Author: goutamdas

  • জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

    জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

    গৌতম দাস

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শুক্রবার

    জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

    বাংলাদেশের দু-একটি দৈনিকে খবরটা আসে গত ৯ সেপ্টেম্বর যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর  নয়াদিল্লীর এক সেমিনারে “ঢাকাকে সমর্থন দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান” জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।  দক্ষিণ ভারত ভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দুর’ বরাত দিয়ে ঢাকার মিডিয়া খবরটি প্রকাশ করে। এর এক দিন পর অর্থাৎ  ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার জয়শঙ্করের ঐ বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। তবে ঢাকার মিডিয়াসহ সব জায়গায় পাঠকের মনে একটা কমন বিভ্রান্তি ছিল যে, জয়শঙ্কর কোথায় এবং কেন এই বক্তব্য রেখেছেন। কারণ গত ২৯ আগস্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) জন কেরির বাংলাদেশ সফরের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিদেশী প্রভাবশালী ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেনি। আবার বাংলাদেশের কোনো সরকারি নেতা বা মন্ত্রীও ভারত অথবা কোনো প্রভাবশালী দেশ সফরে নেই। ফলে কোন পটভূমিতে জয়শঙ্করের বক্তব্যের অর্থ বুঝব, সেই পটভূমি সবাই জানতে চাইছিল। যেমন- মানবজমিন লিখেছিল, ‘জয়শঙ্কর দিল্লিতে ২০১৬ ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সে’ বক্তব্য রাখেন। এখন ‘ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সটা কী জিনিস এটা ওই রিপোর্ট থেকে কিছুই জানা যাচ্ছে না। অর্থাৎ জয়শঙ্করের বক্তব্যের একটা কনটেক্সচ্যুয়াল বা পটভুমিগত দিক আছে। তাই সংক্ষেপে সেই পটভূমি বা ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সটি কী তা খুঁজে দেখা দরকার হয়ে পড়ে। এরপ্র তা খুঁজে দেখে জানা যাচ্ছে যে আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপরাজ্যের এক একাডেমিক ইন্সটিটিউট হল ঐ “ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার”। আর প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত ছিল বা আছে, এমন ভারতীয় প্রফেশনালদের একটি সংগঠন আছে দিল্লিতে, যার নাম ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন’ (বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশে এমন শাখা আছে)। এই অ্যাসোসিয়েশন তিন দিনব্যাপী এক কনফারেন্স (ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া কনফারেন্স নামে) ডেকেছিল দিল্লিতে ৮-১১ সেপ্টেম্বর, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন জয়শঙ্কর ও অন্য আরেক নোবেল সেলিব্রিটি। জয়শঙ্কর সেখানে যে লিখিত বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটারই সারাংশ ঐ খবরের উৎস, যা মিডিয়া রিপোর্টে এসেছে। এখন এরপরেও আরো প্রশ্ন থেকে যায় যে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ এটা আবার কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান?

    ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ আমেরিকার ৫০তম রাজ্য হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় নন-প্রফিট একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। হাওয়াই আমেরিকান মূল ভূখণ্ডের বাইরে প্রশান্ত মহাসাগরে এক দ্বীপপুঞ্জ রাজ্য। আমেরিকার সাথে এশিয়ার ভূখণ্ডগত দূরত্বের দিক থেকে এ দ্বীপ মাঝে অবস্থিত।  হাওয়াইয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠানের বিরাট ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠানটি জন্ম বা উদ্বোধনের সময় সাবেক সিনেটর  ও সেকালের আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডসে জনসন বলেছিলেন, এটা “পশ্চিম (আমেরিকার) আর পুবের (এশিয়ার) ইন্টেলেকচ্যুয়ালদের মিলনস্থল হবে”।
    আরো প্রশ্ন, আমেরিকা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলে কেন? এর জবাবে প্রেক্ষিতের দিকটি হল বিশাল পরিসরে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। এই বৃহত্তর প্রেক্ষিত থেকে দেখে বললে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে বসবাস ও অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো অসমভাবে বিকশিত হয় বা হচ্ছে, ফলে পরস্পরবিরোধী নানা স্বার্থবিরোধ এর ভিতর সবসময় তৈরি হতে থাকে। এই দ্বন্দ্ব-বিরোধগুলোকে নিয়ে বসে কথা বলে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা যতটা কমানো বা লঘু করে দেয়া যায়, আমেরিকার দিক থেকে বুঝ তৈরি করা যায়, কাউকে কাউকে কিনে ফেলা বা প্রভাবিত করে রাখা যায় – এসব প্রয়োজনে আমেরিকা ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের মত একাডেমিক থিঙ্কট্যাংক অথবা নীতি গবেষণা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার তাগিদ আমেরিকা বোধ করে থাকে। তবে থিঙ্কট্যাঙ্ক-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এই ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ কিছুটা ভিন্ন এক অর্থে যে, এ সেন্টার নিজ খরচ চালানোর একটা বড় ফান্ড আমেরিকান সরকার থেকে আসে, আর বাকিটা অন্যান্য আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তুলে চলে। যেখানে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর বেলায় তারা প্রায় সবাই প্রাইভেট দাতব্য প্রতিষ্ঠানের (সরকারি ফান্ড নয়) অর্থে চলে।
    জয়শঙ্করের বক্তৃতা লিখিত ও তাতে ১৭টা পয়েন্ট ছিল। যার মূলকথাগুলো সার করেই ‘দ্য হিন্দু’ নিয়ে এসেছিল তিনটা শিরোনামে : চীন প্রসঙ্গ, টেররিজম ও পাকিস্তান এবং শেষে বাংলাদেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া কেবল বাংলাদেশ অংশটিই তুলে রিপোর্ট করেছে।
    এ সম্মেলনে জয়শঙ্করের টার্গেট শ্রোতা পশ্চিম, বিশেষত আমেরিকা। অর্থাৎ ঠিক বাংলাদেশ বা এ দেশের জনগণ নয়। কারণ আমেরিকা যেন এশিয়া নিয়ে ভারতের কথা শুনতে এসেছে। ফলে ভারতের চোখে এশিয়ায় দ্বন্দ্ব বা খোঁচা-বিরোধ তৈরি হয়ে থাকা জায়গা হল এই তিন ইস্যু। জয়শঙ্কর আমেরিকাসহ পশ্চিমকে বলতে চাচ্ছেন, শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের ঝামেলায় আছে। বিগত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের ওপর ভর করে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান আছে কথা সত্য। এবং তা প্রকাশ্যই ফলে সবাই জানে। তাই জয়শঙ্কর বলছেন, “এটা সমালোচনার সময় নয়। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আমাদেরও উদ্বেগ রয়েছে। আর এ জন্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সরকারকে সমর্থন দেয়া উচিত”। শেষ বাক্যটা ‘দ্য হিন্দু’ থেকে নিয়ে অনুবাদ করে লেখা হল। ওদিকে আনন্দবাজার কথাটা লিখেছে এভাবে, “বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদকে রক্ষা করা না গেলে সেখানে জঙ্গিপনা আরো বাড়বে”। তবে জয়শঙ্করের ১৭ পয়েন্টের বক্তব্য যেটা সরাসরি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাইটে পাওয়া যায়, তার ১৪ নম্বর পয়েন্ট হল, ‘বাংলাদেশ সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ চাপের মুখে আছে, এই অবস্থায়  আমাদের দ্বিধা ঝেড়ে সমর্থন করা উচিত। ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা করে প্রত্যেক দিকে অতিরিক্ত গুরুত্বের সাথে না তাকিয়ে আমাদের বরং সামগ্রিক উন্নয়নের অভিমুখের দিকে তাকানো উচিত, সুনির্দিষ্ট করে এটা গুরুত্বপূর্ণ”। এ অনুবাদ আমার করা এবং এখানে লেখা।
    জয়শঙ্কর বলতে চাইছেন, সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন হয়েছে কি না, অভিমুখ ঠিক আছে কি না সেটা আগে চেক করলেই তো হয়। তা হয়ে থাকলে সেটা অর্জনে গুম-খুন-নিপীড়ন-দলন ধরনের কিছু হয়ে থাকলে সেগুলো আর আলাদা আলাদা করে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় এখানে, আমাদের এই বাক্য দুটো পড়ার সময় প্রথম বাক্যটির আগে দ্বিতীয় বাক্যটি পড়তে হবে। কারণ দ্বিতীয় বাক্যটি নিজেই জয়শঙ্করের প্রথম বাক্যটির বিরোধী।
    জয়শঙ্করের দ্বিতীয় বাক্যের সারকথা হল – সামগ্রিক বিচারে উন্নয়নের অভিমুখ ঠিক আছে তো, সব ঠিক আছে। তাহলে যদি তাই হয়, তবে প্রথম বাক্য আর বলার দরকার থাকে না। কারণ “সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ বিপদে থাকুক আর নেই থাকুক, দুনিয়ার কোন সরকারেরই আর হাসিনা সরকারকে দ্বিধাহীন সমর্থন করার কিছু থাকে না। কারণ উন্নয়ন তো হয়েছেই। উন্নয়ন ঠিকমতো হয়ে থাকলে “সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ বিপদে” আছে অথবা না আছে তা আবার দেখতে যাব কেন?” সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদকে আবার রক্ষা করা কেন? কারণ উন্নয়ন ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়ে ফোকাস না করতেই কি জয়শঙ্কর দ্বিতীয় বাক্যে আমাদের পরামর্শ দেননি? উন্নয়ন হলেই তো সব হচ্ছে!
    তাহলে দাঁড়াল, বাংলাদেশ সম্পর্কে জয়শঙ্কর দু’টি বাক্য লিখেছেন, যার একটি অপরটিকে নাকচ করে দেয়। এ ধরনের স্ববিরোধী পরিস্থিতিতে আমরা বলতে পারি, ভারতের বিদেশ সচিব জয়শঙ্করের ‘কথা হয় না’! কারণ তা স্ববিরোধী। আচ্ছা, একটা সেকেন্ড থট দেয়া যাক।
    ‘বহুত্ববাদ’ এই শব্দটি কি ভারতের বিদেশনীতিতে আছে বা ছিল?  জবাব হল – না, তা আগে জানা যায়নি। তাহলে কী আমেরিকাকে খুশি করতে কেবল জয়শঙ্কর এখন এই শব্দ ব্যবহার করতে চাইছেন? আমাদের সন্দেহ প্রবল হচ্ছে। কেন? কারণ, বহুত্ববাদ বলতে আমেরিকা আমাদেরকে বোঝাতে চায় কেবল কোন সরকারের বক্তব্য নয়, সরকারবিরোধীদেরও সমালোচনা বক্তব্য থাকবে, থাকতে দিতে হবে। বিরোধীরাও অবাধে তাদের কথা বলতে পারবে। তাদের কোনো আপত্তি, বিরোধিতা থাকলে তা আমলে নিতে হবে। ইনক্লুসিভ অর্থে সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে ও ক্ষমতাসীনদের তা যতই অপছন্দ লাগুক তা শুনতে হবে। আর বিনা বাধায় তা সরকারকে সহ্য করতে হবে। জয়শঙ্কর কি বহুত্ববাদ বলতে এটাই বুঝেছেন বা বুঝাচ্ছেন? তাই যদি হয়, তবে ২০১৪ নির্বাচনে ‘সবাইকে নিয়ে’ নির্বাচনের বিপক্ষে কেন ভারত অবস্থান নিয়েছিল? কেন ভারতের বিদেশ সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে জানালেন সবাই নয়, যারা যারা হাসিনার অধীনে আসে এই অর্থে মেজরিটি নিয়ে নির্বাচনের পক্ষে ভারতের অবস্থান? অর্থাৎ বহুত্ববাদকে ভারত নিজেই বহু আগে থেকে চাপের মুখে বিপদে ফেলে ত্যাগ করে রেখেছে। তাই নয় কী? তাহলে এখন কান্নাকাটি করে লাভ কী? বোঝা যাচ্ছে, জয়শঙ্কর খুব খারাপ ছাত্র! এসব পুরানা দিক নিয়ে  হোমওয়ার্ক করে ক্লাসে আসেননি!
    আসলে আমাদের মানতেই হয় সুজাতা জয়শঙ্করের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান ছিলেন। কারণ ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এখন থেকেই বহুত্ববাদের কথা তুলে জয়শঙ্কর কি আগামিতে নিজের বিপদ ডেকে আনার রাস্তা খুলছেন! যেটা সুজাতা কখনোই করেননি। যেহেতু ২০১৪-এর নির্বাচন বলে রাখা হয়েছিল যে ২০১৯ সালে ঐ সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, তার মানে সরকারকে ২০১৯ সালে আবার নির্বাচনের ঝামেলা পোহাতে হবে। সেই আলোকে আগে থেকেই বহুত্ববাদের কথা মাঠে এনেছেন বলে জয়শঙ্করের বেলায়  বিপদের আশঙ্কা প্রবল। সুজাতা বুদ্ধিমান ছিলেন বলে ‘বহুত্ববাদ’ বলে কোনো কথাই তোলেননি। এবার সুজাতার জায়গায় জয়শঙ্কর কী বলবেন?
    আসলে কঠিন এক বাস্তবতা হল, আমরা মানি আর না-ই মানি, ক্ষমতা বলে কিছু থাকলে ক্ষমতার বিরোধী বলেও কেউ কেউ থাকবে। এখন বিরোধী বলতে যদি কোনো বিরোধী দল না থাকতে দেই, মানে আমার দলের বাইরে বিরোধী কাউকে থাকতে না দেই – তাহলে আমার দলের ভেতরেই এক সবল বিরোধী গ্রুপ হবে। এ ছাড়া আরো এক বিপদ আছে। লিবারেল বা আইনি বিরোধী দলের সবাইকে যদি গুম-খুন করে দমিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলি, তো এবার এক সশস্ত্র বিরোধী দল হাজির হবে।  এর অর্থ হল – আসলে আমিই ঠিক করি আমার বিরোধীরা কেমন হবে, কোথায় থাকবে, ভেতরে না বাইরে, সশস্ত্র না নিরস্ত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকলে ক্ষমতার বিরোধীও থাকবেই। শুধু তাই না, ঐ বিরোধী বেছে নেয়ার দায় এবং ক্ষমতা আসলে ক্ষমতাসীনের। দেখেন কোনটা নেবেন! অন্যকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই।
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (প্রিন্টে ১২ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। তা আরও সংযোজন ও এডিট করে এখানে আবার নতুন ভার্সান হিসাবে তা ছাপানো হল।]

  • হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

    হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা
    গৌতম দাস
    ১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৬, সোমবার ০০ঃ০১

    হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

    ভারতের জন্মের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বিস্তর চড়াই-উতরাই আছে। কখনো তা চরম তুঙ্গে, আবার কখনো তুলনামূলক শীতল। কিন্তু এবারের চরম অবস্থা নিজগুণেই যেন তুলনাহীন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৭ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্টে জানাচ্ছে, কাশ্মিরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া চলমান কারফিউ ২৭ আগস্টে পঞ্চাশতম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু পুরা ঘটনার বেজ-ফ্যাক্টস মানে, কী থেকে ঘটনা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিল সেটা কী? সেটা ভারত সরকারের ভাষায় বলা যাক। ভারতের এনডিটিভির খবর অনুবাদ করে আমাদের বাংলা ট্রিবিউন কী ছেপেছে সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে।  সেই ভাষ্যটা হল,  হিজবুল মুজাহিদিন নামে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠনের নেতা বুরহান ওয়ানী গত ৯ জুলাই ২০১৬ ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তার ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া রাজনৈতিক গণ-অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করেছিল জনগণ এবং জানাজায় অংশ নেয়া থেকে অসন্তোষ ও এর তীব্রতা শুরু। আর তা এবার ৫০ দিন পূর্ণ করল। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত দিয়ে তৈরি। এই শব্দ দিয়ে আমরা অনেক কিছু ঘটনা বুঝে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমাদের পরিচিত এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটা বুঝানো হল। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া সুনির্দিষ্ট করে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ভারতীয় গণমাধ্যমের শব্দ। অপর দিকে যে শহরে ৫০ দিন টানা কারফিউ দিয়ে রাখতে হয়, সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী, মানুষের আয়-ইনকাম দিন এনে খায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

    কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সরকার সবসময় যথেচ্ছাচার বলপ্রয়োগে দাবড়ে সমাধান করে এসেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু এবার বুরহান এনকাউন্টারের পরের পরিস্থিতি যে এমন অগ্নিরূপ ধারণ করবে, কারফিউ দিলেও যে তা ভেঙ্গে মানুষ বুরহানের জানাজায় অংশগ্রহণ করে বসবে এগুলো তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কাশ্মীরের রাজ্য সরকারে উপরে কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীর রুস্তমি চলে থাকে। এজন্য আইনগত ভাবেই সামরিক বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিগত ১৯৫৮ সালের এক আইনে (ওটা প্রথম আইন আসামের নাগাদের জন্য ছিল। পরে ঐ আইনের আদলে ১৯৯০ সালে বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য এক আইন প্রনয়ন করা হয়) যার নাম Armed Forces (Special Powers) Acts (AFSPA)। ফলে বলা যায় এই বাহিনীই এই প্রথম কার্যত পর্যদুস্ত হয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার এই বিষয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে যার শিরোনাম, “কোন পথে উপত্যকায় শান্তি আসতে পারে, হাতড়ে বেড়াচ্ছে নয়াদিল্লি”।  যেখানে ভারতের গোয়েন্দা-নিরাপত্তা মহলের হারু ও পর্যদুস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আনন্দবাজার সেখানে লিখছে,  “প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে না পারার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে কেন্দ্র। এক জন জঙ্গির মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরে যে এত বড় মাপের অশান্তি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না গোয়েন্দাদের। এমনকী দিল্লিতে বসে শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তারা দাবি করেছিলেন,বিক্ষোভ সাময়িক। দশ দিনেই থেমে যাবে। তা যে কবে থামবে,সে ধারণাও নেই কারও! উপত্যকার অশান্তি সেটাই!”।খুব সহজে কাতর হন না এমন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর গায়েও আঁচ লেগেছে। আর চুপ থাকা যায়নি এবং আনন্দবাজারের রিপোর্ট তা ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। এসব পরিমাপের দিক থেকে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও কাশ্মিরের এবারের ঘটনায় আর চুপ থাকতে পারেননি। আনন্দবাজারের ভাষ্যটাই তুলে আনছি, এক টিভি সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেছেন,

    “সরকার এতটাই খারাপভাবে কাশ্মির-পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে যে এটাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরে সবচেয়ে বড় দাগ হিসেবেই দেখছে গোটা বিশ্ব”। চার দিক থেকে সবাই বিষয়টিকে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে নাড়াচাড়ার ত্রুটি হিসেবেই দেখছে তাতে সন্দেহ নেই। সেটা এখানে তুলে ধরতে একটু বড় এক উদ্ধৃতি আনন্দবাজার থেকে আনছি। লিখেছে “সমালোচনা হচ্ছিলই। কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুষছিল মোদি সরকারকে। আরএসএস নেতাদের একাংশও মনে করছেন, কাশ্মিরের পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানো হচ্ছে না। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এভাবে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হওয়ায় চাপ আরো বাড়ল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সরকারের ওপরে। কাশ্মিরিদের মধ্যে যে দেশের বাকি অংশ সম্পর্কে নানা রকম মত রয়েছে, সে কথাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতার নিরিখেও সরকার যে ভূমিকা নিচ্ছে, অমর্ত্যরে মতে সেটা বড় রকমের ভুল। এই সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কাশ্মিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা জরুরি। তবে সেটাই কাশ্মিরিদের মূল সমস্যা বলে ধরে নেয়াটা ভুল। …অমর্ত্য সেনের এই সমালোচনার জবাবে সরকারের তরফে কেউ মুখ খোলেননি তাৎক্ষণিকভাবে। এবং ভূস্বর্গে অব্যাহতই রয়েছে অশান্তি। দক্ষিণ কারের কাজিগুন্দে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর জখম আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে আজ। এই নিয়ে ১১ দিনে উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৪। তবে গুলি চালনার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।”

    আনন্দবাজারের এই রিপোর্ট গত ২০ জুলাইয়ের। ফলে নিহতের সংখ্যা এটা সর্বশেষ সংখ্যা নয়। কারফিউর ৫০তম দিনে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৬৯ জন।
    এক কথায় বললে মোদি সরকার এবারের কাশ্মির ইস্যুটি নিয়ে বড়ই পেরেশান আর বেকায়দায় আছে। বেকায়দায় পড়লে মানুষ আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। এখানেও তাই হয়েছে। আর সেটাই এখানে  আমাদের এই রচনার মুল প্রসঙ্গ।

    তবে ঘটনাস্থল এবার ঠিক কাশ্মীর নয়। কাশ্মীর থেকে ব্যাঙ্গালোরে, যদিও ইস্যু সেই একই কাশ্মীর। ব্যাঙ্গালোরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের’ (এআই) শাখা অফিস কাশ্মিরে মানবাধিকার ইস্যুতে এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
    কিন্তু বিজেপির ছাত্রসংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের’ (এভিবিপি) অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে, তাদের আয়োজিত ঐ কাশ্মির বিষয়ক সেমিনারে ভারতের বিরুদ্ধে ও ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লাগাতার স্লোগান দেয়া হয়েছে। তাই অ্যামনেস্টি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এর পরের দু-তিন দিন ধরেই ব্যাঙ্গালুরুতে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিজেপির ছাত্র শাখা। যদিও জবাবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কোনো ভিত্তিই থাকতে পারে না।
    ঘটনার সূত্রপাত সেমিনারের একজন বক্তা, কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিত নেতা আর কে মাট্টু দাবি করেছিলেন “ভারতীয় সেনার মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী দুনিয়াতে কমই আছে”। এই তথ্যগুলো নিয়েছি ভারতীয় বিবিসির ১৬ আগস্টের এক রিপোর্ট থেকে। ব্যাঙ্গালুরুতে ঐ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর আগের শনিবার, মানে ১৩ আগস্ট। ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কিছু কাশ্মীরি ছাত্র, যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। ফলে হিন্দু পণ্ডিত নেতা মাট্টুর ওই বক্তব্যের পর সভায় উপস্থিত কাশ্মীরি যুবকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন, তাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন। আসলে ঐ সভায় হিন্দু নেতা আর কে মাট্টুসহ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের উপস্থিতিও গণ্ডগোল লাগানোর দিক থেকে পরিকল্পিত বলা যায়। দাওয়াতি না হয়েও তারা গণ্ডগোল পাকানোর উদ্দেশ্যে সভায় শুরুতে দলবেঁধে ওই সভায় প্রবেশ করেন। এরপর উসকানিমূলকভাবে কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর তৎপরতার পক্ষে উগ্র ও কড়া সাফাই বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দিয়েছিল তারা।
    কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের পর ঘটনা পরিকল্পনায় মঞ্চে হাজির হয় এভিবিপি। পরের দিন গুলোতে  বিজেপির ছাত্র শাখা এভিবিপি, তারা ঐ অনুষ্ঠানে স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে এবং শহরে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে মিছিল করে জনমত খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে তাঁরা ব্যাঙ্গালুরু অ্যামনেস্টির অফিসে হামলা করেছিল। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে পুলিশের ওপর উলটা চাপ সৃষ্টি করে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা’ করে।
    এ বিষয়ে বিবিসি তাদের রিপোর্টে লিখেছে, অনেকটা তাদের চাপের মুখেই ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ ‘অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার’ বিরুদ্ধে দেশদ্রোহসহ আরো নানা অভিযোগে এফআইআর দাখিল করে। এ ছাড়া বিবিসি আরো লিখেছে, বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সাকেত বহুগুনা বলছেন, “অ্যামনেস্টি ও তাদের মতো আরো কিছু এনজিও বারবার এটাই বলে চলেছে কাশ্মিরে সব সমস্যার মূলে আছে ভারতীয় সেনা। তারা এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে যে, কাশ্মিরের মুসলিমরা সেনাদের হাতে নির্যাতিত। তাদের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, এখন বলুন কোন দেশ এটা সহ্য করবে যে, তাদেরই একটা অংশকে আলাদা করে ফেলতে প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হচ্ছে?’।
    কাশ্মির ইস্যুতে সাধারণভাবে বিজেপির অবস্থান হল, যেভাবে সাকেত বহুগুনার বক্তব্যে দেখা গেছে, মোটা দাগে সেটাই। কাশ্মিরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠলেই সেটাকে তারা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ বলে অভিযোগ আনে। সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তারা জনমনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে থাকে।
    উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগিরে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন যে কাশ্মিরের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠালে তা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ হতেও পারে। কিন্তু না, এটা রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ নয়। এটা আমার কথা নয়, এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার বক্তব্য ও ঐ ধরণের বহু মামলায় বেকসুর খালাসের রায় আছে। আশির দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথম এমন রায় দিয়েছিলেন। যা পরে অন্যান্য অনেক ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা হিসেবে কোর্টের সামনে আনা হয়েছিল। এখানে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার সীমা টেনে দেয়া লাইন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্লোগান – সেটা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাই অথবা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা চাই; যা-ই তোলা হোক এগুলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ ঘটে এমন কাজ নয়। স্বাধীনতার দাবি করে স্লোগান দিলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা সেনাবাহিনী যার বিরুদ্ধেই স্লোগান হোক না কেন। তবে একমাত্র কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্লোগান দিলে বা সশস্ত্র সাংগঠনিক তৎপরতা চালালে বা সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন চালালে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ হবে।
    বিজেপি এই রায়ের কথা জানে। তবুও সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে হাজির করে আবেগ থেকে ফায়দা নিতে চাওয়া তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল। তারা বলছে, ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এখন বলুন, কোন দেশ এটা সহ্য করবে?’ – হ্যাঁ, ভারত রাষ্ট্রই এটা সহ্য করবে, নিরস্ত্র হলেই করবে। করতে হবে এটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়। সেনাবাহিনী অন্যায় করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে, যদি তা নিরস্ত্র হয় এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে না।

    ওদিকে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার আরেক তামাশার দিক আছে। কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু (পুরানা নাম ব্যাঙ্গালোর)। এর রাজ্য সরকার বা প্রাদেশিক সরকার হল কংগ্রেস দলের ফলে এর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসি। বিবিসি তাদের ওই রিপোর্টে বলছে, “কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া আবার যুক্তি দিচ্ছেন, একটা সভায় দেশবিরোধী স্লোগান ওঠার পরও সরকার হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ে তার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে”। অর্থাৎ একজন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তিনিও বিজেপির রাজনীতি অনুসরণ করে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, পছন্দ করছেন। কেন? তিনি তো বিজেপি করেন না, কংগ্রেস দল করেন ও সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী! তাতে কী? তিনিও বিজেপির সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে জনমনে বিভ্রান্তি জাগানোর বিরুদ্ধে দাড়াতে, সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিজেপি হিন্দুত্বের জিগিরের এমনই এক আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তিনি কিছুতেই ঐ  হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ারের সামনে দাড়াতে চাচ্ছেন না, এতে তিনি অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ার তুলে এর সামনে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীকেও বিজেপির রাজনীতি করতে বাধ্য করেছে বিজেপি। অথচ সব দলই জানে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বা অভিযোগ কোনো হাইকোর্ট আমল করবেন না, বেকসুর খালাস দিয়ে দেবেন। কিছু দিন আগে দিল্লীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা কাহানাইয়ার মামলাতেই একই ঘটনা হয়েছিল। মামলা চলে নাই। কাহানাইয়া এখন মুক্ত কিন্তু কয়েক মাস তাকে জেলে থাকা সহ বিশাল হয়রানী পোহাইতেই হয়। অর্থাৎ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ নিতে, হয়রানির রাজনীতি করতে কংগ্রেস বিজেপির থেকে প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে থাকতে চায় না। এই হলো হিন্দুত্বের রাজনীতি, এই তার মহিমা।
    হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা এতই যে, বিবিসি লিখেছে, ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিলেও দিল্লিতে দলের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলছেন, “একটা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা যায় কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে”।
    মি. সিংভির বক্তব্য, ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দেয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা বোধ হয় সমীচীন নয়।’ ‘কোনো ব্যক্তি হয়তো তার বাকস্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা সংস্থাকে এভাবে অভিযুক্ত করা ভুল বলেই আমার ধারণা।’ অর্থাৎ কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি জানেন বুঝেন নিজেই এটাকে ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি’ দিয়ে নাচা বলছেন। এর পরও হিন্দুত্বের রাজনীতি করার লোভ না ছেড়ে বরং চিকনে মেরে ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই’ বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা ছাড়তে চাচ্ছে না। যাতে এ-ও হয় সে-ও হয়, এমন একটা ঝাপসা অবস্থান থাকে।
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    লেখাটা এর আগে গত ২৮ আগষ্ট দৈনিক নয়াদিগন্তে অনলাইনে (প্রিন্টে ২৯ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে আপডেট ভার্সান হিসাবে এখানে আবার ছাপা হল।

     

     

  • মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

    মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়
    গৌতম দাস
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বৃহষ্পতিবার

    মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

     

    ঘটনার শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে। সেখানে তিনি এই ভাষণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ( এবং সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশেও) দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ এনেছেন। ‘‘আমি বালুচিস্তান, গিলগিট, ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়ে বলতে চাই। এ নিয়ে ভারত সরব হওয়ায় গত কয়েক দিনে ওখানকার অনেক লোক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।’’ এর ব্যাখ্যা হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে (ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি যোগাযোগে করলে) নাকি বলা হয়েছে, মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ এনেছেন এ জন্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আগের দিন ১৪ আগস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে চলমান লাগাতার বিক্ষোভ, কারফিউর প্রসঙ্গ টেনে একে ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মানে এসব আসলে একটা পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা, যেখান থেকে সত্যতা বের করা কঠিন। তবে ১৪ আগস্টের আগেও ড্রেস রিহার্সেলের মত করে মোদী বেলুচ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১২ আগস্ট ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে ভারতের কাশ্মিরকেন্দ্রিক সব রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক হয়। মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরে লাগাতার কারফিউ কাশ্মিরের জনজীবন স্থবির করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে মোদী সর্বপ্রথম বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আনন্দবাজারের রিপোর্টের ভাষায়, ‘গত শুক্রবার কাশ্মির প্রসঙ্গে সবর্দলীয় বৈঠকে প্রথম এই নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সেই বৈঠকে বলেছিলেন,পাক-অধিকৃত কাশ্মির ও বালুচিস্তানের মানুষ যারা এখন অন্য কোনো দেশে থাকেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের নির্যাতনের কথা সামনে আনতে হবে।’ সার কথা হল, কাশ্মির অসন্তোষে বুরহান ইস্যুর পর থেকে বর্তমানে ভারত যে চাপের মুখে আছে সেখান থেকে মুক্তি পেতে পাল্টাপাল্টিতে পড়ে ঘটনা এখন মোদীর ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ পর্যন্ত ঠেকেছে।

    নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলা অন্তত ভারতের দিক থেকে একেবারেই নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্র ভারতের জন্য শুধু নতুন তাই নয়। কারণ মানবাধিকার ইস্যু সবসময়ই দু’ধারী তলোয়ারের মত। কাঁচের ঘরে বসে অ্ন্যের উপর ঢিল ছুড়ার মত। ফলে তা ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ভারত নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এক কথায় বললে কারো বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ আনা ভারত কখনোই নিজের কাজ মনে করেনি বা নিজের চায়ের কাপ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আজ ভারত যেমন এক এককাট্টা রাষ্ট্র বলে দেখি কলোনি আমলের বৃটিশ-ভারত ঠিক তা ছিল না। সরাসরি কিছু প্রাদেশিক (সেকালে প্রেসিডেন্সী বলা হত) সরকারি এলাকা আর প্রায় ৫০০ এরও বেশি ছোট বড় করদ রাজ্য – এই সব মিলিত ভুখন্ডটাকে বলা হত বৃটিশ-ভারত। বিগত ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্মের সময় থেকেই অন্তত পরের তিন বছর ধরে সমানে পিটাপাটা আর সামরিক বলপ্রয়োগ করে বিভিন্ন রাজার রাজ্যকে মুল ভুখনন্ডে অন্তর্ভুক্তিতে বাধ্য করতে হয়েছিল। অর্থাৎ নেহেরুর নেতৃত্বের নতুন ভারত সরকারের অধীনে পুরান স্টাইলে কোন রাজাকে কর-খাজনা দিয়ে করদ রাজ্য হয়ে থাকার ব্যবস্থা রাখেন নাই। যেখানে ভারতভুক্তি আপোষে হয় নাই সেখানে সামরিক বল প্রয়োগ করে তা করা হয়েছিল। এর পরবর্তিকালের ভারতে একের পর এক লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মাওবাদী আন্দোলনের সমস্যা ভারত রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাশ্মির, পাঞ্জাব, নকশাল আর উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের আন্দোলন সেসবের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রকে জন্মের পর থেকেই লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বলপ্রয়োগ, হত্যা-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দমিয়ে নিজের রাষ্ট্রকে সংহত রাখতে হয়েছে ও হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট সেই রাষ্ট্রের কাছে ‘মানবাধিকার’ শব্দটিই হারাম। কারণ সে নিজেই সর্বক্ষণ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হবে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা। জন্মের পর থেকে এটাই এত দিন ভারত রাষ্ট্রের পুরানা সব সরকারের গৃহীত নীতি ছিল। ছিল বলতে হচ্ছে, কারণ অগ্রপশ্চাৎ যথেষ্ট বিবেচনা করে মোদি সেই নীতি এখন ভেঙেছে তা মনে করা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত চলতি কাশ্মীর ক্রাইসিস আরও মহীরুহ হয়ে সামনে আসতেছে এটা আঁচ  করে, মোকাবিলায় উপায়ন্ত না দেখে আপাতত “কুইনাইন খাইয়ে” যেভেবেই হোক জ্বর ছাড়াবার ব্যবস্থা এটা। এতে এরপর কুইনাইন সারাবে কে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
    ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা – এটাই এতদিনের ভারতের নীতি ছিল তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের দিকে তাকালে। যেকোনো পশ্চিমা বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর শুরুতে ভারত সব সময় সবার আগে কবুল করিয়ে নেয় যে ‘কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু’, ভারত এই ইস্যুর ‘কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না’, এমনকি ‘জাতিসঙ্ঘেও মুখোমুখি হতে চায় না’ – এ ব্যাপারে ভারতের সেই পরদেশী বন্ধু একমত আছে। এমন একমত হবার পরই কেবল ভারত সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে আগায়। সে কারণে যে আমেরিকা মানবাধিকার ইস্যুকে অন্য রাষ্ট্রের পেছনে লাগার, তাকে বিব্রত করার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি বছর রিপোর্ট বের করে থাকে, অথচ সে ভারতের কাশ্মির ইস্যুতে উল্টো নিজেকেই নিয়ন্ত্রিত রাখে। তো এই হল, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইস্যু কেন ভারতের চায়ের কাপ নয়, এটা ভারতের জন্য নয়- এই ভাব ধরে রাখার ভারতীয় স্টাইল। তাই ‘মানবাধিকার’ ভারতের জন্য ‘নো গো’ বা অগম্য এলাকা- এভাবেই এত দিন ছিল। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীদের ব্রিফিংও এত দিন এই আলোকে সাজানো ছিল, এভাবেই চলে আসছিল।
    তাই  ‘বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’- মোদির এই নতুন বয়ানের পথ অনুসরণ করা দেখে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে ভারতের ভেতরেরই অন্য রাজনৈতিক, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া গোষ্ঠী। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, মোদির রাজনৈতিক লাইনটি এ রকম যে, মোদি এখন থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তুলবে। আর তাতেই নাকি পাকিস্তান কুপোকাত হয়ে যাবে। মোদির এই লাইনের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, ভারতের কাশ্মিরের অসন্তোষ তৈরি করার জন্য পুরোপুরিভাবে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করে দোষ চাপানোর ফলে অনেক রিলিফ পাওয়া যাবে, চাপ কমানো যাবে। ঠিক যেমন বেলুচিস্তানে অসন্তোষের জন্য পাকিস্তান ভারতকে দায়ী করে থাকে। উভয় পক্ষের এসব দায়ী করার ঘটনার সাথে সবচেয়ে ভাল তুলনীয় ঘটনা হল, ঠিক যেমন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হত ভারতের প্ররোচনাতেই নাকি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। যেন বাংলাদেশের জনগণের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্খা বা লড়াই-আন্দোলন বলে কিছু ছিল না। আবার তাই বলে বাংলাদেশের আন্দোলন বলশালী হলে এর মধ্যে ভারতের কোনোই স্বার্থ-প্রভাব ছিল না, এটা ঠিক তা বলাও নয়। ব্যাপারটা হল হবু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ফলে স্বার্থের এক সম্মিলন আমরা দেখেছিলাম। তবে প্রপাগান্ডার সময় মুখ রক্ষার্থে পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনার কথাই বলবে। ঠিক যেমন ভারতের কাশ্মির সমস্যা ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের প্ররোচনাকে দায়ী করার পথ ধরতে চাইছে। প্রচারণার এসব স্টাইল নতুন নয়। যেটা নতুন তা হল ভারতের আমলা কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা মোদীর এই নতুন রাজনৈতিক লাইনের ভেতর বিরাট বিপদ ও সমস্যা দেখছে।
    আনন্দবাজার পত্রিকা ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট মোদির বক্তব্য নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা তখনো ছিল খোশমেজাজে, কারণ বিপদ তখনো কেউ তাদের মনে করিয়ে দেয়নি। এ দিনের আনন্দবাজারের দু-দু’টি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-পাক সঙ্ঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান’ এবং ‘কাশ্মিরের জবাবে বালুচ তাস, পাকিস্তানকে ফের খোঁচা মোদির’– যা তাদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। আনন্দবাজার সবসময় তাতানো সেনসেশনাল আর খুবই সস্তা জাতীয়তাবাদী শিরোনামে রিপোর্ট লিখে থাকে। এই উচ্ছাস তেমনই। তবে সে হানিমুনের পিরিয়ড এখানেই শেষ। এর পরের দিন থেকে আনন্দবাজারসহ সব মিডিয়া, কূটনীতিক সবাই খুবই সতর্ক, যার প্রতিফলন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে। পরের দিন ১৭ আগস্ট থেকে মিডিয়া পুরো উল্টে যায়। যেমন এবার আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘লাভ কী হবে বালুচ তাসে, উঠছে প্রশ্ন’ অথবা আরও একদিন পর ১৮ আগস্টের রিপোর্ট, ‘বালুচিস্তান নিয়ে বেপরোয়া হতে গিয়ে মোদি এখন ঘোর কূটনৈতিক প্যাঁচে’। এখানে ভারতীয় বাংলা পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বাংলায় বুঝানোর সুবিধা নিলাম। ইংরেজি পত্রিকা রিপোর্টগুলোও কমবেশি একই রকম।
    তাহলে কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা এতে কী বিপদ দেখলেন? তারা আসলে বলতে চান মানবাধিকার রেকর্ডের রিপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারত প্রতিযোগিতা করলে তাতে পাকিস্তানের যা হবে হোক, কিন্তু ভারতের কাপড় খুলে যাবে। কারণ জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হুমকি সামলাতে গিয়ে ভারত মারাত্মক দুস্থ ও বিপজ্জনক অবস্থায় আছে; কারণ তার মানবাধিকার রেকর্ড খুবই খারাপ। ফলে মানবাধিকারের কথা যত চেপে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভাল।
    তাই আনন্দবাজার লিখছে, “…দ্বিধাবিভক্ত দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক শিবির। অনেকের প্রশ্ন, ইসলামাবাদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছোড়ার এই নতুন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে কি না?”। আর সবশেষে লিখছে, তবে কূটনীতিকদের একাংশের মত, “বালুচিস্তান নিয়ে ভূকৌশলগত খেলা চালিয়ে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে। কিন্তু তাতে কাশ্মির সমস্যা মিটবে না। বালুচিস্তানের সাথে চিন ও ইরানের স্বার্থও জড়িত। মোদির এই তাসে ওই দু’টি দেশও ক্ষুব্ধ হবে বলেই মত অনেক কূটনীতিকের”। যদিও মোদীর এই মানবাধিকার বয়ানের লাইনের আরও এক আসল কারণ আছে তা এখানে আনন্দবাজার বলে নাই। সেটা এই রচনার শেষের দিকে আনব।
    অর্থাৎ এখানেও আসল কারণ লুকিয়েছে মিডিয়া রিপোর্ট। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কংগ্রেসের সাবেক বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তিনি আসল কারণ কিছুটা বলেছেন। আনন্দবাজার বলছে, সলমন খুরশিদের মতে, “অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু খোলাখুলিভাবে তা নিয়ে ভারত নাক গলায় না। …সে দেশের নেতাদের কাছে ঘরোয়াভাবে আমরা উদ্বেগ জানাই ঠিকই। কিন্তু সেটাকে কখনো নীতি হিসেবে ব্যবহার করি না। তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের পার্থক্য কী হলো? …বালুচিস্তান নিয়ে ভারত গলা চড়ালে পাকিস্তানও কাশ্মির নিয়ে আরো সরব হওয়ার সুযোগ পাবে”। তবে কংগ্রেস দল সলমন খুরশিদের কথাকে নিজ দলের কথা তা বলতে পারেনি। বরং বলেছে এটা সলমনের ব্যক্তিগত মতামত। আনন্দবাজার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছে, “ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেস মোদির পাকিস্তান বিরোধিতা থেকে দূরে যেতে চায়নি। তাই এমন সিদ্ধান্ত”।
    এখানে এখন একটা তথ্য দেইয়া যাক। পাঠকের মনে হতে পারে এগুলো ভারত-পাকিস্তানের “সাদিও পুরানা” ক্যাচাল, এতে আমাদের কী! এমন দেশী পাঠককে সন্তুষ্ট করার জন্য তথ্যটি হল, আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার তথ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সাথে কথা বলেছেন। ওই পত্রিকার এসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনাম, ‘মোদীর বেলুচিস্তান ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন’ (Bangladesh backs Modi on Balochistan)। ওই রিপোর্ট থেকে দু’টি উদ্ধৃতি আনব এখানে। এক. ইনু বলেছেন, “বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে (বেলুচ) মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য এবং আমরা শিগগিরই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আমাদের সরকারের নীতি ঘোষণা করব”। এরপর উদ্ধৃতি দুই. “দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাপারের টেররিজম পাঠিয়ে আর বেলুচদের মতো গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের নিজ ভূখণ্ডে নির্যাতন করে ইসলামাবাদ কী পেতে চায় তা ব্যাখ্যা করা উচিত”।
    মানবাধিকারের নীতিগত দিক থেকে এবং সে বিচারে আমাদের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। যেকোনো মুক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্যাতনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খুবই মারাত্মক। কিন্তু তবু তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি না বলা মুশকিল। কারণ, যে কেউই ওই একই বাক্যে বেলুচ শব্দের জায়গায় কাশ্মির আর ইসলামাবাদের জায়গায় দিল্লি বসিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এতে ভারতের কোনো সরকারি পাঠক খুশি না হয়ে উল্টো বিপদ দেখে ফেলতে পারেন।

    সবশেষে এখানে মোদীর মানবাধিকার কর্মী হবার এই লাইন কেন নিলেন এর আসল কারণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এটা সেপ্টেম্বর মাস। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ২৫ তারিখের আশেপাশে নিউইয়র্ক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ে সরগরম থাকে। কারণ জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলে। বিগত ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরে গণভোট দিবার এক প্রস্তাব পেন্ডিং বা চাপা পড়ে আছে। এজন্যই ভারত বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের আগে কবুল করিয়ে নিয়ে রাখে যে, “কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু”, ভারত এই ইস্যুর “কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না”।  কাশ্মীরের অসন্তোষ চলছে। এবারের বুরহান ইস্যুতে এপর্যন্ত প্রায় ৭৫ এর উপরে মানুষ সেখানে মারা গিয়েছে।  তাই ভারতের আশঙ্কা পাকিস্তান এবারের জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে কাশ্মীর ইস্যুকে সরগরম করার চেষ্টা করবে। তাই পালটা কৌশল হিসাবে আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আর টেররিজমের ইস্যু তুলে রাখার কৌশল নিয়েছে ভারত। অন্যান্য মিডিয়া ব্যাপারটা আবছা ভাষায় বললেও ভারতের livemint পত্রিকা স্পষ্ট করে লিখেছে পাকিস্তান ২২ জন ডিপ্লোম্যাট নিয়োগ দিয়েছে যারা কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লবি করবে। মোদীর ভাষ্য জাতিসংঘে এই লড়াইয়ে জিতবার জন্যই সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাই এবারের G20 বা টপ ২০টা অর্থনীতির রাষ্ট্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ৫ সেপ্টেম্বর চীনে। মোদী সেখানকার বক্তৃতায় নাম না ধরে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও টেররিজমের অভিযোগ তুলে বক্তৃতা করেছেন। আর ওদিক সিপিএম এর সীতারাম ইয়াচুরী মোদীকে অভিযোগ করছেন যে তিনিওই পাকিস্তানকে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন,

    “We are giving an opportunity to Pakistan by raising the Balochistan issue. Now Pakistan may say that since India is taking about Balochistan, which is an integral part of that country, they have the right to talk about Kashmir. With this kind of foreign policy, we are giving an opportunity to others to internationalise the Kashmir issue,” Mr. Yechuri said.

    অর্থাৎ ইয়াচুরি বলতে চাইছেন, আমরা সবসময় বলে এসেছিলাম, “কাশ্মীর ইস্যু ইন্টারনাশনালাইজ করতে দিব না। সেখান থেকে মোদী সরে আসাতেই এটা ঘটতেছে”। এখন দেখা যাক, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা কী দেখব। আগামি নভেম্বরে সার্ক সম্মেলন বসার কথা পাকিস্তানে। আদৌও তা হবে কিনা তা পুরাটাই নির্ভর করছে এই সেপ্টেম্বরের ফলাফল কেমন কী হয়, তিক্ততা কেমন মাত্রায় ছড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছু উপরে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যেতে পারছেন না বলে প্রচার হওয়া শুরু করেছে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ২১ আগষ্ট ২০১৬ (প্রিন্টে ২২ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট  করে আবার ফাইনাল ভার্সান আকারে ছাপা হল।]

  • হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

    হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে
    গৌতম দাস
    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬,রবিবার

    হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

    ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলত হিন্দুত্ব। এটা বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েরই অবস্থান; এটা তারা সঠিক মনে করেন, মেনে চলেন। বরং এর কোনো বিচ্যুতি ঘটছে মনে হলে একে অপরকে দোষারোপ করে। কেন করেন? কারণ তাদের মনে হয়, প্রায় ২৯টা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মানুষের এত বিশাল জনসংখ্যার মানুষকে কী দিয়ে একত্রে ধরে রাখা হবে বা যাবে? তবে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও বাছবিচার ছাড়াই তাদের ধারণা ‘হিন্দুত্ব’ – এটাই সেই সুপার গ্লু যা তাদের সব আশঙ্কার সমাধান।

    আসলেই কী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে এমন একটা সুপার গ্লু – হিন্দুত্ত্বের বা কমন ধর্মীয়  ভিত্তি অথবা কমন ভাষার ভিত্তি  ইত্যাদি একটা না একটা ‘আইডেনটিটি’ এরকম একটা কিছু লাগেই? এমন ভাবনা থেকেই দুনিয়াতে আইডেনটিটির রাজনীতি শুরু হয়ে আছে। । ‘আইডেনটিটির রাজনীতি’ ছাড়া কী রাষ্ট্রগঠন অসম্ভব?  আমরা নিশ্চিত রাষ্ট্রচিন্তায় এদিকটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয় নাই। অথচ আবার এই হিন্দুত্ত্বের ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের মূল কারিগর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘প্রগতিশীলদের’ চোখে পাকিস্তান – ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাদের অভিযোগ। অথচ সারকথা করে বললে, বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা ভাল বা আদর্শ, ধর্মের (হিন্দুত্ত্ব বা মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা খুব খারাপ বা অগ্রহণযোগ্য এটা বলা বা ভাববার সুযোগ নাই।

    সে যাক, ভারতের প্রধান দুই সর্বভারতীয় দল দল কংগ্রেস ও বিজেপি এরা এ জায়গায় ঐকমত্য। অন্যদের মধ্যে ‘বাস্তববাদীতার দোহাই দেয়া’ সিপিএম সেও ঐ দুই দলের মতো করে ভাবে ও মান্য করে যে ধন্বন্তরি ওষুধ বা সুপার গ্লু-এর নাম হিন্দুত্ব। কিন্তু কোনো দল প্রকাশ্যে মানে ফরমালি তা স্বীকার করে না। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলে, স্বীকার করে যুক্তি দেয়। তবে বলা না বলা, সেটাঅন্য জিনিস। ফলে এখান থেকেই আরো দুই খান কথা বলে তাদের বিভক্তি শুরু হতে দেখি আমরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিন্দুত্ব- কংগ্রেস ও বিজেপির এ ব্যাপারে একমত হয়ে এটা মেনে নেয়ার পরও প্রত্যক্ষভাবে হিন্দুত্ব ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের কথা বাইরে প্রকাশ বা স্বীকার করা ঠিক হবে কি না- এই প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির ভিন্নতা শুরু। কংগ্রেস মনে করে, কৌশলী হওয়ার দরকার আছে। কথাটা সেকুলারিজমের ভেক ধরে বলতে হবে। বুঝতে বুঝাতে হবে হিন্দুত্ব কিন্তু মুখে বলতে হবে ‘সেকুলারিজম’। উপরে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে এর আড়ালে বসে মুখে সেকুলারিজম বললে হিন্দুত্বের এফেক্ট পাওয়া যাবে, আনা যাবে। এই হল কৌশল। এর বিপরীতে বিজেপি মনে করে, সেকুলারিজম- এটার আবার কী দরকার? হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রভিত্তি হিসেবে মানতে পারলে বলতে পারব না কেন? বরং ‘বোকা’ হয়ে লাভ নেই। হিন্দুত্বের গর্বকে বুক উঁচা করে সামনে আনলে এই ‘আইডেন্টিটির রাজনীতি’ কংগ্রেসের ওপরে তাদেরকে একটা বাড়তি মাইলেজ দিবে। কারণ হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সিতে এটা খুবই ফলদায়কভাবে মানুষের মনে সুড়সুড়ি লাগানোর ক্ষমতা রাখে। ভারতের সেকুলারিজম সত্যিই এমন এক তামাশার নাম।

    ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির মূল দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের (আরএসএস)  গৃহীত ও নির্ধারিত এক কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’ চালু করেছে। এমন কর্মসূচির পক্ষে লজিকটি হল, ভারতে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের যারাই আছে, তারা কোনো না কোনো সময়ে হিন্দু থেকেই ধর্মান্তরিত। অতএব, এই যুক্তিতে আরএসএস-বিজেপি তাদের ‘ওয়াপাস’- মানে ফিরিয়ে আনার প্রচার-প্রপাগান্ডার কর্মসূচি নিতে পারে, ফোর্স করতে পারে, বিজেপি সরকারের প্রটেকশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে, পাবলিক নুইসেন্স করতে পারে, সব পারে। আর এতে এক কামে সব কাম হবে। হিন্দুত্বের জয়জয়কার হবে, ভোটের বাক্সও ভরে উঠবে। বাড়তি লাভ হল কংগ্রেসও ভয়ে সিটিয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। কারণ এতে কংগ্রেসকে বিজেপি খুব সহজে উভয় সঙ্কটের ক্যাচালে ফেলতে পেরেছে। কংগ্রেস ভেবে ভীত যে, ‘ঘর ওয়াপসির’ বিরোধিতা করতে গেলে কংগ্রেসঈ হিন্দুরা হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সির প্রভাবে বিগড়ে গিয়ে যদি কংগ্রেসকে ভোট না দেয়! এই ভয়ে কিছু না বলে দলটি চুপ থাকে।
    আসলে বিজেপি এ জায়গায় স্মার্ট ও ‘সৎ’। সে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়, হিন্দুত্বের রাজনীতি করে এবং প্রকাশ্যে তা বলেও। আর স্মার্ট এ জন্য যে, সে বুঝে গেছে কংগ্রেসকে এভাবে উভয় সঙ্কটে ফেলে জব্দ করা সহজ। এর পরও মূল বিষয় এখানে কন্সটিটুয়েন্সি। কন্সটিটুয়েন্সি মানে- ভোটারদের ক্যাটেগরি বা গ্রুপ অথবা ভোটার এলাকা; যারা কোন কথা, কোন দাবি অথবা কোন ইস্যুর পক্ষের ভোটার- এক কথায় কোন ক্যাটেগরির ভোটদাতা, কোন ভোটারদের গ্রুপে একে ফেলা যায় এই অর্থে ‘ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি’। আগেই বলেছি- কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই একমত যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র থাকুক এবং থাকতেই হবে। এর পক্ষে তাদের কমন যুক্তি হল, এটা না হলে ভারতকে এক রাখা, একভাবে ধরে রাখার আর কোনো উপাদান বা আঠা-গ্লু নেই। কারণ রাষ্ট্র বলতে তারা একমাত্র এই আইডেন্টিটি-ভিত্তিক রাষ্ট্রই কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য কোনো রাষ্ট্র হওয়া আদৌ সম্ভব কি না নেহরুর জমানা থেকেই এই পর্যন্ত এটা নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা আছে বলে জানা যায় না। এর বাইরে তাদের কল্পনা আগায় না, ভোঁতা করে রেখে দেয়া থাকে, তাই কাজ করে না। বরং আইডেন্টিটি-ভিত্তিক হিন্দুত্ব চিন্তার সুড়সুড়ি জাগানোর ক্ষমতা সীমাহীন। তাই সেটার প্রতি লোভে সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সারকথা দাঁড়াল ওপরের সেকুলার পর্দা সরিয়ে ফেললে কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আসলে একই। আর এটাই হল সমস্যার গোড়া। কেন? কোন রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা সাধারণভাবে বিজেপি যখন ‘ঘর ওয়াপসি’ ধরনের কর্মসূচি চালাতে নেমে পড়ে তখন কংগ্রেস এর কোনো বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি তো ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণার’ সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে সবচেয়ে পারফেক্ট। আসলে কংগ্রেস মনে করেছিল বা বলা ভাল, নিজের সেকুলারিজম স্ট্রাটেজিতে নিজেকে সাজিয়েছিল এই মনে করে যে, যেকোনো হিন্দু বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু বুঝবে তার হিন্দুত্ব সেকুলারিজমের মোড়কে ‘ব্রান্ড করে’ প্রকাশ করাই সবচেয়ে লাভের। কারণ এতে সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকে তো পাওয়াই যাবে। সেই সাথে সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আর অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকেও কাভার করা যাবে- কংগ্রেস অনেক আগে থেকেই এসব অনুমানের ওপর সাজানো দল। কিন্তু বিজেপির ঘর ‘ওয়াপসি কর্মসূচি’র সামনে কিছু বলতে না পারায়, মুখ বন্ধ রাখতে হওয়ায় কংগ্রেসের কাম্য, তিন ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিই কংগ্রেসের ওপর বেজার হচ্ছে। তারা কংগ্রেসকে অকেজো মনে করছে। কারণ এই তিনের প্রথমটা, সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- এরা মনে করে কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপিই ভালো ও সঠিক। সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিতে যারা পড়ে, এদের মধ্যে পশ্চিমা জীবনকে আদর্শ মানা আধুনিক ভোটাররা এমনিতেই গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এরা নিজের ‘ক্লাস সচেতনতার’ কারণেও নিজেই আলাদা ও বিশেষ হয়ে থাকতে চায়। এরা ঘর ‘ওয়াপসি’র মতো কর্মসূচির সামনে নিজেই অসহায় মার্জিনালাইজড বোধ করে। আর তৃতীয়, অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- ঘর ওয়াপসি দেখে এরা হতাশ হয়ে কংগ্রেসকেই অভিশাপ দিতে থাকে যে, কংগ্রেস ‘সেকুলারিজমে’ সিরিয়াস না। এবার  গত মে মাসে সদ্যসমাপ্ত আসামের নির্বাচনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, হিন্দুত্বের ভোটাররা কংগ্রেস ছেড়ে কিভাবে বিজেপিমুখী হয়েছে।
    তবে এর ব্যতিক্রম কী হতে পারে তা বোঝার জন্য কাছাকাছি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মমতা বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। বিশেষত ঐ একই সময় গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যদি খোজ করা হয় যে, ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র প্রশ্নে মমতার অবস্থান কী? মমতা তত্ত্ব জানেন না, তত্ত্ব করেন না, তত্ত্বের বড়াইও তাঁর নেই। মমতাকে সম্ভবত মাঠ অথবা  ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ দেখার ভিত্তিতে চলা পপুলার রাজনীতিক বলা সঠিক হবে। ফলে তাকে বুঝতে হবে তার বাস্তব তৎপরতা দিয়ে। প্রথমত, তিনিই দেখালেন সেকুলারিজম নামের ছলনা না করেও প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিরও নেতা হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মোট মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। ৩-৪% বাদ এরা সবাই আজ মমতার পিছনে। এমনকি মুসলীম লীগ অথবা সিপিএমে যারা মুসলমান নেতা ছিলেন তাঁরা গত নির্বাচনে মমতার দলের টিকিটে ভোটে দাড়িয়েছেন এবং জিতেছেন। তবু মমতা আজ পর্যন্ত কোথাও বলেননি যা তিনি করছেন তিনি সেটাকে সেকুলারিজম নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছা করেন অথবা একাজকে সেকুলার বলে ডাকার দরকার আছে। গত রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন নিজ দল আবার বিজয়ী হয়েছে জানার পরে মিডিয়া মন্তব্যের কোথাও এই বিজয়কে তিনি সেকুলারিজমের জয় বলার দরকার মনে করেননি। বরং বলেছেন, বিজেপি হিন্দুত্বের কথা তুলে সব কিছুকে ভাগ-বিভক্ত করে এটা তার অপছন্দ। আবার বিগত ২০১৪ সালে বর্ধমানে কথিত জঙ্গি বোমা ইস্যুতে মুসলমানবিদ্বেষী ও তৃণমূল বিরোধী যে মিথ্যা জঙ্গী-আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল, বিজেপির অমিত শাহ তা করেছিলেন আর লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম এতে তাল দিয়ে নিজের রুটি সেঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করেও ফলাফল প্রকাশের দিন তবুও তৃণমূল দল অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি সংযত আচরণ করেছে। বলেনি যে, মুসলমানেরা ‘এবার দেখিয়ে দিয়েছে’। ‘বর্ধমান ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছে’- এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও প্রকাশ করেনি। মমতার দল ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ জুলাই দলের ১২ কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে ‘শহীদ দিবস’ পালন করে থাকে। এবারের ২১ জুলাই দলীয় কর্মসূচিতে জনসভায় দেয়া মমতার বক্তৃতাকে মিডিয়া শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ছাগল মুরগি খেলে দোষ নেই। গরু খেলেই দোষ!”। ” কেউ নিরামিষ খান। তাই বলে যারা আমিষ খান, তাদের আক্রমণ করবেন?”। ” শাড়ি-ধুতিতে দোষ নেই। যত অপরাধ সালোয়ার-কামিজ আর লুঙ্গিতে?” এ ছাড়া নাম না ধরেই বিজেপির বিশেষায়িত দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) সম্পর্কেও কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ভারতবাসী কী পরবে, কী খাবে- সেগুলো ঠিক করে দেবে একদল লোক?”। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি বুঝে নেয়া যায়। তবে এটা মমতাকে আদর্শ বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন মনে করলে ভুল হবে। মমতার রাজনৈতিক ঝোঁকের ভেতরে ‘রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হতে হবে’ এমন চিন্তার বাইরে থাকার চেষ্টা আছে। এতটুকুই বলা হচ্ছে। তবে তা শেষে কোথায় যাবে তা এখনই বলতে চাওয়া ভুল হবে।
    ইতোমধ্যে মোদির বিজেপি ‘ঘর ওয়াপাসির’ পরে – গরু খাওয়া, জবাই ইত্যাদি নিয়ে আরেক তুলকালাম ‘গোরক্ষা কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও পর্যন্ত গরু খাওয়া, জবাই করা যাবে না – এটা কেন্দ্র বা মোদি সরকারের কোনো আইন নয়। কেবল মহারাষ্ট্রসহ আরো কিছু রাজ্যের আইনে তা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এটা স্থানীয় আইন; বাকি আর রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তা পালনীয় নয়। কিন্তু মোদি সরকার বা খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তিনি বিএসএফকে ‘গোরক্ষার’ পক্ষে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। যেসব রাজ্যে গোরক্ষার এমন আইন নেই, সেখানেও তা ঠেকাতে বিজেপি কর্মীরা মাঠে ‘গোরক্ষক’ সেজে নেমে জনগণকে নাজেহাল করছে। মধ্যপ্রদেশে দুই মহিলাকে তারা মাংস বহন করছিলেন এই অজুহাতে পুলিশের সামনেই তাদেরকে নির্যাতন-নাজেহাল করেছে। দিল্লির শহরতলির ভেতর চলাচলকারী ট্রেনে এমনকি ডিম – তা হাতে নিয়ে কোনো যাত্রী তা বহন করতে পারবেন কি না এটাও এখন ট্রেন কোম্পানি ও পুলিশের কাছে ইস্যু। তারা নজরদরি বসিয়েছে। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন অথবা উচ্চ আদালতে এসব হিন্দুত্বের দলের বিরুদ্ধে তাদের সেক্টোরিয়ান আচরণ এবং সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে েকশন নিবার সুযোগ আছে তা করছে না, কেউ সেখানে অভিযোগ করারও সাহস দেখাচ্ছে না। মানে হিন্দুত্বভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র এতই সেকুলার যে, অভিযোগ করার কাউকে আমরা দেখি না। উলটা দিকে বিজেপিকে থামানোর কেউ নেই। এটা প্রমাণ করে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি কত বেপরোয়া ও ডমিনেটিং। তাহলে?

    হঠাৎ গত ৬ আগস্ট থেকে কিছু উল্টা হাওয়া বইতে দেখা গেছে। খোদ নরেন্দ্র মোদি এ দিন নিজেই নিজের দলীয় ‘গোরক্ষকের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদেরকে ‘সমাজবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত!’ “নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গোরক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।” মোদির কথায়, ‘এসব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’ — অবাক করা হঠাৎ এই গেম চেঞ্জ? এটা কেন? ভারতের মিডিয়া আসন্ন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে এর পেছনের কারণ বলে ব্যাখ্যা করছে। ওখানে ভারতের প্রকট জাতবর্ণের বিভক্তিতে ডুবে থাকা সমাজের দলিত- চর্মকার, ঋষি, কসাই, মাংস ব্যবসায়ী, গরু ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা হল উত্তর প্রদেশের এক বড় সমাজ; আসন্ন ভোটে তাদের মন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদের ভোট ছাড়া নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া যাবে না টের পেয়েই নাকি মোদীর এমন হার্ট বদল। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জনবিন্যাস ও গঠনপ্রকৃতির দিক থেকে (জাতপাতের ধরনসহ) সাথে লাগোয়া বিহার রাজ্যের অনেক মিল। আর গত বছরের শেষে নভেম্বর ২০১৫, বিহারের নির্বাচনের সময়ও একই ভাবে ‘গোরক্ষা’ ইস্যু বিজেপি তুলেছিল ও চলছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিগত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধসের পরাজয় সেটা। ফলে সেই  আশঙ্কা মোদিকে স্পর্শ করেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোট-রাজনীতিতে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তিকে স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভা্েব দুর্বল কতে নির্বাচন করতে চাইছে বিজেপি। তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির হার-জিত ভারতে বিজেপি শাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই বলছেন, উত্তর প্রদেশের হার মোদির সরকারের আগামীতে ২০১৯ সালে পরেরবার সরকারে না আসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখা এর আগে গত ১৪ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১৫ আগষ্ট প্রিন্টে) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্তন সংযোজন ও এডিট করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

  • নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
    গৌতম দাস
    ২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

     

     

    নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

    গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
    বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
    চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
    এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
    ১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
    ২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
    প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
    এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
    চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

     

  • কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

    কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়
    গৌতম দাস
    ১৮ আগস্ট ২০১৬

    কমিউনিটিতে মৃত মানুষের প্রতি জীবিতদের দায়

    সম্প্রতিকালের বাংলাদেশ ‘জঙ্গী’ হামলার ব্যাপকতা দেখার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। গত এক-দেড় বছর ধরে কিছু বিশেষ ধরণের সশস্ত্র হামলা, গলা কেটে দেওয়া বা বোমা হামলার মত ঘটনাগুলো আমরা দেখছিলাম। হামলার বৈশিষ্ঠের দিক থেকে এগুলোর কোনটাই ঠিক হামলাকারির আত্মঘাতি ধরণের তৎপরতা ছিল না। এর পরবর্তিতে আমরা বড় ব্যতিক্রম দেখলাম গুলশানের ‘হলি আর্টজান বেকারি’ নামের রেস্টুরেন্টে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ঘটনা। এটাকে ব্যতিক্রম বলছি এজন্য যে এই ঘটনাটা প্রথমে জিম্মি করা আর পরে সকলকে হত্যা করা ধরণের। যদিও এরপর সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কালে পাঁচজন হামলাকারির মৃত্যু ঘটে। এই অর্থে হামলাকারিরা মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই বা আত্মঘাতি প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়েই এই হামলা চালিয়েছিল বলা যায়। এর আগে কখনও এমন  বৈশিষ্ঠের হামলা আমরা দেখি নাই। আগে হামলাকারিরা কখনও আক্রমণস্থলে নিহতও হন নাই। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাকারি গ্রেফতারও না হয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। এসব দিক থেকে বিবেচনায় গুলশানের হামলার ধরনটা ভিন্ন – জিম্মি করে হত্যা করা আর শেষে নিজেরাও নিহত হওয়া – এটা একেবারে নতুন।

    এই নতুনত্ব শুধু হামলার ধরণেই নয় আরও অনেক জায়গায় নতুনত্ব এনেছে। যেমন আগে সমাজে ‘জঙ্গিবিষয়ক’ নানা আলাপ হতে দেখা যেত, যেখানে সত্য-মিথ্যা প্রচারণা করতে দেখা যেত। যার বিবেচনা যে তাঁর শত্রু সে আসলে জঙ্গি হোক আর নাই হোক তাঁর বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি’ প্রচারণায় নামতে আমরা দেখেছিলাম। অথবা, কারা জঙ্গী হয় এই প্রশ্নে একচেটিয়া বাছবিচার ছাড়া মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করে প্রচারণা ইত্যাদি এসবও আমরা দেখে আসছি গত প্রায় ১৫ বছর ধরে। কিন্তু এবার বড় ব্যতিক্রম। স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণে জানা গেল হামলাকারিরা সমাজেরই উচু ঘরের। একেবারে রাজধানী শহরের সবচেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের শিক্ষালাভ দেশের মর্ডান ইংলিশ স্কুলের ও দেশি বিদেশি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এককথায় বললে তা মাদ্রাসা তো নয়ই, বরং তারা একেবারে আধুনিক উচ্চস্তরের শিক্ষা, মর্ডান কারিকুলামের ভিতরে থেকে তাদের পড়াশুনা করছিলেন। ফলে হামলাকারিদেরকে ‘পশ্চাদপদ’ বলে নাক সিটকানো, গরীব মাদ্রাসার তুচ্ছ ও দায়ী করা অথবা লজিক্যাল র‍্যাশনাল মন থাকলে সবকিছুর সমাধান পাওয়া যেত ইত্যাদিতে আধুনিকতার শ্রেষ্ঠত্ব ধারণা যা এতদিন করে খাচ্ছিল সেই ভ্যানিটি আর মিথ্যা গৌরব সবকিছুই এবার তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়েছিল। এটাও একটা বিশাল ব্যতিক্রমি ঘটনা মানতে হয়। এরকম করে হয়ত আরও  অনেক ব্যতিক্রমী দিক আমরা খুঁজলে বের করতে পারব। কিন্তু আসল  উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যা এখানে লেখার মুল প্রসঙ্গ তা হল, হামলাকারি ‘জঙ্গিদের’ মৃত্যু পরবর্তি জটিলতা। অর্থাৎ মৃত ‘জঙ্গিদের’ মাটি পাওয়া বা দেওয়া। যতদুর মিডিয়া দেখে জানা গেছে তাতে মৃত ‘জঙ্গিদেরকে’ মাটি দেওয়া বা সৎকারের কাজ করার ব্যাপারে খোদ নিজ পরিবারের প্রধানদেরকে প্রকাশ্য অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এমনকি লাশ গ্রহণ না করার পক্ষেই প্রকাশ্যে ঘোষণা বা অনীহা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

    মানুষ মারা গেলে সে তখন লাশ মাত্র – একে সৎকার করতে হবে। এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়। গোত্র বা ধর্মীয় নানান রীতিনীতি অনুশাসন অনুসরণে করে দুনিয়ার সব সমাজ কমিউনিটিই তা পালন করে থেকে। আমাদের যার যার ধর্ম ও সমাজ সভ্যতার রীতিনীতি সম্পর্কে যত প্রাচীন অভিজ্ঞতার কথা জানা যায় সব ধরণের কমিউনিটিতে লাশের সৎকার করার বাধ্যবাধকতা সব সমাজেই আছে থাকে দেখা যায়। এছাড়া আর একটা দিক হল, জীবিত অবস্থায় মানুষ কারও কাছে অথবা অনেক মানুষের কাছে বন্ধু হয়,আবার শত্রুও হয়। একারণে মানূষের কাজ ততপরতার মুল্যায়নে জীবিত অবস্থাতেই সে খুবই ঘৃণিতও হয়, হতেই পারে। প্রচন্ড অন্যায়কারি বা অত্যাচারিও হতে পারে। আবার মানুষের যা কিছু স্বভাব বা বদস্বভাব এর মুল্যায়ন শুধু তার জীবতকালে এবং মারা যাবার পরও চলে, চলতে থাকে। তবে মারা যাবার পর কেবল একটা জায়গায় তফাত হয়। মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে নানান মূল্যায়ন তখনও জারি থাকে। যেটা থাকে না তা হল মুল্যায়ন-উত্তর করণীয় একশন – অর্থাৎ মুল্যায়নে যদি দোষ পাওয়া যায় তবুও ওখানেই তার সমাপ্তি টানা হয়। দোষের জন্য আমরা কোন বিচার বা শাস্তির পদক্ষেপ আর থাকে না। মানে আমাদের মুল্যায়নে যদি দেখা যায় যে উনি জীবিত অবস্থায় খারাপ ছিলেন, ধরা যাক অত্যাচারি ছিলেন – তবুও মারা যাবার পর এর জন্য তাকে কোন শাস্তি দেওয়া, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা ইত্যাদি থেকে আমরা বিরত থাকি। কারণ তখন এগুলো অর্থহীন। কিন্তু পরিস্কার রাখার জন্য মনে করিয়ে দেই, মৃত মানুষের মুল্যায়ন মৃতের-বাসায় না হোক সমাজে বন্ধ হয় না। কিন্তু তবু মুল্যায়ন করার পর সেটা আর বিচার শাস্তি বা অভিযোগের পদক্ষেপের দিকে যায় না, আমরা নেই না। কারণ বাস্তবে সে তখন শাস্তির উর্ধে।  এধারণাটাই অনুসরণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আদালতেও মৃত ব্যক্তির পক্ষে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেট দাখিল করলে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কিন্তু মৃত অপরাধীকেও আদালত ঐ ব্যক্তির নামে আনা সব অভিযোগ থেকে তাকে রেহাই ও মুক্ত করার রায় দেন।

    মুল্যায়ন বিচার কথাটা ব্যাপক দিক থেকে দেখলে, মানুষের বিচার দুই দুনিয়াতেই হয় বলে মনে করা হয়। এই দুনিয়ার বিচার মানে রাষ্ট্রের আইন আদালত। রাষ্ট্রের আদালত কোন মৃত মানুষের বেলায় দুনিয়ায় তাঁর কৃতকাজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ থেকে তিনি মুক্ত বলে রায় দেয়। আর অন্য দুনিয়া বেলায়, সেখানে আবার  বিচারের এক্তিয়ার আর আমাদের নয়, একমাত্র আল্লাহর। এই পরেরটার ব্যাপারে আমরা কেউ জানি না সেই বিচারে কার কী হবে, কে কীসে দোষী না বেকসুর বলে সাব্যস্ত হবে। আমাদের মানুষের এক্তিয়ারের বাইরে সেটা। তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ মারা যাবার পর মুল্যায়ন তখনও চলে কিন্তু বিচার বা মুল্যায়ন-পরবর্তি কোন একশন আর চলে না। মানুষের সাধ্য নাগালের বাইরে এটা। তাহলে দাঁড়াল, দুনিয়ার আদালত তাকে মুক্ত করেই দেয়। আর আল্লাহর এক্তিয়ার তো আমাদের নয়। এটা আল্লাহর উপরই ছেড়ে রাখতে হয় আর সেটাই বিধানও বটে।

    এই অর্থে সারকথাটা হল,মানুষ মারা গেলে সে সব বিচার-শাস্তির উর্ধে চলে যায়। কারণ সব অভিযোগ তখন অর্থহীন হয়ে যায়।

    গুলশান ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করার তাগিদ অনুভব খুবই স্বাভাবিক এক ঘটনা। সরকার জনগণের সাথে বন্ধুমুলক মানে যাকে ফ্রেন্ডলি বা পপুলার বলি – তা হোক আর নাই হোক সব সরকারই এমন ঘটনার পর হামলা ঘটনার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টাই করে থাকে। এদিক থেকে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তুই কতদুর এটা স্বাভাবিক? যতদুর তা মাটি দেওয়ার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরির ব্যাপার পর্যন্ত প্রসারিত না হয়।

    তাহলে অভিভাবক পিতারা কেন অনীহা দেখাচ্ছেন,কেন প্রকাশ্যে লাশ নিতে চাচ্ছেন না? মনে হচ্ছে তারা বাবা হিসাবে নিজ মৃত সন্তানের সৎকারের দায় আর ব্যক্তি বা সমাজের একজন হিসাবে দায় – এই দুইয়ের মধ্যে গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

    ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে আমাদের এমন গন্ডগোলে পড়ার কথা না। সমাজে একই মানুষের একই সাথে নানান রকমের ভুমিকা পালন করতে হয়, থাকে। মুল ব্যাপারটা হল, নিজ সন্তান ‘জঙ্গি’ হবার পথে গিয়েছে অথবা কাউকে হত্যা করে শেষে নিজেও নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম কথা হল, যেভাবে যাই ঘটুক, শেষ বিচারে সাবালক সন্তানের কৃতকর্মের দায় ঐ সন্তানের। লিগাল দায় সন্তানের, পিতা বা অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্রীয় আইন আদালতের ক্ষেত্রেও এটা এমনই। এমনকি শুধু সন্তান কেন, যে কোন একজনের দায়ে অন্য জনকে শাস্তি দেওয়া যায় না। আর ওদিকে ধর্মীয় বা আখিরাতের বিচারেও দুনিয়ায় যার যার কৃতকর্মের দায় তাঁর নিজের। এমনকি, চুরি ডাকাতি করে সংসার চালানো পিতার ঐ সংসার থেকে ভরণপোষণ পাওয়া পোষ্য সদস্যদের কারও উপর কোন চুরি ডাকাতির দায় বর্তায় না। না এই দুনিয়া না সেই দুনিয়ার বিচারে। যদিও সন্তান ‘জঙ্গী’ বলে পিতা বা অভিভাবকের মনে অস্বস্তি থাকতে পারে, সন্তাহ হারানোর বেদনাও সেখানে  থাকে, এমনকি সন্তান যাকে হত্যা করেছে তার বা তাঁর পরিবারের প্রতিও সমবেদনা থাকে – সেগুলো আলাদা জিনিষ।

    অতএব ‘সন্ত্রাসী’ হামলার ততপরতার বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্র জনমত তৈরি করলে সেখানেও  কোন মৃত ‘জঙ্গির’ পিতাও সমাজের একজন হিসাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। তিনি একইসাথে কোন মৃত সন্তানের পিতা হন আর নাই হন। স্বাভাবিক অংশগ্রহণই তিনি করবেন। এমনকি ‘সন্ত্রাসী’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি যদি নিন্দা জানাতে মনস্থ করেন সক্রিয় অথবা নিষ্ক্রিয়ভাবে – তবে তাও করবেন, একদম স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তাই বলে সেই একই পিতা সন্তানের সৎকারের প্রসঙ্গে তার করণীয় যা, সৎকারে আয়োজনের ক্ষেত্রে পিতার যা ভুমিকা হয় তাও পালন করবেন, তাকে করতে হবে। কেননা এটা শুধু পিতা বলে নয়। মনে রাখতে হবে, এটা মৃত মানুষের প্রতি তাঁর রেখে যাওয়া আত্মীয় স্বজন পড়শির কমিউনিটি-দায়ও।

    আমরা আশা করব অভিভাবক পিতারা ‘জঙ্গী’ ততপরতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরির ব্যাপারের অংশগ্রহণের সাথে সাথে, মৃত সন্তানের  লাশ গ্রহণ ও  সৎকারের  প্রসঙ্গে পিতা হিসাবে তার যা কিছু দায় তারও প্রতিটা তিনি পালন করবেন। এই দুইয়ের মধ্যে কোন স্ববিরোধ নাই।

    আচ্ছা, কোন পিতা বা অভিভাবক যদি লাশ না নেন, অস্বীকার করেন তাহলে সেক্ষেত্রে লাশের কী হবে? এখান একটা কথা মনে রাখতে হবে – ধর্মীয় রীতিনীতি যাই থাক, জীবিত মানুষ নিজের ব্যবহারিক স্বার্থেই মৃত মানুষকে কবরস্ত করে। পাশে রেখে ঘুমায় না। এটাও জীবন বাস্তবতার আর এক দিক। কারণ লাশ পাশে রেখে বা পচিয়ে ঘর সংসার পরিবার করা চলে না। পচনশীলতার ম্যানেজমেন্ট দিক থেকে সে হিসাবেও লাশ সম্মানের সাথে কবরস্তই সঠিক ও বাস্তব বিধান। একাজ  মৃতের  পিতা বা অভিভাবক না করলেও সমাজ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কাউকে না কাউকে তা করতেই হবে। এবং সেটা করতে হবে একেবারে সম্মানের সাথে। কারণ মৃত মানুষের ভিতরে আমরা জীবিতরা  প্রত্যেকেই নিজেকে দেখতে পাই। আমার মৃত্যুর পর যেহেতু  আমিও আমার অসম্মান দেখতে চাইতে পারি না। তাই আমার মৃত্যুর আগেই সমাজে সৎকার ব্যবস্থা – এটা সমাজের রেওয়াজ হিসাবে গড়ে উঠুক, আমরা সবাই তা চাই। তাই আমরা দুনিয়ার সব লাশ এমনকি একেবারে অচেনা অজানা লাশকেও অজান্তে মনের গভীর থেকে সম্মান করি। তবুও কেউ কেউ, কাউকে হত্যা করে সেই লাশের উপর নৃত্য করার রেফারেন্স দিতে চাইতে পারেন।  হা পারেন তবে সেটাকে আমরা জিঘাংসা বলি। জিঘাংসা এক মানসিক রোগ যা থেকে বের হয়ে আসার উপায় বা পাথেয় হল মনোরোগের চিকিৎসা। কী আর করা,  জিঘাংসা মানুষের মৌলিক স্বভাব না হলেও আমরা অনেক মানুষকে জিঘাংসার ভিতর সুখ খুজতে দেখি।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ

    হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ
    গৌতম দাস
    আগস্ট ১২, ২০১৬

    http://wp.me/p1sCvy-1EO

    ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার সময়কালের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে (১৭৫৭-১৯৪৭) বাংলা ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নির্ধারক ভূমিকা যিনি রেখেছিলেন, তিনি হাজী শরীয়তুল্লাহ। তাঁর ভূমিকা প্রভাবশালী ও নির্ধারক বলছি এই অর্থে যে, ব্রিটিশ শাসন-উত্তরকালে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য কী রূপ ধারণ করতে পারে, তা নির্ধারণে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা তিনি রেখেছেন। এমনকি আজকের বাংলাদেশেও আমাদের যা কিছু ‘বিশেষ বৈশিষ্ট্য’ তাকে বুঝতে হলে হাজী শরীয়তুল্লাহ যে বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ইসলামচর্চা করেছেন, সেদিকে নজর না ফিরিয়ে উপায় নেই। অনেকে কখন কীভাবে এ দেশে ইসলামের আগমন ঘটেছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস অনুসন্ধান করছেন। বিশেষত তলোয়ারের দ্বারাই যদি এ অঞ্চলে ইসলাম কায়েম হয়ে থাকে, তাহলে দিল্লির আশপাশের চেয়েও দিল্লি থেকে বহুদূরে কীভাবে তা সম্ভব হল, তা নিয়ে তর্কবিতর্ক করছেন। এ দেশের জনগণের আত্মপরিচয়ের স্বরূপ কিংবা সেই স্বরূপ নিয়ে বিতর্ক বোঝার জন্য ইসলামের আগমনকেই নির্ধারক মনে করা হয়। কিন্তু ইসলাম কীভাবে এই ভূখণ্ডের ইহলৌকিক বাস্তব লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে মূর্ত করেছে, সে হদিস আমরা বিশেষ নিতে চাই না। এ পরিপ্রেক্ষিতে হাজী শরীয়তুল্লাহ আমাদের জন্য নতুন ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসেবে হাজির হন। হাজী শরীয়তুল্লাহর সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন ইসলামের এক বিশেষ ঐতিহাসিক পর্বের দিকে আমাদের নজর ফেরাতে বাধ্য করে। যাকে শুধু ইসলামের আগমন দিয়ে বোঝা যাবে না। এমনকি শুধু ধর্ম দিয়েও নয়। বরং আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ইসলাম গণমানুষের লড়াই-সংগ্রামে কী ভূমিকা রেখেছে, সেদিকেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করার তাগিদ তৈরি করে। হাজী শরীয়তুল্লাহর ভূমিকা প্রভাবশালী ও নির্ধারক এ অর্থেই।

    হাজী শরীয়তুল্লাহর জীবনকাল ১৭৮১ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ। তিনি ধর্মীয় সংস্কারক এবং ব্রিটিশ-ভারতের বাংলায় সবচেয়ে প্রভাবশালী ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা। তার জন্ম হয়েছিল ফরিদপুরে; মানে, সেকালের ফরিদপুরের এক মহকুমা, যা একালের মাদারীপুর জেলা, এরই শামাইল (বাহাদুরপুর) গ্রামে। বেশির ভাগ লিপিকার তাঁর সম্পর্কে পরিচিতি দেয়া এভাবে শুরু করেন যে, “তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, বরং কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন”।

    হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম এক ‘তালুকদার’ পরিবারে বলে জানা যায়। তিনি হজ করতে মক্কা শরিফে যান ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে। হজ শেষে ১৮১৮ সালে বাংলায় আসেন। দেশে ফিরে তিনি ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। শরীয়তুল্লাহর নামানুসারেই বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে।

    ‘ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া’ নামে একটি কথা চালু আছে। যারা আমাদেরকে কলোনি বানিয়ে আমাদের ওপর এক দখল শাসন কায়েম করেছিল। সেকালের অবিভক্ত ভারতবর্ষ ব্রিটিশ কলোনির শাসনাধীন থাকার সময়কালকে বোঝাতে সাধারণত ব্রিটিশ- ইন্ডিয়া লেখা হয়। যদিও ব্রিটিশ কলোনির শাসনাধীন বলতে বাস্তবে সরাসরি ব্রিটিশ সরকার নয়, বরং শুরুতে ছিল এক ব্রিটিশ জয়েন্ট স্টক কোম্পানির শাসন, যে কোম্পানির নাম ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া (সংক্ষেপে এখন থেকে শুধু ‘কোম্পানি’ বলা হবে)। আমাদের অতি পরিচিত ১৭৫৭ সালের পলাশি যুদ্ধেও ব্রিটিশ দখলদারীর আগের অনেক কিছুরই তখন শেষ হয়নি, চূডান্ত ফয়সালা হয়নি।

    সেদিক থেকে পরবর্তীতে নির্ধারক আরেক ঘটনা হল, ১৭৬৪ সালের ‘বক্সারের যুদ্ধ’ (বক্সার বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত)। ওই যুদ্ধে মোগল সম্রাট, অযোধ্যার নবাব ও বাংলার নবাব এই ত্রয় ছিল কোম্পানির বিপক্ষের ক্যাম্পে। এদের পরাজয়ের পরই বাস্তবে বাংলায় কোম্পানির শাসন বা ব্রিটিশ কলোনির পত্তন ঘটেছিল। যদিও আমাদের পপুলার ধারণা হল, বাংলার পলাশীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় হওয়া থেকেই বাংলায় কোম্পানির শাসন শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা না হলেও পপুলারলি আমরা তা বলে থাকি এই অর্থে যে, আমরা বোঝাতে চাই পলাশির পরাজয়ের পর কোম্পানি শাসন সঙ্গে সঙ্গে না এলেও কোম্পানি শাসন আসার বীজ বপন করা হয়ে গিয়েছিল। পলাশিতে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নবাব সিরাজের পরাজয়ের পর আসলে কোম্পানির সহায়তায় পাপেট নবাব হয়েছিলেন মীরজাফর। কিন্তু মীরজাফর কোম্পানির পক্ষে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল কোম্পানির ভারতে পণ্য আমদানি-রফতানিতে ট্যাক্স না দেয়ার সুবিধাদি ও নগদ অর্থ কোম্পানিকে দেয়ার আঁতাতের শর্তের বিনিময়ে। এতে সে নিজে নবাবও হয়েছিল, কিন্তু ওসব দেনা-পাওনার শর্ত পরে বাস্তবে কাজ করেনি। দুপক্ষই শর্ত ভেঙেছিল। ফলে কিছুই থিতু হতে পারেনি। এরই মধ্যে মীরজাফরের মৃত্যুর পর ১৭৬০ সালে তাঁর জামাই মীর কাশেম বাংলার নবাব হন। আর কোম্পানির সঙ্গে পুরানা অসন্তোষের বিষয় আরো প্রকট হতে থাকে। মীর কাশেম নিজের কৌশলগত নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে নদীপথের ব্রিটিশদের কর্তৃত্বের নাগাল থেকে দূরে থাকতে তারা রাজধানী নিয়ে যান বিহারের মুঙ্গেড়ে। ফলে সব পক্ষের অসন্তোষের ফয়সালার যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল বিহারের বক্সারের যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে কোম্পানির হাতে পরাজয়ের পর বিজয়ী হিসেবে কোম্পানির দেয়া শর্ত হিসেবে এই প্রথম আইনগত ভিত্তিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। অষ্টাদশ মোগল সম্রাট শাহ আলম (দ্বিতীয়), যুদ্ধে হারার খেসারত বা শর্ত হিসাবে কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানি লিখে দিয়েছিলেন। যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় আরও যেসব শর্তে নবাব ও সম্রাটরা কোম্পানীর সাথে চুক্তি করেছিলেন তাই বিখ্যাত ‘এলাহাবাদ চুক্তি’, যার অংশ ছিল এই দেওয়ানি লিখে দেওয়া।  দেওয়ানি মানে খাজনা-রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক দেখভালের কর্তৃত্ব। বাংলার দেওয়ানি লাভ কোম্পানির দিক থেকে এক গুরুত্বপুর্ণ মাইলস্টোন অর্জন। কারণ দেওয়ানি লাভের পর ভূমি খাজনা আদায় ব্যবস্থায় কোম্পানি এক আমূল বদল আনে। আগের মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় দেওয়ান বা দেওয়ানের প্রতিনিধিকে জমির খাজনা দেয়ার বিনিময়ে জমির ভোগদখল করত আবাদি কৃষক যাদের ‘রায়ত’ বলা হত। কিন্তু এবার দেওয়ানি অধিকারপ্রাপ্ত কোম্পানি আর খাজনাদাতা জমির ভোগদখলকারী কৃষকের মাঝে তৃতীয়পক্ষ এক জমিদারকে এনে এক ‘জমিদারি ব্যবস্থা’ চালু করা হয়। জমিদার কোম্পানিকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে আগাম ও স্থায়ীভাবে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দেবে এ শর্তে স্থায়ীভাবে জমিদারকে জমিদারিস্বত্ব দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয় এই ‘জমিদারী আইন’ থেকে। এর পর জমিদার ইচ্ছামত পরিমাণ খাজনা আদায় করে প্রজাদেরকে জমি বন্দোবস্ত বা পাট্টা দিত। ভূমি মালিকানা ও চাষাবাদ ব্যবস্থায় এভাবে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটায় জমিদারি আইন। জমিদারি আইন কথাটা প্রচলিত ভাষায় বলা, আর তা আনুষ্ঠানিক নামে বলা হয় – চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ১৭৯৩ (বা পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট অ্যাক্ট, ১৭৯৩)।

    মোগল আমল থেকেই পুরো ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনাটা দাঁড়িয়ে ছিল মূলত দুটো পক্ষ দেওয়ান ও আবাদি কৃষক, এদের সম্পর্কের উপরে। যেখানে ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে দেওয়ানের পক্ষে কালেক্টর বা তালুকদার বা কানুনগো ইত্যাদি নানা নামের আর এক পক্ষকে দেখা যেত। কিন্তু যারা কোনোমতেই দেওয়ানের ঠিকাদার নয়, বরং অবশ্যই তাঁর বেতনভোগী বা কমিশনভোগী কর্মচারী। এবং তারা আগাম কোনো অর্থ দিয়ে দেওয়ানের কাছ খাজনা তোলার অধিকার লাভ করা কোনো ঠিকাদারও নয়। পুরানা মোগল ভূমি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল যে, এ অঞ্চলের কৃষিকাজ একেবারেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এতে ফসলের ভালো-মন্দ বা কম-বেশি হওয়াটা একেবারেই প্রকৃতি নির্ভরতার তালে এগিয়ে চলত। ফলে জমি থেকে ফসল বা আয় প্রাপ্তির ব্যাপারটা বা এই প্রকৃতি নির্ভর থাকার অনিশ্চয়তাটার দায়ক্ষতি মোগল শাসকরা রায়তের সঙ্গে শেয়ার করত। কিন্তু ব্রিটিশরা এসে সেটা আর করতে চাইল না। এছাড়া তারা নতুন বলে, নিজেদের ব্রিটিশ রাষ্ট্র চালিয়ে আসা লোক বলে মনে করেছিল তারা বাংলাকে আগের চেয়ে ভাল, আরো বেশি প্রফিট আদায় অর্থে ভাল এক ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। আর তা করতে গিয়েই নতুন ব্যবস্থা – জমিদারি আইন। তবে এখানে ব্রিটিশ শাসকরা জমিদারকেই নিশ্চিত ও স্থায়ী পরিমাণ খাজনা জমা দিতে বাধ্য করার পুরা দায় ও এজেন্ট হিসেবে হাজির করাতে গিয়ে তাকে এক স্বৈরাচারী দানব বানিয়ে দিবার সব শর্ত পুরণ করেছিল। ফলে এবার ভূমি বন্দোবস্ত ব্যবস্থাপনাটা পরিষ্কার তিনপক্ষ ব্রিটিশ দেওয়ানি, বাংলার নতুন শ্রেণী জমিদার আর আবাদি কৃষক – এভাবে করে সাজানোতে প্রথম দুপক্ষই তাদের স্ব স্ব স্বার্থটা নিংড়ে বের করে নিতে পেরেছিল ঠিকই, আর তা করা গিয়েছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আবাদি কৃষক ঘাড়ে চড়ে, তাদেরকে চুষে শুষে নিয়ে। অর্থাৎ আবাদী কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ সেখানে ছিল না। নতুন জমিদারি ব্যবস্থায় আবাদি কৃষকরা তাই হয়েছিল সব হারানো, কেবল জমিদারের প্রজা। মোগল আমলে  রায়ত হিসাবে জমির টাইটেল ছিল খাজনাদাতা আবাদি কৃষকের নামে। জমিদারি আইনে জমির ঐ টাইটেল রায়তের থেকে কেড়ে নিয়ে তা দিয়ে দেওয়া হয় জমিদারকে।

    এ জমিদারি ব্যবস্থার ভেতর আরো এক অত্যাচার হাজির ছিল। বলা হয়ে থাকে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় জমিদারকেন্দ্রিক ভূমি ব্যবস্থা পছন্দ করেছিলেন। সেটা নাকি এই যুক্তিতে যে, এভাবেই ব্রিটেনের মত বাংলার কৃষিতেও একটা ক্যাপিটালিজম সম্ভব হবে। যদিও এটা প্রমাণের জন্য তাদের বক্তব্যকে আপসে মেনে নেবার মতো কোনো যুক্তি দেখা যায় না। বরং বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাথে বাংলাসহ সারা বৃটিশ-ভারতের সম্পর্ক তো কলোনির  – কেন এটাকে কলোনিয়াল বলছি – এই প্রশ্নটাকে পাশ কাটিয়ে উহ্য রেখেই বরং জমিদারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে পণ্ডিতদেরকে কথা বলতে দেখা যায়। কেন প্রকৃতি-নির্ভরতার কৃষিতে ফসল না হওয়া বা কম হওয়ার দায় শাসক বা রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনাও শেয়ার করবে না, দায় সবাই শেয়ার করে উন্নত কোনো ব্যবস্থাপনার উদ্যোগই যেখানে সমাধান, সেখানে এ নিয়ে এটা যেন কোনো প্রশ্নই নয়, এমন মনে করা হয়েছে। শাসকের এ দায় শেয়ার না করে কেবল শাসক হওয়ার চেষ্টা— এ স্বভাবটাই তো ‘ফরেন’ এবং ‘কলোনিয়াল’। ইউরোপ থেকে এসেছে ওরা তাই ‘ফরেন’ ঠিক তা নয়। ফলে সেকালে কৃষিতে ‘অর্থকরী ফসল’ বলে একটা ধারণা ছিল। ব্রিটিশ শাসকের হাতে পড়ে তা কেবল শুধু পাট চাষ নয়, বরং আরো ভয়ঙ্করভাবে তুতগাছের চাষ বা নীলচাষ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আর শুরু থেকেই কোম্পানি এ্তে এতই উত্সাহী ছিল যে, জমিদার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরাসরি বহু ব্রিটিশ ব্যবসায়ীকে নীলচাষের জন্য জমি দেয়া হয়েছিল। ওই ব্যবসায়ীরা এতই মরিয়া ছিলেন যে, নির্মম অত্যাচারের ভূমিদাস ব্যবস্থা (বন্ডেড লেবার বা ফোর্সড লেবার) চালু করে হলেও তারা এ কাজে সফলতা পাওয়ার চেষ্টা করে গিয়েছিলেন। এটাই ইতিহাসে নৃশংসতায় নীলকরের নীলচাষ।

    সিনেমা উপন্যাসের স্ক্রিপ্টে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ভিলেন। অনেকের মনে হতে পারে, না, এর উত্তর হবে নায়ক। আসলে ভিলেন মানে হল নেগেটিভ নায়ক। সামাজিক দ্বন্দ্বের বা গল্পে দ্বন্দ্বের নেগেটিভ দিকটা, যার মাধ্যমে প্রকাশ করার সুযোগ নেয়া হয়। ভিলেন যত নেগেটিভ করে ফুটিয়ে তোলা যাবে, ততই স্পষ্ট বোঝা যাবে ওখানে নায়কের ভূমিকা কত ইতিবাচক, কেন সে নায়ক। ঠিক সেরকম, এতক্ষণ বাংলার কলোনিয়াল ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ভিলেনের দিক থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। এবার এতে নায়কের প্রবেশ ঘটবে। অথবা আরেক দিক থেকে বললে, এতক্ষণ বাংলার কলোনিয়াল ভূমি ব্যবস্থাপনাকে যেন নৈব্যক্তিক দিক থেকে তুলে ধরা হয়েছে। এবার এতে সাবজেক্টিভ অ্যাক্টর বা কর্তাস্বত্বা হাজির হবে।

    গণ-প্রতিরোধ শব্দটা একালের, বিশেষত ‘রাজনীতি’ বলে আমাদের ভু-অঞ্চলে কোনো ফেনোমেনা হাজির হওয়ার পরের। এমনকি জনগণ, বা ইংরেজি mass শব্দটাও ‘রাজনীতি’ বলে শব্দ হাজির হওয়ার পর, ওরই অনুষঙ্গ শব্দ হয়ে এসেছে। আগে নয়; রাজনীতি শব্দটা ফুটিয়ে তোলার দরকারে। কারণ রাজা, সম্রাট বা বাদশা-নায়েব নবাবের আমলে আবার জনগণ কী জিনিস!, জনগণ বলে কিছু ছিল না।  এ বিচারে বলা যায়, বাংলায় ব্রিটিশ কলোনি শাসনের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ‘জমিদারি ব্যবস্থা’। এর বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ এবং গণ-প্রতিরোধের ঘটনাটা ঘটেছিল হাজী শরীয়তুল্লাহর হাতে।

    আগেই বলেছি, তিনি হজ করে দেশে ফিরে আসেন ১৮১৮ সালে। ফিরে তার প্রধান কাজ হয়েছিল ধর্ম সংস্কারের কাজে মনোযোগ  দেয়া। বলা হয়, সেই ৮০০ বছর আগে ভারতবর্ষে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু ১৭৯৯ সালে দেশ ছেড়ে হজে যাওয়ার আগেও তিনি দেখে গেছেন, ফলে জানেন যে ন্যূনতম ইসলামের রিচুয়াল বা ফরজ কাজ যেগুলো, তাও করতে অভ্যস্ত ছিল না সে সময়ের বাংলার আম-মুসলমানরা। সেজন্যই ফিরে এসে তাঁর ধর্ম সংস্কারের কাজে নামা। সবাই একালে তাই হাজী শরীয়তুল্লাহ পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই তাঁর ধর্ম সংস্কারের প্রসঙ্গ আনেন। কিন্তু ধর্ম সংস্কার কথাটা এই অর্থে যে, মুসলমানদের ন্যূনতম ফরজ কাজগুলো করতে উদ্যোগী করার দিকটা জোর দিয়ে তিনি কাজে নেমেছিলেন। যেজন্য তাঁর ধর্ম ও সামাজিক সংস্কারের আন্দোলনকে ‘ফরায়েজি’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু তিনি ধর্মীয় সংস্কারের আন্দোলনকে জীবনের বৈষয়িক দিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন মনে করেননি। ফলে উপরে যে জমিদারকেন্দ্রিক কলোনি ভূমি ব্যবস্থার কথা বলেছিলাম, যেটা তিনি হজের পর দেশে এসে পেলেন, এটা তার চোখ এড়ায়নি। কারণ বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থা তত দিনে ১৭৯৩ সালে জন্মের পর থেকে ২৫ বছর পার করে ভিত পুঁতে ফেলেছে। জমিদার ও কলোনি শাসকরা মিলে প্রজাদের ওপর তাদের অত্যাচার, শোষণ নির্মমতাগুলোও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। তাই এখানে আমরা যে মুসলমান ফেনোমেনার কথা বলছি, তা ঠিক কলেমা পড়লেই যাকে মুসলমান বলি এতটুকু অর্থে নয়।

    ব্রিটিশ-ভারতের আইন অনুযায়ী জমিদারদের খাজনা আদায় বৈধ। বলা হয়, জমিদারদের ৯০ ভাগ ছিল হিন্দু। এর ওপর আবার তাদের বারো মাসের তেরো পূজা পার্বণের চাঁদা/খাজনা থেকে শুরু করে সন্তানের অন্নপ্রাশন, বিয়ে বা  ‘জামাই খরচা’ ইত্যাদি নানা নামে জমিদারদের বাড়তি খাজনার দাবি লেগেই থাকত। ফলে শরীয়তুল্লাহ মূল খাজনার ব্যাপারে আপত্তি না তুলে (কারণ সেক্ষেত্রে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেটসি ক্ষমতা দেয়া ছিল, যা সীমিতভাবে হলেও পেয়াদা দিয়ে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রজাকে নিজের জেলে রেখে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা জমিদারদের ছিল) বরং বাড়তি খাজনাগুলো না দেয়ার ছলে জমিদারের সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা শিখিয়েছিলেন শরীয়তুল্লাহ। এই হলো বিশেষ ‘মুসলমান’ ফেনোমেনা। তিনি প্রজার আপত্তি-যুক্তিকে আরো জোরদারে হাজির করতে দাবি করতেন প্রজারা ‘মুসলমান’। ফলে কেন তাঁরা পূজার চাঁদা দেবে? সেকালে জমিদার মানে প্রচণ্ড ক্ষমতাশালী, যার স্বার্থ আর কলোনি শাসকের স্বার্থ এক সুতায় গাঁথা, জমিদারের ক্ষমতা দুর্বল হওয়া মানে তা কলোনি শাসকেরও। এদিক থেকে দেখলে জমিদারের সর্বময় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার তাত্পর্যটা বোঝা যাবে। আবার অনেকের মনে হতে পারে, এখানে শুধু জমিদারের ক্ষমতা বিষয়টা সবকিছুর কেন্দ্র ভাবা হচ্ছে, এটা কি ঠিক?

    বলা হয় সব সমাজেই মানুষের সঙ্গে মানুষের মাঝে অসংখ্য কিসিমের স্বার্থের বিরোধ, ছোট-বড় সংঘাত কাজ করে থাকে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এর ভেতর প্রধান কিছু একটা বিরোধ থাকে, যেটা বাকি সব বিরোধের ওপর প্রধান, মাও সে তুংয়ের ভাষায় যেটাকে সমাজের ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ বলে। এই দ্বন্দ্বে সমাজের সবচেয়ে বেশি মানুষ অ্যাফেক্টেড থাকে, আর এ বিরোধ ক্রমে সবার আগে তাই মানুষ সমাধান চায়। পুরা ব্রিটিশ শাসনকালটাই অন্তত বাংলার সমাজজুড়ে প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে থেকেছিল, জমিদার-প্রজা সম্পর্কের দ্বন্দ্ব বা ভূমি মালিকানা বন্দোবস্ত ব্যবস্থায় দ্বন্দ্ব। আবার সেকালের সমাজের অর্থনীতিক জীবন বলতে পঁচানব্বই ভাগজুড়েই বোঝাত কৃষির অর্থনীতি। এ কারণে ভূমি মালিকানা বন্দোবস্ত ব্যবস্থার দ্বন্দ্বকে বলা যায়, – প্রধান দ্বন্দ্ব – যা সমাজের প্রায় সবাইকে অ্যাফেক্টেড করে রেখেছিল। অর্থাৎ প্রত্যন্ত মাঠেও ব্রিটিশ ক্ষমতার প্রভাব উপস্থিতি টের পাওয়া যেত জমিদারি শাসনের উপস্থিতি থেকে। সারা বাংলার কৃষির প্রত্যন্ত মাঠ থেকে কৃষির উদ্বৃত্ত পুঞ্জীভূত সেই সারপ্লাস এটাই ছিল ব্রিটিশ কলোনির রুস্তমি আর নিজ দেশ বৃটেনে উদ্বৃত্ত পাচার এমন সবকিছুর রসদ। আর একদিকে এই কৃষি-উদ্বৃত্ত আবার এর স্থানীয় দিক ‘কলকাতা’, এর প্রাণশক্তি। এভাবে কলকাতা মূলত কলোনি মাস্টার আর জমিদারের শহর, তাদের পোষ্য কিংবা তাদেরও পোষ্য শ্রেণীর কায়কারবারের শহর।

    অতএব, সবকিছুর কেন্দ্র এ জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নায়ক হিসাবে কাউকে না কাউকে উঠে দাঁড়াতেই হত। হাজী শরীয়তুল্লাহ সেই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যিনি বাংলার সবার হয়ে কাজটা করেছিলেন। সেটা শ্রেণী-সংগ্রাম বা রাজনীতি বুঝি, তা বলার কাল ছিল না। কারণ ১৮৩২ সাল, যাকে মনে রেখে কথাগুলো বলছি, যেটা ছিল তাঁর সক্রিয়তা ও প্রভাবের তুঙ্গ বছর। তিনি বলেছিলেন, জমিদারের কালচার বা আচার যেটা, সেটা তো প্রজার নয়, হতে পারে না। ফলে কলোনির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রত্যক্ষ শোষক জমিদারের বিরুদ্ধে তিনি কালচারাল শ্রেণী সেপারেশনের দিক থেকে কথা তুলেছিলেন। এজন্য তিনি বরং তার মত করে মুসলমান প্রজাদের নতুন লাইফ স্টাইলের কথা বলেছিলেন। না লাইফ স্টাইল বলে একালের কোন ফ্যাশন শো- এর মেয়েদের ক্যাটস ওয়ার্ক বুঝাই নাই। এমন বুঝাটাও ডাহা ভুল।  লাইফ স্টাইল কথার মূল অর্থ , মানুষ জীবন সম্পর্কে স্পিরিচুয়ালি বা মেটারিয়ালি যা বুঝে সেটাই প্রকাশিত হয়ে পড়ে তার বাস্তব জীবনে। তাই মানুষ যেভাবে তাঁর স্পিরিচুয়ালি বা মেটারিয়ালি জীবন প্রকাশ করে তাই লাইফ স্টাইল। হাজী শরীয়তুল্লাহ যে লাইফ স্টাইল আমাদের শিখিয়েছিলেন সেই চিহ্ন বা trait তা আজও বাংলার মুসলমানদের মৌলিক বৈশিষ্ট হয়ে আছে। তবে এ কথা বুঝলে ভুল হবে যে, তিনি ছাড়া আর কেউ জমিদারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলেননি বা করেন নি। অবশ্যই বলেছেন। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ও সংগঠিত ভাবে বলেছেন এবং টিকে থেকেছেন বাংলায় মুসলমান মানুষের স্পিরিচুয়াল ও বৈষয়িক জীবন এক গ্রন্থিতে একসঙ্গে প্রভাবিত করে গেছেন, এমন ঘটাতে পেরেছেন একমাত্র তিনি। এখানেই তিনি অদ্বিতীয়। ১৮৪০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ফরায়েজি আন্দোলনের হাল ধরেন তার ছেলে মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া। এই আমলেই আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কার রূপের দিকের চেয়ে কলোনি-জমিদারি ক্ষমতার বিরুদ্ধে ফরায়েজিদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বিস্তারের দিকের রূপটা সবচেয়ে ভারী হয়ে উঠেছিল। স্থানীয়ভাবে এক সরকার অর্থে পাল্টা এক সরকারের মতো কাঠামোতে নিজ কমিউনিটিতে ধর্ম নির্বিশেষে বিচার-আচার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। পরে ১৮৬২ সালে দুদু মিয়ার মৃত্যুর পরও তার সাংগঠনিক কাঠামো কার্যকর ছিল। তবে ধর্ম সংস্কারের দিকটা আবার প্রাধান্যে আসে।

    ফরায়েজি আন্দোলন সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো প্রামাণিক গ্রন্থটা হল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মুঈন উদ-দীন আহমদ খান স্যারের ‘বাংলায় ফরায়েযী আন্দোলনের ইতিহাস’ বইটা। এ বইটা আসলে উনার পিএইচডি থিসিস ও গবেষণা গ্রন্থ। ১৯৬১ সালে তিনি এ পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। শরীয়তুল্লাহ সম্পর্কে একটা কথা অনেকে দাবি করে থাকেন যে, তাঁর ফরায়েজি আন্দোলন আসলে ওহায়েবি আন্দোলন। এ বিষয়টা নাকচ করেছেন মুঈন উদ-দীন আহমদ খান। যদিও হাজী শরীয়তুল্লাহ  ওহায়েবি ছিলেন কিনা, সে তর্কে তাঁর সম্পর্কে আমাদের উপরের মূল্যায়নের হেরফের হয় না। হাজী শরীয়তুল্লাহ সবচেয়ে কার্যকরভাবে ‘মুসলমান’ নাম ধারণ বা মুসলমান পরিচয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে কলোনি-জমিদার কোটারি স্বার্থের বিরুদ্ধে লড়বার পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাদের শরীয়তুল্লাহ। মুঈন উদ-দীন খান তার বইয়ে শরীয়তুল্লাহর সমসাময়িক অন্তত আরো তিনটা ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনেছেন, তাদের মধ্যে তুলনা করেছেন। ফরায়েজিদের প্রতিযোগী মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরীর ‘তাইউনী’ ধারার সঙ্গে বাহাসের বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন সত্যিকারের একজন গবেষকের ভূমিকায়। সেখানেই তিনি দেখিয়েছেন, কেউ তাকে ওহায়েবি বলেননি। আবার শরীয়তুল্লাহ ওহায়েবি ধারার অনুসারি হলেই সেটা দোষের, তাও আমরা বলতে পারি না। বরং তার ফরায়েজি ধারার সমান্তরাল লড়াকু  হয়ে জমিদার ফেনোমেনাকেই প্রধান আক্রমণের কেন্দ্র বিবেচনা করে লড়াই প্রতিরোধ সাজাতে আমরা আর কাউকে দেখিনি। তাই বাংলায় ‘মুসলমানেরা’ কেন নিজেকে ভিন্ন আত্মপরিচয়ে হাজির করেছিল এবং সেটা করতে গিয়ে সমাজের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য কীভাবে বদলে গেল, সেটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরিপ্রেক্ষিতে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে গণ-মানুষের লড়াই সংগ্রামের অর্থনৈতিক মর্মের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই। ‘মুসলমান’ এ নাম নিয়ে কার্যকর গণ-প্রতিরোধের পথপ্রদর্শক তিনি।

    ইতিহাসের পদ্ধতিগত দিক থেকে বিচার করলে আমরা এটুকু দাবি পেশ করে শেষ করতে চাই যে, বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মের ইতিহাস আলোচনা, কিন্তু ইতিহাস থেকে ধর্মের ইতিহাস বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ইতিহাসের বিচার সম্ভব নয়। এতে কিছুই বোঝা যাবে না। ‘মুসলমান’ ইতিহাসের বিচারে নিছকই একটি ধর্মীয় পরিচয় নয়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ‘মুসলমান’ আত্মপরিচয় নিছকই ধর্মীয় পরিচয় মাত্র নয়। ঔপনিবেশিক দখলদারি এবং তাদের আরোপিত ভূমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ঐতিহ্যের মধ্যে ‘মুসলমান’ পরিচয়ের ঐতিহাসিক তাত্পর্য নিহিত।

    এ’পরিচয়ের চাবিকাঠি উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সময়ের বহু সমস্যাকে নতুনভাবে চিহ্নিত ও মীমাংসা করতে পারব বলে আশা করি।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক বণিকবার্তা ১১ আগষ্ট প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় । তা এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপানো হল।]

  • শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

    শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
    গৌতম দাস
    ০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

    শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

    তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

    ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
    কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
    খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
    বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

    শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

    না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

    মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

    [এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

    লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

    সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

    এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

  • ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
    প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


    Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
    কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


    জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
    যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
    আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
    বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

    এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
    আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
    সব শেষ।

    আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
    আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

    দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

    আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
    সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

  • যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    গৌতম দাস
    ১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
    http://wp.me/p1sCvy-1uG

    গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
    পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
    হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
    উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
    এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
    প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

    ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

    তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

    কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

    গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

    সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

    সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com