Category: ব্রিকস (BRICS)

  • ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী 

    ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী
    গৌতম দাস

    ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ০৮ঃ ০৪

    https://wp.me/p1sCvy-4EQ

     

              BRICS

    আবার ব্রিকস [BRICS]! বাংলাদেশে এনিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে! তাতে এর সবটা না হোক মূল বিষয়টা কী তা বুঝি -না-বুঝি, অনেকেই এতে মেতে উঠেছে এই মনে করে যেন এটা বাইডেনের আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের এক কড়া সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ।  আর হাসিনা বাংলাদেশকে ব্রিকসে নিয়ে উঠালে মানে সদস্য  করে ফেললে তা বাইডেনের আমেরিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অথবা বাইডেনকে যেন এক কড়া জবাব দেয়া হবে। এই ভুল অনুমানের উপর মিডিয়া গরম!  কারণ ব্রিকস মানে যেন একটা অর্থনৈতিক পক্ষ-জোট!  এই এজাম্পশন বা ধরে নেওয়া অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন! এক ভুল অনুমান!  দাঁড়ানো এক ভুল বুঝাবুঝি! 

    কথা আরো আছে তাহলে ব্রিকস যদি নেহায়তই এক আমেরিকাবিরোধী অর্থনৈতিক জোট হয় আর এর জন্ম মাত্র ২০০৯ সালে – সেটা কী ২০০৯ এর জায়গায় গত শতকে ধরা যাক ১৯৯০ এর দশকে হত তবে কী এটা আমেরিকাকে আরো আগে বধ করে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারত না? ব্যাপারটা কী তাই?  তাহলে তো এই প্রশ্নেরও জবাব পেতে হবে যে ব্রিকস উদ্যোক্তারা সেটা করে নাই কেন?  সারকথায় ব্রিকস কখন কার্যকর হবে – খুলবে  সেই সময় নির্ধারণ – সেটা কী উদ্যোক্তাদের ইচ্ছাধীন? নাকি অন্য কোন শর্ত (অবজেকটিভ) বা কিছু পুর্ব-প্রস্তুতি পূরণ  আগে হতে হবেই যেটা চীনের ইচ্ছাধীন নয়?  এই জবাবটা এখনই দিয়ে নেই। এটা চীন বা আমেরিকাবিরোধী কারও ইচ্ছাধীন নয়। বরং বেশকিছু বিষয়কে বাস্তবে যোগ্য হয়ে উঠতেই হবে, পেকে উঠতে বা যোগ্য- ম্যাচিউরিটি -তে পৌছাতে হবেই! যা এখনও হয় নাই। তবে হওয়ার দিকে হাঁটছে! এছাড়া আগেই বলেছি এটা কোন অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়। কোন আশিয়ান [ASEAN] অথবা RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership ] ধরণের বিশেষ অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়! তাই এটা ঠিক কে অ্যামেরিকান আর কে চীনের পক্ষ নিয়ে কথা বলব আর এই ভিত্তিতে কাকে সঠিক বলব ব্যাপারটা মোটেও তা নয়!  

    অতএব, এমনই অনেকগুলো ভুল বুঝাবুঝির মধ্যে প্রথম এক সমস্যা হল ব্রিকস নিয়ে রিপোর্টিংয়ের। যেমন বাংলাদেশে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম – বাংলাদেশ ব্রিকসে যোগ দিতে যাচ্ছে – ধরণের। একথার মানে কী? বাংলাদেশ চাইলেই কী ব্রিকসে যোগ দিতে পারবে? নাকি আগে দাওয়াত আসতে হবে? মানে তারও আগে ব্রিকস নিজেরা কোন নয়া সদস্য নিতে চায় এমন এক তাদের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে হবে। মানে ব্রিকস এর পক্ষে এটা এমন পরিপক্ক হয়েছে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হবে! কিন্তু এসব প্রশ্ন এখনও এখানে সবটা পরিস্কার ঠিক তা নয়।

    তবে তুলনায় আপাতত এখানে ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনেক স্বচ্ছ ও সাবধানী। মানে যা জানে না, তা নিয়ে আগায় নাই; অনুমান করে ইচ্ছামত লিখে নাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে কোট করে তারা লিখেছে, “We will surely join once they invite us. We have yet to receive any formal letter…. । বাংলা করলে হয়, “আমাদের একবার দাওয়াত করলেই আমরা নিশ্চয় সেখানে যোগ দিব। (এর আগে) আমাদেরকে এখনও তাদের আনুষ্ঠানিক (দাওয়াতের) চিঠি পেতে হবে”।  মানে আশা করা হচ্ছে যে আগামি আগষ্টে তাদের এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আগে তারা নয়া সদস্য হতে আগ্রহী বা যাদেরকে তারা সদস্য হিশাবে নিতে আগ্রহী তারা দাওয়াত পত্র পেতে পারে। এরপরেই যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে নড়াচড়া শুরু হবে।

    ব্রিকস নিয়ে বিভ্রান্তিই বিভ্রান্তিঃ
    ব্রিকস নিয়ে যেকোন কিছুতেই বিভ্রান্তির শেষ নাই। এর এক অন্যতম কারণ, ব্রিকস যাদের লেখার বিষয় হয়েই যায় যেমন, মিডিয়া রিপোর্টার বা যারা কলাম লিখেন কমবেশি এদের সকলের মধ্যেই বিভ্রান্তি ঢুকে আছে, তা বর্তমান। যেমন ধরণ হিশাবে ব্রিকস কেমন সংগঠন – এই প্রশ্ন কে কিভাবে নাড়াচাড়া করছে কি লিখছে তাতেই বুঝা যায় যে তারা প্রায় সকলেই বিভ্রান্ত; মানে নিশ্চিত জানা নাই। প্রথমত, মিডিয়ায় অনেকেই “ব্রিকস-কে অর্থনৈতিক জোট” ভেবেছে।  যেমন প্রথম আলোর এক ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ লিখছে,  “ব্রিকস হচ্ছে পাঁচ দেশের একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট”।  অর্থাৎ এই বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিকস-কে শুধু অর্থনৈতিক জোট-ই না একে এক আঞ্চলিক জোটও বানিয়েছে। কিন্তু ব্রিকস আর যাই হোক কোন আঞ্চলিক বা ভৌগলিক জোট একেবারেই নয়। কোথায় দক্ষিণ আফ্রিকা আর কোথায় রাশিয়া আর কোথায় ভারত বা চীন – এসব একটা অঞ্চল বা একটা মহাদেশেই সব সদস্য তা তো নয়; কাজেই একটু কল্পনা করে দেখলেই তো এমন ভুল করার কথা না!
    আবার দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ড এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান- পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক এর বরাতে জানাচ্ছে,  তিনি বলছেন – ‘আমাদের স্মরণে রাখতে হবে এটা কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই যোগ দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।’  আবার ঐ একই রিপোর্ট,  এবার আরেক বরাতে জানাচ্ছে, – “যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির ব্রিকসকে একটি ‘শিথিল ধরনের অর্থনৈতিক জোট’ বলে অভিহিত করেন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে”।  এটাও এক শতভাগই ভুল অনুমান।
    জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজও লিখেছেন, –  ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক জোট ব্রিক এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলন হয় ২০০৯ সালে। এটা তো এক ভিত্তিহীন ভুল অনুমান যে ব্রিকস এক অর্থনৈতিক জোট!
    আবার এক কলাম লেখক ব্রিকসকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জোট মনে করে – ধরে নিয়েই লিখেছে “বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যঘাটতি, যেখানে আমদানি রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে ব্রিকসের সুবিধা আদায়ে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে”;  তিনি আরও একই লেখায় অন্যখানে লিখেছেন, “…… ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য বিষয়ে উদারতার অভাব আছে“।
    অর্থাৎ সবার ভিতরেই দেখা যাচ্ছে একটা বিভ্রান্তি কাজ করছে যে ব্রিকস [BRICS] কী ধরণের জোট – এই প্রসঙ্গে। অনেকের লেখার রেফারেন্স আনলাম এবং অবশ্যই এসব কাউকে খাটো করার জন্য না। বরং একধরণের সার্ভের মত করে কয়েকজনের লেখা এনে দেখলাম যে সমাজে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় ভুল কোথায় হচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়! আর এখন এই বিভ্রান্তি কাটাতে আমার বক্তব্য কী সেটাই নিচে বলব।

    ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়ঃ
    হ্যা একথা সত্য যে ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়। এই বুঝাবুঝি ভিত্তিহীন ও ভুল।  কথাটা যদি এভাবে বলি যে আইএমএফ [IMF] বা বিশ্বব্যাংক [ WB or IBRD] বা এডিবি [ADB] বা আইডিবি [Islami DB] এআইআইবি [AIIB] বা এনডিবি [NDB] ইত্যাদি – এরা হল কোন অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট তাহলে বুঝাবুঝিতে যে কঠিন সমস্যা সৃষ্ঠি হবে – এটা সেধরণের ভুল। দুনিয়ার প্রায় ১৯২+ রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। আর এদের মধ্যে প্রায় সকল রাষ্ট্র-ই  আবার IMF ও WB এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। কিন্তু তবু কোন যুক্তি বা বাস্তবতাতে IMF ও WB কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়।

    বরং সোজাসাপ্টা বললে,   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালে Bretton Woods সংগঠন বলে এক গ্লোবাল কনফারেন্সে IMF-WB এদুই গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া হয়েছিল। আবার এদেরকে ঠিক কোন জোট বা সমিতি বলা হয় না। বলা হয় মাল্টি ল্যাটারাল [multi-lateral] বা বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।  আর এসব বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মূল উদ্দেশ্য হল, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সিস্টেম গড়ে তোলা। অনেক সময় যেটাকে Global Econimic order  – এক শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের ব্যবস্থা বলা হয়। আর তা গড়তে Bretton Woods সেই সভায় তাতে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এর মত দেশের প্রতিনিধি সহ অন্য আমেরিকাসহ লিডার দেশ এবং আমাদের মত ছোট দেশের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিল। এটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের  Bretton Woods এলাকায় Bretton Woods নামে হোটেলে জন্ম নেয়া এক ঘটনা।  উদ্দেশ্য ছিল  – জাতিসংঘকে যদি বলি এক গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান ঠিক সেই রকম IMF-WB হল এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান কায়েম করা যাতে একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম চালু করা যায়।

    তাহলে ব্রিকস কীঃ
    ব্রিকস হল সেকালের জায়গায় একালে আরেকটা উদ্যোগের নাম যাদের লক্ষ্য একাল এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে এক পালাবদলের যুগ – সেই পালাবদলে মূলত চীনের নেতৃত্বে সেকালে  IMF-WB এর মতই তবে একালে এবং  আগামিতে বিকল্প এক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম কায়েমের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা। আর সেকাজের উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস [BRICS] যার জন্ম ২০০৯ সালে।  তবে পরিস্কার থাকতে হবে ব্রিকস  নিজেই কোন বিকল্প  IMF অথবা WB সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তা একেবারেই নয়। বিকল্প  IMF ও WB ধরণের প্রতিষ্ঠান হাজির করা একাজে অবশ্যই লম্বা প্রস্তুতি ও সময় লাগবে; আর তা করার জন্য উদ্যোক্তা তাও আবার একেবারে প্রাথমিক উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস। যেটা ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা – এই পাঁচদেশের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি এক প্রাথমিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান মাত্র।  আর এই মাত্র পাঁচদেশ সদস্য থাকা অবস্থাতেই বিকল্প  IMF-WB গড়ার আগ্রহ থাকলেও কেবল বিকল্প WB গড়ার লক্ষ্যের এক ভ্রুণ প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ইতোমধ্যেই তারা চালু করেছে গত ২০১৫ সালে। এর নাম নিউ ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক [NDB  বা এনডিবি], যেটাকে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করতে পারি। আর এই প্রথম ব্রিকসের সদস্য দেশ সম্প্রসারণের কালে ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এর সদস্য হয়ে গেছে। প্রথম আলো লিখেছে, ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য হয়। যদিও আমার ধারণা এভাবে  ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য লিখাটাও এক ভুল বুঝাবুঝির উৎস বা ভুল হবে। বরং যদি বলা যেত ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক অথবা আরেকটু পরিস্কার করে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান – তাহলে এসব কথা নয়া ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করত না। মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই এমনকি ব্রিকস নিজেই এক আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংক হতে যাচ্ছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। তা ভুল হবে।

    মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই;
    এমনকি ব্রিকস নিজেই এক বিকল্প আইএমএফ [IMF] অথবা বিশ্বব্যাংক [WB] হতে
    যাচ্ছে এভাবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। কারণ সেটাও ভুল। 

    বরং ব্রিকস হল স্রেফ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান যার ইচ্ছা আছে আগামি দিনের দুনিয়াতে
    বিকল্প  IMF এবং WB প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে এক
    নয়া  গ্লোবাল  সিস্টেমের জন্ম দেয়া।
    আর ‘ব্রিকস উদ্যোগ’ যেন জন্ম নিয়ে নেয়, গড়ে উঠে – আমেরিকা নিজেই পরোক্ষে ইস্যুটাকে এদিকে ঠেলে দিয়েছে।    

     

    আমাদের বুঝাবুঝি পরিস্কার না থাকার পিছনের অন্তত দুই সমস্যাঃ
    যতদুর লিখেছি তাতে অন্তত এতটুকু পরিস্কার যে আমাদের সমাজে বুঝাবুঝিতে ব্যাপক সমস্যা আছে। এদিকে, আমরা চাই বা না-চাই আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাতে ব্যাপক বদল ঘটে যাচ্ছে এটা অন্তত আমাদের টের পাবার কথা। এব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই অপ্রস্তুত। পাবলিক বা সরকারি হলে সেখানকার মূল ইস্যু লীগ বা বিএনপি কোনটা ভাল!!!!! কে কোনদিকে!!
    অথচ হওয়া উচিত ছিল ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে বুঝব কী করে এবং গ্লোবাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠান যেগুলো সেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছে এদের ততপরতায় যে দুনিয়ায় নয়া ব্যবস্থা চালু হয়েছিল একে বুঝবার উপায় কী? সেগুলোর ভাল-মন্দ দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারত। আর সেকাজে তরুণদের যোগ্য করে  গড়ে তোলা এটাই হতে হত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তা হয় নাই। আমরা এর বদলে কেন কমিউনিজম বা কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতায় ঈমান আনতেও হবে এবং এটাই নাকি সবচেয়ে “অগ্রসর জ্ঞান” তা মনে করে আমরা বাস্তবতা বা বাস্তব জীবনের বাইরে থাকতে চেয়েছি।  যেটা এখন পরিস্কার যে আমাদের এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতাই আসলে এক হিন্দুত্ববাদী মাত্র। আর এটাই আমাদেরকে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ায় যে নয়া ধারা একটা গ্লোবাল সিস্টেম-ব্যবস্থা খাড়া হয়ে গেছে তা বুঝতেই দেয়নি।

    বরং ব্যাপারটা হয়েছে এমন যেন, একটা জিনিষ বাঘ না বিড়াল সেটা বুঝব শিখে ফেলব কী করে সেই বুঝাবুঝির ক্ষমতা শানানো বা চর্চা করা নয়; এর চেয়ে আমরা ভাগ হয়ে গেছি এভাবে যে আমাদের মধ্যে কে কে এটাকে বাঘ বলার পক্ষে আর কে কে বিড়াল বলার পক্ষে। ফলে এরই নিট ফলাফল হল আমরা কোন পক্ষই আজ দুনিয়াকে এসব ফেনোমেনাগুলোকে বুঝতে আমরা কেউ-ই সক্ষম নই, হই নাই।
    তাই, আমাদের বোকা বোকা প্রশ্ন হল জাতিসংঘ কেন “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান” নয়। কেন কেউ কেউ ভেটো সদস্যধারী? এই খায়েস শুনলে মনে হবে প্রশ্নকর্তা খুবই বোদ্ধা! কিন্তু আসলে সে একটা পড়ালেখা না করা চটকদার তার্কিক! আবার অগ্রসরতার দাবিদার কমিউনিস্ট তাদেরও জাতিসংঘ  মানে, এই গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোন ধারণা নাই।  আর  IMF-WB  সম্পর্কে ধারণা সেটা আরো করুণ অবস্থা। কমিউনিস্টদের চোখে এগুলো হলো “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান”।   মানে যেকথা বলছিলাম বাঘ না বিড়াল এর বুঝাবুঝি ও ফারাক করতে শিখা ও জানা – এসব জানার পদ্ধতি শিখার কাজ যেখানে মুখ্য হওয়া উচিত ছিল সেসব ফেলে আমরা হয়ে গেলাম কে বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলবে এনিয়ে দুপক্ষের লড়াইয়ে বিভক্ত। IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” -এধরণের হতেও পারে! কিন্তু এর আগে এসব প্রতিষ্ঠানকে চিনব কী করে, কী করে চিনতে হয় এর জানার পদ্ধতি-উপায় কী আমরা জানলাম না। এর ম্যান্ডেট কী, এটা কী করে, কী করার উদ্দেশ্যে জন্ম আমরা কমিউনিস্টেরা তা জানি না। প্রথমে তাদের বলতে দেখলাম এরা নাকি সুদ খেতে আসছে এমন লগ্নি প্রতিষ্ঠান!!!!!  এর সোজা মানে হল IMF-WB এদের সুদহার কত তাই কোন খবর কমিউনিস্টেরা জানেই না।  আবার আচ্ছা  IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” মানে হল বাংলাদেশ যদি এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে কী বাংলাদেশ মানে ধরা যাক বাংলাদেশের অর্থনীতি কী টিকে থাকতে পারবে? কেন পারবে অথবা পারবে না তা আমাদের কমিউনিস্টেরা বলতে পারবে, মনে হয় না।  তাহলে?

    আবার দ্বিতীয় সমস্যাটা হল, একালে বিশেষ করে হাসিনার ১৫ বছরে অনেকেই আমেরিকায় বসবাসের রেসিডেন্ট পারমিট পেয়েছে। কিন্তু তাতে আবার এরা একটা কমপ্লেক্সে মানসিক জটিলতায় পড়েছে।  তারা চীন ভাল না আমেরিকা ভাল এই তর্কে অংশ নিতে চায়। তা খুবই ভাল কথা কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু তাদের যে দ্বিধা তা হল, তাদের কী আমেরিকা ভাল – একথার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলা উচিত নয়!!!!  অর্থাৎ জাতিবাদের সমস্যায় পড়েছেন তারা; যেটা অবশ্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা। আর আমেরিকা তো  হাসিনার বাংলাদেশ নয়।  তবুও কেউ কেউ আরেক ধাপ উপরে। তারা মনে করে তারা যদি অ্যামেরিকান প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে কথা না বলি তাহলে কী এটা পরে কখনও তাদের রেসিডেন্ট পারমিট বাতিলের পক্ষে যুক্তি হয়ে হাজির হয়ে যাবে? এসব!! “এক্ষেত্রে কে কী পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন তা নিয়ে আমার বলার নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, যেমন ব্রিকস বুঝাবুঝির ক্ষমতা বাড়ানো বা বুঝাবুঝির পদ্ধতিটাই জানা এদিকে কারও আগ্রহ নাই।   বরং বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলে চালিয়ে দিবে কিনা – কোনটা করবে এটা হল তাদের তর্ক। যা খুবই হতাশজনক!
    তাহলে কথা ছোট করি এখন। তাহলে যারা ১৯৪৫ সালের পরের গ্লোবাল সিস্টেমটা কেন এমন হয়ে খাড়া হয়েছিল তা বুঝতেই অক্ষম – বরং কেবল পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে থাকতে চায় বা এসেছে তারা কীভাবে ব্রিকসকে ব্যাখা করতে পারবে বুঝাবুঝি শানাতে পারবে!
    আবার  কমিউনিস্টরা মনে করেন ক্যাপিটালিজম করা অথবা মুনাফা কামানো খারাপ কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হল সেই রাম বা অযোধ্যা কোনটাই নাই, টিকে নাই। পুরানা চীনও নাই। সোভিয়েতেরও আগে সেই ১৯৫৮ সালের পর থেকে পুরান চীন নাই।   কাজেই সোভিয়েত বুঝ দিয়ে সোভিয়েতের বাইরের দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কেন? তাতে তো বাইরের সবাইকেই পাপী মনে হবে। কারণ ‘বাইরের দুনিয়া” যেটা সেটাই এখন বাস্তব দুনিয়া। কাজেই সোভিয়েতের টুলস দিয়ে ব্রিকসকে বুঝবার চেষ্টা অর্থহীন!  তাইতারা তো ব্রিকস আলোচনায় ঢুকতেই সক্ষম হবেন না; তাদের অপ্রয়োজনীয় এবং নিপাত যাক অবস্থানের কারণে! তাই ব্রিকস বুঝাবুঝি তাদের জন্য নয়!

    এজন্যই বলছিলাম, যারা বুঝতে চান তাদের জন্য তাহলে সারকথায় এর মানে আমরা এখন আরেক সমস্যায় পড়লাম যে তাহলে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক কেমন ধরণের সংগঠন যারা সেই ১৯৪৪ সালে একই [ Bretton Woods] বৈঠকে জন্ম নিয়েছিল, তা বুঝতে হবে আগে। আবার, তারা একই বৈঠকে জন্ম নেয়া হলে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক নামে আলাদা দুইটা হবার দরকার হল কেন? এসব দিকগুলো আমাদের জানতে হবে নইলে ব্রিকস উদ্যোগের কিছুই স্পষ্ট বুঝা যাবে না।  আরেকভাবে বললে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক এদের ম্যান্ডেট বা কী দরকারে জন্ম দেয়া হয়েছিল সেসব কাহিনী ঘাটতে হবে। হ্যা কিছু করার নাই। কারণ, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক তাহলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান – কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট কী? না অবশ্যই না।  তাহলে কেমন প্রতিষ্ঠান এরা? এই হল মুখ্য জানবার প্রশ্ন!

    একটা ক্লু দিয়ে শুরু করা যাক!
    লক্ষ্য করলে দেখব এক আইএমএফ ছাড়া বাকি বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ব্যাংক বা “ইংরাজিতে B” আছে। কাজেই নামের শেষে ব্যাংক আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট মনে করা অবশ্যই অর্থহীন বা মিলল না – এটুক তো বুঝাই যায়! এরপর আরও ইতিবাচকভাবে বুঝতে চাইলে লক্ষ্য করব এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইংরাজিতে B লেখা থাকার আগে বা পরে দেখেন D আছে,  যেখানে D  হল ডেভেলবমেন্ট শব্দের আদ্যক্ষর।  মানে হল বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি ইত্যাদি এরা সবাই আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান; মানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি  এরা কোন অর্এথনৈতিক জোট নয়, একেবারেই নয়। তবে এরা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক অবশ্যই।

    আচ্ছা,  ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বলতে ঠিক কী বুঝবঃ
    এর জবাব হল, ব্যাংক বলছে যেহেতু ফলে ঋণ দেয় তা হয়ত অনুমান করা যায়। কিন্তু এই অনুমান কী সঠিক? হ্যা একেবারে সঠিক।  কিন্তু এটা অবশ্যই আমাদের দেশের  প্রাইভেট ন্যাশনাল ব্যাংক বা সরকারি সোনালি ব্যাংকের মত ব্যাংক নয়। এটা হল ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক যেখানে ডেভেলবমেন্ট এর মানে করতে হবে ইংরাজিতে যেটাকে ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট [অবকাঠামো উন্নয়ন] বলে। আর সেখান থেকে ছোট করে নেয়া শব্দ শুধু ডেভেলবমেন্ট কথাটাই বাংলায় উন্নয়ন।

    আর ইনফ্রাস্টাকচার বা অবকাঠামো শব্দের ব্যবহার অবকাঠামো ব্যাঙ্ক [DB] এভাবে এই শব্দের ব্যবহার ও ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। অনেকে মার্শাল প্ল্যান কথাটা শুনে থাকবেন। বিশ্বযুদ্ধে যেহেতু তাই সেখানে রাস্তাঘাট কারখানা বাড়িঘ্অর বা পানি-বিদ্যুতের উতপাদন অবকাঠামোর এসব দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ জর্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন [reconstruction & Development (RD)] জন্য নয়া উদ্যোগ পরিকল্পনার নামই মার্শাল প্ল্যান । এখানে আমেরিকা একাই মানে  অ্যামেরিকান প্রশাসনের দিক থেকে যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল সেটাই মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিত।  সেসময়ে (RD) খুবই এক চালু শব্দ ছিল। যেকারণে আজকের বিশ্বব্যাংকের (WB) মূল পুরা নাম হল [IBRD – International Bank for Reconstruction & Development ]।  আর অবকাঠামো [Infrastructure] বলতে ঠিক কী বুঝব? কোন দেশের অর্থনীতি চালু ও সরগরম থাকার পুর্বশর্ত হচ্ছে ভাল অবকাঠামো থাকা। মানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, পানির সাপ্লাই, নিস্কাষণ ব্যবস্থা, কারখানার বর্জ্য রিসাইক্লিং, নগর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল অবকাঠামো, গ্রামীন রাস্তাঘাট ইত্যাদি গড়তে হয় আগেই। তবেই অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে এসব গড়তে হবে নামমাত্র বা কমসুদের (১% এরও কমে) ঋণে।  সেসব অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে সরকারকে ঋণ দেয়াই  বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের ম্যান্ডেট বা মুখ্য কাজের লক্ষ্য। এককথায় এগুলো কর্মাশিয়াল বা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তাই সুদ নামমাত্র। এটা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের মুখ্য বৈশিষ্ঠ। এটাই  যদিও অর্থনীতি উঠে দাড়ালে মাথাপিছু আয় বাড়তে শুরু করলে সরকারকে দেয়া এই ঋণের সুদ বেড়ে ৩% পর্যন্ত হতে পারে!
    তাহলে আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গ – বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি এই ধরণের প্রতিষ্ঠান কোনভাবেই কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট নয়। এমন মনে করা ভুল, ভিত্তিহীন। এগুলো আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান।

    তাহলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা যেটা এখন আছে আগে তা বুঝলে পরে, আগানো যাবে ব্রিকস কীঃ
    নয়া প্রসঙ্গে যাবার আগে একটা সাবধানতাঃ
    ঘরে ঢুকার আগে বাইরে জুতা খুলে ঢুকার মত পাঠকেরা দয়া করে আপনি কোন পন্থী – প্রো অ্যামেরিকান নাকি প্রো চীন অথবা ধরেন কোল্ডওয়ার কালের মত আপনি সোভিয়েত না অ্যামেরিকান পন্থী – ইত্যাদি এসব ভাগ ও আলাপ গুলো এই আলোচনা পাঠের আগে বাইরে রেখে আসেন। তাহলে এই আলোচনার কথাগুলো বুঝতে সুবিধা পাবেন।  কারণ এখানে কথাগুলো যে পন্থীরই হোন এমন সবার জন্য লেখা হয়েছে। বরং আপনি নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে রেখে পড়তে বসলেই বুঝতে ঝামেলা হতে পারে। পরে আরো বিস্তার করব সেসব কথা।

    তাহলে ব্রিকস কী ? কেমন ধরণের প্রতিষ্ঠান?
    এটা খুবই প্রতিষ্ঠত এক সত্য যে ১৯৪৫ সাল নাগাদ বিশ্বযুদ্ধে শেষে (কমিউনিস্ট নেতা স্তালিন সহ) সকলে মেনে নিয়েছিল যে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা। এর মূল কারণ হল বা তখনকার বাস্তবতা ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সকলের প্রধান খরচ এককভাবে সকলকে  যুগিয়েছিল একনাগারে চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত অ্যামেরিকান  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। অর্থাৎ মিত্রপক্ষ এই জোটের একমাত্র নেতা হয়ে দাড়িয়েছিলেন রুজভেল্ট। শুধু তাই নয় যুদ্ধে শেষে আবার ইউরোপের নানান দেশের ( এমনকি এবার কেবল মিত্রপক্ষের দেশগুলোকেই নয় সাথে হিটলারের পক্ষের দেশগুলোসহ) অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন এর খরচও যোগান  বা অবকাঠামো ঋণ হিশাবে দিয়েছিল ঐ আমেরিকা একাই। এজন্য আমেরিকা বাদে ইউরোপীয়-সহ প্রায় সকল দেশই পরে আমেরিকাকে ধরেছিল  একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে। যত সহজে এই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা কথাটা লিখলাম ততই কঠিন অনেকের জন্য এটা বুঝা বা ইমাজিন করে বুঝা কঠিন। বিশেষ করে কোন কমিউনিস্টের পক্ষে কমিউনিস্ট থেকে গিয়ে এটা বুঝা কঠিন হবে। এর অন্তত একটা কারণ হল, কমিউনিস্ট বুঝাবুঝিতে বাণিজ্য বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয়! কারণ যতই নিজেদের এরা কমিউনিস্ট বলে দাবি করুক এরা মূলত উগ্র জাতিবাদীদের মত গভীর অর্থনৈতিক জাতিবাদিও। মানে কোনকিছুই আমদানি করা যাবে না; পারলে অন্যদেশে কেবল রপ্তানি করেন – এমন চিন্তার। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ ১৫ টা আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে – এটা এত বড়। তাই ভিতরে প্রায় সব ধরণের প্রয়োজনীয় পণ্য একই নিজ সোভিয়েত দেশেই উতপাদন সম্ভব ছিল। যেটা আমাদের মত দেশের বেলায় অসম্ভব।  এই সুযোগে কমিউনিস্টদের  (অবাস্তব বা আইডিয়েল) অনুমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া, বাণিজ্য মানে তো মুনাফা কামানো যা তাদের চোখে হারাম কাজ!  অথচ খোদ কার্ল মার্কস এর কাছে এক্সচেঞ্জ [exchange] (বাংলায় বিনিময় যেমন পণ্য বিনিময় থেকে প্রেম বিনিময় বা সম্পর্ক) কেন এত গুরুত্বপুর্ণ ও প্রায় সর্বব্যাপী এক ধারণা কেন?
    অথচ আবার খেয়াল করেন মোদি যে এক উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী এবং কট্টর চীনবিরোধী। অথচ ভারতে যে মোবাইল ব্যবহার হয় এর ৭৩% মার্কেট শেয়ার হল একা চীনের। আমি জানি না কমিউনিস্টেরা এই ফেনোমেনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন! কেন এটা ঠেকানো যাচ্ছে না?

    তাই আরেক সাবধানতা -দুই বলে রাখি। গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা জিনিষটা কী তা নিয়ে আলাপেঃ
    মূলত এটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই তবে এরচেয়েও বড় এরই গ্লোবাল রূপ।  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা মানে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য যাতে চলতে পারে এর একটা সিস্টেম গড়ে তোলা। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে এত জটিল সিরিয়াস ভাবা কেন? যদি এর মূল সমস্যাটা বুঝতে পারি তাহলে সবকিছু বুঝব।
    যেমন আপনার দেশীয় মুদ্রায় কেনা-বেচা আপানার দেশের সীমানার ভিতরেই কেবল চলতে পারে। সীমানা পার হয়ে গেলে আপনার পকেটের আপনার দেশীয় মুদ্রা ভিনদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কিছুই কিনতে পারবেন না।তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধারণা লাগবে, একটা সিস্টেম লাগবে। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রতিষ্ঠান লাগবে যার কাজ হবে যেকোন দেশের মুদ্রার প্রতিদিনের বিনিয়ময় হার কী হবে তা জানানো। আর একাজ সে টেকনিক্যাল ও ইম্পারশিয়াল নিউট্রাল কোন পদ্ধতি দাড় করিয়ে সে ভিত্তিতে প্রকাশ করবে। আর যে গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান এই কাজ করবে – সেই প্রতিষ্ঠানটারই নাম হল আইএমএফ।  এসব দিকের বিপরীতে কমিউনিস্টেরা মনে করে  আইএমএফ হল নাকি কেবল শর্ত দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। না বুঝে কত কথাই না বলা যায়! কমিউনিস্টদের আরেক ভুয়া অনুমান হল, আইএমএফ এমন শর্ত দেয় বেশি মুনাফা কামানোর জন্য। এজন্য যে হাসিনা সরকার পরিণত হয়েছে বিদেশে অর্থপাচারের সরকারে ফলে হাতে ডলার শুণ্যতার সরকার, কমিউনিস্টেরা তাকে সাফাই যোগাতে চেয়ে বলছে ডলার সংকটের সব দোষ নাকি আইএমএফ এর।  কারণ নাকি আইএমএফ খালি শর্ত দেয়। আর এই ভুয়া আলাপের লেজ ধরে অর্থমন্ত্রীও সাফাই দিয়ে বলে সরকার  “আইএমএফ এর শর্তের কথা ভেবে” মানে আমল করে এবারের বাজেট দেয় নাই। মানে খুবই বিপ্লবী সরকার এটা! আর তা শুনে কমিউনিস্টেরা হাততালি দিয়ে উঠেছে।

    যে আলাপ তুলি নাইঃ
    প্রশ্ন হল ব্রিকস এক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বলছি যার লক্ষ্য আগামি দিনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প সিস্টেম আনা। এই ব্রিকস তাহলে নিজ জন্মের ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে এখনও আইএমএফ নিয়ে কিছু করছে না কেন, অগ্রগতি ধীর কেন?  জবাবটা আপাতত এক বাক্যে শেষ করব। জবাব হল, চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাটা অ্যামেরিকান ডলার কেন্দ্রিক। মানে এখন দুনিয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ৭০% এর বেশি পণ্য কেনাবেচা হয়, ইনভয়েস লিখা হয় অ্যামেরিকান ডলারে। সবার আগে এখানে বদল ঘটতে হবে; ঘটাতে হবে। অন্য মুদ্রা ইউয়ান অথবা  অন্যদেশের মুদ্রায় হতে হবে। এটাই সেই পুর্বশর্ত যা না হলে ব্রিকস উদ্যোগের সফলতা দেখাতে পারবে না। কিন্তু একালে আবার বাইডেন ডলারে বাণিজ্য করতে পারবে না এমন ডলার স্যাংশন যেকোন ব্যক্তি বা সরকারের উপর জারি করছে যথেচ্ছভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে। এটাই পরোক্ষে ব্রিকসকে আশা জাগানো হয়ে যাচ্ছে, বা সাহায্য করছে। যেটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে উপস্থিত লাভালাভ পেতে গিয়ে বাইডেন অপব্যবহার করে ফেলছেন – বলবেন অনেকে। এমন ডলারের সুবিধা অপব্যবহারের বিপদ বাড়ছে কথাটা সম্প্রতিকালে বাইডেনের  ট্রেজারি মন্ত্রী স্বীকারও করেছেন Yellen Says Sanctions May Risk Hegemony Of US Dollar।

    তাহলে আদার ব্যাপারী কথা তুললাম কেনঃ
    কথাটা আমার না স্বয়ং শেখ হাসিনার। বিডিনিউজের রিপোর্টার লিখছেন, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক আরও জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না। উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন”।

    এইকথাটাই প্রমাণ করে যে হাসিনা নিশ্চিত যে ব্রিকসের সদস্য হলে সেটা বাইডেনের আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়া বা বুড়া আঙুল দেখানো এসবের কোনটাই নয়। তিনি তো আদার ব্যাপারী, তাই এটা তিনি বুঝেন। এটা কেবল একটা ভাব ধরা যে ব্রিকসে যোগ দিয়ে হাসিনা বাইডেনের প্রভাবের বাইরে চলে যাবেন বা বাইডেনকে যেন একটা উচিত শিক্ষা দিলেন। তবে এসব কথা দলের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে কাজে আসবে এতটুকুই মাত্র।

    এছাড়া সকল পাঠককে আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেষ করব। ব্রিকসের জন্মদাতারা সহ সকল রাষ্ট্র আজও আইওএমএফ ও বিশ্যাব্যাংকের সদস্য হয়েই আছে। ছাড়ে নাই। কোনদিন যদি চীন আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল নেতার প্রতিষ্ঠা পায় কেবল তখনও হয়ত অনেক বিশ্বব্যাংকের মত সমতুল্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও দুনিয়ায় আইএমএফ হবে একটাই; তবে অবশ্যই সেটা হবে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া এক নয়া আইএমএফ!

    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ১০ঃ ১২
    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৫৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

     

    বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-4eU

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

    সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

     

    চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

    চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

    বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

    চীনা ততপরতাঃ
    এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

    নয়া ধারার জোটঃ
    কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

    নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
    তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
    কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
    এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

    যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
    অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

    তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

    এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

    আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
    এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

    ২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
    তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

    আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

    আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

    তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

    আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

    প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

    তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

    সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

    এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
    উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

    বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
    গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
    এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
    এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

    আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
    তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
    আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
    আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

    আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
    এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
    তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!

  • শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    শশী থারুরের আইএমএফ, ব্রিকস বুঝা-না-বুঝা

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৫ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-49S

     

    Ignoring BRICS is ignoring turn of history

     

    শশী থারুর [SHASHI THAROOR] একজন ভারতীয়, কংগ্রেস দলীয় রাজনীতিবিদ। মূলত, তিনি রাজনীতিকের চেয়ে বরং একজন কেরিয়ারিস্ট; তিনি প্রফেশনাল কেরিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কূটনীতি এবং গ্রাজুয়েশন করেছেন আমেরিকার স্বনামধন্য ফ্লেশ্চার স্কুল [The Fletcher School of Law and Diplomacy] থেকে। এই অর্থে তাঁর এক নামী একাডেমিক ইনস্টিটিউশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। যদিও তিনি ততটুকুই রাজনীতিবিদ হতে পেরেছেন বা চেয়েছেন যতটুকু  কেরিয়ার বাড়াতে তাঁর দরকার মনে হয়েছে। অনেকের মতে, এতে তিনি যতটা যোগ্য হয়েছেন তার চেয়ে বেশি  নিজ একাডেমিক (ফ্লেশ্চার) বড়াই বা গর্ব করে থাকেন এবং তা বাড়াবাড়ি রকম। তার সমসাময়িক বা এল্যুমনিদের [alumni] মধ্যে যারা এমনকি বাংলাদেশী (ফ্লেশ্চার) তাদেরকেও এমন অভিযোগ করতে দেখা যায়।

    মোদির ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষমতায় আসার আগের টানা দুই টার্ম (২০০৪-১৪) কংগ্রেসের মনমোহন সিংয়ের কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় ছিল; সেই সময়কালে থারুরের কেরিয়ার ও এর রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছিল। সে সময়টা ছিল কংগ্রেস সরকারের – তাই তিনি কংগ্রেস দলের (কেরালা থেকে) এমপি-মন্ত্রীও হয়েছিলেন। মানে সে সময় অন্য দলের সরকার হলে তিনি সেই দল করতেন হয়ত, এ রকম কেরিয়ারিস্ট তিনি। কেন এমন বলছি?

    বলছি, সেকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই যেমন এতদিন তিনি ছিলেন এক মোদিবিরোধী কংগ্রেসী। কিন্তু গত ৭ জুলাই ২০২২ তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate] এক আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে দেখা যাচ্ছে – অবস্থান বদলে নিতে চাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি  বাইডেনের মহাউদ্যোগে নবগঠিত বা চলতি যে ‘পশ্চিমা জোট’ শক্তি তৈরি হচ্ছে (সাম্প্রতিকালে জি-৭ আর মাদ্রিদে ন্যাটোর সম্মেলন ডেকে বাইডেন হইচই ফেলতে চেয়েছেন, ইউরোপের সাথে আমেরিকার জোটকে তিনি  ‘পশ্চিমা ব্লক জোট’  [Western bloc’s] বলে পরিচয় করিয়েছেন সেখানেই) শশী থারুর বাইডেনের এই উন্মাদনা দেখে  আর বসে থাকতে পারেননি। একেবারে এর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকালতি শুরু করেছেন। যেখানে এতদিন তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকার ভারত পলিসির ক্রিটিক।

    শশী থারুর নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।  সেখানে তার ব্যক্তি অবস্থান হিসেবে যে লাইন তিনি পারসু করতেন বা পক্ষে কথা বলে থাকেন তা হল যেমন – কেন আমেরিকা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেনমেন্টের [China Containment] এ’কাজের ঠিকা দিয়েছে; এর সমালোচক ছিলেন তিনি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই চীন ঠেকানোর পুরস্কার বা মজুরি হিসেবেই ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল।

    এই ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ প্রশ্নেই থারুর  মোদির প্রো-আমেরিকান হয়ে লেপ্টে থাকার নীতির সমালোচক ছিলেন। ফলে যেন কংগ্রেসি হিসেবেই মোদির সমালোচক তিনি, এ’পরিচয় লটকে চলতে চাইতেন। কিন্তু এবার তিনি পাশ ফিরছেন; মোদির সমালোচক হয়ে বাইডেনকে অতি আপন করে নিতে চাইছেন। যেটা অনেকে পাল্টিমারাও বলতে পারেন। কিন্তু কী প্রসঙ্গে ছিল থারুরের সেই লেখা?

    আলোচ্য সেই লেখার শিরোনাম হল  – ‘ব্রিকস থেকে ভারত কি বেরিয়ে যাবে?’ এটা বাংলাদেশে অনেকে এভাবে বাংলা করে ছেপেছে – যেটা ভালো বাংলা হয়নি। কারণ, মূল ইংরাজি ভাষ্যটা ছিল Are the BRICS Breaking Up?  বা – ‘ব্রিকস কী ভেঙে পড়বে’-এরকম।

    প্রতি বছর ব্রিকস জোটের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার গতমাসে ২৩-২৪ জুন তা হয়েছিল চীনে। একইসাথে তা বিশেষ গুরুত্বে ‘বেইজিং ঘোষণা’ [XIV BRICS Summit Beijing Declaration] বলে এক ঐক্যমতের দলিলে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। আর এবার ব্রিকস সম্মেলন হয়েছে এমন পটভূমিতে যখন বাইডেনের ‘পশ্চিমা-শক্তি’ আগেই ঘোষণা দিয়ে যা যা বলেছে এর অর্থ হয় যে, মূলত চীন ও সাথে রাশিয়া এবং এদের সহযোগী সব রাষ্ট্রকে তারা একঘরে করবে, কোনো অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্কও রাখবে না; ভিন্ন করে দিবে; যেন অ-জাত বা নিচা-জাত তারা। সেটা অনেকটা ১৯৯২ সালের আগে সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই-ব্লকে দুনিয়া ভাগ হয়ে থাকার সময়কালে দুনিয়া যেমন ছিল তেমনি।
    সেখানে আবার দুনিয়াটাকে ফিরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বাইডেনের এটা এক অবাস্তব খায়েস-কল্পনা মাত্র। যেটাকে ‘কোল্ড ওয়্যার’ [cold war]-এর সেকাল বলে অনেকে চিনে থাকে যার মূল অমন বৈশিষ্ঠ যে ব্লকে ভাগ হতে পেরেছিল যে, তাতে সোভিয়েত-আমেরিকা বলে এ দুই ব্লকের মধ্যে কোনো বাণিজ্যিক বা পণ্য-পুঁজিবিনিয়োগ বিষয়ক (ফলে  জ্ঞান বা স্বাভাবিক বাতচিত-সহ সবকিছুও) মানে ভাব বা ব্যবসা কোনোকিছুরই বিনিময় সম্পর্ক ছিল না।

    ঐ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ, খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের কোনো দেশ কেউই – ১৯৪৪ সালে আইএমএফ প্রথম  জন্ম ও গঠন হওয়ার পর থেকেই – এরা কেউ  সদস্যপদ নেয়নি। আর যে সুযোগে পরে আমেরিকাও সদস্যপদ না দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাইডেনের নয়া-কল্পনার খায়েস অনেকটা সেকালের মতই যা একালে আবার সেখানে পৌঁছানো যায় কি না; এই তাঁর আকাঙ্খা বা মনোবাঞ্ছা। যদিও একালে সে বাস্তবতাটাই নাই ভেঙে গেছে, মানে বাস্তবে তা আর উপস্থিতিও নেই। তবু এ জায়গায় বাইডেন নির্বিকার। কিন্তু জিদ ধরেছেন সেকালেই ফিরতে চান! বাইডেনের ভাষায় বললে, তার নেতৃত্ব গড়ে তোলা ‘পশ্চিমা শক্তির’ সাথে চীন ও এর বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নাকি ‘মূল্যবোধে’ [Beijing…. challenges the Western bloc’s ‘interests, security and values’] এক বিশাল ফারাক আছে; তাই তিনি যেন অবাস্তব জেনেও এমন জিদ ধরেছেন।

    এ ছাড়া এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেক তাৎপর্য ছিল, এতদিন এতে পাঁচসদস্য রাষ্ট্র শুধু অংশ নিয়েএসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম অতিথি হিসেবে আরো ১৩টি রাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। যে দেশগুলো হল – আলজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, সেনেগাল, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। আমরা বলতে পারি, এর মানে, এদের কাছে বাইডেনের উদ্যোগে নবগঠিত যে ‘পশ্চিমা ব্লক’ করেছে, চীনকে একঘরে করবে বলে হুমকি দিয়েছে- সেসব দিকগুলো এসব দেশের কাছে কোনো গুরুত্বই পায়নি। কেন এভাবে বলছি?

    গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস (BRICS) আসলে কীঃ
    এক কথায় বললে, এখনো আমেরিকা গ্লোবাল ইকোনমির নেতা হয়ে থাকলেও এর অবস্থা পড়তি শেষ পর্যায়ে। বিপরীতে চীনের নেতৃত্ব উত্থিত হয়ে তা সেই জায়গা নিতে চাইছে। আ্মাদের অর্থ-বাণিজ্যের দুনিয়া এখন এরই জংশনে আছি। আর এতে গ্লোবাল অর্থনীতি-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; যেটা নিজে আছে আবার আমেরিকার একক নিয়ন্ত্রণে।
    কারণ, নিয়ন্ত্রক আইএমএফ এর বড় শেয়ার মালিকানা একা আমেরিকার নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। এমনকি চীন উঠে এলেও তার সাথে শেয়ার শেয়ার ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। আর তা থেকেই ওয়াল স্টিটের পরামর্শে ব্রিকস ব্যাংকের জন্ম! তাহলে ব্রিকস হল সেই আগামী আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান; যখন গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল ঘটবে তখন যা কার্যকরি হবে। কিন্তু তা সক্রিয় ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে যখন চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হতে পারবে তখন। কেন? এখন নয় কেন?

    ইকোনমিক-টেকনিক্যাল কারণে একই দুনিয়াতে দুইটা ‘আইএমএফ’ ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। ঠিক যে কারণে একটা দেশে একই সাথে দুটা সরকার থাকতে পারে না। তাই ২০০৯ সাল থেকে ব্রিকসের জন্ম হলেও এখনই তা দুনিয়াজুড়ে ‘আইএমএফ’-এর সমান্তরালে সক্রিয় হয়নি, ইচ্ছা করেই।
    চীন, ভারত, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও ব্রাজিল – এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস গঠিত। যদি অনুমান করে নেই আমাদের চেনা দুনিয়ার বাইরে কেবল এই পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে সমান্তরাল আরেকটা দুনিয়া যেন আছে; তবে এখন অস্থায়ীভাবে এই পাঁচ রাষ্ট্রের জন্যই শুধু ব্রিকস যেন, আর সেই দুনিয়ায় আরেক আইএমএফ হিসেবে তা আপাতত হাজির আছে।
    এভাবে মনে করা যেতে পারে। যেদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে চীন আসীন হবে সেদিন ব্রিকস আর আইএমএফ মিলিত হয়ে এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে যাবে বলে অনুমান করা হয়। তবে তা আজকের আমেরিকান প্রভাবের (মানে লায়ন শেয়ার) আইএমএফ যেমন, সেই রকম তখন সেটা চীনের প্রভাবের একটা নয়া আইএমএফ প্রতিষ্ঠান হবে, তাতে নতুন নাম কিছু একটা হবে হয়ত বা পুরনোটাই থাকবে। কিন্তু নয়া মালিকানা শেয়ারে বড় ভাগটা চীনের পক্ষে পুনর্গঠিত হবে তা সহজে অনুমান করা যায়। কাজেই চীনকে উপেক্ষা করে নয়া দুনিয়া সাজানো বাইডেনের আমেরিকার এক মরণ খায়েশ মাত্র। অথচ বাইডেনের এ’অবস্থানের পরোয়া না করে ১৩ রাষ্ট্রের এবার ব্রিকসের অতিথি হয়েছে – নিজেদের স্বাধীন পতাকা উড়িয়ে দেয়ার ঘটনাটা ঘটিয়েছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাইডেন যেখানে চীনকে গ্লোবাল বাণিজ্য থেকে বের করে একঘরে করার জিদ ধরেছেন; সেখানে এই ১৩ রাষ্ট্র উল্টা বাইছে – এমন পদক্ষেপ নজর-আমল করার মতই বলতে হবে!

    তবে ওদিকে একই দুনিয়াতে বিশ্বব্যাংক টাইপের প্রতিষ্ঠান একাধিক হতে পারে। টেকনিক্যাল অসুবিধা নাই। যেমন ইতোমধ্যেই ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (এডিবি ADB) অথবা ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি IDB) আসলে এরা বিশ্ব ব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছে। এছাড়া চীনা প্রভাবাধীন নয়া এআইআইবি [AIIB] অথবা ব্রিকসের ভেতরেই আরেকটা ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক [NDB]’ নামে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে আছে।

    সার কথায় এতক্ষণের কথাগুলো সারকরে বললে, ব্যাপারটি হল, শশী থারুরকে এতদিন ব্রিকস নিয়ে কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি। বরং ভারত-আমেরিকার চীন ঠেকানো নিয়ে কথা বলতেন। সেই তিনি এখন “ব্রিকস ভেঙে যাবে কি না” তা নিয়ে কথা বলছেন!
    আসলে আগেও অনেকবার বলেছিলাম যে গ্লোবাল ইকোনমি বা আইএমএফ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় কূটনীতিকদের সাবধান হওয়াই ভাল; এটা সাধারণ কোনো কূটনীতির ইস্যু বলে ঠাওরে নিয়ে কথা বলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের বিদ্যের দৌড় প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে – তাই অসাবধানে এ ইস্যুর সাথে আচরণ না করা ভুল। আর ঠিক সেই ভুল ও ফাঁদে আটকে গেছেন শশী থারুর!
    আগে বলে নেয়া যাক – কেন এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ‘বেইজিং ঘোষণা’ জিনিসটা কী যার ওপরই মূলত শশী থারুর এত ক্ষোভ বা আপত্তি!

    পাকিস্তানি আবদুল রহমান মক্কিকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা নিয়ে তিন পর্যায় :
    প্রথমত, ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগের সপ্তাহে ১৭ জুন, একজন পাকিস্তানি কিন্তু আইএস সদস্য আবদুল রহমান মক্কির নাম জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকায় তোলা হবে কি না এ নিয়ে ভারত-আমেরিকার এক যৌথ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে চীন এটা আরো ছয় মাস দেরি করার পক্ষে নিজ ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে।

    দ্বিতীয় পর্যায়ে, পরের সপ্তাহে চীনে ব্রিকস সম্মেলনের ভারতের মোদি নিজ বক্তৃতায় সরাসরি এ প্রসঙ্গটা উচ্চারণ না করে তবে প্রসঙ্গটা মাথায় রেখে বলেন, ‘আমাদের (ব্রিকসের সদস্যরা) একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বোঝা উচিত, সন্ত্রাসী চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা দেয়া উচিত; যাতে এমন ইস্যুর রাজনীতিকরণ না হয়ে যায়।’

    Modi has said that the BRICS member nations should understand each other’s security concerns and provide mutual support in the designation of terrorists, asserting that this sensitive issue should not be “politicised”.

    আর এতে তৃতীয় ঘটনাটা হল, ব্রিকস সম্মেলন শেষে ‘বেইজিং ঘোষণা’ নামে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। আর এই প্রস্তাবের  বিষয়টা সারকথায় বললে – আগে জঙ্গি-সন্ত্রাসী ইস্যুসহ অন্যান্য ইস্যুতে ব্রিকস সদস্যরা  যখনই একসাথে জাতিসঙ্ঘে অবস্থান  নিতে পেরেছে তাতে কত ভাল কিছু ফলাফল এসেছে -সেসবের তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখন থেকে আবার পরস্পরের সহযোগী হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

    কেন এসব বলেও বারবার চীন-ভারত একসাথে থাকতে পারেনি :
    এর মুলকথা হিসাবে বলা যায়, গ্লোবাল নেতৃত্বের পরিবর্তনের একালে গত ২০ বছর ধরে ভারত যে নীতি অনুসরণ করে এসেছে তাতে মৌলিক বোঝাবুঝিই ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেছে বা রাখা হয়েছে বলে এর উল্টো ফলই ভারত বারবার পেয়েছে। যেমন- ভারত মনে করে এসেছে, এযুগে চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে ব্যবহার করে ভারত এদের দুজনের মাথার উপরে উঠে যেতে পারবে। নিজ ভাগ্য গুছিয়ে নিতে পারবে, কারণ ভারতের কূটনীতি খুবই চতুর!!  কিন্তু এটা এতটাই উচ্চাশা যে, এ নিয়ে কথা বলাই সময় নষ্ট। কারণ, এখানে মূল বিষয়টা – কূটনীতিক দক্ষতা দেখানোর নয়- বরং ‘নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ও তা দেখানোর’। নিজেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি করে দেখানোর।
    এতে মোদি ভাল নেতা কি না, বা দেশপ্রেমিক জাতিবাদী কি না কেবল তা দিয়ে বা এই কর্তাসত্তা দেখিয়ে দাবি করা অর্থহীন যে- ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’ অর্জন হয়ে গেছে। ফলে এখন চীন-আমেরিকাকে কূটনীতিক চাতুরি দিয়ে টেক্কা মেরে দিলেই সব অর্জন হয়ে যাবে?  না, তা হওয়ার কারণ নাই। বরং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে দেখাতে হয়। তার আগেই নিজেকে পরাশক্তি দাবি করা অর্থহীন। বাগাড়ম্বর! আর কিছু হওয়ার আগেই আমি বিরাট কিছু এই বাগড়ম্বরতাই ভারতের কিছু না হতে পারার কারণ। সর্বোপরি আছে হিন্দুত্ববাদ, এই ভুল শুধু না বিরাট ক্ষতিকর রাজনীতি।
    যেমন ধরেন, সম্প্রতি ভারতের জনসংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়েছে। বিবিসি বাংলা খবরটা ছেপেছে যেন এটা নিজেই এক অর্জনের ঘটনা।   গ্লোবাল অর্থনীতির প্রধান কেউ হতে হলে বড় জনসংখ্যা এর অর্জনের জন্য অবশ্য একটা ইতিবাচক উপায় (ফ্যাক্টর) ও সুযোগ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, বড় জনসংখ্যার কোনো দেশ হয়ে যাওয়া মানেই সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কারণ, ওই বড় জনসংখ্যাকে অর্থনীতিতে কাজে লাগিয়ে সম্পদ বানাতে রূপান্তর করতে সক্ষম হতে হবে আগে – তবেই বড় জনসংখ্যা ইতিবাচক; না হলে ওই বিপুল জনসংখ্যাই হবে তখন বড় বোঝা বা ভার।

    আর এই ভারতীয় ভুল মনোভাবকেই ফুসলিয়ে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে দিল্লিকে নিয়ে গেছে, ঠিকা দিয়েছে; মানে উল্টা ভারতকে ব্যবহার করেছে। চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়েছে। অথচ আমেরিকা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘পতিত শক্তি’। অর্থাৎ ভারতসহ উদীয়মান যেকোন অর্থনীতির জন্য বিপরীত শক্তি। কাজেই আমেরিকা ভারতের দোস্ত বা এলাই হতে পারে না!!

    এবার সুনির্দিষ্ট করে জঙ্গি ইস্যু :
    চীনের উইঘুর ইস্যু। আপনি উইঘুর বাসিন্দাদের পক্ষে চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন এবং যাওয়া উচিতও। কিন্তু এক শর্তে! তা হল – উইঘুররা আবার আফগানিস্তানে আইএসের সহযোগী হয়ে সশস্ত্র তৎপরতা করে বেড়াতে পারবে না। আসলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তালেবানেরাও উইঘুর [ETIM]  এদের এমন তৎপরতা করতে আপত্তি ও বাধা জানিয়েছে। এইখানে দেখেন এনিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত রিপোর্ট।
    কিন্তু তারা তবু ভারত ও আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। যে কাজে কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচরাও থাকছে।

    পাকিস্তানে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা ইনস্টিটিউটে হামলা বা পাকিস্তানে গোয়াদর ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে চীনা প্রকৌশলী মারতে বেলুচদের সাথে মিলে উইঘুরের বাসিন্দারা যদি তৎপরতা চালায় তবে এরপর আপনি আর একই সাথে তাদের প্রতি চীনা মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য সহানুভূতি প্রকাশের সুযোগ পাবেন না। এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরেক বড় তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, গত ২০০১ সাল থেকে উইঘুররা আমেরিকা সরকারের “সন্ত্রাসী দলের তালিকায়” অন্তর্ভুক্ত ছিল। অথচ ২০২০ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগ-দিয়ে  ট্রাম্প প্রশাসন এই [ETIM] গ্রুপকে আমেরিকান সন্ত্রাসী তালিকা থেকে মুক্ত করে দেয়। আর পরে বাইডেন উইঘুর বাসিন্দাদের উপর চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বেইজিংয়ের উপর অবরোধ আরোপ করেছে। রফতানিতে চীনা তুলা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাহলে বাইডেন আসলে কী চায়?

    সম্প্রতি পাকিস্তানি তালেবান গ্রুপ টিটিপির [Tehrik-i-Taliban Pakistan] সাথে এদের মিলিত তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তান সীমান্তে আশ্রয় অঞ্চলগুলোতে বোমাবর্ষণ করে তাদের তৎপরতা স্তিমিত করেছে। আসলে বটমলাইন হল – আপনি আরেক দেশে সন্ত্রাস উসকে দিয়ে নিজ দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত বা নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারবেন না। আমেরিকার সাথে মিলে ভারত, পাকিস্তান-আফগানিস্তানে সন্ত্রাস উসকে তোলার নীতিতে চলে তারা স্ব স্ব নিজ দেশ সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে পারবে না। ভারত-আমেরিকা মিলে পাকিস্তানে [চীনা স্থাপনা বা প্রকল্পে] সন্ত্রাসী হামলায় সমর্থন দিয়ে নিজেরা ভাল থাকতে পারবে না। সন্ত্রাস প্রসঙ্গে সবখানেই সব ফোরামেই একই নীতিগতভাবে অবস্থান নিতে হবে। এটাই একমাত্র এথেকে মুক্তির উপায়। পিস-মিল করে একেক সন্ত্রাসের ঘটনায় একেক অবস্থান নিবেন কোনটা কাছে টেনে কোল দিবেন আবার কোনটাকে জাতিসংঘের তালিকায় তুলবেন – এগুলো কোনটাই কাজ করবে না। শেষ বিচারে এসব কোন কাজের অবস্থান হবে না।  কেবল নুইসেন্স সৃষ্টি করা যাবে।

    যেমন যদি প্রশ্ন করি, ভারত মুক্কি ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে আমেরিকার সাথে মিলে ভারত জাতিসঙ্ঘে যৌথ প্রস্তাব উত্থাপনে গেল কেন? একই সাথে এ ইস্যুতে চীনের সাথে কথা বলা ও একই নীতি তৈরি করে উভয়েই তাতে চলতে চাইল না কেন? সমস্যা তো এখানেই! ভারত তো আসলে মুক্কি ইস্যুতে মানে সন্ত্রাস ইস্যুতে চীনের সাথেও এক অবস্থানে যেতে চায় না। চাইলে এই পথ ধরত। ভারত চেয়েছিল আমেরিকার সাথে গলা মিলিয়ে চীনকে জাতিসঙ্ঘের আসরে বিব্রত করতে। ভারত সমাধান চাইলে আগেই চীনের সাথেও একই অবস্থান নিয়ে কথা বলত। যেটা মোদি ব্রিকসের সভায় নিজ বক্তৃতায় বলেছেন যে, “ব্রিকসের পাঁচ সদস্যের সবাই অন্যের সন্ত্রাস নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ আমল করা উচিত”। কিন্তু ভারত নিজেই তো তা অনুসরণ না করার নীতিতে চলেছে। না হলে পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সাথে মিলে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী, উইঘুর বা আইএস সশস্ত্র তৎপরতাকে ক্রমাগত সাহায্য সমর্থন না করে তা থেকে দূরে সরে আসত! কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান থেকে সহযোগিতা পেয়ে কোন সশস্ত্র হামলা হয় নাই। কিন্তু সেজন্য ইমরানের সাথে মোদি সরকারের কোন ঘনিষ্ঠতা, কাজের আলাপ বা সম্পর্কের উন্নতিতে কোন পরিবর্তন আসে নাই। বরং পাকিস্তান-মুসলমান বলে বিদ্বেষ-ঘৃণা আরো বেড়েছে। মুসলমান কোপানো এখন আরো প্রত্যক্ষভাবে প্রতিটা ভারতীয় নির্বাচনি প্রধান ইস্যু। এরই শেষপ্রান্তে আমরা নুপুর শর্মা-কে দেখতে পাচ্ছি!!!

    আগেই বলেছি, মূল কথা্টা হল – ভারত মনে করে চীন-মার্কিন বিরোধে ভারতকে আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকতে হবে, আর এরপর এ থেকে ফয়দা তোলার কূটনীতিতে চলতে হবে। চীন-আমেরিকার বিরোধ কাজে লাগিয়ে এভাবেই নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে। যেন ভারতের কূটনীতিই খুবই বুদ্ধিমান তাই এটাই জিততে থাকবে সবস্ময়!!!  কিন্তু বাস্তবতা কী?? সময়ে তা ধরা যাক কিছুটা আদায় হলেও হতে পারে হয়ত, কিন্তু এথেকে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে কীভাবে? অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের সাথে কূটনীতিতে ওস্তাদ হওয়া বা না থাকার কী সম্পর্ক? চালাকি কূটনীতি আর অর্থনৈতিক সক্ষমতা কী এক জিনিস? না কি এটা উলটা ক্ষতি করবে? করছে!! এখানে কবি নীরব! অথচ এসব নিয়ে  নুপুর শর্মা ইস্যুতে ডুবে যাওয়া দিনে শশী থারুর এ নিয়েই আমেরিকার পক্ষে তৎপর হতে উঠে দাঁড়ানোর সঠিক সময় ভাবলেন।

    ভারত কিসে ডুবে যাচ্ছে?
    মূলত মুসলমান নির্যাতন ও কোপানো। অথচ একমাত্র  মুসলমান নিধন করেই মোদি নির্বাচনে বাক্স ভরার নীতিতে তাকে চলতে হবে বলে মনে করেন। কারণ অর্থনীতির পারফরম্যান্স আগামিতে আর ভাল করার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। সর্বশেষ ফরেন কারেন্সী্তে বিপর্যয়ের ধাক্কা আরো বিশাল। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাহার করে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে বাইডেনের দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার-  সবদেশের উপর প্রয়োগ করা ছাড়া তার অস্ত্র ভোঁতা – তাই বাইডেনের পক্ষে ভারতকে বন্ধু হিসেবে পেতে চাওয়া আবার দিল্লির ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রয়োগ না করা স্ববিরোধী।

    অথচ থারুর ভাবছেন মোদি তার মত বুদ্ধিমান নন। সেজন্যই নাকি সমস্যা!! তাই তিনি ভেবেছেন বাইডেনের এ নয়া উদ্যমে চীনের বিরোধিতা করার সময়গুলোতে একে ভারতের নিজের কাজে লাগাতে বাইডেনের বন্ধু হতে হবে ও আমেরিকার সাথে আরো ঘনিষ্ঠ ভাব দেখাতে হবে। অথচ এসব অবস্থান মোদি-জয়শঙ্কর সব উল্টে-পাল্টে যতদুর ব্যবহার করা যায় করেছেন । এরপরেই সব অকেজো অবস্থায় তারা। ভারতের উপত লাগাতর তিনবছর ধরে  মুসলমানদের উপর আক্রমণ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শুণ্যের কোঠায় আনার জন্য অবরোধ আরোপের সুপারিশ ঝুলছে। অথচ সেদিকে শশী থারুর খবর নাই। কেবল নিজেকে মোদির চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবা ছাড়া……!!!

    ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা- একথা দিয়ে শিরোনাম লেখা কেনঃ
    শশী থারুর তার লেখার শিরোনাম করেছেন ব্রিকস ভেঙ্গে যাবে কিনা এই প্রশ্ন দিয়ে। কেন?
    এনিয়ে লেখায় একটাই কারণ জানা যায় যে সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ঐক্যমত না দেখাতে পারা। প্রশ্ন হল, সেটা তো এখন দেখা যাচ্ছে তা তো না। এনিয়ে ভিন্নতা ব্রিকসের জন্মের আগে ছিল। মাঝে ছিল এখনও আছে। তাহলে এখন সেকথা তুলে এই প্রশ্ন কেন? এটাই সন্দেহজনক। এমনকি মোদি  নিজে বা  সরকারের কেউ এমন “ভেঙ্গে যাওয়া” ধরণের মন্তব্য বা ইঙ্গিত করেছেন দেখা যায় নাই।  তাহলে “ভেঙ্গে যাওয়া” নিয়ে যেন আলোচনা উঠে এর কৃতিত্ব একা থারুরের। কেন? তিনি এই ইঙ্গিত তুলে মোদির আগে বা উপরে আমেরিকার প্রিয় হতে চান? আমেরিকার নয়া এজেন্সি নিতে মোদির সাথে টক্কর দিয়ে আগায় থাকতে চান? যদিও কংগ্রেস এখনও কোথাও চীন ফেলে প্রো- আমেরিকান অবস্থান নিবে এমন ইঙ্গিত এখনও কোথাও কোন ইস্যুতে দেখায় নাই। বরং একাদেমিক বা সোশাল পর্যায়ের ঘরোয়া আলোচনায়, মোদি জমানা শেষ হলে চীন-ভারত সম্পর্ক ভাল হবে এমন ইঙ্গিত নন-পার্টিজানদের দিয়ে অনেক সময় দেয়া হয়েছে।
    তো সেটা হতেই পারে। শশী থারুর তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি অবস্থান নেন, বদলান।
    কিন্তু ২০১৬ অক্টোবরের এক সংবাদ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শশী থারুর  ব্রিকস সম্পর্কে বলছেন, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনের সুযোগ নেয়া উচিত, তাই ব্রিকস কে উপেক্ষা করলে এমন মোড় পরিবর্তন থেকে নিজেকে উপেক্ষিত করা হয়ে যেতে পারে [Ignoring BRICS is ignoring turn of history: Shashi Tharoor]। তাহলে, মিস্টার থারুর, কী দাড়ালো ব্যাপারটা?
    মনে হচ্ছে খোদ শশী থারুরেরই মোড় পরিবর্তন হয়েছে। যাহোক, সেটা হতেও পারে। কিন্তু এনিয়ে তার একটা ব্যাখ্যা পেলে আমাদের জন্য সব বুঝাবুঝি সহজ হতে পারত।  তা শশী থারুর কী এখন অবলীলায় “ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকেও উপেক্ষার” পক্ষপাতি হতে বলছেন!!!! কোথায় গেল তার সে ইতিহাসবোধ!!  কেন?

    শশী থারুর গ্লোবাল অর্থনীতির ব্যবস্থাটাই বুঝেন না তা উদামঃ
    তাই শেষ কথাটা হল – শশী থারুর যে গ্লোবাল অর্থনীতি বুঝেন না সেটাই এতে উদাম হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন “ব্রিকসকে আরও চীনকেন্দ্রিক করা হোক, সেটা ভারত চায় না।’। আসলে এই হল হাজার কথার এক কথা। গোপেন এবার ধরা পড়েছে!!!! শশী থারুর যে ব্রিকস কী ধরনের প্রতিষ্ঠান এটাই বুঝেন না, তার এক শক্ত প্রমাণ এটা।

    প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে আইএমএফ কী এবং – এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান ও গ্লোবাল ব্যবস্থাটা ছাড়া দুনিয়াতে কোন দেশ আরেক দেশের সাথে পণ্য-বিনিময়, পুঁজিবিনিয়োগ বিনিময় ইত্যাদি চলতেই পারত না কেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা ও যুদ্ধের খরচ একক বহণকর্তা হিসাবে আমেরিকার উঠে আসা ও পরবর্তিতে আবার অর্থনীতির পুণর্বাসনে রিপেয়ারে অর্থ ঢেলেছে ঐ আমেরিকাই। এরসাথে সেই উদ্যোগ নিয়ে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক  ব্যবস্থা জন্ম দিয়ে গিয়েছে বলে আজও দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা বলে একটা কিছু চলছে। তবে এটা মন্দের ভাল। আর এই ব্যবস্থা আমেরিকার দিকে কান্নিমারা ভাবেই তৈরি হয়েছে এনিয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে এই শতকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান আর চীনের হাতে নয়া ও বিপুল সঞ্চিত সম্পদের কারণে একা চীনের হাতেই সবার চেয়ে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা পুঞ্জিভুত হচ্ছে। এটাই চীনের সব ধরণের ক্ষমতা বা সক্ষমতার উতস।  এই কারণেই মূলত চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা সবখানে বেশি উঠছে। কিন্তু ঐ ১৯৪৫ সালের দিকে যদি আওয়াজ তোলা হত যে  (ঐকালের ব্রিকস মানে) আইএমএফ এই প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না, তাহলে কেমন হত?  এককথায় এর উত্তর হত তাহলে আজও দুনিয়ায় কোন বাণিজ্য-বিনিয়োগ ব্যবস্থা চালুই হত না।

    উদ্বৃত সম্পদ  বা সারপ্লাস কথাটা বুঝতে হবে। আমেরিকাই ছিল সেকালে (মোটামুটি  ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া শতক জুড়ে)  একমাত্র রাষ্ট্র যার হাতে বা যার অর্থনীতি হচ্ছিল উদ্বৃত সম্পদে ভরপুর। সেকালের কলোনি সাম্রাজ্যের নেতা বৃটিশ বা ফরাসীদেরকে ছাড়িয়ে।  ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতাই ছিল সেকালের একমাত্র ভরসা যে যুদ্ধের পরেও এই আমেরিকার ভরসাতেই, সেই প্রথম দুনিয়াতে একটা গ্লোবাল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন গড়ে উঠে। এবং তাই হয়েছিল। তাই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। তাই আমেরিকা ছাড়া বা আমেরিকা-কেন্দ্রিক নয় এমন এক আইএমএফ গড়ার কথা কেউ যদি বলে তাহলে বুঝতে হবে তিনি আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা কী ও কেন এর দরকার সেটাই আসলে বুঝেন নাই।
    এখন সেকালে কী শশী থারুর মত টেরা কিন্তু বোকা চিন্তার কেউই ছিল না যে বলে নয়া আইএমএফ কে আমেরিকা-কেন্দ্রিক করে গড়া যাবে না ???
    হা অবশ্যই ছিল।  আর সেটা হল ফ্রান্স।  ফ্রান্স আপত্তি তুলেছিল যে একমাত্র আমেরিকান ডলার-কেন্দ্রিক  এক আইএমএফ বাণিজ্য-অর্থনৈতিক  এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না। ফ্রান্সের যুক্তি ছিল অনেকটা কথিত ‘গণতন্ত্রি’ বা রাষ্ট্রের সাম্য ধারণার মত যে একা আমেরিকা কেন সব খাবে? সব কর্তৃত্ব নিবে!!
    কিন্তু  বলাইবাহুল্য ফ্রান্সের আপত্তি সবাই নাদান বালকের আপত্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কারণ সেকালে আমেরিকাই ছিল একমাত্র উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশ। আর উদ্বৃত্ব সম্পদের দেশের মুদ্রা ছাড়া  (এটাই মূল টেকনিক্যাল যুক্তি বা কারণ) ঐ একই ন্যাশনাল মুদ্রাকে একই সাথে গ্লোবাল বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। তাই সদস্য সকল দেশই একমাত্র ডলারকেই পছন্দ না হলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।   

    এখন একালে, চীনকে নিয়েও প্রায় একই আচরণ দেখাচ্ছে বাইডেনের আমেরিকা। নাদান আচরণ করছে।  আওয়াজ তুলছে বাইডেন। যেমন একটা তুলনা চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পকে নিয়ে। বাইডেন এই প্রথম এই চীনা প্রকল্পকেই চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন বলে আওয়াজ উঠিয়েছে। যদিও সবাই জানে ও বুঝছে এটা অবুঝ বাচ্চার আকাশের চাঁদ পাবার জিদের মত!
    বাইডেন বহুকষ্ট পশ্চিমের সবদাতা মিলে কুথে-কাথে ছয়শ বিলিয়ন ডলার যোগাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেবল। যদিও এখনও সে অর্থ দিয়ে কাজে নামে নাই। এর ভিতর আমেরিকা দিয়েছে মাত্র দুইশ, সারা ইইউ মিলে দুইশ আর জাপান ও অন্যেরা মিলে বাকি দুইশ বিলিয়ন এভাবে। আর  এভাবে তারা সবাই মিলে বিনিয়োগ সক্ষমতা যোগাড় করেছে ছয়শ বিলিয়ন ডলার। ভাল, খুব ভাল!!

    কিন্তু চীনের বেল্ট-রোডে বিনিয়োগ কত?  
    চীন মনে করে, বেল্ট-রোড এটা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর স্বপ্ন। সে যা হয় হোক, এর যাত্রাশুরু মাত্র এই ২০১৩ সাল থেকে।   ইতোমধ্যেই এর বিনিয়োগ চার ট্রিলিয়ন (মানে চারহাজার বিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে [China Belt And Road Projects Value Now Exceeds US$4 Trillion]।
    ব্যাপারটা সোজা। আমেরিকাও ওর অর্থনৈতিক উত্থানে যখন ওর যৌবনকালে ছিল তখন বেশির ভাগ এমন বিনিয়োগ প্রকল্প একা আমেরিকাই চালিয়েছে। সেটাই এখন শিফট করে গেছে, চীনের উত্থান ঘটছে একালে।

     তাহলে, এটা চীনা উদ্বৃত সম্পদে উত্থানের যুগঃ
    তাই সেকালে আমেরিকার নেতৃত্বে আইএমএফের বদলে একালে আমরা চীনের নেতৃত্বে হবু আইএমএফ এর ভ্রুণ হিসাবে যেন – ব্রিকসকে দেখছি। কাজেই একালে চীন ছাড়া তো ব্রিকস দাড়াবেই না। আর এতে বড় বিনিয়োগ-মালিকানাও চীনেরই হবে। যেমন এখনও আইএমএফের শেয়ার মালিকানা আমেরিকার সবার চেয়ে বেশি; তা আমেরিকা জবরদস্তিতে হলেও ধরে রেখেছে।

    তাহলে, বটম লাইন ফ্যাক্টস হল – চীন নাই এবং প্রধান ভূমিকায় নেই এটা যদি কল্পনা করি, তবে ব্রিকস বলে কোনো প্রতিষ্ঠানই হবে না, দাঁড়াবেই না। দাঁড়ানোর দরকারও হবে না।

    আসলে ব্রিকস প্রতিষ্ঠান দরকার কেন? এটা নিয়ে শশী থারুর নিজেই প্রশ্ন তুলে নিজেই যেসব জবাব দিয়েছেন তাতেই তাঁর বিদ্যা-বুদ্ধির খামতি প্রকাশিত হয়ে গেছে। যেমন তিনি বলছেন- প্রথমত, ব্রিকস বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক নাকি ভূরাজনৈতিক জোট?

    এর জবাব হল – ব্রিকস না অর্থনৈতিক না ‘ভূরাজনৈতিক’ জোট। না বুঝে প্রশ্ন তুলতে গেলে এভাবেই ধরা খেতে হবে!!!! যেমন যদি প্রশ্ন তোলা হয় – আচ্ছা আইএমএফ কী কোন জোট? অর্থনৈতিক না ভূরাজনৈতিক জোট? এটা তেমনই এক বোকা প্রশ্ন হয়েছে।  আইএমএফ মূলত এক “গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম’ খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে  আর এই সিস্টেমের মুল নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ, সাথে সহযোগী বিশ্বব্যাংক।

    আর নয়া ব্রিকস [BRICS],  এটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান। তবে পুর্ণ প্রস্ফুটিত নয় বা করা হয় নাই ইচ্ছা করেই। এক ঘরে দুই পীর থাকে না তাই।  এখন আইএমএফ কেমন প্রতিষ্ঠান এটা যখন শশী থারুর, আপনার ধারণায় নাই তখন ব্রিকসও আপনি বুঝবেন না। কেবল প্রশ্ন করবেন আর নিজের বোকামিটাই তুলে ধরবেন!

    কাজেই মুখ খোলার আগে শশী থারুরের উচিত হবে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটি কী – এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ফ্লেশ্চার স্কুল কিন্তু আইন আর কূটনীতি বিষয়ে জোর দেয় সত্ত্বেও এটা মান্টিশেডের সাবজেক্ট এমন প্রতিষ্ঠান। একথা বারবার বলা হয়েছে। তবে এর বাকি শেডগুলো স্টুডেন্টদেরকে নিজ যোগ্যতায় পূরণ করে নিতে হবে। থারুর সেদিকে মনোযোগ দেন নাই দেখা যাচ্ছে। অতএব তার এখন এসব ব্যাপারে দ্রুত মুখ খুলা এড়ায় চলা উচিত! এটা অপ্রয়োজনীয়! এজন্যই বারবার বলেছি এই যুগের কূটনীতিতে মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যা আইআর [আন্তর্জাতিক রিলেশন] এবিষয়ে পড়ুয়াদের ক্লাসের পাঠ্য না হলেও নিজ উদ্যোগে অর্থনীতি পড়ে নিতেই হবে।

    একারণে শশী থারুর নিজে বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে, ভারত ব্রিকসের সদস্য ঠিকই হতে চান। কিন্তু তার দাবি, “চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না”। এর মানে কি?  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফে কী ভারতের জন্য কোন জায়গা আছে? আইএমএফে ভারতের উল্লেখ করার মত কোন মালিকানা নাই কেন? আর সেটা কী আমেরিকা একালে ভারতকে দেওয়ার জন্য বসে আছে? দিবে? আমেরিকার প্রিয়বান্দা হতে চাওয়া  শশী থারুর কাছে এর কী কোন জবাব আছে? অতএব তাঁর না বুঝে কথা বলা বন্ধ করা উচিত নয় কী!!!

    তাহলে নবগঠিত বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান AIIB, আসেন এখানে দেখিঃ
    এটা চীনা উদ্যোগের একালের বিশ্বব্যাংক যেন। ব্রিকস (বা আইএমএফ) গড়তে গিয়ে আগেই নিজস্ব বিশ্বব্যাংকটা যেন গড়ে নিয়েছে।  ফলে চীনা প্রভাব ও সিদ্ধান্ত এখানে প্রধান ভুমিকায়। চীনের নিজের মালিকানা শেয়ার এখানে ৩০% এর মত। এটাই সবার চেয়ে বেশি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হল, ভারত যার, শেয়ার মালিকানা ১০% এর মত। আমেরিকার নাই, ইউরোপের খুব কিছু উল্লেখ করার মত নয়। অর্থাৎ আর কাউকে তেমন নয়, তবে ভারতকে  চীন ঠিকই গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসারে পাশে রেখেছে। তাতে ভারতের সাথে চীনের যতই রেষারেষি প্রতিযোগিতা থাকুক।  এটা স্বাভাবিক!

    তাহলে শশী থারুর কীবুঝে বলছেন – চীনকেন্দ্রিক  ব্রিকস তিনি চাননা?? 

    ভারী কথাবার্তা থাক একটা গল্প বলে শেষ করব।
    শশী থারুর ব্রিকস চান কিন্তু চীনকেন্দ্রিক ব্রিকস চান না। আর বাস্তবতা হল, চীন না থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে উদ্বৃত্ব সম্পদ – বিনিয়োগ দিবে কে? বুঝা যাচ্ছে এদিকটা নিয়ে তিনি ভাবেনই নাই। তাহলে আইএমএফ অথবা ব্রিকস বলতে তিনি কী বুঝছেন? কেমন প্রতিষ্ঠান এর কিছুই বুঝেন নাই। আবার  আমেরিকাকেন্দ্রিক আইএমএফ নিয়েও তার আপত্তি দেখি না। তাই সবমিলিয়ে, তাঁর এই অবস্থানেরই প্রতীক যেন নিচের এই গল্প!
    শ্রাদ্ধঃ  কোন হিন্দু ধর্মালম্বী ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সৎকারের নানা অনুষ্ঠান হয়। এই  ক্রিয়াকর্মাদি যা কিছু করা হয় একে শ্রাদ্ধ বা শ্রাদ্ধাদির নানা অনুষ্ঠান বলে। আর কয়েকদিন ব্যাপী এমন অনুষ্ঠান শেষে সাধারণত একটা নিরামিষ ভোজ বা খাওয়াদাওয়া ভিতর দিয়ে এসবের সমাপ্তি ঘটে থাকে। এখন এক ব্যক্তি দাওয়াতে এমন শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন।  কিন্তু উপস্থিত হয়ে তিনি সৌজন্য আলাপ জমাতে গিয়ে  ঐ বাড়ির কর্তাগোছের এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আচ্ছা যার শ্রাদ্ধ খেতে এলাম তাঁকে দেখছিনা? তিনি কোথায়???” 

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “শশী থারুরের ব্রিকস বুঝ!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও’নিল পাঠ


    যে নায়ক এখন ভিলেন হতে চায়?
    গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও
    ’নিল পাঠ

    গৌতম দাস

    ২৩ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46Y

     

          Brics ‘grew more than I thought’, says Jim O’Neill 2016

    The Big Issues for 2022

    জিম ও’নিল [Jim O’Neill] মূলত যুক্তরাজ্যের [UK] এক অর্থনীতিবিদ। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিট পাড়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী এক বিনিয়োগ কোম্পানি ‘গোল্ডম্যান স্যাশে’[Goldman Sachs] আর এরই প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন তিনি; আর এর পুরা সেই সময়কালটা হল ১৯৯৫-২০১৩ সাল। তাঁর প্রসঙ্গে বৃটিশ সরকারের উপস্থাপিত এক বাইওগ্রাফিতে দেখা যাচ্ছে সেখানে লেখা আছে – Jim O’Neill worked for Goldman Sachs from 1995 until April 2013, spending most of his time there as Chief Economist.। পরে ২০১৫-১৬ সালে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’ [Project Syndicate] নামে বিভিন্ন নামি-লেখকের প্রবন্ধ সংগ্রহ ও মজুদের যে ওয়েবসাইটটা আছে সেখানে ২০০৮ সাল থেকেই তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন বলে তারা জানাচ্ছে।

    গোল্ডম্যানের সাথে থাকার সময়ের তার কিছু কাজ ছিল দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাব পড়া ঘটনার একটা যা, তাকে বিখ্যাত করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই ২০০১ সালের এক নিবন্ধে তিনি প্রথম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান হিসাবে নয়া ব্রিকসের {BRICs} ধারণা (যা থেকে পরে ব্রিকস BRICS ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়) নিয়ে আসেন। কাজের অংশ হিসেবে তিনি তখন আসলে একটা নিবন্ধ বা পেপার লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকোনমিকস ব্রিকস’ [“Building Better Global Economic BRICs.”]। পরে সেই ধারণাটাই আরো সবিস্তার করেছিলেন ২০০৩ সালে সিরিজ আকারে লিখে। সেখানেই তিনি পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস-ফিগার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটা পূর্বাভাস বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে’ [China’s economy could become as large as the US economy (in nominal dollar terms) by 2040]।

    সেই ও’নিল গত বছর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর তাঁর সেই প্রথম রচনার ২০ বছর পূর্তিতে এ নিয়ে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেই একটি কলাম লিখেছিলেন। “ব্রিকস কী আদৌ কখনও জাগবে? [Will the BRICS Ever Grow Up?] শিরোনামে।  যেখানে তার আরো কিছু আপডেট মূল্যায়ন যোগ করেছিলেন।

    যদিও তাঁর ২০০১ সালের প্রথম মুখ্য মন্তব্যটা ছিল, তিনি “রাইজিং ইকোনমিজ” [Rising Economy] দেশ বলে একটা নয়া শব্দ চালু করেছিলেন। সেকালেই দাঁড়িয়ে দেখে, শতকোটির উপরের জনসংখ্যার দুই দেশ চীন ও ভারতকে এদের অর্থনীতির গ্রোথ রেট দেখে তিনি ‘রাইজিং ইকোনমি’র দেশ বলে আলাদা এই ক্যাটাগরি চালু করেছিলেন। সার কথায় বলেছিলেন, চীনা অর্থনীতি সবাইকে ছাড়িয়ে এক নম্বর অবস্থানে যাবে। আর ভারত সেকালের এশিয়ার জাপানকেও ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া আমেরিকার পরে, মানে তৃতীয় স্থানে উঠে যাবে […… India could surpass Japan to become the third-largest economy soon thereafter; ]। শুধু তা-ই নয়, তৎকাল থেকেই এক বিবেচনায় সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ব্লক বা গ্রুপের দেশ বলতে জি-৭ [G7 group] দেশগুলোকে বুঝানো হত; সেই জি-৭ ভুক্ত (কানাডা বাদে) দেশগুলোর মোট প্রবৃদ্ধির চেয়ে একত্রে এই নয়া রাইজিং ইকোনমিগুলোর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগ করলে এটাই বেশি হবে – এই ছিল তার প্রধান দৃষ্টি-আকর্ষণী মন্তব্য!! অর্থাৎ তিনি তুলনা করছিলেন সেকালের অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে শীর্ষ ইকোনমিক ব্লকের সদস্য এমন সাত দেশের সাথে রাইজিং ইকোনমিগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগফল – এটা তুলনায় ভালো ও বেশি সম্ভাবনাময় বলে দাবি উঠিয়ে!!

    স্বভাবতই জিম ও’নিল এর এই কাজ, এটা কোনো গণকের ভাগ্য গণনা ছিল না। ছিল বাস্তব পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্ট ও ফিগারের উপরে দাঁড়িয়ে করা বিশ্লেষণ। তাই ওই প্রবন্ধ সেকালে ওয়াল স্ট্রিট জগতে অর্থাৎ গ্লোবাল বিনিয়োগ পুঁজির পুঁজিবাজারের জগতে ব্যাপক আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এর মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে কখনো এতে কম হারে প্রবৃদ্ধি হলে তা গ্লোবাল বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জগতে খুবই নেতি চোখে ও ব্যবসা খারাপ যাওয়ার ইঙ্গিত বলে বিবেচিত হয়। তাদের হিসাবটা সোজা;  সেটা হল যে যত ভাল বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ততই তা আরো বড় বিনিয়োগ পুঁজির জন্য বড় চাহিদার বাজারের ইঙ্গিত আর ততই তাদের ব্যবসা  ভাল ও বাড়বার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে সেটা।
    আর এখানেই একপর্যায়ে জাতিবাদি অর্থনীতির ধারণা ব্যর্থ ও ভেঙে পড়া শুরু হয়ে যায়। কিভাবে, কেন?

    ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলতে এখানে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে:
    আক্ষরিক অর্থে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street] বলতে  সেটা নিউ ইয়র্ক শহরের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই মাত্র। আমাদের মতিঝিলের মত! কিন্তু এখানে এখন থেকে সেটা আর কেবল নিউ ইয়র্কের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই নয়, বরং প্রতীকী অর্থে এটাই গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থ – এটাকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ধরণের কোম্পানির প্রধান অফিসগুলো বেশির ভাগই নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পাড়াতেই অবস্থিত বা শুরু হয়েছিল। অনেকটা যেমন খুবই ক্ষুদ্র-অর্থে হলেও বাংলাদেশের পুঁজি ও শেয়ারবাজার বলতে ‘মতিঝিল’ পাড়া বুঝানো যায়। অবশ্য একালে “ওয়াল স্ট্রিট” ততপরতা আর কেবল ওয়াল স্ট্রিটেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছাড়িয়ে এর একটা দুবাইয়ে ও আরেকটা সিঙ্গাপুরে গড়ে উঠে ইতোমধ্যেই আসর জমিয়েছে; যদিও তা ওয়াল স্ট্রিটেরই ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বি না বরং সহযোগী হিসেবে নয়া কিছু অঞ্চলে, গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের নয়া কিছু তুলনায় ছোট কেন্দ্রভুমি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বললে এখন থেকে বুঝতে হবে এর ব্যাপকার্থে  – গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থের কথাই বলছি।

    নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের জন্ম বা যাত্রা শুরু ধরা হয় ১৭৯৪ সাল। তখনকার গভর্নর পিটার স্টাইভেসেন্টের [Then-Governor Peter Stuyvesant] এক নির্দেশে ওয়াল স্ট্রিট গড়ে উঠেছিল মূলত নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে [NYSE]। যেটার ঠিকানা ১১ নম্বর ওয়াল স্টিটে।  আর এর প্রায় শত বছর পরে ১৮৮০ এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতি তখনকার বড় অর্থনীতি ব্রিটেনকে প্রথম ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে ব্রিটিশ এম্পায়ার ছিল সবচেয়ে বড় কলোনি দখলদার যার সূর্য নাকি ‘কখনো অস্ত যায় না’ বলে গর্ব করা হত। আর এরও পরবর্তীতে আরেক বিরাট ঘটনাটা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫)। যে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, যাকে বলা হয় আমেরিকাকে দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা বানানোর নায়ক; সেই রুজভেল্ট ছিলেন আসলে প্রধানত ওয়াল স্ট্রিটেরই স্বার্থ মাথায় রেখে চলা প্রেসিডেন্ট। আর এভাবে চলে তিনিই প্রথম আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার স্তরে উত্তীর্ণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত বিপুল উদ্বৃত্ত সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, মূলত ওয়াল স্ট্রিটের কোর [core] স্বার্থে, তিনি আমেরিকাকে এই স্তরে উঠিয়েছিলেন। আর তাই দেখা যায় এই প্রেসিডেন্টের চার টার্মের সময়কালে তাঁর আশপাশের  প্রায় সব উপদেষ্টা-মন্ত্রী-পরামর্শদাতা বা দফতর পরিচালকরা যারা ছিলেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড হল যারা এর আগে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো চালাতেন, মানে ওর (ঠিক মালিক না) পরিচালন-কর্তা বা এক্সিকিউটিভ হিসাবে কাজ করেছেন।

    এখন যে প্রশ্নটা তুলব, সেটা হল নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ কি সবসময় আমেরিকা রাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল? হয়ে আছে বা থাকতে পেরেছে? এর জবাব খুঁজব এখন।

    জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ বলে নয়া টার্মে কথা বলা শুরু করেছিলেন তখনকার চীনা অর্থনৈতিক উত্থান মানে  সেটা ডাবল ডিজিট গ্রোথের (১০% বা এর উপরের জিডিপি) প্রথম দশকটা (১৯৯০-২০০০) পার হয়ে গেছে। ও’নিল মূলত চীনের এই উত্থান দেখেই ‘রাইজিং ইকোনমি’ টার্মটা আনছেন, কারণ ভারতের অর্থনীতিতে তখনও তেমন নড়াচড়া শুরু হয়নি। তবে ভারতেরও চীনের (এখন ১৪২ কোটি 2022) মতই বিপুল জনসংখ্যার দেশ শতকোটি (এখন ১৩৮ কোটি) ছাড়িয়েছে যা। যার সোজা মানে, একটা সঠিক নীতি-পলিসি বেছে নিতে পারলে এই জনশক্তিই হয়ে উঠতে পারে সম্পদ আর তাতে বিপুল উদ্বৃত্ত ও সঞ্চিত সম্পদের এক রাষ্ট্র হতে পারে ভারত। তাই চীনকে দেখেই ভারতও সেই থেকেই হতে পারে এমন সম্ভাবনাময় গোনায় ধরা দেশ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল।

    পরিস্কার করে রাখি, এখানে সেসময় বলতে তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-০৮) জুনিয়র বুশের শেষ আমল আর প্রেসিডেন্ট (২০০৯-১৬) ওবামা আমলের শুরু এদুই কালের এক মিলিত সময়কাল ছিল সেটা।
    সময়টা একই সাথে আরো অনেক কিছুর। যেমন আফগানিস্তানে বুশের ওয়ার অন টেররে পা আটকে গেছে তা টের পাবার সময় সেটা। মানে ২০০৫-০৬ সাল থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তখন আর দুনিয়াটা সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই মেরু দুনিয়া নয়। আর সেখান থেকেই এই দৃষ্টিভ্রম যে কাজেই একা আমেরিকা তখন দুনিয়াতে যা খুশি করতে পারে বাধাহীনভাবে একথায় তখন জুনিয়র বুশ এন্ড গংয়েরা ভেবেছিল – আর এটাই, তখন পরিস্কার হয়ে যায় যে এই বুঝাবুঝি ছিল ভিত্তিহীন। কারণ আমেরিকা তখন আফগানিস্তানে নিজেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে যেখানে বিজয় দূরে থাক যুদ্ধ-ফেলে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনাটুকুও নাই। মানে নিরন্তর খরচের এক অন্তহীন যুদ্ধে আটকে গেছে আমেরিকা যা থেকে কোন প্রাপ্তি বা সুফলও নাই। আর এতে খরচ জোগাতে ব্যর্থ আমেরিকান অর্থনীতি শেষে এথেকেই এক নয়া গ্লোবাল মহামন্দা্র (২০০৭-০৮) ডেকে এনেছিল বা গড়িয়ে যায়। অথচ তুলনায় তখনো চীনের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট না হলেও ৭-৮ শতাংশ চালিয়ে যাচ্ছিল। মহামন্দার প্রভাব পশ্চিমা দেশগুলোতে ছিল সর্বোচ্চ অথচ যেটা চীন-কেন্দ্রিক এশিয়া দেশে ততটা অনুভুত নয়!  ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবেঃ এতদিনের পশ্চিমের হাতে উপেক্ষিত হয়ে থাকা এশিয়ার অর্থনীতি এবার উলটা উপেক্ষিত হয়ে থাকাটাই তো তাদের সুবিধা – মানে এশিয়ান অর্থনীতি পশ্চিমের সাথে ততটা সমন্বিত বা ইন্ট্রিগেটেড ছিল না, করা হয় নাই  বলেই পশ্চিমের মহামন্দার আঁচ এশিয়ায় কম দেখা যাচ্ছিল।

    আর এসব কিছু দেখে শেষে ওয়াল স্ট্রিট আর আমেরিকা-কেন্দ্রিক বা পশ্চিমাকেন্দ্রিক থাকতে পারেনি বা চায়নি। বিদেশে যেখানেই আয় করুক, আমেরিকাতেই তাকে উদ্বৃত্ত সম্পদ ফেরত নিতে হবে, এই বাধ্যবাধকতা এই প্রথম সে ভুলতে শুরু করেছিল। এশিয়াতেই নয়া বিনিয়োগ বাজার, তাই নয়া চাহিদার দেশ অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে যায় সে!! এটাই জিম ও’নিলের পর্যবেক্ষণের মর্মার্থ বলে দাবি করা যায়!  আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে রিপোর্টগুলোতেও তা প্রতিফলিত হতে থাকে। সার কথায়, ওয়াল স্ট্রিট আর জাতিবাদি থাকেনি, পারে নাই। গ্লোবাল স্বার্থ হয়ে উঠেছিল। রুজভেল্টের আমেরিকায় এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিটের সাধারণ স্বার্থ আর আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হয়ে থাকতে পারে নাই। এক ব্যাপক বিচ্ছেদ ঘটে যায়। এটা মনে করা ভুল হবে না যে এই বিচ্ছেদের ঘটনাটাই জিম ও’নিল এর পর্যবেক্ষণে ধরা পরেছিল। আবার এখানেই জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ এই তত্ব আনলেন এটাই আসলে তখন ওয়ালস্টিটের আচরণের সাফাই হিসেবে ব্যবহৃত হতে থেকেছিল। এক কথায়, এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিট আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ ফেলে চীনা ‘রাইজিং ইকোনমি’র ভেতরে নিজের ‘কোর’ মানে, গ্লোবাল বিনিয়োগের বাজার এই মৌলিক স্বার্থ খুঁজে পেয়েছিল!

    ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সংস্কারঃ
    সাথে আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ছিল ২০০৯ সালের। যেমন একটা হল,  বিশ্বব্যাংকের ঢেলে সাজানোর ঘটনা। না, সবটা বোধহয় ঠিক বললাম না। আসলে এটা হল ঘটনার কেবল বাইরের দিকটা দেখে বললে। বিশ্বব্যাংক জন্ম থেকেই এর “অভ্যন্তরীণ তথ্য উন্মুক্ত নয়” – এভাবেই গড়ে উঠেছিল। এর সম্ভাব্য দুটো কারণ আছে মনে করা হয়। এক. বিশ্বব্যাংক কাজের ধরণ অনুসারে কোন সাধারণ আম পাবলিককে সার্ভিস দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। তবে পাবলিকের যে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান আছে মূলত এর সাথে তার কারবার ও ডিলিং [dealing]। আর সেটাকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে এর কান্ট্রি অফিসগুলো (যেমন বাংলাদেশের বিশ্বব্যাংক অফিস) পাবলিক থেকে দূরে পাবলিক ডিলিং না করেও চলতে পারত। সাধারণ তথ্য যেমন কোন দেশের মৌলিক তথ্যাবলী বা কান্ট্রি প্রোফাইল – এ’তথ্যও উন্মুক্ত ছিল না তখন। দুই. এরই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়, কোল্ডওয়ার যুগ বলে তখন ছিল  কড়া কমিউনিস্ট ভীতি। এ’ভীতির কারণে নিজেকে ঢেকেঢুকে কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহির্বিভাগ (ERD বা এক্সটারনাল রিসোর্স ডিভিশন) আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) সাথে যোগাযোগ রক্ষার মধ্য দিয়েই নিজ তৎপরতা চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না। আগের এই ঢেকেঢুকে চলার সিদ্ধান্ত ভেঙে নিয়ে বিশ্বব্যাংক উন্মুক্ত হয়ে যায় ২০০৯ সাল থেকে। এমনকি এখন তো কান্ট্রি অফিসেরও ফেসবুক পেজ আছে যেখানে অনেক ইস্যুতে ওপেন আলোচনাও দেখতে পাওয়া যাবে। প্রশ্নোত্তর ও তথ্য সেখান থেকে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া প্রতিটি ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের কান্ট্রি অফিসগুলো বা হেড কোয়ার্টারের বহু কিছুই এখন নানা ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি যে কেউ আম-পাবলিক নিজেই জানতে পারে। একালে ‘ডিসকাশন ব্লগও’ [discussion blog] আছে যার বুলেটিন পাওয়া বা ওয়েবে সদস্য হওয়া যায়। কিন্তু কেন এই উন্মুক্ততা? সেটাও জিম ও’নিল-এর পরোক্ষ প্রভাব। কিভাবে সেটা?

    আসলে রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর মোট প্রভাব তখন ক্রমশ জি-৭ উন্নত অর্থনীতিগুলোকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে এ’কথার গুরুত্ব তখন কেউ অস্বীকার বা ছোট করে আর দেখতে পারছিল না। এ’ছাড়া ওয়াল স্ট্রিট আপন স্বার্থেই এসব ঘটনা ও তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছে। মূল কথা, এর আরো কিছু প্রভাব ছিল মারাত্মক।

    যেমন, বিশ্বব্যাংকের প্রাকটিস বা নিয়ম হল, নিজ অর্থনীতির সাইজ-প্রভাব অনুসারে সদস্য দেশকে কম বা বেশি চাঁদা দিয়ে শুরুতে বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিতে হয়। আর পরে যাদের অর্থনীতির সাইজ ব্যাপক বড় কিছু হয়ে যায় ততই বাড়তি চাঁদা দিতে হয়। এখন এই চাঁদা মানে কী আবার? চাঁদা মানে, বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা আসলে এক শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানির মত আর সদস্য দেশগুলোর চাঁদা দেওয়াটাই আসলে সদস্য দেশের বিশ্বব্যাংকের শেয়ার কেনা হিসেবে দেখা হয়। কাজেই সদস্যদেশের অর্থনীতি যত বড় হয়ে যাবে ততই বড় শেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু ব্যতিক্রম হল, একেবারে বড় মালিকানাগুলোর বেলায়। যেমন এখন সবচেয়ে বড় মালিকানা আমেরিকার; তা ১৬.৫৭% [অবশ্য গত ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এটা ১৬-১৮% এর মধ্যে নড়াচড়া করেছে]। পরে জাপান ৮.৩২%। আর এরপর ইউরোপের বড় অর্থনীতির চারটা দেশ ৪-৫ শতাংশের বেশি কেউ নয়। তুলনায় বাংলাদেশ ১ শতাংশের শতভাগের এক অংশের মত, এরকম। নিচের এই ডাটা পেয়েছি  সরাসরি বিশ্বব্যাংকের সাইট থেকে, তবে একটু পুরানা। যা কম্পাইল করা হয়েছে ২০১৯ পর্যন্ত আর প্রকাশিত ২০২০ সালে। [নিচের এই তথ্য যথেষ্ট আপডেটেড না, তবে এর চেয়ে আপডেট সংগ্রহ আমার নাগালে আসে নাই।]

    Who are the World Bank’s shareholders and
    how much capital do they own?
    • 189 member countries have subscribed to US$280
    billion of subscribed capital (paid in capital + callable
    capital)
    • The largest shareholders include the United States
    (16.57% of total subscribed capital), Japan (8.32%),
    China (4.59%), Germany (4.16%), and France and
    the United Kingdom (with 3.90% each
    source: WORLD BANK 2020

    কিন্তু বিরোধ বাধে চীন নিজের শেয়ার বাড়াতে চাইলে। চীন তার নয়া অর্থনীতির সাইজে শেয়ার মালিকানা বাড়াতে চাইলে তাতে আমেরিকা মানে তার সিনেট সেই ফাইলে অনুমোদন দেয়নি। মানে অভ্যন্তরীণভাবে বিশ্বব্যাংক টেকনিক্যালি চীনের প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিলেও তা পাস করতে আমেরিকান মতামত চেয়ে পাঠালে সেই ফাইল আর (মূলত আমেরিকান সিনেট থেকে) ফিরে যায়নি। ফলে চীনের শেয়ার (২০১৯ পর্যন্ত) ৪.৫৯% এর নিচেই থেকে যায়। তুলনায় ভারতের শেয়ার হল ২.৯১%, এটা ভারতের সরকারি তথ্য।  

    আসলে বিশ্বব্যাংকে চীনের মালিকানা বাড়ানোর আবেদনে সাড়া না দেয়া  এটা ছিল চীনের প্রতি আমেরিকার এক অব্যক্ত মেসেজ। মানে কিছু না বলে যেটা ইঙ্গিতে বলা হয়ে যায় তা হল যে, আমি আমেরিকা বিশ্বব্যাংকের মালিকানায় চীনের শেয়ার বাড়াতে দিব না। একে নিজ নিয়ন্ত্রণেই রাখব। আমেরিকা জানত [জিম ও’নিলের ততপরতার কারণে অনুমানে] যে, চীন তাহলে নিজেই আলাদা করে বিশ্বব্যাংক খুলবে। আর সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সেটাই তুলনায় আমেরিকার স্বার্থের জন্য ভাল বলে আমেরিকার কাছে মনে হয়েছিল।

    আসলে ততদিনে, মানে সেই ২০০৩ সাল থেকে জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমির’ তত্ব দিচ্ছেন, সম্ভবত পরোক্ষে তিনি চীনের রাইজিং অবস্থা দেখে আগে থেকেই চীনকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন যে, চীন যেন নিজ প্রভাবাধীন (আমেরিকান প্রভাবের বিপরীতে) নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান দুটোই গড়ে নেয়।

    পাঠককে মনে করিয়ে দেই, জিম ও’নিল-এর কথাগুলো কিন্তু আদতে ছিল ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলা কথা। অর্থাৎ যে কথা এখন সহজ করে বলতে পারি যে, আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট স্বার্থ সে রাইজিং চীনা সরকারকে পরামর্শে দিয়ে বলে চলছিল যে, নিজ প্রভাবাধীন নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান খাড়া করে নাও। অর্থাৎ সেই থেকে ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আর জাতিবাদ আমেরিকান সীমায় থাকেনি, থাকতে চায়নি বা থাকলে নিজ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যেত।

    অতএব সেই থেকে ও’নিলের BRIC বা ব্রিক ধারণাটা সবল হচ্ছিল। আর ২০০৯ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সংস্কার এবং উন্মুক্ত করা আর সেই সাথে চীনকে প্রত্যাখ্যানের সেই বছরই ব্রিকস ব্যাংক [BRICS Bank] নামে চীনা প্রভাবাধীন নয়া প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে যায়। এখানে একটু তথ্যের কারেকশন আছে। জিম ও’নিলের প্রথম আইডিয়াটা ছিল চীন, ভারত আর সাথে রাশিয়া ও ব্রাজিলকে নিয়ে মানে তাদের দেশের নামের প্রথম অক্ষরত নিয়ে BRIC বা ব্রিক এভাবে। ২০০৯ সালে এই চার দেশ নিয়েই ব্রিক নামে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও সাথে জুড়ে নিলে এবার নয়া নাম হয়ে যায় ব্রিকস [BRICS]।

    এখন একটা প্রশ্ন, তাহলে ব্রিকস ব্যাংক যদি এর নাম হয়  তো সেক্ষেত্রে এটা একটাই প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা দুটো; যদিও তাদের সমন্বয় আছে। এমনকি কোনো দেশের বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে সেই দেশকে আগে আইএমএফের সদস্য হতেই হয়। সেটা হয়ে থাকলে এবার বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার সে যোগ্য হয়। তা হলে ব্রিকস ব্যাংক কার সমতুল্য, আইএমএফ না  বিশ্বব্যাংক এর? এর উত্তর হল, আসলে ব্রিকস ব্যাংকটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মিলিত ধারণা। আর এর ভেতরে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ [NDB] বলে বিশ্বব্যাংক সমতুল্য আরেকটা নয়া প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে।

    কিন্তু জিম ও’নিল এখন অন্য কিছু বলছেনঃ
    গত ১৭ মে ২০২২ ও’নিল আরেক কলাম লিখেছেন সেই প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ওয়েবেই। যার শিরোনাম হলো ‘ফের গ্লোবাল মহামন্দা কী আসন্ন?’ [Another Global Recession?]  আর আমাদের প্রথম আলোও এ’লেখার একটা অনুবাদ ছাপিয়েছে।   এখানে পাঠককে আবার একটু মনে করিয়ে দেই। এখানে “এখন” মানে সুনির্দিষ্ট করে যখন বাইডেন তার নয়া ও শেষ অস্ত্র [স্যাংশন ও মানবাধিকার] নিয়ে হাজির যেটাতে জিদ আছে কিন্তু সাফাই নাই। মনের গহীনের জিদটা হল যে, দুনিয়াতে সাদা চামড়ার (সাদা ককেশীয় এথনিসিটি) শাসন চলে আসছে, যা প্রায় ৫০০ বছর [মোটামুটিভাবে ১৬০৭ সালে আমেরিকাকে (আজকের ভার্জিনিয়া রাজ্য) বৃটিশ কলোনি করা দিয়ে শুরু থেকে আজও] ধরে টিকে আছে। এটা যেভাবেই হোক বাইডেন আরো টিকিয়ে রাখবেন। চীনা অবজেকটিভ উত্থানের বিরুদ্ধে  জিদ-জবরদস্তিতে যা করা যায় এমন সবকিছু করে হলেও টিকে থাকবেন! তাতে অবজেক্টিভ বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বললেও তিনি জিদ ধরে আড়াআড়ি বসে থাকবেন। একবার বলবেন অবরোধ আর মানবাধিকার  নামে নতুন দুটো অস্ত্র এনেছেন। এতে আর অর্থ-অস্ত্র কোনটাই আর লাগবেই না। আমেরিকা এমনিতেই ইউক্রেনসহ সবকিছুতেই জিতে যাবে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় শেষ বা আপস হতে যাওয়া অবস্থায় পৌছে গেলে এবার নয়া ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ-অস্ত্র ঢেলে সেই মরা যুদ্ধকে তিনি আবার চাঙ্গা করছেন। এমনকি এতে ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই মিলে আপোষের অর্থের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই যে আসলে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব” জাতিবাদ বা সাদা চামড়ার শাসনের ঘোর সমর্থক তা এখানে উদাম হয়ে প্রকাশিত। কিন্তু এতে স্বভাবতই আমেরিকান জন্য বড় যুদ্ধের খরচ বাইডেন ডেকে নিয়ে আসছেন, যা বইবার অর্থনৈতিক অবস্থা আমেরিকারই নাই, এই দুইদল তা জানা সত্বেও একাজ করছে অবলীলায়!! অর্থাৎ আবার আরেক ভয়াবহ হিটলারিজম মানে এক এথিনিসিটির শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম কিন্তু তফাত এই যে এবার জর্মান শ্রেষ্ঠত্বের বদলে সাদা ককেশীল শ্রেষ্ঠত্ব – করে হলেও তারা দুনিয়ার নেতা থেকে যাবেই। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব যেন গায়ের জোর জবরদস্তি বা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করার বিষয়???

    তাই এ অবস্থায় ও’নিল নিজের এ লেখার সারাংশ শুরুতেই লিখছেন এভাবেঃ
    এককথায় ও’নিলের এই লেখা পড়লে অনুমান হবে ও’নিল তিনিও সম্ভবত দুনিয়া থেকে সাদা শাসন উঠে যাওয়ার শকুনি শোকের ফাঁদে পড়েছেন!!!
    যদিও তিনি এলেখার শুরুতেই নিজ লেখার সারাংশ করে বলছেন, “উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে আসল আয় ক্রমেই কমছে, ওদিকে চীনের দুর্বল বাইরের চেহারা আর সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে লতিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা এসব কিছুর মধ্যে করোনা মহামারীর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বদলে নিচে চলে যাওয়া দেখে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্তে¡ও নীতিনির্ধারকদের এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, যাতে ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠা যায়!

    Between falling real incomes in advanced economies, China’s weakening outlook, and the uncertainties stemming from Russia’s war in Ukraine, there is more than enough reason to worry that the post-pandemic recovery is giving way to a downturn. But there is still much that policymakers could do to mitigate the blow.

    এ বক্তব্যের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, ও’নিল গ্লোবাল অর্থনীতি করোনা মহামারী ক্ষতি কাটিয়ে উঠার বদলে নিচের দিকে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু তাতে বাইডেনের বর্তমান অনুসৃত নীতি-পলিসিই যে এটা তৈরি করছে সেদিকে জিম ও’নিলের ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি বাইডেনের নীতিতে খারাপ ভুমিকা বা আপত্তির কিছু দেখছেন না। একেবারে বাইডেনের নামই তিউনি উচ্চারণ করেন নাই। কেন? ভাসুরের নাম? পতিত বৃটিশ অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাইদেনকে দরকার? তাই এখন কিছু বিপক্ষে বলা যাবে না??   আসলে সবমিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে হয়েছে এই পশ্চিমা বায়াসড অবস্থানটাই তিনি গ্রহণ করেছেন। সাধারণত পলিটিক্সের চেয়ে যার আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি হয় তিনি যেকোনো উপায়ে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে খাড়া অবস্থান নেন। কিন্তু এখানে তিনি ব্যতিক্রম, তা করেননি।
    আবার ধরা যাক পুতিন সবকিছুর জন্য দায়ী তবু সেক্ষেত্রে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ানোর দিকে আরো ঠেলে দেওয়া কী বাইডেনের নীতি-পলিসি হতে পারে? করোনা উত্তরকালে অর্থনীতির রিকভারি গুরুত্বপুর্ণ, খাদ্যের মূল্য নিচে নামানো গুরুত্বপুর্ণ নাকি পুতিনকে শায়েস্তা?

    আবার ও’নিল রাজনীতির প্রসঙ্গেই যদি ঢুকলেন তা হলে বাইডেন কেন বিনা অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের কথা বলে শেষে প্রায় আপস হয়ে যাওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে টেনে অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের মধ্যে ঢুকালেন এটাও ও’নিলের চোখে আমল পায়নি। তা হলে তিনিও কী এখানে চীনা উত্থানে সাদা শাসন হারানোর আশঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত? অথচ তিনিই না অবলীলায় ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে মানে, পরোক্ষে রাইজিং চীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ফোরকাস্ট করেছিলেন এবং তার ফোরকাস্ট ২০৪০ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে, যা এখন ‘২০২৮ সাল’ বলছে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিসংখ্যান স্টাডির লোকেরা। তিনি এখন তা হলে পিছাচ্ছেন কেন? পালাচ্ছেন কেন? এখানে তিনি নিজ পুরনো অবস্থানের বদল সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে!!!

    আবার চীনের বর্তমান লকডাউন প্রসঙ্গে দুই রকম কথা বলছেন। এক দিকে বলছেন, ‘সেই দিক থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক থাকার ব্যাপারে চীনের সমালোচনা খুব কমই করা যেতে পারে” [China can hardly be criticized for being generally cautious. ]।’ আবার বলছেন, চীন “কোভিডের বিরুদ্ধে এত কড়া অবস্থান নিবার বদলে শিথিল করলে চীনা অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; এটা চীনের জন্য ভাল, গ্লোবালিও ভাল”!  আসলেই জিম ও’নিল কী বলছেন এগুলা????

    শেষে বলছেন তিনটা ফ্যাক্টরের কথা, আমেরিকান ফেডারল রিজার্ভসের সিদ্ধান্ত, চীনা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর পুতিনের কথা। প্রথমত তিনি বাইডেনের নীতি-পলিসির উপর দুনিয়ার যেন কিছুই নির্ভর করে না, এই মিথ্যা অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। অর্থাৎ দুনিয়া উলটে গেলেও এমন অবস্থানে থেকেই তিনি কথা বলবেন বলে আগেই ঠিক করেছেন।  কারণ এই তিন ফ্যাক্ট্রের মধ্যে বাইডেনের সিদ্ধান্ত-করণীয় কোনোই ফ্যাক্টর নয়, তিনি ধরে নিয়েছেন। তাই এই তিনের একটাতেও বাইডেন ফ্যাক্টর নয়।  অথচ বাইডেন ৪০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ নিয়েছেন যেন তিনি ইউক্রেনকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে এই যুদ্ধ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত চালাতে পারেন। আর মরা যুদ্ধকে জাগিয়ে আরো কমপক্ষে ছয়মাস জীবিত-যুদ্ধ করে দেয়া মানেই সরাসরি অন্তত জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম বা খাদ্যের দাম কমার বদলে আরো বেড়ে যাবার সব লক্ষণ নিশ্চিত করেছেন বাইডেন। অথচ ও’নিল এখানে এসে বাইডেনের নাম উচ্চারণই করছেন না।  সোজা কথায় ও’নিল দেখা যাচ্ছে তাঁর নিজ কথা আর কাজের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। তিনি কেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা বাইডেনের নীতির সমর্থক হচ্ছেন এর কোন কারণও বলছেন না। এমনকি তিনি যে সমর্থক তা পাঠক যেন বুঝবে না বলে ধরে নিয়েছেন!

    সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, বাইডেনের হাতে এখন আরো ছয় মাস আরামে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ আছে। মানে, যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অথচ ও’নিল এটাকে কোনো ফ্যাক্টর মনে করছেন না!! তার এ অবস্থানের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিটের কোনো স্বার্থ কিভাবে লুকিয়ে আছে? তিনি নিশ্চুপ!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২১ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জিম ও’নিল : যে নায়ক এখন ভিলেন!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]