Category: কোয়াড QUAD

  • মোহন ভাগবতের হিন্দুত্বে ঢিলা দিবার ভান

    মোহন ভাগবতের হিন্দুত্বে ঢিলা দিবার ভান

    গৌতম দাস

    ১২ জুলাই ২০২১, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Di

                          মোহন ভাগবত

    RSS chief Mohan Bhagwat calls for uniting Hindu society RSS chief Mohan Bhagwat at Manthan meet

    মোহন ভাগবত হলেন আরএসএসের প্রধান। আরএসএস  হল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গুরু সংগঠন। “রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ” [RSS] নামেরই সংক্ষিপ্ত রূপ হল আরএসএস।  ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির মূল “আইডিয়ার” ধারক মানে আদর্শ দেয়ার সংগঠন হল আরএসএস। তবে তাদের মূল আইডিয়া সাধারণ মানুষের কাছে অনেক ‘তিতা’ লাগতে পারে বা কট্টর মনে হতে পারে। তাই উপরে চিনির প্রলেপ দেয়া এদেরই “নরম” গণ-সংগঠনের নাম বিজেপি।

    আরএসএস-এর বৈশিষ্ট্যঃ
    আরএসএস কেমন বৈশিষ্ট্যের সংগঠন? এটা সামাজিক তবে ধর্মতত্বীয় সংগঠন। হিন্দুত্ববাদ, এই ধর্মীয় আইডিয়া ভারতের সমাজে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম। কিন্তু আরএসএস জানে, তার একাজে রাজনৈতিক ক্ষমতাও দরকার। তাই নিজের অধীনস্থ এক রাজনৈতিক দল যার নাম ভারতীয় জনতা পার্টি বা সংক্ষেপে বিজেপি, এই নামে একটা দল রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছে। তবে আইনি কারণে প্রকাশ্যে আরএসএস দাবি করতে পারে না যে, বিজেপি তার অঙ্গ-সংগঠন বা অধীনস্থ দল। তাই তারা বলে থাকে যে, কিছু আরএসএস-সদস্যকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিজেপি নামে রাজনৈতিক দল খুলে সেটা আরএসএসের আইডিয়াতে পরিচালিত করতে। তাই এরা নন-আরএসএস এমন যে কাউকেও বিজেপিতে নিতে পারবে। অর্থাৎ আরএসএসের অনেক কাজ বিজেপির জন্য পালনীয় নয়, বিজেপিতে তা ছাড় দেয়া যাবে। বাজপেয়ি বা মোদী এরা সবাই আসলে আরএসএসের “প্রচারক” সদস্য ছিলেন বা আছেন। প্রচারক, মানে দলের ‘ফুল টাইমার’ বা সার্বক্ষণিক কর্মি,  যারা দলীয় ভাতায় চলেন।

    কেন মোহন ভাগবতঃ
    কিন্তু কেন মোহন ভাগবতের নাম তুললাম? সম্প্রতি (৪ জুলাই) তিনি এক সভায় গুরুত্বপুর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। মুসলমান কোপানো যেসব কাজের জন্য মোদী বা বিজেপির কুখ্যাতি বা যেটা তাদের মূল পরিচিতি, ভাগবত ঐ সভার বক্তব্যে  ঠিক তার উল্টা কথা বলেছেন। যেমন মিডিয়াতে তার ঐ বক্তব্য-রিপোর্টের শিরোনাম – যেমন, আনন্দবাজার লিখেছে, “যিনি বলবেন মুসলিমরা ভারতে থাকবেন না, তিনি হিন্দু নন, বললেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত”। আবার ঐ রিপোর্টের ভেতরে কথা, তিনি বলেছেন, “যে বা যারা গো-রক্ষার দোহাই দিয়ে গণরোষ তৈরি করে কাউকে কাউকে আক্রমণ করছেন, তারাও হিন্দুত্বের বিরোধী”। আবার বলেছেন, …“মনে রাখতে হবে ভারতের হিন্দু, মুসলমান একই (ডিএনএ বা DNA) উৎস থেকে এসেছেন”। এ ছাড়াও আছে, …”গরু একটি পবিত্র প্রাণী। কিন্তু গো-রক্ষার কারণে যারা গণরোষ তৈরি করে অন্যকে আক্রমণ করছেন, তারা হিন্দুত্ব থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। আইন আইনের পথেই চলবে”।  অথবা, ‘‘আমরা গণতন্ত্রে বাস করি। এখানে হিন্দু বা মুসলিম, কারওরই প্রাধান্য থাকতে পারে না। এখানে প্রাধান্য পাবে শুধু ভারতীয়রা……”।

    “We are in a democracy. There can’t be a dominance of Hindus or Muslims. There can only be the dominance of Indians.”
    “…cow was a holy animal for Hindus, but those involved in lynching were “going against Hindutva”, according to The Times of India. “Law should take its own course against them without any partiality,”
    “Hindu-Muslim unity is misleading as they are not different, but one,” he said, according to PTI. “DNA of all Indians are same, irrespective of religion”
    …urged muslims not to get “trapped in the cycle of fear” that Islam is in danger in India.

    মোহন ভাগবত লিঞ্চিং [lynching] নিয়ে কথা বলছেনঃ
    মোহন ভাগবত এমনকি লিঞ্চিং বা কথিত গণপিটুনিতে মৃত্যু মানে দলবদ্ধভাবে রাস্তায় মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ঘটনা এতদিন মোদির আমলে ঘটে এসেছে সে সবের দায় অস্বীকার করে পুরা উল্টা কথা বলছেন। অথচ দুইবছর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘‘গণপিটুনি পাশ্চাত্যের ভাবনা। ভারতীয় ঐতিহ্যে এই শব্দ নেই। এর উৎস অন্য একটি ধর্মীয় গ্রন্থ। এই শব্দ ভারতের উপর চাপিয়ে দেবেন না।’’ এভাবে  তখন তিনিই পরোক্ষে এর দায় অস্বীকার করার চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন।
    অথচ এখন বলছেন, “যারা লিঞ্চিংয়ে জড়িত তারা হিন্দুত্ববিরোধী লোক”। অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই গরু রক্ষার রক্ষক সেজেছিলেন। আর এই রক্ষার নামে, গরু হাটে বেচাকেনা, গরু মাংস হিসেবে বিক্রি, দুধের ব্যবসার জন্য গরু পালা কেনাবেচা, ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা ইত্যাদি সবকিছুর বিরুদ্ধে আইন করতে গেছিলেন। প্রথমে আলাদা আলাদা কয়েকটা রাজ্যে আইন করেছিলেন, পরে কেন্দ্র সরকারের হয়ে আইন করেছিলেন। কিন্তু আইন চালুর একপর্যায়ে সুপ্রিমকোর্টের শুনানিতে জাজের প্রশ্নের সদুত্তর না দিতে পেরে শেষে পিছু হটে ‘আপাতত’ স্থগিত বলে ঘোষণা দিয়ে সরে এসেছিলেন সেই গোরক্ষা আইন থেকে। অথচ আজ মোহন ভাগবত সব দায় অস্বীকার করে বলছেন, “লিঞ্চিংয়ে জড়িতরা হিন্দুত্ববিরোধী লোক”। তাহলে কি তিনি বলতে চাইছেন মোদি সরকারটাই হিন্দুত্ববিরোধী? না ঠিক তা নয়। তাই তিনি এবার আরেক গল্প জুড়ে দিয়ে দাবি করছেন, ওসব  নাকি ছিল সব মিথ্যা মামলা! [Though at times, some false cases of lynching have been registered against people, Bhagwat said.]।

    তবে এবার এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। লিঞ্চিংয়ের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে ভাগবত কিন্তু স্বীকার করে ফেলেছেন বা করে নিয়েছেন যে, মোদী ও তাঁর দলই আসলে একটা এমন লিঞ্চিং উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন। কথাটা বলছি এজন্য যে ব্যাপকভাবে এমন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ‘অন ক্যামেরা’ মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও [তাবরেজ আনসারিকে লিঞ্চিংয়ে হত্যা দেখুন “Our Dear Jharkhand Now Known As ‘Lynchistan’ In Country”: Brinda Karat] ঐ মামলায়  মোদী সরকারের এক সংখ্যালঘু মন্ত্রী আছেন; তিনি তাকে দিয়ে এসব ঘটনায় মন্ত্রী হিসেবে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, এমন ঘটনাগুলোর কথা সরকারের জানা নাই, এগুলো সব গুজব”।

    ওদিকে আরো ছিল। যেমন রাস্তায় যেকোনো মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে ‘জয়শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা এবং ক্রমাগত নির্যাতন করা যেমন বুকের খাঁচার ওপর উঠে দাঁড়ানো ইত্যাদি ধরনের অজস্র টর্চার- এসব ভিডিও ক্লিপ আমরা দেখেছি।

    আবার কলকাতার সর্বশেষ আরেক রূপ দেখেছি। জেলা শহরের শিক্ষকরা কলকাতায় অফিসের কাজে এসে, তারা মুসলমান বলে তাই তাঁরা শহরের হোটেলে থাকতে পারবে না, রেস্টুরেন্টে খেতে পারবে না বলে কথিত “পাড়া কমিউনিটির নামে” আপত্তি তুলে তাদের বের করে দেয়া হয়েছে।

    আরো ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ছিল। তাবলিগ মারকাজে যোগ দিতে আসা প্রথমবারের লকডাউনে শহরে আটকা পড়া মুসলমানদের নিয়ে। বিজেপি মিডিয়া সেলের প্রধান এটাকে প্রসঙ্গ করে প্রপাগান্ডা ছড়ায় যে, মুসলমানরা অসভ্য, এরা খেতে জানে না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা জানে না। হাতের আঙুল দিয়ে উঠিয়ে চেটে চেটে এরা খায়”। অর্থাৎ এটা নাকি মুসলমানদের নিচা কালচারের কাজ ও প্রমাণ। এভাবে মুসলমানদের নিয়ে নেতি ‘চিত্র’ একে সেবার এরা ছড়িয়েছিল যে, একারণেই নাকি ভারতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী এই নিচা কালচারের মুসলমানরা। চরম ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দু সমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য ওই সেলে কিছুই করতে বাকি রাখে নাই। অথচ এখন মোহন ভাগবত বলছেন, ভারতের হিন্দু-মুসলমান তারা সব এক। শুধু ‘একই’ না, তাদের ডিএনএ (মানুষের শরীরের মৌলিক কণা বা জিনগত বৈশিষ্ট্য) এরা একই। অর্থাৎ ইংরেজি রেস অর্থে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত বৈশিষ্ট্যও নাকি একেবারেই এক। কী সাঙ্ঘাতিক? একেবারে উল্টা ‘ফতোয়া’!

    এদিকে মোহন ভাগবতের এই বক্তব্য প্রসঙ্গে, ভারতের মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র-প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে দ্য হিন্দু পত্রিকা লিখেছে। পত্রিকাটার নিজস্ব মন্তব্য হল, সমাজের বেশির ভাগেরই ধারণা, বদলে যাওয়া গ্লোবাল রাজনীতিতে আরএসএস তার ইমেজ বদলে খাপ খাইয়ে নিতে এটা করছে বলে মনে করছে [However, most of them saw it as an attempt to reshape the RSS’s image according to changing global politics.]। 

    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় হায়দ্রাবাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফয়জান মুস্তফা [Faizan Mustafa], কলাম লিখেছেন। তার পুরা লেখাটা “সবাই লিবারেল বা উদারনৈতিক হয়ে গেলেই তো হয়” ধরনের; মানে হিন্দুত্বের চাপের মধ্যে থাকা এতদিনের কলকাতার মুসলমানদের অবস্থার মত। যার সার কথা হল, হিন্দুত্বের আধিপত্যটাকেই আপন বলে মেনে নিতে এরা সাজেশন দেন। কারণ, তাহলে বিনিময়ে ওরা হিন্দুত্বের সমাজে থাকতে পারবে –  তাতে ওরা স্কুলে ঢুকতে দিবে, এক বেঞ্চে বসতে দিবে, পাস করে ডিগ্রি পেলে একই অফিসে কলিগ বলে দু-এক্টা চাকরি ছুড়েও দিতে পারে ইত্যাদি। অতএব, এটাকেই মুসলমানেরা নিজেদের ‘লিবারেল’ জীবনযাপন বলে চালিয়ে দেক, এটাই এদের মন বাসনা! যেন বলতে চায় বিরোধ করে আর কতদুর কী হবে!

    আসলে ফয়জান মুস্তফার লেখার শিরোনামটাই এমন অনেক কথা বলে দেয়। যেমন তার লেখার শিরোনাম হল, ‘মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক মন্তব্যটা কি হিন্দুত্ববাদের নরম ধারার ইঙ্গিত?’ [Are Mohan Bhagwat’s recent remarks a sign of moderation in Hindutva?]

    নিঃসন্দেহে এগুলো খুবই হতাশার কথা। কারণ যেখানে খাড়া কথাটা হল – কারো ধর্মীয় মতবাদের নরম বা গরম রূপ বা ধারার কোনোটা নিয়েই আমাদের রাষ্ট্র সাজানো যায় না।  কারণ রাষ্ট্র গঠন বা সাজানোর কাজে কম্প্রোমাইজ বলে করার কিছুই নাই, সুযোগ নাই। কারণ মূল কথা, নাগরিক যেই হোক তারসহ সবার নাগরিক অধিকার সমানই হতে হবে। কোনো উসিলায় কেউ ‘বেশি অধিকারী’ হতে পারে না। যেমন আমরা সংখ্যায় বেশি বা আমার ধর্মটা বেশি ভালো বা আমি সমতলী তাই পাহাড়িদের চেয়ে আমি এগিয়ে অথবা আমি বাঙালি ইত্যাদি কোন অজুহাতেই কারো অধিকার কম কারো বেশি এটা হতে পারবে না।

    কাজেই মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদটাকে এবার নরম করে হাজির করেছেন কিনা – এটা কোন আলাপই হতে পারে না। তাই এটা মুসলমানদেরসহ কারো গ্রহণযোগ্য হবে – সরি, আমরা খুবই সরি; এটা হতেই পারে না। বিশেষ করে নরম অথবা গরম যাই হোক এটা মূলত হিন্দুত্ববাদ এদিকটা নজর করতেই হবে। এই হলো সার কথা। তবে ফয়জন সাহেব হয়ত বাস্তবের সমাজে হিন্দুত্বের প্রবল চাপের মধ্যে টিকে ও বেঁচে থাকতে চেয়ে কৌশলগতভাবে এমন লিখতে গিয়েছেন। কিন্তু তবু মোহন ভাগবতের প্রশংসা করতে যাওয়ার কৌশল নেয়াটা তার ঠিক হয়নি। [The RSS chief deserves appreciation for repeatedly saying that Muslims are equal citizens of this country.] তিনি তাকে স্বাধীনচেতা ও অন্য কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের তুলনায় ভালো বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেজন্যই নাকি মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদের এসব অন্যায়কে অন্যয় বলতে পেরেছেন- এমন মন্তব্য করেছেন। [He speaks his mind and that, too, without any fear of retaliation from the extreme Hindu right. ]

    আসলে ফয়জন মোস্তফা সাহেব এখানে বাস্তবতার চাপে সম্ভবত চরম আর সহনশীল বলে দুটো হিন্দুত্ববাদ আছে এ কথা বলছেন। তবু এভাবে কথা বলাও আসলে কৌশলগতভাবেও ভুল পথ। তবে তিনি প্রশ্ন তুলে একটা শেষ বাক্য লিখেছেন খুবই মারাত্মক।   লিখেছেন, ‘রাজা রামমোহন রায়ের কথিত হিন্দু রেনেসাঁ কি আসলে বেদ ও উপনিষদে আবার ফেরত যাওয়ার তাগিদ ও আহ্বান নয়? Was not Raja Ram Mohan Roy’s Hindu renaissance all about going back to the Vedas and Upanishads? তার লেখার শেষের এই অল্প কটা শব্দের বাক্য কয়টা আসলে তার মনের কথা – যা তিনি বাইরে না এনে পারেননি। এ জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

    কেন এই সময় মোহন ভাগবতের পিছু হটতে চাইলেন?
    নিঃসন্দেহে এটা আরএসএস-বিজেপিরই পিছু হটা; তাতে এটা গরম থেকে নরমে অথবা আগের হিন্দুত্ববাদই তাতেও কিছু যায় আসে না। তবে সেটা এবার লিবারেল করে হাজির করা হয়ত – সেটা যাই হোক না কেন, এটা পিছু হটাই। কিন্তু কেন? আর এখন কেন? এর সম্ভাব্য দু’টি কারণ বলব।

    এক. মোদি সরকারের অবস্থা ভালো নয় বলে সেটা আরএসএস-বিজেপি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এসেছে। এর মূল বিষয় অর্থনৈতিক দুরবস্থা। মনে রাখতে হবে, করোনা এবং দ্বিতীয় ঢেউ অবশ্যই  অর্থনীতির দুরবস্তায় বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু যারা ভারতের অর্থনীতি মনিটর করে আসছেন তারা মানেন, করোনা ফ্যাক্টর হওয়ার বহু আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি দুর্বলতা দেখিয়ে আসছিল। আর সেটাই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার পরও। তবে এবার ফাইনালি মোদী ধরা খেয়েছেন কারণ তিনি উত্তরাখন্ড রাজ্যে কুম্ভমেলায় গঙ্গাস্নানের আয়োজন আর কয়েকটা  রাজ্য নির্বাচনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কারণে  অতিরিক্ত রোগীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা (অক্সিজেন, বেড বা সৎকার ইত্যাদি নিয়ে হাহাকার) ভেঙ্গে পড়ায় সবকিছুতে মোদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। সহসাই আর এই অর্থনীতিতে রিকভারি হচ্ছে না। কারণ এখন  মুখ্যত প্রথম এক বছর যাবে করোনা থেকে রিকভারি করতে; এরপরে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মনোযোগ দেয়ার সময় আসতে পারে। আর ইতোমধ্যেই সরকারি ফান্ডে অর্থের সঙ্কট চারিদিকে উকি দিচ্ছে। যেমন জ্বালানি তেলের উপর ট্যাক্স বসিয়ে দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সঙ্কটের এটা একটা খুবই খারাপ চিহ্ন। কারণ এটা আত্মঘাতি। কারণ তেলের দাম বাড়ানোর ইমপ্যাক্ট যেকোন উতপাদিত পণ্য ও সেবার উপরে বড় করে পড়ে। এক লিটার ডিজেল বাংলাদেশে ৬৫ টাকা আর ভারতে (বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করে) ৮১ টাকা।

    ইন্ডিয়ান হামবড়ার ফেরত মারঃ
    এছাড়া সব কিছুতে অপ্রয়োজনে মিথ্যা হামবড়া দেখানো ভারতের এক পুরনো স্বভাব। তবে অনেক হামবড়া দেখানোর ক্ষেত্রে বাইরের মানুষ পরে জেনে যায় ওই অংশটা লোক দেখানো ছিল তবে তাতে হয়ত তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু ভারত ‘টিকা কূটনীতির বড় প্লেয়ার’ এই মিথ্যা হামবড়া ভাব এবার ভারতকে একেবারে ফুটা করে ছেড়ে দিয়েছে। খোদ ভারতই এখন সারা দুনিয়া থেকে নিজের জন্য টিকা সংগ্রহে নাকাল হয়ে পড়েছে। কারণ সুপ্রিম কোর্ট একেবারে চেপে ধরেছে এর সত্যিকার অবস্থা জানাতে বলছে। এতেও ভারতের যোগ্য সবার জন্য টিকা দেয়া শেষ করতে ক’বছর লাগবে সেটাই এখনো অনিশ্চিত।
    এর পরে আরো বড় সমস্যা আছে। এখন টিকার বড় অংশ বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে বলে এই টিকার মূল্য (আগে স্থানীয় টিকা ছিল ১৫০ রুপী, এখন তা হাজার রুপীর মত) জোগাড় করতে আর সাধারণভাবে ‘স্বাস্থ্য খাতের’ অর্থ পেতে ভারত এখন লাজলজ্জা ভুলে তৃতীয় বিশ্বের গরীরদেশ সেজেছে।  আসলেই সে গরীব দেশ হয়েও নিজের হামবড়া দেখাচ্ছিল যে সে টিকা কূটনীতিতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর এখন সেসব ফাঁপা ইমেজ ভুলে, পশ্চিমের দাতা অনুদান চক্রের কাছে খোলাখুলি হাত পেতে “লাইনে দাড়িয়ে গেছে”। জয়শঙ্কর আমেরিকার মন পেতে হয়রান সময় পার করছে। এক কথায়, ভারত এখন টিকা পেতে আর হাসপাতালের খরচ চাইতে  এখন দাতব্যের সন্ধানে নেমেছে। তাকে লিল্লাহ-য় এখন এসব পেতেই হবে। কারণ এখন লোকলজ্জার সময় নেই। কেন?
    এক কথায়, যতই ভারত তার নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা পেতে দেরি করবে ততই অর্থনীতি ন্যূনতম স্বাভাবিক হতে তা পিছাতে থাকবে। আর তাতে, ততদিন অর্থনৈতিক রিকভারির প্রসঙ্গে কথা আসতে পারবে না। টিকাদান শেষ না হলে অর্থনীতি, মানে ন্যূনতম অবাধে মানুষের মুভমেন্টই শুরু হবে না। করা যাবে না। আর এর ভেতরে আবার যদি করোনার তৃতীয় কী চতুর্থ ঢেউ হানা দেয় তো সব শেষ। এজন্যই সব দেশের জন্যই টিকাদান সবার আগে শেষ করা একেবারেই মুখ্য কাজ। অথচ মোদীর জন্য একাজটাই এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।

    এদিকে, ইতোমধ্যে ভারতের জন্য এক মহাবিপর্যয় এবং ইজ্জতের সওয়াল উঠে এসেছে।  যার শুরুটা করেছিল লন্ডনের ফাইনান্সিয়াল টাইমস ম্যাগাজিন। তারা এক বিস্তারিত রিপোর্টে ভারতের অর্থনীতি থেকে দেখিয়ে রিপোর্ট করে যার শিরোনাম হলো,  “India’s Covid calamity exposes weakest link in US-led ‘Quad’ alliance”। মানে হল, ভারতের কোভিড বিপর্যয় (মানে কোভিডের সেকেন্ড ঢেঊয়ে মোদী প্রশাসনের ভেঙ্গে পড়া) আমাদেরকে খুলে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকান নেতৃত্বের কোয়াডে ভারত একটা দুর্বল শক্তি, একটা মারাত্মক ফুটা (উইক লিঙ্ক)। কোয়াড মানে আমেরিকা, জাপান অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের এক আন্তর্জাতিক জোট।  অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে এই জোটের মধ্যে ভারত দুর্বল বলে সে কম্পটেবল বা বাকি সবার সাথে তুলনীয় দেশ নয়; ফলে সে বাকি সবাইকে ডুবাবে। অর্থাৎ আবার সেই খামোখা হামবড়া দেখানোর পরিণতি।

    আমাদের দিনাজপুরের এক আঞ্চলিক প্রবচন – “দই ফেলে  ভেলটাঙগা!”। মানে, দই এমন একটা জিনিষ যা একবার মাটিতে পরে গেলে তা আর উঠায়ে নেয়া যায় না। তাই দই হাত থেকে পরে গেলে এবার আর নিজের বোকা উলটানো ঠোট দেখায়ে নিজের বেকুবি প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।  কাজেই সাবধান!  মানে আমাদের এই কনটেক্সটেঃ  চাপাবাজি করতে গিয়ে আজ মোদীর এই দশা। তাই সব জিনিষ নিয়ে চাপাবাজি করতে হয় না।

    ভারত টিকার কারখানা বাড়ানোর জন্য আমাদের থেকে আগাম অর্থ নিয়েও শেষে টিকা দেয় নাই। অনেকের কাছে মনে হতে পারে ব্যাপারটা একেবারেই লোকাল আঞ্চলিক। মানে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যেকার রাগারাগি। তাই সবাই ভেবেছিল এই কেলেঙ্কারি ঘরের ভিতরেই থাকবে।  না একেবারেই না। এটা গ্লোবাল। আর এই অভিযোগে ভারত কোয়াড জোটে থাকার অযোগ্য, এখন এই প্রশ্ন উঠে গেছে। কেন?

    বাইডেন ক্ষমতায় এসেই দেড় মাসের মধ্যে প্রথম কোয়াড  মিটিং (অন লাইনে) ডেকে বসেছিলেন ১২ মার্চ ২০২১। উদ্দেশ্য ছিল নিজদেশের জন্য টিকার হাল করা আর সাথে সারা দুনিয়ায় জন্য কিছু টিকার মজুদ যোগাড় হাতে নিয়ে টিকা কুটনীতিতে চীনের মোকাবিলায় নামা যায় কিনা সে সম্ভাবনা যাচাই করা।  কিন্তু সেখানেও মোদীর সেই হামবড়া সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছিল। বাইডেনের ইচ্ছা ছিল না আগেই টিকা বিলি করা নিয়ে এখনই চীনের সাথে মাসল দেখিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ার। তিনি কেবল সম্ভাবনা কী তা জানতে চাচ্ছিলেন আর তার মূল টার্গেট ছিল আমেরিকার জন্য টিকা সংগ্রহ।  কিন্তু ভারত দাবি করতে থাকে যে সে সারা দুনিয়ার জন্য টিকার মজুদ নিয়ে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে। এমন উতপাদন সক্ষমতা তার আছে। কেবল, বিনিয়োগ ক্ষমতা নাই বলে সে পারছে না। আমেরিকা বিনিয়োগে সাহায্য করলে সে টিকা কূটনীতিতে চীনকে দেখিয়ে দিতে পারে।  বাইডেন জাপানকে এসব কথা চিন্তা করেই আগাম কথা বলে এসেছিলেন যে জাপান সেই বিনিয়োগ দিবে। এভাবে ভারতের হামবড়ার চোটে শেষ পর্যন্ত রেজুলেশন দিয়ে মিটিং শেষ করতে হয় যে তারা চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে।

    এখন বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত টিকা না দিবার খবর সবাই জেনে যায়। তাই ফাইনান্সিয়াল টাইমস এখন এঘটনাকে ভারতের আসল মুরোদের উদাহরণ হিসাবে হাজির করেছে। আর বলছে যার প্রতিশ্রুত টিকা দিবার মুরোদ নাই এমনকি নিজদেশের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা উতপাদনেরই মুরোদ নাই – তাকে বাইরে থেকে টিকা সংগ্রহে নামতে হয়েছে – সে কেন ঐ হামবড়া দেখায়ছিল? চীনের সাথে টিকা কূটনীতির প্রতিযোগিতায় নামা দূরে থাক সে তো নিজের টিকাই বানাতে পারে নাই। ভারতের সামগ্রিক টিকা উতপাদন ক্ষমতা ভারতের নিজের জন্যই যথেষ্ট নয়। এর সবসচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, ভারত ইতোমধ্যেই টিকা আমদানি শুরু করে দিয়েছে। তাহলে সে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা টিকা কূনীতি এসব বলে আমেরিকার কাছে মিথ্যা হামবড়া  করতে গেছিল কেন।

    আবার ভারতের নিজের স্বাস্থ্য  ব্যবস্থাই যার এত দুর্বল যে এটা ভেঙ্গে পড়েছে – এটা তো একটা চিহ্ন যে, রাষ্ট্র হিসাবে এর সক্ষমতা দক্ষতা কেমন কী কোন স্তরের। কাজেই সে প্রতিযোগিতায় আসবারই তো যোগ্য নয়!

    ভারত টিকে আছে “কঠিন উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেমের” ফুটানি দিয়ে। স্বভাবতই এসব কথা তাদের হজম করা কঠিন। তাই তাদের যুক্তি একটাই যে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ এসে গেল তাই নাহলে চীন-আমেরিকাকে দেখিয়ে দিত।  এটা মিথ্যা কথা, কোন জবাবই নয় এটা। একই কথা বাংলাদেশকে টিকা না দিয়ে আমাদেরকেও দিয়েছিল। কারণ মূল প্রশ্ন হল, ভারতের টিকা উতপাদনের মোট সক্ষমতা যোগ করলেও তা শুধু ভারতের জন্যই যথেষ্ট নয়। কাজেই সে সারা দুনিয়ার জন্য টিকা উতপাদনকারী এই দাবিই তো ভুয়া। টিকা কূটনীতিতে সে নামতে চায় এই কথা তার উচ্চারণই তো হারাম! তাতে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ কোনদিন না আসলেও ভারত এই সমস্যাতে পড়তই!  এছাড়া ভারতের ১৮ বছরের উপরের সবাইকে টিকা দিতে গেলে ভারত কী পাচবছর লাগিয়ে তা নিজে উতপাদন করবে – এমন সুযোগ তো কোভিড দিবেই না! আর এই পাচবছর কী ভারতের অর্থনীতি সচল হলে অপেক্ষা করে বসে থাকবে? তবু ভারতের পালটা যুক্তিগুলো এমনই দেশপ্রেমে ভরা! কাজেই পালটা যুক্তিগুলো এমন খামোখা হামবড়ায় ভরা! এখানে তার কয়েকটা তুলে দিলাম যেমন এক,  দুই,    তিন । এককথায় এগুলো মুখরক্ষামূলক এমন দাবি যে কারও সাহায্য ছাড়াই ভারত চীনের মোকাবিলা করে চলেছে লাদাখে, এরকম। অথচ এই দাবিটাও ভুয়া। কারণ ভারত কম্প্রোমাইজ করেছে চীনের কাছে ভুমি মালিকানা ছেড়ে দিয়ে আর দুই, ভারতের সরকার বা রাজনীতিক আর বাহিনীর লোকেরা নিজেদের মধ্যে স্বীকার করে নিয়েছে যে ভারত সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয় তাই এই আপোষই জায়েজ! কাজেই চাপাবাজিতে হামবড়া করে চলতে চাইলে একসময় না একসময় হাত থেকে দই ফেলে দেওয়ার দেওয়ার বেকুবিতে পড়তেই হবে!

     মোহন ভাগবতের পিছু হটার দ্বিতীয় কারণঃ  এই কারণটা হল, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ফেরত চলে যাওয়া। ভারতের ওপর এর সোজা প্রভাব হল, এতদিন আমেরিকার আড়ালে থেকে ভারত জঙ্গিবাদ বিরোধিতার নামে ইসলামোফোবিক, ইসলামবিদ্বেষী সব ঘৃণা জাগিয়ে সারা ভারত এবং প্রতিবেশীদের ওপর হিন্দুত্ববাদের ছড়ি ঘুড়িয়ে চলছিল। কিন্তু এখন আমেরিকা নেই (মানে প্রত্যাহার) তো ভারসাম্য নেই, ভেঙে গেছে। সশস্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক গ্রুপ প্রায় সবাই এতে মুক্ত হয়ে ভারসাম্য ভেঙে পড়তে শুরু করবে বা ভেঙ্গে গেছে বলে তাদের সবার সাথে এখন আমেরিকা তো নাই,  ভারতকে নিজেই নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য এদের মোকাবেলা করতে হবে। এ কারণে ভারতের কাশ্মির রক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। অথচ গত দু’বছর ধরে কাশ্মিরে কেবল রাজনৈতিক তৎপরতা নয়, সাধারণ অর্থনৈতিক তৎপরতাও স্তব্ধ করে ফেলে রাখা হয়েছিল। মোদির ‘হামবড়া’ ছিল এই যে হিন্দুত্ববাদের জোশ তুলে কাশ্মিরকে দখল করে রাখা সম্ভব ছিল, ভারতের স্বাধীনতার সেকালে। সেটাই সে নাকি এখন করে ভারতের  কাশ্মীর বিজয় (৫ আগষ্ট ২০১৯) ঘটিয়েছিল।

    অথচ এখন উল্টা ভারতীয় কাশ্মির রক্ষা ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে শুরু করেছে। কাশ্মিরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরাটাই সশস্ত্রমুখী হয়ে ওঠার সম্ভাবনায় কাপছে! অবস্থা আঁচ করে আমেরিকার পরামর্শে মোদি দ্রুত আপস করার পথ খুঁজছেন কিন্তু তা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কাশ্মীরের আইনি রাজনীতিক যেগুলা ছিল তাদেরকে মোদী এতদিন ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। আজ সবাইওকে তোয়াজ করে ডেকে নিয়ে মোদী নিজ বাসভবনে মিটিং করেছেন। ওদিকে  ওই অঞ্চলের ইরান বা পাকিস্তানের সহযোগিতা এমনকি কিছু পরামর্শ পাওয়ারও পথ রাখেননি মোদী। কারণ যেমন ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে অবিবেচক ভারতের ভারত-ইরান সম্পর্ক হাতছাড়া হয়ে ভেঙে গেছে। আর ওদিকে পাকিস্তানবিরোধী অভ্যন্তরীণ হিন্দুত্ববাদী জজবা তুলে হিন্দু মেরুকরণে ভোট সাজতে গিয়েছেন তিনি সবসময়। আর এতে এখন পাকিস্তানের ইমরানের কোন সহযোগিতা পাওয়ার পথও তিনি নিজেই বন্ধ করে রেখে গেছেন। কিন্তু এখন বাইডেনকে খুশি করতে এমন বক্তব্য আপাতত তাকেই দিতেই হচ্ছে।

    অতএব, থুতু ফেলে সেই থুতু গেলা। হিন্দুত্ববাদের নরম ভার্সানকেই মোহন ভাগবতের বাইরে নিয়ে আসা! কিন্তু এতে ভরসা? না একেবারেই অনিশ্চিত সেটা! কেন?

    কারণ আগামি বছরের শুরুতেই তিনটা গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচন উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব আর উত্তরাখন্ড। এর মধ্যে  উত্তর প্রদেশ সবচেয়ে বড় রাজ্য ফলে খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু আগের মতই মুসলমান কোপানো ছাড়া কখনই মোদী সেখানে ভয় দেখিয়ে নিজের বাক্স ভরতে পারে নাই। কাজেই এবার আরো না পারার সম্ভাবনা। অতএব আবার সেই  জয় শ্রীরাম বলানো কিংবা ‘ফ্রিজে মাংস রাখার’ অজুহাত ধরণের নির্যাতন বা কুপিয়ে হত্যার দিন আবার ফিরে আসার সম্ভাবনাই প্রবল!

    পঞ্চাশের দশকের ভারতের হিন্দি সিনেমার বিখ্যাত নায়ক দিলীপ কুমার যার আসল নাম ইউসুফ খান; তিনি গত সপ্তাহে বার্ধ্যক্কে  মারা যান। কিন্তু তাকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের সোশাল মিডিয়ায় যে  গালাগালি অপমান এসবই প্রমাণ করে মোহন ভাগবত কিছুই বদলান নাই। বদলাতেই চান এমন কোথাও কোন প্রমাণই এখনও নাই। সবই আসলে আইওয়াশ আর নয়ত চাপাবাজি!

    ভারত আসলে মোহন ভাগবতের খাঁকি হাফপ্যান্টের নিচে চাপা পড়ে গেছে। আর এই খাকি আবার হের হিটলারের ভলিনটিয়ার বাহিনীর সিম্বলিক পোষাক! কাজেই……

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১০ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “মোহন ভাগবত পিছু হটছেন কেন“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ছেন না দুনিয়াকে শাসন

    বাইডেন আফগানিস্তান ছাড়ছেন না দুনিয়াকে শাসন

    গৌতম দাস

    ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3uR

    America’s Slow-Motion Failure in Afghanistan – FOREIGN AFFAIRS

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন হল, হিটলারের উত্থান ও দমনের পর থেকে রেসিয়াল [race or racial] জাতের গর্ব দেখানো, কাউকে রেসিয়ালি অন্যের সাথে তুলনা করা, উঁচা-নিচা দেখানো ইত্যাদি সবই মারাত্মক অপরাধ-কাজ বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তবু  ছোট গ্রুপের চর্চায় ফাঁকে-ফোকড়ে এখনো এসব বিষয় উঠে আসতে ও থাকতে দেখা যায়। যদিও  লিখিত অক্ষরে বা প্রকাশ্যে তা আর চর্চা তেমন করা হয় না, তবে প্রমাণ না থুয়ে কানে কানে চর্চাই পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বেশকিছু ব্যতিক্রম, আইন-নিয়ম ভাঙ্গা ট্রাম্পের গত চার বছরের প্রশাসনের আমলে আমরা খোদ আমেরিকাতেই ঘটতেও দেখেছি । সেটাই প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসন যা যতটা সম্ভব প্রকাশ্যে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” ও রেসিয়াল বা বর্ণবাদী  রাজনৈতিক ধারাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গেছে। সেটি অনেক কাছ থেকেই আমরা দেখেছি। বিশেষ করে ৬ জানুয়ারি ২০২১ যা JAN6 capitol hill riot  নামে পরিচিত সেদিনের অপতরতা-ঘটনা ইতিহাসে লেখা হয়ে গেছে ও থাকবে। কিন্তু সেসব সাদা-কালো অথবা জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদের কথা এখানে এখন কেন? মূল কথা হল, জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা ব্যাপারটা কেন খারাপ ও অন্যায়-অপরাধ সে সবই এখন গ্লোবজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের এই সময় যারা হেরে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন তাদের কারো কারো মধ্যে ওই হার স্বীকার না করে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা” আঁকড়ে ধরে আবার উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা ও বৃথা চেষ্টা করার ঝোঁক বর্তমান থাকতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটাও তো প্রবল বেড়েছিল ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ কয়েক মাসে যা শেষ হয়ে এখন বাইডেনের ক্ষমতায় আসা তিন মাস পার হওয়ার পর ক্রমে বাইডেনের পাকাপোক্ত হয়ে বসার সাথে সাথে ওসব সাদা-বাদী ঝোঁক তো আপাতত শীতল হয়ে গেছে বা যাচ্ছিল! তাহলে আবার হঠাৎ পুরান অভিযোগ কেন?

    একমাত্র কমন শব্দের শিরোনাম – উইথড্রলঃ
    গত ১৩ এপ্রিল সারা পশ্চিমা মিডিয়ার মূল শিরোনামে একমাত্র শব্দ ছিল, উইথড্রল [Withdrawal] বা সেনা প্রত্যাহার। অর্থাত কমন শিরোনামটা প্রায় এরকম যে,  “বাইডেনকে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে আসতে হবে” [Biden to Complete Full Afghanistan Withdrawal by Sept. 11]।’ লন্ডন ইকোনমিস্ট  প্রিন্টেড পত্রিকায় অনেক রিপোর্টের শিরোনাম পরবর্তিতে অনলাইন ভার্সানে বদলে দেয়া হয়ে থাকে, তবে দুটা শিরোনামের রেফারেন্সই থাকে। আর প্রিন্টেডের শিরোনামটা খুবই ছোট রাখা হয়। ওর এক অনলাইন শিরোনাম করেছে, বাইডেন আফগান যুদ্ধে তার দুর্বল বন্ধু ফেলে পালিয়ে আসছেন”, [Joe Biden gives up on the war in Afghanistan, leaving a weak ally]। আর সাথে আরেকটা ছোট শিরোনামও আছে, সেটি বলছে, “চিরদিনের জন্য যুদ্ধ শেষ করে” [Ending the forever war]।  কিন্তু এমন করে কথাটা লিখছে কেন? কারণ, এই ছোট অংশটাই বাইডেনের উচ্চারিত কোট-আনকোট কয়েকটা হুবহু শব্দ।

    কিন্তু, এর মানে কি আমেরিকা আর কখনো যুদ্ধে যাবে না? তাই কি বুঝাচ্ছে? কিন্তু এর আগে ট্রাম্পও তার ক্ষমতায় আসার প্রথম বছর (২০১৭) থেকেই তো প্রায় একই সেনা প্রত্যাহারের কথা বলে আসছিল। সেটা বাস্তবায়ন হলে এতদিনে ট্রাম্পেরই তো  সব ফেলে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসার কথা! কিন্তু তখন তো ইকোনমিস্ট এমন শিরোনাম করেনি? এবার করছে কেন? তার মানে কী ট্রাম্পকে পাগল ভেবেছিল, সিরিয়াসলি নেয় নাই? এখন তাই তো মনে হচ্ছে! আবার এমন কি কেবল ইকোনমিস্ট পত্রিকাই শিরোনাম ও রিপোর্টে করছে? না তা একেবারেই না। আমেরিকা-ইউরোপ মিলিয়ে সারা পশ্চিমের সব লিডিং পত্রিকার টোনই প্রায় একই, এই ইকোনমিস্টের মতনই।

    যেমন আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’ শিরোনাম করেছে, বাইডেনের “আফগানিস্তান ছেড়ে আসা কি বিপথগামিতা না অনেক আগেরই বকেয়া?’ [Is Leaving Afghanistan Misguided or Overdue?] তখন ওয়াশিংটন পোস্ট আবার আরো কড়াভাষায় লিখছে, “আমেরিকান-মিথ্যা-গর্বের এক কবরে পরিণত হয়েছে আফগানিস্তান” [“Afghanistan became the graveyard of American hubris“]। ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “আমেরিকা আফগান সেনা প্রত্যাহারের পরে কী করে দূর থেকে আবার কোনো যুদ্ধ করার পরিকল্পনা আঁটতে পারবে” [How the U.S. Plans to Fight From Afar After Troops Exit Afghanistan“]।  মানে বলতে চাচ্ছে এরপরে আফগান ছেড়ে দূরে বসে আমেরিকা হয়ত ড্রোন ছুড়ে কিভাবে আফগান সামলাবে কী করে?

    এছাড়া আরেকটা দিক হল, পশ্চিমা  প্রত্যেকটা মিডিয়ায় গত দু-তিন দিনের মধ্যে এই একই প্রত্যাহার ইস্যুতে আট-দশটা পর্যন্ত আর্টিকেল ইতোমধ্যে ছাপা হয়েছে। আর বলাই বাহুল্য, প্রতিটা লেখাতেই  যে সুর তা হল – পশ্চিমা মন ভারাক্রান্ত, হতাশ, তাদের সব হারিয়ে গেছে এমন সুর ও টোনে লেখা। এব্যাপারে সবার চেয়ে আগিয়ে সম্ভবত লন্ডন ইকোনমিস্ট। ইংরাজি এক্সোডাস [EXODUS]  যার আক্ষরিক অর্থ দেশান্তরি হওয়া বা, ছেড়ে পালানো। আর, ইহুদী ধর্মতত্বীয় ভাষ্য অনুসারে অশুভ মনে করে টের পেয়ে সটকে পড়া। এমনিতেই ইহুদী ধর্মতত্বীয় গল্পের ভাষ্যগুলো মিথ-গল্পে ঠাসা। তাদের সৃষ্টিতত্ব বিষয়ক মিথিক্যাল [Myth-ical] গল্প সব এই দেশান্তর বা ইক্সোডাস ধরণের। তার ৪১ নম্বর গল্পটা যিশুর পিতা জোসেফের মিসরের এক ফারাওয়ের স্বপ্নের অর্থ ব্যাখ্যা করা বিষয়ক যার সফলতাতে জোসেফ দাসজীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল। সাপ্তাহিক তার এর রিপোর্টের শিরোনাম করেছে “Exodus, chapter 41 – Can Joe Biden get America out of the Middle East”।

    এখন সোজা মূল পয়েন্টে এসে বললে, কথা হল – সারা পশ্চিমের মনে ভয় ঢুকেছে, হতাশা পেয়ে বসেছে যে, আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে (মে-সেপ্টেম্বর ২০২১ এর মধ্যে ) ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত এটা কী কোন আরো বৃহত্তর (পরাজয় বা কোন দেশান্তরি) ঘটনার ইঙ্গিত! সৃষ্টিতত্ব বা Genesis! কোন এক্সোডাস বা দেশান্তরির মত ইঙ্গিত? যে এটা আসলে গত প্রায় পাঁচশ বছর সাদা চামড়া বা সুপ্রিমিস্টদের দুনিয়ার উপর তাদের যে শাসন (মানে কলোনি ও লুন্ঠন) চালিয়ে এসেছে এবার এরই সমাপ্তির ইঙ্গিত? তাই  আমেরিকা এই আফগানিস্তান প্রত্যাহার কেবল আফগানিস্তানই না, সারা দুনিয়া থেকে আমেরিকানদের মানে কেবল আমেরিকানদেরই না এটা আসলে সাদা পশ্চিমা শাসকদের সারা দুনিয়া থেকেই পাততাড়ি গুটানোর ইঙ্গিত? তারা কী দুনিয়ায় আর কোথাও শাসনে ফিরতে পারবে না সেই ইঙ্গিত?  এই আশঙ্কার পটভুমিতে ইকোনমিস্ট যেমন আরেকটা রিপোর্টে ধর্মতত্বীয় ইঙ্গিত ঢুকিয়ে বলছে – এক্সোডাস, সৃষ্টিতত্ব ৪১; বাইডেন কী ধবংস হয়ে যাবার আগেই মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে বের হয়ে পালাতে পারবে?

    সুতরাং, এক কথায় বললে, এটা শুধু আমেরিকার আফগান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়া নয়, এটা আসলে যেন বাইডেনের আমেরিকার সারা দুনিয়া থেকেই আমেরিকান সেনা ও নেতৃত্ব প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা। আর এমনই আশঙ্কায় – অনুভবে ও সুরে আর্টিকেলগুলো পশ্চিমা মিডিয়ায় লেখা হয়েছে। আর এখানকার এমন মনোভাবটার সঠিক প্রকাশকে ফুটিয়ে তুলতে গেলে বলতে হবে, দুনিয়াতে একদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব, সাদা শাসন, সাদাদের গর্ব, সাদারাই মরদ এ টাইপের যেসব বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছিল – ঠিক তারই উল্টা ঘটনাই যেন এটা। তাই সাদা-বাদের এই  শোক – যখন তারা বুঝে গেছে বাইডেন কথাটা কেবল আফগানকে লক্ষ্য করে বললেও এর উপলক্ষ্য যেন আসলে এর অর্থ সবারই কানেই কু-স্বরে বেজে উঠেছে যে বাইডেন বলছেন, “আমেরিকা আর কখনো কোনো যুদ্ধেই যাবে না” [Ending the forever war]। যেন আমেরিকার ও গোটা পশ্চিমের  “দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে”।

    আমেরিকান ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টঃ গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০
    উপরের এতক্ষণ সেসব কথাগুলো বলেছি এর অনেকাংশই ইহুদি-খ্রীশ্চান ধর্মতত্বীয় মিথে যা সব আছে সেসবেরই ছায়ায় বসে লেখা। তাই এবার বস্তুগত বা বৈষয়িক ও আধুনিক ভাষায় যেসব শাস্ত্র আছে তার ভিত্তিতে কিছু কথা লিখা যাক। আমেরিকাকে আমেরিকার মতন করে এবং আন্তরিকভাবে না বুঝলে এটা বলা বা লেখা যাবে না।  আমেরিকা রাষ্ট্রের রেওয়াজ হল শুধু ঠিক চার বছর পরপর একজন নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে দেয়া না।  সেই সাথে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে নতুন এক “ইনটেলিজেন্স রিপোর্টও” তুলে দেওয়া। ইন্টেলিজেন্স শব্দের বাংলা আমরা করি ‘গোয়েন্দা’। আর যা গোয়েন্দাদের বিষয় তা যেন আর একাদেমিক বিষয় না, গবেষণা-স্টাডি আর নয় – এই হল আমাদের গোয়েন্দা শব্দের সাথেকার বুঝাবুঝি। কিন্তু আমেরিকান  এই রিপোর্টের মুল ফরমাল নাম GLOBAL TRENDS।  যেমন এবারের রিপোর্টের নাম ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০। এই গবেষণা  রিপোর্টিংয়ের কাজটা নিয়মিত প্রতি চারবছর পরপর করে থাকে “আমেরিকান National Intelligence Council (NIC).- Office of the Director of  National Intelligence, এই অফিস।

    বিশেষ করে আমেরিকা চীনের কাছে গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাচ্ছে গত ২০০৪ সালে এই অনুমান-ইঙ্গিত চাউর হবার পর থেকে গত ২০০৮ সালে এই অফিস থেকে প্রথম যে অফিসিয়াল রিপোর্ট বের হয়েছিল যার নাম ছিল “গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০২৫”। অর্থাৎ ২০২৫ সালে দুনিয়ায় গ্লোবাল লিডারশীপ বা রাষ্ট্রগুলোর পরাশক্তিগত বিন্যাস দেখতে কেমন লাগবে।  যেখানে ফাইন্ডিংস বা প্রাপ্ত ফলাফলে প্রথম স্বীকার করে নেয়া হয়েছিল যে চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গা নিতে অবশ্যম্ভাবী ভাবে আসছেই এবং তা আর কোনদিন উলটা পথে যাবে না। মানে আমেরিকাসহ পশ্চিম চিরদিনের মত এশিয়ার কাছে নেতৃত্ব হারাচ্ছেই। আর মনে রাখতে হবে, তা বলছে, আমেরিকারই এক সরকারি সার্ভে রিপোর্ট। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের চতুর্থ রিপোর্ট হল, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০৪০।

    এখন যারা এই খবরের বিস্তারে যেতে চান, তাঁরা মূল রিপোর্টটা এখানে পাবেন পিডিএফে, না্মিয়ে নিতে পারেন। আর আসলে, এটাই আমেরিকানদের বিউটি যে তাদের এই রিপোর্ট  কখনই কোন গোপন রিপোর্ট নয়, সকলেই কপি নিতে পারে।  আর যারা প্রথম আলোতে এক আধা বুঝা রিপোর্ট হলেও মোটামুটি কাজ চলবে বলে মনে করেন তারা এখানে গিয়ে এই রিপোর্টটা পড়তে পারেন।

    ঝোঁক আকারে দুনিয়াতে কলোনি দখল শুরু বলা হয় ১৫ শতাব্দীতে (১৪০০-১৪৯৯)। আর মোটামুটি ১৬০৫ সাল থেকেই একদম কোম্পানি খুলে কলোনিদখল করার ব্যবসায় নেমে পড়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এই ছিল সেকালের বৃটেনের প্রধান ও বড় ব্যবসা ধারা।  আর এটাকেই সাদাদের শাসনের যুগ, সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা সাদারা ফিটেস্ট ইত্যাদি নাম দিয়ে নানা সাফাই তত্ত্ব চালু হয়েছিল। তাহলে বাইডেনের এই আফগান ঘোষণা, এটাই কি সেই সাদা যুগের অবসান বলে পশ্চিমা মনে কু-ডেকে উঠেছে! সে কারণেই সাদা মনের আহাজারি এগুলো? তাই কী?

    পশ্চিমাশক্তি বলতে রেসিয়াল প্রতীক আকারে বললে,অনেক সময় তারা নিজেরাই বলে যে তারা হোয়াইট ককেশিয়ান। বিপরীতে নতুন ও আসন্ন গ্লোবাল নেতা হিসেবে এবং রেস বা প্রজাতি পরিচয়ে দেখলে চীনারা সম্ভবত মঙ্গোলয়েড প্রজাতি-ভাগের। যদিও এই ২১ শতাব্দীতে এসে জাত্যাভিমান, জাতগর্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ইত্যাদি সব ধরনের জাতবাদিতা এমনকি ধর্মীয় জাতবাদিতা, ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা ইত্যাদি সবই ভয়ঙ্কর রকমভাবে সবার জন্যই প্রবল ক্ষতিকারক হবে। এই মেসেজ যারা আমল করবেন তা তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। আর যারা আমল করবেন না, বুঝমান নন তাদেরকে বলেও লাভ নেই। তবে সম্ভবত এককালে সাদাদের “সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট” ধরনের আর্গুমেন্ট আমাদের আর কাউকে মুখোমুখি দেখতে হবে না!  আশা করি! তবু, আমরা কি পারব এই নতুন সময়কে সামলাতে! কোনো আরেক জাত বা ধর্ম শ্রেষ্ঠত্ব সামলাতে? তবে এবারও মঙ্গোলয়েডদের সাথে আরেক অর্থে পূর্ব-ইউরোপীয় (রাশিয়ান বা অন্যরা) অর্থে আরেক ধরণের সাদা ককেশিয়ানও থাকবে। এ ছাড়া সাথে থাকবে ব্যাপক বাদামি এশিয়ান আর আফ্রিকানও। অর্থাৎ প্রথম সাদা-বাদের একক উত্থানের তুলনায় এবার অনেক সম্মিলিত, মিশ্রিত জনগোষ্ঠী উত্থিত হবার সুযোগ পাবে ও নিবে – যারা মিশ্রিত ব্যাপক রেঞ্জের জনগোষ্ঠী জড়িত ও সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ পাবে। আশা করব সাথে আবার কোনো ‘ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের’ নামে কোনো কিছুর উত্থান ঘটবে না, আমাদের সেই হেদায়েত নিজ থেকেই জেগে উঠুক সে কামনা করি! তবে আজ যেমন উচ্চশিক্ষার জন্য, উচ্চ-ট্রেনিং ওরিয়েন্টেশনের জন্য আমরা পশ্চিমামুখী হই এটাও নিশ্চয় দিক বদলাবে। সেই ঝোঁকটাই তবে এবার সেটার অভিমুখ হতে পারে পশ্চিম থেকে এশিয়ামুখী, এমন দেখতে পাওয়াটা আর অসম্ভব থাকবে না সম্ভবত!  

    এবার কথাগুলো অন্য দিক থেকে বলিঃ
    জো বাইডেনের শপথ নেয়ার দিন থেকে হিসাব করলে তার প্রশাসন বা সরকারের আয়ু আগামী ২০ এপ্রিলে মাত্র তিন মাস পূর্ণ হবে। গত ২০ জানুয়ারিতে শপথ গ্রহণের পর থেকে দুনিয়ার সব কোণে তিনি আশা জাগিয়ে চলছিলেন। কিসের আশা? একটাই মূল বক্তব্য যে আমেরিকাকে তিনিই আবার ২০০১ সালের আগের (নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ার হামলার আগের) অবস্থায় নিয়ে যাবেন যে আমেরিকা ছিল গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতা, যা ছিল গত টানা প্রায় ৭৫ বছরের।

    এমনকি, বাইডেনের এই আশা জাগানি  ছিল বাঘের মুখ থেকে ইউরোপ – এই বন্ধু-পার্টনারকে ছিনিয়ে আনার মতও। মানে? ইউরোপ আমেরিকার বন্ধু-পার্টনার গত ৭৫ বছর ধরে। যখন সেই ইউরোপ, অন্তত ৩০০ বছর (১৬৫০) আগে, সেই কলোনিযুগের নেতা ইউরোপ যখন – আমেরিকা না, ইউরোপই ছিল প্রধান শক্তি। হ্যাঁ, কলোনি মাস্টার ইউরোপ, ব্রিটিশ-ফ্রান্সের ইউরোপ ছিল প্রধান শক্তি। কিন্তু কপালের ফেরে পড়ে শেষে হিটলারের হাতে সর্বস্ব, সম্পদ ও ভূমি (নিজ ভূখণ্ডসহ কলোনিতে পাওয়া ভূমিও) হারানোর দশায় পড়ে যায় ব্রিটিশ-ফ্রান্স সহ ইউরোপের এসব শক্তি, বিশেষ করে গত শতকের ত্রিশের দশকের পর থেকে ক্রমে। বিগত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ঐ সময়ে অবস্থা এতই খারাপ জায়গায় পৌঁছায় যে তাদের জন্য একটাই অপশন খোলা ছিল; তা হল – আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতা মেনে নেয়া, দুই. তার নেতৃত্বে ও তারই অর্থ ব্যয়ে হিটলারের অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা আর তৃতীয়ত, ওই যুদ্ধে বিজয়ের পরে সব দখলি কলোনি ত্যাগ করে প্রাক্তন কলোনিগুলোকে স্বাধীন-মুক্ত করে দিয়ে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ, স্প্যানিস ইত্যাদি কলোনিশক্তিগুলোর সবারই নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে যাওয়া। আমেরিকার কথা মেনে একমাত্র এই পথে গেলে তবেই সে ক্ষেত্রে কেবল কলোনি-মাস্টাররা তারা কেবল অন্তত নিজ ভিটামাটি-দেশ রক্ষা করতে পারে, আবার চাই কি আমেরিকান দান-সাহায্য-বিনিয়োগের সহায়তায় আবার অর্থনৈতিকভাবে তাদের রাষ্ট্র উঠে দাঁড়াতেও পারে। আর তাই-ই হয়েছিল। আর সেই থেকেই ইউরোপ অনেকটা আমেরিকার ছোট-পত্নীর মত এমন মর্যাদা পেয়ে আসছে।

    এতে আমেরিকাও ইউরোপকে আপন পাশেই রেখে আসছে, নেতৃত্ব নিজের হাতে রেখেছে বটে, তবু ইউরোপকে ছোট-পার্টনারের মর্যাদা দিয়েছে। গত ৭৫ বছরের আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব মানে সবসময় ইউরোপকে ছোট-পার্টনারের মর্যাদায় রাখা। আর সাথে এতদিন যত যুদ্ধের খরচ, যেমন ইউরোপে বা জাপানের কোন ব্যারাক চালানোর সব ব্যয় ও ন্যাটো পরিচালনার ব্যয়ভার সব কিছুর লায়ন-শেয়ার একা আমেরিকা বহন করে এসেছে। এনজিওও দান-অনুদান কিংবা অবকাঠামো বিনিয়োগ ইত্যাদির  নব্বই ভাগ ব্যয় যোগান দিয়ে আসছে আমেরিকা।  যদিও আমেরিকার ঢলে পড়া অবস্থায় ওবামার সেকেন্ড টার্মের সময় থেকে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ে ইউরোপ কেন কোনো ব্যয়ের দায় নেয় না – আমেরিকা ইউরোপের এই অযোগ্যতার কথা তুলে খোঁচা দেয়া শুরু করেছিল। আর চরম ও বিরাট ব্যতিক্রম ঘটে যায় ট্রাম্পের চার বছরে। ট্রাম্প নিজেকে জাতিবাদী-আমেরিকা বলে ঘোষণা দিয়ে নেয়াতে (মানে সে আর গ্লোবাল নেতা থাকতে চায় না) ইউরোপ বুঝে যায়, আমেরিকার কাছে ইউরোপ আর সেই ছোট-পত্নীর মর্যাদাতেও থাকছে না।

    দিন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। এরই প্রকাশ ঘটে যায় আরসিইপিতে [RCEP] (এটা সাধারণ বাণিজ্যজোট নয়, চীনের নেতৃত্বে এক ভ্যালু-এডিশন শেয়ারড প্রডাকশনের এক নয়া উতপাদন ব্যবস্থা)। চীন এই ব্যবস্থাটা করেছিল মূলত আসিয়ান-দেশ কেন্দ্রিক, সাথে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দ: কোরিয়া ইত্যাদি যারা কেউই এর বাইরে থাকতে চায় না তাই তাতে তাদের মধ্যেই আবার কেউ কেউ যতই কোয়াড [QUAD] জোটেরও সদস্য হোক না কেন! আর পরবর্তিতে এই আরসিইপি জোটের সাথে ইইউ মিলিয়ে Comprehensive Agreement on Investment (CAI) গড়ে তুলেছিল; শেষ সময়ে। মানে? মানে হল, সে সময়টা হল গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। কারণ, চীন চাইছিল বাইডেন পরের মাসে, ২০ জানুয়ারি শপথ নেয়ার আগেই ইইউর সাথে সিএআই (CAI) চুক্তিটা সম্পন্ন করে ফেলা। কারণ বাইডেনের মূল পরিকল্পনা ছিল আবার ইইউকে আমেরিকার নেতৃত্ব ও আস্থায় ফিরিয়ে আনা। শুধু তাই নয়, চীনের বিরুদ্ধে ইইউর সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। চীনের হিউম্যান রাইটের খামতির কথা তুলে প্রবল চাপ সৃষ্টি করা যাতে চীন তাদের সম্মিলিত চাপের কাছে হার মানে। তাই, এর বিপরীত দিকে, পাল্টা  আমেরিকাকে বাইরে  রেখে  চীন ইইউর সাথে আগেই (CAI) চুক্তি করে ফেলতে পেরেছিল বটে।

    কিন্তু চীনা জিনজিয়াংয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগের আঙুল তুলে আমেরিকাও ঠিকই ইইউকে সাথে নিয়ে একসাথে হিউম্যান রাইটের অভিযোগ তুলতে সক্ষম হয়ে যায়। যদিও পুরা জিনিসটাতে পশ্চিম আর   তাতে চীনকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করার লক্ষ্যের জায়গায় থাকেনি, বরং চীনের দিকে আঙুল তুলে বাণিজ্য সুবিধা চীনের থেকে বাগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই নেংটাভাবে উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ এখন পর্যন্ত চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিম কী চায়?  তারা কী চীনকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে তুলতে চায়, নাকি চীনের নির্মুল চায় তা স্পষ্ট করে না বললেও তারা যেন চীনের উতখাত ও নির্মুল চায় তাই মানে হয়ে আছে। অর্থাৎ সারা পশ্চিম নিজেই দুনিয়াকে হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স করে গড়ে তোলার পক্ষের শক্তি কিনা এই প্রমাণ নাই। হলে তো অন্তত তাদের তোলা অভিযোগ সত্য কিনা এর জন্য নিরপেক্ষ ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ইত্যাদির দিকে আলোচনা আগাত……এমন কোন আলোচনাই শুরু হয়নি! অর্থাৎ তারা হিউম্যান রাইট এর লোক না, তারা চীনের কাছ থেকে পালটা সুবিধা নিয়ে হিউম্যান রাইটের সওদা করতে চায়! তবে বাঘের মুখ থেকে বন্ধু-পার্টনারকে ছিনিয়ে আনার কথা যেটা বলছিলাম যে বাইডেন ইইউকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি ট্রাম্পের উল্টা পথে যাবেন, ২০০১ সালের আগের আমেরিকান অবস্থানে যাবেন – এই লোভ দেখিয়ে ইউরোপকে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন।

    কিন্তু না, সেটাও এখন তলানিতে আর সব কিছু ওদিকে ভেঙে পড়েছে! কেন?

    কারণ, বাইডেনের আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কথাটা সারা ইউরোপে সাদা পশ্চিমা শক্তিরই কানে দুনিয়া থেকে সাদা-শাসনের দিন ও সুযোগের চিরসমাপ্তি হিসেবে পশ্চিমা মনে অনুরণিত হয়েছে। আফগান সেনা-প্রত্যাহার মানে গোটা পশ্চিমা শক্তিরই দুনিয়া থেকেই শাসনের পাততাড়ি গুটানো হিসেবে কানে বেজেছে!

    এদিকে দিনকে দিন গত চার বছর ট্রাম্প যেসব অবস্থান নিয়ে কট্টর চীনবিরোধী তবে জাতবাদী, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ডানাও মেলেছিলেন সে সবের সাথে বাইডেনের নীতিগত পার্থক্য কমে প্রায় শুণ্য হয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার সঙ্গীরা এই কথাটাই বলে গেছিলেন যে ট্রাম্পের নীতির বিরোধী কোনো অবস্থান যেন বাইডেন না নিতে পারেন এবং বাইডেন ট্রাম্পবিরোধী হতেই পারবেন না। বাস্তবত, ব্যাপারটা সে দিকেই ক্রমশ যাচ্ছে !

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “কাকে ছাড়ছেন বাইডেন, আফগানদের না দুনিয়া শাসন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com