Category: চীন-ইরান প্যাক্ট

  • ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    গৌতম দাস

    ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৭ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-38a

     

           Chinese Ambassador in India, on Decoupling India-China Economy, YouTube

    ভারত-চীন সংঘাত বা বিতর্ক সহসা মিটছে না। তবে আস্তে আস্তে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আর কী হলে তা মিটতে পারে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত কী গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার গ্লোবাল অর্ডারটা সম্পর্কে বুঝে? যদি বুঝতে পারে তবে এই অর্ডারের  নেতৃত্বে বদলের নির্ধারক সময়কাল হাজির হয়েছে। ভারত এর কোনদিকে থাকতে চায় – এনিয়ে ভারতকে এখনই সিদ্ধান্ত অবস্থান নিতে হবে। এতদিন ভারত দুদিকেই পা দিয়ে থাকার সুবিধা যা পেয়েছিল তা শেষ। তাই পুরানের সাথে গাটছাড়া বেধে শেষ হয়ে যাবে না নতুনের সাথে থেকে নিজের বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে এনিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও নতুন নেতা চীনের সাথে ভারতের না যাবার সম্ভাবনা এখনও বেশ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ ভারত “গ্লোবাল অর্ডার” জিনিষটা ধরতে পারে না। এর কারণ আবার হল, জাতি-রাষ্ট্র চিন্তায় বা এরই সহযোগী চিন্তা  – “স্বদেশীপনা” বা বিদেশী মাত্রই আমার অর্থনৈতিক শত্রু – এই চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা বিজেপি-আরএসএস, এরা কখনই গ্লোবাল অর্ডার বা খোদ গ্লোবাল শব্দটার অর্থ তাতপর্য কখনই বুঝতে পারবে না। কারণ তাদের ‘হিন্দুজাতি’ বা খোদ জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটাই এক [fetish] কাল্পনিক রাজনীতি। এছাড়া এই “জাতি” ধারণার জন্ম ও বিকাশ ও টিকে থাকা সবই ঘটেছিল ইউরোপের কলোনি যুগে ও কলোনি শাসনের পুর্ব-পটভুমিতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষে কলোনি শাসন লুপ্ত হয়ে গেলে এই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে ইউরোপ অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রে অসামঞ্জস্যভাবে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তাতে ভর করেই এগুলো বিকশিত হচ্ছে মনে করা হয়েছিল। আজ গ্লোবাল ইকোনমির প্রধান ধারা আরো বেশি করে  পারস্পরিক লেনদেন বিনিময় বাণিজ্যে গভীরে জড়িয়ে যাওয়া। কারণ এটা ভ্যালু এডিশন শেয়ারের যুগে প্রবেশ করছি আমরা। তাই এই যুগে ঐ পুরানা সুপ্ত “অসামঞ্জস্যতা” প্রকট ভাবে হাজির হচ্ছে। তাই এখকার দুনিয়ায় যে চীন-আমেরিকা বা চীন ভারত যা কিছু হবু সংঘাত  ও টেনশন – এটা জাতি-রাষ্ট্রবাদীদের চোখে নেহায়ত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।  এগুলো যে “গ্লোবাল” মাত্রার সমস্যা, কোন বাই-লেটারাল বা দ্বিপাক্ষিক জটিলতা নয় তা এরা টেরই পাবে না। সম্ভাবনা নাই।

    কোন দুই দেশের সীমান্তঃ কিছু তত্বকথা
    এনিয়ে যে কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকিঃ সীমান্ত বা ম্যাপ কথার আসল মানে হল – সীমান্তের দুই পক্ষের ঐকমত্যে একটাই ম্যাপ যেখানে আঁকা হয় আর ঐ একই ম্যাপের দুটি কপি দুই পক্ষের হাতে ছাড়া তখন  অন্য কোনো ম্যাপ বা এলএসি [LAC] বলে আর কিছু  থাকে না। এটি সম্ভব যখন দুই পক্ষই সীমান্তে একটি শান্ত নীরবতা একটা প্রশান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে আর সেই মেজাজে আসবে। কারণ, অপরের ভুমি দখলের কলোনি যুগ বহু আগেই শেষ হয়েছে।  বিপরীতে কোনো পক্ষ যখন মনে করবে আমি যেটা আমার রাষ্ট্রসীমা বলে বুঝি সেটাই আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ সেখানে সীমান্ত চিহ্নিত করা, একটাই ম্যাপ তৈরি কখনোই ঘটবে না। আর স্বভাবতই এতে দেশের অর্থনীতিতে মানুষের জীবনমানে বাড়াতে মনোযোগে দেওয়ার বদলে নিঃস্ফলা সীমান্তেই সব সময় কেটে যাবে। এটাই ঘটবে কারণ, আপনি অন্যের দাবি উপেক্ষা করে, এর সুসমাধা না করে কোনো ভূমি দখল করে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। কখন টেনশন আসবে আমি জানবেনও না। এখানে চিহ্নিত বা ডিমার্কেশন শব্দের আসল মানে হল – নিজেই নিজের রাষ্ট্রসীমা বলে এককভাবে কিছু দাগানো- একবারেই নয়। বরং পড়শিকে সাথে নিয়ে দাগানো। যাতে দাগাবেন একবারই। এরপর এ নিয়ে কেবল শান্তি আর প্রশান্তিই অর্জন করবেন।
    এ লক্ষ্যেই আপনাকে কিছু হোমওয়ার্কও করতে হবে। কারণ ডিমার্কেশনের আলোচনা মানেই মূলত গিভ অ্যান্ড টেক। পেতে হবে আর ছাড়তেও হবে। কী কী আপনাকে পেতে হবে তা বাদে বাকি সীমানা-বিতর্কে সব খানেই ছাড় দিতে বা নিগোশিয়েট করতে রাজি আছেন এটি বুঝায় দেন। প্র্যাকটিশটা উভয়পক্ষ করলে সহজে কাজ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন আপনি শুধু না, উভয়পক্ষেরই প্রশান্তি লাভ প্রধান লক্ষ্য। সত্যিকারের ডিমার্কেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। গিভ অ্যান্ড টেক শেষে একটি ম্যাপ আঁকতে এসেছেন। কারণ, সামরিক শক্তি দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, ডিমার্কেশন করা যায় না।

    [একটু অফসাইডে এটা মূল প্রসঙ্গের বাইরের কিছু কথা। ফলে নিচের এই প্যারা আপনি বাদ দিয়ে রেখে ব্রাকেটের শেষে আবার পড়া শুরু করতে পারেন।]

    [ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্টঃ আজকের কথা শুরু করার আগে ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্ট, তাই গুরুত্বপুর্ণ কিছু বাড়তি কথা যোগ করব এখানে। যখন লিখছি তখন সময়টা ৫ আগষ্ট ২০২০ এর দিবাগত রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের দিকে যাচ্ছে যাতে আইনত ৬ তারিখ শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আর আমার এই বাড়তি প্রসঙ্গ হল, আজকের ভারতের জন্য ঘটনাবহুল “৫ আগষ্ট”।  ৫ আগষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য নির্ধারক দুটা কারণে।
    এক, কাশ্মীর যে আইনি সুত্রে  ভারতের সাথে আগে একভাবে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হত সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করে মোদী-অমিত গতবছর এদিন থেকে সংসদীয় ততপরতা শুরু করেছিল। আর এরপর শ্রেফ গায়ের জোরে ঘোষণা করেছিল যে কাশ্মীর এখন থেকে ভারতের সরাসরি অংশ। অতএব এদিন হল দখলদারি ও নতুন হত্যার প্রথম বার্ষিকী। আর দুই, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সে জায়গায় রামমন্দির বানানোর জন্য এর ভিত্তিপ্রস্তত স্থাপনের দিন;  মোদী ও তাঁর দলবলেরা এই ৫ আগষ্টকেই এর দিন হিসাবে ঠিক করেছে, যার নাম দিয়েছে ‘ভুমি পুজার” দিন।
    কিন্তু এদুই দিক থেকে আজ এসবের মাহাত্ম বা তাতপর্য নিয়ে কথা বলব না, ঠিক সেটা আমার প্রসঙ্গ না।  প্রসঙ্গ হল, আমরা স্বীকার করি আর নাই করি ভারতের রাজনৈতিক জগতে বড় বড় কিছু গভীর রাজনৈতিক সংকট আছে। যেটাতে সময় না দিলে তা ভারতরাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্কট হয়ে হাজির হতে পারে।  যেগুলোকে শুধু সংকট বা ক্রাইসিস না বলেও কিছুটা ইতিবাচক শব্দে একে চ্যালেঞ্জ – ভারতের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলা যেতেও পারে। সেই প্রেক্ষিতে, এই ৫ আগষ্টকে, ইতিহাসে লেখা হবে এই বলে যে যেদিন থেকে ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (ও যারা এদের কোন একের সাথে জোটে সম্পৃক্ত) – বিজেপি ও কংগ্রেস এদের দিন শেষ তা লেখা হয়ে গেছিল। কী অর্থে? না, এদের হাতে আর ভারতের বর্তমান ও আসন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটগুলোর মিটানো বা সমাধান করতে আর কোনই ভুমিকা থাকবে না, তাই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার দিন। কেন?
    তত্বগত বা কিছুটা কঠিন ভাষায় বললে, বিজেপি চীনের সাথে কথিত সীমানা লড়াইয়ে হার স্বীকার করে  নেওয়াতে এনিয়ে কোন নির্বাচনে আর এটাকে ইস্যু করে সুবিধা হবে না। তাই ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বদলে “হিন্দুত্বের বিজয় ও গর্বের” উস্কানি তুলে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে ভোট চাইবে মোদী ও বিজেপি। অর্থাৎ এবার মাঠের ভাষায় বললে, মোদী ও বিজেপি  – চীন, পাকিস্তান বা সীমান্ত এসব ইস্যু আর ভোট-নির্বাচনে নিয়ে আসবে না, মোদী ভোট চাওয়ার ইস্যু করবে না।  তারা প্রধানত, রামের নামে (মসজিদের উপর রামের মন্দির নির্মাণের বিজয়-সাফল্য, ফলে তারাই আসল রামভক্ত, পুজারী ইত্যাদিতে মিথিক্যাল রামকে বাস্তব বানানোর কারবার), এভাবে ভোট চাইবার রাজনীতি শুরু করবে। মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের সাফল্য হবে বিজেপির প্রধান নির্বাচনি ফোকাস বা অর্জন বলে হাজির করা। এটাই এখন থেকে হিন্দুত্বের বা হিন্দু ভোট মেরুকরণের প্রধান ফোকাস হবে।
    ওদিকে ঠিক একারণের আমরা লক্ষ্য করছি এর বিপরীতে এবার, কংগ্রেসের তাতপর্যপুর্ণ সিদ্ধান্ত হল যে তারাও এখন থেকে  বিজেপির মত হিন্দুত্বের রাজনীতিই করিবে।  এনিয়েই প্রতিযোগিতায় নামবে। ৫ আগষ্ট উপলক্ষ্যে  মা সোনিয়া অথবা ভাই রাহুল নয়, প্রিয়াংকাকে দিয়ে  কংগ্রেস সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে মোদীর মসজিদ গুড়িয়ে এর উপর মন্দির নির্মাণের সাফল্যের  ‘ভুমি পুজার” দিন – এই হিন্দুত্বের ভাগ নিতে কংগ্রেসও এগিয়ে এসেছে। তাই কংগ্রেস মনে করছে, এদিন নাকি কথিত জাতির ইউনিটি, ভাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা প্রকাশ ও উতযাপনের দিন – আর আনন্দবাজার লিখেছে প্রিয়াংকা বলছে রাম নাকি সবার করার দিন, তা সকলের উতযাপনের দিন এই ৫ আগষ্ট। সবচেয়ে ভয়ানক বোকার মত কথা তিনি বলেছেন,  ‘Rab is Ram’।

    “a celebration of national unity, fraternity and cultural affinity” – WIRE.  “রাম সবার” – আনন্দবাজার

    সোজা কথায় মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া এখন থেকে কংগ্রেসের চোখে কথিত জাতীয় উতসব আবার ভাতৃত্বেরও নাকি দিন! এ কেমন জাতি? আর কাদের কাদের মধ্যেইবা ভাই গিরি? সে এক বিরাট বিস্ময়। মোদী-অমিত-মোহন ভাগওয়াত থেকে গোলঅওয়াকারও যেটা সাহস করে নাই, কংগ্রেস এখন থেকে সেই কথিত হিন্দু জাতি, হিন্দুত্ব এসবের ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে যাত্রা শুরু করল।  আর তাকে অনুসরণ করেছে আম আদমি পার্টিও। তাই ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভবিষ্যতে বিজেপির সাথে কংগ্রেসের কোন ভুমিকা থাকবে না তাই নির্ধারিত হয়ে গেল। আর মোদীর বিজয় হল এই যে এখন থেকে (মমতার মত দুএকজন বাদে) সবার রাজনীতির ভিত্তি হল সরাসরি হিন্দুত্ব। ]

    সম্প্রতি ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েদং একটি ভার্চুয়াল বা অনলাইন কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াইর’[WIRE] ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব পত্রিকা, যেটি একালে এক ব্যতিক্রম; উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধবাজ চিন্তাধারী ও হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছে। এই ওয়াইর পত্রিকাও উপস্থিত ছিল। তাদের বরাতে আমরা জানছি, রাষ্ট্রদূত সেখানে মোটাদাগে কী বলেছেন। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্য কিছু কথা।

    ভারত-চীনের বাস্তব সীমান্তঃ
    সীমান্ত বা ম্যাপ নিয়ে তত্ত্বকথা থুয়ে বাস্তবে আসি।   ভারতের অভ্যন্তরে এখন প্রধান আলোচ্য বা তর্ক হল – প্রতিহিংসা – যে কী উপায়ে ‘প্রতিশোধ’ নেয়া যায়।  ভারতের ভাষায় “মুখ-তোর” বা বাংলায় বললে “দাঁতভাঙা” জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে তারা। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, ভারতের চরম জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতির কারণে এর প্রতীক মোদী সরকারকে চীন একেবারে আউলায়ে দিয়ে চরম অপমানিত করে দিয়ে গেছে। যখন অন্তত ২০ সেনার নির্মম মৃত্যুর পর মোদীকে দিয়ে চীনারা বলিয়ে ছেড়েছে – ভারতের ভূমিতে (চীনারা) কেউ  আসেনি, বেদখল হয়নি। যার মানে দাঁড়িয়েছে অন্তত ওই ২০ জন সেনা চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে চীনাদের হাতে মারা গেছে। এরচেয়ে বড় অপমান আর কী হতেপারে! এছাড়া এভাবেই গলওয়ান উপত্যকা পুরাটাই চীনাদের, তাও মোদীকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও আরও অন্যান্য ভূখণ্ডগুলো এখনো চীন ছাড়ল না কেন, কবে ছাড়বে, তাদের মুভমেন্ট কী – এ নিয়ে প্রতিদিন ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট বের হচ্ছে, আর মোদীর উপর চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ ভারতের সব মিডিয়াই জানে তারা একটা ‘জুয়াচুরি’ খেলছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি হয় যে চীন, ভারতের কোনো ভূখণ্ডই দখল করে নাই। তবে এই যে প্রতিদিন রিপোর্ট লেখা হচ্ছে যে, চীন ভারতের ভূখণ্ড, অমুক লেক, অমুক ভূমি ছেড়ে যায়নি – এই এসবের কী কোনো মানে আছে? সত্যতা আছে?  প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষী যা দখলই হয় নাই তা আবার চীন ছেড়ে যাবে কী করে? দাবি করাই বা কেন?

    তাহলে কোনটা সত্য? চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল নেয়নি? নাকি এখনকার মিডিয়া রিপোর্ট। ফ্যাক্টস হল, সারা ভারত জানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদের মোদী এখানে সোজা  মার খেয়ে হেরে গেছে। জাতিরাষ্ট্রবাদী চিন্তায় যা এতদিন খুবই সহজ কাজ মনে করা হয়েছে যে যেকোন সীমান্তবিরোধকে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনে “ভুয়া হিন্দুত্বের বিজয়” বা দেশপ্রেম হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু পোলারাইজেশন ভোট ঘটানো চলে এসেছিল অথচ, আজ এখানে প্রমাণ হয়েছে এটা কত বড় আত্মঘাতী, এরই বড় প্রমাণ আমরা এখানে পাই।

    অথচ সীমান্তবিরোধকে তথাকথিত ‘জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর কী আছে? সীমানা বিরোধকে মিটানোই দুই দেশের ডায়লগ সহ সবকিছুর লক্ষ্য, এটা তো কারো কোন “ভূমি বিজয়” একেবারেই নয়। দ্রুত যেকোনো সীমানা বিরোধ বা বিতর্ককে কথিত ‘হিন্দু জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর মোদীর হিন্দুত্ব – এ ব্যাখ্যার কবলে পড়ে মোদীর অপমান এবং তার হিন্দুত্বের পতন বা মার খেয়ে যাওয়া এটাকেই এখন সারা ভারতের অপমান ও মার খেয়ে যাওয়া বলে হাজির করার কসরত চলছে। এছাড়া সারা ভারত জানে সামরিকভাবে  প্রতিশোধ নেয়ার অবস্থায় বা মুরোদে ভারত নাই। তাহলে?

    কোয়াড’ আসছেঃ
    অতএব  উপায়ন্তহীন মোদী এখন আরেক স্বপ্ন ছড়িয়েছেন – ‘কোয়াড’ [QUAD] আসছে। তারাই নাকি ভারতকে এবার প্রতিশোধ নিয়ে দেবে। এই কোয়াড কারা? কোয়াড শব্দের  এক সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা হবে চতুষ্টয় বা চারটা; মানে  চার মহাজন। তবে এখানে সুনির্দিষ্ট করে এর অর্থ চার রাষ্ট্রজোট – ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জন্ম থেকেই চলছে এর নানান উত্থান আর পশ্চাদ অপসারণ। জাপান এর জন্ম প্রস্তাব দিয়েছিল বাকিদের কাছে। কিন্তু তা দেয়ার পর ১০ বছর এর আর খবর ছিল না। এরপর ২০১৭ সালে যদিওবা এর জন্ম দেয়া হল, তাও সেটি কাকের ঘরে কোকিলের জন্মের মত করে। মানে ফিলিপাইনে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তারা আরও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে এক  ‘আসিয়ান সম্মেলন’ করতে এসেছিলেন। কিন্তু এর ফাঁকে মানে সাইডলাইনে বসে জন্ম দিয়ে ফেলেছিলেন কোয়াড নামে এক ব্লকের। কিন্তু তাতেও আবার জন্মাইছেন এ খবর সামনে আনতে প্রথম বিবৃতি দিতে গিয়েই ধরা। সেই মূল বিবৃতিটা চার দেশ চার রকমভাবে নিজেদের কথা ঢুকিয়ে এডিট করে ছেপেছিল। পরিণতি চারটি আলাদা ভার্সন এর, ২০১৭ সালে ভারতের দা হিন্দুর রিপোর্ট দেখেন এখানে। আর সেই সাথে এনিয়ে ততকালে আমার এক লেখা এখানে – “চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!”।

    তবু এদের মুখে কোয়াড নিয়ে হামবড়া গর্বের ফেনা তোলার শেষ নেই। বলা হচ্ছে – এটি নাকি ডেমোক্র্যাসি’স বা গণতন্ত্রওয়ালাদের জোট। আসলে তারা হল চীনবিরোধী, তাই। আমেরিকার ভাষায় চীনে তো ‘গণতন্ত্র’ নাই, তাই তাদের পোয়া বারো।  আর তাতেই চীনবিরোধী  বলে ঐ চার রাষ্ট্র নিশ্চয় “ডেমোক্রেসির চ্যাম্পিয়ান”।  নিজেরা কী তা বুঝানোর এটাই তারা তরিকা হিসেবে নিয়েছে। অথচ ঘটনা হল, জন্ম থেকেই এই ডেমোক্র্যাসি শব্দটা সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাটো বা নিচা করে দেখাতে আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল। আর রাষ্ট্র বুঝাতে ক্লাসিক্যাল মূল শব্দটা হল – ‘মর্ডান রিপাবলিক’, কখনই যাকে ডেমোক্রাসি বলা হয় নাই। তা বাদ রেখে একটু সরিয়ে সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খোঁচা দিতে এই শব্দ হাজির করা হয়েছিল। তো ভালো! কী আর বলব। হিন্দু উগ্র জাতিরাষ্ট্রবাদী মোদী আর তার অনুসারীরা যদি ভারতের কোন মুসলমান নাগরিকের বুকের ওপর উঠে; তাদের বুকের হার ভেঙ্গে দিয়ে জবরদস্তিতে তাকে দিয়ে জয় শ্রীরাম বলানোকে তাদের “ডেমোক্র্যাসির” বিরাট নায়ক বলে জাহির করতে থাকেন আর মোদী ঐ ডেমোক্রাসির বিরাট নেতা হন – তাহলে বলতে হয়, হে ডেমোক্র্যাসি দূরেই থাকো, আমার লাগবে না! তা তোমাদেরই থাক। আর অমন ডেমোক্রাসিকে ধিক্কার!
    এর মানে আবার অবশ্যই এও নয় যে, চীনারাষ্ট্র এর কোন অযোগ্যতা বা খামতি নাই। তবে অবশ্যই এই কথিত ‘ডেমোক্র্যাসি’র ফেরিওয়ালারা বিপজ্জনক ও ধান্দাবাজ। এমনই ধান্দাবাজ  যারা আবার নিজেরা চার রাষ্ট্র পরস্পরকেই বিশ্বাস করে না। তো এই ফেরিওয়ালারা ২০১৭ সালে জন্মের পর থেকে ঘুমিয়েই ছিলেন। কোন সক্রিয়তা ছিল না। কিন্তু গত এক মাসে আবার জেগেছে। তাতে চীনাদের হাতে অপমানিত ভারত ও মো্দী যেন তিন দিনের ক্ষুধার্ত লোক যে প্রথম রুটির দেখা পেল। সর্বস্ব হতাশায় ঢুবে যাওয়া ভারতের মনে এবার সবার মনে তাই আশা, এবার মনের জ্বালা মিটবে! কিন্তু আদৌ মিটিবে কী?
    সন্দেহ আছে প্রবল। যেমন জাপানের পত্রিকা নিক্কিই-এর উপ- শিরোনাম হল, Pompeo says ‘Quad is revived’ and calls for democracies to unite। আর শিরোমানে নিজেরাই সন্দেহ রেখে বলছে এটা এমবিশাস, মানে উচ্চভিলাসী – US seeks ambitious relationship with ‘global power’ India.।
    এদিকে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি হচ্ছে এই খবর বাজারে এসে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সমতুল্য) মাইক পম্পেও ইউরোপে গিয়েছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়াতেও যান। কিন্তু ২৯ জুলাই পম্পেওকে অষ্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, “চীনবিরোধিতা প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া আমেরিকাকে আংশিক সাপোর্ট দিবে” [Australia gives US partial support against China]। এই হল মিডিয়া শিরোনাম। শুধু তাই নয়, ভেতরে লিখছে পার্শিয়াল মানে কী। বলছে  – দক্ষিণ চীনসাগরে চীনবিরোধী জোটের মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া যোগ দিবে না। আরো আছে। চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়া গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক সে অটুট […pursue policies independent of both the US and close trade ally China.] রাখবে। আর লাগে কিছু? বোঝা গেছে না!

    ঘটনাটি তাহলে কী? কোয়াড ব্লক দাঁড়ায় না কেন? অথচ ইন্ডিয়ানরা এত ভরসা করে বসে আছে! এমনকি ফিলিপাইনে থাকেন এক ভারতীয় অরিজিন হায়দারিয়ান সম্ভবত খ্রিষ্টান, তিনি এশিয়া টাইমসে লিখেন। তিনিও প্রবল উৎসাহে গত সপ্তাহে ২৭ জুলাই কোয়াড নিয়ে রিপোর্ট লিখছেন এক আকাশ ফাটানো শিরোণামে Quad alliance forms ‘arc of democracy’ around China। কিন্তু লেখার মাঝখানে নিজেই লিখছেন, কিন্তু চীনের সাথে ব্যবসায় লাভালাভের স্বার্থে ইন্ডিয়া আর অস্ট্রেলিয়া এরা কখনো চীনবিরোধী এই জোটে সক্রিয় হয়নি ……India and Australia were until now often reluctant to participate in an ostensibly anti-China alliance.।

    তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
    একটা মৌলিক দিক নিয়ে কথা তুলব। সে শব্দটা হল অবজেকটিভ। কিন্তু এর মানে কী? ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি এধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু মানুষ কি কখনো এর বিরুদ্ধে, যেন দুর্যোগ থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে লড়াই-এর চিন্তা করছে – এমন কী আমরা কখনো দেখেছি? অবশ্যই না। বরং আমরা সবসময় দেখি এধরণের খবরটা জেনে নিয়ে মানুষ এবার এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় কী করে; যাতে লক্ষ্য থাকে কত কম ক্ষতিতে এটি পার করা যায় কিভাবে। মানে কোনো লড়াই নয়, বরং একভাবে একে স্বাগত জানানোই বলা যায়। এগুলোকেই আমরা অবজেকটিভ ঘটনা বলতে পারি। যা অবজেক্টের উলটা  সাবজেক্ট – মানে কর্তা মানুষের কারণে ঘটে না। (যদিও লোভে অজান্তে করে বসতে পারে।)  এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা। এই অবজেকটিভ ঘটনাগুলোর প্রতি সাবজেক্ট মানুষের আচরণ সবসময় সব কালেই পুর্বনির্ধারিত। আর তা হল  অধস্থন, অবজেকটিভিটির বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া।  অবজেকটিভ ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো বোকামি। তাতে সেটাকে প্রাকৃতিকতা বলেন কিংবা স্পিরিচুয়ালিটি বলেন – এমন কোন ফারাক নাই।  তবে এপ্রসঙ্গে একজনের নাম ও পরিণতি মনে করতে পারেন  – রবার্ট ম্যাকনামারা Robert S. McNamara । আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী (সমতুল্য) ভিয়েতনাম যুদ্ধের কু-নায়ক ও কেমিকেল অরেঞ্জ বোমা ফেলায় আজীবন সকলের বদ-দোয়া প্রাপ্ত খলনায়ক তিনি। যার কারণে এখনও ভিয়েতনামে বিকলাঙ্গ বাচ্চা পয়দা হচ্ছে, কেউ জানে না কার বেলায় কোন হবু বাচ্চার সেটা হবে।ম্যাকনামারা ছিলেন অবজেকটিভিটির সাথে লড়তে যাওয়া কুখ্যাত বোকা। অতএব, সব সমাজের দুরছাই নিন্দা এড়াতে জীবনের শেষ বিশ বছর তিনি নিজেকে ঘরে বন্দী করে কথা না বলে কাটিয়েছেন।
    তাহলে সারকথাটা হল, অবজেকটিভিটি প্রসঙ্গে সাবজেক্ট মানুষ হিসাবে আমাদের ভূমিকা নির্ধারিত। তা হল- কোনো লড়াই বা যুদ্ধ একেবারেই নয়, বরং পাশ কাটিয়ে থাকা যতটা সম্ভব যাতে ক্ষতি কম হয়। বলা যায়, তাই আমরা এ ধরনের অবজেকটিভ বা ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনার সাথে আমরা ভুলেও লড়তে যাই না। এটি আমাদের কাজও নয়।
    ওদিকে আরেকটা ধারণা হল “গ্লোবাল”; মানে – একটি গ্লোবাল সিস্টেমের প্রয়োজন শুরু হয়; যেকোনো দুটি রাষ্ট্রের পণ্য বিনিময় বাণিজ্যের লেনদেনের প্রয়োজন মিটাতে। কেন? কারণ ওই লেনদেন বাণিজ্যে দুই রাষ্ট্রের কারো মুদ্রা দিয়েও বাণিজ্য চালানো যায় না। মুদ্রামান, বিনিময় হার জানা ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। এখান থেকেই গ্লোবাল মুদ্রা, এর মান এক ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয়তা্র অনুভব ও তা মিটানোর শুরু।
    সময়কাল ১৬০৭-১৯৪৫, এই প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি দখলের আমলে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ খুবই সীমিত ছিল। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর চালু ছিল না। কিন্তু এই ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়া প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে। আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায়’ মেজর লেনদেনের মুদ্রা এখনো ডলার, আর এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মালিকানা শেয়ারও ঐ আমেরিকার হাতেই। বিগত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা নেতার অবস্থান নিয়ে আছে। যদিও এ প্রভাব ইদানীং কমে আসছে, বিপরীতে চীন সে জায়গা নিয়ে ক্রমেই উঠে আসছে। আমাদের বক্তব্যের ফোকাস হল – এই দুই দেশের উঠে আসা বা পড়ে যাওয়াটা যত না সাবজেকটিভ, এর চেয়ে ঢের ঢের বেশি এটা বস্তুগত, তাই অবজেকটিভ ঘটনা। দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজির সঞ্চিতি বা একুমুলেশন একেক সময় মুখ্যত একের দেশের হাতে, নানা কারণে ঘটেছে। এটা আবার সহসাই চলেও যায় না। আবার, কবে আসবে কবে নাগাদ যাবে তাও আন্দাজে বলা যায় না।  অতএব যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানো যাবে না। চীনের উত্থানের বড় দিকগুলোই এক অবজেকটিভিটি।
    কিন্তু এরপরও মোদীরা জিদে ধরা যাক যুদ্ধের দিকে ঘটনা গড়িয়ে দিল। কিন্তু আর ঘটনা বৈশিষ্ট হল যতই নাবুঝা কল্পনায় বলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা – এগুলো কিন্তু ভুয়া আর মিছা -পুরাটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনায় ঠাসা যখন পারমানবিক অস্ত্র কথাটাই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এখন প্রধান বিবদমানদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে। অতএব এখন যুদ্ধ মানে সে্টা খুবই সীমিত পরিসরে রাখতে হবে; কারণ তা কোনোভাবেই যেন পারমাণবিক উস্কানির দিকে না যায় তা দুপক্ষকেই মনে রাখতে হবে। যতই জিদ উঠে যাক সীমিত যুদ্ধে থাকতেই হবে। সীমিত যুদ্ধ মানে তা আপস মিটমাটের রাস্তায় নিতে সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে বেশি অর্থনীতির ক্ষতি হবে চীন বাদে বাকি সবার। কারণ, চীনের ক্ষতি সামলানোর দিক থেকে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বলা যায় শুরু। কেন?

    কারণ, এই কথিত ডেমোক্র্যাসিসরা তাদের ভেঙেপড়া অর্থনীতি আবার চাঙা ও পুনর্বাসন করতে দুনিয়ায় সাহায্য পাবার মত একমাত্র শক্তি বেঁচে থাকবে চীনই। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখতে পারেন ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধে হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যারাই আমেরিকার পক্ষে ছিল; সবাইকে যুদ্ধের খরচ দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও। আবার যুদ্ধ শেষে পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে সকল্কে, ধার দিয়েছে সেও ঐ আমেরিকাই। এছাড়া সে যুদ্ধ শেষে আবার পরাজিত হিটলারের জার্মানি, তার বন্ধু জাপান বা ইতালি এদেরও পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে ঐ আমেরিকাই। ইতালিতে তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুসোলিনি যুদ্ধ করেছিল; ইতালীয়রা সেই আমেরিকার কাছেই ভিক্ষা চেয়েছিল, দুই হাত তুলে তাদের গডের কাছে মিনতি জানিয়েছিল আমেরিকাকে সুমতি দিতে এবং আমেরিকাও হাত খুলে সাহায্য এবং পুনর্বাসন সব কিছু অর্থ ঋণ-অনুদান দিয়েছিল। কাজেই……।

    দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। ইতিহাস পড়েন, একই ভুল দ্বিতীয়বার করার মানে হয় না। রেললাইনে মাথা দিয়ে আবার বুঝার দরকার নেই যে মাথা কাটা যাবেই। কাজেই প্রথম কাজ বুদ্ধিমান হন। জিদ ত্যাগ করেন, প্রতিশোধের স্পৃহা ত্যাগ করেন। এটি নেগেটিভ এনার্জি। এটা কমবেশি সবার ক্ষতি করবে। মূলকথা, মানুষের স্বভাব বা কাজ না অবজেকটিভিটির বিরুদ্ধে লড়া। নিজের স্বার্থের জন্য লড়বার আরো অনেক পথ আছে, সেগুলো খুঁজেন, ইনোভেটিভ হন। রাস্তা পাবেন। কেবল সতর্ক থাকেন কোনগুলো ধ্বংসাত্মক, তা এড়ায় চলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা (থিওলজিতে বিশ্বাসী লোকেরা বলবে আল্লা চাহে তো) আস্থা রাখেন দিন আপনারও আসবে!

    কিন্তু এখনই একটি পরীক্ষা করে নেন। আমেরিকার ট্রাম্প যে কোয়াডের পিছনে তাল দিচ্ছেন তাতে তিনি নিজে থাকবেন তো? নাকি? ২০১৭ সালে জন্মের সময় ট্রাম্পের আমেরিকা কিন্তু পালিয়েছিল। কারণ সেবারই সবার আগে ট্রাম্পের চীন সফর ছিল। সমস্যা হয়েছিল চীন ঠিক কত কী বাজারসুবিধা দিতে রাজি; তা ক্যালকুলেট করতে সময় লাগছিল বলে তত দিনে ট্রাম্প ফিলিপাইনে এসে কোয়াডের জন্ম ঘোষণা করে দেয়ার পরই চীন থেকে বাজারসুবিধা দেয়ার তালিকা এসে পড়াতেই ট্রাম্প আর কোয়াডের পক্ষে থেকে শক্ত অবস্থান নিতে যা কথা হয়েছিল তা আর এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও হাজির করতে রাজি থাকেননি। আর তা থেকেই অন্তত তাদের যৌথতায় – তাতে ভাঙনের একটি কারণ।

    তাহলে এবার? এবারো আমেরিকাকেই পরীক্ষা করতে বলছি। মূলত ট্রাম্প চীনবিরোধী যত গরম গরম কথা বলেছেন – সেগুলার মধ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি এর কোনগুলো বা কত শতাংশ আর কতটা ট্রাম্পের নির্বাচনী ভোট টানতে চেয়ে বলা হচ্ছে –  তা আগে পরিষ্কার হতে নেন। কেন?

    সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যে “কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন থেকে তড়িঘড়ি করে সব খুলে ফেলার চাপের কারণেই মূলত ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে”। এ জন্যই দেড় লাখের বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এটা ট্রাম্পের চরম ব্যর্থতা কী না? তাই ট্রাম্প প[আলিয়ে বেড়াচ্ছেন।  ট্রাম্পের প্রতি ঠাট্টাগুলো লক্ষ্য করেন, আর কত লোক মরলে পরে আমেরিকা মহান (great) হবে?  আর ততই তিনি ভোটারদের মধ্যেও এই মনোভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি এখন উঠতে বসতে  চীনবিরোধি গরম কথা বলছেন। “চীনা ভাইরাস” বলে নিজের সব দুর্ভাগ্যের জন্য সব কিছুর জন্য চীন দায়ী বলে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা তুঙ্গে নিচ্ছেন। কাজেই কোনটা চীনবিরোধী রাষ্ট্রের পলিসি অবস্থান আর কোনটা ট্রাম্পের ভোটের বাক্স ভরানোর প্রপাগান্ডা তা একমাত্র আলাদা হয়ে যাবে নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনের পর। এর আগে পর্যন্ত এটা মাখামাখি হয়েই থাকবে।  কাজেই মোদী যে আমেরিকার উপর আস্থা বিশ্বাস রাখছেন ঢালছেন – এর ভিত্তি ঠিক আছে তো?

    আবার দেখেন ট্রাম্প সরকারের আয়ু মূলত আর তিন মাস। কারণ নির্বাচনী ফল হয়ে যাওয়ার পর সেটা মূলত রুটিন সরকার। তাহলে এই তিন মাসের জন্য পম্পেও এর এত দৌড়াদৌড়ি, কোয়াডের প্রপাগান্ডা এটি কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এগুলো একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যদি এগুলো সবই নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে করা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পম্পেওর দৌড়াদৌড়িও – সেটাও খুবই পারফেক্ট টাইমিং। কিন্তু মোদীর জন্য তাহলে কী হবে? হিন্দু জাতিবাদী মোদী ও তার সকল সমর্থকরা এদের জন্য কী হবে? হতাশায় আত্মহত্যা বাড়াবেন? এটা হতেও পারে!

    ওদিকে আরেক ঘটনা তৈরি হচ্ছে। এখন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় বিদ্বানেরা কিভাবে চীনের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি লাগানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে তাদের দিন যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে উপরের জনপ্রিয় আলাপটা হল, চীনের একচীন নীতি বা তিব্বত বা হংকং নীতি ভারত না মেনে ভাঙলে চীন কেমন শায়েস্তা হবে – এই হল তাদের আলোচনার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মত খাতির আচরণ করা বা মর্যাদা দেয়া। অথচ এতে প্রধান ভায়োলেশনটা হবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর আগে এক পূর্বশর্ত স্বীকার করিয়ে নেয় যে – তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত ইত্যাদি এগুলো কোনো স্বাধীন ভূমি নয়, চীনেরই অংশ বলে গণ্য করতে রাজি হতে হবে। অর্থাৎ এই বিদ্বানেরা বলতে চাইছেন; তারা মোদীর ভারতকে পরামর্শ দিচ্ছেন – যার সোজা মানে মোদী যেন চীনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। কিন্তু এত দূর পরিণতি কী তারা মেপে কথা বলছেন? আমরা নিশ্চিত নই।

    যাই হোক, উপরে ভারতের চীনা রাষ্ট্রদূতের কথা বলছিলাম। তিনি ওই আলাপে এ প্রসঙ্গগুলো নিজেই এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকা বোঝাবুঝি রেখে কাজ করতে পরামর্শ রেখেছেন। ভদ্র ও বক্তব্য নরম রাখতে বলেছেন। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় পক্ষ (মানে চীনা পক্ষও) যেন ভালো আর পুরো বোঝাবুঝি করে এরপর পদক্ষেপ নেয়। তবে ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে তিনি কিছু সোজা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে্টার প্রসঙ্গে বলেই আজকের লেখা শেষ করব।

    মায়েদের দুষ্ট সন্তানকে সামলানোঃ
    কথাগুলো অনেকটা দুষ্ট সন্তানকে সামলাতে মায়েরা অনেক সময় শর্ত দিয়ে কথা বলেন। বলেন যে, পায়েস তিনি আজ রেঁধেছেন, তুলেও রেখেছেন বাটিতে। কিন্তু শান্ত ও বুঝমান সন্তানের মত আচরণ যারা করবে তারাই কেবল ঐ পায়েসের বাটির হকদার হবে। ঠিক এইকথা মনে রাখলে আমরা চীনের পদক্ষেপগুলোর অর্থ বুঝতে পারব।
    চীনের সাথে ভারতের এবারের সঙ্ঘাত মূলত লাদাখ অঞ্চলে। কাশ্মীরেরই ভারত-চীন সীমান্তের অংশ এটা।  কিন্তু এখানেই কেন? কারণ ভারত গত বছর এই ৫ আগস্টই লাদাখেরই স্ট্যাটাস বদলিয়েছে। কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মির ভারতেরই অঙ্গীভূত করে নেয়ার সময়। এই ঘটনাটা বিজেপির হাতে পড়ে কাশ্মির মোদীর কাছে জাস্ট একটা হিন্দু পোলারাইজেশন ঘটিয়ে ভোট পাওয়ার ইস্যু। যাতে মোদী ব্যাপারটাকে ‘হিন্দুজাতির বীরত্ব’ হিসেবে দেখিয়ে আরো বেশি ভোট পেতে পারেন, এরই লক্ষ্য। এতে কাশ্মিরিদের কী পরিণতি হবে অথবা পড়শিদের কাছে কী ম্যাসেজ যাবে এ নিয়ে তিনি পুরো বেপরোয়া থাকবেন।

    যেমন ম্যাসেজ কী গেছে?
    চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ওই যুদ্ধের আগে ও পরে লাদাখ অঞ্চলের বহু অংশই চীন দখলে নিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ১৯৯৩-৯৬  এই সময়টা ভারতের জন্য ছিল খুবই নির্ধারক। এ সময়কালেই লম্বা সময় ধরে চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা চলেছিল। পুরনো ১৯৫৮-৬০ সালের সেই এলএসি দেখিয়ে চীন যেসব ভূখণ্ড দাবি করত সেসব দাবির বড় বড় অংশ ১৯৯৩-৯৬ সালের আলাপের সময় চীন ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেটা চীনের ভাষায়,  শান্ত ও প্রশান্তির কামনা ও আকাক্ষায় ভারতকে পেয়েছিল বলে  দুই দেশের সীমান্ত আলাপে এভাবে এগিয়ে এসেছিল চীন। কিন্তু গত বছর কাশ্মির ও লাদাখের স্ট্যাটাস মোদীর খেয়ালি একক ইচ্ছায় বদলে দেওয়াতে – এটা ওই ১৯৯৩-৯৬ আলোচনার সময়ে তৈরি হওয়া যে পারস্পরিক বোঝাবুঝি তা পুরো উপেক্ষা ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেই চীন মনে করছে। আর ঠিক একারণেই এখন ১৯৫৮-৬০ সালের দাবির এলএসি মোতাবেক সব পুরানা ছাড় দেওয়া ভুখন্ড চীন আবার দখল করে নিয়েছে। সেই ধারণাতে ফিরে গেছে। তাই চীন এখানে পরামর্শে ও ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় যে, ভারত যদি ফের শান্তি চায় বিশ্বাস করাতে পারে – আর যেসব বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনে, তবেই  চীন একমাত্র ১৯৯৩-৯৬ সালের বুঝাবুঝি সীমানা বা এলএসিতে আবার ফিরে চলে যাবে। ভারতকে ভূখণ্ড ছাড় আবার দেবে। নইলে না। আর যদি উল্টা ভারত আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠে আর এক-চীন নীতি ভাঙাসহ নানা হুমকি দিতে থাকে তবে সীমান্ত ১৯৫৮-৬০ সালেরটাই বহাল থাকবে। শান্তি চাওয়া সৎ প্রতিবেশী হলে একরকম আর উল্টাটা হলে আরেক রকম। সারকথা, সিদ্ধান্ত ভারতের। ভারতকেই ঠিক করতে হবে সে কোন পথে যাবে, ঠিক কী চায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৭ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনদিকে যাবে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    গৌতম দাস

    ২০ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-36q

     

    https://www.dailymail.co.uk/news/article-3413556/

    চীন-ইরান এলায়েন্স থেকে গ্লোবাল পালাবদলের শুরু হবে,
    আর ইউরোপের চীনের দিকে ঝুঁকবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলঃ

    বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে “গ্লোবাল অর্ডার” বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে [Global Economic Order] নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী  ও স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও এদুই দেশের গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থের উপর এর প্রভাব থাকবে, এমন অবস্থা হয়ে যাবে। অর্থাৎ এদুই দেশ স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক।

    এনিয়ে মিডিয়ায় দুনিয়াজুড়ে  মন্তব্যের ঢল বইছে। মন্তব্যগুলো মূলত আমেরিকা ও ভারতের ব্যর্থতা বা অকর্মন্নতার  দিকে আঙুল তুলছে আর বলছে এরা দুই হল হারু পার্টি – They are the losers। যদিও লুজার শব্দটা কারোরই শুনতে ভাল লাগে না। তবু তেমনটাই কয়েকটা পত্রিকা লিখছে – ১।  ট্রাম্পের মহাকাব্যিক পরাজয় । ২। এই পার্টনারশিপ আমেরিকার জন্য ভয় পাইয়ে দিবার মত ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ৩। এই প্যাক্ট এশিয়া্র সাথে আমেরিকার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবার বোকা গাড়োলের মত এক মন্তব্যও আছে আর এটা সম্ভবত এই প্যাক্ট নিয়ে আমেরিকার প্রথম সরকারি মন্তব্য। বর্তমানে ইরানের উপর অস্ত্র-ক্রয় বিষয়ে জাতিসংঘের এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে যেটা আগামি তিন মাস পরে অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (বিদেশমন্ত্রী) মাইক পম্পেও বোকার মন্তব্য করেছেন – “এই প্যাক্টই বলে দিচ্ছে আমাদেরকে আবার একটা শক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে“। ঘটনা হল, জাতিসংঘের কাঠামোতে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা যেকোন একরাষ্ট্র  না-ভোট দিয়ে দিলে এরপরে ঐবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত হবার সুযোগই নাই। চীন ইতোমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। এখন এখানে ভেটো ক্ষমতাধর চীন থাকার পরেও এতে পম্পেও-এর এমন আওয়াজ ছাড়ার কোন অর্থ আছে?
    আচ্ছা, আপাতত আর এদিকে আগে না গিয়ে, প্যাক্ট বা চুক্তিপত্রের ভিতরে প্রেবেশ করি।

    চুক্তির খসড়া দলিল তৈরির কাজ শেষ। তবে এখানে খসড়া কথার মানে হল, এর  অনুমোদনের অংশ বাকি বা প্রক্রিয়াধীন যা দুদেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানদের  অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বা কিছু শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এরই ফাঁকে প্যাক্টটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে, তাদের এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে, বলতে হয়। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার এই খসড়া দলিলটা্র কপি চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটা হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকাটার দিক থেকে দেখলে, হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া একটা দলিল ছাপানোতে, এতে  গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা (নিউ ইয়র্ক) টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে, এই ভাবের। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকা এপর্যন্ত  ইরানের উপর দীর্ঘদিন ধরে  যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে তাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের নেতি উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে ভাড়া খাটা আর শত্রুতামূলক কাজ করা। যদিও এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের উপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু টেকনিক্যালি আমেরিকা আমাদেরকে বাধ্য করতে পারে এসুযোগ আমেরিকার হাতে আছে।

    তবে অবশ্যই, আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার করা হচ্ছে এখানে। মূলত “আমেরিকান অবরোধ আরোপ” কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, আমেরিকার ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কোন আন্তর্জাতিক কেনাবেচা করতে পারবে না। কারণ দুই দেশ ডলারে কোন বেচাকেনা করলে “আমেরিকান কোন ব্যাংকের” কাছে যাওয়া ছাড়া এই লেনদেনের একাউন্ট ট্রান্সফার সম্পন্ন হবে না।   অতএব এর প্রতিকারের ব্যাপারটা এখন গায়ের জোর। এই অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে ঐ আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ।  সেটা কেমন, সেদিকে যাব।

    চুক্তিটা ঠিক কী নিয়েঃ
    সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, ইরানের এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিতেও সহযোগিতা নিয়ে সেসব গড়ে নেয়া। (নিউইয়র্ক)  টাইমসের ভাষায়, ইরান ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প হাতে নিবে; এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ এসব বিষয় দেয়ানেয়া করবে। এভাবে ইরান নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তুলবে। আর নেয়া ঐ ঋণ শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করবে। ফলে মোট ২৫ বছর এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা।  টাইমসের ভাষায়, এজন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট [Economic and Security Partnership]। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক  সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হল বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। আর তুলনায় ইরানের এই ঋণ হল গড়ে একাই কেবল নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে, এবং তা ধারাবাহিক ২৫ বছর।

    ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কীঃ
    কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ এজেন্ট পাঠিয়ে (যেটা একালে (2013) আমেরিকান সরকারের স্বীকার করার কারণে প্রতিষ্ঠিত সত্য) ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল, সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল হয়েছিল। এক সবল পালটা থাপ্পর।  আর তাতে লুটেরাদের হাত থেকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট থেকে গেছে, প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের এনার্জি পণ্য, অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয় – এঅবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। ইরানের শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না বেকার, সে দুঃখ সম্ভবত  ঘুচবে এবার।

    উপচে ওঠা প্রভাবঃ
    হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতই কিছু ঘটনা হয়ত। কিন্ত তাই কী? আর এতটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হবে তা অন্যান্য প্রভাবের উপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ ফলাফল পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই “গ্লোবাল অর্ডারে” বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা তাই এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা স্থিতি ছেড়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল – এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতই প্রবল পটেনশিয়াল।

    যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের উপর “অবরোধ আরোপ করে” তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পড়ে পাওয়া চার আনার মত পেয়েছে ও নিয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই (এবং এটাই তখন সব শর্তপুরণ করতে পারে এমন একমাত্র যোগ্য মুদ্রা ছিল) আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হল, কোন না কো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হল, এটাই একমাত্র বাস্তব কার্যকর ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের হাতে তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়েছিল। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নাই।
    তাই  আইএমএফ-স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করে থাকে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে।
    শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও সেকালে চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে এর বিনিময়ে নিজ অর্থনীতি সামলিয়েছে। অবশ্য এছাড়াও ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা অবরোধ আরোপের বাইরে ছাড় দিয়ে রেখেছে। তবে মূলত চীনের সাথে লেনদেনের ভরসায় রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। মনে রাখতে হবে, অবরোধের আরেক ব্যবহারিক মানে হল গ্রামে কাউকে যদি একঘরে করে রাখা হয় – এর প্রভাব একটা রাষ্ট্রের উপর তেমনই। সেটা যাই হোক, এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বর্তমান বিশেষ সম্পর্ক ও  এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। তাদের আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের গোড়ার কথা এটা। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই তা ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র হিসাবে সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এমন যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার লম্বা যৌথ পরিকল্পনা আছে।

    ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কীঃ
    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু ও দাঁড়িয়ে আছে এটাই তারা রিয়েলাইজ করে না। এই ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো তখন এতে অংশ নেয় নাই (আবার আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্য-পদলাভের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা)।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো সেই থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমিতভাবে বার্টারে কিছু পণ্য বিনিময় হত। কিন্তু এভাবে কতদিন?  এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই আইএমএফের সদস্যপদ পায় ও নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধানত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া প্রবলে  শুরু হয়ে গেছে। প্রধানত মানে? মানে হল, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের  সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোন একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটাই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মত। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দোকান কেউ দাড়াতেই পারে না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে ঐ দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এদিকে ইতোমধ্যে  চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে পারায় গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে।

    চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানোঃ

    China's annual average crude oil imports

    Source: China General Administration of Customs, based on Bloomberg, L.P.

    এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হল, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয় [World’s largest Importer]  …..more than 10 million barrels a day last year। মানেই তার পরিশোধ করা এক বড় পেমেন্ট হল জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হল, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ঐ ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা বা গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একবার রাজি হয় ভরসা করে – এভাবে। কিন্তু এর ভিতরে  ইরানকে নিয়ে গোনায় ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে কখনও  দেখায়নি। আর ইরানের কাছে চীনের দেয়া প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মত হতে হবে এই শর্তের।  ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে ইরানের বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাব। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই, কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ইরানের হাতে এর বিকল্প আর কী আছে? ব্যাপারটা হল, পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! এই হল ইরানের বাস্তবতা। যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝা যেতে পারে।

    সেটা যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্প আরো  কড়া অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা (একে তেল পাঠানো রি-সেল করার জন্য) ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত এই প্রথম কোন তেল কিনে নাই। তাও সেটা আবার সকলকেই  কনসেশন রেটে আর ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছিল এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি এমন হলেও এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করায় রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, একথা ইতোমধ্যেই লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হল ততটুকুতেই নয় বরং নতুন এক চীনা গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতে হাজির হতেও বড় ভূমিকা রাখবে। যেখানে ইরান সেই নতুন ক্ষমতার পাশে বুক ফুলিয়ে হাটবে তা বলাই বাহুল্য!  এজন্যই বলা হচ্ছে এই চুক্তি পালাবদলের শুরুর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্যতম হবে ভারতঃ
    ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন ও প্রকাশিত যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দিবে, দিশেহারা করে দিবে। অথচ, এর আগাম কোনো হদিস এই কথিত চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না।  বরং আমরা বিস্মিত হই দেখে যে, হবু-চুক্তি প্রকাশ হবার পরে সবচেয়ে বেশি অহেতুক বাজে কথা বলা হামবড়া লোকটাই এখন সবার আগে মাথা নিচা করেছে। বিসিসিকে এরা যা বলেছে এর সারকথাটা হল, তারা হেরে সব মেনে নিয়েছে। বিবিসি লিখছেঃ

     “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে। মি. চক্রবর্তীর কথায়,”ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি,চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” “আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে – কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।”
    —এরপর আর আমাদের কিছুই কী বলার আছে!

    এর মানে, এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে সব গুটিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরতে মানসিকভাবে তৈরি। কিন্তু ভারতের দুর্দশা তো এতেও শেষ হবে না। এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন কঠিন এক  দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবার মুখে নিয়ে যাবে যেখানে – ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারত যদি আমেরিকা ক্যাম্পে যায় তা গেলে হয়ত সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু সাথে খামোখা অনেক দায় আসবে যেগুলো  আসলে হুদাই পশ্চিমের ব্যাগেজ টানা হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে  সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে বাইরে থেকে সব অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফিরে তবে চীনের টার্মেই ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে।

    আবার উপরে এই যে অবলীলায় বলছেন,  “ভারতেরও শেয়ার থাকবে” – এই কথা কয়টা তো মারাত্মক ভীতিকর। মানে ব্রিকস ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাংক ইত্যাদি এমন সবখান থেকে ভারত গুটিয়ে যাবে কেবল নিস্ক্রিয় পার্টনারের মত  শেয়ার মালিকানা নিয়ে থাকবে – তাই কী? তার মানে গত এক সপ্তাহের মধ্যে কথার চাপা আর তুবরি ছুটানো লোকগুলো সব হার মেনে নিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে  -সেলফ, নিজ উদ্যোগে??

    আবার যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য – এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতেরই বহুমুখী স্বার্থ  যে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে সেটা তারা আগে দেখতেই পায়নি, টেরই পায় নাই! তাদের চোখে “মেরা ভারত মহান” হয়েই ছিল বা “অনেক ক্ষমতাবান” হয়েই ছিল! তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থের দিক থেকেও  বহু পিছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ।

    ভারত ইরানের জাভেদ জারিফকে প্রবল হতাশায় ফে্লে এর পরিণতি খাটো করে দেখেছিলঃ  
    আবার ঘটনা দেখেন সেদিন কীভাবে ঘটেছিল। তেলকেনা বিষয়ে ভারতের পিছলানির আলাপ সেই ২০১৮ জুনে নিকি হেলির ভারত সফরের সময় থেকে শুরু আর মোচরানি দিতে শুরু করেছিল। ভেবেছিল কী জানি বিরাট ক্ষমতাবান এক ভারতীয় পাঞ্জাব অরিজিনের মানুষ হাতে লেগে গেছে, ভারতকে আর পায় কে!  তাই সেসব মোচরানি! এছাড়া  সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ [Mohammad Javad Zarif] এক দিনের ঝড়ো সফরে ভারত এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল; আমেরিকান অবরোধের অজুহাত দেখিয়ে। অথচ  চীন তখনও তেল কিনা জারি রেখেছিল। বিশেষত সেবার যেখানে তেল ইরানি পাহারায় ইরানি ট্যাঙ্কারে ভারতের তীরে পৌছে দেওয়ার সস্তা অফার ছিল। তবু ভারত এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মত “ফাইনাল ওয়ার্ডস” শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ঐ আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস [CSIS] -তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন [Iran not disappointed with India for not buying oil from Tehran: Jaishankar] তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো ভয়ঙ্কর সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, [we frankly understand each other’s compulsions and possibilities,] – “যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে”। এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? বুঝে শুনেই তো যার যার লাভালাভের সন্ধানে ভারত ইরানকে ছেড়ে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছিল! তাহলে চার দিকে আজ চীন-ইরান চুক্তির খবরে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? জয়শঙ্করের সম্ভবত অনুমান এই যে আমেরিকার CSIS থিঙ্কট্যাঙ্কে দাওয়াত পেলে জাতে উঠা যাবে।  কিন্তু গ্লোবাল সিস্টেমটাকে বুঝবার  যে দুনিয়াদারি সেখানে আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা গ্লোবাল অর্ডার যে ভেঙ্গে পড়েছে  এটা তো নিজের যোগ্যতায় জেনে নিতে হয়, আর ঠিক করতে হয় কী কী করব না!
    যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা ঠিক কী হয়েছে সেটাও বুঝেনি মনে করার কারণ আছে। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুন, “ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে”। এর মানে ঘটনাকে কত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখছে। ভাবছে ব্যাপারটা হল ভারতকে কেবল একটা রেল প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া।  ঠিক একই নাদান বুঝ  বিবিসিকে দিয়েছে ভারতের এক সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। বলেছেন তাদের ঠিকাদার কোম্পানিটা আসলে নাকি ঢিলা!  কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ হিন্দুর ঐ রিপোর্টেই ভেতরে ঐ চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। ভারতকে যে  মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়শুণ্য বের করে দিবে সেদিকটা দেখতেই পায় নাই। এছাড়া নিজে  অন্তত অবকাঠামো বিনিয়োগে ঘাটতি  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেসব তো আছেই।
    এর সোজা মানে হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল – আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই তখনকার এসব অনুমানের উপর খুশিতে ডগমগ আত্মতুষ্টিতে থাকা ভারত এখন কিভাবে অনুসিদ্ধান্ত টানে যে এখন ভারতের যা ক্ষতি তাতে সব দোষ চীনে্র? বড়ই বিচিত্র ভারতের ভিকটিমহুড মন!
    যেমন দেখেন এনিয়ে আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনামঃ ‘”চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন”, “ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ” – এটা নাকি আবার আমাদের প্রথম আলোর সারা দুনিয়ার মিডিয়া ঘেটে করা এক ডেস্ক রিপোর্ট।  বুঝেন অবস্থা তাদের চোখ কত সংকীর্ণ। আবার “চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি”। কিন্তু ট্রাম্প বাবাজি অস্বস্তিতে পড়বে কেন? তিনি কী ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি কেন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?  অর্থাৎ এর মানে হল,  এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা তিনি আমল করতে পারেনি।  আসলে এখনও অনেকেই ব্যাপারটাকে নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে  – ভারত চাইলে  ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে কোন প্রজেক্ট থেকেই বাদ দিতে পারে না! আহা কী সুবিধা!

    এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে আমরা কিছুটা বুদ্ধিমান লোকজন আছে মনে হচ্ছে। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে অথচ মোদী সরকার সেটা আগে বুঝতেই পারেনি।’ অর্থাৎ  কংগ্রেস অন্তত বিনা প্রসঙ্গে চীনকে দোষী করার দিকে যেতে চায়নি; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে।

    মাথা নিচা ভারতের বুদ্ধিমানেরাঃ
    তবে এই প্রথম আমরা এক নতুন ধরণের ভারতকে দেখতে পাচ্ছি যারা চীন-ইরান হবু চুক্তির কথা প্রকাশিত হবার পর একেবারেই চুপসে গেছে, যেন তাদের দম্ভ কমেছে অন্তত কিছুটা। বিশেষ করে থিঙ্কট্যাকের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন যারা এমন ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলাদেশের ১/১১ এর সময়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদুত  পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর পরিবর্তন অবাক করার মত। ওআরএফ – এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে  সর্বশেষ জড়িত এই সাবেক কূটনীতিক, যেখানে সেখানে কটু কথা বলার ক্ষেত্রে খুবই খ্যাত, তিনি বিবিসির সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তার ইঙ্গিতটা হল যেন বলা যে, আমরা চীন-ইরান চুক্তির কাছে হেরে গিয়েছি আর তা মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের স্বর এমন নরম হয়ে বদলে গেছে। তবে  স্বর বদলে  নরম করে নেয়া প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন আরেক নারী ব্যক্তিত্ব, তিনি  দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজ নামে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্কের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী। বিবিসির কাছে তিনি প্রায় সব প্রশ্নেই ভারতের দোষ দেখেছেন বা হার স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি  “ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল”  বলেছেন। এছাড়া বলেছেন, “ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই!”।  মানে একদম গুলে গিয়ে সবাই যেন মোম হবার দশায়।  যদিও তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে”। মনে হতে পারে তিনি এখানে পরোক্ষে হলেও চীনকে দায়ী করছেন সুবিধা তুলে নেওয়ার জন্য। যেখানে ব্যাপারটা হল আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিকে যদি বোকা হয়ে সুবিধা করে দেন সেক্ষেত্রে সে সুবিধা তো নিবেই। গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের দিনগুলোতে সামলে না চললে প্রতিদ্বন্দ্বি সুবিধা ত নিবেই। সেখানে প্রেসিডেন্টের নানান ক্ষমতার মর্ম ও ওজন বুঝে না এমন কোন দেউলিয়া ব্যবসায়ী যদি হঠাত করে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আসনে বসে পড়ে তবে তার ‘কেলাসনেস’ বা অযোগ্যতা আমেরিকার ক্ষতি তো করবেই। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি এভাবেই সুযোগ নিয়ে নিয়ে সামনে ধেয়ে আসছে এবং আসবেই – এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। আর এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তার চিন্তা করার প্রকৃত সামর্থ ও যোগ্যতা তার যে লেবেল বা মানের তাতে শেষে আজ সে ঠিক সেই মাপের বামন হয়ে গেছে।  ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা খাটো করে দেখা বা ইরানের তেল না কিনলে ভারতের কিছুই হবে না এই হামবড়া ভাব – এভাবে ট্রাম্প আর মোদী মিলে ধারাবাহিক ভাবে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেন ইরানকে ঠেলতে ঠেলতে চীনের কোলে ফেলে দিয়েছে। এখন এর কাফফারা দিতে দিতে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকে তাই দেখার বিষয়!

    চিন্তায় অযোগ্য আর বেপরোয়া মানুষেরা এমন কাফফারা দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়! দিন সবারই একদিন আসে, আগে আর পরে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]