হয়ে উঠেছে “লকডাউন”। শব্দটা একটা গোটা জেলাশহর তো বটেই, আবার একটা পাড়া বুঝাতেও সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    কিন্তু লকডাউন শব্দটার অর্থ একটা নয়, দুটা। বলা সম্ভবত ভাল যে এটা যুগ্ম অর্থের শব্দ। এমনকি এমন এক দ্বৈত বা যুগ্ম অর্থের শব্দ যেটা সাধারণত দেখা যায় যে, এসব শব্দ একটা অর্থে ব্যবহৃত হলে শব্দের অন্য অর্থটা সেখানে আর হাজির থাকে না। কিন্তু লকডাউন শব্দটার দুই-অর্থই সবখানে বজায় থেকে চলে। লকডাউন কথার মূল অর্থ কোন এলাকা যেটা একটা দেশ বা জেলা বা পাড়াও হতে পারে, সেই এলাকাকে ওর সব পড়শি সব এলাকা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা শব্দটা তাই ব্যবহার করছি স্বাস্থ্য সুরক্ষার্থে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে যেমন, ল্যাবে কোন পরীক্ষিত ফলাফলে মানে, প্রমাণিত কোনো ভাইরাস সংক্রমণের কেস হলে, এটা এরপর যাতে সেই পরিবার-সমাজে আর না ছড়িয়ে পড়ে তাতে বাধা দেয়ার জন্য,রোগীকে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে আমরা বলি, লকডাউন করা হয়েছে।

    লকডাউনের দ্বিতীয় অর্থ হল, অর্থনৈতিক অর্থে যেখানে এতে অর্থনীতিটাও পরিণতিতে লকডাউন হয়ে গেছে। কাজেই একটা পাড়াকে লকডাউন করা  মানে ঐ পাড়ার সাথে (ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে) অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময়ও বন্ধ করা হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন  করা হয়ে যায়। যদিও সেক্ষেত্রে কেবল খুবই সীমিত পর্যায়ের একটা ‘একমুখী কিছু ভোগ্যপণ্য সরবরাহ’ সেখানে চালু রাখা হয়। তাই, এভাবে লকডাউন শব্দটা না চাইলেও সবসময় একই সাথে এ দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে যায়।

    অতএব দুনিয়াজুড়ে ভাইরাসের আতঙ্কে বিচ্ছিন্নকরণ করা মানে একই সাথে অর্থনীতিও বিচ্ছিন্নকরণ। তাই অর্থনৈতিক  বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন দুনিয়াজুড়ে। আর অর্থনীতিকেও ‘বিচ্ছিন্ন’ করার অর্থ হল অর্থনীতির ঢলেপড়া, স্তব্ধ বা স্থবির মৃত হয়ে যাওয়া। তাই ভাইরাসের শঙ্কার পাশাপাশি লকডাউনের ফলে দুনিয়াজুড়ে এখনকার আরেক সবচেয়ে বড় শঙ্কা হল করোনার দশায় পড়া বন্ধ অর্থনীতি কি দুনিয়াজুড়ে আবার কখনও জীবিত হবে, চালু হবে? হলে কবে, কিভাবে হবে? নাকি অর্ধেক বা ত্রিশ ভাগের বেশি ওচল থেকে যাবে যা আর কখনোই চালু হবে না? নাকি একে কোনো চাবুক দিয়ে চাবকাতে হবে মানে প্রণোদনা দিয়ে চালু করতে হবে ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন এখন চার দিকে। এই আশঙ্কা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বা কম প্রভাবের নয়।

    একটা উদাহরণ নেয়া যাক। বাংলাদেশে এখন চৈত্র-বৈশাখের গরম চলছে। এরই মধ্যে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্তও পৌঁছেছিল কয়েক দিন। আমরা তা খেয়ালও করেছি হয়তো কেউ। প্রতি বছরের মত এবারও আমাদের টিভিগুলোতে চৈত্র- বৈশাখ মাসের মত করে বিজ্ঞাপনের ধরণও বদলে ছিল। যেমন এবারের গরমের জন্য নতুন এয়ার কন্ডিশনার  ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্সের এড; অথবা ট্যালকম পাউডার কিংবা বৈশাখী উৎসব আসন্ন বলে ক্রেতার মনে সুড়সুড়ি তোলার এড বা পণ্যের লোভ দেখানোও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তাতে ছন্দপতন ঘটে যায়। লকডাউনের দিন বাড়ানোর নির্দেশ আসাতেই  এখন প্রায় সব বন্ধ। উতপাদক-বিক্রেতারা এথেকে বুঝে যায় যে এই লকডাউন অবস্থায় এখন আর এড দেখানোটা মাঠে মারা যাবে। কারণ দোকানপাট মানে বেচাবিক্রিই বন্ধ। ওদিকে টিভিতে গান-নাটক ইত্যাদির বিনোদন ধরনের প্রোগ্রামে নতুন রেকর্ডেড আগে তৈরি অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কারণ নতুন রেকর্ডিং বন্ধ। আর এসব মিলিয়ে টিভির আয় হিসাবে পাওয়া বিজ্ঞাপনে টান পড়তে শুরু করেছে। এই টানাটানি এখন ক্রমশ কর্মী মানে তাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে। এর ফলাফল এই পরিবারগুলো এখন সাবসিস্টেন্স (নুন্যতম “টিকে থাকার” ) মানে, ন্যূনতম খাওয়ার পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কিনবে না। এটা আসলে হাজার হাজার এমন উদাহরণের একটা মাত্র। এভাবে সবাই যদি “টিকে থাকার” [[subsistence] ক্রেতা হয়ে যাই, এর মিলিত ফলাফল হল অর্থনীতি শুকিয়ে ক্ষীণ হয়ে আসা; সবাই মিলে ডুবে মরার মত হবে। এটাই সামগ্রিক অর্থনীতির ঢলে পড়া।
    আসলে এর উল্টোটা ছিল স্বাভাবিক সময়ে; যখন তা চালু থাকে, তখন পণ্যের ভোক্তা যখন বাড়ে তাতে উৎপাদনও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, তাতে নতুন কাজ সৃষ্টিতেও বৃদ্ধি ঘটে আর তাতে আবার নতুন ভোক্তাও বাড়ে। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়, সব মিলিত যার ফলাফল হল, সবার প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলা। আর এখন ঠিক এটারই উলটা – সাবসিষ্টেন্স লেবেলে পৌছানোর দিকে সকলের ধেয়ে চলা।

    এই হল অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর অদ্ভুত ও কঠিন খেলা।  সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে আসতে চাইছে। যদিও অর্থনীতিতে এমন চাকা ঘুরার বা ঘুরানোর নিয়ম হল একটা চাকা ঘুরলেই তা ধীরে ধীরে অসংখ্য চাকাকে ঘুরিয়ে তুলতে পারে। তাহলে এখনকার জন্য আমাদের নির্ধারক প্রশ্ন হল – কোন চাকা সবার আগে ঘুরানোর চেষ্টা করব? অনেকে চাকা ঘুরানোর প্রসঙ্গটা চাহিদার চাকার দিক থেকে শুরু করতে চাইতে পারেন। চাহিদা নতুন চাহিদা সৃষ্টি করে; ফলে তা নতুন উৎপাদন আর নতুন কাজও। যেসব চাহিদা সহজেই প্রথমে পূরণ করে দেয়া সম্ভব ও উপযুক্ত যাতে তা চালু করে দিলে বা বাড়িয়ে তুললে তা অন্যসব চাহিদার চাকাকে ঘুরাতে, চালু করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটা প্রাইম মুভার (প্রথমে যে চাকা ঘুরে অন্যদের ঘুরায়) [Prime mover] বা এমন মূল চাকার সন্ধান পেতে হবে আমাদের সবাইকে।

    একইভাবে গ্লোবাল অর্থনীতির চাকাকেও আবার সচল রাখা বা দেখতে চাওয়া যাদের প্রথম মাথাব্যাথা বা যারা মূল দায়িত্বে বা সংশ্লিষ্ট সেই পরিসরে যেমন আই এমএফ বা জি২০-এর সভায়, সেখানে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য হল বাজারে প্রচুর অর্থঢালা ব্যয় বাড়ানোতে যেতে হবে। মানে কৃচ্ছতার উল্টোটা। যেমন এব্যাপারের সবচেয়ে প্রচলিত চিত্র হল, গ্লোবাল পরিসরে সরকারি বন্ড আগে থেকেই বাজারে থাকলে তাতে লভ্যাংশ বাড়িয়ে বেশি দিয়ে এগুলোকে ফিরে সরকার কিনে নিয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ সাধারণত বাড়ানো হয়ে থাকে।  এভাবে মোট অর্থঢালা ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এক ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে গত জি২০ রাষ্ট্রগুলোর [What is the G20] বিশেষ সভা থেকে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ-ভারতের মত দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার ক্ষেত্রে কোথায় আঘাত করা উচিত, মানে কোথায় প্রাথমিক চাহিদা বাড়াবার উদ্যোগ নিলে অন্য সব চাকাকে সে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে সচল করে ফেলতে পারে – সেই জায়গাটা কী হতে পারে?

    কোথায় প্রণোদনার অর্থ ঢালবেনঃ
    এর আগে গত বছর (২০১৯) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কলকাতায় জন্ম নেয়া অভিজিত-এস্থার নোবেল দম্পতির কথা বলেছিলাম। গত সপ্তাহে ভারতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সমিতি মানে চেম্বার অব কমার্সের কলকাতা রাজ্য শাখা, অনলাইনে কথা বলার এক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। যেখানে অভিজিত-এস্থার ছিলেন মূল বক্তা-অতিথি তাদের (আমেরিকায়) বোস্টনের বাসাতে বসেই।

    ভারত বা বাংলাদেশে আমদের সরকারগুলো ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে শুরু করে দিয়েছে , নানান প্যাকেজ ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।  কেবল ব্যবসায়ীদেরকে দেয়াকে কেন্দ্র করে এসব প্রণোদনার অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করা মানে বুঝা যাচ্ছে এখানে সরকারের  পিছনের-অনুমান হল হল এসব প্যাকেজই চাহিদা বা উদপাদন বাড়ানোর প্রাইম মুভার বলে সে নিশ্চিত হয়েছে।  অর্থাৎ এসবের কোন প্রমাণ সাথে হাজির না করলেও এই সরকারি উদ্যোগগুলো বুঝাতে চাইছে, এই প্রণোদনাই একমাত্র প্রাইম মুভার ফলাফল আনবে।

    কিন্তু এই প্রসঙ্গে অভিজিতের প্রস্তাব এখানে একেবারে রেডিক্যাল এবং আলাদা। তার সাহসী পরামর্শ হল, গরিবের হাতে টাকা পৌঁছানো, যাদের এটা এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার।

    নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ-এর রেডিক্যাল প্রস্তাব হল, ঘরে খাবার নাই এমন গরীবের হাতে টাকা পৌছানো। যাদের  এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার। 

    ফলে তাঁদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোটা আমাদের প্রায়োরিটি হতে হবে। মোদীর গত টার্মে ২০১৫ সালের একটা সফল প্রকল্প ছিল “জনধন প্রকল্প”।  যার সারকথাটা হল, যেখানে গরিব কৃষককে ১০ টাকা দিয়ে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সরকার যাতে সরাসরি এমন গরীব উৎপাদকের হাতে প্রয়োজনে যেকোন অর্থ সরাসরি পৌঁছাতে পারে। অভিজিত এই প্রকল্পের অবকাঠামো সুবিধা নিয়ে সরাসরি গরিব কৃষকের চাহিদা পূরণ করে দিয়ে অর্থনীতির প্রাইম চাকাকে ঘুরাতে চাওয়ার পক্ষপাতী। এটাই তাঁর আসল কথা।

    যদিও তাঁর বক্তব্যের এই মূল অংশ চাপা পড়ে যায় তাঁর বক্তব্যের অন্যকিছু সহ-মন্তব্যের কারণে।  ভারতের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা হল, করোনা আক্রমণে ছেয়ে ওঠার আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি স্থবির হয়েই ছিল। তাই এখন অভিজিতের গরীব-প্রণোদনার প্রস্তাবে এমন  প্রশ্ন উঠা ছিল স্বাভাবিক যে, সরকারের হাতে তো এখন এমন যথেষ্ট বাড়তি অর্থ নেই। সে কথা চিন্তা করে  তাই অভিজিত আগাম বলেছিলেন, “নতুন টাকা ছাপিয়ে হলেও” সরকারের এটা করা উচিত।

    এদিকে এটা এখন গ্লোবালি প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে যে, আমরা ইতোমধ্যেই এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দায় প্রবেশ করে গেছি। বিশেষত আইএমএফের প্রধানের এ নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যের পরে আর কোনো তর্ক থাকে না। সে কথা মনে রেখে অভিজিতের প্রস্তাব, এই অবস্থায় ভারতের ম্যাক্রো বা সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় ডুবে গিয়ে চিন্তা করার চেয়ে কিছু সদর্প সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেছেন, “প্রথাগত, সাবধানি পথে হেঁটে এই পাহাড়প্রমাণ সমস্যার মোকাবেলা করা শক্ত। চাহিদার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়েও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো জরুরি। তাতে মূল্যবৃদ্ধির হার মাথাচাড়া দেবে কি না, সেসব ভাবার সময় এখন নয়। কারণ, এই অবস্থায় তা না করলে, অর্থনীতিকে চড়া মাশুল দিতে হতে পারে বলে সম্ভাবনা থাকছে”। কলকাতার আনন্দবাজারে এভাবেই লেখা হয়েছে। এনিয়ে ইংরাজি টেলিগ্রাফের রিপোর্টিংও এখানে।

    এমনকি তিনি ‘আর্গু’ করছিলেন – তিনি মানছেন স্বভাবতই একটা মুদ্রাস্ফীতি হবে এতে। কিন্তু তিনি বলছেন, এটা পরে আলাদা করে মোকাবেলা করা যাবে এবং তা সম্ভব। তাঁর একথা অবশ্যই তা সত্যি কারণ, একালে প্রত্যেক রাষ্ট্রে একটা কেন্দ্রীয় (রিজার্ভ) নিয়ন্ত্রক ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংকের মত) থাকায় এবং এর হাতে ম্যাক্রো অর্থনীতির পরিচালনার যেমন এর ঘোষিত ফিসক্যাল বা মনিটরি পলিসি ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকার কারণে বাজারে মুদ্রার (টাকার) প্রবাহ বাড়ানো বা কমানোর মেকানিজমে যদি সদিচ্ছা থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ কাজ। যদিও সাবধান, আজকাল টাকা ছাপানো বলতে এর অর্থ বাজারে মদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া বুঝায়। অ্যামেরিকান ফেড (ফেডারল রিজার্ভ) এটাই করে। এভাবে বুঝতে হবে।

    কিন্তু অভিজিতের পরামর্শের উজ্জ্বল দিকটা হল তিনি চাহিদা বাড়ানো বা চাহিদা ধরে রাখার প্রাথমিক চাকা হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিবার কথা তিনি বলেননি। সেদিকে তিনি যানই নাই। বরং তিনি উলটা বলেছেন, গরিব মানুষের পকেটে টাকা দিতে। তিনি আসলে জোর দিয়েছেন এই জনগোষ্ঠির বিপল সংখ্যাটার দিকে। এক বিরাট ভোক্তা বাজার এটা। এটাকে তিনি আসলে পালটা শক্তি হিসাবে দেখে সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে রেডিক্যাল হতে চেয়েছেন। সারা পশ্চিমের কোনো রাষ্ট্রের যে সুবিধাটাই নেই। এ কারণে এটা অপ্রচলিত, কিন্তু বাস্তব।

    বাংলাদেশে চিত্রটা এর কাছাকাছিই। আমরাও আমাদের লকডাউন করেছিলাম; কিন্তু দিন এনে খাওয়া লোকগুলোর ঘরে চাল নেই।  এই পরিকল্পনা এখনও করি নাই।  তাদের ঘরে খাবার কোন ব্যবস্থা না করেই।  তাঁরা চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে আকুতি জানিয়ে রাস্তায় ভিড় করছে, সৈনিকের পায়ে ধরে আকুতি জানাচ্ছে তাকে রাস্তা-ছাড়া না করতে। নারায়নগঞ্জের এমন এক ছবি আমরা দেখেছি; চিত্রটা খুবই মর্মান্তিক। নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এখানে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে? আমরা অন্তত এক মাসের বিনা পয়সায় রেশন বরাদ্দের কথা তুলছি না। কিন্তু সরকার এটা না যেন বাকি সব কিছুই করতে আগ্রহী।

    নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এর ভিতরে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে আমরা গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। গরীবের না খেয়ে হলেও তাদের ঘরে থাকার বিনিময়ে আমরা বাকিরা নিজেরা ভাইরাসমুক্ত থাকতে চাইছি। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে?

    আবার যেটুকু  দশ টাকা কেজি চাল কিনার ব্যবস্থা আছে [মানে যার হাতে অন্তত দশটা টাকা আছে কেবল তাদের জন্য] তাতে প্রতিদিন ‘দশ টাকার চাল’ চুরি করার ঘটনার লুটপাট রিপোর্টেড হচ্ছে। আমরাও কি আমাদের “না-আয়ের” সব গরিবের  হাতে চাল তুলে দিয়ে একটা প্রোগ্রাম চালু করতে পারি না? এমন চার কোটি লোকের চাহিদা মেটানো আমাদের অর্থনীতিতে এক প্রণোদনা হতে পারে। এ জন্য এক-দুই মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির আছে। আবার চাইলে বিশ্বব্যাংকের করোনা ‘রিকভারি ফান্ড’ আছে। সেখান থেকে চাওয়া যেতে পারে। এছাড়া তাদের কোনো অনুদান ফান্ড আছে কি না, তাও চেক করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি সরকার আইএমএফের কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা  দেয়েছে .[..to mitigate the economic impact of the coronavirus crisis] – করোনায় অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে। ওদিকে ভয়ে অব আমেরিকা জানিয়েছে এমন মোট পাঁচ দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ চাওয়ার মোট পরিমাণ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার।

    তবে আমাদের ক্ষেত্রে ঘরে একমাসের বিনা পয়সার রেশন পৌছানো – এটাই অভিজিতের মত করে বলা প্রস্তাব। অভিজিতের মত করে এই প্রস্তাবের সারকথাটা হল, আমাদের সমাজের যেসব চাহিদা প্রবল তাকে কাজে লাগানো, হারিয়ে যেতে না দেয়া। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে বা উদ্ধার পেতে চাইলে কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে আমরা মেরে ফেলতে বা মরে যেতে দিতে পারি না। কারণ বিপুল জনসংখ্যার দেশে এটাই আমাদের অ্যাসেট।

    তবে অভিজিতের প্রস্তাবে আইএমএফ খুশি হয়নি, যদিও সেটা তাদের আলাদা বিবেচ্য বিষয়ের কারণে। আর কলকাতায় ওদিকে সেটা ছিল ব্যবসায়ী উৎপাদকদের চেম্বার সমিতির আয়োজিত কর্মসূচি, ফলে তারাও তেমন খুশি হয়েছে অথবা গা-করেছে মনে হয়নি। তবে আইএমএফের পক্ষে অভিজিতকে সমর্থন না দেয়ার কারণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তাদের অন্য সমস্যা আছে সেকারণে।

    চলতি পরিস্থিতিতে আমাদের গ্লোবাল মহামন্দায় প্রবেশ যেটা এখন ঘটে গিয়েছে, অভিজিত-এস্থারসহ অনেকেই মনে করেন সেটা ব্যাপকতার দিক থেকে ১৯৩০ সালের মহামন্দার সাথে  তুলনীয়। সেই সময় ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র আয়ের চেয়ে যুদ্ধে ব্যয় বেশি করাতে তা মিটানোর অক্ষমতায় যার যার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। মানে, তারা বিস্তর টাকা ছাপিয়েছিল তখন। আর সবাই মিলে একসাথে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটানোয় – এই মূল কারণেই গ্লোবাল মহামন্দা হাজির হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আর এই মূল্যায়নের ওপরে দাঁড়িয়েই বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল। তাই ‘সম্মিলিত মুদ্রা অবমূল্যায়ন’ ঘটানো আইএমএফের চোখে লিখিত জন্মনীতি হিসাবে হারাম ধরনের কাজ মনে করা হয় সেই থেকে।

    ফলে আইএমএফ  অভিজিতকে বলতে চাইবে- অবমূল্যায়ন নয়, সে বরং ঋণ দিতে চায়। তবে সেটা যা হোক, অভিজিতের কথা আমরা আক্ষরিকভাবে না নিয়ে তার মূলকথা গরিব মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছানো; এর বাস্তবায়ন করতে পারি। এটাকে একটা সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ মনে করতে পারি আমরা। বাংলাদেশের লকডাউনে অভুক্ত গরিবদের জন্য এটা কি আমরা করতে পারি না? দায়িত্ববানদের ভেবে দেখা উচিত।

    ওদিকে চরম ক্রাইসিসে টাকা ছাপানো জায়েজ আছে – উদাহরণও আছে – একথা বলে লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইম রীতিমত এক নিজ সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে গত ০৬ এপ্রিল ২০২০। যা বলা যায় পরোক্ষে নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। লিখেছে “Printing money is valid response to coronavirus crisis”।

    “Printing money is valid response to coronavirus crisis” – London Financial Times

    তাদের দাবি ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডও জন্ম থেকেই এমন অর্থ ছাপিয়ে নিয়ে সরকারকে সাহায্য করে আসছেই। কানাডার এক স্থানীয় পত্রিকা দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোও নাকি তাই করেছে।

    তবে আমাদের জন্য সারকথা, বাংলাদেশেও টাকা ছাপানো নয়, চাল কিনতে  হাতে টাকা নাইদের ঘরে একমাসের চাল পৌছে দেওয়া প্রকল্প আমরা নিতেই পারি।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে  “করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]