Category: নেশন-স্টেট Nation State

  • নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    গৌতম দাস

    ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gD

    ব্যাপারটা একটু পুরনো। কিন্তু বারবার ফিরে আসে এমন পুরনো রোগ। বীনা সিক্রি [Veena Sikri ] বাংলাদেশে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত। গত ২০০৩-০৬ সময়কালে তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ভারতের প্রায় সকলের সব কিছুতে শো-আপ বা বাড়িয়ে বলা বা দেখানো – এটা এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে তো বটেই সরকারি পর্যায়েও অভ্যাসের মত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে সম্ভবত শো-আপ করাদের শীর্ষ আছেন বীণা। আর বাংলাদেশে তিনি এটা করার আরো সুযোগ নিয়ে থাকেন কারণ তিনি সরকারি আমলা হিসেবে চাকরি শেষ করলেও এখন সাউথ এশিয়ান উইমেন্স নেটওয়ার্কের (South Asia Women’s Network, SWAN)) আহ্বায়ক বলে জানা যায়, এর সুযোগে।

    সিক্রির সেকুলারিজম-বোধঃ
    দেখা যায়, তিনি সবসময় আমাদের যেচে ‘হেদায়েত’ করতে ভালোবাসেন আর ইদানীং তা সবচেয়ে বেশি যা নিয়ে, সেই সাবজেক্ট হচ্ছে  সেকুলারিজম। আবার তাঁর সেকুলারিজম ভাবনাটা ‘বিশেষ’। সেটা যেন উল্টো মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু মুসলমান। তাই যেন বলতে চান, এরা তো একটু খাটো (!), সেটা এখন এঁরা সেকুলার হলে  সমান পক্ষ হতেও পারে!। যদিও এই সাবজেক্ট নিয়ে তাঁর জানা-বুঝা ঠিক বা যথেষ্ট কি না তা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ আছে। এ ছাড়াও অন্য যেসব প্রসঙ্গ তিনি সাধারণত আনেন ও কথা বলেন সেগুলো যেমন – ভারত নাকি পড়শিদের জন্য ‘বড়ভাই’, সে কথাটা আবার উনি নিজমুখেই বলছেন। এমনই ডেস্পারেট এবং যেন  মুল্যবোধের ঘাটতিতে থাকা ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত শো করা মানুষ তিনি। গত ২০১৫ সালে ভারতের এক ওয়েব মিডিয়ায় [livemint] তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন যেটা ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকও পরদিন অনুবাদ করে ছেপেছিল। ওর বাংলা শিরোনাম ছিল- “ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ‘এলডার ব্রাদার’ : বীনা সিক্রি”। আবার ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মুসলমান ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে আটকে গেছে” [Bangladesh is caught between Bengali and Muslim identities: Veena Sikri]। এ ছাড়াও শাহবাগ আন্দোলনের আমলে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলছেন, সেটা নাকি “৭১-এর প্রজন্মের জেগে উঠা ছিল” – ইত্যাদি ধরনের ভারতীয় ব্যাখ্যা যার সার কথা হতে দেখা যায় যেটাকে আমরা প্রচলিত ভাষায় বলি, ইসলাম ‘কোপানো’র সুযোগ নেয়া আর উচ্ছ্বাস দেখানো। তখন প্রশ্নকর্তা অবশ্য শাহবাগের মধ্যে যা দেখেছিলেন সেটা হল এক না- বুঝা অবুঝ চোখে এক “আরব স্প্রিং” বলে একে ভ্রম। অথচ আরব স্প্রিং (নামেও বোঝা যাচ্ছে) সেকালে ঘটেছিল সাধারণত মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রে। আর আমেরিকান এই প্রোগ্রামের লক্ষ্যও ছিল সেটা।  কিন্তু বাংলাদেশের শাহবাগ তো ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত কথিত “সেকুলারদের” আন্দোলন!

    এমনিতেই যারা বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এঁদের মধ্যে একটা ‘কলোনি দখলদার মাস্টার’ ভাব কমবেশি থাকতে দেখা যায়; যেন তারা ভারত সরকারের ভাইস-রয় বা ‘কলোনি রাজপ্রতিনিধি, আমাদের দেখভাল বা দেখেশুনে রাখতে ও হেদায়েত করতে এসেছেন। ঠিক যে জিনিসটা ১৯৪৭ সালে আগস্টে কলোনিমুক্ত ও স্বাধীন ভারত হয়ে গেলে নেহরুর মধ্যে দেখা গিয়েছিল বা যেত। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তিনি নিজেকে ‘ব্রিটিশ ভাইসরয়’ ভাবতেন যার সবচেয়ে ভাল ও বিস্তারিত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষায়। কলোনিদখলি চোখ মনে করে দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে পারে না। কোন সম্পর্ক হলে তা হতেই হয় দখলদার ও অধস্তনের, এই বিশ্বাস তাঁর প্রখর ছিল। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেহরু যেন ব্রিটিশের উত্তরসূরি; তাই তিনি কলোনি মাস্টারের সেই ভূমিকায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এমন চিন্তার সমস্যার গোড়া হল – নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার মধ্যে; যেখানে দুই রাষ্ট্রের সমমর্যাদার নাগরিক সম্পর্ক বলে কোনো ধারণা বা ইমাজিনেশন থাকে না, কাজ করে না। সব কিছুকেই এরা মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু আর গোলামঅধস্তন বানিয়ে ফেলেন এবং সেভাবে দেখে থাকেন। এর বাইরে ভাবতে পারেন না। অথচ মজার কথা এরাই আসেন আমাদেরকে সেকুলারিজম শিখাতে; আর এতে যদিও আমরা তাঁদের ক্লাস-সেন্স দেখি আর প্রীত হই!।

    বীণা সিক্রির সেকুলারিজম আসলে একজন হিন্দু জাতিরাষ্ট্রবাদীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বৈ আর কিছু নয়। এটি সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ে যখন আমরা দেখি আরএসএস-বিজেপির মতো পাঁড় হিন্দুত্ববাদী দলের মোদী সরকার প্রায় সাত বছর ধরে ভারতে ক্ষমতায়; অথচ বীণা সিক্রির মোদীর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি বা সমালোচনাই নাই; বরং ভাবটা হল একেবারে সব ঠিকঠাক সুন্দরভাবে চলছে। অথচ “জয় শ্রীরাম” বলানোর জবরদস্তি অত্যাচার নিপীড়নে টেকা দায়, মুসলমান নাগরিকের বুকের খাঁচার ওপর লাফিয়ে উঠছে তাঁরা। কিন্তু বীণা সিক্রির তাতে কোন বিকার আছে আমরা দেখি নাই! তার মানে, সিক্রির সেকুলারিজম ভাবনার ফিল্টারেও আরএসএস বা মোদী পার হতে যেতে পারেন। এর চেয়ে তামাশা আর কী হতে পারে! আবার দেখি – বীনা সিক্রি মোদী-অমিতের ভারতের পড়শি দেশের থেকে কেবল ‘না-মুসলমানদেরই নাগরিকত্ব দেয়া’ হবে এই চরম বৈষম্যমূলক আইন গ্রহণ করেছেন বলে প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন। এমনকি বীণা সিক্রি মোদীর এই আইনের পক্ষে তিনি নিজে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটা ‘ন্যায্য’। এখানে তাকে “বাহ রে সেকুলারিস্ট” ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখি না।

    সিক্রির ভারত ‘এলডার ব্রাদার’ তত্ত্বঃ
    ভারতের বাইরের মানুষ ভারতের বড় ভাই সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে আপত্তি ও নিন্দা জানিয়ে থাকে। অথচ বীণা ভারতের এই অশিষ্ট ও আন-ওয়েলকাম আচরণ এটাকেই ভারতের জন্য গৌরবের বলে মনে করেন বা তুলে ধরে থাকেন।   বীনা সিক্রির এমন বুঝাবুঝির দৌড় দেখে জানা যায়, তার চিন্তা কত স্থুল। আর তিনি মনে করেন, বাকচাতুরি দিয়ে তিনি কথা বলবেন আর এটাকে কূটনৈতিক কথা বলে সবাই তা গ্রহণ করবে বা মেনে নিবে।

    বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জবরদস্তির তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করে আমেরিকা বাংলাদেশকে ক্রমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল; যাতে ভারত যেমন ইচ্ছা আসামসহ নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের নামে পুরো একটা করিডোর এবং তা বিনাপয়সায় এবং প্রায়রিটিতে আমাদের দুই বন্দরও প্রায় বিনাপয়সায় ব্যবহার করতে পারে। অবশ্য আসাম নিয়ে ভারতের জন্মের সময় (১৯৪৭) থেকেই নেহরুসহ ভারতের শাসকদের দ্বিধা ছিল যে, আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর মাগনা পেলেও সেটা দরকার কি না, নেয়া ঠিক হবে কি না! এ কথাটা শুনতেই আজব ও অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু কথা সত্য।

    আসামের অসুস্থ দ্বৈততাঃ বাংলাদেশের করিডোর ভোগ করে কিন্তু মুসলমান খেদাও চায়
    ভৌগলিকভাবে, আসামসহ ভারতের পুরা নর্থ-ইস্ট কিন্তু বাকি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা ল্যান্ডলকড নয় একেবারেই। অন্তত ১৮ কিলোমিটার সংযোগ-ভূমির (চিকেন নেক) দ্বারা এটি সরাসরি ভুমিসংযুক্ত। আবার দেশভাগের সময়ের আগে বা পরে কখনোই নর্থ-ইস্টের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট দরকার বলে ভারত কখনো এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহই প্রকাশ করেনি। এটাই প্রমাণ করে, ভারত আসামের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট চায় না, অন্তত এই প্রশ্নে তাদের বিরাট দ্বিধা আছে। কেন?

    কথাটা বুঝা খুবই সহজ। আসাম যে যুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে, বাংলাদেশের অগভীর ফিডার বন্দর বা কোন গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা-নেয়ার সুবিধা চাইবে, এরই সাথে সাথে ঠিক একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টের ওপারে আরো উত্তরে আছে চীন। চীনের ঐ ভূখন্ডের বাসিন্দারা তাঁরা পুরোপুরিই ল্যান্ডলকড বলে, তারাও আসামের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে আর একইভাবে অসমীয়দের মত বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া সব করিডোর ফ্যাসিলিটিই পেতে চাইবে। এর সোজা মানে হবে, ভারতকেও আসামের ওপর দিয়ে চীনকে করিডোর সুবিধা পেতে দিতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু এটাই ভারত কখনো চায় না। এতে নাকি ভারতের আসামের ‘পবিত্রতা ও শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে’- এই হল ভারতের প্রকাশ্য যুক্তি।  এটা আসলে নিজ সন্তানকে হাত-পা নুলা করে দিয়ে এবার তাকে দেখিয়ে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করানো – এভাবে আয়-ইনকাম করার মত। আসাম ডেভেলপড হয়ে গেলে তা দেখে চীনের সাথে আসামের সীমান্তে লাগোয়া অংশ আসামের উপর দিয়ে করিডোর চেয়ে বসতে পারে তাই, আসামকে নুলা করে রাখতে হবে, এই মনোভাব!
    এ জন্যই আমরা দেখি স্থানীয় (অসমীয়, বোড়ো বা অন্যান্যরা) আসামের বাসিন্দারা কথিত ‘বাঙালিদের বহিষ্কার’ চাইত সেই ১৯৫১ সাল থেকে। কিন্তু কখনো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চায়নি। অথচ আবার ভারতের শাসকরা পিছিয়ে পড়া আসামে (১৯৭২ সালের আগে পুরো নর্থ-ইস্টকে আসাম রাজ্যের অংশ গণ্য করা হত) কখনো অবকাঠামো বিনিয়োগই ঠিকমতো দিতে রাজি হয়নি; সম্পদ নাই বা ঘাটতি বলে এড়িয়ে গেছে। আর তাতে আসামই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবল সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জেগে উঠেছে (এখনও উঠে আছে), তবু ভারত কিছুই করতে রাজি হয়নি, নির্বিকার।
    আমরা নাকি “মাগনা পেলে আলকাতরাও খেতে চাই”- এখন সেই অবস্থা হয়েছে ভারতের। মাগনায় করিডোর পাচ্ছে বলে যেন এখন ভারতের আগ্রহ হয়েছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং হল – বাংলাদেশ বিনাপয়সার পোর্টসহ করিডোর দিচ্ছে; এটা বিজেপির পক্ষ থেকে আসামের বাসিন্দাদের জন্য কোনো উপহার মোদী সরকার এনে দিয়েছে – এটা প্রকাশ্য সত্য হলেও এটা আসামে কোন দলের নির্বাচনী ইস্যু নয়। এখনও এমন মানে বা মনে করা হয়নি। মূল কথা, আসামের এ পাওয়াটা লোপ্রোফাইলে রেখে দিতে চায় ভারত সরকার। কারণ সম্ভবত বাংলাদেশ যে এত বিশাল সুবিধা দিয়েছে এটা বেশি প্রচার করা হলে না বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ বা মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আন্দোলন বন্ধ (আসামের বাঙালি খেদাও বা এখনকার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে অসমীয় মুসলমানদের খেদানো) করার দাবি বের হতে পারে। এ ছাড়া এর প্রচার বেশি হলে কখন আবার চীন না একই সুবিধা দাবি করে ভারতের কাছে চেয়ে বসে আর বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেয়। এটা অবশ্যই বিরাট এক তামাশা যে, পোর্টসহ করিডোর সুবিধা পাওয়া আসামের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কোনো দলের নির্বাচনে এটা কোনো ইস্যুই কেউ করতে রাজি না…।

    করিডোর নেয়ার পালটা কী, বাংলাদেশকে কী দিয়ে বুঝ দিবেঃ
    কিন্তু সমস্যা আরেক জায়গায়। আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিলেও ভারতের জন্য এটা কিছু চক্ষুলজ্জার যে, কোন কিছু পাল্টা সুবিধা বাংলাদেশকে না দিয়ে করিডোর নেয়াটা কেমন দেখাবে! তাই এই অস্বস্তিটা কাটাতেই ঠিক করা হয়, বাংলাদেশকে “দুধ-ভাত খেলোয়াড়” বানিয়ে খেলায় নিবে। সেটা কী?
    মরহুম শেখ মুজিব সেই ১৯৭৪ সালে ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আমাদের ছিটমহলে যাওয়ার করিডোর ভারত দিয়ে দেবে – এই ভূমিবিনিময় চুক্তি হয়েছিল ওই সময়। তাই আমাদের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে শেখ মুজিব আমাদের কর্তব্য করেছিলেন তখনই। কিন্তু ভারত তার দায় কখনো গত ৪১ বছরে পূরণ করেনি। অর্থাৎ এটা আমাদের পাওনা অধিকার হলেও ভারত আটকে রেখেছিল। এ ছাড়া তিস্তার পানি পাওয়াও ছিল আমাদের ভাটির দেশের পাওনা ও অধিকার। আর যা কোনো রাষ্ট্রের পাওনা অধিকার সেটি পেতে আবার নতুন করে ভারতকে কোন কিছু দিয়ে ভারতের সাথে বিনিময় করার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা হবে অনেকটা যেন সেই ঠগের কারবার যে, আমার থেকে ধার নেয়া টাকা ফেরত দেয় না। কিন্তু একবার যে ফেরত দিবার আগ্রহের নামে এবার আমার থেকেই আবার নতুন করে ধার নিয়ে সেই টাকা দিয়েই আমার আগের ধার শোধ করল বলে দাবি করছে; ঠগের বাটপাড়ি যেমন হয়। ভারত সেই ছিটমহল ভূমিবিনিময়ের আইন এবার ৪১ বছর পরে ২০১৫ সালের মে মাসে পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছে। আর তিস্তার পানি? সেটাও আমাদের পাওনা হলেও তা আর কখনোই পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

    কিন্তু এই ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়াটাকে নিয়ে বীণা সিক্রির মন্তব্য সাক্ষাৎকারে দেখেন।  “এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত তার বড় ভাই (বিগ ব্রাদার) পরিচিতি মুছে দক্ষিণ এশিয়ায় জ্যেষ্ঠ ভাই (এলডার ব্রাদার) হিসেবে সম্মান অর্জন করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি” [……By approving implementation of LBA, India has shed its “big brother” tag and acquired an “elder brother” status in South Asia, says Veena Sikri ]। দেখেন কারবার! আসলে টাউটারিতেও তো কিছু সীমা থাকে। সিক্রি সেটাও ছড়িয়ে গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, সিক্রির আরো চাপাবাজি হল, তিনি বলছেন – সংসদে এই আইন পাস করে দিয়ে নাকি মোদী তাঁর “প্রতিবেশী প্রথম” [neighbourhood first] মতবাদ কাজে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন”। এ ছাড়া আরো আছে। সিক্রি বলেছেন, এই আইন পাস হওয়াতে নাকি, “ভারতের জন্য ভূখণ্ডগত জাতীয় ক্ষতি হয়েছে” [for India, it’s a notional loss of territory]।  এটা কলোনিদখলবাজ ইংরেজদের চেয়েও শঠতাপূর্ণ কথা। কারণ এটা ছিল ভূমির বিনিময়ে ভূমি নেয়ার চুক্তি। তাই তথাকথিত কোন আত্মত্যাগের বালাই নাই এবং নয় এটা। এটা কারো জন্যই একপক্ষীয় কোন ভূমি হারানোই নয়। আমরাও সমতুল্য ভূমি হারিয়েছি। অথচ সিক্রি এটা এখানে তুলে ধরছেন ‘ভারতের দয়া’ বলে, “একপক্ষীয় ভূমি হারানো” বলে। ফলে সত্যিই আমরা ঠগের পাল্লায় পড়েছি দেখা যাচ্ছে। এটাই হলো, টিপিকাল ছেচরামো! আমরা নির্বাক!

    এভাবে সর্বশেষ যে মিথ্যা বলা আর চাপাবাজিটা বীনা সিক্রি করেছেন আর আবার এদেশে লেখা ছাপিয়েছেন, সেটা গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, বাংলা-ইংরেজি দুভাবেই ছাপিয়েছিল [তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত]।

    এ ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে গত ২৯ আগস্ট এক ভার্চুয়াল ওয়েবনিয়ার আলোচনায় তিনি আবার আরো মিথ্যা ও চাপাবাজি করতে গেছেন। এটাই তাঁর তথাকথিত নষ্টা-সেকুলারিজম নিয়ে। এর আয়োজক ছিল Indian Council for International Cooperation নামে কেউ। সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন, “বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন বঙ্গবন্ধুর লিগ্যাসি এবং ওর মধ্যে সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে – যেগুলো ইন্ডিয়ান কনস্টিটিউশনের সাথে কমন”।   ……….. “ঢাকার ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক শুরু করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে”।

    ইসলাম-কুপানি নষ্টা-সেকুলারিজমঃ
    লক্ষ্য করা যাচ্ছে বীনা সিক্রি ইদানীং সুযোগ পেলেই ‘জ্ঞানী’ লোক হওয়ার আর বাংলাদেশকে সেকুলার হতে জ্ঞান দেয়ার উৎস হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইছেন। কিন্তু আমরা সত্যিই খুব দুঃখিত! আমরা মনে করি, তার কনস্টিটিউশন বা সেকুলারিজম বিষয়গুলো নিয়ে নুন্যতম কোন জ্ঞান বা ধারণাই নেই। সাথে কিছু ফ্যাক্টস প্রসঙ্গেও একেবারেই জানা নাই। কিন্তু এজ ইউজুয়াল আন্দাজে বলা ঠিকই আছে। বীণা সিক্রি চাইলে  একেবারেই কান খুলে শুনে রাখতে পারেন, নিচের বাক্যটাঃ

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি আমরা তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোন পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে।

    মানুষ মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত শিখে এবং চাইলে শিখতেও পারে। সিক্রি, আপনার উচিত হবে এ বিষয়ে পড়তে বসা, স্টাডি করা। দুঃখজনক হল – নেহরু, গান্ধীসহ যারা আগের ভারতের নেতা ছিলেন এমনকি ইন্দিরা গান্ধী এরা কেউই উপরে যে প্যারাটা লিখেছি, সে কথাগুলো জানতেন তা মনে হয় না। সে কারণে ভারতের কনস্টিটিউশনেও সেকুলারিজম শব্দটা আগে ছিল না। এরা সবাই সেকুলারিজম কী করলে একমাত্র হয় সে বিষয়ে জানাজানি শেষ না করেই মারা গেছেন। সেটা তাঁদের এজেন্ডাও ছিল না মনে করার কারণ আছে। কারণ কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে জন্মের পর থেকে যে রাষ্ট্রের ধারণা রপ্ত ও বাস্তব করেছে সেটার মূল বৈশিষ্ট হল –  এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র।

    তাই একটা সত্য আগে জেনে রাখুন। সেকুলারিজম লিখে রাখা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের দুই কনস্টিটিউশনে এটি কমন কথা এবং কমন ভিত্তি এবং এই কমন ভিত্তির বলে যে নতুন ধরনের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কথা বীনা বলেছেন তাও অর্থহীন এবং ভিত্তিহীন – অসত্য ও ভুল।

    ফ্যাক্টসটা হল – বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সময় রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন নীতি লেখা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ১১ বা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১।  এরপরে ১৯৭১ সালের অক্টোবরেও – ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেক এই অনুরোধ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার থেকে তত দিনে তিনবার চাওয়া হলেও ভারত তা দেয়নি। কারণ ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্র বিষয়ক ধারনায় অস্পষ্টতা ছিল। কিন্তু যেটা তাকে তাড়া করছিল তা হল,  ভারত মানে মূলত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ভারত যার জন্মের শত্রু পাকিস্তান যে পাকিস্তানের পুর্ব অংশ যা বাংলাদেশ নামে সাধীন হতে চাইছে কিন্তু সব ছাপিয়ে ইন্দিরাকে যা খোঁচা দিচ্ছে এরা তো নব্বই ভাগই মুসলমান – এই মুসলমানদের স্বাধীন হতে তিনি কেন গাটছাড়া বাধবেন? তাই তিনি একটা নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন, একটা রক্ষাকবচ চাইছিলেন। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সবগুলো পক্ষই এলাইয়েন হয়ে যাবার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে সবাই সক্রিয় হবেনই এটা নির্ধারিত হয়ে গেছিল একাত্তরের আগষ্টেই। যেমন বাস্তবত সুযোগ ছি না নাহলে ইন্দিরাই মন শান্তির জন্য তিনি হয়ত অনুরোধ রাখতেন তোরাও ভারতের মত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে যা। তাই এরই বিকল্প শব্দ যা সম্ভবত তার পরামর্শকেরা তাকে দেয় সেটা হল “সেকুলারিজম”।  কিন্তু একটা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন কী করে সেকুলার গণ্য হয়, কী করে তা নিশ্চিত করতে হয় তা তারা কেউ জানতেন না।  জানতেন না এত কঠিন শব্দ উচ্চারণ করে বলছি এজন্য যে  – এই কাজটা অন্তত “আমরা সেকুলার” অথবা “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” এভাবে  তা কনষ্টিটিশনের প্রতিটা পাতায় লিখে রাখলেও তা হবে না। ফলে ইন্দিরার “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” – লিখে রাখা দেখেই নিশ্চিত বলা যায় যে তাঁরা এটা কেউই জানতেন না। ইন্দিরার ভয় যে বাংলাদেশ না কথিত ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যায় – এটাই ছিল তাঁর আসল ভয়। কিন্তু তিনি জানেনই না এই ভয় তাড়ানোর পথ কী। তাই পুরা আনাড়ী হয়ে সেকুলারিজম শব্দটা তিনি আকড়ে ধরেন।  এতে তখনকার মত বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারকে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর যে  ড্রাফট বা পরামর্শটা পাঠান যাতে তিনি সররত আছেন জানান  সেখানে – সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতির কথা উল্লেখ করে- এটাই ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেন নতুন করে অনুরোধ পাঠায় ইনফরমালি তাই বলা হয়েছিল।

    আরেকটু বলে রাখা ভাল, হিন্দু-ভারত ও প্রগতিধারীরা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়ে গেল কিনা এনিয়ে প্রবল শঙ্কায় থাকে যদিও ভারত নিজেই যে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে জন্ম হয়ে আছে সে খবর তাঁদের নাই। তারা প্রায়ই আপত্তি তুলে পাকিস্তান একটা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়েছিল। কিন্তু কেউই বলতে পারবে না কি দেখে তারা তা বুঝেছিল তাও বলতে পারবে না। কেবল আপাত জ্ঞানীরা দাবি করবে পাকিস্তানের ফরমাল নাম দেখে – সেটা হল ইসলামি রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। এই নামের মধ্যে ‘ইসলাম” লেখা থাকার কারণে। কিন্তু শব্দটা আসলে ডেকোরেটিভ বা নেহায়তই সাজানোর জন্য।  পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টমূলক শব্দ হল রিপাবলিক, একমাত্র যা দিয়ে ওর ক্যারেকটর প্রকাশ পায়। এর অর্থ হল, এটা নাগরিকের ভোটে প্রতিনিধিত্বে নির্বাচিত ক্ষমতার রাষ্ট্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা হল, এই নাগরিক হিন্দু এবং মুসলমান দুধরণের যেকেউই হতে পারে। মানে হিন্দু নাগরিকের ভোটটা অর্ধেক বলে গণনা হবে তা নয়। একজন মুসলমান নাগরিকের ভোটের মত সমান হিন্দুর ভোটটাও ঐ এক ভোট বলেই গণনা হবে। যদিও পাকিস্তান রাষ্ট্রে নাগরিক বৈষম্যমূলক কিছুই ছিল না এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না।

    জাতিরাষ্ট্রের ভুল নয়, দরকার বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক রাষ্ট্রঃ
    যাহোক কথা শেষ করতে এখন সংক্ষেপ করব। আসলে বাই ডেফিনেশন রিপাবলিক শব্দের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত যে আরেক অর্থ আছে তা হল এখানে নাগরিক বলতে সবাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক হতেই হবে ধরে নেয়া হয়েছে। তাতে নাগরিকদের মধ্যে  ধর্মীয় বা গায়ের রঙ, বা পাহাড়ি-সমতলি ধরনের ইত্যাদি যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। আইডিয়েলি এটাই হল রিপাবলিক ধারণা। সেটাকে আরও স্পষ্ট রাখার জন্য “সাম্য নীতির” কথা অনেকে আলাদা করে উল্লেখ করে রাখে অনেক কনষ্টিটিশন। আর যে কনষ্টটিউশন সাম্যনীতি মানবে বলে পাবলিককে প্রতিশ্রুতি দেয় সেটাই (কোন ধর্মবিদ্বেষী নয়) সত্যিকার সেকুলার রাষ্ট্র বলে বিবেচিত হবার জন্য যথেষ্ট। তাই মূলকথা ” নাগরিক সাম্যনীতি মানবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়াই – যথেষ্ট। এরপরে ঐ রাষ্ট্র আর সেকুলার কিনা এটা বোকার প্রশ্ন। ধর্ম কুপানোর বদ-চিন্তার সাথে নষ্টা-সেকুলারিজম এতে বিদায় হতে পারে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র আলাদা করা এটাও আরেক বদ-চিন্তা, মূলত অপ্রয়োজনীয় চিন্তা।

    কিন্তু সাবধান লেখাই যথেষ্ট না। সামাজিক রাজনৈতিক প্রাকটিস বা চর্চায় সেকথাকে বাস্তব করে দেখানো এটা আলাদা কাজ। সেটা আলাদা করে অর্জনের বিষয়। কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার প্রায় দুশ বছর পরেও আমেরিকায় – “ব্লাক লাইফ ম্যাটারস” বলে আন্দোলন করে মানুষে হুশ ফিরাতে হয়।

    যারা সেকুলারিজম জিনিষটাই খায় না মাথায় দেয় বুঝে না তারাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলারিজম লিখে এবার প্রবল্ভাবে ইসলামবিদ্বেষী চর্চায় মেতে উঠে।

    বীণা সিক্রির কথায় ফিরি আবার। এখন সার করলে, এর মানে- ১. সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতি করার শর্তেই নিরুপায় বাংলাদেশকে ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে হয়েছে। ২. তখনও ভারতের কনস্টিটিউশনে এই চার নীতির কোনো শব্দই ছিল না। তা অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে আমাদেরও ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে, নতুন করে ভারতের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে নিবার সময় [THE CONSTITUTION (FORTY-SECOND AMENDMENT) ACT, 1976]। এবং বলা বাহুল্য ভারতের সমাজ রাজনীতিতে যার কোন ইম্প্যাক্ট বা ভুমিকা নাই। কারণ, থাকলে আরএসএস বা মোদী সরকারের জন্ম হবার কথা না। তাই মূলত কাজটা ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতের যারাই এই কথিত ও নষ্টা-সেকুলারিজমের ভক্ত অথবা যারা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার হয় কিভাবে বুঝেন না তাদের সবার চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করে এবং এ অজ্ঞতা চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে – সেকুলারিজম লিখে রাখা না রাখা পর্যন্তই এদের জ্ঞান।

    এক দিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সময়ে কী কী বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট ধারণা না রাখা, অন্য দিকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিণতিই হলো আমাদের তিন দেশে (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সব অসাম্যের সবচেয়ে বড় কারণ।  কারও মনের দগদগে ধর্মবিদ্বেষ ও ঘৃণা যেন সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে এজন্য সেকুলারিজম ধারণাটাকেই এর সাফাই-হাতিয়ার করে হয়েছে। নষ্টা-সেকুলারিজমকে – সেভাবে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে এত দিন।

    আবার তাজউদ্দিন যা লিখতেই বাধ্য হয়ে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষরা সচেতন, তাই তাদের প্রতি এই বিদ্বেষ ও ঘৃণা তারা টের পেয়েছে। তাই তারাও কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলারিজম’ বলে এক শব্দ লিখে রেখে সকল নষ্টামি চিন্তাকে প্রতিরোধ ও শায়েস্তা করতে, কিছুটা রাগে ক্ষোভে পাল্টা – আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস বা রাষ্ট্রধর্ম ধরনের শব্দ বা ধারণা ঢুকিয়ে রেখেছে। যদিও তারা ভালোই জানে, এগুলো লিখে রাখা বা না রাখার সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নড়াচড়া হবে না, হওয়ার কোনোই সম্পর্ক নেই।

    যারা নষ্টা-সেকুলারিজমের শয়তানি থেকে বেরিয়ে শুদ্ধ হতে চান, তারা আরেকটু একটু খোঁজখবর করতে পারেন। রাজা রামমোহন রায় যাকে ভারতের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলরা ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় ‘রেনেসাঁর আদিগুরু’ বলে সবাই জানেন ও মানেন, তিনিই তো ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন, ১৮১৫ সালে। তা হলে এখানে রেনেসাঁর আদিগুরু ধর্ম চালু করেন কেমনে? আর সেই ধর্ম এখানে ইতিবাচক হয় কেমনে?

    প্রগতিশীলদের এক প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন। কারণ তার দাদা দ্বারকানাথ শুধু রামমোহনের অনুসারী ছিলেন না, ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা গেলে তিনিই ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ১৯১১-১৫ সময়কালে ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র ‘তত্ত্ববোধিণী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

    কিন্তু তবু সেকুলারিজম বলি আর নাই বলি, বৈষম্যহীন সার্বজনীন সম-নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র কেন কায়েম হয় নাই আমাদের তিন রাষ্ট্রে – আমাদের সেই আদি-পাপ অন্যখানে – সেকথা এখনও বলা হয় নাই। রামমোহন ভাবতেন ১. রাষ্ট্র মানেই তা নেশন-স্টেট, ২. আর নেশন বা জাতি মানেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি।

    এই বোধটাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক ধারণা বা রিপাবলিক ধারণা বুঝতে না পারা বা পৌছাতে না পারার প্রধান বাধা, মুল কারণ – যেটা রামমোহন রায়ের আদি-পাপ। আমরা তিন রাষ্ট্র যার ভুক্তভোগী সাফারার!

    আর এসব ধারণা মূলত কলোনিবৃটিশ রাজের আমলের জাতি বা জাতিরাষ্ট্র এর ধারণাজাত। কিন্তু হিটলারের উত্থান ভয়াবহতা দেখার পরে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে নিজেদের ভূল সংশোধন অরে নিয়েছিল। আমরা যার খবর জানি না।

    তবু রামমোহন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন করেছিলেন সেটা মনে করা ভুল হবে।  আসলে ভারতের সবাইকে ব্রাহ্মধর্মে নিয়ে গিয়ে এরপর সবাইকে নিয়ে এক ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্র গড়তে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বলেই এই ধর্ম চালু করেছিলেন। তবে তা সফল হয়নি। যদি সফল হত তবুও এটা রাষ্ট্র বিষয়ে ভুল ধারণা ।  আর প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনাকারী এই রামমোহন রায়। তা হলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন এবং জিন্নাহকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দায়ে অভিযোগ আনা কিভাবে সঠিক হয়? সর্বোপরি ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস দল সেটা তো এই রামমোহন রায়ের উদ্যোগেরই শেষ পরিণতি।

    তবু একজনের কথা এখানে উল্লেখ করে রাখি যার “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার” ইচ্ছাটা উদ্দেশ্যমূলক। বাকিটা পাঠকেরা আরও খোঁজ করেন। তিনি হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়। ১৮৭৯ সালে তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধপুস্তক – নাম ছিল ‘সাম্য’। কিন্তু বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন, আর ছাপান নাই। রামমোহন বলা যায় অকালেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। কিন্তু এরপরেও যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না এটা সকলেই বুঝতে পারছিলেন। শেষে ১৮৭২-৭৮ সালের মধ্যে এটা তিন টুকরা ভেঙ্গে যায়। এরপর যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে বলে এটাকে সাফাই হিসাবে ব্যবহার করে হিন্দু প্রকল্প মানে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প করে আগিয়ে যান তাঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম। এসবেরই পরিণতি ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস। কিন্তু মুসলমানেরা কেউ একটা হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পকে নিজের মনে করে নিবে সেকথার কোন জবাব দেয় নাই। বরং এদের স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র চিন্তা যে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প চিন্তা তা ক্রমশ লুকিয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। সামনের হিন্দু শব্দটা উচ্চারণ এড়িয়ে চলেছে। তবু প্রধান চিন্তার ভুল বা আদি-পাপ হল রাষ্ট্র মানেই ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র-বুঝ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২১ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বীনা সিক্রির নষ্ট সেকুলারিজম” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    গৌতম দাস

    ০৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3cY

    প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে-পরের দিনগুলোতে সাধারণত দেখা যায় সরকার প্রধানেরা নিউইয়র্কমুখী হচ্ছেন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের [UNGA, UN General assembly] সভায় যোগ দিতে ব্যস্ত দিন কাটান। সাধারণ পরিষদের সভা মানে, বছরে এই একটাই গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠান যা সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র এখন প্রায় ১৯৩ টি। এখানে সবার হাজিরা বাধ্যতামূলক না হলেও জাতিসঙ্ঘের এই জমায়েতেকে যেন এক ‘বিশ্বসভা’। মানে যা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীর হাজির থাকার এক প্রতিনিধিত্বমূলক বিশ্বফোরাম বা বিশ্বদরবার ধরনের ধারণা – সেটা কোথাও ঘোষণা করা না থাকলেও, ক্রিয়াশীল থাকে বলে মনে করা যায়, এখানেই এর গুরুত্ব। এ’বছরও সেপ্টেম্বরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও ফারাক এতটুকুই ছিল যে এবার কোন সরকারপ্রধানই কোভিডের কারণে জাতিসংঘে নিজ সশরীরে হাজির হননি, আগাম রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদীও বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন।

    জাতিসঙ্ঘ কেমন ধরনের প্রতিষ্ঠান আর কী তার ক্ষমতার এখতিয়ার ও সীমা? এটা কী পারে বা পারে না? এ নিয়ে সাধারণ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে, এমনকি সরকারপ্রধান বা অনেক দেশের একাডেমিক পর্যায়েও।

    সাধারণত কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান আর সাম্য ধারণাটা প্রায় হাত ধরাধরি করে চলে। এজন্য সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান মানেই তা মাস (ইংরেজি mass বা বাংলায় গণ) অর্গানেইজেশন বলে ধরে নেয়া হয়। আর কোন গণসংগঠন মানেই সেখানে সদস্যরা সবাই সমান; এমন সাম্যতাই সেখানে ভিত্তি বলে সবাই মেনে নিয়ে থাকে। তবে গণপ্রতিষ্ঠান মানেই সবাই সেখানে সমান – এটা আধুনিক কালের ধারণা। কিন্তু এটারইবা আসল মানে কী?

    তা হল, যখন রাজা বা সম্রাটের শাসন বা রাজবংশের দিন ফুরিয়েছে আর এর বিপরীতে পাবলিক বা জনগণের শাসন বলে ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। কোনো ব্যক্তি বা রাজা নয়, সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস পাবলিক বা জনগণ।  প্রতিটা নাগরিক তবে সম্মিলিতভাব ক্ষমতার উৎস, একথা থেকে যেখানে সবকিছুর শুরু। আর ঐ সমাজে ও সংগঠনে ‘রাজকীয় মর্যাদার’ কোন বিশেষ বলে কেউ থাকে না। বরং পাবলিকের রাষ্ট্রটাই হল সমাজের সবচেয়ে বড় বা প্রধান গণপ্রতিষ্ঠান। তাই কোন ব্যক্তি বা রাজার খামখেয়ালি না, পাবলিক আর পাবলিকের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অন্তত হওয়ার কথা।
    এই সূত্রে পাবলিকের রাষ্ট্র বা ‘রিপাবলিক’ [republic] কথাটা এসে গেছে সেখানে রাষ্ট্রসহ যেকোনো গণপ্রতিষ্ঠান মানেই ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সবাই সমান, এমন বৈষম্যহীনতার এক সাম্য ধারণা ও নীতি বজায় থাকতে হবে।

    এখন এই বিচারে তাহলে ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট লিখে যখন জন্ম হয়েছিল সেকালে এর সব সদস্য রাষ্ট্রই সমান এমন ধারণার ভিত্তিতেই একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও ব্যতিক্রম আছে। যেমন- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্যরা সবাই সমান আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘেরই আরেকটা ফোরাম আছে নিরাপত্তা পরিষদ [UNSC, UN Security Council] যা এক অর্থে সাম্যনীতির ফোরাম নয়। তাহলে কী এটা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের নীতি ভঙ্গ করে গড়া হয়েছে? জবাব হবে, না। ঠিক তা নয়; আর সেটা জরুরিও নয়। তাহলে? ব্যাপারটা কী, কিভাবে এটা ব্যাখ্যা করব?

    আমরা এ বিষয়ে অনেক ফতোয়া পাবো, এমনকি অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানেও; যেখানে হয়ত স্টুডেন্টরা শিখছে – জাতিসঙ্ঘ ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক শব্দটা এখানে আনলাম অনেকে ব্যবহার করে বলে।  প্রথমত ‘গণতন্ত্র’ খুব ভালো শব্দ নয়, বরং চাতুরীর শব্দ।
    পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বিকল্প বা সমতুল্য ধারণা ‘গণতন্ত্র’ নয়। যেমন এতে অনেকে কোন একটা দেশের বেলায় হয়ত বলবে,  “সেদেশে নির্বাচন হয়, চাইকি সেটা নিশীথভোট হয়ত, অতএব গণতন্ত্র আছে” – টাইপের কথা বলে রিপাবলিক ধারণাকে অর্থ তাৎপর্যহীন করে ফেলতে পারে। তাই এখানে দুটি পয়েন্টে কথা বলব।

    প্রথম পয়েন্টঃ আমরা জাতিসংঘের প্রসঙ্গে কথা বলছি মানে প্রসঙ্গটা এখানে ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রবিষয়ক; আর আমরা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে একাকার করে দেখছি। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক করে দেখলেও কোনো ভুল হয় না, এ কথাও সত্যি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয় ও হবেই। লক্ষ্যণীয়, এছাড়াও আমরা নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে কথা বলছি মানে এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতরের বা অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় নিয়ে। রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় মানে এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা খেয়াল রেখে তা লঙ্ঘন যাতে না হয় এভাবে কথা বলতে হবে। সোজা কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা এসোসিয়েশন এমনটা বুঝে নিয়ে,এরপর প্রশ্ন হল,  জাতিসঙ্গে বসে নেয়া সবার সিদ্ধান্ত কী কোনও একটা সদস্য রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করা যাবে? কারণ তা করতে গেলে তো ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে? এজন্য, যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর মনে করা যায় না, তেমন জাতিসঙ্ঘেরও। অর্থাৎ সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ কোন সুপার-স্টেট হতে পারে না; কিংবা আরেক বড়ভাই রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতেই পারে না। (তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে করা যায়।) কাজেই ব্যক্তিদের নিয়ে একটা সমিতি বা ক্লাব ব্যক্তির উপর ক্লাব বা দলের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেও এই ব্যাপারটা রাষ্ট্রের বেলায় খাটতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা কোন জাতিসংঘ তার কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে না। রাষ্ট্রই শেষ কথা এর উপর আর কেউ কর্তা থাকতে পারে না। তাই, এখানে এসে যা ব্যক্তির বেলায় সত্য ও প্রযোজ্য মনে করা যায় তা রাষ্ট্রের বেলাতেও সত্য ও প্রযোজ্য বলে একাকার করে দেখা যাবে না, ভুল হবে।

    তাহলে কী জাতিসঙ্ঘের কোন সিদ্ধান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদস্য রাষ্ট্রের  উপর প্রযোজ্য নয় বা করা যাবে না? তাহলে হয়ে আছে কী করে? সেটা বুঝার জন্য সার্বভৌমত্ব কথাটা খেয়াল রেখে – একটা কায়দা করা হয়েছে – সেদিকে তাকাতে হবে। যেমন ধরা যাক, সব রাষ্ট্র বসে কোন নতুন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন তৈরি করতে লাগলো। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ধরা যাক তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দলিল প্রস্তুত শেষে ওই দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে এলেন। এখন ঐ আইন মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করানো কী যাবে? কারণ সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। আমাদের সংসদের বাইরের কোন আইন আমাদের কেন মানতে হবে? তাই এই জটিলতা এড়িয়ে যেতে বা এথেকে বিরত থাকতে যা করা হয় তা হল, জাতিসংঘের ঐ মিটিংয়ে পাশ হওয়া ওই আইন বা কনভেনশনটাই এবার দেশে নিয়ে এসে সরাসরি আমাদের সংসদে পেশ করা হয়। যেন আমরা আমাদের সংসদে কোনো প্রস্তাব পেশ করছি এভাবে। এইবার সেই প্রস্তাব আমাদের সংসদে পাস হওয়ার পর সেটা আর জাতিসঙ্ঘের আইন বা কনভেনশন বলে বাংলাদেশ মেনে চলছে এমন নয়। সেটা আমাদের সংসদে পাস হয়ে যায় যদি তবে তা আমাদের সংসদে গৃহীত আইন বলে মানতে কোন আর অসুবিধা নাই। এই প্রক্রিয়াটাকেই র‌্যাটিফিকেশন [ratification] বা অনুসমর্থন করে নেয়া বলে।  আর এই হল সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে আর জাতিসঙ্ঘের সাথে দেশের সম্পর্ক রক্ষার সমাধান।

    দ্বিতীয় পয়েন্টঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৩৩-১৯৪৫ সালের এ সময়ে একনাগাড়ে চারবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের আইডিয়া বা ইমাজিনেশনের উদ্গাতা মূলত তিনি। এর পেছনের কারণ, তিনি হলেন সেকালের কলোনি শাসন উচ্ছেদ করে দেয়ার পক্ষের লোক। যাতে এরপর স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজ অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমেরিকান পুঁজিবাজারের ঋণখাতক হতে চাইলে হতে পারে। মানে নিজ প্রয়োজনীয় ঋণের গ্রহীতা অর্থে পুঁজিবাজারের ক্রেতা হয়ে উঠে। যাতে দুনিয়ায় কলোনি দখল শাসনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক ভাল স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একাজে তিনি আবার যুদ্ধের বিপক্ষের লোক। এজন্য সবাইকে নিয়ে আগে আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থ বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষের লোক। কারণ তাঁর অনুমান যুদ্ধে পুঁজি-সম্পদ বিনষ্ট হয় মারাত্মক, তাই এমন বাস্তবতা থেকে তিনি সরতে চাচ্ছিলেন। [যদিও তার স্বপ্ন বা আইডিয়া আর পরবর্তিতে বাস্তবের আমেরিকা ১৯৫৩ সাল থেকেই আর এক থাকে নাই। তবে তা নিয়ে কথা আজকের প্রসঙ্গ নয়।] যদিও সেকালে তার প্রস্তাব ইউরোপের নেতারা সহজেই মেনে নিয়েছিল কারণ হিটলারের আক্রমণের মুখে  তাদের তখন  আমেরিকার অধস্তন হয়ে পড়া এবং পুরা মুখাপেক্ষি হয়ে থাকার দশা তাই। কিন্তু তখনকার  সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন তা মানতে চাননি। স্তালিনের সোজা আপত্তির দিকটা ছিল, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ও  চলে এমন এক জাতিসঙ্ঘ গড়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কলকাঠির প্রভাবে কোন সময় সেই জাতিসঙ্ঘ তার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যদি সংখ্যালঘু বলে সোভিয়েত ইয়নিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তখন কী হবে?
    আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র ওর ঊর্ধ্বে বা বাইরের জাতিসঙ্ঘ বলে কারো সিদ্ধান্ত কেন বাধ্য হয়ে মানবে? অতএব স্তালিন তা একেবারেই মানতে নারাজ।

    ভেটো ধারণার আবির্ভাবঃ
    এই জটিলতা সমাধান করতেই আসে ‘ভেটো’ সিস্টেমের আইডিয়া। এর সোজা ব্যবহারিক মানে হল, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই ভেটোওয়ালা সদস্য রাষ্ট্রের একটাও যদি আপত্তি করে, না ভোট দেয় (না-ভোটটাই ভেটো) তবে সেটা আর সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। সেজন্য এটা আলাদা করে নিরাপত্তা পরিষদ এই ফোরাম, এখানে পাঁচ রাষ্ট্রের একটাও যদি কোন ইস্যুতে আপত্তি করে তাতে আলোচনার প্রস্তাব ভোটাভুটির আগেই বাতিল হয়ে যাবে। তবে এটা গেল ভেটো ব্যবস্থার নেগেটিভ দিক থেকে ব্যাখ্যা। এটাকে উল্টা ইতিবাচক করে বলা যায়, উপস্থিত দুনিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাঁচটা পরাশক্তি বা বিশেষ রাষ্ট্র একমত না হলে সেটা নিয়ে এরপর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। দুনিয়ার ক্ষমতা-ভারসাম্যের জন্য সবার আগে পাঁচটা বিশেষ রাষ্ট্রের একমত হয়ে থাকা জরুরি একথাটা সবার মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই আসলে জাতিসংঘের জন্ম। এই আইডিয়া হাজির করেই রুজভেল্ট স্তালিনকে নিজের নৌকায় তুলতে পেরেছিলেন, জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হয়েছিল।

    মফস্বলি মোদীর এবারের জাতিসংঘঃ
    এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল এক প্রধানমন্ত্রীর মত জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে তাই। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ব জাতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  ভারতের “সীমান্ত সঙ্ঘাতের” এই “মোক্ষম সময়ে” প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ভারতের “নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন”- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার। মানে আনন্দবাজারের কথা শুনে মনে হচ্ছে রুজভেল্টসহ সবাই নিজের নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো তুলেছিল” বলেই যেন জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল! মফস্বলি আর কাকে বলে! আনন্দবাজার আর, নেহেরু থেকে প্রণব মোদী এভাবে সকলেই যদি মফস্বলি হয়ে যায় তো ভারতের ভবিষ্যত কী? একটু পড়াশুনা ও তথ্য সংগ্রহ আর বুঝাবুঝি ভারতকে কে করাবে? কঠিন এক পরিস্থিতি! আনন্দবাজারসহ এসব উগ্র হিন্দুজাতিবাদের ধারণা হল যে ঐ নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা এক উদগ্র হিন্দুজাতি হয়ে মোদীর মত যুদ্ধবাজ-দেশপ্রেমিক [jingoist] নেতার নেতৃত্বে জোরালো করে তোলা – এটাই হল চাবিকাঠি! যেটা একেবারেই হিটলারের জর্মানির নীলচোখের জর্মান জাতশ্রেষ্ঠত্ব চিন্তা। সে ভিত্তিতেই এবারের মোদীর বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট [Full text of PM Modi] লিখেছেন সম্ভবত হিটলারকে গুরু মানা কোন আরএসএস নেতা!

    কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী? কোন বক্তব্য? আর সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ, কী মিডিয়া ঠিক কী বুঝেছে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বুঝেনি তাও নয়। আসলে এযুগে এখনো যারা “জাতিরাষ্ট্র চিন্তার” রাজনীতিতে আছেন কোন জাতিসংঘ বা এর চেয়েও কোন উন্নত প্রতিষ্ঠান বা দুনিয়া গড়া তাদের বুঝের বাইরেই থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও উলটা এরা যদি হিটলারের মত আরো উগ্র-জাতি চিন্তার কেঊ হন তাহলে তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদীর এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝে উঠতে পারে নাই। অন্তত নিচের কয়েকটা পয়েন্ট থেকে তা বুঝে নেয়া যায়।

    এক. জাতিসঙ্ঘের জন্ম হল সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন “জাতিরাষ্ট্র” [nation state] ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখার পরে জাতিসঙ্ঘের জন্ম ততপরতার সমান্তরালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫০ সালে স্বাক্ষর নেয়া শুরু আর ১৯৫৩ সালে কার্যকর) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি। একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। বরং উলটা ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমত দানব হয়ে উঠেছে। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। কেবল জাতীয় স্বার্থের খাতিরে এটা বলছেন এই সাফাই দিলেই সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর সব জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই ‘জাতীয়স্বার্থ’ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

    দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কোন কথিত জাতির ভিত্তিতেও নয়। কাশ্মির ভূখন্ডের বাসিন্দা নির্বিশেষে তাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য, রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও তা কেউ করেন নাই। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাদের রাজনীতি ও মহান ভারত রাষ্ট্র খাড়ায় আছ। রাম মোহন রায় থেকে শুরু করে (হিন্দুত্বের) জাতিরাষ্ট্র এখনও তাদের রাজনীতির মূলভিত্তি। তাতে কেউ হিন্দুত্বের ভিত্তি কথাটা গলা নামিয়ে বলে বা মুখে উচ্চারণ না করেও ধরে নিয়ে কথা শুরু করে। আর মোদীর মত যারা এরা সবাই গলা চড়ায় প্রকাশ্যে বলে, এই যা ফারাক। নেহেরুও তাই কাশ্মীরের রাজা খুজে বের করেছে। অথচ কাজটা সহজ ছিল কাশ্মীরের ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরণের জনগণের কাছে এপ্রোচ করতে পারতেন, তাদের সমর্থন চাইতেন যেই রাজনীতিতে নেহেরু যেতেই পারেন নাই, বা করতেন না।
    আর এছাড়া সুযোগ পেলেই অন্য বা পড়শি রাষ্ট্রকে অধস্থন কলোনিকৃতের মত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। কলোনি করে নেয়া ছাড়াও যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হওয়া যায় এটা ভারতের বুঝে দেখা হয় নাই। কলোনিচিন্তাই তার কাছে পথ থেকে গেছে। ভারতের ধারণা এটাই নিজরাষ্ট্র পরিচালনার খাসনীতি (নেপাল-ভারত চুক্তি এর খাস উদাহরণ)। অথচ এর উলটা কলোনিদখল হারাম – এই ধারণার উপর জাতিসংঘ দাঁড়ানো।

    তিন. একালের জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপ মারতে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে। কারণ ভারত খবরই রাখে নাই যে আমেরিকার সেই মুরোদ এখন আর রাখে না। যা ছিল জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগে। যা এখন আর কিছুই নাই। এখন কেউ কাউকে সদস্যপদ পাইয়ে দিতেই পারে না।
    তাই আমেরিকান ঝুলানী মুলা খেয়ে বিশ্বাস করেছিল প্রণব মুখার্জি। গত ২০১০ সালে হাসিনার প্রথম ভারত সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রণব তাই লেখিয়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতে ভেটো সদস্যপদ পায় যেন তা সমর্থন করে। প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ এমনই যে তিনি বুঝেছিলেন হাসিনার মত অনেক দেশের সমর্থন বাগানো যেন জাতিসংঘে ভারতের ভেটোসদস্যপদ হাসিলের উপায়।
    ব্যাপার হল, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? ব্যাপারটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদীও তাই বিশ্বাস করে বলছেন, “আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?”। মোদী পুরাই বেকুবি আরো ধারণাটা হল, এই কথাটা জোর দিয়ে উদগ্রভাবে বললে বোধহয় কেউ শুনবে বা কাজ হবে। মোদী বক্তৃতায় এবার সেটাই করেছেন। আর আনন্দবাজার আরেক বেকুব হয়ে এটারই প্রশংসা করে ছেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কথা হল, মোদী এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন? নাকি কারও কাছে এটা চাওয়ার জিনিষ কিনা সেটা মোদী বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চিত হয়েছেন? উগ্র জাতিবাদীর কাছে আসলে সব কিছুই জোর দাবি করে নেওয়ার জিনিষ! এর বাইরে কোন ভাবনা তাদের কাজ করে না!

    প্রথম কথা, এটা এককালের মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগের সময়ের কোন রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন  ছিল যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। যা সেকালে একমাত্র আমেরিকারই ছিল। এমনকি সেকালের স্টালিনেরও ছিল না। ইউরোপেরও কারোই না; তারা হিটলারের মার খেয়ে ১৯৪১ সালের আগষ্টের পর থেকে একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। ফলে এরা নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক মত হাসিল হয়েছে কিনা কেবল এতেই সন্তুষ্ট ছিল। যেমন পঞ্চম দেশ চীন এর মধ্যে ঢুকে নিজ ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিল কী করে?

    [যারা পড়তে কম সময় দিতে চান তারা নিচের প্যারাটাই বাদ দিয়ে পড়তে পারেন।]

    চীন কিভাবে ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিলঃ
    এর জবাবটা একালে যে জানে সে-ই সেকালের পুরা ব্যাপারটা বলতে পারবে। চীন আসলে ছিল সেকালের পুরা সময়জুড়েই  জাপানের কলোনি, পুরাটা না হলেও চীনের অন্তত ২৫% এর মত ভুমি সমসময়ই জাপানের দখলে ছিল।  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জর্মান ইতালি ও জাপানের বিরোধী যে মিত্রশক্তিজোট গড়ে উঠেছিল আমেরিকার রুজভেল্ট তার মূলনেতা হিসাবে নিজ স্বপ্নের আগামি দুনিয়া যার হবু গ্লোবাল নেতা হবে আমেরিকা, সেই দুনিয়ায় এশিয়ান কলোনিশক্তি হিসাবে জাপানকে ধবংস করে চীনকে এশিয়ার হবু নেতা ও আমেরিকার পক্ষের দেশ হিসাবে দেখতেন তিনি। মূলত রুজভেল্টের সে স্বপ্ন-কল্পনার কারণে চীন ভেটো সদস্যপদ পেয়ে গেছিল। এমনকি এটা চীনও তা চেয়েছিল বা কল্পনা করেছিল কখনও তা জানা যায় না।
    কিন্তু একটা আসল কথা এখনও এখানে বলা হয় নাই। আমাদের জেনে নিতে হবে। আমরা এতক্ষণ  যে চীনের কথা বলছি সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের চীন তখন উদয় হয় নাই, হয়েছিল আরও চারবছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই এতক্ষণ চীন বলতে বুঝিয়েছি – চীনা ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির নেতা চিয়াং কাইসেকের চীনের কথা। কিন্তু রুজভেল্ট ও কাইসেকের কপাল পোড়া দুঃখটা হল, ১৯৪৫ সালে কলোনিশক্তি জাপানের পতন হলে এর মাত্র চারবছর পরেই ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব চীনে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর চিয়াং কাইসেক পালিয়ে সেকালেও চীনেরই ভুখন্ড কিন্তু আলাদা দ্বীপ তাইওয়ানে, আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর একদিকে মাওয়ের বিল্পবীদের লংমার্চের ক্লান্তি অন্যদিকে সেকালের হবু বিশ্বশক্তির দুই নেতা স্তালিন ও প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান (১৯৪৫ সালে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এই ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন) এদের চাপাচাপিতে “যুদ্ধের বদলে শান্তির” কথায় মাও আর ফিরে তাইওয়ান দখলে যান নাই, পরে দেখবেন বলে ছেড়ে দেন। এতে পরবর্তিতে চিয়াং কাইসেক তাইওয়ানেই ঘাটি গেড়ে বসে যায়। যেটা এখনও আছে। এটা পরে আরও পোক্ত হয়ে যায় আমেরিকার কারণে। কারণ মাওয়ের চীনই আগের জাতিসংঘে রেজিষ্টার করা ভেটো সদস্যপদের চীন হিসাবে নিজের প্রতিনিধিত্ব চাইলে আমেরিকা এতে সমর্থন দিতে এবার গড়িমসি শুরু করেছিল। স্তালিনও কিছুই করতে পারে নাই। মাওয়ের চীন নিচু স্বরে মনে করে স্তালিন চায় নাই তাই হয় নাই। তবে সেসময় মাও চাইলে হয়ত আলাদা নতুন চীন হিসাবে সদস্যপদ পেতে পারত কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের ভেটো সদস্যপদ চিরদিনের মত হাতছাড়া হয়ে তাইওয়ানে হাতে থেকে যেত। তাই মাওয়ের  চীন এরপর জাতিসংঘের সদস্যপদ নাই এভাবে এমন চীন হয়েও রয়ে গেছিল। কিন্তু কতদিন?
    একনাগাড়ে (১৯৪৯-১৯৭১) এই সময়টা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রিত, খাওয়া না খাওয়া হয়ে আছি আর নির্যাতন, হত্যায় নিত্যসঙ্গি হয়ে দিন যাচ্ছে; ১৯৭১ মার্চের পরের সেই ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরের  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘটেছিল প্রকাশ্যে অনেক কিছু। সেখানে এক প্রস্তাবে উপর ভোটের সময় সংখ্যাগরিষ্টতার ভোটে “এতদিনের তাইওয়ানের ভোগ করা ভেটো সদস্যপদ” এর আসল হকদার মাওয়ের চীন বলে ঐ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আর এর চেয়েও বড় কথা এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ ঐ ভোটাভুটির সময়ে আমেরিকা ছিল আধারাজি কিন্তু আবার বাধাও দেয় নাই, এমন অবস্থান নিয়েছিল সেকারণে। কেন? এর পিছনের লম্বা কারণ হল, এটাই ছিল বিগত ১৯৬৮ সাল থেকে চলে আসা গোপনে চীন-আমেরিকান আলোচনা-বুঝাবুঝি-আলাপের প্রথম প্রকাশ। যেটা সেসময়ে ঘটেছিল পুর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিনিময়ে, আয়ুব-ইয়াহিয়ার শাসন কাল জুড়ে তাদের মধ্যস্ততায়। আর সাথে আরও সবচেয়ে নির্ধারক ঘটনাটা ছিল – ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন একথা বলে মাঝের দুদিন গোপনে কিসিঞ্জার সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন। সেসময়েরই একমত হওয়া ডিলের প্রথম সাক্ষাত আলাপ ও আতাঁত ছিল সেটা। মূলত মাওয়ের চীন আমেরিকান পুঁজি ও ব্যবসা বাণিজ্য চীনে প্রবেশ করতে দিবে যদি নিক্সনের আমেরিকা বিনিময়ে  চীন নামের ভেটো সদস্যপদ তাইওয়ানের বদলে এটা তখন মাওয়ের চীনের হাতে এনে দিবে তাতে রাজি হয়। এই ছিল ডিল। এভাবেই মাওয়ের চীন জাতিসংঘের ভেটো সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর মাঝের সময়ে লম্বা আলোচনা ও বুঝাবুঝি করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় দেশে এমবেসি খুলে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু করেছিল।

    গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা আর কাউকে এখন ভেটো সদস্যপদ পাইয়ে দিবার বা এমন কোন নেতাগিরি মাতব্বরি করারই মুরোদ রাখে না; সব এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত আগামিতেও  জাতিসংঘের কোন সংস্কার হওয়া অথবা এমনকি ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকাও বদলাবে না,  যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ এসে বসছে। সেটা এখনই বলে দেয়া যায়। কারণ, এটা হবে সেই হবু নেতার নতুন করে জেগে উঠা প্রভাব ইচ্ছা বা এখতিয়ার। অন্যভাবে বলা যায়, তার সাথে অন্যরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা পাবে, নাকি কেউই পাবে না অথবা বাদ যাবে। এখন যদি হবু সে নেতা চীন হয়, তবে তাই! সমস্যা হচ্ছে জাতিসংঘের উত্থানের সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে আপনার স্টাডি বা পরিস্কার বুঝাবুঝি না থাকলে আপনি মফস্বলি চিন্তাই তো করবেন, আমেরিকার টাউটারি মিথ্যা আশ্বাসই আপনার  কাছে সত্যি মনে হবে। আর এই বেপুথে যেতে আপনাকে আরও টানবে আপনার জাতিরাষ্ট্র চিন্তা। অথচ ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই কলোনিচিন্তাটাই, এই জাতিরাষ্ট্র চিন্তা যে  মৃত সে খগবর আপনি রাখেন নাই।

    আজকের ভারত মানে এই হিটলার-অনুসারি হিন্দুত্ববাদী ভারত, একে  চীন আগামিতে নতুন নেতা হলে  কেন একে ভেটো সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দিবে? আর এমন সদস্যপদ পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্য হবার জন্য তবু অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য অ-হিন্দু সকল নাগরিকের প্রতি চরম বৈষম্য করে, কোন সাম্য আচরণের কথা চিন্তাও করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

    আবার মোদীর ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদীর ভারত হল এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নাই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদী এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে!
    দেখা যাচ্ছে এটাই এখনও ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৩ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি-প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    গৌতম দাস

    ২৭ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-37d

    Sharad Pawar: The God of Broken Mandates, YOUTUBE Rare Interviews, Crux Files

    আপনি যে ভুখন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন চাইলে কেবল তার কথা মনে রেখে নিজের সম্পর্কে কথা বলতে পারেন। নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন এভাবে। অথবা অন্যটা হল,  এই গ্লোব বা বিশ্বের যে অংশ আপনার ঐ ভুখন্ড, গ্লোবাল পটভুমির কথা খেয়ালে রেখে এবার আপনি আপনার ভুখন্ড সম্পর্কে অনুভবের কথা বলতে পারেন। এখানে খেয়াল করেন, দ্বিতীয়টাও কিন্তু আপনার সম্পর্কেই অনুভব। কিন্তু ফারাক হল, এখানে এক গ্লোবাল পটভুমিতে আপনি, এভাবে।  তাতে এই দুই ভাষ্য হবে দুরকম।  সেক্ষেত্রে প্রথমটাকে বলা হবে এক লোকাল ভাষ্য আর দ্বিতীয়টাকে গ্লোবাল ভাষ্য।  অর্থাৎ আপনারই  সম্পর্কে প্রথমটা হল এক সংকীর্ণ ভাষ্য আর পরেরটা পুর্ণ ভাষ্য। এই হল লোকাল বনাম গ্লোবাল ভাষ্যের ফারাক।
    [লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেছে, এড়াতে পারিনি। তবে একটা উপায় আছে, যারা ছোট ভার্সানে পড়তে চান তারা কিছু প্যারা বাদ দিয়ে পড়তে পারেন। যে সব প্যারা এক ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে শুরু এগুলোই সেই প্যারা। বাদ দিয়ে পড়া যায় এখানে এমন দুটা প্যারা আছে। এতে লেখাটা অনেক ছোট হবে। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ]

    গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই ভারতের প্রবীন রাজনীতিক শারদ পাওয়ার [Sharad Power] কথা বলেন। তবে তিনি একা নন বরং ভারতের প্রায় সব রাজনীতিকই এমন, তাই তাঁকে সব রাজনীতিকেরই প্রতীকী প্রতিনিধি হিসাবে ধরে নিয়ে কথা হবে। এঁদের দেশ বলতে একটা ‘লোকাল’ বুঝের ধারণায়,  আর এক কল্পনার জগতে বাস করা রাজনীতিবিদ। মানে গ্লোবাল প্রেক্ষিতে থেকে এবার লোকাল অনুভবটা করতে পারেন না এরা, মিসিং। এঁরা মনে করেন তারা ‘স্বনির্ভর’, ‘আত্মনির্ভরশীল’, ‘স্বদেশ’ ইত্যাদি শব্দের লোক। কিন্তু আসলে তাঁরা এসব শব্দের মিথ্যা ফুলজুড়ি বিলানো ধরনের রাজনৈতিক জগতের জন্য লড়ছেন। যদিও  এঁদের অনেকেই জানেন এটা বাস্তব নয়, বাস্তবে এসব নেই, পরাবাস্তবতা অস্তিত্বহীন। তবু এটা কেবল তাদের কল্পনায় আছে। রেখে দিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন হোক অবাস্তব তবু এর একটা ‘উপযোগিতা’ আছে।  বাস্তবায়ন অযোগ্য হলেও এটা তাদের লাগে পাবলিকের কাছে কিছু স্বপ্ন বিলিয়ে কল্পনায় জগতে পাবলিককে প্রবেশ করিয়ে যাতে আবেগী কিছু মিথ্যা কথা বলে তাদের সংযত রাখতে পারেন। আবার সময়ে উস্কে তুলতে পারেন – এমন কিছু শব্দ দিয়ে যেমন দেশপ্রেম, দেশভক্তি, হিন্দু জাতি মহান অথবা ভারতীয় জাতি মহান ধরনের অলীক এবং অর্থহীন। একদিকে এরা গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা গ্লোবাল অর্ডার বলে দুনিয়াতে কিছু আছে কি না তারা খোঁজ করে দেখেননি। আবার অন্যদিকে তবু কেবল ভুয়া স্বদেশিপনায় অলীক স্বপ্নগুলোই তারা বিক্রি করেন, এটাই তাদের রাজনীতি। অন্তত ভোট যোগাড়ের কৌশল। এটাই ভারতের নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র বাদীদের অনড় রাজনীতি। তাতে এরা হিন্দুত্বের জাতিবাদী বিজেপিই হোক কীংবা  সফট হিন্দুত্বের জাতিবাদী কংগ্রেস যেই হোক। জাতিবাদী সকল রাজনীতির বৈশিষ্ট এটা।

    কেন শারদ পাওয়ার প্রসঙ্গঃ
    শারদ পাওয়ার, ৮০ বছর বয়সী ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন, যিনি এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়। মূলত মারাঠা জনবসতির রাজ্য মহারাষ্ট্র, যার রাজধানী মুম্বাই; আর এর এখনকার ক্ষমতাসীন রাজ্য-সরকার এক কোয়ালিশন সরকার। এতে শারদ পাওয়ার কেবল এক অংশীদার শুধু নন, অ্যাংকর বলা যায়, যিনি জোট ধরে রাখার ক্ষেত্রে এক বড় মুরব্বির ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই রাজনীতিবিদ ১৯৬০ সালের দিকে ২০ বছর বয়সে প্রথম কংগ্রেস দলে নাম লিখিয়েছিলেন।  আর অনেক পরে, তিনি আসলে ভারতের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সমসাময়িক; এই অর্থে যে, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী মারা যাওয়ার পর তাঁরা একসাথে দলের প্রধান পদের দাবিদার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকা শেষে নরসীমার পক্ষে যায়। নরসীমা প্রধানমন্ত্রীও হন, আর শারদ পাওয়ার পান পরের ভারী পদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্ব। অবশ্য তিনি একবার কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীও ছিলেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী আর অনেকবার অনেক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন।
    কিন্তু ১৯৯৯ সালে এসে পুরনো প্রতিযোগিতার লেজ ধরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে আরো চাপের মুখে ফেলে হারাতে চেয়ে পাল্টা গান্ধী পরিবারের হাতে দলের সবক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল নিয়েছিল। পরিণতিতে একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে নিজেই নিজ আঞ্চলিক মারাঠাকেন্দ্রিক এক দল খুলে বসেন যার নাম- ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি। কিন্তু কংগ্রেসের প্রতি নিজের জন্ম-মোহটা থেকেই গিয়েছিল বলা যায়। তাই আমরা পরবর্তিতে দেখি প্রায় সব সময়ই তিনি কংগ্রেস দলের সাথে ঐক্যে নানান কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় অথবা কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন।

    শারদ পাওয়ার ভারতের রাজনীতিবিদদের এক সিম্বল বা প্রতীক ধরে নিয়েই আজকের কথা আগাবো আমরা। আমাদের আজকের লেখায় তাকে বেছে আনার গুরুত্ব হল – তার সমবয়সী ভারতীয় কোন রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিতে প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁরা অবসরে নয়ত মৃত। গান্ধী পরিবারে ক্ষমতা এক বংশ পরম্পরার মধ্যে কুক্ষিগত হওয়ায় একদিকে কংগ্রেসে আর অন্যদিকে মোদীর উত্থানের পর মোদীর দলেরও সিনিয়র প্রায় সব নেতাকে (ঘোষণা দিয়ে ৭০ বছর বয়স যাদের হয়ে গিয়েছে তারা সবাইকে) অবসরে পাঠিয়ে দেয়াতে, বলতে গেলে ভারতের সিনিয়র রাজনীতিকদের এক আকাল শুরু হয়েছে যার মধ্যে শারদ পাওয়ার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি ৬০ বছর একটানা রাজনীতি করেও এখনো সক্রিয় রাজনীতিক। আমাদের দরকার ছিল একজন ভারতীয় রাজনীতিকের যিনি অন্তত টানা ৬০ বছর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন এবং এখনো ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশেষ করে বর্তমান চীন সম্পর্কে কী ভাবেন তা সেই নিজ বুঝটাই সরাসরি অবলীলায় তুলে ধরেন বা ধরতে রাজি আছেন। কারণ ভারতের রাজনীতিকদের চিন্তার ঝোঁক বা ট্রেন্ডের একটা উদাহরণ হিসেবে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল যাতে তাকে দেখিয়ে প্রতীক হিসেবে বাকিদেরই এক নমুনা হিসাবে তাঁকে তুলে ধরে কথা বলা যায়। আমাদের মনে হয়েছে শারদ পাওয়ার তেমনই একজন, ভারতীয় রাজনীতিকদের কমন ট্রেন্ডের প্রতীক।

    এক মুখপাত্র ‘সামনা’ ম্যাগাজিনঃ
    মুম্বাইয়ে এখন মূলত শিবসেনা দল ক্ষমতায়। কিন্তু তারা তাদের সাবেক জোটসঙ্গী বিজেপিকে বাদ দিয়ে এবার সাথে কংগ্রেস আর এনসিপিকে নিয়ে মিলে রাজ্যক্ষমতায় সরকার গঠন করে আছে। আর মুরব্বি হিসেবে পরামর্শ দিয়ে শারদ পাওয়ার এই জোটকে  ইতোমধ্যেই কয়েকবার সরকার-পড়ে-যাওয়া  সামলিয়েছেন। অনুমান করা হয়, শারদ পাওয়ারের এসব দিক ও গুরুত্ব বিবেচনা করে – শিবসেনা দলের মারাঠি ভাষায় প্রকাশিত এক দলীয় মুখপত্র পত্রিকা আছে নাম ‘সামনা’- (এর একটা ভাল বাংলায় অর্থ হবে সম্ভবত মুখোমুখি বা ফেস করা) এই পত্রিকায় শারদ পাওয়ারের এক লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপা হয়েছিল। মারাঠি ভাষার সেই সাক্ষাৎকার পরে গত ১২ জুলাই আরেক (মূলত টিভি) মিডিয়া ‘নিউজ ১৮’ [NEWS18.COM]-এর ওয়েবে ইংরাজিতে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছিল। যা আমাদের হাতে মানে নজরে আসে।
    সময়কাল হিসেবে এই সাক্ষাৎকার হল চীন-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। ফলে সেসব ঘটনাকে পটভূমিতে রেখে পাওয়ার কথা বলে গেছেন।
    ভারতে কী রাজনীতি চলে আসছে? তা অন্তত গত ৬০ বছর ধরে যে চিন্তায় যে রাজনীতি তারা সব দলের সবাই যা করে এসেছেন এমন কোনো রাজনীতিকের নিজের মুখে এর স্বীকার করেছেন – এমনটা সহজে পাওয়া যায় না। আমরা এই সাক্ষাৎকারটাকেই নিব ভারতের দল নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের চিন্তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ঝোঁক বা ট্রেন্ড কেমন, কী – সেটা বুঝতে ও রেফার করতে একটা উদাহরণ হিসেবে।

    লোকাল বনাম গ্লোবালঃ
    আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, ভারতীয় রাজনীতিকদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধ একদমই নেই। এই কথাটা বলতে ঠিক কী বুঝব? শুরুতে যেটা বলছিলাম, তারা যে রাজনীতির বোধে অভ্যস্ত ও যাকে আদর্শ মনে করে বড় হয়েছে, সারা দেশে যেটা ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন প্রধান ধারার চিন্তা সেটা হল – এক পবিত্র দেশপ্রেম আর নেশন বোধ। মানে প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী বা সংক্ষেপে প্রবল জাতিবাদী এবং মূলত এক কাল্পনিক স্বদেশিপনা। আর সর্বোপরি এপ্রসঙ্গে উপরে যেভাবে বলছি, তাতে এ’এক “লোকাল” চিন্তা।  সম্ভবত এত প্রবল এর স্বদেশিপনা বলেই এরা এর মধ্যে আর গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধকে জন্ম নিতে দেয় নাই। বিজেপির মোদী অথবা শাওরদ পাওয়ার ইত্যাদি সবাই এই জায়গায় এক – কম অথবা বেশি স্বদেশিপনা আর আর লোকাল চিন্তাতেই সব সীমিত। আর এক কমন দিক এরা সকলে জাতি-রাষ্ট্র বাদী।
    সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাই মূলত এক লোকাল ফেনোমেনা – এক স্থানীয় সিস্টেম। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটা সিস্টেম – এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, কিন্তু তা স্থানীয়। আর একে লোকাল বা স্থানীয় বলছি বলে এর সাপেক্ষে একটা গ্লোবাল বা বাইরের বলতে কিছু আছে। হা আছে। ঠিক যে অর্থে রাষ্ট্র মূলত আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। তাহলে ওর বাইরের দিকের কী হবে? কোন বাইরের? কেবল নিজেরই বাইরের? না। সব রাষ্ট্রেরই কমন বাইরের দিক যেটা তা নিয়ে কথা বলছি। মানে কেবল একটা রাষ্ট্রের কথা আর বলছি না। একটা রাষ্টের মধ্যে প্রসঙ্গ আর নাই, বের হয়ে গেছি। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্তঃসম্পর্ক এখন প্রসঙ্গ। এই আন্তঃসম্পর্কঅকে একটা ব্যবস্থাধীন করার জন্য একটা সিস্টেম লাগবে মানে আরেক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা লাগবে, এটার কী হবে? আসলে এটাকেই বলছি গ্লোবাল – এক গ্লোবাল সিস্টেম দরকার। গ্লোবাল অর্ডার, গ্লোবালি ছেয়ে থাকা এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার কথা বলছি।
    তাহলে এখন সার করে বললে, রাষ্ট্র বলতে যদি স্থানীয় বা লোকাল পর্যায়ের এক আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা বুঝি তবে রাষ্ট্রগুলোর বাইরের দিকের জন্য আরেকটা ব্যবস্থা, এক গ্লোবাল সিস্টেম বা গ্লোবাল অর্ডার লাগবে। এটাই গ্লোবাল অর্ডার, এর কথা বলছি।
    দুনিয়ায় প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার স্থাপিত হয়েছিল আমেরিকার হাতে বা নেতৃত্বে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, এতে বিজয়ীদের হাতে ও নেতার নেতৃত্বে। এই প্রথম অর্ডার চালু করতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করা হয়েছিল। এমন সব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যদিও প্রস্তুতির কাজ ১৯৪২ সাল থেকে শুরু বলা চলে।
    তার মানে কী এর আগে কোন গ্লোবাল ব্যবস্থা বলতে দুনিয়াতে কিছু ছিল না?  হ্যাঁ ঠিক তাই। আসলে এর আগের দুনিয়া বলতে ১৬০৭-১৯৪৫ এই সময়কালটা কলোনি যুগ। মানে তা দখল শাসন ও লূটের যুগ। তখন কলোনি মালিকদের মধ্যে শত্রুতাই ছিল মুখ্য, তেমন কোন আন্তঃবাণিজ্য বা সম্পর্ক বলতে খুব তেমন কিছু ছিল না।
    আসলে গ্লোবাল অর্ডার বলতে এ্কটা একই সাথে এটা মূলত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বুঝায়।  আর এই তিনটাই প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালের ঐ সময়ে। তাহলে এর আগের কালটাকে কি বলতে পারি? বলতে পারি সেটা ছিল একটা কলোনি যুগ যার মাধ্যমে একধরণের “কলোনি ক্যাপিটালিজম” বলতে পারি একে কিন্তু সাথে খুবই সীমিত বা তেমন কোন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ছিল না বলা যায়। এখন ৭৫ বছর পরে আমেরিকার নেতৃত্বের ঐ গ্লোবাল ব্যবস্থার যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। আর সে জায়গা নিতে উঠে আসতে চাইছে চীনের নেতৃত্বের এক ভিন্ন গ্লোবাল ব্যবস্থা বা অর্ডার।

    গ্লোবাল অর্ডার বলতে মুখ্য ফোকাস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যঃ
    গ্লোবাল ব্যবস্থার মুখ্য বা কেন্দ্রীয় ফোকাস বলতে সবসময়ই সেটা হল বাণিজ্য – আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের এক সিস্টেম গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রিত হয় মূল দুই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে, আর সাথে বাণিজ্যিক বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের পারস্পরিক বুঝাবুঝির প্রতিষ্ঠান হল ডাবলুটিও। আগেই বলেছি গ্লোবাল অর্ডার বলে যাই বুঝি না কেন এর মুখ্য জিনিষ হল এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। গ্লোবাল পণ্য ও পুঁজির লেনদেন বিনিময় বাণিজ্য। যা আবার আসলে একটা মুদ্রা ব্যবস্থা – আন্তর্জাতিক  বেচাকেনা বিনিময়ের মুদ্রা ব্যবস্থা। কারণ প্রত্যেক রাষ্ট্রের সীমানা যেখানে শেষ সেই রাষ্ট্রের স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে কেনাবেচা সেখানেই শেষ। তাই যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য হতে পারে যেকোন দু রাষ্ট্রের মানে সব রাষ্ট্রের কাছেই গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে পারা দিয়ে; মানেই এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে হবে আগে। নইলে পণ্য বিনিময় অচল। এই কাজটারই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ। আমরা বলি দুনিয়াটা বড়লোক দেশের দিকে ফেবার করে সাজানো। কথা সত্য। এরই আরেক অর্থ হল, আইএমএফ বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর দিকে কান্নি মেরে কাজ করে ও সাজানো। কিন্তু সাবধান। এর মানে আইএমএফ “নিপাত গেলে” এটা কোন সমাধান নয়, হবে না। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্ভব করতে চাইলে আইএমএফ ধরণের কোঅর্ডিনেশন ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান আমাদের লাগবেই। তবে যাতে সে কান্নি না মারে – তা বন্ধ করার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। যদিও কান্নি মারা বন্ধ করতে সক্ষম হওয়া সেটা কিন্তু এক ক্ষতিগ্রস্থ-পক্ষদের গ্লোবাল ক্ষমতার অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রশ্ন। মানে এটা আইএমএফ “নিপাত” যাওয়ার প্রশ্ন নয়। আমরা যাই নতুন কিছু করি না কেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু রাখা ও নিয়ন্ত্রণ – দুনিয়াকে চালু রাখার জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয়।
    অনেকে শ্লোগান দেন, বিদেশি পুঁজি, বিদেশি পণ্য ইত্যাদি সব হারাম – দেশি – স্বদেশিপনাই একমাত্র পথ। এরাই অবশ্য জাতি-রাষ্ট্র বাদী। আর এটাই কলোনি যুগের ধারণা। যখন আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ধারণাটাও ছিল না। ফলে স্বদেশি বা আত্নম্বভরিতা ধরণের ধারণা জন্মানোর জন্য উর্বর মাটি-পরিস্থিতি। আর রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানেই অন্যদেশ ভুমি কলোনি-দখলের ক্ষমতা। এরচেয়েও বড় কথা “স্বাধীন রাষ্ট্র” বলে কিছু নাই। আছে কলোনি হয়ে থাকা রাষ্ট্রের ধারণা – মাই লর্ড বলে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকা। ফলে এই দশা-পরিস্থিতি জন্ম নেয়া রাষ্ট্র ধারণাটাই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা। আর এদেরই অলীক কল্পনাটা হল অর্থনৈতিক স্বদেশিপনা, বিদেশি মানে হারাম ধারণা। পণ্য বিনিময় বানিজ্য ধারণাকে নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা। বলাই বাহুল্য এটাই এবসার্ড, অবাস্তব কথা বলা। বাস্তবে তাদের কথা মিলিয়ে দেখে এরপর তারা বলে না। আপনি নিজেই একটা কারখানা দিলেন কিন্তু সেটা চালাতে যদি অন্য দেশের একটা টেকনোলজি, একটা ধাতব অংশ যা খুবকম দেশে পাওয়া যায় ইত্যাদি এমন হয় (আর সব কিছুই – সেটা ধাতু বা কাঁচামাল সব দেশে পাওয়া যায় না, যাবে না বলে) সেক্ষেত্রে ঐ কারখানা চলবে না। কারণ,ধাতু বা কাঁচামাল বা টেক (বাজার না হয় না বললাম) ইত্যাদি পেতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ই ওর একমাত্র সমাধান। কিন্তু স্বদেশিপনা জাতিবাদী আপনি তো কিছুই বিদেশের কিনতেও চান না, বেচতেও চান না। অথচ এটাই আইএমএফ “নিপাত যাক” কথার ব্যবহারিক সত্যিকারের মানে।
    সারকথায়, এই জাতিবাদীদের জন্ম কলোনি যুগে যখন দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু সেখান থেকে আজকের দুনিয়ায় একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার দুনিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে গেল কেমন করে? কে করল তা এরা ‘কেউ’ জানে না।  এই কেউ বলতে জাতি-রাষ্ট্র বাদী আর কমিউনিস্ট দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে। এই রূপান্তরটা সম্পর্কে এদুই পক্ষই অন্ধকারে। গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, খারাপ-ভাল ত্রুটিপুর্ণ যাহোক একটা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর হয়ে আছে এটা তারা জানে না। যদিও এটা থাকার সুবিধা গ্রহণ করতে তারা দ্বিধা করে না। ডলার কামানোকে কাঙ্খিত ভগবান পাওয়ার মতনই মনে করে। যদিও আবার যারা একটু সিনিয়র মোটামুটি বুঝতে পারে গ্লোবাল ব্যবস্থা একটা কিছু আছে তারা আবার সে ধারণায় পানি ঢেলে একে নেতি চোখে দেখে আর বলে ওটা “সাম্রাজ্যবাদী”। একারণে তারাও অন্ধকারে।
    কেউ বুঝুক অথবা সারাজীবন অন্ধকারেই থেকে যাক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্রে রেখে একটা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়ার কার্যকর আছে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠা যে ব্যবস্থাটা বয়স এখন প্রায় ৭৫ বছর। এদিকে আবার এই গ্লোবাল ব্যবস্থার নেতা আমেরিকাকে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করে নেতৃত্ব নিতে চীনের উত্থান এখন আসন্ন। ধীরে ধিরে তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। এটা যে আসন্ন তা চীন নিজে বলেছে বলে জেনেছি তা নয়। এটা আমেরিকান সার্ভে-স্টাডিতে পাওয়া রিপোর্টর ফাইন্ডিংস বলেছে।
    এখন সমস্যা কত গভীর হয়েছে দেখেন! যে জাতিবাদীরা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডার সম্পর্কে পুরাই অন্ধকারে থেকে গেছিল গত ৭৫ বছর ধরে তারা এখন কিভাবে বুঝবে যে এখন যে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বটাই বদল হয়ে চীনের উত্থানের সময় হয়েছে?

    অতএব চীন বা আমেরিকেকেও ভারত বিবেচনা করছে গ্লোবাল অর্ডারের হবু অথবা পুরান নেতা হিসাবে নয়। বড় জোর আর পাঁচটা পড়শি রাষ্ট্রের মতই যেখানে এরা দুজন হয়ত কিছু বাড়তি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, এরকম। গ্লোবাল সিস্টেম বলতে মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর তাকে কেন্দ্র করে পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেম এক গ্লোবাল ব্যবস্থা বলে যে কিছু আছে এসব তাদের নলেজ-অনুমানের বাইরে মনে হচ্ছে। একটা জাতিসংঘ বলে কিছু আছে তা জানে। কিন্তু কে বানালো এটা, কেন বানাতে পারল, সেসব জানা এসব গ্লোবাল প্রেক্ষিতের ভিতর দিয়ে ভারতের দুনিয়াকে জানা – না, জাতি-রাষ্ট্রের রাজনীতির জন্য এসব জানা জরুরি নয়। এসব বিষয় সবচেয়ে ভাল্ভাবে ধরা পড়ে জাতিসংঘের ভেটো-মেম্বার হওয়ার জন্য তাদের বোকার আকুতি দেখলে। বুশ আমলের শেষে ওবামার শুরুতে ওবামা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেইমেন্ট কাজের ঠিকা দেওয়ার কথা পাকা করেছিল। আর তখন টোপ দিয়েছিল যে বিনিময়ে আরেকটা মুলা দিবে। সেটা হল ভেটো-মেম্বার পদ। আর প্রণব মুখার্জি তা বিশ্বাস করেছিল এতই দৃঢ়ভাবে যে ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে হাসিনাকে দিয়ে দাবি তুলিয়েছিল যে ভারতকে ভেটোক্ষমতা দিতে হবে! জাতিসংঘের জন্ম কেন হয়েছিল কী করতে হয়েছিল আর কেনই বা এই ভেটোক্ষমতার ব্যবস্থা্র জন্ম তা প্রণব বুঝেন এরপর আর তা মনে হয় না। যদি হত তাহলে ওবামা আশ্বাস যে ফাঁকা ধুর্তমি তা ধরতে পারতেন। ভেটো কথাটার ব্যবহারিক মানে কী তাই তো তিনি বুঝেন নাই, দেখা যাচ্ছে। কথা হল পাঁচ ভেটো মেম্বারের কেবল একজন যদি ভেটো দেন মানে না করে দেন তবে সেই সিদ্ধান্ত হবে না। কাজেই ওবামা চাইলেই ভারতকে নতুন সদস্যপদ দিতেই পারবেন না। অন্তত চীনকেও পক্ষে নিতে হবে। তা যদি বুঝতেন তাহলে তো চীনকেই আগে সন্তুষ্ট করতে যেতেন। আসলে সেটাও কম বোকামি হত না। কারণ, আমেরিকা নেতা ছিল বলেই ডিকটেট করে ঐ পাঁচজনকে ভেটো ক্ষমতা দিয়ে হলেও একটা জাতিসংঘ গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার নেতা বদলালে পরে তার ডিকটেটের ক্ষমতা কী মাত্রায় হবে সেটার উপর নির্ভর করে তিনি জাতিসংঘ-২ বলে কিছু শুরু করতে পারবেন কিনা! এতা গ্লোবাল সিস্টেম সম্পর্কে বুঝাবুঝির মামলা। তবে সাবধান তা আবার ইউরোপের কোন দেশের বই-পুস্তক পড়ে জানা যাবে না। অর্থাৎ সারা ভারত এই অতি জাতি-রাষ্ট্রবাদ এটাই তাদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত থেকে ভারতকে অস্তিত্বের তাতপর্য ও সম্ভাবনা কখনও বুঝতে পারেন নাই। গ্লোবাল প্রেক্ষিত সম্পর্কে দুর্বল বুঝাবুঝির উতস এখানেই। মজার কথা কলোনি আমলের ও ঐ আমলের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ ধারণা বলে কলোনি শাসনের সমাপ্তিতে সারা ইউরোপের সকল রাষ্ট্র এটা ১৯৫৩ সালের মধ্যে ত্যাগ করে, বাতিল করে দেয়। সেটা রাজনীতিকরা তো নয়ই, ভারতের একাদেমিকরাও টেরও পেয়েছে জানা যায় না।
    সাধারণভাবে ভারতের রাজনীতিক্বেওর পর্ব এখানেই শেষ করে এবার শারদ পাওয়ারের পর্ব।

    সুনির্দিষ্ট শারদ পাওয়ারের লেখা থেকেঃ
    বয়ান একঃ ঐ সাক্ষাৎকারে শারদ পাওয়ারের বক্তব্য, ‘চীন সামরিক সক্ষমতা ভারতের চেয়ে দশ গুণ বড়। কাজেই পাকিস্তানের চেয়ে চীন আমাদের বড় শত্রু ও হুমকি”। কিন্তু এর মানে কী যারাই ভারতের চেয়ে সামরিক দিক দিয়ে বড় তারা সবাই ভারতের শত্রু? তাই নয় কী?
    অর্থাৎ তাহলে তো আমেরিকা ভারতের জন্য চীনের চেয়েও আরো বড় শত্রু; মানতে হবে। কারণ আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে এখনো চীনের চেয়ে বড়। কিন্তু পাওয়ার-সহ ভারতীয় নেতা ও পাবলিক কি তাই মনে করবে? ট্রাম্প পুজা করা বিজেপি তো অবশ্যই না। তার মানে ভারতের চেয়ে সামরিক সক্ষমতায় বড় হওয়াটাই ভারতের কেউ শত্রু হবেই। এটা ভিত্তিহীন তাই কারো মানার কোন কারণ নাই!
    আবার তিনি বলছেন, ‘শত্রুর কথা উঠলেই আমাদের পাকিস্তানের কথা মনে আসে। কিন্তু না, পাকিস্তান নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বরং সামনে চীন আমাদের প্রধান শত্রু, কারণ ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার চীনের ক্ষমতা আছে, আর আছে দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি”।

    পাওয়ারের এই বোঝাবুঝিও ভুল। কারণ একই যুক্তিতে তো তাহলে আমেরিকাও ভারতের শত্রু হয়ে উঠতে পারে। মানে উঠবেই। এই যে ‘ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ’ কথাটা- এখানে কে শত্রু হবে আর কে মিত্র হবে এটা বুঝবার ভিত্তি কী?
    আসলে শারদ পাওয়ার বা তার মত করে ভাবা (জাতি ভাবনার) মোদীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা সবাই একই চিন্তা ফ্রেমের লোক যেটা পুরনো ফ্রেমের কলোনি আমলের ফ্রেম ও সে আমলে সারা ইউরোপ এভাবেই চিন্তা করত। যার সার কথাটা হল – বিদেশী মাত্রই আমার শত্রু। আমার দেশে আমরা এক জাতি আর এর বাইরে সবাই ‘বিদেশী’ যার মানেই ওরা সবাই আমার শত্রু। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার চিন্তা ফ্রেম। য়াগে বলেছি এটা অবশ্য সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সাল থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিদেশী মাত্রই শত্রু এ কথা সবসময় ঠিক নয়। বরং বিদেশীর সাথে ‘বাণিজ্যও’ করা সম্ভব আর তা দুদেশের জন্য বিরাট লাভজনক হতে পারে। বাণিজ্য মানে পণ্য বিনিময়, লেনদেন- এক পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য দেয়া। যেটা নিজ নিজ দেশের হাটবাজার-গঞ্জে করে থাকি, সেটাই তবে কিছু ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন শর্ত-পরিস্থিতিতে।

    যদিও আন্তঃরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক পরিস্তিতিতে সেখানে আরেক বাস্তব টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। সেটা হলো মুদ্রা। একটা দেশের সীমানার মধ্যে ওই দেশের মুদ্রা- এটাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিরাট ও মূল ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে, আপনি পকেটে টাকা নিয়ে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত চষে বেড়াতে পারবেন, যা মনে চান আর যা সেখানে পাওয়া যায় সব কিনতে পারবেন। কিন্তু দেশের সীমান্ত পার হলেই বাংলাদেশী মুদ্রা আর কাজ করবে না। আপনি বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। অর্থাৎ সীমান্ত ছেড়ে যাওয়া মানে তখন পড়শি দেশের মধ্যে একটা বিনিময় বাণিজ্যের অবস্থা। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশে বেচাকেনা মানে কেবল সে দেশের মুদ্রাই চলবে। তাই আপনার সে ক্ষেত্রে বাড়তি দরকার পড়বে একে তো মুদ্রার বিনিময় হার জানা আর মুদ্রা বিনিময় করে দিতে রাজি থাকা একটা দোকান বা ব্যাংক। আরো কথা আছে- আলোচ্য দুই দেশকে আইএমএফের সদস্য হতে হবে। নইলে বিনিময় হার জানাসহ আরো বহুবিধ জটিলতার মুখে পড়বেন। কেনাবেচা লাটে উঠবে। কিন্তু একটা বিশাল ঘটনা এখানে ঘটে গেছে। তা হল, এই দুই দেশের বাণিজ্য মানে জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতিবিদরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছেন একটা গ্লোবাল বাণিজ্যের ব্যবস্থা চালু হয়েই আছে। তাই তারা ধরে নেন, এই ব্যবস্থাটা দুনিয়ার জন্ম থেকে নিশ্চয়ই ছিল।
    এটাই শতভাগ মিথ্যে অনুমান। আইএমএফেরই জন্ম এইমাত্র ১৯৪৪ সালে। এর মানে এর আগে বিনিময় বাণিজ্য খুবই কঠিন না প্রায় ছিলই না, দরকারও কম ছিল, সে অন্য কারণে। এক কথায় আজ আইএমএফ যা করে এই পুরোটাই সেকালে করত মাত্র এক ব্যক্তির মালিকানার এক ব্যাংক আর ইউরোপের আর তিন-চার শহরে বসে থাকা তার তিন-চার ছেলে মিলে। সেদিকে এখন আর যাবো না। আরো যাবো না কমিউনিস্ট রহস্য-গল্প দূরে রাখার জন্য।
    যে কথা বলছিলাম, তার মানে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য মানে হল – আইএমএফের জন্ম এর আগেই হয়ে গিয়েছে আর এই বাণিজ্য আর কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বা ‘লোকাল’ ঘটনা একেবারেই নয়। একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দুনিয়ায় চালু থাকা। তাতে জাতিবাদী মন যতই মনে করুক পড়শি দেশের সাথে বাণিজ্য একটা লোকাল ঘটনা, এটা কিন্তু একেবারেই সত্য নয়।
    গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবলির পুরো কাঠামোই যে তৈরি হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে সেটা আমরা টের না পেয়ে বিদেশী পুঁজি, বিদেশী ঋণ ঘৃণাকারী যেই হই না কেন। একটা গ্লোবাল সিস্টেম আছে বা ১৯৪৫ সালে চালু হয়েছিল বলেই মোদী বা শারদ পাওয়ারের ‘দেশী অর্থনীতি’ নামক কল্পনা চালু আছে। নইলে তো বাণিজ্যের অভাবে না খেয়ে রাজনীতিবিদিদের মুখ দিয়ে কথাই বের হত না!

    কাজেই আমাদের একটা বড় অবজারভেশন ও দাবি যে, ভারতের রাজনীতির সাধারণ ধারা হল তাদের এক প্রবল মিথ্যা অনুমান যে সব কিছুই ‘লোকাল’। তারা ‘বিদেশী’ বিরোধী। বিদেশী মাত্রই ভারতের স্বার্থবিরোধী ইত্যাদি যত সব মনগড়া কল্পনা আছে। মানে ভারতের অভ্যন্তরীণ চোখে দুনিয়াটাকে দেখা। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোর উপরে একটা প্রবল প্রভাবশালী গ্লোবাল ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর থাকে ও সক্রিয় কাজ করে থাকে। সেই গ্লোবাল অর্ডারের অধীনে আমাদের অভ্যন্তরীণ বা লোকাল ঘটনাবলিগুলো তৈরি ও কার্যকর হয় ও ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু আমরা তা টের পাওয়ার যোগ্য না হলে মনে হবে গ্লোবাল সিস্টেম বলে কিছু নেই। ভার্তে যা ঘটে তার সবই যেন তার অভ্যন্তরীণ স্বার্থ বা ইচ্ছা দিয়েই ঘটায়। সার কথায়- গ্লোবাল প্রেক্ষিতই বড় প্রভাব বিছিয়ে ঠিক করে দেয় লোকাল ঘটনাবলি কেমন ঘটবে। কাজেই স্থানীয় স্বাধীন কোন প্রেক্ষিতে লোকাল ঘটনাবলি ঘটে না, ঘটবে না। চীন পালটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ার উদ্যোগ ও এক নয়া গ্লোবাল ব্যবস্থা খাড়া করতে চায় বলে, চাইতে পারে বলেই ভারতের কাছে অফার আসতে পারে আসবে। আবার ভারত যদি ঠিক করতে বসে আমেরিকার চীন ঠেকানোর ঠিকা নিয়ে আমেরিকার সাথে ভাগ্যকে বেধে ডুবতে বসা সিস্টেমের নায়কের সঙ্গি হবে নাকি নতুন গ্লোবাল অর্ডার যে ঠিক করবে যে দুনিয়ার ভবিষ্যত ঠিক করবে তার সাথে যাবে – এটা কে বেশি সুবিধা দিবে সেই মামলা একেবারেই নয়। ভারতের ভবিষ্যত নতুন গ্লোবাল অর্ডারের ভিতরে – যদি গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা বুঝতে সক্ষম হন।
    বয়ান দুইঃ শারদ পাওয়ার বলছেন, “ভারতের জন্য সত্যিকারের হুমকি হলো চীন, যে চীন ভারতের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেছে। অতএব, ঐ চীনের সাথে, কমরেডদের সাথে আমাদের খুব গলাগলি আছে, (যেমন একই দোলনায় বসে মোদি-শিং দোল খাচ্ছে আর কথা বলছে) এমনটা এই ছবি দেখিয়ে য়ামাদের মাঝে যে শত্রুতা এর মোকাবিলা হবে না। মোদি হাত মিলাচ্ছে বা কুলাকুলিতে জড়িয়ে ধরছে প্রেসিডেন্টকে শি কে এটা হতে পারে না”।
    এর চেয়ে জাতিবাদী বক্তব্য আর কী হতে পারে?
    শারদ পাওয়ারের এসব কথা তাকে আরো নাদান কম চিন্তা ও সঙ্কীর্ণ বুঝের লোক বলে পরিচিত করবে। তার প্রথম সমস্যা শত্রু আর প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দ দুটোকে মাখিয়ে ফেলা। যেমন ক্লাসের দুই ফার্স্ট-সেকেন্ড স্টুডেন্টের মধ্যে যেটা হয় সেটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে, শত্রুতা নয়। স্পোর্টসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়।
    সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকার মধ্যে শত্রুতা ছিল তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ফোরামে একসাথে বসে কথা বলা ও কাজ করার মতো বন্ধুত্ব থাকতেই হত। কিন্তু কোন বাণিজ্য সম্পর্ক, পণ্য লেনদেন ছিল না, গ্লোবাল বাণিজ্য সিস্টেমের সুবিধাও কার্যকর ছিল না। কিন্তু এটা ১৯৪৫-৯২ সাল পর্যন্ত। আর এর পর থেকে রাশিয়ার পুতিনসহ নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করা (আজ অথবা আগের) সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছে। মানে দুনিয়াটা এখন একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এসে গেছে। যেটা এখনো আমেরিকার একার পকেটে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণে। আর এটাই ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে আর চীনের নেতৃত্ব নতুন একটা ব্যবস্থা গড়তে, বদল ঘটাতে এগিয়ে আসছে। মোদী বা শারদের মত কথিত দেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা আগেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের মধ্য থেকেও এর সম্পর্কে বেখবর থেকেছে। নিজের স্বনির্ভর-অর্থনীতি নামে সোনার-পাথর বাটি ধরণের কাল্পনিক ধারণার মধ্যে বসবাস করে গেছে বলে গ্লোবাল অর্ডারের পালাবদল ব্যাপারটা কখনও বোধগম্য হয় নাই। বাস্তবতা হল – ভারত চাইলেও পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের পুরনো অর্ডারের মধ্যে বসবাস করতে পারবে না। খোদ আমেরিকাকেও চীনের নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে ঢুকতে হবে। কারণ একসাথে দুনিয়াতে দু’টি অর্ডার চালু থাকতে পারবে না। দুইটা আইএমএফ চালু থাকতে পারবে না।

    একাধিক বিশ্বব্যাংক  যদিও থাকতে পারবে। তাহলে কেন চীন ভারতের শত্রু? আবার খেয়াল করতে হবে যে, চীন শত্রু না হলেও খুবই খারাপ প্রতিদ্বন্দ্বী সেই চীনই আবার বাণিজ্যের পার্টনার হতে পারে, পুঁজি বিনিয়োগদাতা ইত্যাদি এসবই একালে সম্ভব। কারণ কোল্ড-ওয়্যারের আমলে সোভিয়েত-আমেরিকা কোন একই বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য ছিল না। সোভিয়েতরা বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশ্বাস করত মনে হয় না। অন্তত এনিয়ে তাদের তাত্বিক অবস্থানও নাই। এটাই সেকালে শত্রুতা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়া সম্ভব ছিল। সেটা একালে আর সম্ভব নয়। কারণ এখন চাল-ডাল মিলে গেছে, এখন আলাদা করা তত্বে সম্ভব বলে যদিও দেখাতেও পারে বাস্তবে এটা প্রায় অসম্ভব।
    আবার ঘটনা হল, চীনের সাথে ভারতের নতুন ও পাল্টা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নির্মাণ প্রকল্প ব্রিকস, সেটা এতদিন ঠিকই চলছিল। এর মানে কী তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা মিলিয়ে গেছিল, তা ছিল না? বিস্মিত হতে হয় শারদ পাওয়ারের চিন্তা না করে কথা বলে বসা দেখে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা যাই বলেন তা অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবাই নখ লুকিয়ে ফেলা শত্রুতা সামনে না নিয়ে আসা অর্থে একটা কার্যকর লেনদেনের সম্পর্কের মধ্যে ছিল। এটা সম্ভব। আর এটাই একালের গ্লোবাল সিস্টেমের বৈশিষ্ট। যেটা জাতি ধারণা নিয়ে ধরাছোয়া যাবে না। সবই উলটাপালটা মনে হবে। কাজেই ভারতের সব দুর্দশার রুট কারণ এসব জাতিবাদী, বিদেশবিরোধী আজিব চিন্তা যা এদেরকে গ্লোবাল সিস্টেম বুঝতে সবসময় বিরাট বাধা হয়ে থেকেছে!

    মোদী বা শারদের বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধে কথা বলাটা ভুল। বিদেশের সাথে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়া মানেই তা  বিদেশনির্ভরতা নাও হতে পারে। যদি ব্যাপারটাকে ইন্টারডিপেন্ডেন্সি –পরস্পরের উপর পরস্পর নির্ভরশীল হওয়া, একপক্ষীয় না এভাবে সাজানো যায়। আর ব্যাপক বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িয়ে যাওয়া মানে কিছু কিছু রপ্তানি পণ্যে মাস্টার উতপাদক হয়ে যাওয়া। মানে সবচেয়ে দক্ষ উতপাদক মানে সবচেয়ে কম শ্রমে তা উতপাদন করতে পারা নায়ক হওয়া। এসব নয়া ধারণা, বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধবাদীদের মাথায় ঢুকবে না!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৫ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “শারদ পাওয়ার সবার প্রতিনিধি” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-350

     

    সবার শেষে বলতে আসলেন নরেন্দ্র মোদী, তিনি বলে উঠলেন – “না, সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢুকতে আসেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই। লাদাখের কোনো বর্ডার পোস্ট অন্যের দখলে যায়নি”। এভাবেই মার খেয়ে মার হজম অথবা কান্না হজম করতে হয়েছে মোদীকে! চীনের হাতে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে ডাকা ভারতের সর্বদলীয় সভাতে তিনি এভাবেই তার কথা শুরু করেছিলেন। এ যেন দুই বারো-চৌদ্দ বছরের বাচ্চার মারামারি আর তাতে দুই বাচ্চার বাবারা যখন সালিশ মিটিংয়ে বসেছে সেখানে হঠাৎ মার খাওয়া বাচ্চার বাবা বলে বসলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ মারেইনি”। স্বভাবতই এরপর আর অন্য কারো কিছু বলার থাকে না, মিটিংও ডিসমিস হয়ে যায়। অর্থাৎ কঠিন মার হবে কিন্তু আওয়াজ বের হবে না সিচুয়েশন। কিন্তু মোদী এমন বললেন কেন? যেখানে ঐ মিটিংয়েরই প্রথম দিকের বক্তৃতায় এমনকি মোদীর মন্ত্রীরা বলেছেন, চীনা সৈন্যরা ভারতের ভূমি দখল করেই তাদের সেনাদের হত্যা করেছে!

    রাষ্ট্র বলতে একটা নেশন-স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র বুঝ, এক ফান্ডামেন্টাল সমস্যা
    মোদী কেন এমন বললেন, এই প্রশ্নের জবাবের আগে আমাদের অন্য কিছু সিরিয়াস আলাপ সেরে নিতে হবে। আমাদের মত দেশগুলোতে রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্র বুঝা হয়ে থাকে যেটা আসলে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণাই; যদিও এখানে সেটা ‘ধর্মীয়’ কিনা এর চেয়ে কথিত ‘জাতি” এই ভুতুড়ে ধারণাটাই মুল সমস্যা। আর এই ‘নেশন’ কথাটাকে সবাই কথার কথা হিসাবে রাষ্ট্র বলেও ডাকে। দুনিয়াতে প্রথম কলোনি দখল শুরু হয়েছিল সতেরো শতকে।  এমন দখল করা প্রথম ভূমি হল ভার্জিনিয়া, আমেরিকায় এই উপনিবেশ, যা ১৬০৭ সালে ব্রিটিশদের হাতে দখল হয়েছিল। আর সেই থেকে শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (প্রায় টানা ৩০০ বছর) সারা দুনিয়ায়ে কলোনি দখল টিকে ও চালু ছিল। আর, এরপর থেকে কলোনিমুক্ত স্বাধীন করে দেয়া শুরু হয়েছিল। এই লম্বা কলোনি যুগের দখলদার রাষ্ট্রের কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজদেশের রাষ্ট্র-কাঠামোই হল নেশন-স্টেট [nation-state] ও এর ধারণা। সেযুগে দখলে বের হওয়া কোম্পানির (যেমন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি) সামরিকভাবে সজ্জিত জাহাজ নিয়ে বের হয়ে পড়া ছিল ঐ সময়ে ওসব সমাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ও প্রধান ব্যবসা।

    জনপ্রতিনিধিত্বের রিপাবলিক রাষ্ট্র কেমন হওয়ার কথা ছিলঃ
    ইংল্যান্ডের কথাই যদি ধরি, রাজতন্ত্র [monarchy] [মানে একটা রাজবংশ বা ডায়নেস্টির শাসন যে, রাজার ছেলে রাজা হবে] ভেঙে প্রথম রিপাবলিক বা জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা হিসাবে দেখা হয় ইংলিশ রেভোলিউশনকে (১৬৪২-৬০) [English Revolution]। যারা রেভেলিউশন বলতে চায় না এদের অনেকে এটাকে “ইংলিশ সিভিল ওয়ারও” বলে থাকে। এ্মন জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো হওয়ার কথা এমন যে এটা  একটা রাজনৈতিকতা বা পলিটি [Polity] প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হব্ব। যেখানে সমাজের সব অংশকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সমাজের সকল অংশকে জায়গা দিতে হবে, কথা বলতে দিতে হবে, সবাইকে শুনতে হবে ইত্যাদি। এভাবে সবার জন্য যা ভাল হবে এমন এক “কমন গুড” এর পক্ষে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে এর লক্ষ্য। এভাবে এক “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” অর্থে রাষ্ট্রগঠন, এই ছিল এর উদ্দেশ্য।

    কিন্তু সেসময়ের বৃটিশ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ব্যবসা ছিল কলোনি দখল কোম্পানির মালিক হওয়া। তাই ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর স্বার্থে “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” গঠনের সব চিন্তা সবকিছু উলটে দিয়ে বাস্তবে যে প্রথম রিপাবলিক গড়েছিল তাই ছিল নেশন-স্টেট।
    অর্থাৎ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটাই পলিটিক্যাল কমিউনিটি হিসেবে গঠিত আর হলো না। এর বদলে রাষ্ট্রের বাইরের দিকে তাকিয়ে এক রাষ্ট্র গড়া হল। যেমন ঐ কলোনি দখল ব্যবসা কোম্পানিগুলোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইউরোপের পড়শি রাষ্ট্রের (যেমন ফরাসি বা ডাচ রাষ্ট্রের) সমতুল্য কোম্পানি – যেমন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হল ডাচ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি, এরকম। তাই ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো নিজের স্বার্থে চাইল এই নেশন-স্টেট। যাতে সকল ব্রিটিশ মানুষ কথিত ‘এক জাতির’ আওয়াজ তুলে অপরাপর ডাচ বা ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে নিজ দেশের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বিনা-বিভক্তিতে সকলে খাড়া হয়ে যায়। এতে কলোনি দখলের কোম্পানিগুলোর স্বার্থই যেন সব ব্রিটিশ নাগরিক-মানুষের স্বার্থ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এতে সকল বৃটিশ নাগরিক বিশেষত যারা প্রান্তজন, গরীব বা কম আয়ের মানুষ – তারা কী চায়, তাদের সমস্যা কী সেটা আর তাদেরকে বলতে সুযোগ দেয়া হল না, শুনাও হল না। এককথায় “কমন গুড” আর হল না।  কলোনি দখল আর দাস ব্যবসায়ীদের স্বার্থটাই কথিত “নেশনের স্বার্থ” বলে চালিয়ে দিতে তা সবার উপরে চেপে বসল, চাপিয়ে দেওয়া হল। নেশন স্টেটের কাজই হল এই চাপিয়ে দেয়াটা নিশ্চিত করা।

    রেনেসাঁর ধারণার মূলকথা হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্রঃ
    রিপাবলিক বলতে নেশন-স্টেট ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় মূলত যে দুই নিট ক্ষতি হয়ে যায় তা হল – এক. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হলে সব পক্ষকেই শুনার যে বাধ্যবাধকতা থাকার কথা তা হারিয়ে যায়। দুই. অন্যের দেশ কলোনি-দখল করা ও সম্পদ লুট করে আনা বৈধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র সব জায়েজ করে দেয়।  আর সবচেয়ে ভয়াবহ তৃতীয় ক্ষতিটা হল, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিকল্প হিসাবে রিপাবলিক বা গণপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র বলতে আসলে নষ্টা নেশন-স্টেট রূপটাই রেনেসাঁ চিন্তার সর্বোত্তম উপহার দাবিতে হাজির হয়ে যায়।

    রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন রায়ের হাতে ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্রের মশালঃ
    কমিউনিস্টদের দাবি রামমোহন রায় ভারতে রেনেসাঁ এনেছেন মানে, প্রগতিশীলতা এনেছেন। বাস্তবত কথা মিছা নয়। কিন্তু প্রগতির ঐ রেনেসাঁতে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে  ‘নেশন-স্টেট’ (জাতি-রাষ্ট্র) ধারণাই। অর্থাত জাতি-রাষ্ট্র ধারণা রেনেসাঁর ভিতর দিয়ে  রামমোহন রায় ভারতে এনেছেন। কিন্তু এর উপর আবার তাঁর দেখা ও বুঝের ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র বলতে একে তিনি বুঝেছিলেন, ধর্মভিত্তিক একটা জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে। মানে তাঁর বুঝাবুঝিতে  কথিত বৃটিশ জাতিরাষ্ট্রকে তিনি এভাবেই বুঝেছিলেন; এক  “এংলো ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ব্রিটিশ” জাতি, এভাবে। এখানে ‘এংলো ক্যাথলিক’ বলতে সেটা ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ধর্মটাই কিন্তু ইংলিশ রাজপরিবার এর যে ভাষ্যটা মানে কেবল সেই রূপ ও ভাষ্যটা।   কিন্তু এদিকে রামমোহনের  নিজ ভারতের বেলায় এখানে দুটা বড় ধর্ম হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও ছোট সংখ্যায় পালিত আরও অনেক ধর্ম আছে, টের পেলেন। তাই তিনি স্বাধীন ভারত একটা “জাতি-রাষ্ট্র” গড়ার প্রধান সমস্যা সমাধানের জন্য সবার আগে সবাইকে একই একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন। কিন্তু এরপর তিনি মাত্র আর ১৮ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতেই যেসব বাধা ও সমস্যার তিনি মুখোমুখি হচ্ছিলেন তা তিনি মারা যাবার পরে আরও বিরাট আকার ধারণ করে। শেষে তাঁর ব্রাহ্মসমাজ দুটো ধারাতে ভাগ হয়ে যাবার পর ক্রমশ তারা সকলেই অকেজো, স্থবির হয়ে যায়।  এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে আর তিনি মারাও গেছেন বলে এরপরে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের হাত ঘুরে এই প্রকল্প যেন “ব্রাহ্ম জাতি-রাষ্ট্র” হতে পারল না বলে নেহায়তই ‘না-পারতে’,  এটা এক ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র’ প্রকল্প হিসাবে মানিয়ে নেয়ানোর চেষ্টা হিসেবে হাজির করেন, এরা সকলে। ততদিনে কংগ্রেস দলের জন্মানোর সময় হয়ে গেছিল। তাই  ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস দলের জন্মের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসাবে  ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাই হাজির হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এটা মুসলমানদের জন্য অস্বস্তিকর। কংগ্রেসের মুসলিম সদস্যরা তো বটেই সমাজেও মুসলিমদের থেকে আপত্তি প্রবল হয়ে থাকে। এটা না হবার কোন কারণ ছিল না। কারণ, একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে  জনগণকে একটা ধর্মে আসতে হবে – এটা কী কোন পুর্বশর্ত হতে পারে?  কাউকে আরেক ধর্মে যেতে ফোর্স করা যায়? না সম্ভব?  এটাই তো বড় জুলুম, চরম অন্যায্য!
    মুসলমানদেরকে হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র মেনে নিতে বলা হচ্ছিল – কেন? গান্ধী ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে  মরবার আগে পর্যন্ত  এমন আবেদন একাজ করতে গিয়ে  “হিন্দু-মুসলমান এক” হতে বলে চলেছেন, অসহায় পাগলের মতন। কারণ ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হতেই ব্যাপক দাঙ্গা ছড়িয়ে পরেছিল। কিন্তু তাতে কী? বাস্তবে গান্ধী টের পেয়েছেন তার এই আবেদন কতটা অবসার্ড, উদ্ভট। কোন মানুষের কাছেই স্ব স্ব ধর্মত্যাগের আহবান খুবই অস্বস্তিকর। মানুষ একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে তাদের সবাইকে এক ধর্মে যেতে হবে, এক হতে হবে – এর কী সম্পর্ক?  অথচ সব জটিলতার, সব এবসার্ডিটির উতস হল একই ধর্মের এক জাতিরাষ্ট্র গড়ার কল্পনা – রাষ্ট্র সম্পর্কে এমন উদ্ভট ইমাজিনেশন থেকে। অথচ সহজ সমাধানটা হল, কে কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, সবাই নাগরিক। কিন্তু সমান নাগরিক। সমান অধিকার-সম্পন্ন নাগরিক। অধিকারের বৈষম্যহীন নাগরিক। কাজেই এরপর কে কোন এক না ভিন্ন ধর্মের নাগরিক তাতে কিছু এসে যায় না। কাউকে ধর্ম বদলাবার আহবান অথবা তথাকথিত হিন্দু-মুসলমান’  “এক হবার আবেদন” করতে মারা যাবারও কোন দরকারই পরে না। কারণ সেক্ষেত্রে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক।  কিন্তু গান্ধী-নেহেরুর কংগ্রেস নিজেদের এই উদ্ভট চিন্তার পরাজয় ঢাকতে হিন্দু শব্দটা লুকিয়ে ফেললেন কিন্তু সেই  হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র – এটাকেই কায়েম করতে সচেষ্ট থেকে গেলেন।
    কংগ্রেসের জন্মের পর মুসলমানেরা দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষার দেন-দরবার চালিয়েছিলেন। এরপর ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প হিসাবে মুসলিম লীগের জন্ম হয়ে যায়।
    কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার হল, মুসলিম লীগ “মুসলমান” জাতি-রাষ্ট্র কথাটা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেই বলতে হয়েছিল যাতে সে মুসলমানদের এতে, এদলে ডেকে আনতে পারে। কারণ, তাদেরকে “মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়েই” আলাদা রাষ্ট্র চাই একথা বলা ছাড়া উপায় ছিল না।  আর এই সুযোগে কংগ্রেসিরা নিজেদের হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের লোক – তাদের এই পরিচয় লুকিয়ে ফেলে দাবি করতে থাকে তারা কেবল জাতি-রাষ্ট্রের লোক এবং তারা প্রগতিশীল। কারণ তারা রেনেসাঁ মানা-বুঝা লোক। আর এখান থেকেই এক পর্যায়ে আর জাতি-রাষ্ট্র কথাটাও না বলে তারা  বলতে থাকে তারা জাতীয়তাবাদী।  যেন নেশন-স্টেট ধারণা থেকে জাতীয়তাবাদী ধারণাটা আলাদা।  তাই এই “জাতীয়তাবাদ” এক প্রগতিশীল ধারণা হয়ে যায়।
    আর এর বিপরীতে মুসলমানেরা ধর্মের রাষ্ট্র চায়, রেনেসাঁ মানে না- তাই তারা হয়ে যায় পশ্চাৎপদ – এই হয়ে যায় তাদের যুক্তি। বিশেষ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র আলাদা হয়ে যাওয়ার পর জমিদার-হিন্দুরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে  নিজেদের ক্ষমতা জমিদারি হারানোর বদলা নিতে গিয়ে এই “পশ্চাৎপদ-প্রগতিশীলতার” ভুয়া তর্ক ও যুক্তিটা তুলে ধরেছিল। আর সেই সাথে জাতি-রাষ্ট্র কথাতে যে তার হিন্দুজাতি্রাষ্ট্র আকাঙ্খা পরিচয় যাতে ধরা না পড়ে যায় তাই “জাতি” শব্দটা ভেঙে এবার ‘জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র’ বলা শুরু করল; যেন এটা জাতি-রাষ্ট্র থেকে এটা  ভিন্ন কোন ধারণা। এই রেনেসাঁ আর প্রগতিশীলতা এটাই ড; সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বুঝের ‘রেনেসাঁ’ আর ‘প্রগতিশীলতা’ ধারণার উতস। জিন্নাহ’র উপরে কুপিয়ে গেছেন অথচ নেহেরু-গান্ধীর হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের কংগ্রেস এটা চোখে দেখেন নাই। ভাবেন – এটা ভারতীয় রেনেসাঁ ফলে প্রগতিশীলতা , এই বলে কাভার দেন – এসব হল “জাতীয়তাবাদ”।

    ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র চিন্তার পরিণতিঃ
    ভারত-পাকিস্তানের পরিণতি জানলাম এখন ইউরোপের পরিণতি দেখা যাক। মূলত দু’কারণে সারা ইউরোপ. (৪৭ টা রাষ্ট্রের এক জোট হয়ে) ১৯৫৩ সালে জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ত্যাগ করেছিল।  তারা ঐ ৪৭ রাষ্ট্র একটা সম্মেলন ডেকে “পুর্ণ-স্নান সেরে” নিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করে  নিয়েছিলেন। স্ব স্ব রাষ্ট্র পুণর্গঠন করে নিয়েছিলেন যে জাতি-রাষ্ট্র আর না, সবারই এটা এখন  নাগরিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র।  কারণ এক. দ্বিতীয় বিশযুদ্ধে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তার সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ও প্রোডাক্ট হল জার্মানির হিটলার ও তাঁর শাসন।  হিটলারের উত্থান ও তাঁর নীলচোখের শ্রেষ্ঠ “জার্মান নেশন” – এই জাতগর্বের চরম বর্ণবাদী ভয়াবহতা দেখতে হয়েছিল সারা দুনিয়াকে।  এটা ছিল নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র ধারণার সবচেয়ে কদর্য ও চরম রূপ। সারা ইউরোপ কোনমতে এটা থামাতে পেরেছিল তবে নিজের মুরোদে না। মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দেয়া অর্থ ও সামরিক সহায়তায় তাঁরা সক্ষমতা দেখিয়ে  জিতেছিল । অতএব এরপর জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ফেলে দেয়া এটা ফরজ হয়ে যায়।  আর দ্বিতীয় কারণ, ঐ মার্কিন সহায়তা যেটা না পেলে সারা ইউরোপই  হিটলারের পদানত হয়ে যেত, ঐ সহায়তাটা পেতে শর্ত হিসাবে সারা ইউরোপকে দাসখত দিতে হয়েছিল যে, তারা দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ব্যবসা বন্ধ করে দেবে এবং কলোনিকৃত রাষ্ট্রগুলোকে মুক্ত স্বাধীন করে দেবে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ বিজয় পরবর্তী দুনিয়ায় রাষ্ট্রের যে ধারণা আঁকছেন, তবে তা তিনি করছেন মূলত একটা জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামো বর্ণনা করে। সে কাঠামোটা হল অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের এসোসিয়েশন হিসেবে জাতিসঙ্ঘ। অতএব রাষ্ট্র হতে হবে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র  এই বাধ্যবাধকতাও ছিল।

    এই বাধ্যবাধকতায় জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামোটা কী ছিলঃ
    রূপ্টা কী ছিল তা বুঝার সবচেয়ে সহজ প্রমাণ হল আমাদের সবার পরিচিত কাশ্মির। কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সাথে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে [Accession Treaty বা ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন] (যদিও অস্থায়ী) স্বাক্ষর করেছেন তাই কাশ্মির ভারতের অংশ হয়ে গেছে – এই দাবি নিয়ে নেহরু ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে রায় আনতে  জাতিসঙ্ঘে দরবার করতে যান। খুশি তিনি, কারণ তার চোখে এত সহজ এই মামলা, অতএব রায় তার পক্ষে আসবেই। এই যে আস্থা আর নেহরুর রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী। আর সেই সাথে জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি কী তিনি এর কিছুই জানেন না, অজ্ঞ। কখনো খেয়াল করেন নাই, বুঝতেও যান নাই। তাই তিনি বোকা হয়ে দেখলেন, জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরে গণভোটে আয়োজন করতে বললেন। আর সে ভোটের রায় নিয়ে সে ভিত্তিতে কাশ্মির কার থাকবে – ভারত বা পাকিস্তানের না স্বাধীন কাশ্মির হবে, কোনটা – তা ফয়সালা করতে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত যে শাসক কে হবে তা বেছে নিবার নাগরিক অধিকার, পাবলিক ভোট  – এই হল ভিত্তি।

    কেন জাতিসঙ্গ এমন রায় দিয়েছিলঃ
    কেন এমন রায়? কারণ সেকথাটাই জাতিসঙ্ঘেরও জন্মভিত্তি। এর মানে হল নেহরু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না। নেহেরু তো রাজা নিয়ে এসেছিলেন, ভেবেছিলেন রাজার সইয়ের হুকুমে কাশ্মির ভারতের।  কাশ্মির ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত – এরাই যে ক্ষমতার উতস তা নেহেরু জানতেন না। জানলে তো রাজার কাছে ছুটতেন না।  জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কলোনি দখল ‘হারাম’। তাই যেকোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই সিদ্ধান্ত নিবার হক রাখেন যে তারা কার দ্বারা শাসিত হবেন – এটাই, জাতিসংঘেরও জন্মভিত্তি। কোন ভূখণ্ড কোথায় কার সাথে যুক্ত হবে, কাদের দ্বারা শাসিত হবে, এর সিদ্ধান্ত নেবার একমাত্র এখতিয়ার কোনো রাজা নয়, কোনো সম্রাট বা সুলতানও নয়। সেই সিদ্ধান্ত নেবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ। এটা তাদের নাগরিক অধিকার।
    খেয়াল করুন কোনো, “জাতি”গোষ্ঠী নয়, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীও নয়। কোনো ‘নেশন’ নয়। আর এই যুক্তির ভিত্তিতেই জাতিসঙ্ঘ কলোনি দখল করা অবৈধ জ্ঞান করে। কাজেই রাজা-সম্রাটেরা কেউ কিছুই নয়। বাসিন্দা নাগরিকেরাই সব, তারাই ক্ষমতার উৎস। এ কারণে রাজা হরি সিংয়ের চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। তাই কাশ্মির সেকালের নেহরুর ভারতের নয়, একালে ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিলেও তা মোদীর ভারতের নয়। মোদীর কাশ্মিরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি করে নেওয়াও একই কারণে জাতিসঙ্ঘের চোখে অবৈধ। অর্থাৎ কাশ্মির ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের ‘নাগরিক অধিকারই’ মূল কথা; যেটা জাতিরাষ্ট্র বুঝের নেহরু বুঝেন নাই বলেই ধরা খাইছিলেন। তিনি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র সম্পর্কে নির্বোধ ও উদাসীন। তাই এর বাস্তবায়কও নন। তিনি আসলে এক জাতি-রাষ্ট্রের শাসক ও তেমনই রাজনীতিক। তিনি জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না বলেই কাশ্মির ইস্যুতে ‘বোকার সাহস” করে জাতিসঙ্ঘের রায় আনতে গেছিলেন। ধরাও খেয়েছিলেন।

    তাহলে এখন চীন-ভারত বিবাদের মধ্যে এসব কথার গুরুত্ব কী?
    আমরা আসলে এতক্ষণ ছিলাম রাষ্ট্রের ‘লোকাল’ দিকের আলোচনায় যে রাষ্ট্র জাতিভিত্তিক না নাগরিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক হতে হবে এই প্রসঙ্গে। এখন আমরা যাব এর ‘গ্লোবাল’ দিকে।
    রুজভেল্ট শুধু রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে সেকথাই সবাইকে নিয়ে সে সময় ঠিক করে দিয়েছিলেন তাই নয়। তিনি রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক কী হবে সেটাও ঠিক করেছিলেন।

    গ্লোবাল দিক মানে হল মূলত “আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের” দিক – যেটা মূলত গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্ডার এবং গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এসব দিক। আমরা এখন ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করব। ইংরাজি ‘অর্ডার’ শব্দটা নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা বা চালু করা  অর্থে ব্যবহৃত হয়। সময়ে এটা আইন প্রণয়ন অর্থেও।  মানে রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক বলতে আমরা বুঝাতে ও বুঝতে বলছি গ্লোবাল অর্ডার এর দিক।  অর্থাত এবার আর রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নয়  মূলত বাইরের এই অর্থে যে এতক্ষণ যদি রাষ্ট্রের ভেতরের অর্ডার নিয়ে কথা বলে থাকি তবে এখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার, বাইরের বা পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়মশৃঙ্খলা ও আইন অর্থে এক অর্ডার নিয়ে কথা বলব। তাই কথাটা এখানে গ্লোবাল অর্ডার বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকের মত বিষয়গুলোতে পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম-শৃঙ্খলার  বা সুশৃঙ্খলা বিন্যাস ঘটাতে একটা অর্ডার।।

    আগেই বলে নিয়া যাক েই গ্লোবাল অর্ডার স্থাপন আপনাতেই বা কর্তা ছাড়া হয় নাই। এই কর্তা হলেন চারবারের (১৯৩২-৪৫) লাগাতর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলোনো রুজভেল্ট [Franklin Delano Roosevelt  বা FDR]। দুনিয়াকে একটা গ্লোবাল অর্ডারে সাজানোটা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের হাতে হওয়াটা জায়েজ হয়েছে কী না – তা নিয়ে কথা বলা এখানকার প্রসঙ্গ নয়। সেটা খোলা রেখেই আমরা ইতিহাসে যা ঘটেছিল তা নিয়েই আগাচ্ছি।  তবে কোন সাবজেকটিভ কর্তা ছাড়া একাজ সম্ভবত হতই না।  রুজভেল্টের আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গ্লোবাল অর্ডার কী হবে এর এক নির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন। গ্লোবাল অর্ডার  বলতে যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কী হবে, কিভাবে হবে এর নির্ধারক হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। অথবা আরো সরাসরি বললে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতি নিয়ম, মুদ্রা কী হবে তা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঠিক হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারে। এই গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হয়ে ছিল বা আছে মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠান জাতিসঙ্ঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে। অবশ্য সাথে আরো কিছু অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান থাকলেও এরাই মুখ্য। গত সত্তর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারটা চালু থেকেছে। আর তা ভালো ও খারাপ দু অর্থেই। কিন্তু এখন এই প্রথম ক্রমশ অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীন আরো প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসছে। ফলে এবার চীনের নেতৃত্বের নতুন এক গ্লোবাল অর্ডার একে বদলে ফেলতে উঠে আসছে।

    তৈরি হন, গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছেঃ
    কিন্তু এর প্রমাণ কী? এই বক্তব্যের ভিত্তিই বা কী? কারো খেয়ালে বা নেহায়তই অনুমানে এমন কথা নিশ্চয় লেখা যায় না।  আসলে প্রথমে কথাটা কিছু লক্ষণ দেখে বলাবলি শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের দিকে, কিছু পশ্চিমা মিডিয়ায়। পরে আমেরিকা নিজেই সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্টাডি করে গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছে তা নিশ্চিত হয় ও আমাদেরকেও নিশ্চিত করে। এর রিপোর্ট ওয়েবে পাবলিক করে দেয়া ডকুমেন্ট আর যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। শিরোনাম ছিল “২০২৫ সালের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে” [“NIC Global Trends 2025 | (Published in- 2008)| ]। শুধু তাই নয়, পরেও এই স্টাডি চালিয়ে যাওয়া হয়। আরো দুটা রিপোর্টে – ২০৩০ সালে কেমন “NIC Global Trends 2030″| (Published in- 2012)| আর শেষেরটা ২০৩৫ সালে কেমন হবে [“NIC Global Trends 2035″| (Published in- 2017) ] এভাবে। সবগুলোরই একই রেজাল্ট আসে, আমেরিকা ডুবে যাচ্ছে চীন ভেসে উঠছে – নতুন নেতা চীন। বাস্তবে চীনের নেতৃত্বের এই স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে লিড নেয়া শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে।

    ঐ স্টাডিতে চীনের পিছনে পিছনে আর কার অর্থনীতি উঠে আসার সম্ভাবনা আছে, এরও স্টাডি-ডাটা সেখানে ছিল। এ থেকেই বুশের আমল থেকে আমেরিকা নিজের করণীয় ঠিক করে যে, ভারতের পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে একে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা – এটা তার কৌশল হবে। আর তা থেকেই বাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়ে। এমনিতে ভারতের অর্থনীতি খুব গরিবই; বিশেষ করে অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে। তবুও চীনের কাছাকাছি জনসংখ্যার বলে এর পটেনশিয়াল বা সম্ভাবনা আছে এমন “রাইজিং অর্থনীতি” মনে করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৯ সাল থেকে  চীনের নেতৃত্বে পালটা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক ধরনের কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক জন্ম নেয়। ভারত সেখানে যুক্ত হতে অফার পেলে যোগ দেয়। চীনও তার বিনিয়োগ সক্ষমতা থেকে ভারতের চাহিদামত ঋণ বিশেষত অবকাঠামোগত ঋণ প্রদান করতে থাকে। কিন্তু ততই আমেরিকার কাছে ফিরে ফিরে যাওয়ার ঝোঁক ও আমেরিকার অফার করা সুবিধা নেওয়ার ঝোঁক তার বাড়তেই থাকে। যদিও ট্রাম্প আমলে এসে আমেরিকা মনে করে, ভারতকে চীনের পেছনে লাগানো বৃথা। কারণ এটা তেমন কোনো ফলদায়ক নয়, তেমন রেজাল্ট নাই।

    কিন্তু ভারতের আচরণ এমন হয়ে যায় যে, সে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে থাকে যে, সে যেন চীন ও আমেরিকার মাঝে দুটার সাথেই স্মার্ট প্লে করে দু’জনের থেকেই নিজের সুবিধা আদায় করে ফুলে উঠতে পারবে। বর্তমান ভারত-চীন দ্বন্দ্ব-সংঘাত হল,  সেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মোদীর ভারতকে নিজ প্রকৃত সক্ষমতার দিকে হুঁশ-নজর করিয়ে দেয়ারই চীনা-উদ্যোগ, বলা যায়।

    ব্যাপারটা অনেকটা কাউকে মারধর দেয়ার পরে আবার যেমন বুঝিয়ে দেয়া যে কাঁদলে আবার আরো মার খাবি। কথিত বিশ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর চীন সাবধান করে দেয় যেন ভারত নতুন টেনশন আবার সৃষ্টির চেষ্টা না করে। তাই অবশেষে মোদীর সবল অবস্থান ঘোষণা যে “কেউ ভারতের মাটিতে আসেনি”। খুব সম্ভবত ভারতকে সামরিকভাবে আরো হেস্তনেস্ত করবে আর বুঝিয়ে দিবে যে চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করলে ভারতেরই বেশি ক্ষতি শুধু নয়, তার অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া থেকেই মোদির এমন হঠাত বক্তব্য – ‘কেউ ভারতের মাটিতে আসে নাই।’

    কিন্তু ভারতের কেন এমন হল কেনঃ
    ভারতের কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক বা নীতিনির্ধারক চলতি পুরা ইস্যুটাকে “গ্লোবাল অর্ডারের” দিক থেকে দেখেছেন এমন কোন মিডিয়া রিপোর্ট নজরে আসেনি। এর ওপর আছে ভারত মানেই আসলে এক নেশন-স্টেট ভাবনায় ডুবে থাকা ভারত। এর প্রধান স্বাক্ষ্য হল হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনীতি একমাত্র নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই নিজে দাড়াতে পারে।  মোদীর তথাকথিত বয়কট বা স্বদেশি অর্থনীতির ধারণাও বোকা বোকা কথার নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই জন্মাতে পারে।

    তাই এবার আরো সরাসরি বলে, যদি প্রশ্ন করা যায়, গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণের লিডার প্রশ্নে ভারত কার সাথে থাকতে চায় নিজের ভবিষ্যত ভাল হবে বলে মনে করে – আমেরিকা না চীনের সাথে? এখন পর্যন্ত ভারতের আচরণ থেকে এর জবাব হল ভারত জানে না। এবং না জেনেই এমন ফেলে রেখে থেকে যেতে চায়।

    অথচ এর সহজ জবাব হবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং সেটা এজন্য যে, যে নেতার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে সে আমেরিকা, সে ক্ষয়িষ্ণু শেষ হয়ে যাচ্ছে – তাই সে দুনিয়ার অতীত নেতা; বিপরীতে ভারত নিঃসন্দেহে নিজেই প্রধান নেতা হতে চায় অথবা অন্ততপক্ষে আগামী নেতা চীনের প্রধান সহযোগীর ভূমিকায় দেখতে চায়। তাই এটাই হতে হবে। এসবের বাইরে অন্য কিছু তো হতে পারে না। তাহলে সে বারবার অতীতের মধ্যে মানে আমেরিকার ভেতর আশ্রয় খুঁজছে কেন, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে কেন?

    এর জবাব ভারতের কাছে নেই। কেন নেই?
    মূল কারণ, গ্লোবাল দিকটা সে বুঝতেই পারে না। মূল কারণ, হিন্দুত্ববাদী জাতি-রাষ্ট্র বুঝের লোক। এর বাইরে তার দৃষ্টি যায় না, প্রয়োজনও দেখে না। গ্লোবাল বলে কিছু দেখতেই পায় না। তাদের দুনিয়া স্বদেশিপনাতেই!

    যেমন আমাকে একজন বলছিল, পাকিস্তান যদি চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে তাহলে ভারতও চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখলে সেটা দোষের হবে কেন? বা পারবে না কেন?

    প্রথম কথা, আমরা গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকদের সহযোগী (মূল নেতার সাথে প্রভাবশালী ভূমিকায়) কেউ একজন হওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলছি। স্রেফ দুটা রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয় নয় এটা। পাকিস্তান গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকারীদের কেউ নয়, সহযোগী হয়ে ওঠার তালিকাতেও কেউ নয়। পাকিস্তান অর্থনীতিগতভাবেও তেমন কোনো শক্তিশালী দেশ নয়। তাই বলছি গ্লোবাল অর্ডার বা এর নিয়ন্ত্রক বলতে কী বুঝিয়েছি সেটা আমল করাই হয় নাই, এই প্রশ্নের মধ্যে। অর্থাৎ এই প্রশ্নকর্তা যেন ভারত নিজেই!

    হিন্দি বা উর্দুতে একটা কমন ফিল্মি ডায়লগ আছে- “আওকাত দেখা দিয়া” না! মানে কারও বাস্তব মুরোদ বা স্টাটাস কি ও কেমন সেটা কোনো হামবড়া লোককে মনে করিয়ে বা দেখিয়ে দেয়া। চীন ভারতকে তার আওকাত মনে করিয়ে দিয়েছে; যদিও তার মিডিয়া ও বিরোধী দল, এমনকি তার নিজ দল পুরানা স্টাইলে এখনো ভাব দেখিয়ে যাচ্ছে! অর্থাৎ তারা ধারণাও করতে পারছে না চীন মোদীকে ঠিক কী দেখিয়ে দিয়েছে!

    কারো কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা নিশ্চয় দোষের নয়। তবে না থাকলে কেমন আচরণ করতে হয় সেটাই আলোচ্য। যতদিন সেটা অর্জিত না হয় ততদিন ভারত চীনের সাথে সংঘাতবিহীন সম্পর্ক রেখে বা সংঘাত এড়ানোর বুদ্ধিতে চলাই তার জন্য “সোজা রাস্তা” । আসলে চীন বুঝিয়ে দিচ্ছে মোদী তোমার হিন্দুত্ব, তোমার জাতি-রাষ্ট্র ধারণার বাইরের সবকিছুতে অবুঝ থাকা আর তোমার হামবড়া ভাব- এগুলো অচল! এভাবে চললে তুমি মরে যাবা – তাই এসব ছাড়তে হবে।

    চীন কী আগ্রাসনবাদী হয়ে উঠছেঃ
    নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “চীন যা করছে তা পড়শিকে দেয়া উস্কানি মনে হলেও এতে ম্যাসেজ দিয়েছে আমেরিকাকেই”।  আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটরা গালওয়ানের হত্যার ঘটনাকে “চীনের আগ্রাসন” বলছে।  কিন্তু ভারতের এক রিটায়ার্ড লে জেনারেল বলছে, “কে ক্ষমতায় বস – এটা ভারতকে চীনের দেখানো শেষ হয়েছে মনে হয়ে গেলে সে সব ভুমি ফেরত দিয়ে চলে যাবে”।

    একথার সাথে সম্ভবত আরেকটা কথা যোগ দিতে হবে – ততদিনে সম্ভবত চীন  সাথে – এক ডিসিপ্লিন্ড  অনুশাসন মেনে চলা – সুবোধ বালক, এমন ভারতকেও দেখব আমরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভূখণ্ড ফেরত আনা ব্যাপার নয়”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

    “সাম্প্রদায়িকতা” শব্দটা ব্যবহার বাদ দিতে হবে

    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-30x


    গত ১৪ মে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ঢাকার একটা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে করা পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন। তবে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছিলেন। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পাওয়া বাংলাদেশী একজন একাডেমিক। যে কোনো মৃত্যুই শোকের। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।

    তাঁর সম্পর্কে মুল্যায়নের প্রথমেই যে কথাটা বলতে হয় তা হল বাংলাদেশ সরকারের যত সর্বোচ্চ পদক বা সম্মাননা আছে তার সম্ভবত কোনো কিছুই লাভ বা অর্জন করা থেকে তিনি বাদ যাননি। তাই বর্তমান সরকারের ‘ইডিওলজিক্যাল আইকন’ মনে করা যেতে পারে তাকে। শুধু তাই না, তিনি ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা – ‘পদ্মভূষণ’ পদকও লাভ করেছেন।

    গত বারো বছরের নানান রাজনৈতিক উলটপালটে বাংলাদেশের সমাজ এখন মতভিন্নতার এক বিপদজনক জায়গায় পৌছে গেছে। যদিও কোন দেশের সমাজে রাজনৈতিক মতামতে নানাবিধ ভিন্নতা থাকে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় এটা আর এখন নিছক মতভিন্নতা নয় বরং তীব্র এক সামাজিক পোলারাইজেশনের পর্যায়ে চলে গেছে। ড. আনিসুজ্জামান এই মেরুকরণে একটা পক্ষের অন্যতম আইকন ছিলেন, এটা তার ভূমিকায় প্রমাণিত।

    পাকিস্তান কায়েমের সুবিধাভোগী কে নয় কিন্তু, ঘটনা ইতিহাসে স্বীকার নাইঃ
    ১৯৪৭ সালের আগষ্টে পাকিস্তান কায়েম হয়ে যাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান  আর কোন আইডিয়েল [ideal] বা কল্পনা থাকে না, ছুয়ে-ছেনে দেখা ও স্পর্শ করা যায় এমন রিয়েল [real] বা বাস্তব সত্য হয়েছিল। কিন্তু তবু সেই থেকে বুঝে না বুঝে পাকিস্তান এক নিন্দার জিনিষ, খারাপ কাজ হয়ে আছে আমাদেরই অনেকের কাছে। সে সময় থেকেই আমরা পাকিস্তান পছন্দ করি আর না করি এমন নির্বিশেষে আমাদের জন্য কঠিন সত্যটা হল, পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা প্রত্যেকেই পাকিস্তান জন্মের বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছিলাম।  এতে ব্যতিক্রম অবশ্য ছিল কেবল জমিদার ও জমিদার হিন্দুরস্বার্থ ও হেজিমনি বজায় থাকলে ওরই ভিতরে যারা নিজের স্বার্থ দেখতেন, এরাই সেই ব্যতিক্রম।  জুলুম অত্যাচার ও লুন্ঠনকারীরা তো সংখ্যাল্প ও ব্যতিক্রম হবেনই। এতদিন এভাবে রাজত্ব ও রুস্তমি করা এই গোষ্ঠি – এদেরকে বাদে একজনও কেউ সুবিধাভোগের বাইরে ছিল না। বিশেষ করে এই মহাসত্যের কারণে যে, সাতচল্লিশের আগে এই বাসিন্দারাই যেখানে ছিলেন জমিদারের প্রজা অথচ পাকিস্তান কায়েমের পরে তাদের সেই প্রজা- মুক্তি ঘটে গিয়েছিল। প্রজা-পরিচয় থেকে মুক্তি বলতে শুধু জমিদারি উচ্ছেদই নয়, ১৯৫১ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, 1950  ইংরাজিতে মুল আইনটা  [The State Acquisition And Tenancy Act, 1950] গৃহিত হইয়ে যাওয়াতে স্বাধীন পাকিস্তানে আগে প্রজা হিসাবে  চাষাবাদের জমির ভোগদখলের দলিল ‘চাষা’রা এবার নিজের নামে পেয়ে গেছিলেন।  ধর্ম বা দল নির্বিশেষে মূলত সবাই প্রত্যেকেই এতে লাভবান। এমনকি যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেননি, করা পছন্দ করেন নাই অথবা পাকিস্তান কায়েম হওয়া পছন্দ করেননি তারাও হয়েছেন লাভবান। এককথায়, অতএব আপনি-আমি স্বাধীন পূর্ব-পাকিস্তানের বাসিন্দা, নাগরিক হওয়াতে, পাকিস্তান কায়েমের বাস্তবতায় এদের চেয়ে বড় লাভবান হওয়া বেনিফিসিয়ারি আর কেউ নাই।
    কিন্তু আজব ঘটনাটা হল, স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হবার পরবর্তী কালের বাস্তব পাকিস্তানে ‘সাতচল্লিশের দেশভাগ’ যে সঠিক কাজ হয়েছিল এমন কোনো বয়ান ইতিহাসে দেখা যায় না। পাকিস্তান কায়েম ‘সঠিক’ বলে ইতিহাসে তা লিখতে তাদের দ্বিধা ছিল। তাই টেক্সটবুকে পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে সাফাই বক্তব্যের দেখা মেলে না। সেটা এখনো এমনই আছে।  যেমন এটা কী সম্ভব যে ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পরের লিখিত ইতিহাসে টেক্সটবইতে এই স্বাধীনতার পক্ষে সাফাই থাকবে না! কিন্তু পাকিস্তানের বেলায় তাই হয়েছিল।  যেন পাকিস্তানের জন্ম ‘অবৈধ’, আর অবৈধ  সন্তান বলে যেন এর দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না । অথচ এর বাসিন্দারাই  এর আসল সুবিধাভোগী। জমিদারি আইন উচ্ছেদের সুবিধা আমাদের বাপ-দাদা পুর্বসূরিরা প্রত্যেকে ভোগ করে গেছেন, এখনো করছে। তবুও ১৯৪৭-১৯৭১ এ সময়টা আমাদের ইতিহাসে যেন একটা ভ্যাকুয়াম, ফাঁকা কিছু ঘটেনি। অথবা যা ঘটেছে তা ঘটা উচিত ছিল না। তার মানে কী এরও আগের জমিদারি শাসনটাই (১৭৯৩-১৯৪৭) কী সঠিক ও বৈধ ছিল, কাম্য ছিল?

    অথচ এ্মনকি পাকিস্তান আমলের (১৯৪৭-৭১) এই পঁচিশ বছরের মধ্যে  চুয়ান্ন সাল পর্যন্ত না হলেও অন্ততপক্ষে যেখানে একান্ন সালের জমিদার উচ্ছেদ আইন পাস এই অর্জনকে যদি আমরা আপন না করে নেই, তবে এর মানে হবে আমাদের আত্ম অস্তিত্বের সংকটে পড়া। পাকিস্তানের জন্ম যদি আমাদের কাছে অগ্রহণীয় হয়, কাম্য নয় ও অবৈধ মনে হয় আমাদেরকে তাহলে এই উত্তর দিতে হবে যে আমাদের বাপ-দাদারা সকলে জমি কোথা থেকে পেয়েছেন? কারণ ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের নিরানব্বই ভাগই ত জমিদারের প্রজা ছিলেন?

    আমাদের প্রগতিবাদীসহ সকলের চিন্তায় অস্পষ্টতা ও অসঙ্গতি হল আমরা যদি পাকিস্তান জন্মানোকে আপন মনে না করি তবে এটা  তখন কী ছিল? অথবা কী হয়েছিল সেটা কী আমরা কেউ বলতে স্বীকার করতে চাই না! তাহলে এককালে জমিদারের প্রজা চাষা  ‘এরা’ জমির মালিকানা পেলেন কী করে? কেউ বলতে চান না। তারা সম্ভবত বলতে চান, পাকিস্তান কায়েম হওয়াটাই ভুল ছিল।  সেক্ষেত্রে প্রকারন্তরে এর মানে নয় তাহলে জমিদারি শাসনটাই ভাল ছিল। অথচ পাকিস্তান জন্মানোর পরে আমাদের অন্যান্য নতুন রাজনৈতিক চাহিদা বা অভিমুখ তৈরি হতেই পারে। এই আমরাই আবার খোদ পাকিস্তানই ভাঙতেও চাইতে পারি। কিন্তু সে জন্য তো পাকিস্তান কায়েম হবার ঘটনাটা মিথ্যা নয়। তা মিথ্যা একথা বলার কোন দরকারও পড়ে না। আসলে আগের সেই জমিদার হিন্দুর স্বার্থ ও হেজিমনি – সামাজিক কালচারাল আধিপত্য সেটাকেই ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে কেউ অলক্ষ্যে।
    ইতিহাস জিনিসটা এমন যে নানান দেশ, রাষ্ট্রের জন্মের প্রেক্ষাপটে, এর ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য তৈরি হবেই। এমনকি একই দেশের ভেতরেও কমপক্ষে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্য সাধারণত দেখা যায়। সব দেশেই এমন হয়ে থাকে।  ঐতিহাসিকদের মধ্যে তা নিয়ে বিভক্তি ও বিতর্কও চলতে থাকে।  যেকথা বলছিলাম বুদ্ধিমান হলে দু-তিনটি ভিন্ন কিন্তু প্রধান ভাষ্যই টিকে থাকতে পারে আর সেক্ষেত্রে সবগুলো ভাষ্যেরই মৌলিক গল্পকাঠামোটা মোটামুটি একই থাকে, আর কিছু অংশ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। আর ঐতিহাসিকেরা সতিকারের পেশাদার হলে বুঝমান ও দায়ীত্ববান হলে একসময় ভাষ্য-ভিন্নতা নিরসিত হয়ে কোন ইতিবাচক ব্যাখ্যা বয়ানে পৌছাতে পারি, নইলে দেশ ইতর-বয়ানে শার্প বিভক্ত হোয়ার দিকেও যেতে পারে।  আদালতকে দিয়ে ইতিহাস লিখতে চেষ্টা করার ঘটনাও দেখা যেতে পারে।  যদিও আবার দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই পুরা বয়ানই ভিন্ন হয়ে যাবে। যেমন ১৯৭১ নিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভাষ্য-বয়ান ভিন্ন তো হবেই। ১৯৭১ সাল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাষ্যও হবে ভিন্ন। যেমন ভারত  ১৯৭১ কে ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ বলে তাদের সরকারি ইতিহাস লিখেছে।

    বাস্তব পাকিস্তান কায়েমের পরে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজের লিখিত ভাষ্য-বয়ান না থাকায়, মানে পূর্ব পাকিস্তানিরা আপন করে নেয় এমন কোনই বয়ানভাষ্য না থাকায় এর পরিণতি কী হয়েছে? এমন লিখিত ইতিহাস ভাষ্য না থাকলে যেটা হবার কথা, কলকাতায় প্রচলিত টেক্সটবুকের ভাষ্যবয়ান কিছু দিন পরে এখানে চালু হয়ে গেছে। কারণ, বয়ান তো খালি থাকে না। একপর্যায়ে বাংলাদেশেরই কেউ হয়ত কলকাতার সেসব বই পড়ে তা থেকে নিজেই কলকাতার বয়ানে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখে বসেছে। আর তা চালু হয়ে গেছে। এসব শুনে এখন কেউ বোকাবোকা উদার বুঝ থেকে জানতে চাইতে পারে আমরা কলকাতার বয়ানে ইতিহাস পড়লে অসুবিধা কী?  ক্ষতি কী?  আমরা একই বাংলা, একই দেশ তো ছিলাম? তাহলে? আসলে কথাটা হল এমন যেন বলা যে ১৯৭১ সালের আগে তো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ  “তো একই দেশ ছিলাম” কাজেই একাত্তরের পরেও আমরা পাকিস্তানের পাঠ্য ইতিহাসটাই গ্রহণ করে নিয়ে আমাদের পাঠ্য করে নিলে অসুবিধা কী? এখন নিশ্চয় এই জবাব প্রশ্নকর্তার ভাল লাগবে না।
    কলকাতার বয়ানে ইতিহাস নিয়ে আমাদের অসুবিধাটা হল, ওটা আসলে কলকাতার জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে এক সাফাই-ভাষ্য হবে।  আরও স্পষ্ট করে বললে ভারত বা কলকাতা যেটাকে বলে “স্বদেশি আন্দোলন –  সোজা সাপ্টা জমিদারি স্বার্থবয়ানের উপর আধারিত ইতিহাস হবে সেটা। কাজেই এটা আমরা প্রজাদের নিজের স্বার্থবয়ান করে লেখা ইতিহাস হতেই পারে না। দুঃখের কথা আর কারে বলব, পাকিস্তান কায়েমের পর থেকে সাতচল্লিশের আগের শাসক জমিদারহিন্দুরা  শাসন আধিপত্য হারিয়ে কমিউনিস্ট রূপ ও রাজনীতি ধারণ করে সমাজে হাজির থেকেছে। ফলে আগের জমিদারির শাসন আধিপত্যের স্বপক্ষে সাফাই-ভাষ্যটাই  এবার নব্য প্রগতিবাদী কমিউনিস্টরা গ্রহণ ও প্রচার শুরু করেছিল। আমাদের ইসলামবিদ্বেষের শুরু এখান থেকেই। কমিউনিজমের নামে তারা ইসলামবিদ্বেষ করে পাকিস্তানের জমিদার উচ্ছেদের প্রতিশোধ নিয়েছে।
    আরও কঠিন সত্য মানে ফ্যাক্টস হল, ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ আইন  অর্থাৎ বড় হয়ে যাওয়া আগের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি প্রশাসনের নজর প্রধাণত কেবল কলকাতা ও এর আশেপাশে আটকে পড়েছিল, এতে ওদিকে পুর্ববঙ্গ অংশে বা এরও বাইরে আসাম পর্যন্ত এলাকায় প্রশাসন আরো শিথিল হয়ে পড়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিকশিত হয় নাই।  তাই প্রশাসন চালানোতে দক্ষতা আনতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বাংলা প্রদেশ আর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ বলে ভাগ করাকে কেন্দ্র করে হিন্দু জমিদারেরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।  কারণ এতে কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে দাড়াত ঢাকা।  আবার জনসংখ্যার দিক থেকে পুর্ববঙ্গে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট ছিল।  অর্থাৎ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কায়েমের পর থেকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থ আর কলকাতার অধীনস্ততায় না থেকে  বের হয়ে নিজেই কলকাতার সমান্তরাল ক্ষমতা ও শাসন হয়ে উঠতে সুযোগ পেয়ে গেছিল। এটাই  জমিদার হিন্দু আধিপত্যের কলকাতা সহ্য করতে পারে নাই, চায় নাই।  এই দ্বন্দ্ব খোলাখুলি উদাম হয়ে যায়।  এখানে জমিদারহিন্দু শাসন আধিপত্য এতই বড় ক্ষুন্ন হয়েছিল যে তারা বৃটিশদের বা বঙ্গভঙ্গ করার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার ফ্যান্টাসিও করতে গিয়েছিল – যেটা অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুটা গ্রুপের কথা জানা যায়।  কাজেই অনুশীলন ও যুগান্তর ছিল জমিদার স্বার্থেরই সশস্ত্র উদ্যোগ। অথচ কোন সশস্ত্র উদ্যোগ মানে তা “বিপ্লবী” এমন ধরে নেওয়ার কিছু নাই। কিন্তু প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ঢেকে দেয়া হয়েছিল। কারণ অনুশীলন ও যুগান্তর পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে বিলিন হয়েছিল। এমন তামাসা সম্ভবত দুনিয়ার কোথায় দেখা যাবে না যে  বাংলার জুলুমবাজ  খোদ জমিদারেরাই এখানে সশস্ত্র।  এরাই কমিউনিস্ট নামে পরিচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই জুলুম নিপীড়নে অত্যাচারি  জমিদারদের সশস্ত্র স্বার্থ-ততপরতাকেই বলা হয়েছে এটা নাকি “স্বদেশি আন্দোলন” – এটা নাকি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা?  জমিদারের স্বার্থহানি ঘটেছে কলোনি প্রশাসনিক পরিবর্তনে। অতএব এটাকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা বলে চালায় দিতে হবে – কি ফকফকা তামসা! পুর্ববঙ্গের স্বার্থ  এমন জমিদারদের স্বার্থ ও তাদের সশস্ত্র ততপরতার বিপক্ষে ছিল বলে তারা এটাকে কোন “স্বদেশি আন্দোলন” বলে মানে নাই। অতএব তারা কলকাতার লিখিত ইতিহাস পড়তে পারে না। এত কড়া সত্য কথা অনেকের মানতে কষ্ট হতে পারে। অথচ কড়া সত্য হল, দুই দুবারই বাংলা ভাগ হলে (১৯০৫ ও ১৯৪৭ সালে) এটাকে পুর্ববঙ্গ তাদের জন্য ভাল হয়েছেই মনে করেছিল। যেটা জমিদারদের স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ছিল। আমরা জমিদার আর প্রজার স্বার্থ দৃষ্টিভঙ্গি এক হলনা কেন এমন আবদার বা জবরদস্তি তুলতে পারি না! কিন্তু তাই করার চেষ্টা করা হয়েছে। পুর্ববঙ্গ অবশ্যই চাইবে ঢাকা কলকাতার মত ও কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বি এক শহর হোক, সমান হোক, কাছাকাছি হোক। এই দ্বন্দ্ব ও সংঘাতই সব গল্পের মুখ্য বিষয় যেখানে সবসময় আমাদেরকে দাবড়িয়ে অধস্থন করে রাখার অপচেষ্টা আছে।

    কিন্তু আনিসুজ্জামানের মুল্যায়ন প্রসঙ্গে এসে জমিদার স্বার্থবিরোধী পুর্ববঙ্গের কথা উদাম করছি কেন?
    ড. আনিসুজ্জামান আমাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছেন প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ২০১৪ সালে, যা আসলে তার লিখিত বই তিনটারই কিছু সারকথা।  আর সেলেখা  উনার মৃত্যুদিনেই বিকেলে নতুন শিরোনামে প্রথম আলোতে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে।  ড. আনিসুজ্জামানের প্রকাশিত তিনটা আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা ধরণের বইয়ে তাঁর সবকথাই ছড়িয়ে আছে । প্রথম আলোতে ২০১৪ সালে যার পুরানা শিরোনাম ছিল, “বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার“;  আর এরই পুনঃমুদ্রিত ১৪ এপ্রিল ২০২০ এর শিরোনাম হল, মানুষের ভালোবাসা যথেষ্ট পেয়েছি: আনিসুজ্জামান। এই সাক্ষাতকারে যা তিনি বলছেন এর সারাংশ হল, বাবা-মাসহ তার পরিবার কলকাতায় থাকার সময় তারা সকলে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষেই ছিলেন, স্লোগান দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরে পরে পশ্চিমবাংলার ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও পুরা পরিবারই নতুন পাকিস্তানে এসে পড়েছিলেন। নতুন পাকিস্তানের নানা সুযোগ- সুবিধা নিতে খুলনায় পুরা পরিবার মোহাজের হয়ে বসবাস শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে আসার পর এবার মুসলিম লীগের সমর্থন ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। মেরু বদল করে নেন তিনি। কেন?

    তিনি বলছেন, কলকাতার “১৯৪৬ সালে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার সময়” থেকে “আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল”। তিনি বলছেন, “হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়”। এর পরের প্যারায় আরেকটু পরিষ্কার করে বলছেন, “একদিকে সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি”। তার মানে, পাকিস্তানের টিকে থাকাটাকে তিনি নেতিবাচক বলছেন আর দাবি করছেন এই টিকে থাকাটা এক “সাম্প্র্রদায়িকতা”। আর শেষে বলছেন, “তখন সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে”। অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি তার চিন্তা ও মনের হিসাবে ‘শত্রু’ বলে তিনি যাকে চিনেছেন তা হলো ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা বলে তিনি কি আসলেই কিছু চিনেছেন? জবাব হল, একেবারেই না। মনে হয় না। তিনি বরং সাম্প্র্রদায়িকতা বলে আবছা এক আড়ালে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। কেন?

    আনিসুজ্জামানের ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’ মানে কী?
    বুঝা যাচ্ছে সেটাই বুঝতে হবে আগে।
    তিনি কী বলতে চাইছেন ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা থেকে আজ পর্যন্ত যত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছে, তার সবগুলোর জন্য দায়ী একেচেটিয়াভাবে মুসলমানরাই? হা, আনিসুজ্জামান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘটা দাঙ্গাকেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে ভালোবাসেন এবং কেবল মুসলমানদেরকেই এই দাঙ্গার দায়ী জন্য করেন। এটাই তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিযোগে তোলা।
    প্রথমত, সমাজে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পাড়া বা এলাকায় যে আগে থেকেই আধিপত্য ও বড় প্রভাব অবস্থানে থাকে, সেই ‘অপরপক্ষ’কে উৎখাত ও বিনাশ করে তাকে ঐ এলাকা ছাড়া করার উদ্যোগ নিতেই আমরা সব জায়গায় দেখে থাকি, প্রায় অবশ্যম্ভাবী ঘটনার মত। এটাই সাধারণ ঝোঁক হতে দেখা গেছে।  এর কারণ হল, সমাজ দুটো সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানে, তারা তখন উভয়েই পরস্পরের কাছে থাকা অনিরাপদ বোধ করা শুরু করে। এই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যারা শক্তির আধিপত্যে আছে, তারা বিপক্ষকে প্রথমে নির্মূল করে এলাকায় কেবল নিজেরা, নিজেদের একক হুকুমে এলাকা চলবে এই ভিত্তিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা – এটা একমাত্র পথ বলে সাব্যস্থ করে থাকে। আর এতেই  তারা আগে দাঙ্গার সুত্রপাত করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মনেও ভয় থাকে যদি দুর্বল হলেও অপরপক্ষে আগে আক্রমণ করে বসে। এই অজানা টেনশন দ্বিমুখি নিরাপত্তাবোধের অভাব থেকেই সাধারণত বলশালিরাই আগে হামলা করে থাকে যদিও  তাতে শেষে কে মরবে-বাঁচবে তা অন্য কথা। কাজেই দাঙ্গা হলেই তাতে হিন্দু অথবা মুসলমান কোনো একটা সম্প্রদায়কে আগাম ও একচেটিয়াভাবে দায়ী করা ভিত্তিহীন ও ভুল। আমরা  আগেই যেকোন একটা সম্প্রদায়কে দায়ী বলে প্রিজুডিস হয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিতে পারি না। এমন চিন্তা করতে থাকলে একসময় এমন চিন্তাই এক রেসিজমে পৌছাবেই যে ঐ জাতটাই খারাপ, ওদের রক্তের দোষ ইত্যাদি এসব। সারকথায়  এটা আগাম নির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব। আর কোথায় একটা দাঙ্গা হয়ে গেলে পরস্পর পরস্পরকে দায়ী করবে এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু এসবের মধ্যে মুল কথা এটা না যে কে দায়ী – এটা জানলে আমরা কোনদিকে আগাতে পারব। কারণ মূল কথাটা হল পরস্পর থেকে পরস্পর নিজ নিজ নিরাপত্তার অভাববোধ করার অবস্থায় চলে গেছে – এই সামাজিক পরাজয়  আগে ঠেকাতে হবে বা রিপেয়ার করতে হবে।
    কিন্তু এসবেরও আগে আরেক কথা মনে রাখতে হবে। দাঙ্গার মত অবস্থা কেন তৈরি হচ্ছে  সেটার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।  যেমন এক্ষেত্রে দাঙ্গার পিছনের কারণ হল আগের ২০০ বছর ধরে জমিদারি জুলুম অত্যাচার নির্যাতনে ফলে যে ক্ষোভগুলোর জন্ম ও এর নানান মাত্রা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছিল তা গ্রাহ্য না করে জমিদারি চালিয়ে যাওয়াতে  একদিন এমন পরিণতিই তো হবে। আমরা এটা আমল করি নাই।  তা কেন কেউ ভাবেনি? এখন কোন একটা পক্ষের প্রতি ভিকটিমহুড দেখিয়ে সহানুভূতি পাইয়ে দিতে চাইলে তা কতটা কাজের হবে? কাজেই ডঃ আনিসুজ্জামানের সাম্প্রদায়িকতা এই বয়ান মারাত্মক মুসলমানবিদ্বেষী ও  সুক্ষভাবে জমিদারের পক্ষপাতিত্ব করা। ভিকটিমহুডের নেকাব চড়িয়ে। কিন্তু তবু নিশ্চয় কোন দাঙ্গাই পবিত্র নয় হতে পারে না। আমাদের অবস্থান হতে পারে না।  কোন পক্ষকে জিতিয়ে দেয়ার দাঙ্গাই কাম্য নয় হতে পারে না, জায়েজ নয়  এবং সাফাই অযোগ্য।

    বুঝা যাচ্ছে এই দাঙ্গার পুরা ঘটনায় এক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের কাছে তার কয়েন করা শব্দ  ‘সাম্প্রদায়িকতার’ অর্থ হল, তার চোখে “সাম্প্রদায়িকতা” মানেই মুসলমানরা দায়ী। অথচ হিন্দু ডোমিনেটিং এলাকায় সে মুসলমানকে কোপাবে- এটাও স্বাভাবিক। আর যদি কোন মুসলমানেরা বেশি এমন এলাকা হয় তবে এর ঠিক উল্টাটাই হবে – স্বাভাবিক।   ঐ একই পরস্পরকে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধের অভাব। তাই আগাম আক্রমণ – সেই একই ফর্মুলা। অনেকে আবার এসব মেনে নিয়েও এবার কায়দা করে কে কম কে বেশি, এসব কূট তর্ক শুরু করতে পারে। তবে দেখা গেছে প্রশাসনের ভুমিকা গুরুত্বপুর্ণ। আদর্শ হল, কোন দাঙ্গা সংগঠিত হতে দেয়া ছাড়াই প্রশাসন যদি উত্তেজনা নিরসন করতে পারে।   এভাবে সব ক্ষোভ নিরসন করতে পারা একটা সাফল্য হতে পারে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি প্রশাসনের ইতি ভুমিকার কারণ দুই সম্প্রদায় নিজ নিজ নিরাপত্তাবোধ ফিরে পেয়েছে – এটাও হতে পারে।
    দ্বিতীয়ত, অতএব আনিসুজ্জামানের এই ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বুঝ কোন ভাল বা কার্যকর কিছু আনতে পারে না। শুধু তাই না এটা একপেশেও তাই অর্থহীন।  এছাড়া এর আরেক মস্ত ভ্রান্তির দিক আছে।  আমাদের জ্বর হওয়া হল রোগের লক্ষণ,  তা  আসলে রোগ নয়। জ্বর হলে বুঝতে হবে আমার অন্য কোন রোগ হয়েছে। শরীরের কোন ইন্টারনাল অঙ্গ ডিসওর্ডার আছে, ঠিক্ মত কাজ করছে না। সেটা খুজে বের করতে হবে আগে ও সেরে উঠতে হবে। শুধু প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর তারানো যাবে রোগ তাড়ানোর কিছু হবে না।  ঠিক তেমনি কথিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজের কোন মূল সমস্যা নয়, এটা কোন গভীর সমস্যার বাইরের লক্ষণ। তাই কেন দাঙ্গা লেগেছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলে হিন্দু অথবা মুসলমানকে অভিযুক্ত করা নিরর্থক। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করেই একমাত্র স্থায়ী সমাধান পেতে হবে।
    তৃতীয়ত, এটা একটু বড় আর সিরিয়াস। কলোনিমুক্ত স্বাধীন অখণ্ড ভারত গড়তে ১৮১৫ সাল থেকেই রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ আর সেখান থেকে শুরু করে  মাঝে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম পেরিয়ে ১৯৪৭ পর্যন্ত –  ভারতের ‘সকলকে’ নিয়ে কখনও নেহরু-গান্ধীসহ কেউই একটা ভারত গড়ার কোনো কার্যকর প্রস্তাব তারা করতেই পারেন নাই। কারণ তাদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটির দিকটা হল, তারা মনে করেন ধর্মই তাদের কথিত জাতি ধারণার মূল ভিত্তি, আর এটা ধরে নিয়ে একটা হিন্দু-নেশন স্টেট গড়তে প্রস্তাব করে যাচ্ছিলেন তারা। কারণ তাদের সকলের কাছেই রাষ্ট্র গড়া বলতে তা এক জাতি-রাষ্ট্র গড়াই একমাত্র তারা বুঝতেন। রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রবর্তনের চিন্তাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তিতে ব্রাহ্মধর্ম প্রকল্প পরের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ব্যর্থ ও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে হাজির যায়।  এই ব্যর্থতাই তাদের মনে এক সাফাই হিসাবে হাজির হয় যে কথিত ব্রাহ্মধর্ম ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র যেহেতু চেষ্টা করে তারা পারেন নাই, তাই নিরুপায় হয়েই এবার এক “হিন্দু নেশন স্টেট” করতেই তারা এগিয়ে গেছেন। একাজটাই পরবর্তিতে করে গেছেন বঙ্গিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ প্রমুখ সকলেই।  যদিও কংগ্রেসের জন্ম হয়েছেও যতটা সম্ভব এই “হিন্দু নেশন স্টেট” কামনা আড়াল করে, কিন্তু কার্যন্ত তা প্রকাশিত থেকেই গেছে। কিন্তু এই ঝুটা সাফাইয়ের উপর  যে আমরা বিকল্প চেষ্টা করেছিলাম পারি নাই।  কিন্তু মুখ্য প্রশ্ন, অন্য ধর্মের লোকেরা কেন “হিন্দু নেশন স্টেট” এর কল্পনা মানবে এর স্বপক্ষে কোন জবাব কোন সাফাই দেওয়ারও চেষ্টাই করে নাই কংগ্রেসের কোন নেতা। যার সোজা অর্থ হল  তারা জবরদস্তিতে এটা করবেন, চাপিয়ে দিবেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।  এখানেই কংগ্রেসের সাথে হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের দারুন মিল। অতএব কলকাতাসহ সারা ভারত জানত  বাস্তবে তাদের “হিন্দু নেশন স্টেট” চিন্তা আর এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।  আর এরই পরিণতিতে কংগ্রেসের দেখানো পথে এখান থেকেই আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবি ওঠে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল মুসলিম লীগের হাতে। “হিন্দু নেশন স্টেট” এই চিন্তা ও কামনার কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যে দেখানো পথেই তাই মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

    মজার কথা হল রাষ্ট্র বলতে যে “হিন্দু নেশন স্টেট” মানে ধর্ম ছাড়া নেশন হয় না আর নেশন স্টেট ছাড়া আর রাষ্ট্র ধারণা হয় না – এই দুই ভুল চিন্তা আমাদের উপমহাদেশের রূট সমস্যা। কিন্তু এটা  চিন্তা করে ধরতে ও বুঝবার অসমর্থতা আজও যায় নাই।  কংগ্রেস নেতারা হয়ত সীমাবদ্ধতাটা বুঝত কিন্তু তারা আবার নিজেদের নিরুপায়ও মনে করে মিথ্যা  সাফাই খাড়া করতেন। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের “কথিত হিন্দুস্বার্থ” – এর বাইরে তারা যেতে পারেন না এটাই মনে করতেন। আর কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা “নেশন স্টেট” চিন্তাটাই যে সমস্যার আর তা যে মারাত্মক ভুল তা ই বুঝতে সক্ষম তা কোথাও প্রমাণ রাখেন নাই।  তামসার কথা হল তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের রাষ্ট্র-বুঝ নাকি “শ্রেণীরাষ্ট্র” বুঝের। যদি তাই হয় তবে “নেশন স্টেট” এর পক্ষে চলে যাওয়া আর তার উপর আবার তলে তলে সেটা “হিন্দু নেশন স্টেট”  – এই ধারণা তারা হজম করেন কী করে?   অর্থাৎ “শ্রেণীরাষ্ট্র” কথাটা বইয়ের ভিতর তাত্বিক রেখে দিয়েছেন আর বাস্তবের ভারতে কার্যত “হিন্দু নেশন স্টেট” ধারণা কাঁধে নিয়ে কংগ্রেস-বিজেপির সাথে পেস মিলিয়ে এখনও হাটছেন।

    ওদিকে এসব প্রগতিবাদী দাবি করেন তারা নাকি সবার আগে ও উপরে রেনেসাঁ-বুঝের প্রগতিপন্থি। যদি তাই হয় তবে তাদের ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু রাজা রামমোহন কেন এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন?  এদিকটা কোন বামপন্থি বা কমিউনিস্ট কখনও টের পেয়েছেন, ঝামেলাটা ধরতে পেরেছেন তাই জানা যায় না। অথচ কমিউনিস্টদের মধ্যে  ইসলামবিদ্বেষ তাদের মজ্জাগত। আর এই সুত্রে এরা উলটা জিন্নাহকে দায়ী করে যে তিনি “ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান’ কায়েম করেছে বলে।

    কমিউনিস্টদের মাথায় আরেক আজব চিন্তা লক্ষ্য করা যায় ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদ বলে একটা ধারণা।  তারা “নেশন স্টেট” কথাটা শুনলেও এর সাথে জাতীয়তাবাদ ধারণাকে মিলায় না। বরং জাতীয়তাবাদ ধারণাটা নেশন-স্টেট ধারণা থেকা আলাদা এবং তাদের কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বন্ধু মনে করে।  অনেক মনে করে জাতিয়তাবাদ হল  কমিউজম বা সমাজতন্ত্র ধারণার বাস্তবায়নে যাবার আগের ধাপ তাই এটা বন্ধু ধারণা।  অথচ ইউরোপের তিনশ বছরের মর্ডানিটি ও রাষ্ট্র ধারণাটা বলতে তা সব সময়ই নেশন স্টেট ধারণা। জাতীয়তাবাদ শব্দটা ইউরোপে তেমন ব্যবহার নাই তবে কেউ তা করলে সেটাও নেশন স্টেট ধারণা অর্থেই। খুব সম্ভবত এর কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলোনি্মুক্তির যুগে এরা সোভিয়েত ব্লকে গিয়ে ঢুকলে তাদেরকে ‘জাতীয়তাবাদী’ বলে প্রশ্রয়ের খেতাব ও বন্ধু মানা হত।  তারা সমাজতন্ত্রে পৌছানোর আগের ধাপে থাকা রাষ্ট্র বলে সার্টিফিকেট দেয়া হত। এই সার্টিফিকেট অনুসারে নেহেরু-গান্ধীর কংগ্রেস হল ‘জাতীয়তাবাদী’  কিন্তু জিন্নাহর পাকিস্তান? না না। এটা নাকি ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, তাই অগ্রহণযোগ্য ও নিন্দনীয়।

    তবু মনে রাখতে হবে  সব সম্ভাবনা শেষ হবার এর আগে ১৯২৮ সালে সর্বশেষ একটা প্রস্তাব ছিল।  সেটা জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’। বাংলাদেশের একমাত্র বদরুদ্দিন উমরকে দেখা যায় এর জিকির করেছেন। ওর প্রথম দফা ছিল যে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে এরপর ফেডারেল আমেরিকার মত প্রদেশগুলোর এক অখণ্ড ‘কনফেডারেটেট ইন্ডিয়া’ গড়ার দাবি তুলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, নেহরু-গান্ধীরা জিন্নাহর এহেন প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া সহজ কাজ। কিন্তু এর অর্থ যে, পরিস্থিতিকে দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া, এ দিকটা কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না।
    এত দূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারেননি ড. আনিসুজ্জামানরা।  ডঃ আনিসুজ্জামানদের মত যারা চিন্তা করেন তাদের সমস্যা হল,তারা মুসলমানদের উপর সব দায় চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চান। “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা” শব্দটা তাদের কাছে ভাল ওজনদার ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডার এক শব্দ। ্তাই দাঙ্গার পিছনের কারণ কী সেদিকে এরা কোনভাবেই যাবেন না।  অথচ “সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা”  বলতে যদি সব মুসলমানরাই দায়ী হয় তাহলে ভারতের সব দাঙ্গাগুলোর জন্যও মুসলমানরাই দায়ী এটাই কী আনিসুজ্জামান মনে করতেন!

    তবে দাঙ্গার পিছনের কারণ কী এতদুরে আনিসুজ্জামান যাবেন ক্ষতিয়ে দেখতে সক্ষম হবেন এটা আশা করাও ঠিক হবে না। কারণ তিনি রাজনীতিবিদ তো নন বা এ বিষয়ে ভাবার উপযুক্ত কোন একাদেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিও তিনি এমন ধারণা আমাদের নাই। যদিও  এটা ব্যক্তি আনিসুজ্জামানের জন্য দোষেরও নয়। কিন্তু এটা  অবশ্যই এক বিরাট সমস্যা হয়ে হাজির হল, যখন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রোগের এক লক্ষণকেই রোগ বলে ঠাউরে বসতে চাইছেন। বরং ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কে সব সমস্যার গোড়া বলে প্রপাগান্ডা দিয়ে হারানো জমিদার হিন্দুর রাজনীতি ও স্বার্থের পক্ষে থাকা – এভাবে খাড়া হয়ে যাওয়া তাঁর অনুচিত।

    কিন্তু এত শব্দ থাকতে “সাম্প্রদায়িকতা”, এই শব্দটাকেই তাঁরা এত পছন্দের বিষয় করলেন কেন? এছাড়া অবশ্য তাঁরা সময়ে আরো সামনে বাড়েন। যেমন তাদের আরেক শব্দ আছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ (অথবা সময়ে বলেন ‘সেকুলারিজম’), যেটা আরেক ভুয়া শব্দ এবং তা জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থ লুকানোর এক কৌশল।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’। জমিদারেরা বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু ছিলেন বলে জমিদারি সামাজিক ব্যবস্থাটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপ্রথারও ধারাবাহিকতা হয়ে উঠেছিল সহজেই। মুসলমানেরা বাঙালি নয় সেটা না হয় ফতোয়া দেয়া গেল। কিন্তু এদিকে মুসলমানরা তো হিন্দু বাঙালি সমাজেই পাশাপাশি বসবাস করত, তাই চাইলেই ফেলে দিতেও পারেনি। তবে বর্ণহিন্দুর জাতিভেদপ্রথায় মুসলমানদের জন্যও তাদের জাত-অবস্থান ঠিক করে দেয়া হয়। আর সেটা বলাই বাহুল্য তা ছিল নমঃশূদ্র, চর্মকারদেরও দু’ধাপ নিচে। এভাবেই জমিদারি ক্ষমতার হাতেই কথিত “বাঙালিয়ানা” যাত্রা শুরু করেছিল, মুসলমানদের বাইরে উপেক্ষিত রেখে। এওখন এই কলকাতার বাঙালিয়ানা এরা কেমন করে আশা করে যে, তাদের এই সাজানো বাগানে আগুন লাগবে না , ব্যাকফায়ার করবে না? এসব তৎপরতার কোনো চরম ব্যাকফায়ার লন্ডভন্ড প্রতিক্রিয়া হবে না? তাহলে দাঙ্গা জিনিষটা কী যেন?

    তাহলে সেই থেকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এই যে সাজানো মনোরম বাগান মানে জমিদার বাবুর “বাঙালি সমাজ”, এতে প্রবেশ করতে গেলে মুসলমানদের “অনুমতি” নিতে হবে। ঘটনাচক্রে কোনো মুসলমানকে যদি এই ‘বাঙালি সমাজ বসতে উঠতে জায়গা পেতে হত, অফিসে বা ক্লাসরুমে যেমন ততদিনে আবার বৃটিশ ইন্ডিয়াতে মডার্ন এডুকেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরি এসে গেছিল, মাস্টারি ওকালতি পেশকার ধরণের নানান কাজও। এসব কিছুর সুযোগ যদি পেতে হত তবে মুসলমানদের প্যান্ট বা ধুতি পরতে হত, মাথায় টুপি চাপাতে পারতেন না। এই ইতিহাস আমাদের সকলের জানা  অন্তত ষাটের উপরে যাদের বয়স।  এটা কি এনাফ নয় সে সময়টাকে ধরবার জন্য! মডার্নিটি নামের আড়ালে জমিদার হিন্দুর কালচার বা তাদের ঠিক করে দেয়া বৈশিষ্ট্য মুসলমানদের অনুসরণ করতেই হবে, কেন? নইলে? নইলে আপনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ডাকা হবে। আর মনে রাখবেন, একবার সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে দিলে ‘বাঙালি সমাজে’ আপনার প্রবেশ নিষিদ্ধ, অচল হয়ে যাবেন সেখানে। শিক্ষা, চাকরি কিছুই জোগাড় করতে না পেরে এখন না খেয়ে মরবেন, আপনি! আর যারা এখনকার ২০-৩০ বছর বয়সের তাদেরও দুঃশ্চিন্তার কারণ নাই। মমতার আমলে কিছু হয়ত বদলাতে চাইছে। তবু এখনও কলকাতা চলে যান, দেখে আসেন মনোযোগ দিয়ে। তাহলে আনিসুজ্জামান আমাদের কী অসাম্প্রদায়িকতা শিখাতে এসেছেন?

    আর  ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া মানে কী? জমিদারির আধিপত্যে সাজানো ‘বাঙালি সমাজে’ প্রবেশ ওঠা-বসার সুযোগ ও অধিকার পেতে হলে শাসক জমিদার বাবুর নির্ধারিত যে কোড আপনাকে মেনে চলতে হবে, অভ্যস্ত হতে হবে, এটাই “অসাম্প্রদায়িকতা”। আবার অসাম্প্রদায়িকতার ট্রেনিং ও ওরিয়েন্টেশন শেষে ওই সমাজে প্রবেশ করতে পারলে ভেবেন না আপনি তখন বাঙালিও হয়েছেন। আপনি সেই তখন বড় জোর হিন্দু বাঙালির এক পড়শি কেবল।

    অনেকের মনে আছে হয়ত ২০১৩ সালের আগষ্টে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের একাত্তর টিভির এক টকশো ক্লিপ পাওয়া যায় ইউটিউবে, সেখানে “বাঙালি মেয়ে কারা” তা নিয়ে মিতা হকের দেয়া এর বর্ণনা আছে। তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। আর ঐ বক্তব্যের টেক্সট পাবেন এখানে। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আমার কথা আরো ভাল বাস্তব উদাহরণে বুঝা যেতে পারে। মিতা হকের বক্তব্য আমে দেখতে বলছি আমি যা বলতে চাইছি এর রেফারেন্স বা উদাহরণ হিসাবে।  তার বক্তব্যের পক্ষ নেয়া বা নিন্দা করা কোনটাই এখানে উদ্দেশ্য নয়। ওথচ কেউ বাঙালি কি না এর সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হল, সে তার মায়ের সাথে কী ভাষায় কথা বলে, কিভাবে ডাকে ইত্যাদি। অথচ আনিসুজ্জামানের মত যারা চিন্তা করেন তারা ধর্ম বা পোশাক ইত্যাদির একধরনের লাইন টেনে দিতে চায় জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত অসাম্প্রদায়িকতার কোড বলে। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে।এটাও কি ব্যাকফায়ার করবে না? আসলে ‘মাদার টাঙ’ তো লুকানো যায় না, ভুলা যায় না।

    কিন্তু তা না হয় বুঝা গেল, তবু কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক বা সম্প্রদায়, এসব ডাকাডাকির ট্যাগ দেয়া কেন? কারণ খুব সহজ। জমিদারির হিন্দু কালচার বলতে চায় তারা তাদের বাঙালি সমাজ বলে এক বাগান সাজিয়েছে। সেখানে তাদের কোডের বাইরে আলাদা পোষাক বা আচার অথবা কোন চিহ্ন হাজির করা মানে হল তাদের সম্প্রদায়ের সেট আপের মধ্যে আমি আমার মুসলমান সম্প্রদায়েরও  চিহ্ন দেখিয়ে মাথা তুলতে চাচ্ছি। অতএব তাদেরটা নয় আমারটাই কেবল ‘সম্প্রদায়গত বিভক্তি’ চিহ্ন, যা আমি শো করছি বলে তারা দাবি করবে। কারণ রাজত্ব তো তাদের, আমরা তো প্রজা। তাদের সাজানো বাগানে আমরাই যেন হস্তক্ষেপ করছি! এটাকে তারা তাদের সাজানো বাগানে অন্যরাই যেন হস্তক্ষেপ করছে – এভাবে দেখতে চাচ্ছে। অতএব আমরা সাম্প্রদায়িক! এই হল ডঃ আনিসুজ্জামানের রপ্ত করে নেয়া ভাষ্য।
    সেই জমিদার শ্রেণীর আধিপত্যে ও নেতার হাতে চালু করা সমাজ আজও একইভাবে চলছে। আর পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আজো ‘অসাম্প্রদায়িক’ চিহ্ন রপ্ত করতে করতে একেবারে ট্রেইন্ড। কারণ সে জানে এটাই এখনো তার পাসপোর্ট, না হলে বাঙালি সমাজে উঠতে দেয়া হবে না।

    আনিসুজ্জামান সম্ভবত আমরা অনুমান করতে পারি “কলকাতার মুসলমান” হিসেবে ছোট থেকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠতে ট্রেইন্ড হয়েছিলেন। সেই থেকে তাঁর মনে অজানা ভয় কাজ করেছে যে, গোষ্ঠী বিশেষের আধিপত্যের তৈরি করা কোনো গাইড লাইন বা কোড ভঙ্গ করলে সমাজের কোথায় না আবার অপমানিত হতে হয়। মজার কথা হল, কলকাতার মুসলমান যখন পূর্ব-পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন, তখনও তাদের ‘ট্রমা’ যায় না। পিছু ছাড়ে না। কারণ ব্যাপারটা অভ্যাসের গভীরে ঢুকে গেছে – গভীর ট্রমা আর ভয়ে।  উল্টো তারা বাংলাদেশের মুসলমানদেরও ঐ একই ধরনের তথাকথিত মাই ফুট “অসাম্প্রদায়িক” হতে সবক দিয়ে বসেন।

    ঠিক এটাই প্রবলভাবে ঘটেছিল বিশেষ করে ১৯৪৯ সালের দিকে আওয়ামি লীগের জন্মের সময়। কলকাতায় পড়ালেখা করে ফেরত শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত হয়ে যায় লীগের বুদ্ধিজীবী অথবা কালচারাল ভ্যানগার্ড। একারণেই সেকাল থেকেই লীগের অসাম্প্রদায়িক বা কথিত ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার অহেতুক কসরত দেখেছিলাম আমরা।

    ব্যাপারটা হল কোন মডার্ন ভ্যালু বা সরাসরি ইন্ডিভিজুয়ালিজম যদি চর্চা করতেই হয় তো করেন না? সমস্যার তো কিছু নাই।  তবে বুঝে শুনে করেন, মন লাগিয়ে। কিন্তু পুরানা জমিদার বা সামন্ত আধিপত্যের ভ্যালুর জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘোরা তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয় আর হাস্যকর! কেবল খেয়াল রাখবেন, সহনাগরিক কারো অধিকার লঙ্ঘন করে যেন না বসেন, পায়ে মাড়াবেন না কাউকে। কারণ তারাও আপনারই সমান অধিকার; তাদেরও বৈষম্যহীন অধিকার আছে। এটা খুবই শক্তভাবে মেনে চললে দেখেন ভুয়া কথাবার্তার কবল থেকে বহু আগেই আর সহজেই রেহাই পেয়ে যেতে পারেন। খেয়াল রাখবেন কারণ সাবর্ডিনেট হওয়া যাবে না, মানা যাবে না।

    এবার কিছু সারকথা। বাঙালি মুসলমান তা সে যেখানকারই হোক, তার আর কারো কাছ থেকে সে ‘বাঙালি’ কি না, এই স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট অপ্রয়োজনীয়। পুরানা জমিদার গোষ্ঠীর আধিপত্যের কোনো কিছুকে সে আর গুরুত্ব দেয় না বিশেষত ১৯৪৭ সালের পর থেকেই। দিলে তো সে সেই থেকে কলকাতার অধীনেই থেকে যেত। প্রধান কারণ পাকিস্তান কায়েমের পরই পুরা পুর্ব-পাকিস্তান থেকেই জমিদারি উৎখাত করে হয়েছিল। তাই এই জমিদারি-হারানি পরাস্ত স্ট্যাটাস আর তাকে কাউকে বাঙালি সনদ দেবার-না- দেবার কোনো মুরোদ রাখে না। তবে ওই জমিদার ও তার স্বধর্মী সঙ্গীরাই এখন সব ক্ষমতা আর আধিপত্য হারালেও বাম ভেক নিয়ে নতুন করে হাজির আছে। তারা মাঝে মাঝে বাঙালি মুসলমানকে এইবার কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িকতা শেখানোর চেষ্টা করে।

    কিন্তু বাঙালিয়ানা? না সে মুরোদ বা বাস্তবতা আর নেই। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে প্রধানত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করে রেখেছে যে, নিজের বাঙালি স্বীকৃতি আর অপরের কাছে নয়, নিজেই নিজের বাঙালি স্বীকৃতি, নিজেই তা হাসিল করে নিয়েছে। এরজন্য এই জায়গায় এসে শেখ মুজিব আমাদের একটা প্রশংসার দাবি রাখেন। দেখেন তিনিও কলকাতায় বড় হওয়া, পড়তে যাওয়া তাদেরই আরেকজন। কিন্তু কোয়ালিটি একেবারে উলটা। জেনুইন কোর মুসলিম লীগার। ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ কাহিনী তিনি গুমোর ফাঁক করে বুঝতেন। তাই মোহ ছিল না।

    তাহলে ডঃ আনিসুজ্জামান তিনি আসলে কে?
    তিনি হলেন পতিত কিন্তু হার স্বীকার না করা জমিদার হিন্দুর রিয়েল রিপ্রেজেন্টেটিভ।  কলকাতায় জমিদারি এখন আর নাই। আমাদের দেখাদেখি ১৯৫৫ সালের তারাও উঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কলকাতার হিন্দুমনের ফাউন্ডেশন  ও মেজাজ এই জমিদারের হাতে শুরুর দিকে তার রমরমা আমলেই এর নির্ধারক টাচগুলো হস্তান্তর করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের উপর থেকে চরম ও প্রাকটিক্যাল অর্থে হারানি জমিদার হিন্দুর আধিপত্য বা সমস্ত ধরণের প্রতিপত্তির কিছু অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু কলকাতা (বৃহত্তর অর্থে এটা এখন সারা ভারত) হাল ছেড়ে দেয় নাই , হার স্বীকার করে নাই।  চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এই যে হারানি জমিদারের খাসিলতের কথা বললাম ডঃ আনিসুজ্জামান আধিপত্য প্রতিপত্তি হারানো হিন্দু মনের প্রতিটা রক্তফোটার গতিবিধি আকাঙ্খা তিনি বুঝতেন। একারণে বাংলাদেশের কেউ যদি একালে ভারতের সাথে গাটছাড়া বেধে চলতে চান তাহলে তাকে দেখাতে হত যে তিনি ডঃ আনিসুজ্জামানকে আদর খাতির কেমন করেন, কোথায় রাখেন।  আবার ডঃ আনিসুজ্জামান এর দিক থেকে দেখলে তিনিও এসব জানতেন, বুঝতেন তার কোয়ালিটির বাজারদর কোথায় ও কত। ফলে তিনি সে মোতাবেক দাম চাইতেন ও পেতেন। ডঃ আনিসুজ্জামানের মৃত্যতে এই যুগের সমাপ্তি ঘটল।

    কিন্তু কলকাতায় বড় হওয়া মুসলমানরা এখনো এক ট্রমায় ভুগছেন। যেমন মনে করুন, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের অনেক বন্ধু মিলে কোনো আলাপ করছেন। সেখানে নিজেদের মনের মধ্যে কারো কোনো অসাম্য বা নিচু বোধ নেই। ফলে  যা বলতে ও লিখতে ইচ্ছা করছে, তাই করতে তারা অভ্যস্থ অর্থে মুক্ত। কিন্তু যদি আপনারই কোনো কলকাতার মুসলমান বন্ধু এসে গেছে সেখানে এমন হয়! লক্ষ্য করবেন, সে আপনার সাহস ও মর্যাদাবোধ দেখে তো কাঁপছে আর হয়তো বারবার আপনাকে, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে, জামা টেনে ধরছে। তাহলে বুঝতে হবে, কলকাতায় থাকতে থাকতে এটা আপনার বন্ধুর ট্রমা, কোড মেনে চলার তাগিদের ট্রমা।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “ডঃ আনিসুজ্জামান ও “সাম্প্রদায়িকতা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

    ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের মোদী-পাঠ

    গৌতম দাস

    ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Sm

    বিজেপির নরেন্দ্র মোদী ও তার ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর তৎপরতা অব্যাহত আছে তো বটেই বরং বেড়েছে দিল্লির রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে। মানে, বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বা সংশোধিত নাগরিক আইন পাস করার পরে এ নিয়ে বিজেপির হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি বাড়িয়েই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। দিল্লির বিজেপি নেতারা এখন প্রকাশ্য জনসভায় বিরোধিদের “দেশদ্রোহী” তকমা দিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে;  নিজ কর্মীদের নিয়ে গুলি করে মারার শ্লোগান তুলেছে। এরই মধ্যে লন্ডনের ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন এই ইস্যুতে গত সপ্তাহে এক আর্টিকেল ছেপেছে। শিরোনাম “ইকোনমিস্ট এক্সপ্লেনস, দ্যা ইরোশন অব সেকুলার ইন্ডিয়া” [The Economist explains, The erosion of secular India]।
    ‘Explains’ – শিরোনামে উল্লেখ থাকে এমন টাইপের লেখা সাধারণত অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হয় দেখা যায়; যাতে পাঠক ওই ইস্যুর খুঁটিনাটি দিকগুলো ঐ লেখা থেকে জেনে নিতে আগ্রহী হয়। ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেলটা তেমনি ধরনের এক লেখা, যেটার শিরোনাম হল – আমরা “ইকোনমিস্ট ব্যাখ্যা করে বলছি, ভারতের সেকুলারিজমে ক্ষয় ধরে গিয়েছে”।
    এই আর্টিকেলের লেখক দিল্লিতে বসে লিখেছেন তা নিজেই জানিয়েছেন। আর এ ধরনের লেখাকে পত্রিকার নিজের অবস্থান, অন্তত কিছু দায়দায়িত্ব নিয়ে লেখা মনে করা হয়ে থাকে।
    কিন্তু এই লেখার সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক হল “সেকুলার” শব্দের ব্যবহার। সারা ভারতে সেকুলার শব্দের এধরণের বিশেষ আবিষ্কার ও বিরক্তিকর ব্যবহার প্রচলিত আছে সেই ১৯৪৭ সালের আশেপাশের সময় থেকে আজ পর্যন্ত। সেটা এখন ‘লন্ডন ইকোনমিস্ট’ পর্যন্ত এতে সওয়ার হয়েছে এটা দেখতে পাওয়াটা বড়ই চমকপ্রদ ও তামাশার নিঃসন্দেহে! ইকোনমিস্ট এখানে ধরে নিয়েছে যে, ভারত একটা সেকুলার রাষ্ট্র, অন্তত সেকুলার রাষ্ট্র ছিল – ইকোনমিস্ট এই সার্টিফিকেট এখানে বিতরণ করেছে। কিন্তু ‘সেকুলা’র মানে কী? আর কোনটা সেকুলার কোনটা না, তা চেনার উপায় কী?

    যারা দাবি করে থাকে যে সে সেকুলার অথবা তাদের অমুক রাষ্ট্র সেকুলার তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তিনি সেকুলারিজম ও রাষ্ট্রবিষয়ক কনসেপ্ট সম্পর্কে আসলে খুবই কম কিছুই জানেন। যেমন এটা ভারতীয় উপমহাদেশেই কেবল প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় যে, ওমুক রাষ্ট্র বা ভারত সেকুলার কি না! ইউরোপে কোন রাষ্ট্র সেকুলার আর কোনটা না- এমন প্রশ্ন উঠতে দেখা যায় না। এমনকি আমেরিকা কি সেকুলার রাষ্ট্র? এই প্রশ্ন করতে দেখা যায় না কেন? এছাড়া আবার ঠিক কী প্রয়োজন মিটাতে কোন রাষ্ট্রের সেকুলার হওয়া জরুরি কেন? এর জবাব কী তারা জানেন? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন- কোনো রাষ্ট্র সেকুলার কিনা তা বুঝার উপায় কী?

    ইকোনমিস্টের এই লেখায় কোথাও অবশ্য ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, কী অর্থে ভারতে ‘সেকুলারিজম আছে বা ছিল’ বলা হচ্ছে। এটা বলতেই বা আসলে কী বুঝান হয়েছে? তবুও ঐ লেখায় লেখকের এক দাবি হল- “১৯৮০ এর দশক পর্যন্ত ভারতে সেকুলার ভিশন বজায় ছিল এবং তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় নাই” , [“It was the secular vision which prevailed and which remained pretty much unchallenged until the 1980s.”] অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, সেকুলার শব্দের পাশে একটা ‘ভিশন’ শব্দ লাগানো হয়েছে; মানে সেকুলার জিনিসটা একটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বলে ব্যাখ্যা করতে দেখছি। এমনিতে অবশ্য ভারতের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ‘ভারত সেকুলার কি না’ এই গর্ব বা তর্কের মীমাংসা করার পদ্ধতিটা দেখা যায়, খুবই সহজ। ভারতে একজন মুসলমানকে প্রেসিডেন্ট বানানো হলে এটাই তাদের কাছে সেখানে প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে গৃহীত হয়ে যায় যে, ভারত সেকুলার। অথচ ইস্যুটা অমন লোক দেখানোর মোটেই নয়। রাষ্ট্র ধারণা বিষয়ে যারা সিরিয়াস তাদের কাছে এসব আমলযোগ্য কথা হতে পারে না।

    এ ছাড়া ঐ আর্টিকেলের শুরুতে বলা হয়েছে, ভারতের যারা মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে ছিল (মানে কংগ্রেসকে কল্পনা করা হয়েছে) এরা নাকি ‘সেকুলারিজমের স্বপ্ন’ ও ‘ইনক্লুসিভ রিপাবলিক’-এর স্বপ্ন দেখতেন, [Whereas the mainstream of India’s independence movement envisioned a secular, inclusive republic……]। কিন্তু সরি, লেখক মহাশয়! আপনার এই কথা বাস্তবের সাথে মিলে না। ফলে, এটা অগ্রহণযোগ্য দাবি। কারণ ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিষয়ক কোনো ধারণা প্রকাশ করা আমেরিকানদের চালু করা শব্দ। এ ছাড়া কোল্ড ওয়ার যুগ শেষের আগে আমাদের এদিকে এই শব্দ দেখা যায়নি। বিশেষ করে গ্লোবালি ইসলামী রাজনীতিতে একালে তা বাধ্যতামূলক আমলযোগ্য ইস্যু হয়ে পড়ার পর এটা আমেরিকানদের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশের পরই কেবল এটা এক ভাষ্য হয়ে উঠেছে; আগে না। ইসলামী রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্র বা শাসন ধারণার “খেলাফত” শব্দে আমেরিকার আপত্তি তারা এভাবেই এই শব্দ দিয়েই প্রকাশ করে থাকে যে রাষ্ট্র মাত্র তাতে বসবসকারি সকল অংশকে সাথে নিয়েই রাষ্ট্র গড়ার কল্পনা করতে হবে। কাউকে বাইরে রাখা যাবে না, উপেক্ষায় ফেলে রাখা সুযোগ নেয়া যাবে না।

    এছাড়া মূলত কংগ্রেস কখনই “ইনক্লুসিভ রিপাবলিক” বলে কোনো ধারণা ব্যবহার করে নাই। এমনকি ১৯৪৯ সালে ভারতের কনস্টিটিউশন রচনার সময় রুটিন কাজ হিসাবে ‘রিপাবলিক’ শব্দটা ব্যবহার করা ছাড়া আর ভারতের আর কোথাও শব্দটাই ব্যবহার করা হয়নি। আসলে রিপাবলিক শব্দটাই আমাদের এশিয়ায় এদিকে প্রয়োজনীয় ধারণা মনে করার রেওয়াজ নাই। খুব সম্ভবত আমেরিকানেরা কমিউনিস্ট ঠেকাতে চালু করা এক ভুয়া শব্দ “ডেমেক্রেসি” – এটা চালু করার কারণে গুরুত্বপুর্ণ ‘রিপাবলিক’ ধারণাটা চাপ দিয়ে ফেলা হয়েছে। তাই  এই দুর্দশা।  আর সোজা হিসাবে এদিকে ‘ইনক্লুসিভ’ শব্দটার ব্যবহার কংগ্রেস দলের নেতা ব্যক্তিত্বরা  যদি বুঝেই থাকত ও মেনে নিত, তবে পাকিস্তান আলাদা হওয়ার দিকে যেত না। অথবা বলা যায় তাঁরা যেতে দিয়েছিল কী করে? তাহলে নেহরুর “অখণ্ড ভারত” দখলের ও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা,  যেটা তাঁর ষোলোআনা ছিল, তার কী হবে? আমরা তো সেটার এখনো সহজেই এর প্রমাণ পাই। মনে রাখতে হবে, অখণ্ড ভারত পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আর সবাইকে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ ভারত রাষ্ট্র গড়া- এ দুটো কারও কারও কাছে অতি উতসাহে শুনতে কাছাকাছি মনে হবে হয়ত। কিন্তু এ দুটো- একই বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও, এরা একেবারেই ভিন্ন বিষয়। আসলে একটা হল, স্রেফ ভূখণ্ডের লোভ। আর একটা হল সবাইকে একই ও সমান নাগরিক মানুষ হিসেবে একত্রে এক রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত ও গণ্য করে গড়ে তুলতে চাওয়া।
    ওদিকে আবার, গান্ধী ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন; এর প্রমাণ দেখা যায় না।  বরং আসলে তা হবার কথাই না। কারণ  গান্ধী-নেহেরুর রাষ্ট্র-চিন্তা – সেটা এক জাতিরাষ্ট্র পাবার চিন্তা। আর জাতিরাষ্ট্র চিন্তায় “খেলাফত কোন অনিবার্য প্রয়োজনীয় ধারণা নয়।  বরং, তাদের কথিত “দেশপ্রেমিক জাতি” হলেই চলে। গান্ধী বরং তাঁর খামতি চিন্তার অপুষ্টির কারণে  সারাজীবন তিনি “হিন্দু আর মুসলমান’ – এভাবে পরিচয়মূলক শব্দ আওড়ায়ে গেছেন। নন-আইডেনটিটি-মূলক সিটিজেন বা নাগরিক শব্দ কখনই ব্যবহার করতে পারেন নাই।  আসলে মূলত তিনি ‘হিন্দু-মুসলমান এক করতে হবে’ এই হাল্কা ও অর্থহীন ভাষ্য আউড়িয়ে গেছেন। একটা রাষ্ট্র গড়তে চাইলে দুটো আলাদা ধর্ম হিন্দু-মুসলমান, এদের এক করতে হবে কেন? এর চেয়েও বড় কথা- দুটো আলাদা ধর্মকে এক করা কি আদৌ সম্ভব, না এর দরকার আছে? এদিকগুলো তিনি ভাবতে সক্ষম ছিলেন মনে হয় না।
    দুনিয়াতে ‘আধুনিক রিপাবলিক’ রাষ্ট্রধারণা আসা ও এটা গড়ার চিন্তা এসেছে কবে থেকে? জবাবে সবাই মেনে থাকেন যে, এটা মোটাদাগে ১৬৫০ সালের পর থেকে। একটা ভুল ধারণাও এখানে আছে যা অনেকে ধারণ করে থাকতে পারে। ১৬৫০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত জন্ম নেয়া সব রাষ্ট্র একই ধরনের রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রধারণা, তা কিন্তু নয়। সহজে চিনবার জন্য বললে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আর পরের ধারণা আলাদা এভাবে মনে রাখলেই চলে। এই যুদ্ধ সব বদলে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে ফারাকটা কী ছিল? তা হল, ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র বলতে একমাত্র তা নেশন-স্টেট বলে বুঝা হত। আর পরে সেগুলো সবই হয়েছে অধিকারভিত্তিক ‘রিপাবলিক রাষ্ট্র’। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, ১৯৫৩ সালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্রের “কাউন্সিল অব ইউরোপ” গঠনকে যদি  লক্ষ্য করা যায়। এর জন্ম-উদ্দেশ্যই ছিল এক হিউম্যান রাইটস কনভেনশন ডাকা (নাম ছিল ইউরোপীয় কনভেনশন অন হিউম্যান রাইটস, ECHR)। নিজেদের রাষ্ট্র-ভিত্তি কথিত “জাতি” ধারণা থেকে বদলে হিউম্যান রাইটে রূপান্তরিত করে নেয়া যায়।  যাতে ওই কনভেনশন শেষে একমত হওয়া ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা, এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রগুলোকে জাতিরাষ্ট্র থেকে হিউম্যান রাইটসভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র আকারে ভিত্তি বদলে নেয়া যায়।

    অতএব যে ইউরোপের কথা আমরা শুনি জানি, যার এক নমুনা হল সেকালের কলোনি-মালিক ব্রিটিশ রাষ্ট্র; এটা আসলে সেকালে ছিল এক জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট; মানে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। আর তাই যে জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে সেকালের রেনেসাঁ-চিন্তা ব্রিটিশের হাত ধরে ভারতবর্ষে এসেছিল সেই রেনেসাঁ ছিল মূলত একটা জাতিরাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ও ধারণা। কমিউনিস্ট সার্টিফিকেট অনুসারে সেকালের রাজা রামমোহন রায়কে ‘ভারতীয় রেনেসাঁর আদিগুরু’ মানা হয়। সেই রামমোহনের সক্রিয়তার কাল (১৮১৫) থেকে পরিশেষে ১৯৪৭ সালের আশপাশের সময়কালের নেহরু-গান্ধীর রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত তো বটেই, এমনকি এখনো সেই রাষ্ট্রধারণাটা মূলত একটা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৪৭ সালের পর  ‘গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত’ আসলে এক নেশন-স্টেট হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল। এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। কিন্তু ভারত নেশন-স্টেট বুঝের ভারত হলে, তাতে কী সমস্যা?

    এক্কথায় এর জবাব হল, নেশন-স্টেট ধারণা “নাগরিক অধিকার” বা “হিউম্যান” রাইট ধারণা বুঝতেই পারে না। আর নেশন-স্টেট ধারণা এসেছে – রাষ্ট্রগড়া বলতে যেখানে মুল কর্তব্য ছিল একটা “রাজনৈতিক কমিউনিটি” গড়া – এই কাজ থেকে বিচ্যুতি [derailment] হিসাবে।
    এছাড়া রাষ্ট্র বলতে এক ‘জাতিরাষ্ট্রে’র স্বপ্ন-কল্পনা থাকলে গঠনকারীদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়, কাকে তারা ‘জাতি’ হিসেবে নেবে? যেমন রামমোহন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র দেখে এক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু খেয়াল করতে হবে তার এই জাতি ধারণাটা আসলে (এথনিক অর্থে) এক ধর্মীয়-জাতি ধারণা। ঠিক যেমন এই একই  বিচারে ব্রিটিশরা হল, এঙলো-ক্যাথলিক খ্রিশ্চান, আর এই ধর্মের ভিত্তিতে তারা এক ব্রিটিশ জাতি। আর এখান থেকেই রামমোহন একটা একক ধর্মের ভিত্তিতে এক ভারতীয় জাতির কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এতে হিন্দুধর্ম তার ‘ঐ’ প্রয়োজন মিটাতে পারবে, তা তিনি মনে করেননি। কারণ এই হিন্দুধর্ম জাতভেদ প্রথায় ডুবে অসংখ্য জাতে বিভক্ত। এছাড়া ভারতে আরো ধর্মও আছে। এছাড়াও তিনি কোন একটা একেশ্বরবাদী ধর্ম হলে তা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত হবে বলে মনে করতেন। কারণ হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার ধারণাকে তিনি এক্ষেত্রে তার প্রয়োজনের দিক থেকে দেখে সমস্যা ভাবতেন। এসব চিন্তা থেকেই ১৮১৫ সালে তিনি একেশ্বরবাদী ‘ব্রাহ্মধর্মের’ প্রচলন করেছিলেন।
    কিন্তু এই “জাতি” ধারণা প্রয়োজনে ধর্ম-প্রকল্প বাস্তবায়ন রামমোহন বা তার অনুসারীরা কেউ সম্পন্ন করতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আর ১৮৭২ সালের দিকেই, খোদ ব্রাহ্মধর্মই দু’ভাগ হয়ে যায়। অর্থাৎ সবাইকে এক ধর্মের অনুসারী করে জাতিরাষ্ট্র বানানো দূরে থাক ব্রাহ্মধর্ম নিজেই বিভক্ত হয়ে যায়। তাই, এটা উদ্যোক্তাদের কাছে অবাস্তব প্রকল্প মনে হতে থাকে আর ততই পরবর্তিকালে বিবেকানন্দ-অরবিন্দ-বঙ্কিমচন্দ্রসহ সবার কাছেই “ব্রাহ্ম-প্রকল্প বাদ দিয়ে” হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একমাত্র বাস্তবতা বলে নিরুপায় ‘সাফাই’ হয়ে উঠতে থাকে। কংগ্রেসের জন্মের (১৮৮৫) পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা- এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়। আফ্রিকা থেকে ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে দেশে ফিরেন গান্ধী। পরের বছরের মধ্যে তিনি কংগ্রেসের হাল ধরেন । তখন থেকেই এবং মূলত ১৯২৩ সালের ‘লক্ষৌ প্যাক্ট’-এর ঐক্য ব্যর্থ হয়ে যারার পর থেকে হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা একেবারে নির্দিষ্ট হয়ে জায়গা পেয়ে যায়। তবে গান্ধীর কৌশলে, এটা হিন্দুধর্মভিত্তিক বা এটা আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, সে কথা সরাসরি না বলে আবছা করে রাখা হয়। আর তখন থেকে বিপদে পড়লে হিন্দু শব্দটা ঠিক ধর্ম নয়, সভ্যতা বলে বুঝতে হবে বলে দাবি করার চাতুরী তারা করে গেছেন।

    আসলে জাতিরাষ্ট্র বুঝের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, এখানে ‘জাতি’ মানেই কোনো একটা আইডেনটিটির জাতি মানে, ভাষা ধর্ম বা অন্য কোনো পরিচয়কে ভিত্তিতে জাতি ধরেই এখানে আগাতেই হয়। আর এতেই অন্যান্য ধর্ম অথবা অন্য আইডেনটিটিগুলোও কেন জাতির ভিত্তি হিসেবে তাদেরটা নেয়া হবে না, সে দাবিদারির প্রশ্ন উঠে নতুন অসন্তোষ তো অবশ্যই উঠে কিন্তু সবচেয়ে বড় এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব খাড়া হয় যে নাগরিকদের প্রতি নাগরিকদের মধ্যে একটা না একটা অসাম্য রাষ্ট্র নিয়মিত তৈরি করতে থাকে।

    তুলনায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নগুলো মীমাংসিত। যদিও কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার পরে এবার তা বাস্তবায়ন করাটা মূল কাজ যে, ধর্ম বা যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

    সারকথাটা হল গান্ধী-নেহরুরা হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণা আঁকড়ে থাকাতে তারা জিন্নাহ বা মুসলিম লীগের বা কোনো মুসলমানের প্রতি বৈষম্যের কোন সদুত্তর বা সন্তোষজনক জবাব তৈরি করতে পারেননি। পরিণতিতে আলাদা রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি বড় হয়ে শেষে তারা আলাদা হয়ে যায়; যদিও অনেক মুসলমান দেশত্যাগ করলে নিজের বৈষয়িক অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ার হবু আশঙ্কায় ভয়ে আপসে ভারতেই থেকে যান।

    এর সার কথাটা হল, এখান থেকেই হিন্দুধর্মভিত্তিক ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণার কারণে ভারতের সব প্রধান দলই কমবেশি ‘হিন্দুত্ব’- এই জাতিবাদের অনুসারী থেকে যায়। এর মধ্যে সেকালের আরএসএস কে (একালের বিজেপি) বলা যায় ‘চরম’ হিন্দুত্ববাদের দল। এ কারণে লক্ষ্যণীয় যে বিজেপির চোখে এখনও ‘নাগরিক’ বলে কোনো ধারণা নেই। তাই সহজেই, মুসলমান বা অন্য নাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষার কোনো দায় অনুভব করে না বিজেপি। তাদের দলের কোনো দলিলেও এর স্বীকৃতি নেই।

    তাহলে এটা কী কংগ্রেসের কি আছে? না তাও নেই। কারণ ভারত মূলত ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণার দল দিয়েই গঠিত ও পরিচালিত। ‘নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ ধারণা ও বোধের দল দিয়ে নয়, তাতে সে দল কমিউনিস্ট হোক কি বিজেপি!

    উনিশ শ’ আশির দশকের শেষের দিক থেকে ভারতে কংগ্রেস দলের প্রভাব ও আধিপত্যের পতন শুরু হয়ে যায়। আর এটা লক্ষ্য করেই ইকোনমিস্টের লেখক দাবি করছেন সেকুলারিজমের ক্ষয় তখন থেকে। তিনি ‘কংগ্রেস’ শব্দের জায়গায় ‘সেকুলারিজম’ বসিয়ে কাজ সেরেছেন যেন এর আগে ভারত বিরাট সেকুলার ছিল। এর আগে যেন বছর বছর দাঙ্গা হয়নি। কাশ্মিরে নির্বাচনে ভোটে কারচুপি করে ভোটের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো আর রাজনীতিতে সশস্ত্রতার আমদানি কি ১৯৮৭ সালে কংগ্রেস আমলে হয়নি? তাই, একা বিজেপি সব দোষের ভাগী এ কথা ভিত্তিহীন। রাহুল গান্ধী কি একালে ‘সফট হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছেন না?

    তাহলে এখন সত্যিকারভাবে চিনতে হয় কী করে যে, রাষ্ট্র সেকুলার কিনা? রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা ও বোধের অভাব আর সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে সেকুলারিজম সম্পর্কে সব অদ্ভুত ধারণা আমরা দেখতে পাই। সেটা মুসলমান রাষ্ট্রপতি দেখানো মানে, তা সেকুলারের লক্ষণ পর্যন্ত। এমনকি এটা কনস্টিটিউশনে ওই রাষ্ট্র সেকুলার বলে ঘোষণা দেয়া আছে কিনা অথবা রাষ্ট্রের মূলনীতির একটা সেকুলারিজম কিনা, ইত্যাদি দেখিয়ে যারা দাবি করে, আমার বা অমুকের রাষ্ট্রটা সেকুলার তারা রাষ্ট্র বা সেকুলারিজমের কিছুই বুঝে না। এটা আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। তবে একাজটা তারা করে তাদের একটাই উদ্দেশ্য হল, মূলত ধর্মীয় সংখালঘুদের ভোট এই উপায়ে হাসিল করা।

    তাহলে আবার প্রশ্ন সেকুলারিজম বুঝব কেমন করে?  এপর্যন্ত আমরা দেখেছি সেকুলারিজম যেন অবশ্যই ধর্মবিষয়্ক একটা ইস্যু। হা আপতিকভাবে তা মনে হতে পারে কিন্তু এটা মূলত নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষম্যের ইস্যু। কোন দুই নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সাম্য বজায় না রাখার সমস্যা।  যেমন দেখেন, আমাদের রাষ্ট্র এখন ছাত্রলীগের বা আওয়ামি কোন অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইনভঙ্গ করে হলেও বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। তাদের কৃত কোন অপরাধ বা রাষ্ট্রের আইনভঙ্গকে উপেক্ষা বা প্রশ্রয় দিচ্ছে।  রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের প্রতি আইন ভঙ্গ করে হলেও ছাড় দিচ্ছে, বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে – এগুলো যথেষ্ট প্রমাণ যে, এই রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারবিষয়ক বৈষমাই করছে – ফলে বৈষম্যের রাষ্ট্র। নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র নয়। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক বৈষম্য করা মানে তা যদি হয় ধর্ম পরিচয়ের কারণ-সংশ্লিষ্ট তখন এটাকে রাষ্ট্র সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করছে বলা হয়। তাই ‘সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গ’ কথার মূল অর্থ হল নাগরিক বৈষম্য করা।
    যেমন মোদীর সিএএ – এই আইনে মুসলমানদের বেলায় বৈষম্য করা হয়েছে তাই এই আইন সেকুলারিজমের নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে – এভাবে বলা যায়।  যদিও এখানে মূল কথাটা হল নাগরিকের মধ্যে অধিকার বৈষম্য করা। আর কেমন ধারার বৈষম্য এর উত্তরে বলা যায় ভিন্ন ধর্মের নাগরিক বলে সংখ্যালঘু বলে তাদের সাথে করা বৈষম্য এটা।
    আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রলীগের মতো সংগঠনকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এটাও বৈষম্য করা। ধর্মের কারণেসহ যেকোনো কারণে নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা, বৈষম্যের চোখে দেখা ও আচরণ করা এটাই মূলত নাগরিক সাম্য বজায় রাখার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা।  কেবল ধর্মীয় বৈষম্য নয়, বরং যেকোনো নাগরিক বৈষম্যই নাগরিক-সাম্যের নীতি ভঙ্গ করা।
    এরপরে আর একটা দিক আছে। আলাদা করে “আমাদের রাষ্ট্র সেকুলার” – একথা কনস্টিটিউশনে লিখে রাখা বা না রাখাটা গুরুত্বপুর্ণ না। কারণ মূলত রাষ্ট্রকে ধর্মীয় কারণের বৈষম্যসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হয়ে দাড়ানোই  নাগরিক সাম্যনীতি।  তাই  রাষ্ট্র সেকুলার কিনা  এটা বুঝবার আসল জায়গা হল ঐ রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেখানে তাকাতে হবে।  আমার রাষ্ট্র সেকুলার – আলাদা করে একথা লিখা রাখা না রাখা এজন্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।  মানে লিখে রাখলেও সেকুলারিজম কায়েম হবে না। এজন্যই যারা এই লিখে রাখাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এরা সেকুলারিজম ইস্যুটা বুঝে কিনা সন্দেহ করা যায়। রাষ্ট্রের চোখে দেশের সবার পরিচয় যাই থাক, মূল বিষয় হবে তাদেরকে কমন “নাগরিক” পরিচয়ে আমল করা হচ্ছে কি না, সে সমান অধিকারের নাগরিক বলে মানা হচ্ছে কি না, কোন ধরনের বৈষম্যের শিকার সে হচ্ছে কি না, ন্যায়বিচার পাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এগুলোর সদুত্তর হল সেকুলার রাষ্ট্রের চিহ্ন। নাগরিক সাম্যের ব্যত্যয় ঘটলেই মানে, অধিকারে বৈষম্য ঘটলেই আসলে  নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ হবে। আর নাগরিক সাম্যের নীতি ভঙ্গ মানে সেখানে সেকুলারিজম নীতিভঙ্গও ঘটবেই। তাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলার লেখা আছে কি না এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল রাষ্ট্র নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না সেদিকে পরীক্ষা করতে হবে।

    ওদিকে আবার অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র না হলে নাগরিক সাম্য বজায় থাকা বা বৈষম্যহীনতা রক্ষা করা আশা করা যায় না। আর সেকুলারিজম চিনার উপায় হল রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের বেলায় বৈষম্যমূলক কিনা মানে নাগরিক সাম্যের নীতি মানে কি না এটা চেক করে দেখতে হব।

    জন্ম থেকেই ভারত হিন্দুজাতিভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই ভারতের নাগরিক জীবনে নাগরিক সাম্য বা বৈষম্যহীনতা বজায় থাকার দাবি বা এই বোধ সরব বা সক্রিয় নয়। একই কারণে তাই সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশনের উপর নাগরিকের দাবি বা চাপ তেমন নেই। জেলা শহরভিত্তিক মফস্বলে বিজেপি বা এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা, মুসলমান বলে কোনো মানুষকে ধরে নির্যাতন করছে, তাকে মাটিতে শুইয়ে বুকের ওপর লাফ দিয়ে জোড়া পায়ে উঠছে। অথচ গোল হয়ে চার পাশে মানুষ নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে এই নির্যাতন উপভোগ করছে। অথচ  কোনো প্রতিক্রিয়া নাই তাদের। এমন ভিডিও ক্লিপ মোদীর একালে আমরা অনেক দেখেছি। এর মানে হল,  নির্যাতিতকে কেউ তাঁরা তারই মত সমান মর্যাদা ও অধিকারের নাগরিক মনে করছে না। এটাই এর অর্থ তাতপর্য। আবার গত নির্বাচনে নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে একমাত্র মোদীর বিরুদ্ধেই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি বা রায় দেয়নি। কেন? বিজেপি দলের ম্যানিফেস্টোতে নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য নেই কেন? নির্বাচন কমিশন কোনো আপত্তি তুলেনি কেন? আবার বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী বক্তব্য দেয়াতে এই ভাবনার উৎস হিসেবে দলের দলিল তালাশ করে কী কমিশন কখনও দেখেছে?  কখনো কোনো প্রশ্ন তুলেছে?  মনে হয় না। অথচ এগুলো সবই নাগরিক অসাম্যের মামলা। মানে সেকুলারিজমের নীতিও ভঙ্গের মামলা। অথচ ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছে সেকুলারিজম শব্দের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষ করা ও উল্টা বৈষম্য করা সবই যেন বৈধ।
    এখন দিল্লির নির্বাচন চলছে। বিজেপি নেতা কাপিল গুজ্জর গুলি ছুড়ে হুমকি দিয়ে বলেন  এই দেশে কেবল হিন্দুরা যাই বলবে তাই চলবে On 1 February, Kapil Gujjar fired shots at Shaheen Bagh saying, “Iss desh mein sirf Hinduon ki chalegi (Only Hindus will have their say in this country).”। এগুলো গুরুতর নাগরিক বৈষম্য করার মামলা। এবং সেকুলারিজম নীতি ভঙ্গের মামলা।

    এভাবে এক হিন্দুত্ববাদ ছেয়ে বসছে চারদিকে; যেন হিন্দুত্ববাদই, অর্থাৎ এর এই বৈষম্য ও অবিচারের আধিপত্যই একালের নিয়ম!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    এই লেখাটা গত ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “‘ইকোনমিস্টের’ মোদি-পাঠ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]