Category: পিভোট Pivot

  • আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3dR

    Biegun-Momen joint Press meeting

    আমেরিকান ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের দু’দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম যে মন্তব্য করার আছে সেটা হল, এতে তাৎক্ষণিক কোনো ফল আসেনি বা আসছে না তা বুঝা গেছে। কিন্তু এর মানে কী আগামীতে আসবে? না। সেটাও একেবারেই অনিশ্চিত এবং সম্ভবত, না। বরং এশিয়ায় আমেরিকা এক চির-অথর্ব শক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

    যদিও আপাতত, আমেরিকার দিক থেকে বললে তারা যে ফলাফলের আশায় আর যে বুঝাবুঝিতে বাংলাদেশকে রাজি করানোর পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল তা তাৎক্ষণিক ফল দেয়নি, মানে কাজ করছে না, এটা তারা বুঝেছে। এ যাত্রায় তাতে দেরি হবে, সময় লাগবে এমনকি কখনো না-ও হতে পারে। এখন আমেরিকা যদি একটা ইতিবাচক ফল চায় তবে এই রাস্তায় হবে না। ভিন্ন রাস্তা ও কৌশল ধরতেই হবে। তাহলে কী হবে এখন?

    ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়েছে নাকি-আলাপ হয়নিঃ
    ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ জিনিসটা কী? স্ট্রাটেজি নাকি নেশনস বা ভিশন অথবা জোট বা সমিতি? আজও তা আমেরিকাও জানে না। তবু ভারতের মিডিয়াকে অনুসরণ করে এবার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (বা সংক্ষেপে আইপিএস [Indo-Pacefic Strategy, IPS]) বলতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু প্রো-ইন্ডিয়ান মিডিয়াকে। যেখানে খোদ আমেরিকাই এখনো একেক সময় একেকটা শব্দ ব্যবহার করে অস্থিরতা প্রকাশ করে যাচ্ছে। আমেরিকান কূটনীতিকরা আর গ্লোবাল নেতা থাকছেনা বলে আমেরিকার ওজনের ভারে কিছু কাটতে পারছেন না। তারা বললেই হয়ে যাচ্ছে না। বহু কাঠখড় পুড়িয়েও সময়ে তা থেকে কিছুই মিলছে না। সবকিছু দ্রুতই যেন দিন ফুরিয়ে আসছে, এমন দশা। এ দিকে বিগানের বাংলাদেশে আসার পর দেখা যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক “বিজনেস ফোরাম” বলে আরেক নতুন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। শব্দটা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মানে রাষ্ট্র যারা ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্ত হবেন তাদের একটা ইকোনমিক বা বিজনেস জোটও থাকবে, তাই মনে হচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দিক থেকে দেখলে এটা যেন বিগানকে দেয়া তার এক সান্ত্বনা পুরস্কার যে, ‘বিজনেস ফোরাম নিয়ে খুশি থাকো’! এদিকে আবার ‘কোয়াড’ বলে চার-রাষ্ট্রীয় (QUAD) এক জোট  তো আছেই। সেই সাথে আবার এদের সবাইকেই কি ‘এশিয়ান ন্যাটো’ বলে আরেক নামে নামাবে এরও কানাঘুষা উঠছে। তার মানে ইন্দো-প্যাসিফিক বলতে সামরিক-নিরাপত্তা জোট নাকি বিজনেস জোট মুখ্য হবে এ নিয়ে টানাটানির এখনো শেষ হয়নি।

    অভ্যন্তরীণভাবে ইন্দো-প্যাসিফিকে এসব অমীমাংসিত বিষয় থাকা অবস্থায়, বাংলাদেশে আমরা দেখছি এবার প্রথম বাধা উদয় হল যে, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলাপ হয়েছে, না হয়নি – এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান হল, ধারাবাহিকভাবে তারা বলছেন- ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন ও ডেপুটি-মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দু’জনই আলাদা করে ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন “আইপিএসের প্রসঙ্গটা আলোচনায় আসেনি”। অথচ ‘প্রথম আলো’ নিশ্চিত করে লিখেছে তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিগান বলেছেন, “আজ (বৃহস্পতিবার) আমি বাংলাদেশ সরকারের সাথে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করেছি। ব্যাপকতর অর্থে আইপিএসে যেসব সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছি। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে আমরা একে অন্যকে কিভাবে যাতে সহায়তা করতে পারি তা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই, এর প্রতিবেশী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে”।

    এখন ভাষ্যগুলোকে আমরা কী এভাবে নিতে পারি? বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে কথা বলতে চায় না এই অবস্থানটা বুঝিয়ে দিতে গিয়ে যতটুকু যা কথা বলতে হয়েছে, এটা তাই। এ ছাড়া সরকারের অবস্থানটাও  বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগে থেকেই অনেক শক্ত ছিল। অন্তত যতটুকু আর যে শক্ত ভাষায় তারা মিডিয়ায় কথা বলছেন। যেমন, দেশের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় উঠেছে, বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগের দিন মন্ত্রী মোমেনকে এক সাংবাদিক যতবার আমেরিকান প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন করেছেন তাতে অন্তত বেশ কয়েকবার তিনি বলেছেন ‘উই আর নট ইন্টারেস্টেড’। এর মধ্যে সবচেয়ে কোটেড দু’বাক্য হল এ রকম। মোমেন বলছেন,

    “We have no objection to the Indo Pacific Strategy. But they should come forward to the infrastructure development if they want to make the Indo Pacific Strategy more effective”.

    “ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আমাদের আপত্তির তো কিছু নেই। যদি তারা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে কার্যকর দেখতে চান, তবে তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপায়গুলো নিয়ে সামনে আসতে হবে। তাদের অর্থব্যয় করতে পারতে হবে; শুধু কথায় কাজ হবে না”। এরপরে ঐ সাংবাদিক নিজে যোগ করেছেন, ‘মন্ত্রী আসলে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে আমেরিকার কোনো বিনিয়োগ বা অবদান নেই এ কথার দিকে ইঙ্গিত করছেন”।
    এর আগেরদিনও আমেরিকার কেবল অস্ত্র-বিক্রির দিকে আগ্রহকে খোঁচা দিয়ে মোমেন বলেছিলেন, “তারা আমাদের অস্ত্র-বিক্রি (অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইত্যাদি) করতে চায়। কিন্তু আমরা কোনো সঙ্ঘাতের ব্যাপারে জড়িত হতে আগ্রহী নই। তারা চাইলে অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে”।

    “They want to sell arms, but we are not interested in issues related to conflict,”

    আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক নৌকায় ওঠার প্রস্তাব উপড়ে ফেলে দেয়ার দিক থেকে দেখলে এটা হাসিনা সরকারের ভাল কৌশল যে, এমনভাবে শান্তিবাদী এবং উন্নয়নবাদী সেজে জবাবটা দিয়েছে। আর উল্টা আমেরিকাকে খোঁটা দেয়া যে, – “এখন অবকাঠামো খাতে আর তোমার বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তুমি অযোগ্য আর এটা তোমার দুর্বল জায়গা”। সাথে যেন বুঝিয়ে দেয়া বাংলাদেশের চীনের প্রতি আগ্রহ বা চীনকে আমার দরকার তোমার চেয়ে বেশি। অতএব “উই আর নট ইন্টারেস্টেড”। কিন্তু বাংলাদেশের এই অবস্থান কত দূর টিকবে? সেটা বলা মুশকিল হলেও এটা আপাতত আমেরিকান স্ট্রাটেজিস্টদের বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছে, সন্দেহ নেই।

    বাংলাদেশের অনেকে এখানে একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তর্ক করেন যে, “আমেরিকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ নাকি এখন সর্বোচ্চ”। অনেকে আরো অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটের রেফারেন্স দেন। তাদের বিনয়ের সাথে বলব, বিনিয়োগ বলতে অবকাঠামো বিনিয়োগ বলে যা বুঝায় সেটা সাধারণত কেবল সরকারি ভাবেই হয়। আরেক ধরণের বিনিয়োগ হয় সেটা বেসরকারি। অর্থাৎ ডাইরেক্ট মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) [FDI, Foreign Direct Investment]। যেটা সরকারের নয়; আমেরিকান প্রাইভেট কোম্পানির। আমেরিকান সরকার সেটার মালিকও নয়; ফলে এসব কোম্পানি উঠে চলে যেতে বা জেঁকে বসতে চাইলেও তা তাদের মালিক-শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই মুখ্য করেই সব সিদ্ধান্ত নিবে যেটা ওর শেষ কথা। সেক্ষেত্রে আমেরিকান সরকারের বলার সুযোগ এখানে তাই প্রায় নাই। অতএব, ‘আমেরিকান সরকারি বিনিয়োগ’ বলতে কেবল অবকাঠামোকেই বুঝতে হবে। কিন্তু দূতাবাসের সাইটে ব্যাপারটাকে Bilateral Economic Relations ‘বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ’  বলে শিরোনামে রাখা হয়েছে। অথচ ভিতরে কেবল এফডিআই এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সব বিভ্রান্তি সম্ভবত এখান থেকে। যেখানে আবার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে ঐ বিনিয়োগে সাঙ্গু গ্যাসের জন্য বিনিয়োগটাই ওর বড় অংশ। এটা আসলে শেভরন কোম্পানির বিনিয়োগ। তাই মোট পরিমাণ হিসাবে সেটা ৩.৪ বিলিয়নের। তবু সেখানেও একটা অঙ্কের ফাঁকি আছে। ঐ ফিগারটা বলা হয়েছে ২০১৮ সালের। এ কথার মানে হল তারা ২০২০ সালের পর্যন্ত আপডেটেড তথ্য দিচ্ছে না।, সম্ভবত এর পরের দু’বছরে ফিগারটা কমে গেছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ কথাটা মিথ্যাও নয় আবার এটাই সব সত্যি তাও নয়। তবে মন্ত্রী মোমেনের পরিস্কার দাবি – অবকাঠামোতে আমেরিকান বিনিয়োগ নেই। আর একথাটাও ভুল বলে কেউ দাবি করেছেন, দেখা যায়নি।

    তাহলে কি এখন আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশকে তুলতে না পেরে হতাশ মুখে বসে থাকবে?
    না, ঠিক তা নয়। তবে ইতোমধ্যে বিগান ও তার দল তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটা দেখিয়ে ফেলেছেন মনে করা যেতে পারে। যেমন প্রথম আলোর বিস্তারিত কথোপকথনের রিপোর্টে (১৬ অক্টোবর) দেখা যাবে, যতগুলো ইস্যু বিগান তুলেছেন তাতে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন আমেরিকা তা সমাধানে আগ্রহ দেখাবে যদি তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশ আগে উঠে, তাহলে। তবেই আমেরিকা প্রধান উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে।
    যেমন, স্টিফেন বিগানের এই সফরের পাশাপাশি আরেক প্রচেষ্টা চলছে ইউরোপে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। তাতে বাংলাদেশ অনাগ্রহ দেখিয়েছে ইতোমধ্যেই। ক্রিটিক্যাল বিচারে ব্যাপারটায় বাংলাদেশের অনাগ্রহ দেখানো খুবই সঠিক। কারণ, ব্যাপারটা হল  এরা ইউরোপিয়ানদের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এভাবে জোট বেধে আগামি ২২ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য একটা ফান্ড তৈরির চেষ্টায় বসতে যাচ্ছে। এমন বিষয়ে এক রিপোর্টের শিরোনাম – “রোহিঙ্গাদের ১০ বছর মেয়াদি মানবিক সহায়তা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের, আগ্রহী নয় বাংলাদেশ”।  এখান থেকেই আসলে পুরা ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে যাতে সুবিধা হয় এমন আমেরিকান পরিকল্পনা থাকা অসম্ভব নয় মনে হচ্ছে। যেমন এনিয়ে বণিকবার্তায় মোমেনের বক্তব্য বা মিডিয়ায় প্রশ্ন রেখেছেন,  এতে মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর”।

    চারটি গ্রুপ এ বৈঠকটি মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর। – পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন

    অর্থাৎ সোজা মানে হল, রোহিঙ্গা[Rohingya] ইস্যুতে আমরা আশ্রয়দাতা অথচ কোথাকার চার গ্রুপের মিটিং আর আমরা তা জানি না কেন? দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের পালার জন্য অর্থ সাহায্যের চেয়েও বড় প্রয়োজন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি যাতে তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেদিকে কোনো উদ্যোগ নেই কেন? আর তৃতীয়ত, তিন বছর হয়ে গেল; এখন কেবল ফান্ডের উদ্যোগ। তাহলে প্রত্যাবাসন নিয়ে আগ্রহ হবে কবে, সে খবর নেই কেন? এই কঠোর সমালোচনা বিগান প্রকারান্তরে মেনে নিয়ে বলছেন- কেবল “এ দেশের জনগণকে যাতে তার বোঝা টানতে না হয়” তাই ফান্ডের অর্থ তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দরকার আছে। এছাড়া বিগানের দাবি, “এ সমস্যার শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। তবে এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। সব দেশকেই এ সমস্যা সমাধানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে”।
    দেখা যাচ্ছে “আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন”  বা ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’- সবই তিনি বলছেন কিন্তু উদ্যোগ কে নিবে – ঘন্টাটা বাধবে কে – সেটাই বলছেন না। বরং এক “অনন্তকালের দিকে” তা ঠেলে দিয়েছেন, এটাই সম্ভবত ষড়যন্ত্রপুর্ণ দিক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এছাড়াও, বিগান যে ভাষায় বলছেন, “শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে” যুক্তরাষ্ট্র করেছে বলে যা বলছেন এটা পুরাপুরি ভুয়া। বরং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সীমান্তে ধেয়ে আসার এর প্রথম বছরটা ছিল – আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন শক্তিরই বার্মিজ জেনারেলদের কে কত তোয়াজ করতে পারে এরই যেন প্রতিযোগিতার বছর। কারণ মূল প্রতিযোগিতাটা আসলে ছিল মায়ানমার থেকে কে কত ব্যবসা বাগাতে পারে সেদেশে, এরই প্রতিযোগিতা।  বার্মীজ জেনারেলরাও এই ব্যবসা বিতরণের টোপ দিয়ে ঐতিনটা দেশকেও নাচিয়ে চলেছিল। ব্যবসা পাবার লোভে আমেরিকা, ভারত ও চীন কারোরই আন্তর্জাতিক দায়দায়ীত্ব বা মানবাধিকার প্রসঙ্গে কোন খেয়াল ছিল না। আর এটার সুযোগ নিয়েই  বার্মীজ জেনারেলেরা রোহিঙ্গাদের ইচ্ছামত হত্যা ও রেপ ও নির্মমতার আয়োজন  করে বাংলাদেশে তাদের ঠেলে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এভাবে ঠেলে দেওয়ার সাফাই হিসেবে বার্মিজ পুলিশ-আর্মির ওপর কথিত “আরসা (ARSA) বাহিনীর” মিথ্যা আক্রমণের গল্প হাজির করেছিল। অথচ আরসা হল বার্মীজ সেনাবাহিনীরই তৈরি এই বাহিনী – যা একই পুতুল শিয়ালের ছানার মত বার্মীজ সেনাবাহিনী সব জায়গায় হাজির করে বিপদে পড়লেই; বিচ্ছিন্নতাবাদী ফোর্স হিসাবে দেখায়। যেমন সেসময় দাবি করেছিল কথিত আরসা আক্রমনের প্রতিক্রিয়ায় নাকি বার্মীজ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মেরে রেপ করে সীমান্তে পাঠিয়েছিল। আর এসবের সবচেয়ে ত্যাদরামো ব্যাপার হল, এ নিয়ে এই তিন শক্তি কে কত ভালোভাবে বার্মীজ সেনাবাহিনীর ঐ সাফাই এর পক্ষে দাড়াতে ও সমর্থন যোগাতে পারে, গল্প  গাইতে পারে এরই প্রতিযোগিতা চলেছিল। সে কারণেই রোহিঙ্গাদের আগমনের ঢল সে সময়ে সহসা বন্ধ করা যায়নি। অতএব প্রথম বছরজুড়ে সেসব দিন ছিল ভয়াবহ, এখন সেসব সত্যতা পাল্টাতে চাইলেই কেউ পারবে না। বরং বিপদ ও শঙ্কার কথা হল, ঐ তিন শক্তির বার্মীজ সেনাবাহিনী তোয়াজের প্রতিযোগিতা আবার না শুরু হইয়ে যায়। যদিও এখন একমাত্র চীনই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া  নিয়ে সোচ্চার। আর ভারত, আমেরিকার কোনই খবর নাই। এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এদুইয়ের কাছে কোন ইস্যুই নয়।
    আসলে বার্মীজ সেনাবাহিনীর সাথে এই তিন শক্তির খাতিরদারি সবকালে একই রকম থাকে নাই। যেমন এখন মুখ্যত ভারত সবচেয়ে কাছে বার্মীজ সেনাবাহিনীর নৌকায়। আর এই ভারতই হল সেই ২০০৭ সাল থেকেই আমেরিকাসহ সারা ইউরোপ এমন সকলকে  বার্মীজ জেনারেলদের সা্থে যোগাযোগের অগ্রদুত বা এডভান্স পার্টি – এই ভুমিকা পালন করে এসেছে। আর চীন এখন একেবারেই বাইরে ছিটকে পড়েছে, মনে হচ্ছে। আর আমেরিকার অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগে, যার প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা মেইনটেন করে দিচ্ছে ভারত এবং অবশ্যই তা ভারতের বিরাট এক স্বার্থে। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসব।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুরই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে। এর মানে কি তারা এখন একেবারেই চলে যাচ্ছে?
    অবশ্যই না। তারা অবশ্যই আবার আসার কথা ভাববে। তবে সেটা খুব সম্ভবত আমেরিকার নির্বাচন সমাপ্তির আগে না; পরেই নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাত ধরে, হয়ত। যদি তা ঘটে তবে সেটা হবে বাংলাদেশের উপর আরো চাপ নিয়ে, আরো প্রলোভন নিয়ে এবং আমাদের সরকারকে যতভাবে বাধ্য করার সুযোগ তাদের হাতে আছে সব নিয়ে। এছাড়া আরো অনেক ‘কিন্তু’ আছে।

    স্টিফান বিগানের এই সফরের মুল সাফাইঃ
    মনে রাখতে হবে, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গড়তে চাওয়া এটা আসলে ইতোমধ্যেই একটা ফেইল্ড প্রজেক্ট ছিল; ২০১৬ সালেই ওবামার হাতে ‘এশিয়া পিভোট’ নামের এই প্রকল্পটা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইন্দো-প্যাসেফিক সমুদ্র-অঞ্চলের পাশের একটা দেশও সেকালে ওবামা নিজ নৌকায় তুলতে পারে নাই। তারপরেও স্টিফেন বিগান কিন্তু এখন প্রথম আলোকে যে নতুন গল্পটা দিয়েছে তা এরকমঃ স্টিফেন বিগান বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্যি, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে আমাদের নিরাপত্তার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আর এটা আমি অস্বীকারও করতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দেশেরও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করব না। যেমন হিমালয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গালওয়ান উপত্যকায় চ্যালেঞ্জ আছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপান সাগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাইওয়ানে উত্তেজনা রয়েছে। হংকংয়ে ক্রমবর্ধমান দমন পীড়ন চলছে। তিব্বতের শিনজয়ানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। এসব উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে”।
    এখানে প্রথম বাক্যে ‘আমাদের’ লেখা, এই আমাদের বলতে কারা? কারণ, ওবামার সেই কালেও এশিয়া-প্যাসিফিকের (এশিয়া-পিভোট নাম ছিল তখন ) কোনো দেশই আমেরিকার নৌকায় উঠেনি। এমনকি এই ভারতও না। যদিও তাতে অনেক দেশই আছে যারা সেসময় হয়ত জেনুইনভাবেই চীনের ওপর অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধও এবং অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার যুদ্ধ-নিরাপত্তা ফেরি করার জোটে তারা কেউ উঠেইনি। তাহলে এটা এখনও আমেরিকার “আমাদের” নিরাপত্তা’ চ্যালেঞ্জ হল কেমনে? আমাদের মানে, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ তো আসলে আমেরিকাকে একাই! অর্থাৎ আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে আর তা হয়েছে চীনের হাতে। এবং বড় কথা তা ন্যাচারাল!  আর মানতে হবে কেউই দুনিয়ায় স্থায়ী নেতা নয়। তাই, এমন ধরে নেয়ার কোনই ভিত্তি নাই। কাজেই “আমাদের” বলে এই মিথ্যাটা বলার দরকার কী? আর এতে কী আমেরিকার দুঃখ ঘুচবে? এছাড়া একালেও তো কোয়াডের তিন দেশ ছাড়া আর কেউ এখনও আমেরিকার সাথে জোট করেনি? আবার এই তিন রাষ্ট্রও আবার আধামন দিয়ে ও দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায়। অতএব আগের এশিয়া পিভোটের মত এবারো ইন্দো-প্যাসেফিক উদ্যোগও যে ফেল করবে না, তেমন নতুন কিছু তো ঘটেনি। আমেরিকা তা দাবিও করতে পারছে না।  আর ভারত? সেও আধামনে ও দ্বিধায় যতটুকু ভিড়েছে আর যা করছে এর কারণ ভিন্ন। ভারত তা কেবল নিজদেশের লোক আর মিডিয়ার মনোবল যেন চাঙ্গা থাকে সে জন্য করেছে – যেন বলতে চাইছে “ভয় নাই, বড় মুরুব্বি দেশ ভারতের পাশে আছে”। কিন্তু আসলে আছে কী?

    ভারতের আধা-মনে, দ্বিধায় দিন গুজরানঃ
    ভারতের আধা-মনে মানে হাফ-হার্টেড হয়ে দ্বিধায় দিন কাটছে। চলতি অক্টোবর মাসের ছয় তারিখে জাপানে যে কোয়াড (QUAD) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেল এটা তো আসলে ভারতেই হওয়ার কথা ছিল। [“But he (Biegun) added that the Quad grouping is expected to meet in New Delhi this autumn..…. ] কিন্তু ভারত আগেভাগেই গত মাসে মাফ চেয়ে হোস্ট হতে অপারগতা জানায়। কারণ ভারতের আসল অবস্থান হল – একপা আগে দুইপা পিছে, এমন টলমলে। কেন?

    মোদী গত ২০১৮ সালে ১ জুন সিঙ্গাপুরে আটল্যান্টিক জোট ‘সাংগ্রিলা” এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানবক্তার বক্তব্যে হিন্দু বেদের বরাত দিয়ে; ভারত ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কারো বিরোধী হয়ে কোন জোট গড়ার বিরুদ্ধে- বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে ভারতের নিজের সংশ্লিষ্টতা এমন হতে হবে যে ভারত কারো বিরুদ্ধে না [মানে এখন যেভাবে আমেরিকা বলছে চীনের বিরুদ্ধে জোট তা নয়] বরং ইনক্লুসিভ বা সবাইকে নিয়ে হতে হবে। এবার ধর্মগ্রন্থ বেদের বরাত দিয়েছিলেন – एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति বাংলায়, সত্য একটাই, জ্ঞানীরা তা বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করে থাকে। তাই ভারত বহুত্ববাদে, একসাথে পাশাপাশি বসবাসে, খোলামনে আর ডায়লগে বিশ্বাস করে। যারা এর রেফারেন্স চান তারা ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটের এই রেফারেন্স লিঙ্কে পুরা বক্তৃতাটা দেখতে পারেন।

    In conclusion, let me say this again: India’s own engagement in the Indo-Pacific Region – from the shores of Africa to that of the Americas – will be inclusive. We are in-heritors of Vedanta philosophy that believes in essential oneness of all, and celebrates unity in diversity एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति (Truth is one, the learned speak of it in many ways). That is the foundation of our civilizational ethos – of pluralism, co-existence, open-ness and dialogue. The ideals of democracy that define us as a nation also shape the way we engage the world.

    এছারা এই আলোকেই একবার এই গত জুলাই ২০২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন যে, ভারত কোন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যাবে না [India will never be a part of an alliance system, says External Affairs Minister Jaishankar]। কারণ ভারত জোট-নিরপক্ষে সেই সোভিয়েত কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে। এই নীতিতেই ভারত এখনো থাকবে। তার মানে হল, যতটুকু অন্য দেশে গিয়ে কোয়াডের মিটিং-এ ভারত যোগ দিয়েছে সেটা লোক দেখানোর জন্য। আর খুব সম্ভবত তা প্রধানত বর্তমান চীনের চাপে মারখাওয়ার মুখে নিজ পাবলিক ও মিডিয়ার মনোবল ঠিক রাখতে। তাই এবার একবার যদি ভারত কোয়াডের হোস্ট হয়ে যেত তবে সেখান থেকে যে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোকাস ভারতের জন্য তৈরি হয়ে যেত তাতে ভারত আর কোয়াডের সিরিয়াস ও সক্রিয় কেউ নয় বা সে তখনও জোট-নিরপেক্ষ  – এসবকথা এরপর দাবি করা খুবই কঠিন হয়ে যেত। সেটা হলে হয়ত পাবলিকলি অনেক কিছুই ভারতকে মুখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলতে হত যা করতে ভারত একেবারেই প্রস্তুত নয়। এই বিড়ম্বনা ও সম্ভাব্য ‘বেইজ্জতি’ থেকে বাঁচতে বা এড়াতে সে কোয়াড মিটিংয়ের আয়োজক না হয়ে এড়িয়ে যায়।

    নতুন আরো বিশাল বড় কারণঃ
    যদিও এর পেছনে আরো বড় কারণ আছে। আসলে এখন ক্রমশ পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে শুধু কোয়াডের চার দেশ – ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া – আর এদেরকে নিয়ে আমেরিকা, এদের নিয়েও কোনো ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়া একেবারেই সম্ভবই নয়। কেন? এত বড় কথা কেন?
    মূল কারণ মিয়ানমার ইস্যু। অথবা বলা যায় ভারতের আসল ইচ্ছা বা ঘটনায় মোঁচড়।
    মূল প্রশ্নটা হলঃ মিয়ানমার ইস্যুতে আমেরিকা্র রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করাসহ মিয়ানমার জেনারেলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যেকোনো ভূমিকা – এটা নেয়া কি আদৌ সম্ভব? উত্তরটা কন্ডিশনাল বা শর্ত সাপেক্ষ। মানে আমেরিকাকে যদি তা সম্ভব করতে তুলতে চায় তাহলে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক কোনো জোট খাড়া করার চিন্তা আমেরিকাকে এখন থেকে একেবারেই বাদ দিতেই হবে। কারণ কী?

    কারণ, নিশ্চয় আমেরিকা জানে যে মিয়ানমারকে সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। আর এতে ভারত মুখে সাফাই দিয়েছে, চীনের ভয়ে তাকে নাকি এটা করতে হয়েছে। অর্থাৎ ভারত-মিয়ানমার এখন এক ঘোষিত সামরিক-অ্যালাই বা পক্ষজোট হয়ে গেছে। তাহলে আমেরিকার এই ভারতকে নিয়েই কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কী করে সম্ভব?
    এর সোজা মানে হল, যত দিন মিয়ানমার-ভারতের সম্পর্ক ভারতের কাছে সবার উপরে বা আগে অগ্রাধিকার-সম্পর্ক হয়ে আছে বা থাকবে তত দিন আমেরিকা ভারতকে নিয়ে  ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কোন ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। এশিয়ায় কাউকেই কোনো সাহায্যে হাজির হতে বা কিছু করতে পারবে না যা ভারতের স্বার্থবিরোধী। এর মানে আমেরিকার আসলে হাত-পা বাঁধা পড়তে যাচ্ছে। এক অথর্ব শক্তি হচ্ছে। এসব আমাদের আগেই বুঝতে পারা কি খুব কঠিন? বার্মীজ জেনারেলেরা বহু চিন্তা করে  ঠিক এটাই করতে চেয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের মধ্যে ভারতকেই বেছে আলাদা করে কাছে টেনে আপন করে নিয়েছে। আর তা থেকেই এতকিছু ঘটা শুরু হয়েছে।
    এখন এসবের সোজা মানে স্টিফেন বিগানের এই সফর এখন তাহলে দাড়াচ্ছে যে এটা পুরাটাই লোক দেখানো বলে হাজির হতে পারে। যদিও এমনিতেই আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরে পরিষ্কার হয়ে যাবে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট এরা আসলে সিরিয়াস না নির্বাচনী দেখন-শোভা ছিল; নির্বাচনের পরেও কি এরা বেঁচে থাকবে, তৎপর থাকতে পারবে, কিভাবে?
    এরপরে নতুন প্রেসিডেন্ট তিনি যদি চান – এইবার আমেরিকা যে অথর্ব নয় তা প্রমাণ করতে গেলে আমেরিকার জন্য সেক্ষেত্রে একমাত্র অপশন হল, ভারতের বিরুদ্ধে সামরিকসহ সবভাবে খাড়া হতে আমেরিকাকে রাজি থাকতে হবে – এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারা। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছে দেখাতে হবে যে আমেরিকা ভারতবিরোধী সামরিক কোন জোটনেতা বা শক্তি – এভাবেই একমাত্র হাজির হতে হবে। সেক্ষেত্রে তাহলে এর মানে হবে এশিয়ায় আমেরিকার ভারত বলে কেউ নাই, দাঁড়াবার জায়গাই নাই। এমন হয়ে যাবে যা চিন্তা করা আমেরিকার জন্যই খুব কঠিন। আর আমাদের জন্য আমেরিকা তেমন দুর্দশায় পড়েছে সেটি চোখে না দেখলে আমরা কেউ বিশ্বাস করব না।

    আমেরিকার কুমিরের কান্না নাকি অথর্ব হয়ে যাওয়াঃ
    অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আমেরিকান চোখের পানি কুমিরের কান্না হয়েই থাকার সম্ভাবনা প্রবল।  তাহলে  গত দুবছর ধরে স্টিফেন বিগানের ততপরতা ফল কী এবার উল্টা ফলতে যাচ্ছে? এশিয়াতে আমেরিকাই ভারতের স্বার্থের অধীনে কেবল ততপর থাকবে? আর এটাই কী এবার স্টিফেন বিগানের ভারত সফরের ফলাফল হবে!
    তাই এখন এই অথর্ব আমেরিকা যে ভারতের কারণে উত্থান-রহিত হতে যাচ্ছে (আগামি ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে), এই আমেরিকাকে লইয়া কেবল হাসিনা নয়, পুরা বাংলাদেশই বা ‘কী করিবে’?  এই অথর্ব আমেরিকা আমাদের কোন কাজে আসবে? ভারত তার নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ফাঁদে, অগ্রাধিকারের ফাঁদে খোদ আমেরিকাকেই আটকে ফেলতে যাচ্ছে, সম্ভবত!
    তার মানে আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকা পড়তে চাইছে! নাকি এটাই যৌথ উদ্যোগ?

    সবশেষে একটা বাড়তি প্রসঙ্গ কথিত ভুরাজনীতিঃ
    বিগানের সফর উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের মিডিয়ার দুর্দশা দুর্গতি কী মাত্রায় তা সব উদাম হয়ে গেছে। এক কারো দালালি বা এজেন্ট হওয়া ছাড়া কোনকিছুই এদের করার দূরে থাক ইস্যুটা বুঝবারও সামর্থের সংকট প্রবল হয়ে ধরা দিয়েছে।  আর যখন কোন কিছু বুঝার ব্যর্থতা হাজির হয় তখন তা ঢাকতে এদের অনেকে একটা শব্দ ব্যবহার করে – ‘ভুরাজনীতি’। এ’এক কঠিন সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে। অথচ শব্দ না বুঝলে তা ব্যবহারের দরকার কী? এছাড়া ভুরাজনীতি শব্দটাই ভাল শব্দ নয়, আসলে তা  এমন আবছা। যেমন গ্লোবাল অর্থনীতি বা কোন গ্লোবাল অর্ডার নিয়ম বলে যে দুনিয়ায় কিছু আছে তা ভুরাজনীতি শব্দটা কাভারই করে না, তাই এই প্রসঙ্গটা কিছুই বুঝবার উপায় নাই। এই কথিত ভুরাজনীতি মানে কী, তা তাদের লেখা পড়েও কিছু বুঝার সুযোগ নাই। আরেক দল আছে যারা নিজের অসহায়ত্ব টের পেয়ে বুদ্ধিমান হতে চেয়ে ভারতের মিডিয়াকে কপি করে রিপোর্ট লিখেছে। অথচ এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থানই ভারতের বিরুদ্ধে সে খবর তাদের নাই। তারা খেয়ালই করে নাই। ওদিকে স্টার গ্রুপ বা প্রো-আমেরিকান মিডিয়া যারা, তারা ভাব ধরতে গেছে তারা সরাসরি আমেরিকান অবস্থান হাইলাইট করছে। কিন্তু হায়! তারাও বুঝে নাই যে এই ইস্যুতে স্টিফেন বিগানও মায়ানমারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইছেন না। যদিও তিনি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ‘আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক’ উদ্যোগ নিলে আমেরিকা আছে। মানে তিনি আসলে ইস্যুটাকে অনন্তকালের দিকে অমীমাংসিত ঠেলে দিয়েছেন। মানে কোন উদ্যোগ না নেওয়া, মানেই ত ভারতের অবস্থান। আবার বিগানের  “আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক” উদ্যোগ মানে কী? চীন উদ্যোগ নিলে তারা যাবে না সে তো বলাই বাহুল্য। ফলে এটাও এক কথার কথা।  সারকথায় রোহিঙ্গা বা মায়ানমার ইস্যুটাকে স্বাধীনভাবে বুঝবার তাগিদ বা সম্ভবত মুরোদ আছে মিডিয়ার তা বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে টের পাওয়া যায় না। আবার প্রথম আলোর বাংলা অনুবাদের এক উদাহরণ হল, চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগের বাংলা করেছে  – “অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই)”। ফলে এক কঠিন দশা। আর এসবের সার ফলাফল হল বাংলাদেশের পাবলিককে মুল ইস্যুটা কী তা বুঝাতেও মিডিয়ার ব্যর্থতা। এতে সবমিলিয়ে ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থের। আর এটা বলার সময় হয়েছে যে সরকার সরকারের অনুগামি মিডিয়া (ফার্মের মুরগীর মত) তৈরি করে রাখলে এর কী পরিণতি হয় তাও আমরা দেখলাম!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৭ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের স্বার্থে আটকা পড়ছে আমেরিকা!” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    গৌতম দাস

    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3aW

     

    চীন মনে করে ইন্দো-প্যাসিফিক বলে কিছু দাঁড়াবে না, কারণ এটা একটা ডেড এন্ড।Hegemonic nature of US Indo-Pacific Strategy exposed – Global Times

    [সার সংক্ষেপঃ আমেরিকা চীন ঠেকানোর (Containment) লক্ষ্যে জোট গড়তে চায়, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট। সেটাই পরিস্কার করে বলছে এখন।   কিন্তু এই জোটের বৈশিষ্ট্য কী হবে সেটাসহ এর চেহারা গত দুই দিনে অনেকটাই পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু তাদের জন্য খারাপ খবর হল, সে জোটের ‘নৌকায়’ তারা চাইলেও ভারতকে তুলে নিতে পারছে না। ব্যাটে-বলে হচ্ছে না। তারা যেমনভাবে ভারতকে চায় আর বাস্তবের যে ভারত সেদুটোতে মিল নাই। এক নয়, তাই মিলছে না।  গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর তাদের নিজেদের মনের কথাগুলো নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটা আর্টিকেলে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলে তাদের কথাগুলো  দু’টি শর্ত যুক্ত করে তারা বলছে।  আর ভারতকে সেই শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঐ নৌকায় তুলে নেয়া যেতে পারে বলে ঐ আর্টিকেল সিদ্ধান্ত টেনেছে। শর্ত দু’টি হল – যদি ভারতের পতিত অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর জন্য আবার জোয়ার আনা যায় আর দুই, বর্তমান ভারত রাষ্ট্র, রাজনীতি ও দলে ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্য’ হাজির থাকতে হবে – যার মানে হল মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো মোদীকে বন্ধ করতে হবে। আর প্লুরাল বা একাধিক মুখ ও ধারার রাজনীতি যেখানে পাশাপাশি চলতে পারে এমন সমাজ গড়তে রাজি হয়ে ভারত যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তবে এটাও পরিষ্কার যে, সাধারণভাবে ভারত তো বটেই বিশেষত মোদীর সরকার এদুই শর্ত কোনো দিনই পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সাত মণ ঘি ঢালা হচ্ছে না, রাধাও নাচবে না। কারণ এই শর্ত পূরণ করার অন্তত একটা অর্থ হল, বিজেপি-আরএসএসকে ভাল হয়ে যেতে হবে;  নাম ও রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে।
    সে জন্যই কি আমরা আরেকটা ডেভেলপমেন্ট দেখছি, খুব সম্ভব তাই। রাশিয়ার পুতিনের মধ্যস্থতায় সীমান্ত ইস্যুতে চীন-ভারত ‘”পাঁচ দফা ঐকমত্যের” এক যৌথ বিবৃতির ঘোষণা প্রকাশ করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে মস্কোতে এমন সভা সমাপ্ত হয়েছে। রয়টার্সের নিউজ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় এই খবর হোস্ট করেছে। এর ফলে পরবর্তী বিস্তারিত দিক বিশেষত ভারতে চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর প্রায় সবকিছুতে যে অবরোধ এবং ঘোষিত-অঘোষিত বাধা আরোপ ও প্রপাগান্ডা চালু করা হয়ে আছে এসবের এখন কী হবে, আমরা এর সম্পর্কে এখনো কিছুই জানি না। তবে বিবিসি ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের এ দিকটার করুণ অবস্থা নিয়ে “উঠতি বহু ব্যবসার চোখে অন্ধকার”’ শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে।]

     

    আমেরিকা তাদের হাতের কার্ড দেখিয়ে ফেলেছে। চীন ঠেকাতে আমেরিকা কী করতে চায় বা কী আশা করে – তা আর্টিকেল লিখে প্রকাশ করে ফেলেছে। অনেকে এ পর্যন্ত এটা-সেটা বলে পেটের কথা বাইরে আনতে চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সময়ে। ফাইনালই তারা এখন উপস্থাপনের একটাই ভাষ্য ঠিক করেছে। গুছিয়ে থিতু হয়ে বলা সেই ভাষ্যটা হল – এশিয়ার দেশগুলো কোনদিকে যাবে; চীনের বেল্ট-রোডে নাকি আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে, সেটা তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের চ্যানেল২৪ টিভি একটা নিউজ প্রচার করছে, [এটা ছোট করে আর ওর বাংলা ভার্সানটাই লিঙ্ক দিয়েছি। আগ্রহীরা ‘মুখোমুখি | আর্ল মিলার-যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত’ এই শিরোনামের মূল পুরা ভিডিওটা ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন।] এখানে বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মিলার আগেই বলে নিয়েছেন, “চীন আমেরিকার শত্রু না, প্রতিদ্বন্দ্বি”। তবে বাংলাদেশ এটা না ওটা নেবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে এখানে ‘চোঙ্গা ফুকতে’ দেখা গেল। তবে বাংলাদেশের কোনোটাই না নেয়ার অপশন আছে কি না স্পষ্ট বোঝা যায়নি।
    এছাড়া এই উপস্থাপনে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিটা হল, চীনা বেল্ট-বোড প্রকল্পের সাথে আমেরিকার “ইন্দো-প্যাসিফিক জোট” – এদুটার মধ্যে তুলনা টানা চলে না, এরা সমতুল্য বিষয়ই নয়।  বেল্ট-রোড মূলত একট প্রজেক্ট যাকে বড়জোড় বহুদেশকে সামিল করে নেয়া চীনের এক অর্থনৈতিক মেগাপ্রকল্প বলা যেতে পারে।  বিপরীতে প্রথমত, ইন্দো-প্যাসেফিক জিনিষটা কি তা এখনও স্পষ্ট না। যেমন রাষ্ট্রদুত মিলার চ্যানেল২৪-কে বলেছেন ইন্দো-প্যাসেফিক ‘নেশনস্‌ মানে রাষ্ট্রের জোট।  কিন্তু সেক্ষেত্রেও কথা হল এটা কী সামরিক জোট না অর্থনৈতিক জোট, তা অস্পষ্ট। অন্তত অর্থনৈতিক তো নয়ই।  আহলে বেল্ড-রোড এর সাথে এটা তুলনীয়ই নয়। তবে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো সময়ে ইন্দো-প্যাসেফিক বলতে এক যুদ্ধজোটে সামিল করা্র কথা বুঝিয়েছে। যে জোটের ভিতরে আবার আছে কোয়াড [QUAD] জোট। কোয়াড মানে আমেরিকা জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার রাষ্ট্রকে নিয়ে কথিত চীনবিরোধী যুদ্ধজোট। যেটা আবার এখনও পর্যন্ত গত সর্বশেষ পাঁচবছর ধরে – এক পা আগে তো দু’পা পিছে এমন হয়ে আছে। তাহলে কথা দাড়ালো,  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দগুলো মিলারের ভাষার ‘নেশনস’ হোক কিংবা অন্যদের ভাষ্যে সেটা ‘যুদ্ধজোট’  যাই হোক তা অন্তত বেল্ট-রোড – এই অর্থনৈতিক প্রকল্পের সাথে তুলনা করা যায় এমন সমতুল্য কোন বিষয় বা ফেনোমেনা হতেই পারে না।
    আবার চ্যানেল২৪ নিজে এটাকে ইন্দো-প্যাসেফিক “করিডোর” বছে।  কেন বলছে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে সবমিলিয়ে  যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে ‘চীনা প্রভাব’ ছুটানোর জন্য ভারতের সর্বাত্মক তৎপরতা চীন-ভারতের লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে হাজির হয়েছে, তাদের অনুমান ‘ভুল’। বিষয়টা আসলে হল – এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে একটা শেষ লড়াই লড়ার খায়েশ এখন আমেরিকান নির্বাচনের আগে আমেরিকার দুই দলেরই (বাই-পার্টিজান) খায়েশ হয়ে দাড়িয়েছে, এই হল বাস্তবতা। খালি তফাত এটুকুই যে, ট্রাম্প জিতলে একটু কৌশলে ভিন্নতা থাকবে যেটা বাইডেন জিতলে তুলনামূলকভাবে সফট কৌশল হবে। অর্থাৎ এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকান লড়াইয়ের চেষ্টা শুরু  হবে আসন্ন আমেরিকান নির্বাচনের পরের বিজয়ী প্রশাসনের হাত দিয়ে। কিন্তু লড়াই একটা কমবেশি হবে সেটা নিশ্চিত।
    সেটা হলেও এটাকে শেষ লড়াই বলছি এ জন্য যে, ঠিক এটাই ওবামার প্রথম টার্মে ২০১১ সালে চেষ্টা করা হয়েছিল , ‘এশিয়া পিভোট’ নাম দিয়ে যা ওবামার সেকেন্ড টার্মেও বিস্তৃত থাকলেও বোঝা গিয়েছিল যে, এটা অকেজো, কাজ করছে না; মানে ভুয়া চেষ্টা। ব্যাপারটা সার কথায় বললে, ‘পিভোটে’ অনুমানে ধরে নিয়েছিল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করে, চীন এক আগ্রাসী শক্তি। আর তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে একটা চীনবিরোধী সামরিক জোটে আমেরিকা শামিল করতে পারবে বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান সঠিক ছিল না। তাই এটা ফেল করে যায়, কারণ এশিয়ার দেশগুলো বলতে চায় – চীনের অনেক কিছুতেই তাদের বিরোধিতা বা অপছন্দ থাকলেও সে জন্য আমেরিকান নেতৃত্বে কোনো চীনবিরোধী জোটে বা যুদ্ধজোটে তাদের ঢুকতেই হবে, এটা হবে আত্মঘাতী। এতে ‘ওভার অ্যাক্ট’ করা হয়ে যাবে। এর চেয়ে চীনের সাথে যদি কোনো দেশের সীমান্তবিরোধ থাকে তা নিয়ে আপত্তির কথা নিয়মিত বলে যাওয়া ও ডায়ালগের চেষ্টা (এব্যাপারে আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত প্রেসিডেন্ট দুতের্তো-র ফিলিপাইন) করে যেতে হবে।
    আর একই সাথে, উঠতি অর্থনীতির চীনের সাথেই অর্থনৈতিক (পুঁজি-পণ্য বিনিময়ের গভীর ) সম্পর্ক জোরদার করা হবে নিজ দেশ পরিচালনার সঠিক কৌশল। এর বিপরীতে কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনার মধ্যে নিজ দেশকে ফেলে দেয়ার মানে হবে অর্থনৈতিকভাবে নিজ দেশকে শেষ করে দেয়া। কাজেই ঐ আমেরিকান কৌশলের পক্ষে প্রায় কেউই নামেনি। তাই ওবামার শেষ বছর, পুরো ২০১৬ সালটাই ছিল আসলে তার ‘পিভোট’ গুটানোর বছর। কিন্তু পরে ট্রাম্প আমলে নিজের টার্মে চীনবিরোধিতাও তিনি অবশ্যই করেছেন, কিন্তু নিজে জাতিবাদী আমেরিকান হিসেবে আর অবশ্যই তা চীনবিরোধী কোনো জোট গড়তে অনাগ্রহী থেকে। এর ফলে আগে ‘চীন ঠেকানোর’ রাজনৈতিক তৎপরতার ধারা জারি রাখা বা আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকগুলোর জন্য গাইড হিসেবে যে ভূমিকা রাখছিল ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এসে পেন্টাগন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট সে কাজ থেকে নিজেদেরকে  প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এ কারণে গত দুই বছর ধরে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক আবার নিজেরাই ‘চীন ঠেকানোর’ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল। এবারের এই মিশনের মুখ্য ভূমিকায় ছিল ও আছে থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ [www.atlanticcouncil.org]। এর মূল ভূমিকাটা হল যেন, মোদীর ভারতকে আমেরিকান নৌকায় তোলা, এটাকে সর্বক্ষণের ধ্যানজ্ঞান করা। একাজে তাদের জন্য  মূল গুরুত্বপুর্ণ প্রিয় ব্যক্তিত্ব এস জয়শঙ্কর, তিনি মোদীর এখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যার সাথে  প্রায় সর্বক্ষণ যোগাযোগের মাধ্যমে মোদী সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখছে। কারণ আবার উল্টাদিকে মোদীর এক ট্রমার নাম হল চীন। চীন আবার কোন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ১৯৬২ সালের মত ভারতকে মার দিয়ে যায় কি না!  এরই কাউন্টার হিসাবে নিজের নিরাপত্তাবোধ, সেফবোধ করার জন্য বিশেষত মোদীকে আমেরিকা যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য অথবা কেবল নতুন নতুন আমেরিকান অস্ত্র কিনবার জন্য চাপ সব সহ্য করে হলেও আমেরিকা পাশে আছে এই বোধটা মোদী পেতে চেয়ে এসছেন। আর মোদীর ধারণ তার মনোবাসনা সবচেয়ে ভালভাবে আমেরিকায় ঠিক ঠিক জায়গায় কানে তুলতে পারেন একমাত্র জয়শঙ্কর। তাই ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’  আর মোদী এই দুজনের মাঝে জয়শঙ্কর, দুদিকেই দুজনে দুজনার। যদিও  ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ ছাড়াও অন্য আরোদিকে ভূমিকা রাখছিল আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’  [Carnegie Endowment[ আর কার্ণেগি ইন্ডিয়ার ওয়েবপেজ এখানে।

    এই ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’ (সংক্ষেপে এন্ডোমেন্ট বলব)  সেই বুশের আমলে ২০০৬ সাল থেকে এই কাজে ভারতে ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে রেজিস্ট্রার্ড ইন্ডিয়ান শাখা হয়েছে অনেক পরে আর, তবে সেটা সম্ভবত এনজিও হিসাবে। ভারতের চীনবিরোধী বয়ান ভাষ্য যাই আমরা ভারতে চালু থাকতে দেখি বিশেষত, সকল ভারতীয় থিঙ্কট্যাংকের ফান্ড পাওয়া এবং তাদের যে কমন এক বয়ানে অবস্থান, এটাকে সাজিয়ে দিয়েছে  মূলত এই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট। যেমন, “চীন ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলছে” অথবা চীন “ঋণের ফাঁদে” সবাইকে ফেলছে ইত্যাদি।  এন্ডোমেন্টের আরেক বড় ফান্ড দিবার খাত হল তরুণ গ্রাজুয়েটদেরকে  মাস্টার্স পড়তে বা পিএইচডি করতে পশ্চিমে যেতে স্কলারশীপ দেওয়া। আসলে এর বিনিময়েই তাদেরকে আমেরিকান বয়ানে দীক্ষা নিতেই হয়।  তাই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট এর প্রধান কাজ আমেরিকান বয়ান ছেয়ে ফেলা, খাড়া করা ও নিয়ন্ত্রণ করা। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নিজের জাতিবাদী রাজনীতিতে নিজেকে হাজির করার আগে পর্যন্ত এন্ডোমেন্ট প্রবলভাবে ভারতে নিজের ফান্ড ঢেলে তৎপর ছিল। নিয়মিত তরুণদের মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য স্কলারশিপ বরাদ্দ করেছে আর ওসব বয়ান মুখে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান তাদেরকে এরপর থেকে তৎপরতা ছোট করে আনতে বাধ্য করেছিল। আগে এর বড় কর্মকর্তা  ছিলেন সি রাজামোহন। তিনি সম্ভবত এখন এটা ছেড়ে সিঙ্গাপুরের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু একটা মজার তামাশা ঘটেছে। রাজামোহন অনেক আগে থেকে নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সাপ্তাহিক কলাম লিখে থাকেন। লাদাখে চীনা হামলায় অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাবার পরে তাঁর লেখা একটা কলামের শিরোনাম মোদীর উচিত চীনকে এক পরাশক্তি বলে মেনে নেওয়া। মানে মোদীকে এককালে আমেরিকান বয়ানে সাজিয়ে এখন মোদীকে উলটা পরামর্শ দিচ্ছেন চীনকে মেনে নিতে।

    সেই কার্নেগি এন্ডোমেন্টে এখন আরো অনেক ততপর।  এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে এশলে জে তাল্লিস [Ashley J. Tellis,, Tata Chair for Strategic Affairs; মানে হল তাল্লিসের কাজের চেয়ারের জন্য ফান্ড দেয় ভারতের টাটা কোম্পানি]। তিনি আমেরিকান আগামী সম্ভাব্য অবস্থানের ডকুমেন্টটা তৈরি করেছেন। লেখাটা এখানে পাবেন।  এই লেখাকে কার্নেগি এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক পলিসি ব্রিফিং হিসেবে দেখতে বলে – উল্লেখ করে হিন্দুস্তান টাইমসে একটি আর্টিকেল ছাপানো হয়েছে। সেটা আবার লিখেছেন মঞ্জরি চ্যাটার্জি মিলার, যিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির পারদি স্কুলের [Frederick S Pardee School of Global  Studies] অধ্যাপক। তিনি নিজের লেখাটা আনাদেরকে  পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে – “আমেরিকার দীর্ঘ দিনের এক খায়েশ, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ায় কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে কাজে লাগায়। ভারত কী তা করবে?’ [The United States has long wanted it to act as a counterweight to China. Will Delhi do so?]
    ঐ পুরো লেখাতেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল এই ‘কাউন্টার-ওয়েট’ [Counterweight to China], বাংলায়, চীনের পাল্টা ওজন বা বাটখারা।  এশলের এই লেখাটা ছাড়াও অধ্যাপক মঞ্জরি আরেকটা লেখার কথা তুলেছেন। তা হল- ড্যানিয়েল টেনরিরো [DANIEL TENREIRO] এর লেখা; যার শিরোনাম ‘এশিয়ায় চীনের পাল্টা বাটখারা হিসেবে ইন্ডিয়া’ [India as Counterweight to China in Asia]।

    ড্যানিয়েলের লেখাতে পরিষ্কার যে, ভারতকে চীনের কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে এশিয়ায় পাওয়া- এর প্রয়োজনটা ভারতের নয়। বরং, খোদ আমেরিকার ও ড্যানিয়েলের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টদের। তাই ড্যানিয়েল বা মঞ্জরি আশা রাখছেন, ভারত কি আমেরিকার হয়ে কাউন্টার-ওয়েট বা চীন ঠেকানোর  ভূমিকায় নামবে? কিন্তু কেন?

    কারণ স্ট্র্যাটেজিস্টদের মনের খায়েশ হল – চীনের পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে (ভারতকে) হতে হবে আমেরিকার হাতের পুতুল। চীনের মত না হলেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় হতে হবে। আর মি. এশলে কোনো লাজলজ্জার বালাই না রেখে বলেছেন, ভারত বা সেই পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে দু’টি শর্ত মানতে হবে- ‘ইকোনমিক অগ্রগতি’ [‘economic momentum’ ] ফেরত আনতে হবে আর ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্যের’ [‘liberal credentials’] হতে হবে।

    কথাটাকে বাংলাদেশিদের বুঝার মত করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে যেমন ২০০৯ সাল থেকে ভারতের জন্য “ওপেন মার্কেট” আর ভারতের চোখে যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল বা বাংলাদেশ ভারতের জন্য এমন দুটা শর্ত পূরণ করা হয়েছিল। ঠিক সেই রকমই এবার আমেরিকারও খায়েস হল, ভারতেকে আমেরিকার জন্য “ওপেন মার্কেট” আর আমেরিকার চোখে ভারতকে  যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজানোর শর্ত পূরণ করা হোক – এই হল এশলে, মঞ্জরি বা ড্যানিয়েলের মত স্ট্রাট্রজিষ্টদের আমেরিকার জন্য খায়েস ও প্রেসক্রিপশন। তবে বাংলাদশের বেলায় যেমন একজন প্রণব মুখার্জি ছিল আমেরিকার বেলায় নিশ্চয় একটা সাদা চামড়ার প্রণব মুখার্জি থাকবে, সেটা কে তা এখনও জানা যায় নাই।

    কিন্তু কেন এশলে কে ভারতের নাম এমন শর্ত আকারে বলতে হল? এশলে লেখাটার শিরোনামের দিকে তাকালে দেখি তা হল,  ‘বড় লীগে যোগ দিতে হলে ভারতের রাস্তা’ [India’s Path to the Big Leagues]। এর মানে আসলে এশলে তার লেখাটা শুরুর আগেই বুঝে গেছেন, ভারত চীনের পাল্টা তাদের পেয়ারের কাম্য  হবু ওজনদার দেশটা হচ্ছে না। হতে পারছে না। পারবে না। তাই তিনি তখন সরাসরি লিখতে বসেছেন- ‘কেন ভারতকে দিয়ে হবে না’। সে কারণে উল্টা করে লিখতে বসেছেন কোন শর্ত পূরণ করলে হবে। যেখানে এশলে জানেন, এই শর্ত ভারত পূরণ করতে পারবে না। তাই তিনি শর্ত লাগিয়ে বলছেন।

    আবার সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখে বললে, এশলে অ্যান্ড গং-এরা চীনের কাউন্টার-ওয়েট বলে কাউকে খুঁজেই পাবে না। যদিও ভারতের প্রবল আর বিশেষ ‘খামতি’ আছে। কিন্তু ভারতের খামতি না থাকলেও এশলেরা ভারতকে বেছে নিতে পারতেন না। কেন?

    কারণ আমেরিকার দরকার এমন এক ভারত যাকে সে চীনবিরোধী তাদের মডেল দেশ হিসেবে তারা তুলে ধরতে পারে। চীন খারাপ, চীন আদর্শ না, চীন কথিত লিবারেল দেশ নয়, ইত্যাদির বিপরীতে যেন তারা এমন ভারতকে তুলে ধরতে পারে – যে ভারত আমেরিকার চোখে আদর্শ ও কাম্য দেশ, এভাবে। কিন্তু তাহলে আবার ভারতকে এমন আদর্শ দেশ বলে ফুলানোরই বা আমেরিকার কেন বা কী দরকার? দরকার এ জন্য যে, ভারত লিবারেল- এই প্রশংসা করে এর বিনিময়ে ভারতের ওপর মাতব্বরিটা  আমেরিকা নিজের হাতে তুলে নিতে চায়, ভারত না আমেরিকার জন্য বিপুল বিনিয়োগ আর লাভালাভের কেন্দ্র বানাতে চায় ভারতকে। সে জন্য ভারতে তাদের “ইচ্ছামতো একটা সংস্কার” করে সাজিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এখানে সাবধান। এখানে কথাটা এভাবে বলাতে ভারতের অর্থনীতিকে ভারতের নিজেরই জন্য কোন সংস্কার দরকার নাই, এটা বুঝে বা ধরে নেওয়া চভুল হবে। ভারতের অর্থনীতির সংস্কার দরকার অবশ্যই আছে। কিন্তু এর মানে “আমেরিকার স্বার্থে ভারতের অর্থনীতির সংস্কার” – এমন বুঝা বিরাট ভুল ও ভিন্ন অর্থ হবে।

    যেমন- এশলের লেখায় আরো দু’টি বিশেষ শব্দ আছে- ‘ফাস্ট-গ্রোয়িং ‘ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি’[fastest-growing free market democracy]। এর মধ্যে সোনার পাথরের বাটি ধরণের অর্থহীন শব্দটা হল – “ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি”। এখানে ‘ফ্রি মার্কেট’ শব্দের সাথে ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দের কী সম্পর্ক? এসবের অর্থহীন কথা ও শব্দের ভজকট মিশাল দিয়ে তারা খাড়া করেছে যাতে তাদের স্বার্থটা সহজে বুঝা বা ধরা না যায়। অথচ এর ভেতর দিয়ে তারা বুঝাতে চায়- ভারতকে আমেরিকার ডমিনেটেড বাজার ব্যবস্থা করে গড়ে পেতে চায় তারা। কিন্তু জবাব দিতে চায় না ভারত কেন এটা আমেরিকাকে দেবে? ইন্ডিয়ান পুঁজি আর ব্যাবস্থাপনা দক্ষতা কী নাই? পুঁজি ঘাটতি থাকতে পারে কিন্তু তা বলে ভারত সব আমেরিকার হাতে ছেড়ে দিয়ে অধস্থন নিতে হবে কেন?  এসব বিদ্যানেরা সংস্কার আর লিবারেল – এসব শব্দের আড়ালে আমেরিকান স্বার্থটা হাসিল করতে চায়।
    যে কথা বলছিলাম, ভারতের নিজস্ব অন্য খামতি যে নাই তা নয়। যেমন ভারতের রুট সমস্যা তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ ধরণের কথাবার্তা। মোদীও বলতে ভালোবাসেন, তিনি “আত্মনির্ভর অর্থনীতির” লোক। ভালো কথা। তার যা ইচ্ছা হতে চান, হবেন। কিন্তু মোদী তাহলে আবার রফতানি করতে ডলার গুনতে ভালোবাসেন কেন? ওসব ডলার পেয়ে জমিয়ে তিনি কী করবেন? ডলার জমানো মানেই তো তিনি আমদানিও করবেন! তাহলে উনার ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ কোথায় রইল? আবার মোদীর খুব খায়েশ দুনিয়াটা এমন হয়ে যাক যেন তিনি কেবলই রফতানি করতে পারেন। যেন সবাই তাকে রফতানি করতেই দিক! অথচ এটা তো অসম্ভব কল্পনা। তবু ভারতের খায়েশ, দরকার হলে সুযোগ পেলে অন্যকে পুরনো কায়দায় কলোনি করে শাসন করা। তবে ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ তার বাস্তবে যতটা না দরকার এর চেয়ে বেশি শব্দটা প্রপাগান্ডা হিসেবে দরকার। কারণ উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ শব্দগুলোর প্রপাগান্ডা-মূল্য অনেক। তবে আবার সাবধান এই কথিত জাতিবাদী স্বদেশিয়ানার উদ্ভট ধারণা – এসব  বিজেপির একার নয়, নেহরু আমল থেকেই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের কমবেশি অবস্থানই এটা;  এটা একই সমস্যা ভারতজুড়ে।

    মজার ব্যাপারটা হল, একমাত্র চীন-ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বেলায় এই সমস্যাটা তুলনায় কম। কারণ চীন ব্যাপারটা দেখে এ জায়গা থেকে যে, তার পার্টনার দুনিয়ার সব সমস্যারই ডিপো হতে পারে। হলে তা হোক। তাই এটা ধরে নিয়েই চীন পার্টনারের সমস্যা কী সেদিক থেকে না গুনে বরং প্রাকটিক্যালি মাঠে ঠিক কী হলে চীন কাজ করতে পারে সেটা পূরণ আছে কি না সেদিক থেকে মাপা শুরু করে। নইলে বলে দেয়, সে পারবে না। এ জন্য চীনের সাথে ভারতের কাজের সম্পর্ক তুলনায় ভালো। আর চীনের অ্যাপ্রোচ ব্যবহারিক দিক থেকে বলে ভারতীয়রাই বদলে যায়; মেনেও নেয়। কারণ তারা দেখে তারা এই ব্যবহারিক বদলটা না করলে চীনের সাথে সম্পর্ক বা ডিলটাই হবে না। চীনাদের এই অ্যাপ্রোচে সুবিধার দিক হলো –  পার্টনারের নিজস্ব  প্রবলেমটা কী এটা নিয়ে আগেই তারা ঝগড়া শুরু করে না। যাই হোক, সার কথাটা হল – আমেরিকানদের সাথে কোনো ভারতীয় জাতিবাদীর কিল হওয়া একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাতে দোষ কার অথবা কে কতটা ভালো-মন্দ সে আলাপ উঠায় রাখি।

    তাহলে এখন কী হবে?
    বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ কাজে কাউন্টার ওয়েট হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের পক্ষে ভারতের সাথে কোনো সম্পর্কই কার্যকর হচ্ছে না; যদিও এমন ভাব নেয়ার অঙ্গভঙ্গি সম্ভবত জীবিত ও জারি থাকবে। অনেক সময় মানুষ তা চায় না বলে কোন প্রমাণিত সত্য জিনিস মেনে নিতেও তার কষ্ট হয়। তেমন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর মোদীর কাছে  এখন সম্ভবত এটা প্রমাণিত যে, চীন তার হিন্দুত্বের রাজনীতির জন্য তুলনামূলক ভালো বিকল্প। তবু চীনের বেলায় যেটুকু সঙ্ঘাত বারবার সামনে এসে পড়বেই সেটা বারবার এড়িয়ে হলেও মোদী চলতে পারবেন। কিন্তু যেটা সহসা চীন-ভারত সম্পর্ককে আগের জায়গায় ফিরতে দেবে না তা হলো- সারা ভারতে ‘চীন আমাদের শত্রু’ বলে যে ক্যাম্পেইন মোদী চালিয়েছেন তা সহসাই লোপ পাবে বা উধাও হবে না।

    আবার অন্য দিকে, আমেরিকা ও তার বন্ধুরা যেটাকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট’ বলে ড্রাম পিটাচ্ছে এই প্রপাগান্ডাও সহসাই থেমে যাবে না; তাতে ভারতের সাথে আমেরিকার কোন সম্পর্ক হোক আর নাই হোক তা জারি থাকবে। দ্বিতীয়ত, এি জোটের আরেকটা নাম আছে, এশিয়ান-ন্যাটো। মানে ইউরোপে যেমন ১৯৪৫ সালের পরে সোভিয়েতবিরোধী সবাইকে ন্যাটো সামরিক জোটে জড়ো করা হয়েছিল, সেই ন্যাটোই যেন এবার এশিয়ায় জাগতে যাচ্ছে, এমন ভাব শুরু করা হয়েছে। মোদীর প্রো-আমেরিকান মন্ত্রী জয়শঙ্কর তাই একবার বলেন, ভারত জোটনিরপেক্ষ দেশ; আরেকবার বলেন, জয়শঙ্করদের এশিয়ান ন্যাটোর স্বপ্নের কথা। ব্যাপারটা নিয়ে জয়শঙ্করের সবচেয়ে বড় সমালোচক হলেন প্রচণ্ড ক্ষেপা এমকে ভদ্রকুমার, তিনি এক সিনিয়র সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে দুহাতে লেখা এক কলাম লেখক।https://www.reuters.com/article/us-india-china-idUSKBN262039তামাশার দিকটি হল – এই জয়শঙ্করই আবার মস্কোতে সাংহাই করপোরেশনের মিটিংয়ে হাজির হওয়ার উছিলায়  মস্কোর মধ্যস্থতায় চীন-ভারত যে পাঁচ দফা আপস সমঝোতা করল সেখানে ভারতের প্রতিনিধি। জয়শঙ্করের গা থেকে তখনো আমেরিকান কোনো ডিনারের ঢেঁকুর উঠছিল হয়ত। তবে রয়টার্সই একমাত্র এর ব্যাপক রিপোর্টিং করেছে। তাতে তারা দু’টি ছবি ছেপেছে যেখানে রাশিয়া, চীন ও ভারতের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফানি পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তিনজনই ‘ফানি’ভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুলেছেন, যেটা অবশ্যই কূটনৈতিক আচরণ না হলেও; একটু ইনফরমাল মুড প্রকাশ করেছে যেন, আমেরিকাকে তিনজনে ঠাট্টা করতে এসব করেছেন। এর বটম লাইনটা হল, চীন-ভারতের সম্পর্ক  আবার আগের বন্ধুর মুড়ে ফিরে যাওয়া শুরু করবে হয়ত। কিন্তু তা কতটা? মনে হয় না খুব সহসাই সেটা আগের লেভেলে ফিরে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয়ত, চীন ঠেকানোর কাজে ভাটা পড়লে আমেরিকা তো কাজের অভাবেই মারা যাবে! একমাত্র একটু ভরসা, নির্বাচনে বাইডেন যদি জিতেন। সে ক্ষেত্রে চীনের থেকে বাণিজ্যে আমেরিকার জন্য অনেক বড় ছাড় আনতে পারবেন তিনি। ফলে ট্রাম্প আমলের বাণিজ্যযুদ্ধের অনেকটাই স্মৃতিতে পেছনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন অনেক বেশি চীনকে ঘায়েল করবেন। কমবেশি আমরা নিশ্চিত। এ ব্যাপারে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মার্ক এস্পারের আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনকল করেছেন যেটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া ‘রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তার’ ওপর জোর দিলেও ঢাকার দূতাবাসের বিবৃতিতে “একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতির” কথা বলে সেখানে জোর দেয়া হয়েছে। রাষ্টড়দুত মিলারের “বাংলাদেশের জন্য ইচ্ছা কোনদিকে যাবে – এই ভাষ্যের তুলনায় এসপারের ভাষ্য অনেক এগ্রেসিভই বলতে হয়।  এর অভ্যন্তরীণ আমেরিকান মেসেজটা হল – যেন বলতে চাচ্ছে, আমরা চীন ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্তভাবে চেপে ধরতে আসছি। ফলে আমরাও আপনার কাছে গুরুত্ব চাই। ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে তাই আমাদের ক্যাম্পে আসুন। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা পাচ্ছে না, আপাতত এটাই সারকথা মনে হলেও মিয়ানমার বা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য এগুলো ডমিনেটিং বিষয় হতে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। তবে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোথায় সম্পর্কিত তা এই ফোনকল স্পষ্ট করতে পারেনি।  হাসিনা চাইবে আমেরিকা, চীন ও ভারত স্কলকেই পাশাপাশি রেখে দিয়ে একটা নিউট্রাল অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে। বাংলাদেশের জন্য সেটাই সঠিক ও আদর্শ অবস্থানই হত, অবশ্যই। কিন্তু তা হাসিনার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জিং, কারণ তার মূল জিনিষটাই নাই। পাবলিক সাপোর্ট বা রেটিং।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “আমেরিকা ভারতকে হবু জোটে পাচ্ছে না” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]
  • চীন-ভারত যুদ্ধ কী না চাইতেও লেগে যাচ্ছে

    চীন-ভারত যুদ্ধ কী  না চাইতেও  লেগে যাচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-35o

     

                               Global times Editor – Hu Xijin, @HuXijin_GT   আর বাংলা অনুবাদ নেয়া হয়েছে এখান থেকে

    চীন-ভারত যুদ্ধ কী লেগে যাবে? মোদী মনের মধ্যে যুদ্ধ চাই না এই বাসনা রাখা সত্বেও? যদিও ইতোমধ্যে সাধারণ তবে শিক্ষিত মানুষ যারা এতদিন দূর থেকে দেখে একটু মজা পাচ্ছিল তারা এখন যুদ্ধের টেনশনটা দীর্ঘ হচ্ছে দেখে এবার নিজের জন্য একটু উদ্বিগ্ন হয়ে যাচ্ছেন যে, নিজের জন্য আমল করার মত এখানে কোন লুকিয়ে থাকা হুমকি বা বিপদ হঠাৎ হাজির হতে পারে কি না(!), তাই এনিয়ে ভাবা শুরু করেছেন। গত ১৫ জুন চীনা হামলায় কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর থেকে এই টেনশনটা এভাবে ক্রমেই সত্যি বলে হাজির হচ্ছে।

    অপমানিত ‘ভারত-নেশন’ থেকে নিজেকে আলাদা করার দৌড়াদৌড়িঃ
    পুরা ব্যাপারটা শুধু ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার মধ্যেই শেষ বা  আটকে থাকলে তাও হয়ত চলত। কিন্তু সর্বদলীয় বৈঠকের ব্রিফিংয়ে ভারতের কেউ যা কল্পনাও করেনি তাই ঘটে গেছে। গত ছয় বছরে সবসময় ছাপান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতি দেখিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই সভায় বলে বসেন, “সীমানা পেরিয়ে কেউ ভারতে ঢুকেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই”। এর সোজা মানে দাঁড়ায়, ওই ২০ ভারতীয় সেনা চীনের ভূখণ্ডে গিয়ে মার খেয়ে মরেছে। আর সহযোদ্ধা-সেনারা তাদের লাশ বয়ে ভারতে এনেছে। এতে ব্যাপারটা এতই শকিং আর বেইজ্জতির প্রশ্ন হয়েছে যে, বিরোধীরা বুঝে যান এ নিয়ে কথা বাড়ালে সারা ভারত আরও অপমানিত হবে। তাই ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত নিজের কলামে লিখছেন, কোনো বিরোধী নেতা সভার ওই অবস্থায় আর যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মুখ খোলেনইনি। কিন্তু কিছু “সাহসী” সাংবাদিক বা সাবেক কূটনীতিক যারা নিজেদের খুবই ‘সাচ্চা ন্যায়পরায়ণ’ মনে করেন তারা তাদের “ভারত-নেশন” আরো অপমানিত হবে, সে সম্ভাবনার দিকটা ভুলে বা পেছনে ফেলে বরং প্রধানমন্ত্রী মোদীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কর্তব্য পালনে খুবই ব্যস্ত। আসলে তারা “নেশনের” অপমানের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে বরং এর দায় মোদীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন সফলভাবে। সুতরাং অন্তত নিজেরা আর অপমানিত বোধ করছেন না। ভারতের সাংবাদিক করণ থাপার আর সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাওয়ের সাক্ষাৎকার দেখে তাই মনে হয়েছে। যেন তারা জানেন না যে, মোদীর রাজনীতি উগ্র হিন্দু-জাতিবাদী এবং তার বিজেপি দল মিথ্যা বলতে বলতে পুরা দেশকেই প্রায়ই অপমান করে ফেলে থাকেন। তারা ভারতের মুসলমান নাগরিকদের সীমাহীন নিপীড়ন নির্যাতন হত্যা করে থাকে। আর এজন্য নিয়মিত দুনিয়ার হিউম্যান রাইটস সংগঠনগুলো এসব কাজ তুলে ধরে মোদী সরকারের নিন্দা করে। তাতেও এরা কেউ বিজেপির মতোই কোন অপমান বোধ করেন না।
    আসলে তারা “নেশন-স্টেট” বা জাতি এই বোধছাড়া কোন রাজনীতি হতেই পারে না বলে মনে করে নিশ্চিন্তে এতেই ডুবে থাকেন। অথচ এরাই আবার বাস্তবে অন্যের হাতে অপমানিত হলে বা মার খেলে তখন ওই কথিত নিজ জাতি-দেশ থেকে নিজেকে মুক্ত বলে কল্পনা করতে থাকেন। এরাও জানেন এতে অপমান বা সমস্যা যাবে না; তবু নিজেকে একটা সান্ত্বনা দিতে তারা এসব হাসির কাণ্ড করে থাকেন। কিন্তু তবু এরা ‘নেশনের’ রাজনীতিই যে ‘উগ্র জাতিবাদ’ তা বুঝেও এর প্রতি তাদের ভালোবাসা থেকে একটু হিলবেন না। তাদের বিশ্বাস এমনই শক্ত।

    নতুন মরীচিকা দেখতে পাওয়াঃ
    এরই মধ্যে গত সপ্তাহে এই ব্যক্তিবর্গরা আরেকটা আশার আলো দেখে ফেলেছিলেন। এরা আলোর মরীচিকায় বিশ্বাস করেন, আর ওর পেছনে ছুটতে রাজি থাকেন। এরা জানেন এটা মরীচিকা এবং নিছক আলো নয়, এরপরেও নিজের প্রবল হতাশা ঠেকাতে মনকে বুঝ দেন যদি ওটা সত্যিই আলো হয়েই যায়! এমন ব্যক্তিরা বিশেষ করে মিডিয়াকর্মীরা আশার আলো জাগাতে বলতে শুরু করলেন, আমেরিকা নাকি ভারতের সমর্থনে সৈন্য সরিয়ে আনছে জার্মানি-ইউরোপ থেকে এশিয়ায়। বাংলাদেশেও আমেরিকান বা ভারতীয় স্বার্থ দেখা থাকতে চাওয়া মিডিয়ার কেউ কেউ এই খবরটাকে টুইস্ট করে প্রচার করেছে।
    ঘটনা হল, যুদ্ধ করে নগদ বা বাকি কোনো রিটার্নই নাই – আমেরিকা নিজের জন্য তা আনতে পারেনি। অথচ এক বিপুল বেহুদা সামরিক খরচ করে ফেলেছে। সেটা কোথায় আর কবে? আপনারা অনুমান করলেই তা মিলে যাবে। জবাব হল, ইরাক ও আফগানিস্তানে। এই বেহুদা খরচের কারণে দুর্বল আমেরিকার অর্থনীতি আরো ডুবেছে, ২০০৭-৮ সালে গ্লোবাল মহামন্দা হয়েছে।  এসব বাস্তবতায় সেই ২০১০ সাল থেকে লিয়ন পেনেত্রা, চাক হেগেল বা এশ কার্টার এভাবে পরপর যারা ডিফেন্স সেক্রেটারি ছিলেন তারা সবাই খরচের সেই দায়্ভার ভুলতে হাতের কাছে ইউরোপকে দেখে, ন্যাটোর মিটিংয়ে “ইউরোপ কোনো খরচ দেয় না” বলে প্রবল সরব থেকেছেন। আর প্রকাশ্যে মিডিয়ায় অভিযোগ তুলেছেন এই অনুমানে যে, অপমান করলে বোধহয় ইউরোপ যুদ্ধের এই ভাটির দিনে এসে কিছু খরচের দায় নেবে। কিন্তু না, প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকান সেনারা (যখন সেটা আমেরিকার এম্পায়ার উত্থানের যুগ, ফলে বহু খরচের দায় নিজেই এককভাবে নিয়ে নিয়েছিল) আর কখনও ইউরোপ থেকে ব্যারাক গুটিয়ে নিজ দেশে ফেরেনি বরং জার্মানিতেই ঘাঁটি গেড়ে থেকে গিয়েছিল। আর ন্যাটো গঠিত হলেও এর ৯৫ শতাংশ পরিচালন খরচের দায়ভার আমেরিকা একা বহন করে গেছে। যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানেও আমেরিকা এক ব্যর্থ যুদ্ধে খরচ করে গেছে, তবু মনকে সান্ত্বনা দিতে – ইউরোপ ন্যাটোর খরচ দেয় না – বলে ইউরোপকে ঝাড়ি দিয়ে গেছে সেই থেকে।

    যুদ্ধের বেহুদা খরচ সামলাতে না পেরে গ্লোবাল মহামন্দাঃ
    আসলে আঁচ লাগা শুরু হয় ইরাক আফগানিস্তানে ওয়ার অন টেররের পরাজয় থেকে। একটা কমিটি বসেছিল ২০০৬ সালে যার পরিষ্কার রিপোর্ট ছিল যে, আমেরিকা যুদ্ধে হেরে গেছে এই অর্থে যে, আমেরিকা এমন এক অনন্ত যুদ্ধে আটকে গেছে যা থেকে বিজয় লাভ অসম্ভব; আবার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াও খুব সহজ না। অথচ এ থেকে নিয়মিত যে খরচ বেড়েই চলেছিল, তাতেই মূলত আমেরিকান অর্থনীতির ভেঙে পড়া আর বেসামাল অবস্থার শেষে ২০০৭-০৮ সালের দুনিয়া মহামন্দা হাজির হয়েছিল। আর তখন থেকেই চীনের সাথে তুলনায় অর্থনীতিতে ক্রমশ আমেরিকার পিছিয়ে পড়ার শুরু। ওবামা আমলে তার প্রশাসন তাই এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ইরাক-আফগান যুদ্ধে বিজয়ের চিন্তা তো আর নয়ই বরং,  ২০১০-১৪ ধরে সময়কালের মধ্যে সব সৈন্য ফিরিয়ে আনতে হবে। এই ছিল সবচেয়ে নির্ধারক সিদ্ধান্ত। এটা বাইপার্টিজান সিদ্ধান্ত। আর সেটার তলানি অংশটাও গুটিয়ে ফেলা হলো এবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে, এটাও বাইপার্টিজান মানে দু-দল মিলে নেয়া সিদ্ধান্ত। তাই আফগানিস্তান ছেড়ে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তালেবানদের সাথে ট্রাম্পের মরিয়া চুক্তি হল। ওদিকে ৭৫ বছরের আগের সিদ্ধান্ত বদলানো যে (ন্যাটোর অধীনে), ইউরোপে থাকা সেনা প্রত্যাহার, যা নিয়ে আবার ইউরোপের এখন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।
    লক্ষণীয় যে, এই ফেরত আনা সেনা এশিয়ার কোথার মোতায়েন হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের যতগুলো কারণ ছিল তার মধ্যে মোদীর মতোই চাপাবাজি করে “চীন-ভারতের সামরিক টেনশনও একটা বাড়তি কারণ” বলে এই শব্দ কয়টা সেখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

    ওবামার এশিয়ান পিভোট (২০১০) এটা আগেই ব্যর্থ হয়েছিল তবু সেটাই আবার আনা হচ্ছেঃ
    তবু আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা একটা পুরানা ব্যর্থ উদ্যোগ। কেন? ওবামা আমলে খুবই জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে এটা হল ওবামার এশিয়া ‘পিভোট’ [Pivot] পলিসি। ওবামা আমলে অনুমান-পরিকল্পনাটা ছিল এমন যে, আমেরিকার অনুমিত ও কথিত চীনের “আগ্রাসী নীতির” কারণে ভয়ে আশ্রয় লাভের জন্য ইস্ট এশিয়া বা সাউথ চায়না সি- এর সংশ্লিষ্ট দেশগুলো (ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম…) নিরাপত্তা খুঁজতে আমেরিকার কোলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর আমেরিকা ভারসাম্য রক্ষাকারী (পিভোটাল) ভূমিকায় নেমে কথিত আগ্রাসী চীনের হাত থেকে এদের সবাইকে রক্ষা করবে। এই ছিল মোটামুটি মূল অনুমিত ধারণা-পরিকল্পনা। আর এরই অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় একটা স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানো ও উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মধ্যেই জানা হয়ে যায় যে এই পরিকল্পনাটাও ব্যর্থ ও পরাজিত হচ্ছে। কারণ এশিয়ার সাউথ চায়না সি- এর সংশ্লিষ্ট কেউই আমেরিকার কাছে নিরাপত্তা খুঁজতে যায়নি। জাপানের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক পত্রিকা ‘ডিপ্লোম্যাটের’ মতে সেকালে তারা লিখেছিল এটা ওবামার চরমতম ভুল [The Pivot to Asia Was Obama’s Biggest Mistake]।
    কারণ সাউথ চায়না সি নিয়ে এশিয়ার এদিকে টেনশন আছে, অসন্তোষ আছে কথা সত্য। কিন্তু সেজন্য কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দেয়া সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে তপ্ত কড়াই থেকে চুলার ভিতরে ঝাঁপ দেয়ার শামিল বলে তাদের মনে হয়েছিল। তাই তারা সামরিক প্রশ্নে চীন বা আমেরিকা কোন দিকে যায়নি, দূরে ছিল। বরং অর্থনীতির প্রশ্নে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে গেছে। এক কথায় এটা আমেরিকার জন্য এক “বিগ মিস-ক্যালকুলেশন”। তবে নতুন করে যুদ্ধে কোন রিটার্ন আনা ছাড়াই আবার অর্থ নষ্ট হয়েছিল। মাঝখান থেকে অস্ট্রেলিয়াও ঘাঁটি বানাতে উৎসাহ ভরে যতটুকু নিজের অর্থ ঢেলেছিল সেটাও লস। যেটার জন্য বুক চাপরানি এখনও সে করে মাঝে মাঝে।
    তাহলে এখন জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের নামে সেই পতিত প্রকল্পে আবার হাওয়া, নাড়াচাড়া দেয়া কেন? প্রথমত আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এর সাথে এসময়ের  চীন-ভারতের উত্তেজনার কোনই সম্পর্ক নাই। কারণ চীন-ভারত উত্তেজনা শুরুর বহু আগে থেকেই এই সেনা প্রত্যাহারের নড়াচড়ার শুরু। আসলে এর কারণ মূলত হংকং। আর সাথে কিছু আলাদা টেনশনে থাকা তাইওয়ান। এক-চীনের দাবিতে চীন কবে তাইওয়ানে হামলা করে, আর তা থেকে নিজের নিরাপত্তার জন্য তাইওয়ান একেবারেই আমেরিকার হাতে বাঁধা। তাইওয়ানের কেসটা না হয় বুঝা গেল কিন্তু হংকংয়ে নতুন টেনশনটা কী?

    হংকং নতুন ফোকাসঃ
    মূল টেনশনটা হল, হংকংয়ের তরুণেরা তারা চীনের থেকে আপোষে যা পেতে পারে সেই অর্থে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা হল আরও এক  স্বায়ত্তশাসনের চেষ্টা করা; কিন্তু ঘটনা সেদিকে মুভ করেনি। বরং ‘চীনের থেকে স্বাধীনতা’ মানে হংকংকে চীন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা – এদিকে তারা আগিয়েছে। এটা অবশ্যই তাদের স্বার্থ-বুঝ ও ইচ্ছা কী নিয়ে তারা আগাবে। তবে এটা ব্রিটিশ-আমেরিকান স্বার্থ-পরিকল্পনার দিকেও ঝুঁকে পড়া। মানে, এর ভিতরে নিজেদের স্বাধীনতার স্বার্থকে প্রোথিত করা। এখন হংকংয়ের বাসিন্দাদের জন্য এদুই পথের কোনটা ভালোমন্দ, ব্যাপারটা সেভাবে দেখার চেয়ে যেমন পথ তেমন ওটা মিস্টি না তিতা, এভাবে বলাই সঠিক হবে। তারা যেপথ বেছে নেবে তার সমান মূল্য তো দিতে হবেই। যদিও চরম আত্মাহুতি দিলেই হংকংয়ের স্বাধীনতা মিলবে এমন নিশ্চয়তা নাই, বেইজিংয়ের তিয়েনআনমিন স্কয়ারের অভিজ্ঞতা তাই বলে। সবচেয়ে বড় কথা, হংকং ইস্যুকে কোন সাধারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে মনে করা হবে অতি সরলীকরণ হবে। ফলে তা হবে মারাত্মক ভুল বিবেচনা।
    এছাড়া যেমন, হংকংয়ের ব্যবসায়ীরা যাদের স্বার্থ এক বিরাট ফ্যাক্টর যে তারা কী ছাত্র-তরুণতরুণীদের সাথে স্বাধীন হবার আন্দোলন পর্যন্ত যেতে চাইবে কী? সেটা এখনো পুরাই অনিশ্চিত। কারণ হংকং হচ্ছে চীনা পণ্য বাইরে বিক্রির দিক থেকে এক বড় আড়ত বা ‘হাব’ [hub], দুনিয়াজুড়ে চীনা পণ্য পৌঁছে দেয়ার পাইকারি বাজার। কাজেই এই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ কতটা চীনবিরোধী হবে, তারা কতটা সাড়া দিতে আগ্রহী হবেন এখনও বলা মুশকিল। আবার এটা ১৯৮৯ সালও নয়। ফলে  তিয়েনআনমিনের মতই ব্যাপক ম্যাসাকার এবারও চীন করে ফেললে তা সামলানো চীনের জন্যও খুবই কঠিন এক ঘটনা হবে, অন্তত দ্রুত এক  ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে, তা বলাই বাহুল্য। এসব মিলিয়ে চিন্তা করে এতে চীনা তাতক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হল, আইনি প্রস্তুতি নেয়া। চীন ইতোমধ্যে ৩০ জুন একটা নতুন নিরাপত্তা আইন পাস করেছে (Hong Kong  national security law)। যার কারণে, কেউ রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম যত যাই করুক, কিন্তু তা ছাড়িয়ে “হংকংয়ের স্বাধীনতা চাই” ধরনের স্লোগান দিলে, এটর্নি অফিস এর ভাল প্রমাণ পেলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি’ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। এই আইনে ইতোমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বাক্ষর হয়ে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত চীনের জন্য এর একটা দুর্বল পয়েন্ট হল, আইনটা পাস হয়েছে মেইনল্যান্ড চীনে, যা পরে হংকংয়ের আইনসভাতেও তা এনডোর্স করে নেয়া হয়নি। নিলে ভালো হত। যদিও এর পক্ষে চীনের জন্য কোন আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে কি না আমরা পরিস্কার নই।
    ঘটনা হল এ নিয়ে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া কী হবে? ঘটনা সেখানে। একটা দুরবর্তি সম্ভাবনা কারও মনে হতে পারে যে চীন আমেরিকার সহায়তা নিয়ে এই বিক্ষোভকারীদের সাথে নিগোশিয়েট করে ফেলল। এর সম্ভাবনা খুবই কম কারণ চীন চাইবে না এভাবে আমেরিকাকে দেবতা বা গুরুত্বপুর্ণ বানানো। বরং নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় এই আইন ইতোমধ্যেই আমেরিকা ও তার বন্ধুদের জন্য এক হুশিয়ারি সঙ্কেত (The law sends a warning to the U.S. and other countries.)।

    অল-আউট অবরোধ, মানে কীঃ
    তাই আমরা বরং অন্য দিকগুলো দেখি।  যেমন, প্রত্যক্ষ সূত্র নেই; কিন্তু “হতে পারে” ধরনের আধাগুজব, মিডিয়ায় নিউজ ছিল যে, চীন এই আইন চালু করলে আমেরিকা নাকি চীনের ওপর ‘অল-আউট’ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে। এর তাৎপর্য হল, চীন আমেরিকান ডলারে কোনো কিছু কেনাবেচা করতে পারবে না। বেচাকেনার কোন দলিল-ইনভয়েজ ডলারে হতে পারবে না। হলে তা ভাঙিয়ে  এর অর্থ নিজের কারেন্সি ও একাউন্টে আনতে কোন না কোন আমেরিকান ব্যাঙ্কের কাছে যেতেই হবে। আর কোন আমেরিকান ব্যাঙ্কের জন্য এদেরকে সাহায্য করা হবে নিষিদ্ধ কাজ করা, ফলে দুই বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানা দিতে হতে হয়েছে অতীতে হংকং ব্যাঙ্ককে, আমরা দেখেছি। এদিকে চীনের ‘হংকং নিরাপত্তা আইন’ পাস হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে আমেরিকার অল-আউট কোন অবরোধ আরোপ করা হয়নি। যদিও ছোটখাটো (যেমন ভিসা রেস্ট্রিক্টকশন ধরনের) অবরোধ, আপত্তিগুলো কার্যকর হতে যাচ্ছে।
    অল-আউট অবরোধ আরোপ কথাটা শুনতে ভালো লাগে, আমেরিকা তা হয়ত ঘোষণা করে দিতেও পারে যদি, তাতে সে এখনো অনেক পাওয়ারফুল বল মনে হবে হয়ত। কিন্তু তাতে বাস্তবতা পুরো উলটো হয়ে যাওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা। কারণ চীন এই সুযোগে তার কারেন্সি ইউয়ানকেই (ডলারের জায়গায়) চীনের আমদানি-রফতানিতে লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে বসানোর চেষ্টা করতে পারে। যেমন শুধু যদি  সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনে এর দাম যদি ইউয়ানে পরিশোধ করতে পারে, তবে ডলার ফেলে ইউয়ানই দুনিয়ায় লেনদেন প্রধান কারেন্সি বলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনা আছে – তখন কী হবে?
    আর এথেকেই বাজারে অল-আউট অবরোধের গুজব আর সামরিক প্রস্তুতির সম্পর্কটা বোঝা যেতে পারে। কিন্তু সাবধান। আমেরিকা যদি যুদ্ধ-বেচার ক্ষেত্রে হেরে যাওয়া পার্টি হয়ে থাকে আর সেজন্য গত ১০ বছরে সে যদি প্রধানত খরচ কমানোর পার্টি হিসেবে নাম লিখিয়ে থাকে, তাহলে এখন আবার হংকং ইস্যুকে কেন্দ্র করে অল-আউট যুদ্ধের প্রস্তুতি নিবে এ কথাতো ঠিক মিলছে না, মানে কথা হয় না। সম্ভবত সেজন্যই এখনো পরিস্থিতি “ছোটখাটো অবরোধের” মধ্যে আটকে আছে। এই হল, জর্মানি থেকে সেনা প্রতাহারে ঘটনার পিছনের সত্যি কথাটা। চীনও আমেরিকার দিক থেকে এমনকি সাউথ চায়না সি তে কোন প্রতিরোধ দেখছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু তা বলে হম্বিতম্বি করা, ট্রাম্প মোদীর মতো চাপাবাজি করতে যাবে না, তা তো নয়। দেখা যাক! অর্থাৎ ব্যাপারটা নিয়ে এখন পর্যন্ত নিট লাভালাভ হল মিডিয়া হাইপ বা উত্তেজনা তোলা, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে।
    মিডিয়ায় উত্তেজনা তোলা সেটাই সম্ভবত আপাতত করা হচ্ছে বা চলবে। কিন্তু মোদীর আমেরিকার পকেটে হাত ঢুকিয়ে থাকার কাজ-সার্ভিসটা করে দেয় কে?  সম্প্রতি এনিয়ে নেপাল ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এক আর্টিকেল লিখে বলেছেন, এই কাজের হোতা মূলত সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর, তিনি ভারতের এখনকার বিদেশমন্ত্রী। মোদীর সাথে তাঁর সম্পর্ক আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত থাকার শেষজমানায়, তাঁর অবসরে চলে যাওয়ার আগে আগে, সেই ২০১৪ সালে। কিন্তু সেটা ছিল মোদীর ক্ষমতায় আসারও বছর। মোদী যখন আমেরিকার সাথে সম্পর্ক কীভাবে শুরু করবেন, কোন দিক দিয়ে আগাবেন, এসব দুশ্চিন্তায় বে-দিশা হয়েছিলেন, তখন রাষ্ট্রদূত জয়শঙ্করের আগেই করা কিছু হোমওয়ার্ক [আমেরিকান কিছু ডিপ্লোম্যাটদের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক বা র‍্যাপো(rapport) ও তাদের থেকে আমেরিকান মনোভাবের খোঁজখবর রাখা] মোদীর কাছে খুবই কাজের মনে হয়েছিল ও কাজে লেগেছিল। সেই থেকে জয়শঙ্কর মোদীর ‘আমেরিকান পকেটে হাত ঢুকানো’র বিশেষ দূতের ভূমিকায় আছেন। কারণ, আমেরিকান ডিপ্লোমেটদের কারো কারো সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক দু’পক্ষই খুবই কাজের জিনিস বলে মানতে শুরু করেছিল। আর একারণে সেই রাষ্ট্রদূত থেকে জয়শঙ্কর এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

    জয়শঙ্কর মোদীর কে লাগেঃ
    বলা হয়ে থাকে, চাপাবাজি বিষয়ক মোদীর সু অথবা কু পরামর্শ জয়শঙ্করই বয়ে নিয়ে যেয়ে থাকেন আমেরিকান সেক্রেটারি অব স্টেট পম্পেও-এর কাছে। আর সেখান থেকেই ট্রাম্প আরো নানা চাপাবাজির উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। মাইক পম্পেও জার্মানি থেকে আমেরিকার সৈন্য স্থানান্তরের কারণগুলোর মধ্যে একটা কারণ হিসেবে “চীন-ভারত টেনশন” কথা কয়টা ঢুকিয়ে দেন। আর তাতেই কিছু ‘পেইড মিডিয়া’ এ নিয়ে হইচই ছড়ানো শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে তামাশার দিকটা হল, মোদী সরকারের কেউ এ নিয়ে কোথাও কোন ইতি বা নেতি মন্তব্য করেননি। কারণ তাঁরা এই চাপাবাজিটা থেকে কিছু লাভালাভ তুলে নেয়ার চেয়েও বড় টেনশনে আছেন যে, চীন আবার এই চাপাবাজির খবরে ক্ষেপে গিয়ে কিছু না করে বসে।

    কিন্তু এতে চীনা প্রতিক্রিয়াটা ধরা পড়ে যখন চীনা গ্লোবাল টাইমসে এক প্রফেসর আর্টিকেল লিখে বলেন, ভারতের প্রধান সমস্যা হল ‘উগ্র জাতিবাদ’। মানে তিনি বলতে চাইছেন মোদী সরকার চীনের বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে  – এই করে ফেলবে, সেই করে ফেলবে, বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে, মুখ তোড়া জবাব দিব অথবা একমাত্র ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মোদী এমন জবাব দিতে পারেন – ইত্যাদি এ ধরনের ‘উগ্র জাতিবাদ’ উস্কানি দিয়ে ভোটের ইস্যু বানানোতে মোদী এক ওস্তাদ লোক অথচ পুরো ব্যাপারটাই বানোয়াট। এতে সমস্যা হল, যদি কখনো সত্যিকার পরিস্থিতি আসে আর মোদী কিছুই করতে পারেন না অবস্থা হয়, তা হলে মোদী ইজ্জত-সম্মান হারানো এক ভয়ঙ্কর লোক হিসেবে হাজির হয়ে যান ও যাবেন। তাই ব্যাপারটা নিয়ে চীন এতই বিরক্ত যে, এবারের বিশ ভারতীয় সেনার বিপরীতে চীনা আহত-নিহতের ফিগারটা কী তা সে এখনও একেবারেই প্রকাশ করেনি। যেন মোদী ও তাঁর দল এনিয়ে কোন নির্বাচনী বীরত্বগাথা গল্প তৈরি না করতে পারে সেজন্য। যেমন লাদাখে যারা মার খেয়েছে তারা ভারতের বিহার রেজিমেন্টের। তাই ভারতের অন্তত একজন পত্রিকা সম্পাদক ইতোমধ্যে টুইটে বলে বসেছেন আগামি বছর বিহারে রাজ্য নির্বাচন – তাই সেখানে যেন ঐ বিহার রেজিমেন্টের ‘উগ্র জাতিবাদী মিছা বীরত্বের গল্প” নির্বাচনে ভোট পাবার ইস্যু না করা হয়।

    ঘটনা হল, মোদীও জানেন চীনের বিরক্ত হওয়ার বিষয়টা। সম্ভবত এজন্যই মোদী স্বীকার করে নিয়ে বলেছিলেন যে, “ভারতীয় ভূখণ্ডে কেউ ঢুকেনি”। এর উদ্দেশ্য ছিল চীনকে ঠাণ্ডা ও খুশি করা। বরং এতে সম্ভবত চীনের মনে এখন ধারণা এই যে মোদী উগ্র জাতিবাদী রাজনীতির লোক হিসেবে ভোটের লোভে যেকোনো গল্প বানাতে মিছা মিছা যুদ্ধ লাগিয়ে এই সেই জয় নিয়ে আসছেন বলে কোনো মকারি-যুদ্ধ খাড়া করে ফেলতে পারেন। অতএব এবার তাই সত্যিকার ভয় দেখাতে চীন সেনা সমাবেশ করেছে। এর পালটা ভারতও করেছে। তাই সত্যিকার যুদ্ধের মুডে কেউ নেই বলেই মনে হয়। যদিও একটা ভয় থেকেই যায় মোদী কখন না আবার  “নেশনকে দেখানোর মুডে” বা মোডে চলে যান। বিশেষত এই কোভিড ভাইরাসে কাবু হয়ে থাকার কালে।

    মোদী লাদাখ সফরেঃ
    সম্প্রতি মোদী লাদাখ সফরে গিয়েছিলেন; সেখানে গিয়ে আবারও হম্বিতম্বি। কড়া কথার মধ্যে তিনি চীনকে পরোক্ষে “আগ্রাসনবাদী” বলেছেন। অর্থাৎ নাম না নিয়ে বলেছেন।  যেটা নিয়ে ভারতেরই কিছু বুদ্ধিমান সম্পাদক তা নাকচ করে দিয়েছেন।  বিশেষ করে আবার চীনও এর পালটা প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, চীনের ১৪ প্রতিবেশি রাষ্ট্রের মধ্যে  ১২টার ক্ষেত্রেই আপোষে সীমানা চিহ্নিতকরণ সুষ্টভাবে সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই মোদীর দাবি মিছা কথা, প্রপাগান্ডা। কিন্তু তাতে বাকী ঐ দুই রাষ্ট্র কারা? ভারতেরই আরেক সম্পাদক [এখানে তার কথার[এখানে ভিডিও ক্লিপ আছে ইউটিউবের] তিনিও মোদীর “চীন আগ্রাসনবাদী” – এই মন্তব্য পছন্দ করেন নাই। তিনি বলেছেন ঐ দুই রাষ্ট্র হল এক ভারত। আর দুই হল, ভারতেরই প্রভাবের কারণে ভুটান। এখন পাঠক বুঝে নেন আগ্রাসনবাদী তাহলে কে দাঁড়ালো!
    আবার সেনাদের সামনে মোদীর  গরম জাতিবাদী বক্তৃতা  – “ভারত কখনো মাথা নত করেনি। এখানেও করবে না”। ধরনের গা গরম করা কথা বলেছেন। সেনাদের উত্তপ্ত করতে আর মনোবল ধরে রাখতে এমন কথা রাজনৈতিক নেতারা বলেই থাকেন বা বলতেই হয়।  তবে সাবধান! মোদী এরপর কিভাবে পদক্ষেপ-আচরণ করেন তা দিয়ে তার এই কথার অর্থ তৈরি হবে।
    কিন্তু চীন ইতোমধ্যেই একটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ভারত যেন কোনো স্ট্র্যাটেজিক মিস-ক্যালকুলেশন [Avoid miscalculation, says China ] বা ভুল হিসাব না করে বসে। এই কথাকে কলকাতার এক বাংলা নিউজ এর বাংলা করেছে।  সেটা এই রচনা শুরুতে যেটা টাঙানো হয়েছে। অর্থাৎ মোদীর কথা নেহায়েত কথার কথা হিসাবে থাকাটা ভাল হবে, চীনা সম্পাদক এটাই বুঝিয়েছেন।
    মোদীর আরেক জাতিবাদী তত্ত্ব কথায় বলেছেন, “দুর্বলরা নাকি শান্তি স্থাপন করতে পারে না”। তাই তিনি “সাহসী” হতে বলছেন। কিন্তু কথা হল, দুর্বল শব্দের উল্টা হল সবল হওয়া; কিন্তু মোদী খামোখা উল্টাপাল্টা সাহস দেখাতে গিয়ে না ডুবে যান, সে শঙ্কাও হাজির হচ্ছে দেখা যাচ্ছে।
    আগামী দিনে মোদী আবার “আমাকে কেউ মারে নাই” ধরনের মেসেজ দিয়ে নিজেকে কারেক্ট করেন কিনা কিংবা কী বলে বসেন তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। “উগ্র জাতিবাদ” এই হিন্দুত্ব আসলেই এক গভীর সমস্যা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৪ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ভারত কি যুদ্ধ বাধার দিকে হাঁটছে”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]