Category: মার্শাল তেজো Tōjō Hideki

  • মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    গৌতম দাস

    ২৬  জুন ২০২১, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3BI

     

    –

    (গত সংখ্যার পরে শেষ পর্ব, বাইডেন জি৭ ইস্যুতে।)

    কলোনিদখলদারি (মোটামুটি ১৫০০-১৯৪৫) ব্যবসার যুগেই শেষের দিকে ১৮৮০ এর দশকে  আমেরিকা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে বড় অর্থনীতি হিসেবে কলোনি দখলদারদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল। তবে এক ঝাপটায় আমেরিকা সাথে  নেতা হয়নি। আর কারও নেতা হওয়া বা দুনিয়াতে অর্থনীতিতে কেউ নেতা হওয়া এসব বিষয়গুলো তখনও শুরুই হয় নাই। মূল কারণ গ্লোবাল পণ্যবিনিময় বাণিজ্য দূরে থাক দুটা কলোনি মালিক দেশের মধ্যে বিস্তর পণ্য বিনিময় বা অর্থনৈতিক নীর্ভরশীলতা বিষয়টাই তখনও সুনিয়াতে হাজির হয় নাই।  তাই সব মিলিয়ে  আমেরিকাকে  আরো প্রায় ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটাই  দুই দুটা বিশ্বযুদ্ধের কাল।  মূল কারণ দুনিয়া তখনও মূল একটিভিটি বলতে  কলোনি দখলের রামরাজত্বে মজেছিল, যার অবসান ঘটানো আগে  করে নেওয়ার দরকার ছিল আমেরিকার জন্য।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তিগুলা যারা দুনিয়ার ওপর একচ্ছত্র খবরদারি চালিয়ে বেড়াত তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই (২০১৪) সবাই এক এক করে দেউলিয়া হয়ে গেছিল, মূলত যুদ্ধের খরচসামলাতে ফেল করাতে। আর এরই সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল রথশিল্ড ব্যাংক [Rothschild Bank]  যেটা মূলত এবং একমাত্র সেকালের মুদ্রা কনভার্ট বা বিনিময় করে দিবার ব্যবসায়ে ছিল; এর বন্ধ হয়ে যাওয়া।  কারণ এই ব্যাংকটা কার্যকর ছিল সে সুত্রের ভিত্তিতে তা হল, ব্যাংকের ভল্টে সমতুল্য মানের সোনা রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা তখন ওসব দেশে চালু আছে।  এটা চালু থাকলে ঐ ব্যাংকের কাছে কোন দেশের পণ্য আমদানি / রফতানির হিসাব রাখা মানে ঐদেশে সোনা এসে ঢুকেছে বা বেরিয়ে গেছে কতটা তা জানায় বিশ্বাসযোগ্য উপায়।  কিন্তু যুদ্ধের সময়  সোনাজমা না রেখে মুদ্রা ছাপানোর সস্তা পথে যুদ্ধের খরচ সামলাতে যাওয়াতে এইবার মুদ্রার মানের (অবমূল্যায়ন) ঢলে পড়ে যাওয়ায় রথশিল্ডের ব্যাবসা বন্ধ রাখতে হয়।

    প্রথম আমেরিকান ঋণগ্রহিতা ইউরোপঃ
    ফলে এইবার কলোনিমালিক ইউরোপের দেশগুলোর  কাছে ঋণ পাবার একমাত্র বিকল্প মনে হয় আমেরিকাকে। তবে মূলত এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালের পর থেকে। আর আমেরিকান থেকে বলতে আমেরিকান প্রাইভেট ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রগুলো যেমন বৃটেন সরকার এবং ব্যবসায়ীরাও – এরা  ঋণ পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।  যদিও এনিয়ে আবার আমেরিকায় আভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভক্তি শুরু হয়েছিল যে আদৌও ইউরোপকে  ঋণ দিতে যাওয়া ঠিক কিনা। কারণ এতে ক্রমশ ইউরোপের যুদ্ধে খোদ আমেরিকাই সামিল হয়ে পড়ে যেতে পারে। এটাই সেকালের আমেরিকার  বিচ্ছিন্নপন্থি বনাম আন্তুর্জাতিক-পন্থি বিতর্ক  [America’s isolationist Vs internationalist debate] বলে পরিচিত। এই বিতর্ক ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যারা এনিয়ে বিস্তারে বুঝতে চান তারা রুজভেল্টের Cash & Carry Law 1939 এবং এবং সাথে এই আইনের আগের সব ভার্সান। আর সবমিলিয়ে – Neutrality Act of 1939, Lend-Lease সহ বহুকিছুর ভিতরে ঢুকতে পারেন বা ঢুকতে হবে।

    ওদিকে ১৯৩২ সালের পর থেকে হিটলারের উত্থান শুরু হয়েছিল। এতে ক্রমশ নেতা হিটলার সাথে মুসোলিনির ইতালি আর মার্শাল তেজো জাপানসহ অন্যদের মিলে গ্রুপ বড় হতে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপের ঋণ বা বাজেট সংকটের কথা জানা যায় না।  ফলে একদিকে হিটলার ও তার সঙ্গিদের গ্রুপ  আর অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিরা এভাবে এক পোলারাইজেশন ঘটতে পেরেছিল।  আর মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ বইবার ক্ষেত্রে আমেরিকান সক্ষম অর্থনীতি ও বিপুল উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে্র সক্ষমতার বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আমেরিকার নেতৃত্বে আসে আর এই অংশই যার সেকালের ডাকনাম এলায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তিই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।
    কিন্তু  এই যুদ্ধের আসল ফ্যাক্টর যে যুদ্ধে  আমেরিকান সক্ষমতার পোলারাইজেশন এবং তা এমন কেন হয়েছিল ও কিসের ভিত্তিতে; এসব কিছু আমাদেরকে  মানে বৃটিশ-ভারতের আমাদেরকে পরিষ্কার জানতে দেয়া হয়নি। তাই দুটো শক্তি বৃটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – এরা  ঘটনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিল আমরা খাপছাড়াভাবে তাই জানতাম।
    এরই একটা হল, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা  যেন এদের মত “ভাল মানুষদের” নেতৃত্বে মানে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নেতৃত্বে তাঁরা বিপরীতে খারাপ মানুষ হিটলার আর তার বন্ধুদেরকে  চার্চিল  পরাজিত করেছিল। এই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। এছাড়া ওদিকে আরেক ব্যাখ্যা চালু ছিল কলোনি-ভারতের কমিউনিস্টদেরও। এটিও আরেক ভালভালাইয়া; মানে চার দিকে সব খালি ভাল আর ভাল। ভাল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের হাতে জর্মানির হিটলারের পরাজয় ঘটেছিল। তিনি ভাল লড়েছিলেন বলেই হিটলার পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই সব ক্রেডিট কমিউনিস্টদের, এটাই নাকি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল গল্প।  যেমন এই গল্পের প্রভাব এতই মারাত্মক যে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কমিউনিস্ট – এখন এনজিও নেতা  মনে করে – পড়তি গ্লোবাল নেতা আমেরিকা নয়, এটা ইউকের বৃটিশেরা। এককথায় বৃটিশেরা আমেরিকার চেয়ে অর্থনীতির শক্তিতে সেরা। যাক, সেসব কথা। তবু  আমরা খুবই সরি, স্টালিন বা চার্চিল  বা তাদের সমর্থকদের একটারও বয়ানের ভিত্তি নাই। কারণ এদের বয়ানে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস – আমাদেরকে  যুদ্ধের পোলারাইজেশনে মুখ্য ফ্যাক্টর কী ছিল তা বলতে পারে না। কেন?

    প্রধান ধারা হিসাবে আমরা  চার্চিলকে দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বুঝতে গেছিলাম আর সেটা এজন্য যে তারাই তো আমাদের কলোনি মালিক।  আর তাই একমাত্র তাদের মাধ্যমেই তো সব তথ্য ও উতস। আমাদের ইউরোপকে চিনি-মানি আর বুঝাবুঝি ঘটেছিল। তারাই আমাদের প্রভু ছিল। ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংরেজিই আমাদের এলিটরা বুঝত আর তারা কেবল ব্রিটিশ মিডিয়া পড়ে সেখান থেকে এগুলো অনুবাদ করত। এভাবে গ্লোবাল কাহিনীর যতটুকু বাংলার নাগালে আসত তা দিয়েই কেবল আমরা বিশ্বযুদ্ধ যতটুকু যা বুঝতাম। তাই আমেরিকা বলে কোনো দেশ আছে কি না বা কেমন তারা সেটাই তো তখনও আমরা ঠিকমত বুঝতাম না; অর্থাৎ চার্চিলের চোখ দিয়েই নিরুপায় আমরা  দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ বুঝেছিলাম। তাই আমাদের চোখ এই বীর চার্চিল যে আমেরিকার কাছে দাসখত দিয়েছে সেটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। স্টালিনের সোভিয়েত দেশকেও যে অ্যামেরিকা যুদ্ধের খরচ ধার দিতে পারে এসব আমাদের কমিউনিস্ট মনে চিন্তার অতীত।  স্টালিনসহ বিপ্লবীদের চোখে কলোনি বা উপনিবেশ তো উঠেই নাই। তাই তো সেটা এখনও কমিউনিস্টদের চোখে “নয়া-উপনিবেশবাদ”।  যার মানে কী একমাত্র স্টালিনই জানে…।  যেখানে একালে আমাদের হাসিনাই বাইডেনকে চোখ উলটে তাকাতে পারে এটা সম্ভব (যদিও  হাসিনার ক্ষমতার স্বৈরাচারি বলতে পারেন তবু সে স্বাধীন আর এরপরেও এখনও তাঁর বড় বড় সীমাবদ্ধতা আছে )  – সেখানে দুনিয়াটা এখনও নয়া উপনিবেশের দুনিয়ায় আমরা আছে এই কথার অর্থ কী?

    অথচ হার্ডকোর সত্যটা এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের মত কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো আর ইউরোপের কারো না কারো কলোনি  হয়ে শাসনে থাকবে কি না- এটাই ফয়সালা করে দিয়েছিল। কঠিন সত্যটা ছিল, চার্চিল আমাদের ত্রাতা বা মুক্তিদাতা ছিলেন না। কলোনি থেকে মুক্তি –  আমাদের আসল মুক্তিদাতা ছিল আমেরিকা, তাতে আমরা যতই তখন বা আজও আমেরিকাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করি না কেন। এটাই ফ্যাক্টস।  যদিও তা আমেরিকার নিজ স্বার্থেই ঘটতে পেরেছিল। কীভাবে?

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দুনিয়ার সব কলোনি দখলদার চার্চিলসহ সব কুতুবকে দাসখত দিতে বাধ্য করেছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ে শেষ হলে পরে তাদের সবাইকে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা উঠিয়ে ফেলে দিতেই হবে। কেন? যাতে দুনিয়া কলোনিমুক্ত প্রায় শ দুয়েক স্বাধীন রাষ্ট্রের এক দুনিয়া হয়।  আসলে মূল কথাটা হল, আমাদের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চার্চিলও আসলে আমাদের জন্য ভিলেন ও এনিমি ছিল। কিন্তু হিটলারের মারের মুখে নিজের যুদ্ধের খরচ চালানোর মুরোদ ছিল না বলে সারা ইউরোপ আমেরিকান ঐ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অতএব যুদ্ধ শেষে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন-আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে অসংখ্য দেশের কলোনিমুক্তি ঘটে গিয়েছিল। সর্বশেষটা দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সালে। আর বলাই বাহুল্য ভারত বা পাকিস্তান কলোনিমুক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে।

    অখণ্ড ভারতের দিক থেকে দেখলে বিশ্বযুদ্ধের এটাই ছিল আসল বিশ্ব-ইতিহাস, আমাদের কলোনিমুক্তির ইতিহাস। গ্লোবাল ইতিহাসের দিক থেকে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ও একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধশেষে প্রথম “গ্লোবাল অর্থনীতি” বলে কোন কিছুর নেতা হয়েছিল আমেরিকা। আর এই ইতিহাস জানার একমাত্র পথ হল সরাসরি  আমেরিকান হিস্ট্রি পড়া। তবে এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা নিজেই সেসব ডকুমেন্ট অনলাইনে দিয়ে রেখেছে। তাই যে কেউ চাইলে আর পড়তে জানলে নিজেই জেনে নিতে পারে।

    এখন এই আমেরিকান নেতৃত্ব মানে কী? এর মানে আর আবছা রেখে লাভ নেই, যা স্টালিন বা চার্চিল আমাদেরকে সেকালে জানতে দেয়নি (কারণ তা নিজেদের অযোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে) তা হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে খরচের বড় অংশটি একাই [মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার আর একে ৫১গুণ করলে আজকের ডলার হবে] বহন করেছিল আমেরিকা। মানে ইউরোপ এমনি এমনি আমেরিকান নেতাগিরি মেনে নেয়নি।

    এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আরেক যে ব্যাখ্যা- আমাদের দেশের রাজনীতি ভাল  বুঝে এমন ভাব ধরে থাকা কমিউনিস্টদের মুখ থেকে যা জানি, সেটিও আসলে সোভিয়েত ভাষ্য। আর সেখানেও যুদ্ধের বড় খরচদাতা ঐ এক ও অদ্বিতীয় আমেরিকা হলেও কমিউনিস্টদের ইতিহাস ভাষ্যে সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়ে এসেছে।

    তবে অন্যদিকের ফ্যাক্টস হল, আমেরিকাও দাসখত বা ‘সহযোগিতা’ চুক্তিতে স্তালিন বা চার্চিলকে অপমানজনকভাবে শামিল হতে বাধ্য করেননি। এসব চুক্তিতে অপরপক্ষ হিসেবে প্রথম ও একক স্বাক্ষরদাতা ছিলেন চার্চিল আর সেটার নাম আটলান্টিক চুক্তি, ১৪ আগস্ট ১৯৪১। আর পরে সেই ড্রাফটটাই কিন্তু এবার চার রাষ্ট্র  – ব্রিটেন, আমেরিকা চীন ও সোভিয়েত মিলে আবার স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। তবে এবার ওই চুক্তির নাম দেয়া হয়েছিল “জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণায়” স্বাক্ষর এই নামের আড়ালে। সাথে একই দিনে আরো ২৬ দেশ ঐ একই ডকুমেন্টে প্রতি-স্বাক্ষর করেছিল। এটাই আমেরিকার নেতৃত্বে হিটলারবিরোধী জোটের মুলভিত্তি দলিল। কিন্তু তবু কোথাও “কলোনি শাসন ছেড়ে দিতে চলে যেতে হবে” – এই ভাষায় বা শব্দ কোথাও নেই। তবে  কথাটা ঘুরিয়ে বলা হয়েছে – “যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবে যে ওই ভূখণ্ডের শাসন কিভাবে চলবে; অর্থাৎ কলোনি করা নিষিদ্ধ হলেও তা এই ভাষায় বলা হয়ে আছে।

    এ’প্রসঙ্গকথা এবার গুছিয়ে সম্পর্ক-দেখিয়ে দিয়ে বলে শেষ করা যাক। তা হলে আমেরিকা কিভাবে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল সেটা আমাদের মতো দেশের কোন এলিট বা কুতুবরা কেউ সেকালে বা একালে জানতেন বা টের পেয়েছিল তা মনে হয় না। এর কাহিনী বা ঘটনার দিক এটাই। আর এটাই এখন আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক।

    কারণ গত ১১-১৬ জুন ২০২১ সাল জুড়ে বাইডেন জি-৭ আর ন্যাটোর মিটিংয়ে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি বা হুমকি তুলেছিলেন। অথচ আসল কথাটা এই যুদ্ধের খরচ কে দেবে সেটা নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কিছুই  বলেননি। আর আমরা উপরে দেখলাম যুদ্ধের খরচই যুদ্ধের হুমকি বা যুদ্ধ যেই করুক এর মুখ্য ও নির্ধারক  বিষয়।  আর এই খরচ  সেকালে ঐ পরিস্থিতিতে একমাত্র বহন করতে সক্ষম ছিল রুজভেল্টের আমেরিকা। তাই ইউরোপ হিটলারের হাতে দখল ও বিলীন হওয়ার বদলে আমেরিকান নেতৃত্বকেই মেনে ওর অধীনে পরিচালিত হওয়াটাকেই বেটার বিকল্প বোধ করেছিল সকলে। তাহলে একালে বাইডেনের স্বপ্ন্বের যুদ্ধ ও এই যুদ্ধের খরচ বইবার মত দাতাটা কে হবে?  এই ভাসুর বা স্বপ্নে দেখা দাতার নাম জানান না দিলে বাইডেনের হুঙ্কারের অর্থ কী?

    কেন আমেরিকার জন্য বিশ্বযুদ্ধ-২ এর নেতা হওয়া এত জরুরি ছিলঃ
    তবে কথা আরেকুটু আছে।  আমেরিকা এমনি ওমনি যুদ্ধে সবার নেতা হতে নিশ্চয় চায় নাই। কিন্তু সেটা কী?  তা হলে? আমেরিকার স্বার্থ শুধু গ্লোবাল নেতা হওয়া ছিল তা নয়, মূলত তার হাতে জমা থাকা বিপুল সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ তখন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল, অথচ ঋণ-খাতক বা গ্রহিতা দেশ আমেরিকা খুজে পাচ্ছিল না।  কারণ দুনিয়া তখন  কলোনিদখল হয়ে থাকা দুনিয়া। আর ১৯০৫ সালের এই হিসাবে দুনিয়ার কলোনি হতে  বাকি আছে এমন ভুমি বা কোন দেশ আর  খালি ছিল না। ফলে এটা ছিল আমেরিকান   স্বার্থ যে সে দুনিয়াকে এক কলোনি দখল বা শাসন মুক্ত এক স্বাধীন দেশের দুনিয়া হিসাবে যেন দেখতে পায়। যাতে স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশগুলো –  এরা সবাই তখন আমেরিকার ঋণের সরাসরি অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে খাতক হতে পারে। যাতে আমেরিকা এসব স্বাধীনমুক্ত দেশকে আমেরিকান ঋণের খাতক হিসেবে পেয়ে যায়।
    কাজেই একালে বাইডেনের ভাবি যুদ্ধের খরচের সংস্থান না করে চীনকে যুদ্ধের হুমকি দেখানো এগুলোকে কী বলা যায়? এর মানে কি আমেরিকা-চীনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ নামে যে বিরোধ প্রকাশ্যে বাজারে হাজির আছে, তা বাইডেন এখন যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছেন? হ্যাঁ তাই। সে জন্যই এটাকে ছেলেমানুষি চিন্তা বলছি। কারণ এক তো খরচের ব্যাপার আছে; সেটি ছাড়াও চীনের সাথে আমেরিকান বিরোধ মূলত হাতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকা থেকে উদ্ভূত বিরোধ  – এমন বিরোধকে বাইডেন যুদ্ধে গিয়ে সেটাকে নিজের পক্ষে জিতে আনবেন কী করে?

    যেমন ধরা যাক, যুদ্ধ একটা হল আর আমেরিকা তাতে জিতেও গেল। কিন্তু তার পরে এতে কি আমেরিকার হাতে যথেষ্ট ‘সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ’ না থাকার সঙ্কট, যেটা এখনই প্রকট হয়ে আছেও তা আমেরিকার কেটে যাবে?  আর এই বিপুল সম্পদটা আসবে কোথা থেকে? কিভাবে?

    আসলে তখনো দুনিয়ায় সম্ভাব্য একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদের উৎস দেশ হয়ে থাকবে এই চীনই। আর সেই চীনের কাছে হাত পেতে আমেরিকা তার জনগণকে খাওয়াবে, দুনিয়া রুল করবে – এমন কল্পনা এবসার্ড বলারও সুযোগ দেখি না। এ জন্য বলেছি, হাতে বিপুল সঞ্চিত সম্পদ থাকা না থাকার সঙ্কট এটাই মূল সংকট – অথচ এই সংকট  কী যুদ্ধে জিতেও কেটে যাওয়ার বিষয়???

    তা হলে অথর্ব ন্যাটোকে সামনে আনা কেন?
    বাইডেন ন্যাটোকে সামনে রেখে হুমকিটা দিয়েছেন। ন্যাটোকে দিয়ে তিনি আর্টিকেল পাঁচ চালু করার সামরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার হাসির এক কথা হল, চীন-রাশিয়া নাকি পারমাণবিক অস্ত্রে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমান হয়ে যাচ্ছে। আর  ন্যাটো সেক্রেটারি এটাকে আমেরিকার জন্য হুমকি দেখছেন। আচ্ছা খোদ পারমাণবিক অস্ত্রই যেখানে সবার জন্যই হুমকি, সে্টা  আপনার বন্ধু বা শত্রু   যার হাতেই থাকুক; সেখানে ওরা আমার সমান হয়ে যাচ্ছে কেন  – এটা কী নাকিকান্নাময় যুদ্ধের অজুহাত তোলা নয়!

    কিন্তু  ন্যাটো নিয়ে ঘরের কথাটা হল – সেই ওবামা আমল থেকে, চাক হেগেল [Chuck Hagel] যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (২০১৩-১৫), তখন থেকেই ন্যাটো যে একটি খরচের ডিব্বা, আর সেই খরচের বেশির ভাগ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) কেন আমেরিকা একা বইবে- এসব প্রশ্ন আর অজুহাত তুলে কি চাক হেগেল সেকালেই ইউরোপকে খরচের দায় নেয়না ওথচ বড় কথা বলে – এই বলে অপমান করেনি?   ট্রাম্পও তো একই প্রশ্ন তুলেছিলেন।  ইউরোপকে খরচের দায় নিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একালে ন্যাটো একটি অপ্রয়োজনীয় সংগঠন। আফগানিস্তানের পর ন্যাটোর আর দুনিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ কমে আসছে তাই – ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন সব ঘোষণা দেয়নি কি? এমনকি তিনি ইউরোপে (জার্মানিতে) ও জাপানে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এখনো আমেরিকান সৈন্যের সামরিক ব্যারাক মেনটেন করে যাওয়ার খরচ এবার থেকে ইউরোপকে দিতে হবে বলে ট্রাম্প দাবি করেননি?
    তাহলে সেসব প্রশ্নের সদুত্তর কী? উঠে থাকা এসব প্রশ্ন যা ন্যাটোর ভবিষ্যতই এলোমেলো করে রেখেছে সেসব পাশ কাটিয়ে বাইডেন কতদুর কোথায় যেতে পারবেন?  বাইডেনের কাছে এসব খরচের ব্যয়ভার প্রসঙ্গে সমাধান কী আছে? অর্থাৎ খরচ বইবার প্রশ্নে ন্যাটো এখন একটি পর্যদুস্ত সংগঠন হয়ে আছে! অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা না বলে, এক দিনের ন্যাটো বৈঠকে গিয়ে চীনকে হুমকি দিয়ে এলেন বাইডেন! এটি কি তামাশা না ছেলেখেলা?

    Bantonglaoatang

    অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের বিতর্কও আছে গভীরেঃ
    তবে মনে হচ্ছে, ইউরোপের সবাই এখনো বোকা ধামাধরা নেতাদের দেশ হয়ে যায়নি। তাই খোদ সিএনএন খবর দিচ্ছে কানাডা বাদে ইতোমধ্যেই জি-৭ এর বাকি নেতাদের মধ্যে বাইডেনের চীনের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। গরম তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি প্রকাশ করেছে ইতালি। এ নিয়ে চীনা ব্যাখ্যা হল, ইতালিই ইইউর প্রথম দেশ যে চীনের বেল্ট-রোডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে।  উপরের কার্টুনটা আমি নিয়েছি চীনা গ্লোবাল টাইমস ম্যাগাজিনের এক আর্টিকেল থেকে। ঐ আর্টিকেলে কার্টুনের চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইটালিকে কুমড়া নাম দেয়া হয়েছে যার আবার “শার্প টাং” মানে কাউকে কিছু বলতে যার মুখে কিছু আটকায় না এমন নির্দয়ভাবে ক্রিটিক্যাল। সেই ইটালি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে,   The grey wolf image shows Italy, the first European country that joined China’s Belt and Road Initiative (BRI), is reluctant to collaborate with the US in suppressing China, commented “sharp-tongued pumpkin.” 

    তবে সামগ্রিকভাবে বললে, চীনের বিরুদ্ধে কামান দাগানো যৌথ বিবৃতি ধরনের কাগজে চীনকে কী ভাষায় কতটা অভিযুক্ত করছে মূলত এই প্রশ্নেই ভিন্নতাগুলো দেখা দিয়েছে। স্বভাবতই সবচেয়ে শক্ত ভাষায় বাইডেন ওই সব ড্রাফট দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু কেউই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় ততটুকুতেই থাকতে চায়। যেমন জাপান টাইমস, যৌথ বিবৃতি ড্রাফট করতে গিয়ে বড় মতভেদের কথা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনকে কতটা সমালোচনা করা হবে সে বিষয়ে [G7 …….to counter Chinese influence in the world may prove a daunting challenge… ]।

    এ দিকে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, [G-7 Split on Biden’s Anti-China Push]। ইতালি জার্মানি আর ইইউ প্রতিনিধিকে দেখা গেছে, চীনের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে এরা অনিচ্ছুক; বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থাকতে আগ্রহী। আবার এসব প্রশ্নে কানাডা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর আমেরিকা নিজে এভাবে এরা চারজন আবার চার মাত্রায় চীনের বিরোধিতা করতে চায়। আর জাপান যে কোন দিকে অবস্থান নেবে, তা সে সবচেয়ে অনিশ্চিত।

    “There were some interesting discussions and a little bit of a differentiation of opinion,” said a senior Biden administration official……Italy, Germany, and the European Union appear reluctant to take as tough a stance on China, and instead would rather focus on the “cooperative nature of the relationship.” …… The U.S., Britain, Canada, and France, on the other hand, want to be more “action-oriented” to different degrees. Japan appears to be the most ambivalent of the group.

    সিএনএন লিখছে, এক আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট তাদেরকে জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানি খুবই অস্বস্তিতে ছিল বিবৃতির ভাষা নিয়ে [….US officials said Italy and Germany were uneasy with potential communique language that China might view as provocative. ]। যেন চীন এটিকে কোনোভাবেই উসকানিমূলক হিসেবে না দেখে। চ্যান্সেলর মার্কেল তো বলেই বসেছিলেন যে, চীন আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বটে কিন্তু আবার অনেক ইস্যুতে আমাদের পার্টনারও তো বটে [Angela Merkel said that “China is our rival in many questions but also our partner in many aspects.” ]। ফরাসি নেতা ম্যাক্রোঁও যোগ করেছেন, জি-৭ কে তো ওই চীনের সাথেই আবার জলবায়ু, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অন্য অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তিনি পরিষ্কার করে রাখার পক্ষে যে, তাদের জি-৭ কখনো চীনবিরোধী কোনো ক্লাব হতে পারে না. “I will be very clear: The G7 is not a club hostile to China,” the French President said।

    সারকথায়, ভেতরে বড় মাত্রায় বাইডেন বিরোধিতা বজায় আছে। তবে সবচেয়ে মজার অবস্থানে ভারত। ভারতের মিডিয়াই ভেতরের বিরোধের খবরগুলো বড় করে সামনে এনেছে। যেমন হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, জি৭ লিডারেরা কত শক্ত করে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এনিয়েই তাদের মধ্যে বড় তর্কবিতর্কটা শুরু হয়েছিল। [The leaders of Group of Seven (G7) debated how strongly they should respond to China’s growing clout around the world and alleged forced labour practices in the Xinjiang region.] আর উইঘুর ইস্যুতে আরো মারাত্মক কথা বলেছে ঐ একই রিপোর্টে, ……there was no immediate consensus on how forcefully they should call out Beijing over the alleged human rights abuses। অর্থাৎ কত জোর দিয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগ তুলবে তা নিয়ে এখনি নেতসাদের মধ্যে ঐক্যমত নাই। কিন্তু কেন এমন লিখল, কারণ, ভারতই চায় না এটা। কারণ সেক্ষেত্রে এখানে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ না চলে আসে। এছাড়া চীনের নেজেরই লিক হয়ে যাওয়া রিপোর্ট রেফার করে হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে ঐ চীনা রিপোর্টে “struggle against terrorism, infiltration and separatism.” চীন লিখেছে তারা (উইঘুরের) সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একথাগুলো ভারতের মনে দাগ ফেলেছে।

    এছাড়া আরেক নিরপেক্ষ মিডিয়া ওয়াইর [WIRE]  লিখেছে,  ন্যাটো মিটিংয়ে একসময় এমন উত্তপ্ত ভাষায় বাইডেনের সাথে ইউরোপীয়দের বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে কমিউনিকেশন সুইচ অব করে রাখতে হয়েছিল, যাতে বাইরে মিডিয়ার কাছে তা না পৌঁছায়। আবার আরেক ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছে, মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিবৃতিতে কিছু অবস্থান প্রসঙ্গে খোদ ভারতেরই অস্বস্তি দেখা দিতেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির প্রশ্ন ছিল, উইঘুর বা ফোর্সড লেবার ইস্যুতে কতটা চাপ দিয়ে তা বলা হবে, এ নিয়ে বিতর্ক।

     বাংলাদেশের প্রসঙ্গঃ
    এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশেরও বলার আছে। প্রথমত, বাইডেন আমাদেরকে যে পটেনশিয়াল বিপদের মধ্যে হাজির করে ফেলেছেন তা হল, সত্যিই যদি তিনি চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেন বা টেনে নিয়ে যান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি হয়ে উঠতে পারে তাদের দুই দেশের যুদ্ধের রণভুমি। এছাড়া অনেকের মনে আশা যে বাংলাদেশে কেমন ধরনের সরকার থাকবে বা কে থাকবে- এ প্রশ্নে বাইডেন তাদেরকে সাহায্য করবে বা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। যেমন করেছিল ১/১১ এর সময়ে। কিন্তু সে আশায় কী আমরা বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকার রণক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাইতে পারি? এমন আশার কোন মানে হয় না। এরা বাংলাদেশের হত্যাকারী।  ঠিক যেমন ১/১১ পরিণতি হয়েছিল আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  যার ফলে আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল আমরা ভোগ করছি কিন্তু বের হতে পারি নাই।  আমরা আমেরিকার স্বার্থের ওই যুদ্ধের বলি হতে পারি না। যেমন ভাবে বার্মা নিয়েও তাদের স্বার্থের লড়াইয়ের কোনো অংশ হয়ে যেতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও নানা পক্ষ আছে স্বাভাবিক। তাদের সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে আমরা যাই করি আমরা কারো হাতিয়ারে যেন পরিণত না হই। একবার হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।  বিশেষত বাংলাদেশকেই না তাদের বার্মা-বিবাদের রণক্ষেত্রে বানিয়ে ফেলি সেটা আমাদের খেয়াল রাখতেই হবে।

    আর উইঘুর বা মানবাধিকার প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে আমাদের অবস্থানটা হবে সবাইকেই হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স অবস্থানে যেতে হবে। আমরা কি উইঘুরে সত্যি মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই? নাকি এ নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ নিতে চাই, যাতে সেটি আমেরিকার বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়? এ দুয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা চায় তা আমেরিকাকে স্পষ্ট করতে হবে।

    কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটঃ
    এবার দাবি করা হচ্ছে, এবারের জি-৭ মিটিং নাকি কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটের লড়াই। আচ্ছা এই জি-৭ এটি কী এককালে জি-৮ করে নেয়া হয়নি? রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে। পরে যদিও ইউক্রেন-ক্রিমিয়া প্রশ্নে এক বিবাদে ২০০৭ সালে আবার রাশিয়াকে বের করে দেয়া হয়েছিল এবং সেই থেকে রাশিয়ার ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হয়ে আছে আজও। তা হলে সেসব সময় রাশিয়া যখন ভেতরে ছিল, তখন সবাই জি-৮ এর সবাই ডেমোক্র্যাসির লোক হয়ে গেছিল?  তার মানে রাশিয়া ভিতরে থাকলে জি হল ডেমোক্রেসির উদাহরণ আর তারা বের করে দিলে  রাশিয়াই হয় অটোক্রাসি! হায়রে ডেমোক্র্যাসি!

    আবার  প্রনবল আমানবিকভাবে ইয়েমেন তছনছ করতে সৌদিদেরকে   আমেরিকান সমর্থন এটিও কি ডেমোক্র্যাসির তাণ্ডব অথবা ওদিকে দেখেন, দুই দিন পরে পরে নিয়মিত গাজায় ইসরাইলি হামলা এটাই বা কোন ডেমোক্র্যাসি? আমেরিকার এসব “ডেমোক্র্যাসি-বিক্রির” বক্তব্য আসলে  আমাদে্র  জন্য এক চরম বিরক্তিকর জায়গায় পৌঁছেছে।

    তবে চীনের প্রসঙ্গেও অন্তত দুটো কথা বলার আছে। বিশেষ করে বাইডেনের সমালোচনা করছি বলে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইট ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ও পরে ১৯৪৮ সালের সম্মেলনে উঠলেও এর অগ্রগতি খুবই হতাশজনক। অথচ এরই মধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্বে বদলের সময়কাল আসন্ন। এত দিন কমিউনিস্টদের রাজনীতি ও তাদের দেশ যেভাবেই চলুক, এখনকার প্রশ্ন আলাদা।

    অন্তত গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বার্থে  মানবাধিকার  রক্ষা প্রসঙ্গে চীনের ন্যূনতম একটি অবস্থান গ্রহণ পূর্বশর্ত। নইলে প্রতি পদে এই ইস্যুতে সঙ্ঘাতে গ্লোবাল সব কাজ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। চীনকেই অযথা বিব্রত হতে হবে প্রায়ই।  চীন নিশ্চিত থাকতে পারে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে ন্যূনতম একটি অবস্থান ছাড়া চীনের নেতা থাকা খুবই কঠিন হবে। ফেলও করতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যুদ্ধের খরচ জরুরি, হিউম্যান রাইটও“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

    কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না

    গৌতম দাস

    ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৫, সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Nl

     

     

     

    [সার সংক্ষেপঃ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কোন মুল্যায়ন চোখে পড়ে না। ফাঁপা আবেগী কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের পুজা বা স্তুতি দেখা ছাড়া। কেউ সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বোধের চিহ্ন বা রাজনৈতিক অবস্থান – তা নাও হতে পারে। নেতাজী সুভাষ এই তিন গুণের ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাষ্ট্র বা রাজনীতি জ্ঞান বলে কিছু ছিল তা জানা যায় না। জাপানি রেসিস্ট শাসকের ফ্যাসিজমের রাজনীতি ছিল। “নেতাজী” তিনি তাদের ট্রেনিং পেয়েছিলেন। ঠিক যেমন বার্মিজ জেনারেলেরা পেয়েছিলেন। এবং জাপানি সামরিক সহযোগিতায় এই জেনারেলেরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্য-মুক্ত করেছিলেন। কাজেই নেতাজী সুভাষ যদি জাপানি সামরিক সহায়তায় সশস্ত্রভাবে ভারতকে স্বাধীন করে ফেলতেন তবে তিনিও বার্মিজ  জেনারেলদের মত যাদের কৃতিত্ব হল নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো, ক্লিনজিং আর রেসিজম, ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি বৈশিষ্ঠের – এদের মতই নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! ]

     


    নেতাজী সুভাষ কেন বাংলাদেশের কেউ নন

    আসল নাম সুভাষচন্দ্র বসু, সংক্ষেপে সুভাষ বোস [Subhas Chandra Bose]। বৃটিশ-ভারতে অবিভক্ত বাংলার এক রাজনীতিবিদ, কংগ্রেস দলের দু’বারের সর্বভারতীয় সভাপতি। কিন্তু কলকাতার হিন্দু বাঙালি মধ্যবিত্তের যারা ঢবঢবে ইমোশনাল, এদের চোখে তিনি ‘নেতাজী’। প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে মধ্যবিত্তের সস্তা আবেগের নেতা হলেন সুভাষ বোস। এদেরই স্বীকার করে নেয়া সুভাষ বসুর খেতাবি নাম হল ‘নেতাজী’।

    তাঁর রাজনৈতিক জীবনসীমা খুবই ছোট, ১৯২১-১৯৪৫ সাল। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর ১৯২০ সালে বৃটিশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দিতে না দিতেই সেই চাকরি ছেড়ে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর অপরপ্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, তিনি  বৃটিশ কলোনির এক বাসিন্দা হয়েও বৃটিশ-প্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি ও জাপানের সামরিক সাহায্য নিয়ে ছোট হলেও এক সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিলেন। সশস্ত্র যুদ্ধে বৃটিশদেরকে পরাজিত করবেন ভেবে জাপানি সহযোগিতায় জাপানে বসে নিজস্ব এক সেনাবাহিনী (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা INA) বা আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়েছিলেন। যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ মেরুকরণের দিক বিচার করে বললে,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা-বৃটিশ-রুশ ইত্যাদি ‘মিত্রবাহিনীর’ কাছে জার্মানি, ইতালি ও জাপান ‘অক্ষশক্তির’ জোটের পরাজয় ঘটেছিল। ফলে সুভাষের বাহিনীকেও ১৯৪৫ সালে বৃটিশদের কাছে সারেন্ডার করতে হয়েছিল। কিন্তু এরপর দেশে ফিরতে যে সামরিক বিমানে তিনি উঠেছিলেন, এখান থেকেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ বলেন তাইপেই-য়ের (এখন তাইওয়ানের রাজধানী) আকাশে প্লেন ক্রাশ করে  মারা গেছেন, কিন্তু সেই লাশ কই কেউ জানে না।  এরপর ঠিক কী হয়েছিল সুনিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না বরং ব্যাপারটা রহস্য আবৃতই থেকে যায়। কিন্তু এ’ঘটনাটাই আবার আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগ আরও সপ্তমে তুলতে ভুমিকা রেখেছে।

    বয়সের হিসাবে নেহরু সুভাষের চেয়ে ৮-৯ বছরের বড়। তবে একসাথে কাজ করেছেন। যেমন, ১৯২৮ সালের কংগ্রেস দলের সম্মেলনে, গান্ধী আর মতিলাল নেহরু (জওয়াহেরলাল নেহরুর বাবা) এরা হেদায়েত করছিলেন “বৃটিশ ডমিনিয়ান রুল” দাবি করে দলের প্রস্তাব পাস করাতে। ডমিনিয়ান [Dominion] মানে হল, ভারতকে বৃটিশ শাসন কর্তৃত্বের অধীনেই রেখে ও মেনে, কেবল নিজেদের জন্য এক সীমিত স্বায়ত্বশাসন চাওয়া। আর এক্ষেত্রে গান্ধীর বিপরীতে তারুণ্যের অবস্থান নিয়েছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু আর সুভাষ বোষ, তাদের দাবি ছিল”পূর্ণ স্বাধীনতা”। সেকালে ‘পূর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হত ডমিনিয়ান শব্দটা নাকচ করতে। যদিও নেহরু আর সুভাষ কংগ্রেসের একই উপধারার রাজনীতির লোক ছিলেন না। এটা ছিল তাদের  সিনিয়রদের বিরুদ্ধে কমন এক অবস্থান নেয়া।

    সুভাষ বোস ছিলেন মূলত সব সময় আপাত ‘রেডিক্যাল’ বা সশস্ত্রতার রাজনীতির পক্ষে। আর একভাবে বলা যায় তিনি গান্ধীর আপোষকামী ও অহিংস ধারার রাজনৈতিক এপ্রোচের বিপরীতে বৃটিশের বিরুদ্ধে সংঘাত করে করে আগানো – এই লাইনের লোক।

    সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই।

    এখানে একটা কথা খুব পরিস্কার করে আমাদের মনে পরিস্কার রাখা দরকার। সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকা এসব হলেই তা রাজনীতি বা রাজনৈতিক অবস্থান নাও হতে পারে। এগুলো নিজেই কোন বিপ্লবী অবস্থান তো নয়ই। এই স্বল্প পরিসরে এর কিছু বুঝতে, একটা চিহ্নের কথা বলা যেতে পারে। যেমন সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা দিয়ে কেউ এমনকি “দেশ স্বাধীনও” করে ফেলতে পারে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে এরা দেশ বুঝে কিন্তু রাষ্ট্র বুঝে না। স্বাধীনতা অর্জনের পরে এরা কী রাষ্ট্র গড়বে? কী রাষ্ট্র গড়বে, কেমন? এরা জানে না। কারণ চিন্তা করে নাই। কলকাতার নেতাজী, সুভাষচন্দ্র বসু এমনই দেশপ্রেমী বিপ্লবী!

    যদিও সুভাষ তাঁর দল খুঁজে নিয়েছিলেন ঐ কংগ্রেসকেই; তবে সেটা তিনি আসলে তার গুরু চিত্তরঞ্জন দাশের (মৃত্যু হয় ১৯২৫ সালে) কংগ্রেস দলেই এসে যোগ দিয়েছিলেন। এটা বড় প্রভাবক ছিল। কিন্তু আবার রেডিক্যাল যদি তিনি হবেনই, তবে কংগ্রেস দলে যোগ দিতে গিয়েছিলেন কেন? এর কোনো সদুত্তর বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আবার তিনি কোনও কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট রাজনীতিও করতেন না। ফলে এ কারণে তার চিন্তাকে রেডিক্যাল যদি বলি, তবে সে কথা টেকানোও মুশকিল। কোন এক আবছা রংয়ের সোশালিজমও তিনি পছন্দ করতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনটা হলেও ব্রিটানিকাও তাঁকে প্রমাণহীনভাবে সোশালিস্ট বলতে চেয়েছে। তা খুব সম্ভবত সেকালের যেসব ট্রেড ইউনিয়নিস্ট বা কৃষক আন্দোলনের নেতা যারা আবার দল হিসাবে কংগ্রেসেই থাকতেন আর যারা সারাজীবন কংগ্রেস দলের ভিতর গান্ধীর গালমন্দ খেয়ে কোনঠাসা হয়ে থাকতেন – এদেরকে আনুকুল্য দিতেন সুভাষ – এই কারণে।

    তবে সুভাষের সশস্ত্রতা এর আরও বৈশিষ্ট আছে। যেমন তা আবার বৃটিশদের শত্রু হিসেবে খোদ হিটলার, তারই সাথে সখ্য গড়ে, সামরিক সাহায্য নিয়ে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেন – এমন লোক হলেন সুভাষ। এমনকি এই ‘নেতাজী সুভাষ’ আবার গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেসের ১৯৩৭ সালের প্রথম (বাংলাসহ সাত প্রদেশে) প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি জার্মান-জাপানের সহযোগিতায় বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে এমনই বদ্ধধারণায় ডুবে মোহাচ্ছন্ন ছিলেন যে, ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত ছেড়ে পালিয়ে তিনি জর্মানিতে গিয়ে খোদ হিটলারের সাথে দেখা করেন।

    কিন্তু হিটলার, এত দূর সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদীতা এসে জড়িয়ে যেতে অনাগ্রহী ছিলেন বলে তিনি না করে দিলে, সুভাষ সেখান থেকে হিটলারের সহায়তায় জাপান চলে যান। হিটলারের যুদ্ধের বন্ধু জাপানের শাসক মার্শাল তেজোর [Tōjō Hideki] সাথে দেখা করেন আর সেখান থেকেই নেতাজী সুভাষের সামরিক সহায়তা পাওয়ার কপাল খুলে যায়। জাপানি সহায়তায় বাহিনী গড়ে নিয়ে সুভাষ একসময় বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে যান। তিনি বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর বার্মা সীমান্ত দিয়ে জাপানি বিমান হামলার কাভার বা ছত্রছায়ায় দুটো বৃটিশ সীমান্ত চৌকি আক্রমণ করে (ইম্ফল ও কোহিমা, দুটোই আজকের মনিপুর ও নাগাল্যান্ড ছোট দুই রাজ্যের রাজধানী) দখল করেছিলেন বলা হয়। এটাই তাঁর সর্বসাকুল্যে কৃতিত্ব ধরা হয়।

    এর আগে তিনি যে অনেক দিন ধরেই (সম্ভবত ১৯২৭ সাল থেকে) জার্মান-জাপানের শাসকদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন তা কংগ্রেস দলের সিনিয়রেরা অনেকেই জানত। সুভাষ বোস কংগ্রেস দলে নিজ গ্রুপিং শক্তিশালী করে ১৯৩৮ সালে প্রথম কংগ্রেস দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি পরের বছরও একই প্রভাবে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হবার শেষে গান্ধী পরে আলটিমেটাম দেন যে, সুভাষকে পদত্যাগ করতে হবে; না হলে কমিটির বাকি নির্বাহী সদস্যরাও পদত্যাগ করবে। এর মূল কারণ ততদিনে সুভাষের জার্মান-জাপানের সাথে যোগাযোগ-সম্পর্কটা খুবই পরিপক্ক হয়ে উঠে স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই কংগ্রেসের রাজনীতিকে সশস্ত্রতার পক্ষে হেদায়েত করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তাই সুভাষের হেদায়েতি ঠেকাতেই গান্ধীর এই আলটিমেটাম এসেছিল। তখনই সুভাষ নিজের গ্রুপকে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ [Forward Bloc] নাম দিয়ে আলাদা দল হিসেবে প্রকাশ করেন। ফরওয়ার্ড ব্লক নামে দলটা এখনো কলকাতায় আছে আর তা “বামফ্রন্ট” নামে কলকাতাকেন্দ্রিক যে কমিউনিস্টদের জোট আছে তারই এক শরিক দল। মজার কথা হল, এই “ফরওয়ার্ড ব্লক” দল নিজেদেরকে এক কিসিমের কমিউনিস্ট দল বলে দাবি করে। কিন্তু কোন সূত্রে তারা কমিউনিস্ট, এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। সম্ভবত আবছা জোড়াতালির ভাষ্যটা হবে এ রকম যে, তারা সশস্ত্রভাবে ‘দেশ স্বাধীন’ করার লোক। সুতরাং তারা ‘বিপ্লবী’ না হয়ে যায় না। আর বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট-সোশালিস্ট না হলেও অন্তত প্রগতিবাদী তো বটেই। অতএব…।

    কিন্তু তাহলে আসল কথায় আসি, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ মানে অবিভক্ত বাংলার থেকে পূর্ববঙ্গের আলাদা প্রদেশ ও ঢাকা এর রাজধানী হয়ে যাওয়ায় হিন্দু-জমিদারদের এর প্রবল বিরোধিতা শুরু করেছিল, পাগল হয়ে গেছিল। সেই ইস্যুতে অথবা খোদ জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদে পূর্ববঙ্গের দাবির প্রতি সুভাষ বসুর অবস্থান কী ছিল? এক কথায় ভিন্ন কিছুই না। একেবারেই আর পাঁচটা হিন্দু কংগ্রেসের নেতা, গান্ধী-নেহরুর মতই ছিল সুভাষের অবস্থান। অর্থাৎ হিন্দু-জমিদারি স্বার্থের নেতাই তিনিও। মূলত এ কারণেই নেতাজী (সুভাষচন্দ্র বসু) কংগ্রেস দলে গান্ধী-নেহরুর বিরোধী ক্যাম্পের নেতা হলেও তিনি পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে তখন বা এখন কেউ হতে পারেন নাই, নন। যদিও সুভাষ কংগ্রেসে যোগ দেন অনেক পরে ১৯২১ সালে আর ততদিনে মানে ১৯০৫ সাল থেকেই এসব ভাগাভাগি ঘটে গিয়েছিল।

    এরপরেও আমরা দেখব, বাংলাদেশে খুঁজে পাবো কেউ কেউ সুভাষ বোসের ছবি বা মূর্তি সাজিয়ে রেখেছেন ড্রয়িংরুমের শোকেসে। যেমন বাংলাদেশে টাটা গাড়ির এজেন্ট কোম্পানির মালিক অথবা কোন দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারের কেউ। সম্ভবত তাদের সাধারণ বুঝাবুঝি অবস্থানটা হল – কংগ্রেস দল যে হিন্দুইজমের দল, এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দল, তা অনেকে জেনেও লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। করে বলতে চায় কংগ্রেস  মানে তো প্রগতিশীলতা, কাজেই কংগ্রেস দলের কোনো নেতার চিহ্ন তো ধারণ করাই যায়।  তা দোষের নয়। অথবা উপরে বলা আগের ফর্মুলা যে সশস্ত্রতা মানেই বিপ্লবীপনা মানেই প্রগতিশীলতা। এ রকমই কিছু একটা ধামাচাপা বুঝ!

    সম্প্রতি মোদীর এই জমানায় বিজেপির হাতে কিছু পুরানা বিতর্ক টেনে তোলা হয়েছে। মোদী বা বিজেপি দলের ধারণা নেতাজী সুভাষ যেহেতু কংগ্রেসের নেহরু-গান্ধীর বিরোধী ধারার, কাজেই হিন্দু কোলকাতার ‘নেতাজী’ আবেগে কৌশলগত সুড়সুড়িতে সমর্থন দিলে আখেরে বিজেপির তাতে লাভ আছে। তাই গত নির্বাচনে নেতাজীর এক ভাতিজার ছেলে চন্দ্রকুমার বসু, তিনি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে কলকাতা থেকে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও জিততে পারেননি। সম্প্রতি সুবীর ভৌমিক এনিয়ে লিখেছেন। তিনিও একই নেতাজী আবেগ আঁকড়ে লিখেছেন – মোদী-বিজেপিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “গেরুয়ারা অপরিহার্যভাবেই বদহজমে ভুগবে”।

    কারণ, পরবর্তিতে এসে হঠাৎ সেই চন্দ্রকুমার মোদীর বিজেপিকে এক হুঁশিয়ারির কথা বলে বিপদে ফেলে দিয়েছেন। বলেছেন, “মোদীর দল যদি ঐক্যবদ্ধ ভারতের নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ অনুসরণ না করে, তবে দেশ টুকরা টুকরা হয়ে যাবে”। কথাটা বিজেপির নেতাদের জন্য বিব্রতকর সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু এটা কোন অর্থপূর্ণ কথা তিনি বলেননি। কারণ, চন্দ্রবসু যদি এ কথাই আওড়াবেন তবে বিজেপির টিকিট নেয়ার তো তাঁর কথা নয়। তিনি বিজেপিতে গেছিলেন কেন? আবার বিজেপি যে তাঁর এই বয়ান বা নতুন রাজনীতির কেউ না, সেটা তো সকলেই আগে থেকেই জানে। কাজেই এই তামাশা অর্থহীন। স্টান্টবাজি করা ছাড়া অন্য কিছু নয়।

    এ ছাড়া আবার চন্দ্রকুমারের উদ্ধৃত ও কথিত ‘নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ’- এটা আবার কী জিনিস? চন্দ্রবসু নিজেই এর জবাবে বলছেন যেহেতু, “নেতাজীর সেনাবাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম-শিখ ইত্যাদি” সব ধর্মের লোক ছিল তাই এটাই নাকি “নেতাজীর সেকুলার মতাদর্শ”। এসব কথা আসলে সোনার-পাথরের বাটি ধরণের। একজন কথিত মুসলমান প্রেসিডেন্ট থাকলেই ভারত একটা সেকুলার দেশ, এসব পোলাপানি বোকা-বুঝের রাজনীতি অনেক দিন ধরে চলে আসছ্‌ দেখেছি আমরা। এগুলো অর্থহীন, না বুঝে কথা বলা। যারা রাষ্ট্র ধারণা রাখেন না, এই ইস্যুতে কোন বুঝাবুঝি না রেখে আন্দাজে বলা কথা এগুলো। এরা না বুঝে মর্ডান রাষ্ট্র না বুঝে কোন সেকুলারিজম! তবু আন্দাজে কথা বলে যায়।

    আসলে ব্যাপারটা হল, শত বিপ্লবীপনা ফলালেও ভারতের স্বাধীনতা কোনও সশস্ত্র আন্দোলনের ফলাফলে অর্জন হয় নাই। টেবিলে বসে আপোষ-আলোচনায় পাওয়া স্বাধীনতা এটা। এই আত্মশ্লাঘা নিয়ে  আবেগী হিন্দু মধ্যবিত্তের মনে মেলা আপসোস আছে। এই ফাঁপা আবেগী জোশ মেটাতে “নেতাজী” এক ভাল টোটকার নাম। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা যায়, নেতাজীর অবদান কী? তখন আবার আরেক প্রশ্ন, কারও অবদান মাপে কেমনে? কারণ এটা তো জানা নাই। তবু তাতে যেমন যদি বলা হয়, তিনি জাতীয়তাবাদী ছিলেন? এখন জাতীয়তাবাদী মানে কী? অথবা তিনি কী রাষ্ট্র বুঝতেন? কেউ জানে না। আচ্ছা তাহলে বলেন যে, আপনার নেতাজীর ভারত রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে অবদান কী? এবার কবিরা একেবারেই নীরব হয়ে যাবে। অনেকে বলতে চাইবেন তাঁর মৃত্যুরহস্য কী কিছু না? মানে তিনি বলতে চাইছেন, এখানে গোয়েন্দা গল্পের প্লট আছে। কিন্তু আছে হয়তো তাতে কী?

    এতেও নেতাজীর অবদান কী তা দেখানো যায় না। আসেন তাহলে উল্টো জায়গায় তাঁর হিটলারের সাথে দেখা করা বা জাপান যাওয়াকে মূল্যায়ন করি। না, হিটলার খারাপ তাই নেতাজী ভাল হয় কেমনে সেকথা না হয় নাই তুললাম। সেসব বাদ রেখেই আগাই। প্রথমত, জার্মান-জাপান যেতে নেতাজীর ভারত ছেড়ে বের হয়ে পড়া; এটা তার অবসেশন ও এক আবেগ মাত্র। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল  অধিকারভিত্তিক কলোনিমুক্ত রাষ্ট্র ও জাতিসঙ্ঘ জন্ম দেওয়ার এক নতুন ব্যবস্থার দুনিয়া কায়েম বনাম রেসিজম ও ফ্যাসিজমের কলোনি মালিকের দুনিয়া- এ দুয়ের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছিল। যেখানে হিটলাররা দ্বিতীয় বা নেতিপক্ষ। এ দিকটা মূল্যায়নের ক্ষমতা হিন্দু মধ্যবিত্তের আবেগী-গর্বের কলকাতার নেই। আবার সময়ের সেন্সের দিকটা দেখেন। সুভাষ জাপান পৌছেছেন ১৯৪৩ সালের ২ জুলাই। কিন্তু ঘটনা হল ততদিনে যুদ্ধ ঘোরতর জায়গায় পৌছেছে শুধু তাই না। বরং বলা যায় যুদ্ধের পরিণতি নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেটা হল, হিটলার-তেজো-মুসোলিনির জোটপক্ষ হেরে যাচ্ছেন।  আসলে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকেই আমেরিকান রুজভেল্ট  এর বিজয়ের বাতি জ্বলে উঠে গিয়েছিল। বাকি ছিল তা ঘটতে যে সময়টা লাগে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সুভাষ বোস তা আমল করার যোগ্য বোধবুদ্ধির লোক ছিলেন না।

    নেতাজী সুভাষ ভারত স্বাধীন করে ফেললে কী হত?
    সবশেষে একটা পরিণতির কথা দেখিয়ে শেষ করব। ধরা যাক নেতাজী সুভাষ ও তাঁর সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিতে গেছেন। তারা ভারত স্বাধীন করে ফেলেছেন।  তাহলে কেমন ভারত দেখতাম আমরা?
    আগে বলেছি দুটো সীমান্ত চৌকি তারা দখল করতে পেরেছিলেন, ইম্ফল ও কোহিমায়। কিন্তু এগুলো সবই বার্মা-ভারত সীমান্তে কেন?

    এর মূল কারণ বা ঘটনার ভিতরের ঘটনা হলঃ জাপান মানে কলোনি শাসক মার্শাল তেজোর জাপানের সামরিক সহায়তায় ১৯৪২ সালে  বার্মা একবার বৃটিশ শাসনমুক্ত হয়ে গেছিল। ঠিক যেমনটা সুভাষ বোস স্বপ্ন কল্পনা দেখতেছিলেন। সেই জাপানিজ-বার্মায় এবার জাপান থেকে  সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজকে তুলে এনে এর হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়েছিল। আর তাতে এই রাজধানী রেঙ্গুনে বসে ভারত-বার্মা সীমান্তে হামলা করা আর কঠিন কাজ ছিল না। আর তাতেই দুটা সীমান্ত চৌকি মুক্ত করার দাবি।

    আসলে আমরা কেমন নেতাজী দেখতাম- এর এককথার জবাব হল, বার্মার এখনকার রোহিঙ্গা-কচুকাটা করা বীরত্মের জেনারেলদের মতই এক নেতাজী সুভাষের জেনারেলদের ভারত – এটাই দেখতে পেতাম আমরা। বার্মা প্রথমবার বৃটিশ কলোনি দখলে চলে যায় ভারত বৃটিশ-দখলে চলে যাওয়ার ৬৭ বছর পরে, ১৮২৪ সালে। যদিও ১৮৮৫ সালে তৃতীয় ও শেষ বৃটিশ-বার্মার যুদ্ধের পরে সেবার বার্মা স্থায়ী দখল হয়ে যায়। আর এতে বার্মা একই বৃটিশ-ভারত শাসক প্রশাসনের অধীনেই ভারতেরই একটা প্রদেশ (বার্মা প্রদেশ নামে) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ও শাসিত হতে শুরু করেছিল। এর ফলে বার্মার ভিতরে পাবলিকের দিক থেকে ধীরে ধীরে যে সর্বব্যাপী মূল অসন্তোষ দেখা দেয় এর লিড নিয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়্কেন্দ্রিক আন্দোলনকারি জনগণ। তাদের তপ্ত ক্ষোভের কেন্দ্রীয় সার বক্তব্য হল এই বলে যে, বৃটিশরা ভারতীয় সহকারীদের সাথে নিয়ে এসেছে আর তাদের দিয়েই বার্মা প্রশাসন চালাচ্ছে। আর এরই সাথে চাকরি-ব্যবসার পুরা বিষয়গুলোতে ভারতীয়রাই বার্মা এসে জেঁকে বসে গেছে, সব কিছুতে দখল দিয়েছে। বৃটিশ শাসকদের এই ভারতপ্রীতি এই প্রেফারেন্স – বার্মিজদের বদলে পুরনো অভ্যস্ততায় ভারতীয়দের অগ্রাধিকার করে ফেলা এটাই জেনোফোবিক বা বিদেশিবিরোধী করে তুলেছিল বার্মিজ এলিটদেরকেও।

    অর্থাৎ বার্মিজ মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ভারতীয়রা বার্মায় চাকরি-ব্যবসা করত। এই অসন্তোষ বৃটিশরা টের পেয়ে ব্যবস্থা নিয়েছিল অনেক পরে ১৯৩৭ সালে। এতে  বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয়, বার্মার জন্য আলাদা বৃটিশ শাসক প্রশাসন কায়েক করতে করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই ১৯৩৭ সালে এসে বার্মা আর ভারতের প্রদেশ নয় ঘোষণা করা হয়। বার্মা আলাদা বৃটিশ-বার্মা কলোনি হিসেবে শাসিত হতে শুরু করেছিল।

    কিন্তু ততদিনে বিক্ষুব্ধ বার্মা জাপানের তোজোর নাগাল পেয়ে গিয়েছিল। জাপান “ত্রিশজন বিপ্লবী” তরুণকে সবার আগে জাপানে নিয়ে গিয়ে সরাসরি ট্রেনিং দিয়েছিল। Aung San, U Nu এরা ছিল ঐ ত্রিশজনের মূল নেতা। Aung San হল একালে অং সাং সুচির বাবা।  পরে ঐ ত্রিশের তাদের হাতেই একটা পুরা সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল। এদেরকে সামনে রেখে পেছনে জাপানি আর্মি মিলে একত্রেএরা ১৯৪২ সালে বার্মাকে বৃটিশ সৈন্যমুক্ত অর্থে স্বাধীন করে ফেলেছিল। পরে নতুন গঠিত সরকারের আজকের সু চির বাবা ওই ৩০ জনের একজন হিসাবে ১৯৪৪ সালে জাপান সমর্থিত বার্মা সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় ঐ বছরই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। মায়ানমারে এখনও ঐ ত্রিশজনকে বিরাট বিপ্লবী জাতীয় বীর মানা হয় যারা জাতীয় গর্বের। যদিও বলা হয় বর্তমানে ঐ ত্রিশজনের মধ্যে মাত্র দুজন জীবিত। যার একজন আবার ব্যাঙ্কক-এ নির্বাসিত জীবনে আছেন। ওদিকে পরবর্তিতে বার্মায় এই ত্রিশজনের-দলের বিরোধী ছিল যারা এদেরকে ১৯৪৪ সালে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী জোটে শামিল করে, সম্মীলিতভাবে বৃটিশরা ফিরে বার্মা দখল করেছিল, বিশ্বযুদ্ধ শেষে। পরে অবশ্য ওই ৩০ জনের বেশির ভাগই বার্মার (১৯৪৮ সালে) নতুন ক্ষমতায় আসীন হয়ে যায়।

    দুনিয়াতে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তায় জাপানিজদের অবদান রাখার মত কিছু নাই। ওদিকে সশস্ত্রতা, দেশপ্রেম বা জাতীবাদী হওয়া বা থাকার সাথে রাজনীতি বা রাষ্ট্র-বিষয়ক চিন্তার সাথে জানাশুনা পরিচিত থাকার কোন সম্পর্ক নাই।

    তাহলে অসুবিধা কী? মানে নেতাজী ভারত মুক্ত করতে পারলে আমাদের কী অসুবিধা হত? অসুবিধা বিরাট।  বৃটিশরা কলোনি মাস্টার, জাপানের মার্শাল তেজোর সাম্রাজ্যও তাই। কিন্তু আরও বিরাট তফাত আছে। তা হল, বৃটিশদের হাত দিয়ে রেনেসাঁ চিন্তাও এসেছিল, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কী তা জানা গেছিল। আর জাপানের মার্শাল তেজোর হাত ধরে এসেছিল রেসিজম আর ফ্যাসিজম-এসবের জয়জয়কারের ধারণা। নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরানা “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

    নির্মম রোহিঙ্গা খেদানো ক্লিনসিং রেসিজম ইসলামবিদ্বেষ ইত্যাদি- এগুলোই কি জেনারেলদেরকে দেয়া পুরনো “জাপানিজ ট্রেনিংয়ের” শিক্ষা উসুল নয়! পরম্পরা, ধারাবাহিকতা নয়!

    আজ জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী? মার্শাল তেজোর ফ্যাসিজম? না। কারণ মার্শাল তেজো-দের কাছে রাজনীতি শব্দটাই অপরিচিত ছিল। কোন গণক্ষমতা, কোন রিপাবলিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ইত্যাদি সব মিলিয়ে কোন ধরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাই তাদের ছিল না। ছিল এক এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য ধারণা আর ছিল নির্মম বর্ণবাদিতা, ফ্যাসিজম -ইত্যাদি এগুলোই একমাত্র সত্য এই ধারণা। আজ জাপানে পার্লামেন্ট, সিনেট নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা ইত্যাদি আছে। যেগুলো সরাসরি কপি করে গড়ে নেয়া হয়েছে। সমাজে এসব নিয়ে কোন পক্ষও নাই এমনকি বিপক্ষও নাই। এজন্য সাথে অবশ্য আছে এরপর থেকে জন্মগতভাবে হতাশ জাপানি নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তাদের কাছে জবাব নেই যে কেন তারা এমন দানব ছিল, কেন তারা সেকালে চীন আর দুই কোরিয়া এই পুরা অঞ্চল জুড়ে  সকলকে তাদের কলোনি বানিয়ে রেখেছিল? কেন কোরিয়ান মেয়েদের যৌন সেবাদাসী বা “গেইসা” বানানো আর নির্মমতার কিছুই করতে তাদের শাসকেরা বাকি রাখেনি! এই লজ্জা থেকে মুখ লুকাতে, জবাবহীনতা থেকে আপাত মুক্তি পেতে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান মার্শাল প্লানে নতুন  বিনিয়োগ  পেয়ে, মিথ্যা করে নতুন উদ্যম দেখিয়ে জাপানিজরা “কাজপাগল” [workaholic] সাজার সুযোগ নিয়েছিল। নইলে সদলে আত্মহত্যা করার রাস্তাটাই কেবল তাদের জন্য বাকি খোলা ছিল!  রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হতে পারে এনিয়ে এমন রাজনৈতিক চিন্তায় এক কথায় বললে জাপানের অবদান শুণ্য। হয়ত নেগেটিভ। অথচ জাপান তো বৃটিশ এম্পায়ারের মত একই ধরণের কলোনি দখলদার এম্পায়ার, এক সাম্রাজ্য শক্তি।

    আর জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত বার্মা? ওর কপালে যুদ্ধের পরে নতুন কিছু শিখবার সেই সুযোগ আর জোটেনি। তাই সেই আপাত সংশোধনও জোটেনি। তাই একালে বার্মা মায়ানমার হলেও এর মানে আসলে পুরনো জাপান। মার্শাল তেজোর জাপান। কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন! আর বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে!

    কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের ফাঁপা ভ্যানিটির বিরাট নেতাজী, আপনাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিনি বার্মিজ আজকের জেনারেলদের চেয়েও নিকৃষ্ট কেউ একজনই হতেন হয়ত! অথবা আর নির্মম ও বড় বর্ণবাদী কেউ। নিশ্চয় তিনি “রোহিঙ্গা” হিসাবেও কাউকে পেয়েই যেতেন! হয়ত সেটা বাঙালি মুসলমানেরা, কে জানে! রেসিজমে বর্ণবাদীদের একটা “অপর” লাগেই, তাতে একটা না একটা ‘অপর’ হলেই চলে!

    কাজেই কলকাতার হিন্দু মধ্যবিত্তের এক ভগবান নিশ্চয়ই আছেন, বোধ করি! নইলে কার আশীর্বাদে তাঁরা- নেতাজী, এক বার্মিজ জেনারেলের মত- এক নেতাজী, এমনটা দেখার হাত থেকে বেঁচে গেলেন! সত্যিই সে এক বিষ্ময়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত  ১৬ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “নেতাজী সুভাষ কেন বাংলাদেশের কেউ নন“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]