Category: কোল্ড ওয়ার ২.০

  • গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গৌতম দাস

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3id

     

     

    Washington is pressing for a post-pandemic decoupling from China

    আমেরিকার এবার নভেম্বর ২০২০ নির্বাচন সমাপ্ত এবং ফলাফল অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন বিজয়ী হতে যাচ্ছেন জানা গেছে। তবে ফলাফল নিয়ে নানা রাজ্যের যেসব আপত্তি এর নিষ্পত্তি এখনো শেষ হয়নি। তবে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছেন, বাইডেনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষিত হবেন। গ্লোবাল মিডিয়াতে বাইডেনকে নামের আগে রীতি অনুযায়ী “প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট” [President-Elect] শব্দ যোগ করেই পরিচিত করানো হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন তাঁর হবু নতুন সরকারে মানে আমেরিকান ভাষায়, বাইডেন প্রশাসনে কাদেরকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা প্রধান কর্মকর্তা করবেন এই বাছাইও শুরু হয়ে গিয়েছে। বেছে নেয়া ব্যক্তিদের নাম ক্রমেই সামনে আসছে।

    হবু বাইডেন প্রশাসনে তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পদ “সেক্রেটারি অব স্টেট” বা আমাদের ভাষায় “পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। এক হিসাবে এটা প্রশাসনের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে বাইডেন যে নাম বেছে নিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন তিনি  এন্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony John Blinken]। হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েট ব্লিঙ্কেন এর আগে ওবামা আমলে একসময় উপ-নিরাপত্তা মন্ত্রী (২০১৩-৫) আর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৫-৭) হিসেবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ বাইডেন তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে তার সাথে কাজ করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, সেসব সূত্রে ব্লিঙ্কেন এবার হবু বাইডেন প্রশাসনে বাছাইয়ে টিকেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের আমলেই একটা নতুন শব্দ চালু হয়েছিল ‘ডি-কাপলিং’ [decoupling]। ইংরেজি ‘ডি-কাপলিং’ শব্দের অর্থ কঠিন কিছু নয়, আমাদের প্রায় পরিচিত। এটা আসলে কাপলের [couple] উল্টা শব্দ। কাপল শব্দের একটা অর্থ, দম্পতি (স্বামী-স্ত্রী)। মানে, কারো সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া। আর এরই উল্টা শব্দ হল, ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা বুঝাতে ডি-কাপলিং। ট্রাম্পের আমলে শেষের দিকে এই শব্দটা ব্যবহার করে বলা হত যেমন,  ট্রাম্প চীনকে ডি-কাপলিং করার নীতি নিয়েছে। মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্ক থেকে চীনকে আলাদা করে দূরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাচ্ছেন ট্রাম্প, চীনের সাথে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে। যেমন, যেসব আমেরিকান কোম্পানি চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে তা স্থানান্তর করে আমেরিকায় ফিরিয়ে না আনলেও চীনের বাইরে অন্য দেশে নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আর তাতে ওই স্থানান্তরের খরচও ট্রাম্পের সরকার বহন করবে। এই ছিল,  ট্রাম্পের ডি-কাপলিং। এমনকি এই প্ররোচনায় জাপান এগিয়ে এসেছিল। অবশ্য যুক্তি দিয়েছিল যে, চীনের ‘ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে এটা সে করছে। যদিও কোনো এন্টারপ্রাইজ বা বড়  কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন স্থানান্তর খুবই রুটিন। আর তা মূলত যে কারণে সাধারণত হয়ে থাকে তা হল, ফেলে আসা দেশে ন্যূনতম মজুরি তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়া। অথবা উল্টা করে বললে, নতুন কোন দেশ পাওয়া গেছে যেখানে ন্যূনতম মজুরি অনেক কম এবং অবকাঠামোগত সুবিধা অনেক ভাল, প্রশাসন দক্ষ চটপটে ইত্যাদি। আর এমন পাওয়া যায় বলেই ফ্যাক্টরি স্থানান্তর করা হরহামেশাই হয়ে থাকে। যেমন জাপান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের এক সিগারেট কোম্পানি কিনে বাংলাদেশের সিগারেট ব্যবসায় ঢুকে গেছে অনেকটা এমনভাবেই। যদিও এখানে ব্যাপারটা ঠিক মেশিনপত্র নয়, পুঁজি স্থানান্তর করে। আর বিপরীতে, ট্রাম্পের ‘ডি-কাপলিং  ব্যবস্থাটার কথা বলা হয়েছিল এর উদেশ্য ছিল, চীনকে একঘরে করা, চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে।
    কিন্তু হবু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ইতোমধ্যেই ডি-কাপলিং প্রসঙ্গে তার শক্ত বিরোধী অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “ডি-কাপলিং করা এক অবাস্তবচিত ও উল্টা ফল দেবে এমনটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ ধারণা” […।decoupling is ‘unrealistic’ and ‘counterproductive’; it also wouldn’t work]।’ এ নিয়ে তিনি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ  বক্তৃতাও করেছেন।

    গ্লোবাল বাণিজ্যঃ
    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ [Global Trade] শব্দটা শুনলে বিরাট দুনিয়াব্যাপী কোনো ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই দূরের কিছু না। এখানে বাণিজ্য মানে লেনদেন; অর্থাৎ আপনি আপনার পণ্য দিবেন আর অন্যের পণ্য নিবেন। কিন্তু না, অনেকের মনে হতে পারে এর আরেকটা মানে আছে। সেটা হল, বাণিজ্য মানে পণ্য দিয়ে মুদ্রা নেবেন। হ্যাঁ, এই কথাও ঠিক; তবে এটা পুরো ঘটনার অর্ধেকটা। আপনি পণ্য দিয়ে যে মুদ্রা নিয়ে ফিরলেন এরপরে সেই মুদ্রা দিয়ে আবার অন্য পণ্য বা কাঁচামাল কিনবেন। মানে, কিনতে হবে আপনাকে; খুব স্বাভাবিক। যেটা শেষ বিচারে পণ্য বেচে আরেক পণ্য কেনার ঘটনায় গিয়ে দাঁড়াবে। একারণে বাণিজ্য মানে, পণ্য লেনদেন। এটাই পণ্য কেনাবেচা মানে বিনিময়, ইংরেজিতে এক্সচেঞ্জ [exchange]। তাই গ্লোবাল বাণিজ্য মানে একটা গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ, দুনিয়াব্যাপী পণ্য বিনিময়।
    কথাগুলো ধারণা হিসেবে অবশ্যই ঠিক আছে, তবুও একটা বিষয় এতে আড়ালে থেকে গেছে, সেটাকে সামনে আনতে হবে। সে বিষয়টা হল মুদ্রা। পণ্য কেনাবেচা করতে গেলে মুদ্রা লাগবে। এর সাথে কথা আরো আছে। পকেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে আপনি বাংলাদেশের যেখানেই যান যেকোনো পণ্য কিনতে পারবেন। টাকার বিনিময়ে বিক্রেতা আপনাকে পণ্য দিবে। তবে আবার সেই কিছু ‘কিন্তু’ও এখানে আছে সাথে! বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলে কী হবে? না, এইবার আর কেউ আপনাকে কোন পণ্য বেচবে না। কারণ আপনার হাতে বাংলাদেশের মুদ্রা, তাই বাংলাদেশের ভেতরে থাকলে যেকোনো বিনিময় সম্ভব হলেও সীমান্ত পার হলে কিন্তু আর ওই মুদ্রা চলবে না। প্রত্যেকটা স্থানীয় মুদ্রার সীমাবদ্ধতা হল এটাই; দেশের সীমানা পার হলে ওই মুদ্রায় কোন বাণিজ্য, পণ্য কেনাবেচা বা বিনিময় আর চলে না। তাহলে?
    দেশের বাইরেও বাণিজ্য বা বিনিময় করতে চাইলে এবার প্রয়োজন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা”। এমন এক মুদ্রা, যা দেশের সীমানা পার হয়ে গেলেও যেকোনো দেশেই ওই মুদ্রায় পণ্য বাণিজ্য বা বিনিময় বিক্রেতারা তখনও করবেন। তাই এবার সোজা বলা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় যে বাণিজ্য সম্পন্ন করা যায় তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এটাকেই গ্লোবাল বাণিজ্যও বলে। বাংলাদেশের বাইরের সাথে কোনো কিছু বেচাকেনা, বাণিজ্য করে আসা – এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য। আমাদের সীমান্তের বাইরের ভারত থেকে কোনো কিছু বাণিজ্য করে আসাও তাই গ্লোবাল বাণিজ্যের অংশ। কাজেই “গ্লোবাল বাণিজ্য” বলতে সুদূরের কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলেই এর শুরু।
    এখন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা” আবার কী? গ্লোবাল বাণিজ্য মানে বুঝেছিলাম তা আদতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বেচাকেনার বাণিজ্য। আর এটাই সম্পন্ন করার একটা সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটাই আইএমএফ। ফলে যেসব দেশের মুদ্রাকে আইএমএফ আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে (আইএমএফ এর টেকনিক্যাল শর্ত পূরণের কারণে), যে মুদ্রার বিনিময় হার (conversion rate) আইএমএফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, এমন মুদ্রাগুলোই কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যেমন এখন পর্যন্ত – ডলার, পাউন্ড, ইউরো, ইয়েন ও ইউয়ান আন্তর্জাতিক মুদ্রা। তবে মনে রাখতে হবে এগুলো কিন্তু একই সাথে প্রধানত দেশীয় মুদ্রা বা নিজ নিজ দেশের স্থানীয় মুদ্রা যাকে আবার ‘ডাবল রোল’ হিসেবে কাজ করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রারও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
    এখন এতে দুনিয়াতে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে তা হল – একটা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বা নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে গেছে যার কারণে আমরা নিজ দেশের ভেতরের মতই দেশের বাইরেও বাণিজ্য-বিনিময় বা গ্লোবাল বাণিজ্য সহজেই করতে পারি। এবং তা কবে থেকে? গত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে।

    কিন্তু এ তো গেল ইতিবাচক দিক। এবার নেতিবাচক দিক থেকে দেখা যাক। যেমন ইরান কোন কোন দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে বা আদৌ কারো সাথে পারবে কি না এটা ডিকটেট করার ক্ষমতা এসে গেছে আমেরিকার হাতে। এই ক্ষমতাটা যদিও পড়ে পাওয়া। মানে আইএমএফ এটা জেনেশুনে দিতে চেয়েই দিয়েছিল ব্যাপারটা এমন নয়। এটাকেই আমরা ইরানের ওপর আমেরিকার “অবরোধ” [Sanction] বলে জানি। অবরোধ – মানে ইরান নিজদেশের বাইরের কারো সাথে বাণিজ্য করতে পারবে না। কিন্তু এটা আমেরিকা কার্যকর করে কী করে? ের জবাবের আগে একটা কনসেপ্ট পরিস্কার করে নেই। আমেরিকার যে অবরোধ দেয় তা আইএমএফ-এর অনুমোদনে প্রাপ্ত কোন ক্ষমতা নয়, বরং আমেরিকা নিজ ক্ষমতাতেই এটা আরোপ করে থাকে। কিন্তু ইরান সেটা মানতে বাধ্য হয় কেন? সোজা। আমেরিকার ‘অবরোধ’ কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, যেন আমেরিকা বলছে, ইরান তুমি কোন কেনাবেচা ডলারে করতে পারবে না; মানে, ইনভয়েসে মূল্যটা “আমেরিকান ডলারে” তা লিখতে পারবা না। করলে কী হবে, আমেরিকা বাধা দেবে কিভাবে? ইনভয়েসে বা বিলে ডলারে দাম লেখার মানে হল, ঐ কেনাবেচা সম্পন্ন করতে গেলে ক্রেতার ব্যাংক আর বিক্রেতরা ব্যাংকের লেনদেনের মাঝখানে একটা আমেরিকান ব্যাংকের সাহায্য-সহায়তা লাগবেই। না হলে কেনাবেচায় মূল্যের অর্থ-স্থানান্তর ঘটানো যাবে না। আর ট্রাম্প তাঁর দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে, “যেসব দেশ বা ব্যক্তিকে অবরোধ তালিকায় ফেলেছি এদের দেশের কোনো কোম্পানির  অর্থ ছাড়ে তোমরা জড়িত হবে না, হলে ঐ আমেরিকান ব্যাংককেই আমেরিকা-রাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করবে”। এভাবেই অবরোধ কার্যকর করেছে আমেরিকা। এই এক পড়ে পাওয়া বিশাল ক্ষমতা আমেরিকান হাতে আছে বা এসে গিয়েছে, সেই থেকে।

    ডি-কাপলিংঃ
    তাহলে ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধে “চায়না ডি-কাপলিং” এই প্রোগ্রামের আসল মানে কী? মানে হল, চীনকে একঘরে করা। যেটা আরও পরিস্কার করে বললে, চীনকে বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়ার যত বেশি দেশ পাওয়া যায় এমন সকলকে নিয়ে আগে যেমন আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে ছিল  যেন সে অবস্থাটাই ফিরে এসেছে বলে ট্রাম্পের সুখবোধ ফিরে পাবার এ’এক বাসনা!  তবে এটা বাসনাই! মূল কারণ এই শতকের শুরু থেকেই চীন হল সেই রাষ্ট্র যার হাতে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস সঞ্চিত হওয়া শুরু হয়েছে। যার অর্থ চীনই এখন আমাদের মত বা এর চেয়েও ভাল অর্থনীতির রাষ্ট্র এমন যাদেরই আবার বিদেশি বিনিয়োগ-পুঁজি খুবই দরকার তাঁদের চীনকে খুবই দরকার। এছাড়া চীনের উঠতি বিশাল বাজার সেটাও আকর্ষণীয়। অতএব ট্রাম্প তো ফেল করবেন; করছেনও। কারণ এই জায়গায় এসে আমেরিকা আর চীনের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কোনটাই একেবারেই নয়। একারণে অষ্ট্রেলিয়া বা এমনকি জাপান যারা ট্রাম্পের হামবড়া বাতের কোয়াড [QUAD] জোটের দুই মাতবর; এই তারাই আবার চীনের নেতৃত্বের RCEP বাণিজ্য জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সেখানে সবার আগে নাম লিখায়। সাথে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ভিয়েতনাম কেউ বাইরে বাকি থাকে নাই।

    যদিও বাস্তবত ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন তবু এমন ঘোষিত নীতিটা এখনও বর্তমান। তাই এই ‘একঘরে’ করতে চাইলে মানে আসলে ঠিক কী হত? আমাদের গ্রাম-সমাজের প্রেক্ষিতে একঘরে মানে ওর নুন, পানি বন্ধ করে দেয়া; আর ওর সাথে কেউ কোনো পণ্য বিনিময় করবে না যার ব্যবহারিক মানে ‘নো এক্সচেঞ্জ’! ওকে সমাজ থেকে বের করে দেয়া; সেক্ষেত্রে যদিও সে আগের বাড়িতেই বসবাস করবে, তারপরেও। কেমন করে এটা ঘটানো সম্ভব হবে? কারণ, ওর সাথে পণ্য বিনিময় না করা মানে, ও যে লবণটা খাবে সেটাও তাকে নিজেই সমুদ্রের পানি জোগাড় করে শুকাতে হবে, না হয় লবণের খনি জোগাড় করতে হবে এবং তা নিজেই। তাতে সমুদ্র হাজার মাইল দূরে বা লবণের খনি খুঁজতে পাকিস্তানের সিন্ধুতে যেতে হতে পারে। মূল কথায়, যা কিছু সে ভোগ করবে তার সবটার ‘উৎপাদক’ তাকে নিজেই হতে হবে। নইলে তা ভোগ করা যাবে না, ভোগ নাই! ‘নো এক্সচেঞ্জ’ কথার মানে তাই। এখান থেকেই ‘সমাজ’ কথাটার মানে কত বিশাল সে হুঁশ আসতে পারে আমাদের। আমরা যারা যারা পণ্য বিনিময় করি-জড়াই তারা এই কাজের মাধ্যমে আসলে একটা সমাজ গড়ে তুলি, অজান্তেই। সমাজ মানে তাই এক অর্থে পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ, পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়ার সমাজ। এমনকি এভাবে ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’ও। অর্থাৎ চীন যেখানে আমেরিকার বদলে নয়া গ্লোবাল নেতা হবার সবগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠছে সেখানে ঐ চীনকেই একঘরে করার চিন্তা? এটা ট্রাম্পের একটা ফাজলামো ছাড়া আর কিইবা বলা যায়!

    জাতিবাদী সমাজঃ
    আর গ্লোবাল পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ ঠিক এর উল্টা অর্থ সেটাই হল “জাতিবাদী সমাজ”। সে জন্য জাতি-রাষ্ট্র বা বিদেশবিরোধীতা কথাটার অর্থ এখানেই। তত্ত্ব অনুযায়ী (তত্ব বলেছি কারণ বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না; অলীক) এসব জাতিবাদী দেশে সবকিছুই নিজেরাই দেশের ভিতরে উৎপন্ন করার কথা। জানি একথা শুনে অনেকেই খুশিতে পুলকিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু না ঘটনাটা হবে উলটা! তত্ত্বীয়ভাবে বললে এরা আমদানি-রফতানি কোনটাকেই না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা তা অপছন্দ করে। কিন্তু বাস্তবতা এর উলটা।
    নরেন্দ্র মোদী সাহেব কট্টর হিন্দুত্ব জাতিবাদী। তিনি জাতিবাদী সমাজের প্রবক্তা। বক্তৃতায় সবসময় আত্মনির্ভর, স্বদেশী দেশপ্রেমিক টাইপের কথা তুলে বক্তৃতা করবেন এরা। কিন্ত সেই মোদী সীমান্তে চীনের হাতে মার খেয়ে চীনা-পণ্য বয়কটের হুঙ্কার দিয়েছিল। অর্থাৎ আগেই যেমন চীনা-পণ্য আমদানি করতেন, কোন কোন পণ্য ৯০% পর্যন্ত চীনা আমদানির, তেমনই তিনি আর করবেন না বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টাটা, ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বেড়েছে। দেখুন, As Chinese imports boom, what happened to Modi’s ‘self-reliant’ India?
    এটাই মোদীর ‘আত্মনির্ভরশীল’ তবে ‘অলীক অর্থনীতি’। গত সপ্তাহে ভারতের নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই আত্মনির্ভরশীল (তবে অলীক) অর্থনীতির গড়বেন [New Parliament building testament to Aatmanirbhar Bharat: PM Modi] বলে ‘চাপা মেরেছেন’।
    এখানে আরেকটা কথা পরিস্কার করে রাখা ভাল। এই জাতিবাদিরাই আবার নিজ দেশের বিদেশি পণ্য আমদানিকে খুবই অপরাধ বা নিচা চোখে দেখে থাকেন। এটাও অর্থহীন এবং এক মিথ্যা ধারনা-বুঝ। প্রথমত আমি আমদানি করতে পারি মানে আমার বৈদেশি্ক মুদ্রা যথেষ্ট আছে। অর্থাৎ অন্যকিছু পণ্য আমি উতপাদন ও রপ্তানি আমিই করি তবেই না ঐ মুদ্রা পাই। তাহলে এটা খারাপ কেন? যেমন আমরা গার্মেন্ট রপ্তানি করতে পারি মানে হল অন্তত একটা ধরণের পণ্য আছে যা উতপাদনে আমরা দক্ষ বলে সবার চেয়ে কম শ্রমে মানে দামি তা রপ্তানি করতে পারি। আর এরপরে ঐ প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আমরা অবশ্যই আমদানি করব,।কাজেই আমদানি মানেই নিচা বা খারাপ এমন ধারনা ভিত্তিহীন!

    ট্রাম্পের অবুঝ খায়েস ডি-কাপলিংঃ
    তামাশার কথা হল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এমনই এক কল্পিত আমেরিকান জাতিবাদী অর্থনীতি গড়বেন বলে- ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে।
    ট্রাম্প সেই গত চার বছরে আবদার ধরে বসেছিলেন যে, চীন চাক বা না চাক তিনি চীনকে একঘরে রাষ্ট্র বানাবেনই। তবে এটা তো আসলে অলীক, এক খায়েশের কথা। আর বাস্তবে সেটা আসলে উল্টা। তিনি চীনবিরোধী হতে চান এমন বুঝা না বুঝা উসকানি-চুলকানি যাদের আছে এ ধরনের দেশগুলোর একটা আমেরিকান প্রভাবাধীন জোট বানিয়ে চীনকে তা থেকে আলাদা করে দিতে চান। এমনই কল্পরূপের কিছু নমুনা হল, ‘কোয়াড’ রাষ্ট্র গ্রুপ (ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া) বা হবু ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ ইত্যাদি।
    আপাতত ট্রাম্পের হাত থেকে দুনিয়া বেঁচে নাজাত পাইছে, চায়না অথবা কোন দেশকে ডি-কাপলিং করা দুনিয়াকে আর দেখতে হচ্ছে না। কারণ ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গেছেন। আর ব্লিঙ্কেনও দাবি করছেন, তিনি বুঝেছেন ডি-কাপলিং অবাস্তব। কিন্তু ধরা যাক, ট্রাম্প নির্বাচনে জিতলে কী হত?

    সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ কী?
    এক কথায় বললে, ট্রাম্পের হবু পদক্ষেপে সেটাই হওয়ানোর চেষ্টা হত। ফলে যেন তা সম্ভাব্য সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’। যদিও এটা নিয়ে অনেকে এর আগে আন্দাজে ঢিল মেরেছেন। চীন ও আমেরিকার ঝগড়া-সঙ্ঘাত কখনও মারাত্মক হলেই লিখে দিয়েছেন ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ আসছে। কিন্তু না। ঠিক কোন শর্ত পূরণ হলেি কেবল ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ হতে পারে, সেটাই আমরা জানব এখন। তার আগে,  কোল্ড ওয়ার বলতে ঠিক কী বুঝব? গত ১৯৫৩-৯১ সাল, এই সময়কালে দুনিয়াটাকে সোভিয়েত-আমেরিকা এদের উভয়ের নেতৃত্বে দুইটা ব্লকে ভাগ করে নেয়া হয়েছি্‌ বা গিয়েছিল। কিন্তু শুধু দুই ব্লক-জোটরাষ্ট্রে দুনিয়া ভাগ করলেই সেটা কোল্ড-ওয়্যার বলে চালানোটা আনাড়িপনা হবে। তাহলে আর কী শর্ত লাগবে? সেটি হল, প্রথমত যদি একটা ব্লক-জোট ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ না নেয়। নেয়ার যোগ্য না হয়। কিন্তু অংশ নেয় নাই তা বুঝব কেমন করে? এটা বোঝা খুবই সহজ। একেবারেই সহজ বুদ্ধিটা হল কোন রাষ্ট্র যদি আইওএমএফের সদস্যপদ না নিয়ে থাকে এর মানে তখন সে চাইলেও আর গ্লোবাল বাণিজ্যে যোগ দিতে পারবে না। তাই আমরা জেনেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের কখনই সদস্যপদ আবেদনই করে নাই। আর সাথে তার ব্লকের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই এমন সদস্যপদ নেয় নাই। অথবা বাংলাদেশ  মত; যে নিয়েছে ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ১৯৭৬ সালের শুরুরদিকের আগে তেমন কোন সক্রিয়তায় কোন কাজে লাগায় নাই। এভাবেই আমরা শেখ মুজিব জীবিত থাকতে ১৯৭৪ জুলাইয়ে দুর্ভিক্ষটা পর্যন্ত আমরা যেন সোভিয়েত ব্লকেই ছিলাম। আবার শেখ মুজিব নিজেই ১৯৭৪ সেপ্টেম্বর থেকে আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয়তা চাইতে গেছিলেন। তো, এদেরকেই  যারা কোল্ড-ওয়ারে জড়িয়ে গেছিল এমন দেশের ব্লক বুঝাতে চাচ্ছি।  এদের যারা যারাই আইএমএফের সদস্যই না হয় অথবা আগে হয়ে থাকলে এখন সদস্যপদ ত্যাগ করে – এটাই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ যে এরা ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নেয় না। আইএমএফের সদস্যপদ ত্যাগ করা মানে, ওসব রাষ্ট্র আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নিতে পারবে না। ঠিক এমনটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের অনেক রাষ্ট্রের।
    কিছু বেজ ফ্যাক্টস বলে রাখি। আইএমএফের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলের ২২ দিনের সম্মেলনে, ৪৪ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে। তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মানে, জোসেফ স্টালিনের প্রতিনিধিও তাতে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু এর জন্ম দলিল তৈরি করা সম্পন্ন হওয়ার পরে ফাইনাল সদস্যপদ নিয়ে যখন চাঁদা দিয়ে স্বাক্ষর করতে একটা দিন ধার্য হয়েছিল তখন থেকে কোনো সোভিয়েত প্রতিনিধি আর উপস্থিত হননি। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই আইএমএফের সদস্য ছিল না। তবে  আইএমএফ ফাংশনাল হলে পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত ব্লকের অনেক সদস্যই যেমন- পোল্যান্ড এর সদস্যপদ পেতে আবেদন করেছিল। তাতে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়েই অনুমোদন করলেও আমেরিকান প্রশাসনের আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়। অতএব মূল কথাটা হল সোভিয়েত ব্লক-জোটের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিদের ব্লক-রাষ্ট্রের কোনো গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। তাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সম্ভব ছিল না। এটাই যেকোন ‘কোল্ড-ওয়ার’ পরিস্থিতি আবার দেখা দিতে গেলে প্রধান শর্ত, যা আগে পুরণ হতেই হবে।

    কাজেই ট্রাম্পের স্বপ্ন একালে অধরা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই ছিল প্রচুর। মূল কারণ এখন দুনিয়ার খুব কম রাষ্ট্রই আছে যে আর আইএমএফের সদস্য নয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ভেঙ্গে আরো ১৫ রাষ্ট্রে পরিণত হবার পর থেকে এরা সকলেই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল সেজন্য। আর ১৯৮০ সালে কমিউনিস্ট চীন আইএমএফের সাথে সম্পর্ক সক্রিয় করে ফেলার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০ টা দেশই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় চীনকে আর একঘরে করা আরো অসম্ভব হয়ে গেছে। যে চীন দুনিয়ার হবু নেতা এবং পালটা নতুন করে পুরান আইএমএফের সংস্কার করে নিবার ক্ষমতা সম্পন্ন।  কাজেই ট্রাম্প আবার জয় লাভ করলেও আইএমএফ একটা বড় ঝাকুনি খেত হয়ত। কিন্তু তবু আইএমএফের সদস্যপদ সবারই থেকে যেত। ওদিকে সারা ইউরোপ ট্রাম্পের আমেরিকার উপর ১৯৪৫ সালের পরে এই প্রথম আস্থা হারিয়েছিল যেটা আর ফিরে আসত না। যেমন এর উল্টাটা, সেই আস্থা আবার কতটা ফিরে পাওয়া যাবে সেলক্ষ্যে বাইডেন ঝাপিয়ে পড়ে কাজ করার পরিকল্পনা নিচ্ছে্ন এখনই।

    তাই  একালে বাইডেনের হবু প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ডি-কাপলিং ‘অবাস্তব’ ও ‘কাউন্টার-প্রডাকটিভ’। কথাটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ; যদিও এর মানে বাইডেনের আমলে চীন ও আমেরিকার মধ্যে আর কোনো সঙ্ঘাত থাকবে না  – না সেটারও কোন সত্যতা নাই, এর একেবারেই সত্যি নয়। মূল বিষয়, একই গ্লোবাল বাণিজ্য সমাজে সবাই থাকছে কি না। আর একই বাণিজ্য সমাজে আর যদি কখনও না থাকে একমাত্র সেক্ষেত্রেই যেটা হতে পারে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ পরিস্থিতি। কাজেই না-বুঝ ‘কোল্ড-ওয়ার ২ বলে এ নিয়ে আলাপ তোলা বন্ধ করাই ভাল। আর উল্টাটা যদি চীন-আমেরিকা একই বাণিজ্য সমাজে যদি থাকে, তবেই দুনিয়া ফান্ডামেন্টালি ঠাণ্ডা থাকবে!‘ বলাই বাহুল্য!

    সবশেষেঃ
    ১। কয়েক মণ চাল-ডাল যদি একবার মিশিয়ে ফেলা হয়, এরপর তা আবার আলাদা করে আগের জায়গায় আলাদা চাল ও আলাদা ডাল করা প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা। এই যুগে ডি-কাপলিং প্রয় সেরকমই এক অলীক ধারণা!
    ২। একটা মজার কথা হল, কমিউনিস্টদের কাছে তবু সেই থেকে জোসেফ স্টালিনের মতই “গ্লোবাল বাণিজ্য” এক অ-বুঝ ধারণা শুধু না, একটা নো-গো [no-go] ধারণা; যা তারা বুঝার চেষ্টাও করে না, আলোচনায় অংশগ্রহণও করে না! বরং অনেকটা যেন হারাম খাদ্যের প্রতি যেমন মানুষের আগ্রহ থাকে না সেরকম! এমনকি কেন এমন ‘হারাম মনোভাব সেটা উলটে দেখা বা রিভিউও করে না এরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গ্লোবাল বাণিজ্য ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কোল্ড ওয়ার ‘টু’ বলে কিছু ঘটবে না

    কোল্ড ওয়ার ‘টু’ বলে কিছু ঘটবে না

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-39k

     

    কোল্ড ওয়ার ‘টু’ সিনেমা

    ‘কোল্ড ওয়ার’ [COLD WAR]; যার সরাসরি আক্ষরিক বাংলা কেউ কেউ করেন “ঠাণ্ডা যুদ্ধ”। তবে তাতে এর অর্থ খুব একটা পরিষ্কার হয় না। এছাড়াও আরেকটা বাংলা অনেকে করেন – “স্নায়ুযুদ্ধ”। নার্ভে লাগে এমন টেনশন অর্থে নার্ভ বা স্নায়ুতে চাপ ফেলে যে যুদ্ধ। কিন্তু কোনোটাই অর্থ ঠিক পরিষ্কার করে না। তবে কেন কোল্ড ওয়ার নাম – এর ব্যাখ্যাটা একটা পাওয়া যায় যে, ‘যুদ্ধ’ বলতে আমরা যা বুঝি তাকে যদি ‘হট ওয়ার’ বলে বুঝি তবে যেটা ঠিক যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের মতই একটা রেষারেষি অস্থিরতা আর সব সময়ের জন্য লেগে থাকা টেনশন – এ অবস্থার নাম দেয়া যায় ‘কোল্ড ওয়ার’। এই হলো সূত্র। আর কোল্ড ওয়ারের মূল দুই বৈশিষ্ট্য হল যখন দুই দেশের মধ্যে ঠিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সেনা সমাবেশ নয়, কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ের মত একটা বিরাট টেনশন সব সময় সক্রিয় থাকে। এছাড়া সব সময়ই একপক্ষের কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অপরপক্ষ এক পাল্টা পদক্ষেপের কথা চিন্তা করতেই আছে – এমন অবস্থা। তবে একটা কথা মনে থাকতে হবে যে, কোল্ড ওয়ার বলতে অবশ্যই আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ব্যাপার হিসাবেই তা কেবল হাজির হয়েছিল। আর এই প্রতিযোগিতা মূলত পরাশক্তিগত লড়াই, গ্লোবাল ইকোনমিক ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডারের নেতা হবার লডাই নয়। কারণ গ্লোবাল বাণিজ্যের কী হবে, চলবে কী করে কি ব্যবস্থায় এটা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সারা কমিউনিস্ট জগতের কারই ভাববার এজেন্ডা নয় বা কমিউনিস্ট রাজনীতিই নয়।  কাজেই সাকথায় কোল্ড ওয়ার মূলত পরাশক্তিগত – গ্লোবাল ক্ষমতা বাড়ানোও প্রভাব বাড়ানোর লড়াই যা অর্থনীতিগত কোন কিছুই নয়।

    কেন এরকম?
    সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিনের রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭ সালে। এ সময়টা ছিল এমনই যখন সে দেশে কী হচ্ছে সে দিকে মনোযোগ দেয়ার অবস্থায় ছিল না ইউরোপের কেউ; মানে ইউরোপের কলোনি দখলদার মালিকদের কারো। কারণ এর চেয়েও বড় স্বার্থ নিয়ে তারা সবাই ডুবে ছিলেন। সেটা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মাতব্বরেরা সবাই যুদ্ধে যার যার স্বার্থ নিয়ে একেবারেই ডুবে ছিল, যে যুদ্ধ চলেছিল ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সময়কালজুড়ে। এই যুদ্ধে জার্মানিকে সামলাতেই ইউরোপের বাকিরা কঠিন হিমশিম অবস্থায় পড়েছিল। আর এ সুযোগ নিয়ে সবাব অলক্ষ্যে লেনিনের বিপ্লব বা ক্ষমতা দখল সম্পন্ন হয়ে যায়। সেই থেকে আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশ বলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপের ঘটনাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই কাটিয়ে দিয়েছিল। এরপর ১৯৩২ সাল থেকে জার্মানিতে হিটলারের উত্থান আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু, এ দুই ঘটনার উদয় হওয়া পর্যন্ত ইউরোপের কেউ তাকিয়ে দেখার ফুরসত পাননি যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে ঠিক কী ঘটেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সোভিয়েত আর (হিটলারের) জার্মানির মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি থাকলেও হিটলার সোভিয়েত আক্রমণ করেছিলেন। তখনো আমেরিকা যুদ্ধে কোনো পক্ষেই অংশ নেয়নি। ফলে হিটলারবিরোধী অ্যালায়েন্স বা মিত্রবাহিনী যুদ্ধজোট জন্মের তখনো কোনো খবর ছিল না। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন বছর পরে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে সোভিয়েতরা আমেরিকার সাথে একই জোট পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ঠিকই।  কিন্তু ততদিনে হিটলারের হাতে সোভিয়েতের ক্ষয়ক্ষতি  হয়ে গিয়েছিল অনেক। তবু ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি মিত্রবাহিনী গঠনের শর্তাবলিতে স্বাক্ষর দিতে সোভিয়েত রাশিয়া ব্যাপারটাকে বিরাট সুযোগ হিসাবে নিয়েছিল। পরের চার বছরে ১৯৪৫ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে এলে এবার সারা পশ্চিমের এই প্রথম নজরে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি। সব কিছু সরকারি মালিকানায় আনতে হবে – আমেরিকা ও ইউরোপের সব রাষ্ট্রের কাছে এটাই মূলত ভীতি আর এটা একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে বলে এটাকে তারা হুমকিরূপে দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমের এসব আপত্তি  প্রকাশ্য না এনে বরং তারা বাইরে বলার সময়  বলত, কমিউনিস্ট দেশে নাগরিক অধিকার না দেয়া, মানুষকে কথা বলতে না দেয়া, দমিয়ে রাখা, ন্যূনতম স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি চাপের অভিযোগ তুলত।
    এমনিতেই অবশ্য ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে আমেরিকার সাথে সোভিয়েতের যুদ্ধজোটের সময়ের সম্পর্ক ঢিলা হতে শুরু করেছিল। এ ছাড়া প্রথম মনোমালিন্য দেখা দেয় জার্মানি ভাগ করা নিয়ে। এ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধে ভেঙে পড়া  অর্থনীতি – অবকাঠামো আর শিল্প-প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসনের জন্য আমেরিকা এক বিশাল, খুবই কম সুদের অবকাঠামো ঋণ প্রকল্প নিয়েছিল, যা ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল। আমরা বলতে পারি, বিশ্বব্যাংক জন্মের পরে কাজ শুরু করে প্রথম হাত পাকিয়েছিল এই মার্শাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করেই। এরপর ষাটের দশকের শুরুর দিকে ইউরোপে অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। কিন্তু মূল কথা হল,  মার্শাল প্ল্যানের ব্যাপারে স্টালিনের আপত্তি ও অস্বস্তি ছিল। স্বভাবতই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে যাওয়া মানেই ঐ সব ইউরোপীয় দেশে আমেরিকান প্রভাব বাড়বে, এটাই ছিল তার অস্বস্তির কারণ। কিন্তু এতে স্টালিনের বাস্তবে কিছুই করার ছিল না। কারণ যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, রেল বা কলকারখানা ইত্যাদি নিয়ে ইউরোপের বসে থাকা বা ধুঁকে মরা তো চলতে পারে না। আবার কমরেড স্টালিনের মুরোদও ছিল না যে নামেমাত্র সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে কোনো অবকাঠামো ঋণ দেয়। আবার ঋণ দেয়া তাদের চোখে ‘পুঁজিবাদী কারবার।’ ফলে তা কমিউনিস্টদের দৃষ্টিতে, পাপকাজ। এ অবস্থাটা ছিল ‘মিয়াবিবি রাজি’র মত। ঋণদাতা আমেরিকা আর গ্রহীতা ইউরোপ রাজি। কাজেই তা ঠেকাবে কে?
    ওদিকে ইরানের তেল তোলার কন্ট্রাক্ট পাওয়ার জন্য সোভিয়েতের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের জোটের প্রতিযোগিতা নিয়ে টেনশনও শুরু হয়ে গিয়েছিল।
    কাজেই আমেরিকার সাথে স্টালিনের টেনশন বেড়েই চলছিল। এর মধ্যেই ১২ মার্চ ১৯৪৭ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান তার ‘ট্রুম্যান ডকট্রিন’ আমেরিকার কংগ্রেসে ঘোষণা করেছিলেন। এর সার কথা হল, ‘কমিউনিজম ঠেকানো [containment] – কমিউনিজম’ ঠেকাতে হবে। ট্রুম্যান বললেন, কোনো রাষ্ট্র কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে চাইলে তিনি তাদের সাহায্য করবেন। এ কাজই তিনি ১৯৫২ সাল পর্যন্ত চালিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে এই প্রথম টানা ২০ বছর পরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ক্ষমতায় আসেন। তারা আরো সবলভাবে ‘কমিউনিজম ঠেকানো’ নীতি কার্যকর করে গেছেন। আর তখন থেকেই সোভিয়েত-আমেরিকান ঠাণ্ডা যুদ্ধ আরো প্রবলভাবে জেগে উঠেছিল। ১৯৯১-তে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তা বজায় ছিল। তার মূল কারণ হল, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের। আর সেখান থেকেই ঘটনা এবার তৃতীয় মাত্রায় উন্নীত হয়।
    আসলে, ততদিনে এ দুই রাষ্ট্রের হাতে দুনিয়াকে কয়েকবার নির্মূল করে দিতে সক্ষম, এমন পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ হয়ে গেছিল।

    কিন্তু তাতে আগে যেমন মনে হত  নানান কিসিমের অস্ত্রের  মজুদ হাতে আসা মানেই নিরাপত্তা বোধ জগত। কিন্তু তখন এই প্রথম মনে হতে লাগলে যে না অস্ত্রই নিরাপত্তাহীনতার কারণ। কারণ দুপক্ষই এই ভেবে  প্রচণ্ড মাত্রায় ভীত হয়ে পড়েছিল যে, কোনো ভুলচুক হয়ে গেলে বা ছোট ঘটনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়ার কারণে একপক্ষ যদি অপরের ওপর বোমা ফেলে, তা হলে কী পরিণত হবে? এতে এবার কোল্ড ওয়ার শব্দটার উপর তৃতীয় আরেক বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছিল। যুদ্ধ লেগে যায় কি না এ নিয়ে সর্বক্ষণ টেনশন ছিল আগের এই বৈশিষ্ট্ তো ছিলই। আর এখন কে কার মাথায় পারমাণবিক বোমা ফেলে দেয়; এমনকি ভুলেও যদি হয়ে যায়? সেই দুশ্চিন্তাই সেই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য।
    একটা কথা বলে রাখি। স্টালিন বা পরবর্তীকালের সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধানরা যে নীতি অনুসরণ করে গেছেন তা হলো, মূলত আমেরিকা থেকে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কোন ব্যবসায়িক পুঁজি (এফডিআই) নেয়া যাবে না এবং কেউ নিলে এর বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কলোনি লুটেরাদের হাতে সব ফোকলা হয়ে যাওয়া আমাদের মত দেশের সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার ফলে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ পুঁজি পাওয়া এসব দেশের জন্য মৌলিক প্রয়োজন। অথচ এটাই সোভিয়েত বা কমিউনিষ্টরা মেনে নিতে চায়নি। তাদের পয়েন্ট হল, এতে আমাদের মতো দেশে আমেরিকান প্রভাব বেড়ে যাবে, তাই তারা এতে একমত নন। কিন্তু  তাহলে আমাদের পুঁজি পাওয়ার বিকল্প উপায় কী? না, এ নিয়ে সোভিয়েত নায়কদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
    কিন্তু এর একটা মজার পরিণতি ঘটে গিয়েছিল সত্তরের দশকে। আমাদের সবার লিডার হয়ে এখন সামনে হাজির হতে চাইছে চীন। এর আনুষ্ঠানিক শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সাল থেকে। যখন চীন আমেরিকান পুঁজি গ্রহণের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তবে এর অনেক আগে চীনকে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়েছিল, ১৯৫৮ সালেই। সোভিয়েত ইউনিয়নও ‘আরেক কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী’ দেশ বলে চীন অভিযোগ তুলেছিল; যার নাম দিয়েছিল ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’।
    আমরা আমাদের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এরপর পুরো আশির দশকটাতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের আয়-ইনকাম রাজস্ব কমতে শুরু করেছিল, বিশেষ করে কারখানা উৎপাদন যেখানে মালিকানা মাত্রই সরকারি ছিল। মূলত উৎপাদনে অদক্ষতার দরুন এটা ভেঙে পড়া শুরু করেছিল। আর এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে অন্য সব কিছু মিলিয়ে ফেল করাতে ১৯৯১ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। রাশিয়া বাদে আরো ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে সোভিয়েত মহারাষ্ট্র টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
    সবচেয়ে বড় কথা, কোল্ড ওয়ার জিনিসটারও পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে।

    কোল্ড ওয়ার ২.০
    সেকালে কোল্ড ওয়ারের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা একালে এখানে আবার বয়ান করতে নিশ্চয় বসিনি। তাহলে? অন্তত গত ছয় মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উঠতে বসতে চীন-ব্যাশিং বা চীনকে গুঁতা দেয়া একবারে চরমে নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের পুরো চার বছর (২০১৭-২০) চীন বিরোধিতার বাণিজ্যযুদ্ধ সারা সময়ই কমবেশি ছিল। এমনকি এ বছরের শুধু চীন-আমেরিকার আপসী বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ভাগও দু’পক্ষ স্বাক্ষর করে রেখেছে। কিন্তু আর কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্প করবেন না নির্বাচন পর্যন্ত। কারণ তার বিশ্বাস একমাত্র চরম ও কড়া চীনা ব্যাশিং করলেই তিনি ভোটে হেরে যাওয়ার অবস্থার মুখে, একমাত্র সম্ভাবনা হিসেবে পরিস্থিতি নিজের দিকে ঘোরাতে পারেন।
    সে যাই হোক, নির্বাচনে জয়-পরাজয় তো একটা হবেই। কিন্তু এর আগের যে ভাষ্যটা ক্রমেই প্রবল হচ্ছে সেটা হল, কোল্ড ওয়ার আবার নাকি ফিরে আসছে। দেশের-বিদেশের মিডিয়াতেও প্রায়ই এমন লেখা দেখা যায়। অনেক সিরিয়াস লেখক বা মিডিয়া এমন ভুল করতেছেন।  ইতোমধ্যে ২০১৬ সালে কোল্ড ওয়ার টু – এই নামে একটা প্রপাগান্ডা সিনেমাও হয়ে গেছে। তাই বুঝুক না বুঝুক পেটি মধ্যবিত্ত জোশও একটা তৈরি হয়েছে।  ্বসবের মুল বক্তব্যটা হল, যেহেতু  চীন-আমেরিকার মধ্যকার এবারের হবু টেনশন-সঙ্ঘাত ভালই চড়ছে দেখা যাচ্ছে তাই এর কোন বৈশিষ্ট লক্ষ্মণ বিবেচনা ছাড়াই নিজের আতলামি প্রকাশের জন্য এটা বলা শুরু করে দিয়েছে  যে কোল্ড ওয়ার ২.০ আসতেছে।

    এনিয়ে আমার প্রথম মন্তব্য হল, আমাদের পরিচিত একমাত্র দুনিয়াটাতে আবার নতুন করে কখনো কোথাও কারো সাথে কারো আর কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক তৈরি হবে না, তা দেখা যাবে না।

    কাজেই যারাই কোল্ড ওয়ারের কথা আবার তুলছেন, তারা সময় ও পরিবেশ মিলিয়ে যাচাই করে না দেখেই মুখস্থের মতো এসব কথা বলছেন। তাদের উচিত হবে, কেন সোভিয়েত-আমেরিকা একটা কোল্ড ওয়ার সম্পর্কে জড়াতে পেরেছিল, তার পেছনের অবজেকটিভ বা বাস্তব শর্ত কী ছিল আগে তা খুঁজে দেখা।
    কথাটা সরাসরি বললে, সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য বিনিময় ছিল না। এটাই হল সবচেয়ে নির্ধারক বাস্তবতা। এ কারণে কোল্ড ওয়ারের মতো চরম বিরোধাত্মক সম্পর্কে যাওয়ার বাস্তব শর্ত সেকালে তৈরী ছিল, যা এখন আর নেই। আর কখনো ফিরেও আসবে না। এর বিপরীতে আজকের পুতিনের রাশিয়া আর ভেঙে তৈরি হওয়া ১৫টি রাষ্ট্রসহ সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য। মানে একই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  যখন লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না বলেই  এক রাষ্ট্র অপরের রাজধানীতে বোমা ফেলে আসার কথা অবলীলায় ভাবা তখন সম্ভব ছিল। কারণ পরস্পরের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলেই অপরের মাথায় বোমা  নিজের ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু আজ আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট চীনের বাজারে বিনিয়োগ করে ছেয়ে আছে। তাই চীনের মাথায় বোমা মারতে হলে এর আগে য়ামেরিকাকেই অনেক কিছু ভাবতে হবে। নিজের স্বার্থের মাথায় কে বোমা ফেলে?কারণ আজ সেটা নিজ দেশের বা স্বার্থের প্রতিষ্ঠানের ওপরই বোমা মারা হয়ে যেতে পারে। কাজেই আজকের সম্পর্ক নতুন করে অন্য কিছু একটা হলেও হতে পারে; কিন্তু পুরনো কোল্ড ওয়ার আর হবে না।

    এছাড়াও ফারাক আরও অনেক আছে। সোভিয়েত বনাম আমেরিকার বিরোধ ছিল পরাশক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতিযোগিতা। কিন্তু আজ চীন-আমেইরিকার বিরোধ গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্বের যেখানে আমেরিকা নিজের গবেষণা থেকে জানে সে হারু পার্টি। কাজেই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে টেনশন দেখলেই সেটাকে কোল্ড ওয়ার বলে দিজ্ঞজি বুঝ তুলে কথা বলতে হবে,  এটা কোন ভাল কথা না।

    দুনিয়াতে কোল্ড ওয়ার আর ফিরবে না। এখন চাল-ডাল মিশে যাওয়ার মত অবস্থায় আমরা যখন একবার তা মিশিয়ে দিলে যেমন তা আবার চাল-ডাল আলাদা করা কঠিন, সেরকম আমরা সবাই গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে চলে গেছি বলে চাইলেই অনেক কিছু করা যাবে না। আবার পুজিঁ-পণ্য শ সবকিছু ভাষা পর্যন্ত লেনদেন বানিজ্য বিনিময়ে বন্ধের জায়গায় ফিরে যেতে পারব না। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলছেন, তিনি সম্পর্ক ভালো করতে চীনের দিকে আগাবেন না। কিন্তু নির্বাচনের পরে ট্রাম্পই জিতে গেলে অথবা যেই জিতুক, আবার চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক হওয়া খুবই সম্ভব। এই যে আগে-পিছে করার সুযোগ নিতে পারি এখন, এটা পুরনো কোল্ড ওয়ারের আমলে সম্ভবই ছিল না। কাজেই না-বুঝ অবুঝ কোল্ড ওয়ার নিয়ে কথা বলতে সাবধানতা   নিতেই হবে। যা মনে চায় বলা যাবে না, ভেবেচিন্তে বলতে হবে। কাজেই আমরা আশা করব সকলে এবিষয়ে দায়ীত্ব নিয়ে কথা বলবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৫ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “কোল্ড ওয়ার ‘টু’ হবে কি?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]