Category: আফগানিস্তান

  • আফগানিস্তানের সম্ভাব্য আগামী

    আফগানিস্তানের সম্ভাব্য  আগামী

    গৌতম দাস

    ২৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬

     

    চলতি অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান [Wendy Ruth Sherman ] ভারত সফরে এসেছিলেন। দুই দিনের সফরে তিনি প্রকাশ করেননি, তিনি ফেরার সময় আর কোথায় যাবেন; যদিও ধরে নেয়া হয়েছিল তিনি কেবল ভারতে এসেছেন, আর আফগান-তালেবান ইস্যুতে বেদিশা হয়ে থাকা ভারতকে দিশা ও রাস্তা দেখাতে আসছেন। দিশা কতটা দেখাতে পারছেন, সেটা নিয়ে আমরা আজ কিছু কথা বলব। কিন্তু এর চেয়েও, দিশা দিতে এসে শেরমানও বুঝে গেছেন যে, ভারত একটা দেখানো ঘামবড়া আর ফুটানিতে চলতে চায় এমন দেশ। ফলে শেরমান তার ভারত ছাড়ার আগে যখন প্রকাশ পেল তিনি পাকিস্তান হয়ে ফিরবেন (শুধু তা-ই নয়, তিনি আসলে পাকিস্তান সফর শেষে  এরপরে আবার তালেবানদের আফগানিস্তান হয়েও ফিরেছিলেন) তখন সেটা শুনে ভারত তার ভান-ভণিতা আর ভারত যেন খুবই উচ্চবংশীয় – এই মিথ্যা ফুটানি প্রদর্শন তুঙ্গে উঠেছিল। তারা তখন শেরমানকে অভিযুক্ত করেছিল এই বলে যে  তিনি ভারত-পাকিস্তানকে সমান পাল্লায় মাপছেন। মানে বলতে চেয়েছেন, পাকিস্তান ভারতের সমতুল্য নয়, বরং ভারত অনেক শুদ্ধ বা পবিত্র। কাজেই এতে ‘ভারত-পাকিস্তান’ এভাবে মাঝখানে হাইফেন দিয়ে লেখা (হাইফেনেটেড, hyphenated) শুরু হয়ে যাবে। সেটা নাকি ভারতের জন্য ‘অপমানজনক’! এতে শেরমান বুঝে যান তিনি কোনো ভয়ঙ্কর পেটি কালচারাল খপ্পরে পড়েছেন। উপায়ন্ত না পেয়ে তাই তখন তিনিও তেল ঢালা শুধু করেছিলেন। আর যে কথার আড়ালে যেটা বলে পার পেতে চেয়েছিলেন তা হলো – পাকিস্তানের সাথে আমি কোনো গভীর ভালোবাসায় জড়াতে যাচ্ছি না। আমার ‘খুবই সুনির্দিষ্ট আর ছোট্ট একটি কাজ’ [very specific and narrow purpose]আছে; তাই যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো পুরুষ যখন তার এক প্রেমিকার কাছে ধরা পড়ে যায় তার অপর প্রেমিকার খবরসহ – সেই দশায় তিনি। শেরমান নাকি তখন বলেছিলেন, “ভারতের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক সেই লেভেলের কোনো দিন পাকিস্তানের সাথে হবে না। কিন্তু সেটা কেউ ভালো করে না ছাপানোয় ভারত আবার সেটা নিজেই লন্ডন গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছাপানোর ‘বন্দোবস্ত’ করেছিল। এ ঘটনা জেনে আমাদের মনে হতে পারে ভারত আসলেই খুবই উচ্চবংশীয় কালচারের দেশ!

    কিন্তু শেরমান পাকিস্তান থেকেও আমেরিকা ফেরেননি। এরপরে গিয়েছিলেন আফগানিস্তানে এবং সরাসরি তালেবানের সাথে একই টেবিলে মুখোমুখি বসে মিটিং করে গেছেন। কিন্তু কেন আফগানিস্তানে আর তালেবানদের সাথে মিটিং? যখন শুধু আমেরিকা কেন, বলতে গেলে কোনো রাষ্ট্রই এখনো যে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠনিক স্বীকৃতি দেয়নি। তবে এ কারণে  ভারতের অসুবিধা হয়নি; কারণ ভারতের হিন্দুত্বপ্রেমী ভোটারদের দৃষ্টি-আগ্রহের ততদিনে এসবের বাইরে চলে গিয়েছিলেন শেরমান। আসলে মোদির নিজের তৈরি যে খাঁচা সেখানে তিনি নিজেকে বন্দী দেখাতে বাধ্য হন যে, তিনি বিদেশী কূটনৈতিক দেখা সাক্ষাৎ সম্পর্কগুলোর মধ্যেও ক্রমেই মুসলমান বা পাকিস্তান কোপানোর একমাত্র নেতা এবং সফল হিন্দুবাদী নেতা তিনি। আর এটা দেখিয়েই তিনি ভোটের বাক্স ভরিয়ে ক্ষমতাসীন আছেন। যদিও কাহিনী হল, নয়নীমা বসু প্রমুখের মত কূটনৈতিক সংবাদদাতাদেরও তবু মোদির হিন্দুত্বপ্রেমি ভোটারকে দেখানোর এসব মিথ্যা ভাব-ভনিতার সেনসিটিভিটির দিকে খেয়াল রেখে তেমন শব্দ বেছে রিপোর্ট লিখতে হয়।

    শেরমানের দেশ আমেরিকা আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি না দেয়া সত্ত্বেও তার আফগান সফর এবং ফ্লাইট-এয়ারপোর্ট ঠিকমতো ন্যূনতম থিতু হয়ে চালু শুরু না হওয়া সত্বেও এক আমেরিকান মন্ত্রী হিসেবে তার আফগানিস্তান গিয়ে সরাসরি তালেবানের সাথে মিটিং – সেটা এক বেশ উল্লেখযোগ্য ঘটনা বৈকি। যখন  এ’ঘটনাটাকে তালেবানদের অনেকে আমেরিকার ওপর তাদের ‘বিজয়’ বলে দেখার আগ্রহ আছে। যা এমনকি আমাদের দেশেও অনেকের।

    এমন আরো কথা হল – তালেবান, ২০ বছর ধরে আমেরিকার হাতে মার্জিনালাইজড বা চাপা পড়ে থাকা জনগোষ্ঠী বলে তাদের মনেও ক্ষোভ কম নয়; বরং এমন হওয়ারই কথা। আর হতেই পারে তারা সেটা প্রকাশ করেছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সংস্পর্শে কখনো আসার কালে, যা মোটেও অসম্ভব নয়; কারণ আমরা দেখেছি ইমরান খান তাদের মুখপাত্র হয়ে যেন আমেরিকাকে একটু বকা দিতে গেয়েছিলেন। সিএনএনের সাথে ইন্টারভিউয়ে বলেছেন, এবারের তালেবান উত্থানের কারণে গত ২০ বছরের আমেরিকান চাপ-নির্যাতন থেকে আফগানরা মুক্তি পেয়েছে। আবার ইমরান একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে, গত ২০ বছর আমেরিকা পাকিস্তানকে ‘ভাড়া করা অস্ত্রের মতো ব্যবহার’ করেছে [US treated Pakistan like a ‘hired gun’ in its fight against Taliban, says Imran Khan]। গত ১৫ আগস্টের পর ইমরানের এধরনের কড়া কথাগুলো আমেরিকার ভালো হজম হয়নি। আবার কথাগুলোতে অনেক খানিকটা সত্যতা তো আছেই। ইমরান নিজের দেশের অভিজ্ঞতা হিসেবে দ্বিতীয় কথাটা বলতে পারতেন হয়ত, কিন্তু তালেবানদের জন্যও তাদের মুখপাত্র ও নেতা হতে চেয়ে আমেরিকাকে দায়ী করে কিছু বলা্র কারণে হয়ত আমেরিকানরা এটাকে “একটু বেশি কথা” হিসেবে দেখেছে। ফলে শেরমান ঐ সফরে ইমরানের সাথে সাক্ষাৎ করেননি; যদিও করবেনই এমন  নির্ধারিত কোন শিডিউল ছিল না।

    এদিকে আরো অন্য কিছু মূল কথা, আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের পর আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের আর পাকিস্তানকে প্রয়োজন নেই বা ফুরিয়েছে –  এখনকার বাস্তবতা কিন্তু এর একেবারেই ধারেকাছেও নয়। বরং উল্টো; আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের পাকিস্তানকে এখন আরো বেশি দরকার তবে ভিন্ন কারণে। লন্ডন ইকোনমিস্ট সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সম্প্রতি এক আর্টিকেল ছেপেছে।  আবার আরও ধারালো আরেক মন্তব্য করেছে [It is too important—and dangerous—to ignore] আবার পাকিস্তানেরও আমেরিকাকে আর তেমন দরকার নেই, পরিস্থিতি সেটাও নয়। আজকের পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকা ছেড়ে অনেক বেশি চীন নির্ভরশীল হলেও এটা কোনো ‘আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়’ ধরনের অবস্থা নয়। তাই মাঠের সাধারণ নাগরিকের ভাষায়, কোনো প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকার সাথে বা নিয়ে কথা বলতে যাওয়ার কিছু দিকটা ধরলে এই আমলনামাতে একটা ভুল তো এখানে আছেই। ব্যাপারটাকে সেভাবে দেখতে পারি আমরা।

    এটাকে ভুল বলার অন্য আরো যে বিশেষ কারণ, তা এখন বলব। প্রথমত, এবারের সেনা প্রত্যাহার করার পর বাইডেন প্রশাসনের কারো, মানে শেরমানের এই পাকিস্তান সফর একেবারের ভিন্ন ও নয়া তাৎপর্যের। এটা অবশ্যই আমল করতে হবে। এটা এক নয়া যুগের। কারণ আগের ২০ বছর আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক ছিল এমন যে, আমেরিকার বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে হামলা চালাতে চায় তাই হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসেবে আমেরিকার পাকিস্তানকে দরকার ও তাকে আমেরিকা বাধ্য করবে – এই যে “সম্পর্ক” – সেটা এতদিন বজায় থাকলেও সময় এসেছে এবারই প্রথম সেই শর্ত আর নেই। পাকিস্তানও এসব বাধ্যবাধকতা থেকে এখন একেবারে বাইরে ও মুক্ত। আর এই নয়া মুক্ত পরিস্থিতিতে শেরমান পাকিস্তান সফরে এসেছেন। অতএব এই নয়া পরিস্থিতির উপলব্দি – তা থেকেই সব পক্ষের দেখা উচিত। ফলে কথাবার্তা বা নতুন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় এ নিয়ে সব পুরনো রেফারেন্স বাদ দিয়ে বরং নয়া এই পরিস্থিতির মধ্যে নয়া সম্পর্কের কাল হিসেবে কথা বলতে পারতে হয়েছে বা হবে এখন থেকে উভয়পক্ষকে।

    কিন্তু সাবধান, উপরের এসব ঘটনার সাথে আরো কমন কিছু ইস্যু সামনে। সেগুলো  হলঃ
    ১. তালেবান এখনো কোনো সরকার গঠন করতে পারেনি।
    ২. তারা এখনো এক আমিরের আফগানিস্তান নিয়ে আঁকড়ে পড়ে আছে। রাজা আর জনপ্রতিনিধির ফারাক বুঝতে চাইছে না।  ফলে অবলীলায় রাজা বা আমিরের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতে পারছে। এযুগেও জনপ্রতিনিধি হবার যুগ ফেলে রাজা হতে চাইছে তা স্পষ্ট না। আমিরের দেশে আমিরই দেশের মালিক এখানে কোনো নাগরিক থাকে না, সব হুকুমের বান্দা থাকে। এখানে দেশ গড়ার কিছু থাকে না। আমিরের খেয়াল থাকে। অথচ এক আমিরাতই তাদের লক্ষ্য।

    ৩. সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপদের কথা হল, আমেরিকান ভোয়া [VOA] লিখছে,  জাতিসঙ্ঘসহ সারা পশ্চিম যেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তা হলো- প্রায় ১০ লাখ শিশু না খেয়ে মরার মুখোমুখি, প্রায় ১৮ লাখ দুস্থ মানুষ যারা জাতিসঙ্ঘের মানবিক নানান ধরনের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল প্রভৃতি। এসব মানবিক সাহায্য তালেবান সরকার স্বীকৃত নয় বলে আগের মতো সরবরাহ বজায় রাখতে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের ক্ষুধা এসব কী সমস্যা তা জানার যোগ্য থাকে না।

    Sherman recounted a recent U.N. warning that about 1 million Afghan children were at risk of starvation, that more than 18 million Afghans needed urgent humanitarian assistance, and that deepening drought and the approaching harsh winter were only going to make matters worse.

    পশ্চিম তাই আগেই স্বীকৃতির ইস্যু বাইরে রেখে এড়িয়ে সরাসরি কথা বলতে এসেছে। আমেরিকা, ইইউ এরই মধ্যে স্বীকৃতির প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে  কাবুল সফরে এসে কথা বলেছে। এমনকি সেখানে আবার একটা স্বীকৃত সরকার হতে করণীয় কী সে সম্পর্কে আলোচনা, পরামর্শ তুলেছেন। কিন্তু এটাকে তাদের ঠেকা, তারাই বিপদে পড়েছে – এমন অনুমান নিয়ে ব্যাপারটাকে তালেবানদের দেখা এক বিরাট ভুল ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে যাওয়া হবে।  তার ইঙ্গিত উঠে আসছে।  ফলে আমেরিকা, ইইউ যেটা আগবাড়িয়ে করছে, সেটা হলো নিজেদের দিক থেকে যা করণীয় কর্তব্য ছিল, তা যতদুর পারে আগেই পূরণ করে রাখছে; যাতে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় যদি কিছু শিশু অভুক্ত মারা যায়; যাতে সে আগেই পরিষ্কার রাখতে পারে তাদের দায়ের অংশ ও উদ্যোগ তারা যথেষ্টই নিয়েছিল। তাতে তখন কিন্তু পরিস্কার দেখা যাবে তালেবানদের কারণে পুরোটাই ব্যর্থ হয়ে গেছে। তাই এমনটা কখনই যেন না হয় যে, দানগ্রহীতার আগ্রহ নেই ফলে দাতা চেষ্টা করেও কিছু করতে পারে নাই। ফলে তখন মানুষ দাতাকে নয় গ্রহিতাকেই প্রধান দায়ী করবে।

    ৪. অতএব দাতারাই ঠেকায় পড়েছে আর তাদের সেই ঠেকে যাওয়া দশাকেই ব্যবহার করে চাপ দিয়ে তালেবানদেরকে তাদের স্বীকৃতি আদায় করে নিতে হবে এমন অনুমান- এটি খুবই আত্মঘাতী ও বিপজ্জনক এবং দায়দায়িত্বহীন  সিদ্ধান্ত হবে।

    ৫. এরপর যা লিখব সেগুলোই তালেবান ইস্যুর মূল প্রসঙ্গ। নয়া তালেবান এরা কোন স্বীকৃত সরকার নয়। একারণেই এটা কোন থিতু সরকার নয়, এ অনুমান ভুল, ভিত্তিহীন। কারণ আসলে এটা এখনো অস্থিতিশীল মূলত এর অভ্যন্তরীণ (গ্রুপিং-গুলোর) সংহতি খুবই দুর্বল, তাই। কথাটাকে যদি রেডিক্যাল [হাক্কানি] আর তুলনায় লিবারেল [তালেবান]  ধারা হিসেবে বলি, তবে এ দুই ধারার বিরোধ – এটাই প্রধান অ-সংহতি [un-consolidated] চিহ্ন। এখানেই শেষ নয়। তালেবানের ভেতরের এই বিরোধের বাইরেও আবার আরো চরম রেডিক্যাল (আইসিস-কে) ধারা আছে, যার ছাতার নিচে আবার এর সমমনা আরো ছোট ছোট গ্রুপ আছে। এই চরম রেডিক্যাল (আইসিস-কে) [ISIS-K] –  এরা তালেবানদের ‘চরম অসহ্য শত্রু’ জ্ঞান করে।

    ৬. এরই মধ্যে আইসিস-কে গত আগস্টের দুইবার এয়ারপোর্ট হামলার পরে আর শান্ত বসে নাই। তাদের এখনকার টার্গেট মূলত হাজারা ট্রাইব বা এথনিক গোষ্ঠী, যারা শিয়া জনগোষ্ঠী। [The Hazaras are a Persian-speaking ethnic group; bigger other parts are in Iran. They primarily residing in the Hazarajat region in central Afghanistan.] আর মোট আফগান জনসংখ্যার ৯ শতাংশ। আফগানিস্তানের বড় প্রথম তিন জনগোষ্ঠী হল – পশতুন (৪০-৫০ শতাংশ ), তাজিক (২৫ শতাংশ) আর হাজারা (৯ শতাংশ)। ISIS-K এর এই হামলা মূলত নির্মূল করা [Ethnic Cleansing] ধরনের। আপাতত এনিয়ে তাদের ততপরতা “মসজিদে হামলা” টাইপের। অনেকে হাজারা-রা মুসলমান কি না তর্ক সে দিকে নিতে পারেন। এটি ভুল পথ। কারণ, এমন তর্ক ইসলামের ভেতরের। এটা বাইরের গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের জায়গায় বসে দেখলে  বাইরের এই পুরো দুনিয়ার চোখে তারা ব্যাপারটাকে দেখবে কোনো এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা হিসেবে, বসনিয়ায় যা হয়েছে। দুনিয়াতে ১৯৪৫ সালের আগে এমন বহু এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে দেয়া গেছে। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরে দুনিয়া বদলে গেছে; কারণ এক ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ তৈরি হয়ে আছে। বিশেষত ২০০০ সালের পরে যে গ্লোবাল আইনি-কাঠামো, আদালত ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেছে; তাতে যারাই কোনো এথনিক জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে যাবে, তো সে যে অজুহাতেই হোক তারা সহি মুসলমান ছিল না বলে অথবা অন্য কিছু, এরা প্রত্যেকেই এখন বিচারের সম্মুখীন হবেই, সর্বোচ্চ সাজা পাবে। যেমন ইতোমধ্যেই বার্মার শাসকেরা রোহিঙ্গা নির্মূল প্রচেষ্টার অভিযোগে।

    এসব হলো আফগানিস্তানের আরেক জগৎ। সেই জটিলতার একটু ইঙ্গিত দিলাম। আর এখানে এবার ভারতের অবস্থা নিয়ে একটি কথা বলে শেষ করব।

    অবশেষে ভারতের মিডিয়া জানাচ্ছে, আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আফগানিস্তানে যেসব দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা আছে এমন দেশগুলোর ‘জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার’ [NSA, National Security Advisor] দায়িত্বে আছেন এমন মর্যাদার মন্ত্রী-উপদেষ্টাদের নিয়ে এক সম্মেলন আহ্বান করতে যাচ্ছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হল, তাতে ভারতের প্রধান দুই মেহমান হল পাকিস্তান ও চীন [Pakistan & China among invitees as India looks……… ]।

    তাহলে এত দিন মোদির হিন্দুত্ববাদ আর ভোটের স্বার্থে যে এ দুই দেশকে ভারতের চরম শত্রু বলে প্রপাগান্ডা চালানো হয়েছিল, এর কী হবে? যে চরমশত্রু দেশ সেই আবার দাওয়াতি-অতিথি হয় কী করে? এই ভারত সরকারের এই স্ববিরোধিতার কোন উত্তর নাই।আলাদা রাষ্ট্র বলে  ভারতের স্বার্থ অবশ্যই চীন বা পাকিস্তানের স্বার্থের বিরোধী এবং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে ‘চরমশত্রু দেশ’ বলে চীন বা পাকিস্তানকে চিনানো আর প্রতি মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালানো – এই হিন্দুত্ববাদ অগ্রহণযোগ্য ও আত্মঘাতি, তা ভারতের পক্ষেও যায় না – এটাই ভারত প্রমাণ করল!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৩ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তানের আগামী“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

     অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

    গৌতম দাস

    ০৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৫৬ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3KC

     

     

    গত পনেরো আগস্ট ছিল এক আজব ঘটনার দিন। বিগত ২০ বছর ধরে  (তখন থেকে) এক মেরুর দুনিয়ায় মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা, আফগানিস্তানে এক পুতুল সরকার গঠন করে শাসন করে আসছিল। প্রথমে কারজাই পরে গণি সরকার এভাবে। কিন্তু এবছর, যার প্রটেকশনে সেই পুতুল সরকার  ক্ষমতায় ছিল সেই আমেরিকা নিজেকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর তাতে, ‘”তালেবানেরা কাবুল দখলে আসছে’ এই আওয়াজ শুনেই গনি সরকার শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর সত্যিই তালেবান যোদ্ধারা শহর দখল করে এবং ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছিল ঐ ১৫ আগস্ট ২০২১।

    আসলে কোন সরকার যখন তাকে উৎখাত করতে কেউ এগিয়ে আসছে শুনে নিজ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং তার সেনাবাহিনীও কোনও প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না, এটাই আসলে মুরোদহীন সরকারের উদাহরণ। কারণ, যার নিজেকে রক্ষার মুরোদ নাই সেটা তো কোন সরকারই নয়!

    সরকারের বৈধতার প্রথম ধাপ হল মুরোদ, যে মুরোদের খাঁড়া অর্থ গায়ের জোর, নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা। এরপরের ধাপ হল, জনসমর্থনে ঐ সরকারের পক্ষে জন-অনুমোদন নেয়া। তবেই সেটা পুরাপুরি এক বৈধ সরকার হয়। যদিও এরপরেও আরেকটা ধাপ থেকে যায় যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি বা জাতিসংঘের স্বীকৃতি। তবে সে পর্যায়ে যাবার আগেই, আশরাফ গনি সরকারের নিজেকে রক্ষার মুরোদ ছিল না, এই হলো গোড়ার সমস্যা।

    ট্রাম্পের আমলে এসে আমেরিকা আফগানিস্তান ‘ফেলে’ পালাতে চাচ্ছিল। তাই আফগানিস্তান থেকে পালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই (আপন ঘোষিত শত্রু) তালেবান গোষ্ঠির সাথেই এক আপোষনামা রচনার চেষ্টা করেছিল। আর তাতে সফল হলে এক চুক্তি সই করেছিলেন গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। কিন্তু ট্রাম্প এই চুক্তি করেছিলেন গনি সরকারকে উপেক্ষা করে, তাকে এই চুক্তির কোনও পক্ষই না করেই। কারণ  আফগান পুতুল সরকারকে এর মধ্যে আনা যাবে – এটাই ছিল তালেবানের ট্রাম্পকে দেয়া পুর্বশর্ত। আর অসহায় ট্রাম্প নিরুপায় হলে এই শর্ত মেনেই চুক্তিটা করেছিল।

    এই যে গনি সরকারকে উপেক্ষা করে তালেবানের সাথে চুক্তি সই করা – আসলে সেদিন থেকে এর সোজা মানে হয়ে গিয়েছিল; আমেরিকান প্রটেকশনে তারা আর পুতুল সরকারও থাকে না। সরাসরি বললে, বাস্তবত ওইদিন থেকে গনি সরকারকে আমেরিকাও আর কোন সরকার মানতে অস্বীকার ঘোষণা করে দিয়েছিল। যদিও এরপর থেকে কেউ গনি সরকারকে ঠেলে ফেলে দেয়া বা চ্যালেঞ্জ দেয়নি বলে বাইরে থেকে দেখে এটাকে আগের মতনই  এক সরকার মনে করেছিল। আর নিজস্বার্থ এই মোহে ছিল ভারত সরকারও।

    যদিও বাস্তবতা ছিল ট্রাম্প গনি সরকারকে এতিম করে ছেড়ে দিয়েছিল, কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল। গনি সরকারকে সাথে না রেখে কেবল তালেবানের সাথে চুক্তি করার মানেই তো হল ট্রাম্প স্বীকার করে নিয়েছিলেন গনি সরকার বলে কেউ নাই, তালেবান যোদ্ধারাই আফগান ক্ষমতার একমাত্র হকদার। অথচ ১৫ আগস্ট কাবুলে তালেবান যোদ্ধাদের প্রবেশের পরে  সবাই এমন ভান করতে থাকল যেন ঐদিনই বোধহয় প্রথম গনি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হল আর তালেবান ক্ষমতা পেল। এজন্য বলছি ১৫ আগস্ট হল এক আজব দিন! ভান আর ভনিতার দিন!

    এখন ভান করাদের মধ্যে ভারত সরকারকে আমরা শীর্ষে রাখতে পারি। কেন? কারণ তারাও আমেরিকান ক্ষমতার দিকে চেয়ে থাকা বা আমেরিকার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখা পার্টি। অথচ এখন তারাও নিরুপায়। অতএব তারা ভান করছে বা মনে করছে যে গনি সরকারই “বৈধ সরকার”। তবে আমেরিকান ক্ষমতার আড়ালে বসে আফগানিস্তান থেকে যারা ব্যবসা আর প্রজেক্ট লুটছিল ভারত সরকার তাদের অন্যতম বলেই এই মিথ্যাকথার আড়ালে মুখ লুকানো ছাড়া এখন আর উপায় কী?

    কিন্তু আবার সাবধান! এখন সব অর্থেই কার্যত ‘গনি সরকার’ বলে আর কেউ নাই। কিন্তু এর মানে কি তাহলে আপনাতেই তালেবান বৈধ সরকার? অন্তত আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের বা জাতিসংঘের মেনে নেয়া অর্থে? অবশ্যই না। যদিও কার্যত তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায়।

    আর নিজেদেরকে বৈধ সরকার বলে খুঁটি গাড়তে বা অনুমোদন যোগাড় করতে যেসব বাধা তালেবানের সামনে এর তালিকাটাও ছোট না। যেমন-

    একঃ তালেবানেরা এখনও নিজেরাই ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক শপথ নিতে পারে নাই; শপথের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দেখাতে পারে নাই।

    দুইঃ সেই আনুষ্ঠানিকতায় আবার কাদের দাওয়াত দিবে, এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হল – দাওয়াত দিলেই সে দাওয়াতি আসবে এর নিশ্চয়তা এখনো নাই বলেই মনে হচ্ছে।

    তিনঃ দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ আছে এমন সত্য-মিথ্য অনুমান ছড়িয়েছে যেটা তাদের পক্ষে যাচ্ছে না। আর, ওদিকে শপথ অনুষ্ঠানও হতে দেখাতে পারছেনা বলে সেই অভ্যন্তরীণ আন্তঃ বিভেদের অনুমানই আরও পোক্ত হয়ে চলছে।

    চারঃ সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো বা না-ভেটোসদস্য সবাই মিলে মোট ১৫ সদস্যের সমর্থনে জাতিসংঘের পাশ হওয়া এক প্রস্তাব যা আহবান রেখেছে,  আফগানিস্তানের সব পক্ষকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ[inclusive] ও মানবাধিকার রক্ষার পক্ষের এক সরকার গড়তে। এনিয়ে বিস্তারে আমার আগের লেখা এখানে।

    পাঁচঃ  অর্থাৎ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্স – এই পাঁচ পরস্পরের স্বার্থবিরোধী ভেটোসদস্য একসাথে এই প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, যা খুব কম ঘটে থাকে, রেয়ার। আর বলা বাহুল্য এটা তাই তালেবানের  উপর খুবই শক্ত চাপ।

    ছয়ঃ আমাদের অনেকের ধারণা, কোন দেশে আমরা মুরোদে কুলালে যেমন ইচ্ছা তেমন কোনও সরকার গঠন করে বসতেই পারি, আর যেন যেমন ইচ্ছা তা চলতে চালাতেও পারি, আমারটাই ভাল, আমার ধর্মটাই বা শ্রেষ্ঠ মনে ঠাউরে সেই যুক্তিতে। কিন্তু এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন। একটা সমাজেও আমরা এভাবে টিকতে বা থাকতে পারব না। এছাড়া এটা উল্টা আমাদেরকেই একঘরে করে ফেলতে পারে। ফলে এমন চিন্তার কারণেও এনিয়ে একটা স্থবিরতা চলছে।

    সাত) মূল সমস্যা, তালেবান এক আমিরাত (আমীরের) সরকার-  অর্থাৎ আমিরাতে আফগান সরকার চাইছে। যদিও তারা জনপ্রতিনিধির সরকার না রাজা হবেন তা স্পষ্ট করতে পারছেন না। যদিও ঝোঁক রাজা বা আমীর হবার। [যদিও আমীর হলে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেবে না।]
    এই প্রসঙ্গ শেষ করার আগে  উপরের ছয় নম্বর পয়েন্টে যেটা ভুল অনুমান বলেছি সেটা কেন তা এখন নিচে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নিব।

    ঐ অনুমিত যুক্তি ভুল কেন?
    সমাজ মানেই আসলে পণ্য বিনিময়ের সমাজ। এই বিনিময় মানে আপনি যা উতপাদন করেছেন তা অন্য উতপাদকে দেওয়ার বিনিময়ে সেই উতপাদকের পণ্য পাওয়া-নেয়া ও ভোগ করা। এভাবে পরস্পর সকলে মিলেই এক পণ্য-বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো এটাই সমাজ। তাহলে সমাজ মানেই সেখানে পণ্য-বিনিময় আছে। আর এই পণ্য-বিনিময়ের ভিত্তিতে আমরা সমাজ হয়ে থাকি।
    এখন একটা নতুন কথা বলি।  এই যে আমরা পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় করতে রাজি হই বা জড়াই – এই বিশেষ কাজেরই আরেক অর্থ-তাতপর্য আছে।  যেমন মাইগ্রেশন [migration] মানে গ্রাম ছেড়ে কাজের খোঁজে কাছাকাছি শহর বা রাজধানীর দিকে বসবাসের জন্য রওনা দেয়া, এটাই মাইগ্রেশন।   এখন গরীব বা নদীভাঙনে পড়া লোক যখন কাছের কোন সমৃদ্ধ শহর বা রাজধানিতে প্রবেশ করে  তখন ঐ সমাজে সে বাইরের আর নতুন লোক। এমনকি হতে পারে সে হাতে কোন অর্থও নাই। তাহলে বিনিময় করবে কী করে?  আর বিনিময় না হওয়া মানে কিন্তু নতুন বা মাইগ্রেটেড হয়ে আসা লোকটা যে ঐ নতুন শহরে আছে এর অস্তিত্ব স্বীকৃত না হওয়া।  তাহলে কী হয় তখন?  কান খাড়া করে শুনেন তা হল, আমাদের সমাজে সাধারণত যা ঘটে,  কেউ নতুন আগত লোকটার কাহিনী শুনে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।  এভাবে এখন সম্পর্ক শুরু হবে। একজন সাহায্য করবে বা দিবে (ঠিক কোন সচেতন বিনিময়ে না হলেও) স্বেচ্ছায় আর গ্রহিতা লোকটাও স্বেচ্ছায় সবার জন্য দোয়া করবে। আর সারকথায় এভাবে পরস্পরকে সমাজে স্বীকার করে নিবে। এভাবেই আমাদের অলক্ষ্যে আমরা সমাজে পরস্পরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেই। তাহলে সমাজ মানে পণ্য বিনিময় সম্পর্ক। আর এমন বিনিময়ের ভিতর দিয়ে পরস্পরকে স্বীকার করে নেয়া। এ যেন স্বীকার করে নেয়া যে, হ্যা, তুমিও কিছু উতপাদন বা তৈরি করেছো মেনে নিলাম। এমনকি সময়ে বিনা বস্তুগত বিনিময়, সামাজিক দায় মিটাতে অন্যকে সাহায্য করা আর সর্বপরি সবার জন্য নিঃস্বার্থ দোয়া করা। এভাবেই সম্পর্ক তৈরি করা জড়ানো আর এর ভিতরেই মানুষের বসবাস। আর ঠিক এর উল্টাটাই হল কাউকে একঘরে করে।
    তাই কোন জনগোষ্ঠি নতুন করে রাষ্ট্র-সরকার মানে নতুন করে পারস্পরিক স্বীকৃতির আসর বসানো। আর এটারই সবচেয়ে বড় রূপ হল বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো। আর এর ট্রেন্ডটা হল, যতই দিন যাচ্ছে আমরা ততই আমরা চিনা-জানা তেমন নাই এমন দেশ-ভুমির মানুষের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি, নিজের স্বার্থেই।  তাই শুরু থেকেই যেমন ইচ্ছা তেমন করে চলতে চালাতেও পারি অবশ্যই তবে এটা আইডিয়েল [ideal]। মানে হল এটা  যতটা কল্পনার ততটাই তা বাস্তবে সুবিধার না, আর তা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন কল্পনা।
    সবশেষে, সার্ক নিয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।

    সার্ক [SAARC]:
     এতদিন ভারত পাকিস্তানের ভয়ে সার্ককে অকেজো করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তার ভয় এই অবস্থায় যদি ভারতকেই বাদ দিয়ে চীন সার্কে ঢুকে যায় আর সার্ককেই কার্যকর করে ফেলে! তাই ভারত এখন সার্ককেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়। তাই এখন প্রকৃত বাস্তবতাটা হল সার্ক নিয়ে ভারত যেদিকেই যাক, চীনেরই লাভ আর ভারতের ক্ষতিই হবে। মূল কারণ, ভারত চীনের সাথে তুলনাযোগ্যই নয়, কমপেটিবল নয়।
    সার্ক এই জোট নিয়ে কথা-আলোচনা যত দিন যাচ্ছে ততই কমে নাই হয়ে যাচ্ছে। অল্পকথায় একেবারেই এর মূল কারণ, ২০০১ সাল থেকে দুনিয়া নতুন অভিমুখ বা ঝোঁকে বইতে শুরু করানো হয়েছিল তাই।  ভারত বা আমেরিকার মত দেশের ভাষায় বললে এটাকে তারা শব্দে আকারে বলবে  “সন্ত্রাসবাদ” বা “ওয়ার অন টেরর”।  আসলে এসব দেশগুলো ভেবেছিল, “ওয়ার অন টেরর” এর নামে  “ইসলাম কোপানো” শুরু করলে তারা নিজেদের অপরাধ আড়ালে ফেলে দুনিয়াটাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু আজ ২০ বছর পরের অভিজ্ঞতা বলছে সেটা ঘটেই নাই। উলটা সময়টা এখন ভারত ও আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের এখন কাফফারা দিবার সময়। কারণ তারা সমুলে হেরে  গেছে। আর আফগানিস্তান থেকে সেনা গুটিয়ে চলে আসা এর জলজ্যান্ত নমুনা।  এছাড়া  নতুন নতুন ক্ষত ও বিরোধ তৈরি করেছে তারা, সেসবের জন্য নতুন কাফফারা দিতে হবে। আর সবার উপরে এদের সবার সব ধরণের সক্ষমতাই এই প্রশ্নের সম্মুখীন ও পড়তির দিকে। তাই বুদ্ধিমানেরা কেউ কেউ আগেই পুণঃমুল্যায়নে বসে গেছে। কিন্তু না চাইতে যেসব নতুন ক্ষত তৈরি করেছে তার কী হবে?
    কথাটা বোধহয় এভাবে বলা যায়।  আগেই বলেছি এখানে “ইসলাম কোপানো” আর এর সুযোগ নেয়াটা দিয়ে শুরু হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল ইসলামি সমাজগুলোকে অস্বীকৃত আর চাপে মার্জিনালাইজ করে রাখলেই তারা জিতে যেতে পারবে। কিন্তু ২০ বছর পর দেখা যাচ্ছে ফল হয়েছে উলটা। আর তাতে দুটা ধারা তৈরি হয়েছে। একটা হল, গোণায় ধরা আর আপন করে নেয়া। পুর্ণ মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে সসম্মানে পাশে রাখা, পারস্পরিক সম-মর্যাদার গ্লোবাল সমাজ গড়ার পথে রওনা দেয়া। আর এর বিপরীতে আরেক ধারা হল, আমরা শ্রেষ্ঠ, এককালে সব আমাদেরই ছিল। তাই, ইসলামের নেতৃত্বে আগে আমাদের নয়া কিছু রাষ্ট্র গড়ে তোলা এরপর এর অধীনে দুনিয়াকে ঢেলে সাজানো।
    তবে ২০০১ সালের মূল পরিবর্তনের কৌশলগত কারণে আমেরিকা ভারতকে তোয়াজ করে একে চীনের বিরুদ্ধে খারা করেছে শুধু তাই না। পালটা পাকিস্তানকেই আমেরিকা নিজ সন্ত্রাসী হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসাবে ব্যবহার করেছে আবার পাকিস্তানকেই সন্ত্রাসবাদী বলে দোষী দাবি করেছে। এই সুযোগে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ক্ষমতায় উপরে এক সাধু রাষ্ট্রের ইমেজে বসার চেষ্টা করেছে। ফলে সেই থেকে এর প্রভাবে সার্কের ভিতরে ভারত আর পাকিস্তানকে নিজের সমান গণ্য করতে চায় নাই।  এটাই সার্কের অকার্যকর হয়ে পড়ার মূল কারণ।  সারকথায় সার্ক অকার্যকর হবার মুল কারণ  আমেরিকার নীতি। পাকিস্তানকে কোপের মধ্যে রাখা আর বিপরীতে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ভারতের তোয়াজে রাখা।
    এতে ভারত চেয়েছে সার্ক থেকে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাকিদেরকে নিয়ে নতুন জোট করা। সাথে অন্য নতুন কাউকে ঢুকানো। এতে ১৯৯৭ সালে গড়া সেটার নাম বিমসটেক [BIMSTEC] বা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ, একেই ভারত সার্কের বিকল্প হিসাবে পুশ করতে শুরু করেছে। আসলে ২০০১ সাল থেকে “সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার” আড়ালে, মার্কিন সমর্থনে ভারতের মুসলমান ও পাকিস্তানবিদ্বেষ চরমে উঠাতে ভারত আর সার্ক টিকাতেই চায় নাই। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ, নয়াদিল্লিতে সরকারি আমন্ত্রণে ২০১৬ সালে ভারত সফররত একদল বাংলাদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাবেক রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী [বর্তমানে ঠিঙ্কট্যাঙ্ক ORF ফেলো] খোলাখুলি বলেই ফেলেছিলেন, [দেখুন সার্ক ভুলে যেতে বললেন পিনাক রঞ্জন;] আর ‘বিমসটেক জোটের’ ওপর বাংলাদেশ জোর দিক।
    কিন্তু ২০২১ সালে এসে আবার ভারত পল্টি দিচ্ছে।  এবার বলছে সার্ক আর অকেজো করে রাখা না, সার্কের বিলুপ্তি দরকার। কেন? ভারতের ভয় সার্ক অকেজো করে ফেলে রাখলে সার্কে ঢুকে চীন না সার্ক নিয়ে চলে যায়!  কিন্তু কাজটা সে করতে গেছে আফগানিস্তান প্রসঙ্গে নিউইয়র্কে সার্কের এক সভাকে কেন্দ্র করে।

    আফগানিস্তানকে নিয়ে সার্ক বৈঠকে হতে গিয়েঃ
    গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের বার্ষিক  সাধারণ পরিষদ বৈঠকের সাইড লাইনে। আফগানিস্তানকে সার্কে সর্বশেষ যুক্ত সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে নেয়া হয়েছিল আগেই। সংশ্লিষ্ট নেতারা সার্কের একটি বৈঠক করতে চেয়েছিলেন ঐ সাইড লাইনে। কিন্তু তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি মূলত আফগানিস্তানকে সেখানে ডাকা হবে কি না বা হলে কীভাবে এনিয়ে অমীমাংসিত বিতর্কের কারণে।

    এমনিতেই গত ১৫ আগস্টের পরে ভারত আফগানিস্তান ইস্যুতে একা হয়ে এক আজিব অবস্থান নিয়েছে। তা হল অনেকটা যেন “আমাকে আগের গনি সরকার ফিরে এনে দাও। আমি এর অন্য কমকিছু হলে মানব না’- টাইপের।  সম্ভবত এর মূল কারণ এতদিন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার আড়ালে থেকে আফগান ইস্যুতে অবাধ বিচরণ ও সুবিধা খেয়েছে। আর এখন ঠিক উল্টা যুক্তরাষ্ট্রও কারও দিকে না কেবল নিজের একক  স্বার্থের দিক চেয়ে চলার কারণে ভারত একা বোধকরা এক এতিম যেন! তাই সার্কের ঐ হবু মিটিংয়ে ভারতের অবস্থান ছিল, আগের নাই হয়ে যাওয়া গনি সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব আনতে হবে। তবে, ভারতের ব্যাখ্যা পাকিস্তান বরং তালেবানদেরকে ঐ আফগান প্রতিনিধিত্বের আসনে বসাতে চেয়েছে, তাই সব ভন্ডুল হয়ে গেছে। সারকথায় ওই বিতর্কে পড়ে, সার্কের সভা বসতেই পারেনি; বাতিল হয়ে গেছে।

    কিন্তু ভারতের মিডিয়া এ নিয়ে অস্থির অধৈর্য হয়ে উঠেছে। যেমন দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রার এক লেখা। [অনুমান করা হয় এটা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লেখানো।] তারা নিজেরাই এর সারাংশ সেখানে করেছে এভাবে: “চীন আর সার্ক রুমের মধ্যে ঢুকে পড়া হাতি নয়। বরং সে ওর পুরা ঘরবাড়িই দখল নিয়ে বসেছে। ভারতের বরং উচিত হবে তার পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইউকে, রাশিয়া প্রভৃতি অগ্রসর দেশ ও কোয়াডের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া” ।

    China is no longer the elephant in the SAARC room, it occupies the entire zoo. India would rather jump over its neighbourhood and build ties with US, France, UK, Russia, and the Quad.

    এসব কিছু আসলে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের এলায়েন্স গড়ে তোলা, যার ভিত্তি হল কথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ইস্যু। আর এতে এর নামে ভারতের অদ্ভুত এক মুসলমানবিদ্বেষী মন আর সেই মনের তৈরি করা ঘৃণা হাজির হয়েছে! যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে ভারতের এই আচরণ সমর্থন করে গেছে আর আজ এরই পরিণতি দেখছে সবাই।
    আসলে একালের আফগান থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের পরে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে তার গত ২০ বছরের সম্পর্ককে পুনঃমুল্যায়নে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া শুরু করাতে ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়া।
    বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়ার এখন লক্ষ্য ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে লেখা ছেপে নিজের ভাগ্য গুছানো। যেমন মানবজমিনের এক লেখার শিরোনাম “আফগান সংকট খাদের কিনারায় সার্ক”।

    এটা প্রমাণ করে ভারতের বিদ্বেষী আচরণ কোন মাত্রা ছুঁয়েছে। একালে এর উপর যুক্ত হয়েছে আমেরিকা আর আগের মতো ভারতকে সমর্থন করতে পারছে না, সম্পর্ক আর আগের মতো নাই। আমেরিকা নিজের স্বার্থ নিয়েই ডুবে আছে। আর সে ভিত্তিতেই ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক ঢেলে সাজাতে চাইছে। আর এতেই ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ!

    চীন থাকলে ভারত-পাকিস্তান কোনই সমস্যা নাই, কেন এমন??
    কথাটা আসলেই সত্য, অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আমেরিকাই ভারতকে তোয়াজ করে গাছে তুলে তার পাকিস্তান-চুলকানি বা সময়ে চীন চুলকানি তৈরি করেছে। সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানেইজেশন [SCO] মূলত চীনের নেতৃত্বে এক জোট। এর উপর সাথে আছে পুতিনের রাশিয়া। এবং সেন্ট্রাল এশিয়ার কিছু দেশ।  সম্প্রতি এই জোটে  ভারত ও পাকিস্তান দুদেশকেই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আফগান বা তালেবান নিয়ে অস্থিরতা এই সময়ে  SCO তে ভারত ও পাকিস্তান একসাথে সুন্দ্রভাবে মিটিংয়েও বসেছিল। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হল?  এখানেই শেষ না।  পাকিস্তানে যাচ্ছে ভারত! কেন? এই SCO এর পক্ষ থেকে এক সন্ত্রাসবিরোধী ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে। না আপনারা ভুল শুনেন নাই। আচ্ছা, ভারতের বিশ্বস্ত মিডিয়া ভোরের কাগজের রিপোর্টের লিঙ্কটা দিচ্ছি দেখেন যার শিরোনামঃ পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী মহড়ায় যাচ্ছে ভারত।  অথবা ভারতের জি-নিউজের খবর শিরোনাম “পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ভারতীয় সেনা, এবার সঙ্গী চিনও”। এর অর্থ কী ?
    অর্থ একটাই। আমেরিকাই ভারতকে বিগড়েছে, উস্কানি দিয়ে গেছে। যে কারণে চীনের নেতৃত্বে থাকলে ভারত ঠিক থাকে এবং ভারত-পাকিস্তান একসাথে কাজ করতে পারে, অবলীলায়।
    ঠিক একই সময়ে যখন আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান এখন ভারত সফরে আছেন।  আর ভারত শেরমানের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নালিশ দিচ্ছে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করা, কনট্রোল করার জন্য; [ India Wednesday raised concerns over … Haqqani Network in Afghanistan along with the active role being played by Pakistan there…]। আর জবাবে শেরমান বলছেন, আফগান ইস্যুতে আমরা ভারত-আমেরিকা এক দেহ এক প্রাণ; US-India ‘one mind, one approach’ on Afghan-related issues. কেন? মনের দুঃখে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রা যেন “পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে”  বনবাসে চলে যেতে চেয়েছেন!
    অথচ এটা অপ্রয়োজনীয়! চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে পাশে নিয়ে এক ওয়ার্কিং জোট গড়ে নিয়েছেন। আপাতত যেখানে বাংলাদেশ হল ওয়ার হাউজ! আপাতত টিকার ওয়ার হাউজ!


    লেখক : 
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ অক্টোবর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “সার্ক এখন কারও না“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    রাশিয়ান ট্রয়কা ভারত নয়, পাকিস্তানকে নিয়েছে

    গৌতম দাস

    ০৯ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

     

    India Not Invited to Extended Troika Meeting on Afghanistan

     

    তালেবানবিরোধী  প্রচারণা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে।  ফলে তাদের সতর্ক ও বুদ্ধিমান হয়ে পা-ফেলা দরকার। এদিকে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি কখনো কখনো বেশি শক্তি দেখাতে চায়। আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council], এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো-রা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়েও বুদ্ধিমান দেখাতে চাচ্ছেন নিজেদের। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে হিমশিম খেয়ে, কী বলবেন এখন, কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন তা হাতড়ে অসহায় অবস্থায় মুখ বন্ধ হয়ে আসার দশায় তারা। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা এখন আমেরিকাকে সাধুপুরুষ আর মহাভদ্রলোক সাজিয়ে এরপর চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এমনকি ভারতকেও অভিযুক্ত করে নিজ মান বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। বলার চেষ্টা করছেন এসব দেশের স্বার্থের কারণেই নাকি তালেবানেরা আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরে আসার অবস্থা তৈরি হয়েছে।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক হয় নাই। এমনকি এর স্বপক্ষে কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেও সে নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই  এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  অতএব,  আটলান্টিক কাউন্সিল – এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব পুরান প্রপাগান্ডায় খ্যান্ত দেয়া, ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  দেখাই যাচ্ছে, রাশিয়ার উদ্যোগে চীনও পাশে দাড়িয়েছে। বাইডেনও যোগ দিয়েছেন। কাজেই নতুন ও ইতিবাচক চোখে  এসব কনসালটেন্টদের সামনে তাকানো উচিত।  বাইডেনের চেয়ে বুদ্ধিমানের ভান করা অপ্রয়োজনীয়।

    ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান দখল কাজটা যে সে সঠিক করেছে এমন কোনই সাফাই-ন্যায্যতা গত ২০ বছরে একেবারেই নুন্যতমও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।  কাজেই সেটা এখনও তালেবানেরা খারাপ, ওরা নৃশংস, ওদের ধর্মটা খারাপ, ওরা নারীর উপর অত্যাচার করে ইত্যাদি ক্যাম্পেইন করে নতুন কিছুই আগাবে না।  কাজেই আটলান্টিক কাউন্সিল, এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলোদের এখন এসব ত্যাগ করা উচিত।  আমেরিকা হেরে গেছে এটাই বাস্তবতা। কাজেই নতুন ভাবে তাকাতে হবে; চাইলে তারা নিজেদেরকে রিভিউয়ে নিতে পারে।  আবার ওদিকে ফ্যাক্টস হল, তালেবানদের আইডিয়া মর্ডান না হতেই পারে। কিন্তু সেটা তো তাদের প্রতি বিদ্বেষ জাগিয়ে তা কোন সমাধান নয়, এটা তো প্রমাণিত। একমাত্র ডায়লগ চালিয়ে গেলে, এনগেজমেন্ট এটাই পথ।  আর মূলত দরকার আফগানি স্টাবিলাইজিং ফোর্স। যেটা অবশ্যই পুতুল সরকারের কেউ নয়। এটা আপন ভাগ্যন্বেষণের লোক।  তুলনায় তালেবানদের নিয়ে যত আপত্তি আমরা মিডিয়ায় দেখি তবু তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

    ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে আমেরিকা তালেবানবিরোধী পুতুল সরকার বসিয়ে যা খুশি তাই করার সুযোগ নিয়ে চলেছিল। অথচ এই কনসালট্যান্ট ফেলো এরাই এখন প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কেন আফগানিস্তানে এমন রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি, যেখানে তালেবানের বিকল্প শক্তি তৈরি হয়, কেন তালেবানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকল?” এখন এই প্রশ্ন তাদেরকেই আমরা জিজ্ঞাসা করব। তাদেরকে এর জবাব দিতে হবে। তাই তারা বুদ্ধিমানের মত আগে নিজেই প্রশ্ন তুলে জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন, কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। এরাই আবার পাকিস্তানকে দায়ী করছেন যে পাকিস্তান হল তালেবানের “আশ্রয়দাতা”। যেন সে জন্য আজকের আফগানিস্তানে তালেবানরা ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে। অথচ ঘটনা হল আফগানিস্তান বা তালেবানরা কেউই পাকিস্তানের শত্রু বা বিরোধী ছিল না, স্বাভাবিক পড়শি ছিল। আমেরিকানরাই জবরদস্তিতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে, আমেরিকার আফগান-শত্রুতাকে যেন পাকিস্তানও নিজের শত্রু জ্ঞান করে। আর যাতে আমেরিকা পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে আফগানিস্তানে বোমা ফেলে আসতে পারে। অথচ সেই আমেরিকাই (ইন্ডিয়াকে বগলে নিয়ে ) উল্টো পাকিস্তানকে “জঙ্গি আশ্রয়দাতা” দেশ বলে প্রপাগান্ডা করে গেছে।  অথচ কার্যত এভাবে পাকিস্তান তো আমেরিকান হুকুমে চলে যাওয়া এক দেশ হয়েই ছিল। তাহলে এই পাকিস্তান আবার আমেরিকানদের শত্রু তালেবানদের নিজ দেশেই আমেরিকানদের পাশাপাশি আশ্রয় দেয় কেমন করে!

    আবার একালে আফগানিস্তান সব খোয়ানো আমেরিকার সেই আফগানিস্তানকে ফেলে পালানোর ইচ্ছা বহুদিনের, সেই ওবামা আমল থেকে। এ কারণে তারাই সে সময় চীনকেও আফগানিস্তানে সংশ্লিষ্ট হতে বলেছিল। গ্লোবাল নেতা হতে চাওয়া চীনেরও কিছু কিছু দায়-দায়িত্ব  নেয়া শুরু করুক এই উদ্দেশ্যে আমেরিকা তার কিছু ভার হাল্কা করতে চেয়েছিল, ফলে চীন তালেবানদের সাথে কথা বলুক মূলত এ লক্ষ্যে।  ফলাফলে  এক থার্ড পার্টি দেশ কাতারে  – তালেবানরা যেন অবাধে যেতে-আসতে ও যে কারো সাথে মিটিং করতে পারে; এ ব্যবস্থা ওবামা আমলেই ২০১৫ সাল থেকে চালু করা হয়েছিল। অরিজিনালি ‘সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন’ বা এসসিও জোট গঠন করার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এটিই। যে কারণে সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশ আর চীন ও রাশিয়াকে নিয়েই গঠন করা হয়েছিল এসসিও। অথচ আজ আমেরিকান ফেলোরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন যেন চীন-রাশিয়া নিজ স্বার্থেই তালেবানদের ফেরত আনছে। আর ওদিকে বিবিসি খবর দিচ্ছে কাতারের আলোচনা আরো পুরানা ২০১৩ সালের উদ্যোগ।

    আবার ওবামার পরে ট্রাম্প আরো জব্বর উদ্যোগী যেন পারলে এখনই আফগানিস্তানকে ফেলে নিজ সেনাদের নিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু তিনিই তো সেনা প্রত্যাহারের আলোচনা আফগান পুতুল সরকারের সাথে করেননি; বরং সরাসরি কেবল তালেবানদের সাথেই কথা বলেছিলেন, ‘ডিল’ করেছিলেন। সেনা প্রত্যাহারের শেষ দিন কী হবে, তাও পর্যন্ত ঠিক করেছিলেন; যা বাইডেন ক্ষমতায় এসে পুনঃঅনুমোদন দিয়ে সেটি ‘তারও চুক্তি’ বলে স্বীকৃতি দেন। অথচ ট্রাম্প তালেবানদের সাথে কিসের বিনিময়ে কী ডিল করে গেছেন, সেটা প্রকাশ্য নয়। তালেবানরা নিজ উদ্যোগে ক্ষমতা দখল করুক আর এতে ট্রাম্পই অনুমোদন দেয়ার বিনিময়ে- এ শর্তেই আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার বাধাহীন করে দিয়ে যাননি, তা আমরা কি নিশ্চিত? সে জন্যই কি থিংকট্যাংক ফেলোরা আমেরিকা বাদে বাকি সবাইকে আগাম দায়ী করা শুরু করেছেন যেন তাদের জন্যই তালেবানরা ক্ষমতায় ফিরে এসে যেতে পারে বলে – প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। মানে তারা কলসালট্যান্ট এই পরিচয় ধুলায় লুটিয়ে একেকজন ‘প্রপাগান্ডিস্ট’ পরিচয় নিতে চাইছেন! অথচ কী চুক্তি হয়েছে অন্তত ইনফরমালি কিছু তাদের অজানা থাকার কথা নয়!

    রাশিয়ার পুতিনের ট্রয়কাঃ
    অরিজিনালি ট্রয়কা (troika) শব্দের আক্ষরিক অর্থ সেকালের রাশিয়ান তিন ঘোড়ায় টানা গাড়ি; অর্থাৎ তিন শক্তির সমন্বয়ে কোনো একশন। আর এখন এখানে  শক্তি বলতে এরা হল রাশিয়ার পুতিনের উদ্যোগের তিন শক্তি   – রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন। হ্যাঁ, অবশ্যই তারা পরস্পর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও এরা আফগান-তালেবান ইস্যুতে একসাথে কাজ করতে নেমেছে। আর একাজে মানে আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর যেন আফগানিস্তানে কোনো বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা বা সশস্ত্র তৎপরতার ঢল নেমে না আসে, অতীতে যেমন আফগানিস্তানে অনেকবারই ঘটেছে। সেটা ঠেকানোর কাজ।  কিন্তু সেটাই বা ট্রয়কা চাচ্ছে কেন?

    খুবই সংক্ষেপে বললে, সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিবদমান পক্ষ ও স্বার্থগুলো একত্রিত হয়ে একটি রাজনৈতিক নেগোশিয়েশনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি থিতু সমাজ, একটি ফাংশনাল সরকার আর ন্যূনতম আইনশৃঙ্খলা স্থাপন করতে যেন সক্ষম হয়, সে কাজে সহায়তা করা এই ট্রয়কার উদ্দেশ্য।

    গত ২০১৮ সালের শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তালেবানদের সাথে কথা বলার, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেনা প্রত্যাহার। কারণ তার সরকারের অর্থ আফগানিস্তানে ঢালার অপচয় চলছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল ছাড়াই। তাই তিনি এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট  – জালমে খলিলজাদেকে [Zalmay Mamozy Khalilzad, an Afghan-American diplomat]  সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে তাঁর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি তালেবানদের প্রধান আলোচক বা নেগোশিয়েটর মোল্লা আবদুল গনি বারাদরের সাথে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহার নিয়ে কথা শুরু করতে পারেন। আর মূলত প্রথম থেকেই তালেবানদের শর্তানুসারে আফগান পুতুল সরকারের কোনো প্রতিনিধিই তাদের দুপক্ষের কোনো সভাতেই না রাখার নিয়ম চলে আসছে। কারণ এতাই তালেবানদের শর্ত ছিল। শেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একটি চুক্তিতে তারা পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিল আমেরিকার নির্বাচনের বছর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখে; যদিও এর বাস্তবায়নের মূল উদ্যোগের মাঠের কাজ গড়িয়ে যায় পরের বছরে। অর্থাৎ তত দিনে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে নিয়েছেন।

    কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পরে অনেক স্থানে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় তালেবানদের সশস্ত্র তৎপরতা। এ ঘটনায় তাই উদ্বিগ্ন হয়ে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছিল পুতিনের রাশিয়া। কেন? সুনির্দিষ্ট করে রাশিয়ান স্বার্থ কী?

    ২০০৮ সালে সেকালের জি-৮ গ্রুপ থেকে রাশিয়াকে বের করে দেয়ার পর (আবার তা জি-৭ হয়ে যায়) রাশিয়া-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল। তা কখনোই ভালো হয়নি। কিন্তু আফগানিস্তানের যেকোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা আজো রুশ স্বার্থের জন্য অনেক কিছু যায়-আসে, তাই গুরুত্বপূর্ণ। এর মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই রাশিয়ার স্বার্থ। এসব দেশ অতীতে জার সাম্রাজ্যের অধীনে দখলে গিয়ে প্রথম রাশিয়ান শাসিত  অঞ্চল হতে শুরু করেছিল।  ফলে সেই থেকে পরে (১৯১৭-১৯৯১) কমিউনিস্ট আমলেও শুরু থেকেই এই সেনট্রাল এশিয়া কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যায়। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে সেন্ওটাল এশিয়ান দেশগুলো আলাদা আলাদা দেশ হয়ে যায় তবুও তা বড় পাহারাদার বা রাশিয়ান বলয়ের দেশ হয়েই থেকে যায়। আসলে এখনও পর্যন্ত আশপাশের রাষ্ট্রগুলোর ভিতর কোন র‍্যাডিক্যাল ইসলামী সমাজ-রাজনীতির চিন্তার প্রভাবে যেন সেন্ট্রাল এশিয়ায় সাজানো রুশ ভারসাম্য নষ্ট না হয়ে যায়, এ দিকে পরের রাশিয়ার সব শাসকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল, এখনো আছে। এটাই কোর রুশ স্বার্থ।

    এমনকি যেমন। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে খোমানির ইরান বিপ্লবের পরে এর প্রভাবে না সেন্ট্রাল এশিয়ান দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন-বিপ্লবের ছাপ পড়ে যায় বা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে; এই ভয়ে ভীত হয়েই ছয় মাসের মধ্যে ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরেই আগাম আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ কার্যত আফগানিস্তান হল ইরান থেকে সেন্ট্রাল এশিয়াকে [The region consists of the former Soviet republics of Kazakhstan, Uzbekistan, Tajikistan, Kyrgyzstan, and Turkmenistan.] বেশির ভাগ জায়গায় আলাদা করার এক ভুখন্ড ও দেয়াল। তাই সেই ইরান বিপ্লবের পর শুরু হয়ে আফগানিস্তান আজো এক হট স্পট ও আন্তর্জাতিক ইস্যু।

    এ কারণে রাশিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক যতই নিচে থাকুক না কেন, পুতিনের রাশিয়া আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ও স্বার্থে রাশিয়াকে অনেক কিছু করতেই হয়। তাই নিজেই উদ্যোগ নিয়ে আমেরিকা ও চীনকে সাথে নিয়ে ট্রয়কা গড়ে নিয়েছেন পুতিন। সেই পুরনো উদ্দেশ্য, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোন রেডিক্যাল ইসলামি চিন্তার ছাপ বা আঁচ যেন মধ্য এশিয়ার দেশে না পড়ে যায়। এদিকে চীন এখন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল নেতা হওয়ার দাবিদার। ফলে তারও দায়-স্বার্থ আছে। ফলে রাশিয়া ঢাকলে তাকেও অংশ নিতেই হয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে চীনের খোদ সীমান্তই আছে।

    তাহলে মুলকথা, এই ট্রয়কায় চীন ও রাশিয়া এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা শত্রুতা থাকলেও মিলের ভিত্তিটা ঠিক কী? কেন?
    এই ভিত্তিটাই হল, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার, যার কেন্দ্রে আছে জাতিসঙ্ঘ। ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্র রেখে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাই এর ভিত্তি। কেন?
    এই জাতিসঙ্ঘকেন্দ্রিক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থাটা  – যেটা গত ৭৫ বছর ধরে ফাংশনাল হয়ে আছে, এটি নিয়ে অজস্র অভিযোগ এবং এর নানান খুঁত ও ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। তা সত্ত্বেও এটাই দুনিয়াতে একমাত্র গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার কায়েম করা এক সিস্টেম। আর এটা না থাকার মানে ১৯৪৫ সালের আগের সময়ে ফিরে যাওয়া, যখন যুদ্ধ করারও কোনো নিয়মনীতি মানার বালাই নেই; আইনকানুন  বা প্রটেকশন নাই।  চাইলে যেকোনো জনগোষ্ঠীকে ‘নির্মূল’ করে দেয়াও ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। জর্মানিতে হিটলারের হাতে ইহুদি নিধন ও নির্মুলের চেষ্টা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। রেসিজমও কার্যত বৈধ ছিল মানে কোনো বাধা ছিল না – যা খুশি, জোর যার রাজ্য তার এবং সর্বোপরি কাউকে কোন ভুখন্ড দখল নেয়া বা কলোনি করে রাখাও ন্যায্য ছিল।  শুধু তাই না  কলোনিদখল করে রাখা এটাই সেকালের  প্রধান ফেনোমেনা ও প্রচলিত ঘটনা ছিল। সারা অখন্ড ভারত বৃটিশ কলোনি হয়ে ছিল।   কাজেই সেই পরিস্থিতির বিপরীতে  জাতিসংঘ – এটাই সবেধন নীলমনি, এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমের ভারকেন্দ্র। আর এটি দাঁড়িয়ে আছে যে ভিত্তি-অবস্থানের  উপর তা হল, কোনো ভূখণ্ডের নাগরিক বাসিন্দারা হল আসল ক্ষমতার উৎস;  তারাই একমাত্র নির্ধারক যে কোনো ভূখণ্ড কার দ্বারা শাসিত হবে। ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণ এই নির্ধারণের একমাত্র হকদার – এ ভিত্তিতে। তাই এটা মূলত অন্য কারো দেশ দখল বা কলোনি করে নেয়ার বিরুদ্ধে এক রক্ষাকবজ। যেকারণে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর  নেহেরুর ভারতের সাথে যুক্ত করে দিয়ে গেছে, এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ একথা বলবার হকদার একমাত্র কাশ্মীরের জনগণ, কোন রাজা নয়।  আর সেখান থেকেই, এই আইনিভিত্তি – পরোক্ষেও রাজা-বাদশাহদের কোন ভুখন্ডের শাসন ক্ষমতাকেও বৈধতা দেয় না। তবে একটা ছাড় আছে যে, আগে থেকে চলে আসা কোনো রাজতন্ত্র বা বাদশাহতন্ত্রকে জাতিসঙ্ঘ অবৈধ বলতে চায় না, যতক্ষণ না ওর অভ্যন্তরীণ জনগণ সংগঠিত হয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ চায় বা দাবি করে। অর্থাৎ জাতিসংঘের ফর্মুলা হল গণভোটে চলে যাওয়া ও সে রায়ের ভিত্তিতে দাবির ফয়সালা করা।

    ঠিক এ কারণে ট্রয়কার কাজের ভিত্তি জাতিসঙ্ঘ ও একে কেন্দ্রে রেখে তৈরি হওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার-টা। আর ২০১৯ সালের মার্চ থেকে এই ট্রয়কা নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন মিটিং করে আসছে, আর সেখানে জাতিসঙ্ঘের পাশ হওয়া বিভিন্ন প্রস্তাবকে ভিত্তি করেছে এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিকেই সংশ্লিষ্ট করেছে। আর তাই সেখানে ৩০ নভেম্বর ২০২০ এক রেজ্যুলেশনের তিন নম্বর সিদ্ধান্ত হল এরকমঃ [কথাগুলো ট্রয়কার এক বিবৃতি থেকে নেয়া]

    3. As stated in the UNSC resolution 2513 (2020), we do not support the restoration of the Islamic Emirate and we call on the Government of the Islamic Republic and the High Council for National Reconciliation to engage openly with their Taliban counterparts regarding a negotiated settlement.

    অর্থাৎ, ট্রয়কা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) ২০২০ সালের এক সিদ্ধান্ত অনু- সমর্থন করছে। আর যেখানে বলা হয়েছে, তারা ‘তালেবানদের ইসলামিক আমিরাতকে পুনঃস্থাপন সমর্থন করছে না”। বরং আহ্বান রাখছে যেন আফগানিস্তানের বিবদমান সব পক্ষকে সাথে নিয়ে সবাই সংশ্লিষ্ট হয়ে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছায় এবং বিবাদের একটি শান্তিপূর্ণ সুরাহা যেন হয় এবং তা করতে উতসাহ ও সহায়তা দিতে চায়।

    এসব প্রস্তাবকে কিভাবে দেখব ও বুঝব?
    প্রথমত শুরুতে যেমন বলেছি আমেরিকান থিংকট্যাংক ফেলো যারা সব দোষ তালেবানের বলে তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন, অথচ এরা জানেন একটি  ট্রয়কা-উদ্যোগ কাজ করছে ফাংশনাল; যেখানে রাশিয়া, আমেরিকা ও চীন এই তিন শক্তি সক্রিয়। অথচ এরা তালেবানদের এক  শত্রুজ্ঞান করে আগাম কোন ক্যাম্পেইন করতে বসেনি। কেবল ডায়লগে সবাইকে নিয়ে বসে একটি পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট করে নিতে বলছে, সাহায্য করতে চাইছে। অথচ এই থিংকট্যাংক ফেলোরা তালেবানবিরোধী প্রপাগান্ডায় আগাম নেমে গেছেন, যা আসলে ভারতের অবস্থান! এমনকি এ্টা আমেরিকার অবস্থানও নয়। উপরের ট্রয়কার বিবৃতিটা আমেরিকান সরকারি ওয়েব সাইট থেকে নেওয়া যার শিরোনাম – Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan.।

    এখন অনেকে মনে করতে পারেন যে এই সেট হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটা আপনি পছন্দ করেন না, তা হতেই পারে। জাতিসঙ্ঘ এর একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা দাঁড় করানোই শেষ কথা নয়। বরং কেবল শুরু যাকে অনেক পথ হাঁটতে হবে, বদলাতে হবে, অন্য অনেক ‘অপরকে’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, ডায়লগ করতে হবে। যেমন ধরা যাক, আপনি এক ইসলামিস্ট অথবা কোনো কমিউনিস্ট, যিনি গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাটাকে পছন্দ করেন না বা এটা আপনার ফেভারে বলে দেখেন না। সেক্ষেত্রে কী করণীয়?

    আসলে এ ব্যাপারটা অনেকটা আগে থেকে গড়ে থাকা একটি শহরের মত, যেখানে ওই শহরের ভেতরে বাসিন্দাদের বসবাস ও থাকা বা চলাচল ইত্যাদির জন্য সেখানে প্রচলিত নিয়মকানুন আইন কনভেনশন সবই আছে। ধরা যাক, আপনি এখন বাইরে থেকে এসে ওই শহরেই বাস করতে চাইছেন। কিন্তু আপনার দাবি ওদের সব নিয়ম আইনের কিছুই আপনি মানেন না; কারণ এগুলো তৈরির সময় আপনার মতামত নেয়াই হয়নি। এখন – এমন কথা বলে যদি ওই শহরে ঢুকতে যান এতে ফলাফল হতে পারে এই যে, ওরা উল্টো আপনাকেই আউটকাস্ট, কী বাইরের লোক বা গোঁয়ার, গাঁইয়া অভব্য আনকুথ কিংবা ধরেন জঙ্গি বলেই বের করে দিতে পারে। আইনের শাসন না মানা লোক বলে ‘অমার্জিত’ ট্যাগ দিয়ে আপনাকে একা করে দিতে পারে; আর এমন ইমেজের কারণে হয়তো আপনি আর কারও কোনো সহানুভুতি বা আপনার কী হয়েছে, তা শুনানোর মত কাউকেই পেলেন না- এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে রাখার দশায় পড়ে যেতে পারেন।

    তা হলে এদেরকে মোকাবেলার উপায় কী?  আছে। একারণে ঐ শহরে ঢুকতে গেলে আপনাকে পরিকল্পনা-কৌশল নিয়ে এগোতে হবে। তাই সম্ভবত এর চেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রথমত আপনি তাদের নিয়ম মানেন বলে প্রবেশাধিকার তো নিয়ে নিবেন আগে। এরপর ওদের নিয়ম মেনেও চলেন। আর এবার কেউ আপনার পাল্টা নিয়মটা যা আপনি চালু করতে চান, সেটা কেন বেশি ভালো সেটা দেখান ও এই প্রচার চালান আশপাশে। ওই শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটে নিজের ভালো চিন্তাগুলো তুলে ধরার চেষ্টাও করতে পারেন। এরপর সময়ে আপনার দলে ভারী বুঝলে এবার তখন ঐ শহরের পুরানা সব নিয়ম বদলানোর চেষ্টা বা উদ্যোগ নেন।

    অর্থাৎ এর মূল কথাটা হল – খেলার পুরনো নিয়ম বদলাতে চাইলে দূরে গ্যালারিতে বসে থেকে তা বদলাতে পারা যাবে না। উল্টো আপনাকেই এরা উপড়ে তুলে ফেলে দিতে পারে। এর চেয়ে বরং খেলায় অংশ নিয়ে খেলতে খেলতেই এমন পুরনো নিয়ম বদলাতে চেষ্টা করতে পারেন। এর সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এই পথ না ধরলে কী হবে?

    সেটা একটি উদাহরণে বলা যাক। গত ৩০ জুলাই আমাদের স্থানীয় প্রথম আলো দৈনিকের খবরের শিরোনাম – “ফজলের ‘কৌতুক’ চিরতরে স্তব্ধ করল তালেবান”। ফজল, তিনি আফগান পুতুল সরকারের এক পুলিশ অফিসার ফজল মোহাম্মদ। তিনি অনলাইনে হাস্যরসাত্মক নানান ভিডিও পোস্ট করার জন্য আফগানদের কাছে তার পুলিশ পরিচয়ের চেয়ে ‘কৌতুক অভিনেতা’ বলে বেশি পরিচিত। কিন্তু তালেবানরা নাকি প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি বাড়ি ফেরার পর তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করে। এ ক্ষেত্রে হত্যার কথা শুরুতে অস্বীকার করলেও পরের সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। তার পরই তাকে হত্যার কথা স্বীকার করে তালেবান। এ হলো খবরটার সারকথা। তবে অবশ্য আফগানিস্তানে অনেক সময় এসব হত্যা প্রকাশ্যেও ঘটে থাকে।

    এখানে তালেবানদের জন্য খবরটার  সবচেয়ে খারাপ দিকটা  হল, এটা তার ইমেজ ধ্বংস করেছে। সেটা তালেবানেরা আইনের শাসন মানে না আর জঙ্গি ট্যাগ লাগানো ধরণের ইমেজ সৃষ্টির প্রচেষ্টা অবশ্যই। তাই খবরটা যতটা সত্যি তাতে তালেবানদের এমন স্টাইলের তৎপরতা আত্মঘাতী!

    কোনো যুদ্ধের মাঠে আপনি বা আপনার শত্রু খুন হয়ে যাওয়ার একটা আলাদা অর্থ হয়। সামরিক ইস্যুতে এর ক্রিমিনাল আইনে মামলা হয় না। তবে এর বিপরীতে তুলনামূলক শান্ত এক জনসমাজে আপনি ঘর থেকে কোনো জেনুইন অপরাধীকেও যদি উঠিয়ে এনে জনসমক্ষে মেরে ফেলেন এর ফল হবে উল্টো। আপনি অপরাধী হবেন। এছাড়া নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ, ওই সময়ে অসহায় যে মানুষটা খুন হচ্ছে, তা যারা দেশে-বিদেশের লোক দেখবে  এরা প্রায় সকলে নিজেকে আবিষ্কার করবে ঐ খুন হওয়া নিরস্ত্র লোকটার ভিতরে। ফলে খুন হয়ে লোকটার প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর এটাই আপনার জন্য বিরাট নেতি-ইমেজ তৈরির উপাদান হয়ে উঠবে। বলাই বাহুল্য এই ইমেজের জন্য এবার আপনিই হেরে যাবেন।  আপনি নৃশংস খুনি, কিংবা আপনার ধর্মটাই খারাপ এমন বয়ান উঠে আসতে পারে। তা হলে করণীয়?

    এমন ঘটনা যুদ্ধের মাঠের খুনোখুনি কিনা সেটা এক বড় প্রশ্ন। যদি তা হয় বুঝাতে চান, তবে আগে যুদ্ধ ঘোষণা করে নেয়া হয়েছে সে প্রমাণ হাজির দেখান।  নইলে অপর বিপরীত পথ হল,  কাউকে (সে অপরাধী হলেও) হত্যা করার আগে তার বিচার হতে হবে। এখন বিচার মানে কিন্তু অনেক কিছু। যার শুরু সেই কনস্টিটিউশন থেকে। এরপর রাষ্ট্র সরকার আইন, বিচারব্যবস্থা সেটআপ ইত্যাদি অনেক কিছু। মানে আসলে সবার আগে ক্ষমতা দখল করে নিতে হবে। এরপর আবার অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে এবং স্থায়ী ও আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আদালত থাকতে হবে। আর গ্রেফতারকারীই পরে বিচারক এবং তিনিই আবার শাস্তি বাস্তবায়নকারী, তিনি এমন হতে পারবে না। মানে পুলিশিং আর বিচারক একই লোক হতে পারবে না। নইলে তো যে কেউ যে কাউকে অপরাধী বলে মেরে ফেলার অরাজকতা শুরু হয়ে যাবে। আর এখানেই দেশে-বিদেশে আপনার ইমেজ আপনার রাজনৈতিক চিন্তা কেমন, আপনি দায়িত্বশীল ক্ষমতাবান মানুষ কি না – এসব বহু প্রশ্ন ভর করবে। বলাবাহুল্য, আপনি জঙ্গি, আপনি অমানবিক গুণের বা আপনি নৃশংস, কাজেই আপনার ধর্মটাই খারাপ- এই ইমেজ দাঁড় করানোর জন্য একদল লোক অবশ্যই হাজির থাকবে। অর্থাৎ আপনি নিজেই ২০০১ সালের মতো নিজেকে উপড়ে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পক্ষে কাজ করতে পারেন না।  এমন বোকামির অর্থ হয় না।  কাজেই আপনার  দায়ীত্বশীল ও গঠনমূলক ইমেজ অবশ্যই খুবই জরুরি।

    সারকথায় একালের দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলে একটা কিছু আছে, একে অবজ্ঞা করবেন না। একে মানুন আর না-ই মানুন, একে আগে বুঝুন। এরপর এগোনোর পদক্ষেপ কৌশল ঠিক করেন। নইলে বেঘোরে মার খেয়ে উলটা আপনিই হারিয়ে যাবেন।  এরা আপনাকেই উপড়ে ফেলে দিবে!

    আফগানিস্তান নিয়ে এত হইচইয়ের কারণ কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ট্রয়কার গঠন দিয়ে। পরে এই ট্রয়কা নিজেকে প্রথমে নিজেকে বর্ধিত করে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আর তাতেই ঘটে প্রথম বিস্ফোরণ। কেন?

    প্রথমত, পাকিস্তান হল ল্যান্ডলকড আফগানিস্তান ভূখণ্ডের এক প্রবেশদ্বার, যা সমুদ্রের পর  পাকিস্তানের পেরিয়ে এরপর সহজেই প্রবেশ করা যায়। আমেরিকা এজন্য আফগানিস্তানে হামলা চালানোর আগে পাকিস্তানকে হাত করে, বাধ্য করে, ঘাঁটি বানিয়েই নিয়েছিল। অতএব, আফগানিস্তানে ব্যবহারিক যেকোনো পদক্ষেপের আগে ট্রয়কাকে পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে নেয়া জরুরি ছিল। কাজেই রাশিয়া নিজে উদ্যোগ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে কথা বলে সসম্মানে তাকে ট্রয়কার বাড়তি সদস্যের ভূমিকায় জুড়ে  নিয়েছিল।

    কিন্তু রাশিয়া আমেরিকা বা চীনের ত্রয়কার এসব ব্যবহারিক সমস্যার দিকটি ভারতের বুঝার বা আমল করার মত অবস্থান নিলে ভারতের চলে না। এমনকি মনে মনে মানলেও তা স্বীকার করা অসম্ভব। কারণ? ও পাকিস্তান- এটা তো একটা জঙ্গি রাষ্ট্র, ‘তালেবানদের মদদ দেয়া রাষ্ট্র’ ইত্যাদি গত ২০ বছর ধরে ভারত তার দেশের ভিওতরে বাইরে  প্রপাগান্ডা করে এসেছে।  নিজের সেই কথা তো এখন ভারত টিকাতে পারছে না। মানে এখন প্রশ্ন হল, পাকিস্তান যদি জঙ্গি রাষ্ট্রই হয়, তা হলে তো সে রাশিয়া, আমেরিকা বা চীনের পাশাপাশি একই মর্যাদার আসনে বসতে পারে না। আর বাস্তবে যদি বসতে দেখা যায় তার মানে পাকিস্তান জঙ্গি রাষ্ট্রই নয়, দায়িত্ববান রাষ্ট্র। তাই যদি রাশিয়া পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতকেও ট্রয়কায়  সাথে নিত, তাতে  হয়ত ভারতের কিছুটা মুখরক্ষা হত।   মানে ভারত নিজেই এখন আগের ইসলামবিদ্বেষী নিজের ছড়ানো ঘৃণার মধ্যেই নিজেই আটকে গেছে!

    ওদিকে রাশিয়া আবার পাকিস্তানকে ট্রয়কার ভিতরে নিয়ে ট্রয়কাকেই পরে ট্রয়কা-প্লাস [troika+] নাম দিয়ে নিয়েছে, ফলে তাতে ভারতের জ্বলুনি আরো বেড়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির আর বাইরে খুবই কম প্রচারিত ঘটনা বলে এত দিন ভারত এই লজ্জা লুকিয়ে রাখতে পেরেছিল। যদিও তাদের মিডিয়া গত মার্চ ২০২১ থেকেই জানত যে ভারতকে বাদ দিয়ে ট্রয়কার মিটিং চলছে [ India not part of Russian meet on Afghanistan]।  কিন্তু এখন, গ্লোবাল মিডিয়ায় আফগানিস্তানে কী হচ্ছে এটা এক শীর্ষ ইস্যু। তাই মিডিয়া জুড়ে  আগাম ঘোষণা দিয়ে বলা হচ্ছে,  আগামি ১১ আগস্ট হবে ট্রয়কা+ এর পরের মিটিং। আর সাধারণত এসব মিটিং  এতদিন হয়েছে রাশিয়ায় না হলে কাতারে। কারণ কাতার ২০১৫ সাল থেকে আফগান-তালেবান ইস্যুতে নিরপেক্ষ হোস্ট। তাই সেও ট্রয়কার মিটিংয়েও প্রতিনিধি পাঠায়; সাথে ওই মিটিংয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ইরান ও তুরস্ককেও নেয়া হয়েছে। এতে এখন ভারতের মিডিয়াও আর দেশপ্রেমের জোশে মোদি-জয়শঙ্করকে জবাব দাবি করে  পার পাচ্ছে না।  একেবারে সবারই ইজ্জতের সওয়াল হয়ে গেছে।  কারণ এখন ভারতের চেয়ে  (কথিত জঙ্গী) পাকিস্তান রাষ্ট্র এখন গ্রহণযোগ্য আর দায়ীত্বশীল রাষ্ট্র হিসাবে  আমেরিকা, রাশিয়া বা চীনের সাথে সমান মর্যাদার টেবিলে বসেছে কথা বলছে। এটা ভারতে বসে দেখা যায় না! এমনই কঠিন জলুনি!   আর এসব কথা বাংলাদেশেও  ভারত প্রভাবিত মিডিয়ায় বড় করে আসায় বাংলাদেশেও ভারতের এই বেইজ্জতির খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

    রাশিয়া ভারতকে এমন বিমুখ ও বেইজ্জতিতে ফেলল কেন?
    রাশিয়ার সমস্যা ভিন্ন! রাশিয়া মনে করে এই আগস্টের শেষে সেনা প্রত্যাহারের পরে বর্তমান আফগান পুতুল সরকারের আর ক্ষমতায় থাকা ঠিক নয়। ,[However, the Russian side appears opposed to the continuation of the Ghani government and favours an interim set-up ……]   বরং অন্তর্বর্তীকালীন ও সবার প্রতিনিধিত্বমূলক এক সরকারের থাকা উচিত, যার কাজ হবে সবাইকে নিয়ে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো। আর এর বিপরীতে ভারতের অবস্থান হলো, বর্তমান পুতুল সরকারে হাত দেয়া যাবে না” [While India has backed the government of President Ashraf Ghani…।]।’ আরো আগিয়ে ভারত বলছে, গায়ের জোরে পুতুল সরকারকে বদলালে ভারত মানবে না। যেন ভারত না মানলে বিরাট কিছু যায়-আসবে!

    কথা হল, প্রথমত ক্ষমতা তো মুরোদেই মানে গায়ের জোরেই বদলাতে হয়, বদলায়। যদিও এ্টাই শেষ নয়। এরপর ক্ষমতা নিজের কাছে রেখে কিন্তু  সব পক্ষকে নিয়ে প্রপার সুযোগ দিয়ে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন গড়তে তো অসুবিধা নেই।
    আর তালেবানদের ক্ষমতা দখল না করতে কেউ স্পষ্ট করে তো কিছু বলেনি। ত্রয়কাও কোন আগাম আপত্তি প্রকাশ করে নাই। এমনকি ব্রিটেন আগাম জানিয়েই দিয়েছে, সে স্বীকৃতি মানে কাজ করতে রেডি। কাজেই তালেবানরা ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়ার পর তখন ত্রয়কার কথা শুনে তাদের কনসার্ণ গুলো আমল করে চলতে অসুবিধা হবার কথা না! যেমন তারা সব পক্ষীয় সরকার ইত্যাদির করতে গেলে অসুবিধা কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়ার ত্রয়কা ভারতের বুকে শেল মেরেছে“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  •  “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

     “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

    গৌতম দাস

    ০২ আগষ্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    FP.COM   A security officer walks past a mural showing U.S. Special Representative for Afghanistan Reconciliation Zalmay Khalilzad and Taliban co-founder Mullah Abdul Ghani Baradar in Kabul on July 31, 2020. WAKIL KOHSAR/AFP VIA GETTY IMAGES

     

    [সার-স্ংক্ষেপঃ   লেখার শিরোনাম “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে” – এটা মূলত এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুতের দেয়া শিরোনাম, সেখান থেকে নেওয়া।  তিনি আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদুত,  বিবেক কাতজু [Vivek Katju]। হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হওয়া তাঁর লেখা  এক কলামের শিরোনাম ছিল – India is losing out in Afghanistan ।  অর্থাৎ এই সাবেক কূটনীতিক মোদী-জয়শঙ্করের ভারতের এক করুণ পরিণতি দেখছেন।  তাঁর পুরা লেখাটাই মোদী-জয়শঙ্করের কঠোর সমালোচনা করে লেখা।
    ঠিক তেমনই আরেকজন হলেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলো তাকে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি বলে পরিচয় করায়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি মোদী-জয়শঙ্কর থেকে নিজেকে দুরত্ব তৈরি করে তাদের দায় না নিয়ে এক রচনা লিখে বলেছেন –  “আফগানিস্তান হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কূটনৈতিক দক্ষতার কষ্টিপাথর”। অথচ প্রথম আলো তার এই দায় না নেয়া লেখাটা ছেপেছে সৌম্যর ‘মতামত কলাম” হিসাবে।  অর্থাৎ সৌম্য প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি সে হিসাবে নয়।
    মুলকথাটা হল, তালেবান ইস্যুতে মোদীর নীতি-পলিসিতে বড় গলদ দেখছেন ভারতের কূটনীতিক, একাদেমিক বা মিডিয়াকর্মিরা – তাঁরা মোদী-জয়শঙ্করদের থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করে কথা বলা শুরু করেছেন। তবুও মোদী-জয়শঙ্কর হুশিয়ারি দিচ্ছেন।  জয়শঙ্কর ২৯ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় বলেছেন, আফগানিস্তানে বলপ্রয়োগের সরকার ক্ষমতা দখল করলে (মানে তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করলে) ভারত তা মেনে নিবে না [We would never accept any outcome which is decided by force”]। মানে স্বীকৃতি দিবে না। যদিও ভারতের স্বীকৃতির অপেক্ষায় তালিবানরা রয়েছে এমন কথা জানা যায় না। তবে ভারত সফরে আসা আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তার কথাও ভারতের কাছাকাছি মনে হলেও, কিন্তু এক বড় ফারাকের। তিনি বলছেন সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালেবানদের অসুবিধা হবে। তিনি একটা শব্দ ব্যবহার করেছে “pariah” [Afghanistan to become ‘pariah state’ if Taliban seizes power: US] যার সমতুল্য বাংলা মানে হল অছ্যুত বা একঘরে হয়ে থাকা।  দেখা যাচ্ছে আমেরিকা যেখানে হুমকি নয়, অবজেকটিভলি তালেবান্দের উদ্দেশ্যে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছেন  মুরোদহীন ভারত সেখানে হুঙ্কার দিয়ে বলছে – ভারত মেনে নিবে না। ]

     

    এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়িঃ
    আফগানিস্তানকে ঘিরে এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি চরমে উঠেছে। গ্লোবাল পাওয়ারগুলোর সবাই তো বটেই,  এমনকি মুরোদ না থাকলেও যারা আকাঙ্খী, তারাও এতে শামিল হতে চাইছে। কারণ একটাই তালেবান ইস্যু গরম হয়ে উঠছে। মানে আমেরিকার বন্ধুরা যারা গত বিশ বছর ধরে আমেরিকার পক্ষে থেকে কাবুলের পুতুল সরকারের থেকে নানান “প্রজেক্ট” বাগিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এখন দুঃখের দিন, হাহাকারদের দিন। বিশেষ করে ভারত তার তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আটকে গেছে সেই দুঃখে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দিয়ে যাচ্ছে – যে তালেবান সরকার টিকবে না।  এতো গেল একটা দিক। অন্যদিকটা  আরেকটু ভেঙে বললে, গত ২০ বছর হিতাহিত ভুলে আমেরিকার এই আফগানিস্তানে চালানো আক্রমণ ও দখলদারির দিন এবারের মত শেষ হবে। কিন্তু শেষ ‘কাফফারা’ দিতে হবে আরো অনেক; এবার সে ‘কাফফারা’ দেওয়ার  এক নয়া জমানায় সম্ভবত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

    SPUTNIKNEWS

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা যা আজকাল অস্বীকার-কারীরাও পরোক্ষে স্বীকার না করে পারছে না যে, আমেরিকার বদলে এর জায়গায় চীনের উঠে বসার কথা বা লক্ষণ-ইঙ্গিতও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আমেরিকার জন্য এই শাস্তি ডেকে নেওয়ার কারণও মূলত আফগানিস্তান। কারণ আসলে এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়েই, এতদিন সামলে চলা আমেরিকার অর্থনীতি, ২০০৭ সাল থেকেই বেসামাল হয়ে যায়। এই খরচ বেহিসাবি কারণ এই যুদ্ধ অন্তহীন এবং  এতে লোভ ও চরম অপরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখানে খরচের কোনো রিটার্ন আপাতত আর আসার সম্ভাবনা নাই, এর কিছুই ফেরত আসবে না। সেটা ক্রমান্বয়ে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে ২০০৮ সাল থেকেই গ্লোবাল মহামন্দা নেমে এসেছিল। আর তাতেই প্রথম সুবিধাটা যায় চীনের ঘরে যে তখন নিজ অর্থনীতির কেবল ডাবল ডিজিট জিডিপির ২০ বছরে পৌঁছাতে যাচ্ছিল। তাই আমেরিকার বদলে সে জায়গায় চীন – এই সুবিধা চীনের জন্য প্রথম উন্মুক্ত হয়েছে আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার পরের পিছু হটা থেকে।

    তাই ২০১৪ সালেই আমেরিকাকে প্রথম বড় সেনা প্রত্যাহার ঘটাতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান  অর্থমন্ত্রী বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের  খরচ জোগানোর অপারগতায় শেষ টাইমলাইন ছিল সেটা। তাই প্রথম সেই প্রধান সেনা প্রত্যাহার (আমেরিকাসহ ‘ন্যাটো’ ও তার বন্ধুদের সেনা) যা শুরু হয়েছিল তা এবার ২০২১ সালে বাদবাকি সমূলে প্রত্যাহার শেষ হতে প্রতিশ্রুত হয়েছে, যার টার্গেট আগস্টের শেষে। অর্থাৎ এ মাসের মধ্যেই।

    এতে  আফগানিস্তানে এতদিন আমেরিকার যা অর্থসম্পদ ক্ষতি হয়েছে তা তো হয়েছেই; কিন্তু সেটাই শেষ নয়। বরং আরেক  বিরাট সম্ভাব্য ওলটপালট সামনে অপেক্ষায়। আর তাতে আমেরিকার এর চেয়েও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলে যে নতুন  ভারসাম্য আসন্ন, অন্তত এশিয়ার ভারসাম্য এখান থেকেই পুনর্লিখিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

    ওদিকে এনিয়ে ভারতের অবস্থান আরও নাজুক, একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। তাই যদিও আপাতত মোদীর ভারত আমেরিকাকে জাপটে ধরেই থাকছে বটে; তবে পারলে বাইডেনের চেয়ে – ভারতের হিউম্যান রাইট নিয়ে প্রশ্ন না তোলা – ট্রাম্পের মত প্রেসিডেন্টই মোদীর ভারতের কাম্য।  কিন্তু এসব কিছুই ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। এরপরে সেই নির্বাচনে বিজেপি ফিরে জিততে না পারলে সেই ভারত পথ বদলে চীনের বন্ধু হয়ে যাবার পথে যাওয়াটাও অসম্ভব নয়। বিশেষত ইতোমধ্যেই ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন আওয়াজ ইতোমধ্যেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং তাতে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে চলে আসার সম্ভবনা ভারতকে একেবারে অস্থির বেচাইন করে দিয়েছে।
    কারণ মূল সে ঘটনা হল তালেবান  – মানে ১৯৯৬ থেকে আমেরিকার ২০০১ সালে দখলের আগে পর্যন্ত যারা কাবুলের সরকারের ক্ষমতায় ছিল, সেই তালেবানরা। নিঃসন্দেহে সেই আর এই – তালেবানের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এবার আকাশ-পাতাল ফারাক দেখব বলে আশা করতে পারি।  তবুও তালেবানরা এবার “আগের মত একই তালেবান কি না” (ভারত যেমনটা আগেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে) – তবু সেটা বড় ফ্যাক্টর নয়।
    কারণ মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালে আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার পর পাল্টা আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করেছিল পরের মাসে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। আর এরপরই  জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটোক্ষমতাসহ মোট ১৫ আসনের  সকলে সর্বসম্মতিক্রমে ১৪ নভেম্বর ২০০১, তালেবান শাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা প্রস্তাব ও ভোট দিয়েছিল।  মানে গ্লোবাল রাজনীতিতে রুলিং শাসকেরা সেসময় একেবারেই সদলে  তালেবানের বিরুদ্ধে চলে গেছিল।  অথচ  তুলনায় আজকের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন।  এখন একই পরিষদে আমেরিকান কোনো প্রস্তাব নিয়ে যদি ভোটাভুটি হয় তবে এর বিপক্ষে  অন্তত দু’টা (চীন ও রাশিয়া) ভেটো পড়বে আর বিভক্তি ভোট তো হয়ে যাবেই। অর্থাৎ কোন প্রস্তাব পাসই হবে না। এটাই অনেক বড় ফ্যাক্টর।

    উপরে যে গ্লোবাল পালাবদলের কথা তুলেছি, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুর উপর এরই মধ্যে ছাপ পরে গেছে পুরোদস্তুর। যেমন – গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে ইতোমধ্যেই “আমেরিকা বনাম চীন” এমন দুটো পক্ষের মধ্যে অন্য দেশগুলো কে কোন দিকে সেই পক্ষ-বিপক্ষ প্রতিদিনই আমরা আরো চোখা হয়ে উঠতে দেখছি। গ্লোবাল পালাবদলে ‘আমেরিকা বনাম চীন’ এই পক্ষ-বিপক্ষের ছাপটাই আফগানিস্তানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই মেরুকরণে পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে পেছনে কাজ করছে। যেমন- কে কে আমেরিকার ফেলে যাওয়া পুতুল সরকারের পক্ষে আর কে কে তালেবানের (শর্ত সাপেক্ষে) প্রতি সহানুভূতিশীল – এই দুই ভাগেই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রথমটা আমেরিকার পক্ষে আর পরেরটা ‘চীনের পক্ষ’। এদিকটাই এখন প্রধান ফ্যাক্টর।

    তবে আফগানিস্তানের এখনকার সব ঘটনার শুরু যে ২০০১ সালের আমেরিকান হামলা থেকে সেই আমেরিকার এখন প্রধান টার্গেট ও স্বার্থ হল – আফগানিস্তানে আমেরিকার সব অর্থব্যয় এবার বন্ধের ব্যবস্থা করা যা ড্রেনে পড়ছে; আর, এরপর আমেরিকান টার্গেট সেই আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে যাওয়া। তাই, এরপরে তালেবান আক্রমণের মুখে কাবুলের সরকার টিকে থাকতে পারবে কি না সেটা আমেরিকার কাছে সেকেন্ডারি, তার পারলে ভালো  – এরকম। যদিও আমেরিকা তা মুখে স্বীকার করছে না, ভাবে বলছে। ওদিকে আমেরিকার আরেক কোর-স্বার্থ হল, সেনা প্রত্যাহারের পরে, আল-কায়েদার মত গ্লোবাল সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপগুলো যেন আফগানিস্তানে্র আশ্রয়ে থেকে অপারেট না করে। আর এটাই তালেবানদের সাথে ট্রাম্প ও বাইডেনের মুখ্য ডিলিং পয়েন্ট, যা অপ্রকাশ্য রাখা আছে। যদিও তালেবানেরা সেই আশ্বাসও দিয়েছে [The Taliban has also assured the US that it would not allow global terrorist groups to operate from Afghanistan.] বলে জানা যাচ্ছে।

    তিনটা আলাদা মিটিং কিন্তু প্রায় সমান্তরালেঃ
    আমেরিকান সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের সময় তেমন আর বেশি নাই, মাত্র আগস্ট মাসটাই। তাই আমরা অস্থির কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখছি যার মধ্য থেকে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের তিনটা মিটিংয়ের কথা এখানে তুলে ধরব।

    এক.
    সময়ের হিসাবে ধরলে তিন মিটিংয়ের সবশেষেরটা হল ২৮ জুলাইয়ে, ৯ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধিদের চীন সফর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ওয়াং ই-এর [Wang Yi] সাথে বৈঠক।

    আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার [Mullah Abdul Ghani Baradar] বুধবার চীন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে।

    বলা যায় ভারত ও সমমনা যারা এতদিন আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের হাতে গত বিশ বছর মাখন খেয়ে গেছে, তাদের জন্য চীন-তালেবান এই বৈঠক এক মহাজুলুনি তৈরি করেছে। সেই ঈর্ষা আর জলুনি কত তীব্র তা দেখা যাচ্ছে বিবিসি বাংলার নিচের এই রিপোর্টে।

    চীন-আফগানিস্তান: ঘনিষ্ঠ হচ্ছে কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নী তালেবান, তৈরি হচ্ছে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

    এতে তালেবানদের দিক থেকে এই প্রথম আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের ‘কাউন্টার ওজন’ প্রকাশ করা মানে পাল্টা-পাল্লায় বাটখারার ভার দেখানো হল। আর তাতে চীনের পেছনে রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলো আর (হবু ছয় দেশীয় জোট দেখানোর কারণে) সম্ভবত বাংলাদেশও – তাদের সবাই যে আছে সেই অনুমান ছড়িয়ে দেয়া হল। এরই পাল্টা হিসেবে আমেরিকার বগলে এক ভারত ছাড়া আর কেউ আপাতত দৃশ্যমান নয়। আমেরিকা-ভারতের বিপরীতে তালেবানের এই বাটখারার ভার দেখানো তাৎপর্যময় অবশ্যই। এটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু মন্তব্যে। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং বলেছেন, তালেবানরা ‘এখন আফগানিস্তানে এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি” [“Wang Yi pointed out, the Afghan Taliban is a crucial military and political force in Afghanistan,” ]।’ আবার রয়টার্স রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীন বলছে, তালেবানদের কাছে চাওয়ার আছে যে, তারা আফগানিস্তানের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মিলমিশ ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক!’ [China told a visiting Taliban delegation on Wednesday it expected the insurgent group to play an important role in ending Afghanistan’s war and rebuilding the country,] এই কথায় ভারতসহ সমমনাদের জলুনি উঠলেও বলার কিছু নাই। কারণ চীনের একথা সবচেয়ে ইতিবাচক এক স্টেমমেন্ট।
    এছাড়া আরেক তাতপর্যপুর্ণ দিক আছে। চীনের উইঘুরে (মানে জিনজিয়াং প্রদেশ যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা) ‘পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামী আন্দোলন’ [East Turkestan Islamic Movement বা সংক্ষেপে ETIM] নামে সশস্ত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে বা রুখতে তালেবানরা চীনকে সাহায্য করবে – চীন এই আশাবাদ রেখেছে। ঐ মিটিং শেষে তালেবান মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম জানিয়েছেন, ‘তারা চীনকে আশ্বস্ত করেছেন, আফগান-ভূমি চীনের বিরুদ্ধে কাউকে ব্যবহার করতে তারা দেবেন না [“(The) delegation assured China that they will not allow anyone to use Afghan soil against China,” Naeem said. ]।’ তালেবানদের আরেক মিডিয়া মুখপাত্র সুহেল শাহীন অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, চীন আফগানিস্তানের অবকাঠামো পুনর্গঠনের ‘welcome friend’  বা ‘স্বাগত-বন্ধু’;  [Taliban spokesman Suhail Shaheen says the group welcomes Chinese investments in reconstruction and would guarantee the safety of investors and workers]।
    সার কথায়, তালেবানেরা সশস্ত্র এবং অ-দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক শক্তি বলে পশ্চিমে ও বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে যে প্রচার আছে বা খারাপ ইমেজ করে রাখা আছে, একালে সেসব কাটানো ও লঘু করার দিক থেকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এই বৈঠক তালেবানদের অনেক সুবিধা দেবে, ইমেজ বাড়াবে।

    দুই.
    আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony J Blinken] ২৭-২৮ জুলাই ভারত সফর করে গেলেন। এক কথায় বললে এটা ছিল আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যু পরিস্থিতিতে বেদিশা ও একা হয়ে পড়া ভারতকে আশ্বাস দিয়ে পিঠ-চাপড়ে দেয়ার সফর।
    প্রথমত, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদী তাঁর অভ্যন্তরীণ জনগণ, কূটনীতিক, একাডেমিশিয়ান ও মিডিয়াকর্মীদের কাছেই আস্থা একেবারে হারিয়েছেন। তারা লেখা শুরু করে দিয়েছেন, “আফগান প্রশ্নে দিল্লি বন্ধুহীন“। অথবা এখানে দেখেন,  Indian experts are wondering why New Delhi has been sidelined in Afghanistan. ।  আর উল্টা পাকিস্তানের ভেতরে আমেরিকা ও রাশিয়া নিজ নিজ স্বার্থের আশ্রয় খুঁজছে। ওদিকে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার চীন তো আছেই। জয়েন্ট স্টেটমেন্ট দেখেন এখানে  [Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan]।    মনে করা হচ্ছে, ভারতকে বাইরে রেখে মূলত এই ফ্যাক্টসগুলো মিডিয়ায় প্রচার হয়ে পড়াতে মোদি ভীত হয়ে যান। বিজেপির ধারণা, মোদীর ভারতকে ছাড়িয়ে  পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আগামী যেকোনো ভোটে মোদীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। আর সেটা কাউন্টার করতেই ব্লিঙ্কেনকে এনে যেন দেখিয়ে মোদী সবাইকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। তবে এর ফল তেমন সুখকর হয়নি।

    এর অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হল, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার স্বার্থের অনেক মিল থাকলেও কিন্তু অমিল-ভিন্নমতও কম নয়। যেমন – ব্লিঙ্কেনের ফিরে যাওয়ার আগে ভারতে মিডিয়ায় সামনে এসেছিলেন তিনি। ততক্ষণে চীন-তালেবান মিটিংয়ের রিপোর্ট মিডিয়ায় এসে গেছে। তাই, তালেবানের চীন সফরের সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে এর জবাব দিতে গিয়ে ব্লিঙ্কেন প্রকারান্তরে চীনের প্রশংসা করে বসেন।

    Asked about the Taliban visit, U.S. Secretary of State Antony Blinken said in New Delhi that it was a “positive thing” if Beijing was promoting a peaceful resolution to the war and “some kind of (Afghan) government … that’s truly representative and inclusive.”

    বলেন, এই ‘সফরটা ইতিবাচক’। চীন যদি যুদ্ধাবস্থায় এক শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব ও আফগানিস্তানে কোনো ধরনের সরকারের কথা বলে যা সত্যিই সবাইকে নিয়ে এবং প্রতিনিধিত্বমূলক তবে তা তো ইতিবাচক”। এখন ব্লিঙ্কেনের পক্ষ থেকে চীনের এই পরোক্ষ প্রশংসা তো মোদীর জন্য হজম করা খুবই মুশকিল। এই হল, আমেরিকা ও ভারতের স্বার্থের বেমিল। ওদিকে ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীর সবচেয়ে বড় অনাস্থা হলো – আফগানিস্তানে যার যার স্বার্থ আছে সে মোতাবেক সংশ্লিষ্ট এমন সবাই ইতোমধ্যে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালেবানদের সাথে কয়েকবার বৈঠক এবং আলোচনা, বুঝাবুঝি বা সমঝোতা করে নিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান মূলত কেউ বাকি নেই এদিক দিয়ে। অথচ ভারত এই পথেই নেই। এটাতে মূলত ভারতের আভ্যন্তরীণ ইন্টেলেজেন্সিয়া  তারা অসন্তুষ্ট ও হতাশ। ভারত কেবল গোপনে একবার তালেবানদের সাথে দেখা করেছে যা আবার প্রকাশ্যে অস্বীকার করে থাকে। আর পাকিস্তান তালেবানদের নাকি ভারতের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করছে বা উসকাচ্ছে বলে ডাহা মিথ্যা এমন প্রপাগান্ডায় ভারত লিপ্ত হয়ে গেছে। অতীতে তালেবানরা কী কী খারাপ কাজ করেছে এর বর্ণনা দিয়ে ভারত এখন প্রচার শুরু করেছে। অথচ ভারতের এক মিডিয়া-মুঘল দা-প্রিন্ট পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তা লিখেছেন ……

    “Like them or not, Taliban are a reality. India can deal with them if BJP resets its politics…”

    অর্থাৎ তিনি উলটা বিজেপি-আরএসএস কে তালেবান-বাস্তবতা মানতে বলেই থামেন নাই। উলটা পরামর্শ রেখে বলেছেন, মোদীর খোদ নিজেদের রাজনীতিই বদলে নিতে। আসলে একেবারেই কোন সঠিক পলিসিতে মোদীর ভারত নাই বলেই ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীদের প্রধান অনাস্থা। এছাড়া আরো ভেতরের খবর হল, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মুডে আছে।  খবরটা দিয়েছেন আফগানিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদুত বিবেক কাতজু। লিখেছেন,

    Indian policymakers had looked at the Afghan scene dispassionately especially after the US began talking to the Taliban in Doha in 2018. What is strange is that even after the US-Taliban deal in February 2020, Indian strategists, instead of making up for lost time, continued to ignore emerging realities.
    Stranger still, Kabul-based senior political personalities, who have recently interacted with the Indian leadership, say that India continues to have a “wait and watch” approach. What they are leaving unsaid is that India has become a bystander in Afghanistan, not knowing which way to turn.
    Some analysts are railing against countries which are engaging the Taliban. They believe that these countries will pay a price for not understanding the true nature of the group.

    অর্থাৎ ভারত কোন প্রস্তুতিই নেয়নি তাই নয়। শেষের বাক্যটা বলছে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে।  তাই আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত কোনোই প্রস্তুতি নেয়নি। কারণ ভারতের ধারণা- তালেবানরা পরাজিত হবে, হারিয়ে যাবে। আর বর্তমান সরকারই থাকবে যা আসলে অনিশ্চিত জেনেও ভারত আমেরিকার ভরসায় বসে থাকতেই চায়। কিন্তু সে দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরেই সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আমেরিকার চাওয়া আর ভারতের চাওয়াও তো এক নয়।

    তবে ব্লিঙ্কেনের এবারের সফর শেষের পর থেকে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া হুমকি ও আক্রমণ শুরু করেছে। দিল্লি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নতুন মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে বলিয়েছে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে জানাচ্ছে যে, সারা কাশ্মিরই ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মির ভারতেরই ভূমি – যেটা নাকি পাকিস্তানের দখল করে থাকা। তাই পাকিস্তান-কাশ্মিরের কিছু অংশের ওপর দিয়ে চীন-পাকিস্তানের করিডোর [CPEC] নির্মাণ করা হয়েছে সেটা ‘তথাকথিত’  করিড়োর সহ সব অবৈধ দখল ছেড়ে যেন পাকিস্তান চলে যায় সেই কড়া আহ্বান রেখেছে ভারত [“We call upon Pakistan to vacate all Indian areas under its illegal occupation,” ]।

    একই সাথে তালেবানদের চীনে গিয়ে মিটিং করার বিরুদ্ধে ভারত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে [India Thursday also reacted against Taliban leaders visiting China and meeting the country’s leaders there]। আর সবশেষে, ‘আফগানিস্তানে গায়ের জোরে কোনো সরকার কায়েমের বিরুদ্ধে’ মানে, তালেবানদের কাবুলের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে [“Unilateral imposition of will by any party will not be democratic…..] ভারতের আপত্তির কথা জানিয়েছে। তবে এসব হুঙ্কার মোদীর ভারত মূলত তার অভ্যন্তরীণ জনমত যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনুমান, তাকে ফিরানোর লক্ষ্যের বলা হয়েছে বলে দেখেছেন অনেকে। কিন্তু আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিবেক কাটজু; তিনি খুবই কড়াভাবে মোদি-জয়শঙ্করের নীতি পলিসিকে তুলোধোনা করে হিন্দুস্তান টাইমসে কলাম লিখেছেন।

    তিন.
    এটা হল – গত ২৫ জুলাইয়ে চীন-আমেরিকার নিজস্ব সম্পর্ক প্রসঙ্গে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক। বাইডেন জানুয়ারিতে মার্কিন ক্ষমতায় শপথ নেয়ার পরে মার্চের ১৮-১৯ তারিখে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দু’পক্ষের প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছিল যা খুবই তিক্ততা দিয়ে শেষ হয়েছিল। এবারের মিটিংটাকে এক দিক থেকে এরই পরবর্তি ও পাল্টা সফর বলে মনে করছেন অনেকে [Why Tianjin? And what’s in store in China for US envoy Wendy Sherman?]। বিশেষত আগের মিটিংটা হয়েছিল আমেরিকার রাজধানীর বাইরে দেশের উত্তরের আলাস্কা শহরে। আর এবারের আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সাথে বৈঠকটা দেয়া হয়েছিল বেজিংয়ের বাইরে তিয়ানজিং শহরে যেটা আসলে চীনা-আফগান সীমান্তের এক শহর।
    এবারের এই মিটিংয়ের সার কথা ছিল, নিজেদের মধ্যে যত মনোমালিন্যই থাকুক যুদ্ধ তারা কেউ চায় না- এ কথাটা প্রকাশ করে রাখা। যেমন- এই মিটিংয়ের পরে আমেরিকা মিডিয়াকে জানিয়েছে, তাদের সম্পর্ক খুবই ‘টাফ কম্পিটিশনের’[stiff competition]। তবে একই নিঃশ্বাসে তারা জানিয়েছে যে, ‘আমেরিকা চীনের সাথে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত চায় না’ [Price said that in her meeting with Wang, Sherman vowed “stiff competition” with China but also stressed that the US “[did] not seek conflict” with Beijing.] এবং আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতেই থাকবে। এর পাল্টা চীন বলেছে, ‘তিনটা জিনিস দেখতে চাই আমরা।’ [three demands with the second-ranking US diplomat: the United States must not challenge or seek to subvert China’s model of governance; it must not interfere in China’s development; and it must not violate China’s sovereignty or harm its territorial integrity.] আমেরিকা আমাদের মডেলের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলবে না; চীনা পথের উন্নতি নিয়ে তারা কোনো কথা বলবে না। আর হংকং ও তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। ফলে আমেরিকা যেন চীনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে না আসে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক ডায়ালগ চালিয়ে যেতে চায় বলে জানায়। এক কথায়, না চাইতে কোনো যুদ্ধের শঙ্কা যেন কোনো পক্ষের মনে কাজ না করে তা আগেই মিটিয়ে রাখার মেসেজ তারা আদান-প্রদান করে রাখল।

                                        ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের  মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি

    কেন এমনটা হল?
    এর কিছুটা হদিস আমরা পাই ভারতের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মনের চরম ক্ষোভ উপচিয়ে প্রকাশ করা বিবৃতি থেকে। এরপর এ নিয়ে ভারতের সামরিক ইন্টেলিজেন্সিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকে। যেমন পারভিন শাওনি [@PravinSawhney] নামে এক সাবেক মেজর যিনি একটা ‘ডিফেন্স ম্যাগাজিন’ চালান ও এর সম্পাদক। তিনি টুইট করে লিখেছেন ‘মোদি একেকটা অর্থহীন মন্তব্য করে  যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার দিকে ভারতকে নিয়ে যাচছে – যা তিনি কখনো জিততেই পারবেন না, আর এই যুদ্ধ তো এড়ানোযোগ্য!’ [With each mindless remark, India is heading towards war – which it cannot win & is avoidable. ] এ ছাড়াও লিখছেন, এটা ‘মোদির দুর্ভাগ্য যে, তার টপ সামরিক জেনারেল রাওয়াত; অগ্রসর সামরিক ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই!’ [Modi’s misfortune is have Rawat as the top military officer who knows nothing about advances in warfare!]

    শেষ দুটা পয়েন্টঃ
    আর একমাস পরে আফগানিস্তানে তালেবানদেরকে আমরা কোন ভুমিকায় দেখব? এর সম্ভাব্য দুটা অবস্থান হতে পারে। গত ২০ বছর ধরে তালিবানেরা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যা থেকে কী করা যাবে আর কীনা – এসম্পর্কে তারা অনেক ওয়াকেবহাল অবস্থায় এখন তা আমরা অনুমান করতে পারি।।

    আমরা পছন্দ করি আর নাই করি এপর্যন্ত দুনিয়া যে জায়গা পর্যন্ত পথ-পরিক্রম করে এসেছে তাতে গ্লোবাল রাজনীতির কিছু ভ্যালুজ তারা তৈরি ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা বলছি না সেগুলা সব আদর্শ অথবা দুনিয়ার সকল জনগোষ্ঠিরই স্বার্থ ও কালচারকে তা প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তালেবানেরা যদি আউট-রাইট সেগুলোর বিরোধিতা করে নিজেদের সব ভ্যালুজ নিয়ে চলতে চায় বা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে এটা আগের মতই ব্যর্থ হবে তা বলাই বাহুল্য। এটা হল কো খেলার নিয়ম বদলানোর মত সমস্যা। আপনি গ্যালারিতে বসে থেকে খেলার নিয়ম বদলাতে পারবেন না। বরং প্রথমত তাদের নিয়মেই খেলতে নামতেই হবে। এরপর খেলতে খেলতে খেলার নিয়ম বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।

    কাজেই একটা পথ হল তালিবানেরা দুনিয়ায় উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতির নিয়ম – পুরান খেলার নিয়ম মেনেই খেলতে নেমে পড়া। এতে সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হবে দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রের আচরণ করা। বড়জোর এর সাথে নিজেদের যেসব ভ্যালুজ আছে কোথাও কোথাও এর প্রদর্শনে নেমে পড়া। তবে  আগে ইমেজ তৈরি এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
    আর যেকথা মনে রাখতেই হবে তা হল,  যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের সরকারি নানান বাহিনীই কেবল থাকবে। কিন্তু  একই সাথে ঐ দেশ আবার পাশাপাশি কোন সশস্ত্র গ্রুপকেও অপারেট করতে দিতে পারে না।  এক ঘরে দুই পীর হয় না। অথরিটি একজনই বা একটাই হয়।  তবে সাবধান এসব কিছু শুরু হতে পারে আগে দেশে একটা বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল করে নিবার পরেই। কারণ ক্ষমতা দখলের পরেই কেবল একটা কনষ্টিটিউশন আর ওর নানান নিয়ম, আইন-কানুন  তৈরি হতে পারে। এটাই হতে পারে দায়ীত্বশীল পথ। এবার এই পথের সফলতার সম্ভাবনা প্রচুর। প্রধান কারণ  এবার গ্লোবাল রাজনৈতিক শক্তির একটা সফল অংশ তালিবানের পক্ষে আছে।

    অন্যদিকে আরেকটা পথ হল, আগের (১৯৯৬-২০০১) বারের মত করে মাঠে নেমে পড়া। যারা গ্লোবাল ইসলামি রাজনীতির সমর্থক তাদের দৃষ্টিতে  হয়ত এটাই সম্ভবত সঠিক পথ। হতে পারে।  তবে এই পথটা আগের বারের মত আপাতত ব্যর্থ হবে, ছিটকে পড়বে। টিকতে পারবে না। এখন যে যেটা পথ পছন্দ করে সে তো সেই দিকটাকেই সহি পথ বলবে!
    তবু মুলকথাটা হল, আসলে আমরা যে যেই রাজনীতিই কোন দেশে করতে চাই না কেন –  একেবারেই নতুন বা পুরানা ধারা – এসব কিছুর বাইরে  মূল ফ্যাক্টর হল উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতিতে ও শক্তিতে যারা ক্ষমতাবান থাকে তারা আপনাকে কী চোখে দেখবে! আমরা এটা উপেক্ষা করতে পারি না!
    তবু, তালিবানেরা শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নিবে সেটা দেখার অপেক্ষা করতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩১ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “তালেবান ইস্যু ও তিন মিটিং“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]