Category: আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক

  • গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গৌতম দাস

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3id

     

     

    Washington is pressing for a post-pandemic decoupling from China

    আমেরিকার এবার নভেম্বর ২০২০ নির্বাচন সমাপ্ত এবং ফলাফল অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন বিজয়ী হতে যাচ্ছেন জানা গেছে। তবে ফলাফল নিয়ে নানা রাজ্যের যেসব আপত্তি এর নিষ্পত্তি এখনো শেষ হয়নি। তবে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছেন, বাইডেনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষিত হবেন। গ্লোবাল মিডিয়াতে বাইডেনকে নামের আগে রীতি অনুযায়ী “প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট” [President-Elect] শব্দ যোগ করেই পরিচিত করানো হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন তাঁর হবু নতুন সরকারে মানে আমেরিকান ভাষায়, বাইডেন প্রশাসনে কাদেরকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা প্রধান কর্মকর্তা করবেন এই বাছাইও শুরু হয়ে গিয়েছে। বেছে নেয়া ব্যক্তিদের নাম ক্রমেই সামনে আসছে।

    হবু বাইডেন প্রশাসনে তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পদ “সেক্রেটারি অব স্টেট” বা আমাদের ভাষায় “পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। এক হিসাবে এটা প্রশাসনের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে বাইডেন যে নাম বেছে নিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন তিনি  এন্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony John Blinken]। হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েট ব্লিঙ্কেন এর আগে ওবামা আমলে একসময় উপ-নিরাপত্তা মন্ত্রী (২০১৩-৫) আর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৫-৭) হিসেবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ বাইডেন তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে তার সাথে কাজ করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, সেসব সূত্রে ব্লিঙ্কেন এবার হবু বাইডেন প্রশাসনে বাছাইয়ে টিকেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের আমলেই একটা নতুন শব্দ চালু হয়েছিল ‘ডি-কাপলিং’ [decoupling]। ইংরেজি ‘ডি-কাপলিং’ শব্দের অর্থ কঠিন কিছু নয়, আমাদের প্রায় পরিচিত। এটা আসলে কাপলের [couple] উল্টা শব্দ। কাপল শব্দের একটা অর্থ, দম্পতি (স্বামী-স্ত্রী)। মানে, কারো সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া। আর এরই উল্টা শব্দ হল, ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা বুঝাতে ডি-কাপলিং। ট্রাম্পের আমলে শেষের দিকে এই শব্দটা ব্যবহার করে বলা হত যেমন,  ট্রাম্প চীনকে ডি-কাপলিং করার নীতি নিয়েছে। মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্ক থেকে চীনকে আলাদা করে দূরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাচ্ছেন ট্রাম্প, চীনের সাথে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে। যেমন, যেসব আমেরিকান কোম্পানি চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে তা স্থানান্তর করে আমেরিকায় ফিরিয়ে না আনলেও চীনের বাইরে অন্য দেশে নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আর তাতে ওই স্থানান্তরের খরচও ট্রাম্পের সরকার বহন করবে। এই ছিল,  ট্রাম্পের ডি-কাপলিং। এমনকি এই প্ররোচনায় জাপান এগিয়ে এসেছিল। অবশ্য যুক্তি দিয়েছিল যে, চীনের ‘ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে এটা সে করছে। যদিও কোনো এন্টারপ্রাইজ বা বড়  কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন স্থানান্তর খুবই রুটিন। আর তা মূলত যে কারণে সাধারণত হয়ে থাকে তা হল, ফেলে আসা দেশে ন্যূনতম মজুরি তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়া। অথবা উল্টা করে বললে, নতুন কোন দেশ পাওয়া গেছে যেখানে ন্যূনতম মজুরি অনেক কম এবং অবকাঠামোগত সুবিধা অনেক ভাল, প্রশাসন দক্ষ চটপটে ইত্যাদি। আর এমন পাওয়া যায় বলেই ফ্যাক্টরি স্থানান্তর করা হরহামেশাই হয়ে থাকে। যেমন জাপান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের এক সিগারেট কোম্পানি কিনে বাংলাদেশের সিগারেট ব্যবসায় ঢুকে গেছে অনেকটা এমনভাবেই। যদিও এখানে ব্যাপারটা ঠিক মেশিনপত্র নয়, পুঁজি স্থানান্তর করে। আর বিপরীতে, ট্রাম্পের ‘ডি-কাপলিং  ব্যবস্থাটার কথা বলা হয়েছিল এর উদেশ্য ছিল, চীনকে একঘরে করা, চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে।
    কিন্তু হবু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ইতোমধ্যেই ডি-কাপলিং প্রসঙ্গে তার শক্ত বিরোধী অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “ডি-কাপলিং করা এক অবাস্তবচিত ও উল্টা ফল দেবে এমনটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ ধারণা” […।decoupling is ‘unrealistic’ and ‘counterproductive’; it also wouldn’t work]।’ এ নিয়ে তিনি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ  বক্তৃতাও করেছেন।

    গ্লোবাল বাণিজ্যঃ
    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ [Global Trade] শব্দটা শুনলে বিরাট দুনিয়াব্যাপী কোনো ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই দূরের কিছু না। এখানে বাণিজ্য মানে লেনদেন; অর্থাৎ আপনি আপনার পণ্য দিবেন আর অন্যের পণ্য নিবেন। কিন্তু না, অনেকের মনে হতে পারে এর আরেকটা মানে আছে। সেটা হল, বাণিজ্য মানে পণ্য দিয়ে মুদ্রা নেবেন। হ্যাঁ, এই কথাও ঠিক; তবে এটা পুরো ঘটনার অর্ধেকটা। আপনি পণ্য দিয়ে যে মুদ্রা নিয়ে ফিরলেন এরপরে সেই মুদ্রা দিয়ে আবার অন্য পণ্য বা কাঁচামাল কিনবেন। মানে, কিনতে হবে আপনাকে; খুব স্বাভাবিক। যেটা শেষ বিচারে পণ্য বেচে আরেক পণ্য কেনার ঘটনায় গিয়ে দাঁড়াবে। একারণে বাণিজ্য মানে, পণ্য লেনদেন। এটাই পণ্য কেনাবেচা মানে বিনিময়, ইংরেজিতে এক্সচেঞ্জ [exchange]। তাই গ্লোবাল বাণিজ্য মানে একটা গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ, দুনিয়াব্যাপী পণ্য বিনিময়।
    কথাগুলো ধারণা হিসেবে অবশ্যই ঠিক আছে, তবুও একটা বিষয় এতে আড়ালে থেকে গেছে, সেটাকে সামনে আনতে হবে। সে বিষয়টা হল মুদ্রা। পণ্য কেনাবেচা করতে গেলে মুদ্রা লাগবে। এর সাথে কথা আরো আছে। পকেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে আপনি বাংলাদেশের যেখানেই যান যেকোনো পণ্য কিনতে পারবেন। টাকার বিনিময়ে বিক্রেতা আপনাকে পণ্য দিবে। তবে আবার সেই কিছু ‘কিন্তু’ও এখানে আছে সাথে! বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলে কী হবে? না, এইবার আর কেউ আপনাকে কোন পণ্য বেচবে না। কারণ আপনার হাতে বাংলাদেশের মুদ্রা, তাই বাংলাদেশের ভেতরে থাকলে যেকোনো বিনিময় সম্ভব হলেও সীমান্ত পার হলে কিন্তু আর ওই মুদ্রা চলবে না। প্রত্যেকটা স্থানীয় মুদ্রার সীমাবদ্ধতা হল এটাই; দেশের সীমানা পার হলে ওই মুদ্রায় কোন বাণিজ্য, পণ্য কেনাবেচা বা বিনিময় আর চলে না। তাহলে?
    দেশের বাইরেও বাণিজ্য বা বিনিময় করতে চাইলে এবার প্রয়োজন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা”। এমন এক মুদ্রা, যা দেশের সীমানা পার হয়ে গেলেও যেকোনো দেশেই ওই মুদ্রায় পণ্য বাণিজ্য বা বিনিময় বিক্রেতারা তখনও করবেন। তাই এবার সোজা বলা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় যে বাণিজ্য সম্পন্ন করা যায় তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এটাকেই গ্লোবাল বাণিজ্যও বলে। বাংলাদেশের বাইরের সাথে কোনো কিছু বেচাকেনা, বাণিজ্য করে আসা – এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য। আমাদের সীমান্তের বাইরের ভারত থেকে কোনো কিছু বাণিজ্য করে আসাও তাই গ্লোবাল বাণিজ্যের অংশ। কাজেই “গ্লোবাল বাণিজ্য” বলতে সুদূরের কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলেই এর শুরু।
    এখন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা” আবার কী? গ্লোবাল বাণিজ্য মানে বুঝেছিলাম তা আদতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বেচাকেনার বাণিজ্য। আর এটাই সম্পন্ন করার একটা সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটাই আইএমএফ। ফলে যেসব দেশের মুদ্রাকে আইএমএফ আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে (আইএমএফ এর টেকনিক্যাল শর্ত পূরণের কারণে), যে মুদ্রার বিনিময় হার (conversion rate) আইএমএফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, এমন মুদ্রাগুলোই কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যেমন এখন পর্যন্ত – ডলার, পাউন্ড, ইউরো, ইয়েন ও ইউয়ান আন্তর্জাতিক মুদ্রা। তবে মনে রাখতে হবে এগুলো কিন্তু একই সাথে প্রধানত দেশীয় মুদ্রা বা নিজ নিজ দেশের স্থানীয় মুদ্রা যাকে আবার ‘ডাবল রোল’ হিসেবে কাজ করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রারও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
    এখন এতে দুনিয়াতে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে তা হল – একটা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বা নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে গেছে যার কারণে আমরা নিজ দেশের ভেতরের মতই দেশের বাইরেও বাণিজ্য-বিনিময় বা গ্লোবাল বাণিজ্য সহজেই করতে পারি। এবং তা কবে থেকে? গত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে।

    কিন্তু এ তো গেল ইতিবাচক দিক। এবার নেতিবাচক দিক থেকে দেখা যাক। যেমন ইরান কোন কোন দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে বা আদৌ কারো সাথে পারবে কি না এটা ডিকটেট করার ক্ষমতা এসে গেছে আমেরিকার হাতে। এই ক্ষমতাটা যদিও পড়ে পাওয়া। মানে আইএমএফ এটা জেনেশুনে দিতে চেয়েই দিয়েছিল ব্যাপারটা এমন নয়। এটাকেই আমরা ইরানের ওপর আমেরিকার “অবরোধ” [Sanction] বলে জানি। অবরোধ – মানে ইরান নিজদেশের বাইরের কারো সাথে বাণিজ্য করতে পারবে না। কিন্তু এটা আমেরিকা কার্যকর করে কী করে? ের জবাবের আগে একটা কনসেপ্ট পরিস্কার করে নেই। আমেরিকার যে অবরোধ দেয় তা আইএমএফ-এর অনুমোদনে প্রাপ্ত কোন ক্ষমতা নয়, বরং আমেরিকা নিজ ক্ষমতাতেই এটা আরোপ করে থাকে। কিন্তু ইরান সেটা মানতে বাধ্য হয় কেন? সোজা। আমেরিকার ‘অবরোধ’ কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, যেন আমেরিকা বলছে, ইরান তুমি কোন কেনাবেচা ডলারে করতে পারবে না; মানে, ইনভয়েসে মূল্যটা “আমেরিকান ডলারে” তা লিখতে পারবা না। করলে কী হবে, আমেরিকা বাধা দেবে কিভাবে? ইনভয়েসে বা বিলে ডলারে দাম লেখার মানে হল, ঐ কেনাবেচা সম্পন্ন করতে গেলে ক্রেতার ব্যাংক আর বিক্রেতরা ব্যাংকের লেনদেনের মাঝখানে একটা আমেরিকান ব্যাংকের সাহায্য-সহায়তা লাগবেই। না হলে কেনাবেচায় মূল্যের অর্থ-স্থানান্তর ঘটানো যাবে না। আর ট্রাম্প তাঁর দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে, “যেসব দেশ বা ব্যক্তিকে অবরোধ তালিকায় ফেলেছি এদের দেশের কোনো কোম্পানির  অর্থ ছাড়ে তোমরা জড়িত হবে না, হলে ঐ আমেরিকান ব্যাংককেই আমেরিকা-রাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করবে”। এভাবেই অবরোধ কার্যকর করেছে আমেরিকা। এই এক পড়ে পাওয়া বিশাল ক্ষমতা আমেরিকান হাতে আছে বা এসে গিয়েছে, সেই থেকে।

    ডি-কাপলিংঃ
    তাহলে ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধে “চায়না ডি-কাপলিং” এই প্রোগ্রামের আসল মানে কী? মানে হল, চীনকে একঘরে করা। যেটা আরও পরিস্কার করে বললে, চীনকে বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়ার যত বেশি দেশ পাওয়া যায় এমন সকলকে নিয়ে আগে যেমন আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে ছিল  যেন সে অবস্থাটাই ফিরে এসেছে বলে ট্রাম্পের সুখবোধ ফিরে পাবার এ’এক বাসনা!  তবে এটা বাসনাই! মূল কারণ এই শতকের শুরু থেকেই চীন হল সেই রাষ্ট্র যার হাতে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস সঞ্চিত হওয়া শুরু হয়েছে। যার অর্থ চীনই এখন আমাদের মত বা এর চেয়েও ভাল অর্থনীতির রাষ্ট্র এমন যাদেরই আবার বিদেশি বিনিয়োগ-পুঁজি খুবই দরকার তাঁদের চীনকে খুবই দরকার। এছাড়া চীনের উঠতি বিশাল বাজার সেটাও আকর্ষণীয়। অতএব ট্রাম্প তো ফেল করবেন; করছেনও। কারণ এই জায়গায় এসে আমেরিকা আর চীনের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কোনটাই একেবারেই নয়। একারণে অষ্ট্রেলিয়া বা এমনকি জাপান যারা ট্রাম্পের হামবড়া বাতের কোয়াড [QUAD] জোটের দুই মাতবর; এই তারাই আবার চীনের নেতৃত্বের RCEP বাণিজ্য জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সেখানে সবার আগে নাম লিখায়। সাথে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ভিয়েতনাম কেউ বাইরে বাকি থাকে নাই।

    যদিও বাস্তবত ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন তবু এমন ঘোষিত নীতিটা এখনও বর্তমান। তাই এই ‘একঘরে’ করতে চাইলে মানে আসলে ঠিক কী হত? আমাদের গ্রাম-সমাজের প্রেক্ষিতে একঘরে মানে ওর নুন, পানি বন্ধ করে দেয়া; আর ওর সাথে কেউ কোনো পণ্য বিনিময় করবে না যার ব্যবহারিক মানে ‘নো এক্সচেঞ্জ’! ওকে সমাজ থেকে বের করে দেয়া; সেক্ষেত্রে যদিও সে আগের বাড়িতেই বসবাস করবে, তারপরেও। কেমন করে এটা ঘটানো সম্ভব হবে? কারণ, ওর সাথে পণ্য বিনিময় না করা মানে, ও যে লবণটা খাবে সেটাও তাকে নিজেই সমুদ্রের পানি জোগাড় করে শুকাতে হবে, না হয় লবণের খনি জোগাড় করতে হবে এবং তা নিজেই। তাতে সমুদ্র হাজার মাইল দূরে বা লবণের খনি খুঁজতে পাকিস্তানের সিন্ধুতে যেতে হতে পারে। মূল কথায়, যা কিছু সে ভোগ করবে তার সবটার ‘উৎপাদক’ তাকে নিজেই হতে হবে। নইলে তা ভোগ করা যাবে না, ভোগ নাই! ‘নো এক্সচেঞ্জ’ কথার মানে তাই। এখান থেকেই ‘সমাজ’ কথাটার মানে কত বিশাল সে হুঁশ আসতে পারে আমাদের। আমরা যারা যারা পণ্য বিনিময় করি-জড়াই তারা এই কাজের মাধ্যমে আসলে একটা সমাজ গড়ে তুলি, অজান্তেই। সমাজ মানে তাই এক অর্থে পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ, পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়ার সমাজ। এমনকি এভাবে ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’ও। অর্থাৎ চীন যেখানে আমেরিকার বদলে নয়া গ্লোবাল নেতা হবার সবগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠছে সেখানে ঐ চীনকেই একঘরে করার চিন্তা? এটা ট্রাম্পের একটা ফাজলামো ছাড়া আর কিইবা বলা যায়!

    জাতিবাদী সমাজঃ
    আর গ্লোবাল পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ ঠিক এর উল্টা অর্থ সেটাই হল “জাতিবাদী সমাজ”। সে জন্য জাতি-রাষ্ট্র বা বিদেশবিরোধীতা কথাটার অর্থ এখানেই। তত্ত্ব অনুযায়ী (তত্ব বলেছি কারণ বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না; অলীক) এসব জাতিবাদী দেশে সবকিছুই নিজেরাই দেশের ভিতরে উৎপন্ন করার কথা। জানি একথা শুনে অনেকেই খুশিতে পুলকিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু না ঘটনাটা হবে উলটা! তত্ত্বীয়ভাবে বললে এরা আমদানি-রফতানি কোনটাকেই না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা তা অপছন্দ করে। কিন্তু বাস্তবতা এর উলটা।
    নরেন্দ্র মোদী সাহেব কট্টর হিন্দুত্ব জাতিবাদী। তিনি জাতিবাদী সমাজের প্রবক্তা। বক্তৃতায় সবসময় আত্মনির্ভর, স্বদেশী দেশপ্রেমিক টাইপের কথা তুলে বক্তৃতা করবেন এরা। কিন্ত সেই মোদী সীমান্তে চীনের হাতে মার খেয়ে চীনা-পণ্য বয়কটের হুঙ্কার দিয়েছিল। অর্থাৎ আগেই যেমন চীনা-পণ্য আমদানি করতেন, কোন কোন পণ্য ৯০% পর্যন্ত চীনা আমদানির, তেমনই তিনি আর করবেন না বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টাটা, ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বেড়েছে। দেখুন, As Chinese imports boom, what happened to Modi’s ‘self-reliant’ India?
    এটাই মোদীর ‘আত্মনির্ভরশীল’ তবে ‘অলীক অর্থনীতি’। গত সপ্তাহে ভারতের নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই আত্মনির্ভরশীল (তবে অলীক) অর্থনীতির গড়বেন [New Parliament building testament to Aatmanirbhar Bharat: PM Modi] বলে ‘চাপা মেরেছেন’।
    এখানে আরেকটা কথা পরিস্কার করে রাখা ভাল। এই জাতিবাদিরাই আবার নিজ দেশের বিদেশি পণ্য আমদানিকে খুবই অপরাধ বা নিচা চোখে দেখে থাকেন। এটাও অর্থহীন এবং এক মিথ্যা ধারনা-বুঝ। প্রথমত আমি আমদানি করতে পারি মানে আমার বৈদেশি্ক মুদ্রা যথেষ্ট আছে। অর্থাৎ অন্যকিছু পণ্য আমি উতপাদন ও রপ্তানি আমিই করি তবেই না ঐ মুদ্রা পাই। তাহলে এটা খারাপ কেন? যেমন আমরা গার্মেন্ট রপ্তানি করতে পারি মানে হল অন্তত একটা ধরণের পণ্য আছে যা উতপাদনে আমরা দক্ষ বলে সবার চেয়ে কম শ্রমে মানে দামি তা রপ্তানি করতে পারি। আর এরপরে ঐ প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আমরা অবশ্যই আমদানি করব,।কাজেই আমদানি মানেই নিচা বা খারাপ এমন ধারনা ভিত্তিহীন!

    ট্রাম্পের অবুঝ খায়েস ডি-কাপলিংঃ
    তামাশার কথা হল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এমনই এক কল্পিত আমেরিকান জাতিবাদী অর্থনীতি গড়বেন বলে- ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে।
    ট্রাম্প সেই গত চার বছরে আবদার ধরে বসেছিলেন যে, চীন চাক বা না চাক তিনি চীনকে একঘরে রাষ্ট্র বানাবেনই। তবে এটা তো আসলে অলীক, এক খায়েশের কথা। আর বাস্তবে সেটা আসলে উল্টা। তিনি চীনবিরোধী হতে চান এমন বুঝা না বুঝা উসকানি-চুলকানি যাদের আছে এ ধরনের দেশগুলোর একটা আমেরিকান প্রভাবাধীন জোট বানিয়ে চীনকে তা থেকে আলাদা করে দিতে চান। এমনই কল্পরূপের কিছু নমুনা হল, ‘কোয়াড’ রাষ্ট্র গ্রুপ (ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া) বা হবু ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ ইত্যাদি।
    আপাতত ট্রাম্পের হাত থেকে দুনিয়া বেঁচে নাজাত পাইছে, চায়না অথবা কোন দেশকে ডি-কাপলিং করা দুনিয়াকে আর দেখতে হচ্ছে না। কারণ ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গেছেন। আর ব্লিঙ্কেনও দাবি করছেন, তিনি বুঝেছেন ডি-কাপলিং অবাস্তব। কিন্তু ধরা যাক, ট্রাম্প নির্বাচনে জিতলে কী হত?

    সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ কী?
    এক কথায় বললে, ট্রাম্পের হবু পদক্ষেপে সেটাই হওয়ানোর চেষ্টা হত। ফলে যেন তা সম্ভাব্য সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’। যদিও এটা নিয়ে অনেকে এর আগে আন্দাজে ঢিল মেরেছেন। চীন ও আমেরিকার ঝগড়া-সঙ্ঘাত কখনও মারাত্মক হলেই লিখে দিয়েছেন ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ আসছে। কিন্তু না। ঠিক কোন শর্ত পূরণ হলেি কেবল ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ হতে পারে, সেটাই আমরা জানব এখন। তার আগে,  কোল্ড ওয়ার বলতে ঠিক কী বুঝব? গত ১৯৫৩-৯১ সাল, এই সময়কালে দুনিয়াটাকে সোভিয়েত-আমেরিকা এদের উভয়ের নেতৃত্বে দুইটা ব্লকে ভাগ করে নেয়া হয়েছি্‌ বা গিয়েছিল। কিন্তু শুধু দুই ব্লক-জোটরাষ্ট্রে দুনিয়া ভাগ করলেই সেটা কোল্ড-ওয়্যার বলে চালানোটা আনাড়িপনা হবে। তাহলে আর কী শর্ত লাগবে? সেটি হল, প্রথমত যদি একটা ব্লক-জোট ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ না নেয়। নেয়ার যোগ্য না হয়। কিন্তু অংশ নেয় নাই তা বুঝব কেমন করে? এটা বোঝা খুবই সহজ। একেবারেই সহজ বুদ্ধিটা হল কোন রাষ্ট্র যদি আইওএমএফের সদস্যপদ না নিয়ে থাকে এর মানে তখন সে চাইলেও আর গ্লোবাল বাণিজ্যে যোগ দিতে পারবে না। তাই আমরা জেনেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের কখনই সদস্যপদ আবেদনই করে নাই। আর সাথে তার ব্লকের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই এমন সদস্যপদ নেয় নাই। অথবা বাংলাদেশ  মত; যে নিয়েছে ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ১৯৭৬ সালের শুরুরদিকের আগে তেমন কোন সক্রিয়তায় কোন কাজে লাগায় নাই। এভাবেই আমরা শেখ মুজিব জীবিত থাকতে ১৯৭৪ জুলাইয়ে দুর্ভিক্ষটা পর্যন্ত আমরা যেন সোভিয়েত ব্লকেই ছিলাম। আবার শেখ মুজিব নিজেই ১৯৭৪ সেপ্টেম্বর থেকে আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয়তা চাইতে গেছিলেন। তো, এদেরকেই  যারা কোল্ড-ওয়ারে জড়িয়ে গেছিল এমন দেশের ব্লক বুঝাতে চাচ্ছি।  এদের যারা যারাই আইএমএফের সদস্যই না হয় অথবা আগে হয়ে থাকলে এখন সদস্যপদ ত্যাগ করে – এটাই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ যে এরা ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নেয় না। আইএমএফের সদস্যপদ ত্যাগ করা মানে, ওসব রাষ্ট্র আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নিতে পারবে না। ঠিক এমনটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের অনেক রাষ্ট্রের।
    কিছু বেজ ফ্যাক্টস বলে রাখি। আইএমএফের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলের ২২ দিনের সম্মেলনে, ৪৪ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে। তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মানে, জোসেফ স্টালিনের প্রতিনিধিও তাতে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু এর জন্ম দলিল তৈরি করা সম্পন্ন হওয়ার পরে ফাইনাল সদস্যপদ নিয়ে যখন চাঁদা দিয়ে স্বাক্ষর করতে একটা দিন ধার্য হয়েছিল তখন থেকে কোনো সোভিয়েত প্রতিনিধি আর উপস্থিত হননি। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই আইএমএফের সদস্য ছিল না। তবে  আইএমএফ ফাংশনাল হলে পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত ব্লকের অনেক সদস্যই যেমন- পোল্যান্ড এর সদস্যপদ পেতে আবেদন করেছিল। তাতে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়েই অনুমোদন করলেও আমেরিকান প্রশাসনের আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়। অতএব মূল কথাটা হল সোভিয়েত ব্লক-জোটের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিদের ব্লক-রাষ্ট্রের কোনো গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। তাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সম্ভব ছিল না। এটাই যেকোন ‘কোল্ড-ওয়ার’ পরিস্থিতি আবার দেখা দিতে গেলে প্রধান শর্ত, যা আগে পুরণ হতেই হবে।

    কাজেই ট্রাম্পের স্বপ্ন একালে অধরা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই ছিল প্রচুর। মূল কারণ এখন দুনিয়ার খুব কম রাষ্ট্রই আছে যে আর আইএমএফের সদস্য নয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ভেঙ্গে আরো ১৫ রাষ্ট্রে পরিণত হবার পর থেকে এরা সকলেই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল সেজন্য। আর ১৯৮০ সালে কমিউনিস্ট চীন আইএমএফের সাথে সম্পর্ক সক্রিয় করে ফেলার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০ টা দেশই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় চীনকে আর একঘরে করা আরো অসম্ভব হয়ে গেছে। যে চীন দুনিয়ার হবু নেতা এবং পালটা নতুন করে পুরান আইএমএফের সংস্কার করে নিবার ক্ষমতা সম্পন্ন।  কাজেই ট্রাম্প আবার জয় লাভ করলেও আইএমএফ একটা বড় ঝাকুনি খেত হয়ত। কিন্তু তবু আইএমএফের সদস্যপদ সবারই থেকে যেত। ওদিকে সারা ইউরোপ ট্রাম্পের আমেরিকার উপর ১৯৪৫ সালের পরে এই প্রথম আস্থা হারিয়েছিল যেটা আর ফিরে আসত না। যেমন এর উল্টাটা, সেই আস্থা আবার কতটা ফিরে পাওয়া যাবে সেলক্ষ্যে বাইডেন ঝাপিয়ে পড়ে কাজ করার পরিকল্পনা নিচ্ছে্ন এখনই।

    তাই  একালে বাইডেনের হবু প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ডি-কাপলিং ‘অবাস্তব’ ও ‘কাউন্টার-প্রডাকটিভ’। কথাটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ; যদিও এর মানে বাইডেনের আমলে চীন ও আমেরিকার মধ্যে আর কোনো সঙ্ঘাত থাকবে না  – না সেটারও কোন সত্যতা নাই, এর একেবারেই সত্যি নয়। মূল বিষয়, একই গ্লোবাল বাণিজ্য সমাজে সবাই থাকছে কি না। আর একই বাণিজ্য সমাজে আর যদি কখনও না থাকে একমাত্র সেক্ষেত্রেই যেটা হতে পারে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ পরিস্থিতি। কাজেই না-বুঝ ‘কোল্ড-ওয়ার ২ বলে এ নিয়ে আলাপ তোলা বন্ধ করাই ভাল। আর উল্টাটা যদি চীন-আমেরিকা একই বাণিজ্য সমাজে যদি থাকে, তবেই দুনিয়া ফান্ডামেন্টালি ঠাণ্ডা থাকবে!‘ বলাই বাহুল্য!

    সবশেষেঃ
    ১। কয়েক মণ চাল-ডাল যদি একবার মিশিয়ে ফেলা হয়, এরপর তা আবার আলাদা করে আগের জায়গায় আলাদা চাল ও আলাদা ডাল করা প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা। এই যুগে ডি-কাপলিং প্রয় সেরকমই এক অলীক ধারণা!
    ২। একটা মজার কথা হল, কমিউনিস্টদের কাছে তবু সেই থেকে জোসেফ স্টালিনের মতই “গ্লোবাল বাণিজ্য” এক অ-বুঝ ধারণা শুধু না, একটা নো-গো [no-go] ধারণা; যা তারা বুঝার চেষ্টাও করে না, আলোচনায় অংশগ্রহণও করে না! বরং অনেকটা যেন হারাম খাদ্যের প্রতি যেমন মানুষের আগ্রহ থাকে না সেরকম! এমনকি কেন এমন ‘হারাম মনোভাব সেটা উলটে দেখা বা রিভিউও করে না এরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গ্লোবাল বাণিজ্য ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জিডিপিতে অতুষ্ট ভারতকে উদ্ধারে সিপিডি

    জিডিপিতে অতুষ্ট ভারতকে উদ্ধারে সিপিডি

    গৌতম দাস

    ০২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3f7

     

    India’s annual GDP growth (contraction), AJ

    সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির অবস্থা কী বা কতটুকু হয়েছে এর একটা মাপক হল জিডিপি। এর অনেক সীমাবদ্ধতা সত্বেও এটাই এখনও রাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রধান মাপক হয়ে হাজির আছে। জিডিপি হল Gross Domestic Product (GDP) বা বাংলায় মোট দেশজ উতপাদন। এর অর্থ আরেকটু খুলে বললে, এখানে ‘গ্রস’ মানে আমরা যেমন বলি মোটের উপর, সেটাই। অর্থাৎ গ্রস মানে কোন কিছু বাদ দেয়া ছাড়াই অর্থে, এভাবে মোট। যেমন মোট বেতন বা গ্রস সেলারি। কারণ ‘আসল বেতন’ বুঝতে ‘মোট বেতন’ থেকে এরপর ট্যাক্স বা অন্যান্য নানান কিছু বাদ দিলে বুঝা যেতে পারে বাসায় আনা বেতনটা কত। আর ডোমেস্টিক বা দেশজ শব্দটা এখানে নেয়া হয়েছে এটা বুঝানোর জন্য যে যা  দেশে উতপন্ন পণ্য বা সেবা নয় এখানে হিসাবের মধ্যে তা বাদ দেয়া হয়েছে এটা বুঝাতে। অর্থাৎ ভৌগলিক বাউন্ডারি এখানে গুরুত্বপুর্ণ এবং সীমানার বাইরের জিনিষ বাদ। তাহলে বিদেশে আয় বা রেমিট্যান্স কী জিডিপির ভিতরে হিসাবে ধরা হয়? জবাব হল আয় হিসাবে ধরা হয় হয় না। কিন্তু ব্যয় করার সক্ষমতা হিসাবে যে বাসায় এই রেমিট্যান্স এসে ঢুকেছে ওদের ব্যয়ের সক্ষমতা হিসাবে গোনায় অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা হয়। অর্থাৎ পরোক্ষে অন্তর্ভুক্ত করে ধরা হয়। একারণেই বাংলাদেশে  বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে প্রায় ১৭০ দিন হরতাল থাকলেও জিডিপি গণনায় এর প্রভাব তেমন না। কারণ, বছরের অর্ধেকদিন হরতাল থাকলেও কোন ভুরঙ্গমারি উপজেলার কোন মা ছেলের পাঠানো টাকা পেয়ে উপজেলা বাজারে এসেছে টিন-সিমেন্ট ইত্যাদি বাড়ি তৈরির পণ্য কিনতে আসে। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি হরতালে ঝিমিয়ে পড়া ঠেকিয়ে উলটা চাঙ্গা থাকার জন্য চাপ অনুভব করে হরতালের নেতি প্রভাব অনেকটাই সামলে ফেলে থাকে। আসলে জিডিপি গণনায় আয়ের চেয়ে ব্যয়ের সক্ষমতা দিয়ে আয়কে বুঝার ও ধরার চেষ্টা করা হয়, এটাই মূল কারণ। যেমন মোট জিডিপি মানে হল, জিডিপি=ভোগ+বিনিয়োগ+সরকারি ব্যয়+(রপ্তানি-আমদানি)।

    GDP = consumption + investment + (government spending) + (exports − imports).

    আর সবশেষে জিডিপিতে প্রডাক্ট (উতপাদন) বলতেও শুধু উতপন্ন পণ্য না বরং পণ্য ও সেবা (সেবা মানে যেমন খাওয়া বা থাকার হোটেল যেটা বিক্রি করে) দুটাই ধরে নেয়া হয়। এখানে পণ্য ও সেবার মুল্য মানে। এক বছরে পণ্য ও সেবা কতটা নতুন মুল্য (এডেড ভ্যালু) যোগ করল তাই জিডিপিতে বিবেচ্য।
    তবে এভাবে জিডিপি মাপকের বহু সমালোচনা আছে, যার অনেকটাই জেনুইন। যেমন জিডিপি দেশের প্রবৃদ্ধি মাপে হয়ত কিন্তু তা সমাজে মানুষের আয়ের বৈষম্য তুলে ধরে না বা জানা যায় না। এটাকে অনেকে বলতে পারেন, এখানে প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরে সরকার আয়ের বৈষম্যের দিকটা লুকিয়েছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে।  জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে বৈষম্য ঢেকে ফেলার মত করে উপস্থাপন বা কথা বলা অবশ্যই রাজনীতিকদের খুবই অগ্রহণযোগ্য ও খারাপ দোষ। যদিও আবার মনে রাখতে হবে, যা যা আমরা জানতে চাই কোন একটা মাপকই এমন সবকিছুর মাপক-প্রকাশক হবে না, তুলে ধরে না। তাই আয় বৈষম্যটা আলাদা ফিগার চার্ট বা গ্রাফ থেকে দেখে নিয়ে রাজনীতিবিদদের ধরতে বা শায়েস্তা করতে হবে।
    তাই সারকথায়, অর্থনীতিতে মাপামাপির রেওয়াজ বলে কিছু তো থাকারই কথা, থাকবেই। বাইরের লোককে তা দেখাতে চাই আর না চাই অন্তত নিজের তো জানা দরকার যে অর্থনীতি আগাল না পিছাল এবং কতটুকু। তাই সব দেশেরই স্ট্যাটিস্টিক্যাল (পরিসংখ্যান) ব্যুরো নামের প্রতিষ্ঠান থাকে। সেখানে কোন পদ্ধতিতে কেমনে কী মাপবে তারও ছকে বাধা অনেক নিয়ম আছে। এছাড়া দুনিয়ার সব রাষ্ট্র প্রায় একই নিয়মে মাপামাপি করে থাকে আরও অন্য একটা কারণে। কেন?
    সেটা হল, দুনিয়াতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামে দুটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি; সেই ১৯৪৫ সাল থেকে যার শুরু। বেচাকেনা, পণ্য বিনিময় ও ব্যবসাবাণিজ্যের আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও গ্লোবাল ও বাস্তব করে তুলেছে এ দুই প্রতিষ্ঠান। গ্লোবাল অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানও বলা যায় আইএমএফ-কে। যেটা গ্লোবাল সিস্টেমটাকে একটা অর্ডারে, এর নিয়ম ও ব্যবস্থাকে ধরে রেখেছে। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে যেগুলোর অনেক কিছুই সত্যি। যার মূল কারণ এই দুনিয়াটা অসম ও ব্যাপক বৈষম্যের দুনিয়া। এরই ভিতরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোনো গ্লোবাল বাণিজ্য চালু রাখতে বা একটা সিস্টেম চালু ও খাড়া রাখতে গেলে সেখানেও ঐ বৈষম্য থাকবেই, প্রভাবিত করবেই। গ্লোবাল অর্ডারের নেতা আমেরিকা এসব প্রতিষ্ঠানেও আধিপত্য নিয়ে বসবেই। আর তাতে সিস্টেমের সুবিধাগুলো গরিব রাষ্ট্রের অনুকূলে যাবে না এটাই স্বাভাবিক। এক কথায় এ’দুই প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের মালিকানার মতোই নিয়মে খাড়া করা হয়েছে যে, যার যত শেয়ার মালিকানা তার গলার স্বর তত উঁচু। এটাই একেবারে মূল কারণ। কিন্তু  সাবধান! সে জন্য গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থারই দরকার নেই বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিপাত যাক ধরনের স্লোগান তোলা হবে নির্বুদ্ধিতা এবং আত্মঘাতী। কারণ  প্রধানত আমাদের অবশ্যই দরকার এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা; আর এরপরের দাবি এটা যেন  বৈষম্যহীন না হলেও অন্তত যেন কম বৈষম্যমূলক হয়! তাই বিদ্যমান ব্যবস্থার বৈষম্য সম্পর্কে আপত্তি ও বৈষম্যের কথা তুলে যেতে হবে। কিন্তু সাবধান নিপাত যাক নয়!

    এবারের জিডিপি নিয়ে কথা শুরু কী থেকেঃ
    এবারের ঘটনার শুরু মূলত ভারতের ইস্যু আর তা মিডিয়ার কারণে যতটুকু যা বাংলাদেশেও হাজির। মূল ঘটনা, বাংলাদেশ জিডিপির মাপে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সে কারণে যেমন, ভারতের মিডিয়ার মতই প্রথম আলোও লিখছে, “ভারতে তোলপাড়, বাংলাদেশে আত্মতৃপ্তি।’ আইএমএফের এক প্রতিবেদন নিয়েই সব আলোচনা। বাংলাদেশ তো আগেই জিডিপিতে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়েছিল। এবার মাথাপিছু জিডিপিতে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে ভারতকে। ভারত কেন পিছিয়ে পড়ল, তার চেয়েও বড় আলোচনা, বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে গেল”।

    কিন্তু কোনও দেশ অর্থনীতিতে ভালো করবে তো অন্যদেশ কেউ খারাপ, তাতে তোলপাড় হবে কেন? এর একটা সাধারণ জবাব হল, ইতোমধ্যেই করোনাকালের অর্থনীতি পাক্কা সাত মাস প্রায় বসে পার করেছে, তাই বিশ্বজুড়েই একটা মন্দা বয়ে যাচ্ছে। কাজেই এটা আরও কতটা খারাপ হতে পারে, কত ক্ষতি করেছে মুলত কবে পুনরুদ্ধার পাবে, এসব নিয়ে মাপামাপির মাতামাতি তো হবেই। কিন্তু না ভারতের এই মাতামাতি এর চেয়েও বেশি এবং কারণও ভিন্ন।

    প্রথম কারণঃ
    ভারতের মাতামাতিটা আইএমএফ [IMF] নিজেই তৈরি করেছে। তার ইকোনমিক আউটলুক রিপোর্ট প্রকাশ করে। কেন? ভারতের অর্থনীতি জাগছে না ডুবছে সেটা আইএমএফের এক বিশেষ আগ্রহের বিষয়। অবশ্যই। এর পিছনের জেনুইন ও প্রকাশ্য কারণটা হল, ভারতের জনসংখ্যা- ১৩৮ কোটি, এক বিশাল ফিগার। দুনিয়ার মোট জনসংখ্যার পাঁচভাগের একভাগের পুরাটাই ভারতের বাসিন্দা। ফলে অন্ততপক্ষে এক বিরাট ভোক্তা বাজার এটা।  যদিও এই বৈশিষ্টটাকে ভারতে ইতি ও নেতি ব্যবহার, দুটাই করে থাকে। এছাড়া তা নিয়ে হবু গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বপ্নসহ ন্যূনতম শর্ত পূরণ করা গুটিকয়েক দেশের একটা ভারত। যদিও এটুকুতেই সে কোন একদিন গ্লোবাল নেতা হবেই তা নিশ্চিত হয় না। কিন্তু একটা বড় শর্ত পূরণ হয় অবশ্যই। আবার অন্য দিকে আইএমএফ নিজের জন্মের ম্যান্ডেটেই বলা আছে যে, বিগত ১৯৩০ সালের মত গ্লোবাল মহামন্দা যেন দুনিয়াতে আর না আসে সেটা ঠেকাতেই মূলত এই আইএমএফের জন্ম। কাজেই ভারতের অর্থনীতি ভালো করা মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে এর বড় ইতিবাচক প্রভাব থাকবে – যেটা আইএমএফের নিজের ইচ্ছা ও অস্তিত্বের পক্ষে এক বড় সাফাই।

    আবার অন্য দিকে আইএমএফের অপ্রকাশ্য ভারতপ্রীতির একটা দিক আছে। সেটার কারণ হল, আইএমএফের রিপ্লেসমেন্ট (আগামি বিকল্প) প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেমন ব্রিকস [BRICS] উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সক্রিয়  হয়েছে চীনের নেতৃত্বে। যদিও ভারত সেখানে আবার চীনের প্রধান সহযোগী। ওদিকে এটাও সত্যি চীন এখনঅও আইএমএফের বড় সদস্য হয়ে আছে ছেড়ে যায় নাই। যদিও চীনের বড় মালিকানা শেয়ার কিনে-নেয়া আমেরিকা ঠেকিয়ে রেখে দিয়েছে। তবু আসন্ন নতুন গ্লোবাল নেতা হিসাবে চীন আসন নিয়ে নিলে পরে সেই চীনের সাথে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকে তা ভাবলে এনিয়ে অপ্রকাশ্য রাখা কোন অস্বস্তি আইএমএফের স্টাফদের থাকা অস্বাভাবিক নয়। যদিও তারা খুবই উচ্চস্তরের প্রফেশনাল ব্যক্তিত্বের লোক; আমেরিকান স্বার্থ আর নিজ প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ যে আলাদা তা যতটা তাদের পক্ষে সম্ভব আলাদা রাখার চেষ্টা করে যান। ওদিকে ব্রিকস এখন আইএমএফের মতই প্রতিষ্ঠান তবে কেবলমাত্র পাঁচ সদস্য-রাষ্ট্রের জন্য। কিন্তু  একই দুনিয়াতে দুইটা আইএমএফ একসঙ্গে থাকতে পারে না। কারণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইএমএফের ভুমিকা, গ্লোবাল অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকের ভুমিকা। কাজেই এখন ব্রিকসের ততপরতা কেবল পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে এর কোন ভুমিকা নাই বা টের পায় না। কিন্তু চীন নেতার আসন নিয়ে বসে গেলে এটা এমন আর থাকবে না।

    অতএব সব মিলিয়ে ভারতের অর্থনীতির প্রতি আইএমএফের কড়া নজর আছে ও  থাকবে। এছাড়া ওদিকে আসলে করোনার প্রভাব পড়তে শুরুর বহু আগে থেকেই ব্যাপকভাবে ডুবতে থাকা ভারতের অর্থনীতি, পরবর্তিতে  করোনার প্রভাবে আরও চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। গত কোয়ার্টারে (একটা বছরকে তিন মাস করে একেক কোয়ার্টারে ভাগ করে দেখলে) ভারতের জিডিপি ছিল নেগেটিভ ২৪%, যেটা অর্থবছর শেষে গড়ে প্রায় নেগেটিভ ১০.৪% হতে পারে বলে অনুমান-আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকা দেশ যেমন এশিয়ার কোন দেশে নেগেটিভ জিডিপি হতে দেখা যায় না। নেগেটিভ বা খুবই কম (২% এর মধ্যে) জিডিপি হয় সাধারণত অগ্রসর অর্থনীতির পশ্চিমা দেশগুলোর।

    এই প্রেক্ষিতে ভারতের চলতি বছর শেষে অনুমিত জিডিপি নেগেটিভ ১০.৪% হওয়া তাই খুবই খারাপ লক্ষণ। আর সেটাকেই ফোকাস করতে আইএমএফ কথাটা বাংলাদেশকে টেনে এনে একটা তুলনা করে বলেছে। এছাড়া ব্যাপারটাকে আরো করুণ দুরবস্থা করে তুলেছে কলকাতার এক ব্যক্তিত্বের দুঃখ প্রকাশ করা এক টুইট-বার্তা। তিনি বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু। গত ১৫ অক্টোবর তিনি লিখেছেন, “আইএমএফের প্রাক্কলন দেখাচ্ছে যে ২০২১ সালে বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে। যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির ভালো করাটা সুসংবাদ। তবে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, পাঁচ বছর আগেও যে ভারত ২৫ শতাংশ বেশি এগিয়ে ছিল, সেই ভারত এখন পিছিয়ে যাচ্ছে। এখন ভারতের প্রয়োজন একটি সাহসী আর্থিক ও মুদ্রানীতি তৈরি করা”। [এই অনুবাদটা প্রথম আলো থেকে নেওয়া]। এসব তথ্য মোদীর মাজা ভেঙে দিয়েছে, মোদীকে উদাম করে দিয়েছে। যেটা সেই ২০১৬ সালে ভারতে মোদীর নোট বাতিলের সময় থেকে তিনি ভারতের অর্থনৈতিক দুরাবস্তা লুকিয়ে চলেছেন। বিশেষ করে আগামী আট মাসের মধ্যে যখন মোদীকে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ আর আসামের মত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য-নির্বাচন মোকাবেলা করতে হবে। তখন আইএমএফ এভাবে সব উদাম করে দিয়েছে। আর এতে বিরোধীরা এই প্রথম মোদীকে শক্ত ও অস্বীকার-অযোগ্য এমন ডাটা দিয়ে ঘায়েল করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। অবশ্য অনেকেই আবার মোদীকে রক্ষা করতে এগিয়েও আসছে!

    দ্বিতীয় কারণঃ
    মিথ্যা বলার এক বিরাট অসুবিধা হল কখন যে তা নিজেরই বিরুদ্ধে হাজির বা ব্যবহৃত হয়ে যায়। এটা অনেকটা অন্যের কথা ভেবে খুঁড়ে রাখা গর্তে নিজেরই পড়ে যাবার মত। ভারতের রাজনীতিকদের বিশেষ করে মোদীর অবস্থা হয়েছে তাই। ভারতের হিন্দুমনের কাছে একটা কমন ব্যাখ্যা থাকতে দেখা যায় যে, সাতচল্লিশের ভারতভাগে যেন শুধু বাংলাদেশ থেকেই হিন্দুরাই ভারতে মাইগ্রেশন করেছে। উল্টাটাও যেন সত্যি না বা ব্যাপারটা যেন উভমুখি ছিল না। ভিত্তিহীন হলেও এই কথা তারা সেই সাতচল্লিশ থেকে আউড়ে চলেছে। একালে ভারতের দুইটা রাজনৈতিক দল বা গ্রুপের নিজপক্ষের রাজনীতি এমন ভাষ্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এরা হল – এক, আসামের মুসলমানবিদ্বেষী অসমীয় এবং বোড়ো এদুই জাতিবাদিরা। আর দুই, সারা ভারতজুড়ে বিজেপির মোদী-অমিতের বয়ান তো আছেই। মিথ্যা বয়ান দিয়ে হিন্দুমনকে খেপিয়ে মুসলমান খেদানোর নাগরিকত্ব আইনের পক্ষে সাফাই তৈরি করতে মোদী-অমিত এসব করেছে। বিশেষত অমিতের বয়ানে ঘুসপিটা (অনুপ্রবেশকারী মুসলমান), উইপোকাকে পিষে মেরে ফেলা, বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলা ইত্যাদির উন্মাদনা বয়ান নিয়ে তিনি এসেছেন। যেটা দাঁড়িয়ে আছে এই ভিত্তিতে যেন বাংলাদেশটা এতই গরিব-দুস্থ যে সমৃদ্ধ ও মহান ভারতের হিন্দুদের সম্পদ খেয়ে নিচ্ছে।  যেন এরা হিন্দুদের সম্পদ খেতে দলে দলে এখনো ভারতেই যাচ্ছে। আর এটাই নাকি ভারতের প্রধান সমস্যা। তাই এর সমাধান করতেই মোদী মুসলমান খেদানোর নতুন নাগরিকত্ব আইন করছেন। এমনকি দেখা যাচ্ছে, বীণা সিক্রির মত প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত এমন বয়ান প্রকাশ্যে অনুমোদন করেন। অতএব বিজেপির এখান থেকে সিদ্ধান্ত হল,   হিন্দুমন (ভোটার) যেন ‘দেশ রক্ষার্থে’ এই ভেবে ঘৃণায় জেগে ওঠে, আর এ কাজে সহায়তা করতে শুধু বিজেপিকেই ভোট দেয় – এই হল বিজেপির ভোট-রাজনীতির মূখ্য বয়ান।
    কিন্তু মোদী-অমিতের কপাল আসলেই খারাপ!  কারণ, আইএমএফের ইকোনমিক আউটলুক রিপোর্ট বাংলাদেশের সাথে তুলনায় ভারতের অর্থনীতি কত পিছনে গেছে; আর কৌশিক বসুর প্রকাশিত দুঃখে ২৫ বছরের পরাজয়ের বাণী ইত্যাদি সবই মোদীকে একেবারে ন্যাংটা করে দিয়েছে। এখন আসন্ন নির্বাচনগুলোও সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, ভারত বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়া অর্থনীতির দেশ এটা যখন আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সাক্ষ্য দেয় তার মানে তো মোদীর (বাংলাদেশ থেকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারিরা আসছেই) এই বয়ান একেবারেই ফুটা হয়ে যাওয়া! তার নাগরিকত্ব আইনসহ পুরো হিন্দুত্ববাদের বয়ানে মারাত্মক ধস নেমে আসা! বাংলাদেশের অর্থনীতির ট্রেন্ড যদি ভারতের চেয়ে উন্নত বা ভালই হয় তাহলে সেই বাংলাদেশ থেকেই ইকোনমিক (মুসলমান) মাইগ্রেন্টদের ভারতে যাচ্ছে এই বয়ানের ভিত্তিই নাড়িয়ে দেয়, ভিত্তি আর থাকে না। কাজেই মোদীর মুখ্য বয়ানই যদি মিথ্যা হয়ে যায় তবে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে আর আসামে মোদী-অমিত নির্বাচন করবেন কী দিয়ে, কোন বয়ানে? এই হলো তাদের মারাত্মক সঙ্কটে পরে যাবার দিকটা। ফলে তারা এখন দিগিবিদিক শূন্য হয়ে জিডিপি মাপামাপি – এটারই ত্রুটি খুঁজতে নেমেছে বা নামিয়েছে  যে জিডিপি জিনিষটাই “বেঠিক” তা প্রমানে নেমে পড়!

    জিডিপির প্রগতিবাদী সমালোচনাঃ
    ব্যাপার হল, দুনিয়ার কোন একটাই স্ট্যাটিস্টিক্যাল ফিগার, গ্রাফ বা ম্যাপ তা আমাদের প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিতে পারে না, সব প্রশ্নের তা জবাব নয়। অর্থাৎ সব তথ্য একটা চার্ট থেকে পাওয়া যাবে না। সব ফিগার বা গ্রাফেই এমন সীমাবদ্ধতা থাকে। জিডিপির পরিমাপও তেমনই।
    জিডিপি বা বাংলায় মোট দেশজ উৎপাদন-এর মানে হল, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার মোট পণ্য ও সেবা মূল্যে (অ্যাডেড ভ্যালু) কতটুকু বেড়েছে আর তা মুদ্রায় (সাধারণত ডলারে) কত, এরই প্রকাশ। তবে সাথে আমদানি করা পণ্য ও সেবা যা এসেছে তা বাদ দিয়ে হিসাব করতে হবে। এরপরে দেশের মোট জিডিপিকে আবার দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে গড়ে মাথাপিছু জিডিপির ধারণা তৈরি করা হয়। এটা একেবারেই রাফ বা মোটের উপর ধরনের ধারণা। এখানে মাথাপিছু মানে সমাজের প্রতিটা মানুষের এটা ন্যূনতম আয় তা বুঝা কোনভাবেই ঠিক হবে না আর তা দাবিও করা হচ্ছে না। বরং হরেদরে সবাই সমান হলে কি হত এমন একটা গড় ধারণা মাত্র।  গড় শব্দটার অর্থও তাই। এছাড়া জিডিপির আরেক সীমাবদ্ধতা আছে তা হল, সব দেশে ও মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা (পারচেসিং পাওয়ার) এক নয়। ফলে দুটা দেশের মধ্যে জিডিপির তুলনা করতে বসার ক্ষেত্রে এটা জিডিপি পরিমাপের এক বিরাট সীমাবদ্ধতা। তবে একালে এরই সংশোধন হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে পিপিপি (পারচেসিং পাওয়ার প্যারিটি) Purchasing Power Parity (PPP) সূত্র প্রয়োগ করে সব রাষ্ট্রের জিডিপিকেই পরস্পর তুলনাযোগ্য করে এনেছে।

    প্রগতিবাদ ও জিডিপিঃ এবারের আইএমএফের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২০ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১৮৮৮ ডলার, আর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১৮৭৭ ডলার। অর্থাৎ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের গড় আয় বেশি হয়ে যাবে। আর এই কথাটাতেই বিজেপি ও আমাদের দেশের “ভারতপ্রীতি থাকা কর্তব্য মনে করা” কিছু মানুষের চিত্ত জ্বলে গেছে।
    আসলে গড় মাথাপিছু আয় কত সেটা হল, দেশের সাথে দেশের তুলনার প্রয়োজনে তাদেরকে কিছুটা অন্তত তুলনীয় করতে কী করা যায় সেই অর্থে এটা একটা মাপক। তাই মোট আয় ভাগ মোট জনসংখ্যা, এই সোজা ফর্মুলার ব্যবহার। আগেই বলেছি, পদ্ধতিমাত্রেরই ওর সীমাবদ্ধতা থাকবেই। তবে সবচেয়ে বড়কথা, এটা মনে করা মারাত্মক ভুল যে কোনো দেশের মানুষের ন্যূনতম আয় আর মাথাপিছু জিডিপি এক। অবশ্যই তা নয়। বরং মাথাপিছু আয় আর মানুষের ন্যূনতম আয়ের ফিগার (যেটা শিল্পশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির) সাথে তুলনা করলেই বোঝা সম্ভব সমাজের আয়-বৈষম্য কত মারাত্মক।

    প্রগতিবাদিতার আড়ালে সিপিডিঃ
    গত ১৩ অক্টোবর আইএমএফের ইকোনমিক আউটলুক রিপোর্ট প্রকাশের পর থেকে  ভারতের জিডিপি বা অর্থনৈতিক পারফরমেন্স নিয়ে মোদী সরকার চারদিক থেকে  কঠিন সমালোচনার মুখে পড়া শুরু হয়েছিল। প্রথম আলো ১৪ অক্টোবর মোদীর সমালোচনা নিয়ে রিপোর্ট করতে শুরু করেছিল আর সবার মত। এমনকি ১৯ অক্টোবর নিজস্ব স্টাফও এক রিপোর্ট করেছিল সেটাও মোদীর জিডিপি ফেল করার সমালোচনা করেই করা। কিন্তু একই সাথে সেদিনই আবার সিপিডির [CPD] এক উলটা গান – “কেন ভারত ও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপির তুলনা বেঠিক” – এই শিরোনামের রিপোর্টও প্রকাশ করে। অর্থাৎ একই দিনে সিপিডির ‘জিডিপির তুলনা বেঠিক’ আর নিজের রিপোর্টে জিডিপির তুলনা সঠিক বলে দুটা রিপোর্ট প্রথম আলো ছেপেছিল।
    এখন এটা বেশ কৌতুকের যখন একটা থিংকট্যাংক বা অর্থনীতিতে দাতা প্রকল্পে অথবা অবকাঠামো প্রকল্পে কনসাল্টেন্সি করা প্রতিষ্ঠান একালে যখন একই সাথে নিজেকে কথিত ‘প্রগতিবাদী’ সংগঠন হিসেবেও তুলে ধরতে চায়। অথচ প্রগতির ভাষ্যমতে কনসাল্টেন্সি আর কমিউনিস্টগিরি এক সাথে চালানো যায় না, চলার কথা নয়। অথচ সিপিডির ভারতের সাথে আমাদের ‘জিডিপির তুলনা বেঠিক’ বলে লিখে এই লেখা ভারতের প্রতি প্রীতিবশতই করা তাই প্রমাণ করেছে। সিপিডি যে চিন্তাগত অবস্থান আর যে টাইপের কনসাল্টেন্সি করা প্রতিষ্ঠান তাতে জন্মের পর থেকে জিডিপি মাপা ও তুলনাকে “সঠিক” ও ইতিবাচক ভাবে ধরে নিয়ে সিপিডি এপর্যন্ত চলে এসেছে। জিডিপির গণনার ভিত্তিতেই কোন দেশের পারফরমেন্স নিয়ে কথা বলেই নিজ কাজ করে এসেছে। কিন্তু সেই সিপিডি আইএমএফের রিপোর্টে মোদীর বেড়াছেড়া অবস্থা দেখে যেন আর বসে থাকতে পারেনি। অর্থাৎ ভারতের সমালোচনা শুরু হলে হঠাত সেক্ষেত্রে এর বেলাতে এসে সিপিডি জিডিপি গণনা বেঠিক বলে ফতোয়া দিয়ে ‘প্রগতিবাদী’ অবস্থানে হাজির হয়েছে। অথচ এমনকি ২০০৭ সালের তত্ববধায়ক সরকার আনার পক্ষে কাজ করার পুর্বপ্রস্তুতির সময়ও সিপিডি আগের বিএনপি সরকারের অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের সমালোচনা করেছিল এই জিডিপি মাপা ও তুলনা করেই, এই ভিত্তিতেই। ার তা নিয়ে এক মামলাও হয়েছিল। অর্থাৎ এবার ভারতের জিডিপি সমালোচনা উঠার সময় থেকে আমরা দেখছি সিপিডির জিডিপি অরুচির শুরু হয়ে গেছে! এটা আর তার ভাল লাগছে না!
    যদিও আমরা দেখি সিপিডির এমন ভারতপ্রীতির কাজ নতুন নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনতে ২০০৪ সাল থেকেই সিপিডি নির্বাচনে ‘সৎ প্রার্থী দিতে হবে’ এই আন্দোলন করেছিল। এরপর ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয়ে বাংলাদেশকে ভারতের শিখণ্ডি করে ভারতের হাতেই বাংলাদেশকে তুলে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করার পর এখন তা পরিণতিতে নিশীথ ভোটের সরকার হয়ে ঠেকছে। সেকালের এক কোটি টাকার দুর্নীতি উচ্ছেদের দুদক এখন দুর্নীতি মাপে হাজার কোটিতে। ভারতের নর্থ-ইস্ট আসামকে দিতে চায় বিনা পয়সার করিডোর, পোর্ট, সাথে প্রায়োরিটি ইত্যাদি। অথচ সে সময় যারা ভারতকে ট্রানজিট দেওয়া এবং ট্রানজিটের নামে করিডোর দেওয়ার বিরোধীতা করেছিল সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান তাদের গালাগালি করে বলেছিল – “I think it’s a debate of ignorant people,” the veteran economist added.। সিপিডি ঐ বিরোধিতাকারীদের বললেন  – ওরা মূর্খ! “ট্রানজিট দেওয়া নিয়ে বিতর্ককে ‘অশিক্ষিত বির্তক’ বলে অভিহিত করেছেন সিপিডি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান” – এখানে দেখুন।
    অথচ আজ যখন বিনা পয়সার করিডোর দেয়া শুধু না, প্রায়োরিটিতে পোর্ট সার্ভিস দেওয়াতে গিয়ে ঠেকেছে সব কিছু তখন “শিক্ষিত” সিপিডি চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের কোন বিরোধিতা দূরে থাক একটা রা-কারতে দেখি না আমরা। আমরা অসহায় অনুভব করি! এইভাবে বয়ান-চিন্তায় ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া সিপিডিকে আমরা এখন দেখছি মোদীকে রক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

    সিপিডির দাবি, আইএমএফের রিপোর্ট পিপিপির ধারণা ছাড়াই জিডিপি হিসাব কষেছে কাজেই এই জিডিপি তুলনাই নাকি “ঝুটা হ্যায়”!  অথচ ফ্যাক্টস হল, আইএমএফের নিজের দাবি, তার World Economic Outlook (WEO) রিপোর্ট পিপিপি অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবহার করেই  তা করা শুরু করেছিল সেই ১৯৯৩ সাল থেকে। তাহলে কিসের ভিত্তিতে সিপিডির এই দাবি যে, এবারের ১৩ অক্টোবরের রিপোর্ট পিপিপি ব্যবহার ছাড়াই জিডিপি মাপামাপি করেছে? আর এমন দাবির পক্ষে সিপিডির প্রমাণ কী? এছাড়া সিপিডির দাবি যদি সত্যিই হয় সেক্ষেত্রে আবার আইএমএফ হঠাৎ ব্যতিক্রম করে এবার পিপিপি ব্যবহার করবে না কেন, এর ব্যাখ্যা কী? এসব ব্যাখ্যা না দেওয়া পর্যন্ত সিপিডির দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়?

    আবার সিপিডির দাবিতে বলা হয়েছে, জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশ আত্মতুষ্টিতে ভুগছে -“বাংলাদেশের আত্মতুষ্টিতে ভোগা ঠিক হবে না”। প্রথমত বাংলাদেশে পাবলিকের মনে জিডিপি কোনো আলোচনার ইস্যুই নয়। কেবল টেকনিক্যাল অর্থনৈতিক আলোচনার জগতেই জিডিপির কদর পায়, তাই হবার কথা। কিন্তু সে জগতেও, আবার আমাদের স্ট্যাটিস্টিকস বিভাগে দলীয় লোকজন বসানো আর ডাটা ম্যানিপুলেট করার পর থেকে,  স্বাধীনভাবে যারা জিডিপি মাপামাপিতে আগ্রহী ছিলেন তারাও অনাগ্রহী হয়ে যায়। কারণ এদের ম্যানিপুলেশনের প্রধান কায়দা হল জিডিপি তুলনার ভিত্তিবছর বদলে মাপা শুরু করা। এতে আমাদের জিডিপি ২-২.৫% বাড়িয়ে দেখানো আছে বলে এখন মনে করা হয়। মজার কথা হল, মোদীর ভারতেও প্রায় একই পার্সেন্টে তাদের জিডিপি ম্যানিপুলেট করা হয়েছে বলে তাদের অর্থনীতিবিদদের অনুমান। সার কথায় বাংলাদেশে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারে একমাত্র সরকার, বাকি সবাই অনাগ্রহী। যদিও সেই সরকারও এখন বুঝে, তার সম্পর্কে পাবলিকের ধারণা এতই খারাপ যে জিডিপি কোন আত্মতুষ্টি জাগাবে না। তাই এবার সরকারও তেমন চেষ্টা করেনি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩১  অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের জিডিপিতে অতুষ্টি ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    গৌতম দাস

    ২০ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-36q

     

    https://www.dailymail.co.uk/news/article-3413556/

    চীন-ইরান এলায়েন্স থেকে গ্লোবাল পালাবদলের শুরু হবে,
    আর ইউরোপের চীনের দিকে ঝুঁকবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলঃ

    বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে “গ্লোবাল অর্ডার” বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে [Global Economic Order] নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী  ও স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও এদুই দেশের গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থের উপর এর প্রভাব থাকবে, এমন অবস্থা হয়ে যাবে। অর্থাৎ এদুই দেশ স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক।

    এনিয়ে মিডিয়ায় দুনিয়াজুড়ে  মন্তব্যের ঢল বইছে। মন্তব্যগুলো মূলত আমেরিকা ও ভারতের ব্যর্থতা বা অকর্মন্নতার  দিকে আঙুল তুলছে আর বলছে এরা দুই হল হারু পার্টি – They are the losers। যদিও লুজার শব্দটা কারোরই শুনতে ভাল লাগে না। তবু তেমনটাই কয়েকটা পত্রিকা লিখছে – ১।  ট্রাম্পের মহাকাব্যিক পরাজয় । ২। এই পার্টনারশিপ আমেরিকার জন্য ভয় পাইয়ে দিবার মত ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ৩। এই প্যাক্ট এশিয়া্র সাথে আমেরিকার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবার বোকা গাড়োলের মত এক মন্তব্যও আছে আর এটা সম্ভবত এই প্যাক্ট নিয়ে আমেরিকার প্রথম সরকারি মন্তব্য। বর্তমানে ইরানের উপর অস্ত্র-ক্রয় বিষয়ে জাতিসংঘের এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে যেটা আগামি তিন মাস পরে অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (বিদেশমন্ত্রী) মাইক পম্পেও বোকার মন্তব্য করেছেন – “এই প্যাক্টই বলে দিচ্ছে আমাদেরকে আবার একটা শক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে“। ঘটনা হল, জাতিসংঘের কাঠামোতে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা যেকোন একরাষ্ট্র  না-ভোট দিয়ে দিলে এরপরে ঐবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত হবার সুযোগই নাই। চীন ইতোমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। এখন এখানে ভেটো ক্ষমতাধর চীন থাকার পরেও এতে পম্পেও-এর এমন আওয়াজ ছাড়ার কোন অর্থ আছে?
    আচ্ছা, আপাতত আর এদিকে আগে না গিয়ে, প্যাক্ট বা চুক্তিপত্রের ভিতরে প্রেবেশ করি।

    চুক্তির খসড়া দলিল তৈরির কাজ শেষ। তবে এখানে খসড়া কথার মানে হল, এর  অনুমোদনের অংশ বাকি বা প্রক্রিয়াধীন যা দুদেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানদের  অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বা কিছু শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এরই ফাঁকে প্যাক্টটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে, তাদের এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে, বলতে হয়। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার এই খসড়া দলিলটা্র কপি চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটা হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকাটার দিক থেকে দেখলে, হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া একটা দলিল ছাপানোতে, এতে  গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা (নিউ ইয়র্ক) টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে, এই ভাবের। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকা এপর্যন্ত  ইরানের উপর দীর্ঘদিন ধরে  যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে তাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের নেতি উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে ভাড়া খাটা আর শত্রুতামূলক কাজ করা। যদিও এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের উপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু টেকনিক্যালি আমেরিকা আমাদেরকে বাধ্য করতে পারে এসুযোগ আমেরিকার হাতে আছে।

    তবে অবশ্যই, আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার করা হচ্ছে এখানে। মূলত “আমেরিকান অবরোধ আরোপ” কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, আমেরিকার ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কোন আন্তর্জাতিক কেনাবেচা করতে পারবে না। কারণ দুই দেশ ডলারে কোন বেচাকেনা করলে “আমেরিকান কোন ব্যাংকের” কাছে যাওয়া ছাড়া এই লেনদেনের একাউন্ট ট্রান্সফার সম্পন্ন হবে না।   অতএব এর প্রতিকারের ব্যাপারটা এখন গায়ের জোর। এই অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে ঐ আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ।  সেটা কেমন, সেদিকে যাব।

    চুক্তিটা ঠিক কী নিয়েঃ
    সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, ইরানের এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিতেও সহযোগিতা নিয়ে সেসব গড়ে নেয়া। (নিউইয়র্ক)  টাইমসের ভাষায়, ইরান ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প হাতে নিবে; এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ এসব বিষয় দেয়ানেয়া করবে। এভাবে ইরান নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তুলবে। আর নেয়া ঐ ঋণ শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করবে। ফলে মোট ২৫ বছর এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা।  টাইমসের ভাষায়, এজন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট [Economic and Security Partnership]। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক  সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হল বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। আর তুলনায় ইরানের এই ঋণ হল গড়ে একাই কেবল নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে, এবং তা ধারাবাহিক ২৫ বছর।

    ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কীঃ
    কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ এজেন্ট পাঠিয়ে (যেটা একালে (2013) আমেরিকান সরকারের স্বীকার করার কারণে প্রতিষ্ঠিত সত্য) ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল, সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল হয়েছিল। এক সবল পালটা থাপ্পর।  আর তাতে লুটেরাদের হাত থেকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট থেকে গেছে, প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের এনার্জি পণ্য, অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয় – এঅবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। ইরানের শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না বেকার, সে দুঃখ সম্ভবত  ঘুচবে এবার।

    উপচে ওঠা প্রভাবঃ
    হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতই কিছু ঘটনা হয়ত। কিন্ত তাই কী? আর এতটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হবে তা অন্যান্য প্রভাবের উপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ ফলাফল পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই “গ্লোবাল অর্ডারে” বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা তাই এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা স্থিতি ছেড়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল – এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতই প্রবল পটেনশিয়াল।

    যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের উপর “অবরোধ আরোপ করে” তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পড়ে পাওয়া চার আনার মত পেয়েছে ও নিয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই (এবং এটাই তখন সব শর্তপুরণ করতে পারে এমন একমাত্র যোগ্য মুদ্রা ছিল) আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হল, কোন না কো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হল, এটাই একমাত্র বাস্তব কার্যকর ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের হাতে তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়েছিল। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নাই।
    তাই  আইএমএফ-স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করে থাকে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে।
    শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও সেকালে চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে এর বিনিময়ে নিজ অর্থনীতি সামলিয়েছে। অবশ্য এছাড়াও ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা অবরোধ আরোপের বাইরে ছাড় দিয়ে রেখেছে। তবে মূলত চীনের সাথে লেনদেনের ভরসায় রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। মনে রাখতে হবে, অবরোধের আরেক ব্যবহারিক মানে হল গ্রামে কাউকে যদি একঘরে করে রাখা হয় – এর প্রভাব একটা রাষ্ট্রের উপর তেমনই। সেটা যাই হোক, এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বর্তমান বিশেষ সম্পর্ক ও  এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। তাদের আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের গোড়ার কথা এটা। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই তা ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র হিসাবে সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এমন যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার লম্বা যৌথ পরিকল্পনা আছে।

    ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কীঃ
    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু ও দাঁড়িয়ে আছে এটাই তারা রিয়েলাইজ করে না। এই ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো তখন এতে অংশ নেয় নাই (আবার আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্য-পদলাভের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা)।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো সেই থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমিতভাবে বার্টারে কিছু পণ্য বিনিময় হত। কিন্তু এভাবে কতদিন?  এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই আইএমএফের সদস্যপদ পায় ও নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধানত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া প্রবলে  শুরু হয়ে গেছে। প্রধানত মানে? মানে হল, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের  সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোন একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটাই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মত। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দোকান কেউ দাড়াতেই পারে না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে ঐ দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এদিকে ইতোমধ্যে  চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে পারায় গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে।

    চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানোঃ

    China's annual average crude oil imports

    Source: China General Administration of Customs, based on Bloomberg, L.P.

    এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হল, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয় [World’s largest Importer]  …..more than 10 million barrels a day last year। মানেই তার পরিশোধ করা এক বড় পেমেন্ট হল জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হল, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ঐ ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা বা গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একবার রাজি হয় ভরসা করে – এভাবে। কিন্তু এর ভিতরে  ইরানকে নিয়ে গোনায় ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে কখনও  দেখায়নি। আর ইরানের কাছে চীনের দেয়া প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মত হতে হবে এই শর্তের।  ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে ইরানের বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাব। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই, কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ইরানের হাতে এর বিকল্প আর কী আছে? ব্যাপারটা হল, পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! এই হল ইরানের বাস্তবতা। যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝা যেতে পারে।

    সেটা যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্প আরো  কড়া অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা (একে তেল পাঠানো রি-সেল করার জন্য) ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত এই প্রথম কোন তেল কিনে নাই। তাও সেটা আবার সকলকেই  কনসেশন রেটে আর ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছিল এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি এমন হলেও এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করায় রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, একথা ইতোমধ্যেই লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হল ততটুকুতেই নয় বরং নতুন এক চীনা গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতে হাজির হতেও বড় ভূমিকা রাখবে। যেখানে ইরান সেই নতুন ক্ষমতার পাশে বুক ফুলিয়ে হাটবে তা বলাই বাহুল্য!  এজন্যই বলা হচ্ছে এই চুক্তি পালাবদলের শুরুর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্যতম হবে ভারতঃ
    ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন ও প্রকাশিত যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দিবে, দিশেহারা করে দিবে। অথচ, এর আগাম কোনো হদিস এই কথিত চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না।  বরং আমরা বিস্মিত হই দেখে যে, হবু-চুক্তি প্রকাশ হবার পরে সবচেয়ে বেশি অহেতুক বাজে কথা বলা হামবড়া লোকটাই এখন সবার আগে মাথা নিচা করেছে। বিসিসিকে এরা যা বলেছে এর সারকথাটা হল, তারা হেরে সব মেনে নিয়েছে। বিবিসি লিখছেঃ

     “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে। মি. চক্রবর্তীর কথায়,”ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি,চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” “আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে – কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।”
    —এরপর আর আমাদের কিছুই কী বলার আছে!

    এর মানে, এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে সব গুটিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরতে মানসিকভাবে তৈরি। কিন্তু ভারতের দুর্দশা তো এতেও শেষ হবে না। এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন কঠিন এক  দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবার মুখে নিয়ে যাবে যেখানে – ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারত যদি আমেরিকা ক্যাম্পে যায় তা গেলে হয়ত সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু সাথে খামোখা অনেক দায় আসবে যেগুলো  আসলে হুদাই পশ্চিমের ব্যাগেজ টানা হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে  সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে বাইরে থেকে সব অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফিরে তবে চীনের টার্মেই ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে।

    আবার উপরে এই যে অবলীলায় বলছেন,  “ভারতেরও শেয়ার থাকবে” – এই কথা কয়টা তো মারাত্মক ভীতিকর। মানে ব্রিকস ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাংক ইত্যাদি এমন সবখান থেকে ভারত গুটিয়ে যাবে কেবল নিস্ক্রিয় পার্টনারের মত  শেয়ার মালিকানা নিয়ে থাকবে – তাই কী? তার মানে গত এক সপ্তাহের মধ্যে কথার চাপা আর তুবরি ছুটানো লোকগুলো সব হার মেনে নিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে  -সেলফ, নিজ উদ্যোগে??

    আবার যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য – এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতেরই বহুমুখী স্বার্থ  যে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে সেটা তারা আগে দেখতেই পায়নি, টেরই পায় নাই! তাদের চোখে “মেরা ভারত মহান” হয়েই ছিল বা “অনেক ক্ষমতাবান” হয়েই ছিল! তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থের দিক থেকেও  বহু পিছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ।

    ভারত ইরানের জাভেদ জারিফকে প্রবল হতাশায় ফে্লে এর পরিণতি খাটো করে দেখেছিলঃ  
    আবার ঘটনা দেখেন সেদিন কীভাবে ঘটেছিল। তেলকেনা বিষয়ে ভারতের পিছলানির আলাপ সেই ২০১৮ জুনে নিকি হেলির ভারত সফরের সময় থেকে শুরু আর মোচরানি দিতে শুরু করেছিল। ভেবেছিল কী জানি বিরাট ক্ষমতাবান এক ভারতীয় পাঞ্জাব অরিজিনের মানুষ হাতে লেগে গেছে, ভারতকে আর পায় কে!  তাই সেসব মোচরানি! এছাড়া  সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ [Mohammad Javad Zarif] এক দিনের ঝড়ো সফরে ভারত এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল; আমেরিকান অবরোধের অজুহাত দেখিয়ে। অথচ  চীন তখনও তেল কিনা জারি রেখেছিল। বিশেষত সেবার যেখানে তেল ইরানি পাহারায় ইরানি ট্যাঙ্কারে ভারতের তীরে পৌছে দেওয়ার সস্তা অফার ছিল। তবু ভারত এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মত “ফাইনাল ওয়ার্ডস” শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ঐ আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস [CSIS] -তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন [Iran not disappointed with India for not buying oil from Tehran: Jaishankar] তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো ভয়ঙ্কর সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, [we frankly understand each other’s compulsions and possibilities,] – “যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে”। এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? বুঝে শুনেই তো যার যার লাভালাভের সন্ধানে ভারত ইরানকে ছেড়ে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছিল! তাহলে চার দিকে আজ চীন-ইরান চুক্তির খবরে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? জয়শঙ্করের সম্ভবত অনুমান এই যে আমেরিকার CSIS থিঙ্কট্যাঙ্কে দাওয়াত পেলে জাতে উঠা যাবে।  কিন্তু গ্লোবাল সিস্টেমটাকে বুঝবার  যে দুনিয়াদারি সেখানে আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা গ্লোবাল অর্ডার যে ভেঙ্গে পড়েছে  এটা তো নিজের যোগ্যতায় জেনে নিতে হয়, আর ঠিক করতে হয় কী কী করব না!
    যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা ঠিক কী হয়েছে সেটাও বুঝেনি মনে করার কারণ আছে। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুন, “ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে”। এর মানে ঘটনাকে কত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখছে। ভাবছে ব্যাপারটা হল ভারতকে কেবল একটা রেল প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া।  ঠিক একই নাদান বুঝ  বিবিসিকে দিয়েছে ভারতের এক সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। বলেছেন তাদের ঠিকাদার কোম্পানিটা আসলে নাকি ঢিলা!  কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ হিন্দুর ঐ রিপোর্টেই ভেতরে ঐ চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। ভারতকে যে  মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়শুণ্য বের করে দিবে সেদিকটা দেখতেই পায় নাই। এছাড়া নিজে  অন্তত অবকাঠামো বিনিয়োগে ঘাটতি  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেসব তো আছেই।
    এর সোজা মানে হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল – আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই তখনকার এসব অনুমানের উপর খুশিতে ডগমগ আত্মতুষ্টিতে থাকা ভারত এখন কিভাবে অনুসিদ্ধান্ত টানে যে এখন ভারতের যা ক্ষতি তাতে সব দোষ চীনে্র? বড়ই বিচিত্র ভারতের ভিকটিমহুড মন!
    যেমন দেখেন এনিয়ে আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনামঃ ‘”চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন”, “ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ” – এটা নাকি আবার আমাদের প্রথম আলোর সারা দুনিয়ার মিডিয়া ঘেটে করা এক ডেস্ক রিপোর্ট।  বুঝেন অবস্থা তাদের চোখ কত সংকীর্ণ। আবার “চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি”। কিন্তু ট্রাম্প বাবাজি অস্বস্তিতে পড়বে কেন? তিনি কী ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি কেন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?  অর্থাৎ এর মানে হল,  এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা তিনি আমল করতে পারেনি।  আসলে এখনও অনেকেই ব্যাপারটাকে নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে  – ভারত চাইলে  ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে কোন প্রজেক্ট থেকেই বাদ দিতে পারে না! আহা কী সুবিধা!

    এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে আমরা কিছুটা বুদ্ধিমান লোকজন আছে মনে হচ্ছে। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে অথচ মোদী সরকার সেটা আগে বুঝতেই পারেনি।’ অর্থাৎ  কংগ্রেস অন্তত বিনা প্রসঙ্গে চীনকে দোষী করার দিকে যেতে চায়নি; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে।

    মাথা নিচা ভারতের বুদ্ধিমানেরাঃ
    তবে এই প্রথম আমরা এক নতুন ধরণের ভারতকে দেখতে পাচ্ছি যারা চীন-ইরান হবু চুক্তির কথা প্রকাশিত হবার পর একেবারেই চুপসে গেছে, যেন তাদের দম্ভ কমেছে অন্তত কিছুটা। বিশেষ করে থিঙ্কট্যাকের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন যারা এমন ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলাদেশের ১/১১ এর সময়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদুত  পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর পরিবর্তন অবাক করার মত। ওআরএফ – এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে  সর্বশেষ জড়িত এই সাবেক কূটনীতিক, যেখানে সেখানে কটু কথা বলার ক্ষেত্রে খুবই খ্যাত, তিনি বিবিসির সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তার ইঙ্গিতটা হল যেন বলা যে, আমরা চীন-ইরান চুক্তির কাছে হেরে গিয়েছি আর তা মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের স্বর এমন নরম হয়ে বদলে গেছে। তবে  স্বর বদলে  নরম করে নেয়া প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন আরেক নারী ব্যক্তিত্ব, তিনি  দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজ নামে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্কের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী। বিবিসির কাছে তিনি প্রায় সব প্রশ্নেই ভারতের দোষ দেখেছেন বা হার স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি  “ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল”  বলেছেন। এছাড়া বলেছেন, “ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই!”।  মানে একদম গুলে গিয়ে সবাই যেন মোম হবার দশায়।  যদিও তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে”। মনে হতে পারে তিনি এখানে পরোক্ষে হলেও চীনকে দায়ী করছেন সুবিধা তুলে নেওয়ার জন্য। যেখানে ব্যাপারটা হল আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিকে যদি বোকা হয়ে সুবিধা করে দেন সেক্ষেত্রে সে সুবিধা তো নিবেই। গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের দিনগুলোতে সামলে না চললে প্রতিদ্বন্দ্বি সুবিধা ত নিবেই। সেখানে প্রেসিডেন্টের নানান ক্ষমতার মর্ম ও ওজন বুঝে না এমন কোন দেউলিয়া ব্যবসায়ী যদি হঠাত করে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আসনে বসে পড়ে তবে তার ‘কেলাসনেস’ বা অযোগ্যতা আমেরিকার ক্ষতি তো করবেই। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি এভাবেই সুযোগ নিয়ে নিয়ে সামনে ধেয়ে আসছে এবং আসবেই – এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। আর এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তার চিন্তা করার প্রকৃত সামর্থ ও যোগ্যতা তার যে লেবেল বা মানের তাতে শেষে আজ সে ঠিক সেই মাপের বামন হয়ে গেছে।  ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা খাটো করে দেখা বা ইরানের তেল না কিনলে ভারতের কিছুই হবে না এই হামবড়া ভাব – এভাবে ট্রাম্প আর মোদী মিলে ধারাবাহিক ভাবে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেন ইরানকে ঠেলতে ঠেলতে চীনের কোলে ফেলে দিয়েছে। এখন এর কাফফারা দিতে দিতে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকে তাই দেখার বিষয়!

    চিন্তায় অযোগ্য আর বেপরোয়া মানুষেরা এমন কাফফারা দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়! দিন সবারই একদিন আসে, আগে আর পরে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-350

     

    সবার শেষে বলতে আসলেন নরেন্দ্র মোদী, তিনি বলে উঠলেন – “না, সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢুকতে আসেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই। লাদাখের কোনো বর্ডার পোস্ট অন্যের দখলে যায়নি”। এভাবেই মার খেয়ে মার হজম অথবা কান্না হজম করতে হয়েছে মোদীকে! চীনের হাতে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে ডাকা ভারতের সর্বদলীয় সভাতে তিনি এভাবেই তার কথা শুরু করেছিলেন। এ যেন দুই বারো-চৌদ্দ বছরের বাচ্চার মারামারি আর তাতে দুই বাচ্চার বাবারা যখন সালিশ মিটিংয়ে বসেছে সেখানে হঠাৎ মার খাওয়া বাচ্চার বাবা বলে বসলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ মারেইনি”। স্বভাবতই এরপর আর অন্য কারো কিছু বলার থাকে না, মিটিংও ডিসমিস হয়ে যায়। অর্থাৎ কঠিন মার হবে কিন্তু আওয়াজ বের হবে না সিচুয়েশন। কিন্তু মোদী এমন বললেন কেন? যেখানে ঐ মিটিংয়েরই প্রথম দিকের বক্তৃতায় এমনকি মোদীর মন্ত্রীরা বলেছেন, চীনা সৈন্যরা ভারতের ভূমি দখল করেই তাদের সেনাদের হত্যা করেছে!

    রাষ্ট্র বলতে একটা নেশন-স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র বুঝ, এক ফান্ডামেন্টাল সমস্যা
    মোদী কেন এমন বললেন, এই প্রশ্নের জবাবের আগে আমাদের অন্য কিছু সিরিয়াস আলাপ সেরে নিতে হবে। আমাদের মত দেশগুলোতে রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্র বুঝা হয়ে থাকে যেটা আসলে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণাই; যদিও এখানে সেটা ‘ধর্মীয়’ কিনা এর চেয়ে কথিত ‘জাতি” এই ভুতুড়ে ধারণাটাই মুল সমস্যা। আর এই ‘নেশন’ কথাটাকে সবাই কথার কথা হিসাবে রাষ্ট্র বলেও ডাকে। দুনিয়াতে প্রথম কলোনি দখল শুরু হয়েছিল সতেরো শতকে।  এমন দখল করা প্রথম ভূমি হল ভার্জিনিয়া, আমেরিকায় এই উপনিবেশ, যা ১৬০৭ সালে ব্রিটিশদের হাতে দখল হয়েছিল। আর সেই থেকে শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (প্রায় টানা ৩০০ বছর) সারা দুনিয়ায়ে কলোনি দখল টিকে ও চালু ছিল। আর, এরপর থেকে কলোনিমুক্ত স্বাধীন করে দেয়া শুরু হয়েছিল। এই লম্বা কলোনি যুগের দখলদার রাষ্ট্রের কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজদেশের রাষ্ট্র-কাঠামোই হল নেশন-স্টেট [nation-state] ও এর ধারণা। সেযুগে দখলে বের হওয়া কোম্পানির (যেমন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি) সামরিকভাবে সজ্জিত জাহাজ নিয়ে বের হয়ে পড়া ছিল ঐ সময়ে ওসব সমাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ও প্রধান ব্যবসা।

    জনপ্রতিনিধিত্বের রিপাবলিক রাষ্ট্র কেমন হওয়ার কথা ছিলঃ
    ইংল্যান্ডের কথাই যদি ধরি, রাজতন্ত্র [monarchy] [মানে একটা রাজবংশ বা ডায়নেস্টির শাসন যে, রাজার ছেলে রাজা হবে] ভেঙে প্রথম রিপাবলিক বা জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা হিসাবে দেখা হয় ইংলিশ রেভোলিউশনকে (১৬৪২-৬০) [English Revolution]। যারা রেভেলিউশন বলতে চায় না এদের অনেকে এটাকে “ইংলিশ সিভিল ওয়ারও” বলে থাকে। এ্মন জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো হওয়ার কথা এমন যে এটা  একটা রাজনৈতিকতা বা পলিটি [Polity] প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হব্ব। যেখানে সমাজের সব অংশকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সমাজের সকল অংশকে জায়গা দিতে হবে, কথা বলতে দিতে হবে, সবাইকে শুনতে হবে ইত্যাদি। এভাবে সবার জন্য যা ভাল হবে এমন এক “কমন গুড” এর পক্ষে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে এর লক্ষ্য। এভাবে এক “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” অর্থে রাষ্ট্রগঠন, এই ছিল এর উদ্দেশ্য।

    কিন্তু সেসময়ের বৃটিশ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ব্যবসা ছিল কলোনি দখল কোম্পানির মালিক হওয়া। তাই ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর স্বার্থে “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” গঠনের সব চিন্তা সবকিছু উলটে দিয়ে বাস্তবে যে প্রথম রিপাবলিক গড়েছিল তাই ছিল নেশন-স্টেট।
    অর্থাৎ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটাই পলিটিক্যাল কমিউনিটি হিসেবে গঠিত আর হলো না। এর বদলে রাষ্ট্রের বাইরের দিকে তাকিয়ে এক রাষ্ট্র গড়া হল। যেমন ঐ কলোনি দখল ব্যবসা কোম্পানিগুলোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইউরোপের পড়শি রাষ্ট্রের (যেমন ফরাসি বা ডাচ রাষ্ট্রের) সমতুল্য কোম্পানি – যেমন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হল ডাচ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি, এরকম। তাই ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো নিজের স্বার্থে চাইল এই নেশন-স্টেট। যাতে সকল ব্রিটিশ মানুষ কথিত ‘এক জাতির’ আওয়াজ তুলে অপরাপর ডাচ বা ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে নিজ দেশের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বিনা-বিভক্তিতে সকলে খাড়া হয়ে যায়। এতে কলোনি দখলের কোম্পানিগুলোর স্বার্থই যেন সব ব্রিটিশ নাগরিক-মানুষের স্বার্থ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এতে সকল বৃটিশ নাগরিক বিশেষত যারা প্রান্তজন, গরীব বা কম আয়ের মানুষ – তারা কী চায়, তাদের সমস্যা কী সেটা আর তাদেরকে বলতে সুযোগ দেয়া হল না, শুনাও হল না। এককথায় “কমন গুড” আর হল না।  কলোনি দখল আর দাস ব্যবসায়ীদের স্বার্থটাই কথিত “নেশনের স্বার্থ” বলে চালিয়ে দিতে তা সবার উপরে চেপে বসল, চাপিয়ে দেওয়া হল। নেশন স্টেটের কাজই হল এই চাপিয়ে দেয়াটা নিশ্চিত করা।

    রেনেসাঁর ধারণার মূলকথা হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্রঃ
    রিপাবলিক বলতে নেশন-স্টেট ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় মূলত যে দুই নিট ক্ষতি হয়ে যায় তা হল – এক. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হলে সব পক্ষকেই শুনার যে বাধ্যবাধকতা থাকার কথা তা হারিয়ে যায়। দুই. অন্যের দেশ কলোনি-দখল করা ও সম্পদ লুট করে আনা বৈধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র সব জায়েজ করে দেয়।  আর সবচেয়ে ভয়াবহ তৃতীয় ক্ষতিটা হল, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিকল্প হিসাবে রিপাবলিক বা গণপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র বলতে আসলে নষ্টা নেশন-স্টেট রূপটাই রেনেসাঁ চিন্তার সর্বোত্তম উপহার দাবিতে হাজির হয়ে যায়।

    রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন রায়ের হাতে ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্রের মশালঃ
    কমিউনিস্টদের দাবি রামমোহন রায় ভারতে রেনেসাঁ এনেছেন মানে, প্রগতিশীলতা এনেছেন। বাস্তবত কথা মিছা নয়। কিন্তু প্রগতির ঐ রেনেসাঁতে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে  ‘নেশন-স্টেট’ (জাতি-রাষ্ট্র) ধারণাই। অর্থাত জাতি-রাষ্ট্র ধারণা রেনেসাঁর ভিতর দিয়ে  রামমোহন রায় ভারতে এনেছেন। কিন্তু এর উপর আবার তাঁর দেখা ও বুঝের ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র বলতে একে তিনি বুঝেছিলেন, ধর্মভিত্তিক একটা জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে। মানে তাঁর বুঝাবুঝিতে  কথিত বৃটিশ জাতিরাষ্ট্রকে তিনি এভাবেই বুঝেছিলেন; এক  “এংলো ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ব্রিটিশ” জাতি, এভাবে। এখানে ‘এংলো ক্যাথলিক’ বলতে সেটা ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ধর্মটাই কিন্তু ইংলিশ রাজপরিবার এর যে ভাষ্যটা মানে কেবল সেই রূপ ও ভাষ্যটা।   কিন্তু এদিকে রামমোহনের  নিজ ভারতের বেলায় এখানে দুটা বড় ধর্ম হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও ছোট সংখ্যায় পালিত আরও অনেক ধর্ম আছে, টের পেলেন। তাই তিনি স্বাধীন ভারত একটা “জাতি-রাষ্ট্র” গড়ার প্রধান সমস্যা সমাধানের জন্য সবার আগে সবাইকে একই একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন। কিন্তু এরপর তিনি মাত্র আর ১৮ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতেই যেসব বাধা ও সমস্যার তিনি মুখোমুখি হচ্ছিলেন তা তিনি মারা যাবার পরে আরও বিরাট আকার ধারণ করে। শেষে তাঁর ব্রাহ্মসমাজ দুটো ধারাতে ভাগ হয়ে যাবার পর ক্রমশ তারা সকলেই অকেজো, স্থবির হয়ে যায়।  এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে আর তিনি মারাও গেছেন বলে এরপরে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের হাত ঘুরে এই প্রকল্প যেন “ব্রাহ্ম জাতি-রাষ্ট্র” হতে পারল না বলে নেহায়তই ‘না-পারতে’,  এটা এক ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র’ প্রকল্প হিসাবে মানিয়ে নেয়ানোর চেষ্টা হিসেবে হাজির করেন, এরা সকলে। ততদিনে কংগ্রেস দলের জন্মানোর সময় হয়ে গেছিল। তাই  ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস দলের জন্মের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসাবে  ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাই হাজির হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এটা মুসলমানদের জন্য অস্বস্তিকর। কংগ্রেসের মুসলিম সদস্যরা তো বটেই সমাজেও মুসলিমদের থেকে আপত্তি প্রবল হয়ে থাকে। এটা না হবার কোন কারণ ছিল না। কারণ, একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে  জনগণকে একটা ধর্মে আসতে হবে – এটা কী কোন পুর্বশর্ত হতে পারে?  কাউকে আরেক ধর্মে যেতে ফোর্স করা যায়? না সম্ভব?  এটাই তো বড় জুলুম, চরম অন্যায্য!
    মুসলমানদেরকে হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র মেনে নিতে বলা হচ্ছিল – কেন? গান্ধী ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে  মরবার আগে পর্যন্ত  এমন আবেদন একাজ করতে গিয়ে  “হিন্দু-মুসলমান এক” হতে বলে চলেছেন, অসহায় পাগলের মতন। কারণ ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হতেই ব্যাপক দাঙ্গা ছড়িয়ে পরেছিল। কিন্তু তাতে কী? বাস্তবে গান্ধী টের পেয়েছেন তার এই আবেদন কতটা অবসার্ড, উদ্ভট। কোন মানুষের কাছেই স্ব স্ব ধর্মত্যাগের আহবান খুবই অস্বস্তিকর। মানুষ একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে তাদের সবাইকে এক ধর্মে যেতে হবে, এক হতে হবে – এর কী সম্পর্ক?  অথচ সব জটিলতার, সব এবসার্ডিটির উতস হল একই ধর্মের এক জাতিরাষ্ট্র গড়ার কল্পনা – রাষ্ট্র সম্পর্কে এমন উদ্ভট ইমাজিনেশন থেকে। অথচ সহজ সমাধানটা হল, কে কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, সবাই নাগরিক। কিন্তু সমান নাগরিক। সমান অধিকার-সম্পন্ন নাগরিক। অধিকারের বৈষম্যহীন নাগরিক। কাজেই এরপর কে কোন এক না ভিন্ন ধর্মের নাগরিক তাতে কিছু এসে যায় না। কাউকে ধর্ম বদলাবার আহবান অথবা তথাকথিত হিন্দু-মুসলমান’  “এক হবার আবেদন” করতে মারা যাবারও কোন দরকারই পরে না। কারণ সেক্ষেত্রে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক।  কিন্তু গান্ধী-নেহেরুর কংগ্রেস নিজেদের এই উদ্ভট চিন্তার পরাজয় ঢাকতে হিন্দু শব্দটা লুকিয়ে ফেললেন কিন্তু সেই  হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র – এটাকেই কায়েম করতে সচেষ্ট থেকে গেলেন।
    কংগ্রেসের জন্মের পর মুসলমানেরা দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষার দেন-দরবার চালিয়েছিলেন। এরপর ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প হিসাবে মুসলিম লীগের জন্ম হয়ে যায়।
    কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার হল, মুসলিম লীগ “মুসলমান” জাতি-রাষ্ট্র কথাটা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেই বলতে হয়েছিল যাতে সে মুসলমানদের এতে, এদলে ডেকে আনতে পারে। কারণ, তাদেরকে “মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়েই” আলাদা রাষ্ট্র চাই একথা বলা ছাড়া উপায় ছিল না।  আর এই সুযোগে কংগ্রেসিরা নিজেদের হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের লোক – তাদের এই পরিচয় লুকিয়ে ফেলে দাবি করতে থাকে তারা কেবল জাতি-রাষ্ট্রের লোক এবং তারা প্রগতিশীল। কারণ তারা রেনেসাঁ মানা-বুঝা লোক। আর এখান থেকেই এক পর্যায়ে আর জাতি-রাষ্ট্র কথাটাও না বলে তারা  বলতে থাকে তারা জাতীয়তাবাদী।  যেন নেশন-স্টেট ধারণা থেকে জাতীয়তাবাদী ধারণাটা আলাদা।  তাই এই “জাতীয়তাবাদ” এক প্রগতিশীল ধারণা হয়ে যায়।
    আর এর বিপরীতে মুসলমানেরা ধর্মের রাষ্ট্র চায়, রেনেসাঁ মানে না- তাই তারা হয়ে যায় পশ্চাৎপদ – এই হয়ে যায় তাদের যুক্তি। বিশেষ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র আলাদা হয়ে যাওয়ার পর জমিদার-হিন্দুরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে  নিজেদের ক্ষমতা জমিদারি হারানোর বদলা নিতে গিয়ে এই “পশ্চাৎপদ-প্রগতিশীলতার” ভুয়া তর্ক ও যুক্তিটা তুলে ধরেছিল। আর সেই সাথে জাতি-রাষ্ট্র কথাতে যে তার হিন্দুজাতি্রাষ্ট্র আকাঙ্খা পরিচয় যাতে ধরা না পড়ে যায় তাই “জাতি” শব্দটা ভেঙে এবার ‘জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র’ বলা শুরু করল; যেন এটা জাতি-রাষ্ট্র থেকে এটা  ভিন্ন কোন ধারণা। এই রেনেসাঁ আর প্রগতিশীলতা এটাই ড; সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বুঝের ‘রেনেসাঁ’ আর ‘প্রগতিশীলতা’ ধারণার উতস। জিন্নাহ’র উপরে কুপিয়ে গেছেন অথচ নেহেরু-গান্ধীর হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের কংগ্রেস এটা চোখে দেখেন নাই। ভাবেন – এটা ভারতীয় রেনেসাঁ ফলে প্রগতিশীলতা , এই বলে কাভার দেন – এসব হল “জাতীয়তাবাদ”।

    ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র চিন্তার পরিণতিঃ
    ভারত-পাকিস্তানের পরিণতি জানলাম এখন ইউরোপের পরিণতি দেখা যাক। মূলত দু’কারণে সারা ইউরোপ. (৪৭ টা রাষ্ট্রের এক জোট হয়ে) ১৯৫৩ সালে জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ত্যাগ করেছিল।  তারা ঐ ৪৭ রাষ্ট্র একটা সম্মেলন ডেকে “পুর্ণ-স্নান সেরে” নিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করে  নিয়েছিলেন। স্ব স্ব রাষ্ট্র পুণর্গঠন করে নিয়েছিলেন যে জাতি-রাষ্ট্র আর না, সবারই এটা এখন  নাগরিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র।  কারণ এক. দ্বিতীয় বিশযুদ্ধে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তার সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ও প্রোডাক্ট হল জার্মানির হিটলার ও তাঁর শাসন।  হিটলারের উত্থান ও তাঁর নীলচোখের শ্রেষ্ঠ “জার্মান নেশন” – এই জাতগর্বের চরম বর্ণবাদী ভয়াবহতা দেখতে হয়েছিল সারা দুনিয়াকে।  এটা ছিল নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র ধারণার সবচেয়ে কদর্য ও চরম রূপ। সারা ইউরোপ কোনমতে এটা থামাতে পেরেছিল তবে নিজের মুরোদে না। মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দেয়া অর্থ ও সামরিক সহায়তায় তাঁরা সক্ষমতা দেখিয়ে  জিতেছিল । অতএব এরপর জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ফেলে দেয়া এটা ফরজ হয়ে যায়।  আর দ্বিতীয় কারণ, ঐ মার্কিন সহায়তা যেটা না পেলে সারা ইউরোপই  হিটলারের পদানত হয়ে যেত, ঐ সহায়তাটা পেতে শর্ত হিসাবে সারা ইউরোপকে দাসখত দিতে হয়েছিল যে, তারা দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ব্যবসা বন্ধ করে দেবে এবং কলোনিকৃত রাষ্ট্রগুলোকে মুক্ত স্বাধীন করে দেবে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ বিজয় পরবর্তী দুনিয়ায় রাষ্ট্রের যে ধারণা আঁকছেন, তবে তা তিনি করছেন মূলত একটা জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামো বর্ণনা করে। সে কাঠামোটা হল অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের এসোসিয়েশন হিসেবে জাতিসঙ্ঘ। অতএব রাষ্ট্র হতে হবে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র  এই বাধ্যবাধকতাও ছিল।

    এই বাধ্যবাধকতায় জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামোটা কী ছিলঃ
    রূপ্টা কী ছিল তা বুঝার সবচেয়ে সহজ প্রমাণ হল আমাদের সবার পরিচিত কাশ্মির। কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সাথে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে [Accession Treaty বা ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন] (যদিও অস্থায়ী) স্বাক্ষর করেছেন তাই কাশ্মির ভারতের অংশ হয়ে গেছে – এই দাবি নিয়ে নেহরু ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে রায় আনতে  জাতিসঙ্ঘে দরবার করতে যান। খুশি তিনি, কারণ তার চোখে এত সহজ এই মামলা, অতএব রায় তার পক্ষে আসবেই। এই যে আস্থা আর নেহরুর রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী। আর সেই সাথে জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি কী তিনি এর কিছুই জানেন না, অজ্ঞ। কখনো খেয়াল করেন নাই, বুঝতেও যান নাই। তাই তিনি বোকা হয়ে দেখলেন, জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরে গণভোটে আয়োজন করতে বললেন। আর সে ভোটের রায় নিয়ে সে ভিত্তিতে কাশ্মির কার থাকবে – ভারত বা পাকিস্তানের না স্বাধীন কাশ্মির হবে, কোনটা – তা ফয়সালা করতে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত যে শাসক কে হবে তা বেছে নিবার নাগরিক অধিকার, পাবলিক ভোট  – এই হল ভিত্তি।

    কেন জাতিসঙ্গ এমন রায় দিয়েছিলঃ
    কেন এমন রায়? কারণ সেকথাটাই জাতিসঙ্ঘেরও জন্মভিত্তি। এর মানে হল নেহরু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না। নেহেরু তো রাজা নিয়ে এসেছিলেন, ভেবেছিলেন রাজার সইয়ের হুকুমে কাশ্মির ভারতের।  কাশ্মির ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত – এরাই যে ক্ষমতার উতস তা নেহেরু জানতেন না। জানলে তো রাজার কাছে ছুটতেন না।  জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কলোনি দখল ‘হারাম’। তাই যেকোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই সিদ্ধান্ত নিবার হক রাখেন যে তারা কার দ্বারা শাসিত হবেন – এটাই, জাতিসংঘেরও জন্মভিত্তি। কোন ভূখণ্ড কোথায় কার সাথে যুক্ত হবে, কাদের দ্বারা শাসিত হবে, এর সিদ্ধান্ত নেবার একমাত্র এখতিয়ার কোনো রাজা নয়, কোনো সম্রাট বা সুলতানও নয়। সেই সিদ্ধান্ত নেবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ। এটা তাদের নাগরিক অধিকার।
    খেয়াল করুন কোনো, “জাতি”গোষ্ঠী নয়, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীও নয়। কোনো ‘নেশন’ নয়। আর এই যুক্তির ভিত্তিতেই জাতিসঙ্ঘ কলোনি দখল করা অবৈধ জ্ঞান করে। কাজেই রাজা-সম্রাটেরা কেউ কিছুই নয়। বাসিন্দা নাগরিকেরাই সব, তারাই ক্ষমতার উৎস। এ কারণে রাজা হরি সিংয়ের চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। তাই কাশ্মির সেকালের নেহরুর ভারতের নয়, একালে ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিলেও তা মোদীর ভারতের নয়। মোদীর কাশ্মিরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি করে নেওয়াও একই কারণে জাতিসঙ্ঘের চোখে অবৈধ। অর্থাৎ কাশ্মির ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের ‘নাগরিক অধিকারই’ মূল কথা; যেটা জাতিরাষ্ট্র বুঝের নেহরু বুঝেন নাই বলেই ধরা খাইছিলেন। তিনি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র সম্পর্কে নির্বোধ ও উদাসীন। তাই এর বাস্তবায়কও নন। তিনি আসলে এক জাতি-রাষ্ট্রের শাসক ও তেমনই রাজনীতিক। তিনি জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না বলেই কাশ্মির ইস্যুতে ‘বোকার সাহস” করে জাতিসঙ্ঘের রায় আনতে গেছিলেন। ধরাও খেয়েছিলেন।

    তাহলে এখন চীন-ভারত বিবাদের মধ্যে এসব কথার গুরুত্ব কী?
    আমরা আসলে এতক্ষণ ছিলাম রাষ্ট্রের ‘লোকাল’ দিকের আলোচনায় যে রাষ্ট্র জাতিভিত্তিক না নাগরিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক হতে হবে এই প্রসঙ্গে। এখন আমরা যাব এর ‘গ্লোবাল’ দিকে।
    রুজভেল্ট শুধু রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে সেকথাই সবাইকে নিয়ে সে সময় ঠিক করে দিয়েছিলেন তাই নয়। তিনি রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক কী হবে সেটাও ঠিক করেছিলেন।

    গ্লোবাল দিক মানে হল মূলত “আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের” দিক – যেটা মূলত গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্ডার এবং গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এসব দিক। আমরা এখন ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করব। ইংরাজি ‘অর্ডার’ শব্দটা নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা বা চালু করা  অর্থে ব্যবহৃত হয়। সময়ে এটা আইন প্রণয়ন অর্থেও।  মানে রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক বলতে আমরা বুঝাতে ও বুঝতে বলছি গ্লোবাল অর্ডার এর দিক।  অর্থাত এবার আর রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নয়  মূলত বাইরের এই অর্থে যে এতক্ষণ যদি রাষ্ট্রের ভেতরের অর্ডার নিয়ে কথা বলে থাকি তবে এখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার, বাইরের বা পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়মশৃঙ্খলা ও আইন অর্থে এক অর্ডার নিয়ে কথা বলব। তাই কথাটা এখানে গ্লোবাল অর্ডার বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকের মত বিষয়গুলোতে পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম-শৃঙ্খলার  বা সুশৃঙ্খলা বিন্যাস ঘটাতে একটা অর্ডার।।

    আগেই বলে নিয়া যাক েই গ্লোবাল অর্ডার স্থাপন আপনাতেই বা কর্তা ছাড়া হয় নাই। এই কর্তা হলেন চারবারের (১৯৩২-৪৫) লাগাতর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলোনো রুজভেল্ট [Franklin Delano Roosevelt  বা FDR]। দুনিয়াকে একটা গ্লোবাল অর্ডারে সাজানোটা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের হাতে হওয়াটা জায়েজ হয়েছে কী না – তা নিয়ে কথা বলা এখানকার প্রসঙ্গ নয়। সেটা খোলা রেখেই আমরা ইতিহাসে যা ঘটেছিল তা নিয়েই আগাচ্ছি।  তবে কোন সাবজেকটিভ কর্তা ছাড়া একাজ সম্ভবত হতই না।  রুজভেল্টের আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গ্লোবাল অর্ডার কী হবে এর এক নির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন। গ্লোবাল অর্ডার  বলতে যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কী হবে, কিভাবে হবে এর নির্ধারক হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। অথবা আরো সরাসরি বললে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতি নিয়ম, মুদ্রা কী হবে তা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঠিক হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারে। এই গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হয়ে ছিল বা আছে মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠান জাতিসঙ্ঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে। অবশ্য সাথে আরো কিছু অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান থাকলেও এরাই মুখ্য। গত সত্তর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারটা চালু থেকেছে। আর তা ভালো ও খারাপ দু অর্থেই। কিন্তু এখন এই প্রথম ক্রমশ অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীন আরো প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসছে। ফলে এবার চীনের নেতৃত্বের নতুন এক গ্লোবাল অর্ডার একে বদলে ফেলতে উঠে আসছে।

    তৈরি হন, গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছেঃ
    কিন্তু এর প্রমাণ কী? এই বক্তব্যের ভিত্তিই বা কী? কারো খেয়ালে বা নেহায়তই অনুমানে এমন কথা নিশ্চয় লেখা যায় না।  আসলে প্রথমে কথাটা কিছু লক্ষণ দেখে বলাবলি শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের দিকে, কিছু পশ্চিমা মিডিয়ায়। পরে আমেরিকা নিজেই সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্টাডি করে গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছে তা নিশ্চিত হয় ও আমাদেরকেও নিশ্চিত করে। এর রিপোর্ট ওয়েবে পাবলিক করে দেয়া ডকুমেন্ট আর যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। শিরোনাম ছিল “২০২৫ সালের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে” [“NIC Global Trends 2025 | (Published in- 2008)| ]। শুধু তাই নয়, পরেও এই স্টাডি চালিয়ে যাওয়া হয়। আরো দুটা রিপোর্টে – ২০৩০ সালে কেমন “NIC Global Trends 2030″| (Published in- 2012)| আর শেষেরটা ২০৩৫ সালে কেমন হবে [“NIC Global Trends 2035″| (Published in- 2017) ] এভাবে। সবগুলোরই একই রেজাল্ট আসে, আমেরিকা ডুবে যাচ্ছে চীন ভেসে উঠছে – নতুন নেতা চীন। বাস্তবে চীনের নেতৃত্বের এই স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে লিড নেয়া শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে।

    ঐ স্টাডিতে চীনের পিছনে পিছনে আর কার অর্থনীতি উঠে আসার সম্ভাবনা আছে, এরও স্টাডি-ডাটা সেখানে ছিল। এ থেকেই বুশের আমল থেকে আমেরিকা নিজের করণীয় ঠিক করে যে, ভারতের পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে একে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা – এটা তার কৌশল হবে। আর তা থেকেই বাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়ে। এমনিতে ভারতের অর্থনীতি খুব গরিবই; বিশেষ করে অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে। তবুও চীনের কাছাকাছি জনসংখ্যার বলে এর পটেনশিয়াল বা সম্ভাবনা আছে এমন “রাইজিং অর্থনীতি” মনে করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৯ সাল থেকে  চীনের নেতৃত্বে পালটা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক ধরনের কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক জন্ম নেয়। ভারত সেখানে যুক্ত হতে অফার পেলে যোগ দেয়। চীনও তার বিনিয়োগ সক্ষমতা থেকে ভারতের চাহিদামত ঋণ বিশেষত অবকাঠামোগত ঋণ প্রদান করতে থাকে। কিন্তু ততই আমেরিকার কাছে ফিরে ফিরে যাওয়ার ঝোঁক ও আমেরিকার অফার করা সুবিধা নেওয়ার ঝোঁক তার বাড়তেই থাকে। যদিও ট্রাম্প আমলে এসে আমেরিকা মনে করে, ভারতকে চীনের পেছনে লাগানো বৃথা। কারণ এটা তেমন কোনো ফলদায়ক নয়, তেমন রেজাল্ট নাই।

    কিন্তু ভারতের আচরণ এমন হয়ে যায় যে, সে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে থাকে যে, সে যেন চীন ও আমেরিকার মাঝে দুটার সাথেই স্মার্ট প্লে করে দু’জনের থেকেই নিজের সুবিধা আদায় করে ফুলে উঠতে পারবে। বর্তমান ভারত-চীন দ্বন্দ্ব-সংঘাত হল,  সেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মোদীর ভারতকে নিজ প্রকৃত সক্ষমতার দিকে হুঁশ-নজর করিয়ে দেয়ারই চীনা-উদ্যোগ, বলা যায়।

    ব্যাপারটা অনেকটা কাউকে মারধর দেয়ার পরে আবার যেমন বুঝিয়ে দেয়া যে কাঁদলে আবার আরো মার খাবি। কথিত বিশ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর চীন সাবধান করে দেয় যেন ভারত নতুন টেনশন আবার সৃষ্টির চেষ্টা না করে। তাই অবশেষে মোদীর সবল অবস্থান ঘোষণা যে “কেউ ভারতের মাটিতে আসেনি”। খুব সম্ভবত ভারতকে সামরিকভাবে আরো হেস্তনেস্ত করবে আর বুঝিয়ে দিবে যে চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করলে ভারতেরই বেশি ক্ষতি শুধু নয়, তার অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া থেকেই মোদির এমন হঠাত বক্তব্য – ‘কেউ ভারতের মাটিতে আসে নাই।’

    কিন্তু ভারতের কেন এমন হল কেনঃ
    ভারতের কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক বা নীতিনির্ধারক চলতি পুরা ইস্যুটাকে “গ্লোবাল অর্ডারের” দিক থেকে দেখেছেন এমন কোন মিডিয়া রিপোর্ট নজরে আসেনি। এর ওপর আছে ভারত মানেই আসলে এক নেশন-স্টেট ভাবনায় ডুবে থাকা ভারত। এর প্রধান স্বাক্ষ্য হল হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনীতি একমাত্র নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই নিজে দাড়াতে পারে।  মোদীর তথাকথিত বয়কট বা স্বদেশি অর্থনীতির ধারণাও বোকা বোকা কথার নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই জন্মাতে পারে।

    তাই এবার আরো সরাসরি বলে, যদি প্রশ্ন করা যায়, গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণের লিডার প্রশ্নে ভারত কার সাথে থাকতে চায় নিজের ভবিষ্যত ভাল হবে বলে মনে করে – আমেরিকা না চীনের সাথে? এখন পর্যন্ত ভারতের আচরণ থেকে এর জবাব হল ভারত জানে না। এবং না জেনেই এমন ফেলে রেখে থেকে যেতে চায়।

    অথচ এর সহজ জবাব হবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং সেটা এজন্য যে, যে নেতার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে সে আমেরিকা, সে ক্ষয়িষ্ণু শেষ হয়ে যাচ্ছে – তাই সে দুনিয়ার অতীত নেতা; বিপরীতে ভারত নিঃসন্দেহে নিজেই প্রধান নেতা হতে চায় অথবা অন্ততপক্ষে আগামী নেতা চীনের প্রধান সহযোগীর ভূমিকায় দেখতে চায়। তাই এটাই হতে হবে। এসবের বাইরে অন্য কিছু তো হতে পারে না। তাহলে সে বারবার অতীতের মধ্যে মানে আমেরিকার ভেতর আশ্রয় খুঁজছে কেন, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে কেন?

    এর জবাব ভারতের কাছে নেই। কেন নেই?
    মূল কারণ, গ্লোবাল দিকটা সে বুঝতেই পারে না। মূল কারণ, হিন্দুত্ববাদী জাতি-রাষ্ট্র বুঝের লোক। এর বাইরে তার দৃষ্টি যায় না, প্রয়োজনও দেখে না। গ্লোবাল বলে কিছু দেখতেই পায় না। তাদের দুনিয়া স্বদেশিপনাতেই!

    যেমন আমাকে একজন বলছিল, পাকিস্তান যদি চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে তাহলে ভারতও চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখলে সেটা দোষের হবে কেন? বা পারবে না কেন?

    প্রথম কথা, আমরা গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকদের সহযোগী (মূল নেতার সাথে প্রভাবশালী ভূমিকায়) কেউ একজন হওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলছি। স্রেফ দুটা রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয় নয় এটা। পাকিস্তান গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকারীদের কেউ নয়, সহযোগী হয়ে ওঠার তালিকাতেও কেউ নয়। পাকিস্তান অর্থনীতিগতভাবেও তেমন কোনো শক্তিশালী দেশ নয়। তাই বলছি গ্লোবাল অর্ডার বা এর নিয়ন্ত্রক বলতে কী বুঝিয়েছি সেটা আমল করাই হয় নাই, এই প্রশ্নের মধ্যে। অর্থাৎ এই প্রশ্নকর্তা যেন ভারত নিজেই!

    হিন্দি বা উর্দুতে একটা কমন ফিল্মি ডায়লগ আছে- “আওকাত দেখা দিয়া” না! মানে কারও বাস্তব মুরোদ বা স্টাটাস কি ও কেমন সেটা কোনো হামবড়া লোককে মনে করিয়ে বা দেখিয়ে দেয়া। চীন ভারতকে তার আওকাত মনে করিয়ে দিয়েছে; যদিও তার মিডিয়া ও বিরোধী দল, এমনকি তার নিজ দল পুরানা স্টাইলে এখনো ভাব দেখিয়ে যাচ্ছে! অর্থাৎ তারা ধারণাও করতে পারছে না চীন মোদীকে ঠিক কী দেখিয়ে দিয়েছে!

    কারো কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা নিশ্চয় দোষের নয়। তবে না থাকলে কেমন আচরণ করতে হয় সেটাই আলোচ্য। যতদিন সেটা অর্জিত না হয় ততদিন ভারত চীনের সাথে সংঘাতবিহীন সম্পর্ক রেখে বা সংঘাত এড়ানোর বুদ্ধিতে চলাই তার জন্য “সোজা রাস্তা” । আসলে চীন বুঝিয়ে দিচ্ছে মোদী তোমার হিন্দুত্ব, তোমার জাতি-রাষ্ট্র ধারণার বাইরের সবকিছুতে অবুঝ থাকা আর তোমার হামবড়া ভাব- এগুলো অচল! এভাবে চললে তুমি মরে যাবা – তাই এসব ছাড়তে হবে।

    চীন কী আগ্রাসনবাদী হয়ে উঠছেঃ
    নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “চীন যা করছে তা পড়শিকে দেয়া উস্কানি মনে হলেও এতে ম্যাসেজ দিয়েছে আমেরিকাকেই”।  আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটরা গালওয়ানের হত্যার ঘটনাকে “চীনের আগ্রাসন” বলছে।  কিন্তু ভারতের এক রিটায়ার্ড লে জেনারেল বলছে, “কে ক্ষমতায় বস – এটা ভারতকে চীনের দেখানো শেষ হয়েছে মনে হয়ে গেলে সে সব ভুমি ফেরত দিয়ে চলে যাবে”।

    একথার সাথে সম্ভবত আরেকটা কথা যোগ দিতে হবে – ততদিনে সম্ভবত চীন  সাথে – এক ডিসিপ্লিন্ড  অনুশাসন মেনে চলা – সুবোধ বালক, এমন ভারতকেও দেখব আমরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভূখণ্ড ফেরত আনা ব্যাপার নয়”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ট্রাম্প যখন লোভী সেলসম্যান, টোটকা ক্যানভাসার

    ট্রাম্প যখন লোভী সেলসম্যান, টোটকা ক্যানভাসার

    গৌতম দাস

     ২০ এপ্রিল ২০২০, ০২:৩৯

    https://wp.me/p1sCvy-2Xm

    –

    Anti-malarial drug Hydroxychloroquine – NYT

    করোনাকাল! মানে এখনকার দুনিয়ায় যখন করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাই সবখানে বর্তমান হয়ে আছে। আমরা এরই জীবন্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এর ভেতরেই জীবন-মৃত্যুর মধ্যে প্রতিদিন বসবাস করছি। বিশেষত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যখন কোন পরীক্ষিত ও প্রমাণিত ওষুধ বা কোনো প্রতিকার প্রতিষেধক মানুষের নাগালে মধ্যে এখনও নেই।

    আমরা অপেক্ষা করছি ভ্যাকসিন প্রতিষেধক হাতে পাওয়ার। কারণ এ ধরনের ভাইরাসের প্রতিষেধক মানবদেহ আত্রান্ত হলে প্রতিক্রিয়ায় নিজেই শরীরের ভেতরে তৈরি করে থাকে। আর যত দিন ও ক্ষণ এটা  আক্রান্তদের শরীরে ব্যাপকসংখ্যক পাল্টা তৈরি না হয়ে যায় তত দিনই আমরা ঝুঁকিতে এবং কষ্টে থাকি। এমনকি স্টাডি বলছে মোট আক্রান্ত লোকের কমপক্ষে দুই পার্সেন্ট  আক্রমণ সামলাতে টিকতে বা সহ্য করতে না পেরে মারাও যেতে পারে। এটাকে আমরা ভাইরাস প্রতিরোধী হয়ে উঠা মানুষ বা নতুন শরীর বা অ্যান্টিবডি [Anti-boby] বলে থাকি। মানব প্রজাতির জন্মলগ্ন থেকে আমাদের দুনিয়াতে মানুষের পাশাপাশি এধরনের কোটি কোটি অসংখ্য ভাইরাস এ পর্যন্ত হাজির হয়েছে আর আমরা আমাদের শরীরে এমন ভাইরাস প্রতিটিরই অ্যান্টিবডি হাজির করিয়ে টিকে গেছি। এই বিচারে এবারও অবশ্যই সফল হব আশা করা যায়। তবে এখনকার সময়কালটা হচ্ছে মেজরিটির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় দেয়ার, আর তত দিন কোনো মতে বেঁচে টিকে যাওয়ার সময়। আর ওদিকে ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধকের আবিষ্কার হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকছি, যা পাওয়া গেলে তা এরপর থেকে আক্রান্তের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে মানুষকে সহায়তা করবে। অর্থাৎ শেষ বিচারে মানুষের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়া একমাত্র পরিত্রাণ ও থিতু অবস্থায় পৌছানো।  এসব বিচারে এখনকার সময়টা এটাই হল মানব-প্রজাতির জন্য ক্রুশিয়াল ‘করোনাকাল’। মানে ‘নিও করোনাভাইরাস’ (বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া স্টান্ডার্ড নাম, কোভিড-১৯) নামে জীবাণুর সংক্রমণের কাল এটা। যে কেউ এর শিকার হয়ে পড়লে তা থেকে মৃত্যুও হতে পারে। এমন আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সবাই এই করোনাকালে জীবন্ত বসবাস করছি। বলাই বাহুল্য, এটা দুনিয়ার মানব-প্রজাতির জন্য   সাময়িক এক অসহায় তবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা।

    খারাপ সময়ে অনেক কিছু ধরে রাখা যায় না; অন্তত খুবই কঠিন হয়ে যায়। পরিচিত চিরচেনা দুনিয়াটাও সে সময়ে হঠাৎ করে খুবই অপরিচিত মনে হতে থাকে। কারণ কোনো কিছুই আর আগের অর্ডার বা পরিচিত নিয়মশৃঙ্খলের মধ্যে নেই, থাকে না দেখতে পাই। আমরাও অধৈর্য হয়ে উঠতে থাকি। কারণ বেঁচে থাকাটাই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠতে থাকে।

    এ সময় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় পড়ে মানুষের মূল্যবোধ [value]। তা ধরে রাখতে হিমশিম খাওয়া মানুষের মধ্যে বিপর্যয়ও দেখা দিতে পারে।  ভ্যালু বা মুল্যবোধ মানে, মানুষ কী করে আর কী করে না; করবে না, করতে পারে না – এ পর্যন্ত তৈরি হওয়া ও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর শাণিত হতে থাকা এ নিয়ে নতুন বিকশিত ভাবনাগুলো – যাকে আমরা মানুষের মূল্যবোধ বলি, তা ধরে রাখা খুবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই করোনাকাল মানুষের মূল্যবোধ রক্ষা বা ধরে রাখার পরীক্ষায় চরম এক ক্রান্তিকাল হয়েও উঠতে পারে। যেমন ইতোমধ্যেই পরিবারের আপন বাবা-মা করোনায় মারা গেলে তাঁকে ফেলে পালানো বা জানাজায় কোন দায় না নেয়ার ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। নিজ পাড়ার আশেপাশে হাসপাতাল করতে না দেওয়া বা কবরস্থান করতে না দেওয়ার মতামত প্রবল হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যুক্তি বা বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নয় বরং এক অজানা আশঙ্কা, অহেতুক স্বার্থপরতায় চরমে উঠে পড়তে চাইছি আমরা। অন্যকে মেরে হলেও নিজে বেঁচে থাকতে চাইছি – এমন ঝোঁক আমাদের মধ্যে বাড়ছে! এ’হলো করোনাকালের ফেনোমেনা!

    গত চার শ’ বছরের দুনিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসকে যদি আলোচনায় আনি তবে একে তিনটা বড় কালপর্বে ভাগ করে দেখতে পারি। প্রথমটা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত; যেটাকে ‘কলোনি ইকোনমি’ বা কলোনি-শাসনের ইতিহাস বলতে পারি। বিষয়টাকে অনেকে অর্থনৈতিক ইতিহাসের পর্যায় না বলে, ক্যাপিটালিজম’ শব্দ ব্যবহার করে বললে তা বেশি অর্থবোধক বলে মনে করে থাকেন। সেভাবে  এই প্রথম সময়কালটাকে আমরা ইউরোপের নেতৃত্বে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের যুগ” বলতে পারি। আর এরই দ্বিতীয় পর্যায় বা রূপটা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে  “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের যুগ” যা গত শতকের মোটা দাগে শেষ পর্যন্ত জারি ছিল ধরতে পারি। আর তৃতীয় পর্যায় ও রূপটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল চলতি শতকের শুরু থেকে (প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল থেকে বলা যায়) চীনের নেতৃত্বে এবং ক্রমেই যা আমেরিকার বদলে চীনের প্রভাব দখল নিয়ে বা জায়গা নেয়া হয়ে বেড়েই চলছে।

    দ্বিতীয় পর্যায়টায় ভাল এবং মন্দ বহু দিকই আছে, যার সবকিছু আমেরিকার নেতৃত্বে ঘটেছে। সেযুগেই প্রথম বহুরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জন্ম নেয় জাতিসংঘ। আর সাথে বাণিজ্য অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময় সুসম্পন্ন করার প্রথম বহুরাষ্ট্রীয় নিয়ম শৃঙ্খলার জন্ম দেয়া প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। যার মন্দ দিকটা হল এটা পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও তার ভায়রাভাই রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর পক্ষে কান্নি মেরে গড়ে তোলা। তবুওও উপরে এর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাওয়ার সময়কাল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সাল বলা হয়েছে এজন্য যে ২০০৯ সালেই প্রথম প্রশ্ন উঠে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকে আগে সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ার ছিল আমেরিকার (১৮%) সেখানে চীন তার মালিকানা শেয়ার বাড়াতে চেয়ে প্রস্তাব দেয়। আভ্যন্তরীণভাবে টেকনোক্রাটেরা চীনকে ভিতরেই রাখতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ভিতরেই জায়গা বড় করে আটিয়ে নেওয়ার পক্ষে প্রস্তাব তৈরি করে অ্যামেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিশেষ করে সিনেটে এই ফাইল গেলে তা কখনই অনুমোদিত না হয়ে ওর মৃত্যু ঘটেছিল। যে সিদ্ধান্তের প্রাকটিক্যাল মানে হল আমেরিকা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ভিতরে প্রভাব বিস্তারের ঝগড়ার খাতা খুলার চেয়ে বাইরে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সতীন নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে চীন লড়ে নেক – এভাবে লড়ার দিকে চীনকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  আর তা থেকেই চীনা প্রধান শেয়ারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর প্যারালাল সতীন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্ম ও বিস্তারলাভের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

    আগেই বলেছিল গ্লোবাল অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় যুগ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যার প্রভাব পরিণতি ভালো-মন্দ দুটো মিলিয়েই ছিল। তবু বড় কথা সেখানে একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নিয়মশৃঙ্খলা আনা প্রথম শুরু  হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় পর্যায়ে নতুন নেতা চীনের আগমনে আমেরিকার চাপ প্রভাব বাংলাদেশের মত দেশগুলোর উপর অনেকটাই হালকা হয়ে গেছিল। আমাদের হাসিনা সরকার বিশ্বব্যাংকের (আমেরিকার) প্যারালাল উতস চীনা ঋণ পাবার দরজা খুলে গেছিল।   কিন্তু তবু আগে দ্বিতীয় পর্বকালে আমেরিকার কর্তৃত্বে তৈরি হয়ে থাকা নেতৃত্ব ও অর্ডার এই প্রথম খোদ এক অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট  মানে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তাঁর আমেরিকা নিজেই গ্লোবাল নেতাগিরি ও দায় ছেড়ে দিতে শুরু করেছিল। এক অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট স্বেচ্ছায় গ্লোবাল কর্তৃত্ব ত্যাগ করা শুদ=রু করেছিল। আর এতেই পুরনো গ্লোবালিস্ট নেতা আমেরিকা হতে  শুরু করেছিল ন্যাশনালিস্ট, মানে এক জাতিবাদী আমেরিকা। গত এক শ’ বছরে আমেরিকার এই রূপ দুনিয়া আগে দেখেনি।

    যেকোনো সমাজে যার অর্থসম্পদ বেশি সমাজের দাতব্য কাজের উদ্যোগগুলোতে এর ব্যয়ভারের বড় অংশ তাকেই বইতে দেখা যায়। এটা বাস্তব এবং তিনি সামর্থ্যবান বলে এটা গ্লোবাল সমাজসহ লোকাল সমাজ সবখানেই সবচেয়ে স্বাভাবিক। এটা সেকালে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা বলে তো বটেই, এছাড়া আমেরিকা বড় জনসংখ্যা মানে বড় অর্থনীতির দেশ বলেও জাতিসঙ্ঘ ধরনের বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ব্যয়ভারগুলোর বড় অংশের আমেরিকা থেকে জোগান এসেছে, গত ৭০ বছর ধরে। অথচ এই প্রথম আমরা লক্ষ্য করছি – এসব ব্যয়ভার আর বইবে না বলে আমেরিকা থেকে হুমকি দেয়া শুরু হয়েছে। প্রথম এমন হুমকি এসেছিল খাপছাড়া ভাবে জুনিয়র বুশের আমলে। আর এবার করোনাকালে জাতিসঙ্ঘের এজেন্সি সংগঠন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার [World Health Org – WHO] পুরো চাঁদাদানই বন্ধ ঘোষণা করে দিয়েছেন ট্রাম্প।  আমেরিকার এপর্যন্ত প্রদেয় চাঁদা ছিল বাতসরিক ৪০০ মিলিয়ন ডলার।  তুলনায় এখন চীনের প্রদেয় ৪৪ মিলিয়ন। তবে এখনই এক কথায় বলাযায়, চাদা না দেওয়ার হুমকি আত্মঘাতি হবার সম্ভাবনাই বেশি। সম্ভবত অচিরেই আমরা দেখব একা চীনই ৪০০ মিলিয়ন দিচ্ছে কারণ স্বভাবতই সেক্ষেত্রে ঐ সংস্থায় চীনের প্রভাব সর্বোচ্চ হয়ে যাবে। এমনিতেই ট্রাম্পের অভিযোগ খুবই ঠুনকো ও অপ্রতিষ্ঠিত যে, এই সংস্থা চীনের সাথে কাজ করেছে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি মাসেও খোদ ট্রাম্পই সার্টিফিকেট দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছিল যে চীন উদার ভাবে করোনা নিয়ে সব তথ্য বা ডাটা সবার সাথে শেয়ার ও উন্মুক্ত করেছে। এমনকি অ্যামেরিকান গবেষকদেরকেও প্রবেশাধিকার দিয়েছে।  কিন্তু ট্রাম্প তখন করোনাকে তুচ্ছ করেছিল, হালকা করে দেখেছিল, সম্ভাব্য করোনা আক্রমণকে দুর্বল ভেবে অপ্রয়োজনীয় মিথ্যা বড়াই প্রকাশ করেছিল। আজ সেসব মিথ্যা বড়াই সামনে এসে যাওয়াতে সে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উপর আক্রমণ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। তাই এখন ট্রাম্পকে পালটা যে চরম সমালোচনা শুনতে হচ্ছে তা হল  চাঁদাদান বন্ধ করার টাইমিং। বিশেষত সারা দুনিয়া যখন করোনা সংক্রমণ মোকাবেলা ও লড়াইয়ে সবাই সক্রিয় প্রাণপণ লড়ছে আর প্রয়োজনমত গাইড লাইন ও সমন্বয় তারা এই সংস্থা থেকে পাচ্ছে।  আবার খোদ নিউ ইয়র্ক যখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিন হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া করোনা মৃত্যুর শহর। অথচ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ বাস্তবতা ও এই ফ্যাক্টরগুলোর কোনোটাই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে না। অর্থাৎ করোনা-উত্তরকালেও যে সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারতেন, সেই সিদ্ধান্ত তিনি এখন কোন বিবেচনায় নিলেন- এর সদুত্তর নেই। অর্থাৎ এই প্রথম আমেরিকা শুধু গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে নিজেকে খারিজ হয়ে যাচ্ছে না বরং খোদ রাষ্ট্রটা নিজের জন্যও মূল্যবোধে খামতি বা সঙ্কট তৈরি করছে।

    ঘটনার এখানেই শেষ নয়। খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটা ওষুধ কোম্পানির পণ্য বা ওষুধের পক্ষে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। তিনি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন [ Hydroxy-chloroquine] এই জেনেরিক নামের এক ওষুধের পক্ষে ওকালতি শুরু করে দিয়েছেন। এটা করোনাভাইরাসের নিরাময়ে আবিস্কৃত কোন ওষুধ নয়। এর কার্যকারিতা  মূলত ম্যালেরিয়া নিরাময়ের ক্ষেত্রে; সেকাজের জন্য কেবল পরীক্ষিত ওষুধ এটা। এর কার্যকারিতা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রেও আদৌ কার্যকর হবে কি না;  হলে কতটা অথবা কোন বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে এটা একেবারেই প্রয়োগ করা যাবে না কিনা ইত্যাদি কোন কিছুই এখন সব পরীক্ষা ও কার্যকারিতা প্রমাণ শেষ করে অনুমতিপ্রাপ্ত হয় নাই এই ওষুধ।  কেবল প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী কিছু করোনা রোগীর উপর এটা প্রয়োগ করা হয়েছিল বলেই মনে করা হচ্ছে যে এটা সম্ভাব্য ওষুধ হতে পারে, তাই।

    ওষুধ কোন সাধারণ পণ্য নয় যেটা সরাসরি আর পাঁচটা কোন পণ্যের মত বাজারে বিক্রির জন্য তোলা যায়। এমনিতেই কোন ড্রাগ অথবা কোন মুখে খাওয়ার খাদ্য বা শরীরে ব্যবহারের কোন কেমিকেল ইত্যাদি ভোগ্যপণ্য বাজারে তোলার আগে প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই নির্ধারিত অনুমতিদাতা প্রতিষ্ঠান থাকে – যেখান থেকে পরীক্ষিত ও ঐ পণ্যের কার্যকারিতা সত্য কিনা সেই সার্টিফিকেট আগাম পেয়ে নিতে হয়। কাজেই এটা কোন প্রেসিডেন্টের সুপারিশেই বিষয় নয় যে যেমন আমার চাল বা গম খেতে খুব সুস্বাদের এটা নিয়ে যান বলে যে কেউ ফেরি করতে পারে। এসবই কোন ওষুধ-পণ্যকে  বাজারে তোলা ও বিক্রি করার টেকনিক্যাল শর্তও। এই শর্তপূরণ না করে কোন ওষুধ বাজারে কেনাবেচা করার চেষ্টা এক মারাত্মক ক্রিমিনাল অপরাধ।  কারণ, ঐ ওষুধ যথার্থ নয় বলে সেকারণে এটা খেয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা কেউ মারা গেলে এর দায়দায়িত্ব কে নিবে তা চিহ্নিত ও দায়ী করার জন্যই এই সতর্কতা। এতো গেল টেকনিক্যাল দিক।

    অন্যদিকে, সাধারণত কোন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রেসিডেন্টের ব্যক্তি-ব্যবসায়িক স্বার্থ যদি প্রেসিডেন্টের কোনো সিদ্ধান্তের ইস্যুতে জড়িয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সেই নির্বাহী  ঐ স্বার্থের ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। মূলত এজন্যই কেউ প্রধান নির্বাহী বা মন্ত্রী হলে শপথগ্রহণের আগেই তিনি কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির মালিকানা বা নির্বাহী পদে থেকে থাকলে আগেই  পদত্যাগ করে থাকেন যাতে দুমুখি স্বার্থ সঙ্ঘাতের [conflict of interest] বালাই না থাকে। যেমন, কোনও প্রেসিডেন্ট কোনও ওষুধ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার হলে তিনি ওই কোম্পানির ওষুধ সরকারকে দিয়ে কিনাতে সরকারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে ফেলতে পারেন। এমনটা যেন না হয় তাই তিনি আগেই কোম্পানির মালিকানা-পদত্যাগ করে থাকেন।  এই হল, রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতাধারীদেরকে (মন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি এমন এদেরকে) একই সাথে তাদের প্রাইভেট ব্যবসায়িক কাজ থেকে দূরে রাখার নীতি।

    ট্রাম্প ও তাঁর বন্ধুদের শেয়ার মালিকানাঃ
    এসব দিক নিয়ে বিস্তর ঘাটাঘাটি করে তথ্য তুলে এনেছে আমেরিকার ফোর্বস গ্রুপের ম্যাগাজিন ‘FORBES’। ফোর্বস বলছে ট্রাম্পের এক ক্ষুদ্র মালিকানা আছে সানোফিতে, [ has a “small personal financial interest” in Sanofi, a French drug-maker that produces a brand-name……]।  তবে পাঠকেরা ক্ষুদ্র মালিকানা শুনে আবার যেন বিভ্রান্ত না হয়ে যায়। ফোর্বস তাই এই ক্ষুদ্র মানে কত ডলার এর একটা  এস্টিমেটও সাথে দিয়েছে – সেটা পরিমাণ হল ২.১ বিলিয়ন ডলার।

    “Trump’s three family trusts have investments in a Dodge & Cox mutual fund, with Sanofi as the largest holding, according to the Times.
    Forbes estimates the value of Trump’s Sanofi holdings to be less than $3,000; for context, Forbes estimates Trump’s total net worth at $2.1 billion”

    অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, ট্রাম্প কোন নীতির কোনটাই মানছেন না। তাই আমরা দেখছি এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন – যেটা আসলে  ‘সানোফি [SANOFI]’ নামের ফ্রান্সের এক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির পণ্য -সেই কোম্পানির মালিকানায় আছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনেরা; এমনকি খোদ ট্রাম্পও এই কোম্পানীর এক ছোট শেয়ারের মালিক – এমন খবর ছেপেছে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। ইঙ্গিত করছেন ট্রাম্প ও তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুরা এ কারণেই এই ওষুধের পক্ষে টাউটিং [touting] বা দালালিতে নেমেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ যদি একবার করোনাভাইউরাসে আক্রান্তদের অন্তত কিছু কিছু ক্ষেত্রে কার্যকারিতা আছে বলে প্রমাণিত হয়ে যায় [যদি লাইগ্যা যায়] তবে মুনাফায় লালে লালে হয়ে পারেন – এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে এরা সকলে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছে।

    “If hydroxychloroquine becomes an accepted treatment, several pharmaceutical companies stand to profit, including shareholders and senior executives with connections to the president. Mr. Trump himself has a small personal financial interest in Sanofi, the French drug-maker that makes Plaquenil, the brand-name version of hydroxychloroquine.” – NYT

    অথচ ট্রাম্প অ্যামেরিকান বাস্তবতা সেসব ফ্যাক্টসের পরোয়া না করে, উল্টো এই ওষুধ ব্যবহারের পক্ষে অন্ততপক্ষে পাঁচটি পাবলিক হাজিরাতে প্রকাশ্যে যুক্তি খাড়া করেছেন। তার এক কুখ্যাত আরগুমেন্টের মূল বক্তব্য হল- ‘আপনার আর কী ক্ষতি হবে’ (হোয়াট ডু ইউ হ্যাভ টু লুজ,‘What do you have to lose?’ )। এই কথা তুলে তিনি অপ্রমাণিত কার্যকারিতার ওষুধের পক্ষ নিয়ে প্রকাশ্য দালালি শুরু করে দিয়েছেন যা কোনো অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের মুখে খুবই অশোভন। ট্রাম্প বলতে চান যেহেতু ‘করোনাভাইরাসের ওষুধ বা ভ্যাকসিন এখনো আবিস্কৃত নাই, তাই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা পরীক্ষিত ও প্রমাণিত না হলেও এটা ব্যবহার করে দেখুনই না। এটা কাজে লেগেও যেতে পারে। এতে ক্ষতি কী?” নিউইয়র্ক টাইমস লিখছে, “What do you have to lose?” he asked five times on Sunday. এছাড়া ট্রাম্পের আহাম্মকি নিয়ে কথা বলাটাও একটা লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। যেমন তিনি নিচের উদ্ধৃত অংশের শেষে বলছেন,  “তাহলে ক্ষতি কী ব্যবহার শুরু করে দেন,……  আমি ডাক্তার না, কিন্তু আমার কমন সেন্স আছে …”। এর মানে দাড়াল তিনি নিজেই স্বীকার করে বলছেন তিনি ডাক্তার নন। তাহলে তিনি ওষুধ ফেরি করছেন কেন? তাঁর দাবি এটা তিনি কমন সেন্স দিয়ে বলছেন। আচ্ছা কমন সেন্সের উপর ভর করে প্রেসিডেন্ট একটা ওষুধ খেতে পাবলিককে বলতে পারেন? ওষুধ কী কমন সেন্স দিয়ে, তাও আবার অন্যের কমন সেন্সের উপর ভর করে খাওয়ার কথা, না খাওয়া যায়?  ঐ ওষুধ খাবার পর কোন জটিলতা দেখা দিলে বা ব্যক্তি মারা গেলে সে দায়দায়িত্ব কে নিবে? সেটা তো তখন এক খুনের মামলা দায়ের হবে! এছাড়াও কোন প্রেসিডেন্ট কোন বিশেষ পণ্য ভোগ-ব্যবহারের পক্ষে ওকালতি করা গর্হিত অপরাধ ও পক্ষপাতিত্ব। কারণ তিনি ঐ পণ্যের প্রতিদ্বন্দ্বি কোম্পানীর স্বার্থের ক্ষতি করছেন নিজের প্রেসিডেন্ট পদকে অপব্যবহার করে।

    Once again, according to a person briefed on the session, the experts warned against overselling a drug yet to be proved a safe remedy, particularly for heart patients. “Yes, the heart stuff,” Mr. Trump acknowledged. Then he headed out to the cameras to promote it anyway. “So what do I know?” he conceded to reporters at his daily briefing. “I’m not a doctor. But I have common sense.”

    সোজা কথা, ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটা হল, এক. ওষুধসহ যেকোনো পণ্যের পক্ষেই কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট টাউটিংয়ে নামতে পারেন না। এটা আইনি দিক থেকে গর্হিত কাজ। কিন্তু ট্রাম্প এখানে আরেকটা আড়াল নিয়েছেন। তিনি ইতোমধ্যে এই ওষুধ তার সরকারকে দিয়ে কিনিয়ে বিপুল সরকারি স্টক গড়েছেন। অথচ ওষুধটার কার্যকারিতা প্রমাণিত বা উপযুক্ত ছাড়পত্র-প্রাপ্ত নয়।  তিনি দাবি করছেন চলতি এই করোনার খারাপ সময়ে যতটুকু কার্যকর ওষুধ পাওয়া যায় তার সবটাই তিনি সংগ্রহ করার সুযোগ নিয়েছেন। তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে বলছেন “আরও স্টাডির জন্য আমরা অপেক্ষা করতে পারি না। কারণ রোগীরা মারা যাচ্ছে”।

    But Mr. Trump on Sunday dismissed the notion that doctors should wait for further study.

    “We don’t have time to go and say, ‘Gee, let’s take a couple of years and test it out,’ and let’s go out and test with the test tubes and the laboratories,” Mr. Trump said. “I’d love to do that, but we have people dying today.”

    Saying that the drug is “being tested now,” Mr. Trump said that “there are some very strong, powerful signs” of its potential, although health experts say that the data is extremely limited and that more study of the drug’s effectiveness against the coronavirus is needed.

    President Trump prevented Dr. Anthony S. Fauci from answering a question on hydroxychloroquine – NYT

    কিন্তু কোনো ওষুধ কার্যকর কি না, তা বলার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে, টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত ট্রাম্প একজন প্রেসিডেন্ট হলেও তা নিবার এক্তিয়ার তার নাই, তিনি নিতে পারেন না। এটা তাঁর কোন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট বা কমিটি তাকে পরামর্শ দিলে এরপর তিনি নিতে পারেন। কারণ তিনি পেশাদার ডাক্তার নন বা ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত-মন্তব্য করা তার এখতিয়ারের ভিতরেও পড়ে না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এখনই তাঁর সরকারের অন্তত দুজন এক্সপার্ট (Dr. Anthony Fauci and Dr. Deborah L. Birx,)  এই ওষুধ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।  প্রথমজন ফাউচি হলেন সরকারি “অ্যালার্জি ও সংক্রামক রোগবিষয়ক ইনস্টিটিউটের” পরিচালক এবং ট্রাম্পের করোনা সম্পর্কিত টাস্ক ফোর্স কমিটির একজন লিড মেম্বার। আর ডা. দেবরা ট্রাম্পের করোনাভাইরাসবিষয়ক কোর্ডিনেটর।  ফাউচি তার আপত্তির কথা সরকারি অভ্যন্তরীণ এক পরামর্শ সভায় উচ্চারণ করেছেন। এই ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে তিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন।  ডা: এন্থনি ফাউচি মনে করেন, এখনো এটা “কান কথা” (এনেকডোটাল এভিডেন্স, anecdotal evidence ) পর্যায়ের তথ্য, ফলে প্রমাণিত সত্য নয়। এমনকি ট্রাম্পের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিএনএনের এক সাংবাদিক প্রকাশ্যেই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ওষুধের কার্যকারিতার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে বিফ্রিংয়ে উপস্থিত, ফাউচির বক্তব্য জানতে চান। কিন্তু ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ফাউচিকে মুখ খুলতে বাধা দেন।  “ফাউচি কথা বলবেন না”  বলে সরাসরি তাঁকে থামিয়ে দেন। মানে, যা বলার ট্রাম্প নিজেই বলবেন। ট্রাম্প এমনকি তার এফডিএ [FDA] কমিশনার স্টেফান হান – এর উপরও চাপ প্রয়োগ করে রেখেছেন যাতে ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিষ্ট্রেশনের কমিশনার হিসাবে তিনি কোন নেতি মন্তব্য না করে বসেন।

    ট্রাম্পের এই টোটকা কানভাসিং টাউটারি এত ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে যে এক মেডিকেল রিসার্চ প্রকাশ করা জার্নাল [International Journal of Antimicrobial Agents (IJAA).] বিবৃতি দিয়ে এই ওষুধ বিতর্ক থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ঐ জার্নাল বলেছে তাদের প্রফেশনাল সমিতি ISAC [International Society of Antimicrobial Chemotherapy ] এর বোর্ড মনে করে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন প্রসঙ্গে যে আর্টিকেল তাদের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তা তাদের আকাঙ্খিত স্টান্ডার্ডের নয়। [The ISAC Board believes the article does not meet the Society’s expected standard]।

    আমেরিকার কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী, সব নির্বাহী ক্ষমতা একহাতে – সেটা প্রেসিডেন্টের হাতে রাখা হয়েছে।  তাই প্রেসিডেন্টের অসংখ্য উপদেষ্টা – পরামর্শক থাকে কিন্তু নির্বাহী তিনি একা। এতে বলাবাহুল্য এর সব দায়দায়িত্বও কিন্তু ঐ একব্যক্তির। তাই ্তার হোয়াইট হাউজে “সিচুয়েশন” রুম [situation room] বলে একটা শব্দ চালু ও বিশেষ রুম আছে। মানে হল যেখানে প্রেসিডেন্ট এসব পরামর্শকদের আলোচনা ও বাদানুবাদের ভিতর দিয়ে ফাইনাল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। আমেরিকার এক্সিসিয়স বা AXIOS বা নামের এক ওয়েব সাইট ঐ সিচুয়েশন রুমের বিতর্ক কেমন ছিল এর এক উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা তুলে ধরেছে। যেখানে ট্রাম্প নিয়োজিত এক ব্যবসাবিষয়ক এজেন্ট পিটার নাভাররো [economic adviser Peter Navarro] কে ডাক্তার গবেষক ফাউচি [Dr. Anthony Fauci ] আচ্ছা করে ধোলাই করে দিয়েছেন। ফাউচি সরাসরি বলেন, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  ওষুধের পক্ষে যা বলা হচ্ছে তা আসলে এখনো কানকথা মাত্র [Fauci pushed back against Navarro, saying that there was only anecdotal evidence that hydroxychloroquine works against the coronavirus.]।

    অর্থাৎ মুনাফা কামানোর চকচকে লোভে ট্রাম্প যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছেন। আর কোন ওষুধের টেকনিক্যালবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারকে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নেয়া এখতিয়ার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। যেন কোনো রোগী দেশের প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসা করে বেছে ওষুধ খাবেন – এটাই ট্রাম্প দাবি করলেন।  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প এই হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  ওষুধের ব্যবসাটা ধরতে এতই মরিয়া যে, তিনি এক পর্যায়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে হুমকি ধমকি দিয়ে বসেন [Hydroxychloroquine: The unproven ‘corona drug’ Trump is threatening India for]।

    Hydroxychloroquine: The unproven ‘corona drug‘ Trump is threatening India for– BBC

    ম্যালেরিয়া ও দুই চাপাবাজ সরকার প্রধানঃ
    ম্যালেরিয়া মূলত এশিয়ায় বা আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়। তাই বলা যায় এদিকের রোগ।  তাই দুনিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ উৎপাদনে বড় উতপাদক দেশগুলো হল এশিয়ায়, বিশেষত বড় জনসংখ্যা বা বাজারের দেশ ভারতে। ভারতের তিনটি কোম্পানি ভারতের বার্ষিক চাহিদার চেয়েও ১০ গুণ বেশি পর্যন্ত কাঁচামাল উৎপাদন ও তা থেকে এই ওষুধ পর্যন্ত উৎপাদন সক্ষম। তাই ট্রাম্প ভারতের মোদীকে ফোন করে আমেরিকায় হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ রফতানি-সরবরাহের অনুরোধ জানান। অর্থাৎ ওষুধের কার্যকারিতা প্রমাণিত হোক আর না হোক, ট্রাম্প আমেরিকার সরকারি স্টক হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের সরবরাহ দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন। যেন ট্রাম্প একটা পাবলিক ইমেজও চাচ্ছিলেন যে, করোনার কথিত ওষুধ সংগ্রহে তিনি কত তৎপর। ওদিকে এই অনুরোধ পেয়ে  মোদিও দেখলেন এটা তারও কথিত ‘দেশপ্রেম’ দেখানোর এবং গলাবাজি একটা বিরাট সুযোগ। তিনি পাল্টা ট্রাম্পকে জানিয়ে দিলেন, নিজ দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটিয়ে তিনি সাপ্লাই করতে পারছেন না। আসলে এটাও একটা মিথ্যা কথা।  কারণ ভারতের বছরের চাহিদা সর্বোচ্চ ২২ মিলিয়ন পিস। আর উৎপাদন সক্ষমতা ২০০ মিলিয়ন। কিন্তু মোদি আসলে নিজ দেশে দেখাতে চাইছিলেন, তিনি কতই না দেশপ্রেমিক। তাই তিনি ট্রাম্পের ফোন পাবার পরে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ভারত থেকে রপ্তানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন।  অথচ বড় কথাটা হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা পরীক্ষিত ওষুধও নয়। ভবিষ্যতে তা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কারণ, ভাইরাসের প্রতিষেধক মূলত ভ্যাকসিন বা টিকা। হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের ব্যবহার বড়জোর যেন টোটকা ও সাময়িক। তাও আবার হার্টের অসুখের রোগীর ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মারাত্মক, সেটা রোগীকে মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলার মতো হতে পারে।

    তার মানে মোদী আর ট্রাম্প দু’জনই পাবলিককে বোকা বানাচ্ছেন আর দেশপ্রেম বেচছেন!

    কিন্তু এতে ঘটনা হল উলটা। ব্যাপারটা ট্রাম্প-মোদী দুজনেরই বেকুবিতে তাদের ইজ্জতের ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় যায়। তাই  হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ট্যাবলেট মোদী আমেরিকাকে সরবরাহের অপারগতা জানানোকে ট্রাম্প খুবই সিরিয়াসলি নিয়ে মোদীকে পাল্টা হুমকি দিয়ে বসেন। ট্রাম্প পাবলিকলি বলে দেন, হয় মোদি হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন সাপ্লাই করবেন, না হলে এর পরিণতি ভোগ করবেন [US could “retaliate” if India does not release stocks …]। তামাশার কথা হলো, দুই চাপাবাজ এবার মুখোমুখি হয়ে যাওয়াতে শেষে মোদি দ্রুত সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এবার ‘উল্টো গান’ ধরেন। করোনাকালে দরকারের সময় তিনি মহান উদার সরবরাহদাতা সেজে গেলেন। এবার তিনি আমেরিকার ট্রাম্পকে তো বটেই; সার্কের পড়শিদের মধ্যে বাংলাদেশকেও নিজে থেকে তা সরবরাহের অঙ্গীকার ঘোষণা করলেন।

    এদের বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান আর সরকারপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা কতটুকু তা এখানেই ধরা পড়ে যায়। যেমন- ওষুধ আর পাঁচটা পণ্য নয় যেটা যেকোনো ব্যবসায়ীই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিজেই যথেষ্ট। কাজেই বাংলাদেশ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইনের আমদানির অনুমতি দেবে কি না সেটি মোদী তো নয়ই, এমনকি এটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইস্যু বা এখতিয়ারই নয়। আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের টেকনিক্যাল সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া এই ওষুধ আমদানিযোগ্য নয়। বলাই বাহুল্য, করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের প্রমাণিত কার্যকারিতার সার্টিফিকেট না পেলে আমাদের  ওষুধ প্রশাসন এই অনুমতি দিতে পারে না। লন্ডনের বিখ্যাত মেডিকেল প্রফেশনাল জর্ণাল ল্যনসেট [LANCET], এই জর্নালে হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে সাবধান করেছে।  বাচ্চাদের  রিমোটিক ফিভার অথবা বয়স্কদের আর্থারাইটিস খুবই জটিল রোগ। সারা দুনিয়া ভুগেছে। বহুকষ্টে ইউনিসেফে ক্যাম্পেইন টিকা ও ওষুধে  যেগুলো দেওয়া হয় তাতে এটা এখন নিয়ন্ত্রিত।  লানসেট বলছে এটা এখন নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলে হলেও এই ওষুধের ব্যবহার  আর্থারাইটিস ও রিমোটিক ফিভার রোগকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

    আসলে ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমেরিকার ফুড ও ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) দুনিয়ায় আদর্শ স্থানীয় বলে মানা হত। এর নিজস্ব ল্যাবে প্রমাণিত ও অনুমোদিত না হলে আমেরিকার কোনো উৎপাদক তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক পণ্য আমেরিকায় বাজারজাত করতে পারে না। কারণ নাগরিক ভোক্তার খাদ্য বা ওষুধবিষয়ক সঠিক ও অক্ষতিকর পণ্য ভোগের অধিকার রক্ষার্থেই এফডিএ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। আর এটাকে আদর্শ মেনেই ১৯৮২ সালে এর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের ১৯৮২ সালের বিখ্যাত ওষুধ নীতিতে বাংলাদেশেও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর খোলা হয়েছিল। যদিও ১৯৮২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ওষুধ মালিক দরবেশেরা  এই দপ্তরের যে শক্ত দাঁত বসানোর ক্ষমতা ছিল তা ক্রমশ ভোঁতা করে দিয়ে জনস্বার্থ রক্ষার বদলে একে ওষুধ মালিকদের অধী্নস্ত করে ফেলা হয়েছে বলে মনে করা হয়।  আমেরিকার এফডিএর সমতুল্য ইউরোপেরও প্রতিষ্ঠান আছে। তবে সুনাম ও স্ট্যান্ডার্ডের দিক থেকে এফডিএ দুনিয়ায় সেকালে অনুসরণযোগ্য মানা হত।

    কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা শুধু তার গ্লোবাল নেতৃত্বের কৃতিত্ব ও গৌরবই হারায়নি, বহু বিশ্ব স্ট্যান্ডার্ডও ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছে। ব্যবসা ও মুনাফার স্বার্থের কাছে কোনটা ওষুধ কোনটা নয়, এর ভেদাভেদ গুণ বিচারও লুটিয়ে দিয়েছে। আর ট্রাম্প নাকি সবচেয়ে বড় ওষুধ বিশেষজ্ঞ!

    “Day after day, the salesman turned president has encouraged coronavirus patients to try hydroxychloroquine with all of the enthusiasm of a real estate developer…”

    তাই নিউ ইয়র্ক টাইম বলেছে, ট্রাম্প যে মূলত একজন ব্যবসায়ী মূলত হাউজ বিল্ডিং ডেভেলপার, তার মানে যিনি ‘একজন সেলসম্যান তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন’, তিনিই এখন করোনা সংক্রমণে কোন ওষুধ খেতে হবে, এর বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন!”

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৮ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর “ট্রাম্প যখন ওষুধের ক্যানভাসার“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]