Category: থিঙ্কট্যাঙ্ক

  • চীনবিরোধী বাইডেন হবেন, ব্যালেন্স তো ইইউর হাতে

    চীনবিরোধী বাইডেন হবেন, ব্যালেন্স তো ইইউর হাতে

    গৌতম দাস

    ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3mQ

     

    EU-China investment agreement raises tensions with US

    দীর্ঘ ৩০ বছরের সার্ভিস-জীবনের এক ভারতীয় ক্যাডার কূটনীতিক, নাম এম কে ভদ্রকুমার, এখন অবসরে আছেন। পূর্ণ রাষ্ট্রদূত ছিলেন সর্বশেষে তুরস্কে ও উজবেকিস্তানে। এ ছাড়া উপ-রাষ্ট্রদূতও ছিলেন অনেক রাষ্ট্রে – পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানসহ অনেক দেশেই। কিন্তু এসব বিচারে তিনি বিশেষ কেউ নন;  তাঁর বিশেষত্ব অন্যখানে। অনেকে বলতে পারেন, তিনি আন্তর্জাতিক নীতি পলিসি বা অভিমুখগুলো নিয়ে গবেষক ও লেখক। নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে, দুহাতে লেখা এই লোকের তিন-চারটি লেখা দেশে-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এখন ছাপা হয়। তবু এগুলোও তাঁর মূল বিশেষত্ব নয়।
    চলতি শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা ভারতের ওপর মনোযোগ ঢেলে প্রভাব বিস্তারে দেশটাকে নিজ কাজে লাগায়; তার ‘চীন ঠেকানোর’ [China Containment Policy] কাজের ঠিকা ভারতকে দেয়া আর ভারতের একাডেমিক জগতের মাস্টার্স বা হায়ার স্টাডিজের স্কলারশিপ বিতরণ করে লোভ দেখিয়ে আমেরিকান বয়ান মননে ঢুকিয়ে দেয়া, আবার আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা খুলে দেয়া ইত্যাদি শুরু হয়েছিল। ফলে ডিপ্লোম্যাটরা চাকরিতে থাকা অবস্থা থেকেই ওসব বয়ানে অনুরক্ত হতে শুরু করেছিলেন যাতে চাকরি শেষে  অবসরে যাবার পরেও কোনো থিংকট্যাংকে আবারও চাকরি পাওয়া যায়। এসব বিচারে একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ভদ্রকুমার। তিনি অনেকের চেয়েই সক্ষম এবং স্বাধীন গবেষক ও লেখক। তিনি আমেরিকান বয়ান বা তাদের অর্থ দ্বারা প্রভাবিত কোনও থিংকট্যাংকের সাথে যাননি। নিজের স্বাধীন চিন্তা অবস্থান নিয়ে এখনও লিখে চলেছেন। যেমন ভদ্রকুমারই সম্ভবত একমাত্র ভারতীয় যিনি মনে করেন ভারতের যুক্ত থাকা এমন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ স্ট্রাস্টেজিক জোট বা ‘কোয়াড’ জোটের, একদম কোনো ভবিষ্যৎ নাই। ফলে ভারতের এই যুক্ত থাকা ‘খামোখা’ মনে করেন। তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তাঁর নিয়মিত কালেকশনে থাকে প্রচুর তথ্য ও ইন্টেলিজেন্স (রাশিয়ানটা-সহ) যা তিনি নিজের লেখায় ব্যবহার করেন যেটা সম্ভবত তার কূটনীতিক জীবনের ধারাবাহিকতায় প্রাপ্ত প্রবেশ-অধিকারের বদৌলতে।

    ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসনের ক্যাবিনেট সদস্যদের নিয়োগে ‘সিনেটে অনুমোদন’ পাওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। তারা এরপর নতুন প্রশাসনের নীতি-পলিসিগুলো নিয়ে নিজেরা পারস্পরিক সমন্বয় শেষে কাজে নেমে পড়ছেন আস্তে ধীরে। সভা সেমিনারে গিয়ে নতুন প্রশাসনের পলিসি নিয়ে মুখ খোলাও শুরু হয়েছে। সেসব নিয়ে ভদ্রকুমারের একটা বড় রচনা ছাপা হয়েছে হংকংভিত্তিক ‘এশিয়া টাইমস’ পত্রিকায়। সে লেখাকে পটভূমিতে রেখে আজকের প্রসঙ্গ।

    ভদ্রকুমার হদিস দিচ্ছেন আমেরিকায় নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট) অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন ভারতের মন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। জানা গেল, সে কথা খুবই সংক্ষিপ্ত; মূলত সৌজন্য বিনিময় দিয়ে শুরু করা মাত্র। ফলে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটা জানার চেয়ে এই কথা সম্পর্কে ভারত ও আমেরিকা উভয়েই প্রেসের জন্য নোট (Readout) নিজ নিজ ওয়েবসাইটে কী টাঙিয়েছে, সেটা দেখা দরকার।
    যেমন দেখা যাচ্ছে সেখানে ভারত অর্থহীন ফুলানো শব্দগুলো ব্যবহার করেছে বেশি। মূলত ভারত ওখানে যা বলতে চেয়েছে তা হল –  আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এধরণের রুটিন কথা। কিন্তু ভারত সেটাকে ফুলিয়ে বলেছে, “আমাদের বহুমুখী স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ পোক্ত করতে আর বিস্তার ঘটাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ” […consolidate and expand the multi-faceted strategic partnership]। আর যে কথা মনে করে সম্ভবত এসব লিখেছে সেটা হল, কেবল আমেরিকার অস্ত্র কেনাকেই ভারত এক ‘স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক’ বলে জ্ঞান করা হয়েছে। কারণ প্রপাগান্ডা যাই থাক, ভারতের সাথে আসলে পুরা ট্রাম্পের আমলে তেমন কোনো সম্পর্কই ছিল না, ভারতের আমেরিকান অস্ত্র কেনা ছাড়া। আর  অস্ত্র কেনাবেচাতে আমেরিকার দিক থেকে বহুবিধ শর্তাবলি থাকে। অস্ত্র কিনতে ভারতের সেসব শর্ত মেনে চলাকেই এখানে মূলত ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ বলা হচ্ছে। যেমন এমনই  অস্ত্র কেনাবেচার একটা সাইড চুক্তি,  ‘ইন্ডিয়া-ইউএস ২+২’ এই শিরোনামে। মানে দুপক্ষ থেকে দুইটা করে মন্ত্রী (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা) যুক্ত থেকে এই চুক্তি তাই ২+২। তাই আবার ভারতের কথিত ‘বহুমুখী’ (মাল্টিফ্যাসেট multi-faceted) শব্দটা অবশ্যই অহেতুক; কিছুই প্রকাশ করে না এমন, কথার কথা। আসলে ভারত বলতে চেয়েছে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ হবুজোট ও ‘কোয়াড’ জোট নিয়ে আমাদের সম্পর্ক আছে। কিন্তু এখন ভারতের সন্দেহও আছে যে, এই কথাগুলোতে আসলে ট্রাম্পের চীনবিরোধী পলিসি ও কিছু বকোয়াজেরও অংশ ছিল, যা আসলে বাইডেনও মেনে চলবেন কি না, নিজের বলবেন কি না তা নিয়ে ভারত নিশ্চিত নয়; সন্দেহ করে। তাই ভারত নিজের রিড-আউটে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘কোয়াড’ এই শব্দদুটো ব্যবহারই করে নাই আর বরং তা না করে আরও আবছা এক শব্দ ‘বহুমুখী’ বলে সব ঢাকা দিয়েছে আপাতত।  কারণ ভারতের এই প্রেস বিফিং (রিড-আউটটা) ড্রাফটের সময়ে তখনও সে জানে না, আমেরিকা তাদের রিড আইটে ঠিক কী লিখে রাখবে। তাই আমাদের এই অনুমানটা দেখা যাচ্ছে সঠিক কারণ এখন আমরা আমেরিকা কী লিখে রেখেছে, রা জানি। কিন্তু তামশাটা হল, ভারত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘কোয়াড’ শব্দ দুটোতে  দ্বিধা রেখে তা আর ব্যবহারে করেনি। অথচ  আমেরিকা বলেছে, মানে ব্যবহারে এনেছে শব্দ দুটো। যদিও  এর অর্থ বদলে দিয়ে। লিখেছে, আমরা ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে আমেরিকার হবু পার্টনার হিসেবে ভারতের ভূমিকায় জোর দেই’ এবং ‘কোয়াডের মাধ্যমেসহ একসাথে কাজ ও সহযোগিতার দিকে গুরুত্ব দেই” [The Secretary underscored India’s role as a preeminent U.S. partner in the Indo-Pacific and the importance of working together to expand regional cooperation, including through the Quad. ]।

    তাহলে ব্যাপারটা কেমন হল? ভারত শব্দ দুটো উল্লেখ করলই না অথচ বাইডেনের আমেরিকা উচ্চারণ করল কেন? কারণ ভারত জানত, ট্রাম্পের সময়ের এশিয়ার এই দুই ইস্যুকে বাইডেন নিজেরও ইস্যু বলে মানবেন না। কিন্তু বাইডেন চোখবন্ধ করে শব্দ দু’টির ব্যবহার হঠাৎ করে বাদ বা একেবারে ফেলে দিবেন না। কিন্তু সাবধান, তার মানে এটা ধরে নেয়াও ভুল যে, ট্রাম্পও এই শব্দ দু’টি নিয়ে বিরাট কিছু করতেন – তা নয়। আসলে ট্রাম্প এটাকে তার আমলের চীনবিরোধী একটা সামরিক ধরনের জোট ভেবেছিলেন যেন। কিন্তু শেষে এটা আসলে তাও না; বরং একটা কথার হুমকি মাত্র – এমন করে রেখেছিলেন। আর তাই বাইডেনও শব্দ দু’টি ব্যবহারে রাখবেন, তবে তা ‘চীনবিরোধী’ এমন অর্থে বলবেন না। এমনকি এটা সামরিক জোট ইঙ্গিত করেও – এমন কোনো অর্থ তো করবেনই না। হয়তো জোটের সদস্যদের পারস্পরিক ইকোনমিক সমঝোতা ধরনের এক অর্থে রেখে দিতেও পারেন যেমনটা আমরা এখন প্রেস ব্রিফিং বা রিড-আউটে দেখছি, সে রকম। এ জন্য বাইডেন প্রশাসন বা ব্লিঙ্কেন শব্দ দু’টি কোনো সিরিয়াস বা অর্থপূর্ণ অর্থে ব্যবহার করছেন না। শুধু উচ্চারণে রেখে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্লিঙ্কেনের লিখিত রিড-আউট নোটে কমন কিছু কূটনৈতিক শব্দ ও কথাও আছে; যেমন- ‘পারস্পরিক কমন উদ্বেগ বা আগ্রহের বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করব – এসবই বাকি কথা হিসেবে সেখানে আছে। সার কথায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উভয়ের প্রথম কথা বিনিময়টায় কথার ফুলঝুড়ি অংশটাই বেশি হয়ে থাকল। অর্থাৎ কাজের কথা খুব বেশি আগাবে না, এরই ইঙ্গিত। এর মানে, সামনে ‘তিতা কথা’ বেশি হবে হয়ত।

    তবে ভদ্রকুমার বলছেন, ব্লিঙ্কেন এশিয়াতে ভারতেরও আগে পূর্ব-এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সাথে কথা বলেছেন এবং ঠিক কাজটা করেছেন [ শিরোনাম দেখেনঃ Blinken strikes the right chords toward India]। যেমন – জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড এভাবে পর্ব-এশিয়ায় কথা বলেছেন আগে।। যদিও ব্লিঙ্কেন কেবল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বেলাতেই একটা মুক্ত ও অবাধ চলাচলের  ‘ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নের’ কথা উল্লেখ করেছেন। আবার অস্ট্রেলিয়ার বেলায় ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা না তুলে কেবল আমেরিকার সাথে তাদের দু’রাষ্ট্র, তাদের ‘ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ ও ‘অটুট বন্ধন’ এসবের প্রশংসা করে কথা বলেছেন।
    এরপরে ভারতের বেলায় এসে ব্লিঙ্কেন নাকি গলার স্বর নিচা করে (‘টোন ডাউন’ রেফারেন্স) ফেলেছেন; ভদ্রকুমারই বলছেন। সাথে যোগ করেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে ভারতকে বাইডেনের আমেরিকার পাশে প্রয়োজন হলেও এই অঞ্চলে সেই ‘আকর্ষণ’ আর শক্ত হচ্ছে না বা দানা বাঁধছে না […To be sure, the US has a great need to keep India on board its “Indo-Pacific” strategy, which is not gaining traction in the region.।

    কিন্তু ভারসাম্য ইইউ-এর হাতেঃ
    ওদিকে এসবের আগেই আমেরিকার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক আর আগের মত জায়গায় নেই। বিশেষত ট্রাম্পের ‘একলা চলো’, ‘কঠোর চীনবিরোধী হও’ দাবি যেটা ইইউ পছন্দ করে নাই কারণে সেটা আগেই অনেক পরিষ্কার ছিল। এসব ঘটে গিয়েছিল বিশেষত ট্রাম্পের ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার দুই সপ্তাহ আগেই। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের যৌথ অধিবেশনে যখন বাইডেনের বিজয়কে ‘ফর্মাল রায়’ বলে সিল দেয়া হয়, এর পর থেকেই সব জায়গায় বাইডেন প্রশাসনকে যেন (পম্পেও-এর বিষিয়ে দেয়াতে) ইউরোপের বিরূপ মনোভাব সামলাতে হিমশিম খেতে হয়, সে জন্যই যেন পম্পেও আগেই প্রকাশ্যে ইইউকে আহ্বান রেখেছিলেন ইইউকে ‘আমেরিকা না চীন’ এ দুটার একটাকে বেছে নিতে। এরই প্রত্যক্ষ জবাব জানাতে ইইউর ফরেন পলিসি চিফ জোসেফ ব্যারেল পম্পেওর সাথে ঐ বৈঠকের ঘণ্টাখানেক আগেই ঘোষণা করে দেন যে, তারা ‘চীনবিরোধী’ কোনো ‘ট্রান্স-আটল্যান্টিক অ্যালায়েন্স’ মানে আমেরিকা-ইইউ অ্যালায়েন্স গড়ার আহ্বান প্রত্যক্ষভাবেই নাকচ করে দিচ্ছেন। সোজা কথায়, ১৪ জানুয়ারি জোসেফ ব্যারেল জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইইউ আমেরিকার সাথে চীনবিরোধী এমন কোনো জোট করবে না।
    তিনি আরো স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, “চীন-আমেরিকা সঙ্ঘাত শুরু হোক আর তারা তাতে কোনো পক্ষ নিক তা তারা কখনো করবে না। কারণ ইইউ মাল্টিলেটারিজম (বহু ধরনের রাষ্ট্ররূপের পক্ষে) ও পারস্পরিক সহযোগিতার পক্ষে। কথাটা এভাবে বলেছিলেন; কারণ চীন পশ্চিমা ধরনের কথিত ডেমোক্র্যাসির দেশ নয়, সে কথা তুলে পম্পেও ‘চীনবিরোধী ডেমোক্র্যাসিগুলোর জোট বাঁধার’ ঘ্যানঘ্যানে এক আহ্বান করে যাচ্ছিলেন। সেই সাথে একটা খুবই কড়া কথা জোসেফ ব্যারেল বলেছিলেন, ‘সামনে যাই আসুক, আমরা ইইউ আমাদের বুঝ মতোই চলব।’

    ডাভোসে মার্কেলের আরও কড়া অবস্থানঃ

    ঘটনা সেখানেই থেমে গেলে হয়ত এক রকম হত; কিন্তু তা হয়নি। এরপর সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে এবারের জানুয়ারিতে “ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের” [WEF]’ সম্মেলনও এবার স্বাভাবিক সিডিউল মত আয়োজিত হয়েছিল ২৫-২৯ জানুয়ারি, তবে ভার্চুয়ালি। মানে, যার যার দেশে বসে কিন্তু অনলাইনে। সেখানে জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল ‘বোমা টা ফাটান’। ইউরোপীয় ‘পলিটিকো’ [Politico] পত্রিকা বলছে, তিনি ডাভোসে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি খুবই চাইব, কোনো ধরনের ব্লক তৈরি এড়িয়ে চলতে চাই। আমি কল্পনা করি না যে, আমাদের বলতে হয়, এই যে দেখো এটা হলো আমেরিকা আর ওই দূরেরটা হলো চীন আর এভাবে আমরা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছি। সামনের দিনে এমনটা হতেই হবে- এটা আমার বোঝাবুঝি নয়। এমন হলে অন্য ধরনের সমাজগুলোর (আমাদের মতো নয় বলে) প্রতি অবিচার করা হবে” [“I would very much wish to avoid the building of blocs,” Merkel told the Davos World Economic Forum. “I don’t think it would do justice to many societies if we were to say this is the United States and over there is China and we are grouping around either the one or the other. This is not my understanding of how things ought to be.”] ।
    মার্কেল এখানেই থামেননি। ডাভোসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, তিনিও অনলাইনে উপস্থিত ছিলেন। মার্কেল তার রেফারেন্স তুলে বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট কালকে (আমার সাথে) বক্তৃতা করেছেন। সেখানে তিনি ও আমি একমত হয়েছি যে, আমাদের এক বহু রাষ্ট্রীয় (বহু ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা) ব্যবস্থাই দরকার [Referring to Xi’s speech at the same forum, Merkel said: “The Chinese president spoke yesterday, and he and I agree on that. We see a need for multilateralism.”]। … তবে সেখানে আরেকটা প্রশ্নও ছিল। প্রশ্নটা সম্ভবত আমরা যখন বিভিন্ন সোস্যাল মডেলে বসবাস করি সে সংক্রান্ত। এতে কখন হস্তক্ষেপের শুরু আর কোথায় এর শেষ? আর কখন আমরা এক মৌলিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়াতে পারব যা আমাদেরকে আর বিভক্তিতে ফেলবে না? মার্কেল এতদূর পর্যন্ত বলেছেন [“But there is one question where we are not in immediate agreement. Probably the question of what it means when you have different social models. When does interference begin and where does it end? When do you stand up for elementary values that are indivisible?”] । তিনি একই সাথে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়া চীন-ইইউ ‘কম্প্রিহেনসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা সিএআই [CAI] চুক্তি নিয়ে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

    এ থেকে এখানে অনুমান করে একটা কথা আগেই বলে দেয়া যেতে পারে যে, আগামীতে বাইডেন প্রশাসন চীন-আমেরিকা হবু-সম্পর্ককে যেখানে নিয়েই থিতু বা শেষ করুক না কেন তা আর দুনিয়াকে (চীন ও আমেরিকা ব্লক) দুই ভাগ করতে পারছে না। কারণ ব্যালেন্স বা ভারসাম্য তৈরির ক্ষমতা এখন ইইউর হাতে। চীন-ইইউ চুক্তিই সেই ব্যালেন্স- মানে ভারসাম্যের উৎস। অর্থাৎ বাণিজ্যযুদ্ধ নয় বরং একটা ‘ওয়ার্কেবল বাণিজ্য সম্পর্ক’ এর মধ্যেই বাইডেনকে বাণিজ্যবিরোধের রফা খুঁজতেই হবে। তা তাদের দুই দেশকেই। কারণ চীনবিরোধী কোনো ইইউ-আমেরিকা জোট পাকানোর সব সম্ভাবনা এখন শেষ।

    ভদ্রকুমার তাই এখন এই পটভূমিতে বলছেন, ব্লিঙ্কেন দায়িত্বভার নেয়ার শুরুতেই প্যারিস, বার্লিন, লন্ডন বা ব্রাসেলস যাদেরই পররাষ্ট্র দফতরের সাথে কথা বলেছেন সেখানে কোথাও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ শব্দটাই তিনি ব্যবহার করেননি, আমেরিকার রিড-আউট তাই বলছে।
    ভদ্রকুমার আরো জানাচ্ছেন, ব্লিঙ্কেন সিনেটে অনুমোদন পাওয়ার তিন দিন পর এসব উল্লেখ করেছিলেন। এরও দুই দিন আগে ২৭ জানুয়ারি ভারত ও আমেরিকা দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়েও টেলিফোনে সৌজন্য বিনিময় হয়েছে। অর্থাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা সেখানে ছিল না।

    ব্লিঙ্কেনের আফগানিস্তান ও পাকিস্তানেও ফোনঃ
    এ দিকে ভদ্রকুমার আরো জানাচ্ছেন, ঐ দিনই ব্লিঙ্কেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথেও একইভাবে কথা বলেছেন। সেখানে ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া আধাখেঁচড়া এক কারবার হল, তালেবানদের সাথে যে সমঝোতা ডিল তিনি করেছিলেন, তা ট্রাম্পের শেষ সময় থেকেই অকার্যকর “ঢলে পড়া” শুরু হয়েছিল। বাইডেনকে তাই এখন আবার তালেবানদের সাথে কথা শুরু করতে হবে। আর তাতে আমেরিকার জন্য আবার পাকিস্তান খুবই গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হতেই হবে। তাই ভদ্রকুমার মনে করেন, বাইডেন রেডি হচ্ছেন পাকিস্তানের সাথে আগের মতই ঘনিষ্ঠ পার্টনারের সম্পর্ক করতে। আবার মোদীদি সরকারকে সাবধান করে তিনি লিখেছেন, বাইডেন প্রশাসন যদি এই পর্যায়ে চীনের কোন সহযোগিতা চেয়ে বসে তাতে ভারত যেন অবাক না হয়!

    দুনিয়া আসলেই বদলে যাচ্ছে যা আগে কল্পনাও করা যায়নি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীনবিরোধী হবেন, ব্যালেন্স ইইউর হাতে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    গৌতম দাস

    ২০ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-36q

     

    https://www.dailymail.co.uk/news/article-3413556/

    চীন-ইরান এলায়েন্স থেকে গ্লোবাল পালাবদলের শুরু হবে,
    আর ইউরোপের চীনের দিকে ঝুঁকবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলঃ

    বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে “গ্লোবাল অর্ডার” বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে [Global Economic Order] নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী  ও স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও এদুই দেশের গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থের উপর এর প্রভাব থাকবে, এমন অবস্থা হয়ে যাবে। অর্থাৎ এদুই দেশ স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক।

    এনিয়ে মিডিয়ায় দুনিয়াজুড়ে  মন্তব্যের ঢল বইছে। মন্তব্যগুলো মূলত আমেরিকা ও ভারতের ব্যর্থতা বা অকর্মন্নতার  দিকে আঙুল তুলছে আর বলছে এরা দুই হল হারু পার্টি – They are the losers। যদিও লুজার শব্দটা কারোরই শুনতে ভাল লাগে না। তবু তেমনটাই কয়েকটা পত্রিকা লিখছে – ১।  ট্রাম্পের মহাকাব্যিক পরাজয় । ২। এই পার্টনারশিপ আমেরিকার জন্য ভয় পাইয়ে দিবার মত ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ৩। এই প্যাক্ট এশিয়া্র সাথে আমেরিকার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবার বোকা গাড়োলের মত এক মন্তব্যও আছে আর এটা সম্ভবত এই প্যাক্ট নিয়ে আমেরিকার প্রথম সরকারি মন্তব্য। বর্তমানে ইরানের উপর অস্ত্র-ক্রয় বিষয়ে জাতিসংঘের এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে যেটা আগামি তিন মাস পরে অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (বিদেশমন্ত্রী) মাইক পম্পেও বোকার মন্তব্য করেছেন – “এই প্যাক্টই বলে দিচ্ছে আমাদেরকে আবার একটা শক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে“। ঘটনা হল, জাতিসংঘের কাঠামোতে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা যেকোন একরাষ্ট্র  না-ভোট দিয়ে দিলে এরপরে ঐবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত হবার সুযোগই নাই। চীন ইতোমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। এখন এখানে ভেটো ক্ষমতাধর চীন থাকার পরেও এতে পম্পেও-এর এমন আওয়াজ ছাড়ার কোন অর্থ আছে?
    আচ্ছা, আপাতত আর এদিকে আগে না গিয়ে, প্যাক্ট বা চুক্তিপত্রের ভিতরে প্রেবেশ করি।

    চুক্তির খসড়া দলিল তৈরির কাজ শেষ। তবে এখানে খসড়া কথার মানে হল, এর  অনুমোদনের অংশ বাকি বা প্রক্রিয়াধীন যা দুদেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানদের  অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বা কিছু শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এরই ফাঁকে প্যাক্টটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে, তাদের এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে, বলতে হয়। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার এই খসড়া দলিলটা্র কপি চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটা হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকাটার দিক থেকে দেখলে, হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া একটা দলিল ছাপানোতে, এতে  গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা (নিউ ইয়র্ক) টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে, এই ভাবের। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকা এপর্যন্ত  ইরানের উপর দীর্ঘদিন ধরে  যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে তাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের নেতি উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে ভাড়া খাটা আর শত্রুতামূলক কাজ করা। যদিও এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের উপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু টেকনিক্যালি আমেরিকা আমাদেরকে বাধ্য করতে পারে এসুযোগ আমেরিকার হাতে আছে।

    তবে অবশ্যই, আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার করা হচ্ছে এখানে। মূলত “আমেরিকান অবরোধ আরোপ” কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, আমেরিকার ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কোন আন্তর্জাতিক কেনাবেচা করতে পারবে না। কারণ দুই দেশ ডলারে কোন বেচাকেনা করলে “আমেরিকান কোন ব্যাংকের” কাছে যাওয়া ছাড়া এই লেনদেনের একাউন্ট ট্রান্সফার সম্পন্ন হবে না।   অতএব এর প্রতিকারের ব্যাপারটা এখন গায়ের জোর। এই অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে ঐ আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ।  সেটা কেমন, সেদিকে যাব।

    চুক্তিটা ঠিক কী নিয়েঃ
    সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, ইরানের এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিতেও সহযোগিতা নিয়ে সেসব গড়ে নেয়া। (নিউইয়র্ক)  টাইমসের ভাষায়, ইরান ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প হাতে নিবে; এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ এসব বিষয় দেয়ানেয়া করবে। এভাবে ইরান নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তুলবে। আর নেয়া ঐ ঋণ শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করবে। ফলে মোট ২৫ বছর এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা।  টাইমসের ভাষায়, এজন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট [Economic and Security Partnership]। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক  সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হল বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। আর তুলনায় ইরানের এই ঋণ হল গড়ে একাই কেবল নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে, এবং তা ধারাবাহিক ২৫ বছর।

    ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কীঃ
    কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ এজেন্ট পাঠিয়ে (যেটা একালে (2013) আমেরিকান সরকারের স্বীকার করার কারণে প্রতিষ্ঠিত সত্য) ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল, সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল হয়েছিল। এক সবল পালটা থাপ্পর।  আর তাতে লুটেরাদের হাত থেকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট থেকে গেছে, প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের এনার্জি পণ্য, অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয় – এঅবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। ইরানের শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না বেকার, সে দুঃখ সম্ভবত  ঘুচবে এবার।

    উপচে ওঠা প্রভাবঃ
    হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতই কিছু ঘটনা হয়ত। কিন্ত তাই কী? আর এতটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হবে তা অন্যান্য প্রভাবের উপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ ফলাফল পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই “গ্লোবাল অর্ডারে” বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা তাই এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা স্থিতি ছেড়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল – এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতই প্রবল পটেনশিয়াল।

    যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের উপর “অবরোধ আরোপ করে” তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পড়ে পাওয়া চার আনার মত পেয়েছে ও নিয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই (এবং এটাই তখন সব শর্তপুরণ করতে পারে এমন একমাত্র যোগ্য মুদ্রা ছিল) আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হল, কোন না কো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হল, এটাই একমাত্র বাস্তব কার্যকর ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের হাতে তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়েছিল। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নাই।
    তাই  আইএমএফ-স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করে থাকে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে।
    শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও সেকালে চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে এর বিনিময়ে নিজ অর্থনীতি সামলিয়েছে। অবশ্য এছাড়াও ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা অবরোধ আরোপের বাইরে ছাড় দিয়ে রেখেছে। তবে মূলত চীনের সাথে লেনদেনের ভরসায় রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। মনে রাখতে হবে, অবরোধের আরেক ব্যবহারিক মানে হল গ্রামে কাউকে যদি একঘরে করে রাখা হয় – এর প্রভাব একটা রাষ্ট্রের উপর তেমনই। সেটা যাই হোক, এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বর্তমান বিশেষ সম্পর্ক ও  এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। তাদের আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের গোড়ার কথা এটা। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই তা ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র হিসাবে সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এমন যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার লম্বা যৌথ পরিকল্পনা আছে।

    ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কীঃ
    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু ও দাঁড়িয়ে আছে এটাই তারা রিয়েলাইজ করে না। এই ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো তখন এতে অংশ নেয় নাই (আবার আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্য-পদলাভের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা)।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো সেই থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমিতভাবে বার্টারে কিছু পণ্য বিনিময় হত। কিন্তু এভাবে কতদিন?  এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই আইএমএফের সদস্যপদ পায় ও নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধানত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া প্রবলে  শুরু হয়ে গেছে। প্রধানত মানে? মানে হল, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের  সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোন একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটাই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মত। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দোকান কেউ দাড়াতেই পারে না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে ঐ দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এদিকে ইতোমধ্যে  চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে পারায় গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে।

    চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানোঃ

    China's annual average crude oil imports

    Source: China General Administration of Customs, based on Bloomberg, L.P.

    এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হল, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয় [World’s largest Importer]  …..more than 10 million barrels a day last year। মানেই তার পরিশোধ করা এক বড় পেমেন্ট হল জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হল, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ঐ ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা বা গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একবার রাজি হয় ভরসা করে – এভাবে। কিন্তু এর ভিতরে  ইরানকে নিয়ে গোনায় ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে কখনও  দেখায়নি। আর ইরানের কাছে চীনের দেয়া প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মত হতে হবে এই শর্তের।  ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে ইরানের বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাব। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই, কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ইরানের হাতে এর বিকল্প আর কী আছে? ব্যাপারটা হল, পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! এই হল ইরানের বাস্তবতা। যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝা যেতে পারে।

    সেটা যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্প আরো  কড়া অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা (একে তেল পাঠানো রি-সেল করার জন্য) ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত এই প্রথম কোন তেল কিনে নাই। তাও সেটা আবার সকলকেই  কনসেশন রেটে আর ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছিল এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি এমন হলেও এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করায় রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, একথা ইতোমধ্যেই লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হল ততটুকুতেই নয় বরং নতুন এক চীনা গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতে হাজির হতেও বড় ভূমিকা রাখবে। যেখানে ইরান সেই নতুন ক্ষমতার পাশে বুক ফুলিয়ে হাটবে তা বলাই বাহুল্য!  এজন্যই বলা হচ্ছে এই চুক্তি পালাবদলের শুরুর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্যতম হবে ভারতঃ
    ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন ও প্রকাশিত যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দিবে, দিশেহারা করে দিবে। অথচ, এর আগাম কোনো হদিস এই কথিত চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না।  বরং আমরা বিস্মিত হই দেখে যে, হবু-চুক্তি প্রকাশ হবার পরে সবচেয়ে বেশি অহেতুক বাজে কথা বলা হামবড়া লোকটাই এখন সবার আগে মাথা নিচা করেছে। বিসিসিকে এরা যা বলেছে এর সারকথাটা হল, তারা হেরে সব মেনে নিয়েছে। বিবিসি লিখছেঃ

     “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে। মি. চক্রবর্তীর কথায়,”ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি,চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” “আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে – কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।”
    —এরপর আর আমাদের কিছুই কী বলার আছে!

    এর মানে, এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে সব গুটিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরতে মানসিকভাবে তৈরি। কিন্তু ভারতের দুর্দশা তো এতেও শেষ হবে না। এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন কঠিন এক  দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবার মুখে নিয়ে যাবে যেখানে – ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারত যদি আমেরিকা ক্যাম্পে যায় তা গেলে হয়ত সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু সাথে খামোখা অনেক দায় আসবে যেগুলো  আসলে হুদাই পশ্চিমের ব্যাগেজ টানা হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে  সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে বাইরে থেকে সব অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফিরে তবে চীনের টার্মেই ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে।

    আবার উপরে এই যে অবলীলায় বলছেন,  “ভারতেরও শেয়ার থাকবে” – এই কথা কয়টা তো মারাত্মক ভীতিকর। মানে ব্রিকস ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাংক ইত্যাদি এমন সবখান থেকে ভারত গুটিয়ে যাবে কেবল নিস্ক্রিয় পার্টনারের মত  শেয়ার মালিকানা নিয়ে থাকবে – তাই কী? তার মানে গত এক সপ্তাহের মধ্যে কথার চাপা আর তুবরি ছুটানো লোকগুলো সব হার মেনে নিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে  -সেলফ, নিজ উদ্যোগে??

    আবার যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য – এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতেরই বহুমুখী স্বার্থ  যে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে সেটা তারা আগে দেখতেই পায়নি, টেরই পায় নাই! তাদের চোখে “মেরা ভারত মহান” হয়েই ছিল বা “অনেক ক্ষমতাবান” হয়েই ছিল! তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থের দিক থেকেও  বহু পিছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ।

    ভারত ইরানের জাভেদ জারিফকে প্রবল হতাশায় ফে্লে এর পরিণতি খাটো করে দেখেছিলঃ  
    আবার ঘটনা দেখেন সেদিন কীভাবে ঘটেছিল। তেলকেনা বিষয়ে ভারতের পিছলানির আলাপ সেই ২০১৮ জুনে নিকি হেলির ভারত সফরের সময় থেকে শুরু আর মোচরানি দিতে শুরু করেছিল। ভেবেছিল কী জানি বিরাট ক্ষমতাবান এক ভারতীয় পাঞ্জাব অরিজিনের মানুষ হাতে লেগে গেছে, ভারতকে আর পায় কে!  তাই সেসব মোচরানি! এছাড়া  সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ [Mohammad Javad Zarif] এক দিনের ঝড়ো সফরে ভারত এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল; আমেরিকান অবরোধের অজুহাত দেখিয়ে। অথচ  চীন তখনও তেল কিনা জারি রেখেছিল। বিশেষত সেবার যেখানে তেল ইরানি পাহারায় ইরানি ট্যাঙ্কারে ভারতের তীরে পৌছে দেওয়ার সস্তা অফার ছিল। তবু ভারত এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মত “ফাইনাল ওয়ার্ডস” শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ঐ আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস [CSIS] -তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন [Iran not disappointed with India for not buying oil from Tehran: Jaishankar] তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো ভয়ঙ্কর সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, [we frankly understand each other’s compulsions and possibilities,] – “যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে”। এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? বুঝে শুনেই তো যার যার লাভালাভের সন্ধানে ভারত ইরানকে ছেড়ে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছিল! তাহলে চার দিকে আজ চীন-ইরান চুক্তির খবরে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? জয়শঙ্করের সম্ভবত অনুমান এই যে আমেরিকার CSIS থিঙ্কট্যাঙ্কে দাওয়াত পেলে জাতে উঠা যাবে।  কিন্তু গ্লোবাল সিস্টেমটাকে বুঝবার  যে দুনিয়াদারি সেখানে আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা গ্লোবাল অর্ডার যে ভেঙ্গে পড়েছে  এটা তো নিজের যোগ্যতায় জেনে নিতে হয়, আর ঠিক করতে হয় কী কী করব না!
    যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা ঠিক কী হয়েছে সেটাও বুঝেনি মনে করার কারণ আছে। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুন, “ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে”। এর মানে ঘটনাকে কত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখছে। ভাবছে ব্যাপারটা হল ভারতকে কেবল একটা রেল প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া।  ঠিক একই নাদান বুঝ  বিবিসিকে দিয়েছে ভারতের এক সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। বলেছেন তাদের ঠিকাদার কোম্পানিটা আসলে নাকি ঢিলা!  কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ হিন্দুর ঐ রিপোর্টেই ভেতরে ঐ চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। ভারতকে যে  মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়শুণ্য বের করে দিবে সেদিকটা দেখতেই পায় নাই। এছাড়া নিজে  অন্তত অবকাঠামো বিনিয়োগে ঘাটতি  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেসব তো আছেই।
    এর সোজা মানে হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল – আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই তখনকার এসব অনুমানের উপর খুশিতে ডগমগ আত্মতুষ্টিতে থাকা ভারত এখন কিভাবে অনুসিদ্ধান্ত টানে যে এখন ভারতের যা ক্ষতি তাতে সব দোষ চীনে্র? বড়ই বিচিত্র ভারতের ভিকটিমহুড মন!
    যেমন দেখেন এনিয়ে আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনামঃ ‘”চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন”, “ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ” – এটা নাকি আবার আমাদের প্রথম আলোর সারা দুনিয়ার মিডিয়া ঘেটে করা এক ডেস্ক রিপোর্ট।  বুঝেন অবস্থা তাদের চোখ কত সংকীর্ণ। আবার “চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি”। কিন্তু ট্রাম্প বাবাজি অস্বস্তিতে পড়বে কেন? তিনি কী ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি কেন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?  অর্থাৎ এর মানে হল,  এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা তিনি আমল করতে পারেনি।  আসলে এখনও অনেকেই ব্যাপারটাকে নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে  – ভারত চাইলে  ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে কোন প্রজেক্ট থেকেই বাদ দিতে পারে না! আহা কী সুবিধা!

    এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে আমরা কিছুটা বুদ্ধিমান লোকজন আছে মনে হচ্ছে। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে অথচ মোদী সরকার সেটা আগে বুঝতেই পারেনি।’ অর্থাৎ  কংগ্রেস অন্তত বিনা প্রসঙ্গে চীনকে দোষী করার দিকে যেতে চায়নি; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে।

    মাথা নিচা ভারতের বুদ্ধিমানেরাঃ
    তবে এই প্রথম আমরা এক নতুন ধরণের ভারতকে দেখতে পাচ্ছি যারা চীন-ইরান হবু চুক্তির কথা প্রকাশিত হবার পর একেবারেই চুপসে গেছে, যেন তাদের দম্ভ কমেছে অন্তত কিছুটা। বিশেষ করে থিঙ্কট্যাকের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন যারা এমন ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলাদেশের ১/১১ এর সময়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদুত  পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর পরিবর্তন অবাক করার মত। ওআরএফ – এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে  সর্বশেষ জড়িত এই সাবেক কূটনীতিক, যেখানে সেখানে কটু কথা বলার ক্ষেত্রে খুবই খ্যাত, তিনি বিবিসির সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তার ইঙ্গিতটা হল যেন বলা যে, আমরা চীন-ইরান চুক্তির কাছে হেরে গিয়েছি আর তা মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের স্বর এমন নরম হয়ে বদলে গেছে। তবে  স্বর বদলে  নরম করে নেয়া প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন আরেক নারী ব্যক্তিত্ব, তিনি  দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজ নামে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্কের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী। বিবিসির কাছে তিনি প্রায় সব প্রশ্নেই ভারতের দোষ দেখেছেন বা হার স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি  “ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল”  বলেছেন। এছাড়া বলেছেন, “ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই!”।  মানে একদম গুলে গিয়ে সবাই যেন মোম হবার দশায়।  যদিও তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে”। মনে হতে পারে তিনি এখানে পরোক্ষে হলেও চীনকে দায়ী করছেন সুবিধা তুলে নেওয়ার জন্য। যেখানে ব্যাপারটা হল আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিকে যদি বোকা হয়ে সুবিধা করে দেন সেক্ষেত্রে সে সুবিধা তো নিবেই। গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের দিনগুলোতে সামলে না চললে প্রতিদ্বন্দ্বি সুবিধা ত নিবেই। সেখানে প্রেসিডেন্টের নানান ক্ষমতার মর্ম ও ওজন বুঝে না এমন কোন দেউলিয়া ব্যবসায়ী যদি হঠাত করে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আসনে বসে পড়ে তবে তার ‘কেলাসনেস’ বা অযোগ্যতা আমেরিকার ক্ষতি তো করবেই। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি এভাবেই সুযোগ নিয়ে নিয়ে সামনে ধেয়ে আসছে এবং আসবেই – এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। আর এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তার চিন্তা করার প্রকৃত সামর্থ ও যোগ্যতা তার যে লেবেল বা মানের তাতে শেষে আজ সে ঠিক সেই মাপের বামন হয়ে গেছে।  ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা খাটো করে দেখা বা ইরানের তেল না কিনলে ভারতের কিছুই হবে না এই হামবড়া ভাব – এভাবে ট্রাম্প আর মোদী মিলে ধারাবাহিক ভাবে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেন ইরানকে ঠেলতে ঠেলতে চীনের কোলে ফেলে দিয়েছে। এখন এর কাফফারা দিতে দিতে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকে তাই দেখার বিষয়!

    চিন্তায় অযোগ্য আর বেপরোয়া মানুষেরা এমন কাফফারা দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়! দিন সবারই একদিন আসে, আগে আর পরে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চায়, জানে?

    ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চা্‌য়, জানে?

    গৌতম দাস

     ২২ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-34w

     

    ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এরা নাকি পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন একটা অনুমান-পারসেপশন অনেকের মধ্যে আছে। একথার হয়ত কিছুটা সত্যতাও কেউ কেউ দেখাতে পারবেন। এরপরেও  সেটা যত ঘনিষ্ঠই কল্পনা করা যাক না কেন, শেষ বিচারে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে এরা দুটো একেবারেই আলাদা রাষ্ট্র।  আমের মওসুম এটা, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে যেন এখন – সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার একটা গল্প আছে, তাই যেন কেউ আনতে চাইছে।

    সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার গল্পঃ
    ছোটবেলায় বৈশাখ মাসের ঝড়ে আম কুড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একালের ঢাকা শহরে যারা বড় হচ্ছেন তাদের জীবন-অভিজ্ঞতার সাথে মিলবে না হয়ত। তবে যারা পুরনো দিনের বা জেলা শহরে বা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের এমন অভিজ্ঞতা আছে। তেমনি এক কালবোশেখি ঝড়ে আম কুড়ানোর বিকেলের ঘটনা। আট-দশ বছর বয়সের বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে বিকেলে ঝড় উঠতেই আম কুড়াতে ছুটছে। বাগানে গিয়ে আম কুড়ানোর ধুম লেগেছে। কিন্তু বন্ধুদের একজনের যেন কোনো ঘুম নেই। দেখতে-শুনতেও সে অন্যদের চেয়ে একটু যেন আলাদা, সবার চেয়ে লম্বাতেও হয়ত একটু বেশিই হবে। সে আম কুড়াচ্ছে না।
    কিন্তু আবার প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারণ সে বরং সবাইকে আম কুড়াতে বাধা দিয়ে বেড়াচ্ছে – “এই আম নিবি না, রাখ” – বলে হাত থেকে আম কেড়ে ফেলে দিয়ে পরের জনেরটা কাড়তে যাচ্ছে। এভাবে সবার হাত থেকে আম ফেলে দিচ্ছে। আর মুখে বলে চলছে, “আমার খালাত দুলাভাইয়ের চাচার বাগানের আম, তোরা কেউ আম নিবি না”। কিন্তু এখানে সমস্যাটা হল, বাধাদানকারী একজন আর কুড়ানেওয়ালা বাকি সবাই। ফলে সবাই বিকল্প উপায় খুঁজতে গিয়ে কিছু সুযোগ পাচ্ছে। অন্যকে বাধা দেয়ার সময় কিছু না কিছু ফাঁকফোকর পেয়েই যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দু’চারটা করে আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। এদিকে একসময় ঝড় থেমে গেছে। সবাই যার যার বাড়ির পথে। কিন্তু অবাক ব্যাপার। দেখা গেল সবারই হাতে-কোচড়ে দু-চারটা করে আম আছে। বাধাদানকারী মেয়েটার ভাগে একটাও আম নেই! কারণ সে যখন পুরো সময়টা সবাইকে বাধা দিতে গিয়ে নষ্ট করেছে, অন্যরা প্রত্যেকে সেই ফাঁকে দু-চারটা করে আম সংগ্রহ করে নিতে পারলেও সে নিজে কিছুই পায়নি।
    গল্পটার মরাল হলঃ হিংসা বা ঈর্ষা না, এর ইতিবাচক ফল নাই; তাই বরং কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে নিজ শ্রম-উদ্যোগ কাজে লাগালে ভাগ্য কিছুটা ফিরতেও পারে।

    থিংকট্যাংকের মাহাত্ম্যঃ
    কথাগুলো মনে হল ভারতের এক জয়িতা ভট্টাচার্যের একটা রচনা দেখে। যেন তিনি সেই ঝড়ের সময় সবার কুড়ানো আম ফেলে দিয়ে বেড়ানো ছোট মেয়েটা। জয়িতা ভারতের ‘ওআরএফ [ORF]’ মানে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে এক থিংকট্যাংকের ফেলো। সম্ভবত আসামের শিলচরের মেয়ে তিনি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেছেন।

    আমেরিকান সমাজের পলিটিক্যাল কালচারে রাষ্ট্র-সরকারের নীতিনির্ধারণে বা পলিসি সাব্যস্ত করতে পক্ষ-বিপক্ষের পয়েন্টগুলোকে নিয়ে গুছিয়ে জোরালো করে তুলে ধরতে অনেক স্টাডি ও গবেষণা করতে হয় অথবা কখনও কনসেন্সাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কাজটা – আমেরিকান সমাজ সেগুলো থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করে থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা নন-প্রফিট ফাউন্ডেশন টাইপের কাঠামোর হয়ে থাকে। যদিও একটা দুর্ভাগ্য যে, একালে এসে লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক সময় থিংকট্যাংক গড়ার নামে এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান গড়া ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকা চলতি শতকে এসে যখন এখাতে ভারতের দিকে তাকিয়ে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করেছে। এমনিতেই আরেক দেশের অর্থে থিংকট্যাংক গড়া- এটা থিংকট্যাংক ধারণার মৌলিক ভিত্তিরই বিরুদ্ধে। কারণ থিংকট্যাংক তো গড়া হবে নিজ দেশেরই নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি গবেষণার জন্য। কাজেই এ’খাতে অন্য-রাষ্ট্রের যেচে অর্থ দিতে আসা মানে এতে দাতাদেশের সরাসরি স্বার্থ ও চিন্তায় প্রভাব ছড়ানো শুধু নয়, এটা প্রায় ঐ দাতা দেশের ফরেন পলিসির বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তামশার দিকটা হল প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সবখানে এক “আত্মম্ভরিতা” মানে স্বনির্ভরতার গল্প বলে বেড়ানো ভারত সে-ই, প্রথম রাষ্ট্র যে আমেরিকার টাকায় ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে ভরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কেন?

    সোজা কথাটা হল, চীন-ভারত দুরাষ্ট্র যেন পরস্পর থেকে দূরে থাকে, পরস্পরকে চরম ও একমাত্র ‘শত্রুজ্ঞান’ করে দূরে থাকে এটাই আমেরিকা নিশ্চিত করতে চায়। এদের পারস্পরিক প্রবল রেষারেষি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেন এরা লিপ্ত ও ডুবে থাকে, ঈর্ষায় থাকে এটাই আমেরিকান স্ট্র্যাটেজি। আমেরিকা এখনও বর্তমান গ্লোবাল লিডার যদিও দ্রুত এটা শুকিয়ে আসছে, ক্ষীয়মান। আর বিপরীতে চীন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, নেতৃত্বের জায়গাটা সে দখল করবে এটাই এর অভিমুখ। এখন ভারত যদি চীনের পাশে দাড়ায় তবে এই  অনিবার্য রদবদলটা ঘটবেই তবে এবার দ্রুত হতে থাকবে।  আমেরিকা যদি ডুবতে বসা এক বর্তমান হয় তবে চীন পাশে ইন্ডিয়া এক সম্ভাব্য আগামি। এখন  আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতায় পতন আর চীনের উত্থানের একালে তাই আমেরিকার চাওয়া ও তার ভয় হল যে চীন-ভারত যেন আমেরিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আগামীর নেতৃত্ব হয়ে একজোটে দাঁড়িয়ে না যায়। ফলে এর সোজা হিসাব হল, চীন-ভারত যেন রেষারেষির সম্পর্কে খাড়া হয়ে থাকে সবসময়। আর এখানে সবচেয়ে বড় ইনপুট যেটা দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি নাকি সবার চেয়ে (চীনের চেয়েও) উপরে যাবে এমন কথা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর তাই ভারত, বাস্তবতার সাথে মিল না পেলেও ‘যদি লাইগা যায়’ এই লোভে, ভারত চীনের সাথে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে বরং অস্থিরতায় একধাপ আগালে তিনধাপ পিছিয়ে যায়। এ কাজগুলোই নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে করিরে নিচ্ছে আমেরিকার কিছু থিংকট্যাংক যারা ভারতে এর শাখা খুলেছে।

    আবার এটাও খুবই সম্ভব যে ভারত বিরাট কিছু হওয়ার লোভ করতে গিয়ে আমেরিকান পরামর্শের ফাঁদে পড়ে , ভারত আর হয়ত চীনের সহযোগী আগামির স্থানটাও নিতে পারল না। বরং আমেরিকান লোভ-উস্কানি বা পরামর্শে ডানে-বায়ে চীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেটুকু সফল হওয়ার ভারতের সম্ভাবনা ছিল সেটুকুও ভেসে গেল। এমনও ঘটে যেতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। কারণ, ভারত যদি দুনিয়ার আগামি বা আগামির মূল সহযোগী বলে নিজেকে মনে করে তবে ভারতকে অবশ্যই মানতেই হবে আমেরিকা তার পথে বাধা অর্থে এনিমি। কারণ আমেরিকার বর্তমান অবস্থান থেকে সে যদি চ্যুত না হয় তবে ভারতের ভাগ্য খুলতে পারে না। অথচ তামশাটা হল, ভারত আমেরিকার হাত জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে চাচ্ছে, আর মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে কিছু একটা হওয়ার। যেটা আমেরিকার হাত ধরে অর্জন তো হবারই নয়।

    আমেরিকা যেমন চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তেমন ভারতের কাছেও আমেরিকা নিশ্চয় হারতে চাইবে না। অথচ এ কথাটা ভারতের কানে নিচ্ছে না, কোনো আমলই করে না। বরং ধরে নিয়েছে আমেরিকা তার বন্ধু থাকবে। এসব কারণেই ভারতের কোন ধরণের কোন অর্থনৈতিক শক্তির কিছুই না হয়ে ফলাফলে, কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে না ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। এছাড়াও ভারতের আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র-কাঠামোগত  দুর্বলতার দিক  আছে যেমন অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বলতা হল কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব। মানে এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ঘাড়ে উঠে থাকতে চায় – ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নামে।

    তবে ভারতের বিপুল এক ভোক্তা জনগোষ্ঠী আছে, যা তার নিজের জন্যই এটা চীনের মতোই বিশাল তবে তুলনায় একটু ছোট) এক বিরাট সম্ভাব্য রেডি বাজার। এই ফ্যাক্টরটা ছাড়া ভারতের সব কিছুই প্রায় নেগেটিভ জোনে। কাজেই কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) আর পজিটিভ এটিটিউড লাগবে, খুবই জরুরি এটা। অন্যের ক্ষতি করে বেড়ানো কারও অন্তত ভারতের বেলায়, তার জনজীবনের লক্ষ্য হতেই পারে না। এটি কী সবার আগে ভারত বুঝবে? দেখা যাক!

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখাগুলো যা ভারতে খোলা হয়েছে এরা আবার কাঠামোর দিক থেকে বিদেশী এনজিও গোত্রের। আর ভারতে ওদের বড় অফার হল, ভারতীয় স্টুডেন্ট-একাডেমিকদের পিএইচডি বা মাস্টার্স বিদেশে পড়তে স্কলারশিপ দেয়া। এটা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির উপর একে প্রলুব্ধ করে বিপথগামি বা বিভ্রান্ত করে ফেলার বিরাট পদক্ষেপ। আমেরিকা বিগতা অর্থনৈতিক শক্তি। অথচ এর স্বপক্ষে ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মনকে কব্জা করে সাজিয়ে নেয়া, মূল লক্ষ্য ভারতীয় মনকে কনফিউজ করে রাখা। । এর কাজ হল  ক্যারিয়ারের লোভে এরা ভারতে বা জাপানে বসে চীনা তৎপরতার এটা বা সেটা খারাপ, চীনা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খারাপ এসব কথা প্রচার প্রপাগান্ডামূলক কাজ অথবা  ক্যাম্পেইন-মূলক গবেষণা স্টাডিতে এসব ভারতীয়দেরকে এনগেজ করে রাখা। গত ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর থেকে এসব কাজের ধারা শুরু হয়েছিল। পরে ওবামার আমলে তুঙ্গে উঠেছিল ডালপালা বিছিয়ে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে এসে ২০১৭ সাল থেকে ট্রাম্পের আধাখেচড়া জাতিবাদী  ধারণার ধাক্কায়  আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলোর  আগের প্রায় সব অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই সাথে, ভারতকে দেয়া আমেরিকায় বিশেষ রফতানি সুবিধা (যেন চীনবিরোধী হওয়ার বুকিং মানি) যা কিছু আগে ওবামা আমলে দেয়া হয়েছিল সব গুটিয়ে ফেরত নেয়া হয়। সারকথা ট্রাম্পের আমেরিকা এ ব্যাপারে আমেরিকানদের কোন লাভ হচ্ছে কিনা এনিয়ে হতাশ ও হয়রান, সন্ধিহান হয়ে উঠেছিল। থিংকট্যাংক এনজিওগুলো তাই ট্রাম্প আমলে এসে ফান্ড অনেক গুটিয়ে ফেলেছে। তবে “চীনা ঋণের ফাঁদ”, “চীনা ঋণের শোষণ” ইত্যাদি এসব ক্যাম্পেইনগুলো এখনও এরা চালিয়ে যায়।

    তবে ওআরএফ এর গঠন ঠিক একইরকম নয়, ব্যতিক্রম। ওআরএফ এটাও দাতব্য অবশ্যই, তবে মুখ্যত স্থানীয় ব্যবসায়ী – রিলায়েন্স গ্রুপেরই প্রায় একক দানের অর্থে পরিচালিত। কিন্তু আমেরিকান  থিংকট্যাংকগুলোর সাথে ওআরএফ এর সবচেয়ে কমন মিল ও সম্পর্কের দিকটা হল, ওআরএফসহ সব থিংকট্যাংক পরিচালিত হয় ওই একই আমেরিকান চীনবিরোধী বয়ানভাষ্য ও নীতির অধীনে। আমেরিকার তৈরি যে অভিমুখ। আমেরিকান মাদার থিংকট্যাংকগুলোতে বসে যেসব চীনবিরোধী যুক্তি বয়ান তৈরি হয় সেগুলো সারা ভারতের সব থিংকট্যাংকই আউড়িয়ে যেতে থাকে। তবে লক্ষণীয় যে ভারত সরকার বেশির ভাগ সময়ই নিজের সরকারি ভাষ্য বা অবস্থানে ওইসব বয়ানকে য়ানে না, মূলত এড়িয়ে চলে। এর সম্ভাব্য কারণ, এই চীনের সাথেই তো ভারত সরকারের যৌথভাবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক, এআইআইবি ব্যাংক [AIIB]  অথবা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] ধরনের জোট তৎপরতায় অংশ নিয়ে থাকতে হয়।

     ওআরএফ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এখন কেনঃ
    সারা দুনিয়ার মত করোনাভাইরাসে বাংলাদেশেও খারাপভাবেই আক্রান্ত। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট করার সুযোগহীনতা বা চিকিৎসাহীনতার চরম দিনগুলো পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রায় ৬০টির মতো টেস্ট-সেন্টার খুলতে সক্ষম হয়েছে তত দিনে আবার এখন দিনকে দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডেড সংখ্যাটাই বিপজ্জনকভাবে বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। হাসপাতালে একটা সিটের খোঁজে পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে করতেই রোগী মরে শেষ এমনই অবস্থা। এমনিতেই আমাদের সরকারের ম্যানেজমেন্ট সামর্থ্য সামলিয়ে যতটুকু যা রিসোর্স বা স্বাস্থ্য বাজেট আমরা জড়ো করতে সক্ষম সেটাও দুর্নীতির কারণে লোপাট হচ্ছে। যার সারকথাটা হল, এক চরম ম্যানেজমেন্ট ফেল করা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। বের হওয়ার উপায় নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সমস্যার কারণে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রেনিং বা দক্ষতা বাড়ানো পর্যন্ত আমাদের রিসোর্স পৌঁছাতে পারে না। করোনার আবির্ভাব আমাদের সবাইকে উদাম করে ছেড়েছে, নিজেদের অযোগ্যতায় নিজেরাই এখন চরম বিপদে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই হুমকি দিচ্ছেন ‘এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দিতে পারব না।’ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থা যদি চূড়ান্ত ফেল করে তবে এরপর পুরা আইনশৃঙ্খলাই ফেল করতে আর সময় লাগবে না।

    দেরিতে হলেও করোনা মোকাবেলায় একশন গত মার্চের শেষে আমরা যখন শুরু করি তখনই অনেকে জানতেন যে আমাদের জন্য সামনে অনেক রিস্ক অপেক্ষা করছে, আমরা ঢুকছি। যারা দূরেরটা আগে দেখতে পেয়ে যান; তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমরা কঠিন বিপদে পড়ে গেলে শেষ পর্যায়ে আমাদের এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার একটাই সম্ভাবনা আছে যে চীনের সাহায্য সহায়তা যদি পেয়ে যাই, দুয়ার খোলে যদি । কারণ করোনা যা দাবি করে আর আমাদের যা সামর্থ্য এ দুইয়ের গ্যাপ মিটাতে সক্ষমতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র চীনা সহায়তা।
    ঘটনাচক্রে সেটাই এখন বাস্তব, আমরা তারই মুখোমুখি। আমাদের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, ইতোমধ্যেই চীনা সাহায্যকারী টিমও এখন ঢাকায়।

    আমরা উদ্যোগ নিতে পেরেছি এটা ভালো খবর অবশ্যই। সব সরকারই কোনো খারাপ অবস্থায় হাতের কাছে যা আছে ও সম্ভব তার সবই কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয় আমরা এমন কোনো সরকার দেখার আশা করি না যারা বুঝছেন তাদের কোনো ভুল বা ব্যর্থতায় বা কোনো গ্যাপে শেষে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে, অথচ তারা সেটা দাঁড়িয়ে কেবল দেখছেন! এটা তো হতে পারে না!

    তবে এরপর আরেকটু আছে, চীনেরই আরেকটা প্রোগ্রাম আছে ‘সিস্টার সিটি অ্যালায়েন্স’ [China wants ‘sister cities’ in Bangladesh]। পত্রিকার ঐ রিপোর্ট বলছে, চীনা টিম আমাদের ঐ এলায়েন্স প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হতে পারি বা চাই কিনা এর দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। তা নিয়ে সরকারি নানা পর্যায়ে কথাবার্তা এখনো চলছে।

    কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্যের লেখা দেখে বুঝা যাচ্ছে, এনিয়ে তাঁরা খুবই ক্ষেপে উঠেছেন।, ওই চীন-বাংলাদেশ সরকারপ্রধান পর্যায়ে টেলিফোন আলাপ ঘটার পর থেকেই। যেন তিনি বলতে চাইছেন আমার “দখলি প্রিয়া” কেন অন্যের সাথে কথা বলল। কিন্তু
    সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশটা ইন্ডিয়া নয়। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে চীনের টিম বা উহান সিটির কর্তাদের আমরা কেন দেখব?  আমরা দেখতে পারব না। আমাদের প্রয়োজনের চোখ দিয়েই আমরা দেখব?

    বলা বাহুল্য, করোনা প্রসঙ্গে আমাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে সীমা কী তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই। তাই চীনা বন্ধুদের আমরা দেখব আমাদের খারাপ সময়ের  সহায়তা-দাতা হিসেবেই। এই দাতা যাদের নিজ শহর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, দক্ষতা আছে, দক্ষ জনবল আছে, সব রিসোর্স আছে যারা আমাদের শিখিয়ে নিতে দিতে সহায়তা করতে পারবে। আর সর্বোপরি যাদের আগ্রহ আছে। এখন খাদের কিনারায় ঠেকে যাওয়া আমরা কোন ‘সিটি অ্যালায়েন্স চুক্তি’ তে যুক্ত হই আর নাই হই – করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চীনা সহযোগিতা খুবই দরকার। এ হলো বাস্তবতা। তাহলে আমরা কেন তা নেবো না?

    ভারত পছন্দ করছে না তাই?
    কোনদিক দিয়েই  ভারতের অবস্থান ও সক্ষমতা কোনোভাবেই চীনের কাছাকাছি নয়। না রিসোর্সের সক্ষমতায়, না অভিজ্ঞতায়। এর উপর ভারতেরই এখন অথবা আগামী মাসে করোনা সংক্রমণের পিক সময়কাল আসে কিনা এ নিয়ে তারা চরম এক হিমশিম অবস্থায়। এছাড়া আরো বিরাট এক সমস্যা আছে। ভারত থেকে সহায়তাকারী কোনো টিম এসেছে এমন যদি হয় তবে ওই টিমকে সাধারণ মানুষই গ্রহণ করবে না, এটা আমাদের আগে খোদ জয়িতাই জানেন! তিনিই লিখেছেন আমরা ভারতীয়দের পছন্দ করি না। তাহলে?

    পাবলিকের উপর গোসসা করা  – যারা পাবলিক নিয়ে ডিল করেন যেমন কোন গবেষক তিনি কখনই তা করতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন পাবলিকের উপর রাগ করা গোসসা দেখানো তার কাজ এক্তিয়ার একেবারেই নয়। কাজেই সাবধান! জীবনে ভাল সফল গবেষক হতে চাইলে তার উচিত হবে বরং পাবলিক কেন ওরকম বা সেরকম হয়েছে বা আচরণ করছে সেটা খুজে বের করা, এটা বের করতে জীবন লাগিয়ে দেয়া। সস্তা দেশপ্রেমিক হবেন না।

    ইন্ডিয়ার সমস্যা এটা যে, নিজের আকার আকৃতি বা অবস্থানের ব্যাপারেও তার সঠিক ধারণা নেই। তাই ভান করে যেন সে এক পরাশক্তি। যেমন দেখেন, বাংলাদেশের এক পত্রিকা মালিক সম্পাদকের উপজেলার পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য প্রজেক্টে ভারত তাতে মাত্র কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। অথবা ধরেন মফস্বলের একটা কলেজের কয়েকটা ঘর দোতলা করতে হবে তাকে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়ে দিল। আর ভারতের হাইকমিশনার সেটা আবার ঘটা করে উদ্বোধনও করতে গেছেন। ভারতের ধারণা এতে এবার ভারতকে দাতা দেশের আসনে বসতে জায়গা দেয়া হবে। অথচ বুঝতে চেষ্টা করল না যে, সব রাষ্ট্রেরই অনুদান দেবার সক্ষমতা থাকতেই হবে এর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কোন ঘটনাটা নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলবে এটা তো সকলেরই অবশ্যই বুঝার ক্ষমতা থাকা উচিত! তাই না!
    আবার দেখেন, এবার করোনা শুরু হলে সার্কের নামে একটা ফান্ড তৈরি করতে হবে বলে হইচই করা হল। কেন? সত্যিই অর্থপূর্ণ সাঙ্ঘাতিক কিছু কী তারা করতে চেয়েছিল?
    ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (যেটা ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট) এটা করোনার ওষুধ বলে যা এখনও প্রমাণিত নয় – অথচ এটাকেই মোদীর পক্ষ থেকে করোনা নিরাময়ের ওষুধ বলে দান করে গেলেন। শুধু তাই নয়, জানিয়ে গেলেন ওই ওষুধের দাম মোদীর দেয়া চাঁদার ভাগ থেকে কাটা যাবে। বুঝেন মোদী-ফান্ডের কী মহিমা! এতে দুটো ঘটনা ঘটল। এর একটা অপরাধ। কারণ আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনহীন একটা ওষুধ আমাদের দেশে আমদানি করা হল। আবার এটা তো ডাক্তারেরা ব্যবহার করতে বলতে পারবেন না। অন্তত আইনি ঝামেলায় পড়বেন। আর এটা করোনার বিরুদ্ধে কাজ করবে এর কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই এখনো শেষ হয়নি,  ফলে প্রমাণিত কোনো ওষুধ নয় এটা। ফলে আমাদের ওষুধ প্রশাসনেরও কোন অনুমোদন দেয়ার সুযোগই নেই। মানে যেন দাওয়াত দিয়ে কাউকে গরম ভাতের বদলে পান্তা খেতে দেয়া যায়? আপনি তাই করলেন।

    এদিকে, জয়িতা বলতে চাইছেন এই ‘সিটি অ্যালায়েন্সের’ অফারের মধ্যে চীনা “বেল্ট-রোড প্রকল্পের” সম্পর্ক আছে। আর এটাতে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে”।  আসলে দুনিয়ার অনেক সমস্যারই জন্ম হত না। হয়েছে এস্টিমেশন থেকে মানে নিজেকে মাপতেই শিখে নাই। শিক্ষা নেয় নাই কখন। বিশেষ করে দুচারজন  বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার এরকম। এরা পোস্টিং পেয়েই মনে করা শুরু করে তারা বাংলাদেশের রাজা না হলেও কিছু অংশের মালিক হয়ে গেছেন!  আচ্ছা ধরা যাক, বাংলাদেশে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে””  [The Chinese motivation exceeds the promotion of cultural ties and it has a larger Geo-strategic objective…]।  আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে বেল্ট-রোড প্রকল্প – এই ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের চীনা “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য নাই।  কিন্তু সাবধান প্রশ্নটা “আছে কিনা” এর নয়, এটা একেবারে মুরোদের প্রশ্ন। এজন্য বাইরের কারও দিকে তাকানোর আগে নিজের মুরোদ চেক করা উচিত! তাই না! তাই প্রথম প্রশ্ন হল,  তাতে ভারতের কী সমস্যা? যার মুরোদ নাই আসলে তার কোন সমস্যা কী আমলযোগ্য? ভারতই বলুক! আচ্ছা এছাড়া আরও কাহিনী আছে! দেখেন  অফার তো বাংলাদেশকেই করেছে তাই না? ভারতকে তো করে নাই? নাকি? কাজেই প্রতিক্রিয়া যা দেখানোর তা বাংলাদেশই দেখাক। অন্তত বাংলাদেশকে দেখাতে দেয়া উচিত। এজন্যই বলে ওভার-এস্টিমেশন একটা গভীর অসুখ!

    আসলে, বুঝা গেছে সমস্যার গোড়াটা মেন্টরের। জয়িতার মেন্টর-মুরুব্বি সম্ভবত বলে দিতে ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশ কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এমন ধারণা জয়িতার মুখ দিয়ে প্রকাশ পেলে  লোকে জয়িতাকেই বেকুব বলবে!

    আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। ভারতে কী চীনা ঋণে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প চালু নেই? খোদ মোদীই মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই একাজে দক্ষ্মহস্ত নয়?  ভারতে কোনো নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণ অথবা রেলের অবকাঠামো বা রেলকর্মী ট্রেনিং ইত্যাদি? এগুলো কাদের বিদেশি অবকাঠামো প্রকল্প? এখানে ভারতে চীনা রাষ্ট্রদুতের একটা সাক্ষাতকার আছে ২০১৫ সালের এপ্রিলের সেকালের চীনা প্রজেক্টের হদিশ মিলবে এখানে।  এটাই  মোদীর ক্ষমতায় আসার পরে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝাপিয়ে পড়া ছিল।  আমরা এই একটা নমুনা থেকে অ-নে-ক নিশ্চয় জানবে পেরে স্বর নিচা করব! এখন কথা হল,  তাহলে সেগুলোতে কী “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে” তা ভারতের মনে হয়নি? নাকি সব জিও-স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার কেবল বাংলাদেশের চীনা প্রকল্পের বেলায়? যত্তসব বিরক্তিকর কাণ্ড!

    আর জয়িতা “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” খুজতে বাংলাদেশে এসেছেন? ভারতের মিডিয়া খবর লিখছে ভারতের ওষুধের বাজারের ৪০% কাচামাল বা তৈরি ওষুধ আমদানির দিক থেকে নির্ভরশীল।  সেই চীনের কাছে গালয়ানে মার খেয়ে এসে এখন চীনাপণ্য বয়কট আউড়াইতেছেন, “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য বুঝতে আইছেন?  তো চীনা ওষুধ বা কাঁচামাল কী এখন আমদানি বন্ধ করতে পারবেন? এই আপনাদের স্ট্রাটেজিক বুঝ?  যে চীন ভারতের প্রথম সম্ভাব্য এনিমি তার কছেই আপনি ওষুধের মত জীবনরক্ষাকারি পণ্যে নির্ভরশীল। আর মুখে সেই গান্ধীর আমল থেকে আউড়াইতেছেন আত্মনির্ভরতা? অথচ এই আত্মনির্ভরতা শ্লোগানটাই বহু আগে থেকেই ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত। অথচ ভারতের রাজনীতিকদের সে হুশই নাই।  আপনারা আসলে কাকে ফাঁকি দেন? চীনা ওষুধ বা কাচামাল সবচেয়ে সস্তা আর এই সস্তা থুয়ে অন্য জায়গায় যাবার মুরোদ কী ভারতের আছে, কেমনে সে মুরোদ অর্জন ক্রতে হয় তাও তো জানেন না। সস্তা দেখলে যেখানে কাপড় ঠিক রাখা মুশকিল – এমনই অর্থনীতি আপনারা বানাইছেন? আবার এই অবস্থায় আইছেন আমাদেরকে “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” বুঝাইতে? হা হা হা কী তামশা……

    আবার কিছু কথা তো একেবারেই পরিষ্কার। যেমন বেল্ট-রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে যুক্ত আছে সেই ২০১৬ সাল থেকে। এটা তো লুকানো নয়। এ নিয়ে একবার আমাদের অবস্থান ইন্ডিয়াকে জানান দিতে গিয়ে য়ামাদের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে ছোটখাটো একটা বিতর্কও হয়ে গিয়েছিল সে সময়। অর্থাৎ এই ফ্যাক্টসটা প্রতিষ্ঠিত। তবে ভারতের নিজের জন্য এই বেল্ট-রোড প্রকল্প হারাম বলে মনে করতেই পারে ভারত। এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো, তা করুক। কিন্তু তাহলে ভারতের জন্য যা হারাম তা আমাদের ওপরও হারাম বলে চাপানোর চেষ্টা কেন?

    এখন চীনের ‘সিটি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের’ সাথে যদি বেল্ট-রোড প্রকল্প যুক্তও থাকে আর তাহলে তা ভারতের জন্য “সন্দেহের উদ্রেক” [raised suspicions ] করলেও বাংলাদেশের তাতে কী? কারণ আমরা তো বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ হয়েই ঢুকে আছি। কাজেই ভারতের ‘সন্দেহের উদ্রেক’ আমাদের ঘাড়ে চড়াবার তো সুযোগ নেই। ভারতের নিজের ঘাড়েই এটা রাখতে হবে জয়িতাকে। তিনি নিশ্চয় আশা করবেন না যে আমাদেরও চীনকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করতে হবে! আশা করি জয়িতা পরিষ্কার থাকবেন, নাকী!

    জয়িতার চীনা শোষণ তত্বঃ
    আবার আরেক বিপদ। জয়িতার দাবি বেল্ট-রোড প্রকল্প বিভিন্ন রাষ্ট্রকে এতে ঢুকিয়ে নেয়ার এটা নাকি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে চীনা ঋণগ্রস্ত করে ‘ঋণের বোঝা’ চাপানোর আর ‘শোষণের’ প্রকল্প [debt burden and the exploitation by China]। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য তাহলে বলেন, ভারতও কেন নানা ধরনের চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলে সেটা আবার কোন চীনা শোষণের পাল্লায় পড়ার জন্য? আমি অবশ্য ভুটানে ইন্ডিয়ান লোন কত তানিয়ে কিছু বলছি না। জয়িতা নিজের ক্রাইটেরিয়াতে নিজেই চেক করে দেখতে পারেন।

    আবার এখানেই শেষ নয়। চীনা-বিশ্বব্যাংক এআইআইবি-তে সেখানে চীনা (শোষকের) সাথে ভারতই তো প্রধান পার্টনার-মালিক হয়ে আছে। আবার ভারত একই শোষক চীনের সাথে ব্রিকস ব্যাংক খুলেছে? এর মানে কী, তাহলে কি ভারতও শোষক? বলেন কী? না না – জয়িতা আপনাকে অনেক পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে!

    এ জন্যই বলছিলাম, কেউ আজকাল ন্যূনতম হোমওয়ার্ক না করে লিখতে বসে না। থিংকট্যাংক বলতে আমেরিকানরা গবেষণা কাজ বোঝাত। অথচ আজকাল থিংকট্যাংক আর প্রপাগান্ডা কাজ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। যারা প্রপাগান্ডিস্ট তারাই গবেষক বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এমন দুর্দশার কথা কারে বলি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২১ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  সেদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

    রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

    গৌতম দাস

    ১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2Ae

     

    চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

    সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

    গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

    এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
    খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

    গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

    রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

    এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
    তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

    এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

    ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
    কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

    গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

    ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

    আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

    আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

    তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

    গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

    হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

    এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

    তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

    সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

    আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

    এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

    চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

    দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

    ———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


    বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
    এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
    বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

    ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

    আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
    কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

    আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

    “কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

    যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

    সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”। এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
    কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
    দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

    ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

    গৌতম দাস

    ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

    https://wp.me/p1sCvy-2xv

    সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”।

    তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

    দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

    এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

    কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

    আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

    যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

    ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

    আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

    ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

    কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

    আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

    মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

    কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

    মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

    নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

    তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

    আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

    বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

    তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

    আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

    বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

    এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

    অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

    [CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

    আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

    এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

    তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

    আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

    বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে?“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

    নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

    গৌতম দাস

    ৩১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2×5

    –

    [সার সংক্ষেপঃ বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক-গুলোকে বেশ বিপদেই ফেলেছে, মনে হচ্ছে। তারা সাধারণ ও সোজা যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়ে অর্থপূর্ণ একটি লেখা দাঁড় করাতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে এর আগে একটা লেখা ছাপিয়েছিলাম যেগুলো মূলত ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকদের লেখা নিয়ে। সেসব লেখায় দেখেছিলাম – সেখানে এ জাতীয় সমস্যা দেখা যায়নি। থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকেরা স্বাধীনভাবেই তাদের মনের কথা পরিষ্কার বলেছিলেন।  কিন্তু থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিতরের লেখকেরা? বুঝা যাচ্ছে থিঙ্কট্যাঙ্কের লেখকেরা ভারত সরকারের অবস্থানের সাথে মিল রেখে কথা বলার দায় রেখে লিখছেন। তাতেই অর্থপুর্ণ বাক্যগঠন ঠিক রাখতে পারছেন না। অথচ যেভাবেই হোক নির্বাচনের ফলাফলের পক্ষে সাফাই খাঁড়া করতে চাইছেন। এতেই এলোমেলো সব বিপদ ভেসে উঠছে। ]

    এমনিতেই ভারতে বিদেশের (মূলত আমেরিকা) সাথে সম্পর্কিত থিঙ্কট্যাঙ্ক (Pro-US Think Tank) আর অপর দিকে ভারত থেকে প্রকাশিত বিদেশি মিডিয়া  (পাবলিশিং অথবা এজেন্সি, যেমন রয়টার্স)- এদেরকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা। বোঝা যায়, ভারত থেকে এগুলো প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অথবা এদের অবস্থান যেন সরকারি অবস্থানের বিপরীত হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে, সম্ভবত অলিখিত কোনো শর্তে, তা প্রকাশিত হতে গিয়ে এসব সমস্যা হাজির হয়। যেমন- কিছু থিঙ্কট্যাঙ্কের দৌরাত্ম্যের প্রাবল্য এত দিন যা নিয়ে ভরপুর ছিল তা হলো চায়নাব্যাশিং বা চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা থেকে প্রকাশিত নানান প্রপাগান্ডা। অর্থাৎ তারা আর মূলত থিংকট্যাংক থাকতে চাইছিলেন না বা ছিল না। আমেরিকার স্বার্থে চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার ‘ঘেঁটু’ হয়ে উঠতে চাইছিল এরা। বাক্যে মিল থাকুক আর না-ই থাকুক, অর্থপূর্ণ যুক্তি সাজানো হোক আর না-ই থাক, চীনবিরোধী প্রপাগান্ডায় সরব থাকতে হবে – এই ছিল তাদের কান্ডকাখানা।

    তবে এই সমস্যা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের স্বস্তি দিয়ে বাঁচিয়েছেন। ভারতে বসে আমেরিকান থিংকট্যাংকের চীন ঠেকানোর প্রপাগান্ডায় অর্থ ঢালা অথবা ভারতকে এর বিনিময়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া – এসবের মধ্যে তিনি আগের প্রেসিডেন্টদের মত তিনি নাই, থাকতে চান না – এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে ভারতের কিছু থিংকটাংকের খামাখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ইদানীং আর দেখা যায় না। বিশেষ করে, এপ্রিল ২০১৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত মোদি-শি জিনপিং এর মধ্যে  য়ুহান সামিটের [Wuhan Summit] পরে। বলা যায় এই সামিট থেকেই আমেরিকার হয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা থেকে ভারত সরে আসতে শুরু করে।  তবে এ ছাড়াও এর আরেক কারণ, বুদ্ধিমান মোদী সরকার চীনের সাথে ঐ সামিট-সুখালাপের সময় যাতে কোন বিরূপভাব তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চীনবিরোধী এধরনের থিংকট্যাংকগুলোর তৎপরতা বন্ধ করতে তাদেরকে সভা-সেমিনার করার অনুমতি না দেয়াকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এতে এগুলোর অনেকেই তৎপরতা গুটিয়ে গিয়েছিল বা সরাসরি গুটিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবুও ভারতের সরকারি নীতির পক্ষে প্রচারে থাকা কিছু থিংকট্যাংক এখনো আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লিখতে গিয়ে এরাই সমস্যায় পড়েছে।

    সাধারণভাবে  মানুষের পক্ষে লেখা ও চিন্তা করা সমান্তরাল কাজ, যা প্রায় সমার্থক। এ জন্য দরকার মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা; এ কারণে, এক দিকে ফরমায়েশি সরকারি অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে আবার নিজ মনে (ফ্রি আরগুমেন্টে) লিখতে হবে – এ দুই কাজ এক সাথে করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবুও চাকরি বাচাতে অনেককে এমনটা করতেই হয়। সেক্ষেত্রে ফরমায়েশি সে লেখা শেষ করলেও এটা যে ফরমায়েশি, এর ছাপ লেখাতেই থেকে যায়। এ জন্য বলা হয়, চিন্তাকে বন্ধক রেখে গবেষক বা  একাডেমিক হওয়া যায় না। থিংকট্যাংক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন” বা ওআরএফের [ORF] ফেলো ডঃ জয়িতা ভট্টাচার্য আর বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন বা ভিআইএফের [Vivekananda International Foundation (VIF) ] ফেলো ডঃ শ্রীরাধা দত্তের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুটা আলাদা আর্টিকেল রচনায় তাদের সেই হাল হয়েছে। ভারতের মিডিয়ায় ভিআইএফ -কে বিজেপির মোদী সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্ক বলা হয়েছে।

    এমনিতেই কোন একাডেমিক পরিচয়ধারী যদি আবার আনক্রিটিক্যাল হন – এটা খুবই অযাচিত কম্বিনেশন। আন-ক্রিটিক্যাল মানে যে ক্রিটিক্যাল নয় অর্থাৎ আগে থেকেই সব জানার অজুহাতে, যেকোনো জিনিসকে পুনরায় উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখে না, যাচাই-বাছাই বা সন্দেহ করার দৃষ্টি যার তৈরি হয়নি, এদের পক্ষে নিজের একাডেমিক পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করা কঠিন। কিছু একাডেমিকের “ভারতীয় সেকুলারিজম” বিষয়ক ধারণা ও এর ব্যাখ্যার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এতই আনক্রিটিক্যাল যে, এটা পোপের বাইবেলের উপর আস্থা-বিশ্বাসকেও হার মানায়। অনেকের ধারণা – থিওলজিতে কারও ক্রিটিক্যালনেস বলে কিছু নেই; কিন্তু সেটিও আসলে ভিত্তিহীন। আধুনিকতাতেই শুধু ক্রিটিক্যালনেস বা উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখা ও যাচাই করা আছে, এ কথা সত্য নয়। থিওলজিতেও ক্রিটিক্যালনেস দেখা যায়। এর ভালো প্রমাণ হল, থিওলজির ইন্টারপ্রিটেশনে বা তাফসিরে ভিন্নতা। আর সেখান থেকেই একই ধর্মের নানান ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যাখ্যার উৎপত্তি। আর তা অনুসরনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধারা বা Sect দেখতে পাওয়া যায়, যা খুবই স্বাভাবিক। তবুও ভারতীয় সেকুলারিজম ও এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোন ক্রিটিক্যাল অবস্থান দেখা যায় না।

    জয়িতা ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের আগেই ২৬ ডিসেম্বর এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। ঐ লেখার প্রথম তিন অনুচ্ছেদ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে। এর মধ্যে এক উপশিরোনাম আছে, তা হল- “নির্বাচন কমিশনে ৭০টা রেজিস্টার্ড দলের মধ্যে ১০টাই ধর্মীয় রাজনৈতিক দল” [10 Out of 70 Religious Political Parties Registered With EC]। কিন্তু তাতে জয়িতা সমস্যা দেখছেন কোথায়? মানে তিনি এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন কেন? ওরা ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বলে? আর এখানে ধর্মটার নাম ‘ইসলাম’ বলে? তাই কী?

    কিন্তু ব্যাপার হল, ইসলামি দল হলেই এমন খড়্গহস্ত হওয়া অপ্রয়োজনীয়। বরং এমন চিন্তার মানে, দেখা যাবে হয়ত কথিত এই ‘সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি” আসলে নিজেই ইসলামোফোবিক। আবার ভাবনা-চিন্তা করা দরকার যে এই ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতে হিন্দুত্বের দল বিজেপির ফারাক কিসে? জয়িতা বিজেপিকে সহ্য করতে পারলে বাংলাদেশের এই ১০টি ইসলামী দলকে করতে পারছেন না কেন? আরও সিরিয়াস কথায় আসা যাক। জয়িতার সম্ভাব্য আপত্তি বা বিচার করার ক্রাইটেরিয়া কী? স্বভাবতই আগে ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি ঠিক না করে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব বা ফোবিক [-phobic] অথবা বিদ্বেষী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

    আসল কথায় আসি। জয়িতা জানাচ্ছেন – এই ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড। আমরা নিশ্চয়ই বুঝি ‘রেজিস্টার্ড’ শব্দের মানে। এর সোজা অর্থ হল – বাংলাদেশের রিপাবলিক কনস্টিটিউশনকে মেনে সে অনুসারে রাজনৈতিক দলের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকতে বাধ্য বলে (দলটা নয়) নির্বাচন কমিশন মনে করে, সেসব শর্ত এই দলগুলো পূরণ করেছে। সে কারণে এরা রেজিস্টার্ড দল, সার্টিফায়েড। এখন এসব রেজিস্টার্ড দলের গায়ে গন্ধ, চিহ্ন, শব্দ ও রঙের মধ্যে যতই স্পষ্ট করে ইসলাম প্রকাশ পাক না কেন, যেহেতু বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন মেনেই এরা রেজিস্টার্ড হয়েছে, রাজনীতি করতে চাইছে, তাতে আর সমস্যা কী? একে এরপরও সমস্যা ভাবার কারণ কী? বরং এরপরও কারো কাছে ‘সমস্যা’ মনে হলে সেটি তারই ইসলামবিদ্বেষ মানে, মনের ফোবিয়ার সমস্যা হতে পারে। যেখানে এমনকি আগামীতেও নির্বাচন কমিশন যদি বাড়তি কিন্তু কনস্টিটিউশন কাভার করে, এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করে, সেটাও তো এসব রাজনৈতিক দল মানতে বাধ্য থাকবে। তাহলে এরপরে আর আপত্তির কী আছে? আপনি আর কী চাইতে পারেন? আসলে সবার আগে আমাদেরকেই “চাইতে” জানতে হবে। একটা ইসলামী দল রিপাবলিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই থাকতে চাইছে, আর কী চান আপনারা? আসলে এর পরের স্তর হল, রজনীকান্তের সেই গানের কলি- “ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়”। আসলে রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য অথবা রাষ্ট্র কী, তা জানা বোঝা সম্পন্ন না হয়ে মানে, বাকি রেখে কোনো আপত্তি প্রকাশ করতে গেলে তা শেষে ‘ফোবিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।

    জয়িতা ভট্টাচার্যের ওই রচনায় আর একটা উপশিরোনাম হল – তিনি বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে “ধর্মভিত্তিক দলের ভোট-শেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নয়” [Vote-Share of Religion-Based Parties Not Too Significant]। বাস্তবে জয়িতার এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ, যেমন বলা যায় গত ২০১৩ সালের ৫ মের পরে প্রথম নির্বাচন ছিল ঢাকার বাইরের গাজীপুরসহ কিছু শহরের “মেয়র নির্বাচন”। ঐ নির্বাচনে সরকার সবখানেই গো-হারা হেরে যায়। কেন? কারণ, জামায়াত নয় এমন কিছু ধর্মীয় দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থীকে ভোট না দিতে ক্যাম্পেইনে নেমেছিল; মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল। আর তাতেই ঐ ফলাফল হয়েছিল। তাই কেউ নিজে ভোটে দাঁড়ালে কয়টা ভোট পাবে সেটাই নয়, বরং অন্যের ভোট কত কাটতে পারবে, সেটাও এক বিরাট সক্ষমতা ও নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর এরপর থেকে, “নির্বাচনের মা মারা যাওয়াতে” সেই শোকে ঐ নির্বাচনের পর থেকে (আগের মানের) “অবাধ নিরপেক্ষ” নির্বাচন বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যায়; তা আর কখনো হয়নি। বুদ্ধিমান জয়িতা নিশ্চয়ই এসব কথা বুঝবেন। এছাড়া আরও বিস্তারে জানা ও যাচাই করতে তিনি গোয়েন্দা লাগাতে বা খোঁজ নিতে পারেন। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্ক বুঝা, তা বিশেষ করে ভারতীয় সেকুলারিজমের বুঝ দিয়ে বুঝতে যাওয়া, আরও অসম্ভব।

    জয়িতা নির্বাচনের পরেও গত ৩ জানুয়ারি আমাদের নির্বাচন প্রসঙ্গে আর একটা নিবন্ধ লিখেছেন । তা প্রকাশিত হয়েছিল ওআরএফের ওয়েবসাইটে।

    জয়িতা ভট্টাচার্য এবং রাধা দত্তের রচনায় এক অভিন্ন ত্রুটি হল, তাঁরা আগে বলে নিচ্ছেন না যে, তারা কেবল নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে লিখছেন। কারণ, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, তা অবাধ ছিল কি না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক দিক সম্পর্কে চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এরা সেসবের কোন খোঁজ নিয়েছেন, তাদের জানাশোনা আছে, তা মনে হয় নাই। তাঁরা দাবিওও করেন নাই। কেবল সব জায়গায় “নিষ্ঠাবান যুধিষ্ঠির” (পুরাণে যে কখনও মিথ্যা বলেন নাই বলে মনে করা হয়) ভেবেছেন আমাদের নির্বাচন কমিশনের বচনকে।  বলা যেতে পারে, কমিশনের বয়ানের বাইরে্র কোন উৎস ও তথ্যকে তাদের বিবেচনায় তারা কোন কারণে আনতে পারেননি বা আনেননি। এ অবস্থাতেই তাদের ওই রচনা লিখিত হয়েছে।

    জয়িতার দ্বিতীয় এই লেখায়, তৃতীয় প্যারা থেকে পরের চার প্যারা মিলিয়ে তিনি একটা বয়ান সাজিয়েছেন। এর প্রথম প্যারায় বলেছেন, “বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেছে”। এর পরের প্যারায় বলছেন, “কিন্তু নির্বাচন অবজারভারেরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেনি”। [অর্থাৎ পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হল, বিএনপির অভিযোগ বাতিল হয়র গেল।] এবার পরের প্যারায় জয়িতা বলছেন, “১৯ জন লোক মারা গেছে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি”। এর শেষে বলছেন, “নির্বাচনের আগে বিরোধীরা আওয়ামি লীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। আর একইভাবে লীগও বিরোধীদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ এনেছে”। [পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]। অথচ এরপরেই আবার লিখছেন, “নির্বাচনপূর্ব ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে মানুষ ভোট দিতে আসে কিনা এনিয়ে আশঙ্কা ছিল”। কিন্তু ভোটের শেষে কমিশন বলেছেঃ আশি ভাগ ভোট পড়েছে; তাই ওই ভয়-আশঙ্কা ছিল ভুয়া”। [মানে এখানেও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]

    আসলে এসব বাক্যের মাধ্যমে জয়িতা নিজের পরিচয়  “থিংকট্যাংক গবেষক” থেকে “প্রপাগান্ডিস্টের” স্তরে নিজেই নামিয়েছেন। কারণ এটা কোনো গবেষকের কাজ নয়, কাজের পদ্ধতিও নয়। সাধারণ বিবেচনা হল, দু’টি বিবদমান পক্ষের বেলায় কার কথা গ্রহণ করা হবে, তা ঠিক করতে হয় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় ওয়াকিবহাল পক্ষের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি আগেই একটা পক্ষ বেছে নিয়েছেন। এটা গবেষকের উচিত নয়, কাজও হতে পারে না। কথিত কিছু নির্বাচন “অবজারভারদের” বরাতে জয়িতা বলছেন, “ভোটে কারচুপি হয়নি, কারণ অবজারভারেরা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি”। কিন্তু খোদ “অবজারভারদেরই” গ্রহণযোগ্যতা কী ছিল? তা কি তিনি জেনে নিয়েছিলেন? সম্প্রতিকালে ঐ “অবজারভারদের” অনেকেই এখন “তওবা” পড়ছেন, বড় ভুল হয়ে গেছে বলছেন। তাহলে জয়িতা এখন কী বলবেন?

    শেষের প্যারায় তিনি একবার ভায়োলেন্সের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে এটা ‘ডিসমিস’ করছেন। অথচ পরের বাক্যেই বলছেন, ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে [Considering the level of pre-poll violence] ভোটার আসে কি না সে শঙ্কা ছিল। এর মানে জয়িতাই আবার মেনে নিচ্ছেন যে, আসলে উল্লেখযোগ্য মাত্রারই ভায়োলেন্স সেখানে হয়েছিল। তাহলে? মোট কথা, তার গল্পটা এখানে এসে আর মিল রাখতে পারল না।

    আবার লক্ষণীয়, ১৯ জন মারা গেছে দাবি করে তিনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এর মানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। আসলে এ কথার মানে হয় না। কারণ, ঠিক কতজন মারা গেলে কোনো নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে? কোথাও এমন কোন মাপকাঠি কী আছে? আর এই মাপকাঠি কে দিয়েছে? ওদিকে আবার এই ১৯ জন কারা? কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে? এটা কেবল লীগের দেয়া ফিগার। এদের মধ্যে আওয়ামিলীগেরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু কয়জনের? সে খোঁজ কি নেয়া হয়েছে? অথচ ‘১৯ জন মরেছে – মানে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়নি” – এসব মুখস্থ বলছেন তিনি। কোনো সিরিয়াস মানুষ বা গবেষক এভাবে মুখস্থ কথা বলার কথা না।

    আবার তার লেখায় (শেষের দিক থেকে গণনায়) চতুর্থ প্যারায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে বাধা’ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন জয়িতা। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি বিরোধীদের তোলা অভিযোগ নাকচ করেছিলেন জয়িতা। কেন? সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। তাহলে শেষে দাঁড়ালো কী? জয়িতার লেখা পড়ে মনে হয়েছে সরকারি “ব্রিফিং ঠিক রাখতে আর, ভাষ্য ব্যালেন্স করতে গিয়েই তিনি তাল হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ কারও ভাষ্যের ব্রিফিং ঠিক রাখা, সেই তালে কথা বলা কোনো গবেষকের কাজ হতে পারে না। এভাবে তিনি নিজেই নিজের কাজের মান প্রকাশ করলেন।

    শ্রীরাধা দত্তের লেখা :
    আমাদের নির্বাচনের পরে তাঁর লেখা দেখেছি একটাই। আর সে লেখার চার ভাগের তিন ভাগই হল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর দিয়ে ভারতের কত কী উন্নতি করে দিয়েছেন, এরই ফিরিস্তি। অথচ এই লেখার মূল প্রসঙ্গ আমাদের নির্বাচন কাভারেজ। অর্থাৎ এই লেখার সাথে বাংলাদেশের নির্বাচন বা শেখ হাসিনার বিজয়ের সম্পর্ক কী? অথবা এটা কি বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নের গল্প? হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর উন্নয়ন করে দিয়েছেন, তাই কী? সেটা যাই হোক ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।

    শ্রীরাধার লেখায় শেষের একটা প্যারায় এক অদ্ভুত কথা আছে। তিনি লিখেছেন- “বিএনপি নিজেই দায়ী”। কোথায় কী বিষয়ে আমরা তা দেখব। তবে রাধা সবচেয়ে কড়া এক বাক্য লিখেছেন। সে কথাটি হল – আওয়ামী লীগের জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পেল আর বিএনপি জোট মাত্র সাতটি পেল; এটা ”মনে হচ্ছে আমি মানতে পারলাম না”[looks unconvincing]।

    কিন্তু তিনিই শেষের দিকে বলছেন, “২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ওয়াকওভার দিয়েছে”। কিন্তু এবারের ফলাফলের জন্য অন্য কেউ নয় তাঁরা নিজেরাই দায়ী। এমনকি যদি কেউ মেনেও নেয় যে নির্বাচনে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সর্বত্র হাত ঢুকানোর অভিযোগ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, আর যেকোন ভিন্নমতের প্রতি তাঁর দমনের নীতি তবুও সরকার বিরোধীরা নিজেই আসলে নিজেদেরকে কোণায় চিপার মধ্যে ফেলার জন্য দায়ী। […this time around they have none to blame for their dismal performance. Even if one accepts the allegations of executive overreach, Hasina’s intolerance, and her increasing repressive ways towards any contrarian views, the opposition had really bound themselves into a corner]।

    অর্থাৎ বলছেন- “এবারো খারাপ ফলাফলের জন্য বিরোধীরা অন্যকে দায়ী করতে পারে না। যদি নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, ক্রমবর্ধমান বিরোধী মত দমন এসব অভিযোগ যা-ই ঘটুক তা সত্ত্বেও বিরোধীরা নিজেই নিজেদের এক কোনায় বন্দী করেছে”।
    এটি কি নুন্যতম অর্থপূর্ণ কোন কথা? না পুরাটাই স্ববিরোধী? দুঃখিত, আসলেই বুঝতে অপারগতা জানাচ্ছি। পাঠক নিজেকে সাহায্য করেন……।
    এ কারণেই, শুরুতে বলেছি বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে অর্থপূর্ণ অন্তত কয়েকটা বাক্যও লিখতেও বিশাল বিপদেই ফেলে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নির্বাচনঃ ভারতের থিংকট্যাংকের বিপদ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]