Category: ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর

  • ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চায়, জানে?

    ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চা্‌য়, জানে?

    গৌতম দাস

     ২২ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-34w

     

    ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এরা নাকি পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন একটা অনুমান-পারসেপশন অনেকের মধ্যে আছে। একথার হয়ত কিছুটা সত্যতাও কেউ কেউ দেখাতে পারবেন। এরপরেও  সেটা যত ঘনিষ্ঠই কল্পনা করা যাক না কেন, শেষ বিচারে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে এরা দুটো একেবারেই আলাদা রাষ্ট্র।  আমের মওসুম এটা, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে যেন এখন – সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার একটা গল্প আছে, তাই যেন কেউ আনতে চাইছে।

    সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার গল্পঃ
    ছোটবেলায় বৈশাখ মাসের ঝড়ে আম কুড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একালের ঢাকা শহরে যারা বড় হচ্ছেন তাদের জীবন-অভিজ্ঞতার সাথে মিলবে না হয়ত। তবে যারা পুরনো দিনের বা জেলা শহরে বা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের এমন অভিজ্ঞতা আছে। তেমনি এক কালবোশেখি ঝড়ে আম কুড়ানোর বিকেলের ঘটনা। আট-দশ বছর বয়সের বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে বিকেলে ঝড় উঠতেই আম কুড়াতে ছুটছে। বাগানে গিয়ে আম কুড়ানোর ধুম লেগেছে। কিন্তু বন্ধুদের একজনের যেন কোনো ঘুম নেই। দেখতে-শুনতেও সে অন্যদের চেয়ে একটু যেন আলাদা, সবার চেয়ে লম্বাতেও হয়ত একটু বেশিই হবে। সে আম কুড়াচ্ছে না।
    কিন্তু আবার প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারণ সে বরং সবাইকে আম কুড়াতে বাধা দিয়ে বেড়াচ্ছে – “এই আম নিবি না, রাখ” – বলে হাত থেকে আম কেড়ে ফেলে দিয়ে পরের জনেরটা কাড়তে যাচ্ছে। এভাবে সবার হাত থেকে আম ফেলে দিচ্ছে। আর মুখে বলে চলছে, “আমার খালাত দুলাভাইয়ের চাচার বাগানের আম, তোরা কেউ আম নিবি না”। কিন্তু এখানে সমস্যাটা হল, বাধাদানকারী একজন আর কুড়ানেওয়ালা বাকি সবাই। ফলে সবাই বিকল্প উপায় খুঁজতে গিয়ে কিছু সুযোগ পাচ্ছে। অন্যকে বাধা দেয়ার সময় কিছু না কিছু ফাঁকফোকর পেয়েই যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দু’চারটা করে আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। এদিকে একসময় ঝড় থেমে গেছে। সবাই যার যার বাড়ির পথে। কিন্তু অবাক ব্যাপার। দেখা গেল সবারই হাতে-কোচড়ে দু-চারটা করে আম আছে। বাধাদানকারী মেয়েটার ভাগে একটাও আম নেই! কারণ সে যখন পুরো সময়টা সবাইকে বাধা দিতে গিয়ে নষ্ট করেছে, অন্যরা প্রত্যেকে সেই ফাঁকে দু-চারটা করে আম সংগ্রহ করে নিতে পারলেও সে নিজে কিছুই পায়নি।
    গল্পটার মরাল হলঃ হিংসা বা ঈর্ষা না, এর ইতিবাচক ফল নাই; তাই বরং কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে নিজ শ্রম-উদ্যোগ কাজে লাগালে ভাগ্য কিছুটা ফিরতেও পারে।

    থিংকট্যাংকের মাহাত্ম্যঃ
    কথাগুলো মনে হল ভারতের এক জয়িতা ভট্টাচার্যের একটা রচনা দেখে। যেন তিনি সেই ঝড়ের সময় সবার কুড়ানো আম ফেলে দিয়ে বেড়ানো ছোট মেয়েটা। জয়িতা ভারতের ‘ওআরএফ [ORF]’ মানে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে এক থিংকট্যাংকের ফেলো। সম্ভবত আসামের শিলচরের মেয়ে তিনি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেছেন।

    আমেরিকান সমাজের পলিটিক্যাল কালচারে রাষ্ট্র-সরকারের নীতিনির্ধারণে বা পলিসি সাব্যস্ত করতে পক্ষ-বিপক্ষের পয়েন্টগুলোকে নিয়ে গুছিয়ে জোরালো করে তুলে ধরতে অনেক স্টাডি ও গবেষণা করতে হয় অথবা কখনও কনসেন্সাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কাজটা – আমেরিকান সমাজ সেগুলো থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করে থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা নন-প্রফিট ফাউন্ডেশন টাইপের কাঠামোর হয়ে থাকে। যদিও একটা দুর্ভাগ্য যে, একালে এসে লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক সময় থিংকট্যাংক গড়ার নামে এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান গড়া ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকা চলতি শতকে এসে যখন এখাতে ভারতের দিকে তাকিয়ে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করেছে। এমনিতেই আরেক দেশের অর্থে থিংকট্যাংক গড়া- এটা থিংকট্যাংক ধারণার মৌলিক ভিত্তিরই বিরুদ্ধে। কারণ থিংকট্যাংক তো গড়া হবে নিজ দেশেরই নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি গবেষণার জন্য। কাজেই এ’খাতে অন্য-রাষ্ট্রের যেচে অর্থ দিতে আসা মানে এতে দাতাদেশের সরাসরি স্বার্থ ও চিন্তায় প্রভাব ছড়ানো শুধু নয়, এটা প্রায় ঐ দাতা দেশের ফরেন পলিসির বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তামশার দিকটা হল প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সবখানে এক “আত্মম্ভরিতা” মানে স্বনির্ভরতার গল্প বলে বেড়ানো ভারত সে-ই, প্রথম রাষ্ট্র যে আমেরিকার টাকায় ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে ভরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কেন?

    সোজা কথাটা হল, চীন-ভারত দুরাষ্ট্র যেন পরস্পর থেকে দূরে থাকে, পরস্পরকে চরম ও একমাত্র ‘শত্রুজ্ঞান’ করে দূরে থাকে এটাই আমেরিকা নিশ্চিত করতে চায়। এদের পারস্পরিক প্রবল রেষারেষি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেন এরা লিপ্ত ও ডুবে থাকে, ঈর্ষায় থাকে এটাই আমেরিকান স্ট্র্যাটেজি। আমেরিকা এখনও বর্তমান গ্লোবাল লিডার যদিও দ্রুত এটা শুকিয়ে আসছে, ক্ষীয়মান। আর বিপরীতে চীন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, নেতৃত্বের জায়গাটা সে দখল করবে এটাই এর অভিমুখ। এখন ভারত যদি চীনের পাশে দাড়ায় তবে এই  অনিবার্য রদবদলটা ঘটবেই তবে এবার দ্রুত হতে থাকবে।  আমেরিকা যদি ডুবতে বসা এক বর্তমান হয় তবে চীন পাশে ইন্ডিয়া এক সম্ভাব্য আগামি। এখন  আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতায় পতন আর চীনের উত্থানের একালে তাই আমেরিকার চাওয়া ও তার ভয় হল যে চীন-ভারত যেন আমেরিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আগামীর নেতৃত্ব হয়ে একজোটে দাঁড়িয়ে না যায়। ফলে এর সোজা হিসাব হল, চীন-ভারত যেন রেষারেষির সম্পর্কে খাড়া হয়ে থাকে সবসময়। আর এখানে সবচেয়ে বড় ইনপুট যেটা দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি নাকি সবার চেয়ে (চীনের চেয়েও) উপরে যাবে এমন কথা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর তাই ভারত, বাস্তবতার সাথে মিল না পেলেও ‘যদি লাইগা যায়’ এই লোভে, ভারত চীনের সাথে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে বরং অস্থিরতায় একধাপ আগালে তিনধাপ পিছিয়ে যায়। এ কাজগুলোই নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে করিরে নিচ্ছে আমেরিকার কিছু থিংকট্যাংক যারা ভারতে এর শাখা খুলেছে।

    আবার এটাও খুবই সম্ভব যে ভারত বিরাট কিছু হওয়ার লোভ করতে গিয়ে আমেরিকান পরামর্শের ফাঁদে পড়ে , ভারত আর হয়ত চীনের সহযোগী আগামির স্থানটাও নিতে পারল না। বরং আমেরিকান লোভ-উস্কানি বা পরামর্শে ডানে-বায়ে চীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেটুকু সফল হওয়ার ভারতের সম্ভাবনা ছিল সেটুকুও ভেসে গেল। এমনও ঘটে যেতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। কারণ, ভারত যদি দুনিয়ার আগামি বা আগামির মূল সহযোগী বলে নিজেকে মনে করে তবে ভারতকে অবশ্যই মানতেই হবে আমেরিকা তার পথে বাধা অর্থে এনিমি। কারণ আমেরিকার বর্তমান অবস্থান থেকে সে যদি চ্যুত না হয় তবে ভারতের ভাগ্য খুলতে পারে না। অথচ তামশাটা হল, ভারত আমেরিকার হাত জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে চাচ্ছে, আর মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে কিছু একটা হওয়ার। যেটা আমেরিকার হাত ধরে অর্জন তো হবারই নয়।

    আমেরিকা যেমন চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তেমন ভারতের কাছেও আমেরিকা নিশ্চয় হারতে চাইবে না। অথচ এ কথাটা ভারতের কানে নিচ্ছে না, কোনো আমলই করে না। বরং ধরে নিয়েছে আমেরিকা তার বন্ধু থাকবে। এসব কারণেই ভারতের কোন ধরণের কোন অর্থনৈতিক শক্তির কিছুই না হয়ে ফলাফলে, কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে না ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। এছাড়াও ভারতের আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র-কাঠামোগত  দুর্বলতার দিক  আছে যেমন অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বলতা হল কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব। মানে এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ঘাড়ে উঠে থাকতে চায় – ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নামে।

    তবে ভারতের বিপুল এক ভোক্তা জনগোষ্ঠী আছে, যা তার নিজের জন্যই এটা চীনের মতোই বিশাল তবে তুলনায় একটু ছোট) এক বিরাট সম্ভাব্য রেডি বাজার। এই ফ্যাক্টরটা ছাড়া ভারতের সব কিছুই প্রায় নেগেটিভ জোনে। কাজেই কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) আর পজিটিভ এটিটিউড লাগবে, খুবই জরুরি এটা। অন্যের ক্ষতি করে বেড়ানো কারও অন্তত ভারতের বেলায়, তার জনজীবনের লক্ষ্য হতেই পারে না। এটি কী সবার আগে ভারত বুঝবে? দেখা যাক!

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখাগুলো যা ভারতে খোলা হয়েছে এরা আবার কাঠামোর দিক থেকে বিদেশী এনজিও গোত্রের। আর ভারতে ওদের বড় অফার হল, ভারতীয় স্টুডেন্ট-একাডেমিকদের পিএইচডি বা মাস্টার্স বিদেশে পড়তে স্কলারশিপ দেয়া। এটা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির উপর একে প্রলুব্ধ করে বিপথগামি বা বিভ্রান্ত করে ফেলার বিরাট পদক্ষেপ। আমেরিকা বিগতা অর্থনৈতিক শক্তি। অথচ এর স্বপক্ষে ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মনকে কব্জা করে সাজিয়ে নেয়া, মূল লক্ষ্য ভারতীয় মনকে কনফিউজ করে রাখা। । এর কাজ হল  ক্যারিয়ারের লোভে এরা ভারতে বা জাপানে বসে চীনা তৎপরতার এটা বা সেটা খারাপ, চীনা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খারাপ এসব কথা প্রচার প্রপাগান্ডামূলক কাজ অথবা  ক্যাম্পেইন-মূলক গবেষণা স্টাডিতে এসব ভারতীয়দেরকে এনগেজ করে রাখা। গত ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর থেকে এসব কাজের ধারা শুরু হয়েছিল। পরে ওবামার আমলে তুঙ্গে উঠেছিল ডালপালা বিছিয়ে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে এসে ২০১৭ সাল থেকে ট্রাম্পের আধাখেচড়া জাতিবাদী  ধারণার ধাক্কায়  আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলোর  আগের প্রায় সব অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই সাথে, ভারতকে দেয়া আমেরিকায় বিশেষ রফতানি সুবিধা (যেন চীনবিরোধী হওয়ার বুকিং মানি) যা কিছু আগে ওবামা আমলে দেয়া হয়েছিল সব গুটিয়ে ফেরত নেয়া হয়। সারকথা ট্রাম্পের আমেরিকা এ ব্যাপারে আমেরিকানদের কোন লাভ হচ্ছে কিনা এনিয়ে হতাশ ও হয়রান, সন্ধিহান হয়ে উঠেছিল। থিংকট্যাংক এনজিওগুলো তাই ট্রাম্প আমলে এসে ফান্ড অনেক গুটিয়ে ফেলেছে। তবে “চীনা ঋণের ফাঁদ”, “চীনা ঋণের শোষণ” ইত্যাদি এসব ক্যাম্পেইনগুলো এখনও এরা চালিয়ে যায়।

    তবে ওআরএফ এর গঠন ঠিক একইরকম নয়, ব্যতিক্রম। ওআরএফ এটাও দাতব্য অবশ্যই, তবে মুখ্যত স্থানীয় ব্যবসায়ী – রিলায়েন্স গ্রুপেরই প্রায় একক দানের অর্থে পরিচালিত। কিন্তু আমেরিকান  থিংকট্যাংকগুলোর সাথে ওআরএফ এর সবচেয়ে কমন মিল ও সম্পর্কের দিকটা হল, ওআরএফসহ সব থিংকট্যাংক পরিচালিত হয় ওই একই আমেরিকান চীনবিরোধী বয়ানভাষ্য ও নীতির অধীনে। আমেরিকার তৈরি যে অভিমুখ। আমেরিকান মাদার থিংকট্যাংকগুলোতে বসে যেসব চীনবিরোধী যুক্তি বয়ান তৈরি হয় সেগুলো সারা ভারতের সব থিংকট্যাংকই আউড়িয়ে যেতে থাকে। তবে লক্ষণীয় যে ভারত সরকার বেশির ভাগ সময়ই নিজের সরকারি ভাষ্য বা অবস্থানে ওইসব বয়ানকে য়ানে না, মূলত এড়িয়ে চলে। এর সম্ভাব্য কারণ, এই চীনের সাথেই তো ভারত সরকারের যৌথভাবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক, এআইআইবি ব্যাংক [AIIB]  অথবা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] ধরনের জোট তৎপরতায় অংশ নিয়ে থাকতে হয়।

     ওআরএফ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এখন কেনঃ
    সারা দুনিয়ার মত করোনাভাইরাসে বাংলাদেশেও খারাপভাবেই আক্রান্ত। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট করার সুযোগহীনতা বা চিকিৎসাহীনতার চরম দিনগুলো পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রায় ৬০টির মতো টেস্ট-সেন্টার খুলতে সক্ষম হয়েছে তত দিনে আবার এখন দিনকে দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডেড সংখ্যাটাই বিপজ্জনকভাবে বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। হাসপাতালে একটা সিটের খোঁজে পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে করতেই রোগী মরে শেষ এমনই অবস্থা। এমনিতেই আমাদের সরকারের ম্যানেজমেন্ট সামর্থ্য সামলিয়ে যতটুকু যা রিসোর্স বা স্বাস্থ্য বাজেট আমরা জড়ো করতে সক্ষম সেটাও দুর্নীতির কারণে লোপাট হচ্ছে। যার সারকথাটা হল, এক চরম ম্যানেজমেন্ট ফেল করা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। বের হওয়ার উপায় নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সমস্যার কারণে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রেনিং বা দক্ষতা বাড়ানো পর্যন্ত আমাদের রিসোর্স পৌঁছাতে পারে না। করোনার আবির্ভাব আমাদের সবাইকে উদাম করে ছেড়েছে, নিজেদের অযোগ্যতায় নিজেরাই এখন চরম বিপদে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই হুমকি দিচ্ছেন ‘এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দিতে পারব না।’ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থা যদি চূড়ান্ত ফেল করে তবে এরপর পুরা আইনশৃঙ্খলাই ফেল করতে আর সময় লাগবে না।

    দেরিতে হলেও করোনা মোকাবেলায় একশন গত মার্চের শেষে আমরা যখন শুরু করি তখনই অনেকে জানতেন যে আমাদের জন্য সামনে অনেক রিস্ক অপেক্ষা করছে, আমরা ঢুকছি। যারা দূরেরটা আগে দেখতে পেয়ে যান; তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমরা কঠিন বিপদে পড়ে গেলে শেষ পর্যায়ে আমাদের এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার একটাই সম্ভাবনা আছে যে চীনের সাহায্য সহায়তা যদি পেয়ে যাই, দুয়ার খোলে যদি । কারণ করোনা যা দাবি করে আর আমাদের যা সামর্থ্য এ দুইয়ের গ্যাপ মিটাতে সক্ষমতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র চীনা সহায়তা।
    ঘটনাচক্রে সেটাই এখন বাস্তব, আমরা তারই মুখোমুখি। আমাদের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, ইতোমধ্যেই চীনা সাহায্যকারী টিমও এখন ঢাকায়।

    আমরা উদ্যোগ নিতে পেরেছি এটা ভালো খবর অবশ্যই। সব সরকারই কোনো খারাপ অবস্থায় হাতের কাছে যা আছে ও সম্ভব তার সবই কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয় আমরা এমন কোনো সরকার দেখার আশা করি না যারা বুঝছেন তাদের কোনো ভুল বা ব্যর্থতায় বা কোনো গ্যাপে শেষে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে, অথচ তারা সেটা দাঁড়িয়ে কেবল দেখছেন! এটা তো হতে পারে না!

    তবে এরপর আরেকটু আছে, চীনেরই আরেকটা প্রোগ্রাম আছে ‘সিস্টার সিটি অ্যালায়েন্স’ [China wants ‘sister cities’ in Bangladesh]। পত্রিকার ঐ রিপোর্ট বলছে, চীনা টিম আমাদের ঐ এলায়েন্স প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হতে পারি বা চাই কিনা এর দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। তা নিয়ে সরকারি নানা পর্যায়ে কথাবার্তা এখনো চলছে।

    কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্যের লেখা দেখে বুঝা যাচ্ছে, এনিয়ে তাঁরা খুবই ক্ষেপে উঠেছেন।, ওই চীন-বাংলাদেশ সরকারপ্রধান পর্যায়ে টেলিফোন আলাপ ঘটার পর থেকেই। যেন তিনি বলতে চাইছেন আমার “দখলি প্রিয়া” কেন অন্যের সাথে কথা বলল। কিন্তু
    সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশটা ইন্ডিয়া নয়। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে চীনের টিম বা উহান সিটির কর্তাদের আমরা কেন দেখব?  আমরা দেখতে পারব না। আমাদের প্রয়োজনের চোখ দিয়েই আমরা দেখব?

    বলা বাহুল্য, করোনা প্রসঙ্গে আমাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে সীমা কী তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই। তাই চীনা বন্ধুদের আমরা দেখব আমাদের খারাপ সময়ের  সহায়তা-দাতা হিসেবেই। এই দাতা যাদের নিজ শহর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, দক্ষতা আছে, দক্ষ জনবল আছে, সব রিসোর্স আছে যারা আমাদের শিখিয়ে নিতে দিতে সহায়তা করতে পারবে। আর সর্বোপরি যাদের আগ্রহ আছে। এখন খাদের কিনারায় ঠেকে যাওয়া আমরা কোন ‘সিটি অ্যালায়েন্স চুক্তি’ তে যুক্ত হই আর নাই হই – করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চীনা সহযোগিতা খুবই দরকার। এ হলো বাস্তবতা। তাহলে আমরা কেন তা নেবো না?

    ভারত পছন্দ করছে না তাই?
    কোনদিক দিয়েই  ভারতের অবস্থান ও সক্ষমতা কোনোভাবেই চীনের কাছাকাছি নয়। না রিসোর্সের সক্ষমতায়, না অভিজ্ঞতায়। এর উপর ভারতেরই এখন অথবা আগামী মাসে করোনা সংক্রমণের পিক সময়কাল আসে কিনা এ নিয়ে তারা চরম এক হিমশিম অবস্থায়। এছাড়া আরো বিরাট এক সমস্যা আছে। ভারত থেকে সহায়তাকারী কোনো টিম এসেছে এমন যদি হয় তবে ওই টিমকে সাধারণ মানুষই গ্রহণ করবে না, এটা আমাদের আগে খোদ জয়িতাই জানেন! তিনিই লিখেছেন আমরা ভারতীয়দের পছন্দ করি না। তাহলে?

    পাবলিকের উপর গোসসা করা  – যারা পাবলিক নিয়ে ডিল করেন যেমন কোন গবেষক তিনি কখনই তা করতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন পাবলিকের উপর রাগ করা গোসসা দেখানো তার কাজ এক্তিয়ার একেবারেই নয়। কাজেই সাবধান! জীবনে ভাল সফল গবেষক হতে চাইলে তার উচিত হবে বরং পাবলিক কেন ওরকম বা সেরকম হয়েছে বা আচরণ করছে সেটা খুজে বের করা, এটা বের করতে জীবন লাগিয়ে দেয়া। সস্তা দেশপ্রেমিক হবেন না।

    ইন্ডিয়ার সমস্যা এটা যে, নিজের আকার আকৃতি বা অবস্থানের ব্যাপারেও তার সঠিক ধারণা নেই। তাই ভান করে যেন সে এক পরাশক্তি। যেমন দেখেন, বাংলাদেশের এক পত্রিকা মালিক সম্পাদকের উপজেলার পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য প্রজেক্টে ভারত তাতে মাত্র কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। অথবা ধরেন মফস্বলের একটা কলেজের কয়েকটা ঘর দোতলা করতে হবে তাকে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়ে দিল। আর ভারতের হাইকমিশনার সেটা আবার ঘটা করে উদ্বোধনও করতে গেছেন। ভারতের ধারণা এতে এবার ভারতকে দাতা দেশের আসনে বসতে জায়গা দেয়া হবে। অথচ বুঝতে চেষ্টা করল না যে, সব রাষ্ট্রেরই অনুদান দেবার সক্ষমতা থাকতেই হবে এর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কোন ঘটনাটা নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলবে এটা তো সকলেরই অবশ্যই বুঝার ক্ষমতা থাকা উচিত! তাই না!
    আবার দেখেন, এবার করোনা শুরু হলে সার্কের নামে একটা ফান্ড তৈরি করতে হবে বলে হইচই করা হল। কেন? সত্যিই অর্থপূর্ণ সাঙ্ঘাতিক কিছু কী তারা করতে চেয়েছিল?
    ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (যেটা ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট) এটা করোনার ওষুধ বলে যা এখনও প্রমাণিত নয় – অথচ এটাকেই মোদীর পক্ষ থেকে করোনা নিরাময়ের ওষুধ বলে দান করে গেলেন। শুধু তাই নয়, জানিয়ে গেলেন ওই ওষুধের দাম মোদীর দেয়া চাঁদার ভাগ থেকে কাটা যাবে। বুঝেন মোদী-ফান্ডের কী মহিমা! এতে দুটো ঘটনা ঘটল। এর একটা অপরাধ। কারণ আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনহীন একটা ওষুধ আমাদের দেশে আমদানি করা হল। আবার এটা তো ডাক্তারেরা ব্যবহার করতে বলতে পারবেন না। অন্তত আইনি ঝামেলায় পড়বেন। আর এটা করোনার বিরুদ্ধে কাজ করবে এর কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই এখনো শেষ হয়নি,  ফলে প্রমাণিত কোনো ওষুধ নয় এটা। ফলে আমাদের ওষুধ প্রশাসনেরও কোন অনুমোদন দেয়ার সুযোগই নেই। মানে যেন দাওয়াত দিয়ে কাউকে গরম ভাতের বদলে পান্তা খেতে দেয়া যায়? আপনি তাই করলেন।

    এদিকে, জয়িতা বলতে চাইছেন এই ‘সিটি অ্যালায়েন্সের’ অফারের মধ্যে চীনা “বেল্ট-রোড প্রকল্পের” সম্পর্ক আছে। আর এটাতে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে”।  আসলে দুনিয়ার অনেক সমস্যারই জন্ম হত না। হয়েছে এস্টিমেশন থেকে মানে নিজেকে মাপতেই শিখে নাই। শিক্ষা নেয় নাই কখন। বিশেষ করে দুচারজন  বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার এরকম। এরা পোস্টিং পেয়েই মনে করা শুরু করে তারা বাংলাদেশের রাজা না হলেও কিছু অংশের মালিক হয়ে গেছেন!  আচ্ছা ধরা যাক, বাংলাদেশে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে””  [The Chinese motivation exceeds the promotion of cultural ties and it has a larger Geo-strategic objective…]।  আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে বেল্ট-রোড প্রকল্প – এই ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের চীনা “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য নাই।  কিন্তু সাবধান প্রশ্নটা “আছে কিনা” এর নয়, এটা একেবারে মুরোদের প্রশ্ন। এজন্য বাইরের কারও দিকে তাকানোর আগে নিজের মুরোদ চেক করা উচিত! তাই না! তাই প্রথম প্রশ্ন হল,  তাতে ভারতের কী সমস্যা? যার মুরোদ নাই আসলে তার কোন সমস্যা কী আমলযোগ্য? ভারতই বলুক! আচ্ছা এছাড়া আরও কাহিনী আছে! দেখেন  অফার তো বাংলাদেশকেই করেছে তাই না? ভারতকে তো করে নাই? নাকি? কাজেই প্রতিক্রিয়া যা দেখানোর তা বাংলাদেশই দেখাক। অন্তত বাংলাদেশকে দেখাতে দেয়া উচিত। এজন্যই বলে ওভার-এস্টিমেশন একটা গভীর অসুখ!

    আসলে, বুঝা গেছে সমস্যার গোড়াটা মেন্টরের। জয়িতার মেন্টর-মুরুব্বি সম্ভবত বলে দিতে ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশ কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এমন ধারণা জয়িতার মুখ দিয়ে প্রকাশ পেলে  লোকে জয়িতাকেই বেকুব বলবে!

    আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। ভারতে কী চীনা ঋণে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প চালু নেই? খোদ মোদীই মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই একাজে দক্ষ্মহস্ত নয়?  ভারতে কোনো নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণ অথবা রেলের অবকাঠামো বা রেলকর্মী ট্রেনিং ইত্যাদি? এগুলো কাদের বিদেশি অবকাঠামো প্রকল্প? এখানে ভারতে চীনা রাষ্ট্রদুতের একটা সাক্ষাতকার আছে ২০১৫ সালের এপ্রিলের সেকালের চীনা প্রজেক্টের হদিশ মিলবে এখানে।  এটাই  মোদীর ক্ষমতায় আসার পরে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝাপিয়ে পড়া ছিল।  আমরা এই একটা নমুনা থেকে অ-নে-ক নিশ্চয় জানবে পেরে স্বর নিচা করব! এখন কথা হল,  তাহলে সেগুলোতে কী “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে” তা ভারতের মনে হয়নি? নাকি সব জিও-স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার কেবল বাংলাদেশের চীনা প্রকল্পের বেলায়? যত্তসব বিরক্তিকর কাণ্ড!

    আর জয়িতা “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” খুজতে বাংলাদেশে এসেছেন? ভারতের মিডিয়া খবর লিখছে ভারতের ওষুধের বাজারের ৪০% কাচামাল বা তৈরি ওষুধ আমদানির দিক থেকে নির্ভরশীল।  সেই চীনের কাছে গালয়ানে মার খেয়ে এসে এখন চীনাপণ্য বয়কট আউড়াইতেছেন, “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য বুঝতে আইছেন?  তো চীনা ওষুধ বা কাঁচামাল কী এখন আমদানি বন্ধ করতে পারবেন? এই আপনাদের স্ট্রাটেজিক বুঝ?  যে চীন ভারতের প্রথম সম্ভাব্য এনিমি তার কছেই আপনি ওষুধের মত জীবনরক্ষাকারি পণ্যে নির্ভরশীল। আর মুখে সেই গান্ধীর আমল থেকে আউড়াইতেছেন আত্মনির্ভরতা? অথচ এই আত্মনির্ভরতা শ্লোগানটাই বহু আগে থেকেই ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত। অথচ ভারতের রাজনীতিকদের সে হুশই নাই।  আপনারা আসলে কাকে ফাঁকি দেন? চীনা ওষুধ বা কাচামাল সবচেয়ে সস্তা আর এই সস্তা থুয়ে অন্য জায়গায় যাবার মুরোদ কী ভারতের আছে, কেমনে সে মুরোদ অর্জন ক্রতে হয় তাও তো জানেন না। সস্তা দেখলে যেখানে কাপড় ঠিক রাখা মুশকিল – এমনই অর্থনীতি আপনারা বানাইছেন? আবার এই অবস্থায় আইছেন আমাদেরকে “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” বুঝাইতে? হা হা হা কী তামশা……

    আবার কিছু কথা তো একেবারেই পরিষ্কার। যেমন বেল্ট-রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে যুক্ত আছে সেই ২০১৬ সাল থেকে। এটা তো লুকানো নয়। এ নিয়ে একবার আমাদের অবস্থান ইন্ডিয়াকে জানান দিতে গিয়ে য়ামাদের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে ছোটখাটো একটা বিতর্কও হয়ে গিয়েছিল সে সময়। অর্থাৎ এই ফ্যাক্টসটা প্রতিষ্ঠিত। তবে ভারতের নিজের জন্য এই বেল্ট-রোড প্রকল্প হারাম বলে মনে করতেই পারে ভারত। এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো, তা করুক। কিন্তু তাহলে ভারতের জন্য যা হারাম তা আমাদের ওপরও হারাম বলে চাপানোর চেষ্টা কেন?

    এখন চীনের ‘সিটি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের’ সাথে যদি বেল্ট-রোড প্রকল্প যুক্তও থাকে আর তাহলে তা ভারতের জন্য “সন্দেহের উদ্রেক” [raised suspicions ] করলেও বাংলাদেশের তাতে কী? কারণ আমরা তো বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ হয়েই ঢুকে আছি। কাজেই ভারতের ‘সন্দেহের উদ্রেক’ আমাদের ঘাড়ে চড়াবার তো সুযোগ নেই। ভারতের নিজের ঘাড়েই এটা রাখতে হবে জয়িতাকে। তিনি নিশ্চয় আশা করবেন না যে আমাদেরও চীনকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করতে হবে! আশা করি জয়িতা পরিষ্কার থাকবেন, নাকী!

    জয়িতার চীনা শোষণ তত্বঃ
    আবার আরেক বিপদ। জয়িতার দাবি বেল্ট-রোড প্রকল্প বিভিন্ন রাষ্ট্রকে এতে ঢুকিয়ে নেয়ার এটা নাকি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে চীনা ঋণগ্রস্ত করে ‘ঋণের বোঝা’ চাপানোর আর ‘শোষণের’ প্রকল্প [debt burden and the exploitation by China]। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য তাহলে বলেন, ভারতও কেন নানা ধরনের চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলে সেটা আবার কোন চীনা শোষণের পাল্লায় পড়ার জন্য? আমি অবশ্য ভুটানে ইন্ডিয়ান লোন কত তানিয়ে কিছু বলছি না। জয়িতা নিজের ক্রাইটেরিয়াতে নিজেই চেক করে দেখতে পারেন।

    আবার এখানেই শেষ নয়। চীনা-বিশ্বব্যাংক এআইআইবি-তে সেখানে চীনা (শোষকের) সাথে ভারতই তো প্রধান পার্টনার-মালিক হয়ে আছে। আবার ভারত একই শোষক চীনের সাথে ব্রিকস ব্যাংক খুলেছে? এর মানে কী, তাহলে কি ভারতও শোষক? বলেন কী? না না – জয়িতা আপনাকে অনেক পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে!

    এ জন্যই বলছিলাম, কেউ আজকাল ন্যূনতম হোমওয়ার্ক না করে লিখতে বসে না। থিংকট্যাংক বলতে আমেরিকানরা গবেষণা কাজ বোঝাত। অথচ আজকাল থিংকট্যাংক আর প্রপাগান্ডা কাজ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। যারা প্রপাগান্ডিস্ট তারাই গবেষক বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এমন দুর্দশার কথা কারে বলি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২১ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  সেদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্প যখন লোভী সেলসম্যান, টোটকা ক্যানভাসার

    ট্রাম্প যখন লোভী সেলসম্যান, টোটকা ক্যানভাসার

    গৌতম দাস

     ২০ এপ্রিল ২০২০, ০২:৩৯

    https://wp.me/p1sCvy-2Xm

    –

    Anti-malarial drug Hydroxychloroquine – NYT

    করোনাকাল! মানে এখনকার দুনিয়ায় যখন করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাই সবখানে বর্তমান হয়ে আছে। আমরা এরই জীবন্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এর ভেতরেই জীবন-মৃত্যুর মধ্যে প্রতিদিন বসবাস করছি। বিশেষত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যখন কোন পরীক্ষিত ও প্রমাণিত ওষুধ বা কোনো প্রতিকার প্রতিষেধক মানুষের নাগালে মধ্যে এখনও নেই।

    আমরা অপেক্ষা করছি ভ্যাকসিন প্রতিষেধক হাতে পাওয়ার। কারণ এ ধরনের ভাইরাসের প্রতিষেধক মানবদেহ আত্রান্ত হলে প্রতিক্রিয়ায় নিজেই শরীরের ভেতরে তৈরি করে থাকে। আর যত দিন ও ক্ষণ এটা  আক্রান্তদের শরীরে ব্যাপকসংখ্যক পাল্টা তৈরি না হয়ে যায় তত দিনই আমরা ঝুঁকিতে এবং কষ্টে থাকি। এমনকি স্টাডি বলছে মোট আক্রান্ত লোকের কমপক্ষে দুই পার্সেন্ট  আক্রমণ সামলাতে টিকতে বা সহ্য করতে না পেরে মারাও যেতে পারে। এটাকে আমরা ভাইরাস প্রতিরোধী হয়ে উঠা মানুষ বা নতুন শরীর বা অ্যান্টিবডি [Anti-boby] বলে থাকি। মানব প্রজাতির জন্মলগ্ন থেকে আমাদের দুনিয়াতে মানুষের পাশাপাশি এধরনের কোটি কোটি অসংখ্য ভাইরাস এ পর্যন্ত হাজির হয়েছে আর আমরা আমাদের শরীরে এমন ভাইরাস প্রতিটিরই অ্যান্টিবডি হাজির করিয়ে টিকে গেছি। এই বিচারে এবারও অবশ্যই সফল হব আশা করা যায়। তবে এখনকার সময়কালটা হচ্ছে মেজরিটির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় দেয়ার, আর তত দিন কোনো মতে বেঁচে টিকে যাওয়ার সময়। আর ওদিকে ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের আবিষ্কার হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকছি, যা পাওয়া গেলে তা এরপর থেকে আক্রান্তের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে মানুষকে সহায়তা করবে। অর্থাৎ শেষ বিচারে মানুষের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়া একমাত্র পরিত্রাণ ও থিতু অবস্থায় পৌছানো।  এসব বিচারে এখনকার সময়টা এটাই হল মানব-প্রজাতির জন্য ক্রুশিয়াল ‘করোনাকাল’। মানে ‘নিও করোনাভাইরাস’ (বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া স্টান্ডার্ড নাম, কোভিড-১৯) নামে জীবাণুর সংক্রমণের কাল এটা। যে কেউ এর শিকার হয়ে পড়লে তা থেকে মৃত্যুও হতে পারে। এমন আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সবাই এই করোনাকালে জীবন্ত বসবাস করছি। বলাই বাহুল্য, এটা দুনিয়ার মানব-প্রজাতির জন্য   সাময়িক এক অসহায় তবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা।

    খারাপ সময়ে অনেক কিছু ধরে রাখা যায় না; অন্তত খুবই কঠিন হয়ে যায়। পরিচিত চিরচেনা দুনিয়াটাও সে সময়ে হঠাৎ করে খুবই অপরিচিত মনে হতে থাকে। কারণ কোনো কিছুই আর আগের অর্ডার বা পরিচিত নিয়মশৃঙ্খলের মধ্যে নেই, থাকে না দেখতে পাই। আমরাও অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকি। কারণ বেঁচে থাকাটাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে থাকে।

    এ সময় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পড়ে মানুষের মূল্যবোধ [value]। তা ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া মানুষের মধ্যে বিপর্যয়ও দেখা দিতে পারে।  ভ্যালু বা মুল্যবোধ মানে, মানুষ কী করে আর কী করে না; করবে না, করতে পারে না – এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া ও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর শাণিত হতে থাকা এ নিয়ে নতুন বিকশিত ভাবনাগুলো – যাকে আমরা মানুষের মূল্যবোধ বলি, তা ধরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই করোনাকাল মানুষের মূল্যবোধ রক্ষা বা ধরে রাখার পরীক্ষায় চরম এক ক্রান্তিকাল হয়েও উঠতে পারে। যেমন ইতোমধ্যেই পরিবারের আপন বাবা-মা করোনায় মারা গেলে তাঁকে ফেলে পালানো বা জানাজায় কোন দায় না নেয়ার ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। নিজ পাড়ার আশেপাশে হাসপাতাল করতে না দেওয়া বা কবরস্থান করতে না দেওয়ার মতামত প্রবল হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যুক্তি বা বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নয় বরং এক অজানা আশঙ্কা, অহেতুক স্বার্থপরতায় চরমে উঠে পড়তে চাইছি আমরা। অন্যকে মেরে হলেও নিজে বেঁচে থাকতে চাইছি – এমন ঝোঁক আমাদের মধ্যে বাড়ছে! এ’হলো করোনাকালের ফেনোমেনা!

    গত চার শ’ বছরের দুনিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসকে যদি আলোচনায় আনি তবে একে তিনটা বড় কালপর্বে ভাগ করে দেখতে পারি। প্রথমটা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত; যেটাকে ‘কলোনি ইকোনমি’ বা কলোনি-শাসনের ইতিহাস বলতে পারি। বিষয়টাকে অনেকে অর্থনৈতিক ইতিহাসের পর্যায় না বলে, ক্যাপিটালিজম’ শব্দ ব্যবহার করে বললে তা বেশি অর্থবোধক বলে মনে করে থাকেন। সেভাবে  এই প্রথম সময়কালটাকে আমরা ইউরোপের নেতৃত্বে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের যুগ” বলতে পারি। আর এরই দ্বিতীয় পর্যায় বা রূপটা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে  “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যুগ” যা গত শতকের মোটা দাগে শেষ পর্যন্ত জারি ছিল ধরতে পারি। আর তৃতীয় পর্যায় ও রূপটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল চলতি শতকের শুরু থেকে (প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল থেকে বলা যায়) চীনের নেতৃত্বে এবং ক্রমেই যা আমেরিকার বদলে চীনের প্রভাব দখল নিয়ে বা জায়গা নেয়া হয়ে বেড়েই চলছে।

    দ্বিতীয় পর্যায়টায় ভাল এবং মন্দ বহু দিকই আছে, যার সবকিছু আমেরিকার নেতৃত্বে ঘটেছে। সেযুগেই প্রথম বহুরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয় জাতিসংঘ। আর সাথে বাণিজ্য অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময় সুসম্পন্ন করার প্রথম বহুরাষ্ট্রীয় নিয়ম শৃঙ্খলার জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। যার মন্দ দিকটা হল এটা পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও তার ভায়রাভাই রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর পক্ষে কান্নি মেরে গড়ে তোলা। তবুওও উপরে এর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাওয়ার সময়কাল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল বলা হয়েছে এজন্য যে ২০০৯ সালেই প্রথম প্রশ্ন উঠে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকে আগে সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ার ছিল আমেরিকার (১৮%) সেখানে চীন তার মালিকানা শেয়ার বাড়াতে চেয়ে প্রস্তাব দেয়। আভ্যন্তরীণভাবে টেকনোক্রাটেরা চীনকে ভিতরেই রাখতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ভিতরেই জায়গা বড় করে আটিয়ে নেওয়ার পক্ষে প্রস্তাব তৈরি করে অ্যামেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিশেষ করে সিনেটে এই ফাইল গেলে তা কখনই অনুমোদিত না হয়ে ওর মৃত্যু ঘটেছিল। যে সিদ্ধান্তের প্রাকটিক্যাল মানে হল আমেরিকা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ভিতরে প্রভাব বিস্তারের ঝগড়ার খাতা খুলার চেয়ে বাইরে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সতীন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে চীন লড়ে নেক – এভাবে লড়ার দিকে চীনকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  আর তা থেকেই চীনা প্রধান শেয়ারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর প্যারালাল সতীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্ম ও বিস্তারলাভের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

    আগেই বলেছিল গ্লোবাল অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় যুগ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যার প্রভাব পরিণতি ভালো-মন্দ দুটো মিলিয়েই ছিল। তবু বড় কথা সেখানে একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়মশৃঙ্খলা আনা প্রথম শুরু  হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ে নতুন নেতা চীনের আগমনে আমেরিকার চাপ প্রভাব বাংলাদেশের মত দেশগুলোর উপর অনেকটাই হালকা হয়ে গেছিল। আমাদের হাসিনা সরকার বিশ্বব্যাংকের (আমেরিকার) প্যারালাল উতস চীনা ঋণ পাবার দরজা খুলে গেছিল।   কিন্তু তবু আগে দ্বিতীয় পর্বকালে আমেরিকার কর্তৃত্বে তৈরি হয়ে থাকা নেতৃত্ব ও অর্ডার এই প্রথম খোদ এক অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট  মানে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তাঁর আমেরিকা নিজেই গ্লোবাল নেতাগিরি ও দায় ছেড়ে দিতে শুরু করেছিল। এক অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছায় গ্লোবাল কর্তৃত্ব ত্যাগ করা শুদ=রু করেছিল। আর এতেই পুরনো গ্লোবালিস্ট নেতা আমেরিকা হতে  শুরু করেছিল ন্যাশনালিস্ট, মানে এক জাতিবাদী আমেরিকা। গত এক শ’ বছরে আমেরিকার এই রূপ দুনিয়া আগে দেখেনি।

    যেকোনো সমাজে যার অর্থসম্পদ বেশি সমাজের দাতব্য কাজের উদ্যোগগুলোতে এর ব্যয়ভারের বড় অংশ তাকেই বইতে দেখা যায়। এটা বাস্তব এবং তিনি সামর্থ্যবান বলে এটা গ্লোবাল সমাজসহ লোকাল সমাজ সবখানেই সবচেয়ে স্বাভাবিক। এটা সেকালে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা বলে তো বটেই, এছাড়া আমেরিকা বড় জনসংখ্যা মানে বড় অর্থনীতির দেশ বলেও জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ব্যয়ভারগুলোর বড় অংশের আমেরিকা থেকে জোগান এসেছে, গত ৭০ বছর ধরে। অথচ এই প্রথম আমরা লক্ষ্য করছি – এসব ব্যয়ভার আর বইবে না বলে আমেরিকা থেকে হুমকি দেয়া শুরু হয়েছে। প্রথম এমন হুমকি এসেছিল খাপছাড়া ভাবে জুনিয়র বুশের আমলে। আর এবার করোনাকালে জাতিসঙ্ঘের এজেন্সি সংগঠন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার [World Health Org – WHO] পুরো চাঁদাদানই বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন ট্রাম্প।  আমেরিকার এপর্যন্ত প্রদেয় চাঁদা ছিল বাতসরিক ৪০০ মিলিয়ন ডলার।  তুলনায় এখন চীনের প্রদেয় ৪৪ মিলিয়ন। তবে এখনই এক কথায় বলাযায়, চাদা না দেওয়ার হুমকি আত্মঘাতি হবার সম্ভাবনাই বেশি। সম্ভবত অচিরেই আমরা দেখব একা চীনই ৪০০ মিলিয়ন দিচ্ছে কারণ স্বভাবতই সেক্ষেত্রে ঐ সংস্থায় চীনের প্রভাব সর্বোচ্চ হয়ে যাবে। এমনিতেই ট্রাম্পের অভিযোগ খুবই ঠুনকো ও অপ্রতিষ্ঠিত যে, এই সংস্থা চীনের সাথে কাজ করেছে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি মাসেও খোদ ট্রাম্পই সার্টিফিকেট দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছিল যে চীন উদার ভাবে করোনা নিয়ে সব তথ্য বা ডাটা সবার সাথে শেয়ার ও উন্মুক্ত করেছে। এমনকি অ্যামেরিকান গবেষকদেরকেও প্রবেশাধিকার দিয়েছে।  কিন্তু ট্রাম্প তখন করোনাকে তুচ্ছ করেছিল, হালকা করে দেখেছিল, সম্ভাব্য করোনা আক্রমণকে দুর্বল ভেবে অপ্রয়োজনীয় মিথ্যা বড়াই প্রকাশ করেছিল। আজ সেসব মিথ্যা বড়াই সামনে এসে যাওয়াতে সে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উপর আক্রমণ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। তাই এখন ট্রাম্পকে পালটা যে চরম সমালোচনা শুনতে হচ্ছে তা হল  চাঁদাদান বন্ধ করার টাইমিং। বিশেষত সারা দুনিয়া যখন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলা ও লড়াইয়ে সবাই সক্রিয় প্রাণপণ লড়ছে আর প্রয়োজনমত গাইড লাইন ও সমন্বয় তারা এই সংস্থা থেকে পাচ্ছে।  আবার খোদ নিউ ইয়র্ক যখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিন হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া করোনা মৃত্যুর শহর। অথচ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও এই ফ্যাক্টরগুলোর কোনোটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে না। অর্থাৎ করোনা-উত্তরকালেও যে সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারতেন, সেই সিদ্ধান্ত তিনি এখন কোন বিবেচনায় নিলেন- এর সদুত্তর নেই। অর্থাৎ এই প্রথম আমেরিকা শুধু গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে নিজেকে খারিজ হয়ে যাচ্ছে না বরং খোদ রাষ্ট্রটা নিজের জন্যও মূল্যবোধে খামতি বা সঙ্কট তৈরি করছে।

    ঘটনার এখানেই শেষ নয়। খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটা ওষুধ কোম্পানির পণ্য বা ওষুধের পক্ষে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। তিনি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন [ Hydroxy-chloroquine] এই জেনেরিক নামের এক ওষুধের পক্ষে ওকালতি শুরু করে দিয়েছেন। এটা করোনাভাইরাসের নিরাময়ে আবিস্কৃত কোন ওষুধ নয়। এর কার্যকারিতা  মূলত ম্যালেরিয়া নিরাময়ের ক্ষেত্রে; সেকাজের জন্য কেবল পরীক্ষিত ওষুধ এটা। এর কার্যকারিতা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেও আদৌ কার্যকর হবে কি না;  হলে কতটা অথবা কোন বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে এটা একেবারেই প্রয়োগ করা যাবে না কিনা ইত্যাদি কোন কিছুই এখন সব পরীক্ষা ও কার্যকারিতা প্রমাণ শেষ করে অনুমতিপ্রাপ্ত হয় নাই এই ওষুধ।  কেবল প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী কিছু করোনা রোগীর উপর এটা প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে যে এটা সম্ভাব্য ওষুধ হতে পারে, তাই।

    ওষুধ কোন সাধারণ পণ্য নয় যেটা সরাসরি আর পাঁচটা কোন পণ্যের মত বাজারে বিক্রির জন্য তোলা যায়। এমনিতেই কোন ড্রাগ অথবা কোন মুখে খাওয়ার খাদ্য বা শরীরে ব্যবহারের কোন কেমিকেল ইত্যাদি ভোগ্যপণ্য বাজারে তোলার আগে প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নির্ধারিত অনুমতিদাতা প্রতিষ্ঠান থাকে – যেখান থেকে পরীক্ষিত ও ঐ পণ্যের কার্যকারিতা সত্য কিনা সেই সার্টিফিকেট আগাম পেয়ে নিতে হয়। কাজেই এটা কোন প্রেসিডেন্টের সুপারিশেই বিষয় নয় যে যেমন আমার চাল বা গম খেতে খুব সুস্বাদের এটা নিয়ে যান বলে যে কেউ ফেরি করতে পারে। এসবই কোন ওষুধ-পণ্যকে  বাজারে তোলা ও বিক্রি করার টেকনিক্যাল শর্তও। এই শর্তপূরণ না করে কোন ওষুধ বাজারে কেনাবেচা করার চেষ্টা এক মারাত্মক ক্রিমিনাল অপরাধ।  কারণ, ঐ ওষুধ যথার্থ নয় বলে সেকারণে এটা খেয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা কেউ মারা গেলে এর দায়দায়িত্ব কে নিবে তা চিহ্নিত ও দায়ী করার জন্যই এই সতর্কতা। এতো গেল টেকনিক্যাল দিক।

    অন্যদিকে, সাধারণত কোন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রেসিডেন্টের ব্যক্তি-ব্যবসায়িক স্বার্থ যদি প্রেসিডেন্টের কোনো সিদ্ধান্তের ইস্যুতে জড়িয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সেই নির্বাহী  ঐ স্বার্থের ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। মূলত এজন্যই কেউ প্রধান নির্বাহী বা মন্ত্রী হলে শপথগ্রহণের আগেই তিনি কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির মালিকানা বা নির্বাহী পদে থেকে থাকলে আগেই  পদত্যাগ করে থাকেন যাতে দুমুখি স্বার্থ সঙ্ঘাতের [conflict of interest] বালাই না থাকে। যেমন, কোনও প্রেসিডেন্ট কোনও ওষুধ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হলে তিনি ওই কোম্পানির ওষুধ সরকারকে দিয়ে কিনাতে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে ফেলতে পারেন। এমনটা যেন না হয় তাই তিনি আগেই কোম্পানির মালিকানা-পদত্যাগ করে থাকেন।  এই হল, রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতাধারীদেরকে (মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি এমন এদেরকে) একই সাথে তাদের প্রাইভেট ব্যবসায়িক কাজ থেকে দূরে রাখার নীতি।

    ট্রাম্প ও তাঁর বন্ধুদের শেয়ার মালিকানাঃ
    এসব দিক নিয়ে বিস্তর ঘাটাঘাটি করে তথ্য তুলে এনেছে আমেরিকার ফোর্বস গ্রুপের ম্যাগাজিন ‘FORBES’। ফোর্বস বলছে ট্রাম্পের এক ক্ষুদ্র মালিকানা আছে সানোফিতে, [ has a “small personal financial interest” in Sanofi, a French drug-maker that produces a brand-name……]।  তবে পাঠকেরা ক্ষুদ্র মালিকানা শুনে আবার যেন বিভ্রান্ত না হয়ে যায়। ফোর্বস তাই এই ক্ষুদ্র মানে কত ডলার এর একটা  এস্টিমেটও সাথে দিয়েছে – সেটা পরিমাণ হল ২.১ বিলিয়ন ডলার।

    “Trump’s three family trusts have investments in a Dodge & Cox mutual fund, with Sanofi as the largest holding, according to the Times.
    Forbes estimates the value of Trump’s Sanofi holdings to be less than $3,000; for context, Forbes estimates Trump’s total net worth at $2.1 billion”

    অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, ট্রাম্প কোন নীতির কোনটাই মানছেন না। তাই আমরা দেখছি এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন – যেটা আসলে  ‘সানোফি [SANOFI]’ নামের ফ্রান্সের এক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির পণ্য -সেই কোম্পানির মালিকানায় আছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনেরা; এমনকি খোদ ট্রাম্পও এই কোম্পানীর এক ছোট শেয়ারের মালিক – এমন খবর ছেপেছে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। ইঙ্গিত করছেন ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুরা এ কারণেই এই ওষুধের পক্ষে টাউটিং [touting] বা দালালিতে নেমেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ যদি একবার করোনাভাইউরাসে আক্রান্তদের অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকারিতা আছে বলে প্রমাণিত হয়ে যায় [যদি লাইগ্যা যায়] তবে মুনাফায় লালে লালে হয়ে পারেন – এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে এরা সকলে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে।

    “If hydroxychloroquine becomes an accepted treatment, several pharmaceutical companies stand to profit, including shareholders and senior executives with connections to the president. Mr. Trump himself has a small personal financial interest in Sanofi, the French drug-maker that makes Plaquenil, the brand-name version of hydroxychloroquine.” – NYT

    অথচ ট্রাম্প অ্যামেরিকান বাস্তবতা সেসব ফ্যাক্টসের পরোয়া না করে, উল্টো এই ওষুধ ব্যবহারের পক্ষে অন্ততপক্ষে পাঁচটি পাবলিক হাজিরাতে প্রকাশ্যে যুক্তি খাড়া করেছেন। তার এক কুখ্যাত আরগুমেন্টের মূল বক্তব্য হল- ‘আপনার আর কী ক্ষতি হবে’ (হোয়াট ডু ইউ হ্যাভ টু লুজ,‘What do you have to lose?’ )। এই কথা তুলে তিনি অপ্রমাণিত কার্যকারিতার ওষুধের পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্য দালালি শুরু করে দিয়েছেন যা কোনো অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের মুখে খুবই অশোভন। ট্রাম্প বলতে চান যেহেতু ‘করোনাভাইরাসের ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো আবিস্কৃত নাই, তাই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত না হলেও এটা ব্যবহার করে দেখুনই না। এটা কাজে লেগেও যেতে পারে। এতে ক্ষতি কী?” নিউইয়র্ক টাইমস লিখছে, “What do you have to lose?” he asked five times on Sunday. এছাড়া ট্রাম্পের আহাম্মকি নিয়ে কথা বলাটাও একটা লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যেমন তিনি নিচের উদ্ধৃত অংশের শেষে বলছেন,  “তাহলে ক্ষতি কী ব্যবহার শুরু করে দেন,……  আমি ডাক্তার না, কিন্তু আমার কমন সেন্স আছে …”। এর মানে দাড়াল তিনি নিজেই স্বীকার করে বলছেন তিনি ডাক্তার নন। তাহলে তিনি ওষুধ ফেরি করছেন কেন? তাঁর দাবি এটা তিনি কমন সেন্স দিয়ে বলছেন। আচ্ছা কমন সেন্সের উপর ভর করে প্রেসিডেন্ট একটা ওষুধ খেতে পাবলিককে বলতে পারেন? ওষুধ কী কমন সেন্স দিয়ে, তাও আবার অন্যের কমন সেন্সের উপর ভর করে খাওয়ার কথা, না খাওয়া যায়?  ঐ ওষুধ খাবার পর কোন জটিলতা দেখা দিলে বা ব্যক্তি মারা গেলে সে দায়দায়িত্ব কে নিবে? সেটা তো তখন এক খুনের মামলা দায়ের হবে! এছাড়াও কোন প্রেসিডেন্ট কোন বিশেষ পণ্য ভোগ-ব্যবহারের পক্ষে ওকালতি করা গর্হিত অপরাধ ও পক্ষপাতিত্ব। কারণ তিনি ঐ পণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বি কোম্পানীর স্বার্থের ক্ষতি করছেন নিজের প্রেসিডেন্ট পদকে অপব্যবহার করে।

    Once again, according to a person briefed on the session, the experts warned against overselling a drug yet to be proved a safe remedy, particularly for heart patients. “Yes, the heart stuff,” Mr. Trump acknowledged. Then he headed out to the cameras to promote it anyway. “So what do I know?” he conceded to reporters at his daily briefing. “I’m not a doctor. But I have common sense.”

    সোজা কথা, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা হল, এক. ওষুধসহ যেকোনো পণ্যের পক্ষেই কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট টাউটিংয়ে নামতে পারেন না। এটা আইনি দিক থেকে গর্হিত কাজ। কিন্তু ট্রাম্প এখানে আরেকটা আড়াল নিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে এই ওষুধ তার সরকারকে দিয়ে কিনিয়ে বিপুল সরকারি স্টক গড়েছেন। অথচ ওষুধটার কার্যকারিতা প্রমাণিত বা উপযুক্ত ছাড়পত্র-প্রাপ্ত নয়।  তিনি দাবি করছেন চলতি এই করোনার খারাপ সময়ে যতটুকু কার্যকর ওষুধ পাওয়া যায় তার সবটাই তিনি সংগ্রহ করার সুযোগ নিয়েছেন। তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে বলছেন “আরও স্টাডির জন্য আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। কারণ রোগীরা মারা যাচ্ছে”।

    But Mr. Trump on Sunday dismissed the notion that doctors should wait for further study.

    “We don’t have time to go and say, ‘Gee, let’s take a couple of years and test it out,’ and let’s go out and test with the test tubes and the laboratories,” Mr. Trump said. “I’d love to do that, but we have people dying today.”

    Saying that the drug is “being tested now,” Mr. Trump said that “there are some very strong, powerful signs” of its potential, although health experts say that the data is extremely limited and that more study of the drug’s effectiveness against the coronavirus is needed.

    President Trump prevented Dr. Anthony S. Fauci from answering a question on hydroxychloroquine – NYT

    কিন্তু কোনো ওষুধ কার্যকর কি না, তা বলার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে, টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত ট্রাম্প একজন প্রেসিডেন্ট হলেও তা নিবার এক্তিয়ার তার নাই, তিনি নিতে পারেন না। এটা তাঁর কোন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট বা কমিটি তাকে পরামর্শ দিলে এরপর তিনি নিতে পারেন। কারণ তিনি পেশাদার ডাক্তার নন বা ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত-মন্তব্য করা তার এখতিয়ারের ভিতরেও পড়ে না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এখনই তাঁর সরকারের অন্তত দুজন এক্সপার্ট (Dr. Anthony Fauci and Dr. Deborah L. Birx,)  এই ওষুধ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।  প্রথমজন ফাউচি হলেন সরকারি “অ্যালার্জি ও সংক্রামক রোগবিষয়ক ইনস্টিটিউটের” পরিচালক এবং ট্রাম্পের করোনা সম্পর্কিত টাস্ক ফোর্স কমিটির একজন লিড মেম্বার। আর ডা. দেবরা ট্রাম্পের করোনাভাইরাসবিষয়ক কোর্ডিনেটর।  ফাউচি তার আপত্তির কথা সরকারি অভ্যন্তরীণ এক পরামর্শ সভায় উচ্চারণ করেছেন। এই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন।  ডা: এন্থনি ফাউচি মনে করেন, এখনো এটা “কান কথা” (এনেকডোটাল এভিডেন্স, anecdotal evidence ) পর্যায়ের তথ্য, ফলে প্রমাণিত সত্য নয়। এমনকি ট্রাম্পের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিএনএনের এক সাংবাদিক প্রকাশ্যেই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ওষুধের কার্যকারিতার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে বিফ্রিংয়ে উপস্থিত, ফাউচির বক্তব্য জানতে চান। কিন্তু ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ফাউচিকে মুখ খুলতে বাধা দেন।  “ফাউচি কথা বলবেন না”  বলে সরাসরি তাঁকে থামিয়ে দেন। মানে, যা বলার ট্রাম্প নিজেই বলবেন। ট্রাম্প এমনকি তার এফডিএ [FDA] কমিশনার স্টেফান হান – এর উপরও চাপ প্রয়োগ করে রেখেছেন যাতে ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিষ্ট্রেশনের কমিশনার হিসাবে তিনি কোন নেতি মন্তব্য না করে বসেন।

    ট্রাম্পের এই টোটকা কানভাসিং টাউটারি এত ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে যে এক মেডিকেল রিসার্চ প্রকাশ করা জার্নাল [International Journal of Antimicrobial Agents (IJAA).] বিবৃতি দিয়ে এই ওষুধ বিতর্ক থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ঐ জার্নাল বলেছে তাদের প্রফেশনাল সমিতি ISAC [International Society of Antimicrobial Chemotherapy ] এর বোর্ড মনে করে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন প্রসঙ্গে যে আর্টিকেল তাদের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তা তাদের আকাঙ্খিত স্টান্ডার্ডের নয়। [The ISAC Board believes the article does not meet the Society’s expected standard]।

    আমেরিকার কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী, সব নির্বাহী ক্ষমতা একহাতে – সেটা প্রেসিডেন্টের হাতে রাখা হয়েছে।  তাই প্রেসিডেন্টের অসংখ্য উপদেষ্টা – পরামর্শক থাকে কিন্তু নির্বাহী তিনি একা। এতে বলাবাহুল্য এর সব দায়দায়িত্বও কিন্তু ঐ একব্যক্তির। তাই ্তার হোয়াইট হাউজে “সিচুয়েশন” রুম [situation room] বলে একটা শব্দ চালু ও বিশেষ রুম আছে। মানে হল যেখানে প্রেসিডেন্ট এসব পরামর্শকদের আলোচনা ও বাদানুবাদের ভিতর দিয়ে ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আমেরিকার এক্সিসিয়স বা AXIOS বা নামের এক ওয়েব সাইট ঐ সিচুয়েশন রুমের বিতর্ক কেমন ছিল এর এক উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা তুলে ধরেছে। যেখানে ট্রাম্প নিয়োজিত এক ব্যবসাবিষয়ক এজেন্ট পিটার নাভাররো [economic adviser Peter Navarro] কে ডাক্তার গবেষক ফাউচি [Dr. Anthony Fauci ] আচ্ছা করে ধোলাই করে দিয়েছেন। ফাউচি সরাসরি বলেন, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  ওষুধের পক্ষে যা বলা হচ্ছে তা আসলে এখনো কানকথা মাত্র [Fauci pushed back against Navarro, saying that there was only anecdotal evidence that hydroxychloroquine works against the coronavirus.]।

    অর্থাৎ মুনাফা কামানোর চকচকে লোভে ট্রাম্প যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছেন। আর কোন ওষুধের টেকনিক্যালবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারকে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নেয়া এখতিয়ার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। যেন কোনো রোগী দেশের প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করে বেছে ওষুধ খাবেন – এটাই ট্রাম্প দাবি করলেন।  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প এই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  ওষুধের ব্যবসাটা ধরতে এতই মরিয়া যে, তিনি এক পর্যায়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে হুমকি ধমকি দিয়ে বসেন [Hydroxychloroquine: The unproven ‘corona drug’ Trump is threatening India for]।

    Hydroxychloroquine: The unproven ‘corona drug‘ Trump is threatening India for– BBC

    ম্যালেরিয়া ও দুই চাপাবাজ সরকার প্রধানঃ
    ম্যালেরিয়া মূলত এশিয়ায় বা আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়। তাই বলা যায় এদিকের রোগ।  তাই দুনিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ উৎপাদনে বড় উতপাদক দেশগুলো হল এশিয়ায়, বিশেষত বড় জনসংখ্যা বা বাজারের দেশ ভারতে। ভারতের তিনটি কোম্পানি ভারতের বার্ষিক চাহিদার চেয়েও ১০ গুণ বেশি পর্যন্ত কাঁচামাল উৎপাদন ও তা থেকে এই ওষুধ পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষম। তাই ট্রাম্প ভারতের মোদীকে ফোন করে আমেরিকায় হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ রফতানি-সরবরাহের অনুরোধ জানান। অর্থাৎ ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত হোক আর না হোক, ট্রাম্প আমেরিকার সরকারি স্টক হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের সরবরাহ দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। যেন ট্রাম্প একটা পাবলিক ইমেজও চাচ্ছিলেন যে, করোনার কথিত ওষুধ সংগ্রহে তিনি কত তৎপর। ওদিকে এই অনুরোধ পেয়ে  মোদিও দেখলেন এটা তারও কথিত ‘দেশপ্রেম’ দেখানোর এবং গলাবাজি একটা বিরাট সুযোগ। তিনি পাল্টা ট্রাম্পকে জানিয়ে দিলেন, নিজ দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে তিনি সাপ্লাই করতে পারছেন না। আসলে এটাও একটা মিথ্যা কথা।  কারণ ভারতের বছরের চাহিদা সর্বোচ্চ ২২ মিলিয়ন পিস। আর উৎপাদন সক্ষমতা ২০০ মিলিয়ন। কিন্তু মোদি আসলে নিজ দেশে দেখাতে চাইছিলেন, তিনি কতই না দেশপ্রেমিক। তাই তিনি ট্রাম্পের ফোন পাবার পরে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ভারত থেকে রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন।  অথচ বড় কথাটা হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা পরীক্ষিত ওষুধও নয়। ভবিষ্যতে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কারণ, ভাইরাসের প্রতিষেধক মূলত ভ্যাকসিন বা টিকা। হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ব্যবহার বড়জোর যেন টোটকা ও সাময়িক। তাও আবার হার্টের অসুখের রোগীর ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মারাত্মক, সেটা রোগীকে মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলার মতো হতে পারে।

    তার মানে মোদী আর ট্রাম্প দু’জনই পাবলিককে বোকা বানাচ্ছেন আর দেশপ্রেম বেচছেন!

    কিন্তু এতে ঘটনা হল উলটা। ব্যাপারটা ট্রাম্প-মোদী দুজনেরই বেকুবিতে তাদের ইজ্জতের ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় যায়। তাই  হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট মোদী আমেরিকাকে সরবরাহের অপারগতা জানানোকে ট্রাম্প খুবই সিরিয়াসলি নিয়ে মোদীকে পাল্টা হুমকি দিয়ে বসেন। ট্রাম্প পাবলিকলি বলে দেন, হয় মোদি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন সাপ্লাই করবেন, না হলে এর পরিণতি ভোগ করবেন [US could “retaliate” if India does not release stocks …]। তামাশার কথা হলো, দুই চাপাবাজ এবার মুখোমুখি হয়ে যাওয়াতে শেষে মোদি দ্রুত সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এবার ‘উল্টো গান’ ধরেন। করোনাকালে দরকারের সময় তিনি মহান উদার সরবরাহদাতা সেজে গেলেন। এবার তিনি আমেরিকার ট্রাম্পকে তো বটেই; সার্কের পড়শিদের মধ্যে বাংলাদেশকেও নিজে থেকে তা সরবরাহের অঙ্গীকার ঘোষণা করলেন।

    এদের বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান আর সরকারপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা কতটুকু তা এখানেই ধরা পড়ে যায়। যেমন- ওষুধ আর পাঁচটা পণ্য নয় যেটা যেকোনো ব্যবসায়ীই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিজেই যথেষ্ট। কাজেই বাংলাদেশ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের আমদানির অনুমতি দেবে কি না সেটি মোদী তো নয়ই, এমনকি এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইস্যু বা এখতিয়ারই নয়। আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের টেকনিক্যাল সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া এই ওষুধ আমদানিযোগ্য নয়। বলাই বাহুল্য, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের প্রমাণিত কার্যকারিতার সার্টিফিকেট না পেলে আমাদের  ওষুধ প্রশাসন এই অনুমতি দিতে পারে না। লন্ডনের বিখ্যাত মেডিকেল প্রফেশনাল জর্ণাল ল্যনসেট [LANCET], এই জর্নালে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে সাবধান করেছে।  বাচ্চাদের  রিমোটিক ফিভার অথবা বয়স্কদের আর্থারাইটিস খুবই জটিল রোগ। সারা দুনিয়া ভুগেছে। বহুকষ্টে ইউনিসেফে ক্যাম্পেইন টিকা ও ওষুধে  যেগুলো দেওয়া হয় তাতে এটা এখন নিয়ন্ত্রিত।  লানসেট বলছে এটা এখন নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলে হলেও এই ওষুধের ব্যবহার  আর্থারাইটিস ও রিমোটিক ফিভার রোগকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

    আসলে ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমেরিকার ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) দুনিয়ায় আদর্শ স্থানীয় বলে মানা হত। এর নিজস্ব ল্যাবে প্রমাণিত ও অনুমোদিত না হলে আমেরিকার কোনো উৎপাদক তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক পণ্য আমেরিকায় বাজারজাত করতে পারে না। কারণ নাগরিক ভোক্তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক সঠিক ও অক্ষতিকর পণ্য ভোগের অধিকার রক্ষার্থেই এফডিএ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। আর এটাকে আদর্শ মেনেই ১৯৮২ সালে এর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের ১৯৮২ সালের বিখ্যাত ওষুধ নীতিতে বাংলাদেশেও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর খোলা হয়েছিল। যদিও ১৯৮২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ওষুধ মালিক দরবেশেরা  এই দপ্তরের যে শক্ত দাঁত বসানোর ক্ষমতা ছিল তা ক্রমশ ভোঁতা করে দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষার বদলে একে ওষুধ মালিকদের অধী্নস্ত করে ফেলা হয়েছে বলে মনে করা হয়।  আমেরিকার এফডিএর সমতুল্য ইউরোপেরও প্রতিষ্ঠান আছে। তবে সুনাম ও স্ট্যান্ডার্ডের দিক থেকে এফডিএ দুনিয়ায় সেকালে অনুসরণযোগ্য মানা হত।

    কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা শুধু তার গ্লোবাল নেতৃত্বের কৃতিত্ব ও গৌরবই হারায়নি, বহু বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ডও ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। ব্যবসা ও মুনাফার স্বার্থের কাছে কোনটা ওষুধ কোনটা নয়, এর ভেদাভেদ গুণ বিচারও লুটিয়ে দিয়েছে। আর ট্রাম্প নাকি সবচেয়ে বড় ওষুধ বিশেষজ্ঞ!

    “Day after day, the salesman turned president has encouraged coronavirus patients to try hydroxychloroquine with all of the enthusiasm of a real estate developer…”

    তাই নিউ ইয়র্ক টাইম বলেছে, ট্রাম্প যে মূলত একজন ব্যবসায়ী মূলত হাউজ বিল্ডিং ডেভেলপার, তার মানে যিনি ‘একজন সেলসম্যান তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন’, তিনিই এখন করোনা সংক্রমণে কোন ওষুধ খেতে হবে, এর বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন!”

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৮ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর “ট্রাম্প যখন ওষুধের ক্যানভাসার“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]