Category: ওয়াল স্ট্রিট Wall Street

  • ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন

    ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন

    গৌতম দাস

     ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3lO

    ট্রাম্প ঠিক কার বিরুদ্ধে লড়ছেন, চীন না বাইডেন – ফাইল ছবি

    ট্রাম্পের চোখে তার বিরোধী কে বা কারা?  কার বিরোধিতা করতে তিনি মাঠে নেমেছিলেন? চীন না বাইডেনের?  ট্রাম্প আমেরিকান সংসদে হামলা-ভাঙচুর, ভেঙে তছনছ করেছেন, কিন্তু কার বিপক্ষে যাবেন বলে? মূলত এনিয়ে তিনিই বিভ্রান্ত! তাই তিনি নিজে এক সিটিং প্রেসিডেন্ট হয়েও সংসদে হামলা করিয়েছেন! আর এতেই আমেরিকান রাষ্ট্রের সক্ষমতা যতটুকু যা ছিল তা নষ্ট করে দেশটিকে আরো কয়েক ধাপ দুস্থ অবস্থায় নিয়ে ফেলে গ্যালেন! পিউ রিসার্চের ফাইন্ডিংস মতে ট্রাম্পের পাবলিক রেটিং এখন ২৯ শতাংশে নেমে গেছে [Donald Trump is leaving the White House with the lowest job approval of his presidency (29%) ]।  এদিকে আমেরিকার এখনকার মারাত্মক অর্থনৈতিক সমস্যা হল মুখ্যত কোভিড ভাইরাস মোকাবেলায় ট্রাম্পের চরম অক্ষমতা-জাত। এক দিকে চার লাখের মত মানুষের ভাইরাসে মৃত্যু, সাথে বেকারত্ব, অর্থনীতিতে ধস প্রভৃতি। যে দিকটা ভেবেই সম্ভবত বাইডেন শপথ নেয়ার আগেই প্রায় ১.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ‘অর্থনীতি রিকভারি পরিকল্পনা” [Biden Seeks $1.9 Trillion for Relief in First Economic Plan] সিনেটে অনুমোদনের জন্য পেশ করতে রেডি করেছেন। সিনেটে বাই-পার্টিজান হয়ে তাই দুই দল একসাথে কেবল ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টে নিয়ে মেতে থাকা নয়, বাইডেনের নতুন ক্যাবিনেট অনুমোদন বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনুমোদনের মত জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করতেও নিজেদের মধ্যে সময় ভাগাভাগি করে কাজ করার আলাপ-আলোচনা করছেন [Senate to split time ...।]।  এখন অন্তত আগামী এক বছরের মধ্যে এসবের ফলাফল যদি ইতিবাচক হয়ে ফলতে থাকে, তবে মধ্যবিত্ত, স্বল্প আয় ও পেশার মানুষের ট্রাম্প সম্পর্কে তাদের ইতি-মূল্যায়ন থাকলে তাতে বদল আসবে। আর এতে তাদের নিজ হতাশ জীবন পেছনে ফেলে সামনে আগাতে তারা ইতিবাচক দিশা পেতেও পারে!

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার আয়ু আর মাত্র দুই দিন। কিন্তু ক্ষমতার টার্ম শেষ হওয়ার শেষ দুই সপ্তাহ যেন কঠিন থেকে কঠিনতর অসহায়ত্বের দিন হয়ে ট্রাম্পের কেটেছে। প্রতিদিনই নতুন আরেকটা খারাপ কিছু ঘটে চলেছে। এভাবে গত ১৩ জানুয়ারি আমেরিকান সংসদে (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে) তিনি ইমপিচড হয়েছেন [Trump Impeached for Inciting violent Insurrection]। নিজ দলের ১০ জন সদস্যও তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ আইনত তিনি এখন দাগী বা ইমপিচড। আর তার বিরুদ্ধে ‘ইনসাইটিং ভায়োলেন্ট ইনসারেকশন’ [inciting violent insurrection] বলে এবারের ইমপিচমেন্টে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলা হয়েছিল। যার বাংলা হল – প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ‘সহিংস বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা করতে উসকানি’ দিয়েছেন। যদিও এটা আংশিক, মানে ইমপিচমেন্টের পুরো আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি এখনো। কারণ আমেরিকান সংসদ আমাদের মত একটা না দুইটা, মানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। অর্থাৎ আমেরিকার আরেক সংসদ আছে যেটাকে ওরা সিনেট বলে। প্রতি রাজ্য থেকে দু’জন নির্বাচিত সিনেটর নিয়ে এই সিনেট গঠিত। তবে আমেরিকান কনস্টিটিউশন অনুসারে, সংসদ সদস্য বা আইনপ্রণেতাদের দুটো কক্ষ (সিনেট ও হাউজ) থেকেই একই বিল অনুমোদন পেলে তবেই এরপর সেটি ‘পালনীয় পূর্ণ আইন’ বলে বিবেচিত হয়। তাই এখন সিনেট থেকেও ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাস হওয়ার অপেক্ষায়; প্রস্তুতি চলছে।

    ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার আগে কি সিনেটেও ইমপিচমেন্ট শেষ হবে?
    এর একেবারেই সংক্ষিপ্ত জবাব, মনে হয় না। পরিস্থিতি সম্পর্কে এক্সপার্ট এক্সপ্লেনারের ব্যাখ্যা হল, এটা সম্ভব নয়। এক কথায় বললে ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি তার টার্ম শেষে হোয়াইট হাউজ ছেড়ে যাওয়ার পরেই কেবল সিনেটে ওই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব উঠবে। এটাই এক্সপার্ট অপিনিয়ন। এর মানে, তাহলে ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট না থাকলেও সিনেটে তাঁকেই ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব কী জীবিত থাকছে? হ্যাঁ, ঠিক তাই, থাকছে। আর এর একটা কারণ হল, সংসদ বা হাউজে উঠা প্রস্তাব ও তা পাস হওয়ার পর তা সিনেটেও পেশ ও পরিণতিতে ভোটাভুটিতে যাই হোক তা সম্পন্ন হতেই হবে। কারণ প্রস্তাব একবার উঠেছে যখন, এর প্রক্রিয়া শেষ হতে হবে। আর দ্বিতীয় কারণ হল, যদি সিনেটেও ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবটা পাস হয়ে যায় তখন এরপরেও আরেক বাধ্যতামূলক কাজ বাকি থাকবে। সেটা হল, সিনেটের প্রস্তাব পাস হওয়া মানে তখন সেটা গৃহীত হয়ে যাওয়া এক আইন। যার সোজা অর্থ, ট্রাম্প দোষী ও অযোগ্য বলে প্রমাণিত। তাই এর সাথে তখন যে প্রশ্নটা উঠবেই যে, তা হলে ট্রাম্প কী এরপরও পাবলিক অফিসে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য থাকবে? এ বিষয়টির মীমাংসা করতে হবে। কারণ সেটা মীমাংসা করতে আবার কেবল সিনেটেই আরেকটা প্রস্তাব তুলতে হবে। সেটা হলো, ইমপিচড হয়ে যাওয়া ট্রাম্প এরপরে পাবলিক অফিসে কোনো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য কি না – এ প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটি করা।
    তবে এখানে আমাদের একটা জিনিস পরিষ্কার রাখা দরকার। ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব হাউজে যখন প্রথম তোলা হয়েছিল, সেখানে তা পাস হওয়ার নিয়ম ছিল, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হলেই পাস মনে করা যায় সেখানে। মানে ঐদিন উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ‘সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের’ (৫০%+) পক্ষভোট পেলেই যথেষ্ট। আর তাতে ট্রাম্প হাউজে ইমপিচড হয়েছিলেন ২৩২/১৯৭ ভোটে। কিন্তু এরপর ওই প্রস্তাব সিনেটেও পাস করতে গেলে সেখানে এবার তা হতে হবে দু-তৃতীয়াংশ (৬৭%) ভোটে। কিন্তু আবার এরপরে সিনেটেই অভিযুক্ত ট্রাম্প জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য থাকবেন কি না এ প্রস্তাব ভোটে উঠলে তখন এবার সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হলেই তা পাস হয়ে যাবে। এভাবেই ইমপিচমেন্টের পুরো প্রক্রিয়াটা কনস্টিটিউশন অনুসারে সম্পন্ন হবে বলে মনে করা হয়।

    এদিকে যদিও নিয়ম অনুসারে হাউজে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব (একে আর্টিক্যাল বলা হয়ে থাকে) পাস হওয়ার পরে এরপর সিনেটে তা পৌঁছে দেয়ার দায়িত্বটা কনস্টিটিউশন দিয়েছে হাউজ স্পিকারকে (এখানে ডেমোক্র্যাট স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে)। কথা আরো আছে, তিনি কবে তা সিনেটে পাঠাবেন এর বিবেচনার ভার কনস্টিটিউশন স্পিকারের নিজের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্পিকারের আরেকটা বড় কাজ আছে।  ঐ প্রস্তাব হাউজে কী প্রেক্ষিতে পাস হয়েছে, তা সিনেটে গিয়ে সেটা নিয়ে ব্রিফ ও ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য আগেই স্পিকার ৯ জন ম্যানেজার বা এজেন্ট সিলেক্ট করে সিনেটে নাম পাঠিয়ে দিবেন বা দেয়ার কথা। ইমপিচ-প্রস্তাব আলোচনার সময় সিনেট এদের থেকে তা শুনে নিবে। সেই ম্যানেজার নিয়োগের কাজও পেলোসি শেষ করেছেন এরই মধ্যে।

    আবার ইতোমধ্যে সিনেটেরও কিছু ডেভেলপমেন্ট বা নতুন ঘটনা আছে। চলতি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আছে রিপাবলিকানরা আর এর নেতা হলেন ম্যাক-কনেল [Mitchell McConnell Jr.]। কিন্তু ২০ জানুয়ারি থেকে নতুন নির্বাচিত সিনেটে, সেখানে ভোটের স্টাটাস হয়ে যাবে রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট সমান সমান ৫০, এরকম। তবে আমেরিকান কনস্টিটিউশনে এরও সমাধান দেয়া আছে। রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট যিনি থাকেন তিনিই পদাধিকারবলে সবসময় সিনেটের প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট হলেও তিনি ঐ সিনেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে আসেন কেবল কোন বিশেষ অনুষ্ঠান হলে অথবা সিনেট অধিবেশনে পক্ষে-বিপক্ষে সমসংখ্যক ভোট পড়েছে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে। কারণ কেবল তখনই তিনি সিনেটের ভোটাভুটিতে কোন একটা পক্ষে নিজের ভোটটা প্রদান করে প্রস্তাবে সিদ্ধান্তমূলক ফলাফল এনে দেন। অর্থাৎ এটা বলা যায় যে এবার সিনেটে ডেমোক্রাটদের পক্ষে।  নইলে সাধারণ সময়ে, সিনেট পরিচালনা করে থাকেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা যিনি থাকেন তিনিই পদাধিকারবলে  এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

    এসবের সোজা মানে এখন সিনেটেও ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পাস হতে গেলে ৬৭টা ভোট লাগবে, অর্থাৎ ন্যূনতম ১৬টি রিপাবলিকান ভোট লাগবে। আর সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসেরও ভোটটা, এমন হতেই হবে। কিন্তু কমলা হ্যারিস শপথ নেবেন বাইডেনের সাথেই আগামি ২০ জানুয়ারি। আর এদিকে চলতি সিনেট যা ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলে টার্ম শেষ করবে এতে ডেমোক্র্যাটরা ৫৭/৪৭-এ মাইনোরিটিতে আছে।

    এসব বিবেচনায় আমেরিকান মিডিয়ার দুটো (এপি আর নিউ ইয়র্ক টাইমস) এক্সপ্লেনার রিপোর্ট বলছে, আগামী ১৯ জানুয়ারির আগে পেলোসির ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব সিনেটে পাঠানোর সম্ভাবনা নাই। কারণ তখনই একমাত্র ডেমোক্র্যাটরা সিনেটেও শক্তিশালী হবে। এছাড়া বর্তমান মেজরিটি লিডার রিপাবলিকান ম্যাক-কনেল জানিয়েছেন, ১৯ জানুয়ারির আগে সিনেট বসার কোন শিডিউল এখনো পর্যন্ত নাই। আর ইমপিচমেন্ট প্রসঙ্গে তার অবস্থানটা হল, তিনি ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের পক্ষেই ভোট দিতেন হয়ত কিন্তু তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রস্তাব আনতে চান না। আবার ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত তার সদস্য থাকার শেষ দিন। এথেকে বুঝা যায় যে, এবিষয়ে  এক্সপ্লেনারদের  ব্যাখ্যা কেন ব্লছে যে ২০ তারিখের আগে কিছু হবে না!
    সাথে আরেকটা খবর দিচ্ছে রয়টার্স যে, ক্ষুব্ধ ক্ষ্যাপাটে ট্রাম্পকে সামলাতে তার স্টাফরা পেরেশান দশায়। আর ২০ জানুয়ারি শপথের দিনেই সকালে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ ও ওয়াশিংটন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। সম্ভবত ফ্লোরিডায়, থাকবেন সেখানেই।

    এবার আসা যাক ট্রাম্প আমেরিকাকে কোথায় নিয়ে এনে ফেললেন তাহলে? এর পরিণতি কী হবে?
    প্রথম কথা, এখনো যে দিকে বেশির ভাগ মিডিয়া বা আলোচক ফোকাস করতে চাইছে না; তা হল ট্রাম্পের সমর্থক কারা, আমেরিকান সমাজের কোন অংশ? এবং কেন? নিশ্চয় আমরা মনে করব না যে ট্রাম্পের সমর্থকরা সব ট্রাম্পের মতোই পাগলাটে অথবা যাদের আচরণের দিশা বুঝা বা কার্যকারণ বের করা সহজ না। রাজনৈতিকভাবে দেখলে ট্রাম্পের সমর্থকরা মূলত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা। বিভিন্ন নামে এদের সংগঠন আছে, ডেরা আছে। এদের সাথে ট্রাম্পের প্রমোটার যারা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ২০১৬ সালে পেশ করেছেন, এমন লোকদের বুঝাপড়া আছে যে, ট্রাম্প সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিদের দাবি ও তাদের চিন্তাগুলো পপুলার করতে সহায়তা করবেন। এছাড়া আবার ট্রাম্পের ভোটার-সাপোর্টার যারা তাদের বড় অংশ হল মূলত স্বল্প আয়ের বা ছোট এন্টারপ্রাইজ, ছোট উদ্যোক্তা অথবা গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের ধাক্কায় চাকরি হারানো নানা ধরনের মানুষের বিরাট অংশ।

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুনিয়া এখন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এক পালাবদলের জাংশন পয়েন্টে। চীনা উত্থানের এই পর্বে সব দেশের তো বটেই, এমনকি পুরনো গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতিতেও এর বড় ছাপ পড়বেই। আগের নেতা হিসেবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ যেসব পেশা বা প্রডাক্টকে সে সহজেই জন্ম ও প্রটেক্ট করতে পারত, সেই ক্ষমতা আমেরিকার কমে যাচ্ছে, কমে নিঃশেষ হওয়ার পথে যাচ্ছে। তবে এসব পেশা উদ্যোক্তাদের জীবনের আর কোনই সম্ভাবনা নেই, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং ব্যাপারটা একটা ঢেলে সাজানো ধরনের কিছু; যা  পুরনোদের একেবারেই বাদ দেয়া নয়। বরং নতুন কিছু করা, কিছুর বেলায় নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার সুযোগ বের করা, কিছুতে  নিজের প্রতিযোগী অবস্থান ধরে রাখতে  নিজে লাভ ছাটাই করে প্রতিযোগিতায় নেমে যাওয়া ইত্যাদি এসব করে পেশা উদ্যোক্তাদের অনেকটাই বাঁচানো সম্ভব। আর সর্বোপরি চীনের সাথে একটা বড় বারগেন করা। যত বেশি পারা যায় (কৃষি বা শিল্পপণ্যের) বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে আসা, তেমন রাজনৈতিক নেগোসিয়েশন করার সুযোগ এখনো যা আছে তা ব্যবহার করা। এক কথায় চীনকে গ্লোবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে নিজের পক্ষে বাজার ছাড় যতটা সম্ভব ফিরিয়ে হাতে আনা, ধরে রাখার জন্য দরকষাকষি করা – এই মূলনীতিতে চলা। বাইডেন সম্ভবত সে দিকেই যাচ্ছেন।  কিন্তু এমন অনুমানের ভিত্তি কী? কারণ হংকংভিত্তিক এশিয়ান টাইমসে এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে কুর্ট ক্যাম্পবেল [Kurt Campbell] এই নামের ওবামা আমলের এক সহকারি-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর [assistant secretary of state for East Asian and Pacific affairs] কথা বলা হয়েছে। যদিও তিনি ভুমিকা রাখবেন বাইডেন প্রশাসনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অফিসে, পররাষ্ট্র দফতরে নয়। আর সেটা বাইডেন যাকে  ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার বলে পছন্দ করেছেন সেই জ্যাক সুলেভান [Jake Sullivan] হলেন ক্যাম্পবেলের পলিসি পেপার লেখার সহ-লেখক। তাঁদের যৌথভাবে লেখা ও ফরেন এফেয়ার্সে প্রকাশিত তাঁদের সে লেখার শিরোনাম “Competition Without Catastrophe: How America Can Both Challenge and Coexist With China,” । অনুমান করা হচ্ছে এটাই হবে বাইডেনের চীন-নীতির প্রধান অভিমুখ। লেখার শিরোনামটা বাংলায় বললে তা হবে, কোন বিপর্যয় না ঘটিয়ে প্রতিযোগিতা করাঃ কি করে আমেরিকা চীনকে চ্যালেঞ্জও করবে আবার চীনের সাথে একসাথে টিকে থাকার নীতিতে চলতে পারে”।  এই কথাটাকেই উপরে বলেছিলাম, – “চীনকে গ্লোবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে চীনের থেকে আপোষে নিজের পক্ষে বাজার ছাড় যতটা সম্ভব ফিরিয়ে হাতে আনা, ধরে রাখার জন্য দরকষাকষি করা – এই মূলনীতিতে চলা”।

    যদিও গত চার বছর ট্রাম্প এর উল্টো পথে চলেছেন। ট্রাম্প ও তার প্রমোটার ও অদৃশ্য উপদেষ্টারা ভেবেছেন, এগুলো হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের মত সংগঠন বা তাঁদের চিন্তা দিয়ে পরিচালনা করতে হবে। আর কথিত আমেরিকান “জাতিকে” চীনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে পারলেই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। এছাড়া যদিও একথা সত্য যে, আমেরিকা এখনো সামরিকভাবে চীনের থেকে ৬-৮ গুণ বড় বা শ্রেষ্ঠ। কাজেই এদের অনুমান, এই কারণে আমেরিকা কেন চীনের কাছে হেরে যাবে বা হার স্বীকার করবে! কিন্তু এদের এমনই চিন্তার ত্রুটির দিকটা হল এরা মনে করে, চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে পাল্টা যেন আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব!

    গত ৮ জানুয়ারি রয়টার্স একটা ইন-ডেপথ নিউজ করেছে; যার শিরোনাম হল – ‘ট্রাম্পের ফ্যানরা সহিংসতার নিন্দা করে কিন্তু তাই বলে ট্রাম্প এজন্য দায়ী তা আবার মনে করে না [Trump’s fans condemn violence, but they aren’t about to blame him]।’ গত ৬ জানুয়ারি আমেরিকান সংসদে হামলার পর রয়টার্স দেখানোর চেষ্টা করেছে যে ট্রাম্পের ভোটার সমর্থক কারা? কেমন পেশার লোকজন আর সংসদে হামলা নিয়ে তাদের ক্ষোভ বা বক্তব্য কী? দেখিয়েছে, এরা ছোট শপে, রেস্টুরেন্টে বা সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি করে। তাদের দাবির সারকথা হিসেবে রয়টার্স বলছে, তারা কেউই এখনোও ট্রাম্পকে ত্যাগ করতে চায় না। বরং তাঁদের ধারণা ট্রাম্প হল তাদের আর্থিক অবস্থা-পরিস্থিতির পক্ষের প্রবক্তা, তুলে ধরার লোক। কিন্তু তাই বলে তারা সংসদে ভায়োলেন্স বা সহিংসতার দায় নিতে চায় না। ট্রাম্পের উপরেও দিতে চায় না। কারণ এতে আইন ভাঙ্গার দায় আছে। যা তাঁদের শ্রেণীর লোকেরা অবশ্যই জড়িত নয়। মূলত কর্মজীবি তারা ঐদিন সংসদে হামলা করতে  সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সাথে সঙ্গী হয় নাই।

    যদিও বলছি, গত চার বছর ট্রাম্প চলেছেন উল্টো বা ভুলনীতি নিয়ে। নিজের ক্ষ্যাপাটে নীতিতে। একটা উদাহরণ এখানে টানলে বাস্তবতাটা আরও স্পষ্ট বুঝা যাবে। যেমন ট্রাম্প এতদিন সাধারণভাবে আমেরিকায় উপস্থিত চীনা কোম্পানির উপর বা বিরুদ্ধে  খড়গহস্ত হওয়ার নীতিতে চলেছিলেন। চীনা কোম্পানিমাত্রই, বিশেষ করে টেলিফোন কিংবা ইলেকট্রনিকস সম্পর্কিত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আমেরিকা থেকে তথ্য পাচার করছে অথবা এরা চীনা সামরিক বাহিনীর সাথে জড়িত ভাড়াটে অথবা বাহিনীর হয়ে তথ্য পাচার করছে, – ইত্যাদি এগুলাই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের কমন অভিযোগ বা উছিলা। কিন্তু কোনোটার বেলাতেই তিনি কোনো প্রমাণ সাথে হাজির করেননি। নেহায়তই কখনো কোনো চীনা লোকের বিরুদ্ধে আদালতে যা ক্ষুদ্র বা পেটি মামলা দেয়া হয়েছে প্রপাগান্ডার সুবিধার জন্য, তাও বেশির ভাগই আদালতেও টিকাতে পারেননি। কিন্তু জাতিবাদী বা বিদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা যা ট্রাম্পের এক বিশেষ অস্ত্র যা সাদা সুপ্রিমিস্টদের জন্য খোরাক ও ভুয়া সুসংবাদ – এসব ঠিকই এই পেটি অভিযোগগুলো ব্যবহার করে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেয়া হয়েছে। যেমন টিকটক সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়েও একইভাবে তিলকে তাল বানানো হয়েছে; অতথ্য পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। আবার যতই আমেরিকা গত নভেম্বরের নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছিল, সেখানে ভোট পেতে পাবলিককে প্রভাবিত করতে ততই তিনি এসব প্রপাগান্ডা চরমে তুলছিলেন। এতে শেষের দিকে তিনি আরেক নতুন নীতি হাজির করলেন। যেমন – চীনা টেক জায়েন্ট কোম্পানি – টাইটানস [Titans], আলিবাবা [Alibaba], টেনসেন্ট [Tencent], বাইদু [Baidu] ছাড়াও আরো ৯ বড় জায়ান্ট চীনা কোম্পানির নামের একটা লিস্টর বানিয়ে ট্রাম্প এবার দাবি করলেন, এগুলো চীনা সেনাবাহিনীর সাথে জড়িত কোম্পানি। এরপর সরকারি নির্দেশ জারি করলেন যে, এসব কোম্পানির সাথে আমেরিকানরা বিনিয়োগ-ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে পারবে না।

    কোনো দেশ গ্লোবাল পাওয়ার হতে গেলে বা গ্লোবাল পাওয়ারের লক্ষণ হিসেবে কী থাকতে হবে এই প্রশ্নের জবাবে দুনিয়াতে মানা হয় যে ঐ দেশটা হাইটেকে কত এগিয়ে আছে, কত তার দখল এবং সর্বোপরি হাইটেকে তার মোট বিনিয়োগ কী পরিমাণ ইত্যাদি এগুলোই হল সেই বিচারের লক্ষণ।
    সম্প্রতি হংকংভিত্তিক এশিয়ান টাইমস এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীনের টেক কোম্পানি টাইটান নিয়ে। লিখেছে “ট্রাম্প চায়না টেক জায়েন্ট কোম্পানি টাইটানস-কে সাদা পতাকা দেখিয়েছে” [Trump waves white flag at China’s tech titans]।’ এখন কেন? অথচ নভেম্বর নির্বাচনের আগের ট্রাম্পের প্রপাগান্ডায় তো মনে হচ্ছিল এই তথ্য পাচার বা বিদেশি সেনা প্রসঙ্গ [যেটা জাতিবাদি রাজনীতিতে কথিত দেশপ্রেমি পাবলিককে ক্ষেপিয়ে তুলার খুবই সহজ অস্ত্র মানা হয়] তুলে তারা না চীনের সাথে যুদ্ধি না বাধিয়ে দেয়! তাহলে এখন কেন ট্রাম্প সুর বদলিয়ে নিচ্ছেন? গত নভেম্বরেরই তো নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নির্বাহী নির্দেশ জারি করেছিলেন চীনা টেক কোম্পানির বিরুদ্ধে। অথচ আজ এর উল্টো করছেন। কেন?

    কারণ ট্রাম্পের ওই সিদ্ধান্তের পর ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্সের মতো আরো গ্লোবাল মিডিয়া এ সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। ওয়ালস্ট্রিট কী লিখেছিল তা এখানে জানা যাচ্ছে ।  আলিবাবা বাইদু নিউ ইয়র্কে রেজিস্টার্ড কোম্পানি, টেনসেন্ট হংকংভিত্তিক। এই তিন কোম্পানির মোট বিনিয়োগ হলো ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা অস্ট্রেলিয়ার ইকোনমির চেয়েও বড়। ট্রাম্পের কী সে খবর আছে?
    অর্থাৎ আসলে ওরা বলতে চেয়েছে, আমেরিকার পক্ষে এমন পাল্টা ট্রিলিয়ন ডলারের টেক কোম্পানি জন্ম দেয়ার সক্ষমতার দিন পেরিয়ে গেছে। কাজেই ওসব কোম্পানির সাথে আমেরিকার ব্যবসায়িক সম্পর্কও যদি ভেঙে দেয়া হয়, তবে আমেরিকা ততই আরো এই টেকনোলজিতে “কেউ না” হয়ে যাবে। যেমন এদিকে মোবাইল ফোনের ৫জি টেকনোলজিতে চীন এরই মধ্যে লিড নিয়ে ফেলেছে। আর আমেরিকাই কেউ না হয়ে গেছে।  যেখানে আমেরিকা কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে চলতি শতকের শুরু থেকেই ফোন টেকনোলজি থেকে ছিটকে পড়ে আমেরিকা  ‘কেউ না’ হয় গেছে। আর ইউরোপ কেবল কোন মতে ৫জিতে ছোট তরফের কোম্পানি হয়ে আছে।

    সারকথায় কোন গ্লোবাল নেতার মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা ঢলে পড়লে  তখন থেকে আর এর সবাইকে শাসানো কিংবা ডমিনেট করার ক্ষমতা কোথাও থেকে যোগাড় করতে পারে না। সাধারণভাবে আমেরিকা ও বিশেষ করে ট্রাম্পের আমেরিকা এখন এমন লুজার হয়ে গেছে।  তাই এই অবস্থায় ট্রাম্পের মত জাতিবাদী নেতারা  তখন আর আমেরিকা ফার্স্ট বা জাতিবাদী স্লোগান বা সাদা সুপ্রিমিস্ট জজবা তুলে কিছুই ঠেকাতে পারবে না। চেয়ে চেয়ে কেবল নিজের হার আর দুর্দশাই দেখার দিকেই এরা ক্রমশঃ যাচ্ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৬ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ট্রাম্পের শত্রু কে, চীন না বাইডেন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

    ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

    গৌতম দাস

     ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2VO

    করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। এখন কোনো দেশী অথবা বিদেশী মিডিয়া যেটাই খুলা যাক, দেখা যাবে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নিউজের বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। দুনিয়াতে এখন এই ভাইরাসের প্রভাব এতই মারাত্মক। আরেক অদ্ভুত দিক হল – যা আমাদের ঘরে ঘরে ঠিক তা দুনিয়াজুড়েও – আগে দেখা যায়নি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি।  শুধু আমরাই যার যার ঘরে বন্দি নয়, এটা সারা দুনিয়ারই চিত্র। ভাইরাস দাবি করছে “নো কনটাক্ট”, কোন যোগাযোগ লেনদেন ্সব বন্ধ করতে হবে। অথচ  ব্যবসা বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের যোগাযোগই অর্থনীতি।  তাই সোজা মানে দাঁড়াল, আমরা ভাইরাস মোকাবিলায় যত সচেষ্ট ও সফল ততই যেন অর্থনীতি বিকল হবে – এ’এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে এখন আমরা দুনিয়ার সকলে।  সামগ্রিক এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা একটা গ্লোবাল মহামন্দার দিকে যাচ্ছি, কেউ কেউ অবশ্য দাবি করছেন, আমরা ইতোমধ্যেই মন্দায় প্রবেশ করে ফেলেছি [Clear We Have Entered Recession That Will Be Worse Than 2009: IMF Chief]।

    জি৭  ও জি২০
    মহামন্দার শঙ্কা যে সবাইকে ভীত করে ফেলেছে এর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হল, অকালে প্রথমে ‘জি৭ [G7]’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠক। আর পরে ‘জি২০’ [G20] অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক। কিন্তু এর আয়োজনের ধরন বলে দিচ্ছে, এ ধরনের গ্লোবাল সামিট হচ্ছে যার যার দেশে বসে ভার্চুয়ালি মানে ভাবের মধ্যে, যা দেড় ঘণ্টার এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ মাত্র। এখনকার আরেক গ্লোবাল হয়ে ওঠা শব্দ হল ‘ডিস্টান্সিং’ [distancing]। এর মানে হল, কাছে এলেও দূরে দূরে থাকা। প্রথমত আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বন্দী হয়ে বাস করতে হবে সবাইকে কিছু দিন বা হয়ত মাস। আর এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে যদি দেখা করতেই হয় তবে পাঁচ-সাত ফুট দূরে দূরে থেকে কথা বলতে বা লেনদেন করতে হবে। স্বভাবতই এমন গ্লোবাল পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার ঘণ্টা বাজারই এমন সময়ে ইমার্জেন্সি গ্লোবাল সামিট হবে দেড় ঘণ্টার, এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ – এটাই স্বাভাবিক।

    রাষ্ট্রজোট জি৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলো হল – আমেরিকা, কানাডা আর সাথে আরো চার ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার একমাত্র জাপান। এভাবে গ্লোবাল (মুলত) অর্থনীতিক পলিসিতে  সাত রাষ্ট্রের এক সমন্বয় গ্রুপ জি৭। এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ জি৭-এর কোন রাজনৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এক বিশেষ ক্ষমতার। কারণ কোনো ইস্যুতে (সাধারণত অর্থনীতির ও গ্লোবাল ইস্যু) তারা একমত হয়ে গেলে এর প্রভাব বাকি সব রাষ্ট্রের উপর অনেক বড় ও নির্ধারক হয়ে ওঠে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে যেমন বিশ্বব্যাংকের মালিকানাই ধরা যাক; জি৭ দেশগুলোর বিশ্বব্যাংকের মালিকানা সব মিলিয়ে মোট ৩৫% এর বেশি হবে, যেখানে আমেরিকার একা মালিকানা  ১৮% এর মত। ফলে স্বভাবতই তাদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত বাকি সবার জন্য অনেক ভারী ও খুবই নির্ধারক।
    তবে উপরের কথাগুলো অতীত ঘটনা হিসেবে বলা সম্ভবত বেশি সঙ্গত।  কারণ এরা ‘পুরান জমিদার’, যার ঠাটবাট আছে কিন্তু বাস্তব মুরোদ আর নেই; শুকিয়ে ফোকলা হয়ে গেছে। পুরানা মাতবর আমেরিকার জায়গায় চীন এসে প্রবেশ করাতে আস্তে আস্তে অনেক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে, রঙ ফিকে হয়ে পড়ছে। আর সেই সাথে নতুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
    যদিও জি৭ নিয়ে অনেকে সবচেয়ে বিরক্তিকর ভাষায় বলার চেষ্টা করেন, এরা নাকি “সেভেন ডেমোক্রেসিজ”। কেন? চীনের বিরুদ্ধে পুরান ডাট দেখানোর জন্য। এমনিতেই ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটাই তৈরি করা হয়েছিল পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোপানোর জন্য   অ্যামেরিকান শব্দ হিসাবে। অরিজিনাল ক্লাসিক শব্দটা ছিল রিপাবলিক, এর বদলে ডেমোক্রেসি শব্দের আমদানি।  এছাড়া, একালে একা চীনা নেতৃত্বেই পাল্টা বিকল্প-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক হতে চাইবার মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে গেছে। জি৭ বা এর সদস্যরা এখনো (মুরোদ না থাকলেও গুণ-মানে) চীনের চেয়ে তারাই ভাল, এমন ভাব ধরার জন্য এটা বলে থাকে। ফ্যাক্টস হল একা চীনের এখন ঋণ- বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি। সে কারণে চীনা নেতৃত্বের নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই মাথা তুলছে, প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। মূলকথা, ইতোমধ্যেই তারা বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করে ফেলেছে। যেমন এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিশ্বব্যাংকের বদলে সরাসরি চীনের বা চীনের ‘বিশ্বব্যাংকে’র কাছে অবকাঠামো ঋণ নিতে যেতে পারেন।
    আসলে লাশের বাক্সে শেষ পেরেকটা মেরেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street]। মানে, গ্লোল্ডম্যান স্যাসের [Goldman Sachs] মত দানবীয় বড় বড় অর্থবিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতীকী উপস্থিতি বা প্রধান অফিস যেখানে। গত ২০০৯ সালে তারা আওয়াজ তুলে বলেছিল জি৭ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। কারণ এদের অর্থনীতি আর আগের মতো নয়, তাকত নাই বরং ঢলে পড়েছে। আর পালটা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে “রাইজিং ইকোনমি” [Rising Economy] বলে পরিচিত আরেক ক্যাটাগরির দেশগুলো যাদের জিডিপি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দ্রুত বাড়ছে। কাজেই ‘তাদেরও পুরানা জি৭-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলাদা পরিসরে  জি২০ নামে জোট গড়া হোক। এই দাবি ছিল এমনই এক বাস্তবতা, যে তাই জি২০ গ্রুপ কার্যকর হয়ে যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন এরা দুনিয়ার টপ ২০টা ইকোনমির একটা গ্রুপ। সেটা যতটা না সত্যি, এর চেয়েও সত্য হল, চীন মানে যার নিজের আছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজার, সাথে আছে এর চেয়েও বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্য দেশে ঋণ-বিনিয়োগদাতা হয়ে হাজির হবার সক্ষমতা; আর পাশে ভারত যার অভ্যন্তরীণ ১৩৬ কোটির বড় ভোক্তাবাজার আর, উৎপাদন সক্ষমতার পটেনশিয়াল আছে; এ ছাড়া ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত মিলে গঠিত হয়েছে এই জি২০। তাই গত সপ্তাহে (২৬ মার্চ) জি২০ এর ভিডিও কনফারেন্সের নয় দিন আগে (১৭ মার্চ) জি৭-এর একই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হইয়ে যায়। বলাবাহুল্য, জি৭ জি২০ এর অংশ অবশ্যই। আর প্রতিটি জি২০ বৈঠকের আগে জি৭-এর সভা হয়ে যায়, যাতে ‘জি৭-ওয়ালা’রা মাতবরি নিবার সুযোগ পেয়ে গেলে জি২০-এর বৈঠকে একই স্বরে কথা বলতে পারে।

    এদিকে ভাইরাসের ব্যাপকতায় এখন আর লুকানো থাকছে না যে, আসন্ন এক গ্লোবাল মহামন্দার মখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা সকলে। তাই জি২০ অর্থমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্সের মূল কথাটা ছিল, তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন অর্থ ঢালবেন যাতে গ্লোবাল বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এনিয়ে তাই রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম G20 leaders to inject $5 trillion into global economy in fight against coronavirus। জি২০ এর এখনকার চেয়ারম্যান সৌদি আরব। তার নেতৃত্বেই এ ঘোষণা দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার মানুষের চাকরি আর আয়ের ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এনিয়ে আলজাজিরার শিরোনাম হল, ‘কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে গ্লোবাল অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াইয়ে জি২০-এর পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি [  G20 pledges $5 trillion to defend global economy against COVID-19]।

    কিন্তু তাহলে জি৭-এর বিবৃতি বা রিপোর্ট কই? সেখানে কী বলা হয়েছে?
    সরি, সেটা নাই। কেন?  এর কারণ আসলে জি৭-এর সভা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি দিতেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। আর বলতে গেলে, এর কয়েকদিন পরে জি২০ থেকে ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

    কেন জি৭ ব্যর্থ হল? কারণ, আমেরিকা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে।  তাই এর খাড়া জবাব হুল, ট্রাম্পের আমেরিকা এক দায়িত্বজ্ঞানহীন তৎপরতা এর জন্য দায়ী। সেটা কীভাবে? এবার জি৭-এর সভা ছিল মূলত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে ঐ সভায় উপস্থিত মানে ভার্চুয়ালি ওয়েব কনফারেন্সে হাজির ছিলেন। আর তিনি যেন চাকরি রক্ষার্থে পাগলা প্রেসিডেন্টের আনুগত্যের এক চরম দশা দেখাতেই নিজের কোন বিদ্যাবুদ্ধিও খরচ করেন নাই। আর তাতেই বিবৃতি ড্রাফটের সময় তিনি গোঁ-ধরে বসেন যে, ভাইরাসটাকে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নয়, বরং ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলতে হবে। আর এতে স্বভাবতই ইউরোপীয়সহ কোনো সদস্য রাষ্ট্রই তা মানতে রাজি না হওয়ায় সব নস্যাৎ হয়ে যায়। সদস্যরা আর একমত হতে পারে নাই। কারণ তারা মনে করেছিল যখন ভাইরাস সামলাতে ঐক্য দরকার তখন একাজ হবে বিভক্তি তৈরি করা  [viewed it as needlessly divisive at a time when international cooperation is required to slow the global pandemic …]। ফলে ড্রাফট আর ফাইনাল পর্যন্ত যায় নাই। তবে এতে পরবর্তিতে ট্রাম্পকেই এর সব ‘কাফফারা’চুকাতে হয় অবশ্য।

    আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী নভেম্বর মাসে। আর ট্রাম্প এবারো এতে প্রার্থী। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এক বিরাট লড়াকু যিনি এই প্রথম জাতিবাদী-আমেরিকান হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ লড়ছেন। এ্মন ইমেজ আর প্রপাগান্ডা জোরদার করতেই তিনি কোভিড-১৯ কে ‘য়ুহান ভাইরাস’ [চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী য়ুহানে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়] বলে ডাকার বালকসুলভ আবদার ধরে বসেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এমন প্রপাগান্ডায় কোন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে ট্রাম্প পারেন নাই। অক্ষম; তা এখন প্রমাণিত। কেন?
    প্রথমত, সারা দুনিয়া মারাত্মকভাবে ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে; হিমশিম খাচ্ছে যে, কী করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়, মৃতের সংখ্যা কমানো যায়। যাতে এতে ন্যূনতম সফলতা আসা শুরু হলেই, এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা যাতে ভাইরাসের ক্ষতির উপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে না পারে তাই এর মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। অথচ ট্রাম্প এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি আছেন তার ব্যক্তিগত সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, তথা নির্বাচন নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্পের এই অবস্থান নেয়া গ্লোবাল ঐক্যের বদলে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
    দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করার জন্য ট্রানপের দাবিই তো ধারাবাহিক নয়। যেমন, ঘটনার শুরুর দিকে তিনিই বিবৃতি দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছেন যে, চীন উদার হয়ে এই ভাইরাস সম্পর্কে সব তথ্য ও আপডেট খোলাখুলিভাবে আমাদেরসহ সবাইকে জানাচ্ছে শেয়ার করছে বলে। নিচের টুইট দেখেন।

    কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিক সিনেটর টম কটন “করোনা চীনের জীবাণুযুদ্ধের অস্ত্র” যা “সম্ভবত হাত ছুটে বাইরে এসে পড়েছে” বলে অভিযোগ তোলেন। আর তা থেকেই ট্রাম্পের বয়ান ও অবস্থানও বদলে যায়। অথচ কটন তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি [Cotton provided no evidence for the claim and asserted that it was the Chinese government’s job to disprove it.]। বরং একটা ‘সম্ভবত’ বলেছেন। অর্থাৎ নিশ্চিত করে, এমন শব্দ দিয়ে নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে চীনও আমেরিকাই এই জীবাণু চীনে ছড়িয়েছে বলে পাল্টা দাবি জানায়। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলে তার প্রপাগান্ডা চালু করে দিয়েছিলেন। আর চীন এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয়া শুরু করে ছিল ১৭ মার্চ থেকেই।  কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থানের অসঙ্গতি হল, তাহলে শুরুতে তিনি কেন চীনের প্রশংসা আর ভাইরাস সামলানো ও তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার প্রশংসা করেছিলেন।
    ট্রাম্পের প্রপাগান্ডা করার ব্যাপারটাকে পাঠকের নিজেই বিচার ও বুঝে দেখার জন্য একটা ভিডিও এখানে আছে আগ্রহিরা এটা দেখতে পারেন।
    তৃতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ  অসংলগ্ন অবস্থানের ট্রাম্প-এর হাত ছেড়ে দেয়া ছাড়া নিজেরাই নিরুপায় বোধ করেছিল। সে কারণে ‘জি৭’ ভিডিও কনফারেন্স  হয়ে পড়েছিল অকার্যকর ও স্থবির। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতির দুর্দশার মুখে নতুন উদ্যোগের এক ধারাও শুরু হয়েছিল। এর লিড নিতে আসে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু [WHO, World Health Org]। সংস্থাটি পরিষ্কার করে বলেছে এভাবে ‘উহান ভাইরাস’ বলে চীন-এশিয়া বা কোনো অঞ্চলকে দায়ী করা ঠিক নয়। এ কারণেই আমরা এর নাম কোভিড-১৯ বলে স্থির করেছিলাম”। ’সবচেয়ে কড়া কথাটা বলে ট্রাম্পকে সাবধান করেছেন হু এর এক নির্বাহী পরিচালক ডঃ  মাইক রায়ান। তিনি বলেন, ভাইরাসের কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। আপনি কোন জাতি কোন রেস, গায়ের রঙ কী অথবা ব্যাঙ্কে আপনার কত টাকা আছে ইত্যাদি এসবের পরোয়া করে না। অতএব ভাষা ব্যবহারের সময় সাবধান – এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারি না যেটা কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির জাত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরি করে বসতে পারে”।

    “Viruses know no borders and they don’t care about your ethnicity, the color of your skin or how much money you have in the bank. So it’s really important we be careful in the language we use lest it lead to the profiling of individuals associated with the virus,”  Dr. Mike Ryan, the executive director of WHO’s emergencies program,

    বলতে গেলে ট্রাম্পকে তিনি একেবারে ছেঁচা দিয়ে যেন বলেছেন – আপনি কথা বলার আদব জানেন না; দায়ীত্বজ্ঞানহীন।  এযেন বলা আপনি ট্রাম্প এক রেসিষ্ট[racist], তাই আপনি চীন বা এশিয়ার কোন অঞ্চলের মানুষদেরকে নিচা দেখাতে তাদের দায়ী করছেন। আর এঘটনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে তাঁর রেসিজম বা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ছেঁকে ধরেন। উপরের লিঙ্কটা এক অ্যামেরিকান মিডিয়া CNBC থেকে নেয়া। ওখানে শুরুতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে আগ্রহীরা তা দেখে নিতে পারেন।

    এরপরেই আসলে দ্রুততার সাথেই অবশেষে একটা সন্ধি হয়। যার প্রকাশ ঘটানো হয় আমেরিকায় চীনের রাষ্ট্রদূত, অন্য কথা প্রসঙ্গে আমেরিকান এক প্রেসের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে “চীন-আমেরিকার পারস্পরিক অভিযোগ তোলা থেকে” তিনি “দূরে থাকতে চান” বলে জানিয়ে দেন।  এই কথাটাকে হংকং এর এক মিডিয়া লিখেছে, “এতে পরিপক্ক আচরণ আবার শুরু হয় যখন চীনা বিবৃতিতে আকুল আবেদন জানানো হয় যে প্যান্ডেমিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, আর এতে ট্রাম্পও তারপর থেকে চাইনিজ ভাইরাস বলা বন্ধ করেন [Adult behaviour resumed as statements out of China urged the world to unify against the pandemic; Trump stopped calling it a “Chinese virus”.]।

    ট্রাম্প এবার ২৪ মার্চে  প্রেসের কাছে বলেন যে, “তিনি করোনার জন্য জন্য চীন বা এশিয়ার কেউ দায়ী বলে মনে করেন না”।  মানে পুরা উলটা সুর এবার।  আর তাতে কয়েকদিন কূটনীতিতেই জি৭-এর ব্যর্থতার পরও ২৬ মার্চ জি২০-এর ভার্চুয়াল সভা থেকে সাফল্য আসে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ভাইরাসকে সবার জন্য বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে সবার জন্য ‘কমন হুমকি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।  ইতোমধ্যে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ডলার ছাড় করার জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। এক কথায় বললে, ট্রাম্পকেই নিজের ফেলা থুথু চেটে তুলে নিয়ে বিতর্ক শেষ করতে হয়। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রিপোর্টিং করেছে হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। তারা ট্রাম্পের কান্ডকারখানা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি কখন কী বলেছেন এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে।

    ঘরের খবরঃ
    এবার ‘ঘরের খবরে’র দিক। করোনাভাইরাস মানেই, এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে, যা মানুষ জানে তা হল, মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা বা থাকা। আইসোলেশন বা ঘরে বন্দী হয়ে থাকা। ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে ছোঁয়া এড়িয়ে থাকা। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রতিকার। কেন?
    দেশের মানুষকে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস (বা হয়ত এরও বেশি) একনাগাড়ে ঘরে বন্দী করে রাখার সোজা মানে হল, ওই সময়ের জন্য অর্থনীতি স্তব্ধ অচল করে রাখা। প্রতিটা স্থানীয় দেশের এবং গ্লোবাল দুই অর্থেই। অথচ সবার খরচ আগের মতোই। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন এক এস্টিমেট হচ্ছে ভারতের ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ৮০ কোটিকেই তাদের ভর্তুকি বা পুরা রেশন সরবরাহ করতে হবে, তাতে ভারতের রাজস্ব আয়ের ঘরের অবস্থা যাই থাকুক না কেন [The government aims to distribute 5kg of wheat or rice for each person free of cost every month, with 1kg of pulses for every low-income family, helping to feed about 800 million poor people over the next three months.]। ওদিকে পাকিস্তান করোনায় আক্রান্তদের ১২ হাজার রুপি করে অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
    এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঘোষণা খুবই অপ্রতুল বা অগোছালো মনে হয়েছে। সব ঘটনা-দুর্ঘটনা একদিন না একদিন শেষ হয়েই যায়, করোনার প্রভাবও একদিন শেষ হবে। কিন্তু ততদিন আমাদের মানুষদের নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। এভাবে এথেকে যদি টিকে যেতে পারি, তা হলে আবার নতুন উদ্যোমে অর্থনীতি চালু করার সংগ্রামে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন (অন্তত তিন-ছয় মাস) নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।  অথচ  আমাদের সরকার কেবল গার্মেন্টসশ্রমিকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। এর বাইরে শহরের রিকশাচালক থেকে গ্রামের দিনমজুর পর্যন্ত কথিত ইনফরমাল শ্রমিকদের কথা ভেবে আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে যা আমরা দেখছি না। যদিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু আছে হয়ত স্থানীয় উদ্যোগে। কারণ, তাঁরা যদি না খেয়ে ঘরে বা রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য ভাল অভিজ্ঞতা হবে না। বরং সেটা মহাবিপর্যয়কর কিছু একটা হবে। নিজের মুখ নিজেকে দেখানো  যাবে না এমন অবস্থা হবে। তাই যেভাবেই হোক এর জন্য ফান্ড জোগাড় করার  দায় আমাদের সরকারকে নিতেই হবে। অন্তত কথা বলতে হবে।
    ইতোমধ্যেই মোট প্রায় ১৯০ এর বেশি সদস্যের মধ্যে  ৮০টি সদস্যরাষ্ট্র আইএমএফের কাছে লোন চেয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা কী, ঋণ-অনুদানের ব্যবস্থা কী আছে, জানতে হবে। এসবের মধ্যেই পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকদের দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওদেরকে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে সামলানো যাবে না। এটা কোনো সমাধানই নয়। রাস্তায় গরীব মানুষ কাজে বা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়লে কী করতে হবে এনিয়ে পুলিশের প্রতি নির্দেশ বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত হতে হবে। এটা ২০২০ সাল। এখনো না খেয়ে মানুষ মরলে তা ঘটবে একমাত্র কুশাসনের কারণে। প্রধানমন্ত্রীকে ইনোভেটিভ হতে হবে। বিকল্প খুজতে হবে প্রোএকটিভ হয়ে। যারা বুড়া বয়েসে নির্বাহী প্রধানের ধামাধরা সুযোগ না পেলে নিজ উদ্যোগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মসংস্থানের আর যোগ্যতা রাখে না এরা ইনোভেটিভ হবে এটা কষ্টকল্পিত। খেটে খাওয়া মানুষদের বাঁচাতে হবে। এটাই এক সফলতার চিহ্ন হবে। আর তা যদি সফল হই তবেই এরপরে আসন্ন গ্লোবাল মহামন্দা মোকাবিলার যোগ্য হব!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২৮ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  “ভাইরাসে বেঁচে গেলেও গ্লোবাল অর্থনীতিতে কী হবে“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]