Category: পিটিআই

  • চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা

    চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা
    গৌতম দাস

    ১২ মে, ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4rH

     

         Top Pakistan court orders ex-PM Imran Khan’s release after deadly riots

     

    পাকিস্তানের পিটিআই [PTI] বা তেহরিকে ইনসাফ যার বাংলায় মানে “ইনসাফের জন্য আন্দোলন” – এই  দলের প্রধান ইমরান খান। তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা (যার স্বপক্ষে  ইতিবাচক রেটিং ৬১%) তাঁকে গত বুধবার ০৯ মে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করেছে। অ্যামেরিকান সিএনবিসি [CNBC] নিউজ এঘটনায় শিরোনাম লিখেছে, Former Pakistani Prime Minister Imran Khan arrested amid tensions with military.]  সেনাবাহিনীর সাথে উত্তেজনার মধ্যেই ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদিও আইনত দেখানো হয়েছে যে গ্রেফতার করা হয়েছে পাকিস্তানের NAB [National Accountability Bureau] আইনে ও মামলায় যেটা আমাদের “দুদুকের” মতই যেন এক প্রতিষ্ঠান তবে এটা দুদুকের চেয়ে আরও ক্ষমতাবান আর আমাদের মতই সরকার অনুগত। তবে সরকার গ্রেফতার করেছে বলছি  যে কারণে প্রথমত তা হল, ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে আমাদের র‍্যাব এর কাছাকাছি এক প্যারা-মিলিটারি বাহিনী [paramilitary Rangers] দিয়ে এবং তা ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে। বিশেষত যেখানে আদালত (হাইকোর্ট) আগে থেকেই কোন ধরণের গ্রেফতার না করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। এবং এর পরেও গ্রেফতারের করার বিরুদ্ধে আদালত প্রশাসনকে শো-কজ করেছে। দ্বিতীয়ত, তবে সবচেয়ে বড়  ঘটনাটা ঘটিয়েছে সেনাবাহিনী নিজেই এক উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়ে; এখানে দেখেন । ফলে এটা একটা শাহবাজ সরকার আর বর্তমান সেনাবাহিনী এভাবে নেতৃত্বের যৌথ-উদ্যোগের ফসল হয়ে দাড়িয়েছে, তা্রা চাক বা না-চাক!

    এতে সবমিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। সীমার বাইরে মানে তা সেনাবাহিনীরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে – বুঝতে হবে। কেন তা বলছি কারণ, এক. ইমরানকে গ্রেফতারের সাথে সাথে পাকিস্তানের চার প্রদেশেই ১৪৪ ধারা জারি করে চারজনের বেশি একসাথে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কোথাও “বিক্ষোভকারি জনগণ” তা মানে নাই। রাস্তায় নেমে গিয়েছে  – যা লক্ষণ হিশাবে একেবারেই কারও জন্য ভাল ইঙ্গিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা সবপ্রদেশেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে, কোথাও তা সেনাব্যারাক-গেটের বাইরে। তবে লাহোরে পাশের এক সেনা-আবাসনে হামলা পর্যন্ত ঘটেছে।  তাই এর মধ্যে পরিস্থিতি সেনা নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যাবার উপাদান আছে। এবং এই অর্থে তা যেন পাকিস্তানে অ্যামেরিকান স্বার্থেরও বাইরে চলে যেতে চাইছে।  কারণ, এরই মধ্যে সবচেয়ে খারাপ কাজটা করে ফেলেছে সেনাবাহিনী।  সেনা-মিডিয়া আইএসপিআর [ISPR] এর বিবৃতির নামে তারা ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে। সেটা এমন ভঙ্গিমায় যেন তারা পাকিস্তানের সব আইনের উর্ধে। 

    একটু পিছনে থেকে বলা যাকঃ
    শুধু সেনার প্রসঙ্গটা একটু পিছন থেকে যদি বলি। গতবছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এক জনসমাবেশে যোগ দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে  ইমরান খানের উপর জান-হামলা ঘটেছিল। সৌভাগ্যবশত গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার পায়ে লেগেছিল ফলে তিনি জানে বেঁচে যান। কিন্তু প্রত্যক্ষ সেই আততায়ী বন্দুকধারী স্পটেই জনতার হাতে ধরাও পড়ে যায়। সেটার ভিডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমরান খান সবসময়ই ভোকাল; তিনি কোনহুমকিতেই ভিতু হন না, চোখে চোখে রেখে কথা বলতে পারেন। দীর্ঘদিন বৃটেনে বসবাসে থাকার কারণে পশ্চিমা ভ্যলুজ ও আচার-কালচার সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল যা থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বোপরি আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোতে সেটা খাটো কোন কাজ ছিল না – বিশেষত দেশকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার থেকে  তা কোন অংশ দূরে বা খুবই খাটো ছিল – এমনটা ভাল মন্তব্য হবে না। আবার এখনকার পাকিস্তানের বিচারে  ইমরান অবশ্যই একজন পাকিস্তানি বড় এলিট কিন্তু আজ তার সেসব অর্জন তাঁর সেসব এলিটজম সবই আজ পাকিস্তানের জনগণের সেবায় তাদের পদতলে সমর্পিত! কাজেই এরচেয়ে মধুর এলিটিজম আর কী হতে পারে!! আবার তিনিই বুকফুলিয়ে বলতে পারেন আমি বিদেশে ডলার পাচার করিনা, দরকার হয় না। বরং দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলে যেসব বিদেশি আয় জমিয়েছি তা সময়ে পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনি।

    তিনি তাই সরাসরি এই হত্যা প্রচেষ্টার জন্য সিনিয়র মিলিটারি অফিসার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সেটাকে “গুন্ডামির” কায়দায় প্রতিহত করার চেষ্টা করতে থাকে। কেন গুন্ডামি বলছি?
    আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় অভিযোগ আনা বা অ্যামেরিকান ভাষায় যেটা ইনডাইক্টমেন্ট (indictment) এর মানে হল “বিচারের জন্য যেসব অভিযোগ” আনা বা তোলা হয়েছে। এটা বিচার করে দেখার আগে [Pre-] করা অভিযোগ। যার সোজা মানে এগুলো অভিযোগ তবে অবশ্যই প্রমাণিত নয়। কেবল শুনানি-বিচার প্রক্রিয়া শেষেই জাজের রায়ে যা প্রমাণিত গণ্য হতে পারে, এর আগে নয়। এর আগে সবই অপ্রমাণিত এবং কিছু অভিযোগ মাত্র।
    সিএনবিসি লিখছে, “…this week for “highly irresponsible and baseless allegations against a serving senior military officer without any evidence,” to which Khan replied via video statement Tuesday: “This is my army and my Pakistan. I don’t need to lie.’ “। যার সারকথাটা বাংলায় বললে্‌, এক সেনা মুখপাত্র ইমরানকে বলেছেন যে ইমরান একজন সিনিয়র সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন। পরে এনিয়ে ইমরান যার এক ভিডিও জবাবে বলেছেন, ” ‘এই হল আমাদের আর্মি এবং আমাদের পকিস্তান! আমার কি আর মিথ্যা বলার দরকার আছে!’ ” অর্থাৎ সেনা ভাষ্যটা হচ্ছে এমন যেন আমাদের গুলশান-বারিধারার কোন এলিট কাউকে ধমকাচ্ছে আর বলছে তো এত বড় সাহস – তুই জানিষ কার বিরুদ্ধে তুই অভিযোগ করেছিস??????

    ফ্যাক্টস হল এটা আধুনিক রাষ্ট্র বা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র গড়ার যুগ, রাজা-শাসনের যুগ নয়। রিপাবলিক আর রাজার যুগের ফারাক বুঝতে হবে। ফলে যেকোন কারও বিরুদ্ধেই মামলা করা ও অভিযোগ দাখিল এখন জায়েজ। এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক আজকের শাসন ব্যবস্থায়! অন্তত আইনে এটা স্বীকার করে নেয়া আছে!  আর তাতে কোন মামলা “…..প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন” ভাবে কেউ তুলেছে কিনা  সেটা দেখার জন্য তো আদালত ও বিচারক তো আছেই। এটা তো  জমিদারি কায়দায় ধমক দিয়ে কাউকে বসানোর কিছু নাই, এবং ও দিন গয়া! এছাড়া আপনি কথিত জমিদার চাইলে আপনার স্বার্থ দেখভালের জন্য আরও দশটা উকিল-ব্যারিস্টারও লাগাতে পারেন। কিন্তু ধমকানোর তো কোন সুযোগ নাই। এটাই তো গুন্ডামি!! আর সবচেয়ে বড় কথা, কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রে  আমরা কেউ-ই আদালত ও বিচারের উর্ধে নই।  আদালতই আমার বিরুদ্ধে যেকোন অভিযোগের বিচার করে দেখতে পারে; খালাস অথবা শাস্তি দিতে পারে।  এমনকি সেনাপ্রধানসহ যেকোন  সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে কোন সিভিলিয়ানের অভিযোগ যদি সেনাদের মনে হয় সেটা সেনা আদালতের ভিতরে হওয়া উচিত তাতেও কোন সমস্যা নাই। সিভিত আদালতে মামলা উঠার পর সেনারা আপীল দিতে পারেন এই যুক্তিতে যে কেন এই  মামলাটা সেনা আদালতে হতে হবে, সেনা প্রতিষ্ঠানও নিশ্চিত করুক যে তারা বিচারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে আর তা সিভিল বিচারক যদি তার রায়ে এব্যাপারে একমত হয় তাহলে তো হয়েই গেল। আর যদি সিভিল বিচারক নিজেই বিচারের ইক্তিয়ার দেখেন তিনি বিচার চালু রাখবেন আর সেনাদের তা মানতে হবে। এনিয়ে কারোরই নিজেকে সব আইনের উর্ধে বা কোন রাজা বা এলিট ভাববার তো কোন সুযোগ নাই, প্রয়োজন নাই।

    অ্যামেরিকান ভুমিকাঃ
    আমাদের অনুমান এখানেই আমেরিকার অন্তত কিছু  ইতি ভুমিকা আছে; কারণ, পাকিস্তানে অ্যামেরিকান অনেক বড় স্বার্থ জড়িত আছে। যদি শুধুমাত্র চলতি শতকের শুরু থেকেই দেখি সেদিকে তাকাই তবে বলতেই হয় যে  ২০০১ সালের ওয়ার অন টেররের লঞ্চিং প্যাড ছিল পাকিস্তানের ভুমি। এবং খামোখা বিনা কারণে জাস্ট অ্যামেরিকান স্বার্থে পাকিস্তানকে আমেরিকা তার লঞ্চিং প্যাড হয়ে থাকতে ২০ বছর ধরে বাধ্য করে গেছে। কোন আইন বা ন্যয্যতা ছাড়াই। লঞ্চিং প্যাড মানে যেমন আফগানিস্তানে মারা আমেরিকার প্রতিটা বোমা বা উড়ে যাওয়া প্রতিটা যুদ্ধযান পাকিস্তানের ভুমি ইচ্ছামত ব্যবহার করেই তা করেছিল। এমনকি আফগানিস্তান তো ল্যান্ড লকড দেশ; কাজেই সেখানে প্রবেশ করতে গেলে পাকিস্তানের উপর দিয়ে তাদের যাওয়াই ছিল একমাত্র উপায়, ভরসা ও সহজ। আর এতে পাকিস্তানের প্রতিটা সাধারণ মানুষের জনজীবন আমেরিকার প্রতিটা ততপরতায় একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। তাদের জীবনযাত্রা যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমেরিকা ভাবতে পারে পাকিস্তানের দুই পুরানা দলের  [নওয়াজের মুলসিল লীগ ও ভুট্টোর পরিবারের পিপিপি] নেতাদেরকে তো আমরা যথেষ্ট পয়সা খাইয়েছি তারা বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে – কিন্তু কে না জানে এসব করে এতে কিছুই শোধ হয় না বা এগুলো কোন প্রতিদানও নয় ঘুষ মাত্র!  এখন একালেও আমেরিকা যদি বুঝমান ও বুদ্ধিমান আচরণ করতে চায় তাহলে অন্তত নতুন করে আর অপরাধের মাত্র না বাড়িয়ে একালের যেকোন গণমানুষের স্বার্থের ইস্যুতে সহানুভুতি হয়ে থাকতে পারে। অন্তত কিছু পাপ ধুয়ে যাক এতে, একটু মন জয়ের চেষ্টা করুক!!! এটা কী খুব বেশি চাওয়া? যদি আমেরিকার তাই মনে হয় তবে বুঝতে হবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতা থাকার দিন ফুরিয়েছে!

    নিশ্চয় আমেরিকার জানা আছে ইমরানের পিটিআই-ই একমাত্র পাকিস্তানি রাজনৈতিক দল যে আমেরিকার এই পাকিস্তানকে লঞ্চিং প্যাড হতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে কথা তুলে তৈরি হয়েছে। নিশ্চয় বুদ্ধিমান ও প্রাকটিক্যাল অ্যামেরিকান নীতিনির্ধারকেরা মানবেন যে এজন্য অ্যামেরিকার পাকিস্তানের পিটিআই দলকে আগাম এনিমি ঠাউড়ে রাখা কোন কাজের কথা নয়। এটা স্টুপিডিটি হবে।  বরং পিটিআই এর সাথে ইতিবাচকভাবে সহানুভুতির সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টার মধ্যেই সবার ভাল লুকিয়ে আছে – ইতিবাচক কোন কিছু শুরু হতে পারে সেখান থেকে।

    তাহলে কী করতে হতঃ
    একালের দুনিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের বিকাশ ঘটানো।
    মানে ব্যাপারটা যদি পাবলিকের স্বার্থের চোখে দেখেন তাহলে এটা হল যে কলোনিদখল যুগের শেষ বা ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত স্বাধীন আমাদের মত দেশগুলোতে – গ্রাম থেকে লোক জমি থেকে থেকে উচ্ছেদ হয়ে শহরে কাজ- ও নয়া জীবনের খোজে আসতেই থাকে এটা সব দেশেই স্বাভাবিক ঘটনা-ফেনোমেনা। কিন্তু শহরে এসে যে টেম্পর হেলপারির চাকরি জুটাতে পেরেছে তাযদি দেখা পরের পাঁচটা প্রজন্ম হয়ে গেছে কিন্তু জীবন মান একই জায়গায় থেকে গেছে – এটাই হল কমিউনিস্ট চিন্তার নেগেটিভ প্রভাব ও মারাত্মক নেগেটিভ অচলায়তন প্রভাব।  এটাই হল অর্থনীতিতে কোন দিকে বিকশিত হতে না দেওয়া। যেন চারি-তে কুকুরের শুয়ে থাকা। যেখানে চারি মানে হল মাটির বড় পাত্র যা গো-পালন ঘরে গরুকে খৈল-ভুসিতে মেখে দেয়া খাদ্যদানের মাটির পাত্র – যেখানে থেকে গৃহপালিত গরু আরামে খেতে পারে। কিন্তু সময়ে আবার এও দেখা যায় যে একটা গৃহপালিত কুকুর ঐ চারিতে আরামে শুয়ে আছে।  চারি কুকুরের খাদ্য-পাত্র নয় অথচ সেই পাত্র কুকুর দখল করে রেখেছে আর গরুকেও খেতে দিচ্ছে না। এটাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামের অর্থনৈতিক চিন্তার জন্য খুবই প্রতিকী! তাদের অর্থনীতি-চিন্তা  এরকমই যে নিজে ঐ পাচ-প্রজন্মকে ঐভাবে টেম্পো হেল্পার করে আটকে রেখেছে বাড়তে দেয় নাই; নিজেরাও দেশের অর্থনীতিকে বাড়তে দেয় নাই – যেমন বিদেশি পুঁজি হারাম জাতীয় নানান আপ্ত বাক্যে।
    এই বিচারে একালের অভিমুখ হচ্ছে আর তথাকথিত কোন আদর্শ আর নয়, বরং গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের নুন্যতম বিকাশ ঘটানো – গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমার জন্য বিশেষ কী সুবিধা লুকিয়ে আছে তা তালাশ করে [Comparative advantage] বুদ্ধিমানের মত তা নিজ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে কাজে লাগানো। গরীবের জানগুলো একটু বাচুক, একটু শ্বাস নিতে দেন আগে পরে বাঁচলে কোন বাপের নাম আবার নিব না-হয়!!!!!।

    আসলে বলতে চেয়েছি পুরানা অচল স্থবির চিন্তা থেকে বের হতে হবে। আর তাই, একালেও পছন্দ না হলে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে গ্লোবাল নেতাদের ভিনদেশের অপছন্দের কোন প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট মেরে ফেলা এগুলা খুবই পুরানা ধারণা। অন্তত কোল্ডওয়ারের পরের যুগে এবার তাতে ক্ষান্ত দেয়ার সময় হয়েছে মানা উচিত।  একালে চীন-ভারত ঝগড়াও করে আবার ব্যবসায় করে সমান তালে। এটাই বর্তমান কাল তা বুঝতে হবে! এসব  খুনোখুনি কলোনি আমলে, কিংবা কোল্ড ওয়ারের যুগে এমনকি আশির দশকের ইউরোপেও হয়ত মানাত। কিন্তু নয়া শতকে সেটা আর নয়, তা একেবারেই বেমানান; অনেক হয়েছে আর নয়। যেই ঘটাক ইমরানকে আততায়ী দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টা এটা খুবই নিম্নমানের চিন্তা, কাজ-আচরণ। এটা অগ্রহণযোগ্য। একালে যাকে শত্রু মনে হচ্ছে তার সাথেও বাণিজ্য- ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রাখতে জানতে হবে। এটাই একালের ট্রেন্ড, ও নয়া বৈশিষ্ট।

    তাহলে আমেরিকার ভুমিকা কী হতে পারত?
    এসব আততায়ী-মার্কা ঘটনায় আমেরিকার কোনও সংশ্লিষ্টতা নাই ধরে নিয়েই বলা যায়, আমেরিকার অনেক কিছুই করণীয় ছিল, নিজ স্বার্থেই। তার উচিত ছিল অন্তত বিবদমানদের মধ্যে মধ্যস্ততার ভূমিকা নেয়া, এভাবে করে ব্যাপারটা বাড়তে না দেয়া।  প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত  হতে হত – আমেরিকাকে লিড নিতে হত –  সবপক্ষই যাতে মানে ও গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট তদন্ত ও বিচারের ভিতর দিয়ে ইস্যুটার সমাপ্তি টেনে মিটিয়ে দেওয়া।
    ওদিকে যদিও এটা ঠিক যে  ২০১৮ সালের পরে একালে আমেরিকাকে পাকিস্তানে জায়গা করে নিতে হয়েছে নওয়াজ-শাহবাজ (সেই সাথে ভুট্টো পরিবার) গংয়ের হাত ধরে, যারা চিহ্নিত সম্পদ লুটেরা। এভাবে স্টার্ট আপ – এটাই আমেরিকার কপালের দুর্ভাগ্য! বাইডেন প্রশাসনের জন্য এটা খুবই খারাপভাবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের শুরু! যে সম্পর্কের কোনই নুন্যতম স্টান্ডার্ড নাই। যেন কোন নীতি-পলিসির বালাই না থাকাটাই স্বাভাবিক!

    এখন এর শেষ হবে কোথায়?
    পাকিস্তানের শাহবাজ সরকার এক অদ্ভুত রেওয়াজ চালু করেছে; এতে এই সরকার কত অক্ষম অপারগ ও অযোগ্য আর আনফিট এরই প্রমাণ । তিনি প্রধানমন্ত্রী বলছেন তিনি চীফ জাস্টিসের রায় মানবেন না??????  কারণ চীফ জাস্টিস সমন্বয়ে গঠিত এক আদালত রায় দিয়েছিল যে মে ২০২৩ মাসের মধ্যে প্রাদেশিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এদিকে মিডিয়া আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে জেনারেল মোশাররফের পরের পাকিস্তানে  এপর্যন্ত আদালত  দুইটা প্রধানমন্ত্রীকে শ্রেফ রায় দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তা যেন আমরা মনে রাখি!!!

    তাহলে পাকিস্তানে সিভিল সরকারের ভবিষ্যত কই?
    সেনাবাহিনী কী তাহলে শাহবাজ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে ক্ষমতা নিবে?  আর তখনও কী আমেরিকা বসে দেখতেই থাকবে – কিছু না ছুয়ে বা না দেখে? আর কাউকে কী আমেরিকা বিশ্বাস করাতে পারবে যে সে কিছুই করে নাই?  আর তাতে কী তার ইজ্জত বাঁচবে?
    পাকিস্তানের সামরিক শাসন নিয়ে সেই অর্থে একটা মৌলিক ঘটনা জেনে রাখা ভাল হবে।  কোল্ডওয়ারের আমলে মানে সোভিয়েত আমলে বা ১৯৫৩-১৯৯২ এই সময়কালের এক কমন ফেনোমেনা ছিল, আমাদের মত গরীব দেশে পপুলার কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার কাছে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে আমেরিকাকে একমাত্র নির্ভর করতে হত কোন  সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে। আর এটাকেই যেন সামরিক বাহিনী ক্ষমতালোভী বলে তারা নিজ ইচ্ছায় এমন করে থাকে বলে প্রচার করে থাকে; তারা একদল সুশীল বা বাকশাল-পছন্দের লোক এমন করে থাকে যেমন প্রথম আলোর (মৃত) মিজানুর রহমান খান বা একালের সোহরাব হাসান। আবার প্রায় একই চিন্তার আরেক বৃটেন প্রবাসী পাকিস্তানির অধ্যাপক আছেন নাম আয়েশা সিদ্দিকা [Ayesha Siddiqa] । এটা আমাদের মত দেশের সেনাবাহিনী নিজে নয় বরং এর পিছনে আমেরিকার কাজ করার ধরণই তাদের এমন করেছে – এই অংশটা তারা অজানা রেখে দিতে চায়। এনিয়ে রান্ডের [RAND Corporation] এক গবেষণা রিপোর্ট আche.

    সংক্ষেপে ঘটনাটা হল – গত ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাওয়ার কালে সেসময় ১৯৯৩ জানুয়ারিতে ক্ষমতার শপথ নিয়েছিলেন বিল ক্লিনটন – সেটা তার প্রথম টার্ম ছিল আর তিনি দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  অ্যামেরিকান রাজনীতি নির্ধারিত হওয়ার একটা বড় সামাজিক জায়গা হচ্ছে ওর থিঙ্কট্যাংকগুলোর যে সমাজ সেখানে; কারণ তাদের থিঙ্কট্যাংকগুলোর ফান্ড সংগ্রহ ও ফান্ড ব্যবহারের কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয় হয়ে থাকে ইনফরমালি কিন্তু খুবই নিবিড়ভাবে – এসব সামাজিক ইনফরমাল আসরে বসে। র‍্যান্ডের ঐ রিপোর্টে আছে – এমনই এক ইনফর্মাল সভায় থিঙ্কট্যাংকগুলোর যুক্তি ছিল  – এতদিন আমেরিকান ধারাবাহিক সরকার- প্রশাসনগুলো সোভিয়েত উপস্থিতির যুক্তি দিয়ে বলত ওদের প্রপাগান্ডার জন্যই আমাদের মত দেশে আমেরিকা অজনপ্রিয় আর সেটা পূরণ করতেই আমেরিকাকে সামরিক আইন জারি করে ওসব দেশে ক্ষমতা ও প্রভাব চর্চা করতে হয়ে থাকে। অতএব সোভিয়েত পতনে যেহেতু দুনিয়া এক-মেরুর হয়ে গেছে, অ্যামেরিকান এক-মেরুর দুনিয়া – তাই এখন থেকে অ্যামেরিকান সরকার-প্রশাসকদের সামরিক শাসন থেকে সরে আসার নীতি নেয়া উচিত। এটা সবচেয়ে ভাল সময়। এই প্রেক্ষিতে তাই   ক্লিনটন বা ডেমোক্রাটদের  পক্ষ থেকে  থিঙ্কট্যাংকগুলোর কাছে প্রতিশ্রতি দেয়া হয়েছিল যে তারা আর আমাদের মত দেশকে সামরিক শাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে না।  এর পিছনে মূল আর্গুমেন্ট ছিল যে দুনিয়া যেহেতু আমেরিকাই এক  পরাশক্তির কাজেই আমেরিকার আর সেনা শাসন দরকার হবে না। [যদিও ভারত-পাকিস্তান কারগিল সীমিত যুদ্ধ (১৯৯৯) হয় আর এর সব দায় মোশাররফ এর বলে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী  নওয়াজ ভারতের কাছে মন্তব্য করেন, পরে তিনি মোশাররফকে ক্ষমতাচুত করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া আর শেষে কার্যত পালটা মোশাররফ এর নামেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্ষমতাদখল করেছিল –  শ্রীলঙ্কা থেকে মোশাররফকে বহনকারী  বাণিজ্যিক বিমানকে করাচীর মাটিতে নামতে জায়গা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল যা নওয়াজ সরকার কিছু সময় আটকে রেখে দিয়েছিল।] এই ঘটনার পরে ক্লিনটন তাই সামরিক ক্ষমতা বলেই মোশাররফ এর (১৯৯৯ সালের) এই ক্ষমতা দখলকে স্বীকৃতিই দেয় নাই। চলেছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। এরপরে, ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন বুশের আমলে টুইন টাওয়ার হামলার দিনের শেষভাগে  সেকালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোলিন পাওয়েঙ্কে সিএনএন-এ স্বীকার করে নিতে দেখা যায় যে তারা মোশাররফ সরকারের সাথে কাজের কথা বলেছেন – অর্থাৎ তখন থেকে কার্যত বুশের আমেরিকা পাকিস্তান সরকারকে স্বীকার নিচ্ছে। তবে এখন এতকথা বলার মূল বাক্যটা হল, এরপর থেকে পিছনের এই কারণেই  এতদিন পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতাদখল আর কখনও হয় নাই বলে মনে করা হয়।

    তাহলে স্বভাবতই প্রশ্নঃ  পাকিস্তান সেনাবাহিনী কী  এবার আবার ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে আবার ক্ষমতাদখলের পথে রওনা দিবে? আর তারপরেও এবার আমেরিকা  কাউকে কী বিশ্বাস করাতে পারবে যে সেকিছুই করে নাই, ভুমিকা নাই?

    একাল আর সেকাল অনেক ফারাকঃ
    এমনিতেই দুনিয়ার সব “একাল আর সেকালে”  এর মধ্যে  অনেক ফারাকই থাকে, থাকবেই। তাহলে আর এবারের আলাদা বিশেষত্ব কী? মানে এবার গ্লোবাল নেতা হিশাবে অ্যামেরিকার ক্ষেত্রে এর আর বিশেষত্ব কী?
    আগে একটু বলে নেই। গ্লোবাল নেতা কথাটার অর্থ কোল্ডওয়ারের আমলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া হত এর অর্থ পরাশক্তি  – মানে সামরিক পরাশক্তি বা পরাশক্তিগত সামর্থ। অথচ একালে মানে ১৯৯২ সালের পরে থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে ধারণাটা মোটেও  সামরিক নয়। এটা আসলে মূলত দুনিয়ায় মানে কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিসরে সামর্থ কতটা। অর্থাৎ নিজ অর্থনীতিতে এক বিপুল উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের নয়া এক নিরন্তর ধারাবাহিক সক্ষমতার দেশ হওয়া যা অন্তত পরের শতবছর ধরে এমনি টিকে থাকবে। যারা আরও আগ্রহী তারা “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” নামের একটা ধারণার তালাশ করতে পারেন। গত ১৯৪১ সালের অ্যামেরিকান টাইমস ম্যাগাজিনের এক নয়া সহযোগী পত্রিকার যার প্রচ্ছদ কাহিনীর নাম ছিল এই “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” । আমার কোন পুরা লেখায় এই আর্টিকেলটা সংযুক্ত আছে – সেটা এখানে দেখতে পারেন। কেন ওর নাম “দ্যা অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী”  হল তা বুঝতে হবে। আরেকভাবে বললে এটাই বিনিয়োগ করার সামর্থ বিশেষ করে সারা দুনিয়ার গরীবদেশগুলোকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঋণ [Infrastructure Dev. loan] এবং সাথে এফডিআই [FDI]  দেওয়ার সক্ষমতা আর তা রাষ্ট্রীয় ভাবে বা বিশ্বব্যাংকের মত নানান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা কথাটার অর্থ এটাই – এভাবে একালে বুঝতে হবে।

    এই সক্ষমতার বিচারেরই একালে আমেরিকা চীনের চেয়ে অনেক পিছনে পড়ে গেছে। এই উপলব্দি বা বুঝাবুঝিটা এমন না যে  আপনার পছন্দ  আমেরিকা, আর আমার পছন্দ চীন সেজন্য আমি প্রসঙ্গটা তুলছি আর তাই আমি আর আপনি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলব।  এমন না।  যখনই কোন দেশে একালে অ্যামেরিকান এই ঋণ-বিনিয়োগ সক্ষমতায় ঢিলা পড়ছে – মানে সরাসরি জি-টু-জি বা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ-বিনিয়োগ দিতে পারছে না  – আর তখনই ঐ ফাঁক দিয়ে চীনা ঋণ-বিনিয়োগ বিপুল পরিমাণে ঢুকে পড়ছে।  আবার কোন দেশের  চীনের কাছে নেয়া ঋণ তা সময়কাল পুর্ণ হবার পর ফেরতদান যদি ডিউ [due] মানে বকেয়া হয়ে যাবার তারিখ পার হয়ে যায় তবে অনুরোধ করলে চীনের সেই তারিখ আরো দু এক বছর বাড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ প্রচুর – এটাও চীনের আরেক শক্তি অন্য গ্লোবাল নেতা  অথবা এর কাছাকাছি দাবিদার  যে কারো তুলনায়!

    যেমন ধরা যাক আমেরিকা সাপোর্টেড শাহবাজ-ভুট্টো সরকার ক্ষমতায় এলো ইমরানের সরকারকে সরিয়ে। এখন এমনিতেই অর্থনৈতিক চরম সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলতে শাহবাজ সরকারকে চীনে দৌড়াতে হবে কেন? এটা অড! কেন আমেরিকা এই সহায়তা করার উপযুক্ত থাকবে না – এটাই একালের আমেরিকার সামর্থের প্রশ্ন! পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তারের রাজনৈতিক সামর্থ তার অটুট আছে কিন্তু অর্থনৈতিক সামর্থ ছাড়া রাজনৈতিক সামর্থ অকেজো – এটাই প্রমাণিত হচ্ছে! এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ আমেরিকাকে যদি কাজ করতে হয় তবে কোনভাবেই এসব সেনা গুন্ডামি সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না। সেনা বনাম জনগণের সংঘাতে নিশ্চুপ দর্শক হতে পারে না। এটা আত্মঘাতি!

    এককথায় বললে, আমেরিকান যেকোন ব্যর্থতা, বোকামি বা ভুল এর সুযোগ আপনাতেই বিপরীতে চীনের কোলে গিয়ে জড়ো হবেই। তাতে আমরা কে অ্যামেরিকান সমর্থক আর কে চীনের – সেটা অপ্রয়োজনীয়। তা চোখে আঙুল দিয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আমাদের দেখাচ্ছে!

    এর উপরে শাহবাজ সরকার এই কথিত বিরাট নায়ক NAB (মানে যেন আমাদের দুদুক), NAB – তারা শাহবাজকে অর্থ পাচার মামলায় নির্দোষ সার্টিফিকেট দিয়েছে। এটাও কী আমেরিকা বসে বসে দেখবে?
    এদিকে সর্বশেষ খবর হল সুপ্রিম কোর্ট গত ৯ মে, NAB [এটাই Al-Qadir Trust case] মামলায় ইমরানকে নাটকীয়তা করে গ্রেফতারকে অবৈধ ঘোষণা করে ইমিডেয়েট রিলিজ করে দিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে।  আর এসব সমস্ত ঘটনাবলীতে অ্যামেরিকান অবস্থান কোথায়, কোথাও প্রকাশ্য সে হদিস নাই। আর সেনাবাহিনীর অবস্থান তাহলে এখন কোথায় দাঁড়ালো? সেনাদের গণবিরোধী [anti-people] ইমেজ এটা অবশ্যই পাকিস্তানের আমজনতা পাবলিকের কাছে আমেরিকা-ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

    আর ওদিকে আগামিতে যে মেজর সংঘাতের ইমেজ বা আগমনিবার্তা এসবের ভিতর দিয়ে উঠে আসছে তাতে আদালত শাহবাজ সরকার  ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে  আদালত-নিজস্ব তার ক্ষমতাকে সংহত ও প্রো-পাবলিক এবং তা ন্যায্য বলে প্রতিভাত করে নেয়ার সুযোগ তৈরি করে ফেলল। আর সেনাবাহিনী এখানে দুধ-আম এক হয়ে যাবার পর নিজে শুকনা আঠি হয়ে পাত্রের বাইরে গড়াগড়ি দিচ্ছে.. এমন অবস্থায় চলে গেল।  আগামিতেও তা দিতে থাকবে। অর্থাৎ আদালতের পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের রায় ও নির্দেশ অমান্যের দায়য়ে এবার শাহবাজ  সরকার শজেই অভিযুক্ত হবে। এবার জনসমর্থন নিয়ে এখন সুপ্রিম কোর্ট  নিজ প্রাতিষ্ঠানিক অথরিটি  প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যাবে – যার অর্থ শাহবাজ সরকারের জন্য খারাপ সময়ের দিন সামনে , এরই ইঙ্গিত!

    আমেরিকা মনে করতে পারে, দাবিও করতে পারে বা নিজেকে বুঝ দিতে পারে যে তারা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এতে তাদের কিছু বলার নাই করার ছিল না; কাজেই তারা নিরপেক্ষ। কিন্তু সমস্যা হল পাকিস্তানের আম-পাবলিক মাইন্ডে এটা জায়গা পাবে না। পাকিস্তান আর্মি আর আমেরিকা যে আলাদা – আলাদা তাদের স্বার্থ ও উপস্থিতি তা যতটুকুই সত্য হোক না কেন পাবলিক মাইন্ডে – তারা আলাদা – এমন ধারনা তৈরি করার পক্ষে আমেরিকা এতদিন কোন কাজ করেছে বলে জানা যায় না।

    তবে এপর্যন্ত পুরা ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে লুজার – সবচেয়ে ইমেজ খুয়ানো ক্ষতিগ্রস্থ সংগঠনের নাম হল পাকিস্তান সেনাবাহিনী – সে এখন সত্যিই গণবিচ্ছিন্ন একটা বোঝা –  অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও! আভ্যন্তরীণ নিজ জনগণকে থ্রেট করা বা ধমকানো এ্টা দুনিয়ার কোন সেনাবাহিনীর কাজ হতে পারে না।  কিন্তু তাই ঘটেছে পাকিস্তানে – বর্তমান সেনা নেতৃত্ব এমনই বোকা আত্মভরি, উদ্ধত ও আন-সিভিল! তাহলে ইতিহাস বোধহীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমরানের গ্রেফতারকে ও ততপরবর্তি জনবিক্ষোভকে কালো অধ্যায় [BLACK CHAPTER] বলে চিহ্নিত করেছিল – তার কী হবে এখন???
    যদিও পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি এখন ৩৬% এর উপরে। ফলে জীবনের উপর উঠে পড়া এই কঠোর সময়েও পাবলিকের রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ, এটা উদাহরণ হয়ে থাকবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

     

     

  • প্রিজুডিস বা অযোগ্যতায় ডুবে গেছে পাকিস্তানের বিচারকরা

    প্রিজুডিস বা অযোগ্যতায় ডুবে গেছে পাকিস্তানের বিচারকরা

    গৌতম দাস

    ১৮ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-42L

    –

    প্রিজুডিস [prejudice] মানে হল আগাম প্রভাবিত হয়ে থাকা। বিচারকদের বেলায়, কোন আসামি সম্পর্কে এজলাসে আনীত যেসব ডকুমেন্ট তাঁর নজরে আনা হবে আর বাদি-বিবাদি পক্ষ যেসব আর্গুমেন্ট দিবেন ইত্যাদি এসবের ভিত্তিতেই কেবল বিচারক আসামি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিবেন। এটাই আদর্শ ও স্বাভাবিক। সেটা না করে ধরা যাক আসামি দেখতে খুব সুন্দর ও আকর্ষণীয় কিংবা ইনোসেন্ট ফেসের বলে বিচারকের বিচার শুরুর আগেই যদি মনে হতে থাকে যে আসামি নির্দোষ তবে বিচারকের এই আচরন-মনোভাব এটাকে প্রিযুডিস বলে। অর্থাৎ বিচার শুরুর আগেই তিনি বিচার-বহির্ভুতভাবে কোন ধারণায় আচ্ছন্ন বা প্রভাবিত হয়ে গেছেন।  কোন বিচারকের বেলায় প্রিযুডিস হয়ে যাওয়া তাঁর জন্য মারাত্মক অপরাধ ও অযোগ্যতা।  এমন ‘ডিস-কোয়ালিফিকেশন’  বা যোগ্যতায় ত্রুটির কারণে তার বিচার করার এক্তিয়ারই কেড়ে নেয়া যেতে পারে। তাই এটাকে প্রি মানে আগাম; আর “যুডিস” মানে নিশ্চিত না হয়ে অনুমানে বিচার করে ফেলার ঘটনা হিসাবে দেখা হয়। আমরা এখানে দেখব পাকিস্তানের উচ্চ-আদালতের বিচারকেরা কিছু বিশেষ মামলায় একালে কী প্রি-যুডিস হয়ে গেছেন!!  ,

    শেষে পাকিস্তানে এখন কী দাঁড়াল? একটা বাংলা প্রবাদ আছে “ভিক্ষার চালের আবার কাঁড়া আর আকাঁড়া’। মানে, ভিক্ষা করে পাওয়া চালের গুণ বিচার অনর্থক। কাঁড়া মানে সযত্নে ছাঁটা, তুষ নেই, খুদ-কুঁড়া বা ভাঙা নেই। আর এরই ইংরেজি ভাষ্য হল – ‘বেগারস ক্যান নট বি চুজারস’ [“beggars can not be choosers”]। আক্ষরিক বাংলায় বললে ‘ভিক্ষুকের বাছাবাছির ক্ষমতা থাকতে নেই বা থাকে না’।
    আমেরিকার সাথে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পাকিস্তানের যে বর্তমান বিতর্ক সেটা নিয়ে চলতি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ প্রসঙ্গ ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু এনিয়ে নিজের মনের কথা বলতে গিয়ে সারা পাকিস্তানবাসীকেই তিনি ভিক্ষুক গণ্য করেছেন। শাহবাজ বলতে চেয়েছিলেন ইমরানের আমেরিকার সাথে বাদানুবাদে যাওয়া ঠিক না কারণ পাকিস্তান একটা গরীব দেশ। ফলে ভিক্ষুক পাকিস্তানের কোন বাছবিচারের ক্ষমতা থাকতে নাই। শাহবাজের এই মন্তব্যের প্রবল বিরোধিতা করে এগিয়ে আসেন ইমরান খান। আর তাতে আরেক দফা শাহবাজ নিজের বক্তব্যের সাফাই দিতে গিয়ে আরো অপমান ডেকে এনে তিনি বলেন, “……আমাদেরকে আমাদের মানুষকে খাওয়াতে হয়, আমাদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে হয় তাই আমরা এমন ওদের সাথে লড়তে যেতে পারি না। তাদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে পারি না”।  “……আমরা আর কারাই বা…। আমরা সেই দেশ যাদের নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করতেই দিন যাচ্ছে…”। সারকথায় এভাবেই শাহবাজ আমেরিকান হস্তক্ষেপ-মূলক হুমকি ও বক্তব্যের বিরুদ্ধে ইমরানকে  প্রতিবাদ না করতে বা আমেরিকার সাথে লাগতে না যেতে উপদেশ দিয়েছেন।  শাহবাজ বলছেন, আমরা গরীব ভিক্ষুকের মত, আমাদের আমেরিকার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানো ঠিক না। আসলে এসব কথা বলে তিনি নিজের আমেরিকার দালালির পক্ষে পোক্ত সাফাই দিতে গেছিলেন।

    “We have to feed our nation […] we have to send our children to school, we can’t fight with someone, can’t raise slogans against others,” he was quoted as saying by ARY News. “Who are we, we are the country which is fighting for its survival.”
    Defending his previous remarks, Shahbaz Sharif said that.

    কম করে হলেও গত ৪০ বছরে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা যা প্রধানত নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ (পিএমএল-এন) আর ভুট্টোর বংশধরদের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) – এ দুই পার্টি ও তাদের সহযোগী ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী আরো কিছু ছোট দল – এরাই পাকিস্তানকে বিদেশী বিশেষত আমেরিকার খেয়াল ও ইচ্ছার লীলাভুমি করে রেখেছে। এর সাথে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনী। আর এদের প্রত্যেকের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা তো ভিক্ষুক! আমরা গরিব। তাই আমেরিকা আমাদের তো এমন করবেই! আমাদের কিছু বলার নাই , কিছু বাছবিচারের ক্ষমতা নাই। কাজেই ক্ষমতাধর আমেরিকা পাকিস্তানকে যেভাবে রাখছে, যা দিচ্ছে, আমাদের সাথে যা করছে এটা মেনে নাও! এতদিন ধরে এমন কথাগুলোই উচ্চারিত হয়ে আসছিল; তবে এদের সবার মনে মনে। আর এখন, আরেক ক্রাইসিসে পড়ে মনের কথাটাই প্রকাশ্যে উচ্চারণে নিয়ে এসেছে শাহবাজ শরিফ, যিনি মাত্র দু’দিন হল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছেন। শাহবাজ শরিফের নিজ বড়ভাই নওয়াজ শরিফ বর্তমানে বড় দুর্নীতির দায়ে ও বিচারে জেল-জরিমানায় ডুবে আছেন; সাথে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হয়ে গেছেন। তাই ছোট ভাই শাহবাজ এখন দল পিএমএল-এনের প্রধান নেতা। শাহবাজ নিজেও বর্তমানেই দুর্নীতি মামলার আসামি; আর বর্তমানে তার মামলার চার্জ গঠনের শুনানি চলছে!

    বিপরীতে, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (ইনসাফের জন্য আন্দোলন) বা সংক্ষেপে পিটিআই দলের মুলনেতা ইমরান খান। তার রাজনৈতিক জীবন ও দলের শুরু থেকেই – পাকিস্তান ভিক্ষুক ফলে আমেরিকান খেয়াল-অত্যাচার মেনে নাও – এধরণের বয়ান ইমরান মানতে অস্বীকার করেন। বিশেষ করে ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে যে দলীয় মেনিফেস্টো তিনি প্রকাশ করেন তাতে সরাসরি আমেরিকান ‘ওয়ার অন টেরর’ পলিসিকেই তিনি চ্যালেঞ্জ করেন এবং আমেরিকার এই নীতিতে পাকিস্তানের কত মানুষ বলি হয়ে গেছে আর কত কোটি টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে এ নিয়ে কিছু পরিসংখ্যানও প্রচার করা শুরু করেছিলেন। গত ২০১৩ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ইমরানের দল এই “নয়া বয়ানের” উপর দাঁড়িয়ে অংশ নিয়েছিল।

    এভাবে একসময় ২০১৮ সালের নির্বাচনও এসে যায়। ততদিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমলে এসে তিনি আগের প্রতিশ্রুতি দেয়া আমেরিকান অর্থ সাহায্য পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে না দেয়া আর ট্রাম্প উল্টা ভারতের প্ররোচনায় টেররিজমের জন্য পাকিস্তান ও তার সেনাবাহিনীকে দায়ী করাতে, সেবার প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর দূরত্ব এক উল্লেখযোগ্য বিভেদ হিসেবে হাজির হয়েছিল। আর এ’থেকে, পাকিস্তানের এতদিনের পুরানা দুই রাজনৈতিক দলের কোনো একটা আর সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আমেরিকা – এই ত্রিপক্ষীয় যে শক্তি পাকিস্তানকে এতদিন ছিঁড়ে খেয়ে আসছিল, ‘ভিক্ষুক তত্ব’ জারি রেখে আসছিল; আর এই সুযোগে দুর্নীতিতে বান ডেকে এনেছিল – এই গোষ্ঠীতন্ত্রে এক ব্যাপক ভাঙন তৈরি হয়; অসংগঠিত হয়ে পড়ে তারা। এই ভাঙনকে ব্যবহার করে, শক্তি-ভারসাম্যের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই ২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরান নিজ দলকে ক্ষমতাসীন করতে সমর্থ হন। ফলে কার্যত এই প্রথম ইমরান তাদের ‘ভিক্ষুক তত্বকে’ চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। মানে, আমেরিকা ভিক্ষা-দাতা (পাকিস্তানে যা খুশি করার ভিক্ষাদাতা) আর পাকিস্তান গ্রহীতা-ভিক্ষুক; ফলে সব মেনে নেবে – এই সম্পর্ক মানতে অস্বীকার করে চলতে থাকেন।

    অবশ্য কিছু দিনের মধ্যেই ট্রাম্প বুঝে যান যে, ইমরানের পাকিস্তানকে আমেরিকা নিজের স্বার্থেই দরকার। কারণ আফগানিস্তানে আমেরিকার তখন প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ; এভাবে সম্পদ ড্রেনে ফেলা চলছিল যা বন্ধ ও ছাঁটাই করতে ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাই আবার তিনি ট্রাম্পের সাথে কাজের সম্পর্ক মানে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।

    অবশ্য সেকালে কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম্প বুঝে যান, আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ ছেড়ে উঠে আসতে গেলে নিজ স্বার্থেই ঐ ইমরানের পাকিস্তানকে আমেরিকা নিজেরই দরকার। কারণ আফগানিস্তানে তখন আমেরিকার প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হয়ে যাচ্ছে, এভাবে আমেরিকার সম্পদ ড্রেনে ফেলা তাকে বন্ধ করতে হবে। ফলে এই ড্রেনেজ বন্ধ করতে ট্রাম্প মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাই আবার ট্রাম্প পাকিস্তানের সাথে এক কাজের সম্পর্ক মানে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনা প্রত্যাহারে পাকিস্তানের সাহায্য চাইতে এগিয়ে আসেন।

    কিন্তু পুরান খাসলত অনুসারে ট্রাম্প ধরে নেন তারা ইমরানের পাকিস্তানকেও – ভিক্ষুক বলে – আগের মতো যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারবেন। তাই তারা ইমরান সরকারকে প্রস্তাব দেন, ‘আফগানিস্তানে যে প্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর ভর করে তারা আফগানিস্তানকে পরিচালনা করতেন এখন সেটার আদলে তেমন একটা সামরিক-ঘাটি [military base] তারা পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা করতে চান। আর এই আবেদনে পাকিস্তান কোন কিছু না দিলেও যেন আফগানিস্তানে ড্রোন হামলা করার একটা বেজ স্টেশন আমেরিকাকে করতে দেয়।’ কিন্তু ইমরান সব প্রস্তাবই নাকচ করে দেন।

    এ নিয়ে এখন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পাকিস্তান সেনা-আইএসপিআরের [ISPR] ডিজি মেজর জেনারেল বাবর ইফতেকার খামোখা অস্বীকার করতে চাইছেন [“And in reality, they did not even ask for bases and there was no mention of it on any level.”] যেটাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছেলেমানুষি ছাড়া আর কী-ই-বা বলা যায়! তারা ধরে নিয়েছে যে, লুকাতে চাইলেই তারা একালে ইন্টারনেটের যুগে সবকিছু লুকাতে পারবে। অথচ ২০২১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহ আর পরে জুনের প্রথম সপ্তাহে- এই দুই সপ্তাহজুড়ে অনলাইন নিউজ খুললেই, এখনই সব বেরিয়ে পড়বে, কিছুই লুকানো যাবে না।  আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী জ্যাক সুলেভানের [Jake Sullivan] ৩৬ পৃষ্ঠার প্রেস ব্রিফিং (৭ জুন ২০২১) তো পাবলিক ডকুমেন্ট যা এখনও হোয়াইট হাউজের ব্রিফিং সাইটে লটকানো আছে। জাপানি ডিপ্লোম্যাট [Don’t Expect Pakistan to Host US Military Bases] বা পাকিস্তানের ডন (কয়েকটা রিপোর্ট) পত্রিকা সেকালে এর রিপোর্টগুলো জ্বলজ্বল করছে।   এমনকি এ নিয়ে সিআইএ চিফের এক সিনেট শুনানিতে [CIA chief told drone bases won’t be hosted] পাকিস্তানে তার গোপন ভিজিট ও আমেরিকা ড্রোনের জন্য পাকিস্তানে বেইজ স্টেশন পাচ্ছে না; এ নিয়ে দেয়া বক্তব্যও পাওয়া যাবে। অথচ ঐ আইএসপিআরের ডিজি জেনারেল বাবর কী লুকাতে চাইলেন? তিনি দাবি করেছেন, আমেরিকা ঘাঁটি বানানোর প্রস্তাব নিয়ে আসেইনি [“And in reality, they did not even ask for bases and there was no mention of it on any level.”]। এই আইএসপিআর এরা কী কৌশল নিয়ে কাজ করে কথা বলে?? সব অর্থহীন, চোখ উলটানো মিথ্যার বেসাতি!!  এটা কার কাজে লাগে??? আমেরিকান বাজে ততপরতাকে আড়াল করা কী পাকিস্তান সেনাদের কাজ???

    এতে আসলে দাড়িয়েছে এখন এই যে ইমরান যে, পাকিস্তানজুড়ে আমেরিকান হস্তক্ষেপের কথা ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই আমেরিকার সাথে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেন নেই, ছিল না – এটা প্রমাণে সেনারা হাত-পা ধুয়ে নেমে পড়েছে। আর ফল হয়েছে উল্টা। পাক সেনাবাহিনী এর আগে এমন বেচাইন হতে কেউ দেখেনি।

    বরং এতে তাদেরকে বলা যায়, আমেরিকা ও পাক-সেনাবাহিনীর ‘আন্ডারহ্যান্ড সম্পর্ক’ বিশেষ করে যা এখন রাজনীতিবিদ ইমরান এই সম্পর্ককে অনুমোদন না দিয়ে বরং খোলাখুলি পাবলিকের সামনে এর বিচার দেয়াতে এখন পাকিস্তান সেনাদের টনক নড়েছে। আর তা থেকেই তারা তওবা পড়ে বের হয়ে আসতে চাইছে যেন। আর এটা এমনই ছ্যাঁকা খাওয়া যে সেনাপ্রধান বাজওয়া এখন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ভালো মানুষ হয়ে যেতে চান, যিনি অনেক বদনাম কামিয়েছেন। তাই এখন আগামী ঠিক ২৯ নভেম্বরেই এ বছরে তিনি অবসরে চলে যাবেন, কোনো এক্সটেনশন দিলেও নাকি নেবেন না- তা আগ বাড়িয়ে ওই জেনারেল বাবরকে দিয়ে রটিয়ে দিয়ে পার পেতে চাইছেন। তার মানে হলো- ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? না আমি কলা খাই নাই, দেখিই নাই এবং আমি আর জীবনে কলা খাবো না’ দশা!

    “Let me put this to rest. The chief of army staff is neither seeking an extension nor will he accept an extension. No matter what, he will be retiring on the 29th of November 2022.”  – says Maj Gen Babar

    তাতে এখন সারকথা দাঁড়াল যে, ইমরান এদেরকে এই ছ্যাঁচা দেয়াতে এই কুচক্রী ত্রিশক্তি – এদেরকে একেবারে এই প্রথম ইমরান ল্যাংটা করে ছেড়েছেন। সোস্যাল মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, ইমরান এই ত্রিশক্তির কুচক্রীপনা বিশেষত, আমেরিকান তৎপরতা একেবারে উদাম করে দিয়েছেন। আজ পাকিস্তানের গৃহবধূরাও নিজ বাচ্চাদের সাথে নিয়ে রাতে রাস্তায় প্রতিবাদে শামিল।
    ইমরানকে সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁর এত জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে ছবি : রয়টার্স

    এমনিতেই ইমরানের সবচেয়ে বড় সমর্থক গোষ্ঠী হল এক ব্যাপক সংখ্যক সব বয়সের নারী। কয়েকটা সোস্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাসে দেখা যাচ্ছে, এই নারী-পুরুষেরা ইমরানের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এর সাথে কিছু ইন্টারভিউও দেখা গেল; তারা শামিল হয়েছে [clip]। অর্থাৎ ওই তিন কুচক্রী শক্তি যারা এতদিন রাজত্ব করে গেছে ‘ভিক্ষুক তত্ব” দিয়ে, এরা যে একদিন পাকিস্তানের গৃহবধূদের হাতে নাকানি-চুবানি খাবেন, তাদের অকাম সব উদাম হয়ে যাবে তা তারা কখনো অনুমানই করেননি মনে হচ্ছে। কিন্তু এটাই পাকিস্তানে এখন হচ্ছে এবং তা বাস্তব। সম্ভবত সে কারণে সেনাবাহিনী সবার আগে সব ছেড়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে। জেনারেল বাবরের প্রেসের সামনে নিজে যেচে সেসব প্রসঙ্গ তুলে কথা বলা তাই প্রমাণ করে। আসলে শাহবাজের “ভিক্ষুক তত্ব”- এই ত্রিশক্তি মানে সেনা-আমেরিকাসহ পুরোনো রাজনীতিবিদ সবাইকেই পাবলিকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে! এটাই ইমরানের এক বিরাট রাজনৈতিক সাফল্য।

    এমনকি এনিয়ে সাম্প্রতিকালের আমেরিকান প্রতিক্রিয়াও দেখার মতো। ঘটনাটা হলো, পেন্টাগন মানে, আমেরিকান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা দেখাশোনা যাদের কাজ, সেই ডিপার্টমেন্ট পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি গত ১৩ এপ্রিল এক প্রেস ব্রিফিং ডেকে বসেন। উদ্দেশ্য ইমরানের দল সারা পাকিস্তানের সব বড় শহর যেভাবে তোলপাড় করে আমেরিকার হস্তক্ষেপ করে বিরোধী দল লেলিয়ে দেয়ার কাহিনী উন্মোচন করে দিয়েছে তাতে ব্যাপকভাবে ইমেজ হারানো আমেরিকা তা পুনরুদ্ধার করা, কমপক্ষে বলা যে, আমরা এত খারাপ না – যেন সে জন্যই এই প্রেস ব্রিফিং। ইমরানের অভিযোগের জবাবে এটুকু তিনি বলতে এসেছিলেন যে, ইমরানের অভিযোগ সত্যি নয়। অবশ্য এটা একই কথা; যেটা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি অনুমোদিত যে কড়া প্রতিবাদ (ডিমারসে demarche) চিঠি সেটা ইমরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট পৌঁছে দেয়ার পরও [Pakistan Sends US Demarche Over Alleged Political Meddling] তারা এভাবেই অস্বীকার করেছিল।

    কিন্তু জন কিরবির একটা বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “ঐ অঞ্চলে পাকিস্তান (আমাদের জন্য) এক নির্ধারক ভুমিকা পালন করেছিল। আমরা পাকিস্তান ও পাকিস্তানের জনগণের এই ভুমিকা স্বীকার করি। সেটা এমন ছিল যে [আমাদের সাহায্য করতে গিয়ে] পাকিস্তানিরা যে, নিজ দেশের ভেতরেই টেররিস্ট আক্রমণের শিকার হয়েছেন সেটাও আমরা স্বীকার করি।’ ফলে সেখান থেকে আমাদের একটা স্বার্থ-শেয়ার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান সেনাদের সাথে আমাদের সেনাদের একটা ভাল (healthy) সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।’ অর্থাৎ যেন বলতে চাইলেন, বিশ্বাস করেন ভাই – আমরা ঐ “তিন কুচক্রী শক্তি” হিসেবে পাকিস্তান সেনাদের কোনো খারাপ পথে নেইনি।

    এছাড়া আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তারা দূরেও “কোনো আমেরিকান সেনার ভুমিকা দেখেন না”। এ কথা বলেই তিনি সাথে সাথে জিহবায় কামড় দিয়ে বলেন, ‘ভাই, আমাকে আবার পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলে ফেলার দিকে টেনে নিয়েন না, মাফ চাই”!

    সার কথায়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর আমেরিকা প্রশাসন, তাদের গোমর পাকিস্তানি জনগণের সামনে ইমরান নিয়ে যাওয়াতেই এসব ঘটছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সবাই এখন নিজের গা-হাতপা ধুয়ে ফেলতে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

    ওদিকে সেনা আইএসপিআরের ডিজি জেনারেল বাবর সেনাপ্রধান বাজওয়ার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে গিয়ে ফেঁসেছেন। তিনি দাবি করছেন, আমেরিকার বিরুদ্ধে পাঠানো পাকিস্তানের কড়া প্রতিবাদ-পত্রে ‘কনস্পিরেসি’ শব্দটা ছিল না [Conspiracy not mentioned’, demarche was given on ‘interference’…]। কিন্তু তাতে কী এসে গেছে? দুদেশের  ফরমাল কূটনৈতিক কথাবার্তায় অনেক শব্দই থাকে না কারণ তা কূটনীতিতে অনুমোদিত ভাষা নয়। কিন্তু এরপর আবার নিজেই বলছেন, আমেরিকাকে দেয়া আমাদের প্রতিবাদলিপি (demarche) যেটা গেছে সেখানে মূল কথাটা ছিল মূলত ‘আমেরিকার অকূটনীতি-সুলভ শব্দ ব্যবহারের বিরুদ্ধে যে শব্দগুলো পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সমান”।
    তাহলে এটা আমেরিকান ‘কনস্পিরেসি’ হতে বাকি থাকল কী? তবুও ‘কনস্পিরেসি’ শব্দটা পাকিস্তান ব্যবহার করেনি ইচ্ছা করেই এ জন্য যে, তাতে পাকিস্তানেরও ‘অকূটনীতি-সুলভ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়ে যেত।
    তাহলে যেটা আসল কথা এটা নিয়ে পাকিস্তান সেনাদের এখন কথা বলার কী আছে? তারা কি আমেরিকাকে সার্ভিস দিতে চাচ্ছে, আমেরিকান কনসার্নটা তারা নিজেই হাজির করতে চাইছে? কিন্তু কেন?  এটা কি পাকিস্তান সেনাদের কাজ? তাদের আনুগত্যের জায়গাটা কোথায়? আমেরিকান প্রশাসন, ওরাই কী সেনাদের বাপ-মা? তাহলে দেখা যাচ্ছে  ভিক্ষুক তত্বের বিরুদ্ধে আসলে ইমরান দেশের স্বার্থরক্ষার প্রশ্ন আর আমেরিকান হস্তক্ষেপ ইস্যুটাকে পাকিস্তানের সাধারণ্যে একেবারে গৃহবধূর পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে সঠিক পদক্ষেপ ও কাজটাই করেছেন! এখন মনে হচ্ছে পেন্টাগনের জন কিরবি আর পাক সেনাবাহিনী একটা ভালো শিক্ষাই পেয়েছে এ থেকে!

    পাকিস্তানের বিচার বিভাগঃ
    আসলে ঐ গণবিরোধী তিন কুচক্রী শক্তির ‘ভিখারি তত্ব’, এই বয়ান এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাবটা হল, এটা মূলত সারা পাকিস্তানকেই সব সেক্টরে মেরুদণ্ড ভাঙা করে রেখে দিয়েছিল। সেটাই এখন বোঝা যাচ্ছে। এ থেকে এমনকি আদালতও বাইরেনয়। মানে, তারাও প্রভাবিত হয়নি, তা বলা যাচ্ছে না। এমনকি গত ৯ এপ্রিল দিন-শেষের রাতদুপুরে যেদিন সংসদে ইমরানের ওপর অনাস্থা ভোট পাশ হয়েছিল; সে দিনের আদালতের ভূমিকা মারাত্মক রকমের প্রশ্নবিদ্ধ এবং তারাও যে ভিখারি তত্বে  আপ্লুত ও প্রভাবিত হয়ে ওই তিন কুচক্রীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এই ইঙ্গিত ও প্রমাণ থেকে গেছে। সারকথায় আমেরিকা বা পাক-সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করতে যেন বিচারকদের ভিখারি মন সায় দেয়নি। অথচ ইমরান বা তার দলের আদালতের নির্দেশ অমান্য করা, এমন কোনো অভিপ্রায়ই যে ছিল না এটা এখন প্রমাণিত।

    ঘটনা হল, ৭ এপ্রিল সন্ধ্যাসাড়ে সাতটায় আদালতে বসে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, সংসদ যা  আগে ভেঙে দিয়েছিল ইমরানের সরকার তা পুনর্বার জাগিয়ে অনাস্থা ভোটের প্রস্তাব নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। আর সুনির্দিষ্ট করে বলেছিল ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় পুনরায় সংসদ বসিয়ে অনাস্থা ভোট নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতেই হবে। আর এতে ইমরান সরকার ও স্পিকার ঠিক সে মোতাবেক সবকিছুই করেছিল। আর ঐ রায়ে অবশ্যই এমনটা বলা ছিল না যে, কতক্ষণের মধ্যে এই অনাস্থা প্রস্তাবে পাস করতে হবে। কারণ এটা বলা বেকুবি হত এবং সেটা বলা অবশ্যই বিচারকদের এখতিয়ার-বহির্ভুতও হত।

    এদিকে এটা পরিষ্কার হয়ে পড়ছিল যে, আদালতের রায়ে ইমরান অসন্তুষ্ট ও হতাশ হলেও তিনি রায় মেনে নিয়েছেন। ফলে এমন আচরণ ইঙ্গিত তিনি দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি আগের রাতে (৮ এপ্রিল) ছিল ইমরানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেষ পাবলিক বক্তৃতা। তিনি সেখানে পরোক্ষে বলেই দেন যে, কাল থেকে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকছেন না।

    কিন্তু ওই তিন-কুচক্রী-শক্তি তবু আস্থা রাখতে পারেনি। যেন তারা তাদের স্বভাব দিয়ে ইমরানকে ব্যাখ্যা করতে গেছে। কিন্তু এরা যা খুশি করুক তাতে আদালতেরই এতে প্রভাবিত হয়ে পড়ার তো কোন কারণ নাই, থাকতেই পারে না। অথচ তাই ঘটেছিল! সুপ্রিম কোর্ট (যেটা সারা পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালত) আর ইসলামাবাদ হাইকোর্ট (পাঞ্জাব প্রদেশের সর্বোচ্চ আদালত) এ দুটোই রাত ১২টার আশপাশের সময় আগাম আদালত খুলে বসে গেছিল। কেন? কেন তারাীকাজ করেছিল এর কোন সদুত্তর দেননি?

    এটা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও  প্রধান বিচারপতির জন্য চরমতম লজ্জার। এতে বিচারকরা যে আর নিরপেক্ষ নন এই দাগ লেগে গেছে তাঁদের গায়ে। প্রধান বিচারপতি একটা রায় দিয়েছেন ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় যে, সংসদকে আবার বসে অনাস্থা প্রস্তাবের সুরাহা করতে হবে। আর এনিয়ে সমাজের কোনো কর্নারে তো অমান্য করার ইঙ্গিত নেই। আর সেটা থাকার কোনো কারণ ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা রায়ে সংসদ ৯ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় বসার কথা বলা আছে আর ঠিক তাই-ই ঘটেছে। এখন কতক্ষণে অনাস্থা প্রস্তাবের সুরাহা হবে এর কোন সময়সীমা বাস্তবত আদালতের দেয়া সাজে না, বিচারকরা তাই, অনুমান করি, সঠিকভাবেই তা দেননি। আর তা দেয়ারও তার সুযোগ ছিল না। তবুও সে দিন প্রায় মধ্য রাতেও সংসদ চলমান। কাজেই ওই সংসদ কিভাবে শেষ হয় অন্তত সে দিন রাত ১২টা পর্যন্ত তো তাকে সময় দিতেই হবে এবং সারা বিচারক গোষ্ঠীকে এ জন্য অপেক্ষা করতেই হত। সবচেয়ে বড় কথা, দুনিয়ার কোন বিচারকই  কোন অনুমান করে নিতে পারে না একটা অপরাধ হবেই!!!
    যেকারণে “হবু অপরাধী” বলে কোন ধারণা বিচারকের ডিকশনারি থাকতে পারে না। পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্ট পুর্ব-অনুমানে ধরে নিতে পারেই না (এটাই প্রিযুডিস)  যে, ইমরান বা তার দল “বিচারের রায় অমান্য করবেই”। কোন বিচার অপরাধ ঘটার পরেই একমাত্র শুরু হতে পারে। ঘটতে পারে অনুমানে বিচারক অপেক্ষা করতে পারে না।  অমান্য করেছে কিনা সেটা দেখার পরেই কোনো আদালত তার কাজ শুরু করতে পারে। এর আগে একেবারেই নয়। কারণ সেটা অবশ্যই প্রিজুডিস হবে। অথচ তাকে কেন আগাম রাত ১২টায় আদালত খুলে বসতে হল? আদালত আজও এর কোন ব্যাখ্যা দেয় নাই। কেন???

    এর মানে বিচারকদেরকেও কি বিরোধী জোট এবং আমেরিকা ও সেনাবাহিনীকে খুশি করতে হবে – এই ভিক্ষুকের স্বভাব পেয়ে বসেছিল? ধরা যাক আগের রাত ১২টাতেও সংসদ অনাস্থার সুরাহা করেনি এবং পরদিন সকালে আবার সংসদ বসেছে ইত্যাদি যেটাই হোক সেটা ঘটতে দেখার পরেই তো বিচারকেরা পরদিন বসে ব্যবস্থা নিতে পারতেন? অর্থাৎ তিনি আগাম ইমরান ও তার দল সম্পর্কে এক চরম মিথ্যা ধারণা ও এক আগাম ধারণা যে, ইমরানের দল ‘রায় ভায়োলেটর’ বলে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছিলেন- কেন? এমন আগাম অনুমান, একেই আদালতের ভাষায় বলে প্রিজুডিস – মানে বিচারপ্রার্থী সম্পর্কে পক্ষ-বিপক্ষ শোনা আদালতের এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই বিচারপ্রার্থী সম্পর্কে বিচারকের নেতি ধারণা পোষণ করা। আর এ জন্যই প্রিজুডিস যেকোনো বিচারকের জন্য সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা! যার সোজা মানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি-সহ পাঁচ বিচারক প্রিজুডিস রোগে আক্রান্ত।  এর অর্থ তারা অযোগ্য প্রমাণিত!!!

    যেমন আজো বাস্তবতা হল, ওই ৯ এপ্রিলের পরে ১০ এপ্রিল থেকে আজ পর্যন্ত কেন সুপ্রিম আদালত আর এই ইস্যুটাকে আর আদালতে তোলেনি? এর মানে কী? এর সোজা অর্থ, সংসদেই শেষে ঐ রাতেই অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং ইমরান ও তার দলের কেউ এতে কোনো বাধা সৃষ্টি করেইনি। এটাই ফ্যাক্টস! এর অর্থ আদালতের আগাম শঙ্কা প্রকাশ পুরাটাই অমূলক তা প্রমাণিত। আর যে আদালত আগাম শঙ্কা প্রকাশ করে সেটা আর আদালতই নয়। থাকে না। আদালত তো আইনশৃঙ্খলাবাহিনী একেবারেই নয়। তাই কোন আগাম অনুমানে সিদ্ধান্ত নেয়া তার কাজ নয়, হতে পারে না। অপরাধ ঘটার পরেই  কেবল বিচার শুরু হতে পারে। তাহলে এখন প্রশ্ন ইমরান ও তার দল কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার আগেই তাদের সন্দেহের খাতায় বিচারকরা ফেলেছিলেন? কেন? এটাতে তো বিচারকরাই বড় অপরাধী। অপরাধ করতে পারে মনে করে আদালত খুলে বসে থাকা বিচারক তারা! এই কি তাহলে তাদের পরিচয়?

    আর সোজা অর্থ এই বিচারক গোষ্ঠী আসলে ভিখারি তত্বে নিজেরা আপ্লুত ও খুবই খারাপভাবে প্রভাবিত!!! নিজ বিচারকাজ বা নিজ দায়দায়িত্ব কী সেসব কিছু ভুলে তারা আমেরিকা বা সেনাবাহিনীকে খেদমত করতে নিজ মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছে এমন বিচারপতি তারা। এক কথায় তারা অযোগ্য ডিস-কোয়ালিফায়েড বিচারপতি।

    এখন উল্টা দিকে আসি। তাহলে ইমরান ও তার দল সংসদকে অত রাত পর্যন্ত নিয়ে গেছেন কেন? বিচারকদের অবিচারকসুলভ টেনশন বাড়িয়েছেন কেন?
    প্রথমত কারো টেনশন বাড়ানো তাদের উদ্দেশ্য মনে হয়নি। তাদের মূল অবস্থান হল, বিরোধী জোট যে আমেরিকান পাপেট (ইমরানের ভাষায় ইম্পোর্টেড বা আমদানিকৃত সরকার) সেটা তুলে ধরা। সে কারণে তারা কৌশল নিয়েছিল রাত ১১টার পরে তাদের পিটিআই দলের স্পিকার পদত্যাগ করবেন আর সংসদ সদস্যরা পরে অনাস্থার ভোট শুরু হলে সংসদ ত্যাগ করবেন। অর্থাৎ এক. ইমরানের দলের স্পিকার অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি কার্যক্রম পরিচালনাই করবেন না। কিন্তু তা বলে সংসদের কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি না করে বরং বিরোধী জোটের পছন্দের এক স্পিকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে পদত্যাগ করে চলে যাবেন। যা কোনো যুক্তিতেই কোনো বাধা দেয়া হবে না। আবার ইমরানের দলের বাকি এমপিরা, এরাও অনাস্থা প্রস্তাবের কার্যক্রমের সময় সংসদে উপস্থিত থাকবেন না। এটা তো তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। তারা এটা নিতেই পারেন। আর সে্টি অবশ্যই অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে কোনো বাধা সৃষ্টি কোনোভাবেই নয়। তা-ই হয়েছিল। অর্থাৎ ভোটাভুটির সময় সংসদে কেবল বিরোধী জোটের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
    এক কথায়, আসলে “ইম্পোর্টেড” সরকার গঠনের সময় এর সাথে কোনো সংসর্গ ইমরান রাখতে চাননি। এটাই তাদের কৌশল ছিল আর সেটাই তারা বাস্তবায়ন করেছেন এবং তা সংসদে ভোটাভুটি কার্যক্রমে কোন বাধা না দিয়েই। সবচেয়ে বড় কথা, ইমরান বা তার দল সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে সারা দিন কোথাও বাধাসৃষ্টিমূলক কোনো কাজ করেননি এবং ইমরানের দল পরিকল্পিতভাবেই ৯ এপ্রিলের দিনটা শেষ হওয়ার আগেই সংসদ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল। তাই এটা কোনো যুক্তিতেই আদালতের উদ্বেগের কোনো ঘটনাই নয়। বরং আদালত অন্যের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আগাম ও মিথ্যা অনুমান করে আদালত খুলে বসে থেকেই সবচেয়ে বড় অপরাধটা করেছেন। এখান থেকেই সিদ্ধান্ত যে, আদালত আসলে আত্মসম্মান খোয়ানো বায়াসড [biased], প্রিজুডিস (ঘটনা ঘটার আগেই ওর বিচার করা, পক্ষ নিয়ে ফেলা) হয়ে গেছেন! তাই এরা আদালতে বসারই যোগ্যতা হারিয়েছেন।

    এখান থেকে আরো বড় প্রশ্ন উঠে আসে। তা হল, আমেরিকার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ- সুপ্রিম আদালতের এই পয়েন্টটাকে আমলে না নিয়ে এটা ছাড়াই সংসদ ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্তকে ভুল বলে রায় দেয়া – এটাও তো আসলে ছিল বিচারকদের পক্ষপাতিত্ব ও প্রিজুুডিস চোখে ঘটনাকে দেখা ও বিচার করা, যা এক বিরাট অবিচারের নজির!!! তা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায়!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “প্রিজুডিসে ভুগছেন পাকিস্তানের বিচারকরা? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ১৬ জুন  ২০১৪    ০৩ঃ ৪৪

    https://wp.me/p1sCvy-7m

     

    প্রথম পর্ব এখানে দেখুন

     

    রবার্ট ডি কাপলানঃ
    তাঁকে আমেরিকার এক প্রভাবশালী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। প্রভাবশালী Stratfor ম্যাগাজিনের চীফ ভুরাজনৈতিক বিশ্লেষক তিনি। আমেরিকান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্যও তিনি। “Beijing’s Caribbean Logic” শিরোনামে গত মার্চ ২০১৪ তিনি এক আর্টিকেল (আসলে তাঁর নতুন বইয়ের এক আর্টিকেল) লিখেছেন। ওখানকার সারকথা হলঃ বৃটিশ বা ফরাসী সাম্রাজ্য যখন দুনিয়াকে লূট দখলের কলোনী রাজত্ত্ব করে রেখেছিল এর শেষের দিকে আর বিপরীতে আমেরিকার যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগের সেই সময়ে আমেরিকা প্রথম ক্যারেবিয়ান সাগরের কর্তৃত্ত্ব নিয়েছিল কলোনী মাষ্টার বৃটিশ সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে। ক্যারেবিয়ান সাগর হল, মার্কিন দেশের দক্ষিণ দিকে যেখানে আমেরিকা মানে উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ (বা ল্যাটিন) আমেরিকা বিভক্ত হয়েছে সেই বিস্তৃর্ণ সাগর জলরাশি। ক্যারেবিয়ানের উত্তরদিকে আমেরিকার মিয়ামি, মেক্সিকো আর ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র পানামা, কিউবা জামাইকা ইত্যাদি আর দক্ষিণদিকে কলম্বিযা, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্র – সেই অঞ্চল। এটাই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে এক চিকন ভুখন্ডগত (সবচেয়ে চিকন অংশটাই পানামা রাষ্ট্র) সংযোগে ধরে রেখেছে। আবার বলা যায় ঐ চিকন ভুখন্ড পুবে আটলান্টিক মহাসাগর অঞ্চল আর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল এভাবে মহাসাগর দুটোকে বিভক্ত করে রেখেছে। আমেরিকা নিজের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত উত্থানের যুগে প্রথমেই সে তার নিজ ভুন্ডের দক্ষিণের ক্যারেবিয়ান সাগরের দখল নিয়েছিল, বৃটিশদের থাকতে দেয়নি। এখন কাপলান ঐ লেখায় যুক্তি দিচ্ছেন, তাহলে আজকের রাইজিং ইকোনমির চীন কেন এশিয়ায় জলরাশিতে আমেরিকাকে ঢুকতে দিবে? চীন তো আসলে আমেরিকার “ক্যারেবিয়ান লজিকই” প্রয়োগ করছে। তাই কাপলানের লেখার শিরোনাম “বেইজিং এর ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলানের কথার এক ধরণের গুরুত্ত্ব আছে সন্দেহ নাই। তবে তিনি এম্পেয়ার নষ্টামির পিছনের ভাবাদর্শগত ন্যায্যতা খুজতে গিয়েছেন। কিন্তু এতে যেদিকটা আড়ালে পড়ে গিয়েছে তা হল, চীন নিজে প্রথমে কাউকে হটিয়ে এশিয়ার জলরাশিতে নিজের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যায় নাই। উত্তেজনাহীন নিঃতরঙ্গ এশিয়ার জলরাশিতে জাহাজ নৌরুটে পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার করে চীন তার অর্থনীতিতে বিকাশ সাধন করে যাচ্ছিল। তার পড়শিরাও যার যার মত নিজের অর্থনীতিতে মশগুল ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে চীনের পড়শিদেরকে আমেরিকার নৌ-সামরিক শক্তি অফার করা, নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করার উস্কানি থেকে। স্বভাবতই এটা চীনের দিক থেকে বিরাট হুমকি মনে করারই বিষয়। বিশেষত তার নৌবাণিজ্য বা পণ্য আনা-নেয়ার প্রধান রুট এশিয়ার জলরাশি বিশেষত সাউথ চায়না সি অবাধ চলাচল এলাকা রাখার স্বার্থে, এই কারণে। দাবার পালটা চালের মত, আমেরিকার ঐ পদক্ষেপের ফলে চীনের এতদিনের -দুনিয়ার কারো সাথে সামরিক সংঘাতের সম্পর্কে সে নাই – এই নীতি থেকে সরে গিয়ে চীনের এখনকার নীতি হয়ে দাড়িয়েছে – যারাই আমেরিকার কাছে আশ্রয় খুজছে, সামরিক জোটে আবদ্ধ হতে চাইছে বা হয়ে আছে এমন সব দেশের প্রতি চীনের ভুমিকা মাসল দেখানোর। যেমন উদাহরণ হিসাবে জাপানের প্রসঙ্গঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপান ঐ অঞ্চলের সকলের কাছেই এক কলোনী মাষ্টার হিসাবে পরিচিত; চীনসহ দুই কোরিয়াকে সে কলোনী দখল করে রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মৃত এবং জীবিত জাপানী যারা যুদ্ধাপরাধী হিসাবে ফাঁসি সাজাপ্রাপ্ত এদের সহ সকলের উদ্দেশ্য নির্মিত স্মৃতিসৌধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কখনই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ফুল দিতে যান নাই। কিন্তু এবার গিয়েছেন। এঘটনাটা চীন ও কোরিয়াকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এরচেয়ে হাস্যকর হল তিনি নিজের ফুল দিতে যাওয়ার পক্ষে যে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতারাই নিজ দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন তাই তিনি গিয়েছেন। বিপরীতে চীনের প্রতিক্রিয়া হল, পিছনের ইতিহাস না ঘেটে যখন আমরা সামনের দিন নির্মাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা করছি তখন এই আচরণ খুবই বিভেদমূলক ও শত্রুতা উস্কে দেয়ার। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে এটা কোরিয়ান জনগণের অনুভুতিকে পায়ে মাড়ানো। এছাড়া ছোট্ট যে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জাপান-চীনের বিবাদ সেটাও কলোনী দখল যুগের মালিকানার বিবাদ। স্পস্টতই জাপানের ভুমিকা মাসল ফোলানোর, খুচিয়ে পুরান ঘা তাজা করার, টেনশন তৈরি করার। এর পিছনের কারণ হল, আমেরিকার সাথে বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের সামরিক চুক্তি আছে যে জাপান আক্রান্ত হলে সেটাকে আমেরিকা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে, ফলে জাপানের শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিবে। এসব কিছু মিলিয়ে এককথায় বললে, চীন বর্তমান অবস্থান নিয়েছে, এশিয়ার জলরাশিতে আমেরিকার কোন ভুমিকা সে দেখতে চায় না – এটাই তার নীতি ও আকাঙ্খা।

    সাংগ্রিলা ডায়লগঃ
    এশিয়ায় জলরাশিতে উস্কানি তৈরি করে আমেরিকার নিজের কদর বাড়ানো, বিপরীতে চীন আমেরিকান জোট পাকানোর বিরোধীতা তার বর্তমান নীতি, এর ফলে এখনকার সময়টাকে বলা যায় এটা এশিয়ার জন্য মাসল দেখানো, টেনশনের পিঠে টেনশন তৈরি করার এক সময় চলছে। কিন্তু এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে বা কিভাবে থিতু হতে পারে – সেই ছবিটাকে ধরার জন্য গতমাসের শেষদিকে ৩০ মে থেকে তিনদিন সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা হোটেলে এশিয়ার বার্ষিক (১৩তম) নিরাপত্তা সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানকার রিপোর্টিং কে ব্যবহার করব।
    বৃটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক International Institute for Strategic Studies (IISS)এর দায়িত্ত্বে পরিচালিত সাংগ্রিলা ডায়লগ মূলত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ২৮ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদেরকে নিয়ে বার্ষিক আলোচনাসভা বা ডায়লগের স্থান। থিঙ্কট্যাঙ্ক IISS এটাকে “The IISS Asia Security Summit” বলে পরিচিত করিয়ে থাকে। শুরুতে মূল উদ্যোক্তা ছিল আমেরিকা; থাইল্যাণ্ডকে সাথে নিয়ে এর আয়োজক হয়েছিল ২০০২ সালে। উদ্দেশ্য পরাশক্তিগত স্বার্থগুলো ডায়লগ আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বুঝে শুনে নেয়া। ঐ ২৮ দেশের মধ্যে আমেরিকা বৃটেন রাশিয়া চীন জাপান কোরিয়া ভারত পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি প্রায় সকলেই অন্তর্ভুক্ত। এটাকে বলা যায় গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্রে চলে আসার আর এক প্রতিক্রিয়া। “সাংগ্রিলা ডায়লগ” (Shangri-La Dialogue বা সংক্ষেপে SLD) নাম হবার পিছনের কারণ এটা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চেন হোটেল সাংগ্রিলার “সিঙ্গাপুর সাংগ্রিলায়” আহুত হয় বলে সেখান থেকে এই নেয়া নাম।
    Shangri-La Dialogue 2014 সভার এবার উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। খুবই আক্রমাণাত্মক তাঁর বক্তৃতার সারকথা হল, রুল অব ল এট সি অর্থাৎ সমুদ্র বিষয়ে আইনের শাসনে চলতে হবে সবাইকে। মানে সীমানা বিবাদ মীমাংসায় চীনকে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন ইত্যাদির মধ্যে আসতে হবে। “আইনের শাসন” কথাটা শুনলে সকলের সহজেই আকৃষ্ট হবার ইচ্ছা জাগে, তাই তাঁর এই শব্দ দিয়ে বলা। সেকথায় পরে আসছি। শিনজোর পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তাঁকে সমর্থন করে বক্তৃতা উত্তেজনা আরও এক ধাপ সুরে চড়িয়ে দেন। চাক হেগেল চীনকে অভিযুক্ত করেন,“অস্থিতিশীল করার দেশ” “আগ্রাসী শক্তি” ইত্যাদি বলে। মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, আগে থেকেই আমেরিকা ও জাপানের উপর ক্ষিপ্ত ছিল বলে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ত্ব চীনাদল আসেনি, এর বদলে এসেছে চীনা সামরিক জেনারেলদের নেতৃত্বে এক চীনাদল। সেই জেনারেলও বক্তৃতায় পালটা জাপানের দানবীয় সামরিক অতীতের কথা তুলে মুখ ছুটিয়েছিল। বলেছেন, “চীন যে কোন “নির্মম ফ্যাসিষ্ট এবং সামরিক দাঙ্গাবাজ আগ্রাসনকারীর আসরে ফিরে আসা প্রতিহত করবে”। আর আমেরিকা সম্পর্কে বলেছে্ন, “চীনের বিরুদ্ধে ঘোট পাকাচ্ছে, সকলকে খেপিয়ে তুলছে”। চাক হেগেলের বক্তৃতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলেছে এটা “কল্পনাতীত”, “আধিপত্যসুলভ, হুমকির মত এবং হস্তক্ষেপমূলক” বক্তব্য। এবিষয়ের সারকথাটা বলবার জন্য পশ্চিমা সাপ্তাহিক “ইকোনমিষ্ট” থেকে ধার নিব। সাংগ্রিলা ডায়লগ শুরুর দিন তিনেক আগে ওবামা “ওয়েষ্ট পয়েন্ট” বলে খ্যাত আমেরিকার এক মিলিটারি একাডেমিতে বক্তৃতায় ক্যাডেটদের আশ্বস্ত করার ছলে বলেছিলেন, ”আমেরিকা অবশ্যই বিশ্ব পরিসরে নেতৃত্ত্ব দিয়ে যাবে” এবং “আমেরিকার জোট-বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সে এক-পক্ষীয়ভাবে সামরিক বল প্রয়োগ করবে”। ইকোনমিষ্ট বলছে,এসব কথা চীনের নজরে না আসার কারণ নাই, তাই সম্ভবত চীনা জেনারেলের এমন প্রতিক্রিয়া। এছাড়া ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের কিছু শেষকথা চীনা অবস্থান ভাবনাকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মনে করা যেতে পারে। অনুবাদ করে বললে তা দাঁড়ায়,- “…… চীন আমেরিকা জাপানের এসব কথাবার্তা, এক ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থার’ মাতবরদের কথা হিসাবে দেখছে যা তার কাছে গ্রহনীয় নয়। চীনের দিক থেকে দেখলে ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থা’ মানে পশ্চিমের স্বার্থে বিশেষত আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জারি করা অর্ডার, এক নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলা। যা নিজ শাসন-শৃঙ্খলার বাসার ভিতর উত্থিত চীনকে অন্তর্ভুক্ত হতে দেয় অবশ্যই, কিন্তু ততটুকুই যতটুকুতে চীন ঐ বাসাতে আগে থেকে সেট করা নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুগত হয়ে মেনে নেয় আর ওদিকে অন্য দেশগুলো ঘোট পাকিয়ে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনা জারি রাখে। এসব তারা করে এই বিশ্বাসে যে এভাবে চীনের বিরাট শক্তি হিসাবে উত্থানকে দমায়ে রাখতে পারবে”।

    এশিয়া নীতির সম্ভাব্য পরিণতি
    “সাংগ্রিলা ডায়লগে” কি ঘটেছে সে প্রসঙ্গে এরপরে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু কথা বলে শেষ করব। এই লেখার পরের নিচের অংশ বেশিরভাগই টাইমসের রিপোর্ট থেকে টুকে নেয়া ছোট ছোট ঘটনা বর্ণনা, সাথে নতুন কিছু ব্যাখ্যামূলক পয়েন্ট তাতে যোগ করে লেখা হবে। টাইমসের মূল ইংরাজি রিপোর্ট এখানে আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
    টাইমসের রিপোর্টের শিরোনামটাই মজার,“জোটবন্ধুরা চীনা চ্যালেঞ্জের মুখে, আমেরিকা কাপাকাপি দশায় এশিয়ায় ডুবতে বসেছে” । শিরোনাম থেকেই যথেষ্ট সরাসরি কথাবার্তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
    সম্প্রতিকালে পড়শিদের সাথে চীন যেসব বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও জাপানের সাথে; যেমন, ভিয়েতনামের এক মাছধরা নৌকা ডুবিয়ে দেয়া ও সাগরের নিচের তেল তোলার রিগ বসানো নিয়ে ভিয়েতনামের সাথে বিরোধ আর জাপানের সাথে এক ছোট দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাপান গোয়েন্দা সার্ভিলেন্স স্থাপনার খুব কাছে দিয়ে চীনা যুদ্ধজেট বিমানের উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঐ অঞ্চলে। অন্যদিকে আগেই বলেছি, ঐ অঞ্চলে চীনের পড়শিদের সাথে আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং পার্টনারশীপ ডায়লগ প্রোগ্রামে আমেরিকা নিরাপত্তা ফেরি বিক্রির চেষ্টায় রত; যাতে এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে এক শক্ত জোট খাড়া করে আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত উপস্থিতির ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রাক্তন এক অষ্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা হলেন Hugh White। ওয়াশিংটনের সাথেও তাঁর ঘনিষ্টভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর বরাতে টাইমস পত্রিকা লিখছে, চীনের লক্ষ্য আমেরিকাকে দেখানো যে সে যদি এশিয়ায় এভাবে এন্টি-চীন শক্তিজোট খাড়া করতে চায় তবে তাকে চীনের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার রিস্ক নিতে হবে। White বলছেন, “চীন উদ্দেশ্যপুর্ণভাবে দেখতে চায় যে আমেরিকা চীনের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার পড়শিদের সাথে জোট বাধার চেষ্টা – এভাবে এই অঞ্চলে আমেরিকার নেতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা -এটা টিকাতে পারবে না”। চীন যেন বাজি ধরে বসেছে সবশেষে ক্লান্ত ও ঘরমুখে গুটানো আমেরিকা পিছু হটবেই আর এতে এশিয়াতে নিজের প্রভাব যতটুকু আছে তা খুইয়ে প্রকারন্তরে এটা চীনের শক্তিকেই বাড়িয়ে তুলবে।
    টাইমস আরও জানাচ্ছে, ওবামা প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে ভিতরের অনেক খবর দিচ্ছেন। বলছেন, চাক হেগেল ও আমেরিকা প্রশাসন জনসমক্ষে জাপানের পিছনে সমর্থনে দিয়ে যাবার কথা বলে চলবে এমনকি কিছুটা মাত্রায় ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের মত অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তা করে যাবে। কিন্তু প্রশাসন আসলে নিজেকে চীনের সাথে মুখোমুখি সংঘাত অবস্থাতেই দেখছে। এটা দেখে প্রশাসনে হতাশা বাড়ছে যে নিজে সকলকে নিয়ে এমন এক খেলার প্যাচে জড়িয়ে যাচ্ছে যা যুদ্ধের পরিণতি ডেকে আনতে পারে। টাইমস ম্যাগাজিন আরও লিখছে, প্রশাসনের আর এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমেরিকান নীতির সমস্যাগুলো নিয়ে মন খুলে কথা বলতে নাম প্রকাশ না করে বলছেন, “দেশগুলোর (বিবদমান চীনের পড়শিরা) কেউ বিষয়টা সামলাতে সাহায্য করছে না”; জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে আমেরিকা যদিও জনসমক্ষে সবসময় জাপানকে সমর্থনের কথা বলে যাবে কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমপর্যায়ের জাপানী কর্মকর্তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বারবার বুঝাচ্ছেন যে যে কোন পদক্ষেপ নেবার আগে সাতবার ভাবতে; আর তারা যেন কোনভাবেই চীনকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ার অবস্থায় না নেয়।
    ওদিকে আর এক কর্মকর্তা বিক্রম জে সিং, গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যিনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্ত্বের আমেরিকার উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি বলছেন, “ তাদেরকে যদি স্কুলের বাচ্চা ধরি তাহলে বলতে হয় তারা আসলে হাতে কাঁচি নিয়ে চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে”। “ছোটখাট জিনিষ থেকেই দুর্ঘটনায় বা হিসাবের ভুলের ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমন যুদ্ধপ্লেন চলতে চলতে খামোখা বিপদজনক গোত্তামারা মোড় নেয়া থেকে দুর্ঘটনা বা আগ্রাসী মনোভাবের প্রকাশের ফলে অযাচিত পালটা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখিতে পড়তে হতে পারে”।
    সাংগ্রিলা ডায়লগের সভায় চাক হেগেল ও তার সাথী সামরিক বাহিনীর অনুগামি দল জয়েন্ট চীফ অব ষ্টাফের চেয়ারম্যানসহ বাঘা জেনারেলরা খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ব্যাডমিন্টন খেলার কর্কের মত দৌড়াদৌড়ি করে। কেন? কারণ, ঐ সভায় প্রধান উস্কানিদাতা বক্তা ছিলেন জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। প্রধান বক্তা হিসাবে তার বক্তৃতার পর ডায়াসে থাকা অবস্থায় তিনি এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এক তরুণ চীনা অফিসার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বীপের মালিকানা বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি কি চীনের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবতে রাজি আছেন? প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে ছুপা জবাবে তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে রাখাটা জরুরী” যাতে কোন “অজানা, যদি ঘটে যায় এমন ঘটনাকে ঠেকানো যায়”। আমেরিকান জেনারেলরা তাই দৌড়াদৌড়ি করে সবার কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা নিচ্ছিলেন “অজানা, যদি ঘটে যায় ঘটনা” যেন কোনভাবেই না ঘটে।
    এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ও পুর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ Andrew L. Oros বলেছেন,”কোন বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখিতে ওর রেফারি হওয়ার চেয়ে বরং যেকোন ভাল শিক্ষক জানেন বাচ্চাদেরকে সব কিছুর আগে ডিসিপ্লিন আচরণ শিখিয়ে নিতে হয়”। এখানে “রেফারি” প্রসঙ্গে টিটকিরি করে বলা হয়েছে। এমন হওয়ার কারণ,ওবামার প্রথম টার্মে তার নতুন “এশিয়া পলিসি” হাজির করেন যেখানে রেফারি মানে “এশিয়ায় আমেরিকার pivot বা ভারকেন্দ্র ভুমিকা” থাকবেই একথা বারবার উচ্চারিত হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আমেরিকান ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে অক্টোবর ২০১১ সালে নিজে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন, America’s Pacific Century শিরোনামে। ঐ আর্টিকেলের প্রথম বাক্য ছিল “As the war in Iraq winds down and America begins to withdraw its forces from Afghanistan, the United States stands at a pivot point”. ফলে এখান থেকেই ওবামার এশিয়া পলিসি মানেই শব্দটা কয়েন হয় নতুন শব্দে “এশিয়াতে আমেরিকার পিভোটাল রোল” বা রেফারি ভুমিকা – এভাবে। আমেরিকান একাদেমিকরা সেকথার সুত্র ধরে এখন ঠাট্টা মশকরা করে বলছেন, “ওবামার রেফারি ভুমিকা”। কারণ অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ওবামার এশিয়া পলিসির অর্থ এন্টি চীন মাতবরির আমেরিকান জোট এভাবে না ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়। এবং সেক্ষেত্রে এই নীতি অকার্যকরে হয়ে যাবে।

    ওবামা্র মানে গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধ
    উপরে এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টের ম্যাপে দেখিয়েছিলাম লাল গোল দাগ দেয়া “চোকিং পয়েন্ট”। চোকিং পয়েন্ট এর আক্ষরিক মানে শ্বাসরুদ্ধ করে চেপে ধরার এমন সহজ জায়গা। অর্থাৎ চীনের অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ করে দেবার মত সহজ জায়গা কোনটা – চীনের পণ্য বাণিজ্য জাহাজের নৌচলাচল পথে এমন দুটো জায়গা যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই চিকন হয়ে থাকা কিছু অংশ পার হতে হয়। এর একটা ইরানের নৌসীমায় হরমুজ প্রণালী (সমুদ্র নৌপথের চিকন অংশকে বাংলায় প্রণালী আর ইংরাজিতে strait বলা হয়ে থাকে) আর অন্যটা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভুখন্ডের মাঝে মালাক্কা প্রণালী [Malacca Strait মালাক্কা প্রণালী]। প্রণালীতে কোন যুদ্ধজাহাজ আড়াআড়িভাবে রেখে দিলে অথবা ঠিক প্রণালীর উপর কোন বাণিজ্যিক জাহাজও ডুবিয়ে দিতে পারলে ঐ নৌচলাচল পথকে সহজেই কয়েক মাসের জন্য স্থবির রুদ্ধ করা সম্ভব। ফলাফল এটা চীনের অর্থনীতিকে অকেজো করে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই টুটি চেপে ধরার চোকিং পয়েন্ট।
    আমেরিকার সাথে চীনের ১৯৭১ সালে প্রথম সম্পর্ক স্থাপনের সময় দেনা-পাওনার মৌলিক যেদিকটা নিয়ে রফা হয়েছিল তা হল, চীন আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজি নিজ ভুখন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিবে, পুঁজিকে প্রয়োজনীয় আইনী সুরক্ষা দিবে। বিদেশী পুঁজি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করে নেয়ার মত কোন পদক্ষেপ নিবে না। (এগুলো আজকাল আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শর্ত হয়ে গেছে।) বিনিময়ে আমেরিকান রাষ্ট্র চীনকে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্যপদ পাবার সহযোগিতা থেকে শুরু করে চীনের বিকাশে অর্থনৈতিক, ষ্ট্রাটেজিক,পণ্যবাজার সুবিধা ইত্যাদি চীনা স্বার্থের দিকগুলোতে বাধা তো হবেই না বরং সহযোগিতা করবে। এটা চীনের দিক থেকে খুব স্বাভাবিক চাওয়া। কারণ চীনে বিদেশী পুঁজি এসে উতপাদন বাণিজ্য করতে গেলে এগুলো তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ চাওয়া। কারণ মূলত তা ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজির স্বার্থেই, কারবার ভায়াবল হওয়া, তার মুনাফাসহ আরও স্ফীত হওয়ার স্বার্থেই। কিন্তু সে প্রসঙ্গটা এখানে এখন তোলার কারণ আছে। আমেরিকা-চীনের প্রথম সম্পর্কের সময়ের মৌলিক দিকটা খুবই সংক্ষেপে এখানে বলা হলেও তবু এটুকু থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে এই রফার ভিতর আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্যই এক বড় বিপদ লুকিয়ে ছিল, এখনও আছে। বিশাল ভুখন্ড ও জনসংখ্যার চীন মানে বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার আর ওদিকে সস্তা শ্রমে প্রতি জোড়া হাতে সস্তায় রপ্তানিযোগ্য ও কমপিটিটিভ পণ্য উতপাদন – এতে চীনের দুনিয়া কাপানোর কথা সন্দেহ নাই। এতে এক বিশাল অর্থনৈতিক উত্থান চীনকে সবদিক থেকেই পরাশক্তি করে তুলবে, তা সকলেরই জানা ছিল। যেটা আবার খোদ আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও হুমকি। কিন্তু শুরু থেকেই এটা টের পাবার পরও আমেরিকান রাষ্ট্রের কিছুই করার ছিল না। কারণ এটাই গ্লোবাল পুঁজির আপন স্ববিরোধীতা। যেমন, একদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থ হল সবসময় নতুন নতুন অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে,ওটাই তার প্রাণভোমরা। যেভাবেই হোক অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে। অন্যদিকে ওয়াল ষ্ট্রিট পুঁজির নিজেরই আকার দেয়া দানব এমপায়ার বা দুনিয়ায় সবাইকে পিটায় ধমকায় বেড়ানো “সাম্রাজবাদ” রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকান রাষ্ট্রের এমন কিছু নিজস্ব স্বার্থ আছে যা সব সময় তারই ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। এমনিতেই ওয়াল ষ্ট্রিটের মালিক রাষ্ট্র নয় ব্যক্তিবর্গ, যার মুনাফা লাভালাভে আকার বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের এর উপর কোন নগদ লাভ নাই কর্তৃত্ত্ব নাই। ফলে ওয়াল ষ্ট্রিটের একান্ত নিজ স্বার্থে খোদ আমেরিকান রাষ্ট্রকে বিপদে হুমকির মুখে ফেলে হলেও তার বিনিয়োগ বাজার চাই। ফলে রাষ্ট্র টিকে থাকার স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রিটের টিকে থাকার স্বার্থ এখানে এক নয়, এক তালে নয়। এজন্য একদিকে চীনে প্রবাহিত গ্লোবাল পুঁজি (ওয়াল ষ্ট্রিট যার কেন্দ্র বা প্রতীকী নাম) এর ফুলেফলে বেড়ে উঠা সুরক্ষা করতে ওবামা কমিটেড ও বাধ্য আবার বিপরীতে রাইজিং চীন রাষ্ট্র আমেরিকান রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ওর চেয়েও বড় পরাশক্তি হয়ে উঠার বিপদে নিজেই হুমকিতে, দুনিয়ায় নিজের একছত্র সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার ভুমিকার মুকুট যায় যায় অবস্থা। তাই একদিকে ওবামা চীনের চোকিং পয়েন্ট মানে টুটি টিপে ধরার জায়গাটা খুজে বেড়ায় আবার ওর খুজে বেড়ানো দেখে রাইজিং চীনের খারাপ প্রতিক্রিয়া হুমকিতে তটস্থ হয়ে যায় সে। নিজেই জাপানকে উস্কানি দেয় আবার নিজেই তাকে জোরে চিৎকার করতে না করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (জাতিসংঘ,আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি) গড়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আমেরিকান রাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সাম্রাজ্যের রুস্তমি চালায়, আমেরিকান মাতবরিতে সাজানো তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানে ঢুকার চেয়ে চীন বরং আবার নতুন করে নতুন ভারসাম্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়। এর ভিতরই নিজের স্বার্থ দেখে স্বস্তিবোধ করে। BRICS যার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ওদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের এক বিশাল মোড়ল “গোল্ডম্যান স্যাসে” কোম্পানী তাই নিজেই BRICS গড়তে পরামর্শ উতসাহ জুগিয়েছে কারণ এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই তা তাকে নতুন আয়ু দিবে। তাতে আমেরিকান রাষ্ট্র ডুবে মরল না বাচল এটা তার কাছে গৌণ, মুখ্য হল কে তাকে অফুরন্ত নতুন নতুন বিনিয়োগ বাজার এনে দিচ্ছে। ওয়াল ষ্ট্রিটের বাইরে আফ্রিকাকে মাথায় রেখে দুবাই আর চীনকে মাথায় রেখে সিঙ্গাপুরে পুঁজি বাজার ক্রমশ বড় ও বিকশিত কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ওবামা তাই একদিকে এশিয়ায় এন্টি চীন নয়, এশিয়ায় নিজের পিভোট বা ভারকেন্দ্র অথবা রেফারির ভুমিকা দেখে। আবার একইসাথে এখনও দুনিয়াকে নিজ রাষ্ট্রের সাম্রাজ্য নেতৃত্ত্ব চালিয়ে যাবার স্বপ্নে চীনের চোকিং পয়েন্ট হাতড়ে বেড়ায়। গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধীতা স্বভাব এভাবে চারদিক থেকে ফুটে উঠে।
    এখন ফলাফল? টাইমসের ঐ রিপোর্টের শেষ অংশে চীনের সাঙহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির ‘আমেরিকান ষ্টাডি সেন্টার’ এর ডিরেক্টর Wu Xinbo এর উধৃতি দিয়ে বলছে, “ওবামা প্রশাসন সম্ভবত এশিয়ার আকাশ ও নৌ-সীমা বিষয়ক বিবাদ্গুলোকে হাওয়া দিয়ে জাগিয়েছে আমেরিকার এশিয়া নীতির দিকে মনোযোগ দিবার কথা তুলে”। সে আসলে চীনের নার্ভ পরীক্ষা করতে গেছিল। “একারণে চীন আর কখনও এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্ত্বে শক্তিজোট পাকানোর বিষয়্টাকে স্বাগত জানাবে তা যেন কেউ আর আশা না করে। চীনের স্বার্থের দিকটাই এরা উপেক্ষা করেছে”। অবস্থা দেখে ওদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট গত মাসের ১৯ মে তারিখে “নতুন এশিয়ার নিরাপত্তা কৌশলের” রূপরেখা হাজির করেছেন এক আন্তর্জাতিক সভায়। ওখানে আহুত সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলো ছিল চীন রাশিয়া ও অন্যান্য এশিয়ান দেশ। কিন্তু আমেরিকাকে বাইরে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছে, এটা চীনের জেনেবুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত।

    কয়েনের উলটা দিক
    কিন্তু কয়েনের আর একটা দিক থেকে কিছু কথা বলা দরকার। আমেরিকার সাথে এই টানাপোড়েন করতে গিয়ে চীন সাগরের পড়শি বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে চীন একটা খারাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে ফেলেছে। আকাশ বা নৌপথ অথবা সাধারণভাবে সীমানা বিষয়ক কোন বিবাদ বিতর্ক উঠলে এর সমাধান কি তবে সামরিক পথেই লাঠির জোরে করতে চায় নতুন রাইজিং চীন? নাকি জাতিসংঘের আনক্লজ পদ্ধতি পছন্দ না হলে আরও ভাল কোন আন্তর্জাতিক সালিসের পথে করতে চায়? এদিকটা নিয়ে চীনকে অবশ্যই ভাবতে হবে। যদিও মূলত চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্ত্বে আর এক পলিটিক্যাল জোট হাজির হয়েছে দেখা যাচ্ছে, নামঃ Conference on Interaction and Confidence Building Measures in Asia (CICA)। এর নামের মধ্যে ইন্টার-একশন আর কনফিডেন্স বিল্ডিং মানে “পারস্পরিক আলাপ আলোচনা” ও “পরস্পরের আস্থা অর্জন” শব্দ দুটোর তাতপর্য আছে অনুমান করা যায়। কারণ CICA এর সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়া জানা গেল, ওখানে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে। জাতিসংঘ জন্ম দেবার আগের ৫-৭ বছর ধরে এমনিভাবেই বিভিন্ন ধরণের নানান জোটের জন্ম হয়েছিল, সবগুলো টিকে নাই বটে তবে সবগুলো উদ্যোগের মিলিত পরিণতি্তে জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘ। বলা বাহুল্য, একদিকে CICA উদ্যোগের আর অন্যদিকে চীনের পড়শিদের সাথে চীনের বিরোধ মীমাংসার পথ – এদুটো পরস্পর অসামঞ্জ্যপুর্ণ। আমরা আশা করব এদিকগুলোতে চীন মনোযোগী হবে।

    আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩, সকাল নয়টা সাত