Category: পাকিস্তান

  • “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    “আমেরিকান শান্তি ও নেতৃত্ব শেষ, যেমন ন্যাটো”-গার্ডিয়ান

    গৌতম দাস

    ২৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬

    AFTER   AFGANISTAN,THE  PAX  AMERICA  IS  OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    PAX AMERICA IS OVER

    AMERICANA PEACE IS OVER

    সব ভেঙে গেছে, ভেঙে পড়ছে। খসে খসে পড়ছে, এক এক করে! আমেরিকান ক্ষমতার সাজানো বাগান। আর লুকানো যাচ্ছে না। শুধু আমার কথা নয় এটা। দেখা যাচ্ছে যারা এতদিন শুধু আমেরিকান সমর্থক না আমেরিকা তাদের জীবন, ভরণপোষণ, পেশা ইত্যাদিতে ডেইলি-লাইফের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল এমন ব্যক্তিরাও এখন আমেরিকার সাথে নিজের দুরত্ব তৈরি করছে। এরাও আমেরিকার কোন দায় আর নিতে চাইছে না। দুনিয়া এখন এমন নতুন চেহারায় পৌছেছে।
    কোনো  পরাশক্তি এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দেখা যায়নি। এটা ওর জন্য বিশাল সঙ্কটের একটা যুগে প্রবেশ। এর গভীর সংকটের বড় লক্ষণ ও প্রধান  প্রমাণ হল যখন, এই দেশের অভ্যন্তরীণ সব বিরোধ-মতান্তর খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়। আমেরিকান সমাজে অসংখ্য বিভক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আরেক বড় লক্ষণ হাজির হয়েছে, সবার গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়া। তাই এখন আফগান-রিলেটেড প্রায় সবাই হতাশায় হাত-পা ছুড়ছে। কে যে কাকে গালাগাল করছে তার কোনো তাল-ঠিকানা নেই। অনেক সময় রাগে ক্ষোভে বা গভীর হতাশায় অথবা নিজেদের আর ভবিষ্যৎ নেই দেখে ফেললে – বড় মানুষও শিশুদের মতো আচরণ শুরু করে; নিজের বাবা-মাকেই গালাগালি শুরু করে; এটা তেমন অবস্থা যেন! কিন্তু  কোন ঘটনাটা এমন এত বড় প্রভাব ফেলতে পারল? আফগানিস্তানে তালেবান ২.০ এর উত্থান ঘটেছে! এরই প্রতিক্রিয়া এগুলো!

    প্রতীকীভাবে কিছু ব্যক্তিত্বের প্রতিক্রিয়া এখানে জড়ো করব।  রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বুশ (২০০১-০৯) থেকে শুরু করি। তিনি আফগানিস্তান ও ইরাকে মিথ্যা অভিযোগে হানাদার দখলদারি ঘটানোর প্রধান নায়ক। এবার তিনি প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে বকাবকি শুরু করছিলেন গত মাস (জুলাই) থেকেই যে বকাবকিটা ১৫ আগস্টের ( আমেরিকান কাবুলের পতনের দিন ) পরে আবার শুরু করেছেন। বুশের অবস্থান হল, তিনি আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের একেবারেই বিপক্ষে। তিনি আফগানিস্তান ছাড়তে চান না। বেচারা! কেন? কী যুক্তি তার? তিনি গত মাসে ১৪ জুলাইয়ে জার্মান ডয়েচে ভেলে’কে বলেছেন, সেনা প্রত্যাহার এক ‘ভুল কাজ’ [George W. Bush: Afghanistan troop withdrawal ‘a mistake‘]। তিনি আরো বলেন, ‘আফগান নারী ও মেয়েদের বর্ণনাতীত কষ্টের কথা ভেবে আমি উদ্বিগ্ন” [I’m afraid Afghan women and girls are going to suffer unspeakable harm,” Bush said.(২০ জুলাই)]।’ আচ্ছা, তার মানে কি তিনি আফগান নারীদের দুর্দশামুক্তির নায়ক হতেই আফগানিস্তান দখল করেছিলেন? তাই কী?   না, তা কেউ বলছে না, তিনিও তা দাবি করছেন না। তা হলে, এমন ভুয়া উদ্বিগ্ন কেন তিনি?

    পিছনের বিশাল কারণটা হল, আফগানিস্তানে ও ইরাকে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আমেরিকা হানাদার ও দখলদার বাহিনী, আর এই কাজের প্রধান নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ও কর্তা তিনি নিজেই। বুশের এই একচুয়াল লিগ্যাল স্ট্যাটাস লজ্জাজনক, এটা তিনি জানেন। একবার জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তা পাবলিকলি উচ্চারণ করেছিলেন। তাই বুশ জানেন, বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে আমেরিকান সমাজে এখন প্রশ্ন উঠবে যে আমেরিকার তাহলে লাভ হলো কী? ২০ বছরে মার খেয়ে? দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে? এবং সবাই প্রেসিডেন্ট বুশের বিরুদ্ধে আঙুল তুলবে? তাই অন্য কারো তাকে বিব্রত করে ফেলার আগেই তার ভান হল, নারীর জন্য ‘প্রাণ কান্দা’। এজন্যই তার মুখরক্ষার বয়ান-দর্শন এখন একটাই, ‘নারীর-দুর্দশামুক্তি’। ভাবখানা এমন যেন নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে দেখে তিনি আর চুপ থাকতে পারেন নাই। তা রক্ষা করতে বুশ বা আমেরিকা আফগানিস্তান দখলে এসে ২০ বছর কাটিয়ে গেল! কী তামশা!

    আমেরিকার এক পপুলার মিডিয়া হল ‘এনপিআর’ [NPR, National Public Radio] রেডিও। এরই ওয়েবসাইট লিখছে, আমেরিকা নাকি ‘আফগানিস্তানে গণতন্ত্র এনে দিতে গিয়েছিল []। তবে এটা করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত খোদ আমেরিকাতেই গণতন্ত্রের অভাব ঘটিয়ে ফেলেছিল, [The U.S. involvement in Afghanistan is a story of democracy and its shortcomings. ]।’ এদেখি বিরাট এক আঁতলামো! ইদানীং আমেরিকান মিডিয়ার এমন লেখা দেখে মনে হয় তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে, তাই কথার আর সেই ওজন থাকছে না। কখন কী বলে ঠিক থাকছে না।

    এ ছাড়া এ কথাটাও সত্য নয়। যেমন, বুশ দুই টার্মে ক্ষমতায় ছিলেন। প্রথম টার্মে যদি ধরে নেই পাবলিক জোশে তিনি আফগানদের কড়া শাস্তি দেয়ার জন্য বোমা ফেলতে গিয়েছিলেন, মানে নাইন-ইলেভেনে টুইনটাওয়ারে হামলার শাস্তি দিচ্ছিলেন। কিন্তু এরপরে কী? প্রশ্ন উঠবে, তাহলে এর পরও যুদ্ধ চালু রাখতে ভোটাররা তাকে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত করলেন কেন? এর দায় তো তখন অবশ্যই (লোভী) ভোটারদেরও নয় কি?  আসলে এসব ভোটারেরা কখনই দায়িত্ব নিতে চায়নি, বুশ বা তাদের প্রেসিডেন্ট কী করে বিদেশ থেকে দেশে টাকা আনছেন? আর বুশের পদক্ষেপ তাদের পক্ষে যাচ্ছে বলে তারা মেপেছিলেন ও আর উৎসাহ দিতে বুশকে আবার নির্বাচিত করে দিয়েছিলেন তাদের ওসব বৈষয়িক লাভ দিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তাদের বিচারে আমেরিকান সমাজে “কাজ-কাম” আর ‘মানি সার্কুলেশন’ বাড়া দেখেই তো তারা সিদ্ধান্তে গিয়েছিলেন… “কাজেই বুশকেই আবার জিতিয়ে দাও”। তাতে আফগানিস্তানে কী হচ্ছে তাতে ভোটারদের কী – এভাবেই  তারা জিতিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো যুদ্ধে আমেরিকান জনগোষ্ঠী ও অর্থনীতিকে জড়ানোর কারণে এই মানি সার্কুলেশন বৃদ্ধি পেয়েছিল- যেটা ছিল এক জবরদস্তি বৃদ্ধি। আর যুদ্ধ তো ঠিক কোনো ব্যবসা বা বাণিজ্য নয়। তাই যুদ্ধ শেষে কিছু রিটার্ন এলে আসতেও পারে, এই রিটার্ণের উপর ভরসা করে কেউ যুদ্ধে যেতে পারে না।
    যুদ্ধ দেশকে বিশেষ কোনো সুবিধা (অ-মানিটারি সুবিধা) কখনো কখনো এনে দিতে পারে। যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সবার উপরে সাবধান থাকতে হয়, কারণ, কোনো যুদ্ধের খরচ যেন দেশের বইবার সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি দাবি না করে বসে। সে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ করেও টিকে গিয়েছিল। আমেরিকা ইউরোপ (এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নসহ) ও  এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন
    আমেরিকার উপর একই গ্লোবাল কর্তৃত্ব সুযোগ এনে দিয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান-ইরাকের যুদ্ধের ব্যয় ছিল লাগামছাড়া আর বিপুল খরচের তুলনায় রিটার্ন এমন বড় কিছু নয়। ততদিনে যুদ্ধের সাত বছর পেরোতেই বেহিসাবি খরচের ভারে শুধু ‘আমেরিকান ইকোনমি’ নয় এর নেতৃত্বে ও সাথে থাকা ইউরোপসহ সারা গ্লোবাল ইকোনমিও মহামন্দার (২০০৮) কবলে পড়ে যায়। এভাবে এঘটনাই আমেরিকান কর্পোরেট হাউজ, ব্যবসাদার ও ভোটার সবপক্ষেরই যুদ্ধের শখ মিটিয়ে দিয়েছিল। কারণ, গ্লোবাল মন্দার মধ্যে আর আফগান-ইরাক যুদ্ধও তো এক সাথে দুনিয়াতে কখনো চলতে পারেনি।

    এরপরের ওবামা দু-টার্ম বা পরে ট্রাম্প- দু’জনেই তাদের কালের যুদ্ধের উল্টা এরা – যুদ্ধের খরচ কমানোর নায়ক সাজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখকর খুব কিছু হয়নি। তবে দায়ীত্ব ও  বিবেচনাহীনভাবে যুদ্ধের দায় ফেলে পালিয়ে যাবেন – এই সস্তা শর্টকাট বেকুবির পথ নিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তালেবানদের সাথে আমেরিকানদের চুক্তিও সম্পন্ন করেছিলেন একা ট্রাম্প নিজেই। ফলে তালেবান-চুক্তি করার মূল দায়ভার এককভাবে ট্রাম্পের। কিন্তু বাইডেন তা বাস্তবায়নে গেছেন বলে সব দায় এখন তিনি বাইডেনের ওপর চাপাচ্ছেন। এটাই বড় তামাশার।

    আবার বাইডেন আসলে  তালেবানদের ক্ষমতায় এনে নিজের সেনা-প্রত্যাহার নিশ্চিত করবেন এমন বাস্তবায়ক প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছেন।  যদিও এই দায় নেয়া যে খুবই রিস্কি তা তাঁরও অজানা ছিল না। কিন্তু তবু তিনি রাজি হয়েছিলেন; কারণ সেনা প্রত্যাহার তার সরকারের পরিচালনা খরচ কমাবে, এই ছিল লোভ। কারণ, আফগানিস্তানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩০ কোটি ডলারের বেশি – । এখনকার আমেরিকা মানে অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব, সেই প্রাচুর্যের আমেরিকা আজ আর নেই। কিন্তু তার অর্থ দরকার। কারণ, এদিকে অর্থের সংস্থান ও সোর্সের খবর না রেখে বাইডেন  সারা ইউরোপ আর জাপানের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন [বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)] যে, চীনের পাল্টা ব্যাপক বিনিয়োগ সক্ষমতা, পাল্টা বেল্ট-রোড খাড়া করার সক্ষমতা হাজির করবেনই। এখন আফগান ফ্রন্ট থেকে সেনা প্রত্যাহার যদি বাইডেনকে কিছু খরচ সেভ করাতে সে অর্থই বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস হয়ে দেখায় – যদিও শেষে এসবই  সুখের গল্প হয়েই থেকে যাবে! সে সম্ভাবনাই প্রবল!

    কিন্তু এর আগেই (বাইডেনের উপর দিয়ে) ট্রাম্প দান মারার চেষ্টা করেছেন। তিনিও আগামী নির্বাচনের হিসাব মোতাবেক এখন উল্টা বাইডেনের ওপর নিজেরই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের সব দায় চাপিয়ে নিজে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। তাই বলা যায়, সাবেক প্রেসিডেন্টরা মাত্রই আসলে দায়দায়িত্ব নিতে না চাওয়া অপরচুনিস্ট, সুবিধাবাদী। তাই শেষে সব ভার বাইডেনের উপর। যেমন,  বাইডেন ইতোমধ্যেই তালেবান ক্ষমতা দখল নিয়ে নেয়ায় নৈতিক দিক থেকে ঘায়েল হয়ে গেছেন; আমেরিকানদের মানসিক-নৈতিক দিক দুর্বল করে ফেলেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের একগুঁয়ে নীতিটাই বাইডেন চুপেচাপে অনুসরণ করে যেতে চেয়েছিলেন। চীনা পণ্যের আমেরিকায় আমদানিতে বাধা দিতে ট্রাম্প ওসব পণ্যের উপর বাড়তি ২৫ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছিলেন। সেটা সযত্নে চালু রেখেছেন বাইডেন। আর সেটাই এখন বাইডেনের উপরই শাস্তি হিসেবে আসা শুরু করেছে। ঐ ট্যাক্স আরোপ বাইডেন আগে বদল করতে যাননি, ‘কম দেশপ্রেমী’ হতে চাননি বলে হয়ত। কিন্তু সেটাই বাইডেনকে আমেরিকার আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ দিতে উদ্যত হচ্ছে বলে খবর চাউর হয়েছে। একই কায়দায় এটাও ট্রাম্পের আরেক ফায়দা।

    তালেবান-ক্ষমতারকালে বাইডেনের ভারতঃ
    ওদিকে বাইডেনের তালেবান উত্থান পলিসি ভারতের জন্য একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠেছে। ভারত আর নিতে পারছে না কিন্তু পালানোর পথ নাই। আর সবচেয়ে অসহ্য হয়েছে  মূলত, পাকিস্তানের কাছে ভারতের নৈতিক পরাজয়। পাকিস্তানকে আর ‘জঙ্গি দেশ’ প্রচার করে ভারতের সুবিধা হচ্ছে না, জমছে না। (যদিও ভারত তাতে ক্ষান্ত দেয় নাই।) গত ২০ বছর ধরে প্রপাগান্ডায়  – যেন পাকিস্তানই আফগানিস্তানের মা-বাপ; সব ইসলামী রাজনীতিক বা সশস্ত্র ধারার উৎস। এই ছিল ভারতের মুখ্য প্রপাগান্ডা বয়ান।  গত ২০ বছর আমেরিকার ওয়ার-অন-টেরর যেন আফগানিস্তানের তালেবানসহ অন্যান্য সশস্ত্র গ্রুপের  বিরুদ্ধে ছিল না, যেন আমেরিকার যুদ্ধ চলছিল (জঙ্গি) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আমেরিকা যেন  পাকিস্তানি ইসলামী জঙ্গি থেকে ভারতকে মুক্ত করতে লড়ছিল। বিশেষ করে এত দিনের আফগানিস্তান যেন ছিল এক নারীমুক্তির ঘাঁটি  – এমন এক বিরাট কারখানা। আর এখন যা হয়েছে তা যেন, তালেবানদের আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল নয় –  বরং “পাকিস্তানের কারণেই” এই নারীমুক্তির কারখানা -টা এখন যেন বন্ধ হয়ে যাবে। আফগান নারীরা বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে  আমেরিকান স্কলারশিপে পড়তে গিয়েছে।  ফ্যাক্টস হল, কাবুলে আমেরিকান পুতুল গণি সরকার পালানোর কারণে এখন  এসব নারীদের পড়াশুনা  অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। কিছু না হলেও তা একটা সাময়িক ধাক্কা খাবে।  কিন্তু  আমেরিকান প্রশাসন সতর্ক ব্যবস্থা নিলে কোন সমস্যাই হবার কথা নয়। মূল কারণ, পড়াশুনার কেন্দ্রটা  আফগানের বাইরে আর, সেসব দেশেই স্কলারশীপের অর্থ পাঠাতে কোন সমস্যা নাই। তবে উদ্বিগ্নতা থাকবে আর নতুন করে ছাত্রীরা এই সুযোগ পাবে না, এটা অনিশ্চিত। কিন্তু ভারত ইতোমধ্যেই প্রচার চালিয়েছে যে  তা তালেবানদের দ্বারা নয়, পাকিস্তানের কারণে যেন বন্ধ হয়ে যাবে। এই ক্যাম্পেইন এতদিন কানে কানে বলার মতো করে চালিয়েছিল ভারত। বিশেষ করে ইউরোপের স্কানডিনেভিয়ান দেশগুলোর কথা বেশি  করে ঢাকায় আমাদের কানে পর্যন্ত পৌছিয়েছে।

    ভারত এই ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডার কাজ হাতে নিয়েছিল আরেক কারণে। রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাকে সাথে নিয়ে তালেবানের ওপর শক্ত গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমের মধ্যে তাদেরকে আসতে বাধ্য করার জন্য ত্রয়কা গঠন [দেখুন ট্রয়কা নিয়ে  আমার আগের লেখায়] করেছিল যাতে এই তিন দেশের বিরল কমন ও শক্ত অবস্থান তালেবানদের দেখানো এবং মানতে চাপ দেয়া যে তাদের কমন অবস্থান ও বক্তব্য আবার নিরাপত্তা পরিষদেরই প্রস্তাব। এর বাইরের কারো বা কোনো প্রস্তাব নয়। আর এ কাজ বাস্তবায়ন করতেই তারা পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, যার নয়া নাম দিয়েছিল ‘ট্রয়কা প্লাস’। আর এতেই ভারতের সব পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডা পানি হয়ে গিয়েছিল। এসবেরই প্রতিশোধ হিসেবে ভারত পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আফগান নারীদের মধ্যে প্রপাগান্ডা চালিয়েছে যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ পাকিস্তান। পাকিস্তানই তালেবানদের পরিচালক। অতএব আফগান নারীরা যেন পাকিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপের জন্য জাতিসঙ্ঘে “পিটিশন” লিখে আবেদন জানায়। অথচ বাস্তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কোনো সরকারের এমন কোনো অভিযোগই নাই। জাতিসঙ্ঘসহ কোনো ফোরামেই এমন কিছু নাই। কিন্তু ভারত ইউরোপের ক্যাম্পাসগুলোতে আফগান নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন পিটিশন স্বাক্ষর ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেই।

    গতকালের আনন্দবাজার পত্রিকা এক মজার খবর দিয়েছে, ভারতীয় অ্যাম্বাসির সর্বশেষ দেড় শ’ জনের যে দলটা কাবুল থেকে ফেরত এসেছেন তারা ফিরে এসেছেন তালেবানের দেয়া সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহায়তায়। ঘটনা হল, তারা দেশে নিরাপদে ফিরতে চান বলে স্থানীয় তালেবান কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করলে কমান্ডার ভারতীয় অ্যাম্বাসির ২২টি গাড়ির কনভয়-বহর পাহারা দিয়ে এয়ারপোর্টে নিরাপদে পৌঁছে দেন। আনন্দবাজার লিজেই লিখছে, “সকলকে তাজ্জব করে ভারতীয় দূতাবাসের ১৫০ কর্মীকে বিমানবন্দরের পৌঁছে দিল ওই তালিবান বাহিনীই”। যার মানে ভারতের নিজের ছড়ানো তালেবানদের নেগেটিভ ইমেজ তারা নিজেরাই পরিস্কার করে তবেই ভারতে ফিরে আসতে পেরেছে।

    ‘কাউন্টার হিরো’ ব্রহ্ম চেলানিঃ
     ব্রহ্ম চেলানি (Brahma Chellaney) একজন ভারতীয়; তিনি অনেক বাংলাদেশীর মতই আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো। তিনি দিল্লিতে বসে আমেরিকান ফান্ডে এক এনজিও / থিংকট্যাংক চালান, নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ  [Centre for Policy Research ]। তিনি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে [Project Syndicate]  কলাম লেখেন আর সে লেখা বাংলাদেশের ‘প্রো-আমেরিকান’ পত্রিকাগুলো অনুবাদ করে ছাপে। কিন্তু তিনি বাইডেনের তালেবানদের সাথে রফা-ডিল করা  নিয়ে ক্ষিপ্ত এবং পরে  তালেবানরা নিজ মুরোদে আফগানিস্তানে  ক্ষমতা দখল করলে, এরপর তিনি একেবারে ক্ষেপে আগুন হয়ে যান। এতে তিনি এমনই হতাশ আর ক্ষুব্ধ হয়ে গেছেন, যাকে বলে ‘রাগে অন্ধ’। এর আগে তিনি কখনও  আমেরিকার উপরে এমন পরিপুর্ণ হতাশ হয়ে পড়েন নাই, অন্তত আমরা দেখিনি। যেমন তার একেবারে ভেঙ্গে পড়া বুঝা যাবে যদি দেখি  তার এবারের লেখার শিরোনাম – ‘কাবুলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বনেতৃত্বের অবসান হলো’ [Pax Americana Died in Kabul]। এটাই এর প্রমাণ। এই লেখার শুরুতে তার কথা মনে করেই লিখছিলাম।

     

  • রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    গৌতম দাস

    ০৯ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

     

    India Not Invited to Extended Troika Meeting on Afghanistan

     

    তালেবানবিরোধী  প্রচারণা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।  ফলে তাদের সতর্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে পা-ফেলা দরকার। এদিকে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি কখনো কখনো বেশি শক্তি দেখাতে চায়। আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council], এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো-রা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়েও বুদ্ধিমান দেখাতে চাচ্ছেন নিজেদের। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে হিমশিম খেয়ে, কী বলবেন এখন, কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা হাতড়ে অসহায় অবস্থায় মুখ বন্ধ হয়ে আসার দশায় তারা। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা এখন আমেরিকাকে সাধুপুরুষ আর মহাভদ্রলোক সাজিয়ে এরপর চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এমনকি ভারতকেও অভিযুক্ত করে নিজ মান বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। বলার চেষ্টা করছেন এসব দেশের স্বার্থের কারণেই নাকি তালেবানেরা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরে আসার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক হয় নাই। এমনকি এর স্বপক্ষে কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেও সে নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই  এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  অতএব,  আটলান্টিক কাউন্সিল – এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব পুরান প্রপাগান্ডায় খ্যান্ত দেয়া, ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  দেখাই যাচ্ছে, রাশিয়ার উদ্যোগে চীনও পাশে দাড়িয়েছে। বাইডেনও যোগ দিয়েছেন। কাজেই নতুন ও ইতিবাচক চোখে  এসব কনসালটেন্টদের সামনে তাকানো উচিত।  বাইডেনের চেয়ে বুদ্ধিমানের ভান করা অপ্রয়োজনীয়।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক করেছে এমন কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেই নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই সেটা এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  কাজেই আটলান্টিক কাউন্সিল, এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  আবার ওদিকে ফ্যাক্টস হল, তালেবানদের আইডিয়া মর্ডান না হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো তাদের প্রতি বিদ্বেষ জাগিয়ে তা কোন সমাধান নয়, এটা তো প্রমাণিত। একমাত্র ডায়লগ চালিয়ে গেলে, এনগেজমেন্ট এটাই পথ।  আর মূলত দরকার আফগানি স্টাবিলাইজিং ফোর্স। যেটা অবশ্যই পুতুল সরকারের কেউ নয়। এটা আপন ভাগ্যন্বেষণের লোক।  তুলনায় তালেবানদের নিয়ে যত আপত্তি আমরা মিডিয়ায় দেখি তবু তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

    ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে আমেরিকা তালেবানবিরোধী পুতুল সরকার বসিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ নিয়ে চলেছিল। অথচ এই কনসালট্যান্ট ফেলো এরাই এখন প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কেন আফগানিস্তানে এমন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি, যেখানে তালেবানের বিকল্প শক্তি তৈরি হয়, কেন তালেবানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকল?” এখন এই প্রশ্ন তাদেরকেই আমরা জিজ্ঞাসা করব। তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তাই তারা বুদ্ধিমানের মত আগে নিজেই প্রশ্ন তুলে জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন, কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। এরাই আবার পাকিস্তানকে দায়ী করছেন যে পাকিস্তান হল তালেবানের “আশ্রয়দাতা”। যেন সে জন্য আজকের আফগানিস্তানে তালেবানরা ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ ঘটনা হল আফগানিস্তান বা তালেবানরা কেউই পাকিস্তানের শত্রু বা বিরোধী ছিল না, স্বাভাবিক পড়শি ছিল। আমেরিকানরাই জবরদস্তিতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে, আমেরিকার আফগান-শত্রুতাকে যেন পাকিস্তানও নিজের শত্রু জ্ঞান করে। আর যাতে আমেরিকা পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে আফগানিস্তানে বোমা ফেলে আসতে পারে। অথচ সেই আমেরিকাই (ইন্ডিয়াকে বগলে নিয়ে ) উল্টো পাকিস্তানকে “জঙ্গি আশ্রয়দাতা” দেশ বলে প্রপাগান্ডা করে গেছে।  অথচ কার্যত এভাবে পাকিস্তান তো আমেরিকান হুকুমে চলে যাওয়া এক দেশ হয়েই ছিল। তাহলে এই পাকিস্তান আবার আমেরিকানদের শত্রু তালেবানদের নিজ দেশেই আমেরিকানদের পাশাপাশি আশ্রয় দেয় কেমন করে!

    আবার একালে আফগানিস্তান সব খোয়ানো আমেরিকার সেই আফগানিস্তানকে ফেলে পালানোর ইচ্ছা বহুদিনের, সেই ওবামা আমল থেকে। এ কারণে তারাই সে সময় চীনকেও আফগানিস্তানে সংশ্লিষ্ট হতে বলেছিল। গ্লোবাল নেতা হতে চাওয়া চীনেরও কিছু কিছু দায়-দায়িত্ব  নেয়া শুরু করুক এই উদ্দেশ্যে আমেরিকা তার কিছু ভার হাল্কা করতে চেয়েছিল, ফলে চীন তালেবানদের সাথে কথা বলুক মূলত এ লক্ষ্যে।  ফলাফলে  এক থার্ড পার্টি দেশ কাতারে  – তালেবানরা যেন অবাধে যেতে-আসতে ও যে কারো সাথে মিটিং করতে পারে; এ ব্যবস্থা ওবামা আমলেই ২০১৫ সাল থেকে চালু করা হয়েছিল। অরিজিনালি ‘সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন’ বা এসসিও জোট গঠন করার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এটিই। যে কারণে সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশ আর চীন ও রাশিয়াকে নিয়েই গঠন করা হয়েছিল এসসিও। অথচ আজ আমেরিকান ফেলোরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন যেন চীন-রাশিয়া নিজ স্বার্থেই তালেবানদের ফেরত আনছে। আর ওদিকে বিবিসি খবর দিচ্ছে কাতারের আলোচনা আরো পুরানা ২০১৩ সালের উদ্যোগ।

    আবার ওবামার পরে ট্রাম্প আরো জব্বর উদ্যোগী যেন পারলে এখনই আফগানিস্তানকে ফেলে নিজ সেনাদের নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু তিনিই তো সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা আফগান পুতুল সরকারের সাথে করেননি; বরং সরাসরি কেবল তালেবানদের সাথেই কথা বলেছিলেন, ‘ডিল’ করেছিলেন। সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিন কী হবে, তাও পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন; যা বাইডেন ক্ষমতায় এসে পুনঃঅনুমোদন দিয়ে সেটি ‘তারও চুক্তি’ বলে স্বীকৃতি দেন। অথচ ট্রাম্প তালেবানদের সাথে কিসের বিনিময়ে কী ডিল করে গেছেন, সেটা প্রকাশ্য নয়। তালেবানরা নিজ উদ্যোগে ক্ষমতা দখল করুক আর এতে ট্রাম্পই অনুমোদন দেয়ার বিনিময়ে- এ শর্তেই আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার বাধাহীন করে দিয়ে যাননি, তা আমরা কি নিশ্চিত? সে জন্যই কি থিংকট্যাংক ফেলোরা আমেরিকা বাদে বাকি সবাইকে আগাম দায়ী করা শুরু করেছেন যেন তাদের জন্যই তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে এসে যেতে পারে বলে – প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। মানে তারা কলসালট্যান্ট এই পরিচয় ধুলায় লুটিয়ে একেকজন ‘প্রপাগান্ডিস্ট’ পরিচয় নিতে চাইছেন! অথচ কী চুক্তি হয়েছে অন্তত ইনফরমালি কিছু তাদের অজানা থাকার কথা নয়!

    রাশিয়ার পুতিনের ট্রয়কাঃ
    অরিজিনালি ট্রয়কা (troika) শব্দের আক্ষরিক অর্থ সেকালের রাশিয়ান তিন ঘোড়ায় টানা গাড়ি; অর্থাৎ তিন শক্তির সমন্বয়ে কোনো একশন। আর এখন এখানে  শক্তি বলতে এরা হল রাশিয়ার পুতিনের উদ্যোগের তিন শক্তি   – রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন। হ্যাঁ, অবশ্যই তারা পরস্পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও এরা আফগান-তালেবান ইস্যুতে একসাথে কাজ করতে নেমেছে। আর একাজে মানে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যেন আফগানিস্তানে কোনো বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা বা সশস্ত্র তৎপরতার ঢল নেমে না আসে, অতীতে যেমন আফগানিস্তানে অনেকবারই ঘটেছে। সেটা ঠেকানোর কাজ।  কিন্তু সেটাই বা ট্রয়কা চাচ্ছে কেন?

    খুবই সংক্ষেপে বললে, সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিবদমান পক্ষ ও স্বার্থগুলো একত্রিত হয়ে একটি রাজনৈতিক নেগোশিয়েশনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি থিতু সমাজ, একটি ফাংশনাল সরকার আর ন্যূনতম আইনশৃঙ্খলা স্থাপন করতে যেন সক্ষম হয়, সে কাজে সহায়তা করা এই ট্রয়কার উদ্দেশ্য।

    গত ২০১৮ সালের শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তালেবানদের সাথে কথা বলার, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেনা প্রত্যাহার। কারণ তার সরকারের অর্থ আফগানিস্তানে ঢালার অপচয় চলছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল ছাড়াই। তাই তিনি এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট  – জালমে খলিলজাদেকে [Zalmay Mamozy Khalilzad, an Afghan-American diplomat]  সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে তাঁর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি তালেবানদের প্রধান আলোচক বা নেগোশিয়েটর মোল্লা আবদুল গনি বারাদরের সাথে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার নিয়ে কথা শুরু করতে পারেন। আর মূলত প্রথম থেকেই তালেবানদের শর্তানুসারে আফগান পুতুল সরকারের কোনো প্রতিনিধিই তাদের দুপক্ষের কোনো সভাতেই না রাখার নিয়ম চলে আসছে। কারণ এতাই তালেবানদের শর্ত ছিল। শেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একটি চুক্তিতে তারা পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিল আমেরিকার নির্বাচনের বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখে; যদিও এর বাস্তবায়নের মূল উদ্যোগের মাঠের কাজ গড়িয়ে যায় পরের বছরে। অর্থাৎ তত দিনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে নিয়েছেন।

    কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরে অনেক স্থানে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় তালেবানদের সশস্ত্র তৎপরতা। এ ঘটনায় তাই উদ্বিগ্ন হয়ে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল পুতিনের রাশিয়া। কেন? সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়ান স্বার্থ কী?

    ২০০৮ সালে সেকালের জি-৮ গ্রুপ থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার পর (আবার তা জি-৭ হয়ে যায়) রাশিয়া-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল। তা কখনোই ভালো হয়নি। কিন্তু আফগানিস্তানের যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা আজো রুশ স্বার্থের জন্য অনেক কিছু যায়-আসে, তাই গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই রাশিয়ার স্বার্থ। এসব দেশ অতীতে জার সাম্রাজ্যের অধীনে দখলে গিয়ে প্রথম রাশিয়ান শাসিত  অঞ্চল হতে শুরু করেছিল।  ফলে সেই থেকে পরে (১৯১৭-১৯৯১) কমিউনিস্ট আমলেও শুরু থেকেই এই সেনট্রাল এশিয়া কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যায়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে সেন্ওটাল এশিয়ান দেশগুলো আলাদা আলাদা দেশ হয়ে যায় তবুও তা বড় পাহারাদার বা রাশিয়ান বলয়ের দেশ হয়েই থেকে যায়। আসলে এখনও পর্যন্ত আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর ভিতর কোন র‍্যাডিক্যাল ইসলামী সমাজ-রাজনীতির চিন্তার প্রভাবে যেন সেন্ট্রাল এশিয়ায় সাজানো রুশ ভারসাম্য নষ্ট না হয়ে যায়, এ দিকে পরের রাশিয়ার সব শাসকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, এখনো আছে। এটাই কোর রুশ স্বার্থ।

    এমনকি যেমন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে খোমানির ইরান বিপ্লবের পরে এর প্রভাবে না সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন-বিপ্লবের ছাপ পড়ে যায় বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে; এই ভয়ে ভীত হয়েই ছয় মাসের মধ্যে ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরেই আগাম আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ কার্যত আফগানিস্তান হল ইরান থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে [The region consists of the former Soviet republics of Kazakhstan, Uzbekistan, Tajikistan, Kyrgyzstan, and Turkmenistan.] বেশির ভাগ জায়গায় আলাদা করার এক ভুখন্ড ও দেয়াল। তাই সেই ইরান বিপ্লবের পর শুরু হয়ে আফগানিস্তান আজো এক হট স্পট ও আন্তর্জাতিক ইস্যু।

    এ কারণে রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক যতই নিচে থাকুক না কেন, পুতিনের রাশিয়া আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ও স্বার্থে রাশিয়াকে অনেক কিছু করতেই হয়। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমেরিকা ও চীনকে সাথে নিয়ে ট্রয়কা গড়ে নিয়েছেন পুতিন। সেই পুরনো উদ্দেশ্য, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোন রেডিক্যাল ইসলামি চিন্তার ছাপ বা আঁচ যেন মধ্য এশিয়ার দেশে না পড়ে যায়। এদিকে চীন এখন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল নেতা হওয়ার দাবিদার। ফলে তারও দায়-স্বার্থ আছে। ফলে রাশিয়া ঢাকলে তাকেও অংশ নিতেই হয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে চীনের খোদ সীমান্তই আছে।

    তাহলে মুলকথা, এই ট্রয়কায় চীন ও রাশিয়া এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা শত্রুতা থাকলেও মিলের ভিত্তিটা ঠিক কী? কেন?
    এই ভিত্তিটাই হল, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার, যার কেন্দ্রে আছে জাতিসঙ্ঘ। ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্র রেখে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাই এর ভিত্তি। কেন?
    এই জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা  – যেটা গত ৭৫ বছর ধরে ফাংশনাল হয়ে আছে, এটি নিয়ে অজস্র অভিযোগ এবং এর নানান খুঁত ও ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তা সত্ত্বেও এটাই দুনিয়াতে একমাত্র গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার কায়েম করা এক সিস্টেম। আর এটা না থাকার মানে ১৯৪৫ সালের আগের সময়ে ফিরে যাওয়া, যখন যুদ্ধ করারও কোনো নিয়মনীতি মানার বালাই নেই; আইনকানুন  বা প্রটেকশন নাই।  চাইলে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে ‘নির্মূল’ করে দেয়াও ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। জর্মানিতে হিটলারের হাতে ইহুদি নিধন ও নির্মুলের চেষ্টা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। রেসিজমও কার্যত বৈধ ছিল মানে কোনো বাধা ছিল না – যা খুশি, জোর যার রাজ্য তার এবং সর্বোপরি কাউকে কোন ভুখন্ড দখল নেয়া বা কলোনি করে রাখাও ন্যায্য ছিল।  শুধু তাই না  কলোনিদখল করে রাখা এটাই সেকালের  প্রধান ফেনোমেনা ও প্রচলিত ঘটনা ছিল। সারা অখন্ড ভারত বৃটিশ কলোনি হয়ে ছিল।   কাজেই সেই পরিস্থিতির বিপরীতে  জাতিসংঘ – এটাই সবেধন নীলমনি, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের ভারকেন্দ্র। আর এটি দাঁড়িয়ে আছে যে ভিত্তি-অবস্থানের  উপর তা হল, কোনো ভূখণ্ডের নাগরিক বাসিন্দারা হল আসল ক্ষমতার উৎস;  তারাই একমাত্র নির্ধারক যে কোনো ভূখণ্ড কার দ্বারা শাসিত হবে। ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ এই নির্ধারণের একমাত্র হকদার – এ ভিত্তিতে। তাই এটা মূলত অন্য কারো দেশ দখল বা কলোনি করে নেয়ার বিরুদ্ধে এক রক্ষাকবজ। যেকারণে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর  নেহেরুর ভারতের সাথে যুক্ত করে দিয়ে গেছে, এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ একথা বলবার হকদার একমাত্র কাশ্মীরের জনগণ, কোন রাজা নয়।  আর সেখান থেকেই, এই আইনিভিত্তি – পরোক্ষেও রাজা-বাদশাহদের কোন ভুখন্ডের শাসন ক্ষমতাকেও বৈধতা দেয় না। তবে একটা ছাড় আছে যে, আগে থেকে চলে আসা কোনো রাজতন্ত্র বা বাদশাহতন্ত্রকে জাতিসঙ্ঘ অবৈধ বলতে চায় না, যতক্ষণ না ওর অভ্যন্তরীণ জনগণ সংগঠিত হয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ চায় বা দাবি করে। অর্থাৎ জাতিসংঘের ফর্মুলা হল গণভোটে চলে যাওয়া ও সে রায়ের ভিত্তিতে দাবির ফয়সালা করা।

    ঠিক এ কারণে ট্রয়কার কাজের ভিত্তি জাতিসঙ্ঘ ও একে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার-টা। আর ২০১৯ সালের মার্চ থেকে এই ট্রয়কা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন মিটিং করে আসছে, আর সেখানে জাতিসঙ্ঘের পাশ হওয়া বিভিন্ন প্রস্তাবকে ভিত্তি করেছে এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিকেই সংশ্লিষ্ট করেছে। আর তাই সেখানে ৩০ নভেম্বর ২০২০ এক রেজ্যুলেশনের তিন নম্বর সিদ্ধান্ত হল এরকমঃ [কথাগুলো ট্রয়কার এক বিবৃতি থেকে নেয়া]

    3. As stated in the UNSC resolution 2513 (2020), we do not support the restoration of the Islamic Emirate and we call on the Government of the Islamic Republic and the High Council for National Reconciliation to engage openly with their Taliban counterparts regarding a negotiated settlement.

    অর্থাৎ, ট্রয়কা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) ২০২০ সালের এক সিদ্ধান্ত অনু- সমর্থন করছে। আর যেখানে বলা হয়েছে, তারা ‘তালেবানদের ইসলামিক আমিরাতকে পুনঃস্থাপন সমর্থন করছে না”। বরং আহ্বান রাখছে যেন আফগানিস্তানের বিবদমান সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সবাই সংশ্লিষ্ট হয়ে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছায় এবং বিবাদের একটি শান্তিপূর্ণ সুরাহা যেন হয় এবং তা করতে উতসাহ ও সহায়তা দিতে চায়।

    এসব প্রস্তাবকে কিভাবে দেখব ও বুঝব?
    প্রথমত শুরুতে যেমন বলেছি আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো যারা সব দোষ তালেবানের বলে তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন, অথচ এরা জানেন একটি  ট্রয়কা-উদ্যোগ কাজ করছে ফাংশনাল; যেখানে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন এই তিন শক্তি সক্রিয়। অথচ এরা তালেবানদের এক  শত্রুজ্ঞান করে আগাম কোন ক্যাম্পেইন করতে বসেনি। কেবল ডায়লগে সবাইকে নিয়ে বসে একটি পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট করে নিতে বলছে, সাহায্য করতে চাইছে। অথচ এই থিংকট্যাংক ফেলোরা তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় আগাম নেমে গেছেন, যা আসলে ভারতের অবস্থান! এমনকি এ্টা আমেরিকার অবস্থানও নয়। উপরের ট্রয়কার বিবৃতিটা আমেরিকান সরকারি ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া যার শিরোনাম – Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan.।

    এখন অনেকে মনে করতে পারেন যে এই সেট হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটা আপনি পছন্দ করেন না, তা হতেই পারে। জাতিসঙ্ঘ এর একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। বরং কেবল শুরু যাকে অনেক পথ হাঁটতে হবে, বদলাতে হবে, অন্য অনেক ‘অপরকে’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ডায়লগ করতে হবে। যেমন ধরা যাক, আপনি এক ইসলামিস্ট অথবা কোনো কমিউনিস্ট, যিনি গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটাকে পছন্দ করেন না বা এটা আপনার ফেভারে বলে দেখেন না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

    আসলে এ ব্যাপারটা অনেকটা আগে থেকে গড়ে থাকা একটি শহরের মত, যেখানে ওই শহরের ভেতরে বাসিন্দাদের বসবাস ও থাকা বা চলাচল ইত্যাদির জন্য সেখানে প্রচলিত নিয়মকানুন আইন কনভেনশন সবই আছে। ধরা যাক, আপনি এখন বাইরে থেকে এসে ওই শহরেই বাস করতে চাইছেন। কিন্তু আপনার দাবি ওদের সব নিয়ম আইনের কিছুই আপনি মানেন না; কারণ এগুলো তৈরির সময় আপনার মতামত নেয়াই হয়নি। এখন – এমন কথা বলে যদি ওই শহরে ঢুকতে যান এতে ফলাফল হতে পারে এই যে, ওরা উল্টো আপনাকেই আউটকাস্ট, কী বাইরের লোক বা গোঁয়ার, গাঁইয়া অভব্য আনকুথ কিংবা ধরেন জঙ্গি বলেই বের করে দিতে পারে। আইনের শাসন না মানা লোক বলে ‘অমার্জিত’ ট্যাগ দিয়ে আপনাকে একা করে দিতে পারে; আর এমন ইমেজের কারণে হয়তো আপনি আর কারও কোনো সহানুভুতি বা আপনার কী হয়েছে, তা শুনানোর মত কাউকেই পেলেন না- এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখার দশায় পড়ে যেতে পারেন।

    তা হলে এদেরকে মোকাবেলার উপায় কী?  আছে। একারণে ঐ শহরে ঢুকতে গেলে আপনাকে পরিকল্পনা-কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। তাই সম্ভবত এর চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রথমত আপনি তাদের নিয়ম মানেন বলে প্রবেশাধিকার তো নিয়ে নিবেন আগে। এরপর ওদের নিয়ম মেনেও চলেন। আর এবার কেউ আপনার পাল্টা নিয়মটা যা আপনি চালু করতে চান, সেটা কেন বেশি ভালো সেটা দেখান ও এই প্রচার চালান আশপাশে। ওই শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটে নিজের ভালো চিন্তাগুলো তুলে ধরার চেষ্টাও করতে পারেন। এরপর সময়ে আপনার দলে ভারী বুঝলে এবার তখন ঐ শহরের পুরানা সব নিয়ম বদলানোর চেষ্টা বা উদ্যোগ নেন।

    অর্থাৎ এর মূল কথাটা হল – খেলার পুরনো নিয়ম বদলাতে চাইলে দূরে গ্যালারিতে বসে থেকে তা বদলাতে পারা যাবে না। উল্টো আপনাকেই এরা উপড়ে তুলে ফেলে দিতে পারে। এর চেয়ে বরং খেলায় অংশ নিয়ে খেলতে খেলতেই এমন পুরনো নিয়ম বদলাতে চেষ্টা করতে পারেন। এর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই পথ না ধরলে কী হবে?

    সেটা একটি উদাহরণে বলা যাক। গত ৩০ জুলাই আমাদের স্থানীয় প্রথম আলো দৈনিকের খবরের শিরোনাম – “ফজলের ‘কৌতুক’ চিরতরে স্তব্ধ করল তালেবান”। ফজল, তিনি আফগান পুতুল সরকারের এক পুলিশ অফিসার ফজল মোহাম্মদ। তিনি অনলাইনে হাস্যরসাত্মক নানান ভিডিও পোস্ট করার জন্য আফগানদের কাছে তার পুলিশ পরিচয়ের চেয়ে ‘কৌতুক অভিনেতা’ বলে বেশি পরিচিত। কিন্তু তালেবানরা নাকি প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি বাড়ি ফেরার পর তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করে। এ ক্ষেত্রে হত্যার কথা শুরুতে অস্বীকার করলেও পরের সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরই তাকে হত্যার কথা স্বীকার করে তালেবান। এ হলো খবরটার সারকথা। তবে অবশ্য আফগানিস্তানে অনেক সময় এসব হত্যা প্রকাশ্যেও ঘটে থাকে।

    এখানে তালেবানদের জন্য খবরটার  সবচেয়ে খারাপ দিকটা  হল, এটা তার ইমেজ ধ্বংস করেছে। সেটা তালেবানেরা আইনের শাসন মানে না আর জঙ্গি ট্যাগ লাগানো ধরণের ইমেজ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অবশ্যই। তাই খবরটা যতটা সত্যি তাতে তালেবানদের এমন স্টাইলের তৎপরতা আত্মঘাতী!

    কোনো যুদ্ধের মাঠে আপনি বা আপনার শত্রু খুন হয়ে যাওয়ার একটা আলাদা অর্থ হয়। সামরিক ইস্যুতে এর ক্রিমিনাল আইনে মামলা হয় না। তবে এর বিপরীতে তুলনামূলক শান্ত এক জনসমাজে আপনি ঘর থেকে কোনো জেনুইন অপরাধীকেও যদি উঠিয়ে এনে জনসমক্ষে মেরে ফেলেন এর ফল হবে উল্টো। আপনি অপরাধী হবেন। এছাড়া নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ, ওই সময়ে অসহায় যে মানুষটা খুন হচ্ছে, তা যারা দেশে-বিদেশের লোক দেখবে  এরা প্রায় সকলে নিজেকে আবিষ্কার করবে ঐ খুন হওয়া নিরস্ত্র লোকটার ভিতরে। ফলে খুন হয়ে লোকটার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর এটাই আপনার জন্য বিরাট নেতি-ইমেজ তৈরির উপাদান হয়ে উঠবে। বলাই বাহুল্য এই ইমেজের জন্য এবার আপনিই হেরে যাবেন।  আপনি নৃশংস খুনি, কিংবা আপনার ধর্মটাই খারাপ এমন বয়ান উঠে আসতে পারে। তা হলে করণীয়?

    এমন ঘটনা যুদ্ধের মাঠের খুনোখুনি কিনা সেটা এক বড় প্রশ্ন। যদি তা হয় বুঝাতে চান, তবে আগে যুদ্ধ ঘোষণা করে নেয়া হয়েছে সে প্রমাণ হাজির দেখান।  নইলে অপর বিপরীত পথ হল,  কাউকে (সে অপরাধী হলেও) হত্যা করার আগে তার বিচার হতে হবে। এখন বিচার মানে কিন্তু অনেক কিছু। যার শুরু সেই কনস্টিটিউশন থেকে। এরপর রাষ্ট্র সরকার আইন, বিচারব্যবস্থা সেটআপ ইত্যাদি অনেক কিছু। মানে আসলে সবার আগে ক্ষমতা দখল করে নিতে হবে। এরপর আবার অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে এবং স্থায়ী ও আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আদালত থাকতে হবে। আর গ্রেফতারকারীই পরে বিচারক এবং তিনিই আবার শাস্তি বাস্তবায়নকারী, তিনি এমন হতে পারবে না। মানে পুলিশিং আর বিচারক একই লোক হতে পারবে না। নইলে তো যে কেউ যে কাউকে অপরাধী বলে মেরে ফেলার অরাজকতা শুরু হয়ে যাবে। আর এখানেই দেশে-বিদেশে আপনার ইমেজ আপনার রাজনৈতিক চিন্তা কেমন, আপনি দায়িত্বশীল ক্ষমতাবান মানুষ কি না – এসব বহু প্রশ্ন ভর করবে। বলাবাহুল্য, আপনি জঙ্গি, আপনি অমানবিক গুণের বা আপনি নৃশংস, কাজেই আপনার ধর্মটাই খারাপ- এই ইমেজ দাঁড় করানোর জন্য একদল লোক অবশ্যই হাজির থাকবে। অর্থাৎ আপনি নিজেই ২০০১ সালের মতো নিজেকে উপড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পক্ষে কাজ করতে পারেন না।  এমন বোকামির অর্থ হয় না।  কাজেই আপনার  দায়ীত্বশীল ও গঠনমূলক ইমেজ অবশ্যই খুবই জরুরি।

    সারকথায় একালের দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে একটা কিছু আছে, একে অবজ্ঞা করবেন না। একে মানুন আর না-ই মানুন, একে আগে বুঝুন। এরপর এগোনোর পদক্ষেপ কৌশল ঠিক করেন। নইলে বেঘোরে মার খেয়ে উলটা আপনিই হারিয়ে যাবেন।  এরা আপনাকেই উপড়ে ফেলে দিবে!

    আফগানিস্তান নিয়ে এত হইচইয়ের কারণ কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ট্রয়কার গঠন দিয়ে। পরে এই ট্রয়কা নিজেকে প্রথমে নিজেকে বর্ধিত করে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আর তাতেই ঘটে প্রথম বিস্ফোরণ। কেন?

    প্রথমত, পাকিস্তান হল ল্যান্ডলকড আফগানিস্তান ভূখণ্ডের এক প্রবেশদ্বার, যা সমুদ্রের পর  পাকিস্তানের পেরিয়ে এরপর সহজেই প্রবেশ করা যায়। আমেরিকা এজন্য আফগানিস্তানে হামলা চালানোর আগে পাকিস্তানকে হাত করে, বাধ্য করে, ঘাঁটি বানিয়েই নিয়েছিল। অতএব, আফগানিস্তানে ব্যবহারিক যেকোনো পদক্ষেপের আগে ট্রয়কাকে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে নেয়া জরুরি ছিল। কাজেই রাশিয়া নিজে উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কথা বলে সসম্মানে তাকে ট্রয়কার বাড়তি সদস্যের ভূমিকায় জুড়ে  নিয়েছিল।

    কিন্তু রাশিয়া আমেরিকা বা চীনের ত্রয়কার এসব ব্যবহারিক সমস্যার দিকটি ভারতের বুঝার বা আমল করার মত অবস্থান নিলে ভারতের চলে না। এমনকি মনে মনে মানলেও তা স্বীকার করা অসম্ভব। কারণ? ও পাকিস্তান- এটা তো একটা জঙ্গি রাষ্ট্র, ‘তালেবানদের মদদ দেয়া রাষ্ট্র’ ইত্যাদি গত ২০ বছর ধরে ভারত তার দেশের ভিওতরে বাইরে  প্রপাগান্ডা করে এসেছে।  নিজের সেই কথা তো এখন ভারত টিকাতে পারছে না। মানে এখন প্রশ্ন হল, পাকিস্তান যদি জঙ্গি রাষ্ট্রই হয়, তা হলে তো সে রাশিয়া, আমেরিকা বা চীনের পাশাপাশি একই মর্যাদার আসনে বসতে পারে না। আর বাস্তবে যদি বসতে দেখা যায় তার মানে পাকিস্তান জঙ্গি রাষ্ট্রই নয়, দায়িত্ববান রাষ্ট্র। তাই যদি রাশিয়া পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতকেও ট্রয়কায়  সাথে নিত, তাতে  হয়ত ভারতের কিছুটা মুখরক্ষা হত।   মানে ভারত নিজেই এখন আগের ইসলামবিদ্বেষী নিজের ছড়ানো ঘৃণার মধ্যেই নিজেই আটকে গেছে!

    ওদিকে রাশিয়া আবার পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভিতরে নিয়ে ট্রয়কাকেই পরে ট্রয়কা-প্লাস [troika+] নাম দিয়ে নিয়েছে, ফলে তাতে ভারতের জ্বলুনি আরো বেড়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির আর বাইরে খুবই কম প্রচারিত ঘটনা বলে এত দিন ভারত এই লজ্জা লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। যদিও তাদের মিডিয়া গত মার্চ ২০২১ থেকেই জানত যে ভারতকে বাদ দিয়ে ট্রয়কার মিটিং চলছে [ India not part of Russian meet on Afghanistan]।  কিন্তু এখন, গ্লোবাল মিডিয়ায় আফগানিস্তানে কী হচ্ছে এটা এক শীর্ষ ইস্যু। তাই মিডিয়া জুড়ে  আগাম ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে,  আগামি ১১ আগস্ট হবে ট্রয়কা+ এর পরের মিটিং। আর সাধারণত এসব মিটিং  এতদিন হয়েছে রাশিয়ায় না হলে কাতারে। কারণ কাতার ২০১৫ সাল থেকে আফগান-তালেবান ইস্যুতে নিরপেক্ষ হোস্ট। তাই সেও ট্রয়কার মিটিংয়েও প্রতিনিধি পাঠায়; সাথে ওই মিটিংয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ইরান ও তুরস্ককেও নেয়া হয়েছে। এতে এখন ভারতের মিডিয়াও আর দেশপ্রেমের জোশে মোদি-জয়শঙ্করকে জবাব দাবি করে  পার পাচ্ছে না।  একেবারে সবারই ইজ্জতের সওয়াল হয়ে গেছে।  কারণ এখন ভারতের চেয়ে  (কথিত জঙ্গী) পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন গ্রহণযোগ্য আর দায়ীত্বশীল রাষ্ট্র হিসাবে  আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের সাথে সমান মর্যাদার টেবিলে বসেছে কথা বলছে। এটা ভারতে বসে দেখা যায় না! এমনই কঠিন জলুনি!   আর এসব কথা বাংলাদেশেও  ভারত প্রভাবিত মিডিয়ায় বড় করে আসায় বাংলাদেশেও ভারতের এই বেইজ্জতির খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

    রাশিয়া ভারতকে এমন বিমুখ ও বেইজ্জতিতে ফেলল কেন?
    রাশিয়ার সমস্যা ভিন্ন! রাশিয়া মনে করে এই আগস্টের শেষে সেনা প্রত্যাহারের পরে বর্তমান আফগান পুতুল সরকারের আর ক্ষমতায় থাকা ঠিক নয়। ,[However, the Russian side appears opposed to the continuation of the Ghani government and favours an interim set-up ……]   বরং অন্তর্বর্তীকালীন ও সবার প্রতিনিধিত্বমূলক এক সরকারের থাকা উচিত, যার কাজ হবে সবাইকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। আর এর বিপরীতে ভারতের অবস্থান হলো, বর্তমান পুতুল সরকারে হাত দেয়া যাবে না” [While India has backed the government of President Ashraf Ghani…।]।’ আরো আগিয়ে ভারত বলছে, গায়ের জোরে পুতুল সরকারকে বদলালে ভারত মানবে না। যেন ভারত না মানলে বিরাট কিছু যায়-আসবে!

    কথা হল, প্রথমত ক্ষমতা তো মুরোদেই মানে গায়ের জোরেই বদলাতে হয়, বদলায়। যদিও এ্টাই শেষ নয়। এরপর ক্ষমতা নিজের কাছে রেখে কিন্তু  সব পক্ষকে নিয়ে প্রপার সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন গড়তে তো অসুবিধা নেই।
    আর তালেবানদের ক্ষমতা দখল না করতে কেউ স্পষ্ট করে তো কিছু বলেনি। ত্রয়কাও কোন আগাম আপত্তি প্রকাশ করে নাই। এমনকি ব্রিটেন আগাম জানিয়েই দিয়েছে, সে স্বীকৃতি মানে কাজ করতে রেডি। কাজেই তালেবানরা ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়ার পর তখন ত্রয়কার কথা শুনে তাদের কনসার্ণ গুলো আমল করে চলতে অসুবিধা হবার কথা না! যেমন তারা সব পক্ষীয় সরকার ইত্যাদির করতে গেলে অসুবিধা কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়ার ত্রয়কা ভারতের বুকে শেল মেরেছে“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে, ভারতের পরিকল্পিত ফেক নিউজ

    করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে, ভারতের পরিকল্পিত ফেক নিউজ

    গৌতম দাস

     ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3eu

    প্রথম ছবিটা ভারতের scroll.in মিডিয়া ওয়েব সাইট থেকে নেয়া। ভারতের CNN-News18  টিভির অফিসিয়াল টুইটার পেজ থেকে নেয়া স্ক্রিন শর্ট। যেখানে লেখা আছেঃ
    #ImranUnderSeige – Civil War breaks out in Pakistan.
    Clashes between Sindh Police and Pakistan Army.
    Chorus for Imran Khan’s ouster grows.
    Massive explosion in Karachi kills 5
    @Arunima24 reports from New Delhi.

    আর দ্বিতীয় ছবিটাও নেওয়া হয়েছে একই উৎস থেকেঃ তবে এটা পাকিস্তান থেকে পালটা ঠাট্টা করে দেয়া এক টুইট বার্তা। বলা হয়েছেঃ ব্রেকিং নিঊজ। করাচির গুলশান-ই-বাগের এই সাহসী নওজওয়ান পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের এই বিমানটা থামিয়ে দিয়েছে। নাগরিকেরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেমেছে।
    ছবির ক্যাপশন শেষ এখানে।


    জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটা পারস্পরিক টেনশন অস্বস্তি সবচেয়ে ঠান্ডা সময়েও বর্তমান থাকে। কিন্তু এরও কিছু নিয়ম ও সীমার মধ্যে তা থাকে। কিন্তু এবার সেসব সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। গত ২০ অক্টোবরের ঘটনা।  ভারতের লিডিং মিডিয়াগুলো আর সোশাল মিডিয়ায় ভুয়া একাউন্ট থেকে যে ফেক নিউজ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা হল, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাক আর্মি ও সিন্ধ পুলিশের মধ্যে বন্ধুক যুদ্ধ (ফায়ার ফাইটিং) থেকে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, পুলিশের আইজিপিকে অপহরণ করা হয়েছে ইত্যাদি। আমাদের মত যেকোন দেশের মত পাকিস্তানেও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিক সংঘাত হয় অথবা তা থেকে সময়ে অনেক ধরণের উত্তেজনা তৈরি হয়। আর অনেক সময়ই সেসব বিষয় নিয়ে পড়শি ভারত বা পাকিস্তানে চুইয়ে পড়া ধরণের যেটুক কিছু কিছু খবর তারা স্থানীয় মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করতে পারে তাই ছাপা হয়। কিন্তু কখনই উৎস দেশের মিডিয়ার চেয়েও পড়শি দেশে ছাপানো তথ্য বেশি বা বানানো ফেক নিউজ হয়না কখনও। কিন্তু এবার করাচীতে – আর্মি-পুলিশ, পরস্পরের ফায়ার ফাইটিং, গৃহযুদ্ধ, আইজিপি অপহরণ ইত্যাদি – ধরণের শব্দ ব্যবহার করে ভারতে এই ফেক নিউজ ছেয়ে ফেলা  হয়েছে। এটা মারাত্মক এবং সীমা ছাড়ানো ঘটনা নজিরবিহীন। সবচেয়ে মারাত্মক হল এই ফেক এমনই যে করাচীতে “গুলশান-ই-বাগ” বলে কোন পারা বা এলাকাই নাই। এটা এমনই অর্গানাইজড মিথ্যা। ঘটনা অনুসন্ধানে এটা ভারতের গোয়েন্দা, মিডিয়া ও সরকারের যোগসাজশে ঘটানো ঘটনা বলে অনুমান করার কারণ আছে যা নওয়াজ শরীফসহ বিরোধীদলীয় জোটের সাথে ভারতের আঁতাতের ইঙ্গিত বহন করে। বিবিসির চোখে এটা সংগঠিত ও “সমন্বিতভাবে” মিথ্যা বলার ঘটনা। কিন্তু কেন?

    পাকিস্তানে কথিত সেনা-পুলিশ সঙ্ঘাতের ফেক নিউজ করে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়া ভারত ছেয়ে ফেলেছে; অনেক সেলিব্রেটি যাদের অ্যাকাউন্ট ভেরিফাইড চিহ্ন লাগানো তারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব ফেক নিউজ কপি করে ছেয়ে ফেলেছেন। এ অবস্থায় ওই ফেক নিউজ প্রসঙ্গে এর বিরুদ্ধে ‘বিবিসি বাংলা’ ও তুরস্কের ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’ এজেন্সি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আলাদা রিপোর্ট ছেপেছে।

    টিআরটির রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘ভারতীয় মিডিয়া নির্দয়ভাবে গণউন্মাদনা জাগিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কাল্পনিক গৃহযুদ্ধের খবর প্রচার করছে’ [Mass hysteria as Indian media relentlessly covers imaginary war in Pakistan]। আর বিবিসি বাংলার শিরোনামটা হল – “করাচিতে গৃহযুদ্ধের ভুয়া খবর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে মাতামাতি।
    তবে পরবর্তিতে ভারতের এই ফেক নিউজ করা নিয়ে পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন ঠাট্টা তামাশা বা টিটকারি করা হচ্ছে বলে পাকিস্তানেই পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে তেমনি বিবিসিও কোথায় কিভাবে কারা এই নানান ফেক নিউজ তৈরি করেছে
    , আর কিভাবে কারা কারা তা প্রচার করেছে এরই এক লম্বা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে। এটি মূলত বিবিসিরই নিজের যেটা ফেক নিউজ ধরা বা চেক করার বিভাগ আছে, ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক’ ও ‘বিবিসি মনিটরিং’ নামে, এদেরই মুখ্য তৎপরতা ও সহায়তায় তৈরি করা এক রিপোর্ট। যেমন বিবিসি ঠাট্টা টিটকারি প্রসঙ্গে বলেছে, ‘সিভিলওয়ারকরাচি’, ‘ফেইক নিউজ’ এবং ‘ইন্ডিয়ানমিডিয়া‘ হ্যাশট্যাগে তারা অনেক রঙ্গ রসিকতামূলক পোস্ট এবং মিম শেয়ার করেছে টুইটারে’।

    করাচীতে “গুলশান-ই-বাগ” নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নাই; অথচঃ
    করাচিতে যে নামে কোন পাড়াও নাই, সেখানে “সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে” বলে টুইট করা হয়েছে।  বিবিসি লিখেছে, “প্রথম এই টুইট কে করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। বিবিসি অনেক খোঁজখবর নিয়েও @drapr007 নামের এই টুইটার অ্যাকাউন্টটি কে চালায় সে সম্পর্কে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। (তবে) এই টুইটের এক ঘন্টা পর একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি টুইট করা হয়। এবারের টুইটে ব্রেকিং নিউজ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে। যারা করাচী শহর চেনেন, তারা জানেন যে সেখানে গুলশান-ই-বাগ নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নেই। কিন্তু বেশিরভাগ পাঠক তো আর সেটি জানেননা”।

    “…টুইটে ব্রেকিং নিউজ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে। যারা করাচী শহর চেনেন,তারা জানেন যে সেখানে গুলশান-ই-বাগ নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নেই”।

    অথচ এই ফেক তৎপরতায় ভারতীয় মিডিয়ায় এমন ব্যক্তিত্বও আছেন যাদের অবস্থান এমন কোন হালকা কিছু নয়, বরং সিরিয়াস ও রাষ্ট্রীয় পদকজয়ী সম্পাদকও আছেন। অথচ এদেরও ফেক নিউজের প্রতি আগ্রহ এখন খুবই তীব্র মনে হচ্ছে, যার কারণ সম্ভবত তারা চীনা সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখে নিজেদের মানে ভারতের ভবিষ্যত নিয়েই হতাশ ও যেন অনিরাপদ বোধ করছে! তাই তারা কোন ধরণের চেক না করে নেয়া ফেক নিউজ প্রচারে অংশ নিয়েছেন, আর নিজেদের পত্রিকার এমন শিরোনাম করেছেন ও ধরা খেয়েছেন। যেমন- বিবিসির এমন তালিকায় আছে “সিএনএন-নিউজএইটিন (CNN-NEWS18), জি নিউজ (ZEE NEWS) ও ইন্ডিয়া টুডে (IndiaTODAY) পর্যন্ত’ – এমন মিডিয়া। অর্থাৎ এরা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা করা কোন পেড মিডিয়া বা পারসন নয়, এর বাইরের। এর আগেও ভারতের এই ফেকপ্রীতির দশা দেখে আগে যেটা মনে হত এটা বোধহয় কেবল বিজেপি-আরএসএস এর সমস্যা। (দেখুন বিবিসির রিপোর্টে ভারতের ফেক নিউজ ফ্যাক্টরির ততপরতা নিয়ে )। কিন্তু এখন এটা প্রমাণ করে যে ভারত রাষ্ট্র ও সমাজে কতটা নিচে নেমেছে। আর এই ফেক নিউজ ছড়ানো আসলে ভারতীয় গোয়েন্দা, মিডিয়া ও সরকারের এক যোগসাজশ ততপরতা।
    যেমন – এরা অর্ণব গোস্বামী বা রিপাবলিক টিভিসহ হিন্দি বা মারাঠি ভাষায় প্রচারিত বিজেপি দলীয় মিডিয়া প্রপাগান্ডিস্ট যারা আছেন
    , এদের মত কেউ নয়। যেমন ইন্ডিয়া টুডের সম্পাদক রাজদ্বীপ সরদেশাই; তিনি এটা ছাড়াও আরো অনেক মিডিয়া গ্রুপের সাথে জড়িত সম্পাদক-সমতুল্য নানান পর্যায়ে। তিনি এত খারাপ রেপুটেড কোন লোক নন, বরং ভারতের বিচারে নতুন ধরনের মিডিয়াব্যক্তিত্ব (সে সময় নতুন উদ্যোগ এনডিটিভির সাথেই শুরু থেকেই রাজদ্বীপের উত্থান হয়েছিল ) হিসেবে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত। অথচ তার নিজের পত্রিকার হেডলাইনেও একই রকম ফেক নিউজ। শিরোনামে লিখেছেন, “করাচিতে সিন্ধু-পুলিশ প্রধানকে অপহরণ করা হয়েছে” – এধরণের ফেক রিপোর্ট। বিবিসি সেটারও এক স্ন্যাপ শট তুলে এনে ছাপিয়েছে  প্রকাশিত ঐ রিপোর্টে।তবু আমাদের আজকের লেখার প্রসঙ্গ ঠিক পাকিস্তান নয়; বরং কেন ভারত সরকার ও তার প্রভাবে তার মিডিয়া এমন প্রচারণা চালাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে? এটা কিসের ইঙ্গিত? আর মূলত কেন এই ইঙ্গিত আমাদের জন্যও ভয়ঙ্কর? আমাদের বেলাতেও এটা ঘটতে পারে কেন? এনিয়ে কথা বলব।

    বিরোধী জোট পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট)
    পাকিস্তানে এক বিরোধী জোট তৈরি হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে। এই জোটের আলাদা নামও দেয়া হয়েছে – পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম)। এর চেয়েও মজার দিকটা হল এই জোটের প্রধান বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে মওলানা ফজলুর রহমানকে। আর খুব দ্রুত চলতি মাসজুড়ে চলছে তাদের সিরিজ জনসভা। তাদের এবারকার জনসভার স্টেজে দেখা যাচ্ছে বয়স্ক মওলানা ফজলুর দুই পাশে জোটের প্রধান দুই দলের দুই তরুণ প্রতিনিধি – মরিয়ম নওয়াজ শরিফ আর বিলওয়াল ভুট্টো।  দুই জেনারেশনের মিলন বা জংশন-মূলক এই চিত্রটা ইতিবাচক মনে করা যেত কিন্তু সমস্যা হল, এসব নিউ জেনারেশনের নেতাদের পিতারা দুর্নীতির দায়ে বিচারে অভিযুক্ত বলে সর্বোচ্চ আদালতের রা কাঁধে নিয়ে এখন জেলের বাসিন্দা; সে কারণেই তারা এখানে। আর এই দুর্নীতির অভিযোগ দু-এক কোটি রুপির নয়, মিলিয়ন ডলার তো বটেই, বিলিয়নেও মাপতে হতে পারে। অনুমান করা হয় তা দুই বিলিয়নের বেশি ডলারের। নওয়াজ শরিফ আরো ‘শ্রেষ্ঠ’। তিনি নাম তুলেছেন মানে তা প্রকাশিত হয়েছে ‘পানামা পেপারস’ নামে পরিচিত এক অর্থপাচার কেলেঙ্কারির ডকুমেন্টে। যেটা ‘অফশোর অ্যাকাউন্টে’ যারা টাকা পাচার করে রেখে দিয়েছেন দুনিয়ার এমন প্রায় দুই লাখ লোকের ডকুমেন্টের তালিকা যা এক ভুলের কারণে ফাঁস হয়ে যায়। আগ্রহীরা লন্ডন গার্ডিয়ানের এর রিপোর্টটা দেখতে পারেন – What are the Panama Papers? A guide to history’s biggest data leak.।  আর এই পানামা পেপারস এর কেলেঙ্কারিতেই পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী কোর্ট তাকে দশ বছরে সাজা  ও সাথে ফাইন হিসাবে আরও $10.6 million শোধ করতে নির্দেশ দিয়েছে। এর সাথে “রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ” করে রায় দেয়।

    “The Panama Papers (Spanish: Papeles de Panamá) are 11.5 million leaked documents that detail financial and attorney–client information for more than 214,488 offshore entities. … The documents contain personal financial information about wealthy individuals and public officials that had previously been kept private.”

    মওলানা ফজলুর নেতৃত্বে পিডিএম, এটা নওয়াজ ও ভুট্টোর দলসহ ছোট-বড় ১১ দলের জোট, যা জন্ম নিয়েছে গত সেপ্টেম্বর ২০২০ মাসে আর এ’মাসের ৩ অক্টোবর  মওলানা ফজলুকে এর প্রধান বানিয়েছে। এর প্রথম সমাবেশ ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালায় আর দ্বিতীয়টা ছিল করাচিতে ১৮ অক্টোবর। এখান থেকেই ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার ঘটনা সামনে আসতে থাকে।

    তবে এর আগেও, মানে গত বছর নভেম্বরে একই রকম সমাবেশ করেছিলেন মওলানা ফজলু। নওয়াজ ও ভুট্টোর দল বাইরে দাঁড়িয়ে সেসময় তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে জানালেও কেউই তাতে অংশগ্রহণ করেনি। রাজধানীতে তখন সেখানে মওলানা ফজলু জমায়েত নিয়ে ১৩ দিনের অবস্থান করে  বসেছিলেন। কিন্তু কোনো দাবি কিছু আদায় করা ছাড়াই তা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল সে সময়ে। ইমরান খান ২০১৮ সালের আগস্টের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। আর তাতে খাইবার-পাখতুন প্রদেশের এক কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে ফজলু হেরে যান, ইমরানেরই দলের প্রার্থীর কাছে।
    বলা হয়ে থাকে সেই জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ১৯৭৮-৮৮) তাঁর উত্থানের সময় তাঁর সাথে মওলানা ফজলুর প্রভাবশালী উত্থান ঘটেছিল
    ; বিশেষত বিতর্কিত ব্লাসফেমি আইন ও দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইন ইত্যাদি প্রসঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব খুবই মুখ্য ছিল বলে। সেই থেকে তিনি ‘প্রভাবশালী ইসলামী নেতা’ হিসেবে রাজনীতি করে এসেছেন। ভোটে দাঁড়িয়েছেন পাখতুন প্রদেশ থেকে। সেই জিয়াউল হকের আমল মানে সেটা মূলত গ্লোবাল ইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ টার্নিং পয়েন্ট “সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান দখল” এরই কালপর্ব পাকিস্তানের সমকালীন শাসন পর্বকাল; যাকে আমেরিকা পেলেপুষে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বড় করেছিল, সোভিয়েত মোকাবিলা করতে। সেই জিয়াউল হক, মওলানা ফজলুর মাধ্যমে অসংখ্য মাদরাসা খুলে তারই মাধ্যমেই পরিচালনা করেছেন।  তাই মাদ্রাসা ফান্ড মওলানা ফজলুর রহমানের প্রভাব ও উত্থানের পিছনে এক বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে থেকেছিল মনে করা হয়। এছাড়াও আরও বাড়তি দিকটা হল, তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে সৌদি রাজ-প্রভাব রাখা বা ফেলার এক বড় উপায় হয়ে ওঠেন। অথচ সেই তিনিই ২০১৮ নির্বাচনে নিজ রেগুলার কনস্টিটুয়েন্সি থেকেই পরাজিত হয়ে যান। এই ফলাফল দেখে তিনি অপমানিত। তাই তিনি মেনে নিতে পারেননি। সে কারণে এক বছর না যেতেই তিনি ইমরানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন, এমনটা মনে করা হয়। তবুও মওলানা ফজলুর ২০১৯ এর ঐ একক আন্দোলন আর এবার ২০২০ সালের  নওয়াজ মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টিকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ফারাক আছে।

    এবারে বিরোধীদের আন্দোলনের মূল দাবি কী?
    কম কথায় বললে, তাদের মূল দাবি ২০১৮ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে অথবা তাদের অভিযোগ আর্মি সেখানে নির্বাচনের পরিবর্তে ‘সিলেকশন’ করেছে; তাই এটা বাতিল করতে হবে।
    ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট [Brookings Institution]
    , বহু পুরানা (১৯১৬) এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ও গবেষণা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরই এক গবেষক ফেলো হলেন ড. মাদিহা আফজাল [Madiha Afzal]। মাদিহা পাকিস্তানি অরিজিনের; লাহোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ল-এর গ্র্যাজুয়েট। পরে আমেরিকান ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি; আর পরে আমেরিকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন অধ্যাপনার পর তিনি এখন ব্রুকিংসের ফেলো। তিনি নিয়মিত পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় বা ব্রুকিংসের নিজ সাইটেই লিখে থাকেন। সেখানের এক আর্টিকেলে তার বক্তব্য হল, ‘এখনকার আর্মির অনেকেই নওয়াজকে অপছন্দ করে সত্য কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝির নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের ক্ষমতাসীন হওয়াতেও এই আর্মিই তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল বলে অভিযোগ আছে।’ এ ছাড়া একালে নওয়াজের মধ্যে প্রায় খোলাখুলিই প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ওঠার ঝোঁক প্রবল হয়ে উঠেছে – আমরা দেখছি।

    খুবই কম কথায় বললে  ঘটনাটা হল, ১৯৯১ এর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা দুনিয়ার একক নেতা হয়ে যায়। এতে আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলো তাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চেপে ধরে যে, দুনিয়ার একলাই নেতা এখন আমেরিকা বলে এবার তৃতীয় বিশ্বে আমেরিকাকে সামরিক শাসন জারি বা সমর্থন করা আর চলবে না, তখন থেকে বন্ধ করে দিতে হবে। ক্লিনটন (প্রেসিডেন্ট ১৯৯৩-২০০১) সে সময়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন। আর এখান থেকেই নতুন চক্রে পড়ে নওয়াজ মূলত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে ব্যবসায়ী হিসেবে বেশি সক্রিয় হওয়াতে ভারতের ফাঁদে আটকা পড়েন। ক্লিনটন যেখানে স্বীকার করে নিয়েই শুরু করছেন যে, আমেরিকার ইচ্ছা ও কারণে এত দিন ‘সামরিক শাসন’ এশিয়া চলেছে সেখানে ভারত, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীই পাকিস্তানের সামরিক শাসনের মূল কারণ ও সমস্যা বলে এক ধারণা প্রচার করতে থাকে। এতে ক্লিনটন ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে গেলেও নওয়াজ শরিফ ভারতের এউ লাইনে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর ওপর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এসেছে বলে প্রচার করতে থাকেন। একই সময় ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধ সীমিত হয়ে শেষ হয়েছিল। কিন্তু এবার নওয়াজ এই যুদ্ধের জন্য ভারতের সহযোগী অবস্থান নিয়ে প্রচার ও প্ররোচনা করতে থাকেন যে, ততকালীন আর্মি চীফ জেনারেল মোশাররফের কারণে কারগিল যুদ্ধ ঘটেছে বলে সব দায় আর্মির উপর চাপায় দেন। আর এই দাবি করে তাকে সরাতে এক পরিকল্পনা করেন নওয়াজ। শ্রীলঙ্কা থেকে জেনারেল মোশাররফ দেশে ফিরিতে রওনা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে বহনকারী সেই বাণিজ্যিক প্যাসেঞ্জার বিমান পাকিস্তানের কোথাও নামতে দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই ফাঁকে নওয়াজ আর্মি চিফ পরিবর্তন করে দেন। এই ঘটনাটা জেনারেল মোশাররফের নিজের দেয়া বর্ণনায় তারই  “লাইন অফ ফায়ার” বইতে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়।  কিন্তু মোশাররফকে আকাশে ঝুলিয়ে রেখে চিফ পরিবর্তন এই ব্যাপারটার প্রতিক্রিয়া আর্মির ভিতরে ভাল হয় নাই। বিশেষত কারগিল যুদ্ধের জন্য পুরা সেনাদের দায়ী করা আবার আকাশে একটা প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটকে এক-দেড়শ নিরীহ নাগরিককে মৃত্যুর মুখে নিরাপত্তাহীন করে ফেলে রাখা যেটা ফৌজদারি খুনের অপরাধ এর দায়  সেনারা শেয়ার নিতে চায় নাই । তাই এতে উলটা আর্মির মধ্যে নওয়াজবিরোধী ক্ষোভ জেগে উঠাতে আধা ঘণ্টার মধ্যে পালটা ক্ষমতা দখল ও বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রো-মোশাররফ মেজরিটির সেনা গ্রুপ। তারা ঐ প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটের তেল ফুরানোর প্রায় পাঁচ মিনিট আগেই নিরাপদে মোশাররফের ঐ ফ্লাইটকে আবার পাকিস্তানের রাজধানীতেই অবতরণে সক্ষম হয়। মোশাররফ ক্ষমতাসীন হন আর নওয়াজ বন্দী হন। এটাই ১৯৯৯ সালের প্রথম অমেরিকার অনিচ্ছায় পাকিস্তানের সামরিক ক্ষমতা দখল। তাই প্রতিক্রিয়ায়  আমেরিকা মোশাররফের সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। এভাবেই চলতে থাকে। পরে ২০০১ সালের ‘নাইন-ইলেভেন’ হামলার পর সেদিনই নিরুপায় আমেরিকার পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বিবিসি-সিএনএনকে জানায় যে আমেরিকা সেদিন প্রথমেই পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে জানায়। কিন্তু ভারতের পক্ষে সেনাদের বিরুদ্ধে যাবার ঐ ঘটনায় নওয়াজের আসলে স্বার্থ ছিল, ভারতীয়দের সাথে ব্যবসা করা। নওয়াজ  নিজে তিনি তার মূল ইত্তেফাক গ্রুপের মালিক ও ব্যবসায়ী। তিনি ও তাঁর মত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছিল ভারতের সাথে আরও নতুন ব্যবসায় যুক্ত হতে। সেকাজে তারা চেয়েছিলেন – ভারতীয় পণ্য পাকিস্তানে এনে বিক্রি করে কমিশন খাওয়া্র ব্যবসা করবে। যেমন একটা দিক উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশের মত পাকিস্তানেও একই আইনে একই সময় থেকে, ভারতীয় সিনেমা অবিভক্ত পাকিস্তানেই আমদানি নিষিদ্ধ ছিল। নওয়াজ এটা প্রথম খুলে দিয়েছিলেন। আর ভারতীয় সিনেমা প্রডিউসার-মালিকরা নগদ খদ্দের পেয়েছিলেন। আসলে এমন ব্যবসাপাতির বিরুদ্ধে আর্মিই নওয়াজের ক্ষমতার জন্য প্রধান বাধা বলে অনুভব করাতেই পুরো ব্যাপারটা আর রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকেনি। নওয়াজ গংয়ের পেটি ব্যবসায়িক স্বার্থ মুখ্য হয়ে হাজির হওয়াতেই ভারতের তাঁবেদারিটাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল; অথচ এই স্বার্থটাই যা পাকিস্তানে সে সময় রাজনীতিবিদ (ব্যবসায়ী) বনাম আর্মি এই ভুয়া নামে হাজির হয়েছিল। তবু পাকিস্তান আর্মি আমেরিকার ইচ্ছা মেনে সেই থেকে আর কখনো ক্ষমতা দখল করতে যায়নি। তবে তা আর না করেও রাজনীতিতে যতটুকু প্রভাব রাখা যায় সে চেষ্টা করে অবশ্যই। বলাবাহুল্য, নওয়াজদের মত রাজনীতিবিদ থাকলে পাকিস্তানে এ সমস্যার কোনো দিন কোনো সমাধান নাই।

    তবে পরিস্থিতিকে ভারতের আধিপত্যে নেয়ার জন্য উপযুক্ত করে সেদিকে ঠেলে দেয়ার জন্য আমেরিকানদের লোভের স্বার্থ মূলত দায়ী। কারণ মূলত আমেরিকার আগ্রহ ভারতের বাণিজ্য, বাজার, অস্ত্র বিক্রি ইত্যাদির ওপর। যেটা ভারত পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলার পর (১৯৭৪) থেকে ভারত-আমেরিকা প্রায় বাণিজ্য সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছিল। তাই ১৯৯৯ সালে ভারত নিজ বাজার বাণিজ্য সুবিধা আমেরিকাকে দেয়ার এক পূর্বশর্ত হিসেবে উল্টো পাকিস্তানের বাজার ভারতকে পাইয়ে দিতে যেন আমেরিকা সাহায্য করে এই শর্ত দিয়েছিল। আর এই ভারত-আমেরিকান স্বার্থের মধ্যে পড়ে পাকিস্তানের নিজভাগ্য হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ ভারতের প্ররোচনায় ব্যবসায়ী নওয়াজেরা পাকিস্তান আর্মিকেই নিজ স্বার্থ হাসিলের পথের বাধা হিসাবে উপলব্দি করতে থাকে। আজ সেসব পুরনো পাকিস্তানবিরোধী পরিকল্পনা আবার সামনে আসছে, একটু একটু করে। তার আগে মাদিহার বাকি কথা শেষ করে নেই।

    মাদিহা এবার তার কথা শেষ করতে সরাসরি ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে চলে যান। তার ঐ আর্টিকেলের শিরোনাম হল, পাকিস্তানের ইমরান খান কী নোংরা নির্বাচনে বা না প্রকৃত ম্যান্ডেটে জিতেছেন [Did Pakistan’s Imran Khan win a “dirty” election or a real mandate?] ২০১৮ জুলাই ২৭ তারিখে সেটা ছাপা হয়েছিল, যেখানে ঐ নির্বাচন হয়েছিল ২৫ জুলাই।  মাদিহা ঐ লেখায় বলেন, এখানে ‘অস্বীকার করা কঠিন’ এমন দুটো ফ্যাক্টস আছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর বা অযোগ্যতাটা ছিল মারাত্মক। সারা দিন ভোট প্রদানের সময় কোথাও কোনো বড় অভিযোগ ছিল না, উঠেনি। কিন্তু ভোট গণনার শুরুতে তাতে আরো দেরি হওয়ায় মানুষের সন্দেহ বাড়তে থাকে। অথচ এর কারণ হল কমিশনের সফটওয়ার ফেল করেছিল। এবং এই ফেল করা কমিশনের অযোগ্যতা অবশ্যই। মাদিহার দ্বিতীয় পয়েন্টটা অনেক শক্ত। তিনি বলছেন, বিদেশী পর্যবেক্ষক হিসেবে সেখানে ছিল ইইউর অবজারভা্রের, এক বড় টিম। কিন্তু তাদের রিপোর্ট হল, নির্বাচন মোটা দাগে ‘ইতিবাচক’ হয়েছে।

    এ ছাড়া কিছু প্রসঙ্গ যা মাদিহা আনেননি তা হল, আসলে যেখানে আর্মির প্রভাব কার্যকর ছিল, সেখানে নওয়াজের দলের পুরনো এমপিকে দুর্নীতির দায়ে আদালতের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল। এই কাজে পরোক্ষে আর্মির হাত ছিল মনে করা হয়। এ কথা অবজারভাররাও বলেছিল। তবে তারা এটা সরাসরি নির্বাচনের দিনের ঘটনা নয় পুর্ব প্রভাব বলে কম গুরুত্ব দিয়েছিল তারা। এর মূল কারণ, ঐ  জেনারেল জিয়ার আমলের ইসলামী দুর্নীতির আইন। বিচারকদের এটা প্রয়োগ ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আদালতকে যথেচ্ছ অধিকার দেয়া আছে এতে। সেকারণে এক রায়ের শেষে বিচারকের এমন মন্তব্য আছে যে, তিনি মন্তব্যে বলেছেন, আমাদের এমন ক্ষমতা দিলে তো এটা অপব্যবহার হবেই। আর সেটা ব্যবহার করাতেই নওয়াজের দলের বহু প্রার্থী অযোগ্য হয়ে যায়। তবে মূলত কমিশন তাদের সফটওয়ার ফেল করার কারণে ফলাফল দিতে দেরি হয়েছে। আর এ থেকেই প্রচারণার শুরু।

     এবার এপ্রসঙ্গে শেষের মূল যে কথাটা তা হল, বিরোধী দলের এখনকার এই আন্দোলন শুরু হলে পরে কেন ইমরান সরাসরি আলজাজিরাকে বলছেন যে, এই আন্দোলনে নওয়াজ শরিফ “ভারতের খেলা খেলতে নেমেছেন”! [Pakistan’s Khan accuses rival Sharif of “playing India’s game”] প্রথমত এটা কথার কথা কোন অভিযোগ নয় বা কমন রাজনৈতিক দল একে অপরকে যেভাবে ও অর্থে যেমন বলে থাকে সেই সাধারণ অর্থ বলা কোনো কথা নয়। এর সুদূরপ্রসারী অর্থ আছে। কী সেটা?

    দুনিয়ার এই সময়টা এখন পালাবদলের। এটা গ্লোবাল নেতা বা নেতৃত্বের পালাবদল – আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্ব নেয়ার পালাবদল। আমেরিকা জানে, এই পরিবর্তন অনিবার্য। তা জেনেও যত তাতে দেরি করিয়ে দেয়া যায় এই লক্ষ্যে আমেরিকা খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। আর তা থেকেই এখন চারদিকে যাবতীয় নতুন সমস্যা।

    আর এ কাজে আমেরিকার চেয়েও অনুসারী সাগরেদ ভারত আরো কূটাশ্রয়ী হতে চাইছে। তাই ভারত চাইছে, একটা গ্লোবাল পোলারাইজেশনের মধ্যে পাকিস্তানকে ফেলে দিতে। মওলানা ফজলু মানে সৌদি লবি বা প্রভাব। ভারত এটার উপরে আমেরিকা, মাঝে সৌদি আর নিচে ভারত এভাবে চায়না বিরোধী এক পোলারাইজেশন টানতে চাইছে। যেন পাকিস্তানে আমেরিকা-চায়না পোলারাইজেশনটা পাকিস্তানের দলভিত্তিক হয়ে যাক। যেমন ইমরান এক দিকে আর তিনটি দল অন্য দিকে;  ভারত-চীন পোলারাইজেশনের দুই ভাগ এমন হোক। এতে ভারত যেন নওয়াজকে নিজের নৌকায় সামিল করে নিতে পারে। আর নওয়াজকে পুরনো ১৯৯৯ সালের কথা ও অ্যালায়েন্সের কথা, ব্যবসায়িক সুবিধার কথা মনে করিয়ে ভারত সেই সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আর নওয়াজের অবস্থা হল – যিনি দুর্নীতির দায়ে বাকি জীবন জেলে থাকার জন্য শাস্তির রায়প্রাপ্ত; কারণ তাঁর তো দুর্নীতিতে সাজার রায় হয়ে গেছে তাই, তার কাছে পুরা পাকিস্তান ভারতের অধীনে চলে গেলেইবা কী? যদি তাতে নওয়াজ খালাস পেয়ে যাওয়ার উপায় পাওয়া যায়? এ কারণেই ভারতের গৃহযুদ্ধের প্রপাগান্ডা নওয়াজের সাথে ভারতের আঁতাত কত গভীরে চলে গেছে এরই প্রকাশ। ভারত প্রকাশ্যে পাকিস্তান নিয়ে, পাকিস্তানের একটা দলের পক্ষ নিয়ে ফেক নিউজ প্রপাগান্ডা শুরু করেছে – এই ফেনোমেনা এটা গত পচাত্তর বছরের ইতিহাসে কেউ দেখেনি!

    কিন্তু মূল কথা- একটা দেশের জন্য এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের হবে যদি ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা এরা এভাবে চীন বা আমেরিকান এই ভিত্তিতে দেশের দলগুলো একেকটার এজেন্ট হয়ে ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্তানের ভাগ্যে সেই বিপদ ঘটতে যাচ্ছে।

    আর এটাই আমাদের জন্যও কী কোনো ইঙ্গিত যে, আমাদের ভাগ্যেও না এমন পরিণতি কোনো ফাঁক-ফুটা দিয়ে এসে যায়!

    সর্বশেষ, ভারতের এক খুবই সিনিয়র সম্পাদক হলেন শেখর গুপ্তা। যিনি ভারতের প্রধান সব পত্রিকার সম্পাদক হওয়া শেষে এখন বয়স্ক হয়ে এখন নিজের দ্যাপ্রিন্ট নামে মিডিয়ার সম্পাদকমন্ডলীর প্রধান। তিনি প্রায়ই ভিডিও ক্লিপ রিপোর্ট করেন। তিনি স্বীকার করেছেন, করাচী নিয়ে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্টিং ভিত্তিহীন মিথ্যা। বিশেষত গৃহযুদ্ধ বা পাকিস্তানি সেনাদের আইজিপির অপহরণ এর খবর প্রসঙ্গে বলছেন ইনি নিজের সোর্সের মাধ্যমে খবর নিয়েছেন ও জেনেছেন এগুলা ফেক। যদিও তিনি কারা তাহলে ফেক একাউন্ট থেকে ফেক এমন টুইট তথ্য ও রিপোর্ট  ছড়ালো, ফেক গৃহযুদ্ধের ছবি  ছড়ালো – এসব নিয়ে কোন টুশব্দ তিনি  করেন নাই। কিন্তু এরপরের রাজদ্বীপ তার ইন্ডিয়া টুডে প্রিন্ট পত্রিকা থেকে অপহরণের শিরোনাম দেয়া ফেক রিপোর্ট এখন সরায় নেন নাই বা দুঃখ প্রকাশ করেন নাই। ইতোমধ্যে ইমরান খান এই ইন্টারভিউয়ে প্রতিজ্ঞা করে জানান, তিনি নওয়াজ শরীফকে যিনি সুপ্রীমকোর্টের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত তাকে বৃটেন থেকে ফেরত আনবেনই। এছাড়াও বলেন যে তিনি ক্ষমতায় থাকেন আর না, এই দুর্নীতিবাজেরা যেন ক্ষমতায় না ফিরতে পারেন এটা নিশ্চিত করবেন। [He said whether he remained in power or not, he would make sure that leaders of the protesting opposition parties never came back to power.]।

    ।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত  ২৪  অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের ফেক নিউজ, করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    গৌতম দাস

    ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Qz

    _

    চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

    বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

    কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

    আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

    এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

    বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

    এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
    তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

    দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

    না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

    নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

    নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

    এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

    কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

    নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

    ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

    শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

    মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

    তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

    আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

    গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

    আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

    তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

    স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

    তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

    পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতি

    গৌতম দাস

    ১১ নভেম্বর ২০১৯, ০১:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2MQ

     

    পাকিস্তানের রাজনীতিতে যেন ‘বিনা মেঘে বৃষ্টি’ আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে সম্ভবত সেখানে এসে যাচ্ছে একেবারে ঘূর্ণিঝড়, যাতে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। ফলে অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। যেমন অসময়ে কিলিয়েও কাঁঠাল পাকানো যায় না, এমনকি ফল পাকানোর ওষুধ দিয়েও না, সেই অবস্থা এটা। আসলে সব কাজে টাইমিং বা সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর!
    সীমাহীন অব্যবস্থাপনা আর গরীবদেশের নিত্যসঙ্গী দুর্নীতিতে ডুবে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থাকে টেনে তুলতে আশার আলো দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিলেন। ওদিকে এরই মধ্যে কাশ্মীরে নরেন্দ্র মোদীর ভারত “দখলদার বাহিনী” হিসেবে হাজির হওয়ায় এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে কাশ্মীরিদের পক্ষে লড়ার জন্য দৃশ্যত এই প্রথম পাকিস্তান এমন এক নেতা পেয়েছে যিনি সৎ হিসেবে পরিচিত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলি যার চেনাজানা এবং নয়া দৃষ্টিতে ও নয়া উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানকে সাজাতে যার আগ্রহ এক নেতা হয়ে হাজির ইমরান খান। এবারের ইমরানের জাতিসংঘ-বক্তৃতার প্রশংসা করেনি বা এটা তাঁকে স্পর্শ করেনি, এমন সংবেদনশীল মানুষ কমই পাওয়া যাবে। আমরা ‘মুখের উপর কঠিন সত্য ছুড়ে দেয়া’ বলি যেটাকে, ঐ বক্তৃতা তেমন। তাই প্রতিপক্ষ ভারত এই বক্তৃতার বিরোধিতায় না গিয়ে পাশ কাটিয়ে ‘মোকাবেলা’ করার পথ ধরেছিল।
    এক দিকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া আর কোনো নেতা ইমরানের পর্যায়ে পপুলার নন বলে তাঁর ভক্তদের দাবি। অথচ আমেরিকার স্বার্থে ওয়ার অন টেররে ব্যবহৃত হতে হতে পাকিস্তান বলতে গেলে, নিজস্বার্থের পাকিস্তান-রাষ্ট্র হওয়ার কথা যেন সে ভুলেই গিয়েছে। এই দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় পুরানা রাজনীতিবিদেরা ভেবেছিল এই সুযোগে লুটপাট ছাড়া তাঁরা আর কী করার থাকতে পারে! আমেরিকার ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে তারা ভেবেছেন, দায়িত্ব পালন করা হয়ে গেছে। এ ছাড়া তাদের যেন কোনো কাজ-ভূমিকা নেই। আর তাতে স্বভাবতই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে ছারখার। এই চরম হতাশার মাঝে গত বছরের নির্বাচনে ‘আশা-ভরসার একক নেতা’ ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরানের উত্থান ঘটতে দেখেছিল পাকিস্তান। বলাই বাহুল্য, এই পাবলিক তারা কেউই আশা করে না যে, ইমরানের হাতে কোনো চেরাগ আছে যেটা ঘষা দিলে অথবা ভেঙে পড়া অর্থনীতির উপর ইমরান স্রেফ হাত বুলিয়ে দিয়েই সব কিছু আবার ঠিক করে ফেলবেন তিনি।
    তারা এতটুকু অন্তত বুঝতে পারা ‘পাবলিক’। তাই আশা ছিল একজন ন্যূনতম সৎ লোক, যার বিদেশে চুরির অর্থ রাখার অ্যাকাউন্ট নাই, যিনি সৎভাবে ও ঈমানের সাথে নতুন নতুন উদ্যোগে আন্তরিক চেষ্টা করবেন অর্থনীতিকে পতিত অবস্থা থেকে উঠিয়ে আনার জন্য। এমনই  ছোট আশার আলো দেখিয়েই উঠে এসেছিলেন ইমরান। পাকিস্তানের অর্থনীতি যত নিচে ডুবে ছিল এখনো তার রেশ কাটেনি। তাতে ইমরানের সরকার অনেক ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ফেললেও তার সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
    পাকিস্তান আসলে বিদেশী স্বার্থে ও তাদের দায় মাথায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে চলেছিল। আর এই সুযোগে দেশী শাসক-চোরদের হাতে লুটের শিকার হয়ে পাকিস্তান ফোকলা হয়ে গিয়েছিল। সরকার চালানোর মতো যে নগদ কিছু বৈদেশিক মুদ্রা লাগে, সে খরচের মাত্র তিন মাস ভার বইবার বা সরকার চালানোর মত সক্ষমতাও সে দেশের ছিল না- এমন অবস্থায় ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল।
    আর তাতেই ইমরান খান নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। অবশ্য এই অভিযোগও ছিল এবং এখনো আছে যে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতা পেতে অন্যায় প্রভাব খাটিয়েছে। আবার এর পাল্টা সাফাইও অনেকে দেয় যে, সেনাবাহিনী ঠিকই বুঝেছিল এই ফোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনীতি ও জনজীবনকে টেনে তুলতে হলে নতুন মুখ ও নতুন উদ্যোগ লাগবে- এই বিবেচনায় তারা ইমরানকে অপেক্ষাকৃত যোগ্য লোক হিসেবে দেখেছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ‘হাত ঢুকিয়ে থাকা’- এটা বহু পুরনো সত্য হলেও একমাত্র সত্য নয়। অন্তত আরো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হল – এক. কোল্ড ওয়ারের জমানায় (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা নিজ ব্লকের খুব কম রাষ্ট্রকেই সেনাসরকার বসানো ছাড়া চালাতে পেরেছিল।
    দুই. কাশ্মীর ইস্যুর কারণে জন্ম থেকেই ছোট অর্থনীতির দেশ হলেও দক্ষ সেনা আর ব্যাপক খরচের সংস্থান করতে হয়, এমন দেশ হতে হয়েছে পাকিস্তানকে। তাতে বাহিনীর পেছনে সরকারি সমর্থন যে মাত্রায় দরকার, সেই প্রয়োজন নিজেরাই সরকারে্র ক্ষমতায় থাকলে পাওয়া যাবে বলে সেনারা সঠিক অথবা ভুলভাবে মনে করত। তবে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা যাই হোক না, তাদের ক্ষমতায় ব্যাপক অপব্যবহারের বড় বড় নেতিবাচক ভূমিকাই অনেক বেশি।
    আর তিনঃ বাস্তবতা হল, ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লব আর এর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল- আর তা থেকে শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকানোর মার্কিন বিদেশনীতিতে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থপূরণের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান আমেরিকান স্বার্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল। আর এথেকে পাকিস্তান ততটা নিজের থাকতে পারে নাই, যদিও সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানো সেটা পাকিস্তানের নিজের স্বার্থও ছিল বটে। কিন্তু বড় কথা যেটা যে তালেবান আমলে এসে যতদিন গিয়েছে পাকিস্তান আর তখন নিজের জন্য পাকিস্তান থাকতে পারে নাই। বাধ্য করা হয়ঞ্ছিল তাকে [প্রেসিডেন্ট মোশাররফের লেখা “লাইন অন ফায়ার” বইটা এর বড় স্বাক্ষী। ], আমেরিকার স্বার্থ বাস্তবায়নের এক হাতিয়ার রাষ্ট্র হয়ে গেছিল পাকিস্তান। যেন আমেরিকান যুদ্ধের জাম্পিং প্যাড বা লঞ্চিং প্যাড [ launching pad]।

    তাই সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বড় বড় ব্যর্থতা আর চরম হতাশার মধ্যেও এখন ইমরানই এক আশার আলো, আশা-ভরসার প্রতীক। মনে হয়, ২০ বছর পরে পাকিস্তান এই প্রথম নিজের জন্য নিজে কিছু করার চেষ্টা করছে, পাকিস্তানের পাবলিক পারসেপশন এখন এটাই। পাকিস্তানের কলামিস্ট ইকরাম সেহগাল লিখছেন, “নতুন সরকার আগের সরকারগুলোর হাতে বিধ্বস্ত একটি অর্থনীতির উত্তরসূরি হয়েছিল। মাওলানার দুর্ভাগ্যময় মার্চ তখনই হচ্ছে, যখন এই অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার প্রথম লক্ষণ প্রকাশিত হচ্ছে”। কোন মাওলানার কথা বলছেন তিনি?

    এরই মধ্যে এখন এক বৈপরীত্য – একটা নাম চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে – “মাওলানা ফজলুর রহমান”। এই মাওলানার কথাই বলছিলেন সেহগাল।  দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাকে এখন “ডিজেল মওলানা” বলে কুৎসা করার চেষ্টা হয়েছে, দেখা গেছে। এটা তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের ভাল পথ বা সঠিক উপায় না। অতীতে পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতিকে কিছু কমন ইস্যুতে (জিয়াউল হকের আমল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে) একটা জোটে সবাইকে আনার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল, এ কথা অনেকে বলে থাকেন। কিন্তু তাতে আসলেই “ইসলামী রাজনীতি” বলে কিছু এগিয়েছিল কি না অথবা ইসলামী নাম দিয়ে বসলেই তা ভালো কিছু হওয়ার গ্যারান্টি কিনা – এসব প্রশ্ন, এমন বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে বহু কিছু এখনও বাকি থেকে যায় – এ বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়ন করা বা ফিরে দেখা দিন চলে যাচ্ছে!

    পাকিস্তানে এখন যেসব রাজনীতিবিদ দুর্নীতির দায়ে জেলে অথবা দুর্নীতি করার অভিযোগে “দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইনে” ব্যাপক সংখ্যায় যারা গত নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে, আদালতের রায়ে আনফিট বা অযোগ্য হয়ে গেছিলেন – এসব ক্ষেত্রে তারা নিজেদেরই তৈরি ‘ইসলামী আইনে’ তারা নিজেরাই ফেঁসে গেছিলেন। কারণ কিছু নুন্যতম পড়াশুনা করতে হয় আর বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি লাগে।  আধুনিক রাষ্ট্র ও এর আইনের বৈশিষ্ঠ সম্পর্কে নুন্যতম শিক্ষা ধারণা ও জানাশুনা না রেখে এক জেনারেল তাঁর নিজস্বার্থে কিছু সুবিধা পেয়েছে বলেই একটা ইসলামি রাজনীতি বলে কোন কিছুকে চালু করা যায় না। সেটা ইসলামিওও হয়ে যাবার গারান্টি নাই। সবকিছুর সামনে “ইসলাম” শব্দ বসায় দিয়েই পার পাওয়া যায় না।   আইন প্রণয়নের সময় ইসলামের নামে অর্থহীন অস্পষ্ট শব্দ রেখে দিলে তাতে ভবিষ্যতে  নিজেই তাতে বলি-শিকার হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাদেরই বিরুদ্ধে ঐ আইন ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব আইন তৈরি করার ক্ষেত্রে ফজলুর রহমানসহ পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাজনীতির নেতারা ভূমিকা রেখেছিলেন। জেলারেল মোশাররফের শাসন সমাপ্তিতে নওয়াজ শরিফ বা ভুট্টোর দল পরবর্তীতে এসব আইন সংশোধনের (সংসদীয় একটা কনস্টিটিউশনাল রিভিউ কমিশন গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে ১৮তম সংশোধনী আনতে) সুযোগ পেয়েও তাঁরা নেয়নি; বরং নওয়াজের দল বাধা দিয়েছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে এর প্রথম শিকার হয়েছিলেন নওয়াজ শরীফ নিজেই। তিনি এই ইসলামি আইনেই ডিস-কোয়ালিফাইয়েড মাই অযোগ্য বিবেচিত ও পদচ্যুত।

    আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন এখানে ২০১৭ সালের এক রিপোর্ট, জিয়াউল হকের আমলের পাকিস্তান কনষ্টিটিউশনের সম্পর্কিত ৬২ ও ৬৩ ধারা, যা দাবি করে – জনপ্রতিনিধিকে ‘সাদিক’ বা সত্যবাদী ও ‘আমিন’ বা বিশ্বস্ত হতে হবে। [Under Article 62(1)(f) of the Constitution, a person cannot be qualified as member of the national or provincial legislatures, if he is not ‘Sadiq and Ameen’ – truthful and trustworthy.] অন্যথায় হাইকোর্টের বিচারক তাকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন। নওয়াজ এই আইনেই অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানের এক বিচারপতি, বিচারপতি খোসা; তার মন্তব্য থেকে অনেক কিছু পরিস্কার জানা যায়ঃ
    [Two years ago, Justice Khosa in Ishaq Khan Khakwani case had described the words ‘Sadiq’ and ‘Ameen’ as obscure and impracticable and had also talked about ‘nightmares of interpretation and application that they involved’.
    Justice Khosa had said that some provisions of Article 62 of the Constitution certainly contained strong moral overtones but those provisions introduced into the Constitution by General Ziaul Haq had not been undone by the popularly elected parliaments in the last many decades.]

    আর পরে গত নির্বাচনে পরোক্ষে সেনাবাহিনী এই আইন ব্যবহার করেই মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টির বহু (কমপক্ষে ৭০ জন) সম্ভাবনাময় প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেয়নি, অর্থাৎ দৃশ্যত অযোগ্য করে দিয়েছিল। কাজেই কোনটা “ইসলামি আইন” আর সেটা কার জন্য তৈরি করা হয়েছিল অথবা কার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল এর এক ব্যাপক ও প্রকৃত মূল্যায়ন কি তারা মাওলানা ও তার ইসলামি বন্ধু রাজনীতিকরা এখন করবেন? করতে সক্ষম হবেন? এমন কোনো ইচ্ছার কথা আমরা শুনিনি।

    তাহলে এখন মাওলানা ‘ফজলুর রহমানের আন্দোলন’ হচ্ছে কেন? এর অর্থ ও তাৎপর্য কী?
    একটা অনুমান হল, পাকিস্তান তার অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার সঙ্কট থেকে বের হওয়ার একটা পথ বের করতে পেরেছে; যদিও সঙ্কট থেকে এখনও বের হয়ে যায়নি, এটা হতে সময় লাগবে। এই অর্থে ইমরানের সরকার কিছুটা থিতু হয়ে বসতে শুরু করেছে। কিন্তু মাওলানা ফজলুর রহমানসহ রাজনীতিক যারা বিরোধী দলে আছেন, বিশেষত যারা জেলে আছেন অথবা গত নির্বাচনে যারা অযোগ্য বিবেচিত হওয়াতে দাঁড়াতেই পারেননি বা পরাজিত হয়েছেন- তারা এখন খুবই খারাপ অবস্থায় আছেন। তারা নিজেদের জন্যও কিছু সুবিধার অর্থে কিছু আনুকূল্য ভাগ চাইছেন সরকারের কাছে। কিন্তু মাওলানার পক্ষের মিডিয়া ক্যাম্পেইন বা গুজব ছড়ানোর অনেক ক্ষমতা আছে বুঝা যাচ্ছে। যেমন আমাদের ইনকিলাব এসব নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে যার শিরোনামে লেখা হয়েছে এভাবেঃ “ইসলামাবাদে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা; দুশ্চিন্তায় ইমরান খান”। এটাকে “টু মাচ” ছাড়া আর কীবা বলার আছে! এখন সবকিছুই আর সবার কাছেই নিশ্চয় সবাই তা বাস্তবে বুঝতে পারছেন।  যুগান্তরের আর এক এমন ম্যানুফ্যাকচারড রিপোর্ট কোথা থেকে নিয়েছে তা বলে নাই।

    যেকথায় ছিলাম আমরা যে,  বিরোধীরা এখন যে খারাপ অবস্থায় আছেন, সেটা অবশ্য ইমরানের কৃতিত্ব নয়; বিরোধীদের নিজেদের ব্যর্থতাই এর কারণ যে তারা আদালত মোকাবিলায় ব্যর্থ। তবু এরা সবাই পুনরায় অন্তত বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় তৎপর হতে চাইছেন। কিন্তু সমস্যা হল এরা নিজ মুরোদে তা নিশ্চিত করতে পারছেন না। কিন্তু তারা একটা ‘তৃতীয় পক্ষ’ – মধ্যপ্রাচ্যকে কামনা করেছেন আর তা পেয়ে গেছেন এবং নিয়েছেন; যা তাদেরকে সরকারের সাথে দর কষাকষিতে সহায়তা করতে পারে।

    লক্ষণীয়, মাওলানা ফজলুর রহমানকে সামনে রেখে পিছনে নওয়াজ (PML-N) ও ভুট্টোর(PPP) দল দুটো এরা তিন দলীয় ভাবে নয় বরং মাওলানার আন্দোলনকে বাইরে থেকেই সমর্থন দিয়েছে। অর্থাৎ এটা মূলত একা এই মাওলানার আন্দোলন। কোনো “ইসলামী” রাজনীতির যে দায়দায়িত্ব, তাতে নওয়াজ-ভুট্টোরা নিজেকে জড়াচ্ছেন না। আর মূলত ফজলুর রহমানের প্রতিই সৌদি সরকারের সমর্থন। কিন্তু যুবরাজরা কেন তাকে সমর্থন করতে আগ্রহী?

    এখনকার সৌদি আরবঃ
    এখনকার সৌদি আরবের বিরাট সঙ্কট কেবল রাজতন্ত্র টিকানো নয় অথবা ইরানি হুমকি থেকেই কেবল নিজের রাজত্ব বাঁচানো নয়। সঙ্কট অন্যত্র এবং তা বাস্তব ও অবজেকটিভ। মানে, যা কোন ব্যক্তি বা দেশ দায়ী নয়। যেমন বলা হচ্ছে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে চলতি দুনিয়ায় আর ফসিল ফুয়েল [fossil fuel] বা মাটির নিচের তেল ব্যবহার করে চলতে চাইবে না বা পারবে না। বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গ্লোবাল অভিমুখ চলে যাবে যা ইতোমধ্যেই যাচ্ছে ধীরে ধীরে হলেও। সৌরবিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত যানবাহন বা ইঞ্জিন আবিষ্কার বা তা চালুর পক্ষে ব্যাপক বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার ব্যাপারটা নজর করলে, এ ব্যাপারে কিছুটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। তাই সৌদি আরব দুনিয়ায় এই মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যাবার আগেই নিজের ব্যবসা-বিনিয়োগ সব কিছুকে আর তেল বিক্রিনির্ভর নয়, অন্যান্য ব্যবসা-বিনিয়োগের উপর নির্ভরশীল করে স্থানান্তত করে নিতে চায়। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে পৌঁছাতে চায় বলে দেশটা বিরাট কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যদিও  এটা খুবই ঝুঁকিবহুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা। বহু ইফ, নট আর বাট [if, not, but] এসবে ঢাকা প্রতি পদক্ষেপ।

    প্রথম কারণ, অনেক দেরিতে এটা ‘বুড়ো বয়সে’ এসে সৌদি আরবে শুরু করা হয়েছে। যেমন সৌদিদের চেয়ে দশ ভাগের এক ভাগেরও কম পুঁজি নিয়ে, আমিরাতের দুবাই একা অন্যান্য ব্যবসায় ঢুকে গেছে গত শতক থেকেই। গত ২০০০ সাল থেকেই দুবাই এক নম্বর এয়ারলাইন্স কোম্পানি (এমিরেটস) আর বিরাট এয়ারপোর্ট (দুবাই) প্যাসেঞ্জার হাব চালু করে ফেলেছে। শেখেরা চাইলে যে তাঁরা কেবল আয়েশি জীবন কাটানোর মানুষ নয়; বড় বিনিয়োগ-ম্যানেজমেন্ট নাড়াচাড়া ও সামলানোর মালিক হতে পারে এটা তার বড় প্রমাণ। অথচ দুবাইয়ের সাথে তুলনায়, তেলভিত্তিক নয় এমন বড় প্রকল্পের কথা সৌদিরা জীবনেও ভাবে নাই। তেলবিক্রির মুনাফা তারা ব্যাঙ্কে জমা রেখে খেয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং বিনিয়োগের আগ্রহ নেয় নাই। এখন সৌদিরা একালে এসে তাদের অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ নিয়ে যেতে চাইছে। সৌদিরা এ বছর পাকিস্তানে ২০ বিলিয়ন আর ভারত প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে গেছে, যার বড় অংশ তেল শোধনাগারে।

    সমস্যা আরও আছে, বাড়বাড়ন্ত। আমেরিকা এখন আর সৌদি বা পুরা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ ১৯৭৩ এর হাত ধরে তেল অবরোধের পালটা পদক্ষেপ হিসাবে তৈরি কিসিঞ্জারের হাতের “আমেরিকার মিডিল-ইস্ট পলিসির” জন্ম হয়েছিল। আমেরিকার কাছে যা বিখ্যাত আর আরবদের কাছে যা কুখ্যাত। ইসরায়েলকে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে শায়েস্তা করা বা চাপে রাখার কৌশল তখন থেকেই চালু হয়েছিল। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তিও যার গুরুত্বপুর্ণ অংশ। আমেরিকার এগুলো সব ব্যবহার বা প্রয়োগ করার সুযোগ এখনও আগের মতই আছে। কিন্তু আমেরিকা আর সৌদি বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর নির্ভরশীল নয়। কারণ আমেরিকা এখন তেল রপ্তানিকারক দেশ, যেটা মূলত ফ্রেকিং অয়েল ( শুকনা কাদামাটির শ্লেট চাপে-তাপে পিষে ভেঙ্গে বের করা তেল)। যার একটাই ডি-মেরিট যে এর উতপাদন খরচ ৫০ ডলারের বেশি। তা সত্বেও এটাই এখন বাজারে সৌদি তেলের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বি। তবুও নিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে আমেরিকা এখনো কোন পরিবর্তন আনে নাই। ফলে সৌদি আরব উলটা আরও বেশি একপক্ষীয়ভাবে আমেরিকা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে।

    আসলে এটা এখন প্রমাণিত যে সৌদি আরব ইতোমধ্যে তার রাষ্ট্রের বইবার সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি শত্রু  সৃষ্টি ও তাদের মোকাবিলা-নির্ভর করে নিজ নীতি সাজিয়ে চলে এসেছে। সর্বশেষ ২০১৯ সেপ্টেম্বর মাসে ইরানি ড্রোন-হামলা খেয়ে উলটা সৌদিদের দুঃস্থ অবস্থা  আরও প্রকাশ হয়ে পড়েছিল, তারা হামলা খেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া স্পষ্ট করে ফেলেছিল। সৌদি আরব নিজেকে প্রটেক্ট করতে কতটা অসহায়, আর ওদিকে তার এপর্যন্ত নেওয়া অনুসরণ করা বিদেশনীতি কতই অকেজো – এটা স্পষ্ট সবাই জেনে যায়। অস্ত্র কেনাসহ নানা উছিলায় আমেরিকাকে অর্থদান-সহ ব্যক্তিগতভাবে আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের দায়দেনা দেউলিয়াত্বের পিছনে অর্থব্যায় করা – সৌদি বাদশারা এতদিন কী না করেছে। অথচ কাজের সময় এগুলোর কিছুই তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ট্রান্সশ্লেটেড হয় নাই।  কাজে আসে নাই।

    এছাড়াও আর একটা বড় সমস্যা হলঃ তাদের ‘রাজাগিরি’ স্বভাব। মানে,  ফিউডাল বা সামন্ততান্ত্রিক ও বোকা রাজার স্বভাব; তাই সব কিছুকে তাঁরা ভুয়া রাজকীয় ভ্যানিটিতে আঘাত পেয়েছে বলে খাশোগির মত সবকিছুই টুকরা করে কেটে ফেলার মতো সহজ মনে করে – আর এর সম্ভাবনা কিন্তু সব সময়। কাজেই তাদের রাজত্ব টিকানোর ভয়ও সব সময়। একালে আধুনিক রাষ্ট্র অর্থ খরচ করে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বাড়ানোর জন্য যাতে অন্তত ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা হয়। কিন্তু সৌদিরা অর্থ খরচ করে নিজের েসব আজীব স্বভাব আর রাজত্ব রাজাগিরি টিকানোর জন্য।

    তুলনায় আর এক রাজতন্ত্রী কিন্তু একেবারেই ভিন্ন ও স্মার্ট’ ব্যবসায়ী এবং উতপাদক হল কাতার রাজ পরিবার। সে ট্যাংকার-জাহাজে ভরে (গ্লোবাল সেকেন্ড হায়েস্ট রিজার্ভ আছে কাতারে) গ্যাস রফতানিতে বিরাট বিনিয়োগকারি ও হাইটেক এক উতপাদক ও ব্যবস্থাপনা তাকে সামলাতে হয়। এছাড়াও আছে অ্যালুমিনিয়াম, নিজের খনি থেকে তুলে তা থেকে অন্তত ছয় ধরনের ফিনিশড প্রোডাক্ট উৎপাদন করে রফতানি করে এমন হাইটেক বিজনেস করে চলেছে।  এসব কাজ বসে বসে তেল বেচা অর্থ ভোগ-খরচের রোয়াবি না,  রাজতান্ত্রিক মধ্যপ্রাচ্যের  রূপান্তরে – আর কী  ম্যানুফ্যাকচারিং মডেল হতে পারে – এর আরেক উদাহরণ এখন কাতার। কিন্তু সৌদি আরব যার নিজ নিরাপত্তার ঠিক নাই সে কাতারকে বোকার মত সামরিক হুমকি দিয়ে বসেছিল। মূল অভিযোগ ব্রাদারহুডকে সাহায্য ও আশ্রয়দান। আর তাতে কাতার দ্রুত তুরস্কের সাথে সামরিক চুক্তি করে তুর্কি সেনাবাহিনীর স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলেছে খোদ রাজধানী দোহা-তে। এতে কী লাভ হল সৌদিদের? এটা কেন তারা আগে বুঝে নাই? এরই নিট ফলাফল হল, শুধু ইরানই নয়; তুরস্কও সৌদি আরবের আর এক বড় সামরিক প্রতিপক্ষ তৈরি হয়ে উঠল। সৌদিরা এক ইরানের ঠেলায় বাঁচে না তাতে আবার তুরস্ক!

    রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অর্থ না থাকুক; তবু অনেক দেশের চেয়ে পাকিস্তান অনেক বিকশিত ও উন্নত। বড় কারণ, দেশটা একটা মডার্ন রিপাবলিক। ন্যাটো সদস্য তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের এখন প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত অস্ত্র বা উপকরণ বিনিময় বেচাবিক্রিতে সম্পর্ক গভীর। এদিকে ইমরানের উদ্যোগের কারণে ইরান-পাকিস্তান অস্পষ্ট সম্পর্ককে এখন ধোয়ামোছা করার ফলে তারা খুবই ঘনিষ্ঠ। এর আগের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীরা ভাবতেন সৌদি রাজতান্ত্রিক দেশের ওপর নির্ভর হয়ে থাকা , মাঝে মধ্যে অনুদান নেওয়া আর প্রতিদানে ইরানকে খামাখা উপেক্ষায় ফেলে রাখা, এটাই পাকিস্তানের একমাত্র ও বেস্ট কূটনীতি। বিপরীতে ইমরান প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, তিনি ২০ বিলিয়ন সৌদি বিনিয়োগও আনতে পারেন, সাথে সৌদি অনুদানের কিছু মিলিয়ন ডলারও আনতে পারেন আবার যুবরাজ এমবিএস এর বিশেষ বন্ধু হতে পারেন। তদুপরি, ইরানের সাথে সম্পর্কের জট খুলে তাদেরও ঘনিষ্ঠ হতে পারেন। শুধু তাই নয়, এমনকি ইরান-সৌদি বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন। তাহলে  পাকিস্তানের পটেনশিয়াল কী ছিল তা কি এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নওয়াজ শরিফ কিংবা অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট বেনজিরের উত্তরসূরিরা দেখতে পাচ্ছেন?
    মনে হচ্ছে না! বরং তামসা হইতেছে আমাদের মাওলানা ফজলুর রহমান পোক্ত যুক্তি আর যথেষ্ট খোজ খবর ছাড়াই তার আন্দোলন থেকে  দাবি করেছেন ইমরানের আমলে নাকি পাকিস্তান বন্ধুহারা হয়ে গেছে!

    একালের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন আলাদা। এটা আর কোল্ড ওয়ারের (১৯৫৩-১৯৯১) যুগ নয়। এ কালে চীন-ভারত প্রচণ্ড বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিযোগিতা করবে আবার একই সময়ে ভিন্ন ইস্যুতে প্রচণ্ড সহযোগিতা করবে, স্থায়ী কিছু বোঝাবুঝির ভিত্তিও তৈরি করবে। সবই চলবে ইস্যুভিত্তিক, একেকটা ইস্যুতে একেক রকম কৌশল ও অবস্থান; কখনো মিত্র তো কোনটায় চরম বিরোধীতা শত্রুতা। দু’টি দেশের মধ্যে কোনো ইস্যুতে মারামারি লেগে যায় অবস্থা, আবার কোনো ইস্যুতে সহযোগিতা।

    এই পটভুমিতে খুব সম্ভবত সৌদি যুবরাজের ধারণা, পাকিস্তানের ইমরানের তুরস্ক ঘনিষ্ঠতাকে একটা ছেঁটে দেয়া বা সাইজ করার জন্য একটু চেষ্টা করা যাক। কোনো চাপ সৃষ্টির সুযোগ পাওয়া যায় কি না, চেষ্টা করে দেখা যাক। মাওলানা ফজলুর রহমানকে ‘ব্যাক’ করার ফলাফল এমনটাই হয়ে যেতে পারে। এই হল সেই অনুমান। এতে যুবরাজকে ইমরানের পাল্টা যুক্তি হবে, আপনি তো আমার পাশাপাশি ভারতেও বিনিয়োগ দিয়েছেন। আবার দুবাইকে দিয়ে মোদীর ‘কাশ্মির দখল’কে সমর্থন দেয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।

    কাজেই এখন  যুবরাজ বা মাওলানার চাপ উপেক্ষা করে ইমরান মাথা উচা রেখেই উঠে দাঁড়াতে পারেন কিনা অথবা কতটা পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। যদিও মাওলানা ফজলুর রহমানদের খারাপভাবে  ‘হেরে যাওয়ার’ অনেক দ্রুতই সম্ভাবনা বাড়ছে।

    কারণ, টাইমিং জ্ঞান। প্রথমত ইমরানের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠানোর জন্য এটা উপযুক্ত বা পরিপক্ক সময় একেবারেই নয়। না পাকিস্তান দেশের ভেতরে না আন্তর্জাতিক জগত-পরিসরে। প্রায় এবছর জুড়ে এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমেরিকার তেমন কোনো অভিযোগ-অনুযোগই নেই। আবার জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা দিয়ে এখন ইমরান যেন ‘হিরো’। মুসলমানেরা ও যারা সাধারণভাবে ন্যায়বিচারের দুনিয়ার পক্ষে, তারা সবাই ইমরান তাদের মনের কথাই বলেছেন বলে মনে করছে। এই ইমেজ কী দিয়ে মাওলানা ভাঙ্গবেন! নিজেকে ইসলামের খেদমতের লোক বলে হাজির করবেন? সেই ইসলামি রাজনীতিরইবা কোন ভাল ইমেজ কই? ইমরানের ইমেজের কাছে এখন এর রেটিং সর্বনিম্ন! এছাড়া, দেশের ভেতরে ইমরান আশা-ভরসা ও ভালো দিনের প্রতীক। এই সময়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলা আর তা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। কিলিয়ে কাঠাল পাকানোও বোধহয় সম্ভবত তুলনায় সহজ ও সম্ভব। বিশেষ করে যখন কোনটা ‘ইসলামী’ রাজনীতি বা ইসলামি স্বার্থ তা পুরাই অস্পষ্ট। পাকিস্তানের “ইসলামিজম” পুরাই ব্যর্থ এখানে আপাতত।

    সম্ভবত প্রকৃতিও বিরুদ্ধে। সমুদ্রে নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই রাস্তায় যেখানে আন্দোলনকারীরা এক তারিখ থেকে বসে আছেন, তা বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে, কতটা হানে দেখতে হবে। কর্মসূচি শেষ ঘোষণা করার আগেই এগিয়ে আসছে প্রকৃতির আক্রোশরূপী ‘বুলবুল’! কোন কিছুই মাওলানা ফেবারে নাই, মনে হচ্ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত  ০৯ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “পাকিস্তানের রাজনৈতিক ধাঁধা“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]