Author: goutamdas

  • বিগ-বি তে আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে না, ফলাফল? 

    এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ঢুকে পড়ার পথ দুইটা
    কিন্তু জাপান-ভারত-বাংলাদেশের কথিত বিগ-বি তে আমেরিকাকে দেখা যাচ্ছে না, ফলাফল?

    ০৯ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4qz

     

                                          The Big-B Initiative: Alive or Dead? 

     

    এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ঢুকে পড়ার এপর্যন্ত দুইটা পথ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এশিয়ায় আমেরিকাকে প্রবেশের বিশেষ পথ খুঁজতে শুরু করতে হল কেন ও তা কবে থেকে?
    যদিও গত শতক পর্যন্ত এশিয়া তো গতানুপতিকতা ভাবেই অ্যামেরিকান নেতৃত্বে বয়ে গেছিল।  চীনা উত্থান ঘটনার উল্লেখ করার মত কিছু ঘটে নাই, কোন চিহ্নও ছিল না। কেবল, ডাবল ডিজিটে চীনা জিডিপি বাড়ছিল যেটা বিগত ১৯৯০ সাল থেকে সেটা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন লক্ষণ ছিল না। এমনকি ২০০৮ সালের যে গ্লোবাল মহামন্দা [বাড়তি পড়তে আগ্রহিরা দেখতে পারেন The Great Recession and Its Aftermath] ; এটাকে আমেরিকা সরকারি ভার্সানের এক বয়ান মনে করা যেতে পারে। তারাও জেনেছিল যে এই মহামন্দার কেন্দ্রভুমি মূলত পশ্চিমা জগতেই; মানে এশিয়ায় এর প্রভাব তেমন দৃশ্যমান নয়। একমাত্র চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সেটা ১৯৯০ সাল থেকে এক নাগাড়ে ১৭-১৮ বছর চলার পরে সেই প্রথম ৮-৯% এভাবে ক্রমশ সিঙ্গেল ডিজিটের দিকে নামতে শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ গ্লোবাল ইকনমি (যেটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম) বলতে যেটা আমরা বুঝি সেটাও মাত্রার দিক থেকে তখনও তত গ্লোবাল হয়ে উঠে নাই – পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার আর এশিয়ার বাজারগুলো ততটা পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠে নাই – গভীর বাণিজ্য লেনদেনের সম্পর্কই এই পারস্পরিক নির্ভরশীল এক গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে উঠে, তা তখনও ছিল না।  কিন্তু এখন সেটা অনেক ইন্টিগ্রেটেড বা পরস্পর সম্পর্কিত। বিশেষ করে সারা এশিয়া দেশগুলোর বাজারে চীনা উপস্থিতি ও চীনের যায়গা করে নিয়েছে অনেকখানিই।
    প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ত্রিদেশীয় সফর ছিল মূলত ইমেজ তৈরির সফর, দেশের অর্থনৈতিক সংকট বিশেষত বৈদেশিক রিজার্ভের দৃষ্টিকটু ঘাটতি যা সাধারণ মানুষ পর্যায়ে তাদের জীবনেও অনুভুত হয়ে গেছে ভালভাবেই। অথচ আসন্ন নির্বাচন যেমনই হোক বা না হোক – সরকারের ইমেজের প্রশ্ন খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তাই তিনি রাজনৈতিক নুন্যতম অধিকার দিতে পারেন আর নাই পারেন সরকার “উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান” এই ইমেজ তৈরিই মূলত এসফরের লক্ষ্য ছিল।  সরকারের প্রায় ১৫ বছরের আয়ুতে কেবল ২০১৬ সালের পরেই (চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর সফর) সরকার উন্নয়ন করছে বলে মনোযোগ টানা শুরু করতে পেরেছিল। এর একদম খাড়া কারণটা হল অবকাঠামো ঋণ [ যেটা ইংরাজিতে – Infrastructure Development Loan বা  ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলবমেন্ট লোন-  এথেকেই বাংলায় উন্নয়ন শব্দটা এসেছে] এর দাতা ছিল একচেটিয়া বিশ্বব্যাংক। এটা বলাই বাহুল্য বিশ্বব্যাংকের লোন নিয়ে কোন দেশ “উন্নয়নের চ্যাম্পিয়ান” দাবি করে নাই, করা যায় না। এর মূল কারণ, আমাদের মত দেশ যাদের সকলেরই এমন বিশাল ঋণ চাহিদায় ভুগছে যেটার খুবই অল্প অংশই কেবল বিশ্বব্যাংক (এর নিজস্ব ফান্ড ক্যাপাসিটি) পূরণ করতে সক্ষম।  তাই ২০১৬ সালের আগে আমরা ছিলাম উন্নয়নের ঋণ পাবার দিক থেকে সাপ্রেসড বা চাপিয়ে রাখা দেশ। আর আরেক সবচেয়ে বড় অ্যামেরিকান বোকামির খেসারত দিয়েছে আমেরিকা। তারা ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছিল। এই অভিযোগ কতটা সঠিক বা বেঠিক আমরা জানতেই পারি নাই। তবে আমেরিকা যে অবিবেচক আনপ্রফেশনাল এটা একেবারেই প্রমাণিত। তারা দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করেছে  ভাল কথা কিন্তু বছর দুই ঘুরতেই নিজেরাই সে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তাহলে প্রধান প্রশ্ন অভিযোগ দায়ের কেন করেছিল? যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করেই? যারা এত কম চিন্তা করে কাজ করে তারা কী প্রফেশনাল??  এরপরে আরও বড় প্রশ্ন আছে।  চীন যে এই শতকে বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে অবকাঠামো ঋণ দানের সুযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠে আসছে – সেটা কী সারা অ্যামেরিকান প্রশাসন বা বিশ্বব্যাংকের পরিচালকেরা কেউ খেয়াল করে নাই?? বাংলাদেশের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক ঝুলে গেলে এটাই যে চীনের বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার সুযোগ হিশাবে হাতে এসে যাবে – এটা যে আমেরিকা বুঝেই নাই সেই আমেরিকা তো ডুবে মরবেই…। নাকি!!!
    তাই এটা একটা ক্লাসিক উদাহরণ যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনা উত্থানের সক্ষমতায় সে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবেই এবং ছাড়িয়ে গেছিল এর হাতে নাতে প্রমাণ। তাই এভাবে বলা যায় পুরানা নেতা আমেরিকার সাথে প্রতিযোগিতায় চীন সক্ষমতায় এগিয়ে যাওয়া চীন আমেরিকাকে পরাজিত করে নিজ প্রভাব বাড়িয়ে নিয়েছিল; আর আগিয়ে যাওয়ার সেটাই ছিল শুরু। বিপরীতে আমেরিকা পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে।

    আমেরিকা এশিয়ায় কতটুকু আগিয়েছেঃ
    বহু পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর একালে এশিয়ায় বাইডেনের আমেরিকার ইন্টারভেনশন বা হস্তক্ষেপ বা পদক্ষেপ নিয়ে ঢুকে পড়তে এখন শেষ পর্যন্ত দুটা পথ বা পাটাতন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও মনে রাখতে হবে এটা চীন-আমেরিকার মধ্যে এশিয়ায় কোন অবকাঠামো ঋণ দান করে নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়। চীন সেটাতেই নিজেকে আকড়ে ধরে থেকেছে  বটে কিন্এতু আমেরিকা  বহু আগেই এটাকে সামরিক ও স্ট্রাটেজিক দিক দিয়ে আগানোই তার পথ চুনেছে। যার সোজা মানে সে চীনের কাছে অবকাঠামো ঋণদানের প্রতিযোগিতার পথ ছেড়ে দিয়েছে – হার স্বীকার করে কেটে পড়েছে। তবে আমেরিকার অনুসৃত  সেই পথই এখন ফাইনালি ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি এই মুখ্য নামে আপাত থিতু হয়েছে। যদিও এটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে ওবামা্র এশিয়া পিভোট নামে। সেটা অনেক আগেই ব্যর্থ হলে পরে ট্রাম্পের আমলে পুরানা কোয়াড নামে আবার তা চালু করা হয়েছিল।  পরে তা অ্যামেরিকান বন্ধুদের মধ্যে কে কার কাছে সাবমেরিন বেচবে এসব তর্কাতর্কিতে পরে আর ওদিকে মাঝখান থেকে ভারতের কার্যত কোয়াড থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। মূল কারণ ভারত কোন সামরিক জোটে যেতে চায় না; কেবল চীনবিরোধী পলিটিক্যাল জোটে থাকাতেই তার স্বার্থ বলে মনে করে।  আরও পরে বাইডেন এসে সব ঝিমিয়ে পড়া দশাকে আবার চাঙ্গা করতে চায় তবে এবার এরই নাম হল ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যার খাস অর্থ হল কে কে চীনকে একঘরে করতে চাও (ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জাতিসংঘের ফোরামেও), বলো।  এটাই লেটেস্ট হয়ে খাড়িয়ে আছে। এই গেল বাইডেনের একটা প্রথম পথ   বা এশিয়ায় পা রাখার পাটাতন বা সম্পভাব্থয উপায়।

    তাহলে অপর পথ বা পাটাতনটা  কী?
    শিরোনা্মে আমরা সেটাকে বলতে পারি আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ। যার সবচেয়ে বড় সাফাই-অজুহাত হল এক মিলিয়ন এরও বেশি রাখাইন রোহিঙ্গা খেদিয়ে বাংলাদেশে তাদের মানবেতর জীবনে ফেলে দিয়েছে বার্মার জেনারেলেরা। কথা সত্য। নিঃসন্দেহে যা এক চরম মুসলমানবিদ্বেষী জাত-ঘৃণার প্রকাশ; এক হিটলারি এথনিক উদগ্র ঘৃণা ছড়ানির বেপরোয়া কাজ। আর এত নিচা পর্যায়ের কাজের নয়া-উস্কানি বার্মার জেনারেলেরা ভারত থেকে পেয়েছিল – সেকালে ২০০৭ সালের আগের একঘরে হয়ে থাকা বার্মাকে পশ্চিমের দুনিয়ার সাথে মুলাকাত – পশ্চিমের অবরোধ তুলে দেওয়া – একাজে পশ্চিমের এক এজেন্ট হিশাবে ভুমিকা রাখার সুযোগ নিয়ে ভারত এই পরামর্শ দিয়েছিল। ভারত আশ্বাস ও পরামর্শ দিয়েছিল জেনারেলদের যে এটাই ভাল সময়। ভারতের ক্যালকুলেশন সঠিক তবে তা বার্মার জন্য আত্মঘাতি ছিল। কারণ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়াতে এক নয়া বার্মা যেভাবে ২০০৮-১০ সাল থেকে উন্মেচিত হয়েছিল  ফলে বার্মার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য আর মাটির নিচের সম্পদ লুটে খাওয়ার এক নয়া বার্মা যেভাবে ২০০৮-১০ সাল থেকে উন্মেচিত হয়েছিল তা  চীন, ভারত আর আমেরিকাসহ পশ্চিমের কাছে তাতে কোনপক্ষই নিজের লোভ সামলাতে পারে নাই। তাই রোহিঙ্গা খেদানি কাজকে চীন, ভারত আর আমেরিকা সকলেই সমর্থন করেছিল। আর এর পক্ষে বার্মা বা আমেরিকাসহ সকলেরই  সাজানো বয়ান ছিল কথিত এক আরসা (ARSA) নাকি বার্মিজ সামরিক বাহিনীর উপরেই হামলা করেছিল আর তার পালটা হামলাতেই নাকি রোহিঙ্গাদের নির্মুল শুরু হয়েছিল। চীন, ভারত আর আমেরিকা এই সাফাই বয়ান সমর্থন করেছিল।
    এখন আমেরিকা গত কয়েক বছর হলো, সে অবস্থান বদলিয়েছে।  এখন সে রোহিঙ্গা খেদানোকেই প্রধান কারণ বানিয়ে এর প্রতিকার হিশাবে  বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর পরিকল্পনা করেছে।

    এমুহুর্তে আমেরিকার মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখছে কেনঃ
    এতক্ষণ পশ্চাত পটভুমি বর্ণনা করলাম। আর এতে আমরা দেখলাম আমেরিকার হাতে এখন দুটা খাতা  বা পথ খুলা আছে। তবে এদুইয়ের কোনটা নিয়ে আমেরিকা আগামিতে এশিয়ায় নিজ প্রভাব বিস্তারে আগাবে এহলো প্রশ্ন! যদিও এনিয়ে আমেরিকার মধ্যে কেউ কেউ দোনোমনো দেখছে কেন? যদিও এই পথের দ্বন্দ্ব বলতে এমন না যে বাইডেন দুই খাতার কোন একটাকে নিয়ে আগাবে!  বরং আগানোর পথ হিসাবে সে পথ দুটাকেই একসাথে ব্যবহার করতে পারে অবশ্যই। কিন্তু কোনটা ডমিনেটিং বা ফোকাসে আর কোনটা সেকান্ডারি হয়ে সহায়তার ভুমিকা নিবে – এনিয়ে বাইডেনের পরামর্শদাতাদের মধ্যে সাময়িক ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে এটাকে  দ্বিধাদ্বন্দ্ব বলে মনে করা ভুল হবে। আর এসব নিয়ে বাংলাদেশে যারা নিজেকে হাসিনাবিরোধি  মনে করে তাদের মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে একধরণের সাময়িক –  ঢাকার বাজার অন্তত কিছুটা হতাশা ও কৌতুহলে দেখছেন বলে দাবি করেছেন! জাপান সফর থেকে জাপান-বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছে আর পরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেলের কিছু বক্তব্যকে ভোয়া যেভাবে কায়দা করে হতাশব্যঞ্জকভাবে হাজির করেছে – তাতে এথেকে এসব তৈরি হতে পারে হয়ত।

    জাপানে দুই প্রধানমন্ত্রীর এক যৌথ ঘোষণার মূলকথা কীঃ
    যৌথ ঘোষণার মূলকথা কী – তা নিয়ে আমার বুঝ কী সেটাই সবার আগে বলে দিয়েই শুরু করা যাক। জাপান, (হাসিনার) বাংলাদেশ আর (মোদির) ভারত – এই তিনদেশ মিলে যদি একটা পথচলার জোট খাড়া করতে পারত তাহলে হয়ত সেই আলোকে এই যৌথ ঘোষণা কে একটা পারফেক্ট যৌথ ঘোষণা বলে মানা যেত। কিন্তু অসুবিধা হল যে এমন তিন নেতার তিনদেশীয় আকাঙ্খার সবচেয়ে বড় খামতিটা হল এদের এওই পরিকল্পনার আমেরিকাকে কোথাও দেখা যায় নাই। এশিয়ায় এমন যেকোন জোটের-কৌশল পরিকল্পনায় যদি আমেরিকা অনুপস্থিত থাকে তবে বুঝতে হবে এমন পর৮ইকল্পনার কোন ভবিষ্যতই নাই। তাতে যদি আমেরিকাকেও ভিতরে না রাখা যায় তবে অন্তত এনিমি হিশাবে বিপরীতে দেখাতেই হবে।  তবু আমেরিকাকে অনুপস্থিত বা উহ্য রেখে যেকোন পরিকল্পনা মাত্রই তা এক অলীক আকাশ-কুসুম বলেই আমাদের মানতে হবে। হতে বাধ্য।

    তাহলে জাপান ও বাংলাদেশের সাথে বিগ-ব [BIG-B] বলে প্ল্যান যেটা মোদি সাজাচ্ছে দেখেন এখানে [JAPAN AND THE BIG-B PLAN FOR BANGLADESH: AN ASSESSMENT] , এখানে বিগ-বি নিয়ে জাপানের জাইকার উদ্যোগ [The Initiative of BIG-B, JICA], অথবা এখানে চীন এবং  আমেরিকাকেও বাদ দিয়ে ভারতের এক “নয়া ওয়ার্ল্ড অর্ডার” এর স্বপ্ন-কল্পনা [“THE NEW WORLD ORDER” ]; অথবা এমনকি মোদির হিন্দুত্বের স্বরাজ্য ম্যাগাজিন যেভাবে এতে মোদির বিজয়  দেখছে –A Quiet Diplomatic Victory for India, Japan Against China in Bangladesh – এরকম যত কথা এখন উঠেছে এর সবই যেন নিশ্চিত বৃথা যাবার জন্যই অপেক্ষা করছে। বলা হচ্ছে BIG-B উদ্যোগটা নাকি ২০১৪ সালে শুরু হয়েছিল। তাহলে এতদিনেও এর কোন অগ্রগতি নাই কেন? কারণ, আমেরিকারকে উদ্যোক্তারা কী কোথায় রাখবে এর ভিতরে না বাইরে তা ঠিক করতে পারে নাই তাই??? আর আমেরিকা এতে রাজি হবে কেন এসব প্রসঙ্গ-গুলো নিয়ে কথা আগাতে ভারত ও জাপান উভয়েরই দ্বিধা অস্বস্তি আছে তা তো বলাই বাহুল্য! মোদি এখন একালে একেবারেই চাইবে না এতে আমেরিকা কোনভাবেই যুক্ত হোক বা তার ছায়া কোথাও থাকুক। আবার বিপরীতে বাইডেন এর অবস্থাও তাই!

    এছাড়া এখন এটা কে না জানে যে, বাইডেনের বার্মা দখল প্রকল্পে সে সরাসরি মোদির ভারত এবং চীনেরও বিরোধী। আর এমনিতেই আগামি ২০২৪ সালের ভারতের  আগামি নির্বাচনে বাইডেনের বাজি হল সে মোদিকে উতখাত আর রাহুলকে ক্ষমতাসীন দেখতে চায়। তাই আইন বাঁচিয়ে যতটুকু যা করা যায় এর সবটুকুই করতে শুরু করেছেন বাইডেন। তাহলে মোদির ভারত আর বাংলাদেশ-কে সাথে নিয়ে জাপানের ত্রিদেশীয় খায়েশ এর তো কোন ভবিষ্যতই নাই!!!!  আসলে এককথায়, যেখানে আমেরিকা নাই অথচ জাপান-মোদির ভারত আর হাসিনার বাংলাদেশ – এমন ত্রিদেশীয় কোন পরিকল্পনা আছে এখন তাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে জাপানি বিনিয়োগ হানতেন ইত্যাদি যাই দেখানো হোক না কেন এসবকিছুর ভবিষ্যত শুণ্য!!  এসব অবাস্তব ও অলীক সব কল্পনা হয়েই থাকবে – যেভাবে ২০১৪ সাল থেকে এই উদ্যোগটা কেবল টিকেই আছে!
    এছাড়া আমরা যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির এনিমি ও হেরে যাওয়া জাপানের কথা মনে রাখি তবে কিছু কথা আমরা হাতে গুনে মনে রাখতে পারি যে যুদ্ধের পর থেকে জাপানি পররাষ্ট্রনীতি অ্যামেরিকান পররাষ্ট্রনীতিরই অনুগত হয়ে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর এই প্রতিশ্রুতির কারণ হল –  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পক্ষ নেয়া ও হেরে যাওয়া সত্বেও জাপানের পুণর্বাসনে ও পুনর্গঠনে সমস্ত বিনিয়োগ আমেরিকাই দিয়েছিল। কাজেই  Initiative of BIG-B   এটা যতই উচ্চে তুলে সম্ভাবনাময় হিশাবে দেখানো হোক না কেন  অ্যামেরিকান স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে বা বাইরে জাপান যেতে পারবে না; কিছুই করতে পারবে না।

    কেন Initiative of BIG-B এর ভবিষত নাই এর দ্বিতীয় আরেক কারণঃ
    এই উদ্যোগটা আসলে মূলত গভীরভাবে নিজেদের চীনবিরোধী মনে করে তাদের আগ্রহে তৈরি হওয়া উদ্যোগ। সে হিশাবে এটাক ভারত ও জাপানের উদ্যোগ; কিন্তু তাহলে এর ভিতর বাংলাদেশ কেন?  কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা এটা প্রথমে চীনা নেতৃত্ব আরেক উদ্যোগ আগে তৈরি হয়ে যাবার পরে এরই নকল এক উদ্যোগ মাত্র। চীনা সেই উদ্যোগের নাম RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership] । এটা আশিয়ান [ASEAN] জোটের গর্ভ থেকে প্রথম প্রস্তাবিত হয়েছিল ২০১১ সালে। মজার কথা হল চীনা নেতৃত্বের RCEP তৈরি হলেও  এখানে জাপানও সদস্য হয়ে আছে।  মূলত আশিয়ান দশটা দেশই ভারি এরা দশটা দেশ আর এদের সাথে  জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন – এভাবে এরা সবাই মিলে এটা একটা Free trade agreement (FTA) এর বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্ত। এটা গত বছর ২০২২ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে সক্রিয় ততপরতায় চলে গেছে; জার্কাতা এর হেড কোয়ার্টার। কিন্তু  এর চেয়েও বেশি ইম্পর্টেন্ট তথ্যটা হল এটা মূলত শেয়ার্ড ভ্যালু চেন [shared value Chain] – ভিত্তিতে এক উতপাদন ব্যবস্থায় সদস্যরা সকলে যুক্ত হবে – যেখানে যেকোন একটা পণ্য নির্মাণে সদস্য সকল দেশের শ্রম যুক্ত করে [শ্রম যোগ করা মানে ভ্যালু এড করা] নির্মিত হবে আর সদস্য সকলেই ঐ পণ্যের ক্রেতা ব্যবহারকারি-ভোক্তা হবে। এটাই দুনিয়ার লেটেস্ট অর্থনৈতিক জোটবদ্ধতার এক নয়া ধারা যা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে অবশ্যই ।  আর এর সদস্য হতে গেলে প্রধান শর্ত হল আপনার নিজ দেশে বিদেশি পণ্য আমদানিতে যে শুল্ক ব্যবস্থা বজায় আছে তাতে গড়ে শুল্ক হার  ৮-১০% এরও নিচে হতেই হবে। এটা আশিয়ান জোটের সদস্যপদ পাবার ক্ষেত্রেও শর্ত।

    কিন্তু তাতে কী?
    তাতেই এটা ভারতের পক্ষে এসব শর্তপূরণ একেবারেই অসম্ভব। কেন?

    আসলে কোন উগ্র জাতিবাদি বিশেষ করে যাদের জাতিবাদ এক অর্থনৈতিক জাতিবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত তেমন ধারায় বিরাজ করে ভারত। এমনিতেই ভারত জন্ম থেকেই এক উগ্র-জাতিবাদি অর্থনৈতিক দেশ। আর একালে মোদির উগ্রজাতি-বোধের হাতে পড়েছে এটা আরও মারাত্মক দিক। ঠিক এই অর্থনৈতিক উগ্র-জাতিবাদ অবশ্য ব্যবহারিক কমিউনিস্ট বা স্তালিনিস্টদের মধ্যেও  গেথে থাকা একই ধারণা।  এরা মনে করে দেশের মানুষ যা কিছুর ভোক্তা বা সেবা নিবে এমন সকল পণ্যই দেশে তৈরি হতে হবে। একারণের জাতিবাদি ও কমিউনিস্টেরা কার্যত বাণিজ্য-বিরোধী। এমনিতেই নেহেরুর হাতে গড়ে উঠা ভারত অন্যের পণ্য তো কিনবেই না – এমন কঠোর নীতিতে বিশ্বাসী; আর এর উপর আবার এক কলোনিদখল মানসিকতাও তারা ক্রেডিট হিশাবে দেখে থাকে। সেটা এমন যে পারলে ছলেবলে অন্য দেশের বাজার দখল করবে আর এজন্য চাপ দিয়ে বা বেকায়দায় ফেলে হলেও এটা তারা জায়েজ মনে করে। একারণেই নেহেরুর সেই নীতি একালে এখনও ধরে রেখে চলছে মোদি।
    আরেকটা তথ্য দেই তাহলে অনেক কিছু পরিস্কার হবে।
    RCEPএর জন্মের প্রস্তাব যখন তুঙ্গে তখন কথা উঠেছিল মোদির ভারত কেন তাতে যোগ দিবে না?  স্বভাবতই মোদি ও তার পররাষ্ট্র নেতা জয়শঙ্কর জানিয়েছিলেন এসব উদ্যোগ ভারতের জন্য নয়। আসলে ভারতকে ত অন্যের পণ্য ঠেকাতে ট্যাক্স বেশি ধরতে হবে বা ডাম্পিং করতে হবে। যেমন আমাদের পাটের উপর এখন এমন ট্যাক্স আরোপ করে, আমাদের রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছে। তাহলে আমরা ভারতের পণ্য আমদানি করব কেন? এই প্রশ্নের জবাব তারা দিবে না বুঝাতে চাইবে তারা বড় ভাই। এনিয়ে আমার পুরানা লেখা একটু পরে খোজ করে দিচ্ছি।
    এমন পুরানা লেখার শিরোনাম ও লিঙ্ক এখানেঃ
    ১।    আরসিইপিঃ দুনিয়ায় নতুন সম্পর্ক আনার সম্ভাবনা

    ২। যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    আর ঠিক একই প্রস্তাব বাংলাদেশকেও দেয়া হয়েছিল। কিছুদিন পরে বাংলাদেশ আশিয়ান সদস্য হবার জন্য আবেদনও করে রেখেছে।

    তাহলে এখন এটা সবার কাছেই পরিস্কার হয়ে যাবার কথা যে ভারত দুনিয়ার কোন দেশের সাথেই অর্থনৈতিক জোট গড়বার যোগ্য নয়। তাতে সেটা সার্ক বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন!
    অতএব, এত ঘটা করে তাহলে RCEP  এর বিকল্প হিশাবে  Initiative of BIG-B  নিয়ে এত গল্প আর এই জাপান-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণার কী আর কোন অর্থ আছে? এক নিজ নিজ দেশের পাবলিককে বোকা বানানোর প্রপাগান্ডা ছাড়া…।।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
     

     

     

  • আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!

    আজ সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে!
    গৌতম দাস

    ০৫ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4pZ

     

     

     

    সেই ৫ মে, আবার ফিরে এসেছে! আজ ৫ এর ২০১৩ এর দশম বার্ষিকী!
    অনেকে যেটাকে শাহবাগ বনাম শাপলা, অথবা শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলার সমাবেশ বলে।
    জমিদার হিন্দুর জমিদারি বন্দোবস্ত ব্যবস্থা ১৯৫১ সালে উচ্ছেদ হয়ে গেলে একারণে, জমিদার হিন্দুর রাজনৈতিক ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে গেলেও এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক [Cultural] প্রভাব থেকেই যায়।
    সেই কালচারাল প্রভাব – যা মূলত ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান ঘৃণা চর্চার এক ভরপুর আধার – প্রগতিশীলতার নামে গড়ে উঠা শাহবাগের ততপরতার বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধের দিন!

    বৃটিশ আমলে জমিদারি হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর জমিদারি আইনের পরে মোটামুটি ১৮০০ সাল থেকে ক্রমাগত রাজত্ব করতে উঠে চলেছিল। এর বিরুদ্ধেই প্রথম সবল ধাক্কা ও আমাদের বিজয় হল ১৯৪৭ সালের আগষ্টে্র ভারতভাগ নামে যা পরিচিত যার অপর নাম পাকিস্তান কায়েমে সফল হওয়া।  পাকিস্তান কায়েমের অনেক অর্থ তাতপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নেতি ব্যাখ্যাও আছে দেখা যায়। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থ তাতপর্য হল, পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল – মানে কোন আপোষ হয় নাই বলেই দেশ ভাগ হয়ে গেছিল। আর তা হয়েছিল বলেই এরপরে সহজেই জমিদারিব্যবস্থা উচ্ছেদ সম্ভব হয়েছিল।
    এই ধারাবাহিকতায় ১৬ মে ১৯৫১ সালে আইনগতভাবে জমিদারি আইন উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছিল। আইনি ভাষায় যা “পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০” নামে পরিচিত দেখুন বাংলাপিডিয়াতে । আইনটা ইংরাজিতে দেখতে এখানে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act 1950 ক্লিক করেন।  পাকিস্তান কায়েমের ফলে এভাবে সবচেয়ে বড় অর্জন হল পুর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে বসে এই জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাস করতে সক্ষম হওয়া। তাতে কমিউনিস্টেরা যতই জোরগলায় মিথ্যা-ব্যাখ্যায় বলুক না কেন যে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম করেই নাকি পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল।
    অথচ তারা স্বীকার করতে চায় না যে এই একই পাপ করার রাস্তা তো কংগ্রেসই আমাদের দেখিয়েছিল; যেটা কমিউনিস্টেরা চেপে যায়।  কংগ্রেস কী আমাদেরও আগে একই কাজ করে নাই?  আর আমাদেরও একই পথে যেতে বাধ্য করে নাই? তাঁরাই কী ১৮৮৫ সালে ধর্মের ভিত্তিতেই এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ভারত কায়েম করতে – “কংগ্রেস” [যার ফর্মাল নাম “ইন্ডিয়ান জাতীয় কংগ্রেস”] নামে দলের জন্ম দেয় নাই!  আর আমাদেরকে সেই উপেক্ষা থেকেই কী ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয় নাই!!! তবে পাকিস্তান কায়েমে যতটুকু যা আমাদের ভুল [যেমন ধর্ম, ভাষা বা যেকোন ভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভুল] ছিল তাতে কংগ্রেসের ভারত কায়েমেও ততধিক ভূল। আর সেক্ষেত্রে মোদির হিন্দুত্ববাদের বিজেপির ভারত? তাকে কী বলবেন? এক্ষেত্রে প্রগতিবাদীরা বাকশুণ্য, কেন?  এটাকেই তো নিরেট ইসলামবিদ্বেষ আর দগদগে মুসলমান ঘৃণা বলছি!  জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল গতবছর অক্টোবরে আন্তোনিও গুতেরেজ ভারতে  এসে কঠোর ভাষায় প্রকাশ্যে ভারতের মুসলমান-ঘৃণা চর্চার বিরুদ্ধে সমালোচনা আর সাবধান করে গেলেন। প্রতিক্রিয়ায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছিল নিজেই এক মামলা ডেকে নিয়ে। অথচ এখন বিকার নাই।  কিন্তু এখন কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি? দ্যা কেরালা স্টোরি নামে বিদ্বেষমূলক ও মনগড়া কাহিনীতে গড়া সিনেমা রিলিজের বিরুদ্ধে বাধা দিতে সুপ্রিম কোর্ট ও কেরালা হাইকোর্ট নিঃশ্চুপ। তারা এখন সিনেমা বানানোর খরচ  যেন ঠিক মত উঠে আসে তোলা হয় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।  কোর্ট আসলে বলছে সিনেমার বাজার ঠিক করবে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে কিনা। ‘Market will decide’ — SC, Madras HC refuse to stay release of ‘The Kerala Story’ অথবা বলতে চাইছে,  নির্বাচনের আগে মুসলমানবিরোধী হিংসা বিদ্বেষ এর ঝড় তুললে কোনই অসুবিধা নাই!

    নিজেকে কমিউনিস্ট বলে দাবি করতে এদের ভাল লাগে মানে, যেটা লতিফ সিদ্দিকীর ভাষায় “কমিউনিস্ট মাড়ানি” তা এদের হতে খুব ভাল লাগে; অথচ জমিদার শ্রেণীকে উচ্ছেদের বিরোধীতা করা এরা কোন কমিউনিস্ট???  বাংলাদেশে এরাই বা এটাই প্রগতিশীলতা!!! এনিয়ে আমার আগের দুপর্বে লেখা আগ্রহিরা পড়তে পারেন।

     নুন্যতম অর্থনীতি জ্ঞান থাকলে এরা বুঝত জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ ছাড়া কোন দেশের অর্থনীতি গড়া, ভিত্তি স্থাপন সম্ভব নয়।  এবং সেটা অবশ্যই ক্যাপিটালিজমের প্রথম পদক্ষেপ। তাতে এই ক্যাপিটালিজম বলতে যেকোন ধরণের ক্যাপিটালিজমই হোক না কেন! তাতে কমিউনিস্টদের পছন্দের রাষ্ট্রীয় ক্যাপিটালিজম [State Capitalism; যেটাকে তারা সমাজতন্ত্র নামে ডাকে] সেটা হোক অথবা মালিকানা ভিত্তিক স্বাভাবিক ক্যাপিটালিজম – যেটাই বুঝেন না কেন – বটম লাইন হল, যে পথেই যান  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ আপনাকে করতেই হবে এটাই হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশে নিজ অর্থনীতি সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ। সমাজের সবাইকে কাজের সংস্থান দিবার মত একটা অর্থনীতি চাইলে আপনাকে  জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ থেকে শুরু করতে হবে। অথচ জমিদার হিন্দুর স্বার্থ হল ঠিক এরই বিরুদ্ধে; তারা এর ঘোরতর বিরোধী। আর এই জমিদার হিন্দুর কায়েমিস্বার্থ ও আধিপত্যের সমাজ ও চিন্তাকেই প্রগতিশীলতা বলে এক কমিউনিস্ট রাজনীতি বাংলায় যাত্রা শুরু করেছিল। কেন জমিদারি উচ্ছেদ বাংলাদেশের  অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি গড়ার জন্য জরুরি ছিল তা জানতে প্রিয়া সাহা ইস্যুতে আমার পুরানা দুপর্বে লেখা এখানে  দেখতে পারেন। এতে বুঝা যাবে কেন কোন কৃষি সংস্কার মানে জমিদার মালিকানা  এই মালিকানার ধরণ উচ্ছেদ না করলে কোন শিল্পায়ন গড়ে উঠবে না। সকলকে কাজ দিবার মত অর্থনীতি হবে না।

    অথচ কমিউনিস্টেরা নাকি মুখ্যত শ্রেণী সংগ্রামের রাজনীতি করেন বলে দাবি করেন। তাহলে জমিদার হিন্দুর জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার কাজ কিভাবে কমিউনিস্টদের প্রগতিশীলতা হয়??? এই জমিদার হিন্দু একই সাথে তাল দিয়ে প্রজা-হিন্দুদেরও কালচারালি তাদের স্বার্থপক্ষ হতে বুঝিয়ে নিজ জমিদারি স্বার্থের পক্ষে সামিল করেছিল। এর ফলাফলে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রাও জমিদার হিন্দুর  (যা কার্যত জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার) পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। জমিদারি মালিকানা নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধাচারণকে সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দু্রা হিন্দু-বিরোধিতা জ্ঞান করত।  এটা ছিল আসলে,  প্রজা-মুসলমানদের উপর প্রজা-হিন্দুদেরকে কালচারাল শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া ও এই জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনা মাথায় ঢুকানোতে প্রজা-হিন্দুরাও কালচারালি  জমিদার হিন্দুর  জমিদারিব্যবস্থা রক্ষার পক্ষে লাঠিয়াল হয়ে যায়। আগ্রহীরা আরো পড়ে দেখতে পারেন আমারই ২০১৬ সালে লেখা – হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ। 

    এরই পরিণতি হল, দেশভাগের পরে মূলত ১৯৫০ সালের পরে দেশত্যাগের কালে  প্রজা-হিন্দুরা পুর্ব-পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) থেকে যেতে পারে নাই। সামাজিক এনিমিটি আগেই তৈরি হয়ে গেছিল। কারণ বহু আগেই তারা প্রজা-মুসলমানেদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন [alien] মানে এক সামাজিক বিচ্ছিন্নতা রচনা করে ফেলেছিল।   জমিদার হিন্দুর স্বার্থ আর সাধারণ হিন্দু বা প্রজা-হিন্দুর স্বার্থ যেনবা এক এই হুদাই ভাবনায় এমন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো লাঠিয়াল-গিরিতে তারা দেখিয়ে ফেলেছিল তারা যেন জমিদার স্বার্থেরই লোক – এমন মনোভাব আগ থেকেই বলে ও ভেবে ফেলার জন্য বাংলাদেশে তারা থেকে যেতে পারে নাই।

    সবচেয়ে বড় কথা জমিদারি উচ্ছেদ আইনে তো  কেবল প্রজা-মুসলমানদেরকেই  নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমির মালিক করে দেওয়া হয় নাই। বা ঐ আইনে কেবল মুসলমানেরাই সুবিধা পাবে, হিন্দুরা নয় একথা বলে তো লেখা নাই। সকল প্রজাই এই সুবিধা পেয়েছে বা পাবার যোগ্য ছিল। কাজেই হিন্দু-প্রজারাও একই সুযোগে  ‘নয়াভাবে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে’ জমির মালিক হয়েছে। তবু কালচারালি তারা জমিদার হিন্দুর সাথে সংযুক্ত বা এটাচড [Cultural attachment] – এই বোধের কারণে এটা ক্রমশ তাদের জন্য দেশত্যাগই একমাত্র সত্য ও পরিণতিতে নিয়ে গেছে। এরই কাফফারা বা খেসারত হিশাবে বাংলাদেশের হিন্দুরা এখন ভিকটিম-হুড বা সংখ্যালঘু ইত্যাদি যা পায় সে বয়ান আকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করে চলছে আজও।

    তবে এখানে আমাদের সকলেরই কিছু গুরুত্বপুর্ণ করণীয় আছে। পুরানা প্রজা-হিন্দু ভুল করেছে বলে আমরা এখন তাদের প্রতি কোন বিদ্বেষ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারিনা। তাতে তাঁরা একালে হিন্দুত্ববাদে উতসাহিত হোক কিংবা মোদির কোলে উঠে তাঁকেই ত্রাতা মনে করুক না কেন; আমাদের কাজ কর্তব্য আমাদের করে রাখতে হবে। তা হল, ধর্ম-নির্বিশেষে বা এমনকি শাঁওতাল বা পাহাড়ি ট্রাইব বা উপজাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকই একই এবং সমান অধিকারের নাগরিক এই ভিত্তিতে ব্যবহারিক রাষ্ট্র তাড় আইন প্রয়োগ ও চর্চায় তা বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রতিফলিত করতে হবে। এমন একটা ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে যেতে হবে। এ’দায় আমাদের সকলের; তাতে পুরানা বিবাদে আমাদের অবস্থান ভিন্নতা যাই থাক। তবেই একটা নয়া বাংলাদেশের স্থিতিশীল সমাজ আমরা পাব।  পুরানা কোন বিবাদ-বৈষম্য জিইয়ে রাখলে এটাই আগামিতে নানা দিকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হবে।  এটাই সম-সুযোগের [Equal Opportunity], সকলকে নিয়ে [inclusive] এক বাংলাদেশ গড়ার শেষ সুযোগ – যা আমরা যেকোন মূল্যেই হারাতে পারি না।

    তাহলে আজ ৫ মে এর তাতপর্য কী?
    এদিন থেকেই আমাদের বুঝতে আর বাকি থাকে নাই প্রগতিশীলতা ও তাদের কথিত সেকুলারিজম আর কমিউনিজম কী জিনিষ। শাহবাগ আমাদের চিনিয়েছে প্রগতিশীলতা আর কমিনিজম এর নামের আড়ালে এটা ইসলামবিদ্বেষ আর মূসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর পরিকল্পিত কাজ। যা আমরা হয়ত আগে তত খেয়াল করি নাই। এটাই জমিদার হিন্দুর অসমাপ্ত আধিপত্যকে কালচারাল মোড়কের আড়ালে আবার প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ। এটাই একালে ভারতের রাজনৈতিক ও কালচারাল আধিপত্য যেটাকে বাংলাদেশের উপর আবার জেঁকে বসানোর আমেরিকার সহায়তার নয়া উদ্যোগ। তাই ৫মে এর প্রতিরোধ ছিল এর সম্মিলিত বিরোধিতার দিন, একে সমূলে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টা – এই আত্ম-সচেতনতার দিন!
    জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থকে বিশেষত এর রাজনৈতিক দিকটাকে আমরা উতখাত করতে পেরেছিলাম পাকিস্তান আমলে, বিশেষ করে ১৯৫১ সালে। কিন্তু প্রগতিশীলতার নামে কমিউনিজমের নামের আড়ালে এর সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ও আধিপত্য আমাদের সমাজের উচ্চ-অংশ ও শিক্ষিত অংশের মধ্যে কালচারালি টিকেই ছিল, এখনও আছে। আর এভাবেই জমিদার হিন্দুর উত্থান ও আধিপত্য ও স্বার্থ সব বিনষ্ট হয়ে গেলেও এটা কালচারালি-সাংস্কৃতিকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছে।

    আর এর বিরুদ্ধে প্রথম সফল ও সদর্প প্রতিবাদ ছিল শাপলা সমাবেশ। শাহবাগের বিরুদ্ধে শাপলা সফল কালচারাল প্রতিবাদ। এখান থেকেই আমরা প্রথম টের পাই এখনও আমাদের অসম্পুর্ণ কাজ কী এবং আমাদের অর্জন কী কী ছিল।
    এখন এর মূলনীতিটাকে এভাবে হয়ত বলা যায়, বাঙালি মুসলমান স্বাধীন। ১৯৭১ সালেও সে বাংলাদেশি হিন্দুর সাথে মিলে নয়া রিপাবলিক গড়েছে। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে। কিন্তু কোনভাবেই এর অর্থ এমন নয় যে এখন বাঙালি মুসলমানকে (এবং সেই অর্থে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিকেও)  কলকাতার বাঙালিকে অনুসরণ করে বাঙালি হতে হবে বা বাঙালিত্ব শিখতে হবে; ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলমান-ঘৃণা করতে শিখতে হবে।

    বাঙালি মুসলমান কেউ চাইলে মর্ডান জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে চাইলে হতেই পারে। কিন্তু কলকাতা এখানে বাঙালির মুসলমানের (বা সেই অর্থে বাঙালি হিন্দুরও) মডেল (কথিত সেকুলার বা ইসলামবিদ্বেষী) হতে পারবে না। এখানে সচেতনতা লাগবে।  এই নয়া সচেতনতা নিয়ে সামনে আগালে নয়া রাষ্ট্র-রিপাবলিকে ইসলামি-ওরিয়েন্টেড মানুষ [যাদেরকে সাধারণভাবে অনেকে ইসলামিস্ট বলে থাকে ]  এরাও মর্ডান বাঙালি মুসলমানকেও জায়গা করে দিবে।   বলাই বাহুল্য শর্ত একটাই যে সে কলকাতা-অনুসারি বাংলাদেশি মুসলমান বা ঘৃণা-বিদ্বেষী বাঙালিয়ানার চর্চা করবে না। এককথায়, কলকাতায় গড়ে উঠা বাঙালি কালচারাল চোখ ও অভ্যাসকে আমাদের সীমানার বাইরে রেখে আসতে হবে। তাতে কলকাতার প্রতি আমাদের কোন বিদ্বেষ নাই, তারা তাদের কালচার নিয়ে ভাল থাকুক, যা হতে চায় হোক। মোদির হিন্দুত্ববাদকে নিয়ে যা করতে চায় করবে। আমাদের বলার নাই। কেবল মনে রাখতে হবে তারা আমাদের অনুসরণীয় বাতিঘর নয়! তাদের “বিদ্যাসাগরেরা” কেবল তাদেরই থাকুক!

    ৫মে এর আত্মত্যাগ যেন ভুলে না যাই!  এর তাতপর্য আমাদের মধ্যে জিন্দা থাকুক! আরও বিকশিত, উদ্ভাসিত হোক!

    last Edit – 06:35am 06 May 2023


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি

    হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি
    গৌতম দাস

    ০২ মে ২০২৩  মধ্যরাত ০০ঃ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4oK

     

    United Communist League of Bangla Desh

    দেশে না জেনে আন্দাজের উপর কথা বলা লোকের সংখ্যা বাড়তেছে। গত ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ত্রিদেশীয় জাপান-আমেরিকা-যুক্তরাজ্য সফর শুরু করেছিলেন। আর এরপরেই ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় সিপিবি-র এক জ্ঞানী বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি পরের দিনও তাদেরই “বাম গণতান্ত্রিক জোট” একই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছিল। সরকারকে অভিযুক্ত করার ভাবে তেমনই টোনে এসব বিবৃতি। যেমন সিপিবির বিবৃতির শিরোনাম – ‘প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে যেন জাতীয় নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়া না হয়: সিপিবি’। আর জোটের বিবৃতির শিরোনাম – ‘তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি প্রকাশ করার দাবি’।
    যারা এতদিন মানে, কম করে ধরলে গত পনেরো বছর ধরে ‘সরকারের বিকল্প দেখে নাই’ তারা আজ হঠাত এত কড়া অভিযোগে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে – এটা কেন?  তার মানে, বামেরা কী মনে করে সরকারের কী তবে আয়ু শেষ? তাই বিপ্লবীপনায় ফিরে যেতেই…!  সম্ভবত একারণেই, সবার আগে বামেরা তাই হাসিনার দায়দায়িত্ব আর এতদিনের সমর্থন ও ঘষাঘষি সম্পর্ক এখন থেকে  মুখে অস্বীকার করে ডিস্ট্যান্স তৈরি করে দূরে দাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে মনে হচ্ছে!

    তাই দেশে এখন একটা “হালকা, আবছার উপর ঝাপসা মারা বিবৃতি” ও তা নিয়ে পত্রিকা রিপোর্ট করা শুরু হয়েছে; যে ঘটনার  শুরু প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাপান সফর থেকে, সফর শুরুর দিন থেকে। সেদিন আবার দৈনিক যুগান্তরেও একটা খবর ছাপা হয়েছিল যার শিরোনাম, “গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে”। একইদিনে মাদারবাড়িতে জাপানের গভীর বন্দর নির্মাণ আর ভারতকে চট্টগ্রামের পরে এবার মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার রাজস্ব বিভাগের খুটিনাটির নির্দেশ জারি এবং বাংলাদেশেরও আগে ভারত প্রায়োরিটিতে যেন বন্দর ব্যবহার করতে পারে ইত্যাদি এসব বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আর তা থেকে বাম-বিপ্লবীপনার জোয়ার ছড়িয়ে পরা শুরু হয়েছে। যা অন্যান্যদের রাজনীতিকেও বিভ্রান্ত-প্রভাবিত করেছে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, মনিষীরা বলে গেছেন – বিভ্রান্তিই ছোঁয়াচে রোগের মত যা সহজেই ছড়িয়ে পরে; তুলনায় যা ‘জ্ঞানবুদ্ধির’ কথা তা সুস্বাস্থের মত। মানে যা ছোঁয়াচে নয় বলে মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ানো যায় না। আর তাতে বর্তমান রাজনৈতিক জ্ঞানগম্যি-তথ্য-পরিস্থিতি বুঝতে সবাই ছুটছে “তেল-গ্যাসের মধ্যে’।

    মানুষ মানে কী কেবল অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান? তাহলে রাজনৈতিকতা কীঃ
    কমিউনিস্টেরা আজও – রাজনীতি- এই শব্দের অর্থ আমল করতে চাইলো / পারলো না। মানুষের বৈষয়িক স্বার্থ আর রাজনৈতিক স্বার্থ যে দুটা আলাদা জিনিষ ও আলাদা চাহিদা তা তারা হদিশ জানলো না। মানুষের কেবল তাঁর তনু বা দেহ বাঁচায় রাখলেই, কেবল এতেই সতুষ্ট থাকলেই চলে না। প্রাণ শুধু জৈবিক না – এর স্পিরিচুয়ালিটি বা রাজনৈতিক দিকের মত বহু আরও দিকে এর উন্মেষ দরকার হয়। অথচ এরা মানুষকে কেবল বৈষয়িকতায় সীমাবদ্ধ [reduced] করে রাখতে চায়, এভাবে কল্পনা করতে চায়। অথচ আমাদের শুধু অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব বৈষয়িক চাহিদার দিক পূরণ হলেও মানুষের একেবারেই চলে না। কারণ, এসব ছাড়াও মানুষ তো অন্তত রাজনৈতিক মানুষ!  বৈষয়িকতা ছাড়িয়েও যে মানুষ আছে তাঁর  আরও যেসব চাহিদা আছে তা কমিউনিস্টেরা কখনও বুঝতে চাইলো না। আর এরই পরিণতি হল একালে; যেমন, তাঁর রাষ্ট্র কী তাকে গুম-খুন-অপহরণ ইত্যাদি করতে পারবে? রাষ্ট্রে জায়েজ আছে, থাকবে? কথিত শ্রেণী শাসনের একনায়কতন্ত্রের রাষ্ট্রে সব কী জায়েজ, এর নামে?  এসব প্রশ্ন, মানুষের ‘রাজনৈতিকতার’ প্রশ্ন – যা কমিউনিস্টেরা আমল করতে জানে না। অধিকার কী, নাগরিক কী – এসব ধারণা তাদের ভোকাবুলারিতেই নাই।  অথচ এদের জবাব  জানা না থাকা, এসব নাগরিক মানুষের ধারণা ও প্রশ্ন সম্ভবত একালে ভাতের প্রশ্নের চেয়েও বেশি জরুরি!

    কিন্তু তবু এরা “সরকারের বিকল্প দেখে” না। খুঁজে পায় না। আর  না পেয়ে সেজন্যই কী এরা “তেল-গ্যাসের বৈষয়িকতার মধ্যেই’ কেবল মানুষকে দেখতে চায়। এভাবে খুঁজতেই যেন মানুষকে আবার ঠেলতে শুরু করেছে কিছু বামেরা।
    তেল-গ্যাস বা মাটির নিচের সম্পদ নিয়ে কথা উঠলেই দেশের বামপন্থিরা মনে করে এটা তাদের একচেটিয়া এক সাবজেক্ট  আর তাঁরা নিজেকে এর বিষয়ের চ্যাম্পিয়ান মনে করে। আর তাতে তারা ইস্যু্টার অলিগলি বা রাজনীতি জিনিষটা বুঝুক আর নাই বুঝুক। তারা মনে করে তেলের খনির ইস্যু উঠলেই তারা একে এক মুখস্ত শব্দ ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে দিলেই বা ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বলে এক অর্থহীন ফতোয়া বিবৃতি দিয়ে দিলেই তারা এই ইস্যুতে চ্যাম্পিয়ান হয়ে যাবে। সব রাজনৈতিক দায় অবস্থান হাজির করে ফেলতে পারবে, আর এতেই তাদের কথিত “রাজনীতি-বোধ”  প্রকাশের কাজ হাসিল হবে? তাই কী?

    সরকার আমেরিকান ব্কেযক্তি কোম্পানিকে তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষঃ
    সরকার আমেরিকান কোন কোম্পানিকে  তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষ, মানে সরকার টিকে যাবে? কথিত কোন ডিল হয়ে যাবে?  দৈনিক যুগান্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে  ধরণের রিপোর্ট ছাপা হবার পর থেকেই বামপন্থিরা এমন অনুমান ও গুজব ছড়িয়েছে। যার মূল কারণ সম্ভবত, তারা মনে করে আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনীতিক স্বার্থ মানে কেবল বৈষয়িক স্বার্থ – কয়েকটা তেলের খনি হস্তান্তর।
    প্রথমত, এটা গত পনেরো বছরে লটকে থাকা একটা তেল অনুসন্ধানের কাজ বিতরণের ঘটনা যার কিছুই অন্ত নাই, দেখা যাচ্ছে না। কারণ, এটা “তেল আছেই” এমন জানা কোন ভুখন্ডের কোন অনুসন্ধান নয়। খুব সম্ভবত এর প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম বা অনিশ্চিত মানে একটা এমন ঘটনার নুন্যতম নিশ্চয়তা্র প্রাইমারি থ্রেসহোল্ড [Primary Threshold] যদি না থাকে তাতে ঐ কাজে অর্থ ঢালার আগ্রহ কম হবেই, সক্রিয় প্রতিযোগিতায় উতসাহ কমে যায় এটা তেমন।  তাই ব্লক বিতরণ পনেরো বছরে লটকে আছে।  এতে নয়া উতসাহ পেতে এবার কোম্পানি প্রস্তাব করছে যে ১৫টা ব্লক-ই তাকে দিতে হবে। অথবা নয়া উতসাহ দেখা যেতে পারে হয়ত আগামিতে কোন কারণে গ্লোবালি তেল-গ্যাসের দাম আকাশ্চুম্বি হলে, উতসাহ বাড়তে পারে। কিন্তু সেসব যাই হোক না কেন বেশিরভাগ ব্লকে এক্সপ্লোরশনে কিছু পাওয়া না গেলেও গড়ে তা লাভজনক হয়ে যায়। অর্থাৎ উতসাহের অভাব দূর না করতে পারলে কেউ আসতে চাইবে না।
    তবে সেসব যাই হোক ঘটনার মূল পয়েন্ট সেটা না। বরং ধরা যাক, এখানে তেল-গ্যাস পাওয়া একেবারে নিশ্চিত সেক্ষেত্রে কে “লাভবান” হবে? আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ নাকি এক্সন মবিল? যদি ধরে নেই ‘লাভবান” বলতে রাজনৈতিক স্বার্থ  বলে কিছু নাই সবটাই বৈষয়িক স্বার্থ তাহলে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এখানে কোন খাতক নয়। মূল সম্ভাব্য খাতক এক্সন মবিল [Exxon Mobil Corporation] কোম্পানি একা আর এর উচ্ছিষ্ট কুড়াবে বাইডেন প্রশাসনের কেউ কেউ বড় জোর। সোজা কথা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এতে কোন  লাভালাভ পাবে না।
    এর মানে হল – আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ কী – এটা যারা বুঝতেই পারে না, এটা হল সেই কমিউনিস্টদের বয়ান! অর্থাৎ ঐ ১৫টা ব্লকে যদি তেল উপচিয়ে পড়া নিশ্চিত ব্লকও হয় তবু আমেরিকা-হাসিনা সরকারের এখন এথেকে  সমঝোতার সংকট তা কাটার কোন সম্ভাবনা নাই।  অথচ এই শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রধান সংকট গ্লোবাল পালাবদলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতার নিজের আগের গ্লোবাল নেতৃত্ব ও প্রভাব আগের মতই পক্ষে ধরে রাখা। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০১৫ সালে ওবামা আমল থেকে এশিয়ায় চীনকে হারানো ও প্রভাব বাড়াতে না দেওয়া ইত্যাদি করতে যতগুলো কর্মসুচি আমেরিকা নিয়েছে তার কোনটাই ফলাফল আনে নাই। সাউথ চায়না সি – কে কেন্দ্র করে মালাক্কা প্রণালি বাধা তৈরির সম্ভাবনা থেকে শুরু করে কোয়াড আর সর্বশেষ ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজি ইত্যাদি  কোনটাই আমেরিকাকে জুতমত চীনের উপরে কোন মাইলেজ দেয় নাই। সব উদ্যোগই ফেল করেছে বা করছে ক্রমশ। মূলত আশিয়ান দেশগুলোর [ASEAN] অনাগ্রহের জন্যই, তা বিশাল ফ্যাক্টর হয়ে থাকছে! আমেরিকান নীতিনির্ধারক ও থিঙ্কট্যাংকগুলো আশিয়ান দেশগুলোর স্বার্থ বা আগ্রহকে ছুতেই পারে নাই। তারা কেবল নিজ-রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে লাভালাভ আশিয়ান সদস্যেদের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তাই  কোনভাবেই আমেরিকা তাদের হিলাতে পা্ররে নাই, পারার সম্ভাবনাও নাই।  ওতএব নয়া উদ্যোগে আমেরিকার জন্য নয়া কর্মসুচি হল বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ; আর এতে এবার যদি আমেরিকার কোন ভাগ্য খুলে…! এগুলোই হল আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ বা রাষ্ট্রস্বার্থ।  এখন কমিউনিস্টেরা যদি  দশ-পনেরোটা তেল-গ্যাসের উপচে পড়া খনি পাবার স্বার্থ দিয়ে আমাদেরকে ইস্যুটা ব্যাখ্যা করতে চায় বা বুঝতে বলে তাহলে আমরা কী বুঝব? এরা কী কোন রাজনৈতিক দল, কমিউনিস্ট ? এসব পেটি মধ্যবিত্ত, এরা কারা?
    যারা গ্লোবাল নেতৃত্বে –  প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ-সংঘাত দিকটা আমল করার যোগ্যই নয় – বড় জোর তেলের খনি আর সবকিছুকেই বস্তুস্বার্থ দিয়ে বুঝে তাই সবকিছু তেলগ্যাসের বুঝ দিয়েই বুঁদ হয়ে থাকে তবে এদের লইয়া আমরা কী করিব!!

    সিপিবির এক ফাঁকা বিবৃতিঃ
    সিপিবির বিবৃতির এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ হল –

    বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ এশিয়াভিত্তিক সামরিক অভিলাষ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রামের মাতারবাড়ীতে জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছিল, সেটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং এর সহায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইচ্ছানুযায়ী বাংলাদেশে একটি মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি বিষয় জাপান সফরকালে আলোচিত হবে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটি হলে তা হবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

    প্রথমত এটা আমেরিকার নেহায়েতই কোন “সামরিক অভিলাষ” -মাত্র নয়।  ঠিক যেমনটা আমরা কোল্ড-ওয়ারের (১৯৫৩-৯১) আমলে সোভিয়েত-আমেরিকান ঝগড়ায় আমরা সবকিছুকেই ‘সামরিক’  বলে বয়ান করতে সোভিয়েত  বয়ানের মধ্যে দেখতাম। এছাড়া এমনকি সত্তর-আশির দশকের বয়ান দিয়েও বিশেষত,  কোল্ড-ওয়ারের চিন্তা ফ্রেমে একালে কিছুই ব্যাখ্যা বর্ণনা করা যাবে না। নিজেকে বোকা প্রমাণ করা ছাড়া ওতে আর কোন লাভ হবে না।
    দুই. ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি এটা কোন আমেরিকান প্রকল্পই নয়। বড়জোর একটা কনসেপ্ট মাত্র। আর তা হল,  চীন নাকি কোন আন্তর্জাতিক রুল, নিয়ম-কনভেনশন মানে না, রুল বেজড নয়। বিশেষ করে আড়ালে বলতে চায় চীন নাকি  জাতিসংঘের [UNCLOS – The United Nations Convention on the Law of the Sea] মানে, সমুদ্রসীমা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরবিট্রেশন (যা ঠিক বিচার নয় তবে সালিশীর মত জাতিসংঘের অধীনে এক  মিটমাট ব্যবস্হা) মানে না। এই অজুহাতে চীনকে একঘরে করে আমেরিকা – ভায়েরা আসেন একটা কনসেপ্ট তৈরি করি যার যার কনসেপ্ট অবস্থান বলি বললে যেমনটা হত – এটাই আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি বাতচিত।  এই লক্ষ্যে, সবদেশের একেকটা স্ট্রাটেজি প্রকাশিত হোক এটাই আমেরিকার ইচ্ছা। আর এর বিরুদ্ধে চীনা রাষ্ট্রদুতের অভিযোগ ওরা সুনিদির্ষ্ট করে একটা দেশকে (মানে চীন)  বাদ দিয়ে একটা কোন ইন্টারন্যাশনাল জোট কনভেনশন করতে পারেন না। তবে মূলকথাটা বা বটম অব দা ফ্যাক্টস হল, চীন কখনও এপর্যন্ত সে – জাতিসংঘ মানে না বা UNCLOS মানে না বা আইনের শাসন মানবে না ইত্যাদি বলে কোন বিবৃতি বা ধারণা দেয় নাই। ফলে এমন অভিযোগ গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে অ্যামেরিকান একটা চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন মাত্র। যদিও একথা ঠিক, সাউথ চায়না সি (যেটা চীন থেকে সমুদ্র পথে বের হলেই যে নৌ-অঞ্চল)  -তে চীন তার প্রায় সকল পড়শির সাথেই সমুদ্রসীমা বিতর্কে আছে।
    তিন. মাতারবাড়ি জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর এর সাথে “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত” -এসবকথা কোথায় পেল সিপিবি? হঠাত এনিয়ে মাঠে উদিত হল কোথা থেকে – এই কমিউনিস্টেরা ভারতের উত্তর পুর্বাঞ্চল রক্ষার দায়ীত্ব কাধে নিল কেন?  মাতারবাড়ি মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের (যা মাতারবাড়ি প্রকল্পের আরেক অংশ) জন্য বড় বাল্ক জাহাজে করে কয়লা (ছোট লাইটার জাহাজ না) সরাসরি বিদ্যুৎ প্রকল্প পর্যন্ত প্রবেশ সহজ করতে পারার এমন উপযোগী করে নির্মিতব্য এক গভীর সমুদ্রবন্দর। আর এতে আমেরিকার নৌঘাঁটি করার খায়েস এর পথে তা সাহায্য হতে পারে তাই এটা জাপানকে সামনে রেখে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তা করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আর এসবের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য মূল বা বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দর করার স্টাডি-পরিকল্পনা করা হয়েছিল পাশে মহেশখালির সোনাদিয়াতে। যেটা চীন (কুনমিং), বাংলাদেশ ও বার্মায় পণ্য আনা-নেওয়া জন্য ব্যবহার করা যায় – সাথে আর চাইলে ভারতও তা ব্যবহার করতে পারবে;  এতে তাহলে এর নির্মাণ খরচ সহজেই বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করে উঠে আসবে।  কিন্তু ভারতের আপত্তি ও ফুসলানিতে এই প্রকল্পই ২০১৫ সাল থেকেই বাগড়া, শেষে সরকার বাদ দিয়ে দেয়। আর আজকে পট উলটে যাওয়ায় সিপিবি  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য রক্ষার গল্প ও কান্নাকাটি নিয়ে এসেছে! এটাই ভাগ্যের পরিহাস! কিন্তু এখন কেন?  ভারতের পিঠে আমেরিকার হাত থাকাতেই এতদিন ভারত-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক বন্ধু  এই গর্বে মাটিতে পা না পড়া ভারত এতেই কী বাংলাদেশকে করদ রাজ্যের মত ব্যবহার করে আসে নাই???  তখন সিপিবি ও বামেরা কারদিকে কোথায় ছিল??? কোন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ছিল???
    চার. বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত তার “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি” পাবলিক করেছে। এনিয়ে বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম হল – “ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা: চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ”। মানে হাসিনার বাংলাদেশ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে কোন পক্ষ নিবে না, বরং ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখবে – যেকোন কারণেই হোক এটা সঠিক পদক্ষেপ। এটা ২০২০ সালে বা তারও আগে থেকেই হাসিনার একই অবস্থান – মানে এটাই হাসিনার নিজেকে ক্ষমতায় রাখার দিক থেকেও বরং উপযুক্ত বলে তাঁর নিজস্বার্থ ও  বিবেচিত। আর তা তিনি বজায় রেখেছেন। তাহলে হাসিনার এই চলতি ত্রিদেশীয় সফরে আমেরিকান সাথে আতাঁত আপোষ হয়ে যাচ্ছে বলে ভয় দেখানোর সুযোগ কই???
    অতএব,  হাসিনার এই ত্রিদেশীয় সফর নিয়ে আমরা বড়জোর বলতে পারি এটা হাসিনার শেষ চেষ্টা কোন “ওয়ার্কেবল রিলেশন” বের করার তবে সেটাও যদি লাইগা যায় ধরণের, তবে তুকতাকে বিশ্বাসের। তুকতাক বললাম এজন্য যে মানুষ সব হারালে তুকতাকে বিশ্বাস করতে চায়। মানে, মনে হয় না হাসিনা লজিক্যালি এমন কোন সম্ভাবনা দ্যাখেন।
    সারকথায় তাহলে, সিপিবির তরুণ নেতাদের নতুন করে পড়াশুনা করতে হবে। পুরানা সত্তর-আশির দশকের ভাবনা একেবারেই অচল, মুখস্থ কথা অচল হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট চিন্তা একালে ঢেলে সাজাতেই হবে – মার্কস যাকে নিরন্তর পর্যালোচনা বা নিজেকেই ক্রিটিক [Critique] করতে বলতেন। রিভিউ [Review] বা ঢেলে সাজানো এটাই। এই মুরোদ ছাড়া সব পন্ডশ্রম, সময় নষ্ট – এই পথেই যাচ্ছে কমিউনিজম, যাবেই!

     

    কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদঃ
    সিপিবি’র বিবৃতির একটা বাক্য হল এরকম, “সিপিবি মনে করে, শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কখনো শুভ হবে না” ।
    এখন একথার মানে কী?  তাহলে বাংলাদেশে গত পনেরো বছরে কী হয়েছে? এসময়ে “ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেয়া” – বলতে কিছুই ঘটে নাই? এটাই কী সিপিবি মনে করছে? তাহলে এতদিনে হাসিনার বিকল্প নাই কথা এখন ফেলে ত্যাগ করে সরকারের সমালোচনায় আসার ভাব দেখানোর দরকার কী?
    ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটা কমিউনিস্ট ভোকাবুলারিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে চালু হয়েছিল কমিউনিস্টদের এক গুরু-নেতা লেনিন এর ১৯১৬ সালে লেখা বা প্রকাশিত ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামের বই থেকে। আর ওর পরের বছরই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় রুশবিপ্লব বা দুনিয়ায় প্রথম এক কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল। যেটা পরে  ১৯২২ সালের পর থেকে – সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই নয়া নামে ১৫টা আলাদা মোটা জাত-ভুখন্ডের এক সমাহার রাষ্ট্র হিশাবে তা পুণর্গঠিত হয়েছিল। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়তে গিয়ে তা ১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত তাতে নয়া দেশ যুক্ত করা তখনও চালু ছিল। সবচেয়ে বড় কথা কবে থেকে কমিউনিস্টেরা আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ট্যাগিং বা নাম দেওয়া বা নিচা দেখানি শুরু হয়েছিল এর হদিস খুব কম কমিউনিস্ট দিতে পারবে। তাদের বেশির ভাগেরই এনিয়ে ধারণাটা আবছা, তবে তারা সারকথায় বলবে হয়ত কমিউনিজমের জন্ম থেকে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবা্দী” বলে কমিউনিস্টেরা ডাকে, যা একেবারেই ভুল। ফ্যাক্টস হল লেনিন সাম্রাজ্যবাদ নামে নয়া ধারণা আনতে বই লিখলেও ঐ বইয়ের ভিতরে অন্তত আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয় নাই। বরং ওখানে প্রসঙ্গ ছিল সেকালের জর্মানি। লেনিন ১৯১৭ অক্টোবরের রুশবিপ্লবের পরে বেঁচেছিলেন মাত্র আরো প্রায় ছয় বছর, ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। আর ওদিকে আমেরিকা ১৯৪৫ সালে মানে বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির আগে গোনায় ধরার মত কেউ কিছু ছিল না, মানে গ্লোবাল নেতা বলেও কিছু ছিল না। যখন সারা দুনিয়া ছিল কেবল ইউরোপ-কেন্দ্রিক কলোনি দখলদারদের হাতে বা নেতৃত্বে। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে কোন বিশেষ বিরোধ-সংঘাত বা শত্রুতা কিছুই ছিল না।

    তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদি দেশ বলা শুরু করেছিল কবে থেকে? স্বভাবতই সেটা ১৯৪৫ সালের পরের পঞ্চাশের দশকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫৩ সাল থেকে জব্বর ভাবে। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে স্তালিন তো প্রেসিডেন্ট রুজভেন্টের ঘনিষ্ট বন্ধু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যামেরিকান নেতা রুজভেল্টের ডানে-বায়ে থাকা আরো দুই ঘনিষ্ট দেশবন্ধুর একজন ছিলেন খোদ স্তালিন, আর তাতে অপরজন ছিলেন  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। এই তিন নেতা ১৯৪২ সালের পর থেকে একসাথেই বিভিন্ন দেশ নানান ইস্যুতে নেতৃত্ব দিতে ভ্রমণ করতেন। পরে ১৯৪৫ সালে রুজভেল্ট এর হঠাত স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান যিনি রুজভেল্টের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন ও একই নীতি অনুসরণ করতেন। ফলে তাঁর সাথে স্তালিনের সম্পর্কও প্রায় একই ছিল – সো নো সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগিং!
    পরের রিপাবলিকান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিলে সোভিয়েতের সাথে আমেরিকান সম্পর্ক একেবারেই বদলে এনিমি হয়ে যায় যা যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। যেমন, সিআইএ দল পাঠিয়ে আইসেনহাওয়ার এর ইরানের সরকার বা রেজিম চেঞ্জ, যেটা ইরানে মোসাদ্দেক সরকারকে  উপড়ে ফেলা ও তেলের খনির দখল নেয়া এমনকি আবার ওদিকে, চীনের তিব্বতে নেহেরুর ভারতের সাহায্যে ভারতে সিআইএ ঘাটি করে একই কাজ করা এর আরেক উদাহরণ। এখান থেকেই দালাইলামাদের তিব্বত ত্যাগ, ভারতে আশ্রয় আর পরিণতিতে শাস্তি হিশাবে চীন কয়েকদিনের জন্য সারা আসাম দখলে রেখে দেয়া ঘটিয়েছিল যা ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ বলে বাইরে থেকে বিবেচিত।  ভারত-চীনের সম্পর্ক তিতা সেই থেকে আর যা এনিমি হয়ে যায়।

    অন্যদিকে মনে রাখতে হবে লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা ও প্রসঙ্গ এর সাথে ১৯৫৩ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আমেরিকাকে ট্যাগ লাগানো সাম্রাজ্যবাদ ধারণা – এদুটো ঠিক একই নয়।  মনে রাখতে হবে,  এমনিতেই রাষ্ট্র মাত্রই তা এক একান্ত স্বার্থ। এবং যা বাকি সব রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে আলাদা ও অপর [Other] গণ্য করা; এবং সবকিছুর উর্ধের নিজস্বার্থ – এক স্বার্থপর স্বার্থ। এবং এমন এক একান্ত স্বার্থ এটা যে অন্য কোন অপর রাষ্ট্রকে নিজ স্বার্থে অবলীলায় ব্যবহার করে ফেলতে পারে।  তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যতই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হোক না কেন অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি  যতই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে নিজেদের আদর্শগত মিল আর হরিহরাত্মা এক দেহ-বোধ দেখাক না কেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের প্রশ্নে সে সবকিছুর উর্ধে এক নিরঙ্কুশ আত্মস্বার্থ দিয়েই পরিচালিত স্বার্থ। কাজেই আইসেনহাওয়ারের আমল থেকে আমেরিকা-সোভিয়েতের যে বৈরিতা তাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজের সেই একান্ত চোখেই দুনিয়ার সকল কমিউনিস্ট দেশ ও পার্টি আমেরিকাকে দেখুক সেটাই হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি। আর এই পররাষ্ট্রনীতি,  আবার এর ভিতরে যদি আরেক কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র তার নিজস্বার্থের বেলায় তারও একান্ত স্বার্থ বের করে তাহলে?? তাতে অন্তত আমারও একান্ত স্বার্থ বইলা সেটা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটু আলাদা তো হতেই পারে। কিন্তু সেই ভিন্নতা কী সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি এলাও করবে বা শ্বাস নিতে দিবে???  তাই একই কমিউনিস্ট আদর্শের হওয়া সত্বেও দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতার বিরোধ কমিউনিজমে কখনও রিসলভড বা সমাধা করা হয় নাই বা যায় নাই। মূল কারণ, দুই রাষ্ট্রের আদর্শ একই – এর মানে তাদের রাষ্টস্বার্থও এক  – এই অনুমান ভিত্তিহীন। মূলত দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও এক হতেই পারে না। এমন হওয়া মানে তারা তো এক-রাষ্ট্র হয়ে যেত!!!  তাই সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগ কতটা কমিউনিস্ট  আদর্শগত ধারণা আর কতটা সোভিয়েত রাষ্ট্রস্বার্থের একান্ত পররাষ্ট্র নীতি তা ভেদজ্ঞানে আলাদা করতে জানতে হবে। একারণে ১৯৫৮ সালের মাওয়ের  চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই নয়া ধারা  ডাকার কারণে পরে চীনও সোভিয়েত হামলার ভয়ে উলটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে  সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বলে ট্যাগ দিয়েছিল; যেটা পরে ১৯৯২ সালে  সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙ্গে যায় বলে এই ট্যাগিংয়ের সমাপ্তি ঘটে আর দরকার থাকে নাই।

    তাহলে একালে কে সাম্রাজ্যবাদ?
    কাকে কে, কেন সাম্রাজ্যবাদ বলবে সে ব্যাপারটা  নতুন করে পরিস্কার ঝালাই করে নিবার সময় এটা। যেমন ধরেন আজকের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে শুরু করা চীন-কে সিপিবি বা কোন কমিউনিস্ট পার্টি কী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগে ডাকার মত চীনকেও সাম্রাজ্যবাদ বলে ডাকবে? কেন ডাকবে আর কেন ডাকবে না এর ব্যাখ্যা-বুঝ একালের বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের লাগবে। নয়া পক্ষে বা বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক সে সাফাই লাগবে। কোল্ডওয়ার আমলের বুঝ ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার রিভিউ ঢেলের সাজানো আগে করে নিতে হবে। এই বুঝাবুঝির আবার যোগ্য হতে হবে।  সত্তর-আশির দশকের মুখস্ত ধারণা দিয়ে চলবে না। সোভিয়েত ভেঙ্গে গড়া ১৫ দেশই এখন আইএমএফের সদস্য, বলা ভাল যে দুনিয়ায় কে এখন আর আইএমএফের সদস্য নয় তাই এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার আনরিয়েলিস্টিক [অবাস্তব] ও আইডিয়েল [আদর্শগত] ধারণা আঁকড়ে কথা বলার মানে হবে না। তাহলে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা বুঝতে হবে আগে, বুঝাবুঝিতে ভুল কী ছিল  এর জানাবুঝা শুরু করতে হবে সেখান থেকে।   ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানটা জন্ম নেওয়ার সম্মেলনে তখন জীবিত স্তালিন; তিনি সেই জন্মসভায় সোভিয়েত প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। যদিও পরে যখন চাঁদা পরিশোধ করে আইএমএফের সদস্যপদ নিবার কথা তখন যোগাযোগ ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ঠিক কী কারণে? স্তালিনের বুঝ কী ছিল তা নিয়ে কোথাও তিনি কিছুই লেখেন নাই।  আজকের আধা-বুঝের কমিউনিস্টেরা অবশ্য মনে করেন তারা এই প্রতিষ্ঠানটা বুঝেন? যেন তারা স্টাডি করেছেন? অথচ তারা বলতেই পারবেন না যে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান এটা, ম্যান্ডেট কী? যেমন তারা কী বলতে পারবেন – বাংলাদেশ যদি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে বাংলাদেশের  লাভ বা ক্ষতি কী কী হবে? বাংলাদেশ বা যেকোন দেশ আইএমএফ এর সদস্য না হয়ে অর্থনীতিতে টিকে থাকতে পারবে কিনা, এনিয়ে কমিউনিস্টদের বক্তব্য কী??
    ক্যাপিটালিজমকে কমিউনিস্টরা যদি পাপ মনে করে সেক্ষেত্রে এটা তো এক এথিক্যাল বিবেচনা মাত্র – সে বোধ কী  কমিউনিস্টদের আছে – যদিও তাদের এই বিচারে বাংলাদেশের বা সেই অর্থে দুনিয়ার সব মানুষই পাপী। এমনকি যেসব অর্থনীতির শিক্ষক ও কমিউনিস্ট  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তারাও সমান পাপী। কারণ তারাও ক্যাপিটালিজমের বাংলাদেশ সরকার ও সমাজের থেকে বেতন নিচ্ছেন – তাদের  ভাত গলার নিচে যাওয়া এমন প্রতিটা ভাত – এর সবই ক্যাপিটালিজম পাপের ভাত। তাহলে পাপের বাইরে কে?

    “জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করলেই” এসব পাপের মুক্তি ঘটবে – এই অনুমানও এক স্বপ্ন-কল্পনা। কারণ এগুলাও আর বাস্তবে রিয়েলিজমে নাই।

     

    আরেক বিপদ কমিউনিস্টদের সার্বভৌমত্ব ধারণাঃ
    সবশেষের এক প্রসঙ্গ; বাংলাদেশে আরেক  বয়ান তৈরি করছেন  সিপিডি [CPD] এই প্রতিষ্ঠানের ডিস্টিঙ্গুইশুড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। যা খুবই বিপদজনক ও এথিক্সের ভয় সৃষ্টিমূলক।
    সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটি [Sovereignty] নিয়ে এথিক্যাল বুঝকে রাজনীতি বানিয়েছে কমিউনিস্টেরা। আমাদের মত রাষ্ট্রগুলো কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ফলে সার্বভৌম হয়ে গেল কেমনে আর তা থেকে একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা জাতিসংঘ দুনিয়াতে কোথা থেকে হাজির হল যারা এর কিছুই জানে না – এরাই আবার কিছু হলেই দেশের সার্বভৌমত্বের বুঝ হাজির করবে। যেমন দাবি করবে বাংলাদেশে সার্বভৌম তাই বাংলাদেশ নিজ ইচ্ছায় এটা সেটা কত কী করতে পারে। মনে মনে ভাব নিবে প্রবোদ দিবে যে এসব প্রশ্ন তোলা বুদ্ধিমানেরা যেন আমেরিকাকে কত্তবড়ই না বিপদে ফেলতে পারছে!
    না ভাই সরি, আপনারা পারেন নাই। আসলে বাংলাদেশের মত দেশগুলো কী করে কী অর্থে সভরেন তা আপনি আজও জানেন না। মানে কী? মানে হল, এটা আমেরিকারই অবদান যে সে দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রের অন্যদেশকে কলোনিদখল করে রাখা এই কাজটা অন্যায়, অবৈধ বলে – এই ভিত্তিতে এক জাতিসংঘ বানিয়েছিল – এটা অ্যামেরিকান আইডিয়া ও তাদের একক অবদান। এতে আমাদের মত দেশগুলো তাই ১৯৪৫ সালের পর থেকে কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ও জাতিসংঘের সদস্যদেশ হয়েছে; তাই এই অর্থে সে সভরেনও। কলোনিদখল হারাম কাজ –  এটাই দুনিয়াতে প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার তৈরি করেছিল, আর তারই রায় এটা। যদিও এর আর অনেক কিছুই এখনও পূরণ হয় নাই, খামতিতে আছে অনেক; কথা সত্য কিন্তু দয়া করে এই অর্জন টুকুকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না।  কারণ, সার্বভৌমত্ব এটা আসলে কী ও কতটুকু হয়েছে তা নিয়ে কমিউনিস্টেরা এখনও বেখবর।

    এখন আরো একটা কথা মনোযোগে শুনেন।
    এরপরেও যে  সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটির ধারণা যা তবুও আপনি শুনে ফেলেছেন তা কোথা থেকে  এলো বাংলাদেশ সভরেন দেশ বলে বিবেচিত হল তা না জানা সত্বেও –  একথা সত্য যে এই সার্বভৌম ধারণাটা আসলে এক আইডিয়াল [IDEAL] ধারণা। মানে তা রিয়েল [REAL] বা বাস্তবে দেখানো যাবে, এমন সত্য করে দেখানো যাবে – এমন ধারণা নয়।এটাই আইডিয়েল ধারণা। আর আইডিয়েল বলতে বুঝতে হবে – হওয়া উচিত – ধরণের ধারণা যেটা কাগজে বা খাতায় থাকা ধারণা মাত্র। সেকালে জন্ম নেয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডারটা অতটুকুই আপনাকে দিতে পেরেছে। এখন আপনি কতটুকু বাস্তবে সভরেন সেটা তো আপনার রাষ্ট্রকে  -হয়ে উঠে  মানে, মুরোদ অর্জন করে দেখিয়ে দিতে হবে।  অর্থাৎ আপনার রাষ্ট্রকে রিয়েলি [really] -ই সত্য করে দেখাতে হবে যে এটা সার্বভৌম। চীন বা ভারত যেমন আজকাল – রাশিয়াল তেল বুক ফুলিয়ে আমদানি করে দেখাচ্ছে, আমেরিকাকে অবজ্ঞা করছে। আমরা অবশ্যই তা পারি না। এমনকি  রুপপুরের রাশিয়ান প্রকল্পের পেমেন্ট রাশিয়াকে বাংলাদেশ ইউয়ানে শোধ করতে পারব কিনা তা নিয়েও আমেরিকারআপত্তি শোনা যাচ্ছে। এসব শুনতে বা আমাদের রাষ্ট্রকে আমল করতে হচ্ছেই। মানে হল রিয়েল সার্বভৌমত্ব বা মুরোদ দেখানোর মত সভরেনিটি হতে পারি নাই। কারণ, এটাও না-বুঝার কারণ নাই যে এসব জায়গায় – আমরা সভরেন দেশ – বলে বোকার মত বীরত্ব দেখাতে যাওয়ার মানে হয় না, অবশ্যই!

    কিন্তু দেবব্রত ভট্টাচার্য বিজ্ঞের মত বলেছেন,  “আইএমএফ ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে আমরা অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেছি। আমরা তাদের শর্তাবলি মেনে নিয়েছি”। আচ্ছা কারও ঋণ শর্ত মেনে নিয়ে ঋণ নিলেই তাহলে আমাদের সার্বভৌত্ব চলে যাবে, ঢিলা হয়ে যায়। তাহলে মানুষের ব্যক্তি বা ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণ নিলেই ইজ্জতের মত আমাদের সার্বভৌমত্ব চলে যাবে! কেন?  আইএমএফ এর ঋণ নিলে সার্বভৌমত্ব চলে যাবে কেন?   আইএমএফ কী তাহলে কোন পাপী সংগঠন।  দেবব্রত কী জানেন খোদ আমেরিকান রাষ্ট্র মানে যেটাকে আমেরিকা রাষ্ট্রের নেয়া  সভরেন লোন বলে, সেটা ৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে [দেখুন, On December 16, 2021, lawmakers raised the debt limit by $2.5 trillion to a total of $31.4 trillion.1 ] ; এবছর আরো ঋণসীমা বাড়ায়ে  নিতে হবে? আবার ওদিকে জাপান নিজ রাষ্ট্রের সভরেণ লোন (দেশি-বিদেশি বাজার থেকে খোদ রাষ্ট্রের  নেয়া ঋণ এটাই সভরেন ঋণ)  হল তা ইতোমধ্যেই ঐদেশের বাৎসরিক জিডিপির ২০০% এর বেশি?  তাহলে এদুই দেশের সভরেনিটিও কী নাই ধরতে হবে?? আর যারা ঋণ দিয়েছে তারা আমেরিকা বা জাপানকে কী বিনাশর্তে এসব লোন দিয়েছে? তাই কী? দেবব্রত ভট্টাচার্য কী বলেন!!

    আবার,  আচ্ছা দেখেন; আইএমএফ কী  হাসিনার বাংলাদেশকে বাধ্য করেছিল যথেচ্ছারে রিজার্ভ খরচ করতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ এর দেশ হতে, ডলারে সম্পদ পাচার করতে – রিজার্ভ ভেঙ্গে সঙ্কটে পড়তে? এমনকি শেষে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতেও কী আইএমএফ আমাদের সরকারকে বাধ্য করেছিল? এমন তো কোন সরকারি বা খাতক ভাষ্য জানা যায় না। তাহলে রিজার্ভ খুইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতে গেলে সেটা আইএমএফেরই দায় ও দোষ জ্ঞান করে কমিউনিস্টেরা কেন?  নিজেই দেশকে বিপদে ফেলে এরপরে নিজেই আইএমএফের কাছে আমাদের শাসকেরা যায় কেন, এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নাই! কিন্তু কমিউনিস্টেরা এমন প্রপাগান্ডায় বিশাল জ্ঞানী সাজতে চায় কেন???
    সাধারণ ফেনোমেনা হল, যেখান থেকেই কোন লোন নেন না কেন, তা আপন ভাই হলেও – সেই ভাইয়েরও কিছু সুবিধা-অসুবিধা বা স্বার্থ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যেমন কবের মধ্যে ভাইয়ের থেকে নেয়া ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে অন্তত এমন কথা তো থাকবেই। এখন এমন শর্ত দিলে কী সেটা নিজ ভাইয়ের কাছে আমার সারর্ভৌমত্ব চলে যাবে? কেন এই আজিব ভাবনা?
    তাহলে “শর্তাবলি মেনে নিয়েছি” একারণে, “আইএমএফ এর কাছে কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ” – মনে করছেন কেন দেবব্রত?? এত পাপবোধের অতিশুদ্ধতা কেন? অতিভক্তি কেন? রাজনীতিতে পাপপুণ্যের ধারণা মানে এই এথিক্স রাজনীতিতে নাই। তবে ধর্মতত্বে আছে। দেশীয়  কমিউনিস্ট কাছে ক্যাপিটালিজম বা সেই সুত্রে আইএমএফ এর ধারণা একেবারেই এমন ভুতুড়ে ধারণা! এর চেয়েও তা পাপ আর ছুয়াছুয়িতে শুদ্ধ-অশুদ্ধতার ধারণায় ভরপুর। এজন্যই তাদের কাছে  আইএমএফ ঋণ   মানে যেন শুদ্ধতা খুইয়ে আত্মসমর্পণ করা!  কমিউনিস্ট  মস্কোর পিএইচডি হলে কী এমন ভেট দেয়া বয়ান দিতেই হয়?  মা কালীর ভোগ চড়ানোর মত!!!

    আচ্ছা গত ওয়ান ইলেভেনের সময় ভারতের নর্থ-ইস্টকে সব ধরণের করিভোর দিয়ে দেওয়ার পক্ষে সিপিডি আদাজল খেয়ে লাগা ততপরতা দেখেছিলাম আমরা; সেটা কী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য করা হয়েছিল??  এমনকি যারা সিপিডির বিরোধিতা করবে তারা মুর্খ অশিক্ষিত বলতেও সিপিডির মালিক মহাজনদের সেসময় মুখে আটকায় নাই। আর ভারতকে করিডোর দিলে এর আয়ে নাকি আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাবার কথা কারা বলেছিল?  এসব গুলো কী ছিল? ভারত-স্বার্থের পক্ষে ওপেন  দালালি নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষার উদাহরণ?   এগুলো কী আমাদের “অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ধরে রাখার” কাজ? কোন ধরণের “আত্মসমর্পণ না করার” উদাহরণ এগুলো?? বাহরে নন্দলাল…!! মারহাবা!

    সর্বশেষ এডিটঃ সকাল ০৯ঃ৫৭, ৩মে ২০২৩
    ____
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

  • ডলার-স্যাংশনের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেনেট ইয়েলেন 

    ডলার-স্যাংশনের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেনেট ইয়েলেন
    গৌতম দাস

    ২৮ এপ্রিল ২০২৩      ০০ঃ ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4nV

     

          What Janet Yellen Can Do……..

    ঠিক দুদিন আগে গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে – এই শিরোনামে  একটা লেখা দিয়েছিলাম। অর্থাৎ এর ঠিক আগের লেখা ছিল সেটা।  আজকের প্রসঙ্গ সেই লেখাটার উপর দাঁড়িয়ে লিখবো। সেখানে আগের “গ্লোবাল নেতা” ধারণাটা আরো অনেক বেশি বিস্তারে ব্যবহার করব। একটা দেশে সবচেয়ে বড় রাজনীতি ও ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতিষ্ঠান হল ঐ দেশের রাষ্ট্র মানে ওর রাষ্ট্র ব্যবস্থা। যেটাকে আমরা ওর State System বা Political Order & System বলে বুঝি। এখন এটাকে যদি লোকাল বা স্থাণীয় পর্যায়ের ঘটনা বলে বুঝি তবে ঠিক তেমনি দুনিয়াজুড়ে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল অর্ডার ও সিস্টেম  বলে কিছু একটা আছে; যার মুখ্য পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ।  এটাই লোকাল রাষ্ট্রগুলোর বিপরীতে গ্লোবাল ইন্সটিটিউশন। আর যে রাষ্ট্র এমন গ্লোবাল ইন্সটিটিউশন-গুলোর উপর এর সকল সিদ্ধান্ত-ততপরতার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ও আধিপত্য রাখে সেটাই গ্লোবাল নেতা-রাষ্ট্র বলতে পারি।
    এই সুযোগে এটাও বলে রাখি গ্লোবাল নেতা ধারণাটা সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে ছড়িয়ে পড়েছে ১৯৪৫ সালের পরে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই দুই অর্থেই গ্লোবাল নেতা ধারণাটা বিস্তার ঘটিয়ে দুনিয়ায় ছেয়ে বসেছিল আমেরিকাকে কেন্দ্র করে। মানে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা বলে ধারণাটা ১৯৪৫ সালের আগে তেমন বিস্তারিত কিছু ছিল না। যদিও ইউরোপের কলোনিদখলদার হিশাবে টপ পাঁচটা দেশ (বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) এর মধ্যে বৃটিশেরা ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী, যাদের প্রধান অর্থনীতি বা ব্যবসা ছিল অন্যদেশকে কলোনিদখল করা – ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত কোম্পানি খুলে বা বিনিয়োগ করে কলোনিদখলে বেরিয়ে পড়া।  সেকালের ভাষায় এমন দখলদার শক্তিগুলোকে  ‘সাম্রাজ্য’ বলার চল ছিল। যেমন গর্ব করে সেকালে বলা হত – “বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্য কোনদিন অস্ত যাবে না, ঢুববে না”। এমন গর্বে ফেটে পড়া বাক্য থেকে অনেক কিছু বুঝা যায়। যদিও কোম্পানি-সাম্রাজ্যের এই দুনিয়া টিকে থাকতে পারে নাই, ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়।

    সংক্ষেপে বললে বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪০ সালের জুনে হিটলারের জর্মানির হাতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গ দখল হয়ে যায়, পজর্মান সেনাবাহিনী নিজ প্রশাসন বসিয়ে এসব দখলি ভুখন্ডে শাসন শুরু করেছিল। এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা এজন্য যে সামরিক ও অর্থনৈতিক দখলদার শক্তি হিশাবে  ইউরোপের বৃটিশের পরেই ছিল ফ্রান্সের অবস্থান। সেই ফ্রান্সই হিটলারের জর্মানির দখলে চলে যাওয়া ছিল তাই তাতপর্যপুর্ণ ও ইঙ্গিতময়। আর তা দেখে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল নিজেদেরও একই ভবিষ্যত এঘটনার মধ্যে  দেখতে পেয়ে যায়। কারণ সাউদার্ণ ইংল্যান্ড আর নর্দার্ণ ফ্রান্স এদের মাঝে মানে এই দুই ভুখন্ড মাত্র এক ইংলিশ চ্যানেল দুরত্বে। কাজেই হিটলারের ইংল্যান্ডে আসতে আর কতক্ষণ – এই ছিল চার্চিলের মুখ্য ও চরম উদ্বিগ্নতা। এই চিন্তা করে চার্চিল সব ধরণের সাহায্য লাভে আশায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দারস্থ হওয়া ছাড়া বাঁচবার উপায় দেখেন নাই। আর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও রুজভেল্ট তখনও যুদ্ধে কোন পক্ষ না নিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েই চলেছিলেন।  আর অপেক্ষা করছিলেন ইউরোপের মাথা গ্লোবাল নেতারা কবে সাহায্যের জন্য তার পায়ে পড়েন। সেবার চার্চিল কার্যত নিজ কলোনিসাম্রাজ্যের মালিক গর্ব বা সমস্ত ভ্যানিটি ভুলে নিজেকে লুটিয়ে সারেন্ডার করেছিলেন। আর তা থেকে সাহায্যদাতা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল নেতা আর যুদ্ধে সকলের (নিজ মিত্রশক্তির)খরচদাতা হয়ে উঠেছিল। এটা ১৯৪১ সালের আগষ্টের সিদ্ধান্ত। চার্চিল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এরপর যুদ্ধে হিটলারকে হারাবার পরের নতুন দুনিয়াটা হবে কলোনিদখল-মুক্ত এক দুনিয়া।  এটাই হয়েছিল রুজভেল্টের আমেরিকা ও এর ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ ব্যবসায়ী প্রধান চাওয়া ও তা অর্জনের সাফল্য। স্বভাবতই এই সুফল আমরাও পরে নিয়েছিলাম। বৃটিশ-মুক্ত স্বাধীন হয়েছিলাম।  কিন্তু এর আগে রুজভেল্ট-চার্চিল চুক্তির পরে এর চারমাসের মাথায় ১৯৪২ জানুয়ারি এক জানুয়ারিতে, স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নও একই পথ অনুসরণ করে মানে, আমেরিকান নেতৃত্ব মেনে চুক্তিস্বাক্ষর করেছিল। কমিউনিস্টেরা এই ইতিহাস স্মরণ করতে চায় না; বরং না জেনে থাকতে চায়। তারা হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েত দেশ বাঁচানো এক বীর হিশাবে স্তালিনের জয়গান দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের বয়ান সাজায়। অথচ আমেরিকার নেতৃত্বে মিত্রশক্তিতে স্তালিন যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বলেই আর এতে, যুদ্ধের খরচ হিশাবে আমেরিকান অর্থসাহায্য  না পেলে বীর স্তালিনের সোভিয়েত দেশ বাঁচানো কি করে সম্ভব হত – সেদিকটা ভুলে চুপ থাকতে চায়।
    তবে  মোটামুটি ১৯৫০ সালের পর আর ১৯৫৩ সালের পরে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। সুনির্দিষ্ট করে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বলা শুরু করেছিল; যেখান থেকে আমেরিকা-সোভিয়েত কোল্ডওয়ার [Cold War] এরও যাত্রা  শুরু মানা হয়। কারণও ছিল এই যে আমেরিকান রাজনীতিতে টানা ২০ বছর পরে ১৯৫৩ সালে এসে প্রথম কোন রিপাবলিকান আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে উঠেছিলেন; তিনি হলেন আইসেনহাওয়ার, তাঁর বিজয় ঘটেছিল। আর তাতে এতদিনের আমেরিকার সে গ্লোবাল ইমেজ যে আমেরিকা  বিশ্বযুদ্ধে জিতিয়ে দুনিয়াকে গড়া নতুন রূপ দেয়া, জাতিসংঘ এর জন্ম দেয়া, আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়া যে ইতিবাচক উজ্জ্বল আমেরিকান ভুমিকা ছিল এর পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। কারণ আইসেনহাওয়ার আমেরিকা তখন এক নয়া আমেরিকা যে এক নয়া ফেনোমেনা চালু করেছিল – সিআইএ দল পাঠিয়ে রেজিম চেঞ্জ, দেশ দখল বা তেলের খনির মত সম্পদের দখল নেয়া ইত্যাদি বহু কিছু শুরু হয়েছিল, সে আরেক প্রসঙ্গ।

    কিন্তু এত পরিবর্তনের মাঝেও পরবর্তিতে কমিউনিস্ট চিন্তা ও ভুমিকা ততই  সব মিলিয়ে আরো পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছিল। যেমন “গ্লোবাল নেতা” বা একটা নয়া “গ্লোবাল অর্ডার”  বলে দুনিয়ায় এতবড় পরিবর্তন নয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু হওয়াকে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন আমল না করার পথে চলে যায়। অথচ নয়া দুনিয়ায় নয়া বিশ্বব্যাবস্থা যেটা তখন হাজির হয়েছিল যার ভিত্তি হল, কাউকে কলোনিদখল হারাম এটা মানতে আমেরিকার সারা ইউরোপকে লিখিতভাবে বাধ্য করা থেকে ইত্যাদি এসব দিক গ্লোবাল কমিউনিস্ট রাজনীতিতেই আর কখনও আমল হয় নাই। অথচ স্তালিনের নয়া ভাষ্যটা হল সেটা নাকি নয়া-উপনিবেশবাদি দুনিয়া। তাহলে ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারিতে স্তালিন কোন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন??  যেটা জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা ১৯৪২ এর দলিল?

    এই প্রসঙ্গটা নানাভাবে বহুবার আমার লেখায় যুক্ত করেছি। কিন্তু খুব একটা প্রভাব পরেছে টের পাইনি। আগে খাড়া রেফারেন্স দিয়েছিলাম ইংরাজি ডকুমেন্ট থেকে। সম্প্রতি একটা বাংলায় করা পিডিএফ পেয়েছি। সেখান থেকে ওর সপ্তম পাতা থেকে নিচার অংশ তুলে এনেছি। আগ্রহিরা পুরা পিডিএফ ডকুমেন্ট এখানে পেতে পারেন। এটা সম্ভবত স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বাংলায় করা।

    অথচ কমিউনিস্টেরা জানতেও পারে নাই বা জানতে চায় নাই যে কলোনিদখল ব্যবস্থার উতখাত ও নিষিদ্ধ এই ঘোষণা দিয়েই জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা, যার মধ্যে স্তালিনও একজন স্বাক্ষরকারি।
    এভাবে কমিউনিস্টেরা কখনই জানতেই পারে নাই, চায় নাই যে  গ্লোবাল নেতা বা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু ফেনোমেনাগুলো আসলে কী? অথচ আজ দুনিয়া ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান নেতৃত্বে ৭৮ বছর পার করছে আর সবচেয়ে বড় কথা এটা এখন সেই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এর সময়। কমিউনিস্টেরা এখানে এনিয়ে এখনও বেখবর। খাড়া বলতে গেলে, কমিউনিস্টেরা আসলে  এরপর থেকে বিশেষত চলতি শতকের দুনিয়ার ঘটনা-ফেনোমেনা গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। পিছিয়ে অযোগ্য হয়ে গেছে। যার মূল কারণ, ১৯১৬ সালের পরে কমিউনিস্ট চিন্তায় আর কোন আপডেট বা কোন ব্যবহারিক ভাষ্য আর নাই, আসে নাই।

    তবে এখানে আরেকটা কথা বলে রাখি, ১৯৪৫ সালের আগের যতটুকু গ্লোবাল নেতার ধারণা ছিল সে ধারণা মতে গ্লোবাল নেতা সেটা মূলত সামরিক শক্তি গত ধারণা বলেই বুঝা হত। বিপরীতে  ১৯৪৫ সালের পরে একালের গ্লোবাল নেতা বলতে আরও অনেক দিকে ধারণাটা ছড়িয়েছে। যেমন এর একটা বড় অনুষঙ্গ অংশ বা দিক হল গ্লোবাল কমিউনিটিতে দান বা লিল্লাহ। জাতিসংঘের দিক থেকেই যদি বলি মূল জাতিসংঘের অধীনে আরেক এজেন্সি প্রতিষ্ঠান হল ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম [WFP] বা বাংলায়, বিশ্ব খাদ্য  কর্মসুচি। এটাই হল দুনিয়ার ভুখা মানুষকে দানের খাদ্য পৌছে দেওয়া। আমাদের যুদ্ধের পরে ১৯৭২-৭৩ সালে আমরা এই WFP এর ভরসাতেই বেচে গেছিলাম। ১৯৭৪ সালে আর পারি নাই, সে আরেক কাহিনী, তা পরে কখনও।  গুলশান ধরণের জায়গা বাদে ঢাকার বাকি এলাকায় কমিউনিটি বা মহল্লা সেন্স কাজ করে প্রবল্ভাবে। দেখা যাবে মহল্লার কোন মুরুব্বি প্রায়ই ডেকচি বসিয়েছেন – খিচুরি-বিরিয়ানি কিছু একটা রান্না করে গরীব বস্তিতে বিলাচ্ছেন। WFP এই অর্থে লিল্লাহ সংগঠন যেন। এখন WFP এর সাথে গ্লোবাল নেতার কী সম্পর্ক? WFP-কে বড় চাঁদাটা দেয় কে? কেউ গ্লোবাল নেতা হতে চাইলে সবচেয়ে বড় চাঁদাদাতা হতেই হয়। এমনকি সরকারি অর্থের ঘাটতি থাকলে রাষ্ট্রীয় ঋণ করে হলেও গ্লোবাল নেতাকে WFP-কে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারতে হয়। গতবছর আফগানিস্তানে খাদ্য সংকট হয়েছিল চরমে। জাতিসংঘ নয়া সরকারকে এখনও স্বীকৃতি না দিলেও খাদ্য সাহায্য যোগাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করে নাই। সারকথায় মানবিক সাহায্যের এক সেফটি নেট এক নয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ১৯৪৫ সালের এই দুনিয়া হাজির এবং তা খুবই সুসংগঠিত এক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম হিশাবে তা স্বীকৃত।

     

    সরাসরি ব্যবহারিক বাস্তবতায়, বাইডেনের আমেরিকাঃ
    বাইডেন ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন মূলত একথা বলে যে গ্লোবাল নেতা হিশাবে আমেরিকার এখনও কতসব হাতিয়ার বা টুলস আছে যা অন্য বিশেষ করে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টেরা কখনও এক্সপ্লোর বা হাতড়ে খুজে দেখেনই নাই।  এগুলো ব্যবহার করে আমেরিকা এখনও চীনকে ছাড়িয়ে গ্লোবাল শীর্ষনেতা থেকে যেতে পারে। তাই তাঁর ক্ষমতামলের বৈশিষ্টই হবে আমেরিকার সেসব পড়ে থাকা মারাত্মক হাতিয়ার প্রয়োগে আনতে হবে।  যেমন, তিনি এমন দুটা হাতিয়ার এর কথা বললেন – শত্রু বা বেয়াড়া দেশের বিরুদ্ধ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ এনে তাকে পর্যদুস্ত করে ফেলা। এমনি আরেকটা অস্ত্র হল অবরোধ বা স্যাংশন [Sanction] আরোপ করা।

    চলতি প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি তাই তাঁর পুর্বসুরি ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান আর তিনি ডেমোক্রাট, আর নিজে ডেমোক্রাটে বলে তারা আতেঁল ও বুদ্ধিমান, বুদ্ধির চর্চা করে চলে থাকেন এটা রিপাবলিকানদের উপর ডেমোক্রাটদের চিরাচরিত উচা ও গর্বের ধারণা! তাই ‘বোকা’ ট্রাম্পের উপর তাদের বুদ্ধির ছটা দেখাতেই যেন তিনি যে নীতি-পলিসি নিয়ে সামনে এসেছিলেন তা হল এরকম যে, আমেরিকা কেন চীনের কাছে হারবে যেখানে আমেরিকার এখনও অঢেল বাড়তি সুবিধার হোল্ডার! বাইডেন যেন বলতে চান যে বোকা ট্রাম্পের মত লোকেরা ঝটাপট প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে – তাই চীনের উপর আমেরিকার হাতে থাকা বাড়তি সুবিধাগুলো কী কী তা এদের ‘জানাই নাই’! আর এসব বাড়তি সুবিধার দুটা বাইডেন বের করে দাবি করলেন যে তিনি এমন দুইটা কে তাঁর নীতি-পলিসি করে হাজির করছেন। যা অন্যদের বা শত্রুদেশকে বিপদে ফেলতে সক্ষম আর তা থেকে তাদেরকে আমেরিকার হাতে একধরণের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তেমনই এক মোক্ষম অস্ত্র হল তাদের ‘হিউম্যান রাইট’ ভায়োলেশনের প্রশ্ন তুলে তাদেরকে বেকায়দায় ফেলা। অন্যভাষায় বললে, এজন্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেন ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘হিউম্যান রাইট’ কমপ্লায়েন্সের প্রশ্ন তোলা তাঁদের বৈদেশিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    বিগত ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক জোটঃ
    বিগত বাইশ বছর ধরে মানে চলতি শতকের শুরু থেকে  ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক জোট বা ঐক্য যা আমরা এতদিন কাজ করতে দেখেছিলাম সেই প্রেসিডেন্ট বুশের আমলের শুরু থেকে, মনে হচ্ছে তা এই ২০২৩ সালে এসে এবার ক্ষান্ত দিতে চাইছে বা থেমেছে; যে স্ট্রাটেজিক ঐক্যজোটের অকার্যকারিতা বা স্তব্দ হয়ে যাওয়া এখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে না বললেও প্রায় সবটাই এখন কার্যত প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। আগামি নির্বাচনে মোদি সরকার যেন জিতে আসতে না পারে সেকাজে বাইডেন কমবেশি প্রকাশ্যে উঠেপড়ে লেগে পড়েছে। অথচ গত বাইশ বছর ধরে এই চীন-ঠেকানোর ঐক্য বা চায়না কনটেইনমেন্ট [China Containment] এর ঐক্য যেন চিরকালের তাই অনেকের মনে হচ্ছিল। মোদি এখন ক্রমশ বাইডেনের ‘হিউম্যান রাইট’ অস্ত্রে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ছেন। বার্মায় রেজিম চেঞ্জ প্রশ্নে আলাদা স্বার্থ বা আলাদা রাস্তার দুই দেশ হয়ে উঠছে।

    বাইডেনের ব্যবহৃত আরেক অস্ত্রের নাম ‘ডলার অবরোধ’ অনেকে যেটাকে অনেক সময় “ইকোনমিক স্যাংশন”[Economic Sanction] আরোপ বলছেন.  এর সোজা মানে হল ডলারে কোন বাণিজ্য বা বেচাকেনা করা যাবে না অথবা আমেরিকান কোন ব্যাংকের সুইফট কোড ব্যবহার করা যাবে না আমেরিকান সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে। আন্তর্জাতিক দুনিয়াজুড়ে যত বাণিজ্য বা পণ্য কেনাবেচা হয় এর সত্তরভাগের বেশি বাণিজ্য-লেনদেন হয় আমেরিকান ডলারে। অর্থাৎ পণ্যমুল্য ডলার এই মুদ্রায় লিখে ইনভয়েস তৈরি করা হয়। আর সেকারণে এই লেনদেন সম্পন্ন হতে হলে প্রক্রিয়ার মাঝে কোথাও কোন আমেরিকান ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা বা সাহায্য লাগবেই। আর এখানেই আমেরিকান স্যাংশন মানে আপনি (যেমন তেল-বিক্রেতা রাশিয়া হলে) আমেরিকার ব্যাংকের সুবিধা ব্যবহারে অযোগ্য।

    এখন এটা হল দুইধারী তলোয়ারের মত। কারণ, এটা ঠিক যে কোনদেশের উপর আমেরিকান ব্যাংক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিষধাজ্ঞা যেটা স্যাংশন নামে পরিচিত এবং তা আমেরিকান সরকারের পক্ষে বাস্তবায়নও সহজ। কারণ আমেরিকান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এই নির্দেশ পাঠিয়ে তা বাস্তবায়ন করানো সম্ভব। আর নির্দেশ অমান্য করলে ব্যাংকগুলো দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করারও উদাহরণ আছে। ইরানের উপর নিষধাজ্ঞার বেলায় হংকং ব্যাংকের উপর এমন দু বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল। কিন্তু দিনকে দিন এই ইচ্ছামত ডলার অবরোধ অপব্যবহার আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যেমঞ্চীনের সাথে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যও এখন উঠতি ট্রেন্ড। মানে আসলে বলতে চাচ্ছি ডলারের পাশাপাশি চীনা ইউয়ানেও বাণিজ্য বাড়ছে। অর্থাৎ যত বেশি ডলার ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে ততই এথেকে ছুটকারা পেতে প্রচেষ্টাও প্রবল হবে। আর এতে এখন গ্লোবাল মোট বাণিজ্যিক লেনদেন তা ডলারে লেনদেন এর ৭০-৯০% ডলারে  হয়ে থাকে। তা একবার ৭০% এর কাছাকাছি হতে শুরু করলে এই ঝোঁক স্থায়ী হতে চাইবে। মানে অবরোধের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বিপুরীতে কাজ করবে।
    একথাটা যেকোন ভাবেই হোক মিডিয়ার সামনে এসে গেছে। আমেরিকান অর্থ-ট্রেজারি মন্ত্রী হলেন জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]। সিএনএন এর ফরিদ জাকারিয়ার সাথে এক আলাপ তিনি মন্তব্য করে বসেন যে অপর দিকটা হল,  “আমরা যখন কোন দেশের বিরুদ্ধে স্যাংশন ব্যবহার করি যা ডলারের ভুমিকার সাথে সম্পর্কিত – এতে এমন রিস্কও থেকে যায় যাতে তা ক্রমশ ডলারের আধিপত্য ক্ষুন্ন করে ফেলতে পারে”।  তিনি আরও বলেন, “এভাবে ডলার অবরোধের যথেচ্ছ ব্যবহার  এটা অবশ্যই চীন, রাশিয়া বা ধরেন ইরাণকে ডলারের বিকল্প খাড়া করার জন্য প্রবল আকাঙ্খার জন্ম দেয়”।  অর্থাৎ আমেরিকাও রিস্কের পথে হাটছে তা জেনেট স্বীকার করে নিয়ে বলেই ফেলেছেন ।

    “There is a risk when we use financial sanctions that are linked to the role of the dollar that over time it could undermine the hegemony of the dollar,” “Of course, it does create a desire on the part of China, of Russia, of Iran to find an alternative,” 

    আরো কিছু প্রতিক্রিয়াঃ
    এদিকে এখনকার পাকিস্তান খুব ভাল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আগের ইমরান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে ডোনাল্ড লু এর ভুমিকা নিয়ে অনেক কথা উঠেছিল। সেটা যাই হোক, তাতে ইমরানের ক্ষমতাচ্যুতি এড়ানো যায় নাই। পরিবর্তে শাহবাজ শরীফ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ক্ষমতা পেলেও  সরকার চালাতে গেলে খারাপ অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়া পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় ডলারের ব্যবস্থা যদি আমেরিকা না করে দিতে পারে; নিদেনপক্ষে বিশ্বব্যাংককে দিয়েও যদি আমেরিকা ব্যবস্থা এরেঞ্জমেন্ট না করে দিতে পারে তবে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ক্রমশ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে যাবে। পাকিস্তানের নিয়মিত অর্থসংকট এমন ইঙ্গিত দেয়। আবার এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে যদি চীনের কাছ থেকে নিয়মিত লোন দেরিতে পরিশোধে ছাড় রোল আউট[Roll Out] বা নয়া ঋণ চাইতে হয় তবে এটা তা আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের জন্য ভাল সংবাদ নয়।  মানে ইমরানও তার আমলে ক্ষমতা ছাড়ার দুমাস আগে এমন রোল আউট নিয়েছিলেন।

    আবার রয়টার্সের এক নিউজ যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে ওর শিরোনাম হল, রাশিয়ার তেলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিতে ইউরোপ, লাভ তুলছে এশিয়া। মানে হল ডলার অবরোধ কাজ করছে না। আর শুধু আমেরিকা না বলে পশ্চিমা অবরোধ মানে হল এখানে আমেরিকার মত করেই ইইউ জোটেরও আলাদা অবরোধ দেয়া আছে। এমনকি এশিয়ার জাপান বা অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশেরও একই অবরোধ দেয়া ছিল।

    অন্যদিকে, জ্বালানি তেল প্রসঙ্গে আরো দুর্দশার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যেমন, আমেরিকা রাশিয়ার উপর তার তেল বিক্রির লেনদেনে ডলারে করার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এতে ভারত হয়ে উঠেছে রাশিয়ান ক্রুড ওয়েল আমদানি করে পরে নিজে রিফাইন করে তা পুণ-রফতানীর প্রধান দেশ বা  রাশিয়ান তেল রপ্তানির সেকেন্ডারি উৎস দেশ।  অথচ আমেরিকা এতে বাধা দিতে পারছে না। বা অন্তত দিচ্ছে না তাই আমরা দেখছি যার অন্তত একটা বড় কারণ হল অর্থনৈতিক লেনদেন ডলারে হচ্ছে না। এতে ফলাফলে রাশিয়ার উপর অবরোধ কার্যত এখানে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ অবস্থা হল এতে বিপদ ক্রমশ আরো বাড়ছে। কারণ পাকিস্তানের কথাই যদি ধরি,  ইতোমধ্যে এবার পাকিস্তানও দুই চালান এমন রাশিয়ান অশোধিত তেল যা ভারত শোধন করে রপ্তানি করছে তা ভারত থেকেই আমদানি করে ফেলেছে পাকিস্তান।  শুধু তাই না, এবার সরাসরি রাশিয়া থেকেই (তবে অশোধিত) রাশিয়ান তেল আমদানি করে ফেলেছে পাকিস্তান, পরে নিজ রিফাইনারিতে শোধন করে ব্যবহার করবে বলে। আর এতে কোন মুদ্রায় তা আমদানি করেছে তা মিডিয়ায় পাকিস্তানের মন্ত্রী অপ্রকাশ্য রেখেছেন। অর্থাৎ ধরে নিতে পারি তা ডলারে অবশ্যই নয় এবং সম্ভবত তা ইউয়ানে।
    এতে নিট ফলাফলে, রাশিয়ার উপর আমেরিকান অবরোধের পরিণতি যা দেখা গেল তা নিঃসন্দেহে বিব্রতকর!  মানে হল একদিকে, আমেরিকা নিজ সমর্থনের শাহবাজ সরকার যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বিদেশি মুদ্রার অভাবে মারাত্মক ভুগছে – এই বাস্তাতবতায় আমেরিকা শাহবাজ সরকার রাশিয়ান তেল যেন না কিনে তা করতে চাপ দিতে পারছে না। অপরদিকে চাপ দিতে না পারায় রাশিয়ার উপর আমেরিকান অবরোধ অকার্যকর হয়ে থাকছে। এভাবে আমেরিকার যদি সকল দেশকেই নানান অজুহাতে ছাড় দিতেই হয় তাহলে অবরোধ-শ্যাংশন কথাটা অর্থহীন!!  এসবই কী আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের সক্ষমতার বিরুদ্ধে ইঙ্গিত হয়ে উঠবে!!!  মানে হল শুধু রেজিম চেঞ্জ নয় সাথে নয়া সরকার চালানোতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আমেরিকান সক্ষমতাতেও সে যেন শর্টেজে না থাকে তা,  একালে আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকার জন্য সমান গুরুত্বপুর্ণ  এসেনশিয়াল বলে হাজির হচ্ছে!!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে

    গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

    https://wp.me/p1sCvy-4nv

     

    US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

     

    গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

    তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক।
    অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

    আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
    এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

    বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
    এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

    যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
    তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
    ১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

    কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

    অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

    ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
    কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

     সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

    চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

    তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
    অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
    বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

    এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

    [উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]

  • ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!

    ভারতের হিন্দুত্ববাদ উপড়ে ফেলার নায়ক, আমেরিকা!
    গৌতম দাস
    ২০ এপ্রিল ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4mT

    ‘The next few months are a crucial test of our democracy’   ‘The next few months are a crucial test of our democracy’ | Photo Credit: AP

    রাজনৈতিকভাবে গ্লোবাল ইস্যুতে  এশিয়া উত্তাল হয়ে উঠছে।  বিশেষ করে সাউথ-ইস্ট এশিয়া সামনের দুবছরে আরও বড় করে উত্তাল হবে। লঙ্খণগুলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে।   ঘটনার মূল ফেনোমেনাটা হল অর্থনৈতিকভাবে  রাইজিং চীনের দুনিয়া জুড়ে প্রবল  গ্লোবাল প্রভাবের প্ক্ষেটভুমিতে  ব্যাপারটা উঠতি চীন আর নামতি আমেরিকা এরই উত্থান-পতনের ঘটনাবলী ও প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে । যেটাকে অনেক সময় আমি “গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল” বলে ব্যাখ্যা করেছি। চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা আর তা থেকে জেগে উঠা কোন হবু সংঘাত – এই ঘটল বলে, লাগল বলে ধরণের পরিস্থিতিতে যা গত অন্তত দশবছর ধরে ক্রমশ বাড়ছে বা অস্থির হয়ে উঠছে – এটা হল সেই দৃশ্যপট।

    এর আগে আমরা দেখেছি ওবামা আমলের সেকেন্ড টার্ম (২০১৩-১৬) থেকে এই পালাবদলের ফেনোমেনা সাধারণ চোখে মোটামুটি  দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। তাতে তা বড়জোড় শ্রীলঙ্কা, বা মালদ্বীপ বা নেপালের নির্বাচনে ওসব দেশের দলগুলো একেকটা হয় ভারত বা চীনের সমর্থক হয়ে এমন ‘পালাপদলের’ প্রক্সি খেলে  চলছিল – এতটুকুই দেখা যেত। এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদিও  তখনকার ভারত মানে? সেকালের ভারত ছিল মূলত এশিয়ায় – এঅঞ্চলে আমেরিকান স্বার্থের প্রতিনিধি ফলে ভারতের উপস্থিতি যেন এক বরকন্দাজি “যৌথ” উপস্থিতি। আমেরিকা তখন ব্যাপারটাকে আমাদের বুঝাতে এক বয়ান ভাষ্যে বলত – ভারত হল “এশিয়ায় আমেরিকার চীন ঠেকানো এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্ট”। তাই এশিয়ায় ভারতকে আমেরিকার এই চাঙ্গে তোলা!

    কিন্তু এখন এশিয়া উত্তাল হবার কথা যেটা বলছি, তাতে কথিত সেই যৌথ উপস্থিতি জিনিষটাই নাই, উধাও! তা একেবারে বদলে গিয়েছে। এককথায় বললে – যৌথ উপস্থিতি দূরে থাক বরং এশিয়ার ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যেকোন স্ট্রেটেজিক ইস্যুতে আলাদা; যার যার তার তার। তবে এমন আলাদা অবস্থান যত গভীরে ততই আরো বেশি করে একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে; তবে ততদুর তা প্রকাশিত করা হয় না; তবে সেটা দুপক্ষেরই নিজ নিজ স্বার্থের আলাদা কারণে।

    যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান একবারেই আমেরিকার চেয়ে আলাদা। ভারত এখন রাশিয়ান তেল রপ্তানির  প্রধান পার্টনার। কিভাবে  নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সরাসরি তেল রপ্তানি করতে পারে না। তাই ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি করে এরপর, রিফাইন করে পরে আবার বিদেশে বিক্রির সবচেয়ে বড় দেশ। ভারত তার আট-নয়টা রিফাইনারির সবগুলাই এখন কেবল একাজেই ব্যস্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেলের সেকেন্ডারি উতস হিশাবে ভারত ঐ তেল আবার বিভিন্ন পশ্চিমা দেশেই  রপ্তানি করছে।
    কাজেই সরকথাটা হল ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে আর বিপরীতে আমেরিকা রাশিয়ার বিপক্ষে তা সবাই জানেন।

    আমেরিকার বার্মায় রেজিম চেঞ্জে আগ্রহঃ
    তবে ভারত আর আমেরিকা  স্ব স্ব স্ট্রাটেজিক স্বার্থে কত দূরদুরান্তে আলাদা এর মোক্ষম উদাহরণ হল আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” [Regime Change] বা সরকার বদলের আগ্রহ – এই ইস্যু। এই ইস্যুতে বরং ভারত-চীন-রাশিয়া এই তিন দেশ যৌথভাবে আমেরিকার বিরোধী অবস্থানে।  ভারতে আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন মিডিয়া এনালাইসিসে রিক [RIC] বলে একটা শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। [আগ্রহীরা এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন।] যেটা আসলে যথাক্রমে রাশিয়া, ভারত ও চীন এই তিনদেশের ইংরাজি নামে  প্রথম অক্ষর  নিয়ে তৈরি।  তবে আবার সাবধান এজন্য যে  এটা আর ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ (১৯৫৩-৯২) নয়। দুনিয়াতে কোথাও আর কোল্ড-ওয়ার এর নীতি ও অভ্যাস নাই। মানে হল, কোল্ড-ওয়ারের কালে কোন দুই দেশ স্ট্রাটেজিক বন্ধু হলে তারা এতে বাকি অন্য সব ইস্যুতে আপনাতেই ‘বন্ধু’ হয়ে যেতই। কিন্তু একালে সব উলটা। একালে দুই রাষ্ট্রের যেকোন শত্রুতা বা বন্ধুত্ব হল মূলত ইস্যু ভিত্তিক। তাই একালে দুইটা রাষ্ট্র এক ইস্যুতে চরম শত্রু হলেও অন্য ইস্যুতে কিছুটা ‘বন্ধু’ থাকতে দেখতে পাওয়া সম্ভব। চীন-ভারত এখনও বিভিন্ন স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ইস্যুতে যথেষ্ট শত্রুতা বজায় রাখে, আর ভারতের মিডিয়া এখনও এন্টি-চায়না টোনে যেকোন কিছু বয়ান করে থাকে। কিন্তু  আমেরিকার “বার্মায় রেজিম চেঞ্জ” ইস্যুতে  ভারত-চীন একসাথে আমেরিকা বিরোধিতায় ও অবস্থানে;  আর তা রাশিয়াকে সাথে নিয়ে। আর একথাও সত্য যে এই ইস্যু খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশাল বলেই অন্য অনেক ইস্যুর উপরে  – তা খুবই নির্ধারক। যেমন “বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ” ইস্যু ভারতের কাছে খুবই প্রভাবশালী ইস্যু। আর প্রভাবশালী ইস্যু বলতে বুঝতে হবে এই ইস্যু ভারতের অন্যান্য ইস্যুতেও যা প্রভাব রাখবেই। যেমন, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে নোঙর করে উপস্থিত থাকুক এটা আমেরিকার বহুদিনের খায়েস। আর ঠিক এর উলটা অবস্থানটাই ভারতের। মরে গেলেও আমেরিকান এই খায়েসে একমত হবে না ভারত।
    ‘বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ’ ইস্যু বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নৌ-উপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। যদিও এর চেয়েও বড় কথা বার্মা আর ভারতের বিস্তির্ণ সীমান্ত আছে যা বার্মাতে রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেলে এর ব্যাপক প্রভাব ভারতের উপর পড়তে বাধ্য। শুধু তাই নয়, এঘটনা ভারতের আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট অঞ্চল এর উপরেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। যদিও  এতদিন ভারত ভেবে এসেছে তার আসামসহ নর্থ-ইস্ট অঞ্চল রক্ষার স্বার্থ  এর প্রধান বাধা ও বিরোধি হল নর্থ-ইস্ট সীমান্তেরওপারে চীনের উপস্থিতি বা চীনের তিব্বত সীমান্ত। আর এটাকে বিক্রি করেই ভারত এতদিন বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর আদায়, বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ আর ফেনী-অঞ্চলকে যত রকমভাবে সম্ভব কব্জা করে নেয়া ও রাখা তা করে গিয়েছে। কিন্তু এখন টের পাচ্ছে আমেরিকা ভারতের জন্য প্রকৃতপক্ষে কে ও কী???

    কিন্তু কাকে ঘিরে এশিয়া উত্তাল হচ্ছেঃ
    এলেখায় কথা শুরু করেছিলাম ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলে। কিন্তু কাকে ঘিরে তা হবে? মানে এর কেন্দ্র বা ফোকাস হতে যাচ্ছে কোন ভুগোল? সোজা জবাব হল,  সেই মূল ফোকাস হতে যাচ্ছে সম্ভবত বার্মা। তবে এটা সেখানেই একমাত্র বা ঘনীভুত থাকবে তা না। এর সরাসরি ভৌগলিক কেন্দ্র হবে চীনের তিব্বত-কুনমিং সীমান্তের নীচের অংশ থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট ও সংলগ্ন সব অংশ আর বলাই বাহুল্য বাংলাদেশও; ইত্যাদি সব ভূখন্ডই। তবে এসব কথা ভুগোল হিশাবে বলা, রাজনৈতিক প্রভাব বা বলয়ের দিক থেকে নয়, সেটা আরও বড় ও ব্যাপক।

    তাই  ‘এশিয়া উত্তাল হচ্ছে’ বলতে এসবের বাইরেও নানান জায়গায় ব্যাপক রাজনৈতিক অর্থে পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠছে ও উঠবে। যেমন উপরে ভারতের কিছু ভৌগলিক অঞ্চলের কথা বললেও রাজনৈতিক দিক থেকে সারা ভারতের উপরেই ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তন আসন্ন হয়ে উঠতে পারে। আর ভারতে এসব কিছুই ইতোমধ্যে নড়াচড়া করা শুরু করে দিয়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও তা বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে তা বোধহয় আগামি “২০২৪ সালের আসন্ন কেন্দ্রিয় নির্বাচনকে” কেন্দ্র করেই।  আসলে, কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর কাছে  ২০২৪ সালের নির্বাচনে   মোদি ও বিজেপির ভরাডুবি ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে এই আমেরিকান পরিকল্পনা আগাচ্ছে।
    যেমন একটা ঘটনার কথা বলি।
    রাহুলের কংগ্রেসের সাথে মমতার তৃণমূলের সম্পর্ক খুবই খারাপ, বিশেষেত মোদিবিরোধি জোটের নেতা হিশাবে কংগ্রেস অথবা রাহুল গান্ধী কোনটাকে মানতে তৃণমূল রাজী নয় বলে। আবার, কলকাতার রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস  বিজেপিকে শত্রু মনে করে না বরং গোপনে বা প্রকাশ্যে বিজেপির সাথে মমতাবিরোধী এলায়েন্স করে।  একারণে গত ২ মার্চ ২০২৩ মমতা জানিয়ে দেন যে আগামি  “২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিরোধী জোটে যাচ্ছে না তৃণমূল, লড়বে একলাই, জানিয়ে দিলেন মমতা“। কোন জোটে যাবেন না।  কিনতু বেশি না ঐ মাসের তিন সপ্তাহের মাথায় একেবারে বিরোধি জোটের নেতা হিশাবে রাহুলের পক্ষে নিজে টুইট করলেন খোদ মমতাই। তিনি সব “তিক্ততা ভুলে কার্যত রাহুলের পাশে দাঁড়িয়ে … “রাহুলের পক্ষে মমতার টুইট: আমাদের গণতন্ত্র আজ নতুন নীচতায় পৌঁছাল। কেন?
    কারণ, ততদিনে মমতা জেনে গেছেন এই বিরোধি জোট নেতা রাহুল আগের জন নন। এটা সর্বাত্মক! তার মানে আমেরিকা ভারতে মোদির বিরোধিদের একাত্ম করতে পেরেছে এই মাঝের সময়ের মধ্যে।

    এখন এতে কী হতে পারে? সারা ভারতরাষ্ট্র মূলত এতে শেষে এমন এক যুগে প্রবেশ করতে পারে তাতে তা এই প্রথম হিন্দুত্ববাদ-সহ  মোদির বিজেপি-আরএসএস সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। পুরানা গান্ধী-নেহরুর সফট বা লুকানো হিন্দুত্ববাদ ( মানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদ) যা একালে (২০১৪) মোদির প্রধানমন্ত্রী হবার আগে ঢলে পড়ে বিলীন হবার যুগে হাজির হবার পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনি বিজয় থেকে মোদির বিজেপি-আরএসএস একে আরো উগ্রভাবে  আর নরমের বদলে উগ্র-হিন্দুত্ব হয়ে হাজির হয়েছিল। তাতে ভারত চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও  চরম মুসলমান নিপীড়নমূলক এক চরম বৈষম্যমূলক  রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল, এবার এই পর্যায়ের একটা অবসান ঘটতে পারে।

     

    ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার সম্পর্কঃ
    কিন্তু ভারতের নির্বাচনের সাথে এশিয়া উত্তাল হবার কী সম্পর্ক? বিশেষ করে যেখানে গতবার মানে ভারতের ২০১৯ সালের নির্বাচনে তো আমরা তেমন কিছু দেখি নাই!
    হা সেকথা সত্যি; তবে সেবার আর এবার এক নয়; আর তেমন থাকছে না। মানে কী?
    আমাদের দেশেও আজকাল রাজনীতিক দল ক্ষমতায় বা বাইরে যেখানেই থাকুক এরা বলা শুরু করেছে “আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে, করার ক্ষমতা রাখে ইত্যাদি. যেমন এখানে দেখেন,  ….. যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যেকোনও দেশের ক্ষমতা উল্টাতে-পাল্টাতে পারে।

    তবে এটা বলতে তামাসার মত শোনাচ্ছে যদিও তবু কথাটা হল – আমেরিকা রেজিম চেঞ্জ করতে পারে বলতে মনে করা হয় এটা কেবল বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশের বেলায় সত্যি। তবে, যেখানে ভারত অবশ্যই একালে আর যেন তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলে বুঝানো যাবে না। কেন?
    কারণ, মোদির প্রপাগান্ডায় ভারতের সারা মিডিয়া এক উগ্র-হিন্দুজাতি-বোধ থেকে সময়য়ে নিজ পত্রিকায় লিখেছে ও বিশ্বাস করা শুরু করেছে যে ভারত তৃতীয় বিশের দেশ থেকে একলাফে কবে যেন পরাশক্তি হয়ে গেছে। দ্যা-হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দারও একথা বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু মোহভঙ্গের পরে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন।
    মোদির সেই ‘পরাশক্তি ভারতকে’ বাইডেনের আমেরিকা এখন মোদি রেজিম চেঞ্জের জন্য উঠে-পড়ে লেগে গিয়েছে – যদিও পুরা ঘটনাটা দেখে আগামি ২০২৪ সামের মে মাসের ফলাফলে জনগন দেখবে মোদি সেই নির্বাচনেই হেরে গেছে – এমনই মনে হবে হয়ত।
    তাই এশিয়া উত্তাল হচ্ছে বলতে যদি ভারতের দিকে তাকিয়ে বলি তবে, বলতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে আগামি বছর ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে। সেক্ষেত্রে এই নির্বাচন শুরু হতে এখন থেকে এক বছরেরও কম সময় আর বাকি আছে বুঝতে হবে। কারণ গতবারের (২০১৯ সালের নির্বাচন) কথা মনে রেখে বললে ২০২৪ সালের ১১ এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন শুরু হয়ে যাবার কথা। আর আমেরিকা ও রাহুলের নেতৃত্বের বিরোধী দলের টার্গেট হল ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি ( ফলে সাথে তার হিন্দুত্ববাদও) উপড়ে উঠিয়ে ফেলে দেওয়া। আর আমেরিকান টার্গেট হল, এভাবে ভারত থেকে প্রো-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক নীতি-পলিসির এক ভারতকে পাওয়া।

    মোদি-উপড়ানোতে উতসাহিদের বয়ান দাবি করে যে ভারতে ধারাবাহিক একশন শুরু হয়ে গেছে। যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, শেয়ার বাজারে মোদির দোস্ত আদানির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুলের ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ] বলে মোদির অভিযোগ, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে যুক্ত।

    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্টঃ
    আমেরিকান স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট মানে হল আমাদের ভাষায় আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যায় এর মুখপাত্র ছাড়াও আরেকজন উপ-মুখপাত্র আছেন যার নাম বেদান্ত প্যাটেল। তাকে আগে আমরা খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু তিনি এখন খুব এক্টিভ। ভারতের কেন্দ্রিয় সংসদের স্পিকার কংগ্রেসের রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করে দিয়েছেন।  আর এর অজুহাত হল গুজরাতের এক মেজিষ্টেট কোর্টে দুবছর আগের মামলা যে রাহুল মোদির মানহানি করেছেন, তার তাকে দুবছরের সাজা দিয়েছেন। তবে কোর্ট নিজেই তাকে আগাম জামিন দিয়েছেন উচ্চ আদালতে যাবার জন্য, এর আগে সাজা বলবত স্থগিত রেখেছেন ইত্যাদি। এমনিতেই বহু আইনি ত্রুটিতে ভরা এক সাজা আদেশ আর এছাড়া ঐ আইনেই বলা আছে চলতি সংসদ সদস্যের বেলায় আপিলের আগে এই সাজা বলবত করা যাবে না তবু স্পিকার  রাহুল গান্ধির সংসদ সদস্যপদ খারিজ করেছেন। এরপর ঐ বেদান্ত প্যাটেল এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আমেরিকা রাহুলকে নিয়ে আদালতের ঘটনাবলীর দিকে নজর রাখছেন। ‘Importance of freedom of expression’: US says it’s watching Rahul Gandhi’s case – এই শিরোনাম দেখুন।
    অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ভারত আর বাংলাদেশ যেন একাকার – এক তৃতীয় বিশ্বের দেশ নিয়ে আমেরিকান বিবৃতি যেমন হয়ে থাকে।

    হিউম্যান রাইট নিয়ে আমেরিকাঃ
    আমাদের মত দেশে হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ কী কাম্য? স্বাগত জানানোর মত? নাকি আমাদের আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে হস্তক্ষেপের উসিলা?
    এককথায় বলা যায়, কমিউনিস্টেরা মনে করে এটা হস্তক্ষেপ। কোন দেশ উত্তর কোরিয়া হয়ে গেলেও ভিন্ন কোনদেশের তা একেবারেই আমল করা উচিত না। কারণ, এটা তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়।

    এ সম্পর্কে একটা কথা বলাই যথেষ্ট যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক বলে কোন ধারণা নাই, অনুপস্থিত। অতএব সে অবস্থায় আবার নাগরিক অধিকার বা অধিকার [Citizen’s right] বলে কোন ধারণা সেরখানে থাকার আশা করা অর্থহীন। তবে রাষ্ট্রে শ্রেণী [Class] বলে ধারণার প্রাবল্য আছে। কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে বাসিন্দারা সকলে নাগরিক এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সকলে সমান নাগরিক অধিকারের নাগরিক। কমিউনিজমের রাষ্ট্র চিন্তায় নাগরিক বলে ধারণাটাই নাই, তাই সমান অসমানের বালাই নাই। তবে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা শ্রেণী ধারণা আছে।  আর তাদের ওই রাষ্ট্র কেবল প্রলেতারিয়েটের পক্ষের রাষ্ট্র, এর পক্ষে সগর্ব ঘোষণা আছে। সুতরাই এখানে সমান নাগরিক, সমান অধিকারের মানুষ বা নাগরিক বলে কিছু নাই। বরং মারাত্মক অসম ক্ষমতার বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েট বলে অন্তত দুটা আলাদা ও অসম শ্রেণী ধারণা আছে।
    অতএব কমিউনিস্টেরা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা বলে, আভ্যন্তরীণ ইস্যুর কথা তুলে নিজের এই দুর্বলতা ঢাকবে বা লুকাবে স্বাভাবিক!

    কিন্তু তাই বলে কী  হিউম্যান রাইট লঙ্ঘণ নিয়ে কথা তুলে আমরা আমেরিকাকে ডেকে আনবো? হস্তক্ষেপের উসিলা করে দিব?
    সেটাও অবশ্যই না।  এককথায় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘণ বা হস্তক্ষেপ না করতে দিয়েও অধিকার দিয়ে কথা বলতে দেয়া সম্ভব ও তা যায়।  এছাড়া মনে রাখতে হবে হিউম্যান রাইট তো জাতিসংঘের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং ইস্যু তাই এনিয়ে জাতিসংঘের ফোরামে তো কথা উঠবেই।  আর এখানেও কোন কথা না তোলার মানে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিতরে  সরকারবিরোধী সবাইকে গুম-খুন অপহরণ বা পিটায়ে মেরে ফেললেও তা নিয়ে বাইরের কাউকে কথা বলতে না দেয়া হবে।
    আসলে মূল তর্কটা অন্যখানে, সেখানে সরাসরি যাওয়া যাক।
    আমেরিকান সরকারি ফরেন পলিসিতে, আমেরিকান সরকার যদি কোন দেশ ও সরকারের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন এর বিরুদ্ধে কথা বললে আমেরিকারর নিজের স্বার্থ আছে বলে না দেখে তবে আমেরিকা সেক্ষেত্রে নিঃশ্চুপ থাকবে। অর্থাৎ ভায়োলেশন হলেই তা নিয়ে আমেরিকা মুখ খুলবে না। যদি তাতে আমেরিকান স্বার্থও না থাকে বা আমেরিকান সরকার না দেখে।

    তাহলে কনক্লুশন কীঃ
    ওয়ান-এলেভেনের হস্তক্ষেপ এর সুবিধা  যাদের পক্ষে গেছিল স্বভাবতই তারা এই হস্তক্ষেপকে ভাল বলবে। অন্যেরা সমালোচক হবে। বর্তমানে বা আগামিতেও এই নিয়মে সব হিসাব মিলবে দেখা যাবে। এর বাইরে আপাতত কোন কমন সুত্র বা সমাধান দেখছি না।

    সবশেষে ভারত প্রসঙ্গে আরেকটা তথ্যা দেই। সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি ও রাহুলের মা। দলের এক শীর্ষ বা প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি মোদির দুটার্মের প্রায় দশ বছরে রাজনৈতিক অপরাধ ও অন্যায়গুলোর একটা তালিকা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায় মোদির নাগরিক অধিকার লঙ্ঘণ-গুলোর এক গ্রহ্নিত তালিকা এটা।  সিরিয়াস ও ভাল তালিকা সন্দেহ নাই। শিরোনাম করেছেন,  “An enforced silence cannot solve India’s problems.” জবরদস্তিতে চুপ করিয়ে দেয়া ভারতের সমস্যার কোন সমাধান নয়।  কিন্তু একটা অসুবিধা হল তিনি এটা কেবল দ্যা হিন্দু পত্রিকাকে দিয়েছেন আর তারা পাঠক এটা পুরাটা পড়তে চাইলে পয়সা চাচ্ছেন। যা খুবই অন্যায়। কংগ্রেসের দিক থেকেও বড় অন্যায়।  তবে অর্ধেকটা বিনা পয়সাতে পড়া যায়।
    একটা ভিন্ন বিকল্প আছে। আরো কয়েকটা পত্রিকা এনিয়ে পর্যালোচনার ছলে প্রায় অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে, যাদের একটা হল ইন্ডিয়া টুডে – সেটা এখানে দেখা যেতে পারে।  এমন করে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা এর টা এখানে।


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    গৌতম দাস

    ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4mg

     

     

    Fact Sheet: Indo-Pacific Strategy of the United States – U.S. Embassy in the Philippines

    বাইডেনের আমেরিকা সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বেচারা হয়ে গেছে! তাঁর কোন নীতি-পলিসিই কাজের না, ফলে আনতে পারছে না। তাতে সেটা হোক ইউক্রেন ইস্যু অথবা বাংলাদেশের মত ছোটদেশের উপর আমেরিকান প্রভাবের ক্ষেত্রে; সব অকার্যকর। ফলে শেষে কেবল বকোয়াজ আর বোলচালে ভরপুর এক আড়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকছে তাঁর প্রশাসন। ব্যাপারটা হল কেবল ফাঁকা দাবি না,  ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় তিনি ভাল বিকল্প – সেটা নিজ আমেরিকান জনগণের কাছে তো  অন্তত প্রমাণ করতে হত; এখন এশিয়ায় বা বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে  মূলত যেন এক ‘খামোখা’ বলেই পরিচিতি তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের যারা হাসিনার শাসন এই ফ্যাসিজম থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখছিলেন যেখানে আমেরিকার একটা ভুমিকা থাকার সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে, তারাও সমুলে হতাশ হয়েছেন।

    যেমন ধরা যাক, বাইডেন তাঁর শাসনের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘হিউম্যান রাইট’ বা মানবাধিকার নাকি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ। যারা পোড় খাওয়া ‘আমেরিকা অবজারভার’ তারা বিশ্বাস করেন নাই; কিন্তু এটাই পরিণতি তা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন। যেমন বাইডেনের শাসনকে বলা যায় “স্যাংশনের রেজিম’ বলা যায়। যা কিছুই বাইডেনের অপছন্দের বা আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে তিনি মনে করেছেন তাতে সেখানেই তিনি যেন এক স্যাংশন আরোপের রাজা বনে গিয়ে অবিরাম সেসবের উপর স্যাংশন আরোপ করে গেছেন। এসবের মধ্যে কোথাও সত্যিই হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ঘটনাবলীও মাখামাখি করে আছে, অবশ্যই। যেমন বাংলাদেশের গুম, খুন হত্যা, অপহরণ, গায়েব, ‘ক্রশফায়ারের’ নামে হত্যা ইত্যাদি যতধরণের অপরাধ আছে তা গত পনেরো বছরে ঘটে চলেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ঘটনা। যেসবের উপর আমেরিকা স্যাংশন আরোপ করেছে। আবার একই নিঃশ্বাসে যেমন, রাশিয়া তার জ্বালানি তেল বিদেশে বেচতে পারবে না – এজন্য সে একই স্যাংশনও যথেচ্ছাচারে আরোপ করে চলেছে। যা মানবাধিকারের ইস্যুওই নয়; বরং খাসা একান্তই আমেরিকান ব্যবসা-বাণিজ্যিক স্বার্থ বৈ আর কিছু না – এমনটাও আছে।

    ঠিক যেমনি বাংলাদেশে হাসিনা রেজিমের তার রাজনৈতিকবিরোধীদের নির্বিচার দমনকে জঙ্গীবাদ দমনের নামে চালিয়ে দেয়াতে –  এর বিরুদ্ধে হাসিনার র‍্যাবসহ নানা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের উপর স্যাংশন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক বলে দেখে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু না – পরিশেষে আমেরিকা সবকিছুকেই তার চীনবিরোধী বাণিজ্যিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বলে যে মনে করে সেকথা আর লুকায়ে রাখল না বা পারল না!

    এককথায় বললে, ঢাকার শাহীনবাগে গুন-খুনের ভিকটিমদের সাথে দেখা করতে রাষ্ট্রদুত পিটারহাস উপস্থিতের সাথে সাথে হাসিনা যে মৃদ্যু পরোক্ষ বাধার পালটা অবস্থান দেখিয়েছিল তাতেই আমেরিকার নিজের আগানোর পথ নিয়ে রিভিউ-এ বসেছিল। এই আদ্যোপ্রান্ত পর্যালোচনা থেকেই আমেরিকার পথ চলায় গিয়ার বদল! মানে যেটারই পরিণতি আমরা দেখলাম ডোনাল্ড ল্যু এর বাংলাদেশ সফর। আর সেখান থেকে বাইডেনের মতিগতির ল্যাংটা হয়ে পড়া! কেমন সেটা?
    সেটা হল ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এসব বাইডেন প্রশাসনের কাছে কিছু না! তারা এসবের আসল ভক্ত না। সিনসিয়ার বা সিরিয়াস কোনটাই না! বকোয়াজ মাত্র!! বাইডেনের আসল স্বার্থ সারা দুনিয়ায় যেমন, তেমন এশিয়াতেও তার প্রতিযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বি নয়া উত্থিত হতে থাকা চীন; এই চীনবিরোধীতায় নিজ স্বার্থ উদ্ধার এটাই বাইডেনের মুখ্য নীতি-পলিসি। আর সেকাজ তার বাকি সব ততপরতা বিক্রিযোগ্য! যেমন এসময়ের এশিয়ায় বাইডেনের স্বার্থ সোজা  ভাষায় যা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) নামে পরিচিত।

    একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাঃ
    এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, এই আইপিএস (IPS) বা আগের কোয়াড (QUAD) গঠন – এদুইয়ের সম্পর্কই বা কী? প্রথম সমস্যা আমাদের মিডিয়া রিপোর্টার লেবেলেই ব্যাপারটা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। এর উপর আবার ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF) বলে আরেক ফেকড়া বা বাড়তি দিক (এক্সটেনশন) বা নয়া খাতা আছে।
    খুবই অল্প কথায় বললে, কোয়াড [QUAD] বা চারদেশীয় জোট (আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া)  যেটা ছিল তা কার্যত অকেজো। হাত লাগলেই ভেঙ্গে যাবে, সম্ভবত ভারত বেরিয়ে যাবে; এরকম! মূলত, একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাকে না বুঝা থেকে এই সমস্যা। আমেরিকা বরাবর এব্যাপারে ফেল করছে এজন্য যে তাদের মাথায় জোট বলতে সবসময় কোল্ডওয়ার কালের (১৯৫৩-৯১) সোভিয়েত (ব্লক) বনাম আমেরিকা (পশ্চিমা জোট) এর স্বপ্ন মাথায় ঘুরে থাকে। এই স্বপ্নকল্পনার কারণে আমেরিকার মনে ইচ্ছা করে আগের সোভিয়েতের মত যদি একালে চীনবিরোধী এক পশ্চিমাজোট (মূলত আমেরিকা ও ইইউ এর সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট) গড়তে পারা যায়।
    অথচ এই স্বপ্নটা একেবারেই অবাস্তব, অথচ সেটা আমেরিকার ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদলের কোন প্রেসিডেন্ট যারা হয়ে আসছেন তাদের  নীতি-পলিসিতে এটা প্রতিফলিত নাই। কিন্তু কেন অবাস্তব বলছি? সেকথা বললেই বাকি সব কথা পরিস্কার হয়ে যাবে। যাকে সোভিয়েত ব্লক বলছি এদের মূল ও কমন পরিচয় এটা না যে তারা কমিউনিস্ট অর্থনীতির চক্করে আটকে থাকা দেশ ছিল তাই। তাদের মুল পরিচয় আসলে তারা কেউই আইএমএফের [IMF] সদস্য ছিল না; তবে সেটা দু’এক রাষ্ট্র হতে চেয়েও সদস্যপদ পায় নাই বলে, আর বাদ বাকিরা, বেশির ভাগই রাশিয়ার স্টালিনের  অবস্থানের কারণে নিজেরাও সদস্য হতেও চায় নাই, একারণে। কিন্তু সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য ছিল না তাতে কী?

    এর এককথায় উত্তর হল, আইএমএফের সদসদ্য নয় একথার ব্যবহারিক মানে হল এসব রাষ্ট্র অন্যকোন রাষ্ট্রের সাথে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারবে না বা পারত না। এই কারণে তখনকার মানে কোল্ডওয়ারের  [Cold War]আমলে যেকোন জোট মানে কার্যত তা সামরিক-স্ট্রাটেজি অথবা রাজনীতিক আদর্শ কেন্দ্রিক জোট হত।  এর চেয়েও বড় কথা সেকালের ‘জোট ধারণা’ একালের ‘জোট ধারণা’ একেবারেই এক নয়। মানে কী?

    মানে হল একালের জোটে যার সাথে সামরিক-স্ট্রাটেজিক অথবা এমনকি অর্থনৈতিক স্বার্থের গভীর বিরোধ আছে তারই সাথে আবার একালে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘটে আছে। ফলে সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ গভীরবিরোধ থাকলেও তারই সাথে আবার গভীর বাণিজ্যিক লেনদেন ও পরস্পর গভীর নির্ভরতা তা শুধু সম্ভবই নয় একেবারে প্রধান বাস্তবতা। চীনের সাথে আমেরিকা, চীনের সাথে ভারত, চীনের সাথে জাপান, চীনের সাথে অষ্ট্রেলিয়া এমন প্রায় সকলের সাথেই চীনের যে  গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং এতে পণ্য-পুঁজির গভীরতম বিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা – এটাই বাস্তবতা। এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক এতই প্রধান যে একই সাথে চীনবিরোধী কোন সামরিক-স্ট্রটেজিক বা রাজনৈতিক জোট গড়া তা প্রায় অসম্ভব হয়ে আছে; এতে হয়ত তা গড়া হয়েছে ঠিকই, কার্যত যা অকেজো! যেমন সর্বশেষটা হল, অষ্ট্রেলিয়া বা জাপান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় স্কট মরিসনকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন অ্যান্থনি আলবানিজ। স্কট মরিসনের দল লিবারেল পার্টি। আর নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন লেবার পার্টির অ্যান্থনি আলবানিজ। অষ্ট্রলিয়া-চীন বিরোধে চীনে অষ্ট্রেলিয়ার সব রপ্তানি সুবিধা  প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল।  অষ্ট্রেলিয়ায় নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী এখন আগের দলের উপর দোষচাপিয়ে আগের মতই চীনে রপ্তানির সুযোগ কতটা পুনরুদ্ধার করা যায়, চীনের সাথে সেসব সম্পর্ক ও চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গভীরভাবে ব্যস্ত।  আবার ওদিকে জাপান; চীনে কোভিডের কারণে চীনের অর্থনীতির অনেক খাত ঝুলে পড়াতে জাপানের র্অথনীতি সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ও এর ধাক্কার শিকার দেশ হয়ে উঠেছে। আবার কোয়াডকে আমেরিকা সামরিক অভিমুখী করে ঘুড়িয়ে দিতে চাইলে সবার আগে পিছটান দিয়েছে ভারত; ভারত কারও সাথে সামরিক জোট করতে চায় না, তাই। তাই বাইডেন আর কোয়াড নিয়ে সমস্ত নাড়াচাড়া স্তব্দ করে রেখেছেন।

    আর তাতেই আইপিএস (IPS) নামে আমেরিকা নয়া এক খাতা খুলেছেন বা এদিকে জোর দিয়েছেন। কিন্তু আইপিএস কী কেন? বলা হচ্ছে এটা কোয়াড থেকে আলাদা। জিজ্ঞাসা করলে বলে এটা কোন রাষ্ট্রজোট নয়, ডোনাল্ড ল্যু এবারের বাংলাদেশ সফরে যেমন পাবলিকলি বলেছেন। তাহলে এটা কী? বলছেন এতে নাকি সবদেশই ইন্দো-প্যাসেজিক জোন প্রসঙ্গে নিজের নিজের স্ট্রাটেজি জানাবে। কিন্তু কেন বা কী উদ্দদেশ্য? এখানেই কবি একটু নিরব! মানে প্রথমত এটা কী কোন একটা দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য স্ট্রাটেজি বা কৌশল? নাকি যুদ্ধ কৌশল, না সামরিক স্বার্থের কৌশল, নাকি রাজনৈতিক, না অর্থনৈতিক – এসব এই প্রশ্ন আছে। তা কেউই প্রকাশ্যে পরিস্কার করছে না। দ্বিতীয়ত, এখানে শত্রুদেশটা কে? এটা সবচেয়ে নির্ধারক প্রশ্ন! এটা লিখিত ভাষায় বা রেকর্ডে না বলে চর্চায় তারা বলে থাকে; ফলে মনে মনে ধরে নেয়া সেই শত্রুদেশ হল চীন!

    তাহলে কী দাড়ালো এটা?  যেখানে আমেরিকাসহ সকল দেশই চীনের সাথে বাণিজ্য- অর্থনীতিতে পুঁজি-পণ্য বিনিময়ে গভীরভাবে সম্পর্কিত সেখানে একই সাথে চীনবিরোধী আইপিএস (!) এটা কেমন স্ট্রাটেজিক জোটের কল্পনা???  আমেরিকা ঠিক চাইছেটা কী???  এর বাস্তব দিকটা তো খোদ আমেরিকার কাছেই অপরিস্কার!! তবু আমেরিকা চাইছে এশিয়ার সবদেশ তো বটেই কানাডাকেও কার্ড দেখাতে হবে! বা কানাডার কাম্য ইন্দো-প্যাসেজিক স্ট্রাটেজি কী তা লিখে জানাতে হবে। মানে হল কতটা সে চীনবিরোধী তা দেখাতে বলতে হবে! আর ঠিক এর মতই হাসিনার বাংলাদেশেকেও মূলত সেকথা বলতেই এসেছিলেন ডোনাল্ড ল্যু। তিনমাস মানে মার্চ মাসের মধ্যেই তা আমেরিকাকে জানাতে হবে। এদিকে আরও প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

     

    ওদিকে আইপিএস, এর আরেক বাড়তি ঝালড় আছে – সেটা হল, ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)। মানে এটাই আসল অর্থনৈতিক জোটের কল্পনা। কিন্তু সমস্যা হল, এটা টু লেট (too late)!! কেন?

    কারণ ইতোমধ্যেই চীনা আগ্রহের আরেক এবং আরো গুছানো এক অর্থনৈতিক জোটের জন্ম ও ততপরতা গত ২০২০ সাল থেকে শুরু হয়েই আছে যার নাম RCEP। বাংলা লিখলে, রিজিওনাল কম্প্রিহেন্সশীপ ইকোনমিক পার্টনারশীপ [RCEP]। যেটা আসলে কালজয়ী; কারণ এটা জোটদেশগুলোর যেকোন উতপাদিত পণ্যে সদস্য সবদেশেরই শ্রম যুক্ত করার সুযোগ (shared value addition) রাখা হয় ও তাতে সকলেই এই পণ্যের ভোক্তা-ক্রেতা। যেমন জাপান, অষ্ট্রেলিয়া দুই কোয়াড সদস্য এমনকি আমেরিকা প্রভাবিত দক্ষিণ কোরিয়াও এই জোটের সদস্য হতে মিস করে নাই। জন্ম থেকে এরা সবাই সদস্য, তাতে কোয়াড বা IPS বলে কিছু গঠিত থাকুক আর নাই থাকুক!

    তাহলে এতদিনে  IPEF খাড়া করার আমেরিকান নয়া বাসনা কেন আর কতটুকু এটা নতুন কিছু করতে পারবে? যদিও এটা RCEP এর নকল করে তার চার বৈশিষ্টের একটা হিশাবে supply chains বলে একটা ধারণা রেখেছে যেটা shared value addition ধারণার ধারেকাছের নয় বলেই অনুমান। কারণ, shared value addition এটা আমেরিকান কনসেপ্ট নয়। বরং উঠতি অর্থনীতি বা ‘প্রাক্তন কমিউনিস্ট’ দেশ হলে এনিয়ে তাদের নিরীক্ষায় আগ্রহী দেশ হতে দেখা যায়। কারণ এখানে লেবার মানে ভ্যালু এডিশন“ভাগাভাগির” প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
    কিন্তু সেটাই মূল ইস্যু বা প্রধান বাধার দিক নয়। প্রধান বাধার দিক হল, আমরা যদি IPEF-এ যোগ দেই তবে আমাদের  কারখানা পুঁজি (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ) এবং  অবকাঠামো পুঁজির উতস কে হবে?

    একাজে আমেরিকা বুড়া সিংহ, আর বিপরীতে চীনকে উঠতি বাঘ বলা যায়। উদাহরণ, এই বুড়া বয়সে বাইডেনের আমেরিকা উঠে দাড়ানোর সখ করেছিলেন। বর্তমানের চীন দুনিয়ার আমাদের মত সবদেশের জন্যই অবকাঠামো পুঁজির ঋণদাতা ভুমিকায় একছত্র হয়ে উঠে আছে। এমন এক অর্থনীতিকে আমেরিকার বাইডেন এই বুড়া বয়সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। দেখা গেলে এতে তারা সবাই মিলে মাত্র ৬০০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্টের জোগাড় করতেই তাদের হিসশিম। এছাড়া এখনও এই সংগ্রহ হাতে আসা ও কাজে নেমে পড়ার ততপরতার কোন কিছুই শুরু করতে পারেন নাই। তাই খুব সম্ভবত ২০২৪ সালে বাইডেন ক্ষমতা ত্যাগের পরে এই উদ্যোগ্রটারও মৃত্য সংবাদ আমরা পাব!!!  তাহলে IPEF-এ যোগদানে আমাদের কী হবে????

    আসলে, কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক এসব শব্দ দিয়ে এপর্যন্ত আমেরিকান পেসিডেন্টেরা পিসমিল একমুঠো করে যা কিছু করে যাচ্ছেন এসবের কিছুই টিকবে না, শুরুতে কার্যকরই হতে পারবে না। তবুও  RCEP এর সমান্তরাল আরেকটা IPEF বলে জোট অবশ্যই খাড়াতে পারে তবে এর অন্যতম শর্ত হতে হবে যে এসব কোন অর্থনৈতিক জোটই বিশেষে দেশের (যেমন চীন অথবা আমেরিকা্র বিরোধী হতে পারবে না। ফলে একই দেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাপেক্ষে ইচ্ছা মত একই সাথে দুইটা জোটের মধ্যেই থাকতে ও সদস্য হতে পারবে, এমন জট হতে হবে। একটা জোটের মধ্যে সবাই থাকবে তাও হতে পারবে। কিন্তু কোন ভাবেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমরা চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক জোট করতে চাই, এমন করা যাবে না – এসব চিন্তা অবাস্তব, অকেজো। ঘৃণা ছড়াতে পারবে কিন্তু নিজে কার্যকর কিছুই হতে পারবে না। মুল কারণ আমরা সবাই একই [IMF] আইএমএফের সদস্য। মানে আমরা সকল রাষ্ট্র একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ ফলত আমরা মূলত একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ।  ক্যাপিটালিজমে “কোটারি” হয় না; সব ক্যাপিটালিজমই পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে  যাবেই; এভাবেই সে টিকে থাকে যা এর মৌল স্বভাব!

    চীন একারণের এটাকে নিন্দা করতে বলে, বাইডেনের ‘কোল্ডওয়ার মানসিকতা’।  এমনকি বাংলাদেশের চীনা নয়া রাষ্ট্রদুতই এসব ধারণা আড়াল নিয়ে বলেছেন “কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে: চীনের রাষ্ট্রদূত”। ওথবা “কোনো দেশকে বাদ দিয়ে গড়া জোটে যোগদানে সতর্ক থাকতে হবে”।

    এখনও তিনটা কথাঃ
    প্রথমত, আমেরিকা ল্যু এর সফরে মার্চের মধ্যে হাসিনা সরকারকে নিজদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরি করে তাদের জানাতে বলে গেছে বলে জানা যায়। কিন্তু এটা কেন?
    ল্যু যেটা বলতে চাইছেন এর সারকথা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে সম্পর্ক বিশেষত অর্থনৈতিক যেটা যেমন প্রধানত, চীনা অবকাঠামো ঋণ ও চীনের উপর নির্ভরশীলতা না করে চলা। এছাড়া চীনা অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামও মানে করে থাকতে পারে। এছাড়া সাউথ চায়না সি নিয়ে আমেরিকা যে গায়ে পড়া ঝগড়া-বিরোধ বানিয়ে রেখেছে তাতে আমেরিকার পক্ষ নেয়। বাংলাদেশ যেন এমন অবস্থান নেয়!

    আমরা উপরে দেখেছি, আমেরিকান এই আকাঙ্খাটা আনরিয়েলিস্টিক; বাস্তবে তা সংঘটন বা করে দেখানোর কারও কোন সম্ভাবনা নাই বা সম্ভাবনাচ্যুত! তাহল এটা নিয়ে এই জিদ ধরার অর্থ কী?

    দ্বিতীয়ত, আমেরিকা বা এমনকি সে বগলে জাপানকে নিয়েও যে আমেরিকা সে আমাদের অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটানোর যোগ্য কোন দেশ নয়। যদিও এটা ঠিক ওয়ার্ল্ডব্যাংকের যেকোন ঋণপ্রকল্পে ওপেন টেন্ডার হতেই হয়।  যমুনা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তরফে সিংহভাগ লোন দিয়েছিল জাপান। অথচ ১৯৯৭ সালে এই সেতু নির্মানে জাপান কোন অংশের কাজই পায় নাই। আর একালে, বাংলাদেশে চীনাঋণের প্রকল্পের কমিশন সরাসরি সিঙ্গাপুরে জমা হয়ে যায়, এটা এক বিরাট সমস্যা হয়ে আছে। কাজেই তরুণ উঠতি আকাঙ্খার ঋণ আকাঙ্খার বাংলাদেশকে আমেরিকা নিজ বাহুডোরে আটকে রাখার খায়েস; অর্থহীন!  তবে বাংলাদেশে নয়া এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ভিত্তিক নুন্যতম কিছু সংস্কার করতে পারলে এর অনুষঙ্গ হিশাবে চীনাঋণের কমিশন সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ, চীনা সরকার আমাদের মত দেশে নুন্যতম সাধু বা সীমাহীন চরম চোর নির্বিশেষে সব ধরণের সরকারের সাথে কাজ করে থাকে।

    তৃতীয়ত,
    আমেরিকা কেন ডোনাল্ড ল্যু পাঠিয়ে এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) যোগদানের জন্য হাসিনা সরকারকে জোরাজুড়ি করছে?
    প্রায় ছয় মাস আগে থেকে বিএনপির এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এবারের আন্দোলন শুরুর পিছনে গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১০ তারিখে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর আমেরিকান স্যাংশন আরোপের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে।  কারণ এবারের আন্দোলন শুরুর প্রথম দিকে সরকার আগের মত অভ্যাসে গুম-খুনের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতে আগে থেকেই দেয়া স্যাংশনের চাপ আরো বাড়ছে ও বাড়বে। আর সরকারের এমন ততপরতা সব মনিটরিংয়ের অধীনে। তাই বলা যায় আমেরিকান অপ্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছিল এই আন্দোলন শুরু করার। শুধু তাই না, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ঢাকায় গোলাপবাগে বিএনপির লাখো সমাবেশের পরে প্রথম দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়  যে হাসিনা সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে এবার সত্যিই গণভিত্তি পেয়ে এক আন্দোলন উঠে দাড়িয়েছে। এরপর আসে পিটার হাসের আরেক স্টেপ আগানো। তিনি হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ভিমটিমদের ভিজিট করতে শুরু করে সরকারের দিক থেকে কিছু পরোক্ষ বাধার সম্মুখীন হন। আর এরপরেই আমরা দেখি পরিস্থিতি ক্রমশ আমেরিকার সাথে সরকারের “বাতচিত, ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর” ইত্যাদির দিকে যাচ্ছে। স্যাংশন আরোপের দিক থেকে বললে এটা নিঃসন্দেহে আমেরিকার পিছনে হাটা। কারণ, হাসিনা সরকারের সাথে যা যা ডায়লগ প্রয়োজন আমেরিকা মনে করে সেরকম  “বাতচিত ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর ইত্যাদি শেষ হবার পরই তা থেকে আমেরিকার প্তেরাপ্তি মনে করা যায় এমন  “কোন রফা” বা ভদ্র ভাষায় কোন অগ্রগতি না হলে এরপরই তো আমেরিকার স্যাংশন আরোপের দিকে যাবার কথা! এটাই অনুমান করা যায়!
    তার মানে আমেরিকা এই উলটাপালটা করে আগে-পিছে মানে এক-পা আগে পরে দুই-পা পিছের কূটনীতি করতে গিয়েছে! কেন? অনুমান করা যায় তাদের ধারণা এতে হাসিনার উপর  চাপের প্রভাবটা বেশি হবে!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা আমেরিকাকে বেশি চাপের সুবিধা দিবেঃ
    প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সেকথায় যাবার আগে অন্য কিছু কথা।
    তাহলো এর মানে বাইডেনের মানবাধিকার ও স্যাংশন তার পররাষ্ট্রনীতির কোন পলিসি তা একেবারেই নয়। বাইডেন মূলত মানবাধিকার ব্যবসায়ী হিশাবে নিজেকে হাজির করেছেন।
    এর মূল কারণ,  হাসিনা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি পেশ করবেন কিনা বা আমেরিকার নেতৃত্বে চীনবিরোধী কোন এক কমন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির অংশ হবেন কিনা অথবা ক্রমশ  ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক(IPEF) এ যোগ দিবেন কিনা অথবা চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণসহ অন্যান্য প্রকল্প সুবিধা ও সম্পর্ক করা সব গুটিয়ে নিবেন কিনা ইত্যাদি এসবের সাথে  সমান্তরালে হাসিনার মানবাধিকার ভায়োলেশনের রেকর্ডের কী সম্পর্ক??? মানে হাসিনা চীনের থেকে সরে আসলে তার সব মানবাধিকার অপরাধ আর অপরাধ মনে করা হবে না???? তাই কী?
    ধরা যাক হাসিনা-সরকারের কাছে আমেরিকার যা কিছু খায়েস এর প্রায় সবকিছুতেই হাসিনা একমত হলেন। তাহলে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের  অভিযোগ এর রেকর্ড কী সব তখন থেকে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে??? আমাদের জানা মতে, ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি হতে পারে একমাত্র উপযুক্ত আদালতে এর বিচারের পরে। এরপরেই কেবল অভিযোগ বা স্যাংশন উঠিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন!  তাহলে???

    তাহলে এই পরিস্থিতিতে এখন সরকারের সাথে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি ইস্যুতে আমেরিকার কথা বলা, সময় দেয়া কেন? আবার আমেরিকান সব প্রস্তাবে যদি সরকার একমত হয় তবে তাতে দেশে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সেই সাথে সেই নির্বাচনে এই সরকারকে পুনরায় জিতবার নুন্যতম নিশ্চয়তাও তাতে ব্যবস্থা কী থাকবে?? আমেরিকা কীভাবে হাজির করবে তা? নাকি তা সম্ভব? আর এসব নিশ্চয়তা না থাকলে সরকার কেন আমেরিকার এত কথা শুনবে, বা মান্য করবে? এমনিতেই হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ঘটানো – এমন সমীকরণ অসম্ভব। এর উপর হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোন নির্বাচনে বিএনপিকে সামিল করা আরেক  অসম্ভব।

    অর্থাৎ বাংলাদেশের এক্ষণকার বাস্তবতা হল আগামি নির্বাচন পার হবে কীকরে আর  সাথে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি এদুইয়ের কোনটাকে বগলে নিয়ে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি-তে বাংলাদেশের এলাইনমেন্ট করে নেয়া নিয়ে কথা তোলা – এটা একদিকে আন-এথিক্যাল অন্যদিকে এমনটা ঘটবার কোন বাস্তবতাই নাই। আর সবার উপরে এসব ডিল বা সমঝোতা-অযোগ্য আইটেম। সেটা আমেরিকা বা হাসিনা সরকার দুদিক থেকে এটা ডিল অযোগ্য ইস্যু।
    যেমন গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভায়োলেশন চরমে উঠে আছে।  আর ওদিকে এই লম্বা সময়কালগুলোতে অভিযোগ সবকিছু জানা সত্বেও আমেরিকা এনিয়ে নিঃশ্চুপই ছিল। তাই বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিবার পরেও যদি এনিয়ে ধারাবাহিক নিশ্চুপ থাকত তাহলে একরকমের পরিস্থিতি হত। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিজের পররাষ্ট্রনীতির নীতি-পলিসি বানানোর ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্য আচরনের পথে আর বাইডেন প্রশাসন যে নাই তাই তো উন্মোচিত!!  এককথায় “মানবাধিকার ও স্যাংশন”  এর পলিসি ঘোষণা ও স্যাংশন আরোপের পরে এটা  ডিল অযোগ্য ইস্যু হয়ে গেছে।
    আবার একটা মজার তথ্য হল, এখন ভারতও চায় না যে হাসিনা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তে সামিল হয়। প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত একথা বলেছেন বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে!

    আবার হাসিনার দিক থেকে যদি দেখি, কোন কিছু পাবার বিনিময়েও হাসিনার চীনের হাত ছেড়ে দেওয়ার যোগ্য থাকবে না। কারণ, সরকারের উন্নয়নের ঢোল পিটানোর সঙ্গে সামনজস্যপুর্ণ কাজ হল এই ধরণের ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা ও তা থেকে চুরির অব্যবস্থাপনা জারি রাখতে হবে। কারণ নাহলে দলের যারা এর বেনিফিসিয়ারী এরা কেউ আর দলের সাথে থাকবে না। অথচ সরকার চীনের হাত ছেড়ে দিলে  আমেরিকা-জাপানের পক্ষে হাসিনা সরকারকে ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা একই লেভেলে জারি রাখা অসম্ভব।
    মূলত এই প্রধান কারণেই আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে হাসিনা সরকারের চীনবিরোধী কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরির ততপরতায় সামিল হওয়ার বাস্তবতা নাই। এছাড়া আবার এটাই ছিল ২০২১ সালে হাসিনা সরকারের চীনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি; আর সেই সৌজন্যেই আমরা সে সময় বিনা পয়সায় আমাদের সমস্ত চীনা টিকা প্রাপ্তি ঘটেছিল!

    কাজেই সব ব্যাপারেই অবজেক্টিভিটি বা কঠিন বাস্তবতাই হয়ে উঠেছে একমাত্র নির্ধারক! আমেরিকা বা হাসিনা সরকার ডিল অযোগ্য বা সমঝোতায় আসা অযোগ্য এসব বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে!
    তাই, আইপিএস (ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি) বা এর সংশ্লিষ্ট কোনও ততপরতায় হাসিনা সরকারের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ! এছাড়া, বাংলাদেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছে; এতে একমাত্র রাস্তার আন্দোলনের দিকেই এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার অভিমুখ রাস্তা!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়? (২য় ও শেষ পর্ব)

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?
    (২য় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩  ০০ঃ২২ রবিবার

    https://wp.me/p1sCvy-4lO

     

    প্রথম পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4l1
    দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব এখান থেকে শুরু। continued………

    যেমন মানুষের সম্পর্কগুলো কোন ধরণের?
    মূলকথায় এটা ‘রিলেশনাল’ (relational) মানুষে মানুষের সম্পর্কিয় দিকটা সে লালন করে থাকে। সে কেবল লজিক্যাল সম্পর্ক করে না।  সেটা কেমন?
    দোকানদারের সাথে ক্রেতার সম্পর্ক এটা লজিক্যাল। (যদিও এটা মানুষে মানুষেরই এক সম্পর্ক, তবুও)।  এখানে দোকানদারকে দশ টাকা দিলে দোকানদার ঠিক দশটাকার পণ্যই বিনিময়ে তুলে দেয়।  কিন্তু পিতার সাথে সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অথবা আমাদের যে কারো পিতামাতার সাথে সম্পর্ক এটা রিলেশনাল, মানুষে মানুষের সাথে সম্পর্কিত বোধ করা এক সম্পর্ক। যদি হয় এমন যে কোন পুত্র বা কন্যা  পিতার রাশনাল আকাঙ্খা মানছে না। পড়ালেখা করছে না, ঠিকমত খাওয়া যা নিজ যত্ন নেয়া করছে না, পারিবারিক বা সামাজিক ডিসিপ্লিন অনুসরণ করছে না। এখন ব্যাপারটা রাশন্যালি দেখলে পুত্র-কন্যার পিতার অনুগত হবার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। এজন্য পিতা ক্রমশ চাপসৃষ্টি জন্য শাস্তি দেওয়ার দিকে যেতে পারে। বকাঝকা থেকে খাওয়া পরা বন্ধ চাইকি বাসা থেকে বের করে দেয়া বা খোদ সন্তানই বের হয়ে যাওয়াও ঘটতে পারে। রাশনালি এটাই হবার কথা!
    কিন্তু তা ঘটছে না। কারণ, পিতা ব্যাপারটাকে দেখছে রিলেশনাল জায়গায় বসে। পিতা একই সাথে ভাবছে সন্তান তো তার নিজেরই, যাকে সে প্রচন্ড ভালবাসে। তাই এমন পথে সমাধান করতে গেলে পিতার নিজেরই তা আরো কষ্ট পাবার কারণ হবে সেটা। তাই, এটা কোন সমাধান নয়। তাই পিতা হয়ে গেলেন হেদায়েতি লাইনে। বা পারসুয়েশিভ (persuasive) মানে  তিনি কোন ভাল ফল পাক আর নাই পাক পিতা হয়ে গেল নিয়মিত ‘বুঝানোর’ লাইনে। কন্যার হয়ত এক দুর্বল জায়গা হল ওর নানী অথবা বড় ভাই অথবা এক বড় বোন। তাই তাদেরকে দিয়ে পিতা নিয়মিত বুঝানোর লাইনে গেলেন। এটাকে আমরা হেদায়েতি লাইনও বলতে পারি। হয়ত দেখা গেল ২৫-৩০ বছর বয়সের আশেপাশের কালে কন্যার ভিতর হঠাত পরিবর্তন দেখা গেল। নিজে নিজেই তার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল এমন হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটা রিলেশনাল; মানে বিয়ন্ড লজিক্যাল – বা যুক্তিবুদ্ধির সম্পর্ক ছাড়িয়ে চলে যাওয়া এক দশা।

    আবার আরেকটা উদাহরণ স্বামী-স্ত্রী নিয়ে। দুজনেই চাকরি করে। কিন্তু স্ত্রী দাবি প্রতিদিন অফিস শেষে বাসায় এসে আমাকেই চা বানাতে হয়। কেন? স্ত্রী বলছে তুমি কিছুই না করে আরামে কেবল আমার দেয়া সেসব সেবা উপভোগ কর! এটা তো সাম্যের সম্পর্ক নয়। তাই তারা সমাধান ঠিক করল যে এরপর গুনে গুনে একেকজন পনেরোদিন করে চা বানাবে। কিন্তু তাতে দেখা গেল স্ত্রীর এক (কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল) বান্ধবী ব্যাপারটা শুনে ব্যাপারটাতে বান্ধবিকে একটা র‍্যাশনাল বোকা বলে সাব্যস্ত করল।  স্ত্রী ব্যাপারটা কীভাবে তা বুঝতে চাইলে তার বান্ধবী বলল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা শুধুই রাশনাল নয়, এটা র‍্যাশনাল এন্ড বিয়ন্ড। এভাবে দেখতে হয়! কিভাবে সেটা?

    বান্ধবি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলল, নিজেদের দম্পতি সম্পর্কের বেলায় সে লক্ষ্য করেছে প্রতিদিনই সে নিজেই চা-নাস্তা সব বানায়। আর সে সময়ে সে যখন উপাচার সাজিয়ে স্বামীর সাথে বসে কথা বলে গল্প করে সেসময়ই তার স্বামী সবচেয়ে উতফুল্ল থাকে, সবচেয়ে কেয়ারিং স্বামী হয়ে উঠে যা স্বামীর প্রতিটা কথায় আচরণে প্রকাশ পেতে থাকে। এটা তাকে ভীষণ সুখ দেয়। এথেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না! আর এটা তাঁর বেচে থাকার জন্য খুবই প্রশান্তিময় এক উপাদান হয়ে আছে জীবনে।  তাই এই সুখের লোভে কোন বোকা চা-নাস্তা বানানোর কাজ ভাগের কথা তুলবে আর এভাবে ‘সাম্য’ খুজতে যাবে? এখানে সাম্য অবশ্যই রেশনাল কিন্তু তুলনায় অকেজো; কাজেই রিলেশনাল পথ ধরাই উত্তম!! এই হল বান্ধবীর সিদ্ধান্ত!

    তাহলে দাড়ালো যা – সব জানা বুঝাবুঝিই কী কেবল  বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে পাওয়া??? মানুষ কী কেবল লজিক, রিজন বা র‍্যাশনালিটি দিয়েই চিন্তা করে? এর জবাব হবে মানুষ শুধুই কেবল লজিক্যাল বা র‍্যাশন্যাল হয় না। সে একই সাথে রিলেশনাল হয়েও চিন্তা করে থাকে।

    আরেকটা কথা বলে এই প্রসঙ্গটা এখানে শেষ করব তবে সেটা আবার আসবে পরে।
    ১৪৫০-১৫৫০ সাল এসময়টা এজ অব সাইন্স [Age of Science] বা বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে এক বিরাট অর্জনের যুগ মনে করা হয়। যেটা পরবর্তিতেো ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
    আর ঠিক এরপরেই বা পাশাপাশি যে রেনেসাঁ নামে আরেক আন্দোলনের কথা বলেছি তা ইউরোপীয় ইতিহাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, ব্যাপক নাড়া দিয়েছিল। সারকথার দিক থেকে বললে এই রেনেসাঁ  ছিল আসলে পরবর্তিতে যাকে এনলাইনটেনমেন্ট বলে বা র‍্যাশনালিটি আবির্ভাবের যুগ বলে এরই প্রাথমিক দিক বা শুরুর রূপ। রেনেসাঁ থেকে  এনলাইনটেনমেন্ট-এ পৌছাতে মোটাদাগে প্রায় চারশ বছর লেগেছিল। তাই রেনেসাঁ বলে ভাল-মন্দে যা শুরু এরই পরিণত রূপ এনলাইটেনমেন্ট। যেখান থেকে আবার মর্ডানিটির ধারণা; রাজনৈতিকভাবে যেখান থেকে মর্ডান স্টেট (আধুনিক রাষ্ট্র) ও ব্যবস্থার ধারণা। তবে এগুলো র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানের যুগ অবশ্যই তবে অচিরেই যা থেকে নেতি অর্থে অতি-বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানবাদিতার তা শুরুও বটে।
    তাহলে বিজ্ঞান ও থিওলজির লড়াইটা কী রূপ নিয়েছিল ও কেন?
    বিজ্ঞান কেন ঐ সময়ে মানে রেনেসাঁ একটু আগে আগে বিকশিত হয়েছিল? এই প্রশ্নটা গুরুত্বপুর্ণ।

    এরিস্টোটলের কথা শুনেছি কমবেশি  আমরা, একটা প্রাথমিক ধারণাও আছে। তাঁর সময়কাল ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩৮৪ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২)। মানে পুরাটাই যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা। তিনি দার্শনিক না রাজনীতিবিদ নাকি আবার বিজ্ঞানী বা জোর্তিবিদ এককথায় বলা মুশকিল তাই সেকালে এমন গুণীদের বলা হত বহুবিদ্যাগুণী; (polymath) বলা হত। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ লক্ষ্যনীয় হল, তাহলে তখন বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বা থিওলজিস্ট  এভাবে সবকিছু আলাদ আলাদা মানুষের কাজ হয়ে যায় নাই।  একই লোক একই সাথে বিজ্ঞানী ও  থিওলজিস্ট  হতে পারত। আর তা অবলীলায়!
    কিন্তু পরবর্তিতে রেনেসাঁ আন্দোলনের একটু আগে বা প্রায় সমসাময়িক ঘটনা হয়েছিল বিজ্ঞান বিকাশের শতবর্ষ। কিন্তু এবার  সেই বিজ্ঞান কিন্তু এরিস্টোটল যুগের বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। কারণ সে তখন যে মূলত রাশনালিস্ট, রিজন (reason) তার মন্ত্র বা চিন্তা পদ্ধতি্র।
    তাহলে এবার এই বিজ্ঞান আসলে কী, কোথায় সে আগের চেয়ে আলাদা হয়ে গেল? এতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন!

    সেকথাগুলো  বুঝাবার জন্য সহজ করে বললে, আগে জোতির্বিদ, দার্শনিক বা থিওলজিস্ট একই চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে চলত ও পারত। অর্থাৎ দুনিয়াটা ফিজিক্যাল বা বস্তুগত এবং একই সঙ্গে স্পিরিচুয়াল; মানে ফেনোমেনা আকারে বললে এটা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা এবং একই সাথে তা স্পিরিচুয়াল ফেনোমেনা হিসাবে দেখা হত।  কিন্তু এখনকার মূল আগাম অনুমান (assumption) হল এই ধরে নিয়ে আগানো যে দুনিয়াটা কেবলই সব ফিজিক্যাল ফেনোমেনা।
    অর্থাৎ ইউরোপের রেনেসাঁ বা বিজ্ঞানের যুগের বিজ্ঞানচর্চায় মূল আগাম অনুমান বা সেই ভিত্তি হল সব ফেনোমেনাই কেবল ফিজিক্যাল বা বস্তুগত। কোন স্পিরিচুয়াল দিক নাই। এজন্যই এটা র‍্যাশনাল, রিজন-বেজ বা লজিক্যাল হয়ে উঠেছিল।
    একারণের তাদের মহা আবিস্কার হিউম্যানিজম (Humanism) – এই ধারণাটা স্পিরিচুয়াল ধারণার ছিটেফো্টাকেও এড়িয়ে তা কেবল এক “বস্তুগত মানুষের” ধারণা। মানে এর মধ্যে  মানুষের রিলেশনাল দিকের বুঝাবুঝি অনুপস্থিত। যা এখন এক হিউম্যান কোয়ালিটির কথা তুলে ধরা যা স্পিরিচুয়াল দিক নাই, রিলেশনাল দিক নাই। কানেকটেড বোধ নাই।  এই  হিউম্যানিজম (Humanism) কথার সোজা মানে হল, কথিত মানবতাবাদী। মানে যে ব্যক্তি – মানুষের সব হিউম্যান কোয়ালিটির কথা বুঝে ও মানে। কিন্তু তার চোখে এই মানুষের মধ্যে কোন স্পিরিচুয়ালিটির বোধ ধারণার বালাই নাই।
    সারকথায় এমন এক বৈষয়িক ভোগী মানুষ যার স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা বা আকাঙ্খা নাই। তাই, “রিলেশনাল” নয়, বোধ নাই।  তাই যেমন কেউ যদি বলে, নবী মানবতাবাদী ছিলেন? তাহলে কেমন হবে? এটা কথা হল না, মানে হয় না! কারণ এখানে এমন এক নবীর কথা কল্পনা করা হয়েছে যার মধ্যে স্পিরিচুয়ালিটির ক্ষুধা বা আকাঙ্খা অথবা বোধ ইত্যাদি এসবের কোনটাই নাই। মানে যেটা এক উদ্ভট, এব্সার্ড বা অলীক ধারণা। যার কোন নবী ধারণাই নাই!
    দুনিয়ার বস্ত-অবস্তু ও গ্রহ-নক্ষত্র সহ সকল কিছুর সাথে আমরা মানুষ কানেকটেড, যুক্ত বা সম্পর্কিত। আর এই সম্পর্ক তৈরি করেছে এমনভাবে যেখানে প্রতি দুই সত্বার (being) মাঝখানে আছে আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর ধরণের কিছু ধারণা যে আমাদের যেকোন দুই সত্বাকে কানেক্ট বা সম্পর্কযুক্ত করে তুলে,  সম্পর্কিত করে এক বন্ধনের মধ্যে রেখেছে।  যেকোন থিওলজির কমন ভিত্তিমূলক ধারণা এটাই। এভাবে আমরা সবাই “আল্লাহ ধরণের ধারণা” যার মধ্যে দিয়ে সবাই সবকিছুর সাথে কানেকটেড – যেকোন থিওলজির মূলকথা এটাই। তবে  হয়ত কোন কোনটা থিওলজিতে ব্যাখ্যা বেশি স্পষ্ট করে সাজানো, এভাবে ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারে।
    সরাসরি বললে বিজ্ঞান বা রাশনালিটি এই কানেকটেড দিকটা উপেক্ষা করে চলে, আমল করে না। তবে যেমন নিউটনের গতিসুত্র এটার (ফিজিক্যাল ফেনমেনাকে ব্যাখ্যা করার বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি) উপর মানুষের স্পিরিচুয়াল দিকের তেমন প্রভাব নাই। কিন্তু সাবধান। যখনও আমাদের যাকে ব্যাখ্যা করছি তার ভিতর যদি “মানুষ” থাকে তবে  বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি সেখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ মানুষের উপর প্রয়োগ মানেই ধরে নিতে হত ওখানে স্পিরিচুয়াল দিক আছে,  মানুষ কানেকটেড বা সম্পর্কিত বিষয়াবলী আছে। তাই বিজ্ঞান চিন্তা পদ্ধতি বা লজিক্যাল বা রেশনাল দিক যথেষ্ট নয়। কিন্তু তবু বিজ্ঞানবাদিতা বিশ্বাস করে তারা সর্বগামি তারা হিউম্যান ফেনোমেনা (যা কেবলই ফিজিক্যাল নয়) গুলোকেও ব্যাখ্যা করতে সমর্থ; তাদের চিন্তা পদ্ধতি সমর্থ!! অথচ এই অনুমান ও দাবি অসত্য!!

    আবার পুরানা কথায় একটু ফিরে যাই।
    কথিত “প্রগতিশীলতার” যে মৌলিক বৈশিষ্ট – ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা, এর পক্ষে যে সাফাই বা তাদের মূল আড়াল যার পিছনে দাঁড়ায়ে তারা নিজের ডিফেন্স সাধারণত নিয়ে থাকে বলে বুঝি সেটা হল এই রেনেসাঁ (renaissance) ধারণা; যদিও রেনেসাঁ কী জিনিষ এটা জিজ্ঞাসা করা যায় তবে দেখা যাবে খুবই আবছা কিছু না-বুঝা মুখস্ত কথা তারা বলছে।
    তবে তাদের এক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে, বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ বলে যে তর্ক তারা তুলে থাকে। ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে সেটা হল – বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দিয়েছে। অথচ ব্যাপারটা কী তাই? আর এতই সিম্পল?মোটেই তা নয়। তাহলে কী?
    প্রথম কথা হল বিজ্ঞান ও থিওলজি (ধর্মতত্ব) এদুইয়ের সাবজেক্ট ম্যাটার বা কথা বলার প্রসঙ্গই এক নয়। এরা একই বিষয় নিয়ে কাজ করে না।

    রেনেসাঁ জিনিসটা কীঃ
    রেনেসাঁ শব্দের প্রাথমিক ধারণা করতে, যদি এর আক্ষরিক বাংলা করি তবে এর অর্থ পুনঃজন্ম (re-birth) । তবে এটা যতটা না জন্ম এর চেয়ে বেশি আবার ফিরে পাওয়া (re-found) এমন অর্থ করলে তা এর আসল অর্থের বেশি কাছাকাছি হবে।
    এটা মূলত এখনকার ইটালির রাজধানী রোম এবং ফ্লোরেন্স শহরে বিকশিত হওয়া এক প্রগাঢ় আবেগ উচ্ছ্বাসের কাল (১৪ শতক থেকে ১৭ শতক জুড়ে মানে ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী। কী নিয়ে? এটা ছিল ইউরোপীয় সংস্কৃতিতে শিল্পকলার নানা ধরণে এবং রাজনীতি ও অর্থনীতিতে। তবে এই বয়ানের মধ্যে যেটা বাদ পরে গেল তা হল সাইন্স বা বিজ্ঞানের বিস্তারে মানে শতবর্ষ জুড়ে (১৪৫০-১৫৫০) নানা বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের যুগ। তবে পরে ১৪৯৯ সাল থেকে এই আন্দোলন এবার আর রোম বা ফ্লোরেন্সে আবদ্ধ থাকে নাই; বরং নর্থ ইউরোপ বা ফ্রান্স দিয়ে ঢুকে সারা ইউরোপকে আন্দোলিত করে ফেলেছিল।

    একাদেমিসিয়ানদের মধ্যে বলা হয়ে থাকে, প্রায় চারশ বছরের রেনেসাঁ আন্দোলন ধারাবাহিকতায় বিকশিত হলেও এর বিকাশের তিনটা আলাদা পর্ব বা স্তরে বলে চিহ্নিত করা যায় – শুরুর দিক, চরম বিকাশের দিক আর শেষের দিক এভাবে। বিস্তারে দেখতে দেখুন এখানে। তবে আমরা সেই বিস্তারের দিকে এখান থেকে আর এখন যাব না।

    The Renaissance was a fervent period of European cultural, artistic, political and economic “rebirth” following the Middle Ages.
    Generally described as taking place from the 14th century to the 17th century, the Renaissance promoted the rediscovery of classical philosophy, literature and art.
    Although the evolution of Italian Renaissance art was a continuous process, it is traditionally divided into three major phases: Early, High, and Late Renaissance.

    বিশেষ করে যেটা ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নামে প্রগতি-চিন্তায় যে পপুলার ধারণা আছে যে বিজ্ঞান ধর্মকে নাকচ করে দেয় – আমি এমন ধারণ-অনুমানের সমর্থক-খাদক নই। মূল কারণ এরা মূলত মানুষের চিন্তার ইতিহাস বিশেষ করে ‘চিন্তার পদ্ধতি’ সম্পর্কেই বেখবর। তবু তারা কেবল রেনেসাঁ বলতে বুঝেছে বা আগ্রহী যেন এজন্য যে তারা মনে করে রেনেসাঁ পাওয়া মানে ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম কোপানোর একটা অস্ত্র পাওয়া গেছে!

    রেনেসাঁ মানে পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদঃ
    রেনেসাঁ মানে  আগে বলেছি পুনঃজন্ম কিন্তু কার পুনঃজন্ম, সেই রহস্য ভেদ করতে হবে সবার আগে। তবেই প্রগতিবাদীদের ইসলাম কোপানোর আকাঙ্খা ও গোমড় ফাঁক হবে।  তাই সেকাজে সবার আগে ‘মধ্যযুগ’ (middle age) এই ধারণাটা নিয়ে কথা শুরু করা যাক। মধ্যযুগ বলতে মোটাদাগে ৫০০ থেকে ১৫০০ সাল; মাঝের এই হাজার বছরটাকে কী বুঝানো হয়ে থাকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, এটা প্রাচীন রোমের (ancient Rome) সাথে সংযুক্ত ঘটনা। বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য রোম নিয়ে স্বল্পে কিছু কথা এখানেই যোগ করে রাখি। প্রাচীন রোম বলতে একেবারে শুরুতে এক ছোট নগর রাষ্ট্র যা পরে রোমান রাজার রাজ্য (৭৫৩-৫০৯ খ্রীষ্ট্রপুর্ব) হয়ে যায়। আর পরে তা এক রোমান রিপাবলিকে পরিণত হয়েছিল (৫০৯-২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব)। এভাবে সবশেষে তা পরিণত হয়েছিল এক রোমান সাম্রাজ্যে (২৭ খ্রীষ্ট্রপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্ট্রাব্দ বা যিশুর জন্মের পরে)। আর এই ৪৭৬ সালে রোম সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যায়। একালের ইউরোপের বড় অংশ জুড়েই তা এই রোম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।

    কিন্তু পরে ৮০০ সাল থেকে আরেক রোমান সাম্রাজ্য জন্ম নিয়েছিল। যদিও দুই রোমান সাম্রাজের মধ্যে কোন সম্পর্ক নাই, একই সাম্রাজের পুনঃ-আবির্ভাবও নয়। তাই পরের রোমান সাম্রাজ্যের পুরা নাম ছিল হলি রোমান এম্পায়ার যা বাংলায় বললে ‘পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য’ হয়। তাই মধ্যযুগ বলতে আসলে রোমান সাম্রাজ্যের পতন (৪৭৬ সাল) বুঝা বা ধরা হয়। আর ওদিকে ১৫০০ সাল বলতে আসলে চোদ্দ শতকে রেনেসাঁর জন্মকে বুঝানো হয়। মধ্যযুগ মানে দাঁড়ালো প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের পতন আর রেনেসাঁর জন্ম এদুই এর মাঝের সময়কে। কিন্তু কেন?

    আসলে ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে রেনেসাঁ আন্দোলন শুরু হওয়ার পিছনে্র কারণ হিশাবে বলা হয় এ’শহর দুটা শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট চিত্রকর, আর্কিটেক্ট, ভাস্কর্য-শিল্পী ইত্যাদিতে ও তাদের কাজে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ছিল। তারাই এরা টের পেতে শুরু করেছিল যে তখনও রোমের প্রাচীন যেসব শিল্পকলার নিদর্শন তখনও টিকে ছিল সেগুলো তাদের সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অগ্রসর ছিল। অর্থাৎ  সেকালে রেনেসাঁ শুরুর জমানা চোদ্দ শতকের চেয়ে প্রাচীন রোম অনেক অগ্রসর ছিল। তাই তাদের উচিত হবে প্রাচীন রোমের  শিল্পকলার নিদর্শনগুলোকে আবার খুঁজে নিয়ে সেগুলোর অনুসারি হয়ে সেসবের পুনজন্ম ও ব্যবহার ঘটিয়ে নিজের সময়কালকে আপডেট করে নেয়া। ক্রমশ একই জিনিষ দেখা যেতে লাগলে রাজনীতি বা অর্থনীতি বিষয়ক ধারনাগুলোতেও। কিন্তু এমন দেখা যাওয়ার পিছনের কারণ কী???
    এর কারণ হিসাবে অনেকে ধারণা করতে থাকে যে খ্রীষ্টধর্মের বন্ধন-ই এমন পিছিয়ে যাবার কারণ। এর মানে কী? আর  কী দেখে তাদের কেন এমন মনে হল?

    প্রাচীন রোম কী খ্রীশ্চান ধর্ম অনুসারি ছিলঃ
    উত্তর টা হ্যা। কিন্তু সাথে আরেক প্রশ্ন হল, প্রাচীন রোমের মোট সময়কাল মানে এর শুরুটা হল যিশুর জন্মেরও ৭৫৩ বছর আগে বা যেটাকে আমরা  খ্রীষ্টপুর্ব বলি, তখন। সে সময় থেকে শুরু করে এই সাম্রাজ্যের পতন হয়ে যায় যিশুর জন্ম পরবর্তি ৪৭৬ সাল পর্যন্ত। মোট কথা যিশুর জন্মের আগেকার ঘটনা হল রোম সাম্রাজ্যের জন্ম। তাহলে? কবে থেকে সেই রোম ক্যাথোলিক খ্রীশ্চান ধর্মকে গ্রহণ ও অনুসারি হয়েছিল?

    আসলে ৩১৩ খৃষ্টাব্দ বা সাল থেকে সম্রাট কনষ্টানটিন (Constantine) এর আমলে রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট-সহ প্রজারাও খ্রীশ্চান হয়ে যায়। তাই আরো সুনির্দিষ্ট করে মধ্যযুগ বলতে অনেকে বলে থাকেন আসলে ৪৭৬ সালে রোমের পতন থেকে নয় বরং আরও আগে এই ৩১৩ সালে পুরা সাম্রাজ্যের খ্রীশ্চান হবার পর থেকেই – রোমের শিল্পকলা-সহ  জ্ঞানবুদ্ধির সবকিছুতে তারা আগেকার সময় থেকে পিছিয়ে যাওয়ার শুরু মনে করে থাকে। সরাসরি বললে, খ্রীশ্চান হওয়ার কারণেই তাদের এরপরের জীবনে জ্ঞানবুদ্ধি কমতে শুরু করেছিল।  অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ ধর্মবিরোধী এক ধারণা হয়ে উঠার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু আসলেই কী তাই?

    কেন এমন প্রশ্ন করছিঃ
    কারণ ৩১৩ সালে এসে রোমের সবাই খ্রীশ্চান হয়ে যাবার আগে কী তাহলে রোমের সমাজ ধর্মহীন ছিল??? রোমের বাসিন্দারা অন্যকোন ধর্মের অনুসারী  ছিল না?  এর জবাব হল ৩১৩ সালের আগে তারা অবশ্যই অন্যধর্মের অনুসারী ছিল। কোন ধর্মহীন ছিল না! কারণ এথেন্স বা গ্রীক সভ্যতার দেবতা বা বহুঈশ্বরবাদী ধারণা-বৈশিষ্টের গ্রীক থিওলজি-ই ছিল রোমের পুর্বপুরুষ-সকল। তাই গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবীই ছিল  ও রোমের বাসিন্দাদের উপাস্য ও অনুসৃত ধর্ম। অর্থাৎ রোমের রেনেসাঁ সাধারণভাবে সব ধর্মের বিরোধী এক ধারণা ছিল না। বরং ছিল ৩১৩ সাল থেকে প্রচরণ শুরু হওয়া ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের বিরোধী। এবং গ্রীক থিওলজি ও গ্রীক দেব-দেবী কেন্দ্রিক ধর্মচর্চার প্রতি সহানুভুতিশীল! একালের কমিউনিস্টদের আকাঙ্খায় যে নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতা – তার সাথে রেনেসাঁ আন্দোলনের  গ্রীক ধর্মের প্রতি যে মনোভাব তা কোনভাবেই এক নয়।  এককথায় বললে, অন্তত শিল্পকলার বিচারে  রোমে গ্রীক থিওলজির প্রভাব ও অবদান ৩১৩ সাল থেকে অনুসৃত ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের  প্রভাব ও অবদান নেতিবাচক – তাদের ভাষায় পিছিয়ে থাকা।
    তবে আমাদের জন্য যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল,  ফ্লোরেন্স আর রোম নগরীতে শুরু হওয়া রেনেসাঁ আন্দোলনের রেনেসাঁ-বাদীরা তারা ধর্মবিরোধী নয়। একালের কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদীরা আকার-ইঙ্গিতে আমাদের যা বুঝিয়ে থাকে, সেটা একেবারেই মিথ্যা। – “ধর্ম মানেই কালো যুগ, অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ” এসব অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!!
    তবুও যে প্রশ্নটা থেকে যায় যে গ্রীক থিওলজি আর ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের তুলনা – যে তুলনাতে ক্যাথলিক খ্রীষ্ট্রধর্মের অবদান “পশ্চাদপদতা” সেই অনুমানও কতটা সঠিক? আর সবচেয়ে বড় কথা কেন এমন অনুমানের জন্ম??

    দুনিয়ায় মোটাদাগে দুই বৈশিষ্ঠের থিওলজিঃ 
    এসব প্রশ্নের জবাব খুজতে আমাদেরকে প্রসঙ্গের আরেকটু গভীরে যেতে হবে। দুনিয়াতে যত ধরণের ধর্মচর্চা (থিওলজি) আছে সেগুলো মোটা দুভাগে ভাগ করা যায়। যেমন আসমানি কিতাব বা কিতাবি ধর্ম – এর একটা ধরণ। যেখানে নাজেল হওয়া কিতাবি ধর্ম সেটা, বলে মনে করা হয়। আবার নন-কিতাবি ধর্মও আছে। যেমন ভারতের হিন্দু সভ্যতা থেকে বিজেপি-আরএসএস পর্যন্ত এসে তা হিন্দু-ধর্ম হয়ে উঠা। অথবা আরেক উদাহরণ হল, গ্রীক দেবদেবী ভিত্তিক অনুসৃত গ্রীকদের ধর্মচর্চা। ফলে এটাই গ্রীকদের রোমের আসার পরে তখনও তাদের অনুসৃত ধর্ম ছিল যাকে নন-কিতাবি থিওলজি বলা যায়।
    মোটা দাগে কিতাবি আর নন-কিতাবি ধর্মের বড় ফারাকটা হল, কিতাবি ধারার মধ্যে, স্ব স্ব মূল কিতাব একবারই আসে বা নাজেল হয় আর তাদের নবী-জন্মের পরে তাতে কিছু কালাম যোগ হয় বড়জোর। তুলনায় নন-কিতাবির বেলায় এখানে এক লম্বা সময় ধরে ইভলভিং (evolving) বা ক্রমশ প্রকাশিত এমন ধারায় উদ্ভব বা বিকশিত এভাবে নয়া দেবতা-সহ নয়া বাণী এখানে এসে থাকে। এখানে একাধিক দেব-দেবির ধারণাও দেখা যায়।  অবশ্যই এখানে এদুইয়ের মধ্যে কোনটা ভাল এজাতীয় কথা বলার মানে হয় না। সেটা অন্তত আমার কাজ না। এলেখার উদ্দেশ্যও না।  বরং যে যেটা অনুসরণ করে তার কাছে সেটাই সবচেয়ে ভাল – এমনটাই দেখতে পাওয়া যায়।  তবে আরেক ফারাক-বৈশিষ্ট হল, কিতাবি ধর্ম কম্প্রিহেন্সিভ (comprehensive) হয়ে থাকে। মানে সর্ব-বিষয়ে ব্যাপকভাবে বক্তব্য এড্রেস করা হয়ে থাকে যেন কোন প্রসঙ্গই স্পর্শ করতে বাদ রাখে নাই সাধারণত এমন হয়ে থাকে। এছাড়া কিতাবি ধর্ম যেটা সবচেয়ে পুরানা পরে নাজেল হওয়া সেটা তত বেশি ডিটেল হয়ে থাকতে দেখা যায়।
    এসব বিচারে বলা যায়, প্রাচীন রোম আসলে প্রায় হাজার বছর ধরে নন-কিতাবি গ্রীক দেবতাভিত্তিক ধর্ম অনুসরণ করে চলার পরে, ৩১৩ সাল থেকে কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্মের অনুসারি হয়ে উঠেছিল। আর কিতাবি খ্রীশ্চান ধর্ম ইনক্লুসিভ ও কম্প্রিহেনসিভ হওয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের (মানে ফিজিক্যাল ফেনোমেনা গুলা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে) চর্চায় অনেক বেশি নয়া বিধিনিষেধ তখন থেকে তাদের মেনে চলতে হয়েছিল।
    এতদুর বলার পরও মৌলিক কথার আরো কিছু অংশ বাকি থেকে গেছে। এখন সেদিকে যাব।

    রেনেসাঁ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এর বিকাশের তিন পর্ব বা স্তরের দিক আছে তা বলেছি। কিন্তু এভাবে সতেরো শতকে (১৬০১-১৭০০) এসে রেনেসাঁ স্তব্দ হয়ে যায় বা থেকে যায়। একাদেমিকভাবে এর সাতটা কারণ বা সাতটা উপাদানের সম্মীলিত প্রভাবের কথা জানা যায়। যেমন পনেরো শতকের দিকে রোমের ভুমি দখলে মেতে উঠেছিল  স্পেন, ফ্রান্স ও জর্মানী। ফলে রোম বা ফ্লোরেন্স অস্থিতিশীল উঠতে শুরু করেছিল। আবার প্রতিযোগিতায় পড়ে যাবার কারণে ফ্লোরেন্স ও রোমে আসা-যাওয়ার নৌবাণিজ্যের রুট বদলে গিয়েছিল । ফলে আয় বিশেষত সমৃদ্ধ ফ্লোরেন্সের সম্পদ-ধারীরা আর আগের মত রেনেসাঁ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যেতে পেরে উঠছিল না। ইত্যাদি কারণগুলো ছাড়াও আরেক নির্ধারক কারণও উঠে এসেছিল। এতদিন রেনেসাঁ আন্দোলন ক্রীশ্চানিটিকে কোনঠাসা করে চলে আসছিল। কিন্তু এই রেনেসাঁই এবার পালটা আক্রমণ ও চাপের মুখে পড়ে যায়। কারণ ততদিনে ততকালীন প্রশাসন নয়া আইনি বাধা তৈরি করতে সমর্থ হয়ে যায়। তাই সেকাজে নয়া আইনের নাম রোমান ইনকুইজেশন (Roman Inquisition) বলে  আইন চালু করেছিল তাদের কাউন্সিল অব ট্রেন্ট (Council of Trent) । সহজ ভাষায়, এই ট্রেন্ট মানে হল রোমান ক্যাথলিক অথরিটি যারা “ধর্ম-অবমাননার” শাস্তি আরোপ করার ক্ষমতাধারী কর্তাগোষ্ঠি। আসলে মূলকথাটা হল, রোমের ক্যাথলিক ক্রিশ্চান চার্চ মূলত প্রটেষ্টেন্ট (Protestent) খ্রীশ্চানিটি ধারার হাতে ক্রমান্বয়ে আগে থেকেই  চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছিল। যার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-কারী হয়ে উঠেছিল প্রটেস্ট্যান্টেরা।  হওয়াতে আর সাথে প্রকারন্তরে রেনেসাঁর অবস্থান প্রটেসটেন্ট দের পক্ষে যাওয়াতে সবমিলিয়ে ক্ষমতাসীন ক্যথলিকেরা “নিজ ধর্মীয় আইন লঙ্ঘন ও নিষিদ্ধ পুস্তক চর্চার বিরুদ্ধে  ও এই অজুহাতে  মৃত্যুদন্ডের শাস্তি চালু করেছিল।

    মিলিত ফলাফলে রেনেসাঁ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে যায় সতেরো শতকেই। আর এখান থেকেই পরের মানে আঠারো শতকে এরই পরিপূরক আরেক আন্দোলন এনলাইটেনমেন্ট (enlightenment) আন্দোলন বিকশিত হয়ে উঠেছিল।  তবে এখানে প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির ধারা সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক।
    এনলাইটেনমেন্ট  নিয়ে কথা  কথা আগানোর আগে রেনেসাঁ নিয়ে গুরুত্বপুর্ণ আরো কিছু কথা আগে শেষ করে নেয়া যাক।
    তবে বিদ্রোহি প্রটেস্টেন্ট খ্রীশ্চান ধারার সাথে রেনেসাঁবাদীদের সখ্যতা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। খুবই সংক্ষেপে বললে,  প্রটেস্টেন্ট ধারার উত্থান তাদের মূল নেতা মার্টিন লুথারের হাতে। জর্মানিতে জন্ম লুথারের জীবনকাল (১৪৮৩-১৫৪৬); যার পরিচয় সম্পর্কে বলা হয় তিনি এক জর্মান থিওলজিষ্ট, প্রফেসর, যাজক ও চার্চ সংস্কারক ইত্যাদি।  আসলে তিনি ছিলেন ধর্মতত্বে একাদেমিক গ্রাজুয়েট। গত ১৫০০ সালের পরে রেনেসাঁ যখন নর্থ ইউরোপে হানা দিয়েছে ঘটনাচক্রে শহরের সিনিয়র পাদ্রীদের সাথে বাইবেলের ব্যাখ্যা নিয়ে গভীর ঝগড়ায় লিপ্ত। রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম এক ইতিবাচক অবদান হচ্ছে মানুষকে সবকিছু নিজে দেখেশুনে পড়ে বুঝাবুঝি করে নিতে আগ্রহী করে তোলার যুগের সুচনা করেছিল। যেমন এর আগে বাইবেলে কী আছে তা পাদ্রীরাই ব্যাখ্যা করার এক্তিয়ারধারী। এমন হবার পিছনের টেকনিক্যাল কারণ হল শুকানো চামড়ার উপর বাইবেল হাতে লেখা। ফলে তা জনে জনে বিতরণ বা সহজেই পাওয়া যায় এমন বস্তু ছিল না। বলা হয়ে থাকে রেনেসাঁ উদয় পিছনে তিনটা জিনিষ আর আগে আবিস্কৃত হতে হয়েছিল। তাহল গোলাবারুদ, কম্পাস আর প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানা। এর প্রথম দুটা হল বাকি ইউরোপ থেকে নৌপথে ফ্লোরেন্স বা রোম পৌছানো বাস্তব ও সহজেই সম্ভব করে তুলতে ভুমিকা রেখেছিল। এমনিতেই  ফ্লোরেন্স বা রোম থেকে রেনেসাঁ নর্থ ইউরোপ পৌছাতে লেগেছিল প্রায় একশ বছর।  কেবল ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়েছিল বলেই এরপরে তা অসংখ্য কপি ছাপা হয়ে  ইউরোপে রেনেসাঁ ছড়িয়ে পড়তে তা সাহায্য করেছিল। বাইবেলও এরপরে জন-নজরে উন্মোচিত হতে সাহায্য করেছিল। যারা বাইবেলের ব্যাখ্যা নিজে কুক্ষিগত করে এতদিন রাখতে পেরেছিল  সেই পাদ্রিগোষ্ঠি  এরাই সেকালের ক্ষমতাসীন এলিট ক্লাসের সহযোগী ছিল। ঝগড়া শুরু হয়েছিল এক আন্ডার কনষ্ট্রাকশনে থাকা চার্চে নোটিশ টাঙানো ছিল যে এই দানবাক্সে অর্থে দিলে সহজেই বেহস্ত মিলব – ধরনের গ্যারান্টি।  লুথার এই বক্তব্য বাইবেল সমর্থিত নয় বলে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আর তা থেকে বড় রাজ-পাদ্রি পর্যন্ত সকলের সালে তার বিতর্ক – শেষে পালিয়ে থাকা, রাজ নীটিশ ইত্যাদি। আর ততই তিনি লুথার প্রতিদিন এসব সরকারি পাদ্রিদের বিরুদ্ধে তাঁর গরীব মানুষের স্বার্থের পক্ষে বাইবেলের ব্যাখ্যা দান। শেষে রাজ-পাদ্রিদের পশ্চাদ-অপসারণ। আর তা থেকেই প্রটেস্টটানিজম (Protestant Reformation) হাজির হয়েছিল। যেখান থেকে প্রটেস্টটানিজম (Protestantism, Reformation of Catholic) বা বলা যায় প্রটেস্টেন্ট নামে নয়া ফ্যাকড়ার খ্রীশ্চানিটির জন্ম। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হল, রেনেসাঁর আগমন প্রটেস্টান্ট খ্রীশ্চানিটির আগমন ও উদ্ভবকে সাহায্য করেছিল। ফলে আমাদের এদিকের ইসলাম কোপানি খায়েসের কথিত সেকুলার যারা নাকি  রেনেসাঁ পাঠ করে রায় দিয়ে থাকেন যে রেনেসাঁ ধর্মের প্রয়োজনীয়তা শে করেছে তারা আদৌ কোন রেনেসাঁ পাঠ করেছে কিনা তা সন্দেহজনক!

    কথা শুরু করেছিলাম মধ্যযুগ (medieval period) নিয়ে। এই শব্দটা উচ্চারণ করাই হয় একটা তুচ্ছতাতুচ্ছ অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে যে এটা নাকি ধর্মের যুগ তাই এটা পশ্চাদপদ। যদিও রেনেসাঁর উদ্গাতা প্রভাবশালী সামনের সারির দশজন কর্তার নাম নিলে দেখা যাবে ওর মধ্যে মাত্র একজন মধ্যযুগ-কে অন্ধকার যুগ (Dark Ages) বলে চিহ্নিত করেছেন [Francesco Petrarca (known as Petrarch) was the first person to coin the term ‘Dark Ages’. He was an Italian scholar of the 14th century.] ।

    তা ভাল! কিন্তু বিপরীতে তারা কী কামনা করতেন? সেটা এখন আমরা বিচার করে দেখব আর এভাবেই তাদের ‘অন্ধকারের ধারণা’ বুঝব।

    হিউম্যানিজম (Humanism) এই শব্দটার বাংলা অনেকে করেন। মানবতাবাদ। ইন্টারেস্টিং ঘটনা হল শব্দটাকে খুবই ইতিবাচক শব্দ বলে আমরা মনে করি। এমনকি কেউ কেউ বলে বসেন যে নবীও খুবই মানবতাবাদী ছিলেন।  কিন্তু দুঃখের কথা হল এই “মানবতাবাদ” হল রেনেসাঁর প্রধান বৈশিষ্ট। আর এটা একটা এন্টি-রিলিজিয়াস শব্দ।   দুনিয়াতে যারা হিউম্যানিস্ট গ্রুপ আছে তারা নিজের সম্পর্ক মনে করে তাদের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হল, তারা হলেন রিজন (reason) যুক্তিবুদ্ধিতে চলা উচ্চমানের ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া তারা যেসব মুল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন যা আল্লাহ-ভগমানের মত কোন অতিপ্রাকৃত (super-natural) ধারণায় আস্থাবিশ্বাস রাখেন না। বরং যা মানুষের প্রকৃতি ও অভিজ্ঞতালব্ধ ধারনায় কেবল এর উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেন। [Humanism is an approach to life based on reason and our common humanity, recognizing that moral values are properly founded on human nature and experience alone.]।
    কথাগুলোকে আরো সরাসরি বললে তাদের ধারণা হল, আল্লাহ-খোদা বলে কিছু নাই। মানুষই সব। এভাবে বলাতে অনেকের মনে হতে পারে এটা আর এমন কি? এটা তো আল্লাহ বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীর মধ্যকার পুরানা বিবাদ বৈ আর কিছু না!  হা আপাত চোখে তা মনে হতে পারে কিন্তু তা নয়।  কেন?

    মানুষ কী কেবল কোন বস্তুগত সত্বা (physical being) মানে ফিজিক্যাল বিয়িং। নাকি এটা একই সাথে এক স্পিরিচুয়াল বিয়িং (spiritual being) -ও; এটাও বটে!  রক্ত-মাংসের মানুষের অসংখ্য বস্তুগত চাহিদা আছে; তাই মানুষ কেবলই এক বস্তুগত সত্বা বা ফিজিক্যাল বিয়িং নয়। তাই এতেই সে শেষ না, মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদাও সাথে আছে।
    হিউম্যানিজম  স্পিরিচুয়াল চাহিদাকে অস্বীকার করে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু এই স্পিরিচুয়াল জিনিষটা কী?
    সারকথায় মূল প্রশ্ন হল আমরা মানুষ কিভাবে দুনিয়াতে অন্যান্য বস্তু, অবস্তু, অন্যান্য প্রাণী- অপ্রাণী বা উদ্ভিদ এমনকি গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি অথবা আরেকটা মানুষ ও অন্যান্য অস্তিত্ব ইত্যাদি সবকিছুর সাথে কানেকটেড বা সংযুক্ত – এই বিষয় নিয়ে যে কথা বলে বা যার সাবজেক্ট ম্যাটার এটাই থিওলজি। কি করে মানুষ বাকি সবকিছু অন্যান্যের সাথে কানেকটেড এটাই  থিওলজি ব্যাখ্যা করে থাকে।  মানুষের কোন বিষয়ে একটা ধারণা যেমন যুগে যুগে বিকশিত হয়ে পরে পোক্ত হয় তেমনই এটাও। যত পরবর্তিকালের থিওলজি ততই আরেকটু স্পষ্ট তার ব্যাখ্যা। তবে ব্যাখ্যা সঠিক কিনা অথবা কোন থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যাটা ভাল এটা এখানকার আলোচনার বিষয় না। বরং বুঝাতে চেয়েছি কানেকশন, কি করে আমরা সম্পর্কিত সেদিকটা বুঝাবার চেষ্টা করছি। আর আমরা কী করে সকলে কানেকটেড এটা জানা-বুঝার যে আকুতি – সম্পর্কিত বোধ করার আকুতি এটাই স্পিরিচুয়াল চাহিদা। আমি দুনিয়াতে কেন, এর দরকার কী অথবা এর অর্থ তাতপর্য কী এগুলোকে জানা এটাই মানুষকে তাড়া করে। এছাড়া মানুষ তার পরিবারের সদস্য অথবা কোন কোন ঘনিষ্ঠজন এদের প্রতি একটা “টান” অনুভব করে কেন?
    মূল কথাটা হল, এই অনুভবগুলো আর মানুষের কেবল ‘ফিজিক্যাল বিয়িং’ ধারণার মধ্যে আটকে থাকতে দেয় না। মানে হল মানুষ কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা চিকিতসা ও বাসস্তানের চাহিদা-ধারী নয়, তার স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে।

    এজন্যই আমরা লক্ষ্য করলে দেখল ১৪শতকের রেনেসাঁ থেকে শুরু করে ১৮ শতকের এনলাইটেনমেন্ট এই পুরা সময়কাল জুড়েই কেবল বিজ্ঞানবাদিতা আর সাথে রিজন, লজিক্যাল বা রেশনালিটি ধারণার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা।

    কাজেই রেনেসাঁ অথবা ওর চারশবছরের সফর শেষে এনলাইটমেন্ট পর্যায়ে আসা, এক পড়তে হবে ক্রিটিক্যালি। শুধু সবই ভাল বা সবই খারাপ এমন কোনটার করেও নয়। বিশেষ করে আমাদের এদিকের প্রপাগান্ডা ধারণা –  রেনেসাঁ নাকি এসেছে ধর্মের ইতি টানতে,  এমন ভিত্তিহীন অনুমানও এড়িয়ে চলতে হবে। আসলে মূলত বিজ্ঞান ও রেশনালিটি ধারণাকে এর প্রয়োগ সীমাবদ্ধতা এর নো গো [No Go] এরিয়া সম্পর্কে জেনে তবেই এটা আমল করতে হবে।

    সমাপ্ত

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্টঃ
    বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটির সীমা কোথায়?

    গৌতম দাস
    ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ 
    ০০ঃ০২  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4l1

     

                  What is Enlightenment and Perpetual Peace by Immanuel Kant – Book Review

     

    এই লেখা শুরুতে এর শিরোনাম সম্পর্কে আগাম পরিচয় করিয়ে দিতে এই শিরোনাম কেন ও কী ধরণের এনিয়ে কিছু বাক্য দিয়ে শুরু করব।
    এই লেখার মূল বিষয়বস্তু “এনলাইটেনমেন্ট” (enlightenment)। আর শব্দটা দেখাই যাচ্ছে এক ইংরাজি শব্দ। “এনলাইটেনমেন্ট” শব্দটা ও এই ধারণার খুবই ইতিবাচক অনুসারি এমন অনেকে সম্ভবত এর বাংলা করবেন যে “এনলাইটেনমেন্ট” মানে, মানুষ বা জনগোষ্ঠিকে “অজ্ঞতামুক্ত” করা বা  “আলোকপ্রাপ্ত” করা। তবে পরিস্কার থাকার দরকার যে এই অর্থ আমার করা নয় বরং “এনলাইটেনমেন্ট” এর অনুসারিদের করা; মানে বলতে চাচ্ছি যে,  আমি এনলাইটেনমেন্ট-এর অনুসারি নই। বরং বলা যায় আমি ক্রিটিক্যাল বা পর্যালোচক অবস্থানের। আমি  বরং এই শব্দটার যা অর্থ নয় অথচ অনুসারিরা দাবি করে এদিকটা সামনে তুলে ধরতে চাইব এখানে।  সরাসরি বললে, এই শব্দের অর্থ-সীমা কোথায় সেদিক থেকে শব্দটাকে বরং সবাইকে পুরাপুরি ও খুটিয়ে জেনে ও চিনে নিতে আহবান জানাবো।

    এনলাইটেনমেন্ট শব্দটার প্রায় সমার্থক [synonymous] বা সহ-শব্দ হিসাবে উঠে আসে – বিজ্ঞান (science) বা র‍্যাশনালিটি (rationality) – এসব শব্দ। যে শব্দগুলোর অর্থ যদি সম্যক জানি তবে এসব শব্দের অর্থের সীমা জানা থাকবে। শব্দের অর্থসীমা জানা মানে কোন শব্দ কতদুর কী শব্দার্থ বহন করে ও কার পরে আর করে না সে সম্পর্কে সচেতন থাকা। এই অর্থে এই লেখার একটা উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দের অর্থের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করা, পাঠককে সচেতন করা।  বিজ্ঞান বা র‍্যাশনালিটি শব্দগুলো আমরা মূলত ব্যবহৃত হতে দেখি যে  ধর্ম-কে (বিশেষ করে ইসলাম) কোপানো বা ধর্মকে তুচ্ছ, নাকচ ইত্যাদি করার কাজে।

    যেমন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কথিত “বিজ্ঞান চর্চাবাদিদের” কার্যত মুল উদ্দেশ্য হল ধর্ম বা মূলত ইসলাম সম্পর্কে ঘৃণা বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিচা ধারণা প্রচার করা। অথচ বিজ্ঞান ও ধর্ম ধারণা দুটো একে অপরের সমতুল্য ক্যাটাগরি বা প্রসঙ্গই নয়। এছাড়া এরা মুখে বলে থাকে তারা সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব কমাতেই বিজ্ঞানচর্চা করতে বা বাড়াতে চায়; এতে যা কার্যত এক গভীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোই হয়ে দাড়ায়। শেষে ব্যাপারটা দাড়ায় সুনির্দিষ্টভাবে একটা ধর্ম ইসলাম – ইসলাম কোপাতে চাওয়া এর উদ্দেশ্য। এই রাজনৈতিক লক্ষ্যটা আসলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বা বিজেপি-আরএসএসের মত এক উগ্র হিন্দু জাতিরাষ্ট্রীয় ধারণা। এটাই ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই চলে আসা হিন্দুত্ববাদ – উগ্র বা নরম “হিন্দু জাতিবাদই শ্রেষ্ঠ” এমন ধারণা।  অর্থাৎ কার্যত বাংলাদেশের কথিত বিজ্ঞানচর্চাগুলো আসলে হয়ে দাড়ায় হিন্দুত্ববাদের সমর্থক ও হিন্দুত্ববাদের প্রচার-প্রসার ঘটানো;  বা বাংলাদেশে প্রগতিবাদের নামে হিন্দুত্ববাদকে সহনশীল করে হাজির করার ততপরতা। এটাই ফলাফলে বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য জন্মানোর সাফাই বয়ান তৈরি করে। সারকথায় এনিয়ে বাংলাদেশে প্রগতিবাদী বয়ানটা হল, মুসলমান মানেই যেহেতু জঙ্গী তাই, যেন জঙ্গীবাদকে দুর্বল করতে চাওয়ার কর্মী তারা? তাই যেন বাংলাদেশকে কথিত জঙ্গীবাদের কবল থেকে মুক্ত থাকতে আমাদেরকে ভারতীয় আধিপত্যের আড়াল আশ্রয়ে যেতেই হবে – এই হল তাদের প্রচ্ছন্ন সাজেশন……!

    জাত বা জাতি ধারণায় পরিচয়-আইডেনটিটি খাড়া করতে চেয়ে যেকোন ধর্ম বা বর্ণ, কালচারাল ভিন্নতা অথবা  সাধারণভাবে যেকোন এথনিসিটি [ethnicity] বা জাতপরিচয় এর পক্ষে দাঁড়িয়ে – “এটাই শ্রেষ্ঠ ” – ধরণের প্রচার করতে আমরা সকল ধারাকেই করতে দেখি যা খুবই কমন ফেনোমেনা; এটাই যেকোন রাষ্ট্র বা সমাজের কোন-না-কোন জাতির পরিচয় আঁকড়ে দাঁড়ানো – এটাই দেশের অস্থিতিশীলতার উতস হয়ে দাড়ায় আছে যা প্রকারন্তরে সমাজের জন্য গভীর ক্ষত ও বড় ক্ষতিকর ততপরতাতা। এটা মূলত যা আমার জাত-পরিচয়ের প্রেক্ষিতে “অপর” [others] এমন সকল এথনিক চিহ্ন-পরিচয়ের জনগোষ্ঠিকে জাত-নির্মুলের আকাঙ্খা রূপেই শেষে হাজির হয়ে যায়। যাকে আমরা “সব অপরকে” নির্মুলের এক এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর আকাঙ্খা বা পোড়ামাটির নীতি বলেও চিনি! কারণ,  শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা মাত্রই এর মৌলিক স্বভাব হল নিজের সকল “অপরকে” এই উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা; যার সবচেয়ে বড় ও এক প্রভাবশালী প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইউরোপ-জুড়ে হিটলার বা হিটলারিজমে। আবার ঐসময়ের হিটলারের হাতে নির্মুলের শিকার হওয়া জর্মান ইহুদি জনগোষ্ঠি, তারাও এখন পালটা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল নামে এক “হিটলারী”  রাষ্ট্র বানিয়ে নিজেই হয়ে গেছে মোদী-আরএসএসের মতই আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদী – ইহুদিবাদ যার নাম। অর্থাৎ মনে সেই একই শ্রেষ্ঠত্ববোধ আর ‘অপর’ সকল এথনিক জনগোষ্ঠিকে উদগ্র নির্মুলের আকাঙ্খা মনে পুষে রেখে এরাও বড় হচ্ছে, এগিয়ে চলেছে। অথচ কারো শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে – নিজে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাড়া করা এটা কোন প্রতিকার নয় – কারও শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা  নিজেও আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা খাঁড়া করার মানে হয় না; হতে পারে না।
    দুনিয়ার কোন রাষ্ট্র বা সমাজ এককাট্টা শতভাগ একই এথনিক আইডেনটিটির হয়না। নুন্যতম এক থেকে দশভাগ ভিন্ন এথনিক আইডেনটিটির জনগোষ্ঠি সে সমাজে থেকে যায়। ফলে এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শ্রেষ্ঠত্ববাদিতার উদ্ভব ও অত্যাচার শুরু হতে দেখা যায়।  অথবা কখনও হয়ত দেখা যায় মোটামুটি একই আইডেনটিটির জনগোষ্ঠির কিন্তু একদল চায় ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের শ্রেষ্ঠত্ব, তো অন্যদল চায় ধর্মভিত্তিক আরেক জাতিবাদী শ্রেষ্ঠত্ব। এরাই নিজ নিজ শ্রেষ্ঠত্ববাদের সবচেয়ে বড় সংকট ও স্থায়ী তৈরি করে। অথচ একই সমাজে থাকতে হলে সবার আগে নির্মুল আকাঙ্খা ত্যাগ করতে হবে; “আমার অপর” যাকে মনে করছি তাকেও পাশাপাশি সমান অধিকার ও মর্যাদায় স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সবার আগের প্রধান কাজ হতে হবে যেকোন ধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ত্যাগ করতেহবে। ধর্ম-নির্বিশেষে জনগোষ্ঠির সকলকে বাইরে  জুতা খুলে ঘরে প্রবেশের মত করে নিজ নিজ সবধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধকে সমাজ-ঘরে প্রবেশের আগে বাইরে খুলে রেখে আসতে হবে। আমরা নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান রাজনৈতিক অধিকারের – এই নীতিতে দাঁড়ালে শক্ত ও স্থায়ী ভিত্তির এক রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব।
    যদিও আরেক মুলকথায়, বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটি শব্দগুলো ব্যবহার করে আজীব এক কথিত সেকুলার নামের প্রগতিবাদ এই আড়ালে তারা এথনিক ঘৃণায় তারা “ইসলাম কোপাতে” চাইছে। ইসলাম ঘৃণায় সব ছেয়ে ফেলতে চাচ্ছে; কার্যত যা হিন্দুত্ববাদ। এবং ভারতীয় আধিপত্যের বিস্তারের সহায়ক। ‘জঙ্গীবাদের’ কথা তুলে ভয় দেখিয়ে এরাও হিন্দুত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্ব – যা আরেকভাবে আরেক শ্রেষ্ঠত্ববোধের ধারক, তাই কায়েম করতে চায়। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশের উপর ভারতের আধিপত্য কায়েম ও বাংলাদেশকে তার বাজারে পরিণত করার আরেক কলোনি-চিন্তা!!। বিজ্ঞানবাদিতা বা রেশনালিটির নামে প্রগতিবাদের এভাবে শব্দ ব্যবহার বা এমন মানে করা যে মারাত্মক ভুল ও অন্যায় সেদিকটাই তুলে ধরা এলেখার উদ্দেশ্য।

    র‍্যাশনাল[rational] বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন চিন্তাঃ
    এখানে এখন প্রাথমিকভাবে র‍্যাশনাল [rational] শব্দের অর্থ কিছুটা বলে রাখা যাক। এই শব্দটাও ইংরাজি দেখাই যাচ্ছে। এর খাস বা সার অর্থ হল – “বুদ্ধি”। মানে বুদ্ধি বলতে বা এমন ধারণাকে কেন্দ্র করে যা বুঝি, তাই!  যেমন রেশনাল শব্দের একটা অর্থ করা হয় – বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন বা যুক্তিবুদ্ধিসম্পন্ন বিচার বা বিচারকারি মানুষ। অর্থাৎ দুটাতেই “বুদ্ধি” ব্যবহার করে যে “বিচারটা” করা হয় তাই বলা হয়েছে। সেই সুত্রে তাহলে এখানে এতে ‘কী’ বলা হয় নাই? বা বাদ রাখা হয়েছে??  সেদিকে যাওয়া যাক, তাহলে র‍্যাশনাল শব্দের অর্থ আরেকটু খুলবে!
    যেমন বললাম, মন আর মগজের লড়াই চলছে!  এখানে মগজ মানে আসলে বুঝানো হয়েছে বুদ্ধি। মগজের ব্যবহার মানে বুদ্ধির ব্যবহার। আর বুদ্ধির বিপরীতে তাহলে কী ধারণা থেকে গেল? বা কী সংশ্লিষ্ট নয়, বাদ পড়ল?? সে প্রশ্নের দিকে আগানো  যাক! এখানে, বুদ্ধির বিপরীতে যা বাদ পড়ে থাকে তা হল মন বা মানুষের আবেগ অনুভুতি।  মানে মানুষের অন্য মানুষের সাথে অথবা মানুষে-মানুষের মধ্যে সম্পর্ক – এই মৌলিক দিক যাকে অনেক সময় বলি আমাদের মানবিক সম্পর্ক। মানুষের রিলেশনাল দিক বা বোধের দিক এটা। এটা বাদ বা বুদ্ধির বাইরে থেকে গেল। এদিকটা আর রেশনাল শব্দটা কাভার করে না বা অন্তর্ভুক্ত নয়। মানুষের আবেগ অনুভুতি বা “সম্পর্কিত বোধ” যেকারণে বুদ্ধির আমলই করে না; করতে পারে না। মানে এটা বুদ্ধি দিয়ে বুঝার বাইরে!

    তাই, শুধুই লজিক, যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে মানবিক সম্পর্ক [human relation] বা মন-কে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে।  আর বাস্তবে আমরা তা করিও না। তাহলে সারকথায়,  র‍্যাশনাল মানে যা কেবল লজিক [logic], রিজন [reason], যুক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে চলে। মন বা মনের ফিলিং [Feeling] অনুভব ইত্যাদি এসব একদিকে সরিয়ে রেখে এই বিচার করা হয়। [Reason বা রিজন বলতে form judgements logically বুঝতে হবে। মানে “যুক্তিবুদ্ধিতে ভর করে পৌছানো রায়” বুঝলেই আপাতত চলবে।] একারণেই যা লজিক্যাল মানে র‍্যাশনাল তা  রিলেশনাল (মন বা মানবিক সম্পর্ক) দিককে সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে করা কোন বিচার নয়। মানে হিউম্যান বা রিলেশনাল দিক এখানে বাদ থেকে যায়। যেমন যদি বলি, সাধারণত এটাই মানুষের স্পিরিচুয়াল [spiritual] দিক আমলে না নেয়া বা বাদ রেখে চিন্তা করা।  স্পিরিচুয়াল মানে মানুষের স্পিরিচুয়াল চাহিদা আছে; বস্তগত নানা কিছু ভোগের চাহিদার মত এবং বস্তুগত ভোগের চাহিদা থাকা সত্বেও।  অন্যভাবেও বলা যায়, মানুষের অন্য সকল মানুষ ও প্রকৃতির (কসমিক বা গ্রহ-নক্ষত্র সহ) সবকিছুর সাথে কিভাবে সম্পর্কিত সেই সম্পর্ককে জানা ও অনুভব করার আকাঙ্খাও আছে যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা! কারণ মানুষ দুনিয়ার তাঁর আগমন-আবির্ভাবেই কারণ উদ্দেশ্য কী আর এরপরে তাঁর জীবনের করণীয় কর্তব্য কী তাও এখান থেকেই সে সংগ্রহ (derive) করে বুঝে নিতে  চায়! এভাবে নিজ জীবনকে সামঞ্জস্যপুর্ণ করে সাজিয়ে নিতে চায়। আর এখান থেকেই এই আকাঙ্খা, যা স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা!!  অর্থাৎ এটা বৈষয়িক বা বস্তুগত আকাঙ্খা নয় বরং বস্তগতগুলোকে ছাড়িয়ে বা transcend করে গেলে তবেই এই আকাঙ্খার হদিস জানা যায়।  এর কারণ সে লক্ষ্য করেছে সম্ভবত এভাবে জীবন না সাজিয়ে নিলে এক গভীর “একাকিত্ববোধ” বা উদ্দেশ্যহীনতাবোধ জীবনকে গ্রাস করে থাকে। এসরের সমাধান পাওয়া থেকেই স্পিরিচুয়াল চাহিদা্কের উদ্ভব ও তা জাগিয়ে রাখা। এথেকেই মানুষের উপলব্দি যে মানুষ মাত্রই রিলেশনাল [relational] বা অজস্র আরো প্রাণ-অপ্রাণ ও প্রকৃতির সাথে সে রিলেশনে আছে সে বা গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে আছে – এই বোধ তাকে এমন ইঙ্গিত দেয়। এটাকেই আমি বলছি মানুষ “রিলেশনাল” বা relational element। মানুষ মাত্রই সম্পর্কিত বোধে [relational] এর মানুষ।   কিন্তু লজিক বা রেশনালিটি এই রিলেশনাল দিকটা ধরতে পারে না, ছুতে পারে না।
    অন্যভাষায়, তাই আমাদেরকে লজিক বা র‍্যাশনালিটির বিচার ছাড়িয়ে ছাপিয়ে বা ইংরাজিতে ট্রানসেন্ড [transcend] করতে পারলে তবেই মানুষের রিলেশনাল দিক সম্পর্কে জানা যায়, চর্চা করা সম্ভব।

    কিন্তু ষোল শতকে নতুন কী ঘটেছিলঃ
    আবার যেমন নিউটনের গতিসুত্র বুঝতে বসে সেখানে মন বা মনের ফিলিং বা অনুভব-কেও খাটাতে চাওয়া তা কোন কাজে আসে না। মানে রিলেশনাল দিকটা সংযুক্ত রাখা বা না-রেখে গতিসুত্রকে বুঝতে গেলে দুই ফলাফলে কোন ভিন্নতা আসে না।  তাতে রেজাল্ট ভিন্ন হবে না। তবে এটা কেবল বস্তগত ফেনোমেনাকে বুঝার ক্ষেত্রে খাটবে। তাই কথা ছিল যে কেবল  বস্তগত ফেনোমেনাকে ব্যাখ্যা বা বুঝবার ক্ষেত্রেই কেবল র‍্যাশনাল বা বিজ্ঞানবুদ্ধিতা, এই চিন্তা পদ্ধতি সীমাবদ্ধ থাকবে। যদিও তা তারা থাকে নাই। কাজেই সংক্ষেপে বললে, র‍্যাশনাল [rational] মানে হল, মগজ বা বুদ্ধি দিয়ে বিচার। রিলেশনাল দিক থেকেও বিচার নয় এটা।  যার সবকিছু “বুদ্ধি” এই কেন্দ্রিয় ধারণার উপর দাঁড়ানো! এই অর্থে যা র‍্যাশনাল তা আসলে কেবল বুদ্ধি দিয়ে বুঝাবুঝির পথ ও প্রসঙ্গ!

    দুনিয়াতে মানুষের আগমন শুরু থেকেই সে ছিল যাযাবর, মানে দুনিয়ার কোথাও শুরু থেকে কোন ভুমিতে সে থিতু হয়ে বাস করেনি, করে নাই। আর মূলত, খাবার সংগ্রহ ও শিকারের তাগিদে যে এভাবে একেবারেই যাযাবর (Pastoral) ছিল।  আর  কয়েক দশ-লাখ বছরের সেই যাযাবর জীবন শেষে এক সময় মানুষের জীবন থিতু হয়ে এসেছিল। আরেক ভাষায় এটাকেই বলে মানুষের প্রথম কৃষিকাজের জীবনের শুরু বা বলা যায় মাটি কামড়ে কোন ভুমিতে থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক বসবাসের শুরু হয়েছিল যেখান থেকে। একারণেই যাযাবর আর কৃষিকাজ পরস্পর ভিন্ন বা বিপরীত ধারণা! আর শেষের এই থিতু হয়ে বসবাস – এটাকেই মোটামুটি গত ছয় হাজার বছরের মানুষের ইতিহাস বলা হয়। এটাকেই মানুষ এথনিক জীবন-যাপনের ইতিহাস বলে। জাত-পরিচয় বোধের শুরু এমনকি তাই শ্রেষ্ঠত্ববোধ ধারণার শুরুও একই – এই এথনিক জীবনের শেষের দিক থেকে। আমরা এখন যার বর্তমান প্রান্তে।
    এবার আসেন, এই ছয়হাজার বছরের মানুষ-জীবনের সফরে প্রায় পুরাটা পথই আমরা হেঁটেছি ধর্মতত্বের [theology] হাত ধরে।  অর্থাৎ আমাদের জীবনকে পুরাপুরি গাইড করে গেছে-হেঁটেছে নানা ধর্ম বা ধর্মবোধ থিওলজি। [ইংরাজি থি বা [ The] এর অর্থ হল দ্যা গড বা সমতুল্য আল্লাহ বা ঈশ্বর ধরণের ধারণা। তাই থিওলজি মানে গড বা আল্লাহ-বিষয়ক তত্ত্ব বা জ্ঞান।] তবে এই থিওলজিতে জীবন চলতে চলতে কেবল গত প্রায় পাঁচশ বছর আগের নয়া ঘটনা আসে; যখন নতুন করে এক বিজ্ঞান ও টেকনোলজির চর্চার রূপ দেখা গিয়েছিল – বিজ্ঞানের যুগ বলে! যে যুগে নয়া এক চিন্তার পদ্ধতির রূপ দেখেছিলাম আমরা। সারাংশে বললে সেটা একটা এজাম্পশন (assumption) এর উপর দাঁড়ানো বা আগাম ধরে নেয়া এক ভিত্তিতে যে কিছু ফেনোমেনা বা ঘটনা যা একেবারেই বস্তুগত বা ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; আর এনিয়ে চিন্তা চর্চার পদ্ধতি ও এর ভিত্তি লজিক্যাল বা রেশনাল পদ্ধতিতে করা হবে। যেহেতু এগুলো ফিজিক্যাল ফেনোমেনা মানে নিউটনের গতির গতিসুত্র বুঝতে চাওয়ার মত ঘটনা তাই, মানুষের রিলেশনাল দিক বিচার এখানে স্থগিত বা বাদ দিয়ে আগানো যাক।   বা নিউটনের মোশন থিওরি (Laws of motion) বা গতিসুত্রের মত  ফিজিক্যাল ফেনোমেনা; মানে যার উপর হিউম্যান ফেনোমেনার প্রভাব নাই (তা স্পিরিচুয়ালও নয়) বা এর প্রভাব প্রায় নাই বলে উপেক্ষাযোগ্য। অন্যভাষায় এটাই বিজ্ঞানের যুগ বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিন্তার যুগ। সেই থেকে রেশনাল পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হওয়া এই চিন্তা পদ্ধতিই সাইন্টিফিক, লজিক্যাল বা রেশনাল ইত্যাদি নানান নামে শনাক্ত হতে থাকে। কারণ পরবর্তিতে ইম্মানুয়াল কান্ট [Immanuel Kant] এই চিন্তা পদ্ধতি-কেই তত্বায়িত করেন। মানে আগে ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়া আর পরে কী হয়েছিল তাকে তত্বায়িত (Theorized) করে বলা। মানে এখানে চর্চা থেকে তত্ব এসেছিল, তত্ব থেকে চর্চা নয়। আর শেষে তার লেখা বিখ্যাত আর্টিকেল What is Enlightenment যা ১৭৮৪ সালে লেখা।

    Immanuel Kant: What is Enlightenment?,  1784

    যদিও অর্ধ-শিক্ষিত ও মুসলমান-কোপানিতে ও ঘৃণা ছড়াতে আগ্রহীদের মাঝে এটা বেশ গেথে বসা অনুমান এবং তা ভুল অনুমান যে এনলাইটেনমেন্ট এর ধারণা – এটা নাকি জোঁকের মুখে নুনের মত; যা ধর্ম-কে নাকচ করতে হাজির হয়েছে। তাই যেকোন ধর্ম বা ধর্মতত্বের সামনে এনলাইটেনমেন্ট অথবা  বিজ্ঞান-কে তুলে ধরলেই যেন ধর্ম নাকচ হয়ে যায় তাতে। একারণেই জাফর ইকবালেরা বিজ্ঞানবাদি। বলা বাহুল্য  বলাই বাহুল্য বিজ্ঞানবাদিতা একটা নেতি ধারণা। বুঝে-না-বুঝে ও সীমাবদ্ধতা না জেনে যারা অসৎ উদ্দেশ্যে যত্রতত্র “বিজ্ঞান” মারাতে যায় এরাই “বিজ্ঞানবাদি”। চিন্তার যে পদ্ধতি আছে; পদ্ধতি মেনে চিন্তা চর্চা করতে হয়। এরা তা জানে কখনও শুনেছে মনে হয় না।  বিজ্ঞান মূলত একটা চিন্তা পদ্ধতি; এটাকে র‍্যাশনাল চিন্তা পদ্ধতিও বলা হয়। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল থিওলজির উপর র‍্যাশনাল চিন্তা-পদ্ধতি প্রযোজ্য নয়।  কারণ থিওলজি মূলত মানুষের সম্পর্ক (যাকে উপরে রিলেশনাল বলে বুঝিয়েছি) বিষয়ক জ্ঞানচর্চা। এই অনুমান ভিত্তিহীন হলেও এটা গভীরে  গেথে বসা সেই ভুল অনুমান। এসব নিয়েই এখানে কথা বলব।

    এই ভুল অনুমানের শুরু হয়েছিল রেনেঁসা আন্দোলন থেকে। এটা আজকের ইটালি তখন যা রোম-কেন্দ্রিক এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের (-৭৫৮ খ্রীষ্টপুর্ব থেকে ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দ) লেজ ছাড়ার পরের ঘটনা এবং সেকালে ফ্লোরেন্স ও রোমে বিস্তৃত হওয়া ১৩০০-১৬০০ এই সময়কালের ঘটনাবলী।  ততদিনে (৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে) প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য এর সম্রাটসহ সকলেই  ক্যাথলিক খ্রীশ্চান হয়ে গিয়েছে। আর পরে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য ৪৭৬ সাল থেকে ধবংসও হয়ে গেছিল। তবে পরবর্তিতে, হলি রোমান এম্পায়ার (Holy Roman Empire) নামে তবে আজকের ফ্রান্স-জর্মানের মাঝের শার্মেগেলন [Charlemagne] এর সম্রাটের নেতৃত্বে ৮০০ সালের শেষ সপ্তাহে এই নয়া সাম্রাজ্যের শুরু বা পত্তন হয়। কালক্রমে সারা ইউরোপ যার অধীনস্ত হয়, টিকেছিল (কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে) ১৮০৬ সাল পর্যন্ত। যদিও প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সাসথে এর কোনই সম্পর্ক নাই। তবে  সেকালে রেনেসাঁ [Renaissance] আন্দোলন ফ্লোরেন্স ও রোম থেকে শুরু হওয়া হলেও তা ছিল আসলে হলি রোমান এম্পায়ারের আমলে; মানে যেটা কোনভাবেই প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের আমলে নয়। কিন্তু মানুষে দুটা সাম্রাজ্যের মধ্যে বিভ্রান্ত সাধারণত হয়ে থাকে বলে পুরা ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত করলাম। সারকথায়, রেনেঁসা আন্দোলন যা ১৩০০ থেকে ১৬০০ সালের মাঝের ঘটনাবলী এবং যার সাথে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের কোন সম্পর্ক নাই। যে রোমের অধীনে ছিল স্রা ইউরোপ। কিন্তু রেনেঁসা আন্দোলন প্রাচীন  ফ্লোরেন্স ও রোম শহরে শুরু হলেও পরে ১৪৯৯ সাল থেকে ফ্রান্সের ভিতর দিয়ে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পরেছিল।  আর ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল সহ সব ধরণের পরিবর্তন আবর্তিত হয়েছিল এই আন্দোলনের কারনে। একারণে অনেকের মনে এটাকে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যেরই কোন ঘটনা মনে করে ভুল করে থাকে। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এর বহু আগেই ৪৭৬ সালেই  প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য ধবংস হয়ে গেছিল।

    এখন রেনেঁসা আন্দোলন এর বিচারে ইউরোপে এক “ধর্মের যুগ” ছিল। যেটাকে মোটাদাগে ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ বলে তারা মনে করে আর এটাকেই তাদের কোন কোন ধারা কালো যুগ (Dark age) অথবা  মধ্যযুগ বলে (Middle Ages or medieval period) পরিচিত করায়, এটাকে তারা অতিউতসাহীরা  অন্ধকার যুগ  (dark age period) বলেও মানে করে থাকে। আমরা এই আলোচনায় দেখব কেন তাদের এই ভুল অনুমান; এছাড়া এই অনুমিত ভুল ধারণার কোন ভিত্তির উপর দাঁড়ানো! যদিও ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল এটা সারা দুনিয়াব্যাপী কোন  অন্ধকারের সময়কাল ধারণা নয়; বরং পুরানা রোম-কেন্দ্রিক শাসিত (বা পরের হলি রোমান এম্পায়ার শাসিত) যে ইউরোপ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটা ধারণা। এবং এর চেয়েও বড় কথা এটা সব ধর্মের বেলায় নয় বরং কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের – মানে সেকালে রোম-শাসিত ইউরোপের ও যা কেবল খ্রীশ্চান ধর্মের বেলায় এই অর্থে এটা ৫০০-১৫০০ খ্রীষ্টাব্দ এই হাজার বছর সময়কাল বুঝানো হয়েছে। তবু ইউরোপ পরে এটা সব ধর্মের বেলাতেই যেন প্রযোজ্য এমন অর্থ করে থাকে। এমনকি পুর্ব-ইউরোপ যার বেশিরভাগ অংশ শাসিত হয়েছিল রাশিয়ান জার (১৫৪৭-১৯১৭ সাল) এর অধীনে, এরা থেকে গেছিল অর্থডক্স ক্রিশ্চান। অন্ধকার যুগ-ওয়ালারা এদেরকেও গোনায় ধরে নাই। আমরা এশিয়ার মুসলমানেরা তো আরো দূরে…।

    আর  এই অন্ধকারের ধারণা – এরই বিপরীতে আলোর ধারণা এনে  মানে অন্ধকার কারও উপর “আলো ঢেলে” যেন কিছুকে আলোকিত করে তোলা – এই অর্থেই এর নামকরণ হয়েছে এনলাইটমেন্ট বা en-light-en-ment ।

    এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানোঃ  
    ওদিকে আবার এনলাইটমেন্ট ধারণাটা মূলত রিজন (reason) এই ধারণার উপরে দাঁড়ানো। এমনকি বিজ্ঞান ধারণাটারও সারকথা হচ্ছে লজিক (logic) আর সেই অর্থে এর আরেক শব্দ হল র‍্যাশনাল (rational) বা বাংলা করে একে যুক্তিবুদ্ধি-সম্মত, এভাবেও বলা যায়। এনিয়ে আলাপ বিস্তারে নিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা ভাল যে বিজ্ঞান নিজে কোন জ্ঞানের শাখা নয় বরং মানুষের এক চিন্তা পদ্ধতি বা ম্যাথডলজি (methodology)। আর এই চিন্তা পদ্ধতিটাইকেই (বৈশিষ্ট হিসাবে) বলে লজিক্যাল বা র‍্যাশনাল। তবে এই আলোচনার মূল ফোকাস হল বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি এই ধারণাগুলোর ব্যবহার সীমা কোথায় সে সম্পর্কে পাঠককে জানানো। কোথায় কতদুর যাবার পরে বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটি ধারণা দিয়ে সেই প্রসঙ্গ আর ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে সেই সীমাকে বুঝা ও বুঝে নেওয়া।  যেমন বিজ্ঞান ও র‍্যাশনালিটির জ্ঞান দিয়ে ধর্ম ব্যাখ্যা করতে যাওয়া ভুল হবে।

    অষ্টাদশ শতকে যুক্তি (reason) ও বিজ্ঞানের বিকাশের সেকালে ইউরোপীয় ইতিহাস যে নয়া রূপ-পদ্ধতিতে হেঁটেছিল একেই এনলাইটেনমেন্ট (আলোকপ্রাপ্ত ) বলে চেনানো হয়েছিল। ইম্মানুয়েল কান্ট (Immanuel Kant (1724-1804)) তিনি এক জর্মান দার্শনিক তিনিই এনলাইটেনমেন্ট ধারণাকে তত্বায়িত করে সামনে নিয়ে আনেন। এখান থেকেই কান্ট শব্দটা থেকে কানশিয়ান (Kantian মানে যেমন, ইম্মানুয়াল কান্টের লজিক অর্থে) কানশিয়ান লজিক (logic); বা র‍্যাশনালিটি (rationality) ধারণাগুলো প্রচলিত বা ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছিল। তবে এভাবে “তত্বায়িত করেন” বললাম এজন্য যে “থিওরি ও প্রাকটিস” এদুইয়ের সম্পর্ক মানে তত্ব ও তার চর্চা নিয়ে  এদুইয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটা কথা চালু আছে সেটা এরকম যে কোন তত্ব আগে না ওর ব্যবহার বা চর্চা আগে ঘটেছিল। এই তর্কের সমাধান হল, দার্শনিকেরা আগে তত্ব তৈরি করেন, এরপর ওর ব্যবহারিক রূপ তৈরি হয় ঠিকই। এরপরে আবার ঐ চর্চিত রূপ থেকে পুনরায় নয়া তত্ব-ও তৈরি হতে পারে। কান্টের ক্ষেত্রে তাঁর তত্বের আগেই এর ব্যবহার শুরু হয়েছিল। পরে কান্ট সেসব ব্যবহারিক ধারণা থেকে সেগুলোকে তত্বায়িত করে সাজিয়ে যা এনেছিলেন সেটাই কানশিয়ান লজিক ও  রাশন্যালিটি ধারণা।

    “বিজ্ঞান” কী কোন জ্ঞানের শাখাঃ
    এদিকে বিজ্ঞান ধারণাটা নিয়ে আমাদের মধ্যে আবার এটা সবরোগের ওষুধ যেন এমন ধারণা আছে।  বিশেষ করে আপনি যদি ধর্ম কোপানোর বা নাকচ করার হাতিয়ার বুঝা ও ফেরি করা লোক হয়ে থাকেন। তাদের ধারণা হয়ে থাকে বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম বা ধর্মতত্ব-কে (Theology) পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু আসলেই কী তাই???

    দুঃখিত, তা অবশ্যই না।
    এমনিতেই থিওলজি ও বিজ্ঞান দুটা সমতুল্য ক্যাটাগরি নয়। থিওলজিকে যে অর্থে জ্ঞানের একটা ব্রাঞ্চ বা শাখা বলা যায়। তাহলে বিজ্ঞান কী কোন জ্ঞানের শাখা???  আমরা যেমন ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বাইলজি বা ইতিহাস, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন জ্ঞানের শাখা সম্পর্কে সম্পর্কে জানি; তাহলে বিজ্ঞানও কি তেমন আরেক জ্ঞানের শাখা? অবশ্যই না। আবার সাইন্স, আর্টিস, কমার্স সমাজ-বিজ্ঞান কিংবা শিল্পকলার কোন শাখায় পড়াশুনা করি তেমনই আর্টস বা শিল্পকলাতেও কী বিজ্ঞান থাকে? এর জবাব কি হবে??
    আপাতত দ্রুত জবাবে চলে যাব, কারণ কম কথা বা মূল কথায় এর জবাব হল – বিজ্ঞান নিজে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বা ইতিহাস এর মত কোন জ্ঞানের শাখা নয়। তাহলে বিজ্ঞান কী? বিজ্ঞান হল জ্ঞানের পদ্ধতি বা  এক চিন্তা পদ্ধতি। আর সেকারণে শিল্পকলাতেও বিজ্ঞান থাকা সম্ভব আর তা সত্যিই আছে। মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে।  সব জ্ঞানের শাখাই বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিতে অগ্রসর হওয়া বা জানা হয়ে থাকে।  মানুষ মাত্রই আবার রাশনাল এন্ড বিয়ন্ড (rational & beyond) । মানুষ রাশনাল অবশ্যই কিন্তু একই সাথে একে ছাড়িয়েও (Beyond) আরও অনেক কিছু। এই ছাপিয়ে যাওয়া বা ট্রান্সশিয়েন্ট (transient) – এটাও র‍্যাশনালিটির উপরে মানুষের আরেক স্বভাব বৈশিষ্ট।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    অসমাপ্ত, বাকিটা দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে দেখুন।
    দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক এখানে https://wp.me/p1sCvy-4lO

    [এই লেখার একটা প্রথম ভার্সান আগে  একটা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। পুরানা সেই লেখার লিঙ্ক দেখেন এখানে।   আর তা ছাপা হয়েছিল গতমাসে মানে গতবছর, ৩ ডিসেম্বর ২০২২ ও তা হয়েছিল ইসলামি ছাত্র আন্দোলন এর কেন্দ্রীয় সম্মেলনের স্মারকে প্রকাশিত প্রকাশনায়। স্বভাবতই সেটা প্রথম ভার্সান বলে তা এখানে এই সর্বশেষ ফাইনাল ভার্সান এর চেয়ে আকারে অনেক ছোট ছিল। আমার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত  বর্তমান এই রচনা ফাইনাল ভার্সান বলে বিবেচিত হবে। যদিও দু ভার্সানের লেখার নামে  অনেক ফারাক করে দিয়েছি, গুহুবহু একই নাম রাখি নাই। আশা করি লেখাটা উপভোগ্য হবে। এই ই-মেল ঠিকানায় প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।]