Category: করোনাভাইরাস CoronaVirus

  • ভারতের বাংলাদেশে ‘সৈন্য পাঠানো’ শখ

    ভারতের বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ শখ

    গৌতম দাস

    ২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Yj

     

    গত ২১ এপ্রিল ভারতের অনেক  প্রিন্টেড মিডিয়া তাদের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই এর বরাতে একটা রিপোর্ট ছাপায় যে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। পরে তৃতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভারতীয় হাইকমিশন জানায় যে এই খবরটা মিথ্যা (This claim is false )।

    পিটিআই এর এটাকে বলে স্রেফ ইতরামো – মোদী সরকার, তার সরকারী বার্তা সংস্থা আর তার গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও নিচু একটা কাজ তারা করেছে।  দেখা যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), এরা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমেছে, বাংলাদেশে কথিত ভারতীয় সেনা পাঠানোর প্রপাগান্ডায় নেমে এনিয়ে বানানো খবর ছেপে দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশকে নিচা দেখানে যায় আর তাতে তাদের দেশ ও দেশপ্রেমের ভারতকে যেন দেখানো যায় অনেক উপরে।  বাংলাদেশকে মোদীর অধীনস্ত করে দেখালে তাতে নরেন্দ্র মোদী ভারতকে অনেক উপরে উঠায়ছেন দেখান যাবে এই হল তাদের বিশ্বাস। তাই, প্রচারিত সেই খবরটা হল ভারত নাকি “বাংলাদেশে আর্মি পাঠাচ্ছে” [Indian Army to send teams to Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan & Afghanistan to fight Covid-19]। আর এই মিথ্যা খবরটা ছড়িয়েছে সরকারি সংস্থা পিটিআই।

    এই খবরের ভাষ্যে ভাবটা এমন যেন ভারত যেন তার পড়শি ‘কলোনিগুলোকে’ দেখভাল ও  রক্ষার্থে এসব দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটা হল প্রপাগান্ডা। কিন্তু এই পিটিআই কী জানে না কোনটা নিউজ আর কোনটা ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা? এটা অবিশ্বাস্য তাই, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত করে ভারতে প্রায়ই সে দেশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে “পেজ-বিক্রি” করা খবর ছাপা হয়, এটা যদি মনে রাখি। অনেকের মতে, ভারতে মিডিয়ায় এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, কোনো পত্রিকার ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা যত খারাপ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে সে তত বেশিবার নিজেকে বিলিয়ে দিবে, ‘পেজ বিক্রি’ করে অর্থ বা সুবিধা সংগ্রহ করবে।  আর সেক্ষেত্রে বিনিময়ে গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে যা খুশি ছাপতে চায়, সেভাবে তা যেন ছাপাতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে এই ইতরামো করে চলতে প্রায়ই দেখি আমরা। আর ভারতের গোয়েন্দাবিভাগকেও এদের এই দুরবস্থার সুযোগের সদব্যবহার করতে প্রায়ই দেখা যায়। গোয়েন্দাবিভাগেরও হাতেও মিডিয়া-বাজেট মানে মিডিয়াকে প্রভাবিত করার বাজেট থাকে সেটাই এখানে ব্যবহৃত হয়। ছপ্পড় ফেরে এই বাজেটের লোভ লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারতে প্রধানধারার বাইরের অনেক ইন্ডেপেন্ডেন্ট মিডিয়া দাঁড় করার উদ্যোগ আছে, যেমন থাকে সবদেশেই.  যেমন, WIRE, SCROLL, CARAVAN ইত্যাদি। কিন্তু অনেককে দেখি হঠাত করে একটা ‘খেপ’ মেরে বসেছে। যেমন ২০১৪ সালে অমিত শাহের মমতার বিরুদ্ধে জঙ্গি প্রপাগান্ডা ও আক্রমণ। দাবি পশ্চিমবঙ্গের “বর্ধমানে জেএমবি বোমা হামলা ঘটনা” পাওয়া গেছে। আর এতে তখনও কিছু মিডিয়া পয়সা কামিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর দেখা গেলে মোদীর অফিসের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং ‘এসব কিছু না’ বলে হঠাত ঘটনায় ঠান্ডাপানি ঢেলে দিয়েছিলেন। এটাই  ভারতের দুস্থ মিডিয়ার এই সাধারণ ঝোঁক যেটা সব সময় দেখা যায়।

    আলোচ্য ঘটনাটা আরো অনেক বড় গুরুত্বের এজন্য যে, দেখা যাচ্ছে এবার সরকারি পিটিআই নিজেও এই বানোয়াট খবরের ব্যবসায় এসে গিয়েছে অথচ, পিটিআই ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা। শুধু তাই না আরও দিক আছে।  যেমন একটা বার্তা সংস্থা বানোয়াট প্রপাগান্ডার কনট্যাক্ট নিউজ বা চুক্তিতে ছাপানো খবর ডেস্কে রাখলেই তা ঐ সংস্থার সব “প্রাহক মিডিয়া” যেমন ধরা যাক ওয়েব পত্রিকা “দ্যাপ্রিন্ট” – তাকেও নিউজটা  গ্রহণ ও নিজ পত্রিকায় তা ছাপাতেই হবে ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। উলটা এমনকি “দ্যাপ্রিন্ট” চাইলে এর পালটা নিজস্ব ইনভেস্টিগেটিভ রহস্যভেদী কোন রিপোর্টও ছাপতে পারে। কিন্তু ঘটেছে উলটা। দাপ্রিন্ট প্রপাগান্ডা খবরটা যত্ন করে ছাপিয়েছে।

    তাহলে শেখর গুপ্তা যিনি এতই  বর্ষীয়ান সম্পাদক, ভারতের অনেক কয়টা প্রধান দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক  ও তাঁর ইন্ডেপেন্ডন্ট মিডিয়ার বড়াই – বর্তমানে “দ্যাপ্রিন্ট” এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা, তাঁর এত বড় বড় কথা বলে লাভ হল কী?   সেই “দ্যাপ্রিন্ট”-ও পিটিআইয়ের প্রপাগান্ডা নিউজটা ছেপেছে  এবং সবার চেয়ে হুবহু বেশি আর নিষ্ঠার সাথে।  তাকেও কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? শেখর গুপ্তের নিজের পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’- তারও এই দশা কেন? এমনকি এই নিউজ প্রসঙ্গে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর চেয়ে ‘দ্য হিন্দুর’ প্রেজেন্টেশন অনেক শোভন। কিন্তু ‘দ্য প্রিন্ট’ পড়ে মনে হয় পিটিআইয়ের ভাষ্যটা হুবহু না তুলে  লিখলে যেন ‘দ্যাপ্রিন্ট’ পেমেন্ট কম পাবে, এই ভয়ে আছে। তাই আলোচ্য কেসটা আসলেই আরো বড়। আচ্ছা, ভারতীয় হাইকমিশন এখন  জানিয়ে দিছেন যে পিটিআইয়ের এই  খবরটা মিথ্যা – “This claim is false. There is no decision to send the Indian army …,”।  – এখন মিডিয়ার স্বাধীনতা ইনডিপেন্ডেন্টস নিয়ে মুখের ফেনা তোলা শেখর গুপ্তারা কী বলবেন? কী বা কোন “দেশপ্রেমের” আড়ালে নিজেকে  লুকাবেন? বলবেন যে “ভারতীয় হিন্দুজাতির স্বার্থে রাষ্ট্রের দেশপ্রেমে এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা হলেও সরকারের পক্ষে থাকতে হয়েছিল! হায় রে দুস্থ হাভাতে হতভাগার দেশপ্রেম!

    বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ওয়াকেবহাল যারা পিটিআইয়ের বানোয়াট কারবারটা দেখেছেন ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বুঝতে  তাদের বাড়তি কিছু মনোযোগ দিতে হতে পারে।  আমাদের বার্তা সংস্থা বাসস বা ইউএনবিকে দিয়ে ভারতের পিটিআই এর ধারণা নেয়া যাবে না। কারণ এদের তুলনায় পিটিআই মহীরূহ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, ভারতের মিডিয়া ব্যবসায় খবর সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য এত বড় ভারতজুড়ে নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে একমাত্র পিটিআই এর। এ কারণে ভারতের সব রাজ্যের সব পত্রিকার প্রধান ও প্রায় একমাত্র খবরের উৎস এই প্রতিষ্ঠান। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে  কোন বার্তা সংস্থার ভূমিকা অনেক কম। কারণ আমাদের এখানে বাংলাদেশের প্রতিটা মিডিয়া হাউজেরই সবার মূলত নিজস্ব আলাদা  রিপোর্টার স্টাফ সেট থাকে। তবে তাদের সংগৃহীত খবরের খুব ছোট একটা অংশ তারা সরকারি-বেসরকারি বার্তা সংস্থা থেকেও নিয়ে থাকেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিটের সাংবাদিক আছে।  অর্থাৎ সরকথায় ভারতের নিউজ মিডিয়া জগতে বার্তা সংস্থা হিসাবে পিটিআই-এর ভুমিকা অনেক বড় প্রভাবের।

    নিউজমিডিয়ায় বার্তা সংস্থার খবর ছাড়া আর এক ধরনের ‘উৎস’ থাকতে দেখা যায় – যেমন ‘আমাদের “নিজস্ব সোর্স” বা সূত্র বলেছে’। যদিও কখনওবা কথিত ‘সোর্স’ অথবা ‘সূত্র মোতাবেক’ এর কথা বলে আড়ালে গুজব বা প্রপাগান্ডাও চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতে পেজ বিক্রি এভাবেই হয়ে থাকে। তবে “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সোর্স-এগুলো বিশ্বাসযোগ্যও হয় অনেকসময়। তবে পিটিআইয়ের ‘আমার সোর্স বলছে’ বা ‘সূত্র মোতাবেক’ বলে এমন উৎসের খবর ছাপানোর সুযোগ কম। মূল কারণ এটা সরকারি তো বটেই; এছাড়া একটা বার্তা সংস্থা সাধারণত ‘সূত্র-খবরের’ উপরে কাজ করে না। এছাড়া ‘সূত্র-খবরের’ ধরনের কাজগুলো মূলত ব্যক্তি বা গ্রুপ মালিকের পত্রিকাগুলোর জন্যই যেন মূলত বরাদ্দ। এই সূত্রে আমরা কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সে দেশের কম-প্রচারিত পত্রিকাগুলোর সাথেই মূলত সরাসরি ‘কেনাবেচা’ করতে দেখি।

    এসব বিচারে ‘ভুয়া সোর্সের নামে’ পিটিআই ভারতে ‘পেজ বিক্রি’ করেছে- এমন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এগুলো প্রাইভেট মিডিয়া আউটলেট এরাই মূলত করে থাকে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখলাম সরকারি পিটিআই এমন প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

    ঐ রিপোর্টে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আফগানিস্তান এই চারটা দেশের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে- ভারতীয় সৈন্য এসব দেশে আলাদা আলাদা গ্রুপে পাঠাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে [The sources said the teams for Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan and Afghanistan are being readied ]। আর তাতেই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম- এই প্রপাগান্ডা খবর অস্বীকার করেছে [Dhaka needs no Indian army ……] দৈনিক নিউ এজ -কে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন। এর পরে তা করেছেন আরেকটু পরিষ্কার ও কঠোরভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কমল গুণরত্নে [No need of military assistance from other countries… ]। শ্রীলঙ্কার বক্তব্য বেশি ক্যাটাগরিক্যাল এবং বোল্ড। তিনি বলেছেন, “সৈন্য পাঠানো প্রসঙ্গে দু’রাষ্ট্রে আমাদের মধ্যে কোনো ডায়লগও হয়নি” [there was no such dialogue that had taken place between two nations.]। অর্থাৎ তিনি বুদ্ধিমানের মত প্রকারন্তরে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম দেশ। ফলে কোন ডায়লগ ছাড়া আমি রাজি না হলে আপনি মোদী আমার দেশে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনি কে? মনে হচ্ছে আমাদের অবশ্য এত সাহস হয় নাই।  মানে শ্রীলঙ্কা তার প্রতিক্রিয়া অন্যদের চেয়ে আরেকটু কড়া বা জোরদার করতে পেরেছিল বলা যায়। কারণ শ্রীলঙ্কার অন্তত দু’টি মিডিয়া এখবরের সত্যতা নিয়ে কলম্বোর স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে প্রশ্ন করলে (যেমন, শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকাকে)  ভারত জানিয়েছে এমন ‘খবর মিথ্যা’ (“This claim is false. ) বলে খবরটাকে অস্বীকার করেছে।

    এখন এখানে এক মজার তামাশা দাঁড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হল, ভারত সরকারের একটি অফিস আরেকটি অফিসের দাবিকে ‘মিথ্যা বলছে’, অস্বীকার করছে। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশন মানে হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অংশ প্রতিষ্ঠান। কাজেই তাদের বক্তব্য ওজনদার। কাজেই এখন এর একমাত্র ফয়সালা প্রধানমন্ত্রী মোদীই করতে পারবে সম্ভবত!
    এর মানে হল, পিটিআইয়ের ইজ্জত-লজ্জা কিছু থাকলে তাদেরই এখন ‘ঝুলে পড়া উচিত’। কারণ শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশনই বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে। অথচ পিটিআইয়ের দাবি এমন খবর নাকি “বিশেষ সূত্রের খবর”। এই বিশেষ সুত্র এরা তাহলে এখন কোথায়? তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে? সবচেয়ে তামাসাটা হল এমন নিউজ প্রকাশের জন্য পিটিআই কোন জবাবদীহি করেছে আমরা এখনও শুনি নাই।  সরকার বা পিটিআই কাউকে ‘সরি’ বলে নাই।
    এর মানে প্রমাণ হল  পিটিআই-এর এডিটরের পক্ষে দিল্লির কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও কোন টংয়ের দোকান চালানোর যোগ্যতাও তাঁর নাই।  মোদীকে কাপড় পড়ায়ে ঢাকতে গিয়ে পিটিআই-এডিটর নিজেই ন্যাংটা হয়ে গেছেন!  অবস্থা এখন এমন  কোন ভারতীয় হাইকমিশন মানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলছে,  পিটিআই-এডিটর এক ভুয়া নিউজ করেছে। এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য পিটিআই-এডিটর এর জন্য আর কী হতে পারে?

    তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে?
    খুব সম্ভবত এটা নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর বিজেপির ইমেজ বাড়ানোর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। আর এদিকে একাজ করে দিয়ে অর্থ বা পদ-পদবির লোভ ভারতের কিছু সরকারি কর্মচারী সামলাতে পারেননি, এরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হয়ত (মোদী সরকারের বিশেষ স্বার্থ বা দেশপ্রেম বলে ভুয়া কথার আড়ালে) গোয়েন্দা বিভাগ আর পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। যার মূল ভাষ্যটা হল- এটা দেখানো যে এই মোদী সরকার এতই উঁচুতে ভারতকে নিয়ে গেছে যে, পড়শি চার-চারটা রাষ্ট্রকে এখন মোদী পকেটে রেখে চালায়। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সেগুলো দেখভাল আর ঠিকঠাক করে রাখতে হয়”। এই ভাষ্যটা যেন বলতে চাইছে, ওসব দেশে সরকার বা প্রধানমন্ত্রী এক আধজন থাকে বটে তবে মোদীই সেগুলোকে মূলত চালায়ে থাকেন। – মোটামুটি এটাই সম্ভবত ছিল গগন-ফাটানো “মোদীগল্প”। আর এদিকে আমরা হয়েছি যেন মোদীগল্প বাস্তবায়ন করে দেয়ার চাকর-বাকর; কিন্তু তাতে আমরা অস্বস্তিহীন হয়ে গেলাম কিনা সে খবর নাই। “ভারতের ব্যগেজ” বইতে বইতে আমাদের মান-ইজ্জত বলে আর কিছু নাই। থ্যাঙ্কস টু শ্রীলঙ্কান জার্নালিস্ট!

    পিটিআইয়ের ঐ প্রপাগান্ডা রিপোর্টে একটা বাক্য ছিল যে অংশটা কোনো পত্রিকা কপি করতে  বাদ দেয়নি। বাক্যটা হল, “সার্ক রিজিয়নে করোনা মহামারী ঠেকানোর জন্য একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক গড়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এগিয়ে রয়েছে ভারত  [New Delhi has also been playing a key role in pushing for a common framework in dealing with the crisis.]”। কিন্তু মোদীকে এই – “প্লেয়িং কী রোল” –  করতে তারে কে এত ডাকতেছে?
    আচ্ছা মোদীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী  সার্কের করোনা বৈঠক করতে গেছিলেন কেন? এই কী রোল দেওয়ার জন্য নয় তো? চাঁদাই বা দিয়েছিলেন কেন? মোদীকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া- ‘প্লেয়িং কী রোল’ করার জন্য নয় নিশ্চয়? কিন্তু এতে খুশি হয়ে তিনি যখন খুশি তখন, কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই কিছু দেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিতে পারেন? তাই কী? সত্যি অবিশ্বাস্য! অথচ ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা শব্দ আছে! মনে হয় না ভারতের কেউ শব্দটা শুনেছে!

    এখানে আলোচ্য পিটিআইয়ের ঐ মিথ্যা রিপোর্টের কিছু অসংলগ্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাকঃ
    একঃ  পিটিআইয়ের ওই রিপোর্টে মাত্র চারটি দেশের নাম আছে। কিন্তু পাকিস্তান বা নেপালের নাম নেই কেন?  ভারত বা মোদীর কী নাম নিতে ভয় লেগেছে! না কোনো ‘ঝাপ্টা’ খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? সার্কের সদস্য তো অন্তত সাত রাষ্ট্র।

    দুইঃ ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের বন্ধুত্ব-সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে মহামারী সামলাতে ৫৫টা দেশে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন পাঠানো হয়েছে, আর তা আমেরিকাতেও” [As part of its policy to help friendly countries to deal with the pandemic, India is also supplying anti-malarial drug hydroxychloroquine to 55 countries] । কিন্তু ঘটনা হল, এই তথ্য অর্ধসত্য অথবা কোথাওবা পুরাটাই অসত্য। যেমন, এই ওষুধ ভারতের প্রয়োজনের তুলনায় দশ গুণ উৎপাদিন হওয়া সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ভারত থেকে তা রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গোঁফে তা দিয়ে যেন দাম বাড়াবার আনন্দ উপভোগ করতে চায় ভারত। কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকি-ধমক খেয়ে তৎক্ষণাৎ সব রফতানি বাধা খুলে দিয়েছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়। এরপর থেকে মোদি দাবি করছেন, এখন তিনি উদার হয়ে গেছেন, ৫৫টি দেশে ভারতীয় ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  পাঠাবেন।

    তিনঃ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য ও তথ্য হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাস নিরাময়ের কোন ওষুধই নয়। এটা মূলত ম্যালেরিয়া তাড়ানোর ওষুধ। অথচ ভারত সরকার গত দুই সপ্তাহের বেশি ধরে এমন ভাব আনছে যেন ক্লোরোকুইনই করোনাভাইরাসের ওষুধ এবং ভারতই এই মহা-ওষুধের আবিষ্কারক, অথবা যেন এবারই এটা প্রথম আবিষ্কার হল। অথচ এই কথাগুলোর কোনটাই সত্য নয়। অনেক আগেই এই ওষুধ আবিষ্কৃত আর ভারতের ম্যালেরিয়া রোগীর জন্য তাদের নিজেদেরই এটা অনেক লাগে, তাই অনেক প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তবু এটা আগে বা কখনো করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদিতই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO  বা হু) ’র কাছেও অনুমোদিত নয়।

    চারঃ ঐ একই রিপোর্টের পরের বাক্যও অসত্য।
    যেমন পরের বাক্যে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন অ্যামেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ট্রিটমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে…”। এটা শতভাগ মিথ্যা তথ্য – [ Hydroxychloroquine has been identified by the US Food and Drug Administration as a possible treatment for COVID-19] ।

    মজার কথা হল, মিথ্যা করে হলেও ২১ এপ্রিলের এই রিপোর্টেই প্রথম অ্যামেরিকায় যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) বলে ওষুধের অনুমোদনদাতা বা অথরিটি প্রতিষ্ঠান বলে কেউ আছে, তা নিয়ে প্রথম ভারতের মিডিয়ায় কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল। কারণ, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের প্রতিটি দৈনিকসহ মিডিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন নিয়ে তুঙ্গে তুলে আলাপ করা হচ্ছিল এভাবে যে ১. ভারতেই করোনার ওষুধ পাওয়া গেছে। ২. তা ভারতের হাতেই আছে। ৩. তা বিশাল ‘গেম চেঞ্জার’, ‘ভারত খেলা বদলে দিতে পারে’ ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরে আসল কথাটা যে এই ওষুধের এফডিএ অনুমোদন নাই – এটা কোন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হচ্ছিল না। অর্থাৎ প্রমাণিত কার্যকারিতার প্রমাণ  বা অনুমোদনই নেই এবং কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় – এ দিকটা ভারতের সব মিডিয়া চেপে চলেছিল।

    কেন?
    প্রথমত এর জন্য মূলত দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর সেই আড়ালে লুকাতে চেয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী-মহলসহ ক্ষমতাসীন মোদীর দলবল। তাই তারা এই ওষুধ একবার ব্যবহারে শুরু হয়ে গেলে তারা সবাই কত বিলিয়ন ডলারের মুনাফায় লালে লাল হয়ে যাচ্ছে- এই লোভে মশগুল ছিল।  ট্রাম্পের ঘনিস্ট বন্ধুরা এবং তিনি নিজেও এই ওষুধের প্রস্তুতকারি কোম্পানির SONAFI এর কিছু শেয়ারের মালিক বলে, ট্রাম্প এই ওষুধের পক্ষে একটা প্রপাগান্ডা বলয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

    সবচেয়ে বড় কথা –  শুরু থেকেই প্রমাণিত যে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হার্টের রোগীর জন্য  নিষিদ্ধ ও ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। বিশেষত অসংলগ্ন অস্থির হার্টবিটের চাপের মুখে রোগী পড়ে যেতে পারেন। অথচ তা ভারতের কেউ বলছেন না। তবে ট্রাম্প এই ওষুধের গ্লোবাল কোম্পানি সানোফির শেয়ারের মালিক বলে তিনিও এটাকে ‘প্রমাণিত’ ওষুধ বলে চালিয়ে দিয়ে চান। এফডিএ-এর ওপর তিনি চাপ দিয়ে যতটুকু করতে পেরেছেন, তা সত্ত্বেও এখনো ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’কে  এফডিএ এখনও করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবু এটা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেটা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে। কোনো ডাক্তার এই ওষুধকে কেবল ‘অফ ড্রাগ’ হিসেবে ব্যবস্থা দিতে পারেন শর্তসাপেক্ষে। সেটা কেবল মরণাপন্ন করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই। তবে রোগীকে জানিয়ে ব্যাখ্যা করে ‘সজ্ঞান-সম্মতি’ লিখিতভাবে নিয়ে, রোগী যদি রিস্ক নিতে রাজি থাকেন কেবল এমন বিশেষ পরিবেশে ও শর্তে তা সম্ভব বলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে। এটাও ট্রাম্প করেছেন এফডিএ’র কমিশনারের ওপর চাপ সৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত গত সংখ্যায় লিখেছিলাম।

    সবচেয়ে বড় কথা মাত্র গত ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রথম যে পত্রিকা ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের অনুমোদনহীনতার কথা ভারতে প্রকাশ করে দিয়েছে –   মিথ্যা লোভ ভেঙেছে ও রিপোর্ট করে দিয়েছে- সেটা কলকাতার ইংরেজি ‘টেলিগ্রাফ’। এর রিপোর্টের বাংলা শিরোনাম- ‘লোভ-লালসার ড্রাগ থেকে সাবধান হয়ে যান’ (ওয়ার্নিং অন কাভেটেড ড্রাগ, Warning on coveted drug)।  এতে যে খবরটা আগেও সত্য ছিল তা ভারতের ভিতরেই আরও মেলে তুলে ধরেছিল কলকাতা টেলিগ্রাফ।  ঐ রিপোর্ট আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্কুল অব মেডিসিনের স্টাডি-গবেষণার ফলাফলের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছে, ‘এজিথ্রোমাইসিন নামে অন্য ওষুধের সাথে অথবা একা –  ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধের করোনাভাইরাসের নিরাময়ে কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই” [……had found no evidence that hydroxychloroquine (HCQ), used with or without the antibiotic azithromycin, reduced mortality or the need for ventilation in hospitalised Covid-19 patients.]।

    কিন্তু তবু আজ ২৬ এপ্রিল ভারত নিজেদের তৈরি ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন যা আসলে করোনার জন্য অনুমোদনহীন, আ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

    তাহলে ৫৫টা দেশে ভারতের অকার্যকর ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধকে পাঠাবার মোদীর উদ্দেশ্য তাহলে কী?  এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অকার্যকর ওষুধ পাঠিয়ে বাজার ধরা? মোদী তো দেখা যাচ্ছে একদম ট্রাম্পের পারফেক্ট শিষ্য!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর “প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

    করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

    গৌতম দাস

    ১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2WY

     

      Image MSN.COM,করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন

    করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত শুক্রবার সারা দুনিয়ায় মোট মৃত্যু এক লাখ ছাড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশেও করোনাবিষয়ক খবরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হয়ে উঠেছে “লকডাউন”। শব্দটা একটা গোটা জেলাশহর তো বটেই, আবার একটা পাড়া বুঝাতেও সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

    কিন্তু লকডাউন শব্দটার অর্থ একটা নয়, দুটা। বলা সম্ভবত ভাল যে এটা যুগ্ম অর্থের শব্দ। এমনকি এমন এক দ্বৈত বা যুগ্ম অর্থের শব্দ যেটা সাধারণত দেখা যায় যে, এসব শব্দ একটা অর্থে ব্যবহৃত হলে শব্দের অন্য অর্থটা সেখানে আর হাজির থাকে না। কিন্তু লকডাউন শব্দটার দুই-অর্থই সবখানে বজায় থেকে চলে। লকডাউন কথার মূল অর্থ কোন এলাকা যেটা একটা দেশ বা জেলা বা পাড়াও হতে পারে, সেই এলাকাকে ওর সব পড়শি সব এলাকা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা শব্দটা তাই ব্যবহার করছি স্বাস্থ্য সুরক্ষার্থে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে যেমন, ল্যাবে কোন পরীক্ষিত ফলাফলে মানে, প্রমাণিত কোনো ভাইরাস সংক্রমণের কেস হলে, এটা এরপর যাতে সেই পরিবার-সমাজে আর না ছড়িয়ে পড়ে তাতে বাধা দেয়ার জন্য,রোগীকে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে আমরা বলি, লকডাউন করা হয়েছে।

    লকডাউনের দ্বিতীয় অর্থ হল, অর্থনৈতিক অর্থে যেখানে এতে অর্থনীতিটাও পরিণতিতে লকডাউন হয়ে গেছে। কাজেই একটা পাড়াকে লকডাউন করা  মানে ঐ পাড়ার সাথে (ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে) অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময়ও বন্ধ করা হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন  করা হয়ে যায়। যদিও সেক্ষেত্রে কেবল খুবই সীমিত পর্যায়ের একটা ‘একমুখী কিছু ভোগ্যপণ্য সরবরাহ’ সেখানে চালু রাখা হয়। তাই, এভাবে লকডাউন শব্দটা না চাইলেও সবসময় একই সাথে এ দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে যায়।

    অতএব দুনিয়াজুড়ে ভাইরাসের আতঙ্কে বিচ্ছিন্নকরণ করা মানে একই সাথে অর্থনীতিও বিচ্ছিন্নকরণ। তাই অর্থনৈতিক  বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন দুনিয়াজুড়ে। আর অর্থনীতিকেও ‘বিচ্ছিন্ন’ করার অর্থ হল অর্থনীতির ঢলেপড়া, স্তব্ধ বা স্থবির মৃত হয়ে যাওয়া। তাই ভাইরাসের শঙ্কার পাশাপাশি লকডাউনের ফলে দুনিয়াজুড়ে এখনকার আরেক সবচেয়ে বড় শঙ্কা হল করোনার দশায় পড়া বন্ধ অর্থনীতি কি দুনিয়াজুড়ে আবার কখনও জীবিত হবে, চালু হবে? হলে কবে, কিভাবে হবে? নাকি অর্ধেক বা ত্রিশ ভাগের বেশি ওচল থেকে যাবে যা আর কখনোই চালু হবে না? নাকি একে কোনো চাবুক দিয়ে চাবকাতে হবে মানে প্রণোদনা দিয়ে চালু করতে হবে ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন এখন চার দিকে। এই আশঙ্কা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বা কম প্রভাবের নয়।

    একটা উদাহরণ নেয়া যাক। বাংলাদেশে এখন চৈত্র-বৈশাখের গরম চলছে। এরই মধ্যে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্তও পৌঁছেছিল কয়েক দিন। আমরা তা খেয়ালও করেছি হয়তো কেউ। প্রতি বছরের মত এবারও আমাদের টিভিগুলোতে চৈত্র- বৈশাখ মাসের মত করে বিজ্ঞাপনের ধরণও বদলে ছিল। যেমন এবারের গরমের জন্য নতুন এয়ার কন্ডিশনার  ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্সের এড; অথবা ট্যালকম পাউডার কিংবা বৈশাখী উৎসব আসন্ন বলে ক্রেতার মনে সুড়সুড়ি তোলার এড বা পণ্যের লোভ দেখানোও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তাতে ছন্দপতন ঘটে যায়। লকডাউনের দিন বাড়ানোর নির্দেশ আসাতেই  এখন প্রায় সব বন্ধ। উতপাদক-বিক্রেতারা এথেকে বুঝে যায় যে এই লকডাউন অবস্থায় এখন আর এড দেখানোটা মাঠে মারা যাবে। কারণ দোকানপাট মানে বেচাবিক্রিই বন্ধ। ওদিকে টিভিতে গান-নাটক ইত্যাদির বিনোদন ধরনের প্রোগ্রামে নতুন রেকর্ডেড আগে তৈরি অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কারণ নতুন রেকর্ডিং বন্ধ। আর এসব মিলিয়ে টিভির আয় হিসাবে পাওয়া বিজ্ঞাপনে টান পড়তে শুরু করেছে। এই টানাটানি এখন ক্রমশ কর্মী মানে তাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে। এর ফলাফল এই পরিবারগুলো এখন সাবসিস্টেন্স (নুন্যতম “টিকে থাকার” ) মানে, ন্যূনতম খাওয়ার পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কিনবে না। এটা আসলে হাজার হাজার এমন উদাহরণের একটা মাত্র। এভাবে সবাই যদি “টিকে থাকার” [[subsistence] ক্রেতা হয়ে যাই, এর মিলিত ফলাফল হল অর্থনীতি শুকিয়ে ক্ষীণ হয়ে আসা; সবাই মিলে ডুবে মরার মত হবে। এটাই সামগ্রিক অর্থনীতির ঢলে পড়া।
    আসলে এর উল্টোটা ছিল স্বাভাবিক সময়ে; যখন তা চালু থাকে, তখন পণ্যের ভোক্তা যখন বাড়ে তাতে উৎপাদনও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, তাতে নতুন কাজ সৃষ্টিতেও বৃদ্ধি ঘটে আর তাতে আবার নতুন ভোক্তাও বাড়ে। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়, সব মিলিত যার ফলাফল হল, সবার প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলা। আর এখন ঠিক এটারই উলটা – সাবসিষ্টেন্স লেবেলে পৌছানোর দিকে সকলের ধেয়ে চলা।

    এই হল অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর অদ্ভুত ও কঠিন খেলা।  সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে আসতে চাইছে। যদিও অর্থনীতিতে এমন চাকা ঘুরার বা ঘুরানোর নিয়ম হল একটা চাকা ঘুরলেই তা ধীরে ধীরে অসংখ্য চাকাকে ঘুরিয়ে তুলতে পারে। তাহলে এখনকার জন্য আমাদের নির্ধারক প্রশ্ন হল – কোন চাকা সবার আগে ঘুরানোর চেষ্টা করব? অনেকে চাকা ঘুরানোর প্রসঙ্গটা চাহিদার চাকার দিক থেকে শুরু করতে চাইতে পারেন। চাহিদা নতুন চাহিদা সৃষ্টি করে; ফলে তা নতুন উৎপাদন আর নতুন কাজও। যেসব চাহিদা সহজেই প্রথমে পূরণ করে দেয়া সম্ভব ও উপযুক্ত যাতে তা চালু করে দিলে বা বাড়িয়ে তুললে তা অন্যসব চাহিদার চাকাকে ঘুরাতে, চালু করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটা প্রাইম মুভার (প্রথমে যে চাকা ঘুরে অন্যদের ঘুরায়) [Prime mover] বা এমন মূল চাকার সন্ধান পেতে হবে আমাদের সবাইকে।

    একইভাবে গ্লোবাল অর্থনীতির চাকাকেও আবার সচল রাখা বা দেখতে চাওয়া যাদের প্রথম মাথাব্যাথা বা যারা মূল দায়িত্বে বা সংশ্লিষ্ট সেই পরিসরে যেমন আই এমএফ বা জি২০-এর সভায়, সেখানে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য হল বাজারে প্রচুর অর্থঢালা ব্যয় বাড়ানোতে যেতে হবে। মানে কৃচ্ছতার উল্টোটা। যেমন এব্যাপারের সবচেয়ে প্রচলিত চিত্র হল, গ্লোবাল পরিসরে সরকারি বন্ড আগে থেকেই বাজারে থাকলে তাতে লভ্যাংশ বাড়িয়ে বেশি দিয়ে এগুলোকে ফিরে সরকার কিনে নিয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ সাধারণত বাড়ানো হয়ে থাকে।  এভাবে মোট অর্থঢালা ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এক ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে গত জি২০ রাষ্ট্রগুলোর [What is the G20] বিশেষ সভা থেকে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ-ভারতের মত দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার ক্ষেত্রে কোথায় আঘাত করা উচিত, মানে কোথায় প্রাথমিক চাহিদা বাড়াবার উদ্যোগ নিলে অন্য সব চাকাকে সে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে সচল করে ফেলতে পারে – সেই জায়গাটা কী হতে পারে?

    কোথায় প্রণোদনার অর্থ ঢালবেনঃ
    এর আগে গত বছর (২০১৯) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কলকাতায় জন্ম নেয়া অভিজিত-এস্থার নোবেল দম্পতির কথা বলেছিলাম। গত সপ্তাহে ভারতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সমিতি মানে চেম্বার অব কমার্সের কলকাতা রাজ্য শাখা, অনলাইনে কথা বলার এক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। যেখানে অভিজিত-এস্থার ছিলেন মূল বক্তা-অতিথি তাদের (আমেরিকায়) বোস্টনের বাসাতে বসেই।

    ভারত বা বাংলাদেশে আমদের সরকারগুলো ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে শুরু করে দিয়েছে , নানান প্যাকেজ ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।  কেবল ব্যবসায়ীদেরকে দেয়াকে কেন্দ্র করে এসব প্রণোদনার অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করা মানে বুঝা যাচ্ছে এখানে সরকারের  পিছনের-অনুমান হল হল এসব প্যাকেজই চাহিদা বা উদপাদন বাড়ানোর প্রাইম মুভার বলে সে নিশ্চিত হয়েছে।  অর্থাৎ এসবের কোন প্রমাণ সাথে হাজির না করলেও এই সরকারি উদ্যোগগুলো বুঝাতে চাইছে, এই প্রণোদনাই একমাত্র প্রাইম মুভার ফলাফল আনবে।

    কিন্তু এই প্রসঙ্গে অভিজিতের প্রস্তাব এখানে একেবারে রেডিক্যাল এবং আলাদা। তার সাহসী পরামর্শ হল, গরিবের হাতে টাকা পৌঁছানো, যাদের এটা এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার।

    নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ-এর রেডিক্যাল প্রস্তাব হল, ঘরে খাবার নাই এমন গরীবের হাতে টাকা পৌছানো। যাদের  এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার। 

    ফলে তাঁদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোটা আমাদের প্রায়োরিটি হতে হবে। মোদীর গত টার্মে ২০১৫ সালের একটা সফল প্রকল্প ছিল “জনধন প্রকল্প”।  যার সারকথাটা হল, যেখানে গরিব কৃষককে ১০ টাকা দিয়ে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সরকার যাতে সরাসরি এমন গরীব উৎপাদকের হাতে প্রয়োজনে যেকোন অর্থ সরাসরি পৌঁছাতে পারে। অভিজিত এই প্রকল্পের অবকাঠামো সুবিধা নিয়ে সরাসরি গরিব কৃষকের চাহিদা পূরণ করে দিয়ে অর্থনীতির প্রাইম চাকাকে ঘুরাতে চাওয়ার পক্ষপাতী। এটাই তাঁর আসল কথা।

    যদিও তাঁর বক্তব্যের এই মূল অংশ চাপা পড়ে যায় তাঁর বক্তব্যের অন্যকিছু সহ-মন্তব্যের কারণে।  ভারতের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা হল, করোনা আক্রমণে ছেয়ে ওঠার আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি স্থবির হয়েই ছিল। তাই এখন অভিজিতের গরীব-প্রণোদনার প্রস্তাবে এমন  প্রশ্ন উঠা ছিল স্বাভাবিক যে, সরকারের হাতে তো এখন এমন যথেষ্ট বাড়তি অর্থ নেই। সে কথা চিন্তা করে  তাই অভিজিত আগাম বলেছিলেন, “নতুন টাকা ছাপিয়ে হলেও” সরকারের এটা করা উচিত।

    এদিকে এটা এখন গ্লোবালি প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে যে, আমরা ইতোমধ্যেই এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দায় প্রবেশ করে গেছি। বিশেষত আইএমএফের প্রধানের এ নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যের পরে আর কোনো তর্ক থাকে না। সে কথা মনে রেখে অভিজিতের প্রস্তাব, এই অবস্থায় ভারতের ম্যাক্রো বা সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় ডুবে গিয়ে চিন্তা করার চেয়ে কিছু সদর্প সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেছেন, “প্রথাগত, সাবধানি পথে হেঁটে এই পাহাড়প্রমাণ সমস্যার মোকাবেলা করা শক্ত। চাহিদার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়েও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো জরুরি। তাতে মূল্যবৃদ্ধির হার মাথাচাড়া দেবে কি না, সেসব ভাবার সময় এখন নয়। কারণ, এই অবস্থায় তা না করলে, অর্থনীতিকে চড়া মাশুল দিতে হতে পারে বলে সম্ভাবনা থাকছে”। কলকাতার আনন্দবাজারে এভাবেই লেখা হয়েছে। এনিয়ে ইংরাজি টেলিগ্রাফের রিপোর্টিংও এখানে।

    এমনকি তিনি ‘আর্গু’ করছিলেন – তিনি মানছেন স্বভাবতই একটা মুদ্রাস্ফীতি হবে এতে। কিন্তু তিনি বলছেন, এটা পরে আলাদা করে মোকাবেলা করা যাবে এবং তা সম্ভব। তাঁর একথা অবশ্যই তা সত্যি কারণ, একালে প্রত্যেক রাষ্ট্রে একটা কেন্দ্রীয় (রিজার্ভ) নিয়ন্ত্রক ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংকের মত) থাকায় এবং এর হাতে ম্যাক্রো অর্থনীতির পরিচালনার যেমন এর ঘোষিত ফিসক্যাল বা মনিটরি পলিসি ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকার কারণে বাজারে মুদ্রার (টাকার) প্রবাহ বাড়ানো বা কমানোর মেকানিজমে যদি সদিচ্ছা থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ কাজ। যদিও সাবধান, আজকাল টাকা ছাপানো বলতে এর অর্থ বাজারে মদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া বুঝায়। অ্যামেরিকান ফেড (ফেডারল রিজার্ভ) এটাই করে। এভাবে বুঝতে হবে।

    কিন্তু অভিজিতের পরামর্শের উজ্জ্বল দিকটা হল তিনি চাহিদা বাড়ানো বা চাহিদা ধরে রাখার প্রাথমিক চাকা হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিবার কথা তিনি বলেননি। সেদিকে তিনি যানই নাই। বরং তিনি উলটা বলেছেন, গরিব মানুষের পকেটে টাকা দিতে। তিনি আসলে জোর দিয়েছেন এই জনগোষ্ঠির বিপল সংখ্যাটার দিকে। এক বিরাট ভোক্তা বাজার এটা। এটাকে তিনি আসলে পালটা শক্তি হিসাবে দেখে সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে রেডিক্যাল হতে চেয়েছেন। সারা পশ্চিমের কোনো রাষ্ট্রের যে সুবিধাটাই নেই। এ কারণে এটা অপ্রচলিত, কিন্তু বাস্তব।

    বাংলাদেশে চিত্রটা এর কাছাকাছিই। আমরাও আমাদের লকডাউন করেছিলাম; কিন্তু দিন এনে খাওয়া লোকগুলোর ঘরে চাল নেই।  এই পরিকল্পনা এখনও করি নাই।  তাদের ঘরে খাবার কোন ব্যবস্থা না করেই।  তাঁরা চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে আকুতি জানিয়ে রাস্তায় ভিড় করছে, সৈনিকের পায়ে ধরে আকুতি জানাচ্ছে তাকে রাস্তা-ছাড়া না করতে। নারায়নগঞ্জের এমন এক ছবি আমরা দেখেছি; চিত্রটা খুবই মর্মান্তিক। নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এখানে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে? আমরা অন্তত এক মাসের বিনা পয়সায় রেশন বরাদ্দের কথা তুলছি না। কিন্তু সরকার এটা না যেন বাকি সব কিছুই করতে আগ্রহী।

    নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এর ভিতরে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে আমরা গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। গরীবের না খেয়ে হলেও তাদের ঘরে থাকার বিনিময়ে আমরা বাকিরা নিজেরা ভাইরাসমুক্ত থাকতে চাইছি। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে?

    আবার যেটুকু  দশ টাকা কেজি চাল কিনার ব্যবস্থা আছে [মানে যার হাতে অন্তত দশটা টাকা আছে কেবল তাদের জন্য] তাতে প্রতিদিন ‘দশ টাকার চাল’ চুরি করার ঘটনার লুটপাট রিপোর্টেড হচ্ছে। আমরাও কি আমাদের “না-আয়ের” সব গরিবের  হাতে চাল তুলে দিয়ে একটা প্রোগ্রাম চালু করতে পারি না? এমন চার কোটি লোকের চাহিদা মেটানো আমাদের অর্থনীতিতে এক প্রণোদনা হতে পারে। এ জন্য এক-দুই মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির আছে। আবার চাইলে বিশ্বব্যাংকের করোনা ‘রিকভারি ফান্ড’ আছে। সেখান থেকে চাওয়া যেতে পারে। এছাড়া তাদের কোনো অনুদান ফান্ড আছে কি না, তাও চেক করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি সরকার আইএমএফের কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা  দেয়েছে .[..to mitigate the economic impact of the coronavirus crisis] – করোনায় অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে। ওদিকে ভয়ে অব আমেরিকা জানিয়েছে এমন মোট পাঁচ দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ চাওয়ার মোট পরিমাণ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার।

    তবে আমাদের ক্ষেত্রে ঘরে একমাসের বিনা পয়সার রেশন পৌছানো – এটাই অভিজিতের মত করে বলা প্রস্তাব। অভিজিতের মত করে এই প্রস্তাবের সারকথাটা হল, আমাদের সমাজের যেসব চাহিদা প্রবল তাকে কাজে লাগানো, হারিয়ে যেতে না দেয়া। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে বা উদ্ধার পেতে চাইলে কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে আমরা মেরে ফেলতে বা মরে যেতে দিতে পারি না। কারণ বিপুল জনসংখ্যার দেশে এটাই আমাদের অ্যাসেট।

    তবে অভিজিতের প্রস্তাবে আইএমএফ খুশি হয়নি, যদিও সেটা তাদের আলাদা বিবেচ্য বিষয়ের কারণে। আর কলকাতায় ওদিকে সেটা ছিল ব্যবসায়ী উৎপাদকদের চেম্বার সমিতির আয়োজিত কর্মসূচি, ফলে তারাও তেমন খুশি হয়েছে অথবা গা-করেছে মনে হয়নি। তবে আইএমএফের পক্ষে অভিজিতকে সমর্থন না দেয়ার কারণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তাদের অন্য সমস্যা আছে সেকারণে।

    চলতি পরিস্থিতিতে আমাদের গ্লোবাল মহামন্দায় প্রবেশ যেটা এখন ঘটে গিয়েছে, অভিজিত-এস্থারসহ অনেকেই মনে করেন সেটা ব্যাপকতার দিক থেকে ১৯৩০ সালের মহামন্দার সাথে  তুলনীয়। সেই সময় ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র আয়ের চেয়ে যুদ্ধে ব্যয় বেশি করাতে তা মিটানোর অক্ষমতায় যার যার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। মানে, তারা বিস্তর টাকা ছাপিয়েছিল তখন। আর সবাই মিলে একসাথে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটানোয় – এই মূল কারণেই গ্লোবাল মহামন্দা হাজির হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আর এই মূল্যায়নের ওপরে দাঁড়িয়েই বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল। তাই ‘সম্মিলিত মুদ্রা অবমূল্যায়ন’ ঘটানো আইএমএফের চোখে লিখিত জন্মনীতি হিসাবে হারাম ধরনের কাজ মনে করা হয় সেই থেকে।

    ফলে আইএমএফ  অভিজিতকে বলতে চাইবে- অবমূল্যায়ন নয়, সে বরং ঋণ দিতে চায়। তবে সেটা যা হোক, অভিজিতের কথা আমরা আক্ষরিকভাবে না নিয়ে তার মূলকথা গরিব মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছানো; এর বাস্তবায়ন করতে পারি। এটাকে একটা সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ মনে করতে পারি আমরা। বাংলাদেশের লকডাউনে অভুক্ত গরিবদের জন্য এটা কি আমরা করতে পারি না? দায়িত্ববানদের ভেবে দেখা উচিত।

    ওদিকে চরম ক্রাইসিসে টাকা ছাপানো জায়েজ আছে – উদাহরণও আছে – একথা বলে লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইম রীতিমত এক নিজ সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে গত ০৬ এপ্রিল ২০২০। যা বলা যায় পরোক্ষে নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। লিখেছে “Printing money is valid response to coronavirus crisis”।

    “Printing money is valid response to coronavirus crisis” – London Financial Times

    তাদের দাবি ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডও জন্ম থেকেই এমন অর্থ ছাপিয়ে নিয়ে সরকারকে সাহায্য করে আসছেই। কানাডার এক স্থানীয় পত্রিকা দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোও নাকি তাই করেছে।

    তবে আমাদের জন্য সারকথা, বাংলাদেশেও টাকা ছাপানো নয়, চাল কিনতে  হাতে টাকা নাইদের ঘরে একমাসের চাল পৌছে দেওয়া প্রকল্প আমরা নিতেই পারি।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে  “করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

    করোনাভাইরাস ও অর্থনীতির সম্পর্ক

    গৌতম দাস

     ১৬ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2UI

    _

     

     

    –

    করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি আসলে দুই পরস্পরের বিরোধী ফেনোমেনা। মানুষে মানুষে সব ধরণের যোগাযোগ-লেনদেন-সম্পর্কই (কমিউনিকেশন) কোন অর্থনীতির মুল কথা। অথচ করোনাভাইরাস হাজির হচ্ছে ঠিক এর উল্টা দাবি নিয়ে যে – কমিউনিকেশন সীমিত করতে হবে, পারলে বন্ধ করে দিতে হবে – যদি ভাইরাসের বিস্তার বা নতুন সংক্রমণ বন্ধ ও ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাই।  তাই আমরা এখন এমন এক কালে যে করোনাভাইরাস ও  অর্থনীতি এদুই পরস্পরবিরোধী ফেনোমেনার ভিতরে আমাদের বসবাস।

    ‘করোনাভাইরাস’ শব্দটা এখন আর কোন একটা শহরের “টক অব দ্য টাউন” নয়, বরং এটা এখন “টক অব দ্য গ্লোব”‘; বিশ্বের আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। ঘটনার শুরু গতবছরের ডিসেম্বরে, চীনের য়ুহান [Wuhan] শহর থেকে।  ইতোমধ্যে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ আমরা পার হয়ে এসে পড়েছি। এই হিসাবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বা ছড়িয়ে পড়ার তৎপরতার ‘বয়স’ মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের।  আলজাজিরা টিভির ওয়েব সাইটে একটা ঘটনা-কালপর্ব তৈরি করা হয়েছে। সেটা অনুসারেও, করোনার বিস্তার মাত্র গত তিন মাসের ঘটনা। সেখানে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানতে পারে, চীনের য়ুহান শহরে অপরিচিত এক ধরনের ‘নিউমোনিয়া’ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

    এটাকেই শুরুতে চীনাদের তরফে “নিও করোনাভাইরাস” বলা হয়েছিল। এখন জাতিসঙ্ঘের দেয়া এরই আন্তর্জাতিক নাম হল কোভিড-১৯ [COVID-19]; মানে করোনাভাইরাস ডিজিজ-২০১৯। কোনো রোগ ছড়ানোর ঘটনা কেবল একটা পাড়ার কোণে ছড়ালে ও সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে একে ইংরেজিতে ‘এন্ডেমিক’ [Endemic] বা স্থানীয় রোগ বলা চলে। আর সেটা একটা শহরে অথবা একই দেশের পরস্পর লাগোয়া বা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কয়েকটা শহরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে এমন ঘটনাকে এপিডেমিক [Epidemic] বা ‘মহামারী’ বলি আমরা। নিও করোনাভাইরাসকে জাতিসঙ্ঘ ‘প্যানডেমিক’ [Pandemic] বা বিশ্ব-মহামারী বলে ঘোষণা করেছে। কারণ এ পর্যন্ত ১৫৩টার মতো রাষ্ট্রে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। যদিও এমন নাম দেওয়ার ব্যাপারটা সবটাই টেকটিক্যাল নয়, এসব নামকরণে একই সাথে  জড়িয়ে থাকে নানান রাজনৈতিক বিবেচনাও ।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই রোগের মূল বৈশিষ্ট্য হল – এটা ছোঁয়াচে, মানে মানুষের পরস্পরের ছোঁয়াছুঁয়িতেই (যেমন কোলাকুলি বা হ্যান্ডশেক) এটা অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে বা প্রবেশ করতে পারে। তবে একেবারেই শুকনা ধরনের ছোঁয়াছুঁয়ি নয় বরং ড্রপলেট [droplet] বা জলীয়বাষ্প-কণা ধরনের (হাঁচি-কাশিতে বের হওয়া) সংস্পর্শ সেখানে থাকতে হবে। আসলে  দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এমন কোন রোগের মানেই হল সেটা ছোঁয়াচে। তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ এ ধরনের রোগের জীবাণুর ছড়িয়ে পড়া উপস্থিতি সেখানে আছে।

    নিও করোনার এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া থেকে অনুমান করা হয় যে, একালের দুনিয়ায় এটা হতে পেরেছে মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্যের কারণে। যেমন এটা ‘কন্টাজিয়াস” [Contagious]’ মানে, সংক্রামক বা ছোঁয়াচে। দ্বিতীয়ত, করোনা এক নতুন ভাইরাস আক্রমণ থেকে আসা রোগ বলে এর কোন ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক ওষুধ এখনই মানুষের কাছে নেই। তাই এর ছড়িয়ে পড়াকে থামানো যাচ্ছে না। আর তৃতীয় কারণ-বৈশিষ্ট্য হল, একালে এটা গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়, এই বাস্তবতার যুগ। আমরা আসলে এখন দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়া বা পড়া পণ্য-লেনদেন-বিনিময় ব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করেছি, সেখানে কোনো উৎপাদনই আর স্থানীয় নয়। মানে ওই উৎপাদিত পণ্যের আসল বা শেষ-ভোক্তা বহু দূরের কোথাও- দুনিয়ার অন্য কোন কোণে বাস করতে পারে। তাই কেবল একই দেশে তো নয়ই, সেটা বরং অন্য মহাদেশে তো বটেই এবং দুনিয়ার একেবারেই অন্য কোনো প্রান্তে হওয়ারই সম্ভাবনা। যেমন, আফ্রিকার উগান্ডার কোনো গ্রামে বাংলাদেশের কেয়া সাবান কিনতে পাওয়া যাচ্ছে দেখতে পেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই এখন স্বাভাবিক। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আবার এক্ষেত্রে আরো ‘বিশেষ’ হয়ে উঠেছে, কারণ এ ভাইরাসের উৎস দেশটা চীন – দ্য রাইজিং চায়না। আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন আসন্ন নেতা।

    চীনের বিপুল পুঁজি ও এর বিনিয়োগ সক্ষমতা অথবা চীনে তৈরি করা কাঁচামাল বা পণ্য অথবা চীনের বাজারে অন্যদের পণ্য বা প্রবেশ- এসব কিছু মিলিয়ে একালে এটা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ; পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কে আমরা পরস্পর সব রাষ্ট্র এতে জড়িয়ে গেছি বা আছি। সারকথাটা হল, একদিকে গ্লোবাল অর্থনীতির অভিমুখ হল গ্লোবাল হয়ে উঠা লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক আর অন্যদিক এই করোনা ভাইরাস বলছে এই ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গেলে সব কমিউনিকেশন বন্ধ বা সীমিত করতে হবে। করোনা আর অর্থনীতি এই দুই বিপরীত পথ ধরেছে।

    একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমাদের গ্লোবাল হয়ে ওঠা পণ্য-লেনদেন-বিনিময় সম্পর্কের কথা এখানে যেমন বলছি, তেমনি এর উল্টো পরিস্থিতি বা ধারণাটা হল, গ্লোবাল পণ্য-লেনদেন-বিনিময়ের ব্যবস্থাটাই আবার ঢলে পড়া বা শ্লথ হয়ে পড়া- যেটাকে রিসেশন [recession] বা ‘মহামন্দা’ বলা হয়- তেমনটাও ঘটা স্বাভাবিক। আর ১৯৩০ সালে তা ঘটেছিল, যাকে প্রথম গ্লোবাল মহামন্দা বলা হয়। সময়টা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, প্রায় ২১ বছরের এমন বিরতির কালে। এই মহামন্দার মূল কারণ বা দায়ী ছিল ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রই; বিশেষ করে অন্তত কলোনি দখলদার রাষ্ট্রগুলো যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নিজ নিজ খরচ, এই বিপুল ব্যয়ভার মিটাতে গিয়ে নিজ নিজ আয়ের চেয়ে ছাড়িয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। তাই যুদ্ধ শেষে সেই ঘাটতিটা পূরণ করতে চেয়ে পরিকল্পিত মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়েছিল প্রত্যেক রাষ্ট্র। এতে সবাই নিজ নিজ মুদ্রার মূল্যমান ফেলে দিয়ে রফতানি-বিক্রি বাড়ানোর জন্য  পরস্পর আত্মঘাতী এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছিল। এর সামগ্রিক প্রভাব ও ফলাফলই হল ঐ মহামন্দা। আবার এখান থেকে বের হতে গিয়ে, হিটলারি-জাতিবাদকে মুখে পড়েছিল তারা।  আবার সেটা ঠেকাতে গিয়েই আরো বড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া- এভাবে এক ধারাবাহিক চক্রে পড়ে ইউরোপ নিজের সব ইতিবাচক সক্ষমতা বা সম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছিল।

    এই পরিস্থিতির সমাধান হিসাবে যুদ্ধশেষে এখান থেকেই আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের জন্মের সময় তাদের কর্মসীমা বা ম্যান্ডেটে যে মুখবন্ধ লেখা হয়েছিল তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল, ১৯৩০ সালের মত মহামন্দা আবার যাতে দুনিয়াতে না আসে তা ঠেকানোও এ দুই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হবে। তবুও অর্থনৈতিক মহামন্দা দুনিয়ায় আবার এসেছিল ২০০৭ সালের শেষে আর ২০০৮ এর শুরুতে। বলা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের দ্বিতীয় ও শেষ জমানায় শুরু হয়ে পরের প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সব প্রেসিডেন্টকেই এর ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। এখনো হচ্ছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত রিসেশনের ভয় ও প্রভাব দুনিয়া থেকে আর কখনো যায়নি, এভাবেই দিন কাটছে।

    তবে ২০০৭ সালের যে মহামন্দা, সেখানেও মূল কারণ কী ছিল? আসলে তখনও কারণ একই, রাষ্ট্রের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলা। কিন্তু কেন?

    মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০১ সালে শুরু করেছিলেন আফগান-ইরাক দখলের যুদ্ধ; যেটাকে আমেরিকা নিজের ইজ্জত ঢাকতে, পর্দার আড়ালে ফেলতে বলে থাকে ‘ওয়ার অন টেরর’, বা সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধ। এই যুদ্ধেও এক পর্যায়ে আমেরিকার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করে ফেলেছিল। আর এর চেয়েও আরেকটা বড় বিষয় ছিল, আমেরিকা এই যুদ্ধে জয়লাভের অযোগ্য তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।  ফলে তা হয়ে পড়েছিল সমাপ্তির টার্গেটবিহীন এক অনন্ত যুদ্ধ। অথচ এমন যুদ্ধের খরচ বইবার সামর্থ্য আমেরিকার অর্থনীতির ছিল না। তাই আমরা স্মরণ করতে পারি পরের প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্তকে। আফগান যুদ্ধ কবে শেষ হবে সেই টার্গেট থেকে নয়, বরং আমেরিকান অর্থনীতি কষ্টেসৃষ্টে হলেও সর্বোচ্চ কত দিন যুদ্ধের ব্যয় বইতে সক্ষম হতে পারে বা বহন করা ঠিক হবে- এই ভিত্তিতে টার্গেট ঠিক হয়েছিল যে যুদ্ধে জয়লাভ আসুক আর না আসুক, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সৈন্য ফেরত আনতেই হবে। এভাবেই যুদ্ধের খরচ থামানোর প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছিলেন ওবামা। আর এই চলতি বছরে এবার আর একটা ধাপ শেষ করার জন্য  ট্রাম্প আফগানদের সাথে চুক্তি করল। তবে আমেরিকার আর সঙ্গী ইউরোপের যারা ভেবেছিল লোভ-লিপ্সার কথিত যুদ্ধজয়ের থেকে উচ্ছিষ্ট কিছু নিজের ভাগেও আসবে, সেটারও তেমন কোনকিছু না হওয়াতে তাদের অর্থনীতিও একই সময়ে মহামন্দায় বিপর্যস্ততার মুখে পড়েছিল। কিন্তু যে কথাটা বলার জন্য এখানে এত আয়োজন, তাহল – ঐ ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার ধাক্কা প্রধানত লেগেছিল আমেরিকা-ইউরোপে, মানে পশ্চিমা দেশে। অন্য মহাদেশে তেমন নয়। এমনকি সেকালের ক্রমশ দৃশ্যমান, উত্থিত (১৯৯০-২০১০ বিশ বছরের রাইজিং চীন) হতে থাকা চীন – এই চীনের উপর ঐ মহামন্দার পরোক্ষ প্রভাব কমই হয়েছিল। আমাদের এশিয়াতেও এর প্রভাব হয়েছিল আরো কম। কেন?

    এর সোজা অর্থ-তাতপর্য হল, তত দিনে পশ্চিমের সাথে এশিয়ার পণ্য-বিনিময় লেনদেন সম্পর্ক হাল্কা হতে শুরু হয়ে গিয়েছিল; আবার অন্যদিকে চীনের  সাথে এশিয়ার প্রায় সকলের নতুন করে ততটাই সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই।

    আমরা আসলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি একটা ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশনকে, অন্য ভাষায় পণ্য ও পুঁজি বিনিয়োগে লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক গ্লোবাল হয়ে ওঠার ফেনোমেনাটাকে। মনে রাখতে হবে, গত শতকের (১৯০০-৯৯) শেষ অর্ধেক মানে ১৯৫০ সালের পর থেকে, বিশেষ করে শেষ বিশ বছর (১৯৮০ থেকে) ছিল লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্কের (এই প্রথম) ব্যাপক গ্লোবাল হয়ে পড়ার দিকে বিকশিত হতে শুরু করারই সময়কাল। আমাদের গার্মেন্টেসে উত্থানও সে কালেরই ঘটনা। পরে নতুন শতকের শুরু থেকেই আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো পশ্চিমের চেয়ে বেশি করে, চীনের অভিমুখী হওয়া শুরু করেছিল। আমাদের মত দেশ বা চীনের উপর গত ২০০৭ সালের দ্বিতীয় মহামন্দার প্রভাব তেমন না পড়াকে সম্ভবত এভাবেই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

    মূলত কোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যর্থ হলে ওর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য অর্থনীতিতেও কতটা ধস নামে এর মাত্রাটাই বলে দেয় যে, আমরা ওই ধসনামা রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে কত গভীরে জড়িয়ে আছি।

    কিন্তু এবার, করোনাভাইরাসের কালে?
    এত দিনে এশিয়া তো বটেই, পশ্চিমও এখন চীনের সাথে অনেক অনেক বেশি গভীর সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে ও রয়েছে। তার প্রধানতম চিহ্ন-লক্ষ্য হল, দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা অর্থনীতির সারপ্লাস (surplus) এখন সঞ্চিত (accumulation) হওয়ার প্রধান অভিমুখ ও কেন্দ্র হয়ে উঠেছে চীন। যা তিন ট্রিলিয়নেরও বেশি। এই সারপ্লাসেরই আরেক নাম ‘পুনঃবিনিয়োগ সক্ষমতা’; যে সক্ষমতা আছে চীনের। ইউরোপও চীনা উত্থানের সাথে যুক্ত হয়ে পড়তে বেল্টরোডে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে আগানো শুরু করে দিয়েছে। আবার তাই আমরাও অন্তত এশিয়ার সবাই এখন আমাদের লেনদেন বিনিময় সম্পর্কগুলো প্রধানত চীনমুখী করে ফেলেছি বা করতে বাধ্য হয়েছি।  এই চীনা-নির্ভরশীল হয়ে সম্পর্ক গড়ে ওঠার একটা আরেক বড় কারণ আমাদের সব উৎপাদনেরই কাঁচামালের পুরোটাই বা অন্তত কোনো-না-কোনো একটার নির্ভরযোগ্য উৎস – সেটি মূল্যের দিক কম হওয়া থেকে বা সহজ নির্ভরযোগ্য প্রাপ্যতার উতস চীন হাজির হয়েছে বলে  – এটা  প্রধানত এখন চীন।

    তাই সার কথায় করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আমাদের- অন্তত এশিয়ার অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে; স্থবির করবে বা থামিয়ে দেবে। যেমন চীনা কাঁচামাল বা তৈরি করা পণ্যের ভোক্তা হিসেবে বাংলাদেশের বাজারে তাই বাজারের ভাষায় ‘সাপ্লাই বন্ধের’ আওয়াজ উঠা শুরু হয়েছে।  সবার মুল জিজ্ঞাস্য যে এমন সাপ্লাই বন্ধ অবস্থা কতদিন সহ্য করতে হতে পারে?  কারণ এই স্থবির পরিস্থিতি আরও ছয়মাসে বেশি হলে তা আমরা সম্ভবত আর সহ্য করতে পারব না। বিকল্পের জন্য মরিয়া হয়ে যেতে হবে।

    ওদিকে ভারতের অবস্থা আরো কাহিল। ইন্ডিয়ান মিডিয়া বলছে, সাধারণভাবে চীনা-বিকল্প হাতে পাওয়ার দিক থেকে ভারতের হাতে অপশন খুবই কম, প্রায় নেই [India doesn’t have too many options to deal with economic impact of coronavirus]। যেমন ভারতের ওষুধ কোম্পানির ব্যবসা কাঁচামালের দিক থেকে বলতে গেলে পঞ্চাশ ভাগের মতো উৎস হলো চীন। ফলে ব্যাপক নির্ভরশীলতা চীনের ওপর। ভারতের সব পণ্যের মোট আমদানির ১৪ শতাংশের উৎস চীন। [more than half of India’s imports in 19 categories come from China……] আর ১৯টা আমদানি আইটেমের ৪০ শতাংশের আমদানি উৎস চীন। ভারতের ক্ষেত্রে এসব কিছুর মূল কারণ চীনা পণ্য দামে সস্তা হওয়া।

    আসলে করোনাভাইরাস এমন অনেক অপ্রকাশ্য বাস্তবতাকেই আমাদের সামনে তুলে ধরছে। ভারতীয় দেশপ্রেম বলে বেড়ায় যে সে মনে করে চীন তার প্রধানতম শত্রু। যে রাষ্ট্রের সাথে আগামিতে ভারতের সম্ভাব্য যুদ্ধ লাগতে পারে সেটা চীন।  তাই যদি ভারতের বিশ্বাস, অনুমান হয়ে থাকে তাহলে সেই ভারত কোনভাবেই  চীনের কাঁচামালের উপরই ভারতের আভ্যন্তরীণ ওষুধের প্রাপ্যতা চরম নির্ভরশীল করে নিজেকে সাজাতেই পারে না। কথাই নয়। এর মানে এসব সস্তা দেশপ্রেম ছেদো মানে এতে বড় ছিদ্র আছে তা বলাই বাহুল্য। তাহলে ঘটনাটা আসলে কী? খুব সম্ভবত ব্যাপারটা হল, ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতে হেরে যাওয়ায় ও তাতে ভারতের পুরা নর্থ-ইষ্ট আসাম পার হয়ে চীনাসৈন্যের ভিতরে  ঢুকে পড়েছিল। আর এসবেরই নীট ফলাফল হল এক ট্রমা; চীনের সাথে আবার হেরে যাবার এক ভীতিজাত এই ট্রমা । ফলে চীনেওর সাথে কোন যুদ্ধে জিতার চেয়ে এই ট্রমা ভারতীয়-মন থেকে দূর করার উদ্যোগ নেয়া – এটা কম গুরুত্বপুর্ণ নয়! সে যাই হোক!
    আমার এখান থেকে এই প্রশ্নও উঠে যে একালের পোষ্ট কোল্ড ওয়ার যুগের  ব্যাপক গ্লোবাল  বাণিজ্যিক সম্পর্কের দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শত্রুতার ধারণা আগের মত থাকা, বাণিজ্য নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলা – সেটা আর বজায় রাখা সম্ভব নয় সম্ভবত! এটা স্বীকার করে নিতে হবে!

    [ইতোমধ্যে আমরা দেখছি “সার্ক ভিডিও কনফারেন্স” বলে এক নতুন লোক হাসানো শুরু হয়েছে। প্রথমত ভারত বহু আগে থেকেই সার্ককে [SAARC] কবর দিয়ে রেখেছে। সেটা শুধু নিজের মন থেকে না, লিখেও বলে থাকে ভারতের বিদেশ বিভাগ। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন [ORF] এক ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাংক।  বাংলাদেশে ভারতের এক  রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী চাকরি শেষে সাবেক হওয়ার পরে এখন এই প্রতিষ্ঠানের এক ফেলো ও সংযুক্ত। কলকাতার অভাবের সংসারের কোন এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত সাধারণত যে ভাষায় কথা বলে সেই একই ভাষায় কটু কথা বলতে তিনি ভীষণ পারদর্শী। গত ২০১৬ সালে তিনি  অ-কুটনীতিক ভাষায় সার্কের বিরুদ্ধে অজস্র বমি উগলেছিলেন।  বিরাট শখ কিন্তু সাধ্য নাই অথবা  কেউ-মানে-না এমন কোন মোড়লের ভাষায় তিনি বলেছিলেন – সার্ক মৃত। ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন”। সেকালে ভারতের বিদেশ বিভাগও এই লাইনে অনেক কাজ ও ভুমিকা রেখেছিল। সে সময়ে আমাদের সাংবাদিকদের একটা দল ভারত সফরে গেলে পিনাক রঞ্জন তাদেরকে প্রকাশ্যে গর্ব করে জানিয়েছিল, সার্ক ভুলে যেতে, সার্ক মৃত। সার্ককে তো ভারত এতদিন বাস্তবতই মৃত করে রেখেছিল। মূলত মোদীর বিজেপি আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলমানবিদ্বেষী ও পাকিস্তানবিরোধী হাওয়া তুলে ভোট যোগাড় – এই নীতি ফলো করতে গিয়েই সার্কের বিরুদ্ধে কামান দেগেছিল। আজ হঠাত মোদীর আবার সেই সার্কের ভক্ত হয়ে উঠা এটা যেন পিনাক রঞ্জনের উগরানো বমিকেই আবার উঠিয়ে গিলে খাওয়া বললেও কম বলা হবে। সার্কের বিরোধী হবার ভারতের মূল ইচ্ছার কারণ হল পাকিস্তানকে বাদ দেয়া বা পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে অন্যভাবে জোট গড়ে তোলা।  এছাড়া একালে সদ্য দিল্লি ম্যাসাকার ঘটানোর পরে মোদী যখন বিদেশিদের সাথে কোন আসরে বসার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কটে আছে তখন ভারতের সাথে তাল দেওয়া আমাদের কাজ হতে পারে না।  ভারতের এধরণের পিছলে চলার সাথে আমাদেরকে কেন তাল দিয়ে চলতে হবে অথবা কেনই বা হল সেটা বাংলাদেশের সরকার অথবা কারও কাছে পরিস্কার বলে মনে হয় না। এটা আমাদের সরকারকেই নতুন বিপদে বা বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে নিয়ে যাবে তা মনে করার কারণ আছে।]

    তাহলে বাস্তব ভাইরাস পরিস্থিতিতে এখান থেকে বের হওয়ার পথ কী? আশার আলো কী? যদি ভাইরাসের প্রতিষেধক পাওয়া যাবে কি না বা সেটি কবে – এটা একটা আশার আলো হিসাবে মনে করে থাকি তবে এই প্রশ্নের জবাব হলো চলতি বছরে তা হাতে পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তবে দ্বিতীয়ত, আরেক পথ-সম্ভাবনার চিহ্ন হল, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বেড়েচলার একটা চরমকাল থাকে যারপর থেকে এতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেখা যায় কমতে শুরু করে – সেই পিক টাইম [Pic time] বা চরমকাল কবে অথবা তা কী ইতোমধ্যে আমরা ছেড়ে এসেছি? এটা জানার জন্য অনেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কারণ মানুষের মধ্যে সেলফ রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া শুরু হলে অন্তত একটা সময় গোনা শুরু করা যায় যে, য়ার কত দিনে রিকভারি বা ক্ষতি থেকে বের হওয়া সম্ভব! চীনা সরকার এ ধরনের একটা ধারণা-ইঙ্গিত এখনই দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে এটা চীনা এই ইঙ্গিত আস্থার সাথে গ্রহণ করা যায়,  তাতে দেশী-বিদেশী লোকেরা আস্থা এখনো রাখতে পারেননি। তারা কথাটা বরং আরও  নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শুনতে চেয়ে অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের চীনা রাষ্ট্রদূত আবেদন রেখেছেন, বাংলাদেশের অন-অ্যারাইভাল ভিসা যেটা দেয়া সাময়িক বন্ধ রেখেছে আমাদের সরকার সেটা যেন আবার আগের মত চালু করা হয়। বলাই বাহুল্য, এটা টু আর্লি বা ‘খুব তাড়াতাড়ি’ হয়ে যায়। সম্ভবত এই বিবেচনায় বাংলাদেশও তাতে সাড়া দেয়নি। চীনে করোনাভাইরাস আক্রমণের চরম সময় পেরিয়েছে কি না সেটা জানতে পারা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেটি জানা যায়, তবুও পরবর্তী ছয় মাসের আগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না।

    আমাদের জন্য এখন প্রধান সমস্যাটা হল – জনসমাবেশ ঘটাতে হয় এমন কোনো কিছুই এই ভাইরাস অনুমোদন করে না। কারণ নুন্যতম জনসমাবেশ এই ভাইরাসের বিস্তারের জন্য খুবই সহায়ক। অথচ যেমন, পঞ্চাশজনের একই বাসে ভ্রমণ বা দেড়-দু’শজনের বিমানে ভ্রমণ, স্কুলের ক্লাসে বা কারখানার কাজে কিংবা বাজারে, স্টেশনে যেকোনো ছোট জনসমাবেশই এ’কারণে বিরাট ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। অথচ এমন ঝুঁকিগুলো এখনো আমরা নিচ্ছি।  আর এই কারণেই সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতি বিরাট ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। এর মধ্যে আবার আমাদের গার্মেন্ট কোম্পানিগুলোকে ইউরোপের বায়ারদের ধীরে চলতে বলা নিঃসন্দেহে আরেক খারাপ লক্ষণ!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ১৪ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে “করোনাভাইরাস ও অর্থনীতি“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]