Category: ইন্দো-প্যাসেফিক জোট

  • চীনবিরোধী বাইডেন হবেন, ব্যালেন্স তো ইইউর হাতে

    চীনবিরোধী বাইডেন হবেন, ব্যালেন্স তো ইইউর হাতে

    গৌতম দাস

    ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3mQ

     

    EU-China investment agreement raises tensions with US

    দীর্ঘ ৩০ বছরের সার্ভিস-জীবনের এক ভারতীয় ক্যাডার কূটনীতিক, নাম এম কে ভদ্রকুমার, এখন অবসরে আছেন। পূর্ণ রাষ্ট্রদূত ছিলেন সর্বশেষে তুরস্কে ও উজবেকিস্তানে। এ ছাড়া উপ-রাষ্ট্রদূতও ছিলেন অনেক রাষ্ট্রে – পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানসহ অনেক দেশেই। কিন্তু এসব বিচারে তিনি বিশেষ কেউ নন;  তাঁর বিশেষত্ব অন্যখানে। অনেকে বলতে পারেন, তিনি আন্তর্জাতিক নীতি পলিসি বা অভিমুখগুলো নিয়ে গবেষক ও লেখক। নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে, দুহাতে লেখা এই লোকের তিন-চারটি লেখা দেশে-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এখন ছাপা হয়। তবু এগুলোও তাঁর মূল বিশেষত্ব নয়।
    চলতি শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা ভারতের ওপর মনোযোগ ঢেলে প্রভাব বিস্তারে দেশটাকে নিজ কাজে লাগায়; তার ‘চীন ঠেকানোর’ [China Containment Policy] কাজের ঠিকা ভারতকে দেয়া আর ভারতের একাডেমিক জগতের মাস্টার্স বা হায়ার স্টাডিজের স্কলারশিপ বিতরণ করে লোভ দেখিয়ে আমেরিকান বয়ান মননে ঢুকিয়ে দেয়া, আবার আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা খুলে দেয়া ইত্যাদি শুরু হয়েছিল। ফলে ডিপ্লোম্যাটরা চাকরিতে থাকা অবস্থা থেকেই ওসব বয়ানে অনুরক্ত হতে শুরু করেছিলেন যাতে চাকরি শেষে  অবসরে যাবার পরেও কোনো থিংকট্যাংকে আবারও চাকরি পাওয়া যায়। এসব বিচারে একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ভদ্রকুমার। তিনি অনেকের চেয়েই সক্ষম এবং স্বাধীন গবেষক ও লেখক। তিনি আমেরিকান বয়ান বা তাদের অর্থ দ্বারা প্রভাবিত কোনও থিংকট্যাংকের সাথে যাননি। নিজের স্বাধীন চিন্তা অবস্থান নিয়ে এখনও লিখে চলেছেন। যেমন ভদ্রকুমারই সম্ভবত একমাত্র ভারতীয় যিনি মনে করেন ভারতের যুক্ত থাকা এমন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ স্ট্রাস্টেজিক জোট বা ‘কোয়াড’ জোটের, একদম কোনো ভবিষ্যৎ নাই। ফলে ভারতের এই যুক্ত থাকা ‘খামোখা’ মনে করেন। তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তাঁর নিয়মিত কালেকশনে থাকে প্রচুর তথ্য ও ইন্টেলিজেন্স (রাশিয়ানটা-সহ) যা তিনি নিজের লেখায় ব্যবহার করেন যেটা সম্ভবত তার কূটনীতিক জীবনের ধারাবাহিকতায় প্রাপ্ত প্রবেশ-অধিকারের বদৌলতে।

    ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসনের ক্যাবিনেট সদস্যদের নিয়োগে ‘সিনেটে অনুমোদন’ পাওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। তারা এরপর নতুন প্রশাসনের নীতি-পলিসিগুলো নিয়ে নিজেরা পারস্পরিক সমন্বয় শেষে কাজে নেমে পড়ছেন আস্তে ধীরে। সভা সেমিনারে গিয়ে নতুন প্রশাসনের পলিসি নিয়ে মুখ খোলাও শুরু হয়েছে। সেসব নিয়ে ভদ্রকুমারের একটা বড় রচনা ছাপা হয়েছে হংকংভিত্তিক ‘এশিয়া টাইমস’ পত্রিকায়। সে লেখাকে পটভূমিতে রেখে আজকের প্রসঙ্গ।

    ভদ্রকুমার হদিস দিচ্ছেন আমেরিকায় নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সেক্রেটারি অব স্টেট) অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন ভারতের মন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে ফোনে কথা বলেছেন। জানা গেল, সে কথা খুবই সংক্ষিপ্ত; মূলত সৌজন্য বিনিময় দিয়ে শুরু করা মাত্র। ফলে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটা জানার চেয়ে এই কথা সম্পর্কে ভারত ও আমেরিকা উভয়েই প্রেসের জন্য নোট (Readout) নিজ নিজ ওয়েবসাইটে কী টাঙিয়েছে, সেটা দেখা দরকার।
    যেমন দেখা যাচ্ছে সেখানে ভারত অর্থহীন ফুলানো শব্দগুলো ব্যবহার করেছে বেশি। মূলত ভারত ওখানে যা বলতে চেয়েছে তা হল –  আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এধরণের রুটিন কথা। কিন্তু ভারত সেটাকে ফুলিয়ে বলেছে, “আমাদের বহুমুখী স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ পোক্ত করতে আর বিস্তার ঘটাতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ” […consolidate and expand the multi-faceted strategic partnership]। আর যে কথা মনে করে সম্ভবত এসব লিখেছে সেটা হল, কেবল আমেরিকার অস্ত্র কেনাকেই ভারত এক ‘স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক’ বলে জ্ঞান করা হয়েছে। কারণ প্রপাগান্ডা যাই থাক, ভারতের সাথে আসলে পুরা ট্রাম্পের আমলে তেমন কোনো সম্পর্কই ছিল না, ভারতের আমেরিকান অস্ত্র কেনা ছাড়া। আর  অস্ত্র কেনাবেচাতে আমেরিকার দিক থেকে বহুবিধ শর্তাবলি থাকে। অস্ত্র কিনতে ভারতের সেসব শর্ত মেনে চলাকেই এখানে মূলত ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ বলা হচ্ছে। যেমন এমনই  অস্ত্র কেনাবেচার একটা সাইড চুক্তি,  ‘ইন্ডিয়া-ইউএস ২+২’ এই শিরোনামে। মানে দুপক্ষ থেকে দুইটা করে মন্ত্রী (পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা) যুক্ত থেকে এই চুক্তি তাই ২+২। তাই আবার ভারতের কথিত ‘বহুমুখী’ (মাল্টিফ্যাসেট multi-faceted) শব্দটা অবশ্যই অহেতুক; কিছুই প্রকাশ করে না এমন, কথার কথা। আসলে ভারত বলতে চেয়েছে, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ হবুজোট ও ‘কোয়াড’ জোট নিয়ে আমাদের সম্পর্ক আছে। কিন্তু এখন ভারতের সন্দেহও আছে যে, এই কথাগুলোতে আসলে ট্রাম্পের চীনবিরোধী পলিসি ও কিছু বকোয়াজেরও অংশ ছিল, যা আসলে বাইডেনও মেনে চলবেন কি না, নিজের বলবেন কি না তা নিয়ে ভারত নিশ্চিত নয়; সন্দেহ করে। তাই ভারত নিজের রিড-আউটে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘কোয়াড’ এই শব্দদুটো ব্যবহারই করে নাই আর বরং তা না করে আরও আবছা এক শব্দ ‘বহুমুখী’ বলে সব ঢাকা দিয়েছে আপাতত।  কারণ ভারতের এই প্রেস বিফিং (রিড-আউটটা) ড্রাফটের সময়ে তখনও সে জানে না, আমেরিকা তাদের রিড আইটে ঠিক কী লিখে রাখবে। তাই আমাদের এই অনুমানটা দেখা যাচ্ছে সঠিক কারণ এখন আমরা আমেরিকা কী লিখে রেখেছে, রা জানি। কিন্তু তামশাটা হল, ভারত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ও ‘কোয়াড’ শব্দ দুটোতে  দ্বিধা রেখে তা আর ব্যবহারে করেনি। অথচ  আমেরিকা বলেছে, মানে ব্যবহারে এনেছে শব্দ দুটো। যদিও  এর অর্থ বদলে দিয়ে। লিখেছে, আমরা ‘ইন্দো-প্যাসিফিকে আমেরিকার হবু পার্টনার হিসেবে ভারতের ভূমিকায় জোর দেই’ এবং ‘কোয়াডের মাধ্যমেসহ একসাথে কাজ ও সহযোগিতার দিকে গুরুত্ব দেই” [The Secretary underscored India’s role as a preeminent U.S. partner in the Indo-Pacific and the importance of working together to expand regional cooperation, including through the Quad. ]।

    তাহলে ব্যাপারটা কেমন হল? ভারত শব্দ দুটো উল্লেখ করলই না অথচ বাইডেনের আমেরিকা উচ্চারণ করল কেন? কারণ ভারত জানত, ট্রাম্পের সময়ের এশিয়ার এই দুই ইস্যুকে বাইডেন নিজেরও ইস্যু বলে মানবেন না। কিন্তু বাইডেন চোখবন্ধ করে শব্দ দু’টির ব্যবহার হঠাৎ করে বাদ বা একেবারে ফেলে দিবেন না। কিন্তু সাবধান, তার মানে এটা ধরে নেয়াও ভুল যে, ট্রাম্পও এই শব্দ দু’টি নিয়ে বিরাট কিছু করতেন – তা নয়। আসলে ট্রাম্প এটাকে তার আমলের চীনবিরোধী একটা সামরিক ধরনের জোট ভেবেছিলেন যেন। কিন্তু শেষে এটা আসলে তাও না; বরং একটা কথার হুমকি মাত্র – এমন করে রেখেছিলেন। আর তাই বাইডেনও শব্দ দু’টি ব্যবহারে রাখবেন, তবে তা ‘চীনবিরোধী’ এমন অর্থে বলবেন না। এমনকি এটা সামরিক জোট ইঙ্গিত করেও – এমন কোনো অর্থ তো করবেনই না। হয়তো জোটের সদস্যদের পারস্পরিক ইকোনমিক সমঝোতা ধরনের এক অর্থে রেখে দিতেও পারেন যেমনটা আমরা এখন প্রেস ব্রিফিং বা রিড-আউটে দেখছি, সে রকম। এ জন্য বাইডেন প্রশাসন বা ব্লিঙ্কেন শব্দ দু’টি কোনো সিরিয়াস বা অর্থপূর্ণ অর্থে ব্যবহার করছেন না। শুধু উচ্চারণে রেখে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্লিঙ্কেনের লিখিত রিড-আউট নোটে কমন কিছু কূটনৈতিক শব্দ ও কথাও আছে; যেমন- ‘পারস্পরিক কমন উদ্বেগ বা আগ্রহের বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করব – এসবই বাকি কথা হিসেবে সেখানে আছে। সার কথায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উভয়ের প্রথম কথা বিনিময়টায় কথার ফুলঝুড়ি অংশটাই বেশি হয়ে থাকল। অর্থাৎ কাজের কথা খুব বেশি আগাবে না, এরই ইঙ্গিত। এর মানে, সামনে ‘তিতা কথা’ বেশি হবে হয়ত।

    তবে ভদ্রকুমার বলছেন, ব্লিঙ্কেন এশিয়াতে ভারতেরও আগে পূর্ব-এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সাথে কথা বলেছেন এবং ঠিক কাজটা করেছেন [ শিরোনাম দেখেনঃ Blinken strikes the right chords toward India]। যেমন – জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড এভাবে পর্ব-এশিয়ায় কথা বলেছেন আগে।। যদিও ব্লিঙ্কেন কেবল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বেলাতেই একটা মুক্ত ও অবাধ চলাচলের  ‘ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নের’ কথা উল্লেখ করেছেন। আবার অস্ট্রেলিয়ার বেলায় ইন্দো-প্যাসিফিকের কথা না তুলে কেবল আমেরিকার সাথে তাদের দু’রাষ্ট্র, তাদের ‘ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ ও ‘অটুট বন্ধন’ এসবের প্রশংসা করে কথা বলেছেন।
    এরপরে ভারতের বেলায় এসে ব্লিঙ্কেন নাকি গলার স্বর নিচা করে (‘টোন ডাউন’ রেফারেন্স) ফেলেছেন; ভদ্রকুমারই বলছেন। সাথে যোগ করেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে ভারতকে বাইডেনের আমেরিকার পাশে প্রয়োজন হলেও এই অঞ্চলে সেই ‘আকর্ষণ’ আর শক্ত হচ্ছে না বা দানা বাঁধছে না […To be sure, the US has a great need to keep India on board its “Indo-Pacific” strategy, which is not gaining traction in the region.।

    কিন্তু ভারসাম্য ইইউ-এর হাতেঃ
    ওদিকে এসবের আগেই আমেরিকার সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক আর আগের মত জায়গায় নেই। বিশেষত ট্রাম্পের ‘একলা চলো’, ‘কঠোর চীনবিরোধী হও’ দাবি যেটা ইইউ পছন্দ করে নাই কারণে সেটা আগেই অনেক পরিষ্কার ছিল। এসব ঘটে গিয়েছিল বিশেষত ট্রাম্পের ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার দুই সপ্তাহ আগেই। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের যৌথ অধিবেশনে যখন বাইডেনের বিজয়কে ‘ফর্মাল রায়’ বলে সিল দেয়া হয়, এর পর থেকেই সব জায়গায় বাইডেন প্রশাসনকে যেন (পম্পেও-এর বিষিয়ে দেয়াতে) ইউরোপের বিরূপ মনোভাব সামলাতে হিমশিম খেতে হয়, সে জন্যই যেন পম্পেও আগেই প্রকাশ্যে ইইউকে আহ্বান রেখেছিলেন ইইউকে ‘আমেরিকা না চীন’ এ দুটার একটাকে বেছে নিতে। এরই প্রত্যক্ষ জবাব জানাতে ইইউর ফরেন পলিসি চিফ জোসেফ ব্যারেল পম্পেওর সাথে ঐ বৈঠকের ঘণ্টাখানেক আগেই ঘোষণা করে দেন যে, তারা ‘চীনবিরোধী’ কোনো ‘ট্রান্স-আটল্যান্টিক অ্যালায়েন্স’ মানে আমেরিকা-ইইউ অ্যালায়েন্স গড়ার আহ্বান প্রত্যক্ষভাবেই নাকচ করে দিচ্ছেন। সোজা কথায়, ১৪ জানুয়ারি জোসেফ ব্যারেল জানিয়ে দিয়েছিলেন, ইইউ আমেরিকার সাথে চীনবিরোধী এমন কোনো জোট করবে না।
    তিনি আরো স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন, “চীন-আমেরিকা সঙ্ঘাত শুরু হোক আর তারা তাতে কোনো পক্ষ নিক তা তারা কখনো করবে না। কারণ ইইউ মাল্টিলেটারিজম (বহু ধরনের রাষ্ট্ররূপের পক্ষে) ও পারস্পরিক সহযোগিতার পক্ষে। কথাটা এভাবে বলেছিলেন; কারণ চীন পশ্চিমা ধরনের কথিত ডেমোক্র্যাসির দেশ নয়, সে কথা তুলে পম্পেও ‘চীনবিরোধী ডেমোক্র্যাসিগুলোর জোট বাঁধার’ ঘ্যানঘ্যানে এক আহ্বান করে যাচ্ছিলেন। সেই সাথে একটা খুবই কড়া কথা জোসেফ ব্যারেল বলেছিলেন, ‘সামনে যাই আসুক, আমরা ইইউ আমাদের বুঝ মতোই চলব।’

    ডাভোসে মার্কেলের আরও কড়া অবস্থানঃ

    ঘটনা সেখানেই থেমে গেলে হয়ত এক রকম হত; কিন্তু তা হয়নি। এরপর সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে এবারের জানুয়ারিতে “ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের” [WEF]’ সম্মেলনও এবার স্বাভাবিক সিডিউল মত আয়োজিত হয়েছিল ২৫-২৯ জানুয়ারি, তবে ভার্চুয়ালি। মানে, যার যার দেশে বসে কিন্তু অনলাইনে। সেখানে জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল ‘বোমা টা ফাটান’। ইউরোপীয় ‘পলিটিকো’ [Politico] পত্রিকা বলছে, তিনি ডাভোসে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমি খুবই চাইব, কোনো ধরনের ব্লক তৈরি এড়িয়ে চলতে চাই। আমি কল্পনা করি না যে, আমাদের বলতে হয়, এই যে দেখো এটা হলো আমেরিকা আর ওই দূরেরটা হলো চীন আর এভাবে আমরা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গেছি। সামনের দিনে এমনটা হতেই হবে- এটা আমার বোঝাবুঝি নয়। এমন হলে অন্য ধরনের সমাজগুলোর (আমাদের মতো নয় বলে) প্রতি অবিচার করা হবে” [“I would very much wish to avoid the building of blocs,” Merkel told the Davos World Economic Forum. “I don’t think it would do justice to many societies if we were to say this is the United States and over there is China and we are grouping around either the one or the other. This is not my understanding of how things ought to be.”] ।
    মার্কেল এখানেই থামেননি। ডাভোসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, তিনিও অনলাইনে উপস্থিত ছিলেন। মার্কেল তার রেফারেন্স তুলে বলেন, চীনা প্রেসিডেন্ট কালকে (আমার সাথে) বক্তৃতা করেছেন। সেখানে তিনি ও আমি একমত হয়েছি যে, আমাদের এক বহু রাষ্ট্রীয় (বহু ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা) ব্যবস্থাই দরকার [Referring to Xi’s speech at the same forum, Merkel said: “The Chinese president spoke yesterday, and he and I agree on that. We see a need for multilateralism.”]। … তবে সেখানে আরেকটা প্রশ্নও ছিল। প্রশ্নটা সম্ভবত আমরা যখন বিভিন্ন সোস্যাল মডেলে বসবাস করি সে সংক্রান্ত। এতে কখন হস্তক্ষেপের শুরু আর কোথায় এর শেষ? আর কখন আমরা এক মৌলিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড়াতে পারব যা আমাদেরকে আর বিভক্তিতে ফেলবে না? মার্কেল এতদূর পর্যন্ত বলেছেন [“But there is one question where we are not in immediate agreement. Probably the question of what it means when you have different social models. When does interference begin and where does it end? When do you stand up for elementary values that are indivisible?”] । তিনি একই সাথে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়া চীন-ইইউ ‘কম্প্রিহেনসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা সিএআই [CAI] চুক্তি নিয়ে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।

    এ থেকে এখানে অনুমান করে একটা কথা আগেই বলে দেয়া যেতে পারে যে, আগামীতে বাইডেন প্রশাসন চীন-আমেরিকা হবু-সম্পর্ককে যেখানে নিয়েই থিতু বা শেষ করুক না কেন তা আর দুনিয়াকে (চীন ও আমেরিকা ব্লক) দুই ভাগ করতে পারছে না। কারণ ব্যালেন্স বা ভারসাম্য তৈরির ক্ষমতা এখন ইইউর হাতে। চীন-ইইউ চুক্তিই সেই ব্যালেন্স- মানে ভারসাম্যের উৎস। অর্থাৎ বাণিজ্যযুদ্ধ নয় বরং একটা ‘ওয়ার্কেবল বাণিজ্য সম্পর্ক’ এর মধ্যেই বাইডেনকে বাণিজ্যবিরোধের রফা খুঁজতেই হবে। তা তাদের দুই দেশকেই। কারণ চীনবিরোধী কোনো ইইউ-আমেরিকা জোট পাকানোর সব সম্ভাবনা এখন শেষ।

    ভদ্রকুমার তাই এখন এই পটভূমিতে বলছেন, ব্লিঙ্কেন দায়িত্বভার নেয়ার শুরুতেই প্যারিস, বার্লিন, লন্ডন বা ব্রাসেলস যাদেরই পররাষ্ট্র দফতরের সাথে কথা বলেছেন সেখানে কোথাও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ শব্দটাই তিনি ব্যবহার করেননি, আমেরিকার রিড-আউট তাই বলছে।
    ভদ্রকুমার আরো জানাচ্ছেন, ব্লিঙ্কেন সিনেটে অনুমোদন পাওয়ার তিন দিন পর এসব উল্লেখ করেছিলেন। এরও দুই দিন আগে ২৭ জানুয়ারি ভারত ও আমেরিকা দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়েও টেলিফোনে সৌজন্য বিনিময় হয়েছে। অর্থাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা সেখানে ছিল না।

    ব্লিঙ্কেনের আফগানিস্তান ও পাকিস্তানেও ফোনঃ
    এ দিকে ভদ্রকুমার আরো জানাচ্ছেন, ঐ দিনই ব্লিঙ্কেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথেও একইভাবে কথা বলেছেন। সেখানে ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া আধাখেঁচড়া এক কারবার হল, তালেবানদের সাথে যে সমঝোতা ডিল তিনি করেছিলেন, তা ট্রাম্পের শেষ সময় থেকেই অকার্যকর “ঢলে পড়া” শুরু হয়েছিল। বাইডেনকে তাই এখন আবার তালেবানদের সাথে কথা শুরু করতে হবে। আর তাতে আমেরিকার জন্য আবার পাকিস্তান খুবই গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হতেই হবে। তাই ভদ্রকুমার মনে করেন, বাইডেন রেডি হচ্ছেন পাকিস্তানের সাথে আগের মতই ঘনিষ্ঠ পার্টনারের সম্পর্ক করতে। আবার মোদীদি সরকারকে সাবধান করে তিনি লিখেছেন, বাইডেন প্রশাসন যদি এই পর্যায়ে চীনের কোন সহযোগিতা চেয়ে বসে তাতে ভারত যেন অবাক না হয়!

    দুনিয়া আসলেই বদলে যাচ্ছে যা আগে কল্পনাও করা যায়নি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীনবিরোধী হবেন, ব্যালেন্স ইইউর হাতে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

    গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

    গৌতম দাস

    ১৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gc

    US  President-elect Joe Biden

    গত কমপক্ষে সত্তর বছর ধরে রাজত্ব করা গ্লোবাল নেতা আমেরিকা শেষকালে এসে ট্রাম্পের হাতে পড়ে এক ঝটকায় সেটা  লোকাল-আমেরিকায় পরিণত হয়ে গেছিল। লোকাল মানে গ্লোবাল নেতার মফস্বলি হয়ে যাওয়া। যে মফস্বলি বলতে এখানে জাতিবাদি আমেরিকা বা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যেটা, সেটাই বুঝানো হয়েছে। অথচ যে আমেরিকা দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেল, সেই নেতা – সেই আমেরিকা কি করে “সংকীর্ণ ও আমি আগে” এই মফস্বলি অবস্থান নেয়? আবারীখন বাইডেন জিতেছে বলে, আমেরিকার আগের গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকা অবস্থানে ফিরে যাওয়া সেটা কী আদৌ সম্ভব? সম্ভবত একেবারেই না। এছাড়া আমেরিকা যখন নেতা ছিল সে তো তখন আত্মভোলা  নিজের স্বার্থ-অবস্থান ভুলে থাকা কোন আমেরিকা ছীল না। বা কোন খেপা মাজারের পাগল ধরণের কেউ তো ছিল না। তাহলে জাতিবাদী, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ – এটাও কী ট্রাম্প আসলে আমেরিকাকে নিতে পেরেছিল?  আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে যেখানে আশির দশক থেকে শুরু হয়ে যাওয়া গ্লোবালাইজেশন – বিশেষত গ্লোবাল পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সেটা দুনিয়ায় চালু হয়ে গেলে তা থেকে ফিরে গিয়ে খোদ আমেরিকাই আবার জাতিবাদী হবে এটাই তো সম্ভবই না। তাহলে আমেরিকার জন্য গত চারবছরের ট্রাম্প কে ছিল?

    ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিল একটা মশকরার নাম, একটা তামাসা। অনেক সময় কিছু কঠিন সত্যিকথা থাকে যা সরাসরি তা প্রকাশ করা যায় না, উচ্চারণও করতে চায় না অনেকে। যদিও সেটা ঘটে গিয়েছে। সেকথাটা হল, আমেরিকা  – গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়েছে।  এই তিন শব্দের ছোট বাক্যটা আমেরিকার জন্য উচ্চারণ কঠিন বলে যেন একথাটাই আরেকভাবে ঘুরিয়ে বলা হয়েছিল যে জাতিবাদী  ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর একজন ট্রাম্পের উত্থান ঘটেছে। একারণে ট্রাম্পের আরেক নাম “পাবলিক ন্যুইসেন্স” (Public nuisance)! ন্যুইসেন্স মানে কী?  মানে হল, আপনি যদি একবার নিজের পোষাক খুলে ফেলতে পারেন, শহরের প্রধান রাস্তায় ন্যাংটা হয়ে হাটতে পারেন তবে এরপর এর কোন দায় আর আপনার না। বরং তাঁদের সব দায় যারা আপনাকে ন্যাংটা দেখছে। আপনার পোষাক খুলে ফেলার মানে অন্য সব মানুষকে এবার  চোখেমুখে পোষাক এঁটে, ঢেকে চলাচল শুরু করতে বাধ্য করা। এটাই নিজের একার দায়দায়িত্ব অন্য সবার ঘাড়ে চড়িয়ে দেয়া! এটাই বেস্ট ন্যুইসেন্স! আমেরিকায় এই ন্যুইসেন্সের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প;  তাঁর উত্থান ও চার বছরের শাসন। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়ে যাওয়া সরাসরি সে স্বীকার করতে পারেনি বা চায়নি বলে, আমেরিকা যেন ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স দেখিয়ে সেটাই প্রকাশ করেছিল। সারা ইউরোপ  ট্রাম্পের আমেরিকার এই জাতিবাদ একেবারেই পছন্দ করে নাই। আর এখন বাইডেনের চ্যালেঞ্জ হল, সেই আস্থাহারানো ইউরোপকে আবার আস্থায় ফিরিয়ে আনা, যেটা প্রায় অসম্ভব। যেমন একজন বলছে, বাইডেন পুর্বাবস্থায় ফিরে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেও “US could swing back to Trump-ism, so they’re wary” – আমেরিকা যে আবার কোনদিন ট্রাম্পএর জাতিবাদে ফিরে যাবে না এর নিশ্চয়তা কী?

    এছাড়াও ইউরোপে ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকান সেনা গ্যারিসন রেখে এসেছে এপর্যন্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা ২০১৮ সালে এসে হঠাত করে এজন্য ৪০০% হায়ার চার্জ চেয়েছিল ইউরোপের কাছে। সেটা কী আমেরিকা আবার চাইবে না? নিশ্চয়তা কী?

    “German Chancellor Angela Merkel also warned in 2018 that the European Union could no longer depend on the US, while core Asian allies, such as South Korea and Japan, suddenly found themselves faced with demands for up to 400% higher payments for the presence of US troops.”

    তাহলে এখন প্রশ্ন উঠবে, এখন আবার জোসেফ বা জো বাইডেন – তিনি কে? আগে ট্রাম্প-জোকার জাতিবাদী আমেরিকা  হয়ে তা  প্রকাশ করেছিল এবার বাইডেন এবার প্রকাশ্যে সরাসরি স্বীকার করে নিবেন যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নাই। বড় জোর এটাই হবে।

    বাইডেনের আমেরিকাই যতটুকু যা শেষ নেতাগিরিঃ
    প্রভাবশালী সিএনএন একটা আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনামঃ “সমমনা জোটবন্ধুদের আস্থা ফিরে অর্জন করা হবে বাইডেনের বিদেশনীতির কঠিনতম চ্যালেঞ্জ“(Biden’s toughest foreign policy challenge may be regaining allies’ trust)। তিন স্টাফ লেখকের এক যৌথ রিপোর্ট এটা। লেখায় বলতে চাওয়া হয়েছে, ট্রাম্প গত চার বছরে ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নয়। ইউরোপের দায় এবং ওর ভালমন্দ চিন্তা আর ট্রাম্পের নয়। ট্রাম্প হল – আপনি বাঁচলে বাপের নাম – এমন এক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। কাজেই সেই আমেরিকাকে এবার বাইডেন আবার তুলে এনে আগের জায়গায় কতটুকু বসাতে পারবে, নেতৃত্ব ফিরে আসবে কী করে? এছাড়া বাইডেনও আবার ট্রাম্পের মত ফেলে পালাবে না তো? এই আস্থা অর্জন বাইডেনের প্রধান চ্যলেঞ্জ। কিন্তু লেখাটা আসল যে কথাটা দেখতেই পারে নাই তা হল, এখন এটা একেবারেই এক ফ্যাক্টস হল, আমেরিকা আর আর নেতৃত্বে ফিরে আসবে না। পারবেই না।

    সারকথায়, আসলে ট্রাম্প আর বাইডেন একই ঘটনার দুইটা প্রকাশ। দুজনই বলছে,  আমেরিকা আর নেতা নয়। তবে ট্রাম্প কথাটা বলছে আমেরিকার সেসব লোকের হয়ে যেন যেমন, এক পরিবারের পিতা জীবনের শেষ বয়সে এসে বলছে আমি কেবল আমার জন্য ভাত রাধব, সবার ভাত যোগাড় করতে পারব না বলে, এভাবে। অন্যদিকে বাইডেন হচ্ছে সেই আশ্বাসবাদী যে ভাবধরতে চায় আমরা এখনও নেতা আছি; অথচ এটা সত্যি না। তবু এমন বলে সবাইকে আশ্বাস সে দিচ্ছে বটে কিন্তু কেউ তারকথায় আস্থা রাখছে না, রাখবে না।

    ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স তৈরির ক্ষমতা আরো দুমাস আছেঃ
    এমাসের গত ৭ নভেম্বরের দিকে প্রথম জানা গেছিল যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল হিসাবে জো বাইডেন অন্তত ২৭৯ [এখন সর্বশেষ গণনা অনুসারে এটা ৩০৬] ইলেক্টোরাল কলেজের আসন পেয়ে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিতর্ক, আপত্তি বা মামলার নিষ্পত্তি এখনো খতম হয়নি। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি মামলা বা ঘটনায় ট্রাম্প-ক্যাম্পের তোলা আপত্তি বা অভিযোগের কোনো “প্রমাণ পাওয়া যায়নি” বলেই তা খারিজ হয়ে ক্রমে অনেক কিছুর নিষ্পত্তি হয়ে চলেছে [US election security officials reject Trump’s fraud claims]। তবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে আমেরিকার আকাশের কালো মেঘ ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এর পেছনের প্রধান কারণ সম্ভবত, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু ঘোষণা ও পাল্টা পদক্ষেপ। যেমন- তিনি নিজেই হুমকি দিয়েছেন যে- ‘তিনিই এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন অথচ তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা হেরেছেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে”। এটা তিনি মানেন না।  এতে এবার সংশ্লিষ্ট কিছু পদক্ষেপ বিপদজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমন, জেনারেল সার্ভিস এডমিনিস্টেশন (জিএসএ) বলে হোয়াইট হাউজের একটা সেকশন আছে। এই অফিস নতুন প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর শপথ ইত্যাদির প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করে থাকে। ট্রাম্পের বিশেষ নির্দেশে এই অফিস নড়াচড়াহীন বসে আছে। বিবিসি লিখছে এই অকার্যকারিতা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির ইস্যু হয়ে উঠতে পারে [could access “pressing national security issues”.]।
    কিন্তু ট্রাম্প-ক্যাম্প অনড়। তারা মূলত নানান ইস্যুতে  প্রমাণসহ অভিযোগ তুলে ধরতে আগ্রহী হওয়ার চেয়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছড়ানোর চেষ্টা করছে অনেক বেশি। ট্রাম্প স্টেট ডিপার্টমেন্টের পম্পেইকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন যে, আগামী ২০ জানুয়ারির (দেশের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার দিন) পরে ট্রাম্পের সরকার কার্যক্রম অব্যহতভাবে চালু রাখবে। তাই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অজানা আশঙ্কা যা আগে কখনো আমেরিকা দেখেনি তা এখন থেকেই তাদের সমাজে ছেয়ে বসে আছে। যদিও সেটা বাড়ছে, ঠিক এমনটাও বলা যাবে না।
    বরং ছোট ছোট পদক্ষেপে ক্রমে অভিযোগগুলো আদালতে বা নির্বাচনী কর্তাদের হাতে প্রত্যাখ্যান বা নাকচ হয়ে যাচ্ছে। ১৪ নভেম্বরের শুরুতে, ভোর রাতের হিসাবে কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত কয়েকটা খবরের শিরোনাম এ রকম- ১. পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী কর্তারা নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আদালতে ট্রাম্পের মামলার ফেডারেল বিচারককে জানিয়েছেন, তিনি মামলা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারেন এখন – রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ২.আমেরিকার নিবার্চনী কর্তারা ট্রাম্পের কারচুপির অভিযোগ বা দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন- বিবিসি ইংরেজির রিপোর্ট। তারা আরো বলেছেন, ‘এবারের ভোট ব্যবস্থায় কোনো ভোট বাতিল হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, পরিবর্তন করা হয়েছে অথবা কোনো ধরনের কালোদাগ লেগেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ বরং আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ‘ভালো নির্বাচনগুলোর অন্যতম এবারের ভোট”। ৩. বাইডেন এরিজোনার আসনগুলোও পেয়ে নিজের ইলেক্টোরাল কলেজ আসন ২৯০ তে নিয়ে আরো পোক্ত হতে যাচ্ছেন- রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ৪. এটা বিবিসি বাংলার ফ্যাক্ট চেক টিমের গবেষণা; মানে, তাদের ভাষায় ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক টিম’-এর ১০ নভেম্বরের রিপোর্ট। তারা বলছেন, “কোনো তথ্যপ্রমাণ না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেশ কয়েকটি পোস্টের কথা উল্লেখ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রচারণা শিবির”।
    এভাবেই ট্রাম্পের অভিযোগের পাটাতন ক্রমে নিজ পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে চলেছে। তবু সব অভিযোগ শেষ হয়েছে এমন নয়। এর প্রধান কারণ, আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমাদের মতো কোন কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল নির্বাচনী অফিস বলে কিছু নেই। ভোট নেয়া, তদারকি ও ফলাফল ঘোষণা প্রত্যেকটা রাজ্যের দায়িত্ব এবং তা তাদেরই নিজ নিজ আইনে পরিচালিত হতে হয়; যাতে আবার রাজ্যে রাজ্যে কিছু আইনগত ভিন্নতাও আছে। তাই এখন ট্রাম্পের অভিযোগগুলো নিষ্পন্ন হচ্ছে, প্রতিটি রাজ্যে এবং মূলত নির্বাচন অফিস ও আদালতে। তবু একটা ধারণা হিসেবে বলা যায়, এগুলো নিষ্পত্তি করতে আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে রাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণার কাগজে স্বাক্ষর করা শেষ করতে পারেন। তখন এই ফলাফল ‘অফিসিয়ালি ঘোষিত ফলাফল’ বলে বিবেচিত হবে।
    আর তখন ট্রাম্পের অফিস ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়ে যাবে। তা না করলে আদালত ট্রাম্পের অফিসকে অকার্যকারিতার জন্য অভিযুক্ত করতে পারবেন এবং পাল্টা করণীয় নির্দেশ জারি করতে পারেন। অর্থাৎ ক্রমে ট্রাম্পের জন্য, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার বাধ্যবাধকতা কঠিন ও শক্ত হয়ে আসছে।
    এভাবে অনুমান করা যায়, ট্রাম্প যতই হুমকি দেন তবু, ২০ জানুয়ারির আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু ও সম্পন্ন করতে ট্রাম্প বাধ্য হবেন। আর সবার উপরে আমেরিকার মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, দেশে একটা ফাংশনাল সিস্টেম দেখতে চায়; মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো হতাশাগ্রস্ত জীবনের কোনো দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে বলবেন, ‘আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করব না’-এই দায়দায়িত্বহীন বাক্য কিংবা বিশৃঙ্খলা মানুষ দেখতে চায় না। জীবন ইতিবাচক এবং জীবন এমন আশা-ভরসা নিয়েই চলে। তাই আমরা বরং এখন জো বাইডেনের বিজয়ে ও হবু বাইডেন প্রশাসনের চলার পথের নীতি-পলিসি কী হতে যাচ্ছে আলোচনা সেদিকে নিচ্ছি।

    বাইডেন প্রশাসন সম্ভাব্য অবস্থান-বৈশিষ্ট কেমনঃ
    প্রথমত এ্তদিন ট্রাম্প গত চার বছরে যত ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, এর উল্টা যাত্রায় বাইডেন এখন যতটা সম্ভব আগের ওবামা আমলের অভিমুখী হবেন। সাধারণভাবে যা “ডেমোক্র্যাট আইডিয়াল অবস্থান” মনে করা হয় তেমন অভিমুখে যাবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটা আরো প্রো-পাবলিক হতে চেষ্টা করবে, সাধারণ জনমত ঠিক যা আশা করে। যেমন- পরিবেশ ইস্যুতে ‘প্যারিস চুক্তিতে’ ফেরত যাওয়া আর হিউম্যান রাইটস ইস্যুতে অনেক কড়া অবস্থান নিয়ে আসছেন বাইডেন।
    তবে সব কিছুর উপরে যা প্রধান দ্বন্দ্ব, যার নিরসন হবে বাইডেনের মুখ্য ইস্যু – যা অনেকটা পরস্পর সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো চাকার মধ্যে প্রথম যে চাকাটা ঘুরে বাকি সব চাকাকে ঘুরতে বাধ্য করে, এমন সেই ‘প্রাইম মুভার’ ইস্যু হবে চীনের সাথে ‘বাণিজ্য ইস্যু’ নিয়ে আলোচনা (যাকে গত চার বছর বাণিজ্যযুদ্ধ বলে ডাকা হয়েছে) তা শুরু করা। সেকারণে, আগামি ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ নেয়ার পরেই এক নম্বর প্রায়রিটি হবে এই ইস্যু।

    যদিও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের আমলেই তা তিন পর্বে মিটিয়ে ফেলার একটা পরিকল্পনা ছিল যার প্রথম পর্ব ট্রাম্পই আলোচনা ও ঐকমত্য শেষে স্বাক্ষরও সমাপ্ত করেছিলেন। কিন্তু আর অগ্রগতিতে না গিয়ে সব স্তব্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। সেসবই এবার ফাংশনাল হতে শুরু করবে। এটাই হবে বাইডেনের ‘প্রাইম মুভার’ ঘটনা। এ জন্য যে, ট্রাম্প বাণিজ্য আলোচনাকে বাণিজ্যযুদ্ধের জায়গায় নেয়াতেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা গত ৭৫ বছর ধরে রাজত্ব করার শেষে এর পালাবদলটা মসৃণ হওয়ার বদলে তা যুদ্ধপরিস্থিতির দিকে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ঠেলে দেয়ার দিকে নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। আর এটাই এখন অভিমুখ বদলাবে, যেটা দুনিয়াজুড়ে সবার আশা। এই অর্থে, বাইডেনের বিজয়ের প্রাথমিক খবর মানুষকে এক সম্ভাব্য গ্লোবাল যুদ্ধপরিস্থিতি এড়াতে এক মুক্তির সূচনা করল মনে করেছে। এক সম্ভাব্য গ্লোবালযুদ্ধ এড়াতে পারা অর্থে এটা এক নাজাত।

    তাহলে এখন কী হতে পারে?
    খুব সম্ভবত বাণিজ্য আলোচনায় আসলে যা হবে চীনের দিক থেকে দেখলে তাকে বলা যায়- এটা হবে, যত বেশি সম্ভব আমেরিকাকে বাজার ছাড় দিয়ে এর বিনিময়ে চীন নিজের গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া- এই হস্তান্তর মসৃণ ও বাধাহীন করার নিশ্চয়তা ‘কিনে নেয়া’। বাণিজ্য আলোচনায় এই দেয়া-নেয়াই সম্পন্ন হতে পারে। যদিও  এটা আবার দুইভাবে ঘটতে পারে। এক, মুখে স্বীকার করে নিয়ে শুরু করা যে, আমরা পরস্পর এটাই বিনিময় করছি। অথবা তা হতে পারে মুখে স্বীকার না করে দুইপক্ষই মনে মনে এটা ধরে নিয়ে। তবে মুখে স্বীকার না করে নেয়ার কৌশলগত সুবিধা বেশি।
    এভাবে বাণিজ্য আলোচনা-নেগোসিয়েশনের আগের পথেই দ্বিতীয় পর্ব একটা চুক্তিতে পৌঁছালেই এরপর জো বাইডেন-শি জিনপিংয়ের যৌথ সামিট অনুষ্ঠিত হতে পারবে ও হবে। আর দুইপক্ষের উপরই দ্রুত এমনটা করার জন্য গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাজারের চাপ থাকবে প্রচন্ড। কারণ করোনাকালে দ্বিতীয়বারের আক্রমণের ধাক্কাও আসন্ন। ফলে নিরন্তর মন্দা বাজারে মধ্যে ইতিবাচক মেসেজ পেতে সবাই আগ্রহী যাতে বাজার চাবুক খেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

    এতে গ্লোবাল বাজার ও ক্ষমতার করিডোরে কী মেসেজ যাবে?
    সামগ্রিকভাবে মূল মেসেজটা হবে ইন্দো-প্যাসিফিক এবং কোয়াড [QUAD] উদ্যোগ ও স্ট্র্যাটেজিকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প মূলত মরিয়া হয়ে এদুটাকে একই সাথে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়ে চলেছিলেন। ট্রাম্প জানতেন এটা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পরে অকেজো দিশেহারা স্থবির হয়ে যাবে, কারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গেলে তো এমনই দশা হওয়ার কথা।
    চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনায় একবার প্রথমপর্বের আলোচনার শেষে  ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে এবং প্রকাশ্যে প্রেসের সামনে বলেছিলেন, চীন বাকি নেগোসিয়েশন আর করল না, আগালোও না – বাইডেনের ভরসায়। মানে নিজ ক্ষমতাসীন থাকার দু’বছরের মধ্যেই সে সময় ট্রাম্প বুঝাতে চেয়েছিলেন আগামীতে রিপাবলিকান প্রার্থী বাইডেন জিতে আসবে, এই ভরসায় আছে চীন। আর তারা তখন বেটার সুবিধা পাবে ও নিবে (ট্রাম্পের কাছে পাচ্ছে না) চিন্তা করে এখন ট্রাম্পের সাথে কম্প্রোমাইজ ডিলে যাচ্ছে না। তাই তিনি ওখানে ঘোষণা করেন, আগামীতে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হওয়া বন্ধ করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তাই ধীরে ধীরে চীনবিরোধী জোট গড়া – আর সেটা খাঁড়া করা খুবই কঠিন হলেও তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড গড়ে এটাতে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট এ দুই লক্ষ্য জুড়ে দিয়েছিলেন।
    আর এখন ঠিক এ জায়গাটাতেই বাইডেন বদল ঘটাবেন। কৌশলগতভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড উদ্যোগ ভেঙে না দিয়ে বরং এখন এটা কেবল বাণিজ্যের জোট এমন ধারণা সেট করে দেবেন। অর্থাৎ চীনের সাথে বাইডেন কী দেয়া-নেয়া করতে যাচ্ছেন বা করে ফেলবেন এর ছাপ-ইঙ্গিত তিনি এভাবে প্রকাশ করবেন।
    স্বভাবতই, আড়াই লাখ আমেরিকানের কোভিড-১৯-এ মৃত্যু আর প্রায় ৯ কোটি বেকারের আমেরিকায় বাইডেনের চীনা ডিল বা সম্ভাব্য এই ‘দেয়া-নেয়া’ – এটা একটা ইতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করবে। যেকোনো অর্থনীতিই বেকারত্ব ও মহামারী থেকে বের হয়ে আসতে চায়। কারণ ‘উহান ভাইরাস’ বলে ট্রাম্পের নিজের সব শোচনীয় ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা চীনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া নির্বাচন পার হওয়ার জন্য হয়তো চলে। কিন্তু বাস্তবতা খুব কঠিন। তাই, না আমেরিকান অর্থনীতি না বেকার মানুষ এসব কথাকে এতদিন ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। অতএব, যদি এভাবেই আগানো হয় তবে বাইডেন-শি জিনপিংয়ের সামিট তখন আমেরিকায় এক শীতল-পরশের মতো ভূমিকা নিয়ে হাজির হবে বলে অনুমান করা যায়।

    তাহলে ভারত তখন কোথায় যাবে?
    সীমান্তে চীন ভারতের সব দখল করে ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি করে বসে পড়াতে ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়া বিশেষত মিডিয়া ফোরফ্রন্টে যারা আছেন তারা বুঝে গেছেন, মোদি তাদের সবাইকে বেইজ্জতি করে ফেলেছেন। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব একালে ফুটে উঠেছে। তারা পরিষ্কার জানেন, কেন চীন ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি মেনে ভারতের সব কেড়ে নিয়েছে। কেন ‘এলএসি’ [LAC] বলে এখন কিছুই নেই। মোদীর হামবড়া ভাব আর পুরা কাশ্মির ভারতের বলে দখলের দাবি – এসব অবিবেচক অবস্থাই ভারতে তাদেরকে ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব অনুভবে ফেলে দিয়েছে, তা তারা কমবেশি সকলেই জানেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত হল – তবু কথিত ‘জাতীয় স্বার্থের’ নামে মিথ্যা কথার জার্নালিজমই তাদের করতে হবে। অথচ যা মিথ্যা তা কখনই জার্নাজিলম-ই নয়। তাই তাদের দেখে  বাইরে থেকে মনে হবে তারা মোদীর পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আসলে এটা তাদের ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাবেন, তাদের রিলিফ দিবে মনে করেই এই মিথ্যার চর্চার মহড়া যাতে তারা এখন যুক্ত ও মত্ত হয়েছেন।

    এ কারণে আগামীতে বাইডেন-জিনপিংয়ের সামিট যতই আসন্ন হয়ে উঠবে ভারত ততোধিক অস্থির হয়ে ভারত-চীন সম্পর্ক আবার আগের মত অবস্থায় ফিরে পেতে মরিয়া ও ন্যাংটা হয়ে উঠবে। চীনের সাথে ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের কাশ্মিরের স্ট্যাটাস বদলে দিবার আগের সময়ের চীন-ভারত সম্পর্ক যে জায়গায় ছিল সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির ও মরিয়া হয়ে উঠবে। অবশ্য একালের মোদীর ভারত জানবে যে, বাইডেনের আমেরিকা ভারতকে আর ‘চীন ঠেকানোর’ কাজের কোনো ঠিকা দেবে না। ফলে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া- সেই ঠিকা ফেরত পাওয়া – না, এরও কোনো বালাই থাকবে না। তবু চীন-আমেরিকার সম্পর্কের টেনশনের আড়ালে ভারত নিজেকে লুকায় রাখার কৌশল নিবে যাতে বাইডেনের “ঝারি” একটু কম ভারতের গায়ে লাগে।

    আর এটাই মোদীর সবচেয়ে বড় “বাইডেন-অস্বস্তি” ইতোমধ্যেই মোদীকে কঠিনভাবে অস্থির করে তুলেছে। সে কারণে বাইডেন আসছে এই খবর পাওয়ার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়ার সুর বদলে গেছে।  ট্রাম্পকে বাপ ডাকা আক্ষরিক অর্থেই পুজা করা মোদীর ভারতের জন্য বাইডেন জিতাতে এখন আঙুর ফলে একেবারেই টক হয়ে গেছে! যেমন আনন্দবাজার লিখছে, “অ্যামেরিকায় গদি বদলালে ভারতের কী”! যেন সমাজ-সংসারে নিরাসক্ত এক যোগী কথা বলছে। মানে তারা এখন ভেক ধরে বলছে, “আমেরিকার নির্বাচনে কে জিতল তাতে ভারতের কিছুই যায় আসে না”। অর্থাৎ তারা আসলে যেন বলতে চাইছে,  “হে মহান বাইডেন সাব, আমরা ভুল করেছি; আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের মোদি ‘হাউ ডি মোদী’ করেছিল, হিউস্টনে আর গুজরাটে। যেখানে মোদী নিজে মুখে সমস্ত প্রটোকল ইজ্জত সম্মান ভেঙ্গে “আব কি বার ট্রাম্প সরকার” (পরের নির্বাচনে ট্রাম্পই জিতবেন) বলে স্লোগান ধরেছিল। এটা গর্হিত কাজ, অসৌজন্যমূলক। কারণ একজন সিটিং প্রধানমন্ত্রী এভাবে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ্যে নিয়েছে। ফলে এখন বাইডেন-মোদী কখনো সাক্ষাৎ হলে (বা একারণেই হয়ত সাক্ষাত হতে অনেক দেরি হবে) মোদী মুখ দেখাবেন কী করে, সেই অস্বস্তি এড়াবেন কী করে? এমন ন্যূনতম হুঁশজ্ঞান নেই এমন লোকই এখন ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান। আর সেসব ঢাকতেই মোদী এখন মিডিয়াকে কিনে-বশ করে এমন রিপোর্ট ছাপানোর তোড়জোড়। বিবিসি বাংলার ট্রাম্পের নামে আগেভাগে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ জয়ধ্বনি দিয়ে মোদি কি এখন বিড়ম্বনায়?’ এই শিরোনামের রিপোর্টটা বলে দেয়, মোদী কোন বেইজ্জতিতে আছেন। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মী দুই সপ্তাহ আগে যারা ট্রাম্পকেই তাদের নিরাপত্তাদাতা মনে করতেন এরাই এখন বলছেন, বাইডেনের সাথে ভারতের সম্পর্ক যেন কতকাল আগের। আসলে তামাশার বোধ হয় কোনো সীমা থাকে না!

    এদিকে চীন-ভারত লাদাখ সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যেই হঠাৎ গতি পেয়েছে, মনে হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশে?
    কিন্তু বাইডেন জিতবার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে সম্ভবত হবে সবার চেয়ে ভিন্ন। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে বাইডেনের কড়া অবস্থান নিবেন অনুমান করা হচ্ছে তাই। এটাই মোদীর জন্যও সবচেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ার কারণ হয়েছে ইতোমধ্যেই। বাইডেন আগেই তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাশ্মিরে রাইট ভায়োলেশন নিয়ে সোচ্চার হবেন জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কড়া অবস্থানের কারণ হল,  সাধারণভবে এটা ছিল সবাইকে দেয়া, মূলত হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শ যে, একালে চীনকে বেকায়দায় রাখতে চাইলে হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে আমেরিকার নিজ প্রশাসনের কড়া অবস্থান জরুরি। তাই ব্যবসা পাওয়ার লোভে আমেরিকার মানবাধিকারে ছাড় দেয়া যাবে না। এই নীতি অবশ্য ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক বেশি অনুসরণ করেছেন। বাইডেনের কড়া অবস্থানের পেছনে এটাই কারণ।

    আর এটাই হাসিনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। অনেকে বলতে পারেন, এটাই একই সাথে চীনের উপরেও চাপ, যাতে হাসিনা-চীন ঘনিষ্ঠতা কমে। এক থিঙ্কট্যাঙ্ক কনসালট্যান্ট কুগেলমানের [Michael Kugelman] বরাতে বাংলাদেশের একটি পত্রিকা লিখেছে, এই “ঘনিষ্ঠতা কমানো হবে” বাইডেনের বাংলাদেশ অবস্থানের মূল নির্ণায়ক।

    “I do imagine that he will view Bangladesh through the lens of US-China rivalry, and he will aim to engage with Dhaka in order to encourage it to distance itself from Beijing.

    কিন্তু কুগেলমানের একথা আসলে ‘ওভার এস্টিমেশন’। কারণ ‘বেসিক ফ্যাক্টস’ হল – অবকাঠামোর- ঋণদাতা বিনিয়োগকারী  হিসাবে আমেরিকা বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী একেবারেই নয়, এমনকি চাইলেও তা হতে পারবে না। আমেরিকার এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই বলেই তো গ্লোবাল নেতা হবার পদ হারাচ্ছে, চীন সে জায়গায় বসতে যোগ্য হয়ে গেছে। তাই আমেরিকার বাংলাদেশের ‘চীনা ঘনিষ্ঠতা’ ছুটানোর কোনো মুরোদই নেই। মনে রাখাই ভাল ধমকিয়ে কারো মন পাওয়া যায় না, এর সম্ভাবনা নেই। সে জন্য মন পাওয়ার ‘তরিকা’ ধরতে হয়। তবে অবশ্য বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার মুরোদ আমেরিকার এখনো শেষ প্রান্তে হলেও আছে এবং খুব সম্ভবত এই বাইডেন প্রশাসনই হবে বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার ব্যাপারে আমেরিকার শেষ প্রশাসন। আরেক বটম লাইন হল – চীন বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো-ঋণদাতা বিনিয়োগকারী থাকবেই, তাতে বাংলাদেশে যেই ক্ষমতায় থাক অথবা একটা নির্বাচিত সরকার থাকুক কি না থাকুক কিংবা ওই ঋণ থেকে অর্থ সরানোর সুযোগ কারো থাকুক আর নাই থাকুক। কাজেই কুগেলমান যেভাবে কথাটা চীনকে জড়িয়ে হাজির হয়েছেন তাতে ব্যাপারটা এক “সস্তা ভয় দেখানো’  হয়েছে। ভদ্র ভাষায় বলতে হয়, এটা কুগেলমানের “অতিসরলীকৃত এক বুঝ” বলা যায়।

    কিন্তু বাংলাদেশে হিউম্যান রাইট মেনে চলার রেকর্ড সঠিক করার চাপ আসন্ন, একথা বাস্তব ও সত্য। ট্রাম্প নয়, এটা বাইডেন জিতেছে বলে, ভারত আর বাইডেনের পিঠে চেপে চলা বা আসা কোনো ‘ব্যাগেজ’ নয়। তাই সরাসরি আমেরিকান চাপই আমাদের সরকারের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে। কিন্তু তাই বলে ভারতের কোন চাপ নয়। হবার সম্ভাবনাও নাই। আবার ওদিকে রাতারাতি বাংলাদেশের সরকার ভাল হয়ে যাবে, হিউম্যান রাইটের সব রেকর্ড ভালো করে ফেলবে – তা সম্ভবই নয়। করা যায় না। তবে বাইডেন হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য সরকারকে চাপ দিলে এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের একটা সমর্থন আমেরিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে অবশ্যই। ঠিক যে অর্থে হাসিনা সরকারের জনসমর্থন বা পাবলিক রেটিং প্রায় নেই বলে, বাইডেনের চাপের বিরুদ্ধে, ইন্টারভেনশনের বিরুদ্ধে জনমতকে সরকার কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে।

    তবু ‘কী হতে যাচ্ছে’ তা নিয়ে এসব আসলে অনুমানের কথা। বাস্তবে কিভাবে ব্যাপারটা ঘটবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদিও চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তব!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৪ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “গ্লোবাল ও লোকালি ‘বাইডেন পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3dR

    Biegun-Momen joint Press meeting

    আমেরিকান ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের দু’দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম যে মন্তব্য করার আছে সেটা হল, এতে তাৎক্ষণিক কোনো ফল আসেনি বা আসছে না তা বুঝা গেছে। কিন্তু এর মানে কী আগামীতে আসবে? না। সেটাও একেবারেই অনিশ্চিত এবং সম্ভবত, না। বরং এশিয়ায় আমেরিকা এক চির-অথর্ব শক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

    যদিও আপাতত, আমেরিকার দিক থেকে বললে তারা যে ফলাফলের আশায় আর যে বুঝাবুঝিতে বাংলাদেশকে রাজি করানোর পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল তা তাৎক্ষণিক ফল দেয়নি, মানে কাজ করছে না, এটা তারা বুঝেছে। এ যাত্রায় তাতে দেরি হবে, সময় লাগবে এমনকি কখনো না-ও হতে পারে। এখন আমেরিকা যদি একটা ইতিবাচক ফল চায় তবে এই রাস্তায় হবে না। ভিন্ন রাস্তা ও কৌশল ধরতেই হবে। তাহলে কী হবে এখন?

    ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়েছে নাকি-আলাপ হয়নিঃ
    ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ জিনিসটা কী? স্ট্রাটেজি নাকি নেশনস বা ভিশন অথবা জোট বা সমিতি? আজও তা আমেরিকাও জানে না। তবু ভারতের মিডিয়াকে অনুসরণ করে এবার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (বা সংক্ষেপে আইপিএস [Indo-Pacefic Strategy, IPS]) বলতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু প্রো-ইন্ডিয়ান মিডিয়াকে। যেখানে খোদ আমেরিকাই এখনো একেক সময় একেকটা শব্দ ব্যবহার করে অস্থিরতা প্রকাশ করে যাচ্ছে। আমেরিকান কূটনীতিকরা আর গ্লোবাল নেতা থাকছেনা বলে আমেরিকার ওজনের ভারে কিছু কাটতে পারছেন না। তারা বললেই হয়ে যাচ্ছে না। বহু কাঠখড় পুড়িয়েও সময়ে তা থেকে কিছুই মিলছে না। সবকিছু দ্রুতই যেন দিন ফুরিয়ে আসছে, এমন দশা। এ দিকে বিগানের বাংলাদেশে আসার পর দেখা যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক “বিজনেস ফোরাম” বলে আরেক নতুন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। শব্দটা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মানে রাষ্ট্র যারা ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্ত হবেন তাদের একটা ইকোনমিক বা বিজনেস জোটও থাকবে, তাই মনে হচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দিক থেকে দেখলে এটা যেন বিগানকে দেয়া তার এক সান্ত্বনা পুরস্কার যে, ‘বিজনেস ফোরাম নিয়ে খুশি থাকো’! এদিকে আবার ‘কোয়াড’ বলে চার-রাষ্ট্রীয় (QUAD) এক জোট  তো আছেই। সেই সাথে আবার এদের সবাইকেই কি ‘এশিয়ান ন্যাটো’ বলে আরেক নামে নামাবে এরও কানাঘুষা উঠছে। তার মানে ইন্দো-প্যাসিফিক বলতে সামরিক-নিরাপত্তা জোট নাকি বিজনেস জোট মুখ্য হবে এ নিয়ে টানাটানির এখনো শেষ হয়নি।

    অভ্যন্তরীণভাবে ইন্দো-প্যাসিফিকে এসব অমীমাংসিত বিষয় থাকা অবস্থায়, বাংলাদেশে আমরা দেখছি এবার প্রথম বাধা উদয় হল যে, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলাপ হয়েছে, না হয়নি – এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান হল, ধারাবাহিকভাবে তারা বলছেন- ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন ও ডেপুটি-মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দু’জনই আলাদা করে ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন “আইপিএসের প্রসঙ্গটা আলোচনায় আসেনি”। অথচ ‘প্রথম আলো’ নিশ্চিত করে লিখেছে তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিগান বলেছেন, “আজ (বৃহস্পতিবার) আমি বাংলাদেশ সরকারের সাথে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করেছি। ব্যাপকতর অর্থে আইপিএসে যেসব সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছি। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে আমরা একে অন্যকে কিভাবে যাতে সহায়তা করতে পারি তা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই, এর প্রতিবেশী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে”।

    এখন ভাষ্যগুলোকে আমরা কী এভাবে নিতে পারি? বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে কথা বলতে চায় না এই অবস্থানটা বুঝিয়ে দিতে গিয়ে যতটুকু যা কথা বলতে হয়েছে, এটা তাই। এ ছাড়া সরকারের অবস্থানটাও  বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগে থেকেই অনেক শক্ত ছিল। অন্তত যতটুকু আর যে শক্ত ভাষায় তারা মিডিয়ায় কথা বলছেন। যেমন, দেশের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় উঠেছে, বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগের দিন মন্ত্রী মোমেনকে এক সাংবাদিক যতবার আমেরিকান প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন করেছেন তাতে অন্তত বেশ কয়েকবার তিনি বলেছেন ‘উই আর নট ইন্টারেস্টেড’। এর মধ্যে সবচেয়ে কোটেড দু’বাক্য হল এ রকম। মোমেন বলছেন,

    “We have no objection to the Indo Pacific Strategy. But they should come forward to the infrastructure development if they want to make the Indo Pacific Strategy more effective”.

    “ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আমাদের আপত্তির তো কিছু নেই। যদি তারা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে কার্যকর দেখতে চান, তবে তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপায়গুলো নিয়ে সামনে আসতে হবে। তাদের অর্থব্যয় করতে পারতে হবে; শুধু কথায় কাজ হবে না”। এরপরে ঐ সাংবাদিক নিজে যোগ করেছেন, ‘মন্ত্রী আসলে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে আমেরিকার কোনো বিনিয়োগ বা অবদান নেই এ কথার দিকে ইঙ্গিত করছেন”।
    এর আগেরদিনও আমেরিকার কেবল অস্ত্র-বিক্রির দিকে আগ্রহকে খোঁচা দিয়ে মোমেন বলেছিলেন, “তারা আমাদের অস্ত্র-বিক্রি (অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইত্যাদি) করতে চায়। কিন্তু আমরা কোনো সঙ্ঘাতের ব্যাপারে জড়িত হতে আগ্রহী নই। তারা চাইলে অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে”।

    “They want to sell arms, but we are not interested in issues related to conflict,”

    আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক নৌকায় ওঠার প্রস্তাব উপড়ে ফেলে দেয়ার দিক থেকে দেখলে এটা হাসিনা সরকারের ভাল কৌশল যে, এমনভাবে শান্তিবাদী এবং উন্নয়নবাদী সেজে জবাবটা দিয়েছে। আর উল্টা আমেরিকাকে খোঁটা দেয়া যে, – “এখন অবকাঠামো খাতে আর তোমার বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তুমি অযোগ্য আর এটা তোমার দুর্বল জায়গা”। সাথে যেন বুঝিয়ে দেয়া বাংলাদেশের চীনের প্রতি আগ্রহ বা চীনকে আমার দরকার তোমার চেয়ে বেশি। অতএব “উই আর নট ইন্টারেস্টেড”। কিন্তু বাংলাদেশের এই অবস্থান কত দূর টিকবে? সেটা বলা মুশকিল হলেও এটা আপাতত আমেরিকান স্ট্রাটেজিস্টদের বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছে, সন্দেহ নেই।

    বাংলাদেশের অনেকে এখানে একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তর্ক করেন যে, “আমেরিকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ নাকি এখন সর্বোচ্চ”। অনেকে আরো অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটের রেফারেন্স দেন। তাদের বিনয়ের সাথে বলব, বিনিয়োগ বলতে অবকাঠামো বিনিয়োগ বলে যা বুঝায় সেটা সাধারণত কেবল সরকারি ভাবেই হয়। আরেক ধরণের বিনিয়োগ হয় সেটা বেসরকারি। অর্থাৎ ডাইরেক্ট মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) [FDI, Foreign Direct Investment]। যেটা সরকারের নয়; আমেরিকান প্রাইভেট কোম্পানির। আমেরিকান সরকার সেটার মালিকও নয়; ফলে এসব কোম্পানি উঠে চলে যেতে বা জেঁকে বসতে চাইলেও তা তাদের মালিক-শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই মুখ্য করেই সব সিদ্ধান্ত নিবে যেটা ওর শেষ কথা। সেক্ষেত্রে আমেরিকান সরকারের বলার সুযোগ এখানে তাই প্রায় নাই। অতএব, ‘আমেরিকান সরকারি বিনিয়োগ’ বলতে কেবল অবকাঠামোকেই বুঝতে হবে। কিন্তু দূতাবাসের সাইটে ব্যাপারটাকে Bilateral Economic Relations ‘বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ’  বলে শিরোনামে রাখা হয়েছে। অথচ ভিতরে কেবল এফডিআই এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সব বিভ্রান্তি সম্ভবত এখান থেকে। যেখানে আবার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে ঐ বিনিয়োগে সাঙ্গু গ্যাসের জন্য বিনিয়োগটাই ওর বড় অংশ। এটা আসলে শেভরন কোম্পানির বিনিয়োগ। তাই মোট পরিমাণ হিসাবে সেটা ৩.৪ বিলিয়নের। তবু সেখানেও একটা অঙ্কের ফাঁকি আছে। ঐ ফিগারটা বলা হয়েছে ২০১৮ সালের। এ কথার মানে হল তারা ২০২০ সালের পর্যন্ত আপডেটেড তথ্য দিচ্ছে না।, সম্ভবত এর পরের দু’বছরে ফিগারটা কমে গেছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ কথাটা মিথ্যাও নয় আবার এটাই সব সত্যি তাও নয়। তবে মন্ত্রী মোমেনের পরিস্কার দাবি – অবকাঠামোতে আমেরিকান বিনিয়োগ নেই। আর একথাটাও ভুল বলে কেউ দাবি করেছেন, দেখা যায়নি।

    তাহলে কি এখন আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশকে তুলতে না পেরে হতাশ মুখে বসে থাকবে?
    না, ঠিক তা নয়। তবে ইতোমধ্যে বিগান ও তার দল তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটা দেখিয়ে ফেলেছেন মনে করা যেতে পারে। যেমন প্রথম আলোর বিস্তারিত কথোপকথনের রিপোর্টে (১৬ অক্টোবর) দেখা যাবে, যতগুলো ইস্যু বিগান তুলেছেন তাতে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন আমেরিকা তা সমাধানে আগ্রহ দেখাবে যদি তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশ আগে উঠে, তাহলে। তবেই আমেরিকা প্রধান উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে।
    যেমন, স্টিফেন বিগানের এই সফরের পাশাপাশি আরেক প্রচেষ্টা চলছে ইউরোপে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। তাতে বাংলাদেশ অনাগ্রহ দেখিয়েছে ইতোমধ্যেই। ক্রিটিক্যাল বিচারে ব্যাপারটায় বাংলাদেশের অনাগ্রহ দেখানো খুবই সঠিক। কারণ, ব্যাপারটা হল  এরা ইউরোপিয়ানদের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এভাবে জোট বেধে আগামি ২২ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য একটা ফান্ড তৈরির চেষ্টায় বসতে যাচ্ছে। এমন বিষয়ে এক রিপোর্টের শিরোনাম – “রোহিঙ্গাদের ১০ বছর মেয়াদি মানবিক সহায়তা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের, আগ্রহী নয় বাংলাদেশ”।  এখান থেকেই আসলে পুরা ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে যাতে সুবিধা হয় এমন আমেরিকান পরিকল্পনা থাকা অসম্ভব নয় মনে হচ্ছে। যেমন এনিয়ে বণিকবার্তায় মোমেনের বক্তব্য বা মিডিয়ায় প্রশ্ন রেখেছেন,  এতে মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর”।

    চারটি গ্রুপ এ বৈঠকটি মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর। – পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন

    অর্থাৎ সোজা মানে হল, রোহিঙ্গা[Rohingya] ইস্যুতে আমরা আশ্রয়দাতা অথচ কোথাকার চার গ্রুপের মিটিং আর আমরা তা জানি না কেন? দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের পালার জন্য অর্থ সাহায্যের চেয়েও বড় প্রয়োজন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি যাতে তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেদিকে কোনো উদ্যোগ নেই কেন? আর তৃতীয়ত, তিন বছর হয়ে গেল; এখন কেবল ফান্ডের উদ্যোগ। তাহলে প্রত্যাবাসন নিয়ে আগ্রহ হবে কবে, সে খবর নেই কেন? এই কঠোর সমালোচনা বিগান প্রকারান্তরে মেনে নিয়ে বলছেন- কেবল “এ দেশের জনগণকে যাতে তার বোঝা টানতে না হয়” তাই ফান্ডের অর্থ তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দরকার আছে। এছাড়া বিগানের দাবি, “এ সমস্যার শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। তবে এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। সব দেশকেই এ সমস্যা সমাধানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে”।
    দেখা যাচ্ছে “আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন”  বা ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’- সবই তিনি বলছেন কিন্তু উদ্যোগ কে নিবে – ঘন্টাটা বাধবে কে – সেটাই বলছেন না। বরং এক “অনন্তকালের দিকে” তা ঠেলে দিয়েছেন, এটাই সম্ভবত ষড়যন্ত্রপুর্ণ দিক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এছাড়াও, বিগান যে ভাষায় বলছেন, “শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে” যুক্তরাষ্ট্র করেছে বলে যা বলছেন এটা পুরাপুরি ভুয়া। বরং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সীমান্তে ধেয়ে আসার এর প্রথম বছরটা ছিল – আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন শক্তিরই বার্মিজ জেনারেলদের কে কত তোয়াজ করতে পারে এরই যেন প্রতিযোগিতার বছর। কারণ মূল প্রতিযোগিতাটা আসলে ছিল মায়ানমার থেকে কে কত ব্যবসা বাগাতে পারে সেদেশে, এরই প্রতিযোগিতা।  বার্মীজ জেনারেলরাও এই ব্যবসা বিতরণের টোপ দিয়ে ঐতিনটা দেশকেও নাচিয়ে চলেছিল। ব্যবসা পাবার লোভে আমেরিকা, ভারত ও চীন কারোরই আন্তর্জাতিক দায়দায়ীত্ব বা মানবাধিকার প্রসঙ্গে কোন খেয়াল ছিল না। আর এটার সুযোগ নিয়েই  বার্মীজ জেনারেলেরা রোহিঙ্গাদের ইচ্ছামত হত্যা ও রেপ ও নির্মমতার আয়োজন  করে বাংলাদেশে তাদের ঠেলে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এভাবে ঠেলে দেওয়ার সাফাই হিসেবে বার্মিজ পুলিশ-আর্মির ওপর কথিত “আরসা (ARSA) বাহিনীর” মিথ্যা আক্রমণের গল্প হাজির করেছিল। অথচ আরসা হল বার্মীজ সেনাবাহিনীরই তৈরি এই বাহিনী – যা একই পুতুল শিয়ালের ছানার মত বার্মীজ সেনাবাহিনী সব জায়গায় হাজির করে বিপদে পড়লেই; বিচ্ছিন্নতাবাদী ফোর্স হিসাবে দেখায়। যেমন সেসময় দাবি করেছিল কথিত আরসা আক্রমনের প্রতিক্রিয়ায় নাকি বার্মীজ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মেরে রেপ করে সীমান্তে পাঠিয়েছিল। আর এসবের সবচেয়ে ত্যাদরামো ব্যাপার হল, এ নিয়ে এই তিন শক্তি কে কত ভালোভাবে বার্মীজ সেনাবাহিনীর ঐ সাফাই এর পক্ষে দাড়াতে ও সমর্থন যোগাতে পারে, গল্প  গাইতে পারে এরই প্রতিযোগিতা চলেছিল। সে কারণেই রোহিঙ্গাদের আগমনের ঢল সে সময়ে সহসা বন্ধ করা যায়নি। অতএব প্রথম বছরজুড়ে সেসব দিন ছিল ভয়াবহ, এখন সেসব সত্যতা পাল্টাতে চাইলেই কেউ পারবে না। বরং বিপদ ও শঙ্কার কথা হল, ঐ তিন শক্তির বার্মীজ সেনাবাহিনী তোয়াজের প্রতিযোগিতা আবার না শুরু হইয়ে যায়। যদিও এখন একমাত্র চীনই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া  নিয়ে সোচ্চার। আর ভারত, আমেরিকার কোনই খবর নাই। এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এদুইয়ের কাছে কোন ইস্যুই নয়।
    আসলে বার্মীজ সেনাবাহিনীর সাথে এই তিন শক্তির খাতিরদারি সবকালে একই রকম থাকে নাই। যেমন এখন মুখ্যত ভারত সবচেয়ে কাছে বার্মীজ সেনাবাহিনীর নৌকায়। আর এই ভারতই হল সেই ২০০৭ সাল থেকেই আমেরিকাসহ সারা ইউরোপ এমন সকলকে  বার্মীজ জেনারেলদের সা্থে যোগাযোগের অগ্রদুত বা এডভান্স পার্টি – এই ভুমিকা পালন করে এসেছে। আর চীন এখন একেবারেই বাইরে ছিটকে পড়েছে, মনে হচ্ছে। আর আমেরিকার অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগে, যার প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা মেইনটেন করে দিচ্ছে ভারত এবং অবশ্যই তা ভারতের বিরাট এক স্বার্থে। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসব।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুরই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে। এর মানে কি তারা এখন একেবারেই চলে যাচ্ছে?
    অবশ্যই না। তারা অবশ্যই আবার আসার কথা ভাববে। তবে সেটা খুব সম্ভবত আমেরিকার নির্বাচন সমাপ্তির আগে না; পরেই নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাত ধরে, হয়ত। যদি তা ঘটে তবে সেটা হবে বাংলাদেশের উপর আরো চাপ নিয়ে, আরো প্রলোভন নিয়ে এবং আমাদের সরকারকে যতভাবে বাধ্য করার সুযোগ তাদের হাতে আছে সব নিয়ে। এছাড়া আরো অনেক ‘কিন্তু’ আছে।

    স্টিফান বিগানের এই সফরের মুল সাফাইঃ
    মনে রাখতে হবে, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গড়তে চাওয়া এটা আসলে ইতোমধ্যেই একটা ফেইল্ড প্রজেক্ট ছিল; ২০১৬ সালেই ওবামার হাতে ‘এশিয়া পিভোট’ নামের এই প্রকল্পটা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইন্দো-প্যাসেফিক সমুদ্র-অঞ্চলের পাশের একটা দেশও সেকালে ওবামা নিজ নৌকায় তুলতে পারে নাই। তারপরেও স্টিফেন বিগান কিন্তু এখন প্রথম আলোকে যে নতুন গল্পটা দিয়েছে তা এরকমঃ স্টিফেন বিগান বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্যি, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে আমাদের নিরাপত্তার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আর এটা আমি অস্বীকারও করতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দেশেরও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করব না। যেমন হিমালয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গালওয়ান উপত্যকায় চ্যালেঞ্জ আছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপান সাগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাইওয়ানে উত্তেজনা রয়েছে। হংকংয়ে ক্রমবর্ধমান দমন পীড়ন চলছে। তিব্বতের শিনজয়ানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। এসব উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে”।
    এখানে প্রথম বাক্যে ‘আমাদের’ লেখা, এই আমাদের বলতে কারা? কারণ, ওবামার সেই কালেও এশিয়া-প্যাসিফিকের (এশিয়া-পিভোট নাম ছিল তখন ) কোনো দেশই আমেরিকার নৌকায় উঠেনি। এমনকি এই ভারতও না। যদিও তাতে অনেক দেশই আছে যারা সেসময় হয়ত জেনুইনভাবেই চীনের ওপর অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধও এবং অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার যুদ্ধ-নিরাপত্তা ফেরি করার জোটে তারা কেউ উঠেইনি। তাহলে এটা এখনও আমেরিকার “আমাদের” নিরাপত্তা’ চ্যালেঞ্জ হল কেমনে? আমাদের মানে, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ তো আসলে আমেরিকাকে একাই! অর্থাৎ আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে আর তা হয়েছে চীনের হাতে। এবং বড় কথা তা ন্যাচারাল!  আর মানতে হবে কেউই দুনিয়ায় স্থায়ী নেতা নয়। তাই, এমন ধরে নেয়ার কোনই ভিত্তি নাই। কাজেই “আমাদের” বলে এই মিথ্যাটা বলার দরকার কী? আর এতে কী আমেরিকার দুঃখ ঘুচবে? এছাড়া একালেও তো কোয়াডের তিন দেশ ছাড়া আর কেউ এখনও আমেরিকার সাথে জোট করেনি? আবার এই তিন রাষ্ট্রও আবার আধামন দিয়ে ও দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায়। অতএব আগের এশিয়া পিভোটের মত এবারো ইন্দো-প্যাসেফিক উদ্যোগও যে ফেল করবে না, তেমন নতুন কিছু তো ঘটেনি। আমেরিকা তা দাবিও করতে পারছে না।  আর ভারত? সেও আধামনে ও দ্বিধায় যতটুকু ভিড়েছে আর যা করছে এর কারণ ভিন্ন। ভারত তা কেবল নিজদেশের লোক আর মিডিয়ার মনোবল যেন চাঙ্গা থাকে সে জন্য করেছে – যেন বলতে চাইছে “ভয় নাই, বড় মুরুব্বি দেশ ভারতের পাশে আছে”। কিন্তু আসলে আছে কী?

    ভারতের আধা-মনে, দ্বিধায় দিন গুজরানঃ
    ভারতের আধা-মনে মানে হাফ-হার্টেড হয়ে দ্বিধায় দিন কাটছে। চলতি অক্টোবর মাসের ছয় তারিখে জাপানে যে কোয়াড (QUAD) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেল এটা তো আসলে ভারতেই হওয়ার কথা ছিল। [“But he (Biegun) added that the Quad grouping is expected to meet in New Delhi this autumn..…. ] কিন্তু ভারত আগেভাগেই গত মাসে মাফ চেয়ে হোস্ট হতে অপারগতা জানায়। কারণ ভারতের আসল অবস্থান হল – একপা আগে দুইপা পিছে, এমন টলমলে। কেন?

    মোদী গত ২০১৮ সালে ১ জুন সিঙ্গাপুরে আটল্যান্টিক জোট ‘সাংগ্রিলা” এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানবক্তার বক্তব্যে হিন্দু বেদের বরাত দিয়ে; ভারত ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কারো বিরোধী হয়ে কোন জোট গড়ার বিরুদ্ধে- বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে ভারতের নিজের সংশ্লিষ্টতা এমন হতে হবে যে ভারত কারো বিরুদ্ধে না [মানে এখন যেভাবে আমেরিকা বলছে চীনের বিরুদ্ধে জোট তা নয়] বরং ইনক্লুসিভ বা সবাইকে নিয়ে হতে হবে। এবার ধর্মগ্রন্থ বেদের বরাত দিয়েছিলেন – एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति বাংলায়, সত্য একটাই, জ্ঞানীরা তা বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করে থাকে। তাই ভারত বহুত্ববাদে, একসাথে পাশাপাশি বসবাসে, খোলামনে আর ডায়লগে বিশ্বাস করে। যারা এর রেফারেন্স চান তারা ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটের এই রেফারেন্স লিঙ্কে পুরা বক্তৃতাটা দেখতে পারেন।

    In conclusion, let me say this again: India’s own engagement in the Indo-Pacific Region – from the shores of Africa to that of the Americas – will be inclusive. We are in-heritors of Vedanta philosophy that believes in essential oneness of all, and celebrates unity in diversity एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति (Truth is one, the learned speak of it in many ways). That is the foundation of our civilizational ethos – of pluralism, co-existence, open-ness and dialogue. The ideals of democracy that define us as a nation also shape the way we engage the world.

    এছারা এই আলোকেই একবার এই গত জুলাই ২০২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন যে, ভারত কোন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যাবে না [India will never be a part of an alliance system, says External Affairs Minister Jaishankar]। কারণ ভারত জোট-নিরপক্ষে সেই সোভিয়েত কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে। এই নীতিতেই ভারত এখনো থাকবে। তার মানে হল, যতটুকু অন্য দেশে গিয়ে কোয়াডের মিটিং-এ ভারত যোগ দিয়েছে সেটা লোক দেখানোর জন্য। আর খুব সম্ভবত তা প্রধানত বর্তমান চীনের চাপে মারখাওয়ার মুখে নিজ পাবলিক ও মিডিয়ার মনোবল ঠিক রাখতে। তাই এবার একবার যদি ভারত কোয়াডের হোস্ট হয়ে যেত তবে সেখান থেকে যে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোকাস ভারতের জন্য তৈরি হয়ে যেত তাতে ভারত আর কোয়াডের সিরিয়াস ও সক্রিয় কেউ নয় বা সে তখনও জোট-নিরপেক্ষ  – এসবকথা এরপর দাবি করা খুবই কঠিন হয়ে যেত। সেটা হলে হয়ত পাবলিকলি অনেক কিছুই ভারতকে মুখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলতে হত যা করতে ভারত একেবারেই প্রস্তুত নয়। এই বিড়ম্বনা ও সম্ভাব্য ‘বেইজ্জতি’ থেকে বাঁচতে বা এড়াতে সে কোয়াড মিটিংয়ের আয়োজক না হয়ে এড়িয়ে যায়।

    নতুন আরো বিশাল বড় কারণঃ
    যদিও এর পেছনে আরো বড় কারণ আছে। আসলে এখন ক্রমশ পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে শুধু কোয়াডের চার দেশ – ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া – আর এদেরকে নিয়ে আমেরিকা, এদের নিয়েও কোনো ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়া একেবারেই সম্ভবই নয়। কেন? এত বড় কথা কেন?
    মূল কারণ মিয়ানমার ইস্যু। অথবা বলা যায় ভারতের আসল ইচ্ছা বা ঘটনায় মোঁচড়।
    মূল প্রশ্নটা হলঃ মিয়ানমার ইস্যুতে আমেরিকা্র রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করাসহ মিয়ানমার জেনারেলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যেকোনো ভূমিকা – এটা নেয়া কি আদৌ সম্ভব? উত্তরটা কন্ডিশনাল বা শর্ত সাপেক্ষ। মানে আমেরিকাকে যদি তা সম্ভব করতে তুলতে চায় তাহলে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক কোনো জোট খাড়া করার চিন্তা আমেরিকাকে এখন থেকে একেবারেই বাদ দিতেই হবে। কারণ কী?

    কারণ, নিশ্চয় আমেরিকা জানে যে মিয়ানমারকে সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। আর এতে ভারত মুখে সাফাই দিয়েছে, চীনের ভয়ে তাকে নাকি এটা করতে হয়েছে। অর্থাৎ ভারত-মিয়ানমার এখন এক ঘোষিত সামরিক-অ্যালাই বা পক্ষজোট হয়ে গেছে। তাহলে আমেরিকার এই ভারতকে নিয়েই কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কী করে সম্ভব?
    এর সোজা মানে হল, যত দিন মিয়ানমার-ভারতের সম্পর্ক ভারতের কাছে সবার উপরে বা আগে অগ্রাধিকার-সম্পর্ক হয়ে আছে বা থাকবে তত দিন আমেরিকা ভারতকে নিয়ে  ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কোন ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। এশিয়ায় কাউকেই কোনো সাহায্যে হাজির হতে বা কিছু করতে পারবে না যা ভারতের স্বার্থবিরোধী। এর মানে আমেরিকার আসলে হাত-পা বাঁধা পড়তে যাচ্ছে। এক অথর্ব শক্তি হচ্ছে। এসব আমাদের আগেই বুঝতে পারা কি খুব কঠিন? বার্মীজ জেনারেলেরা বহু চিন্তা করে  ঠিক এটাই করতে চেয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের মধ্যে ভারতকেই বেছে আলাদা করে কাছে টেনে আপন করে নিয়েছে। আর তা থেকেই এতকিছু ঘটা শুরু হয়েছে।
    এখন এসবের সোজা মানে স্টিফেন বিগানের এই সফর এখন তাহলে দাড়াচ্ছে যে এটা পুরাটাই লোক দেখানো বলে হাজির হতে পারে। যদিও এমনিতেই আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরে পরিষ্কার হয়ে যাবে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট এরা আসলে সিরিয়াস না নির্বাচনী দেখন-শোভা ছিল; নির্বাচনের পরেও কি এরা বেঁচে থাকবে, তৎপর থাকতে পারবে, কিভাবে?
    এরপরে নতুন প্রেসিডেন্ট তিনি যদি চান – এইবার আমেরিকা যে অথর্ব নয় তা প্রমাণ করতে গেলে আমেরিকার জন্য সেক্ষেত্রে একমাত্র অপশন হল, ভারতের বিরুদ্ধে সামরিকসহ সবভাবে খাড়া হতে আমেরিকাকে রাজি থাকতে হবে – এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারা। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছে দেখাতে হবে যে আমেরিকা ভারতবিরোধী সামরিক কোন জোটনেতা বা শক্তি – এভাবেই একমাত্র হাজির হতে হবে। সেক্ষেত্রে তাহলে এর মানে হবে এশিয়ায় আমেরিকার ভারত বলে কেউ নাই, দাঁড়াবার জায়গাই নাই। এমন হয়ে যাবে যা চিন্তা করা আমেরিকার জন্যই খুব কঠিন। আর আমাদের জন্য আমেরিকা তেমন দুর্দশায় পড়েছে সেটি চোখে না দেখলে আমরা কেউ বিশ্বাস করব না।

    আমেরিকার কুমিরের কান্না নাকি অথর্ব হয়ে যাওয়াঃ
    অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আমেরিকান চোখের পানি কুমিরের কান্না হয়েই থাকার সম্ভাবনা প্রবল।  তাহলে  গত দুবছর ধরে স্টিফেন বিগানের ততপরতা ফল কী এবার উল্টা ফলতে যাচ্ছে? এশিয়াতে আমেরিকাই ভারতের স্বার্থের অধীনে কেবল ততপর থাকবে? আর এটাই কী এবার স্টিফেন বিগানের ভারত সফরের ফলাফল হবে!
    তাই এখন এই অথর্ব আমেরিকা যে ভারতের কারণে উত্থান-রহিত হতে যাচ্ছে (আগামি ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে), এই আমেরিকাকে লইয়া কেবল হাসিনা নয়, পুরা বাংলাদেশই বা ‘কী করিবে’?  এই অথর্ব আমেরিকা আমাদের কোন কাজে আসবে? ভারত তার নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ফাঁদে, অগ্রাধিকারের ফাঁদে খোদ আমেরিকাকেই আটকে ফেলতে যাচ্ছে, সম্ভবত!
    তার মানে আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকা পড়তে চাইছে! নাকি এটাই যৌথ উদ্যোগ?

    সবশেষে একটা বাড়তি প্রসঙ্গ কথিত ভুরাজনীতিঃ
    বিগানের সফর উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের মিডিয়ার দুর্দশা দুর্গতি কী মাত্রায় তা সব উদাম হয়ে গেছে। এক কারো দালালি বা এজেন্ট হওয়া ছাড়া কোনকিছুই এদের করার দূরে থাক ইস্যুটা বুঝবারও সামর্থের সংকট প্রবল হয়ে ধরা দিয়েছে।  আর যখন কোন কিছু বুঝার ব্যর্থতা হাজির হয় তখন তা ঢাকতে এদের অনেকে একটা শব্দ ব্যবহার করে – ‘ভুরাজনীতি’। এ’এক কঠিন সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে। অথচ শব্দ না বুঝলে তা ব্যবহারের দরকার কী? এছাড়া ভুরাজনীতি শব্দটাই ভাল শব্দ নয়, আসলে তা  এমন আবছা। যেমন গ্লোবাল অর্থনীতি বা কোন গ্লোবাল অর্ডার নিয়ম বলে যে দুনিয়ায় কিছু আছে তা ভুরাজনীতি শব্দটা কাভারই করে না, তাই এই প্রসঙ্গটা কিছুই বুঝবার উপায় নাই। এই কথিত ভুরাজনীতি মানে কী, তা তাদের লেখা পড়েও কিছু বুঝার সুযোগ নাই। আরেক দল আছে যারা নিজের অসহায়ত্ব টের পেয়ে বুদ্ধিমান হতে চেয়ে ভারতের মিডিয়াকে কপি করে রিপোর্ট লিখেছে। অথচ এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থানই ভারতের বিরুদ্ধে সে খবর তাদের নাই। তারা খেয়ালই করে নাই। ওদিকে স্টার গ্রুপ বা প্রো-আমেরিকান মিডিয়া যারা, তারা ভাব ধরতে গেছে তারা সরাসরি আমেরিকান অবস্থান হাইলাইট করছে। কিন্তু হায়! তারাও বুঝে নাই যে এই ইস্যুতে স্টিফেন বিগানও মায়ানমারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইছেন না। যদিও তিনি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ‘আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক’ উদ্যোগ নিলে আমেরিকা আছে। মানে তিনি আসলে ইস্যুটাকে অনন্তকালের দিকে অমীমাংসিত ঠেলে দিয়েছেন। মানে কোন উদ্যোগ না নেওয়া, মানেই ত ভারতের অবস্থান। আবার বিগানের  “আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক” উদ্যোগ মানে কী? চীন উদ্যোগ নিলে তারা যাবে না সে তো বলাই বাহুল্য। ফলে এটাও এক কথার কথা।  সারকথায় রোহিঙ্গা বা মায়ানমার ইস্যুটাকে স্বাধীনভাবে বুঝবার তাগিদ বা সম্ভবত মুরোদ আছে মিডিয়ার তা বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে টের পাওয়া যায় না। আবার প্রথম আলোর বাংলা অনুবাদের এক উদাহরণ হল, চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগের বাংলা করেছে  – “অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই)”। ফলে এক কঠিন দশা। আর এসবের সার ফলাফল হল বাংলাদেশের পাবলিককে মুল ইস্যুটা কী তা বুঝাতেও মিডিয়ার ব্যর্থতা। এতে সবমিলিয়ে ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থের। আর এটা বলার সময় হয়েছে যে সরকার সরকারের অনুগামি মিডিয়া (ফার্মের মুরগীর মত) তৈরি করে রাখলে এর কী পরিণতি হয় তাও আমরা দেখলাম!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৭ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের স্বার্থে আটকা পড়ছে আমেরিকা!” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোন জোটে উঠা এড়াতে হবে

    উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোন জোটে উঠা এড়াতে হবে

    গৌতম দাস

    ১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3dt

    যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট (উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী) স্টিফেন ই. বিগান

    বাংলাদেশের একটা ক্রিটিক্যাল সময় পার করছে, সামনে আরও খারাপ সময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। সাথে আবার এটা এমন একটা সময় যখন বাংলাদেশের সরকারের রেটিং ভালো নয়, হওয়ার কোন কারণও নাই। অথবা সরকারও এ সময়ে অন্তত ২৫% মানুষ তার পক্ষে আছে মনে করে বোকার সাহস দেখাতে একটা খোলা সার্ভে হতে দিতে চাইবে না বা মনেও করবে না। সাধারণভাবে এশিয়ার জন্য বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যই খুব খারাপ সময় এটা। মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতির পুরান নেতা আমেরিকার বদলে পালাবদলে চীনের ক্রমশ নেতা হয়ে হাজির হওয়ার সময় হয়েছে। মূলত গ্লোবাল নেতা হওয়ার পালাবদলের এই সময়, বিশেষ করে এশিয়ান স্টেজ বা রঙ্গমঞ্চে ছোট দেশগুলোকে নিজের নিজের নৌকায় বা জোটে তুলতে টানাহেঁচড়ার খুব ভয়ঙ্কর সময় সামনে। তার প্রকৃত মাত্রা ও চিত্রটা পাবো আমরা আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরের সপ্তাহ থেকে। কারণ এই টানাহেঁচড়ার পেছনের আবার একটা বড় কারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ‘দেখন শোভা’ বা রোডশো। এই নির্বাচনে ট্রাম্পকে দেখাতে হবে, তিনি চীন বিরোধিতায় প্রবল লড়ছেন ও এমন সক্রিয়ভাবে তৎপর যে, নিজের অসুস্থতা ভুলে করোনার বেড থেকে উঠে এসেছেন।

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড’ [QUAD – India, Australia, japan, USA] জোট গড়তে ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (বা আমাদের সমতুল্য অর্থে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) পম্পেও গত এই ৬ অক্টোবরও জাপানে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিটিং করেছেন, ট্রাম্প লড়ে চলেছেন এটা দেখাতে। অথচ ভিতরের কাহিনী হল, এবারেও তারা একসাথে চার রাষ্ট্র মিলে একটা যৌথ-বিবৃতি দিতে পারেনি। আলাদা আলাদা করে দিয়েছেন আর তাতে নিজ নিজ ইস্যু ঢুকিয়েছেন। এ’থেকেই সন্দেহ ৩ নভেম্বরের পরে কোয়াডের কোন অর্থপুর্ণ মিটিং আদৌ আর হয় কিনা অথবা কী হয়? আর হলে সেটা কেমন হয়, ভাষ্য কী থাকে তা দেখতে হবে আগে। নইলে আমেরিকান ইলেকশনের আগের মাসেও আমেরিকান কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এর আগে কখনও এমন তৎপর ছিলেন জানা যায় না।

    পালাবদলঃ
    আমেরিকার বদলে চীন নতুন নেতা হতে যাচ্ছে, এটা কোন মানুষ বা সাবজেক্ট দ্বারা নির্ধারিত ঘটনা নয়; অবজেকটিভ ঘটনা। বস্তুগতভাবে নির্ধারিত এই ঘটনা। আর এটা আমেরিকার পরপর তিনটা সরকারি সার্ভেরই একই মূল ফাইন্ডিং বা প্রাপ্ত ফলাফল। অবজেকটিভ বা বস্তুগত শর্ত বলতে এখানে প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে হাজির হয়েছে চীনের হাতে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা বা চীনের হাতের বিপুল সারপ্লাস বা পুনঃবিনিয়োগযোগ্য সঞ্চিত সম্পদ। যা সম্ভবত সবাই মানবেন তা হল এই চীনা সক্ষমতা, এটা আনপ্যারালাল; মানে একালে এই বস্তগত সক্ষমতার তুলনা একমাত্র চীন নিজেই। কিন্তু সমস্যা হল, কোন দেশ নিজে পরাজিত হয়েছে জানলেও একেবারেই চলতে না পারা দশা না আসা অবধি কে যেচে পরাজয় স্বীকার করতে চায়! জটিলতা সেখানেই। তবে বোকার স্বর্গে বাস করা কেউ কেউ তো থাকেনই। অথবা আমেরিকান ছোট ছোট এন্টারপ্রাইজের পরিচালকেরা কেউ, যাদের পক্ষে আমেরিকার হারু-বাস্তবতা মেনে নেয়া তো আসলেই কঠিন। তাই এদের কেউ কেউ এর পরেও সামরিক দিক থেকে আমেরিকা এখনো অনেক গুণ শক্তিশালী – এ দিয়ে আমেরিকার শক্তি মেপে চলতে চাইবে হয়ত। তাদেরকে বুঝানোও সম্ভব নয় যে, সামরিক শক্তি দিয়ে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব কায়েম করা যায় না, সক্ষমতাও মাপা যায় না।

    এখনও এক অমীমাংসিত অংশঃ
    কিন্তু তবু আমেরিককন ঐ সার্ভেতে নির্ধারিত ফাইন্ডিংসে যে মুখ্য অংশটা এখনও অমীমাংসিত তা হল, এই পালাবদল কী একটা যুদ্ধের পরিণতি হয়ে আসবে, না আপসে টেবিলে বসে কথা বলে আসবে? আমরা এখনও কেঊ তা জানি না। তবে বড়জোড় গত পালাবদলের কথা মনে করে দেখতে পারি আমরা। গত পালাবদল মানে? এর আগেও গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল হয়েছে নাকি? অবশ্যই; এর আগেও যে পালাবদল হয়েছে তা অনেকে আমলই করেন নাই হয়ত। তাদের মন করিয়ে দেই, ৭৫ বছর আগে আমেরিকা গ্লোবাল পলিটিক্যাল (অর্থনৈতিকসহ) নেতা হয়েছিল বিপরীতে সব কলোনি-দখলদারদের (ইউরোপের বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ ইত্যাদি সকলকে) পরাজিত করে অথবা তাদের উপরের নেতা হয়ে বসে আর সেটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৫ সাল। অর্থাৎ যুদ্ধের ফলাফল হিসাবেই আমেরিকা নেতা হয়েছিল বৃটিশসহ সবার উপরে। যে ইউরোপের ওরা গর্ব করত যে, কলোনি সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কখনোই অস্ত যাবে না। সেই গর্ব ভেঙে চুরমার করে দেয় আমেরিকা। তা সত্বেও এটা আজ কোন নিশ্চয়তা নয় যে এবারও তাহলে একটা যুদ্ধের পরেই কেবল চীন নেতা হবে।

    সীমিত যুদ্ধ না বড় পারমাণবিকঃ
    এছাড়াও যুদ্ধ হলে সেটা ছোটখাটো যুদ্ধের সীমায় থাকবে তো? না বড় আত্মহত্যার কোনো কাণ্ড ঘটবে? ‘আত্মহত্যা’ বলছি এজন্য যে, বেশির ভাগ মন্তব্যকারী “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” বলে একটা কথা প্রায়ই বলে ফেলে। কিন্তু তাতে এটা বুঝাই যায়, তারা কী নিয়ে কথা বলছে, এর কোনো ইমাজিনেশন বা কল্পিত ছবিও তাদের মাথায় কিছু নেই। তারা প্রায় সবাই গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনাটাই মাথায় রেখে এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা অবলীলায় বলে যায়। অথচ তারা আমলই করেনি যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেটা কোন পারমাণবিক বোমার যুদ্ধ ছিল না। কারণ সেকালে রাষ্ট্রনেতারা পকেটে পারমাণবিক বোমার কোড নিয়ে ঘুরতেন না। কিন্তু একালে ঘুরেন! তবু সেবার কেবল আমেরিকা ঐ যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এরপরেও ঐ যুদ্ধের পটভূমিকে উসিলা করে পারমাণবিক বোমা কেমন নৃশংসভাবে মানুষ মারতে পারে এরই পরীক্ষা করে নিয়েছিল। যুদ্ধে এক “হারু পার্টি” ছিল হিটলারের বন্ধু জাপানের সামরিক সরকার, কলোনি এম্পায়ার; অথচ বেচারা জাপানের জনগণের উপর পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে সেই পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। এর ফলাফল ছিল চরম ভয়াবহ, তা বললেও কম বলা হবে! কিন্তু তবু একালে যারা অবলীলায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলছেন মনে হয় না তারা আমল করেছেন যে, এবার হবু যুদ্ধে প্রধান তিন থেকে ছয়টা দেশ – পারমাণবিক বোমাসমৃদ্ধ দেশই হবে। সুতরাং এবার যদি (সীমিত নয় এমন) বড় যুদ্ধ হয় তাহলে আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাকেই আর খুজে পাওয়া না যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই নিজে বাঁচার তাগিদে হুঁশজ্ঞানটুকু অন্তত যদি থাকে তবে বড় যুদ্ধের কথা কেউ বলবে না বা সেদিকে যাবে না। কিন্তু যুদ্ধ লেগে গেলে কে নিশ্চয়তা দিতে পারে এটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে! নাকি দুনিয়াই শেষ হবে?
    তাই এসব সম্ভাবনার দিক মাথায় রেখে এশিয়ান স্টেজে চীন ও আমেরিকার মহড়া আর লেজে ফাঁকফোকরে আমেরিকান প্রক্সি হিসাবে ভাবধরা ভারত  – এভাবে সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা আমাদের মত দেশের জন্য এক অস্বস্তিকর ও খারাপ সময়।
    তাই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল ঘটবে অনিবার্য এটা জেনেও আমেরিকা যেন নিজ মনকে শান্ত্বনা দিতে চীনবিরোধী একটা যুদ্ধজোট গড়তে চাইছে, কখনও যেটাকে ‘কোয়াড’ অথবা “ইন্দো-প্যাসেফিক জোট” বলছে কখনও “এশিয়ান ন্যাটো”। আর ভাবছে  একবার এই জোট গড়তে পারলে আমেরিকা আরও কিছুদিন গ্লোবাল নেতা থাকতে পারবে। অথচ খাঁড়া মিথ্যাটা হল, সামরিক শক্তি দেখিয়ে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়া যায় না। কারণ মুরোদের প্রশ্নটা এখানে বিপুল সারপ্লাস বা বিনিয়োগ সক্ষমতার, বিপুল সমরাস্ত্রের যোগ্যতার নয়; বিনিয়োগ সক্ষমতার তারুণ্য একালের চীনের মত আমেরিকারও এককালে ছিল, যা সবশেষে এখন আর নাই।

    স্টিফেন ই বিগান এর বাংলাদেশ সফরঃ
    এমন অবস্থায় আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি (উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী) স্টিফেন ই বিগান বাংলাদেশ সফরে আসছেন আগামী ১৪-১৬ অক্টোবর। মি. বিগান আমাদেরকে বলে কয়েই তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে তুলে নিতে চেয়েই আসছেন। ঢাকার আমেরিকান এমবেসি ও বণিকবার্তা  আমাদের তাই জানাচ্ছে। আমেরিকা তার স্বার্থের কথা ও পথে তাদের মতে আমাদের ‘হেদায়েত’ করতে চাইবে। তাতে বলার কিছু নেই। কিন্তু আমরা আমাদের কোনো কোটারি গোষ্ঠীর স্বার্থে তাতে সাড়া দিতে পারি না। আমাদেরকে পাবলিক ইন্টারেস্ট বা জনস্বার্থ তো দেখতে হবে! আর ঠিক এই বিষয়ে আমাদের জন্য আইডিয়েল ও সঠিক অবস্থান হবে নিউট্রালিটি; মানে কারও নৌকায় বা জোটে না উঠে, এড়িয়ে যাওয়া। কোন যুদ্ধে বা কারো যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া মানে হবে আমাদের যাকিছু অর্জন এর শেষ সম্বলটাও হারানো। অথচ আমাদের জন্য সময়টা কঠিন এজন্য যে, আমাদের এখনকার সরকার দুর্বল, পিছনে জনসমর্থন নাই; তাই স্বর নরম করে ফেলতে পারে। আর সে কারণে সেসব ঘাটতি পূরণ করতে ওদিকে আবার ক্ষমতায়ও থাকতে চাইবে বলে কোন না কোন আপস যাতে না গিলে ফেলে, এই ভয় আমাদের থাকবে। সরকারের পাবলিক রেটিং থাকা না থাকাটা এখানে এভাবে সম্পর্কিত। অথচ এসময় দরকার ছিল অভ্যন্তরীণভাবে অন্তত এই ইস্যুতে পাবলিকের সবপক্ষের একটা ঐকমত্য, একক অবস্থান নিয়ে এক ভয়েজে কথা বলা। তাহলেই আমাদের এসব কোটারি স্বার্থগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারা সহজ হয়ে যেত।

    ভুল ম্যাসেজ(!) দিয়ে শুরুঃ
    ওদিকে ইতোমধ্যেই  মি বিগান আমাদের সাইলেন্ট মেজরিটিকে একটা প্রাথমিক ভুল মেসেজ দিলেন মনে হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশে কাজ শেষে ভারতে যাচ্ছেন। এর মানে কী? চৌদ্দ বছর পরে আবার একালেও ভারতকে বগলে করে আমেরিকা কী বাংলাদেশে এসেছে? এর অর্থ-ইঙ্গিত খুবই সুদূর প্রসারীভাবে হবে নেতিবাচক। যদি মানে তাই হয় তবে আমাদের দেশের মানুষের জন্য খুবই খারাপ মেসেজ তিনি এনেছেন। এর মানে বাংলাদেশের সাইলেন্ট মেজরিটির মনোভাব আমল করতে ও ক্ষোভ বুঝতে আমেরিকা আবার ব্যর্থতার পথই বেছে নিতে যাচ্ছে। যেখানে হাত পরিষ্কার রাখতে ও দেখাতে আমেরিকার উচিত আলাদা ডেস্ক মানে আলাদা স্টাফ-ডেস্ক থেকে ভারতকে ডিল করা। তাই বলা বাহুল্য যে এরকম চললে আমেরিকার এখনও বাংলাদেশে কাজ করা বা ভূমিকা রাখার যতটুকু শেষ সুযোগ আছে তা অকার্যকর করা হবে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এতে বাংলাদেশে আমেরিকার কোনো পরিকল্পনাই পাবলিকের দিক থেকে কোনদিনই আর সমর্থন বা আমল পাবেই না।

     

    এশিয়ার ছোট দেশের সমস্যা, উদাহরণ হিসাবে মালদ্বীপঃ
    তাই একটা উদাহরণ হিসাবে এবার মালদ্বীপকে সামনে রেখে কিছু কথা বলব। তবে মালদ্বীপ এশিয়ার ছোট দেশ হিসাবে পালাবদলের কালের সমস্যা ভাল মোকাবেলা করেছে কীনা সেজন্য নয়; বরং কিভাবে আরো জটিল জালে মালদ্বীপ আটকে গেছে এর উদাহরণ হিসেবে মালদ্বীপকে নিয়ে কথা বলব। মালদ্বীপের মূলসমস্যা আসলে – তাদের দুই প্রধান দল  গ্লোবাল পালাবদলের দুই ক্যাম্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে একটু ফারাক হল এটা চীন-আমেরিকা দুই ক্যাম্প না হয়ে চীন-ভারত হয়ে আছে; মানে আমেরিকার প্রক্সি এক্ষেত্রে ভারত। যেকোন দেশের জন্য এটা চরম দুর্ভাগ্যজনক যে, দেশের প্রধান দুই রাজনীতির দল যদি চীন ও ভারতের এজেন্ট হয়ে কায়েমি দোকান খুলে বসে যায়। এরই আরেক উদাহরণ যেমন শ্রীলঙ্কা। অভ্যন্তরীণভাবে বলা হয় মালদ্বীপ মূলত নাকি দুই সৎভাই মামুন আবদুল গাইয়ুম আর ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম মূলত তাদের আর তাদের অনুসারী বা অনুগামী রাজনীতিকদের নিজেদের দুই দল হিসেবে ভেতরের লড়াই হয়ে বিভিন্ন সময়ে হাজির হয়ে চলেছে।

    Mohamme্‌d, Nasheed, Ibrahim Mohamed, Solih & Abdulla Yameen

    দুই ভারতীয় রিপোর্টারঃ
    মালদ্বীপ নিয়ে এ’বছরের আগস্ট থেকে এপর্যন্ত দুই ভারতীয় রিপোর্টারের দুইটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। সুধা রামচন্দ্রন ব্যাঙ্গালোর থেকে লিখেছেন আগস্টে জাপানি ‘ডিপ্লোমেট’ পত্রিকায় – [Has India Won the Match Over the Maldives?]- এই শিরোনামে। আর সীমা দাসগুপ্তা কলকাতা থেকে লিখেছেন গত সপ্তাহে হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমসে -India risks losing its military hold on Maldives – এই শিরোনামে। সুধার লেখাটা একেবারেই প্রো-ইন্ডিয়ান ভাষ্য বা ভারতের তথাকথিত ‘জাতীয়’ স্বার্থ মেনে লেখা বলা যেতে পারে। সীমার লেখাটা সে তুলনায় অনেক বেশি নিউট্রাল।
    গত ২০১৮ সালের শেষে সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  (প্রো-চাইনিজ) ইয়ামিন হেরে যান প্রো-ইন্ডিয়ান নাশিদ গ্রুপ ও দলের কাছে। মালদ্বীপ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ও প্রায় ১২শ’ দ্বীপমালার দেশ, যার মাত্র  প্রায় ১৮৫টা ছোটবড় দ্বীপ বসবাসযোগ্য। বাকিগুলোতে চাষাবাদ হয় মূলত। ইয়ামিনের গত আমলে রাজধানী মালে ও এর সংলগ্ন এমন বড় চারটা দ্বীপকে একটা ব্রিজ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে, যার একটাতে এয়ারপোর্ট আর শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য জোন আছে। আর বাকি দুটোতে বসবাসের জন্য ১৬-২৫ তলা করে আবাসিক ফ্লাট তৈরি করেছে,  ইয়ামিনের সরকার চীনা ঋণে। মোট প্রায় ২২৪০০০ ফ্লাট। এরকম প্রতি ফ্লাটে যদি দু’জন করে বাসিন্দার এক পরিবার ধরি তবে মালদ্বীপের ৮৬% জনসংখ্যাকেই সরকার আবাসন দিতে পারবে, এতই বিপুল সংখ্যায় ফ্লাট নির্মাণযজ্ঞের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে এখনও।
    এখন সুধার লেখায় তাঁর অভিযোগ হল, ইয়ামিন মোট ১.৪ বিলিয়ন ডলার চীন ঋণ নিয়ে এসব নির্মাণকাজ করেছে। আরো বড় অভিযোগের স্বরে লিখছেন, এখন এই ঋণ কি মালদ্বীপ পরিশোধ করতে পারবে? নাকি শ্রীলঙ্কার মত হবে? মানে, বলতে চাইছেন, ভারত শ্রীলঙ্কায় যেমন প্রপাগান্ডা করতে পেরেছিল তেমন প্রপাগান্ডা করার সুযোগ কি মালদ্বীপেও পাবে?
    সুধা লিখছেন, “This was of concern to India. Would the Maldives, like Sri Lanka, end up handing over strategic assets in lieu of unpaid debt to China? Would the Chinese set up a naval base in the archipelago?”। কিন্তু তামাশাটা হল, ঋণ নিয়েছে মালদ্বীপ, কিন্তু তাতে উদ্বিগ্ন হয়েছে ভারত, যে কী করে মালদ্বীপ সেই ঋণ শোধ দিবে! আবার সেই ভারতই ইয়ামিনের পরের বর্তমান প্রো-ইন্ডিয়ান সলিহ-নাশিদ সরকারকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ দিয়েছে। অথচ এখন এই নতুন ঋণের বোঝা এটা শোধ দিবে কী করে সেটা ভারতের উদ্বিগ্নতার বিষয়ই নয়? দুনিয়াতে এরচেয়ে বড় জোকারি আর কী হতে পারে!

    প্রপাগান্ডা ও গুজবের শুরু এখান থেকেইঃ
    ধরা যাক, সুধার আশঙ্কামত মালদ্বীপ চীনা ঋণ পরিশোধে বিরাট সমস্যায় পড়বে। কিস্তির অর্থ দিতে গিয়ে বাজেটে টান পড়বে!  ইব্রাহিম সলিহ এখন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। তাহলে সলিহ-নাশিদ গ্রুপ যারা এখন ক্ষমতায়, এরা তো ক্ষমতায় এসেই নতুন করে ইন্ডিয়ান ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ মালদ্বীপ সরকার নতুন আরও প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ভারতীয় ঋণ নিয়ে এবার একইভাবে অন্য আর তিনটা দ্বীপ যুক্ত করতে রাস্তা বানাচ্ছে। এখন চীন ঋণ শোধে যদি মালদ্বীপের মুরোদই না থাকে তবে এর উপর আবার ভারতীয় ঋণ নিচ্ছে কেন? কোন সুখে আর বিবেচনায়? আর এই ভারতীয় ঋণের বেলায়ও এর কিস্তি পরিশোধের অর্থ কোথা থেকে আসবে, শোধ দিবে কী করে? এনিয়ে ভারত নিরুদ্বেগ কেন?  অর্থাৎ সুধার অনুমিত, কথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আসলে ছিল প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন মাত্র। আর মালদ্বীপের অর্থনীতির কোন ঋণের দায় বইবার আসল সহ্যক্ষমতা কী এবং কতটুকুর উপর দাঁড়িয়ে এনিয়ে কোন পেশাদারের বিশ্লেষণ-প্রাপ্ত ফলাফল জেনে নিয়ে তিনি কথা বলেননি। বরং ভারতীয় সাংবাদিক বলে চোখ বুঝে মিথ্যাবলার  ভারত সরকারের স্বার্থের পক্ষে দাড়ায় অপেশাদার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করে বসেছেন! অথচ প্রপাগান্ডা করা তার কাজ বা পেশা নয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সুধা আসলে প্রবল জাতিবাদী হয়ে কথিত ভারতীয় “জাতীয় স্বার্থে” এই মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। আর আমাদের জন্য এখান থেকে শিক্ষণীয় হচ্ছে, এমনিভাবে দুই প্রধান দলের, এমন চীন বা ভারতের পক্ষ নিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করবেই – একটা দেশের জন্য এই ইতরোচিত প্রপাগান্ডাই সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ও আপত্তিকর ও বিপদজনক। আর মালদ্বীপের প্রধান দুর্ভাগ্য আর পতনের কারণ হতে পারে এটা! এ জন্যই বলছি একেকটা দল চীন বা ভারতের দালালি নিবে, আর দেশটা ভাগ হয়ে যাবে পাবলিক এটা চলতেই দিতে পারি না। এমন হলে সে দেশ শেষ হয়ে যাবেই।
    আবার এই নাশিদ (২০১৩ সালের তিনিই শুরুতে প্রো-ইন্ডিয়ান প্রেসিডেন্ট ছিলেন যদিও, কিন্তু শেষে প্রো-চাইনিজ হয়ে ভারতীয়দেরকে দেয়া এক এয়ারপোর্ট প্রকল্প তিনিই বাতিল করে দিয়েছিলেন ) পরে তিনি ইয়ামিনের আমলে দুর্নীতির দায়ে জেলে ছিলেন। কিন্তু কোনো এক (সম্ভবত অসুস্থতার) অজুহাতে জামিন পেয়ে সেসময় পালিয়ে শ্রীলঙ্কা চলে যান আর সেখান থেকে ২০১৮ সালে মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান আর্মিকে মালদ্বীপ দখলের প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এদের দল আবারও ২০১৮ নির্বাচনে জয়ী হয়ে এলে সেবার ঘোষণা দিয়ে প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার কায়েম করেছিলেন যেখানে সোলিহ হন প্রেসিডেন্ট আর নাশিদ স্পিকার। আর পুরাতন চেয়ারছোঁয়া-খেলায় রোটেশনের মত ইয়ামিন এখন জেলে। এই হল ভারত বা চীনা দালালির রাজনীতির পরিণতি!

    এখন সলিহদের অভিযোগ হল চীন ঋণ থেকে ইয়ামিন সরকারের আমলে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ, চীনা প্রাইভেট কোম্পানির কাছে ঋণ নিয়ে ইয়ামিনের সরকার মালদ্বীপের কিছু প্রাইভেট ব্যবসায়ীকে কয়েকটা রিসোর্টগুচ্ছও বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইয়ামিনের সরকার ঋণের খাতক না হয়েও নিজে ঐ বেসরকারি বাণিজ্যে লোনের গ্যারান্টার হয়ে আছে। অতএব সলিহ-নাশিদের গ্রুপ এর দাবি এখানে এই গ্যারান্টার হওয়া মানে, তারা এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে এি সমুদয় অর্থও সরকারই ঋণ নিয়েছে ধরতে হবে। অর্থাৎ গ্যারান্টার হওয়া মানেই সরকার নিজেই ঋণ বুঝতে হবে। এবং এই অর্থও আত্মসাৎ হয়ে গেছে। সলিহ-নাশিদের অর্থমন্ত্রী অভিযোগ তুলে বলছেন, গ্যারান্টার হওয়া মোট ৯৫৩ মিলিয়ন ডলার হল এটাও ইয়ামিন সরকার চীনা ঋণ নিয়েছে ধরতে হবে। আর এছাড়া সরকার নিজের জন্য ঋণ নিয়েছে বাদ বাকিটা। এভাবে মোট ১.৪ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নিয়েছে। সে ঋণ পরিশোধে নাকি শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হবে মালদ্বীপের। আসলে এই প্রো-ইন্ডিয়ান গোষ্ঠী বুক ফুলিয়ে সবাইকে ‘হাইকোর্ট’ দেখাচ্ছে। ভেবেছে, সারা দুনিয়া তাদের এই বাক-চাতুরী বুঝবে না। অথচ এতে যে প্রশ্ন উঠে গেছে, তাহলে বাড়তি ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ঋণ নিল কেন আর এই ঋণের কিস্তি দেবে কিভাবে?

    সরকার গ্যারান্টার হওয়ার কালচার কোথা থেকেঃ
    প্রপাগান্ডা ফেলে এখন প্রকৃত ঘটনাটা ব্যাখা করা যাক। রাষ্ট্র কেন এখানে গ্যারান্টার হতে গেল এর পক্ষে ইয়ামিন সরকারের উপযুক্ত সাফাই থাকা দরকার ছিল, অবশ্যই। কিন্তু অন্যদিকের আরেক কথাও জেনে রাখা ভাল। তাহলে, ফেয়ার বিচার করা হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের গ্যারান্টার হয়ে থাকা স্বাভাবিক হতে পারে। যেমন  তা হল, বিশ্বব্যাংকের নিয়ম ও কালচার অনুযায়ী যারা নিজেদের “মধ্য আয়ের দেশ” হয়ে যায় বা দাবি করে আর বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদের (যেখানে ঋণের সুদহার নামমাত্র ০.৭৫% যা ১% এরও কম) ঋণ আর পাবে না। তখন থেকে তাদের ২% সুদহারের ঋণ শ্লটে যেতে হবে। বাংলাদেশ এখন এই শ্লটে। এছাড়া আরও একটা শ্লট আছে যেটাকে আইএফসি (ইন্টারনাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, IFC) লোন বলে, যার সুদহার ৪%। আইএফসি বিশ্বব্যাংক গ্রুপেরই আরেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে ওর লোনও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ওর শর্ত হল এই লোন সরকারি খাতের জন্য নয়, কেবলমাত্র বেসরকারি কোম্পানিকে দেয়া হয়। এছাড়াও আরেক শর্ত হল তবু সরকারকেই আবার ঐ লোনের গ্যারান্টার থাকতেই হবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে দুইটা বেসরকারি কোম্পানি যারা ১২০০ মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকারি তারা আইএফসির লোন পেয়েছে বা পাইয়ে দিয়েছে। কারণ এই লোন সরকারকেই পাইয়েই দিতে হয়, সুপারিশ করে। স্বাধীনভাবে পাওয়া যায় না। এই ঋণের অন্তত একটা মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন প্রকল্প অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই এমন গ্যারান্টার হয়ে আছে। সম্ভবত বিশ্বব্যাংককে অনুকরণ করে চীনা বেসরকারি লোন নেয়া হয়েছে ওখানে, মালদ্বীপে সরকার গ্যারান্টার হয়ে। আরো কথা আছে, এই লোন চুক্তি কিন্তু হয় ঐ বেসরকারি লোন গ্রহীতা কোম্পানির সাথেই দাতা IFC এর। কারণ, যদি পরিশোধে কোনো সমস্যা দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে সরকার যাতে লোন আদায়ে দাতার পক্ষ নেয়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা। আর এমন প্রকল্প যেহেতু তা সাধারণত সরকারের কোন ঠিকাদার কোম্পানির জন্যই করা হয়; যেমন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সরকারি ঠিকাদার অথবা উতপাদিত বিদ্যুৎ  সরকারকে বিক্রি করে এমন হয়ে থাকে ফলে ঐ বেসরকারি কোম্পানিকে আল্টিমেট পেমেন্ট দেয় সরকার। তাই সরকারের হস্তক্ষেপের কোন না কোন সুযোগ থেকেই যায় তাই এমন গ্যারান্টার ব্যবস্থা কোন সরকারের জন্য  বড় কোন রিস্কের সম্ভাবনা কম থাকে।
    এই যদি হয় আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের কালচার বা নিয়ম তাহলে আমেরিকার বন্ধু ভারত মানে প্রো-ইন্ডিয়ান মালদ্বীপ সরকার কেন এই প্রপাগান্ডা শুরু করেছে? ৯৫৩ মিলিয়ন ডলার ঋণে সরকার গ্যারান্টার বলে এই অর্থও ‘সরকার চীনা ঋণ নিয়েছে’ বলে পাড়া মাতাচ্ছে কেন? এগুলাই চরম অসততা ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফলে বিপদজনক। চীন বা ভারতের স্বার্থে তাদের এজেন্টরা এসব মিথ্যা প্রপাগান্ডার লড়াই দেশের উপর চড়িয়ে দেয়। এই হল মালদ্বীপে দেশ ভাগ হয়ে থাকা দুই দালালদের কায়কারবার থেকে পাওয়া শিক্ষা; যদি তা আমরা শিখতে চাই!
    এখন তামাসা হল, মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের দুই লেখকের আশঙ্কা কিন্তু একই। তাই শিরোনামও প্রায় এক। দু’জনই আশঙ্কা করছেন, ভারত মালদ্বীপে টিকবে কিনা; মালদ্বীপে ভারতের প্রভাব টিকাতে আর কতদিন পারবে? প্রথম লেখক সুধা রামচন্দ্রনের আশঙ্কা, চীনের মত ভারতের বেশি ঋণ দেবার মুরোদ নাই, তাই সমস্যা। তাই সুধার শিরোনামে শঙ্কা – “মালদ্বীপে ভারত কী চীনের উপরে জিততে পেরেছে?”। আর দ্বিতীয় লেখক সীমা দাসগুপ্তের আশঙ্কা ভারত হেরে যাচ্ছে সেজন্য শিরোনাম দিয়েছেন, “মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত”। কারণ সলিহ-নাশিদ গ্রুপ প্রো-ইন্ডিয়ান হলেও সম্ভবত ইতোমধ্যে তারাই আবার চীনের সাথে যোগাযোগ শুরু করে বসেছে। কোভিডের পরে তাদের সম্ভবত অর্থ বা ঋণ দরকার। আর অনুমান করি এক্ষেত্রে তারা সঠিকভাবেই ভারতের চেয়ে চীনকে উপযুক্ত মনে করেছে।

    এছাড়াও মালদ্বীপে নন-পার্টিজান এক সংগঠন ‘প্যাট্রিওটিক ইয়ুথ মুভমেন্ট অফ মালদ্বীপ’  মালদ্বীপে ভারতের উপস্থিতি, হেলিকপ্টার ও আকাশ থেকে সমুদ্রসীমা মনিটরিংয়ের কিছু বায়ুযান দেশের সঠিক প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করেছে। এ ছাড়া এসব যানগুলো পরিচালনার জন্য পাইলটদের ট্রেনিং শেষ করতে অসীমভাবে দেরি করে মালদ্বীপ ছাড়তে ভারতীয় সেনাদের গড়িমসি নিয়ে  – সবমিলিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে তারা নানা ধরণের পাবলিক সমাবেশে প্রতিবাদ করা শুরু করে দিয়েছে। তাই সীমা দাসগুপ্তার আশঙ্কা, ভারতকে মালদ্বীপ ছাড়তে হতে পারে। তাই তার লেখার শিরোনামই হলো সরাসরি, “মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত”। অর্থাৎ ভারতের ফকিরি বা ছ্যাঁচরামি করতে এখানেও দেখা যাচ্ছে।  ছেচরামো করে হলেও ভারতের সামরিক সদস্যদের মালদ্বীপে রাখতে হবে। এতে ভারতের কোন ইজ্জত বাড়ে তা কে জানে!  এটা যেন ভারতের ফরাক্কা বাঁধ তৈরির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বাঁধটা  পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর অনুমতি নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশের থেকে, শেখের আমলে। অথচ সে পরীক্ষামূলকটাই এখন  বিনা অনুমতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে, ভারতের খবর নাই!

    এদিকে সীমা দাসগুপ্তা দুটা আরো ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন। সীমা লিখেছেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেন্ট সলিহ ভারতের সাথে করা একটা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন, যেটা অনুসারে মালদ্বীপে “ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত বিষয়ে ভারতীয় আদালতের রায় প্রযোজ্য হবে”। এটা এক ভয়ঙ্কর নতজানু চুক্তি। আমাদেরও এটা নিয়ে সতর্ক হওয়ার ব্যাপার আছে। সারা দুনিয়ার রেওয়াজ হল – আইনি বিষয়ের জন্য এক্তিয়ার হবে প্রকল্প ভোক্তার স্থানীয় দেশের আদালতের। তবে আরও কিছু স্বার্থবিরোধ-বিতর্ক দেখা দিলে আন্তর্জাতিক কোনো সালিশি আদালত যেমন বিশ্বব্যাংকের সালিশ-বিরোধ নিরসনের আদালত, না হয় ইউরোপীয় সমতুল্য সালিশি আদালতের কথা সাধারণত বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লেখ করা থাকে।
    এছাড়া অপর তথ্য হল, সীমা লিখছেন, “ভারতের নজরদারি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন এবং এগুলো পরিচালনার জন্য (মালদ্বীপে) মোতায়েন করা ভারতীয় সেনা ও সরঞ্জামাদির বিষয়কে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু“ করেছে মালদ্বীপের পাবলিক। এমন ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ও ছড়িয়েছে যা দাবি করছে যে, “মালদ্বীপের কিছু অংশকে ভারত নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে”। সীমা লিখেছে, “মালদ্বীপের সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তা বলছেন, ভারতের সামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে মালদ্বীপের পাবলিকের মধ্যে গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে যার গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে”। দেখা যাচ্ছে, অপরের জন্য গর্ত-খানাখন্দ খুঁড়লে তার শিকার হয়ে ঐ গর্তে নিজেকেই পরতে হতে পারে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১০ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোনো জোটে ওঠা নয়” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]