Category: টেররিজম

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

    ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার,

    আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০১৯ ১৭:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2CP

    –

    একালে আপনি কার দিকে? চীন, আমেরিকা নাকি ভারতের? সাথে রাশিয়ার নামটা নিলাম না, সেটা একটু পেছনে পড়েছে বলে। তো চীন, আমেরিকা নাকি ভারত – এই প্রশ্নের জবাব হল – একটাও না। আর সরাসরি বললে, জবাবে এখানে বিকল্প শব্দটা হল “ভারসাম্য”। কারও দিকে ঝুঁকে পড়া না, কান্নি মারাও না – বরং একটা ভারসাম্য। নিজের স্বার্থের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্য। এই অর্থে এটা ভারসাম্যের যুগ।  চীন, আমেরিকা নাকি ভারত কারো সাথে নয়, এক ভারসাম্য অবস্থান বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট- এমন পজিশন নেয়া।

    এককালে আপনি কোন দিকে? অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে – আমেরিকা না সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) কোন দিকে অবস্থান নিয়েছে? এটা খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন ছিল। এভাবে ‘আপনি কোন দিকে’ বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বা কলোনি-উত্তরকালে ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়ায় চলতে শুরু করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা আমেরিকার নেতৃত্বে সেকালের নতুন দুনিয়া। তখনো পরাশক্তি বা দুই মেরুতে বিভাজন শুরু হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরু হয়েছিল গ্লোব-জুড়েই এক ব্লক রাজনীতিঃ সোভিয়েত ব্লক না আমেরিকান ব্লক। এভাবে সেই থেকে ৭০ বছর আমরা পার করে দিয়েছি। ফলে আমাদের মতো দেশের ভাগ্য সেকালে লুকিয়ে ছিল ‘কোন দিকে’ বলে যার যার মতে, এক ভাল ব্লক খুঁজে নেয়ার ভিতরে। আর এই ছিল আমাদের “কোন দিকের” ধারণার জন্ম কাহিনী। এভাবেই চলছিল একনাগাড়ে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর লোকে বলতে শুরু করেছিল যে, দুনিয়া এবার এক মেরু, আমেরিকান মেরুর দুনিয়া হয়ে গেল। কথা হয়তো আপতিকভাবে সত্য, অন্তত সাদা চোখে সবার তো তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলেই তাই কী?

    ওদিকে চীনের উত্থানঃ  শুরু হিসাবে ধরলে চীনের উত্থানে আজকের চীন হয়ে উঠার শুরুটা বলা যায় সেই ১৯৬৮ সাল থেকে, যদি না ১৯৫৮ সালের তথাকথিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে” এর শুরু বলে কেউ কেউ না-ই ধরতে চান। না, তথাকথিত লিখেছি, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভুয়া ছিল বা মনে করি কিনা সেজন্য না। লিখেছি কারণ, আসলে সেটা ছিল দলের চিন্তার মূল খোলনলচা বদলে দেয়া এক বদল।  কিন্তু সেটা করা হয়েছিল “সাংস্কৃতিক বিপ্লবের” নামের আড়ালে। ফলে এটা দলের পলিটবুরোর নেতাদের সাথে তৃণমুল কর্মীদের সাংস্কৃতিক ফারাক দূর করার আন্দোলন একেবারেই নয়। বরং সেটা ছিল, পলিটবুরোর নেতাদের সাথে নেতাদের লড়াই। দলের পুরানা অবস্থানের সাথে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের লড়াই। আজকের চীন বলে যেটা দেখছি আমরা এটাই ছিল সেই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। এমনকি মাওও ছিলেন এটারই পক্ষে।
    যাহোক, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভাল না মন্দ সে তর্ক এখানের নয় বলে সেটা এখন এড়াতেই মূলত ১৯৬৮ বলেছি। যেখানে ১৯৬৮ সাল হল যখন আসলে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শেষে তা বিজয়ী ও মোটামুটি থিতু হবার কাল। তবুও দুনিয়া জুড়ে চীন আজকের এজায়গায় যেতে রওয়ানার এটা কোন ইঙ্গিত কিনা এমন আলোচনা কোথাও ছিল না। এর চেয়েও তখন মুল আলোচ্য ছিল কথিত “চীনা সমাজতন্ত্র” কোথায় যাচ্ছে।
    এমনকি ১৯৬৮ সালই বা কেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৮ সালেও খুবই কম একেবারেই হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউ বুঝেনি যে, সেটাই আজকের চীন হওয়ার শুরু। অথচ চীনের কাছে ১৯৭১ সাল মানে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি অনুসারে, ওর সাহায্যে চীন মানে মাও সে তুংয়ের চীন, সেই প্রথম জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর এটা ছিল ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সদস্যপদ। অনেকের কাছে তথ্যটা আজব লাগতে পারে কিন্তু এই তথ্য শতভাগ সত্য। কারণ, জাতিসংঘে এই সদস্যপদ এত দিন (চীন বলতে) তাইওয়ানকে দিয়ে রাখা ছিল। আর সেটাই ১৯৭১ সালে সেবার তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মাওয়ের চীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, আমেরিকার সাথে চীনের গোপন আলাপের ফলাফল অনুসারে। গোপন বলছি এজন্য যে ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জার [Henry Kissinger] গোপনে প্রথম “মাওয়ের  চীন” সফর করেছিলেন, আর সেখানেই ভেটোওয়ালা সদস্যপদ ফেরত পাবার বুঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছিল।

    আরও ওদিকে ১৯৭৮ সালঃ এটা উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, মোটাদাগের সব দেনা-পাওনা [চীন আমেরিকান পুঁজি, বিনিয়োগ ও পণ্য ইত্যাদি নিজ বাজারে প্রবেশ করতে দিবে। এতে বিনিময়ে কী কী নিবে এরই দেনা-পাওনা] ডিল সম্পন্ন করে চীন-আমেরিকা উভয় রাষ্ট্র পরস্পর পরস্পরকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে উভয়ে একে অন্যের দেশে অফিস খুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সাল থেকে। এভাবে পরবর্তিতে ১৯৯০ পর্যন্ত চীন ছিল আসলে আমেরিকান পুঁজি ও টেকনোলজি কিভাবে ব্যবহার করবে এর, আর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি ও গ্লোবাল বাজারে প্রবেশ করে চীনের নিজেকে অভ্যস্ত, সাজানো ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতিকাল। আর এরও পরের প্রায় ২০ বছর ধরে চলে চীনের অর্থনৈতিক ডাবল ডিজিট (বা সময়ে এর চেয়েও বেশি) উত্থানের পর্ব। তবে ২০০৭ সালে গ্লোবাল রিসেশন শুরু হলে তা কমতে থাকে। তত দিনে আমেরিকা বুঝে গেছিল যে, চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার দিকে, তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
    তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমেরিকা আগে তা জানত না বা অনুমান করেনি। আসলে বিষয়টা ছিল জেনেও কিছুই করার নেই ধরণের পরিস্থিতি। গ্লোবাল পুঁজির এক আপন স্ববিরোধী স্বভাব এটা। চীনের জনসংখ্যার শত কোটির ওপরে (২০১৮ সালের হিসাবে ১৪২ কোটি)। এমন দেশে সত্তরের দশকেও সে ভার্জিন এই অর্থে যে তখনও সেখানে কোন বিদেশি বিনিয়োগ যায় নাই। তাই এর বাজার খুলে দিলে এর বিদেশি পুঁজি পাবার আকাশচুম্বি চাহিদা পুরণ করতে বাইরের সকলে ঝাপিয়ে পড়বে। মানে উলটা করে বললে ওয়ালস্ট্রিটের চোখে এত বড় ক্রেতা সে জীবনেও কল্পনা করে নাই। তাই চীনে বিদেশি বিনিয়োগে বাজার চাহিদা ধরতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট একে উপেক্ষা করা কথা চিন্তাও করতে পারে না।  তাই আমেরিকান পুঁজিতে চীন ফুলে-ফেঁপে উঠতে থেকেছিল ১৯৯০ সালের আগেও,  তবে ১৯৯০ সালের পরে আরও প্রবলভাবে। এটা জানা সত্বেও যে এই পুঁজি চীনে ব্যবহৃত হবার পরে যে নতুন উদ্বৃত সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিবে এবং চ্যালেঞ্জ করবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে চীনে প্রবেশের সুযোগ আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট উপেক্ষাও করতে পারে নাই কারণ উপেক্ষা করলে তাতে তার নিজের মরণ। মূল কথা, সব সময় নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগের ভিতরই কেবল আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট এর জীবন। তাই নতুন শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা জেনে যায় চীন উঠে আসতেছে। এটা দেখেই বুশের আমলে, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এবার চীন ঠেকানোর [China Containment] কৌশলের তোড়জোড়। প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর (২০০৬ মার্চ) থেকে ভারত আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর কাজ হাতে নেওয়ার ব্যাপারটা আর একধাপ আগিয়েছিল। আর তখন থেকেই ধীরে ধীরে আপনি কোন দিকে অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে, সেটা বুঝতে পারা ও জবাব দেয়া আর আগের মত সহজ থাকেনি। কেন?

    আপনি কোন দিকে, এর জবাব দেয়া শুরুর সেকালে সহজ ছিল। কারণ, আমেরিকা নাহলে সোভিয়েত – এদুটোর কোন একটা মেরু বা পরাশক্তি আপনি বেছে নিলেই হত। কিন্তু একালে ব্যাপারটা আর মেরু বা পরাশক্তি-কেন্দ্রিক বিষয় নয়। যেমন – আপনি কোন দিকে চীন, আমেরিকা নাকি ভারত? এই প্রশ্নের মধ্যে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কাউকে পরাশক্তি গণ্য করা নাই বা হয়নি। একালে কেউ পরাশক্তি কি না তা এখানে মুখ্য বিষয়ই নয়। মুখ্য বিষয় গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা বা নেতৃত্ব কার, সেখানে। ফলে তা আসলে এখন মূলত পুরনো নেতা আমেরিকার জায়গায় নতুন হবু নেতা চীনের যোগ্য হয়ে দখল নেয়ার ইস্যু।

    এই হিসাবে এখানে নেতা বা কেন্দ্র দুইটা – চীন ও আমেরিকা। তাহলে, সাথে ভারতের নামও আসছে কেন? কারণ, ভারত আমেরিকার হয়ে সে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটত। প্রতিদান হিসেবে পেয়ে গেছিল বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান ছড়ি ঘুরিয়ে মাতবরি। এছাড়াও আর একটা দিক হল, চীনের প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হল ভারত। ফলে এখনই না হলেও ভারত পটেনশিয়াল বা আগামীর সম্ভাবনা ভাল, এমন অর্থনৈতিক হবু শক্তি; এতটুকুই। তাতে সব মিলিয়ে ভারত ভেবেছিল এভাবেই দিন যাবে “চীন ঠেকানোর” বোলচালের মধ্যে থাকবে আবার চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ খুললে তাতে চীনের পরই বড় মালিকানা শেয়ারটা চীন ভারতকেই দিবে। ব্যাপারটা সেই কবিতার মতো যেন বলছে – “এভাবে কি দিন যাবে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে অথচ তোমার কথা না ভেবে!’ ভারত আগামি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা চীনের কোলে শুয়ে অথচ আমেরিকার কথা ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারবে – তাই ভেবেছিল।
    কিন্তু না একালে দিন তেমনভাবে যায়নি। যাওয়ার কথাও ছিল না। এখন ফলাফল হল বাংলাদেশ আমেরিকার হাতছাড়া, উল্টা বাংলাদেশ এখন ভারতের কোলে, সেটা সত্য। কিন্তু ওদিকে আবার ট্রাম্পের আমলে এসে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটাতে ট্রাম্পের আমেরিকাই আর আগ্রহী নয়। উল্টো চীনের মত ভারতের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক আরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যেখান থেকে ভারত আবার মোচড় দিয়ে নিজের আত্মগরিমা আর ট্রমা-ভীতি পেছনে ফেলে চীনের কোলে য়ুহান সামিটে হাজির। বলা হচ্ছে, ওই য়ুহান সম্মেলন সেখানে এমন কিছু মৌলিক বোঝাবুঝির ভিত্তি নাকি তৈরি হয়ে গেছে, যা আরো বিকশিত বা বাড়তে না পারলেও নাকি পিছাবে না। আমেরিকার সাথে ভারতের পরস্পরের পণ্য অন্যের যার যার বাজারে ঢুকার বিরুদ্ধে উভয়েরই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে – এটা দুদেশেরই রপ্তানি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। গতমাসে জাপানে জি২০ এর বৈঠকের ফাঁকে সাইডলাইনে ট্রাম্পের চাপ বা হুমকি – মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্কারোপ গ্রহণযোগ্য নয় – এসবই একালের পরিণতি।

    কিন্তু ট্রমা- ভারতের ট্রমা [Trauma] সে ব্যাপারটা কী? বিষয়টা হল, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের হার, এটাই তাকে বারবার বেচাইন অস্থির করে যে যদি একালে আবার সেটা হয়, এটি ভীতিই ভারতকে বারবার আমেরিকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। চীন আগামির ফ্রেশ গ্লোবাল নেতা, তুলনায় আমেরিকা ক্রমশ ডুবে যাওয়া নেতা – এটা ভারতের অজানা নয়। তাই আমেরিকার চেয়ে আগামি নেতা চীনের সাথে আগেই গাটছাড়া বাধলে গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্যি আগেই বাড়বে শুধু তাই না, আগামি দুনিয়ার যা কিছু নতুন রুল তৈরি হবে তা তৈরিতে নিজের ভুমিকা মতামত আগেই চীনের পাশাপাশি জোরদার করে রাখতে সুবিধা পাবে।  কিন্তু ট্রমার জন্য ভারত আমেরিকার দিকেই বারবার ফিরে আসে, কান্নি মেরে পরে থাকে। অর্থাৎ বলা যায়, ভারত আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ককে ভারসাম্যের জায়গা থেকে দেখে না, দেখতে পারে না। বরং আমেরিকাকে পুরনো পরাশক্তির আলোকে দেখতে চায়। কিন্তু চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব তো পরাশক্তিগত নয়। তবু ভারত আমেরিকার দিকেই কেবল ছুটে যায়। এছাড়া সবখানেই ভারতের গাছের খাওয়া আবার তলারও খেতে চাওয়ার নীতি তো আছেই। আবার তাতে সময়ে ধরাও খায়। যেমন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ট্রাম্প নিজের আফগান পলিসি প্রকাশ করেছিলেন। এতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেবার অভিযোগ দিয়ে সাজানোতে ভারত আবার তাতে ছুটে গিয়েছিল মোহে। কিন্তু না! ছয় মাস যেতেই জানা গেল ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে শেষ হাজার দশেক আমেরিকান সৈন্য, তাও এবার ফেরত আনতে চান। অথচ আফগান নীতিতে এর কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। যা হোক, সৈন্য ফেরতের চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেখল, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। ফলে যে পাকিস্তানকে আমেরিকা চীনের কোলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার কুড়িয়ে নেয়া শুরু করেছিল।

    আমেরিকার আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ [U.S. envoy Zalmay Khalilzad ] এই সেই বিশেষে দুত যিনি ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রকাশের সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচক, উঠতে বসতে সন্ত্রাস লালনকারী বলেছিল। সেই তিনি এবার সৈন্য ফেরানোর উপায় হিসেবে তালেবানদের সাথে কথা বলা আর রফাচুক্তি করার চেষ্টায় পাকিস্তানের সহায়তা কামনায়  এসে এবার পাকিস্তানকেই প্রায় বাপ ডাকা বাকি রেখেছে।  এরই সর্বশেষ হল আজ ১৫ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে “আফগান শান্তি আলোচনা থেকে ভারতকে কুনুই মেরে বের করে দেয়া হয়েছে” [India elbowed out of Afghanistan peace talks]।

    আবার, সাম্প্রতিককালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স” [Financial Action Task Force (FATF)] প্রবল সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এই সংগঠন মূলত মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যার একটা বড় অংশ জঙ্গিসংগঠনের অর্থ যোগানদাতা বলে অনুমানে এরই কাউন্টার করতে নানান পদক্ষেপ নিয়ে থাকে ও তা মনিটর করে। এতে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তানকে চেপে ধরাতে [পাকিস্তানের অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুতিমত তা নেয় নাই। তারিখ মিস করেছে।] ভারত খুবই খুশি ছিল। নিজ মনকে আশ্বস্ত করেছিল ভারত যে, হ্যাঁ অন্তত এই টেররিজম ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার এই অ্যালায়েন্স, এটাই তো ভারত চায়। এটা খুব দরকারি আর কাজেরও। এবং তারা দুই-রাষ্ট্র কত ভাল এবং তার টেররিজম ইস্যুতে একটা ন্যায্য লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা পাকিস্তানের মত নয়। অনেক ভাল। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা হল, এমন টেররিজম ইস্যু বলে আসলে বাস্তব দুনিয়াতে সত্যিকারের কিছুই নেই। টেররিজম কী, কোনটাকে বলবে, কী হলে বলবে এর এমন সংজ্ঞাই নাই – না আমেরিকার নিজের কাছে, না জাতিসংঘের। কেবল এক তালিকা আছে, কাদেরকে বা কোন সংগঠনকে তারা টেররিস্ট মনে করে। আর সেই থেকে বরং টেররিজম বলতে ভারত-আমেরিকা নিজেরা কী বুঝবে ও বুঝাবে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে “গভীর বোঝাবুঝি” আছে অবশ্যই। কাকে টেররিজম বলে চালিয়ে দিবে – সেটাই আসল সেখানে। যেমন- ২০০৭ সালে যা বলা হয়েছিল ওর সারকথা ছিল যে, বাংলাদেশকে টেররিজম মোকাবেলার যোগ্য করে সাজাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ এই “টেররিজম” কথাটি ছিল এক সাইনবোর্ড মাত্র। ভারতের মূল স্বার্থ ছিল আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে, তা ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা আর কলকাতা থেকে নর্থ-ইস্ট সরাসরি যোগাযোগের নানান করিডোর হাসিল করা।  সেকাজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর এককভাবে হাসিল করেছে ভারত। এখানে এককভাবে কথাটার মানে হল, করিডোর কেবল ভারতই ব্যবহার করবে, চীন পারবে না। এছাড়া সেই সাথে ভারত পুরা বাংলাদেশের বাজার দখল পেয়ে নিবে।  সার কথা ভারত কেবল “কানেকটিভিটি” “কানেকটিভিটি” বলে চিৎকার করবে, মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। কিন্তু এর মানে হবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কেবল ভারতই যাবে। কিন্তু ভারতের উপর দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশে আসতে চায়, আমরা যেতে চাই – না সেটা সে পারবে না। সেটা নেপাল, ভুটান কিংবা চীন এমন পড়শি কেউ যেই হোক তারা বাংলাদেশে আসতে পারবে না বা আমরাও যেতে পারব না। আর ভারত সব পাবার বিনিময়ে  আমেরিকার স্বার্থে ভারত এবার  “চীন ঠেকানোর” কাজে অবস্থান নিয়ে ভাড়া খাটবে। তাহলে দাঁড়াল যে এই হল ভারত-আমেরিকার টেররিজমের সংজ্ঞা ও বিশেষ বুঝাবুঝি। আর সেই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশি মেরে শেষ করে চলবে। কিন্তু? হা আরও বিরাট “কিন্তু” তৈরি হয়েছে এখন।

    ভারত-আমেরিকার এই “বিশেষ টেররিজম-বুঝের” সাইনবোর্ড তাদেরকে অনেক কিছু এনে দিয়েছিল, বিশেষ করে তাতে ভারতের  আস্থা ছিল দৃঢ় ও গভীর। কিন্তু টেররিজম-বুঝের সাইনবোর্ড এখন তা করলার চেয়েও তিতা। কেন? বালুচিস্তান!

    বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন হতে চাওয়ার আন্দোলন অনেক পুরনো। কিন্তু এতে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো নেগোসিয়েশন বা রফা-পরিণতিতে না যেতে পারার পেছনে একটা বড় কারণ হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এই আন্দোলনের দলকে [(বিএলএ), Baluchistan Liberation Army (BLA)) প্রায় খোলাখুলি সহায়তা ও সমর্থন। কিন্তু এবার এক বিরাট কিন্তু হল,  গত ২ জুলাই আমেরিকা পররাষ্ট্র দফতর বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট [Specially Designated Global Terrorists (SDGTs)] বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এক নির্বাহী নির্দেশে এটা জারি করা হয়েছে গত সপ্তাহে, ০২ জুলাই।

    পাকিস্তানে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে (বিএলএ) বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ২০০৬ সালে এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এবারের ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে চীন ও পাকিস্তান উভয়ে স্বাগত জানিয়েছে। অথচ চিপায় আটকা পড়ে ‘কোথাও নেই’ হয়ে গেছে ভারত। বিএলএ-কে টেররিস্ট বলায় এতে চীনেরও স্বার্থ ছিল সরাসরি। কারণ, পাকিস্তানের পেট চিরে পাকিস্তানের সব প্রদেশ ছুয়ে তাদের উপর দিয়ে টানা “চীন-পাকিস্তান করিডোর” [CPEC] স্থাপনার কাজে চীনা ঠিকাদারের কর্মীরা বারবার বিএলএ’র হাতে অপহরণের বা চাঁদা দানের শিকার হয়েছে বহুবার, চলতি শতকের শুরু থেকেই। সেসময় মনে করা হত, চীন-পাকিস্তানের এমন সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভারত  (বিএলএ)কে সহায়তা দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নির্বাহী নির্দেশের পরে? আরও আছে!

    ট্রাম্পের বিএলএ-কে শুধু টেরর ঘোষণা করা নয়, আগামী ২২ জুলাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-ইমরানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার এক ঘোষণাও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ, গত ১১ জুলাই। মানে ব্যাপারটা এক কথায় বললে আমেরিকার নিজের কৌশলগত অন্য কোনো স্বার্থে – এককালে আচারের আঁটির মতো চুষে রস খেয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া পাকিস্তানকে আবার এবার সমাদরে কোলে তুলতে চাইছে আমেরিকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এখানেও (বিএলএ)কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আসলে কোন টেররিজম ইস্যু নয়, সাইনবোর্ড মাত্র; আমেরিকার কৌশল্গত স্বার্থ মাত্র, যা আগে বাংলাদেশের মতোই। তাহলে ভারতের এখন এতে বাকশূন্য বোকা হয়ে যাওয়া কেন? যাকে কেউ কেউ বলছে তিতা ওষুধ খাওয়া। কারণ হল, ভারতের কাশ্মিরে সরকারি টেররিজমের নিপীড়ন ও হত্যার পক্ষে এতদিন ভারতের পক্ষে একটা ন্যায্যতা বা সাফাই জোগাড় করে দেয়া হয়ে যেত এই বলে যে, টেররিজমের একক হোতা হল পাকিস্তান বা মুসলমানরা। কিন্তু আমেরিকার বিএলএ-কে টেররিস্ট ঘোষণা করাতে এবং  ঘোষিত সেই দলকে খোদ ভারতই সমর্থন করত বলে ভারত হয়ে গেল এখন টেররিস্ট-সমর্থক রাষ্ট্র ; আমেরিকা পরোক্ষে এবার তাই বলে বসল।

    তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? শিক্ষাটা হল, চলতি এযুগ গ্লোবাল নেতৃত্বের বিশেষত, অর্থনৈতিক নেতৃত্বের নেতা বদলের যুগ এটা। আবার খেয়াল রাখতে হবে, এটা সোভিয়েত-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়। ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা কথাটা বুঝতে হবে। সেকালে এর মানে ছিল এক ব্লকের কোনো রাষ্ট্রেরই অপর ব্লকের কারো সাথে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক রাখত না, হারাম মনে করত, তাই সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না।

    অথচ এ কালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যতই ঝগড়া বা রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধই থাক না কেন- সেখানে একই সাথে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে সব বিনিময় লেনদেন-বাণিজ্যও সমানে চলে থাকে। অতএব, এ কালের ফর্মুলা হল সবার সাথেই নিজস্বার্থ মুখ্য করে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে লেপটে থাকা। তাই চীন, না আমেরিকা, নাকি ভারত এভাবে কারও দিকেই এককভাবে কান্নি মেরে থাকা যাবে না। এটা আবার শর্টকাট কোনো ন্যাশনালিজমের মত তা ভেবে বসাও ভুল হবে।

    কাজেই আপনি ভারতের দালাল – নিজভূমিতে অন্যকে করিডোর দিয়েছেন, বাজারসহ সব খুলে দিয়েছেন এমন ভারতের দালাল, নাকি আপনি চীনের বিনিয়োগ এনে সয়লাব করেছেন সেই চীনা দালাল- এ দুটোই ভুল পথ। এমনকি এ দুইয়ের ভয়ে আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছেন, এটাও ভুল। বরং তিনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে হবে কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণভাবে। এককভাবে কারো সাথে সম্পর্ক [এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ সম্পর্ক, বন্ধুরাষ্ট্র ইত্যাদি সব] একালে হারাম, বরং কার সাথে কতটুকু যাবেন তা আগেই নিজ বোঝাবুঝি ঠিক করে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তা বলা যেতে পারে, কখনো বলা যাবে না, কাজে দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে কী করবেন সেই নিজ হোমওয়ার্ক অবশ্যই আগে করে রাখতে হবে।

    সোনাদিয়ায় বন্দরসহ বিসিআইএম করিডোর নির্মাণ আমাদের কৌশলগত মৌলিক স্বার্থ। অথচ ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্যে রাখতে এটা কমপক্ষে ১০ বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমাদের ‘নিশীথ ভোটের’ পরবর্তীকালে এ থেকে পরে পাওয়া দিকটা হল, এটা উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় আসার জন্য কারোই আর ভারতের সমর্থন জরুরি বা এসেনশিয়াল নয়। আবার আমেরিকাও এখন বিষহীন ঢোঁড়া সাপে পরিণত। আর বিরোধী দলসহ সারা দেশের মানুষ আজ ভারতকে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা দানব মনে করছে। ফলে তারা ভারতবিরোধী। লক্ষ্যনীয় যে এবারই প্রথম এই ভারতবিরোধিতা পুরাপুরি রাজনৈতিক, এ টু জেড রেখা টানতে পারবেন। তাই এটাই তো হাসিনার জন্য ছিল সব উপেক্ষা করে নিজস্বার্থে চীন সফরের সবচেয়ে ভালো সময়। শেখ হাসিনা যা বুঝেই নিয়ে থাকেন না কেন, এক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ওদিকে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া ব্যাপক। তারা আশাতীত খুশি যে, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস তিনটারও বেশি আর্টিকেল ছেপে উচ্ছসিত। হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, বাংলাদেশ বেল্ট-রোড আর বিসিআইএম [BCIM-EC] করিডোরে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, Hasina in balancing act between China, India। [এই রিপোর্টের শেষেই সবগুলো খবরের লিঙ্ক পেতে পারেন]।

    তারা আসলে আরও খুশি এ জন্য যে, বিসিআইএম প্রকল্প জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এতে বা বেল্ট রোডে ভারত যোগ দেবে হয়তো কোনো এক কালে, আমেরিকার হাতে কোনো পরিস্থিতিতে চরম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরে। কিন্তু কথাটা তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে।  সেকথা আমাদের ইউএনবি বার্তা সংস্থার বরাতে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকা বিরাট করে লিখেছে [“the initiative would have to be revived working together with India,” the United News of Bangladesh (UNB) reported on its website.]।

    প্রথম আলোতে চীন সফরঃ
    তবে হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে প্রথম আলোর ভুমিকা খুবই নেতিবাচক। প্রায় সময় সে আমেরিকান অবস্থান নিয়ে খবর হাজির করে থাকে। এবার আমেরিকার হাসান ফেরদৌস যে লেখাটা লিখেছে সেটা অর্ধ সত্য বা পুরাই অসত্য। আর তা আমেরিকার তো বটেই, ভারতেরও কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখা। মূলত তিনি কোন যুক্তি বলা ছাড়াই, চীনবিরোধী। এই খামতি তিনি পুরণ করতে, আশির দশকের চিন্তায় ও তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আবার ভারতীয় প্রপাগান্ডা খেয়ে লিখছেন, ভারত নাকি আমাদের চীনের মতই ঋণ দিয়ে অবকাঠামো গড়ে দেওয়ার সঙ্গী। যেমন লিখছেন, “চীন ও ভারত দুই দেশই আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে”। কিন্তু ভারত কোন অবকাঠামো আমাদের গড়ে দিয়েছে? নিজস্বার্থে করিডোরের কিছু অবকাঠামো গড়ে নেয়া ছাড়া? তা আমাদের জানা নাই। যেমন ভারতের বহরমপুর জেলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে আসাম – এই তেল পাইপ লাইন স্থাপন কী বাংলাদেশের স্বার্থে্র অবকাঠামো? ভারতের টাটা আর লিলেন্ড গাড়ি, আমাদের বিআরটিসি- এর ঘাড়ে ডাম্প করতে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এটা করা হচ্ছে। আর এতে দেখানো হয় যে ভারত আমাদের ঋণ দিয়েছে এই গাড়ি কিনতে। অথচ ব্যাপারটা উলটা, ভারতের রুগ্ন ইস্পাত শিল্পকে বাঁচাতে ভারত সরকার ওসব গাড়ির দাম আগেই শোধ করে কোম্পানিগুলোকে বাঁচায়। এরপর কেনা সেই গাড়ি ভারত সরকার আমাদেরকে ঋণে বিক্রি করেছে বলে কাগজপত্রে দেখায়। এই হল “অবকাঠামো ঋণ”!
    এছাড়া ভারত কী কাউকে অবকাঠামো ঋণ দিতে সক্ষম এমন অর্থনীতির রাষ্ট্র? নাকি ভারত এখনো মূলত ঋণ নেওয়ার রাষ্ট্র? কাজেই ভারত আমাদের অবকাঠামো গড়ে দেয়, এসব আজগুবি তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? এগুলো তো ভারতের প্রপাগান্ডা দালালি! আজীব! এছাড়া লেখার শিরোনামসহ তিনি হাসিনা সম্পর্কে আনন্দবাজারি স্টাইলে লিখছেন, হাসিনা নাকি “চীনা তাস” খেলতে গেছেন। যেন এক বিনোদন রিপোর্ট লিখতে বসেছেন।
    সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সম্পর্কে লিখছেন, “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” সেজন্যই নাকি এই বন্দর নির্মাণ হয় নাই। আবার নিজেই বলছেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সে (সোনাদিয়া) উদ্যোগ ভেস্তে যায়”। এই তথ্যও ভিত্তিহীন কারণ, যুক্তরাষ্ট্রকে হাসিনার “বিকল্প কিছু” দেওয়াতে সোনাদিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এতে কোন আপত্তি নাই। আপত্তি একমাত্র ভারতের।  আবার “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” – এই কথা সত্যি হলে তাহলে আর হাসিনা চীন সফরে গেলেন কেন? কী বিনোদন কাটাতে গেছিলেন? তাহলে চীনে গিয়ে আবার [BCIM-EC] প্রকল্প শুরু করতে আলাপ তুললেন কেন? সে ব্যাখ্যা কই?
    আর [BCIM-EC] প্রকল্পতে যদি বন্দরসহ প্রকল্প এটা নাই হয় তবে এটাকে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পে যুক্ত হবার এক “করিডোর” ভাববার তো কোন সুযোগই নাই। কাজেই বন্দর-ছাড়াই BCIM-EC প্রকল্প, এমন ভাবনা তো আসলে ভারতের অবস্থান। তাও পুরানা অবস্থান। সম্প্রতিকালে সেঅবস্থান থেকে ভারতের নড়াচড়ার আলামত দেখাচ্ছে। আসলে হাসিনার চীন সফর নিয়ে কিছু বলার জন্য নুন্যতম তথ্য নিয়ে পড়াশুনা বা নাড়াচাড়ার দরকার তা ফেরদৌসের কাছে নাই, ফাঁকিবাজ ছাত্রের মত যার হোমওয়ার্ক নাই।

    আরও আজিব কান্ড তিনি পায়রা বন্দরকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের বিকল্প বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পায়রা চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে একটু বড় মাত্র। এছাড়া ড্রাফট বা গভীরতার লিমিটেশন, মানে বড় জাহাজ ঢুকানোর লিমিটেশন আছে, তাই একে গভীর সমুদ্র বন্দর বলতে অনেকের দ্বিধা আছে। আরও পরিকল্পনাগত বিরাট ত্রুটি হল,  সারা বছর এই বন্দরের প্রবেশ অংশকে নাব্য রাখতে হলে সারা বছরই একে ড্রেজিং করে যেতে হবে। সোনাদিয়া লোকেশনে ড্রাফট যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই ১৮ মিটার। তাই আমেরিকার চোখেই বাংলাদেশের দুটা বিস্ময়কর অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প হল, পায়রা আর রূপপুর। এককথায় বললে, চীন ঠেকানী মুডের ভারতের মান-মন রাখতে ‘পায়রা’ আসলে এক অর্থহীন, টাকা পানিতে ফেলা প্রকল্প।

    হাসান ফেরদৌসের আজগুবি তথ্য আরও আছে। তিনি বলেছেন, এবার এপ্রিলে চীনে “বেল্ট-রোড সামিটে নাকি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম নেতৃত্ব দিতে” গিয়েছিলেন। এটা ভুল তথ্য। বরং প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে গেছিলেন কোন প্রতিমন্ত্রী না বরং ফুল মন্ত্রী। আর সেই মন্ত্রী হলেন, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন । যেটা গওহর রিজভিও নিশ্চিত করেছেন পাবলিকলি। আর হংকংয়ের পত্রিকায় সাক্ষাতকার শাহরিয়ার আলম দিয়েছিলেন কথা সত্য কিন্তু, কোথায় বসে তা অস্পষ্ট। ঢাকায় বসেই খুব সম্ভবত, এবং তা ভারতের আয়োজনে। খুব সম্ভবত ঠিক সেসময়ের দ্বিধাগ্রস্থ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কাজে লাগিয়ে। যেটার পুরা পরিস্থিতি বদলে যায় চীনা রাষ্ট্রদুতের উদ্যোগে ফলে, বিশেষ করে বিএনপিকে -সহ  স্থানীয়ভাবে সরকার, রাজনীতিক, সাংবাদিক ইত্যাদি নানান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে “বাংলাদেশ-চীন সিল্ক রোড ফোরাম” গঠন করে ফেলার পরে; হাসিনা তখন থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
    এখন কথা হল, প্রথম আলো এমন আধা-সিদ্ধ লেখা ছাপাচ্ছে কেন? লেখকের পরিচয় হিসাবে তাঁর লেখার নিচে লেখা থাকে, ” হাসান ফেরদৌস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি”। অর্থাৎ এটা অপিনিয়ন বা কোন গেস্ট লেখকের কলামও নয়, প্রথম আলোর নিজের স্টাফ রিপোর্ট। তাহলে প্রথম আলো, সে কার পক্ষে থাকতে চায়? ভারত বা আমেরিকার সমর্থনে ভারতের পক্ষে? প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট কী এগুলো দেখে নাই, জানে না? অদ্ভুত ব্যাপার! তবে একটা জিনিষ আমরা পরিস্কার থাকতে পারি। এমনটা চলতে থাকলে আগামিতে বড় কাফফারা দিতে হবে।

    কিন্তু কথা হল, তাতে চীন ভারতকে যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ডালি চীন বা বাংলাদেশ যতই সাজিয়ে রাখুক না কেন অথবা বিসিআইএম প্রকল্পে ভারতের যোগদানের দরজা খুলে রাখুক না কেন – এতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি খুব সহজ নয়। আবার তা অসম্ভবও নয় নিশ্চয়। আবার এটা হতেও পারে যে, দেখা গেল ট্রাম্পের বাকি আমলের (জানুয়ারি ২০২১) মধ্যেও মোদী সিদ্ধান্ত নিতেই পারলেন না। [একটু আগের খবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভারত সফরের (এটা গত বছর চীনে মোদীর “য়ুহান সামিটের” পাল্টা সমতুল্য সফর)] তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তা সেই অক্টোবর ১২ তারিখে। অর্থাৎ বুঝা গেল মোদীর তেমন তাড়া নাই।  যদিও অনেকে অবশ্য বলছেন, গত জুন মাসে কাজাখস্তানে সাংহাই করপোরেশনের [SCO] শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে ঐ সম্মেলনের এক যৌথ ঘোষণা থেকে বেল্ট রোড প্রকল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। আগে এমন হলে, তাতে ভারতের আপত্তি আছে বা অংশগ্রহণে ভিন্নমত আছে বলে তা সাথে উল্লেখ থাকত। এবার তেমন কিছুই দেখা যায়নি। অনেকে এর অর্থ করছে যে, ভারত সম্ভবত এখন থেকে এতটুকু সরেছে যে সে বেল্ট-রোডের প্রসঙ্গটা গ্রহণও করেনি আবার বিরোধিতাও করেনি, এমন অবস্থায় এসেছে – আগের আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসে।

    তবুও এতে তেমন আশাবাদী না হওয়ার অন্য কারণ হল, যে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা তুলে মোদি আবার ক্ষমতায় এসেছেন তা হলো চরম মুসলমান বিরোধিতা, যেটা পারলে ভারত থেকে প্রায় মুসলমান জনগোষ্ঠিকে মুছে নির্মুল করে ফেলার এক আকাঙ্খা যেন, যার মানে মুসলমানের কারণে পাকিস্তান বিরোধিতাও। কিন্তু এই ডিভিডেন্ড বা বাড়তি লাভ মোদী সহসাই লঘু করতে চাইছেন না। আগামী পাঁচ বছরজুড়েই ভারতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ রাজ্য করে নির্বাচন হবে। তাই এই একই মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুত্ব মোদীকে ব্যবহার করে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবরি মসজিদ মন্দির বানানো, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে মুসলমান খেদানো, পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যসরকার দখল, কাশ্মিরে চরম বলপ্রয়োগে একে  কনষ্টিটিউশনালি ভারতের অঙ্গ করে নেয়া; এমন অনেক কিছু মোদির কর্মপরিকল্পনার তালিকায় আছে।

    এদিকে যদিও ঐ সাংহাই করপোরেশন মানে হল, যেখানে চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া আর, ভারত-পাকিস্তানও এর সদস্য। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘টোন-ডাউন’ করা মোদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর হলেন মোদী – এই বোলচাল মিথ্যা হলেও নিজের এই নির্বাচনী ইমেজে তিনি জিতেছেন তাই এটা তিনি আবছা হতে দেবেন না। যদিও ওদিকে আবার মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এবার আমেরিকা ভারতের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নাই এটা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি।

    অতএব, ভারতকে বাদ রেখে বন্দরসহ বিসিআইএম প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। ভারতের জন্য অপশন খোলা থাকবে, যার ফাইন্যান্সিয়াল দায়ভারসহ যুক্ত হতে চাইলে ভারত সে সুযোগ নিতে পারবে। কারণ, ভারত সহসাই প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে, এমন আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন।

    শ্রীলঙ্কা ড্রামাঃ
    অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এক নতুন ড্রামার মঞ্চস্থল হয়ে উঠেছে। এম ভদ্রকুমার হলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি তার কলামে হাসিনার চীন সফর সফল ও বিরাট অর্জন বলে প্রভুত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আবার  লিখেছেন, ” শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালেই, অ্যাঙলো-আমেরিকান ‘রেজিম বদল’ প্রকল্পে সঙ্গ দিয়ে ভারতের কূটনীতি ইতোমধ্যেই হাতে রক্ত লাগিয়ে ফেলেছে [“In Sri Lanka (2015), Indian diplomacy tasted blood by collaborating with the Anglo-American project at ‘regime change.”] …… আর এখন যা হচ্ছে তাতে ভারতকে পাপোষের মতো ব্যবহার করে আমেরিকা শ্রীলঙ্কায় ঢুকে পড়েছে। শ্রীলঙ্কাকে সামরিক চুক্তিতে জড়িয়ে নিচ্ছে, অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ধন্য আমেরিকান হস্তক্ষেপ নীতি। [Meanwhile, the US used India as a door mat to make inroads into Sri Lanka. And the result is Sri Lanka has been seriously destabilized, thanks to intrusive US policies]। আসলে ওখানে রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা আমেরিকাকে ডেকে আনার নায়ক। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রয়োগ করে এক উগ্র বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা [নাম Galagoda Aththe Gnanasara], নানাসারা বলে পরিচিত এই নেতাকে অপহরণের অভিযোগে ছয় বছরের ও আদালত অবমাননার সাজার জেল থেকে ছুটিয়ে এনেছেন। রাজনৈতিক দলের মত তাঁর এক ধর্মীয় সংগঠন আছে – নাম Bodu Bala Sena (BBS) or “Buddhist Power Force”। মানে কথিত অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের এই নেতা নিজ সংগঠনের নাম রেখেছে “পাওয়ার ফোর্স”। বুঝা যাচ্ছে তিনি শিকারির “খুবই অহিংস”। এরপর তাঁর সম্পর্কে আর কিইবা বলার বাকি আছে। তিনি সম্প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উগড়ানো এক পাবলিক মিটিং করেছেন। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের এই ধারাই মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন রোহিঙ্গাবিদ্বেষী একই বৌদ্ধ ধারা। অর্থাৎ তাহলে ফলাফল হল, শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব দমাতে গিয়ে ভারত ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোর পর এখন এর মাখন উঠিয়ে দিচ্ছে বা তা নিয়ে যেতে এসেছে আমেরিকা।

    তা হলে এশিয়ায় মূল বিষয়টি হচ্ছে, না চীনের কোলে না ভারতের – এটাই বাঁচার উপায়। ভারসাম্যের নীতিতে, কারো দিকে কান্নি না মেরে থাকা। আর কেবল নিজের স্বার্থের দিকে ফোকাসের নীতি – এভাবে হোমওয়ার্ক করে আগানো, এই নীতিই একমাত্র বাঁচোয়া। কিন্তু ভারত ভারসাম্যের নীতি না মেনে চলার দেশ। বরং উলটা, আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকার নীতি ভারতের। যে আমেরিকা আবার চলে নিজের একক স্বার্থে। আমেরিকার বেলায়, বালুচদের টেররিস্ট ঘোষণা করে দেয়া অথবা শ্রীলঙ্কায় (SOFA সহ) সামরিক চুক্তি করে ঢুকে পড়া, এগুলো এর উদাহরণ হলেও এসব বিষয় ভারতকে হুঁশে আনবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

    তবে যারাই চীনের বদলে ভারত অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য খুনখারাবি পর্যন্ত যাবে, সম্পর্কের ব্যাপারটা যারা এভাবে দেখবে বা এই ভুল করে বসবে – এরাই সবশেষে সব খুইয়ে নিজের সব অর্জন আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে থাকে। হাসিনার জন্য এটাও এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে যে, যদি না তিনিও আবার শেষে সব হারিয়ে, আমেরিকাকে ডেকে নিয়ে না আসেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “এটা ভারসাম্যের যুগ“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

    মোদীর এখন “টেররিজমেই” লাভ ও ভরসা

    গৌতম দাস

    ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2xP

     

    কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের এক জেলা শহর পুলওয়ামা(Pulwama)। সেই ‘পুলওয়ামা’ শব্দ এখন ভারত ছাড়িয়েও দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত। কিন্তু ঘটনা কী? গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুলওয়ামাতে ভয়াবহ এক আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনাক্রম খুবই পুরনো – ভারতের জন্মের সমান বয়সী নিরন্তর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার নাম কাশ্মির; আর তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার কোন কারণ নাই কাশ্মিরি জনগণের। কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের বলপ্রয়োগের মাত্রা কেমন তা বুঝাতে বলা হয় – সেখানকার জনসংখ্যার চেয়েও সেখানে জড়ো করা ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা বেশি। আর এই বিপুল সেনা সমাবেশ মানেই গণ-নিপীড়ন, হত্যা, গুম ইত্যাদি দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অজস্র এবং নিয়মিত ঘটনা। বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্বাধীনতাহীন এক মারাত্মক পরিস্থিতি। আর এসবের বিপরীতে আছে গণ-আন্দোলন, এমনকি সশস্ত্র প্রতিরোধও।

    বিপরীত দিক থেকে দেখলে এটাই ভারতের সরকারি ভাষ্যে ‘সন্ত্রাসবাদ’।অথবা প্রাক্তন বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর ভাষায় – ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’। মানে হল বলা হচ্ছে, কাশ্মীরের আসল সমস্যা হল “সন্ত্রাসবাদ”।  আর এই সমস্যা পাকিস্তান থেকে এসেছে; ভারত কিছুই করেনি”। ভারতের কোন দায় বা ভুমিকা নাই। ভারত সরকার যেন কাশ্মীরে আদরণীয়। যেন ভারতের জন্মের সময় কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি খুবই শীতল সংঘাতহীন ঘটনা, কোন জবরদস্তি বলপ্রয়োগ সেখানে ছিল না। অথচ ভারতের কনষ্টিটিউশনের ভাষায় বললে, এই ‘অন্তর্ভুক্তি’ [accession] সম্পুর্ণ নয়। একারণে ফ্যাক্টস হল,১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে কি না তা অমীমাংসিত। এভাবেই এটা চলে আসছে। যেটাকে আজ “সন্ত্রাসবাদ” বলা হচ্ছে মানে সরকারি বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পালটা হামলা তা ১৯৮৯ সালের আগে ছিল না। কাজেই ভারত বা পাকিস্তানের কাশ্মীরীদের “সন্ত্রাস” নয় কাশ্মীরের মূল সমস্যা তার ভারতভুক্তির অমীমাংসিত থেকে যাওয়া; আর কোন ডায়লগ নয় বরং এর বদলে ভারতের নিরন্তর বলপ্রয়োগে টিকে থাকার চেষ্টা।

    অথচ দেখে বুঝবার বা জানার উপায় নাই, কেউ জানে না কাশ্মীর নিয়ে সমাধানে ভারতের পরিকল্পনা কী। কাশ্মীরের সংঘাতের সমাপ্তি টানার পথ কী! সরকারি কড়া দমন নীতিতে ভীতি ও সরকারি সন্ত্রাস জারি রেখে,দাবড়ে দিয়ে কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা কখনও আসবে না। আবার স্থানীয় জনগণ এর পালটা, ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ দাঁড় করাতে সক্ষম হলেও তাঁরা নিজ সশস্ত্রতায় ভারত সরকারকে পরাজিত করতে পারবে এমন কোন বাস্তবতা নাই। ওদিকে আবার কাশ্মীরের আর এক অংশ,যা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত অংশ হয়ে আছে। সেই সুত্রে সেটাও বা পুরা কাশ্মীর দখল করতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোন যুদ্ধে কেউ কারও কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীর-সমস্যার সমাধান হবে সে সম্ভাবনাও নাই। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে কোন নির্ধারক যুদ্ধ নয় কেবল একটা খুবই সীমিত ধরণের যুদ্ধই সম্ভব;যা আসলে আবার পারমাণবিক বোমা নিয়ে খেলাই,এমনই রিস্কি।

    তবু এসব কিছু সত্বেও বলপ্রয়োগের পথই একমাত্র,এমন বোধ ও নীতি আকড়ে বসে আছে ভারতের শাসকেরা। বিশেষ করে বিজেপির মোদীর সরকারের নীতি হল আরও হার্ড লাইন। এরই আর এক মানে যুক্তি-বুদ্ধিতে কাশ্মীরকে ভারতে অংশ দাবি করা কঠিন বলে প্রকারন্তরে বিজেপি মেনে নিচ্ছে। তাই কঠোর বলপ্রয়োগের পথ ধারণ করেছে। আর মোদী সরকারের হার্ড লাইন নীতি মানে হল – শক্ত বল প্রয়োগ,দমন আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম আর মুসলমান মানেই এরা অধস্তন বা আধা-নাগরিক – এসব নীতি ও অনুমানের উপর দাঁড়ানো। এছাড়া আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল করে দিবে বলে না বুঝে গোয়া্র চিতকারের বিজেপি – সে তো আছেই।

    ভারতের কনষ্টিটিশন কাশ্মীরের উপরও প্রযোজ্য হবার যে আইনি সুত্র তা হল কনষ্টিটিশনের আর্টিকেল ৩৭০। বা উলটা করে বলা যায় কাশ্মীর অন্যান্য রাজ্যের মত ভারতের কোন রাজ্য নয়, সেটা নেহেরুর স্বীকার করে নেয়ার চিহ্ন। এছাড়া ফ্যাক্টস হল কাশ্মীর এক বিশেষ স্বাধীন স্টাটাস-ওয়ালা এক রাজ্য – যার নিজের আলাদা কনষ্টিটিউশন ও পতাকা ইত্যাদি আছে, আর  – এই বিশেষ স্টাটাসের কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ঐ আর্টিকেলে। ফলে মোদীর বিজেপির সরকার আর্টিকেল ৩৭০ মানে না বা বাতিল করে দিবে,অথবা আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন তাই এটা এখন নাল এন্ড ভয়েড – ইত্যাদি যা দাবি বিজেপির আছে তা খামোখা – অহেতুক ও অচল। আর্টিকেল ৩৭০ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর – এই দাবিতে করা এক রিট ভারতের সুপ্রীম কোর্ট গত বছর ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। তবু এরা এতই গোয়াড় যে এসব সত্বেও এখনও বিজেপির সমর্থকেরা একই দাবি করে চলেছে। এই হল মোদীর বিজেপি।

    সম্প্রতি আমরা দেখছি, কাশ্মীরের আর এক ব্যবহার মোদীর হাতে চালু হতে দেখা যাচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেখানো বা উগ্র দেশপ্রেম প্রদর্শন এর সবচেয়ে ভাল জায়গা বা ইস্যু হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার এর আগেও ছিল। এবার ভারতের আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ করার আশঙ্কা চারদিকে ফুটে উঠাতে বিজেপি নিজের ভাঙ্গা ইমেজকে চাবকে খাড়া করার উপায় হিসাবে কাশ্মীরকে ব্যবহার করতেই পুলওয়ামা ইস্যুকে মোদী ব্যবহার করল কী না তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ভারতে এখন তুঙ্গে।

    গত সপ্তাহে আমরা দেখেছিলাম নির্বাচনী ইস্যুগুলো এমনভাবে খাড়া হয়ে গেছে যার বেশির ভাগটাই ক্ষমতাসীন মোদীর বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। এই অবস্থায় এক বিদেশি গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে – নির্বাচনের আগে নিজের পড়ে যাওয়া পাবলিক রেটিং চাঙ্গা করতে মোদী কোন পরিকল্পিত দাঙ্গা লাগাতের পারে – সেই থেকে এমন আশঙ্কা বাড়ছিল। যদিও কাশ্মীরের এবারের পুলওয়ামা ইস্যুটা হল এক সুইসাইড বোমারু হামলার ঘটনা। কিন্তু মোদী কী এই ঘটনাটাকেই নিজ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছেন – এই প্রশ্ন প্রবলভাবে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে একারণেই বিজেপি-আরএসএসের অঙ্গ সংগঠনগুলো হামলা ঘটনা পরবর্তিতে সারা ভারত জুড়ে “পাকিস্তানের উপরে প্রতিশোধের হামলা” করতে হবে বলে জিগির তুলে এই দাবি উঠিয়েছে। কিছু রাজ্যে কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিজেপির এই অসৎ ততপরতা এখন প্রমাণিত। আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার লিখেছে, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিজে থেকে হস্তক্ষেপ করে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রিপোর্ট চেয়েছে বৃহস্পতিবার। আর দুই, সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র ও ১০ রাজ্যকে কাশ্মীরিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে”। এদিকে রাজস্থানের জনসভায় মোদী এখন ভোল পালটে বলছেন, “কাশ্মীরিদের পাশে দাঁড়াতে হবে”।

    যদিও ভারতের যেকোন সরকার জানে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ ভারতের জন্য কোনই অপশন নয়। এছাড়াও ওদিকে কাশ্মীরি যারা অন্যান্যে রাজ্যে ব্যবসা বা শিক্ষার সুযোগ নেয়া ইত্যাদির উদ্দেশ্যে আছেন বা এসেছেন [যেমন দেরাদুনে যারা পড়তে এসেছেন অথবা কলকাতায় যারা ব্যবসা করতে এসেছেন] তাদের উপর পরিকল্পিত উস্কানি দিয়ে হামলা-আক্রমণ করেছে বিজেপি। এতে মোদীর সরকারি উগ্র দেশপ্রেমের বয়ান যে-ই নিতে চায় নাই,অথবা উগ্রতা নরম করতে চেয়েছেন – মোদীর লোকেরা তাদেরকে দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করেছে। তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত এবং পাবলিক লিঞ্চিং করেছেন। এমনকি জনমত সমীক্ষা করার কথিত এক উদ্যোগের মতে নাকি ৩৬% লোক পাকিস্তানে এখন হামলার পক্ষে।

    পুলওয়ামার ঘটনা-সংক্ষেপ হল, সিআরপিএফ (CRPF) বা সেন্ট্রাল পুলিশ রিজার্ভ ফোর্স – ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনের এক বিশেষ পুলিশ বাহিনী। প্রাপ্ত ট্রেনিংয়ের ধরণ আর প্রাতিষ্ঠানিক গঠনের বিচারে এরা সেনাবাহিনী নয়; তবে আমাদের র‍্যাবের মত তারাও স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে এক বিশেষ বাহিনী। এই সংগঠনের জন্ম বৃটিশ আমলে হলেও সত্তরের দশকে ভারতে নকশাল আন্দোলন প্রবল হবার মুখে একে ঢেলে আরও গুছিয়ে নেয়া হয়।  বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের মত নকশাল সন্ত্রাসে আক্রান্ত রাজ্যগুলোকে সহায়তা করতে বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া বাহিনী দিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্দিরা সরকার এই প্রাতিষ্ঠানিক পুণর্গঠন করেছিলেন। তবে কোন রাজ্যেই এই বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি নাই। তবে কোন রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে নিজের পুলিশের বাইরে অতিরিক্ত ফোর্সের সহায়তা চাইলে কেন্দ্রীয় সরকার কাছাকাছি কোন জোনাল স্থায়ী ক্যাম্প থেকে এই বাহিনী পাঠিয়ে থাকে। ফলে প্রায় সবসময়ই এক মুভমেন্ট বা চলাচলের মধ্যে থাকে এই বাহিনী। তেমনি ৮০টা বাসে করে প্রায় আড়াই হাজার বাহিনী সদস্য স্থানান্তরে  – পুলওয়ামা জেলা পার হবার সময় সেই গাড়ী বহরের ভিতর আর একটা জীপ গাড়ী ঢুকিয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলা চালানো হয়। এতে প্রায় ৪০ এর বেশি জন জওয়ানের মৃত্য হয়। এই ঘটনায় আহত-নিহতের সংখ্যা দেখে যে স্বাভাবিক জন-অসন্তোষ তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলতে মাঠে পরিকল্পিতভাবে নেমে পড়েছিল বিজেপি-আরএসএস এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বজরং দল,বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এরা। একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দেখা গিয়েছে তিনি এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার।

    আর ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির এক ভয়াবহ প্রতিনিধির ভুমিকা দেখিয়েছেন এমন ব্যক্তি হলেন তথাগত রায়। তিনি এখন মেঘালয় রাজ্য গভর্নর, তিনি প্রাক্তন ত্রিপুরার গভর্নরও আর কলকাতা বিজেপির প্রাক্তন নেতা তথাগত রায়। গভর্ণর ভারতের প্রেসিডেন্টের মতই কনষ্টিটিউশনাল পদ, যার মুলকথা তিনি দল মত নির্বিশেষে সবার প্রতিনিধি। কিন্তু এই গভর্নর কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বাকি ভারতের নাগরিকের কাছে আহবান জানিয়েছেন যে “যা কিছু কাশ্মীরি,তা বয়কট করুন” – এই বলে এক  টুইট বার্তায়।  এর আগেও তিনি কাশ্মীরীদেরকে কঠোর নির্যাতন নিপীড়নের ভয় দেখিয়ে বাগে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। গত ২০১৬ সালের এক বিবিসি রিপোর্টে তা দেখা যায়। রাজনীতিকদের মধ্যে একমাত্র মমতাকেই দেখা গেল প্রশ্ন তুলে বলতে যে একজন গভর্ণর – কনষ্টিটিউশনাল পদে থাকা ব্যক্তি কোন একদল নাগরিকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ান কী করে?  যদিও তথাগত রায়ের দুর্ভাগ্য এমনই আর তাঁর মন্তব্যের কনষ্টিটিউশনাল দায়-অপরাধ এত বেশি যে মোদী সরকারের তথ্যমন্ত্রীও তাঁর কাজের দায় নেন নাই। একাজের সাথে তিনি “একমত নন” বলে জানিয়েছেন।

    তবে মমতা আরও কিছু মুখ্য প্রশ্ন তুলেছেন। হামলা হতে পারে “মুখ্যমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন, ভোটের আগে ভারতজুড়ে দাঙ্গা লাগানো হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়েছিল,তা কি ঠিক? আগাম খবর থাকা সত্বেও কেন সেনা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন সিআরপিএফের অনুরোধ সত্ত্বেও এয়ারলিফ্ট করা হল না? এতবড় ব্যর্থতা কেন হল? এরপরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হল না কেন?” – এগুলোই তাঁর এখন অভিযোগের আঙুল।

    এমন অভিযোগ উঠাই স্বাভাবিক। কারণ যে হাইওয়েতে গাড়িবহরে হামলা হয়েছে সেখানে কয়েকশ গজ পরে পরে চেকপোস্ট আছে,বলা হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে গাফিলতি না থাকলে ৩৫০ কেজি বোমা নিয়ে একটা গাড়ি কিভাবে সেনা গাড়িবহরের ভিতরে ঢুকতে পারল? এনিয়ে কংগ্রেসের প্রশ্ন, “নরেন্দ্র মোদীজি ৩ কেজি গোমাংসের খোঁজ পেয়ে যান, আর ৩৫০ কেজি আরডিএক্স এর খোঁজ পান না” – কেন?

    আমেরিকায় ভারতীয় অধ্যাপক সুমিত গাঙ্গুলী এক লেখা ছাপিয়েছেন আমেরিকার ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে। তিনি মোদী সরকারের কাশ্মীর পলিসির খামতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন মোদীর কঠোর কাশ্মিরী নীতির কারণেই এই আমলেই হামলা ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আর – তা দুপক্ষেই, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যায় আর কাশ্মীরি জনগণ বিশেষ করে মৃত তরুণের সংখ্যা।

    কিন্তু এসবকে পাশ কাটিয়ে এটা “টেররিজমের সমস্যা” বা পাকিস্তানের দায়-প্রশ্রয়ের দিকে আঙুল তুলে মোদী নিজের উদ্দেশ্য ও দায় এড়িয়েছেন। অথচ এই ঘটনায় কথিত হামলাকারি ‘আদিল আহমেদ দার’ – তিনি ভারতীয় কাশ্মীরের পুলওয়ামারই বাসিন্দা, হামলার ঐ গাড়িও ভারতীয়। কেবল যে সংগঠনের ভারতীয় শাখার হয়ে তিনি কাজটা করেছেন তার হেড অফিস পাকিস্তানে। আর এথেকে সব পাকিস্তানের দায় বলে মোদী আঙুল তুলে নিজের হাত ধুয়ে ফেলতে সুযোগ নিতে চেয়েছেন।

    তবে আর একটা বড় জটিলতা হল কোনটা টেররিজম বা সেই সুত্রে কে টেররিজম করেছে? – সেই অমীমাংসিত প্রশ্ন। প্রথমত, এখন পর্যন্ত “টেররিজম” বললেই সবচেয়ে বড় ঘটনার রেফারেন্স হল ২০০১ সালে আমেরিকার ৯/১১ এর টুইন টাওয়ারে হামলা। মানে প্রায় ১৮ বছর গত হয়েছে। কিন্তু এখনও টেররিজমের কোন কমন সংজ্ঞা নাই। সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য, মেনে নিয়েছে টেররিজম বলতে এমন কোন কমন সংজ্ঞা বলে কিছুই নাই। এমনকি আমেরিকার কাছে কিংবা জাতিসংঘের হাতে বা তাদের দলিলেও তা নাই। তাই হাতে অস্ত্র নিলেই সে টেররিস্ট  – না বিষয়টা এমন সহজ তাও নয়। তাহলে এত বাতচিত চলছে কী করে?  আমেরিকার নীতিতে বা জাতিসংঘের কাছে সন্ত্রাসী দলের একটা তালিকা বলে একটা বই আছে। ঐ বইয়ে কোন ভিত্তি ছাড়া সংশ্লিষ্ট সব সদস্য যাকে খুশি টেররিস্ট বলে দেখাতে একমত হয়েছে, মনে করে; নাম ঢুকানো হয়েছে; সুতরাং এই সুত্রে সে টেররিস্ট। আসলে এককথায় বললে –কেউ কাউকে টেররিষ্ট বলবে কিনা সেটা ঐ রাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে এমন ভিত্তিতেই নির্ধারিত। মানে যার যার “রাষ্ট্রস্বার্থ” ওর নির্ণায়ক। আমার নিজের রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে হলে সে “টেররিস্ট” – এই হল সেই সুত্র। ফলে বেলুচিস্তানের আন্দোলন ভারতের চোখে ‘স্বাধীনতাকামী’ বা (Separatist Movement) আর পাকিস্তানের চোখে তাঁরা “টেররিস্ট”। এটার জন্যই যয়েশ-ই-মোহম্মাদ বা ভারতের চোখে যেগুলো টেরর সংগঠন বলে চিহ্নিত তাদেরকেই আবার পাকিস্তানে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করে না। আর এর সাফাই হল এটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রস্বার্থ – এই যুক্তিতে। সারকথায় সেজন্য কারও বিরুদ্ধে টেররিজমের অভিযোগ আসলে এখন যেভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠ গরমের চেষ্টা করছেন মোদী – এটা শেষবিচারে হল, যার যার রাষ্ট্রের প্রপাগান্ডায় জিতবার ইস্যু। অতএব মূলত কেউ “টেররিস্ট” কিনা সে দাবি বা তা বুঝতে যাওয়া এখানে অর্থহীন।

    সবশেষে এটা এখন দেখবার বিষয় যে  এই হামলা ইস্যুকে মোদী নিজের ভোটবাক্সে কতটা কাজে লাগাতে পারেন। ভারতীয় আম ভোটারদের জ্ঞান-বুদ্ধি আসলেই কতটা – কিছু আছে নাকি সবই সস্তা আবেগ,সেন্টিমেন্ট!
    যদিও ইতোমধ্যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দাঙ্গার অভিযোগে মামলা খাবার ভয়ে, আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের অবাস্তবতা মেনে মোদী ইতোমধ্যে অনেকটাই ব্যাকফুটে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “টেররিজমেই’ কি মোদির লাভ ও ভরসা?“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

    ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

    গৌতম দাস

    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2tL

     

    পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ভারতের এক সাবেক কূটনীতিক, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, ২০০৭ সালে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। বর্তমানে তিনি ভারতের একটা বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসেবে সক্রিয়। তাঁর বিশেষ গুরুত্বের দিকটা হল, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের নীতিনির্ধারক যারা – ভাবেন, অবস্থান নেন এমন সবার সাথে, অন্য সব কূটনীতিকের চেয়ে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থার সাথে সংযুক্ত এমন এক ব্যক্তিত্ব তিনি। তাঁর সার্ভিস পিরিয়ড, ২০০৭-০৯ সময়পরিধিতে তাঁর বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্বে থাকাকালীন কিছু কাজ এর পিছনের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করা হয়। না, এটা যথেষ্টভাবে বলা হলো না। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই রচনা কী নিয়ে সেদিক আলোকপাত করে কিছু কথা বলা দরকার।

    আসলে, বাংলাদেশ যে পিনাক রঞ্জনকে চিনত সে নয়; তা থেকে একেবারে ভিন্ন, ‘আনলাইক’ এক পিনাক রঞ্জনের এক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ পত্রিকায়। সে প্রবন্ধের ভাষ্য এমন যে এটা শেখ হাসিনা সরকারের উপর থেকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত হিসেবে তা পাঠ করার সুযোগ রেখে লেখা হয়েছে। [এটা বাংলা ও ইংরাজী দুই ভাষাতেই একই লেখা প্রকাশিত হয় এমন এক ওয়েব পত্রিকা, ফলে বাংলায় অনুদিত ও প্রকাশিত ভাষ্য পাঠকেরা পড়তে পারেন। ]

    এক-এগারোর সরকারের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এবং পরিণতিতে, আমেরিকা যদি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হাওলা বা হস্তান্তর করে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করে থাকে; তবে ভারতের দিক থেকে এতে এক নম্বর পরামর্শদাতা এবং বাস্তবে তা রূপদানকারী ব্যক্তি হলেন কাকাবাবু প্রণব মুখার্জি। আর সে কাজেরই মাঠের বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।

    প্রকাশিত উইকিলিকস ফাইল থেকে জানা যায়, এক-এগারোর টেকওভার বা ক্ষমতা দখল এবং এর লক্ষ্য অনুযায়ী সাধিত কাজ শেষে এরপর এর এক্সিট রুট কী হবে, মানে কাকে ক্ষমতা দিয়ে তাঁরা তখন কেটে পড়বে, এটা নিয়ে শত প্রশ্ন ও অনুরোধ সত্ত্বেও ক্ষমতা দখলকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর জানতে পারেনি। উপায়ন্তরহীন সেই পরিস্থিতিতে অবস্থা দেখে মনে হয়, এ ব্যাপারে ক্ষমতা দখলকারীরা একটা নিজস্ব আবছা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। তা হল, লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ হওয়া শেষে তারা নিজেরাই এরশাদের মতো কোনো দল গঠন করে রাজনীতিতে নেমে পড়বে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের জুনের পর থেকে অক্টোবরের মধ্যে এটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে যে, আমেরিকা এ অঞ্চলের তার -ওয়ার অন টেররে – “টেররিজমের বিরুদ্ধে পাহারাদারের” ঠিকা ভারতকে দিচ্ছে। আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেমিনারে সাব্যস্ত হয় যে,  “ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় তার নিরাপত্তা স্বার্থ” দেখবে ও বুঝে নেবে। এথেকে তাই মনে করা হয়, এরই নিট ফলাফলে বাংলাদেশ ভারতের ইচ্ছাধীনে চলে যায়। এর অন্য আরেকটি লুকানো দিক ছিল, আসলে এটা ছিল আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নামে পদক্ষেপের আড়ালে ভারতকে নিজের নৌকায় অন বোর্ড করে নেওয়া। যার মানে হল, এটাই আমেরিকান স্বার্থে ‘চীন ঠেকাও’ বা ‘China containment’ এর কাজটা ভারতকে দিয়ে করিয়ে নিতে আমেরিকা তাকে রাজি করিয়ে নেয়, আর দেনা-পাওনাও ঠিক করে নেয়। বিনিময়ে এরই রাজভেট হল, “বাংলাদেশকে বলি দেওয়া” – আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হস্তান্তর, ভারতের করিডোর লাভ থেকে শুরু করে লাভ আর লাভ ইত্যাদি।

    কিন্তু বিউটেনিস নিজেদের এই নতুন সিদ্ধান্তের পক্ষে মইন-ফখরুদ্দীন ও তার সঙ্গীদেরকে রাজি করাতে পারছিল না। একারণে শেখ হাসিনার জামিন, দেশত্যাগ, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে আলোচনা করতে দেয়া ও তাকে ক্ষমতায় আনা ইত্যাদিতে সহযোগিতা করতে তারা রাজি হচ্ছিল না। এ সময় পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কিছু নির্ধারক কাজ করে, আর তাতে মইন ও তার সঙ্গীদেরকে বাধ্য হয়ে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আগমনের পরে ২০০৯ সালে পিনাক রঞ্জন তার ‘সফল’ অ্যাসাইনমেন্ট শেষে দেশে ফিরেছিলেন।

    পিনাক রঞ্জনের বিশেষ প্রবন্ধ
    পিনাক রঞ্জনের এই বিশেষ প্রবন্ধের শিরোনাম অবশ্যই সেটা পিনাক রঞ্জন-সুলভ ছিল না। যেমন লেখাটার বাংলা শিরোনাম হল- “বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ছায়া, হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, বিএনপিকে দমন”। আর ইংরাজিতে, “Shadow of India, Hasina government’s corruption, repression of BNP looms over Bangladesh polls.” অনুমান করা যায় লেখাটা ইংরাজীতে আর পরে তার অনুবাদ বাংলায় করা হয়েছে।

    এখানে দেখা যাচ্ছে, এটা সত্যিই বেশ তামাশার যে “বিএনপির ওপর নিপীড়ন হচ্ছে” – এই কথা তুলে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত তাঁর লেখায় এটাকে শিরোনাম করেছে। তবে এর চেয়েও আরো বিস্ময়কর হল, শিরোনামের কিছু বিশেষ ‘শব্দ’ পছন্দ করে নেওয়া। যেমন, বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে কি না, শেখ হাসিনা সরকার সেই দুর্নীতি করছে কি না – এটা গত দশ বছরে ভারত বা পিনাক রঞ্জনের ভাষায় তা কখনও উঠে আসেনি। ভারতের মিডিয়া বা ইন্টেলেক্টরাও কখনও এসবকে তাদের লেখার বিষয়বস্তু করেনি। বরং হাসিনার শাসনে ভারত কত কিছু – না চাইতেই সব উপুড় করে পাচ্ছে, তাদের পছন্দে ও ভাষ্যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিচ্ছে – হাসিনা সরকারের এসব অবদান নিয়েই সবসময় তাঁরা বিগলিত থেকেছে। আসলে “দুর্নীতি” – এটি মূলত আমেরিকান ভাষা। ফলে অচানক এটা পিনাকের ভাষা হয়ে উঠা সত্যিই ‘তাতপর্যপুর্ণ’, তা বলতেই হয়।

    এভাবে পিনাক রঞ্জনের পুরা লেখাতে যেসব বিস্ময়কর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তার একটি তালিকা এখানে আমরা দেখে নেই।

    এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনঃ
    অচিন্তনীয় ঘটনা হল, পিনাক রঞ্জন আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। তিনি
    লিখেছেন,

    “আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পদক্ষেপকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং এর মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের নীলনকশা হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিক্ষোভ করেছিল। এর জের ধরে বিএনপি সরকার সংবিধানে বিধিটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার আয়োজিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল করে”।

    দুই. কোটা আন্দোলন ও যানবাহন ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন সামলাতে ব্যর্থতা ও হার্ডলাইনে যাওয়াঃ
    এটাও সত্যিই বিস্ময়কর যে, পিনাক রঞ্জনের মত ভারতের কোন কূটনীতিক হাসিনাকে “হার্ডলাইনে দমন করা” [যে হার্ড লাইন ছাড়া আর কোন লাইনে তিনি কখনও দাঁড়াতেই পারেন নাই।] আর ‘কাজ’ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলে অভিযোগ আনছে।  কিছুটা আমেরিকান বা পশ্চিমা কূটনীতিকের আদলে মানবাধিকারের কথা ব্যাকগ্রাউন্ডে মনে রেখে তারা যেভাবে কথা বলেন, যা বলাই বাহুল্য “পিনাক-সুলভ নয়” আর তা না হয়েও তিনি লিখেছেন –
    “সরকারি চাকরির কোটার মতো ঘরোয়া ইস্যু এবং ঢাকার অবাধ্য ও বিশৃঙ্খল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন ইস্যুতে হাসিনা সরকারের ছন্দপতন ঘটেছে, যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল, ঢাকার অবাধ্য যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। এসব চালক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ফলে দেশব্যাপী ছাত্রদের ক্রোধ উসকে দেয়া এবং এ ইস্যুতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নস্যাতের অভিযোগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার ছিল বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে, কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করেননি”।

    অর্থাৎ এমনকি “আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার” বলে শহিদুল আলমের কথাও তিনি উল্লেখ করে সে ড্রাম পিটানো ছদ্ম এক্টিভিস্ট সাজতে  তিনি এখানে দ্বিধা করছেন না, আর লিখেছেন – “এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে”।
    মজার ব্যাপার হল, গত দশ বছরে ভারতের কোনো কূটনীতিক, কলামিস্ট, মিডিয়া রিপোর্ট কেউ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো গুম-খুন, পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া ইত্যাদি থেকে শুরু করে, ‘হার্ডলাইনে দমন করা’ আর কাজ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলছে আমরা এমন কখনও দেখিনি।

    তিন. স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতিঃ
    নিজ চোখে দেখলেও এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন “স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতির” অভিযোগ আনছেন। বিশেষত যখন, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় আনার কালে মাঠের এক কুশীলব ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি লিখেছেন –
    “হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতি। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব ইস্যু ও ভারত ফ্যাক্টর প্রাধান্য পাবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের অব্যাহতভাবে হয়রানি করার ফলে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নীরব ক্ষোভ বেড়েই চলেছে এবং ব্যাপকভাবে এ ধারণার সৃষ্টি করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। অনেক সমালোচক বিশ্বাস করেন, হাসিনা সরকার নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একে বলা হয় ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’ “।

    চার. মাদকবিরোধী অভিযান আসলে “গুলি করে হত্যার” নীতিঃ
    কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন কি পরিচয় বদলে ‘মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট’ হয়ে যাচ্ছেন? সে এক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! যেমন তিনি লিখেছেন –
    “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি ‘গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত হয় বলে মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন। এতে অনেক নিরপরাধ মারা যায়”।  আসলে বরং ফ্যাক্টস হল, গত দশ বছরে ভারতের ‘বাংলাদেশ নীতি’ কখনও হাসিনা সরকারের হিউম্যান রাইট মেনে চলার রিপোর্ট কার্ড রেকর্ড কেমন কখনও সেটাকে ইস্যু করে নাই, সবসময় এড়িয়ে চলেছে, মাতে নাই ফলে কোন অভিযোগও কখনও তুলে নাই। তাহলে পিনাক এখন এতবড় ব্যতিক্রম কেন?

    পাঁচ. সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও আওয়ামী লীগের হিন্দু দলন ইস্যুঃ
    ভারতের কোনো সাবেক হাইকমিশনার শেখ হাসিনা ও তার দলকে “হিন্দু সংখ্যালঘুদের দলন, হয়রানি ও বৈষম্য করছে” বলে অভিযোগ করছে – এটা এর আগে কখনও চিন্তাও করা যায়নি। তাহলে, এটাই কি হাত ছেড়ে দেয়ার চূড়ান্ত ইঙ্গিত? সবাইকে অবাক করে পিনাক রঞ্জন এই অভিযোগ তুলে বলেছেন,
    “হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক প্রধান বিচারপতি সরকারের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে ও বিদেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনসূচক থাকা হিন্দু সংখ্যালঘুরাও ক্ষুব্ধ। কারণ, আওয়ামী লীগ নেতারা দায়মুক্তির সাথে হিন্দু সম্পত্তি জবরদখল করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ছাড়া ভারতের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্য করা হলেও কিছু বলবে না”।

    ছয়. বিএনপির প্রতি সহানুভূতিঃ
    পিনাক রঞ্জনের দু-দুটি প্যারাগ্রাফ ধরে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিমূলক ভাষায়, “তারা হাসিনা সরকারের হাতে নির্যাতিত” এই পটভূমি তৈরি করে লিখেছেন,
    “তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে বিএনপি”। অর্থাৎ বিএনপির সম্ভাব্য আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তিনি পরের প্যারাগ্রাফে আরো লিখেছেন, “কয়েক দিনের মধ্যেই আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে। তা ঘটলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়বে”। পিনাক রঞ্জন এখানে গণক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে উঠতে চাওয়া তাতপর্যপুর্ণ।
    এখানে পাঠককে একটু সাবধান করার আছে যে, এখনই কোনো “সরল” সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঝাপিয়ে পড়ার কিছু নেই। ওয়েট অ্যান্ড সি। বরং অবজারভ করেন মন দিয়ে। পিনাক রঞ্জনের ভাষা ও বক্তব্যের মধ্যে সত্যিই কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না এই বিচার্য বিষয়ে, এতটুকুতেই আপাতত থাকাই ভাল।

    সাত. আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির ভেতরে কথিত ভাঙনের গুজব ছড়ানোর দায় আনাঃ
    পিনাক রঞ্জন “আগে দেখা যায় নাই” এমন বেশ খোলাখুলিই লিখেছেন,
    “বিএনপির প্রবীণ নেতারা তারেককে অপছন্দ করেন। তারা নেতা হিসেবে খালেদাকেই অগ্রাধিকার দেবেন। বিএনপির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা রয়েছে, এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে ভাঙনের মাধ্যমে নতুন দলের আবির্ভাব ঘটতে পারে। সম্ভাব্য ভাঙনে আওয়ামী লীগের হাত আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে”।
    এই ভাষ্যে লক্ষণীয় বিষয়টা হল,  বিএনপি নিয়ে এত কথা পিনাক রঞ্জন লিখেছেন অথচ ২০০১-০৬ সালের বিএনপি সরকারের কোনো কাজ বা পদক্ষেপের কোনই সমালোচনা নেই। এমনকি, দশ ট্রাক অস্ত্র অথবা কথিত জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেয়ারও কোনো অভিযোগও তিনি তোলেননি। এটি কোন ভারতের কূটনীতিক ও সাবেক হাইকমিশনারের জন্য চরম সীমাহীন ব্যতিক্রম। বিশেষ করে ঠোঁট কাটা অ-কূটনীতিক-সুলভ মন্তব্যের জন্য যেই পিনাক রঞ্জন খারাপভাবে খ্যাত।

    আট. নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার অভিযোগঃ
    এই অভিযোগটা তুলেছিল মূলত বিএনপি। কিন্তু পিনাক রঞ্জন সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে তুলে এনেছেন। তবে অবশ্যই “নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার” এই অভিযোগ যে কোন নির্বাহী সরকারের বিরুদ্ধে খুবই মারাত্মক। তিনি লিখেছেন,
    “‘বিএনপির নির্বাচনী প্ল্যাটফর্মের মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি। দলটি অভিযোগ করছে, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রেখেছে”।

    পিনাক রঞ্জনের লেখায় মূল অভিযোগ মূলত এগুলোই। তবে কামাল হোসেনের যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে হাসিনার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মন্তব্যেরও পিনাক সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে একটি শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। ব্যাপারটা হল, অনেকটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব কিছুতেই ভারতের নিরন্তর দাদাগিরি ও হস্তক্ষেপ আর নিজের একক স্বার্থে মাখনটুকু নিয়ে যাওয়া ইত্যাদির গত দশ বছর ধরে এমন আচরণ – এসব কিছুকে ইঙ্গিত করে এটাকেই তিনি ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে বুঝাতে চেয়েছেন, আর তা করেছেন অনেকটা ক্ষমা চেয়ে নেয়ার ভঙ্গিতে। যেমন নিজে থেকেই প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন,
    “বাংলাদেশ ও ভারতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিএনপির হাসিনাকে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নতজানু দেখানোর সম্ভাবনা থাকায় ভারত ফ্যাক্টর হবে বিপুল। প্রধান সমালোচনা হবে, হাসিনা ভারতকে খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন অতি সামান্য”।

    অর্থাৎ পিনাক রঞ্জন এখানে নিজে থেকেই হাসিনার ভারতের সাথে ঘষাঘষি (মুল ইংরাজীটা ছিল kowtowing); যেমন বলেছিলেন “pillory Hasina of kowtowing to India” –  মানে ভারতের সাথে ঢলাঢলিতে গায়ে পড়া হয়ে সব দিয়ে দেওয়া্র দায়ে হাসিনাকে কাঠগড়ায় তোলা – এর সুযোগ আছে বলে পিনাক রঞ্জন নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। তাই এই ভাষা বা অর্থ দিয়ে তা পিনাক রঞ্জন নিজে থেকে আঁকছেন।  খুব সম্ভবত এর কারণ সাধারণ মানুষের ক্ষভ প্রশমন ও তাদের সহানুভুতি সংগ্রহ। তাই পিনাকে এই অংশের “উপস্থাপন” সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ।

    আবার ভারতের পানি না দেয়া ইস্যু নিজেই তুলে বলছেন, “নদীর পানিবণ্টন এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেলেও তা কাটিয়ে ওঠা যাবে না এমন নয়“।
    এ ছাড়া, আসাম নাগরিকত্ব ইস্যুতে মিস্টি প্রস্তাবের সুরে বলেছেন, “…দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে উদ্বিগ্ন করবে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এনআরসি থেকে সৃষ্ট অনিবার্য প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে”।

    সোজা কথায় রাখঢাক না করে বললে ব্যাপারটা হল, গত ১০ বছরে ভারতের যত রুস্তমি, প্রভাব বিস্তার বা বর্ডার কিলিং থেকে শুরু করে তার যা দরকার তা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, ভারতের স্বার্থ সবার উপরে এই নীতিতে এভাবে ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ যে চরমভাবে ক্ষুব্ধ, সে সম্পর্কে পিনাক রঞ্জন সচেতন – তাই জানা গেল। তবে এখানে তিনি ইঙ্গিতে যা বলতে চাইছেন, তা যদি আমরা বুঝে থাকি তা সম্ভবত এমন যে, তিনি বলতে চাইছেন, সম্ভাব্য নতুন সরকার এলে পুরানা সব ভুলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যাত্রা করা যেতে পারে।
    বলা বাহুল্য, মি. পিনাক রঞ্জন আসলে এখানে অনেক ফাস্ট। ফলে অনেক দূর আগেই কল্পনা করে ফেলেছেন। তাই দ্রুত অনেক আগে চলে গেছেন আর খুবই “সরল” আর প্রায় ‘খ্রীষ্টীয় ইনোসেন্ট’ ধরণের সব নানান ভাষ্য হাজির করেছেন। বাংলাদেশে গুম হওয়া কোনো মানুষ ভারতের মাটিতে পাওয়া যাওয়া কি আসলেই এতই সরল আর ইনোসেন্ট? পিনাক রঞ্জন নিজেকেই এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন! ফলে পিনাক রঞ্জন খুব গভীর সচেতন তা বলতে পারছি না। তবে তাকে অনেক গভীরে চিন্তা করতে হবে আর স্বভাবতই তাতে অনেক কাঠ এবং খড়ও পুড়বে।

    সবশেষে পিনাকের রচনার শেষ প্যারাগ্রাফের চারটি বাক্য সম্পর্কেঃ
    প্রথম বাক্যঃ
    বাংলাদেশে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করুক এর বিরুদ্ধে ভারতের আপত্তি ঈর্ষামূলক ও ক্ষতিকর তা কি ভারত এখন বুঝেছে? মনে হয় না কারণ, আমরা কোথাও এমন কিছু দেখিনি। ফলে তার শেষ প্যারাগ্রাফের প্রথম বাক্য –
    “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পূর্ণ বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর আরো একীভূতকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র আরো আধুনিকায়ন, মোটরযান চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ভবিষ্যতে আরো জোরালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে”   – এই আশার কোনো ভিত্তি নেই। খামাখা ইউজলেস। নন স্টার্টার!

    দ্বিতীয় বাক্যঃ
    “ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে”।
    এই বাক্য থেকে আমরা হাসিনা সরকার যে দুর্বল দুস্ত অবস্থায় আছে, তাই সম্ভবত তিনি বুঝতে চাইছেন মনে করতে পারি। কিন্তু ২০১৩ সালে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফর, তাঁর মাতব্বরি ও নোংরা হাত ঢুকানোর সাথে এই বক্তব্যের কোন মিল খুঁজে পাই না। সুজাতা ফরমান জারির মত করে বলেছিলেন, “যারা নির্বাচনে আসবে তাদের নিয়েই নির্বাচন হবেই” আর এরশাদ যেন বিরোধী দলের জায়গা পূরণ করে। সেটা তাহলে কেন বলেছিলেন? কেন তখন বলতে পারেন নাই যে, ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে? বাস্তবতা হল, তিনি তা পারেন নাই। তাহলে এখানে প্রশ্ন উঠবেই যে এখন কেন পিনাক রঞ্জন একথা বলছেন? এটার অর্থ কী এই যে ভারতের “বাংলাদেশ নীতি” বদল হয়ে গেছে? কিংবা পুরান প্রেম ও পছন্দের সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে চাইছে – আর ভাল লাগছে না বলে, তাই কী? পিনাকের কথার অর্থ কোনটা করব? পিনাক নিজেকেই সবার আগে এসব বিভ্রান্তি খোলসা করতে হবে।

    তৃতীয় বাক্যঃ
    “তাই বলে কোনো হাসিনাবিরোধীকে ভারত বিকল্প মনে করছে, এমন কিছু ভাবা হবে কষ্টকর কল্পনা”। বোঝা গেল এটা পিনাকের ‘সংবিধি সতর্ককরণ’ বা একটা “ডিসক্লেমার” দিয়ে রাখা যে ভারত বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে ব্যাপারটা এমন সরল না। নো প্রবলেম। আমাদেরও এমন তাড়া নাই!

    চতুর্থ ও শেষ বাক্যঃ
    “অবশ্য, হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়, ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে”।
    সরি মি. পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী; এটা এভাবে বলতেই হচ্ছে যে “ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়” – আসলে এটাই হল আপনাদের ঘুরিয়ে বলা যে কাজ ফুরিয়েছে, শেখ হাসিনা ক্রমেই এখন লায়াবিলিটি বলে অনুভূত হচ্ছেন, আপনাদের কাছে। বলাই বাহুল্য, আসলে এমনটাই হয়ে থাকে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

    উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

    গৌতম দাস

    ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

    http://wp.me/p1sCvy-2hx

    গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

    এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

    অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

    চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

    নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
    ২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

    কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
    The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

    এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

    সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

    প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

    গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

    [প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

    ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

    গৌতম দাস

    ২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

    http://wp.me/p1sCvy-2hm

     

    ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

    “I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

    তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

    গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

    আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

    গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

    আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

    সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

    আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

    মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

    কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

    গৌতম দাস

    ২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

    কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

    ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

    কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন ও ২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
    এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
    এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
    তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

    এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

    দুইঃ
    হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
    অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
    এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
    সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

    কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

    মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
    আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
    তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
    ‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
    একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

    তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

  • শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

    শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
    গৌতম দাস
    ০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

    শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

    তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

    ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
    কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
    খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
    বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

    শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

    না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

    মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

    [এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

    লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

    সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

    এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

  • যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    গৌতম দাস
    ১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
    http://wp.me/p1sCvy-1uG

    গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
    পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
    হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
    উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
    এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
    প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

    ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

    তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

    কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

    গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

    সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

    সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com