Category: নেপাল-ভারত সম্পর্ক

  • নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    গৌতম দাস

    ১৫ জুন ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-33n

    _Nepal’s new territorial map, released earlier this week, has shown the area in the light red shade to be part of its territory, evoking strong reactions from India. This came after India, in its new maps released in November last year, showed the Kalapani area (marked in deep red) to be part of its territory. SCMP

    এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতের পড়শি অঞ্চলের সকলেই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য রাখছে নেপাল কী করছে, কী করে ভারত মোকাবিলা করছে। প্রশ্নটা মোকাবিলার। নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবল টেনশন উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বেড়েই চলছিল। এরই মধ্যে নতুন ঘটনা হল, গত ১২ জুন সকাল নয়টায় ভারতের বিহার রাজ্যের সীতামারহি [Sitamarhi] জেলার সীমান্তের ওপারে নেপালের অংশে তাদের সরলাহি [Sarlahi] জেলার সীমান্ত এলাকায় নেপালি সীমান্তরক্ষীর গুলিতে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। সেই সাথে ঐ গোলাগুলিতে দুজন ভারতীয় গুরুতর জখম হয়ে ভারতের হাসপাতালে জীবন নিয়ে লড়ছে আর একজন ভারতীয় নেপালি হেফাজতে আটকা আছে, যাকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
    নেপাল-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এবারের উত্তেজনা ও অসন্তোষের  মূল ঘটনাটা মূলত ৮ মে থেকে; যখন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (অনলাইনে ভার্চুয়ালি) একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। বিবিসির ভাষায়, “ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ঐ গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটা ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে”। নেপালের দাবির পক্ষে যুক্তি এটাIndia and Nepal Treaty of 1950তে [Sugauli Treaty 1816]  এর রেফারেন্স আছে। সুগৌলি চুক্তি হল ১৮১৪-১৬ সালের এংলো-নেপাল যুদ্ধের শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটা থেকে নেপালের সীমানার রেফারেন্স টানা হয়ে থাকে। এই চুক্তির পরবর্তিতে ব্রিটিশরা আরও তাদের দখল নেয়া এলাকা ছেড়ে দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে ১৯২৩ সালে আরেক আপডেটেড নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি [Nepal–Britain Treaty 1923] করেছিল। আর এই চুক্তিতে উল্লেখিত মেয়াদ শেষেই ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি [India and Nepal Treaty of 1950] স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নিয়ে এখনকার নেপালের প্রবল আপত্তি উঠে আছে। চুক্তি নিয়ে একটা রিভিউ প্রক্রিয়া চালু আছে। যদিও চুক্তি এখনো বহাল আছে।

    সাবধান, প্রতিহিংসা এক নেতি এনার্জি, এটা উলটা আপনারই ক্ষতি ডেকে আনতে পারেঃ
    গত ১৯৯৬ সালে নেপাল মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর প্রাক্কালে এই ১৯৫০ সালের চুক্তি রিভিউ বা বাতিল অন্যতম দাবি হিসাবে তাতে যুক্ত করা ছিল। বিগত প্রায় দুশ বছর ধরে নেপাল-ভারত সব সময়ই কোন না কোন এক চুক্তি  গুরুত্বপুর্ণ হয়ে থেকেছে। অন্তত তা এজন্য যে নেপাল ভুমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। নেপালের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চীন এভাবে এইদুদেশ দিয়েই নেপাল ঘেরা। যদিও আবার দক্ষিণের ভারতের দিক দিয়ে নেপালে প্রবেশপথগুলো তুলনামূলক সহজ, অন্তত দক্ষিণদিকের পাহাড়ি এলাকা বা পথ কম উচ্চতার বলে আর এদিক দিয়ে কোন সমুদ্রবন্দরে পৌছানোর দুরত্ব তুলনায় কম বলে। আর প্রাচীনকাল থেকে এপথটাই আগে থেকে চালু হয়েছিল বলে। ফলে ১৯৫০ সালের চুক্তির মুখ্য প্রসঙ্গ সমুদ্রে যেতে ভারতের অনুমতি ও শর্ত এসব (অসম) চুক্তির মাধ্যমেই বলবত থেকেছে। তবে ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের নতুন কনষ্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা হয় নাই বলে, এরপর ভারত হয়ে পণ্য আমদানীর ঐ একমাত্র পথও ভারত অবরোধে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই সিদ্ধান্তই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষত জ্বালানির অভাবে ভীষণ রকম কষ্টে ফেলে দেওয়ার কথা, আর তা ফেলেছিলও তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সবশেষে এর ফলাফল হয়েছিল একেবারে উলটা।  সেটাই নেপালের জন্য নতুন দুয়ার, নতুন পথ খোলার শর্ত হয়ে বাস্তবতা হাজির হয়েছিল। ঐ অবরোধে নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় মাস ছয়েক পরে  নেপাল চীনকে অনুরোধ করলে চীন সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। চীন মানে চীনা-তিব্বতের সীমানা নেপালের আরও উত্তর দিকে যেটা আরও খাড়া পাহাড়ের দিক।  চীনা-তিব্বতের এদিকে  দুটো সীমান্ত চৌকি দিয়ে বের হওয়া যেত আগে। কিন্তু এপ্রিল ২০১৫ এর নেপালের ভুমিকম্পে সেগুলো ভারী পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে যায় বা ভেঙ্গে যায় বলে ব্যবহার অযোগ্য হয়েছিল। তবুও বিকল্প সুবিধা একটাই ছিল যে ২০১৫ সালের আগে থেকেই চীন-তিব্বত অংশ থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি (২০০০ কিমির বেশি) চীনের কোন সমুদ্রে পৌছানোর হেভিডিউটি রেললাইনের এক প্রকল্পে নতুন করে রেললাইন পাতা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছিল। কিন্তু নেপাল এর ব্যবহারকারি হওয়ার কোনই আলাপ ছিল না বলে ঐ রেলপথ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে কমপক্ষে ১০০কিমি দূর দিয়ে চলে গেছিল। চীন তাই ঐ রেললাইন যেন নেপাল ব্যবহার করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে ঐ প্রায় ১০০কিমির এক নতুন কানেকটিং রেল প্রকল্প নিয়ে নেপালকে সহায়তা করতে আসে। সেই কানেকটিং রেলপথ এখন চালু হয়ে গেছে। চীনের সাতটা বন্দর এখন নেপালও ব্যবহার করতে অনুমতিপ্রাপ্ত উন্মুক্ত। তাই নেপালের ভারত-নির্ভরতার দিন এভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায় আর, এমন শাপে বর নিয়ে নেপাল তাদের ভাগ্য গড়ার দিকে রওনা দিয়েছে। কারও অসুবিধা বা খারাপ করতে চাইলে আপনার অজান্তেই এর পরিণতি তার জন্যই ভাল হয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা হয়, খারাপ উদ্দেশ্য বা নেতি মন বা প্রতিহিংসা – এগুলো এর কর্তার বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য হবাব সম্ভাবনা নিয়ে আসে! কাজেই সাবধান!

    ওদিকে লিপুলেখ নিয়ে নেপালের বিপরীতে ভারতের যুক্তি হল – এলাকাটা প্রায় ‘ষাট বছর’ আগে [মানে এরও আগে বা এর চেয়ে পুরানা কালে নয়] থেকেই তাদের দখলে আছে। তাই এটা তাদের। সাথে আরেকটা যুক্তি দেয় ভারত যে, ২০১৫ সালে এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ই দুই দেশ মিলে লিপুলেখে একটি বাণিজ্যিক পোস্ট খুলতে সম্মত হয়েছিল, যা তাদের যৌথ ঘোষণায় আছে। এ কথার বিপরীতে নেপালের বক্তব্য তাতেও নেপাল  ঐ ঘোষণা কখনোই মেনে নেয়নি বলে তখন থেকেই রেজিষ্টার্ড আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাই এখন গত মাসে ৮ মে লিপুলেখে ভারতের রাজনাথ সিং সড়ক তৈরির কাজ উদ্বোধন করা থেকেই নেপালের পুনঃআপত্তিতে প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। নেপালে প্রতিবাদের বিষয়টাকে পার্লামেন্টে আইন পাস বা কনস্টিটিউশন সংশোধনের পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জিও মোদীর বিরুদ্ধে নেপালের পক্ষে এক স্বাক্ষীঃ
    নেপালে একের পর এক ভারতের পরাজয়ের শুরু বলা যায় নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনার প্রথম উদ্যোগের (First failed Constituent Asembly was dissolved on May 28, 2012 ) ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকে। নেপালের কোন রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভারত কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে না পেরে ঐ রচনা প্রক্রিয়া যেন ফেল করে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এতে হতাশায় ডুবে যাওয়া সারা নেপাল এরপর আবার বহু কষ্ট সহ্য করে (কারণ সবদলের একমত হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ) সর্বদলীয় আবেদন নিয়ে তাদের সুপ্রীম কোর্টে গেলে  কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে  নতুন করে রিপাবলিকের কনষ্টিটিউশন রচনার “কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের নির্বাচন” অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুব কমই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগে নেপালের প্রধান তিনটা দলই  আয়োজনের পুর্ণ সদব্যবহার করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ভারত থেকে (দুই কমিউনিস্ট আর নেপালি কংগ্রেসও) প্রধান তিনদল নিজেদের দূরে নিয়ে যায়। এই তিনশক্তি মিলে নেপালের নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও তাতে ভারতের প্রবল আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করেই ঐ নতুন কনষ্টিটিউশনের ঘোষণা দিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫। তাদের তিন দলীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূরণ করেছিল। কিন্তু এতে ভারত প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ জলুনির। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালে সব ধরণের পণ্য আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকেই চীন-নেপাল সম্পর্কের নতুন দিনের শুরু।  অথচ অন্তত দুশত বছরের ভারত-নেপাল সম্পর্কের মধ্যে চীন কখনও কোথাও হাজির ছিল না। ২০১৬ সাল থেকেই মাত্র নেপালের মঞ্চে চীনের প্রবেশ ঘটেছে।

    এককথায় বললে, তাই কাউকে দোষারোপের আগে ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্তা, রাজনীতিক বা একাদেমিকের নিজেদের লজ্জা ঢাকতে হলে  নিজেকেই দোষারোপ করা উচিত ছিল। হয়ত আত্মসমালোচনা করে এজন্য তারা কিছু অনুশোচনামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এমন আমাদের দেখতে পাওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, তবু কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মোদী ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায়। তাই এদের মধ্যে একটা ঝোঁক উঠে এসেছে যে ভারতের আগের সব ব্যর্থতা মোদীর মাথায় ঢেলে দেওয়া। যদিও মোদীও, তার আমলে পুরান ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছেন নীতি বদলিয়েছেন তা জানা যায় না।
    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা অবসরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোন চলতি সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। কিন্তু সাবেক ভারতীয় এক রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম। তিনি রাজনাথের সড়ক নির্মাণ উদ্বোধন ঠিক পছন্দ করেননি। আর বিবিসিকে বলছেন, ‘রাস্তা উদ্বোধনের বিষয়টা অন্যভাবে করা যেতে পারত বলেও তার অভিমত”। দেবের অভিমত নেপালের আপত্তির মুখে মোদী সরকার নাকি বলেছিল, এ নিয়ে আলোচনা হবে। তাই বিবিসি লিখেছে দেব মুখার্জি বলেছেন, “… ভারত যখন নেপালকে কথা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বলা যায় না এটা আমাদেরই এলাকা – তোমাদের এ নিয়ে কিছু বলার হক নেই”। অর্থাৎ মোদী সরকারকে তিনি খুবই শক্ত হাতে আঘাত ও সমালোচনা করেছেন বলতেই হয়। এই ঘটনাকে আমরা বোধহয় দলবদ্ধভাবে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে করা দেব মুখার্জির প্রায়শ্চিত্ত বলতে পারি।
    আরেক দেশের নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি তোলার আমি কে? এনিয়ে আপত্তি তুলে নিজেকে হাস্যকর করার কোনো মানে হয় বলে এমন কাজ  আমরা কোন রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। কিন্তু নেপালে সব হারিয়ে ভারত তাই করেছিল। যদিও সবকিছু উপেক্ষা করে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত ও ডিক্লারেশন বা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে এক ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ক্ষমতায় আসে সেটা ছিল নেপালের বড় দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে এক দলের সরকার। আর একমাত্র নেপালি কংগ্রেস কোন মতে বিরোধী দলে জায়গা হয় আর সেই সাথে তার ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার কিছু সুযোগও সামনে আসে। কিন্তু এবার, নেপালের পার্লামেন্টে লিপুলেখ নিয়ে প্রতিবাদ ইস্যুতে আলোচনায় সেই নেপালি কংগ্রেসের এক এমপি পুষ্পা ভূষল গৌতম বলেন, “১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই এলাকা সম্পূর্ণভাবে নেপালের”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে নেপাল কংগ্রেস দলও এখন কম ভারতবিমুখ নয়। এ থেকে নেপালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বেশ খানিকটা আন্দাজ পেতে পারি।
    নেপালের মাওবাদীরা তাদের সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৬ সালে। সেখানে নেপালে তাদের রাজার মূল সহযোগী বলে ভারতকে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ওই বিপ্লবের মূল শত্রু বলে তারা চিহ্নিত করেছিল ভারতের শাসকদের। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি বাতিলের প্রধান দাবি তারা সেই থেকে শুরু করেছিল। মাঝে ২০০৭ সালের দিকে নিজেরা কৌশল বদলে সশস্ত্র থেকে গণআন্দোলনে নেমে আসারকালে চুক্তি বাতিলের কথা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে চুক্তি রিভিউয়ের পক্ষে আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার একপর্যায়ে ২০১৬ সালে এটা কাজ শুরু করলেও নেপালের মূল ফোকাস সরে যায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ও কোনো নতুন চুক্তির পথ খুঁজে বের করা। তা এখন চীনের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে গেছে। এরও প্রভাব এখন নগদ দেখা যাচ্ছে। সারা নেপালের চরম ভারতবিমুখ হয়ে পড়া চলছে ধরা যায় গত সাত বছর ধরে। কিন্তু এই লিপুলেখ সীমান্তের রাস্তা নির্মাণ কেন্দ্রে করে এবারের ভারতবিমুখতা বা বিরোধিতা অনেক বাস্তব হয়ে উঠেছে। চীন-নেপালের সাতটা সীমান্ত দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক করার কথা নেপাল প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে পারে এখন। এক কথায় মূল কারণ এটাই যে, ভারত ছাড়াও নেপালের অর্থনৈতিক জীবন এখন সার্ভাইভ করা বাস্তবে সম্ভব। এটাই হলো এবারের ভারতবিমুখতার বিশেষ দিক।

    ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে?
    এছাড়া এরই আরেক ছাপ দেখা যাচ্ছে আবার এখন। যেমন গত ১১ জুন কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় একটা কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম- ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে”? [Is this the end of the ‘special relationship’?] এখানে বিশেষ সম্পর্ক বলতে ভারত-নেপাল বিশেষ সম্পর্কের কথা বুঝানো হয়েছে। আর ঐ লেখায় কলকাতার হিন্দুস্থান টাইমসের এক সম্পাদকীয় আর এক প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমসের ঐ সম্পাদকীয় [The costs of anti-Indian nationalism in Nepal | HT Editorial] একেবারেই সাব স্ট্যান্ডার্ড; ওর নিম্নমান তাদের নিজের জন্যই লজ্জার। এত খারাপ তারা সাধারণত লিখে না। কিন্তু এখানে তারা নিজের দগদগে কিন্তু খামোখা “নেশনস্টেট বোধের” আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর কাউকে “কাজের ছেলে” গণ্য করে কোনো লেখা দাঁড় করালে যেমন হয় তারই ছাপ রেখে একটা লেখা হয়েছে এটা। ঐ সম্পাদকীয়-এরই আবার সাব-হেডলাইন হল, “কাঠমান্ডু (ভারতের সাথে) সম্পর্ক রিসেট করে ঢেলে সাজাতে চায়, এতে তারই স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে“। পত্রিকাটা অভিযোগ করেছে, নেপালে নাকি “গভীর এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” ছড়িয়ে পড়েছে।
    আরো লিখছে, “নেপাল-ভারতের মধ্যে এক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আছে, অসন্তোষের গোড়াটা সেখানে”। লিখেছে, “বাস্তবে এর মানে ভারত-নেপালের সাথে খোলা সীমান্ত শেয়ার করে। ভারত নেপালিদের বিনা বাধায় ভারতে কাজ করতে এলাউ করে আর নেপালিরা (গুর্খা) ভারতের সেনাবাহিনীকে সেবা (কাজ) করে। এর বিপরীতে, নেপালিরা এ দুটোতেই রাজি আছে, পরোক্ষে ওরা নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটা ভূমিকা দিয়েছে (এটা আর কোন সম্পাদকের আলাপ নয় রাস্তার চা দোকানের রকবাজের আলাপ হয়ে গেছে) আর নেপালিরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের ব্যাপারে সেন্সেটিভ হয়ে থাকছে। … ভারতও বিশেষ সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশেষ সম্পর্ক রিসেট(reset) করলে নেপালকে এর মূল্য দিতে হবে”।
    “নেপালকে এর মুল্য চুকাতে হবে। এর মানে হবে কড়া সীমান্ত, এর মানে হবে নেপালিদের ভারতে অবাধে কাজ করা বন্ধ, এর মানে হবে নেপালের উন্নয়নের জন্য (ভারত থেকে) দ্বিপক্ষীয় জরুরি সহযোগিতার দ্রব্যাদি কমে যাওয়া, এর মানে হতে পারে, ত্বরাই মানে নেপালের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ঝড় উঠবে (মানে ভারত উসকিয়ে তুলবে) তা সামলানো। কাঠমান্ডু কি এসবের জন্য তার একক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মূল্য চুকানোর জন্য তৈরি? এটা তো একটা পরিষ্কার প্রো-চায়না ঝোঁক ও এক আগ্রাসী ন্যাশনালিজম? এভাবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সব নিঃশেষ করে দেয়া দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তবে নেপালের বেশি ক্ষতি হবে”।

    এখন এক কথায় বললে, হিন্দুস্থান টাইমসের এই ভাষ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে অন্তত গত দশবছরে নেপাল-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে এদের কোন খবর নাই, মুল্যায়ন বা কমপক্ষে কোন রিডিং  নাই। তবে সেটা যাই হোক, হিন্দুস্থান টাইমস মুলত একটা মিডিয়া একটা দৈনিক, কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়। কাজেই মিডিয়া হিসাবে এই বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। আর তাদের এই লেখার প্রেক্ষিতে মন্ব্যে বলতে হয়, কাউকে কাজের ছেলের মত ট্রিটমেন্ট আচরণ করে যদি বলা হয় “আমার পা-দাবানো ছেড়ে চলে গেলে তুই তো না খেয়ে মরবি”- এটা সেরকমের বক্তব্য।  এটা নেপালের জন্য অপমানজনক হবারই কথা। আসলে ভয় দেখিয়ে কাউকে জোয়ালে নিয়োজিত রাখার অনেক উপায় আমরা জানি, দেখেছিও। তবে এখানে দেখছি; এখানে বলা যে ‘আমারও একটু কষ্ট হবে তোর হাতে আমার পা-দাবানো পাব না, তবে তোরই না খেয়ে থাকতে বেশি কষ্ট হবে”। এটা এ ধরনের। এমনই নিম্নমানের।

    বলাই বাহুল্য, এটা কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় হতে পারে না। বাহ্যত উভয়ের সম্পর্ক যাই থাক, নেপাল-ভারত সম্পর্ক দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের, যেখানে কেউ কারো অধস্তন এমন মনে করাটাই অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, বরং এভাবে বলা বা মনে এমন ধারণা পুষে  নিয়ে কথা বলাটাও অপরাধ। দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের এই সম্পর্ক-নীতির কথা মনে রেখে এই সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। এজন্য এটা গর্হিত কাজ।

    জাতিসঙ্ঘ যেখানে ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রের পড়শি দেশের উপর দিয়ে গিয়ে সমুদ্র ব্যবহারের একসেস পাওয়াকে অধিকার গণ্য করে রেজুলেশন তৈরির প্রক্রিয়ায় আছে, এরা তখন বেখবর হয়ে নেপালকে “এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” করার মূল্য চুকাতে হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে।

    এছাড়া, এটা আসলেই একটা হাসির কাণ্ড যে হিন্দুত্বের ভারত ও হিন্দুত্বের ন্যাশনালিজমের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমরা আরেকটা মানে নেপালের  ন্যাশনালিজম দেখে টিটকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে দেখছি। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল নেপালের ত্বরাইবাসীরা ভারতের উসকানিতে নেপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে – ভারত-রাষ্ট্র তা করাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু হুমকি দিচ্ছেন এক পত্রিকার সম্পাদক! কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক নয়। এখানে আবার পত্রিকার সম্পাদক এমনই জাতিবাদী হয়েছে যে, রাষ্ট্র বা সরকারের কেউ না হয়েই তিনি হুমকি দিচ্ছেন! এটা এমনই জাতিবাদিতা!   জমিদারের ছেলে যদি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে পাশের টেবিলে বাসার এককালের কাজের ছেলেকে খেতে দেখে তাহলে যেমন জমিদার রোয়াব-ভ্যানিটি রক্ষার্তে তেলেবেগুনে ঝাপিয়ে পড়ে, হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদকের অবস্থ হয়েছে তেমনই।  এই অবস্থায় সম্পাদককে একটাই কথা বলা যায় – মহাশয়, কুল ডাউন! আপনি শান্ত হোন! সাম্য, সম-মর্যাদা ব্যাপারটা বুঝেন?  আপনি বুঝে নেন জলদি, অবস্থা আরো খারাপ হবার আগেই! দেখছেন না ৪০০ বছরের আগের কালো-দাস-ব্যবসায়ী সেলিব্রেটি হয়ে এতদিন নিজের মুর্তি টাঙিয়ে খারায় ছিলেন! কিন্তু এখন? না আর না! এবার সময় হয়েছে আপনি মাটিতে, নদীতে লুটায় পড়তেছেন না? আর লুকায়ে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না! আপনিও, কেউ বাদ যাবেন না!

    ওই সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল গত ৮ জুন। আর নেপালে এর পালটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ১১ জুন। এ থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক কোন উত্তেজনায় আর কেমন পর্যায়ে আছে এরই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

    নেপাল সীমান্তে ভারতীয়দের উপর গুলিঃ
    তাহলে গত ১২ জুন নেপালি পুলিশের হাতে ভারতের এক নাগরিককে হত্যা, দুইজন ভারতীয় নাগরিকের মারাত্মক আহত ও একজনকে নেপালি পুলিশের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনার কি নেপাল-ভারত সীমান্ত লিপুলেখ নিয়ে উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে? এর জবাব হল, পরোক্ষে সম্পর্ক অবশ্যই ভাল মতনই আছে, প্রত্যক্ষে সম্ভবত নেই। সাধারণ অবস্থায় নেপাল-ভারত  তো খোলা সীমান্ত, অবাধে দুদেশের নাগরিক যেতে পারে। বিশেষ করে বিহার জেলা সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈবাহিক আত্মীয় সম্পর্কই প্রচুর। কিন্তু এখন নেপালে ১৪ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলছে। নেপ[আলী সীমান্ত্রক্ষীর যুক্তি,  এসময় নেপালের মেয়ে বলে এক ভারতের বউমা অবাধে এখনই শ্বশুরবাড়ি অবাধে আসাযাওয়া করতে পারে না। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেটা করতে যাওয়া থেকেই তর্কবিতর্কের শুরু। এরপর এই বাধা ভাঙতে ভারত থেকে লোকজন এনে (কমপক্ষে ৩০ জন) চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সীমান্তরক্ষীরা (মাত্র ৭ জন) ভয় পেয়ে ভারতীয়দের সামলাতে না পেরে গুলি ছুড়েছে। প্রথমে দশ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার। কিন্তু এতে কোন কাজ না হওয়ায় এবার নিচে ফায়ার করেছে। ভারতের প্রায় সব পত্রিকার বর্ণনার সারকথা এটাই। তবে নেপালের সীমান্ত সৈন্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আছে তা ভারতের ইকোনমিক টাইমস লিখেছে বলে কেউ কেউ লিখেছে। কাজেই পরোক্ষ লিপুলেখের টেনশন এখানেও আছে, বলা যায়। এখানে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি ভারত-নেপাল সম্পর্কের আগামি অভিমুখ সেদিকেই যাচ্ছে – মুক্ত অবাধ সীমান্ত আর থাকছেই না। চুক্তি বদল হচ্ছেই। তবে কতটা আপোষে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন!

    তবে আমরা উপরে দেখলাম ভারতীয় সম্পাদকের মনোভাব। তিনি নেপালের এমন বেড়া দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া কী সহজে সহ্য করে নিবেন? সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে অবশ্যই!   জমিদার-মন এসব সহজে নিতে পারে না। ‘বান্দি’ করে যাকে এতদিন দাবায় পায়ের নিচে রাখছিলেন তিনি, সে এখন আমারই পাশের চেয়ারে বসে কেমনে!   আর বিপরীতে ওদিকে নেপালির পত্রিকার কলামিস্ট চাইছেন নেপাল-ভারত সম্পর্ক রিসেট করা ঢেলে সাজিয়ে নিতে, যাতে অসাম্য, অমর্যাদার সম্পর্ক দূর হয়ে যায়। মানুষ না খেয়ে হলেও সম-মর্যাদার জন্য জীবন দিতেও উঠে দাড়াতে চায়। এটা কোন জমিদার মন বুঝে না। যার একটাই ওষুধ – রিপাবলিক মন – রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতা, মর্যাদা ইত্যাদি ঝাপ্টা দেওয়া।  অর্থাৎ কলামিস্ট তিনি বুঝাতে চাইছেন ১৯৫০ সালের চুক্তির বাতিল অথবা ন্যূনতম একটা রিভিউ করতে। আর বর্তমান সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন। রিভিউ রিপোর্ট এসে গেছে। কিন্তু মোদী সময় পাচ্ছেন না বলে এড়িয়ে রেখেছেন।

    বোঝা যাচ্ছে, নেপালের সাথে ভারত তাদের সম্পর্কটা খামোখাই তিতা করে ফেলেছে, খুব সম্ভবত তাদের পুরাণা কলোনি আচরণ পছন্দ করে তা আকড়ে থাকার কারণে। আর এর তাবত দায় এখন চীনের ওপর চাপাতে চাইছে। যদিও রেকর্ড ও ফ্যাক্টস একেবারেই পরিষ্কার যে ২০১৫ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে চীনের নামই কেউ জানত না। কোথাও উচ্চারিত হত না এমনই অপ্রয়োজনীয় মনে হত। তবে নিশ্চয় চীনও নিস্পাপ নয়। তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গও নয়। বাস্তবতা হল, নেপালের প্রতিটা মানুষকে ভারতের চরম কষ্টকর জীবনের মুখে ফেলে দেয়া থেকেই এর ভিতরেই ত্রাতা হিসেবে হাজির হতে সুযোগ পেয়ে গেছিল চিং । যে সুযোগ সে না চাইতে পেয়েছিল এবং নিয়েছিল।  এরপর থেকে নেপালে চীনের আবির্ভাব ঘটা আর কেউ ঠেকাতে পারে নাই।  প্রতিহিংসা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। নেপালের কিছুই করতে পারবে না, উলটা নিজের আরো ক্ষতি ছাড়া।

    ভারত কেবল নিজের আচরণ আর স্বভাবকেই দায়ী করতে পারে; আর যারা আগে সেসময় ২০১৫ সালে এটা দেখতে মিস করেছেন তাদের জন্যই সম্ভবত সেই প্রমাণ এখনো হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক আবার হাজির করেছেন!

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টেও  “নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

    নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

    গৌতম দাস

    ২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2sO

    Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

    তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

    তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

    কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

    এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

    ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
    নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

    তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

    শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

    তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

    অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

    তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

    তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

    চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

    সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

    অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

    [Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

    তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

    তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

    ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

    [New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

    এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

    ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

    একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

    এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
    আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

    না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

    আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

    বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

    ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

    কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

    আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

    তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

    তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

    ‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

    গৌতম দাস
    ১২ এপ্রিল ২০১৮,  বৃহস্পতিবার, ০০:০১

    https://wp.me/p1sCvy-2rh

     

    ভারতকে নেপালে পানিবিদ্যুতের ড্যাম নির্মাণ প্রকল্পের কাজ না দিয়ে তা চীনকে দিলে ভারত ওই উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজেও কিনবে না আর নেপালের বাইরে কাউকে বিক্রি করতেও দেবে না। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি গত সপ্তাহে (৬-৮ এপ্রিল) দু’দিনের ভারত সফর করে গেলেন।

    গত ডিসেম্বর ২০১৭ সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পরে গত মাসের ১১ মার্চ নেপালের প্রথম নির্বাচিত সংসদে ৮৮ শতাংশ আস্থা ভোট পাওয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি। তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট (UML) এবং অপর কমিউনিস্ট মাওবাদী দলের সাথে মিলে জোট করে নির্বাচনে লড়েছিল তাঁরা এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতেছিল। আর নির্বাচন সম্পন্ন হবাব পর ফলাফলে দেখা যায় বড় দুই মাধেসি আঞ্চলিক দলই কেবল মূলত মাধেসি অঞ্চলের আসনগুলো লাভ করে। ফলে  এদেরকেও  ঐ কমিউনিষ্ট জোটে সাথে নেওয়াতে সংসদের মোট ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী কে পি অলির দল সরকার গঠন করেছিল গত মাসে। আর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে এক যৌথ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে দুই কমিউনিস্ট পার্টি, তারা এবার এক পার্টি হওয়ার পথে আগাচ্ছে।

    ভারতের বাধা উপেক্ষা করে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের মাধ্যমে নেপালে নতুন সংবিধানের কার্যকারিতা শুরু হয়েছিল। পরে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নেপালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সাল থেকেই নেপালে ভারতের প্রভাব খর্ব হওয়ার মতো একের পর এক আনুষ্ঠানিক পরাজয় শুরু হয়েছে। যার সর্বশেষ বড় পরাজয় ছিল সাধারণ নির্বাচনে দুই কমিউনিস্ট জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ, দুই পার্টি আবার এই এপ্রিল মাসেই এক পার্টি হতে যাচ্ছে। আর এই জোটবদ্ধতা বেড়ে ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকারে পরিণত হওয়া। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই পরিবর্তন আসলে ভারতের বিদেশনীতির পরোক্ষ অবদান। ভোটের হিসাবেও বলা যায়, ৮৮ শতাংশ আসন বা ভোটার সমর্থকেরা এখন ভারতবিরোধী। ভারতের বিদেশনীতি বা নেপালনীতির এমনই নেতিগুণ।

    ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০১৭-এর সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত এই সময়কালের মধ্যে সারা নেপালে ভারতবিরোধিতা সবচেয়ে চরমে উঠেছিল। আর এই সময়কালে ভারতের সর্বশেষ আর একমাত্র আশ্রয় হয়েছিল মাধেসি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো। অথচ গত মাসে ওলির সরকার গঠনের সময় থেকে মাধেসি অঞ্চলের প্রায় সব আসন পাওয়া আঞ্চলিক দুই দলও অলির জোটকে সমর্থন করে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে। ফলে ভারতের সমর্থক নেপালের রাজনৈতিক দল বলতে এখন রয়ে গেছে নেপালি কংগ্রেস। ভারতের সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জ্যোতি মালহোত্রা কেবল এই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে লেখা তার নিয়মিত রিপোর্টে ভারত সরকার তার ভুল স্বীকার ও সংশোধন করছে বলে জানিয়েছেন। এপ্রিলের চার তারিখে “Winning the neighbourhood শিরোনামে তিনি লিখেছেন,

    As India stoops to conquer Nepal by laying out the red carpet for the visit of prime minister Khadga Prasad Oli later this week, it is indicating a new self-awareness that its foreign policy missteps have allowed China to gain ground in the neighbourhood, and demonstrating its willingness to sweat behind the scenes to make up for lost time.

    জ্যোতি মালহোত্রার ভাষায় ভারত ‘stoops to conquer Nepal’ মানে নেপালের মন জয়ের জন্য নিজেকে বাকা বা নমনীয় করেছে। এটা নাকি ভারতের “foreign policy missteps” বিদেশনীতির ভুল পদক্ষেপ সম্পর্কে আত্মসচেতন বা নিজে নিজের ভুল সংশোধনের নজির।

    ভারত এক ভিন্ন রাষ্ট্র হয়েও নেপাল রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত কনষ্টিটিউশনে তার অনধিকারে অযাচিত আপত্তি জানিয়েছিল। আর কারণ হিসাবে বলেছিল, নেপালের সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ এতে ক্ষুন্ন হয়েছে। এরই আপত্তি করছে ভারত। অর্থাত ভারতই যেন নেপালের ঐ অঞ্চলের অযাচিত ও স্বঘোষিত জনপ্রতিনিধি।

    নেপালে কমিউনিস্ট জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচনে জয়ী হবার পরে ভারত সরকার তার বিগত দুবছরের নেপাল নীতি পদক্ষেপের ভুল স্বীকার করে নতুন পথে হাটতে গত ১ ফেব্রুয়ারি নেপাল সফরে আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।  তাই জ্যোতি মালহোত্রা লিখছেন, in Kathmandu, she told Oli that Delhi is ready to deal with Nepal as an important neighbour, irrespective of how it wants to discriminate against the people of the Terai. মানে সুষমা বলেছেন তারা আর তরাই অঞ্চল নিয়ে মাথা গলাবে না তাতে নেপাল তরাই অঞ্চলের সাথে বৈষম্যমূলক রাখুক কিংবা না।

    আসলে ভারতের এমন উপলব্দি স্বীকার খাওয়াটাই বাহুল্য। কারণ সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের যতগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে তারা দুই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই হোক কিংবা আঞ্চলিক বড় দুই মাধেসি দলের – এরা সকলেই এখন ওলির সরকারের সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছে। অলির সরকারের পার্টনার। এটা যেন দুধ আর আম এক হয়ে যাওয়া আর (ভারতের) আমের আঠি হয়ে দূরে হেলায় গড়াগড়ি যাওয়া!  ফলে সুষমা স্বরাজ একথা না বলে আর কী করবেন!

    নেপালের বিগত সরকারের পাঁচ বছর কেটেছিল নানান কোয়ালিশন সরকারে। সে সময়ের নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত আসন এমন ছিল যে, প্রতি দু’টি মিলে কোয়ালিশন করলেই সংখ্যার দিক থেকে তা সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট হত, আর এভাবেই কমপক্ষে চারবার কোয়ালিশন সরকার  (ভেঙ্গে ও গড়ে) গড়ে নেপালের রাজনীতি কেটেছিল। এরই সর্বশেষ ঘটনা ছিল, প্রত্যেকে ১১ মাস করে গঠিত দুই সরকার যার প্রথমটা ছিল মাওবাদী পুষ্পকমল দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার আর শেষেরটা নেপালি কংগ্রেসের দুবের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার।

    নেপালের রাজনীতিতে দুই কমিউনিস্ট দলের প্রধান দাহাল ও অলির মধ্যে তুলনা করলে দাহালের ভূমিকা হল, দেশের দলগুলোর যেকোনো বিভক্ত মতামত (দলের ভেতরে বা বাইরে) ও উদ্যোগ নাই পরিস্থিতিতে তিনিই হাজির হন কাণ্ডারি হিসেবে। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা মতামত বা কমন অবস্থানে সবাইকে (সব বিবদমান দল বা পক্ষকে) নিয়ে এসে এবার সঙ্কট কাটিয়ে করে এগিয়ে যাওয়ার পথ রচনা করেন। এভাবে প্রতিবার নানান রাজনৈতিক বাধা কাটিয়ে নেপালকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে কাজ করে যাওয়া নেপালের রাজনীতিতে অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব হলেন দাহাল। বিপরীতে খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি, তিনি ভিন্ন নরম কমিউনিস্ট পার্টির। গত ২০১৩ সালের দ্বিতীয় কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচনের সময় থেকে তিনি মূলত ক্রমেই ভারতবিরোধী অবস্থান নেয়া শুরু করেন। যদিও তার দল ও দলের রাজনীতি কখনই কোনো রেডিক্যাল কমিউনিস্ট অবস্থানের দল নয়; বরং গত নব্বইয়ের দশকে নেপাল-ভারতের যৌথ নদী, মহাকালি নদীর পানিবণ্টনের ঝগড়া মীমাংসার ক্ষেত্রে মন্ত্রী হিসাবে অলি নিজ দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভারতপন্থী অবস্থান নিয়েছিলেন সে ইতিহাস আছে।

    সেই অলি গত সেপ্টেম্বরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের পরে কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে চরম ভারতবিরোধী অবস্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষত ওই সময়টা যখন টানা প্রায় পাঁচ মাস নেপালে সব পণ্য আমদানিতে ভারত অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল। ফলে সারা নেপাল গরিব-ধনী নির্বিশেষে ভারতবিরোধী হয়ে উঠেছিল আর সবচেয়ে কষ্টকর দুর্বিষহ জীবন হয়ে উঠেছিল গরিব ও নারীদের। কারণ রান্নার গ্যাস বা যানবাহন চলাচলের জ্বালানির সরবরাহও বন্ধ করে রেখেছিল ভারতের ওই পণ্য অবরোধ। তাই বলা চলে অবরোধের কারণে নেপালের জনগণের মধ্যে যে চরম ভারত বিরোধিতার সেন্টিমেন্ট উঠেছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলি পরিপূর্ণভাবে এর সাথে ছিলেন এবং ঐ আবেগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই সময় থেকে তার ভারতবিরোধী অবস্থান তিনি এখনো স্থায়ী করে রেখেছেন। আর তার সাথে দাহালকে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি যেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার প্রবক্তা হওয়ার কাজ অলিকেই একছত্রভাবে দিয়ে দিয়েছেন। আর নিজে ভারতের তৈরি মাধেসি ইস্যুর জট কাটানো, অনিশ্চিত হয়ে থাকা কনস্টিটিউশন সংশোধনীর কাজ শেষ করা, প্রদেশে ভাগ করে সীমানা টানার অসমাপ্ত কাজ ঐকমত্য গড়ে সমাপ্ত করা, বিগত ২০ বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি, তা অনুষ্ঠিত করা এবং থিতু এক কনস্টিটিউশনে পৌঁছানো এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার পথ খুলে দেয়া ইত্যাদি জটিল সব কাজ সমাপ্ত করার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এ যেন অলি আর দাহালের মধ্যে একধরনের শ্রমবিভাজন, যা তাদের পরস্পরের পরিপূরক।

    দাহাল যেন জানতেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার মূল প্রবক্তা তিনিও হতে পারতেন, কিন্তু তাতে ভারতের বিষিয়ে তোলা মাধেসি জনমতের সাথে একটা নিগোশিয়েশন ও ঐকমত্য তৈরিসহ একটা সমঝোতায় পৌঁছানো, আর এই উদ্যোগের নেতা হয়ে কাজ শেষ করা তার জন্য কঠিন হত।

    যেকথা বলছিলাম মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস – এই দুই দলের চুক্তিতে  সর্বশেষ ১১ মাসের করে কোয়ালিশন সরকার গঠনের করে ক্ষমতায় থাকার কথা। পুষ্পকমল দাহাল তার প্রথম ১১ মাসের প্রধানমন্ত্রীর আমলে নেপালের বুধি-গান্ডাকি (Budhi Gandaki) নদীতে আড়াই বিলিয়ন ডলারের ‘বুধি-গান্ডাকি ড্যাম ও পানিবিদ্যুৎ (১২০০ মেগাওয়াট) নির্মাণ প্রকল্পের’ (Budhi Gandaki project) চুক্তি করেছিলেন চীনের এক কোম্পানীর সাথে। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে চলে যায়। মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস এই দুই দলের চুক্তি অনুযায়ী শেষের ১১ মাসের সরকার গঠন করে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দুবের সরকার (২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল)। ক্ষমতায় এসে তিনি প্রথম ভারত-তোষণে অবস্থান নেয়া শুরু করেন। ভারতীয় প্ররোচনায় দুবে চীনের সাথে করা ওই পানিবিদ্যুত প্রকল্প চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা দেন। আর ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট ছড়িয়েছিল যে, (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১৫ নভেম্বর ২০১৭) ওই প্রকল্প ভারতের সরকারি করপোরেশনকে (NHPC) দেয়া হচ্ছে। শিরোনামেই লিখেছিল , “Nepal scraps hydro project with Chinese company; Indian company to get it?”।

    এটা ছিল নির্বাচনের এক মাস আগের ঘটনা। নির্বাচনের পরে অলির দলের কমিউনিস্ট জোট ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আর অলির দলই সবচেয়ে বেশি আসন পেলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটা নিশ্চিত হয়ে যায়। এশিয়ার প্রভাবশালী দুই দৈনিকের একটা হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট পত্রিকায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক সাক্ষাৎকার দেন হবু প্রধানমন্ত্রী অলি। সেখানে তিনি ওই বিদ্যুৎ প্রকল্প আবার চালু করার কথা বলেন।  তিনি ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে,  “Political prejudice or pressure from rival companies may have been instrumental in scrapping of the project. But for us, hydropower is a main focus and come what may, we will revive the Budhi Gandaki project,” । অর্থাৎ তিনি বলছেন, “ওই প্রকল্পের কাজ পেতে বিবদমান প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সাথে  আসা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও চাপের কারণে প্রকল্প বাতিল হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে বিদ্যুৎ পাওয়াই মূল বিষয়। তাই আমরা প্রকল্প আবার চালু করব”।

    এছাড়া অলি ভারতের জন্য অস্বস্তিকর ও ধরা পড়ে যাবার মত ইস্যু কিন্তু নেপালের জন্য যা খুবই জেনুইন কিছু স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি  ‘১৯৫০ সালের নেপাল-ভারত শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি’ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে কথাটা এভাবে বলেন যে তিনি ঐ চুক্তির ‘আপডেট’ করা ও ‘সমকালীন উপযোগী’ করতে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনের কথাও তুলেছিলেন ওই সাক্ষাৎকারে। এ ছাড়া নেপালের গোর্খা সৈনিকেরা এক চুক্তি অনুসারে ভারতীয় সেনা ও প্যারামিলিটারি বাহিনীতে নিযুক্ত হয়ে আছে। ওই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাদের দেশের নিজবাহিনীতে ফিরিয়ে নেয়াসহ ভারতের জন্য অস্বস্তিকর বহু ইস্যু নিয়ে খোলামেলা কথা তুলেছিলেন। যদিও নির্বাচনে কমিউনিস্টদের ব্যাপক বিজয় ও ফলাফলে অলি সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকেই হাওয়া বদলে যায়। স্পষ্টত ভারতের নেপালনীতি হেরে যাওয়ায় নতুন সংশোধিত নীতি হিসেবে মোদি সরকার সুর নরম করে ফেলেন। তিনি দুইবার অলিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেছিলেন আর অলিকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে গত ফেব্রুয়ারিতে পালে পাঠিয়েছিলেন। আর অলির সফর ছিল ৬-৮ এপ্রিল।

    কিন্তু ভারতের মনের যত খারাপ দিক ও কলোনিয়াল বাসনা ফুটে উঠতে শুরু করে ওলির সফরের দিন ৬ তারিখ থেকে। ঐদিন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় আবার এক বেনামি সরকারি মন্তব্য ও মনোভাব ছাপা হয়। যার শিরোনাম হল, “যদি চীন তোমার ড্যাম নির্মাণ করে দেয় তাহলে ইন্ডিয়া তোমার বিদ্যুৎ কিনবে না : মোদি অলিকে বলবেন।’ [If China builds your dams, India won’t buy energy: PM Narendra Modi to tell KP Oli।]। বেনামী “সিনিয়র সরকারি অফিসিয়ালের” বরাতে এই খবর ভারত সরকার ছেড়ে দেয়।  ভারত সকারের এই বিরক্তিকর বীরত্বের রিপোর্টে একটা অসত্য বা ‘সত্য লুকানোর’ ঘটনা আছে। যদিও আপতিকভাবে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, প্রকল্প নির্মাণ চীন করলে ওতে উতপাদিত বিদ্যুৎ ভারতকে কেনার বাধ্যবাধকতার কথা আসবে কেন, ফলে কোন কিছুরই দায় বর্তায় না। এই কথাই সঠিক।  ফলে ভারত খুবই ন্যায্য কথা বলেছে বলে মনে হয়। কিন্তু সরি, ব্যাপারটা তা না। ব্যাপারটা বুঝতে তাই, বরং প্রশ্ন করা যাক উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারতের কেনা বা না কেনার প্রশ্ন উঠছে কেন?

    ভোক্তা হিসাবে নেপালকে বিচার করলে, ১২০০ মেগাওয়াট উতপাদিত বিদ্যুৎ দেশটির ছোট অর্থনীতির বিচারে বেশি বা বাড়তি। ফলে এর কিছু অংশ বিক্রি করতেই হবে। কিন্তু স্বাধীনভাবে নেপাল এই বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে কি?  এটাই মুখ্য প্রশ্ন। যেমন-  এই বিদ্যুৎ   বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করলেই তো হয়, বিশেষত পানিবিদ্যুৎ বলে এটা জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের উতপাদন খরচ তুলনায় অনেক সস্তা পড়বে। বাংলাদেশের হিসাবে ২৫-৩৫ পয়সা ইউনিট। না, নেপাল তা বিক্রি করতে পারবে না। এখানেই ভারতের লুকানো গোপন করা সত্য আছে। নেপাল-ভারত তথাকথিত শান্তি বন্ধুত্ব চুক্তি অনুযায়ী, নেপালে উৎপাদিত কোনো পণ্য তা ভারতীয় বা নেপালি কোম্পানি যারই উতপাদিত হোক, তা নেপালের বাইরে বিক্রির কোম্পানি হতে হবে ভারতীয় মালিকের। আর উতপাদন অথবা  বিক্রির কোম্পানি নেপালি কোম্পানি হলে সেটা প্রতিটি কেসের বেলায় ভারত সরকারের কাছে আগাম অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষেই কেবল বিক্রি করতে পারে। আসলে এই অনুমতি পাওয়া যাবে না। মূলকথা নেপালের পণ্য তৃতীয় দেশে বিক্রি করতে গেলে কেবল ভারতীয় ব্যবসায়ীরাই তা করতে পারবেন। এই হল সেই কলোনি সম্পর্কে দাবড়ে রাখা চুক্তি। ফলে নেপালকে কেবল ভারতীয়দের কাছেই বিক্রি করতে হবে বা এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। আর এ কারণেই এখানে “ভারতের কেনার” প্রসঙ্গ আসছে। এতে একেবারে মূলকথা দাঁড়াচ্ছে, ভারতের সরকার বা ব্যবসায়ীর ইচ্ছাতেই কেবল নেপালে কোনো পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এই দাসখত কলোনি চুক্তি দিয়ে ভারত নেপালকে বেঁধে রাখতে চায়। বামন অবিকশিত নেপাল করে রাখতে চায়।

    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে নাম পরিচয় ছুপানো সরকারি কর্তা নেপালের জন্য এক লাল দাগের লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ঐলাইন ক্রশ করলে নেপালের উপর তারা ঝাপায় পড়বেন। […….will be couched in the niceties of diplomatic prose, but there will be no denying “India’s red lines,” a senior government official told The Indian Express.] এর মানে হল এখনও ভারতের আক্কেল হয় নাই।

    তাই ভারতের নীতি ও পদক্ষেপের ধরণ ও  অভিমুখ বিচার করে বলা যায়, এশিয়ার বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো বড় সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠার সম্ভাবনা সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকি বাংলাদেশে যদি হাসিনা সরকারের মতো সরকার থাকে তাহলেও। এই সঙ্ঘাতের মূল কারণ হবে, ভারতের কলোনি বৈশিষ্ঠের বিদেশনীতি অথবা বলা যায় এই একুশ শতকে এসেও কলোনিয়াল মনোভাবে গড়ে ওঠা বিদেশনীতির কারণে।  ভারত অকর্মন্য ও উত্থানরহিত অথচ সে ভাবে তার অর্থনীতির এই খামতি যেন বা কলোনি স্টাইলের নীতি দিয়ে উতরানো যাবে। তবে আর এক দিক থেকে বলা যায় এর মৌলিক বৈশিষ্ট হল, এক শব্দে ‘হামবড়া’। যার অর্থ হল আক্ষরিক অর্থে আমি বড় বা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এতটুকুই না; এর আরো অর্থ হল, বিশেষত যখন কেউ নিজে বড় বা বিশেষ কেউ না হওয়া সত্ত্বেও মিছাই নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করে বড় বা ক্ষমতাবান মনে করে।

    সক্ষমতা অর্থে ক্ষমতাকে যদি দু’টি প্রকরণে ভাগ করে বলি, তবে এর একটা হল অবজেকটিভ। মানে বৈষয়িক বা ফিজিক্যাল দিক থেকে যা বাস্তব। আর অপরটি হলো সাবজেকটিভ, মানে কর্তাসাপেক্ষ। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের এক বিশাল অবজেকটিভ সক্ষমতা। সাধারণভাবে বললে এটি আসলে একটি বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা যেখানে লাগাবে যেভাবে লাগাবে এর ওপর নির্ধারিত হবে আগামী দিনের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে। যদি যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করে বা বাধ্য হয়, তাহলে তা এক রকম হবে। যদি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হিসাবে ব্যবহার করে, যার আবার দু’টি ধরণ হয়; স্বল্পসুদের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ আর সরাসরি (এফডিআই) বাণিজ্যিক বিনিয়োগ – এ দুইয়ের এক ভারসাম্য অনুপাত বিনিয়োগ হয় তবে আরেক রকম হবে। এটা অবজেকটিভ ক্ষমতা।

    একুশ শতকের এখনকার দুনিয়ায় সবচেয়ে নির্ধারক শক্তি চীনের এই সক্ষমতা আছে। অপর দিকে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেটা সাবজেকটিভ, এরা ওই অবজেকটিভ ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাইলে বা না চাইলেও চীনের এই সক্ষমতা থেকে যাবে। কিন্তু আরেকটা পরিস্থিতিও কল্পনা করা যাক। ধরা যাক চীনের অবজেকটিভ পটেনশিয়াল বা সক্ষমতা নেই বা থাকলেও তবে সেটা তেমন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের আকাঙ্খা প্রবল এবং খুবই ভালো স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও আছে – তাহলে কী হবে? সেটাই হলো ওই ‘হামবড়া’ পরিস্থিতি। আর এ অবস্থাই হলো ভারতের। সক্ষমতা নাই কিন্তু স্বপ্ন আছে। ভারতের এই ‘হামবড়া’ বৈশিষ্ট্যের বিদেশনীতি এশিয়ার ভারতসহ আমাদের সবার জন্য বিরাট দুঃখের কারণ।

    যেমন চীনকে দেয়া আড়াই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মতই বহু আগে ভারতকে কার্যাদেশ দিয়ে দেয়া এমনই এক প্রকল্প আছে, যা গত দুবছর ধরে পড়ে আছে, কোন কাজও শুরু হয় নাই। কিন্তু দেখেন ভারতের অবস্থান হল সে পারুক আর নাই পারুক নেপাল তা ভারতকেই দিবে। এই বক্তব্য আমার নয়, নভেম্বর ২০১৭ সালে চুক্তি বাতিলের সময় খোদ সুবীর ভৌমিক ভারতের নীতির এই দশা অকর্মন্যতার কথা তুলে ভারত নিজে যতটুকু পারে তাতে মনোযোগ দিতেও পরামর্শ রেখেছিল।

    নেপালে স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট সার্ভিস একচেটিয়া সরবরাহকারি ছিল ভারত। সম্প্রতি চীনও সেখানে বিকল্প সরবরাহকারি হিসাবে হাজির হয়ে একচেটিয়া ভেঙে দিয়েছে। ফলে এখন ভাল সার্ভিস দেওয়ার ও মুল্যের  প্রতিযোগিতা করেই ভারতকে টিকতে হবে। এধরণের বিষয়গুলোর ভারতের কলোনি মালিকের মত আচরণের পিছনের মূল কারণ। স্বভাবতই এখনই নিশ্চিত করেই বলা যায় কলোনি মালিকেরা নিপাত যাবে, হেরে যাবে।

    তাহলে নেপাল এখন কোন দিকে যাবে? বলা বাহুল্য, ভারতই নেপালকে এখন তথাকথিত ১৯৫০ সালের চুক্তি ভাঙার পথে ঠেকে দিচ্ছে ও যাবে। মনে রাখতে হবে, ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকার এখন নেপালে। দেশটির জনগণের সামনে এই ভারতীয় নিগড়, এই চুক্তি ভাঙা, ছুড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই বাস্তবতা আরও প্রকট হবে সামনের দিনে। নেপালকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে ভারত।

    চীনের সক্ষমতার সাথে পেরে না উঠে ভারত কলোনি স্টাইলে নিগড়ে নেপালকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেপালের জনগণেরই বিজয় হবে। আর ভারতের ভাগ্যে জুটবে চিরদিনের ঘৃণা। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক আইন ক্রমেই নেপালের মতো রাষ্ট্রের স্বার্থের দিকে মানে ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের পক্ষে হাজির হচ্ছে। অন্য রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে অবাধ পণ্য আনা নেয়া “ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের অধিকার” হিসেবে জাতিসঙ্ঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সুবিন্যস্ত করে হাজির হচ্ছে।

    ভারত একদিকে নিজেই স্বীকার করছে নেপালে নিজের ভুলনীতি ও পদক্ষেপের কারণে সেখানে চীন ঢুকে পড়েছে। অথচ নিজে সংশোধন হয়ে যাবার কথা বলে আবার সেই একই পথে হাটছে। ভারতের  নিজের অবজেকটিভ অসক্ষমতা সম্ভবত তাকে এই ভুল করতে প্ররোচিত করছে। মিথ্যা হামবড়া বোধ, যা সে নয় এমন এক কল্পিত বোধ তাকে বারবার স্বপ্নে পোলাও খেতে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এটাই এশিয়ার দুঃখ হয়ে থাকবে অনেকদিন!

    ওদিকে অলির ভারত সফরে স্বাগত  জানাতে এয়ারপোর্টে মোদি নিজে না গিয়ে হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথকে পাঠিয়েছেন। সোজাসাপ্টা করে বললে এতে নেপালবাসীকে অপমান করা হয়েছে এবং এটা অপ্রয়োজনীয় ও অযাচিত সস্তা আচরণ, তাই অগ্রহণযোগ্য। রাষ্টাচারের কনভেনশনে ছোট রাষ্ট্র বা বড় রাষ্ট্র বলে কিছু নাই। আছে মূলত নাগরিক জনগণের সম্মান, যা অলংঘনী্‌ যা ওভারস্টেপ করা যায় না। এমন আচরণ নেপালও করতে পারে। যদিও এগুলো কোনো বাহাদুরি নয়। ফলে এটা কাম্য নয়। কোন রাষ্ট্রদ্বয়ের পরস্পর রাজনৈতিক স্বার্থ না মিললে কোনো সম্পর্ক হবে না, কিন্তু নেপালের জনগণকে অপমান করার অধিকার মোদীর নাই। এটা কোন প্রধানমন্ত্রীর নয়, ভাংড়ির দোকানদারের আচরণ হয়েছে। এটা মোদীর ভুলা উচিত নয়।  মোদীকে একদিন  চুকাতে হবে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালে ভারতের ‘হামবড়া’ কূটনীতি“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

    নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

    গৌতম দাস
    ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহষ্পতিবার ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2lW

     

    নতুন করে রাষ্ট্রগড়া বা একটা মর্ডান রিপাবলিক গঠন কালে এর গঠনসভা, একে ইংরাজিতে কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (Constituent Assembly) বলা হয়; বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭২ সালে ধারণাটাকে বাংলায়  “গণপরিষদ” – এই বাংলাটা নেয়া হয়েছিল। আম-ধারণা হিসাবে নির্বাচন বলতে বা ‘ভোট আসছে’ বলে আমরা যা বুঝি ও বুঝাই সেটাই “সাধারণ নির্বাচন”। আবার কোন নতুন রাষ্ট্র গঠনসভারও সদস্য কারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন এর জন্যও একটা নির্বাচন হয়। তবে সেটাকে “সাধারণ নির্বাচন” নয় বরং একে “গঠনসভার সদস্য নির্বাচন” বলে। যদিও বাইরে থেকে দেখতে সেটা সাধারণ নির্বাচনের মতই মনে হতে পারে।

    ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ এর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল –  উদ্দেশ্য। ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য হল ওখানে ঐ নির্বাচিত কমিটি একটা কনষ্টিটিউশন রচনা করতে বসে, সেকাজ শেষ হলে নিজেরা  অনুমোদন দেয়। পরে এক গণভোটে তা পাশ করিয়ে আনে। আর ফাইনালি  ‘নতুন কনষ্টিটিউশন চালু হল’ বলে এক প্রোক্লেমশন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মূলত এই কাজটাকেই আরেক ভাষায় বলে ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হল। আর গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হল ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরে নির্বাচিত ঐ গঠনসভার অস্তিত্ব ঐ পর্যন্তই, এরপরে সে নিজে নিজেই আপনাতেই ভেঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরা হয়। এইবার রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে গঠিত নতুন কনষ্টিটিউশন মোতাবেক। যার প্রথম পদক্ষেপ হল, কনষ্টিটিউশনে যেভাবে লেখা আছে সে মোতাবেক  কারা জাতীয় সংসদের সদস্য হবেন নির্বাচন কমিশন এর নির্বাচন আয়োজন করতে থাকে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এই নির্বাচনকে ‘সাধারণ নির্বাচন’ বলা হয়। মনে রাখতে হবে “সাধারণ নির্বাচন” ঘটার ক্ষেত্রে সবসময় আগে থেকে একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন  থাকে আর সে মোতাবেক ঐ সাধারণ নির্বাচন আয়োজিত হয়ে থাকে।  ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য একটা কনষ্টিটিউশন লেখা আর এই নির্বাচন একবারই হয়; বিপরীতে সাধারণ নির্বাচনের বেলায় আগে থেকে থাকা একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়।

    তবে কনষ্টিটুয়েন্সির দিক বিচারে এই দুই ধরণের নির্বাচনের কনষ্টিটুয়েন্সি অনেক রাষ্ট্রের বেলায় ভিন্ন দুরকম হয়, অনেক ক্ষেত্রে আবার একই থাকে। কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা মানে হল কোন কোন প্রশাসনিক এলাকা অর্থাৎ কোন কোন ইউনিয়ন বা উপজেলার ভোটারদের নিয়ে একেকটা কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হবে। অনেক সময় এটাকে নির্বাচনী আসন এলাকাও বলতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে এমন কনষ্টিটুয়েন্সি মোট ৩০০ টা। তবে  অনেক দেশে ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ – দুই ক্ষেত্রে কনষ্টিটুয়েন্সি বা আসন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায়, ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ আসন সংখ্যা বা নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনায় বেশি থাকে। যেমন নেপালে ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ মোট আসন ছিল ৬০১, আর সাধারণ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা হল ২৭৫। এছাড়া ‘গঠনসভার নির্বাচনের’ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষে প্রক্লেমেশন আর এরও পরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকে ও পরিচালিত হয় এক অন্তর্বর্তিকালীন বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।  গঠনসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ঐ অস্থায়ী সরকার গঠন করে থাকে। এই হল ভেঙ্গে বিস্তার করে বলা একটা নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া অথবা পুরা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস।

    আমাদের পড়শি নেপাল তাদের প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসন উতখাত শেষে (২০০৬ সালে),  দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস সম্পন্ন করার পরে, এখন নেপালে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন চলছে। কিন্তু প্রায় দশ বছর লাগল কেন? এটা তো বরং চার-পাঁচ বছর বা তারও আগে (বাংলাদেশ একবছরেরও কম সময়ে হয়েছিল) শেষ করে ফেলার কথা। আর কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে কোন জনগোষ্ঠি যত লম্বা সময় নিবে পুরা জনগোষ্ঠিকে ততদিন ভয়ঙ্কর সব বিপদের মধ্যে থাকতে হবে। এ যেন অন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদে থাকা। আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করব, নতুন রাষ্ট্রগঠন করব ইত্যাদি অনেকের স্বপ্ন আমাদের থাকে। কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক অধ্যায় হল  একটা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শুরু করেও শেষ না করতে পারা বা প্রক্লেমশন না দিতে পারা। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে, পেট কাটা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই এবার নানান জটিলতায় পরে সেলাই দিয়ে পেট আর বন্ধ করা যায় নাই। এমন বাজে অবস্থা আর কারও হয় না। স্বভাবতই সেক্ষেত্রে তখন রোগীর জীবন চলে যাওয়ার বিপদ মাথার উপর টিকটিক করবে। নেপাল হল সেই দুর্ভাগ্যের জনগোষ্ঠি যারা প্রথমবার  কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচিত করেও (২৮ মে ২০০৮ থেকে, ২৮ মে ২০১২ সাল সময়কালের মধ্যে) ঐ নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে পারে নাই। এদিকে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নিজেই আয়ু শেষ করে ভেঙ্গে যায়। ফলে পুরা জনগোষ্ঠি দেশবাসী এক লিম্ব বা ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর উপায়ন্ত না দেখে সব রাজনৈতিক দল মিলে সুপ্রীম কোর্টের কাছে আদালতকে সাক্ষী রেখে বিশেষ পরিস্থিতি ও বিবেচনার দোহাই দিয়ে আবেদন করেছিল আর একটা সুযোগ দিতে; আর নিজ জনগোষ্ঠির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এবার আর ব্যর্থ হবে না। এথেকেই আর একবার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচনের বৈধতার ভিত্তি তৈরি করেছিল নেপাল। এটা সৌভাগ্য যে নেপাল যে সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয়বার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নির্বাচন হয়েছিল নভেম্বর ২০১৩ সালে। পড়শি কারও হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদ পেরিয়ে বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই ঐ নির্বাচন শেষে নেপাল আবার নতুন করে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার ফেরা ও কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি্তে কনষ্টিটিউশান রচনার কাজ  শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল। তবে  নেপালি জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়েও বড় সৌভাগ্য হল এবার দ্বিতীয় সুযোগে শত বাধা সত্ত্বেও (বিশেষ করে ভারতের বাধা) ‘কনষ্টিটিশন গঠন কাজ শেষ’ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তারা প্রক্লেমশন জারিতে সফল  হয়েছিল। আর তা সম্ভব হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল  (দাহালের মাওবাদী দল, আর বাকি দু দল হল,  আমাদের সিপিবির মত নির্বাচনমুখি কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস) একজোটে পরস্পরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা যে তারা ভারতের কোন প্ররোচনায়  না পড়ে প্রথম সুযোগেই কনষ্টিটিউশনাল রচনার কাজ শেষ করবে। দুবছরের মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সক্ষম হয়েছিল, যদিও ভারত শেষ চেষ্টা করেছিল মাধোসি জনগোষ্ঠিকে উস্কে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে, কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারিতে বাধা দিতে। কিন্তু সেসব কার্যকর করতে ভারত শেষে ব্যার্থ হয়। তবে নেপালে প্রদেশ কয়টা হবে, কিভাবে ৭৭টা জেলা কোন প্রদেশে কিভাবে  অন্তর্ভুক্ত হবে এটা অমীমাসিত রেখেই ঐ তিন দল কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারি করে দিয়েছিল। আর পরবর্তিতে ঐ অমীমাংসিত কাজ শেষ করা হয়েছিল।

    এখন নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর অর্থ গত দুবছরে সেসব জনগোষ্ঠিগত স্বার্থবিরোধ মিটিয়ে তারা অসমাপ্ত অংশগুলোও পুর্ণ করে ফেলেছে। এটাই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সফলতার আসল  তাতপর্য।

    এটা সাধারণ নির্বাচন, এখানে ‘সাধারণ’ শব্দটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কারণ এটা জানাচ্ছে  নেপালে কনষ্টিটিউশন রচনার কাজ পুরাটাই সমাপ্ত হয়েছে। তবে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পর্বে। কারণ এই শীতের সিজনে দুর্গম পাহাড়ে চলাচলের অসুবিধার কারণে মাঝে দুসপ্তাহের ফারাকে দুই আলাদা দিনে ভোট নেওয়া হচ্ছে।  দুই পর্বের ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ ডিসেম্বর।

    সাধারণভাবে বললে, নেপাল সম্পর্কে ভারতের কল্পনা হল – এটা ‘নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি’ বা তালুক যেন। ফলে সেখানে যা হবে তা ভারতকে তার ইচ্ছাকে অমান্য করে হতে পারবে না। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এখন বাস্তব পুরোটাই উল্টেপাল্টে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভারতের বিদেশনীতির বিরাট পরাজয়ের আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে নেপাল। আর এতে  ভারতের রাজনীতিক ও বিশেষ করে তার আমলা-গোয়েন্দাগোষ্ঠি যেন খোদ ভারতের স্বার্থের শত্রু।

    নেপালকে ভারত নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি মনে করার পটভূমি হাজির হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৪৭-পূর্ব যুগে একদিকে খোদ বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক নেপাল – দুটোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তবে দুই অর্থে। আর এতে বিরাট তফাতটা হল, ১৯৩৭ সালের পর থেকে ভারতে ধীরে ধীরে নেটিভরা অন্তত স্থানীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকার নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। এর বিপরীতে নেপাল তখন নিজস্ব এক রাজতান্ত্রিক সরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এক করদরাজ্য। নেপালের সাথে বৃটিশদের “নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩”, এটাই ছিল দ্বিতীয় ও শেষ চুক্তি, যার মেয়াদ উল্লেখ ছিল ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। যদিও সেটা নেপালের রাজাদের স্বার্থের দিক থেকে খারাপ চলছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা ১৯৪৭ সালে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় নেহরুর-ভারত যেন ‘নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩’-এর ব্রিটিশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওই চুক্তিই এবার ১৯৫০ সালে নতুন করে, ব্রিটিশ সরকারের জায়গায় ভারতের নাম বসিয়ে ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’ নামে পুনর্লিখিত  করা হয়েছিল। সেই থেকে নেহরুর-ভারতের দৃষ্টিতে ও মনোভাবে রিপাবলিক ভারত যেন আসলে নতুন এক ‘কলোনি মাস্টার’।

    সুনির্দিষ্ট করে নেপালের বেলায় বললে, নেহরুর-ভারত এমন ভাববার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কারণ নেপাল ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া তার বাইরে বের হওয়ার বা পণ্য আমদানি-রফতানির উপায় নেই। তিন দিকে ভারত আর উত্তরে চীন। কিন্তু চীনের দিকের অংশে তা আরো দুর্গম উঁচু পর্বতে ঢাকা ফলে পুরাটাই অগম্য এলাকা। কেবল একালে এসে রাইজিং চীন বিপুল বিনিয়োগ করে পাহাড় ডিঙিয়ে নেপালের সাথে স্থল যোগাযোগ (বিশেষ করে হাজারের দুয়েকের কিমি বেশি দীর্ঘ রেল লাইন পেতে) স্থাপনে রত হয়েছে। যদিও তা ঠিক নেপালের জন্য না, চীনের নিজের ঐ অঞ্চলও ল্যান্ডলকড, ওর বিকাশের জন্য।

    রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্র তার কোনো পড়শি বা বিদেশ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করা মানেই সেটা ভারতের কলোনি বানানোর বা কলোনি-সম্পর্কের চেষ্টা করে যেতে হবে – নয়াদিল্লির এই মনোভাব, এই অনুমান ও বোধ স্বাধীন ভারত জন্ম হওয়ার সময় থেকেই। ভারতের এই অনুমান যে মারাত্মক ভুল, আত্মঘাতি, আর এর জন্য ভারতকে উলটা কাফফারা দিতে হবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে শিক্ষা পেয়ে চললেও তা থেকে কোনো শিক্ষা ভারত নিচ্ছে – এমন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের পড়শি প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে একটা কলোনি সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার যুগ যে এটা আর নয়, তা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে- এই শিক্ষা পেলেও তা গ্রহণ করার অবস্থায় ভারত গিয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

    তাই ২০০৬ সালের পর থেকে ক্রমেই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং যদিও তাতে ভারত নির্ধারক ভূমিকায় নেপালকে ইতি-সহায়তা দিয়েছিল তা সত্ত্বেও নেপালের এই বিরাট পরিবর্তনের তাৎপর্য কী তা ভারত কখনো ধরতে পারেনি। কারণ ভারতের রাজনীতিক ও আমলা-গোয়েন্দা এই স্টাবলিশমেন্ট-চক্র আসলে, পড়শি রাষ্ট্র-সম্পর্ক বলতে কলোনি-সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে তা এখনো কল্পনা করে না। তাই এক দিকে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া  – এটা নেপালের জন্য একটা বিরাট বিজয়। আর ভারত ততই অযথা নেপালের জন্য এক নম্বর ভিলেনের ভূমিকায় ক্রমান্বয়ে হাজির হওয়া – এটা ভারতের বিরাট পরাজয়। একালে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার একমাত্র উপায়, ওর ওপর কলোনি সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়া নয়, বরং এটা কাউন্টার প্রডাক্টিভ; মানে উল্টো ফল দেয়া কাজ। এটা ভারতের স্টাবলিশমেন্ট-চক্রের এন্টেনায় ধরা পড়া, হুশ  ও নতুন মুল্যায়নে আসার আগে পর্যন্ত, সে নিজেও শান্তি পাবে না, পড়শিদেরও শান্তি দিবে না।

    ভিন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কলোনি নয় বরং মর্যাদার সম্পর্ক হিসাবে দেখা আর একে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে আগানো – এমন অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ, এটাই অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই বোধের  -পানি ভারতের কানে ঢোকা – দুরঅস্ত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘কলোনি অ্যাপ্রোচ’ যে তার আদি সমস্যা এটা ভারত এখনো উপলব্ধি করে না। আর এখন তো ভারতের এমন বেকুবিপনার নীতির পক্ষে আরো বড় সাফাই এসে গেছে। তা হচ্ছে রাইজিং অর্থনৈতিক প্রভাবের চীন। যেমন নেপালের ক্ষেত্রেও ভারত হয়তো সাফাই দিতে চাইবে, নেপালে ভারতের এমন দুর্দশা হয়েছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার করতে গিয়ে – এসব বাজে কথার সাফাই গাইবে। যদিও ভারতও জানে, এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা। নেপালের বেলায় চীনের প্রভাব বা চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে নেপালের নেয়া এটা একেবারেই নতুন ‘ফেনোমেনা’, মাত্র ২০১৫ সাল বা এর পর থেকে। অথচ নেপাল যেন একটা নতুন কনস্টিটিউশনের ভেতর দিয়ে নতুন করে রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করে থিতু হতে না পারে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এর সপক্ষে নেতিবাচক তৎপরতায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচন করতে হয়েছে নেপালকে, তবু ভারতের নেতিবাচক ভূমিকা শেষ হয়নি। অবশেষে দ্বিতীয়বারের (২০১৩) কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচনের পর নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল এক হয়ে ভারতের বাধা মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপাবলিক নেপাল হিসেবে নতুন কনস্টিটিউশনের ঘোষণা দিতে নেপাল সক্ষম হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে কূটনীতিতে পরাজিত ভারত ঐ ঘোষণারও বিরোধিতা করেছিল। এরপর ভারতের শেষ অবলম্বন হয়েছিল, নেপাল-ভারত সীমান্তের নেপাল অংশের সমতলভূমির বাসিন্দা মাধেসি জনগোষ্ঠীর ত্রাতা সাজার।

    ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপালের সমতলি-পাহাড়ি স্বার্থবিরোধ যেন কোনো মীমাংসায় না পৌঁছায় – এভাবে কাজ করে গেছিল ভারত। নেপালকে কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ২০১৫ সালে ঘোষণা দেয়া হলেও এর অভ্যন্তরে প্রদেশগুলো কিভাবে বিভক্ত করার কাজ অসমাপ্ত ছিল মানে, অভ্যন্তরীণ সীমানা টানার কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এতদিন আয়োজন করাও যায়নি। বিগত দুই বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাধা দিয়ে একাজগুলো যেন শেষ না নয়, পাহাড়ি-সমতলি জনগোষ্ঠীগুলো যেন তাদের স্বার্থের ঝগড়ার ব্যাপারে আলোচনা করে কোন একটা মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারে, এ ক্ষেত্রে নেপালকে ঠেকিয়ে রাখার সব চেষ্টা করা ছিল ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য।

    এই পটভূমিতে চলতি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তাৎপর্য হল, ভারতের সব প্রচেষ্টাকে নেপালের জনগণ পরাজিত করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের সব বিতর্ক-বিবাদ নিরসন করে নেপাল নিজেকে সাত প্রদেশে ভাগ করে  ও প্রদেশ গঠন সম্পন্ন করেছে। এটা একটা বিরাট অর্জন। বিগত ২০ বছর নেপালে কোথাও (আমাদের ইউপি ও উপজেলার মত) স্থানীয় নির্বাচন হয়নি। অনেকটা, সীমানা টানা বা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আমাদের উপজেলার নির্বাচন না করতে পারলে যেমন হত তাই। এই বছরে এসে কনস্টিটিউশনের অসমাপ্ত এসব কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আর সব কিছুই হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তাই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সাল ছিল নেপালের জন্য ‘নির্বাচনের বছর’; ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এই তিন নির্বাচনই এবছর সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এক বছর আগেও এটা আদৌ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রায় সবার মনে সংশয় ছিল। কোনো আশার আলো কোথাও ছিল না। আমাদের অনুমান, নেপালের জনগণ এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট দেবে সম্ভবত নেপালি মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডকে। না, এটা তার রাজনৈতিক আদর্শ ভাল কি মন্দ তা বিচার করে বলা কোন কথা নয়। নেপালের সর্বশেষ সংসদে ৬০০ আসনের মধ্যে মাওবাদীদের ছিল মাত্র ৮০ আসন। আর ওদিকে নেপালি কংগ্রেসের ছিল ১৯৬ আসন আর কমিউনিস্ট নেতা অলির ইউএমএলের ১৭৫ আসন। ফলে নেপালের প্রধান তিন দলের কারোই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তবে সব মিলিয়ে একসাথে মোট আসনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ আসন তাদের দখলে ছিল। ফলে গত পাঁচ বছরে তিনবার এই তিন দলের তিন ধরনের কম্বিনেশনে সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সেটা সব সময় আগাম আপস আলোচনাতেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে কোনো অচলাবস্থার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে দাহালের কৃতিত্ব হল, তিনি ছিলেন সেই আশার আলো; প্রতিটি বিবাদের ইস্যুতে সমঝোতা টানার উদ্যোক্তা।  আর বাকি দুই দল – আমাদের সিপিবি দলের মতো নির্বাচনী কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস এদের ভূমিকা ছিল যে এরা নিজেদের রাজনৈতিক বিবাদের সমাধানে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে না পারলেও দাহালের প্রদত্ত সমাধান প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন এবং ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তা সফল করা। বিশেষ করে ভারতের কোনো প্ররোচনার ফাঁদে বা লোভে না পড়া। অবশ্য পুরো নেপালের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গরিব মানুষের কাছে ভারতের কোনো ইতিবাচক ইমেজ আর নেই। কারণ, ২০১৫ সালে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে ভারত একনাগাড়ে পাঁচ মাস ল্যান্ডলকড নেপালে ভারত থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি ভারত বন্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি, যার ফলে কষ্ট সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছিল  নেপালের গরিব জনগণকে।

    সমঝোতার সরকার হিসেবে বর্তমানে নেপালে শেষ বা তৃতীয় কোয়ালিশন চলছে  এটা নেপালি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার, যার পার্টনার দাহালের মাওবাদী দল। এটাই শেষ ১১ মাসের সরকার, যার আগের ১১ মাসে দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার ছিল। নেপালে সাত না আটটি প্রদেশ থাকবে, কোন কোন জেলা কোন প্রদেশে থাকবে- এ বিষয়টিকে মোটা দাগে বললে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ ছিল স্বার্থবিরোধ বিবাদের সবচেয়ে জটিল ইস্যু। আর ভারত এই বিবাদে মাধেসিদের কান ভারী করে বিবাদ আরো বড় করে তা লাগিয়ে রেখেছিল যেন সমাধান না মেলে – এটাকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ বলে নির্ধারণ করে পথ রেখেছিল। গত ২২ মাসে নেপালের বিরাট অর্জন হল – প্রদেশ ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ মিটিয়ে এগুলোর সীমানা নির্ধারণ শেষ করা। এর পরপরই শুধু প্রাদেশিক নয়, স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজনের সব বাধা খুলে যায়। ফলে ২০ বছর পরে এই প্রথম ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এরপর দুই পর্বে প্রাদেশিক (সরকার) ও ফেডারেল (কেন্দ্রীয় সরকার)- এ দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে যা হবে তা হল, নেপাল মোট ৭৭টি জেলা আর সাতটি প্রদেশে আপোষে বিভক্ত হয়ে থাকবে।

    চলতি সাধারণ নির্বাচনে নেপালে সারা দেশ থেকে মোট ২৭৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (আমাদের ভাষায় কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হয়ে আসবেন। তারা একটি ফেডারেল সংসদ গঠন করবেন। এই সংসদের সংখ্যাগরিস্ট দলের সদস্যরা একটি কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠন করে নেবেন। এ ছাড়াও সাতটি প্রদেশে আলাদা আলাদা প্রাদেশিক সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেকাজে সাত প্রদেশে মোট প্রাদেশিক সদস্য নির্বাচিত হবেন ৫৫০ জন। নেপালের সাফল্য হল নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষমতার তিন স্তর ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এর অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। আর সেই সাথে এ বছরই তিন স্তরের নির্বাচন সফলভাবে শেষ করা। ফলে এখন নেপাল দাবি করতে পারবে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রগঠন পর্ব সফলভাবে শেষ করে সে এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। স্বভাবতই এটা নেপালের জনগণের জন্য যতটা সফলতা ও অর্জনের বিষয়, ঠিক ততটাই ভারতের সরকারের জন্য একধরনের পরাজয়ের বিষয়।

    এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় ভারতের নেপালনীতি আজ পরাজিত। নেপালের নির্বাচন কাভার করা ভারতের মিডিয়াগুলোর সম্পাদকীয় দেখলে বোঝা যায় যে, অন্তত তারা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর নেপালের জনগণের কাছেও ভারত যে একটা প্রবল নেতি-শক্তি এবং নেপালের গরিব মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ, আরো কঠিন ও কষ্টকর করে দিতে পিছপা হয় না, তা প্রমাণিত করে গেছে। ১০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে নেপালের কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেসে ভারত এক বিরাট নেতিবাচক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে, যা থেকে ভারতের জন্য পরাজয় আর নেপালি জনগণের ধিককার কুড়ানো ছাড়া কোনো অর্জন নেই। এর ফাঁকে ভারতের নেতি-রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়ায় নেপালি জনগণের কাছে অনেকটা অপরিচিত চীন, আজ নেপালি জনজীবনের কষ্ট লাঘবে বহুল আকাঙ্খিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগকারী ‘ত্রাতা’ হয়ে উঠছে।

    বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফলাফলে কমিউনিস্টদেরকে আগিয়ে রাখছেন। এই নির্বাচন হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। এক পক্ষে মাওবাদী, অন্য পক্ষে কমিউনিস্ট ইউএমএল আর বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি। ভট্টরায়, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাতের সময় মাওবাদী দলের সাথে দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে ছিলেন। এ তিন কমিউনিস্ট দলের জোট বনাম নেপালি কংগ্রেস এবং এর সাথে ছোটখাটো দলের গণতন্ত্রী জোট। এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে যদি জনগণের মন-মেজাজের ইঙ্গিত বলে আমরা মানতে চাই তবে কমিউনিস্ট জোট বিপুল ভোটে জিতবে, বলা হচ্ছে। [Based on the results of Nepal’s recently concluded local level polls, there is a better chance that the left alliance of CPN-UML and CPN (Maoist Center) will gain a majority and form the government] এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে অবশ্য প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে পর্যন্ত।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে নির্বাচন আয়োজনে সফলতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • নেপালে আবার নড়াচড়া

    নেপালে আবার নড়াচড়া
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০১৬,  মঙ্গলবার
    http://wp.me/p1sCvy-1bK

    ভারতের সাথে তার সব পড়শি রাষ্ট্রের সম্পর্কই নানান রকম খটমট ও সঙ্ঘাতে পরিপূর্ণ। ব্যতিক্রম বা ভারতেরই ভাষায় ‘সফলতা’, কেবল বাংলাদেশে। গত সপ্তাহে ৯ মে নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারির সরকারিভাবে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা হওয়ার কথা ছিল ভারতের রাষ্ট্রপতির অতিথি হিসেবে তাঁর ভারত সফর। কিন্তু সফরের মাত্র দুই দিন আগে ৬ মে নেপাল থেকে সরকারিভাবে জানানো হয় যে, নেপালের রাষ্ট্রপতি এই সফর বাতিল করেছেন। এই খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। কিন্তু খবরটার গুরুত্ব ছিল আরো কয়েক গুণ বেশি। কারণ একটা বাড়তি খবরও সাথে ছিল, নেপাল সরকার ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায়কেও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কূটনীতিতে ‘প্রত্যাহার’ শব্দটির বিশেষ অর্থ আছে। অর্থাৎ প্রত্যাহার বা recall এই শব্দটি কী কী অর্থ নিশ্চিত করে আর কী কী করে না, তা সুনির্দিষ্ট থাকে। যেমন নিশ্চিত অর্থ হল, তার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  ঐ রাষ্ট্রদুতকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এরপর, কেন বলা হয়েছে এর কারণের দিক থেকে এর আবার দুটো মানে হতে পারে- এক. ঐ রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচ্যুত বা দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে। অথবা দুই. কেবল ওই দেশ থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে কিন্তু তাঁর চাকরি বহাল আছে। ফলে এরপর অন্য কোথাও তাঁকে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রদূতের বেলায় তার প্রত্যাহারের কারণও মিডিয়ায় উল্লিখিত হতে থাকে। আর কারণটা সরকার নিজে মিডিয়ায় প্রচার করতে না চাইলেও মিডিয়া নিশ্চিত করছে যে নেপালি সরকার রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত হিসেবে অভিযোগ তিনটার: প্রথমটাই বড় সাঙ্ঘাতিক, কাটমান্ডুতে থাকার সময় চলতি প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির (K P Sharma OLI অথবা K P OLI নামে তিনি বেশি পরিচিত) সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগ, দিল্লিতে বসে অফিস চালিয়েছেন এমনভাবে যে সেখানে তিনি কী করছেন কিভাবে করছেন তা নিজ দেশে তার কাজের হিসাব নেয়া রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানানো। আর তৃতীয় অভিযোগ, ভারতের রাষ্ট্রদূত রণজিত রায়ের (Ranjit Rae) সাথে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত সফরে গিয়েছেন অথচ দেশের নিজ মন্ত্রণালয়কে কিছুই জানাননি। অনুমান করা যায়, মূল অভিযোগ আসলে শেষেরটাই। আর সেটা করতে গিয়ে প্রথম দু’টি অভিযোগ তৈরির অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।

    আসলে গত ৬ মে ছিল নেপালের জন্য ঘটনাবহুল দিন। সেটা শুধু রাষ্ট্রপতির সফর বাতিল আর ভারত থেকে নেপালি রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাহারে ঘটনার কারণে নয়। এ দুটো যদি দেশের বাইরের ঘটনা বলি তবে ঐদিনের বাকি ঘটনাবলি ছিল অভ্যন্তরীণ। এর আগের দিন মানে, ৫ মে অলি সরকারের অন্য পার্টনার দল হল নেপাল মাওবাদী পার্টি, যার সমর্থনে (কিন্তু তারা সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছে) অলির সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে সেই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড মিডিয়ায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তার দল ওলি সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। তবে এও জানিয়েছিলেন ঐদিনের সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর মিটিং আছে। পরের দিন ৬ মে প্রচন্ড জানান, তিনি আপাতত সমর্থন প্রত্যাহার করছেন না; বরং এপ্রসঙ্গে নয় দফা দাবিতে তাদের সমঝোতা হয়েছে। ফলে সরকার আগের মতোই থাকছে।
    এরপর ঘটনাবলী নিয়ে আরো কিছু বর্ণনায় যাওয়ার আগে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনের পটভূমি সংক্ষেপে বলে নেয়া ভালো হবে যাতে এখনকার অবস্থা বুঝতে সুবিধা হয়।
    সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফল অনুসারে নেপালের মোট ৬০১ আসনের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রধান তিন দলের মোট আসন সংখ্যা, এরা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৪৫১ আসন দখল করে আছে। কিন্তু কেউই নিরঙ্কুশ বা অর্ধেকের বেশি ৩০১ আসন পায়নি বলে, কেউ একক সরকার গঠনে সক্ষম নয়। আর আসনসংখ্যা অনুসারে ওপরের প্রথম দল নেপালি কংগ্রেস (১৯৬ আসন), দ্বিতীয় (চলতি প্রধানমন্ত্রীর) নেপালি কমিউনিস্ট ইউএমএল (১৭৫ আসন) আর তৃতীয় মাওবাদী কমিউনিস্ট (৮০ আসন)। বিগত রাজতান্ত্রিক সরকার উচ্ছেদ করার পরে নেপালে প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের স্থাপন করার ক্ষেত্রে সোচ্চার মূলত মাওবাদীরা হলেও এদের সাথে অপর দুই দলও ছিল। ফলে এই তিন দল সে সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা ছিল দ্বিতীয় প্রচেষ্টার নির্বাচনী ফলাফল। কারণ প্রথম প্রচেষ্টা ফেল করেছিল। আর এই তিন দলের আসন সংখ্যা মোট করে দেখানোর কারণ হল, ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর এই তিনটা দলই ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। খুব সম্ভবত এই তিন দলের মধ্যে ভারত প্রসঙ্গে কমন কিছু অবস্থান আছে, যা ইনফরমাল এবং অপ্রকাশ্য। এটাই ভারত থেকে চরমভাবে এই তিন দলকে দূরে নিয়ে যায় আবার এটাই তাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধনের হেতু, ও ভিত্তি।
    আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের (মে ২০০৮) পরে, প্রথমবারের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টায় নির্বাচিত সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সাথে এক এক করে প্রধান তিনটি দলেরই সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক হয়ে যায়। অথচ রাজতন্ত্র উচ্ছেদে রাজনৈতিক পরিকল্পনার শুরুর সময় থেকে ভারতের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। সেসময় আমেরিকানদের কূটনীতির সহযোগী অবস্থান ছিল খুবই নির্ধারক। ফলে আমেরিকার সাথে সমন্বিত ভারতের সে ভূমিকা ছিল গঠনমূলক। কিন্তু রাজতন্ত্র উচ্ছেদ উতখাতের পর তৎকালীন প্রথম অন্তর্বর্তি নির্বাচিত সরকার ছিল মাওবাদীদের সরকার। আর ভারত ক্রমেই কাজের ও স্বার্থের দিক থেকে গড়ে ওঠা এতদিনের ভালো সম্পর্ককে প্রথমে মাওবাদী সরকারের সাথে ও পরে অন্য দুই পার্টির সাথে ক্রমেই আস্থা হারিয়ে তিক্ত করে ফেলেছিল। ফলে মাওবাদী সরকার সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়েছে, এ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়। বলা যায়, তিন পার্টির সাথে সম্পর্ক হারিয়ে, ‘কনষ্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছে’ এই ঘোষণা ঠেকিয়ে দেয়াকেই ভারত নিজের সাফল্য মনে করেছিল। ভারত নেপালের প্রধান এই তিনটি দলকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ লক্ষ্যণীয়, ভারতের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে ছিল না। সংক্ষেপে কয়েক বাক্যে এর কারণ চিহ্নিত করলে বলতে হবে- ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই নেহরুর হাতে যে ভারত হাজির হয়েছিল, তাতে পড়শিনীতি বা বিদেশনীতির মৌলিক কিছু জন্মত্রুটি ছিল। যেমন নেহরু যেন মনে করতেন, পড়শি বা বিদেশনীতি মানেই বিগত ব্রিটিশ কলোনির বিদেশনীতিই। কথাটা এভাবে বলার পিছনের কারণ হল, মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পঞ্চাশের দশক ছিল দুনিয়া ব্যাপী “উপনিবেশ মুক্তির” যুগ। [কিন্তু খুব সতর্কভাবে ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার  মানে বুঝতে হবে।  এসম্পর্কে বাড়তি বিস্তারিত কিছু কথা আলাদা করে নিচে সবশেষের কয়েক প্যারায় আনা হয়েছে।  আগ্রহীরা এসম্পর্কে বিস্তারিত সেখানে পড়তে পারেন।] নেহেরুর চোখে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ উপনিবেশকালীন রূপ – ‘প্রভু-দাস’ এই রূপেরই ধারাবাহিকতা। এরই ছাপ আমরা দেখি নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তিতে। সেই থেকে ভারতের পড়শি বা বিদেশ নীতি এই আলোকে সাজানো হয়ে আছে। মানে জবরদস্তি, চাপ খাটানো, অন্যের সার্বভৌমত্বকে সম্মানের কোনো বিষয় সেখানে রাখার দরকার কী এমন ভাবনায় পরিচালিত এক অবস্থা! অথচ উপনিবেশ-উত্তর সে যুগে উপনিবেশ মুক্তিই বা পড়শির সাবভৌমত্বকে সম্মান করার বিষয় তখন স্পষ্ট প্রধান বিষয় হয়েছিল। এসব পালনীয় শেষ করে বা সুরক্ষিত রেখেও ভারত পড়শি দেশসহ যেকোন দেশে বিদেশ নীতি পরিচালনা করা সম্ভব করতে পারত। ভারতের জনসংখ্যা বড় মানে অর্থনীতিও বড়। এছাড়া ভারত ভাগ হয়েছে বটে কিন্তু কলোনিয়াল শাসনকালের মাখনটা মূল ভারত ভুখন্ডেই থেকে গিয়েছে। পরবর্তিতে আজ পর্যন্ত একটা ভাল রকমের পুজিতান্ত্রিক বিকাশ এই ভারতে ঘটে গিয়েছে। এই অগ্রসর অবস্থার কারণে পড়শী যেকোন দেশের সাথে ভারতের পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেয়ার এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক হলেও সেখানে পড়ে পাওয়া ভাবে ঐ বিনিময়ের ভারসাম্য ভারতের পক্ষেই থাকবে। ফলে এক দেয়ানেয়ার ফেয়ারনেস-ন্যায্যতা বজায় রাখলেও সেই অর্জন ভারতের জন্য যথেষ্ট। অথচ প্রজাতান্ত্রিক ভারতের জন্মের পরে সত্তর বছর পেরিয়ে একুশ শতকে এসেও ভারতের বিদেশনীতির পুরনো তরিকাকেই আছে আর একেই তার নীতি ও সাফল্যের কাঠি মনে করে যাচ্ছে। ল্যান্ডলকড কোনো কিছু শর্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রেরও পড়শির সমুদ্রবন্দরের প্রবেশ ও ব্যবহারের অধিকার আছে- জাতিসঙ্ঘের এমন আইন কনভেনশন যখন প্রণীত হতে যাচ্ছে তখন এই আমলে ল্যান্ডলকড নেপালকে প্যাঁচে ফেলে তার সাথে কলোনি-দাসের মতো আচরণ করতে চাইলে পালটা ঝাপ্টা তো খেতেই হবে।
    নেপালের জনগণ নিজ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে একে উচ্ছেদ করেছে। সে কাজে ভারতের সাহায্য পেয়েছে, কিন্তু সেটা ফিরে আবার ভারতের কলোনি হওয়ার জন্য নয় নিশ্চয়ই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভুল নীতিতে পরিচালনের কারণে নেপালের প্রধান তিনটি দলই এর পর থেকে ভারতের প্রভাবের একেবারে বাইরে চলে গেছে। ভুল বিদেশনীতিতে সব হারিয়ে উপায়হীন হয়ে ভারত এর পর থেকে মাধেশি ও জনজাতির জনগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে নিজের শক্তি দেখাতে গিয়েছে। ফলে একদিকে সরকারসহ তিন নেপালি দল আর অন্যদিকে ভারত – এরকম পক্ষাপক্ষিতে পরস্পরের প্রতি শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হলো গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ – ওই তিন দলের নেপালের সংবিধান রচনা সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে বসা। আর তা প্রতিরোধে ভারত নিজের সীমান্ত শুল্ক বিভাগ আর সাথে মাধেশি অঞ্চলের ছোট দলের মাধ্যমে ভারত থেকে ল্যান্ডলকড নেপাল অভিমুখে পণ্য চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। যদিও মুখে তা স্বীকার করে নাই। এখানে প্রথমত যে প্রশ্নটা ওঠে, নেপালের সংবিধান ঘোষণাতে এর বিরুদ্ধে ভারতের কী বলার আছে! ভারত ভিন রাষ্ট্র, তার কী বলার থাকে না থাকতের পারে? ভারত কী নেপালের মাধোশি বা জনজাতি জনগোষ্ঠিগুলোর প্রতিনিধি? নাকি ভারত ভিন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধি হবার কোন সুযোগ সেখানে আছে?  এভাবে আজিব প্রতিনিধি সাজার চেষ্টা এটাই তো ভারতের জন্য বিপদজনক। বাজে উদাহরণ নয় কী? ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলারা নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে এন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।  কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন গৃহিত হবার ঘোষণার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে সে দেশেরই কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী। পড়শির আপত্তি করার বিষয়ই নয় এটা। লিগ্যাল এই পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখান থেকেই পড়শির ওপর হস্তক্ষেপের জেনুউন অভিযোগ উঠে আসে। এটা সম্ভবত দুনিয়ায় প্রথম উদাহরণ এবং ভারতের দিক থেকেও খুবই বাজে উদাহরণ। কারণ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই পড়শি রাষ্ট্রের  বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার পথ দেখিয়ে রাখল ভারত। অথচ বিষয়টা এত জটিল ছিল না। একটা স্থিতিশীল নেপালের জন্য অথবা অন্য কোনো যুক্তিতে ভারতের নিজ স্বার্থের দিক থেকে উদ্বেগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভঙ্গী খুব গুরুত্বপুর্ণ। ভারতকে সেটা প্রকাশ করতে গেলে অবশ্যই ন্যুনতম পড়শির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করেই তা হতে হবে এবং তা করা সম্ভবও। সে লক্ষ্যে ভারত পড়শি সরকার বা দল্গুলোকে লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু এটা যে প্রচেষ্টা করা হয়েছে তা খুবই নিকৃষ্ট। আসলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাতে সাহায্য সহযোগিতা করার সময় থেকেই ভারত নিজেরও স্বার্থগুলো স্পষ্ট করে এই প্রধান তিন দলের মধ্যে বুঝিয়ে রাজি করার উদ্যোগ নিতে পারত। যেটাকে আমরা পারশু (pursue) বা লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা বলি। কিন্তু ভুল বিদেশনীতি, ভুয়া আত্মগরিমা, নকল উপনিবেশী ভ্যানিটি ভারতকে সে পথে যেতে দেয়নি। এই ভুলের মূল্যায়ন ভারতের ভেতর থেকেই একদিন উঠে আসবে। কারণ তবেই ভারতের সামনে আগানোর বাধা সরাতে সক্ষম হবে।
    এমনিতেই টানা সাড়ে চার মাস ধরে চলা নেপালের সাথে পণ্য চলাচলে অবরোধের ফলাফলও শেষ বিচারে ভারতের বিপক্ষে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল নেপালি জনগণকে শাস্তি দেয়া। কিন্তু ভারতের শাস্তিও কম হয় নাই। এই সাড়ে চার মাস আসলে যেন উভয় পক্ষের কার কত দূর সহ্যক্ষমতা তারই পরীক্ষা চলেছে। পরিশেষে এতে নেপালের দিক থেকে দেখলে তার বিজয়ের দিকটি হল, নেপালের জনগণের কাছে এত দিন যেটা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল যে ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া তাদের অন্যভাবে অন্য কোন দিক দিয়ে বাইরের দুনিয়ায় বের হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ভয়াবহ ঐ নিরুপায় পরিস্থিতিই অপর পড়শি চীনের ভেতর দিয়ে বের হওয়ার বিকল্প উপায় অবরোধের এই দুর্যোগের সময়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অলি চীনের সাথে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। নানান সুবিধাজনক স্পটে ৯টা রেল ও সড়কপথ হবে বের হবার পথ। আর এরই লক্ষ্যে সার্বিক পরিকল্পনা, ভায়াবিলিটি স্টাডি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, একবার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে গেলে সেই নেপালকে আর কোনো কথাই শুনানো ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং এত দিন ভারতের দাবড়ে মুখচাপা দিয়ে রাখা আচরণের বিরুদ্ধে সব অর্গল খুলে ওই নেপালি জনগণ যা করার তাই করবে। বলা বাহুল্য সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানগত। ওদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে নতুন রেল ও সড়কপথে ব্যয় শুরুতে কিছুটা বেশি হলেও এক দিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাম চুকানোর স্বার্থে আশা করা যায় নেপালের জনগণ তা বইতে রাজি হবে। আর এতে ক্রমেই আরো বাড়তি উৎপাদন ও চলাচল বেড়ে যাওয়ার মুখে আস্তে আস্তে ব্যয়ও কমে আসতে শুরু করবে। তবে এখান থেকে এমন মনে করা ভুল হবে যে চীন এটাকে পড়ে পাওয়া ফায়দা হিসেবে দেখবে কি না। এ প্রসঙ্গে চীন অনেক আগেই পরিষ্কার করে রেখেছে। এশিয়ার অর্থনৈতিক পড়শি শক্তি হিসেবে ট্র্যাডিশনালি বা নিজ যোগ্যতায় যেসব বাজার বা সম্পর্ক সুবিধা তার আছে এর শেয়ার ভারতকে দেয়া চীন নিজের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে করণীয় মনে করে। কারণ সে জানে ও মানে দুনিয়াতে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কায়েমের ক্ষেত্রে ভারত তার সঙ্গী। নতুন অর্ডার তৈরির ক্ষেত্রে চলতি নেতা আমেরিকা হবে অতীত নেতা আর ভারত হবে আগামী সহযোগী। ভারত সেসবের পক্ষে নিজের ভূমিকা বুঝে এগিয়ে আসার আগেই চীন ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে নিজ আমন্ত্রণের মনোভাব স্পষ্ট করে রাখতে চায়।
    যেমন নেপালের আমদানি তেলের চাহিদার মাত্র ১৩ ভাগ চীন থেকে আসার চুক্তি হয়েছে। এখন বাকিটা নির্ভর করে ভারতের ওপর। ভারত যদি অবরোধ-সম্পর্কের পথেই থাকতে চায়, তবে এই ভাগের হার শতভাগ হওয়ার দিকে যাওয়া ছাড়া যে উপায় থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।
    ইতোমধ্যে ভারত আরেক হুমকি তৈরির চেষ্টা করেছে। ভারতের ভাষায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। বিগত মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি পরিচালনার সময়ের পুরনো মানবাধিকার ভঙ্গের মামলা, এ ছাড়া একালে সাড়ে চার মাসের অবরোধের সময় মাধেশি জনগোষ্ঠীর অনেকে আহত, নিহত হয়েছেন। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ বা ইউপিআরের মুখোমুখি হতে হয়। গত বছরের শেষে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নেপাল প্রসঙ্গের সভায় ভারত ওপরের উল্লেখ করার দুই ইস্যুতে আপত্তি দায়ের করে। যাতে সরকার ও মাওবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ এখানেও ভারত একইভাবে নিজের বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো দেশের অভিযোগের আঙুল উঠানোর রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। যেমন সেই অভিযোগ হতে পারে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মির ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত। এটা ভারতও জানে। ফলে ভারতের এক মিডিয়া জানাচ্ছে ইউপিআর ইস্যু নিয়ে বেশি দূর যেতে ভারতের ইচ্ছা নেই।
    কিন্তু তবু এই পদক্ষেপের কথা ভেবেই মাওবাদী দলনেতা প্রচন্দ অলির ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন গত ৫ মে, নতুন কিছু পালটা পদক্ষেপে নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল, এই তিন দলের সমন্বয়ে একটা সর্বসম্মতির সরকার হোক যাতে সম্মিলিত কৌশলে ভারতের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলা করতে পারে। আর যদি তা না করা যায়, সবাই রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে নেপাল কংগ্রেস দলের সমর্থনে সে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গড়তে চায়। এমন সিদ্ধান্তের কারণ, অলি সরকারের ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। যার মূল কারণ সরকারের অদক্ষতা বা নন-পারফরম্যান্স। আর সবচেয়ে বড় হলো, এখন অবরোধ উঠে গেলেও জ্বালানি তেল, চিনি ইত্যাদি এজাতীয় জিনিসের দাম কমেনি। ব্যাপক চোরাচালানি মজুদদারি কারবার চলছে সরকার ও দলের প্রশ্রয়ে। ফলে কোনো পদক্ষেপ ছাড়া ওলির হাতে সরকার ছেড়ে রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না মাওবাদী নেতা প্রচন্দ। এতে গত ৬ মে নেপাল ঘটনাবহুল হওয়ার পেছনে ভারতের চাপ সামলানোর নতুন কৌশল ও পদক্ষেপ হিসেবে কী করা যায়, এর অংশ মনে করা যেতে পারে। আর এ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়ার ব্যাখ্যা হলো, অলি সরকার এসব ঘটনায় ভারতকে দায়ী করে নিজ জনগণের কাছে দেখাতেই নেপালের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর আচমকা বাতিল করায়। এতে নিজ সরকারের ব্যর্থতার অনেক কিছুই আড়াল করার কিছু সুযোগ পেতে পারেন, এটাও ভেবে থাকতে পারেন।

    [ওদিকে ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার পর্ব খুবই খারাপভাবে শেষ হয়। রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। ফলে স্বভাবতই অলি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করেন এবং ভারত সরকারকে নোটিফাই করেন। পরে এই ঘটনা আর এক মোড় নেয়। কূটনৈতিক পাড়ায় খবর উঠতে থাকে৪ যে এই ইস্যুতে নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদুত রণজিত রাওকে নেপালে “পারশন নন গ্রাটা” বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। কোন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে হোস্ট দেশ কোন ক্রিমিনাল চার্জ আনার সুযোগ নাই জেনেভা কনভেন অনুসারে। তিনি যে অপরাধই করেন না কেন। এর বদলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা হল ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা। যার বাস্তব ফলাফল ঐ দেশ থেকে বের করে দেয়া। এই প্রচার তুঙ্গে উঠার এক পর্যায়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিতে এই জল্পনাকল্পনা নাকচ করেন।]

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা গতকাল ১৬ মে অনলাইনে (আজ প্রিন্টে ) দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আবার নানা সংযোজনে ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    ফুটনোটঃ
    ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার অর্থ
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা ইউরোপের ইতিহাস আমরা বৃটিশদের চোখ দিয়ে পড়েছি ও জানি।  ফলে ঐ যুদ্ধে “আর কখনও কলোনি করব না” আমেরিকাকে দেয়া বৃ্টিশদের এই দাসখতের কথা আমাদের জানা হয় নাই। এই যুদ্ধ সম্পর্কে এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস বৃটিশ বয়ান এডিয়া গিয়েছে। সোজা কথায় বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার কৃতীত্ব হল সে সারা ইউরোপের কলোনি প্রভুদের কাছ থেকে কলোনি আর না করার দাসঅখত লিখায় নিয়েছে। আর সারা দুনিয়াকে এক ‘উপনিবেশ মুক্ত দুনিয়া’ উপহার দেবার রাস্তা খুলে দিয়েছে।  অনেকের কাছে এটা অবাক লাগতে পারে। তারা “আটলান্টা চার্টার” পড়ে দেখতে পারেন, যেটা আসলে কলোনি প্রভুদের আমেরিকাকে দেয়া দাসখত। আর আমাদের সৌভাগ্য যে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীট বুঝেছিল দুনিয়া থেকে উপনিবেশ তুলে দেয়াই তার স্বার্থ, ক্যাপিটালিজম আরও গ্লোবাল ও  বিকাশিত হয়ে উঠার পুর্বশর্ত। ফলে হিটলারের হাত থেকে আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত কলোনি প্রভু-শিরোমনি বৃটিশসহ ইউরোপকে  বাচাতে আমেরিকা এগিয়ের আসার পুর্বশর্ত হিসাবে এই দাসখত স্বাক্ষর করিয়ে নেবার সুযোগ নিয়েছিল।
    কিন্তু আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য সেসব কথার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুই যে জওহরলাল নেহেরুও দুনিয়া থেকে উপনিবেশ উঠে যাবার উপরে উল্লেখিত দিকটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ছিলেন না। তাঁর বিচারে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ কেবল একটাই, মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু ও দাস এর বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না।  নেপালের সাথে পুরানা বৃটিশ-নেপাল ১৯২৬ সালের চুক্তির আদলে করা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তি করা এই সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। নেহেরু ধরতেই পারেন নাই আটলান্টা চার্টার চুক্তি কেমন আগামি দুনিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।  ফলে এখন থেকে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ আর কেবল কলোনি মাস্টারের প্রভু-দাস রূপ ছাড়াও অন্যরূপে বিকশিত হবার শর্ত তৈরি হয়েছে।  এবসলিউট অর্থে নয় তবে এটা তুলনামূলক অর্থে আগের সরাসরি উপনিবেশ রূপের চেয়ে লিবারেল রূপ সম্পর্ক আকারে হাজির হবে।