Author: goutamdas

  • ইরাকঃ আধুনিক রাষ্ট্র লজিকের আর বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা

    ইরাকঃ আধুনিক রাষ্ট্র লজিকের আর বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা

    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-7Y

    ০১ আগস্ট ২০১৪।
    চলমান ইরাকের সঙ্কট গত কয়েকমাসে মিডিয়ায় নতুন মাত্রায় শিরোনাম হতে শুরু করেছে প্রথমে ISIL এর আন্দোলন নামে পরে ইরাককে খলিফা রাষ্ট্রের ঘোষণায়। এতে সমস্ত মনোযোগ গিয়ে জড় হয়েছে এই শব্দ দুটোতে – ISIL আর খলিফা রাষ্ট্র। এটা ইরাক রাষ্ট্রের সঙ্কটের এক নতুন মাত্রা। যদিও ইরাক রাষ্ট্রের সঙ্কটকে এখানে ব্যাখ্যা করব মূলত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকে; ইরান বিপ্লবের সাথে ইরাকের ভাগ্য ঘোরতরভাবে সম্পর্কিত। এটা সঙ্কটের অবশ্যই দ্বিতীয় পর্যায়। আর প্রথম পর্যায়ের আর এক সঙ্কটও ছিল যেটাকে ১৯১৯ সালে বৃটিশ-ফরাসী কলোনি মাষ্টারের দেয়া জন্ম সঙ্কট বলা চলে, সেটা কলোনি ভাগবাটোয়ারার স্বার্থে ইরাকের বর্তমান রাষ্ট্র সীমানা যখন টেনে ইরাক রাষ্ট্রের জন্ম দেয়া হয়েছিল। তবে প্রসঙ্গ এখানে দ্বিতীয় পর্যায়ের সঙ্কটের দিকেই, ওর গোড়ার কিছু মৌলিক ইস্যুর দিকে পাঠকের নজর ফিরাব।
    দেশে দেশে বিপ্লবের কথা আমরা অনেক শুনেছি। শুনে আমরা অনেকে আপ্লুতও হই। বিপ্লবী ক্ষমতা্র উত্থান – বলতে প্রচলিতভাবে অনেকে যেমন অনেকে ধরে নেন একটা কমিউনিষ্ট বিপ্লব ঠিক তা নয়। এখানে বিপ্লব বলতে শুধু কমিউনিষ্ট বিপ্লবে তা সীমাবদ্ধ এমন ধরে না নিয়ে বরং ইরানের মত ইসলামি বিপ্লব অথবা যেকোন র্যা ডিক্যাল বিপ্লবী ক্ষমতাকেও ধরে নিয়ে কথা বলব। আবার, মোটা দাগে যেকোন “বিপ্লবী ক্ষমতা” বিষয়টাকে তিনটা পর্বে ভাগ করতে পারি -১) বিপ্লবী ক্ষমতা তৈরি, ২) তা দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল আর ৩) পরের এক বড় ধাপ হল সে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু প্রথম দুইটা পর্যায় সম্পর্কে আমরা যতটা অনুসরণ করি ও খবর রাখি “ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার দিকটা” আমাদের কাছে ততটাই অনালোকিত হয়ে দৃষ্টির বাইরে থেকে গেছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার এই কাজটা নিয়ে এপর্যন্ত কোন রাজনৈতিক তত্ত্ব নাই। তবে কিভাবে বাস্তব ইতিহাসে তা ঘটেছে সেদিকে এখানে আলো ফেলব।

    বিপ্লব কমিউনিষ্ট অথবা ইসলামি হোক, তা এক গ্লোবাল বিপ্লবের ধারণা
    “বিপ্লবী ক্ষমতা” বিষয়টা্র প্রথম দুই পর্ব – বিপ্লবী ক্ষমতা তৈরি ও ক্ষমতা দখল উদ্যোগেরও আগের কাজ, বিপ্লবী তত্ত্ব বা আইডিয়া হাজির করার একটা পর্যায় থাকে। ইডিওলজি (ideology) হিসাবে আইডিয়া (idea) – এদিক থেকে দেখলে যেহেতু এটা আইডিয়া অর্থাৎ চিন্তা বা ভাব ফলে এমনিতেই তা নিজ ভুখন্ড ছাড়িয়ে দুনিয়ায় যেকোন কোণে তা ছড়ানোর যোগ্য। চিন্তা ও চিন্তার প্রভাব রাষ্ট্রীয় সীমানা দিয়ে আটকে রাখা যায় না; বিশেষত ইডিওলজি যদি নিজেই গ্লোবাল হয় অর্থাৎ গ্লোবালভাবে ঘটবার, ঘটাবার দাবি কর্তব্য সাথে নিয়ে হাঁটে সেক্ষেত্রে ‘আইডিয়া মানেই তা রাষ্ট্রীয় সীমানা ছাড়িয়ে দুনিয়াব্যাপী প্রয়োগ-প্রযোজ্য’ – এই কথাটা আরও পোক্ত হয়ে উঠে। এই বিচারে কমিউনিষ্ট বিপ্লব অথবা ইসলামি বিপ্লবের ধারণা –এগুলো গ্লোবাল বিপ্লবী তত্ত্ব; গ্লোবাল ইডিওলজি; এর প্রয়োগ-প্রযোজ্য এলাকা দুনিয়াব্যাপী – ‘প্যান’ বা নিখিল জুড়ে।
    কিন্তু একটা বিপরীত বাস্তবতা হল, আইডিয়া গ্লোবাল হলেও যে মানুষ বা যারা এই আইডিয়া বাস্তবায়নের জন্য লড়বে তাদেরকে নির্দিষ্ট ভুখন্ড দাঁড়িয়েই লড়তে হয়, এর অন্যথা হবার যো নাই। যেমন কমিউনিষ্ট বিপ্লবের তত্ত্বটা গ্লোবাল, কিন্তু সুনির্দিষ্ট ভুখন্ড রাশিয়াতেই সেটাকে প্রয়োগে বাস্তব সত্য করে তুলতে গিয়েছিলেন লেনিন ও তার সাথীরা। অথচ আগেই বলেছি, যা নিয়ে বিপ্লবীরা লড়বে সেই চিন্তা, ভাব বা আইডিয়া মাত্রই ওর প্রয়োগ প্রযোজ্যতা প্রভাব তখনও গ্লোবালই থেকে গিয়েছিল। আবার, ওদিকে তত্ত্ব গ্লোবাল বলে স্বাভাবিকভাবে এর এনিমি বা শত্রুও তো গ্লোবালই হবে। কেন শত্রুও গ্লোবাল হবে সে কথাটা আবার অন্য আর দিক থেকে আরও বেশি সত্য। যেমন, যতদিন যাচ্ছে জাতীয়, স্থানিক বা লোকাল ক্যাপিটালিজম বলে আর কিছুই থাকছে না, থাকবে না; স্থানীয় অর্থনীতিগুলো ততই পরস্পর আরও ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত ও গভীর থেকে গভীরতরভাবে পরস্পর নির্ভরশীল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম হয়ে উঠছে, আরও উঠবে। লোকাল ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই এই অভিমুখ চোখা হয়ে হাজির ছিল। ফলে এর বিপরীতে ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে নানান ভুখন্ডে প্রতিরোধ যেকোন লোকাল রাষ্ট্রীয় সীমার আন্দোলন লড়াই সংগ্রাম হলেও ওর গ্লোবাল দিক ছিল ও আছে এবং সেটা আর পিছনের শত বছর মত সুপ্ত না থেকে স্পষ্ট মুর্ত হয়ে হাজির হচ্ছে, হবেই। ফলে স্থানীয় ইতিহাস মানেই তা এখন স্পষ্ট গ্লোবাল ইতিহাসের উপাদান হয়ে হাজির হচ্ছে। অন্যভাবে বললে যে কোন স্থানীয় প্রতিরোধ আন্দোলন মাত্রই তাতে গ্লোবাল আকার ধারণ করার উপাদান থাকবে।
    তাহলে সারকথাটা দাড়ালো, আইডিয়া গ্লোবাল তবু স্থানীয় ও সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রে দাঁড়িয়েই সুনির্দিষ্ট ভুখন্ডে প্রকাশিত প্রতিভাত সুনির্দিষ্ট ও আপাত লোকাল কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করেই লড়াই সংগ্রাম শুরু ও সংগঠিত হচ্ছে, হবেই। আর লোকাল এসব আন্দোলনের গ্লোবাল দিক অভিমুখ থাকলেও বাইরে থেকে দেখে তাকে আবার আপাত লোকাল আন্দোলন ও সংগ্রাম মনে হবে। কিন্তু এবার গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রশ্ন – কে এই লড়াইয়ে বাধা হবে? বাধা দেবার শক্তি হবে মূলত লোকাল রাষ্ট্রই। অবশ্যই এমনও হবে, ফোরফ্রন্ট্রে লোকাল রাষ্ট্র থাকবে যদিও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সুত্রে সহজেই সম্পর্কিত থাকা গ্লোবাল পরাশক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বাধাদানের জন্য স্থানীয় রাষ্ট্রের পক্ষে ভুমিকাও নিবে। অর্থাত মোটের উপর সাক্ষাত বা ইমিডিয়েট শত্রু লোকাল রাষ্ট্র।
    এখন আইডিয়াল বা আদর্শ হত, সারা দুনিয়ায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে নানান ভুখন্ডে এবং নানান চেহারার প্রতিরোধ আন্দোলন লড়াইগুলোকে এক কো-অরডিনেশন ধরণের কেন্দ্রের মাধ্যমে যদি পরিচালিত হতে দেখা যেত। কো-অরডিনেশন বা সমন্বয়ের অনুভুত তাগিদ হাজির থাকাটা সবচেয়ে স্বাভাবিক কারণ দেশে দেশে সব প্রতিরোধ লড়াইগুলোর শত্রু কমন – গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। যাহোক আগেই বলে নিয়েছি এটা আইডিয়াল। তাহলে বাস্তবটা কেমন? এব্যাপারে বাস্তব ইতিহাসে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো খুবই খারাপ। শব্দটা “কো-অরডিনেশন ধরণের এক কেন্দ্র” বলেছি, কারণ এশব্দের পিছনের অনুমানটা হল দুনিয়াব্যাপী প্রতিরোধের আন্দোলনগুলো যতটা সম্ভব পরস্পর একে অপরের সহযোগী হয়ে কাজ করতে পারা উচিত – আর তাতে সবাই উপকার পাবে। কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে আমরা দেখেছি এটা একটা কো-অরডিনেশন কেন্দ্রের বদলে হাজির হয়েছে যে আগে বিপ্লবী ক্ষমতা দখল করেছে সেই রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থে ও নেতৃত্ত্বে এক কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। যেমন লেনিনের রাশিয়া বা মাওয়ের চীন। যার কাজ আর কো-অরডিনেশন থাকেনি, বাস্তবে হয়ে দাড়িয়েছে নিজ রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থে অন্যদের সকলকে ব্যবহার – অন্য দেশ, রাষ্ট্র, দল গোষ্ঠিকে ব্যবহার। এতে বাস্তবে আসলে কি ঘটে সেখানে? বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের পরের রাষ্ট্র একটা মহান কিছু হয়েছে মনে হতে পারে কিন্তু শেষ বিচারে তো সেটা রাষ্ট্রই – আধুনিক রাষ্ট্রেরই কোন একরূপ সেটা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের লজিকও বলবত হবে সেখানে। আর সে লজিকটা হল, রাষ্ট্রের সহজাত বৈশিষ্টমূলক স্বভাব হল সে নিজ রাষ্ট্র সীমার মধ্যকার কেবল নিজ জনগোষ্ঠির স্বার্থকে সবকিছুর উপর প্রাধান্যে রাখে। সেজন্যই সে রাষ্ট্র। ফলে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইডিয়া বাস্তবায়নের বাস্তব উপায় হতে গিয়ে পরিণত হয় নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে ঐ আইডিয়াকে টেলারিং ও খাটো করে নিজ একান্ত স্বার্থের অধীন করে ফেলে। ব্যাপারটা এবার আরও সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলি।
    যেমন কমিউনিষ্টদের বিপ্লবের উদাহরণ হিসাবে সোভিয়েত বিপ্লবকেই যদি ধরি তবে দেখব বিপ্লব ঘটেছিল আসলে কেবল রুশ দেশে, রাশিয়ায়। তাই আসলে ওটা ছিল কেবল রুশ বিপ্লব, অন্তত প্রথম পাঁচ বছর, ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম হবার আগে পর্যন্ত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আসল বিপ্লবটা যেটানে ঘটেছে বিজয়ী নতুন সেই রুশ রাষ্ট্র যেন বাইরের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে, টিকে থাকতে ব্যর্থ না হয় সেজন্য কেন্দ্রে কোর হিসাবে রুশ রাষ্ট্রকে রেখে পড়শি দেশগুলোকে যেন ওকে ঘিরে ধরা এক প্রতিরক্ষা বর্মের বলয় হয় সে কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, গঠিত সেই বর্মের নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুশ বিপ্লবে পড়শি-রাষ্ট্রগুলোকে বলি দেবার এই কাজটা আরও সহজ হয়েছে কারণ ১৯২২ সালে যেটাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বলা হল অর্থাৎ যাদের ব্যবহার করা হল এরা আগে থেকেই রুশ সম্রাট জারের রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্ত ছিল। ফলে রুশ সাম্রাজ্যের সীমানাটাই নতুন নামে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সীমানা হল। আর এবার কেন্দ্রে থাকল রুশ রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ – নিজের প্রতিরক্ষা অথবা অন্যভাষায় বললে নিজ বিপ্লব টিকানো। আজকের পুতিনের রুশ ফেডারেশনকে কেন্দ্রে রেখে এমন [রুশসহ মোট] ১৫ রাষ্ট্র (Russia,Ukraine, Belarus, Turkmenistan, Uzbekistan, Tajikistan, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Georgia, Armenia, Azerbaijan, Estonia, Latvia, Lithuania, Moldavia) মিলিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছিল সেসময়। [এরই বিপরীত পথ পরিক্রমাটাই আমরা দেখেছিলাম ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আবার ১৫ রাষ্ট্রে তার ভাগ হয়ে যাওয়ায় ভিতর।]
    কিন্তু ষ্টালিন সোভিয়েত ইউনিয়ন খাঁড়া করেও যেন তাতে নিশ্চিত বা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ঐ সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরেও আবার বাফার ষ্টেট এর এক বর্ম গড়ে তোলা হয়েছিল – রুমানিয়া, চেকোশ্লোভিয়া, যুগোশ্লোভিয়া, পোল্যান্ড এমনকি পরে পুর্ব জার্মান এদের নিয়ে। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল, রুশ রাষ্ট্রের প্রথম নিরাপত্তা বর্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন আর এরও উপরে দ্বিতীয় নিরাপত্তা বর্ম হিসাবে এই রাষ্ট্রগুলো ছিল বাফার ষ্টেট বা স্যাটেলাইট ষ্টেট। উদ্দেশ্য একটাই, বিপ্লবের কেন্দ্র রুশ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সুরক্ষা। আর এটা করতে গিয়ে পড়শিরা “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নামে শ্লোগানের আড়ালে প্রত্যেকে নিজে বলি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়া “বিপ্লব রপ্তানি” বলে আরও একটা কথা আছে। সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে স্ব স্ব দেশের পার্টিগুলো “দুনিয়ার মজদুর এক হও” নামে ঐ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুরক্ষার পক্ষেই স্থানীয় পার্টি নীতি অনুসরণ করেছিল। তাতে বাস্তবে এর অর্থ দাড়িয়েছিল নিজ জনগোষ্ঠিগত রাষ্ট্রস্বার্থ ভুলে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিদেশ নীতির অন্ধ অনুসরণ করা বললে কম হবে, বলতে হবে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিদেশনীতি বাস্তবায়নের বর্ধিত অংশ হওয়া। আর সামগ্রিকভাবে এই ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে গ্লোবাল কমিউনিষ্ট আন্দোলন। [যদিও পরিস্কার থাকার দরকার আছে,একথাগুলো বলতে গিয়ে কেউ যেন মনে না করেন যে, “দুনিয়ার মজদুর এক হও” শ্লোগানটা ভুল ছিল এমন দাবি করা হচ্ছে। না তা নয়। বরং বলা যায়, শ্লোগান বাস্তবায়নের উপায় কৌশলে অপব্যবহার ঘটেছে আর তাতে শ্লোগানের অর্থ বদলে গেছে।] ফলে এখান থেকেই শ্লেষাত্মক মন্তব্য “মস্কোতে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশে ছাতা ধরা” এর বাস্তবতা টের পাওয়া যায়। অর্থাৎ মস্কো একান্ত নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থে নিজের রাষ্ট্র ক্ষমতা সুরক্ষা বা বাইরের আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য পড়শি রাষ্ট্র বা ভিন্ন রাষ্ট্রকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল। আর একাজে আরও বিশেষ সহায়ক হয়েছিল বিপ্লবের ইডিওলজি আন্তর্জাতিক বা প্যান ধরণের ছিল তাই। অন্যের রাষ্ট্রস্বার্থকে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে বলি দেবার কাজটা আরও সুবিধার ও সহজ হয়েছিল তাতে।
    লেনিনের দেশে ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পরে একটা আভ্যন্তরীণ তর্ক উঠেছিল এক দেশে একটা বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের পরে তাকে একাই টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না। সম্ভব হলে তা কি উপায়ে? এটা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ রাষ্ট্রতত্ত্বের বিতর্ক ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বিতর্কের কোন সমাধান হয় নাই। তত্ত্বগতভাবে এর কোন সমাধান বের করা হয় নাই। লেনিনের জীবদ্দশায় নয় [রুশ বিপ্লবের পরে লেনিন মাত্র ছয় বছর বেঁচে ছিলেন।] তাঁর মৃত্যুর পরেও আর কখনও নয়। বিপ্লব টিকিয়ে রাখার উপায় হিসাবে সংকীর্ণ কেবল নিজ রুশ রাষ্ট্রস্বার্থে বাস্তবে যা করা হয়েছিল, মনে করা আর বাস্তবে ঘটানো হয়েছিল তা ষ্টালিনের হাতে ও নেতৃত্ত্বে। আর সেটা হল, অন্য সব বিপ্লব সমর্থক রাষ্ট্র আর দেশে দেশে কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোকে রুশ রাষ্ট্র বিপ্লবের স্বার্থে নিজের রাষ্ট্র টিকানোর স্বার্থে ব্যবহার করা। এবং এটাকেই গ্লোবাল কমিউনিষ্ট আন্দোলনের নামে “দুনিয়ার মজদুর এক হও” কথার বাস্তবায়নের পথ বলে তাকে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল।
    আধুনিক রাষ্ট্র ধারণার সহজাত মৌলিক বৈশিষ্ঠের লজিকটা হল, রাষ্ট্র কেবল নিজের, মানে নিজ জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ হাসিলের পক্ষে কাজ করে যাওয়াই ওর একমাত্র কাজ। এখানে নিজ রাষ্ট্র সীমানার বাইরের কোন জনগোষ্ঠি বা স্বার্থ দেখার কাজ নিজ রাষ্ট্রের নয়। বরং সুযোগ পেলে রাষ্ট্র অন্যকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে। ফলে রাষ্ট্রের একান্ত স্বার্থ মানে যে স্বার্থের জন্য সে অন্ধ। আবার অন্যদিকে, কোন রাষ্ট্র নিজ একান্ত স্বার্থের পক্ষে যদি কাজ না করে তবে খোদ নিজ অস্বস্তিত্ত্বই সঙ্কটে পড়ে।
    অন্যদিকে গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক ইডিওলজি রাষ্ট্র সীমানা ছাড়িয়ে প্রযোজ্য এবং প্রয়োগ হতে চায়। সে দাবি করে একই সাথে সে সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র এবং অন্য সব রাষ্ট্রের বেলায়ও একই চিন্তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে। এটা স্ববিরোধী। কারণ রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও কখনও সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থের ভিতরে নিজেরও স্বার্থ ফলে কমন স্বার্থ দেখতে পারে বটে কিন্তু এর মানে এই না যে রাষ্ট্র দুটোর স্বার্থ সবসময় সব ইস্যুতে এক হবেই; কারণ পরক্ষণেই ভিন্ন ইস্যুতে তাদের পরস্পর বিরোধি দেখতে পাওয়া তা হবে সবচেয়ে স্বাভাবিক। এর মুল কারণ গ্লোবাল ইডিওলজি আর রাষ্ট্রস্বার্থ সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। আর এক বড় কারণ, রাষ্ট্রস্বার্থগুলো হাজির হয় আভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠিগত কমন স্বার্থ – এর উপর ভিত্তি করে। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর সমন্বয় – আবার এটা ঠিক দুটো স্বার্থের সমন্বয় নয় বরং বিশেষ করে গ্লোবাল আইডিয়ার মৌলিক শিক্ষা বা গাইড লাইনের আলোকে রাষ্ট্রস্বার্থগুলোকে ঢেলে সাজানো ও সমন্বয়।
    তাহলে কোন গ্লোবাল ইডিওলজির (কমিউনিজম বা ইসলামের মত যাই হোক) কি কোন ভবিষ্যত নাই? প্রয়োগ যোগ্যতা নাই? না, এখানে আলোচনায় তা বলতে চাওয়া হয়নি। এই রচনায়, প্রয়োগ যোগ্যতা নাই তা বলা হয়নি বরং এটা কিছু মৌলিক প্রায়োগিক সমস্যার দিকে নজর আকর্ষণের চেষ্টা বলা যেতে পারে। আর কে অস্বীকার করতে পারে গ্লোবাল ইডিওলজি ছাড়া মজলুমের মুক্তি অসম্ভব। এছাড়া গ্লোবাল ইডিওলজি নাই তো গাইডিং প্রিন্সিপল নাই একথা কে না মানবে। অর্থাৎ গ্লোবাল ইডিওলজি এক গভীর প্রয়োজনীয় ও মৌলিক জিনিষ। যেকোন আইডিয়া বা চিন্তার দুনিয়াব্যাপী সার্বজনীন অংশটাই দুনিয়ার ভবিষ্যত। তাহলে আধুনিক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রস্বার্থ আর ইডিওলজি যদি কখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় তখন এই সংঘাতের সমাধান কি? বাস্তবতা তো বাস্তবতাই। এমন বাস্তবতা ঘটবেই। ফলে কখনও যদি আমাদের মুখোমুখি হতেই হয় তাহলে অন্তত নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থটাকে গ্লোবাল ইডিওলজির স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া অন্তত আমরা সৎভাবে পরিত্যাগ করতে পারি। দ্বিতীয়ত, কো-অরডিনেশন। অর্থাৎ আইডিয়ার মৌলিক দিকগুলো পরস্পর শেয়ার করা। তবে ঐ আইডিয়া প্রত্যেক ভুখন্ডে আলাদা আলাদা প্রয়োগ কৌশলের পরিচালিত হওয়ার ব্যাপারটা ছেড়ে দেয়া এবং যতদুত সম্ভব পরস্পরের সহযোগী হবার চেষ্টা করা। এভাবে বাস্তব কাজের ভিত্তির দিয়ে ঐক্য পৌছানোর চেষ্টা করা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের একান্ত সংকীর্ণ স্বার্থ আড়াল করার উপায় হিসাবে ইডিওলজির ভুমিকাকে ব্যবহার করা যাবে না, এই রচনায় এদিকটাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। আরও কিছু উদাহরণ দেয়া যাক।
    যেমন ১৯৭৯ সালে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে বসে। অজুহাত হল আফগান কমিউনিষ্ট বারবাক কারমেল নাকি বিপ্লব করেছে, তাই সোভিয়েত আর্মি আফগানিস্তান মার্চ করছে। অথচ আসল ট্রিগার ঘটনা হল সে বছরের শুরুর ইরান বিপ্লব। অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল হয়ে থাকা মুসলমান পপুলেশনে অধ্যুসিত সেন্ট্রাল বা মধ্য এশিয়ায় [যা তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ] না ইরান বিপ্লবের প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবে বিদ্রোহ বিপ্লব দেখা দেয়। তা ঠেকাতে আগাম একশনে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন, [ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার মাঝে] আফগানিস্তান দখল করে উদ্দেশ্য একে বাফার ষ্টেট হিসাবে ব্যবহার করা – সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের যেটা একান্ত স্বার্থ। কিন্তু সারা দুনিয়ার মস্কো সমর্থক কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো চোখ বন্ধ করে রাশিয়ার সাম্রাজ্য স্বার্থকেই গ্লোবাল কমিউনিষ্টদের স্বার্থ ফলে নিজ স্বার্থ দাবি করে এর সমর্থনে নিজ নিজ দেশ মিছিল সমাবেশ করে। এখানে “সাম্রাজ্য স্বার্থ” শব্দটা সচেতনে ব্যবহার করেছি। কারণ বৃটিশ-ভারত আমলে বৃটিশ সাম্রাজ্য আর জার সাম্রাজ্য ঠিক একইভাবে একইকারণের উভয়েই [Anglo-Afghan War (1878-1880)] আফগানিস্তান দখলের লড়াই করেছিল। ওখানে তখন ট্রিগার ঘটনা ছিল, এর আগে জার সম্রাট সেন্ট্রল এশিয়া অঞ্চল দখল করেছিল আর সেই ভয়ে আফগানিস্তা্নের বাদশা জারের সাথে এক অনাক্রমণ চুক্তি করেছিল। কিন্তু এতে বিপরীতে আবার ভয় পেয়েছিল বৃটিশ-ভারতের বৃটিশ সাম্রাজ্য। তার ভয় সন্দেহ হল যে জারের সাম্রাজ্য আর বৃটিশ সাম্রাজ্যের সীমানার মাঝে এতদিন বাফার রাষ্ট্র হয়ে থাকা আফগানিস্তান না জারকে বৃটিশদের উপর বাড়তি সুবিধা করে দেয়। তাই বৃটিশ সাম্রাজ্য আগাম আফগানিস্তানে হামলা করেছিল। এই প্রসঙ্গে আমরা যেন ভুলে না যাই যে মধ্য এশিয়াসহ জার সাম্রাজ্যের সীমা যতদুর ছিল রুশ বিপ্লব সেই সেই পুরানা সীমা নিয়েই নিজেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পুনর্গঠন করে নিয়েছিল। এই বিচারে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলা চলে সেই জার সাম্রাজ্যই কিন্তু এবার রুশ কমিউনিষ্ট নেতৃত্ত্বে। মধ্য এশিয়ায় ইরানী বিপ্লবের প্রভাব ঠেকাতে ভয়ে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাই আফগানিস্তান দখল করেছিল। সারকথা, এখানে কমিউনিষ্ট ইডিওলজির ভুমিকা হয়ে গিয়েছিল রুশ রাষ্ট্রের নিজ সংকীর্ণ স্বার্থ আড়াল করার উপায়।
    সমতুলনীয় আর এক ঘটনার উদাহরণ হল, ৬৯-৭১ সালের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চীনা কমিউনিষ্টরা আয়ুব-ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে লড়ুক নেতৃত্ত্ব দেক এটা কমিউনিষ্ট চীন তার একান্ত স্বার্থের সাথে যায় এমন বিষয় মনে করতে পারে নাই। কারণ আজকের চীনের যে উত্থান দেখছি এর সুচনা পর্ব, ততকালে কূটনৈতিক সম্পর্কহীন চীন ও আমেরিকার বিশেষ সম্পর্কের শুরু, সুচনা বা প্রস্তুতি পর্ব ছিল ঐ সময়টা। যেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব ও পরে ইয়াহিয়ার ভুমিকা ছিল চীন-আমেরিকা উভয়েরই ঘনিষ্ট বন্ধু হিসাবে বিশ্বস্ততার সাথে দুতয়ালী করে দেয়া, কথাচালাচালি ঘটিয়ে দেয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ ততদিনে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ডিল ফাইনাল করতে ১৯৭১ সালের ০৯ জুলাই ভোরবেলা দুদিনের জন্য কিসিঞ্জারকে পাকিস্তান ভ্রমণের সময়কালিন গোপনে চীন ভ্রমণ [গোপন এই সফরের কোড নাম ছিল, “মার্কোপোলো”] ও চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাইয়ের সাথে সরাসরি সাক্ষাতে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। তবে এঘটনার প্রকাশ্য আলামত শুরু হয়েছিল ঠিক তিনমাস আগে ০৭ এপ্রিল ১৯৭১। ঐদিন হঠাত চীনের চেয়ারম্যান মাওসেতুং আমেরিকার এক টেবিল টেনিস খেলোয়ার দলকে চীন ভ্রমণের আমন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেন। দিন তারিখের দিকে দেখলে ঘটনাগুলো খুব দ্রুতই ঘটেছে। আর এর সাত দিন পরে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাই আমেরিকান টেবিল টেনিস দলের সাথে সাক্ষাত অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন, ১৯৪৯ সালের পরে এরাই প্রথম কোন আমেরিকান অতিথি। “আপনারা আমেরিকান জনগণ ও চীনা জনগণের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করলেন”। চৌএন লাইয়ের এর ঘোষণার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন, আগামি বছর তিনি চীন সফরে যাচ্ছেন বলে মিডিয়ায় ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ সারা দুনিয়া জানে এই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নাই। On April 7, 1971, Chinese Chairman Mao Zedong made a decision to invite the United States table tennis team to visit China. On April 14, Premier Zhou Enlai met with the US ping-pong players, the first visiting American guests since 1949. Zhou told the US players: “You open a new historical chapter in the bilateral relations between Chinese people and American people.” এই ডিলের অংশ হিসাবে এখানে তিনটা ঘটনা উল্লেখ করব। (১) চীন ঐ ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৫ তারিখে জাতিসংঘের প্রথম সদস্যপদ পায় যে সদস্যপদ পাওয়া ১৯৪৯ সালে মাও এর চীন বিপ্লবের পর থেকে মূলত আমেরিকার আপত্তিতে আটকে ছিল। আপত্তির মূল কারণ, ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠনের সময় থেকে ওর নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা পাঁচ সদস্যের একজন ছিল চায়না। কিন্তু মাত্র চার বছর পর ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লবের পর থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত তাইওয়ান নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্য। অর্থাৎ মূলভুমি মাও এর নয়াচীন জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত দেশই নয় আর চীন বলতে জাতিসংঘের চোখে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাওয়ালা চীন মানে এক ছোট দ্বীপ তাইওয়ান। অর্থাৎ মাও এর চীনের জন্য ১৯৭১ সালের অক্টোবর ২৫ খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ দিন। এদিন থেকে চীন শুধু জাতিসংঘের সদস্যপদই পায় নাই, একেবারে সরাসরি ভেটো ক্ষমতাওয়ালা পাঁচ সদস্যের একজন হয়ে গিয়েছিল, আমেরিকান আপত্তি প্রত্যাহারে। এবং সমান গুরুত্ত্বপুর্ণ, তাইওয়ানের ষ্টাটাস তখন থেকে জাতিসংঘের অস্বীকৃত ভুখন্ড। অর্থাৎ তাইওয়ান নয়াচীনের অঙ্গিভুত ভুখন্ড অংশ – নয়াচীনের এই দাবিকে সরাসরি না হলেও প্রকারন্তরে স্বীকৃতি দেয়া হয় জাতিসংঘ। (২) আর দেরি না করে পরের বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রথম চীন সফরে যান। এরপর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ভীত্তিমূলক নীতিগুলোর খসড়া ও বুঝাপড়াগুলো তৈরি হতে থাকে। মূল বিষয়, চীন নিজেকে আমেরিকার দানব-পুঁজি বাজার প্রতীকিভাবে যা ওয়াল ষ্ট্রিট নামে পরিচিত তার কাছে উন্মুক্ত করে দিবে। বিনিময়ে আমেরিকান বাজার চীনা পণ্যের জন্য উন্মুত্ত হবে ইত্যাদি। এগুলো ঠিকঠাক তৈরি, আলোচনা, দেনদরবার নিগোশিয়েশন ইত্যাদি শেষ হতে ১৯৭৮ সাল লেগে যায়। (৩) আর ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারী থেকে চীন আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে ইতোমধ্যে তৈরি সমস্ত ডিল আনুষ্ঠানিক করে নেয়। আর ঐদিন থেকে তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে আমেরিকা।] ফলে এসব গুরুত্ত্বপুর্ণ কারণে আয়ুব ও ইয়াহিয়া এরা দুজনই চীনের কাছে খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ত্ব ছিল। তাই চীনের স্বার্থের খেদমত করার বিনিময়ে বাংলাদেশের (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) চীনা কমিউনিষ্টদেরকে ৬৯ সালের পর আয়ুব ও ইয়াহিয়া নিজেদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা থেকে বিরত করতে চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিকে অনুরোধ রেখেছিল। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করতে ছাত্রদের অংশ বাদ দিলে মূলত শ্রমিকদের সংগঠিত করতে নির্ধারক ভুমিকা ছিল ভাসানীর নেতৃত্ত্বে অধীনস্ত বাংলাদেশ চীনের কমিউনিষ্ট পার্টিগুলো। আর ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের চীনা কমিউনিষ্টরা নিজ স্বার্থের চেয়ে চীনা রাষ্ট্রস্বার্থকে জেনে অথবা না জেনে প্রাধান্যে রেখেছিল।
    তাহলে সারকথায় বললে, একই আন্তর্জাতিক ইডিওলজির দুই রাষ্ট্র আইডিওলজির মিল আছে এমন হলে একজনের স্বার্থে অপরজনের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সব সময় সেখানে থাকবে। উপরে চীনের উদাহরণ্টা আনলাম এটা দেখানোর জন্য যে দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কেমন সরাসরি পরস্পর বিরোধি ১৮০ ডিগ্রি হয়ে যেতে পারে তা বুঝাতে। অতএব এটা আসলে যে কোন আন্তর্জাতিক আইডিওলজির সমস্যা অথবা বলা যায় আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা। অথবা এই দুইয়ের মধ্যকার স্ববিরোধ। আমরা যে রাজনীতিই করি না কেন এই কঠিন বাস্তবতা আমাদের নজরে নিতে হবে, বাস্তব সমাধান খুজতে হবে। কারণ আমাদের আন্তর্জাতিক আইডিয়া বিপ্লবের তত্ত্বও দরকার, আবার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর মুখোমুখি হওয়া একে অন্যকে ব্যবহার করে ফেলা এগুলো এড়ানোর উপায় জানতেই হবে।

    ইরান রাষ্ট্রের সঙ্কট অথবা “ইরানি স্বার্থের ইরাক রাষ্ট্র”
    ইরাক সঙ্কট নিয়ে লিখতে বসে এতক্ষণ উপরের লেখা অংশকে কমিউনিষ্টদের প্যাচাল মনে করবেন পাঠকের কেউ হয়ত, লিখলাম কেন অনেকের মনে তা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। লিখলাম এজন্য যে এই সমস্যাটা কেবল সোভিয়েত বা চীনা কমিউনিষ্টদের বেলায় ঘটে বা সত্যি তাই নয়। যেকোন গ্লোবাল আইডিয়ার ক্ষেত্রেও ঘটবে। কারণ মুলত সমস্যাটা যে কোন আন্তর্জাতিক ইডিওলজির সমস্যা অথবা বলা যায় আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা।
    তাই আমরা এখন দেখব কমিউনিষ্ট বিপ্লব না হওয়া সত্ত্বেও ইরান বিপ্লবও একইভাবে নিজরাষ্ট্রের টিকানোর স্বার্থে পড়শিদের ব্যবহার করেছে।
    ইসলামও নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ইডিওলজি। যারা খলিফা ধারণার রাজনীতি ধারণ করেন সেটা আরো ঘোরতর আন্তর্জাতিক বা প্যান ধারণা। ইরানী বিপ্লব যদিও যতটা না আন্তর্জাতিক তার চেয়ে বেশি জাতীয় বৈশিষ্টের। তবু এটা সুনির্দিষ্ট এক ইডিওলজিক্যাল বিপ্লব। আবার তা পশ্চিমের মত অর্থে একটা আধুনিক রাষ্ট্র না হলেও নতুন ধরণের তবুও মোটা দাগে তা মর্ডান রাষ্ট্র বৈশিষ্টেরই। আর ইরান বিপ্লবে কমিউনিষ্টদের সাথে সবচেয়ে বেশি মিলের দিকটা হল, নিজ বিপ্লব রক্ষা করার সমস্যা, বিপ্লব রপ্তানি এবং নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে ইরাক রাষ্ট্রকে বলি দেয়া এসব কিছুই সে ঘটিয়েছে। কিছু উদাহরণ দিব।
    এক) ইরান বিপ্লবের পরেপরেই ১৯৮১-৮৭ প্রতিবছর হ্বজ করতে গিয়ে নিজ বিপ্লবের পক্ষে প্রচার প্রপাগান্ডা করতে আর সৌদি রাষ্ট্র শাসকের নিন্দা করতে এক সংগঠিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নিয়েছিল। কারণ হ্বজ মানে সারা দুনিয়া থেকে মুসলমানেরা সেখানে সমবেত হয়। ইরান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিবছর মক্কা ও মদিনায় মিটিং মিছিল সমাবেশ বয়ান আয়োজন করে আসছিল। এতে সৌদি কর্তৃপক্ষের মনে মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় স্থানগুলো তাদের দখল পরিকল্পনা আছে এই সন্দেহ ক্রমশই বাড়ছিল। ১৯৮৬ সালে ইরানী দলবদ্ধ রাষ্ট্রীয় হ্বাজিদের (মোট হ্বাজি দেড় লাখ) প্রায় ১০০ জনকে এক্সপ্লোসিভসহ ইমিগ্রেশনে আটক করা হয়েছিল। এসব নিয়ে পরের বছর হ্বজের সময় যথেষ্ট টেনশন বইতেছিল। দ্বিতীয় দিনে ইরানীদের বিশেষ সমাবেশ সামলাতে গিয়ে সৌদি সরকার তাতে (১৯৮৭ সালে ৩১ জুলাই) সরাসরি গুলি করে, কঠোর হাতে দমন করতে গিয়ে স্পটেই চারশতের উপর হ্বাজি ও সৌদি পুলিশ মারা গিয়েছিল। এই ম্যাসাকারের ঘটনা নিশ্চয় আমাদের অনেকের মনে আছে। এঘটনাতে সৌদি ইসলাম ভাল না ইরানী ইসলাম ভাল অথবা ইরান না সৌদি সরকার কে সঠিক ছিল সে ব্যাপারে বিচারকের ভুমিকায় বসা এখানকার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। এই রচনার উদ্দেশ্যও নয়। ফলে তা উহ্য রেখেও বলা যায় ইরান নিজ বিপ্লব নিজ রাষ্ট্র সুরক্ষার তাগিদে ফলে এর পক্ষে দুনিয়ায় মুসলমানদের মনে জায়গা করে নেবার বাসনায় – তার বিপ্লব ধারণার রপ্তানির বাসনা – থেকেই এটা ঘটিয়েছিল, এটুকু বলা যায়।
    দুই) অন্যদিকে, নিজ বিপ্লবী রাষ্ট্র সুরক্ষা নিরাপদ করতে ইরাকি শিয়াদের তাকে ব্যবহার করতে হবে এই বাসনা যে ইরানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের ছিল তা আজকে দাঁড়িয়ে পরিস্কার বলা যায়। যদিও এই বাসনা প্রকাশ্য নয়, এর বাইরের দিকটা হল তাঁরা নিপীড়িত ইরাকি শিয়াদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। একথা ঠিক যে সাদ্দামের আমল ইরাকি শিয়াদের অবদমন আর নিপীড়নে কেটেছে। কিন্তু সেই দশার সুযোগে ইরাকি শিয়াদেরকে ইরানী বিপ্লব ও রাষ্ট্র সুরক্ষা করতে ব্যবহার করার কারো আকাঙ্খা ন্যায্য হতে পারেনা। ওদিকে ইরানী বিপ্লবের পর, ১৯৮০-৮৮ এই সময়টা ইরাক-ইরান যুদ্ধে কেটেছে। অথচ আদর্শ হতে পারত সাদ্দামের সাথে ইরানের কোন সমঝোতা চুক্তিতে পৌছানো যাতে ইরাকের মোট পপুলেশনের ৬০-৬৫ ভাগ ইরাকি শিয়ারা ইরাক রাষ্ট্র ক্ষমতায় উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ত্বের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পায়, অবদমন আর নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়, বিনিময়ে ইরাকের দিক থেকে ইরানী বিপ্লবও নিরাপত্তা সুরক্ষার নিশ্চয়তা পায়। কিন্তু তা ঘটেনি। ইরাক-ইরানের পরস্পরের প্রতি সন্দেহ অবিশ্বাসই মুখ্য হয়ে উঠে ফলে আট বছর ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলে। আজকের পরিস্থিতি দেখে মনে করার কারণ আছে যে স্বাধীন ইরাকি রাষ্ট্র হিসাবে ইরাকি শিয়ারা ইরাকেই টিকে থাক, ইরাক রাষ্ট্র অটুট থাকুক – এটা নয় বরং ইরানী রাষ্ট্র নিরাপত্তা সুরক্ষার কাজে ইরাকি শিয়াদের ব্যবহার করাই ইরানের লক্ষ্য ছিল।
    আজকের ইরাক রাষ্ট্রের বাস্তবতা এমন জায়গায় পৌছিয়েছে যে, “ইরাকি” অর্থাৎ নিজ ইরাকি রাষ্ট্রের জন্য আকাঙ্খা কারও নাই, ইরাক ভুখন্ডে যারা আছেন তারা আসলে শিয়া, সুন্নি অথবা কুর্দি – ইরাকি কেউ নাই, ইরাকি রাষ্ট্র আকাঙ্খা করে, রাখে বাস্তবায়ন দেখতে চায় এমন আর কেউ নাই। এজন্য বাস্তবত ইরাক রাষ্ট্রটা আসলে কোথাও নাই। সবাই এর সমাধান দেখেছে হয় শিয়া, না হয় সুন্নি অথবা কুর্দি হয়ে। ইরাকি নাগরিকের দিক, ইরাকি হয়ে থেকে সমাধান দেখার কেউ নাই। একমাত্র নাগরিক পরিচয়েরই রাষ্ট্র হতে হয় অর্থাৎ রাষ্ট্রে নাগরিক মাত্রই সকলে সমান মর্যাদার, [মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদ রচনা করে এমন রক্ত, বংশ, গোত্র, গায়ের রং বা অন্য বর্ণবাদিতা, রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, নারী-পুরুষ ধরণের ভাগ, পাহাড়ি-সমতলী ধরণের ভুগোল ভাগ ইত্যাদি যত রকমের ভেদটানা সম্ভব সেসব কিছুর উর্ধে সকলে সমান মর্যাদার নাগরিক] একে অন্যের মর্যাদার নিশ্চয়তাকারি এমন না হলে শিয়ারা যদি শিয়া পরিচয় মুখ্য করে রাষ্ট্র হতে চায় তবে বাকি সবাইও নিজের নিজের পরিচয় ঝান্ডা খাড়া করবে। ইরাকি রাষ্ট্র বলে কিছু খাড়া হবে না। এটাও রাষ্ট্রতত্ত্বের আর এক মৌলিক শিক্ষা।
    তিন) একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমেরিকার সাথে পরমাণু ইস্যুতে ইরানের চরম বিরোধ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বুশের ২০০৩ সালের ইরাক হামলা ও দখলে ইরানের সম্মতি ছিল। আমেরিকার ইরাক দখল ইরানের নিরাপত্তার জন্য এক বড় একটা ঘটনা হবার কথা অথচ অবাক বিষয় এঘটনায় আমেরিকার উপস্থিতি ইরান রাষ্ট্রের দিক থেকে সে কোন হুমকি অনুভব করেনি। তাই সম্মতির প্রশ্ন উঠছে। না হলে ইরানী বিপ্লব যে জন্ম থেকেই যেখানে আমেরিকার সাথে একনাগাড়ে সরব বিরোধ চালিয়ে গেছে তা থাকা সত্ত্বেও সেই আমেরিকা ইরাক দখল করে ইরানের ঘাড়ের উপর এসে বসেছে অথচ ইরানের কোন অস্বস্তি নুন্যপক্ষে কোন আপত্তির বিবৃতিও আমরা দেখি নাই কেন? শুধু তাই না ২০০৬ সাল থেকে সেই যে ইরানের পছন্দের নুরে আল মালিকি প্রধানমন্ত্রী হলেন তা এখনও চলছে। আর বুশ তাকে পরিচিত করিয়েছিলেন “আমাদের লোক” হিশাবে। কারণ মালিকি ছিলেন সেই বিন্দু যেখানে আমেরিকা ও ইরানের কমন স্বার্থ এক হয়েছিল। কিন্তু সেটা ইরাকের নিজের রাষ্ট্রস্বার্থে নয়, বরং ইরান মালিকির ইরাকের ভিতর নিজ রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিরাপত্তা দেখেছিলেন। সাদ্দামের শিয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে সমাধান নিশ্চয় এবার শিয়া প্রাধান্যে সুন্নিদের উপর অত্যাচার নয়, অথবা এবার সুন্নিদের অপ্রতিনিধিত্ত্বশীল করে রাখা নয়। তাও আবার পরদেশি ইরানের স্বার্থের এক রাষ্ট্র হয়ে। আসলে “ইরানি স্বার্থের ইরাক রাষ্ট্র” এই বাক্যটাই স্ববিরোধী। ভিন রাষ্ট্রের স্বার্থে কেউ আর নিজের রাষ্ট্র থাকে না, থাকতে পারে না। ওদিকে মুকতাদর আল সদর ও অন্য কয়েকজন ইরাকি আয়াতুল্লাহ (যেমন সিসতানি) কখনও কখনও শিয়া পরিচয়ের উপরে উঠে ইরাকি হতে চেয়েছেন। কিন্তু বারবার তারা চুপ করে গেছেন। অন্তত তারা যে গলার ও প্রভাব-ক্ষমতার জোরের দিক থেকে সংখ্যালঘু তা প্রমাণ হয়েছে।
    (চার) গত কয়েক মাসে ISIL বলে যে বিদ্রোহীদের আমরা দেখছি এটা মূলত আলকায়েদা ঝোকের অংশ সাথে পুরানা বাথিষ্ট (সাদ্দামের দলের নাম) আর সুন্নি গোত্র প্রধানদের সমন্বয়ের এক সুন্নি জোট। যেখানে আলকায়েদা অংশের সাথে বাকি অংশের এলায়েন্সের কমন ভিত্তি হল দুটো –বাগদাদ দখল ও ইরাকি রাষ্ট্রকে ইরানি প্রভাব মুক্ত করা। এছাড়া কোন আদর্শগত বড় মিল এখানে নাই বরং অমিল বেশি। এই জোট উত্তর-পশ্চিমের মসুল দখল করে যখন বাগদাদের দিকে ধাবমান তখন মালিকির ইরাকি সেনাবাহিনী প্রতিরোধ না করে আগেই ময়দান ফেলে বাগদাদে পালিয়ে আসে। অবস্থা দেখে অনেকেই প্রথমে একে বাগদাদের সেনাবাহিনীর মনোবলের ঘাটতি মনে করেছিল। কিন্তু একদিন পরে ইরাকের আকাশে দেখা গেল সিরিয়ান এয়ারফো্র্সের বোমা বর্ষণ। অর্থাত সিরিয়ান এয়ারফো্র্সকে ISIL এর উপর বোমাবর্ষনের সুবিধা করে দেবার জন্য মালিকি নিজ সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কিন্তু এই বোমাবর্ষনের উদ্দেশ্য আরও ভয়ঙ্কর। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েও গেছে যে আমেরিকা-ইরান (সাথে বগলদাবা সিরিয়া)[এই অর্থে সিরিয়া থেকে ইরান এই শিয়া জোট] একজোট হয়ে ISIL বা সুন্নি ও আলকায়েদার বিরুদ্ধে লড়াই করা – এটা ঘটানো সম্ভব। এর প্রবল সম্ভাবনা একটা আছে। আর এতে ইরানের প্রবল আগ্রহ আছে। তার মানে সুন্নি জোটের বিরুদ্ধে এটা আমেরিকা-ইরানের কোন কূটনৈতিক ভাবালাপ নয় একেবারে জয়েন্ট মিলিটারি অপারেশন – এমন ভাবনা কল্পনা করা ইরানের জন্য ডালভাত। এই ইঙ্গিত ভয়ঙ্কর। এটা ইরান রাষ্ট্রের জন্ম থেকে আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির বিরোধীতাকে অর্থহীন প্রমাণ করেছে। ইরান নিজ সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করে আগানোর নিজ ইচ্ছা প্রকাশ করার মধ্যে কোন অস্বস্তি দেখে নাই। এভাবে ইরাক নামের কোন রাষ্ট্র জাহান্নামে যাক, ইরান [আর সেই সুত্রে আসাদের সিরিয়া রাষ্ট্রও] রাষ্ট্রের স্বার্থ সুপ্রীম। তা যেকোন উপায়ে হাসিল করতে হবে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম! এর কিছুদিন পরে বাগদাদে মালিকির প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড, সেনাবাহিনী, আল সদরের বাহিনী ইত্যাদি মিলে যে সামরিক মহড়া আয়োজন করেছিল সেখান থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এটা ইরাকের বাগদাদ রক্ষা নয়, বরং বাগদাদকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে, সেখানে বসে ইরান রাষ্ট্রের সুরক্ষা প্রতিরক্ষার ফিজিক্যাল মহড়া ও মাসল দেখানো ছিল সেটা। অর্থাৎ এটা প্রকাশ্যেই প্রমাণ করেছে মালিকির ইরাকি রাষ্ট্র এমনই এক অদ্ভুত “রাষ্ট্র” যা সাজানো হয়েছে নিজ নিঃস্বার্থ হয়ে ইরান রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা নিজ করণীয় ও কর্তব্য বলে ঠিক করেছে। সেই সাথে ইরানী সেনাবাহিনী ও গার্ড বাহিনী যে ইতোমধ্যেই বাগদাদে এসে ততপরতা শুরু করেছে এর প্রমাণ পাওয়া যায় বাগদাদে দুজন ইরানী সেনা অফিসারের মৃত্যুর ঘটনা থেকে। ইরান আনুষ্ঠানিক ভাবে তা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতেও দ্বিধা করেনি।
    ব্রেজনেভের সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান দখল করে নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে অন্য রাষ্ট্রকে ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করেছিল। এবার ইরানের একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের এক ইরাক সাজিয়ে ইরান আরও বিশাল উদাহরণ তৈরি করল।
    তাহলে বিপ্লব বলতে সেটা রাশিয়ার সোভিয়েত বিপ্লব হোক কি ইরানের ইসলামি বিপ্লব – গোড়ার সমস্যা একই, আধুনিক রাষ্ট্রের লজিক ও বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার সমস্যা।

    [এই রচনা পাঠে পাঠকের প্রতি কিছু পরামর্শঃ] আলোচ্য শিরোনামের লেখাটা চূড়ান্ত কিছু নয়, প্রাথমিক প্রস্তাব। আরও এডিটেড একটা ভার্সান পরে হাজির করার ইচ্ছা রাখি। এখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বা ইরান সম্পর্কে বেশ কিছু ঐতিহাসিক তথ্য সংযোজিত করা হয়েছে। কিন্তু এর উদ্দেশ্য এমন একেবারেই নয় যেন পাঠকের এথেকে এসব দেশের প্রতি বিরূপ মনোভাব অথবা ঘৃণা তৈরি হোক – তা রাষ্ট্রীয় বা ইডিওলজি যেকোন অর্থে। অথবা এমন নয় যে বাংলাদেশের স্বার্থে এসব দেশের কোন ইতিবাচক অবদান নাই। অথবা এমন নয় যে নতুন আইডিয়া হিসাবে এসব দেশের বিপ্লবের কোন আবেদন এবং আমল করার মত রাষ্ট্র-ধারণায় গুরুত্ত্বপুর্ণ কোন তত্ত্বীয় অবদান, সংযোজন নাই। অথবা এমন নয় যে এসব দেশের রাষ্ট্রনীতির সাথে বাংলাদেশের মানুষের কোন স্বার্থ মিল হবার ভবিষ্যতে কোন সম্ভাবনা নাই। ফলে এমন ধারণা করা সঠিক হবে না। অথবা বাংলাদেশে আমি কোন জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ফেরি করতে চাইছি, কোন জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই এখন ভরসা এমন কোন ইঙ্গিত করছি। অথবা নাগরিক ধারণাকে কোন না কোন জাতীয়তাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ বা আটকে রেখে ফেরি করছি। এসব অনুমান অমূলক হবে ও লেখকের প্রতি অবিচার করা হবে। এক হিসাবে নানা দেশের এখানে যা কিছু তথ্য সংযোজিত হয়ে আছে সেগুলোকে ঐতিহাসিক অবজেক্টিভ ফ্যাক্ট ও রিয়েলিটি হিসাবে গ্রহণ করলে সুবিচার করা হবে। অর্থাৎ আমাদের পরস্পরের রাষ্ট্রস্বার্থগুলো ওসব জায়গায় কমন থাকতে পারেনি – এর উদাহরণ হিসাবে নিলেই যথাযথ হবে। তবে অবশ্যই আমি জোর দিব একথা বলে যে, আইডিয়ার নামে আড়ালে একে অন্যকে একান্ত স্বার্থে ব্যবহার – একাজে বিরত থাকা এবং ঘোষণা দিয়ে তা পরিত্যাগ করতেই হবে।

  • অন্যের বাড়িঘর দেশ দখল করে তাদেরই হত্যা করার ‘সেলফ ডিফেন্স’

    অন্যের বাড়িঘর দেশ দখল করে তাদেরই হত্যা করার ‘সেলফ ডিফেন্স’

    গৌতম দাস

    http://wp.me/p1sCvy-7N

    ১৯ জুলাই ২০১৪।
    জায়নিস্ট ইসরায়েলের হাতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যার উৎসব চলছে। আর এ হত্যাযজ্ঞের পক্ষে ছদ্ম-ন্যায্যতার ইসরায়েলি বয়ান হল, ইসরায়েল নাকি নিজের ‘সেলফ ডিফেন্সের’ জন্য এটা করছে, সুতরাং এটা জায়েজ। ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমেরিকা, ব্রিটেন ইত্যাদির বয়ান হল, তারা ইসরায়েলের সেলফ ডিফেন্সের অধিকার সমর্থন করে। পশ্চিম র‍্যাশানাল, বুদ্ধির যুক্তি ছাড়া তারা কথা বলে না। তো তাদের সেলফ ডিফেন্সের শঠতা চাপাবাজি যদি মেনে নিই, তো তাহলে ফিলিস্তিনিদেরও সেলফ ডিফেন্সের অধিকার থাকার কথা। শুধু তা-ই না, অন্তত জায়নিস্টদের চেয়ে তা দ্বিগুণ বেশি হওয়ার কথা। কারণ ইসরায়েল এমন এক রাষ্ট্র, যে অন্যের বাড়িঘর খোদ রাষ্ট্রের ওপর দখলদার। এছাড়া এর রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রতিদিন বাড়ে, এমন অদ্ভুত এক রাষ্ট্র। ফলে প্রথমত. ফিলিস্তিনিদের নিজের রাষ্ট্রভূমি রক্ষার জন্য সেলফ ডিফেন্স প্রতিরোধ সব আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ ও স্বীকৃত। দ্বিতীয়ত. নিজের জান ও মাল রক্ষা, আত্মরক্ষার জন্য সেলফ ডিফেন্সে পাথর ছুড়ে মারা, গুলতি মারা, হাতে তৈরি রকেটসহ আরও কিছু সবই বৈধ ও স্বীকৃত। কিন্তু তা পশ্চিমা শঠতা হল এব্যাপারে তারা নিশ্চুপ।

    রুজভেল্ট ও চার্চিলের আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১
    পরপর চারবারের (১৯৩৩-৪৫) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে নাকে খত দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া দলিল হল, আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১। না আমি এতটুকুও বাড়িয়ে বলছি না, এটা আসলেই নাকে খত দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া দলিল। এর প্রমাণ হল, ‘হিজ ম্যাজেস্টির’ ব্রিটেন মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখনো সবচেয়ে বড় রুস্তম কলোনি মাস্টার, আমরাও তখন ব্রিটিশ-ভারত কলোনির অধীন। অথচ ওই আটলান্টিক চার্টারে চার্চিল স্বীকার করে সই করছেন, যা বলে ওর সারকথা হলো কলোনি দখল করা যাবে না, কলোনি দখল অন্যায়। যেমন— ঐ চার্টার ছিল মূলত আমেরিকা ও ব্রিটেনের এক যৌথ ঘোষণা। ওখানে আটটা দফা আছে, যার প্রায় সবই দুনিয়ায় কলোনি দখল ও শাসন আর না চালানো সংক্রান্ত, যদিও কলোনি শব্দ উচ্চারণ না করে তা লেখা হয়েছে। প্রথম দফা বলছে “দুই রাষ্ট্র নিজ ভূখণ্ড বড় করতে কামনা করে না (seek no aggrandizement, territorial or other)”। দ্বিতীয় দফা বলছে, “তারা অন্যের ভূখণ্ড নিয়ে নিজ ভূখণ্ড বড় করার খায়েস রাখে না যদি সে ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হওয়ার ইচ্ছা না থাকে”। তৃতীয় দফা বলছে, “কোন ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের নিজ পছন্দের সরকার বেছে নেয়ার অধিকারকে তারা সম্মান করে। তাদের সার্বভৌম নিজ সরকার যা জোর করে অন্যে উত্খাত করেছে, সেটা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে দেখতে চাওয়া— ওই জনগোষ্ঠীর ‘অধিকার’ এবং আমাদের তা সম্মান জানাতে হবে”। অতএব দেখা যাচ্ছে, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রুস্তম কলোনি মাস্টারকে দিয়ে এসব স্বীকার করিয়ে নেয়া নাকে খত দেয়া ছাড়া আর কি! আগ্রহীরা পুরা আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১ দেখে নিতে পারেন এখানে। বাঘ ঘাস খায় না। তবে কখনও কখনও বাধ্য হয়ে খায়। কখন ও কেন ঘাস খায় তা কি পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল, রুজভেল্টের স্বপ্নের আগামী দুনিয়াটা কি ছিল, তা নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা করব। আপাতত দু-একটা বাক্য খরচ করব কেবল। ১৯৩৯ সালে অর্থাৎ আটলান্টা চুক্তির দেড়-দুই বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছিল। হিটলারের জার্মানি ফ্রান্স দখল শেষ করে ফেলেছে। আর ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে দাঁড়িয়ে এবার ব্রিটেন দখলের বুদ্ধি আঁটছিল। তাই চার্চিল এসেছিলেন রুজভেল্টের কাছে ভিক্ষা মাঙতে যেন তিনি পক্ষ নেন, পাশে দাঁড়ান। ফলে ব্রিটিশ এম্পায়ারের বিস্তর কলোনি যায় যাক, খোদ নিজ ভূখণ্ডটা যদি রক্ষা করা যায়, চার্চিলের কাছে সেই মামলা ছিল ওটা। আর রুজভেল্টের দিক থেকে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর আগামী দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে দেখা সে স্বপ্নের প্রথম দলিল ছিল আটলান্টা চার্টার। কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া রুজভেল্টের চোখে হারাম ছিল। তিনি চেয়েছিলেন এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজম, ওয়াল ষ্ট্রিটের চোখে দেখা সে স্বপ্নে দুনিয়াটা ছিল পুঁজি বিনিয়োগের বাজার আর বাজার। নিজের সেই স্বপ্নে সায় দেয়ার বিনিময়ের শর্তেই কেবল রুজভেল্টে ইউরোপকে উদ্ধারে রাজি হতে চেয়েছিলেন। তাই ওটা ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের দাসখতের দলিল। পরের বছর ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারী তারিখে এই “আটলান্টিক চার্টারকেই ভিত্তি” মেনে জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই জাতিসংঘের কাজ কী হবে, সেসবের বিস্তারিত যা জাতিসংঘ চার্টার নামে খ্যাত সেসব লিখে, গৃহীত হয়ে জাতিসংঘ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ১৯৪৫ সালে। সেলফ ডিফেন্স, রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার কথাগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে জাতিসংঘ। কাজেই ইসরায়েল নিজের সেলফ ডিফেন্সের জন্য গাজায় রক্তের নদী বইয়ে দেয়া জায়েজ বলে দাবি পশ্চিমের র‍্যাশানাল মনের বুদ্ধির যুক্তিতেই নাজায়েজ এবং একশ ভাগ মিথ্যা; ভণ্ডামি হিপক্রাসি।

    যেভাবে জায়নিস্ট ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে জবরদখল নিল
    ফিলিস্তিনিদের দুঃখের শুরু শুধু না, তাদের ফোরফ্রন্টে রেখে সারা দুনিয়াকে বে-ইনসাফ, অনাচার অত্যাচার হত্যা নিপীড়নের দুনিয়া বানানোর কারবারের শুরু বলা যেতে পারে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে। কলোনি লোভি ব্রিটিশের বাসনা ছিল যে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে মিসর ফিলিস্তিন হয়ে আগেই দখল হয়ে থাকা ব্রিটিশ-ভারত পর্যন্ত ভূখণ্ডগতভাবে পুরাটাই নিজের কলোনি বিস্তার ছড়ানো। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফা ব্রিটিশ ও ফরাসি আক্রমণের মুখে সারা দুনিয়ার প্রতি যে আহ্বান (যেখান থেকে খেলাফত আন্দোলনের সূচনা) রেখেছিলেন, তা আংশিক হলেও আজ সত্যি হয়েছে। মিসর, ফিলিস্তিনসহ সারা মধ্যপ্রাচ্য ১৯১৮ সালের আগে ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। সাম্রাজ্য রক্ষার প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল তার প্রধান প্রতিযোগী ও শত্রু। ওদিকে লেট কামার উদীয়মান জার্মান ছিল তাই তার টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ইউরোপীয় পার্টনার। সেই সূত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (আগস্ট ১৯১৪-নভেম্বর ১৯১৮) পক্ষ-বিপক্ষ ভাগের দিক থেকে তুরস্ক ছিল জার্মানির পক্ষে আর ব্রিটিশ ও ফরাসিদের বিপক্ষে। সে যুদ্ধে জার্মানির সঙ্গে অটোমান তুরস্কেরও পতন হয়। যুদ্ধ শেষে অটোমান এম্পায়ার এলাকাগুলো ভাগ করে নেয় ব্রিটিশ ও ফরাসিরা। এই হলো মোটাদাগে ইতিহাসের ঘটনা। ব্রিটিশ ও ফরাসি দুই কূটনীতিকের (Sir Mark Szkes এবং Georges Picot) স্বাক্ষরিত ভাগবাটোয়ার গোপন চুক্তি হয়েছিল, যার নাম Szkes-Picot Agreement of 1916 অর্থাৎ চলমান যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯১৬ সালে এই চুক্তি হয়েছিল। এ চুক্তি অনুসারে একদিকে বাগদাদকে রাজধানী করে উত্তরে মসুল আর দক্ষিণে বসরা এ তিন অঞ্চলকে নিয়ে নতুন রাষ্ট্র ইরাকের জন্ম দেয় ব্রিটিশরা, সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের তীরের মিসর ও ফিলিস্তিনকে নিজের ভাগে নেয়। অন্যদিকে এ দুয়ের মাঝখানে লেভান্ট অংশ দেয়া হয় ফরাসিদের। Levant ইতালি-ফরাসি উৎসের এ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ইংরেজিতে রাইজিং অর্থাৎ উদিত হওয়া, মানে যেখানে সূর্য সবার আগে ওঠে, সেই অঞ্চল, এই অর্থে। একসময় ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরের গ্রিস থেকে মিসর পর্যন্ত সব দেশকেই এক শব্দে লেভান্ট অঞ্চল বলা হত। ভুমধ্যসাগরের পুর্ব তীরের দেশগুলোতে আগে সুর্য উঠে বলে এই নামের উতপত্তি। কালক্রমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তার শাসিত সিরিয়া, লেবানন এবং আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের কিছু অংশ, যা ফরাসিদের দিয়ে দেয়া হয়, ফরাসিরা একত্র এই ভূখণ্ডকে লেভেন্ট অঞ্চল নামে ডাকত। [নেপথ্যে বলে রাখি চলমান ইরাকে খলিফা রাষ্ট্র ঘোষণার সময়ে ISIL শব্দের অর্থ ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভেন্ট। অর্থাৎ যারা ব্রিটিশ-ফরাসিদের ইরাক ও লেভেন্ট বলে কলোনি ভাগবাটোয়ারা মানেনা। এই হল লেভান্ট নামের তাতপর্য।] তবে অটোমান সাম্রাজ্য অঞ্চলকে ব্রিটিশ-ফরাসিরা ভাগ করে নিলেও এর আইনি কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় একটা রাখঢাক ছিল। বলা হয়, ‘লীগ অব নেশান’-এর কাছ থেকে ব্রিটিশ-ফরাসিরা এ অঞ্চলগুলোয় ‘ম্যান্ডেট’ হিসেবে শাসন অধিকার পেয়েছিল। [লীগ অব নেশন হলো জাতিসংঘের আগের রূপ ও ভার্সন। গঠিত হয় ১৯২০ সালে, কিন্তু শুরুর দশ বছরের মধ্যে কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে, ওর সদস্যদের একে অন্যকে কলোনি দখল করে নেয়ার বিরুদ্ধে বাকি সকলে ন্যূনপক্ষে নিন্দা করতে না পারার কারণে। এরপর তা অকার্যকর পড়েছিল ১৯৪১ সালে আটলান্টা চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত। এরপর লিগ অব নেশনের পুনর্জীবন ঘটে নতুন নামে নতুন চুক্তিতে। ১৯৪২ সালের এক ঘোষণায় এর নাম হয় জাতিসংঘ।] অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের তিনশ বছরে ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কলোনি দখল করে কেটেছে অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর এবার যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের উছিলার যুক্তিতে জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করে আর অটোমান সাম্রাজ্যকে ভাগ করে নেয়। ওই ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অটোমান সাম্রাজ্যের নতুন ভাগবন্দোবস্ত দেয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯২০ সালে লিগ অব নেশন গঠিত হয়েছিল। ম্যান্ডেট কথার কাগজপত্রের কনসেপ্টটা হলো, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজ্যগুলো লীগ অব নেশানের ‘ট্রাস্টি পরিষদ’ নামের এক বিভাগের হাতে হাওলা করা হলো। এরপর ট্রাস্টি পরিষদ ওর নতুন বিলি বন্দোবস্ত দিল ব্রিটিশ ও ফরাসিদের। এ নতুন বিলিবন্দোবস্তের আইনি নাম ‘ম্যান্ডেট’। লীগ অব নেশন গঠনের আর্টিকেল ২২, এটা ম্যান্ডেট সংক্রান্ত আর্টিকেল।

    ম্যান্ডেটঃ লীগ অব নেশন গঠনের আর্টিকেল ২২
    আর্টিকেল ২২ বলছে, ‘গত যুদ্ধের ফলে যেসব কলোনি ও ভূখণ্ড, যেগুলো আগের রাষ্ট্রের সর্বভৌমত্বের শাসন অধীনে আর নেই, যেগুলোয় বসবাসকারী বাসিন্দারা শক্তি দেখানোর আধুনিক বিশ্বে (strenuous conditions of the modern world) নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে চলার উপযুক্ত হয়নি, এগুলোয় এ মূলনীতি প্রয়োগ করা হবে যে, এসব জনগণের ভালোমন্দ ও বিকাশ দেখাশোনার জন্য এক সভ্যতার বিশ্বস্ততা ট্রাস্ট (sacred trust of civilisation) গঠন করা হবে এবং তাদের নিরাপত্তা বিষয়টা এ ট্রাস্টের ওপর ন্যস্ত হবে আর ট্রাস্ট পরিষদ গঠন বিষয়টা লীগ অব নেশন উদ্যোগ চুক্তির অংশ গণ্য হবে”।
    “এই মূলনীতিকে বাস্তবায়নের সবচেয়ে ভালো উপায় হবে, এসব জনগণকে কোনো অগ্রসর জাতির অভিভাবকত্বে (tutelage) হাওলা করে দেয়া, যারা তাদের সম্পদ, অভিজ্ঞতা অথবা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ দায়িত্ব পালনে সমর্থ হবে, যারা নিজ ইচ্ছায় এই দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক এবং লিগ অব নেশনের তরফ থেকে এ অভিভাবকত্ব ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হিসেবে দেয়া হবে ও তারা চর্চা করবে”।
    “ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তরা ট্রাস্টি কাউন্সিলের কাছে অর্পিত দায়িত্ব বিষয়ে এক বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে। ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসন ক্ষমতা কীভাবে চর্চা করবে, তা এককভাবে ট্রাস্টি কাউন্সিল নির্ধারণ করে দেবে, যদি না এ বিষয়ে লিগের সদস্যদের দ্বারা আগে থেকেই একমতের কোনো সিদ্ধান্ত থাকে।
    একটা স্থায়ী কমিশন গঠন করা হবে, যারা ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেয়া বার্ষিক রিপোর্ট গ্রহণ ও নিরীক্ষা করবে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের সব বিষয়ে ট্রাস্টি কাউন্সিলের কাছে পরামর্শ রাখবে”।
    আগ্রহিরা মূল কপির বিস্তারিত এখানে পাবেন, এখানে সবচেয়ে বড় তামাশাটা হলো, পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ কলোনি দখলটাকে নিজ সভ্যতার গৌরব বলে চালিয়ে দেয়া হলো। আবার নিজেই স্বীকার করছে, যে দুনিয়াটাকে তারা “শক্তি দেখানোর আধুনিক বিশ্ব” বানিয়েছে। মানে কলোনি মাস্টারের মাসল দেখানোর ঠেলায় অন্যের নিজ ভূখণ্ড, রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার কাজটা তারাই অসম্ভব করে রেখেছে। এছাড়া স্টাডির বিষয় হলো, কথার চাতুরিতে কীভাবে ম্যান্ডেটের নামে আবার কলোনি দখলকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় নভেম্বর ১৯১৮। কিন্তু এর অন্তত এক বছর আগে অর্থাৎ অটোমান সাম্রাজ্য তখনো বহাল, এ অবস্থায় ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠনের ভ্রূণ তৈরি করে রাখা হয়েছিল। দলিলের নাম বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration 1917), বেলফোর (Arthur James Balfour) ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের তত্কালীন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি একটা চিঠি লিখেছিলেন Walter Rothschildকে। ওয়াল্টার হচ্ছেন জার্মান ইহুদি বাবা লর্ড নাথন রথসচাইল্ডের (জার্মান উচ্চারণে রথশিল্ড) সন্তান, পুঁজি ব্যবসায়ী, সরকারি বন্ডের প্রধান ব্যবসায়ী। ইউরোপের চার দেশের চার শহরে চার ছেলে বসে সে সময় পারিবারিকভাবে তারা প্রতিদিনের আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার ঠিক করতেন। আজকের হিসাবে ওই পরিবারটাকে সেসময়ের আইএমএফ বলা অত্যুক্তি হবে না। বেলফোরের চিঠিটা ঠিক কোনো সরকারি ঘোষণা নয়। তবে তিনি ইহুদিদের জায়নিস্ট রাষ্ট্রের স্বপ্নের পক্ষে তার সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও সহানুভূতির কথা জানাতে এ চিঠি লেখেন। পরে এ চিঠিকেই বেলফোর ঘোষণার দলিল হিসেবে আবির্ভূত ও দাবি করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো এক. ফিলিস্তিনিদের ভূমির ওপরই একক জায়নিস্ট রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্রিটিশ সরকার কে? কারণ ওই ভূখণ্ডের ওপর তখনও বৃটিশের কোনো কর্তৃত্ব নেই, এখতিয়ার নেই। তখনো তা অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ। দুই. ঐ চিঠিতেই বেলফোর আবার বলছেন, “এতে ওই ভূমিতে বসবাস করছে, এমন অ-ইহুদিদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিরুদ্ধে যায়— এমন কিছু করা হবে না। অথবা অন্য দেশে বসবাসরত ইহুদিদের অধিকার ও রাজনৈতিক স্ট্যাটাস সেখানে যা ভোগ করছে, তা এখানেও অটুট রাখা হবে”। অর্থাৎ মুখে বলছেন, অ-ইহুদিদের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবেন, কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব কারণ তিনি এক জায়নিস্ট রাষ্ট্রের স্বপ্ন অনুমোদন করছেন। এছাড়া অন্যের ভূখণ্ডের ওপর কীভাবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন, তাদের নির্মূল বা উত্খাত না করে। সুতরাং তারা আগেই জানতেন এটা কথার কথা। অর্থাৎ আজ তো এটা পরিষ্কার যে, বেলফোরের সরকারের নিজ প্রতিশ্রুতিও নিজে রক্ষা করেনি। দ্বিতীয়ত. অন্য দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের তিনি মাইগ্রেট করে আনার পরিকল্পনা করছেন এটাও পরিষ্কার। শুধু তাই না, সেসব দেশে ইহুদিরা যেমন রুস্তম হয়ে ছিলেন, জায়নিষ্ট রাষ্ট্রে এখানেও তাদের তেমন রুস্তমি নিশ্চিত করবেন। বাস্তবে আজ সেটাই হয়েছে। কিন্তু এর আইনগত দিকটা আরো মারাত্মক। অন্যকে তাঁর নিজ বাড়িঘর জমিজমা এমনকি দেশ থেকে উত্খাত করে সেখানে কারো স্বপ্নের রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে চাওয়া— আইনগতভাবে একথা চিঠিতে বলা এটাই মারাত্মক প্রমাণিত অপরাধ।
    জায়নিস্ট ইসরায়েল রাষ্ট্র কায়েমের ঘোষণা করা হয় ১৯৪৮ সালে। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের ঘোষণার সময় ওর ভূখণ্ড কোনটা কতটুকু তা ওই ঘোষণার অঙ্গ। কিন্তু যতবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়েছে, (১৯৬৭ বা ১৯৭৩) প্রত্যেকবার নতুন নতুন ভূমি দখল করে তাকেও নতুন সীমানা বলে দাবি করা হয়েছে। এসবই হয়েছে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সব আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আর পশ্চিমের পরাশক্তিগত দাপটই সেখানে একমাত্র রুস্তম কর্তা, নির্ধারক। আসলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ ধরে রাখতেই এমন নুইসেন্স টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পশ্চিমের পরাশক্তিগত রুস্তমি হল জায়নিষ্ট ইসরায়েলি রাষ্ট্র টিকে থাকার উৎস। অতএব একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রের ওপর বর্তমান পরাশক্তিগত রুস্তমির সমাপ্তি এবং ভারসাম্য উলট-পালট ও দুর্বল হয়ে গেলেই জায়নিষ্ট ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে। দুনিয়ায় যে কোনো জায়নিস্ট রাষ্ট্রের বিলুপ্তি অনিবার্য। প্যালেষ্টাইনী প্রতিরোধ, হামাসের প্রতিরোধ লড়াইয়ের বিজয় অনিবার্য।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। লেখাটা গত ১৯ জুলাই ২০১৪ দৈনিক বণিকবার্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও কিছু এডিট করে আবার ছাপা হল। এছাড়া চিন্তা ওয়েবেও একটা ভার্সান ছাপা হয়েছে।]

  • মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী

    মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী
    হাসিনা লোভনীয় সম্পদ নাকি দায়

    গৌতম দাস

    ০২ জুলাই ২০১৪।
    ভারতের নবগঠিত মোদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিনদিনের সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়ায় দাদাগিরি মন্তব্য আর মুই কি হনুভাব আবার চেগে উঠেছে। ভারতের নির্বাচন শুরু হবার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ শেষে সুষমার বাংলাদেশ সফরের আগে পর্যন্ত – সব মিলিয়ে প্রায় চার-পাঁচ মাস এসব উতপাতে ভাটা পড়েছিল। এমনিতেই ভারতের সব তরফের দাদাগিরিতে আমরা অস্থির অসহ্য থেকেছি গত প্রায় ছয় বছর। এর উপরে আরও সবচেয়ে অসহ্য ঠেকে ভারতের মিডিয়া, সেরের উপর যেন সোয়া সের। “রাজার চেয়ে পারিষদ বলে শতগুণ”। এরা বুঝতেই পারে না সবকিছুর একটা সহ্য সীমা লিমিট আছে। এরপর সেটা বুমেরাং হয়।
    ভারতীয় মিডিয়া তবু যদি গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ বুঝতে নজর দেবার ক্ষমতা দেখিয়ে তাতে ভারতের কি সম্ভাবনা – ভারত কোন উচ্চতায়, সম্ভাব্য কোন ভুমিকায় তার অবস্থানের গুরুত্ত্ব, মোদি সেটা কিভাবে পাঠ করছেন ও নীতি নিচ্ছেন এনিয়ে যদি তাদের উগ্রজাতিবাদী জোশমুক্ত ও নির্মোহ কোন বাস্তব মুল্যায়নের উপরে দাঁড়ানো কথা বলতে দেখা যেত তাও নাহয় সহ্য করা যেত। সেদিকে না গিয়ে বরং গায়ে মানে না আপনি মোড়লি মন্তব্যের নামে উস্কানিমূলক কলাম আবার প্রতিদিন একটা না একটা পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে।
    কাকে ফেলে কার কথা দিয়ে শুরু করব? দ্যা হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার, না টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটোরিয়াল নাকি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শুভজিত রায়ের কথা? এছাড়া বিখ্যাত আঁতেল ডঃ সুবীর ভৌমিক তো নিয়মিতই আছেন। মোদির বিপুল জয়লাভের পর আবার দেখা গেল কেউ কেউ পুরা ভোল পালটিয়ে ফেলেছেন। যেমন, ডঃ সি রাজামোহন, গত দশ বছরের কংগ্রেস শাসনে তিনি নয় বছরই কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। যা আসলে সেসময়ের ভারতের পিঠে হাত রাখা আমেরিকার সমর্থিত কংগ্রেসের নীতি ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের সাথে আমেরিকার বিবাদ শুরুর পরের সময়ে তিনিও কংগ্রেসের শেষের বছর একটু দুরত্ত্ব রাখছিলেন। আর সেই তিনি এখন একেবারে মোদি ভরসা। সপ্তাহ দুয়েক আগে তিনি বাংলাদেশে এসে সভা সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে গিয়েছেন। সেই সাথে গত ১৩ জুন চ্যানেল আই টিভিতে টকশোর সময়ে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সুবীর আর রাজামোহন মূলত আমেরিকান খুটি ভরসা মানে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখায় বলশালী অনুভব করে কথা বলতেন। তাদের ভারতই বিশাল রুস্তম এই ভাবের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনগণকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলতেন।

    অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
    মোদির উত্থানে কংগ্রেস টানা দশ বছর ক্ষমতায় কাটানোর সমাপ্তি ঘটল। এই শাসনকালের শুরুটা কেটেছিল ওয়ার ওন টেররের রমারমা কোলে। বুশের আমেরিকার দরকার ছিল ভারতকে কোলে তুলে নিবার, পিঠে হাত রাখার। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল ছিল সে ঐকালকে বুঝেছিল আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় আশেপাশে পড়শির উপর রুস্তমি দেখাবার কাল হিসাবে। কংগ্রেসের অযোগ্যতা হল ঐ সময়ের আসল দিকটা পাঠ করতে না পারা। সেটা হল, গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ মোচড় দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে, এশিয়ামুখি হয়ে পাশ ফিরে শুতে চাচ্ছে। তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” হাসিলের নামে রুস্তমি করলে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবে নাকি গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি হওয়াতে যেসব সুবিধা ভারতের জন্য ধেয়ে হাজির হচ্ছে তাকে কাজে লাগানোই নিজ অর্থনীতি বিকশিত করার পথ – রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নাকি অর্থনীতি কোনটা ফোকাস হবে এখান থেকেই এর পয়েন্ট অব ডিপারেচার; পথ আলাদা হয়ে বিভক্ত। কংগ্রেস তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” বলে বিষয়টাকে বুঝছিল। আর এরই তৈরি আবর্জনার নাম বাংলাদেশের বর্তমান হা্লের হাসিনার সরকার। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এটা সবার কাছে দিনের মত পরিস্কার ছিল যে বিগত কংগ্রেস সরকার হাসিনাকে তাদের বিশেষ পছন্দের সরকার হিসাবে পেয়েছিল। অবস্থা এমনও দেখা গেছে যেন বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হলেও নিজের স্বার্থকে ভারতের স্বার্থের অধীনস্ত রেখে সরকার চালানো – এমন নীতিতে সাজানোর জন্যই হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেটা ভরা নদী ভরাট করে ভারতীয় যান চলাচলে বিনা খরচের ট্রানজিট দেয়া থেকে শুরু করে সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যার জন্য উলটা ভারতের পক্ষেই সাফাই গাওয়া পর্যন্ত সবকিছুতে। এছাড়া খুবই কৌশলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অসংখ্য অমীমাংসিত ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যেন কেবল দুটো -তিস্তার পানি আর সীমান্তে ভুমি বিনিময় – এভাবে নামিয়ে আনতে মিডিয়া প্রচার প্রপাগান্ডায় সফলতা দেখিয়েছেন হাসিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ঐ দুটা ইস্যুও কোন ধরণের মীমাংসা ছাড়াই কংগ্রেস সরকারের সময়কাল শেষ হয়েছে। এরপরও হাসিনার পাঁচ বছর শাসনের শেষে ভারতের আবদার আর হাসিনার খায়েসের শেষ হয়নি। বাংলাদেশে ভারতের হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় চাই, তাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খা জাহান্নামে যাক – এই অবস্থান নীতি নিয়েছিল। এভাবে বাংলাদেশ ছিল ভারত সরকারের তাদের তথাকথিত “নিরাপত্তা স্বার্থের” নামে এক অবারিত অভয়ারণ্য – কংগ্রেসের এই আগ্রাসী ও জবরদস্তির নীতির সহায়ক ছিল ভারতের আমলা, কূটনীতিক ও গোয়েন্দা বিভাগ, আর সবার উপরে ছিল ভারতীয় মিডিয়ার ঐ দঙ্গল। সবাই একটা বিষয়ে একমত হয়ে কাজ করেছিল যে ভারতের “নিরাপত্তার স্বার্থের” নামে তাদের পড়শি অপর রাষ্ট্রে যা খুশি করার জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবারিত অভয়ারণ্য করে নিতে পারে। যেন এটা জায়েজ। আর এটাই নাকি বাংলাদেশের ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র, ভারতের সাথে সম্পর্ক ভাল হয়ে থাকার মডেল। এই প্রচার ভারতের মিডিয়ায় তুঙ্গে করে রেখেছিল এই খেদমতগারেরা। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত ইস্যু নাকি কেবল দুইটা এটা প্রতিষ্ঠা করার পরও তা নিয়ে কোন অগ্রগতি না হওয়াতে ভারতের ঐ ম্যানেজড মিডিয়াও লজ্জায় পড়ে। মুখ লুকানোর জায়গা খুজে না পেয়ে এদের কেউ কেউ শেষ বছরে কংগ্রেস সরকারের মৃদু সমালোচনা শুরু করে, সরকারের সাথে নিজেদের দুরত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করে। দায়দায়িত্ত্ব অস্বীকার করে।
    এটা পরিস্কার যে নতুন মোদির সরকার কংগ্রেসের এই নীতি ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক হয়েছে এমন ভাবতে শুরু করেছে। বহুবার বলেছি, মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বিজেপির অতীত কেমন তা দিয়ে এবারের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। অন্তত মোদির প্রথম দুই বছরে কি ফলাফল অভিমুখ তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফলে বিজেপির মোদি নয়, মোদির বিজেপি কি তা বুঝতে চেষ্টার দরকার আছে। মোদির বিদেশনীতির মুখ্য ফোকাস অর্থনৈতিক উন্নতি বা নিজের জনগণকে কাজ দেবার চ্যালেঞ্জ। অন্যভাবে বললে, আসন্ন গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটের সুবিধা বুদ্ধিমানের মত ব্যবহার করে এক ফাইন টিউনের মধ্য দিয়ে নিজের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হবার যে সুযোগ দেখা দিয়েছে তাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা। বিপরীতে কংগ্রেসের ফোকাস ছিল তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। মোদির হুশজ্ঞানের সাথে যদি তুলনা করি তবে বলতে হয় কংগ্রেস অবুঝ শিশু, পোলাপান। প্রথমত ভারতের গ্লোবাল সম্ভাবনার কথা কংগ্রেস বুঝেই নাই। অথবা বুঝেছে আমেরিকান স্বার্থের ফাঁদে পড়ে। ওয়ার অন টেররের নীতির দিক থেকে। যেটা আগে বলেছি কংগ্রেস মনে করেছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটে হাজির সুবিধা কথার অর্থ আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা। আর তাতে ভারত অর্থনৈতিক অর্থে নয় রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক অর্থে পরাশক্তির ভুমিকায় এসে গেছে। এভাবে এতটুকুই বুঝেছে। কিন্তু নিজেকে মৌলিক প্রশ্নটা করে নাই যে নিজের অর্থনৈতিক ভিতের উপর না দাঁড়িয়ে কেউ রাজনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে কি না। কারও যাতাকাঠি ধার করে রাজনৈতিক পরাশক্তি ভাবের মাসল দেখিয়ে পড়শিকে ধরব মারব কাটব – এটা কি ধার করে দেখানোর জিনিষ? কংগ্রেস আমেরিকার ওয়ার অন টেররের মধ্যে নিজের বিশাল সম্ভাবনা দেখেছে, আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে পেয়ে নিজের আঞ্চলিক মোড়ল হবার চকচকে লোভে পড়েছে, ফাঁদে পড়েছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত যে উলটপাল্ট চলছে এর প্রধান অভিমুখ ও ইঙ্গিত হল ভারতের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা। আর কোন রাষ্ট্র নিজ সক্ষমতায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হলে সেই সাথে এবার তার রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হিসাবে উদয় হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেটা এমন নিজের পায়ে দাঁড়ানো যা অন্য কেউ চাইলেও অস্বীকার করতে পারে না। মোটা বুদ্ধির শর্টকাটে মারা লোভি কংগ্রেস এসব দিকে খবর না রেখে নিজদেশের গত দশ-বার বছর নষ্ট করেছে পিছিয়ে দিয়েছে – শুধু নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে, নিজের অর্থনীতি ধুঁকে মরার অবস্থায় নিয়ে গেছে তাই নয়, এই অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের।
    এই ব্যাপারটাকে এককথায় বললে, কংগ্রেসের ফোকাস ছিল অর্থহীন তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” আর বিপরীতে মোদির ফোকাস অর্থনীতি। আবার এর মানে এমন নয় যে মোদি ভারতের সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে খাটো করছেন, তা নয়। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফকে তিনি কি বলতে পারেন? ডিল রফা করবেন এভাবে যে কাসাবদের বোম্বাই হামলার মত বিষয়গুলো আর না ঘটার বিষয়ে তিনি পাকিস্তানের নীতিগত সক্রিয়তা ও নিশ্চয়তা চান। আর এই নিশ্চয়তা নিয়েই তিনি পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের সকলে মিলে এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট করে সব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে হাটতে চান। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটা আসলে বিচ্ছিন্ন আলটপকা আলাদা বিষয় নয়, গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপাল্টের সুবিধায় এশিয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেই অর্থনীতি ফোকাসে পথ চলার অবিভাজ্য অংশ।
    অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা – বলে দুই ফোকাসের ভাগ দেখালাম এটা কি কাল্পনিক? মোদির উপরে নিজের মনের ভালভালাইয়া সৎ খেয়ালে আরোপ করা? মোটেও নয়। মোদির সরকারের বয়স মাত্র একমাস। ওর নীতিগত দিক কি হতে যাচ্ছে তার অনেককিছু অনুমান করা, অপ্রত্যক্ষে জানা গেলেও লিখিত ডকুমেন্টে এখনও তা যথেষ্ট হাজির নয়। কিন্তু তবু সুষমার এই সফরে তাঁর এক লিখিত বক্তব্য আমরা ইতোমধ্যেই হাতে পাই। সুষমার টাইট কর্মসুচীতে বিকেলে এক সেমিনারে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওখানে এক লিখিত বক্তব্য তিনি পড়েছিলেন যা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটেও গুরুত্ত্বের সাথে পাবলিক করে দেয়া হয়েছে। সুষমার এই সফরে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক প্রস্তুতি করেই যে তিনি এসেছিলেন এর ছাপ সব জায়গায় আছে। যেমন ভারতের নতুন সরকারের দিক থেকে দেখলে প্রথমত গত ছয় বছরে কংগ্রেস বাংলাদেশে যথেচ্ছাচার তান্ডব করেছে, অথচ তাতে অর্থনৈতিক বা ষ্ট্রাটেজিকভাবে ভারতের জন্য এমন কোন লাভালাভ ফল আনে নাই যা নিজে টিকে থাকে। বরং এটা অজস্র দায় ও আবর্জনা তৈরি করেছে। বিশেষত ঐ আবর্জনা পরিস্কার না করে ওর উপরে মোদির নতুন কোন নীতি কার্যকর হবে না – তা মোদি ও তাঁর নীতিনির্ধারক টিমের লোকজনের উপলব্দি হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন ভারতের অর্জনের দিক থেকে দেখলে এখন ভারতের সামনে আষ্টেপৃষ্টে বাধা এক হাসিনার বাংলাদেশ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এটা ভারতের জন্য এক বিশাল দায়। এর মূল কারণ ক্ষমতা ভিক্ষা করা হাসিনার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশই হাসিল করে আছে ঠিকই কিন্তু হাসিনারই নিজ দেশে কোন বেইল নাই। অন্তত পাবলিক রেটিং এর দিক থেকে যদি বলি এটা যতটাই শুণ্য এটা ভারতের জন্য ততটাই বোঝা। হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগি ছাড়া সারা বাংলাদেশের সব কোনা আজ ভারত বিরোধি হয়ে উঠেছে। এমনকি বাম রাজনীতিক যারা এর আগে কখনই ভারতের জবরদস্তির বিরুদ্ধে কিছু বললে সেটা নাকি “সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে” এই পবিত্র শুদ্ধ থাকার লোভে কখনও এনিয়ে কথা বলে নাই সেই বামেরাও এখন সোচ্চার হতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বহু আওয়ামি বন্ধুকে বলতে শুনেছি হাসিনা নিজেকে বিক্রি করছে কাজটা খারাপ। কিন্তু কি করব আমি আমার ফয়দাটাই কেবল এখান থেকে তুলে নিচ্ছি কিন্তু কোন দায় নিব না। কংগ্রেসের হাসিনার বাংলাদেশ রেটিং আজ এমন দুরবস্থায়। কিন্তু তবু এই রেটিং শুণ্য হাসিনাকে দিয়েই বাংলাদেশ থেকে কোন লাভালাভ সুবিধা ভারত যদি আদায় করতে চায় তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরও জবরদস্তির উজান নৌকা তাকে বাইতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খার সরাসরি বিরুদ্ধে গিয়ে মোদির ভারতকে দাঁড়াতে হবে। স্বভাবতই এটা ভারতের সুবিধা নয়, লায়াবিলিটি। ওদিকে মোদি যে স্বপ্ন দেখে তাতে তাঁর দরকার বাংলাদেশকে এক গুরুত্ত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে, কংগ্রেসের মত ভারতের তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে এক দাস বাংলাদেশ নয়। যেমন প্রেমের বেলায় পুর্বশর্ত হল, কেউ কারও দাস হলে চলবে না, পার্টনার উভয়কে উভয়ের জবরদস্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। যে মাত্রায় মুক্ত সেই মাত্রায় লেবেলের প্রেম-সম্পর্ক হবে। জমিদারের প্রেমাকাঙ্খা নিজ কুলবধুর সাথে মিটে না, কারণ ওখানে বধুর ভুমিকা কেবল কুল বা বংশরক্ষা ও বিস্তারের মধ্যেই সীমিত। তাই জমিদার দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে বাঈজির কাছে যায়। আসলে জমিদারের দরকার কুলবধু আর বাঈজি এই দুই ভুমিকার মিলিত এক বধু। আবার সেটা যদি হাসিলই হয় তখন দেখা যাবে জমিদার আবার জমিদার নাই। জমিদারি পরিচয় লোপ পেয়ে নিজেই অর্থনৈতিক উতপাদনের উদ্যোক্তা হয়ে গেছে। মোদি জানে নিজের উদ্যোক্তা ভুমিকা। ফলে তাঁর দাস নয় বা দাসের বোঝা নয়, এক মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেই তার চাই।
    মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেএগুলো কোন সুখস্বপ্ন কল্পনা নয়। সুষমা লিখিত বক্তব্যে বলছেন, “We are convinced that India’s development cannot be complete and sustainable unless we succeed in building productive partnerships with our immediate neighbours. We will, therefore, devote our energy to working much more closely with our neighbours in pursuit of our development goals. We will walk the extra mile to create opportunities and to build virtuous cycles of prosperity in the region. We will pursue the goal of economic integration and interconnectedness through trade, investment, transportation, capacity building, environment friendly practices and means that promote equitable development in the region”। নিজ দায়িত্ত্বের এর বাংলা করে বললে সুষমা বলছেন, “আমরা বুঝতে পেরেছি ভারতের (অর্থনৈতিক)বিকাশ নিজে টিকে থাকার মত স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হতে পারে না যদি সংলগ্ন পড়শীদের সাথে কার্যকর সক্রিয় পার্টনার সম্পর্ক আমরা তৈরি করতে না পারি। তাই আমরা আমাদের বিকাশের লক্ষ্য অভিমুখে আমাদের পড়শিদের সাথে আরও ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে আমাদের শক্তি ব্যয় করব। এই অঞ্চলের এমন সুযোগ সুবিধা আর দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্র (virtuous cycles of prosperity) তৈরি করতে আমরা নিজেই আগবাড়িয়ে বাড়তি পথ হাটব। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যাতায়াত,অবকাঠামোগত সক্ষমতার এক প্রকৃতি-পরিবেশ সহায়ক চর্চা তৈরির মাধ্যমে ও উপায়ে আমাদের অর্থনীতিগুলোকে পারস্পরিক পরিপূরক ও আন্তঃনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে আমরা জোর দিব যা এই অঞ্চলে সবার সমান বিকাশ (equitable development)আগিয়ে নিবে”।

    BCIM জোটের তাতপর্য
    অনেকের মনে হতে পারে কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষায় এরকম অনেক কথাই তো বলা হয়,এটাকে এত গুরুত্ত্ব দিবার কি আছে। না, এটা কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষার কথার কথা নয়। সেজন্য আরও কিছু পটভুমির কথা বলব, যে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাগুলো পাঠ করতে হবে।
    অনেকবার বলেছি,১)গ্লোবাল অর্থনীতি এখন এশিয়ামুখি। ২)দুনিয়ার আগামি নির্ধারক দুই অর্থনীতি চীন ও ভারতকে কেন্দ্র করেই এশিয়ামুখি গ্লোবাল অর্থনীতি আবর্তিত হবে। ৩) চীন ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার উচানিচা আছে আর এই দেশদুটোর ঠিক মাঝেই বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে সক্ষমতার উচানিচার ভিতর জোটের (BCIM জোট, বাংলাদেশ,চীন,ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে যে অর্থনৈতিক জোট)নীতিগত সাম্য এবং ভারসাম্য তৈরিতে বাংলাদেশের ভুমিকা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ হবে। [আমেরিকার প্ররোচনায় পড়ে কংগ্রেসের ভারত এতদিন এই সম্ভাবনাকে ছুপিয়ে রেখেছিল, উপেক্ষা করেছিল। মাত্র গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে বিষয়টাকে আমেরিকার উপর প্রতিহিংসা ও রাগ দেখানোর বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে এবার সে নিজেই BCIM ঢোল পিটিয়েছিল।ঐ সময় চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ভিতর দিয়ে ভারত-চীনের পারস্পরিক সীমান্ত হামলার সন্দেহের সমাপ্তি হয়।যদিও ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়াই এখনও এই তথ্য আড়াল করে ভারত-চীনের কোন প্রসঙ্গ আসলেই তাকে সেনসেটিভ করে উস্কানি দেয়ার খাসিলত ত্যাগ করে নাই।] ৪) BCIM জোট খাড়া করা মানে এটা কোনভাবেই আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মিটানো নয়। আমেরিকার কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য চীনের কোলে চলে যাবার ভয় দেখানো নয়। আমাদেরকে কাজ করে দেখাতে হবে। এই চার দেশের অর্থনীতিতে সব অঞ্চলে সম উন্নয়নের সিরিয়াস বিষয় এটা। ৫) কেবল ভৌগলিক অবস্থান নয়,BCIM জোটের তাতপর্য যতটা না এই অঞ্চলের চার দেশের বাইরের বাকি দেশগুলোর সাপেক্ষে নিজেদের জোটবদ্ধ শক্তি হওয়া এরচেয়েও বেশি গুরুত্ত্বপুর্ণ হল জোটের বাইরে নয় বরং এই চার দেশের প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুষম বিকাশের দিকটা। মূল কারণ এই BCIM অঞ্চলটা মুলত চীন ও ভারত উভয়েরই ল্যান্ডলকড পুর্বাঞ্চল। যার আবদ্ধ অবস্থা থেকে সরাসরি সড়ক রাস্তাঘাটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগের দুয়ার খোলার উপায় BCIM জোট। ফলে তা এই অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতেও স্ব স্ব মূল রাষ্ট্রের সব জায়গার মতই সমান অর্থনৈতিক বিকাশের উপায়। আর এই মুক্তি ঘটবে বাংলাদেশ ও বার্মার ভুমির উপর দিয়ে এবং বাংলাদেশে নির্মিতব্য গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে। ফলে “ভারতের বিকাশ পড়শিদের উপর নির্ভরশীল আর স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হবার উপায়” – একথাটা একেবারেই বাকচাতুরি কূটনৈতিক রেঠরিক নয়। সুষমা বা মোদি একথা “বুঝতে পেরেছে” তা স্বীকার করলে বা না করলেও তখনও এটা সত্যি। এছাড়া প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের দিক মুখ্য করে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট যদি ঠিকমত দাঁড়িয়ে যেতে পারে তবে এশিয়ার বাকি অঞ্চলের উপরে এই জোট ভারকেন্দ্র ভুমিকায় চলে আসবে। কল্পিত সে পরিস্থিতি -এটা আর শুধু বাংলাদেশ থেকে সংকীর্ণ ভারতের জবরদস্তিতে ও বিনাপয়সায় ট্রানজিট আদায় করার মত মুদি দোকানি ভাবনা নয়। যেমন, কংগ্রেসের ভারত যে কতবড় ছেচড়া খুদে মুদি দোকানি তা বুঝা যায় তাদের আগাবার পদ্ধতির দিকে দেখলে। তারা জোর দিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিট অনুমতির কাগজ যোগাড়ে এবং তা বিনা পয়সায় হতে হবে। কিন্তু অনুমতি সে তো একটা কাগজ মাত্র। কাগজের উপর দিয়ে তো ভারতীয় মালামাল পারাপার হবে না,বাস্তব রাস্তাঘাট অবকাঠামো লাগবে,আর সেটা যে সে না ভারি যানবাহন চলার অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ট্রাফিক রুল,প্রটোকল, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি অনেক কিছু। এমনকি বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থকথা যদি বাদও দেই তো তবু তাতে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে একটা কিছু লাগবে। ফলে অন্তত ৫০০ কিমি ভারি রাস্তানির্মাণের বিনিয়োগ লাগবে যেটা তা বাংলাদেশ দূরে থাক ভারতও যোগানোর সামর্থ রাখে না। ফলে BCIM কেই জোটবদ্ধভাবে এর প্রয়োজনীয় ফান্ড যোগাড় করতে হবে। এবং এটা অবশ্যই সম্ভব শুধু নয় অন্য বিনিয়োগ দাতারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাস্তব দিকে ভারতের কোন আগ্রহ নাই। মুদি দোকানি যেন ধরেই নিয়েছে ভারতের ট্রানজিটের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চাহিদা বাংলাদেশের অর্থনীতিই পূরণ করবে। কিন্তু কেমন করে – এটা ভারতের ভাবনার বিষয় নয়। বরং ভাবটা এমন যেন হাসিনার ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে ওর কাছ থেকে একটা অনুমতির কাগজ হলেই তো ভারতের হবে। এজন্যই একে মুদি দোকানি বলছি যে নিজেকেও ক্ষুদ্র করে রাখে,নিজেকে অবাস্তব ও ক্ষুদ্রস্বার্থের আলোকে হাজির করে। অন্যদিকে ব্যাপারটাকে আবার বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে তার ভারতের শত্রু হয়ে থাকার কোন কারণ নাই,মতলব উদ্দেশ্য লক্ষ্যও হতে পারে না,কোন ফয়দা নাই,যদি না সেটা যে করেই হোক বাংলাদেশের স্বার্থ নয় সংকীর্ণ কেবল হাসিনার ক্ষমতায় থাকতেই হবে এই স্বার্থ হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুর শেষ নাই বরং বাড়ছে। সেগুলোকে জবরদস্তিতে অমীমাংসিত ফেলে রেখে কেবল ভারতের এবং সংকীর্ণ করে তা ট্রানজিটের কাগজ ধরণের উপস্থাপনের চিন্তায় কংগ্রেস গত ছয় বছর চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অমীমাংসিত সব ইস্যুগুলোর একটা প্যাকেজ ফয়সালা হলে ভারতের সাথে BCIM এ জোটবদ্ধভাবে সবার অর্থনৈতিক বিকাশে সামিল না হতে বাংলাদেশের আপত্তির কিছু নাই, থাকতে পারে না। সেখানে তখন কেবল ভারতের ট্রানজিট খুবই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়। বরং BCIM এর ট্রানজিট হাব হওয়ার মধ্যেই আসলে বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে। তবে অবশ্যই তা কোন জবরদস্তিতে নয় সমান ও সমলাভের জোট পার্টনার হিসাবেই।
    সুষমা এই কথারই প্রতিধ্বনি করছেন। তাঁর virtuous cycles of prosperity শব্দ ব্যবহার যেটার অনুবাদ করেছি “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ” -একথার অর্থ বুঝতে হবে অন্য আর এক অনুমিত বিপরীত শব্দের প্রেক্ষিতে। “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধি” শব্দের বিপরীতটা হল, পরস্পর রেষারেষি তথাকথিত “দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ” এই নীতি থেকে যা উতসারিত। যেটা এতদিন কংগ্রেস অনুসরণ করেছে। মোদির সুষমা এর বিপরীতে “দায়িত্ত্ববান” হতে, হয়ে সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করতে আহবান রাখছেন। ফলে এটা কংগ্রেসের নীতি সম্পর্কে মোদির মূল্যায়ন এবং তা পরিত্যাগও।
    সুষমা আগের উদ্ধৃতির শেষে আরও বলছেন,”Building a comprehensive and equitable partnership with Bangladesh is essential for the realization of our vision of a stable, secure and prosperous South Asia. History and geography have destined us to live together. How we do so is within our hands, and our hands alone.”- এর বাংলা করে বললে,”এক সুস্থির,সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখার আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এক সামগ্রিক ও সমমর্যাদার পার্টনার, এই সম্পর্ক তৈরি করা মৌলিকভাবে জরুরি। আমাদের ইতিহাস ও ভুগোল আমাদের একত্রে বসবাসের ভাগ্য ঠিক করে দিয়েছে। এটা কি করে করব তা আমাদেরই হাতে, একান্তই আমাদের হাতে”। এখানে comprehensive and equitable partnership অর্থাৎ অনুবাদে “সামগ্রিক” ও “সমমর্যাদার পার্টনা” শব্দদুটো বিশেষ গুরুত্ত্ব বহন করে।

    সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা আসলে কি
    অর্থনীতি বনাম তথাকথিত নিরাপত্তা – কার কি ফোকাস প্রসঙ্গে এভাবে কংগ্রেস ও মোদির বিজেপির তুলনা করছি। কংগ্রেস মনে করেছিল উত্তরপুর্ব ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা নাকি ভারতের নিরাপত্তার সমস্যা। জবরদস্তি উত্তরপুর্ব ভারতে ওদের পিটাপিটি দিয়ে আর বাংলাদেশে শিখন্ডি হাসিনার ক্ষমতা থাকা নিশ্চিত করার ভিতরেই ভারত সাত রাজ্য সমস্যার সমাধান। গত সাত বছর কংগ্রেস সমস্যাটা দেখেছে “সাতরাজ্য যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়” এই নীতিতে। ফলে কংগ্রেসের চোখে এটা ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু হিসাবে থেকেছে, আর এই নষ্টা বয়ানকে মিডিয়া তাল দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোদির দেখবার চোখ সম্পুর্ণ ভিন্ন। মোদি অত্যন্ত সঠিকভাবে সমস্যার গোড়ায় তাকাতে পারেন। মোদির চোখে ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর এমন সমস্যার সমাধান বলপ্রয়োগ বা নিরাপত্তা নয়। রিসোর্স এলোকেশন মানে সম্পদের বরাদ্দ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেই একমাত্র এর সমাধান। এসব রাজ্যগুলো ছোট অর্থনীতির ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদ মানে বিনিয়োগেরও ক্ষমতা কম,ফলে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। মোদি কথাটা তুলেছিলেন ঠিক সাত রাজ্যকে কেন্দ্র করে নয়,মমতার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে। মমতার দেখার মধ্যেও সংকীর্ণতা আছে,আছে অর্থনীতিকে মানবতা দেখানোর কাজ ভেবে বিচার করার ঝোক। তিনি গরীব মানুষকে প্রায় সরাসরি নগদ অর্থ বিতরণ ধরণের বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এক কর্মসুচী চালাচ্ছেন। মমতা বলছেন তিনি তার রাজ্যের অর্থমন্ত্রীকে অর্থ যোগাড় সম্ভব কি না জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি যোগাড়ে সমর্থ হয়েছেন। তাই তিনি এটা চালাচ্ছেন। ছোট অর্থনীতির পশ্চিমবঙ্গও এমনিতেই ছোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ফলে সবসময় সক্ষমতা্র অভাবে ভুগবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই অভাবের আকাঙ্খা মিটাতে মমতা মনে করেন কেন্দ্রের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এভাবেই এর সমাধান। বিপরীতে মোদি গত নির্বাচনের আগে এই সাক্ষাতকারে বলছেন,এটা কোন সমাধান নয়। বসিয়ে ভর্তুকিতে খাওয়ানো নয়,বরং কাজ সৃষ্টি ফলে বিনিয়োগ এর সমাধান। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিনিয়োগ যোগাড় করে দেয়া কেন্দ্রের দায়িত্ত্ব মনে করেন তিনি। তিনি কেন্দ্রে গেলে এটাই করবেন।অর্থাৎ আমরা দেখছি কংগ্রেস যেটাকে যুদ্ধবাজি দমনের সংকীর্ণ চোখে “নিরাপত্তার” সমস্যা হিসাবে দেখে মোদি সেটাকে বিনিয়োগ অর্থনীতিক বিকাশে সমাধান দেখেন। দুটো এপ্রোচের আকাশ-পাতাল ফারাক এখানে।

    সুষমার আমলা বাঁচানো নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল তৎপরতা
    গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের সক্রিয় হস্তক্ষেপে পক্ষ নেয়া ও কূটনীতিক সীমালঙ্ঘন করে হাসিনাকে পুন-ক্ষমতায় আনা এটা আমাদের দেশে ও বিদেশে সবাই অবাক বিস্ময়ে নজর করেছে। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই ভোট দিতে চাক নিজেদের প্রতিনিধি মনে করতে চাক সেগুলো তুচ্ছ। কংগ্রেসের হাসিনাকেই ক্ষমতায় চাই – এই ছিল কংগ্রেসের নীতি অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট সচিব সুজাতা সিং নির্বাচনের ঠিক আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসে প্রকাশ্যেই সেসব ততপরতা চালিয়েছিলেন। এর কয়েকমাসের মধ্যে ভারতের নির্বাচনে খোদ সেই কংগ্রেস মোট আসনের ১০ ভাগেরও কম আসনপ্রাপ্তিতে ভরাডুবি এবং বিপুল ভোটে মোদির উত্থান – এই পটভুমিতে নতুন সরকা্রের সুষমার বাংলাদেশ সফর ঘটেছে। কংগ্রেসের ভুমিকা হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগী ছাড়া বাংলাদেশের সবার মনে দগদগে ঘাঁ এর মত জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। সুজাতা ছাড়াও এর আর এক প্রকাশ্য প্রবক্তা হলেন হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ। তিনিও চাকুরিজীবি আমলার সীমায় থাকেন নাই। কংগ্রেসী হয়ে গেছিলেন। তিনিও ভারতের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত বলে গেছেন ভারতের বাংলাদেশ নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে। অন্তত দুবার প্রকাশ্যে তা উচ্চারণ করেছিলেন। এটা তাঁর সীমা লঙ্ঘন। চাকুরিজীবি আমলাকে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের অধীনতা মেনেই কাজ করতে হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বই রাষ্ট্রের নীতি ঠিক করেন যেখানে সেটা অনুসরণ করাই তার আমলা ভুমিকা। আর তিনি কিভাবে জানবেন কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে? আর কংগ্রেস আবার নির্বাচিত হলেও তো নিজের আগের নীতিতে সবটা অথবা কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু তিনি প্ররোচিত হয়ে হাসিনার সমর্থকদের আশঙ্কা দূর করতে নিজেকে বলি দিলেন। নিজেকে কংগ্রেসী রাজনীতির অংশ করে ফেললেন। কিন্তু মোদির বিপুল বিজয়ের পর পঙ্কজ ঠিক সময়মত তওবা পড়ে নিয়েছেন। একাত্তর টিভিতে দেয়া সাক্ষাতকারে যেটা বিডিনিউজ২৪ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট করে ছাপিয়েছিল। ট্রান্সস্ক্রিপ্ট থেকে এবিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশ তুলে আনছি। ইমরোজ খালিদী প্রশ্নকর্তা, বিডিনিউজের মালিক সম্পাদক।
    খালিদী: আপনি আগে বলেছিলেন, সরকার পাল্টালেও স্বার্থের পরিবর্তন হয় না। দিল্লিতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের হেরফের হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কোন কোন স্বার্থগুলো কখনোই পরিবর্তন হবে না বলে আপনি মনে করেন?
    সরণ: আমি আমার সেই বক্তব্য স্পষ্ট করতে চাই। আমি বলতে চেয়েছি, সাধারণ বিবেচনায় দুই দেশের স্বার্থ একই থাকে এবং তা রক্ষায় সম্পর্কের মূল নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে। ফলে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর দেয়াটাও জরুরি।
    খালিদী: তাহলে আগের ওই বক্তব্য নিয়ে আপনি একটু চিন্তিত?
    সরণ: না, ওটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি যা বলতে চাই তা হলো- নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রেসিডেন্ট লোকসভায় একটা বক্তব্য দিয়েছেন।
    বলছে। তবে ভারত ওই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও কি একই রকম থাকবে?
    সরণ: আমার মনে হয়, সেসময় আমাদের বক্তব্য ছিল- সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে- এমনটাই আশা করা হয়েছিল। আমি মনে করি, আমাদের এখন বর্তমানকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পুরনো বিষয় নতুন করে সামনে আনার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না, এখনকার এজেন্ডাই ভিন্ন।

    যদিও এটা ঘরের “আমরা আমরাই তো” ধরণের সাক্ষাতকার তবু পঙ্কজের পিছ-পালানোটা বেশ রগড়-তামশার। পঙ্কজ বলছেন, “কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে”। “সময়ের অনেক পার্থক্য আছে”, “বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার” – এই বাক্যাবলিতে তিনি এবার আগের পাপের হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। সুজাতা বলেছিলেন, “সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে” এই প্রসঙ্গ সেখানে এসেছিল। সুজাতার বক্তব্য তিনি এখানেও সমর্থন করেন তবে একটু পুনঃব্যাখ্যা করে নিয়ে। কিন্তু পঙ্কজ নিশ্চয় মানবেন, বাংলাদেশের জনগণ খোদ সংবিধানই বদলে নিতে পারেন, ১৯৯১ সালের মত অমান্য করতে পারেন এমন বহু কিছু। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ হল এটা তো বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতির আভ্যন্তরীণ প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি এই ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে আছে। সেখানে ভারতের কোন একপক্ষের দিকে পছন্দ প্রকাশ মারাত্মক গর্হিত ও এমন “মন্তব্য করাটা ভারতের জন্য ধৃষ্টতার সামিল”। এবং লজ্জার মাথা খেয়ে সুজাতা তাই করেছিলেন।
    এই “এরেঞ্জড সাক্ষাতকার” দিয়ে পঙ্কজ তওবা পড়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন,ফলে বাংলাদেশে তাঁর চাকরি রক্ষা করে তিনি টিকে আছেন। অনুমান করা যায় এই তওবা পড়ার কাজটা সুষমাকে না জানিয়ে পঙ্কজ ঘটান নাই।এতে সুষমার এক সমস্যা মিটল এতে।কিন্তু আরও বড় কালপ্রিট সুজাতা সিং তিনি তো এখনও পররাষ্ট্র সচিব। এখানে সুষমার সমস্যা হল,নিজের মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ছাড়া তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন না। অন্তত খারাপ দেখাবে সেটা। আবার সুজাতার কৃতকর্মের জন্য তিনিও বাংলাদেশে প্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারেন। এই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে সুষমার এই সফর ছিল কংগ্রেসের কৃত পাপ-আবর্জনা থেকে নিজ সরকারকে মুক্ত করার সফর। ড্যামেজ কন্ট্রোলের সফর। তাই,সুষমা নিজেকে এবং সুজাতাকেও বাংলাদেশে মিডিয়া থেকে দূরে রেখেছিলেন। ভারতের মন্ত্রী বা সচিবের বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে কখনই সঙ্গি হন নাই। কিন্তু এবার মন্ত্রী ও সচিব দুজনই আসা সত্ত্বেও তিনি এসেছেন এবং একা এককভাবে প্রেস সামলানোর ভার তাঁর উপরে। সেই সাথে অবশ্য নিয়ে এসেছেন,আসার আগে নিজ সরকারের সবাই মিলে হোমওয়ার্কে সাব্যস্ত করা বক্তব্যটা। সেটাই তিনি সব জায়গায় বলেছেন, -”সরকার সরকারের সাথে কাজ করে” আর সেই সাথে “তারা বাংলাদেশের জনগণের সাথেও কাজ করতে চান”। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট হাসিনা তাদের আগ্রহের বিষয় নয় – একথাটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকাশ করলেন। অনেকে মনে করতে পারেন এটা জোর করে অর্থ টেনে বের করে ভারতীয় মুখপাত্রের কথা পাঠ করছি। আসলে তা নয়। এর প্রমাণ হিসাবে আগে উদ্ধৃত সুষমার ঐ লিখিত বক্তব্যের আর কিছু অংশ তুলে আনব।
    “I am aware that the Indian general elections in April and May this year were followed closely in Bangladesh. I thank you for all the good wishes that we received. These elections were not just the largest democratic exercise in the world. They mark a turning point in the evolution of India’s democratic polity. They were an election of Hope. I stand before you as the representative of a Government that has come to power through an election process, in which, after a gap of nearly 30 years, the people of India have given a clear verdict in favour of a single political party. … My Government’s foreign policy will be based on the principles of developing peaceful and friendly relations with all countries, anchored in enlightened national self-interest. … We know from experience that democracy requires building strong institutions and promoting a culture of tolerance, inclusion and respect for differences. The strength of democracy lies in its ability to manage differences and resolve them through peaceful means. We all espouse same universal values where there can be no place for violence. We will be glad to share our experiences and best practices, if asked to do so.নিজ দায়িত্ত্বের বাংলায় বললে,“ আমি জানি এবছরের এপ্রিল মে মাসে ভারতীয় নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বাংলাদেশে খুব মনোযোগের সাথে অনুসরণ করা হয়েছে। অনেকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এজন্য আমি ধন্যবাদ জানাই। এই নির্বাচন কেবল দুনিয়ার এক বৃহত্তম গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না। এটা একই সাথে ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকতা পরিমাপে এক মোড় ঘুরানোর মত ঘটনা ছিল। এটা ছিল আশাভরসার নির্বাচন। আমি আপনাদের সামনে সরকারের এক প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি যারা একটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে; যেটা বিরাট এক ত্রিশ বছরের গ্যাপ, এবারই ভারতের জনগণ কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিস্কার রায় দিয়েছে।…… আমার সরকারের বিদেশনীতি হবে সব দেশের সাথে শান্তিপুর্ণ ও বন্ধুত্ত্বপুর্ণ সম্পর্কে উন্নতি করার নীতিতে অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ অনুসরণ করবে। …… অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝি গনতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী (রাষ্ট্রীয়) প্রতিষ্ঠান তৈরি আর মতভিন্নতাকে সহ্য করা, সাথে নেবার ও সম্মান করার সংস্কৃতি দরকার হয়। মতভিন্নতাকে সামলানোর এবং শান্তিপুর্ণ উপায়ে তা মীমাংসার সক্ষমতা ভিতর দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তি প্রমাণ করা যায়। আমরা কিছু সার্বজনীন মুল্যবোধ ধারণ করি যেখানে সহিংসতার কোন জায়গা নাই। এব্যাপারে যদি চাওয়া হয়, আমরা আমাদের চর্চার ভালমাপের উপায় ও আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো অন্যান্যদের সাথে আনন্দে শেয়ার করতে পারি”।

    বিএনপির প্রেস ব্রিফিং
    উদ্ধৃতিটা টুকে এনেছি তিনটা অংশ থেকে। সে প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে একটা অন্য কথা। খালেদা জিয়ার সাথে সুষমার সাক্ষাতে কি কথা হয়েছে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসম্পর্কে বিএনপির মঈন খান জানিয়েছেন —“বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতন্ত্রের দেশ তার প্রতিবেশী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না,তা আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে”(২৭ জুন প্রথম আলো থেকে)। মঈন খানের এটা খুবই দাসত্ত্বমূলক মনোভাব। যদিও খালেদা ঠিক এই ভাষায় সুষমাকে এই প্রসঙ্গে বলেছেন কিনা জানার উপায় নাই। বলে থাকলে সেটাও দাসত্ত্বমূলক। অর্থাৎ বিএনপি কোন হোমওয়ার্ক করে যায় নাই অথচ মনের ভিতর ভারতের দাসত্ত্বভাব রয়ে গেছে;এরই প্রকাশ এটা। ভারত বাংলাদেশে কেমন অথবা এমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না – ভারতকে এই সুযোগ বা অপশন আমরা দিতে পারি না। এটা যেচে ভারতের দাসত্ত্ব নেয়া। দেশ একাজ করতে বিএনপিকে দায় দেয় নাই। বরং বিএনপির দিক থেকে যেটা খাড়া অথচ কূটনৈতিক শোভন কথা হতে পারত -”বাংলাদেশের গত নির্বাচন উপলক্ষ্যে ভারতের বিগত সরকারের নেয়া একপেশে ও পক্ষপাতিত্ত্বমূলক (ইচ্ছা ও সাহসে কুলালে “কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভুত” শব্দ বিএনপি যোগ করতে পারে) অবস্থান আমাদের হতাশ করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। ভারতের নতুন সরকার বিষয়টাকে কিভাবে দেখে আমরা জানতে আগ্রহী” -এভাবে বলা যেত। ঠিক এভাবেই বলতে বলা হচ্ছে না,তবে মূলভাবটা অবশ্যই এমনই হতে হত। অর্থাৎ ভারতকে নাক গলানোর কোন অপশন দেয়া নয় বরং তাদের নীতি কি,ওর পরিণতি কি এসম্পর্কে অসন্তুষ্টি জানানো। বিএনপির মত “অবিপ্লবী” দলের পক্ষে ভারতের নীতিতে “হতাশা” জানানো কঠিন কোন কাজ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক কূটনৈতিক রেওয়াজি শব্দ।
    টুকে আনা সুষমার উদ্ধৃতির প্রথম অংশঃ এতে স্পষ্টতই সুষমার পরোক্ষে হাসিনাকে নিজেদের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়া যে ভারত গণতন্ত্র বা জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের মত কোর বিষয়কে কিভাবে দেখে এবং হাসিনা তেমন প্রতিনিধি নয় সেটাই মনে করিয়ে দেয়া। সুষমার দলের মত ত্রিশ বছর অপেক্ষা করে হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিকতাগুলোকে দুর্বল করে দেয়া উচিত নয়,জবরদস্তি খাটিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা উচিত নয়। ঝিকে মেরে বঊকে শিখানোর মত করে কথাগুলো এভাবেই সুষমা বলে গেছেন।

    “enlightened” মোদি
    উদ্ধৃতির মাঝের অংশঃ এটা একটাই বাক্যের, এই উদ্ধৃতিটা সাদামাটা কূটনৈতিক বাক্যই তবে একটা শব্দ ছাড়া। শব্দটা হল enlightened national self-interest। বাংলা করেছি,“অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ”। শব্দটা ইন্টারেষ্টিং। যে কোন রাষ্ট্রের কাজই হল স্ব-স্বার্থ মানে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দেখা, সেজন্যই ওটা রাষ্ট্র। মুখ্যত কেবলমাত্র নিজ ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ দেখভাল করাই ওর কাজ। কিন্তু স্ব-স্বার্থ মানে কি? অনেক সময় আঞ্চলিক স্বার্থের ভিতর নিজের মুখ্য স্বার্থ থাকে সেগুলো সংকীর্ণ চোখে না দেখাই বুদ্ধিমানের, আরও বড় লাভের দিক থেকে দেখার মত চোখ সেখানে খুব গুরুত্ত্বপুর্ণ। এই অর্থে enlightened। শব্দটা প্রয়োগের প্রশংসাই করতে হয়। ছোট মুদি দোকানদারের চোখ থাকে দুএক পয়সার দিক পর্যন্তও। একজন বড় রপ্তানিকারক সফল ব্যবসায়ী হতে চাইলে এত ছোট চোখে চলে না। তাঁর যে ডিষ্টিবিউটর যার মাধ্যমে তার মালামাল খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে তাদেরও স্বার্থের ভিতরে নিজের স্বার্থ দেখে বড় ব্যবসায়ী উতপাদক। ফলে সে ব্যবসায়ীকে enlightened বলা যায় অবশ্যই।
    টুকে আনা সুষমার বক্তৃতার শেষ অংশঃ মতভিন্নতাকে জায়গা করে দেয়া, অন্তর্লীন করে নেয়া বা একপাত্রে ধরা -কেন গুরুত্ত্বপুর্ণ সে প্রসঙ্গে এটা সুষমার সবক। এখানে বড় তামাশাটা হল,হাসিনার আওয়ামি লীগ নিজেদের সেকুলার রাজনৈতিক শক্তি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে,বিপরীতে বিজেপি সম্পর্কে তাদের রিডিং হল ওটা সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু এখানে সেই বিজেপি সরকারের কাছ থেকেই হাসিনাকে জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের অর্থ কি, গণতন্ত্রের কোর ভ্যলু মতভিন্নতাকে কিভাবে দেখতে হয় এর সবক শুনে যেতে হল।
    সুষমার এই সফরকে সামগ্রিক দিক থেকে বলা যায়,কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির বিপদ ও আত্মঘাতি দিক মোদির বিজেপি উপলব্দি করেছে। কিন্তু অন্য দেশ সফরে এসে তা প্রকাশ্যে খোলাখুলি বলতে পারেনা, বলা যায় না। এটা হাসিনার কারবার নয় যে নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মিটিংয়ে গিয়ে বিগত খালেদা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু তাদের উপলব্দি কি সেটা তারা পরিস্কার করেছে সুষমার ঐ সেমিনারের লিখিত বক্তৃতায়। আর সেই সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাবার নতুন নীতির কথা বলে আসলে পুরানো কংগ্রেসের নীতি যে ভুল ছিল সেটাই পরোক্ষে বলে গেলেন সুষমা। মোদি পরিস্কার করেছেন তাঁর স্বপ্ন অনেক উচু। অনেক উচুতে বসে enlightened হয়ে তিনি নিজের স্বার্থ দেখতে পারেন। এটা কংগ্রেসের মত ফাকা বুলি ও আকামের তথাকথিত “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নয়।

    ভারতের মিডিয়ায় অসময়ী কংগ্রেসী প্রপাগান্ডা
    ভারতের মিডিয়ার কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। এরা মোদির চিন্তা অভিমুখ নীতি কি সেদিকে খবর নাই। সুষমার সফরকে ঘিরে এরা কংগ্রেসের “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নামের নীতি অনুসরণ করে পরামর্শ কলাম রিপোর্ট লিখেই চলেছে। এর কতটা পুরানা অভ্যাস আর কতটা হাসিনা-গওহরের মিডিয়া প্রভাবিত করা বা পেজ কিনে নেবার ক্ষমতা তা আলাদা করা মুশকিল। এমন রিপোর্টেগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সীমা ছাড়ানি লেখাটা হল টাইমস অব ইন্ডিয়া। এটা মূলত টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার এডিটোরিয়াল তাই লেখকের কোন নাম ছাপা হয় নাই। ১৯৭৪ সাল থেকে পেন্ডিং ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি বা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ভারতীয় সুপ্রিম আপিল কোর্টের রায় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও লটকে আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা এবার এর বিস্তর আলাপ আলোচনা টেকনিক্যাল কাজ শেষে কেবল ভারতীয় সংসদে পাস হওয়া বাকি। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়া সেটাকে আবার নতুন করে ঘোলাটে করার উদ্যোগ নিয়েছে। বলছে, বাংলাদেশের তেতুলিয়া সীমান্তে নতুন করে চার কিলোমিটার করিডোরে দিলে ভারতের পুর্বাঞ্চলে পৌছানোর রাস্তা ৮৫ কিমির মত কমবে তাই মোদির এব্যাপারে বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া দরকার। যেন ব্যাপারটা এমন যে ভারত বাংলাদেশকে চাপ দিলেই সব পেয়ে যেতে পারে। তো হাসিনাকে চাপ দিয়ে গোটা বাংলাদেশটাই নিয়ে নিলেই তো হয়? নাকি? যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ কেন দিবে? একথার পিছনে টাইমসের যুক্তি জ্ঞানবুদ্ধি কি? না সেসব কিছু পাওয়া যায় নাই। দাদাগিরি একটাই কথা ভারতের দরকার। ভারতের দরকার এটাই একমাত্র র্যাাশনালি। এটা কংগ্রেসের দাদাগিরির চেয়ে বড়, মিডিয়া দাদাগিরি।
    আবার, দ্যা হিন্দু পত্রিকার ডিপলোমেটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার। তিনিও হিন্দু পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতই বুঝা যায় সুহাসিনীরও মোদির লক্ষ্য নীতি সম্পর্কে তার কিছুই জানা হয় নাই। জানার দরকার অনুভব নাই। বরং এখনও কংগ্রেসের নীতিতে বিভোর আছেন। কংগ্রেস-হাসিনা নীতির পক্ষে মিথ্যা প্রপাগান্ডার সোরগোল তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর লেখা তথ্যের সত্য-মিথ্যায় ভরপুর এবং কষ্ট না করে আওয়ামি পছন্দের লোকে ব্রিফে লেখা এই উপসম্পাদকীয়। যেমন সুহাসিনী লেখার আগেই অযাচিতভাবে ঠিক করেছেন আবার বিএনপি-জামাতের ক্ষমতায় আসা ভারতের স্বার্থের বিরোধী ফলে এটা প্রমান করবেন যে তাদের আগের আমলে ভারতের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। সুহাসিনী ২০০৩ সাল থেকে কাহিনী শুরু করেছিলেন। জামাত-বিএনপির ঐ আমলে বাংলাদেশ ভয়াবহ এন্টি-ইন্ডিয়ান সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল এর ঘটনাবলির ইতিহাস ধারা বর্ণনা দিচ্ছেন। কিন্তু একথা বলতে বলতে হঠাত বছর সাল পিছিয়ে ২০০১ সালে পদুয়ার ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যর কথায় চলে আসলেন। কিন্তু সুহাসিনী খবর রাখেন নাই যে পদুয়ার ঘটনা শুধু ২০০১ সালের বলে নয় এটা তাঁর প্রিয় হাসিনা সরকারের আমলেরই ঘটনা। ইণ্ডিয়া টুডে এর ঐ সময়ের এক রিপোর্ট বলছে ২২ এপ্রিল ২০০১ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে সুহাসিনী যে প্রেমিজের উপর দাঁড়িয়ে তাঁর লেখার যে বিএনপি মানেই ভারতের স্বার্থবিরোধী সন্ত্রাসের বাংলাদেশ এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আর ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনাকে যদি তিনি ভারত বিরোধী সন্ত্রাসের নমুনা হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তবে ঐ সন্ত্রাসের কারিগর হন শেখ হাসিনা। নিশ্চয় এটা তার পছন্দ হবে না। সুহাসিনী আরও বলছেন ২০০৩ সালে বিএনপির-জামাতের আমলে হুজির হেড কোয়ার্টার নাকি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, আমরা পছন্দ করি আর নাই করি আফগান ফেরত বাংলাদেশিদের ইসলামি রাজনীতিক উত্থান ১৯৯৩ সালের পর থেকে, হুজিও তাদের তেমনই এক সংগঠন ও প্রকাশ। হুজির হামলাগুলো তাই হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছরের আমলেও ছিল, উদিচী, নারায়নগঞ্জ ঘটনা পর্যন্ত। অর্থাৎ হুজির এই উত্থানের সাথে হাসিনা অথবা খালেদা কার সরকারের আমল এমন কোন তাল মিল রেখে ঘটেছে এমন কোন সম্পর্কই নাই। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোমাবাজির ঘটনাগুলো কোন সরকারের আমলে ঘটেছে এর ভিত্তিতে ঐ সরকারের তাতে পৃষ্ঠপোষকতা আছে এমন বয়ান খাড়া করে প্রপাগান্ডা চালাতে চাইলে অভিযোগ করলে হাসিনাও দোষী হবেন। একথা সুহাসিনী খেয়াল রাখেন নাই। ফলে বলা বাহুল্য সুহাসিনীর এই রিপোর্ট মিথ্যা ও বায়াসড অথবা পেজ বিক্রি করার চুক্তিতে এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট।
    সুষমার সফর উপলক্ষ্যে ভারতের মিডিয়া রিপোর্টগুলো কমবেশি এরকমই। ব্যতিক্রম হিসাবে চোখে পড়েছে ইংরাজি অনলাইন ফাষ্ট পোষ্ট এর এসএনএম আবদির লেখা আর্টিকেল যেখানে তিনি মোদিকে সাবধানে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে পরামর্শ রেখেছেন। আর ওদিকে রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের এক কলাম যেটা থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক Syed Munir Khasru এর লেখা। এই কলামে তিনি বাংলাদেশের অসন্তুষ্টি এবং স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার ইস্যুগুলো এবং প্রণব বন্দোপাধ্যায়ের দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপের তালিকা – সব তুলে এনেছেন। ওদিকে আর এক আগ্রাসী নীতির ডঃ সুবীর ভৌমিক সুষমার সাথে বাংলাদেশেও এসেছিলেন কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছু লিখেছেন চোখে পড়েনি।

    শেষের কথা
    সামগ্রিক বিচারে সুষমার সফরে হাসিনা বেচতে চেষ্টা করেছেন ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” রক্ষার্থে তিনি কত কিছু করেছেন সেকথা। কিন্তু মোদির চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি নীতি কিছুই হাসিনা ষ্টাডি করেন নাই। মোদি আসলে এগুলো কিনতেই আসেন নাই। ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে তিনি আগ্রহী নন। এটা তাঁর ফোকাসও নয়। তার ফোকাস আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এক বড় ভুমিকা রাখা যেখানে তাঁর লক্ষ্য আরও অন্য অনেক কিছু, দেয়ানেয়ার equitable partner পার্টনার হিসাবে বাংলাদেশ। ফলে বলা বাহুল্য অপ্রতিনিধিত্ত্বের হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে কোন মদদে তাঁর ঠেকা নাই। হাসিনা মোদির কাছে নিজ চাহিদার পক্ষে কোন সম্পদ নয়, লায়াবিলিটি। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুষমার সফর শেষ হচ্ছে, হাসিনার দিক থেকে অবিক্রিত পসরা মাথায় তিনি হাট থেকে ফিরছেন। আর সুষমার দিক থেকে তাঁর পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যে ইমেজ ড্যামেজ করে রেখেছিলেন তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন এমন ধারণায় এটা গুড ষ্টার্টার ভাবছেন।।

  • ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ১৬ জুন  ২০১৪    ০৩ঃ ৪৪

    https://wp.me/p1sCvy-7m

     

    প্রথম পর্ব এখানে দেখুন

     

    রবার্ট ডি কাপলানঃ
    তাঁকে আমেরিকার এক প্রভাবশালী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। প্রভাবশালী Stratfor ম্যাগাজিনের চীফ ভুরাজনৈতিক বিশ্লেষক তিনি। আমেরিকান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্যও তিনি। “Beijing’s Caribbean Logic” শিরোনামে গত মার্চ ২০১৪ তিনি এক আর্টিকেল (আসলে তাঁর নতুন বইয়ের এক আর্টিকেল) লিখেছেন। ওখানকার সারকথা হলঃ বৃটিশ বা ফরাসী সাম্রাজ্য যখন দুনিয়াকে লূট দখলের কলোনী রাজত্ত্ব করে রেখেছিল এর শেষের দিকে আর বিপরীতে আমেরিকার যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগের সেই সময়ে আমেরিকা প্রথম ক্যারেবিয়ান সাগরের কর্তৃত্ত্ব নিয়েছিল কলোনী মাষ্টার বৃটিশ সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে। ক্যারেবিয়ান সাগর হল, মার্কিন দেশের দক্ষিণ দিকে যেখানে আমেরিকা মানে উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ (বা ল্যাটিন) আমেরিকা বিভক্ত হয়েছে সেই বিস্তৃর্ণ সাগর জলরাশি। ক্যারেবিয়ানের উত্তরদিকে আমেরিকার মিয়ামি, মেক্সিকো আর ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র পানামা, কিউবা জামাইকা ইত্যাদি আর দক্ষিণদিকে কলম্বিযা, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্র – সেই অঞ্চল। এটাই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে এক চিকন ভুখন্ডগত (সবচেয়ে চিকন অংশটাই পানামা রাষ্ট্র) সংযোগে ধরে রেখেছে। আবার বলা যায় ঐ চিকন ভুখন্ড পুবে আটলান্টিক মহাসাগর অঞ্চল আর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল এভাবে মহাসাগর দুটোকে বিভক্ত করে রেখেছে। আমেরিকা নিজের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত উত্থানের যুগে প্রথমেই সে তার নিজ ভুন্ডের দক্ষিণের ক্যারেবিয়ান সাগরের দখল নিয়েছিল, বৃটিশদের থাকতে দেয়নি। এখন কাপলান ঐ লেখায় যুক্তি দিচ্ছেন, তাহলে আজকের রাইজিং ইকোনমির চীন কেন এশিয়ায় জলরাশিতে আমেরিকাকে ঢুকতে দিবে? চীন তো আসলে আমেরিকার “ক্যারেবিয়ান লজিকই” প্রয়োগ করছে। তাই কাপলানের লেখার শিরোনাম “বেইজিং এর ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলানের কথার এক ধরণের গুরুত্ত্ব আছে সন্দেহ নাই। তবে তিনি এম্পেয়ার নষ্টামির পিছনের ভাবাদর্শগত ন্যায্যতা খুজতে গিয়েছেন। কিন্তু এতে যেদিকটা আড়ালে পড়ে গিয়েছে তা হল, চীন নিজে প্রথমে কাউকে হটিয়ে এশিয়ার জলরাশিতে নিজের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যায় নাই। উত্তেজনাহীন নিঃতরঙ্গ এশিয়ার জলরাশিতে জাহাজ নৌরুটে পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার করে চীন তার অর্থনীতিতে বিকাশ সাধন করে যাচ্ছিল। তার পড়শিরাও যার যার মত নিজের অর্থনীতিতে মশগুল ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে চীনের পড়শিদেরকে আমেরিকার নৌ-সামরিক শক্তি অফার করা, নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করার উস্কানি থেকে। স্বভাবতই এটা চীনের দিক থেকে বিরাট হুমকি মনে করারই বিষয়। বিশেষত তার নৌবাণিজ্য বা পণ্য আনা-নেয়ার প্রধান রুট এশিয়ার জলরাশি বিশেষত সাউথ চায়না সি অবাধ চলাচল এলাকা রাখার স্বার্থে, এই কারণে। দাবার পালটা চালের মত, আমেরিকার ঐ পদক্ষেপের ফলে চীনের এতদিনের -দুনিয়ার কারো সাথে সামরিক সংঘাতের সম্পর্কে সে নাই – এই নীতি থেকে সরে গিয়ে চীনের এখনকার নীতি হয়ে দাড়িয়েছে – যারাই আমেরিকার কাছে আশ্রয় খুজছে, সামরিক জোটে আবদ্ধ হতে চাইছে বা হয়ে আছে এমন সব দেশের প্রতি চীনের ভুমিকা মাসল দেখানোর। যেমন উদাহরণ হিসাবে জাপানের প্রসঙ্গঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপান ঐ অঞ্চলের সকলের কাছেই এক কলোনী মাষ্টার হিসাবে পরিচিত; চীনসহ দুই কোরিয়াকে সে কলোনী দখল করে রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মৃত এবং জীবিত জাপানী যারা যুদ্ধাপরাধী হিসাবে ফাঁসি সাজাপ্রাপ্ত এদের সহ সকলের উদ্দেশ্য নির্মিত স্মৃতিসৌধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কখনই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ফুল দিতে যান নাই। কিন্তু এবার গিয়েছেন। এঘটনাটা চীন ও কোরিয়াকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এরচেয়ে হাস্যকর হল তিনি নিজের ফুল দিতে যাওয়ার পক্ষে যে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতারাই নিজ দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন তাই তিনি গিয়েছেন। বিপরীতে চীনের প্রতিক্রিয়া হল, পিছনের ইতিহাস না ঘেটে যখন আমরা সামনের দিন নির্মাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা করছি তখন এই আচরণ খুবই বিভেদমূলক ও শত্রুতা উস্কে দেয়ার। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে এটা কোরিয়ান জনগণের অনুভুতিকে পায়ে মাড়ানো। এছাড়া ছোট্ট যে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জাপান-চীনের বিবাদ সেটাও কলোনী দখল যুগের মালিকানার বিবাদ। স্পস্টতই জাপানের ভুমিকা মাসল ফোলানোর, খুচিয়ে পুরান ঘা তাজা করার, টেনশন তৈরি করার। এর পিছনের কারণ হল, আমেরিকার সাথে বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের সামরিক চুক্তি আছে যে জাপান আক্রান্ত হলে সেটাকে আমেরিকা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে, ফলে জাপানের শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিবে। এসব কিছু মিলিয়ে এককথায় বললে, চীন বর্তমান অবস্থান নিয়েছে, এশিয়ার জলরাশিতে আমেরিকার কোন ভুমিকা সে দেখতে চায় না – এটাই তার নীতি ও আকাঙ্খা।

    সাংগ্রিলা ডায়লগঃ
    এশিয়ায় জলরাশিতে উস্কানি তৈরি করে আমেরিকার নিজের কদর বাড়ানো, বিপরীতে চীন আমেরিকান জোট পাকানোর বিরোধীতা তার বর্তমান নীতি, এর ফলে এখনকার সময়টাকে বলা যায় এটা এশিয়ার জন্য মাসল দেখানো, টেনশনের পিঠে টেনশন তৈরি করার এক সময় চলছে। কিন্তু এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে বা কিভাবে থিতু হতে পারে – সেই ছবিটাকে ধরার জন্য গতমাসের শেষদিকে ৩০ মে থেকে তিনদিন সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা হোটেলে এশিয়ার বার্ষিক (১৩তম) নিরাপত্তা সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানকার রিপোর্টিং কে ব্যবহার করব।
    বৃটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক International Institute for Strategic Studies (IISS)এর দায়িত্ত্বে পরিচালিত সাংগ্রিলা ডায়লগ মূলত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ২৮ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদেরকে নিয়ে বার্ষিক আলোচনাসভা বা ডায়লগের স্থান। থিঙ্কট্যাঙ্ক IISS এটাকে “The IISS Asia Security Summit” বলে পরিচিত করিয়ে থাকে। শুরুতে মূল উদ্যোক্তা ছিল আমেরিকা; থাইল্যাণ্ডকে সাথে নিয়ে এর আয়োজক হয়েছিল ২০০২ সালে। উদ্দেশ্য পরাশক্তিগত স্বার্থগুলো ডায়লগ আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বুঝে শুনে নেয়া। ঐ ২৮ দেশের মধ্যে আমেরিকা বৃটেন রাশিয়া চীন জাপান কোরিয়া ভারত পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি প্রায় সকলেই অন্তর্ভুক্ত। এটাকে বলা যায় গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্রে চলে আসার আর এক প্রতিক্রিয়া। “সাংগ্রিলা ডায়লগ” (Shangri-La Dialogue বা সংক্ষেপে SLD) নাম হবার পিছনের কারণ এটা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চেন হোটেল সাংগ্রিলার “সিঙ্গাপুর সাংগ্রিলায়” আহুত হয় বলে সেখান থেকে এই নেয়া নাম।
    Shangri-La Dialogue 2014 সভার এবার উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। খুবই আক্রমাণাত্মক তাঁর বক্তৃতার সারকথা হল, রুল অব ল এট সি অর্থাৎ সমুদ্র বিষয়ে আইনের শাসনে চলতে হবে সবাইকে। মানে সীমানা বিবাদ মীমাংসায় চীনকে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন ইত্যাদির মধ্যে আসতে হবে। “আইনের শাসন” কথাটা শুনলে সকলের সহজেই আকৃষ্ট হবার ইচ্ছা জাগে, তাই তাঁর এই শব্দ দিয়ে বলা। সেকথায় পরে আসছি। শিনজোর পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তাঁকে সমর্থন করে বক্তৃতা উত্তেজনা আরও এক ধাপ সুরে চড়িয়ে দেন। চাক হেগেল চীনকে অভিযুক্ত করেন,“অস্থিতিশীল করার দেশ” “আগ্রাসী শক্তি” ইত্যাদি বলে। মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, আগে থেকেই আমেরিকা ও জাপানের উপর ক্ষিপ্ত ছিল বলে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ত্ব চীনাদল আসেনি, এর বদলে এসেছে চীনা সামরিক জেনারেলদের নেতৃত্বে এক চীনাদল। সেই জেনারেলও বক্তৃতায় পালটা জাপানের দানবীয় সামরিক অতীতের কথা তুলে মুখ ছুটিয়েছিল। বলেছেন, “চীন যে কোন “নির্মম ফ্যাসিষ্ট এবং সামরিক দাঙ্গাবাজ আগ্রাসনকারীর আসরে ফিরে আসা প্রতিহত করবে”। আর আমেরিকা সম্পর্কে বলেছে্ন, “চীনের বিরুদ্ধে ঘোট পাকাচ্ছে, সকলকে খেপিয়ে তুলছে”। চাক হেগেলের বক্তৃতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলেছে এটা “কল্পনাতীত”, “আধিপত্যসুলভ, হুমকির মত এবং হস্তক্ষেপমূলক” বক্তব্য। এবিষয়ের সারকথাটা বলবার জন্য পশ্চিমা সাপ্তাহিক “ইকোনমিষ্ট” থেকে ধার নিব। সাংগ্রিলা ডায়লগ শুরুর দিন তিনেক আগে ওবামা “ওয়েষ্ট পয়েন্ট” বলে খ্যাত আমেরিকার এক মিলিটারি একাডেমিতে বক্তৃতায় ক্যাডেটদের আশ্বস্ত করার ছলে বলেছিলেন, ”আমেরিকা অবশ্যই বিশ্ব পরিসরে নেতৃত্ত্ব দিয়ে যাবে” এবং “আমেরিকার জোট-বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সে এক-পক্ষীয়ভাবে সামরিক বল প্রয়োগ করবে”। ইকোনমিষ্ট বলছে,এসব কথা চীনের নজরে না আসার কারণ নাই, তাই সম্ভবত চীনা জেনারেলের এমন প্রতিক্রিয়া। এছাড়া ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের কিছু শেষকথা চীনা অবস্থান ভাবনাকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মনে করা যেতে পারে। অনুবাদ করে বললে তা দাঁড়ায়,- “…… চীন আমেরিকা জাপানের এসব কথাবার্তা, এক ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থার’ মাতবরদের কথা হিসাবে দেখছে যা তার কাছে গ্রহনীয় নয়। চীনের দিক থেকে দেখলে ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থা’ মানে পশ্চিমের স্বার্থে বিশেষত আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জারি করা অর্ডার, এক নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলা। যা নিজ শাসন-শৃঙ্খলার বাসার ভিতর উত্থিত চীনকে অন্তর্ভুক্ত হতে দেয় অবশ্যই, কিন্তু ততটুকুই যতটুকুতে চীন ঐ বাসাতে আগে থেকে সেট করা নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুগত হয়ে মেনে নেয় আর ওদিকে অন্য দেশগুলো ঘোট পাকিয়ে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনা জারি রাখে। এসব তারা করে এই বিশ্বাসে যে এভাবে চীনের বিরাট শক্তি হিসাবে উত্থানকে দমায়ে রাখতে পারবে”।

    এশিয়া নীতির সম্ভাব্য পরিণতি
    “সাংগ্রিলা ডায়লগে” কি ঘটেছে সে প্রসঙ্গে এরপরে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু কথা বলে শেষ করব। এই লেখার পরের নিচের অংশ বেশিরভাগই টাইমসের রিপোর্ট থেকে টুকে নেয়া ছোট ছোট ঘটনা বর্ণনা, সাথে নতুন কিছু ব্যাখ্যামূলক পয়েন্ট তাতে যোগ করে লেখা হবে। টাইমসের মূল ইংরাজি রিপোর্ট এখানে আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
    টাইমসের রিপোর্টের শিরোনামটাই মজার,“জোটবন্ধুরা চীনা চ্যালেঞ্জের মুখে, আমেরিকা কাপাকাপি দশায় এশিয়ায় ডুবতে বসেছে” । শিরোনাম থেকেই যথেষ্ট সরাসরি কথাবার্তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
    সম্প্রতিকালে পড়শিদের সাথে চীন যেসব বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও জাপানের সাথে; যেমন, ভিয়েতনামের এক মাছধরা নৌকা ডুবিয়ে দেয়া ও সাগরের নিচের তেল তোলার রিগ বসানো নিয়ে ভিয়েতনামের সাথে বিরোধ আর জাপানের সাথে এক ছোট দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাপান গোয়েন্দা সার্ভিলেন্স স্থাপনার খুব কাছে দিয়ে চীনা যুদ্ধজেট বিমানের উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঐ অঞ্চলে। অন্যদিকে আগেই বলেছি, ঐ অঞ্চলে চীনের পড়শিদের সাথে আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং পার্টনারশীপ ডায়লগ প্রোগ্রামে আমেরিকা নিরাপত্তা ফেরি বিক্রির চেষ্টায় রত; যাতে এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে এক শক্ত জোট খাড়া করে আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত উপস্থিতির ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রাক্তন এক অষ্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা হলেন Hugh White। ওয়াশিংটনের সাথেও তাঁর ঘনিষ্টভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর বরাতে টাইমস পত্রিকা লিখছে, চীনের লক্ষ্য আমেরিকাকে দেখানো যে সে যদি এশিয়ায় এভাবে এন্টি-চীন শক্তিজোট খাড়া করতে চায় তবে তাকে চীনের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার রিস্ক নিতে হবে। White বলছেন, “চীন উদ্দেশ্যপুর্ণভাবে দেখতে চায় যে আমেরিকা চীনের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার পড়শিদের সাথে জোট বাধার চেষ্টা – এভাবে এই অঞ্চলে আমেরিকার নেতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা -এটা টিকাতে পারবে না”। চীন যেন বাজি ধরে বসেছে সবশেষে ক্লান্ত ও ঘরমুখে গুটানো আমেরিকা পিছু হটবেই আর এতে এশিয়াতে নিজের প্রভাব যতটুকু আছে তা খুইয়ে প্রকারন্তরে এটা চীনের শক্তিকেই বাড়িয়ে তুলবে।
    টাইমস আরও জানাচ্ছে, ওবামা প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে ভিতরের অনেক খবর দিচ্ছেন। বলছেন, চাক হেগেল ও আমেরিকা প্রশাসন জনসমক্ষে জাপানের পিছনে সমর্থনে দিয়ে যাবার কথা বলে চলবে এমনকি কিছুটা মাত্রায় ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের মত অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তা করে যাবে। কিন্তু প্রশাসন আসলে নিজেকে চীনের সাথে মুখোমুখি সংঘাত অবস্থাতেই দেখছে। এটা দেখে প্রশাসনে হতাশা বাড়ছে যে নিজে সকলকে নিয়ে এমন এক খেলার প্যাচে জড়িয়ে যাচ্ছে যা যুদ্ধের পরিণতি ডেকে আনতে পারে। টাইমস ম্যাগাজিন আরও লিখছে, প্রশাসনের আর এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমেরিকান নীতির সমস্যাগুলো নিয়ে মন খুলে কথা বলতে নাম প্রকাশ না করে বলছেন, “দেশগুলোর (বিবদমান চীনের পড়শিরা) কেউ বিষয়টা সামলাতে সাহায্য করছে না”; জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে আমেরিকা যদিও জনসমক্ষে সবসময় জাপানকে সমর্থনের কথা বলে যাবে কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমপর্যায়ের জাপানী কর্মকর্তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বারবার বুঝাচ্ছেন যে যে কোন পদক্ষেপ নেবার আগে সাতবার ভাবতে; আর তারা যেন কোনভাবেই চীনকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ার অবস্থায় না নেয়।
    ওদিকে আর এক কর্মকর্তা বিক্রম জে সিং, গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যিনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্ত্বের আমেরিকার উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি বলছেন, “ তাদেরকে যদি স্কুলের বাচ্চা ধরি তাহলে বলতে হয় তারা আসলে হাতে কাঁচি নিয়ে চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে”। “ছোটখাট জিনিষ থেকেই দুর্ঘটনায় বা হিসাবের ভুলের ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমন যুদ্ধপ্লেন চলতে চলতে খামোখা বিপদজনক গোত্তামারা মোড় নেয়া থেকে দুর্ঘটনা বা আগ্রাসী মনোভাবের প্রকাশের ফলে অযাচিত পালটা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখিতে পড়তে হতে পারে”।
    সাংগ্রিলা ডায়লগের সভায় চাক হেগেল ও তার সাথী সামরিক বাহিনীর অনুগামি দল জয়েন্ট চীফ অব ষ্টাফের চেয়ারম্যানসহ বাঘা জেনারেলরা খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ব্যাডমিন্টন খেলার কর্কের মত দৌড়াদৌড়ি করে। কেন? কারণ, ঐ সভায় প্রধান উস্কানিদাতা বক্তা ছিলেন জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। প্রধান বক্তা হিসাবে তার বক্তৃতার পর ডায়াসে থাকা অবস্থায় তিনি এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এক তরুণ চীনা অফিসার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বীপের মালিকানা বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি কি চীনের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবতে রাজি আছেন? প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে ছুপা জবাবে তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে রাখাটা জরুরী” যাতে কোন “অজানা, যদি ঘটে যায় এমন ঘটনাকে ঠেকানো যায়”। আমেরিকান জেনারেলরা তাই দৌড়াদৌড়ি করে সবার কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা নিচ্ছিলেন “অজানা, যদি ঘটে যায় ঘটনা” যেন কোনভাবেই না ঘটে।
    এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ও পুর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ Andrew L. Oros বলেছেন,”কোন বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখিতে ওর রেফারি হওয়ার চেয়ে বরং যেকোন ভাল শিক্ষক জানেন বাচ্চাদেরকে সব কিছুর আগে ডিসিপ্লিন আচরণ শিখিয়ে নিতে হয়”। এখানে “রেফারি” প্রসঙ্গে টিটকিরি করে বলা হয়েছে। এমন হওয়ার কারণ,ওবামার প্রথম টার্মে তার নতুন “এশিয়া পলিসি” হাজির করেন যেখানে রেফারি মানে “এশিয়ায় আমেরিকার pivot বা ভারকেন্দ্র ভুমিকা” থাকবেই একথা বারবার উচ্চারিত হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আমেরিকান ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে অক্টোবর ২০১১ সালে নিজে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন, America’s Pacific Century শিরোনামে। ঐ আর্টিকেলের প্রথম বাক্য ছিল “As the war in Iraq winds down and America begins to withdraw its forces from Afghanistan, the United States stands at a pivot point”. ফলে এখান থেকেই ওবামার এশিয়া পলিসি মানেই শব্দটা কয়েন হয় নতুন শব্দে “এশিয়াতে আমেরিকার পিভোটাল রোল” বা রেফারি ভুমিকা – এভাবে। আমেরিকান একাদেমিকরা সেকথার সুত্র ধরে এখন ঠাট্টা মশকরা করে বলছেন, “ওবামার রেফারি ভুমিকা”। কারণ অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ওবামার এশিয়া পলিসির অর্থ এন্টি চীন মাতবরির আমেরিকান জোট এভাবে না ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়। এবং সেক্ষেত্রে এই নীতি অকার্যকরে হয়ে যাবে।

    ওবামা্র মানে গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধ
    উপরে এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টের ম্যাপে দেখিয়েছিলাম লাল গোল দাগ দেয়া “চোকিং পয়েন্ট”। চোকিং পয়েন্ট এর আক্ষরিক মানে শ্বাসরুদ্ধ করে চেপে ধরার এমন সহজ জায়গা। অর্থাৎ চীনের অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ করে দেবার মত সহজ জায়গা কোনটা – চীনের পণ্য বাণিজ্য জাহাজের নৌচলাচল পথে এমন দুটো জায়গা যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই চিকন হয়ে থাকা কিছু অংশ পার হতে হয়। এর একটা ইরানের নৌসীমায় হরমুজ প্রণালী (সমুদ্র নৌপথের চিকন অংশকে বাংলায় প্রণালী আর ইংরাজিতে strait বলা হয়ে থাকে) আর অন্যটা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভুখন্ডের মাঝে মালাক্কা প্রণালী [Malacca Strait মালাক্কা প্রণালী]। প্রণালীতে কোন যুদ্ধজাহাজ আড়াআড়িভাবে রেখে দিলে অথবা ঠিক প্রণালীর উপর কোন বাণিজ্যিক জাহাজও ডুবিয়ে দিতে পারলে ঐ নৌচলাচল পথকে সহজেই কয়েক মাসের জন্য স্থবির রুদ্ধ করা সম্ভব। ফলাফল এটা চীনের অর্থনীতিকে অকেজো করে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই টুটি চেপে ধরার চোকিং পয়েন্ট।
    আমেরিকার সাথে চীনের ১৯৭১ সালে প্রথম সম্পর্ক স্থাপনের সময় দেনা-পাওনার মৌলিক যেদিকটা নিয়ে রফা হয়েছিল তা হল, চীন আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজি নিজ ভুখন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিবে, পুঁজিকে প্রয়োজনীয় আইনী সুরক্ষা দিবে। বিদেশী পুঁজি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করে নেয়ার মত কোন পদক্ষেপ নিবে না। (এগুলো আজকাল আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শর্ত হয়ে গেছে।) বিনিময়ে আমেরিকান রাষ্ট্র চীনকে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্যপদ পাবার সহযোগিতা থেকে শুরু করে চীনের বিকাশে অর্থনৈতিক, ষ্ট্রাটেজিক,পণ্যবাজার সুবিধা ইত্যাদি চীনা স্বার্থের দিকগুলোতে বাধা তো হবেই না বরং সহযোগিতা করবে। এটা চীনের দিক থেকে খুব স্বাভাবিক চাওয়া। কারণ চীনে বিদেশী পুঁজি এসে উতপাদন বাণিজ্য করতে গেলে এগুলো তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ চাওয়া। কারণ মূলত তা ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজির স্বার্থেই, কারবার ভায়াবল হওয়া, তার মুনাফাসহ আরও স্ফীত হওয়ার স্বার্থেই। কিন্তু সে প্রসঙ্গটা এখানে এখন তোলার কারণ আছে। আমেরিকা-চীনের প্রথম সম্পর্কের সময়ের মৌলিক দিকটা খুবই সংক্ষেপে এখানে বলা হলেও তবু এটুকু থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে এই রফার ভিতর আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্যই এক বড় বিপদ লুকিয়ে ছিল, এখনও আছে। বিশাল ভুখন্ড ও জনসংখ্যার চীন মানে বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার আর ওদিকে সস্তা শ্রমে প্রতি জোড়া হাতে সস্তায় রপ্তানিযোগ্য ও কমপিটিটিভ পণ্য উতপাদন – এতে চীনের দুনিয়া কাপানোর কথা সন্দেহ নাই। এতে এক বিশাল অর্থনৈতিক উত্থান চীনকে সবদিক থেকেই পরাশক্তি করে তুলবে, তা সকলেরই জানা ছিল। যেটা আবার খোদ আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও হুমকি। কিন্তু শুরু থেকেই এটা টের পাবার পরও আমেরিকান রাষ্ট্রের কিছুই করার ছিল না। কারণ এটাই গ্লোবাল পুঁজির আপন স্ববিরোধীতা। যেমন, একদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থ হল সবসময় নতুন নতুন অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে,ওটাই তার প্রাণভোমরা। যেভাবেই হোক অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে। অন্যদিকে ওয়াল ষ্ট্রিট পুঁজির নিজেরই আকার দেয়া দানব এমপায়ার বা দুনিয়ায় সবাইকে পিটায় ধমকায় বেড়ানো “সাম্রাজবাদ” রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকান রাষ্ট্রের এমন কিছু নিজস্ব স্বার্থ আছে যা সব সময় তারই ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। এমনিতেই ওয়াল ষ্ট্রিটের মালিক রাষ্ট্র নয় ব্যক্তিবর্গ, যার মুনাফা লাভালাভে আকার বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের এর উপর কোন নগদ লাভ নাই কর্তৃত্ত্ব নাই। ফলে ওয়াল ষ্ট্রিটের একান্ত নিজ স্বার্থে খোদ আমেরিকান রাষ্ট্রকে বিপদে হুমকির মুখে ফেলে হলেও তার বিনিয়োগ বাজার চাই। ফলে রাষ্ট্র টিকে থাকার স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রিটের টিকে থাকার স্বার্থ এখানে এক নয়, এক তালে নয়। এজন্য একদিকে চীনে প্রবাহিত গ্লোবাল পুঁজি (ওয়াল ষ্ট্রিট যার কেন্দ্র বা প্রতীকী নাম) এর ফুলেফলে বেড়ে উঠা সুরক্ষা করতে ওবামা কমিটেড ও বাধ্য আবার বিপরীতে রাইজিং চীন রাষ্ট্র আমেরিকান রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ওর চেয়েও বড় পরাশক্তি হয়ে উঠার বিপদে নিজেই হুমকিতে, দুনিয়ায় নিজের একছত্র সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার ভুমিকার মুকুট যায় যায় অবস্থা। তাই একদিকে ওবামা চীনের চোকিং পয়েন্ট মানে টুটি টিপে ধরার জায়গাটা খুজে বেড়ায় আবার ওর খুজে বেড়ানো দেখে রাইজিং চীনের খারাপ প্রতিক্রিয়া হুমকিতে তটস্থ হয়ে যায় সে। নিজেই জাপানকে উস্কানি দেয় আবার নিজেই তাকে জোরে চিৎকার করতে না করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (জাতিসংঘ,আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি) গড়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আমেরিকান রাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সাম্রাজ্যের রুস্তমি চালায়, আমেরিকান মাতবরিতে সাজানো তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানে ঢুকার চেয়ে চীন বরং আবার নতুন করে নতুন ভারসাম্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়। এর ভিতরই নিজের স্বার্থ দেখে স্বস্তিবোধ করে। BRICS যার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ওদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের এক বিশাল মোড়ল “গোল্ডম্যান স্যাসে” কোম্পানী তাই নিজেই BRICS গড়তে পরামর্শ উতসাহ জুগিয়েছে কারণ এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই তা তাকে নতুন আয়ু দিবে। তাতে আমেরিকান রাষ্ট্র ডুবে মরল না বাচল এটা তার কাছে গৌণ, মুখ্য হল কে তাকে অফুরন্ত নতুন নতুন বিনিয়োগ বাজার এনে দিচ্ছে। ওয়াল ষ্ট্রিটের বাইরে আফ্রিকাকে মাথায় রেখে দুবাই আর চীনকে মাথায় রেখে সিঙ্গাপুরে পুঁজি বাজার ক্রমশ বড় ও বিকশিত কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ওবামা তাই একদিকে এশিয়ায় এন্টি চীন নয়, এশিয়ায় নিজের পিভোট বা ভারকেন্দ্র অথবা রেফারির ভুমিকা দেখে। আবার একইসাথে এখনও দুনিয়াকে নিজ রাষ্ট্রের সাম্রাজ্য নেতৃত্ত্ব চালিয়ে যাবার স্বপ্নে চীনের চোকিং পয়েন্ট হাতড়ে বেড়ায়। গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধীতা স্বভাব এভাবে চারদিক থেকে ফুটে উঠে।
    এখন ফলাফল? টাইমসের ঐ রিপোর্টের শেষ অংশে চীনের সাঙহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির ‘আমেরিকান ষ্টাডি সেন্টার’ এর ডিরেক্টর Wu Xinbo এর উধৃতি দিয়ে বলছে, “ওবামা প্রশাসন সম্ভবত এশিয়ার আকাশ ও নৌ-সীমা বিষয়ক বিবাদ্গুলোকে হাওয়া দিয়ে জাগিয়েছে আমেরিকার এশিয়া নীতির দিকে মনোযোগ দিবার কথা তুলে”। সে আসলে চীনের নার্ভ পরীক্ষা করতে গেছিল। “একারণে চীন আর কখনও এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্ত্বে শক্তিজোট পাকানোর বিষয়্টাকে স্বাগত জানাবে তা যেন কেউ আর আশা না করে। চীনের স্বার্থের দিকটাই এরা উপেক্ষা করেছে”। অবস্থা দেখে ওদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট গত মাসের ১৯ মে তারিখে “নতুন এশিয়ার নিরাপত্তা কৌশলের” রূপরেখা হাজির করেছেন এক আন্তর্জাতিক সভায়। ওখানে আহুত সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলো ছিল চীন রাশিয়া ও অন্যান্য এশিয়ান দেশ। কিন্তু আমেরিকাকে বাইরে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছে, এটা চীনের জেনেবুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত।

    কয়েনের উলটা দিক
    কিন্তু কয়েনের আর একটা দিক থেকে কিছু কথা বলা দরকার। আমেরিকার সাথে এই টানাপোড়েন করতে গিয়ে চীন সাগরের পড়শি বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে চীন একটা খারাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে ফেলেছে। আকাশ বা নৌপথ অথবা সাধারণভাবে সীমানা বিষয়ক কোন বিবাদ বিতর্ক উঠলে এর সমাধান কি তবে সামরিক পথেই লাঠির জোরে করতে চায় নতুন রাইজিং চীন? নাকি জাতিসংঘের আনক্লজ পদ্ধতি পছন্দ না হলে আরও ভাল কোন আন্তর্জাতিক সালিসের পথে করতে চায়? এদিকটা নিয়ে চীনকে অবশ্যই ভাবতে হবে। যদিও মূলত চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্ত্বে আর এক পলিটিক্যাল জোট হাজির হয়েছে দেখা যাচ্ছে, নামঃ Conference on Interaction and Confidence Building Measures in Asia (CICA)। এর নামের মধ্যে ইন্টার-একশন আর কনফিডেন্স বিল্ডিং মানে “পারস্পরিক আলাপ আলোচনা” ও “পরস্পরের আস্থা অর্জন” শব্দ দুটোর তাতপর্য আছে অনুমান করা যায়। কারণ CICA এর সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়া জানা গেল, ওখানে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে। জাতিসংঘ জন্ম দেবার আগের ৫-৭ বছর ধরে এমনিভাবেই বিভিন্ন ধরণের নানান জোটের জন্ম হয়েছিল, সবগুলো টিকে নাই বটে তবে সবগুলো উদ্যোগের মিলিত পরিণতি্তে জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘ। বলা বাহুল্য, একদিকে CICA উদ্যোগের আর অন্যদিকে চীনের পড়শিদের সাথে চীনের বিরোধ মীমাংসার পথ – এদুটো পরস্পর অসামঞ্জ্যপুর্ণ। আমরা আশা করব এদিকগুলোতে চীন মনোযোগী হবে।

    আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩, সকাল নয়টা সাত

  • ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (প্রথম পর্ব)

    ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি

    গৌতম দাস

    [এক]
    পুর্ব চীন সাগরে চীন ও জাপানের দ্বন্দ্ব আর দক্ষিণ চীন সাগরে পড়শিদের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব এশিয়ায় এক বড় ইস্যু। এর ভিতরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী এন্টি-চীন অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন ও জাপান দেশ দুটি সফর করে এলেন। বলা বাহুল্য, চীন-জাপান দ্বন্দ্বের মধ্যে আমরা কারও কোন শর্ত বা লোভে পরে কারও পক্ষ না নিয়ে একমাত্র নিজের স্বার্থের মধ্যে থেকে দুদেশের সাথেই ভারসাম্যপুর্ণ সম্পর্ক গড়াই একমাত্র সঠিক অবস্থান। কুটনৈতিক ভাষায় যাকে ব্যালেন্সিং বলা হয়। এশিয়া ভারকেন্দ্রিক গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন পরিস্থিতিতে ছোট বা বড় কোন শক্তির দ্বন্দ্বে শুধু বাংলাদেশ তো অবশ্যই (এবং সম্ভবত সকল রাষ্ট্রই) নিজস্ব স্বার্থমুখি একটা ব্যালেন্সিং অবস্থানে থেকে কূটনৈতিক দক্ষতা দেখানোর যুগে আমরা সবাই প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ পুরানা রাশিয়া-আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের সময়ের ব্লকে ভাগ অবস্থান নেয়া একালে ঘটতে দেখা যাবে না। অথবা একালে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কহীন ভারত ও আমেরিকার কোন জোট অথবা আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কহীন ভারত ও চীনের জোট এমনটা দেখতে পাবার কোন সম্ভাবনা নাই। এমন অবস্থা আর ফিরে আসছে না। পরস্পরের সবার সাথে সবার অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থাকবেই। এটা থাকার পরেও স্বার্থের সংঘাত বিরোধগুলোও চলতে থাকবে। গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন বিন্যাস এই নব উত্থানের সময়ের বার্তা এটাই। তবু সব রাষ্ট্রের ব্যালেন্সিং অবস্থানের মধ্যে মোটা দাগে কেবল একটাই ভাগ জ্বলজ্বলে দৃশ্যমানভাবে ভেসে থাকবে। এই ভাগের ভিত্তি হবে – কে কে পুরানো ভঙ্গুর গ্লোবাল অর্ডার ধরে রাখার পক্ষে আর কে কে নতুন অর্ডার কায়েম করতে চায়। পুরানো গ্লোবাল অর্ডার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি বিভিন্ন নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যা কায়েম করা হয়েছিল এবং বাকি দুনিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে টিকে আসছে, বর্তমানে শেষ জীবন পার করছে সেই গ্লোবাল অর্ডার। মাতব্বরির এই নিয়ম-শৃঙ্খলার নামে এই অর্ডার ভাঙ্গা গড়ার এই লড়াই এখনকার মুখ্য বিষয় যা প্রবলভাবে হাজির ও ক্রমে স্পষ্ট থেকে ষ্পষ্টতর হয়ে উঠছে। বলার অপেক্ষা রাখে না পুরানা অর্ডারের যাতায় পড়ে বাংলাদেশের মত যারা এত যুগ নিগৃহীত হয়ে আসছে তা্রা এই ভাঙ্গাগড়া থেকে, আলগা দুর্বল হয়ে পড়া পরিস্থিতি থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব তুলনামূলক মুক্ত করার চেষ্টা করা, আর বুদ্ধিমানের মত এথেকে সর্বোচ্চ সুবিধা বের করে নিবার চেষ্টা করা – এটা যে যত আগে বুঝবে, হোমওয়ার্ক করে সে প্রস্তুতি নেয়ায় এখনকার কাজ। তবে একটা সাবধানবানী খেয়াল রাখা দরকার পুরানা অর্ডার আর নতুন অর্ডার বলে যে ভাগের কথা বললাম এর মানে এমন নয় যে যারা পুরানোর পক্ষে তাদের সাথে যারা নতুনের পক্ষে এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন বিনিময় নির্ভরশীলতা এগুলো ছিন্ন করে নিয়ে তা করতে হবে। সম্পর্ক বজায় রেখেই সে সম্পর্কের ভিতর এক নতুন বিন্যাস বা সাজানো, নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়া হিসাবে ঘটবে এটা। ফলে জবরদস্তিতে সম্পর্ক ছিন্ন করে আগাতে হবে এমন করে আমরা যেন না ভেবে বসি।
    প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাপানের পক্ষে ছেড়ে দেয়া ও ভোট দেয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আসলে কি হাসিল করতে চেয়েছেন কি পেয়েছেন তা আমরা এখনও স্পষ্ট কিছু জানি না। যদিও বিশাল অংকের ঋণের প্রতিশ্রুতির কথা আমরা শুনছি। অপরদিকে চীন সফরে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রসঙ্গে সমঝোতা চুক্তির বিষয়টা ঝুলে গেছে তা বুঝা যাচ্ছে। পদ্দা সেতুতে কোন বিদেশী বিনিয়োগ থাকছে না এটা এখন পরিস্কার। কেবল নির্মাণ ঠিকাদার হিসাবে এবং একমাত্র ঠিকাদার হিসাবে চীনা কোম্পানীর কথা শুনা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এটা কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যদিও নিজের অর্থে সেতু নির্মাণের একটা সোজা অর্থ হল, ১% এর নিচের সুদের জায়গায় আমাদেরকে এখন কমপক্ষে ১২% সুদের অর্থে এই সেতু নির্মাণ দায় নিতে হচ্ছে। এতে শেষ চাপটা গিয়ে পড়বে সেতু পারাপারের টোলের অর্থে। প্রতি পারাপারে টোলের অর্থ কত দাঁড়াবে সেটার অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি কি হবে, থাকবে কি না এনিয়ে কোন ষ্টাডি কোথাও হয়েছে আমরা জানতে পারি নাই। কারণ সেতু নির্মাণ বিষয়টা এখন যেভাবে দাড়িয়েছে এর মূল বিবেচ্য অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ইজ্জত বাঁচানো। ওদিকে চীন সফরে যে ৫টি চুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে এগুলোরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবেচনা কতটুকু তা আমরা জানতে আগ্রহী, জানা দরকারও। হাসিনার জাপান ও চীন সফরে যা কিছু বিনিয়োগ চুক্তি হচ্ছে তা সরকারের ন্যায্যতার পক্ষে স্বীকৃতি ও পলিটিক্যাল লিভারেজ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা থাকবে বলা বাহুল্য। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাকে বাংলাদেশের সাথে তাদের চুক্তি হিসাবে বুঝলে সঠিক হবে। ইতোমধ্যেই এটাকে সরকারের পলিটিক্যাল লিভারেজ বা স্বীকৃতি হিসাবে মিডিয়া প্রচার হতে দেখেছি আমরা। তবে আগেই বলা যায় এতে কোনভাবেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বৈধতার সঙ্কট কাটাবে না।

    [দুই]
    পরাশক্তিগত ঝগড়া বিবাদ এমনকি যুদ্ধ দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়। নতুন হল, যারা পরাশক্তি হয়ে ছিল বা আছে তাদের সাইজ ছোট হয়ে আগের গুরুত্ত্ব হারাবে আর নতুন অনেকের পরাশক্তিগত উত্থান ঘটবে – এবিষয়গুলো ক্রমশ আসন্ন হয়ে উঠছে। আলামত ফুটে উঠছে চারদিকে। আর এসব উলটাপালটের ভিতরে আবার যেটা একবারেই নতুন এবং যেদিকটায় আমাদের অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে তা হল, পরাশক্তিগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক। এখনকার দুনিয়াতে হবুসহ পুরানো পরাশক্তিগুলো সকলে গভীরভাবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, লেনদেন ইত্যদিতে এক পরস্পর নির্ভরশীলতার সম্পর্কে ক্রমশ সবাই ডুবে যাচ্ছে এবং তা আরও গভীর হতে থাকবে। থাকতেই হবে, কারণ কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা পছন্দ-অপছন্দের উর্ধে এ’এক অবজেকটিভিটি বা বাস্তবতা। দুনিয়া জুড়ে একক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম আরও প্রবলভাবে বিস্তারি হয়ে উঠছে, পরাশক্তিসহ সকল রাষ্ট্র বা অর্থনীতিকে যা ধরে রেখেছে, সকলেই সেখানে অন্তর্ভুক্ত। পরস্পর নির্ভরশীলতার এই সম্পর্কের দিকটাই একেবারেই নতুন। এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় “পরস্পর নির্ভরশীলতা” এবং গ্লোবাল একটা ক্যাপিটালিজম অর্ডার। এর আগের ল্যান্ডমার্ক সময় হিসাবে যদি দুটো বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে রাখি, যখন আজকের চলমান অর্ডারের জন্ম হয়েছিল সে সময়গুলোতেও “পরস্পর নির্ভরশীলতার” এমন বাস্তবতা হাজির ছিল না। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পঞ্চাশের দশক থেকে আমেরিকা-সোভিয়েত ঠান্ডাযুদ্ধের রেষারেষির কালে দুনিয়ায় প্রথম পরিকল্পিতভাবে যে দুটা আলাদা আলাদা (পরস্পর নির্ভরশীলতাহীন ভাবে) অর্থনীতির ধারা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল, তাও টিকে নাই। বদলে যাওয়া ১৯৭১ সাল থেকে চীনের নতুন ধারা এবং ১৯৯১ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়ার ভিতর দিয়ে সে উদ্যোগের সমাপ্তি ঘটেছে। তারচেয়েও বড় কথা সেটাও আর ফিরে আসছে না, আসবে না। বরং আগামিতেও “পরস্পর নির্ভরশীলতা” দুনিয়ায় মুখ্য হয়ে থাকছে। আর নতুন এই দিকটাতে আমাদের অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
    কিন্তু এমন প্রশ্ন আমাদের অনেক্র মনের আছে যেমন, চীনের বদলে যাওয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়া কি ভাল হয়েছে? এমনভাবে বা এমনদিক থেকে প্রশ্ন করে যেন আজকের আগামি ব্যাপারটাকে আমরা বুঝতে না যাই। কারণ এটা উচিত-অনুচিত অথবা ভাল-খারাপের প্রশ্ন নয়। আবার দুনিয়াব্যাপী শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্ব আকারে দুনিয়াকে বুঝতে যাওয়া কি ভুল ছিল? না একেবারেই তা নয়। ক্যাপিটালিজমের ভিতরে অনেকেরই দুনিয়ার এম্পেয়ারের ভুমিকায় হাজির হওয়া, কমিউনিষ্টরা যেটাকে “সাম্রাজ্যবাদ” শব্দ দিয়ে ধরে ব্যাখ্যা করতে চায় তা এখনও আগের মতই সমান বিপদজনক শত্রু হয়ে আছে। ফলে এদিক থেকে বুঝার মধ্যে আমাদের কোন ভুল নাই। কারণ লড়াই সংগ্রামের মৌলিক বিষয় একই আছে। তাহলে ঘটল কি? আসলে ঘটেছে যা তা হলঃ কোর্স বা গতিপথে বদল। অথবা বলা যায় লড়াই সংগ্রামের মূল বিষয় বা নীতি নয় কৌশলে বদল। যেমন, আগে মনে করা হয়েছিল লড়াইটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এম্পেরিয়াল প্রকাশের বিরুদ্ধে আলাদা প্যারালাল এক গ্লোবাল (“কমিউনিষ্ট”) অর্থনীতি কায়েম করে লড়াটাই উপযুক্ত ও সঠিক কৌশল। কিন্তু সেটা খুব কার্যকর হয় নাই, কাজের হয় নাই। আকাঙ্খিত ফল দেয় নাই। ফল দেয় নাই এই অর্থে যে এটা শত্রু পরাস্ত হওয়ার দিক থেকে যত না তারচেয়ে বেশি হল নিজেরই অর্থনৈতিক বিকাশ, নিজের জনগণকে ভাল অর্থনীতিক জীবন দেয়া, কাজের সংস্থান ইত্যাদি করা যায়নি। আসলে একাজে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম থেকে আলাদা ও প্যারালাল অর্থনীতি কায়েমের চেষ্টা, এটা অনেকটা পুরানা আগে থেকে হাজির ক্লাবে যোগ দিয়ে তাদের সাথে খেলব না, আলাদা নিজেই ক্লাব বানিয়ে নিজের নিয়মে খেলা এধরণের ঘটনা ছিল সেটা। আর আজকের নতুন পরিস্থিতিতে যা হতে দেখছি, চলতি ক্রমশ পরাশক্তিগত উলটাপালট নতুন বিন্যাস পরিবর্তনের ভিতর যে অভিমুখ এখানে নতুন কৌশলটা হল, পুরানা ক্লাবে যোগ দিয়ে তাদের সাথে খেলতে খেলতেই ক্লাবের কর্তৃত্ত্বে ভাগ বসিয়ে আগের খেলার নিয়ম বদলে দেয়া। একথা বলে আবার এমন দাবি করা নয় যে কৌশলের এই বদলটা খুব ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করে নেয়া হয়েছে। বরং আগের কোর্স বা পথ কাজ করে নাই বা ফলদায়ক হচ্ছিল না বলে সেই পরিস্থিতিতে বাস্তবে বিকল্প কি করা যায় সে বিবেচনা থেকে নেয়া। এর পিছনে তত্ত্বগত স্বচ্ছতা ছিল কি ছিল না বা আছে কিনা আমরা হদিস পাই না। ফলে কথাগুলো বলা হচ্ছে নতুন আসন্ন অবজেকটিভ বাস্তবতাকে যেমন দেখা যাচ্ছে এর অর্থ তাতপর্যের দিককে ব্যাখ্যা করে।
    তাহলে যেকথা বলছিলাম আসন্ন বা পুরানা পরাশক্তিগুলোর নতুন বিন্যাস এবং গুরুত্বপুর্ণ বিষয় তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক – সেটা গভীর পরস্পর নির্ভরশীলতার এক সম্পর্ক। কিন্তু গভীর পরস্পর নির্ভরশীলতা সম্পর্ক পরাশক্তিগত বিন্যাস নতুন আকার নিচ্ছে একথা বলার অর্থ এমন নয় যে আগের মত পরাশক্তিগত ঝগড়া বিবাদ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন উবে গেছে। বরং সবলভাবে বহাল আছে। সর্বশেষ ইউক্রেন প্রসঙ্গে পরিস্থিতি ও এর গতিপ্রকৃতির দিকে নজর দিলেই আমরা তা বুঝব। এবং এটা কোনভাবেই আগের ঠান্ডাযুদ্ধের কালের লড়াই এর মত নয়। সেটা আর ফিরে আসবে না। উপরের এই পটভুমিতে এবারের লেখার প্রসঙ্গ “সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর”।

    সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর
    চীনের অর্থনৈতিক উত্থানে পুরানা এম্পেরিয়াল মোড়ল আমেরিকা ক্রমশ অগুরুত্বপুর্ণ হয়ে পড়ছে ফলে চীনের সাথে পারস্পরিক ঘোরতর বাণিজ্য অর্থনীতির সম্পর্কের ভিতরেও একইসাথে নানান গুরুতর ঝগড়া মনকষাকষির পরিস্থিতিতে সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর এখন এক গুরুত্ত্বপুর্ণ ইস্যু। এই শতক থেকে ক্রমশ গ্লোবাল অর্থনীতি বা আরও সঠিকভাবে বললে গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক অর্ডারের ভারকেন্দ্র হয়ে উঠছে এশিয়া। ওবামার “এশিয়া নীতি”এই নতুন এশিয়ায় ঝগড়া বিবাদের ভারকেন্দ্র করতে চাইছে সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর এলাকাকে। এটা আসলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে সারা পশ্চিমের দুনিয়ার উপর একক পরাশক্তির গুরুত্ত্ব হারানোরই এক প্রতিক্রিয়া। অবজেকটিভ এই বাস্তবতা যতই আসন্ন হয়ে উঠুক – বিনা যুদ্ধে না দিব সুচাগ্র মেদিনী – এই দশায় কেউই নিজের একক পরাশক্তির মুকুট ও ভুমিকা বাধ্য না হলে হারাতে চায় না। অতএব সাউথ চায়না সি অর্থাৎ চীনে পণ্য-জাহাজ আসা যাওয়ার মুল নৌরুটকে কেন্দ্র করে -আমেরিকা চাইলে এই গুরুত্ত্বপুর্ণ নৌরুট বাধাগ্রস্থ করতে পারে – এমন অবস্থা তৈরি করে নিজের গুরুত্ত্ব জাহির করার উপায় করতে চাইছে এই এলাকাকে। আমেরিকার দিক থেকে এটা নিঃসন্দেহে এক আগাম সামরিক উস্কানি পদক্ষেপ। ঢলে পড়া নিজের পরাশক্তিগত অবস্থানের ক্রমশ অগুরুত্ত্বপুর্ণ হয়ে পড়া দশাকে, অসুস্থ বুড়া শুয়ে পড়া ঘোড়াকে চাবুক মেরে খাড়া করার মত চেষ্টা এটা। এটাকে আমেরিকার এক শেষ চেষ্টাও বলা যেতে পারে। কিন্তু কতদুর আমেরিকা যেতে পারবে? সেদিকটা বুঝাবুঝির জন্যই এই আলোচনা।
    শুরুটা হয়েছিল আমেরিকান একক সিদ্ধান্তে, ২০০৮ সালের দিকে, যখন সাউথ চায়না সি কে নিয়ে দুনিয়ার কোথাও এমনকি মিডিয়াতেও কোন কোনায় কোন উত্তেজনা, কোন খবর ছিল না। তবে সরব ছিল কেবল আমেরিকার সামরিক ষ্ট্রাটেজিক প্রস্তুতির দলিলগুলোতে। এমনই এক গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রকাশ্য দলিল হল, এক আমেরিকান প্রফেসর ডঃ ওয়াল্টার এন্ডারসনের আমেরিকান কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির (আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের হিসাবে আমেরিকান পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটি) কাছে সাক্ষ্য দিয়ে বলবার জন্য তৈরি দলিল। (সাউথ চায়না সি সম্পর্কে পাঠককে এক ভৌগলিক ধারণা দেবার জন্য নিচে এক প্যারায় এক সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছি। সেখানে ব্যবহৃত ছবি এন্ডারসন সাহেবের ঐ দলিল-রিপোর্ট থেকে নেয়া।) দলিল-রিপোর্টটা মূলত ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক মানে এশিয়ার দুই “রাইজিং ইকোনমির” একটা, ভারতের ঘাড়ে চড়ে বা পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টা মানে চীনকে ঘিরে ধরা – এই বুদ্ধিতে সাজানো। আমেরিকান নির্বাহী প্রেসিডেন্টের সাউথ চায়না সি তাক করে সাজানো বিদেশনীতি আরও কয়েক বছর আগেই নিয়েছিল। আমেরিকান নির্বাহী প্রেসিডেন্টের বিদেশনীতির বিস্তারিত মূল দলিল প্রকাশ্যে প্রায় না পাওয়া যাওয়ার মত। তবে মুল দলিলে কি আছে তার কিছু ধারনা পাওয়া যায় আমেরিকান কংগ্রেস কমিটি বা প্রতিনিধি পরিষদ বা কখনও সিনেট কমিটির শুনানীগুলোতে। কারণ এই শুনানীগুলো প্রকাশ্য পাবলিক দলিল। এটা নির্বাহী প্রেসিডেন্ট কি করছেন তার একটা সংসদীয় স্ক্রটিনী বা নিরীক্ষার চোখ রাখা, আর আমেরিকান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতার চেক এন্ড ব্যালেন্স। আলোচ্য যে দলিলের কথা বলছি তা ভারত আমেরিকান নতুন সম্পর্কের ছক কেন সঠিক সে সম্পর্কে মাষ্টার মানুষ হিসাবে এন্ডারসন সাহেবের ২০০৮ সালের জুন মাসে আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদকে দেয়া লিখিত সাক্ষ্য। প্রতিনিধি পরিষদের সেটা স্বাধীনভাবে বুঝে নিবার উদ্যোগ। আর এন্ডারসন সাহেব সেখানে মাষ্টারি এক্সপার্টে কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিয়ে কি বলেছিলেন সেই দলিল এটা।

    চীনের চোকিং পয়েন্টSouth china sea1

    এটা চীনের উপকুলীয় সীমান্ত সম্পর্কে এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। ম্যাপে চীনা ভুখন্ডের দিকে তাকালে আমরা দেখব চীনের দক্ষিণ-পুর্ব থেকে পুর্বে বিস্তৃত ভুখন্ডের প্রায় পুরাটাই সমুদ্রে উন্মুক্ত। আর অন্য বাকি সবদিকের সীমান্ত ভুখন্ডগতভাবে আবদ্ধ বা ল্যান্ডলকড। অর্থাৎ এটাই চীনের বাইরের সাথে নৌ যোগাযোগের প্রবেশ দ্বার। ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ছয়টা আন্তর্জাতিক নৌবন্দর এই দক্ষিণ-পুর্ব তীরে। এই অর্থে দক্ষিণ-পুর্ব ভুখন্ড আসলে এক লম্বা উপকুলীয় অঞ্চল, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পুর্ব চীন সাগর নামে মোটা দাগে যা আলাদা যদিও এটা অবিচ্ছিন্ন এক উপকুল অঞ্চল। এদুটোর মধ্যে বাণিজ্য গুরুত্ত্বের দিক থেকে আবার সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর সবচেয়ে চালু। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া পেরিয়ে চীনের উপকুলে প্রবেশের দিক থেকে প্রথমে পড়বে দক্ষিণ চীন সাগর, ফলে পুর্ব চীন সাগরের চাইতে দক্ষিণ চীন সাগর উপকুল বাণিজ্যের দিক থেকে চীনে প্রবেশের প্রধানদ্বার। আর মধ্যপ্রাচ্য মানে আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত এই নৌরুট চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য – পণ্য বা কাঁচামালের জাহাজ আসা যাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ। চীনের আমদানি জ্বালানি তেলের ৬০ ভাগ এই নৌরুট (Sea line of communication) ব্যবহার করে এসে থাকে। ফলে সে অনুপাতে চীনের উতপাদিত রপ্তানি পণ্যের জাহাজ বহর যাতায়াত করে এই নৌরুটেই। আবার দক্ষিণ চীন উপকুলে প্রবেশের মুখে সবচেয়ে বেশি পড়শি রাষ্ট্রের সমাহার। চীন থেকে বেড়িয়ে লাগোয়া পড়শি ভিয়েতনামকে পেরিয়ে যতই দক্ষিণে যাওয়া যাবে (ম্যাপ জুম বড় করে দেখুন) ততই মুখোমুখি হবে – ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া (পিছনে অষ্ট্রেলিয়া), ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি রাষ্ট্রের উপকুল – এর পরে বঙ্গোপসাগর। আর ওদিকে পুর্ব চীন সাগরের আশাপাশে পড়শি রাষ্ট্র হল কেবল দুই কোরিয়া আর জাপান।

    এন্ডারসনের সাক্ষ্য দলিল
    মোটা দাগে বললে US Congress hearing on India-US relationship দুইটা অংশে বিভক্ত। প্রথমভাগে, কেন আমেরিকার ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্র সহযোগিতাসহ আধুনিক ও সুক্ষ্ম অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ করা উচিত সে সম্পর্কে ন্যায্যতা দিচ্ছেন এন্ডারসন। আর সেই সাথে কেন আমেরিকান যাতার চাপে বাকা হয়ে থাকা আমাদের মত দেশের উপর এপর্যন্ত ব্যবহার করা আমেরিকান যাতাকাঠিটা আমাদের এই অঞ্চলে সবার উপর ব্যবহারের জন্য ভারতকে ধার দেয়া দরকার সেই সুপারিশ রাখছেন তিনি। এর আগে আমার অনেক লেখায় “যাতাকাঠি তত্ত্বের” রেফারেন্স আনতে এন্ডারসনের এই দলিলের কথা বলেছি। কিন্তু এবার আজকের এই লেখায় ঐ রিপোর্টের দ্বিতীয় ভাগকে উদ্ধৃতিতে আনছি। প্রথমভাগকে যদি বলা হয় আমেরিকা ভারতকে কি কি দিবে এর তালিকা বিষয়ক তবে দ্বিতীয়ভাগটা হল আমেরিকা কি কি নিবে সে বিষয়ক। দ্বিতীয় ভাগে আমেরিকার প্রত্যক্ষ চাওয়া হল এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ভারত যেন সমর্থন জানায়, চীন ঠেকানোর আমেরিকান স্বার্থের ভিতরে ভারত যেন তারও আঞ্চলিক ভুকৌশলগত স্বার্থ হিসাবে দেখে, নেয়। তবে কথাটা বললাম প্রত্যক্ষ ভাষায়। কিন্তু “এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ভারতের সমর্থন” আমেরিকার এই স্বার্থ পরিকল্পনাকে খোলাখুলি তো বলা যায় না। তাই সেটা এখানে উপস্থাপিত হয়েছিল অন্য শব্দাবলিতে আড়াল করে। এন্ডারসনের রিপোর্টের ভাষায় এটা তাই “managing the rise of China”,মানে চীন ঠেকানো বা মোকাবিলা। কথাগুলো টুকে এনেছি এন্ডারসন ভারতের সাথে আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক কেন হবে -কমন স্বার্থগত মৌলিক দিকগুলো কি তা আমেরিকান কংগ্রেসকে মানাতে গিয়ে কি বলছেন সেখান থেকে নেয়া। বলছেন, “This is based on the strong fundamentals of a convergence of interests on key issues, such as curbing religiously-inspired radicalism, managing the rise of China, defeating the Taliban in Afghanistan, and working towards stability in South Asia and beyond”. নিজ দায়িত্ত্বে করা এর অনুবাদ হলঃ (ভারত আমেরিকার আলাদা আলাদা স্বার্থগুলো) মৌলিকভাবে যেসব জায়গায় মিলেছে তা হল, ধর্ম-অনুপ্রাণিত উগ্রতা ঠেকানো, চীনের উত্থানকে মোকাবিলা, আফগানিস্তানে তালেবানদের পরাজিত করা এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে কাজ করা; আরও সামনে আগানো। অর্থাৎ আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত স্বার্থ আড়াল করে আলকায়েদা তালেবানের উপর দোষ চাপিয়ে এক ইতিবাচক ভঙ্গি তৈরি করে কথাগুলো বলা হয়েছে। কিন্তু যতই কথার ফুলঝুড়িতে আলকায়েদা তালেবানের উপর দোষ চাপিয়ে বলা হোক, প্রথমভাগে আমেরিকার ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্রে সহযোগিতাসহ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ করার যে কথা বলা হয়েছে এগুলো কোনযুক্তিতেই আলকায়েদা তালেবান মোকাবিলার অস্ত্র নয় এটা সবাই সহজেই বুঝবেন, মানবেন। ফলে যেটা বলা হচ্ছে, দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কটা নাকি মূলত ভারত-আমেরিকার “সিকিউরিটি এলায়েন্স” –প্রশ্ন করা যায় এই সিকিউরিটি এলায়েন্স কার বিরুদ্ধে? আলকায়েদা তালেবান নাকি উদিয়মান চীনের বিরুদ্ধে? বলা বাহুল্য এটা চীন। ফলে এখান থেকে চীন ঠেকানোর আমেরিকার মুখ্য স্বার্থটা স্পষ্ট বুঝা যায়। কিন্তু ভারতের দিক থেকে দেখলে ভারত কি বুঝে একই ভাষায় এটাকে মুলত সিকিউরিটি এলায়েন্সের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বলে বুঝেছিল? “সিকিউরিটি এলায়েন্স” এর প্রসঙ্গটা যথেষ্ট পুরানা ২০০১-২০০৮ সালের বুশ আমলের;যেমন,বুশের “natural partners” (President Bush in 2006), “strategic allies” (Prime Minister Vajpayee in 2004), and in 2005 Prime Minster Manmohan Singh declared that it is a relationship with “no limits” ইত্যাদি। তার মানে আসলে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এটা ঠিক যে ভারত আমেরিকার সাথে “চীন বিরোধী” কোন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে ভিড়তে চায় না আবার, একই সাথে এশিয়া কোন একক পরাশক্তির সামরিক প্রভাব দখলে চলে যাক এটাও ভারত চায় না – একথা আমেরিকাকে সে আগেই জানিয়ে রেখেছিল। এন্ডারসনের রিপোর্টও এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, “……no single power (i.e., China) should dominate Asia, but India will not support an anti-Chinese alliance and rather will seek ways to integrate China more closely into a larger Asian context.”। তবু ভারত ভান করেছিল যেন আমেরিকার চীন ঠেকানোর নামে এশিয়ায় সাউথ চায়না সি তে সামরিক উত্তেজনা তৈরির স্বার্থটা সে ধরতেই পারে নাই। ভারতের ভান বলছি একারণে যে এন্ডারসনের রিপোর্টের দ্বিতীয়ভাগ পরিস্কার করেই একেবারে ম্যাপ এঁকে (যেট আমি এখানে ব্যবহার করেছি) সাউথ চায়না সি পর্যন্ত চীনের নৌবাণিজ্যের রুট কি করলে আটকে বা বাধা তৈরি করা সম্ভব (এন্ডারসনের ম্যাপে যাকে চোকিং পয়েন্ট বলে লাল কালিতে চিহ্নিত করেছে) তার উল্লেখ আছে। অথচ এটা তো চীনের বাণিজ্য জাহাজের (সামরিক নয়) অবাধে নৌরুটে চলাচলের মত সাধারণ বিষয়। যা সরাসরি ভারতের অর্থনীতি বা সামরিক কোন সমস্যা নয়, কোনভাবেই সমস্যার ইস্যু নয়, চীনের এশিয়ায় একক সামরিক কর্তৃত্ত্ব নেয়া রুস্তমি হুমকিও এটা নয়। ওদিকে আমেরিকান সংসদীয় কমিটির কাছে এন্ডারসনের এই স্বাক্ষ্য কোন গোপন দলিল নয় বরং এটা দুনিয়ার পাবলিকের কাছে খোলা ফলে ভারতেরও অজানা বিষয় নয়। আবার অন্যদিকে আমেরিকাও ভান করেছিল। ভারতের কাশ্মীর বা উত্তর-পুর্বের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নির্মুল সে আমেরিকার “টেররিজম” শব্দের আড়ালে করতে চাইছে আমেরিকা যেন এটা বুঝতেই পারে নাই। কিন্তু এই পারস্পরিক ছলনার সম্পর্ক নেংটা হতে সময় লাগে নাই। আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখতে চায়। এই খায়েস ২০১২ সালে প্রকাশ হওয়া মাত্র ভারত নিজের বিপদ টের পায় যে এটা আসলে চীন ঠেকানো বা চীনের জন্য বিপদ নয়, আসলে খোদ ভারতের জন্যও সমান বিপদ। ফলে ভারত-আমেরিকার হানিমুনের সম্পর্কে টান ধরে, আস্থা বিশ্বাসের ছলনার পর্দা সরে গিয়ে সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এন্ডারসনের এই রিপোর্টের পরের তিন বছরের মাথায় ২০১২ সালের শুরুতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এরপরের কাহিনী আমরা সবাই জানি। কুটনীতিক খেবড়াগোরে আর বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত-আমেরিকার বিবাদ আরও চরমে পৌছায়।
    বিপরীতে চীনের দিকে তাকালে আমরা দেখব পরাশক্তিগত মাসল দেখিয়ে চীনের উত্থান ঘটে নি। অন্তত এখনও ঘটছে না। সত্তরের দশকে ভিয়েতনামের বিপ্লবের পরের চীন দুনিয়ার কোন বিরোধ বিবাদে আর সামরিকভাবে অংশগ্রহণ করে নাই। আসলে পরাশক্তি ভাব যতটা না মাসল ফুলিয়ে দেখাবার বিষয় তারচেয়ে -অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ত্ব অর্জন করা পরাশক্তি হবার পুর্বশর্ত -এই নীতিতে সমস্ত মনোযোগ চীন নিজের অর্থনৈতিক বিকাশের দিকেই ঢেলেছে। কেবল নিজের ভুখন্ডগত বিষয় (তাইওয়ানকে নিজের ভুখন্ড মনে করে ফলে তাইওয়ানসহ) ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন বিবাদের ইস্যুতে চীন সামরিক সংশ্লিষ্টতা রাখেনি। তাই চীন তার অর্থনৈতিক নৌচলাচল ও প্রবেশ রুট সাউথ চায়না সি তে নিজে যেচে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরির কোন কারণ নাই, করেও নাই,উঠেও নাই। কিন্তু এখন উঠেছে। কেন?
    আমেরিকা নিজে ক্ষয়িষ্ণু ও ক্রমশ অগুরুত্ত্বপুর্ণ হয়ে পড়া হলেও তার পরাশক্তিগত দাপটের এখনও অন্যের দরকার আছে, এশিয়ার অনেকেই তাকে চায় এই অবস্থা তৈরি করতে তার নেয়া প্রথম সিদ্ধান্ত হল ২০১০ সালে। তার মোট সামরিক শক্তির ৬০ ভাগ এশিয়ামুখি বা প্রশান্ত মহাসাগরে সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকা, বাকি চল্লিশ ভাগ সামর্থ আটল্যান্টিক মহাসাগরে। এর আগে এটা সমান পঞ্চাশ ভাগে ছিল। একই সাথে নিজ মিলিটারি বাজেট মোটের উপর দশ ভাগ ছাটাই করেছিল। কারণ আফগানিস্থান ও ইরাক যুদ্ধের খরচ সামলাতে গিয়ে গ্লোবাল মহামন্দায় আমেরিকান রাষ্ট্র ও অর্থনীতি আর নতুন করে সামরিক ব্যয় বইতে অপারগ হয়ে গিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত প্যাকেজেরই অংশ হল, ইরাক থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার আর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার। অর্থাৎ প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তের কারণ যুদ্ধ মিশন সম্পন্ন হয়েছে তা নয় বরং যুদ্ধের খরচ যোগাতে রাষ্ট্রের অপারগতা। কিন্তু এশিয়ায় এক আগাম অনুমানের ভীতি ছড়ানোও সে শুরু করেছিল। ভীতির বয়ানটা হল, চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠলে পড়শি রাষ্ট্রগুলোর জন্য তা হুমকি হয়ে উঠবে। ফলে পড়শিদের আমেরিকান সামরিক সহায়তার দরকার হবে। আর তাই এই সহায়তা বিক্রির দোকান খুলে আগেই এশিয়ায় বসে পড়া আমেরিকার দরকার।
    গত ছয় মাস ধরে সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগরের সীমানা অথবা নিচের সম্পদের দখল নিয়ে উত্তেজনা চলছে পড়শি ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের সাথে। ওদিকে পুর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ জাপানের সাথে। এতে অসুস্থ বুড়া শুয়ে পড়া ঘোড়াকে চাবুক মেরে খাড়া করার চেষ্টায় রত আমেরিকার পরাশক্তিগত ভুমিকার ন্যায্যতা হাজির হতে শুরু করেছে। আমেরিকান পরিকল্পনা সফল বলতে হয়। কিন্তু ঘটনা শুরু হচ্ছে কোথা থেকে সেদিক থেকে আমাদের নজর যেন না সরে যায়। আমেরিকার ২০১০ সাল থেকেই তার এশিয়ামুখি করে সামরিক শক্তির পুনর্গঠন আর একইসাথে “পার্টনারশীপ ডায়লগ” এর নামে চীনের পড়শি দেশগুলোকে ভড়কিয়ে নিজের সামরিক নৌকায় তোলার চেষ্টা শুরু করে,চীনের পড়শিদেরকে সামরিক নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করতে থাকে। এই ঘটনা থেকে এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনার শুরু। যাদের সাথে আগে থেকেই চুক্তি আছে যেমন জাপান, তাও ঝালাই করে নেয়।
    চীনের দিক থেকে দেখলে আমেরিকার এই পদক্ষেপ নিজের জন্য হুমকি মনে না করার কারণ নাই। কারণ এটা তার সামরিক না বাণিজ্য জাহাজ অবাধ চলাচলের ইস্যু। এমনিতেই এশিয়ার মহাসাগর প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার নিজ ভুখন্ডের উপকুলীয় কোন উন্মুক্ত নীল জলরাশি অঞ্চল নয়। তাহলে সে কেন এখানে? এর ন্যায্যতা কি?
    [বাকি অংশ দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে সমাপ্ত]

  • ভারতের নির্বাচনের তাত্পর্য

    ভারতের নির্বাচনের তাত্পর্য

    গৌতম দাস

    ভারতের নির্বাচনে ফলাফল পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশটির নিজস্ব রাজনীতির গতি-প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনার শুরুতে কতগুলো প্রিজুডিস বা মনে গেঁথে বসা আগাম অনুমান পরিষ্কার করা দরকার। কংগ্রেস আর বিজেপির তফাত কী— এ সম্পর্কে আমাদের অনুমিত ধারণা হলো, বিজেপি ধর্মীয় দল আর কংগ্রেস সেক্যুলার। বাংলাদেশে সাধারণভাবে মুসলমান পরিচয়ের দিক থেকে বিজেপির প্রতি ভয় ও আপত্তি আছে। সে তুলনায় কংগ্রেসের প্রতিও ভয় আপত্তি কম নয়। শহুরে জনগণ মূলত বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসকে এগিয়ে রাখার একটা ঝোঁক তৈরি করে রেখেছে। কিন্তু উপর উপর নয়, বিষয়ে গভীরে গিয়ে চিন্তা করলে আমরা বুঝব যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে এক ভারতীয় রাষ্ট্র— এই মৌলিক ধারণার ব্যাপারে কংগ্রেস ও বিজেপি একমত। অর্থাৎ এটা তাদের রাষ্ট্রভিত্তিগত মৌলিক মিলের দিক। এটা শুধু বিশেষ হিন্দুধর্মীয় কারণে নয় বরং বিশাল ভারতে কেন্দ্রীভূত করে ঐক্য ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় এবং নির্ধারক বলে এই উভয় দল বিশ্বাস করে। অনুমানটা হলো, একটা শক্ত এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রক্ষমতা তৈরি ও তা ধরে রাখার প্রধান উপাদান হলো হিন্দুত্ব। কারণ এছাড়া নাকি হাজারো পরিচয়ের বিভেদ চিহ্ন (ভাষা, রেসিয়াল অর্থে জাতিগত, সমতলী-পাহাড়ি, কৃষিপ্রধান-অকৃষি প্রধান, একেক অঞ্চলে একেক দেবদেবীর প্রভাব, ধর্মীয় প্রধান উত্সবের ভিন্নতা, জাতপাত বা কাস্টের বিরোধ আর সর্বোপরি নানান ধর্মীয় ভিন্নতা ইত্যাদি) এমন ভারতকে ধরে রাখা যাবে না। ফলে এক রাখার সহজ চাবি হতেই হবে হিন্দুত্ব। এটা আসলে কেবল কংগ্রেস বা বিজেপির দলীয় চিন্তা নয়, ভারতকে এক করে ইউনাইটেড এক ইউনিয়নে ধরে রাখা আর সেই ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক ভারত রাষ্ট্রের যে কল্পনা সবার মনে ১৯৪৭ সাল থেকে জারি আছে, এর মৌলিক ভিত্তি হিন্দুত্ব; হিন্দুত্বের ভিত্তিতে এক ভারতীয় রাষ্ট্র। কনস্টিটিউশন অনুযায়ী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বলা হয় ইউনিয়ন সরকার। এই অর্থে ভারত ইউনিয়ন রাষ্ট্র, কোনো ফেডারেল রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো এটা নয়। হিন্দুত্বের ভিত্তিতে এ ইউনিয়ন খাড়া করতে গিয়ে জোর দেয়া হয়েছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার দিকে। আর এতে কেন্দ্রীয় ভুতুড়ে ক্ষমতায় সব শ্রেণী, অঞ্চলের ‘প্রতিনিধিত্ব’ নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় দিকটা গায়ের জোরে দাবিয়ে রাখা হয়েছে। এই হলো হিন্দুত্বভিত্তিক রাষ্ট্রের গোড়ার কথা। ওর জন্ম সমস্যার আদি কাহিনী। কংগ্রেস ও বিজেপির এই মৌলিক ভিত্তিগত মিলের পরে এবার তাদের ফারাকের দিকটা হলো— কংগ্রেস মনে করে এই মৌলিক ভিত্তিকে লুকিয়ে রেখে একে উপস্থাপন করতে হবে সেকুলার জামা পরিয়ে। বিপরীতে বিজেপি মনে করে— এটা লুকানোর কী আছে। লুকানোর ধার ধারে না শুধু নয়, সে এটা গর্বের পর্যায়ে নিয়ে উপস্থাপন করতে চায়। এ হিসাবে বিজেপিকে সৎ বলা যেতে পারে। আবার সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে কংগ্রেসের সেকুলারিজম জামা লাগিয়ে নিজেকে হাজির করার এই নবপ্রয়াস কিন্তু ১৯৪৮ সালে গঠিত ভারত রাষ্ট্রে ছিল না। ১৯৪৮ সালের গৃহীত ও গঠিত ভারত প্রজাতন্ত্রের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজমের আলাপ পাওয়া যাবে না। এটা পাওয়া যাবে ১৯৭৪ সালের পরে সংশোধিত কনস্টিটিউশনে। আর ওদিকে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিকে গৌরবের বিষয় হিসেবে নিয়ে দাঁড়ানোর কারণে হিন্দুত্বের জন্য গালমন্দের পুরোটাই বিজেপির ওপর দিয়ে যায়। গত ৬৭ বছরের প্রজাতান্ত্রিক ভারতের ৫৬ বছরই কেটেছে কংগ্রেস বা কংগ্রেসের জোটের দ্বারা পরিচালিত সরকারের হাতে। কিন্তু এই ৬৭ বছরে সরকারে কে আছে— এর সঙ্গে দাঙ্গা ঘটছে বা ঘটেনি অথবা কমবেশি ঘটেছে, এর কোনো তালমিল, কো-রিলেশন খুঁজে পাওয়া যায় না। দাঙ্গা যার ইচ্ছা-পরিকল্পনায়ই ঘটুক, শুরু হোক, পুলিশ বাহিনীসহ প্রশাসনের মৌন অথবা সক্রিয় সমর্থন ছাড়া সেই দাঙ্গা সফল হওয়া একেবারে অসম্ভব। ১৯৯০ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার দাঙ্গার সময়ে প্রথম ৩ ঘণ্টা নির্দেশ দেয়ার মতো প্রধানমন্ত্রী ভারতে কেউ ছিলেন না। কারণ তখনকার কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও ওই ৩ ঘণ্টা আনডিস্টার্ব এক দীর্ঘ পূজায় বসেছিলেন— এমন খবরও আমরা শুনি। তবু হিন্দুত্বের এই রাষ্ট্রীয় ফাউন্ডেশন এ ভিত্তির দিকে নজর না ফিরিয়ে কেবল দল বিজেপিকে দোষারোপের এক আবহাওয়া তৈরির জন্য কংগ্রেসের প্রতি আমাদের ‘সেকুলার প্রগতিবাদী’ কামনা দায়ী। বাংলাদেশের মুসলমান ‘সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশকারী’ আসছে— এ ব্যাপারে কংগ্রেস, সিপিএম, এককালের তৃণমূল আর বিজেপি তো আছেই, সবাই একমত। পার্লামেন্টে আলোচনাও করেছে। গত দশ বছর কংগ্রেস শাসনে কথিত সেই ‘অনুপ্রবেশকারী’ মারার অজুহাতেই নির্বিচারে সীমান্তে হত্যা আমরা দেখেছি। ভারতের কোনো দল আপত্তি করেনি। যদিও বিএসএফ একজন ‘সন্ত্রাসবাদী’কেই সীমান্তে হত্যা করতে পেরেছে এমন রেকর্ড জানা নেই। যারা মরেছে তারা গরু চোরাচালানি বা নিরীহ সীমান্ত গ্রামবাসী, এককথায় যারা বড়জোর ‘ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট’। ফেলানী ঘটনা যার জাজ্বল্য প্রমাণ। মজার কথা, এমনকি কোনো ফেনসিডিল চোরাচালানি তাতে নেই। তবু কংগ্রেস ভালো আর বিজেপি একমাত্র দোষের— এমন বয়ান আমরা নিয়মিত উৎপাদন করতে দেখছি। বাংলাদেশ থেকে ‘মুসলিম সন্ত্রাসবাদী’ অনুপ্রবেশকারী কল্পিত শত্রু না থাকলে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা ভারত রাষ্ট্রে ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই এই প্রশ্নে কংগ্রেস, সিপিএম, এককালে তৃণমূল আর বিজেপি সবাই একমত। আশা করব ভারতে মোদির বিজেপির বিজয়ের কালে এর গতি-প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এই গোড়ার প্রিজুডিস থেকে আমরা মুক্ত থাকব।
    বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে ভারত ‘উন্নত আর উন্নয়নশীল’ এ বাইনারি ক্যাটাগরির বাইরে ‘রাইজিং ইন্ডিয়া’— এই নতুন ক্যাটাগরিতে গণ্য হতে পারে এমন সম্ভাবনার দেশ। দুনিয়ার অর্থনীতি এশিয়ামুখী, এশিয়া ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ওবামাসহ সবাই এটা স্বীকার করেন। এই ভারকেন্দ্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে চীনের বিপরীতে একমাত্র ভারতই পশ্চিমের ভরসা। অনুভূত এ ফ্যাক্টর ওয়াল স্ট্রিটের কাছে ভারতের গুরুত্ব আরো কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। ওদিকে ‘জব ক্রিয়েশন বা কাজ সৃষ্টি’ যে পপুলার নামে বিদেশী বিনিয়োগ ব্যবসা মিডিয়ায় হাজির থাকে, এর জোয়ার আর প্রথম ঝলক ভারতের মধ্যবিত্ত টের পেয়েছিল ২০০৫-০৬ সালের দিকে। ভারতের ক্ষমতার জন্য নির্ধারক ৫৪৩ আসনের লোকসভার মধ্যে ১৫০টি আসনকে নির্বাচন কমিশনের ম্যাপে আরবান বা শহুরে কনস্টিটুয়েন্সি মানা হয়। ‘শহর’ কথার তাত্পর্য হলো, গ্রামের বাইরে যেখানে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয় সেই কারখানা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এই প্রয়াস। বলা হচ্ছে, ২০৩১ সালের মধ্যে ভারতের শহরগুলোয় মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ বসবাস করবে। শহুরে জনগোষ্ঠীর জীবনের অর্থ কী, ভোগ কী? মানুষ যা ভোগ করে, যেভাবে ভোগ করে জীবন-যাপন করে, জীবনের অর্থ তাতেই নির্ধারিত ও প্রকাশিত হয়। করপোরেট ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানি শহুরে জীবনের নতুন অর্থ তাকে মিডিয়ার মাধ্যমে বয়ানে নিরন্তর সরবরাহ করে। শহুরে মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীতে সেট করা অর্থকে আবার অনুসরণ করে গ্রামের মধ্যবিত্ত। গ্রাম কি কিনবে কি কিনবে না সেই বোধের গাইড শহর। শহরে কাজ করে গ্রামে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানো প্রতিটা শহুরে ব্যক্তি এর সবচেয়ে বড় বাহক। এসব মিলিয়ে নির্বাচনের সময় তাই মধ্যবিত্ত খুবই নির্ধারক। কমবেশি শিক্ষিত বলে সে ভোকাল, সবার পক্ষে অপিনিয়ন মেকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা হলো, ভারতের শহুরে মধ্যবিত্তের বয়স পাঁচ-সাত পুরুষের। জমির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন এই শহুরে উদ্বাস্তুদের জীবনমান প্রায় স্থবির। ভাড়া বাসায় থাকা কেরানির চাকরি জুটানো প্রজন্ম পরের প্রজন্মে জীবনমানে উন্নতি দেখবে এমন কোনো সম্ভাবনা, আশার আলো তার সামনে নেই। বরং সে চেষ্টা করে বাবার আমলের জীবনমানটাই যদি সন্তান আমলেও ধরে রাখা যায় তো সেটা বিরাট অর্জন। এটাই তার অর্জনের মাপকাঠি। জব ক্রিয়েশন বা কাজ সৃষ্টি বলে পপুলার ধারণাটার অর্থ বিদেশী বিনিয়োগের বাজার হওয়া ছাড়াও এখান থেকেও দেখতে হবে। ভারতের শহুরে মধ্যবিত্তের বড় অংশ গড়ে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ প্রজন্ম এভাবে দিশাহীন স্থবির হয়ে আছে। এরাই ২০০৫-০৬ সাল থেকে সম্ভাবনাময় ‘রাইজিং ইন্ডিয়ার’ প্রথম কিছু আলামত দেখেছিল। আশায় বুক বেঁধেছিল। গত নির্বাচনে ২০০৯ সালের সময় ভারত ছিল ‘রাইজিং ইকোনমি’ হয়ে উত্থিত হতে পারে কিনা— সে অর্থে উত্থানের পর্বে। কংগ্রেস জনগণের মধ্যে আশা আকাঙ্ক্ষার আস্থা তৈরি করতে পেরেছিল, তাই সহজে জিতেছিল। কিন্তু গত তিন বছরে এটা ক্রমে সবার কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে, কংগ্রেস বিনিয়োগ সামলানোর অযোগ্য। এদিকটা নিয়ে বিস্তারিত আমার আগের লেখায় লিখেছি। এখন কথা অন্যদিক থেকে বলব।
    এবারের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু ছিল আবার সেই হতাশ মধ্যবিত্তকে আশার আলো দেখানো। ‘কাজ সৃষ্টির’ সক্ষমতা কার আছে কার নেই। মোদির বিজেপির বিপুল জয়লাভ প্রমাণ করেছে যে, এটাই মূল ইস্যু ছিল। কিন্তু শুধু দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ীর আকাঙ্ক্ষা আর বিপুল মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষাকে এক সুতায় বাঁধে মোদী সরকার— এটুকুতেই এর তাত্পর্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং আরো গভীরে। ফলে জাতপাত, হিন্দু-মুসলমান অথবা সন্ত্রাসবাদ এসব মুখ্য হয়ে থাকা রাজনৈতিক ইস্যুর ভারত এবার অজান্তে তার রাজনৈতিক ইস্যুর পাটাতন বদলে ফেলেছে। মুখ্য ইস্যু ‘কাজ সৃষ্টি’। এত দিন হিন্দুত্বকে প্রধান করে গড়ে ওঠা ও পরিচালিত বিজেপি নিজেই পুরনো প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু বদলে ফেলেছে। মোদির জয়লাভ এ অর্থে পুরনো বিজেপির জয়লাভ নয়। পুরনো বিজেপির প্রতীক আদভানির বদলে মোদির হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রার্থিতা, জয়লাভ কেবল বিজেপি নয়, গোটা ভারতের রাজনীতিতে সব দলকে বদলে ফেলার সম্ভাবনা হিসেবে হাজির হয়েছে। সতর্কভাবে ‘সম্ভাবনা’ শব্দটা ব্যবহার করেছি। ভোটের জনগণের আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে দেখলে হিন্দুত্বের ইস্যুকে গৌণ করে এখানে মুখ্য ইস্যু ‘কাজ সৃষ্টি’ এই রায় হাজির হয়ে গেছে। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা তৈরি আর তাকে বাস্তবে ট্রান্সলেট করে ‘করে দেখানো’ এই ফারাকটা ঘুচে কিনা, মোদি সক্ষম হবেন কিনা, তা এখন দেখার বিষয়। হোক না এটা জিডিপির ভিত্তিতে সাফল্য মাপার আশা।
    সার কথায়, মোদির বিজেপি মনমোহনের কংগ্রেসের মতোই অযোগ্য না নিজগুণে যোগ্য, তা সরকারের প্রথম এক থেকে দুই বছরেই পরিষ্কার বোঝা যাবে। যদি তারা কার্যকর ফল দেখাতে অযোগ্য হয়, তাহলে ভারতের রাজনীতি আবার চরম দাঙ্গা, জাতপাত, হিন্দু-মুসলমান অথবা ওয়ার অন টেররের সন্ত্রাসবাদ এসবকে মুখ্য করে পুরনো জায়গায় তবে আরো ভয়াবহ অবস্থায় ফিরে যাবে। হয়তো তা মোদির নেতৃত্বেই! আর যদি সফল হয়ে যায় তবে কেবল ভারত নয়, এ অঞ্চলের রাজনীতিতে তা গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবু আরো এক অনুষঙ্গ আছে। বিজেপি এ নির্বাচনে আসামের অর্ধেক আসন মানে একাই সাতটা পেয়েছে। ওদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন মাত্র দুটো হলেও ১৭ শতাংশ ভোট জোগাড় করেছে। বিপরীতে মমতা মুসলিম কনস্টিটুয়েন্সির দিকে নতুন ভিত্তি তৈরি করে ‘মোদি ঝড়’ এবারের মতো সামলেছেন। নতুন ১৫ আসন দখলে তার আসন এখন মোট ৪২-এর মধ্যে ৩৪টা। যদিও ফলাফল-উত্তর সব বক্তব্যেই মোদি মূলকথা হিসেবে জোর দিয়ে বলছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা তিনি পেয়েছেন কিন্তু ‘সরকার চালানো আর দেশ চালানো’ এক নয়। ফলে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে সবাইকে নিয়ে ‘কাজ সৃষ্টি ও সমান উন্নয়নের দেশই’ চালাতে চান, কেবল সরকার নয়। ফলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ‘স্থানীয় বিজেপির’ প্রবল বাংলাদেশবিরোধী রেঠরিক কি মোদিরও রেঠরিক এবং কৌশল হবে? হলে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে শান্তি-অশান্তি নির্ধারক এক মোদির ভারতকে আমরা পাব। ফলে এর গতি-প্রকৃতির দিকে আমাদের গভীর নজর থাকবে। আবার আমাদের জন্য একটা নগদ ইস্যু আছে। বাংলাদেশে ‘আমার হাসিনা সরকারই চাই’ এমন নীতির কংগ্রেস আর তা নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে বিরোধের ভারত— এ অবস্থান ধরে রাখার পক্ষে মোদির কোনো দৃশ্যমান বিশেষ কারণ এখনো জানা যায়নি। ফলে ‘বাংলাদেশের জনগণ যাকেই তাদের প্রতিনিধি ও নেতা নির্বাচিত করুক, আমরা তার সঙ্গেই কাজ করতে চাই’— ওবামা ও মোদির সরকারকে এমন কমন এক অবস্থানে আগামীতে আসতে দেখতে পাওয়া কঠিন কিছু নয়। কারণ এটাই পরদেশী রাষ্ট্র বিষয়ে যে কোনো রাষ্ট্রের সবচেয়ে রুটিন কূটনৈতিক অবস্থান।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    লেখাটা গত ২৪ মে ২০১৪ দৈনিক বণিক বার্তায় ছাপা হয়েছিল। সেখান থেকে হুবহু নেয়া হয়েছে।

  • ভারতের নির্বাচনের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া প্রভাব

    ভারতের নির্বাচনের ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া প্রভাব

    গৌতম দাস

    ভারতের নির্বাচনে অন্তত পাঁচটা মিডিয়ার পরিচালিত সবগুলো জনমত জরিপ আর পরে ভোটের বুথ ফেরত নির্বাচন জরিপের ফলাফলের ইঙ্গিতকে সত্যি প্রমাণ করেছে ১৬ মে থেকে চলমান প্রকাশিত আসল নির্বাচনী ফলাফল। এসব অনুসরণ করে রিপোর্টের সর্বশেষ অবস্থা দেখা গেছে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জোট ছাড়াই একা বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৭২ আসনের বেশি) অর্জন করেছে। আর বিজেপির জোটের মিলিত মোট ৩৪২ আসনের দিকে ধাবমান। বহু রাজ্যেই লোকসভা আসনের সবগুলোই বিজেপি নিজের ব্যাগে ঢুকাতে সফল হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারতের মিডিয়া আলোচনা মন্তব্য টকশোতে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপি উঠে আসার পিছনের কারণ খুঁজতে মোদি “আসছে” এই ঝড় একটা প্রধান কারণ বলে সকলে একবাক্যে স্বীকার করতে শুরু করেছে। অন্যান্য কারণ হিসাবে যথাক্রমে দুর্নীতি, দ্রব্যমুল্য আর কুশাসন কে বলা হচ্ছে। আমরা মোদি ঝড় কথাটার অর্থ কি সেদিকে আমাদের মনোযোগ দিতে পারি।
    ভারতের জনগণের প্রধান আকাঙ্খার অভিমুখ ফলে এই অর্থে আকাঙ্খিত রাজনীতির অভিমুখ হল -কাজ সৃষ্টি, মানে বিনিয়োগ ব্যবসায় অগ্রগতিতে কাজ সৃষ্টি – রাইজিং ইকোনমি এসব। ভারত যে সম্ভাবনার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, এতে এর অভিমুখ যা তৈরি হয়েছে এককথায় সেটাকে বলা হয় “রাইজিং ইকোনমির” দেশ হওয়ার সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তোলার বাসনা। যদিও এটা সম্ভাবনা, করে দেখানো হয়ে গেছে এমন নয়। সেজন্য একে বাস্তব করে দেখাতে এই সম্ভাবনার ইঙ্গিতের রাজনৈতিক অর্থ তাতপর্য বুঝবার মত রাজনীতি, তা পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ত্ব, সংশ্লিষ্ট করণীয় কাজের হোম ওয়ার্ক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্য হয়ে উঠা – এই সব মিলিয়ে এক শব্দে বললে দরকার এক যোগ্য রাজনীতি ও নেতৃত্ত্ব। গত নির্বাচনে ২০০৯ সালের সময় ভারত ছিল “রাইজিং ইকোনমি” হয়ে উত্থিত হতে পারে কি না সে অর্থে উত্থানের পর্বে। কংগ্রেস জনগণের মধ্যে আশা আকাঙ্খার আস্থা তৈরি করতে পেরেছিল, তাই জিতেছিল। কারণ ইতোমধ্যেই নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি হতে দেখা শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এটা ক্রমশ সকলের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়ে যে কংগ্রেস একাজের অযোগ্য। বড় বিদেশি বিনিয়োগ যা ভারতে এসেছিল সেগুলোকে কাজের কনট্রাক্ট দেবার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের শক্ত নীতিগত নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার উপর দাঁড়িয়ে সামঞ্জস্যপুর্ণ ও উপযুক্ত আইন-কানুন তৈরি আর এর অধীনে এক দক্ষ বিতরণে ব্যবস্থা হাজির করতে কংগ্রেস সরকার সীমাহীনভাবে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রমাণ হয়েছে কংগ্রেস বিনিয়োগ সামলানোর অযোগ্য। ভারত কি হতে চাইছে সেই অভিমুখ সম্ভাবনা বুঝতে সে অক্ষম। মোবাইল ফোনের লাইসেন্স দেয়া, কয়লা তোলার কন্ট্যাক্ট দেয়া ক্ষেত্রে বড় দুর্নীতি এগুলো এর প্রমাণ। আবার বিদেশি বিনিয়োগ আসার পর সেগুলো ভারতে কেমন করে কাজ করবে রাষ্ট্র কতটা কিভাবে কেন তা নিয়ন্ত্রণ করবে এই প্রশ্নে কংগ্রেস প্রধানত মনমোহনমুখী আর মনমোহন বিশ্বব্যাংকের অনুসৃত কাছাখোলা নীতিতে। তেল ঘি সব একদর করে ফেলা। ইনসুরেন্স ব্যবসা (বিশেষ করে মেডিকেল ইন্সুরেন্স), শেয়ার বাজার, রিটেল চেন শপ ইত্যাদির উতপাদন নয় টাকায় টাকা আনার মত ব্যবসার জায়গায়ও বিদেশী বিনিয়োগকে প্রবেশাধিকার দিতে তিনি কসুর করেন নাই। কারখানা বা উতপাদক পুঁজি আর ব্যাংকের মত টাকার ব্যবসায় পুঁজি – পুঁজির এই দুই চরিত্রের মধ্যেও মোটাদাগের কোন ভাগ বাছবিচার তিনি আরোপ করেন নাই। অর্থনীতি এই দুইয়ের ভুমিকা প্রভাব প্রতিক্রিয়া যে দুই রকম হবে তা তিনি বুঝে বা মেনে চলতে চান নাই। দিন শেষে যখন টের পেয়েছেন পুঁজির এমন সারকুলেশন বা বিচলনে এতে ভারতের ভাগে কিছু জোটে নাই, বরং আসা পুঁজি মুনাফাসহ আবার ভেগে গেছে তখন খুদে দোকানদারের মাইয়োপিক চোখে দেখার মত স্বভাবে ট্যাক্স আরোপ করতে গেছেন। ফলে তা বিয়ে ফুরিয়ে বাজনার মত হয়েছে। শেষ বেলার এই আচমকা ঝটকায় এতে বাকি যারা বিনিয়োগকারি ছিল এবার তাদের এক বড় অংশ ভেগে যাওয়া শুরু করেছিল। রেট্রস্পকেপ্টিভ এফেক্টে অর্থাৎ বিনিয়োগের ভারতে প্রবেশের আগে জারি করা নয় বরং বিনিয়োগ এসে কয়েক বছর ব্যবসা করার পর এবার ট্যাক্সের আইন জারি ও তা আগের প্রবেশের সময় থেকে প্রযোজ্য হবে বলে ঘোষণা দেওয়াতে সরকারকেই আদালতে মামলা খেতে হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারির কাছে সর্বোচ্চ আদালতে হারতে হয়েছে। আর এর নীট লাভালাভ হল সরকার ও সরকার পরিচালনার উপর বিনিয়োগকারিদের অনাস্থা, অবিশ্বাস। এক পর্যায়ে এর সামগ্রিক ফলাফল রুপির মারাত্মক দরপতন – মানে সম্পদ পাচার বা বের হয়ে যাওয়া। “রাইজিং ইকোনমির” রাইজিং-এ ছেদ পড়া। সাধারণ জনগণের দিক থেকে দেখা দৃষ্টিতে এগুলোই দুর্নীতি, দ্রব্যমুল্যবৃদ্ধি আর কুশাসন ইত্যাদি – শব্দগুলোর অর্থ এটাই।

    বিপরীতে মোদিকে যদি দেখি তিনি সারা ভারতের তুলনায় অবশ্যই ছোট আর রাজ্যগুলোর তুলনায় এক মধ্যম সাইজের রাজ্য সফলভাবে চালিয়েছেন। গত ১২ বছর ধরে পরপর তিন টার্মের মুখ্যমন্ত্রী, ব্যবসা-বান্ধব বা ব্যবসা-ফোকাসের রাজনীতির মোদি তিনি। তাঁর প্রশাসন মানে তাঁর রাজ্যে “কাজ সৃষ্টি” একাজে তিনি সফল। সারা ভারতব্যাপী ব্যবসা-বিনিয়োগ সহায়ক ও উপযোগি হিসাবে কে কেমন সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের এক ষ্টাডিতেও মোদির রাজ্য প্রশংসিত। একা তাঁর গুজরাট রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮-১০% তুলনায় সারা ভারতের গড় ৫%। ফলে মোদির সফলতা কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা নয়। এসব কারণে হতাশগ্রস্থ আকাঙ্খা মার খাওয়া জনগণ এবার মোদির উপর বাজি ধরতে ছুটে এসেছেন। ইলেকশন কৌশলের দিক থেকে মোদিকে আগেই হবু প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসাবে বিজেপির সভায় আগাম পাশ করিয়ে নেয়া ও নির্বাচনের বহু আগে থেকেই তা প্রজেক্ট করা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ ও নির্ধারক ভুমিকা রেখেছে। এটা হতাশ জনগণের কাছে প্রধান ম্যাসেজ, আশার আলো হিসাবে খুবই কাজ করেছে। এবিষয়টাকেই মোদি জ্বর বা মোদি ঝড় বা মোদি ফ্যাক্টর বলে চেনানো হচ্ছে মিডিয়ায়। গত ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোট ভোট ছিল ২০%। এবার এপর্যন্ত গণনায় এটা ৫৩% এর কাছাকাছি, বিপরীতে কংগ্রেসের জোটসহ হিসাবে এবার সম্ভাব্য ৬১ আসন বা ২৩% ভোট। পাঁচ বছর আগের ২০% জন সমর্থনকে টেনে ৫৩% এ আনতে পারার সাফল্যের রহস্য যে মোদি ফ্যাক্টর তা আজ আর কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না। এমনকি বিজেপির বয়স্ক নেতা এল কে আদবানী যিনি মোদির প্রধানমন্ত্রী পদের এতদিন ন্যাচারাল দাবিদার ছিলেন, মোদিকে প্রধানমন্ত্রী করার দলীয় সিদ্ধান্তে যিনি সবচেয়ে অখুশি এবং দল থেকে পদত্যাগও করেছিলেন একবার তিনি নির্বাচনের ফলাফলের পর প্রথম মিডিয়া মন্তব্যে বলছেন দলের এই বিশাল বিজয়, মোদির এই বিশাল উত্থান কেন হল তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিজের সহ সব দলের রাজনীতিকের জন্যই জরুরি।
    আবার মোদি ঝড় বা হিন্দিতে লহর বা বিশাল ঢেঊ ভারতে (যেগুলো ৫-১৫ লোকসভা আসনের) ছোট এবং নতুন গঠন করা রাজ্য (যার আসল অর্থ এগুলো সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল তাই তাদের প্রতিবাদ চিতকারের ফলে প্রথম অর্জন আলাদা রাজ্য মানে আলাদা করে কেন্দ্রীয় রিসোর্স এলোকেশন বা কেন্দ্রের হাতে থাকা সম্পদের ভাগ নেয়ার উদ্যোগ) সেসব রাজ্যেও মারাত্মকভাবে পড়েছে। দেখা গেছে এসব রাজ্যের সবগুলো আসন একচেটিয়া বিজেপির পকেটে। যেমন উত্তরাঞ্চল ৭ আসনের ৭ টাই, ছত্রিশগড় ১১ আসনের ৯ টা, আর ঝাড়খন্ডে ১৪ আসনের ১২ টা সবগুলো বিজেপির পকেটে এসেছে। এর অর্থ মোদি উত্থান বা ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রতীক মোদির উঠে আসার অর্থ তাতপর্য তারাও ঠিকই বুঝেছে। তাই ঢেলে ভোট দিয়ে জিতিয়েছে। বিজেপির সবসময়ের খারাপ অবস্থার রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ ভারতের কেরালা বা তামিলনাড়ু অন্যতম। এক পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলক অর্থে ভাল বলতে হবে – এখানে আগের মাত্র এক আসনের বদলে এবার অর্জন দুই আসন। আর মমতার তৃণমূল কংগ্রেস খুবই ভাল করেছে। তাঁর মুসলিম কনষ্টিটুয়েন্সী দখলের নীতি কৌশল ঠিক মতই কাজ করেছে, ফল দিয়েছে এখন বলা যায় (এবিষয়ে আমার আগের লেখার শেষ অংশে কিছু গুরুত্বপুর্ণ অবজারভেশন আছে, আগ্রহিরা দেখতে পারেন); পশ্চিমবঙ্গের মোট ৪২ আসনের মধ্যে মমতার তৃনমূল কংগ্রেস একাই ৩৪ আসন পকেটে পু্রতে পেরেছে। এতে বামফ্রন্টের গত নির্বাচনের তুলনায় এবার ১৫ আসন হারানো আর মমতার তা লাভ ঘটেছে। ওদিকে কেরালায় মোদির বিজেপি শুন্য আসনেই থেকে গেছে। আর তামিলনাডুতে গত পঁচিশ বছরে ধারাবাহিকতায় বিজেপি বা কংগ্রেস ধরনের কোন সর্বভারতীয় দলের স্থান সেখানে নাই সেটাই বজায় থেকেছে। তামিলনাড়ুর দুই ডিএমকে দলের পাল্টাপাল্টি সব আসন পাওয়া রেওয়াজে এবারের পালা জয়ললিতার আন্না-ডিএমকের, মোট ৩৯ আসনের মধ্যে তাঁর পকেটে ৩৭ আসন। আর বাকি দুটা বিজেপির। তবে এবার অন্য ডিএমকের (নেতা করুণানিধি) ভরাডুবি্র ক্ষেত্রে এক বিশেষ ইস্যু ছিল। কারণ থ্রি-জি বা মোবাইল লাইসেন্স বিতরণে অর্থ-দুর্নীতি আদালতে প্রমাণিত হওয়ায় করুণানিধির দলের প্রতিনিধি হিসাবে কেন্দ্রীয় টেলিফোন মন্ত্রী এখন জেলখানায়। করুণানিধির ডিএমকে বিগত কংগ্রেস সরকারের জোট সদস্য। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ ফলাফল এসেছে উত্তরপ্রদেশে। মোট ৮০ আসনের মধ্যে ৭৩ আসন বিজেপি জোটের পকেটে। শুধু এতটুকুওই নয় এর আর এক বিশেষ অর্থ আছে। উত্তর প্রদেশের মায়াবতীর বিএসপি কোন আসন পায় নাই, আর সমাজবাদী দল যারা বর্তমানে রাজ্য সরকারে আছে তারা পেয়েছে মাত্র ৫ আসন। এই দুই দলকে পরাজিত করার তাতপর্য হল এরাই কংগ্রেসের সাথে হর্স টেডিং কোন জোট সরকার করার হুমকি হয়ে উঠত। অথবা কংগ্রেস বাদে কোন তৃতীয় জোটের মুল উপাদান হত। ফলে সবচেয়ে বেশি আসনের রাজ্য, উত্তর প্রদেশে ৭৩ আসন মোদির জয়লাভের জন্য খুবই নির্ধারক। অন্যদিকে বিহার। বিহারে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের আঞ্চলিক দল জেডিইউ নির্বাচনের আগে বিজেপি জোট ত্যাগ করেছিল। কিন্তু ফলাফলে দেখা যাচ্ছে নীতিশ কুমারের ১৮ আসন নিয়ে গেছে বিজেপি। বিহারের মোট ৪০ আসনের ৩১ আসন লাভ করেছে বিজেপি। এই হল মোদি লহর।

    পুঁজিতন্ত্রের জমজমাট বিকাশ উত্থানের এক বিশেষ স্বভাব হল এই উত্থান এক মেল্টিং পট হয়ে হাজির হয়। মেল্টিং পট মানে নানান ধাতুর মিশ্রণ একপাত্রে রেখে সবাইকে গলিয়ে পুর্ব পরিচয় মিলিয়ে দেয়া। পুরানা ধরনের সব সামাজিক বিরোধ (যেমন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকভাবে উত্থিত বিরোধ) একপাত্রে রেখে ঘুটা দিয়ে মিলিয়ে দেয়া বা কম প্রভাবের করে ফেলা – এসব ক্ষমতা পুঁজিতন্ত্রের জমজমাট বিকাশ উত্থানের আছে। এতে মানুষে মানুষে বিভেদমূলক পুরানা সব চিহ্ন লোপ পায়, সব বিরোধ এতে মিলিয়ে যায় না তবে পুরানা বিরোধ ও এর প্রকাশগুলো প্রভাবহীন হয়ে যায় আর নতুন নতুন সামাজিক বিরোধ নতুন রূপে হাজির হয়। এখন দেখা যায় এক পপুলার ধারণা হল কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক দল আর বিজেপি সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ত্বের দল। অথচ এই ধারণা ভিত্তিহীন। মূলত দুটোই হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল। তফাত খালি এটুকু যে হিন্দুত্ত্বের ভিত্তিতে সংগঠিত ভারতরাষ্ট্র খাড়া করার ব্যাপারে উভয় দলেরই ইচ্ছাটা কমন কিন্তু কংগ্রেস লুকিয়ে একে হাজির করে সেকুলারিজমের মোড়কে আর বিজেপি কোন লুকানোর ধার ধারে না। তফাত এতটুকুই। এজন্য বিজেপির বদনাম। জন্মভিত্তির দিক থেকে ও জন্মাবধি বিজেপি হিন্দুত্ত্ব না-লুকানো এক রাজনৈতিক দল। এবারের নির্বাচনে মোদির উত্থান – এটা অর্থনীতি বা ব্যবসাকে মুখ্য করা মোদির উত্থান, যদিও দল হিসাবে এটা সেই হিন্দুত্ত্ব না-লুকানো বিজেপিই। হিন্দুত্ত্ব না-লুকানো আসল এই ধারার প্রতীকি নেতা আদভানী। মোদির উত্থানের আগে পর্যন্ত তিনিই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ছিলেন। এর অর্থ ব্যবসায়ী মোদির উত্থান বিজেপির ভিতর নতুন মাত্রা তৈরি করেছে, এনেছে। একারণে এলেখায় সময়ে বিজেপি আর মোদির বিজেপি বলে একটা তফাত মেনে চলেছি। এখন ব্যবসা-অভিমুখি মোদি কি ব্যবসা বিনিয়োগে রাইজিং অর্থনীতির ইন্ডিয়ার নেতৃত্ত্ব দিতে এই নতুন পরিচয়কে প্রধান করে হিন্দুত্ত্বের রাজনীতিকে গৌণ করে পিছনে ফেলে হাজির হতে পারবেন? দলকে নতুন মুখ্য ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারবেন? কথাটা পড়তে হবে হিন্দুত্ত্ব মুখ্য না গৌণ হবে এদিক থেকে, হিন্দুত্ত্ব এই ভিত্তি বাদ দেয়া অর্থে নয়। কারণ সেটা ফ্যান্টাসির আশা হয়ে যাবে। তাহলে আদবানীর বদলে মোদির উত্থান এর পক্ষে ম্যান্ডেট বা নির্বাচনে জনগণের রায় পাওয়া কথার অর্থ তাতপর্য হল রায়ের দিক থেকে এর ইঙ্গিত হল – হিন্দুত্ত্ব গৌণ করে ব্যবসা বিনিয়োগের দিক মুখ্য করে কাজ সৃষ্টির রাইজিং অর্থনীতির ইন্ডিয়ার নেতা হিসাবে দেখতে মোদিকে জনগণ রায় দিয়েছে। এই অর্থে এটা বিজেপি নয়, বরং মোদির বিজেপির জয় হয়েছে। এখন দেখার বিষয় মোদি জনগণের রায়ের অর্থ তাতপর্য রক্ষা কতটুকু করেন। সক্ষম হন।
    মোদির নিজেকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণার পরে পরে, আজ থেকে দুমাসের বেশ আগে এই অঞ্চলে আমেরিকান উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী নিশা দেশাইয়ের সাথে মোদির আলোচনার বিস্তারিত কখনও মিডিয়ায় আসে নাই। মোদির রাইজিং ইন্ডিয়ার নেতা হয়ে হাজির হবার ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে নীতি কৌশলগত আলাপ রফা কোথায় গিয়ে দাড়ায়, কি রূপ নেয় তা গুরুত্ত্বপুর্ণ। এটা মনে করার কারণ নাই যে এবিষয়ে তারা ইতোমধ্যে যথেষ্ট আলাপ আলোচনা করে নাই, যদিও মিডিয়ায় এর প্রকাশ নাই। সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে, বিগত কংগ্রেস সরকারের “আমার হাসিনা সরকারই চাই” এমন অবস্থান এটা আমেরিকার সাথে কংগ্রেসের ভারতের মুখ্য সংঘাতের পয়েন্ট ছিল। মোদির বিজেপির জয়লাভের সাথে সাথে অন্তত হাসিনার সাথে কংগ্রেস সরকার “বিশেষ সম্পর্কের” দিন গত হল; কারণ কংগ্রেস সরকারই গত হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক নেতৃত্ত্ব অর্থে ভারত রাষ্ট্রের বদল ঘটেছে তবে ভারতের আমলা গোয়েন্দা ইত্যাদির প্রশাসন অর্থে ভারত রাষ্ট্র একই আছে। অবশ্য ভারতের প্রশাসন রাজনৈতিক নেতৃত্ত্ব বিনা তর্ক সুপ্রিম ও অনুসরণে বাধ্য একথা মেনে পরিচালিত হতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশে “আমার হাসিনা সরকারই চাই” এমন অবস্থান ধরে রাখার পক্ষে – মোদির কোন দৃশ্যমান বিশেষ কারণ এখনও জানা যায় নাই। ফলে “বাংলাদেশের জনগণ যাকেই তাদের প্রতিনিধি ও নেতা নির্বাচিত করুক আমরা তার সাথেই কাজ করতে চাই” – এমন কমন এক অবস্থানে আমেরিকা ও মোদির সরকারকে আগামিতে আসতে দেখতে পাওয়া কঠিন কিছু নয়।
    [এই লেখায় বহু ফিগার যা লেখা হয়েছে তা নির্বাচনের চুড়ান্ত ফলাফল নয়, বরং ট্রেন্ড হিসাবে যা লেখার সময় পর্যন্ত মিডিয়ায় হাজির হয়েছে সে ভিত্তিতে রচিত। চুড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলে ফিগারগুলো অল্প কিছু অদলবদল হতে পারে।]

    মোদির জয়লাভে বিশ্ব প্রতিক্রিয়া
    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টে ঐ অভিনন্দন বার্তায় কি আছে এর তেমন ধারণা পাওয়া যায় না, সাদামাটা এক লাইনের রুটিন ধরনের এক বক্তব্য ছাড়া। কিন্তু ভারতের প্রভাবশালী ইংরাজি দৈনিক “হিন্দু” পত্রিকা এব্যাপারে কিছু আলো ঢেলেছেন। “হিন্দু” পত্রিকার ঐ রিপোর্টের শিরোনামটাই বেশ মজার “People trust you: Hasina tells Modi”। এছাড়া গুরুত্বপুর্ণ বন্ধনীযুক্ত করা শব্দাবলীগুলো মানে যেগুলো মূল চিঠি থেকে সরাসরি নেয়া সেগুলো এমনঃ ১। “ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের বন্ধন “ক্রম উচ্চ শিখড়ে নিবার” লক্ষ্যে এক সঙ্গে কাজ করে যাবে। ২। ভারতের জনগণ আপনার (মোদির) প্রতি যে দৃঢ় রায় ব্যক্ত করেছে সেটা “আপনার ডায়নামিক, উদ্বুব্ধ করার যোগ্য এবং দুরদর্শী নেতৃত্ত্বের গুণাবলীর স্বাক্ষ্য দেয় এবং তা বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশের জনগণের আপনার উপর আস্থা ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ”। ৩। ভারত ও বাংলাদেশ এক “স্বাভাবিক ও অটুট বন্ধনের পার্টনার” হিসাবে চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের উভয়ের অংশীদারি ইতিহাস ও সংস্কৃতি……আমাদের অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ত্বের বন্ধন চিরদিনের মত পাকা হয়েছে যখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ………”। ৪। অপ্রত্যক্ষভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্পরিক সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপুর্ণ ল্যান্ডমার্ক উন্নতির কথার উদ্ধৃতি দিয়ে হাসিনা বলেন, “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশ যৌথভাবে বড় বড় পা ফেলে সম্প্রতিকালে আগিয়েছে” আর জোর দিচ্ছে এর অনুভুত উষ্ণতা আমাদের “অবশ্যই সামনে এগিয়ে নিতে হবে”। ৫। সবশেষে মোদিকে বাংলাদেশ ভ্রমণের দাওয়াত দিয়ে হাসিনা বলেছেন, “বাংলাদেশ যেন তার প্রথম গন্তব্য হয়”। [এটা নিজ দায়িত্ত্বে করা ভাবানুবাদ, “হিন্দুর” মূল রিপোর্ট দেখতে লিঙ্কে ক্লিক করে নিতে পারেন]
    বিএনপির বেগম জিয়ায়ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। অভিনন্দন বার্তায় খালেদা জিয়া আরো লিখেছেন, “দুই দেশে মধ্যে যেসব বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে, সেগুলো স্বচ্ছ ও সামগ্রিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।’’ পুরা বিবৃতি এখানে দেখতে পারেন।
    ওবামার অফিস হোয়াইট হাউস থেকে প্রেস সেক্রেটারি এক বার্তায় জানিয়েছে, তাঁরা ভারতের নির্বাচনে বিজেপির “ঐতিহাসিক” বিজয়ে মোদিকে অভিনন্দন জানাচ্ছে এবং হবু নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে একসাথে কাজ করার অপেক্ষা করছে। এই প্রসঙ্গে রিপোর্ট এ দৈনিক হিন্দু অনুযোগের সুরে জানিয়েছিল, ইসরায়েল বা অষ্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য সরকার প্রধানের মত ওবামা মোদিকে – ব্যক্তিগতভাবে তখনও পর্যন্ত অভিনন্দন – জানায় নি। কিন্তু এই রিপোর্ট প্রকাশের চার ঘন্টা পরে আমেরিকান টাইমস অনলাইনে জানাচ্ছে, “ওবামা মোদিকে ফোনে অভিনন্দন জানিয়েছে এবং সুবিধাজনক সময়ে ওয়াশিংটন সফরের দাওয়াত রেখেছেন”। টাইমস মন্তব্য করেছে, ভারতীয় কুটনীতিক খোবড়াগোরাকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কে যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছিল তা কাটিয়ে উঠে পুন উদ্যোগ শুরু করার সুযোগ হিসাবে নিয়েছে হোয়াইট হাউজ। ভার্জিনিয়ার সিনেটর Tim Kaine পুরা সিনেটের পক্ষ থেকে মোদিকে অভিনন্দন জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছে, “We have a historic opportunity before us to leverage this partnership to make our citizens safer, healthier, and more prosperous. Let us seize this moment and ensure that the potential of our partnership is fully realized. Jai Hind.” লক্ষ্যণীয় তিনি বার্তা শেষ করেছেন একেবারে “জয় হিন্দ” বলে।
    রাশিয়ারও সুযোগ হাতছাড়া না করারই কথা। রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিবৃতিতে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
    আমেরিকান এনজিও থিঙ্কট্যাঙ্ক, Carnegie Endowment for International Peace –এই প্রতিষ্ঠানের এক গবেষক Ashley J. Tellis এর লেখা ছাপিয়েছে দৈনিক হিন্দু পত্রিকা। তিনি বলছেন মোদির জয়লাভ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কে নতু উদ্দীপনা এনেছে। তবে ২০০৫ সালে মোদিকে আমেরিকান ভিসা পাবার ক্ষেত্রে আপত্তি বা অনাকাঙ্খিত এটা জানানোর পরে হোয়াইট হাউজের এখন কেবল অভিনন্দন আর আমরা হবু নতুন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় – এমন জানিয়ে যেন “যা হয়ে গেছে তা গেছে এখন ভুলে যাও” ধরনের বার্তা মোদির মন নরম করার জন্য যথেষ্ট হবে না বলে Ashley মনে করেন। তাঁর পরামর্শ, এজন্য একবার “সরি” বলা না হলেও নিদেনপক্ষে ওবামার ব্যক্তিগতভাবে মোদিকে ওয়াশিংটন ভ্রমণের জন্য দাওয়াত পাঠানো সঠিক পদক্ষেপ হতে পারে। এই পরামর্শের লাইনে কি না তা আমরা নিশ্চিত জানি না, তবে আগেই বলেছি ওবামা ফোনে মোদিকে অভিনন্দনসহ ভ্রমণের দাওয়াতও রেখেছেন এটা জানা গেছে। Ashley মনে করেন, আমেরিকা ও মোদি ভুল পথ যাত্রা দিয়ে শুরু করেছিল। তিনি ইঙ্গিত করছেন ২০০৫ সালে মোদিকে আমেরিকার ভিসা দেয়া সম্পর্কিত আপত্তি আরোপের বিষয়ে। Ashley বলছেন, তবে এর মানে মোদি গায়ে পরে আমেরিকার মন জয়ে চেষ্টা করবেন ব্যাপারটা তেমন নয়। এর ভিতরেও মোদি আমলে যদি ভারত-আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোন জোয়ার আসে সেটা ঘটবে ভারতের স্বার্থে প্রাথমিকভাবে কিছু পদক্ষেপে আগিয়ে থাকার কথা যদি মোদি চিন্তা করেন সেজন্য যদিও আমেরিকার তাতে বেশ লাভ হবে। মনমোহনের দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর জমানায় আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক গতি হারিয়েছিল বিশেষত তার অর্থনৈতিক নীতি উল্টামুখে চলতে শুরু করার জন্য আর আমেরিকার সাথে প্রতিরক্ষা ও ষ্ট্রাটেজিক সহযোগিতার ঝুলে পড়ার প্রশ্নে। Ashley অনুমান করেন, মোদি সম্ভবত উভয়ের স্বার্থে এই দুই ইস্যুতে ভারতীয় নীতিতে কিছু পরিবর্তন আনবেন। কারণ মোদি বুঝেন ভারতের প্রতিরক্ষা নীতিতে প্রতিরক্ষা বিষয়ক কেনাকাটা ও উচ্চ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা আগের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে এনথনির আমল থেকে পিছিয়ে পড়ে আছে। Ashley মনে করেন মোদির নেতৃত্ত্বে যদি ভারতের অর্থনীতি উঠে দাড়ায় তবে তা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের পক্ষে যাবে, এবং তা আমেরিকার এশিয়ান ষ্টাট্রেজিক লক্ষ্য পূরণের করবে। Ashley এর কথাগুলোকে এককথায় বললে, আমেরিকা-ভারতের সম্পর্কের রমরমা দিকটা আবার ফিরে আসুক এমন কামনা তাঁর লেখার প্রতিটা ছত্রে ফুটে বেরিয়েছে। Ashley এর মূল লেখাটা ছাপা হয়েছিল তাঁর প্রতিষ্ঠানের পত্রিকায় গত ১২ মে, সেটাই কাটছাট করে মোদির জয়লাভের খবরের পর এবার দৈনিক হিন্দু তে তা ছাপা হয়েছে। তবে একথা ঠিক ভারতের দিক থেকেও অন্তত প্রতিরক্ষা বিষয়ে ভারত-আমেরিকা সহযোগিতা ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ এমন অনুভব ভারতেরও, যা বর্তমানে গতি হারিয়ে বসে আছে।

    ওদিকে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও খুবই উষ্ণ, অধীর আগ্রহের।

    এক প্রাক্তন চীনা কূটনীতিকের সাক্ষাতকার নেয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, মোদি “চীনের সাথে সম্পর্কের ইতিহাস পুনলিখিত করার ক্ষমতা রাখেন”। নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদি চীন সংলগ্ন ভারতের শহর অরুণাচলে চীনকে “সম্প্রসারণবাদী” বলে যে উত্তেজক বক্তব্য রেখেছিলেন সে ঘটনাকে এই কূটনীতিক একেবারেই তুচ্ছ করে কোন গুরুত্ব দিতেই রাজী হলেন না। বললেন ভারতের নির্বাচনে আসলে যেসব কথাবার্তা হয় তা আমাদেরকে পড়তে হবে আভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসাবে। (domestic agenda and China was not a significant topic.) বরং ইন্ডিয়া-চীন সম্পর্ক এখন পরিপক্ক হয়েছে যে এসব বিষয় আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইস্যু করা হয় না। তিনি মোদির দিকে ইঙ্গিত করে এও বললেন, “ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে চীন ডান-ঘেঁষা রাজনীতিক বা রাষ্ট্র নেতার সাথে সম্পর্ক সবচেয়ে ভালভাবে নাড়াচাড়া মোকাবিলা করতে পারে”।
    সামগ্রিকভাবে দেখলে মোদির জয়লাভে সব বিদেশি রাষ্ট্রের ভিতরই একধরনের রিলিফ বা স্বস্তির ভাব দেখা গেছে যেন সকলে বহুদিন ধরে এক চাপের মধ্যে ছিল যেখান থেকে মুক্তির দিন, নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা সময় সমাগত। চীনের প্রতিক্রিয়াতেও এমন ভাবটাই আছে। যদিও Ashley আশঙ্কা করেছেন মোদির (মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মোদি এর আগে চারবার চীন সফর করেছেন) সাথে চীনের পুরানা ভাল সম্পর্কের কারণে না চীন আমেরিকার চেয়ে এগিয়ে যায়। এই হল মোটা দাগে মোদির জয়লাভে বিশ্ব প্রতিক্রিয়া।

  • বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৪) শেষ পর্ব

    চতুর্থ ও শেষ কিস্তি
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা (৪)

    রাশিয়া ফ্যাক্টর ও উপসংহার

    গৌতম দাস

    ১৫ মে ২০১৪

     

    https://wp.me/p1sCvy-6H

    বাংলাদেশে রাশিয়ান স্বার্থ বা ষ্টেক উপরের (আগের তিন পর্ব) অন্যদের অর্থাৎ আগের পর্বে বলা আমেরিকা, ভারত ও চীনের সাথে তুলনায় তেমন বড় নয়। যদিও অস্ত্র সরবরাহ, গ্যাস উত্তোলন, পুরানা বিদ্যুৎ গ্যাস টারবাইন প্লান্ট ওভারহলিং বা বদলে দেয়া সম্পর্কিত বিষয় ইত্যাদিতে অর্থনৈতিক ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয় রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু গ্লোবাল পরিসরের রাশিয়া রাইজিং ইকোনমির একটা দেশ হিসাবে রাইজিং ইকোনমির উত্থান ও ফলাফলে দুনিয়ায় পরাশক্তিগত পালাবদলের আসন্ন হয়ে উঠার কালে রাশিয়া পশ্চিমকে জবাব দিবার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠছে, এদিকটা নজর করা জরুরি। কিসের জবাব? মনে রাখতে হবে বর্তমান রাশিয়া একদা পরাশক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসুরি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে নিজে ভেঙ্গে পড়া ও আলাদা আলাদা ১৫ টা রাষ্ট্রে টুকরা হয়ে পড়ে। এই সময় থেকে (রাশিয়া বাদে) বাকি টুকরা প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোকে নিজ বলয় দখলে নিতে পশ্চিমা স্বার্থ বিশেষত ইউরোপ নিয়মিত উস্কানি দিয়ে গেছে, যাচ্ছে। উতসাহ উদ্যোগের কমতির এখনও দেখা নাই। গত প্রায় পঁচিশ বছর অনেকটা নিরুপায় রাশিয়া এই উস্কানি সহ্য করেছে। খুব সম্ভবত এই প্রথম রাশিয়া ঘুরে দাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা পেয়েছে। আপতিক দৃষ্টিতে যা ইউক্রেন ক্রাইসিস তাই এরই প্রকাশ।

    ইউক্রেন ক্রাইসিস মোড় ফিরানো ঘটনা
    ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা স্বার্থ লড়াই এক বিরাট ইস্যু গতবছরের নভেম্বর মাস থেকে য়াবার মুখ্য হয়ে উঠছে। এটা এক লম্বা সময় ধরে চলা এক ফেনোমেনার ভিতরের নানান মোচড়ের বাইরের দিক। লম্বা সময়ের ফেনোমেনাটা বেশ লম্বা সময় ধরে, মোটামুটিভাবে ১৯৮৯ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়া ও লুপ্ত হওয়ার আলামত শুরু থেকে। আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তি ঘটে ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সকালে। কিন্তু এরপর থেকে এই বিশাল ঘটনা্র প্রতি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের মনোভাব খুব গুরুত্বপুর্ণ নির্ধারক হয়ে থেকেছে। অর্থাৎ পুরা পুর্ব ইউরোপের উথালপাথাল এঘটনায় পশ্চিমা বিশ্ব কিভাবে নিজেদেরকে পেশ করেছিল, জড়িত করেছিল, কিভাবে নিজেদের বিদেশনীতি সাজিয়েছিল আজকের ইউক্রেন ক্রাইসিসের পিছনের কারণ সেখানে লুকানো আছে। সাধারণভাবে বললে, গ্লোবাল অর্থনীতি যে দুটো ব্লক অর্থনীতিতে পশ্চিমা ব্লক আর সোভিয়েত ব্লক হয়ে ভাগ হয়ে চলছিল বিগত প্রায় সত্তর বছর, যাদের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময় প্রায় নাই এভাবেই ছিল – সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটেছিল। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার ফেনোমেনার পরে দুনিয়া এবার একই অর্থনৈতিক মানে একই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের অধীনে পরিচালিত হতে রাস্তা খুলে গিয়েছিল। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের দিক থেকে দেখলে পুঁজি বিনিয়োগের এটা এক বিরাট সুযোগ, বিনা-যুদ্ধেই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম আরও বিস্তৃত হবার, দুনিয়াকে একই গ্লোবাল আন্তর্জাতিক পুঁজির বাজার হিসাবে ধরে ছড়িয়ে পড়ার দিক থেকে সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিট সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতেও এত বিরাট সুযোগ আগে কখনও পায় নাই। দুনিয়া একক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারের অধীনে পারস্পরিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ে বিকশিত (এবং লড়াইও) হতে সুযোগ পায়।
    কিন্তু আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম এই বিশাল সুযোগকেও যথেষ্ট গণ্য করে নাই এবং নিজেদের সন্তুষ্ট মনে করতে পারে নাই। এটাই তার নষ্টা দিক। তাদের কাছে মনে হয়েছিল এটা তাদের বিজয় আর এ বিজয়ে বিজয়ীরা সাপ্টা দিয়ে সবটাই নিয়ে যাবে সেই সুযোগ -এই নীতিতে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে সুযোগ যথেষ্ট নয় এটা একই সাথে পশ্চিমের জন্য রাজনৈতিক, সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক ও সর্বোপরি পরাশক্তিগত রুস্তমিসহ সবকিছুতেই পশ্চিমের লাভ আর লাভ, বাড়তি সুবিধা, প্রভাব, জবরদস্তি দেখানো – লুট করার এক বিরাট সুযোগ এসেছে মনে করে বসেছিল। অর্থাৎ গোটা পুর্ব ইউরোপ অবজেকটিভভাবে বা বাস্তবত তো গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের কাছে এক নতুন উন্মুক্ত বাজার হয়ে হাজির হয়েছিল, ওয়াল ষ্ট্রীটের জন্য অবারিত দুনিয়া হয়ে পুঁজি ছড়িয়ে পড়ার অপার সম্ভাবনা হয়ে ধরা দিয়েছিল। কিন্তু এতটুকুতে তারা সন্তুষ্ট নয়। চকচকে লোভের বশে এই পরিস্থিতিকে তারা সাবজেকটিভাবে কর্তা হয়ে তাদের যুদ্ধজোট ন্যাটোকে বিস্তার করে নেবার সুযোগ হিসাবে দেখেছিল ও ততপর হয়েছিল। এভাবে লোভকাতর চোখে দেখার পিছনে কারণ আছে। কিন্তু আজকের ইউক্রেন ক্রাইসিস প্রমাণ করছে তাদের এই লোভকাতর চিন্তা কত মারাত্মক ভুল ও আত্মঘাতি ছিল।
    সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর আলাপ আলোচনার মাধ্যমে রফাতে রাশিয়া রাষ্ট্রসহ (রাশিয়ান ফেডারেশন) মোট এগারোটা (Russia, Ukraine, and Belarus, Armenia, Azerbaijan, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Moldova, Tajikistan, Turkmenistan, and Uzbekistan) আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে পুরানা শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভক্ত হয়েছিল। একথা সত্যি যে ঐ বাকি দশ যারা ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্র হল তারা এতদিন যেমন মূল রাশিয়ান রাষ্ট্রের (১৯১৭ সালে লেনিনের বিপ্লব কেবল রাশিয়াতেই ঘটেছিল) সুরক্ষা নিরাপত্তার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এর ফলাফলে ঐ ১১ রাষ্ট্র কেবল নিজেদের মধ্যেই পারস্পরিক লেনদেন, বিনিময় বাণিজ্য কারখানা উতপাদন, পরস্পর পরপস্পের বাজার এভাবে রাশিয়াসহ একই ভাগ্যের এক অর্থনীতি হয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, এমন ঘটবার পিছনে লেনিনের বিপ্লব কেবল রাশিয়ান বিপ্লব ফলে নতুন বিপ্লবের রাষ্ট্র মূলত রাশিয়া হয়েছে আর এর প্রতিরক্ষার দরকারে বাকিরা ব্যবহৃত হয়েছে এটাই একমাত্র ঘটনা নয়। গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হল ঐ বাকি দশ রাষ্ট্র আসলে রাশিয়ার মতই একই জার সাম্রাজ্যের অধীনস্ত ছিল, ফলে জারের অধীনে পরিচালিত হত ১৯১৭ সালের বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। তাই লেনিনের বিপ্লবের ফলাফলে কেবল রাশিয়া থেকেই জার সাম্রাজ্য শাসন ক্ষমতা উতখাত হয়েছিল তাই নয় ঐ বাকি দশ রাষ্ট্র এরাও অন্তত জার সাম্রাজ্য শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু দশ রাষ্ট্রের দিক থেকে দেখলে জার সাম্রাজ্য শাসন উতখাতের শক্তি তারা নিজেরা আভ্যন্তরীণ জনগণ কেউ নয় বরং রাশিয়ান বিপ্লবীরা। এই অর্থে যারা বাইরের বা বিদেশী (রাশিয়ান) ফ্যাক্টর। ব্যাপারটা তুলনীয়ভাবে বুঝার জন্য কল্পনার চোখে দেখলে এমনঃ ১৯৪৭ এর আগে পর্যন্ত আমরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া হয়ে থাকার সময় যদি বৃটেনে কোন এক লেনিনীয় বিপ্লবের উত্থানে ক্ষমতা দখলে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে যেত সেক্ষেত্রে আমরা ঐ বিপ্লবের কর্তা কোন বৃটিশ কমিউনিষ্ট পার্টিরই অনুগত হয়ে এক নবজীবনে পরিচালিত হতাম। সেটা ভাল না মন্দ হত সেটা আলাদা বিবেচনা। লেনিনের বিপ্লবে ফলে ১৯১৭ সালে বাকি দশ রাষ্ট্রের অবস্থা হয়েছিল তেমনই। আবার বৃটিশ উপনিবেশী শাসকেরা ১৯৪৭ সালে বৃটিশ ইন্ডিয়া ছেড়ে চলে যাবার পরে যেমন বৃটিশ কমনওয়েলথ নামে এক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে এর মাধ্যমে পুরানা কলোনীগুলোকে এক বাণিজ্য জোটে ধরে রাখার উদ্যোগ প্রচেষ্টা নিয়েছিল (এখনও তা বহাল আছে) অনেকটা তেমনই, সোভিয়েত ইউনিয়নও ভাঙ্গার পর ঐ ১১ রাষ্ট্রগুলো মিলে এক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট গঠন করেছিল, যার নাম CIS (Commonwealth of Independent States)।
    এতক্ষণ বার বার রাশিয়াসহ মোট ১১ রাষ্ট্রে আলাদা হবার কথা বলছি বটে, কিন্তু একটা ছোট বাড়তি তথ্য। মূল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা মোট রাষ্ট্র হয় ১৫টা। এর মধ্যে তিন বাল্টিক রাষ্ট্র (লিথুনিয়া, এস্তেনিয়া ও লাটভিয়া) ভাঙ্গন প্রক্রিয়ার শুরুতেই আগেই নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে আলাদা হয়ে যায়। আর জর্জিয়া ভাঙ্গন প্রক্রিয়ায় সময় আলাদা রাষ্ট্র হতে চেয়েছে ঠিকই কিন্তু আবার CIS গঠনের আলাপ আলোচনা চলাকালীন সময় থেকেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকেনি ফলে এর সদস্য হতে চায়নি। যদিও আবার দুবছর যেতে না যেতে ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়ে থাকা CIS এ সে যোগদান করে। মোট সদস্য হয় ১২ রাষ্ট্র। কেন এই অবস্থা? জর্জিয়ার যোগ না দেওয়া, পরে আবার যোগদান এই অস্থিরতা কি কেবল একা জর্জিয়ার ক্ষেত্রে?
    এর জবাব হল অস্থিরতা কেবল জর্জিয়ার নয়, বলা চলে রাশিয়া বাদে কমবেশি ১১ রাষ্ট্রের বেলায় এটা দেখা গিয়েছে। সংক্ষেপে এর মূল কারণ বলব। আর সেকথা ব্লতে গিয়ে ঐ ১১ রাষ্ট্র বুঝাতে সাধারণভাবে এরপর থেকে প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্র বলব।
    পশ্চিমা স্বার্থ বিশেষত লাগোয়া রাষ্ট্র বলে ইউরোপের প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি নীতির দিক বড় ভুল হল তারা শুরু থেকেই কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকে ঐ রাষ্ট্রগুলোতে প্রবেশের সুযোগে সন্তুষ্ট ছিল না তারা সামরিক ষ্ট্রাটেজিক দিকসহ সামগ্রিক প্রভাব চায় – ইউরোপীয় ইউনিয়ন হিসাবে এই নীতিতে চলেছে। এরচেয়েও সম্ভবত তাদের আরও গুরুত্বপুর্ণ লক্ষ্য হল এসব রাষ্ট্র থেকে রাশিয়ান প্রভাব নষ্ট করা বা কমানো বিচ্ছিন্ন করাটাকে পুর্বশর্ত হিসাবে ধরে নিয়ে আগানো। এজন্য প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোকে কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান ঘটানো নয়, ন্যাটোতেও যোগদান করানোর পক্ষে তাদের কাজ ততপরতার নীতিতে পরিচালিত হয়েছে ইউরোপ। অথচ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হত কেবল অর্থনৈতিকভাবে আগানো। এতে পরবর্তিতে কোন সময় স্ব-উদ্যোগে অনুভব করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অথবা ন্যাটোতে যোগদান করতে চাইলে তাতে সাড়া দেয়া হত তাদের সঠিক নীতি। তাতে দীর্ঘদিনের পুরানা রাশিয়ান বাজার নির্ভর ঐ রাষ্ট্রগুলোর ছোট অর্থনীতি বিস্তৃত হয়ে উঠত। প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজ ক্ষমতার উপর দাড়াত। এমনিতেই প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলো আগে রাষ্ট্রীয় মালিকানা থাকার কারণে নতুন মালিক উদ্যোক্তা যারা নতুন করে হয়ে উঠছিল তারা সরকারি সম্পদ লুটেরা হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। সেটাও হয়ত তত মারাত্মক হয়ে দেখা দিত না যদি তা সীমাহীন স্তরে পর্যায়ে না পৌছাত আর এর চেয়ে বড় কথা তারা যদি ব্যবসা উতপাদন অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা পরিচালনা দক্ষ হত। বরং সেদিক থেকে সরকারী প্রশাসন কাঠামো আর ব্যক্তি উদ্যোগ এই দুটোই চরম অদক্ষ থাকার কারণে গত পচিশ বছরে বার বার সরকার চালানোর অর্থনৈতিক দুরবস্থা প্রকট হয়েছে।
    ওদিকে আর এক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টর হল স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসী। হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ তত্ত্বের অত্যাচার প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর উপরেও ছেয়ে আছে। এই তত্ত্বের মহিমা হল, গণ কূটনীতির (public diplomacy) আলোকে সরকার বিরোধী জনমতকে উসকিয়ে দিয়ে প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সংস্কারের বুদ্ধির সরব পদচারণা। রাশিয়াসহ প্রাক্তন সব সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে এরা ততপর। এই তত্ত্বের প্ররোচনাতেই ২০০৪ সাল থেকেই লাল বা নীল বা বেগুনী ba komola রেভুলেশনের নামে এসব দেশে সুশীল ও এনজিওদের উদ্যোগে নানান তথাকথিত “গণ আন্দোলন” দেখেছি আমরা।
    যেমন উদাহরণ হিসাবে ইউক্রেন এর ঘটনাবলীর দিকে তাকালে দেখব এবারের ক্রাইসিস শুরু হচ্ছে গতবছর নভেম্বরে। আর ঘটনার পিছনের পটভুমিটা হল, ইউক্রেনের সরকারী প্রশাসন কাঠামো আর সরকারি সম্পদ লুটেরা ব্যক্তি উদ্যোগ এই দুটোরই চরম অদক্ষতায় প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে অর্থনীতি। আইএমএফ-ইউক্রেন অফিসের হিসাব ও পরামর্শ মতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি মিটিয়ে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে ১৫ বিলিয়ন ডলার দরকার হবে। মধ্যস্ততাকারী আয়োজক হিসাবে লিথুয়ানিয়া তার রাজধানী Vilnius শহরে ইইউ এর সাথে ইউক্রেনের দরকষাকষির সভা আয়োজন করেছে। ইউক্রেনের সাথে ইইউ এর এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর, ইইউতে ইউক্রেনের সদস্য হিসাবে প্রবেশে চুক্তি স্বাক্ষর আর ঐ ১৫ বিলিয়ন ডলার লোনের ব্যবস্থা – এমন এক টোটাল প্যাকেজ প্রস্তাব ইইউ টেবিলে রেখেছে। কিন্তু অর্থনীতি আর সরকারি খরচে কৃচ্ছতা সাধনের যে শর্ত ইইউ রেখেছে (স্পেনের অষ্টারিটির বা কৃচ্ছতাসাধন শর্তের মতই ভয়াবহ) তা মানতে পারছেন না ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি স্বাক্ষর না করে ফিরে আসলেন। এদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের রাস্তায় সরকার বিরোধী “গণ আন্দোলন” চলছে, যার দাবি ইউক্রেনকে ইইউ-তে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। “গণ আন্দোলন” মূল আয়োজক আমাদের ভাষায় বললে সুশীল সমাজ ও এনজিও – হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ তত্ত্ব প্রবল সক্রিয় সেখানে। অনেকটা আমাদের শাহবাগের মত “গণজাগরণ”। ওদিকে প্রেসিডেন্টের খালি হাতে ফিরে আসার আর এক বড় কারণ আছে। রাশিয়ার হুমকি। না সামরিক হুমকি নয়। হুমকিটা অনেকটা পুরানো দোকানদারের মত যার কাছে এতদিন বাকিতে মালামাল নিয়ে সংসার চালিয়েছি। কম দামে মালামাল নেবার সুবিধাও নিয়েছি। কিন্তু এখন দোকানের ধারদেনা শোধ না করে, সম্পর্ক ত্যাগ করে হঠাত অন্য দোকানদারের দিকে রওনা হবার চেষ্টা করলে তো হুমকি খেতেই হবে, সেরকম। রাশিয়ায় ইউক্রেনের রপ্তানি মালামাল প্রবেশে বাধা, ইউক্রেন কনসেশন রেটে রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে সেই কনসেশন সুবিধা প্রত্যাহার এবং গ্যাসের বিল সেই বিরাট বকেয়া পরিশোধের নোটিশ ইত্যাদির এক লম্বা তালিকার হুমকি। কিন্তু রাশিয়াও বিবেচক দোকানদার। তাই ইইউ এর বিপরীতে রাশিয়া নিজেও পাল্টা ১৫ বিলিয়ন ডলার ধার দিতে প্রস্তুত। এই প্রসঙ্গটা আর বিস্তারিত করব না। এখানে বরং জোর দিব কিয়েভের রাস্তায় গনজাগরণে হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ তত্ত্বের “গণ আন্দোলন” এর দিকে।
    ইইউ অথবা রাশিয়া কোনদিকের সাথেই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট চুক্তি করলেন না। কিন্তু “গণ আন্দোলন” এর তোড়ে প্রেসিডেন্ট পালিয়ে গেলেন। “গণ আন্দোলন” ওলারা ক্ষমতা দখল ও সরকার গঠন করে ফেললেন। কিন্তু সাথে সাথে রাজধানী কিয়েভসহ পশ্চিম ইউক্রেন বাদে বাদবাকি ইউক্রেন – মানে দক্ষিণ ও পুর্ব ইউক্রেন এবং স্বায়ত্ত্বশাসিত ক্রিমিয়ার উপর নতুন সরকারের আর কোন কর্তৃত্ব নাই শুধু নয় ওগুলো বিচ্ছি্ন্ন হয়ে যাবার পথ ধরল। তাহলে কিয়েভের রাস্তায় মাসের পর মাস যাদের “গণ আন্দোলন” করতে দেখা গিয়েছিল তাঁরা এখন কই? তাঁরাই বা কারা, কাদের প্রতিনিধি? “গণ আন্দোলন” এর ‘গণ’ মানে তো সারা ইউক্রেনের গণমানুষের নাকি তারা প্রতিনিধি ছিল – এমন দাবিই তো তারা করেছিল? গতবছর আমাদের শাহবাগে “আরব স্প্রিং” এর এজেন্টরা ছিল কিন্তু তা আগে বাড়েনি ফলে সেই তুলনার দিকটা না ধরে নিয়েই বলছি। ব্যাপারটা হল ধরা যাক শাহবাগ একটা “গণ আন্দোলন” করে যদি ক্ষমতা দখল করে ফেলত আর তাঁরা সরকার গঠন করতে না করতেই যদি দেখা যেত চিটাগাং আলাদা হয়ে গেল আর বগুড়া বিচ্ছিন্ন হবার পথে। এর মানে কি হত? মানে হল শাহবাগ অন্ততপক্ষে “গণ আন্দোলন” ছিল না। সারা বাংলাদেশের কোন প্রতিনিধিত্বই তারা করছিল না। নইলে শাহবাগ ক্ষমতায় আসার প্রতিক্রিয়ায় কেউ আলাদা বিচ্ছিন্ন হবে কেন? ইউক্রেনের বর্তমান দশা প্রমাণ করে যারা এখন কিয়েভের সরকারে আছেন তারা সারা ইউক্রেনের প্রতিনিধি আগে মাঠে থাকার সময়ও ছিলেন না এমনকি এখন সরকার গঠন করার পরও নাই। এই হল হিলারি ক্লিনটনের ‘স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ’ তত্ত্ব অথবা “গণ আন্দোলনের” পরিনতির দিক। এটাই আমেরিকা ও ইইউ এর প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি তাদের বিদেশনীতির পরিণতি। ওদিকে ইউক্রেন প্রসঙ্গে অসামরিকভাবে কি করা যায় তা নিয়ে জেনেভাতে আমেরিকা-রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় রাশিয়া প্রস্তাব রেখেছিল ইউক্রেন এক ফেডারেল রাষ্ট্রের আকারে পুনগঠিত করা পথে যাওয়া একটা সমাধান হতে পারে। কিন্তু সেটা নিয়ে কথা আগায় নাই, বরং এখনও প্রপাগান্ডা যুদ্ধ আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে অকেজো কিছু অবরোধ এটাই মুখ্য হয়ে আছে। কোন নিগোশিয়েশনের দিকে যাবার জন্য কেউ তৈরি হয়নি।
    এঘটনায় রাশিয়ার দিক থেকে বললে, রাশিয়া এই প্রথম আমেরিকা ও ইইউ এর প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি নীতির পরিণতি কি তা দেখিয়ে দেবার সুযোগ নিয়েছে, দেখাতে পেরেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর থেকে চলমান পশ্চিমা নীতির বিরুদ্ধে এটাই প্রথম রাশিয়ার পালটা একশন। এটা যে কাজ করছে তা বুঝা যায় কিছু প্রতিক্রিয়া দেখলে; ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইউক্রেন ইস্যুতে আজ এক রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। সেখানে পরামর্শ হলঃ A report by International Crisis Group urges both Russia and Western powers to “back a vision for the country [Ukraine] as a bridge between East and West, not a geopolitical battleground.” অর্থাৎ এখন বুঝছে আমেরিকা ও ইইউ প্রাক্তন সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি নীতির ফয়দা হয় নাই।
    এই লেখার মূল প্রসঙ্গ পরাশক্তিগত পালাবদলে বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমেরিকাকে রোখা বা কাউন্টার করতে গিয়ে রাশিয়ান সাধারণ নীতি বাংলাদেশে যতটুকু প্রতিফলিত সেটুকুকে চিহ্নিত করা। ইউক্রেন প্রসঙ্গকে সংক্ষিপ্ত পটভুমিতে রেখে সেই সাধারণ দিকটা ব্যাখ্যা করলাম এতক্ষণ। লিখতে গিয়ে রাশিয়ান নীতি কৌশল আপাতত সঠিক ও জয়লাভ করছে এমন একটা ধারণা পাঠক পেয়ে যেতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে কোন পরাশক্তির নীতি জয়লাভ করছে ফলে সে ভাল এমন কোন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। পরাশক্তিগুলো একান্তই তাদের নিজের নিজের স্বার্থে পরিচালিত হবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের কাজ কোন পরাশক্তির সাথে আদর্শগত মিল বা ঐক্য খোজার চেষ্টা থেকে সতর্কে দূরে থাকা। বরং তাদের অভিমুখগুলো সম্পর্কে ওয়াকেবহাল থাকা এই উদ্দেশ্যে যে আমাদের স্বার্থ আমাদেরকেই দেখতে হবে, ফলে সেখান থেকে আমরা আমাদের স্বার্থ বের করে আনতে পারছি কি না এমন দিকে তথ্যগুলো ব্যবহার করা।
    রাশিয়ার এই পালটা একশন নীতি এটা কেবলমাত্র পুর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা রাশিয়ার সাধারণভাবে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে পশ্চিমের বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ার সব অঞ্চলে পালটা একশনে যাওয়ার নীতি। এই অর্থে এটা আমাদের অঞ্চলে মানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্রাইসিসেও প্রতিফলিত। সেই সুত্রে হাসিনা সরকারের সাথে বর্তমানে আমেরিকার নীতির স্বার্থবিরোধ চলমান আছে সেটা থেকে রাশিয়া কি সুবিধা নিতে পারে এমন নীতিতে বাংলাদেশে রাশিয়ান কূটনীতি পরিচালিত। ফলে এমন গুজব বাজারে ছড়িয়ে আছে যে সরকারকে রাশিয়ান পরামর্শ নাকি এমন যে তা বয়ান করলে, মালয়েশিয়ার মাহথির তো আসলে স্বৈরশাসকই ছিলেন কিন্তু ব্যাপক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন দিয়ে তিনি গণমনে নিজের একটা আসন করে নিয়েছেন। মাহথির সম্পর্কে এমন এক মুল্যায়নের অন্তর্নিহিত ম্যাসেজ হল, হাসিনা বিরোধীদের উপর আরও দমন নিপীড়নের কোন ব্যাপক ম্যাসাকারে গেলে রাশিয়ার সমর্থন থাকবে তাতে। আর সে পরিস্থিতিতে রাশিয়া হবে সেই উপচে ঢেলে দেয়া বিনিয়োগ আনয়নকারী। হয়ত এমন গুজব সত্যি হলেও হতে পারে। যদিও গুজব তো গুজবই। তবে রাশিয়ান নীতি অবস্থানের সাথে এমন গুজব বেমিল নয়, কেবল একটা জায়গা ছাড়া।
    গ্লোবাল পরিসরে পশ্চিমা স্বার্থ জোট নিজেরা একসাথে সমন্বয় করে কাজ করে এবং পরাশক্তিগত ক্ষমতা খাটিয়ে নিজেদের ষ্টাটেজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থগুলো হাসিল করে – এমন এক প্রভাবের ভিতর আমরা এখনও আছে যদিও ক্রমশ সেই মুঠি আলগা হতে শুরু করেছে। এই স্বার্থজোট ও এর প্রভাব খর্ব করার তাগিদ চীন ও রাশিয়ার উভয়েরই আছে। এই তাগিদটাই তাদের উভয়ের এক কমন অবস্থানের ভিত্তি। ফলে এক ধরনের বুঝাবুঝি থাকার ভিত্তি সেটা। কিন্তু কোনভাবেই এটাকে পুরান দুই কমিউনিষ্টের আদর্শগত ঐক্য মনে করা ভুল হবে। তারা উভয়ে কুটনৈতিক অঙ্গনে একসাথে পরস্পরকে সমর্থন করে কাজ করবে, অবস্থান নিবে। তাদের বুঝাবুঝিটা এমন যে, যে ইস্যুতে রাশিয়ান ষ্টেক চীনের চেয়ে বেশি সেখানে রাশিয়া অবস্থানটাই চীন যতদুর সম্ভব সমর্থন করবে। অথবা ভাইসভারসা। যেমন সিরিয়া ইস্যুতে চীন রাশিয়ান অবস্থানের সমর্থক। এই সুত্রে বাংলাদেশ ইস্যুতে রাশিয়া মোটা দাগে চীনা অবস্থানের সমর্থক। যদিও রাশিয়ান অবস্থান নিজস্ব ব্যবসা স্বার্থ নিশ্চিত করতে আলাদা করে হাসিনা সরকারের সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক রাখে। ফলে শক্ত হাতে বিরোধী দমনের পক্ষে যুক্তি পরামর্শ রাখার যে গুজবের কথা শোনা যায় রাশিয়ান এই অবস্থান কংগ্রেসের ভারতের বাংলাদেশ নীতি দ্বারাও অনেকটা প্রভাবিত। তবে সেটা, হাসিনা-ভারতের জোট “সেকুলার” এবং তাই হতে হবে – ধরনের কোন রাজনৈতিক অবস্থান রাশিয়ার নয়। বরং আমেরিকার বিরোধিতা করে (যেহেতু এর মধ্যে আমেরিকার বিরোধিতা আছে) এথেকে যতটা সম্ভব নিজস্ব ব্যবসা স্বার্থ নিশ্চিত করার সুযোগ পাওয়া যায়, এটাই রাশিয়ার মুখ্য অবস্থানের দিক। কিন্তু আলামত অনুযায়ী ভারত আর কংগ্রেসের ভারত থাকছে না। ফলে সম্ভবত এখনকার সমীকরণ হতে যাচ্ছে একেবারেই ভিন্ন কারণ বাস্তবতা বদলাচ্ছে। তবে শেষ কথা একটা আছে, শেষ বিচারে যদিও চীন রাশিয়ার সাধারণ বুঝাবুঝির দিক আন্ডারষ্টান্ডিং কমিটমেন্ট যেটা আছে বললাম – সেটার কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নির্ধারক কোন পরিস্থিতিতে চীনের অবস্থা্নের পক্ষেই রাশিয়া অবস্থান নিবে। এটা অনুমান করা যেতে পারে।
    তাহলে ভারতীয় নির্বাচন পরিস্থিতি কি দাঁড়ায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা চীন বা রাশিয়ার কাছে বিষয়টা এমন সরাসরি সম্পর্কিত নয়, তবে পরোক্ষে সম্পর্কিত। নির্বাচন-ঊত্তর ভারতে কংগ্রেস বাদে কে সরকার গঠন করবে তাতে আমেরিকা-ভারতের বাংলাদেশ নীতি কি হবে (মূলত সামঞ্জস্য ও সমন্বয় থাকতে হবে) – এটার সাথে হবু ভারত সরকার ও আমেরিকা সরাসরি সম্পর্কিত। আর এই অবস্থানটা থিতু হলে পরে এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত চীন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির বাস্তবায়ন, এই অর্থে শেষের দুজন পরোক্ষে সম্পর্কিত।

    ভারতের নির্বাচন প্রসঙ্গে সবশেষের সারকথাঃ
    এখনকার সময়টা এমন যে বিশেষত আমাদের এই অঞ্চলের প্রসঙ্গে এর রাজনৈতিক খেলোয়ারদের কোন জোট গ্রুপ বেধে (আদর্শগত তো নয়ই) আগানো অথবা অক্ষশক্তি হয়ে আগানো – আমরা দেখতে পাব সে সময় এটা নয়। এমনকি বলা যায় সেটা সহসাই আবার ফিরেও আসছে না। চীন, আমেরিকা বা ভারত -এদের সবার সাথে সবার (ফলে আমাদেরটাও) সম্পর্কটা হবে – সবার সাথে সবার বিভিন্ন ইস্যুতে স্বার্থের মিলের দিক থাকবে, আবার একই সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রচন্ড দ্বন্দ্বের দিকও থাকবে। এর সবগুলোকে বিবেচনায় রেখে এক ভারসাম্যপুর্ণ অবস্থান অঞ্চলের প্রত্যেকে রাষ্ট্রকেই নিতে হবে, পরিচালিত হতে হবে। এককাট্টা জোটবদ্ধ হয়ে কিছুই আগাতে দেখা যাবে না। তবে নতুন এই ভারসাম্যপুর্ণ অবস্থান মানে কিন্তু নতুন এক ভারসাম্যপুর্ণ অবস্থান, কুটনৈতিক ভাষায় একে ব্যালেন্সিং এক্ট বলা হয়। প্রত্যেককেই কেবল নিজের স্বার্থ বিবেচনায় একটা ব্যালেন্সিং এক্ট বা অবস্থান নিতে হবে। আবার যেটাকে ব্যালেন্সিং এক্ট বলছি তা করতে সবাই বাধ্য হবে কারণ এর প্রাইম মুভার হল, দুনিয়া জুড়ে আসন্ন পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাস। এছাড়া আর মোটা দাগে বললে, এটা শুধু পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাসই নয় এটা একই সাথে ১৯৪৪ সাল থেকে জন্ম নেয়া আমেরিকার নেতৃত্ত্বে পশ্চিমের দিকে ভারসাম্যের কান্নি মারা যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা চালু হয়েছিল এর আয়ুর শেষদিকের বছর চলছে তাই। পাশ ফিরে পুরাণ অর্থনৈতিক অর্ডার বা ব্যবস্থা টা মোচড় দিয়ে পাশ ফিরে আবার শোয়া শুরু করেছে। পাশ ফিরে শোয়াটাকেই আমরা অন্য ভাষায় পরাশক্তিগত নতুন বিন্যাস বলছি। এখন পুরানা ব্যবস্থাটাকে যদি ১৯৪৪ সালের গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার বা ব্যবস্থা বলে বুঝি তবে এর আগামি হল ব্রিক ব্যাংক ও এ জাতীয় আরও জন্ম আসন্ন নতুন নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।
    কিন্তু এতে অন্য সবার তুলনায় ভারতের অবস্থানটা হল একেবারেই দ্বিধাগ্রস্থতা। যেটা আমাদের জন্যও ক্ষতিকর। একদিকে আমেরিকার দেখানো লোভে পুরানা প্রাতিষ্ঠানগুলো থেকে এককভাবে সুবিধা লুটে নেবার চেষ্টা অন্যদিকে আগামি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অমনোযোগ, কার্যকর করার পক্ষে শক্তভাবে না দাঁড়ানো, দাঁড়াতে না দেয়া বা দেরি করিয়ে দেয়া – এই ছিল কংগ্রেসের ভারতের দ্বিধা। এই দ্বিধাগ্রস্থতার কারণেই ব্রিক ব্যাংক প্রচেষ্টা থমকে আছে। চীন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ভিতরে না ঢুকে বরং এককভাবে নিজের চায়না ডেভলবমেন্ট ব্যাংক নামে কাজ চালাচ্ছে। চীনা কারেন্সী ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বাড়ছে। এটা অনেকটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গঠনের আগের মত পরিস্থিতি। আমেরিকা এককভাবে আমেরিকান এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক নাম নিয়েই যখন মুদ্রামান নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো গড়ার কাজ শুরু করেছিল। পরে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্ম নেবার পর ঐ ব্যাংক বিলুপ্ত করে ওর সমস্ত সম্পদ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে আমেরিকান চাঁদা হিসাবে হস্তান্তর করে দেয়া হয়। আর সেগুলো আমেরিকান কন্ট্রিবিউশন বা শেয়ার হিসাবে গণ্য হয়। মোদির ভারত কি দ্বিধাগ্রস্থতা বা নগদের লোভ কাটিয়ে উঠার সিদ্ধান্তে আসতে পারবে? এটা দেখার জন্য ভারতের নির্বাচনের পরও আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের, আদৌ যদি দ্বিধাগ্রস্ততা কাটে তবেই।
    আগামীকাল থেকে ভারতের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হতে শুরু করবে। দিন শেষে হয়ত ফলাফলের অভিমুখ পরিস্কার হতে শুরু করবে আর পরশুদিনের মধ্যে পুরা ফলাফল প্রকাশিত হয়ে যাবে। সাধারণভাবে বললে এ পর্যন্ত যতগুলো ইক্সিটপোল বা আলোচনা বা রিপোর্ট আমাদের নজরে এসেছে তাতে এমন কোন ধারণা পাওয়া যায় নাই যা মোদির বিজেপির ক্ষমতার আসার বিপক্ষে ইঙ্গিত করেছে।


    নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে কিছু সরাসরি কথাঃ

    এবার সরাসরি কিছু কথা বলা যাক। বিজেপি যদি ২১৮-২২০ এর কাছাকাছি বা উপরে আসন পায় তবে নিশ্চিতভাবেই ভারতে বিজেপির সরকারই গঠন হচ্ছে বলা যায়। এখন আমাদের জন্য অনুকুল হয় এমন সরকারটা কেমন হতে পারে? সেই কল্পনায় আমাদের আকাঙ্খা অর্থে আদর্শ সেই সরকার হবে “মমতার সমর্থনের মোদির বিজেপির এক সরকার”। মমতার সমর্থনের মানে বুঝিয়েছি মোদির বিজেপিকে সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে প্রয়োজনীয় (এখানে ধরে নিয়েছি যদি প্রয়োজনীয় হয়) আসনের সমর্থন মমতার তৃনমূল কংগ্রেস দিবে তবে তা সরকারের ভিতরে অংশ নিয়ে অথবা বাইরে থেকে অংশ না নিয়ে হলেও। এতে আমাদের জন্য অসুবিধা বা ফারাক নাই। কিন্তু কেন মমতার সমর্থনের কথা বলছি?
    বলছি কারণ, বিগত অন্তত চার বছর ধরে মমতার রাজনীতির নীতি কৌশলে সে কাদের প্রতিনিধি হতে চাইছে এই অর্থে তার কনষ্টিটুয়েন্সি কি সেদিকে কেউ খেয়াল করেছে এমন আলোচনা আমি দেখিনি। আমরা মমতাকে চিনি বা চেনানো হয়েছে যে, মমতা আমাদের নদীর পানি পাবার ক্ষেত্রে বাধা, এমন ভিলেন সে। এটা সবটা সত্যি নয়। বিগত ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফর প্রাক্কালে (যখন তিস্তা চুক্তি হবে বলে আশা দেয়া হচ্ছিল) মমতাকে মনমোহনের সফরসঙ্গি করার পরিকল্পনা ছিল। সে মোতাবেক ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই কলকাতায় গিয়ে মমতার সঙ্গে দেখা বা ব্রিফ করেছিল। সেসময় মমতা প্রশ্ন তুলেছিল যে পশ্চিমবঙ্গকে না জানিয়ে কেন তিস্তা চুক্তি করতে যাওয়া হচ্ছে। সচিবের জবাব ছিল যেহেতু আগের সিপিএম সরকার এব্যাপারে তাদের অনাপত্তি জানিয়ে রেখেছে তাই। এটা স্বভাবতই মমতার পছন্দ হয় নাই। সচিব এরপর বলার চেষ্টা করেছিল যদি আপনার আপত্তি থাকে তবে কোন অসুবিধা নাই, চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়ে যাক এরপর আপনার আপত্তির চিঠি কেন্দ্রকে দিলে আমরা চুক্তির বাস্তবায়ন বন্ধ রাখব। এতে মমতা আরও যড়যন্ত্রের গন্ধ পান। তিনি বলেন, পানিই যদি না দিবেন তবে এমন চুক্তি করার দরকার কি আর তাতে আমাকে জড়িত করার উদ্দেশ্যই বা কি? ফলাফলে তিনি সফরসঙ্গি হবার অনুরোধ ফিরিয়ে দেন। কিন্তু কংগ্রেস সরকারের পরিকল্পনাটাই ছিল এমন যে মমতা সফরসঙ্গি হন আর নাই হন যেদিকেই ঘটনা যাক চুক্তি না হবার জন্য মমতাকেই দায়ী হতে হবে, হয়েছেও। এপ্রসঙ্গ এখানেই থাক। কনষ্টিটুয়েন্সির প্রসঙ্গে আসি।
    মমতাই প্রথম ভারতীয় রাজনীতিক যিনি সেকুলার মোড়ক ছুড়ে ফেলে দিয়ে এক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দেখিয়েছেন। তিনি বুঝেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি ভোটের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। ফলে তাগিদ বোধ করেছেন মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সির নেতা হতে, প্রতিনিধিত্ব করতে। দেশভাগের পর থেকে এপর্যন্ত একাজে সেকুলারিজম এই বয়ানের আড়ালে প্রধানত কংগ্রেস মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি দখলে রেখেছিল। এরপরে সিপিএমের আমলে এর বিরাট অংশ তারা নিজের পক্ষে ভাগিয়ে নিয়ে যায়। বয়ান সেই একই সেকুলারিজম। কিন্তু ভারতের সাচা কমিশন রিপোর্ট প্রকাশের পর এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে যায় যে সেকুলারিজমের আড়ালে সবই কথার কথা থেকে গেছে।
    এবার এই মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি দখলের প্রতিযোগিতায় মমতা হাজির ঠিকই কিন্তু সেকুলারিজম তার বয়ান নয়। এটা তাতপর্যপুর্ণ। মুসলিম নেতাদের সঙ্গে তিনি সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, এরই সর্বশেষ হল কমিউনিটি লিডার পত্রিকা সম্পাদক ইমরান হাশমিকে রাজ্যসভার মনোনয়ন দিয়ে পাঠানো। আর এরও আগে যখন বাংলাদেশে শাহবাগ আন্দোলন তুঙ্গে তখন কলকাতার মুলনমান কমিউনিটি এর বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করতে চাইলে মমতা সেটা পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বলা হয় ঐ মিছিলে প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক সেখানে সমাগম হয়েছিল। ওদিকে এই ঘটনাটাকে ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক যে কোন মিডিয়ায় আলোচনা বা প্রবন্ধে এঘটনাকে ভারতের জন্য এক হুমকি হিসাবে এখনও রেফারেন্স দেয়া হয়। কিন্তু মমতা এব্যাপারে নির্বিকার। এবারের চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে কলকাতায় সিপিএমের সে মূল নির্বাচনী সভাটা হয় সেখানে এব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সম্পাদক বিমান বসুকে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝা যায় মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি দখলের লড়াইয়ে মমতা সিপিএমের উপর একটা ভাল কামড় বসাতে পেরেছেন। সম্ভবত একটা ভাল ভাগ তিনি পেতে যাচ্ছেন। বিমান বসুর সমস্যা ছিল তিনি সরাসরি বলতে পারেন না যে মমতা তার মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ সেটা কোন আইন বা যুক্তিতে অপরাধ নয়। ফলে তিনি মমতাকে অভিযুক্ত করলেন এই বলে যে মমতা জঙ্গিবাদকে আর বাংলাদেশের জামাতকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। বলা বাহুল্য তার এই বক্তব্যের গ্রাহক হবেন যারা মুসলিম নন তারা ফলে মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এটা কার্যকর নয়। বলা যায় তিনি অমুসলিমদের কাছে বিচার দিয়ে হার স্বীকার করে নিলেন। এখানে বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে তাই বাড়তি একটা কথা বলার সুযোগ নেই। মোদির কলকাতার জনসভাগুলো বাংলাদেশ বিরোধী বা পশ্চিমবঙ্গে তথাকথিত বাংলাদেশের মুসলমান মাইগ্রেশন বিরোধী প্রচার চলেছে। মনে রাখতে হবে এগুলো নির্বাচনী ভোট যোগাড়ে বলা রেঠরিক কথাবার্তা। বিজেপি যেসব রাজ্যে মারাত্মক দুর্বল তার দুর্বলতম হল পশ্চিমবঙ্গ। এখানকার মোট বেয়াল্লিশ আসনের মধ্যে একটার বেশি আসন বিজেপি এপর্যন্ত কখনও পায় নাই। মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি ইস্যুতে একদিকে সেকুলার কার্ডে কংগ্রেস আর সিপিএম দুই পুরানা খেলোয়াড়। ওদিকে মমতার নতুন লক্ষ্য সেকুলার-জামার আশ্রয় ছুড়ে ফেলেই মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি লাভের উদ্যোগ। এই পরিস্থিতিতে মোদির ভরসা বাংলাদেশ বিরোধি মাইগ্রেন্ট ইস্যুতে প্রচারণা। তাতে মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সি নয় বরং অমুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সিতে যতটা দাঁত বসানো যায় যতটা অর্জন করা যায়। কারণ এদিকটাই একমাত্র খালি আছে। মোদি ইতোমধ্যে নিজেই টাইমস নাও টিভিকে বলেছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় কি বলেছি সেটাই আমার সরকার পরিচালনার নীতি হতেই হবে এমন কোন মানে নাই। আবার মমতা এপ্রসঙ্গে মোদিকে কি জবাব দিয়েছেন, মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সিকে কি বলে আশ্বস্ত করেছেন সেটার চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সার কথা হল, তাঁর বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশকে এই বিরোধি প্রচারণার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা –এটাকে মুখ্য করে কথা বলেছেন।
    সারকথায় বললে মমতার যে মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সির ভর করে দাড়ানোর চেষ্টা তাতে তিনি যদি সফল হয়ে যেতে পারেন, তাদের মুখপাত্র ও প্রতিনিধি হয়ে যেতে পারেন অথবা হতে চান তবে বাংলাদেশের প্রতি তাকে সহানুভুতি হতে হবে এটা তিনি বুঝেছেন এবং এর স্বাক্ষর তিনি রেখে চলেছেন এটা মনে করার কারণ হাজির আছে। যদিও আগামিকালের ফলাফলে একমাত্র জানা যাবে তিনি কতটা সফল হলেন, আগালেন।
    এই অনুমানের উপর ভর করে আমরা বলতে পারি, আগামিতে ভারতে যেই সরকার গঠন করুক তাতে যদি মমতার সমর্থন প্রয়োজনীয় আসন সমর্থন নির্ধারক হয় সেটা বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকুলে যাবে। বিশেষত মোদির বিজেপির সরকার হলে এটা আরও গুরুত্বপুর্ণ হবে একারণে যে মমতা হবে বিজেপির হিন্দু-ঝান্ডার ঝোঁকের বিরুদ্ধে ব্যালেন্সিং ফ্যাক্টর। তবে মমতা বলতে মমতা যতক্ষণ মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সির নেতা এই শর্তের মমতা থাকবেন – একথা মাথায় রাখতে হবে। কেবল এই শর্তেই তিনি বাংলাদেশের জন্য কুশন, প্রয়োজনীয় ফ্যাক্টর।
    আবার ধরা যাক মমতার আসনের কোন সমর্থন ছাড়াই মোদির বিজেপি নিজে নিজেই সরকার গঠন করতে পারল। সেক্ষেত্রেও উপরের আলোচনায় বড় কোন রকমফের ঘটবে না। যতক্ষণ মমতা মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সির নেতা থাকবেন, হবেন অথবা থাকতে পারবেন – সেটাই মুখ্য বিষয়। কথাটা ‘হতে পারবেন’ এমন আগামি হিসাবে বলছি এজন্য যে মমতা মনে প্রাণে চাচ্ছেন, ঝোঁক দেখিয়েছেন যে তিনি মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সির নেতা হতে চান। কিন্তু তিনি হয়েছেন কি না, আসলে কতটা হলেন তা জানা যাবে আগামিকাল। পশ্চিমবঙ্গের ৪২ টা আসনের মধ্যে যদি ৩০টা বা তার বেশি আসন তিনি তুলতে পারেন তবে বুঝতে হবে তাঁর নীতি কৌশল কাজ করেছে। মুসলমান কনষ্টিটুয়েন্সির ভোট তার পক্ষে কাজ করেছে।
    এখানেই শেষ করছি। “বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তি: ভারত, চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা” এই শিরোনামের চার পর্বের লেখা এখানেই শেষ।

  • অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

    অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

    গৌতম দাস

    অপহরণ, গুম ও খুনের ভিতর ভাসছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে এটা এক চরম অবস্থানে এসে ঠেকেছে। হয়ত আরও কোন চরমে তা পৌছাবে। আতংক সমাজের প্রায় সব অংশকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে এর আগে অপহরণ গুম ও খুন ঘটেনি, কিম্বা এখনকার মতো চরম আকার ধারণ করে নি । গত এক দেড় বছরে তো বটেই এমনকি গত ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের পর অপহরণ, গুম ও খুনের সংখ্যা ভীতিকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল। অথচ এখনকার তুলনায় অপহরণ গুম ও খুন তখন গণমাধ্যমে আসে নি। যারা এর শিকার হয়েছিল তাদের প্রতি গণমাধ্যম সদয় ছিল না। এখনও সাতক্ষীরায় যে অপহরণ, গুম বা খুনের ঘটনা চলছে তা নারায়নগঞ্জের মত একইভাবে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। বিচারবহির্ভূতভাবে এদের ‘নির্মূল’ করবার ইচ্ছাটাও সমাজের একাংশের মধ্যে প্রবল হয়ে আছে। ফলে সেই সময়ের অপহরণ, গুম ও খুনের মিডিয়া রিপোর্টিং না হবার কারণে বিষয়টাকে সরকার আড়ালে রাখতে পেরেছিল এখনও “বিশেষ বিশেষ” অপহরণ, গুম বা খুনের বেলায় পারছে। যারা অপহরণ গুম ও খুন হচ্ছে তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” ফলে রাষ্ট্রের দিক থেকে এদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড চালিয়ে যাওয়া জায়েজ -গণমাধ্যম খুব সফলভাবেই এই বিকৃত মানসিকতার চর্চা জারি রাখতে পেরেছিল ও পারছে। যে র্যা ব-১১ এর কমান্ডারের নামে এত অভিযোগ, শীর্ষে তিনি, নারায়নগঞ্জে বদলি হয়ে আসার আগে তিনি লক্ষীপুর জেলায় ছিলেন। সেখানকার বিএনপি ও জামাত নেতা কর্মীদের হত্যার অভিযোগ নিয়মিত আমরা দেখেছি। একবার তো ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে জনরোষ থেকে স্থানীয় র্যা ব বাহিনীকে উদ্ধার করতে হয়েছিল। কিন্তু লক্ষীপুরের সেসব ঘটনায় আজকের মত আমরা সামাজিক-রাজনৈতিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। অর্থাৎ বিচার ও আইনবহির্ভুতভাবে অপহরণ, গুম বা খুনের এক রাজনৈতিক-সামাজিক স্বীকৃতি আমরা দিয়েছি। অথচ সেই মিডিয়া ও সেই রাজনীতি আজকে অপহরণ, গুম বা খুনের বিরুদ্ধে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতে চাইছে। বড়ই তাতপর্যপুর্ণ।
    রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী ভূমিকা ও আইন শৃংখলা বাহিনীর আইন বহির্ভূতভাবে হত্যার পক্ষে দাড়ানো লোকের অভাব হয়নি, আর তাদের যুক্তির অভাব ঘটে নি। যেমন, এমন যুক্তিও আমরা শুনেছি যে, সর্বসাধারণের জান ও মাল রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; অতএব রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নাগরিকদের পঙ্গু কিম্বা হত্যা করতেই পারে। খুবই মজার যুক্তি এটা। কিন্তু সমাজের ভেতর থেকেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, কিন্তু গড়ে ওঠে সমাজেরই উর্ধে সমাজের ওপর চেপে বসে থাকা ‘দানব’ হিসাবে – এটা অতি পরিচিত পুরানকাল থেকেই চলে আসা বামপন্থি এক সবল চিন্তা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রকে দেখবার এই পুরানা বামপন্থি চিন্তার জায়গাটা বামপন্থিদের মধ্যেও খুব একটা অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ।
    সেটা দূরে থাকুক, এখন ‘রাষ্ট্র’ নামক এই দানবকেই এক স্বাভাবিক সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করবার মতাদর্শই বাংলাদেশে প্রবল। রাষ্ট্র হাজির আছে বলেই এই প্রতিষ্ঠানটি ন্যায্য, তার গঠনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস ও চরিত্রের হদিস নেবার দরকার নাই, এই চিন্তা থেকে মুক্তি সহজ নয়। রাষ্ট্র আছে বলেই তার আর ন্যায্যতা প্রমাণের দরকার নাই, অতএব কোন নাগরিকের অধিকারের বালাই রাষ্ট্রের না করলেও চলে, এই চিন্তার প্রাবল্যের কারণেই ভিন্ন মতাদর্শের নাগরিকদের রাষ্ট্র যখন নিপীড়ন ও হত্যা করে তখন সমাজে কোন বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয় না। এমনকি তথাকথিত সুশীল বা লিবারেল কিম্বা প্রগতিশীলরাও নিশ্চুপ থাকা শ্রেয় মনে করে, সমর্থন যোগায়।
    এমনকি যারা মুখে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের কথা বলেন, তাদেরও সে ক্ষেত্রে বলতে শুনি যে মৌলিক অধিকার বা অন্য সবকিছু দেখবার আগে দেখতে হবে রাষ্ট্রের দ্বারা নিপীড়িত বা আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে খুন হওয়া নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কি? যদি উনি ইসলামি রাজনীতির হন, কি ইসলামি চিন্তার উপর ঠেস দিয়ে আছেন বলে মনে হয়, তবে তিনি মৌলবাদি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। তখন রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও হত্যার সমালোচনা দূরে থাকুক, বরং প্রয়োজনে ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ বলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হত্যার পাশাপাশি তাদের নির্মূল করতে নেমে পড়তে হবে। এই হল তাদের দশা। এরা মনে করে “ইসলামপন্থি মৌলবাদি বা সন্ত্রাসীরা” রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মাকান্ডে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে গেলে দানব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার কিছু নাই। কারণ তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” এর মত রাজনৈতিক আদর্শের নাগরিক। এরা বলতে চান, এই নাগরিকদের নাগরিক অধিকার জান মাল মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়লেও অথবা রাষ্ট্র তার উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের মতো অপরাধ করলেও আগে বিবেচনায় নিতে হবে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে কোন নাগরিক ব্যক্তির নাগরিক অধিকার নাই – এই হোল তাদের সারকথা।
    বাংলাদেশে এই ধরণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার বিরোধীদের সম্পর্কে একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। গত জানুয়ারির শেষে অপহরণ গুম ও খুনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রচারণার অংশ হিসাবে এক মানবাধিকার সংগঠনের সভার কাজে এক জেলা শহরে যেতে হয়েছিল। মূল প্রবন্ধ পড়ার পর সেখানে প্রথম বক্তা ছিলেন জেলা শহরেরই কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সভাপতি; জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতিও তিনি। তিনি কথা শুরু করলেন এভাবে, মানবাধিকারের কথা বইপুস্তকে অনেক ভাবে থাকে। সেটা সেখানে থাক। খোদ ওবামাও সেগুলো মানতে পারেন না। ফলে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধেও যে অপহরণ গুম ও খুনের অভিযোগ হচ্ছে সেগুলো নিয়ে বিচারে সবার আগে দেখতে হবে যারা অপহরণ গুম ও খুনের ভিকটিম তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। এটাই মুখ্য বিবেচনা। ইস্যুটাকে সেভাবেই দেখতে হবে।

    “রাজনৈতিক আদর্শের” ভিত্তিতে রাষ্ট্র নাগরিককে তার নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণ করবে কথার অর্থ কি
    কথাটার সার কথা কি? আমার পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাঁর নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো বা ক্ষুন্ন হবার বিপক্ষে সোচ্চার হওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য, আমার খুবই বেগ পেতে হয়েছিল ঐ প্রকাশ্য সামাজিক সভায় সেই বক্তার মারাত্মক বিপদজনক ও আত্মঘাতি বক্তব্যের পরিণতি কি হতে পারে তা উপস্থিত সকলকে বুঝিয়ে বলতে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল। আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটা ঘটনাচক্রে কমিউনিষ্ট পার্টি বা সিপিবি কেন্দ্রিক। কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে এই বিশেষ চরিত্রের “নাগরিক অধিকার” ধারণাটা কেবল সিপিবির পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটা ক্যাটাগরি করে বলা যেতে পারে যে, যারা নিজেদের “প্রগতিশীল” বা “চেতনার সৈনিক” মনে করেন নিজেকে মোটামুটি তাদের প্রায় সবারই অবস্থান এটা। তাই আমরা এখন দেখছি। একই বাহিনী কমান্ডারের ততপরতা লক্ষীপুরে ঘটলে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। কিন্তু এবার নারায়নগঞ্জে ঘটলে প্রতিক্রিয়া হয়।
    কোন “যদি” বা “কিন্তুর” আড়ালে বা কোন যুক্তিতেই রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি করবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। এতে সমাজ বা রাষ্ট্র কোনটাই টেঁকে না। নতুন কোন রাষ্ট্রও এমন ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না। সমাজের রক্তাক্ত বিভক্তি কিম্বা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে চাইলে এই অতি গোড়ার নীতি আমাদের আত্মস্থ করতে হবে। একে উপেক্ষা বা গাফিলতি মেনে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। অথচ এই ন্যূনতম নীতির অভাব তাদের মধ্যেই প্রবল যাদের কাছে আমরা এই নৈতিক প্রশ্নে দৃঢ়তা আশা করি। অথচ এরাই একই নিশ্বাসে নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন।
    আদর্শ যাই হোক কোন রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিতে গিয়ে কোন নাগরিক যদি কোন ক্রিমিনাল অপরাধ করে বসেন তবে অবশ্যই তার অপরাধ আমলে নিতে হবে এবং বিচার করতে হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে তিনি কেবল ঐ ক্রি্মিনাল অপরাধের জন্যই শাস্তি ভোগ করবেন। কোন ক্রমেই তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা তৎপরতার জন্য নয়। এটাই মূল কথা। এছাড়া আমরা ভুলে যাই রাষ্ট্রের নির্বাহি বিভাগ বিচার বিভাগ নয়। যার সোজা মানে নাগরিকের কোন কথিত অপরাধের বিচার সরকার করতে পারে না। সরকার বিচারক নয়, বড়জোর আদালতে অভিযোগ আনয়নকারী হতে পারে। অথচ সে জায়গায় আমরা রাষ্ট্রের নির্বাহী সরকারকেই অপরাধের বিচারক বানিয়ে ফেলছি। শুধু তাই নয় সরকারকেও কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ তাঁর পছন্দসই কিনা সেই বিচারের ভার দিয়েছি। অথচ কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কেমন তা কোন আদালতের বিচারকের পছন্দসই কিনা তা বিচারের এক্তিয়ার বিচার আদালতেরও নাই। আসলে, কোন রাজনীতি ভাল না মন্দ তা একমাত্র রাজনৈতিক পাড়ায় বিচার হয় অথবা জনগণ বিচার করে। আদালত পাড়ায় কোন রাজনীতির বিচার করা যায় না, চলে না; বিচারকের সেই এক্তিয়ার কনষ্টিটিউশন দেয় না। তবে কোন রাজনীতি কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করলে অথবা বিরোধী হলে সেটা অন্য কথা। যেটা কোনভাবেই রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোন দলের রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দ করা না করার বিষয় নয়। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা গঠনতন্ত্র রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনের সাথে সংঘাতপুর্ণ বা বিরোধ তৈরি করে এমন প্রমাণিত না হলেই হল। এরপর ঐ রাজনীতি আর রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোনভাবেই পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়, এক্তিয়ার নাই। তবে যে কোন নাগরিক ঐ রাজনীতিকে (আদালতে আইনীভাবে নয় কেবল রাজনৈতিক পাড়ায়) পছন্দ করতে পারেন, বিরোধীতাও করতে পারেন। অথচ আমরা খোদ রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক আদর্শ বিবেচনার ভয়ংকর ও অদ্ভুত কথা বলে অবলীলায় সরকারকেই অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা ঘটাতে দিচ্ছি শুধু না, এর পক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছি।

    দুই

    নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনায় সমাজের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ঘটছে। এটা তাৎপর্যপুর্ণ। আমার অভিজ্ঞতার জেলা আইনজীবী সমিতির ঐ সভাপতির মত আমরা অনেকেই এই সরকারের শুধু শেষের গত তিন বছরে অপহরণ গুম ও খুন করতে দিয়ে একটু একটু করে এমন দানব বানিয়েছি। যুক্তি তুলতে দেখেছি, যে পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাকে তো সরকারের হাতে অপহরণ গুম ও খুনই হতে হবে। এই বেহুঁশ ও আত্মঘাতি চিন্তা নিয়েই আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। আমাদের অনেকের কাছে তা খুবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু নারায়নগঞ্জের ঘটনা কি আমাদের হুঁশ ফিরিয়েছে, ফেরাতে সক্ষম হবে? এটা নির্ণয় করবার সময় এখনও আসে নি। যদিও রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষ সবারই অন্তত এটুকু হুঁশ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে যে, খারাপ কিছু একটা ঘটে গিয়েছে, যার ফল আমরা ভোগ করছি। কেউ বলছেন রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ছে, রাষ্ট্রের একটা মারাত্মক ব্যাত্যয় ঘটে গেছে কোথাও ইত্যাদি।
    রাষ্ট্র কোন না কোন আদর্শের ওপর দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকাও সেই আদর্শের ওপর নির্ভর করে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলা হয় রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে মূল বিষয় নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ওপরই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ নাগরিকেরা সবাই একই রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী এমন কখনই থাকেন না। থাকার কথাও না। এমনকি মোটা দাগে অনেককে একই রাজনৈতিক আদর্শের কোন দলে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বও থাকে। কিভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র তাদের মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা করে তার ওপর নির্ভর করে সেই দল কিম্বা রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকা।
    যে কোন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠি বা প্রবণতার অধিকার আছে তাদের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়বার। কিন্তু সেকাজে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই একমাত্র সেটা করা যেতে পারে। ক্ষুন্ন করে নয়। মোটা দাগে গণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলো অগণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলোর বিরুদ্ধে লড়েই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কারো নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করে গণতন্ত্র কায়েম করে না, বরং সকল নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক শ্রেণির তৎপরতা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বিচার বিভাগ এই ক্ষেত্রে একটা মুখ্য ভূমিকায় থাকে। এটাই গণতন্ত্র নিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী করবার পথ। এর কোন শর্টকা্ট রাস্তা নাই। প্রতিপক্ষকে ‘নির্মূল’ করাই যদি নীতি হয়, তাহলে প্রতিপক্ষও পালটা নির্মূলের নীতিই গ্রহণ করবে। এটা মনে রাখতে হবে। এটা দেশকে টুকরা টুকরা করবার নীতি, গড়বার বা গঠন করবার নীতি হতে পারে না।
    আবার যার যার প্রত্যেকের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম দেখতে চাইলে বাস্তবে সেটা অসংখ্য রাষ্ট্রে টুকরা হয়ে যাবে। উদার গণতন্ত্র ভাল কি মন্দ সেই তর্কে না গিয়ে বলা যায়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি চর্চার অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ণ করে না। মূলত নাগরিকের জানমাল সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র; আবার রাষ্ট্র নাগরিকের সুরক্ষা করতে ব্যর্থ হবে না, কিম্বা নিরাপত্তা ভঙ্গের কারণ হবে না -রাষ্ট্রের এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই নাগরিকরা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মানে বা মানাটা তার স্বার্থের অনুকুল বলে মনে করে। নাগরিকরা ভিন্ন ভিন্ন বা নানান রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করতে পারবে এটা সেখানে স্বীকৃত থাকে। ফলে সরকার বা ক্ষমতাসীন কোন গোষ্ঠির পছন্দসই রাজনৈতিক মতাদর্শ না হলে রাষ্ট্র তাকে অপহরণ গুম ও খুন করতে পারবে এই বিকৃত চিন্তা কোন সমাজে বা রাষ্ট্রে এসে গেলে সেটা ভয়াবহ নৈরাজ্যরই ইঙ্গিত বহন করে। একালে যে রাষ্ট্র নাগরিক ও মানবিক অধিকার স্বীকার করে না তার পরিণতি কী দাঁড়ায়? এককথায় এর জবাব হল আজ হোক কাল হোক রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাবে। বাংলাদেশে যেটা এখন ক্রমশ ঘটছে। অর্থাৎ যারা এতদিন সরকারী দলের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধীদের অপহরণ গুম ও খুনের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন তারাই জেনে না জেনে নিজদের আত্মঘাতি চিন্তার কারণে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার মারাত্মক বিপদ দাওয়াত দিয়ে ঘরে তুলেছেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। যে বিপদ ডেকে এনেছেন তাকে বিদায়ও দিতে পারছেন না। পারবেনও না।
    অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্র মানেই সম্পত্তি বা সম্পত্তি-সম্পর্ক রক্ষার জন্য কাঙ্খিত কার্যকর ও সুপ্রিম প্রতিষ্ঠান। এখানে নাগরিক মানেই সম্পত্তির মালিক, সম্পত্তি আগলে বসে থাকা নাগরিক। এটা শুধু যে প্রচুর সম্পত্তির মালিক কেবল তার বেলায় নয়, যার এক কানি জমি বা ভিটেমাটি আছে এটা তার বেলায়ও সত্য। এমনকি যার কিছুই নাই, সেও সম্পত্তির মালিক। সেই শ্রম হচ্ছে তার শ্রম শক্তি। সেই শক্তি বাজারে বেচাকেনার অধিকার তার নিজের। তাকে দাসের মতো জোর করে কোথাও খাটানো যায় না। অর্থাৎ সেও কোন না কোন সম্পত্তি আগলে থাকা নাগরিক। আমরা বলি, রাষ্ট্রের দায়িত্ত্ব নাগরিকদের “জান ও মাল অথবা জানমাল” রক্ষা। অর্থাৎ কেবল জান বা জীবন সুরক্ষাই নিরাপত্তা নয়, একই সঙ্গে মাল বা সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথাও শুনি আমরা।
    তাহলে রাষ্ট্র যদি কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী হয়ে বাকি সব ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিক অপহরণ গুম ও খুন জারি রাখে তাহলে সেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র ও সরকার কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের “জান ও মাল” সুরক্ষা করবে, অন্যদের নয়, এটা হতে পারে না। অথচ এই নীতির ভিত্তিতেই হাসিনা সরকারের বিগত ছয় বছর বিশেষ করে শেষ তিন বছর চলছে। “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” অপহরণ গুম ও খুন চলছে নিরন্তর। যাদের কাছে মনে হয়েছে “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” এর রাজনীতি ও আদর্শ তার পছন্দসই নয় তারা এতে চুপ থেকেছে, খুশি হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে সমর্থন ও যুক্তি তুলেছে যে হাসিনার সরকারের কাজ হচ্ছে ভিন্ন মতাদর্শীদের নির্মূল করা। নাগরিকদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার নয় বরং রাজনৈতিক আদর্শ সবার আগে বিবেচনায় রেখে অপহরণ গুম ও খুন চালিয়ে যাওয়া। হাসিনা সরকারের সবল ও এখনও টিকে যাবার পিছনে এটাই প্রধান মতাদর্শগত ভিত্তি।

    আসলেই কি হাসিনা “চেতনার” আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার বিলি করেছেন
    নারায়ণগঞ্জের নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা নতুন এক উপাদান যুক্ত করেছে। “রাজনৈতিক আদর্শ” দিয়ে বিচার করলে নজরুল ইসলাম, তার সাথে খুন হওয়া আইনজীবি চন্দন সরকারসহ বাকি ছয় জন, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত অপর কাউন্সিলর নূর হোসেন, শামীম ওসমান এবং খোদ হাসিনা এদের সকলের একই “রাজনৈতিক আদর্শ” – সকলেই আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত। এমনকি র্যাদবের কমান্ডারসহ নারায়নগঞ্জ প্রশাসন সবাই একই “রাজনৈতিক আদর্শ” ধারণ করে কিম্বা তার পরোক্ষ সমর্থক। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এই নীতির ভিত্তিতেই তারা প্রশাসন পরিচালনা করেছে। এভাবেই এরা হাসিনার অপহরণ গুম ও খুনের রাজনীতিতে পরিচালিত হতে স্বচ্ছন্দবোধ করে গেছে।
    তবে নারায়নগঞ্জের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ঘটনা ভিন্ন ভাবে ঘটেছে। খুনাখুনি হয়েছে শেখ হাসিনার মতাদর্শের ব্যক্তিদের মধ্যে। এটা সুস্পষ্ট ভাবেই রাষ্ট্রের ভাঙ্গন ও সরকার পতনের লক্ষণ। কারন যে নীতির ভিত্তিতে প্রশাসন এতোদিন চলছিল, সেই নীতি প্রশাসনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, যা সরকারকেই এখন গ্রাস করতে উদ্যত। যারা ভেবেছিলেন জামাত-বিএনপি-হেফাজত এর রাজনৈতিক আদর্শ না করে আওয়ামি লীগের রাজনৈতিক আদর্শ করলেই জানমাল সুরক্ষিত ও নিশ্চিত থাকবে, হাসিনার সরকার তা নিশ্চিত করবে সেটা এখানে একেবারেই ঘটে নাই। যারা মারা গিয়েছেন তারা আওয়ামি লীগে নাম লিখিয়েও নিজের জানমাল রক্ষা করতে পারেনি। ওদিকে যারা হাসিনার এই দানব রাষ্ট্রের তান্ডব আচরণকে সরাসরি বা প্রচ্ছন্নে সমর্থন করে গেছেন, হয়ত ভেবেছেন তিনি রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে জামাত-বিএনপি-হেফাজত ধারণ করেন না ফলে তিনি সুরক্ষিত ও নিরাপদ তাদের এখন হঠাৎ মানবাধিকারের কথা মনে পড়েছে। তারা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করছেন। এরা শঙ্কিত যে নজরুল ইসলাম সহ সাতজন ‘অপর’ কেউ নয় আসলে ওটা তারা প্রত্যেকে, খোদ নিজেই। নজরুলের ভাগ্য সবারই আগামি ভাগ্য, অপেক্ষমান পরিণতি। ওটা নজরুল নয় নিজেরই খুড়ে রাখা আপন কবর। এই কবর তো দীর্ঘদিন ধরেই খুঁড়ছিলেন, তখন তাদের হুঁশ ছিলনা।
    একই রাজনৈতিক আদর্শ আওয়ামি লীগে অন্তর্ভুক্ত থাকি আর নাই থাকি,- সম্পত্তি বা বিভিন্ন ধরণের স্বার্থ নিয়ে নিজের আপন ভাই, আত্মীয়, আপন বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায় পার্টনার ইত্যাদিদের সাথে নানান স্বার্থ বিরোধ নিয়েই আমরা সমাজে থাকি। সমাজের মুখ্য প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অধীনে থাকি। কিন্তু এর মানে এই না যে স্বার্থ বিরোধের ফয়সালা আমরা নিজে অপরের উপর রুস্তমিতে করি বা কেউ আমার উপর করুক। রাষ্ট্র একছত্র রুস্তম হয়ে থাকবে, আর অভ্যন্তরে একে অন্যের উপর রুস্তমি করতে দিবে না এই শর্তে নাগরিক রাষ্ট্রের রুস্তমি মেনে নেয়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ঘটনা প্রমাণ করেছে হাসিনার রাষ্ট্র এই শর্ত ভেঙ্গেছে। সে নূর হোসেনকে রুস্তমি করতে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রতিটা নাগরিক চায় রুস্তমি বলপ্রয়োগে খুনোখুনি প্রতিপক্ষকে নির্মুলের পথে না, স্বার্থবিরোধ ‘বিচার’ বা আইন কানুনের নিয়মে ফয়সালা হো্ক। নারায়নগঞ্জের ঘটনায় রাষ্ট্র শর্ত ভঙ্গ করায় সকলের মনে আশঙ্কা জাগিয়েছে যে হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আপন ভাই বা আপন দলের বিরোধী স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হাতে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে যাওয়াটাও খুবই স্বাভাবিক। এককথায় রাষ্ট্র নাগরিক নির্বিশেষে জানমালের রক্ষক আর নয়। যে কোন সময় সরকার যে কোন গ্রুপকে সমর্থন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের জানমাল বিপন্ন করে ফেলতে পারে। এবং কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা সরকার আর্শিবাদ জানাবে তারও কোন দিশা নাই। এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হচ্ছে কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপুর্ণ মনে করে। অর্থাৎ একমাত্র বিবেচনা হাসিনার নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকা।
    তাহলে দেখা যাচ্ছে আমার সেই জেলার আইনজীবি বন্ধু যেভাবে বলছিলেন, কারও রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দসই লাগে কি না এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার জানমালের নিরাপত্তা দিবে এই ভিত্তিতেও হাসিনা তার দানব রাষ্ট্র সাজায় নি। হাসিনার কাছেও রাজনৈতিক আদর্শ গুরুত্বপুর্ণ কিছু নয়। আসলে তাঁর একমাত্র বিবেচনা নিজে দানব ক্ষমতায় টিকে থাকা।
    নারায়নগঞ্জের ঘটনা কেন্দ্রিক গণক্ষোভকে আমি এভাবে ব্যাখ্যা করছি ঠিকই। কিন্তু গণমন নিয়ে আমার এই অনুমান কতটা সঠিক সত্য নাকি একেবারেই সাময়িক ও বিচ্ছিন্ন তা জানা যাবে এই ঘটনার শেষ হয় কি করে তা দেখতে পাবার পর। এটা হতেও পারে আশঙ্কিত নাগরিকেরা তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভকে কোন পরিণতির দিকে নিতে অবিচল থাকলেন না; আর ব্যাপারটা একটা সাময়িক ক্ষোভ হিসাবে থেকেই চাপা পড়ে গেল। সেটা যাই হোক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সেই কমিউনিষ্ট নেতা যেভাবে রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার জানমালের রক্ষার পক্ষে যুক্তি তুলে হাসিনার রাষ্টকে দানব হতে পুষ্ট করছিলেন তার সেই আকাঙ্খার অন্তত একটা পরিণতি হল এই সাত অপহরণ গুম ও খুন।
    উপরের কথাগুলো বর্তমানের হাসিনার সরকারকে সামনে রেখে বলছি মানে এই নয় এটা কেবল আওয়ামি লীগ বা হাসিনার জন্য সত্য। অপহরণ গুম ও খুন কমবেশি স্বাধীনতার পর থেকেই সবসময়ই বজায় ছিল। কিন্তু এর মাত্রার ভিন্নতার দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। আজকে এই কথাগুলো আগামি যে কোন সরকার, বিএনপি অথবা জামাতের অথবা অন্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য এবং সত্য। এব্যাপারে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ সন্দেহ নাই। তথাকথিত রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণের রাষ্ট্র এটা যে কোন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বেলায়ই সমান বিপদজনক। আমাদের কি এই শিক্ষা যথেষ্ট হয়েছে? আগামির ভরসায়!

  • লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

    লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

    গৌতম দাস

    হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

    থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
    হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

    কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

    হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
    লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
    প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
    তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
    এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

    এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

    ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
    ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

    হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
    একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

    সত্য লুকানো
    লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
    অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
    তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
    যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
    এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
    তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

    আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
    লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
    লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
    এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
    তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
    আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

    আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
    মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
    অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
    কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
    তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
    একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

    যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
    কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
    এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
    ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
    হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

    যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
    তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

    একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

    SHORT LINK: