Category: ফেডারল রাষ্ট্র

  • কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে

    কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে
    গৌতম দাস
    ২০ জুন  ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Dk

     

                     MODI & MUNTASHIR

    ইংরাজিতে জাতি শব্দটা বুঝাতে মূলত দুইটা শব্দ হয় – Race ও Ethnicity। অর্থাৎ ইংরাজির Race ও Ethnicity এই দুটা শব্দকেই আমরা বাংলা করি জাতি বলে। খুবই সংক্ষেপে বললে এরমধ্যে Race অর্থে জাতি মানে যেটা  মানুষ প্রজাতির দুনিয়ায় আগমন বা উদ্ভব ঘটেছিল কয়েক মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা যেটা; এই অর্থে তা মানুষ জাতি [Human Race]। এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের রেস অর্থে বা রেসিয়াল বা জাতিগত ভিন্নতা – তা আবার বুঝা সম্ভব তার রক্তের ডিএনএ এর ভিন্নতা থেকে।

    বিপরীতে বাংলায় লেখা আরেক জাতি এই শব্দ ও  ধারণা হল যেটা Ethnicity অর্থে জাতি। যেটা একাল থেকে মাত্র মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা – এথনিক জাতি। মানুষ কালচারাল যা কিছু আছে তাতে ভাষা, ধর্মীয়, সামাজিক, প্রধান খাদ্য, রান্নার প্রক্রিয়া, বিশ্বাস মিথ ইত্যাদি সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত – এটাই এথনিক জাতি পরিচয়।  যেটাকে আমরা সভ্যতা বলি অথবা, অন্যভাষায় বললে দুনিয়ায় মানুষ যবে থেকে আগের যাযাবর জীবন ছেড়ে প্রথম কৃষিকাজ এর জীবন শুরু করেছিল। দুনিয়ার কোন এক ভুগোলে থিতু হয়ে বসে গিয়েছিল। আর তাতেই একেকটা সিভিলাইজেশন এর সুত্রপাত ঘটেছিল। এই অর্থে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ। এটাকেই বলে এথনিক জাতি পরিচয়।  আর পরে সিন্ধু সভ্যতারই উপবিভাগ মানে এরও আবার সাব-এথনিক জাতি পরিচয় হিশাবে আমরা বাঙালি।
    উপরের কথাগুলো হল জাতি ধারনাটার সবচেয়ে ইতিবাচক উপস্থাপন। আর এর বাইরে জাতি পরিচয়ের বা জাতি বা জাত পরিচয় নিয়ে কথাবার্তার সবটাই মূলত নেতিবাচক। কারণ সেসবগুলোতে জাত পরিচয় নিয়ে আলাপ মানেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্য সকলকে ঘৃণা করা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো। যেখানে মূল কথাটা হল আমার জাতই শ্রেষ্ঠ  – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ।
    এই ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিপদজনক দিকটা হল – নিজেকে জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধে বলে উপলব্দি ও হাজির করা মানেই অন্য সকল জাত-পরিচয়ের মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, নিচা দেখানো ইত্যাদি আর এখান থেকেই যেহেতু আমি শ্রেষ্ঠ কাজেই আমি অন্য সকল জাত (বা ধর্ম)-পরিচয়ের মানুষকে নির্মুল করতে পারব সেটা জায়েজ হবে মনে করা শুরু হয়। আর এই নির্মুল বলতে অন্য জাত-ধর্ম পরিচয়ের মানুষকে হত্যা, দখল করা নইজের পায়ের নিচে রাখা অধীনস্ত করে রাখা এমনকি কলোনিদখল করা ইত্যাদি এসব কাজকরার স্বপক্ষে নিজ জাতশ্রেষ্ঠত্ব বোধকে সাফাই হিশাবে তুলে ধরা শুরু হয়। এটাই, এই প্রেজেন্টশন এভাবে বয়ান হাজির করা এটাই  মোদির হিন্দুত্ববাদ। এটাই হিটলারিজম – জর্মান জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ।

    তত্বকথা শেষ। এবার ব্যবহারিক কথাবার্তা। আর এর এক নয়া নমুনা হল ভারতের ‘আদিপুরুষ’ সিনেমা। যেটা গত ১২ জুন রিলিজ হয়েছে।  পাঠক সকলকে চিনে রাখতে বলব মনোজ শুক্লা নামের এই ব্যক্তিকে। যার ছবি উপরে দিয়েছি। অনেক স্ময় তাকে মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা নামেও চিনবেন।
    ইনিই হচ্ছেন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় পেমেন্ট পান এমন  -সিনেমা, নাটক বা টিভি অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডায়লগ লেখক। বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ নামে পৌরাণিক বা মিথিক্যাল ঘটনাবলী যদি আপনার কাহিনীর চাহিদা হয়ে থাকে। এছাড়াও ভারতের জাতীয় দিবসগুলোতে সেদিনের টিভি প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট লিখার কাজে। আর বলাই বাহুল্য এসব দিন মানেই ভারতের সেনাবাহিনীর বর্ণনা আর এখান থেকে সবচেয়ে সহজে এবং অবশ্যই থাকবে মানে এতে ভিলেন হয়ে যে জিনিষ থাকবে তা হল পাকিস্তান; মানে মুসলমান-ইসলাম। এবার হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান যেটা সেখানে হাজির থাকবে এরই পপুলার কঠিন সুরসুরি দেয়া আবেগের স্ক্রিপ্ট লেখক হিশাবে পাবেন এই মনোজ মুন্তাশীর-কে!

                                                                                 MANOJ MUNTASHIR SHUKLA

    এমনিতেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান জিনিষটাই থকথকে আবেগের; যা স্থির মনে মানুষকে চিন্তা করতে দেয়না বরং ক্রমাগত আবেগে ভেসে যেতে উস্কানি তুলে চলে। কোন র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিও মানুষের মধ্যে কাজ শুরু করার আগেই ভোক্তা মানুষ বা ক্লায়েন্টকে মনোজ মুন্তাশীর তাঁর আবেগের সুরসুরি তুলে দখল নিতে হবে – এটা মনোজ খুবই ভাল বুঝেন এবং দক্ষ তিনি। ফলে এরপরে আবার মানুষের র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিতে চিন্তা পেরিয়ে স্পিরিট বা স্পিরিচুয়াল স্তরে যেতে মানুষকে মনোজ কোন সুযোগই দেন না।এই হল  মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা। একালের হিটলার মোদি বা হিন্দুত্ববাদ এর মূলত সাফাই বয়ান লেখক। অথচ বাইরে যার পরিচয় পান্ডুলিপি – অভিনয়ের পান্ডুলিপি লেখক বা প্রণেতা।

    মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা তিনিই আদিপুরুষ সিনেমার ডায়লগের লেখক। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “…এদিকে ‘আদিপুরুষ’ সিনেমার সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাশীর শুক্লা সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, যেসব সংলাপ দর্শকদের আঘাত করেছে, সেগুলো সংশোধন করা হবে”।
    আর প্রথম আলোও খুবই ইনোসেন্টলি ছেপেছে, “……এদিকে ‘আদিপুরুষ’ ছবির সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাসির শুক্লা টুইট করে জানিয়েছিলেন যে এই ছবির বিতর্কিত সব সংলাপ বদল করা হবে। মনোজ এক বড়সড় পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমি এবং ছবির নির্মাতা আর পরিচালক মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এই ছবির যেসব সংলাপ আপনাদের আঘাত করেছে, আমরা তা সব সংশোধন করব।’ আর এই সপ্তাহে তা ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হবে”।

     

    সবাই নিস্পাপ, ইনোসেন্টঃ
    মনোজ মুন্তাশীর থেকে প্রথম আলো অথবা চাই কী দর্শকেরা যাদের ভিতর হিন্দুত্ব জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের জোশ-চেতনা জাগরিত হয়েছে এরা সকলেই নিজেকে নিস্পাপ হিসাবেই দেখছেন। যাদের সবার কম কথাটা যেন এরকম – আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা দেখেছি কেবল – অথবা আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা খবরাখবর নিয়ে পত্রিকার বিনোদন পাতা চালিয়েছি যাতে ভারতীয় সেনিমাতার প্রচার প্রসার হয় এতটুকুই। এটা তো বিনোদনমূলক কাজ মাত্র। এভাবে ম্নোজও হয়ত বলবেন আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা যেন চলে প্রযোজক আমাকে টাকা দিয়েছে – তার সিনামাটা চালিয়ে টাকা উঠিয়ে দেয়াটাই আমার দেখার বিষয়। অর্থাৎ কেউ জানেই না যে তিনি একটা মারাত্মক অপরাধ ক্করছেন। নিজের জন্যও ক্ষতিকর একটা কাজ করেছেন।

    যদিও পুরা ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তাতে অনেক মোচড় বা টুইস্টও আছেঃ
    সিনেমাটা মূলত তেলেগু (বৃহত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ) ডমিনেটিং অভিনেতা-প্রযোজকদের এক হিন্দি সিনেমা যার অন্য সব দক্ষিণী ভাষাতেই (তামিল, তেলেগু, কন্নড় ও মালায়লাম ভাষায় ) রিলিজ দেয়া হয়েছে। রিলিজের প্রথম দিনেই নাকি ১৪০ কোটি টাকার টিকেট বিক্রি হয়েছে।  আবার এককথায় বললে এটা হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর প্রচার ভিত্তিক এক সিনেমা ততপরতা যেটা একটা হিটলারিজম! কিন্তু এতে মজার টুইস্ট হল, আরএসএস-এর কিছু অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এতে খুশি না। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “মুক্তির আগে এবং পরেও এই সিনেমাকে ঘিরে অভিযোগ একটাই ‘হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে আদিপুরুষের কাহিনি’। এমনকি সিনেমা থেকে কিছু দৃশ্য বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে আর্জি জানায় হিন্দু সেনার দল।
    আবার আরএক রিপোর্টে লিখেছে, আদিপুরুষ: রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’! – এই শিরোনামে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, “…… সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতের জাতীয় সভাপতি পিটি সুরেশ মিশ্রের পক্ষে কমলেশ শর্মা এই উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন পরিচালককে”। তাহলে কাহিনী কী এখানে?
    কাহিনী হল এটাও আসলে হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর উপর দাঁড়িয়ে আরেক ততপরতা; কিন্তু তা হলেও যেটা দেখে মনে হবে এটা তো সিনেমাটার বিরোধিতা করছে! সেটা কেমন করে?  এটা “হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে” বলে অভিযোগটাই তো  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর দাঁড়ানো।  তারা বলতে চাচ্ছে এটা মুসলমানেরা করেছে বা মুসলমানদের চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে করা কাজ অথবা মুসলমান সংশ্লিষ্টতা বা তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে করা কাজ। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বা অভিযোগ হল এখানে রামায়নের রাবনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ আলী খান যিনি পতৌদির (এখন হরিয়ানা-দিল্লির এক অংশ হয়ে গেছে, সেকালে এক ছোট করদ রাজা ছিল) নবাবের বংশধর মুসলমান, ক্রিকেটার মনসুর আলো খান পতৌদির সন্তান। মূল ইঙ্গিত-বক্তব্যটা হল যেন এটা বলা যে – মুসলমানেরা হিন্দুদের সব ভাল ঐতিহ্য নষ্ট করে দিচ্ছে।
    পরের অভিযোগটা সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতদের। সেটা তো আরো সরাসুরি এটাক  বলছে এটা ” রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’ করা হয়েছে।  তাই এখানে হনুমানের দাড়ি-গোফ রাখা হয় নাই।

    কোনো হিন্দু গোঁফ ছাড়া দাড়ি রাখে না, যেভাবে ভগবান হনুমানজিকে দেখানো হয়েছে।
    চলচ্চিত্রটি রামায়ণ এবং ভগবান রাম,
    মা সীতা, ভগবান হনুমানের সম্পূর্ণ ইসলামীকরণ হয়েছে।
    এমনকি আদিপুরুষে রাবণের ভূমিকায় অভিনয় করা
    সাইফ আলি খানও তৈমুর কিংবা আলাউদ্দিন খিলজির মতো দেখতে।”

    অথচ কেউ টেরই পাইলেন না যে এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে ‘হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ দেখানোর’ এর যত ততপরতা – এটা একটা এতই উগ্র জাতি বা জাতিবাদি চিন্তা যে এটাই ভারতকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য যথেষ্ট। হিটলার হয়ত আপসোস করে বলবেন যে তিনি ও কেন এত উগ্র হতে পারেন নাই।
    আবার ওদিকে নেপাল তার দেশের সব সিনেমা থেকে  আদিপুরুষ সহ সব সিনেমাকে নামিয়ে দিয়েছে। দেখুন নেপালে হিন্দি ছবি প্রদর্শন বন্ধ ঘোষণা, নিষিদ্ধ ‘আদিপুরুষ’।

    আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আর আট মাসের মধ্যে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন। মানে মোদিকে এবার জততেই হবে; নইলে বাইডেনের আমেরিকা বসে আছে ঘাড়ের উপর। তাই ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে – মুসলমান কোপাও, জোরদার করো  – যাতে হিন্দু ভোট সব হিন্দুত্বের বড়াই ভ্যানিটিতে কেবল  মোদির বাক্সে ঢুকে, এরই নানান ততপরতা। এবারও মিথ্যা মিথ্য অভিনয়ে ভারেতের পাকিস্তান আক্রমণের নাটক হতে পারে। জয়শঙ্কর ও উঠতে বসতে কুটনৈতিক নর্মস রেওয়াজ ভেঙ্গে পাকিস্তানকে গালাগালি করছে, সোজন্যেবোধের হ্যান্ডশেক করবেন না জানাচ্ছেন। কারণ যত পাকিস্তানবিরোধীতা প্রদর্শন ততই মোদি নিজেকে হিন্দু-বীর হিশাবে হাজির দেখাতে পারবে – এই হল ভিতরের সাজেশন বয়ান। এছাড়া এসব হিন্দু সেনারা মামলা করলে সিনেমা প্রযোজকেরা অর্থের বিনিময়ে আপোষ করতেও চাইতে পারে। যা এসব লোকাল সংগঠনের আক আয়ের উৎস হতে পারে! কাজেই এগুলা টুইস্ট ঘটনা হিশাবে দেখা যাচ্ছে খারাপ নয়!

    কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়ঃ
    একালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল যে, এখন আমরা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র একই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত হয়ে গেছি বলে এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় সকল জনগোষ্ঠিই অপর (Others) জনগোষ্ঠির সাথে কানেকটেড। আর তা জীবনের সকল অর্থেই জীবনের সাথে আরেক জীবনযাত্রার ক্রমশ গভীর হয়ে উঠছে এই বিনিময়; যা কেবল পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ  নয়।  কাজেই অন্য অপর জাতি জনগোষ্ঠির তুলনায় আপনি শ্রেষ্ঠ  এমন এক  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা একালে অচল শুধু নয়; এটা আত্মঘাতি। কারণ, এতে ভারত উল্টা একঘরে হয়ে যাবে অন্য যেকোন রাষ্ট্র এই ঘৃণা-বিদ্বেষ অপছন্দই শুধু না – এই ভারতের সঙ্গে পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যঅও করতে চাইবে না। কিছুদিন আগে কাতার লিড নিয়েছিল ওআইসির [OIC] হয়ে কঠর সমালোচনা করেছিল। জবাবে ভারতে বিদেশ মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি মুখরক্ষার একটাই শব্দ পেয়েছিল যে  OIC নাকি সাম্প্রদায়িক!!!!!!  এখানে দেখুন, জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    তাহলে এর সারকথাটা হল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে ছেয়ে উঠার একালে, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এই বয়ান এই উগ্র জাতিবাদি রাজনীতি দিয়ে কোন রাষ্ট্র খাড়া করা আত্মঘাতি, অচল। এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ! হিতে-বিপরীত কাজ! আর এরই অনুসঙ্গ আরেক চিহ্ন হল যে, আপনার রাষ্ট্রে বা কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়। কারণ, উগ্র জাতিবাদি রাজনীতিক ভিত্তি থলে তো ভিতরে নাগরিক অসাম্যই চর্চা হবে, মুসলমান কোপায়েই ভোট নিতে চাইবেন। এটাই হবে একমাত্র ততপরতা ও ভিত্তি! আর এঘটনায় আপনার পণ্যের ক্রেতা ভয় পাবে -অপছন্দ করা শুরু করবেই! এজন্যই বলছে একালে উগ্র জাতিবাদ –হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এক অচল আত্মফঘাতি রাজনোইতিক চিন্তা।  হিন্দুত্ববাদের ভারত তাই ক্রমশ ভেঙ্গে পড়বেই, একঘরে হয়ে যেতে বাধ্য
    একালে ধর্ম প্রচার, নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এজন্য অন্যের দেশ দখলে (ধর্ম প্রচার বা কলোনিদখলের জন্য) বেরিয়ে পড়বেন কিংবা এসব কাজকে  পুরানা দিনের রেফারেন্স দিয়ে জায়েজ বলে সাফাই বয়ান খাড়া করবেন – তা হবে না ! এটা কাজ করবে না। আর এরচেয়েও বড় কথা এটা আত্মঘাতি অচল ততপরতা! আপনিই একঘ্রে হয়ে যাবেন। সেটা সবার আগে বুঝবার চেষ্টা করেন!

    সবার আগে দুনিয়ায় বিশেষ করে চলতি নয়া শতকে কী কী  ও কেন বদলে গেছে সেসব কিছুকে আমল করেন।  নিজের ভাল চাইলে এর বাইরে কিছুই নাই!
    তাই একটা সিনেমা শুধু সিনেমা নয়, বহুকিছুই……।

    অথচ ভারত রাষ্ট্রের যেখানে দরকার একটা ফেডারেলিজম বা ফেডারল রাষ্ট্র কায়েম যাতে কেন্দ্র-রাজ্য বৈষম্য দূর হয়ে যায়, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্বের বোধের রাষ্ট্র না হয়।
    তাই এ’রাষ্ট্র নিজেও ভুগবে পড়শি রাষ্ট্রদেরকেও ভুগাবে  আর সাথে সংঘাত হত্যা, ক্লিনজিং ডেকে আনবে সেই শঙ্কা প্রবল হচ্ছে!

    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  মধ্যরাত ০১ঃ ১৯
    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  ভোর ০৫ঃ ০৪
    আপডেটঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৪

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    গুরুত্বপুর্ণ হওয়াতে একটা পাঠক-প্রশ্ন নিচে তুলে আনলাম সাথে আমার জবাবঃ
    Anil Iftakher
    বিশ্বে যতো জাতি আছে,তাদের মধ্যে অনেকেই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে।যারা এগিয়ে আছে তাদের গর্ব করাটা কি অন্যায়? আমরা যে অনেক দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি এটা নিয়ে কেউ খোচা দিলে কি তা অন্যা

    লেখকের জবাবঃ
    Anil Iftakher গর্বটা যখন করবেন “আমিই শ্রেষ্ঠ জাত” বলে দাবি করে তখন অন্যেরা বুঝবে যে এটা তার জন্য বিপদের কথা।
    তবে  এটা অন্যায় হবে মূলত এজন্য যে এরপরে আপনি আমার ঘাড়ে চড়বেন, আপনার পা টিপে দিতে বলবেন, আমার সম্পদ কেড়ে নিবেন, আমাকে উঠায় নিতে চাইবেন ইত্যাদি। আর এসবই করবেন যেহেতু – আপনিই শ্রেষ্ঠ – সেটা আগেই বলে নিছিলেন, তাই। অর্থাৎ আপনি যে জাত-শ্রেষ্ঠ এই বক্তব্যের দাম চাইবেন আপনি, আর আমাকে এর দাম চুকাতে বলবেন………।
    আর এখান থেকেই, অন্যের উপর আধিপত্য করা বা অন্যদেশকে কলোনিদখল করে নিবার পক্ষে যে সাফাই বয়ান, ন্যায্যতার বয়ান বা Justification  সেটা সাধারণত তৈরি হয়, হবে ঐকথার উপর দাঁড়িয়ে যে উনিই “শ্রেষ্ঠ জাত” তাই!
    – বৃটিশেরা আমাদের কলোনিদখল করে নিয়ে দাবি করত আমরা তো অসভ্য তাই সভ্যতা শিখাতে বৃটিশেরা আমাদের দখল করেছ।
    – বাংলায় জমিদার হিন্দুর আধিপত্যও এভাবে শুরু হয়েছিল যেহেতু তারা আগেই বলে নিয়েছিল যে ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’ – তাই মুসলমানেরা বাঙালি হিন্দুর সমান নয়, নিচা ও অধস্তন। অতএব মুসলমানদের উপর জমিদার হিন্দু বাঙ্গালির আধিপত্য, দাপট দেখানো অথবা অসমান জ্ঞান করে মুসলমানদেরকে তাদের পায়ের নিচে রাখাটা জায়েজ! অথবা কী অর্থে তারা বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রবেশাধিকার পেতে পারে সেই শর্ত তারা তাই হাজির করেছিল সেটা হল “অসাম্প্রদায়িকতা”। মানে মুসলমান-ইসলামিক চিহ্ন, অভ্যাস বা বৈশিষ্ঠ ত্যাগ করে বা লুকিয়ে রেখে, প্রকাশ্যে না দেখিয়ে তবেই হিন্দু সমাজে পিছনের বেঞ্চে বসার সুযোগ পেতে হবে!
    – হিটলারেরো জাত শ্রেষ্ঠত্ব বোধ থেকে সাফাই হচ্ছে তাই – জর্মান জাতি নীল চোখের এরিয়ান (Aryan referred to a racial category, বাংলায় আর্য) রক্তের তাই তারা শ্রেষ্ঠ। তাই ইউরোপের বাকি সবাইকে তাদের অধীনস্ততা করতে হবে। আর এথেকেই হিটলারের  ইহুদিদেরকে  গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা জায়েজ ইত্যাদি।

    –  মোদি ভারতে মুসলমানদের নিচা দেখানো আর মোদির হিন্দু জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর বড়াই দেখানোও একই কারণে। যেমন করোনাকালে মাঝে তারা বলেছিল তাবলীগ-মারকাজ এরা কালচারের দিক থেকে খুবই নিচু।  কারণ মুসলমানেরা নাকি আঙুল দিয়ে চেটে চেটে খাবার তুলে খায়। অথচ যেখানে ঘটনা হল, সারা অখন্ড ভারতই  এথনিক-জাত বৈশিষ্ঠ হিশাবে তারা সকলেরই খাদ্য গ্রহণ বা  খাওয়ার স্টাইল হল তারা চামচ দিয়ে তুলে খায় না। বরং হাতের পাঁচ আঙুল ব্যবহার করে, আঙুলে ধরে খাবার তুলে খায়। আবার খেয়ে বলতে চায় যে যে খাবারটা আমার শরীরের বাইরের – প্রকৃতির – কিন্তু তা আমার নিজ শরীর প্রবেশ করার পরে এক ‘প্রক্রিয়ায়’ সেটা আমার নিজ-শরীর হয়ে যাবে তাকে আগে থেকেই নিজ হাতে ছুঁয়ে ছেনে অনুভব করে আদরে আপন করে নিব না কেন! আমি আমার ঐ হবু খাদ্য বা শরীরকে আগেই তাকে স্পর্শে ফিল করতে চাই, এই অনুভুতি আমার জন্য খুবই জরুরি; অতএব হাত দিয়েই খেতে হবে!

    এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – তাই এক ভয়ঙ্কর ফেনোমেনা, ভয়ঙ্কর অসুখ, অসুস্থতা। আপনার যেকোন (অপর) বা আপনার পড়শিকে আপনি এটা ব্যবহার করেই তাকে সহজেই ‘নির্মুল” করার পক্ষে যুক্তি তুলবেন।  আর এটাকেই এথনিক ক্লিনজিং “Ethnic Cleansing” বলে।
    তাহলে আপনার কাছে যেটাকে খুবই সাধারণ – নিজেকে নিয়ে একটু গর্ব করা – বলে বুঝেছিলেন সেটা গত গভীর হিংস্র, নৃশংস এন্টি-হিউম্যান, এক কালো চিন্তা, despotic বা দাগী চিন্তা এখন তা বুঝতে চেষ্টা করেন। জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই  চিন্তার আসল রূপকে বুঝেন, চিনে নেন।
    একালের বাইডেন আর ট্রাম্প এদুই শাসকেরও দুই ব্যাখ্যার কিন্তু একই – হোয়াইট সুপ্রীজম বা White Supremacy – চিন্তা তারা ধারণ করে এসেছে। এনিয়ে আমার লেখাতে পাবেন। আর এখানে হোয়াইট বলতে পুর্ব ইউরোপীয় “সাদা ককেশীয়” [White CAUCASUS] এথনিক জাতের মানুষ বুঝানো হয়। মূল দিক গুলো তুলেছি এখন এবার বাকি অংশ বা আরো গভীরে যেতে গুগল সার্চ করে পড়াশুনা করে নেন।

     

     

     

     

     

  • বিচারক বা কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    দেশপ্রেম নয়, মানুষ ন্যায়বিচার দেখতে চায়!
    বিচারক-কমিশনাররা যখন ন্যায়দন্ড ফেলে সবাই দেশপ্রেমিক!

    গৌতম দাস
    ২১ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3YT

    –

    Former Chief Election Commissioner OP Rawat along with Chief Election Commissioner Sunil Arora (L) and Election Commissioner Ashok Lavasa (R) | PTI–

    গত ১০ মার্চ ছিল ভারতের পাঁচ রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন। এক পাঞ্জাব ছাড়া নির্বাচন কমিশন বাকি চার রাজ্যে  বিজেপিকে বিপুল বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছিল সেদিন। অর্থাৎ বিজেপি এখন ওসব রাজ্যে সরকার গড়বে। উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর এই পাঁচ রাজ্যে এবার নির্বাচন হল। যদিও এই পাঁচ রাজ্য রাজ্যের মর্যাদার দিক থেকে এরা সবাই-ই সমান। কিন্তু এরা সবাই সমান রাজ্যের মর্যাদার হলেও জনসংখ্যা বা রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে তারা সমান নয়। এভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলো কোনোভাবেই অন্য রাজ্যের সমান নয়। কেন সমান নয়?
    এটা বুঝবার একটা দিক-পদ্ধতি হতে পারে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পার্লামেন্ট (বা যেটাকে ওরা লোকসভা বলে) তাতে কোন রাজ্যের কার কতটা আসন তা দিয়ে। কেন্দ্রে কম আসনের রাজ্য মানে সেটা ছোট রাজ্য; মানে কম জনসংখ্যার মানেই তা ভৌগলিকভাবেও ছোটরাজ্য। এই হিসাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট নির্বাচন যেটাকে তারা লোকসভা বলে তাতে মোট ৫৪৩ আসন। আর তাতে উত্তরপ্রদেশ (৮০), উত্তরাখণ্ড (৫), পাঞ্জাব (১৩), গোয়া (২) ও মনিপুর (২) – এভাবে পাশের ব্রাকেটে তাদের লোকসভার আসন বা কনষ্টিটুয়েন্সি কয়টা তা দেখানো হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন হয়ে গেছে গত বছর ২০২১ সালে; তবু কৌতুহল মিটানো আর তুলনা করে বুঝবার জন্য এখানে জানানো হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গ লোকসভা আসন ৪২টা আর এর মোট জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা কম করে ধরলেও ১৬ কোটি।
    তাহলে ফর্মুলাটা হল, ভারতের কোন রাজ্য কত বড় বা গুরুত্বের তা বুঝবার সোজা তরিকা হল ঐ রাজ্যের জন্য বরাদ্দ লোকসভায় আসন সংখ্যা জেনে নেয়া। এই গুরুত্বের বিচারে যেখানে ভারতে কেন্দ্রে সরকার গড়তে লাগে লোকসভায় ন্যূনতম ২৭২ আসন, সেখানে একা উত্তরপ্রদেশ যা একমাত্র বড় রাজ্য তা দিতে পারে একাই ৮০ আসন। ফলে উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বে এখানেই সবার চেয়ে বড়। এ ছাড়া সারা ভারতের উপর যেটাকে বলে হিন্দি বলয়ের শাসন- আধিপত্য, এর কেন্দ্র বুঝাতে উত্তরপ্রদেশকে দেখানো হয় । আবার এটাই ‘আর্য’ বা ব্রাহ্মণ আধিপত্যের কেন্দ্র, এই হিসেবে উত্তরপ্রদেশ। আবার এর বিপরীতটা হল দ্রাবিড়ীয় বা ডেকান [Deccan বা দাক্ষিণার্ত] দক্ষিণী চার রাজ্য আর এ দিকে আংশিকভাবে বাংলা প্রদেশ। এ ছাড়া শেষে একটা ‘নোক্তা’ হিসেবে বলা যায়, ভারতের নেহেরু-গান্ধী ডায়নেস্টি বা বংশের শাসন সেটাও এই উত্তরপ্রদেশ কেন্দ্রিক; সুনির্দিষ্ট করে বললে এলাহাবাদ শহরে যেটা আসলে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য হাইকোর্টের শহর। আর এখানেই নেহেরুর বাবা মতিলাল নেহেরু বৃটিশ আমলে এলাহাবাদে ওকালতি প্র্যাকটিস করবেন বলে পাশের কাশ্মির থেকে এক কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ – তিনিও উত্তরপ্রদেশেই এককালে খুঁটি গেড়েছিলেন।
    দরকার যেখানে ফেডারল রাষ্ট্র অথচ হয়ে আছে উগ্র হিন্দুত্বের জাত শ্রেষ্ঠত্বের এর ভারত জাতিরাষ্ট্র! যার বিচার বিভাগ আবার ন্যায়দন্ড ফেলে ন্যায়বিচারের বদলে এর উপরে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ভুয়া দেশপ্রেমিকতাকে!

    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতির পাঠঃ
    ভূগোলের পাঠ শেষ এখন রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানে নির্বাচনের প্রসঙ্গে আসি। এবার এই পাঁচ রাজ্য নির্বাচন চলেছিল কয়েকপর্বে প্রায় এক মাস ধরে, ৭ মার্চ পর্যন্ত; যার গণনা, ফলাফল এক সাথে ১০ মার্চ প্রকাশিত হয়েছে। উপরে দেখানো উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বের কারণে পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হলেও ভারতের রাজনীতির সবাই আসলে তাকিয়েছিল এক উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের দিকে। যেকোন নির্বাচনে কিসের ভিত্তিতে ভোট বিভিন্ন প্রাথীর বাক্সে যাবে, ভাগ হবে, এমন নানা নির্বাচনী ইস্যু তাতে হাজির হতে দেখা যায়। সেই বিচারে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় গত এক মাস ধরে যেসব নির্বাচনী ইস্যুর কথা বলা ও আলোচনা করে হয়েছিল সেগুলো হল – এক. কৃষক আন্দোলন। মানে আগের টানা ১৫ মাস ধরে চলা এক কৃষক আন্দোলনে শেষে মোদি হার স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট তিন আইন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। দুই. ভারতে কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ সামলাতে মোদির ব্যর্থতা।  অর্থাৎ  মোদির সরকার – সৎকার, হাসপাতাল বেড, অক্সিজেন ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট সব সিস্টেমটাই ভেঙে পড়েছিল যেখানে। আর তাতে নাগরিক হিশাবে মানুষের মর্যাদা এই সামাজিক মুল্যবোধে ধুলায় লুটিয়ে পড়েছিল। তিন. অর্থনীতি; অর্থাৎ ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ও কাজ সৃষ্টিতে অভাব মানে পুরানা অর্থনৈতিক ততপরতাই সীমিত বা বন্ধ হয়ে আসা – কোভিডের আগে যা ছিল তা একেবারেই ভেঙে পড়া, ইত্যাদি।
    এসব ইস্যুগুলোতে এক বিজেপির দলীয় বা সমর্থক মিডিয়া ছাড়া বাকি সব মিডিয়ায় এসব ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ থেকে জবাব-সাফাই নাই, তারা এসব ইস্যুতে নেতি-ছাপ পড়বে প্রাপ্ত-ভোটে তাই এই ভিত্তিতে বিজেপি ভোট হারাবে এই ছিল তাদের সবারই রিপোর্টিংয়ের লাইন। যেমন “উত্তর প্রদেশের ভোটে বিজেপিকে শায়েস্তায় ‘মিশন ইউপি’’ অথবা “উত্তর প্রদেশের ভোট যে কারণে মোদির জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা”- এমন ছিল সেসব রিপোর্টের শিরোনাম।
    এছাড়া “গোরক্ষা ইস্যু” যেটা গরুকে দেবতা মান্য করার হিন্দুত্বের রাজনীতি হাজির করা; উদ্দেশ্য যে এতে ভোটাররা এই হিন্দুত্ত্বের ইস্যুতে ডুবে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিদের ফেলে বিজেপিকেই ভোটটা দিবে এই অনুমান। এই কথিত “গোরক্ষা ইস্যু” বুমেরাং হয়ে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মানে কৃষকের গরু বুড়া হলে তা মাংসের বাজারে বেচার নিষেধাজ্ঞার কারণ গরুকে বসিয়ে খাওয়াতে না পেরে মালিক সে গরুর মালিকানা ত্যাগ করে ছেড়ে দিয়েছে। আর সেই ছাড়া গরু এবার গৃহস্থের জন্য ফসল নষ্টের সমস্যা, তাতে রাতজেগে পাহারা বসানোর সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে।  [নদীতে গরু-মহিষের মৃতদেহ, উত্তর প্রদেশের রাজনীতিতে উত্তাপ]।  এককথায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে গরুর আক্রমণ কেন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে এটা তুলে ধরেছিল বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়া।
    এমনকি আমেরিকান ক্ষমতাসীনদের থিংকট্যাংক “আটলান্টিক কাউন্সিল”, তারাও মোদির জন্য ‘ক্রিটিক্যাল টেস্ট’ বলে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে রিপোর্ট করেছিল [Modi faces a critical test in India’s most populous state]। অথবা বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর ভাগ্য নিয়ে ফ্রান্সের মিডিয়ায় উদ্বিগ্ন রিপোর্ট [Turbulent priest: India’s anti-Muslim firebrand and possible future PM]। অন্য দিকে বিশেষ করে ইংরাজি দ্য-প্রিন্ট এ নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করে গেছে [The BJP and the SP are neck-to-neck in Uttar Pradesh ]  অথবা [CM says UP will be largest economy if BJP wins. Data shows unlikely ...]। আর কলকাতার আনন্দবাজার ছিল আরো সরেস। সে অনিন্দ্য জানা নামে এক রিপোর্টারকে সারা মাস উত্তরপ্রদেশে রেখেই নিয়মিত – “উত্তরপ্রদেশের ভোট-বুক” সিরিজ রিপোর্ট ছাপিয়ে গেছে; ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৩ পর্বে তের শহরের সিরিজ রিপোর্ট। প্রতিটা খণ্ড ছিল উত্তরপ্রদেশে বিজেপির দুঃসহ শাসনের বিভিন্ন নজির। যেমন ‘হাতরাস’ এর কাহিনী যেটা আসলে এক দলিত কিশোরীকে রেপ করে, হত্যা করে উঁচুজাতের লোকেদের কাহিনী। এরপর পুলিশ-বিজেপি মিলে ওই কিশোরীর সৎকারের নামে মা-বাবার অনুমতি বা তাদের উপস্থিতি ছাড়াই সেই লাশ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর সেই কিশোরীর বাড়ি এখন আদালতের নির্দেশে আর্মি ক্যাম্প বানিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

    কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির জিতবার আশা জাগানোর ছিল নাঃ
    অর্থাৎ সমর্থকের বাইরে কোনো মিডিয়া রিপোর্টই বিজেপির পক্ষে জিতবার আশা জাগানোর মত রিপোর্ট ছিল না। এর মধ্যে আরেক সংযোজন হল – দুই কথিত সাধুর (যারা বিজেপি-আরএসএস অ্যাফিলিয়েটেড) প্রকাশ্য সভা থেকে মুসলমান গণহত্যা শুরুর আহবান, হাতে অস্ত্র তুলে নেয়ার আহ্বানের বক্তৃতা দেয়া হয়। [ধর্মীয় বিভাজন ভারতকে তলেতলে ভেঙে দিচ্ছে] অথবা [As UP Polls Continue, BJP MLAs Dial Up Anti-Muslim Hate Speeches]।

    অথচ পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন অথবা সুপ্রিম কোর্ট নির্বিকার। সবার সময় ক্ষেপণ চলতেই থাকে। প্রায় এক মাস পরে কথিত সাধুর একজনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু মামলা দেয়া হয় মেয়েদের প্রতি অশালীন উক্তির  অথবা Haridwar ‘Dharam Sansad’ shows Modi is facing an internal threat from Sangh Parivar। এমন মামলা জামিনযোগ্য বলে ক’দিনের মধ্যেই তার জামিনও হয়ে যায়।
    এছাড়া ক’দিনের মধ্যেই হিজাব নিয়ে প্রায় জোর করে ব্যাপক এক সামাজিক বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়। উদ্দেশ্য হলো, যত বেশি ধর্মীয় মেরুকরণ ততই বেশি বিজেপি ভোট বাড়বে, এই অনুমান। এখানে যে বয়ান তৈরির দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে তা হলো, যেন মুসলমানদের অত্যাচারেই হিন্দু জনগোষ্ঠী অতিষ্ঠ। এমন একটা ভাব তৈরি করা হয়। আর এই ‘নিপীড়িত’ হিন্দুদেরই ত্রাতা হিসেবে এবার হাজির হয় মোদি ও দল বিজেপি। অতএব বয়ান শেষে হিন্দুরা একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দাও!!

    মোদির এই তৎপরতা এবার প্রমাণ করেছিল যে, মোদিও নির্বাচনের ভোট তার বিরুদ্ধে যাবে এটা তার ও দলেরও অনুমান ছিল। তাই এত মরিয়া হয়ে সুনির্দিষ্ট করে এথনিক-ধর্মীয় কোনো জনগোষ্ঠী-বিরোধী প্রপাগান্ডা, সরাসরি খুন করতে বলা, ঘৃণা করতে বলার উদ্বীপ্তকরণ; এসব অ্যান্টি-মুসলমান প্রচারণা, ইসলামবিদ্বেষের [Hijab Row Can Hurt Indian Diplomacy] কোনো কিছুই তিনি বাদ রাখেন নাই।

    আরেক শেষ অস্ত্র প্রপাগান্ডায় বিজয় ঘোষণাঃ
    এরপরেই ছিল বিজেপির আরেক শেষ অস্ত্র। সারা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এসব প্রপাগান্ডার পরে পয়লা মার্চ থেকে মোদি-অমিত একেবারে ড্রাইভিং সিট নিয়ে সরাসরি বসে যান। অমিতশাহ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় পয়লা মার্চ এক লম্বা সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করে দেন, নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হচ্ছে। এই ঘোষণায় একটা মিলের দিক হল, গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি একইভাবে শেষ সপ্তাহে বিজেপি কেন্দ্রের কত আসনে জিতে যাবে, তা ঘোষণা করেছিলেন। এবারও তাই দেখা গেছে। তিনি খুব করে রিপোর্টারকে বুঝিয়ে দেন যে, দিল্লির ক্ষমতায় মানে কেন্দ্রে সরকার গড়তে গেলে উত্তরপ্রদেশ হয়ে তবেই দিল্লিতে যেতে হয়। তাই তারা উত্তর প্রদেশে জিতে যাচ্ছেন। মানে ২০২৪ সালে কেন্দের নির্বাচনেও জিতে যাচ্ছেন [“If anyone wants to form a government with full majority at the Centre, it cannot be without Uttar Pradesh’s mandate,” ]।

    কিন্তু প্রশ্ন যেখানে উত্তরপ্রদেশের এই নির্বাচনে বিজেপির জন্য এত নেগেটিভ ইস্যু আর অসংখ্য জনদুর্ভোগ থাকার পরেও কেন বিজেপি জিতবে- এ নিয়ে কোনো প্রসঙ্গ কোনো কথার জবাব অমিত শাহ দেন নাই। বারবার বলেছেন এবার (২০২২) তারা উত্তরপ্রদেশে জিতে যাচ্ছেন, তাই ২০২৪ সালেও কেন্দ্রে জিতবেন। এ ছাড়া কিসের ভিত্তিতে এ কথা বলছেন এ ব্যাপারে তিনি নিরুত্তর থেকেছেন।

    পরে ১০ মার্চ ফলাফল ঘোষণার দিনও অমিত শাহের বর্ণনা মত ফলাফল আসতে থাকে। আর তাতে নিজেদের বিজয় ঘোষিত হয়েছে বলে মোদি প্রথমেই পার্টির অফিসে বিজয় সভার আয়োজন করেন। পরে আরো বিজয় মিছিল বের করেন গুজরাট সফরে। সেখান থেকেও তার একইকথা তারা ২০২৪ সালের নির্বাচনে কেন্দ্রে জিতে যাচ্ছেন।

    এখানে তামাশা দিকটা হল, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে কোনো মিডিয়ার মনে প্রশ্ন নাই যে, কেন তাদের গত এক মাস ধরে যা কিছু রিপোর্ট – বিজেপির দিক থেকে খারাপ বা নেতি ফলাফল বা জিতিতে বাধা পাবার রিপোর্ট এর কোনো প্রতিফলন ফলাফলের মধ্যে নাই, কেন? এর ব্যাখ্যা কী? এটা আসলেই খুবই মজার যে, অনেক সময় মিডিয়া নিজের আলোচনা-রিপোর্টের প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে না-ও থাকতে পারে। কিন্তু কেন থাকল না এর ব্যাখ্যা কী? সেটা নিয়ে কথা বলা, তালাশ করা কী তাদের কাজ নয়? কিন্তু এখানেই সব ‘কবি’ নীরব দর্শক মাত্র!! আসলে, মোদির হাতে এমন কী আছে যে মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে যত নেগেটিভ দিক তার অযোগ্যতা প্রকাশিত বা প্রমাণিত থাক না কেন, ভোটাররা ক্ষুব্ধ ও সাফারার হোকনা কেন – এসবের কোনোটারই প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে থাকে না কেন? এর উপর এটা নিয়ে ঐ মিডিয়াগুলোই আর কথা বলে না কেন??

    মিডিয়া এদিকে তাকানোকে যেন নিষিদ্ধ মনে করেঃ
    ব্যাপারটা এমন যেন ভোটের প্রকাশিত কমিশনের ফলাফল মিডিয়া আলোচনার বিরুদ্ধে গেলেও তারা এনিয়ে আর আলোচনা করে না। যেন এদিকে তাকানোকে তারা নিষিদ্ধ মনে করে!!  বরং সেদিক থেকে মনোযোগ সরাতে এখন তারা অনেকে রিপোর্ট করেছে যে, কংগ্রেস কেন এত খারাপ ফল করল? যেন কংগ্রেস ক্রমেই সব হারানো দলে পরিণত হচ্ছিল না! যেন সবাই আশা করছিল কংগ্রেস এবার বিরাট কিছু ফলাফল দেখাবে!

    প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য নয়ঃ
    নীতিটা ভারী সুন্দর(!)। দেখা যাচ্ছে ভারতের লিগ্যাল প্রফেশনের (বিচারক, উকিল-ব্যারিস্টার বা লিগাল একাদেমিক ইত্যাদি) কেউ অথবা মিডিয়া যেন প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের কোনো আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য করা দেশের বিরুদ্ধে কাজ মনে করা শুরু করেছে। যেমন ধরা যাক বর্তমানে সাবেক এক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা যিনি নিয়মিত মোদির নির্বাচনী আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে একাই সোচ্চার থাকতেন; আর অন্য কমিশনারেরা নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়া [EC Rejects by 2-1 Vote Lavasa’s Demand to Record Dissent Note in Orders] বা আইনি-নিরপেক্ষ জায়গায় দাঁড়িয়ে যেকোনো বেআইনি কাজের প্রশ্ন তোলাকে দেশ-বিরোধী কাজ মনে করেছেন। এমনকি কমিশনার অশোক লাভাসা ঐ নো-অফ-ডিসেন্ট বা আপত্তি-নোটে ঠিক কী বলেছিলেন সেকথা রাইট টু ইনফরমেশন আইনেও (যে আইনে যেকোন নাগরিক কোন “পাবলিক তথ্য” জানতে চাইলে সরকার সেই তথ্য দিতে বাধ্য) নির্বাচন কমিশন তা প্রকাশ করে নাই। মোদি এবং এসব বিচারক-কমিশনারদের স্বার্থ কত গভীরে যে এরা পরস্পরকে আঁতাতে সাহায্য করে বলে থাকে, তা এখানে প্রকাশিত।  তাই তারা সবাই নির্বাহী ক্ষমতার পক্ষের লোক হয়ে থাকাই তাদের ভূমিকা মনে করছেন। কিন্তু কেন? ভারত এমন হয়ে গেল কেন?? কবে থেকে??

    Ashok Lavasa, the only member of the 3-man Election Commission to rule that Prime Minister Narendra Modi had violated the Model Code of Conduct while campaigning for the 2019 general election, was selected as a potential candidate for surveillance just weeks after his dissent, according to leaked records of phone numbers that The Wire has seen.

    সেই যে এককালে ১৯৭৫ সালে জুনে জরুরি আইনের শাসন দেখেছিল ভারত, সেই থেকে এনিয়ে এক স্মৃতি তারা কাঁধে নিয়ে ফিরছে। তারা আজও বিভ্রান্ত যে, সেসময়ে ঐ হাইকোর্ট মামলার বিচারক [Justice Jagmohanlal Sinha]  সিটিং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে আইনত শাস্তির রায় দিয়ে কি তারা ঠিক করেছিল? তারা মনে করা শুরু করেছিলেন সারকথায় বললে, তা হল প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী ক্ষমতা যদি ট্যারা হয় – আগ্রাসী আচরণের হয়, আইন মানতে, চলতে না চায়, বাড়তি সুবিধা চায়, বিরোধীদের বিরুদ্ধে আদালতকে ব্যবহার করতে চায়- তবে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের কাজ-ভূমিকা যেন হল নির্বাহী বিভাগের পক্ষে দাঁড়ানো বা নির্বাহী বিভাগের জন্য পথ ছেড়ে দেয়া। এককথায় যত আগ্রাসী এক্সিকিউটিভ প্রধানমন্ত্রী, নিয়ম-আইন ভাঙতে চাওয়া নির্বাহীর মুখোমুখি তারা হবেন ততই তাদেরকে যেন আপসে প্রধানমন্ত্রীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। এই হলো সেই নীতি! কেন?

    এটাই তারা সেসময় উলটা ভুল শিক্ষা নিয়েছিলেন; আদালতের দেয়া সাজা ও সিদ্ধান্ত মানতে না চাওয়া প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে! যেন আদালত ইন্দিরাকে সাজা দিয়েছিল বলেই ভারতে জরুরি আইন এসেছিল। মানে পরোক্ষে জরুরী আইন আনার দায় বিচারকদের!!! অতএব, লিগ্যাল প্রফেশনের মানুষের কাজ ও ভূমিকাই হচ্ছে অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাপ খাইয়ে চলা। এতে দেশ ভালো থাকে – তাই এটাই দেশপ্রেমিকতা!!!! বিচারকের হাতে ন্যায়দণ্ড নয়; কথিত দেশপ্রেমিকতা দেখিয়ে দোষী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাকে মাফ বা তাঁর দোষ মাফ করা বা এড়িয়ে চলাই বিচারকের কাজ!!

    লক্ষ্য করা যায়, সেই থেকে আইন প্রফেশন, বিচারকেরা হয়ে গেছেন – ন্যায়দণ্ডের বাহকের চেয়েও সবার আগে ‘দেশপ্রেমিক”। যেন দেশপ্রেমিকতা আগে দেখানো শেষ হলে এরপর বিচার-আচারে বসা যেতে পারে। এ জন্যই কি ভারতের নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসাকে কমিশনের চাকরি ছেড়ে যেতে হলো? অথচ কোনো মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো আলোচনা নাই!

    অথচ অশোক লাভাসা নিজে তো বটেই তার স্ত্রীও তাঁর প্রফেশনে সরকারের হাতে  নিগৃহিত ও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন।  শেষে যেটা কার্যত ক্যাডার বদল করা, এভাবেই অশোক লাভাসা এখন নির্বাচন কমিশন আগাম ছেড়ে দিয়েছেন। আর তিনি এখন মোদি প্রশাসনের তরফে সরকারিভাবে এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) ম্যানিলাতে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে থাকলে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকতেন। মানে এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন তার অধীনে হত।

    তাহলে অবস্থা দাঁড়াল এই যে এখন থেকে আইন না মানতে না চাওয়া অ্যাগ্রেসিভ প্রধানমন্ত্রীকে জায়গা করে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। এভাবেই ভারতের আদালত আর কমিশন চলবে – ভোট কারচুপি, বাক্সের প্রোগ্রাম বদলে দিলেও এভাবেই সব চলবে। আগ্রাসি মোদিকে কিছু বলা যাবে না। আর এমন দুর্দমনীয় ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী মোদি এরপরে মুসলমান গণহত্যার হুমকি দিয়ে হিন্দু ভোট নিজ বাক্সে নিতেই থাকবেন! আর এভাবেই আগামী ২০২৪ সাল তো বটেই, আগামী ভারতে সব নির্বাচন জিতে চলবেন! আর নিশ্চয় এতে দেশপ্রেমিক ভারত অনেক উন্নতি করে এগিয়ে যাবে!!!!

    [আরেক ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা নিয়ে আমার আগের আগের আরেক লেখা – “ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা” – সেটা পাবেন এখানে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বিচারক বা কমিশনাররা যখন সবাই দেশপ্রেমিক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    গৌতম দাস

    ০৭ জুন ২০২১, ২০:০৭, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3zY

    Modi Vs Mamota in the light of Center Vs State conflict

    নেহরুভিয়ান বা নেহেরু স্টাইলের ভারত গড়তে গিয়ে এটা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন করে ভারত-রাষ্ট্রের এসব গুপ্ত-হস্তক্ষেপ ব্যবস্থাদি এখন আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২ মে, মানে এক মাসেরও আগে এবং তাতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মমতা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছেন। মানে আবার মমতা ব্যানার্জি সরকার গড়বেন এবং গড়েছেনও। অথচ এই নির্বাচনে প্রচণ্ড মিথ্যা আশ্বাস জড়ো করে ফেলা হয়েছিল যে, মোদীর বিজেপি বিজয়ী হচ্ছেই; এই প্রপাগান্ডা এখন আত্মঘাতী অবস্থায়। তাই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মানসিক জোর ধরে রাখার জন্য, মিথ্যা উচ্ছ্বাস জীবিত রাখতে গিয়ে প্রতি পদে পদে এখন “কেন্দ্র বনাম রাজ্য” – এভাবে মোদী-মমতা মুখোমুখি সংঘাত জোরদার করে তুলতে চাইছেন মোদী।

    ভারতের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতঃ
    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ভারতের জন্মের সমান বয়সী এক মারাত্মক ক্ষত। এটা মূলত নেহেরু-স্টাইলে চিন্তার পরিণতি।  এই চিন্তার মূল বৈশিষ্ট হল, কলোনিদখলদার বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও (তাদের শাসনের প্রধান রাজ/রানীর প্রতিনিধিকে ভাইসরয় বলা হত)  নেহেরু নিজেকে এক “ভাইসরয়-ই” মনে করতেন।  যা তাঁর কাজ ও ততপরতার মধ্যে বিশেষত খোদ ভারত-রাষ্ট্র কাঠামোটাই এর সবচেয়ে বড় স্পষ্ট প্রমাণ।  অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরের ভারতের জনগণের সাথে নেহেরু নিজের সম্পর্কটা কী এই প্রশ্নে নিজেকে এক কলোনিদখলদারের মত করেই ভবেবে নিয়ে দেখেছেন।  অর্থাৎ “জনপ্রতিনিধি” শব্দ ও এই মৌলিক ধারণাটাই তিনি আমল করতে চান নাই। ফলে একটা “রিপাবলিক” রাষ্ট্রের মূলকথাটাই তাঁর কখনই জানা হয়ে উঠে নাই। বিপরীতে তার ত্রুটিপুর্ণ চিন্তার মৌলিক দিকটা হল, হবু ভারত-রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কথিত এক কেন্দ্রের নামে ও এর হাতে কুক্ষিগত করা যায় কী করে সেদিকে সচেষ্ট থেকেই কলোনি-উত্তর ভারতের জন্ম দিয়েছেন; কনষ্টিটিউশন লিখিয়েছেন। এটাকেই আমরা নেহেরুভিয়ান চিন্তা বা নেহেরু-স্টাইলে চিন্তা বলছি। যাকে প্রতীকীভাবে সময়ে নেহেরুর “ভাইসরয়”-চিন্তাও বলেছি।
    কাজেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত – এটা আসলে ভারতের রাষ্ট্রগঠনের জন্মগত এক মারাত্মক ত্রুটি। ফলে এককথায় (ফেডারল এক ভারত করে)  এর পুনর্জন্ম বা ভেঙ্গে-গড়া যার একমাত্র সমাধান।  কিন্তু ভারত-রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলে সেটা আবার পুনঃর্গঠনের মুরোদ যদি ভারতের রাজনীতিবিদ-ইন্টেলেজেন্সিয়ার থাকে (যার আলামত এখন পর্যন্ত নাই) তবেই এ’থেকে ভারত মুক্ত হতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। নইলে আস্তে আস্তে এটা ব্ল্যাক-হোলের গর্তে হারিয়ে যাবার মত এক ঘটনা হবে। মানে এককালের যুগশ্লোভিয়া, চেকোশ্লোভিয়া অথবা খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে রাষ্ট্র থাকলেও তাদের ভেঙ্গে যাওয়া বা আজ নাই হয়ে যাবার মত আরেক ঘটনা হবে এটা। কথিত একটা কেন্দ্রের নামে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইলে পরিণতি এটাই তো হবার কথা!

    এ অবস্থায় আরেকটু ভেঙ্গে বললে ভারত-রাষ্ট্রে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ, এই জিনিসটা কী আসলে? যদিও এই প্রশ্নটাই এখন মোদীর কারণে সর্বত্র সরব হয়ে উঠেছে। এখন যেটা মোদী-মমতা বলা হচ্ছে এটাই কয়েক বছর আগে উঠেছিল রাজ্য-দিল্লিতে, মোদী-কেজরিলাল নামে।  আর তা এবার কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও ক্রমে ছড়াচ্ছে। সবাই কান-খাড়া করে উঠতে চাইছে।

    ফেডারেল মানে কী বুঝবঃ
    ফেডারেল [Federal] শব্দটা ইংরেজি। এর একটা বাংলা অনেকে করে থাকেন ‘যুক্তরাষ্ট্রীয়’ বলে। যেমন অনেকে লিখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইংরাজি United States of America (USA) এর বাংলা হিসাবে।  ফেডারেল রাষ্ট্র ধারণাটা যদি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমিত থাকে তাহলে হয়ত এমন বাংলা দিয়ে চলতে পারে হয়ত। যদিও এটা ভাল বাংলা নয়। কারণ ফেডারেল শব্দের সাধারণ অর্থ হল, স্বাধীন ও সমতুল্যদের মধ্যে এবং তাদের নিয়ে গড়া এক  এসোসিয়েশন। যেমন স্বাধীন ফুটবল ক্লাবগুলোকে নিয়ে গড়া এক ফুটবলের ফেডারেল এসোসিয়েশন বা ফেডারেশন। অথবা স্বাধীন গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক ফেডারেশন। অথবা সবধরনের স্বাধীন ট্রেডের  এসোসিয়েশনগুলোরও আবার এক ফেডারেশন। লক্ষ্য করেন, এখানে কিন্তু ফেডারেশন বা ফেডারেল ধারণার ব্যবহার কোনো রাষ্ট্র-বিষয়ক ব্যাপারে নয়। তাই ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় শব্দটা এখানে কোনোভাবেই যুতসই তো নয়ই; সোজা কথা তা খাটবে না, অচল। তাই এ লেখায় ফেডারেল শব্দের কোনো বাংলা না করেই তা সরাসরি ব্যবহার করব।

    আর ফেডারল শব্দটা আমাদের মানুষের কাছে তাদের নজর ও নাগালে এসেছিল অন্তত দুবার। প্রথমবার ১৯২৮ সালে যখন মুসলিম লীর নেতা জিন্নাহ নেহেরুকে আগামি ভারত (যেটা এখন ভারত ও পাকিস্তান হয়ে গেছে)  স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যগুলোর একটা ফেডারল ভারত করা হোক বলে প্রস্তাব করেছিলেন। আর স্বভাবতই আমরা উপরে দেখেছি নেহেরু-স্টাইল ছিল ঠিক এর উলটা, তাই তা প্রত্যাখ্যাত বা পত্রপাঠ বিদায় হয়েছিল। আর দ্বিতীয়বার আমরা শুনেছিলাম ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বদলে খন্দকার মোস্তাক পাকিস্তানের সঙ্গে এক কন-ফেডারেশন গড়তে চেয়েছিলেন বা সে লক্ষ্যে কিছু চেষ্টা করেছিলেন।

    তাহলে এখন কেবল রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো ধারণা হিসেবে যদি বলি, এটা একটা ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ বলতে যেমন বললাম, আমেরিকা একটা ফেডারেল রাষ্ট্র, তাহলে কী বুঝব?

    সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, এটা ৫০টা স্বাধীন ও সমতুল্য স্টেটের সমর্থনে গঠিত একটা ফেডারেল রাষ্ট্র অবশ্যই; তবে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগেই সেগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং আছে বলে তাদের নিয়ে গঠিত এই বিশেষ ধরনের এসোসিয়েশন বা রাষ্ট্রটাকে ফেডারেল রাষ্ট্র বলা হচ্ছে।

    তাহলে এখন এক সম্পূরক প্রশ্ন তোলা যাক। তাই, ভারতও কী একটা ফেডারেল রাষ্ট্র? কারণ ভারতেও তো বর্তমানে ২৮টা ছোট-বড় রাজ্য আছে বা নিয়ে গঠিত?

    না, একেবারেই তা নয়। ভারত কোনো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; যদিও কেন নয় তা যথেষ্ট না জেনে বুঝেই অনেকে পত্রিকা রিপোর্টে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরোধের ইস্যু হলেই তাকে ‘ফেডারেল’ সমস্যা বলে যেচে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি জাহির করতে চায় অনেক রিপোর্টার। মানে শব্দটা তারা শুনেছে যেন সেটা বুঝাতে চায়। কিন্তু কথাটা সবচেয়ে বেখেয়ালে বলে ফেললেও ভারত কোনোভাবেই ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ নয়। আর মূলকথাটা হল, একটা রাষ্ট্রের ভিতরে  অনেকগুলো প্রদেশ বা রাজ্য থাকা মানেই সেটা একটা ফেডারল রাষ্ট্র – এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাজে কথা।

    কিন্তু কেন? ফেডারল বুঝতে এত কঠোর সীমারেখা টানছি কেন?
    ফেডারল কথাটা আমরা বুঝতে পারি আমেরিকার জন্মের ইতিহাস দিয়ে এবং সম্ভবত তাতে সবটা সহজে বোঝা যাবে। খুব অল্প কথায় বললে আজকের “ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র” এটা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্ম নিয়েছিল। আজ পর্যন্ত এটাই দুনিয়াতে ফেডারল রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ।  আর এর আগের (১৭৭৬ সালের আগের) কলোনিয়াল আমেরিকা [American colonies] বলতে তা ব্রিটিশসহ ইউরোপের বহু রাষ্ট্রেরই  কলোনিদখল ব্যবসায়ী কোম্পানির মালিকানাধীন ছোট ছোট কলোনি বা দখলকৃত ভূমি হিসেবে ছিল। আর ঐ দখলকৃত ভূমিগুলো আবার ব্রিটিশসহ নানান ইউরোপীয় দখলদাররা নিজ নিজ দেশ থেকে ‘বিনা পয়সায় জমি দেয়া হবে, শুরুর বিনিয়োগ দেয়া হবে’ ইত্যাদি নানা প্রলোভনের কথা বলে গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দাদের মাইগ্রেট করে জাহাজে ভরে ভরে এককালে আমেরিকায় এনেছিল।

    এসব গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দারাই জমি পাওয়ার লোভে মাইগ্রেট করে আমেরিকায় এসেছিল।  এরপর এরাই স্থানীয় আদি বা নেটিভ বাসিন্দাদেরকে (‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলে এরা ডাকত যাদের) খেদিয়ে দিয়েছিল, কখনো মেরে ফেলা হয়েছিল অথবা আরো গহিন বন জঙ্গলে পালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এভাবেই সাদা চামড়ার কলোনি মালিকরা সাদা ইউরোপীয় গরীব মাইগ্রেন্টদের এনে বসতি স্থাপনে বিভিন্ন ছোট শহর বা রাজের আমেরিকা কলোনি স্থাপন সম্পন্ন করেছিল। এই প্রথম পর্বের পরে মালিকরা এরপর সেখানে নিয়ে আসে আফ্রিকানদেরকে ‘কালো দাস’ নামে, একইভাবে মাইগ্রেট করিয়ে। তফাত খালি এরা পায়ে শিকল পরানো দাস হিসেবে এসেছিল এবং তা আফ্রিকা থেকে। আর এই দাসদেরকেই পরিচালনা করত সাদা মাইগ্রেন্টরা তবে সাদা মালিকদের পক্ষ থেকে। আর রাশিয়ান সোভিয়েত শ্রমশিবিরের চেয়েও ভয়াবহভাবে শিকলে বাঁধা দাসশ্রমিক হিসেবে। তবু যতই দিন গেছে, আর কালো মানুষেরা যত “পোষ” মেনেছে, ততই শিকল আলগা করে দিয়েছে শাসকেরা।

    ওদিকে ব্রিটিশরা ভারতে কলোনি দখল ও শাসন শুরু করেছিল – আমেরিকার কলোনিমুক্ত বা স্বাধীন হওয়ার মাত্র কুড়ি বছর আগেই। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের পায়ে শিকল না দিলেও কলোনির হুকুম ও বাধ্যবাধকতার ভেতরে রেখেছিল যা আমাদের প্রায়ই অসহ্য হয়ে উঠলে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটত। কিন্তু আমেরিকার বেলায় নানান শহর ও রাজ্যের সাদা মাইগ্রেন্টরাই এক সময় তাদেরই মাস্টার বা সাদা মালিকদের শাসনের বিরুদ্ধে শুধু বিদ্রোহ নয় একবারে বিপ্লব – মানে পাল্টা ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এটাই আমেরিকান কলোনিতে ‘নয়া আমেরিকান বিপ্লব’ [American Revolution] নামে পরিচিত, যার সময়কাল ১৭৭৬ সালের আশপাশের সময়। সোজা কথা, ব্রিটেনে বসে কলোনি ব্যবসায়ী মালিকরা আমেরিকায় তাদের নানা শহর বা রাজ্যের কলোনিগুলো সাদা ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের দিয়ে পরিচালনা করবে, এই সুযোগেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে। এরপর স্বাধীন সেসব শহর ও কোথাও পুরা রাজ্যটাই স্বাধীন হয়ে যায়। এবং এবার তারা একত্রে হওয়ার জন্য সম্মিলিত হয়ে বসেছিল; যেটাকে তারা আমেরিকা মহাদেশীয় সম্মেলন (আমেরিকান কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ১৭৭৫) নামে ডাকে। Continental-Congress  বসা ছিল খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। এরপর পরের বছর ১৭৭৬ সালে এক ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্রে তারা সম্মিলিতভাবে গঠিত হয় ও এর স্বাধীনতার ঘোষণা [Declaration of Independence (1776)] দেয়।

    ফেডারল ধারণা বুঝবার জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও লক্ষণীয় যে, এখানে শহর বা রাজ্যগুলো আগে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত হয়েছিল। এরপরে  এই স্বাধীন রাজ্যগুলো একটা রাষ্ট্রে ফেডারেটেড [Federated] ভাবে একত্র হতে এসেছিল। এটাই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্মের ঘোষণা দেয়া আজকের ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র ও এর বৈশিষ্ট্য। তবে আজকের ৫০ রাজ্যের আমেরিকা যা আমরা দেখছি তা অবশ্য শুরুতে এমন ছিল না। শুরুতে মাত্র ১৩টা স্বাধীন রাজ্য কনফেডারেশনে এ ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে সম্মতি দিয়েছিল। কেন? কারণ সদ্য স্বাধীন কলোনিমুক্ত রাজ্যগুলোর  সবার মনে ভয় ছিল নতুন এই ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে আবার আগের মত কোনো রাজ্য আরেক রাজ্যের ওপর কলোনির মতো আচরণ শুরু করে কি না – সেটাই সবাই আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তাই দ্বিধা ও দেরি। যেমন শুরুতে ফেডারল আমেরিকার কোন একক কারেন্সি বা ডলার মুদ্রা ছিল না। এমনকি এক রাজ্যের মুদ্রা আরেক রাজ্যে চলত না। প্রত্যেক রাজ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের আলাদা আলাদা ছাপানো কারেন্সি ছিল। প্রথম স রাজ্যীর সব ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা কো-অর্ডিনেশনের জন্য ফেডারল রিজার্ভ ব্যাংক (একালের তুলনীয় আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক ) গঠন করা হয়েছিল এই ১৯১৩ সালে।  এরপর ১৯১৫ সালে প্রথম ফেড-এর ইস্যুকৃত বাজারে আসে। তাই তা কেবল ৫,১০ আর ২০ ডলারের। তাই ধীরে ধীরে যত আস্থা এসেছে ততই ফেডারল আইনকানুন কী তৈরি হচ্ছে সেগুলো এবং গঠনতন্ত্র কী রাখা হচ্ছে, কাঠামো কী ইত্যাদি দেখে আর কিছুটা প্র্যাকটিসে নিশ্চিত হওয়ার পরে ১৩ রাজ্য থেকে সেটা আজ ৫০ রাজ্যের আমেরিকা উঠে এসেছে। কাজেই ফেডারল ধারণার গোড়ার ধারণা হল, আগে নিজে স্বাধীন থাকা পরে ফেডারল বা এক ফেডারেশনের ছাতার নিচে আসা। নইলে বের হয়ে যেন যেতে পারে – এমন সুযোগ ও বের হয়ে যাবার রাস্তা খুলে রাখা থাকা চাই।

    নেহেরুর কেন্দ্র-রাজ্যের ভারতঃ
    তাহলে এখন আসেন ১৯৪৭ সালে, নেহরুর গঠিত ভারত সেও তো এমন ২৮-২৯টা রাজ্যে এবং এরা কি প্রত্যেকে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত রাজ্য ছিল? না, একেবারেই নয়। বরং কথিত ভারত বলে একটা বিরাট ভূখণ্ড ছিল বলে ধরে নেয়া হয়েছিল আর যেটাই ব্রিটিশ শেষ ভাইসরয় (রানীর প্রতিনিধি) মাউন্টব্যাটেন নেহরুর হাতে ১৫ আগষ্ট তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো কোন কোন ভূখণ্ড? এক কথায় বললে, কেবল যেগুলোর প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে তৈরি ও পরিচালিত হত। অর্থাৎ তিন প্রেসিডেন্সি (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) ও প্রায় ১৮টা প্রদেশ। আর এর বাইরে ছোটবড় মিলিয়ে ৫৫০ এরও বেশি করদ রাজার রাজ্য ছিল। কিন্তু এগুলো নেহরুকে হস্তান্তরের প্রশ্নই ছিল না।

    কারণ এগুলো ছিল ব্রিটিশ শাসনক্ষমতার অধীনস্থ এবং শর্ত সাপেক্ষ মানে, রাজারা বৃটিশ শাসনক্ষমতার সাথে তাদের আদায়কৃত রাজস্বের একাংশ শেয়ার করতেন। কাজেই ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওসব করদ রাজ্য তখন থেকে আবার ফিরে স্বাধীন রাজার রাজ্য হয়ে যায়। আর তাতে, নেহরুর কাছে করদ রাজ্যগুলোকে আর হস্তান্তরের কোনো আইনি অধিকার ব্রিটিশ শাসকের ছিল না।

    কাজেই নেহরু যে দুশ্চিন্তায় ‘পাগল’ ছিলেন তা হল, প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ ও পুরানা করদ রাজ – এদের সবগুলোকে পিটিয়ে জবরদস্তি করে হলেও, সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও – কথিত এক ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যায় কী করে! এই হলো জন্মের সময়কালের নেহরুর ভারত। সে কারণে নেহরুর নিজের ভারতের রাজ্যগুলোর জনগণের প্রতি অ্যাটিচ্যুড যেন ভারত কলোনিমুক্ত হলেও তিনি তখনও এক কলোনি ভাইসরয়! যেন নিজেই রাজা বা রানী অথবা প্রধান রাজ-প্রতিনিধি।

    অর্থাৎ উল্টা করে বললে ২৮-২৯ টা রাজ্যে এরা যতই স্বাধীন ততই তা নেহরুর মাথা ব্যথার কারণ। সার কথায়, আমেরিকার মত স্বাধীন রাজ্যগুলো স্বেচ্ছায় যুক্ত হচ্ছে, এমন কোনো ভারত-রাষ্ট্রে তারা সংযুক্ত হয়নি। আর আসলে যে কনসেপ্টটা কাজ করেছে সেখানে যে, মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে ভারত বলে কিছু একটা দিয়ে গেছেন; অতএব সে কারণেই ভারতের রাজ্যগুলো স্বাধীন নয়, এমনকি পুরানা করদ রাজ্যগুলোও স্বাধীন নয়  – জবরদস্তিতে করার এই অনুমানটাই বাস্তবায়ন করেছেন নেহরু। আর সেকালে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে এভাবে। এই রাষ্ট্র তাই নিজেই নিজেকে কখনো অন্তত কনষ্টিটিউশনে  “ফেডারেল” বলে ব্যাখ্যা করতে বা তুলে ধরতে যায় নাই। তাহলে ভারত কী? এই হলো ভুতুড়ে ভারত ও তার জন্ম!

    এখন এই ভূতুড়ে ভারতটা কে? অনেক সময় মনে হবে এটা বোধহয় ‘উত্তর প্রদেশ’ রাজ্য। কেন? কারণ এর এলাহাবাদ শহরে নেহরুরা বাস করতেন। তার বাবা মতিলাল নেহেরু ওকালতি প্র্যাকটিস করতে কাছের বড় শহর হিসেবে (কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ তিনি) এলাহাবাদে এসেছিলেন।

    [ইলাহাবাদের শহরের সব পুরানা চিহ্ন শেষ করে দিলেও এখনও এটা বড় শহর। যদিও এর নাম বদলে “প্রয়াগরাজ” [Prayagraj] রাখা হয়েছে মোদীর দলের হাতে ২০১৮ সালে।  কিন্তু এখনও উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সর্বোচ্চ কোর্ট, হাইকোর্টটা  “এলাহাবাদ হাইকোর্ট” নামেই ইলাহাবাদ শহরে থেকেই গেছে।]

    এখন তাহলে এই উত্তর প্রদেশ নামক এই রাজ্য কী ভারতের বাকি সব রাজ্যের ওপর শাসনকর্তৃত্বের কর্তা? কিন্তু সে ক্ষেত্রেও এই শাসনের ভিত্তি কী, ক্ষমতার উৎস কী,  সে প্রশ্ন থাকবে। যার উত্তর কেউ জানে না। তাই এটা ভূতুড়ে! তাহলে কি এটা সেই ইঙ্গিত যে, উত্তরপ্রদেশ মানে এক আর্য-শাসন বুঝতে হবে? তাহলে আর সেটা সবাই মানলেও বাংলা বা দ্রাবিড়ীয়রা তা মানতে বাধ্য কেন?

    এসব প্রশ্নের কোনো দিনই কোনো সমাধান হয়নি। উল্টা উত্তর প্রদেশ বা হিন্দিবেল্ট কেন্দ্রিক ভূতুড়ে এক ক্ষমতা, এরই নাম হয়ে গেছে “কেন্দ্র”। কনস্টিটিউশনেই আবার কখনো একে ‘ইউনিয়ন’ বলা হয়েছে বটে বিশেষত জুডিশিয়ারি অংশে। কিন্তু এটা কাদের ইউনিয়ন? ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার আগে কি তারা স্বাধীন ছিল?  নাকি ভারত বলে এক ভাববাচক আগাম ভুতুড়ে ধারণাই ছিল মাত্র? তাহলে কারা এক জায়গায় জড়ো বা ইউনিয়নে যুক্ত হচ্ছে? এসবের কোনো জবাব কোথাও নেই। বরং আগেই বলেছি সারা ভূখণ্ডকে ভারত নামের মধ্যে ধরে রাখবেন কী করে, কিসের আঠা লাগিয়ে, এটা ছিল বরং নেহরুর দুশ্চিন্তা। এই ‘আঠা’টারই হল হিন্দুত্ব। যদিও নেহরু ও গান্ধী বুদ্ধিমান, তাই তারা এ কথাটা প্রকাশ্যে কোথায় লিখে বলতে চাননি। আর সে কারণেই সম্ভবত এই কথিত কেন্দ্র এই ভারত, সেটা কথিত ‘সেকুলার’ কি না তাও নেহরু ও গান্ধী রা কোথাও লিখে রাখেননি। ইন্দিরা গান্ধী কেবল ১৯৭৬ সালে এসে “বাংলাদেশের কারণে” তা লিখিয়েছিলেন।

    তবে ভারত মানে উত্তর প্রদেশ কিংবা আর্য-শাসন এসব চিন্তা যে নেহেরুর মাথায় কাজ করত এটা অমূলক নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৬২ সালের কিছু ঘটনা। সেটা হল, সারা ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা ও অফিসিয়াল ভাষা করতে হবে বলে এক সিদ্ধান্ত নেহেরুর সরকার বাস্তবায়ন করতে গেছিলেন।  নেহেরুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রথম প্রতিবাদ বিক্ষোভ বলা হয় এটাকে যা দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য থেকে শুরু হয়েছিল। এবং প্রধানত তামিলনারু থেকে। দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য বলা হয়, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গনা, কর্ণাটক, তামিলনারু, কেরালা – এদেরকে। এর দুবছর পরেই নেহেরু মারা যান। আর তিনি বেচে থাকতেই এবং পরের প্রধানমন্ত্রী এই ইস্যুতে আপোষ করে মিটিয়ে নেন।   আর সেই থেকে ভারতে রাষ্ট্রভাষা বলেই কিছু নাই (এটাই সুপ্রীমকোর্টেরও রায়) তবে অফিসিয়াল ভাষা আছে যদিও সেখানে হিন্দির পাশাপাশি ইংরাজিও যুক্ত করে নেয়া হয়। আসলে এটাই ছিল কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা।  কিন্তু এখান থেকে এটা পরিস্কার যে কেন্দ্র মানে “আর্য-শাসন” (যেখান থেকে হিন্দি-প্রীতি) ধরণের ধারণায় নেহেরু ভুগতেন।  অনেকে মনে করেন নেহেরুর জীবনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা  ও চ্যালেঞ্জ ঘটেছিল প্রায় একই সময়ে ১৯৬২ সালে।  প্রথমটা আর্যশাসন সংক্রান্ত সারাভারত হিন্দিভাষা চালু করতে গিয়ে ধাক্কা খাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ।  আর এই দুই ঘটনার শোকেই তিনি ব্রেনস্ট্রোক করেছিলেন বলে অনেকের বিশ্বাস আর এই ধারণা যে এতে তিনি এই প্রথম নিজের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন। আর এর দুবছরের মধ্যে তিনি মারা যান।

    আমরা তাহলে এখন আরো ফোকাসে আসি। সেটা হলো, নেহরুর ভারত তাহলে ফেডারেল দূরে থাক, এটা বরং “কেন্দ্র” নামে ভূতুড়ে ক্ষমতার অধীনস্থতায় থাকা সব রাজ্যগুলোতে, যেখানে মূলকথাটা হল, বহুবিধ জায়গা ও সুযোগ রেখে দেয়া যাতে কেন্দ্র রাজ্যের ওপর চাইলেই হস্তক্ষেপ করতেই পারে। রাজ্যের  সর্ববিধ শাসন প্রশাসনকে ওভাররুল করে  “কেন্দ্র” নামে এক কর্তৃত্বের অধীনে সব তুলে নিতে পারে।

    যেমন গভর্নর ব্যবস্থা, এটা করাই হয়েছে যেন যেকোনো সময় “কেন্দ্র” রাজ্যসরকারকে বাতিল করে এর পরিচালনা নিজের হাতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতি খারাপ – এই বলে গভর্নর রিপোর্ট দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই আসলে গভর্নর মূলত কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপের হাতিয়ার। একইভাবে বাজেট বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতিরোধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রের একক নিয়ন্ত্রণে, মানে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় রাখা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার-অপব্যবহার করে [যেমন মমতার] রাজ্য সরকারের উপর প্রধানমন্ত্রীর [মোদীর] হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। আসলে এভাবেই হস্তক্ষেপের মেকানিজম যেন তথাকথিত ভূতুড়ে কেন্দ্রের হাতে থাকে এমন সুযোগ রেখেই সেকালে কনস্টিটিউশন লেখা হয়েছিল; যাতে নেহরু নিজ হাতে সব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারেন।

    আবার এ হস্তক্ষেপগুলো আগাম কোন লিখে রাখা ‘রুল বুক’ (বা চাইলে তা সংসদে পাশ করে নিয়ে রাখা) মেনে চলা হোক, তা সেভাবে রাখাই হয়নি। বরং রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তি বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উপর। কাজেই রাজ্যকে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিইচ্ছার অধীন হতে হবে রাজ্যকে, সোজা কথায় ‘তেল মারতে হবে’। এমনিতেই রুল বুক বা প্রশাসনের বিজনেস রুল বুকের অধীনে না থাকা কোনো ক্ষমতা মানেই তা ভয়াবহ  এক দানবীয় হতে বাধ্য। কারণ কোন “রুলবুকের” অধীনে লিখিত এই না থাকার মানেই হলো চরম অরাজকতা। কারণ  কেউ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেই তার ক্ষমতার প্রয়োগের  ব্যাপারটাকে  তার ব্যক্তিখেয়ালের হাতে কোনোভাবেই ছেড়ে দেয়াই যায় না। রুল বুকের স্ট্যান্ডিং গাইডলাইন অবশ্যই থাকতে হবে। অথচ তা নেই, রাখা হয়েছে সাবজেক্টটিভলি বা অবাধ ব্যক্তি খেয়ালে।

    মোদী-মমতা বা কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদঃ
    এবারের রাজ্য নির্বাচনে দলের হারার পর মোদীর আচরণ ও তৎপরতা বলছে তিনি মমতার সাথে সঙ্ঘাতেই থাকতে চান। অনেকটা যেন তিনি বলতে চান, নেহেরু মহাশয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এসব অবাধ হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুবিধা দিয়ে গেছেন।  ফলে কংগ্রেস তাকে কিছু বলতে পারবে না। কাজেই তিনি সেসব সুবিধা বিজেপি দলের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না কেন?   যেমন সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় পরবর্তি পরিস্থতিকে তদারকির উছিলা করে মোদী মমতার সাথে এক মিটিংয়ে বসতে চান বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোদীর ইচ্ছা সেখানে তিনি রাজ্য বিরোধীদলের নেতা হিসেবে তার দলের লোককেও উপস্থিত রাখবেন এবং এতে সম্ভবত দলীয় কর্মীদের দেখাবেন যে কলকাতার বিরোধী নেতাও অনেক ক্ষমতা রাখেন। এখন এই প্রসঙ্গে মমতার দাবি, মোদী এই ব্যাপারটা একা ঠিক করতে পারেন না যে, রাজ্য থেকে সচিব ও প্রশাসনিক স্টাফসহ সাথে আর কোন কোন জনপ্রতিনিধি তাদের দুজনের সভায় উপস্থিত থাকবেন। আর এসব বিধি বা কনস্টিটিউশনে নেই বলে দাবি করেছেন মমতা।

    এমনিতেই এটা দৃষ্টিকটু যে প্রধানমন্ত্রী ব্যুরোক্র্যাট আর মুখ্যমন্ত্রীর মতো জনপ্রতিনিধিকে একই প্রটোকলে ট্রিট করছেন। এর উপর সবখানেই মোদীর এটা প্রদর্শনের ইচ্ছা যে, মুখ্যমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রীর এক অধীনস্থ প্রশাসনিক স্টাফ! এমনিতেই নেহরু কথিত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুযোগ রেখে দিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সাজিয়ে গেছেন। কারণ তার অযথা ভয় থেকে অযাচিত ক্ষমতার চর্চা যে রাজ্য যদি কেন্দ্রের কথা না শুনে; তাই সবসময় রাজ্যকে দাবড়ে রাখার সব মেকানিজম, দ্বৈত ক্ষমতাকর্তৃত্ব-ব্যবস্থা- এসবই হবে এর হাতিয়ার। এর উপর মোদী নিজেই মমতাকে একটা শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থতায় আসতে বাধ্য করতে চাচ্ছেন। তাই সব মিলিয়ে এটা ভয়াবহ।

    এখন মমতা ওই সভায় রাজ্যের প্রধান সচিবকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা করেই সম্ভবত কেবল মোদীর সাথে সাক্ষাৎ করেই, কোনো মিটিং না করেই ফিরে চলে আসেন। শুধু তাই নয়, নিজ রাজ্যের মুখ্যসচিবকেও সাথে নিয়ে  মোদীর মিটিং বর্জন করে চলে আসেন।

    স্বভাবতই এটা মোদির জন্য অপমানবোধের। তিনি মুখ্যসচিবকে শোকজ করেন এবং দিল্লিতে এসে রিপোর্ট করতে বলেন। কিন্তু মুখ্যসচিব এর জবাবে লিখেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে মানে কথা শুনেই মোদীর ওই সভায় থাকতে পারেন নাই। অর্থাৎ তিনি যেন বলছেন, আমিও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী অবশ্যই। কিন্তু আমার বর্তমান রিপোর্টিং জনপ্রতিনিধি হলেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রধানমন্ত্রী নন। কাজেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকেই তাকে ফলো করতে হয়েছে। অর্থাৎ এটাও আসলে এক দ্বৈত ক্ষমতা ব্যবস্থার পরিণতি এবং তা ব্যুরোক্র্যাসিতে।

    এতে যে নতুন জিনিষটা সামনে এসেছে তা হল, এতদিন মনে করা হত কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদের ইস্যুটা বোধহয় কেবল রাজনৈতিক। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের কেবল এতে সংশ্লিষ্ট হবেন বা সাফার করবেন। কিন্তু না। এবার প্রমাণ হল যে বুরোক্রাসির সব অফিসারেরাও (ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের ) এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট হবেনই এবং তাদেরকে পক্ষও নিতে হবেই। আসলে এভাবে একসময় সারা ভারতই অনুভব করবে যে সকলের সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে এই ইস্যুতে। দেখা যাচ্ছে বুরোক্রাসিও এখন এই তর্কে পক্ষ নিচ্ছেন। যদিও এখনও অনেকেই রাষ্ট্রগঠন ব্যাপারটা বুঝেন না বলে ভেবেছেন ভারতের এই দুঃখ বোধহয় বুরোক্রাসির সীমাবদ্ধতা। শ্যাম সরণ একজন অবসরে যাওয়া ক্যাডার কূটনীতিক ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তাঁর ভাবনায় এই সংঘাতের পলিটিক্যাল ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাটা দেখতে চান নাই  বা তার চোখেই পরে নাই হয়ত। তাই তিনি এটাকে বুরোক্রাসির রিফর্ম করেই রাজনৈতিক চিন্তা বা রাষ্ট্রগঠন-বিষয়ক রাজনীতিবিদদের চিন্তার ঘাটতির  সমাধান করে ফেলবেন ভেবেছেন। যা একটা ফলস অনুমান।

    এমনিতেই সবখানে জাতিবাদ বিশেষ করে জাতিগত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের তোড়ে ভারত ডুবছে। এর ওপর তাদের আরেক ভ্যানিটি হল, ভারতের ব্যুরোক্র্যাসি নাকি ‘স্টিলের তৈরি’, [Anarchy, dents Sardar Patel’s IAS steel frame’ ] তাই এটা এতই শক্ত। আর এর ক্রেডিট হল নাকি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের যিনি এর প্রণেতা, মন্ত্রী। প্যাটেল, তিনি মহাত্মা গান্ধীর মতই এক গুজরাটি লোক ও বাসিন্দা। তাই মোদী গুজরাটে তার রেকর্ড উঁচু (৫৯৭ ফুট) এক স্ট্যাচু বানিয়ে নিজেই আরো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্যাটেল হলেন আবার নেহরুর সব আকাম বা জবরদস্তি ঘটানো যে কোনো কাজের ডানহাত। যেমন ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে করদ রাজাদের ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করার নেতা তিনি ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে।

    এখন বাস্তবে এই স্টিলের ব্যুরোক্র্যাসির যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা চর্চার দিক থেকে মূলত এক দ্বৈত শাসনব্যবস্থা আর সেটাই ভেঙে পড়তে যাচ্ছে তা বুঝতে পারা বা বিপদ অনুভব করার কেউ আছেন এমন দেখা যাচ্ছে না।

    কাজেই এভাবে চললে মোদীর টার্ম শেষ হতে হতে ২০২৪ সাল নাগাদ নেহরুর ছাপ মারা এই ভারত মানে, এই নেহরুভিয়ান ভারতরাষ্ট্র তার জন্মদুর্বলতায় ক্রমেই আরো কয়েক ধাপ ভাঙনের দিকেই এগিয়ে যাবে। এর সোজা প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো পরবর্তীতে কথিত কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে। আমরা হয়ত দেখব, কোনো সর্বভারতীয় দল যেমন কংগ্রেস বা বিজেপি – এরা আর কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারছে না।  আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশনই একমাত্র ভরসা হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাই বড় হবে।

    এটাই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস। এমনিতে রাষ্ট্র ভেঙে পড়া মানেই তা খারাপ, তা কিন্তু নয়। কারণ গড়তে গেলে তো আগে তা ভাঙতেই হবে। কিন্তু এটাই বিরাট বিপদের হবে যখন ভাঙার পরে গড়বেন কিভাবে, কী গড়তে চান, এ নিয়ে আপনি একেবারেই অপ্রস্তুত ও পরিকল্পনাহীন! সারা ভারতের দশা আবার এটাই বলে মনে হয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ৫ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “নেহরুভিয়ান এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

    ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

    গৌতম দাস

    ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2we

     

     

    ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

    অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

    কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

    এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

    ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

    অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
    বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

    কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
    প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

    মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

    আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

    এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
    ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

    তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

    কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

    প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

    এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

    তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

    ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

    ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

    এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

    শেষ কথাঃ
    কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
    কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]