Category: কলোনি দখল

  • সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    গৌতম দাস

    ০১ মার্চ ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3oJ

    ক্ষমতার ভারসাম্য বিন্দু চীন-ভারত নয়, নেপালকেই ঠিক করতে হবে © by Hiroko Oshima/Michael Tsang

    –
    নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি (খাড়গা প্রসাদ ওলি, Khadga Prasad Sharma Oli, ) এখন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েও সম্ভবত আগামী মাসের মধ্যে আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না। নেপালের পার্লামেন্টের আয়ুকাল আরো প্রায় দুবছর বাকি থাকা সত্ত্বেও গত ২০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ওলি সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী এপ্রিল-মে মাসে নতুন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী থেকে নিজেকে  অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তিকালীন প্রধানমন্ত্রী করে নিয়েছিলেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিও অনুমোদন দিয়েছিল, যার মূল কারণ অনুমান করা যায় যে রাষ্ট্রপতিও নিজ দলীয় ভগ্নাংশের। কিন্তু তাতে কিছু ‘সংক্ষুব্ধ’ ব্যক্তি ও দলের প্রতিনিধিরা সুপ্রিম কোর্টে নালিশ দিয়েছিলেন। এমন মোট ১৩টি মামলার নিষ্পত্তি করে প্রায় দুমাস পরে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ কোর্ট তার রায় দিয়েছে । সে রায় হল, প্রধানমন্ত্রী ওলির “সংসদ ভেঙে দেয়া ছিল কনষ্টিটিউশন লঙ্ঘন” [……house dissolution as an unconstitutional act,]। এছাড়াও তাই, আগামি ১৩ ওয়ার্কিং ডে-এর মধ্যে সংসদ পুনরুজ্জীবিত করে আবার চালু বা বসাতে হবে।
    এতে এখন এই নতুন পরিস্থিতিতে ওলিকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ মানে – সংসদে তাঁর ইমপিচমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। কারণ ওলির মিলিত কমিউনিস্ট দল আগেই তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে দলের সভাপতির পদ থেকে তাঁকে অপসারিত করে রেখেছে। সে জায়গায় দলের নতুন কো-সভাপতি মাধব কুমার নেপাল (মাধব আগে অ্লির দলের সেক্রেটারি ছিলেন)।  “দলের সেন্ট্রাল কমিটিতে ৪৪৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩১৫ জনই মাধবের পক্ষে” ভোট দেন”।
    এখন সংসদ নতুন করে বসলে প্রথম ইস্যু প্রধানমন্ত্রী ওলিকে অনাস্থা ভোট সামলাতে হবে। যেখানে তাঁর হেরে যাবার সম্ভাবনাও খুবই বেশি। আর এই ব্যাপারটা ফয়সালা হবার পরই দলের অপর অংশের নেতা (প্রাক্তন মাওবাদী) পুস্প কমল দাহাল প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করছে। এদিকে গত নির্বাচনে (২০১৭ ডিসেম্বর) (অলি ও দাহাল) তাঁদের  দুই  নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে লড়েছিল ; তবে একদলে মিশে যাবার প্রক্রিয়াও শুরু করে। ঐ নির্বাচনে নেপালের ২৭৫ আসনের সংসদে তারা পেয়েছিল ১৭৩ আসন। দলে অলিকে সভাপতি পদ থেকে অপসারণের পরে এখন দলে দাহাল-মাধব এর যৌথ প্রভাব দলের মধ্যে কতটা এরই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, কার্যত নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলেও আইনিভাবে সংসদে এটা এখনও একটাই দল হয়ে আছে।  এই পরিস্থিতিতে চীন ও ভারত উভয়েই নেপালের রাজনীতিতে প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

    গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষঃ
    “গ্লোবাল নেতৃত্ব”- এই বিষয়টি এমনিতেই দুনিয়াতে সবসময় হাজির ছিল এমন ফেনোমেনা নয়; ফলে সেই ‘গ্লোবাল” নেতৃত্বের মধ্যে আবার একালে কোনো ‘পালাবদল’ আসা – এটাও বারবার ঘটে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও, ‘গ্লোবাল’ বলে বা ‘দুনিয়াজুড়ে’ কোনো একক বা দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক প্রভাব বলে কিছু ছিল না। তাও রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাব এ দুটোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রভাব সবসময় আগে আসে। আর তাকে ফলো করে রাজনৈতিক প্রভাবও হাজির হয়ে থাকে।
    যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) আগে দুনিয়াতে ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ বলে কিছু ছিল না। যদিও কলোনি দখল করতে চায় এমন ছোট-বড় মাতবর গোটা পাঁচেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র তখনও ছিল যাদের মধ্যে শেষবিচারে প্রধান দুই কলোনিদখলদার ছিল বৃটিশ ও ফরাসি রাষ্ট্র। আর আমরা তখন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি হিসাবে ছিলাম, প্রায় ২০০ বছর। কিন্তু তবুও সে সময়ের ব্রিটিশরা গ্লোবাল নেতা বা লিডার কিনা এমন কিছু বলার কোন চলই ছিল না।
    তবে এমন কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক-রাষ্ট্রের ধারণার এরপর দুনিয়া থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪১ সাল থেকে অবসান ও বিলুপ্তি ঘটেছিল। এটাই ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিতর দিয়ে ঘটেছিল। অর্থাৎ ‘দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর কেউ কাউকে অধীনস্থ ও কলোনি দখল করে আর রাখতে পারবে না”। এই “অবৈধ গণ্য” করার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র-সংঘের [United Nations] জন্ম। মানে, কলোনি অধীনস্থতার সম্পর্ক দুনিয়া থেকে লোপ পাবে – এই নীতিগত দিক তৈরি হয়েছিল তখন। আর তাতেই বিশ্বযুদ্ধে এই ভিত্তিতে পক্ষ-বিপক্ষ দুটো রাষ্ট্রজোট তৈরি হয়েছিল। কলোনি দখল অবৈধ – এ নীতির ভিত্তিতে যারা পক্ষজোট (এদেরকে সেকালে মিত্রশক্তি বলা হত), তারাই আমেরিকার নেতৃত্বে লড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিল। আর তা থেকেই আমেরিকা নিজেকে “গ্লোবাল নেতৃত্বের” আসনে বসাতে সমর্থ হয়েছিল।
    তবে বিশ্বযুদ্ধে বিজয়লাভের সাথে আমেরিকার হাতে গ্লোবাল নেতৃত্ব এসে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল – আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা। যদিও সেই বিনিয়োগের সুযোগ হাতে পেতে আগে আমেরিকাকে আরো দুটো বড় খরচের দায় নিতে হয়েছিল। এক. নিজ পক্ষজোটের সবাইকে যুদ্ধের খরচ বা ব্যয়ভার জোগানো; আর দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের পর, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ-বিপক্ষ সব রাষ্ট্রকেই ত্রাণ, পুনর্বাসন ও ভেঙে যাওয়া অবকাঠামোগুলো আবার গড়ে দেয়া ইত্যাদিতে নতুন বিনিয়োগ-ঋণ দেয়া। এটাই ১৯৪৪ সালে জন্মের পরে বিশ্বব্যাংকের কাজের প্রধান ক্ষেত্র হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এসব খরচ আমেরিকা কিভাবে ফেরত পাবে কিংবা তা ফেরত নাও পেতে পারে এমন সম্ভবনা থাকলেও, এদিকটা অনিশ্চিত ও উহ্য রেখেই আমেরিকা এই বিপুল খরচ শুরু করতে হয়েছিল; যা পরে কমবেশি উসুল হয় অবশ্য। কিন্তু তাতেই আমেরিকার ‘সবচেয়ে বড় পাওনা’ দুনিয়ার গ্লোবাল নেতৃত্ব নিজের হাতে চলে আসা। আর সেই থেকে দুনিয়ায় ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ ধারণাটাও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।
    আরেক দিক থেকে দেখলে, গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাৎপর্য কী? একেবারে ‘রূট’ মানে গোড়ার দিকে তাকিয়ে বললে এটা সোজাসাপ্টা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আর ক্যাপিটালিজম মাত্রই এর ভেতরে গ্লোবাল হয়ে উঠার স্বভাবটা সবসময় সুপ্ত থাকে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যা ব্যাপ্তি লাভ করে ছেয়ে বসে। এতে ছোট ছোট পকেট বা ছোট-বড় আঞ্চলিক ক্যাপিটালিজমের উদ্যোগ ও ফেনোমেনাগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে পড়ে; যা পরবর্তিতে এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজমের রূপ ধারণ করে বিকশিত হয়ে উঠতে চায়।

    এ কারণে ‘কলোনি শাসন অবৈধ’ হয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জয়লাভ কথাটার ব্যবহারিক মানে হয়ে যায়, যুদ্ধ শেষে কলোনিমুক্ত শ-দেড়েকের বেশি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় আমেরিকার বিনিয়োগ-ক্রেতা। এমন হবার পিছনে আরও বড় ফ্যাক্টর ছিল। যেমন, এসব রাষ্ট্র স্বাধীন-মুক্ত হলেও এতদিন কলোনিদখল লুটেরাদের অধীনে থাকায় উদ্বৃত্ত-সম্পদ সব কলোনি মালিকের দেশ লুটে নিয়ে যাওয়ায় এরা স্বাধীনরাষ্ট্র হবার পরেও অর্থনৈতিকভাবে এরা একেবারে ফোকলা। এ’অবস্থা থেকে আবার বেঁচে সক্রিয় হয়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রধান প্রয়োজন ছিল বাইরের বিনিয়োগ-ঋণ, যেটা হতে পারে লুট হয়ে যাওয়া সারপ্লাসের সবচেয়ে ভাল এভেলএবল বিকল্প। এরই স্টোর ও সাপ্লায়ার হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমেরিকা। কাজেই প্রথমবারের গ্লোবাল নেতৃত্বে ‘আমেরিকা’ কথাটার তাৎপর্য হয়ে উঠেছিল এই যে, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর আমেরিকান নেতৃত্ব গ্লোবাল সিস্টেম থেকে বিনিয়োগের পুঁজি-পণ্য নেয়া্র এক নতুন সম্পর্কে জড়ানো। তবু আরও কিছু কথা পরিষ্কার রাখা ভাল। কলোনি-উত্তরকালে আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের সাথে আমাদের মত দেশের গভীরভাবে পণ্য-পুঁজি বিনিময় সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া – এ সম্পর্কটাও আগেকার কলোনি দখল হয়ে থাকা সম্পর্কের চেয়ে অবশ্যই তুলনায় ভাল কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে তা হলেও এটাও অসম; এক অসম বিনিময় সম্পর্ক। কিন্তু অবশ্যই তুলনামূলক অর্থে নতুন সম্পর্কটা বেশি ভাল, কলোনিসম্পর্কের চেয়ে ভাল; ‘মন্দের মধ্যে ভাল’ অর্থে।

    সমাজতন্ত্রী বনাম গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমঃ
    কিন্তু সমস্যা দেয়া দিয়েছিল অন্যখানে। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে এবার আমরা কি ‘কথিত সমাজতন্ত্রী’ হবো নাকি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ হবো? মানে পরেরটা অসম বিনিময় সম্পর্ক হলেও তুলনামূলক ভাল বলে এই অসম বিনিময় সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারব এমন সুযোগ হাজির হয়েছিল। সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ্টাই হয়ে পড়েছিল পরের দীর্ঘ চার দশকের ‘সমাজতন্ত্রী’ হওয়া না হওয়ার দ্বন্দ্ব। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর চীন ষাটের দশক থেকেই ক্রমশ ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজম’ – এভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাথে যুক্ত হওয়ার পথ নেয়ায় আমাদের মত সব রাষ্ট্রের জন্য পথ বেছে নেয়া সহজ হয়ে যায়। ফাইনালি আমরা সবাই এখন আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ – আমরা এটা পছন্দ করি আর নাই করি। আর এটা অসম বিনিময় সম্পর্কের হওয়া সত্ত্বেও ‘মন্দের ভাল’ বলে, এভেলএবল পথ বলে। অর্থাৎ কলোনি-উত্তরকালে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠার পথটাই অন্তত আপাতত টিকে যায়, প্রধান ধারা হয়ে যায়।
    তবে ইন্টারেস্টিং দিকটা হচ্ছে, সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থার রাষ্ট্রগুলো ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকাই ছিল না। তারা নিজ গুণ বা দোষেই ভেঙে পড়ে অকার্যকর হয়ে গেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত একমাত্র যা করলে সবারই টিকে থাকা সম্ভব হবে, অর্থাৎ সারভাইবাল কোন রকমে নিশ্চিত করা ছিল সবার কাছে সবার উপরে একেবারেই মুখ্যবিষয়। এছাড়াও আর সবার চেয়ে বড় কথা – সমাজতন্ত্রীদের বড় বড় খামতির দিক তো ছিলই। যেমন – গ্লোবাল বাণিজ্য বা দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা লেনদেন বিনিময় ব্যবস্থা হাজির থাকা আদৌ এসেনশিয়াল কি না এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মৌলিকভাবে এখনো একেবারেই বেখবর হয়ে আছে সমাজতন্ত্রীরা। ইস্যুটাই কানে ঢুকে নাই এখনও এমন অবস্থা!

    গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলঃ
    এদিকে এই শতকে এসে প্রায় সত্তর বছর চলার পরে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে  এবং ঢলেও পড়ছে। তাই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এই বাস্তবতা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছে।  কিন্তু কেন আমেরিকা ঢলে পড়ল? আগামী ঐতিহাসিকরা সম্ভবত মূলত এর দুটো কারণ উল্লেখ করবেন। এক. আফগানিস্তানঃ  এই রাষ্ট্র আমেরিকার সাথে যে তুলনায় অযোগ্য ও অবিকশিত একথা তুচ্ছভাবে  বলতে পারেন অনেকেই। কিন্তু আমেরিকার এই ঢলে পড়া বা পতন ঘটানোর অন্যতম ‘হিরো’ তবু এই আফগানিস্তান। সে একটাই কাজ করেছে। তা হল, আমেরিকাকে সে এমনই ‘নেভার এন্ডিং’ এক অনন্তযুদ্ধে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে যে এখান থেকে বের হবার পথ নাই ফেলে পালানো ছাড়া। আর তাই ঘটেছে। শুধু তাই না ওদিকে এতে, যুদ্ধের নিজখরচ জোগানোর সামর্থ্য গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতির আর নাই। মনে রাখতে হবে, ২০০৮ সালের যেটা ‘গ্লোবাল মহামন্দা’ বলে জানি আমরা, যেটা দেখা দিয়েছিল ১৯৩০ সালের প্রথমটার পরে দ্বিতীয় বড় মহামন্দা বা রিসেশন [global recession]। ২০০৮ সালের মহামন্দার মূল কারণ কিন্তু যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে ফেল করা আমেরিকান অর্থনীতি। শেষে ওবামা প্রশাসনের ১০ হাজার বাদে (২০১১-১৪) সব সেনা ( অন্যান্য দেশেরসহ ন্যাটোর সেনাও) ফিরিয়ে আনার প্রধান কারণ এই ফেইল্ড অর্থনীতি। অথচ এই যুদ্ধে গিয়ে বলার মত কোন কথিত “লক্ষ্য” অর্জনও করতে পারে নাই।
    এছাড়া আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, পাশাপাশি চীনের উত্থান; ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজমের’ চীন – এর কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারানো।

    গ্লোবাল নেতা মানে কোন সামরিক সক্ষমতার ধারণা নয়ঃ
    একটা বড় ভুল ধারণা আবার ভেঙ্গে দেই। অনেকের মানে সাধারণ মানুষসহ অনেক আমেরিকান দ্বিজ্ঞজদেরও ভুল ধারণাটা হল, “গ্লোবাল নেতৃত্ব” মানে বুঝি সামরিক শক্তির সক্ষমতা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে গেলে প্রধান শর্ত হল বিপুল পরিমাণে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব বা সারপ্লাস জেনারেট করার স্তরে নিজ অর্থনীতিকে পৌছানো আর তাতে ঐ উদ্বৃত্ব মানে অন্যদেশে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষমতা নিজ হাতে আসা। এতে অন্য সবদেশের প্রায় সবকিছুকে প্রভাবিত করার বিপুল ক্ষমতাধারী হয়ে উঠা – এটাই গ্লোবাল নেতৃত্ব।  বলা বাহুল্য এর ফলে এটা নিজ দেশকেও সামরিক, রাজনৈতিক দিক থেকেও প্রভাবশালী করে গড়ে তোলা ও উঠার কারণ হয়ে যায়। অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব-এর স্তরে পৌছানোটা একটা বৈষয়িকভাবে হয়ে উঠার বিষয় যা রাজনৈতিক নয় বা সামরিকও নয়।  যেমন, আমেরিকার এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সামরিক সক্ষমতার ধারক। কিন্তু তা দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানোতে আমেরিকা যোগ্য না।

    চীনের নেতা হিসাবে উত্থান, এটাকেই ‘গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল’ বলা হচ্ছে। নেপালসহ আমাদের মতো রাষ্ট্র বিশেষত যাদের দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতকে সাথে নিয়ে বসবাস, তাদের জন্য এই ‘পালাবদল’ এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    চীনের সাথে ভারতের নাম কেন?
    আবার চীনের সাথে ভারতের নাম নেওয়ার মানে এই নয় যে ভারতও অর্থনীতিতে কিছু একটা হয়েছে, তা নয়। ভারত এখনও বিপুল সারপ্লাস জেনারেট করা বলতে যা বুঝায় তেমন কোন আলামতের দেশই নয়। বরং বিনিয়োগ-ঋণ গ্রহীতা দেশ। সেই বিচারে বাংলাদেশ  লেবার রপ্তানি আর গার্মেন্ট বেঁচে ওর থেকে অর্থনীতিতে (এত চুরি আর পাচারের পরও) ভাল অবস্থায়। তাহলে ভারতের এমন শো-আপের পিছনের মুল কারণ কী? সেটা হল, বুশ প্রশাসনের শেষে আর ওবামা প্রশাসনের শুরুর সময়ে এক আমেরিকান সরকারি স্টাডি থেকে আমেরিকা নিশ্চিত হয়ে গেছিল যে “চীন আসছেই”। কিন্তু একটা শয়তানি উদ্যোগ তারা নিয়েছিল – ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” [China Containment] কাজে ঠিকা দিয়ে নামানো। যদিও এখন সবাই মানে তা কোনই ফল দেয় নাই; আমেরিকার ভারত চীনের উত্থানকে ঠেকাতে পারে নাই। কারণ তা যায় না বলে বাস্তবেও তা এখন প্রমাণিত। তাই গত ট্রাম্পের আমলেই আমেরিকার ভারতকে দেয়া আগের সব সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে ভারতের – “আমিও প্রভাব বিস্তার করতে পারি”, বা এশিয়ায়  আমারও “প্রভাবাধীন এলাকা” আছে ধরণের মুই কী হনুরে – এই ফলস ক্লেইম ও স্বপ্নের জামা পড়ে ভারত সেই থেকে এখনও ঘুরে বেড়ায়।

    এ’পরিস্থিতি ঠিক কী প্রকৃতির, অভিমুখ কী, সম্ভাবনা কী, নেতিবাচক দিক কী ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা খুবই জরুরি। যারা এর ঠিকঠাক বোঝাবুঝি-মূল্যায়নে সফল হবেন ও এক্ট করতে পারবেন, কেবল তারাই টিকে যাবেন। আর বাকিরা এ পালাবদলের সাথে সাথে টিকতে না পেরে এর ধাক্কায় হারিয়ে যা্বার সম্ভাবনায় থাকবে। আবার এ পরিস্থিতিতে চীন নিজেই নিজের যোগ্যতা বা ঘাটতি অথবা ইতি ও নেতি দিক সবটা বোঝে- এ্টাও সবটা সত্যি নয়। সবচেয়ে বড় কথা চীন বড়জোর কেবল গ্লোবাল অর্থনৈতিক দিকের (রাজনৈতিক দিকের নয়) নেতা হতে পারে। আর ঠিক ততটাই আমেরিকার তুল্য বিচারে গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতা হওয়া – এক্ষেত্রে চীন এখনো অযোগ্য। চীনের বিরাট দুর্বলতা হল, ‘মাস পাবলিক’ মানে আম-জনগণের সাথে উপস্থিত চীনা-রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনও একেবারেই কোন ‘রাজনৈতিক সম্পর্ক’ নয়। কারণ, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চোখে – মানুষ মানে, এখনো অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান ইত্যাদি বৈষয়িক চাহিদার একটা ‘ডিব্বা’ মাত্র। যেন মানুষ মানেই এক বৈষয়িকতা, বিষয়সম্পদের চাহিদা মাত্র। আর এই ধারণার কারণে  তাদের কাছে “রাজনৈতিকতা (Polity), স্পিরিচুয়ালিটি” – এগুলো অনেক অনেক দূরের এবং অজানা জিনিস। কাজেই এই চীন দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিবে কিভাবে? যদিও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা সে নিশ্চিত হচ্ছেই!

    সুনির্দিষ্ট করে নেপালঃ
    একটু পেছনে ফিরি ও সুনির্দিষ্ট করি নেপালকে ঘিরে। নেপাল নিয়ে অনেক হিস্টোরিয়ান গর্ব করে থাকেন যে, নেপাল কখন কলোনি শাসনে যায়নি। এ ক্ষেত্রে সমতুল্যভাবে আমরা বলতে পারি, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতেও সাথে ৫৫০টারও বেশি ‘করদরাজ্য’ (প্রিন্সলি স্টেট বা Princely states)  ছিল যারা পালনীয় কিছু শর্তসাপেক্ষে ‘স্বাধীন’ রাজা ছিল বলে দাবি করত। নেপালও প্রায় সে রকম আসলে এক রাজার প্রিন্সলি স্টেট। ঠিক যেমন বৃটিশ আমলে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ছিলেন। আর ঐ ধরনের করদ-চুক্তিতে যা থাকত তা হল, রাজা যা খাজনা-রাজস্ব সংগ্রহ করবেন এর একটা অংশ ব্রিটিশদের দিয়ে যেতে হবে রেগুলার। আর ব্রিটিশরা ছাড়া অন্য কোনো বিদেশী শক্তির সাথে সম্পর্ক বা যোগাযোগ করতে পারবে না; এমনকি বাণিজ্যিক সম্পর্কও স্থাপন করতে পারবে না। বাইরে থেকে অস্ত্রও কিনতে পারবে না। তবে তাদের প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে নয় রাজার নিজের হাতে রেখে পরিচালিত করতে পারবে; তবে ব্রিটিশদের থেকে রাজারা নিজ প্রশাসক স্টাফদের জন্য ট্রেনিং বা এধরণের অন্যান্য সহায়তা পেতে পারবে। কাজেই এই ‘করদ’ সম্পর্ককে কখনও “কলোনি হয় নাই” বলে কথার ফুলঝুরি সাজানো অমূলক ও অপ্রয়োজনীয়।
    নেপালের ক্ষেত্রে আরও যা ‘বিশেষ ছিল’ তা হল, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তারা বৃটিশ শাসকদের সহায়তায় পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। বিনিময়ও পেয়েছিল ভালই। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নেপালি গোর্খা সৈন্য দিয়ে সহায়তা করায় বাড়তি কিছু ছাড় পেয়েছিল। যেমন ভূমি ছাড় (মাধেসি অঞ্চল ফিরে পাওয়া), বাইরের দেশ থেকে অস্ত্র কেনা ইত্যাদিসহ ১৯১৫ সালের সুগৌলি চুক্তি,  ১৯৬০ সালের চুক্তিতে “তরাই অঞ্চল” ফেরত পাওয়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করায় আরো ছাড় দেয়ায় সর্বশেষ ১৯২৩ সালের চুক্তি। তবে ঐ ১৯২৩ সালে চুক্তিতে লেখা ছিল যে, এটা ১৯৫০ সালে আবার রিভিউ হবে। আর তত দিনে স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবার নেপালের সাথে আগের চুক্তির আদলেই ১৯৫০ সালের চুক্তি করেছিলেন। সেটারই মূল কথা হল, ভারতের অর্থনীতি ও ব্যবসার অধীনে থেকে একটা নেপালি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। যেমন ভারতের অনুমতি ছাড়া এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ছাড়া নেপালের বিদ্যুৎ বিদেশে (যেমন বাংলাদেশে) নেপাল বিক্রি করতে পারবে না। আর নেহরু এ ধরনের চুক্তির ড্রাফটটা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলের ১৯২৩ সালের চুক্তি থেকে। এটাই হল ‘কলোনিমুক্ত নেপাল’ এমন ফলস গর্বের নমুনা। তাই স্বভাবতই নিজেদের প্রটেকশনের জন্য নেপালের রাজশাসকেরা এই নেহরু বা ভারত-অনুরক্ত এক নেপালি রাজতন্ত্র গড়তে খুবই আগ্রহী হয়ে থেকেছিলেন। আর এটাই ছিল নেপালে ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হওয়া মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের মূল কারণ। আর যেখানে অন্যান্যের সাথে ঐ আন্দোলনের প্রধান দুই দাবি ছিল – রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নেপালকে ‘রিপাবলিক’ ঘোষণা আর এই ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিল (রিভিউ) করতে হবে।
    যদিও ঐ আন্দোলন শেষে অন্যান্য দলের সাথে মিলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই ক্ষমতা দখলের মধ্যে ২০০৭ সালেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন সম্পন্ন হয়েছিল। পরে রাজতন্ত্র উতখাতের স্বপক্ষে আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন হয়েছিল নেপালের প্রথম কনস্টুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরে। সেই অ্যাসেম্বলিতে ২০০৯ সালে। আর রিপাবলিক নেপালের কনস্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি এবং প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও অসহযোগিতা শুরু করেছিল ভারত। এমনকি ল্যান্ডলকড যে নেপাল ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া কিছু আমদানি করতে পারে না, অখুশি ভারত এরপর দীর্ঘ ছয় মাস ভারতের ওপর দিয়ে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অবরোধ করে রেখেছিল। নেপালে ব্যবহার্য রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ সব ধরনের জ্বালানি ভারত সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর এতেই সারা নেপালের সব শ্রেণীর মানুষই নিজ নিজ স্বার্থে ও কারণে প্রবলভাবে অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে উঠেছিল। কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে আকৃষ্ট হওয়ার চেয়েও নিজ নিজ বৈষয়িক ও সারভাইভালের স্বার্থেই তারা হয়েছিল। যেটা এখনও মনমজ্জায় প্রবেশ করে যাবার মত যে এখনও তা প্রবল!

    নেপালের রাজনীতিতে চীনের প্রবেশঃ
    চীন নেপালের রাজনৈতিক আসরে এই প্রথম প্রবেশ করেছিল তখনই, এই ২০১৫ সালে। কারণ ল্যান্ডলকড নেপালের জনগণ নিজ দেশের বাইরে যেতে ভারতের ভূমি পেরিয়ে বাইরে বের হবার বিকল্প খুঁজছিল। ভারত নেপালের এক উত্তর দিক বাদে বাকি সবদিকজুড়েই।

    আর পুরো উত্তরাংশজুড়ে চীন-সীমান্ত হলেও তা আরো পাহাড়ি উচ্চতায় এবং দুর্গম বলে কখনো একে তেমন বিকল্প বলে ভাবা হয়নি। কিন্তু একালে চীনা উত্থানের যুগে চীনা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় হেভি-ডিউটির রেলযোগাযোগ যুক্ত হয়েছে যেটা সমুদ্রবন্দরের সাথেও যুক্ত এমন উন্নত। কিন্তু নেপাল সীমান্তের সবচেয়ে কাছাকাছি চীনের এমন রেলপথটাও নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে দিয়ে চলে গেছে। এতে প্রমাণ হয় নেপালকে নিয়ে চীনের আগ্রহ কেমন কোন সূদুরে ছিল! তবে চীন সম্প্রতি এই ১০০ কিলোমিটার রেলপথ এক্সটেন্ড করে নেপালকে বহির্বিশ্বের সাথে কানেক্ট করে দিয়েছে। যেটা নেপালের কাছে বিরাট কিছু, এক অতুলনীয় বিকল্প।

    কিন্তু সারা নেপাল অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে ফুঁসে উঠার সেই কালেই নেপালে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার শর্ত ওলির কমিউনিস্ট পার্টির টার্ম আসে আর এতে দলের পক্ষে ওলি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসেন। আর তাতে, এন্টি-ইন্ডিয়ান সেই পপুলার সেন্টিমেন্ট  ভাসা নেপালকে জনগণের পক্ষে সফল ব্যবহার করেন ওলি, একজন মাস পপুলার লিডারের যা করা উচিত সেভাবে। মূলত ওলি বা তার দল সবসময়ই নামকাওয়াস্তেই শুধু কমিউনিস্ট ছিলেন, কাজে নয়। যেমন রাজতন্ত্রী নেপালের যুগে নেপালে রাজনৈতিক দল বলতে সবাই  রাজতন্ত্রকে মেনে চলা রাজনৈতিক দল।  যে রাজতন্ত্র মেনে চলে সে কেমন কমিউনিস্ট তা তো বুঝাই যায়। এরাই রাজ-সরকারের মন্ত্রী থাকার লোভে রাজার মন জুগিয়ে চলা দল হয়ে কাজ করত। এমন প্রথম চামচা ছিল নেপালি কংগ্রেস দল, আর পরেরটা হল ওলির কমিউনিস্ট দল (CPN (UML))। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওলি পপুলিজম বোঝেন বলেই সেসব পিছনে ফেলে ২০১৫ সালে পপুলার নেতা হয়ে যান। তিনি মাওবাদী দলের নেতা পুষ্প কমল দাহালের (মাওবাদী সশস্ত্র দল হয়ে থাকার সময় তাঁর নিকনেম ছিল ‘প্রচণ্ড’) চেয়েও পাবলিকলি পপুলার। তাই সবমিলিয়ে  ইতোমধ্যে ভারত যতই নেপালের চোখে অনিষ্টকারী হয়ে উঠেছিল, চীনা সরকারের সাথে দুই কমিউনিস্ট দলেরই ঘনিষ্ঠতা ও ওয়ার্কিং রিলেশন ততই ঘন হতে থাকে। এমনকি ট্রাডিশনাল নেপাল কংগ্রেস দলও তখন ভারত থেকে দূরত্ব মেনটেন করত। এ দিকে নেপালের ২০১৭ সালের নভেম্বরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে চীনা নেতারা পরামর্শ দিয়েছিলেন ওলি [সিপিএন-ইউএমএল ] ও দাহালের [সিপিএন (মাওয়িস্ট সেন্টার)] এ’দুই কমিউনিস্ট পার্টিকে একদল হয়ে নির্বাচন করতে। তাতে ঐ নির্বাচনী ফলাফল খারাপ হয়নি। তারা প্রায় দু-তৃতীয়াংশ আসন (১৭৩ / ২৭৫) লাভ করে তাতে ভারত বা নেপালি কংগ্রেসকে আরো ক্ষুদ্র বানিয়ে ফেলেছিল।

    মূল সমস্যার গোড়া ওলি নিজেইঃ
    কিন্তু সমস্যার গোড়াটা ছিল অন্যখানে। প্রথমত, মাওবাদী দাহালের নিজদলের আজন্ম দুর্বলতা বা খারাপ কপাল হল – এক. ২০০৯ সালের নির্বাচন ছাড়া আর কখনোই পপুলার ভোটের বেলায় দাহালের দল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। সবসময় তৃতীয় স্থানে থেকে গেছে। অথচ ভারতের চরম বিরোধিতা অসহযোগিতা সত্ত্বেও  ওলির দল, নেপালি কংগ্রেস ও নিজ দলকে একসাথে রেখে দাহাল পরিস্থিতি মোকাবেলার অর্থে মুখ্য ভূমিকাটা পালন করে গেছিল। দাহাল দল বা রাজনীতির জন্য খুবই ভাল সংগঠক, বিশেষত বভন্ন মতবিরোধের মধ্যেও একসাথে কাজ করে লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে।  কিন্তু পাবলিক ইমোশন হ্যান্ডলিংয়ে ঠিক ততটাই যেন তেমন নন। দ্বিতীয়ত, ওলি ব্যক্তিত্ব হিসেবে একজন ফিউডাল লর্ডের মত। তার কাছে দল মানেই, তিনিই এতে একমাত্র ইচ্ছাদাতা, হুকুমদাতা। কিন্তু তার বড় গুণ হল, পপুলার মাস ইমোশন হ্যান্ডলিং ভালো বুঝেন ও পারেন।

    সব মিলিয়ে এখন ২০১৭ নির্বাচনের পরের দুই বছরের মধ্যে যা দাঁড়ালো তা হল, ওলি আরো দুর্দমনীয়, একক নিজ হুকুমে চলা, কোনো ফোরামের সিদ্ধান্ত বা কারো কথা না শুনে চলা ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। ওদিকে কমিউনিস্ট দুই দল মিলেমিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বলে ওলির পক্ষের দলের সবার সাথে মিলে মিলিত দলের কমিটি গড়তে দাহাল খুবই সফল ব্যক্তিত্ব, কিন্তু ওলির দলের লোকেরাই ওলির প্রশ্নে দাহালের সাথে দাঁড়িয়ে যায়। আগে ওলির সাথে যারা ছিলেন যেমন মাধব চন্দ্র নেপাল, ঝালা নাথ কানাল বা বামদেব গৌতম সহ সবাই থাকলেও তারা এখন দাহালের পক্ষে। তাঁদের দাবি তাঁরা ওলির একগুয়েমি ও ক্ষমতা ক্কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে লড়ছেন [… They were protesting PM Oli’s monopoly in the party and government]  আর এটাই একপর্যায়ে ওলিকেই দল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়ার অবস্থায় চলে যায়। এই বহিষ্কার ঘটেছে মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ ওলির সাথে মিলিত দলের সবার বিরোধ প্রকাশ পাওয়ারও প্রায় দু’বছর পরে।

    চীনের অতি আগ্রহঃ
    কিন্তু তাহলে, কেন এত সময় লাগল? এটাই চীনের অনুরোধের ‘ঢেঁকি গেলা’; চীনের অতিরিক্ত জড়িয়ে যাওয়া যা অযাচিত পর্যায়ের। গত ২০১৭-৮ সালের দুই কমিউনিস্ট দলে ঐক্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় থেকে চীন ক্রমশ একেবারেই লাগামছাড়া ভাবে নেপালের রাজনীতির হাত ঢুকাতেই থাকে।

    মাওয়ের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ”?
    যার সোজা অর্থ চীনা কমিউনিস্টরা যেমন কোল্ডওয়ারের যুগে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে থাকা চীনা কমিউনিস্ট দলের সাথে অধীনস্ত নির্দেশগ্রহিতা আচরণ ও সম্পর্ক স্থাপন করে চলত যেন সেই যুগ আবার ফিরে এসেছে। একই অবস্থা ছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বেলাতেও। তারা আমাদের মত দেশে অর্থ ও তত্বের যোগানদার হলেও মুখ্য সবকিছুতে হাত ঢুকিয়ে বসে থাকত। আসলে আমাদের মত দেশের নেতারাই সেটা চাইত। অথচ আলাদা রাষ্ট্র মানেই আলাদা আলাদা একান্ত স্বার্থ।  নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ  কখনও চীনা রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। তেই পারবে না, পারে না।তাতে দুদেশেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতাসীন হলেও কোন হেরফের হয় না। হ কারণ রাষ্ট্র মানেই কেবল নিজ ভুখন্ডের বাসিন্দাদের স্বার্থ দেখা ও সবার উপরে জায়গা দেয়া। এগুলো রাষ্ট্র সম্পর্কে খুবই নুন্যতম ও বেসিক ধারণা। আদর্শের কথা তুলে রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতাকে আড়ালে ফেলা যাবে না।  কাজেই নেপাল ও চীনের দুই কমিউনিস্ট পার্টি কখনই কেউ কারও কথা শুনে অনুগত হয়ে চলতে পারে না।  এমন সম্পর্ক যদি চালু করা হয় তবে এর অর্থ হয়ে যাবে নেপাল আর আলাদা রাষ্ট্র নয়, চীনেরই এক্সটেন্ডেড কোন প্রদেশ মাত্র। কমিউনিস্টদের এমন অযাচিত ভয়ঙ্কর চর্চা সোভিয়েত পতনের পর আপনাতেই হারিয়ে গেছিল। চীন কেন সেই হারানো অভ্যাস আবার ডেস্পারেট হয়ে সামনে আনছে আমরা জানি না। কিন্তু এটা মারাত্মক বিপদজনক এবং চীনের জন্যও আত্মঘাতি। এটাকেই তো মাও “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” বলতেন! নয় কি?

     এতে বড় ভুলের এক নম্বরটা হল, একধরনের ‘কমিউনিস্ট ভাই ভাই’ অযথাই খুঁজে বের করে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়া ও রাখার চেষ্টা সুপ্ত আছে এতে। এটার ফল চীন ও নেপাল দুরাষ্ট্রের জন্যই আত্মঘাতি হতে বাধ্য। এটার প্রকট প্রকাশ আমরা দেখেছি নেপালে চীনা রাষ্ট্রদুত Hou Yanqi এর অবাধ ততপরতায়।  এছাড়া সাথে দেখা যায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের উপমন্ত্রী গুও ইয়াজহু (Guo Yezhou) কে। প্রায়ই তাঁর কাঠমান্ডু সফরে, দুই কমিউনিস্ট অংশকে ধরে রাখতে। নিঃসন্দেহে এগুলো নেতি-ইমেজের কেলেঙ্কারি ছাড়া এ’দুই দেশকে আর কিছুই দিবে না।
    অথচ ‘চীন’ বলে যাকে আমরা দেখছি সে হল হবু গ্লোবাল নেতা যার স্বার্থ অনেক জটিল ও আলাদা। তাই ‘নট নেসেসারিলি’ নেপালের কোনো দল বা নেপালরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে মিলবেই অথবা মিল থাকাটা জরুরি। আর শেষ বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিটি দেশের মধ্যে ভারত ও চীনের যে প্রবল স্বার্থ- লড়াই তাতে এ দু’জনের যাকেই আমাদের বেশি ভালো লাগুক না কেন শেষ বিচারে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখতেই হত। এবং যেকোন পরিস্থিতিতে হতেই হবে। কিন্তু এটা থাকেনি। এতে এখন যদি নেপালি কংগ্রেস দল আমেরিকা বা ভারতের নেতাদেরকে নেপালে নিয়ে এসে দলীয় সভা শুরু করে তাহলে সেটাকে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা কি বলে বাধা দিবেন?

    অথচ পালাবদলের এই কালে যখন আরও সতর্কতা ও দুরত্ব রক্ষার অনুশীলনের দরকার ছিল।  তা বজায় রাখলে চাইলে নেপালকে চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে একটা সম-দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তবেই একমাত্র নেপালের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এখান থেকেই আসে নিজ দেশের দলগুলো চীন, ভারত বা আমেরিকা এই তিন দেশের একেকটার প্রতিনিধি বা দালাল হয়ে খাড়িয়ে যেন না যায় এব্যাপারে সকল দলের সতর্কতা। এটা হতেই পারে না, এ্মনটা বন্ধ করতে হবে। দেশের দলমাত্রই সবাইকে একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের রক্ষকই হতে হবে। যদি এসব কথা উপেক্ষা করা হয় পরিণতি হবে নিজ রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পরা।

    অথচ গত দুই বছরে যতবারই অলির বিরুদ্ধে তার দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে গেছে চীন বারবার ভেতরে হাত ঢুকিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে দেয় নাই। এটা টু মাচ, সীমা পার হয়ে গেছে। বিশেষত যেখনে ওদিকে ওলি ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী র এর প্রধানকেই প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়ে নেপালে এনেছিলেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি ভারতের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছিলেন।

    যদিও এক কম্বোডিয়া ছাড়া কোথায় চীন এমন করেনি। তাই দাহালের উচিত ছিল এর সমস্যার দিকটা খোলাখুলি বুঝিয়েই চীনকে নিবৃত্ত রাখা এবং এ কাজে তার অসফল হওয়ার কোন স্কোপ নাই। আবার চীনের অনুমান যে, ওলিকে বহিষ্কার করে দিলে তিনি নেপাল কংগ্রেস ও ভারতের সাথে মিলে পাল্টা সরকার গঠনসহ বিরাট কিছু করে ফেলতে পারেন- এ অনুমানও এত দিনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আর তা যদি হয়েই যায় তবে সেটাও নেপালের রাজনীতিকদেরই নিজেদের মোকাবিলা করতে হবে।  চীন-ভারত নয়, আগে নেপালকে নিজে বাঁচতে হবে। অন্তত একালের তিন বিদেশ রাষ্ট্র চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে দূরে এক “সম্পর্কের ভারসাম্য বিন্দু” অবশ্যই তৈরি ও মেইনটেন করে চলতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীন-ভারত নয়, নেপালের নিজে বাঁচা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  আমার নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

    জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

    গৌতম দাস

     ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2T2

    –

    সবার মাতৃভাষা রক্ষার পক্ষ নিতে হবে তবে, জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবেঃ
    গত শুক্রবার ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই নিজ উন্মেষ ও বিকাশের জন্য নিজ মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ অবাধ ও  নিশ্চিত দেখতে চায়; এটা তাঁর অধিকার আর এই অধিকার রক্ষা করা তাই আমাদের সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্রুয়ারির সারকথা এটাই। এই দিনটা তাই আমাদের মাতৃভাষা চর্চার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক স্মরণীয় দিন। উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম হওয়ার প্রাক্কালে সে সময় থেকেই হবু পাকিস্তানে, মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের দিক থেক্‌ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। এতে পুবের ভাগ্য যে পশ্চিমের আধিপত্যের তলায় চাপা পড়ে যাবে – বুঝে না বুঝে  “মুসলিম জাতিবাদের” উচ্ছ্বাসে পড়ে সেটা আমল করতে অনেকের মধ্যেই  অনীহা দেখা দিতে শুরু করেছিল। আর তা থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম বেসুরো হতে শুরু হয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে টের পেয়ে আমাদের আপত্তি প্রতিবাদ লড়াইয়ের শুরু এখান থেকেই। আর এখান থেকেই আস্তে আস্তে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের রাষ্ট্রের দিকে চলে যাই আমরা।

    তবে একালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ করতে আমাদের দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক ধারাকেই কম-বেশি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তবুও এর মধ্যে কোথাও জানি একটা ভাগাভাগি বজায় রয়েই গেছে টের পাওয়া যায়। যদিও সব পক্ষ বা ধারার মধ্যে কমন বুঝাবুঝি ঐক্য দেখা যায় তা হল – যেকোন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চার ‘অধিকার’ সমুন্নত রাখতে হবে। পালনের এই ধারার বাইরে অন্য দিকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ অন্য আর ধারাটা হল, ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের দিক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে তুলে ধরার চেষ্টা।

    কারো মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা হয়ে যায়- এটা করে কারা? কেন আসে এরা – এটা বুঝা খুব গুরুত্বপুর্ণ। আসলে একই সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যেকার এথনিক-বিভক্তির কারণে ভিন্নতা বা পড়শি জনগোষ্ঠির উপর আধিপত্য করার আগ্রহ বা সুযোগ নিতে চাওয়া থেকেই অন্যের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা শুরু হয়।  যদিও শুরুর দিকে “ঐক্য রক্ষার স্বার্থে” এই আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে এমন কথায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে স্বেচ্ছায় না বুঝে এই আধিপত্য মেনে নেয়। যেমন আমাদের ভিতর অনেককেই পাওয়া যাবে যারা মনে করে দুনিয়ায় সব মুসলমানের ভাষা আরবী হওয়া উচিত বা না হলেও আরবীর অধীনে সবার আসা উচিত। অথবা এমন হলে খুব ভাল হত এমন মনে করে থাকে।  মানে, ভিন্ন রেস [race] অর্থে জাতি বা ভিন্ন এথনিক [ethnic] গোষ্ঠি অর্থেও জাতি – এমন নির্বিশেষে দুনিয়ার সব ভুগোলের মুসলমানকে আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে। একথা সত্য যে আরবী ভাষা-সংস্কৃতির অনেক কিছু থেকেই ইসলামকে আলাদা করা মুসকিল। তবু এমন দাবি বা ভাবনার প্রতি সমর্থন তৈরি হয় সাধারণত ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও সৎ আবেগ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাস্তবে এমন সম্ভবত দেখা যাবে না। বরং উলটা পরিস্থিতিই তৈরি করবে।  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে ব্যাপারটা অনারব বা আরব নয় যারা তাদের উপর আরবী ভাষাভাষীদের এক দুর্বিষহ অত্যাচার, প্রবল এক আধিপত্য, সব সুযোগ-সুবিধা আগে আরবেরা পাবে ইত্যাদি এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করে তা অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা বা খুনোখুনিতে শেষ হবে। এর মানে কী আমি বলতে চাচ্ছি যে দুনিয়া সব ধারণের মানুষের মধ্যে নুন্যতম কোন ঐক্য রচনা করা বা কাছাকাছি আসা সম্ভবই না। অবশ্যই সম্ভব, তবে একটা পর্যায়ে যখন আমরা আমাদের অপরের রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ রক্ষা করা, যেমন অন্যের মাতৃভাষা রক্ষা করার দায়কর্তব্য – আমি ভিন্ন রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠের হলেও বুঝে যাব এবং রক্ষা করব।  যদিও আর সবার আগে মনে রাখতে হবে কারও মাতৃভাষায় হাত দেওয়া যায় না, যাবে না। আসলে  কারও এথনিক বৈশিষ্টে হাত লাগানো বা চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর এটা অপরাধ হবে সেদিকটা তো আছেই। তাই এই ভুল এড়িয়ে চলতে হবে। মাতৃভাষা মানে মা যে ভাষায় বাচ্চাকে প্রথম কথা শিখায়, কমিউনিকেশন করে। যা বলছিলাম এমন বুঝাবুঝি জাগা সম্ভব হয় এমন সহায়ক  সমাজ ও রাষ্ট্র যা আধিপত্যকে রুখে দেয় তা আগে হাজির থাকতে হবে। অবশ্য দুনিয়ার সব ভাষা আর রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ সবই আল্লাহ সৃষ্টি – এভাবে থিওলজিক্যাল অর্থেও ব্যাপারটা বুঝতে পারি। ফলে একটা ভাষা অন্যটার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা বা চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
    এতসব দিক চিন্তা না করেই সরল মনে ও বিশ্বাসে আমরা অনেকেই এমন সমর্থন দিয়ে ফেলব কারণ তাতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বাড়বে এমন একটা কিছু চিন্তা করে। অনেকে এটাকে ‘উম্মার শুরু’ বলে ভুলে অতি উতসাহও দেখিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সবকিছুই শেষে অন্যের আধিপত্য মোকাবিলাতেই আমাদের জীবন কাটবে এমন অবস্থাতেই পৌছাবে।
    উপরে যেটাকে আধিপত্য বলছি এটাই অন্যের উপনিবেশ বা কলোনি দখলে পড়ে যাওয়া বলতে আমরা যা বুঝি সেই উপনিবেশ ধারণারই ছোট রূপ। মানে আমার উপর কারও বড় ও ব্যাপক আধিপত্য ছেয়ে বসা এটাই তার কলোনি বা উপনিবেশ হয়ে যাওয়া। যদিও শেষ বিচারে কারও আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া এই পুরা ব্যাপারটাই ‘জাতি’ চিন্তার বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সমস্যাজাত। সে কোন এক কল্পিত জাতির স্বার্থে আমার উপরে চেপে বসেছে  এমন সাফাই সেখানে থাকবেই।  যেমন মুসলিম জাতিবাদের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে  – এই জাতীয় স্বার্থে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া উচিত – এই ছিল পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সপক্ষে সাফাই।  অর্থাৎ ব্যাপারটা আসলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তা যাকে অনেক আমরা ‘নেশন-স্টেট’ বলে বুঝি- এই বুঝ থেকে উদ্ভুত সমস্যা।

    এই নেশন [nation] বা জাতি ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটা হল এটা অপর জনগোষ্ঠীর ওপর নিজ আধিপত্য বিস্তার ও কায়েমের হাতিয়ার হয়ে যায়। এই আধিপত্য কায়েমের বড় ও প্রবল ধারণাটাই হল অন্য কারও ঘাড়ে উপনিবেশি-কর্তা হয়ে চড়ে বসা অথবা নিজের ঘাড়ে কারও উপনিবেশত্ব কায়েম হতে দেখা।

    আধুনিক রাষ্ট্র এই ফেনোমেনার শুরু
    আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম এই ফেনোমেনা দুনিয়ায় এসেছিল মোটাদাগে বললে ১৬৫০ সালের দিকে। আধুনিক রাষ্ট্র মানে, মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। অর্থাৎ মনার্কি বা রাজতন্ত্রের শাসনের কবল থেকে বের হতে গিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা শাসন কাঠামো ও ব্যবস্থা দুনিয়ায় কায়েম হতে শুরু করেছিল। কারণ, রাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অগ্রহণযোগ্য দিক ছিল – রাজতন্ত্র বলতে পারে না কে তাকে ক্ষমতা দিয়েছে বা তার ক্ষমতার উৎস কী?
    অনেকে অবশ্যই এসব প্রশ্নের অস্বস্তি কাটাতে সমাজের কিছু প্রভাবশালী এলিট তাদের পছন্দের বেছে নেওয়া শাসনকর্তা – এই অর্থে কোন রাজাকে গ্রহণীয় মনে করে বসে। মনকে প্রবোধ দেয়। এই প্রবোধ সম্ভবত স্বীকার করতে চায় না যে আসলে  এগুলোও আরেক ফ্যাকড়ার রাজতন্ত্র মাত্র। কোণ রাজতন্ত্রকে চিনবার সবচেয়ে সহজ চিহ্ন হল এগুলো সার্বজনীনের পছন্দ বা অনুমোদনে তৈরি হয় না, সমাজের সকলে তাকে নির্বাচিত করে না। একটা খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু অবস্থাপন্ন প্রভাবশালী ক্ষমতাবান গোষ্ঠি এই ‘শাসনকর্তা’ খাড়া করে থাকে।  এছাড়া এই শাসনকর্তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন এদের আরেক প্রধান লক্ষণ চিহ্ন হল কিছুদিনের মধ্যেই এটা একটা ডায়নেস্টি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডায়নেস্টি – মানে রাজার (শাসকের) ছেলে রাজা হবে।

    ফিরে যাই মুলকথায় – ক্ষমতার উতস কী? কে দিয়েছে ক্ষমতা? এখানে যদি মেনে নেই যে রাজতন্ত্রে শাসন ক্ষমতার উৎস ‘গায়ের জোর’ মানে, রাজার নিজের বলপ্রয়োগের সক্ষমতাই রাজার ক্ষমতার উৎস, সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে তাহলে রাজাও অন্য কারও যে রাজার উপর আরও বেশি বলপ্রয়োগে সক্ষমতা রাখে তার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হবে ও মারা পড়বে এবং এ কথাটাও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে মানে, এটা জায়েজ তা মানতে হয়।   অর্থাৎ এখানে এসে দেখা যাচ্ছে  ক্ষমতাকে ন্যায়-অন্যায় বা ইনসাফের প্রশ্ন মোকাবেলার সামনে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে সেকালে উপায় না দেখে রাজা জনসমর্থনকে  ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ভিত্তি বলে খাড়া করতে চায়। যেন যে রাজার পক্ষে ‘জনসমর্থন’ আছে তার সেই ক্ষমতাটা জায়েজ মনে করা হবে। যদিও বেশির ভাগ রাজাই নিজ ক্ষমতার উতস ঐশ্বরিক বা আল্লাহ দিয়েছে ধরণের কথা নিম্নস্বরে বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে  ‘জনসমর্থন’ এর কথা যেটা বলছিলাম, এর যুগটা কম লম্বা নয়। আর এখান থেকে ইংরাজি করোনেশন [Coronation] বা বাংলায় রাজ্যভিষেক বা রাজার ক্ষমতার অভিষেক বা পাবলিক অনুমোদন এর ধারণা হাজির হয়েছিল দেখতে পাই।
    কিন্তু সেখান থেকে  বিস্তারে আরও নতুন প্রশ্ন উঠেছিল যে, যদি গণসমর্থনই ক্ষমতার ন্যায্যতার ভিত্তি হয়ে থাকে তাহলে কে রাজা হবে বা কার শাসন-ক্ষমতাকে মেনে নেয়া হবে, অনুমোদিত হবে সেটার সবকিছু ‘পাবলিকই’ ঠিক করে দেক। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ বা নাগরিক। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। এবং জনগণই সেই ক্ষমতা ডেলিগেট [delegate] করে দিবে। মানে, সাময়িক হস্তান্তরিত করতে এক শাসক নির্বাচন করে তার হাতে দিবে- এসব ধারণা বিস্তার লাভ করা শুরু হয়েছিল। যদিও সেটা আরো অনেক কিছুর পরে হয়েছিল। কিভাবে? না, রিপ্রেজেন্টেশন [Representation] বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে নির্বাচিতের হাতে সাময়িকভাবে (পরের নির্বাচন পর্যন্ত) তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে এসব দিকে ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। এই হল ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের কার্যকারিতা দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা ও এর বৈধতার সমাধান। এক কথায় এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রক্ষমতা, বাংলায় আমরা বলি – গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ধারণা। ফলে স্বভাবতই এখানে রাষ্ট্রক্ষমতার আর কোনও চোরা-ক্ষমতা নয়, বরং এক সুবিন্যস্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়া ডিফাইনড [Defined] ক্ষমতা বা নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো মূলত ইউরোপের ভূখণ্ডে বিকশিত বা পরবর্তিতে তা ফেডারেল রিপাবলিক (১৭৭৬) আমেরিকা্তেও। আর তা থেকে দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক রাষ্ট্ররূপগুলোতে এটাই কম-বেশি অনুসরণ করতে দেখা যায়। যেমন নয়া চীনে এসে, চীনের ভাষায় এটা ‘পিউপিলস রিপাবলিক’ [People’s Republic]। এমনকি লেনিনের রাশিয়া তারা নিজেদের রাষ্ট্রকে ভিন্ন দাবি করলেও সোভিয়েত রাষ্ট্র নিজেকে এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র বলেই মেনেছে।

    কিন্তু তবু সব সমস্যা মিটে নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের সাধারণ রেওয়াজ ও রিচুয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে নির্বাচনের দিন থেকে শপথের দিন পর্যন্ত এখানে  ‘গণক্ষমতা’ তৈরির এক প্রক্রিয়া চলে থাকে। এই লক্ষ্যে প্রতিনিধি নির্বাচন ও সাময়িক ক্ষমতা হস্তাস্তর সম্পন্ন করে ক্ষমতার অভিষেক ঘটিয়ে নেয়া অবধি- এই সময়কালটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেয়াল করেন আমরা এখন দাঁড়িয়ে গেছি নির্বাচনেরও আগের ‘এক নিশীথে’। আর চার দিকে হা-হুতাশে।

    কলোনি দখল আর জাতিরাষ্ট্রের হাত ধরাধরিঃ
    রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও ক্ষমতা তৈরির রেওয়াজ দুনিয়ায় মোটাদাগে চালু হতে দেখা গেছিল ১৬৫০ সালের দিকে; কিন্তু তাতে এর পরেও বড় বিপথগামিতা ঘটেছে, দেখা যায়। মানে চোরাবালিতে পা আটকে যাওয়া বা ভুল রাস্তায় চলে যাওয়া আছে আমরা দেখি। আর এরই নাম হল , নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা। মূলত ‘জাতি’ ধারণাটাই সমস্যার, এটা এক নষ্টা ধারণা হিসেবে হাজির হয়েছিল। রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণার প্রতিশ্রুতি ছিল বা হওয়ার কথা ছিল যে জনগণের সব অংশকেই অন্তর্ভুক্ত করে এখানে এক ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি” নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রগঠন বা Constitute শব্দের অরিজিনাল অর্থ ছিল এটাই। তাই এটাই আসল রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন হওয়ার কথা। কিন্তু এটা বিপথে চলে যায়। গিয়ে হয়ে যায় জাতি নির্মাণ বা ‘জাতিগঠন’[Nation State]। আর এতে ‘রাজনৈতিক কমিউনিটি’ এভাবে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটাই হারিয়ে যায়।

    খেয়াল রাখা দরকার ইউরোপে যখন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বাস্তবায়নের নানা উদ্যোগ কসরত চলছে ঠিক একই সময়ে প্যারালাল আর এক  ফেনোমেনার উত্থানের যুগ সেটা। কলোনি দখলের যুগ সেটা। তাই একই সাথে দুনিয়াতে ব্যাপকভাবে ‘কলোনি দখলের’ শুরু হয়েছিল সেকালে। এটা আরো সম্ভব হয়েছিল সূক্ষ্মমাত্রা [Precision] ও গুণাগুণের স্টিলের আবিষ্কার ও ব্যবহার আর সাথে বারুদ অস্ত্র কম্পাস এসব মিলিয়ে  ব্যাপারটা এক বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ হিসাবে হাজির হয়েছিল। প্রধান বিনিয়োগের আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধজাহাজ ব্যবসা। যুদ্ধজাহাজ কথার আসল মানে,, পাল তুলে বেরিয়ে পড়া কলোনি দখল ও লুটের কাজে। একাজেরই  এক মডেল ধরণ হল – একেকটা “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” খুলে বসা।  তবে ব্যাপারটা শুধু জাহাজ-বিজ্ঞানের উন্নতি বা বিনিয়োগ ব্যবসার স্বর্ণযুগের নয় বা শুধু তা দিয়ে ঘটেনি। এসবই হতে পেরেছিল এর সাথেই সবচেয়ে নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল এক ভাবাদর্শ বা আইডিয়া। সেটি হলো “জাতি” ধারণা- এর যোগ ঘটা। ব্যাপারটা ইউরোপের যার যার দেশ-রাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিক কোম্পানির জাহাজে বিনিয়োগের ব্যবসা হিসেবে তা সে ব্রিটিশ, ফরাসি বা ডাচ ইত্যাদি এরা নিজের একেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলেছিল। আর এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে কলোনি দখলে ঝাঁপিয়ে পড়া ধরনের হয়ে ঘটেছিলও। কিন্তু সাথে আরো কিছু ছিল- তা হলো কলোনি দখলে প্রতিযোগিতা। একে অপরের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া। কিন্তু এরই সাথে ঘটা আরেক বড় ঘটনা ছিল – কোম্পানিগুলো নিজস্ব একান্ত স্বার্থ আর লাভালাভের এই প্রতিযোগিতাকে যেন নিজেদের নিজ নিজ দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে মিথ্যা হলেও তা দেখাতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলোনি দখল প্রতিযোগিতায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ে কতটা বেশি দখল সম্পন্ন করতে পেরেছে – যেন এটা হয়ে যায় কোম্পানিওগুলোর একান্ত বিনিয়োগ স্বার্থ নয়, তা নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ। এই মিথ্যা বয়ান ও তা উপস্থাপনটাই সব কিছু বদলে দিয়েছিল। আর তা করা গিয়েছিল এক ‘জাতি’ ধারণা দিয়ে, দেশ-রাষ্ট্রকে একটা জাতিরাষ্ট্র যেমন, তা এটা ‘জাতীয় স্বার্থ’ এ ধরনের বুলি দিয়ে। এভাবে কোম্পানির স্বার্থ হয়ে যায় কথিত ‘জাতীয় স্বার্থ’। এতে অন্যের দেশকে কলোনি দখলের কাজ এটা যেন আর কোম্পানিগুলোর স্বার্থ নয়- ব্রিটিশ বা ডাচ ‘জাতীয় স্বার্থ’ হয়ে উঠেছিল।
    আর তা থেকেই কলোনি দখল আর কোনো ‘অন্যায়’ বা অপরাধ কাজ নয় বরং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তামাশার দিকটা হল, দেশের অভ্যন্তরে যে রাষ্ট্র নিজের জন্য একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়াকে নিজের কাজকর্তব্য মনে করে, নিজ দেশের বাইরে সেই রাষ্ট্রই আবার অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়াকে জায়েজ মনে করেছিল কিভাবে? এর জবাব কারো কাছে ছিল না। তবে এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যেন নিজেরা একেকটা জাতি, আর তাদের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হল অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়া। এটা জায়েজ মনে করা হতে থাকার মূল কারণ নষ্টা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অথবা তা থেকে উপজাত আরও নষ্টা এক “জাত শ্রেষ্ঠত্বের” ধারণা। [আজকের দিনে যা এক সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হয়ে আবার হাজির হতে দেখা যাচ্ছে] ব্রিটিশরা ফরাসি বা ডাচদের চেয়ে ‘জাতশ্রেষ্ঠ’ শুধু তাই নয় বরং,  অন্য  মহাদেশের যেসব রাষ্ট্র এরা কলোনি-দখল করছিল এমন সবকাজের সপক্ষে সাফাইয়ে সার কত্থাটা হল  জাতিবাদ, জাত শ্রেষ্ঠত্ব অথবা যেমন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব।

    অথচ জাতি বা জাতিগঠন ধারণার সাথে মূল রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার ধারণার কোনোই মিল বা সম্পর্ক নাই। একই কথা তো কখনো নয়, ছিল না। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল যেমন ব্রিটেনের বেলায়- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের ব্যক্তিস্বার্থটাকে কল্পিত এক ‘ব্রিটিশ জাতির’ স্বার্থ বা জাতিরাষ্ট্র স্বার্থ বলে বয়ান তৈরি করে হাজির করেছিল। আর এটাকেই যেন এক ব্রিটিশ রিপাবলিক রাষ্ট্র ও এর স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই ‘জাতি’ ‘জাতিগঠন’ শব্দটাই আসলে কলোনি দখল, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা – এধরনের কাজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই ব্রিটিশদের সেকালের ইন্ডিয়াকে কলোনি-দখল যেন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটা কাজ! এভাবে পুরা ইউরোপই রাষ্ট্র গঠনকে কথিত ‘জাতি গঠন’ বুঝেই করে গিয়েছিল; কিন্তু কত দিন?

    প্রায় তিনশ বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল পর্যন্ত।  এই তিনশ বছর ধরে কলোনি দখল, লুটে খাওয়া আর উদ্বৃত সারপ্লাস পাচার এসবই চলেছিল। কিন্তু এর পরেও হুঁশ এসেছিল কি? হ্যাঁ, অবশ্যই কিন্তু বিশাল খেসারত দেয়ার পরে। জর্মান হিটলারের আগমন ও উত্থান ঘটেছিল সেই খেসারত হিসেবে।

    কলোনি দখল যদি জায়েজ হয়, আর  নিজ জাতিরাষ্ট্রের জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখানো আর বড়াই করা যদি সব আকামের সাফাই হয় তাহলে, হিটলারের জার্মানিরও আরো চরম জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রেঞ্চ দেশ-রাষ্ট্রসহ সবার কলোনিগুলা পাল্টা দখল করে নিলে সেটা নাজায়েজ হবে কেন? এভাবে ইউরোপের সব জাতিরাষ্ট্রই হিটলারের তাণ্ডবের ভেতর নিজ জাতশ্রেষ্ঠ বোধের পরিণতি দেখেছিল। এটাই জাতিবাদের পরিণতি, সবার প্রতিচ্ছবি- দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের গ্রেটেস্ট তাৎপর্য। ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তার চরম পরিণতি ইউরোপের সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল।

    অবশ্য এতটুকুই ইউরোপের রাষ্টড়চিন্তায় বদল আসার একমাত্র কারণ না। এর সাথে আরও ভূমিকা রেখেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চসহ মিত্রশক্তির) আমেরিকান সামরিক-অর্থনৈতিক সাহায্য পাবার শর্ত যে, ইউরোপকে কলোনি-দখলের দিন শেষ করতে হবে। এটা নাজায়েজ ও অপরাধ মানতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকারের উপর দাঁড়াতে হবে। সার্বজনীন মানবাধিকার মানবার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইত্যাদি। যুদ্ধ শেষে ঐ শর্ত মোতাবেক ইউরোপ এভাবে নিজেকে ব্যাপকভাবে বদলে নিয়েছিল।

    কিন্তু তা সত্ত্বেও আরেক অদ্ভুত ঘটনা হল আমাদের এদিকে।, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশগুলোর ট্রেন্ড হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া। কিন্তু কেমন স্বাধীন রাষ্ট্র? বাস্তবে এরা  রাষ্ট্র বলতে তখনও জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বলেই বুঝেছিল। অর্থাৎ একদিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ কলোনি মুক্তির হলেও আর এক দিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ এই তিন মহাদেশে আসলে ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ গড়ার দিকে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের বুঝ তাদের আসেনি। এলোই না।

    আর এর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছিল নেহরু-গান্ধীর ভারত। যেমন আজও কাশ্মীর ইস্যুতে, কাশ্মীর আসলে কে শাসন করবে এর একমাত্র নির্ধারক হল খোদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা। কোনো রাজা নয়, রাজ যদি কাউকে একসেশন চুক্তি করে) কাশ্মীর দিয়েও দেয় তবুও সে রাষ্ট্রও নয়। এই হল বিশ্বযুদ্ধে শেষের শর্ত ও বুঝাবুঝির কনভেনশন হিসাবে পরের  দুনিয়ার নতুন নীতি। যে নীতি অনুসরণে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল আর সেখানে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গিয়েছিল, নেহরু-গান্ধী একটা স্বাধীন ভারত পেয়েছিল। অথচ নেহরু আজীবন ছিল এ সম্পর্কে বেখবর। জবরদস্তিতে তিনি কাশ্মীর দখল করে রেখেছেন।

    অন্য বড় বিপর্যয়টা হলো রাষ্ট্র বলতেই তা ‘জাতিরাষ্ট্র’ বলে বুঝা। বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র ধারণা কী পরিণতি হয়েছিল, আর এতে ইউরোপে কী বদল এলো এসব নিয়ে নেহরু-গান্ধীর হুঁশ বা বুঝাবুঝি শূন্য থেকে যায়। তাই ভারত হয় একটা সেই জাতিরাষ্ট্রই। য়ার বলারই বাহুল্য ঘটনা সেখানেই থামে নাই, থামার কথাও না। তাই দেখা যায় ভারত জাতিরাষ্ট্র হয়ে হাজির হওয়ার একটা চেন-রিঅ্যাকশন আছে।

    নেহরু-গান্ধীর তথা পুরা কংগ্রেসেরই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝার সমস্যা হল, তারা আসলে একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের কল্পনা করছেন বা এমন ধারণার লালন ও অনুসারি হচ্ছেন। আর এটা গ্রহণে মুসলমানদের মনে অস্বস্তি হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নাগরিক বৈষম্য তৈরি হবেই- এটাই হল সারকথা। জবরদস্তিতে তাই করতে যাওয়া হয়েছিল। যার সোজা মানে হল বেপরোয়া ভাবে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র গড়তে সেদিকে ঠেলে দেয়া। এর পরেও ১৯২৮ সালে জিন্নাহর ‘১৪ দফা প্রস্তাব’ একটা খুবই সুচিন্তিত প্রস্তাব ছিল [ইংরাজিতে পেতে এখানে]। কিন্তু এই সমাধানও আমলই করা হয় নাই। আর তা থেকে জিন্নাহ ফাইনালি কংগ্রেসের সম্ভাবনার হাত ছেড়ে  মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের পাকিস্তান গড়ার দিকে চলে যান। অথবা বলা যায় পরিস্থিতি এদিকে চলে যায়। যদিও তাতেও সমস্যার শেষ হয় না। পরবর্তিতে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে হবে- বলাতে পূর্ব পাকিস্তান ভীত হয়ে পড়ে, বিপদ দেখতে পায় অসাম্যের যে পশ্চিমের আধিপত্যের নিচে সে চাপা পড়তে যাচ্ছে। তাই ক্রমে সেই আবার একই – রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদে পৌঁছায় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু জাতিরাষ্ট্র বুঝ আমাদের কাউকে ছাড়ে নাই। একই প্রশ্ন, একই আধিপত্য কায়েমের অভিযোগ এবার পাহাড়িদের দিক থেকে উঠে। কিন্তু তাজ্জবের ব্যাপার হল, পাহাড়িদের চোখেও এর সমাধান হল আবার সেই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝবার চিন্তা আর তা থেকে এক “জম্মু জাতিবাদ”! দেখাই যাচ্ছে এটা এক লম্বা চেন-রিঅ্যাকশন। কিন্তু দুনিয়ার অভিমুখ আঁচ করা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র চিন্তা আমাদের ছুঁতে পারেনি।

    রামমোহন রায় ও তাঁর ব্রাহ্ম প্রকল্পঃ
    এর ভিতরে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে  ‘প্রগতিশীলেরা’। কারণ তারাও মূলত জাতিরাষ্ট্রবাদী। আর এরা আবার জাতি বলতে সেটা আবার ছুপা হিন্দু-জাতি বুঝ।
    যার আদর্শ প্রমাণ রামমোহন রায় ও তার নতুন করে এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করার প্রচেষ্টা। রামমোহনকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা ভারতে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করেন। কিন্তু রেনেসাঁর গুরু তিনি নতুন ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন কেন? অথচ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত ‘প্রগতিশীলরা’ এতে আপত্তিকর কিছু দেখেনি। চেপে গেছেন। পরবর্তিতে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করে যায়।
    এ দিকে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করাতে এই ব্যর্থতাই আবার সাফাই হিসেবে হাজির হয় যে জাতি বলতে হিন্দু-জাতি বুঝি হবে। আর তা থেকে এবার এরা সবাই মিলে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণার অনুসারী হয়ে যান। আর এমনটা তারা এতই অবলীলায় হয়ে যান যে জাতি বলতে যে তারা এক্সক্লুসিভ হিন্দু-জাতি বলে বুঝতেছেন এটাও আর অনুভব করেন না। তাই কোনো জিন্নাহ বা কোনো মুসলমান হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন বা আপত্তি তুললে উল্টা তাকেই ‘সাম্প্রদায়িক লোক’ অথবা ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চাওয়া লোক’ ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ঘৃণাবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন তারা। একাজই তাদের প্রগতিশীলতার শুরু এখান থেকে। অথচ বাস্তবতা হল, সমস্যাটা রাষ্ট্র বলতে তা একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বলে বুঝা থেকে শুরু।

    অতএব একালের বড় শিক্ষা হল, সব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা সুযোগ থাকা বা রাখা এটা তার মৌলিক অধিকার বলে মানতে হবে। কিন্তু এরপর এ থেকে কোণভাবেই জাতিরাষ্ট্র চিন্তার অনুসারী হওয়ার পথে যাওয়া যাবে না। বরং, জাতিরাষ্ট্র এই চিন্তা বা ধারণাটাই আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র; সবার এক পরিচয়, সবাই নাগরিক এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে। আর সেই সাথে তা হতে হবে- সবাই একই পরিচয় নাগরিক এবং বৈষম্যহীন সমান নাগরিক। সাম্য, মর্যাদা আর ইনসাফের এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    এই লেখাটা গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “‘মাতৃভাষার পক্ষ নিলে তা জাতিবাদ নয়” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]