Category: ভারত-রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া

  • বিচারক বা কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    দেশপ্রেম নয়, মানুষ ন্যায়বিচার দেখতে চায়!
    বিচারক-কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    গৌতম দাস
    ২১ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3YT

    –

    Former Chief Election Commissioner OP Rawat along with Chief Election Commissioner Sunil Arora (L) and Election Commissioner Ashok Lavasa (R) | PTI–

    গত ১০ মার্চ ছিল ভারতের পাঁচ রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন। এক পাঞ্জাব ছাড়া নির্বাচন কমিশন বাকি চার রাজ্যে  বিজেপিকে বিপুল বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছিল সেদিন। অর্থাৎ বিজেপি এখন ওসব রাজ্যে সরকার গড়বে। উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর এই পাঁচ রাজ্যে এবার নির্বাচন হল। যদিও এই পাঁচ রাজ্য রাজ্যের মর্যাদার দিক থেকে এরা সবাই-ই সমান। কিন্তু এরা সবাই সমান রাজ্যের মর্যাদার হলেও জনসংখ্যা বা রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে তারা সমান নয়। এভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলো কোনোভাবেই অন্য রাজ্যের সমান নয়। কেন সমান নয়?
    এটা বুঝবার একটা দিক-পদ্ধতি হতে পারে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পার্লামেন্ট (বা যেটাকে ওরা লোকসভা বলে) তাতে কোন রাজ্যের কার কতটা আসন তা দিয়ে। কেন্দ্রে কম আসনের রাজ্য মানে সেটা ছোট রাজ্য; মানে কম জনসংখ্যার মানেই তা ভৌগলিকভাবেও ছোটরাজ্য। এই হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট নির্বাচন যেটাকে তারা লোকসভা বলে তাতে মোট ৫৪৩ আসন। আর তাতে উত্তরপ্রদেশ (৮০), উত্তরাখণ্ড (৫), পাঞ্জাব (১৩), গোয়া (২) ও মনিপুর (২) – এভাবে পাশের ব্রাকেটে তাদের লোকসভার আসন বা কনষ্টিটুয়েন্সি কয়টা তা দেখানো হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন হয়ে গেছে গত বছর ২০২১ সালে; তবু কৌতুহল মিটানো আর তুলনা করে বুঝবার জন্য এখানে জানানো হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ লোকসভা আসন ৪২টা আর এর মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা কম করে ধরলেও ১৬ কোটি।
    তাহলে ফর্মুলাটা হল, ভারতের কোন রাজ্য কত বড় বা গুরুত্বের তা বুঝবার সোজা তরিকা হল ঐ রাজ্যের জন্য বরাদ্দ লোকসভায় আসন সংখ্যা জেনে নেয়া। এই গুরুত্বের বিচারে যেখানে ভারতে কেন্দ্রে সরকার গড়তে লাগে লোকসভায় ন্যূনতম ২৭২ আসন, সেখানে একা উত্তরপ্রদেশ যা একমাত্র বড় রাজ্য তা দিতে পারে একাই ৮০ আসন। ফলে উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বে এখানেই সবার চেয়ে বড়। এ ছাড়া সারা ভারতের উপর যেটাকে বলে হিন্দি বলয়ের শাসন- আধিপত্য, এর কেন্দ্র বুঝাতে উত্তরপ্রদেশকে দেখানো হয় । আবার এটাই ‘আর্য’ বা ব্রাহ্মণ আধিপত্যের কেন্দ্র, এই হিসেবে উত্তরপ্রদেশ। আবার এর বিপরীতটা হল দ্রাবিড়ীয় বা ডেকান [Deccan বা দাক্ষিণার্ত] দক্ষিণী চার রাজ্য আর এ দিকে আংশিকভাবে বাংলা প্রদেশ। এ ছাড়া শেষে একটা ‘নোক্তা’ হিসেবে বলা যায়, ভারতের নেহেরু-গান্ধী ডায়নেস্টি বা বংশের শাসন সেটাও এই উত্তরপ্রদেশ কেন্দ্রিক; সুনির্দিষ্ট করে বললে এলাহাবাদ শহরে যেটা আসলে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য হাইকোর্টের শহর। আর এখানেই নেহেরুর বাবা মতিলাল নেহেরু বৃটিশ আমলে এলাহাবাদে ওকালতি প্র্যাকটিস করবেন বলে পাশের কাশ্মির থেকে এক কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ – তিনিও উত্তরপ্রদেশেই এককালে খুঁটি গেড়েছিলেন।
    দরকার যেখানে ফেডারল রাষ্ট্র অথচ হয়ে আছে উগ্র হিন্দুত্বের জাত শ্রেষ্ঠত্বের এর ভারত জাতিরাষ্ট্র! যার বিচার বিভাগ আবার ন্যায়দন্ড ফেলে ন্যায়বিচারের বদলে এর উপরে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ভুয়া দেশপ্রেমিকতাকে!

    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতির পাঠঃ
    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানে নির্বাচনের প্রসঙ্গে আসি। এবার এই পাঁচ রাজ্য নির্বাচন চলেছিল কয়েকপর্বে প্রায় এক মাস ধরে, ৭ মার্চ পর্যন্ত; যার গণনা, ফলাফল এক সাথে ১০ মার্চ প্রকাশিত হয়েছে। উপরে দেখানো উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বের কারণে পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হলেও ভারতের রাজনীতির সবাই আসলে তাকিয়েছিল এক উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের দিকে। যেকোন নির্বাচনে কিসের ভিত্তিতে ভোট বিভিন্ন প্রাথীর বাক্সে যাবে, ভাগ হবে, এমন নানা নির্বাচনী ইস্যু তাতে হাজির হতে দেখা যায়। সেই বিচারে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় গত এক মাস ধরে যেসব নির্বাচনী ইস্যুর কথা বলা ও আলোচনা করে হয়েছিল সেগুলো হল – এক. কৃষক আন্দোলন। মানে আগের টানা ১৫ মাস ধরে চলা এক কৃষক আন্দোলনে শেষে মোদি হার স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট তিন আইন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। দুই. ভারতে কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সামলাতে মোদির ব্যর্থতা।  অর্থাৎ  মোদির সরকার – সৎকার, হাসপাতাল বেড, অক্সিজেন ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সব সিস্টেমটাই ভেঙে পড়েছিল যেখানে। আর তাতে নাগরিক হিশাবে মানুষের মর্যাদা এই সামাজিক মুল্যবোধে ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিল। তিন. অর্থনীতি; অর্থাৎ ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ও কাজ সৃষ্টিতে অভাব মানে পুরানা অর্থনৈতিক ততপরতাই সীমিত বা বন্ধ হয়ে আসা – কোভিডের আগে যা ছিল তা একেবারেই ভেঙে পড়া, ইত্যাদি।
    এসব ইস্যুগুলোতে এক বিজেপির দলীয় বা সমর্থক মিডিয়া ছাড়া বাকি সব মিডিয়ায় এসব ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ থেকে জবাব-সাফাই নাই, তারা এসব ইস্যুতে নেতি-ছাপ পড়বে প্রাপ্ত-ভোটে তাই এই ভিত্তিতে বিজেপি ভোট হারাবে এই ছিল তাদের সবারই রিপোর্টিংয়ের লাইন। যেমন “উত্তর প্রদেশের ভোটে বিজেপিকে শায়েস্তায় ‘মিশন ইউপি’’ অথবা “উত্তর প্রদেশের ভোট যে কারণে মোদির জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা”- এমন ছিল সেসব রিপোর্টের শিরোনাম।
    এছাড়া “গোরক্ষা ইস্যু” যেটা গরুকে দেবতা মান্য করার হিন্দুত্বের রাজনীতি হাজির করা; উদ্দেশ্য যে এতে ভোটাররা এই হিন্দুত্ত্বের ইস্যুতে ডুবে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিদের ফেলে বিজেপিকেই ভোটটা দিবে এই অনুমান। এই কথিত “গোরক্ষা ইস্যু” বুমেরাং হয়ে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মানে কৃষকের গরু বুড়া হলে তা মাংসের বাজারে বেচার নিষেধাজ্ঞার কারণ গরুকে বসিয়ে খাওয়াতে না পেরে মালিক সে গরুর মালিকানা ত্যাগ করে ছেড়ে দিয়েছে। আর সেই ছাড়া গরু এবার গৃহস্থের জন্য ফসল নষ্টের সমস্যা, তাতে রাতজেগে পাহারা বসানোর সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে।  [নদীতে গরু-মহিষের মৃতদেহ, উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে উত্তাপ]।  এককথায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে গরুর আক্রমণ কেন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে এটা তুলে ধরেছিল বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়া।
    এমনকি আমেরিকান ক্ষমতাসীনদের থিংকট্যাংক “আটলান্টিক কাউন্সিল”, তারাও মোদির জন্য ‘ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ বলে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে রিপোর্ট করেছিল [Modi faces a critical test in India’s most populous state]। অথবা বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর ভাগ্য নিয়ে ফ্রান্সের মিডিয়ায় উদ্বিগ্ন রিপোর্ট [Turbulent priest: India’s anti-Muslim firebrand and possible future PM]। অন্য দিকে বিশেষ করে ইংরাজি দ্য-প্রিন্ট এ নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করে গেছে [The BJP and the SP are neck-to-neck in Uttar Pradesh ]  অথবা [CM says UP will be largest economy if BJP wins. Data shows unlikely ...]। আর কলকাতার আনন্দবাজার ছিল আরো সরেস। সে অনিন্দ্য জানা নামে এক রিপোর্টারকে সারা মাস উত্তরপ্রদেশে রেখেই নিয়মিত – “উত্তরপ্রদেশের ভোট-বুক” সিরিজ রিপোর্ট ছাপিয়ে গেছে; ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৩ পর্বে তের শহরের সিরিজ রিপোর্ট। প্রতিটা খণ্ড ছিল উত্তরপ্রদেশে বিজেপির দুঃসহ শাসনের বিভিন্ন নজির। যেমন ‘হাতরাস’ এর কাহিনী যেটা আসলে এক দলিত কিশোরীকে রেপ করে, হত্যা করে উঁচুজাতের লোকেদের কাহিনী। এরপর পুলিশ-বিজেপি মিলে ওই কিশোরীর সৎকারের নামে মা-বাবার অনুমতি বা তাদের উপস্থিতি ছাড়াই সেই লাশ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর সেই কিশোরীর বাড়ি এখন আদালতের নির্দেশে আর্মি ক্যাম্প বানিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

    কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির জিতবার আশা জাগানোর ছিল নাঃ
    অর্থাৎ সমর্থকের বাইরে কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির পক্ষে জিতবার আশা জাগানোর মত রিপোর্ট ছিল না। এর মধ্যে আরেক সংযোজন হল – দুই কথিত সাধুর (যারা বিজেপি-আরএসএস অ্যাফিলিয়েটেড) প্রকাশ্য সভা থেকে মুসলমান গণহত্যা শুরুর আহবান, হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার আহ্বানের বক্তৃতা দেয়া হয়। [ধর্মীয় বিভাজন ভারতকে তলেতলে ভেঙে দিচ্ছে] অথবা [As UP Polls Continue, BJP MLAs Dial Up Anti-Muslim Hate Speeches]।

    অথচ পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন অথবা সুপ্রিম কোর্ট নির্বিকার। সবার সময় ক্ষেপণ চলতেই থাকে। প্রায় এক মাস পরে কথিত সাধুর একজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মামলা দেয়া হয় মেয়েদের প্রতি অশালীন উক্তির  অথবা Haridwar ‘Dharam Sansad’ shows Modi is facing an internal threat from Sangh Parivar। এমন মামলা জামিনযোগ্য বলে ক’দিনের মধ্যেই তার জামিনও হয়ে যায়।
    এছাড়া ক’দিনের মধ্যেই হিজাব নিয়ে প্রায় জোর করে ব্যাপক এক সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। উদ্দেশ্য হলো, যত বেশি ধর্মীয় মেরুকরণ ততই বেশি বিজেপি ভোট বাড়বে, এই অনুমান। এখানে যে বয়ান তৈরির দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে তা হলো, যেন মুসলমানদের অত্যাচারেই হিন্দু জনগোষ্ঠী অতিষ্ঠ। এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়। আর এই ‘নিপীড়িত’ হিন্দুদেরই ত্রাতা হিসেবে এবার হাজির হয় মোদি ও দল বিজেপি। অতএব বয়ান শেষে হিন্দুরা একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দাও!!

    মোদির এই তৎপরতা এবার প্রমাণ করেছিল যে, মোদিও নির্বাচনের ভোট তার বিরুদ্ধে যাবে এটা তার ও দলেরও অনুমান ছিল। তাই এত মরিয়া হয়ে সুনির্দিষ্ট করে এথনিক-ধর্মীয় কোনো জনগোষ্ঠী-বিরোধী প্রপাগান্ডা, সরাসরি খুন করতে বলা, ঘৃণা করতে বলার উদ্বীপ্তকরণ; এসব অ্যান্টি-মুসলমান প্রচারণা, ইসলামবিদ্বেষের [Hijab Row Can Hurt Indian Diplomacy] কোনো কিছুই তিনি বাদ রাখেন নাই।

    আরেক শেষ অস্ত্র প্রপাগান্ডায় বিজয় ঘোষণাঃ
    এরপরেই ছিল বিজেপির আরেক শেষ অস্ত্র। সারা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এসব প্রপাগান্ডার পরে পয়লা মার্চ থেকে মোদি-অমিত একেবারে ড্রাইভিং সিট নিয়ে সরাসরি বসে যান। অমিতশাহ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় পয়লা মার্চ এক লম্বা সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করে দেন, নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হচ্ছে। এই ঘোষণায় একটা মিলের দিক হল, গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি একইভাবে শেষ সপ্তাহে বিজেপি কেন্দ্রের কত আসনে জিতে যাবে, তা ঘোষণা করেছিলেন। এবারও তাই দেখা গেছে। তিনি খুব করে রিপোর্টারকে বুঝিয়ে দেন যে, দিল্লির ক্ষমতায় মানে কেন্দ্রে সরকার গড়তে গেলে উত্তরপ্রদেশ হয়ে তবেই দিল্লিতে যেতে হয়। তাই তারা উত্তর প্রদেশে জিতে যাচ্ছেন। মানে ২০২৪ সালে কেন্দের নির্বাচনেও জিতে যাচ্ছেন [“If anyone wants to form a government with full majority at the Centre, it cannot be without Uttar Pradesh’s mandate,” ]।

    কিন্তু প্রশ্ন যেখানে উত্তরপ্রদেশের এই নির্বাচনে বিজেপির জন্য এত নেগেটিভ ইস্যু আর অসংখ্য জনদুর্ভোগ থাকার পরেও কেন বিজেপি জিতবে- এ নিয়ে কোনো প্রসঙ্গ কোনো কথার জবাব অমিত শাহ দেন নাই। বারবার বলেছেন এবার (২০২২) তারা উত্তরপ্রদেশে জিতে যাচ্ছেন, তাই ২০২৪ সালেও কেন্দ্রে জিতবেন। এ ছাড়া কিসের ভিত্তিতে এ কথা বলছেন এ ব্যাপারে তিনি নিরুত্তর থেকেছেন।

    পরে ১০ মার্চ ফলাফল ঘোষণার দিনও অমিত শাহের বর্ণনা মত ফলাফল আসতে থাকে। আর তাতে নিজেদের বিজয় ঘোষিত হয়েছে বলে মোদি প্রথমেই পার্টির অফিসে বিজয় সভার আয়োজন করেন। পরে আরো বিজয় মিছিল বের করেন গুজরাট সফরে। সেখান থেকেও তার একইকথা তারা ২০২৪ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রে জিতে যাচ্ছেন।

    এখানে তামাশা দিকটা হল, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে কোনো মিডিয়ার মনে প্রশ্ন নাই যে, কেন তাদের গত এক মাস ধরে যা কিছু রিপোর্ট – বিজেপির দিক থেকে খারাপ বা নেতি ফলাফল বা জিতিতে বাধা পাবার রিপোর্ট এর কোনো প্রতিফলন ফলাফলের মধ্যে নাই, কেন? এর ব্যাখ্যা কী? এটা আসলেই খুবই মজার যে, অনেক সময় মিডিয়া নিজের আলোচনা-রিপোর্টের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে না-ও থাকতে পারে। কিন্তু কেন থাকল না এর ব্যাখ্যা কী? সেটা নিয়ে কথা বলা, তালাশ করা কী তাদের কাজ নয়? কিন্তু এখানেই সব ‘কবি’ নীরব দর্শক মাত্র!! আসলে, মোদির হাতে এমন কী আছে যে মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে যত নেগেটিভ দিক তার অযোগ্যতা প্রকাশিত বা প্রমাণিত থাক না কেন, ভোটাররা ক্ষুব্ধ ও সাফারার হোকনা কেন – এসবের কোনোটারই প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে থাকে না কেন? এর উপর এটা নিয়ে ঐ মিডিয়াগুলোই আর কথা বলে না কেন??

    মিডিয়া এদিকে তাকানোকে যেন নিষিদ্ধ মনে করেঃ
    ব্যাপারটা এমন যেন ভোটের প্রকাশিত কমিশনের ফলাফল মিডিয়া আলোচনার বিরুদ্ধে গেলেও তারা এনিয়ে আর আলোচনা করে না। যেন এদিকে তাকানোকে তারা নিষিদ্ধ মনে করে!!  বরং সেদিক থেকে মনোযোগ সরাতে এখন তারা অনেকে রিপোর্ট করেছে যে, কংগ্রেস কেন এত খারাপ ফল করল? যেন কংগ্রেস ক্রমেই সব হারানো দলে পরিণত হচ্ছিল না! যেন সবাই আশা করছিল কংগ্রেস এবার বিরাট কিছু ফলাফল দেখাবে!

    প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য নয়ঃ
    নীতিটা ভারী সুন্দর(!)। দেখা যাচ্ছে ভারতের লিগ্যাল প্রফেশনের (বিচারক, উকিল-ব্যারিস্টার বা লিগাল একাদেমিক ইত্যাদি) কেউ অথবা মিডিয়া যেন প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করা দেশের বিরুদ্ধে কাজ মনে করা শুরু করেছে। যেমন ধরা যাক বর্তমানে সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা যিনি নিয়মিত মোদির নির্বাচনী আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে একাই সোচ্চার থাকতেন; আর অন্য কমিশনারেরা নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়া [EC Rejects by 2-1 Vote Lavasa’s Demand to Record Dissent Note in Orders] বা আইনি-নিরপেক্ষ জায়গায় দাঁড়িয়ে যেকোনো বেআইনি কাজের প্রশ্ন তোলাকে দেশ-বিরোধী কাজ মনে করেছেন। এমনকি কমিশনার অশোক লাভাসা ঐ নো-অফ-ডিসেন্ট বা আপত্তি-নোটে ঠিক কী বলেছিলেন সেকথা রাইট টু ইনফরমেশন আইনেও (যে আইনে যেকোন নাগরিক কোন “পাবলিক তথ্য” জানতে চাইলে সরকার সেই তথ্য দিতে বাধ্য) নির্বাচন কমিশন তা প্রকাশ করে নাই। মোদি এবং এসব বিচারক-কমিশনারদের স্বার্থ কত গভীরে যে এরা পরস্পরকে আঁতাতে সাহায্য করে বলে থাকে, তা এখানে প্রকাশিত।  তাই তারা সবাই নির্বাহী ক্ষমতার পক্ষের লোক হয়ে থাকাই তাদের ভূমিকা মনে করছেন। কিন্তু কেন? ভারত এমন হয়ে গেল কেন?? কবে থেকে??

    Ashok Lavasa, the only member of the 3-man Election Commission to rule that Prime Minister Narendra Modi had violated the Model Code of Conduct while campaigning for the 2019 general election, was selected as a potential candidate for surveillance just weeks after his dissent, according to leaked records of phone numbers that The Wire has seen.

    সেই যে এককালে ১৯৭৫ সালে জুনে জরুরি আইনের শাসন দেখেছিল ভারত, সেই থেকে এনিয়ে এক স্মৃতি তারা কাঁধে নিয়ে ফিরছে। তারা আজও বিভ্রান্ত যে, সেসময়ে ঐ হাইকোর্ট মামলার বিচারক [Justice Jagmohanlal Sinha]  সিটিং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে আইনত শাস্তির রায় দিয়ে কি তারা ঠিক করেছিল? তারা মনে করা শুরু করেছিলেন সারকথায় বললে, তা হল প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতা যদি ট্যারা হয় – আগ্রাসী আচরণের হয়, আইন মানতে, চলতে না চায়, বাড়তি সুবিধা চায়, বিরোধীদের বিরুদ্ধে আদালতকে ব্যবহার করতে চায়- তবে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের কাজ-ভূমিকা যেন হল নির্বাহী বিভাগের পক্ষে দাঁড়ানো বা নির্বাহী বিভাগের জন্য পথ ছেড়ে দেয়া। এককথায় যত আগ্রাসী এক্সিকিউটিভ প্রধানমন্ত্রী, নিয়ম-আইন ভাঙতে চাওয়া নির্বাহীর মুখোমুখি তারা হবেন ততই তাদেরকে যেন আপসে প্রধানমন্ত্রীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। এই হলো সেই নীতি! কেন?

    এটাই তারা সেসময় উলটা ভুল শিক্ষা নিয়েছিলেন; আদালতের দেয়া সাজা ও সিদ্ধান্ত মানতে না চাওয়া প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে! যেন আদালত ইন্দিরাকে সাজা দিয়েছিল বলেই ভারতে জরুরি আইন এসেছিল। মানে পরোক্ষে জরুরী আইন আনার দায় বিচারকদের!!! অতএব, লিগ্যাল প্রফেশনের মানুষের কাজ ও ভূমিকাই হচ্ছে অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাপ খাইয়ে চলা। এতে দেশ ভালো থাকে – তাই এটাই দেশপ্রেমিকতা!!!! বিচারকের হাতে ন্যায়দণ্ড নয়; কথিত দেশপ্রেমিকতা দেখিয়ে দোষী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাকে মাফ বা তাঁর দোষ মাফ করা বা এড়িয়ে চলাই বিচারকের কাজ!!

    লক্ষ্য করা যায়, সেই থেকে আইন প্রফেশন, বিচারকেরা হয়ে গেছেন – ন্যায়দণ্ডের বাহকের চেয়েও সবার আগে ‘দেশপ্রেমিক”। যেন দেশপ্রেমিকতা আগে দেখানো শেষ হলে এরপর বিচার-আচারে বসা যেতে পারে। এ জন্যই কি ভারতের নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসাকে কমিশনের চাকরি ছেড়ে যেতে হলো? অথচ কোনো মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা নাই!

    অথচ অশোক লাভাসা নিজে তো বটেই তার স্ত্রীও তাঁর প্রফেশনে সরকারের হাতে  নিগৃহিত ও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন।  শেষে যেটা কার্যত ক্যাডার বদল করা, এভাবেই অশোক লাভাসা এখন নির্বাচন কমিশন আগাম ছেড়ে দিয়েছেন। আর তিনি এখন মোদি প্রশাসনের তরফে সরকারিভাবে এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) ম্যানিলাতে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে থাকলে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকতেন। মানে এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন তার অধীনে হত।

    তাহলে অবস্থা দাঁড়াল এই যে এখন থেকে আইন না মানতে না চাওয়া অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীকে জায়গা করে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। এভাবেই ভারতের আদালত আর কমিশন চলবে – ভোট কারচুপি, বাক্সের প্রোগ্রাম বদলে দিলেও এভাবেই সব চলবে। আগ্রাসি মোদিকে কিছু বলা যাবে না। আর এমন দুর্দমনীয় ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী মোদি এরপরে মুসলমান গণহত্যার হুমকি দিয়ে হিন্দু ভোট নিজ বাক্সে নিতেই থাকবেন! আর এভাবেই আগামী ২০২৪ সাল তো বটেই, আগামী ভারতে সব নির্বাচন জিতে চলবেন! আর নিশ্চয় এতে দেশপ্রেমিক ভারত অনেক উন্নতি করে এগিয়ে যাবে!!!!

    [আরেক ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা নিয়ে আমার আগের আগের আরেক লেখা – “ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা” – সেটা পাবেন এখানে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বিচারক বা কমিশনাররা যখন সবাই দেশপ্রেমিক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

     ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

    গৌতম দাস

     ০২ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2TE

     

    মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যুবায়ের – রয়টার্স

    দিল্লির ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকান্ড ভারত-রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্র ‘ভেঙে পড়া’ মানে অকার্যকর হয়ে পড়া বা টুকরো হয়ে যাওয়া। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন মানে, সিএএ’র বিরোধিতা আর দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় হার এসবের বদলা-প্রতিশোধ নিতে মোদী-অমিত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  দিল্লি জ্বলছে, ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৪২ জন এই জিঘাংসার বলি।

    বৈষম্য বা রাগবিরাগের প্রধানমন্ত্রী মোদী
    মোদী-অমিতের মনে কী আছে তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবার। ভারত-রাষ্ট্রের মুখ্য দায়ীত্বে থাকা ব্যক্তিদুজন যে কতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারে সেটা এখন প্রমাণসহ হাজির হয়ে গেছে।  যেমনঃ জেলা শহরের ছোট এক হাসপাতাল [Al Hind Hospital, a nursing home] থেকে কয়েকজন মুসলমান রোগীকে আরও চিকিৎসার প্রয়োজনে বড় হাসপাতালে [GTB বা Guru Tegh Bahadur Hospital ] স্থানান্তর করতে পুলিশ প্রটেকশনের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে দরখাস্ত দেয়া হয়েছিল। পুলিশ তা সন্ধ্যা পর্যন্ত করেনি। এ দিকে বিবিসির এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগী বহনরত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলা করা হয়েছে। রড দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে আর এক মেডিক্যাল কর্মী আবেদন করে বলছে – “এটা তো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। তাই হিন্দু-মুসলমান যেই হোক সবার প্রয়োজনে আমাদের সাড়া দিতে হবেই। কাজেই আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার তো কিছু নেই”।
    এসব বিবেচনা করেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা উকিলের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর দিল্লি রাজ্য-হাইকোর্টের  প্রধান বিচারপতি এস মুরলীধর [ঐ মামলার পর এখন বদলি করে দেয়া হয়েছে] এর সাথে যোগাযোগ করেন। বিচারক তৎক্ষণাৎ আদালত বসানোর ব্যবস্থা করে রিট আবেদন শুনে এর নিষ্পত্তি করে পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে সহযোগিতা করার আদেশ দেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঐ বিচারককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার হাহকোর্টে বদলি করে দিতে, পেন্ডিং এক বদলির আদেশ চাঙ্গা করে আর প্রেসিডেন্ট কোবিন্দ তাতে সই করেছেন। আর তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করতে নির্দেশ জারি হয়েছে। পরদিন মোদীর এক মন্ত্রী এ ঘটনায় সাফাই দিয়ে বলেছেন, এটা রুটিন বদলি।
    মোটেও তা নয়। বরং মোদী সরকারই প্রধান দোষী। অসুস্থতার চিকিৎসায় মানবিক কারণেই রোগীকে সরকারের আগ বাড়িয়ে সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এটা ছাড়াও, নাগরিকের চিকিৎসাকাজে সহায়তা পাওয়া, রোগী মুসলমান হন আর না হন তা রোগীর নাগরিক অধিকার। অথচ তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, মূলত মুসলমান বলে। এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন বিচারপতি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক আদেশ দিয়েছেন। অথচ সরকার তাকেই বদলি করে দিয়েছে।
    অনুমান করি, আসলে মোদী সরকার ভয় পেয়েছে যে সরকারের বিরুদ্ধে এই বিচারক মুরলীধর এর এমন আদেশ দেয়া চালু রাখলে অমিত শাহের দিল্লির পুলিশের প্রটেকশনে মুসলমানদের উপর হামলার বিরুদ্ধে সবাই দলে দলে ঐ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করতে  পারে। কারণ ইতোমধ্যে ঐ রাতেই ঐ একই আদালত আরো দু’টি রিট মামলার নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সে কারণেই সকালে যেন ঐ বিচারক আর আদালত বসাতে না পারেন, সে ব্যবস্থাটাই বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। সারা দুনিয়ার অধিকার প্রসঙ্গে সংবেদনশীল কোনো প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের নাগরিক বৈষম্য ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেয়ার করা চিন্তাই করতে পারে না। অথচ মোদী-অমিত নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা ও নাগরিককে নিরাপত্তাদানের জন্য শপথ নিয়েও তা ভঙ্গের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কেন? এটাই তাদের মন যে রিরি করা ঘৃণায় পরিপুর্ণ হয়ে আছে এরই প্রমাণ।
    অমিত-মোদী এখানেই থামেন নাই।  তারা বিচারক মুরলীধরের সিদ্ধান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তাতে আরও বাধা সৃষ্টি করেছেন। হাসপাতালে পৌছানোর পথে পুলিশ বসিয়ে আবার বাধা দিয়েছে। আর এর শক্ত প্রমাণ এর হল দুটা ভিডিও ক্লিপ যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে আছে।  আর বড় হাসপাতালে [GTB] রোগীদের সাথে যেতে আলহিন্দ হাসপাতাল থেকে আসার সময় একজন ডেন্টিস্ট ডাক্তার তাদের সবাইকে এসকর্ট করে সাথে আসছিল। সে ডাক্তারের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষ্যের বর্ণনা ইংরাজি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়  পয়লা মে “Eyewitness account: Delhi Police beat up wounded riot victims, said ‘if he dies, he dies’ ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে। তাতে ঐ ডাক্তার [তাঁর নাম, ডাঃ মেরাজ বিন একরাম] ঘোষণা দিয়েছেন তাঁকে যদি আবার সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়া হয় তবে যেকোন পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। [Ekram added: “This is the truth. If I have to face consequences for telling the truth, I will.”]।

    বাংলাদেশে যেমন ফেক বা ভুয়া নিউজ চেক করে সত্যতা যাচাই করার ওয়েব গ্রুপ আছে “ফ্যাক্ট চেক” [Fact Check] নামে; সেরকম ভারতের একটা গ্রুপের নাম অল্ট. নিউজ [Alt.News]। তারা আরও একটা প্রায় একই রকম ভিডিও দেখে বিচার করে নিশ্চিত করে দিয়েছে যে ভাইরাল হওয়া আগের ক্লিপটা ফেক নয়, বরং জেনুইন। ইংরাজী টেলিগ্রাফ পত্রিকা  আরও জানিয়েছে,  তারা পুলিশের মুখপাত্রকে এনিয়ে করা ফোনের বা টেক্স ম্যাসেজের কোন সাড়া তিনি দেয় নাই।  আসলে পুলিশের গ্রুপ যেটা রোগীদের হাসপাতালের পৌছানোর পথে এই গুন্ডামি – অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী বা অজ্ঞান রোগীকে আবারও রড দিয়ে পিটিয়ে জাতীয় সঙ্গিত গাইতে বাধ্য করা ইত্যাদির ন্যুইসেন্স করছিল  সেটা ছিল একটা হাইরাইজ আবাসিক বিল্ডিং এর নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আর ঐ বিল্ডিংয়ের দুই বাসিন্দাই উপর থেকে মোবাইলে ঐ ভিডিও ধারণ করেছিল।  তাই, পুলিশের কাছে এর সেখবরই ছিল না। সে কারণে এই অকাট্য প্রমাণ রয়ে গেছে।
    এই ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সাথে থাকায় শুধু দিল্লি পুলিশের প্রধানই নয়,  এই মারাত্মক অপরাধের সাথে কমিশনার ও পুলিশ প্রধানের সরাসরি বস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শাহের বস প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ জড়িত সকলের নাম জড়িয়ে গেছে এখন। অথচ নাগরিক বৈষম্য দূর করা রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্রসহ যেকোন রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ও রাষ্ট্রবৈশিষ্ট্য। ঘটেছে উলটা – বৈষম্য করা বা রাগবিরাগের বশবর্তী হয়ে পরিচালিত হওয়ার অপরাধ করে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের মন্ত্রী। এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ও অকার্যকর হয়ে পড়ার আগের লক্ষণ।

    এটা দাঙ্গা নয়, পরিকল্পিত ম্যাসাকার
    লক্ষণীয় যে, দিল্লির এই ম্যাসাকারগুলো হয়েছে গত দিল্লি নির্বাচনে হাতেগোনা যে ক’টা আসনে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছে কেবল এমন কনস্টিটুয়েন্সিতে। তবুও দিল্লিতে এই ম্যাসাকার, এটা কোনো দাঙ্গা ছিল না। এটা ছিল একপক্ষীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন করে জিঘাংসা চরিতার্থ করা, যাতে তারা ভয়ে চুপ করে আরও মার্জিনাল হয়ে বসবাস করতে শুরু করতে বাধ্য হয়, মেনে নেয়। এনিয়ে আনন্দবাজারের এক রিপোর্টের শিরোনাম, – “গুজরাতের মতো দাওয়াই না দিলে চলবে না! শাসানি দিল্লিতে”। অর্থাৎ এটা ছিল গুজরাট স্টাইলে দাওয়াই – দাবড়ে দেয়া!
    আগেও বলেছি, প্রশাসনিক কাঠামো হিসাবে  দিল্লি একটা রাজ্য হলেও এটা আবার ভারতের রাজধানী বলে কনস্টিটিউশন অনুসারে দিল্লির পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। তাই  অন্যসব রাজ্যে তাদের মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন থাকলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিলালের অধীনে কোন পুলিশই নাই। এটাকেই সুযোগ হিসাবে নিয়ে সদ্য দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় হেরে গেলেও এই অমিত শাহ দিল্লির ওপর ছড়ি ঘুরাতে, ম্যাসাকার করতেই বেছে নিয়েছিলেন এক পুলিশ প্রধান হিসাবে, কমিশনার ‘অমূল্য পট্টনায়েককে’। উনি ইতোমধ্যে রিটায়ার্ড অথচ তাকে এক মাসের এক্সটেনশন দিয়ে অ্যাকটিভ করে দিল্লির পুলিশ কমিশনার করে রেখে দেয়া হয়েছে, কুকামগুলো সম্পন্ন করে নেয়ার জন্য। ইতোমধ্যে তিনি অবসরে চলে যাওয়াতে এখন ঘটনার দায় ঢাকতে সুবিধা হবে – এই হল অমিত শাহের অনুমান।  কয়েক দিন আগে কাপড়ে মুখ ঢেকে জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে [JNU] (ও জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও) একইভাবে পুলিশের প্রটেকশনে বিজেপির কর্মীদের হলে ঢুকতে দিয়ে, সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে এই পট্টনায়েকই হামলা করিয়েছেন বিজেপিবিরোধী ছাত্র সংসদের সদস্যদের ওপর। হামলা সম্পন্ন করার পর পুলিশি প্রটেকশনে হামলাকারি বিজেপির ছাত্র সংগঠনের কর্মিদের বের হয়ে চলে যেতে দেন। এরপর রাস্তার বাতি ফিরে জ্বালিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল।
    দিল্লির চলতি ম্যাসাকারের বেলাতেও এই কমিশনারের পুলিশি প্রটেকশনে বিজেপি-বজরং-হিন্দুসেনা কর্মিদেরকে নিরাপত্তা এসকর্ট দিয়ে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দিয়ে বেছে কেবল মুসলমানদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা নির্যাতন আর তাদের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেয়ার তাণ্ডব ঘটিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যেসব ও যে পরিমাণ উপাদান বা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, এগুলো সংগ্রহ করতে কমপক্ষে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি লেগেছিল। অর্থাৎ এটা একটা পরিকল্পিত হামলা।

    গঙ্গাজল
    নৃশংসতা নিয়ে ভারতের বিহারের একজন প্রযোজক-পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন – নাম ‘গঙ্গাজল’। সেখানে ‘গঙ্গাজল’ বলতে এসিড বুঝানো হয়েছিল। মানে, নৃশংসতা হিসেবে জীবন্ত মানুষের চোখ এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া। দিল্লির হামলাতেও বিজেপির কৌশল ছিল ‘গঙ্গাজলের’। এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিরীহ মুসলমানকে হাসপাতালে কাতরানো অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু তাদের চোখ এসিড ঢেলে গলিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন ঘটনায়, এসিডসহ এর বহনকারী চার বজরং কর্মীও আটক হয়েছে যারা সিএনজিতে চড়ে যাচ্ছিল [অটোর ভিতর থেকে অ্যাসিডের বোতল-সহ আটক করা হয়েছে চার যুবককে]।

    আশ্রয় ও নিরাপত্তার খোঁজে – আনন্দবাজার

    এদিকে প্রায় সপ্তাহজুড়ে হামলা শেষে দিল্লিতে এখন শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন। মুসলমানেরা বাড়িঘর ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পরিবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন শহরের পাড়া বা কনস্টিটুয়েন্সিতে বন্ধু-আত্মীয়ের বাসা খুঁজে ফিরছে।
    এসিড হামলা নিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে এক লোমহর্ষক রিপোর্টঃ

    “…আর একটি উদ্বেগজনক বিষয়, মুস্তাফাবাদ থেকে আজ বেশ কিছু আহত এসেছেন হাসপাতালে। তাঁদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তেগ বাহাদুর হাসপাতাল থেকে লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে আসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও পাননি তিনি। গিয়েছেন রিকশায়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে গিয়েছে ওয়কিলের। …এটা স্পষ্ট, আগুন লাগানো, পাথরবাজি, গুলির সঙ্গে ‘গঙ্গাজল (অ্যাসিড)’-এরও আয়োজন করা হয়েছে রীতিমতো  আট ঘাট বেঁধে।”

    আবার অমিত শাহের কৌশল ইতরামিতে এতই প্রখর যে আগেভাগেই আদালতে  মোদীর সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা … দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, “পুলিশকে নাকি অ্যাসিড হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে”। মানে আগেই হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন তিনি।

    মোদী-অমিত বিপদঃ
    পাবলিকের উপস্থিতি যেখানে মদী-অমিতকে চেহারা দেখাতেই হয় সেসব কিছু এড়িয়ে পালিয়ে ফিরছে মোদী-অমিতও।  এই সময়টা মোদী-অমিত বিরাট বিপদের সুতার উপরে হাঁটছেন। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বাড়ছে দেখে মোদী-অমিত ভয়ও পেয়েছেন মনে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ছিল ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাও ২৪ তারিখটা সরাসরি গুজরাটে নেমেই। আর ২৫ তারিখটা তিনি ছিলেন দিল্লিতে রাতে ডিনার শেষ করা পর্যন্ত। কিন্তু এটা আর এখন লুকানোর কোনো সুযোগ নেই যে, অমিত শাহ পরিকল্পিত হামলা শুরু করিয়েছিলেন নিজ দলের কপিল মিশ্রকে সামনে রেখে। মিশ্র বড় প্রভাবশালী নেতা হওয়ার উচ্চাকাক্ষী হলেও এবারের দিল্লি নির্বাচনে পরাজিত এক রাজ্য এমএলএ। অমিত শাহ  নিজেকে সুরক্ষিত ও আড়ালে রাখতে তাই কপিলের মুখ দিয়ে বলিয়েই প্রত্যক্ষ হামলার হুমকি দেয়ার বে-আইনি  কাজটা করিয়েছেন।
    উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদে, যেটা মূল হামলার কেন্দ্র, সেখানে শাহীনবাগের মতই এক অবস্থান ঘর্মঘট চলছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে সাথে নিয়ে কপিল ২৪ তারিখে এখানে এসে অন ক্যামেরায় হুমকি দেন যে, “পুলিশ এই স্থানীয় অবস্থান সমাবেশ ভেঙে না দিলে তিনি নিজে ট্রাম্পের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তিনি এটা ভেঙে দেবেন”। এই হুমকির ভিডিও ক্লিপ এখন  ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর সে রাতেই ঐ সমাবেশের আশপাশে তিনি এক ট্রাক পাথর আনলোড করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে এই পাথর দিয়েই হামলা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আর পুলিশের উপস্থিতিতে এই হুমকি দেয়া স্পষ্টতই কপিল মিশ্রের করা একটি ক্রিমিনাল অফেন্স।
    অথচ প্রকাশ্যে এই ঘোষণা না দিয়েও বিজেপি একই হামলা ও ম্যাসাকার তো করতে পারত। তাহলে ঘোষণা দিয়ে করার মানে কী? তা হল- আমিই (বিজেপি) ক্ষমতা- এই দম্ভ দেখানো; যাতে হামলা খেয়ে ভয়ে মুসলমানেরা এই ক্ষমতার কাছেই নতজানু হওয়া লুটিয়ে পড়া উপায়হীন শ্রেয়কাজ মনে করে। একইভাবে গত নির্বাচনের সময় অমিত শাহ এই কপিলকে দিয়েই মুসলমানরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের ‘গোলি মারো’ বলে স্টেজ থেকে বিবৃতি পড়ে শুনিয়েছিল। অমিতের ধারণা এই হুঙ্কার দেয়ার কাজটা তিনি নিজে না করে কপিলকে দিয়ে করালে তিনি কপিলকেও প্রটেক্ট করতে পারবেন আর নিজেকেও হুকুমদাতা সংগঠক মূল নেতা হয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন। কিন্তু বিপরীতে, নিজে করলে আদালতে প্রমাণসহ দায়ী বলে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তাতে বলা যায় না, মোদীও অমিতের সাথে সহমরণ থেকে সেক্ষেত্রে সম্ভবত খুব বেশি দূরে থাকতে পারবেন না। এসব বিবেচনা থেকেই মোদী ও অমিত দিল্লির হামলা ইস্যুতে পাবলিক এড়িয়ে চলা বা কোন ঘরোয়া সমাবেশে সামনে নিজেরা মুখ খোলা এড়িয়ে যেতেই ‘কপিল মিশ্র’ ধরনের উচ্চাকাঙ্খী লোকদের সামনে আনছেন।

    মানুষের অসহায়ত্ব আর হতাশা – গার্ডিয়ান

    এদিকে ম্যাসাকারের চতুর্থ দিনেও মোদী (বা অমিত) মুখ না খুললেও ম্যাসাকার বেশি হয়ে গেছে কি না এই ভীতি থেকে মোদী ঐদিন প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে দিল্লির ‘স্বরাষ্ট্র ইস্যু’ দেখতে দায়িত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু প্রথম আট-দশ ঘণ্টা দোভাল প্রকাশ করেননি  ঠিক কী পরিচয়ে তিনি দিল্লিতে তদারকি কাজে নেমেছেন। ইতোমধ্যে  মিডিয়ায় জল্পনা রিপোর্ট প্রকাশ হয়ে যায় যে, তবে কি এটা ” দিল্লি পুলিশের দায়ীত্বে থাকা মন্ত্রী অমিতের উপর মোদীর অনাস্থার প্রকাশ”? এই জল্পনা আরো বাড়িয়ে দেয় সে সময় সোনিয়া গান্ধীর এক প্রেস কনফারেন্স। তিনি দাবি করেন, দিল্লি্কে রক্ষার ব্যর্থতায় অমিতকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সারা দিন ড: মনমোহন সিং অমিতের পদত্যাগ দাবি করেছেন সেটা ভারতের টিভিগুলোর টেলপে স্ক্রল করে দেখিয়ে গেছে। ওদিকে দোভালের বিপদ হল, প্রেসকে যদি বলেন মোদী তাকে পাঠিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন উঠবে, অমিত শাহ কি ব্যর্থ? তাই তিনি বলে বসেছেন যে, না অমিত শাহও তাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কিছু ঢাকা পড়ে নাই।
    কিন্তু দোভালের দিল্লির দায়িত্ব নেয়া বা পাওয়া, এটা আবার তাঁর পদ-পদবির দিক থেকেও মিলে না। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাগিরি করা মূলত বহিঃরাষ্ট্রবিষয়ক কাজ অথবা বড়জোর ‘র’সহ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি পর্যন্ত। কিন্তু ভারতের কোন ধরণের সশস্ত্র  “বাহিনীর বা ফোর্সের” উপর কমান্ড করা তার কাজ নয়। কাজেই দিল্লি পুলিশের তাঁর উপর মাতব্বরির দায় নেয়া কাজটা মিলে না। এছাড়া হামলাকারির মূলনেতা অমিত নিজেই যদি দোভালকে এখন সেই হামলা ঠেকাতে পাঠায় তবে এই পরস্পরবিরোধী একই অমিতের মনের কারণে দোভালের কাজে এর ছাপ পড়ারই কথা। যেমন দিল্লির অলিগলিতে একটা বাচ্চা মেয়ের অভিযোগে তিনি বলে বসেন ‘‘যো হো গ্যায়া হো গ্যায়া।… আর এনিয়ে মিডিয়ায় সোরগোল এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলা পুলিশের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মুখে মানায় না।। আসলেই তাই। পুলিশ বলবে আমরা তাকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলব – এমন একশনের কথাই হতে হয় পুলিশের কথা।
    সম্ভবত এসব বিবেচনায় মোদী-অমিত এক কানপড়া রিপোর্ট ছাপিয়েছেন দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় “বেনামি সূত্র” থেকে  পাওয়া খবর বলে। দাবি করা হয়েছে ‘ট্রাম্পকে বিদায় দেয়ার পর থেকে মোদী নাকি খুবই আপসেট। মোদী মনে করছেন, দেশে-বিদেশে তার ইমেজ ইজ্জত গেছে।’ [ Upset with how the Hindu-Muslim riots in Northeast Delhi overshadowed the visit of US President Donald Trump to India, Prime Minister Narendra Modi ]  গোপন সুত্রের এই দাবির সত্য-মিথ্যা যতটুকুই হোক মোদী-অমিতের এখন উভয় সঙ্কট হল, প্রকাশ্যে দিল্লি ম্যাসাকার ইস্যুতে মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেই সরাসরি এর দায় তাঁদের ওপর এসে পড়বেই। কারণ দিল্লি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং দিল্লি পুলিশের বস হলেন অমিত। বলতে গেলে এর দায়িত্ব মোদীর মন্ত্রীসভার। সে জন্য মিডিয়া এড়িয়ে চুপ করে চলতে চাইছেন মোদী-অমিত দু’জনই। এজন্য  দোভালকে দিল্লি পাঠিয়েই দিল্লির অলি-গলিতে দোভাল যাচ্ছেন এর লাইভ ছবি টিভিতে ব্যাপক প্রচার করা হয়েছে। আর  এতে দেখাতে চেয়েছেন মোদী-অমিত অনেক ব্যস্ত মানুষ তাই অজিত দোভালকে পাঠিয়ে ঠিকই খবরাখবর নিচ্ছেন। কিন্তু এর আবার বিপদ হল, বাজারের মোদী-অমিতবিরোধী যেসব বয়ান বা কানাঘুষা চলছে এর বিরুদ্ধে মোদী-অমিত নিজের বয়ান ও গল্প ঠিকঠাক তাঁরা নিজে পাবলিকলি হাজির থেকে তা প্রকাশ করে পালটা সুযোগ নিতে পারছেন না।

    মোদী-অমিতের পিছনে টিকটিক করা অন্য বিপদ – আদালতঃ
    অন্য দিকে, এই মুহূর্তে মোদী-অমিতের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপদ হল – আদালত।  ভিকটিম ও ক্ষতিগ্রস্থরা যতজন আদালত পর্যন্ত পৌছাতে পারবেন, প্রতিকার চাইবেন – সেটা কেবল শুধু মোদী-অমিত নয় আদালতের জন্যও যথেষ্ট পরীক্ষার। আদালতকে মোদী-অমিতের বিরুদ্ধে একশনে যাবার  তাকত দেখাতে হবে এই চাপ বাড়তেই থাকবে। সেটা আদালত এড়াবে কী করে? আদালত না চাইলেও এটা  যেকোন সময় যেকোন দিকে টার্ণ নিতে পারে।  তবে যেভাবে চাপ বাড়ছে সেটা অবশ্যই সব পক্ষের জন্য খুবই বিপদের ইঙ্গিত।  ইতোমধ্যে কপিল মিশ্রসহ অন্তত চারজন বিজেপির  ফেল করা বা প্রাক্তন এমএলএ-এর বিরুদ্ধে গত নির্বাচনী আইনভঙ্গের অভিযোগে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল এরই পুর্ণাঙ্গ মামলায় মামলা রুজু [FIR] করার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি ছেড়েছেন দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি মুরলীধর। তাতে ইতোমধ্যে মামলা রুজু করাও হয়ে গেছে। এবার যদি আরও উপরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো রিট হয়ে যায়? এসব নিয়ে মোদী-অমিত চিন্তিত। তাই আদালতের ওপর  মোদী-অমিত নিজেদের লোকের মাধ্যমে প্রচণ্ড পাল্টা চাপ সৃষ্টি ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

    তাহলে কি মোদী-অমিত হেরে যেতে পারেন? পাবলিক রিয়াকশনের চাপ তীব্র হলে অবশ্যই হতে পারেন এবং তা খুবই সহজে। মিডিয়া যে চাপটা বাডাতে বড় ভুমিকা রাখছে। এমনকি এর সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা খুবই বিপদের হবে ।  এখানে পরিস্কার করে একটা কথা বলে ও জেনে রাখতে হবে আমাদের।  এখানেই ভারত-রাষ্ট্র ভাঙনের উভয় সঙ্কটে। কারণ যে ম্যাসাকার ঘটে গেছে এতেই রাষ্ট্রের ভাঙন আরও নিশ্চিত করে গেছে। এখন আদালত যদি নুন্যতম প্রতিকারও না দেখায়, মোদী-অমিতের প্রভাবে বা ভয়ে ভীত হয়ে তাদেরকে মাফ করে দেয়, পালানোর সুযোগ করে দেয়;  তবে, এর সোজা মানে হবে আদালতও রাষ্ট্রকে ভাঙনের পথে আগানোকে আরও সহযোগিতা করল। এটাকে দ্রুত করে দিল। আবার যদি নুন্যতম কিছু একশন নেয় সেটাই মোদী-অমিতকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলবে। আর তাতেও ভারত ভাঙ্গন আগাবে। কারণ বিকল্প শক্তি নাই, তৈরি নাই বা হয়নি। যদিও গুজরাট ২০০২ সালের ম্যসাকারের অভিজ্ঞতা বলছে অনেক কষ্ট করে হলেও মোদী-অমিত নিজেদেরকে গুজরাটের মামলাগুলো থেকে শেষে মুক্ত করে ফেলেছেন। কাজেই এবারও পারবে না কেন?। কিন্তু অনেকে এখানে পালটা বলবেন মোদী-অমিত এখন আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়ীত্বে না। এখন তারা কেন্দ্রের সরকারের দায়ীত্বে। অতএব এর ওজন বেশি, সংশিষ্ট বিপরীত স্বার্থের পক্ষগুলো ও তাদের স্টেকও অনেক বেশি। কাজেই এবার একই রকমভাবে ঘটনা শেষে হবে না। না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি হয়ত।

    ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়াঃ
    সারকথাটা হল, আদালত মোদী-অমিতের কোন অপরাধ আমল ও শাস্তির ব্যবস্থা না করতে পারলেও ভারতের ভাঙন তীব্রভা বাড়বে। তবে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারলেও ভাঙন বন্ধ হবে না যদিও ভাঙ্গার তীব্রতা কমতে পারে। আসলে, একা আদালত ভারতের ভাঙন ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া আরও  সবচেয়ে বড় পক্ষ বা ফ্যাক্টর হল অন্য বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বা দলের অনুপস্থিতির কারণে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন সিএএ ইস্যুতে এখনও এটা কোন বিকল্প রাজনৈতিক দলের  আন্দোলন নয়।  এটা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক তরুণ মধ্যবিত্ত আর তাদের সহযোগী হল সরাসরি ভিকটিম মুসলমানেরা। (এর বিপরীতে মোদীর পক্ষে তরুণদের আরেক অংশ – মুলত “মফস্বলের তরুণেরা” এরাই বজরং দলসহ বিভিন্ন নামের সেনা এমন বিজেপির অঙ্গ দলগুলোর মুল শক্তি। এমনকি কপিল মিশ্র ধরণের উচ্চাকাঙ্খীদের বয়স লক্ষণীয়। )

    এছাড়া একটু দূরে আর কমপ্লেক্স ভাবে আছে আসাম বা নর্থইস্ট রাজ্যগুলো। যারা ঠিক ছাত্র ও ভিকটিম মুসলমানদের মতই সিএএ-বিরোধী কিন্তু  একইভাবে ও কারণে মোদী-অমিতের বিরোধী নয়, তবে নিজেদের অবস্থান হিসাবে বিরোধী। অর্থাৎ বিজেপির এই বিকল্প বিরোধীদের পরিচয়ই বলে তারা কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে বা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত কেউ নয়।

    কংগ্রেস অথবা বিরোধী যেকোন আঞ্চলিক দল সিপিএম বা ডিএমকে, জনতাদল ধরণের যারা – এরা সকলেই মনে করে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের ক্ষমতা পাওয়া যাবে কী করে সেদিক থেকে এই সাপেক্ষে বিজেপির বিরোধী সিএএ ইস্যুটাকে তাদের দেখতে হবে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস জোট করে তৃণমুলের মমতার  বিরুদ্ধে মাঠে নেমে গেছে। প্রকাশ্যেই বলছে এটা মোদী-মমতার বিরুদ্ধে একসাথে  আন্দোলন। এই জোটের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি মিথ্যা করে হলেও তারা দেখাতে পারে যে মোদী-মমতার রাজনীতি বা লক্ষ্য এক। এই চেষ্টাটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মুল কাজ মনে করে করে যাচ্ছে। কারণ আগামি বছর কলকাতার রাজ্য নির্বাচন, সেখানে মমতাকে ফেলানো  এটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের প্রধান লক্ষ্য।  মোদী-অমিতের প্রণীত সিএএ-এর বিরোধিতা এই জোটের কাছে এখানে তুলনায় কিছুই নয়। বড়জোর সেকেন্ডারি। এতে মোদী যদি ভারতকে মুসলমান শুণ্য করে ফেলেও দেয় তাতেও তাদের জোটের লক্ষ্য একই থাকবে। কারণ মোদীকে সরানো তাদের মুখ্য ইস্যু নয়, রাজ্যের ক্ষমতা পাওয়াই ইস্যু। এই একই অবস্থা কমবেশি সব আঞ্চলিক দলেরই।
    আবার এসবেরই কিছু উস্কানিমূলক প্রভাব হয়ত আছে ভারতের মুসলমানদের উপর। তারাও সিএএ কে কেবল মুসলমানদের ইস্যু হিসাবে দেখার পক্ষপাতি। যাতে এটাকে কারণ দেখিয়ে সিএএ-বিরোধিতা কেবল মুসলমানদেরই বিরোধীতা হিসাবে তুলে ধরতে পারে।  মুসলমানেরা সিএএ-বিরোধী  ইস্যুতে এলায়েন্স করতে কম আগ্রহী।  মুসলমানেরা ঠিক নাগরিক হিসাবে সিএএ এর বিরোধী হওয়ার চেয়ে বরং মুসলমান হিসাবে এর বিরোধীতার আন্দোলন করতে চায়। মুসলমানেরাই কেবল মুসলমানদের কজে[cause] বা কারণে সোচ্চার হবে – এই রাজনীতি করতে চায়। এটা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতি । এই কৌশলের কারণে ভারতের মুসলমানেরা নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। মূল কারণ, বিজেপি এটাই চায়। মুসলমান হিসাবে মুসলমানেরা সংগঠিত হচ্ছে এটা দেখিয়েই তার হিন্দুদের সহজে  ভয় দেখিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি তো এটাই, ফলে তাদের ভোটের বাক্স ভরে তুলার কাজ সফল হবে বলে বিজেপির অনুমান।
    অন্যদিকে ভারতে মোদীর ম্যাসাকারের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল নাই। কমন ইস্যুতে এলায়েন্স নাই।  রাজনৈতিক হবু শক্তি আছে, মানুষও আছে কিন্তু কাঠামো বা উপযোগী  রাজনীতি নাই। শক্তিজোট বা এলায়েন্স নাই। এজন্যই ভারত-রাষ্ট্রের ভাঙন অনিবার্য – তাতে তা ধীরে বা দ্রুত তা যাই হোক।  অথচ একেকটা অঞ্চলিক দলের কেবল রাজ্যকেন্দ্রিক ক্ষমতা পাবার পরিকল্পনা ও রাজনীতি আছে – এটাই তো ভারত ভেঙ্গে ফেলার পক্ষে কাজ করা। অর্থাৎ লড়াইটা আগাচ্ছে  “হিন্দুত্ব” বনাম রাজ্যক্ষমতা দখল – এদুই রাজনীতি; যেটা আসলে মূলত  ভারত ভাঙ্গনের সবচেয়ে বড় তোড়জোড় এক রাজনীতি! অবশ্যই এভাবেই এদিকেই তা যাচ্ছে!

    ট্রাম্পের সফরঃ
    অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের ভারত সফর সামগ্রিকভাবে মোদীর ম্যাসাকারের পক্ষে একটা আমেরিকান সমর্থন – এই ইমেজ সৃষ্টির আয়োজন করা। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন; এমন মনে করার কারণ আছে। যদিও এমন ক্যাম্পেইন হয়, হতে পারে। এর আলাদা মুল্যও আছে।
    ট্রাম্পের এই সফর ছিল মূলত আসন্ন নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে  কিছু সম্ভাব্য বাড়তি মাইলেজ পাওয়া যায় কিনা এরই এক প্রচেষ্টা এটা। যাতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রবাসীরা ট্রাম্পকে সমর্থন বা ভোট দিতে পারে। ঠিক মোদীর শেষ আমেরিকা সফরে “হাউডি মোদী” সমাবেশটা যেই লক্ষ্য হাসিলে আয়োজন করা হয়েছিল। আর বিপরীতে ট্রাম্পের সফরে মোদীর এখনকার লাভ হল যে,  মোদীর বিরুদ্ধে তার দেশের বিরোধীদের অভিযোগ যে, তিনি নানান বিতর্কিত আইন পাস করিয়ে বিদেশে ভারতের ইমেজ নষ্ট করেছেন, ভারতকে বন্ধুশূণ্য করে ফেলছেন ইত্যাদি – এসবের বিরুদ্ধে মোদীর সপক্ষে একটা ভালো জবাব হবে ট্রাম্পের এই সফর। দুই নেতার এমন পরস্পরের ব্যক্তিস্বার্থের, পরস্পর পরস্পরের পিঠচুলকে দেওয়ার – সেই সফর ছিল এটা। এ কারণে, হোয়াইট হাউজ থেকেই সফরের আগে ট্রাম্প নিজে এবং একজন স্টাফ অফিসার পরিষ্কার করে বলে রেখেছিলেন যে, এই সফরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হবে না। আর প্রকাশ্য অভিযোগ এনেছিলেন যে,  ভারত  “ভাল আচরণ করে না”।
    এছাড়া ট্রাম্পের একটু ক্ষ্যাপা কথাবার্তাও অশ্যই ছিল।  এমনকি হোয়াইট হাউজের এই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন যে  “ট্রাম্প ভারতে গিয়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার’ বিষয়টি জোরালো ভাবে তুলবেন। তাঁর কথায়,‘‘সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়ার বিষয়টি ভারতের সংবিধানের অন্তর্গত। গোটা বিশ্ব এ ব্যাপারে ভারত কি করে সেদিকে তাকিয়ে আছে’’ ।

    এছাড়া, ভারতে এসে পাবলিক বক্তৃতায় ট্রাম্প মোদীকে প্রশংসার ছলে বলতে গিয়ে মোদীবিরোধী স্বার্থগুলোও আড়াল থেকে বাইরে এনে ফেলেছিলেন।  যেমন “মোদী ভাল লোক কিন্তু খুব টাফ”। এই টাফ বলতে আসলে এটা মূলত উভয় দেশেরই লেনদেন বাণিজ্যে বাড়তি ট্যারিফ আরোপের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়াতে, সেব্যাপারে বলছিলেন মোদী টাফ। কিন্তু এই বাণিজ্যবিরোধ হাল্কা করার জন্য কোন পক্ষ থেকে  কোন কথাবার্তা চালানো এই সফরের কোনই লক্ষ্য ছিল না। সবকিছুই যেমন ছিল সেখানেই স্থবির হয়ে আছে তাই। এমনকি আমেরিকান নৌজাহাজ থেকে উড়তে পারে এমন হেলিকপ্টার কেনার কথাবার্তাও একইভাবে বিতর্কে স্থবির হয়েই আছে।

    কিন্তু যেটা প্রথমে ট্রাম্প ছাড় দিতে চান নাই যে, মুসলমানদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে এ নিয়ে “ভারতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলবেন ট্রাম্প” এমন শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সফর শুরুর আগের দিন।  কেননা এর বহু আগেই আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’ সিএএ ইস্যুতে মোদীর কঠোর সমালোচনা করেছিল। নাগরিক বৈষম্য করার অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু মোদী ট্রাম্পের সফরের আগেই এমন মন্তব্য পেয়েই লবি শুরু করে দেন। শেষে মোদী একটি রফা করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সফরকালে এনিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোন কথা হবে না। সেটাই বজায় রাখা হয়েছিল আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু শর্ত অনুসারে  ট্রাম্পের বিদায়ের পরের দিনই “দিল্লিতে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে হামলা চালানো” হয়েছে বলে অভিযোগ করে বসেছে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’।

    ভারতীয় মিডিয়াঃ
    মোদীর জাতিবাদী বা পাকিস্তানবিরোধী উস্কানির বিষয় না হলে ভারতীয় মিডিয়া এপর্যন্ত সময়ে সরকারের বিপক্ষে, সময়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এখন শেষবেলায় পুরোপুরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তা মোদী-অমিতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং তাদের ‘ডুবিয়ে’ দেয়ার সামর্থ্য রাখে। এমনকি, আনন্দবাজার গ্রুপেরই ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ সবার আগে লিড নিয়েছে। ম্যাসাকারের দ্বিতীয় দিনেই সবার আগে তাদের মারাত্মক শিরোনামটা হল, “গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছিয়েছে তখন নিরো ডাইনিং-এ” [Neros dine as Gujarat Model reaches Delhi]।

    রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল- এর অনুকরণে বা সেটা মনে রেখে এই শিরোনাম। আর ডাইনিং মানে এখানে ঐ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেই  দিল্লিতে আরেকাংশে  চলছিল মোদী-ট্রাম্পের নৈশভোজ; সেটাকেই ইঙ্গিতে বুঝানো হয়েছিল।  বুঝানো হয়েছিল মোদী আর ট্রাম্প দুজনেই এখানে উদাসীন, দায়ীত্বজ্ঞানহীন – রোমের নিরো।  আবার গুজরাট বলতে এখানে এই মোদী-অমিত জুটিই ২০০২ সালে গুজরাটে রাজ্য সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ২০০০ মুসলমানের হত্যা করিয়েছিলেন। তাই বলা হচ্ছে সেই গুজরাত মডেলের ম্যাসাকার দিল্লিতে এসে গেছে। টেলিগ্রাফের দেখাদেখি বহু পত্রিকাই পরের দিন একই লিড শিরোনামের রিপোর্ট করেছে। এ ছাড়া পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সরাসরিই লিখেছে ‘দিল্লির গণ-নৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা’ [Express says Muslims target of mob violence in Delhi]।

    আনন্দবাজার  পত্রিকাও ছবিতে চিনিয়ে দিয়ে দেখিয়েছিল কিভাবে লাঠি-রড হাতে হামলাকারী আর পুলিশ একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা সক্রিয় হয়ে হামলার পক্ষে কাজ ভুমিকা রাখছে। আর এমন সব রিপোর্টে  সকলেই দাবি করে বলেছে বা প্রমাণ দেখিয়েছে যে, “এই হামলা পুলিশের সহযোগিতায় ও প্রটেকশনে ঘটেছে”। ফলে মিডিয়ায় এই চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ইনডিপেন্ডেন্ট অর্থে “স্বাধীন বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের কথাও” ফাঁক-ফোকরে উঠে আসছে। যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে “হেট ক্যাম্পেইন” বা মুসলমানের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য রাখা – এর ক্রাইম, এই অভিযোগ উঠেছে। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারির দ্য প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় দিল্লি বিজেপি সভাপতির বরাতে এক রিপোর্ট করে বলা হয়েছে, বিজেপি দিল্লি সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলছেন, “কোন কোন বক্তব্য হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-ছড়ানোর তা মূল্যায়ন ও চিহ্নিত করতে একটা স্বাধীন কমিশন দরকার”।

    এসব কিছু মিলিয়েই ভারতের সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকে ধাপে ধাপে আগাচ্ছে!

     লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে “ভারত রাষ্ট্র কোন দিকে আরো আগাল“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]