Author: goutamdas

  • আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    আলী রীয়াজের আকাঙ্খায় ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

    গৌতম দাস

    ২৯ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3tW

    SOURCE

    আলী রীয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। ঢাকার আরেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যৌথভাবে তিনি এক রচনা লিখেছেন প্রথম আলো পত্রিকায়। তারই তৃতীয় পর্বে যে লেখাটা ছাপা হয়েছে, এর শিরোনাম “রাজনীতিতে ধর্মের ফিরে আসা”।

    রাজনীতিতে ধর্ম আসতে পারবে না বা ফিরে আসতে পারবে না ইত্যাদি এসব খুবই একঘেঁয়ে ধারণা, অতি ব্যবহারে জীর্ণ ফলে ক্লিশে [cliché] আর ভুল; এছাড়া সর্বোপরি বহু আগেই চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া এই ধারণা। এএসব কথা ন্যাগিং-এর পর্যায়ে পৌছানোয় তা আর নুন্যতম আগ্রহ তৈরি করে না। সিরিয়াস কোন আলোচনা এখান থেকে শুরু করা যায় না। এছাড়া কেন এই তর্ক কেউ তুলছে এর উদ্দেশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সৎ বা পরিস্কার রাখা হয় না। এছাড়া পলিটিক্যাল বায়াসনেস তো আছেই। যেমন যেই ভারতকে “সেকুলারিজমের পিতৃভুমি” হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে এতদিন একে তুলনা করা হয়েছে এক বিশাল তুচ্ছতার চোখে যে কথিত ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তান বা মুসলমানের বাংলাদেশ বলে – যেসব গর্বের ঠেলায় আমাদের প্রাণ যায় অবস্থা। অথচ “সেকুলারিজমের” নামে হাজির এই শক্তি মোদী বা আরএসএসের উত্থানে নির্বিকার। আবার মোদী তাদের ঘরের লোক এবং গ্লোবাল লিডারদের ক্ষমতার গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার হয়ে উঠেছে।  অথচ গুজরাট, দিল্লি কী উত্তরপ্রদেশের মুসলমানের রক্তে তার হাত রঞ্জিত হয়ে উঠেছে; এমন রাজ্যের সংখ্যা বাড়ছে তবু মোদীর রাজনীতি তাদের চোখে তেমন ‘ধর্মের রাজনীতি” নয়। এদের অনেকেই, “রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” নীতিগত অবস্থানের লোক – এই বলে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সারকথায়, রাজনীতিতে ধর্ম না আনার” কথা যারাই তুলে তাদের উদ্দেশ্য এমনই গভীরভাবে অস্বচ্ছ থাকতে দেখা যায়। ফলে এদের কারণেই কোন সিরিয়াস আলোচনা সম্ভব হয় না। আর উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ থাকলে কোনদিকেই আগানো সম্ভব হবার কোন কারণ নাই। তবে সব জায়গায় দেখা যায় যে ইসলামি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে যারা আসছে বা ইসলামিস্টরা খারাপ  আর কথিত সেকুলারিস্টরা ভাল – এটাই একমাত্র এপ্রোচই।

    এদিকে রাজনীতি আর ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে যদি শুধু নাইন-ইলেভেনের পরই ধরি, তাতেও গত ২০ বছরে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। একেবারে উল্টে-পাল্টে অনেক দিক থেকে দেখে আলোচনা সমালোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো প্রভাব এমন লেখকদের উপর পড়েছে তেমন মনে হয়নি।  যেমন এখানে দেখে যাচ্ছে  তিনি সত্তর দশকের মধ্যে থেকেই কথা শুরু করতে চেয়েছেন।

    যেমন আলী রিয়াজ শুরুতেই লিখেছেন, “১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ “। এর মানে, কথিত সেকুলারিজম একটা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে নেওয়ার বিষয়। কিন্তু এই অনুমানটাই ভিত্তিহীন।  এছাড়া কেন এটাকে নীতি হিসাবে নিতেই হবে?  আর কী উদ্দেশ্যে?  ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখতে হবে তাই?  আবার পরিস্কার হয়ে কী তারা কথা বলছেন?  যেমন, ব্যাপারটা কী সাধারণভাবে ধর্ম নাকি নির্দিষ্ট করে ইসলাম? মানে ধর্মটা ইসলাম হলে এটাকে রাষ্ট্র থেকে কথিত আলাদা রাখার প্রশ্ন তুলতে হবে? ব্যাপারটা কী এমন? এর জবাব সব সময় কথিত সেকুলারিস্টদেরকে অস্বচ্ছ রাখতে দেখেছি।  কখনও রিভিজিট করে নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন জানা যায় না!

    মূলত প্রশ্নটা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করারই নয়। একেবারেই না।  প্রশ্নটা নাগরিকদের মধ্যে কোন ধরণের বৈষম্য না করার। এটা নিশ্চিত করা, এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের প্রধান শর্ত ও উদ্দেশ্য। তথাকথিত সেকুলারিজম যেখানে কোন ইস্যুই নয়। কারণ বৈষম্যহীন না থাকলে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সকলে সমান এমন সাম্যে থাকবে না। ধর্মীয়সহ সব পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক সকলে সমান অধিকারের এটা চর্চায় নিশ্চিত করতে গেলে ব্যবহারিক দিক থেকে সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র আর ঠিক আর কোন একটা ধর্মের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হবে না আবার কোন এক ধর্মবিরোধী তাও হবে না। এই অর্থে এটা ব্যবহারিকভাবে যতটুকু যা আলাদা। এর বাইরে যারাই নাগরিক-বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয়, রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে হবে – এমন উদ্দেশ্যের কথা বলবে এরাই ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্যে কথা বলছে বুঝতে হবে। ইসলাম-কোপানি এদের উদ্দেশ্য।

    ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজম নীতি এসেছিল ইন্দিরার আত্ম-সংকটেঃ
    আসলে ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজমের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই, আত্মসঙ্কটে। এছাড়া সেটা ছিল  তাঁর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার শর্ত হিসেবে। অর্থাৎ অরিজিনালি সমস্যাটা তাঁর নিজের। কী সমস্যা? তা হল, সাতচল্লিশের দেশভাগ হয়েছিল নেহরুর স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে;  আর তা ভারতের মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর মধ্য দিয়ে। ফলে নেহেরুর চোখে পাকিস্তান ভারতের স্বার্থের শত্রু, তা মেনেই এর জন্ম। তা হলে এই ভাষ্য অনুযায়ী ইন্দিরার চোখে ১৯৭১ সালেও শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীন তো মূলত সেই মুসলমানই যারা স্বাধীন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙ্গেছিল। তা হলে একাত্তর সালে এসে ইন্দিরা গান্ধী ঐ মুসলমানদেরই সহায়তা করবেন কেন? তাই আমাদের নয়, ইন্দিরার মন ভাল করতে পারে এ প্রশ্নের এমন একটা যুৎসই  সাফাই জবাব দরকার ছিল ইন্দিরার। সেই প্রশ্নটা যেন ইন্দিরার মনে উঠেছিল ১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে; যখন ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে কি না সেটা আর বাস্তবে অমীমাংসিত ছিল না। তবে ‘কী পরিচয়ের’ বাংলাদেশক্ব স্বীকৃতি ঘোষণা দিবেন, ইন্দিরা নামবেন তাই তিনি খুঁজে ফিরছিলেন।

    যেমন, আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন,  কোল্ডওয়্যারের ঝগড়ায় দুই ব্লক-রাষ্ট্রজোটে বিভক্তির সেই যুগে যখন পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন এই  ব্লক-গ্রুপের বিপরীতে বাংলাদেশ-ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অ্যালাইনমেন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়ে গেছিল ও এভাবে যুদ্ধ হতে যাচ্ছে তা মুখ্যত নির্ধারিত হয়ে গেছিল, এটা ছিল সেই সময়। কিন্তু তখনই ইন্দিরার মাথায় যেন উদিত হয়েছিল, কেন এই মুসলমানের বাংলাদেশকেই তিনি সমর্থন করতে যাচ্ছেন এর এক সাফাই-জবাব তাঁর হাতে থাকতেই হবে।  তাকে সুরাহা দিতে মুজিব বা তাজউদ্দীন যদি বলতেন যে তারা আর মুসলমান নয় তাহলে হয়ত ইন্দিরার মনষ্কামনা পুর্ণ হত। কিন্তু হায়! এমনটা সম্ভব নয়!  অবাস্তব স্বপ্ন বলে, এর বিকল্প হিসেবে যেন ইন্দিরার মাথায় আসে ‘সেকুলারিজম’ শব্দটা। অর্থাৎ বাংলাদেশ যেন নিজেকে সেকুলার রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে নেয়, এমনটা করার পরই অষ্টম চিঠি চালাচালিতে ইন্দিরা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মানে ইন্দিরার ইচ্ছা পূরণ হয় এতেই যে, তিনি ‘মুসলমান বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দেননি, ‘সেকুলার’ বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন। এভাবেই  তাঁর অস্থির-মন কিছুটা শান্তি পায়!
    কিন্তু একাজ করেও ইন্দিরার সব দ্বিধা-সন্দেহ তবু চলে যায়নি। কারণ যেমনটা আলী রীয়াজের ভাষ্য, ‘সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ’ করা হয়েছিল – ব্যাপারটা ঠিক তা নয় আবার ওমনটা ফ্যাক্টসও নয়। অন্তত আমরা মানে বাংলাদেশ এটা নিজে যেচে কখনও গ্রহণ করেননি, বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়া ছিল – তাই এখন প্রমাণিত।
    এছাড়া পাল্টা একটা বড় প্রশ্ন করা যায়, কথিত সেকুলার নীতি নেয়া ইন্দিরার চোখে যদি এতই কাম্য ও জরুরি হয়ে থাকে এমনকি ধরা যাক পবিত্র হয়ে থাকে তবে খোদ ভারতই ১৯৪৯ সালে জন্মের পর থেকে (ওর কনষ্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে রচিত/গৃহিত) কথিত ‘সেকুলার’নীতির রাষ্ট্র ছিল না কেন? এই মহান সুযোগ ইন্দিরার বাবারা নেহরু বা গান্ধী খুঁইয়েছিলেন কেন? তাহলে তখনো ইন্দিরার ভারত নিজেই সেকুলার না হওয়া সত্বেও উলটা বাংলাদেশকে জবরদস্তিতে সেকুলার বানানো কেন? আলী রিয়াজের উচিত হবে এদিকটা খুঁজে দেখতে পারেন আগে। ইন্দিরার কাছেও এর জবাব ছিল না। বরং এনিয়ে আত্ম-অস্বস্তি ছিল, অনুমান করতে পারি। তাই এর ফায়সালা করতে ১৯৭৬ সালে (অর্থাৎ কথিত সেকুলার বাংলাদেশের জন্মেরই চার বছর পরে) ভারতের কনস্টিটিউশন বদলানোর সুযোগ পেয়ে খোদ ভারতকে কথিত সেকুলার ঘোষণা করিয়েছিলেন। এর প্রমাণ হিসাবে দেখতে পারেন, The Constitution (Forty-Second Amendment) Act, 1976.

    কেন আওয়ামি লীগের পক্ষে নিজেকে কথিত সেকুলার বলা সম্ভবই ছিল নাঃ
    আবার বাংলাদেশের আওয়ামি লীগের  কাছে “তারা সেকুলার” এমন কথা মুখে আনাই সেকালে ক্ষতিকর ছিল – এটাই সেকালের ইতিহাস ও বাস্তবতা ছিল। এভাবেই আওয়ামী লীগ তৈরি হয়েছিল। সেটা কেমন?  কারণ, অন্তত ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দেওয়ার পরে আওয়ামী লীগের বিরোধীরা (মানে মূলত ইসলামী দলগুলো ও আর্মি সরকারের ভাষ্য যেটা)  ছয় দফার বিপরীতে তারা  অভিযোগ তুলে বলে চলত যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও ইসলামকে দুর্বল করতে চায় বলে ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের কথা তুলেছে। অর্থাৎ মূলকথা তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে “ইসলামকে দুর্বল ও ক্ষতি” করার অভিযোগ তুলত। এর অর্থ যেই আওয়ামী লীগের কাঁধে এমন অভিযোগ সেই দল তো যেচে বলতেই পারে না যে, সেকুলারিজম তার কোন হবু-রাষ্ট্রনীতি হবে! কারণ এতে ঐ অভিযোগকেই মেনে নেয়া বা প্রমাণ করে দেয়া হবে! এ কারণে কথিত “সেকুলারিজম” আওয়ামী লীগের দলে বা কোন নেতার মুখে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত থাকবার কোন সুযোগই ছিল না। এটাই আরেকটা খাস প্রমাণ যে “কথিত সেকুলারিজম” আওয়ামি লীগের নীতি ছিল না।
    অতএব, ১৯৭১ সালে আমাদের কথিত সেকুলার হওয়ার কথা যা আলী রীয়াজ দাবি করছেন তা  ভিত্তিহীন। তবে এটা পরিষ্কার যে, এটা ছিল ইন্দিরার ছুপা-মনোবাসনা! তাঁর মনের ‘খচখচি’ মিটানো! যা আমাদের উপর চাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ উল্টো করে বলা যায়, এক অন্যায় মনোবাসনা যে, যে যে মুসলমানদের কারণে অখণ্ড ভারত  হতে পারেনি, সেই মুসলমানদেরই ইন্দিরা সহায়তা করেন কিভাবে? এই খচখচানি দূর করতেই আমাদের সেকুলার হতে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে ইন্দিরার মনোস্তুষ্টি রিয়াজ নিজের কর্তব্য বলে হয়ত অজান্তে গ্রহণ করে নিয়েছেন; যদিও একাদেমিকদের কাজ হওয়া উচিত কোন বক্তব্যের পক্ষ-বিপক্ষ দুই দিকেরই সাফাই পয়েন্টগুলো নির্মোহ যাচাই করা এবং তা, খুলে ও মেলে ধরা।

    কোন রাষ্ট্রকে  কথিত এই সেকুলার হতেই হবে কেন; আর তা হওয়ার উপায়ইবা কী ও দরকার কেনঃ
    সেকুলারিজম নাকি এক ‘পবিত্র’ রাষ্ট্রীয় নীতি- এ কথাটা হল সবচেয়ে অর্থহীন এবং নিজেকেই ফাঁকি দেয়া এক বয়ান। অর্থাৎ এটা আসলে বুঝে বা না বুঝেই বলা কিন্তু মূলত অসৎ উদ্দেশ্যের এক বয়ান। আসলে এখানে মূল প্রশ্ন, কেন কোন রাষ্ট্রকে ‘সেকুলার’ হতেই হবে, দরকার কী? আবার তা হওয়ার উপায় কী? আর ‘সেকুলার’ হওয়া মানেই বা কী?
    আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সেকুলারিজম এক পবিত্র রাষ্ট্রীয় নীতি এ কথা বলে যারা রাষ্ট্রের গায়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে আমরা দেখেছি, এরা কার্যত মুসলমানবিদ্বেষী। এই বিদ্বেষ চর্চা করতেই তারা ঐ সাইনবোর্ড ব্যবহার করেছে। কেন বারবার এই বিদ্বেষের দিকে আঙুল উঠাচ্ছি বা উদ্দেশ্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি?
    কারণ, কোন কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

    তা হলে প্রথমত এটা কোন রাষ্ট্রীয় নীতি বলে সাইনবোর্ড টাঙানোর কাজই না যে, এটা সেকুলার রাষ্ট্র। তা হলে ‘অসততা বা উদ্দেশ্যের কথা’ তোলা হচ্ছে কেন? কারণ অনেক পুরনো ও প্রথম কথা হল, আপনি একটা একচেটিয়া ক্ষমতার আধিপত্যে থেকে এরপর অন্য ধর্মের লোককে ডিকটেট করতে পারেন না যে, তাঁর সেকুলার হওয়া উচিত। সবসময় এই ব্যাপার ঘটেছে এইভাবে।  ঠিক যেমনটাকে আলী রিয়াজ এখন সমস্যা হিসেবে হাজির করছেন। যেমন, আমরা দেখেছি ১৯০ বছরের জমিদার আমলে, দুই বাংলার সেই জীবন জমিদার-হিন্দুর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যে কেটেছে। আর সেই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে তারা মনে করত যেমন ইসলামী টুপি মাথায় দেয়া বা ইসলামী লেবাস পড়ে শহরে ঘোরা যাবে না। করলে নাকি তা সেকুলার নীতি ভঙ্গ হবে। তবে ব্রিটিশ আমলে  জমিদাররা এটাকে ঠিক সেকুলার না,  বলতেন “সাম্প্রদায়িকতা”। আর একালে সেটাকেই গুছিয়ে বলা হয়, কথিত “সেকুলার রাষ্ট্রীয়নীতি”। অথচ উদ্দেশ্যটাই অসৎ! একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখা!
    তাহলে সেকালের সাম্প্রদায়িকতার মানে হল, জমিদার-হিন্দুর যে আধিপত্য কায়েম ছিল সেটাকে কোনো চ্যালেঞ্জ করা যাতে না হয়ে যায়, এমন হতে না দেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের নিজ সম্প্রদায়েরও চিহ্ন প্রদর্শন করতে না দেয়াই সেকুলারিজম। এমন না করা যেন অ-সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলারিজম বলে সেকালে জমিদার-হিন্দু আর একালে ইন্দিরা বা মোদি সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন।
    আর তাই মুসলমান বা কোনো ধরনের ইসলামিজমের কাছে সেকুলারিজম শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে, এটাই ইসলামবিরোধীতার ও বিদ্বেষের এক হাতিয়ার এবং এটা তাদের সাথে বৈষম্য করার জন্য এসেছে।
    তা হলে মূল কথা, আগে থেকে থাকা কোনো মুসলমান বা হিন্দু আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আশ্রয় নেয়া বা এটাকে রাষ্ট্রীয়নীতি বলে চালিয়ে দেয়া- এগুলোই অসততা ও খারাপ উদ্দেশ্য বলছি। তাদের হাত পরিস্কার নয় তাই।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য বৈষম্যহীনতা, নাগরিক অধিকারে সাম্যঃ
    তা হলে, মূলকথাটা হলো বৈষম্যহীনতা। আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল- বৈশিষ্ট হিসেবে তার নাগরিকদের মধ্যে সাম্য, সব নাগরিকের অধিকার সমান- এই নাগরিক বৈষম্যহীন নীতির ভিত্তিতে দাঁড়ানো। যেখানে রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকদের পরিচয় একটাই যে, সে নাগরিক এবং সবার সাথে বৈষম্যহীনভাবে সমান অধিকারের নাগরিক। তাতে নিজস্ব আইডেনটিটি (যেমন ধর্মীয় বা ভাষা বা পাহাড়ি-সমতলী, নারী-পুরুষ প্রভৃতি) আগের মতোই আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি একটাই যে, সে রাষ্ট্রের নাগরিক। অর্থাৎ নাগরিকের অন্যসব আইডেনটিটি আগের মতই নানান ভিন্নতা নিয়ে আছে; কিন্তু সেসবের ভিত্তিকে কাউকে কারো উপরে অধিপতি না বানানো, কাউকে নাগরিক বৈষম্যের শিকার না বানানো – এসব কঠোরভাবে চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকারে সাম্য নিশ্চিত করা, এটাই মূল দরকারি কাজ। খেয়াল করেন, এই পুরো প্যারাটায় কোথাও সেকুলার শব্দটাই লিখতে হয় নাই। অথচ অর্থ পরিষ্কার। নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের এটাই মূল-বৈশিষ্ট্য হতে হবে এবং তা কোনো ‘সেকুলারিজম আমার রাষ্ট্রীয় নীতি’ এমন কথার চাতুরি বা আড়াল না নিয়েও বলা যায়। এটা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই হয়ত আর কোনো মুসলমান বা যে কোন ধারার  ইসলামিজমের পুঞ্জীভূত অনাস্থা ও ক্ষোভ আমরা কাটাতে পারি। বাংলাদেশের হিন্দুরাও অনাস্থা কাটিয়ে তেমন বৈষম্যহীন বাংলাদেশকেই আপন মনে করে আস্থা খুজতে পারেন।
    অর্থাৎ মূল কথা, সেকুলারিজম শব্দের উচ্চারণই অপ্রয়োজনীয়। ফলে এ শব্দের আড়ালে কোনো চাতুরীও চলবে না। নাগরিক সাম্য-নীতি অনুসরণ করবেন এবং কোন সাইনবোর্ডে না – চর্চায় তা প্রতিষ্ঠা করবেন, এটাই এর মূল ফোকাস হতে হবে।

    রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন – বৃটিশ অসততাঃ
    আলী রিয়াজ লিখেছেন, ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকার কথা ছিল, রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ ছিল। এই শব্দ ও বাক্যগুলোই আড়ালেই প্রবল অপ-ব্যবহার ঘটানো হয়েছে। ইসলাম কোপানোর পারফেক্ট সুযোগ করে নেয়া হয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এতে এক বিরাট অনাস্থা তৈরি হয়ে গেছে বিশেষ করে মুসলমান বা কোন ধরনের ইসলামিজমের জনগোষ্ঠীর মনে। মূলত ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ এর নামে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করা হয়েছিল। এই অসততার ‘গুরু’ ব্রিটিশ সরকার। বিশেষত ১৯২৩ সালের নেশন স্টেট ব্রিটিশ রিপাবলিক। এর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া তুরস্ক বা অটোমান এম্পায়ার দখল করে ব্রিটেনের নিজ ইচ্ছায় একে সাজানো। ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া’- এই কামালকে ক্ষমতায় বসিয়ে ব্রিটিশরা ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ কথাগুলো সাজিয়েছিল।
    আগেই বলেছি সাম্য-নীতিকে চর্চার বাস্তবায়ন, নাগরিক বৈষম্যহীনতা বাস্তব করে তোলা – এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারলে “জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক” কী হবে, কোথায় তা ভারসাম্য আনবে সেটা আপনাতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও বাস্তব সমাধান হবে। কিন্তু যার উদ্দেশ্য ইসলাম-কোপানি আর মনে বিদ্বেষ, ক্রুসেদে হারার পুরান রাগ তার মুখে এসব রুচবে না!
    যেমন, সুলতানি তুরস্ক ছিল ডমিনেটিংভাবে ইসলামী। তা এক সাম্রাজ্যরাষ্ট্র ছিল। আবার তুরস্ক মানেই, একই সাথে বারবার ক্রুসেড হেরে যাওয়ার ইউরোপীয় খ্রিশ্চীয়-মনের ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতাও। কিন্তু যেটাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের হেরে যাওয়ার পরের ১৯২৩ সালের সেকালের মডার্ন তবে জাতিরাষ্ট্রের ব্রিটেন চায়নি যে, ১৯২৩ সালের তুরস্কের কারণে ব্রিটেনে্র নিজ আভ্যন্তরীণ   খ্রিশ্চীয় থিওলজি আবার রাজনীতির চেয়ে  প্রবল হয়ে উঠুক বা রাজনীতিকদের পাশাপাশি ক্ষমতার ভাগীদার হয়ে উঠুক। তাই ব্রিটিশ শাসকেরা  ব্যাপারটাকে ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন” থাকা জরুরি এভাবে সাজিয়ে কথা তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ কথাগুলো এনেছিল।  যাতে বৃটেনেও  খ্রিশ্চীয় থিওলজির সত্ত্বা আগের মতই রাজনীতিক সত্ত্বার অধীনস্ত হয়ে নিচে চাপা থাকে। এছাড়া বাস্তবে পেয়ে যাওয়া তাদের বসিয়ে দেয়া শাসক কামাল আতাতুর্ক  জবরদস্তিতে খাড়া হতে পারেন বা কোন ধরণের ইসলামিজমের হাতে আক্রান্ত না হন। কামালকে রক্ষা করতেই এই নীতি। কথিত সেকুলারিজম মানেই রাষ্ট্র আর ধর্মের বিভাজন, এমন কথা সত্য নয়। এককথায় এটা ছিল তুরস্ক বা বৃটেন স্পেসিফিক তাদের আভ্যন্তরীণ হবু কোন সংকট যে উদয় না হয় এর জন্য সাবধাণতা। রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকতেই হবে এভাবে সেকুলারিজমকে উপস্থাপন করা একটা চিহ্ন হিসাবে একে দেখানো এমন কোন কথা কোনকালেই ছিল না।

    কাজেই মোদ্দা কথা ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’-এর তত্ত্ব কামালের তুরস্ককে বৃটেনের নিয়ন্ত্রণে সামলানোর এক আলাপ মাত্র।  এটা কোনোভাবে নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের আলাপই নয়। কাজেই রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের এই আলাপ এক কথায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ইউরোপে এটা যার যেভাবে কাজে লাগে সে সেভাবে এটা ব্যবহার করে, মানার ভান করে। এমনকি আমেরিকান রাষ্ট্রও এটা মানে না। আমেরিকা মনে করে, নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষাই রাষ্ট্রের কাজ। তবে মুখ্য বিষয়টি হল – তুরস্কে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের কথা নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের কথা নয় বা সেদিক থেকে তোলাই হয়নি। তাই এটি উপেক্ষাযোগ্য। এই সারকথাটা আমাদের মনে রাখতেই হবে।
    সোজা কথাটা বললে, লেখক যদি বেড়ে চলা ইসলামিজমের দিকে তাকিয়ে তা ঠেকানোর উপায় খুঁজতে থাকা কেউ হন, তা হলে তিনি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক – এ আলাপে আমাদের কেউ নন। তার এজেন্ডা ও প্রসঙ্গও তাই আলাদা। ১৯২৩ সালে তুরস্ক থেকে ব্রিটিশদের হাতে তৈরি করা ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দের আড়ালে আরো কত কিছু যে আমাদের দেখতে হবে সেটি তাদের ব্যাপার। এভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করতে থাকুন। কিন্তু আমরা তাদের সাথে একই নৌকায় নাই। উই আর নট ইন্টারেস্টেড! কারণ ওটা নষ্টা রাস্তা! এই সেকুলারিজম আমাদের রাস্তা নয়। এটি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক চিন্তারও কোন অংশ বা আত্মীয় কিছু নয়।
    আবার কলোনি জমিদার আমলে, যা আগেও বলেছি, যে এমনটাই জমিদার-হিন্দুর আকাঙ্খা ও বয়ান ছিল যাকে তার অলীক বাসনাও বলতে পারি। যে মুসলমানকে ‘বাঙালি’ বলে মনে করা হতো না, বাংলা ভাষাটা কেবল বাঙালি হিন্দুর ভাষা মনে করা হত। তাই এর শ্রীবৃদ্ধি ও বিকাশে যা বলার সেটাও বাঙালি হিন্দুরই একচেটিয়া মনে করা হত। এরাই এখন ‘হিন্দুত্ববাদের “হিন্দু সংহতি“র নামে আরএসএসের ছায়াতলে অঙ্গসংগঠন হয়ে আছে।

    আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’ হল মূল আসামীঃ
    বেড়ে চলা নানান ধরণের ইসলামিজম ও পশ্চিমের উপর তাদের জেনুইন অনাস্থার জন্য মূল দায়ী আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকার ‘হোম ল্যান্ড সিকিউরিটি’ নামে ডিপার্টমেন্ট খোলা (Nov 2002) এবং তার ইসলামবিদ্বেষী নীতির চর্চা করা। সচেতনে অথবা অচেতনে এই চর্চার ফলে যে মেসেজ তারা হাজির করেছিল তা হল, আমেরিকানরা কথিত সন্দেহভাজন “মুসলমান-মুক্ত” এক দুনিয়া গড়তে চায় আর সেখানেই বসবাস করতে চায়। অথচ এটি ছিল আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজ ভিত্তিমূলক বক্তব্য – নাগরিক বৈষম্যহীন রিপাবলিক ধারণার বিরোধী। আসলে এটাই ছিল ইভানজেলিক-খ্রীশ্চান বুশের শর্টকাট পথ।
    আর এর ফলাফলে ও পরিণতিতে ঠিক এরই উল্টো প্রতিক্রিয়াই হল – এরই নাম বেড়ে চলা নানা ধরনের ইসলামিজম। ইসলামিজম তাই স্বভাবতই আমেরিকাকে পাল্টা বলছে, তারাও এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করে যেখানে কেবল মুসলমানরা আছে। কাজেই বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার আগে উচিত আমেরিকা খোদ নিজ-নীতির দিকে তাকানো। বাইরে বাঘ খুজার আগে নিজ মনে যে বাঘের ভয় ও সীমাহীন ঘৃণা-বিদ্বেষ তাঁরা জন্ম দিয়েছিল এর পরিণতি তো এমনই হবার কথা!  সবার আগে নিজ ভুলগুলো তাদের বুঝতে হবে। বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে আমরা কামনা করব, আগে আমেরিকা নিজেই আত্মসমালোচনার যোগ্য হয়ে উঠুক। তবেই হয়ত তার চরম ইসলামবিদ্বেষ ভালো হয়ে যাক: তাহলেই তো হয়। কিন্তু সে কথা বলার মুরোদ কি অনেকেরই হবে? সন্দেহ আছে!

    ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপনের অভিযোগঃ
    ৯/১১ এ আলকায়েদা আমেরিকা-রাষ্ট্রের উপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের উপরই কোন সশস্ত্র হামলার শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা সর্বোচ্চ শাস্তি।  লিগাল পয়েন্টে এই শাস্তি নিয়ে তর্কের কিছু নাই। কিন্তু সাবধান। আপনি যদি বলেন ঠিক আক্রমণকারী এখানে অপরাধী না।  ইসলাম এখানে অপরাধী? অর্থাৎ অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় তুলে আপনি প্রপাগান্ডা বিদ্বেষ তৈরির এক আসর চাইতেছেন। এবার আপনি তাহলে ইসলামবিদ্বেষ করলেন। অর্থাৎ আমেরিকান রাষ্ট্রের যা করা উচিত না, করণীয় ছিল না তাই করা হয়েছে এখানে।
    যেমন আলী রীয়াজ আরো লিখেছেন, “ইসলাম ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপন করে শাসনের হাতিয়ারে” পরিণত করেছে। সার কথায় তিনি বলতে চাচ্ছেন, “ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ” বলে ব্যবহার করা যাবে না। কেন যাবে না?  কোন কথিত সেকুলারিজম এটা না করতে চায়?  কিন্তু এ’ব্যাপারে আমাদের সবার পথ প্রদর্শক কি সাবেক মার্কিন  প্রেসিডেন্ট খোদ বুশ (জুনিয়র) নন? তিনি কি নাইন-ইলেভেনের দিনেই হামলার কয়েকঘন্টা পরে তাঁর প্রথম টেলিভিশনে হাজির হওয়ার বক্তব্যে আমাদের ইভানজেলিক খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডের হুমকি, আর আবার ক্রুসেড লড়ার হুমকি শোনাননি?  তাহলে ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ হিসাবে ব্যবহারের দায়ে  রিয়াজ ঠিক কাকে এ জন্য অভিযুক্ত করতে চান? আমরা জানি না। আগে রিয়াজের এটা আমাদেরকে জানানো উচিত!
    তবে এগুলো অবশ্যই এর বাইরের দিক। ভেতরের কথা হল, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না – এটা বাস্তবত এক অলীক কল্পনা। অবশ্যই ধর্মতত্ত্ব (Theology) আর রাজনীতি আলাদা বিষয়। বিশেষ করে দুটোর ভাষাই তো আলাদা। এমনকি প্রেজেন্টেশন ও বলার স্টাইল এবং পূর্ব-অনুমানগুলোতে তারা একেবারেই আলাদা। কিন্তু আবার এমন ঘোরতর মিলও আছে যে আলাদা করাই মুশকিল। যেমন আপনি আজ বলছেন, ধরা যাক, আপনার পার্টির কোন এক রাজনৈতিক ‘রেজুলেশনের’ [resolution বা সিদ্ধান্ত প্রস্তাব] কথা। তাতে মনে হতে পারে, আপনি বিরাট জ্ঞানী রাজনীতিক রাজনীতির আলাপ করছেন। কিন্তু তলায় হাত দেন। পারবেন? মুরোদ থাকলে প্রশ্ন করেন এই ‘রেজুলেশন’ শব্দটি কই পাইলেন? এই শব্দটা শতভাগই এক ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ ও ধারণা যার অর্থ খ্রিশ্চীয় বছর শুরুর প্রথম দিনে খ্রিশ্চীয় মানুষ নতুন বছরে কী কী করবে বলে তাঁর গডের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, এটাই তাঁর নতুন বছরের ‘রেজুলেশন’ বলে। ঐ দিন শেষে তাঁরা একে অপরের কাছে তার তার রেজুলেশন কী, জানতে চাইবে, ‘উইশ’ করবে ইত্যাদি। তাহলে এখন বলেন রেজুলেশন কী রাজনীতির না ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ?
    সারা দুনিয়াতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস বা এর চিহ্ন পাওয়া অনুসারে, এটা সর্বোচ্চ ছয় হাজার বছরের পুরানা মনে করা হয়। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি চিহ্ন পাওয়া যায় এই বিচারে তা তিন হাজার বছরের পুরানা। এই তিন হাজার বছরের প্রায় পুরাটা সময় কোন না কোন বা একটা না একটা “ধর্মতত্ব” তাঁর সাথে ছিল, মানুষকে সাথে নিয়ে যে পথ হেঁটে চলছে। আর এসবের বিপরীতে মাত্র দেড় হাজার বছর আগের এক নতুন ফেনোমেনা হল – দুনিয়াতে ধর্মতত্ব বা এর প্রভাব বলে কিছুই নাই, না চাইকি ধর্মতত্ব বলেই কিছু নাই এমন ধরে নেয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে দুনিয়ার সব ফেনোমেনাকে দেখার পদ্ধতির নাম হল বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির এনলাইটেনমেন্ট। অর্থাৎ সোজা বললে,  দুনিয়ার যেন সব ঘটনা-ফেনোমেনাই ফিজিক্যাল, এই অনুমান। মানে স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা বলে কিছুই নাই। আবার এর ফলাফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই খুবই ভাল। তা হওয়ারই কথা।  বিশেষত যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝবার ক্ষেত্রে এর উপর থিওলজির কোন প্রভাব নাই বলে এটা নাই তা ধরে নিতেই পারি। তাতে সুত্রে কোন হেরফের আসে না।  কিন্তু সাবধান যেখানে রক্তমাংসের মানুষের জীবন জড়িয়ে  আছে বা থাকে সেসব ক্ষেত্রে সেখানে বিজ্ঞান বা র‍্যাশনাল চিন্তার পদ্ধতি যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে না। এছাড়া থিওলজি এখনও তার মত করেই প্রভাব ফেলে থাকে।মানুষের চিন্তা বিষয়ক সব শব্দের আদিতে ধর্মতত্বের গর্ভ থেকে উতসারিত।

    তাই মূলকথাটা হল, মানুষের চিন্তায় বিশেষত যেসব শব্দ সে  ব্যবহার ও ধারণ করে এমন প্রতিটা শব্দের উতপত্তি ধর্মতত্বের হাতে ও ঘরে।  যদিও শব্দের উতস বা রূট ধর্মতত্বের তা হলেও সেসবের অর্থ অবশ্যই বদলে যেতে পারে, বদলে নিতেই পারি। secularize বা ধর্মতত্বীয় আগ্রহের বাইরের  সিভিল লাইভে ব্যবহার ধরণের এর অর্থ করে নিতেই পারি।
    দুনিয়াতে শব্দের অর্থের বিবর্তন হয়, নতুন অর্থে পুরনো শব্দের ব্যবহার দেখা যায় যদিও শব্দের রুট একই থাকে। যে ডিকশনারি শব্দের রূটের হদিস দিতে পারে না সেটা ভাল ডিকশনারি নয় বলে মানা হয়। অতএব, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির বন্ধন ও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তা হলে ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো পাকা দেয়াল তোলাও অসম্ভব। যদিও আবার বলছি ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির ভাষ্য ও প্রেজেন্টেশন আলাদা, বলার ঢঙ, গদ্যরূপ আলাদা; উদ্দেশ্যও আলাদা। সেটাও মেনে চলা উচিত।

    অতএব সাবধান। বুঝহ সুজন! আর মূলকথা, অমন সেকুলারিজমকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও আমাদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ (দ্বিতীয় পর্ব)

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    দ্বিতীয় পর্ব

    ২৬ মার্চ ২০২১  বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-3qT

    প্রথম পর্বের লিঙ্ক এখানে

    দ্বিতীয় পর্বঃ
    রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয় প্রধানত, ক্ষমতার রূপ হয় দুইটা বা ক্ষমতার প্রকাশ ঘটতে পারে দুইভাবে। এক হল ফিজিক্যাল ক্ষমতা; যেটা আমরা সকলেই চিনি বুঝি। মানে সৈন্য সামন্ত আর অস্ত্র বা ব্যারাকে যা স্টোর করা থাকতে দেখা যায়, যা বস্তুগত বা সামরিক ক্ষমতা যেমন। আর অন্যরূপটা হল, ভাবগত ক্ষমতা। মানে বয়ান বা ইডিওলজি (ভাবাদর্শ) রূপে ক্ষমতা। মানে যাকে ইংরাজিতে জাস্টিফিকেশন বলে সেই ন্যায্যতা বা সাফাই। কিন্তু এদুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্কটাকে অন্যভাষায় বললে – কোন ফিজিক্যাল ক্ষমতা টিকবে না যদি না বিশেষত সে ক্ষমতাটা কায়েম বা কার্যকর হবার পর ওর স্বপক্ষে কোন সাফাই বয়ানও সাথে হাজির না থাকে। সেজন্য এটাকে ক্ষমতার “ন্যায্যতা বা সাফাই যোগানোও” বলা হয়। পাকিস্তানের জন্ম অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা এমন কঠিন সাফাই বয়ানের ঘাটতি ও অভাবের সমস্যায় পড়েছিল।

    যেমন, কেন পাকিস্তান কায়েম সঠিক হয়েছিল এর স্বপক্ষে অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে কোন সাফাই-বয়ান হাজির ছিল না, কেউ করে নাই। এমনকি এমন বয়ান দাঁড় করানোর কোন চেষ্টাও করা হয় নাই, সমাজের কোন কর্ণার থেকে।। যদিও কার্যত জমিদারি উচ্ছেদ ঘটে যায় সাতচল্লিশের পনেরোই আগষ্টের পর থেকেই। তাই প্রজা-কৃষকের হাতে জমির ভোগদখলে, এর দলিল পাবার আগেই তা চলে এসেছিল। অর্থাৎ জমি প্রজার ভোগদখলে এসে গেছে যদিও সেই দলিল হাসিল করেছিলাম ১৯৫১ সালে এসে। কিন্তু কেন পাকিস্তান আন্দোলন করা সঠিক ছিল আর পাকিস্তান কায়েম করা জায়েজ ছিল এর স্বপক্ষে আমরা বয়ান-ন্যায্যতা তুলে আমাদের ইতিহাস লিখে নেই নাই। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে টেক্সটবুক লিখা হয় নাই, ফলে তা পড়ানোও  হয় নাই। কিন্তু এটা কেন সম্ভব হয় নাই? আবার এমনটা কী করে ও কেন ঘটা সম্ভব হয়েছিল?

    টেক্সটবুক ও ১৯৪৭ এর দেশভাগের সম্পর্কঃ ১৯৭১ এর সাথে তুলনা
    যেমন ১৯৭১ সালের সাথে তুলনা করলে আমরা দেখব, ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম করা যে সঠিক হয়েছে এনিয়ে নতুন করে ইতিহাস লেখা হয়েছিল। কালক্রমে যদিও মোটাদাগের মূল ইতিহাস এবং সাথে এর মুলকাঠামো ও ঘটনাক্রম ঠিক রেখেও কোন কোন প্রসঙ্গে একাত্তর সালের ঘটনা বা জন্ম নিয়ে দুতিনটা লিখিত ভাষ্য বা ব্যাখ্যা-বয়ানই বাংলাদেশে এখন হাজির আছে পাওয়া যায়। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের জন্মের ক্ষেত্রেই তাদের ইতিহাস কোনটা হবে তা নির্ধারণের বেলাতেই ওর ভাষ্য এমনই চার-পাঁচটা পর্যন্ত হতে  দেখা যায়। ফলে “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একটাই হয়” – এধরণের হাসিনা আওয়ামি লীগের দাবি একেবারেই অবাস্তব। আর “সঠিক” বা “খাটি” ইতিহাস কথাটাও অর্থহীন।  বরং বাস্তবে যা দাড়ায় তা হল কিছু বিষয়ে যার যার কয়েকটা ভিন্ন বয়ান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।  দুনিয়ার সবদেশেই এটাই ঘটে। সেকারণে একদেশে কখনও একটাই ইতিহাস একটাই বয়ান থাকে না, যদিও মোটাদাগে বলা ইতিহাসের মূল কাঠামোটা সব বয়ানের মধ্যে একই থাকে। অর্থাৎ মোটের উপর একটা ইতিহাসের বয়ান থাকে আর সেটাই একাদেমিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় লেখা টেক্সটবুকে পড়ানো হয়।

    কিন্তু এবার তুলনা করেন ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের সাথে। পাকিস্তান আন্দোলন করা সঠিক হয়েছিল এমন দাবি করা আমাদের কোন  লিখিত ইতিহাস নাই, কখনই করা হয় নাই। একথা ঠিক ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রায় ২৪ বছর পরে ১৯৭১ সালের মুসলিম লীগ আর পাকিস্তান আর্মি খুবই নিন্দিত ভুমিকা, গণহত্যার মত অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। ক্লিনজিং বা জাত নির্মুলের মত নৃশংস ও রেসিজমের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেকারণে ১৯৪৭ সালে ও তার ইমিডিয়েট পরবর্তিতে মুসলিম লীগের সমস্ত ইতিবাচক অর্জন ও ভুমিকাকে অস্বীকার বা আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হবে বা থাকবে এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এছাড়া এর চেয়েও বড় কথা নিজের ইতিহাস না লিখে উলটা “জমিদারের  বয়ানটাকেই (যেটা উলটা বয়ান) আপন করে তুলে নেওয়া হয়েছিল। যারাই ১৯৪৭ এর পরে ‘শিক্ষিত হবার সুযোগ’ পেয়েছিল  তারাই বিশেষ করে শিক্ষিত মুসলমানেরা  “জমিদারের বিপরীত বয়ানটাকেই” আপন করে নিয়েছিল। তাও আবার সেটাই নাকি প্রগতি বা রেঁনেসার বয়ান এই মারাত্মক বিভ্রম থেকে বা কারণে। অথচ তা ছিল একেবারেই  মূলত এক ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া আর কিছুই না।

    মূল কারণ পুর্ব-পাকিস্তানের কেউ নিজের স্বাধীন রাষ্ট্র পাবার ইতিহাস লেখে নাই। অথচ জমিপাবার সমস্ত সুবিধাভোগী একমাত্র ও মূলত সে-ই। ফলে নিজ ইতিহাস নিজে না লিখলে পরিণতি কী হয় এরই প্রমাণ পুর্ব-পাকিস্তান। বরং উলটা এক তামসার কথা হল, জমিদারি আমলের পুরানা সকল প্রজা –  আজকের পুরা বাংলাদেশের যারা আমাদের পুর্বসুরিরা আমাদের বাপ-দাদাদের দাদারা; এদের প্রায় সবাই আজ যারা জমির মালিক এরা সকলেই কিন্তু ১৯৪৭ সালের জমিদারি উচ্ছেদে ভূমিলাভের প্রথম সুবিধাভোগী। কিন্তু সেই আমরাই যখন মর্ডান এডুকেশন লাভের উদ্দেশ্যে ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি, সেখানে গিয়ে যে ইতিহাস বইটা পড়েছি সেটা পাকিস্তানে (বা পুর্ব-পাকিস্তানে নতুন করে) লেখা হয় নয়, তাই পাকিস্তানের ইতিহাস নয়। জমি পাবার ইতিহাস নয়। বরং আমরা দ্রুত কলকাতায় লেখা ও ছাপা হওয়া বইটাকেই আমাদের পাঠ্য করেছি, সেটা আসলে কলকাতার লেখা তাঁদের ইতিহাস যেটা আমরা কপি করে ততকালীন পুর্ব-পাকিস্তানে ছেপেছিলাম। যেন  হিসট্রি টেক্সটবুক ব্যাপারটা ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রি বইয়ের মত যে সেটা কলকাতার বইটাই কপি করি কী লন্ডন কেমব্রিজেরটা কপি করে আনি না কেন কোন অসুবিধা নাই। কঠিন বাস্তবতটা হল, ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রি বইয়ের মত হিস্টি বই অন্যেরটা কপি করে এনে নিজ দেশে চালু করা যায় না। নিজ ইতিহাস নিজে লিখতেই হয়। কারণ এক রাষ্ট্রের ইতিহাস বয়ান দিয়ে আরেক রাষ্ট্র চলতেই পারে না। কারণ সবারই জন্ম ইতিহাস ও সাফাই-ন্যায্যতা্র বয়ান আলাদা ও ভিন্নই হয়।

    কঠিন বাস্তবতটা হল, ফিজিক্স বা কেমিস্ট্রি বইয়ের মত হিস্টি বই অন্যেরটা কপি করে এনে নিজ দেশে চালু করা যায় না। নিজ ইতিহাস নিজে লিখতেই হয়।

    অর্থাৎ আমরা ধরেই নিয়েছিলাম কলকাতার ইতিহাসের ভাষ্য আর আমাদের (পুর্ব-পাকিস্তানের ইতিহাসের) ভাষ্য যেন একই। যেন কলকাতারটা যেহেতু “আধুনিক শিক্ষার” (মানেই প্রগতিশীলতার ইতিহাস) বই কাজেই, কলকাতার ইতিহাসটা পড়লেই পুর্ব-পাকিস্তানের নিজের ভাষ্য-ইতিহাসিটা জানা হবে আর তাতে আমাদের চলবে। অথচ দুটার বাস্তব ইতিহাস ভাষ্যের সবচেয়ে মুখ্য ও বিরাট ফারাকটা হল, একটা জমিদার হিন্দুর ভাষ্য আরেকটা প্রজার ভাষ্য।  অথচ আমরা এমন দাবিও করতে দেখি যে প্রগতিশীলেরা নাকি সবচেয়ে বেশি শ্রেণী সচেতন!  অথচ এরা জমিদারের ভাষ্যটাকে অবলীলায় প্রজার ভাষ্য বলে চালিয়েছে।

    প্রগতিবাদের সমস্যাঃ
    প্রগতিবাদও কম পুরানা নয়। খুবই অল্প কথায় মূল জিনিষটা বললে, ইংরাজি প্রগ্রেসিভ (progressive) শব্দের বাংলা করে নেয়া হয়েছে প্রগতিবাদ। এটা বৃহত্তর অর্থের এক ধারণা। যেমন সব কমিউনিস্ট প্রগতিবাদী কিন্তু প্রগতিবাদীরা সবাই কমিউনিস্ট নাও হতে পারে। মানে কমিউনিস্টরা আরো খাঁটি প্রগতিবাদী এমন বলা যেতে পারে।  প্রগতিবাদের রূট পাওয়া যাবে রেনেসাঁর মধ্যে। যদিও একালের প্রগতিবাদ রেনেসাঁ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না, কিছুই পড়ে নাই। আবার  সব ধর্ম নয়, কেবল ইসলাম কোপাতে হবে এটা জানে। সেই সুত্রে নিজেকে প্রগতিবাদী বলে দাবি করে থাকে। যদিও কমিউনিস্টরা তাদের পাঠ্য সিলেবাসে কখনও রেনেসাঁ আন্দোলনকে পাঠ্য হিসাবে রেখেছি তা দেখা যায় না। ঠিক যেমন মর্ডানিজম বা মর্ডান রাষ্ট্র কমিউনিস্টদের পাঠে থাকতে দেখা যায় না এটা সেরকমই যেন। তবে

    রোমের তিন শহরে তারা রোমের খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের আগে সময়ের কিছু প্রাচীন নিদর্শন আবিস্কার করেছিল যা ১৪৫০ সালে বসে তাদের মনে হয়েছিল সেগুলো তাদের আমলের চেয়ে উন্নত, তাদের চিন্তাভারণা অনেক উন্নত ছিল। ফলে তারা প্রাচীন রোম যা খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের আগে ছিল সেই রোমকে পুনঃআবিস্কার বা পুণর্জন্ম দেওয়ার এক সংগ্রামে সংগঠিত হয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল। এটাকে তারা রেনেসাঁ  বা রি-বার্থ (re-birth) এর আন্দোলন বলে নামকরণ করেছিল। অর্থাৎ প্রকারন্তরে বলা যেন যে খ্রীশ্চান হওয়াটাই প্রাচীন রোমের জন্য কাল হয়েছিল।
    এখন রোমের রেনেসাঁ আন্দোলন মানে কী?
    সেটা কী এটাই বলা যে সাধারণভাবে সব ধর্মই পশ্চাদপদ (প্রগতির বিপরীত)? নাকি খ্রীশ্চানিটিই পশ্চাদপদ ও সব সমস্যার গোড়া? কিন্তু সেক্ষেত্রেও আরও প্রশ্ন আছে। খ্রীশ্চান হবার আগের যে প্রাচীন রোম সেকালেও কী স্থানীয় ধর্ম মানে গ্রীক দেব-দেবীর ধারণা ছিল না? অবশ্যই ছিল। তাহলে সাধারণভাবে ধর্ম মানে সকল ধর্মতত্বকেই (Theology) আক্রমণের নিশানা করার কোন সুযোগই এখানে নাই। অথচ রেনেসাঁ মানে ধর্ম-কোপানী এই ধারণা ছড়িয়েই তো এর প্রপাগান্ডা শুরু হয়ে গেছিল?
    আবার যেমন মধ্যযুগ মানে কী?
    আক্ষরিক অর্থে ও মোটাদাগে এটা হল ৫০০-১৫০০ খ্রীস্টাব্দ; এই মাঝের হাজার বছর। প্রাচীন রোমের বিচারে এটাই রেনেসাঁর আবির্ভাবের আগের খ্রীষ্টিয়-রোমের হাজার বছর।  এটাই প্রাচীন রোমের সেই  হাজার বছর বা মধ্য যুগ।  কিন্তু সাবধান, রোমের রেনেসাঁর প্রভাবশালী প্রথম দশজনের নাম যদি ধরা হয় তবে এদের মাত্র একজন নবমতম জন হলেন পেট্রার্ক  (Petrarch)। কেবল তিনিই এই ডার্ক যুগ বা অন্ধকার যুগ কথাটা বলতেন।  আর একালের “রেনেসাঁ মানে ধর্ম-কোপানি” এমন মানে কারিরাই এই অন্ধকার যুগ কথাটা প্রচার করেন।

    অবিভক্ত বৃটিশ ভারতে আমাদের সাথে রেনেসাঁ চিন্তা-ধারণাকে পরিচয় করিয়ে দেন – রাজা রামমোহন রায়। বলাই বাহুল্য বৃটিশ কলোনি মালিকদের থেকে ঐসুত্রে পাওয়া রেনেসাঁ ধারণাই তিনি আমাদের কাছে এনেছিলেন, ১৮১৫ সালের পরে। কমিউনিস্ট পার্টি ও ইতিহাসের অধ্যাপকেরা তাঁকেই বাংলায় রেনেসাঁর “আদিগুরু” মনে করেন।  আবার ১৮৩০ এর দশকে বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় মর্ডান এডুকেশন চালু হলেও এতে মুসলমানদের অংশ নেয়া শুরু হয় ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পরাজয়ের পরবর্তিকালে (Anglo-Oriental College on 24 May 1875, দেখেন )। এই দেরিতে অংশ্নেয়াকে পুঁজি করে মুসনমানেরা পশ্চাদপদ তারা কূপমন্ডুক তারা প্রগতি বুঝে না ইত্যাদি প্রপাগান্ডা করে তাদেরকে দাবিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে একে কাজে লাগানো হয়েছিল।
    আর এছাড়াও, সর্বশেষ মুসলমানদের উপর বড় ধাক্কাটা আসে ১৯৪৭ সালের পরে। প্রথম পর্বে বহুবার উল্লেখ করেছি বৃটিশ আমলে – বাংলা জমিদারি ব্যবস্থার কারণে, বেশিরভাগ জমিদার হিন্দু হওয়ার কারণে বাংলা সর্মময়ভাবে  হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল।  এর আরোওও কিছু মজার নমুনা যা এখনও সমান বহাল আছে তা দেখাব। যাহোক, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম হওয়াতে  জমিদার-হিন্দুদের এই  রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য এইবার ভেঙ্গে পরেছিল, বিশেষ করে পুর্ববাংলায় (পুর্ব-পাকিস্তানে)।  যারা এতদিন  কমকরে হলেও গত দেড়শ বছর ধরে ছড়ি ঘুড়িয়ে রুস্তমি দেখিয়ে ঘুরেছিল তাদের পক্ষ এটা হয়ে গেছিল এই দুঃসহ অবস্থা। যা মেনে নিতে তাদের কষ্ট হিচ্ছিল। তাই এ’অবস্থায় যারা পাকিস্তানে থেকে গেছিল এম্ন জমিদার ও তাদের জ্ঞাতিগোষ্ঠি প্রভাবশালী এরা সদল বলে পুর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি যোগ দিয়েছেন। যারা ভারতে চলে যায়নি এমন সদস্যদের নিয়ে ১৯৪৮ সালে এই পার্টি পুনর্গঠন করা হয়। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি কেন?

    কারণ কমিউনিস্ট পার্টি ধর্ম মানে না বলে প্রচারিত। তাই পার্টিতে ঢুকে ধর্ম না মানা প্রগতিশীলতা এই বয়ানের আড়ালে ইসলাম-কোয়ানি আর এই বিনিময়ে যতটুকু রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক প্রভাব তারা অর্জন করতে পেরেছিল তা দিয়েই তারা সমাজে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল।  একারণ, প্রগতিশীলতা মানে ধর্ম মানে ইসলাম-কোপানি, এরা পশ্চাদপদ এসব অভিযোগ এখান থেকেই। আর জমিদার-হিন্দুরা পাকিস্তান কায়েমের ফলে জমিদারি খুইয়ে ইসলামকেই এর প্রধান শত্রু গণ্য করে এসেছে। যেন অনেকটা মুসলমানেদের ধর্মটাই খারাপ পশ্চাদপদ বলেই মুসলমানেরা খারাপ ফলে তাঁর জমিদারি হারানি – এমন একটা সম্পর্ক সুত্র গেথে হাজির করে জঁপতে থাকে তারা। ফলে এটা জমিদার-হিন্দুর ভাষ্য না কমিউনিস্ট ভাষ্য   এদুইয়ের মধ্যে কোন ফারাক নাই। তাই আমাদের এই অঞ্চলের “প্রগতিবাদের” আসল অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে জমিদার-হিন্দুর হারানো প্রভাব প্রতিপত্যি আর সেই দুঃখ থেকে উঠে আসা এক ইসলামবেদ্বেষ।

    পাকিস্তান কায়েম ছিল জমিদার-হিন্দু সরাসরি স্বার্থবিরোধীঃ
    এই লেখার শুরু থেকেই আমরা বলে আসছি পাকিস্তান কায়েম ছিল জমিদার-হিন্দু সরাসরি স্বার্থবিরোধী এক জমিদারী ব্যবস্থা উচ্ছেদের বিপ্লব। তাতে পাকিস্তান কায়েমের মধ্যে যতই খামতি, খারাপ দিক বা সীমাবদ্ধতা থাক না কেন!  অতএব এটাও স্বাভাবিক যে জমিদার হিন্দু সুনির্দিষ্ট করে মনেই করবে যে পাকিস্তান কায়েম তার সরাসরি স্বার্থবিরোধী। আর সেটা অন্তত একারণে যে পাকিস্তান বাস্তবে আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতেই তারা পুর্ব-পাকিস্তানের আইনে জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া আর কলকাতায় বসে তাঁরা ঠেকাতেই পারে নাই। কাজেই সোজা কথাটা হল, জমিদার হিন্দুর চোখে “দেশভাগ হওয়া” মারাত্মক ভুল হয়েছে। খুবই ভুল! অথচ আমরা প্রজারা, পুর্ব-পাকিস্তানি (বাংলাদেশিরা) হলাম জমিদারি উচ্ছেদের সরাসরি সুবিধাভোগী এবং তা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা লাভের সুবিধাভোগী বেনিফিসারি।  অথচ সেই আমাদেরকেই পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা প্রগতির লোভ দেখিয়ে ফুসলিয়েছিল যে কলকাতার ইতিহাস মানে নাকি “প্রগতি-চিন্তাধারায়” লেখা ইতিহাস। কিন্তু কে না জানে “প্রগতি-চিন্তাধারীরা” মনে করে তাদের কথিত “স্বদেশি আন্দোলন” (যা আসলে এক ভুয়া জিনিষ) কারণ এটা  জমিদারের আপন স্বার্থ-ইতিহাসের বয়ান। তাঁদের কাছে আপন ইতিহাস এবং যা আসলে কলকাতার বা জমিদার হিন্দুর ইতিহাস।  এমনকি এখনও স্বাধীন বাংলাদেশেও একাদেমিকভাবে যে ইতিহাসের টেক্সট পড়ানো হয় সেটাও ডমিনিটিংলি কলকাতার জমিদার হিন্দুর অনুমোদিত ইতিহাস –  “প্রগতিশীলতা” বলে সেটাকেই পুর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস বলে পড়ানো হয়। এই হল আমাদের ট্রাজেডি! এর মূলকথাটা হল, প্রগতিশীলদের চোখে দেশভাগ একটা খুবই খারাপ জিনিষ, খারাপ কাজ! যেমন নিচে দেখা যাক!

    বঙ্গভঙ্গ বা ১৯০৫ সালঃ
    একইভাবে বঙ্গভঙ্গ বা ১৯০৫ সালের বাংলা ভাগকে দেখেনঃ এখানেও এমনকি অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিও মনে করে বঙ্গভঙ্গ বা ১৯০৫ সালের বাংলা ভাগ করা (পুর্ববঙ্গ আর আসাম মিলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা নতুন প্রদেশ করা) বৃটিশদের ভুল সিদ্ধান্ত। এই নতুন প্রদেশ হওয়া বা  বঙ্গ  ভঙ্গ হওয়া ঠেকিয়ে দেয়াটা এটাই কলকাতার বা জমিদার হিন্দুস্বার্থ। এটা তার নিজের কোর স্বার্থ মনে করেছিল। অথচ বাস্তবে পুর্ববঙ্গের বাসিন্দাদের কাছে ব্যাপারটা ছিল উলটা। ১৯০৫ সালে পুর্ববঙ্গের প্রজারা মনে করেছিল ঢাকাকে রাজধানী করে আসামসহ বাংলায় নতুন প্রদেশ করা হলে সেটা জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের সেন্টার কলকাতার নাগপাশ ত্যাগ করা হবে, আর সেটাই তাঁদের স্বার্থ। কলকাতার প্যারালাল ঢাকাকেন্দ্রিক পুর্ববঙ্গ ও আসা্মের নতুন রাজধানী – এটাই জমিদার-হিন্দুর কাছে চক্ষুশূল হয়েছিল। আসাম সহজেই তা উতপাদিত চা পুর্ববঙ্গের উপর দিয়ে বন্দরে নিতে পারবে, এই আশা করেছিল। মূলকথা জমিদার হিন্দুর স্বার্থ কখনই পুর্ববঙ্গের প্রজার স্বার্থ ছিল না,  তারা কলকাতায় বসে সব  নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিল। এই হল বাস্তবের মূল স্বার্থদ্বন্দ্ব। কাজেই বাংলার স্বার্থ বলে জমিদার হিন্দুর স্বার্থ আমাদের উপর সবসময় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে আর আমরা পুর্ববঙ্গের প্রজারা আমাদেরকেই তা উলটে দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়েছে। অতএব ১৯০৫ সালের লড়াই ছিল কলকাতার অধীনস্ত সারা বাংলায় জমিদার স্বার্থ বনাম কলকাতার প্যারালাল ঢাকাকে রাজধানী করে জমিদার আধিপত্য সবটা নাহলেও কৃষির উদ্বৃত্ব বা পুজির  সঞ্চয় বা একুমুলেশন কলকাতার সমান্তরালে ঘটানোর কেন্দ্র হিসাবে ঢাকাকে খাড়া করা; যেই ঢাকা তখন ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট।  একারণেই ঢাকাকে রাজধানী করে পুর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশের ঘোষণা – এতা কলকাতার জমিদার-হিন্দুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত প্রতিক্রিয়া সৃষ্ট করেছিল।  সেটা আরেকভাবে বুঝা যায় যখন আমরা দেখি জমিদারেরা সশস্ত্রভাবে মানে জঙ্গি হয়ে গিয়ে বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে দাঁড়িয়ে গেছিল। জমিদারি স্বার্থ এর নাম দিয়েছিল কথিত “স্বদেশি আন্দোলন”।  অর্থাৎ ১৭৯৩ থেকে ১৯০৫ সাল, এই একশ বারো বছর ধরে তারা বৃটিশ কলোনি দখলদারদের ঔরসে জন্ম নিয়ে জমিদারির দাপট চালিয়ে রক্ত চুষে গেছে।  আর বৃটিশ শাসকেরা ১৯০৫ সালে বাংলায় নতুন এক প্রদেশ ঘোষণা দেওয়াতেই সেই জমিদারের অবৈধ বাবা বৃটিশেরা তখন হয়ে গেছিল কথিত “সাম্রাজ্যবাদ”।  কারণ “স্বদেশি আন্দোলন দাবি করে তারা নাকি ১৯০৫ সালে “সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রাম”  করেছেন – এই হল কমিউনিস্টদের বয়ান। । অর্থাৎ যেন জমিদারেরা হইল গিয়া “সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগ্রামি বীর”। সারা বাংলার জমিদারি ক্ষমতা কেবল কলকাতায় কুক্ষিগত করে রাখাটাই নাকি তাদের বীরত্বের প্রমাণ! হায় রে কমিউনিস্ট! একশ বারো বছর ধরে যে জমিদার-হিন্দুরা টানা প্রজার রক্ত চুষে গেল এরাই নাকি সংগ্রামি বীর! কার জন্য এই কথিত বীরত্ব প্রদর্শন? কলকাতা কেন্দ্রীক একছত্র জমিদারি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য?  আর তাহলে কী জমিদারেরা প্রজার নেতা ও প্রতিনিধি!  এটাই শ্রেণী সংগ্রাম? মানে শিয়াল হল যেন মুরগীর নেতা ও প্রতিনিধি! বাহ রে “শ্রেণী সংগ্রাম বুঝ’ ও ‘প্রগতিবাদ’!

    জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত “বাঙলা ভাগ হল” বইটার সবচেয়ে খারাপ দিক ও ডি-মেরিট হল, বাংলা দুই দুই বার ভাগ হল – ১৯০৫ আর ১৯৪৭ সালে; এটাকে তারা নেতিকাজ ও অন্যায় সিদ্ধান্ত মনে করেছে। এটা ধরে নিবার পর এবার এই ধারণার উপরে দাঁড়িয়ে বইটা লেখা হয়েছে।  আর ঠিক এর উলটা – এই দুবারই বাংলা ভাগ করা বা হওয়াকে সঠিক কাজ বলে মনে করেছিল পুর্ববঙ্গ বা পুর্ব পাকিস্তান। বাস্তবে এই ছিল তাদের অনুভব এবং বলাই বাহুল্য কলকাতার জমিদার-হিন্দুর ভাষ্যের চেয়ে এটা আলাদা বা উলটা। অথচ জয়া চ্যাটার্জি ঐ বইয়ে বাংলা ভাগ একটা “খারাপ কাজ” এটা ধরে নিয়ে এই অনুমানের উপর দাড়িয়ে লিখা, যা আমাদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছে। অন্তত এভাবেও বলে নাই যে – ফ্যাক্টস হল (পুর্ববঙ্গ)বাংলাদেশের স্বার্থ অনুভব ছিল কলকাতার চেয়ে ভিন্ন। আর পাকিস্তান সম্পর্কে সরাসরি ফ্যাক্টস হল,  পুর্ব পাকিস্তানের প্রজা কৃষক সকলে ১৯৪৭ সালে জমিদারি উচ্ছেদের ফলেই জমির মালিক হয়েছিল অথচ তাঁদের সন্তানেরা স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শিখতেছে জমিদারেরাই নাকি সঠিক ছিল, পাকিস্তান কায়েম করাই ঠিক হয় নাই, ভুল। এরচেয়ে বড় তামাশা আর কী হতে পারে!
    কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদের বয়ানের ভিতর পাওয়া যায়  –  সুর্যসেন, কল্পনাদত্ত বা প্রীতিলতার কথা – এরা কলকাতার জমিদারের স্বার্থে সশস্ত্রভাবে বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়েছে, মা কালীর পুজা করে অস্ত্রহাতে বের হত তাঁরা। জমিদারেরাও ১৯০৫ সালে প্রত্যক্ষভাবে কলকাতার রাস্তায় ব্যাপক মিছিল মিটিং করেছিল। এগুলাই নাকি তাঁদের স্বদেশীপনা, সেসময়ের স্বদেশী আন্দোলন। অথচ  পুর্ববঙ্গ চেয়েছিল বাংলা ভাগ করে আসামকে সাথে নিয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে নতুন প্রদেশ করতে।  বৃটিশ শাসকের বাংলা ভাগের মধ্যে পুর্ববঙ্গ তার স্বার্থ দেখেছিল। কারণ এতে কলকাতার অধীনস্ততা থেকে বের হওয়ার কিছু সুযোগ ছিল। আর বলাই বাহুল্য এটা কলকাতার জমিদার হিন্দু স্বার্থের পুরাপুরি বিরুদ্ধে, পুর্ববঙ্গের স্বার্থ। সুর্যসেন আমাদের এই স্বার্থের বিরুদ্ধে জমিদারস্বার্থকে রক্ষা করতেই অস্ত্র ধরেছিল। অথচ সুর্যসেন বা প্রীতিলতার নামে হল বা একাদেমিক প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করি আমরা। আর এটাই নাকি ‘প্রগতিশীল’ কাজ।

    এখানে ফাঁকিটা হল, বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা মানেই “কমিউনিস্টরা” তা বিপ্লবী কাজ ফতোয়া দিয়েছে, কথিত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কাজ ধরে নিয়েছে, প্রচার করেছে। অথচ জমিদারের অস্ত্র ধরেছে সারা বাংলায় একছত্র জমিদার-হিন্দুর দাপট রক্ষা করতে। কলকাতাকেন্দ্রিক তাদের একচেটিয়া ক্ষমতায় যেন ঢাকা ভাগ না বসায়, ঢাকা প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে না দাঁড়াতে পারে।  জমিদার-হিন্দুর সব ধরণের জমিদারি উতসারিত আধিপত্য যেন অটুট থাকে, মুসলমান-প্রজাদের উপর জমিদারি-ক্ষমতা আর ধর্ম-পরিচয়ে নিস্পেষণ ও মার্জিনালাইজ করে রাখা যেন অটুট থাকে। কাজেই সরি, প্রগতিবাদ! আমরা দুঃখিত, জমিদার-হিন্দুর সংকীর্ণ স্বার্থের পক্ষে অস্ত্রহাতে সুর্যসেনদের নামানো এটা কোনভাবেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা নয়। আপনাদের দাবির কোন সত্যতা নাই। কারণ, সুর্যসেনেরা ছিল বড়জোড় আমরা বলতে পারি জমিদার হিন্দুর লাঠিয়াল মাত্র। তারা অস্ত্রাগার লুন্ঠন করেছে বাংলায় জমিদার-হিন্দুর ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষার্থে।

    একারণে সোজাকথাটা বললে, দুদুবার বাংলাভাগ হওয়া তা “খারাপ কাজ বা ভুল” এমন কথাটা আগাম ধরে নেয়া এটাই মূলত জমিদা্র-হিন্দুর স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি। আর এটাকেই জয়া চ্যাটার্জি জবরদস্তিতে পুর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়ে ঐ বই লিখেছেন। সুর্যসেনের বাড়ি কক্সবাজার হতে পারে কিন্তু তার পলিটিক্যাল এক্ট এটা কলকাতার বাবু জমিদার-হিন্দুরই স্বার্থ। আর সরাসরি কথাটা হল, তার বৃটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা মানেই তা সাম্রাজ্যবাদবিরোধি কাজ নয়। এমন চালিয়ে দিবার সুযোগ নাই। বরং এটাই পুরাপুরি জমিদার-হিন্দুর স্বার্থে। এবং পুব-পশ্চিম সারা বাংলার প্রজা-কৃষকের সরাসরি স্বার্থবিরোধী। কমিউনিস্টরা শ্রেণী সংগ্রাম, শ্রেণীস্বার্থ শব্দগুলো নিয়ে জান পেরেসান ভাব দেখায়। অথচ সারা বাংলার প্রজা-কৃষকের স্বার্থের প্রশ্ন যখন উঠেছে অথচ তখন  সুর্যসেনেরা জমিদারের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। একারণে, বাংলাদেশের সিপিবি বা বাসদ অথবা যেকোন কমিউনিস্ট এদের ভুল ইতিহাসবোধ সংশোধন করে নেয়া উচিত। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে আর কত! কিছু না করতে পারলে অন্তত আর বিভ্রান্ত ছড়ানোতে তাদের ইস্তফা দেয়া উচিত। নিজেদের ভুল রাজনৈতিক ইতিহাসবোধটা রিভিউ করা উচিত। আবার রানা দাসগুপ্ত যিনি এখন হিন্দু বৌদ্ধ খৃশ্চান ঐক্য পরিষদের সেক্রেটারি, তিনি আসলে সুর্যসেনের আত্মীয় ও সমর্থক। তিনি কী এখনও  জমিদার-হিন্দুস্বার্থের পক্ষেই লড়ে যাচ্ছেন না!

    তরুণ মুসলিম লীগারগণ এখন প্রগতিশীলঃ
    এবার কথা বলব, স্কলার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজির এমিরেটাস অধ্যাপক ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অথবা ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ বাংলার প্রফেসর মৃত ডঃ আনিসুজ্জামানকে নিয়ে। এঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের কিশোর যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে। ১৯৪৭ সালের আশেপাশের কালে তাদের তখন টিনেজ বয়স তাঁরা পার হচ্ছিলেন। সেকথা তারা নিজেই পরিণত বয়সে তাঁদের আত্মজীবনীতে (আনিসুজ্জামানের ‘কাল নিরবধি’ বই  অথবা সাজ্জাদ শরীফের নেয়া সাক্ষাতকার দেখুন) বা এ’সংক্রান্ত যেকোন লেখাতেও তারা এমনকি সেসব পুরানা ঘটনাকে গৌরবের বিষয় হিসাবেই তুলে ধরেছেন। তাহলে তাঁরা বদলে গেলেন, প্রগতিবাদী হয়ে গেলেন কবে,  কখন থেকে? জমিদারেরা আমাদের প্রগতিবাদ শিখায় কী তামসা! সব ফকফকা তামাসা! আর এই  প্রগতিবাদী হওয়া জমিদারদের স্বদেশি আন্দোলনকে আপন করে নেয়া – এমন পক্ষবাদী এরা হয়ে গেছিলেন কখন? সেটা হল, যখন ১৯৪৭ সালের পরে পাকিস্তান কায়েম হয়ে গেছে অথবা তাঁরা এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে গেছেন। কিন্তু ঢুকে দেখেছেন পুর্ব-পাকিস্তানের নিজের ইতিহাস বই নাই। এবার পাকিস্তানের জন্মের স্বপক্ষে সাফাই বয়ানে লেখা পাকিস্তানের কোন ইতিহাস তাঁরা খুঁজে পান নাই। আর সেই সাথে বিবেচনা বাছবিচারহীন প্রগতিবাদের প্রতি মোহ ও লোভ; প্রগতি মনে করে কলকাতা বা জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে লেখা ইতিহাস, তাই পড়েই এঁদের বড় হতে হয়েছে।
    তবে আবার সাবধান, পাকিস্তানের জন্মের পরেকার প্রবল বয়ান সংকট কেবল দুচারজন শিক্ষকের জন্য বলে মনে করা একেবারেই নয়, তা বড় ভুল হবে। আমি কেবল এখানে দুজনের উদাহরণ দিয়ে দেখালাম সেকালের ইয়াং মুসলিম লীগারদের পরিণতি পাকিস্তান কায়েমের পরে কী হয়েছিল। প্রগতিবাদীতার লোভ দেখিয়ে এদেরকে কলকাতার জমিদার হিন্দুর স্বার্থবয়ানের ইতিহাসটাই তাঁদের নিজেদের ইতিহাস বলে খাওয়ানো হয়েছিল।
    আগেই বলেছি জমির দলিল পেতে পেতে আমাদের বাপ-দাদাদের কমপক্ষে ১৯৫১ সাল লেগে গিয়েছিল। আবার ১৯৫২ সাল থেকেই (যদিও এর শুরু ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ-র পুর্ব পাকিস্তান সফর থেকেই) ওদিকে ভাষা আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠেছিল। আর এটা হল পাকিস্তানের দু অংশের ইন্টিগ্রেশন কত দুর্বল ছিল তার প্রকাশ।  আর স্বভাবত এতেই পাকিস্তানকে আপন মনে করতে গিয়ে পুর্ব-পাকিস্তান যে ধাক্কা খায় এর এক বড় চিহ্ন। কিন্তু সেটাই কী প্রথম? না, একেবারেই না। কিন্তু কিভাবে বুঝব আর মানব?

    আওয়ামি লীগের জন্মঃ
    আওয়ামি লীগের জন্ম যদি আমরা দেখি। সেটা ২৩ জুন ১৯৪৯ সালে। সেসময় পুরা ও আসল নাম “আওয়ামি মুসলিম লীগ”। মুসলিম লীগের বিরোধী এক “আওয়ামি মুসলিম লীগ”। মানে যেন এবার ‘পাবলিকের’ এক মুসলিম লীগ গঠন হচ্ছে, এটা অনেক অর্থে অবশ্যই যথেষ্ট বড় ধাক্কা। না এটা দল ভেঙ্গে দল করার জন্য, তা একেবারেই নয়। তবে নতুন দলের আসল ভুল হল, আগের মুসলিম লীগ করাটাকে এরা পুরাপুরি ভুল কাজ মনে করে বসল। অর্থাৎ তখনও জমিদার-হিন্দু স্বার্থের যে বয়ান উঠেছিল সেই ভিত্তিতেই  নতুন দলটা করা হয়েছিল। কেন এমন হল?
    এর মূল কারণ, যারা পরবর্তিতে ‘আওয়ামি মুসলিম লীগ’ খুলেছিলেন তারা দেশভাগের আগে থেকেই মুসলিম লীগের কোন অর্জনকে আর নিজেদের অর্জন বলে মনে করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। যেমন, জমিদার উচ্ছেদ আইন পাস করা এর চেয়ে গৌরবময় অর্জন  এবং মুসলিম লীগের জন্য আর পুর্ব-পাকিস্তানে কিছুই হতে পারে না। এটা শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালের নির্বাচিত প্রথম বাংলার প্রাদেশিক সংসদ থেকে। সেখানে একটা জমিদার উচ্ছেদ কমিশন (ফ্লাউড কমিশন) গঠন করা থেকে। যেটা ১৯৪৬ সালের দ্বিতীয়বারের প্রাদেশিক সংসদের হাতে ঐ কমিশনের রিপোর্ট সেবার বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ এলে প্রস্তাব উঠে যে স্বাধীন পাকিস্তানে বসে তা বাস্তবায়ন করা হবে তাই তখন মুলতবি হয়েছিল। আর সত্যসত্যই ১৯৫১ সালে পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস হয়ে যায়।

    অথচ ইতোমধ্যে নবগঠিত আওয়ামি মুসলিম লীগের এতে কোন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল জানা যায় না। এই উচ্ছেদ আইনকে নিজের বলে আপন মনে করেছিল অথবা উলটা নিন্দা  – না, তাও জানা যায় না।  ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস যেন এক অবৈধ সন্তানের উপেক্ষায় জন্ম নেয়া। সকলেই এর সুবিধাটা নিয়েছিল, প্রজারা জমি বুঝে পেয়েছিল।  তারা মুসলিম লীগকে অস্বীকার করুক কিন্তু উচ্ছেদ আইনটাকে আপন মনে করবে না কেন? কিন্তু কেউ এর ক্রেডিট স্বীকার করে নাই। এটা ভাল কাজ তা বলে নাই। কারণ এই আইনের কারণে জমিদার-হিন্দুর স্বার্থ সমুলে উতপাটিত হয়েছিল। আওয়ামি লীগ কী তাতে প্রগতির লোভে দুঃখবোধ করেছিল?  তাহলে কেন জমিদারি উচ্ছেদ ও বিলুপ্ত হওয়ার দিবস বা ঘটনাকে নিয়ে জন্মের পর থেকে আজও আওয়ামি লীগের কোন উতযাপন কখনও করে নাই কেন? আবার বিপরীতে মুসলিম লীগও কী কোন উতযাপন করেছিল কখনও? না তাও জানা যায় না। কারণ ততদিনে দিনকেদিন মুসলীম লীগ মানে হতে থাকে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থ।

    অথচ আজকে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সমৃদ্ধি এর ফাউন্ডেশন তৈরি হয়েছে ঐ জমিদারি উচ্ছেদ ও বিলুপ্তর কারণে। (পুর্ববঙ্গে) বাংলাদেশের পুঁজির সঞ্চয় (Capital accumulation & formation) ও গঠন এরপর শিল্পের পথে যাবার শর্ত তা শুরুই কখনও হতে পারত না। এই উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত ছিল এই ফান্ডামেন্টাল। আজ বাংলাদেশ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস পশ্চিমাদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম। জমিদারি উচ্ছেদ না হলে এটা কখনই সম্ভব হত না।  নুন্যতম কোন শিল্পায়ন, পুঁজিগঠন সম্ভব হত না।

    আগেই বলেছি ১৯৪৮ সালেই নতুন করে পুর্ব-পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করা হয়েছিল। যার মধ্যে দিয়ে নতুন করে প্রবেশ ঘটেছিল ব্যাপক সংখ্যক জমিদারি হারানি বা জমিদার সংশ্লিষ্ট হিন্দু যারা পাকিস্তান জন্ম নেওয়াতে তাঁদের আগের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক – একছত্র ক্ষমতা সব খুইয়েছিল। তারাই এই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল।

    তাই এরপর বলাই বাহুল্য যে কমিউনিস্ট পার্টিও জমিদারি উচ্ছেদ আইনের পক্ষে কোন বিবৃতি, পক্ষে বা বিপক্ষে কোন টু-শব্দ, আপন করে নেয়া বা বিরোধিতা করা প্রশ্নই উঠে না। কারণ পুরান জমিদার বা সন্তান ও আত্মীয়্রাই তখন কমিউনিস্ট। । আজও কমিউনিস্ট পার্টি এনিয়ে কোন গর্বও করে না, নিন্দাও করে না। যেন জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস এটা ঘটে নাই।  এরা এমনই কমিউনিস্ট যারা জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদে দুঃখবোধ করে! খুব সম্ভব, এসবের পিছনের একটাই মূল কথা বলা যায় যে আসলে ততদিনে তাদের হারানি জমিদারি স্বার্থের দুঃখে ‘প্রগতিশীল’ হয়ে গেছিলেন। যতটা প্রগতিশীল হয়ে গেছিলাম ততটাই যেন জমিদারি উচ্ছেদ বা প্রজার জমি পাওয়া এটা আর কোন ‘কমিউনিস্ট রাজনীতি’ বলে মনে হয় নাই। আসলে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান কায়েমের স্বপক্ষে কোন বয়ান-ইতিহাস নাই লেখা হয় নাই – এই কথাটার তাতপর্য সহজ কোন বিষয় ছিল না। এর ভিতর দিয়েই কোথায় কী ক্ষয় ধরেছিল তা ফুটে উঠে। যদি পাঠ করতে চাই, আমরা এখনও ধরতে পারি, ভুল শুধরাতে পারি। কিন্তু করব কী?

    এদিকে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তাতে পুর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ গো’হারা হেরে একেবারে উতখাত বেখবর হয়ে যায়। এতে ১৯৪৭ এর সময় থেকেই খাজা নাজিমুদ্দিন আর আকরাম খাঁ দের হাতে পুর্বপাকিস্তান মুসলিম লীগের স্থানীয় নেতৃত্ব দেয়া হয়েছিল তাতে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল কারা জিন্নাহ ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের অনুগত। কিন্তু তারা পুর্ব-পাকিস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে কতটুকু তা কোন বিবেচ্য ছিল না। কিন্তু কেন?
    আবার ফজলুল হক বা সোহরওয়ার্দী দেশভাগের আগে প্রায় বছরসময়টা ব্যয় করেছেন কিভাবে দেশভাগ না করে কংগ্রেস বা মহাসভার সাথে সরকার গড়ে থাকা যায়। তাদের আগ্রহ ও স্বার্থ এতই সংকীর্ণ হয়েছিল। এই প্রশ্নে জিন্নাহর সাথে তাঁদের বিরোধ সবচেয়ে বড় হয়ে যায়, যা আর জীবনে কখনই মিটে নাই। বরং জিন্নাহর চোখে এরাই  দেশভাগের বিরুদ্ধের, আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র না করার পক্ষের ‘এজেন্ট’ বলে চিত্রিত হয়ে যায়। তাই খাজা নাজিমুদ্দিন আর আকরাম খাঁ দেরকে সামনে এনে এদের হাতেই পুর্বপাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দিবার পিছনে জিন্নাহর সিদ্ধান্তের পক্ষে জিন্নার সাফাই ছিল এটাই। বদরুদ্দিন উমর সাহেবের অবস্থান ও ব্যাখ্যাটা হল, জিন্নাহ বা পশ্চিমপাকিস্তানের নেতাদের এই “খাজা-গজা প্রীতি” – এটাই মুসলিম লীগ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণ। এরকম ব্যাখ্যাদাতা যারা তারাও অনেকে দেশভাগ ঘটা ব্যাপারটাকে ভাল ছিল না মনে করে থাকেন। অথবা অস্পষ্ট রাখেন।
    এভাবে হক বা সোহরওয়ার্দী এরপর থেকে আর না মুসলিম লীগে না আওয়ামি মুসলিম লীগে সক্রিয় কেউ হয়েছিলেন। কেবল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে আগে এরা দুজন সক্রিয় হন তবে ঠিক কোন দলের হয়ে নামার চেয়েও তারা “যুক্তফ্রন্টের” নেতা এভাবে কোনভাবে আবছা দলীয় পরিচয়ের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। তবে তাতেও মুখ্য বিষয় ছিল মুসলিম লীগ বিরোধীতা সেই দলটাকে বেইজ্জতি করে দেয়া। এটাই মুখ্য ছিল এবং তারা সফল হয়েছিলেন। কিন্তু  সে উদ্দেশ্যেই  সোহরওয়ার্দী কলকাতা থেকে পাকিস্তানে ফেরেনই ১৯৫৪ নির্বাচনের আগে মাত্র। আর হক সাহেব পাকিস্তানেই ছিলেন তবে রাজনীতিতে নয় কারণ তিনি হয়েছিলেন পুর্ব-পাকিস্তানের এটর্নী জেনারেল। ফলে আসলে দেশভাগের পরে পুর্ব পাকিস্তান হয়ে যায় যেন বাপ-মা হারা এতিম কোন সন্তান। যাকে নিয়ে গর্ব বা অর্জন বোধকরার কেউ নাই। কেবল তবু কিভাবে যেন ঠেলে গুতায় ১৯৫১ জমিদার উচ্ছেদ আইনটা পাশ হয়ে গেছিল। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পাকিস্তানের সব ক্ষমতা একচেটিয়া নিজেদের হাতে কুক্ষীগত করতে কসুর ছাড়ে নাই। তাঁদের এসব কাজের পক্ষে একটাই ঠুনকো সাফাই যে ছিল যে হক বা সোহরওয়ার্দী পাকিস্তান লাভ করার চেয়ে দুই বাংলার মুখ্যমন্ত্রীত্ব করতে আগ্রহী ছিলেন বেশি। ঠুনকো বলছি এজন্য যে একবার পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যাবার পরে আর এই অভিযোগ তোলা বা ধরে বসে থেকে আর এই অভিযোগ সারা পুর্ব-পাকিস্তানকে বঞ্চিত বা বৈষম্য করা এটাও তো অন্যায্য কম নয়। এটাই তো ধীরে ধীরে পাকিস্তান ভাঙবার দিকে যাবার রাস্তা খুড়ে ফেলা আর তাই তো ঘটেছিল।

    কাগমারি সম্মেলনঃ
    আবার দেখা যাচ্ছে হক বা সোহরওয়ার্দী কেউ কিন্তু নবগঠিত আওয়ামি মুসলিম লীগে হাল ধরেন নাই। এমনকি ৫৪ সালে নির্বাচিত হবার পরেও না। কেবল ১৯৫৭ সালে হঠাত সোহরওয়ার্দীর পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে শেষবার আপোষে (আমেরিকান মধ্যস্ততায়) কেন্দ্রীয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার সময়ি যা একটা ব্যতিক্রম হতে দেখা যায়। যেটা এক বছরও টিকে নাই।  তবে কাগমারি সম্মেলনের মুখ্য কারণ হল সোহরওয়ার্দীকে আমেরিকানেরা প্রজেক্ট করেছে তুলে ধরেছে বলে সোভিয়েত-আমেরিকার দ্বন্দ্বে কমিউনিস্টরা আর আওয়ামি করবে না – এই ভাগাভাগির সম্মেলন। কিন্তু একাজও ছিল অর্থহীন। কারণ সোহরওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রীত্ব কয়েকমাসও টিকে নাই। আমেরিকা আর আস্থা ও ধৈর্য রাখতে পারে নাই। আয়ুব খান ১৯৫৮ সালে সামরিক ক্ষমতা দখল করেছিল।

    অর্থাৎ এগুলো আসলে একটা উপ বা সাইড-ঘটনা। তা হল আওয়ামি মুসলিম লীগের জন্ম হলেও হক বা সোহরওয়ার্দীর বিহনে এতে এক ভাসানী ছাড়া (যিনি ঠিক মুসলিম লীগের লোক ছিলেন না) বড় নেতা কে ছিলেন? কেউ না। তাহলে ১৯৪৯ সালে জন্মের পরে আওয়ামি মুসলিম লীগ দল চালিয়েছিল কারা? চালিয়েছিল মূলত জমিদারি হারানো হিন্দু কমিউনিস্টেরা।  আবার এটাই ছিল জিন্নাহ-লিয়াকত ইত্যাদি পশ্চিমের নেতাদের পুবের আওয়ামি মুসলিম লীগ অথবা হক বা সোহরওয়ার্দীদের প্রতি আরেক বড় অভিযোগ যে তারা সোভিয়েত-কমিউনিষ্ট-জমিদারি হারানি হিন্দুদের চক্রে বা পাল্লায় পড়েছে। পাকিস্তানের পুর্ব-পশ্চিমের বিভেদ বাড়বার পিছ্নে এগুলোও বড় ভুমিকা রেখেছিল। ইতোমধ্যে কাগমারি সম্মেলন (১৯৫৭ ফেব্রুয়ারি) এর তাতপর্য হল হক বা সোহরওয়ার্দীরা (মূলত  সোহরওয়ার্দীরা) প্রো-আমারিকান অবস্থান নিলেন আর প্রগতি-কমিউনিস্ট জমিদারপক্ষ যেটা আসলে সোভিয়েত পক্ষ। এই পক্ষ এবার আওয়ামি মুসলিম লীগ ছেড়ে ভাসানি ন্যাপ গড়ছেন। মূলত সোহরওয়ার্দীর জীবনে পশ্চিমের সাথে আমেরিকান মধ্যস্ততায় শেষ আপোষ করে প্রধানমন্ত্রী হওয়া এটাই ছিল ভাসানি ন্যাপ জন্মের ব্যাকগ্রাইন্ড, যদিও এর স্থায়ীত্ব মাত্র এক বছর। কারণ আয়ুব খান ক্ষমতা নিয়েছিলেন।

    জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষাকে ভেঙ্গে দেখলেঃ
    ওদিকে একটু যদি পিছনে ফিরি,অনেকে ১৯৪৮ সাল থেকেই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা নিয়ে জিন্নাহর জবরদস্তিকে দুই পাকিস্তানের বিভেদের একটা বড় কারণ মনে করেন। এককথায় জিন্নাহ হয়ত ইতিবাচক ভেবেই জবরদস্তিটা করেছিলেন।

    শেষবিচারে, জিন্নাহর পাকিস্তান রাষ্ট্র চিন্তাও কিন্তু একটা নেশন-স্টেট জাতিচিন্তা। ফলে মারাত্মক ভুল। কিন্তু এটাকেই ইতিবাচক মনে করা।  কিন্তু জিন্নাহ ভাষা ইস্যুটা মুলত জবরদস্তি বলে এটা তাঁর সিরিয়াস ভুল পদক্ষেপ। তার উচিত ছিল আপত্তিগুলো শুনে বুঝতে মনোযোগ দেয়া, এতে ভুল সংশোধনের সুযোগ হতেও পারত।

    তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি নেশন-স্টেট কায়েম করার রাজনীতি যারা করেন এরই জাতি পরিচয়ের রাজনীতি এমনই ধরা খাবার সম্ভাবনা সবসময়, এখানে অথবা সেখানে। তাই পরিস্কারভাবে মনে রাখতে হবে এটা মুসলিম জাতিবাদি বা মুসলিম জাতিরাষ্ট্র কায়েম যারা চায় এটা কেবল তাঁদের ত্রুটিও নয়। এর ভাল উদাহরণ হল যেমন ভারতের নেহেরু আমরা অনেকেই জানি না যে ঠিক জিন্নাহর মত জবরদস্তিতে রাষ্ট্রভাষা করার সমস্যা তিনিও তৈরি করেছিলেন বা পড়েছিলেন। কারণ নেহেরুও ভেবেছিলেন সারাভারতের সবাইকে তিনিও এক জাতি করে গড়তে সবাইকে হিন্দি বলাবেনই ,শিখাবেনই; রাজকার্য বা রাজভাষা বানাবেনই। তাই স্কুলে হিন্দি শিখা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। আর এখানেই ফলাফল খুবই নিম্নচাপ হয়েছিল। এতে পুরা দাক্ষিণার্ত মানে, ভারতের দক্ষিণের কর্ণাটক থেকে তামিলনারুসহ চার রাজ্য যারা অহিন্দিভাষী দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধ অঞ্চল তারা  হিন্দির বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালে ব্যাপক আন্দোলন ও বিদ্রোহে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার হুকমি দিয়েছিল। কারণ অহিন্দিভাষী দ্রাবিড়ীয় প্রতিরোধ এটা ভারতীয় আদি ইতিহাসের আর্য আধিপত্য ঠেকানোর সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিতে লড়ে ১৯৬২-৬৬ এর লড়াই সেই থেকে তামিলনারুতে নিজেদের আঞ্চলিক দল ডিএমকে (দ্রাবিড়ীয় মুনেত্রা কাজাঘাম) গড়ে তুলেছিল। আর তারা ছাড়া কেউ আজও  তামিল প্রাদেশিক সরকারে ক্ষমতায় আসে নাই। সেই দুঃখে নেহেরু ১৯৬৪ সালে মারা যান। পরবর্তি প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুরকে আপোষ করতে হয়েছিল আর সেই থেকে ভারতের কনষ্টিটিউশনে রাষ্ট্রভাষা বলে কিছুই নাই।। যদি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা বলে আছে আর সেটা ইংরাজি। এটা মূলত জাতিরাষ্ট্র চিন্তার রাজনীতি যারা করেন,এমন একটা না একটা জাতিবাদী ‘পরিচয়ের’ রাজনীতি যারা করেন তাঁদের সমস্যা। ঠিক যেমন অন্যদিকে,  মুসলমান মাত্রই তাদেরকে একই আরবি ভাষা রপ্ত করানো বা আরবি কালচার রপ্ত করিয়ে এক পরিচয়ে আনতে হবে এমন পরিচয়ের রাজনীতি – এটাও একই “জাতি”  চিন্তাগত মারাত্মক ত্রুটি। তবে মূলকথা এটা পাকিস্তান বলে “উর্দুর” সমস্যা নয় একেবারেই। এটা হিন্দু কাশ্মীরি ব্রাক্ষ্মণ নেহেরুরও একই জাতি-রাষ্ট্র চিন্তা বা ত্রুটিপুর্ণ “পরিচয়ের রাজনীতি” খাড়া করার গভীর সমস্যা। বাংলাদেশেও এমন বাঙালি জাতিরাষ্ট্র কায়েমের জিদে আমাদেরকেও নতুন করে “পাহাড়ি সমস্যার” জন্ম দেওয়ার জালে ফাঁসতে হয়েছে।

    এরপর তৃতীয় পর্বে একটা সামগ্রিক মুল্যায়ন আনব। তবে  “রেনেসাঁ কী” (যা এই দ্বিতীয় পর্বে খুবই সংক্ষেপে এনেছি) এনিয়ে একটা বিস্তারিত লেখা প্রায় শেষ করে রেখেছি। সেটা আলাদা পর্বে বা তৃতীয় পর্বের সাথে আনব।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    প্রথম পর্ব

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3n4

    সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

    কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

    উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

    দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
    দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
    ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
    এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

    কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

    কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

    পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

    কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
    আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

    তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

    সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

    প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
    আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন। এপ্রসঙ্গে লেখা আমার ক্রিটিক এখানে পাবেন।

    কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
    কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

    কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

    এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

    না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তুলছি না, তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত ও নির্মাণ হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

    —–“মুসলমানেরা বাঙালিই নয়” – কথাটা কী সত্য? —-

    আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে খালি একবার কোন ফতোয়া দিয়ে দেয়া। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ” [মুসলমানেরা পশ্চাতপদ], এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে যায়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

    আইডিয়েল [ideal] চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশ; মানে  কিভাবে ও তখন পর্যন্ত কতদুর সেটা বিকশিত ছিল বা হবার সুযগ ছিল – সেটাই। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও উপরে আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেটা বা যেখানে এটা ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। (বুর্জোয়া শব্দটা এখানে গালি বা নেতিবাচক অর্থ করা ভুল হবে।) যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।
    এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এই পিঙ্ক কালারে লেখা অংশটা এটা আমিই বাক্য সাজিয়ে লিখেছে অবশ্যই।  কিন্তু এর আইডিয়াটা আমি পেয়েছি আমার – কার্ল মার্কসের জার্মান ভাবাদর্শ (পার্ট ওয়ান) – পাঠ থেকে। অর্থাৎ পাঠ ও এখানে উপস্থাপন এর সব দায় আমার কিন্তু মূল আইডিয়াটা অবশ্যই ওস্তাদের। যার কাছে যা নিয়েছি সে ঋণ আগে স্বীকার করে নেয়া ভাল। কেউ আমার একথায় একমত না হলে ক্ষতি নাই, আমি আমারটা স্বীকার করে রাখলাম।  আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের চোখে ও বিচারে – ‘শহর বা নগর’ মানে আসলে কী তা বুঝবার ক্ষেত্রে এটা মার্কসের দুর্দান্ত অবদান, বেস্ট জায়গা হচ্ছে এটা। 

    তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায় এমন নয়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের (উপজেলা) সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে  সেই ভিন-আঞ্চলিক শব্দও এখানে আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে। এখানে একালের ঢাকার প্রসঙ্গ আনলাম তুলনা করে জমিদার আমলের একেবারে শুরুর দিকের কলকাতাকে পরিচয় পরিয়ে দিবার জন্য।

    যেমন এখন বলব,  আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা তাকে বাঙালি বলা থেকে বাদ দিয়েছে, মুসলমানেরা বাঙালি নয় বলতে পেরেছিল আর বাঙালি জাত ও ভাষা যেকোনটাকে তা জমিদারের নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

    সারকথায় যার পরিণতিতে, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার-হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার-হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা [যার অবস্থান হিন্দু-প্রজারও নিচে] মাত্র করে (চাপানো ব্যাখ্যায়) ফেলে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

    মানুষের রেস (race বা জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়। কারোরই রেসিয়াল পরিচয় কেউ বদলানো যায় না পারে না, তবে তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কাজেই (রেসিয়াল ও এথনিক) জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান অবশ্যই হতে পারে। অবিভক্ত বাংলায় এর পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি আর আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে ও আধিপত্যের ছড়ি ঘুরাতে ও দাবিয়ে রাখতে, জমিদার-হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য! সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না – সেটা জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েই থাকে – এটা তেমনই, বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় না্‌ কারও থেকে নিবার দরকার ফুরিয়ে গেছিল। তা রক্ত দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।

    কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের বা হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থানের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। তাই নিচে এদিকে ‘হিন্দু সংহতি’ বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন এর ততপরতাকে দেখেন, উপরে বলা আমার কথাগুলোর মিল পাবেন।  যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
    ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
    “বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
    বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”

                                                                                         হিন্দু সংহতি ফেসবুক

    আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও, এখনও করি না। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যে বাংলাদেশ নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং তাদের চোখে অছ্যুত (untouchable)। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। [যদিও শাহবাগের কিছু  কবি-সাহিত্যিক এখনও প্রবল আছে এরা নিজেদের লেখা কবিতা বা সাহিত্য হয়েছে কিনা তা নিজেরা নিজেকে মুল্যায়ন করতেও অক্ষম তাই উত্থানরহিত। এদের অযোগ্যতা ক্ষমাহীন যখন দেখি এরা কলকাতার পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চায় যে তাদের সাহিত্য হয়েছে কিনা; এরা এমনই সেলফ-লেস বা মর্যাদা বোধহীন স্টুপিড।] অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএস এর কোন প্রকল্প যা আছে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার ভিতরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। পুর্ববঙ্গকে মর্ডানিটি শিখাতে এসেন – এটা আপনাদের কাজ বা আপনারা এই যোগ্যতা নিজের জন্য রেখে দেন, প্লিজ। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই তো কলকাতারই! আমাদের তাতে ভাগীদারি বা দাবি নাই। ডিজ-ওনড এন্ড ফুলস্টপ!

    ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বা ভিকটিমহুডঃ
    সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে, থেকে যায়। তবে আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত! ফোলানো বেগুনের কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ‘ফেবারেবল’ সুযোগের অপেক্ষা করেন। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা বা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে জমিদারের ছাতার নিচের আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার-হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে জমিদার-হিন্দু ও তার মাখনের স্বাদ চাখনা প্রজা-হিন্দু এবার পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এটাই তাদের সেই দুঃখে হু হু করে উঠা মনে দেশভাগ – আর অভিশাপ, শাপান্ত! অর্থাৎ সেটা আর শুধু জমিদার-হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারেরই আদরের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থান দাবি করে সেই অজুহাতে মুসলমান প্রজার উপর আধিপত্যের স্বাদ নিত, সব সুবিধা নিয়ে এসেছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে সেই অপকর্ম যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল।

    যেকোন ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেকেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ এসবেরই মূল বা ফোকাস দল হল সিপিবি। আর এরপরে ন্যাপ, আওয়ামি লীগ থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল প্রগতিশীল – এরা এখনও সেই হেরে যাওয়া ঝান্ডা আকড়ে আছে!!!  সত্যি এক দুর্দান্ত অপচয় বটে!!! যাদের সাহসও নাই যে তারা গত দু’শ বছরের বেশি জমিদার-হিন্দুর অসম্পুর্ণ সন্তুষ্টির এক আকাঙ্খা  -ভটক তে হুয়ে আকাঙ্খা – তারা কেন বয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে আসছে তা উল্টে-পাল্টে দেখে! এটাই এখন এক তীব্র ইসলামোফোব ঘৃণা ও বিদ্বেষ!!!

    পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্র উপড়ে ফেলা আর এর বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। রামমোহন রায়ের (১৮১৫ সালের ব্রাহ্ম-সমাজ এর নেশন-বোধ) এই আদি পাপ বা আদি ভুল থেকে বেরিয়ে আসা।  যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ  “ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তার” ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত (কারণ এরপর নিজেই মারা যায়) কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক – নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝের খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাো কখনও গ্রহণ করে নাই বরং তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে ফেলে দিয়েছে ও হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

    এভাবে এরপর কী হতে হবে সে আলাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর কোন owning বা কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। সেই ‘জমিদার উচ্ছেদ আইন’ এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। ১৭৯৩ সালের জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) জমি অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, পুর্ব-পাকিস্তান সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই মানে তার নামেই জমির নয়া মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অন্তত এই একটা কারণে পুর্ব্বঙ্গের সকল প্রজারা পাকিস্তান আন্দোলনের সুবিধাভোগী বেনিফিশারি বলে পাকিস্তান কায়েমকে অন করা উচিত!   অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে এখান থেকেই ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক হওয়ার কথা! কিন্তু না! যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। এবার পয়সা হাতে পেয়ে কৃষকেরা নিজ সন্তানকে যতই শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল ততই তারা মাথা কামিয়ে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট হতে পথ ধরেছিল। এটাই নাকি আধুনিকতা!!! কেউ যা উল্টে-পাল্টে চেক করে দেখে নাই – সেই পুরানা জমিদার-হিন্দুর স্বার্থবয়ানের চোখে লেখা মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদির চক্করে পড়ে গেছিল তা আজও তারা টের পায় নাই যে ভুলটা কোথায় হয়েছিল!!!  জমিদার-হিন্দুর মূল বয়ান হল ধর্মই সব নষ্টের গোড়া। তবে সাবধান!  এখানে ধর্ম মানে কেবল ইসলাম বা মুসলমানদের কারণেই তার জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একারণে ১৯৪৫ সালের পরে জমিদার ও অনুসারিরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। তাই মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদি  আধুনিকতার ধারণাগুলোকে তারা ইসলাম-উচ্ছেদের প্রকল্পের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছিল।  অতৃপ্ত আত্মা নাকি মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়। জমিদারি-হারানোর অতৃপ্ত আত্মার তাই হয়েছিল।  তাই তামাসাটা দেখেন, সে নিজে কিন্তু নিজধর্ম পালন করেও আধুনিক-প্রগতিশীল হয়ে আছে!  কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    সর্বশেষ এডিট আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩ ভোর-রাত  দুইটা চল্লিশ

    [সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

    ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]

  • হাত ধুয়ে ফেলাটা মাইলামের পক্ষেও যাবে না

     হাত ধুয়ে ফেলাটা মাইলামের পক্ষেও যাবে না

    গৌতম দাস

    ২২ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ss

    Ambassador William B Milam, wilson center

    উইলিয়াম ব্রায়ান্ট মাইলাম, একজন আমেরিকান ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট।  আনুষ্ঠানিক অবসর নিয়েছেন জুলাই ২০০১ সালে। তবে এরপরও মাঝে মধ্যে ছোট ছোট এসাইনমেন্টে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের অধীনে স্বল্প সময়ের খুবই অস্থায়ী রাষ্ট্রদূত বা বিশেষ দূত ধরনের চুক্তিতে নিয়োগ নিয়েছেন। তবে এখন সেসবও ছেড়ে পুরোপুরিভাবে ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো বা সিনিয়র পলিসি স্কলার।  তিনি এককালে বাংলাদেশে ও পাকিস্তানে আমেরিকান এম্বাসাডার ছিলেন। তবে বাংলাদেশে তাঁর আরো বিশেষ পরিচয় আছে। প্রশাসনে বৈধভাবেই লবি করার দেশ আমেরিকা; সেখানে আমেরিকান প্রশাসনে বাংলাদেশের রাজনীতিকদের নানান স্বার্থ নিয়ে যারা কোনো লবি করতে চান বা করেছেন, তাদের চোখে মাইলাম একজন ভাল প্রভাবশালী ওজনদার ব্যক্তিত্ব, যিনি পলিটিক্যাল ক্লায়েন্টকে ‘অনেক দূর’ পৌঁছে দিতে পারেন। অনুমান করা হয়, তার এমন পরিচয় তৈরি হয়ে যাওয়ার পেছনে দুটা মূল ঘটনা আছে।

    কথিত ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ যুগের শুরুর কালেঃ
    এরশাদ যুগের পরে গত ১৯৯১ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক “নবজন্মের কাল” বলে খামোখা উচ্ছ্বাস দেখানোর চেষ্টা করতে অনেককে দেখা যায়। সেটা এমন এক অর্থে যেন তা ছিল এরশাদের পতনের পরের কথিত ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ যুগের শুরু। বলা বাহুল্য, এটি অতি-আবেগি বাস্তবতাশূন্য ও নিজেকে খামোখা বড় দেখানো এক দাবি মাত্র। আসলে এটার সাথে বুদ্ধি-বিবেচনাহীন আরেক প্রবল আবেগ ঐ সময় কাজ করত যাতে বলা হয়ে থাকে যে, এতে “স্বৈরাচার পতন ঘটিয়ে” নির্বাচিত সরকারের যুগের পথের সূচনা হয়েছিল। এখানে ‘স্বৈরাচার পতন’ বলে গলা কাঁপানো হয়েছে, অথচ আমাদের কনস্টিটিউশন আগেরটাই আছে, বরং সেই থেকে একে ক্রমশঃ আরো এমন ‘দানব’ করে নেয়া হয়েছে যে, একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করার মুরোদও এর নেই। এ ছাড়া আবার চলতি সরকার মনে করছে, বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য কোনো নির্বাচন আয়োজন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ না; তা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। বরং মুজিব হত্যার বিচার ও বাংলাদেশের ৫০ বছরপূর্তিতে তার নাম উজ্জ্বল করে সর্বত্র তা লিখে দিলে এটাই হবে “দেশ ও জনগণের জন্য” বড় অর্জন। নিশ্চয় আজকের এই বাংলাদেশকে দেখার পর পুরনো সেসব উচ্ছ্বাস জ্ঞাপনকারী লোকজনের এখনো কিছু লজ্জা জীবিত থাকলে তাতে তারা নিজেকেই আসলে মূল্যায়ন কিভাবে করেন তা আমরা দেখতে চাইতে পারি।

    উইলিয়াম বি মাইলাম – তিনি বাংলাদেশের ঐ  ‘এরশাদ থেকে নির্বাচিত সরকার’ কথিত এই রাজনৈতিক ট্রানজিশনের কালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন আগস্ট ১৯৯০ থেকে অক্টোবর ১৯৯৩ পর্যন্ত, এই হলো প্রথম ঘটনাটা। এ ছাড়াও তার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ের পয়েন্ট আছে। সেটা হল, তাঁর রাষ্ট্রদূতের এসাইনমেন্টেরই আগে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট আরেক এসাইনমেন্টে ছিলেন তিনি।

    প্যারিস ক্লাবঃ
    যাদের জন্ম ১৯৮৫ সালের পরে তারা টার্মটা একাডেমিক পড়াশোনায় অতীতের ঘটনা-ফেনোমেনা হিসাবে শুনে থাকবেন হয়ত; তবে এই ‘সেকাল’ তাঁরা দেখেননি। এমন সেই শব্দটা হল, ‘প্যারিস ক্লাব’ [Paris Club]। জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশ প্রতি বছরের রাষ্ট্রীয় বাজেট নিজেই নিজ-রাজস্ব সংগ্রহ করে বাজেট-প্রণয়ন করতে পারতাম না। কারণ রাষ্ট্র-সরকারের রাজস্ব ও অন্যান্য আয় ছিল খুবই কম, ফলে এডিপি [এনুয়াল ডেভেলবমেন্ট প্রোগ্রাম]) বা উন্নয়ন বা বিনিয়োগ ব্যয়ও ছোট রাখতে হত। আবার যত কম উন্নয়ন ব্যয় ততই পরের বছর আরো কম রাজস্ব আয় – এমনই এক চক্রের মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়া ঘটছিল আমাদের। এমন চক্রে পড়ে যাবার পিছনে  একেবারে মূল কারণ হল, অবকাঠামো খাতে ব্যয়-বিনিয়ো্গের অক্ষমতা; সেটা বাইরে থেকে বা দেশের ভিতর থেকে সংগ্রহ করে আনা বা জোগাড়ের অক্ষমতা। তবে কলোনি আমল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্বৃত্ব পাচার বা লুট হয়ে যাবার ধারা ত সবসময় ছিলই; যেটা আসলে সব কারণের উতস। সবমিলিয়ে  আমাদের রাজস্ব সংগ্রহ আর জনগণের ট্যাক্স দেয়ার ক্ষমতাও এতই কম ছিল যে এর থেকে সরকার চালানোর খরচ ও ব্যয়নির্বাহের দায় মানে যা প্রয়োজন আর পকেটে যা আছে – এদুইয়ের মধ্যে ঘাটতি ও ভারসাম্যহীনতাতেই আমাদের দিন যেত। এ ছাড়া সরকারের প্রশাসনিক অদক্ষতায় অপচয়ও ছিল সীমাহীন; তাই সেটাও আরেক বাধা। আবার স্বাধীনতার পর কলকারখানার ব্যাপক সরকারিকরণ তাতে সে কারখানা উতপাদন চালু থাকুক আর নাই, লাভ হোক আর নাই হোক কিছু এসে যায় নাই ফারাক নাই – কিন্তু প্রতিবছর এর বেতন-ভাতা, দুর্নীতি ও অপচয় যোগানোর দায়, এই ব্যয়ের অর্থযোগাড় বাজেটকে অসম্ভব করে তুলছিল। ফলে বাস্তবত প্রথমে কিছু বিদেশী অনুদান আর পরে বিদেশি অবকাঠামো ঋণ-বিনিয়োগ প্রাপ্তি ছিল আমাদের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটানোর একমাত্র উপায়।

    “কমিউনিস্ট গোঁয়ার্তুমির”  খেসারত কী দিয়ে বাংলাদেশে তা শেষ হয়েছিলঃ
    কিন্তু এখানে খুব স্বল্প পরিসরে থেকে একটা কথা বলে নেই। বিদেশী ঋণ ও অনুদানে বাজেট তৈরির এই যে বিশেষ রকম ও বাস্তবতা, এটাই শেখ মুজিবের শাসনের সাড়ে তিন বছর আর তাঁর মৃত্যুর পরের বাংলাদেশের প্রধান ফারাক। সেটা কেমন?  আগেরটা মানে একাত্তরের স্বাধীনতার পর থেকেই বিদেশী অনুদান ও ঋণ নিব না বলে বুঝি-না-বুঝি এক “কমিউনিস্ট গোঁয়ার্তুমি” করে চলা এটাই ছিল তাজউদ্দীনের অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট। এতেই অর্থনীতি ‘ডুবছিল’ আর একসময়ে দেখা গিয়েছিল ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ের দুর্ভিক্ষ। কোন ফরেন রিজার্ভ নাই। আর এখান থেকেই ক্ষুব্ধ মুজিবের সব কিছু নিজ একক কর্তৃত্বে নেয়া, তাজউদ্দীনকে বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা ঢেলে সাজানো আর শেষে ঐ সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্ক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠক এটেন্ড করার উসিলায় ওয়াশিংটনে সফর, কিসিঞ্জারের সাথে সাক্ষাৎ, ‘বটমলেস বাস্কেট কেস’ বলে মন্তব্য শোনা এবং বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাওয়ার জন্য বন্দোবস্তের আবেদন ইত্যাদি সেরি তিনি ফিরেছিলেন। কারও উপর ভরসা না করতে পেরে ঐ “সব কিছু নিজ একক কর্তৃত্বে নেয়া” এরই বাইরের দিকটা থেকে দেখানোর নাম ছিল তিনি “বাকশাল গঠন” করেছেন বা তিনি “সমাজতন্ত্রের পথে” রওনা।  আমাদের ক্ষতের দিক আমরা ঢেকে রাখি, এটা দেখানোর কিছু নাই। আর এসব ঢাকাঢাকি করতে গিয়ে কতকিছুই না অর্থহীন কান্ড আমরা করি!  তাই, বিশ্বব্যাংকের সাহায্য পাওয়ার জন্য বন্দোবস্তের আবেদনকেই পরিচিত করিয়ে দিতে হয় “বাকশাল গঠন” বলে।  কিন্তু শেখ মুজিবের দুর্ভাগ্য হল তিনি পপুলার নেতা, যিনি ভুলের জন্য মাফ চেয়ে আবার পাবলিকের সামনে খাঁড়া হতে পারলে আবার তাদের সংগঠিত করে ফেলবার সম্ভাবনা – এমন নেতাদের বেলায় এমন সম্ভাব্য ক্ষমতা সব সময় থেকে যায়। সম্ভবত সে কারণেই বা যেকোন কারণেই হোক বেঁচে থাকতে তিনি আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের নজর, পরামর্শ ও অনুদান-ঋণ পাওয়া প্রভৃতি দেখে যাবার সুযোগ পান নাই। মুজিবের ঐ আবেদন ও গ্রাউন্ড ওয়ার্কের নড়াচড়া আমরা পরে জিয়ার আমলের শুরু থেকেই পেতে শুরু করেছিলাম।

    তাহলে বাংলাদেশের জন্য ‘প্যারিস ক্লাব’ কী?
    তাহলে এর মধ্যে আবার ‘প্যারিস ক্লাব’ কী? এটা হল, বিদেশি অনুদান-ঋণ দাতাদের এক ইনফরমাল জমায়েত।  প্রতি বছর আমাদের বাজেটের আগে (এখনও রেওয়াজ অনুযায়ী আমাদের বাজেট পেশ করা হয় প্রতিবছর ১২ জুন।) এপ্রিল মাসে কেবল বাংলাদেশের জন্য আমেরিকাসহ পশ্চিমের দাতা দেশগুলোর এক সমন্বয় বৈঠক বসত, প্যারিসে। তাই ‘প্যারিস ক্লাব’ নামকরণ। এরই ব্যাকগ্রাউন্ড কর্তা থাকে স্থানীয়-বিশ্বব্যাংক। সরকারের অনুদান-ঋণ পাওয়ার অনুরোধে পেয়ে যারা অনেক আগে থেকেই সেগুলো বাছাইয়ের কাজ শুরু করে থাকে।  পরে সরকারের সাথেও বসে। আর ফাইনালি যেসব প্রকল্পগুলো নিবার পক্ষে সুপারিশ তৈরি করত যেমন, কী কী প্রজেক্ট সে অনুদানের জন্য বা ঋণের জন্য স্থানীয় বিশ্বব্যাংক অফিস প্রাক-অনুমোদন দিয়েছে সেসবের উপরে যাতে দাতারা ফান্ড দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (IDA) লোন ও অনুদান পাওয়ার ব্যবস্থাটা কাজ করে এভাবে। আর ঐ প্যারিস বৈঠকে প্রাপ্ত ফান্ড অনুমোদন বা প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেই পরের জুন মাসে আমাদের বাজেট তৈরি হত। আমাদের আজ যা কিছু অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নতি এর সব সেখান থেকেই। তবে পরবর্তীকালে এরই এক পর্যায়ে এপ্রিলের বৈঠকটা ঢাকাতেই বসা শুরু হয়েছিল। এর মূল কারণ তত দিনে আমরা অনেক স্বাবলম্বী; ফলে লোন ও অনুদানের পরিমাণ কমে এসেছিল।  ফলে দাতাদের জন্যও ফান্ডের প্রতিশ্রুতি দিতে দাতাদেশের তেমন বড় কর্তা না হলেও চলে এমন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল আর এটাই মূল কারণ বলা যেতে পারে। আর সেটাই এখনও চলছে কিন্তু একেবারেই রুটিন, আমরা আরো অনেক স্বাবলম্বী বলে এখন দেখা যাচ্ছে। মধ্য আয়ের দেশের পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার অবস্থায় গেছি বলে গর্ব করতে দেখা যাচ্ছে।  আমরা গরীব ছিলাম বলে বিশ্বব্যাংকের খাতায় আইডিএ  ক্যাটাগরিতে ঋণের যোগ্য আমাদের এমন জায়গা হয়েছিল।  আইডিএ ক্যাটাগরি মানে একেবারেই স্বল্পসুদে মানে ০.৭৫% যা ঠিক সুদ নয় সার্ভিসচার্জ) ঋণ এবং এছাড়া  বিনাসুদে-বিনাফেরতে কিছু অনুদানও পাওয়া যেত। তবে এই জমানায় মধ্য আয়ের দেশ বলে দাবি – এমন করার জন্য বিশেষ কিছু  অনুদান ছাড়া, আগের আইডিএ ঋণ এখন প্রায় সব বন্ধ। আর লোনে সুদের হারও বেড়ে হয়েছে ২-৪ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু সেসবের সাথে আমাদের এখানের প্রসঙ্গ – মাইলামের কী সম্পর্ক?

    ডেপুটি এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইলামঃ
    গত ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগে, (১৯৮৫-৯০) উইলিয়াম মাইলাম তিনি টানা পাঁচ বছর ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের (১৯৮১-৮৯) ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি, [Deputy Assistant Secretary of State for International Finance and Development.]। মানে যার দায়িত্ব ছিল বিদেশে আমেরিকার  দান-অনুদান দেয়া মানে “ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট” ডিপার্টমেন্ট দেখাশোনা করা। আর এই সূত্রে তিনি বাংলাদেশের জন্য ঐ ‘প্যারিস ক্লাবে’ দাতা আমেরিকার প্রতিনিধি হয়ে হাজির থাকতেন [He represented the United States at the Paris Club]।

    এদিকে আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যা কিছু হয়েছে বা আরো হওয়ার সম্ভাবনা, ভাল-মন্দ মিশিয়ে এরই ভিত গড়া হিসেবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারটা (তাতে বহু বড় বড় ধরণের নেগেটিভ দিক আছে তা সত্ত্বেও) ঘটেছিল ঐ আশির দশকে ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল থেকে। সেকালে এর আনুষ্ঠানিক নাম ছিল, “স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম” বা [SAP] এবং যা প্রগতিশীলদের কাছে এক “স্যাটায়ারিক্যাল” শব্দও বটে।  বিগত ১৯৮৫ সালের পরের সেসব দিন থেকে মাইলাম বাংলাদেশের সাথে একারণে অনেকভাবে জড়িত হয়ে যান। বিশেষ করে পরে ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার আমলে প্রথম তিন বছর মাইলাম এ’দেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বলে নিয়োগ পাওয়ায় সম্ভবত বিএনপির নেতাদের সাথে ব্যক্তি-সম্পর্ক অন্য সবার চেয়ে বেশি হওয়াতে, এমনটা মনে করা হয়। উইলিয়াম বি মাইলামের সাথে বাংলাদেশে পরিচয় ও সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানেই শেষ করব আমরা।

    সম্প্রতিকালের উইলিয়াম বি মাইলামঃ
    আগেই বলেছি সেই উইলিয়াম বি মাইলাম এখন ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো। গত মাসের ১৭ ফেব্রুয়ারি মাইলামের এক রচনা-মন্তব্য অনেক মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম ‘পলিটিক্যাল হিপোক্রাসি নোজ নো বাউন্ড অর বর্ডারস’ [Political hypocrisy knows no bounds or borders]। নিজ দায়িত্বে এর একটি ভাব-বাংলা করলে দাঁড়ায়, “রাজনৈতিক ভণ্ডামির কোনো সীমা বা সীমান্ত থাকে না”।
    অনেক কিছুই সীমাহীন হতে দেখা যায়। যেমন, অমুক ফ্যানক্লাব অমুকের সীমাহীন সমর্থক; এমন হতেই পারে। কিন্তু মাইলাম বলছেন, শুধু সীমা না। ‘সীমান্তও’ থাকে না। কেন? কারণ তিনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান আর আমেরিকান কিছু সিনেটরের সাম্প্রতিক আচরণ-বক্তব্যকে তুলনা করছিলেন। তুলনা করছিলেন দুটাই তাঁর চোখে “রাজনৈতিক ভন্ডামি” সমতুল্য উদাহরণ বলে। এবছরের শুরুতে ট্রাম্পের টার্ম শেষের পরে, তাঁকে নিয়ে “সিনেট ইমপিচমেন্ট” বা (দোষী ঠাউরানোর প্রক্রিয়া) শুরু হয়েছিল। আর সেখানে কিছু সিনেটর-পলিটিশিয়ানের তিনি তুলনা করছিলেন। মাইলাম ঐ রচনায় বলছিলেন, আমেরিকান কোন এক জার্নালে ঢাকার ডেইলি স্টারের একটা খবর কোট করা হয়েছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছেন বলে লেখা হয়েছিল যে, “আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার জন্য গণতন্ত্রে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অবশ্যই থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের বর্তমান সংসদের বিরোধী দলগুলো উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কাঙ্খিত স্তরে অর্জন করতে পারেনি।’ [……The Daily Star, that I saw the article in which Sheikh Hasina is quoted as saying, “[F]or a democracy, a strong opposition party is a must as we want our democratic trend to continue.” She went on to say, according to the article, “The present opposition parties in Parliament could not attain the confidence and trust of the people at the desired level due to lack of leadership.”]। আমেরিকান সিনেটের কিছু সদস্যের ট্রাম্পের ইম্পিচমেন্টকে বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়ার সময়ে দেয়া বক্তৃতার সাথে হাসিনার এই মন্তব্যকে তুলনা করেছিলেন মাইলাম। আর তাতে এসবকে “সীমা ও সীমানা” অতিক্রম করে যাওয়া দুই ‘ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখাচ্ছিলেন মাইলাম।

    আমরা মাইলামের ঐ লেখার আরও ডিটেলের দিকে আর আগাচ্ছি না। তবে মাইলাম তার এ রচনায় যা সিদ্ধান্ত টেনেছেন যেটা তার রচনার শুরুতে শিরোনামের নিচে সারসংক্ষেপ হিসেবে দেয়া আছে, সেটাতে চলে যাবো। কারণ সেটিই আমাদের প্রসঙ্গ। মাইলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র ব্যর্থতায় ডুবে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাই দায়ী যদিও, বিরোধী দলের ওপরও কিছুটা দায় বর্তায়।’  [Awami League and Sheikh Hasina are responsible for the failure of democracy in Bangladesh, but the opposing party also bears some responsibility, writes William Milam]   তাই কী? বাংলাদেশের দুর্দশায় বিদেশি বন্ধুদের কোনো দায় নেই?

    উড্রো-উইলসন সেন্টারের দুই ফেলোঃ
    মাইলামের মত আরেক বাংলাদেশী-অরিজিন স্কলার ড. আলী রিয়াজ; তিনিও ‘উড্রো-উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার’ থিংকট্যাংকের ফেলো। তবে বর্তমানে রিয়াজ নিয়োগকর্তা বদলে নিয়ে ‘আটলান্টিক কাউন্সিল’ [The Atlantic Council ] নামে আরেক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। আর গত ১৮ মার্চ থেকে আলী রিয়াজ চার পর্বের এক মতামত-কলাম যৌথ নামে ঢাকার প্রথম আলো পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে। সেই লেখার প্রথমপর্বটাই যার শিরোনাম “ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ” – এটাই যেন একটি সাক্ষ্য দলিল। সেখানে তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে, বুশ প্রশাসন একান্তই নিজের সঙ্কীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে কিভাবে ও কেন বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করে ১/১১-এ ক্ষমতা নিয়ে ছিল আর ভারতের হাতে তুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বেচে দিয়েছিল। এনিয়ে তাঁর লেখার কিছু অংশ এখানে নিচের প্যারায় তুলে এনেছি যেটা, প্রেসিডেন্ট বুশের বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ সম্পর্কে আলী রিয়াজের এক সাক্ষ্য-ভাষ্য হিসাবেও অবশ্যই তা পাঠ করা যায়।

    আলী রিয়াজ লিখছেন,
    “নাইন-ইলেভেনের হামলার পর মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। নিরাপত্তার বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া এবং বুশ প্রশাসনের কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ বিবেচনা থেকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বাণিজ্যের সাথে যুক্ত হয় নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়। জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখে এসেছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে, এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়।’

    এ প্যারাটা আসলে শত কথার বদলে মাত্র কয়েকটা কথা। প্রথমত, রিয়াজ সাক্ষ্য দিচ্ছেন তার কথায়,  “আমেরিকা ভারতের স্বার্থের চোখে বাংলাদেশকে দেখেছিল”। কিন্তু কেন? এর জবাব পরের বাক্যে। বলেছেন, “আমেরিকা এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য নিশ্চিত করতে চায়”। মানে শুধু দেখা নয়, আমেরিকা ভারতের আধিপত্যই একেবারে নিশ্চিত করতে চায়। সেটাও বা আবার কেন? কারণ আমেরিকা “পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। মানে চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে এটা ঠেকাতে আমেরিকা  “চায়না কনটেইনমেন্ট”[China Containment] বা চীন ঠেকানো করতে চায়। যদিও এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা আদৌ ঠেকানো যায় না, সেই চেষ্টা করা বৃথা ও অকার্যকর হবে এবং হচ্ছে তা জানা সত্ত্বেও।

    অর্থাৎ আমরা দেখছি আলী রিয়াজ ক্লিয়ার ও ক্যানডিড হয়েই কথা ‘তিনটি’ বলেছেন। যার কোনো দুই রকমের মানে নেই। এর ভেতরে এশিয়ায় চীনের বদলে ভারতীয় আধিপত্য ছেয়ে ফেলা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা – এ স্বীকারোক্তির মধ্যে রিয়াজ কোনো সমস্যা মনে করেছেন বা অন্যায় দেখেছেন, তা মনে হয়নি। স্বাভাবিক হিসাবেই দেখেছেন। অথচ এরপরেও আবার ভারতকেই দায়ী করে বলেছেন, “প্রায় এক দশক ধরে ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে”। যে আমেরিকা ভারতকে দানব বানালো এখন সেই ভারত কেন বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার  আনলো এর জন্য আমেরিকাকে না ভারতকেই দায়ী করছেন আলী রিয়াজ।

    আমরা তা হলে দুই থিংকট্যাংক ফেলোর বক্তব্য জানলাম। রিয়াজ আমাদের পরিষ্কার সাক্ষ্য দিয়ে জানাচ্ছেন বুশের আমল থেকেই আমেরিকান প্রশাসনগুলোর বাংলাদেশে ঢুকে পড়া ও হস্তক্ষেপগুলো কত গভীরে ছিল। এছাড়া দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়া বলে আসলে কিছু ছিল। ছিল এর আড়ালে বাংলাদেশ দখল করে নেয়া ও ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।

    তা হলে দেখা যাচ্ছে আলী রিয়াজ আমেরিকান সব হস্তক্ষেপ স্বীকার করে নিলেও আজকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশাগুলোর জন্য মানুষের যে সাফোকেশন, শ্বাস নিতে পারছে না দশা এ জন্য মাইলাম আমাদের সরকার আর বিরোধী দলকেই পুরো দায়ে দায়ী করছেন। এভাবে মাইলাম নিজের দেশ আমেরিকার প্রশাসনের হাত ধুয়ে ফেললেন; এটি কী ঠিক হল? না এটা বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবে? এ নিয়ে তার ব্যাখ্যা দেয়া উচিত। নিজ দল-গোষ্ঠীর কাজের দায় অস্বীকার করা কোনো কাজের কথা নয়। ভুল মনে করলে তা স্বীকারের সৎসাহস দেখানোই আমরা আশা করব। স্টার্টার হিসেবেও এসব খুবই অখাদ্য! একাজ তাঁকেও কোন সুবিধা দিবে না। বরং  মানুষ হিসাবেও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে থাকবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২০ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মাইলামের হাত ধুয়ে ফেলা অগ্রহণযোগ্য” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায় এবং তাই এখানে করেছি।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বুড়া সিংহ আমেরিকার বাংলাদেশের কাছে বাসনা

    বুড়া সিংহ আমেরিকার বাংলাদেশের কাছে বাসনা

    গৌতম দাস

    ১৯ মার্চ ২০২১ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-3rg

    ডঃ আলী রিয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রথম আলোতে কলাম লিখেন। তিনি সম্প্রতি যৌথ নামে  নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক সাইমুম পারভেজ এর সাথে মিলে এক মতামত ছেপেছেন।  সেই আর্টিকেলের নাম …”ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ”। বলা হয়েছে এটা নাকি চার পর্বের এক রচনা যার প্রথম পর্ব এটা। এর আগে কখনও প্রথম আলোতে তাঁর যৌথ নামের লেখা চোখে পড়ে নাই। কিন্তু কোন যৌথ নামের লেখা মানে ঐ লেখায় প্রকাশিত অবস্থান নিশ্চয় লেখকদ্বয়েরই, এই বলেই পাঠক বুঝবে ও ধরে নিবে। আমরাও তা ধরে নিয়েই  কিছু কথা বলব।

    প্রথমত, ঐ লেখায় এমন কিছু প্রসঙ্গ ও সে প্রসঙ্গে আলী রিয়াজদের বক্তব্য আছে তা দেখে মনে হয়েছে – গত ১৪ বছরের বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্তত আলী রিয়াজের যা মূল্যায়ন ও অবস্থান ছিল (যা আমাদের অনেকেরই পছন্দের অথবা অপছন্দের যাই হোক না কেন) এটা তা থেকে পরিবর্তিত কিন্তু নতুন উপলব্দ একটা পরিস্থিতিতে এসে এবার আলী রিয়াজ নতুন করে কিছু কথা বলছেন। এখন এটা কতটা নতুন আদৌ নতুন কিনা আবার সে সম্পর্কে কর্তা ও বক্তা কতটা অবগত তা নিয়ে মতান্তর থাকতে বা হতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে এটা নতুন অবস্থান। এবং কয়েকটা জায়গায় ১৪ বছর আগের কথার দায় পুরা অস্বীকার করে বিপরীত অবস্থানও আছে।  বিশেষ করে এই লেখার শেষ দুই বাক্য নিজেই নিজ আগের সব অবস্থানেরই বিরোধী। সেটা এরকমঃ

    “কিন্তু এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক নয়। তার বদলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া।”

    বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নষ্ট করেছে। এছাড়া এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আমাদের কেন আগ্রহ হবে, কী লাভ করার জন্য? আবার চীনের প্রভাব কমাতে হবে কেন? সেটাই বা কী পাবার জন্য? এসবের কোন হদিস তিনি দেন নাই।   অথচ  এটাই আমেরিকার স্বার্থ হয়তবা। আর আলী রিয়াজ ধরে নিয়েছেন যে বাংলাদেশ যেন  এটাকেই নিজের স্বার্থ মনে করবেই! নাকি করতেই হবে? ঠিক জানা যায় নাই। আমেরিকা পরাশক্তি হয়ত কিন্তু বুড়া বাঘ আসলে! কিন্তু চীনের প্রভাব কমাতে  হবে এটা না পাবলিক ডিম্যান্ড না সরকারের!

    মানুষ বা দেশ-রাষ্ট্র এসব কিছুরই স্বার্থ বদলে যেতে পারে, ফলে তা থেকে সব কিছুর অবস্থান, সবই বদলাতেই পারে। আবার বদল মানেই তা খারাপ তা নয়, আবার তা ভাল হবেই তাও নয়।  তবে বদলের ভাল-মন্দ নিয়ে পর্যালোচনা মূল্যায়ন তো অবশ্যই হবে।  তবু সবার চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, বক্তা এটাকে বদল বলে স্বীকার করছেন, নাকি অস্বীকার করে বদলে যেতে চাচ্ছেন – সেদিকটা।  তাঁর স্বীকার করা বা না-করাটা এথিক্যাল চোখে এখানে আমরা দেখব না।  তবে কেউ অস্বীকার করতে চাইলে কোন্ অসুবিধার কথা ভেবে কেউ তা স্বীকার করতে চাচ্ছেন না সেটা জেনে রাখা জরুরি। তবে কিছু তামাসার দিকও এসব ক্ষেত্রে থাকতে পারে। যেমন অনেক সময় বদলের মানে হয় আগের “গাধামি অবস্থানকে” পরোক্ষে স্বীকার করে নিয়ে হলেও নিজেকে বদলে নেয়া।  আমরা সেসব দেখব। কথাগুলো একটা তালিকা করে করে আগানো যাক যে কী কী বদল আমরা দেখছিঃ

    ১। ………”বুশ প্রশাসনের তথাকথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের” বিবেচনা থেকে”………

    এটা দেখতেও বেশ তামাসার যে আলী রিয়াজ লিখছেন তথাকথিত “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ”।  মানে এটা “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বলা হলেও তা ছিল না – তিনি তাই বলছেন। বুশের এই সিগনেচার শ্লোগান, এই ক্যাম্পেইনকে নিয়ে  আলী রিয়াজ এর আগে কখনও আপত্তি-মতান্তর অবস্থান দেখিয়েছেন জানা যায় না। বরং  কোন আমেরিকান “থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো” হিসাবে কারও এমন প্রকাশ্য ভিন্ন মূল্যায়ন নজরে আসে নাই।  আমেরিকান “থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো” হিসাবে আলী রিয়াজের নিয়োগ ২০০৭ সালের আগে-পিছের  আমাদের মিলিটারি টেকওভার মানে ১/১১ এর সময়ের, যতটুকু মনে পড়ে। অন্তত যখন থেকে আমরা আমেরিকার বাংলাদেশ সম্পর্কিত পলিসি মেকিং করিডোরে তাঁকে “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” হিসাবে দৃশ্যমান দেখছি। অর্থাৎ সেটা তখনও বুশ প্রশাসনের সেকেন্ড টার্ম চলছিল। কাজেই “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের” তখনও বর্তমান আর সেই পটভুমিতেই তিনি  “থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো” হিসাবে সম্পর্কিত হয়েছিলেন।  পরে অবশ্য ওবামা আমলে এই শ্লোগান শুধরে নেওয়ার সুযোগ নিয়ে তবে বিনা ঘোষণায় ওবামা ধীরে ধীরে এটা ফেস-আউট করে দেন। কিন্তু আভ্যন্তরীণ পলিসিতে “সন্ত্রাসের যুদ্ধ” সেটা একইভাবে চলমান ছিল। কেবল জাতিবাদী পাগলা ট্রাম্পের আমলে এসে, খরচ কমানোর জিদে তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে আমরা বলতে শুনেছিলেন টেররিজম তাঁর নীতিতে সেকেন্ডারি।  তাহলে আলী রিয়াজ এখন “তথাকথিত” বলা মানে, এই বিশেষণ ব্যবহার করা শুরু করেছেন। নট ব্যাড, তাঁকে স্বাগত। কিন্তু কবে থেকে এবং কী বিবেচনায় সেটা তা জানবার কৌতুহল নিবারণ হল না, থেকেই গেল। আর সেটা না জানা পর্যন্ত এটা কী জেনুইন বা কেমন স্থায়ী অবস্থান কীনা সন্দেহ থেকে গেল। কারণ, “তথাকথিত” বলা মানে আমেরিকার অন্তত চার টার্মের প্রশাসনের কোর নীতির বিরোধিতা ও সমালোচক অবস্থান। অথচ তিনি তো পরামর্শক! তাই কতটা মানানসই? কোণা থেকে সে প্রশ্ন উঠতে পারে!

    ২। ……”জর্জ ডব্লিউ বুশের আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র মূলত ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখে এসেছে।………

    অবিশ্বাস্য!  এটা সত্যই অবিশ্বাস্য যে এটা তাঁর কথা।  বরং একথাটাই আমরা বলে এসেছি যে থিঙ্কট্যাংক “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের” ডাকা সভা-সেমিনারে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আন্ডার সেক্রেটারির উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত উঠে এসেছিল। ২০০৭ সালের মে-জুন মাসের দিকের ঘটনা এটা। আর এর কোট-আনকোট ভাষাটা সেটা ঐ সভারই রেজুলেশন ছিল।  এছাড়া, ওদিকে  আমেরিকান কোন প্রশাসনিক কর্তা বা যারা দেশি-বিদেশি বাংলাদেশ-কনসাল্টেন্ট বা এক্সপার্ট তারাও এটা কখনও স্বীকার করেন নাই, কোন লিখিত রচনায় এসব কথা রেফার বা শেয়ার করেন নাই। পবিত্র রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা(?) হবে হয়ত!  তবে  বাংলাদেশি অনেক স্টুডেন্ট একাদেমিককে ক্ষুব্ধ হতে দেখেছি তারা জানিয়েছেন এক বাংলাদেশ এক্সপার্ট এটার অস্তিত্বই ঝেড়ে অস্বীকার করেছেন। এমন সিদ্ধান্তের কোন কথা তাঁর নলেজে নাই – এটা জানিয়েছেন।  সেই থেকে ব্যাপারটা বেমালুম হাওয়া, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সকলেই একেবারে লুকিয়ে মুখবন্ধ করে ফেলেছিলেন। অথচ সবাই জানতেন ঠিক কী হয়েছে। কারণ,  ভারতের চোখেই বাংলাদেশকে দেখা বলে যা বলা হয়েছে বা বাইরে এসেছে তা খুবই নগন্য অংশমাত্র। আর এর পিছনে বাস্তবে এর আরও ভয়াবহ দিক আছে।  সেটা হল এটাই ছিল পুরা বাংলাদেশকেই  ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার আমেরিকান সিদ্ধান্ত।  যে কারণে বেপরোয়া হয়ে  ভারতের এমন লাভালাভ হাসিলের মহানায়ক প্রণব মুখার্জি এই ক্রেডিট নিবার লোভ সামলাতে না পেরে অবলীলায় নিজেই বইয়ে লিখছেন তিনিই ছিলেন, হাসিনা আর মঈনের মধ্যস্থতাকারি গ্যারান্টার।
    এটা কেবলমাত্র একালে প্রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় পরে আমরা  গত বছর ২০২০ অক্টোবরে দেখছিলাম, যখন আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, বাংলাদেশ সরকার মানে মন্ত্রী মোমেন সাংবাদিকদের দিয়ে কথাটা তুলিয়ে  এরপর নিজেই সাফাই দিয়ে বলতে থাকেন, “দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে না যুক্তরাষ্ট্র”।  আসলে মোমেন বলতে চাইছিলেন ও বলেছেনও অন্যকিছু। তিনি স্টেফান বিগানকে একথাটাই বলেন যে, তোমাদের সাথে আগের যে সম্পর্ক ছিল, যেভাবে হাসিনা সরকার ছিল আমেরিকার তৈরি, ভারতের হাতে তুলে দেয়া সরকার – সেটা নাই। “ওদিন গয়া”। এখন হাসিনা সরকার আমেরিকার তো নয়ই; এছাড়া নতুন করে কতটুকু ভারতের আর কতটুকু  নিজেকে ক্ষমতায় রাখতে চাইলে চীনের হওয়া দরকার; সেই ভারসাম্যটাও হাসিনাই নির্ধারণ করেছেন। মূলকথা সেই ২০১১ সালের পর থেকেই হাসিনার উপর আমেরিকার প্রভাব-ক্ষমতা শুণ্য হয়েছিল।  নিজ পাপের শাস্তি আমেরিকা এভাবেই পাওয়া শুরু করেছিল। তাহলে এতদিনে হলেও আলী রিয়াজ নিজেই বুশ যে নিজেই বাংলাদেশকে বেচে দিয়েছিল সেই কাজের  স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন। কেন? এর একটা কারণ তিনি উল্লেখ করেছেন। নিচে দেখেন।

    ৩। ……“এর পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে, এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়।”

    কী সাংঘাতিক, এক ভয়ংকর কথা! আলী রিয়াজ অবলীলায় বলছেন।  তিনি স্বাক্ষ্য দিয়ে বলছেন একথা যে ভারতীয় আধিপত্য আমেরিকার কাছে পছন্দের ও নিজস্বার্থের। তাই বুশ বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। ওদিকে চীন আমেরিকার শত্রু ও অপছন্দের এক বিরোধী শক্তি। কিন্তু শুধু একারণেই তাহলে বাংলাদেশকে বলি হয়ে যেতে হবে ও হয়েছে। এটাই আলী রিয়াজের স্বাক্ষ্য! অর্থাৎ এখানে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ অথবা নীতি বলে কিছু নাই। সবই নৃশংস রাষ্ট্রস্বার্থ। তাই যেন নৃশংসভাবেই আলী রিয়াজ এটা বলে যেতে পারছেন। কিন্তু দুটা প্রশ্নঃ
    ক) আপনি তো পরামর্শক, বাংলাদেশ এক্সপার্ট। তাহলে এই বাংলাদেশকে বেচে দেওয়ার ইস্যুতে আপনার পরামর্শ কী ছিল? সেই ডকুমেন্ট আমাদের না জানালে আমাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা জন্মানোর সম্ভাবনা দেখি না।
    খ) তাহলে, ২০০৭ সালের টেকওভার আর ২০০৯ সালের হাসিনা সরকার বসানো – সেসময় আমেরিকা এই ক্ষমতা বদলের উদ্দেশ্য জঙ্গিদমনের উপযোগী করে বাংলাদেশ সরকারকে সাজানো বলা হয়েছিল – সেগুলো সব তাহলে মিথ্যা কথা ছিল?

    আবার আলী রিয়াজকে একটা “থ্যাঙ্কস” দিতেই হয় আমেরিকার মারাত্মক সব খারাপ কাজগুলো স্বীকার করার জন্য। তিনি পরিস্কার করে শেষে লিখে দিয়েছেন “যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। তবে বাংলায় লেখেছেন বলে এর চেনা-প্রতীক হয়ে যাওয়া শব্দটা  “China Containment” বা এর বাংলা “চীন ঠেকানো” – এভাবে লিখেন নাই বলে অনেক চিনতে পারছেন না হয়ত। এই চীন ঠেকাতে চায় বলেই আমেরিকার উপহার হিসাবে বাংলাদেশকে ১/১১-এ দখল করে  ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল।

    ৪। ……”প্রায় এক দশক ধরে ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে।”…

    কথা সত্য কিন্তু একথার দায় আমেরিকান  (বুশ থেকে এপর্যন্ত সকল) প্রশাসন ও তাঁর পরামর্শকদের সবার আগে নেয়া উচিত। এরপরেই কেবল আমরা কোন নাগরিক বা রাজনীতিবিদ এনিয়ে আমেরিকার সাথে কথা বলতে পারি। আগের বাক্যে আলী রিয়াজ আপনি নিজেই বলছেন ……”ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে চায়”। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কী চীনের বদলে ভারতীয় আধিপত্য চেয়েছিল? না কোন আধিপত্যই চেয়েছিল? আমরা বিক্রি হলাম কেন?
    আবার অদ্ভুত স্ববিরোধিতাটা দেখেন; উপরের তিন ও চার নম্বর পয়েন্ট স্ববিরোধী। আলী রিয়াজ তিন নম্বরে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই ভারতীয় আধিপত্য এনেছে।  আমেরিকা ইচ্ছা-পরিকল্পনা করেই বাংলাদেশে আমাদেরকে  ভারতীয় আধিপত্যের কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তাতে ভারত যা খুশি তাই করছে। বাংলাদেশের বুক চিরে ভারত বিনা পয়সায় করিডোর নিয়ে যাচ্ছে।  আবার চার নম্বর পয়েন্টে রিয়াজ  লিখছেন,  …”ভারত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে”। তাহলে কথা দুটা মিলিয়ে একসাথে পড়লে দাড়ায় মুল অপরাধী তো আমেরিকা। তাহলে  আলী রিয়াজ যে ভারতীয় আধিপত্যের মধ্যে তা চীনের আদফহিপত্যের চেয়ে বেটার অনুমানে আমাদের রাখতে চায়, এটাই আমেরিকার ইচ্ছা ও স্বার্থ মনে করে – সেই ভারতের বিরুদ্ধেই আবার  আলী রিয়াজ অভিযোগ তুলে কেন? এমনকি আমেরিকা নিজের স্বার্থ মনে করে বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনের নামে  এই হাসিনা সরকার যাকে এখন কর্তৃত্ববাদী সরকার মনে হচ্ছে তাকে তারা এনেছিল কেন?

    ৫। চীন ও ভারতের মধ্যে একটা ‘ব্যালান্সিং গেম’ বা ভারসাম্য নীতি বজায় রেখেছে। কিন্তু এটা…… কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ …ব্যর্থতা … শত্রুতা তৈরি করতে পারে।

    এশিয়ায় বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় আলী রিয়াজ স্বীকার করছেন আমেরিকাই ভারতের পিঠে হাত রাখার উসিলায় চীন-ভারতকে মুখোমুখি করে দিয়েছে। একথার মানে দাড়ায় তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় এখন আমাদের জন্য ‘ব্যালান্সিং গেম’ খেলা ছাড়া উপায় কী রেখেছে আমেরিকা? রিয়াজ বলছেন এটা নাকি ঝুঁকিপুর্ণ। কেন? কী হবে, যুদ্ধ লেগে যাবে? আমরা যুদ্ধ করলে তবেই না যুদ্ধ লাগবে! যুদ্ধ ছাড়াও দুনিয়া অনেক কিছু ঘটতে পারে। লাদাখে দেখেন নাই উগ্র জাতিবাদি মোদীও চীনের কাছে ভুখন্ড ছেড়ে দিয়ে চলে আসে নাই? ভারত কী যুদ্ধ করেছে? এর সোজা কথা যুদ্ধই একমাত্র অপশন নয়, অনেক অপশন আছে। ভারতের পাশে আমরা তো আছিই তাতে কী আমরা কেবল যুদ্ধ লাগাচ্ছি আর হেরে যাচ্ছে? বরং আমেরিকা যে বাংলাদেশকে বেঁচে দিয়েছিল তার জন্য তো আরো অনেক অপশন আছে।  সরাসরি বললে, হাসিনা নিজেকে ক্ষমতায় রাখতে ভারত-চীনের ভারসাম্য যেভাবে টানবেন তাতে তিনি টিকে যেতে পারলে সেটা হাসিনা বাংলাদেশ হবে। আর যদি নিজের স্থানীয় বিরোধীদের কাছে হেরে যা্ন তো গেল, সেটা আরেক কম্বিনেশন ও পরিণতিই হবে।  কিন্তু ভারত-চীনের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ লেগে যাবে এটা কারও জন্যই কোন অপশন বা বাস্তবতা তা সত্যি না। ফলে এখনও তা হতে পারে নাই।

    ৬। ……”যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতকেন্দ্রিক নীতির পরিবর্তন হবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে শুধু ভারতের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতার জন্য ইতিবাচক নয়। তার বদলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া।”……

    এটাই আলী রিয়াজ আপনি বেচাবিক্রি করতে এসেছেন। কিন্তু আপনি ভাল ফেরিওয়ালা নন বলেই দেখতে পাচ্ছি। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে আসেন নাই। আপনার বয়ান ঢিলা। গাথুনি ভাল না। উপরের পাঁচটা পয়েন্টেই দেখেন ঝুরঝুরা ঢলে পড়েছে। কথা শুরুর আগে একটা কথা।  আমরা দেখেছি, হাসিনা খারাপ হোক বা ভাল তিনি আমেরিকাকে একেবারেই বিশ্বাস করে না। তাই সবচেয়ে লোভনীয় ডিল তাঁকে অফার করলেও তিনি সেটা নিবেন বলা মুসকিল। এসব ক্ষেত্রে আস্থাহীনতা বিশাল নেতি-ফ্যাক্টর।  অতুএব এই ফ্যাক্টরের  কী করবেন? ভেবেছেন মনে হয় নাই।

    এবার আসি প্রসঙ্গে। আপনি এর আগে লিখেছেন মানে বলতে চেয়েছেন আমরা “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার” করছি না। এটার আবার মানে কী?
    মানে আসলে আমরা জানি। যদিও আপনি মোচরামুচরি করছেন খুলে বলতে চান নাই বা পারেন নাই। আপনি বলতে চাইছেন, ১। বাংলাদেশ যেন এইবার নিজ সমুদ্রসীমায় আমেরিকান সপ্তন নৌবহরকে স্থায়ীভাবে নোঙর ফেলে বসতে চুক্তি করেন। ২। এর সোজা মানে আমাদের সাথে ভারতের যুদ্ধ ঠিক না তবে আমেরিকাকেই এবার  ভারতের সাথে সামরিকস্বার্থের মোকাবিলায় যেতে হবে। কারণ, ভারত এটা জানামাত্র চরম অবস্থানে চলে যাবে। এটা তার জানকবজ মনে করে, তাই।
    এটাই আপনি বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার হাব ইত্যাদি বলে বুঝাতে চেয়েছেন! সমস্যা হল, এটাই যদি আমেরিকার কোর স্বার্থ তাহলে এশিয়ায় এতদিন ১৪ বছর ধরে এশিয়ায় “ভারতীয় আধিপত্য নিশ্চিত” করলেন কেন? কোন সুখে? কী হাসিল করতে?  আর কীইবা পেলেন? এগুলো তো ছেলেখেলা না। অথচ এগুলো তো পরামর্শকদের ছেলেখেলা করে ফেলেছেন। কারণ, এসব ভুল পরামর্শের দায় কাউকে নিতে হবে না!
    এতে সবচেয়ে বড় কথা, বিশেষ করে একবার যখন ভারতের কাছে প্রকাশ পাবে আমেরিকার এই মনবাসনা । পুরা পরিস্থতি হয়ে যাবে আপসাইড ডাউন। ভারত চিরদিনের জন্য (ব্যাক-ফোর্থ না) চরম আমেরিকাবিরোধী হয়ে যাবেই।  আবার আমেরিকার এই স্টেশন করার খায়েস, এতে চীন তো এজন্য আরো বড় বিরোধ সংঘাতে যেতে দাঁড়িয়ে যাবে। অতএব পোলারাইজেশন বদলে যাবে। চীন-ভারতের আমেরিকাবিরোধী হাত মিলানোর সব সম্ভাবনা রেডি হতে থাকবে। মনে রাখতে হবে ভারত এখনও দুই নৌকায়, সে কোয়াডেও আছে আবার চীন-রাশিয়ার BRICS বা SCO জোট – সেখানেও আছে। আবার  ভারতের ভিতরেই এনিয়ে সুপ্ত বিতর্ক আছে, থিঙ্কট্যাঙ্কও মজুদ আছে। আরেক ধারাও প্রস্তুত রেডি আছে। এর মূল কারণ, ভারতের ন্যাচারাল ডেসটিনেশন চীনের সাথে সদ্ভাব!

    তবু এসব কল্পনায় আর গেলাম না। এরচেয়ে বিষয়াশয়, বস্তুগত খাওয়াপড়া ব্যবসাবাণিজ্য আর পুঁজির কারবারের দিকে আসি। প্রথম আর শেষ কথা আমেরিকার কাছে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ আর নাই। বিগত যৌবনা তাই জেনারেট হচ্ছে না।  অথচ এক বিপুল সারপ্লাস এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার প্রথম শর্ত, তাই প্রথম মুরোদ। যেটা থাকলে এরপরেই কেবল রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও জ্ঞানবুদ্ধি থাকলে এরপর গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতাও হওয়া সম্ভব। আর ঐ অর্থনৈতিক মুরোদ থেকেই আসে সামরিক মুরোদও। তাই আমেরিকা এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ সামরিক সক্ষমতার হলেও এই সক্ষমতার সবকিছুই তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যাবে। কারণ, এর খরচ যোগাতে অযোগ্য হবে আমেরিকান অর্থনীতি।  ঠিক যেমন পুরানা সোভিয়েন ইউনিয়নের হয়েছিল। একটাই কারণ, অর্থনৈতিক সামর্থ, উদ্বৃত্ত সম্পদ আর নাই। পুঁজির একুমুলেশন হচ্ছে না। আর এটা মানুষের ইচ্ছার বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উর্ধে  অবজেকটিভ ঘটনা।

    আমেরিকা নিজস্ব সরকারি স্টাডি যা চীনের উত্থান নিয়ে গবেষণা করে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ডিটেলে দুনিয়া অর্থনৈতিকভাবে তখন কী হতে যাচ্ছে তার স্টাডি রিপোর্ট বেরিয়েছিল সেই ২০১৮ সালেই; সেখানেও কোথাও এনিয়ে আমেরিকার সরকারের মানে সাবজেকটিভ-ভাবে কোন নীতি নিয়ে চীনের গ্লোবাল নেতা হওয়া ঠেকানো যাবে সে হদিস দেয় নাই। কারণ এটা অবাস্তব। মানে পরোক্ষে স্বীকার যে এটা অবজেকটিভ ঘটনা।  আবার হাতের কাছে দেখেন এমাসেরই কোয়াড মিটিং যা মূলত ছিল আমেরিকার জন্য ভ্যাকসিন সংগ্রহ। বাইডেন কেন জাপানের সুগাকে বগলদাবা করে মিটিংয়ে গেছিলেন? কারণ ভারতকে ভ্যাকসিনের জন্য বিনিয়োগ দিতে হবে যেটা জাপান ব্যবস্থা করবে, এক বিলিয়ন ডোজের মত ভ্যাকসিনের। অথচ সেই আমেরিকা আজ কোথায়? এসব অবকাঠামো বিনিয়োগের রাজা ছিল যে আমেরিকা, এক তুরিতে এসব বিনিয়োগ দিতে সক্ষম ছিল। সবার আগে এমন দানধ্যান নিজেকে অফার করত যে আমেরিকা!

    হাসিনাকে বুদ্ধিসুদ্ধি নাই এক মফস্বলের নেতা মনে হতে পারে।  কিন্তু হাসিনাও তো ব্যবহারিক বুদ্ধিতে এটাই বুঝেছেন যে আমেরিকার সেই অর্থনৈতিক মুরোদ নাই। হাসিনা আসলে বলতে চেয়েছিলেন তাঁর কাছে মানে তাঁর ক্ষমতায় থাকার নিজস্বার্থের চোখে চীনই ভাল। তাঁর এই মতের মোটাভাষায় ভাষ্যটা হল, “আমরা যুদ্ধ বা অস্ত্র চাই না। আমরা অবকাঠামো বিনিয়োগ চাই”। তাই স্টেফান বিগানকে মোমেন একথাই বলেছিলেন।  বুঝে বা নাই-বুঝে যাই হাসিনা বলে থাকেন না কেন, তিনি তো আমেরিকার ভ্যানিটির এক দুর্বল জায়গাতেই তো আঘাত করেছেন!

    তবে বিষয়টা অবশ্য আঘাত করা বা, না-করার না।  আমেরিকার সেভেন্থ ফ্লিট যদি বঙ্গোপসাগরে বসায়েও দেয় তবে তার একাজে যারা সমর্থক রাষ্ট্র হবে এদের বিনিয়োগ-বাণিজ্য চাহিদা আমেরিকা কীভাবে মিটাবে? অর্থনীতি কীভাবে চলবে?  যুদ্ধ তো খাওয়ার জিনিষ না!

    আগেই বলেছি এসবের মূল মুরোদ – বিপুল “একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল”, সঞ্চিত সারপ্লাস। এটা হাসিল হলে এরপরে বাকি সবকিছু।  কাজেই এই ফেজে যে শক্তিই আপাত সুবিধা পাচ্ছি মনে করে আমেরিকার সাথে গাটছাড়া বাধবে, নিজের ভাগ্য গড়বে বলে স্বপ্ন দেখবে সেই মারা যাবে।

    কাজেই আলী রিয়াজ আপনি কী বেচতে আসছেন? বিপুল সারপ্লাসহীন ফলে বিনিয়োগ সক্ষমতাহীন কিন্তু সামরিক দানব এক আমেরিকা? এটা কারও কাজে লাগবে না। উলটে না খেয়ে মরবে। ওর সামরিক খরচ যোগাতে গিয়ে আস্তে আস্তে ক্রমশ এখন সে নিজেই নিঃস্ব হতে থাকবে। যেভাবে আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। নিজ রাষ্ট্রের অর্থনীতিগত দিক মানে এটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এর অংশ ও বিষয়, সামরিক শক্তি অর্থনীতিক শক্তির কোন বিকল্প নয়। ফলে কিছুই না।

    আলী রিয়াজ তাদের আর্টিকেলের নামে একটা শব্দ রেখেছেন “ভূরাজনীতি”। এটাই সে চিহ্ন। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ও এর ভুমিকা বুঝাবুঝি বাদ দিয়ে বা এর গুরুত্ব আমল করা ছাড়া “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” যাদের স্টাডি ও চর্চার বিষয় হয়ে যায় “ভুরাজনীতি” তাদের শব্দ। কথিত  “ভুরাজনীতি” শব্দটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধারণাটা কাভার করে না। “ভুরাজনীতি” এটা পুরানা ধারণা অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজম নিজেই যখন গ্লোবাল হয়ে উঠে নাই। এর আবার মূল কারণ গ্লোবাল বাণিজ্য বলেও যখন কিছু ছিল না। কোন রাষ্ট্রের  বিপুল সারপ্লাস সঞ্চয়ের ফলে তৈরি অর্থনৈতিক মুরোদ থাকা এটাই গ্লোবাল নেতাগিরির ভুমিকায় হাজির হবার পুর্বশর্ত। মূলত অর্থনৈতিক মুরোদ নাই বলেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ অস্তিত্বহীন, ১৬ টুকরা। ফলে কোনমতে এখন কেবল গোয়েন্দাগিরির স্ট্রাকচার দিয়ে পুতিন করে খাওয়ার চেষ্টা করছে।

    আসলে আমেরিকার পরিকল্পনাকারীরাই এখন আমেরিকার বড় বিপথগামি শক্তি। আমেরিকা আর নেতা নয় এটা যারা মানতে বা বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। এরই আরেক ফেনোমেনা বা বহিপ্রকাশ হল হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। সম্ভবত তারাই আমেরিকাকে বাকি যা আছে এর সবটা ভেঙ্গে ফেলবে, অন্য কারো কোন ক্ষতি করার আগেই।

    আলী রিয়াজ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জো বাইডেন প্রশাসনের বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতকেন্দ্রিক নীতির পরিবর্তন হবে কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়”। হা সেটা শুধু এখনই নয় আগামিতেই তা থেকে যাবার সম্ভাবনা বাড়ছে।  খাসোগী হত্যার অনুসন্ধানি রিপোর্ট তো বাইডেন প্রকাশ করতে পারেন নাই।  মিসরের সিসিকে ঠিকই অস্ত্র বিক্রিতে সায় দিয়েছেন। রাশিয়ান এস-৪০০ কিনার প্রসঙ্গ শেষ হলে তুরস্ক বা ভারতকে তিনি কী করবেন? অবরোধ দিতে পারবেন? কাজেই বাইডেনের উপর আস্থা রাখা কঠিন হতে যাচ্ছে!

    শেষকথাটা হল, কেন আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যের অধীনে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল? কেন সেই আমেরিকাকে আমরা আবার আস্থা রাখব? এর সদুত্তর ফয়সালা না পেলে বাংলাদেশের মানুষের নুন্যতম মন বা আস্থা ও বিশ্বাস পাওয়া কঠিন হবে। আবার আমাদেরকে এই বিপদে ফেলে এথেকে আমেরিকার কী অর্জন হয়েছে, তাও সে বলতে পারবে না।

    অথচ আলী রিয়াজ ধরে নিয়েছেন “এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমাতে হবে, কেন? এতে বাংলাদেশের কী লাভ? আবার আমেরিকাও কী এথেকে কোন লাভ তুলবার মুরোদ রাখে? উপরে আমরা দেখলাম,  না সে মুরোদও নাই, সে বাস্তবতা নাই।

    তাই সেজন্যই বলেছি আলী রিয়াজ সরি, আপনি তো বেচবার মত কোন পণ্য নিয়ে আসেন নাই। আপনার কাছে তো কোন পণ্যই নাই। বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান অধিষ্ঠান – এটা কোন পণ্যই নয়। তাই, আপনি পরে আসেন। বয়ানের গাথুনি, নির্মাণ ঠিক করে পারলে পরে এসেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বাইডেনের ‘কোয়াড’ ট্রাম্পের চেয়েও বেপথে

    বাইডেনের ‘কোয়াড’ ট্রাম্পের চেয়েও বেপথে

    গৌতম দাস

    ১৫ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3pO

    First Quad summit, ছবিতে পরপর  আমেরিকার বাইডেন, ভারতের মোদী, অষ্ট্রেলিয়ার মরিসন ও জাপানের সুগা

    বাইডেনের কোয়াড [QUAD] মানে ট্রাম্পের বদলে বাইডেন প্রশাসনের আমলে বাইডেন কোয়াডকে কি চোখে দেখবেন বা কি রূপে খাড়া করবেন সেটা ছিল বিশাল কৌতুহলের ব্যাপার। গত ১২ মার্চ বাইডেন প্রশাসন এই প্রথম কোয়াড জোটের চার রাষ্ট্রসদস্য আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর ভারত মিলে এক ভার্চুয়াল বৈঠক মানে অনলাইন সামিটে মিলিত হয়েছিলেন। অনলাইন সামিট হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছিল আমেরিকা হল এই সামিটের হোস্ট। এবং দাবি করা হয়েছিল যে এই প্রথম চার রাষ্ট্রের সরকার / রাষ্ট্র প্রধানেরা একসাথে মিলিত হয়ে কোয়াডের বৈঠক করছেন। বিগত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে এমনকি ২০২০ সালের নির্বাচনের মাসখানেক আগে অক্টোবরেও ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব আর যখন তখন হুমকি দিবার হাতিয়ার হিসাবে কোয়াডকে ব্যবহার করেছিলেন; অর্থাৎ এতে কোয়াডের মানে যেন হয়ে গেছিল এটা একটা সামরিক জোট। যদিও সাধারণভাবে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাইডেনের শপথ নিবার পরে সবাই ধরেই নিয়েছেন যে, সেসব দিনের অবসান ঘটেছে। যদিও এমন মনে করা হয় নাই যে, এখন কোয়াড সদস্যরা কেউ আগ বাড়িয়ে ধরে নিবে, যে কোয়াড মৃত। না তাও নয়। তাহলে ফাইনালি বাস্তবে গত ১২ মার্চের সামিটে কোয়াডকে কী পরিচয়ে সাজাতে চান বলে বাইডেন ধারণা দিলেন?

    আগেই জানা যাচ্ছিল, বাইডেন প্রশাসনের সবচেয়ে সম্ভাব্য অবস্থান হবে ‘কোয়াড’ (এবং সাথে “ইন্দো-প্যাসেফিক” [Indo-Pacific] শব্দটাও) থাকবে কিন্তু এর সামরিক বা নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো অর্থ আর থাকবে না। এমনকি তা প্রকাশ্য টার্গেট করে চীনবিরোধিতা করা হবে না। (হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি মিস জেন সাকি ইতোমধ্যে সাংবাদিকদেরকে পরিষ্কার করে দিয়েছেন, ‘কোয়াড মিটিংয়ের ফোকাস চীন নয়’ […’It’s not focused on China…’ ]) তাতে মনে হয়েছিল কোয়াড বলতে (সমমনাদের) অর্থনৈতিক স্বার্থজোট ধরণের  এক অবস্থান দাড়াবে এর। যেমন বলা হয়েছিল এবারের এই অনলাইন সামিটের মূল উদ্দেশ্য হলো দুটো – “আমেরিকানদের ভাষায়”, “কোভিড ভ্যাকসিন প্রাপ্যতার ইস্যু […plans to announce financing agreements…for vaccines in India] ও চীনের প্রভাব”। মানে চীনের ক্রমেই বেড়ে চলা সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে ব্যালেন্স করতে তারা কী করতে পারেন [….to balance China’s growing military and economic power.], এ নিয়ে আলোচনা।

    কোয়াড [QUAD] কী?
    কোয়াড [QUAD] মূলত ইংরেজি শব্দ। তবে সাবধান এটা চারদেশের নামের আদ্যক্ষর নয়। বরং সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলায় এর অর্থ হল ‘চতুষ্টয়’ [quadrilateral]. আর সেখান থেকে সংক্ষেপে QUAD। এর মুল আক্ষরিক অর্থ একসাথে জন্ম নেয়া চারজন, অনেকটা যমজের মত যেখানে একসাথে দু’জনের জন্ম নেয়া বুঝানো হয়। এখানে কোয়াড মানে চীনবিরোধী চার দেশীয় এক জোটের নাম; আর দেশগুলো হল আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত। কিন্তু শুরু থেকেই এটা কেমন ধরনের ‘জোট’? মানে এটা স্ট্র্যাটেজিক জোট হলেও তবে কি মূলত সামরিক নাকি অর্থনৈতিক জোট?
    আমাদের অবজারভেশন বলে, কে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে আছেন তার ওপর নির্ভর করে জবাবটা। এমনকি তার মুড কেমন – এর উপরও নির্ভর করবে। যেমন আনুষ্ঠানিক অর্থে কোয়াডের জন্ম এবারের সামিটি দাবি করা হচ্ছে যে, ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরে যে ভয়াবহ সুনামি হয়েছিল ও কোস্টাল সবদেশগুলো থেকে মিলিয়ে প্রায় ২.৩ লাখ লোক মারা গেছিল; সেই ব্যাপক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর থেকেই কোয়াডের আলাপ শুরু হয়েছিল। কিন্তু মূলত এর আনুষ্ঠানিক জন্ম  ২০০৭ সালে জাপানের উৎসাহে। জাপানের খুব ইচ্ছা চীনবিরোধী একটা জোট বানায়, তাই। এর পেছনের চিন্তা অনেকটা এরকম যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) ‘হারুপার্টি’ জাপান, যুদ্ধে হেরে যাওয়ার দুঃখ বুকে চেপে রেখে –  যুদ্ধের পরে বিপরীতে আমেরিকার বিপুল বিনিয়োগ ও পুনর্বাসন ঋণ পাওয়াতে এটাকেই এটাকেই সহজে লজ্জা ভুলে যাওয়ার উপায় হিসেবে নিয়েছিল। আর সেটাকে কাজে লাগিয়ে ‘কাজপাগল’ [workaholic] একটা জনগোষ্ঠী এই নতুন পরিচয় গ্রহণ করে পালিয়ে বেঁচে ছিল জাপান। এতে ফলাফল খারাপ হয়নি। আর তাতে অচিরেই অন্তত অর্থনীতিতে এত বিপুল উন্নতি লাভ করে যে, জাপান তার “আমেরিকা ভাইকে” সাথে করে আরেকটা ‘বিশ্বব্যাংক’ বা “অবকাঠামো উন্নতিতে সমতুল্য এক বিনিয়োগ ব্যাংক” খুলে বসেছিল, ১৯৬৬ সালেই। এরই নাম এডিবি [ADB] বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। আজ দু’দেশ মিলে তারা প্রায় ১৬% করে এর শেয়ারহোল্ডার ও সবচেয়ে বড় দুই মালিক। এভাবে চলছিল ভালোই। কিন্তু চলতি শতকে এসে ক্রমেই দৃশ্যমানভাবে এবং ২০০৯ সাল থেকে চীন – উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসেবে এর উত্থান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটেছিল। অনেকটা যেন, ক্রমেই এর আগমন হচ্ছিল সেটা টের পাচ্ছিল সবাই আর এর প্রতিক্রিয়ায় জাপান সমমনা বন্ধুদের নিয়ে এই ‘কোয়াড’ জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল।
    কিন্তু জাপানের (সাথে আমেরিকারও) ক্যালকুলেশনে বড় একটা ভুল ছিল। সেটা এই যে, চলতি শতক আর কোল্ড ওয়ারের যুগ নয়। ফলে চীনা নবশক্তি উত্থান ঘটেও এতে চীন-আমেরিকার কোন নতুন “কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক” এখানে হবেই না। তাই কোল্ড ওয়ার উঠে যাওয়ার একালে কোয়াড জোটই ঠিকমত কাজ করবে কিনা, এমনকি জোটটা খাড়া করাই খুব কঠিনই হবে। সংক্ষেপে এর কারণ বলতে গেলে – কোল্ড ওয়ারের আমলজুড়ে (১৯৫৩-৯১) কখনোই আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোন লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্য ছিল না। এটাই ফান্ডামেন্টাল কারণ। ফলে এরা দুরাষ্টড় সহজেই একে-অপরকে নির্মুলভাবে ধ্বংস করে দেয়ার সিদ্ধান্ত-পরিকল্পনা করতে পারত। কারণ কোন দেয়ানেয়া বাণিজ্য-সম্পর্ক নাই বলে অপরে ধ্বংস হয়ে গেলে তাতে নিজের ক্ষতি নাই মনে করতে পারত।  আমরা যদি ১৯৯২ সালের পরের পরিস্থিতিতে এর সাথে উত্থিত চীনের তুলনা করি বড় ফারাকটা হল, একালে কোয়াডের চার সদস্যই চীনের সাথে ঘোরতরভাবে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্কে জড়িত। এছাড়াও দুনিয়ায় আমরা প্রায় সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় [Global Order] অংশগ্রহণ করে অবিচ্ছেদ্দভাবে পরস্পর সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এখান সবাই চীনের সাথে স্বার্থ লড়াই করে আবার গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কও বজায় রাখে।
    মূলত এ কারণেই চীনবিরোধী স্বার্থ যতই থাক; আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর ভারত – এদের সবার গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকার কারণেই বলা যায় ১০ বছর (২০০৭-১৭), কোয়াড জন্মের পরও এটা ততপরতাহীন অকেজো হয়ে ছিল। পরে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের আমলের তাও কেবল প্রথম বছরেই এটাকে আবার চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয়। তাও এর প্রথম সভা তারা করেছিলেন এক সাইড লাইনে বসে। মানে ট্রাম্পসহ নেতারা ফিলিপাইনে এসেছিলেন আসিয়ানের বৈঠকে, এরই সাইড লাইনে বসে সেই মিটিং করা হয়। ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দেয়ার মত করে নামেই এক বৈঠক করেছিলেন। ট্রাম্প আবার সেবার ফিলিপাইনে এসেছিলেন, এর আগে তাঁর চীন সফর শেষ করে ফেরার পথে এবং সেবারের সফরে ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে বাণিজ্যে বহুবিধ ছাড় পেয়েছিলেন। ট্রাম্পের প্রথম বছরে তিনি অতটা মারাত্মক জাতিবাদি হয়ে উঠেন নাই, তাই। কিন্তু তাতেও দেখা যায়, সে কারণেই কোয়াড জোটের তৎপরতা চালুর ঘোষণা দিলেও একসাথে একই ভাষায় কোয়াডের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি তারা দিতে পারেনি। চার দেশই মূল বিবৃতিকে কাটছাঁট করে নিজের বক্তব্য ঢুকিয়ে এরপর প্রেসে দিয়েছিল। এর মূল কারণ সবাই কোন না কোনভাবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কে জড়িত ও সুবিধাভোগী ছিল। ফলে সবাই চেয়েছিল, সেই সম্পর্ক অটুট রেখে কোয়াড জোট খাড়া করতে। ফলে বাস্তবে এটা কখনো দাঁড়াতেই পারেনি। তবে সেই  ট্রাম্পেরই কেবল ২০১৮ সালের শেষে চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধ মিটতে ব্যর্থ হলে, মানে এটা ফেল করতে যাচ্ছে স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরই কোয়াডের গুরুত্ব আবার বেড়েছিল। এমনকি সামরিক দিকে ঝোঁক যেমন, জোটের সামরিক মহড়া ধরনের বিষয়ের দিকে, এ জোট ঘুরতে উদ্যত হচ্ছিল। আবার ট্রাম্পের গত নির্বাচনে এটা সামরিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে ট্রাম্প কোয়াডের তৎপরতা বাড়িয়ে ছিলেন ২০২০ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত।
    নির্বাচনে বাইডেনের বিজয়ের পরে আমরা বলেছিলাম, বাইডেন প্রশাসনের নীতি হবে কোয়াড ভেঙে দেয়া বা অকেজো করা নয়। তবে এটা অর্থনৈতিকভাবে সমমনাদের স্বার্থজোট এমন পরিচয়ে কেবল সীমাবদ্ধ থাকতে চাইবে। আর তাই অনুমান করা হয়েছিল গত ১২ মার্চের অনলাইন বৈঠকে সস্তায় ভ্যাকসিন উৎপাদনের সুরাহা ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু হয়েছিল, চীনের ক্রমেই বেড়ে চলা সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এই কোয়াড জোট স্তব্ধ-ঠেকাতে পারবে না হয়ত। তবু একে কিছুটা ব্যালেন্স করতে তাদের জোট কী করতে পারে তা নিয়ে কিছু আলোচনা তারা করবেন।
    এছাড়া  বাইডেনের দিক থেকে আরো কিছু সাবধানতাও থাকার কথা। বহু আকাঙ্খিত, ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া ‘চীন-আমেরিকা বাণিজ্যবিরোধ’ এর জট ছুটানো নিয়ে আলোচনায় বসার তারিখ এরই মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে এবং সেটা হবে আগামী সপ্তাহেই ১৮-১৯ মার্চ এবং আমেরিকার আলাস্কা রাজ্যে; আর এ স্থান সম্পর্কে বলা হচ্ছে এটি নাকি চীন ও আমেরিকা রাষ্ট্র থেকে সমদূরত্বে। কিন্তু তাতে কোয়াডের সমস্যা কী? সমস্যা হল ১২ মার্চের কোয়াড সামিট থেকে এমন কোনো চীনবিরোধী ভাষ্য বাইডেন প্রশাসন আনবে না বলেই অনুমান যেটা চীন-আমেরিকার আলাস্কা বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা খুঁজে পাওয়ার আগেই বাইরের কারণে ‘তিতা’ হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, আমেরিকার কাছে কোয়াড জোটের থাকা না থাকার চেয়ে চীন-আমেরিকা বাণিজ্যবিরোধের সমাধান নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি গুরুত্বের।

    এবার কোয়াড বৈঠকের ইস্যু কী?
    মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, এ বৈঠকের মূল ইস্যু কী। তবে এ নিয়ে অন্তত দু’টি মতামত বা অনুমান আছে। রয়টার্স এ নিয়ে গত দুই দিনে তিনটি রিপোর্ট ছেপেছে। সেখানে আমেরিকান প্রশাসন পরিষ্কার করে বলছে, সস্তায় করোনা ভ্যাকসিনের যোগাড় ও চীনের প্রভাব ব্যালেন্স করতে সম্ভাব্য করণীয় – এই হল দুই আলোচ্য ইস্যু। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর মনে করেন, “ইন্দো-প্যাসিফিক রিজিয়নে ফ্রি ও ওপেন সমুদ্র চলাচলও’ এখানে আলোচ্য ইস্যু [ on practical areas of cooperation towards maintaining a free, open and inclusive Indo-Pacific region.”]। এর সাথে তিনি আরও দাবি করেছেন ‘মেরিটাইম সিকিউরিটিও’ [summit would also cover supply chains, emerging and critical technologies, maritime security... ] এখানে আলোচ্য ইস্যু। আবার অস্ট্র্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও ‘রিজিওনাল সিকিউরিটি’ এবং “সভরেন ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্দো-প্যাসিফিক” রাখার কথা এজেন্ডায় আছে বলে উল্লেখ করেছেন [Morrison said the meeting would focus on regional security and climate change…….about our support for a sovereign, independent Indo-Pacific,”]- ভারতের মতই। কিন্তু এ ব্যাপারে সবার চেয়ে জাপান একদম মুখবন্ধ; মানে জাপান যেন ওস্তাদ আমেরিকার সাথেই আছে এবং তা ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে বেশি করে। এমন হওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যেমন, ভারতের হিসাবটা সোজা। বাইডেনের আমেরিকা মোদীর জন্য ট্রাম্পের আমলের মত ‘ইজি-গোয়িং’ নয়। কারণ বাইডেন ঘোষণা দিয়েই এসেছেন যে, মোদীর কাশ্মির দখল আর মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন ও নির্যাতনের অভিযোগ – এসব প্রসঙ্গে তিনি মোদীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিবেন ও কথা বলবেন। তাই এথেকে রেহাই পেতে ভারতের মনষ্কামনা হল, যেন চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্ব জোরদার হয়, শিগগির মিটে না যায়। তা হলে এটা যত জোরদার হবে ততই ঐ দ্বন্দ্বের আড়ালেই চার বছর ভারতের কাটিয়ে দেয়া বা টিকে যাওয়া সহজ হবে। এ জায়গায় এসে মোদী আর বাইডেনের পথ দুটো দুই দিকে চলে গেছে।

    করোনা ভ্যাকসিন কোয়াড বৈঠকের প্রধান ইস্যু কেন?
    প্রথমত, যেসব দেশ গবেষণা করে  ল্যাব থেকে ভ্যাকসিন বের করেছে ভারত তাদের অন্তর্গত কেউ নয়। নিজ “ল্যাব থেকে আবিস্কার করা” টিকার দেশ ভারত নয়। তাহলে? এর পরও একটা ‘কিন্তু’ আছে। অনেকটা যেমন,  ডাটাবেজ বা ডিজিটালাইজেশন অথবা ব্রডলি কম্পিউটারাইজেশন করা দুনিয়া এসে যাওয়ায় শিল্পোৎপাদনসহ জীবনযাপন এখন তুলনায় সবখানে এখন সহজ হয়ে গেছে। আর  এ ব্যাপারটা চালু করার নেতা হল আমেরিকা। কিন্তু ল্যাবে মূল আইডিয়া ও পরিকল্পনাটা অর্জন করে নিবার পরে এর বাস্তবায়নে আমেরিকার এতে প্রোগ্রামিং বা কোড বসানোর জন্য যে বিপুল হিউম্যান রিসোর্স লাগবে, তা সাপ্লাইয়ের জন্য নুন্যতমযোগ্য ও একেবারে সস্তা শ্রমদাতা হল ভারত। কারণ কাজের এই অংশটাও করাতে সে আমেরিকায় বসবাসকারী সিটিজেন কেউ হলে ভারতের চেয়ে তার শ্রমমজুরি কয়েক গুণ বেশি গুনতে হবে। অর্থাৎ এটা এড়াতেই সস্তা শ্রমে কাজটা করে নিতেই পুরো শিল্পের বড় শ্রমনিয়োগের অংশটা আউটসোর্সিং করা এবং ভারত থেকে করিয়ে আনা শুরু হয়েছে। ঠিক তেমনই এটাই ঘটতে যাচ্ছে ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে। তা হল ভারত ভ্যাকসিন উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েছে ও নিবে পশ্চিমাদেশের কোম্পানির থেকে।  এরপর এর বাল্ক প্রডাকশন বা গণ-উৎপাদনে নেমে পড়েছে। এটাই বাইডেন আরো করাতে চায়। এমন উতপাদন সক্ষমতা ভারতের আছে।
    এমনিতেই ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে পুরোই আলাদা এবং সক্রিয় ও তৎপর। ট্রাম্প করোনাকে তেমন রোগই মনে করতেন না। আর বাইডেন তিনি দ্রুত আমেরিকার সবাইকে করোনার ভ্যাকসিনের অধীনে আনতে চান। কারণ যতই দেরি, ততই বিভিন্ন এলাকায় ভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইনের জন্ম [virus stain, মানে ভাইরাসের নানান রকম-ফের] বা উপস্থিতির সম্ভাবনা বাড়বে। তাতে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়াও এমনিতেই বলা হচ্ছে যে, ভ্যাকসিন গ্রহিতাদের দুটো ক্লাস তৈরি হয়ে গেছে, গরিব আর বড়লোক বলে। আমেরিকার যে টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে তা এখনো আমাদের দেশের চেয়ে অনেক দামি। আর এমন ভ্যাকসিনের ব্যবহার দিয়েই এর শুরু ও বর্তমান। এই ভ্যাকসিন সংরক্ষণও ব্যয়বহুল। তাই আমেরিকা ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বিতরণ আরও ত্বরান্বিত  ও সস্তায় [affordable] করার উদ্যোগ নিতে চান বাইডেন। এ ছাড়া সেটা চায় নিরাপদ টিকা, সবাই যেন পায় আর দাম সীমার মধ্যে যেন থাকে এমন শর্তে। এদিকে আবার আমেরিকারই আরো অন্তত দুটো (নোভাভ্যাক্স ও জনসন অ্যান্ড জনসন Novavax Inc and Johnson & Johnson] ) ভ্যাকসিন আছে যাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনও তেমন শুরুই হয়নি বা অস্পষ্ট। সব মিলিয়ে বাইডেন ভারতকে দিয়েই ভ্যাকসিন উৎপাদন করিয়ে নিতে চান। তাই এই সামিটের সবচেয়ে বড় ‘নগদ’ উদ্দেশ্য হল, ভারতের সাথে ‘প্লানস টু অ্যানাউন্স ফিন্যান্সিয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট’ […..plans to announce financing agreements to support an increase in manufacturing capacity for coronavirus vaccines in India]-এর গ্রাউন্ড তৈরি করে দেয়া। এতে আমেরিকার ওসব কোম্পানির লাইসেন্স নিয়ে ভারতের উৎপাদনে যেতে যে বিনিয়োগ লাগবে, সেটিও আমেরিকা ও জাপান দিতে চায়। সারকথা ভারতকে দিয়ে ব্যাপক ভ্যাকসিন উৎপাদন করিয়ে নেয়া – এটিই কোয়াডের প্রথম আলোচ্য ইস্যু।
    তবে এখানেও একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার। আমেরিকার প্রশাসন রয়টার্সকে জানিয়েছে বাইডেনের টার্গেট আমেরিকান জনগণকে ভ্যাকসিন দেয়া আর সাথে অল্প কিছু ভ্যাকসিন, যা ইউএসএইড ফান্ডেড এনজিওদের দেয়ার জন্য আমেরিকা কমিটেড, কেবল ততটুকু। কিন্তু ভারত চেষ্টা করেছে কথাটা ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি’ শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে। ভারতের কাছে এর মানে হল, অন্য দেশে ভ্যাকসিন দেয়া মানে ‘প্রভাব বিস্তার’ করা। তাতে আমাদের মতো দেশগুলোতে চীন যদি ফ্রি সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনের অফার দেয়, তবে এর বিরুদ্ধে ভারত লড়বে ওই দেশেই নিজের ভ্যাকসিন বিক্রি করে। আর তা করবে ওদেশের সরকারকে কমিশন দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিজের ভ্যাকসিন বিক্রি করে। এটিই ভারতের ভ্যাকসিন আবিষ্কারক না হয়েও চীনের পাল্টা ভ্যাকসিন লড়াই জারি করা- চীনের বিরুদ্ধে ‘প্রভাব বিস্তার’ করার লড়াই বলে যেটা ভারত বুঝেছে। এই কথিত প্রভাব বিস্তারের লড়াই, এটিই ভারতের চোখে ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি, অন্যের তেলে মাছ ভেজে নেয়া। ভারত এভাবেই তার অন্য কোয়াড বন্ধুদের ভারতে বিনিয়োগ করে চীনের বিরুদ্ধে লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান রেখেছে।

    কিন্তু বাইডেন প্রশাসন এ দিকে তেমন আগ্রহী নয়। যেমন রয়টার্স নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়েছে। তিনি বলছেন, ‘আমেরিকা আপাতত নিজের ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্যই কোয়াড নিয়ে তৎপরতায় নেমেছে, এটিই তাদের ফোকাস। কাজেই আমরা ঠিক এ মুহূর্তে অন্যদের সাথে ভ্যাকসিন শেয়ারের প্রসঙ্গে কথা বলছি না।[United States’ focus was foremost on getting vaccines to Americans…….“We will not be talking about sharing vaccines right now,” she said.]।  অর্থাৎ ভারত যতই আমেরিকাকে চীনের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার কৌশল নিতে চাইছে আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটরা ততই আপাতত ব্যাপারটা পাস কাটিয়ে যেতে চাইছেন।

    মিটিংয়ে পরিস্থিতি পল্টি খেয়ে গেছেঃ
    উপরে এখন পর্যন্ত যা লিখেছিলাম এটাই ১২ তারিখে অনলাইন সামিট বৈঠক শুরুর আগের ভাষ্য।  বৈঠক শুর পর আসলে চার সরকার প্রধানের বক্তৃতার মূল সময় লেগেছিল মোট মাত্র ১২ মিনিট (সকাল ৮:৩২ থেকে সকাল ৮:৪৪), আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য তাই বলছে। অর্থাৎ প্রচারিত বক্তৃতায় তেমন কথা নাই। কিন্তু এই প্রথম কোয়াডের চারদেশীয় এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে যেখানে মাত্র পাঁচটা পয়েন্টে সবকথা আনা হয়েছে। আর এই বিবৃতির ভাষ্য ১১ মার্চ পর্যন্ত সরকারি নানান স্টাফেরা মিডিয়ায় যেসব ধারণা দিয়েছেন এর উলটা। বিশেষত স্টাফদের ভাষ্য ছিল চীনবিরোধী ইন্দো-প্যাসিফিক জোট বা ওর নিরাপত্তা স্বার্থের প্রসঙ্গকে খাটো করে, কেবল সস্তায় ভ্যাকসিন নিশ্চিত ও তাও কেবল আমেরিকানদের জন্য – এই ব্যাখ্যার মধ্যে ব্যাপারটার সীমাবদ্ধ রেখে।  কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে মুল ফোকাস সারা ইন্দো-প্যাসিফিক [for the global benefit — and strengthen vaccinations to benefit the entire Indo-Pacific.]।  এটা বাইডেনের মূল বক্তৃতা থেকে নেওয়া।
    কিন্তু যৌথ বিবৃতির পাঁচ পয়েন্টের প্রথম পয়েন্টে এসেই এবার বাইডেন এজেন্ডা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কভিড ভ্যাকসিন, ক্লাইমেট চেঞ্জের কথা বলার পরেই বলে বসেন “নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের” [security challenges facing the region summon us with renewed purpose] কথা লেখা হয়েছে।  এখানে নিরাপত্তা মানে ইন্দো-প্যাসেফিকে চীন পিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে – এই হল এর পিছনের বলতে চাওয়া ভাষ্য।  অথচ অনলাইন বৈঠকে বসার আগেরদিন পর্যন্ত মিডিয়া রিপোর্টে আমেরিকার কর্তারা “নিরাপত্তা” নিয়ে কোন কথাই বলেই নাই।
    আবার বিবৃতির দ্বিতীয় পয়েন্টে গিয়ে এটা  পুরাটাই চীনবিরোধী ইন্দো-প্যাসেফিক জোট কেন্দ্রিক। যার সারকথা হল চীনবিরোধী এবং সাউথ চীন সাহরের কথা মাথায় রেখে লেখা। বলতে চায় তারা সমুদ্রপথ উন্মুক্ত ও অবাধ রাখতে চায়, আইনের শাসন চায়, আন্তর্জাতিক আইন মানে, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে এভাবে ইন্দো-প্যাসেফিক ও বাইরেরও হুমকি মোকাবিলা করে। তারা আইনের শাসন মানে, সমুদ্র চলাচলের স্বাধীনতা, ও উপর দিয়ে উড়ে চলাচল এলাও করে, বিরোধের শান্তিপুর্ণ সমাধান করে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ নিয়ে চলে ও অন্যের ভুখন্ডগত সংহতিকে সম্মান করে চলে ইত্যাদি। একেবারে সর্বগুণে গুণান্বিতা। আর বিপরীত চীন কেবল দুষ্ট! এভাবেই বাকি তিনটা পয়েন্টও একই রকম সারকথায় চীনবিরোধিতা। আর তারা সবাই ভাল!
    অর্থাৎ চীনবিরোধিতার ইঙ্গিত বা প্রত্যক্ষভাবে কিছু বলব না বলে আমেরিকান প্রশাসনের কর্তারা যে প্রমিজ বা সাধুতা দেখানোর চেষ্টা করেছিল বৈঠক শুরুর আগে তা অনলাইন বৈঠকের শুরু থেকেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। বাইডেন প্রশাসন সারেন্ডার করেছে। বুঝা যাচ্ছে তা মূলত ভারত ও অষ্ট্রেলিয়ার চাপে।

    এদিকে এসব দেখে ট্রাম্পের আমলের এক জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তরের উপসহাকারি মন্ত্রী লিসা কার্টিস এক মন্তব্য-আর্টিকেন লিখেছেন সিএনএনে। যার সারকথা ও শিরোনাম হল, “বাইডেন যা ফরেন পলিসি দাড় করিয়েছেন তা ট্রাম্পের দেখানো পথেই আর তারই উপরে দাঁড়িয়েই”। তাহলে এখন আগামি সপ্তাহে চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধসহ সব আলোচনা যা শুরু হতে যাচ্ছে তা কী বিঘ্নিত হবে না। মনে হচ্ছে অবশ্যই হবে। সেকথার আগে কোয়াডের এই সভা নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া দেখে নেয়া যাক।

    চীনের প্রতিক্রিয়া কী?
    হ্যাঁ, চীনের প্রতিক্রিয়াও আছে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিন্ন প্রসঙ্গে প্রেসের সাথে কথা বলতে গিয়ে কোয়াডের নাম না ধরে বলেছেন, ‘বহুরাষ্ট্রীয় তৎপরতার নামে ছোট এক সার্কেল গড়া এটি তো আসলে গ্রুপ পলিটিক্স করা।’… ‘বহুরাষ্ট্রীয় তৎপরতার নামে খোদ নিজস্বার্থে কাজ করা এটি তো একপক্ষীয় স্বার্থচিন্তার কারবার। কাজেই বেছে বেছে বহুরাষ্ট্রীয় তৎপরতার আওয়াজ তোলা সঠিক রাস্তা নয়” [“building small circles in the name of multilateralism”, which was “in fact ‘group politics”………. “Multilateralism with one’s own interests taking precedence is still unilateral thinking,” he said. “’Selective multilateralism’ is not the right choice.”]।
    এ ছাড়াও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ের মুখপাত্র সাবধান করে ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, কোয়াডের ‘মিটিং যেন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য সহায়ক হয় এবং এর বিপরীত কিছু না হয় “…… do things that are conducive to regional peace stability and prosperity, rather than the opposite,” ।

    এদিকে ভারত এক আজিব দেশ। সে সাপ হয়ে কামড় দেয় আবার ওঝা হয়েও হাজির হতে চায়। তাই চীনের গ্লোবাল টাইমস কোয়াডকে নিয়ে কার্টুন এঁকেছে। নিচে দেখেন।

    গ্লোবাল টাইমস স্যাটায়ার করে এক লেখা ছাপিয়েছে ভারতকে নিয়ে।

    উপরের ছবিতে লক্ষ্যণীয় যে বাইডেন গাড়ি চালাচ্ছে বটে কিন্তু গাড়ির বাকি তিন যাত্রী তাদের প্রত্যেকের কাছেই একেকটা করে গাড়ির স্টায়েরিং আছে! এটা এমনই গাড়ী। মানে কোয়াড এমনই প্রতিষ্ঠান বা গাড়ী যার মধ্যে চার সদস্যেরই ইচ্ছামত দিকে গাড়ি হাকানোর সুযোগ আছে। তাহলে গাড়ীটা কোনদিকে যাবে? পাঠকেরা বুঝে নেন। আবার ভারত যে একই সাথে গ্লোবাল আগের নেতা আমেরিকা ও এর সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের পালটা নতুন সিস্টেম (আইএমএফ) ব্রিকস [BRICS] এর সক্রিয় সদস্য। যে এই বছরই ব্রিকস সম্মেলনের হোস্ট, মানে সেটা ভারতে অনুষ্ঠিত হবে। তার মানে সেই ভারত তাহলে আমেরিকার পিছনে লেজ ধরে হাটে কী করে?  যার সোজা মানে ভারত আমেরিকার সাথে আছে আবার চীনের সাথেও আছে! কী তামসা! এই স্ববিরোধীতাগুলোকেই দেখিয়েছে কার্টুনটা।

    তাহলে চীন-আমেরিকা বাণিজ্যবিরোধের আলোচনায় কোয়াডের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
    প্রথম কথা কোয়াড বৈঠকে বাইডেন কোয়াড কে যতই চীনবিরোধী অভিমুখি করে তুলবেন ততই তা তাঁর বিরুদ্ধে যাবে। সারকথায়, যতক্ষণ বাইডেন চীনবিরোধী সক্রিয় বলে কোন কিছু জোটের নেতা হয়ে থাকতে চাইবেন ততই চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধ আলোচানায় চীন আমেরিকাকে কোন ছাড় দিবে না। এককথায় চীন কোয়াডের চার দেশ সবার সাথেই আলাদা করে সুবিধা দিয়ে রফা করতে চাইবে। এবং এটা সম্ভব। সেকারণে, এতদিন এটাই চলে আসতে পেরেছে এভাবেই। আবার লক্ষ্যণীয়, সারা ইউরোপ চীনবিরোধী অবস্থান নিয়ে বাইডেনের পাশে দাড়ায় নাই। আবার RCEP বাণিজ্য জোটের চীনের সাথে গুরুত্বপুর্ণ সদস্য হয়ে আছে জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া। সেটা তো সে উপেক্ষা করতে পারে নাই। যা প্রমাণ করে এরা চীনেরবিরোধী নয়। তাহলে, কোয়াড নিয়ে এত চিৎকার এর প্রয়োজন কোথায়? কাল জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া চীনের থেকে বাণিজ্য সুবিধা পেলে কোয়াড আবার অকেজো করে রাখবে। যেটা এতদিন ছিল। কাজেই বাইডেন এই প্রথম কোয়াডকে রাষ্ট্রপ্রধানদের পর্যায়ের বৈঠকে আনতে পেরেছে আর এই প্রথম এক সম্মিলিত যৌথ বিবৃতি দেওয়াতে পেরেছে? কিন্তু কতদিন এরা একসাথে সক্রিয় থাকবে তা এই চারসদস্যের কেউ জানে না। কাজেই আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ব্রুকিংসের [Brookings Institution] ভারতীয় ডিরেক্টর তানভি মদন যতই জোর দিকে বলুক যে এবারের কোয়াড থাকতেই এসেছে ……a declaration that the Quad is here to stay,”] তাতে কিছুই এসে যায় না; তা কাজ করবে না। আর  যদি করে তাহলে বুঝতে হবে দুনিয়া কোন যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “বাইডেনের ‘কোয়াড’ যুদ্ধে নয়, টিকা বানাবে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি সর্বোচ্চ ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে তা লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জয়শঙ্কর চান চীনের বদলে জাপান! কিন্তু লাভ নাই

    জয়শঙ্কর চান চীনের বদলে জাপান! কিন্তু লাভ নাই

    গৌতম দাস

    ০৮ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3pl

    জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’। PPBD

    s-jaishankar-aka-momen-040321-201

    দেখানো উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগামি ২৬ মার্চ ঢাকায় আসছেন, এটা নিশ্চিত করতেই নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর গত ৪ মার্চ এক দিনের ঢাকা সফর করে গেলেন। কিন্তু এই সফরের যেসব মিডিয়া কাভারেজ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে বাংলাদেশে বা ভারতে, তা দেখে আমরা পরিষ্কার যে, দুই দেশের মিডিয়াই “উদ্দেশ্যের বিচারে” পুরা বিভ্রান্ত। জয়শঙ্কর ঠিক কেন এসেছিলেন? যেমন – প্রথমত তাঁর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অতিথি হিসেবে মোদীর বাংলাদেশ সফরের কূটনৈতিক ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করা। কিন্তু প্রায় সব মিডিয়া রিপোর্টই এমন যে, এই প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা কোথাও আছে কি না তা খুঁজতে হবে, খালি চোখে পাওয়া যাবে না। এমনই অবস্থা!

    তাহলে ওসব মিডিয়া রিপোর্ট বা শিরোনাম কী নিয়ে? দুই দেশেরই বেশির ভাগ মিডিয়ার শিরোনাম ও রিপোর্টের ফোকাস হল – “সীমান্ত হত্যা”। যেন মোদীর সফর না, ‘সীমান্ত হত্যা’ ছিল আলোচনার মূল এজেন্ডা!  আর সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথা বলা হয়েছে সেখানে – বাংলাদেশ আর ভারত নাকি একমত হয়েছে যে, সীমান্তে অপরাধ হচ্ছে তাই হত্যা করতে হচ্ছে। অপরাধ ও হত্যা, একে অপরের কাউন্টার বা রিমেডি! এই প্রসঙ্গে বড় করে জয়শঙ্করের বাণী সামনে এনেছে বিডিনিউজ২৪। জয়শঙ্করের বরাতে তারা লিখছে, “আমি মনে করি, আমরা একমত হয়েছি, যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করতে হবে, সমস্যাটি কেন হচ্ছে এবং আমরা জানি, সমস্যাটি কী। সমস্যা হচ্ছে অপরাধ।… সুতরাং আমাদের মিলিত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন’ সীমান্ত। আমি নিশ্চিত, আমরা যদি এটা করতে পারি, অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন সীমান্ত, তাহলে একসাথে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব”।

    বুঝা গেল ‘সীমান্ত হত্যা’ নিয়ে জয়শঙ্কর কথা সাজিয়ে এসেছিলেন ভালই, বলতে চেয়েছেন সীমান্তে অপরাধ হচ্ছে তাই হত্যা করতে হচ্ছে। অনেক মিডিয়া তাই সরাসরি কোট করে লিখেছে “অপরাধ নাই তো মৃত্যুও নাই” [India for ‘No crime, no death’ policy on border, says Jaishankar]  কিন্তু  তাতে সীমান্ত হত্যার “হত্যা” শব্দটা জয়শঙ্কর বেশ চাতুরির সাথে লক্ষণীয়ভাবে বদলে দিয়েছে আর বসিয়ে নিয়েছে “মৃত্যু”। কারণ “হত্যা হচ্ছে” মানে ভারতীয় বিএসএফ হত্যা করছে- এটা স্বীকার করা হয়ে যায়। তাই এবার শব্দ বদলে এক চাতুরী করা। ‘হত্যা’র বদলে ‘মৃত্যু’ শব্দ ব্যবহার করেছেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’ এটাই নাকি তাদের সীমান্ত-নীতি। মানে না কিল, তো না ডেথ। আর তাতে মানে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশী হতভাগ্য নাগরিক-ব্যক্তিটার কেন সীমান্তে মৃত্যু হয়েছে, কে গুলি করেছে, এটা জয়শঙ্কর জানেন না বা সেটা যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। অথবা সীমান্তে খুন হওয়া বাংলাদেশি নাগরিক-লোকটা যেন নিজেই বিএসএফকে গিয়ে বলেছেন তাকে গুলি করে মেরে ফেলতে!

    কিন্তু এসব ছেঁদো আলাপে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি কী করছিলেন? মি. মোমেন যদি বুঝেই থাকেন যে তিনি জয়শঙ্করের সাথে বাতচিতে বাংলাদেশীদের সীমান্তে হত্যা ঠেকাতে পারবেন না, এ নিয়ে কথা তুলেও সুবিধা করতে পারবেন না, তাহলে এটাকে তিনি তাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ইস্যু করলেন কেন, হতে দিলেন কেন? কেন রাজি হয়েছেন এতে? এর মানে কী? কী আলোচনার ইস্যু হবে সেটাতেও সম্মতি দেয়া না-দেয়ার মুরোদও তিনি হারিয়েছেন?  এটা আলোচনার ইস্যু না করলে আমাদের কী (বাড়তি) ক্ষতি হতো? তিনি কী ব্যাখ্যা করতে পারবেন? এ ছাড়া এখন এর চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন উঠেছে!

    প্রশ্নটা হল  – বাংলাদেশের কোনো নাগরিক অপরাধ যদি করেও থাকে তাহলেই কী তাকে খুন-হত্যা করতে পারেন? করা যায়?  জয়শঙ্করেরা তাকে হত্যা বা খুন করে ফেলবেন? এই হত্যাকে লুকিয়ে একে ‘মৃত্যু’ বলে ডাকতে পারেন? মি. মোমেন আপনি এটাকে ‘মৃত্যু’ বলে ডাকার কে? কেন একে ‘মৃত্যু’ বলতে জয়শঙ্করকে সম্মতি দিয়েছেন? এটা সিরিয়াস লিগ্যাল প্রশ্ন! এর জবাব কী?

    বিডিআর ও বিএসএফ দুটোই পড়শিদেশের সিভিলিয়ান ফোর্সঃ
    বর্ডার গার্ড (সাবেক নাম বিডিআর) ও বিএসএফ এ দুটোই পড়শি দুই দেশে সিভিলিয়ান ফোর্স হিসেবেই গণ্য, অর্থাৎ এটা যার যার দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। মানে সামরিক বাহিনীর মত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। বরং এটা পুলিশের সমতুল্য এক সিভিল প্রশাসন যাদের কাজ অপরাধীকে ধরে আদালতে পেশ করা। আত্মরক্ষার মতো পরিস্থিতি ছাড়া অতিরিক্ত (অ্যাকসেসিভ ফোর্স) বলপ্রয়োগ না করা, হত্যা না করা। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী তাই স্থানীয় থানার মাধ্যমে আসামিকে আদালতে পেশ করতে পারে। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিষয়ক দুই দেশের চুক্তি (যেটা পাকিস্তান আমল থেকেই চালু হয়েছিল আর স্বাধীন বাংলাদেশে সেটাকেই রিনিউ করে নেয়া হয়েছে) করার উদ্দেশ্যই ছিল মূলত দুটা। এক. সীমান্ত অপরাধের ইস্যুগুলোকে যেন সিভিল প্রশাসনের অধীনে রেখে পরিচালনা করা যায়; দুই দেশের নাগরিকের মধ্যে সদ্ভাব থাকে; দুই সীমান্ত রক্ষীবাহিনীই যেন অযথা এবং ‘অতিরিক্ত’ শক্তিপ্রয়োগ না করে। আর দুই. এতে সুবিধা হল, দুই দেশের সেনারা সীমান্ত থেকে বহুদূরে (সম্ভবত ২৫ কিলোমিটারের বাইরে) ব্যারাক গড়ে থাকতে পারে। এতে সীমান্তে টেনশন কমানোর সহায়ক পরিবেশ পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর এনগেজমেন্টের রুল ভিন্ন এবং তা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে। একটা দেশের শত্রুর ব্যাপারে যেভাবে আচরণ করা উচিত সেভাবে। আর এখানে সবার উপরের কথা হল, সামরিক স্ফিয়ারের কোনো খুন বা ছোট-বড় গোলাগুলির ঘটনা কোনো দেশের আদালতে তোলার বিষয়ই নয়, আর তা এখতিয়ারেরও বাইরে। বড় জোর, কোন আভ্যন্তরীণ নিয়মভঙ্গ হলে নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোর্ট অব এনকোয়ারি হতে পারে; তাও বিশেষ ক্ষেত্রে। তাই দেশের সীমান্ত যদি সেনাবাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানেই হল, সীমান্ত-সম্পর্কিত অপরাধীরা এক্ষেত্রে আদালত-বিচার ইত্যাদির সুবিধা পাবে না। তা দেয়া যাবে না। এটা এড়াতেই দুদেশে সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বসানোর চুক্তি।

    এসবের সার কথাটা হল, ভারত-বাংলাদেশ উভয়েই নিজ সেনাবাহিনীকে সীমান্তের ২৫ কিলোমিটার দূরে ব্যারাকে রেখে এবার নিজ নিজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ও পরিচালিত নিজ নিজ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে উভয়েই সীমান্ত নিরাপত্তা পরিচালনা করার চুক্তি করা হয়েছিল। যার মানেই, সীমান্তে কোনো “অপরাধ ঘটলে তা গুলি” করে সমাধান করা যাবে না। অপরাধ মানেই, গুলি করে হত্যা বা মৃত্যু নয়। কারণ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনী নয়। তারা অপরাধীকে প্রতিপক্ষ দেশে হস্তান্তর করতে পারে প্রটোকল থাকলে, চাই কী নিজ নিজ দেশের আদালতে পেশ করতে পারে। তাতে রায় সাপেক্ষে আসামিকে শাস্তি পেতে হতে পারে। তবে তা আর সীমান্ত বাহিনীর এখতিয়ারই নয়, সিভিল পুলিশের কাজ। তাহলে মি. মোমেন কিভাবে ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’-জয়শঙ্করের এই সীমান্তনীতিতে সায় দিয়েছেন? এ প্রসঙ্গে, বিডিনিউজের রিপোর্ট দাবি করছে মোমেনকে পাশে নিয়ে জয়শঙ্কর বলেছেন … ‘আমরা একমত হয়েছি’…। তাহলে নিজের হাত পরিষ্কার রাখতে এখন মি. মোমেনের উচিত নিজে থেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া, কেন তিনি একমত?

    এক ধান্দালি শব্দ ‘কানেকটিভিটিঃ’
    দুই দেশেরই মিডিয়ায় দ্বিতীয় গুরুত্বের ফোকাস ছিল ‘কানেকটিভিটি’ [Connectivity]। শব্দটা এবার প্রথম আলো বাংলা করেছে “সংযুক্তি”। সরি, এটা ভাল বাংলা হয় নাই। বিশেষত এই অনুবাদ কনটেক্সট বা প্রেক্ষিত থেকে দূরে চলে গিয়েছে, এতে বিচ্ছিন্ন সম্পর্কহীন হয়ে গেছে। ভাল বাংলা হতে পারত “সংযোগ”। মূলত শব্দটার অর্থ “অবকাঠামোগত সংযোগ”।  কিন্তু এসব বাদ দিয়ে আরেক মূল সমস্যা এখানে দেখা দিয়েছে।

    যেমন, অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আবার ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটাই নাই অথবা অর্থহীনভাবে দু-এক শব্দে আছে। যেমন- ভারতের দক্ষিণী- দৈনিক দ্য হিন্দু [thehindu], যা গত দুই জোড়া বছর ধরে মোদীর জাতিবাদের এক বড় প্রবক্তাই শুধু নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের খোদ ‘সাফাইদাতা মুখপত্র’ যেন এমন ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে ওর সুহাসিনী হায়দার বা কল্লোল ভট্টাচার্যের লেখা রিপোর্টগুলো। বলাই বাহুল্য, যা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বলার কথা সেই দায়িত্ব অযাচিত হয়ে একটা মিডিয়া পালন করতে পারে না। এটা মারাত্মক দৃষ্টিকটু শুধু নয় এটা সরকারের তোষামোদ। আর যা তোষামোদ করা তা আর ন্যূনতম কোনো স্বাধীন মিডিয়া কি না সে প্রশ্ন উঠবেই। দ্য-হিন্দুর অবস্থা এমনই! সময়ে মনে হয়েছে জার্নালিজমের ভূমিকা ভুলে গিয়ে ‘অতি দেশপ্রেমী-জাতিবাদী হিটলারের’ ভাই দ্য-হিন্দুর ওপর ভর করেছে। আমাদের চলতি সরকার ২০১৯ সালে গঠন হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত দ্য-হিন্দু অবলীলায় এ কাজ করে চলছে, যা তার কাজই নয়। কিন্তু তামাসার দিকটা হল, মনে হচ্ছে এবার জয়শঙ্করের সফরে দ্য-হিন্দুকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় ‘বেওয়াফা’ করে ছেড়েছেন, মানে ভাগাড়ে নামিয়ে দিয়েছেন। জয়শঙ্করের কানেকটিভিটি শব্দের গোপন অর্থ তাতপর্য কী তা দ্যা হিন্দু আমাদের কিছুই জানাতে পারে নাই।  দ্য-হিন্দুর রিপোর্টে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটা অকিঞ্চিতকরও অর্থহীন, তবে হাজির আছে মাত্র। অথচ  প্রতিদ্বন্দ্বি মিডিয়া এনডিটিভি [India Keen To Focus On Connectivity With Bangladesh: S Jaishankar] , ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গ্রুপের মিডিয়াতেও [considering involving a third country like Japan in further expanding its connectivity ] তা যথেষ্ট অর্থপূর্ণভাবে রয়েছে।

    এটাকে বলা যায়  জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ ট্যুরঃ
    সত্যিকারভাবে বললে, এটা এখন কমবেশি পরিস্কার যে জয়শঙ্করের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল “চীনের বদলে জাপান”! এ কথার মানে কী? মানে হল, গত ১২ বছরের শুরু থেকেই ঢাকা সরকার সবসময় চীনের একটা হাত ধরে রাখা না হলেও অন্তত একটা আঙুল ছুঁয়ে থাকা্র নীতিতে ছিল আমাদের সরকার, বিশেষত ২০১০ সালে সরকার প্রধানের প্রথম চীন সফরের পর থেকেই। অথচ বিপরীত দিকটা হল, “প্রো-ইন্ডিয়ান” হয়েই কিন্তু এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। আর তাতে সরকারের দিক থেকে ভারতকে এই সাফাই-ব্যাখ্যা দেয়া হত যে (২০১২ সালে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক লোন বাতিলের পর থেকে), বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিপুল ঋণ পাওয়া দরকার। যেটা দিবার মুরোদ ভারতের নাই তাই বড় উৎস হিসেবেই বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের সাথে এত যোগাযোগ শুরু করেছে। এমনকি ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর বাংলাদেশে সফর থেকে বাংলাদেশ প্রথম ২০ বিলিয়ন ডলারের নানান অবকাঠামো ঋণের কমিটমেন্ট পেয়েছিল। সেটা ২০১৯ সালের মধ্যে বরং বাস্তবে বেড়ে ২৬ বিলিয়নে পৌঁছেছিল। এতে যদিও সব প্রকল্পের সব অর্থ খরচ হয়ে যায় নাই, তবে সব অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ হয়ে গেছে ও প্রকল্প চলমান। তাই এমনকি গত বছর আরো প্রায় ৬-১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রকল্প নেয়ার কথা চলছে। সারকথায় বাংলাদেশের চীন-ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণটা ভারতকে মেনে নিয়েই এতদিন চলতে দেখেছি আমরা।

    পালটা টানাপোড়েন শুরুর দিনঃ
    কিন্তু এই চীনকে মেনে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যেও ২০১৯ সালের শুরু থেকেই ভারত থেকে বাংলাদেশের আরো দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেটার আগমনবার্তা দেখেছিলাম আমরা – ২০১৮ সালের ২৬ মে মাসে ভারত সফর শেষে হাসিনা দেশে ফিরে ৩১ মে দৃশ্যত তাঁর খুবই হতাশ মন্তব্যে সেই বিখ্যাত উক্তি, “আমি ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে“। একটা ক্ষোভ থেকে এটা বলা হয়েছে অনুমান করা যায়। আর এথেকে এরই প্রতিক্রিয়ার বাস্তবায়নের শুরু ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। সরকথায় এটা ছিল – এটা যতটা ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার উদ্যোগ ততটাই যেন চীনের সাথে আগের চেয়েও এবং খোলাখুলি বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া। য়ার তা থেকে, তিস্তা নদীর নাব্যতা বা ধারণক্ষমতা বাড়ানোর প্রায় বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নেয়া হয়েছিল সেখানে। ইতোমধ্যে আমেরিকায় বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে আমরা লক্ষ করেছি আরো বেশি করে ত্রাতার মতই চীনকে আঁকড়ে ধরাও শুরু হয়েছিল।

    কিন্তু এই সব কিছুকে উলটে দিয়ে দুই সপ্তাহ আগে আমরা আবার শুনছিলাম বিরহের সুর – চীনের হতাশ হয়ে করা কথাবার্তা যে, আমরা আর কখনো জুট বা জুট মিল (পুনর্বাসন) এবং বস্ত্রখাতে বাংলাদেশকে সহযোগিতার কথা তুলব না [Angered, China says will never back Bangladesh jute sector]। যদিও একটা নতুন ও অখ্যাত পত্রিকা [বিজনেসইনসাইডার-বিডি] ছাড়া আর কোথাও এই খবরটা দেখা যায় নাই। অথচ এক মাস আগেও চীনা উদ্যোক্তারা নাকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের শীর্ষে ভীড় করেছে তাই যৌথ বিনিয়োগে সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ-চীন বলে রিপোর্ট দেখছিলাম আমরা।

    আবার এর পরপরেই আসে আরও প্রকাশ্য বিরোধের খবর। বিবিসি বাংলার এক রিপোর্টে পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্পের চীনা ঠিকাদারকে বিল পে না-করা নিয়ে সরকারের সাথে এক বড়সড়-বিরোধ আমরা জানতে পারি। ঠিকাদার যখন বিল না পাওয়ার অভিযোগে বিবৃতি দিয়ে কাজ বন্ধ করে এটা খুবই অস্বাভাবিক কিন্তু চরম বিরোধের আভাস দেয়। অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণত এটা দেনাপাওনার কিন্তু মারাত্মক বিরোধ।  তখন থেকেই অনুমান বেড়ে চলছিল, এটা আবার চীনের থেকে বাংলাদেশের অনেক দূরে চলে যাবার ইঙ্গিত হয় কি না!  মনে হচ্ছে সেসব অনুমানের সঠিকতাই প্রমাণ করতে যেন জয়শঙ্করের আগমন! এখানেই জয়শঙ্করের এই সফরকে ঠিক মোদীর সফরের আগমনবার্তার বাহক যতটা না, এর চেয়ে বেশি এটা জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ ট্যুর মনে হচ্ছে! কিন্তু ‘কানেকটিভিটি’ এই আজিব শব্দ কেন?

    বাংলাদেশের জন্য এক ক্ষতিকর শব্দ ‘কানেকটিভিটিঃ’
    ভারতের হাতে ব্যবহৃত বহুরূপী শব্দ এই “কানেকটিভিটি”।  একেক সময় ভারত একেক ধান্দায় এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু কমন দিকটা হল এটা বাংলাদেশের জন্য সবক্ষেত্রেই এক মারাত্মক ক্ষতিকর শব্দ হয়েই থেকেছে। মজার কথা হল, গত ২০০৯ সালে এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এই শব্দটা বাংলাদেশে পরিচিত শব্দটা ছিল না। তখন মানে ২০০৯ সাল থেকে সুনির্দিষ্ট করে এই শব্দের অর্থ ছিল – ভারতের পুরা নর্থ-ইস্টকে বাংলাদেশের পশ্চিমে, পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংযোগ করে দেয়া (এটাই কানেকটিভিটি) এবং সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে এবং বিনাপয়সায় গড়ে দেয়া। আর সেটা আকাশ, রেল, সড়ক, মাটির নিচে পাইপ লাইনে, বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে এবং নদী ও সমুদ্রপথে- সম্ভাব্য প্রায় কিছুই বাদ না রেখে।

    সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হলো, আমাদের মন্ত্রীরাও ‘কানেকটিভিটি’ ‘কানেকটিভিটি’ বলে বেড়াতেন (সবচেয়ে বেশি বলতেন দীপুমনি যখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এমনকি কেউবা (প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা) করিডোর সুবিধায় দেওয়া সার্ভিসের অর্থ বা ভাড়াটাও “চাওয়া লজ্জার” বলে দাবি করেছেন। অথচ ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের সাথে যুক্ত সব কিছুই ছিল চরম একপক্ষীয়ভাবে ভারতের চাহিদাপূরণ এবং তা বাংলাদেশের ক্ষতি ও নিজেদের অসুবিধা করে হলেও। আর এবার  আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত পরশু সফরে এসে আবার জয়শঙ্কর ‘কানেকটিভিটির’ গান! সেই শব্দ আওড়াতে শুরু করেছেন। কেন?

    এবার নতুন কী চানঃ
    এবার জয়শঙ্কর নতুন কিছু চাচ্ছেন কিন্তু যার সাথে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটার আসলে আবার কোনই সম্পর্ক নেই। যেমন ‘প্রথম আলো’ প্রথম দিনই মানে ৪ মার্চেই যে রিপোর্ট করেছে – তাতে সে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটা নতুন কিছু আভাস পাবার মত করে, সে কথাই লিখেছে। যেখানে বাংলাদেশের অন্য মিডিয়ারা কিছু তেমন লিখে নাই বরং উপেক্ষা করে গেছে। হয়ত বুঝে নাই বা টের পায় নাই কিছু বলে।  প্রথম আলো জয়শঙ্করের মুখভাষ্যে লিখেছে, “এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে আমরা একসাথে কাজ করছি না। যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ৫০ বছর পার হয়েছে এবং পরের ২০ বছর কী করা যেতে পারে, আমি বলব সংযুক্তি (‘কানেকটিভিটি’)। আমাকে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, সংযুক্তি হচ্ছে উৎপাদনশীলতা। যদি আমরা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি ঠিকমতো করতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব কার্যকর। আমরা দুই পক্ষই বিশ্বাস করি, এটি করা সম্ভব”।
    প্রথম আলো আরো লিখেছে, “সংযুক্তি প্রসঙ্গে এস জয়শঙ্কর বলেন, আজকের বৈঠকের বড় একটি সময় তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয়পক্ষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সম্ভাব্য দেশ হিসেবে জাপানের নাম এসেছে। কারণ, জাপানের সাথে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সম্পর্ক যথেষ্ট ভাল। বঙ্গোপসাগরে জাপানের সংযুক্তি প্রকল্প রয়েছে। সম্পর্কোন্নয়নে তিনি সংযুক্তিকে বড় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেন”।

    প্রথম কথা হল, ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের আড়ালে এতদিন ভারত যেভাবে তার নর্থ-ইস্টকে ভারতের বাকি অংশের সাথে কানেক্ট বা যুক্ত করা – এটাই এর মূল অর্থ এবং ভারতের চরমতম একপক্ষীয়ভাবে সুবিধা নেওয়া। এবং এই কানেক্ট করা মানে  সব মাধ্যমে একপক্ষীয় সুবিধায় বিনাপয়সায় জুড়ে নিয়েছে, এর অর্থ সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারের ‘কানেকটিভিটি’ শব্দ দিয়ে আরও অন্য সুবিধা চাচ্ছে ভারত। তাই এবারের সাথে আগেকার ‘কানেকটিভিটি’ অর্থের কোনো মিল নাই। দ্বিতীয়ত, এর সাথে কথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ জাপানের সম্পর্ক কী? এর ন্যায্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা কী? জাপানকে কেন আনতে হবে? তা জয়শঙ্কর এর কোন ন্যায্যতা বা সাফাই দেখাতেই পারেন নাই।
    আসলে “জাপানের কথা” তাকে আনতেই হবে। আর এটাই ছিল তাঁর এই সফরের মুখ্য কিন্তু পরোক্ষে ও পিছনে রেখে দেয়া উদ্দেশ্য।  কিন্তু দেখা যাচ্ছে, খুব একটা হোমওয়ার্ক  করে এরপর প্রসঙ্গটা তিনি আনেন নাই। পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে, উদ্দেশ্যটা খুব একটা ‘স্বচ্ছ’ না। কিন্তু স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলেও হোমওয়ার্ক করে আসতে কোন অসুবিধা থাকার কথা না।  তবে সারকথা হল, তিনি আমাদেরকে খুবই আন্ডার-এস্টিমেট করেছেন। ভেবেছেন  যথেষ্ট ন্যায্যতা-সাফাই ছাড়া এভাবে ‘তৃতীয় পক্ষ’ বলে জাপানের নাম আনা তাও আবার অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের আড়ালে চাতুরিতে – যেন এটা আমাদের কাছে খুব ইজি-গোয়িং হবে। সরি, এটা তিনি না করলে ভাল করতেন।  কানেকটিভিটির উসিলা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।  তিনি দাবি করছেন, “আজকের বৈঠকের (মানে ৪ মার্চের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনা) বড় একটি সময় তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় পক্ষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সম্ভাব্য দেশ হিসেবে জাপানের নাম এসেছে”। তবে জয়শঙ্করের এই কথাটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা না যে ঐ দিনই মানে বিমান থেকে তিনি নামার পর মাত্র এক ঘণ্টার আলাপের মধ্যে এই সব আলাপ করেছেন – না এটা মেনে নেয়া গেল না। এরপর আমাদের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হল,  – তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মন্ত্রী আমাদেরকে আগে-পরে কখনই কিছুই জানালেন না। অথচ জয়শঙ্করের মুখেই প্রথম কথাটা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কী বলতে চান বা বলেছেন জয়শঙ্কর?
    জয়শঙ্কর সম্ভবত  বলতে চান, ‘জাপানের সাথে তার কথা হয়েছে। বাংলাদেশ যেন তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো-ঋণ চীনের বদলে জাপান থেকে নেয়।’ এ কথাটাই জয়শঙ্কর কীভাবে বলবেন বুঝতে না পেরে এটাও নাকি ‘কানেকটিভিটির’ আলাপ এই সূত্র ধরে বলতে গিয়েছেন। তাহলে জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ মানে হল, চীন বাদ আর এর বদলে জাপানি ঋণ নিতে হবে – এই অনুমান সত্য ধরে নিয়ে এবার কিছু আলাপ করা যাক।

    চীন বাদ আর এর বদলে জাপানি ঋণঃ
    এক কথায়, এটা তুলনীয় বা সুবিধাজনক নয়, তাই অকার্যকর হয়ে পড়বে। আসলে জাপান নিজেও জানে, তার সুদের হার চীনের চেয়ে বেশি। আবার অন্যদিক থেকে, জাপানের সাথে আমাদের দেশের সম্পর্ক সেই জিয়ার আমল থেকেই সব আমলেই ভাল। ওদিকে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় হারের পর থেকে আমেরিকার “ছায়ায় নিচে থেকে চলে বা চলতেই হয়” [যেমন কোন সামরিক বাহিনী না গড়ার শর্তও ছিল, জাপানে আমেরিকান আর্মি ব্যারাক স্থাপন সেই থেকে] বলে রাজনৈতিক দিকের দায়ও সব আমেরিকার। এসব জটিল দিক আছে। আবার যেমন জাপানি পণ্যের বিক্রি বাড়ানো কথা যদি ধরি।  বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির চাহিদা বাড়াতে গেলে এখানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ অবকাঠামোর উন্নতি লাগবে। তাহলে এসব বিষয়ে বাংলাদেশে জাপানি প্রজেক্ট নিতে মানে তাতে ঋণ  দিতে জাপানকে আগ্রহী হতে হবে। জাপানের দিক থেকে এর আবার আরেক দিক আছে।  সেটা হল, এসব প্রকল্পগুলোতে জাপানই  ঋণ না দিলে তাতে জাপানি কোম্পানিগুলো সরাসরি কিংবা তাদের শেয়ার কেন কোরিয়ান কনস্ট্রাকশন কোম্পানিগুলো এ দেশে কাজ পাবে কোথা থেকে? কাজেই এসব কিছুই মিলে হল, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানি সম্পর্কের ভিত্তি। এটা বহু আগে থেকেই অনেক গভীর সম্পর্কের। কাজেই এখন জাপানি অবকাঠামো ঋণ নিতে নতুন করে  ভারতের দরকার কী?  ভারতের ভুমিকা শতভাগই আলগা গায়ে পড়া এবং অপ্রয়োজনীয়।  এখানে ভারতের ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন ছাড়া আর কী?
    আবার জয়শঙ্করও নিশ্চয় – ভারতের ক্ষেত্রেই জাপানি ঋণ পাওয়া প্রসঙ্গে এসব প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় জানেন। যেমন – অবকাঠামো খাতে জাপানের চেয়ে চীনা ঋণ ভারতেও বেশি কেন? ভারতে মোদীই সবার আগে চীনকে ভারতে ডেকে আনেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়। কারণ তুলনামূলক বেটার শর্তের বলে তিনি চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হলে পুরানা  ঋণ-গ্রহীতা সম্পর্ক কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাড়িয়ে তুলেন। একই পর্যায়ে মোদী জাপানি ঋণে আগ্রহী হন নাই কেন?

    তাহলে জয়শঙ্কর জাপানকে চীন উপরে উঠিয়ে সে নাম প্রস্তাব করছেন কেন? কারণ, জয়শঙ্করের মনের এক বাসনা হল, এটা ভারতের চীনবিরোধী রাজনৈতিক ক্লাব (জোট) গড়ার স্বার্থ বা খায়েশ; তাই ধরেই নিলাম কোনো কথিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের আলাপ’ এটা। কিন্তু ভারতের (সাথে জাপানেরও) হাত ধরলেই কি বাইডেন – তিনি বাংলাদেশের সরকারকে কোলে উঠিয়ে জায়গা দিবেন? তাই কী!
    তাহলে বাইডেনের কাছে, যে কাশ্মিরের হিউম্যান রাইটস ইস্যু কিংবা মুসলমান নির্যাতনের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের কালো রিপোর্ট মোদীর নামে আছে যা বলাই বাহুল্য অসংখ্য কাঁটাযুক্ত, তার কী হবে? হিউম্যান রাইট নিয়ে একই অবস্থা আমাদেরও! এগুলো পাড় হবে কী করে?
    তাহলে ব্যাপারটা শুধু চীনের চেয়ে জাপানের একটু না হয় সুদের হার বেশি, তা নয় অথবা ঋণ চীনের চেয়ে কতটা বেশি দিতে পারবে সে বিষয় থাকলেও ততটুকুই নয়। আরও বড় দিক আছে।  কিন্তু এগুলোর চেয়ে বড় বিষয় হলো বাইডেনের ‘গায়ে কাঁটার’ জন্য ওর কোলে ওঠার সুযোগই নাই, এর কী হবে?

    তবে  সব কিছুর উপরে জয়শঙ্করের কথার বিরাট এক বিপদের ইঙ্গিত আছে।  কথাটা হল, “……বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি ঠিকমতো করতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব কার্যকর……”।

    এই কথার মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি মানে কানেকটিভিটি – এই অংশটাই ধরা যাক; এর মানে কী?  ভৌগলিকভাবে বললে এটা অর্থহীন কথা।  কারণ, সারা ভারতের সাথে তার নর্থ-ইস্ট ভালভাবে কানেকটেড নয়। কারণ মাঝখানে বাংলাদেশ আছে। কাজেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কানেকটিভিটির কিছু নাই। বাংলাদেশ ভারত ছাড়াই, ভারত পেরিয়ে যাওয়া ছাড়াই আমরা বাইরের দুনিয়ার সাথে কানেকটেড; এবং তা এক নেপাল ও ভুটান ছাড়া। যা ভারত আমাদের দেয় নাই। এখাস্ন থেকে এটা কী যথেষ্ট না ভারতের কানেকটিভিটি বলে কী বুঝাতে চায়? এটা চরমভাবে সব সুবিধা এক পক্ষীয়ভাবে ভারতের নিয়ে নেয়া ছাড়া অন্য কোন অর্থ নাই।  তাহলে আগামি বিশ বছর “সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত” হতে দেখার জন্য অপেক্ষা করার কী আছে? বাংলাদেশের গত বারো বছর কী উদাহরণ হিসাবে যথেষ্ট নয়? বার বার রেললাইনে মাথা দিয়ে নতুন করে আর কী বুঝব যে মাথা কাটা যায় কিনা?  তাহলে জয়শঙ্করের “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আবার কানেকটিভিটি” কথাটার এবারের মানে কী ভারতের ভিতর দিয়ে বিদেশের সাথে সম্পর্ক করা? যার ঠোটকাটা মানে হল বাংলাদেশের ভারতেরই এক ভেসেল স্টেট হওয়া?  আর একদম খাড়া সোজা অর্থ হল, ভারতেরই একটা রাজ্য বনে যাওয়া?  যেটা আমাদের হতে বাকি আছে?

    জয়শঙ্কর ‘বঙ্গোপসাগরের’ কথা তুলেছেনঃ
    জয়শঙ্কর সেই সাথে “বঙ্গোপসাগরের” কথা তুলেছেন। সাথে ভারতের আগামি ২০ বছরের স্বপ্ন! এর আবার মানে কী? বহুদিন থেকেই জানা যায়, আমেরিকান নেভির বঙ্গোপসাগরে সেভেন্থ ফ্লিট এর স্থায়ী মোতায়েনের একটা খায়েশ আছে – এর সংশ্লিষ্ট কিছু কী হবে? ভারত কী বাংলাদেশকে বগলে রেখে আমেরিকাকে দূরে রাখার বাসনা করছে; এভাবে কী ভারত নিজেই মাতবর হওয়ার খায়েশ পুরা করবে?  আর তাতে আমরা হব দুধ ভাত অথবা গুটি? কিন্তু আমরা আগেই জানি এসব যত সম্ভাব্য চিত্রই আঁকা হোক না কেন সব চিত্রই একপক্ষীয়ই , সেটা এককভাবে কেবল ভারতের স্বার্থেই সাজানো হবে। গত বারো-চৌদ্দ বছরের য়ামাদের অভিজ্ঞতা বলে ভারতের “কানেকটিভিটি” শব্দের বাস্তব অর্থ ও পরিণতি এর বাইরে যায় নাই। আর কেউ কেউ ‘ক্ষমতায় থাকা গিয়েছে’ এই এক ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়েই ভারত সমর্থন হাসিল করেছে। আর সেখান থেকেই কী ভারত সাহসী হয়ে উঠে এবার আবার আরও ২০ বছরের গল্প-প্রস্তাব ফেরি করতে এসেছে!  এখনও সেসব যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।

    চার শিফটের কাজঃ
    একটু তামাশা নেয়া যাক, আলোচনা অনেক সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। জাগোনিউজ আর বাংলা ট্রিবিউন লিখছে, “ড. জয়শঙ্কর জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সেখানে শিল্প কারখানাগুলোয় আগে যেখানে তিন শিফটে কাজ হতো, এখন সেখানে চার শিফটে কাজ হয়”। আল্লাহ’র দুনিয়ায় একেকটা দিন মাত্র ২৪ ঘন্টার। এর মধ্যে কারখানার শিফট করা যায় মাত্র তিনটা, আট ঘন্টা করে। তাহলে এর ভিতরে চারটা শিফট তারা কীভাবে সম্ভব করতেছে! প্রো-ইন্ডিয়ান চামচামিতেও কী কিছু লাগাম থাকা উচিত না তাই না?  দালালি আসলেই মহান ও ক্রিয়েটিভ!

    তাই আপাতত ইমিডিয়েট বাস্তবতায় ফিরে আসি। আবার যদি ধরা যাক কোনো জাদুবলে বাংলাদেশ বাইডেনের আমেরিকার কোলে উঠেই গেল? কিন্তু বর্তমান সরকার কী নিজে আমেরিকাকে আস্থায় নিতে পারবেন? কাজেই এটা শেষে আবার কিছু দিন-বছর ভারতের উদ্যোগে ফেরে আমাদের নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরানো ঘটনা হবে?  বড় বিপদই আসতেছে! যদিও মনে হচ্ছে আপাতত অপরিষ্কার অংশগুলো পরিষ্কার দেখতে আমাদের আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৬ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীনের জায়গায় জাপান হলেও দুঃখ যাবে না” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার কাজটা চীন-ভারতের নয়, নেপালেরই

    গৌতম দাস

    ০১ মার্চ ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3oJ

    ক্ষমতার ভারসাম্য বিন্দু চীন-ভারত নয়, নেপালকেই ঠিক করতে হবে © by Hiroko Oshima/Michael Tsang

    –
    নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি (খাড়গা প্রসাদ ওলি, Khadga Prasad Sharma Oli, ) এখন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েও সম্ভবত আগামী মাসের মধ্যে আর ক্ষমতায় থাকতে পারছেন না। নেপালের পার্লামেন্টের আয়ুকাল আরো প্রায় দুবছর বাকি থাকা সত্ত্বেও গত ২০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ওলি সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী এপ্রিল-মে মাসে নতুন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছিলেন। সেই থেকে তিনি নিজেই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী থেকে নিজেকে  অস্থায়ী বা অন্তর্বর্তিকালীন প্রধানমন্ত্রী করে নিয়েছিলেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিও অনুমোদন দিয়েছিল, যার মূল কারণ অনুমান করা যায় যে রাষ্ট্রপতিও নিজ দলীয় ভগ্নাংশের। কিন্তু তাতে কিছু ‘সংক্ষুব্ধ’ ব্যক্তি ও দলের প্রতিনিধিরা সুপ্রিম কোর্টে নালিশ দিয়েছিলেন। এমন মোট ১৩টি মামলার নিষ্পত্তি করে প্রায় দুমাস পরে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ কোর্ট তার রায় দিয়েছে । সে রায় হল, প্রধানমন্ত্রী ওলির “সংসদ ভেঙে দেয়া ছিল কনষ্টিটিউশন লঙ্ঘন” [……house dissolution as an unconstitutional act,]। এছাড়াও তাই, আগামি ১৩ ওয়ার্কিং ডে-এর মধ্যে সংসদ পুনরুজ্জীবিত করে আবার চালু বা বসাতে হবে।
    এতে এখন এই নতুন পরিস্থিতিতে ওলিকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে অপসারণ মানে – সংসদে তাঁর ইমপিচমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। কারণ ওলির মিলিত কমিউনিস্ট দল আগেই তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে দলের সভাপতির পদ থেকে তাঁকে অপসারিত করে রেখেছে। সে জায়গায় দলের নতুন কো-সভাপতি মাধব কুমার নেপাল (মাধব আগে অ্লির দলের সেক্রেটারি ছিলেন)।  “দলের সেন্ট্রাল কমিটিতে ৪৪৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩১৫ জনই মাধবের পক্ষে” ভোট দেন”।
    এখন সংসদ নতুন করে বসলে প্রথম ইস্যু প্রধানমন্ত্রী ওলিকে অনাস্থা ভোট সামলাতে হবে। যেখানে তাঁর হেরে যাবার সম্ভাবনাও খুবই বেশি। আর এই ব্যাপারটা ফয়সালা হবার পরই দলের অপর অংশের নেতা (প্রাক্তন মাওবাদী) পুস্প কমল দাহাল প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা তা নির্ভর করছে। এদিকে গত নির্বাচনে (২০১৭ ডিসেম্বর) (অলি ও দাহাল) তাঁদের  দুই  নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে লড়েছিল ; তবে একদলে মিশে যাবার প্রক্রিয়াও শুরু করে। ঐ নির্বাচনে নেপালের ২৭৫ আসনের সংসদে তারা পেয়েছিল ১৭৩ আসন। দলে অলিকে সভাপতি পদ থেকে অপসারণের পরে এখন দলে দাহাল-মাধব এর যৌথ প্রভাব দলের মধ্যে কতটা এরই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, কার্যত নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলেও আইনিভাবে সংসদে এটা এখনও একটাই দল হয়ে আছে।  এই পরিস্থিতিতে চীন ও ভারত উভয়েই নেপালের রাজনীতিতে প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

    গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষঃ
    “গ্লোবাল নেতৃত্ব”- এই বিষয়টি এমনিতেই দুনিয়াতে সবসময় হাজির ছিল এমন ফেনোমেনা নয়; ফলে সেই ‘গ্লোবাল” নেতৃত্বের মধ্যে আবার একালে কোনো ‘পালাবদল’ আসা – এটাও বারবার ঘটে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেও, ‘গ্লোবাল’ বলে বা ‘দুনিয়াজুড়ে’ কোনো একক বা দুই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক প্রভাব বলে কিছু ছিল না। তাও রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক প্রভাব এ দুটোর মধ্যে অর্থনৈতিক প্রভাব সবসময় আগে আসে। আর তাকে ফলো করে রাজনৈতিক প্রভাবও হাজির হয়ে থাকে।
    যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) আগে দুনিয়াতে ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ বলে কিছু ছিল না। যদিও কলোনি দখল করতে চায় এমন ছোট-বড় মাতবর গোটা পাঁচেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র তখনও ছিল যাদের মধ্যে শেষবিচারে প্রধান দুই কলোনিদখলদার ছিল বৃটিশ ও ফরাসি রাষ্ট্র। আর আমরা তখন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি হিসাবে ছিলাম, প্রায় ২০০ বছর। কিন্তু তবুও সে সময়ের ব্রিটিশরা গ্লোবাল নেতা বা লিডার কিনা এমন কিছু বলার কোন চলই ছিল না।
    তবে এমন কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক-রাষ্ট্রের ধারণার এরপর দুনিয়া থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৪১ সাল থেকে অবসান ও বিলুপ্তি ঘটেছিল। এটাই ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিতর দিয়ে ঘটেছিল। অর্থাৎ ‘দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলোর কেউ কাউকে অধীনস্থ ও কলোনি দখল করে আর রাখতে পারবে না”। এই “অবৈধ গণ্য” করার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র-সংঘের [United Nations] জন্ম। মানে, কলোনি অধীনস্থতার সম্পর্ক দুনিয়া থেকে লোপ পাবে – এই নীতিগত দিক তৈরি হয়েছিল তখন। আর তাতেই বিশ্বযুদ্ধে এই ভিত্তিতে পক্ষ-বিপক্ষ দুটো রাষ্ট্রজোট তৈরি হয়েছিল। কলোনি দখল অবৈধ – এ নীতির ভিত্তিতে যারা পক্ষজোট (এদেরকে সেকালে মিত্রশক্তি বলা হত), তারাই আমেরিকার নেতৃত্বে লড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় লাভ করেছিল। আর তা থেকেই আমেরিকা নিজেকে “গ্লোবাল নেতৃত্বের” আসনে বসাতে সমর্থ হয়েছিল।
    তবে বিশ্বযুদ্ধে বিজয়লাভের সাথে আমেরিকার হাতে গ্লোবাল নেতৃত্ব এসে পড়ার পেছনে মূল কারণ ছিল – আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা। যদিও সেই বিনিয়োগের সুযোগ হাতে পেতে আগে আমেরিকাকে আরো দুটো বড় খরচের দায় নিতে হয়েছিল। এক. নিজ পক্ষজোটের সবাইকে যুদ্ধের খরচ বা ব্যয়ভার জোগানো; আর দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের পর, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ-বিপক্ষ সব রাষ্ট্রকেই ত্রাণ, পুনর্বাসন ও ভেঙে যাওয়া অবকাঠামোগুলো আবার গড়ে দেয়া ইত্যাদিতে নতুন বিনিয়োগ-ঋণ দেয়া। এটাই ১৯৪৪ সালে জন্মের পরে বিশ্বব্যাংকের কাজের প্রধান ক্ষেত্র হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এসব খরচ আমেরিকা কিভাবে ফেরত পাবে কিংবা তা ফেরত নাও পেতে পারে এমন সম্ভবনা থাকলেও, এদিকটা অনিশ্চিত ও উহ্য রেখেই আমেরিকা এই বিপুল খরচ শুরু করতে হয়েছিল; যা পরে কমবেশি উসুল হয় অবশ্য। কিন্তু তাতেই আমেরিকার ‘সবচেয়ে বড় পাওনা’ দুনিয়ার গ্লোবাল নেতৃত্ব নিজের হাতে চলে আসা। আর সেই থেকে দুনিয়ায় ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব’ ধারণাটাও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।
    আরেক দিক থেকে দেখলে, গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাৎপর্য কী? একেবারে ‘রূট’ মানে গোড়ার দিকে তাকিয়ে বললে এটা সোজাসাপ্টা এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আর ক্যাপিটালিজম মাত্রই এর ভেতরে গ্লোবাল হয়ে উঠার স্বভাবটা সবসময় সুপ্ত থাকে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যা ব্যাপ্তি লাভ করে ছেয়ে বসে। এতে ছোট ছোট পকেট বা ছোট-বড় আঞ্চলিক ক্যাপিটালিজমের উদ্যোগ ও ফেনোমেনাগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে পড়ে; যা পরবর্তিতে এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজমের রূপ ধারণ করে বিকশিত হয়ে উঠতে চায়।

    এ কারণে ‘কলোনি শাসন অবৈধ’ হয়ে যাওয়ার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জয়লাভ কথাটার ব্যবহারিক মানে হয়ে যায়, যুদ্ধ শেষে কলোনিমুক্ত শ-দেড়েকের বেশি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে দাঁড়ায় আমেরিকার বিনিয়োগ-ক্রেতা। এমন হবার পিছনে আরও বড় ফ্যাক্টর ছিল। যেমন, এসব রাষ্ট্র স্বাধীন-মুক্ত হলেও এতদিন কলোনিদখল লুটেরাদের অধীনে থাকায় উদ্বৃত্ত-সম্পদ সব কলোনি মালিকের দেশ লুটে নিয়ে যাওয়ায় এরা স্বাধীনরাষ্ট্র হবার পরেও অর্থনৈতিকভাবে এরা একেবারে ফোকলা। এ’অবস্থা থেকে আবার বেঁচে সক্রিয় হয়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রধান প্রয়োজন ছিল বাইরের বিনিয়োগ-ঋণ, যেটা হতে পারে লুট হয়ে যাওয়া সারপ্লাসের সবচেয়ে ভাল এভেলএবল বিকল্প। এরই স্টোর ও সাপ্লায়ার হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আমেরিকা। কাজেই প্রথমবারের গ্লোবাল নেতৃত্বে ‘আমেরিকা’ কথাটার তাৎপর্য হয়ে উঠেছিল এই যে, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর আমেরিকান নেতৃত্ব গ্লোবাল সিস্টেম থেকে বিনিয়োগের পুঁজি-পণ্য নেয়া্র এক নতুন সম্পর্কে জড়ানো। তবু আরও কিছু কথা পরিষ্কার রাখা ভাল। কলোনি-উত্তরকালে আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের সাথে আমাদের মত দেশের গভীরভাবে পণ্য-পুঁজি বিনিময় সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া – এ সম্পর্কটাও আগেকার কলোনি দখল হয়ে থাকা সম্পর্কের চেয়ে অবশ্যই তুলনায় ভাল কিন্তু পরিস্কার থাকতে হবে তা হলেও এটাও অসম; এক অসম বিনিময় সম্পর্ক। কিন্তু অবশ্যই তুলনামূলক অর্থে নতুন সম্পর্কটা বেশি ভাল, কলোনিসম্পর্কের চেয়ে ভাল; ‘মন্দের মধ্যে ভাল’ অর্থে।

    সমাজতন্ত্রী বনাম গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমঃ
    কিন্তু সমস্যা দেয়া দিয়েছিল অন্যখানে। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে এবার আমরা কি ‘কথিত সমাজতন্ত্রী’ হবো নাকি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ হবো? মানে পরেরটা অসম বিনিময় সম্পর্ক হলেও তুলনামূলক ভাল বলে এই অসম বিনিময় সম্পর্কে প্রবেশ করতে পারব এমন সুযোগ হাজির হয়েছিল। সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ্টাই হয়ে পড়েছিল পরের দীর্ঘ চার দশকের ‘সমাজতন্ত্রী’ হওয়া না হওয়ার দ্বন্দ্ব। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর চীন ষাটের দশক থেকেই ক্রমশ ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজম’ – এভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাথে যুক্ত হওয়ার পথ নেয়ায় আমাদের মত সব রাষ্ট্রের জন্য পথ বেছে নেয়া সহজ হয়ে যায়। ফাইনালি আমরা সবাই এখন আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ – আমরা এটা পছন্দ করি আর নাই করি। আর এটা অসম বিনিময় সম্পর্কের হওয়া সত্ত্বেও ‘মন্দের ভাল’ বলে, এভেলএবল পথ বলে। অর্থাৎ কলোনি-উত্তরকালে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক সিস্টেমের অংশ হয়ে উঠার পথটাই অন্তত আপাতত টিকে যায়, প্রধান ধারা হয়ে যায়।
    তবে ইন্টারেস্টিং দিকটা হচ্ছে, সমাজতন্ত্রী ব্যবস্থার রাষ্ট্রগুলো ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকাই ছিল না। তারা নিজ গুণ বা দোষেই ভেঙে পড়ে অকার্যকর হয়ে গেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত একমাত্র যা করলে সবারই টিকে থাকা সম্ভব হবে, অর্থাৎ সারভাইবাল কোন রকমে নিশ্চিত করা ছিল সবার কাছে সবার উপরে একেবারেই মুখ্যবিষয়। এছাড়াও আর সবার চেয়ে বড় কথা – সমাজতন্ত্রীদের বড় বড় খামতির দিক তো ছিলই। যেমন – গ্লোবাল বাণিজ্য বা দুনিয়াজুড়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা লেনদেন বিনিময় ব্যবস্থা হাজির থাকা আদৌ এসেনশিয়াল কি না এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে মৌলিকভাবে এখনো একেবারেই বেখবর হয়ে আছে সমাজতন্ত্রীরা। ইস্যুটাই কানে ঢুকে নাই এখনও এমন অবস্থা!

    গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলঃ
    এদিকে এই শতকে এসে প্রায় সত্তর বছর চলার পরে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে  এবং ঢলেও পড়ছে। তাই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এই বাস্তবতা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছে।  কিন্তু কেন আমেরিকা ঢলে পড়ল? আগামী ঐতিহাসিকরা সম্ভবত মূলত এর দুটো কারণ উল্লেখ করবেন। এক. আফগানিস্তানঃ  এই রাষ্ট্র আমেরিকার সাথে যে তুলনায় অযোগ্য ও অবিকশিত একথা তুচ্ছভাবে  বলতে পারেন অনেকেই। কিন্তু আমেরিকার এই ঢলে পড়া বা পতন ঘটানোর অন্যতম ‘হিরো’ তবু এই আফগানিস্তান। সে একটাই কাজ করেছে। তা হল, আমেরিকাকে সে এমনই ‘নেভার এন্ডিং’ এক অনন্তযুদ্ধে ঢুকিয়ে দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে যে এখান থেকে বের হবার পথ নাই ফেলে পালানো ছাড়া। আর তাই ঘটেছে। শুধু তাই না ওদিকে এতে, যুদ্ধের নিজখরচ জোগানোর সামর্থ্য গ্লোবাল নেতা আমেরিকার অর্থনীতির আর নাই। মনে রাখতে হবে, ২০০৮ সালের যেটা ‘গ্লোবাল মহামন্দা’ বলে জানি আমরা, যেটা দেখা দিয়েছিল ১৯৩০ সালের প্রথমটার পরে দ্বিতীয় বড় মহামন্দা বা রিসেশন [global recession]। ২০০৮ সালের মহামন্দার মূল কারণ কিন্তু যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে ফেল করা আমেরিকান অর্থনীতি। শেষে ওবামা প্রশাসনের ১০ হাজার বাদে (২০১১-১৪) সব সেনা ( অন্যান্য দেশেরসহ ন্যাটোর সেনাও) ফিরিয়ে আনার প্রধান কারণ এই ফেইল্ড অর্থনীতি। অথচ এই যুদ্ধে গিয়ে বলার মত কোন কথিত “লক্ষ্য” অর্জনও করতে পারে নাই।
    এছাড়া আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ইতোমধ্যে চ্যালেঞ্জ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, পাশাপাশি চীনের উত্থান; ‘কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজমের’ চীন – এর কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারানো।

    গ্লোবাল নেতা মানে কোন সামরিক সক্ষমতার ধারণা নয়ঃ
    একটা বড় ভুল ধারণা আবার ভেঙ্গে দেই। অনেকের মানে সাধারণ মানুষসহ অনেক আমেরিকান দ্বিজ্ঞজদেরও ভুল ধারণাটা হল, “গ্লোবাল নেতৃত্ব” মানে বুঝি সামরিক শক্তির সক্ষমতা। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে গেলে প্রধান শর্ত হল বিপুল পরিমাণে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব বা সারপ্লাস জেনারেট করার স্তরে নিজ অর্থনীতিকে পৌছানো আর তাতে ঐ উদ্বৃত্ব মানে অন্যদেশে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষমতা নিজ হাতে আসা। এতে অন্য সবদেশের প্রায় সবকিছুকে প্রভাবিত করার বিপুল ক্ষমতাধারী হয়ে উঠা – এটাই গ্লোবাল নেতৃত্ব।  বলা বাহুল্য এর ফলে এটা নিজ দেশকেও সামরিক, রাজনৈতিক দিক থেকেও প্রভাবশালী করে গড়ে তোলা ও উঠার কারণ হয়ে যায়। অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব-এর স্তরে পৌছানোটা একটা বৈষয়িকভাবে হয়ে উঠার বিষয় যা রাজনৈতিক নয় বা সামরিকও নয়।  যেমন, আমেরিকার এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সামরিক সক্ষমতার ধারক। কিন্তু তা দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানোতে আমেরিকা যোগ্য না।

    চীনের নেতা হিসাবে উত্থান, এটাকেই ‘গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল’ বলা হচ্ছে। নেপালসহ আমাদের মতো রাষ্ট্র বিশেষত যাদের দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতকে সাথে নিয়ে বসবাস, তাদের জন্য এই ‘পালাবদল’ এক কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

    চীনের সাথে ভারতের নাম কেন?
    আবার চীনের সাথে ভারতের নাম নেওয়ার মানে এই নয় যে ভারতও অর্থনীতিতে কিছু একটা হয়েছে, তা নয়। ভারত এখনও বিপুল সারপ্লাস জেনারেট করা বলতে যা বুঝায় তেমন কোন আলামতের দেশই নয়। বরং বিনিয়োগ-ঋণ গ্রহীতা দেশ। সেই বিচারে বাংলাদেশ  লেবার রপ্তানি আর গার্মেন্ট বেঁচে ওর থেকে অর্থনীতিতে (এত চুরি আর পাচারের পরও) ভাল অবস্থায়। তাহলে ভারতের এমন শো-আপের পিছনের মুল কারণ কী? সেটা হল, বুশ প্রশাসনের শেষে আর ওবামা প্রশাসনের শুরুর সময়ে এক আমেরিকান সরকারি স্টাডি থেকে আমেরিকা নিশ্চিত হয়ে গেছিল যে “চীন আসছেই”। কিন্তু একটা শয়তানি উদ্যোগ তারা নিয়েছিল – ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” [China Containment] কাজে ঠিকা দিয়ে নামানো। যদিও এখন সবাই মানে তা কোনই ফল দেয় নাই; আমেরিকার ভারত চীনের উত্থানকে ঠেকাতে পারে নাই। কারণ তা যায় না বলে বাস্তবেও তা এখন প্রমাণিত। তাই গত ট্রাম্পের আমলেই আমেরিকার ভারতকে দেয়া আগের সব সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে ভারতের – “আমিও প্রভাব বিস্তার করতে পারি”, বা এশিয়ায়  আমারও “প্রভাবাধীন এলাকা” আছে ধরণের মুই কী হনুরে – এই ফলস ক্লেইম ও স্বপ্নের জামা পড়ে ভারত সেই থেকে এখনও ঘুরে বেড়ায়।

    এ’পরিস্থিতি ঠিক কী প্রকৃতির, অভিমুখ কী, সম্ভাবনা কী, নেতিবাচক দিক কী ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা খুবই জরুরি। যারা এর ঠিকঠাক বোঝাবুঝি-মূল্যায়নে সফল হবেন ও এক্ট করতে পারবেন, কেবল তারাই টিকে যাবেন। আর বাকিরা এ পালাবদলের সাথে সাথে টিকতে না পেরে এর ধাক্কায় হারিয়ে যা্বার সম্ভাবনায় থাকবে। আবার এ পরিস্থিতিতে চীন নিজেই নিজের যোগ্যতা বা ঘাটতি অথবা ইতি ও নেতি দিক সবটা বোঝে- এ্টাও সবটা সত্যি নয়। সবচেয়ে বড় কথা চীন বড়জোর কেবল গ্লোবাল অর্থনৈতিক দিকের (রাজনৈতিক দিকের নয়) নেতা হতে পারে। আর ঠিক ততটাই আমেরিকার তুল্য বিচারে গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতা হওয়া – এক্ষেত্রে চীন এখনো অযোগ্য। চীনের বিরাট দুর্বলতা হল, ‘মাস পাবলিক’ মানে আম-জনগণের সাথে উপস্থিত চীনা-রাষ্ট্রের সম্পর্ক এখনও একেবারেই কোন ‘রাজনৈতিক সম্পর্ক’ নয়। কারণ, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চোখে – মানুষ মানে, এখনো অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান ইত্যাদি বৈষয়িক চাহিদার একটা ‘ডিব্বা’ মাত্র। যেন মানুষ মানেই এক বৈষয়িকতা, বিষয়সম্পদের চাহিদা মাত্র। আর এই ধারণার কারণে  তাদের কাছে “রাজনৈতিকতা (Polity), স্পিরিচুয়ালিটি” – এগুলো অনেক অনেক দূরের এবং অজানা জিনিস। কাজেই এই চীন দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিবে কিভাবে? যদিও গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা সে নিশ্চিত হচ্ছেই!

    সুনির্দিষ্ট করে নেপালঃ
    একটু পেছনে ফিরি ও সুনির্দিষ্ট করি নেপালকে ঘিরে। নেপাল নিয়ে অনেক হিস্টোরিয়ান গর্ব করে থাকেন যে, নেপাল কখন কলোনি শাসনে যায়নি। এ ক্ষেত্রে সমতুল্যভাবে আমরা বলতে পারি, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতেও সাথে ৫৫০টারও বেশি ‘করদরাজ্য’ (প্রিন্সলি স্টেট বা Princely states)  ছিল যারা পালনীয় কিছু শর্তসাপেক্ষে ‘স্বাধীন’ রাজা ছিল বলে দাবি করত। নেপালও প্রায় সে রকম আসলে এক রাজার প্রিন্সলি স্টেট। ঠিক যেমন বৃটিশ আমলে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ছিলেন। আর ঐ ধরনের করদ-চুক্তিতে যা থাকত তা হল, রাজা যা খাজনা-রাজস্ব সংগ্রহ করবেন এর একটা অংশ ব্রিটিশদের দিয়ে যেতে হবে রেগুলার। আর ব্রিটিশরা ছাড়া অন্য কোনো বিদেশী শক্তির সাথে সম্পর্ক বা যোগাযোগ করতে পারবে না; এমনকি বাণিজ্যিক সম্পর্কও স্থাপন করতে পারবে না। বাইরে থেকে অস্ত্রও কিনতে পারবে না। তবে তাদের প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে নয় রাজার নিজের হাতে রেখে পরিচালিত করতে পারবে; তবে ব্রিটিশদের থেকে রাজারা নিজ প্রশাসক স্টাফদের জন্য ট্রেনিং বা এধরণের অন্যান্য সহায়তা পেতে পারবে। কাজেই এই ‘করদ’ সম্পর্ককে কখনও “কলোনি হয় নাই” বলে কথার ফুলঝুরি সাজানো অমূলক ও অপ্রয়োজনীয়।
    নেপালের ক্ষেত্রে আরও যা ‘বিশেষ ছিল’ তা হল, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তারা বৃটিশ শাসকদের সহায়তায় পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। বিনিময়ও পেয়েছিল ভালই। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নেপালি গোর্খা সৈন্য দিয়ে সহায়তা করায় বাড়তি কিছু ছাড় পেয়েছিল। যেমন ভূমি ছাড় (মাধেসি অঞ্চল ফিরে পাওয়া), বাইরের দেশ থেকে অস্ত্র কেনা ইত্যাদিসহ ১৯১৫ সালের সুগৌলি চুক্তি,  ১৯৬০ সালের চুক্তিতে “তরাই অঞ্চল” ফেরত পাওয়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করায় আরো ছাড় দেয়ায় সর্বশেষ ১৯২৩ সালের চুক্তি। তবে ঐ ১৯২৩ সালে চুক্তিতে লেখা ছিল যে, এটা ১৯৫০ সালে আবার রিভিউ হবে। আর তত দিনে স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবার নেপালের সাথে আগের চুক্তির আদলেই ১৯৫০ সালের চুক্তি করেছিলেন। সেটারই মূল কথা হল, ভারতের অর্থনীতি ও ব্যবসার অধীনে থেকে একটা নেপালি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। যেমন ভারতের অনুমতি ছাড়া এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ছাড়া নেপালের বিদ্যুৎ বিদেশে (যেমন বাংলাদেশে) নেপাল বিক্রি করতে পারবে না। আর নেহরু এ ধরনের চুক্তির ড্রাফটটা পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলের ১৯২৩ সালের চুক্তি থেকে। এটাই হল ‘কলোনিমুক্ত নেপাল’ এমন ফলস গর্বের নমুনা। তাই স্বভাবতই নিজেদের প্রটেকশনের জন্য নেপালের রাজশাসকেরা এই নেহরু বা ভারত-অনুরক্ত এক নেপালি রাজতন্ত্র গড়তে খুবই আগ্রহী হয়ে থেকেছিলেন। আর এটাই ছিল নেপালে ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু হওয়া মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের মূল কারণ। আর যেখানে অন্যান্যের সাথে ঐ আন্দোলনের প্রধান দুই দাবি ছিল – রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নেপালকে ‘রিপাবলিক’ ঘোষণা আর এই ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিল (রিভিউ) করতে হবে।
    যদিও ঐ আন্দোলন শেষে অন্যান্য দলের সাথে মিলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছিল। আর এই ক্ষমতা দখলের মধ্যে ২০০৭ সালেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠন সম্পন্ন হয়েছিল। পরে রাজতন্ত্র উতখাতের স্বপক্ষে আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন হয়েছিল নেপালের প্রথম কনস্টুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরে। সেই অ্যাসেম্বলিতে ২০০৯ সালে। আর রিপাবলিক নেপালের কনস্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি এবং প্রকাশ্যে বিরোধিতা ও অসহযোগিতা শুরু করেছিল ভারত। এমনকি ল্যান্ডলকড যে নেপাল ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া কিছু আমদানি করতে পারে না, অখুশি ভারত এরপর দীর্ঘ ছয় মাস ভারতের ওপর দিয়ে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অবরোধ করে রেখেছিল। নেপালে ব্যবহার্য রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ সব ধরনের জ্বালানি ভারত সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আর এতেই সারা নেপালের সব শ্রেণীর মানুষই নিজ নিজ স্বার্থে ও কারণে প্রবলভাবে অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে উঠেছিল। কোনো রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে আকৃষ্ট হওয়ার চেয়েও নিজ নিজ বৈষয়িক ও সারভাইভালের স্বার্থেই তারা হয়েছিল। যেটা এখনও মনমজ্জায় প্রবেশ করে যাবার মত যে এখনও তা প্রবল!

    নেপালের রাজনীতিতে চীনের প্রবেশঃ
    চীন নেপালের রাজনৈতিক আসরে এই প্রথম প্রবেশ করেছিল তখনই, এই ২০১৫ সালে। কারণ ল্যান্ডলকড নেপালের জনগণ নিজ দেশের বাইরে যেতে ভারতের ভূমি পেরিয়ে বাইরে বের হবার বিকল্প খুঁজছিল। ভারত নেপালের এক উত্তর দিক বাদে বাকি সবদিকজুড়েই।

    আর পুরো উত্তরাংশজুড়ে চীন-সীমান্ত হলেও তা আরো পাহাড়ি উচ্চতায় এবং দুর্গম বলে কখনো একে তেমন বিকল্প বলে ভাবা হয়নি। কিন্তু একালে চীনা উত্থানের যুগে চীনা অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় হেভি-ডিউটির রেলযোগাযোগ যুক্ত হয়েছে যেটা সমুদ্রবন্দরের সাথেও যুক্ত এমন উন্নত। কিন্তু নেপাল সীমান্তের সবচেয়ে কাছাকাছি চীনের এমন রেলপথটাও নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে দিয়ে চলে গেছে। এতে প্রমাণ হয় নেপালকে নিয়ে চীনের আগ্রহ কেমন কোন সূদুরে ছিল! তবে চীন সম্প্রতি এই ১০০ কিলোমিটার রেলপথ এক্সটেন্ড করে নেপালকে বহির্বিশ্বের সাথে কানেক্ট করে দিয়েছে। যেটা নেপালের কাছে বিরাট কিছু, এক অতুলনীয় বিকল্প।

    কিন্তু সারা নেপাল অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান হয়ে ফুঁসে উঠার সেই কালেই নেপালে কোয়ালিশন সরকার হওয়ার শর্ত ওলির কমিউনিস্ট পার্টির টার্ম আসে আর এতে দলের পক্ষে ওলি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসেন। আর তাতে, এন্টি-ইন্ডিয়ান সেই পপুলার সেন্টিমেন্ট  ভাসা নেপালকে জনগণের পক্ষে সফল ব্যবহার করেন ওলি, একজন মাস পপুলার লিডারের যা করা উচিত সেভাবে। মূলত ওলি বা তার দল সবসময়ই নামকাওয়াস্তেই শুধু কমিউনিস্ট ছিলেন, কাজে নয়। যেমন রাজতন্ত্রী নেপালের যুগে নেপালে রাজনৈতিক দল বলতে সবাই  রাজতন্ত্রকে মেনে চলা রাজনৈতিক দল।  যে রাজতন্ত্র মেনে চলে সে কেমন কমিউনিস্ট তা তো বুঝাই যায়। এরাই রাজ-সরকারের মন্ত্রী থাকার লোভে রাজার মন জুগিয়ে চলা দল হয়ে কাজ করত। এমন প্রথম চামচা ছিল নেপালি কংগ্রেস দল, আর পরেরটা হল ওলির কমিউনিস্ট দল (CPN (UML))। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওলি পপুলিজম বোঝেন বলেই সেসব পিছনে ফেলে ২০১৫ সালে পপুলার নেতা হয়ে যান। তিনি মাওবাদী দলের নেতা পুষ্প কমল দাহালের (মাওবাদী সশস্ত্র দল হয়ে থাকার সময় তাঁর নিকনেম ছিল ‘প্রচণ্ড’) চেয়েও পাবলিকলি পপুলার। তাই সবমিলিয়ে  ইতোমধ্যে ভারত যতই নেপালের চোখে অনিষ্টকারী হয়ে উঠেছিল, চীনা সরকারের সাথে দুই কমিউনিস্ট দলেরই ঘনিষ্ঠতা ও ওয়ার্কিং রিলেশন ততই ঘন হতে থাকে। এমনকি ট্রাডিশনাল নেপাল কংগ্রেস দলও তখন ভারত থেকে দূরত্ব মেনটেন করত। এ দিকে নেপালের ২০১৭ সালের নভেম্বরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে চীনা নেতারা পরামর্শ দিয়েছিলেন ওলি [সিপিএন-ইউএমএল ] ও দাহালের [সিপিএন (মাওয়িস্ট সেন্টার)] এ’দুই কমিউনিস্ট পার্টিকে একদল হয়ে নির্বাচন করতে। তাতে ঐ নির্বাচনী ফলাফল খারাপ হয়নি। তারা প্রায় দু-তৃতীয়াংশ আসন (১৭৩ / ২৭৫) লাভ করে তাতে ভারত বা নেপালি কংগ্রেসকে আরো ক্ষুদ্র বানিয়ে ফেলেছিল।

    মূল সমস্যার গোড়া ওলি নিজেইঃ
    কিন্তু সমস্যার গোড়াটা ছিল অন্যখানে। প্রথমত, মাওবাদী দাহালের নিজদলের আজন্ম দুর্বলতা বা খারাপ কপাল হল – এক. ২০০৯ সালের নির্বাচন ছাড়া আর কখনোই পপুলার ভোটের বেলায় দাহালের দল ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। সবসময় তৃতীয় স্থানে থেকে গেছে। অথচ ভারতের চরম বিরোধিতা অসহযোগিতা সত্ত্বেও  ওলির দল, নেপালি কংগ্রেস ও নিজ দলকে একসাথে রেখে দাহাল পরিস্থিতি মোকাবেলার অর্থে মুখ্য ভূমিকাটা পালন করে গেছিল। দাহাল দল বা রাজনীতির জন্য খুবই ভাল সংগঠক, বিশেষত বভন্ন মতবিরোধের মধ্যেও একসাথে কাজ করে লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে।  কিন্তু পাবলিক ইমোশন হ্যান্ডলিংয়ে ঠিক ততটাই যেন তেমন নন। দ্বিতীয়ত, ওলি ব্যক্তিত্ব হিসেবে একজন ফিউডাল লর্ডের মত। তার কাছে দল মানেই, তিনিই এতে একমাত্র ইচ্ছাদাতা, হুকুমদাতা। কিন্তু তার বড় গুণ হল, পপুলার মাস ইমোশন হ্যান্ডলিং ভালো বুঝেন ও পারেন।

    সব মিলিয়ে এখন ২০১৭ নির্বাচনের পরের দুই বছরের মধ্যে যা দাঁড়ালো তা হল, ওলি আরো দুর্দমনীয়, একক নিজ হুকুমে চলা, কোনো ফোরামের সিদ্ধান্ত বা কারো কথা না শুনে চলা ব্যক্তিতে পরিণত হলেন। ওদিকে কমিউনিস্ট দুই দল মিলেমিশে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন বলে ওলির পক্ষের দলের সবার সাথে মিলে মিলিত দলের কমিটি গড়তে দাহাল খুবই সফল ব্যক্তিত্ব, কিন্তু ওলির দলের লোকেরাই ওলির প্রশ্নে দাহালের সাথে দাঁড়িয়ে যায়। আগে ওলির সাথে যারা ছিলেন যেমন মাধব চন্দ্র নেপাল, ঝালা নাথ কানাল বা বামদেব গৌতম সহ সবাই থাকলেও তারা এখন দাহালের পক্ষে। তাঁদের দাবি তাঁরা ওলির একগুয়েমি ও ক্ষমতা ক্কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে লড়ছেন [… They were protesting PM Oli’s monopoly in the party and government]  আর এটাই একপর্যায়ে ওলিকেই দল থেকে বহিষ্কার করে দেওয়ার অবস্থায় চলে যায়। এই বহিষ্কার ঘটেছে মাত্র তিন মাস আগে, অর্থাৎ ওলির সাথে মিলিত দলের সবার বিরোধ প্রকাশ পাওয়ারও প্রায় দু’বছর পরে।

    চীনের অতি আগ্রহঃ
    কিন্তু তাহলে, কেন এত সময় লাগল? এটাই চীনের অনুরোধের ‘ঢেঁকি গেলা’; চীনের অতিরিক্ত জড়িয়ে যাওয়া যা অযাচিত পর্যায়ের। গত ২০১৭-৮ সালের দুই কমিউনিস্ট দলে ঐক্য করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময় থেকে চীন ক্রমশ একেবারেই লাগামছাড়া ভাবে নেপালের রাজনীতির হাত ঢুকাতেই থাকে।

    মাওয়ের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ”?
    যার সোজা অর্থ চীনা কমিউনিস্টরা যেমন কোল্ডওয়ারের যুগে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে থাকা চীনা কমিউনিস্ট দলের সাথে অধীনস্ত নির্দেশগ্রহিতা আচরণ ও সম্পর্ক স্থাপন করে চলত যেন সেই যুগ আবার ফিরে এসেছে। একই অবস্থা ছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বেলাতেও। তারা আমাদের মত দেশে অর্থ ও তত্বের যোগানদার হলেও মুখ্য সবকিছুতে হাত ঢুকিয়ে বসে থাকত। আসলে আমাদের মত দেশের নেতারাই সেটা চাইত। অথচ আলাদা রাষ্ট্র মানেই আলাদা আলাদা একান্ত স্বার্থ।  নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ  কখনও চীনা রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। তেই পারবে না, পারে না।তাতে দুদেশেই কমিউনিস্টরা ক্ষমতাসীন হলেও কোন হেরফের হয় না। হ কারণ রাষ্ট্র মানেই কেবল নিজ ভুখন্ডের বাসিন্দাদের স্বার্থ দেখা ও সবার উপরে জায়গা দেয়া। এগুলো রাষ্ট্র সম্পর্কে খুবই নুন্যতম ও বেসিক ধারণা। আদর্শের কথা তুলে রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতাকে আড়ালে ফেলা যাবে না।  কাজেই নেপাল ও চীনের দুই কমিউনিস্ট পার্টি কখনই কেউ কারও কথা শুনে অনুগত হয়ে চলতে পারে না।  এমন সম্পর্ক যদি চালু করা হয় তবে এর অর্থ হয়ে যাবে নেপাল আর আলাদা রাষ্ট্র নয়, চীনেরই এক্সটেন্ডেড কোন প্রদেশ মাত্র। কমিউনিস্টদের এমন অযাচিত ভয়ঙ্কর চর্চা সোভিয়েত পতনের পর আপনাতেই হারিয়ে গেছিল। চীন কেন সেই হারানো অভ্যাস আবার ডেস্পারেট হয়ে সামনে আনছে আমরা জানি না। কিন্তু এটা মারাত্মক বিপদজনক এবং চীনের জন্যও আত্মঘাতি। এটাকেই তো মাও “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” বলতেন! নয় কি?

     এতে বড় ভুলের এক নম্বরটা হল, একধরনের ‘কমিউনিস্ট ভাই ভাই’ অযথাই খুঁজে বের করে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়া ও রাখার চেষ্টা সুপ্ত আছে এতে। এটার ফল চীন ও নেপাল দুরাষ্ট্রের জন্যই আত্মঘাতি হতে বাধ্য। এটার প্রকট প্রকাশ আমরা দেখেছি নেপালে চীনা রাষ্ট্রদুত Hou Yanqi এর অবাধ ততপরতায়।  এছাড়া সাথে দেখা যায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) আন্তর্জাতিক বিভাগের উপমন্ত্রী গুও ইয়াজহু (Guo Yezhou) কে। প্রায়ই তাঁর কাঠমান্ডু সফরে, দুই কমিউনিস্ট অংশকে ধরে রাখতে। নিঃসন্দেহে এগুলো নেতি-ইমেজের কেলেঙ্কারি ছাড়া এ’দুই দেশকে আর কিছুই দিবে না।
    অথচ ‘চীন’ বলে যাকে আমরা দেখছি সে হল হবু গ্লোবাল নেতা যার স্বার্থ অনেক জটিল ও আলাদা। তাই ‘নট নেসেসারিলি’ নেপালের কোনো দল বা নেপালরাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে মিলবেই অথবা মিল থাকাটা জরুরি। আর শেষ বিচারে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিটি দেশের মধ্যে ভারত ও চীনের যে প্রবল স্বার্থ- লড়াই তাতে এ দু’জনের যাকেই আমাদের বেশি ভালো লাগুক না কেন শেষ বিচারে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাখতেই হত। এবং যেকোন পরিস্থিতিতে হতেই হবে। কিন্তু এটা থাকেনি। এতে এখন যদি নেপালি কংগ্রেস দল আমেরিকা বা ভারতের নেতাদেরকে নেপালে নিয়ে এসে দলীয় সভা শুরু করে তাহলে সেটাকে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা কি বলে বাধা দিবেন?

    অথচ পালাবদলের এই কালে যখন আরও সতর্কতা ও দুরত্ব রক্ষার অনুশীলনের দরকার ছিল।  তা বজায় রাখলে চাইলে নেপালকে চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে একটা সম-দূরত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। তবেই একমাত্র নেপালের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এখান থেকেই আসে নিজ দেশের দলগুলো চীন, ভারত বা আমেরিকা এই তিন দেশের একেকটার প্রতিনিধি বা দালাল হয়ে খাড়িয়ে যেন না যায় এব্যাপারে সকল দলের সতর্কতা। এটা হতেই পারে না, এ্মনটা বন্ধ করতে হবে। দেশের দলমাত্রই সবাইকে একমাত্র নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের রক্ষকই হতে হবে। যদি এসব কথা উপেক্ষা করা হয় পরিণতি হবে নিজ রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পরা।

    অথচ গত দুই বছরে যতবারই অলির বিরুদ্ধে তার দল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে গেছে চীন বারবার ভেতরে হাত ঢুকিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে দেয় নাই। এটা টু মাচ, সীমা পার হয়ে গেছে। বিশেষত যেখনে ওদিকে ওলি ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী র এর প্রধানকেই প্রকাশ্যে দাওয়াত দিয়ে নেপালে এনেছিলেন। বুঝা যাচ্ছিল তিনি ভারতের সমর্থনে ক্ষমতায় থাকতে চাচ্ছিলেন।

    যদিও এক কম্বোডিয়া ছাড়া কোথায় চীন এমন করেনি। তাই দাহালের উচিত ছিল এর সমস্যার দিকটা খোলাখুলি বুঝিয়েই চীনকে নিবৃত্ত রাখা এবং এ কাজে তার অসফল হওয়ার কোন স্কোপ নাই। আবার চীনের অনুমান যে, ওলিকে বহিষ্কার করে দিলে তিনি নেপাল কংগ্রেস ও ভারতের সাথে মিলে পাল্টা সরকার গঠনসহ বিরাট কিছু করে ফেলতে পারেন- এ অনুমানও এত দিনে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আর তা যদি হয়েই যায় তবে সেটাও নেপালের রাজনীতিকদেরই নিজেদের মোকাবিলা করতে হবে।  চীন-ভারত নয়, আগে নেপালকে নিজে বাঁচতে হবে। অন্তত একালের তিন বিদেশ রাষ্ট্র চীন, ভারত ও আমেরিকা থেকে দূরে এক “সম্পর্কের ভারসাম্য বিন্দু” অবশ্যই তৈরি ও মেইনটেন করে চলতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীন-ভারত নয়, নেপালের নিজে বাঁচা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  আমার নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভুখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদীর আপোষ
    গৌতম দাস
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    “India has no military capability to alter the situation”

    – Indian Gen. Panag

    [সার-সংক্ষেপঃ লাদাখ, ভারতের উত্তর-পুর্বে চীন-ভারত সীমান্তের নাম। গত ২০২০, মে মাস থেকে এই সীমান্তে চীন ও ভারত মুখোমুখি সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে বসেছিল। আর  ১৯৯১-৯৪ সালের সময়গুলোতে ভারত-চীন সীমান্ত আলোচনায় আপোষে চীন যেসব ভুখন্ড ভারতের অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছিল, যা ভারতের (LAC) এলএসিতে পাওয়া ভুখন্ড মনে করা হয়, সেসব ভূখন্ড চীন মে মাসের ঐ সময়ে ফিরে দখল করে নিয়ে বসে গিয়েছিল।

    এই নিয়ে এক সামরিক সংঘাতে ১৫ জুন ২০২০ তারিখে ২০জন ভারতীয় সেনা নিহতও হয়েছিল। কিন্তু তা সত্বেও মোদি সেসময় সংসদে ও রেডিও বক্তৃতায় বলেছিলেন, “... neither has anyone entered Indian territory, nor is anyone present in Indian territory currently, and nor is any Indian post captured”। আসলে চীন গতবছর মে মাসের শুরু থেকেই ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া ভুখন্ডগুলোই পুনর্দখল করে বসেছিল। কিন্তু একথা সত্যি হওয়া সত্বেও ২০জন ভারতীয় সেনা হত্যা হওয়ার পরও মোদি অমন বিবৃতি দিয়েছিলেন। কেন?

    এর জবাব এখন পরিস্কার জানা যাচ্ছে। আসলে ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া LAC-এ পাওয়া ভূখন্ডগুলোই পুনরায় দখল কথার মানে হল এর আগের ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখা। এখন ভারত-চীন আলোচনায় ভারত ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখাকেই ভারতও তাঁদের স্থায়ী সীমান্তরেখা বলে মেনে নিয়েছে। উভয়পক্ষ এই ভিত্তিতেই সীমান্তে সেনা সমাবেশ ভেঙ্গে দিতে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে এর দুই পাড়ে নতুন সীমান্ত বরাবর সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে এবং ধাপে ধাপে সেটির বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    সে অনুযায়ী, প্রথম পর্ব ছিল ‘প্যাংগং সো (Pangong Tso) লেকের দুই পাড় থেকে সেনা ও স্থাপনা প্রত্যাহার। গত ১১-১৯ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত মতই এই প্রত্যাহার কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আর ভারতের এই সীমান্তেরই এক সাবেক জিওসি লে জে পরাগ; এই ব্যাপারটাকে দেখে বলেছেন, … the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation….it is “good for the long term peace” ।

    সোজা বাংলায়, আমাদের সামরিক মুরোদ নাই তাই চীনের দাবি মোতাবেক ১৯৫৯ সালের সীমান্ত আমরা মেনে নিয়েছি। এটা দীর্ঘস্থায়ী শাস্তির জন্য ভালই হয়েছে”। কিন্তু কেন ভারতকে এমন পাওয়া-ভুখন্ড ফিরে ত্যাগ করতে বা হারাতে হচ্ছে?]

    Ladakh Stand-Off: India & China, Pangong Tso withdrawal done

    একদম বেড়াছেড়া!

    পথ চলতে চলতে পথিক কখন কোথায় নিজের জামাকাপড় খুইয়ে এসেছে সে হুশই নাই! যখন খেয়াল হল তখন এক বেড়াছেড়া অবস্থা! কেন? কারণ এখন লজ্জা ঢাকে কী দিয়ে সে এক কঠিন সমস্যা। আরেকদিকে, কৌতূহলী আশেপাশের মানুষকে কিভাবে কেন এসব হল তার ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। কাজেই, এ এক বেড়াছেড়া অবস্থা বটে!

    বেড়াছেড়া শব্দটা কথ্য ভাষায় প্রচলিত শব্দ; তাই অনেকে একে ইনফরমাল শব্দ বলবেন হয়ত। তবু ‘বেড়াছেড়া’ শব্দটা আসলে খুবই এক্সপ্রেসিভ মানে, যা ঘটেছে তাকে এক শব্দে ফুটিয়ে তুলতে এক উপযুক্ত-প্রকাশক শব্দ। ইন্ডিয়া, মানে ভারতের মোদি সরকারের আজ এমনই বেড়াছেড়া দশা।

    কেন? কী হয়েছে??

    এবারে মোদির কাপড় খুলে নেয়ার অবস্থার শুরু বলা যায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে। লাদাখ – ভারতের ভাষায় তার উত্তরপূর্ব কোণের ভারত-চীন সীমান্ত যেখানে দুই দেশের সৈন্য মুখোমুখি হয়ে বসে আছে গত ২০২০ সালের মে মাস থেকে। ভারত (মিডিয়াও) এটাকে এক ‘অচলাবস্থা’ (standoff) বলে বর্ণনা করে এলেও চীনের কাছে ব্যাপারটা এমন অচল নয়। কারণ পরিস্থিতি ক্রমশ তার পক্ষেই এগিয়ে চলেছে। যেন – এবার ঘুঘু ধরা পড়েছে, অপেক্ষা কেবল তাকে কাচিয়ে উপরে তুলে পাকড়াও করার অবস্থা। এবং তাই হতে যাচ্ছে আসলে।

    কারণ অবশেষে মোদি চীনের কাছে ‘ভূখণ্ড হারিয়েছে’ স্বীকার করে নেয়ার পর উভয়পক্ষই যার যার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত শুধু না, তা বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ও শেষ করে ফেলেছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি। কথাটার মানে হল, চীন-ভারতের সীমান্তের যত জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করা হয়ে আছে/ছিল তার একেকটা এলাকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এরই প্রথম এলাকা ‘প্যাংগং সো’ নামে লেকের দুই পাড় থেকে প্রত্যাহার, যা গত দশ দিনে শেষ হয়ে গেছে। এখন পরের পর্বের প্রত্যাহার নিয়ে ফোর্স পর্যায়ে কথা বলা ও বাস্তবায়ন শুরু হবে।

    সেনা প্রত্যাহার কোথায় গিয়ে থামবে, নতুন কোন সীমান্তেঃ
    কিন্তু মূল প্রশ্ন : উভয়পক্ষ সৈন্য প্রত্যাহার করবে না হয় বোঝা গেল কিন্তু প্রত্যাহার করে কোথায় গিয়ে থামবে? অর্থাৎ কোনটাকে এখন নতুন সীমান্ত বলে উভয়পক্ষ মেনে চলবে? কারণ সব ফাটাফাটি সংঘাত বা মূল বিতর্কের উৎসই তো ছিল সেটাই!

    না, নতুন সীমান্তরেখাও এখন আর অমীমাংসিত নয়। লক্ষ করা যায়, চীন পা-ফেলে থাকে সাধারণত অনেক ক্যালকুলেশন করে। আসলে গত বছরের ৫ মে এর শুরু থেকেই চীন নিজের সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছিল ১৯৫৯ সালের এলএসি [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা মেনে।

    যদিও কী মেনে চীন একাজ করছে তা কখনো প্রকাশ্যে বলেনি। কিন্তু “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায়” ফিরে যেতে বলে চলেছিল ভারতের সাথে সব মিটিংয়েই। আর এখনকার সমঝোতাও হচ্ছে সেই ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মোদির ভারতের মেনে নিতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে। কাজেই উভয়পক্ষের সৈন্য ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখার’ দুই পাড়ে যার যার দেশের সংলগ্ন অংশে গিয়ে বসবে। আর সেটাই হবে নতুন সীমান্তরেখা।

    এটাই সৈন্য প্রত্যাহারের ভিত্তি বলে মেনে নিতে মোদি রাজি হয়েছেন। যদিও মোদীর জন্য এখন এটাই বিরাট সমস্যা আর ইজ্জতের ব্যাপার যে পাবলিকের কাছে তিনি এই ‘ভূমি হারানোর আপস ও বিনিময়ের কথা কিভাবে বলবেন!

    পাঠক যারা কম সময় দিতে চান, কম বিস্তারে পড়তে তারা নিচের ছোট প্যারার অংশটুকু বাদ দিয়ে সরাসরি পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।

    ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কী?
    একটা বড় তথ্য দিয়ে রাখি। ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কথাটা মূলত চীনের প্রস্তাবিত একটা সীমান্ত ধারণা। কিন্তু তা উভয়পক্ষের সম্মতিতে আঁকা কোনো ম্যাপ – ঠিক তা নয়। এটা ১৯৫৯ সালে চৌ এনলাই ও নেহেরুর এ’দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার চিঠি চালাচালির ঘটনা যেখানে চৌ নেহেরুকে “ম্যাকমোহন লাইন” [McMahon line] মেনে সীমান্ত টানার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

    “ম্যাকমোহন লাইন” প্রসঙ্গে বেশি বিস্তারে যাব না। কমকথায় বললে,  এই লাইন টেনে ঝগড়া মিটাবার চেষ্টাটা ১৯১৪ সালের, তিব্বতকে নিয়ে। হ্যাঁ, তিব্বতকে নিয়ে।  কিন্তু তিব্বতের দুর্ভাগ্য হল, তিব্বত স্বাধীন নাকি চীনের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ এই নিয়ে বিতর্ক মাও-এর আগের চীনা-জাতিবাদী শাসক চিয়াং কাইশেকের আমলের। যদিও ভারতের দিক থেকে অনেকে সময় ধারণা দিবার চেষ্টা করা হয় যে কমিউনিস্ট মাও খারাপ ও এগ্রেসিভ বলে তিব্বত নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন তিনি, ফলে দালাই লামাকে নিয়েও।

    অথচ ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ম্যাকমোহন লাইন এর প্রমাণ। এটা ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে ঘটনা যখন তিব্বত প্রদেশের সাথে এর সীমান্ত সংলগ্ন বৃটিশ-ইন্ডিয়ার কমন সীমান্ত ম্যাপ কী হলে উভয় পক্ষ তা মেনে নিবে সে আলোচনা চলছিল, এটাই সেকালের দশ মাস ধরে চলা সিমলা কনফারেন্স চুক্তি [Simla Accord] নামেও পরিচিত।

    ম্যাকমোহন ছিলেন বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সেনা অফিসার ও পরে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী এবং সে হিসেবে তিনি ঐ সীমান্ত আলোচনার প্রধান নেগোশিয়েটর। তাই তার নামেই ম্যাকমোহন লাইন বলে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ঠিক হয়েছিল। তিব্বত প্রদেশের প্রতিনিধিসহ কেন্দ্রের চিয়াং কাইশেক সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষে কাইশেক সরকারের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে তাঁদের চোখে তিব্বত তো মূলচীনের-ই প্রদেশ। কাজেই তিব্বত কিভাবে স্বাক্ষরদাতা পার্টি হয় এই ছিল তাঁদের আপত্তি।

    অর্থাৎ তাঁদের আপত্তি ঠিক বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নয়। তিব্বত স্বাধীন দেশ/ প্রদেশ কিনা সেই বিতর্ক। তাই পরবর্তিতে চীন মাওয়ের বিপ্লবের অধীনে কমিউনিস্ট চীন হয়ে গেলে কমিউনিস্ট চীনের অফিসিয়াল অবস্থান হয়ে যায় এটি যে, তিব্বত চীনের প্রদেশ আর ম্যাকমোহন লাইনই ভারতের সাথে সীমান্তরেখা। কিন্তু ততদিনে আবার নেহেরুর ইন্ডিয়া সেটা গ্রহণ করতে চায়নি। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন আরও ভুখন্ড দখল করেছিল। যেটা পরে অবশ্য ছেড়েও দেয়। এরপর থেকেই [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা কথাটার উৎপত্তি হয়।

    ঐ চিঠি চালাচালিতে বর্ণনামূলক অর্থে কথা বলার সময় কারও দখলে থাকা ভুমি বুঝাতে চীন এই [LAC] ব্যবহার করেছিল। যেটা অবশ্যই উভয়পক্ষের সম্মতিতে গৃহিত কোনো কমন ম্যাপের স্টাটাস নয়।  তাই টেকনিক্যালি ভারত কখনই ১৯৫৯ সালের কোনো সীমান্ত বুঝাতে [LAC] শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না। তবে চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল সুসময় বলা যায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল।

    ১৯৯১ সালে নরসীমা রাও-এর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি পেং ভারত সফরে এসেছিলেন। আর তাতে উভয়পক্ষের সম্মতিতে [LAC] কোনটা হবে এনিয়ে বিস্তর আলোচনা ও রফার শুরু হয়েছিল। এতে নরসীমার ফিরতি চীন সফর ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে এবং  সেই সফরকালে উভয়পক্ষ [LAC] এর দুই পাড়ে শান্তি বজায় রাখার লক্ষে এক সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আর তখন থেকেই ভারতও অফিসিয়ালি [LAC] কথাটা মেনে নিয়েছিল ও ব্যবহার শুরু করেছিল। আর সেই থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বহুবার তাঁদের বিভিন্ন সীমান্তে  নতুন করে সম্মতিতে সীমান্তরেখা টানা হয়েছিল যেগুলো ঐ বছরের [LAC] যেমন, [LAC 1994] এভাবে বলার চল শুরু হয়েছিল।

    সারকথায়, ১৯৯১ সাল থেকে এবারের বলা [LAC] এর বাড়তি অর্থ হল তখন থেকে [LAC] মানে উভয়পক্ষের সম্মতি নিয়ে আঁকা সীমান্তরেখা। কিন্তু এত সম্মতির পরেও আবার ২০২০ সালে কেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ?

    এর একমাত্র কারণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট সংসদে অমিত শাহের সারা কাশ্মীরই (পাকিস্তান ও চীনা অধিকৃত অংশসহ) ভারতের অংশ দাবি করা। অর্থাৎ এখানে আসলে মোদি-অমিতের সরকার দাবি করে ফেললেন যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত যত কিছু সীমান্ত সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছিল তা তারা মানেন না। এবং এই না মানা একপক্ষীয় ভাবে। আর একপক্ষীয়ভাবে কোনো চুক্তি বাতিল করে দেয়া মানে উভয়পক্ষ বসে কোনো আলোচনায় থেকে নয় – যেটি কূটনীতিতে খুবই অশিষ্ট [rogue] আচরণ গণ্য করা হয়, তাই ঘটানো হয়েছিল।]

    কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের ভাল সম্পর্কের সময়ে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে সীমান্ত নিয়ে আপস আলোচনায় ফলাফলের ভিত্তিতে সে সময়ে প্রতি বছরই উভয়ের সম্মতিতে চীন নিজের দাবিকৃত অংশ থেকে বেশ কিছু ভূখণ্ড ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। এ থেকেই এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর জন্ম। তাহলে এখন ১৯৫৯ সালকেই আবার ফিরে নতুন করে সব সীমানার ভিত্তি মেনে নিয়ে এখনকার মোদির আপসনামার অর্থ কী?

    অর্থ হচ্ছে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে আপোস আলোচনায় যা কিছু ভূখণ্ড ভারত পেয়েছিল তা আর ভারতের হাতে থাকল না। ভারত এই ভূখণ্ডের দাবিই যেন ছেড়ে দিল। সেটা ভারতের অনিচ্ছাকৃত হলেও মোদি-অমিতের “পুরা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড”, সংসদে এই দাবি করাতে এমন অর্থই তৈরি হয়ে গেছিল।

    এর সোজা মানে হল মোদীর এখন ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মেনে আপোস করাতে ভারত চীনের কাছে বড় ভূখণ্ড হারাচ্ছে সেটা স্বীকার করে নিল। শুধু তাই না, এর আরেক বিশেষত্ব আছে।

    আগে মীমাংসিত ছিল এমন ভূখণ্ড এবার আবার চীনকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু কেন? এমন তো আগে কখনো হয়নি! মোদি কি যেকোনোভাবে একটা সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে আসার স্বার্থে পাগল হয়ে এমনটি করছে? একেবারেই যে তা নয় সেটা বলা মুশকিল। কারণ এই করোনাকালের আগে থেকেই মোদির ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। তাই এই সময় সেনা প্রত্যাহার, খরচ কমানো এবং সাথে টেনশনও কমানো ইত্যাদি মোদীর জন্য এক বিরাট চাহিদা তো বটেই। সেকারণে এই আপোস মীমাংসা মানে সেনা প্রত্যাহার বা [disengagement] এটির মূল শর্ত হলে মোদি তাতেও রাজি।

    পাঠকের কাছে ব্যাপারটা আমাদের ভাষ্যে না বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের মিডিয়ায় ছাপা হওয়া এক সাবেক কমান্ডার লে. জেনারেল পানাগের [Lt Gen HS Panag (Retd)] বয়ানে তুলে ধরব। তিনি পরপর দু’বার রাষ্ট্রীয় মেডেলপ্রাপ্ত সেনা অফিসার।

    লে. জে. পানাগ বলছেন, ‘… এই সৈন্য প্রত্যাহার ঘটছে একেবারে ঠিক চীনের দাবিকৃত ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে। কারণ এ পরিস্থিতিকে ভিন্ন কোনো বিকল্প আকার দেয়ার মতো সামরিক যোগ্যতা ভারতের নাই।’

    তিনি আরো বলেন, তবুও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এটাই ভালো  [……” that the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation. However, he said, it is “good for the long term peace”………”The plan, he presumed, will include acceptance of McMohan Line in Northeast with some give and take between New Delhi and Beijing, as per the 1959 proposal.”]।

    কিন্তু এই জেনারেল যে কথা কোনো রাখঢাক না করে গড়গড়ে বলে গেলেন মোদির সে সক্ষমতা নাই। কারণ লাদাখ বা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মোদির নেয়া সব পদক্ষেপেই সততার অভাব ছিল। মোদীর অসততা হল, তিনি নিজ ভোটবাক্স ভরাতে সীমান্তে তিনি বীর, বীরত্ব দেখাচ্ছেন তিনি, হিন্দুত্বের বিজয় আনছেন তিনি ইত্যাদি ভুয়া বয়ানের সুরসুরি তুলতে এসব করেছেন।

    তিনি কাশ্মীর দখল করেছেন। পুরা কাশ্মীর ভারতের মধ্যে এনেছেন তাই তিনি ও তার দল হিন্দুত্বের বীর। এসব জাতশ্রেষ্ঠত্বের জজবা উন্মত্ত জোশ, আধা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি এনেছেন যেকোনো অ-হিন্দুর বিরুদ্ধে। যার সবকিছুর উদ্দেশ্য ভোটবাক্সকে হিন্দুর-ভোটবাক্স এই জোয়ার তুলে।

    আবার এই মিথ্যা বীরত্বের দাবি করতে গিয়ে যেমন – ভারত-চীন প্রত্যক্ষ সেনা সংঘাতে ভারত যখন ২০ জন সৈন্য হারিয়েছিল তার পরে মোদি সর্বদলীয় বৈঠকে দাঁড়িয়ে এবং ‘মন কি বাত’ নামের রেডিও প্রোগ্রামে বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, ‘চীন ভারতের কোনো ভূখণ্ড দখল করে নাই, কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি’ ইত্যাদি। তার সোজা অর্থ হলো, ভারতের সৈন্যরাই চীনে অনুপ্রবেশ করে মার খেয়ে মরেছে। অথচ আসলে মোদীর ওই বিবৃতিতে স্বীকার করে নেয়া হয় যে, চীনা দাবিকৃত ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখাই’ তাদের উভয়ের প্রকৃত সীমান্ত। যদিও মোদি কখনোই তার ওই কথার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সংসদে আলোচনাও তুলতে দেননি।

    কাজেই  এখনকার ‘সেনা প্রত্যাহার’ নিয়ে মোদির বড় সমস্যা হল, তার সংসদ বা নাগরিকের কাছে তিনি কিভাবে খুলে বলবেন যে তার উগ্র জাতিবাদী হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি আর হুঙ্কার আসলে সব অচল আর ভুয়া! ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ার বিনিময়ে তিনি চীনা সৈন্যদের ঠাণ্ডা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেজন্য তিনি বাৎচিত শুরু করছেন আরেক শঠতার আশ্রয়ে।

    এক. তিনি যে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে বিনিময়-সওদা করছেন- এ কথা একেবারে লুকিয়ে ফেলেছেন।

    দুই. এই বিষয়ে পাবলিকের সামনে কথা শুরু করছেন চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে – এখান থেকে। যেন এটা দু’পক্ষেরই সেনা প্রত্যাহার নয়, যেন শুধুই চীনা সৈন্য প্রত্যাহার হচ্ছে। অর্থাৎ যেন চীনা সেনারা ভারতে এসেছিল, এখন পালিয়ে গেল। এটাই যেন এক বিরাট সুখবর আর মোদী সরকারের বিজয়- এমন ভাব দেখাচ্ছেন। অন্তত দুটো মিডিয়া দ্যা হিন্দু আর দ্যা প্রিন্ট এ কাজে মোদির ইজ্জত বাচানোর মত করে এমন ভাষ্য লাগাতার তৈরি করে যাচ্ছে।

    অথচ সত্যিকার ব্যাপারটা হল, ভারতীয় সেনারা ‘পিছিয়ে’ ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায় ফিরে গেল আর চীনা সৈন্য প্রত্যাহার নয় বরং ওই ছেড়ে যাওয়া ভূখণ্ডের দখল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

    মোদীর ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টায় আরেক মন্ত্রী ভিকে সিংঃ
    মোদি তাই ‘চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে’ এমনই কাছাকাছি কিছু একটা ব্যাখ্যায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথকে দিয়ে সংসদে বিবৃতি পড়ে শোনান, ঐ ১১ জানুয়ারি যেদিন ভারতীয় সেনা ইতোমধ্যেই মাঠে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছিল সেদিন। তবু এতকিছুর পরেও আগেই আরেক বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছিল। সে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল মোদীর আরেক মন্ত্রী ভিকে সিং।

    তিনি আসলে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান, এক ফোর-স্টার জেনারেল। সম্ভবত মোদি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিথ্যা অ্যাডভ্যান্স ঢোল পিটানোর – ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে মোদি আপোস করছেন এদিকটা লুকিয়ে কথা শুরু করার জন্য। তিনিই প্রথম বলতে নামেন যে এই সেনা প্রত্যাহার এটাই নাকি মোদীর বিজয়। কিভাবে?

    তিনি গত ৭ জানুয়ারি ভারতের দক্ষিণে তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে সফরে গিয়ে জনগণকে ব্যাপারটা ‘সহজ করে বুঝিয়ে বলার’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এতে তিনি হিতে বিপরীত করে ফেলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কগুলো কত সহজ ফলে অন্যের দেশে অনুপ্রবেশ ঘটানো -এগুলো কোনো ব্যাপার না। এই ধারণা তৈরি করতে গিয়ে বলে বসেন যে ভারত কতবার যে চীনা ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে এর শেষ নেই।

    আরো এক কাঠি ওপরে গিয়ে বলেছেন, “চীনারাও অনুপ্রবেশ করেছে তবে আমাদের চেয়ে কম। চীনারা ১০ বার করলে আমরা ৫০ বার করেছি”   [“Let me assure you, if China has transgressed 10 times, we must have done it at least 50 times,”।

    বলাই বাহুল্য, এরপর এটাই সমালোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এমনকি এ নিয়ে চীনে চীনা সরকারি মুখপাত্রকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কয়েক শব্দে এক মন্তব্য করেন যে, “সত্যি কথা সবসময় অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়ে।”

    আসলে ভিকে সিং সেখানে আরেক ভুয়া দাবি করে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়াকে আড়াল করতে গিয়েছিলেন। তিনি তাই মনে করায় দিয়ে বলার ছলে বলেন, চীনা পণ্য বর্জন প্রোগ্রাম নিয়েছিল বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আর সরকার চীনা বিভিন্ন অ্যাপ-প্রোগ্রাম ভারতে নিষিদ্ধ করেছিল, ভারতে বাণিজ্যে বা টেন্ডারে অংশ নেয়া বন্ধ করেছিল। আর তাতেই নাকি চীনারা চাপে পড়েছিল তাই তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।

    কিন্তু তার এই দাবিও আসলে ভুয়া। কারণ পরিসংখ্যান বলছে যে, বরং চীন থেকে কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যের আমদানি বেড়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ এক দাবি ভিকে সিং শুরুতেই করেছিলেন সেখানে। তিনি বলে বসেন, চীনের সাথে অফিসিয়াল সীমান্তরেখা বলে কোনোকিছু কখনও আঁকাই হয় নাই; [……”  official border with China has never been demarcated.“।

    তার মানে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি পেং ১৯৯১ সালে ভারতে আসেন নাই, নরসীমা রাও-ও ১৯৯৩ সালে পাল্টা চীন সফরে যান নাই। অতএব ১৯৯১-১৯৯৩ এই সময়কালের মধ্যে [LAC] নিয়ে চীন-ভারত উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথমবারের মত কোনো সমঝোতা হয় নাই?

    আসলে এটা তিনি বলছেন কারণ মোদি নিজেই এই “অস্বীকারের” [১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে] ফাঁদে পড়েছেন। তাই ইতিহাস উল্টাতে ভিকে সিং সারা ভারতকে সেই ফাঁদে ফেলতে চাইছেন। ওদিকে, কংগ্রেস গত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে এন্থনী অভিযোগ করে বলেন, লাদাখের এই সেনা প্রত্যাহার আসলে চীনের কাছে সারেন্ডার “Disengagement in Ladakh is surrender to China,” ছাড়া কিছুই না।

    যা হোক, এই সেনা প্রত্যাহার মনে হচ্ছে সফলতার দিকেই যাবে, তাতে ভারতকে যে শর্তই পালন করতে হোক না কেন। তবে ঘটনা আরো কিছু আছে।

    আসলে এখন মোদির এত দ্রুত আপোস করে ফেলার পেছনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মোদি আশা করতেন, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধটা যদি সামরিক দিকে গড়ায় তাহলে তিনিও এর আড়ালে, ভারতের চীনের সাথে বিরোধকে সামরিক দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ নিতে পারবেন। কিন্তু তা হয়নি, মোদির কপাল খারাপ!

    কিন্তু রেকর্ড বলছে, ট্রাম্প তার চার বছরে পরিস্থিতি কখনোই সামরিক দিকে যেতে দেননি। যদিও অনেক গরম কথা, হুঙ্কার দিয়েছেন। আর ওই চার বছরে তিনি মোদিকেও বাকচাতুরি ছাড়া কোনো ফেভারই দেননি। কিন্তু উল্টা ভারতে অস্ত্রবিক্রির সুবিধা নিয়েছেন। সেটা যাই হোক শেষে বাইডেন এসে যাওয়াতে এসব দিকে মোদির সরকার এখন একেবারেই হতাশ। কেবল অপেক্ষা করছেন বাইডেনের সাথে প্রথম মোলাকাতে কী আলামত দেখেন তা জানতে। পছন্দ না হলে এবং বিশেষ করে মানবাধিকারের চাপ খেলে জয়শঙ্করের তৈরি আরেকটা অবস্থান আছে সে দিকে যাবেন। সেটা হলো তিনি বলবেন, এখন থেকে চীন-আমেরিকার বিরোধে ভারত আর কোনো দিকে নেই, গ্যালারির দর্শকমাত্র হয়ে থাকবে। যেন অনেকটা ঘরে খাবার নাই বলে উপোস রাখছি এমন বলে বেড়ানো হবে সেটা আর কী।

    সবশেষে, চীন গত বছর সীমান্তে সেনা সমাবেশের শুরু থেকেই আগে ভারতকে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ানো মানে, এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর মাধ্যমে যেসব ভূমি ফেরত দিয়েছিল তা আবার কেড়ে নিতে এগিয়েছিল কেন?

    স্বল্পকথায় বললে, ব্যাপারটা ২০১৯ সালে মোদির “পুরা কাশ্মিরই ভারতের”- সংসদে এই দাবি করার খেসারত। সংসদে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পরে অমিত শাহ একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাশ্মিরের তিন অংশ- ভারত ও পাকিস্তানের দখলের অংশ এবং চীনের দখলে থাকা অংশ- এই পুরো কাশ্মিরই ভারতের ভূখণ্ড। এই ঘোষণাতেই সবকিছুর ট্রিগার টিপে দেয়া হয়েছিল।

    আজ মোদি সরকার “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা” মেনে নিতে বাধ্য হলেন। দুনিয়ার সব উগ্র জাতিবাদীর পতনের মত এই হিন্দুত্ব জাতিবাদ এখানেও হেরে গেল।

    চীন বলতে চাইল, ভারত আপোস আলোচনায় সীমান্তবিরোধ মিটানোর মত কোনো পার্টনারই নয়, যোগ্য নয় তাই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “সেনা প্রত্যাহারে গিয়ে মোদির যে দশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    গৌতম দাস

    ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3nc

    মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী / ডিফেন্স ফোর্স নামে ক্লাবের প্রধান মিন অং লাইং

    গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমার মানে, বার্মা-দেশ আবার দেশী-বিদেশী খবরের শিরোনামে উঠেছে। যদিও রয়টার্স বা বিবিসি বলছে ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে নাকি একটা ক্যু হয়েছে। আসলেই কী তাই? না, ঠিক তা নয়। আপাত চোখে একটা ক্যু মনে হলেও। কারণ আগে থেকে কোথাও যদি একটা রিপাবলিক বা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন [constitute] হয়ে থাকে একমাত্র এরপরেই না প্রশ্ন উঠে ঐ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কোন সামরিক ক্ষমতাদখল বা ক্যু করেছে কিনা! যেটা রাষ্ট্রই নয় বরং  একটা সামরিক ক্লাব তার বেলায় এটাকে ক্যু বলা না বলায় কী এসে যায়? তাই নয় কী? তাহলে পশ্চিমারা সবাই একে ‘ক্যু’ বলছে কেন?
    এটা বলছে কারণ আমেরিকা-ইউরোপের বা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভাষ্য এটা।  এককথায়, কারণ এই রাষ্ট্রগুলো গত ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে থেকে দাবি করে আসছিল যে বার্মায় নুন্যতম হিউম্যান রাইট নেই, অনবরত এর চরম লঙ্ঘন হচ্ছে। কথা সত্যও বটে। ফলে আমেরিকা তো বটেই সেসময় জাতিসংঘ থেকেও অবরোধ জারি করা ছিল। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।  কিন্তু ২০০৭-১০ এই সময়কালে সব উলটে যায়। টেবিলের নিচে ডিল হয়। হিউম্যান রাইট  বিক্রি হয়ে যায় যা আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিমারা সব সময় করে আসছে।  কারো হিউম্যান রাইট  রেকর্ড খারাপ থাকলে এর বিনিময়ে পশ্চিমারা সওদা করে  নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থ হাসিল করে নিয়ে থাকে। এই ডিলেরই বাইরের প্রকাশ্য চিহ্ন হল নতুন করে লিখিত বার্মার কনষ্টিটিউশন-২০০৮। যেখানে বার্মা সামরিক ক্লাবের ক্ষমতাটা আগের মতই ক্লাবের হাতে থেকে যায় তবে সাথে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ বা ‘ফুটানি কা ডিব্বা’ লটকে দেয়া হয়। সেটা হল,  অং সান সুচির [Aung San Suu Kyi] একটা সিভিলিয়ান ফেস। এতেই ভাব ধরা হয়েছিল যে বার্মা যেনবা একটা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। অথচ ক্ষমতাটা ছিল আগের মতই বার্মার “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে এক সামরিক ক্লাবের হাতে।
    আসলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল,  হিউম্যান রাইট বিষয়ক অভিযোগ আগে যা ছিল তা পশ্চিমের সবাই দলবেধে বেচে দিয়েছিল, মানে মিটিয়ে নিয়েছিল জেনারেলদের সাথে মিলে দেনা-পাওনায়। আর বিনিময়ে বার্মার জেনারেলদের থেকে বাগিয়ে  ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ নিয়েছিল।  আর এটা শুধু অভিযোগ সব চেপে যাওয়া নয়, উলটা সার্টিফিকেট দিয়েছিল যে এরপর থেকে নাকি কথিত “গণতন্ত্রের পথে সংস্কার” হতে শুরু করেছে!   এই “গণতন্ত্র” শব্দটা অদ্ভুত। বিয়ে করে নাই; অথচ বাচ্চা পয়দা হয়েছে দাবি করার মত।  তাই কনষ্টিটিউশন-২০০৮ এটাই তো প্রমাণ যে  বার্মা একটা সামরিক ক্লাব মাত্র, আর ঐ ক্লাবের গঠনতন্ত্রই হল কনষ্টিটিউশন-২০০৮। মোটকথা ব্যতিক্রমহীনভাবে সারা পশ্চিম বার্মার জেনারেলদের থেকে ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ পেয়ে চেপে গিয়েছিল।  আর এই ডিলটাই ঘটাতে প্রাইমারি দুতায়ালিটা ঘটিয়ে দিয়েছিল ভারত, ফলে সেও কিছু ভাগ পেয়েছিল।  আর চীনের কথা আর কী বলব! সে বরং হিউম্যান রাইটের ঢং না করে বরং সোজা সাপ্টা ঘুষ দেয়া আর কাজ নেয়ার লাইনে ছিল। তাই , যেটা বার্মার উপর আশির দশক থেকে জাতিসংঘের আরোপিত অবরোধ সে আমল থেকে চীন সেটার একাই ফয়দা লুটেছিল। কারণ বার্মার পড়শি বলে একমাত্র চীনের মাধ্যমেই না-দেখার ভান করে বার্মা বাইরের দুনিয়ার সাথে সক্ষম রেখে চলতে পারছিল। তাই এটা ছিল চীনের পড়ে পাওয়া সুবিধা।
    তাহলে এখন কী হয়েছে? জেনারেলেরাও কেন ক্যু বলাতে আপত্তি করছে না? মিয়ানমারের জেনারেলরা এই উছিলায় চাইছে তাদের আর ক্লাব নয়, রাষ্ট্রই মনে করা হোক এবং এটাই তাদেরও ভাষ্য। তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? সমস্যা হল, মিয়ানমার একটা দেশ অবশ্যই। কিন্তু এটা জন্ম থেকে কখনোই রাষ্ট্র নয় মানে – মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা মানে এর আগের কলোনি দখলদার জাপান অথবা ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই এটাকে খতিয়ে না দেখে  অভ্যাসে রাষ্ট্র মনে করা হয়েছিল। আর পাঁচটা কলোনিমুক্ত হওয়া স্বাধীন রাষ্ট্র ভেবে।  নেহেরুর ভারত বা জিন্নাহ’র পাকিস্তান অর্থেও বার্মা কখনও রাষ্ট্র হতে পারে নাই। যেমন অন্তত একটা ছোট্ট কথা দিয়ে বলা যায়।
    খুবই অল্প কথায় বললে, প্রশ্নটা ক্ষমতার, মানে রাষ্ট্রক্ষমতার।  যেমন, শাসন-ক্ষমতাধর যেকোন শাসককে বলতে পারতে হয়, কে তাঁকে ক্ষমতা দিয়েছে। মোটা দাগে এখানে দুধরণের জবাব দেখতে পাওয়া যায়। এক. যারা ক্ষমতার উৎসের জবাব দিতে পারে না, হদিস দিতে পারে না; যাদের বেলায় ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে রাজার সন্তান রাজা এমন হয়। অথবা এদের আদি রাজার ক্ষমতার হদিস না দিতে পেরে দাবি করেন যে ক্ষমতা ‘ঐশ্বরিকভাবে’ পেয়েছে।
    আর দুই. যারা হিম্মত রাখে ও ব্যবহারিকভাবে মেনে নেয় যে ‘ক্ষমতা জনগণের’। সে-ই জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এই দ্বিতীয় ধারার বেলায় কেবল এরাই দাবি করতে পারে, তাদের রাষ্ট্র আছে আর সেই দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা একটা রাষ্ট্রগঠন করেছেন, ফলে এরপর একটা সরকার গঠনও করেছে। এই দ্বিতীয় ধারাকেই বলা যায় এটা এক রিপাবলিক বা জনগণের প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। কাজেই রিপাবলিক বাদে আর কোনো দেশেরই ক্ষমতার উতসের হদিস থাকে না, উত্তরাধিকারী রাজা-সম্রাটের সন্তানেরা রাজা-সম্রাট হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও বড়জোর সমাজের কিছু এলিট মিলে তাদের পছন্দের কাউকে শাসক বানিয়ে রাখে। ফলে কোথাও শাসক থাকা মানে তা ‘দেশ’ অবশ্যই; কিন্তু শাসক থাকা মানেই তা ‘রাষ্ট্র’ নয়। আবার যদিও  দুনিয়াতে যা দেখা গেছে, এই অর্থে ইতিহাসে ১৬৫০ সালের আগে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে কিছু ছিল না।
    তবে নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে তা পরিষ্কারভাবে বলতে পারা বা না-পারা- এটাকেই আমরা কোনো ‘দেশ’কে ‘রাষ্ট্র’ বলেও মানা না মানার মূল নির্ণায়ক বলতে পারি।

    কিছু ব্যতিক্রম, ‘নগর-রাষ্ট্র’
    তবে ব্যতিক্রম হিসেবে ক্ষণকালের জন্য আমরা কোথাও নগর-রাষ্ট্র ধারণা লক্ষ করি। যেমন যিশুর জন্মের ৭৫৩ বছর আগে [753 BC] ‘প্রাচীন রোমে’ রাজতন্ত্রের পত্তন হয়েছিল। পরে (প্রায় আড়াইশ’ বছর পরে) সেখানে নগর-রাষ্ট্রের ধারণার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল, সেটাও যিশুর জন্মের ৫০৯ বছর আগে [509 BC]। এটাই প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রিপাবলিক। পরে সেটাও ভেঙে যায় যিশুর জন্মের মাত্র ২৭ বছর আগে [27 BC]। তাতে এবার ফিরে আবার রাজতন্ত্র বা মোনার্কি মানে, রোমান এম্পায়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তা টিকেছিল যিশুর জন্মের ৪৭৬ বছর পরে [476 AD] পর্যন্ত। এ সময়েরই মাঝামাঝি রোমে প্রভাব বেড়ে যাওয়া খ্রিষ্টধর্ম সামলাতে না পেরে শেষে ৩১৩ সালে সম্রাট কনস্টান্টিন নিজেই রোমকে ‘খ্রিষ্টান রোম’ বলে ঘোষণা করেন। তখনই তিনিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সদলে খ্রিশ্চান ধর্মগ্রহণ করেছিলেন।

    কলোনিদখল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও ভালোমন্দ আছেঃ
    অনেকে বলে থাকেন, দেশ যদি কলোনি দখলে যায়ই তবে জাপানের কলোনি হওয়ার চেয়ে ব্রিটিশ কলোনি হওয়া ভাল। এমন কেন বলেন?
    ব্রিটিশেরা ‘পশ্চিমা’ বলে এশিয়ান জাপানের চেয়ে তারা ভাল, ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। আগে দেখেছি, রোম ‘নগর-রাষ্ট্রও’ টিকে নাই। শেষে তা রোম সাম্রাজ্যের ভেতরে হারিয়ে যায়; যে সাম্রাজ্য আবার ৪৭৬ সালের [476 AD] মধ্যে নিজেও বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু পরে “হলি রোমান এম্পায়ার” নামে, ৮০০ সাল থেকে রাজা শার্লেমেন [Charlemagne] (ফরাসি উচ্চারণে শাআলে-মেঁ) নতুন করে “হলি রোমান এম্পায়ার” [Frankish king Charlemagne as Roman emperor by Pope Leo III on Christmas Day in the year 800] নামে এক  সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটান। তবে আগের রোমান সাম্রাজ্যের সাথে নয়া হলি রোমান এম্পায়ারের কোনো সম্পর্ক নেই, কেবল নামের কিছু মিল ছাড়া। আর এখনকার জার্মানি-ফ্রান্সের মাঝের ফ্রাঙ্ক [Frank] ভূখণ্ডকে কেন্দ্র রেখে এর বিস্তার শুরু হয়েছিল। মোটা দাগে, এই সাম্রাজ্যই (৮০০-১৮০৬) সময়কাল জুড়ে জারি ছিল আর এখনকার ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রেরই পূর্বের-শাসক ছিল। যদিও শেষের ৩০০ বছর বিশেষত ১৬৪৮ সাল থেকেই এটা নামকাওয়াস্তে সাম্রাজ্য হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তা আলাদা আলাদা ছোট সাম্রাজ্য হয়ে প্রত্যেকে নিজেদের  সীমানাও ভাগ করে নিয়েছিল। আর সেগুলোই একালে রিপাবলিক রাষ্ট্ররূপ [তবে জাতি-রাষ্ট্র] হয়ে নিয়েছিল যা এখনকার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্দেশ করে।
    এভাবে এক পর্যায়ে ১৬৫০ সালের ব্রিটেনে ক্রমওয়েলের বিপ্লবকেই (Cromwell revolution) ধরা হয়, প্রথম রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার বিজয়। তবে এরপরে সাম্রাজ্যগুলোর ভেতরেই এদের শাসন-কাঠামো কী হবে তা নিয়েও রাষ্ট্র-ধারণার ক্রম-রূপান্তর ঘটেছিল; যেখানে মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলির ভাবনাঃ
    সারকথায় সেটা হল যেমন, নাগরিক হল উপাদান বা কনস্টিটুয়েন্ট। আর এই কনস্টিটুয়েন্টদেরকে নিয়ে রাষ্ট্র কনস্টিটিউট বা গঠন করা – [যেখান থেকে কনষ্টিটিউশন বা Constitution] ধারণাটা। আর এসব ধারণার উপর রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠিত। এখানে পাবলিক বা নাগরিকই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস – এই ধারণা আস্তে ধীরে সমাজগুলোতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এর সাথে সাথে তাই রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিনিধিত্ব ধারণাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটাই জন-প্রতিনিধিত্বের ধারণা; কালক্রমে যা মাঠে ময়দানের ভাষায় ভোট বা নির্বাচন। এখান থেকে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত আরো শব্দ যেমন – জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, জনপরিবহন অথবা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (জনস্বার্থে মামলা)। আবার এখান থেকেই মাও সেতুংয়ের চীনের ভাষায় তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম  – পিপলস ব্যাংক, সেনাবাহিনীর নাম – পিপলস আর্মি ইত্যাদি। সার কথাটা হল, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ; রাষ্ট্রপরিচালনায় সব ক্ষমতার উৎস জনগণ – এটাই মূল ভিত্তি। এই ধারণাকে মূল ও কেন্দ্রীয় ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ধারণার বিস্তার ঘটেছে। তাই না কোন রাজা, না সম্রাট, না কোন রাজ-উত্তরাধিকারী বা না সমাজের এলিটদের বেছে নেয়া কেউ প্রমুখ – এরা কেউই ক্ষমতার উৎস নন। রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস একমাত্র জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি – নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই একমাত্র জনগণের হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। এটাই রিপাবলিক (গণপ্রজাতন্ত্রী) রাষ্ট্র ধারণাটার সারকথা।
    কিন্তু রাষ্ট্র ধারণার এদিকটা এশিয়ায় এভাবে এত বিকশিত হয়নি। একটা মোনার্কি মানে সেখান থেকে ছোট রাজা থেকে বড় সম্রাটের সাম্রাজ্য আর সেখান থেকে  কলোনি দখলদার মালিকের সাম্রাজ্য হয়ে ওঠার পরে দেখা গেছে, এদের বিকাশের এখানেই সমাপ্তি।  এরা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত বিকশিত হতে পারে নাই।  যেমন এশিয়ান অরিজিন জাপান, এর সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি বা চর্চা করি। সে মূলত পূর্ব এশিয়ার (ততকালে অবিভক্ত) একই কোরিয়া ও চীনের আংশিক কলোনি দখলদার এক সাম্রাজ্য ছিল যা নিজে বৃটিশদের মত কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। কেবলমাত্র এক সম্রাটের সাম্রাজ্য (তবে কলোনিদখলদার) ছিল। এবং সেকালের বার্মার কিছু নেতা অথবা পশ্চিমবাংলার সাবেক কংগ্রেসি নেতা সুভাষ বোস – এদের মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারত এই কলোনিকে জাপান নিজের প্রভাবাধীনে কিছু অংশ বা পারলে পুরাটাই পুণঃদখলি কলোনি করে নেয়ার চেষ্টা করেছিল এমনই আরেক কলোনি মাস্টার ছিল সেই জাপান।

    জাপান নিজেকে রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করে কিনা এখনও অস্পষ্টঃ
    কিন্তু জাপান সম্পর্কে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেক দিক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের ভাগাভাগিতে জাপান হিটলারের জার্মানির পক্ষে আর আমেরিকা-সোভিয়েত-ব্রিটিশ মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির হিটলারের সাথে জাপানও হেরে যায়। কিন্তু আমেরিকা আর সব  ‘হারুপার্টির’ মত জাপানকেও ত্রাণ এবং অবকাঠামো ও শিল্প পুনর্বাসনের অর্থ-বিনিয়োগ দিয়েছিল। এতে জাপান পুণর্গঠিত হয়ে উঠেছিল তবে কেবল সামরিক দিকে আমেরিকার অধীনস্ত থেকে পুনর্গঠিত এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জাপান গঠন করা হয়েছিল। এই নতুন জাপান নিজেকে এবার আর কোন সম্রাটের সাম্রাজ্য ফিরে দাবি না করলেও নয়া রাষ্ট্র দাবি করেছিল। কিন্তু সেটাও রিপাবলিক কি না তা জানা যায় না। এছাড়া জাপানে রাজনীতি বলে কিছু আছে কি না, চিন্তায় ও চর্চায় রাজনৈতিকতা [Polity] আছে কিনা, তাও জানা যায় না। জাপানের ফরমাল নাম “ইউনিয়ন অব জাপান”। অর্থাৎ কোথাও এটা যে ‘রিপাবলিক’ সে কথা বলা হয়নি।
    ওদিকে জাপানে রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চার দিক সবসময়ই খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক ধারণা বলতে এখানে বড় জোর একটা জাতিরাষ্ট্র বা দেশপ্রেম – এই পর্যন্তই, যেন এর কোন রাজনৈতিকতা নাই বা সেবুঝে না। বিশেষত জাপানের কলোনি দখলের পক্ষে নিজ কোন সাফাই দেয়ার যেন প্রয়োজন – অনুভব ছিল আমরা দেখি না। যেন তারা বুঝাতে চায় তাদের গায়ের জোর ছিল তাই দখল করেছিল – এধরনের, যেটা বলা বাহুল্য ব্রিটিশদের মত নয়।
    কারণ এসবের বিপরীতে ব্রিটিশদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ে ধারণা ছিল। শুধু তাই না কলোনিদখল করা দেশ বৃটিশ-ইন্ডিয়াতে যেমন- রামমোহন রায়,  (কমিউনিস্টরা যাকে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে) তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও কমতির শেষ নেই কথা সত্য। তবু একটা রাজনৈতিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ব্রিটিশেরা তাঁকে এবং অন্য নেটিভদের দিতে পেরেছিল ও দিয়েছিল। অবশ্য তা মূলত নেশন-স্টেট ধরনের জাতিবাদী, দেশপ্রেম টাইপের আবেগী ধারণা। এটা মূলত জাতিরাষ্ট্র অর্থে রিপাবলিক ধারণা হলেও তা পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র মনে করা হত। এ ক্ষেত্রে রামমোহনে চিন্তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা রাজনৈতিকতা সেখানে ছিল আমরা দেখি। এককথায় জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ও কেন্দ্র এতটুকু চিন্তার রাজনৈতিকতা ব্রিটিশ কলোনি থেকে পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু জাপানের কলোনি হলে এটুকু কেন কোন রাজনৈতিকতা পাওয়ার সুযোগ ছিল না, নাই। এর একেবারে গোড়ার কারণ জাপান আসলে ছিল এক সম্রাটের সাম্রাজ্য; মানে সেকালে তা ছিল এক রাজতান্ত্রিক জাপান। তবে যদিও তা মার্শাল তেজো ধরণের সামরিক নেতা নির্ভর। এদিকে বলাই বাহুল্য রাজতন্ত্রে “রাজনীতি” বলে কোন ধারণা থাকে না। তাই, শাসনের ক্ষমতা কক্তৃত্ব একমাত্র জনগণের এই ধারণা সমাজে না থাকলে সেখানে রাজনীতি শব্দ ও ধারণার উদ্ভব ঘটে না। থাকতেই পারে না। ফলে কোন ধরণের রাজনৈতিকতাও। তাই নেতা সুভাষ বোস বা বার্মার তরুণদের জাপানি আর্মি যত যাই কিছুই শিখিয়ে থাকুক বা ট্রেনিং দেক তার চিন্তায় রাজনীতি বা রাষ্ট্র ধারণার লেশ মাত্র ছিল না। থাকার কথাও না।

    জাপানে কোন ধরণের রাজনৈতিকতার ধারণা না থাকা, এদিকটাই জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত মিয়ানমার শাসকদের ভিন্ন করে তুলেছে বলে অনুমান করা যায়। সেকারণেই বার্মা কেন রাষ্ট্রই নয়, কোনো রিপাবলিক নয়, এর কারণ আমরা এখানে খুঁজলে পাবো।

    তবে মিয়ানমার কেন ব্রিটিশ শাসনবিরোধিতা করতে জাপানের কাছে গিয়েছিল, এর পেছনে আবার সবচেয়ে বড় কারণ মনে করা হয় দুটা। ব্রিটিশরা বার্মা দখল করেছিল ১৮২৪ সালে, ছেড়ে গিয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু এই ১২৪ বছরের মাত্র শেষ ১১ বছর (১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৮) বাদে বাকি সবটা সময় বার্মাকে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ারই একটা প্রদেশ রূপে ঘোষণা করে বৃটিশেরা শাসন করেছিল। আর ভারতীয় ও ব্রিটিশদের উপর এটাই বার্মিজদের প্রধান ক্ষোভের কারণ। সেটাই বা কীভাবে?
    বার্মাকে এমন প্রদেশ হিসেবে গণ্য করে শাসন করাতে বার্মার ক্ষমতায় সবার উপরে ব্রিটিশরা থাকলেও মূলত ভারতীয় সিভিল সার্ভিস অফিসারদের অধীনে বার্মা নিজেকে দেখতে পেত। এর ফলে আরো ঘটনা হল বার্মার শহর-গঞ্জে ভারতীয়রা বার্মায় ব্যবসায় ও চাকরিতে প্রধান ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। যেমন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসগুলো মনে করা যেতে পারে যেখানে বার্মার নাম এই কারণেই বারবার এসেছে। ফলে ভারতীয়রা হয়ে যায় বার্মার সাধারণ মানুষের চোখে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও লুটেরা; যার উপরে কলোনি মালিক ব্রিটিশের ওপর বার্মিজ ঘৃণা তো আছেই।
    ফলে বার্মিজ তরুণদের কাছে জাপানের শাসকেরা হাতছানি তৈরি করতে পেরেছিল। এতে বার্মিজদের পালটা প্রতিক্রিয়া হয় যে, তারা জাপানি সাহায্য নিয়ে হলেও দেশ থেকে ভারতীয় ও ব্রিটিশদের তাড়াবে। এমনকি ভারতীয়দের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ১৯৪৮ থেকে ’৬০ সাল পর্যন্ত আরো তীব্র হয়েছিল তাদের সমূলে ভারত ফেরত পাঠাতে। তবে তরুণদের জাপানি-প্রীতি বাড়ার আরেক বড় কারণ হল, ১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধের ভিতর জাপান থাইল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। আর বার্মার প্রতিবেশী হল থাইল্যান্ড। রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির তরুণ, সু চির বাবা অং সান ও তাঁর বন্ধুরা প্রায়ই ব্রিটিশদের নির্যাতন বা খোঁজাখুঁজি এড়াতে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিতেন। আর সেখানেই জাপানি আর্মির সাথে তাদের প্রথম মোলাকাত ঘটেছিল। সেখানেই সাব্যস্ত হয় যে, জাপানিরা তাদের সামরিক ট্রেনিং দিবে। অং সান গোপনে দেশে ফিরে নিজ বন্ধুদের সংগঠিত করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এরাই হয় ট্রেনার যা গড়ে তুলেছিল বার্মিজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি [Burmese Independent Army, BIA] নামের সেনাবাহিনী। পরের বছর ১৯৪২ সালে জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে এই বাহিনীর তরুণ সেনারা জাপানিদের পক্ষে পদাতিক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এতে জাপানিরা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করে ফেলে। আর এতে বার্মায় গড়ে উঠা জাপানি প্রশাসনে অংশ নিয়েছিলেন অং সান ও তার বন্ধুরা।

    আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না, কেন?
    কিন্তু নির্ধারক ভূমিকাটা ঘটেছিল আরেকটু অন্যখানে। জাপানিরা অং সানের ৩০ জন বিশেষ বন্ধুদের একটা দলকে বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল বিআইএ গঠনের সময়। এদের গল্প-বীরত্বই আজও বার্মার আর্মির পুঁজি। সাথে আবার একই সাথে বার্মা কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব হিসাবে গড়ে উঠবার পিছনের কাহিনী। মনে রাখতে হবে জাপান তাঁদের যতকিছুরই ট্রেনিং দেক তাতে রাজনৈতিক ট্রেনিং বা রাষ্ট্র-বিষয়ক কোন ট্রেনিং বা ধারণা তাদেরকে দেয় নাই। কারণ খোদ জাপানেই তো রাজনীতি বলে কিছু ছিল না। স্মরণ করেন, আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না। কারণ রাজতন্ত্রে এসব ধারণা বা শব্দ থাকে না। যে কারণে এখনকার সৌদি আরবেও রাজনীতি শব্দটা নাই। রাজনীতি শব্দ বা ধারণা থাকার পুর্বশর্ত হল যখন রাজতন্ত্রের বিপরীতে “জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস” – এধারণা প্রতিষ্ঠিত থাকে।

    পরবর্তিতে মাত্র তিন বছরের মধ্যে জাপানিদের ব্রিটিশদের কাছে হার স্বীকার করতে হয়েছিল। মূল কারণ ১৯৪৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান-জার্মান অক্ষশক্তির হার হয়েছিল। ফলে বার্মার ক্ষমতা আবার সেই ব্রিটিশদের হাতে ফিরে চলে যায়। আর তা থেকেই পরে ১৯৪৮ সালে অং সানের (তিনি ১৯৪৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন)বন্ধুরা ক্ষমতা নেন, বিশেষত ঐ ‘প্রমিন্যান্ট’ ৩০ জন।

    বিশেষ ত্রিশজনের পরিণতিঃ
    কিন্তু বার্মার শাসনে দুর্যোগের দিন শুরু হয় এখান থেকেই। মূলত এই ৩০ জন ভাগ হয়ে গেছিলেন মূলত কারা মূল সিভিলিয়ান রাজনীতিবিদ বা প্রশাসক হবেন আর কারা মূল আর্মি অফিসার হবেন – এভাবে। কিন্তু এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়- এ দুই দলের কারা শ্রেষ্ঠ অথবা কাদের ভূমিকা নির্ধারক, এসব নিয়ে। আসলে পেছনের ঘটনাটা আরেকটু ভিন্ন। জাপানি ট্রেনিংয়ে কখনোই রাজনৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। একই কারণে রাষ্ট্রক্ষমতার ও রাষ্ট্রগঠন সংক্রান্ত ধারণা দেয়া হয়নি। কারণ এসব বিষয়ে জাপানিরা নিজেদেরই ধারণা ছিল না। বরং উলটা, তাঁদের ধারণা বলতে সবই ছিল ক্ষমতার ধারণা; তাও আবার যেখানে ক্ষমতা মানে কেবল সামরিকতা। কিন্তু ক্ষমতার অর্থ তো দুইটা; সামরিক ক্ষমতা ও সাফাই বয়ান এর(নেরেটিভের) ক্ষমতা। রাষ্ট্রধারণা, জনগণ ক্ষমতার উৎস কেন বা জনপ্রতিনিধির ধারণা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো ধারণাই এদের ছিল না। এর উপর আবার বার্মা [রেস ও এথনিক অর্থে] প্রধান ৯টি জাতে বিভক্ত যাদের অন্তত তিনটি গোষ্ঠী ব্রিটিশ আমলেই স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করত। কিন্তু স্বাধীন বার্মার জেনারেলরা প্রথমেই তা কেড়ে নিয়েছিলেন। এখন এসব জাতিগোষ্ঠীকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে এ নিয়েও লাগে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এসব জটিলতার সমাধান হবে একমাত্র বল প্রয়োগে তা মনে করে, অং সানের আরেক বন্ধু নেউইন যিনি সামরিক জেনারেল ছিলেন, ১৯৬২ সালে সামরিক বলে ক্ষমতা দখল করার ঘোষণা দেন। অর্থাৎ সিভিল রাজনীতিক বনাম আর্মির ভাগ হয়ে থাকায় একে অপরকে অযোগ্য ব্যাপারটা বুঝে না মনে করা – এরই ভাব ও পরিণতিতে। সেই থেকে দেশের ক্ষমতা আর কখনোই সিভিল রাজনীতিকের হাতে আসেনি। আবার রাষ্ট্র রাজনীতি এই শব্দগুলোই বা কী, রাষ্ট্রগঠন কী জিনিষ তা জীবনেও আর জেনারেলেরা সহ বার্মিজ সমাজের জানা হয় নাই। ঐ “ত্রিশজন বীরের” গর্ব ও আবেগের নিচে সব চাপা পড়ে আটকে যায়। অথচ ঐ ত্রিশজনই ট্রেনিংয়ে রাষ্ট্র রাজনীতি ধারণাগুলোই কখনও শুনে নাই।

    তাহলে ২০০৮ সালে কনষ্টিটিউশন লেখার অর্থ তাতপর্য কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ‘মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র’ নয় বলে। কেন? মিয়ানমার অবশ্যই একটা ‘দেশ’। কিন্তু এই দেশের মালিক যেন একটা ‘ক্লাব’ এবং এটা একটা সামরিক ক্লাব।
    একটু বড় সেসব পিছনের গল্প। বার্মা একটা দেশ ওর শাসক আছে কিন্তু তা রাষ্ট্র নয়, মানে জনগণের রাষ্ট্র নয়।  অনবরত যে মূলত বার্মিজ বা বুদ্ধিষ্টদের বাদে অন্যান্য সব জাতিগোষ্ঠির উপর হত্যা নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বার্মার উপর পশ্চিমা দেশের তো বটেই জাতিসংঘেরও অবরোপ করা ছিল সেই আশির দশক থেকে। অর্থাৎ বার্মা ছিল একঘরে। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রিও নিষেধ ছিল। কিন্তু চীনের সাথে সীমান্ত আছে বলে অনেকটা চোরাচালানের ছলে বা বেনামে ব্যাপক পণ্যবিনিময় চলত। এটাই তার একমাত্র সীমান্তের বাইরে যাবার উপায় ছিল। চীনের সাথে এই সম্পর্ক আবার চীনের যখন ডাবল ডিজিট উত্থান সে যুগে বার্মার সাথেও বেড়ে উঠেছিল।

    সে সময়টা ছিল গ্লোবাল অর্থনীতিতে ২০০৮ সালের মন্দা আসার আগের বছর পর্যন্ত সময়কাল। তাই অর্থনীতি ভাল চলাতে কোন দেশের মাটির নিচের গ্যাস-তেল কে আগে কিনে নিতে বুকিং দিয়ে রাখতে পারে  এর প্রতিযোগিতা ছিল। আমাদের এদিকে চীন ও ভারতের মধ্যে। সেই সুত্রে বার্মার একটা খনির গ্যাস ভারত বুকিং দিতে কথা শুরু করেছিল। কিন্তু শর্ত ছিল  হুইলচার্জ দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে এই গ্যাস নেয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এই অনুমতি দিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করাতে ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতায় চীন ঐ গ্যাস কিনে ফেলার ডিল করে ফেলে। মূলত এরপর থেকে ভারত নতুন এক আইডিয়া নিয়ে একদিকে বার্মা অন্যদিকে মূলত আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সাথে মধ্যস্থতার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। ভারতের মূল পয়েন্ট ছিল অবরোধের সুফল অন্য সবাই বাদ যাচ্ছে, আর একচেটিয়া তা কেবল চীন খাচ্ছে। সুচি তখনও হাউজ এরেস্টে ছিল। তাই নামকা ওয়াস্তে হলেও যদি দেখানো যায় যে বার্মা একটা রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করেছে আর তাতে যে মূল ক্ষমতা তা আগের মতই বাহিনীর হাতে রেখে দিয়েও তাঁদেরই অধীনে কেবল সুচিকে কিছু ক্ষমতা দিয়ে তারা “গণতন্ত্র কায়েম” করেছে বলে যদি পশ্চিম সার্টিফিকেট দেয় তবে এই উসিলায় বার্মার সব অবরোধই পশ্চিম ও জাতিসংঘ তুলে নিতে পারে। এবার তখন আর একা চীন না, ভারত ও পশ্চিমারাও বিনিয়োগ পণ্য-পুজি বার্মার বাজারে রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ নিতে পারে। তবে এমন এই রফাতেও জেনারেলদের কথিত লোকদেখানো সংস্কার (যেটা রাষ্ট্র সংস্কার নয় মোটেও) করে নির্বাচন দিতেই ২০১০ সাল লেগে গিয়েছিল। আর তখনই কি কি ক্ষমতা জেনারেলেরা সুচিকে দিতে চায় এর হিসাব লিখে রাখতেই কথিত ‘কনষ্টিটিউশন সংস্কার’ করা হয়েছিল। ফলে এই সংস্কারে যে আজকের দশায় পড়বে তা সবাই জানলেও সবাই তা এড়িয়ে বার্মার বাজারে ঢুকতে ঝাপিয়ে পরেছিল। যেমন, বার্মায় মোবাইল ব্যবহারকারি ছিল মাত্র কয়েক পার্সেন্ট, সেটা এখন ৯২% । এভাবে যে যা পেরেছে খাবলে নিয়েছে এতদিন। ওদিকে ২০১০ সালের নির্বাচন এই কনষ্টিটিউশন ২০০৮ এর অধীনেই হয়েছিল। সুচি তখন মুক্ত কিন্তু বুঝাবুঝি অনুসারে নির্বাচনে অংশ নেয় নাই। আর আর্মি একাই অংশ নিয়েছে বেনামে, নিজেরাই একটা দল (ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি, USDP) খুলে নিয়েছিল। এভাবেই ক্ষমতায় ছিল। আর পরের ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি অংশ নিয়ে প্রধান নির্বাচিত দল হয়। কিন্তু তবু বাহিনী সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় নাই। কারণ কনষ্টিটিউশনে লেখা আছে সংসদের নিম্ন কক্ষে চার ভাগের এক ভাগ আসন ৪৪০/১১০, আর উচ্চকক্ষের ৩৩% আসন “ডিফেন্স সার্ভিস”কে দিতে হবে।  যেটা আবার সার্ভিস প্রধান ঠিক করে দিবেন কোন অফিসার সংসদ সদস্য হবে। এতেও শেষ হয় নাই। স্বরাষ্ট্র,প্রতিরক্ষা, সীমান্তরক্ষীসহ পাঁচ মন্ত্রীত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে আর সার্ভিস প্রধান এই নিয়োগ দিবে। আর সবার উপরে “ডিফেন্স সার্ভিস” প্রধানের থাকবে সবকিছুর উপর এক ভেটো ক্ষমতা।

    অর্থাৎ “ডিফেন্স সার্ভিস” এরাই আসলে বার্মা দেশের (সরি, রাষ্ট্র বলতে পারছি না) মূল মালিক, এটা এখানে বুঝা গেল। নাহলে ডিফেন্স চীফ কি করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দিবেন!

    বার্মার কনস্টিটিউশনে ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ কারা ও কীভাবেঃ
    মিয়ানমারে এখন তৃতীয় কনস্টিটিউশন চলছে। এর সর্বশেষটা রচিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।
    কনস্টিটিউশন ২০০৮ [এখানে পিডিএফ কপি পাবেন] এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, এই কনস্টিটিউশনের শুরুতে তৃতীয় পাতায় দ্বিতীয় প্যারাতে যে অনুচ্ছেদ, এর শিরোনাম ‘বেসিক প্রিন্সিপল’ [Basic Principles of the Union, p.3]। এর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে (এ থেকে এফ) এভাবে সাতটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। আর এর সর্বশেষ এফ বা সপ্তম উদ্দেশ্যই হলো, হাজার কথার এককথা। সপ্তম উদ্দেশ্য হল, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা” [Enabling Defence Services to be able to participate in the National Political leadership role of the State]।

    বলেছিলাম বার্মা রাষ্ট্র্র নয় একটা দেশ মাত্র। বলেছিলাম, রাজতন্ত্রিক দেশ দেশের ক্ষমতার উৎস জানাতে ব্যর্থ হবেই। অপরদিকে, রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়লে বলা সম্ভব, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ। সেটা যাই হোক, নির্বাচিতের বেলায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা হবেন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট। আর তার অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে। নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অধীনে থাকবে সামরিক বাহিনীসহ সব প্রতিষ্ঠান। এই হলো রিপাবলিক ক্ষমতার কাঠামোগত বিন্যাস। অথচ কনস্টিটিউশনের সপ্তম উদ্দেশ্য বলছে, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের “জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা”। অর্থাৎ এই বাক্য অর্থহীন ও স্ববিরোধী। “ডিফেন্স সার্ভিসের সদস্যরা” দেশের ‘রাজনৈতিক নেতা’ হয় কী করে?  আর এটাই নাকি ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনের উদ্দেশ্য?  কিভাবে?

    আবার এই ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে আমাদের মতো রাষ্ট্রকাঠামোর সেনাবাহিনী বলে বুঝা ভুল হবে। কারণ মিয়ানমারের বর্তমান কনস্টিটিউশনের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে একে সবার উপরের ক্ষমতার এক প্রতিষ্ঠান বলে যদি ধরে নেন তাহলে এরপর এর পুরোটার অর্থ স্পষ্ট হবে। এ জন্যই বলেছি, মিয়ানমারের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ একটা ক্লাবের মত; তবে সামরিক ক্লাব, যে আবার দেশের মালিক। আর ঠিক এ কারণেই মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্রের নাম নয়, রাষ্ট্র নয়।

    শেষকথাঃ
    বার্মায় পশ্চিমাদের ব্যবসা বাগানোর লোভে লোকদেখানো কারবারের নাম ‘গণতন্ত্র’। মানে কথিত যে বার্মার গণতান্ত্রিক সংস্কার’ এতদিন চলতে তা ফেল করল। এটাই ১ ফেব্রুয়ারির তাতপর্য। এর মানে হল ২০১৫ সালের নির্বাচন ছিল “ডিফেন্স সার্ভিস” ক্ষমতায় নিজের নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে সিভিলিয়ানদেরকে কতদুর ক্ষমতার ভাগ দিতে পারে, এরই পরীক্ষা। “ডিফেন্স সার্ভিস” এখন বলল যে সেই পরীক্ষা অচল, অসম্ভব। কারণ এবার ২০২০ সালের নভেম্বর নির্বাচনে সুচির দল আরও বেশি আসন দখল করেছে, প্রায় ৮৩% ভোট। এতে স্বভাবতই সুচি আরও বেশি ক্ষমতার হকদার হয়ে উঠত। তাই এবারের নতুন সংসদ বসার আগেই সিভিল রাজনীতিকদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। সুচি গ্রেফতার তো বটেই, দেশের প্রেসিডেন্টও ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি। আর্মি চীফ আরেক সাবেক আর্মি সদস্যকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন।

    কিন্তু তবু অনেক গণতন্ত্রী বার্মায় সেনাবিরোধী মিছিল সমাবেশ দেখে খুব উতসাহিত হচ্ছেন, আশার আলো দেখছেন। তাদেরকে বার্মার ইতিহাস পড়তে বলব। ঠিক এরকম নির্বাচন অনুষ্ঠান এর আগে ১৯৬০ সালের পর থেকে দুবার ঘটেছিল। দুবারই সিভিলিয়ানেরা প্রবল্ভাবে জিতেছিল। এবং ক্ষমতা পেতে প্রবল সভা সমাবেশ করেছিল। কিন্তু নির্বিচার গুলিতে সবাইকে দমিয়ে ফেলা হয়েছিল আর জীবিতদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখনও রাষ্ট্র-রাজনীতি-ক্ষমতা সম্পর্কে না-বুঝ লোকেদের বেলায় ভিন্ন কিছু হবে না। “গণতন্ত্র” দিয়ে রাষ্ট্রগঠন করা যায় না। বিশেষত যেখানে “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে সামরিক ক্লাব থাকে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মিয়ানমার একটা সামরিক ক্লাব” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  সাপ্তাহিক  “সাম্প্রতিক দেশকাল”  পত্রিকায় ১৬ ফেব্রুয়ারিতে  মিয়ানমারে কোন সামরিক ক্যু হয়নি” এই শিরোনামে আমারই আরেকটা লেখা ছাপা হয়েছিল।    পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাকে একসাথে করে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]